তাইওয়ান-আগুন ছড়ানো না, বাইডেনকে দায়িত্ববান হতে হবে


তাইওয়ান-আগুন ছড়ানো না, বাইডেনকে দায়িত্ববান হতে হবে

গৌতম দাস

০৮ আগস্ট ২০২২, ২৩ঃ২২ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-4c

 

Democratic foreign policy experts divided on Pelosi’s trip to Taiwan: ‘good for her,’ ‘not a good idea’

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগেই যাচ্ছে নাকি! গত সপ্তাহজুড়ে দুনিয়ার কোনায় কোনায় এই আশঙ্কা-আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘পাগলা বাইডেন’ কি ক্রমান্বয়ে সব খুইয়ে এখন চীনের সাথে যুদ্ধ লাগিয়ে দেবেন? আর তা থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জল্পনা এজন্য; কারণ, এমন যুদ্ধ একবার লেগে গেলে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ! মানে বাইডেনের এই পাগলামি হল, শিশু বয়সে খেলাপাতি খেলার বয়সকালে শিশুরা সময়ে যেমন “হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে” আচরণ করে বসে, সেটাই। কিন্তু বাস্তবে কোন অর্থেই বাইডেন শিশু নন, খেলাপাতি খেলার বয়েসেরও না। বরং তিনি এতই বয়স্ক যে কারণে তার দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই বলে নিজের দলেই আলোচনা আছে। তাহলে শিশু বয়সের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য বেমানান আচরণ তিনি কেন করছেন? সে এক বিরাট বিস্ময় বটে!

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে সরাসরি ফোনে কথা বলেও তাদের স্পীকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের উস্কানি তৈরি না করাতে রাজি করাতে পারেন নাই। ফলাফলে চীন সব ধরণের চীন-আমেরিকার যোগাযোগ মাধ্যম প্রটোকল যা তৈরি হয়েছিল যা উভয়পক্ষের জন্য বিশেষ সহযোগিতা এক ব্যবস্থা রচনা করেছিল তা এরপর থেকে কাট-অফ করে দেয়। কোন আমেরিকার দিক থেকে আসা ফোনকলে সাড়া দেয়া বন্ধ রেখেছে চীন। এরপর আমেরিকার হুশ আসে। ইন্দোনেশিয়া সফরে থাকা আমেরিকান পররষ্ট্রমন্ত্রী এন্থনি ব্লিঙ্কেন এনিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে কিছুটা দুঃখ করেন, কিছুটা চীনকেই ‘দায়ীত্বহীন’ বলে দোষারোপ করেন [Blinken chides China’s ‘irresponsible’ cut in U.S. communication]।

বাইডেন প্রশাসনকে থমাস ফ্রিডম্যানের কলামের কষাঘাতঃ
থমাস লরেন ফ্রিডম্যান [Thomas Loren Friedman] একজন নামকরা সাংবাদিক ও বই লেখক। তিনি তিনবারের পুলিৎজার পুরস্কার প্রাপ্ত সাংবাদিক। প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট চেষ্টা করেন তাঁর নিজের গুরুত্বপুর্ণ পলিসি ডিসিশন জনসমক্ষে প্রকাশ করার সময় ফ্রিডম্যানকে হোয়াইট হাউজে ডেকে সাক্ষাতকার দিয়ে থাকেন যাতে পাবলিকের কাছে ফ্রিডম্যানের যে একটা ইতিবাচক ইমেজ আছে সেটা তিনি ব্যবহার করতে পারেন। এই আমেরিকার পুরস্কারপ্রাপ্ত নামকরা সাংবাদিক ফ্রিডম্যান পেলোসির তাইওয়ান সফরে যাওয়া প্রসঙ্গে খুবই অসন্তুষ্ট এক প্রতিক্রিয়া-মন্তব্য কলাম লিখেন নিউইয়র্ক টাইমসে। তাতে তিনি পেলোসিকে [ …she will be doing something that is utterly reckless, dangerous and irresponsible.] অবিবেচক, বিপদজনক ও দায়ীত্বজ্ঞানহীন বলেছেন। ফ্রিডম্যানের এত ক্ষেপে উঠার মূল কারণ, তিনি বলতে চাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপুর্ণ পদে থাকে ব্যক্তিরা এমন দায়ীত্বজ্ঞানহীন আচরণ করতে পারেন না যাতে বড় ধরণের যুদ্ধ কোন বিশ্বযুদ্ধে দুনিয়া জড়িয়ে যায়।
ফ্রিডম্যান আসলে নিউইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলাম লেখক। তিনি তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে সেখানে আসলে “দায়ীত্ববান নেতৃত্বের আচরণ” করতে কে ঘাটতি দেখাচ্ছে সেই প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর দাবি, পেলোসির এই সফরের ফলে “তাইওয়ান আরও সুরক্ষিত হয়ে যাবে না কারণ আপনার এটা ত ছিল এক প্রতীকী সফর। বরং এথেকে অনেক খারাপ জিনিষ এখন উঠে আসবে, জন্ম নিবে” [Taiwan will not be more secure or more prosperous as a result of this purely symbolic visit, and a lot of bad things could happen]। আপনাদের তাইওয়ান উস্কানিতে চীনের সামরিক জবাব দেয়া যদি শুরু হয়ে যায় তাতে আমেরিকা আরো গভীর সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে যাবার হুমকি তোইরি করবে। আর সেখানে আমেরিকাকে একইসাথে দুইটা ফ্রন্ট খুলে দুই পারমানবিক-অস্ত্র-সজ্জিত রাশিয়া ও চীনকে মোকাবিলার বিপদজনক পরিস্থিতি নিজের জন্য তৈরি করা হবে! অথচ যার কোন মানে হয় না!!
তিনি আরো বলেছেন, আমেরিকান প্রশাসন যদি মনে করে থাকে যে তাইওয়ানে সফর করে তাথেকে উস্কানি তুললে আমেরিকান ইউরোপীয় বন্ধুরা আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে যাবে তবে বুঝতে হবে দুনিয়া সম্পর্কে আপনাদের ধারণা কত ভুল ও ভিত্তিহীন [will join us if there is U.S. conflict with China over Taiwan, triggered by this unnecessary visit, you are badly misreading the world.]
ফ্রিডম্যান আরো বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ন্যাটো ও আমেরিকা যখন ইউক্রেনকে ভারি অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছেন তখন আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান চীনকে অনুরোধ করেন যাতে চীন রাশিয়া কোন সামরিক সহায়তা শুরু না করতে তাতে চীন ইতিবাচকভাবে ও দায়ীত্বপুর্ণভাবে আমেরিকার পক্ষে সাড়া দিয়েছে [By all indications, U.S. officials tell me, China has responded by not providing military aid to Putin ]। অথচ বিপরীতে আমেরিকান প্রশাসনের আচরণগুলো দায়িত্বজ্ঞান শুন্য!! ফলে অগ্রহণযোগ্য!

স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির বেপরোয়া তাইওয়ান সফরের জিদঃ
মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, তাঁর এবারের এশিয়া সফরসুচিতে তাইওয়ান সফর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অথচ কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই গত ২ আগস্ট তাইওয়ানের ভুমিতে তিনি নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু সেটা তিনি করেছেন যেন যুদ্ধ করতে এসেছেন।। কিন্তু কেন এমন যুদ্ধ সাজের রব?

ঘটনার সূত্রপাত যদিও অনেক আগের। তবে এর চলতি রূপ হল, গত বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং পেলোসির তাইওয়ান সফরের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, “আগুন নিয়ে খেললে পুড়তে হবে”।
বিবিসি বাংলা লিখেছে, মার্কিন ‘যুক্তরাষ্ট্র বলে, তাইওয়ান কোনো স্বাধীন দেশ নয়, কিন্তু একই সাথে তারা তাইওয়ানকে মিত্র বলে গণ্য করে”। কিন্তু যে দেশ স্বাধীন নয় বলেই আমেরিকা মানে অর্থাৎ যেই তাইওয়ান কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয় বলে আমেরিকা নিজেই মানে সেই তাইওয়ান আবার আমেরিকারই “মিত্র” হয় কেমন করে??? দেখা যাচ্ছে বিবিসিও বাইডেনের এই গভীর স্ববিরোধিতার পক্ষে দাঁড়াতে চাচ্ছে না। যেন এটা হল, কোন বিদেশী রাষ্ট্র মোদিকে পাশ কাটিয়ে, না জানিয়ে যেমন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে স্বীকৃতি বা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না; করার মানে হয় না; সেরকম। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ ভারত থেকে স্বাধীন কোন ভূখণ্ড নয়। তাহলে তাইওয়ান কোন স্বাধীন দেশ-ভূখণ্ড নয় স্বীকার করেও আমেরিকা কেন তার সাথে মিত্রদের মতো আচরণ বা তাকে সামরিকভাবে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিতে চায়?

আবার জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবরে গৃহিত সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব হল, চীন বলতে ‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়না’ (PRC) বা মাওয়ের চীনই, এটাই একমাত্র চীন। ফলে তাইওয়ান এই একক চীনেরই ভূখণ্ড অংশ মাত্র। জাতিসঙ্ঘ তাই এর বাইরে না গিয়ে, তার চোখেও তাইওয়ান কোন স্বাধীন দেশ-ভূখণ্ড নয় মনে করে। 1971 25 oct UN 2758 Restoration of the lawful rights of the People

এছাড়াও, চীন কোন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়্র জড়িত হয় বা ঐ দেশকে স্বীকার বা স্বীকৃতি দেয় তখনই যখন “চীন বলতে” সেটা PRC এই একটাই চীন – এটা তারা স্বীকার করে নেয়। আর এটাই চীনের ‘একচীন নীতি’। আমেরিকাও এটা স্বীকার করে নিয়েছিল বলেই ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকার প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটেছিল। তবে এর পরেও কোন দেশের তাইওয়ানের সাথে অনানুষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক হতে পারে। যেমন, এখনো তাইওয়ানের সাথে খোদ চীনেরই “এমন সম্পর্ক” আছে। এবং চীনে তাইওয়ানের মোট রপ্তানির পরিমাণ ১৮৮ বিলিয়ন ডলার; যেটা আবার তাইওয়ানের মোট রপ্তানির ৪০%।
কাজেই সব মিলিয়ে ন্যান্সির এই সফর পরিপূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন উসকানিমূলক; একটা সেটল জিনিষকে ফের খুচিয়ে ঘা করা!! আর ঠিক এ কথাটাই সাহসের সাথে কলাম লিখে বলেছেন নিউইয়র্ক টাইমসের নামকরা সাংবাদিক থমাস ফ্রিডম্যান।

Pelosi, 82, is a close ally of U.S. President Joe Biden, both being members of the Democratic Party, and has been a key figure in guiding his legislative agenda through the U.S. Congress. – REUTERS

আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদের স্বাধীনতার’ বকোয়াজিঃ
যেন বিভ্রান্ত না হই যে পেলোসি আর বাইডেন একই ডেমোক্রাট দলের দুই কর্তৃত্বস্থানীয় কর্তা। এবং যারা একই এজেন্ডার রাজনীতি ও পলিসির পক্ষে কাজ করে থাকেন। অর্থাৎ তাদের ঘনিষ্ঠতাও যথেষ্ট। থাগুলো লিখেছে রয়টার্স
এরপরেও এখন কথা উঠেছে, বাইডেন নাকি স্পিকার ন্যান্সিকে তাইওয়ান সফরে না যাওয়া নিয়ে কিছুই বলেননি; এমনকি না যেতে পরামর্শও রাখেননি। অপরদিকে যদিও কিছু মিডিয়ার দাবি আমেরিকার আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোতে তাদের কংগ্রেসের (সংসদের) স্পিকার হলেন তিন নম্বর ব্যক্তি; মানে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই, তাই। কিন্তু বিবিসি বাংলা এক সাফাই দিয়ে লিখেছে যে, “প্রেসিডেন্ট বাইডেন অবশ্য ন্যান্সি পেলোসিকে থামানোর চেষ্টা করেননি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস হচ্ছে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন”।
আবার এই বক্তব্যের বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সাংবাদিক থমাস ফ্রিডম্যান। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, “প্রেসিডেন্টের উচিত ছিল ন্যান্সিকে তাইওয়ান না যেতে পরামর্শ দেয়াঃ।’ অর্থাৎ এর মানে হল, প্রেসিডেন্ট না যেতে নির্দেশ দিতেই যদি পারেন, অন্তত পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের আছে ও ছিল যা প্রেসিডেন্ট ব্যবহার করেননি তাই জানা যাচ্ছে এখান থেকে [But the president did not call her directly and ask her not to go, apparently worried he would look soft on China, …]।

তার চেয়ে বড় কথা, এ কেমন ‘সংসদীয় স্বাধীনতা’ যে, বাইডেন তিনি একজন সর্বময় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট; আর তাঁরই পররাষ্ট্র নীতি উল্টে দিতে বা হাত ঢুকিয়ে দিতে পারেন কংগ্রেসের স্পীকার??? এটা অ্যাবসার্ড। এক খামোখা বকোয়াজের নীতি অবশ্যই – যদি তা সত্যি হয়ে থাকে। কাজেই এমনটা হওয়ার কথা না। আমেরিকা রাষ্ট্র এত অসংলগ্নভাবে পরিগঠিত হয়নি। আবার পেলোসির এই সফর – এই আচরণের বিরুদ্ধে চীনের প্রতিক্রিয়া দেখেন – এখানে চীন কোনো ভিন্নতা দেখায় নাই যে এটা বাইডেনের এক্ট না!! এটা স্পীকার পেলোসির এক্ট তাই ভিন্নভাবে দেখতে হবে এমন না। থাকার কথাও না। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আর স্পিকারের আচরণ- আমেরিকা এ দুই আচরণকে চীন ভিন্নভাবে দেখেনি, দেখবে না। চীনের কাছে দুটোই একই আমেরিকান প্রশাসনের উসকানি এবং চীনবিরোধী হস্তক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।

আসলে লক্ষ্য করলে দেখব, ‘স্বাধীনতা’ এই শব্দের সাথে সাথে সব ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার ‘দায়দায়িত্ব’ এই কথাটাও চলে আসে। যার সারার্থ হল, স্বাধীনতা ভোগ করতে চাইলে দায়িত্ববান হতে হবে, দায় নিতে জানতে হবে। তাহলে কথিত স্বাধীন পেলোসির সফরের কারণে যদি বিশ্বযুদ্ধ লেগে যায় তবে এর দায় কার হবে – স্পিকারের নাকি প্রেসিডেন্টের? আবার স্পিকার কি যুদ্ধ পরিচালনার নির্দেশ দিতে ক্ষমতা রাখেন না? সেটা এককভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের একক এখতিয়ার; নয় কী? কাজেই ‘স্পিকারের স্বাধীনতা’ নামক হাস্যকর কথা বলা – এটা আসলে মাথা খারাপ লোকেদের তত্ত্ব!

স্পিকার ন্যান্সির তাইওয়ান সফর গুটানোর পরেঃ
স্পিকার ন্যান্সি এখন সফর গুটিয়েছেন, তিনি তাইওয়ান ছেড়ে পরে জাপান সফরও শেষ করে এখন দেশের পথে; ৪ আগস্ট সকালে তিনি তাইওয়ান ছেড়েছিলেন। আর এরপর থেকেই তাইওয়ানকে ঘিরে ধরে চীন লাইভ এমুনেশনে (সক্রিয় গোলাবারুদ) সামরিক মহড়া শুরু করেছে, যদিও এটা এখনও ঠিক যুদ্ধ শুরু না। তবে তাইওয়ান তাতে আত্মরক্ষামূলক প্যাসিভ বা নিস্ক্রিয় মুডে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। আর না গেলে চীনের এই আগ্রাসী অবস্থানের কারণে গোলা খেতে হত, না হলে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে হত।
তবে বড় লক্ষ্যণীয় ঘটনা হল, ন্যান্সি এখন সফর গুটিয়ে নেওয়ার পর থেকে এনিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার সুরও বদলাতে থাকে। যেমন ইকোনমিস্টের শিরোনাম হয়ে যায়, “পেলোসি তাইওয়ান ছেড়েছেন, আসল সঙ্কট শুরু হবে এখন” [ Nancy Pelosi has left Taiwan. The real crisis may be just beginning]। আর বিবিসির শিরোনাম, “তাইওয়ানঃ ন্যান্সি পেলোসির সফর যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক চীন’ নীতিকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে“।

আর বিবিসি ভিতরে লিখছে, ‘গত ২৫ বছরের মধ্যে ন্যান্সি পেলোসি হচ্ছেন তাইওয়ান সফরে যাওয়া সবচেয়ে উচ্চপদস্থ মার্কিন রাজনীতিক। চীন-মার্কিন সম্পর্ক এমনিতেই ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন সেটাকে ঠিক করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তখন ন্যান্সি পেলোসির এই সফর যেন তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক টেনে আরো নিচে নামাল”।

তাহলে পেলোসি এমন সফর করতে গেলেন কেন? কী লাভ বা অর্জন হল এতে?

বিবিসি আরো বলছে, “তাইওয়ান নিয়ে এই যে একটা ধোঁয়াটে অবস্থান, সেটা সবাই মেনে চলে এবং কেউ নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য একটা আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয় না। কারণ সেখানে ভঙ্গুর একটি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এটাকেই ‘মন্দের ভালো’ বলে মনে করে সবাই”।

তাহলে এই ‘ধোঁয়াটে অবস্থান’ বা এই ‘মন্দের ভালো’টাকেই ভেঙে ফেলতে পেলোসি এমন মরিয়া সফরে গেলেন কেন? এর জবাব নেই!

বিবিসি আবার বলছে, “কিন্তু তাইওয়ান নিয়ে এই যে, একটা পরস্পর-বিরোধী অস্পষ্ট অবস্থান, সেটার ওপর হঠাৎ যেন খুব কড়া আলো ফেলেছে মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির ওই দ্বীপে এক সফর। চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে সেটি তৈরি করেছে বড় ধরনের টানাপড়েন”।

কিন্তু ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে সব বিবাদ মিটিয়েই তো “এক চীন নীতি” মেনে নিয়ে আমেরিকা সম্পর্ক শুরু করেছিল। তাহলে ক্রমান্বয়ে এই ‘সম্পর্কের টানাপড়েন’ আবার কেন? নতুন করে ‘অস্পষ্টতা’ তৈরি কেন?

আসলে বিবিসির এই রিপোর্ট নিজেই সব (বাইডেনীয়) স্ববিরোধিতার দিকগুলো তুলে এনেছে। যেমন বিবিসি এতে আরো দুই এক্সপার্টের মন্তব্য নিয়ে এসেছে। এদের একজন হলেন সাবেক কূটনীতিক ড্যানি রাসেল। তিনি এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের একজন বিশ্লেষক। তিনি বলছেন, “বিশ্বে এখন আরো যেসব সঙ্কট মোকাবেলায় বড় দুই পরাশক্তির (চীন-আমেরিকার) মনোযোগ দেয়া দরকার, সেই চেষ্টায় আগে থেকেই ঘাটতি দেখা যাচ্ছিল, এখন সেটা যেন আরো বেশি পণ্ড হয়ে যাবে”।
“যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় সবচেয়ে উপরের দিকে আছে রাশিয়ার প্রতি চীনের যে কূটনৈতিক সমর্থন, সেটা কিভাবে থামানো যায়। এরপর চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ তো আছেই। এরপর জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলা এবং উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র নিয়েও চীনের সহযোগিতা আশা করে যুক্তরাষ্ট্র।’ তার মানে সবকিছু একেবারে ভেস্তে দেওয়ার দিকেই বাইডেন হাঁটলেন”।

আরেক এক্সপার্টের কথা বলেছে বিবিসি। তিনি জার্মান মার্শাল ফান্ডের একজন বিশেষজ্ঞ বনি গ্লেসার। তিনি এক মারাত্মক কথা বলেছেন এভাবে, তাইওয়ানের ইস্যুটি এখন ‘বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন’ সামনে নিয়ে এসেছে। বলছেন, আমার মনে হয় না প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এখন আর জো বাইডেনের কথায় আস্থা রাখতে পারবেন। বনি গ্লেসার আরো বলছেন, তাইওয়ানের ব্যাপারে এখন যে একটা ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ আছে, তার পরিবর্তে এখন আসলে সবার উচিত যার যার ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা কোথায়, সেটা পরিষ্কার করে বলে দেয়া। আর এজন্য দরকার একটি অকপট আলোচনা

আসলে সমস্যাটা এখানেই। কারণ এখন সবকিছুকেই বাইডেন ‘কপট’ বানিয়ে ফেলেছেন।

আসুন, বাইডেনের কপট অবস্থানের কিছু আলামত দেখি!
২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দু’বছর হয়নি, কিন্তু এপর্যন্ত বারবার তাইওয়ান প্রসঙ্গে বাইডেনকে মাফ চেয়ে বলতে হয়েছে যে, আমেরিকান পুরান তাইওয়ান নীতি বা এক চীন নীতিতে আমেরিকা এখনো অনড় আছে – এটা কয়েকবার বাইডেনকে বলতে হয়েছে।কারণ, বারবার তিনি এই প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গেছেন। এরই সর্বশেষটা হল, গত ২৪ মে ২০২২। বাইডেন ঐদিন টোকিওতে কোয়াড মিটিং করতে গিয়ে একদিন আগে তারই করা মন্তব্যের জন্য মাফ চান। যেমন আমেরিকান মিডিয়া সিএনবিসি’র এনিয়ে করা নিউজের হেড লাইন হল, ‘বাইডেন বলেন, তার তাইওয়ান নিয়ে মন্তব্য থেকে আমেরিকান পলিসিতে কোনো পরিবর্তন হয়েছে মনে করা ঠিক হবে না, যা চীনকে বিরক্ত করেছে”। কেন বাইডেন সেবারও সমস্যায় পড়েছিলেন? কারণ তিনি আগের দিন বলে ফেলেছিলেন যে ‘তার প্রশাসন সামরিকভাবে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে আগ্রহী” [Biden says U.S. willing to use force to defend Taiwan — prompting backlash from China]। তাই পরদিনই তার ‘থুক্কু’ বলা! এভাবে নিয়মিতই তিনি মাফ চেয়ে যাচ্ছেন। মানে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন অথচ মুখে লাগাম নাই!!!

এ ঘটনার পরে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী জ্যাক সুলিভানও আবারও মাফ চাওয়ার মত বলতে হয় যে, আমেরিকা এখনো ‘একচীন নীতিই’ আঁকড়ে আছে; কোনো বদল হয়নি। বাইডেন গত ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকে এভাবে অন্তত চারবার মাফ চেয়ে বা “ভুল না বুঝতে অনুরোধ করে” বলে চলেছেন যে, আমরা ‘একচীন নীতিতেই আছি’। এক কথায় ব্যাপারটা বাইডেন একেবারে ছেঁচড়ামোর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাই পেলোসির সফরের পরে জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশেষজ্ঞ বনি গ্লেসার এমন মন্তব্য করছেন যে, ‘তিনি মনে করেন না আর বাইডেন চীনের বিশ্বাসযোগ্যতায় থাকতে পারবেন”।
বাইডেনের ধামাধরা জি৭ গ্রুপ বিভক্তঃ
এই প্রসঙ্গে আমেরিকান ফক্স নিউজের শিরোনাম হল “Democratic foreign policy experts divided on Pelosi’s trip to Taiwan: ‘good for her,’ ‘not a good idea”। অর্থাৎ পেলোসির সফরকে নিয়ে জি৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা – “সবার নয় পেলোসির জন্য ভাল” আর ওদিকে “এটা ভাল আইডিয়া না” এদুই ব্লকে বিভক্ত। তবে এই জি৭ দেশ মানে এককালের বড় অর্থনীতির দেশ বলে গুরুত্ব পেত যারা যেমন আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, জর্মানি, ইটালি, যুক্তরাজ্য জাপান। ২০০৯ সালের পর থেকে এই গুরুত্ব হারিয়েছে; নয়া গ্রুপ জি২০ এর কাছে। যাই হোক এদেরকে এখানে যদিও এক ফলস মুকুট লাগিয়ে বলা হচ্ছে কথিত ডেমোক্রেসিস মানে “ডেমোক্রেসি” আছে এমন দেশগুলো এই ফুটানির চিহ্ন টাঙ্গিয়ে বলা হচ্ছে; মূলত চীন বা রাশিয়াকে নিচা দেখানোর জন্য।
আবার ইইউ এর মিডিয়া বলতে পলিটিকো নামের আরেক মিডিয়া গতমাসে লিখেছিল বাইডেন নাকি বলেছিলেন, আমের মিলিটারি মনে ক।..।..।।।।।

কেন বারবারন অবশ্য পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, বাইডেন গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচতায় আগ্রহ দেখানোর আগে থেকেই যে হবু পলিসির কথা ভেবেছিলেন সেখানেই এটা ছিল যে – ‘তিনি চীনবিরোধী একটা ‘পশ্চিমা ব্লক’ বা ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ জমায়েত করবেন; ইইউকে সাথে নিয়ে; যার মূল ইচ্ছা-করণীয় হবে চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে চলে আসা ঠেকানো; যদিও এটা একটা অসম্ভব কল্পনা মাত্র। কারণ এটা প্রাকৃতিক ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়কে যেমন মানুষ ঠেকাতে পারে না তেমনই ফেনোমেনা। কারণ, সাবজেক্ট-মানুষের পক্ষে কোন প্রাকৃতিক (অবজেকটিভ) ফেনোমেনাকে ঠেকানো অসম্ভব।

তবু সম্ভবত বাইডেন মনে করেন এটা জিদ ধরে বসে থাকলেই হয়ে যাবে। কেননা তিনি ইউরোপ বা ইইউকেও সাদা শ্রেষ্ঠত্বের সুড়সুড়ি জাগাতে পারবেন যে, চীনের গ্লোবাল নেতৃত্ব মানে গত ৫-৬ শ’ বছরের লাগাতারভাবে সাদাবাদীদের শ্রেষ্ঠত্ব যেটা চলে এসেছে; এই শাসন যাতে না লোপ পেয়ে যায়, এই ভয় দেখিয়ে তিনি ইউরোপকে সাথে রাখতে পারবেনই। এরই প্রথম ধাপ হল ইউক্রেনের যুদ্ধ লাগানো যেখানে তিনি রাশিয়াকে “বধ” করার খায়েস নিয়ে আগাচ্ছেন। এতে আরো কল্পনা ছিল যে, রাশিয়াকে উদ্ধার করতে পরে চীন এগিয়ে এলে সেও এতে জড়িয়ে যাবে এবং তা চীন সামরিকসহ সবভাবেই। কিন্তু এই শেষের অংশটা ঘটেনি। অর্থাৎ বাস্তবে চীন রাশিয়ার পাশে গেছে, থেকেছে ঠিকই কিন্তু সরাসরি কখনো সামরিকভাবে যায় নাই।

 

তাই এবার বাইডেনের সেকেন্ড উদ্যোগ হল, তাইওয়ান ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে চীনকেও উসকানো। যাতে সে সামরিকভাবে জড়ায়। কিন্তু সমস্যা হল, আমেরিকার এক চীন নীতিতে সম্মতি দেয়া আছে, চীন-আমেরিকার সম্পর্কের সেই শুরু থেকে, ১৯৭৮ সালের আগে থেকে। আর সে অবস্থান থেকে এখন বাইডেনের হাত-ধরে আমেরিকার সরে যাওয়ার মানে হবে, চীনের সাথে আমেরিকার যতসব ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে সব ভেঙে যাওয়া, ইতি টানা। সেটা আমেরিকান ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা সবাই মানে, বলতে একেবারে ওয়াল স্ট্রিট সংশ্লিষ্ট সবাই – এদের পক্ষে তা গ্রহণ করা অসম্ভব। কিন্তু এটা ছাড়া বাইডেনের হাতে আর কোন মোক্ষম অস্ত্র নেই। তাই লজ্জার মাথা খেয়ে বাইডেন বারবার একচীন নীতি ভাঙছেন আবার মাফ চাচ্ছেন।

এছাড়া এসবের সাথে বাইডেনের হাতে আরেক সাফাই বয়ান ঞ্জোগাড় করেছেন। সেটা হল, বাইডেন অ্যান্ড গং তার ভাষায় ওয়েস্টার্ন ফোর্স বা পশ্চিমা ব্লক এদের ‘মূল্যবোধ’ [VALUES] নাকি আলাদা, আর তা নাকি অনেক উন্নত। তুলনায় চীন, এরা যেন “ছোটলোক”!!! আর এর ইঙ্গিতেই প্রায় সব জায়গায় বাইডেনের সঙ্গী-সাগরেদরা বলে থাকেন – তারা হলেন ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের’ [rulesbased international order,”] পক্ষের লোক। মানে হল , ১৯৪৫ সালে গঠিত যে ‘জাতিসঙ্ঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক’ ইত্যাদি, এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে “গ্লোবাল ব্যবস্থা”; মানে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার গড়ে উঠেছিল সেটা আমেরিকার নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল। তাই তারা শ্রেষ্ঠ। আর এখন আগামীতে চীনের নেতৃত্বে যা কিছু গড়ে উঠবে এটা নিচা মুল্যবোধেরই হবে কারণ, এরা নিচা জাত। ফলে এখন এটা বাইডেন গংয়ের কাছে মূল্যবোধের লড়াই – এই বুলিতে খই ফুটতে শুরু করেছে। তবে এটাই কিন্তু “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব” – এই রেসিজমের সাফাই বয়ান। আর এর ওপর ভর করেই বাইডেন জিততে চান!!!

কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, আইএমএফকে পাশ কাটিয়ে খেয়াল খুশিমতো যাকে ইচ্ছা তাকে ডলার-অবরোধে ফেলে দেয়া; বাইডেন সাবের এটা কোন ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের’ কাণ্ড? রুলের কথা যদি তোলে, তবে আমেরিকাকে মানতে হবে যে, আইএমএফ-ই এক সঠিক অথরিটি যারা ডলার-অবরোধ কাউকে দিতে হলে তা নির্ধারণের বৈধ কর্তা। আইএমএফের বদলে এটা আমেরিকার খেয়ালে ইচ্ছামত আরোপ মানে হল, এটা আমেরিকার ক্ষমতার অপব্যবহার।

ঘটনা আরো বড় দিকও আছে। যেমন, আবার ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মাঝের মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে চীনের আমদানি-রফতানি-বন্দর আটকাতে যেতে হবে – কারণ এটাই চীনে নৌপথে বন্দরে পৌছানোর একমাত্র উপায়। অথচ আমেরিকা এই পথ বন্ধ করাই তার সামরিক স্ট্র্যাটেজিক কৌশলের চিন্তা। আমেরিকার সিনেট রিপোর্টে যেটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে – এমন এক আমেরিকান পদক্ষেপ এটা। এখন এই পদক্ষেপ কোন মহান “রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের” নমুনা? আপনি আরেকটা দেশে নৌপথে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করার পরিকল্পনা আটবেন – এটা কোন নিয়ম শৃঙ্খলার নমুনা, কোন মুল্যবোধের নমুনা বাইডেন সাহেব?

আর আমেরিকা এই মহান কাজে নেমে গিয়েছে বলে এতে স্বভাবতই, চীন নিজের জন্য বিকল্প পথ ও পোর্টে প্রবেশপথ খুঁজবে, নয়া কিছু গড়ে নিয়ে চেষ্টাও করবেই। এরই বাস্তব রূপ হল , গোয়াদর, হাম্বানটোটা, বার্মা, বাংলাদেশ ইত্যাদিতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে সেখান থেকে চীনের পশ্চিম দিক দিয়ে চীনে প্রবেশের রাস্তা, গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ খুলতে চেষ্টা করবেই। সেটাই চীন করছে। সবচেয়ে বড় কথা চীন যে বিকল্প পথ গড়তে আগাচ্ছে এটা একেবারেই অসামরিক; মানে বাণিজ্যিকভাবে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে।
ভৌগলিকভাবে দেখলে চীন সাড়ে তিন দিক দিয়ে ভূমিতে বা সুউচ্চ হিমালয়ের মত পর্বতমালায় আবদ্ধ এমন এক ভূখণ্ড। সেখানে ওর পুবদিকের একমাত্র বন্দরের প্রবেশপথ আমেরিকা বাধা দিয়ে বন্ধ করতে গেলে চীন তো বিকল্প বের করতে চাইবেই। অথচ এই চেষ্টা করলেই এবার প্রপাগান্ডা শুরু করা হয়েছে – চীন এসব বন্দর গড়ছে নাকি ভারতকে মুক্তমালার মতো চার দিক থেকে ঘিরে ধরার জন্য। ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা খুলে এবার তাদেরকে দিয়ে আমেরিকা-ভারত এই প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে বা গিয়েছে।

আবার ঠিক একই কারণে চীন, পূর্ব চীন সাগরে কোনো নিয়ম মেনে চলার পক্ষে নয় বরং তা না করে এতে নিজের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টার দিকে আমেরিকা তাকে ঠেলে দিয়েছে যেন। কিন্তু এবার বলা হচ্ছে চীন এখানে ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’ মানে না। জাতিসঙ্ঘের আনক্লজে (UNCLOS) ফিলিপাইনের সাথে বিরোধ মীমাংসায়, সে চীনের বিরুদ্ধে বাদী। ঐ সালিসীতে এক বিচারক বদলে দেওয়ার চীনা অনুরোধ উপেক্ষা করে এক জাপানি বিচারককে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
অথচ আনক্লজ – এটি তো কাউকে ঠিক শাস্তি দেয়ার কোনো আদালত নয়, (আদালত বললে আমাদের মাথায় যে কমন জিনিষটা ভাসে এটা তা নয়)। এটা আর্বিটেশন [arbitration ]. অর্থাৎ এটা বরং আর্বিট্রেশন মানে সালিশ আদালত ধরনের। মানে যেখানে আপসে সমাধান বের করা হয়; কাউকে সাজা-শাস্তি দেওয়া যেখানে উদ্দেশ্যই নয়। তাই এখানে বাদী-বিবাদী যেকোন পক্ষ থেকে বিচারক বদলে দেয়ার অনুরোধ করা যায়। অথচ সেই নীতি এখানে কাজ করতে দেয়া হয়নি। ফলে প্রতিবাদে চীন আর ওই আদালতে অংশ নেয়নি। ঐ সালিশের রায়ও বাস্তবে মানে নাই। অথচ প্রপাগান্ডা হল , চীন তাদের কথিত ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’ মানে না।
আর বিপরীতে তাদের দাবি মহান আমেরিকা নাকি অবাধে সমুদ্রে ঘুরেফিরে বেড়ানোর মুক্ত স্বাধীনতা চায়! আর চীন সেটা দিতে চায় না। এই হলো মুক্ত দুনিয়ার মানুষের কারবার!

আসলে, আমেরিকা কত মুক্ত দুনিয়ার মানুষ তা কী আমরা আমাদের ‘ওয়ান-ইলেভেন’ এর সময় বাস্তবে দেখিনি? ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেয়ার মুক্ত দুনিয়ার বাসিন্দা আমেরিকার কায়কারবার কি আমরা দেখিনি? এটাইবা কোন ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের’ অধীনে করা হয়েছিল? কে দেবে এর জবাব? হাসিনা বা আমেরিকা কেউ কি দেবে? আজ উল্টা হাসিনা আমেরিকার থাবায় আটকে পড়ে কান্নাকাটি করছে। কিন্তু পাবলিকের মুড হল যেন কাটা দিয়ে কাটা তোলার মত!! মনে হচ্ছে, আমেরিকার হাতে হাসিনা সরকার উতখাত হলেও পাবলিক সিমপ্যাথি সরকারের পক্ষে যাবে না। কারণ, হাসিনা এতদিন জনমত নিজের পক্ষে রাখার দায় অনুভব করে নাই, উপেক্ষা করে এসেছে।

এখানে একটা কথা আগাম স্পষ্ট রাখা দরকারঃ
এখানে বাইডেনের আমেরিকার নীতি-পলিসির স্ববিরোধ বা তাদের মুরোদ চলে গেলেও গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব ধরে রাখার মিথ্যা চেষ্টার বিরুদ্ধে কথা তুলেছি। কিন্তু এর মানে এই না চীন এসব ইস্যুতে ফিট বা যোগ্য। কথা পরিস্কার করে বলে রাখতে চাই চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হতে ফিট বা যোগ্য অবশ্যই। কিন্তু গ্লোবাল পলিটিক্যাল নেতা হতে নয়। তার আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র ধারণা ও কাঠামো যাই থাক গ্লোবাল অর্থে চীনকে প্রথমত হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স হতেই হবে। চ্যান্সেলার এঞ্জেলার মার্কেলের আমলে যে ভাব-বিনিময় ইইউ-চীন সামিট থেকে শুরু হয়েছিল তাকে পুর্ণতায় নিতেই হবে। যা সম্ভবত এখন বন্ধ হয়ে আছে। রাষ্ট্র আপন নাগরিককে গুম-খুন করতে পারে এটা চলতেই পারে না। এনিয়ে অবশ্যই সর্বসম্মতির গ্লোবাল স্টার্ন্ডার্ড থাকতে হবে। রাজনৈতিক-রাষ্ট্র ইস্যুতে চীনকে আপডেটেড হতে হবে। এটা নিজ সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন না। সার্বভৌমত্ব ধরে রাখা এই কথার আড়ালে নিজ দেশে নাগরিককে গুম-খুন জায়েজ করা যাবে না। তা থাকলে চীনের গ্লোবাল পলিটিক্যাল নেতা বা স্টান্ডার্ড ঠিক করার নেতা হবার কোন সুযোগ নাই।
কারণ, এতে আবার সবচেয়ে বড় বিপদ যে যে দেশ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা সে আবার পলিটিক্যাল নেতা নয়; অন্য কোন রাষ্ট্রের প্রভাব বা নেতৃত্ব এখানে শীর্ষে – সেটা হলে তা খুবই এবসার্ড ধারণা তৈরি হবে। চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো “রুজভেল্ট স্টাডিতে” খামতি আছে তা মনে হয় নাই। অন্তত অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলোতে। কিন্তু রুজভেল্টের রাজনৈতিক ভুমিকার দিকও আমল করতে হবে, তাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। আর এটা না হল, চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বও ধরে রাখা কঠিন হবে!

তাহলে কী বাইডেন তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধে জড়াতে চায়?
একেবারেই না। বরং বারবার চীনের সাথে যে আরেক খাতা খুলেছে। সেটা এই বলে যে আসেন আমরা একটা চুক্তি-বুঝাবুঝি করে নেই যে আমাদের মধ্যে যত বিরোধই থাক সেই বিরোধ যেন যুদ্ধে রুপান্তরিত না হয় তাতে আমরা এক সাথে কাজ করব এই অঙ্গিকার করি। বিস্ময়কর মনে হলেও বাইডেন এতাই করেছে গত বছর। এতাই গার্ড্রেল চুক্তি [GUARDRAIL]. যেমন সরকারি হোয়াইট হাউজের নথি দেখেন, এখানে [we will also continue to engage with the PRC at a senior level to ensure responsible competition.] কিন্তু পেলোসির তাইওয়ান সফর কী “responsible competition” এর মত কাজ হয়েছে?? অর্থাৎ বাইডেন আসলে এক দিশা হারা ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। আর কী চেয়ে কী করছেন এর কোন তাল-মিল নাই???

এজন্যই ক্রমশ বাইডেন মানুষের আস্থা হারাচ্ছেন। সকলেই ভীত যে এই মানুষটা কখন হতাশ হয়ে পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে না ঠেলে দেন। আর এখন করোনা-উত্তর দুনিয়াতে ইউক্রেন-যুদ্ধের ধকলে থাকার এসময়ে আবার নয়া তাইওয়ান যুদ্ধে দুনিয়া জড়িয়ে গেলে – যুদ্ধের গোলায় না, না খেয়ে মানুষ মরবে বেশি। ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদেরকে এজায়গায় নিয়ে ঠেকিয়েছে যে অর্থনৈতিক মন্দায় দুনিয়াতে এত নয়া নয়া চাপে এখন এক বিরাট সংখ্যক গণ-মানুষের খাদ্য কিনবার সামর্থই হারিয়ে গেছে। তাই আমরা সকলে আসলে সত্যি বা মিথ্যা মিথ্যা এক তাইওয়ান-যুদ্ধের মুখে আছি। যদি দায়ীত্ববান না হই, যে যুদ্ধের আগুনে আমরা সবাই পুড়ে মরে যেতে পারি!!!
মনে রাখা দরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্ত হলে পরে, ইতালিতে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল; মানে আমেরিকার নেতৃত্বের মিত্রশক্তির বিরোধী ইতালির শাসক ফ্যাসিস্ট মুসোলিনীর দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। আর সেটা যুদ্ধে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট হতে দেন নাই, ঠেকিয়েছিলেন। দুহাতে সাহায্য দিয়েছিলেন; আর সারা ইউরোপকে পুনর্বাসনের অর্থ বরাদ্দ তো দিয়েছিলেনই!!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা দৈনিক “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার ০৬ আগষ্ট ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে বাইডেনের তাইওয়ান-আগুন সবাইকে পোড়াবে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s