বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত


 

বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত
গৌতম দাস

https://wp.me/p1sCvy-4eU

২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০ঃ০১ রাত

সীমান্তে মর্টারশেলের অবিস্ফোরিত গোলা

 

চীনা নেতৃত্বে দল পাকানো বা জোট গঠন আর আমেরিকার নেতৃত্বে পুরানা ও নয়া জোট গঠন এদুই কাজ যেন সাম্প্রতিককালে ভীষণ দ্রুত আগানো শুরু হয়েছে। এরই এক প্রকাশ হল বার্মাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নড়াচড়া। দু-চারটা মর্টার বা গোলা বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে এসে পড়া বা এতে বাংলাদেশের দু-চারজন করে আহত-নিহত হওয়া – এসবই মূল ঘটনার খুবই ক্ষুদ্র কিছু বাইরের দিক।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি ট্রাম্পের আমলে (২০১৭-২০) যেমন ছিল – একে যদি বলি আমেরিকার তার গ্লোবাল নেতৃত্বের ততপরতা বা দায়ভার ফেলে তা  ট্রাম্পের ঝেড়ে অস্বীকারের অবাস্তব পথ ধরে চীন ঠেকাতে আভ্যন্তরীণমুখি ও জাতিবাদি হয়ে উঠার চেষ্টা; তাহলে পরবর্তিতে মানে চলতি বাইডেনের আমলটা হল, প্রকাশ্যে চীনবিরোধী করে নানান গ্লোবাল জোট পাকানো ও তা দিয়ে আগ্রাসী হয়ে যুদ্ধ-সহ সব সক্রিয় ততপরতা করা্র যুগে তিনি দুনিয়ার সবাইকে টেনে নিতে চাইছেন।

বিপরীতে চীনের দিক থেকে প্রতিক্রিয়ায় এসবের পালটা যেসব ততপরতা চীন ঘটিয়ে চলেছে সেসবের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বললে তা মূলত দুইটা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বা মাধ্যমেঃ এক. এসসিও [SCO] আর দুই.  ব্রিকস [BRICS] নামে ততপরতা।

চীনা ততপরতাঃ
এসসিও [SCO] – এটা এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-জোট যার নাম-সংক্ষেপ কে ভেঙ্গে বললে এর পুরা নাম ‘সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন’; তাই সংক্ষেপে SCO।  সাধারণত যেকোন আন্তর্জাতিক জোটকে মূল যে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; আর তা হল অর্থনৈতিক অথবা স্ট্রাটেজিক এভাবে। আর এই স্ট্রাটেজিক শব্দটাকে বাংলা করে বললে “কৌশলগত” এমন কোন জোট বলতে  বুঝতে হবে মূলত এটা সামরিক ও রাজনৈতিক (ছদ্ম-পলিটিক্যাল) বৈশিষ্ঠের জোট। এভাবেই তা হাজির হতে চেষ্টা করছে। যদিও বেশিরভাগ জোটই মূলত অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জোট হয়ে থাকে যেমন আসিয়ান, সার্ক ইত্যদি।

নয়া ধারার জোটঃ
কিন্তু যদি সুস্পষ্ট করে একালে বলি, ধরাধরি শুরু হয়ে গেছে মানে বলতে চাচ্ছি  কোন দেশ  – চীন না আমেরিকা – কার সাথে বিশেষ ঘনিষ্ট হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে গেছে এই অর্থে, আরেক ধরণের নয়া ধারার জোট হতে দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে চীনা না হয় আমেরিকান জোট।

নয়া ধারার জোট, মানে কী বলতে চাচ্ছি। যেমন আগে মানে গত শতকের নব্বই দশক জুড়ে তখনও জোট হত মূলত অর্থনৈতিক। যা এরপর থেকে ক্রমশ মুল উদ্দেশ্য আড়ালে রেখে (চীনের দিক থেকে বললে) তা চীনের নেতৃত্বে নয়া ধারার জোট গঠন বা গঠনের ইঙ্গিত শুরু হয়েছিল। আর এতে ‘মুল উদ্দেশ্য আড়ালে’ বলতে বুঝিয়েছি তা যে আসলে আমেরিকাবিরোধী সেটা প্রকাশ্যে কোথাও উল্লেখ না রেখে ততপর হওয়া। তুলনায় যেমন – ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব জোট বা সব আন্তর্জাতিক ততপরতাই আসলে বাই ডিফল্ট হয়ে যেত কার্যত আমেরিকান উদ্যোগে বা আমেরিকান নেতৃত্বের জোট। আর ঠিক এর বিপরীতে সোভিয়েত যুগ শেষে একালে  নয়া ফেনোমেনা হিসাবে হাজির হয়ে চলছে চীনের উদ্যোগে বা নেতৃত্বে জোট গড়ে তোলা।
তবে  চীনের দিক থেকে সেটাকে স্পষ্ট করে আমেরিকাবিরোধী সেটা উল্লেখ না করেই তা করা শুরু হয়েছিল যেমন এই এসসিও জোট গড়া থেকে। এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ২০০১ সালে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ২০০১ সালের হলেও তা ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা হামলার বেশ কয়েকমাস আগের ঘটনা। ফলে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এটা ছিল এক অঘোষিতভাবে আমেরিকাবিরোধী জোট।  যা মূলত চীন ও রাশিয়ার সেই প্রথম কাছাকাছি আসা।  আর এটা ছিল ১৯৫৮ সালের পরে সেই প্রথম চীন-রাশিয়ার কাছাকাছি আসা যখন ঐ ১৯৫৮ সালের আগে দুদেশই “স্টালিনবাদী কমিউনিস্ট” দেশ ছিল। আর এর চেয়েও বড় কথা ২০০১ সালে এসে তারা দুদেশের কেউই আর কমিউনিস্ট দেশ নয়।
কেউ কোনদেশ আর কমিউনিস্ট কিনা এর একটা ভাল মাপকাঠি হতে পারে, সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য কিনা। সদস্য না হলে সে তখনও কমিউনিস্ট – এটা একটা ভাল মাপকাঠি। বিশেষ করে যদি আমরা এই ফ্যাক্টস মনে রাখি যে,  পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে ভেঙ্গে গেলে এরপরে রাশিয়াসহ মোট ১৫ রাষ্ট্রে তারা আলাদা বিভক্ত হয়ে যায়। আর এরপরেই রাশিয়াসহ ১৫ রাষ্ট্র সকলে এই প্রথম আবেদন করে আইএমএফের সদস্য হয়ে গেছিল। আর ওদিকে মাওয়ের নেতৃত্বের চীন (বা নয়া চীন) মানে চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনীতিক অস্বীকৃতির চীন ছিল সেটা – সেই চীনে  ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জারের প্রথম গোপন চীন সফরের পরে চীন-আমেরিকার ডিল শুরু করেছিল। আর পরে এথেকেই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনীতিক স্বীকৃতি ঘটে – ইত্যাদি এসব ঘটে যাবার পরে তখন ১৯৮০ সাল থেকেই নয়াচীনও প্রথম আইএমএফের সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

এসব কথাগুলো মনে রাখলে আমরা সহজেই মানব যে আইএমএফের সদস্যপদ নেওয়া মানে সে আর কমিউনিস্ট দেশ নয় হয়ে যাওয়া – এর একটা ভাল মাপকাঠি।
এই বিচারে  চীন ও রাশিয়া প্রথম জোটবদ্ধ দেশ হচ্ছে এসসিও [SCO]-তে ২০০১ সালের শুরু থেকে আর যখন এদুই দেশ কিন্তু আর কমিউনিস্ট দেশ নয়। এরচেয়েও বড় কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে তারা কার্যত আমেরিকাবিরোধি হলেও এর কারণ তারা আগে ‘কমিউনিস্ট ছিল’  এমন কোনই কারণে নয়। মুলকথা এই শতকেও যারাই আমেরিকানবিরোধি ফলে  তারা নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট – এমন ভুল ধারণ অচল তাই এই ভুল অনুমানকে যেন আমরা জেনে-না জেনে আমাদের চিন্তার ভিত্তি না বানায় ফেলে থাকি, এই সতর্কতা দরকার।

যদিও শুরুতে এসসিও এর জন্মানোর ভিত্তি ছিল যে – সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয়টা দেশকে নিরাপত্তার দিক থেকে পুরানা স্টাইলে রাশিয়া-নির্ভরই তারা যেন থেকে যায়, পশ্চিমা-প্রভাবে না চলে যায়। যেমনটা পোল্যান্ড, রুমানিয়া ইত্যাদি সোভিয়েতের বাইরের কিন্তু যারা কমিউনিস্ট দেশ – এদের বেলায় ঘটেছে এমন না হয়ে যায়।
অন্যভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে পাঁচ দেশকে বুঝায় এর মধ্যে আবার যারা রাশিয়া অথবা চীন এদের কোন একটা দেশের সীমান্ত লাগোয়া দেশ এদেরকে নিয়েই এসসিও গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে চীন-রাশিয়া ছাড়া আরো তিন (কাজাখ, কিরঘিজ, তাজিক এই এথনিক-ভিত্তির দেশ) এভাবে পাঁচ দেশ; আর পরে  উজবেক এই এথনিক দেশ মিলে মোট ছয় দেশ নিয়ে এসসিও গঠিত হয়েছিল। যেটা থেকে রাশিয়া ক্রমশ একালে এসে ইউরোএশিয়া [euroasia] বলে একটা নয়া ধারণা চালু করেছে। অনেক পুরানা কমিউনিস্ট তাই ইউরোএশিয়া শব্দটা বেশি ব্যবহার করে কথা বলে। অথচ একালে পুতিনের রাশিয়ার কোন আমেরিকাবিরোধি পদক্ষেপকে কমিউনিস্ট বলে সহি মনে করে কথা বলা বা গর্ব করা অর্থহীন!

তবে যেটা বলছিলাম, এই এসসিও জন্ম থেকেই তারা অনুল্লেখ রাখা আমেরিকাবিরোধী জোট অবশ্যই। তবে এরচেয়েও বড় কথা একালে মানে ধরা যাক গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের রাজধানী সমরখন্দে এবছরের এসসিও সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২; এই সম্মেলন বলছে তাদের সদস্য সংখ্যা ক্রমশ  বাড়ছে। যেমন শুরুতে ছয় দেশের এসসিও  ইতোমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান এদুই রাষ্ট্রকে একসাথে পুর্ণসদস্য করে নেয়া হয়ে গেছে। এবছর থেকে ইরানও পুর্ণসদস্য হওয়াতে মোট পুর্ণসদস্য নয় রাষ্ট্র। আর তুরস্কও সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করাতে ব্যাপারটা আর সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক অথবা যাদের চীন বা রাশিয়ার সাথে সীমান্ত আছে এমন কেন্দ্রিক বলে থাকছে না। কী হচ্ছে তাহলে?

এটাই চীন-কেন্দ্রিক আমেরিকাবিরোধি প্রধান জোটের আকার নিচ্ছে। যেমন ইতোমধ্যেই এসসিও-এর দাওয়াতি বা অবজারভার সদস্যদেশ হয়েছে আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মঙ্গোলিয়া। আর ওদিকে এক নয়া এক ক্যাটাগরি ‘ডায়লগ মেম্বার’ হয়ে যুক্ত হয়েছে  – আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, ইজিপ্ট, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক – এমন এরা আরো নয় দেশ।

আলাপ আবার একটু পিছন থেকে শুরু করছি। চীন-কেন্দ্রিক বা আগামি গ্লোবাল নেতা চীন এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জোট ততপরতা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা যদি খুঁজতে যাই তবে এর প্রকাশ্য শুরু হল ২০০৯ সাল থেকে। যদিও তখনও চীন-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট  মানে খুবই সচল ইতিবাচক ও সক্রিয় ছিল যা উভয় দেশেরই মুখ্য-স্বার্থ বলে বিবেচিত হয়ে চলছিল। এছাড়া মনে যাই থাক, কোন প্রকাশ্যবিরোধ বা কারো মৌলিক ভিন্নস্বার্থের উপস্থিতি তখনও উদয় হয় নাই।
এই বিচারে ইতিহাসের ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বললে, ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একরকম গভীর সহযোগিতামূলক ছিল যা আগের ত্রিশ বছর মানে  ১৯৭৮- সাল থেকে যা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রথম তা তাল কেটে যায়, ২০০৯ সাল থেকে। সেটা ছিল আগের মতই সম্পর্ক সহযোগিতামূলকভাবে একসাথে বেড়ে উঠা সত্বেও এবার বাড়তি আরেক উলটা ফেনোমেনা ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠা শুরু করেছিল – যেটাকে আমরা স্বার্থ যার যার – এমন এক নয়া ফেনোমেনার যুগের শুরু বলতে পারি।

২০০৯ সালের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছিল যার প্রধান ও মুখ্য ঘটনাটা হল চীনের ব্রিকস [BRICS] ব্যাঙ্কের ধারণা নিয়ে সামনে আগিয়ে যাওয়া, যেটা কার্যত সরাসরি আমেরিকাবিরোধি। তবে এটা ঘটবার কারণ আমেরিকা নিজেই। বলা যায় আমেরিকা নিজেই চেয়েছিল এভাবেই বিষয়টা আগে বাড়ুক। নইলে আমেরিকার জন্য তার দিক থেকে অন্য অপশনগুলো হত আরো নিজ স্বার্থবিরোধি হত। মানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা শেয়ার চীনকে ছেড়ে দিতে হত।
তাই ঘটনাবিরোধের শুরু, চীনের বিশ্বব্যাংকের নিজের মালিকানা শেয়ার বাড়ানোর আবেদন, এখান থেকে।  যা আগেই সে করেছিল আর আমেরিকা সেটা ২০০৯ সালে কার্যত প্রত্যাখান করেছিল। এর অর্থ, এথেকে গ্লোবাল পুঁজিবাজার বুঝেছিল যে এটা যেন চীনকে বলা যে পারলে তুমি চীন আমেরিকার মতই সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ারধারী হতে  আরেকটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিতে পারলে কর। অর্থাৎ বর্তমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এ আমেরিকান শেয়ার মালিকানা সর্বোচ্চ; যার সোজা অর্থ আমেরিকাই ইচ্ছাই শেষ কথা। এদুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-মালিকানার কাঠামোর মত করেই তৈরি। তাই চীনকে উপস্থিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মধ্যে মালিকানার ভাগ বাড়াতে না দিয়াটাই আমেরিকার জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে, চীনকে নতুন করে বিকল্প আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমেরিকা।

আর এখান থেকেই আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়।   তাই ওয়াল স্ট্রীটের লিডিং এক কোম্পানির (গোল্ডম্যান স্যাসে goldmansachs.com ) এর চীফ ইকোনমিষ্টের পাবলিক পরামর্শ রেখেছিলেন যাতে চীন এগিয়ে আসে। আর চীন যেন সেই পরামর্শকেই মুল্য দিতে এগিয়ে আসে। আর গড়ে নেয়া নয়া এমন চীনা-বিকল্প  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানই হল ‘ব্রিকস ব্যাংক’ [BRICS Bank]। মূলকথায়, বিগত ১৯৯০ সাল থেকেই দুনিয়ার এমন নতুন দিকে মোচড়ের পিছনের মূল কারণ মনে করা হয়, চীনা অর্থনীতির ব্যাপক উত্থান – রাইজিং ইকোনমির ধারণা এখান থেকেই শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনের অর্থনীতিতে ক্রমশ বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি (accumulated surplus capital)। যা নিজেই তখন থেকেই অন্যান্য দেশে মানে সারা দুনিয়ার সবদেশেই – ‘অবকাঠামো’ ও ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ হিসাবে হাজির হবার যোগ্যতা-সক্ষমতা নিয়ে হাজির হবেই। ঠিক যেমনটা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াতে আমেরিকা ঘটিয়েছিল।  এটাকেই আমরা অন্যদেশের উপর  “প্রভাব বিস্তারের” মুল উপাদান হিসাবে এককালে আমেরিকার আর একালে চীনের সক্ষমতায় দেখি। তাই, প্রভাব বিস্তারি ক্ষমতার পুর্বশর্ত হল নিজ অর্থনীতি যদি বিপুল পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি – গড়ে তুলতে শুরু করা। এটাই আসল কারণ বলে বুঝতে পারি।

আরেক অর্থে এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা অথবা পরাশক্তি হয়ে হাজির হওয়ার মূল শর্ত। অনেকে এই ব্যাপারটাকে সামরিক সক্ষমতা ভেবে ভুল করি। যদিও মূল ফ্যাক্টর বা উপাদান হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো হবেই আর সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানে এবার তা নিজদেশে সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়ানোরও সক্ষমতা হয়ে উঠা স্বাভাবিক যা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আর এটাই একালের দুনিয়ায় ঘটে গিয়েছে বলে গ্লোবাল পরিবর্তনের আরেক পর্যায়ের মুখে এখন আমরা সকলে।  যখন চীন ও আমেরিকার উভয়েই জোট পাকানো বা নিজ নিজ পক্ষে প্রকাশ্যেই নানান দেশকে সামিল করার প্রচেষ্টা যুগের শুরু হয়ে গিয়েছে বলতে পারি। তাই এটাকেই ঠাট্টা করে বলেছি “ধরাধরি শুরু” হয়ে গিয়েছে।

তবে খুবই সাবধান, এই নয়া ফেনোমেনা সাবজেকটিক না। মানে আমি সাবজেকটিভ ভাবে আমাদের দেশে এটা ব্যাখ্যা করে বলেছি বলে এটা তাই হয়েছে তা একেবারেই নয়।  বরং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বা  পুঁজির সারপ্লাস সঞ্চয় ব্যাপক হবে কিনা, হয়েছে কিনা এটা বলার ক্ষেত্রে আমার ভুমিকা আসলে এক আবহাওয়াবিদের মত দর্শক-অবজারভার মাত্র; যে বিভিন্ন লক্ষণ ও দাটা মেপে ঘুর্ণিঝড় আসতেছে একথা আগাম বলে; কিন্তু কোনভাবেই যে নিজে ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টকর্তা নয়।

আবার আমি কমিউনিস্ট কিনা অথবা রশিয়া-চীন কমিউনিস্ট বলে হয়ত  এদের পক্ষ টেনে আমি একথা বলছি – এমন ধারণা প্রসঙ্গেঃ

প্রথমত আমি একেবারেই কোন কমিউনিস্ট নই। সবকিছু সরকারি মালিকানাভিত্তিক যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ধারণা আছে আমি এই চিন্তার অনুসারি একেবারেই নই। এছাড়া উপরে বলেছি, চীন-রাশিয়া কেউই আজ আর কেন কমিউনিস্ট নয়। চলতি কমিউনিজম আমার ইডিওলজি নয়। এছাড়া বর্তমান চীন-রাশিয়ার সখ্যতা যা আমরা দেখছি সেটা তারা কমিউনিস্ট ছিল বলে এখন এমন দেখা দিয়েছে একথা মিথ্যা। মূলত তাদের কমন প্রতিদ্বন্দ্বি বা বাধা এক্টাই সেটা আমেরিকা; এটাই তাদের সহমর্মিতা ও সখ্যতার মূল ভিত্তি। এটাই তাদের যেকোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বা ফোরামে পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন করার চেষ্টায় কমন অবস্থান নিবার আসল কারণ। মনে রাখা দরকার আজ যা চীন করছে ঠিক সে কাজটাই এককালে আমেরিকা করেছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে নিজ ক্ষমতায় করে সাজিয়ে নিবার ক্ষেত্রে।  আর  আমেরিকার সেদিনের উত্থানের বর্ণনার সময় আমি অকাতরে আমেরিকাকে পজিটিভ ভাবেই ব্যাখ্যা করে থাকি। কারণ দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নায়ক অবশ্যই আমেরিকা, তা সে যে কারণেই করে থাকুক। আমেরিকার সেই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত দুনিয়ার আগিয়ে যাবার জন্য এক লম্বা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।   আসলে সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট ধারণা ও চিন্তায় দুনিয়ার সেই পরিবর্তনকে  আজও তাদের উপলব্দিতে আসেনি, নিতে পারে নাই। এটা তাদের চিন্তা ও পদ্ধতির দুর্বলতা।

তাহলে এখন আমরা কে কিভাবে ব্যাপারটাকে দেখব? যেমন একটা খুব কমন ও পপুলার পথ হল, আমরা কে কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাকে সহি মনে করি সেই ভিত্তিতে কেউ চীন আর কেউ আমেরিকার পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করা। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা একটাই যে আমরা কে চীনকে ভালবাসি আর কে আমেরিকাকে সেই ভিত্তিতে দুনিয়ায় পরিবর্তনের ঘটনাবলিকে দেখা ও ব্যাখ্যা করা এটা তো কোন চিন্তার মেথডলজি হতে পারে না।

সারকথায়, আমার এই কথাগুলো বুঝতে সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়া কিভাবে নতুন করে সাজানো হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের মোটা মোটা ফ্যাক্টসগুলো যদি আগাম মনে রাখি বা সুযোগ পেলেই তা পড়ে রপ্ত করে আসি।  কারণ, এটা যার যত সম্যক বিস্তারিক স্টাডি থাকবে তার পক্ষে একালকের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যায় তিনি আগিয়ে থাকবেন।

এবার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কেঃ
উপরে চীন-রাশিয়ার অভিমুখ নিয়ে কথা বললাম; তাহলে এরার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কে। তবে লক্ষণীয় যে উভয় পক্ষই যে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জোট পাকাচ্ছে এর দুটোই বৃহত্তর এশিয়াতেই। মানে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্টাল এশিয়ায় যে এশিয়ার ব্যপ্তি।  এই বিচারে আমেরিকার সাজানো নাট্যমঞ্চের নাম ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ বা ‘কোয়াড’।  কথাগুলো তাই শেষের দিকের আমেরিকান ততপরতাকে মাথায় রেখে ইঙ্গিতে বলব।

বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছেঃ
গত কয়েকদিন ধরে বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছে আর সম্প্রতি আমেরিকান  সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান জেনারেল চার্লস এ ফ্লিন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ফেসবুকে বাংলাদেশ আর্মির যে পেজ আছে সেখানে দেয়া তথ্য এটা। জেনারেল ফ্লিন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছেন এমন অনেক ছবিও সেখানে দেয়া হয়েছে। আর পিছনে টাঙ্গানো ব্যানারে লেখা আছে “৪৬তম ইন্দো-প্যাসেফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার,  IPAMS 2022”।
এতে অন্তত যেসব কৌতুহল সৃষ্ট হয়েছে সেগুলো একেবারেই আমাদের আর্মিকে নিয়ে নয়। মূলত তা ঐ ব্যানারে লেখা  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দটাকে কেন্দ্র করে। আর তা থেকে “বাংলাদেশ কী কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে জয়েন করে ফেলেছি”? কবে থেকে? এসব।
এগুলো নিয়ে যারা যতটুকু জানেন তাদের কেউ কেউ বলছেন,  না – বাংলাদেশ জয়েন করে নাই। কিন্তু তাহলে ব্যানারের কথাগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই কৌতুহল অবশ্য  কেউ মিটাতে পারে নাই। এটাকে কৌতুহল বলছি বটে তবে এটা আসলে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার ভয় মিশানোও বটে!

আবার একথাও সত্য যে বাংলাদেশ আর্মির সাথে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ওয়ার্কিং রিলেশন হল জাতিসংঘ মিশনকে কেন্দ্র করে। আর ঐ ফেসবুক পেজে তাই যেমনটা লেখা আছে –  “……বৈঠকে “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি” বিষয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্যগণ “বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা মিশন ও এর করণীয়” শীর্ষক ব্রেক আউট সেশন এবং জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।  এটা খুবই স্বাভাবিক।
তবে তারা কক্সবাজার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিজিট ও কথাও বলেছে।  আর এর সাথে জুড়ে তাই উঠে আসছে রোহিঙ্গা বা বার্মা নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনার কথা।  আমেরিকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চিন্তার সারকথা হল, বার্মার আরাকান প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে সমাধান টানা। এতে বলাই বাহুল্য এটা একটা সামরিক পরিকল্পনা।
আর তাতে ব্যাপারটা দাড়াচ্ছে এমন যেন,  এখন আমরা ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেই আর না দেই বাংলাদেশের এই ‘সামরিক পরিকল্পনায়’ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কী আসন্ন?
আর সেজন্যই কী বার্মিজ গোলা এসে পড়ছে? আসলে এনিয়ে সরকারি ভাষ্য-অবস্থান নিয়ে কোন ব্রিফিং খুবই কম। তাই, সবকিছু প্রশ্ন কৌতুহল হয়ে আছে যার জবাব নাই। এটা যতই উহ্য থাকবে কৌতুহলের ডালপালা তত বাড়বে। মূল কারন বাংলাদেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে কীনা এটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যু। কারণ সবাই জানে বর্তমান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি ইনফ্লেশনের মধ্যে আবার একটা যুদ্ধ কল্পনার মানে কী!

আসলে বড় পিকচারের দিক থেকে বললে,  এখনকার সব  আলোচনায় প্রধান যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন ডোনাল্ড ল্যু [U.S. Assistant Secretary of State Donald Lu] যিনি  আমাদের অঞ্চলে বাইডেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। যিনি সম্প্রতি ‘বিক্ষুব্ধ’ ভারত সফরে এসেছিলেন। এর চেয়েও বড় হল, পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ফেলানোর মূল নায়ক বা এক্সিকিউটর তিনি বলে মনে করা হয়। সাথে আরো কথা হল, আমেরিকা পাকিস্তানকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করছে যার মধ্যে এফ-১৬ এর যন্ত্রপাতিও সংশ্লিষ্ট আছে। এবিষয়ে ভারতের মিডিয়ার খবর এখানে দেখা যেতে পারে।  তাই ঐ সফরে ভারত খুবই কড়াভাবে এতে “আপত্তি” জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুমান হল, চীনের এসসিও-এর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত দুদেশই আছে। তাই আমেরিকার পরিকল্পনা হল, এফ-১৬ ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত এর দুরত্ব বা কথার যুদ্ধ অন্তত শুরু করে দেয়া যাক। আর এভাবে তাহলে পাকিস্তান ইস্যুতে ইঙ্গিত হল, ইমরানকে জেলে যেতে হচ্ছে, তা সম্ভবত আসন্ন! আর এভাবেই শাহবাজ সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিতভাবে ভারসাম্যহীন এক প্রো-আমেরিকান  করে সাজানোর পরিকল্পনা এই ডোনাল্ড ল্যু এর।
এই সুযোগে  কিছু কথা বলে রাখার সুযোগ নেয়া যাক।  সাম্প্রতিককালে আমাদের মত দেশের নিজে বাঁচার পথ হচ্ছে চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত) কারও দিকে এককভাবে আমরা যেন কোনভাবেই না ঝুকে গিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো দাঁড়ানো। একটা ভারসাম্য তৈরি করা  – আর এর মূল সুত্র হচ্ছে একেবারে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে মেপে পথ চলা। যদিও তা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন নিজেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নিজের জনগণের সমর্থনের উপর শাসক দাড়ানোর মুরোদে থাকে। এটা একেবারে প্রাইমারি। যে-ই ক্ষমতায় থাকতে  চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত)ীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে সে নিজের তো বটেই বাংলাদেশকেও গর্তে ডুবাতে নিয়ে যাবে।
তাই ফ্যাসিবাদ হটাতে চাইলে কি আমাদেরকে কারো যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ও সমর্থক হতেই হবে – সকল ভয় ও কৌতুহলি প্রশ্নের কেন্দ্র এটা!!!!

2 thoughts on “বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s