দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া, চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে 


দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া,
চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে

গৌতম দাস
১৫ নভেম্বর ২০২২  রাত ০০ঃ১৫

https://wp.me/p1sCvy-4k2

    কয়েক ঘন্টা আগের ছবিঃ US President Joe Biden, left, arrives with Chinese President Xi Jinping for a meeting on the sidelines of the G20 summit meeting, November 14, 2022, in Bali, Indonesia [Alex Brandon/AP Photo]

আগে কিছু বিষয়ের সংজ্ঞা দিতে দিতে আজকের কথা শুরু করব। পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে West – এসব শব্দ বলতে একালে বুঝতে হবে সারা ইউরোপ ও সাথে আমেরিকাও। সাধারণত, কালচারাল অর্থে অবশ্য এনিয়ে আরেকটা শব্দও আছে – ‘পাশ্চাত্য’। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতা বলতে যেমন ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’ শব্দটা এভাবে, ব্যবহার করে অনেকে। ঠিক পশ্চিম এর বিপরীত শব্দ পূব তেমন, পূর্ব বা এশিয়ান কালচার বা সংস্কৃতি বুঝাতে অরিয়েন্টাল [oriental] বা বাংলায় ‘প্রাচ্য’ সভ্যতা বলার চল আছে। মানে পশ্চিম বা ইউরোপের বিপরীতে পুব-কে প্রাচ্য বা এশিয়া বলে বুঝানো।
ওদিকে ভৌগলিকভাবে আটল্যান্টিক মহাসাগর ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে অবস্থিত  হয়ে থেকে এদেরকে দুই পাড়ে বিভক্ত করে রেখেছে। এমনভাবেও অনেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। এই অর্থে তাই ট্রান্স-আটল্যান্টিক মানেও পশ্চিম; যার অর্থ হল ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে আটলান্টিক মহাসাগরটা যেন অবস্থিত নাই বরং তারা লাগোয়া বা পাশাপাশি – এই কল্পনাতে তৈরি শব্দটা হল ট্রান্স-আটল্যান্টিক [trans-atlantic]। তাই ইউরোপ আর আমেরিকাকে অন্তত এথনিক কালচারাল অর্থে তারা এক, এভাবে একসাথে বুঝাতে অনেকে “আটল্যান্টিক” শব্দ দিয়ে সেটা বলে বুঝাতে চায় অনেকে। যেমন, সামরিক জোট ন্যাটো [NATO] এর ভিতরের ক্যাপিটাল  ‘A’ এই অক্ষরটা আটল্যান্টিক বুঝাতে ব্যবহার হয়। মানে ন্যাটো হল ইউরোপ আর আমেরিকার মিলিত সামরিক জোট; তাই এটা এক আটল্যান্টিক জোট। আবার ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ বলে অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়; যেমন এ’নামে এক থিঙ্ক ট্যাংক আছে। আবার একইভাবে, সারা দুনিয়ার জন্য নির্ধারক ও সবচেয়ে বিখ্যাত হিটলারবিরোধী ১৯৪১ সালের হবু জোটের পক্ষে প্রথম যে চুক্তি হল সেটার নাম আটল্যান্টিক চার্টার ট্রিটি বা ইংরাজিতে Atlantic charter Treaty । যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে বিরোধী এলাইড ফোর্স বা ‘পক্ষ শক্তি’ নামে জোট গড়ে তোলার লক্ষ্যের পিছনের ভিত্তি, এমন এক প্রধান চুক্তি। এটাই ছিল হিটলারের ‘এক্সিস ফোর্স’ নামে জোটের বিরোধী জোট।

আবার আমেরিকান ভুমির মূল এথনিক  জনগোষ্ঠি অর্থে  জাতি [নেশন], এই অর্থে বিচার করে বললে, এখনকার আমেরিকা এটা ইউরোপের কোন এথনিক জনগোষ্ঠিরই জন্মভুমি ছিল না। বরং ১৬০৭ সাল থেকে বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ ইত্যাদি কলোনিদখলদারেরা তাদের জন্মভূমি ইউরোপ থেকে গিয়ে আমেরিকাকে কলোনিদখল করে নিজেদের ভুমি হিসাবে দাবি করে সেখানেই থেকে যাওয়া ও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়েছিল। আর এতে সেখানকার মূল আদিবাসিদের উতখাত বা তাদের আরো গহীন বনে চলে যেতে ঠেলে বাধ্য করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই ওসব আদিবাসিদেরকে পশ্চিমারা নাম দিয়েছিল “রেড ইন্ডিয়ান” বা  তাদেরকে এই নামে ডাকা চালু হয়েছিল। সেই থেকে ইউরোপের বা পশ্চিমা দেশান্তরি বা মাইগ্রেন্টরা [migrants], এরাই যেন আমেরিকার মূল বাসিন্দা এমন হয়ে বসবাস শুরু করেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকা কার্যত ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের শহর হয়ে যায়। একইভাবে ঠিক যেমন অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড অথবা কানাডা এই দেশগুলো ইউরোপীয়দের হাতে কলোনিদখলের পরে এখন এরা মাইগ্রেট করা ইউরোপীয়দেরই শহর -যেন নিজস্ব দেশ- এমন হয়ে গেছে।

কেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে এত পুরানা কথাঃ
কেন একালের প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে ব্যাখ্যা করতে এত সব পুরানা কথাকে তুলে আনছি; এর কারণ হল ২০২১ সালে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হলে পড়ে সে নীতি-পলিসি নিয়ে তিনি এসেছিলেন সেটা আসলে এক আটল্যান্টিক ফর্মুলা। যার আরেক নাম ‘সাদা ককেশীয় শাসন’ চালু রাখার স্বার্থ।
তাই বর্তমানের প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, বাইডেনের আমলে তিনি কার্যত যে ‘পশ্চিম’ এর সংজ্ঞার উপর নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন যেটা হল প্রধানত -হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট -, অথবা সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি এক ততপরতা। আর মূলত এসব পরিচয় খাড়া করার উদ্দেশ্য একটাই তা হল, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান যা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে যা, ১৯৪৫ সালের পর থেকে গত ৭৭ বছর ধরে রাজ [rule] করে এসেছে ও এখন ক্লান্ত হয়ে শেষ প্রান্তে ঠেকেছে – এই উত্থিত চীনা অর্থনৈতিক উত্থান-আগমনকে আর যতদিন সম্ভব ঠেকিয়ে দেয়া, অন্তত দেরি করিয়ে দেয়া সম্ভব – এরই এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
তাই একালে পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে west শব্দের এক বিশেষ অর্থ হয়েছে যে যারা গত প্রায় ছয়শ ধরে দুনিয়াকে কলোনিদখল করে শাসন করে আসছিল আর সুনির্দিষ্ট করে ১৯৪৫ সাল থেকে  আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল ; যার প্রথম ও সবচেয়ে ইতিবাচক এক নয়া পদক্ষেপ ছিল  চলে আসা পুরানা সাড়ে তিনশ বছরের কলোনিদখল ব্যবস্থাকে আমেরিকা তুলে দিয়েছিল – এরাই সেই থেকে নয়া ‘পশ্চিমা ব্যবস্থা’।

তবে একালে বাইডেন যে নয়া নীতি-পলিসি সাথে যোগ করেন এই ততপরতার পরিচয় হল এটা এখন ‘সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি’ পুনর্বার খাঁড়া করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ এর) সাথে গাটছাড়া বেধে সারা পশ্চিমাদের ‘ইউক্রেনের যুদ্ধে’ সারা দুনিয়াকে নামানো। তাদের অনুমান ছিল ইউক্রেনকে প্রক্সি বা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তারা পশ্চিমারাই ইউক্রেনের পিছনে থেকে পুতিনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে রাশিয়াকে ধংস করতে সক্ষম হবে। এছাড়াও তাদের সহ-অনুমান ছিল যে এতে রাশিয়ার সমর্থনে একসময় নিশ্চয় চীন রাশিয়াকে ‘সামরিক সমর্থন’ করে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এভাবেই তারা চীনকেও এই যুদ্ধে জড়িয়ে চীনা অর্থনৈতিক উত্থানকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারবে। যার ফলাফল হতে পারে, তাদের গত ছয়শ বছরের সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটির শাসন আরো অন্তত শ বছর চালিয়ে যেতে পারবে! এই ছিল আশা।

কী করে বুঝব তিনি পরাজয় স্বীকার করছেন, তোওবা পড়া শুরু করেছেনঃ
বাইডেনের শাসনের প্রথম দুবছরে মাপার আরেক সহজ উপায় হল আমেরিকান মিড-টার্ম ইলেকশন; যা গত সপ্তাহে ৮ নভেম্বর এই নির্বাচন হয়ে গেল। তবে বাইডেন এটাকে নিজ পরাজয় ঢাকার উপায় হিসাবে ব্যবহার করতে নেমে গেছেন, নভেম্বরের শুরু থেকেই। যদিও এমনিতেই যেকোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তার শাসনের মিড-টার্মে মানে চারবছর শাসনের দুবছর পুর্তিতে আগের দুবছরে গৃহিত নীতি-পলিসির রিভিউ বা পুনঃমুল্যায়নের সুযোগ নিয়ে থাকেন।  সেটা বাইডেনের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হয়ে যাচ্ছে একেবারে উলটা গান। মানে চীনবিরোধী একে পিষেমারার নীতির বিপরীতে একেবারে উলটা সহযোগিতামূলক সহ-অবস্থান; মানে পরস্পরকে বিকাশ-বৃদ্ধিতে জায়গা করে দেয়া; এরই প্রাইমারি আলাপ করতে যাচ্ছেন বাইডেন।    কিভাবে?

এর পরের সপ্তাহ মানে আগামিকাল থেকে, ১৫-১৬ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে এবারের G20 সম্মেলন মানে, ১৭তম জি২০ [G20 Countries] বার্ষিক স্মমেলন অনুষ্ঠান শুরু হবে।  আর এই সম্মেলন উপলক্ষ্যে এরই আড়ালে মানে এই সম্মেলনের  সাইড লাইনে বসে বাইডেন সরাসরি চীনা প্রসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাথে বৈঠকে বসবেন তা ঠিক করেছেন। এই পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল জর্মান চ্যান্সেলার ওলাফ শলৎজ [Olaf Scholz] এর গত পাঁচ নভেম্বর ২০২২ এর চীন সফর থেকে; যেখানে তিনি বলেছিলেন তিনি G7 group দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসাবে প্রেসিডেন্ট শি এর সাথে কথা বলতে গিয়েছেন। কিন্তু G7 এর পক্ষ থেকে জর্মানিই কেন?  এর জবাব হবে সম্ভবত জর্মানিই হল G7 গ্রুপের একমাত্র দেশ যে তার আগের চ্যান্সেলার মার্কেল এর কৃতিত্ব হিসাবে ইউরোপের বাকি সবার আগে চীনবিরোধী না হয়ে উলটা চীনকে জর্মানির অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে ইন্ডাস্টিয়াল সহযোগিতা সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আর পরে সেটাই গত দুবছর ধরে বাইডেনের সাদা শাসন বাচিয়ে রাখার নীতি-পলিসির কারণে ভেঙ্গে পড়ার দশায়।  এখানে বলে রাখি যে, G7 বলতে Canada, France, Germany, Italy, Japan, UK, and US এসব রাষ্ট্রগুলোর জোট বুঝানো হয়।

আমার এর আগের লেখায় শিরোনাম করেছিলাম – “মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু”। সেখানে পশ্চিমের তিনটা রেফারেন্সের কথা উল্লেখ করেছিলাম; যার একটা ছিল জর্মান চ্যান্সেলার শলৎজ এর চীন সফর। রয়টার্সের রিপোর্ট  প্রথম আলোতে অনুবাদ করে ছাপা রিপোর্টে শলৎজের এই সফরে আকাঙ্খা প্রসঙ্গে; যার শিরোনাম হল – ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে চাপ দিতে চীনকে পাশে চায় জার্মানি
দ্বিতীয় রেফারেন্স দিয়ে লিখেছিলাম বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর মন্তব্য যেটাতেও রয়টার্সের শিরোনাম হল, ব্লিঙ্কেন বলেন “চীনের সাথে সমন্বয়ে এক তালে [need to align] থাকাটা জরুরি এসম্পর্কে  G7 group পরিস্কার” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China]। অর্থাৎ বিগত দুবছরের অনুসরণ করা বাইডেনের নীতি-পলিসি  এখন ময়লার বাক্সে ফেলে বাইডেন-ব্লিঙ্কেন আপোষের জন্য তৈরি হচ্ছেন। অথচ এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দুবছর ধরে দেয়া চীনকে একঘরে করার আকাঙ্খায় দেয়া বক্তব্যের বিপরীত।
তৃতীয় রেফারেন্স দিয়েছিলাম, এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]অর্থাৎ সবমিলিয়ে এক পরিস্কার আপোষের বার্তা যে জি৭ গ্রুপ নামে “সাদা শাসন ওয়ালারা” তাদের চীনবিরোধিতা ত্যাগ করে আপোষের জন্য রেডি। তবু এত সত্য কথা বলা তাদের জন্য একটু অস্বস্তিকর। তাই যেন একটু আড়াল নেয়া যে এই আপোষের পথে তারা বাড়ছেন যেহেতু এক গ্লোবাল মহামন্দা (recession) আসন্ন সেই বিবেচনায়!
তাই চতুর্থ রেফারেন্স হিসাবে বলেছিলাম যে,  বলেছিলাম যে “আল জাজিরা এবার এই প্রথম পশ্চিম থেকে
তারা দুরত্ব রচনা করতে চাইছে। তাদের এ’প্রসঙ্গে  রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে …as inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!”।

বাইডেন-শি বৈঠক, জি২০ গ্রুপের ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠকের উসিলায় সাইড লাইনেঃ
এখন জি২০ গ্রুপের আসন্ন ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠক উপলক্ষ্যে বাইডেন আরো খোলাখুলিভাবে চীনের সাথে আপোষের কথা আগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।  যেমন, সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে বললেন বাইডেন প্রথম আলো।  এই খবরটা অরিজিনালি এএফপি এর যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে। কিন্তু ঠিক কী প্রসঙ্গকে মাথায় রেখে বাইডেনের এমন অল্প আগের শত্রুর প্রতি এমন মধুর পিঠে হাত বুলানো ভাষণ?
সেটা আমরা জানতে পারি রয়টার্সের আরেক রিপোর্ট থেকে। সেখানে শিরোনাম হল – “চীন-আমেরিকাঃ আসন্ন শি-বাইডেন বৈঠকের আগেই সবার চোখ রেড লাইন” এর উপরে” [China-U.S. ‘red lines’ in focus ahead of expected Xi-Biden meet] ।  এখন এখানে  -রেড লাইন- সেটা আবার কী?
আসলে তাদের আলোচনা অনেক দুর-ই আগিয়ে গেছে। আগে বাইডেন বলত চীন নাকি গ্লোবাল অর্ডারের আইন শৃঙ্খলা রীতিনীতি কিছু মানে না। না, বাইডেন এখন সেখান থেকে সরে গিয়েছেন। আর বাইডেনের নয়া অবস্থান হল, শি-বাইডেন এরা উভয়েই পরস্পরের কাছে বলে নিবেন কোথায় কতদুর অপর পক্ষ যেতে পারবে বা পারবে না, কথা তুলতে পারবে না ইত্যাদি – যেটা বিপক্ষের জন্য সেনসেটিভ। যেমন যদি ধরি তাইওয়ান ইস্যু। চীন বলবে, এক চীন নীতি মানতে হবে। যেটা আমেরিকা, ভারত সহ প্রায় সব দেশই ফরমালি মানে কারণ, তাদের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক  এর উপরে দাড়িয়েই অনেক আগেই স্থাপন হয়ে আছে। আর সেখানে তাদের চীনকে দেয়া স্বীকৃতি মতে তাইওয়ান চীনের অংশ বলে তারা মনে করে। কাজেই এখন তাইওয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে চীনকে বিরক্ত বা খোচাখুচি করা এসব বন্ধ করতে হবে। যার মানে তাইওয়ান নিয়ে ইচ্ছামত খোচাখুচি করা নতুন ইঙ্গিত দেয়া এইটা  – রেড লাইন এলাকা। তাই, রেড লাইন তালিকায় সেটা উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ অযথা একাজে খোচাখুচিতে সময় নষ্ট না করে পরস্পর উভয়ের গঠনমূলক কাজে ব্যায় করবে।   তবে কী কী রেড লাইন তালিকায় উঠবে মূলত তা নিয়ে আপোষ আলোচনায় সেটা সাব্যস্ত হবে মনে হচ্ছে!!

তাহলে বুঝা যাচ্ছে চীন-আমেরিকা আপোষ আলোচনা আগিয়ে নিবার জন্য অনেক প্রস্তুতি ও ফর্মুলা নিয়ে কাজ আগিয়ে রেখেছে। হা ঠিক তাই।  তবে “ভুল বুঝাবুঝি” সরানো বা সরিয়ে ফেলা একথা  বা এই keyword ধরেই যে আপোষটা হবে তা প্রায় স্পষ্ট। যেমন বাইডেন একাই বলেন নাই যে  “সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি” রয়েছে। পালটা এমনকি চীনও একই কথা বলেছে।  যেমন চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আমেরিকার উচিত হবে চীনের সাথে এক্সঙ্গে কাজ করা যাতে ভুল বুঝাবুঝি ও ভুল বিচার-মুল্যায়ন এড়ানো যায়।
চীনা মুখপাত্র আরো বলেন, “চীন আমেরিকার সাথে শান্তিপুর্ণ সহ-অবস্থান বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও তাইওয়ান প্রশ্ন আসলে চীনাস্বার্থের কেন্দ্রে এটা মনে রাখতে হবে”।

The United States should work together with China to avoid misunderstandings and misjudgments, a Chinese foreign ministry spokesman said on Thursday, when asked about reports of the meeting. For his part, U.S. President Joe Biden said on Wednesday he was not willing to make any fundamental concessions when he meets with counterpart Xi Jinping.
China is committed to realize peaceful co-existence with the United States, but the Taiwan question is at the core of its interests, the spokesman, Zhao Lijian, said at a regular briefing in Beijing.

আসলে, বাইডেন ও তাঁর ইউরোপীয় বন্ধুরা “সাদাবাদি” হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে গিয়ে উলটা নিজেরাই এখন এমন ছেড়াবেড়া অবস্থায় পড়েছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার পুতিনকে মানানোর জন্য তাদের হাতে এখন একটাই শেষ অস্ত্র। তা হল,  চীনকে ছাড় দিয়ে হলেও  কিছুটা পক্ষে টানা। যাতে সেই চীনকে দিয়ে ক্ষুব্ধ পুতিনকে তারা ঠান্ডা করতে সক্ষম হতে পারে। যা দিয়ে একটা নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক যেন গড়ে তোলা যায়।  এব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, পুতিন অবশ্যই চীনের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করতেও পারে। কিন্তু সেটা আগামি জানুয়ারির ১৫ তারিখের পরেই। যেন -৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ইউরোপ বসবাসের জন্য কেমন স্থান সেটা দিয়ে তাদেকে শিক্ষা দেয়া যাতে আর কখনও পরিণতি না বুঝে কেউ এদিকে যেন পা না বাড়ায়!!

তাহলে শি-বাইডেন  এর হবু বৈঠকের উপর আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচনের কী কোন প্রভাব নাইঃ
অবশ্যই আছে। এখন পরররযন্ত প্রকাশিত ফল অনুযায়ী বাইদেনের ডেমোক্রাট দল কংগ্রেস বা সংসদে হেরে গেছে। মানে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে সিনেট বা সংসদের উচ্চকক্ষে শেষ পর্যন্ত নিজ ডেমোক্রাট দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০-৪৯) এভাবে  ফিরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও একটা আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয় নাই এখনও। তবু সেই আসনের ফলাফল যেদিকেই যাক সিনেটে ডেমোক্রাটেরা সংখ্যাগরিষ্ঠায় থেকে যাবে। এই খবরটা শোনার পরে বাইডেনের প্রতিক্রিয়া যা ছিল সেখানেই বাইডেনের সব মনোভাব লুকিয়ে আছে। তিনি বলেছেন তিনি শক্তিশালী বাইডেন বলে অনুভব করছেন।   দেখেন মিডিয়া রিপোর্ট।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন রবিবার বলেন, মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্রাট দলের আশা করা হয় নাই [unexpected] এমন জয়ে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে বৈঠকে তাকে এক শক্তিশালী হয়ে বসতে [stronger position] সাহায্য করবে [US President Joe Biden said Sunday that the Democratsunexpected midterm election successes sent him into crunch talks with China’s Xi Jinping in a stronger position. আর ওদিকে প্রায় একই ভাষ্য নিয়ে ব্লুমবার্গের (Bloomberg) রিপোর্টে শিরোনাম হল, Biden Says Senate Victory Gives Him Stronger Hand with Xi।  মানে টা হলে এই সিনেটে বিজয় নাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আলোচনায় বসতেন ঠিকই কিন্তু নিজের মনে প্রশ্ন থাকত যে তিনি তো আমেরিকান সংসদের উচ্চ বা নিম্নকক্ষের সমর্থহীন এক প্রেসিডেন্ট। ফলে ছোট মনে হত নিজেকে।  আর সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনের সংসদের কোন কক্ষেই যে তিনি বিজয়ী হতে পারছেন না এটা তিনি মেনেই নিয়েছিলেন।

তাহলে কীসের ভিত্তিতে বাইডেনের দল গোহারা হারতে যাচ্ছেন এই জল্পনা গড়ে উঠেছিল? এর জবাব দিয়ে এক বিশেষণ রিপোর্ট করেছে রয়টার্স যার বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে প্রথম আলোতে। যার সারকথা হল, এই সমস্যাটা তৈরি করেছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প-ই। মধ্যবিত্ত ভোটারের ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব বা তার রাজনীতি ও কাজ পছন্দ করেন না। তাই যেসব প্রার্থী ট্রাম্পের বেছে নেয়া বা দেয়া বলে ভোটারেরা জেনেছেন তারাই প্রার্থীরাই আসলে হেরে গেছেন। অর্থাৎ রিপাবলিকান দলের পক্ষে জনস্রোত থাকলেও (যেটা বাইডেনও মেনে নিয়েছিলেন আমরা দেখতে পাচ্ছি) ব্যক্তি ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব সবকিছু উলটে দিয়েছেন। এর মানে হল আগামি ২০২৪ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান নমিনেশন পাবার ক্ষেত্রে এঘটনা এক শক্ত রেফারেন্স হয়ে বাদা হয়ে সামনে উঠে আসবে। যার অর্থ হল, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বা বাইডেন কেউ না, বরং  নয়া কোন প্রার্থিরই সম্ভবত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে দেখব আমরা। আর সেই সাথে সাদাবাদিদের আন্দোলন হতে পারে বলে যে আশঙ্কা আমেরিকায় উঠেছিল তা এখন অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে যাবে। সারকথায়, আমেরিকান মধ্যবিত্তের পছন্দই ট্রাম্পের উত্থান বা সাদাবাদি সুপ্রিমিস্টদের উত্থান ঠেকায় দেবার ক্ষমতা রাখে, সেই ইঙ্গিত-ই আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি!!

শেষ কথাঃ  স্থানীয় বা বাংলাদেশ প্রসঙ্গ;  বাইডেন-শি এর আপোষ আলাপ আর তা থেকে  ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আসা মোটেও আর অসম্ভব নয়। সেটাই ফুটে উঠছে। আবার আমেরিকার মিড-টার্মের ফলাফল যা এসেছে তা আর যাই হোক এথেকে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রভাবিত হবার কোন সম্ভাবনাই নাই। সরকারবিরোধী আন্দোলন থেমে যাওয়ারও কোন সম্ভাবনা নাই। মানবাধিকার প্রশ্নে, যেমন গুম খুন অপহরণ বা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর থেমে যাওয়া বা পথ পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনাই নাই।   বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেলে সরকারের এই যুদ্ধের আড়ালে নিজের সরকার পরিচালনার ব্যার্থতা আড়ালের যে চেষ্টা আছে তা আরো উন্মোচিত হয়ে পড়তে পারে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s