গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে


গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে
গৌতম দাস
২৬ এপ্রিল ২০২৩    ০০ঃ০৫

https://wp.me/p1sCvy-4nv

 

US-China Split Could Hinder Foreign Investment, Lower Global GDP, IMF Warns - BloombergUS-China Split 

 

গ্লোবাল নেতা মানে গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতা হিশাবে, দুনিয়ায় আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ১৯৪৫ সাল থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এর পরিণতি বা ফলাফলে। যদিও অনেকের ধারণা এই অবস্থান যেন অফুরান বা অনন্তকাল ধরে চলবে। কিন্তু যার শুরু কিভাবে, কবে ও কী পরিস্থিতিতে আর যদি তা তা জানা-বুঝা যায় সেক্ষেত্রে তার শেষও আমাদের জানা থাকবে ও যাবে। এর মানে তাহলে বুঝতে হবে যে  সেটা আসলে আর অনন্তকালের কোন ঘটনা-ফেনোমেনা নয়। এছাড়া অনেকের আরও একটা ভুল ধারণা করেন যে গ্লোবাল নেতা ধারণাটা যেন সামরিক শক্তির, মানে সামরিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের। ফলে যেন কোন দেশ  পরাশক্তির [Superpower] দিক দিয়ে কতবড়  এর দ্বারাই বোধহয় নির্ধারিত হয়েছে কে গ্লোবাল নেতা বা কে নেতা নয়। না, সরি; এই ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বরং এককথায় বললে, কোন দেশকে গ্লোবাল নেতা বলতে যে সক্ষমতা বা যোগ্যতা কথা বলা হয় এটা মৌলিকভাবে  মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দুনিয়াতে একেকটা দেশ একেক সময়কালে নানান কারণে নিজ অর্থনীতিতে বাড়তি সঞ্চয়ে তা উদ্বৃতের (সারপ্লাস) পাহাড় হয়ে হাজির হতে দেখা যায়। এটাই ঐ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিকসহ সব ধরণের সক্ষমতার আদি উৎস। অর্থাৎ মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই ঐদেশের বাকিসব সক্ষমতার উৎস হয়ে হাজির হয়।  আর উত্থিত অর্থনীতির দেশ তা থেকেই অন্যদেশ বা বাকি দুনিয়ার উপর (ইতি বা নেতি আধিপত্য) এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে হাজির হয়। তাই অর্থনৈতিক বিপুল উত্থান থেকে  তা সবদিকে বিকশিত হয়ে উঠলে তা থেকেই ক্রমশ একটা দেশ গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে উঠে।  তাই বটম লাইনটা হল, গ্লোবাল নেতা মানে আসলে প্রাথমিকভাবে অথবা ওর প্রাথমিক রূপ হল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠা। একারণে চীনের অর্থনীতি কবে আমেরিকার ছাড়িয়ে আরো বড় অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে সেদিকে দুনিয়ার অভিমুখ বুঝতে চাওয়া লোকেদের, এমন সব এনালিস্টেরা আগ্রহের ফোকাস।

তবে সাবধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠার ফেনোমেনাটা সাবজেকটিভ বা কোন কর্তা-মানুষের সিদ্ধান্তমূলক নয়। বরং তুলনা করে বললে,  যেমন সাবজেকটিভের বিপরীত শব্দ হল অবজেকটিভ। সেদিক থেকে  বলা যায়  ‘বিপ্লব’ [Revolution] ধারণাটাই  সাবজেকটিভ বা কর্তাবাচক। সক্রিয় মানুষ চাইলে বা করার চেষ্টা করলে তবেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে পারে; নইলে নয়। বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে কোন ‘বিপ্লব’ ঘটে না অথবা বলা যায় যা প্রাকৃতিক বা নেচারাল তা বিপ্লবী ঘটনা নয়। প্রাকৃতিকভাবেও অবশ্যই দুনিয়াতে হাজারো পরিবর্তন ঘটে থাকে এখনও ঘটে চলেছে তবে সেগুলো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক ঘটনাবলী নয়, মনে করা হয় না। তাই প্রাকৃতিক মানে অবজেকটিভ।  আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ইংরাজিতে তাই বলে ইভোলিউশন [Evolution]। মানে সেটা রি-ইভোলিউশন [Re-evolution বা Revolution (বিপ্লব)] জাতীয় কিছু  নয়। এই পরিবর্তনগুলোকে তাই ‘অবজেকটিভ’ ঘটনা বলা হয়। এখানে কোন কর্তা থাকেনা, এটা প্রাকৃতিক
অর্থাৎ আমাদের এখানকার আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই, কোনদেশের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা তাই ঠিক কোন সাবজেকটিভ ঘটনা নয়; যে তা  ঐ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাপ্রসুত এমন। বরং অবজেকটিভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত; মানে মানুষের ইচ্ছায় যেমন কোন জলোচ্ছাস বা ভুমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আসে না, তেমনই।

আবার অনেককে আরেক মিথ্যা অনুমান পুষে নিয়ে থাকতে দেখা যায় যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই যেনবা সে দেশ গ্লোবাল নেতা হবেই; এমন মনে করে থাকে। এমন ধারণা ভুল। তাদেরকে বরং মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনসংখ্যা কখনও চীন বা ভারতের মত ১৪০ কোটির আশেপাশেও ছিল না, এখনও নয়। আমেরিকা এখনও কেবল আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার, যা প্রায় ৩৩ কোটি মাত্র।  আর এই জনসংখ্যা দিয়েই  আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল এবং এখনও আছে বা শেষ যুগ পাড় করছে বলা যায়। তবে গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ হতে গেলে জনসংখ্যার অধিক্য একটা পজিটিভ ফ্যাক্টর বা উপাদান অবশ্যই। তবু, সাবধান বড় জনসংখ্যা মানেই তা গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ; তা এমনটা নাও হতে পারে। নির্ভর করে নিজ ঐ বড় জনসংখ্যাকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ম্যানেজ করে কাজে লাগিয়ে বড় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তারা কতটা সক্ষম আর কপালও ভাল কিনা – এর উপর। যেমন, ভারত ও চীনের জনসংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি, এখন ভারত বরং একটু বেশি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলারের যেখানে চী্না অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়নের আর আমেরিকা এখনও ২৩ ট্রিলিয়নের, মানে চীনের চেয়ে বড়। তবে এখনকার  আরেক অনুমান হল আগামি ২০৩০ সালের দিকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে,  এনিয়ে হাতের কাছের ভোয়ার [VOA] এক রিপোর্ট  দেখে নেয়া যেতে পারে।
এসব সত্বেও ভারত ব্যাপারটাকে নিজ উগ্র জাতিশ্রেষ্ঠত্বের [হিন্দুত্ববাদের] ধারণা দিয়ে দেখে থাকে। মনে করে সে চীনের চেয়ে কম কিসে, সেও চীনের সাথে এব্যাপারে সমতুলনীয়; এমন ধারণার প্রাবল্য অবশ্য ২০১৩-১৪ সালের ফেনোমেনা। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ শানিয়ে মোদি যখন ২০১৪ সালের পর থেকে নিজ-প্রচার শুরু করেছিল যে ভারত নাকি একটা ‘পরাশক্তি’ হয়ে গেছে!  এই ব্যাপারে অন্তত একটা ফ্যাক্টস বা ঘটনা মনে রাখলেই এর কারণ অনেকটাই বুঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

বিদেশি পুঁজি নিয়ে কমিউনিস্ট ও জাতিবাদি চিন্তায় বেশি-বুঝের মিথঃ
এককথায়, বিদেশি পুঁজি নেয়া না-নেয়া প্রসঙ্গে ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা আসলে একেবারেই উগ্র জাতিবাদিদের অনুসারী।  যেমন বিদেশি পুঁজি নেওয়া বা দেশে আসতে দেয়া দেশের জন্য কী হারাম না হালাল? এনিয়ে উগ্র-জাতিবাদি একরোখা ধারণাটাই কমিউনিস্টদেরও ধারণা। এরা উভয়েই মনে করে বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজি দেশে আসতে দেয়া হারাম, তাই তা দেশে আনাই যাবে না।  আর এপ্রসঙ্গে বাস্তবতার আমল-মুল্যায়নহীন জাতিবাদিদের একচেটিয়া হারাম ধারণাটাই আরও পোক্ত করেছে কমিউনিস্টেরা; তাদের ‘শোষণ’ ধারণা দিয়ে।

যদিও এটা তো বলাই বাহুল্য আইডিয়ালি বললে যে বিদেশি পুঁজি এনে শিল্প-ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বরং নিজ দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতায় এগুলো করা তো নিঃসন্দেহে ভাল; এনিয়ে কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু বাস্তবতা তো এখানে না অন্যখানে! মানে তর্কটা এখানে না।
তাই আরেকটু আগিয়ে এর পক্ষে বলি। দুনিয়ার যেকোন দেশের অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমে, যদি বাইরের হস্তক্ষেপ করতে না দেয়া যায় তবে, ঐদেশের অর্থনীতি বিকশিত হতে যত যা বিনিয়োগ লাগে তার সবটাই ঐ দেশীয় অর্থনীতি নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে, এবং তা সম্ভব; ইতিহাসে এটা প্রমাণিত সত্য। যেমন সারা ইউরোপে একেবারে শুরুর দিকে  মানে ১৬০০ সালের পর থেকে যখন তাদের কলোনি দখল ব্যবসা শুরু হয়েছিল এর আগের কালে, তাদেরকে কোন বাইরে থেকে পুঁজি বা সম্পদ লুটে  আনতে হয় নাই। নিজ অর্থনীতিতেই নিজ সঞ্চয় উদ্বৃত্ব ব্যবহার করেই নিজে বিকশিত হতে পেরেছিল; সম্ভব করেছিল। আমাদের মত দেশের যেমন বিনিয়োগ আনার জন্য “পশ্চিম আছে”,  সে তুলনায় সেকালে পশ্চিমের জন্য ১৬০০ সালের আগে তাদের জন্য কোন “পশ্চিম” বা বিনিয়োগদাতা বলে কেউ ছিল না।
১৬০০ সালের আগে-পরে বলে কথা টানছি এজন্য যে ১৬০৭ সালে ইউরোপ প্রথম কলোনিদখলে বেরিয়েছিল।   আর যাদেরকে কলোনিদখল করতে বেরিয়েছিল প্রথমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশ এর কোনটাই নয়।  সেটা ছিল উত্তর আমেরিকা যা এখন ইউএসএ বা আমেরিকা নামে পরিচিত। গত ১৬০৭ সালে প্রথম কলোনিদখল করা ভুখন্ড বা দেশ হল আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia] সর্বপ্রথম কলোনিদখল হয়ে যায়।  যারা দখল করেছিল তাদেরকে বৃটিশ বা ইংলিশ সেটেলার বলা হয়েছে। এর রেফারেন্স দেখতে এখানে[Colonial America (1492-1763)] আমেরিকান সরকারি লাইব্রেরিতে যেতে পারেন। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকাকে কলোনিদখল করা হয়েছিল এরও পরে নানা সময়ে।

কিন্তু সর্বশেষ আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় যারা ইউরোপের কলোনি হয়ে থেকেছিলাম পরের অন্তত টানা দুশ বছর তারা ১৯৪৫ সালের পরে স্বাধীন মুক্ত দেশ হয়ে গেলেও এরপরে আমাদের নিজ অর্থনীতির বেলায় একই ফর্মুলা কাজ করে নাই যে আমাদের অর্থনীতিও নিজ বিনিয়োগ পুঁজি বা অর্থনৈতিক উদ্বৃত দিয়ে নিজের অর্থনীতির বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারবই। তা হয় নাই আর এটা করবেও না। আমরা পুষ্টির অভাবে ভুগা শিশুর মত বিনিয়োগ পুঁজির অভাবে ভুগবোই। কারণ অন্তত টানা দুশ বছর ধরে লাগাতর ইউরোপের কলোনিদখলদারেরা আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে সেকালের আগে থেকে যাকিছু  সারপ্লাস জমা হয়েছে তা উঠিয়ে দখলদারেরা নিজ নিজ দেশে লুট করে নিয়ে গেছিল। এতে তৈরি হওয়া গভীর স্থায়ী ক্ষত বা বিনিয়োগ পুঁজির ঘাটতি সেটা ১৯৪৫ সালের পরে আমরা স্বাধীন মুক্ত দেশ হলেও তা আপনাতেই নিজ নিজ অর্থনীতিতে পূরণীয় করা যায়নি কারণে এত অধিক লুট আর পূরণীয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ছিল আমাদের জন্য সেই নয়া বাস্তবতা যে আমাদের বিনিয়োগ পুঁজি লুট হয়ে গেছে অথচ আমরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অন্তত কাগজে কলমে ।

অতএব ঐ খারাপ সময়ে  বিদেশি পুঁজি নেওয়া হারাম এই ফতোয়া যা এখনও তাদের মুখে বর্তমান, এসব কথা ছিল একেবারেই চরম অবিবেচক ও আত্মঘাতি। কার্যত এটা ছিল একদিকে চিন্তার মারাত্মক এক অক্ষমতা অন্যদিকে তা বাস্তবতাবিমুখ ভরপুর এক  বিশুদ্ধবাদিতা। ‘খাঁটি’ থাকতে চাওয়ার স্টুপিডিটি! যেন সাময়িক বিদেশি পুঁজি গ্রহণ করলে আমরা অশুদ্ধ হয়ে যাব!! আমাদের এদিকে এমন এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ভারতের জওয়াহরলাল নেহেরুর চিন্তা ও তাঁর অর্থনীতি। তিনি মারা গেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু তার কমিউনিস্ট অরিয়েন্টেড ইকোনমির চিন্তা বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ প্রসঙ্গ এটা চালু থেকেই গেছিল ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত।   যেটা ১৯৯০ সালে এসে ঐ নেহেরু-ইজমের অর্থনীতি তা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল।  সেকালে চন্দ্রশেখরের কোয়ালিশন সরকার অর্থের অভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে যা মূলত  balance of payments বা বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম ও ব্যয় বেশিতে ঘাটতিতে পরা থেকে সৃষ্ট – এই কারণে তিনি বাজেট পেশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন।  আর  balance of payments এর নিয়মিত ঘাটতি হলে একটাই এর ওষুধ, আইএমএফ-এর কাছে ঘাটতি পুরণে ঋণে বৈদেশিক মুদ্রা পেতে হাত পাতা। আর এর পুর্বশর্ত হচ্ছে এতদিনের আয়েসি আন্দাজি বিশুদ্ধবাদিতা ছেড়ে এবার বাস্তবতায় ফিরে আসতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর সংস্কার করতে বাধ্য হওয়া।  ঠিক কী ঘটেছিল এনিয়ে আইএমএফ-এর একটা ভাষ্য এখানে অন্য আরও ভাষ্য এখানে পাওয়া যেতে পারে।  সে সময়ে সব ব্যর্থতায় দায়ভার চন্দ্রশেখরেরর উপর যদিও এসেছিল কিন্তু নেহেরুসহ সকল পুর্ব-সরকারগুলোই এজন্য দায়ী ছিল। চন্দ্রশেখর সে যাত্রায় পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের নভেম্বরে যা থেকে কংগ্রেসের নরসীমা রাও ক্ষমতায় আসেন। আর তাঁর নয়া অর্থমন্ত্রী হন  মনমোহন সিং, যিনি আইএমএফ-এর সাথে মিলে অর্থনৈতিক সংস্কারটা সম্পন্ন করেছিলেন।  তবে মনে রাখতে হবে এঘটনার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ার সাথে (যা ভেঙ্গে গেছিল ১৯৯১ ডিসেম্বরে ) ভারতের এই অর্থনৈতিক পতন ও সংস্কারে বাধ্য হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই।   কারণ ভারতে তা ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগেই ১৯৯০ সালেই।

ভারত ছেড়ে এবার বিদেশি পুঁজিতে চীন প্রসঙ্গেঃ
কম কথায় সেরে ফেলতে এভাবে বলি, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি বা আমেরিকান পুঁজি দেশে আসতে অনুমতি দান শুরু করেছিল। যদিও এর আগে ১৯৫৮ সাল থেকেই মাও সেতুং আর সোভিয়েত বা স্তালিনীয় পথ বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিদেশি পুঁজি গ্রহণ প্রসঙ্গে ভিন্ন পথ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন মাও। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে যদিও এটা চীনের “সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ১৯৫৮” বলে পরিচিত। এসব রাখডাক বা ভিন্ন শব্দে নাম দেয়া খুব সম্ভবত ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য। কারণ,  আদতে এটা ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  আজকের দিনেও যারা কমিউনিস্ট সমালোচক তারা মাওকে তাদের হিরো বলে আপন করে রেখে দিয়েও সব দায় ও এর ভিলেন হিশাবে দেখাতে চায় দেং জিয়াও পিং-কে। তা যাক সে তর্ক অন্যখানে, করেছিও। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, মাও-এর অর্থনৈতিক সংস্কার,  কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাত্রা ইত্যাদি এসব নিয়ে কমিউনিস্টেরাসহ যেকারও  স্তালিনীয় সমাজতন্ত্র বুঝের দিক থেকে যত সমালোচনাই থাক এক জায়গায় গিয়ে সেসবের সবকিছু বেকার হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, চীন এই সংস্কারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ অনুমতি দিয়ে একে আপন করে নিয়েছে; মানে  নিজ অর্থনীতিতে আমেরিকার ওয়াল স্টিটের জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিয়েছে। শুধু তাই না পরে শুরুর দিকে এসব বিনিয়োগ চীন সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা শিল্প-বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগে তারা এখন তাদের পার্টনার। আর এ সবকিছুই ঘটেছে উল্লেখযোগ্য কোন সংঘাত বা ফ্রিকশন ছাড়াই। সেটাও না মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে চীন আজকে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ – চীন নিজেই আজ গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবার পথে। এদিকটার তাতপর্য সেটাও কোন দিক দিয়েই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই গ্রহিতা  চীন নিজেই এখন দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা প্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের এখানে সারা বছরের ঋণদানের বাজেটের চেয়েও এক চীনের বাজেট অনেক বড়। সারকথায় চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব।

 সারকথায়, চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব। 

চীন ১৯৭৮ সালেএর জানুয়ারি থেকে আমেরিকার সাথে  আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও এমবেশি খোলা দিয়ে শুরু করেছিল।  পরে আমেরিকান বিনিয়োগের আসা বা প্রবেশ শুরু হয়েছিল। আর চীনের বড় অর্থনৈতিক উল্লফন ঘটেছিল (ডাবল ডিজিট জিডিপি) (১৯৯০-২০১০) মোটামুটি এই বিশবছরের সময়কালে।  তুলনায় ভারত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদেশি পুঁজি আসতে দেয়া হালাল কিনা তখনও সেই সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নাই। তাই ১৯৯১ সালকে মানা হয় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার বছর, যখন ভারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে মিটাতে ব্যর্থ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতিতে) হয়ে আইএমএফের সাহায্য পেতে দ্বারস্ত হয়েছিল। ফলাফলে সেই প্রথম নেহেরু কথিত ও প্রচলিত কমিউনিস্ট ইকোনমি ১৯৯১ সালেই খোলনলচে বদলায় বাধ্য হয়ে মনমোহন সিং এর অর্থনৈতিক সংস্কারে ঢেলে সাজানো শুরু হয়েছিল – যা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি।

তবে এসব নিয়ে কথা বলাও বিপদের। আপনার কোন পছন্দের রাজনীতি বা আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাবধান। বাস্তব ঘটনা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও পেতে গিয়ে একাজে নিজ রাজনীতি-আদর্শকে শ্রেষ্ঠ মানতে হবে বা দেখাতেই হবে এই জিদ সবার আগে ত্যাগ করেন।  কারণ আপনি তখন আসলে তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গেছেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা বুঝাবুঝি আপনার অস্তিত্বের মত জরুরি। আর এটাই প্রধান ও আপনার আসল কাজ। কাজেই আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ দিয়েই কেবল তা পারতেই হবে এই জিদ ও চিন্তা ভুল। যেখানে আপনার দরকার বাস্তবতাকে বুঝবার জন্য একটা চিন্তা বা পদ্ধতিতে তা করতে সক্ষম হওয়া। যে চিন্তা বা পদ্ধতি এটা করতে সক্ষম তাই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে, আপন করতে হবে। এরপরে বা বাইরে প্রেমিকার মত আপনার পছন্দ বা বিশেষ নেকের একটা রাজনীতি বা আদর্শ আছে থাক না। কাজ না পারলেও জোর করে  আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ এর পক্ষে  ঢোল পিটানো তো সহি হতে পারে না! এরপর এবং সেই সাথে এবার কেন আপনার রাজনীতি-আদর্শ ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপযুক্ত টুলস হতে পারে নাই সেটা খুজে বের করেন। সংশোধন করে নেন।
অনেকবার বলেছি চলতি শতক শুরুই হচ্ছে গ্লোবাল নেতা বদলের পালাবদলের সময়কাল হিশাবে যেটা আমরা পছন্দ করি নাই। বরং ঘটনা-ফেনমেনাই আমাদেরকে এটা দেখতে বাধ্য করেছে। এখন এতে আমেরিকান প্রভাবের ক্রমপতন আর চীনের প্রবল উত্থান যদি বাস্তবতা হয় – অবজেকটিভ বাস্তবতা হয় তা হলে এনিয়ে আমার কথা বলা মানে তো এটা নয় যে আমি চীনের দালাল। অথবা আমি চীনকে পছন্দ করি তাই এটা করছি। অথবা চীন কমিউনিস্ট তাই চীন আমার পছন্দ এটা  ধরে নিতেই হবে!!! অথচ আমেরিকা কী করে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভুমিতে সেই ব্যাপক ইতিবাচক ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণ আমার চেয়ে বেশি এবং ভাল করে কেউ করে নাই। একাজের সময় আমাকে কেউ আমেরিকান দালাল বলে না কেন?
বাস্তবতা হল, নিজ পছন্দের আদর্শ দিয়ে ঘটনা না মিললেও জোর করে তেমন ব্যাখ্যা দেওয়াটা বোকামি; কারণ জরবরদস্তি পাঠক পছন্দ করবে কেন! কাজেই নিজ পছন্দের আদর্শের ভিত্তিতে কথা বলার দিন শেষ।  আর শেষ কথা হল আমি কোন কমিউনিস্টই নই। এছাড়া চীন    কমিউনিস্ট কিনা সেটাও কমিউনিস্টদের মধ্যেই অর্ক সাপেক্ষ, যা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই। গ্লোবাল পরিবর্তনগুলোকে কতটা উপযুক্তভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছি সেটাই মুখ্য দিক!  সেদিকটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হচ্ছি কিনা সেটার পরীক্ষায় উতড়ানো বা সফলতাই একালের মাপকাঠি।

এখানে আমাদের পাঠকের সমস্যা হল, তারাও সময়ে বিভ্রান্ত হয়ে সময়য়ে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা এমন কোল্ডওয়ার এর তর্কের ফাদে আটকে যান। অথচ সেই কোল্ডওয়ার এর যুগ এখন অতীত, সেসব ভাবনা এখন অকেজো। তবুও কেউ কমিউনিস্ট না আমেরিকা-বাদী এমন কথিত একটা ধারণার আগে চালু করে পরে  পাঠক কোন মানুষ ও তার ব্যাখ্যাকে আমল করা শুরু করে থাকে। এটা খুবই ভুল পদ্ধতি।  আশা করব পাটঘক কমিউনিস্ট লুপ-হোল এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হবে ও বাঁচিয়ে চলা শিখে যাবে!


গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

[উপরের এই লেখা আসলে দুদিনের মধ্যেই পরবর্তি যে লেখা দিব তার আগাম অংশ। তাই বুঝাই যাচ্ছে পরের লেখাটা চলতি এই রচনার উপরে দাড়িয়েই লেখা হবে। পরের রচনাকে তাই এলেখারই দ্বিতীয় অংশও বলা যেতে পারে।]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s