নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

গৌতম দাস

০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Us

 

Shringla’s visit, Independent Online /UNB

ভারত-রাষ্ট্র টিকে থাকার ন্যায়ভিত্তি হেলে গেছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নুন্যতম কিছু নৈতিকতা-সম্পন্ন একটা ন্যায়ের ভিত্তি থাকতেই হয়, নইলে সে প্রতিষ্ঠান টিকে না। রাষ্ট্র বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম একটা ন্যায়ভিত্তির উপর না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে সবার আগে প্রতিষ্ঠান মরাল [moral, নৈতিক শক্তি] হারায়, নৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। ভারত-রাষ্ট্র সেই সঙ্কটে আটকে গেছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেছে। কারণ, মোদীর ভারত নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী, তার সরকার ও দলই এর প্রযোজক বলে অভিযুক্ত। গত ২০০২ সালের গুজরাট ম্যাসাকারের সময় গুজরাট কোনো রাষ্ট্র ছিল না, একালের ভারতও নিছক কোনো রাজ্য নয়, এটা রাষ্ট্র। কাজেই কোনও কিছুই ২০০২ সালের মত ঘটবে না। পুনরাবৃতি ঘটবে না।  এদিকে নরেন্দ্র মোদী দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে এপর্যন্ত মুখ খোলেননি। একটা কথাও বলেন নাই। যে নৈতিক সঙ্কটে ভারত পড়েছে এই নির্বাক থাকায় সেটা আরো জটিল হবে। মোদীর সরকার ভারতের বাসিন্দাদের এই নৈতিক সঙ্কটে ফেলে দিয়ে গেছে যা ক্রমে নাগরিকদের হত্যা ও ম্যাসাকারের দায়বোধের অস্বস্তিতে বেঁধে ফেলবে। তাই সরকারি আমলা হিসেবে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এসময় বাংলাদেশ সফরে এসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা বলার শক্ত নার্ভ দেখিয়ে ফিরে গেলেন! এটাই তাঁর অর্জন! ওদিকে, সিল্লি ঘটনা বিস্তারিত ঠিক কী ঘটেছে এবং তা কিভাবে, এর ফ্যাক্টসের কিছু এর মধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরুও হয়েছে।

কেন শ্রিংলাঃ
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা এবার তাঁর দু’দিনের (২-৩ মার্চ) সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন। কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কোনও দেশ সফরের আগে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশ সফরে আসেন। আর তা মূলত নির্বাহী প্রধানের সফরকে নিশ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এ ছাড়াও, সফরে কেন ও কী কী ইস্যু উঠবে আর তাতে উভয়ের অবস্থান কী হবে এসব চূড়ান্ত করাও এর লক্ষ্য। যদিও এরপরেও অনেক কিছুই থেকে যায়, যাবে বা রেখে দেয়া হয় যা সফরকালে দুই শীর্ষ প্রধানের আলাপে ফাইনাল করা হবে। দেখা যাচ্ছে, মোদীর  বাংলাদেশ সফরের আগে সে উপলক্ষে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সচিবকে পাঠিয়েছিলেন। সেটা কোনো দোষ বা বড় ব্যতিক্রমের বিষয় না হলেও, অনুমান করা যায় সেটা ঘটেছে এই বিবেচনায় যে, ঢাকায় শ্রিংলার ‘তাজা বন্ধু’ অনেক বা তাঁর অন্য ভারতীয় কলিগদের চেয়ে তিনি এগিয়ে। কারণ, এই তো গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর কাটিয়ে  তিনি এদেশ ছেড়ে গেছেন। তার সেসব তৎপরতা ও স্মৃতি এখনো তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি কলিগদের সবার চেয়ে বেশি ‘তাজা’ বলে আর তখন যেসব বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক তিনি জমিয়েছিলেন, তা এখন কাজে লাগানোর বিচারে তিনি অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ঘনিষ্ট বন্ধুদেশ’  গভীর ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ অথবা কখনোবা বলা হচ্ছে এরা নাকি ‘স্বামী-স্ত্রী’ অথবা আরো কত কী যেগুলো সত্যিই ইউনিক, একেবারে তুলনা নাই। দুনিয়ার কোনো কূটনৈতিকপাড়ায় এমন অকূটনৈতিক অর্থহীন ও বোকা বোকা শব্দের ব্যবহার নেই। যদিও তা আসলে বাংলাদেশকেই গায়ে পড়ে নিচে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।

পশ্চিম এখন বুঝছে ‘হিন্দুত্ব’ কেন হুমকির বাপঃ
এই পটভূমিতে, শ্রিংলাকেই বেছে পাঠানোর এই ঘটনা – মোদীর ভারত যে ভালই বিপদে আছে এর আরেকটা প্রকাশ। শ্রিংলাকে এমন একটা সফরে আসতে হয়েছে যখন দুনিয়াজুড়ে মোদীর ভারতরাষ্ট্র নাগরিকের হিউম্যান রাইট রক্ষার দিক থেকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। এদিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ার সঙ্কটে পড়া এক রাষ্ট্র বলে ভারতকে দেখা হচ্ছে।  এধরণের ব্যর্থতাবিষয়ক মামলায়  জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইটস সংগঠন [UN-OHCHR] এই ব্যর্থতা নিয়ে আদালতের শুনানিতে অবজারভার হতে চেয়েছিল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এমিকাস কিউরি (amicus curiae OR  “friend of the court”] হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী আগাম ভয় পেয়ে, আপাতত এটা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণ হবে এই অজুহাত তুলে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং তেমন আলোকে বিবৃতি দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। এছাড়া অন্যদিকে জাতিসংঘের অবজারভার হয়ে চাওয়াকে মিথ্যা করে প্রপাগান্ডা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি মামলায় আবেদনকারি বা পিটিশনার হয়ে চেয়েছে। এনিয়ে দক্ষিণের দৈনিক দ্যা হিন্দুর নিজ লেখা সম্পাদকীয় আগ্রহীরা পরে দেখতে পারেন।

এদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ ভারত-রাষ্ট্রে নিয়ে আলোচনা পশ্চিমে এখন আর সংসদীয় কমিটির ছোট্ট পরিসরে আর নয়। মুসলমান হত্যার মোদীর ভারতকে সামলাতে এখন পশ্চিম সরাসরি স্ব স্ব পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নিয়েই মোদী-অমিতের তান্ডব আর হুমকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে BRUT Debate বা আমেরিকার সংসদে (প্রতিনিধি পরিষদে) দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব এখন একটা হট ইস্যু। ভারত থেকে মুসলমান উদ্বাস্তুর ঢল নামবে কি না আর সেক্ষেত্রে আগাম তা ঠেকানোর উপায় কী, আগানোর কৌশল কী, এটাই মুলত তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ভারত ১৩৫ কোটি মানুষের ভোক্তা-বাজারের এর দেশ। কিন্তু এর প্রতি লোভের চেয়েও ওখান থেকে সম্ভাব্য উদ্বাস্তুর ঢল অনেক বেশি বিপর্যয় আনবে, এটাই এখানে মুখ্য দুঃচিন্তা আর হুমকিবোধ।

দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিল্লিতে ৫৮ জনেরও বেশি মানুষ, মুসলমান বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে তিনি কোনো কথা, বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া কোনো কিছুই দেননি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের পক্ষ থেকে কোন আশ্বাস, ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়ানো, কোন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বসানো, হামলাকারিদেরকে আইনের আওতায় আনা ইত্যাদি যেগুলো এমন পরিস্থিতিতে সব রাষ্ট্রই নুন্যতম রুটিন কাজ হিসাবে করে থাকে – এমন কোন পদক্ষেপ মোদী নেন নাই।

মোদী-অমিত এখন এতই নিলাজ আর বেপরোয়া যে তাঁরা খোলাখুলিই ভারতের পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এতে প্রকারন্তরে ম্যাসাকারের দায় তাদের উপর সরাসরি এলেও তারা বেপরোয়া। অর্থাৎ মোদী তবু মূলত প্রতিক্রিয়া শুন্য। এই প্রতিক্রিয়াহীনতা অ-প্রধানমন্ত্রীসুলভ, তাই অগ্রহণযোগ্য; এমনকি মারাত্মক অস্বাভাবিক। আর এটাই মোদীর আর তাঁর সরকারের এতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে তীব্র করছে। এছাড়া এটাই  তাঁর সরকারকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার এক বিরাট সঙ্কট তৈরি করেছে।  আরও বড় কারণ হল, আপনি মুসলমান হলেই আপনাকে দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগানোর পর এবার তাই আপনাকে নিপীড়ন করে হত্যা করা জায়েজ – এই হল এখনকার নয়া নরমাল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা। এটা ভয়ঙ্কর!

অর্থাৎ মোদীর সরকার এখন নাগরিক বৈষম্যহীনতা কায়েম করা দূরে থাক,  ন্যূনতম ন্যায়নীতি পালন ও রক্ষারও অযোগ্য – এমন এক পরিচয় তুলে ধরতে বেপরোয়া হয়েছে। অথচ শ্রিংলার বিপদ হল, এই নৈতিকতার সঙ্কটে থাকা সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করতে তাকেীই সময় বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ লোক মুসলমান।

এসব বিচারে ভারতের হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে আমরা দেখছি তিনি ব্যাকফুটে ও নিষ্প্রভ। তা না হয়ে তার উপায় কী? এমনকি শ্রিংলার ঢাকায় থাকা অবস্থায় ৩ মার্চ আনন্দবাজারের এক রিপোর্টও তার সঙ্কটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পত্রিকা শিরোনাম করেছে বেসুরো ঢাকায় সফর শ্রিংলার“- আর তাতেই শ্রিংলার দফা-রফা। লিখেছে, “সিএএ-এনআরসি বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। দিল্লির হিংসা, সেই ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে দেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের একাধিক জনের ভারত সফর বাতিল করেছিল হাসিনা সরকার। আজ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন, বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফর”। এই খবর মোদী ও শ্রিংলার জন্য বিরাট অস্বস্তির সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি তারা সেন্সে থাকে!

বাংলাদেশের স্পিকারের ভারত সফর ছিল গত ২-৫ মার্চ। তিনি সফর বাতিলের ঘোষণা দেন মাত্র একদিন আগে, ১ মার্চ; যেনবা শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরে আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি। নিশ্চিত হতেই তিনি শেষ বেলায় এসে ঘোষণা দিয়ে দেন। শ্রিংলা ঢাকা আসেন পরের দিন ২ মার্চ। অর্থাৎ শ্রিংলা বাংলাদেশের স্পিকারের সফর বাতিলের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি বা তা পারেননি। মানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত “বড়ভাই” সুলভ ডাট দেখাবেন এমন অবস্থা – না ভারতের না শ্রিংলার সে মুরোদ আর অবশিষ্ট আছে মনে হচ্ছে না। এমনই করুণ অবস্থা! অর্থাৎ এটা মেনে নিয়ে হলেও ব্যাকফুটে থাকাতেই স্বস্তিবোধ করছেন শ্রিংলা।

শ্রিংলার সেমিনারঃ
শ্রিংলা ২ মার্চ সকালে বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় হাইকমিশনের সহ-আয়োজক হয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করেছিল। এটা ছিল ‘”বাংলাদেশ ও ভারত : একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ” এই শীর্ষক এক সেমিনার।   কিন্তু এবারের সফরে শ্রিংলার দুর্ভাগ্য যে, তাকে সরাসরি ডাহা অসত্য বলেই পার পেতে হবে, অন্য রাস্তা নেই। তাই তিনি আসলে ঐ সেমিনারে  ভান করলেন যে, এনআরসি ইস্যুটা যেন এখনো কেবল আসামেই সীমাবদ্ধ বা  সেখনেই কেবল আটকে আছে।  তাই শ্রিংলা বললেন, “ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে” – এমন ডাহা মিথ্যা চোখ বুঝে বললেন। অথচ  তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেননি যে, তিনি এবার “ভারতজুড়ে এনআরসি করবেন”। অথচ অমিত এটা কোনো জনসভায় বলেননি,  খোদ সংসদে এবং মন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। কাজেই এটা কোনো দলের নয়, ভারতের সরকারি অবস্থান। এছাড়া এটা তো ভারতের কোন বিরোধী দল, এমনকি কোন মিডিয়া মানে নাই। এছাড়া মোদী এমনকি দিল্লিতে নির্বাচনে হারের পরেও বলেছেন, আপাতত এনআরসি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর ভারতজুড়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএর বাস্তবায়নে মেতে উঠবেন তিনি।

তাহলে শ্রিংলা কেন এখনও এনআরসিকে ‘আসামের ঘটনা’ বলছেন? ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা মিডিয়াও তো তার কথা মেনে নেয় না। এযুগে ভারতের সরকারের কে কী প্রতিদিন বলেন তা বাংলাদেশে বসে জানা কি খুবই কঠিন! এনআরসি এখন ভারতজুড়ে বাস্তবায়নের ইস্যু আর এটা এখন এনআরসি-সিএএ ইস্যু। অথচ শ্রিংলা সেমিনারে বলে গেলেন এনআরসি ‘প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায়’ চলছে। তাই তিনি দাবি করলেন, ” … সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের ওপর এর কোনো প্রভাব থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি”।  আসলে তিনি জানতেন কেউ তার এ কথা এ দেশে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু তবু এই চাতুরী ছাড়া কিইবা তিনি করতে পারতেন? সম্ভবত এত অসহায় অবস্থায় হয়ত তিনি এর আগে নিজেকে দেখেননি!

তিনি আরো বানিয়ে বলেছেন, সিএএ বা “নাগরিকত্ব বিল কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়”।  বলেছেন দ্বিতীয়ত, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে এসে যারা ভারতে আছেন, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব দেয়াই এর উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়ত, এটা (বাংলাদেশের) বর্তমান সরকারের সময়ের জন্য কার্যকর হবে না। কার্যকর হবে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসক ও অন্য সরকারগুলোর সময়ে, যারা এখানে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি”। এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। কারণ সিএএ আইন প্রযোজ্য হবে বা এর কাট অফ ডেট হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪। মানে এর আগে যারা ভারতে প্রবেশ করবে তাদের সবার উপরে প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেবল ‘১৯৭৫-পরবর্তী’ সময়টার ক্ষেত্রে  এই আইন প্রযোজ্য হবে এই কথাটাই পুরা ভুয়া, ভিত্তিহীন। বুঝাই যায় হাসিনা সরকারের মন পাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সিএএ আইনের মধ্যে তিন দেশে থেকে আসা সম্ভাব্য হিন্দুদের কথা বলার সময় বাংলাদেশের নাম সরাসরি আইনে উল্লেখ করা আছে এবং তা আছে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ বাংলাদেশ সরকার হিসাবে।  কাজেই এটা সরাসরি হাসিনা সরকারকেও ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ অভিযুক্ত করেই আইনটা লেখা হয়েছে।  অথচ, ভারত এখন বাংলাদেশকে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে’ আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পেশের আগে না দিয়ে আবার উলটা  আইনের ভাষ্যটা শ্রিংলা বা ভারত সেকথা লুকাতেছেন।  মূলত বাংলাদেশের নাম না উল্লেখ করলে  বিজেপি দলের লাভ হয় না। কারণ  আইনের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছে এজন্য যে – পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণ করতে বা হিন্দু ভোট সব নিজের রাজনৈতিক ঝুলিতে পেতে এমনটাই বিজেপির দরকার; সেক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যাটা যাই হোক।

অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বন্টনের মুলাঃ
বাংলাদেশে এই সফরে শ্রিংলা আরেক বিরাট মুলা ঝুলিয়েছেন – তিস্তার পানি তো বটেই, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৪ যৌথ নদীর মধ্যে আরো নাকি ছয়টি নদীর পানি ভারত দিবে এই চুক্তি নাকি প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এটা শ্রিংলার দাবি। এটা অবিশ্বাস্য আর ভারতকে বিশ্বাস করার মত আমাদের আস্থা তারা অনেক আগেই হারিয়েছে। আসলে ঐ সেমিনারে শ্রিংলা এমন সব কথা বলেছেন, যা দেখেই বুঝা যায় বানানো কথা বলছেন। আর মিথ্যা বলে  মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, “এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত”। এটা কোনভাবেই ভারতের মনের কথা না কারণ এটা ভারত অনুসরণ করে আসছে অথবা এখনও করছে এমন নীতি পলিসিই নয়। এককথায় এখন এটা ভারতের অবস্থানই নয়, এ’পর্যন্ত ভারতের অনুসৃত নীতিই নয়। কার্যত তাদের অবস্থানটাই উল্টা।

আমরা দেখছি ‘পরিবেশের’ কথা তিনি বলেছেন। যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনায় টেকনিক্যাল নিয়ম হল, নদীর “অবাধ” প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। অথচ এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশবোধ শূন্য এবং তাদের ভূমিকা পরিবেশবিরোধী। ভারত বহু আগে থেকেই হয় নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়েছে, না হলে আন্তঃনদী যুক্ত করার মতো চরম পরিবেশবিরোধী প্রকল্প নিয়েছে। আর তাও না হলে নদীর মূল প্রবাহ থেকে বড় খাল কেটে পানি বহু দূরে টেনে নিয়ে গেছে। এই হলো ভারতের কথিত পরিবেশবোধের বাস্তব অবস্থা।
আর টেকসই? নদীর উপর যথেচ্ছাচার যেসব বাড়াবাড়ি ভারতে হচ্ছে তাতে নদীর “অবাধ” প্রবাহ ধ্বংস করে যা কিছু করা হয়েছে সেগুলো একটাও টিকবে না, বরং মূল নদীই শুকিয়ে যাবে ক্রমেই। ফারাক্কা ইতোমধ্যেই এ অবস্থায়। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ভারতের বিহারে প্রতি বছর বন্যার কারণ বলে অভিযোগ উঠছে এখন লাগাতর প্রতিবছর।
আর ন্যায়সঙ্গত বণ্টন? মানে যৌথ নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনটা কী ? যেকোন যৌথ নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রাপ্য, সমান হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত আইনত বাধ্য। এছাড়া আমাদের সম্মতি ছাড়া বাঁধসহ নদীর প্রবাহকে যেকোনভাবে বাধাগ্রস্ত করাটাই বেআইনি। অথচ ভারতের সাথে নদীর পানি বণ্টনের যেকোন আলোচনায় তাদের দাবি অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হতে হবে – “ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পরে পানি থাকলে তবেই তা বাংলাদেশ পাবে”। মানে তারা হল জমিদার – এই নীতিতেই ভারত চলে। একারণে  প্রায় সব সময়ের বাড়তি যুক্তি হল ‘এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই আরো কম পানি পাবে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ ভাটির দেশ হিসেবে পানি আমাদের প্রাপ্য এই আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তারা কখনও মানে নাই। কথা হল, ভারতের পানির প্রয়োজনের কী কোনো শেষ  থাকবে?
সোজা কথা ‘পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন’ এই শব্দগুলো শ্রিংলা তুলেছেন- কথার কথা হিসেবে এবং মন ভুলাতে। অথচ না পরিবেশ রক্ষা, না আন্তর্জাতিক নদী আইন – কোনটাই ভারতের চলার ভিত্তি বা সরকারের নীতি নয়। মিথ্যা বলাটা সবাই পারে না, বুক কাঁপে। আসলে শ্রিংলা দেখালেন, পুরো মিথ্যা বানোয়াট কথা বলার মত শক্ত নার্ভ তার আছে। আর সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, বাংলাদেশ তবুও তাকে বিশ্বাস করবে বা আস্থা রাখবে – সেটা যাক তাকে মিথ্যাই বলতে হবে!

দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?
আবার ফিরে যাই, এবার দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?  বাংলাদেশে এসে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লি ম্যাসাকার নিয়ে একটা কথাও বলেননি। এক্ষেত্রে তাঁর অজুহাত সম্ভবত, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তাই। কিন্তু বাস্তবতা হল – লাগাতার তিন দিন ধরে এ হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকার চলেছে; দিল্লি জ্বলেছে, কমপক্ষে ৫৮ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের বাড়িঘর যতটুকু যা যা বাড়িঘর সম্পদ সব কিছু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন সবার একভাবে যায় না। এই প্রথম কারা সুনির্দিষ্টভাবে দিল্লি ম্যাসাকার করেছে তার কিছু তথ্য সামনে আসা শুরু হয়েছে।

দিল্লি ভারতের বিশেষ মর্যাদার টেরিটরি, তা সত্ত্বেও ওর ভিতরেই দিল্লি একটা রাজ্য। তাই রাজ্যের ‘বিধানসভা’ নামের একটা সংসদ (প্রাদেশিক পার্লামেন্ট) আছে। সেখানে রাজ্য নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করতে পারে, যা কেবল নিজ রাজ্যের ওপর প্রযোজ্য। দিল্লির বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে এমনই একটা আইন পাস করা হয়েছিল, যার নাম ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট ১৯৯৯’। ব্যাপারটা তুলনা করে বললে এদিকে বাংলাদেশে একটা ‘মানবাধিকার কমিশন’ আছে। আর তা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যত স্বাধীন নয়। আইনের মারপ্যাঁচ ও দুর্বলতায় এটা আমাদের নির্বাহী ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়েই চলে। সে তুলনায় ভারতের অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কমিশনগুলো এত ঠুঁটো নয়। বরং এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এবং ভারতের আদালতের পর্যায়ে স্বাধীন। যেমন ভারতের “জাতীয় নারী কমিশন” যথেষ্ট প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ব রাখে। তেমনি ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে দিল্লি রাজ্য সরকার এক ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন’ (ডিএমসি) গঠন করে রেখেছে। এখানে ঘোষিত মাইনরিটি হল, – The notified Minority Communities, as per the Act, are Muslims, Christians, Sikhs, Buddhists and Parsis.। আর এর মূল কাজ হল, ‘সংখ্যালঘু বা মাইনরিটিদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা’ [To safeguard the rights and interests], যা যা ভারতের কনষ্টিটিউশন মাইনরিটিদেরও নাগরিক অধিকারে সমতা-সাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই DMC কমিশনের ক্ষমতা পুরোটাই আদালতের পর্যায়ের না হলেও তারা অনেক ক্ষমতাই রাখেন। যেমন গত ২৫ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে নর্থ দিল্লিতে কার্ফু জারি করতে তারাই  অনুমোদন দিয়ে চিঠি দেওয়াতে পুলিশ তা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পরে ম্যাসাকার, তান্ডব কমে আসলে পরে, সেই ডিএমসি সরেজমিন দিল্লির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর শেষে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এছাড়া অচিরেই একটা “ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি” গড়ে তারা মাঠে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, যে কমিটিতে আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছে। এই কমিশন বা ডিএমসির চেয়ারম্যান হলেন জাফরুল ইসলাম খান [Zafarul-Islam Khan] ও অন্য সদস্য হলেন কারতার সিং কোচ্চার [Kartar Singh Kochhar]। এরাই প্রথম সরেজমিন রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ বর্ণনা আছে সেই রিপোর্টে। তাদের প্রথম কথা হল, এই হামলা ‘একপক্ষীয়’ এবং ‘পূর্বপরিকল্পিত’ [‘one-sided, well-planned’]। অর্থাৎ এটা কোনধরণের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি বা রায়ট নয়। অথবা এটা হঠাৎ উত্তেজনায় ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং আগেই পরিকল্পনা করে ঘটানো এক ম্যাসাকার-সন্ত্রাস। এছাড়া এই প্রত্যক্ষ মাঠ-সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তাদের কথা বলার সময় জাফরুল ইসলাম খান সাহেবের করা আরও কিছু মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

তাঁর ফাইন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় মন্তব্য হল, প্রায় দুই হাজার বহিরাগতকে পরিকল্পিতভাবে নর্থ-ইস্ট দিল্লিতে এনে, কয়েকটা স্কুলে রেখে তাদের দিয়ে এই ম্যাসাকার, হত্যা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। [“There were approximately 1,500 to 2,000 people who had come to these areas from outside to create trouble,” ]। এর প্রমাণ হিসেবে এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ান তারা সংগ্রহ করেছেন। তার নাম রাজকুমার। তিনি রাজধানী স্কুলের এক গাড়ির ড্রাইভার। তিনি বলেছেন, এরকম ৫০০ বহিরাগত যাদের মুখে মুখোশ ছিল। এরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই স্কুলে অবস্থান করেছিল। তারা সাথে পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র ছিল আর এক ধরনের ‘বড় গুলতি’ ব্যবহার করেছিল উঁচু দালান থেকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারার জন্য। কমিশনও বলেছে, তারা এমন কিছু ব্যক্তির ফুটেজও সংগ্রহ করেছেন।

“Mr. Kumar told us that some 500 persons barged into his school around 6.30 p.m. on February 24. They wore helmets and hid their faces. They remained there for the next 24 hours and went away next evening after the arrival of police force in the area. They were young people who had arms and giant catapults which they used to throw petrol bombs from the school rooftops,”

এ ছাড়া জাফরুল ইসলামের দাবি, তারা জেনেছেন প্রত্যেক গলি থেকেই স্থানীয় অন্তত দু-একজন সহযোগী ছিল যারা মুসলমানদের বাড়ি , দোকান, গুদাম বা সম্পদ কোনগুলো, তা দেখিয়ে দিয়েছে। যাতে কেবল সেগুলোতেই আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এভাবেই ‘যমুনা বিহার’ এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই কেবল বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পদ পোড়ানো হয়েছে।

Muslim-owned shops like a travel agency and motorcycle showroom were looted and torched while Hindu-owned shops were left untouched.

এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা নিয়ে আবার লুকোচুরি শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ ‘মেনস্ট্রিম মিডিয়া’ এটা ছাপেইনি। সবচেয়ে বিস্তারিত ও সাহসী ভাবে ছেপেছে দক্ষিণের ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। এ ছাড়া ওয়েব পত্রিকা ওয়াইর (wire) আর নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এটা ছেপেছে। আরো কিছু পত্রিকা ছেপেছে, তারা কেবল সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের শর্ট ভার্সনটা ছেপেছে। তবে একটা ইউটিউব ভার্সন পাওয়া যায় এমন এক সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ‘এইচডব্লিউ নিউজ নেটওয়ার্ক (HW News Network) থেকে। সেখানে এ নিয়ে নিউজ ছাড়াও চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ফ্যাক্টস বাইরে আসা শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেও মোদী-অমিত কোনো কৌশল গ্রহণ করবেন, ধামাচাপা দিবার চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০৭ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে নৈতিক ভিত্তি হারানো একটি সফর – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

 ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

গৌতম দাস

 ০২ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2TE

 

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যুবায়ের – রয়টার্স

দিল্লির ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকান্ড ভারত-রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। রাষ্ট্র ‘ভেঙে পড়া’ মানে অকার্যকর হয়ে পড়া বা টুকরো হয়ে যাওয়া। সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন মানে, সিএএ’র বিরোধিতা আর দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় হার এসবের বদলা-প্রতিশোধ নিতে মোদী-অমিত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।  দিল্লি জ্বলছে, ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৪২ জন এই জিঘাংসার বলি।

বৈষম্য বা রাগবিরাগের প্রধানমন্ত্রী মোদী
মোদী-অমিতের মনে কী আছে তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবার। ভারত-রাষ্ট্রের মুখ্য দায়ীত্বে থাকা ব্যক্তিদুজন যে কতটা নৃশংস হয়ে উঠতে পারে সেটা এখন প্রমাণসহ হাজির হয়ে গেছে।  যেমনঃ জেলা শহরের ছোট এক হাসপাতাল [Al Hind Hospital, a nursing home] থেকে কয়েকজন মুসলমান রোগীকে আরও চিকিৎসার প্রয়োজনে বড় হাসপাতালে [GTB বা Guru Tegh Bahadur Hospital ] স্থানান্তর করতে পুলিশ প্রটেকশনের অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে দরখাস্ত দেয়া হয়েছিল। পুলিশ তা সন্ধ্যা পর্যন্ত করেনি। এ দিকে বিবিসির এক ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, রোগী বহনরত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের ওপর হামলা করা হয়েছে। রড দিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে আর এক মেডিক্যাল কর্মী আবেদন করে বলছে – “এটা তো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। তাই হিন্দু-মুসলমান যেই হোক সবার প্রয়োজনে আমাদের সাড়া দিতে হবেই। কাজেই আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার তো কিছু নেই”।
এসব বিবেচনা করেই রোগীর আত্মীয়স্বজনরা উকিলের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর দিল্লি রাজ্য-হাইকোর্টের  প্রধান বিচারপতি এস মুরলীধর [ঐ মামলার পর এখন বদলি করে দেয়া হয়েছে] এর সাথে যোগাযোগ করেন। বিচারক তৎক্ষণাৎ আদালত বসানোর ব্যবস্থা করে রিট আবেদন শুনে এর নিষ্পত্তি করে পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে সহযোগিতা করার আদেশ দেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঐ বিচারককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার হাহকোর্টে বদলি করে দিতে, পেন্ডিং এক বদলির আদেশ চাঙ্গা করে আর প্রেসিডেন্ট কোবিন্দ তাতে সই করেছেন। আর তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করতে নির্দেশ জারি হয়েছে। পরদিন মোদীর এক মন্ত্রী এ ঘটনায় সাফাই দিয়ে বলেছেন, এটা রুটিন বদলি।
মোটেও তা নয়। বরং মোদী সরকারই প্রধান দোষী। অসুস্থতার চিকিৎসায় মানবিক কারণেই রোগীকে সরকারের আগ বাড়িয়ে সহায়তা দেয়া উচিত ছিল। এটা ছাড়াও, নাগরিকের চিকিৎসাকাজে সহায়তা পাওয়া, রোগী মুসলমান হন আর না হন তা রোগীর নাগরিক অধিকার। অথচ তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, মূলত মুসলমান বলে। এভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়েছে। একজন বিচারপতি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক আদেশ দিয়েছেন। অথচ সরকার তাকেই বদলি করে দিয়েছে।
অনুমান করি, আসলে মোদী সরকার ভয় পেয়েছে যে সরকারের বিরুদ্ধে এই বিচারক মুরলীধর এর এমন আদেশ দেয়া চালু রাখলে অমিত শাহের দিল্লির পুলিশের প্রটেকশনে মুসলমানদের উপর হামলার বিরুদ্ধে সবাই দলে দলে ঐ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া শুরু করতে  পারে। কারণ ইতোমধ্যে ঐ রাতেই ঐ একই আদালত আরো দু’টি রিট মামলার নিষ্পত্তি করে রায় দেন। সে কারণেই সকালে যেন ঐ বিচারক আর আদালত বসাতে না পারেন, সে ব্যবস্থাটাই বন্ধ করে দিয়েছে মোদী সরকার। সারা দুনিয়ার অধিকার প্রসঙ্গে সংবেদনশীল কোনো প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের নাগরিক বৈষম্য ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নেয়ার করা চিন্তাই করতে পারে না। অথচ মোদী-অমিত নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা ও নাগরিককে নিরাপত্তাদানের জন্য শপথ নিয়েও তা ভঙ্গের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কেন? এটাই তাদের মন যে রিরি করা ঘৃণায় পরিপুর্ণ হয়ে আছে এরই প্রমাণ।
অমিত-মোদী এখানেই থামেন নাই।  তারা বিচারক মুরলীধরের সিদ্ধান্ত ক্ষুব্ধ হয়ে তাতে আরও বাধা সৃষ্টি করেছেন। হাসপাতালে পৌছানোর পথে পুলিশ বসিয়ে আবার বাধা দিয়েছে। আর এর শক্ত প্রমাণ এর হল দুটা ভিডিও ক্লিপ যা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে আছে।  আর বড় হাসপাতালে [GTB] রোগীদের সাথে যেতে আলহিন্দ হাসপাতাল থেকে আসার সময় একজন ডেন্টিস্ট ডাক্তার তাদের সবাইকে এসকর্ট করে সাথে আসছিল। সে ডাক্তারের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষ্যের বর্ণনা ইংরাজি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়  পয়লা মে “Eyewitness account: Delhi Police beat up wounded riot victims, said if he dies, he dies’ ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছে। তাতে ঐ ডাক্তার [তাঁর নাম, ডাঃ মেরাজ বিন একরাম] ঘোষণা দিয়েছেন তাঁকে যদি আবার সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়া হয় তবে যেকোন পরিণতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। [Ekram added: “This is the truth. If I have to face consequences for telling the truth, I will.”]।

বাংলাদেশে যেমন ফেক বা ভুয়া নিউজ চেক করে সত্যতা যাচাই করার ওয়েব গ্রুপ আছে “ফ্যাক্ট চেক” [Fact Check] নামে; সেরকম ভারতের একটা গ্রুপের নাম অল্ট. নিউজ [Alt.News]। তারা আরও একটা প্রায় একই রকম ভিডিও দেখে বিচার করে নিশ্চিত করে দিয়েছে যে ভাইরাল হওয়া আগের ক্লিপটা ফেক নয়, বরং জেনুইন। ইংরাজী টেলিগ্রাফ পত্রিকা  আরও জানিয়েছে,  তারা পুলিশের মুখপাত্রকে এনিয়ে করা ফোনের বা টেক্স ম্যাসেজের কোন সাড়া তিনি দেয় নাই।  আসলে পুলিশের গ্রুপ যেটা রোগীদের হাসপাতালের পৌছানোর পথে এই গুন্ডামি – অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী বা অজ্ঞান রোগীকে আবারও রড দিয়ে পিটিয়ে জাতীয় সঙ্গিত গাইতে বাধ্য করা ইত্যাদির ন্যুইসেন্স করছিল  সেটা ছিল একটা হাইরাইজ আবাসিক বিল্ডিং এর নিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আর ঐ বিল্ডিংয়ের দুই বাসিন্দাই উপর থেকে মোবাইলে ঐ ভিডিও ধারণ করেছিল।  তাই, পুলিশের কাছে এর সেখবরই ছিল না। সে কারণে এই অকাট্য প্রমাণ রয়ে গেছে।
এই ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সাথে থাকায় শুধু দিল্লি পুলিশের প্রধানই নয়,  এই মারাত্মক অপরাধের সাথে কমিশনার ও পুলিশ প্রধানের সরাসরি বস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শাহের বস প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ জড়িত সকলের নাম জড়িয়ে গেছে এখন। অথচ নাগরিক বৈষম্য দূর করা রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্রসহ যেকোন রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য ও রাষ্ট্রবৈশিষ্ট্য। ঘটেছে উলটা – বৈষম্য করা বা রাগবিরাগের বশবর্তী হয়ে পরিচালিত হওয়ার অপরাধ করে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের মন্ত্রী। এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ও অকার্যকর হয়ে পড়ার আগের লক্ষণ।

এটা দাঙ্গা নয়, পরিকল্পিত ম্যাসাকার
লক্ষণীয় যে, দিল্লির এই ম্যাসাকারগুলো হয়েছে গত দিল্লি নির্বাচনে হাতেগোনা যে ক’টা আসনে বিজেপির প্রার্থীরা জিতেছে কেবল এমন কনস্টিটুয়েন্সিতে। তবুও দিল্লিতে এই ম্যাসাকার, এটা কোনো দাঙ্গা ছিল না। এটা ছিল একপক্ষীয়ভাবে মুসলমানদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন করে জিঘাংসা চরিতার্থ করা, যাতে তারা ভয়ে চুপ করে আরও মার্জিনাল হয়ে বসবাস করতে শুরু করতে বাধ্য হয়, মেনে নেয়। এনিয়ে আনন্দবাজারের এক রিপোর্টের শিরোনাম, – “গুজরাতের মতো দাওয়াই না দিলে চলবে না! শাসানি দিল্লিতে”। অর্থাৎ এটা ছিল গুজরাট স্টাইলে দাওয়াই – দাবড়ে দেয়া!
আগেও বলেছি, প্রশাসনিক কাঠামো হিসাবে  দিল্লি একটা রাজ্য হলেও এটা আবার ভারতের রাজধানী বলে কনস্টিটিউশন অনুসারে দিল্লির পুলিশ প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। তাই  অন্যসব রাজ্যে তাদের মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে রাজ্য পুলিশ প্রশাসন থাকলেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিলালের অধীনে কোন পুলিশই নাই। এটাকেই সুযোগ হিসাবে নিয়ে সদ্য দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় হেরে গেলেও এই অমিত শাহ দিল্লির ওপর ছড়ি ঘুরাতে, ম্যাসাকার করতেই বেছে নিয়েছিলেন এক পুলিশ প্রধান হিসাবে, কমিশনার ‘অমূল্য পট্টনায়েককে’। উনি ইতোমধ্যে রিটায়ার্ড অথচ তাকে এক মাসের এক্সটেনশন দিয়ে অ্যাকটিভ করে দিল্লির পুলিশ কমিশনার করে রেখে দেয়া হয়েছে, কুকামগুলো সম্পন্ন করে নেয়ার জন্য। ইতোমধ্যে তিনি অবসরে চলে যাওয়াতে এখন ঘটনার দায় ঢাকতে সুবিধা হবে – এই হল অমিত শাহের অনুমান।  কয়েক দিন আগে কাপড়ে মুখ ঢেকে জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে [JNU] (ও জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও) একইভাবে পুলিশের প্রটেকশনে বিজেপির কর্মীদের হলে ঢুকতে দিয়ে, সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে এই পট্টনায়েকই হামলা করিয়েছেন বিজেপিবিরোধী ছাত্র সংসদের সদস্যদের ওপর। হামলা সম্পন্ন করার পর পুলিশি প্রটেকশনে হামলাকারি বিজেপির ছাত্র সংগঠনের কর্মিদের বের হয়ে চলে যেতে দেন। এরপর রাস্তার বাতি ফিরে জ্বালিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল।
দিল্লির চলতি ম্যাসাকারের বেলাতেও এই কমিশনারের পুলিশি প্রটেকশনে বিজেপি-বজরং-হিন্দুসেনা কর্মিদেরকে নিরাপত্তা এসকর্ট দিয়ে এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাদের দিয়ে বেছে কেবল মুসলমানদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা নির্যাতন আর তাদের বাড়িঘর, সম্পত্তি লুটপাট ও জ্বালিয়ে দেয়ার তাণ্ডব ঘটিয়েছেন তিনি। দিল্লিতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে যেসব ও যে পরিমাণ উপাদান বা অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখে এক পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, এগুলো সংগ্রহ করতে কমপক্ষে দু’সপ্তাহের প্রস্তুতি লেগেছিল। অর্থাৎ এটা একটা পরিকল্পিত হামলা।

গঙ্গাজল
নৃশংসতা নিয়ে ভারতের বিহারের একজন প্রযোজক-পরিচালক একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন – নাম ‘গঙ্গাজল’। সেখানে ‘গঙ্গাজল’ বলতে এসিড বুঝানো হয়েছিল। মানে, নৃশংসতা হিসেবে জীবন্ত মানুষের চোখ এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া। দিল্লির হামলাতেও বিজেপির কৌশল ছিল ‘গঙ্গাজলের’। এ পর্যন্ত অন্তত চারজন নিরীহ মুসলমানকে হাসপাতালে কাতরানো অবস্থায় পাওয়া গেছে, যারা এখনো বেঁচে আছেন কিন্তু তাদের চোখ এসিড ঢেলে গলিয়ে দেয়া হয়েছে। ভিন্ন ঘটনায়, এসিডসহ এর বহনকারী চার বজরং কর্মীও আটক হয়েছে যারা সিএনজিতে চড়ে যাচ্ছিল [অটোর ভিতর থেকে অ্যাসিডের বোতল-সহ আটক করা হয়েছে চার যুবককে]

আশ্রয় ও নিরাপত্তার খোঁজে – আনন্দবাজার

এদিকে প্রায় সপ্তাহজুড়ে হামলা শেষে দিল্লিতে এখন শুরু হয়েছে মাইগ্রেশন। মুসলমানেরা বাড়িঘর ছেড়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পরিবার নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন শহরের পাড়া বা কনস্টিটুয়েন্সিতে বন্ধু-আত্মীয়ের বাসা খুঁজে ফিরছে।
এসিড হামলা নিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে এক লোমহর্ষক রিপোর্টঃ

“…আর একটি উদ্বেগজনক বিষয়, মুস্তাফাবাদ থেকে আজ বেশ কিছু আহত এসেছেন হাসপাতালে। তাঁদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন। খুরশিদ নামে এক জনের দু’চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তেগ বাহাদুর হাসপাতাল থেকে লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালে আসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও পাননি তিনি। গিয়েছেন রিকশায়। দুই চোখ-সহ পুরো মুখ ঝলসে গিয়েছে ওয়কিলের। …এটা স্পষ্ট, আগুন লাগানো, পাথরবাজি, গুলির সঙ্গে ‘গঙ্গাজল (অ্যাসিড)’-এরও আয়োজন করা হয়েছে রীতিমতো  আট ঘাট বেঁধে।”

আবার অমিত শাহের কৌশল ইতরামিতে এতই প্রখর যে আগেভাগেই আদালতে  মোদীর সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা … দিল্লি হাইকোর্টকে জানিয়েছেন, “পুলিশকে নাকি অ্যাসিড হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে”। মানে আগেই হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন তিনি।

মোদী-অমিত বিপদঃ
পাবলিকের উপস্থিতি যেখানে মদী-অমিতকে চেহারা দেখাতেই হয় সেসব কিছু এড়িয়ে পালিয়ে ফিরছে মোদী-অমিতও।  এই সময়টা মোদী-অমিত বিরাট বিপদের সুতার উপরে হাঁটছেন। ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বাড়ছে দেখে মোদী-অমিত ভয়ও পেয়েছেন মনে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর ছিল ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাও ২৪ তারিখটা সরাসরি গুজরাটে নেমেই। আর ২৫ তারিখটা তিনি ছিলেন দিল্লিতে রাতে ডিনার শেষ করা পর্যন্ত। কিন্তু এটা আর এখন লুকানোর কোনো সুযোগ নেই যে, অমিত শাহ পরিকল্পিত হামলা শুরু করিয়েছিলেন নিজ দলের কপিল মিশ্রকে সামনে রেখে। মিশ্র বড় প্রভাবশালী নেতা হওয়ার উচ্চাকাক্ষী হলেও এবারের দিল্লি নির্বাচনে পরাজিত এক রাজ্য এমএলএ। অমিত শাহ  নিজেকে সুরক্ষিত ও আড়ালে রাখতে তাই কপিলের মুখ দিয়ে বলিয়েই প্রত্যক্ষ হামলার হুমকি দেয়ার বে-আইনি  কাজটা করিয়েছেন।
উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদে, যেটা মূল হামলার কেন্দ্র, সেখানে শাহীনবাগের মতই এক অবস্থান ঘর্মঘট চলছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে সাথে নিয়ে কপিল ২৪ তারিখে এখানে এসে অন ক্যামেরায় হুমকি দেন যে, “পুলিশ এই স্থানীয় অবস্থান সমাবেশ ভেঙে না দিলে তিনি নিজে ট্রাম্পের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করতে পারেন। তিনি এটা ভেঙে দেবেন”। এই হুমকির ভিডিও ক্লিপ এখন  ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এরপর সে রাতেই ঐ সমাবেশের আশপাশে তিনি এক ট্রাক পাথর আনলোড করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে এই পাথর দিয়েই হামলা শুরু হয়েছিল। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া আর পুলিশের উপস্থিতিতে এই হুমকি দেয়া স্পষ্টতই কপিল মিশ্রের করা একটি ক্রিমিনাল অফেন্স।
অথচ প্রকাশ্যে এই ঘোষণা না দিয়েও বিজেপি একই হামলা ও ম্যাসাকার তো করতে পারত। তাহলে ঘোষণা দিয়ে করার মানে কী? তা হল- আমিই (বিজেপি) ক্ষমতা- এই দম্ভ দেখানো; যাতে হামলা খেয়ে ভয়ে মুসলমানেরা এই ক্ষমতার কাছেই নতজানু হওয়া লুটিয়ে পড়া উপায়হীন শ্রেয়কাজ মনে করে। একইভাবে গত নির্বাচনের সময় অমিত শাহ এই কপিলকে দিয়েই মুসলমানরা ‘দেশদ্রোহী’, তাদের ‘গোলি মারো’ বলে স্টেজ থেকে বিবৃতি পড়ে শুনিয়েছিল। অমিতের ধারণা এই হুঙ্কার দেয়ার কাজটা তিনি নিজে না করে কপিলকে দিয়ে করালে তিনি কপিলকেও প্রটেক্ট করতে পারবেন আর নিজেকেও হুকুমদাতা সংগঠক মূল নেতা হয়েও আড়ালে রাখতে পারবেন। কিন্তু বিপরীতে, নিজে করলে আদালতে প্রমাণসহ দায়ী বলে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আর তাতে বলা যায় না, মোদীও অমিতের সাথে সহমরণ থেকে সেক্ষেত্রে সম্ভবত খুব বেশি দূরে থাকতে পারবেন না। এসব বিবেচনা থেকেই মোদী ও অমিত দিল্লির হামলা ইস্যুতে পাবলিক এড়িয়ে চলা বা কোন ঘরোয়া সমাবেশে সামনে নিজেরা মুখ খোলা এড়িয়ে যেতেই ‘কপিল মিশ্র’ ধরনের উচ্চাকাঙ্খী লোকদের সামনে আনছেন।

মানুষের অসহায়ত্ব আর হতাশা – গার্ডিয়ান

এদিকে ম্যাসাকারের চতুর্থ দিনেও মোদী (বা অমিত) মুখ না খুললেও ম্যাসাকার বেশি হয়ে গেছে কি না এই ভীতি থেকে মোদী ঐদিন প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে দিল্লির ‘স্বরাষ্ট্র ইস্যু’ দেখতে দায়িত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু প্রথম আট-দশ ঘণ্টা দোভাল প্রকাশ করেননি  ঠিক কী পরিচয়ে তিনি দিল্লিতে তদারকি কাজে নেমেছেন। ইতোমধ্যে  মিডিয়ায় জল্পনা রিপোর্ট প্রকাশ হয়ে যায় যে, তবে কি এটা ” দিল্লি পুলিশের দায়ীত্বে থাকা মন্ত্রী অমিতের উপর মোদীর অনাস্থার প্রকাশ”? এই জল্পনা আরো বাড়িয়ে দেয় সে সময় সোনিয়া গান্ধীর এক প্রেস কনফারেন্স। তিনি দাবি করেন, দিল্লি্কে রক্ষার ব্যর্থতায় অমিতকে পদত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার সারা দিন ড: মনমোহন সিং অমিতের পদত্যাগ দাবি করেছেন সেটা ভারতের টিভিগুলোর টেলপে স্ক্রল করে দেখিয়ে গেছে। ওদিকে দোভালের বিপদ হল, প্রেসকে যদি বলেন মোদী তাকে পাঠিয়েছেন তাহলে প্রশ্ন উঠবে, অমিত শাহ কি ব্যর্থ? তাই তিনি বলে বসেছেন যে, না অমিত শাহও তাকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কিছু ঢাকা পড়ে নাই।
কিন্তু দোভালের দিল্লির দায়িত্ব নেয়া বা পাওয়া, এটা আবার তাঁর পদ-পদবির দিক থেকেও মিলে না। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাগিরি করা মূলত বহিঃরাষ্ট্রবিষয়ক কাজ অথবা বড়জোর ‘র’সহ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি পর্যন্ত। কিন্তু ভারতের কোন ধরণের সশস্ত্র  “বাহিনীর বা ফোর্সের” উপর কমান্ড করা তার কাজ নয়। কাজেই দিল্লি পুলিশের তাঁর উপর মাতব্বরির দায় নেয়া কাজটা মিলে না। এছাড়া হামলাকারির মূলনেতা অমিত নিজেই যদি দোভালকে এখন সেই হামলা ঠেকাতে পাঠায় তবে এই পরস্পরবিরোধী একই অমিতের মনের কারণে দোভালের কাজে এর ছাপ পড়ারই কথা। যেমন দিল্লির অলিগলিতে একটা বাচ্চা মেয়ের অভিযোগে তিনি বলে বসেন ‘‘যো হো গ্যায়া হো গ্যায়া।… আর এনিয়ে মিডিয়ায় সোরগোল এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলা পুলিশের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মুখে মানায় না।। আসলেই তাই। পুলিশ বলবে আমরা তাকে গ্রেফতার করে আদালতে তুলব – এমন একশনের কথাই হতে হয় পুলিশের কথা।
সম্ভবত এসব বিবেচনায় মোদী-অমিত এক কানপড়া রিপোর্ট ছাপিয়েছেন দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় “বেনামি সূত্র” থেকে  পাওয়া খবর বলে। দাবি করা হয়েছে ‘ট্রাম্পকে বিদায় দেয়ার পর থেকে মোদী নাকি খুবই আপসেট। মোদী মনে করছেন, দেশে-বিদেশে তার ইমেজ ইজ্জত গেছে।’ [ Upset with how the Hindu-Muslim riots in Northeast Delhi overshadowed the visit of US President Donald Trump to India, Prime Minister Narendra Modi ]  গোপন সুত্রের এই দাবির সত্য-মিথ্যা যতটুকুই হোক মোদী-অমিতের এখন উভয় সঙ্কট হল, প্রকাশ্যে দিল্লি ম্যাসাকার ইস্যুতে মিডিয়ার সামনে মুখ খুললেই সরাসরি এর দায় তাঁদের ওপর এসে পড়বেই। কারণ দিল্লি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং দিল্লি পুলিশের বস হলেন অমিত। বলতে গেলে এর দায়িত্ব মোদীর মন্ত্রীসভার। সে জন্য মিডিয়া এড়িয়ে চুপ করে চলতে চাইছেন মোদী-অমিত দু’জনই। এজন্য  দোভালকে দিল্লি পাঠিয়েই দিল্লির অলি-গলিতে দোভাল যাচ্ছেন এর লাইভ ছবি টিভিতে ব্যাপক প্রচার করা হয়েছে। আর  এতে দেখাতে চেয়েছেন মোদী-অমিত অনেক ব্যস্ত মানুষ তাই অজিত দোভালকে পাঠিয়ে ঠিকই খবরাখবর নিচ্ছেন। কিন্তু এর আবার বিপদ হল, বাজারের মোদী-অমিতবিরোধী যেসব বয়ান বা কানাঘুষা চলছে এর বিরুদ্ধে মোদী-অমিত নিজের বয়ান ও গল্প ঠিকঠাক তাঁরা নিজে পাবলিকলি হাজির থেকে তা প্রকাশ করে পালটা সুযোগ নিতে পারছেন না।

মোদী-অমিতের পিছনে টিকটিক করা অন্য বিপদ – আদালতঃ
অন্য দিকে, এই মুহূর্তে মোদী-অমিতের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিপদ হল – আদালত।  ভিকটিম ও ক্ষতিগ্রস্থরা যতজন আদালত পর্যন্ত পৌছাতে পারবেন, প্রতিকার চাইবেন – সেটা কেবল শুধু মোদী-অমিত নয় আদালতের জন্যও যথেষ্ট পরীক্ষার। আদালতকে মোদী-অমিতের বিরুদ্ধে একশনে যাবার  তাকত দেখাতে হবে এই চাপ বাড়তেই থাকবে। সেটা আদালত এড়াবে কী করে? আদালত না চাইলেও এটা  যেকোন সময় যেকোন দিকে টার্ণ নিতে পারে।  তবে যেভাবে চাপ বাড়ছে সেটা অবশ্যই সব পক্ষের জন্য খুবই বিপদের ইঙ্গিত।  ইতোমধ্যে কপিল মিশ্রসহ অন্তত চারজন বিজেপির  ফেল করা বা প্রাক্তন এমএলএ-এর বিরুদ্ধে গত নির্বাচনী আইনভঙ্গের অভিযোগে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল এরই পুর্ণাঙ্গ মামলায় মামলা রুজু [FIR] করার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি ছেড়েছেন দিল্লির সাবেক প্রধান বিচারপতি মুরলীধর। তাতে ইতোমধ্যে মামলা রুজু করাও হয়ে গেছে। এবার যদি আরও উপরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো রিট হয়ে যায়? এসব নিয়ে মোদী-অমিত চিন্তিত। তাই আদালতের ওপর  মোদী-অমিত নিজেদের লোকের মাধ্যমে প্রচণ্ড পাল্টা চাপ সৃষ্টি ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে চলেছেন।

তাহলে কি মোদী-অমিত হেরে যেতে পারেন? পাবলিক রিয়াকশনের চাপ তীব্র হলে অবশ্যই হতে পারেন এবং তা খুবই সহজে। মিডিয়া যে চাপটা বাডাতে বড় ভুমিকা রাখছে। এমনকি এর সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও তা খুবই বিপদের হবে ।  এখানে পরিস্কার করে একটা কথা বলে ও জেনে রাখতে হবে আমাদের।  এখানেই ভারত-রাষ্ট্র ভাঙনের উভয় সঙ্কটে। কারণ যে ম্যাসাকার ঘটে গেছে এতেই রাষ্ট্রের ভাঙন আরও নিশ্চিত করে গেছে। এখন আদালত যদি নুন্যতম প্রতিকারও না দেখায়, মোদী-অমিতের প্রভাবে বা ভয়ে ভীত হয়ে তাদেরকে মাফ করে দেয়, পালানোর সুযোগ করে দেয়;  তবে, এর সোজা মানে হবে আদালতও রাষ্ট্রকে ভাঙনের পথে আগানোকে আরও সহযোগিতা করল। এটাকে দ্রুত করে দিল। আবার যদি নুন্যতম কিছু একশন নেয় সেটাই মোদী-অমিতকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলবে। আর তাতেও ভারত ভাঙ্গন আগাবে। কারণ বিকল্প শক্তি নাই, তৈরি নাই বা হয়নি। যদিও গুজরাট ২০০২ সালের ম্যসাকারের অভিজ্ঞতা বলছে অনেক কষ্ট করে হলেও মোদী-অমিত নিজেদেরকে গুজরাটের মামলাগুলো থেকে শেষে মুক্ত করে ফেলেছেন। কাজেই এবারও পারবে না কেন?। কিন্তু অনেকে এখানে পালটা বলবেন মোদী-অমিত এখন আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়ীত্বে না। এখন তারা কেন্দ্রের সরকারের দায়ীত্বে। অতএব এর ওজন বেশি, সংশিষ্ট বিপরীত স্বার্থের পক্ষগুলো ও তাদের স্টেকও অনেক বেশি। কাজেই এবার একই রকমভাবে ঘটনা শেষে হবে না। না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি হয়ত।

ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়াঃ
সারকথাটা হল, আদালত মোদী-অমিতের কোন অপরাধ আমল ও শাস্তির ব্যবস্থা না করতে পারলেও ভারতের ভাঙন তীব্রভা বাড়বে। তবে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারলেও ভাঙন বন্ধ হবে না যদিও ভাঙ্গার তীব্রতা কমতে পারে। আসলে, একা আদালত ভারতের ভাঙন ঠেকাতে পারবে না। এছাড়া আরও  সবচেয়ে বড় পক্ষ বা ফ্যাক্টর হল অন্য বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বা দলের অনুপস্থিতির কারণে ভাঙনের সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন সিএএ ইস্যুতে এখনও এটা কোন বিকল্প রাজনৈতিক দলের  আন্দোলন নয়।  এটা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক তরুণ মধ্যবিত্ত আর তাদের সহযোগী হল সরাসরি ভিকটিম মুসলমানেরা। (এর বিপরীতে মোদীর পক্ষে তরুণদের আরেক অংশ – মুলত “মফস্বলের তরুণেরা” এরাই বজরং দলসহ বিভিন্ন নামের সেনা এমন বিজেপির অঙ্গ দলগুলোর মুল শক্তি। এমনকি কপিল মিশ্র ধরণের উচ্চাকাঙ্খীদের বয়স লক্ষণীয়। )

এছাড়া একটু দূরে আর কমপ্লেক্স ভাবে আছে আসাম বা নর্থইস্ট রাজ্যগুলো। যারা ঠিক ছাত্র ও ভিকটিম মুসলমানদের মতই সিএএ-বিরোধী কিন্তু  একইভাবে ও কারণে মোদী-অমিতের বিরোধী নয়, তবে নিজেদের অবস্থান হিসাবে বিরোধী। অর্থাৎ বিজেপির এই বিকল্প বিরোধীদের পরিচয়ই বলে তারা কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে বা রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত কেউ নয়।

কংগ্রেস অথবা বিরোধী যেকোন আঞ্চলিক দল সিপিএম বা ডিএমকে, জনতাদল ধরণের যারা – এরা সকলেই মনে করে বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের ক্ষমতা পাওয়া যাবে কী করে সেদিক থেকে এই সাপেক্ষে বিজেপির বিরোধী সিএএ ইস্যুটাকে তাদের দেখতে হবে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস জোট করে তৃণমুলের মমতার  বিরুদ্ধে মাঠে নেমে গেছে। প্রকাশ্যেই বলছে এটা মোদী-মমতার বিরুদ্ধে একসাথে  আন্দোলন। এই জোটের জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি মিথ্যা করে হলেও তারা দেখাতে পারে যে মোদী-মমতার রাজনীতি বা লক্ষ্য এক। এই চেষ্টাটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের মুল কাজ মনে করে করে যাচ্ছে। কারণ আগামি বছর কলকাতার রাজ্য নির্বাচন, সেখানে মমতাকে ফেলানো  এটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের প্রধান লক্ষ্য।  মোদী-অমিতের প্রণীত সিএএ-এর বিরোধিতা এই জোটের কাছে এখানে তুলনায় কিছুই নয়। বড়জোর সেকেন্ডারি। এতে মোদী যদি ভারতকে মুসলমান শুণ্য করে ফেলেও দেয় তাতেও তাদের জোটের লক্ষ্য একই থাকবে। কারণ মোদীকে সরানো তাদের মুখ্য ইস্যু নয়, রাজ্যের ক্ষমতা পাওয়াই ইস্যু। এই একই অবস্থা কমবেশি সব আঞ্চলিক দলেরই।
আবার এসবেরই কিছু উস্কানিমূলক প্রভাব হয়ত আছে ভারতের মুসলমানদের উপর। তারাও সিএএ কে কেবল মুসলমানদের ইস্যু হিসাবে দেখার পক্ষপাতি। যাতে এটাকে কারণ দেখিয়ে সিএএ-বিরোধিতা কেবল মুসলমানদেরই বিরোধীতা হিসাবে তুলে ধরতে পারে।  মুসলমানেরা সিএএ-বিরোধী  ইস্যুতে এলায়েন্স করতে কম আগ্রহী।  মুসলমানেরা ঠিক নাগরিক হিসাবে সিএএ এর বিরোধী হওয়ার চেয়ে বরং মুসলমান হিসাবে এর বিরোধীতার আন্দোলন করতে চায়। মুসলমানেরাই কেবল মুসলমানদের কজে[cause] বা কারণে সোচ্চার হবে – এই রাজনীতি করতে চায়। এটা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতি । এই কৌশলের কারণে ভারতের মুসলমানেরা নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। মূল কারণ, বিজেপি এটাই চায়। মুসলমান হিসাবে মুসলমানেরা সংগঠিত হচ্ছে এটা দেখিয়েই তার হিন্দুদের সহজে  ভয় দেখিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে। বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি তো এটাই, ফলে তাদের ভোটের বাক্স ভরে তুলার কাজ সফল হবে বলে বিজেপির অনুমান।
অন্যদিকে ভারতে মোদীর ম্যাসাকারের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প ও সংগঠিত রাজনৈতিক দল নাই। কমন ইস্যুতে এলায়েন্স নাই।  রাজনৈতিক হবু শক্তি আছে, মানুষও আছে কিন্তু কাঠামো বা উপযোগী  রাজনীতি নাই। শক্তিজোট বা এলায়েন্স নাই। এজন্যই ভারত-রাষ্ট্রের ভাঙন অনিবার্য – তাতে তা ধীরে বা দ্রুত তা যাই হোক।  অথচ একেকটা অঞ্চলিক দলের কেবল রাজ্যকেন্দ্রিক ক্ষমতা পাবার পরিকল্পনা ও রাজনীতি আছে – এটাই তো ভারত ভেঙ্গে ফেলার পক্ষে কাজ করা। অর্থাৎ লড়াইটা আগাচ্ছে  “হিন্দুত্ব” বনাম রাজ্যক্ষমতা দখল – এদুই রাজনীতি; যেটা আসলে মূলত  ভারত ভাঙ্গনের সবচেয়ে বড় তোড়জোড় এক রাজনীতি! অবশ্যই এভাবেই এদিকেই তা যাচ্ছে!

ট্রাম্পের সফরঃ
অনেকে মনে করছেন ট্রাম্পের ভারত সফর সামগ্রিকভাবে মোদীর ম্যাসাকারের পক্ষে একটা আমেরিকান সমর্থন – এই ইমেজ সৃষ্টির আয়োজন করা। কিন্তু এই অনুমান ভিত্তিহীন; এমন মনে করার কারণ আছে। যদিও এমন ক্যাম্পেইন হয়, হতে পারে। এর আলাদা মুল্যও আছে।
ট্রাম্পের এই সফর ছিল মূলত আসন্ন নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে  কিছু সম্ভাব্য বাড়তি মাইলেজ পাওয়া যায় কিনা এরই এক প্রচেষ্টা এটা। যাতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রবাসীরা ট্রাম্পকে সমর্থন বা ভোট দিতে পারে। ঠিক মোদীর শেষ আমেরিকা সফরে “হাউডি মোদী” সমাবেশটা যেই লক্ষ্য হাসিলে আয়োজন করা হয়েছিল। আর বিপরীতে ট্রাম্পের সফরে মোদীর এখনকার লাভ হল যে,  মোদীর বিরুদ্ধে তার দেশের বিরোধীদের অভিযোগ যে, তিনি নানান বিতর্কিত আইন পাস করিয়ে বিদেশে ভারতের ইমেজ নষ্ট করেছেন, ভারতকে বন্ধুশূণ্য করে ফেলছেন ইত্যাদি – এসবের বিরুদ্ধে মোদীর সপক্ষে একটা ভালো জবাব হবে ট্রাম্পের এই সফর। দুই নেতার এমন পরস্পরের ব্যক্তিস্বার্থের, পরস্পর পরস্পরের পিঠচুলকে দেওয়ার – সেই সফর ছিল এটা। এ কারণে, হোয়াইট হাউজ থেকেই সফরের আগে ট্রাম্প নিজে এবং একজন স্টাফ অফিসার পরিষ্কার করে বলে রেখেছিলেন যে, এই সফরে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হবে না। আর প্রকাশ্য অভিযোগ এনেছিলেন যে,  ভারত  “ভাল আচরণ করে না”
এছাড়া ট্রাম্পের একটু ক্ষ্যাপা কথাবার্তাও অশ্যই ছিল।  এমনকি হোয়াইট হাউজের এই উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন যে  “ট্রাম্প ভারতে গিয়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার’ বিষয়টি জোরালো ভাবে তুলবেন। তাঁর কথায়,‘‘সব ধর্মকে সমান সম্মান দেওয়ার বিষয়টি ভারতের সংবিধানের অন্তর্গত। গোটা বিশ্ব এ ব্যাপারে ভারত কি করে সেদিকে তাকিয়ে আছে’’ ।

এছাড়া, ভারতে এসে পাবলিক বক্তৃতায় ট্রাম্প মোদীকে প্রশংসার ছলে বলতে গিয়ে মোদীবিরোধী স্বার্থগুলোও আড়াল থেকে বাইরে এনে ফেলেছিলেন।  যেমন “মোদী ভাল লোক কিন্তু খুব টাফ”। এই টাফ বলতে আসলে এটা মূলত উভয় দেশেরই লেনদেন বাণিজ্যে বাড়তি ট্যারিফ আরোপের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়াতে, সেব্যাপারে বলছিলেন মোদী টাফ। কিন্তু এই বাণিজ্যবিরোধ হাল্কা করার জন্য কোন পক্ষ থেকে  কোন কথাবার্তা চালানো এই সফরের কোনই লক্ষ্য ছিল না। সবকিছুই যেমন ছিল সেখানেই স্থবির হয়ে আছে তাই। এমনকি আমেরিকান নৌজাহাজ থেকে উড়তে পারে এমন হেলিকপ্টার কেনার কথাবার্তাও একইভাবে বিতর্কে স্থবির হয়েই আছে।

কিন্তু যেটা প্রথমে ট্রাম্প ছাড় দিতে চান নাই যে, মুসলমানদের উপর নিপীড়ন বেড়েছে এ নিয়ে “ভারতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলবেন ট্রাম্প” এমন শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল সফর শুরুর আগের দিন।  কেননা এর বহু আগেই আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’ সিএএ ইস্যুতে মোদীর কঠোর সমালোচনা করেছিল। নাগরিক বৈষম্য করার অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু মোদী ট্রাম্পের সফরের আগেই এমন মন্তব্য পেয়েই লবি শুরু করে দেন। শেষে মোদী একটি রফা করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সফরকালে এনিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কোন কথা হবে না। সেটাই বজায় রাখা হয়েছিল আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু শর্ত অনুসারে  ট্রাম্পের বিদায়ের পরের দিনই “দিল্লিতে বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে হামলা চালানো” হয়েছে বলে অভিযোগ করে বসেছে আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’।

ভারতীয় মিডিয়াঃ
মোদীর জাতিবাদী বা পাকিস্তানবিরোধী উস্কানির বিষয় না হলে ভারতীয় মিডিয়া এপর্যন্ত সময়ে সরকারের বিপক্ষে, সময়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এখন শেষবেলায় পুরোপুরি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তা মোদী-অমিতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এবং তাদের ‘ডুবিয়ে’ দেয়ার সামর্থ্য রাখে। এমনকি, আনন্দবাজার গ্রুপেরই ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ সবার আগে লিড নিয়েছে। ম্যাসাকারের দ্বিতীয় দিনেই সবার আগে তাদের মারাত্মক শিরোনামটা হল, “গুজরাটের মডেল দিল্লি পৌঁছিয়েছে তখন নিরো ডাইনিং-এ” [Neros dine as Gujarat Model reaches Delhi]।

রোম পুড়ছিল আর নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল- এর অনুকরণে বা সেটা মনে রেখে এই শিরোনাম। আর ডাইনিং মানে এখানে ঐ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেই  দিল্লিতে আরেকাংশে  চলছিল মোদী-ট্রাম্পের নৈশভোজ; সেটাকেই ইঙ্গিতে বুঝানো হয়েছিল।  বুঝানো হয়েছিল মোদী আর ট্রাম্প দুজনেই এখানে উদাসীন, দায়ীত্বজ্ঞানহীন – রোমের নিরো।  আবার গুজরাট বলতে এখানে এই মোদী-অমিত জুটিই ২০০২ সালে গুজরাটে রাজ্য সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় ২০০০ মুসলমানের হত্যা করিয়েছিলেন। তাই বলা হচ্ছে সেই গুজরাত মডেলের ম্যাসাকার দিল্লিতে এসে গেছে। টেলিগ্রাফের দেখাদেখি বহু পত্রিকাই পরের দিন একই লিড শিরোনামের রিপোর্ট করেছে। এ ছাড়া পরের দিনের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সরাসরিই লিখেছে ‘দিল্লির গণ-নৃশংসতার টার্গেট মুসলমানেরা’ [Express says Muslims target of mob violence in Delhi]।

আনন্দবাজার  পত্রিকাও ছবিতে চিনিয়ে দিয়ে দেখিয়েছিল কিভাবে লাঠি-রড হাতে হামলাকারী আর পুলিশ একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা সক্রিয় হয়ে হামলার পক্ষে কাজ ভুমিকা রাখছে। আর এমন সব রিপোর্টে  সকলেই দাবি করে বলেছে বা প্রমাণ দেখিয়েছে যে, “এই হামলা পুলিশের সহযোগিতায় ও প্রটেকশনে ঘটেছে”। ফলে মিডিয়ায় এই চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি ইনডিপেন্ডেন্ট অর্থে “স্বাধীন বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের কথাও” ফাঁক-ফোকরে উঠে আসছে। যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে “হেট ক্যাম্পেইন” বা মুসলমানের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য রাখা – এর ক্রাইম, এই অভিযোগ উঠেছে। তাই ২৮ ফেব্রুয়ারির দ্য প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় দিল্লি বিজেপি সভাপতির বরাতে এক রিপোর্ট করে বলা হয়েছে, বিজেপি দিল্লি সভাপতি মনোজ তিওয়ারি বলছেন, “কোন কোন বক্তব্য হেট ক্রাইম বা ঘৃণা-ছড়ানোর তা মূল্যায়ন ও চিহ্নিত করতে একটা স্বাধীন কমিশন দরকার”।

এসব কিছু মিলিয়েই ভারতের সরকারব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ার দিকে ধাপে ধাপে আগাচ্ছে!

 লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে ভারত রাষ্ট্র কোন দিকে আরো আগাল – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]