জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

গৌতম দাস

 ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2T2

সবার মাতৃভাষা রক্ষার পক্ষ নিতে হবে তবে, জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবেঃ
গত শুক্রবার ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই নিজ উন্মেষ ও বিকাশের জন্য নিজ মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ অবাধ ও  নিশ্চিত দেখতে চায়; এটা তাঁর অধিকার আর এই অধিকার রক্ষা করা তাই আমাদের সকলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একুশে ফেব্রুয়ারির সারকথা এটাই। এই দিনটা তাই আমাদের মাতৃভাষা চর্চার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এক স্মরণীয় দিন। উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম হওয়ার প্রাক্কালে সে সময় থেকেই হবু পাকিস্তানে, মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের দিক থেক্‌ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। এতে পুবের ভাগ্য যে পশ্চিমের আধিপত্যের তলায় চাপা পড়ে যাবে – বুঝে না বুঝে  “মুসলিম জাতিবাদের” উচ্ছ্বাসে পড়ে সেটা আমল করতে অনেকের মধ্যেই  অনীহা দেখা দিতে শুরু করেছিল। আর তা থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম বেসুরো হতে শুরু হয়েছিল। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে আমাদের মাতৃভাষা চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে টের পেয়ে আমাদের আপত্তি প্রতিবাদ লড়াইয়ের শুরু এখান থেকেই। আর এখান থেকেই আস্তে আস্তে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের রাষ্ট্রের দিকে চলে যাই আমরা।

তবে একালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ করতে আমাদের দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক ধারাকেই কম-বেশি এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তবুও এর মধ্যে কোথাও জানি একটা ভাগাভাগি বজায় রয়েই গেছে টের পাওয়া যায়। যদিও সব পক্ষ বা ধারার মধ্যে কমন বুঝাবুঝি ঐক্য দেখা যায় তা হল – যেকোন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চার ‘অধিকার’ সমুন্নত রাখতে হবে। পালনের এই ধারার বাইরে অন্য দিকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ অন্য আর ধারাটা হল, ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের দিক থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে তুলে ধরার চেষ্টা।

কারো মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা হয়ে যায়- এটা করে কারা? কেন আসে এরা – এটা বুঝা খুব গুরুত্বপুর্ণ। আসলে একই সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যেকার এথনিক-বিভক্তির কারণে ভিন্নতা বা পড়শি জনগোষ্ঠির উপর আধিপত্য করার আগ্রহ বা সুযোগ নিতে চাওয়া থেকেই অন্যের মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা শুরু হয়।  যদিও শুরুর দিকে “ঐক্য রক্ষার স্বার্থে” এই আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে এমন কথায় অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে স্বেচ্ছায় না বুঝে এই আধিপত্য মেনে নেয়। যেমন আমাদের ভিতর অনেককেই পাওয়া যাবে যারা মনে করে দুনিয়ায় সব মুসলমানের ভাষা আরবী হওয়া উচিত বা না হলেও আরবীর অধীনে সবার আসা উচিত। অথবা এমন হলে খুব ভাল হত এমন মনে করে থাকে।  মানে, ভিন্ন রেস [race] অর্থে জাতি বা ভিন্ন এথনিক [ethnic] গোষ্ঠি অর্থেও জাতি – এমন নির্বিশেষে দুনিয়ার সব ভুগোলের মুসলমানকে আরবী ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে। একথা সত্য যে আরবী ভাষা-সংস্কৃতির অনেক কিছু থেকেই ইসলামকে আলাদা করা মুসকিল। তবু এমন দাবি বা ভাবনার প্রতি সমর্থন তৈরি হয় সাধারণত ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও সৎ আবেগ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাস্তবে এমন সম্ভবত দেখা যাবে না। বরং উলটা পরিস্থিতিই তৈরি করবে।  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে ব্যাপারটা অনারব বা আরব নয় যারা তাদের উপর আরবী ভাষাভাষীদের এক দুর্বিষহ অত্যাচার, প্রবল এক আধিপত্য, সব সুযোগ-সুবিধা আগে আরবেরা পাবে ইত্যাদি এমন এক চরম অবস্থা তৈরি করে তা অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা বা খুনোখুনিতে শেষ হবে। এর মানে কী আমি বলতে চাচ্ছি যে দুনিয়া সব ধারণের মানুষের মধ্যে নুন্যতম কোন ঐক্য রচনা করা বা কাছাকাছি আসা সম্ভবই না। অবশ্যই সম্ভব, তবে একটা পর্যায়ে যখন আমরা আমাদের অপরের রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ রক্ষা করা, যেমন অন্যের মাতৃভাষা রক্ষা করার দায়কর্তব্য – আমি ভিন্ন রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠের হলেও বুঝে যাব এবং রক্ষা করব।  যদিও আর সবার আগে মনে রাখতে হবে কারও মাতৃভাষায় হাত দেওয়া যায় না, যাবে না। আসলে  কারও এথনিক বৈশিষ্টে হাত লাগানো বা চাপিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর এটা অপরাধ হবে সেদিকটা তো আছেই। তাই এই ভুল এড়িয়ে চলতে হবে। মাতৃভাষা মানে মা যে ভাষায় বাচ্চাকে প্রথম কথা শিখায়, কমিউনিকেশন করে। যা বলছিলাম এমন বুঝাবুঝি জাগা সম্ভব হয় এমন সহায়ক  সমাজ ও রাষ্ট্র যা আধিপত্যকে রুখে দেয় তা আগে হাজির থাকতে হবে। অবশ্য দুনিয়ার সব ভাষা আর রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ সবই আল্লাহ সৃষ্টি – এভাবে থিওলজিক্যাল অর্থেও ব্যাপারটা বুঝতে পারি। ফলে একটা ভাষা অন্যটার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা বা চাপিয়ে দেয়া একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
এতসব দিক চিন্তা না করেই সরল মনে ও বিশ্বাসে আমরা অনেকেই এমন সমর্থন দিয়ে ফেলব কারণ তাতে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বাড়বে এমন একটা কিছু চিন্তা করে। অনেকে এটাকে ‘উম্মার শুরু’ বলে ভুলে অতি উতসাহও দেখিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সবকিছুই শেষে অন্যের আধিপত্য মোকাবিলাতেই আমাদের জীবন কাটবে এমন অবস্থাতেই পৌছাবে।
উপরে যেটাকে আধিপত্য বলছি এটাই অন্যের উপনিবেশ বা কলোনি দখলে পড়ে যাওয়া বলতে আমরা যা বুঝি সেই উপনিবেশ ধারণারই ছোট রূপ। মানে আমার উপর কারও বড় ও ব্যাপক আধিপত্য ছেয়ে বসা এটাই তার কলোনি বা উপনিবেশ হয়ে যাওয়া। যদিও শেষ বিচারে কারও আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া এই পুরা ব্যাপারটাই ‘জাতি’ চিন্তার বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সমস্যাজাত। সে কোন এক কল্পিত জাতির স্বার্থে আমার উপরে চেপে বসেছে  এমন সাফাই সেখানে থাকবেই।  যেমন মুসলিম জাতিবাদের স্বার্থে, ইসলামের স্বার্থে  – এই জাতীয় স্বার্থে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া উচিত – এই ছিল পাকিস্তান জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সপক্ষে সাফাই।  অর্থাৎ ব্যাপারটা আসলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তা যাকে অনেক আমরা ‘নেশন-স্টেট’ বলে বুঝি- এই বুঝ থেকে উদ্ভুত সমস্যা।

এই নেশন [nation] বা জাতি ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটা হল এটা অপর জনগোষ্ঠীর ওপর নিজ আধিপত্য বিস্তার ও কায়েমের হাতিয়ার হয়ে যায়। এই আধিপত্য কায়েমের বড় ও প্রবল ধারণাটাই হল অন্য কারও ঘাড়ে উপনিবেশি-কর্তা হয়ে চড়ে বসা অথবা নিজের ঘাড়ে কারও উপনিবেশত্ব কায়েম হতে দেখা।

আধুনিক রাষ্ট্র এই ফেনোমেনার শুরু
আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম এই ফেনোমেনা দুনিয়ায় এসেছিল মোটাদাগে বললে ১৬৫০ সালের দিকে। আধুনিক রাষ্ট্র মানে, মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। অর্থাৎ মনার্কি বা রাজতন্ত্রের শাসনের কবল থেকে বের হতে গিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা শাসন কাঠামো ও ব্যবস্থা দুনিয়ায় কায়েম হতে শুরু করেছিল। কারণ, রাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অগ্রহণযোগ্য দিক ছিল – রাজতন্ত্র বলতে পারে না কে তাকে ক্ষমতা দিয়েছে বা তার ক্ষমতার উৎস কী?
অনেকে অবশ্যই এসব প্রশ্নের অস্বস্তি কাটাতে সমাজের কিছু প্রভাবশালী এলিট তাদের পছন্দের বেছে নেওয়া শাসনকর্তা – এই অর্থে কোন রাজাকে গ্রহণীয় মনে করে বসে। মনকে প্রবোধ দেয়। এই প্রবোধ সম্ভবত স্বীকার করতে চায় না যে আসলে  এগুলোও আরেক ফ্যাকড়ার রাজতন্ত্র মাত্র। কোণ রাজতন্ত্রকে চিনবার সবচেয়ে সহজ চিহ্ন হল এগুলো সার্বজনীনের পছন্দ বা অনুমোদনে তৈরি হয় না, সমাজের সকলে তাকে নির্বাচিত করে না। একটা খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু অবস্থাপন্ন প্রভাবশালী ক্ষমতাবান গোষ্ঠি এই ‘শাসনকর্তা’ খাড়া করে থাকে।  এছাড়া এই শাসনকর্তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন এদের আরেক প্রধান লক্ষণ চিহ্ন হল কিছুদিনের মধ্যেই এটা একটা ডায়নেস্টি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ডায়নেস্টি – মানে রাজার (শাসকের) ছেলে রাজা হবে।

ফিরে যাই মুলকথায় – ক্ষমতার উতস কী? কে দিয়েছে ক্ষমতা? এখানে যদি মেনে নেই যে রাজতন্ত্রে শাসন ক্ষমতার উৎস ‘গায়ের জোর’ মানে, রাজার নিজের বলপ্রয়োগের সক্ষমতাই রাজার ক্ষমতার উৎস, সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে তাহলে রাজাও অন্য কারও যে রাজার উপর আরও বেশি বলপ্রয়োগে সক্ষমতা রাখে তার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হবে ও মারা পড়বে এবং এ কথাটাও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে মানে, এটা জায়েজ তা মানতে হয়।   অর্থাৎ এখানে এসে দেখা যাচ্ছে  ক্ষমতাকে ন্যায়-অন্যায় বা ইনসাফের প্রশ্ন মোকাবেলার সামনে পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে সেকালে উপায় না দেখে রাজা জনসমর্থনকে  ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ভিত্তি বলে খাড়া করতে চায়। যেন যে রাজার পক্ষে ‘জনসমর্থন’ আছে তার সেই ক্ষমতাটা জায়েজ মনে করা হবে। যদিও বেশির ভাগ রাজাই নিজ ক্ষমতার উতস ঐশ্বরিক বা আল্লাহ দিয়েছে ধরণের কথা নিম্নস্বরে বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে  ‘জনসমর্থন’ এর কথা যেটা বলছিলাম, এর যুগটা কম লম্বা নয়। আর এখান থেকে ইংরাজি করোনেশন [Coronation] বা বাংলায় রাজ্যভিষেক বা রাজার ক্ষমতার অভিষেক বা পাবলিক অনুমোদন এর ধারণা হাজির হয়েছিল দেখতে পাই।
কিন্তু সেখান থেকে  বিস্তারে আরও নতুন প্রশ্ন উঠেছিল যে, যদি গণসমর্থনই ক্ষমতার ন্যায্যতার ভিত্তি হয়ে থাকে তাহলে কে রাজা হবে বা কার শাসন-ক্ষমতাকে মেনে নেয়া হবে, অনুমোদিত হবে সেটার সবকিছু ‘পাবলিকই’ ঠিক করে দেক। আর এখান থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ বা নাগরিক। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। এবং জনগণই সেই ক্ষমতা ডেলিগেট [delegate] করে দিবে। মানে, সাময়িক হস্তান্তরিত করতে এক শাসক নির্বাচন করে তার হাতে দিবে- এসব ধারণা বিস্তার লাভ করা শুরু হয়েছিল। যদিও সেটা আরো অনেক কিছুর পরে হয়েছিল। কিভাবে? না, রিপ্রেজেন্টেশন [Representation] বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে নির্বাচিতের হাতে সাময়িকভাবে (পরের নির্বাচন পর্যন্ত) তাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে এসব দিকে ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল। এই হল ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ইনসাফের কার্যকারিতা দিয়ে পাওয়া ক্ষমতা ও এর বৈধতার সমাধান। এক কথায় এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রক্ষমতা, বাংলায় আমরা বলি – গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ধারণা। ফলে স্বভাবতই এখানে রাষ্ট্রক্ষমতার আর কোনও চোরা-ক্ষমতা নয়, বরং এক সুবিন্যস্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়া ডিফাইনড [Defined] ক্ষমতা বা নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো মূলত ইউরোপের ভূখণ্ডে বিকশিত বা পরবর্তিতে তা ফেডারেল রিপাবলিক (১৭৭৬) আমেরিকা্তেও। আর তা থেকে দুনিয়াব্যাপী ব্যাপক রাষ্ট্ররূপগুলোতে এটাই কম-বেশি অনুসরণ করতে দেখা যায়। যেমন নয়া চীনে এসে, চীনের ভাষায় এটা ‘পিউপিলস রিপাবলিক’ [People’s Republic]। এমনকি লেনিনের রাশিয়া তারা নিজেদের রাষ্ট্রকে ভিন্ন দাবি করলেও সোভিয়েত রাষ্ট্র নিজেকে এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র বলেই মেনেছে।

কিন্তু তবু সব সমস্যা মিটে নাই। রিপাবলিক রাষ্ট্রের সাধারণ রেওয়াজ ও রিচুয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে নির্বাচনের দিন থেকে শপথের দিন পর্যন্ত এখানে  ‘গণক্ষমতা’ তৈরির এক প্রক্রিয়া চলে থাকে। এই লক্ষ্যে প্রতিনিধি নির্বাচন ও সাময়িক ক্ষমতা হস্তাস্তর সম্পন্ন করে ক্ষমতার অভিষেক ঘটিয়ে নেয়া অবধি- এই সময়কালটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেয়াল করেন আমরা এখন দাঁড়িয়ে গেছি নির্বাচনেরও আগের ‘এক নিশীথে’। আর চার দিকে হা-হুতাশে।

কলোনি দখল আর জাতিরাষ্ট্রের হাত ধরাধরিঃ
রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও ক্ষমতা তৈরির রেওয়াজ দুনিয়ায় মোটাদাগে চালু হতে দেখা গেছিল ১৬৫০ সালের দিকে; কিন্তু তাতে এর পরেও বড় বিপথগামিতা ঘটেছে, দেখা যায়। মানে চোরাবালিতে পা আটকে যাওয়া বা ভুল রাস্তায় চলে যাওয়া আছে আমরা দেখি। আর এরই নাম হল , নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা। মূলত ‘জাতি’ ধারণাটাই সমস্যার, এটা এক নষ্টা ধারণা হিসেবে হাজির হয়েছিল। রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণার প্রতিশ্রুতি ছিল বা হওয়ার কথা ছিল যে জনগণের সব অংশকেই অন্তর্ভুক্ত করে এখানে এক ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি” নির্মাণ করা হবে। রাষ্ট্রগঠন বা Constitute শব্দের অরিজিনাল অর্থ ছিল এটাই। তাই এটাই আসল রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন হওয়ার কথা। কিন্তু এটা বিপথে চলে যায়। গিয়ে হয়ে যায় জাতি নির্মাণ বা ‘জাতিগঠন’[Nation State]। আর এতে ‘রাজনৈতিক কমিউনিটি’ এভাবে রাষ্ট্র গঠনের ধারণাটাই হারিয়ে যায়।

খেয়াল রাখা দরকার ইউরোপে যখন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বাস্তবায়নের নানা উদ্যোগ কসরত চলছে ঠিক একই সময়ে প্যারালাল আর এক  ফেনোমেনার উত্থানের যুগ সেটা। কলোনি দখলের যুগ সেটা। তাই একই সাথে দুনিয়াতে ব্যাপকভাবে ‘কলোনি দখলের’ শুরু হয়েছিল সেকালে। এটা আরো সম্ভব হয়েছিল সূক্ষ্মমাত্রা [Precision] ও গুণাগুণের স্টিলের আবিষ্কার ও ব্যবহার আর সাথে বারুদ অস্ত্র কম্পাস এসব মিলিয়ে  ব্যাপারটা এক বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ হিসাবে হাজির হয়েছিল। প্রধান বিনিয়োগের আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল যুদ্ধজাহাজ ব্যবসা। যুদ্ধজাহাজ কথার আসল মানে,, পাল তুলে বেরিয়ে পড়া কলোনি দখল ও লুটের কাজে। একাজেরই  এক মডেল ধরণ হল – একেকটা “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” খুলে বসা।  তবে ব্যাপারটা শুধু জাহাজ-বিজ্ঞানের উন্নতি বা বিনিয়োগ ব্যবসার স্বর্ণযুগের নয় বা শুধু তা দিয়ে ঘটেনি। এসবই হতে পেরেছিল এর সাথেই সবচেয়ে নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল এক ভাবাদর্শ বা আইডিয়া। সেটি হলো “জাতি” ধারণা- এর যোগ ঘটা। ব্যাপারটা ইউরোপের যার যার দেশ-রাষ্ট্রের ব্যক্তিমালিক কোম্পানির জাহাজে বিনিয়োগের ব্যবসা হিসেবে তা সে ব্রিটিশ, ফরাসি বা ডাচ ইত্যাদি এরা নিজের একেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলেছিল। আর এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে কলোনি দখলে ঝাঁপিয়ে পড়া ধরনের হয়ে ঘটেছিলও। কিন্তু সাথে আরো কিছু ছিল- তা হলো কলোনি দখলে প্রতিযোগিতা। একে অপরের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া। কিন্তু এরই সাথে ঘটা আরেক বড় ঘটনা ছিল – কোম্পানিগুলো নিজস্ব একান্ত স্বার্থ আর লাভালাভের এই প্রতিযোগিতাকে যেন নিজেদের নিজ নিজ দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে মিথ্যা হলেও তা দেখাতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলোনি দখল প্রতিযোগিতায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ে কতটা বেশি দখল সম্পন্ন করতে পেরেছে – যেন এটা হয়ে যায় কোম্পানিওগুলোর একান্ত বিনিয়োগ স্বার্থ নয়, তা নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ। এই মিথ্যা বয়ান ও তা উপস্থাপনটাই সব কিছু বদলে দিয়েছিল। আর তা করা গিয়েছিল এক ‘জাতি’ ধারণা দিয়ে, দেশ-রাষ্ট্রকে একটা জাতিরাষ্ট্র যেমন, তা এটা ‘জাতীয় স্বার্থ’ এ ধরনের বুলি দিয়ে। এভাবে কোম্পানির স্বার্থ হয়ে যায় কথিত ‘জাতীয় স্বার্থ’। এতে অন্যের দেশকে কলোনি দখলের কাজ এটা যেন আর কোম্পানিগুলোর স্বার্থ নয়- ব্রিটিশ বা ডাচ ‘জাতীয় স্বার্থ’ হয়ে উঠেছিল।
আর তা থেকেই কলোনি দখল আর কোনো ‘অন্যায়’ বা অপরাধ কাজ নয় বরং ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তামাশার দিকটা হল, দেশের অভ্যন্তরে যে রাষ্ট্র নিজের জন্য একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়াকে নিজের কাজকর্তব্য মনে করে, নিজ দেশের বাইরে সেই রাষ্ট্রই আবার অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়াকে জায়েজ মনে করেছিল কিভাবে? এর জবাব কারো কাছে ছিল না। তবে এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যেন নিজেরা একেকটা জাতি, আর তাদের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হল অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়া। এটা জায়েজ মনে করা হতে থাকার মূল কারণ নষ্টা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অথবা তা থেকে উপজাত আরও নষ্টা এক “জাত শ্রেষ্ঠত্বের” ধারণা। [আজকের দিনে যা এক সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হয়ে আবার হাজির হতে দেখা যাচ্ছে] ব্রিটিশরা ফরাসি বা ডাচদের চেয়ে ‘জাতশ্রেষ্ঠ’ শুধু তাই নয় বরং,  অন্য  মহাদেশের যেসব রাষ্ট্র এরা কলোনি-দখল করছিল এমন সবকাজের সপক্ষে সাফাইয়ে সার কত্থাটা হল  জাতিবাদ, জাত শ্রেষ্ঠত্ব অথবা যেমন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব।

অথচ জাতি বা জাতিগঠন ধারণার সাথে মূল রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার ধারণার কোনোই মিল বা সম্পর্ক নাই। একই কথা তো কখনো নয়, ছিল না। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল যেমন ব্রিটেনের বেলায়- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজের ব্যক্তিস্বার্থটাকে কল্পিত এক ‘ব্রিটিশ জাতির’ স্বার্থ বা জাতিরাষ্ট্র স্বার্থ বলে বয়ান তৈরি করে হাজির করেছিল। আর এটাকেই যেন এক ব্রিটিশ রিপাবলিক রাষ্ট্র ও এর স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই ‘জাতি’ ‘জাতিগঠন’ শব্দটাই আসলে কলোনি দখল, অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা – এধরনের কাজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আর এভাবেই ব্রিটিশদের সেকালের ইন্ডিয়াকে কলোনি-দখল যেন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটা কাজ! এভাবে পুরা ইউরোপই রাষ্ট্র গঠনকে কথিত ‘জাতি গঠন’ বুঝেই করে গিয়েছিল; কিন্তু কত দিন?

প্রায় তিনশ বছর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল পর্যন্ত।  এই তিনশ বছর ধরে কলোনি দখল, লুটে খাওয়া আর উদ্বৃত সারপ্লাস পাচার এসবই চলেছিল। কিন্তু এর পরেও হুঁশ এসেছিল কি? হ্যাঁ, অবশ্যই কিন্তু বিশাল খেসারত দেয়ার পরে। জর্মান হিটলারের আগমন ও উত্থান ঘটেছিল সেই খেসারত হিসেবে।

কলোনি দখল যদি জায়েজ হয়, আর  নিজ জাতিরাষ্ট্রের জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখানো আর বড়াই করা যদি সব আকামের সাফাই হয় তাহলে, হিটলারের জার্মানিরও আরো চরম জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে ইউরোপের ব্রিটেন, ফ্রেঞ্চ দেশ-রাষ্ট্রসহ সবার কলোনিগুলা পাল্টা দখল করে নিলে সেটা নাজায়েজ হবে কেন? এভাবে ইউরোপের সব জাতিরাষ্ট্রই হিটলারের তাণ্ডবের ভেতর নিজ জাতশ্রেষ্ঠ বোধের পরিণতি দেখেছিল। এটাই জাতিবাদের পরিণতি, সবার প্রতিচ্ছবি- দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের গ্রেটেস্ট তাৎপর্য। ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তার চরম পরিণতি ইউরোপের সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিল।

অবশ্য এতটুকুই ইউরোপের রাষ্টড়চিন্তায় বদল আসার একমাত্র কারণ না। এর সাথে আরও ভূমিকা রেখেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের (বৃটিশ-ফ্রেঞ্চসহ মিত্রশক্তির) আমেরিকান সামরিক-অর্থনৈতিক সাহায্য পাবার শর্ত যে, ইউরোপকে কলোনি-দখলের দিন শেষ করতে হবে। এটা নাজায়েজ ও অপরাধ মানতে হবে। রাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকারের উপর দাঁড়াতে হবে। সার্বজনীন মানবাধিকার মানবার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ইত্যাদি। যুদ্ধ শেষে ঐ শর্ত মোতাবেক ইউরোপ এভাবে নিজেকে ব্যাপকভাবে বদলে নিয়েছিল।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আরেক অদ্ভুত ঘটনা হল আমাদের এদিকে।, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশগুলোর ট্রেন্ড হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া। কিন্তু কেমন স্বাধীন রাষ্ট্র? বাস্তবে এরা  রাষ্ট্র বলতে তখনও জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বলেই বুঝেছিল। অর্থাৎ একদিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ কলোনি মুক্তির হলেও আর এক দিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ এই তিন মহাদেশে আসলে ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ গড়ার দিকে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের বুঝ তাদের আসেনি। এলোই না।

আর এর সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়েছিল নেহরু-গান্ধীর ভারত। যেমন আজও কাশ্মীর ইস্যুতে, কাশ্মীর আসলে কে শাসন করবে এর একমাত্র নির্ধারক হল খোদ কাশ্মীরের বাসিন্দারা। কোনো রাজা নয়, রাজ যদি কাউকে একসেশন চুক্তি করে) কাশ্মীর দিয়েও দেয় তবুও সে রাষ্ট্রও নয়। এই হল বিশ্বযুদ্ধে শেষের শর্ত ও বুঝাবুঝির কনভেনশন হিসাবে পরের  দুনিয়ার নতুন নীতি। যে নীতি অনুসরণে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল আর সেখানে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে গিয়ে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গিয়েছিল, নেহরু-গান্ধী একটা স্বাধীন ভারত পেয়েছিল। অথচ নেহরু আজীবন ছিল এ সম্পর্কে বেখবর। জবরদস্তিতে তিনি কাশ্মীর দখল করে রেখেছেন।

অন্য বড় বিপর্যয়টা হলো রাষ্ট্র বলতেই তা ‘জাতিরাষ্ট্র’ বলে বুঝা। বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র ধারণা কী পরিণতি হয়েছিল, আর এতে ইউরোপে কী বদল এলো এসব নিয়ে নেহরু-গান্ধীর হুঁশ বা বুঝাবুঝি শূন্য থেকে যায়। তাই ভারত হয় একটা সেই জাতিরাষ্ট্রই। য়ার বলারই বাহুল্য ঘটনা সেখানেই থামে নাই, থামার কথাও না। তাই দেখা যায় ভারত জাতিরাষ্ট্র হয়ে হাজির হওয়ার একটা চেন-রিঅ্যাকশন আছে।

নেহরু-গান্ধীর তথা পুরা কংগ্রেসেরই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝার সমস্যা হল, তারা আসলে একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের কল্পনা করছেন বা এমন ধারণার লালন ও অনুসারি হচ্ছেন। আর এটা গ্রহণে মুসলমানদের মনে অস্বস্তি হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে নাগরিক বৈষম্য তৈরি হবেই- এটাই হল সারকথা। জবরদস্তিতে তাই করতে যাওয়া হয়েছিল। যার সোজা মানে হল বেপরোয়া ভাবে মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র গড়তে সেদিকে ঠেলে দেয়া। এর পরেও ১৯২৮ সালে জিন্নাহর ‘১৪ দফা প্রস্তাব একটা খুবই সুচিন্তিত প্রস্তাব ছিল [ইংরাজিতে পেতে এখানে]। কিন্তু এই সমাধানও আমলই করা হয় নাই। আর তা থেকে জিন্নাহ ফাইনালি কংগ্রেসের সম্ভাবনার হাত ছেড়ে  মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের পাকিস্তান গড়ার দিকে চলে যান। অথবা বলা যায় পরিস্থিতি এদিকে চলে যায়। যদিও তাতেও সমস্যার শেষ হয় না। পরবর্তিতে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে হবে- বলাতে পূর্ব পাকিস্তান ভীত হয়ে পড়ে, বিপদ দেখতে পায় অসাম্যের যে পশ্চিমের আধিপত্যের নিচে সে চাপা পড়তে যাচ্ছে। তাই ক্রমে সেই আবার একই – রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদে পৌঁছায় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু জাতিরাষ্ট্র বুঝ আমাদের কাউকে ছাড়ে নাই। একই প্রশ্ন, একই আধিপত্য কায়েমের অভিযোগ এবার পাহাড়িদের দিক থেকে উঠে। কিন্তু তাজ্জবের ব্যাপার হল, পাহাড়িদের চোখেও এর সমাধান হল আবার সেই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝবার চিন্তা আর তা থেকে এক “জম্মু জাতিবাদ”! দেখাই যাচ্ছে এটা এক লম্বা চেন-রিঅ্যাকশন। কিন্তু দুনিয়ার অভিমুখ আঁচ করা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র চিন্তা আমাদের ছুঁতে পারেনি।

রামমোহন রায় ও তাঁর ব্রাহ্ম প্রকল্পঃ
এর ভিতরে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে  ‘প্রগতিশীলেরা’। কারণ তারাও মূলত জাতিরাষ্ট্রবাদী। আর এরা আবার জাতি বলতে সেটা আবার ছুপা হিন্দু-জাতি বুঝ।
যার আদর্শ প্রমাণ রামমোহন রায় ও তার নতুন করে এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করার প্রচেষ্টা। রামমোহনকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা ভারতে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করেন। কিন্তু রেনেসাঁর গুরু তিনি নতুন ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন কেন? অথচ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত ‘প্রগতিশীলরা’ এতে আপত্তিকর কিছু দেখেনি। চেপে গেছেন। পরবর্তিতে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করে যায়।
এ দিকে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করাতে এই ব্যর্থতাই আবার সাফাই হিসেবে হাজির হয় যে জাতি বলতে হিন্দু-জাতি বুঝি হবে। আর তা থেকে এবার এরা সবাই মিলে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ধারণার অনুসারী হয়ে যান। আর এমনটা তারা এতই অবলীলায় হয়ে যান যে জাতি বলতে যে তারা এক্সক্লুসিভ হিন্দু-জাতি বলে বুঝতেছেন এটাও আর অনুভব করেন না। তাই কোনো জিন্নাহ বা কোনো মুসলমান হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে প্রশ্ন বা আপত্তি তুললে উল্টা তাকেই ‘সাম্প্রদায়িক লোক’ অথবা ‘ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চাওয়া লোক’ ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে ঘৃণাবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন তারা। একাজই তাদের প্রগতিশীলতার শুরু এখান থেকে। অথচ বাস্তবতা হল, সমস্যাটা রাষ্ট্র বলতে তা একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বলে বুঝা থেকে শুরু।

অতএব একালের বড় শিক্ষা হল, সব জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চা সুযোগ থাকা বা রাখা এটা তার মৌলিক অধিকার বলে মানতে হবে। কিন্তু এরপর এ থেকে কোণভাবেই জাতিরাষ্ট্র চিন্তার অনুসারী হওয়ার পথে যাওয়া যাবে না। বরং, জাতিরাষ্ট্র এই চিন্তা বা ধারণাটাই আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র; সবার এক পরিচয়, সবাই নাগরিক এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে। আর সেই সাথে তা হতে হবে- সবাই একই পরিচয় নাগরিক এবং বৈষম্যহীন সমান নাগরিক। সাম্য, মর্যাদা আর ইনসাফের এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘মাতৃভাষার পক্ষ নিলে তা জাতিবাদ নয়”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

‘বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

গৌতম দাস

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2xm

 

ডান-বামের রাজনীতির কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি, শুনেছি। কিন্তু এর পিছনের কথা কী? প্রথমত বাম ও দান বলে শ্রেণী ভাগ করা তা বামপন্থীদের করা, তাদের চোখে দেখে চালু করা হয়েছিল। প্রায়ই আমরা বলতে শুনি, অমুকে বামপন্থী রাজনীতি করেন। যেমন, কেউ কাউকে অপছন্দ করলে, তার গায়ে “কালো দাগ” লাগিয়ে দিতে চাইলে শোনা যায়, সে লোকের নামের আগে তিনি ‘ডানপন্থী’ শব্দ বসিয়ে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অথবা দাবি করে বলেন, “উনি তো ডানপন্থী”। আসলে বলতে চান ইনি নেতি বা খারাপ চিন্তার লোক। অর্থাৎ শেষে সার কথা দাঁড়াল, যারা ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ কথাগুলো ব্যবহার করেন তারা বলতে চাচ্ছেন- বামপন্থী মানে ভাল আর ডানপন্থী মানে খারাপ লোক। কিন্তু এই নামকরণ কী সঠিক? আর কিসের ভিত্তিতে এই নামকরণ? কাকে ডান বলব আর কাকে বাম? এই ডান-বাম কোথা থেকে এল?

এ প্রসঙ্গে এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে বটে; কিন্তু এর জবাব আমরা যথার্থ পাই আর না পাই, শেষ বিচারে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্টই রয়ে যায়। তবে, ইতিহাসে এমন ধারণার প্রথম উদ্ভব কবে, কখন, কিভাবে – এই বিচারে বলা যায়, ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ‘ফরাসি বিপ্লবের’ পর তার সোস্যালিস্ট প্রতিনিধিরা সংসদে স্পিকারের বামদিকে সদলবলে একসাথে বসতেন। ফলে বাম দিকে যারা বসেন তাদের রাজনীতি অর্থে বামপন্থা শব্দের উদ্ভব। আর সেখান থেকেই পরে বামপন্থী (left), লেফটিস্ট (leftist), লেফট উইং (left wing) ইত্যাদি বাম-বিষয়ক নানা নামের পরিচিতি চালু হয়ে যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাও এই ব্যাখ্যাকে মেনে সায় দেয়। আর যারা বামেদের বিরোধী, স্বভাবতই বামপন্থীরা তাদের ডানপন্থী নামে ডাকার রেওয়াজও এখান থেকে চালু করে দেন। তবে সাধারণভাবে বললে, এভাবে ডান-বাম শ্রেণীকরণ করা খুবই হালকা চিন্তা বা লুজ টক (loose talk) ধরণের কথা; মানে যথেষ্ট না ভেবে চিন্তা করা বা দুর্বল-চিন্তার ভিত্তিতে দাঁড় করানো বক্তব্য।

এই নামকরণের  ভিতর অনেক ধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলোর মধ্যে প্রধান হল, এই বাম-ডান শ্রেণীকরণ (category) করা – এটা এক ‘বাইনারি’ (binary) ভাবনা। অর্থাৎ যার কেবল দুইটা রূপই হতে পারে বলে আগের সীমা টেনে রাখা হয়। এজন্য অঙ্কের ভাষাতেও বাইনারির অর্থ – শূন্য আর এক এই দুই অঙ্ক। মানে আমাদের পরিচিত (এক দুই থেকে নয় আর শুন্য) এভাবে দশটা অঙ্ক দিয়ে সংখ্যা লেখা নয়। কেবল শুন্য আর এক ব্যবহার করে সংখ্যা লেখা। এই ‘বাইনারি’ কথার সোজা মানে হল – হয় এটা, না হলে ওটা; এর বাইরে কিছু নাই, একথা বলা। হয় তুমি আমার বন্ধুর দলে আসো নইলে, তুমি আমার শত্রু – সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও তাঁর বন্ধুরা এমন বাইনারি বিভাজনের ভাষায় কথা বলতেন। অর্থাৎ এমন দুই অবস্থার বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না বলে আগে থেকেই ধরে নেয়া হয়। অথবা বলা যায়, কাউকে হয় সাদা না হলে কালো হতে হবে- এমন মনে করা। অথচ বাস্তবে সাদা আর কালোর মাঝখানে অনেক রঙ আছে, হতে পারে। কারণ হরেক অনুপাতের সাদা ও কালোর মিশ্রণে আলাদা আলাদা বহু রঙ হতে পারে। তাই কেউ কালো না হলে তা সাদা হবেই, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; তা সহজেই বুঝা যায়। কোনো কিছু সাদা অথবা কালো না হলে, মিশ্রণের হলে তাকে ধূসর বলা যায়। আর ধূসর বলতে আবার একটা নয় অনেক ধরনের ধুসর হতে পারে – যাকে আমরা সাদা-কাল মিশ্রণের নানা শেড (shade) বলি, এমন অসংখ্য শেডের ধূসর আছে, হতে পারে। কম সাদা কিন্তু বেশি কালো, অথবা বেশি সাদা কিন্তু কম কালো এমন বিভিন্ন ধরন বা শেডের ধূসর হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পুরা ব্যাপারটাকে কেবল ‘সাদা না হলে কালো’ বলে জোর করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা – এটাই বাইনারি দাবি করার চেষ্টার মতই অস্পষ্ট কাণ্ড হল – কাউকে ‘বামপন্থী না হলে, ডানপন্থী’ বলা বা নাম দেয়ার মত।

তবে এটা ঠিক যে, ফরাসি বিপ্লবের কিছু বৈশিষ্ট্যও এই ধরণের শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। এমনিতে ফরাসি বিপ্লবের এক বৈশিষ্ট্য হল, সেটা ছিল গরিব ও সাধারণ মানুষের প্রাধান্যে ঘটা একটা বিপ্লব-বিদ্রোহের ঘটনা; আর বিশেষত তা ঘটেছিল সমাজের এলিট, অবস্থাপন্ন, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধেও। তবে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই বিদ্রোহ অভিমুখ-বিহীন ছিল না। আবার অনেকেরই ধারণা, “মডার্ন রিপাবলিকান রাষ্ট্রের” সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল ফরাসি বিপ্লব। যদিও উল্লেখ করার মত ব্যাপার হল, আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬) মানে যেটা কলোনিবিরোধী চরিত্রের প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লব, সেটা ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) চেয়ে তা অন্তত ১৩ বছর আগের ঘটনা। আর রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার মধ্যে যেসব ভিত্তিমূলক চিন্তা – এমন ভিত-উপাদান খুঁজে পাবার দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব যথেষ্ট সমৃদ্ধ; অন্তত ফরাসি বিপ্লবের সাথে তুলনায়। আমেরিকান বিপ্লব এক্ষেত্রে তা কোথাও কোথাও অনন্য ও চমৎকার বটে। তবু অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা ফরাসি বিপ্লবের রেফারেন্স দেন প্রায়ই এবং সহজেই; এর তুলনায় আমেরিকান বিপ্লবের নাম প্রায় নেয়াই হয় না, তাদের। বাস্তবতা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার ভাবনা ও এর বাস্তবায়নের দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কোনো অংশেই কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ফরাসি বিপ্লবের ফলে বাম-ডান ক্যাটাগরি করে কথা বলার ভাবনা আসার পিছনের সম্ভাব্য কারণ হল – গরিব বনাম বড়লোক, এমন ভাবনা ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে ছিল। তাই সেখানে স্বভাবতই গরিব পক্ষকে আপন ও কাম্য বা ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিপরীতে, দেখা যায় আমেরিকান বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় বিষয় হল – অধিকার (ইংরেজিতে right); মানে, মানবিক-নাগরিক অধিকার (human rights) মানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার। [এটাই ফরাসি বিপ্লব আর আমেরিকান বিপ্লবের মুল ফারাকও বটে]। বলা যায়, সাধারণভাবে নাগরিক মাত্রই তাঁর “অধিকার” ধারণার চেয়ে বাম বা কমিউনিস্টদের চিন্তা (গরিব-বড়লোক এমন ভাগে) গরিব দশার প্রতি বেশি আগ্রহী, সহানুভূতি বেশি। এটাই মৌলিক পার্থক্য। যদিও বাম-ডান বলে ভাগ করে মানুষের নামের আগে বিশেষণ লাগানো নিঃসন্দেহে খুবই অস্পষ্ট ও দুর্বল-চিন্তায় আচ্ছন্ন।

আর একটু সরাসরি এবং স্পষ্ট করে বললে, ফরাসি বিপ্লবের সারবস্তু যদি সমাজের এলিট, অবস্থাবান, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধে গরিবদের উঠে দাঁড়ানো হয় এবং এই অর্থে একে বিপ্লব বলি – তা বলতে পারি অবশ্যই। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে, সমাধান পেতে চাইলে কেমন রাষ্ট্র চাই এই অর্থে, “অধিকার” ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের দরকার – এই বোধ সেখানে অস্পষ্ট করে রাখা ছিল। যাদের ভেতর এই বোধ অস্পষ্ট, তারাই মূলত বাম-ডান ভাগের ভক্ত। অথচ নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকারের ভিত্তিতে এবং নাগরিক সাম্যের নীতিতে একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন – এটাই রিপাবলিক ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আগেই বলেছি, বাম-ডান হল এক বাইনারি চিন্তাব্যবস্থা। এর মানে কোন ‘বামপন্থীর’ চোখে আপনি তার গ্রুপের নন, এ কথার মানে হল তিনি বলবেন, আপনি ডানপন্থী। সবকিছুই যেন বাম অথবা ডান হতেই হবে। যদিও বাম ও ডান উভয়েরই আবার উপবিভাগ আছে, করা হয়ে থাকে। যেমন – চরম বাম (extreme left), অতি বাম (far left) – বা ultra left। বাংলায় এখান থেকে ‘চরমপন্থী’ শব্দটা এসেছে। তাই আসলে, বাম-ডান বলে একটা শ্রেণীকরণ আগে আছে- এই বলে আগেই ধরে নেয়া একটা ধারণা আছে বলে ধরে নিলে এর ওপর ‘চরমপন্থী’ শব্দটা দাঁড়ানো পাওয়া যাবে। বামপন্থা ধারণাটার চরম রূপটাকে বুঝাতে এর নাম হয়েছে ‘চরমপন্থী’ (এক্সট্রিমিস্ট, extremist)। এই হল বামপন্থার উপবিভাগ। ওদিকে একইভাবে অতি-ডান (far right) বা চরম ডান (ultra right)- এগুলো ডানেরই নানা উপবিভাগ। এজন্য বামপন্থীদের করা এই চিন্তাব্যবস্থায় ডানের বেলায় – কোনো ধর্মীয় গণতন্ত্রী দল, রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী ইত্যাদিকে তারা ডানপন্থী খাপে ফেলেছে। এ ছাড়া রেসিস্ট (racist) বা ফ্যাসিস্টদের (facist)  বামপন্থিরা ‘চরম ডানপন্থী’ বলে মনে করে খাপে ফেলেছে। আবার সোশ্যালিস্ট, লিবারেল বা কমিউনিস্ট- এদেরও বামের উপবিভাগ বলে মনে করা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ‘বাম-ডান এই শ্রেণীকরণের’ প্রবক্তারা রেসিজম (বর্ণবাদ) এবং ফ্যাসিজমকে ‘ডানপন্থী’ ভাগে ফেলেছেন। কিন্তু এতে চিন্তার বিরাট ঘাপলাটা হল, কমিউনিস্টদের মধ্যে কি রেসিজম এবং ফ্যাসিজমের ছায়া নেই? মুখের দাবিতে তারা হয়ত কমিউনিস্ট, নিজেদের বাম বলে দাবি করছেন। অথচ বাস্তব কাজ ও পদক্ষেপ পরিচয়ে কি তাদের কেউ রেসিস্ট অথবা ফ্যাসিস্ট নন? সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রক্ষমতা মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে অথরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্ববাদিতার কিংবা এমন ক্ষমতার অভিযোগ আছে। অতএব রেসিজম এবং ফ্যাসিজমকে ডানপন্থী ভাগে ফেলা – এটাই আর এক জোরালো প্রমাণ যে, বাম-ডানে ভাগ করা মূলত বামপন্থীদের চালু করা পদ্ধতি। অর্থাৎ বামপন্থীরাই মূলত এই শ্রেণীকরণের প্রবক্তা।

এর আর একটা প্রমাণ হল, যাদেরকে কোন কোন মিডিয়া বা বামপন্থীরা  ডানপন্থী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, বিশেষণ লাগায়- কথিত সেই ডানপন্থীরা কিন্তু নিজেদের ‘ডানপন্থী’ বলে অভিহিত করেন না। এছাড়া, আমেরিকার ভেতরে বাম-ডান বলে কাউকে ডাকার, বিশেষণ লাগানোর সাধারণত তেমন চল নাই। বরং আছে উদার (লিবারেল বা liberal) আর এর বিপরীতে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ বা conservative) বলে ভাগ ও চিহ্নিত করার রেওয়াজ। আবার সেখানে উদারেরা নিজেই নিজেকে উদার এবং তাদের বিপরীতে রক্ষণশীলেরা নিজেকে রক্ষণশীল বলেই পরিচয় দিতে কোনো আপত্তি করেন না। শেষ বিচারে বাম-ডান বলে ডাকার আর এক বড় নেতিবাচক দিক হল – এটা ‘নাগরিক-মানবিক’ অধিকার বিষয়টাকে গৌণ, এমনকি অনেক সময়ে তুচ্ছই মনে করে।

ওদিক আর এক মজার দিক হল – লক্ষ করলে আমরা দেখব, বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রের নামের সাথেও কিন্তু ‘রিপাবলিক’ শব্দটা আছে। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রের নামের মধ্যে (যেমন “চীনের পিপলস রিপাবলিক” অথবা “ইউনাইটেড সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিক” ) এই ‘রিপাবলিক’ শব্দটা লিখে রাখা আসলে তা যেন অভ্যাসবশত, নেহায়েত এক রেওয়াজ যেন। এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিশেষ অর্থ তাতপর্য নেই। তবে এর চেয়েও আরও বড় গুরুত্বের দিকটা হল, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নামে ‘রিপাবলিক’ শব্দ থাকলেও ঐনামের ভিতর ‘অধিকার’ বলে অর্থ অন্তর্ভুক্ত নাই। মানে, “নাগরিকের অধিকার” বলে কোনো ধারণাকে রাখা হয় নাই বা অনুসরণ করে লিখা হয়নি। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার বা মৌলিক অধিকার বলে আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না তাই অস্পষ্ট এবং বাস্তবত তা নেই। বরং “শ্রেণীর” কথা তুলে এগুলো সব ঢেকে ফেলা হয়েছে। বরং কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে দেখা যায় নাগরিকদের বহু বস্তুগত জিনিষ পাওয়ার বা ভোগের “অধিকার” আছে। অন্ন, বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা বাসস্থান যোগানো এগুলো সবই যেন রাষ্ট্রের দায়।  কিন্তু গুম-খুন অথবা নিপীড়িত হওয়া – এগুলো থেকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দিবে কিনা এমন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা নেই। আর এমন চিন্তাভাবনা প্রসূত ধারণারই এক অনুষঙ্গ হল ‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ।

‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ বা কমিউনিস্ট আইডিয়ার আধিপত্য – এটা গত শতক পর্যন্ত ভালই দর্পের সাথে চলতে পেরেছিল বলা যায়। গত শতক ছিল মূলত ‘জাতীয়তাবাদী’ চিন্তার শতক। যদিও “জাতীয়তাবাদের রাজনীতি” বলে এর চলা শতকের শুরু থেকে শুরু হয় নাই। কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এর প্রবল উপস্থিতি শুরু হয়। কারণ এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল পরিণতিতে উপনিবেশ ব্যবস্থা দুনিয়া থেকে উঠে গিয়েছিল। এর পর থেকে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমন আইডিয়া বা ভাবনা হল নানা কিসিমের ‘জাতীয়তাবাদের রাজনীতি’।  আসলে (কমিউনিস্টসহ) যেকোন সার্বভৌম রাষ্ট্র মাত্রই, জাতিবাদের ইঙ্গিত সেখানে থাকবেই। আবার এই সময়ের রাজনীতিতে  মূলত রিপাবলিক রাষ্ট্র হতেই হবে এই মূলসুরের সাথে অনেক জায়গায় আবার অনুসঙ্গে ইসলামও ছিল। তবে তা “জাতীয়তাবাদী ইসলাম” এই ধরনের জাতীয়তাবাদ অর্থে [যেমন, ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান (১৯৪৭) অথবা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান (১৯৭৯)]। তবে সবার উপরেই চিন্তাধারা হিশাবে ‘ডান-বাম বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ’- গত শতক পর্যন্ত এটা ভালোভাবেই ছিল। কিন্তু এখন চলতি নতুন শতকে?

এই শতকের শুরুতে আমরা দেখেছি ‘আলকায়েদা’ ফেনোমেনা। মানে ইসলামও কোন বিপ্লবী তত্ত্বের এক উৎস হতে পারে, এই দাবি। যদি এর viable বা টিকে যাবে এমন রূপটা এখনই পাওয়া গেছে কি না তা স্পষ্ট নয় বা প্রমাণিত হয়নি। তবে এর ফলে মোটের উপর  দুনিয়ার সব রাজনৈতিক চিন্তাতেই “ইসলাম প্রশ্ন” – একটা নতুন শক্ত অনুষঙ্গ হয়ে হাজির হয়ে গেছে। সব রাজনৈতিক চিন্তাকেই এখন  “ইসলাম প্রশ্নে” তার অবস্থান দৃষ্টিভঙ্গি বলতে পারতে হবে – এই বাড়তি দিকটা তৈরি হয়েছে। তাই এই কালে এসে ম্রিয়মান হয়ে পড়া বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া অস্পষ্ট আরো অনেক চিন্তার মত ‘ডান-বাম’ বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ – ক্রমশ ম্লান হয়ে  যাচ্ছে। এর যৌবনের সেই ধার বা সক্ষমতা আর নেই। এর বড় কারণ খোদ ‘আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণাটাও এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে, এর পর্যালোচনার দাবি উঠে গেছে। ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে আমল কতে নিবার দাবি উঠে গেছে। এভাবে এক ‘রিভিউড’ বা ‘ক্রিটিক্যাল রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণা পুনরায় হাজির করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করা হয়। এদিকে, বাম-ডান বলাসহ কোনো অস্পষ্ট বা আধো বোলের কোনো ধারণা – একালে এদের খাতক একেবারেই কমে গেছে, যাচ্ছে।

বরং একালে এসে কেউ যদি কেবল বাম-ডান প্রগতিতে আঁকড়ে পড়ে আছে, থাকে এমন দেখি, সর্বোচ্চ প্রগতির চিন্তা বলে বড়াই করতে দেখি তবে বুঝতে হবে এই শতকে দুনিয়া কোথায় চলে গেছে এই খবর সে রাখে না। দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তাদের চিন্তাব্যবস্থায় প্রগতির বড়াইয়ে বুঁদ হয়ে, এর বাইরে কোন খোঁজ না রাখায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে সেই হিশাবে শীর্ষে উঠে আসা এমন রাষ্ট্র হল ভারত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাম-ডান’ ভাবনার তাৎপর্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]