মোদীকে আচ্ছা শিক্ষা দিল এক দুবাই রাজকুমারি

মোদীকে আচ্ছা শিক্ষা দিল এক দুবাই রাজকুমারি

গৌতম দাস

১১ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Zt

কিছুই নজর এড়াবে না, দুবাইয়ের রাজকীয় থাপ্পড় ThePRINT_

তেজস্বী সূর্য [Tejasvi Surya] – এটা ভারতের এক তরুণ বিজেপি এমপির নাম, যার বয়স এখন সবে ২৯ বছর। পুরা নাম Lakya Suryanarayana Tejasvi বা লক্ষ সুর্যনারায়ন তেজস্বী। নামগুলো এখানে বাংলা উচ্চারণ  অনুসরণ করলে যেমন হয় মানে বাংলা ফোনেটিক করে লেখা হয়েছে। তিনি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু এর এমপি। অর্থাৎ কর্ণাটক রাজ্য মানে ভারতের ‘কন্নড়’ নামের জনগোষ্ঠী ও তাদের  কানাড়া ভাষা , এই দ্রাবিড়ীয় ভাষাভাষীদের রাজ্য।  গত বছর ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রের নির্বাচনে তিনি দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণ বেঙ্গালুরু থেকে  এমপি বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে মাত্র এক বছরের মধ্যে  তিনি ভারতের বাইরে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বড় এক ‘কুখ্যাতি’ কামিয়ে ফেলেছেন। ভারতের যারা বাইরে দুনিয়াদারির খবর রাখেন তারা বুঝে যান যে, তেজস্বীর পাশে দাঁড়ানো যাবে না বরং ওর দায় না নিয়ে তাকে নিন্দা করতে হবে। ওর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আর ভারতের যারা বিজেপি দলের প্রভাবে ইতোমধ্যেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণায় অন্ধ হয়ে গেছেন এবং হিটলারি জাতিবাদী-বর্ণবাদী উগ্র চিন্তা ধারণ করেন তারা মনে করেন তেজস্বীর বদনামের প্রতিশোধ নিতে ভারতের মুসলমানদের উপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যদিও ব্যাপারটা মোটেও ঢিল-পাটকেলের মত পাল্টাপাল্টি ইস্যু ছিল না বা নয়।

এমনিতেই ভারতের অর্থনীতির ঢলে পড়ার খবর গত বছরের শেষ থেকে উদাম প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল ( গত ২০১৯ মে এর নির্বাচন পর্যন্ত ওই সব তথ্য  প্রকাশ বহুকষ্টে মোদী ঠেকিয়ে রেখেছিলেন) যে,  ভারতের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই খুবই খারাপ দিকে মোড় নিয়ে ফেলেছে। এর উপর আবার নতুন বছরের শুরু থেকেই অর্থনীতির আরও ঢলে পড়া স্পষ্ট হতে থাকে, করোনার কারণে অর্থনীতি আরেক বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে তাই। এই খারাপ ধাক্কায় সরকার অজনপ্রিয় হতে পড়তে যাচ্ছে, তা টের পেয়ে মোদি মুসলমানবিদ্বেষী কড়া হিন্দুত্ববাদে উসকানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। যেমন এখন আবার গত কয়েকদিন ধরে পাকিস্তান সীমান্তে  উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।   যাতে মুসলমানদের উপরে হিন্দুরা শ্রেষ্ঠ – এমন সুপ্রিমিস্ট চিন্তার উসকানি ও বর্ণবাদী নাগরিক ভেদাভেদ-চিন্তা ছড়িয়ে তাদের মধ্যে একটি জোশও এনে দেয়, আর তা দিয়ে পাবলিক লাইফে মোদীর অর্থনীতির চাপ ও কষ্ট থেকে তাদেরকে যতটা ভুলিয়ে রাখা যায় আর কী!

টার্গেট মওলানা সা’দ, মুসলমানেরা নিচা জাতঃ
ভারতে লকডাউন পালন কার্যত শুরু করা হয়েছিল গত ২৩ মার্চ বিকেল থেকে। আর এবছরে দিল্লির তাবলীগ জামাত সমাবেশ শুরু ও শেষ হয়েছিল এর অন্তত ১০ দিন আগেই; অর্থাৎ এর আয়োজনে কোনো আইনভঙ্গ করা হয়নি, বরং সরকারি অনুমতি নিয়েই ঐ সমাবেশ করা হয়েছিল। লকডাউন শুরু হওয়ার পর কারা কারা করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত সমাজের বিভিন্ন কোণে এদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে সমাবেশফেরত কিছু মুসল্লিদেরকেও (সমাজের আর সব কোণের মত) অনুসন্ধানে তাদের বাড়ি বাড়িতে অনেকের মধ্যে (বিবিসির ভাষায় অন্তত তিনশো জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ পাওয়ার পরে……) করোনা পজিটিভ পাওয়া গিয়েছিল।  কিন্তু এতে এবার বিজেপি এ ঘটনাকে তাদের মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণার বিষয় – এই প্রপাগান্ডা-হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছিল। তারা বলা শুরু করেছিল যে, মুসলমানদের জীবন আচার-অভ্যাসই নীচু ধরনের, ওরা খারাপ, তারা নিম্ন কালচারের, ধর্মীয় জাতিগতভাবে তারা নীচুসহ প্রভৃতি এমন সব বয়ান তৈরি করে জাতবিদ্বেষী, প্রবল রেসিজমের এক জোয়ার তুলেছিল সামাজিক নেটওয়ার্কজুড়ে।

মানুষ ও প্রকৃতিঃ মাঝখানে চামচ কেন
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী ও কেমন এটা কমবেশি সব ধর্মতত্বেরই মুখ্য বিষয়। এনিয়ে শিক্ষালাভের এক সহজ ও প্রধান উতস আমাদের ধর্মতত্বগুলো। যেসব সভ্যতা আধুনিকতার নামে এসব দিকর কিছু বুঝেই নাই বা অবজ্ঞা করেছে তারাই বিজ্ঞানবাদী হয়ে কথিত শিল্প-বিপ্লবের নামে  প্রকৃতি ধবংস করে এখন হাহুতাশ করছে। যা ক্ষতি করে ফেলেছে তা এখন আরেক পরিবেশবাদ বলে কিছু একটা বুঝে ছুটা ছুটি করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু শান্তি হচ্ছে না।  তবু মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্ক ধরতে পারার এরা ধারেকাছেও আসতে পারে নাই। প্রাণ কোথায়, কী খুজে পায় না! কারণ স্পিরিচুয়ালিটির কোন ধারণা নাই, আকাঙ্খা নাই, চাহিদাও নাই – সেটা না দার্শনিক জ্ঞান চর্চায় না ধর্মতাত্বিক চর্চা দিক থেকে। অথচ এগুলো আমাদের সমাজের স্বাভাবিক চর্চা থেকেও অন্তত কিছু জেনে নেওয়া যায়।
আমরা চামচ দিয়ে খাওয়া অভ্যাস রপ্ত করলাম না কেন? কেন সরাসরি হাত দিয়ে খাই? একেবারে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে অনুভব করে ধরে সম্পর্ক পাতিয়ে স্পর্শ, গন্ধ স্বাদ সব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানতে হবেই আমাকে তবেই তা প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের আকাঙ্খা পূরণ হবে – এভাবে। এটাই ছোট থেকেই আমাদের শিক্ষা , ওরিয়েন্টেশন।  তাতে কেন এটা করতে হবে তা বুঝি আর না বুঝি। আর সেটা বড় হয়ে নিজে চিন্তা করলেই অনেক কিছু কারণ বুঝে যাওয়া যায়, আমরা বুঝি। প্রকৃতির যা খেলাম তাই তো আমার শরীর হয়? আমি হই! তাহলে প্রকৃতি কে, কী হয় আমার?  এসব নানান প্রশ্ন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয়, ইসলামেরও। যার অনেক জবাব নির্দেশ রূপে আমরা পেয়েছি ইসলাম থেকেও। আঙুল দিয়ে খাব কেন, চেটে চেটে প্লেট থেকে খাব কেন? এর ভিতর সেসব ইঙ্গিত বা  ম্যাসেজ আছে। এখন আপনি যদি বিজ্ঞানবাদী বা হঠাত ‘সাহেব’ বনে গিয়ে আমাকে বলেন আমি ‘নোংরা’, আমার খাওয়ার স্বভাব আচার খারাপ, আমি নিচা  তাহলে আসলে অজ্ঞ কে? আপনি যে প্রকৃতি চিনেন না, সম্পর্ক বুঝেন না সে আপনি না আমি? আপনি যে বুঝের জায়গায় উঠেন নাই সেতাই আপনি বুঝেন না!
আসলে আপনি মোদী ও ভগত এখন মুসলমান ঘৃণা ছড়িয়ে মিথ্যা এবং বিপদজনক হিন্দু-জাত-শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কায়েমের উদ্দেশ্যে এগুলো করছেন। অথচ সিভিলাইজেশন অর্থে প্রাচীন হিন্দুরীতিতে প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক পাতানোর অনুভব আর ইসলাম থেকে পাওয়া রীতির মৌলিক অমিলটা কোথায়? এবিষয়ে আমরা কী ইসলাম থেকেও সমৃদ্ধ হই নাই!  প্রাচীন হিন্দুরীতি অনুযায়ী  আঙুল দিয়ে খাওয়া, চেটে খাওয়া ইত্যাদি কী নাই, প্লেট চাটাও কী নাই? অথচ এই নব্য হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করছে তারা নাকি হিন্দুকালচারের রক্ষক! তারাই আবার প্লেট চেটে খাওয়াকে নিচা কালচার বলতে চাইছে! অদ্ভুত? তাদের মুসলমান বিদ্বেষে এতই প্রবল ঘৃণায় মারাত্মক যে তারা এখন সাহেব বা বিজ্ঞানবাদী হয়ে হলেও মুসলমান কোপাতে উঠেপড়ে লেগেছে!

হিন্দু-জাত-শ্রেষ্ঠত্ব কায়েমের উন্মাদনায় ঘৃণা ছড়ানোটা বিজেপি সংগঠিত ও প্রবলভাবে করেছিল তাদের আইটি সেল ও ক্যাম্পেইনের প্রধান অমিত মালব্যের নেতৃত্বে। এটা ঠিক যে ভারতে ইতোমধ্যে কবে থেকে করোনাভাইরাস সমাজে প্রান্তরে  ইতোমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছে তা সরকারের জানা ছিল না। এখন বুঝা যাচ্ছে ভারতে লকডাউনের সিদ্ধান্ত আরও আগেই নেয়া উচিত ছিল।  সেটা সরকারেরও বুঝতে অজানা থেকে গিয়েছিল, আর এতে শুধু মুসলমান নয় হিন্দু ধর্মের নানা সমাবেশকেও  তাই একইভাবে সরকার অনুমতি দিয়েছিল। সুতরাং আইনি দিক থেকে দেখলে তাবলিগ জামাত কোন আইনভঙ্গ করে নাই তাই দোষীও নয়। তাবলীগের সমাবেশ মানেই বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আসা মানুষের সমাবেশ। যদিও তারা দলবদ্ধভাবে নিজেরা বিভিন্ন দেশের ঘটনার প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেরাই স্বেচ্ছায় আগাম সতর্কতা হিসাবে সমাবেশ করা থেকে এবার বিরত বা দেরি করতে পারলে এর সুবিধা সবাই পেতে পারত। এতটুকুই।  কিন্তু  আবার বলছি, এটা তাবলীগের কোন ক্রাইম নয়। বিদেশ থেকে উড়ে জাহাজে কী আর লোক আসেনি? অন্য ধর্মীয় সমাবেশ কী হয় নাই। কাজেই একমাত্র উতস তাবলীগ তা তো নয়। আর অন্যদেশ থেকে বিমানবন্দরে তাবলীগের লোকদেরকে বাধা দিয়ে কোয়ারানটাইনে না রেখে বাধাহীন সমাবেশে যেতে দেওয়ার দায়ভার অবশ্যই সরকারের সংশিষ্ট অফিসের। তবে যা কেউই ইচ্ছা করে করে নাই। ভারতে  তাহলে তো মোদী সরকারই সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল যে সে লকডাউনের সিদ্ধান্ত  দিতে দেরি করেছে। তবে অনেক নামাজি মুসলমানেদের বা আল্লার পথে থাকা মুসলমানদের কোরোনা ধরে না – এই জাতীয় নামাজি আবেগ ভরা কথা আমরা শুনেছি, এগুলো তাদের কোন কাজে আসেনি। উলটা অন্যের খোঁচাখুচি বা টিটকারি করে বলা কথাবার্থা শুনার কারণ হয়েছে। আবার নিশ্চয় যারা নামাজি হয়েও আবার করোনা আক্রান্ত হয়েই গেছেন তারা এজন্য কাউকে দোষারাপ করতে আগ্রহী হবেন না। কারণ, এগুলো এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের।
আসলে ভারত জুড়ে মুসলমান ঘৃণা ও বিদ্বেষ তো কেবল আজকের ঘটনা নয়, বিশেষত গত  শতকের শুরু থেকেই তা চলে আসছে।  দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। এরই প্রভাব এখনও আছে আর তাতে এখন ভাল করে হাওয়া দিচ্ছে বিজেপি-আরএসএস। দেখেন, এরই প্রভাবে এক সময়ে কলকাতার বাংলা সিনেমার (উত্তম কুমারের শেষ আমলের) নায়িকা এখন বামপন্থিদের সাথে নানান সামাজিক ইস্যুতে সচেতন হিসাবে বিবৃতিদাতা অপর্ণা সেন, তিনি এবার ধরা পড়ে গেছেন।  তিনিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদের জোশে ভেসে গিয়ে “ভারতের তাবলীগ জামাতকে ভারতে করোনাভাইরাস বৃদ্ধির জন্য দায়ী করে শনিবার (৪ এপ্রিল) টুইট করে” বসেছেন।  এটা ঠিক ইদানিং মোদীর বিপক্ষে জনস্বার্থের নানান ইস্যুতে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের বিপুল চাপ এমনকি মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল অপর্ণা সেনদের গ্রুপটাকে। তাই হয়ত ভেবেছিলেন এ সুযোগে না জেনে বুঝে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের গান একটু গেয়ে দিলে মোদী হয়ত তাদের প্রতি নরম হবেন। তিনি তাবলীগ জামাতের কাজকে ‘ক্রিমিন্যাল অ্যাক্ট’ বলে তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন। এতে বুঝা গেল তার মেন্টর বা বুদ্ধিদাতারই আইনি জ্ঞানে বিশাল ঘাটতি আছে আর অপর্ণা সেন  সেই ফাঁদে পড়ে গেছেন। এছাড়া ঐ বিবৃতির পরে, সোশাল মিডিয়ায় অপর্ণা সে্নের বিরুদ্ধেই প্রশ্ন উঠতে থাকে যে তিনি কেবল মুসলমানদের জমায়েত করার দিকে এর বিরুদ্ধে বলছেন কেন? প্রায় একই সময়ে হিন্দু ধর্মীয় জমায়েতগুলোও কী হয় নাই? পত্রিকাটা লিখেছে  “অপর্ণার এমন মন্তব্য করে নেটিজেনদের তোপের মুখে পড়েন। কেউ অপর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘শুধু জামাত নিয়ে কথা বলে কী হবে? মন্দির বা রামনবমী নিয়ে বলছেন না কেন?’ অপর্ণা সরাসরি সমস্যার গভীরে না গিয়ে শুধু মন্তব্য করে ‘মাঙ্কি ব্যালেন্সিং’ করছেন।’ বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ”।

তবে অমিত মালব্য এন্ড গংদের মিথ্যা কিন্তু সংগঠিত প্রপাগান্ডা শক্ত ছিল। কারণ, এমনিতেই করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে  দুর্বিষহ কষ্টকর জীবনে ছিল, ভারতের সাধারণ মানুষ, তাদেরই মনে সেই সুযোগে এই ঘৃণা ঢুকানো হয়েছিল। এতে ভারতজুড়ে হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্বের সুপ্রিমিস্ট ধারণা, এক গভীর রেসিজমে ভারতকে ঢেকে ফেলেছিল। বিজেপি-আরএসএস তাদের এমন ‘পারফরম্যান্স’ দেখে বেজায় খুশি। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! পাপ বাপকেও ছাড়ে না!

বিজেপির তরুণ এমপি তেজস্বী সুর্য-এর বেয়াদবিঃ
বিজেপির তরুণ এমপি তেজস্বী সূর্য, তার এমন এক ‘পুরনো পাপের ঘটনা ছিল গত ২০১৫ সালে মার্চের। তিনি আরব নারীদের সম্পর্কে খুবই আপত্তিকর ও অসম্মানজনক মন্তব্য টুইট করেছিলেন তখন। লিখেছিলেন, “৯৫ শতাংশ আরব নারী যৌন-সন্তুষ্টি জিনিসটাই জীবনে বুঝেন নাই। তাদের প্রতিটি মা ভালোবাসায় যৌন-সন্তুষ্টির দিকটা কী তা না বুঝেই খালি বাচ্চা পয়দা করে যাচ্ছে”। বলাবাহুল্য, আরব নারীদের সম্পর্কে   ইতরচিতজ্ঞানে এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য সম্ভবত আর হয় না। এর মানে, যার মনে যেই-ই তার মত নয় – এক অপর – এমন তাদের প্রতি দগদগে ঘৃণা চুড়ে দেয়া ছাড়া তার আর কাজ নাই।  নিজেদের জাতশ্রেষ্ঠত্বের অসুখে ভোগা এক গভীর বর্ণবাদ বা রেসিজম এটা।

মানব জনগোষ্ঠী দুনিয়ার বসতি স্থাপন করে যাত্রা শুরু করেছিল দুনিয়াটার নানা কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়েই, আর শুরুতে তা ছিল পরস্পর একেবারেই যোগাযোগবিহীন। এ ছাড়া সবাই দুনিয়াতে একসাথেই বসতি স্থাপন শুরু করেনি, আগে-পিছেও আছে।  আবার ভুমিগঠন, মাটি প্রকৃতি আর আরহাওয়া মানুষের প্রতি ফেবার সবার বেলায় একই রকম ছিল না। ফলে প্রত্যেকেরই জীবন অভিজ্ঞতা বৈচিত্রে ভরা। তবু নৃতত্ত্ববিদদের কড়া মন্তব্য হল, দুনিয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিটি মানবসভ্যতা তার নিজের বিকাশে সবাই শ্রেষ্ঠত্বের গুণসম্পন্ন হওয়ার সক্ষমতা নিয়েই বেড়ে উঠে। প্রকৃতির সাথে নানানভাবে সম্পর্ক পাতে, অদ্ভুত বৈচিত্রের ভিন্নতায় জীবনের নানান রূপ হাজির করে থাকে। কিন্তু পরে নানা দখলদার সভ্যতার চাপে নিজেদের আর আলাদা বৈশিষ্ট্যে ও অভুতপুর্ব সম্ভাবনাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, অবিকশিত থেকে যায় বা চাপা পড়ে থাকে। আর এই দখলদার সভ্যতাগুলোই নিজেদের বেইনসাফি জুলুমের কাজগুলোকে সাফাই দিতেই জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণার মিথ্যা সাফাই নিয়ে আসে।
মানে সারকথায় তাঁরা বলতে চেয়েছেন; কাজেই সভ্যতার বিকাশে বড় ছোট বলে কিছু নেই, সবাই নানান দিকে শ্রেষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনাময় হয়েই জন্মায়। বরং পরে এমন জাতশ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে যারা মানে, আসলে এবাই অন্যায় কলোনি দখলের পক্ষেই মিথ্যা সাফাই দেয়া। অথবা ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে নিজেদের জুলুমকেই বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। তবে খুশির কথা, দুই বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেছে, অনেক কিছু শিখিয়েছে। বিশেষ করে হিটলারের চরম বর্ণবাদ দেখার পর থেকে বর্ণবাদবিস্তারে এসবের বিরুদ্ধে গ্লোবাল মানুষ নানা আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশন তৈরি করে ফেলেছে। চলতি শতক থেকে একে জাতশ্রেষ্ঠত্বের বর্ণবাদ বা রেসিজম বলে চিহ্নিত করে  একে বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন আদালত- সবই এখন অনেক শক্ত বুঝাবুঝির ভিতের উপরও প্রতিষ্ঠিত এবং জনমতও প্রবল সোচ্চার।
কিন্তু ২০১৫ সালে করা তেজস্বী সূর্যের ঘৃণামূলক মন্তব্য নিয়ে সে সময়ে ততটা প্রতিবাদ না হলেও এবার ২০২০ সালে তা ফিরে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। এর মূল কারণ ইতোমধ্যে “তাবলিগের কারণেই ভারতে করোনা ছড়িয়েছে” অথবা “মুসলমানরা নীচু ধর্মীয় ও সভ্যতার আচার ও কালচারের মানুষ” এসব প্রপাগান্ডা করে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ এবার ভারতে মোদীরা প্রবল করাতে এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে না চাইতেই এক বিরাট রেজিষ্ঠান্স বা প্রতিরোধ সংগঠিত হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে কাজ করে  মোটাদাগে এমন নিম্ন আয়ের শ্রমদাতা অথবা হোয়াইট কলার ম্যানেজার, সেমি ম্যানেজার ধরনের সব পদই ভরিয়ে রেখেছে ভারতীয়রা। যেমন কোন রেসিডেন্সিয়াল হোটেলে কেবল মালিক বা মালিকেরাই হয়ত আরব। কিন্তু এছাড়া এর নিচের সমস্ত নির্বাহী থেকে মিডলসহ তারও নিচের সব লেভেলের ম্যানেজার পর্যন্ত এরা সবাই প্রধাস্নত একচেটিয়া দক্ষিণ ভারতের। আর এরও নিচের স্টাফ বাকি সবাই – নিচের দারোয়ান পর্যন্ত সকলেই এশিয়ান আর সব দেশের। তাই এবার করোনাকালে মধ্যপ্রাচ্যের ঐসব ভারতীয়দের সবার মন-মানসিকতাতে ভারত থেকে আমদানি করা চিন্তার প্রভাবে যে মুসলমানদের ওপরে হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা বয়ান তা সহজেই স্থান পেয়েছিল। আর সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সোশ্যাল মিডিয়ার হিন্দু ভারতীয়রা তাদের বিভিন্ন স্ট্যাটাসে যেহেতু আরবরাও মুসলমান, ফলে তাদের সম্পর্কেও অবাধে হিন্দুশ্রেষ্ঠত্বের বোধে বিভিন্ন বর্ণবাদী মন্তব্য লেখা শুরু হয়ে যায়।  তারা ভুলে গেছিল তাদের ভাত-কাপড় যোগান দিচ্ছে কে?  আর এ সময়েই একপর্যায়ে একজন ২০১৫ সালে তেজস্বী সূর্যের ঐ পুরানা আবার মন্তব্যও সামনে নিয়ে আসে একজন। আর এভাবে পুরো ব্যাপারটাতে শুরু হয় আরব সমাজ ও সরকারগুলোর কড়া প্রতিরোধ ও অ্যাকশন। তারা মন্তব্য নিয়ে ঐ মন্তব্যকারীদের অফিসকে  নোটিফাই করাতে এবার ঐ অফিস থেকে তাদের চাকরিচ্যুতির এবং দেশ থেকে বের করে দেয়ার নোটিশ হাতে ধরিয়ে দেয়া শুরু করেছিল।
কারণটা হল, কোন বনেদি ব্যবসায়ী কখনই চাইতে পারে না যে তার ক্রেতা কেবল একটা ধর্মের লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। এটা বাণিজ্য বিকাশের পরিপন্থি। কারণ ক্রেতা কম হবে, সীমিত হয়ে যাবে। তাই ধর্ম নির্বিশেষে সকল ক্রেতাই তার কাছে কাম্য ও  আদরণীয় হয়। এমনকি তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন্ ধর্ম বা ভুগোলের মানুষকে তেমন পছন্দ না করলেও সেকথা চেহারায় কোনভাবেই ফুটে উঠতে দেন না, একান্ত ব্যক্তিগত করে রেখে দেন বরং কার্যকর চেহারাটা হল  তিনি সবার সহবস্থানই পছন্দ করেন। তাই তিনি মুসলমানদেরকে গালি দিচ্ছে, নিচা দেখাচ্ছে এমন ভারতীয় কর্মচারিকে সবার আগে চাকরিচ্যুত করবেন, এরপর ঐ কর্মচারির জন্য  দেশত্যাগ করানোর একশন নিয়েছেন সেটাই দেখাতে চাইবেন যাতে সকল ক্রেতাদের আস্থা বাড়ে ও অটুট থাকে। তাই এককথায় দুরতক চিন্তা করা বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী মাত্রই তিনি সহবস্থান-বাদী।  মোদী ও তার দলের চরম বেকুবি আত্মঘাতি অবস্থানটা এখানেই। এটাই এখনকার স্টান্ডার্ড গ্লোবাল বিজনেস কালচার। মোদী ও তার দল  যেখানে তুলনায় ঘোরতর  মফস্বলি সংকীর্ণ এক নাদান বালক! কুয়ার ব্যাঙ মাত্র!

ভারতের দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা বলছে, অ্যাকশন শুরু হয়েছিল দুবাইয়ের এক আরব নারী ব্যবসায়ীর উদ্যোগ থেকে [Among the first to call out Surya was Dubai-based businesswoman Noora AlGhurair,…]। তিনি প্রথম এক টুইটে লিখেছেন, ‘করুণা হয় সেই শিক্ষাকে যা তোমাকে নারীদের অসম্মান করতে শিক্ষা দিয়েছে” [“pitied his upbringing that has taught him to disrespect women”.।’ এ ছাড়া তিনি “আরব দেশের ভিসা নিয়ে ঘুরে বেরিয়ে আবার আরব নারীদের অপমান করার ব্যাপারে” সতর্ক করে, এমপি সূর্যের পুরনো টুইটটাকে সাথে গেঁথে দিয়ে নতুন করে টুইট করে দিলেন। স্বভাবতই এবার এটা ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি আসলে একই সাথে ভারতে মুসলমানদের সাথে অসাম্য ও অধস্তন আচরণের ব্যাপারে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন।

“করুণা হয় সেই শিক্ষাকে যা তোমাকে নারীদের অসম্মান করতে শিক্ষা দিয়েছে” – Noora AlGhurair

দ্বিতীয় উদ্যোগ বা সতর্কবাণী আসে আরেক আরব নারীর কাছ থেকেও। তিনি দুবাই রাজপরিবারের রাজকুমারী এক বিদুষী, হেন্দ আল কাসেমি [Princess Hend Al Qassimi]। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যারা এই খোলাখুলি রেসিজম এবং মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টির চোখে দেখে মন্তব্য করছেন যা দুবাইয়ের আইন অনুসারে জরিমানাযোগ্য অপরাধ এবং এ কারণে দেশ থেকে বের করে দেয়া হতেও পারে”। Anyone that is openly racist and discriminatory in the UAE will be fined and made to leave. তিনি আরও হুমকি দিয়ে বলেন “এসব ইসলামফোবিক কাজের প্রত নজর রাখা হবে”।  এর পর থেকে এক চেইন রিঅ্যাকশনে মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলো থেকে প্রতিক্রিয়া ও অ্যাকশনের ঝড় বইতে শুরু করে। অনেকেই চাকরি হারায় এবং অনেককে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়। অনেকেই সরাসরি মোদীকে “একশন দেখতে চাই বলে”  টুইট করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি এর প্রতিক্রিয়ায় মুখরক্ষার দায় ঠেলা এম মন্তব্য করেন টুইটে বলেন,  করোনা কোনো ধর্ম মানে না। তাই সংক্রমণে আক্রান্তের জাত ধর্ম বিচার ঠিক নয়।’অথচ বাস্তবে মোদীর দলের নেতাকর্মীরা মুসলমানদের নীচু দেখানো আর করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য দায়ী করে আগের প্রপাগান্ডা চালাতেই থাকেন।
এদিকে ভারতের এক নারী তেজস্বী সূর্যকে উদ্দেশ করে আর্টিকেল লিখে তাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, নারী-পুরুষের সম্পর্কের সমস্যাটা কোন আরব-অনারবের সমস্যাই নয়। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ভারতীয় নারীদের অবস্থা কী, সেটা খুঁজে না দেখে সে সমস্যা কেবল আরব নারীদের বলে দাবি করতে গেছেন কেন? এটাই তো বর্ণবাদ।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে এই তরুণ সূর্য আরব নারীদের অপমান করে নীচু করছেন কেন? বিশেষত পাঁচ বছর আগে তিনি যখন মাত্র ২৪ বছরের তরুণ?
এর সম্ভাব্য কারণ হল, প্রথমত এই তরুণ কেবল বিজেপির নয়, একেবারে আরএসএসের “স্বয়ংসেবক” সদস্য। মানে এর কোর মেম্বার ও প্রশিক্ষিত ভলিন্টিয়ার। কোন প্রশিক্ষণ? গত ১৯২৫ সালে আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার যিনি হেডগেওয়ারের পরে আরএসএসের পরবর্তী সর্বোচ্চ প্রধান নেতা হয়েছিলেন, তিনি হিটলারের বর্ণ-বিশুদ্ধতার মতবাদে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাদের হাতে এই প্রশিক্ষণের মূল নীতি নির্ধারিত হয়েছিল। হিটলার বেঁচে থাকা অবস্থায় এরা হিটলারের এসব তত্ব শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাই হিটলারের জাতের ‘খাঁটিত্ব’ তারাও মানতেন। আর সেখান থেকে এটা তাদের প্রশিক্ষণের ম্যানুয়াল ও গাইডলাইনে উঠে বসে। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জাতবর্ণবাদী বক্তব্যের উত্থান এবং পতন এবং ফিজিক্যালি তার মৃত্যু ও বিনাশ এসব মিলিয়ে সারা ইউরোপ এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের রাষ্ট্রের গঠনভিত্তিটাই বদলে নিয়েছিল। সারা ইউরোপের গঠন ভিত্তি বলতে মোটামুটি (১৬৫০-১৯৫০) তিনশ বছর ধরে একই গড়ন। সেটা হল এরা সব রাষ্ট্র গুলোই ছিল আসলে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট। অর্থাত সেগুলো আধুনিক রিপাবলিক বলে নিজেদের দাবি করলেও আদতে সেগুলোর মূল বৈশিষ্ঠ ছিল নেশন স্টেট। সারকথায় ‘জাতের ধারণা’ ফলে জাতিঘৃণাও প্রবল এমন এক ‘জাত-রাষ্ট্র (nation state) সেগুলা। আর এখান থেকেই এর সবচেইয়ে চরম রূপটাই হল হিটলারি জাতশ্রেষ্ঠত্ব, এক রেসিজম। তাই এই ভিত্তিটাকেই বদলে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল ইউরোপ। ১৯৫৩ সাল ইউরোপের ৪৭ টা রাষ্ট্র তাদের গঠনভিত্তি বদলাতে এক কনভেনশনে মিলিত হয়েছিল। যেখান থেকে নেশনস্টেটের বদলে তাদের প্রত্যেক রাষ্ট্রের গঠনভিত্তি হয় নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। আর এর গৃহিত কনভেনশনটা সদস্য সকলে মানছে কিনা তা তদারকের জন্য, এবং তা সকলের জন্য মানা বাধ্যতামূলক এমন একটা সুপ্রীম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু বিজেপি ইউরোপের এসব  সংশোধণ আর এসব শিক্ষানেয়ার তাতপর্য কখনও বুঝেও নাই, গ্রহণও করে নাই। তবে এই সমস্যাটা একা বিজেপি-আরএসএস নয় সারা ভারতের নেহেরু-গান্ধী বা কোন কমিউনিস্টসহ সব রাজনৈতিক দলের ভিতরই রাষ্ট্রধারণা বলতে nation state ধারণাটাই শুরু প্রবল নয় বরং একমাত্র অর্থ হয়ে গৃহিত থেকে আছে। ততফাত সম্ভবত এতটুকুই যে বিজেপি-আরএসএস সবসময়ই তাদের উগ্র জাতিবাদ প্রকাশ্যে বলে চর্চা করে। আর কমিউনিস্টসহ অন্যেরা সকলেই কঠিন জাতিবাদী। কিন্তু মুলকথাটা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের চরম উত্থান-পতন থেকে জাতি রাষ্ট্র ধারণা একেবারেই পরিত্যাগ করার যে শিক্ষা দিয়ে গেল, ইউরোপ অন্তত তাদের রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি বদলে যেটার স্বীকৃতি দিয়ে গেল – এই শিক্ষার কোন প্রভাব – কোন জানাশুনা, কোন আলোচনা কোথাও নাই। এমনকি কোন একাদেমিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব ধারণা এসেছে আমাদের জানা নাই। এছাড়া সুনির্দিষ্ট করে কমিউনিস্টদের দায় হল, তারা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে নয়, এর ব্যাপারেই সিরিয়াস নয় শুধু তাই নয়। কখনও এটা স্টাডির বিষয়ও করে নাই। বরং এমনকি অধিকার বা রাষ্ট্র ধারণা এগুলো তার রাজনীতিও নয় কোন এজেন্ডাও নয় মনে করে থাকে এখনও। একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত নতুন নেপাল। অথচ ্মনের ভিতরে সকলেই কোর ধারণায় একেকজন nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী। মজার কথা আমাদের বাঙালি জাতিবাদও একই nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী।  এমনকি পাহাড়িভায়েরাও এর বাইরে নয়। জুম্মু জাতিবাদও একই nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী। আসলে কেউই চোখ খুলে তাকায় দেখে নাই, দুনিয়া যুদ্ধের পর কোনদিকে গিয়েছে, আবার কেমন করে দেখতে হবে তাও কখনও জানা হয় নাই। বরং সারা ইউরোপের যে তিনশ বছরের জাতিরাষ্ট্র ধারণা চ্চালু ছিল, চোখ বন্ধ করে সেটাই কপি করে চলেছে এরা।
তাহলে দাড়ালো চিন্তা ও চর্চার সমস্যার সংকীর্ণতা এটা একা বিজেপি-আরএসেওএসের না। যদিও বিজেপিত-আরএসএসের বেলায় তা সবচেয়ে উগ্রভাবে প্রকাশিত।  তাদের ট্রেনিং সিলেবাস এমন চিন্তা এক খোলাখুলি বিষয়। যার পরিণতি এখন হাতেনাতে মোদী পাচ্ছেন। যদি মোদী এখন থেকে কোন শিক্ষা পাবেন সে সম্ভাবনা দেখা যায় না।
যদিও উগ্র জাতি রাষ্ট্র মানা না মানার ব্যাপারে আরএসএসের চেয়ে বিজেপিতে শিথিলতা কিছুটা রাখা হয়েছে। এ কারণে যারা সরাসরি আরএসএসের সদস্য তারা এত কট্টর বেশি। তেজস্বী সূর্য আরএসএসের সদস্য হিসেবেই সবিশেষ প্রশিক্ষিত। এ ছাড়া তেজস্বী সূর্য বেঙ্গালুরু বিজেপির আইটি সেলের প্রধান।  যে আইটি সেল মানে হল অমিত মালব্যের অধীনে মূলত মুসলমানবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা সেল। গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক তদন্ত করেছিল ইউরোপের ভিতরে বসে ভারতের কারা মুসলমান নাম নিয়ে ফেক ওয়েবসাইট চালায়। তাতে যাদের নাম প্রকাশিত হয়েছিল তাদেরই একজন হল তারেক ফাতাহ।  এখানে একটা রিপোর্টে তার নাম ও ছবি আছে। তিনি মূলত পাকিস্তানি-কানাডিয়ান। তিনি বিজেপিকে ভুয়া ওয়েবসাইট আয়োজন করে দিয়ে অর্থ কামিয়ে নিয়ে থাকেন। এতাই তার পেশা।
এখানে এক মজার দিক হল  তেজস্বী সূর্য যে টুইট করে কুখ্যাতি পেয়েছেন,  সেটা এবার ভাইরাল হয়ে গেলে পর তিনি দাবি করেছেন- এই ভাষ্য তার নয়। এটা নাকি ওই (ভাড়াটে) তারেক ফাতাহ  মন্তব্য। যা হোক এই মন্তব্য অন্যের নামে চালিয়ে এমপি সুর্যের কোন অসতকাজের দায়ে পড়েনি বলে মনে করছেন। কারণ তিনি মূলত যেন নাম ভাড়া দেয়া অথবা ফেক ওয়েব সাইট ভাড়া দেয়া ভাড়াটঙ্কে কিনেছেন।  অমিত মালব্যের সাথে তারেক ফাতাহ এর সম্পর্ক এই সুত্রে, অমিত হল ক্রেতা এবং ফেক মুসলমানবিদ্বেষী খবরের অর্ডারদাতা। আর সেখান থেকেই তারেক ফাতাহ আর তেজস্বী সূর্য-এরা হয়ে যান নানান ছোটবড় ছিচকে কিন্তু ঘৃণিত অপধাধের সাগরেদ। তেজস্বী সূর্য তারেক ফাতাহ এর নামে নিজের অপরাধ চালিয়ে দিলেও কেন তিনি ভাড়াটের মন্তব্য ব্যবহার করলেন , সে জবাব দেননি।
এখন এ দিকে সর্বশেষ  হল, দুবাইয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পবন কাপুর ঐ ২১ এপ্রিলই বুঝেছিলেন মোদী ও তার দল যাই করুক অফিসিয়ালি তাকে ভারত রাষ্ট্রের হয়ে কিছু একশনে যেতে হবে। তাই তিনি ঐদিনই ভারতীয়দের সতর্ক করতে টুইট করে বলেছেন, ‘ভারত ও আরব আমিরাত (দুবাই) একই নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতিতে বিশ্বাসী [India and UAE share value of non-discrimination, says ambassador] ফলে সবাই যেন সতর্ক থাকেন”। এই শুকনা কথায়ই কি মধ্যপ্রাচ্য রাজি হবে, বিশ্বাস করবে, অপমান ভুলতে পারবে? স্বভাবতই তা হবার কথা না। তাহলে?

সর্বশেষটা দেখতে পাচ্ছি আজকে। মোদী আপোষ প্রস্তাব দিচ্ছেন।  এতদিন  দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজ মসজিদে তাবলিগ জামাতের প্রধান মওলানা সা্দকে  হয়রানি আর হেস্তনেস্তের চরমে নেয়া হচ্ছিল। মুসলমানেরা নিচাজাতের বলে সারা ভারতজুড়ে জাতঘৃণাটা এই মওলানা সাদের কান্ধে বন্ধুক রেখে  ঐ মামলার ভয় দেখিয়ে চাপে ফেলে করা হচ্ছিল। দিল্লি পুলিশের প্রচার তুঙ্গে উঠেছিল মওলানা সা’দ নাকি পরিকল্পিতভাবে ভাইরাস ছড়িয়েছেন আর এর ভিডিও ফুটেজ আছে পুলিশের কাছে। অথচ আজকের রিপোর্ট হল সেই দিল্লি পুলিশই বলছে, মাওলানা সা’দের নামে প্রচারিত সেই অডিও ক্লিপ ভুয়া, এডিট করা, ফেক ভিডিও।  এর মানে হল, মোদী-অমিত এখন সা’দের বিরুদ্ধের  মামলাকে ফেক বলে স্বীকার করে তা উঠিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে সওদা করতে চাইছেন, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর এখন তিনি চাইবেন বিনিময়ে মওলানা সা’দ ও তার বন্ধুরা যেন এখন মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও  শাসকদের কাছে মোদী সরকারের পক্ষে সুপারিশ করেন। যাতে ইতোমধ্যে ভারতীয়দের যা ক্ষতি হয়ে গেছে গেছে তবে তা আবার স্বাভাবিক পুরানা সুবিধাদির জায়গায় যেন ফিরে আসে। ইতোমধ্যে গত পরশুদিন টুইটারকে মোদী সরকার সরকারি তরফ থেকে এক চিঠি দেয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে ইতোমধ্যে যে ১২১ টা টুইট করা হয়েছে মোদীর দলের নেতা এমপি বা মন্ত্রীর তরফ থেকে, মওলানা সা’দকে টেররিস্ট বলে অথবা ইসলামের বিরুদ্ধে নন্দা বা আপত্তিকর শব্দে – যেন এসব টুইট মুছে সরায়ে বা মুছে ফেলা হয়। কিন্তু এতে কার ভাগ্য খুলল টুইটারের বা মোদীর? আসলে মোদী এখানে নিজের ইজ্জত রক্ষার্থে এই পদক্ষেপ নিল। তাহলে এতদিন সা’দের বিরুদ্ধে এগুলো চলতে দিয়েছিলেন কেন? এটা কী  সরকার চালানোর কোন নীতি হতে পারে? এত নিলজ্জ ও ইতরচিত! তাহলে শিক্ষাটা কী এখানে? শিক্ষাটা হল দুবাইয়ের একজন রাজকুমারিও জানেন কোনটা রেসিজম-জাতবর্ণবাদ এবং কেন এটা পরিত্যাজ্য ও অপরাধ। অথচ একজন প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তার দলবল আরএসএস পর্যন্ত এর সাগরেদেরা – এদের কেউই তা জানে না, শিখতে পারলও না! হায়্ হিন্দুত্ব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ০৯ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর বিজেপির শ্রেষ্ঠত্ববোধ বিপদে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

 

আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

গৌতম দাস

 ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Lb

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ভারত সফর ছিল চলতি অক্টোবর মাসের ৩ থেকে ৬ তারিখ। প্রধানমন্ত্রী তিন তারিখ সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলেন। সেই দিনই মানে ভোরে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র নেতা শাহরিয়ার কবিরের একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। ওর শিরোনাম ছিল “Hasina ascent marked Hindu turnaround: Kabir”। মানে “হাসিনার ক্ষমতারোহণ হিন্দুদের ঘুরে দাঁড়ানোর চিহ্ন হয়ে উঠেছেঃ কবির”।

ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ কলকাতার আনন্দবাজার গ্রুপের পত্রিকা। তবে এর টার্গেট পাঠক আনন্দবাজারের মত ঠিক ‘অস্বস্তিকর দেশপ্রেমী’ বা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা নন। টেলিগ্রাফ রিপোর্টিংয়ের চেয়ে কলাম দিয়ে পাঠক আকর্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে চলে। সম্ভবত এই পত্রিকা এমন কলামের পাঠকের ওপর ভর করে টিকে যেতে পারে বলে তাদের অনুমান। এই সুবাদে একালের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কিছু কলামিস্টদের ভালো কিছু লেখা আমাদের পড়ার সুযোগ ঘটে যায় অবশ্য। এই বিচারে টেলিগ্রাফ একেবারেই মান খারাপ কোন পত্রিকা না হলেও শাহরিয়ার কবিরের কথিত এই সাক্ষাতকারটা বেশ বেমানান তো বটেই। তবে বুঝাই যায় এটা অর্ডারি বা খেপ মারা মাল। ভদ্র ভাষায় যাকে অনেকে পেজ-বিক্রি করা পাওয়া বা ছাপা লেখা বলে থাকে। মানে, এধরণের পাতায় কী ছাপা হয়েছে এর দায়দায়িত্ব সম্পাদকের নাই বলে মনে করা হয়।

একেবারেই সাজানো আর কথিত এক অধ্যাপককে দিয়ে করানো এই সাক্ষাতকারে যেখানে শেষে শাহরিয়ারের নিজ বীরত্বের প্রশংসাটা বাদ দিলে পাঁচটার মত প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু উনি কোথাকার অধ্যাপক, কী বিষয়ের বা আদৌও কোন অধ্যাপক কিনা এমন কোন পরিচয়-ধারণা দেওয়া নাই সেখানে। তাঁর প্রশ্ন শুনে এক গদ্গদ ঘন আবেগী ধরণের কলকাতার এক আম হিন্দু নাগরিক – এর চেয়ে বেশি, যিনি স্থিরভাবে কিছু চিন্তাও করতে পারেন, এমন মনে হয় নাই। বলা বাহুল্য ওখানে প্রশ্নগুলো ফরমায়েশি। যার উদ্দেশ্য হল একটা প্রচারণা চালানো – এই বলে যে বর্তমান আমলে হিন্দুরা বাংলাদেশে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে – এই কথার পক্ষে ঢাক পিটানো। ভারতের কাছে এই ঢাক পিটিয়ে বাংলাদেশের কোন শাসককে সার্টিফিকেট নিতে হবে কেন, এর কোন সদুত্তর এখানে নাই। তবুও এর উদ্দেশ্যটা আরও বুঝতে হলে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছে তোলা তার অভিযোগগুলোর নাটকটা মনে করে দেখতে পারি। সেখানে হাজির করা প্রিয়া সাহার বক্তব্যেরই পালটা কিছু ঠিক কাটান কথা নয় শ্রেফ দাবিই শাহরিয়ার এখানে জানিয়েছেন।

যেমন, সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার দাবি করেছেন, ২০০৯ সালের পর (সুনির্দিষ্ট করেন নাই) তিন লাখ হিন্দু নাগরিক নাকি বাংলাদেশ থেকে ভারতে দেশান্তরী হয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসন এত ভালো ছিল যে, ওর মধ্যে আড়াই লাখ হিন্দুই আবার ভারত থেকে ফিরে বাংলাদেশে চলে এসেছেন”। [……out of 3 lakh Hindus who had crossed the boundary, two-and-a-half lakh returned to Bangladesh] . মানে হাসিনার আমলেও হিন্দু দেশান্তর আগের মতই ঘটে – তিনি স্বীকার করছেন। তবু হাসিনা বীর এজন্য যে তাঁর আমলে এই তিন লাখের আড়াই লাখই আবার ফিরে আসে, তাই। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দাবি তা অবশ্য জানা যায় না। সেখানে কোনো রেফারেন্স দেয়া নাই। আবার ধরে নেয়া হয়েছে যে তিন না হলেও আড়াই লাখ লোকের এমন যাওয়া আসা কোন ব্যাপারনা। শুধু তাই না। তাদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘর সম্পত্তি তারা আবার ঠিকটাক ফিরেও পেয়েছে। দাবির এই অংশটাই বেশ ইন্টারেস্টিং।  এ ছাড়া আরো দাবি করা হয়েছে, হিন্দুদের জন্য এখন জব মার্কেট খুলে রাখা আছে […job market was thrown open for the Hindus,]। এটা পড়ে কারও মনে সন্দেহ হলেও কিছুই করার নাই যে আগে কি তাহলে এই ‘জব মার্কেট’ বন্ধ ছিল! এছাড়া আরও দাবি আছে। বলছেন, গত নির্বাচনে (২০১৮) ‘তারা’ ব্যবস্থা করাতে, ব্যবস্থা নেয়াতে ও পাহারা দেয়াতে মোট ৬১ কনস্টিটুয়েন্সিতে হিন্দুরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছিলেন। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করাই বোধহয় সঠিক। কারণ এবার কেউ ভোট দিতে পেরেছিল কি না সে অভিজ্ঞতা, সেটা সবারই জানা আছে। সারকথায় শাহরিয়ার তার কোন বক্তব্যের স্বপক্ষেই কোন পয়েন্টে কোনও প্রমাণ সাথে দাখিল করেননি। বলা যায় কেবল কিছু স্টেটমেন্ট রেখেছেন।

বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতিতে’ বড় বাঁক বদল
বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতি’ বিশেষত গত তিন বছর ধরে চলা রাজনীতি খুবই বিপজ্জনক স্কেলে ও ডিরেকশনে আগাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এটা ভারতে মোদীর উত্থান এবং তাতে আরএসএসের ততপরতা ও সুবিধা বিতরণ ও উস্কানির মিলিত প্রভাব বা আফটার এফেক্ট। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির শুরু হিন্দু কমিউনিস্ট নেতাদের হাতে, সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্মের পরে। এটা কোন রাস্তায় যাবে, কিভাবে ফুলে-ফলে বাড়বে সেটিও তাদের হাতেই সূচিত। এভাবে এর কৌশল ও বয়ানগুলোও নির্ধারিত হয়েছিল। এই বাস্তবতা মানলে বলা যায় বাংলাদেশের সেই হিন্দু রাজনীতি একালে এসে এখন আরএসএসের দিকে মোড় নিয়েছে – এটা অকল্পনীয় এবং এটা আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরএসএস যারা এখন সমর্থন করে এদের কাছে অতীত হিন্দু-বুঝের সেকুলারিজম এখন কেমন লাগে? তারা কি এখন আরএসএস করেও সেকুলারিজম অপ্রয়োজনীয় বলে বুঝে তাই বাদ দিয়েছেন? এটা পরিষ্কার করে জানা যায় না। এ ব্যাপারে হ্যাঁ ও না, দু’টি জবাবই পাওয়া যায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদ কিভাবে গ্রহণীয় হয়ে যেতে পারে, প্রগতিবাদী থেকে হিন্দুত্ববাদে ঝাপিয়ে পড়া এই জার্নি – সেটা দেখতে পাওয়াই আসলে এক বিরাট বিস্ময়। যার অপর বা ৯০ শতাংশ পড়শি নাগরিক হল মুসলমান সে কী ভবিষ্যত বুঝে এই রাজনীতি বেছে নেয় সেটা এক বিষ্ময় বললেও কমই বলা হয়, সেটা বুঝা সত্যিই মুশকিল! এঁদের স্বপ্ন কী এক হিন্দুত্বের বাংলাদেশ? এ’ কেমন স্বপ্ন!  এছাড়া ওদিকে বাংলাদেশের হিন্দুদের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বেছে নেওয়া মানে আসলে নিজের জন্য রাজনীতি না করে বরং ভারতের জন্য রাজনীতি করা। বাংলাদেশে যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনায় তারা ছিল সেখান থেকে নগদ কিছু লাভের আশায় ভাড়া খাটাই, তবে আরও বড় গহবরে ঢুকে যাওয়া।  অবশ্য সেকালে মস্কোর বৃষ্টির ছাতা বাংলাদেশে তুলে ধরা গেলে এরা আর এখন দোষ করেছে কী? সে সাফাইওও দেয়া যায়। মানুষ তো এমন করেই থাকে, নানান কারণে। যাই হোক, এসব প্রশ্ন আগামীতে নিজেই নিজের জবাব হয়ে উঠে আসবে হয়ত। তবে মনে রাখতে হবে খোদ ভারতেরই ভবিষ্যৎ হিন্দুত্ববাদের ভেতরে নিহিত হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখনো পুরাটাই অমীমাংসিত।

আবার এই প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে, ইউরোপে হিটলারিজম ফিরে আসতে পারে কী, এমন ধরনের। ইউরোপে হিটলারের নাম না নিয়ে হলেও “হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট” বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী নামের ধারার সমর্থক বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একথা সত্য। তবে এখনো তা বিচ্ছিন্নভাবে ও বিভিন্ন পকেটে। আর ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পই সম্ভবত আমেরিকার শেষ ও ছোট হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে থেকে যাবেন। তাতে ওদিকে স্টিভ বেননেরা [STEVE BANON] আবার সুপ্রিমিস্ট চিন্তাকে জাগাতে মটিভেশনাল ক্লাস নেয়া শুরু করেছেন ইতালিতে। সেটাও সত্য।

এদিকে বাংলাদেশে, যারা নিজেদের সুর্যসেন, প্রীতিলতাদের উত্তরসূরি বলে দাবি করেন, দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকে আজকাল মোদী-আরএসএসের দিকে ছুটছেন। এখানে স্পষ্ট কথাটা হল, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়া, এই প্রশ্নে প্রথমবার ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতে যাওয়া আর তা করতে গিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া পর্যন্ত যারা গিয়েছিলেন – তাদের এটা ছিল এক হিন্দুইজমের রাজনীতিতে ঝাপায় পড়া। এক হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি, যা বাস্তবত জমিদার স্বার্থের রাজনীতি। পূর্ববঙ্গের কৃষি উদ্বৃত্ত যা ততদিনে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে, যা কলকাতায় জমা হচ্ছিল – এর বদলে সেসময় বাংলা ভাগ হয়ে পুর্ববঙ্গ আলাদা হওয়াতে এবার কৃষি উদ্বৃত্ত ঢাকায় জমা হবে – এটা জমিদার স্বার্থের প্রাণকেন্দ্র ‘কলকাতা’ মেনে নিতে চায়নি। এটাই স্বার্থবিরোধের মূল। অথচ এটা তো সাধারণভাবে জমিদারি উচ্ছেদের মত কোন কিছু ছিল না, তাই তাদের গায়ে কোনো আঁচড় লাগার কথাও নয়। তবু এটুকু পরিবর্তনও তারা সহ্য করতে পারেননি। কারণ পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে তাতে পুর্ববঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না বলে তারা কর্তৃত্ব হারাতে হত, একথা ঠিক। এই স্বার্থ হারানো এটা তারা মেনে নিতে চায়নি মূল কারণ এটা আর তা থেকে জমিদারদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান।

কাজেই অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর ওপর অহেতুক বিপ্লবীপনা আরোপ করে কমিউনিস্টদের এদেরকে মহান করে দেখানোর কিছু নাই।  এটা বাংলার বা অন্ততপক্ষে পুর্ববঙ্গের সবার স্বার্থের রাজনীতি ছিল না তা তারা করেও নাই। তাদের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা মানে, জমিদারের স্বার্থে পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধিতা। এটাই তারা করেছিলেন। এটাকে স্বদেশী আন্দোলন বলে াপনি এতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন কি না, সেটা নির্ভর করে আপনার রাজনীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্ভর কি না। এই হল প্রীতিলতা-প্রীতি যাদের আছে তাদের রাজনীতি। কাজেই প্রীতিলতাদের উত্তরসুরিদের এখন মোদী-আরএসএস এর দিকে যাওয়া এটা তো তাদের ন্যাচারাল  গন্তব্য, নয় কী? কাজেই সুর্যসেনদের অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর রাজনীতি একটা হিন্দুইজমের রাজনীতি, সেকালের জমিদারদের স্বার্থের রাজনীতি। এর মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজা রঙের আড়াল চড়িয়ে দেয়া অথবা একে কোন অর্থেই প্রগতিশীল বলে দাবি করার কোন সুযোগ নাই।

এবার একালে আসি। আওয়ামি লীগের বোকা হয়ে যাওয়া, মানে না-বুঝে ভুল রাজনীতি করে ফেলার সময়টা হল যখন আওয়ামী লীগে নিজেই আরএসএসের রাজনীতির শাখা হিসাবে বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট’ দল খুলতে দিয়েছিল অথবা নিজেই খুলে বসেছিল। আমরা আরএসএসের আইকন বিনায়ক দামোদর সাভারকারের “কালো টুপিটা” দেখেও চিনতে পারিনি, কারা আরএসএস আর কারা নয়। অথচ মাথায় এই টুপিটা রাখা, এটা আরএসএস প্রধান মোহন ভগত থেকে শুরু করে হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক, এভাবে আরএসএসের সবার চিহ্ন। এই দল ব্যানারে নিজেদের নাম হিন্দিতে কেন লেখে, সে প্রশ্নও আমরা করিনি।  ব্যাপারটা হল, বাঙালি হিন্দু যদি আবার হিন্দির প্রয়োজন বা প্রীতি বোধ করে তা-ও আবার বাংলাদেশে বসে, বুঝতে হবে এটাই রাজনৈতিক ‘হিন্দুত্ব’- হিটলারি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা- এখানে তা ছেয়ে বসেছে। আমরা আসলে সম্ভবত অবুঝ গর্দভ হয়েছি, অথচ ভাব ধরেছি যে এটা উদারতা উদার। আমাদের উদারতার ঠেলায় আমাদেরই কাপড় খুলে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের হুশ নাই। অন্ততপক্ষে হাত ছেড়ে দিতে ত পারতাম!

বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কবে খোলা হয়েছিল এ নিয়ে অনেক মত আছে। কেউ কেউ ২০১৩ সালও বলে থাকে। তবে আওয়ামী লীগ এদের বিরুদ্ধে কিছু ছোট অ্যাকশনে গিয়েছিল সম্ভবত ২০১৬ সালে। কিন্তু যে বুঝ বা অজুহাতে তা করেছিল তাতেই বোঝা যায় এটাই লীগের ভুল রাজনীতি। লীগ ভেবেছিল এমন ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কায়েম হলে সেটা নাকি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক কাটবে। কেবল এতটুকুই নাকি আওয়ামী লীগ ক্ষতি, দেশের ক্ষতি! চিন্তার ক্ষেত্রে এমনই দীনতায় আক্রান্ত আওয়ামী লীগ! মানে, দলটি চিনতেই পারেনি বাংলাদেশের আরএসএস তার সামনে হাজির। তাই শুধু ভোটের চিন্তাতেই নিজেকে অস্থির রেখেছিল। আবার অন্যদিকটা যদি  দেখি? আচ্ছা ব্যাপারটা যেন এমন বাংলাদেশে কী ভোট হয় এখন? যেন, বাংলাদেশের মানুষের ভোটই আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় আনছে! তাই কি?  নিজের সাথে এ’কেমন প্রতারণা!

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএসের নেতা, হিন্দু মহাজোটেরও নেতা এখন গোবিন্দ প্রামাণিক। তার সাথে চট্টগ্রামের অ্যাডভোকেট আরেক হিন্দু নেতা রানা দাসগুপ্তের ব্যক্তিবিরোধের কথা জানা যায়। তাই তারা একই দল হিন্দু মহাজোট করতে পারেন না বলে শুনা যায়। তবু দেখা যায় প্রিয়া সাহা এদের দু’জনেরই লোক, প্রিয়া এদের দুজনের সাথেই সংশ্লিষ্ট।  সেকারণের রানা দাসগুপ্তও দেখিয়েছে যে মোদী পর্যন্ত একসেস তাঁরও আছে আর তা কম না, তবে প্রামাণিকের হাত ধরে তিনি সেখানে যান না।

এই বিচারে শাহরিয়ারের বক্তব্য এই প্রথম প্রিয়া সাহা, প্রামাণিক অথবা সংশ্লিষ্ট হিন্দু নেতা এমন যেকারও অবস্থানের বিরোধিতা করে হাজির করা বক্তব্য ও অবস্থান। তাহলে, শাহরিয়ার কি বুঝাতে চাচ্ছেন এটাই সরকারের নতুন অবস্থান ও লাইন? আওয়ামি লীগ তোবা করতেছে? এমনটা কেউ মনে করতে পারে অথবা করুক – এটাই সম্ভবত শাহরিয়ারের বক্তব্যের উদ্দেশ্য। তবে সেক্ষেত্রে এটা বিয়ের আসর ভেঙ্গে যাওয়ার পর বাজনাদারের বাজাতে আসার মত। প্রামাণিকের মত এসব করিতকর্মা ব্যক্তিত্বরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আরএসএসের রাজনীতি এনে দল খুলে বসেছে শুধু তাই না। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাতের পুতুল হয়েছে। উঠতে বসতে আসামের পত্রিকায় বিবৃতির হুঙ্কার দিচ্ছে। বারবার বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিবৃতি ঠুকতেছে, আমরা দেখছি।  আসামের এনআরসিতে বাদ পড়া উনিশ লাখ  লোক নাকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বলে ফতোয়া দিচ্ছে। আর জোর দাবি জানাচ্ছে বাংলাদেশকে এদের ফেরত ও দায়িত্ব নিতে হবে। এই দাবি এখন পর্যন্ত অমিত শাহ অথবা প্রামাণিকের বড় হুজুর, নেতা খোদ মোহন ভগতও বলতে পারেন নাই। মোদীর সরকারও যেখানে নিজের সরকারি ভাষ্য ও অবস্থান হিসাবে এখনও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছেন যে এনআরসি ভারতের নিজের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ইস্যু। সেখানে গোবিন্দ প্রামাণিক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কোলে বসে তাদের পুতুল হয়েছে আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন, হুঙ্কার দিচ্ছেন। তিনি কোনদিকে এখান থেকেই পরিস্কার।

একটা কথা আছে, মুখে মাটি যাওয়া বা মাটি খেয়ে ফেলা। আওয়ামী লীগের অবস্থাটা হয়েছে তেমন। এটা লীগকে আরো বড় নির্বুদ্ধিতায় ফেলেছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনের বছরের শুরুতে। ভারতের আরএসএস বাংলাদেশে নির্বাচনে পঞ্চাশটা আসন হিন্দু প্রার্থীদের পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি খেলেছিল। আর এই ফাঁদে পড়েছিল লীগ-বিএনপি দু’দলই। এদের চিন্তাশক্তি ও খুবই উর্বর চিন্তা করার ক্ষমতা, যার প্রশংসা না করে আমাদের উপায় নাই। বিগত নির্বাচনে আরএসএস ভারতের সমর্থন এনে দিবে – এই মুলা ঝুলিয়ে দু’দলকেই বিভ্রান্ত করেছিল আরএসএস। আর অবাক বিষ্ময়ে আমরা দেখেছিলাম দু-দলই বিভ্রান্ত হয়েছিল! বলা হয়ে থাকে, এ কাজে আওয়ামী লীগের সমর্থনে পীষুষ বন্দোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ নামে সংগঠন খুলে দেয়া হয়েছিল। ভারতীয় সাংবাদিক চন্দন নন্দীর ভাষ্যমতে, বিএনপির ভিতরের ভারত লবির একটি গ্রুপও আরএসএস সমর্থিত দল বা প্রার্থীকে বিএনপির মনোনয়ন দানের কথা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আরএসএসকে ঘোরতরভাবে এখানকার রাজনীতিতে ডেকে আনা তখন থেকে। অথচ ক্ষমতাসীনদের উচিত ছিল আরএসএসের সাথে কোনো রফায় বা কোনো সুযোগ করে দিতে না যাওয়া। তাতে বিএনপি পালটা যদি হিন্দু মনোনয়ন দিয়ে আরএসএসের কোলে গিয়ে উঠত, সেটা মোকাবেলার অনেক অনেক বিকল্প ও সহজ রাস্তা ছিল। সোজা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারলে তারাই শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসেও নড়ে’। তাই কিছু দিনের মধ্যে প্রিয়া সাহারা উন্মোচিত হয়ে যায়, ট্রাম্পের কাছে নালিশকাণ্ড থেকেই তাদের রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বাস্তবতা হল, শাহরিয়ার কথিত ওমন ৬১ টা কনষ্টিটুয়েন্সি যেখানে মেজর কনসেন্ট্রেশন ভোটার হিন্দুরা – এটা বাংলাদেশে বাস্তবত কোথাও নাই। আমাদের কোন কনষ্টিটুয়েন্সি আপনা থেকেই ওমন কোন ধর্মীয় ভাগে বিভক্ত নয়, বরং ভৌগলিকভাবে মানে ইউনিয়ন বা উপজেলা হিসাবে একেকটা  কনষ্টিটুয়েন্সিতে পড়েছে, এভাবে বিভক্ত। আল্লাহ বাঁচাইছে, চাইলেও আমাদের কোন ধর্মীয় ভাগের কনষ্টিটুয়েন্সি নাই। কিন্তু এই সুযোগে আমরা দেখে ফেলেছি, আমাদের দলগুলোই মোদীর সরকারও না খোদ হিন্দুত্ববাদের কেন্দ্র আরএসএসকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোই বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা বানিয়ে দিতে, মেনে নিতে কীভাবে একপায়ে রাজি এবং বেপরোয়া!

এই অবস্থায় এই কথিত সাক্ষাৎকারের শাহরিয়ার এক সবচেয়ে বড় ভান করেছেন। ওখানে এক প্রশ্ন করানো হয়েছিল, সেটা মূল ইংরাজিটা ছিল এরকম……
Q. The journal South Asia has said that the RSS is working actively in Bangladesh. It has targeted the Hindu minority and is trying to forge a strong Hindu power bloc and a Hindu political party which could act as a power-broker.
প্রশ্নের মূল ভাবটা বাংলায় লিখলে তা হবে এমন যে, – বাংলাদেশে আরএসএস সক্রিয়ভাবে বাড়ছে। তারা স্থানীয় হিন্দুদের সাথে মিলে একটা শক্তিশালী “হিন্দু পাওয়ার ব্লক” নাকি বানিয়েছে?
জবাবে শাহরিয়ার কবির খুব শান্তভাবে বলেন যে, “তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য নেই”। তবে বাংলাদেশে আরএসএস এর রাজনৈতিক উপস্থিতি বা হিন্দু মহাজোট দল বা এদের সহযোগী দল গঠন ইত্যাদিকে সাহায্য করে এবার এসব কিছুকে অস্বীকার করলে আওয়ামি লীগ নিজের বোকামি ঢেকে রাখতে পারবে না। তবে এরপর শাহরিয়ার বাংলাদেশের হিন্দুদের “হিন্দু মৌলবাদী’ দল” না করতে পরামর্শ প্রদান করেছেন। বলেছেন, ” I would strongly advise the Hindu community not to form any fundamentalist outfit”।

তাহলে এবার তামাশাটা দেখেন, শাহরিয়ার আরএসএসকে সেকুলারিজমের মহিমা বুঝাইতে চেয়ে যেন বলছেন, I would like to state candidly that … we speak of a secular, welfare state………। অথবা আবার আরএসএসকে আশ্বস্ত করতে বুঝাইতেছেন যে শাহরিয়াররা বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের আকড় কনষ্টিটিউশনে, সেকুলার কনষ্টিটিউশনে [we are determined to go back to the 1972 Constitution ] নিয়ে যাবেনই। অর্থাৎ তামশাটা লক্ষ্য করেন, শাহরিয়ার এতই বুদ্ধিমান যে আরএসএসের কাছে সেকুলারিজম উপহার নিয়ে গেছেন!

একদিকে তিনারা আরএসএসে কাছে পঞ্চাশ হিন্দু প্রার্থী্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভেবেছিলেন সেই আশীর্বাদে বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকবেন। আবার এখন তারাই আবার আরএসএসের কাছে “সেকুলারিজম” উপহার নিয়ে যাচ্ছেন!

ব্যাপারটা হল, সারা ভারত যেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদের জ্বরে ছেয়ে গেছে, জয় শ্রীরাম না বলাতে মুসলমান পিটিয়ে মেরে ফেলছে। আবার, মোদীর সরকারী অবস্থান হল ভারতে কোথাও কোন পাবলিক লিঞ্চিং (পিটিয়ে মেরে ফেলা) নাই, ঘটে নাই তবে কিছু গুজব আছে। আরএসএস প্রধান মোহন ভগত দাবি করেছেন, লিঞ্চিং শব্দটা যেন ব্যবহার না করা হয়। কারণ লিঞ্চিং নাকি একটা “বিদেশি” ও “খ্রীশ্চান” শব্দ আর এসবের আলোকের বাংলাদেশে আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হিন্দুরাও এতে তাদের আকাঙ্খা ও দাবি সাজিয়েছেন। সেইখানে শাহরিয়ারেরা এই আকাঙ্খাকে সেকুলারিজম দিয়ে ঠান্ডা করতে বা আটকানোতে সক্ষম হবেন, এর কোন কারণ নাই। বাংলাদেশে আরএসএসের প্ররোচনায় বাংলাদেশের নেতা হিন্দুদের সেই আকাঙ্খা এখন এক কল্পিত “হিন্দুত্ববাদের বাংলাদেশে” পৌছে গেছে। শাহরিয়ার ও তার বন্ধুরা একদিকে বাংলাদেশে আরএসএস ও তাদের হিন্দুত্ববাদকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা করবেন আবার তাদের সেকুলারিজম উপহার দিবেন? এটা কোন তামশা? তারা যে তামাশা করতেছেন সেইটা বুঝবার হুশও তারা হারায় ফেলছেন।
আবার দেশে আর একদল লোক ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যারা আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা, হিন্দু মহাজোট দল খুলে দেওয়া গোবিন্দ প্রমাণিক বা দাসগুপ্ত অথবা ইসকনের ততপরতা ও প্রসাদ খাওয়ানো নিয়ে কথা বললে এরা অভিযোগ করছেন যে এই কথা তোলা নাকি “সাম্প্রদায়িকতা” করা হচ্ছে। সমাজ দুনিয়াদারির খবর না রাখা এরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের সাম্প্রদায়িকতার “মহিমা” যে কত অফুরান তাই দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে?

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে? অথচ এককথায় বললে, এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনীতি হতে পারে না, এটা তাদের স্বার্থে যাবে না। কারণ, অন্যদেশের স্বার্থে বাংলাদেশে তৎপর এক কোটারি হিন্দুগোষ্ঠীর ততপরতা এটা।

সুতরাং, ঐ সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের জন্য কাউন্টার প্রডাকটিভ হবে, হতে বাধ্য। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএসের প্রভাব বাড়াতেই, ওর কবলে চলে যেতেই এটা ব্যবহৃত হবে। কেন?
বাংলাদেশের কোন ধর্মীয় বা সামাজিক গ্রুপের বিশেষ অভিযোগের প্রেক্ষিত  বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহির সম্পর্ক পাতাতে পারে না। তাতে সেটা স্বেচ্ছায় অথবা ক্ষমতায় থাকার ভারতের সমর্থনের লোভ যা কিছুই হোক।
বাংলাদেশের সরকারের এক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতাসীনদের আশ্বস্ত করার কিছুই নেই। এটা তেমন বিষয় হতেই পারে না।

জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের সভায়ও আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই জবাবদিহিতা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন নয়। কারণ আমরাই স্বেচ্ছায় জাতিসংঘ ও ঐ কাউন্সিলের সদস্য হয়েছি। ওর নিয়মকানুনে আমরা নিজেই সম্মতি দিয়েছি। নিজের সংসদে তা রেটিফিকেশন করেছি। ঐ মানবাধিকার আমরা নিজ নাগরিকের বেলায় রক্ষা করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এথেকেই এটা আমাদের উপর প্রযোজ্য হতে পেরেছে।
কাজেই অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে আমাদের জবাবহিহিতার কোন সম্পর্ক হতে পারে না। ঠিক যেমন, ভারতে কোন মুসলমান নিপীড়ন হলে কী ভারত আমাদের কাছে জবাবদিহিতা করবে? সেটা কী আমাদের আশা করার ইস্যু হতে পারে?  আমরা কী ভারতের মুসলমান রক্ষাকর্তা সাজতে পারি?

খাড়া কথাটা হল,  বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকের অভিযোগে বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহিতা করতে যেতে পারে না। অথচ শাহরিয়ার কবির হাসিনা সরকারের হয়ে এমন তোষামোদি ও জবাবদিহিতার সম্পর্কই স্থাপনই যেন করতে গিয়েছেন। এটা আত্মঘাতি। এটা তিনি করতে পারেন না। ভারতের ক্ষমতাসীনদেরকে এখানে শাহরিয়ারের আশ্বস্ত করার কিছুই নাই। এটা শাহরিয়ারের বোকামি ও অনধিকার।

প্রিয়া সাহারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের “দুঃখ বেচে খাওয়ার লোক” হিসেবে তাদের চেয়ে শাহরিয়ারেরা কত নাদান ও অযোগ্য। কারণ তারা ভারতের আরএসএস এর ক্ষমতা ও এর শ্রীবৃদ্ধির স্বার্থে ততপর হয়ে চলতে জানে।  বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো যদি নাদান হতে চায়, যদি বাংলাদেশের দলগুলোকে ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে আরএসএস-কে যদি তারা ক্ষমতার উতস বা দাতা মনে করে এর অর্থ তাদেরকে আরএসএসের অধীনস্ত হয়েই রাজনীতিই করতে হবে। আরএসএসের রঙের রাজনীতিই করতে হবে।  এর বাইরে অন্য কিছু ঘটবে না। আর এরপর সেটা আর বাংলাদেশ থাকে, থাকবে না! এটা তাদের বুঝতে হবে। এমনকি সেটা আর বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশও থাকবে না!

যেমন বাংলাদেশের কোন হিন্দু নাগরিকের নালিশ করার জায়গা ভারত হতে পারে না, তেমনি তারা বাংলাদেশে আরএসএস বা হিন্দু মহাজোটকে ডেকে আনতে পারে না। তারা অথবা আমাদের কোন সরকার আরএসএস ও হিন্দু মহাজোটকে দোকান খুলতে দিতে পারে না। আবার আমরাও ভারতের কাছে জবাবদিহি করতে যেতে পারি না। তাহলে?

ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

এখন খাড়া কথাটা শুনেন ও মনে রাখেন।  ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৯ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আরএসএসের মন জয়ের চেষ্টা!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম’

 

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম

গৌতম দাস

০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2JS

https://www.kolkata24x7.com থেকে নেওয়া

[সার সংক্ষেপেঃ ছুপা হিন্দু জাতীয়তাবাদী গান্ধী-নেহেরুসহ ভারতের ইমেজ হল গান্ধীরা খুবই ভাল মানুষ। আর জিন্নাহ বেটা খুব খারাপ তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানিয়েছে, এতই খারাপ এরা। কিন্তু কঠিন সত্যি হল কংগ্রেস গান্ধী-নেহেরুসহ এরাই নিজেদের হিন্দুইজমের বাইরে কখনই যায় নাই। একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারতই কায়েম করতে কাজ করে গেছে তারা। আর এর সবচেয়ে বড় তাত্বিক নেতা হল গান্ধী। ফলে এদের হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হতে চাওয়াটাই নিরুপায় মুসলমানদেরকে ঠেলে দিয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান কায়েম করতে। কাজেই নিরুপায় হয়ে জিন্নাহ সঠিকভাবেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কায়েম করেছিলেন। বলা যায় মুসলিম লীগ মুসলিম জাতীয়তাবাদের দিকে কেন গিয়েছিল তা গান্ধী-নেহেরুসহ কংগ্রেসের হাতে নির্ধারিত হয়েছিল।
মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করা বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ কথিত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা যারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার দায় জিন্নাহ’র উপর এককভাবে চাপিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চায় তাদেরকে চ্যালেঞ্জ। এরা মনগড়া কথা বলে এই গল্প তৈরি করেছে। নিজেদের দায় আকাম জিন্নাহর উপর চাপিয়েছে।
এই লেখার একটা সারকথা এটা। তবে গান্ধী বনাম আরএসএসের তর্ক লড়াটাই কী ছিল তা জানার মাধ্যমে মূলত আপনাদেরকে চিনতে হবে গান্ধীর হিন্দুইজম-কে।]

 

আসেন ছুপা হিন্দুবাদীগণকে চিনে নেইঃ
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যাকে আমরা গান্ধী নামে চিনি। অনেকে তাকে আদর করে বা তেল দিয়ে তোয়াজ করতে বাপু বা মহাত্মা নামেও ডাকে। গান্ধী, জিন্নাহ, প্যাটেল- এরা সবাই মোদীর মতই গুজরাতি। যদিও সেকালের গুজরাট বলতে এটা বোম্বাই মানে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল। মাত্র গত ১৯৬০ সালে গুজরাত প্রথম বোম্বাই (মহারাষ্ট্র) থেকে রাজ্য হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। গত দুই অক্টোবর ছিল সেই গুজরা্তি গান্ধীর জন্মবার্ষিকী; তাও আবার ১৫০তম। সম্ভবত সে কারণে তাকে নিয়ে স্তুতিমূলক-মূল্যায়নের ছড়াছড়ি একটু বেশি দেখা গিয়েছিল এবার, এটা বলতে পারলে সহজ হত হয়ত। কিন্তু সমস্যা জটিল করে তুলতে সক্ষম হয়েছে, বিজেপি এবং আরএসএস এ দুই প্রতিষ্ঠানই। তাই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ‘১৫০তম’ জন্মবার্ষিকীই এবারের হইচইয়ের আসল কারণ কি না।

এক কথায় বললে, ভারতের জন্মের সময় থেকে কংগ্রেসের তৈরি সব না হলেও অনেক আইকন অথবা বয়ান এত দিন ধরে আরএসএস-বিজেপি এই গোষ্ঠী, এরা ভাগ বসিয়ে হয় নিজেদের আইকন করে নিয়েছে অথবা একে ম্লান বা পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। বিজেপির তেমনই আর এক এবারের উদ্যোগ হল গান্ধীকে নিজেদের আইকন করে নেয়ার চেষ্টা। খোদ আরএসএস প্রধান মোহন ভগত এ দিন দাবি করেছেন, “গাঁধীর আদর্শেই এগোচ্ছি”
তবে বলাই বাহুল্য, আইকন দখলের সময় বিজেপি-আরএসএস এর আগের বয়ান-মূল্যায়নকে নিজেদের মত করে আকার দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে থাকে। যেমন নেহরুর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গান্ধীঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল- এই প্যাটেলকে ইদানীং বিজেপি-আরএসএস একেবারে নিজেদের নেতা আইকন করে নিয়েছে। গুজরাতে পৃথিবীর দীর্ঘতম স্ট্যাচু এখন প্যাটেলের, মোদীর উদ্যোগে এটা বানিয়ে নেয়া হয়েছে। মোদীর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে ২০১৩ সালে, পরিচালনা কমিটি তৈরি, অর্থ সংগ্রহসহ এর কাজ তিনি উদ্বোধন করেছিলেন। প্যাটেলকে তুলে ধরারও কারণ-সূত্র একটাই। ভারত স্বাধীনের বছরের আগস্টের পরবর্তীকালে ৫৫০-এরও বেশি ছোট-বড় করদরাজ্যের রাজাগুলোকে বলপ্রয়োগে পিটিয়ে নতুন ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এই বলপ্রয়োগের প্রশ্নে নেহরুর সাথে প্যাটেল একমতে থাকলেও, প্যাটেল নিজে ও তার মন্ত্রণালয় ও এর কাজকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক আগ্রাসী ও চরমপন্থা অবস্থানে। আর শুধু সে কারণেই এক আগ্রাসী হিন্দুজাতিবাদী হিসেবে প্যাটেলকে পরিচিতির আইকন লাগিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে মোদি-আরএসএস গোষ্ঠী। তাই এবার খোদ গান্ধীকে দখল নিতে এবারে বিজেপি এক কর্মসুচি শুরু করেছে যার নাম, “গাঁধী সঙ্কল্প যাত্রা”। ভেঙে বললে এটা হল, থেমে থেমে আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে গান্ধীর জন্মের ১৫০ বছর পালনে বিজেপির নেয়া ১৫০ কিলোমিটার পদযাত্রার এক কর্মসূচি।

স্বভাবতই কংগ্রেসের গান্ধী, তাদের এত বড় “জাতির পিতা’ আইকন বিজেপি-আরএসএসের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া- এটা কংগ্রেস এখন দুর্বল ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেও আপত্তি তো তাদের তুলতেই হয়। তারা তুলেছেও, আর সাথে কমিউনিস্টরাও বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সঙ্গ দিয়েছে। বিজেপি-আরএসএসের গান্ধী দখলে এবারের বার্ষিকীতে ঝাপিয়ে পড়া নিয়ে খোঁচা মারাও কম হয় নি। যেমন কংগ্রেস নেতা  মল্লিকার্জুন খড়্গে; তিনি বলেন,  ‘‘এত দিন যাঁরা শুধু গডসের নাম নিতেন, ভোট পেতে তাঁরা গাঁধীর নাম নেওয়া শুরু করেছেন”।  গডসে [Nathuram Vinayak Godse] হল গান্ধীকে গুলি করে [৩০ জানুয়ারী ১৯৪৮] হত্যাকারী সেই আততায়ীর নাম। দলের দায় এড়াতে যে হত্যা করার আগে দিয়ে আরএসএস থেকে নিজে পদত্যাগ করে নিয়েছিল। আর একালে এই সেদিনও প্রকাশ্যেই বিজেপি গডসে কে দলের হিরো মেনেছিল।

ঘটনার এ দিকটা নিয়ে আমাদের আর এতে খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু এই ১৫০তম উপলক্ষে আমরা অন্তত তিনজন একাদেমিকের লেখা বা মন্তব্য জানতে পেরেছি। এদের একজন প্রফেসর ও লেখক রামচন্দ্র গুহ [Ramachandra Guha], যাকে গবেষক বা ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করা সিরিয়াস লেখক বলা যায়। কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি বর্ষ-পুরানা চিবিয়ে রাখা জিনিষটাই আবার চিবাতে থাকেন, এমন ভারতীয় একাদেমিক না। তার চিন্তার ফ্রেম পুরানাদের চেয়ে আলাদা। কাজেই খুব বড় করে পরিচয় না বললেও আপাতত অন্তত এতটুকু বলতেই হবে। তিনি কলকাতার ইংরেজি দৈনিক “হিন্দুস্তান টাইমস” এবং “টেলিগ্রাফে” কলাম লিখে থাকেন। সেখানে যেমন লেখা এক কলামের তিনি শিরোনাম দিয়ে দিয়েছেন – “সোনিয়া গান্ধীর কেন ইবনে খালদুন পড়া উচিত”। অবলীলায় ইবনে খালেদুনের নাম নিয়ে কথা বলা একাদেমিক ভারতে খুব কমই আছেন!

তিনি “গান্ধী ও আরএসএস” [Gandhi and the RSS] – এই শিরোনামে এক কলাম লিখেছেন গান্ধীর ‘১৫০তম জন্মবার্ষিকী’র তিন দিন আগে। এটা ছিল গবেষণাধর্মী দেড় হাজারের বেশি অক্ষরের এক সিরিয়াস লেখা, সাথে সুনির্দিষ্ট বইপুস্তকের রেফারেন্স। যার মূল প্রসঙ্গ হল, ঘটনাকাল ১৯৪৭ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর, এই সময়কালে গান্ধীর সাথে আরএসএসের সম্পর্ক কেমন গিয়েছিল, তা রেফারেন্সসহ তুলে আনা। তাঁর লেখায় ঘটনার মূল পাত্রপাত্রী হল একদিকে গান্ধী আর অন্য দিকে আরএসএস প্রধান গোলওয়ালকার [Golwalker] ও তার দল।  সে সময়ে নানান শহরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ঘটছিল আর গান্ধী সেসব শহরে গিয়ে দাঙ্গা থামানোর উপায় হিসেবে অহিংস প্রতিবাদে দাঙ্গা না থামা পর্যন্ত অনশনে বসছিলেন। এছাড়া এর পাশাপাশি আরএসএসও সেসব শহরে গিয়ে মুসলমান ও গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, হুমকি দিয়ে কিভাবে লিপ্ত হত অথবা তাদের মুখপাত্র “অর্গানাইজার” পত্রিকায় উসকানি দিয়ে কী লিখত, এমনকি গান্ধীর সাথে চিঠি চালাচালি বা একবারের মুখোমুখি সাক্ষাতে কিভাবে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার অভিযোগ অস্বীকারের লুকোচুরি খেলে গান্ধীর প্রচেষ্টাগুলো ভণ্ডুল করে গেছিল – গান্ধী রচনাবলী ও আর্কাইভ ঘেঁটে তা তুলে আনা- সেসবের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এই লেখায় পাব। তিনি বলেছেন, আর দুদিন পরে (জন্মবার্ষিকীতে) মোদী ও আরএসএস গান্ধী সম্পর্কে নানান ভাল ভাল কথার ফুলঝুড়ি [nice things will be said] তুলবে। তাই এর আগেই তিনি সেকালে গান্ধী ও আরএসএসের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নিয়ে এই রেকর্ড হাজির করে রাখতে চান।
এই লেখকের লেখা অনুসারে, পলিটিক্যাল লাইনের দিক থেকে গান্ধীর অবস্থান হল, তিনি বহুধর্মীয় জাতীয়তাবাদের (religiously plural nationalism) ধরণের এক ভারত চাইছেন, সেজন্য লড়েছেন। গান্ধীর এই হিন্দুবাদে হিন্দুধর্ম বলতে এটা ‘এক্সক্লুসিভ রিলিজিয়ান’ নয়। মানে একা হিন্দুধর্ম না, অন্য (মুসলমান) ধর্মও সাথে আছে। [Hinduism was not an exclusive religion]। কিন্তু মূলকথা এই বিশেষ হিন্দুবাদের, একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভারত চাইছেন গান্ধী। বিপরীতে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার চাইছেন মুসলমানদের মেরে কেটে হলেও বাধ্য করে পাকিস্তানে পাঠানো। হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই মুসলমানদের হিন্দুস্তানে রাখে” [no power on Earth could keep them in Hindustan”]। তো এসব লেখা বা কথার সারাংশ হল, একজন মুসলমানদের কচুকাটা করে ভাগাতে চাইছেন তো অন্যজন হিন্দু-মুসলমানের কথিত ঐক্যের পুর্বশর্ত ও এর জোয়ার তুলতে চাইছেন। না হলে অনশনে, না খেয়ে রইছেন। আর একারণে কাজের কাজ কিছু হোক আর না হোক অন্তত সহানুভুতি তার পক্ষে যাচ্ছে। এতে গান্ধীর আপাত জিত ও জাতির পিতা হওয়া তো কার পক্ষে ঠেকানো যায় নাই।

কিন্তু আসল কথা হল, তাতে লাভ কী হয়েছে? ভারত কি হিন্দু-মুসলমানের ভারত হয়েছে? পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলেও ভারতে নিয়মিত দাঙ্গা হয়ে চলেছে। এমনকি চলতি শতকের শুরুতেও গুজরাটে বড় দাঙ্গা হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত নাগরিকের রাষ্ট্র হতে পারেনি। হিন্দুর রাষ্ট্র হয়ে থেকেছে। পারস্পরিক ধর্মীয় বিদ্বেষ কিছুই মেটেনি, দীর্ঘ সময় যাওয়াতে যা যতটুকু চাপা পড়েছিল তা প্রবল হচ্ছে আবার। সারকথা গান্ধীর নিজের আমল থেকেই দাঙ্গা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু কেন? এর জবাব গান্ধী কখনো দেননি। অর্থাৎ গান্ধীর হিন্দুইজমের ভারতরাষ্ট্র এটা কখনই সমাধান হতে পারে নাই। আসলে তা হওয়ার কথাও না।

তবে রামচন্দ্র গুহের এই পরিশ্রমী কাজটির পরও এই লেখা থেকে একালে, মোদি-আরএসএস খারাপ আর গান্ধী মহান- এর বেশি কিছুই প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। গান্ধীর হিন্দুইজমের বিপরীতে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ- এর ভারত আরও শক্ত হয়ে হাজির হয়েছে। এককথায় রামচন্দ্র গুহের পরিশ্রমটার মধ্যে কোন প্রতিকার নাই, ইঙ্গিত নাই। আছে খালি গান্ধী মহান! সে তো আমরা সকলেই জানতামই!

আবার আর দুই শিক্ষাবিদ- গৌতম ভদ্র ও দীপেশ চক্রবর্তী, এদের মন্তব্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করেছে আনন্দবাজার, এখানে “গাঁধীর স্বরাজ আর সঙ্ঘের রাষ্ট্র এক নয়” – এই শিরোনামে। এদুইজনের মিলের দিকটা হল তারা নিজেদের সাবঅল্ট্রান [subaltern] ধারার প্রবক্তা ভাবেন বা ভাবতেন, যদিও তারাই এখন বলে থাকেন, এই ধারা এখন সাংগঠনিকভাবে মৃত। এদের একটা বৈশিষ্ট্য বলা যায় যে, তারা হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোলে বসে সেই চোখে দেখার যে অভ্যস্ত যুগ ও ধারা ছিল এর বাইরের এরা। বরং সমাজের যাদের কথা বা স্বর শোনা হয় না, উপেক্ষিত, নিচু আয়ের, নিচু জাতের মনে করে চাপানো হয় ইত্যাদি তাদের উদ্বেগগুলো উঠিয়ে আনা বা তাদের জায়গায় বসে দেখার পক্ষের লোক। কিন্তু মডার্ন রিপাবলিক গড়তে একটা ‘জাতি’ ধারণা বা একটা না একটা “জাতীয়তাবাদ” অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে এরা মনে করেন কি না- এই প্রশ্নে, প্রশ্নটাই তাদের মাথায় এসেছে এমন প্রমাণ দেখা যায় না।
তবে দীপেশের এখনকার অবস্থানটা হল, ঠিক মোদী মানে উদ্র জাতীয়তাবাদীরা নয় তবে সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ যেহেতু ভারত মেনেই নিয়েছে তাহলে একইভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে জায়গা করে দিতে অসুবিধা কী। প্রথম আলো বা তাদেরই প্রতিচিন্তায় তাঁর কিছু লেখা দেখে এমন মনে হয়েছে। কিন্তু মূল কথা যেটা, কেন ধর্মীয়সহ যেকোন জাতীয়তাবাদ একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয় পুর্বশর্ত মনে করা হয়েছে? এটা ভিত্তিহীন নয় কেন, সে প্রশ্ন এদের অবস্থান দেখা যায় নাই।

এদিকে আনন্দবাজার দীপেশের একটা বড় উদ্ধৃতি এনেছে সেটা হল এরকম, “হেডগেওয়ার ১৯৩৪ সালেই বলে দিয়েছিলেন, রাজনীতি বিষয়ে সঙ্ঘ উদাসীন। অন্য দলের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সে খাদির সমর্থক এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের বিরোধী নয়। তখনকার কংগ্রেস আর সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেস যেমন এক নয়, হেডগেওয়ারের সঙ্ঘ আর আজকের সঙ্ঘও এক নয়”। এই কথাটাকে স্পষ্ট বুঝবার জন্য এখানে ফুটনোট দিয়ে রাখছি। তা হল, আরএসএস –এর পুরা নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংক্ষেপে একে সঙ্ঘ বলে ডাকে অনেকে। এই সঙ্ঘ ১৯২৫ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হেডগেওয়ার (কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার)। আর পরবর্তিতে ৪৭ সালের দিকে আরএসএস-এর প্রধান ছিলেন,  গোলওয়ালকার (মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার); যার নাম এই লেখার প্রথম দিকে নেয়া হয়েছে।

বিপরীতে গৌতম ভদ্র – তার বিজেপি-আরএসএস সমালোচনা অনেক সরাসরি। তার দুটি উদ্ধৃত বক্তব্য ঐ রিপোর্টে এসেছে। যেমন- ভদ্র আরএসএস প্রধানের সমালোচনা করে বলছেন – ‘ভারত আধ্যাত্মিক দেশ। আধ্যাত্মিক পথেই এর উত্থান হবে বলে চেয়েছিলেন গাঁধী” – মোহনের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। বরং আসল বক্তব্য ও ব্যাখ্যা হল, “গাঁধী কখনই আধ্যাত্মিক দেশ বলেননি। তিনি ধর্মের কথা বলেছেন, রামরাজ্যের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই রাম অযোধ্যায় থাকেন না, অস্তিত্বের ভেতরে তার স্বর অনুভব করা যায়। ইনার ভয়েস!”।
আর ভদ্রের দ্বিতীয় উদ্ধৃতি, গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে প্রবন্ধের অর্থ, এখনকার আরএসএস প্রধান মোহন ভগত যেভাবে করেছেন, এর সমালোচনা সংক্রান্ত। মোহন বলেছেন, “পরাধীনতার ফলে তৈরি গোলামি মানসিকতা যে কী ক্ষতি করতে পারে, গাঁধী বুঝতেন। স্বদেশী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তাই এক ছাত্রের চরিত্র এসেছিল। তৎকালীন রাজনীতিবিদেরা দেশের পূর্ব গৌরব ভুলে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ চালিয়ে যেতেন। তার প্রভাব আজও দেখা যাচ্ছে”। শেষে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন, ‘গাঁধীর পথ ধরেই ভারত আবার বিশ্বগুরু হয়ে উঠবে”।
আনন্দবাজার বলছে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে, দুই ইতিহাসবিদই আপত্তি করে তাদের মতে বলছেন, “হিন্দ স্বরাজ নিছক স্বদেশীর কথা বলে না। সে আধুনিকতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর নৈরাজ্যবাদের কথা বলে। সঙ্ঘের রাষ্ট্রবাদের সাথে তার সম্পর্ক নেই”। ‘আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের অসভ্য করে’- ঐ বইয়ে লিখেছিলেন গাঁধী। ‘হিন্দ স্বরাজ’ আর ‘হাউডি মোদি’ মেলে না কিছুতেই! তবে দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, গান্ধীর কাজকে তিনি বলছেন, একে “জেহাদি অহিংসা বলতে পারেন”। গৌতম ভদ্রও এতে একমত। মোটা দাগে তাঁদের সারকথা হল, মোদি ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি নয়। যদিও সেটা তো বলাই বাহুল্য।

আসলে এখান থেকে দু’টি প্রশ্ন উঠে, যা নিয়ে উপরের রামচন্দ্রসহ তিন শিক্ষাবিদের কেউই তোলেননি। তার প্রথমটি হল, যদি মোদী ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি না-ই হয়, তবু মোদী ও আরএসএস গান্ধীকে নিজেদের করে নেয়ার সুযোগ নিতে বা দাবি করতে পারছেন কেন? এই যে দুইটা পক্ষ এদের উভয়ের চিন্তার মিল বা মৌলিক দিকটি কী ছিল?
কংগ্রেস ও আরএসএস ভিন্ন রাজনৈতিক দল অবশ্যই। তবুও তাদের রাজনীতিতে মিলের দিকটি হল – হিন্দু জাতীয়তাবাদ। উভয়েই হিন্দু জাতীয়তাবাদী। আর ফারাক হল, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে দুই দল দু’ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। আরএসএস বলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ- এটাই হিন্দুত্ব। হিন্দু জাতি খাঁটি, পিওর; খাঁটি আর্য রক্তের ধারা হিন্দুরা। এটাই আবার হিটলারের ভাষায় জর্মানিরা পিওর আরিয়ান রেস (খাঁটি আর্য রক্তের)। অর্থাৎ এরা তাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে এই একই জায়গাকে কেন্দ্র করে। এ কারণে হিটলার ও আরএসএসের রেসিজম বা বর্ণবাদিতা, জাত-শ্রেষ্ঠত্ব একই ধরনের।
বিপরীতে গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় তাঁর দাবি হিন্দু বা হিন্দুইজম শব্দ – এটা কেবল একটা হিন্দুধর্ম নয়, অন্য (মুসলমান) ধর্মও। এ নিয়ে তার ব্যাখ্যার পক্ষে বিস্তর কোশেশ আছে। যেমন দাঙ্গার মুখে প্রতিকার হিসেবে তিনি হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলাতে চান আবার, মুসলমানকে জয় শ্রীরাম ধরনের কিছু। এ কারণে গান্ধীর হিন্দুইজমের পূর্বশর্ত হচ্ছে, কথিত এক ফ্যান্টাসির “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য”। এ প্রসঙ্গে গান্ধী নিজ দলীয় কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশ করে বলা ১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বরের এক ভাষণ থেকে রামচন্দ্র গুহের গবেষণায় উদ্ধৃতিটা দেয়া হল এখানেঃ “be true to the basic character of the Congress and make Hindus and Muslims one, for which ideal the Congress has worked for more than sixty years”.

কিন্তু বাস্তবতা হল, গান্ধীর নির্দেশ নিজের দল কতটা মেনেছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ তো বটেই। এ ছাড়া, এমনকি তা পুরোপুরি মেনে চললেও ফলাফল শূন্যই হয়েছিল। তখন ও এখনকার বাস্তবতাই এর প্রমাণ। তাহলে মূল সমস্যা কোথায়? গান্ধীর “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য” কথার আসল মানেই বা কী? এর সোজা অর্থ পরস্পরের ধর্মের পক্ষে জয়গানের স্লোগান দিতে হবে, এটাই বলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য।

কিন্তু তাতে এ থেকেই আবার, হিন্দুদেরকে কেন আল্লাহু আকবর বলতে বলছেন গান্ধী- এই অভিযোগ তুলে আরএসএস তাদের মুখপাত্র অর্গানাইজার পত্রিকায় গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করে তাদের ধুয়ে দিয়েছিল। আসলে এতে উল্টো আরএসএসের পক্ষে দাঙ্গা বাধানোই সহজ হয়ে গেছিল।

এখানে মূল কথা হল, গান্ধীর এই ঐক্যের প্রস্তাবই ছিল অলীক ও অবাস্তব, বাস্তবায়ন অযোগ্য। ধর্ম মানুষের যার যার কোর বিশ্বাসের প্রশ্ন। এখানে চাইলেই এক ধর্মের লোক আর এক ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বলে ধ্বনি দিতে পারে না। এমনকি কোনো মুসলমানের অন্য ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বা মূল শ্লোক বা কালাম উচ্চারণ করার পরে সে আর মুসলমান থাকে কি না সে প্রশ্ন তো উঠবেই! আবার এটা হিন্দুর দিক থেকেও একই ভাইসভারসা। অথচ গান্ধীর প্রস্তাব ও ব্যাখ্যা দাবি করছে একটা ভারত রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এসব অস্বস্তিকর নিজ নিজ ধর্মবিরোধী অবস্থানে নাকি যেতেই হবে। হিন্দু-মুসলমানের তথাকথিত ঐক্য- এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব নাকি এতই।

এক কথায় বললে গান্ধীর কথিত ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ প্রকল্প- এর ধারণাই বাস্তবায়ন অযোগ্য। ফলে তা অবাস্তব হয়ে থেকে গেছে। আর গান্ধী খুন হয়ে মরে যেন বেঁচে গেছেন।

কিন্তু কেন একটা ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ, বিশেষ করে তা কেন ‘হিন্দুইজমের’ হতেই হবে ? এ ছাড়া একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদই কেন দরকার? একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে চাইলে কেন এটা অনিবার্য?

লক্ষণীয় যে, ওপরের তিন ভারতীয়  একাডেমিকের কেউ এসব প্রশ্নগুলোর দিকে যাননি বা যেতে চাননি। কোনো রাষ্ট্র গড়তে চাইলে একটা জাতীয়তাবাদ, তাও আবার একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ- এটাকে কেন এসেনশিয়াল বা অনিবার্য প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। জাতীয়তাবাদ যার গোড়াটা আছে কথিত এক ‘জাতি’ ধারণায়। বাংলায় জাতি বললেও এটা দু’টি আলাদা ধারণা ইংরেজিতে রেস ও এথনিক- এ দুই শব্দের অর্থ বাংলায় একটাই- ‘জাতি’ করা হয়ে থাকে।

লক্ষণীয় যে, ইংরেজিতে এই দু’টি শব্দই অরাজনৈতিক পরিচয়-প্রকাশমূলক শব্দ। যেমন বাঙালি রেসের লোক আর আমার খাদ্যাভ্যাস বা ধর্ম-সংস্কৃতি কী হবে এই এথনিক পরিচয় আমার জন্মের আগে থেকেই নির্ধারিত। এই পরিচয়গুলো আমরা যে কেউ বেছে নিয়ে দুনিয়ায় আসি না বলেই, এগুলো অরাজনৈতিক। এর দায় আমার নয়। এর সাথে আমি কেমন রাষ্ট্র গড়বে এর সম্পর্ক কী? এমন কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই রাষ্ট্র গড়তে চাইলে নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে সংশয় তৈরি করার প্রয়োজন কী?

নিশ্চয় নেহরু-গান্ধীরা কোনো বোকা অবুঝ মানুষ নন! কিন্তু তবু সেই রামমোহনের আমল থেকেই আমরা যেন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ অনিবার্য প্রয়োজনীয়, এমন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তালাশে থাকতে দেখতে পাই আমরা। কেন?

মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের তাবৎ কামনা, বোঝাবুঝি আগ্রহ ইত্যাদি সব কিছুর উৎস হল ব্রিটিশ কলোনি মাস্টারের রাষ্ট্র। রামমোহন থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই বিশ্বাস করতেন [তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় থাকা একমাত্র রাষ্ট্র] যে ব্রিটিশ রাষ্ট্র তারা দেখছে এর নাগরিকদের এক থাকার পেছনে তাদের একই ধর্মীয় পরিচয় ( এংলিকান ক্যাথলিক, Anglican Catholic)- এটাই তাদের কথিত ঐক্য বা এক হয়ে থাকার ভিত্তি হয়ে আছে। কাজেই ভারতেরও একটা রাষ্ট্র হতে গেলে তাদেরও একটা ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে একটা একক ধর্ম থাকতেই হবে। এই ছিল তাদের প্রবল অনুমান। কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভুল ও ভিত্তিহীন। বৃটিশ রাষ্ট্রের ভিত্তি মানে তা এক হয়ে আছে কোন Anglican Catholicism র কারণে নয়।   যদিও আবার এরা সবাই দেখেছিল ভারতে সেটা বাস্তবতা নয়। কারণ অবিভক্ত ভারতে সবার ধর্ম এক হিন্দুত্ব মানে এক হিন্দুধর্ম তা ছিল না। তাই সেখান থেকে রামমোহন বলে গেছিলেন অবিভক্ত ভারতের সবার জন্য একটা ব্রাহ্ম ধর্ম তৈরি করতে, যদিও সেটাও  অলীক ও অপ্রয়োজনীয় বলে ব্যর্থ হয়েছিল। সম্ভবত সেকারণে গান্ধীর পথটা রামমোহন থেকে আলাদা হয়েছিল। যেটা আবার পরবর্তি উদ্যোগ হিসাবে বঙ্কিম চন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) -এর হিন্দুত্বের কাছাকাছিই, ইসলামবিদ্বেষী ছুপা অথবা উদাম।

এককথায়, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে ঐ সমাজে পিছনে একটা একক ধর্মের মিল বা ঐক্য থাকতেই হয়, এই অনুমান মিথ্যা, ভিত্তিহীন। সম্পুর্ণত এক ভুল ধারণা। বরং রাষ্ট্রে নাগরিক এক হয়ে থাকে – নাগরিক ঐক্য থাকে – মূলত বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার বা নাগরিক নির্বিশেষে “সাম্য” কায়েম রাখতে পারলে। এটাকেই অনেকে ক্লাসিক অর্থে সেকুলারিজম (ইসলামবিদ্বেষী সেকুলারিজম নয়) বলেও বুঝে থাকে।

পরবর্তীকালে সেই একই কারণে গান্ধী নতুন ব্যাখ্যা দিলেন যে ভারতের হিন্দুইজম মানে এটা একটা ধর্ম না, বহু। এক রিলিজিয়াস প্লুরালিটি। একে হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্ম বলে, বহু বলে বুঝতে হবে দাবি করতেন। গান্ধীর হিন্দুইজম বলতে তাই ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য’ কথাটা এভাবে বুঝতে হবে। গান্ধীর এই অবাস্তব সোনার পাথরের বাটি ধারণার উৎস এখানে। অথচ হিন্দু ও মুসলমান শুধু নয়, বরং যেকোনো দুই মানুষ এক বোধ, একটা ঐক্যবোধ করতে পারে খুবই সহজে এভাবে যে,  পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রে সব নাগরিক সমান, তাদের নাগরিক অধিকার সমান- এই ভিত্তিতে যদি একটা রাষ্ট্র গড়া যায়। মানুষের এথনিক, রেসিয়াল, নারী-পুরুষ, ভাষা বা ধর্মীয়সহ যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে এক অধিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কায়েম ছিল এর আসল সমাধান। অথচ খুব সম্ভবত হিন্দু বা হিন্দু সভ্যতা এসব কোনো ধারণার আড়ালে গান্ধীসহ সবার মনেই একটা হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব একটা হেজিমনি কায়েমের, এর ধারণা কাজ করত। তাই কোন হিন্দুইজম ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা তারা করতে চান নাই, বা পারেন নাই। অথচ এক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে হিন্দু-মুসলমানকে এক হয়ে যেতে হবে কেন? এছাড়া এই – হিন্দু-মুসলমান এক করে ফেলা – এই প্রকল্পটাই তো অলীক অবাস্তব; এক সোনার পাথরের বাটি!

ফলে বাস্তবত এক দিকে গান্ধীর দেয়া অলীক অবাস্তব প্রস্তাবের কারণে হিন্দু-মুসলমান এরা এক পরস্পর বিরোধাত্মক পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছিল এবং যেটা এখনো আছে। আবার তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য থাকতে হবে বলে পরস্পর একে অপরের ধর্মের পক্ষে চিল্লা দিতে হবে বলে দাবি করছেন, নইলে তিনি অনশনে যাবেন। আর অন্যদিকে আরএসএস গান্ধীর এই অবস্থানকেই যে [হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলতে হবে], গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে আরএসএসের পক্ষে আনার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার ও দাঙ্গায় প্ররোচিত করে গেছে।

সারকথায়, গান্ধী নিজেই দাঙ্গার কারণ, আবার দাঙ্গা উঠে এলে তিনি অনশনে বসে গেছেন! আর এই গান্ধীকেও মোদী ও আরএসএস এখন নিজেদের করে নিতে চাচ্ছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৫ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে গান্ধীর স্ববিরোধী ‘হিন্দুইজম“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

গৌতম দাস

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2IQ

 

Om Birla during Hindu Mahasabha event (Facebook/om birla) by NEWS18, India

ভারতের আরএসএস বা বিজেপির অঙ্গসংগঠন অনেক। এগুলোর একটা হল, “অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভা”। শুধু ব্রাহ্মণদের নিয়ে সংগঠন এমন আরো আছে – ‘অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ একতা পরিষদ, সর্বব্রাহ্মণ মহাসভা, পরশুরাম সর্বকল্যাণ, ব্রাহ্মণ মহাসভা’ ইত্যাদি। অবশ্য বুঝাই যায় হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিচরণ ধর্মকে পেশা হিসেবে নেয়া অসংখ্য ব্যক্তি বা তাদের দলের মধ্যেই হবে।

গত নির্বাচনের (মে ২০১৯) পরে, ভারতের লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছিল রাজস্থানের এক এমপি, ওম বিড়লাকে। তার পরিচিতি পড়ে তিনি কোনো বড় কেউকেটা কেউ নন মনে হচ্ছে। এমনকি তিনি আইনের ছাত্রও নন। সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পিকাররা আইন পেশার ব্যক্তিত্ব হন। বিড়লা আগে ছিলেন রাজস্থানের প্রাদেশিক সংসদের (ভারতের ভাষায় বিধান সভা বা Assembly) তিনবারের এমএলএ। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বিজেপির যুব সংগঠন – ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার সাবেক রাজ্য সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্থান রাজ্যের কোটা শহরে অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভার এক সভায় যোগ দিয়েছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। কোটা স্পিকারের নিজের নির্বাচনী কনস্টিটুয়েন্সিও। তবে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের শুরু ওই সভায় তার বক্তৃতা থেকে।

তিনি সেখানে ঠিক কী বলেছেন এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বলাটা ঠিক হয়েছিল কিনা, এটাই বিতর্কের বিষয়। কারণ আসলে অনুষ্ঠানস্থল ছিল – রাজস্থান রাজ্যের রাজধানীও নয়, তৃতীয় বড় শহর এই কোটা, যেটা আসলে এক জেলা শহর মাত্র। তাই, ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে সেখানে ভারতের প্রধান পত্রিকাগুলোর সাংবাদিক অনুমান করা যায়, খুব কমই উপস্থিত ছিলেন। তবে সব পত্রিকাতেই ঘটনার নিউজ হয়েছে ছোট, কিন্তু অথেনটিক। কারণ স্পিকার নিজেই এক টুইট করেছেন বা ফেসবুকে ছবি দেয়েছেন ওই সভা প্রসঙ্গে। সেটাই সবার খবরের উৎস। তবে মাত্র তিনটা বাক্যের এক টুইট, তা আবার হিন্দিতে লেখা। অথেনটিক তিনটা বাক্যই সব বিতর্কের উৎস।

স্পিকার বিড়লা তার টুইটারে অনুষ্ঠানের কয়েকটা ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, “সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। যে স্থান তাদের ত্যাগ ও তপস্যার ফল। এ কারণেই সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময় পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন”।

“Brahmins have always had a high status in society. This status is a result of their sacrifice and dedication. This is the reason that Brahmins have always been the guiding light for society,” – নিউজ১৮, এটা একটা টিভির ওয়েব পেজ, থেকে নেওয়া।

কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্ট পড়লে মনে হয়, পত্রিকাটি যেন সবসময় ক্লাস টুয়ের বাচ্চাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ও শেখানোর লক্ষ্যে লিখছে। তবে বলাই বাহুল্য, তারা আবার ঝোপ বুঝে চলে। এবার মনে হচ্ছে কোপ দেয়ার সুযোগ দেখেছে, তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের প্রথম বাক্য, “ব্রাহ্মণেরা সমাজে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য করে বিতর্ক বাধালেন স্পিকার ওম বিড়লা”। আর ও প্রকাশের হিন্দি বক্তব্যের আনন্দবাজারের করা বাংলাটা হল, ‘‘ত্যাগ ও তপস্যার কারণে ব্রাহ্মণেরা বরাবরই সমাজে উচ্চ স্থানে আসীন। তাঁরা সমাজে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন।’’

কিন্তু কথা হচ্ছে এটাই কি ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ভারতীয় হিন্দু সমাজের প্রধান ও সত্য বয়ান নয়!  তাই এমন কথা কী ওম বিড়লাই  প্রথম! ব্রাহ্মণের জাতভেদের বয়ানের ওপর দাঁড়িয়েই কি তাদের সমাজ বিভক্ত নয়? এছাড়া  একালে বিজেপির উসকানি-প্রটেকশনে পুরানা দিন ফিরিয়ে এনে একে ব্রাহ্মণ্য বলশালী কর্তৃত্বের বয়ান হিসেবে সমাজে তা ফেরত আনার চেষ্টা কী চলছে না? দোষ একা যেন কেবল স্পিকারের – আনন্দবাজারের এমন ভান করার দরকার কী?

এই তো গত মার্চ মাসে (২০১৯) ভারতের প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক গিয়েছিলেন উড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির দর্শনে। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ, ব্রাহ্মণমতে একজন দলিত বা নীচু জাতের মানুষ। তাই তার মন্দিরে “প্রবেশ নিষেধ”। এই যুক্তিতে ঐ মন্দিরের ভক্ত ও সেবায়েত- তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের পথরোধ করে বাধা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, এটা “শকিং, চরম বিব্রতকর ও বেয়াদবি আচরণ”। [In a shocking and an extremely embarrassing incident …‘misbehaved with’ ]  আরো লিখেছিল, মন্দির পরিচালনা প্রশাসনের মিটিংয়ে আলাপ হয়েছে, এমন রেকর্ড মোতাবেক কথিত সেবায়েতরা প্রেসিডেন্ট পত্নিকে তাঁর চলার পথের সামনে বাধা দিয়ে তাকে ‘ধাক্কা মেরেছেন” [The group had also shoved the First Lady, as per the minutes of a meeting occurred……… ]। অথচ এনিয়ে কোনো আইনি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোথায় হয়নি। এটাই কি বাস্তবের ভারতীয় হিন্দু সমাজ নয়?

আসলে মন্দিরের দেবতা-রক্ষকদের দাবি মতে, ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে উল্টা, যেন দেবতা নন, দলিতেরা এতই ‘পাওয়ার ফুল’ যে তাঁরা কোনো মন্দির কেন, এমনকি খোদ দেবতাকে ছুঁয়ে দিলে অচ্ছুতেরাই সব কিছুকেই অপবিত্র করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতীয় হিন্দু সমাজের জাত-বিভক্তির উঁচা-নিচা সত্যি খুবই ‘আধুনিক’!

ভারতের স্পিকার ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে যতগুলো অভিযোগ উঠেছে, এসবের মূল কথাটা হল, এটা “জাতবাদ” বা “জাতের শ্রেষ্ঠত্ববাদ”; মানে এটা বর্ণবাদের [racism] মতই আর এক নস্টামি। যেমন, কংগ্রেসের এক প্রাক্তন এমপি, দিল্লির উচ্চ আদালতের নামকরা উকিল কপিল সিবাল বলেছেন, এটা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধযুক্ত মনের, এক মন্তব্য” [senior Congress leader Kapil Sibal said that his mindset reeks of casteism]। তিনি আরও বলেন, “It is this mindset that caters to a caste-ridden unequal India. We respect you Birlaji not because you are a Brahmin but because you are our Speaker in Lok Sabha,” tweeted Kapil Sibal.]। “বিড়লাজি, আমরা আপনাকে সম্মান করি কারণ আপনি স্পিকার, কিন্তু আপনি ব্রাহ্মণ বলে না”।

কথাটা সঠিক। কিন্তু সমস্যাটা হল, কেউ যখন কটু বা পঁচা গন্ধের কোন কিছু নিয়ে সারাক্ষণ সারাদিন নাড়াচাড়া করতে থাকে তাতে একসময় তার শরীর ওই খারাপ গন্ধ-প্রুফ হয়ে যায়। খারাপ গন্ধটা এতই গা-সওয়া হয়ে যায় যে, তার কাছে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি কেউ তাকে মনে করিয়ে দিলেও সে এটা বিশ্বাস করতে বা মানতে চায় না। বিজেপি-আরএসএসের অবস্থাটা হয়েছে তাই। তারা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধপ্রুফ” বা গা-সওয়া হয়ে গেছেন।

হিন্দু-ধর্ম চর্চাকারী সমাজের প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য জাত-ভেদ [caste system]। সমাজের সব মানুষকেই উচা-নিঁচার বিভিন্ন স্তরে এখানে ভাগ করা হয়ে থাকে। তাই হিন্দু ধর্ম মানেই এই জাত-ভেদ প্রথা তার প্রধান অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য। যদিও মানুষের আধুনিক জীবন যাপনের বা শহরায়নের সাথে সাথে জাত-ভেদ ধারণা ও এর চর্চার প্রাবল্য কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই বিজেপির আমলে এটা এখন আবার উল্টামুখী। জাত-ভেদ ব্যবস্থাটাকে অনেক ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ [Brahminism] বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এই সিস্টেমে এর ভিত্তি বা চিন্তাটা হল, ব্রাহ্মণকে শীর্ষে রেখে এটা সমাজের বাকি সব মানুষকে অধস্তন বানায়। এভাবে একটা জাত-ভেদের ব্যবস্থামূলক ধর্ম হয়ে তা নিজেকে হাজির করে থাকে। এই “অধস্তনতার বয়ান” বাস্তবে সক্রিয় ও সত্যি হয়ে যায় এজন্য যে, ওখানে দাবি করা হয়, যাগ-যজ্ঞ-পূজার একমাত্র অধিকারি ব্রাহ্মণের। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ, সবার উপরে।

অনেক হিন্দু ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ শব্দ ও এর অর্থটা না বুঝে ভুল আচরণ, প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন। তাই না বুঝে মনে করে বসে যে কেউ ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ লিখেছে সুতরাং এটা নিশ্চয় হিন্দুদেরকে গালি দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা একেবারেই এমন না। যেমন ইতিহাসবিদ বা প্রাক্তন সাব-অল্টার্ন গ্রুপের সদস্য গৌতম ভদ্র, তিনিও ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তিনি মনে করেন ও  লিখেছেন, বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক”। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দটা কোন গালি নয়, একটা বিশেষ ধরণের চিন্তা ও সেই আদর্শ ও বৈশিষ্ঠকে চিনানোর একটা শব্দ বা নাম এটা।

থিওলজিক্যাল স্কলারদের মধ্যেও, সেই প্রাচীন কালে এমন জাতভেদমূলক-ব্যবস্থা কেন করা হয়েছিল এর এক ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, সেকালের জনগোষ্ঠির পক্ষে সন্তান জন্মদান বা প্রজন্ম টিকানো কঠিন ছিল বলে এটা চালু হয়েছিল। কিন্তু তাতে এটা ন্যায্য-সাফাই হোক আর না হোক, একালে সমাজের হিসেবে এই জাত-ভেদ প্রথা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মূল কারণ এটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের আমল। এখানে নাগরিক অধিকারে অসাম্য, বা মানুষ সকল সমান না এমন বক্তব্যের পক্ষে সাড়া পাওয়া কঠিন। সেটা যাই হোক, এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, কালক্রমে সমাজের এই জাতিভেদ  ব্যবস্থাটাই হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে – একজনের ঘাড়ে চড়ে অন্যদের বা কথিত উঁচু জাতের দাবিদারদের আয়েশি জীবন যাপনের ব্যবস্থার উৎস।

আর যারা একবার জাতের স্তরভেদের সুবিধা লুটেছে তারা আর তা ছাড়তে চাইবে কেন! চাওয়ার কারণ নেই। শুধু তাই না, সমাজের কাছে জাতভেদ প্রথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওই উঁচু জাতের দাবিদারেরাই নিজের অন্যায় সুবিধা অপরিবর্তনীয়, এটা স্থায়ী এমন এক ধারণা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে এখনো। অর্থাৎ ধর্মের নামে জাত-ভেদের ওপর আস্থা বিশ্বাসটা একালে শিথিল বা বাস্তবে তত প্রবল নয় এমন হয়ে পড়লেও, বাড়তি সুবিধা ভোগের লোভে কথিত উচ্চবর্ণরা সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর স্তরে জাত-ভেদের বয়ান বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তা আঁকড়ে সেখান থেকে দাপটের সাথে সব সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। বরং এখানে তাদের মূল অজুহাত হল – তোমরা জাতভেদ মানো না, এর মানে তোমরা ধর্ম মান না। এই যুক্তি তুলে ভয় দেখিয়ে সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে স্তরে জাত-ভেদ কে ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

তবে, এখানে আমাদের একটু সাবধান হতে পরামর্শ রাখব। ব্যাপারটা হল,  সবার কাছেই সবার ধর্মই সবচেয়ে ভাল, এমন মনে করা এটাই স্বাভাবিক। আবার, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করা ঠিক না। তর্ক চলে না সেখানে। তাই এখানে সমাজের আমরা পরস্পরকে একটু স্পেস বা জায়গা করে দিতে হবে। যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অছিলায় কোনো ঘৃণা ছড়ানোর কাজে আমরা যেন নেমে না যাই সেদিকটা খেয়াল রাখাই কাম্য। আর “ব্রাহ্মণরা বদ লোক তাদের উদ্দেশ্য খারাপ” – পাঠককে এমন কোনো ধারণা দেয়া অনুচিত। ফলে সেটা বলা এখানে কোন উদ্দেশ্য নয়। এমন অনুমান সেটা ঠিক হবে না শুধু তাই নয়, বরং অতি সরলীকরণ দোষ হবে।

তাহলে মূল কথাটা কী? সেটা হল, আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে জাত-ভেদ প্রথার চিন্তাকে দুয়ারের বাইরে জুতার মত খুলে রেখে আসতে হবে। অথবা এটা রাষ্ট্রের সাথে সঙ্ঘাতের নয় এমন ব্যাখ্যা বয়ানে, এমন নন-কনফ্রন্টেশনাল ভাবে হাজির করতে হবে।

কারণ জাতভেদ প্রথার সারকথাটা হল, মানুষ সকলে এখানে সমান নয়, সমান হিসেবে গণ্য নয়, মানুষে-মানুষে জাত বলে ভেদাভেদ আছে। অথচ একটা মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ওর কনস্টিটিউশন, গঠন ও মৌলিক ভিত্তি ইত্যাদির বিচারে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রেই সবাই সমান। কোনো অসাম্য সেখানে নেই, রাষ্ট্র তা অনুমোদন করে না। সবাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান, বৈষম্যহীনভাবে আচরণ পাওয়ার যোগ্য, সব সুবিধা সমান পাওয়ার যোগ্য – তাতে নাগরিক মানুষের ধর্ম-বর্ণ-জাত ইত্যাদি যা হোক না কেন।  এবং রাষ্ট্র নাগরিককে বৈষম্য থেকে প্রটেক্ট করতে বাধ্য। কাজেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার আছে, এমন সব বিষয়ে জাতভেদ প্রথার ধর্মীয়-সামাজিক বয়ান নন-কনফ্রন্টেশনাল হয়ে জায়গা ছেড়ে রাখবে।

কিন্তু বাস্তবে ভারত হল এমন – যেখানে পত্নীসহ খোদ প্রেসিডেন্টকেই চরম বৈষম্যের শিকার করা হয়েছে। এক এমএলএ আরেক সহ-এমএলএকে প্রকাশ্যেই ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। অথচ সমাজ নির্বিকার, কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কেউ কেউ এখন বলার চেষ্টা করছেন স্পিকার পদটা নিরপেক্ষ, তাই তার পদত্যাগ করা উচিত। আনন্দবাজার লিখেছে, “নিরপেক্ষতার শপথ নিয়ে যিনি সাংবিধানিক পদে বসেছেন, তিনি কিভাবে একটি বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে সওয়াল করতে পারেন,তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবিলম্বে ওমকে স্পিকারের পদ থেকে সরানোর দাবিও উঠেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা- সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির সুরে কথা বললে এখন সাত খুন মাফ হয়ে যায়। ওমও ছাড় পেয়ে যেতে পারেন। কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের কাছে তাদের আদর্শই শেষ। সংবিধান মূল্যহীন”।

খেয়াল রাখতে হবে যে, ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব সঠিক কি না এটা নিয়ে রাষ্ট্রের বলবার কিছু নেই। কারণ কোন ধর্ম কেমন হবে বা হতে হবে তা নিয়ে কথা বলা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ ছাড়া কোন ধর্মের সংস্কার করা আদৌও দরকার তা, দেখাও রাষ্ট্রের কাজ না।  রাষ্ট্র কেবল বৈষম্যহীন এক নাগরিক সমাজ বজায় রাখা আর মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া ছাড়াই আপসহীন থাকবে। কারণ এটা মৌলিক বিষয়।

ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রায় সব মিডিয়া এখানেই শেষ হয়ে গেছে।  কিন্তু আরও এগিয়ে আনন্দবাজার কিছু একাদেমিকের মন্তব্য এখানে যোগ করেছে। আনন্দবাজার লিখেছে ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র বলেছেন, “বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে ব্রাহ্মণদের মতো অত্যাচারী আর কেউ নেই। ধর্মপদে বলা হয়েছে, মন্ত্র দিয়ে ব্রাহ্মণ হয় না। গুণ থাকতে হয়। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ জাতিভেদ প্রথাকে তুলে ধরে। বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক। ব্রাহ্মণের মূল ক্ষমতা ছিল যজ্ঞের অধিকার। তাই বুদ্ধদেব যজ্ঞের বিরোধী ছিলেন। যজ্ঞের বিরোধিতার মাধ্যমেই সমাজে ব্রাহ্মণদের কার্যত অর্থহীন করে দেয়া হয়েছিল”।  এছাড়া আরো এক সমাজতত্ত্ববিদ অভিজিৎ মিত্রের সাথে কথা বলেছে। মিত্র বলেছেন, “যে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারেন। যিনি গুণের অধিকারী এবং যে গুণ মঙ্গলময় তিনিই ব্রাহ্মণ। তিনি যে কোনও শ্রেণীর প্রতিনিধি হতে পারেন। জ্ঞানের দিক থেকে একটি উচ্চতায় পৌঁছলে সেই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ধরা হতো। সেটাই ছিল ধারণা”। আনন্দবাজার বলছে,  “অভিজিৎ বাবুর বক্তব্য, ‘বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ব্রাহ্মণেরা ব্যর্থ হয়েছেন”।
“ফারাক আছে ব্রাহ্মণে-ব্রাহ্মণেও। যিনি অপরের কাছ থেকে বেশি দান গ্রহণ করেন, তাদের ব্রাহ্মণেরাই নীচু চোখে দেখেন।’ ব্রাহ্মণ হওয়ার অধিকার একটি বর্ণের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করেন অভিজিৎ বাবু”।

কিন্তু আমাদের বক্তব্য এমন হওয়া ঠিক হবে না। কারণ, উপরের দুটা বক্তব্যই মূলত ধর্ম-সংস্কারমূলক। এগুলো একটাও রাজনীতি বা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা নয়। বক্তা একাদেমিক দুজনই ধর্ম সংস্কারের আলাপ করেছেন, তাঁরা আলাপ করেছেন ব্রাহ্মণের তাতপর্য, তাদের কী হওয়া উচিত, না উচিত ইত্যাদি এসব নিয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-রাজনীতির আলাপ করেননি তারা। কিন্তু রাষ্ট্র তো সব ধর্মের নাগরিক সবার। তাই এর এখতিয়ার নেই যে, কোনো ধর্মের সংস্কার হওয়া উচিত কিনা, কেমন হওয়া উচিত এমন কোন আলাপে মগ্ন হয়ে ওঠা। বরং রাষ্ট্র বলবে, জাত-ভেদের আলাপ আপনার ধর্মে থাকুক আর না থাকুক, নাগরিক সবার স্বার্থে আপনাদেরকে আমার নীতিকে – নাগরিক সাম্যের নীতি ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার নীতি – একে সবার উপরে প্রাধ্যন্য দিয়ে মেনে চলতে হবে।

এদিকে, “সিভিল লিবার্টি” নিয়ে কাজ করে এমন এক সংগঠনও ভারতে আছে দেখা যাচ্ছে। আনন্দবাজার আরো জানাচ্ছে, “পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস (পিইউসিএল)- স্পিকারের ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এর রাজস্থান শাখার সভাপতি কবিতা শ্রীবাস্তব”। তাঁর দাবি, “স্পিকারকে ওই মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে”। কবিতা বলেন, “একটি বর্ণ বা জাতকে অন্যদের চেয়ে ভালো বলা বা একটি জাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এটা এক দিকে অন্য বর্ণকে খাটো করে দেখায়, তথা জাতিভেদ প্রথাকে আরো উৎসাহিত করে”।

বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, দল হিসাবে অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

কিন্তু কথা কনস্টিটিউশনে থাকা আর বাস্তবে চর্চা এক নয়। বাস্তবে যদি থাকতই তাহলে তো বিজেপি রাজনৈতিক দল হিসেবে অনুমোদনই পেত না। বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাগরিকবোধের চেয়ে হিন্দুত্ববোধ যদি কারো চিন্তা ও বুদ্ধিতে ওপরে চড়ে থাকে তবে অবস্থা এরকমই হবে।

তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিন্দা করা মন্তব্য দিয়েছেন গুজরাট রাজ্য সংসদের এক এমএলএ ও এক্টিভিস্ট – জিগনেস মাভানি। তিনি তাঁর টুইটে লিখেছেন, “ভারতের জাত ব্যবস্থার পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা – এটা শুধু নিন্দাযোগ্যই না এটা  বিব্রতকরভাবে পিছন-দিকে-হাঁটা। এটা আমাদের জন্য এক তামাশা যে এমন জাত-বর্ণবাদী একজন লোক আমাদের লোকসভার স্পিকার। জনগণের কাছে তার আচরণের জন্য মাফ চাওয়া উচিত”।
এটা একটা ট্রাজেডি যে কনষ্টিটিউশন জাত ব্যবস্থার উচ্ছেদ চায় সেই কনষ্টিটিউশন রক্ষার শপথ নিয়েছেন এই ব্যক্তি।
[Gujarat MLA Jignesh Mevani sought Birla’s apology. “This celebration of Indian caste system is not only condemnable but also cringe-worthy,” he tweeted. “It’s a joke on us that a casteist like him is our Lok Sabha speaker. He should publicly apologise for this attitude.”
He added: “It’s a tragedy that such people take oath on our Constitution that wants to annihilate the caste system.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জাত ভেদের সমাজে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]