ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

গৌতম দাস

০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১২

https://wp.me/p1sCvy-2uC

 

নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকারের পাঁচ বছর শেষ হতে আর ছয় মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। ফলে কেন্দ্রিয় নির্বাচন ২০১৯ সালের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের আইনি ভাষায় এটা “লোকসভা” নির্বাচন। আরও ফরমাল ভাষায় বললে, এটা (ফেডারেল) ইউনিয়ন ভারত-রাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন। ভারতের রাজনীতিতে এখন থেকে সরকার ও বিরোধী দলের যত ততপরতা এবং সাথে যত বিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হচ্ছে – বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সংগঠন, গ্রুপ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সবাই যে যা কিছু গত ছয় মাস ধরে করে চলেছেন এবং আগামী ছয় মাসেও করবেন – ইত্যাদি সব কিছুই আসন্ন এই নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই ঘটছে। এসব ততপরতায় সবার লক্ষ্য এমন কিছু করা যেটা এই নির্বাচনের ফলাফলকে কিভাবে যার যার পছন্দের রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারে – সে কথা মনে রেখেই তাঁরা করে যাচ্ছেন। সেটা অমর্ত সেন বা অরুন্ধতি রায়সহ আরও যারা – জাতপাতের বিরুদ্ধের নিজ অধিকারের লড়াই বা দলিত আন্দোলনে – জড়িয়ে আছেন, তাদের ততপরতাও একইভাবে সংশ্লিষ্ট। এমনকি কোন কোন রাজ্যের বিভিন্ন পকেটে যেসব মাওবাদী ততপরতা চলছে সেগুলোও এখন বেশি ততপর একই কারণে। পুরা ব্যাপারটাই রাজনীতিতে ক্ষমতায় যারা ছিল আর যারা যেতে চায় সবারই একটা স্টক টেকিং বা হিসাব নেয়া ও মিলানোও বটে। ফলাফলে নতুন করে আবার জোট গঠনে কেউ বের হয়ে যাওয়া অথবা কারও প্রবেশের সময় এটা।  তাই এদিক থেকে বিচার করে কেউ হয়তো বলবেন, ভারতের রাজনীতি কেবল “কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনকেন্দ্রিক”।

এমনকি বলতে পারেন, তা পঞ্চম বছর-কেন্দ্রিক, যার প্রথম চার বছর তারা তুলনায় বেখবর থাকেন। কথাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো না হলেও এমন হওয়ার প্রধান কারণ হল – আবার যারা সম্ভাব্য নতুন ক্ষমতার প্রার্থী, ক্ষমতায় যেতে প্রবল আগ্রহী, তারা পঞ্চম বছরেই কেবল ভারতের ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার মুখোমুখি হতে চান বা পারেন। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বিরাট সমাজের বিভিন্ন গ্রুপ, গোষ্ঠী অথবা সামাজিক বা রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের মধ্যে যত বেশি সংখ্যককে তারা তাদের নিজেদের ‘নৌকায় উঠাতে’ সচেষ্ট হন। অন্য সময়ে, মানে আগের চার বছরে এই আমল করার মানে নৌকায় যদিওবা উঠানো যায় কিন্তু চার বছর তাদের ধরে রাখা খুবই কঠিন তাই, কোনো কারণ তারা দেখেন না, হাজিরও থাকেন না। তবে এমন হবার পিছনে এতে বিশাল ভারতে সকলকে এড্রেস করতে গেলে এর একটা বিরাট খরচের দিকও আছে। তাই সব মিলিয়ে এই হল “ভারত” মানে,  প্রতি পঞ্চম বছরের রাজনীতির এক ‘ভারতীয় সমাজ’, এসব সীমাবদ্ধতার ভিতরে থেকেই যার জন্ম ও ততপরতা।

এই পঞ্চম বছরেই দলগুলোর মূল টার্গেট হল, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সমাজের নানা দল ও জোট গড়ে এক ইতিবাচক ঘোঁট পাকিয়ে অর্থপূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে দু’টি বৃহত্তর জোটের পক্ষ হিসেবে নিজেদের হাজির হন বা বলা যায় এভাবেই তাদের হাজির হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সব শেষে দু’টি রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে পুরো ভারতকে মেরুকরণ করে নিতে পছন্দ করা, রাজনীতির এক স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেমন মোটা দাগে গত ৩০ বছরের এমন ‘ফেনোমেনা’ হল – হয় কংগ্রেসকে কেন্দ্রে রেখে ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) আর নয়ত বিজেপিকে কেন্দ্রে রেখে এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স) – এভাবে দু’টি জোট আমরা দেখে আসছি। যদিও এবার সম্ভবত তিনটা জোট অথবা দুটাই জোট তবে ভিন্ন নামে, হতে আমরা দেখব। অর্থাৎ বিজেপির জোট এনডিএ ঠিক থাকছে যদিও জোটের দলের কেউ বের হয়ে অন্য জোটে যাবেন অথবা নতুন কোনো দল এই জোটে ঢুকবে – এমন হবে। কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট ইউপিএ এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও কিছুটা অনিশ্চিত।

যদিও কোন সন্দেহ নাই যে বিজেপির বিরুদ্ধে সব বিরোধীদলের একটা বড় অংশের বড় জোট অবশ্যই হচ্ছে; সে লক্ষ্যে এর তৎপরতা ও উদ্দীপনা বরং অন্যবারের চেয়ে এবার বরং প্রবল। এনিয়ে প্রকাশ্যে প্রাথমিক আলোচনাও হয়ে গেছে, বলা যায় সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে গেছে। তবে এর মধ্যে এখনও অমীমাংসিত কিছু বিষয় আছে। তা হল, বিজেপিবিরোধী এই সম্ভাব্য জোট – এটা ঠিক কংগ্রেসের নেতৃত্বেই হবে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক বেশ গভীরে। অর্থাৎ শুরুতেই ধরে নেয়া যে জোট হবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে, যার মানে হল হবু প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের থেকে বা তিনি রাহুল গান্ধী – তা অনেকে এবার আগেই মেনে নিয়ে শুরু করতে চাচ্ছেন না। এই হল মূল বিতর্কের বিষয়, তাই জোট গঠন শুরু হতে একটু সময় নিচ্ছে। যদিও কংগ্রেস ইতোমধ্যে জোটের নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেও একটা পালটা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে যে  – জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হতে পারেন সেটা কেন্দ্রিয় নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে আলোচনা হবে – সে পর্যন্ত এটা মুলতবি করে রাখা যেতে পারে। কিন্তু জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে সেটাও তো একটা ইস্যু, তাই পুরা ব্যাপারটা আপাতত স্থবির হয়ে আছে।

কিন্তু জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এবারের নির্বাচনের আগেই বিতর্ক উঠল কেন? উঠার মূল কারণ হিসাবে দুটা ইস্যুকে বলা যায়। প্রথমতঃ  গত ২০১৪ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস খুবই খারাপ ফল করেছিল। কংগ্রেসের জন্মের পর থেকে এর আগে সে সরকারে বা বিরোধী দলে যেখানেই থাক, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জোট গঠন করে থেকেছে। কিন্তু কখনই ঐসব জোটে কংগ্রেস দলের আসন সংখ্যা সেখানে ১১৪-এর নিচে (লোকসভার মোট আসন ৫৪৫) যায়নি। অথচ গত (২০১৪) নির্বাচনে তা নেমে আসে ৪৮ আসনে, যা মোট আসনের ১০ শতাংশেরও কম। ফলে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস এবারই প্রথম অন্যান্য আঞ্চলিক দলের আসন সংখ্যার কাতারে নেমে যায়। যেমন, মমতার তৃণমূল দলের (২০১৪ সালে নির্বাচনে) লোকসভায় আসন সংখ্যা ৪২। এছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে এটা সর্বোচ্চ। মানে লোকসভায় আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আসন সংখ্যার দিক দিয়ে একক দল হিসেবে মমতার দলের আসন সংখ্যা ৪২, এটাই সবচেয়ে বড়। ফলে এককালের একক কংগ্রেস দল একালে এসে যেন মমতার আঞ্চলিক দলের কাতারে নেমে গেছে। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে কংগ্রেস আর আগের মত ইজ্জত-সম্মান বা গুরুত্ব আশা করতে পারে না, যেন এটাই আঞ্চলিক দলগুলো বলতে চাইছে।

ইতোমধ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর সম্ভাব্য কোন জোট হলে তাতে কংগ্রেসকে তারা কোথায়, কীভাবে রাখবে – এই অনুমানের একটা মহড়াও হয়ে গেছে ২০১৬ সালে, বিহার রাজ্যের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট ছিল না। বরং বাক্যটা লিখতে হবে এভাবে যে, ঐ নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট হয়েছিল, কংগ্রেস যেখানে নেতা নয়, তবে ঐ জোটের এক অংশীদার হিসাবে ছিল। বিজেপি-বিরোধী “কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট” না কী “আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট” – এদুইয়ের মধ্যে এক বিশাল ফারাক আছে। আর বিহারে গঠিত ঐ আঞ্চলিক জোট বিজেপিকে পরাজিত করেছিল এবং করার পর কংগ্রেস দল থেকে নয়, এক আঞ্চলিক দলের নেতা নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল। ফলে ঐ মহড়াটা যেন কংগ্রেওকে জানিয়ে দিয়েছিল আঞ্চলিক দলগুলো একালে কংগ্রেসকে কীভাবে মাপে, মুল্যায়ন করে কোথায় রাখে।

ভারত ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি প্রদেশে (রাজ্যে) বিভক্ত, যেখানে প্রদেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাজ্য’ বলে পরিচিত। আর কোন রাজ্যের স্থানীয় কোন দলকেই এখানে ‘আঞ্চলিক দল’ বলা হচ্ছে। ‘আঞ্চলিক দল’ শব্দটার বিপরীত শব্দ হল ‘সর্বভারতীয় দল’ (বৃটিশ আমলে এই ধারণাটাকেই “অল ইন্ডিয়া” বা বাংলায় “নিখিল ভারত” বলে শব্দ দলের নামের শুরুতে যুক্ত থাকত। যেমন “নিখিল ভারত মুসলিম লীগ” – বলা হত)। মানে সারা ভারতের সবপ্রদেশের যার শাখা ও সবল ততপরতা আছে এমন দলের ধারণা। আর এর বিপরীতে আঞ্চলিক দল মানে যা মূলত একটা রাজ্য কেন্দ্রিক দল, আর বাকি ভারতজুড়ে মূলত এদের কোনো শাখা বা কর্মতৎপরতা প্রায় থাকেই না। প্রত্যেকটা প্রদেশে সাধারণত কমপক্ষে একটা আঞ্চলিক দল পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসন পায়, ফলে কেন্দ্রে জোট সরকার গড়ার ক্ষেত্রে এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এভাবে সর্বভারতীয় দলের বিপরীতে, ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দল এক নতুন উঠে আসা ফেনোমেনা এবং যা ক্রমশ প্রভাবশালী প্রধান ভূমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত আসন্ন এই নির্বাচন থেকেই বিজেপির বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস দলের ভুমিকা লোপ পেতে থাকবে। না ব্যাপারটা কেবল কংগ্রেসের বেলায় ঘটবে তাই শুধু না সেক্ষেত্রে বিজেপিও বাদ থাকবে না। খুব সম্ভবত “আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট” হবে ভারতীয় আগামি রাজনীতির মূল এবং নতুন ফেনোমেনা। তবে সেই সাথে হয়ত ‘আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট’ হবে দুটা – একের বিরোধী অন্যটা। আর কংগ্রেস ও বিজেপি তাদের পছন্দ অনুসারে এবার একেকটা জোটে যোগ দিবে – এই হবে সম্ভবত নতুন দৃশ্যপট।

জোটের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের দ্বিতীয় কারণঃ কংগ্রেসের প্রভাব “শুকিয়ে আসা” এবং এর বিপরীত ঘটনা হিসাবে আঞ্চলিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা (আর বিজেপি তখন বেখবরিয়া দল ছিল) – গত ৩০ বছর ধরে এটাই ভারতের নির্বাচনী চালচিত্র। ফলে আসন্ন এই সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোটের আঞ্চলিক নেতারা যেমন, তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা উত্তরপ্রদেশের নিম্নবর্গের দল, বহুজন সমাজবাদী পার্টি দলের নেতা মায়াবতী প্রভুদাস – তারা এবার মনে করছেন, তারাও কেন রাহুল গান্ধীর মত “প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার” হবেন না? তারা অযোগ্য কিসে? এ কারণে আঞ্চলিক দলগুলো এবার জোট গঠনের শুরুতেই কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে আগের মত ইউপিএ জোট বাঁধতে দ্বিধা করছে। আর পুরান ধরণে ইউপিএ-জোটের বিপরীতে প্রথম থেকেই এবার সরব হয়েছেন মমতা। তিনি আরো এগিয়ে বলেছেন, তার আলাদা জোটের দাবির অর্থ হল, এবার ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ গড়তে হবে। মানে কংগ্রেসকে ছাড়াই আগে আঞ্চলিক দলগুলোর একটি জোট হবে। এরপর কংগ্রেসকে সাথে নেয়া বা না নেয়ার প্রশ্ন। সার কথায়, বিজেপির এনডিএ নামে জোট থাকলেও এর প্রতিদ্বন্দ্বী জোট কোনটা হবে ইউপিএ নাকি প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’- এটাই নির্ধারিত হতে একটু সময় নিচ্ছে, তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা হয়ে যাবে। ডিসেম্বর এজন্য যে ঐ মাসে পাঁচ রাজ্যের (রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম ) প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল এর নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। ঐ রাজ্য-নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে ওসব রাজ্যের আঞ্চলিক দল ও জোটে আসন ভাগাভাগির বুঝাবুঝি কেমন কী দাড়ায় – এর উপর সব কিছু নির্ভর করছে। সেটা দেখতেই সবার অপেক্ষা।

বিপরীত প্রসঙ্গ হিসাবে বিজেপিঃ
ইতোমধ্যেই এটা স্পষ্ট যে, এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর অবস্থা খুব শোচনীয় হতে পারে। কেন? কারণ মোদীর “ইকোনমিক পারফরম্যান্স” (Economic Performance), অর্থাৎ গত প্রায় পাঁচ বছরে মোদী অর্থনীতিতে কেমন করলেন! কেন্দ্রিয় সরকার অর্থনীতিতে ভালো বা মন্দ করছে কি না এনিয়ে ভারতের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচনে এটা কোন ইস্যু হতে দেখা যায় না বা এর তেমন প্রভাব পড়তে দেখা যায় না বললেই চলে। এটা চলতি মোদী সরকারের আমলনামার ভিত্তিতে বলা খবর। গত সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের বেলায় এটাই দেখা গেছে যে, মোদীর খারাপ “ইকোনমিক পারফরম্যান্স’ (বা অর্থনৈতিক সাফল্য) সেখানে কোথাও কোন ইস্যু হতে পারে নাই। কিন্তু গত দুইবারের (২০০৯ ও ২০১৪) কেন্দ্রের নির্বাচনে দেখা গেছে – আগের (কংগ্রেস ২০০৪-০৯) সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণে পরের বারও কংগ্রেস বিপুল ভোট পেয়ে আবার ক্ষমতায় এসেছিল। আবার ইউপিএ-টু (২০০৯-১৪) সরকারের ব্যর্থতাকে প্রবলভাবে তুলে ধরে দেখিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী (বিজেপি) দল ভোটে নিজে সেই জায়গা নিবে, অর্থনীতিতে ভাল করবে – এই কথায় প্রলুব্ধ করার মত করে ভোটারদের আস্থায় নিজেকে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন মোদী, এই সম্ভাবনা জাগাতে পেরেছিল বলেই মূলত একারণেই মোদী জিতেছিলেন।

এ দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর ছিল “অর্থনৈতিক সাফল্য” – এই ইস্যু। আবার এই সাফল্য প্রদর্শন মানে কেবল জিডিপি অনেক ভাল হলে হবে, তা নয়। সাথে দেখাতে হবে একদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক ‘কাজ সৃষ্টির’ বিষয় সে পেরেছে বা পারবে; অন্য দিকের গুরুত্বপূর্ণ হল, ব্যবসায়ীদের (ম্যানুফ্যাকচারার, বাণিজ্য আর শেয়ার মার্কেটসহ) মধ্যে আস্থার জোশ তুলতে পেরেছে কি না। কংগ্রেস ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে; আবার ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে কংগ্রেসের হাল ছেড়ে দেয়ার মুখে সেটা আবার ঘটাতে মোদির দল ও সরকার পারবে, এই আশা জাগাতে পেরেছিলেন তিনি তাই। এভাবে দুই ক্ষেত্রেই প্রধান ফ্যাক্টর ছিল অর্থনীতিতে পারফরমেন্স। আসলে নিরন্তর গরিব হালে ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধুঁকে মরা দশায় তাদের ফেলে রাখা হয়েছে। তাই, ভারতের নির্বাচনে, “অর্থনীতিতে পারফরমেন্স” মুখ্য ভুমিকায় হাজির হবে – এটাই তো স্বাভাবিক!

তাহলে কেবল এই বিচারে ২০১৯ সালের নির্বাচনে, বিজেপির মোদীর আবার জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, বলতে হয়। কারণ প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সাফল্যের বিচারে মোদী ইতোমধ্যে ব্যর্থ। শুধু তাই না, অর্থনীতিতে সাফল্যের বিচারে – একটু পুরান এবং নতুন (চলতি) – দু ধরণের ইস্যুই আছে; আবার একটু পুরান ইস্যুটা বিরাট বড় ইস্যু। এছাড়া একালের নতুন দগদগে ইস্যুও আছে যা সামনের কয়েক মাসে ‘আরো দগদগে ঘা’ হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা।

একটু পুরনো ইস্যুটা হল, গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে, মোদীর ‘নোট বাতিলের’ (DeMonetization) সিদ্ধান্ত। আগামি দিনের ইতিহাসে এবং আসন্ন নির্বাচনেও মোদী সরকারের বিরাট ব্যর্থতা বলতে অবশ্যই ‘নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত, সামনে আসবে। মানুষের মনে ভেসে উঠবে। নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত কথাটার মানে হল, ভারতের মুদ্রায় সবচেয়ে বড় নোট ছিল ৫০০ ও ১০০০ রুপির। ঐ দিনের শেষে রাত্রে হঠাৎ – এই দুই ধরনের সব নোটই বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন মোদী। যদিও পুরান নোট ব্যাংকে জমা দিলে সেটার বদলে নতুন নোট দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু নাম ঠিকানাসহ কে জমা দিচ্ছেন, তা বলতে হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর হল – মানুষের ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস অথবা দিনমজুরি সব ধরনের কাজ ফেলে ব্যাংকে লাইন দেয়া। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতায় একেবারে এলোমেলো শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়া তো আছেই, সেই সাথে বহু কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়েছিল। আর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব অর্থনৈতিক তৎপরতা ও লেনদেন-বিনিময়ে ভারতের অর্থনীতিতে সচলতার ব্যস্ততা যে পর্যায়ে আগে ছিল অর্থনীতির সেই সাজানো বাগান এবার অর্ধেক হয়ে, বড় স্থবিরতার দিকে গড়াতে থাকে।

দুটা উদাহরণ দিলে এর মারাত্মক প্রভাব বুঝা যাবে। ভারতের অর্থনীতির হাব বলে বুঝানো বা মনে করা হয় মুম্বাইকে আর একালে সাথে পড়শি গুজরাতকেও। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এদুই রাজ্যের অর্থনৈতিক ততপরতা অগ্রসর ও গতি বেশি। ব্যাপারটা কলকাতার স্বর্ণকারদের মাঝে কীভাবে আমল হয়েছিল এর একটা প্রমাণ হল, তারা দল বেধে গুজরাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত এলাকায় দোকান খুলে বসেছিল; একেক জন মুল ওস্তাদ আর সাথে পাঁচ-ছয় জন সাগরেদ এভাবে। তারা সেখানে ভাল আয় করতে পারত ফলে নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গের পরিবারের চলতে তাদের কাছে টাকা পাঠাতেও পারছিল। অর্থনীতিক স্টাডির মুল্যায়নে এগুলো অবশ্যই ‘মূল’ কাজ সৃষ্টি নয়, ইনফরমাল সেক্টর বলা হবে। মানে হল, সরকারের নীতির কারণে যারা কাজ পেয়েছে বা আয় বেড়েছে – এই মূল সুবিধাভোগীদের স্বচ্ছলতার কারণে সৃষ্ট এরা। মুল ফরমাল সেক্টরের কাজ পাওয়া সদস্য তারা নয়। তবে ফরমালদের আয় বাড়াতে ইনফরমালের কিছু লোক তাতে নিজেদের সম্ভাবনা দেখেছিল। তারা নিজেরাই যা পারে তেমন কিছু সার্ভিস নিয়ে ঐ সুবিধাভোগীদের কাছে হাজির হবার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া – এজন্য এটা ইনফরমাল, আর সুবিধাভোগীরা হল ফরমাল সেক্টর। সরকারের খুবই সফল নীতি পলিসি হলে তাতে,  ফরমাল সেক্টরের নিয়োগের চাহিদাই যত বেশি হবে ততই ইনফরমাল সেক্টর ত্যাগ করে মানুষ ফরমাল সেক্টরে চলে যাবে। ফলে তা ঠিক করে দেয় যে একজন চাকরি প্রার্থী বা লেবারকে কতদিন ইনফরমাল সেক্টরে থাকতে হবে। সারকথায় মোদীর অর্থনীতি স্বর্ণকারদের ভাল-সুবিধায়-ভরপুর কাজ দিতে পারে নাই সত্য কিন্তু এর ভিতরেই কলকাতার স্বর্ণকারেরা প্রতি ওস্তাদ পিছু পাচ-ছয় সাগরেদ মিলে ভিন রাজ্যে বেঁচে থাকার অবস্থার (ইনফরমাল) কাজ খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু মোদীর নোট বাতিলের প্রভাবে শ্লথ অর্থনীতির কারণে এদের এটুক স্বপ্নও ভঙ্গ হয়ে যায়। গুজরাতে কাজের অভাবে এরা সবাই সব গুটিয়ে দেশে ফিরে চলে যায়।  তাদের পরিবারসহ তারা এখন সেই আগের দুঃসহ গরীরি হালে ফিরে এসেছে।

আমাদের কাওরান বাজারের মত দিল্লীর পাইকারি বাজারের দিনমজুরঃ পাইকাররা মালামাল কিনলে তা পৌছে দেয়া বা গাড়িতে তুলে দেয়া এই কাজ করে তাদের দৈনন্দিন পাঁচশ রুপির মত আয় করতে পারত। কিন্তু নোট বাতিলের কারণে একই পরিণতি। ঢলে পড়া অর্থনীতির প্রভাব এই পাইকারি বাজারের এতই নিচে পড়েছে যে ঐ মজুরেরা দুই-তিনশ টাকা দৈনিক আয় করতে হিমশিম খেয়েছে। কয়েকদিন তারা উপায়ন্ত না দেখে “বাতিল নোটে মজুরি” নিবে পরে নিজে সময় দিয়ে ব্যাঙ্কে তা বদলে নিবে – এই শর্তে কাজ করেছে। একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে এর প্রভাব কত স্তরে পরে তা বুঝার জন্য এই উদাহরণ দুইটার খুটিনাটি লক্ষ্য করলে অনেক কিছু টের পাওয়া যায়। এছাড়া আসলে এটাই তো স্বাভাবিক, একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে বা যেকোন বিপর্যয় দেখা দিলে সবার চেয়ে বেশি এর চাপ গিয়ে পড়ে স্বল্প আয়ের নিচের মানুষের উপর। মোদী নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এদিকটা আমলই করেন নাই যে তাঁর  টার্গেট লক্ষ্যচ্যুত হলে, তিনি ব্যর্থ হলে পরে এর প্রভাব কত স্তরে কত মারাত্মক হতে পারে।

বরং মোদি আশ্বাসের উপরে চলছিলেন যে, রুপি বদলে নিতে ব্যাঙ্কে আসলে – এতদিন যারা নগদ রুপিতে সম্পদ রাখা কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির সবাই এবার ধরা পড়বেন। অর্থাৎ ধরা পড়ার ও পরে শাস্তির ভয়ে এরা আর ব্যাঙ্কেই আসবে না। সেক্ষেত্রে সরকারের অনুমান ছিল, ৮৫ শতাংশের হয়ত বৈধ আয় বলে রুপি বদলে নিতে আসবে। বাকি ১৫% নোটের মালিক এরা কালোটাকার মালিক বলে ধরা পড়ার ভয়ে তাঁরা আর রুপি বদলে নিতে আসবে না, ফলে প্রায় ২৪০ হাজার কোটি রুপি রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে না, তাই বিপুল লাভ হবে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দেখা গেল, ৯৯ শতাংশ ছাপানো মুদ্রাই ফেরত এসেছে। অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আসেনি। এর মানে, সারা ভারতের জনগোষ্ঠীকে কষ্ট দিয়ে, বিশেষ করে গরিব মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েও কোনো সুফল মেলেনি।

বরং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ রুপি ফেরত আসেনি বলে, ভারতের মিডিয়া লিখছে, ‘‘এ থেকে যা ‘লাভ’ তা মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা। নতুন নোট ছাপা ও বণ্টন এবং অর্থনীতির সামগ্রিক ক্ষতি বিবেচনা করলে অবশ্য সেই লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যাবে!” অথচ সবচেয়ে কষ্টকর অবস্থা স্বল্প আয়, ‘দিনে আনে দিনে খায়’ লোকদের। এ ছাড়া, মূল ক্ষতিটা হয়েছে তাদের কাজ হারানো।

মোদির দ্বিতীয় ব্যর্থতার ইস্যুঃ মোদি গত নির্বাচনে আশ্বস্ত করেছিলেন – নির্বাচিত হলে কংগ্রেসের প্রথম জমানার (২০০৪-০৯) মত ভাল অর্থনীতি তিনি গড়বেন। এ ছাড়া আর আরো বেশি কাজ সৃষ্টি করবেন। তার দেয়া নতুন টার্গেট ছিল, বছরে দুই কোটি লোকের কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু এখন সমালোচকরা বলছেন, বাস্তব পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, উলটো গত চার বছর ধরে গড়ে ৭০ লাখ করে কর্মসংস্থান কমেছে। এটা কাজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গত আট বছরে সর্বনিম্ন। সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন তরুণেরা এখনও বছরে ২ কোটি কাজ সৃষ্টি দেখার অপেক্ষায় আছে। [……said young Indians were waiting for the 20 million jobs promised by the Bharatiya Janata Party (BJP).]

একইভাবে রয়টার্সের এই রিপোর্ট বলছে, যার শিরোনামটাই সাংঘাতিকঃ [No jobs, no vote: Indian town warns Modi ahead of 2019 polls]। ঐ রিপোর্টই আরও বলছে,  কাজ সৃষ্টি দূরে থাক,  ভারতে বেকারত্ব এখন সর্বোচ্চ। [……hit its highest level in 16 months in March at 6.23 percent, according to the Centre for Monitoring Indian Economy (CMIE), an independent think-tank.]

চলতি সময়ে মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ইস্যু – তেলের দামঃ
ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের বিপুল ঘাটতি শুরু হয়েছে, এই ঘাটতিই  সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধির কারণ। ২০১৬ সালে দাম সর্বোচ্চ নেমে যাওয়ার সময়, ৩০ ডলারে নেমে যাওয়া জ্বালানি তেল কিনেছিল ভারত। আর এখন তা (অক্টোবর ২০১৮) ৮৪ ডলার এবং এ দাম ক্রমবর্ধমান। তেলের দাম কমাতে সেই সময় রাজস্ব বিভাগ ১৪০ বিলিয়ন ডলার বাড়তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল। কিন্তু সেই অর্থ থেকে কোন আপতকালীন রিজার্ভ রাখা হয় নাই, বরং পুরা অর্থ অন্য প্রকল্পে লাগিয়ে ফেলায় এখন মোদীর পক্ষে কোন ভর্তুকি আয়োজনের সুযোগ নাই।  তাই ভারতের শহরগুলোতে তেলের পাম্প-স্টেশনে তেলের দাম এখন ওঠানামা করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাথে সম্পর্কিত হয়ে, কোনো সরকারি ভর্তুকি এখানে নেই।
তবুও আগের অবরোধের সময় ভারতের আরও একটা বিশেষ সুবিধা ছিল,  কমমুল্যের ইরানি তেল সরবরাহ কিনতে পারত ভারত (আমেরিকান অবরোধ ভারতের উপর শিথিল থাকত, আর ইরানও কিছুটা সস্তায় তেন বিক্রি করত)  – যেটা খুব সম্ভবত মোদী এবার হাতছাড়া করে ফেলেছেন। ইরান ছিল ভারতে তেল সরবরাহকারি হিসাবে তৃতীয়। এর আগের যেকোন তেল অবরোধের ক্ষেত্রেও আমেরিকার থেকে বিশেষ ছাড় পাবার কারণে ঐ বিশেষ সুবিধার দামে ইরানি তেন কিনতে পেরেছিল ভারত সেটা এবার ব্যতিক্রম কারণ এবার  – রাশিয়ান অস্ত্র আর ইরানি তেল ক্রয় – দুটার ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন জোর আপত্তি জারি করেছিল। খুব সম্ভবত রাশিয়ান অস্ত্র ক্রয়ে ছাড় পেতে আর ট্রাম্পকে খুশি করতে এবারই প্রথম ভারত আমেরিকাকে জানিয়েছে যে, অবরোধ মেনে ইরানি তেল এবার ভারত ক্রয় করবে না। ব্রাকেটে বলে রাখা যায়, চীন এখনও ইরানি তেল কিনছে, তবে ইরানি ট্যাংকার পৌছে দিবে এই শর্তে।

আর মোদীর ক্ষেত্রে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনীতিক গতি বা উন্নতির এক প্রধান নিয়ামক হল জ্বালানি তেলের মুল্য এবং মুল্যের স্থিরতা। ফলে তেলের দাম এবার ভারতের অর্থনীতিকে শ্লথ করার ক্ষেত্রে প্রধান ভুমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে।

ওদিকে আবার তেলের দামের প্রভাবে ভারতে উঠে এসেছে মুদ্রাস্ফীতিও, যেটা তেলের দাম বৃদ্ধির আগে থেকেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী।  এছাড়াও আছে খারাপ ঋণ (নন-পারফরমিং লোন) বিতরণ গত পাঁচ বছরে ৪৫০ গুণ বেড়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্ট করেছে; পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তর থেকে জানা যাচ্ছে তা ১৪৮ বিলিয়ন ডলারের মত।

শেষ বড় আঘাতঃ রুপির দর পতন
সব কিছু মিলিয়ে আবার বাজারের বিরাট অস্থিরতায় রুপি-ডলার বিনিময় হারে রুপির মান কমেই চলেছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা নেয়ার সময় ডলার ছিল ৬০ রুপি, সেটা এখন ৭৪ রুপি। ভারতের ইকনমিক টাইমসের প্রাক্তন সম্পাদকের দাবি রুপির এই মুল্য পতনের পরিমাণ ১২.৫%। [Rupee is Asia’s worst performing currency ..]

তাহলে সার কথাটা হল ‘অর্থনৈতিক সাফল্যের’ ইস্যুতে মোদীর প্রায় সব প্রতিশ্রুতি গত চার বছরে উলটো দিকে হাঁটছে। তাই আর সাফল্য নিয়ে যেন কেউ আর কথা না বলে, এটাই এখন মোদীর কাম্য। তাহলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভারতে যে জাতীয় নির্বাচন আসন্ন – বিজেপি ও মোদিকে যার মুখোমুখি হতে হবে – সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদী বা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ কী করবেন?

অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যু চাপা দেয়া বা পেছনে ফেলে দেয়ার উপায় নিশ্চয় মোদী-অমিত খুঁজবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে এদের একমাত্র ইস্যু এখন হিন্দুত্ব; মুসলমানবিদ্বেষের দামামা সর্বোচ্চ শব্দে বাজানো। এই আলোকেই অমিত শাহের মুসলমান নিধন, বাংলাদেশীদের ‘উইপোকা-তেলাপোকা’ বলে তুচ্ছ করে সম্বোধন এবং মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গালাগালি, তাদের হত্যা করার হুঙ্কার – এসব কিছুকে আমাদের দেখতে ও বিচার করতে হবে। সেই সাথে আসামের নাগরিকত্ব বিল নিয়ে আরো নোংরা হুঙ্কার। আসামের মতো নাগরিকত্ব বাছাইয়ের কর্মসূচি পশ্চিমবাংলা ও ছত্তিশগড় এবং অন্যান্য রাজ্যে চালু করা হবে বলে স্থানীয় বিজেপি হুমকি দিচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই- এ কথা বলে মুসলমানবিদ্বেষী একটা আবহ সৃষ্টি করা। ওদিকে ত্রিপুরায় গিয়ে বিজেপিরই আরেক অসভ্য এমপি সুব্রমানিয়াম স্বামী বাংলাদেশ দখলের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি নাকি হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট, এর নমুনা এটা?

ব্যাপারটা ভারতের আর এক সিনিয়র সম্পাদক,  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গ্রুপের শেখর গুপ্তা, তাঁরও নজরে পরেছে। তিনি নিজেই দ্যা প্রিন্ট এরও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি লিখেছেন, BJP has decided to use Assam as its key to 2019। আবার  রাহুল গান্ধীও হিন্দুত্বের রাজনীতির অনুসারি হয়ে উঠতে চাইছেন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই শেখর লিখছেন, রাহুলেরটা সফট হিন্দুত্ব

সারকথায় এভাবে নাহলে ওভাবে এসব মুসলিমবিদ্বেষী দামামা, ঘৃণা উগরানো আসন্ন হয়ে উঠছে।  এসবেরই উদ্দেশ্য একটাই – মোদীর ডুবে যাওয়া অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের সমস্যাকে আড়াল করে বিজেপি দলকে ভোট চাইবার ‘উপযুক্ত’ করে তোলা। সে কারণে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ভারতের সমাজকে বিভক্ত ও মেরুকরণের ফলে যাতে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে ‘হিন্দুত্ব’। অর্থাৎ আগামী ছয় মাস, অন্তত ভারতের নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মুসলিমবিদ্বেষের বিষ, ঘৃণা উগলানো দেখতেই থাকব, সেই আশঙ্কা হচ্ছে।

শেষ কথাঃ
ভারতের এই ভোটযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক বিচারে আমাদের জন্য “ফেবারিট” বা কাম্য হল, ‘ফেডারল ফ্রন্ট’ গড় উঠে এরা জয় লাভ করুক। এটা মনে রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের নির্বাচন ২০১৯; কী হতে যাচ্ছে?”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ


ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ

গৌতম দাস

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2qj

 

 

সম্ভবত এক ‘বিরাট জ্ঞানী’ জেনারেলের সাক্ষাৎ পেয়েছে ভারত। কোন কথা কোথায় বলতে হয় আর কোথায় তা বলা উচিত নয় – এই বিবেচনা তার লোপ পেয়েছে বলেই মনে হয়। ইতিহাস-ভূগোল বোধ থাকলে এমন করার কথা নয়। কোনটা সামরিক অপারেশনাল বোর্ডরুমে বসে বলার কথা আর কোনটা পাবলিক মিটিংয়ে বা স্টেডিয়ামে, এমন হুঁশজ্ঞান যার নেই – এমন ব্যক্তি হলেন ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। কিন্তু অনেকে আবার বলছেন, এটা আসলে বোকা ও গাড়োল মানুষের চালাকি।

যাই হোক ঘটনা হল, রাওয়াত এবার নয়াদিল্লিতে ‘নর্থ ইস্ট রিজিয়ন অব ইন্ডিয়া- ব্রিজিং গ্যাপ অ্যান্ড সিকিউরিং বর্ডার্স’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে কিছু মন্তব্য করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের সিনিয়র ব্যক্তিরাও ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

‘প্রথম আলো’র ভাষ্য দিয়েই বলা যাক। কারণ, অনেকের অনুমান হল, এদের অনুবাদভাষ্য তুলনামূলকভাবে নমনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য, এমন অনুমানের একদল পাঠক আছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি “চীনের মদদে পাকিস্তান বাংলাদেশিদের ভারতে ঢোকাচ্ছে: ভারতীয় সেনাপ্রধান” – এই শিরোনামে প্রথম আলো লিখেছে, “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তার অভিযোগ, এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে”। এটা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, শুনতে কেউ কোথাও ভুল করেছে কি না। তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু উদ্ধৃতি আনা যাক। এ ব্যাপারে আনন্দবাজারের বক্তব্য এ রকম – “ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই সুপরিকল্পিতভাবে এমন করছে ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ এবং তাতে সমর্থন জোগাচ্ছে উত্তর সীমান্তের দেশটি, যাতে ওই অঞ্চলে গোলযোগ বজায় রাখা যায়”। রাওয়াত আসলেই সরাসরি  ‘পাকিস্তান’ বলেননি। তিনি কূটনৈতিক দায় এড়াতে সরাসরি নাম না নিয়ে ইঙ্গিত করে ‘ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ’ বলেছেন। আর ‘চীন’ও বলেননি, এর বদলে বলেছেন ‘উত্তর সীমান্তের দেশটা’।

রাওয়াত আরো বলেছেন, আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারত পাকিস্তান দখলে (‘taken over’) নিতে চায়। সেজন্য নাকি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের নিয়ে গিয়ে এরা আসামের জেলাগুলো ভরে ফেলছে। এখানে রাওয়াতের ‘দখল’ কথাটির অর্থ বুঝে নিতে হবে। ভূগোল হিসেবে আসামের জেলাগুলো কোনোভাবেই পাকিস্তানের পড়শি নয়। ফলে পাকিস্তানের পড়শি হিসেবে ভুখন্ড দখল ধরনের কিছু করে ফেলার প্রশ্ন নেই। কারণ, পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে সারা ভারতের সুদীর্ঘ বুক পেরিয়ে এরপর বাংলাদেশে ঢুকে তারও উত্তরে গেলে আসামের দেখা মিলতে পারে। বিপিন রাওয়াতের এটা অজানা নয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, একটা অঞ্চলে বা কয়েক জেলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে গেলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে, এর মানে হল – ওই অঞ্চল পাকিস্তানের দখলে চলে যাওয়া, ‘পাকিস্তান’ হয়ে যাওয়া। এটা খুবই অবাস্তব বক্তব্য, রাস্তার ধারের টঙের চা-দোকানের যে লেবেলের আলাপ হয় এটা সেই তুল্য। কোনো রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান এভাবে লুজ টক করতে পারেন না। মুসলমান মানেই পাকিস্তান, মুসলমান মানেই ভারতের শত্রু –  এতগুলো লুজ টক করে কীভাবে বলেন তিনি। এই অনুমানের কারণে তিনি পাকিস্তান-চীনের কথিত পরিকল্পনার ভেতরে ভারতের জন্য হুমকি দেখেছেন। বলছি না চীন বা পাকিস্তান ভারতের প্রতিপক্ষ নয় বা হতে পারে না। নানা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ-সঙ্ঘাতে তা হতেই পারে; কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে এরা ভারতের শত্রু, এগুলো মূর্খতা বললেও কম বলা হয়। তবে হ্যাঁ, বিজেপির ভোটের রাজনীতি এমন হয় আমরা প্রায়ই হতে দেখি। রাস্তায় মুসলমান লোক ধরে চর থাপ্পর মেরে “হরে রাম” বলায় নিচ্ছে। অথবা দ্রিজে গরুর মাংস রেখে ছে অজুহাতে খুনই করে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে, এর মানে হল,  বিজেপির তৃতীয় শ্রেণীর এসব মাঠকর্মির চিন্তা ও ভাষায় বিপিন কথা বলছেন তা মনে রাখতে হবে। যেমন এখানে রাওয়াতের ঘিন ঘিন করে বের হওয়া মুসলমান ঘৃণা গুলো দেখেন। তাঁর চিন্তার ফর্মুলার মধ্যে ধরে নেওয়া আগাম অনুমানটা হল – বাংলাদেশের মুসলমান = মানেই তারা পাকিস্তানের দালাল কারণ তারা মুসলমান = মানে তারা ভারত শত্রু। এগুলোকে একেবারে গো-মুত্র এর রাজনীতিক চেতনা – বলাই শ্রেয়।

আবার রাওয়াত নিজের কথাগুলো বলতে দুটো বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, এটা “পরিকল্পিত মাইগ্রেশন” (planned immigration)। আর এভাবে তারা চীন-পাকিস্তান এক “প্রক্সিযুদ্ধ” (proxy war) চালাচ্ছে। রাওয়াত একজন সেনাপ্রধান। ফলে ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ বা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’ শব্দের সামরিক অর্থ তিনি না বুঝে লেখেননি। এগুলো তার সচেতনভাবে বেছে নেয়া শব্দ বলে আমাদের মানতেই হয়। তবে হাসিনা সরকার বা আওয়ামী লীগের খুশি হওয়ার কারণ নেই। কারণ, মুসলমানদের ‘পরিকল্পিত মাইগ্রেশনে’ চীন-পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের এখনকার সরকারও জড়িত, এটাই রাওয়াতের দাবি।

ভারতের মিডিয়াতেও অনেকে বলছেন, রাওয়াত আসাম নিয়ে মন্তব্য করতে গেলেন কেন? বিশেষ করে আসামে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী কারা এবং কতজন, তা যখন সরেজমিন সার্ভে করে দেখার কাজ চলছে এবং এর নিবন্ধন তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। গত সপ্তাহে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও আগামী জুন মাসের মধ্যে সে তালিকা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমাদের প্রশ্ন আরো গোড়ায়। রাওয়াত ভারতের মতো দেশের সেনাপ্রধান। এই ইনস্টিটিউশন বাই ডিফল্ট নিজগুণে ও নিজ স্বার্থে অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকার কথা। ফলে প্রমাণিত ডাটা বা ফ্যাক্টস ছাড়া কোন অনুমিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া, সেনাপ্রধানের মুখ থেকে বের হওয়া শুধু খুবই বিপজ্জনক তা নয়, এটা অপরাধ। তাই প্রশ্ন করতে হয়, বাংলাদেশ থেকে ‘স্রোতের মতো (ইনফ্লাক্স)’ এবং ‘মুসলমানেরা’ আসামে গিয়েছে বা যাচ্ছে- এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? আসামের জনগণনা, নাগরিকত্ব যাচাই ও নিবন্ধন  তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আদালতও আগামী জুনে সে তালিকা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এর সোজা অর্থ- কারো কাছে এ বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই, তৈরি হচ্ছে। মানে এযাবৎ যা উল্লেখ হচ্ছে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণিত তথ্য বা সত্য কোথাও নেই, সব অনুমাননির্ভর। তবুও একজন সেনাপ্রধান নেহায়েত অনুমাননির্ভর কথা বলেন কী করে? দ্বিতীয়ত, ওই নিবন্ধন তালিকা তৈরি করতে যাচাই হচ্ছে কেবল কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, এতটুকুই।  আর কেউ ভারতীয় নাগরিক না হলেই সে বাংলাদেশি এই অনুমান ভিত্তিহীন। কারণ কেউ বাংলাদেশী কি না এমন কোন কিছু সেখানে যাচাই করা হচ্ছে না। তাদের কাজও নয় সেটা। তাহলে প্রমাণ ছাড়া, অনুমাননির্ভর বলা যে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসীর স্রোত আসছে, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের উৎস কোথায়? এসব মনগড়া তথ্যের প্রপাগান্ডায় রাওয়াত নেমেছেন কেন? তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তাকে বাংলাদেশকে অবশ্যই দিতে হবে। আসলে এ ধরনের প্রপাগান্ডা আসামে চলছে আর তাতে প্রধান মদদদাতা হল মোদির বিজেপি এবং তাদের সাথে কিছু স্থানীয় দল, আমরা জানি। এগুলা তারা করে চলেছে তাদের সস্তা ভোটের রাজনীতির স্বার্থে। রাওয়াত নিশ্চয়ই জানেন, রাজনৈতিক দলের বিভেদমূলক প্রপাগান্ডায় একজন সেনাসদস্যের যোগদানের অর্থ কী।

রাওয়াত আসামের অনুপ্রবেশ ইস্যুতে নিজের আপত্তির কারণ নিজেই প্রকাশ করেছেন এভাবে – ‘যেহেতু মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে’। লক্ষ করেন, রাওয়াতের বক্তব্য ওরা ভারতীয় অথবা অনুপ্রবেশকারী কি না, সেটা নয়। তার আপত্তি বা ভারতের কথিত নিরাপত্তার হুমকি দেখতে পাওয়ার একমাত্র কারণ, ওরা মুসলমান। সেই মুসলমানেরা বেড়ে যাচ্ছে সংখ্যায়। এর সোজা অর্থ – আসলে তিনি এক চরম মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তিত্ব। তার বিচার্য পয়েন্ট হওয়ার কথা ছিল, ওরা ভারতীয় নাগরিক নাকি অনুপ্রবেশকারী! এটাই। আসামের নাগরিক নিবন্ধনের কাজেও এটাই যাচাই চলছে। ওরা মুসলমান কীনা এটা সেখানে অবান্তর প্রশ্ন।

থ্যাঙ্কস জেনারেল বিপিন রাওয়াত। এ রকম স্পষ্ট ‘বিদ্বেষ’ অনেকেই দেখাতে পারেন না, মনের মাঝে লুকিয়ে রাখেন; কিন্তু আপনি পেরেছেন। এর অর্থ – ভারতের মুসলমান নাগরিকেরাও আপনার চোখে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। যা হোক, সে বিচার ভারতের রাষ্ট্র ও নাগরিকেরা করবেন। আমতা আর কী বলতে পারি! ‘সেকুলার’ ভারতের সেনাপ্রধান একজন মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তি – এই তথ্য আমাদের জন্য আসলে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক না আসলে একটা সার্কাস। তবে উদ্বেগেরও এ জন্য যে, বাংলাদেশ থেকে মুসলমানেরা নাকি স্রোতের মতো আসামে চলে যাচ্ছে; কোনো প্রমাণ ছাড়া এ কথা তিনি বলছেন। বাংলাদেশ যদি অর্থনীতির দিক থেকে আসামের চেয়ে পিছিয়ে পড়া হয়, তবেই বাংলাদেশ থেকে বেটার লাইফের আকর্ষণে আসামে ‘মুসলমান’ মাইগ্রেশন হতে পারে। এটা যেকোন মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে এই মৌলিক শর্ত পূরণ হতে দেখা যায়। কাজেই রাওয়াতকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে বাংলাদেশের চেয়ে আসামের অর্থনীতি আগিয়ে আছে, অথবা কাজ পাবার সুবিধা আর ভোগ্যপণ্য উপভোগের সুযোগের দিক থেকে জীবনযাত্রার মান বা  লাইফ স্টান্ডার্ড বাংলাদেশের চেয়ে আসাম লোভনীয়। এটা না পারলে আমাদেরকে রাওয়াতের বক্তব্য ফালতু কথা মনে করতেই হবে।

‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ ও ‘প্রক্সিযুদ্ধ
মি. বিপিন রাওয়াত, আপনি বলছেন, চীন ও পাকিস্তান নাকি ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ চালাচ্ছে আর এর মধ্য দিয়ে এটা একটা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’। একজন ভারতীয় সেনাপ্রধানের জানা থাকার কথা, বাংলাদেশে একটা সরকার আছে। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি দাবি করছেন, আমাদের সরকারসহ আমরা জনগণ সবাই চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা পুতুল, পাপেট। নইলে আমরা চীন-পাকিস্তানের কথায় আসামে ‘মুসলমান’ পাঠিয়ে দেয়ার কাজ করলাম কেমনে! অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়ার ভাষ্য হল – গত ১০ বছরে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভারতবান্ধব সরকার। তাহলে বোঝা গেল ভারতের মিডিয়া ও সরকার রাওয়াতের ভাষ্যের সাথে একমত নয়, বরং উলটা। আচ্ছা মিস্টার  রাওয়াত আপনার কথা অনুসারে আমরা আসলে ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- তাই তো? ঠিক আছে, আমরা জনগণের বেশির ভাগ আপনার দাবিমতো না হয় কাঠপুতলি হলাম। আমরা সারাক্ষণই শুনছি বাংলাদেশের সরকারের বিরোধীদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হবে, ‘পাকিস্তানি মন’ আমাদের ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে এ আর নতুন কী? কিন্তু রাওয়াতের ভাষায় আওয়ামী লীগের হাসিনা সরকারও ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- এ কথা বেশ কৌতুককর। কথা আরো আছে। রাওয়াত বলছেন, “বাংলাদেশী মুসলমানদের অনুপ্রবেশে আসামের চারটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা থেকে বেড়ে এখন ৯টি জেলা হয়ে গেছে, আর এই পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন” – (inversion has taken place whichever be the government)। এ অংশটি বেশ উপভোগ্য। এর সোজা অর্থ – রাওয়াত আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে কোনো ফারাক করেননি। দু’টি দলই সমানে নাকি আসামে মুসলমানের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে মুসলিমবিদ্বেষী বিপিন রাওয়াতের চোখে হাসিনা সরকার কী তা জানা গেল। অর্থাৎ এ সরকার যতই ভারতকে সার্ভিস দিক, ভারতবান্ধব সরকারের খেতাব পাক না কেন, কাকাবাবুকে চেয়ারে বসিয়ে দাস হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে বসে ছবি তুলুক না কেন,  জেনারেল রাওয়াতের চোখে হাসিনাও খালেদার মতো একজন মুসলমানই। তদুপরি, তিনি এমন মুসলমান যে, আসামের জেলাগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সব জেলাকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা করে তুলছেন; ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুলের’ মত আচরণ করছে, ‘প্লান্ড ইমিগ্রেশন আর প্রক্সিযুদ্ধ’ করছেন।

আসলে রাওয়াত এক ঘোরতর মুসলমানবিদ্বেষী অসুখে ভুগছেন, এমন আরও একটা বড় প্রমাণের দিক নজর করা যাক।  আসামের স্থানীয় রাজনীতিতে বারবার মুসলমান নিধনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে বোড়ো পাহাড়িদের হাতে স্থানীয় মুসলমানদের হত্যা ও বিচারহীনতার পটভূমিতে ২০০৫ সালে All India United Democratic Front, AIUDF নামে একটা দলের জন্ম হয়েছিল। দলটির প্রধান নেতা সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল এবং দলটির প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের সমর্থন বেশি।  এটাই হল অপরাধ। ঐতিহ্যগত ও পারিবারিকভাবে সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল আতরের ব্যবসা করেন। তার আতর বিখ্যাত কারণ এটা আসামের জঙ্গলের বিশেষ আগর গাছ থেকে  সংগৃহিত। সবচেয়ে বড় কথা AIUDF কেবল মুসলমানদের দল নয় অথবা ‘ইসলাম কায়েম’ তার লক্ষ্য এমন দল নয়। অর্থাৎ এটা কেবল একটি সম্প্রদায়ের দল নয়। তাদের ঘোষিত আদর্শ : ‘National Inclusiveness with a regionalist political position’ । এ ছাড়া দলটা নামের মধ্যেও নিজেদেরকে মুসলমানের দল বলে কোনো দাবি করা হয়নি। ফলে এটা একেবারে ভারতের কনষ্টিটিশন মানা রেজিষ্টার্ড আইনসম্মত লিবারেল রাজনৈতিক দল।  গত ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় আসামের জন্য বরাদ্দ ১৪টি আসনের মধ্যে তিনটাতে দলটি জয়ী হয়েছে। তারা হলেন- বদরুদ্দিন (ধুবড়ি) এবং তার ভাই সিরাজউদ্দিন (বড়পেটা)। আর তৃতীয় আসনটিতে জয়ী হয়েছেন রাধেশ্যাম বিশ্বাস। ইনি বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। এতসব তথ্য সত্বেও, রাওয়াত AIUDF দলের দ্রুত বিকাশকে মুসলমানদের আসামে সংখ্যা বৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ বলে হাজির করেছেন, প্রকাশ করেছেন উষ্মা। বলেছেন, ১৯৮৪ সালে বিজেপির (তখনকার নাম ছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ) আসন ছিল দু’টি, সেই দলও এত দ্রুত বাড়েনি। (‘AIUDF have grown in a faster time-frame than the BJP grew over the years. When we talk of Jan Sangh with two MPs & where they have reached, AIUDF is moving at a faster pace in the state of Assam,’ said Rawat.)। আসলেই এক বিরাট জ্ঞানীর জ্ঞানের কথা এটা।  রাওয়াত মুসলমানদেরকে কী ও কেমন ঘৃণার চোখে দেখেন, মুল্যায়ন করেন এর এক আদর্শ প্রমাণ এটা।

প্রথমত, তার এই তুলনাই মুসলিমবিদ্বেষের প্রকাশ। AIUDF আইনসম্মত দল কি না, কোনো আইন ভঙ্গ করেছে কি না – সেটা দেখার সরকারি দফতর আছে। যেমন আমাদের বেলায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন । কিন্তু ভারতের সেই দফতরের পক্ষ থেকে এই দলের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি করা হয়নি। এই দল দ্রুত না ধীরে বাড়ল, দলটা ইসলামি কি না এমন কোন অভিযোগ ঐ দফতরের আছে এমন নয়। আর তা থাকলেও তাতে কোন অপরাধ হয়েছে কি না সেগুলো বিচার বিবেচনা করে দেখার দায়িত্ব ভারতের সেনাপ্রধানের নয়। তবে সেনাপ্রধানের কোনো আপত্তি থাকলে ওই দফতরে গিয়ে তিনিও অভিযোগ জানাতে পারেন। তা তিনি করেন নাই। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোনো দলের দ্রুত বাড়া কি অপরাধ? অথবা, ব্যাপারটা কী এরকম যে, এই দলটা কথিত অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে গড়া দল? রাওয়াত কিন্তু এ অভিযোগ পরিষ্কার করে আনছেন না। কেবল অমূলক ইঙ্গিতে বলা সন্দেহ ছড়িয়ে কথা বলছেন। দলের সভাপতি আজমল একজন মুসলমান, এটাই যেন তার বিরাট অপরাধ। আর দ্রুত বাড়াই যদি সমস্যা হয় তাহলে সেনাবাহিনী কি গত ১৯৮৪ সালে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির সময় এমন একই প্রশ্ন তুলেছিল? নাকি সেটা বিজেপি বলে খুশি হয়ে চুপ ছিল? এই প্রশ্নে রাওয়াতের জবাব কী? ইন্ডিয়া যদি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তাহলে কয়েকটা জেলায় মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমস্যা কী? এতে কী এসে যায়? এ ক্ষেত্রে আইনি সমস্যাই বা কী?

আসলে বিজেপি বা বিপিন রাওয়াত যদি অহিন্দু কোনো ধর্মের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করেন, তবে বুঝতে হবে তারা ভারতকে হিন্দুত্ব রাষ্ট্রের ভারত বলে অনুমানে ধরে নিয়েছেন, এমনটাই কামনা করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আরএসএস বা শিবসেনার রাজনৈতিক লোক কীংবা কোন রেসিস্ট কীট হন তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু নিজ পদ পদবির সাথে এসব নোংরা অবস্থান তিনি অবলীলায় জড়াচ্ছেন। বরং সাংবিধানিক পদে থেকে কোনো ধর্মের (যেমন মুসলমানের) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করে ইঙ্গিত করে কথা বলা – এটা ঐ জনগোষ্ঠি-বিদ্বেষী আচরণ ফলে তা অসাংবিধানিক এবং তা ফৌজদারি অপরাধ। ভারত যদি রাজনৈতিক সাম্যের দেশ হয়ে থাকে, ভারতে ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকারের সাম্য যদি বিজেপি বা রাওয়াত মানেন, তাহলে তারা শুধু হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চাইতে পারেন না। রাওয়াতের উচিত, আগে ভারতের কনস্টিটিউশনে এ কথা লিখিয়ে নেয়া যে, ‘এখানে নাগরিক নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান নয়।’ আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, মোদির বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া এতে কী হয়, কী তামাশা সেখানে করে!
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা যায়, বিজেপি বা বিপিন রাওয়াতরা মুসলমান অথবা যেকোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যখনই কোনো এক ‘ভারত’ (যেমন হিন্দুত্বের ভারত) গড়তে চাইবেন, আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, ওই বৈষম্য ও বিভাজনই মহাবিপদ ডেকে আনবে। ১৯৪৭ সালে এটাই হয়েছিল। যে মুসলমান ইনক্লুসিভ ভাবে, ভারতে সমান মর্যাদায় নাগরিক থাকবে, সে কখনো ভারতের জন্য হুমকি হবে না। একথার বিপরীতে যখন ভাবা হবে মুসলমান তাই ওরা ভারতের শত্রু বা হুমকি – এটাই রেসিজম। মনের গভীর গহীনে এক দগদগে ঘৃণার অসুখ! মনে এত ঘৃণা নিয়ে উনি ঘুমান কী করে!

তবে একথা মনে করার কোন কারণ নাই যে ভারতে জ্ঞানবুদ্ধি-ওয়ালা লোকের কোন অভাব আছে। বরং এটা বুঝা যায় যে তাদের চাপিয়ে পিছনে ফেলে রাখা হয়েছে। যেমন এক ‘শ্রীনাথ রাঘবন’ এক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ। তিনি দিল্লীরই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ’ এর সিনিয়র গবেষক সদস্য। রাওয়াতের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,… “চীন-পাকিস্তানের তত্বাবধানে এক পরিকল্পিত মাইগ্রেশন আমরা নাকি দেখতে পাচ্ছি – এটা এক অবান্তর বাড়িয়ে চাড়িয়ে বলা কথা”। [To suggest that we are witnessing “planned immigration” overseen by Pakistan and China appears to be an absurd overstatement.] হিন্দুস্তান টাইমসে লেখা এক মন্তব্য কলামে তিনি এটা লিখেছেন। তাঁর লেখার শিরোনামে তিনি দুটো শক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন – বলেছেন রাওয়াতের বক্তব্য ‘অ-ইতিহাস’ [ইতিহাসের সত্যতা নাই] এবং ‘অপুষ্টির বিচার’ [ahistorical, poorly judged]। পুরা লেখায় একজনের গবেষকের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তিনি সেখানে রাওয়াতকে ন্যাংটা করে তাঁর সমস্ত দাবি প্রচুর যুক্তি তুলে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন। আগ্রহিরা পড়ে দেখতে পারেন।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

গৌতম দাস
১১ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2pL

আসামে ‘বাংলাদেশী’ বা ‘মুসলমান’ নামে আর এক ক্লিনজিং ও নিধন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে সীমাহীন দুর্দশা আর শরণার্থীর ঢল – এসব দৃশ্য কী আমাদের দেখতে হবে? হলে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের কাঁধে বন্ধুক রেখে এই হত্যাকান্ড ঘটবে? এর দায়ভার কী আদালত বইতে পারবে? ভারত হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ডুবে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে আর মাত্র ১৬ মাস বাকী। মোদীর অর্থনীতির ডুবে যাওয়া আর কাজ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা আর লুকানো নয়, গত সপ্তাহে এবার এটা একেবারে ষ্টাটিস্টিক্যালি প্রকাশিত। সেখানে দেখা যায় মোদীর গত চার বছরের শাসনের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি এবার, সাড়ে ছয় পারসেন্টে নেমেছে। ফলে ধরে নেয়া যায় আগামী নির্বাচনের মোদীর অস্ত্র হবে একটাই – উগ্র হিন্দুত্ব ও মুসলমানবিদ্বেষ। আর তাতে এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে পরিণতি কী হবে!

রোহিঙ্গা সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সুরাহার দেখা পাওয়া যায় নাই এখনও, অথচ এর আগেই প্রায় একই ধরনের নতুন আরেক ফেনোমেনা ‘আসাম মুসলমান নিধন নিপীড়ন’ – ব্যাপকভাবে উঠে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তারা কথিত ‘বাংলাদেশী’, ‘মুসলমান’, ‘ফরেনার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি বলে অত্যাচার-নির্যাতন নিয়মিত শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। আসলে এক কথায় বললে আসাম বা অসমিয়রা এক চরম জেনোফোবিয়াতে ভুগছে। ইংরেজি জেনোফোবিয়া (Xenophobia) শব্দের ‘জেনো-‘ এর তুল্য প্রচলিত বাংলা হবে – ফরেনার বা বিদেশী। এভাবে পুরো শব্দের অর্থ হল – ফরেনার বা বিদেশী ভীতি। যদিও এই শব্দের আসল গভীর অর্থ হল – ‘অ-পর’; যে আমার মতো নয়, এমন অপর-ভীতি। ফলে তাকে দেখতে পারি না, ঘৃণা করি। যেমন – কেউ আমার মতো নয়, সে আমার ধর্মের নয়, অথবা আমার মত অহমিয়া নয়, অথবা আমার মতো এশিয়ান নয় ইত্যাদি। ফলে সে আমার ‘অ-পর’। “অসমে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমিয়াদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সব গ্রাস করে ফেলছে” – এই হল অসমিয়াদের সবচেয়ে কমন আক্ষেপ ও বিদেশ- বিরোধী প্রপাগান্ডা। এই ‘অপর-ভীতি’ বা জেনোফোবিয়াতে ভুগছে আসাম। অথবা সম্ভবত বলা ভালো, জেনোফোবিয়াতে ভোগানো হচ্ছে। কারা ভোগাচ্ছে, কারা এরা?
বলাবাহুল্য, ‘অপরে আমাদের সব গ্রাস করে ফেলল’ – এই আক্ষেপের বয়ান তৈরির পেছনে আধা সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প তারা জড়ো করেছে, অনুমান করা যায়। এখানেই সবচেয়ে বড় মিল দেখা যাবে বর্মিজদের সাথে। বর্মিজদের অপর-ভীতি রোহিঙ্গা নিধনের পিছনের মূল কারণ। এদিকে এখানে বর্মিজদের আসাম দখল থেকে অসমিয়াদের অপর-ভীতির সুত্রপাত। দ্বিতীয় এঙ্গলো-বার্মিজ যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৫১ সালে। এর আগেই, (১৮২৪-১৮৩৮) সালের মধ্যে অহম রাজা ও আশপাশের অন্যান্য রাজা যেমন কাছাড় রাজ্য মিলিয়ে পুরো আসামই ব্রিটিশ কলোনির দখলে ও শাসনাধীন চলে যায়। বার্মিজ রাজার আসাম অঞ্চল দখল নিতে যাওয়া থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল।  তাই অসমিয়াদের একালের আক্ষেপের বয়ানে গল্পের একটি উপাদান হল – ব্রিটিশ কলোনি তাদের দখল করে নিয়েছিল। আগে তারা কত সুন্দর দিন কাটাইত। যদিও এর জন্য এখনকার বাংলাদেশ বা এর কোনো বাসিন্দা আমরা কেউ দায়ী নই। তবু এক জেনোফোবিয়ায় ভিকটিম-বোধের গল্প এখান থেকে শুরু হয়েছে। এর ওপর আদি পাপ আমরা তো মুসলমান, সেটা তো আছেই, যা জুড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো সমস্যার জন্য মুসলমানদের দায়ী করা সহজ। তবে আমাদের আরেক অপরাধ ছিল যে, যেহেতু ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক অধীনে একটি ব্রিটিশ কমিশনারেটের কর্তৃত্বে রেখে শাসন করা হয়েছিল, আর তা হয়েছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। ফলে বৃটিশেরা নয়, বাঙালিরাই যেন এতে দায়ী। আর এর জন্য যেন বাংলাদেশ, মুসলমান বা বাঙালিরা দায়ী, এমন বলে নানান অনুমান ও গল্পও তাদের ঝুলিতে আছে। ভিকটিম-হুড যারা বিক্রি করে, তারা এমনই করে।
আর ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হলে আসামকে পুরা বেঙ্গলের সাথে আর না, বরং সরাসরি পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ করা হয়। তাতেও তারা আরো বেশি অখুশি  হয়েছিল। যদিও (১৯০৫-১৯১১) মাত্র এই ছয় বছর আসাম পূর্ববঙ্গের সাথে ছিল। তবে ততদিনে আসাম ব্রিটিশদের চোখে নগদ অর্থকরী ফসল, চা উৎপাদনের এক খনি যেন, এভাবে হাজির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেকালের চা উৎপাদনের শ্রমিক কারা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশেরা স্থানীয় অসমিয়াদের পছন্দ না করে বিপুল শ্রমিক মাইগ্রেট করে এনেছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক রিপোর্টের মতে, এই শ্রমিকেরা মূলত ট্রাইবাল, তবে ছোটনাগপুর উপত্যকা মানে সেকালের বিহারের ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড (যে দুটোই এখন আলাদা রাজ্য) থেকে এবং বিহারের বাকি অংশ থেকে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (তেলেঙ্গনা, কয়েক বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আলাদা হওয়া রাজ্য) এসব অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া লর্ড কার্জনের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেন পূর্ববঙ্গ থেকেও আনা হয়। সম্ভবত পড়শি ও দক্ষ কৃষিকাজ জানা লোক বলে। [People – mostly tribals – were brought in from the Chota Nagpur plateau and its adjoining areas covering present-day Jharkhand, Chhattisgarh, and parts of Bihar, West Bengal, Odisha, Telengana and Andhra Pradesh to work in the newly-opened tea plantations from the mid 19th century; the British encouraged the migration of Muslim farmers from East Bengal after Lord Curzon became Viceroy of India (1899-1905). ]
তবে এর আরেকটা বড় কারণ আছে। ব্রিটিশ-ভারতের ‘ভারত শাসন আইন-১৯৩৫’ অনুসারে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা প্রথম স্থানীয় নেটিভদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় শাসনে সিলেক্টেড স্থানীয় নেতা নেয়া হত। তার পুরো আনুষ্ঠানিক নাম মৌলবি সাইদ স্যার মোহম্মদ সাদদুল্লাহ। গৌহাটির সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাদদুল্লাহ পরে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ও সরকারি প্লিডারও ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের আসাম প্রদেশের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত)। এর আগে তিনি ১৯১৯ সালের সরকারেও সিলেক্টেড প্রতিনিধি ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গোপীনাথ বরদোলাই। এমনকি স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার কাজে যে ৯ সদস্যের খসড়া কমিটি হয়েছিল, তিনি সেখানে একজন ছিলেন। তিনিও পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষক নিয়ে গেয়েছিলেন, ধান চাষে বাংলার অভিজ্ঞতায় বেশি ফসল এরা ফলাতে পারে এই বিশ্বাসে। এসব মিলিয়ে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা জাম্প করেছিল। তবে তা সবই ১৯৪১ সালের মধ্যে, এরপরে নয়। যেমন ১৯০১ সালে আদমশুমারিতে মুসলমান ছিল আসামের মোট জনসংখ্যার ১২.৪ শতাংশ। এরপর বিপুল মাইগ্রেটেড হয়ে আসা জনসংখ্যার কারণে পরের ৪০ বছরের মধ্যে ১৯৪১ সালে তা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছিল, ২৫.৭২ শতাংশে। তবে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সবচেয়ে বড় মুসলিম মাইগ্রেশন। মনে রাখতে হবে এটা হয়েছিল, ব্রিটিশ-ভারতে যখন দাওয়াত দিয়ে জমি ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পুর্ববঙ্গ থেকে মাইগ্রেট করে বাঙালি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের ৩০ বছরে দেখা যায় ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশ কমে ২৪.৫৬ হয়েছিল। এরও পরের ১০ বছরে এই প্রথম মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৮১ সালে ৪ শতাংশ বেশি হয়ে ২৮.৪৩ শতাংশ হয়। এর পরের ১০ বছরে জনসংখ্যা ১৯৯১ সালে আরো ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৩০.৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে এখন মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশ।
নিচের গ্রাফ নেওয়া হয়েছে, সাথে দেয়া লিঙ্ক ফলো করেন। 
ASSAM muslim population
তাই সবচেয়ে হইচই শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এক উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মুসলমান অনুপ্রবেশ’ হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ করে এমন কোন তথ্য না থাকলেও একথা বলা হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এই বিচারে এটা একটি মিথ, একটি পারসেপশন মানে ভোটে জেতার পারসেপশন। এ ছাড়া অনেক গবেষক দেখিয়েছেন এর কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে ১৯৭১ সালের শুমারিতে দেখা গেছে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়েনি। এ ছাড়া অন্য যেসব ‘রাজনৈতিক পারসেপশনের অভিযোগ’, যেমন – বাংলাদেশের সাথে আসামের সীমান্ত এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বেশি। অথচ কোন শুমারির গণনাতে দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করা হয়নি। আবার এমনই আরেক অভিযোগ হল, অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের তুলনায় আসামের মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নাকি বেশি, মানে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী” এসেছে। সেটাও তুলনীয় ফিগার দিয়ে গ্রাফ একে তুলনা করে দেখা গেছে, এই অভিযোগও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আদমশুমারির তথ্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধারণাকে সমর্থন করে না। তবে এটা হতে পারে যে, আসামের ভেতরেই ১৯৮১ সাল থেকে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানদের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এর অর্থ মুসলমান মোট জনসংখ্যা বেড়েছে তা নাও হয়ে পারে। কারণ মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানদের শতকরা হার যেহেতু এটা একটা শতকরা হিসাব অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শতকরা যোগফল ফিক্সড বা ১০০ থাকতে হবে, তাই। এতে কোন কারণে হিন্দুদের জন্মহার কমাটাও তুল্যপরিমাণ মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে বলে দেখাবে। অথচ মুসলমান মোট জনসংখ্যা আসলে হয়ত বাড়েই নাই – এমন হতে পারে।
এমনিতেই সাধারণভাবে কোন জনগোষ্ঠির শতকরা হার এর বাড়া-কমা ঘটার পিছনের কারণ হিসাবে দেখা যায় – আরবানাইজেশন বা শহরায়নের হার বেশি হলে জন্মহার কমে। হিন্দুদের শহরায়ন বা শহুরে চাকরিজীবী পেশা গ্রহণ মুসলিমদের তুলনায় বেশি হলে হিন্দু জন্মহার কমেছে – এর একটা কারণ হতে পারে। মূল কারণ হল, কৃষিকাজ বা প্রত্যক্ষ শ্রম বেচে খাওয়া বাবা-মায়েদের সন্তান বেশি নেয়ার ঝোঁক থাকে। কারণ সেক্ষেত্রে সন্তান কম বয়স থেকেই নিজেই আয় করতে পারে বা উল্টা বাবাকে শ্রম-আয় দিয়ে সাহায্য করতে পারে। যেটা শহুরে বা শিক্ষিত চাকুরে পেশার বাবা-মায়ের বেলায় উল্টা হয়। কারণ তাদের সন্তান শিক্ষিত করতে গিয়ে সন্তানের পিছনে খরচ করতে হয়। তাদের মানুষ করার এই খরচ কমাতে বাবা-মায়েরা জন্মহার কম রাখার পথে যায়। মুসলিম জন্মহারের তুলনায় বেশি দেখানোর সম্ভাব্য কারণ এটিই। আরও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আসাম ভেঙ্গে আরও নতুন চারটা প্রদেশ করা হয়েছে। আর ঐ প্রদেশগুলো হওয়ার কারণে পুরান আসাম প্রদেশ থেকে (মুসলমান জনসংখ্যার তুলনায়) বেশি হিন্দু জনসংখ্যাই বের হয়ে গেছে। তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যা কম বের হওয়াতে মোট সংখ্যাটা একই থাকলেও শতকরা হারের দিক থেকে মুসলমানের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া সম্ভব। তবে মূল কথা, কেন শতকরা হিসাবে মুসলমানের পার্সেন্টেজ বেশি দেখাচ্ছে এর আসল কারণ পরিসংখ্যান ফিগার ঘেঁটে বের করা যেত। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাই মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীর’ উপস্থিতির প্রমাণ – এদিকে অনুপ্রবেশের রাজনীতি, মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় নাই। অথচ এটা একটা অপ্রমাণিত বা ভিত্তিহীন কথা।
আসলে ১৯৪৭ সালের পর থেকেই এক মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় উঠেছিল। এরই সাক্ষ্য হয়ে আছে ১৯৫১ সালের ‘NRC 1951’ (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন)। এটা এই প্রথম ভারতের একটাই প্রদেশে যাচাই করে নাগরিক তালিকা তৈরি করা। ভারতে নিয়মিত প্রতি দশ বছর পরপর আদমসুমারি হয়ে থাকে। সে হিসাবে ১৯৫১ সালের আদমশুমারির পরই সেই ডাটা থেকে সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র আসাম প্রদেশেই “রেজিস্টার্ড নাগরিকদের তালিকা” তৈরি করা হয়েছিল; অর্থাৎ অন্য কোনো রাজ্যে তাদের কোন NRC করা হয় নাই। আসামে ‘মুসলমানেরা বেড়ে গেল কি না’ এই উছিলা তুলে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা তখন থেকেই। এমনকি এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধ’ আসামের হিন্দু বাঙালিদেরও বিপক্ষে। বিশেষ করে সিলেটের লাগোয়া আসামের তিন জেলার (কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি) হিন্দু বাঙালি যাদেরকে বরাক উপত্যকা বিধৌত অঞ্চলের লোক বলা হয়। আর শুরুতে এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস। তাই বরাক অঞ্চলের লোকেরা এখন ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, প্রথম আলোতে প্রকাশিত নাগরিকত্ব নিয়ে সোচ্চার বরাকের বাঙালিরা” এই রিপোর্ট এখনও আসামের বরাকের তিন জেলার হিন্দু বাঙালির প্রতিবাদ। যদিও এরাই ১৯৪৭ সালে সিলেট নিয়ে ভোটাভুটিতে আসামের পক্ষে পতাকা উড়িয়েছিল। এদের মোহভঙ্গ হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। বিশেষত ১৯৫১ সালে কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদোলাই যখন মুখ্যমন্ত্রী এবং  ১৯৬১ সালে, যখন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ ‘উগ্র অহমিয়াবাদের’ শুরুর দিকে এর নেতৃত্বে ছিল প্রদেশ কংগ্রেস।
যদিও খোদ নেহরু বা পরে ইন্দিরা গান্ধী এই উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ পছন্দ করেননি। আবার এদের দুজনের কেউই প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে থামাতেও পারেননি। এর নিট ফলাফল হল – এর পর থেকে আসামের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব কংগ্রেসের দেখানো পথেই থাকে কিন্তু নেতৃত্ব অন্যান্য দল বা গোষ্ঠির হাতে চলে যায়। আর সেটাই এখন বর্তমানে বিজেপির হাতে। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই ‘অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ সংক্ষেপে আসু [AASU] এটাই আসামের বড় ছাত্র সংগঠন। অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করে বললে, ভারত স্বাধীনের পরে কংগ্রেস আর কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠন সব রাজ্যে আলাদা হয়ে যায়। ব্যতিক্রম আসাম। এখানে ভাগ না হওয়া সংগঠনটাই হল আসু। সম্ভবত ‘উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ’ সেকালে উত্তাল হয়ে উঠা – এমন অবিভক্ত থেকে যাওয়ার কারণ।  AASU এই সংগঠন ১৯৭৯ সালে (NRC) এনআরসির নাগরিকের তালিকা তৈরি শেষ করে এর ভিত্তিতে ‘কথিত অনুপ্রবেশকারীদের’ বের করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে ছাত্র সংগঠনের তরফে এমন দাবির তোলা হয়েছিল। এর অর্থ তাতপর্য হল, কংগ্রেস দলের কেন্দ্র বা হাই কমান্ড, প্রদেশ কংগ্রেসের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদে মোড় নেয়ার বিপক্ষে তাদের মুখ বন্ধ রেখেছিল, এরই প্রতিক্রিয়া। এজন্য পরিণতিতে আমরা দেখি পরবর্তিতে এই ছাত্র সংগঠনই নতুন রাজনৈতিক দল (অসম গণ পরিষদ) খুলেছিল, যেটা তখন জন্ম হয় নাই। ১৯৭৯ সালের আসুর আন্দোলন শুরুর পরে ১৯৮৩ সালে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার নির্বাচনের আয়োজন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আসু এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। ফলে কংগ্রেস ছাড়া এতে আর কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু মুসলমান ভোটারেরা কংগ্রেসের প্ররোচণায় ভোট দিতে গিয়েছিল। এখান থেকে এক মহা-বিপর্যয়ের শুরু।
আসামের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান চারটির একটি – বোড়ো (Bodo) ট্রাইব, অনেকে এদেরই আদি অহমিয়া মনে করে। ট্রাইবের নামে এক আঞ্চলিক দল (National Democratic Front of Bodoland) আছে তাদের (পরে অবশ্য দুটা ভাগ হয়ে গেছে)। বিজেপির বাজপেয়ি সরকারের আমলে ২০০৩ সালে বোড়ো সংখ্যাগুরু চারটি জেলা (Kokrajhar, Baksa, Chirang and Udalguri ) নিয়ে এক  স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ও আলাদা নির্বাচিত প্রশাসন, Bodoland Territorial Council (BTC) গঠন করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে BTC তে মোট ৪০ আসনের মধ্যে ৭৫ ভাগ সংসদীয় আসন বোড়োদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই সমস্যা উল্টা হয়। কারণ সর্বসাকুল্যে বোড়ো জনসংখ্যা ৪৮% এর কম। আর পরের বড় অংশ হল ২৭% মুসলমান, এছাড়া অন্যান্য ধর্ম বা ট্রাইব ইত্যাদির লোক আছে। অর্থাৎ ঐ চার জেলাতেই মুসলমানসহ অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আছে। বোড়োরা এখন এসব কোন সংখ্যালঘুদেরকে ক্ষমতায় কোন প্রতিনিধিত্ব দিতে চায় না।  উল্টা রুখে দিতে চায়, রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত করতে চায়। এমনকি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিতে বাধা দেয়, হত্যা ম্যাসাকার করে ইত্যাদি। আগ্রহিরা এই রিপোর্টের পুরাটা পড়ে দেখতে পারেন। এটা ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের অধীনে করা হয়েছেন। সেখান থেকে, [ This year 2014, between May 1 and May 3, nearly 50 unarmed Muslims were shot dead in three separate incidents in the Bodo Territorial Administered Districts. These killings, according to the report, were a retaliation by Bodo militants because a host of non-Bodo communities, including Muslims, had collectively put up an election candidate from the United Liberation Front of Assam to contest for the Kokrajhar Lok Sabha election seat against Bodo candidates.] এরাই ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিও নিলা ম্যাসাকার (Nellie massacre) ঘটিয়েছিল। প্রায় হাজার খানেক বোড়ো অধিবাসী দল বেধে প্রায় মোট প্রায় তিন হাজার (অফিসিয়ালি দুহাজারের কম) মুসলমান জনগোষ্ঠির লোককে হত্যা করেছিল।  ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে আসামের নওগাঁ জেলার নিলা ও এর আশেপাশের গ্রাম এলাকায় মুসলমানকে হত্যা করার সাথে শিশু ও নারীদের আহত এবং নির্যাতিত হয়, এটাই নিলা ম্যাসাকার নামে এটি পরিচিত। পরবতিতে একটা ডকুমেন্টারি সিনেমা হয়েছে এই হত্যাকান্ডের সার্ভাইভারদের নিয়ে। পরে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনেও (মোদি এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর) একইভাবে আক্রমণ নিপীড়ন করা হয়েছিল।

১৯৮৩ সালের মুসলমান নিধন হলেও এ নিয়ে আজো কোনো বিচার আদালত কিছু হয়নি। তবে ইন্দিরা গান্ধীর (তিনি তখনো বেঁচে, নিহত হয়েছেন অক্টোবর ১৯৮৪) প্রতিক্রিয়া কিছু টের পাওয়া যায় তার এক কাজে। তিনি এই হত্যার ব্যাপারটা যতদুর সম্ভব চেপে গিয়েছিলেন, কথা সত্য। কিন্তু একটা কাজ করেছিলেন। ভারতের ভুখন্ডে কোন ‘বিদেশির অনুপ্রবেশ’ ইস্যু ডিল করতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় “১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট” [The Foreigners Act, 1946.] এই আইন। তা সত্ত্বেও ঐ হত্যাকান্ডের পরে কেবল আসামে প্রয়োগের জন্য ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’ [Illegal Migrants (Determination by Tribunal) Act, 1983] বলে নতুন আইন করেন তিনি। এই আইনের সারকথা হল – কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এ ছাড়াও অভিযোগকারীকে কথিত অনুপ্রবেশকারির বাসার ১০০ গজের মধ্যে বসবাস করতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে ভারত থেকে বের করে দেয়া খুবই কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধী  (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) মারা গেলে  পরে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। তিনি এবার ‘আসু’র সব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৮৫ সালের আগষ্টে  ‘আসাম চুক্তি বা আসাম অ্যাকর্ড’ সই করেন। অর্থাৎ NRC ১৯৫১ তালিকা আপডেট করে এর ভিত্তিতে অবৈধ বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার আন্দোলনকারিদের দাবি মেনে এর বাস্তবায়নে চুক্তি করেন তিনি। এছাড়াও তিনি ১৯৮৩ সালের রাজ্য নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য নতুন নির্বাচন দেন। অর্থাৎ রাজীব গান্ধী যা করলেন এর অর্থ তাতপর্য হল, তিনি স্বেচ্ছায় চাইলেন আসু এরপরে নিজেদের নতুন দল খুলুক, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতে আসু সরকার গড়ুক। এবং ১৯৮৫ সালে তাই হয়েছিল। আর  আসুর নতুন গড়া স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নাম হল ‘অসম গণ পরিষদ’ (Asom Gana Parishad, AGP) আর আসুর নেতা প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত এই দলের সভাপতি ও ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ রাজীব গান্ধীর অনুমান ও ভীতি ছিল একটাই, এমন না হতে দিলে আসাম ভারত থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে যেত। অতএব রাজীব গান্ধী টাইম বায়িং বা সময় কেনার পথ ধরেছিলেন। আর মোহান্তর কি হয়েছিল পরে? পরের বারের (১৯৯০) নির্বাচনে মোহান্ত গোহারা হেরে যান। তবে কোনোমতে তার পরের বার (১৯৯৫) জিতেছিলেন । আর সেটাই শেষ। এখন ঐ দল ভেঙ্গে দুইটা, আর প্রতিবারের রাজ্য নির্বাচনে আসামের মোট ১২৬ আসনের রাজ্য সরকারে দলের অর্জনে থাকে ১০-১৪ আসন।

এদিকে এখনকার আসাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন সর্বানন্দ সনোয়াল, তিনি আসলে ছিলেন AGP নেতা এবং আসুরও নেতা সভাপতি (১৯৯২-৯৭)। তিনি ২০০৫ সালে, নিজ নামে ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’-কে [IMDT এক্ট] কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে  একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে  ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণায় বাতিল করে দেন। ফলে এখন অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে বের করে দেয়া সহজ। আসলে এই পরিকল্পনাগুলো ছিল বিজেপির। এবার সে পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তিনি AGP ছেড়ে প্রকাশ্যে ২০১১ সালে এবার বিজেপিতে যোগ দেন। রাজ্য নির্বাচনে সেই প্রথম তিনি বিজেপির পক্ষ থেকে এর আগে যেটা ছিল অনুপ্রবেশ বা বাঙালি বা বাংলাদেশি খেদাও এর ইস্যু সেটাকে তিনি সরাসরিভাবে এবার “মুসলমান খেদাও” বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। সর্বানন্দ পরে ২০১৪ সালের বিজেপি থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হন। আর ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবে ২০১৪ সালের ঐ নতুন ভাষ্যে ‘মুসলমান খেদাও’ এতে প্রায় ৫০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল বলা হয়।  এদিকে আসামে কংগ্রেস এর মাঝের (২০০৬, ২০১১)  আবার দুইবার মুখ্যমন্ত্রী ও সরকার গড়েছিল।  তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল এই যে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে রাজীব গান্ধীর দলসহ সকলে অনুপ্রবেশ বা মুসলমান ইস্যুকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় যাবার জন্য। যারাই রাজ্য সরকারে এসেছে সবাই এটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু সবাই জানে এর বাস্তবায়ন কী কঠিন ও ভীষণ বিপদের। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি খেদাও অথবা অনুপ্রবেশকারী অথবা বিদেশী মাইগ্রেন্টের কোনো না কোনো একটি আসাম রাজনীতির ইস্যু ছিল। আর সবসময়ই ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই ‘বাংলাদেশী’ ইস্যুটি ব্যবহার করতে কেউ দ্বিধা করেনি। কিন্তু এক স্থানীয় এনজিও ইস্যুটাকে সেবার সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে যায়,  আর এর বাস্তবায়ন দাবি করেছিল। সেই থেকে এটা কোর্টের মনিটরিংয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালতও ঐ মিথ বিশ্বাস করেছে যে একটা বড় বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠি ১৯৮১ সালের পরে আসামে এসেছে।

কিন্তু এরপর কী?
সবচেয়ে ভয়াবহ এক অবস্থার জন্য যেন আসামের সব দল বা পক্ষ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও।  কেন? কারণ আসামের নাগরিকের তালিকা কী হচ্ছে, কতদূর হচ্ছে এর বাস্তবায়ন ‘নির্বাহী সরকার’ নিজে করছে না। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধানে, নির্দেশ ও মনিটরিংয়ে এটা সরকার বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু ঘটনা হল যদি ‘কেউ ভারতের নাগরিক’ এটা প্রমাণ করতে পারল না – এর মানেই সে অ-ভারতীয় হয়ত, কিন্তু সে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমানিত হল না, হবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে কারও কাছেই যার জবাব নেই তা হল, তাহল, এই কথিত ‘অ-ভারতীয় বা অবৈধদের’ কোথায় ঠেলে ফেলা হবে? এর জবাব সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নেই। কেউ অ-ভারতীয় এটুকু বলেই আদালত পার পেতে চায়। কিন্তু আদালত এ নিয়ে কিছু না বললে অন্যেরা, কোন না কোন রাজনৈতিক শক্তি এরা কী বসে থাকবে? সুযোগসন্ধানীরা কেউ বসে থাকবে না। বরং ‘বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার ক্রেডিট’ নিজে নিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এর দায় কে নেবে? সবচেয়ে আজব ব্যাপার, সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো আসামের সবাই মনে করছে, নাগরিক তালিকা পূর্ণ হলেই ওটাই সব সমাধান। অথচ এটাই হবে দাঙ্গার উৎস। নতুন ও গভীর ক্ষত তৈরি ও সঙ্কটের শুরু। ভারতের এক গবেষণা থিংক ট্যাংকও (দিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য।) এতে সায় দিয়ে বলছে, আসামের এই তালিকা একটি ‘টাইম বোমা’। তবে ভিন্ন কারণে।

ঘটনার আসল দিকটা হল, আসামের প্রধান সমস্যা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব। আসাম ঠিক ল্যান্ডলকড ভুখন্ড নয়। প্রবেশ বা একসেস আছে কিন্তু সেগুলো কেবল এক কোনা, আসামের কেবল পশ্চিম দিক শিলিগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে, ফলে সহজ না। কখনও পাচগুণ পথ ঘুরতে হয়, পুর্ব দিক থেকে আসলে। অথচ সব রিসোর্সে আসামের সহজে প্রবেশের উপায় হতে পারে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের সাহায্য ও সুসম্পর্ক হতে পারত এর জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বস্তু। কিন্তু মিথ্যা মিথ ও ভ্যানিটি আর ‘অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে পাহাড় ও মনের ঘেরার ভেতর আটকে গেছে অসমিয়রা। অসমিয়াদের যদি মিথের তালাশে দিন কাটে, বিদেশি বা অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ এর মুডে থাকে তবে এই অসমিয়াদেরকে কোন বাংলাদেশ সহায়তা করবে? কেন করবে? কেউ বিদেশি মানে সে আমার জনগোষ্ঠির স্বার্থ-বিরোধী – এসব ধারণা ও কথা বার্তা বড় জোর সত্তর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর আর নাই। বুঝমান মানুষ বুঝেছে এটা ডাহা মিথ্যা আর ভিত্তিহীন কথা। যে মানুষ ‘বিনিময়’ শব্দটার অর্থ তাতপর্য শুনে নাই, খেয়াল করে বুঝে নাই সে তো অচল। দুনিয়ার বাকী সবার জন্য সে এক অচল সিকির মত দায়!

যে ‘বিদেশী’ ঘৃণা করে বাইরের সব রিসোর্সে তাকে অ্যাকসেস দেবে কে? আসামের আসলে ত্রাতা হতে পারে কথিত এই ‘মুসলমানের বাংলাদেশই’, অথচ আসাম মুসলমান ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে। তাকে কে বাঁচাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৯ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আসাম পাহাড়ে আর মনের ঘৃণায় আটকে গেছে সঙ্কট“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]