ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ


ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ

গৌতম দাস

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2qj

 

 

সম্ভবত এক ‘বিরাট জ্ঞানী’ জেনারেলের সাক্ষাৎ পেয়েছে ভারত। কোন কথা কোথায় বলতে হয় আর কোথায় তা বলা উচিত নয় – এই বিবেচনা তার লোপ পেয়েছে বলেই মনে হয়। ইতিহাস-ভূগোল বোধ থাকলে এমন করার কথা নয়। কোনটা সামরিক অপারেশনাল বোর্ডরুমে বসে বলার কথা আর কোনটা পাবলিক মিটিংয়ে বা স্টেডিয়ামে, এমন হুঁশজ্ঞান যার নেই – এমন ব্যক্তি হলেন ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। কিন্তু অনেকে আবার বলছেন, এটা আসলে বোকা ও গাড়োল মানুষের চালাকি।

যাই হোক ঘটনা হল, রাওয়াত এবার নয়াদিল্লিতে ‘নর্থ ইস্ট রিজিয়ন অব ইন্ডিয়া- ব্রিজিং গ্যাপ অ্যান্ড সিকিউরিং বর্ডার্স’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে কিছু মন্তব্য করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের সিনিয়র ব্যক্তিরাও ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

‘প্রথম আলো’র ভাষ্য দিয়েই বলা যাক। কারণ, অনেকের অনুমান হল, এদের অনুবাদভাষ্য তুলনামূলকভাবে নমনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য, এমন অনুমানের একদল পাঠক আছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি “চীনের মদদে পাকিস্তান বাংলাদেশিদের ভারতে ঢোকাচ্ছে: ভারতীয় সেনাপ্রধান” – এই শিরোনামে প্রথম আলো লিখেছে, “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তার অভিযোগ, এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে”। এটা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, শুনতে কেউ কোথাও ভুল করেছে কি না। তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু উদ্ধৃতি আনা যাক। এ ব্যাপারে আনন্দবাজারের বক্তব্য এ রকম – “ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই সুপরিকল্পিতভাবে এমন করছে ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ এবং তাতে সমর্থন জোগাচ্ছে উত্তর সীমান্তের দেশটি, যাতে ওই অঞ্চলে গোলযোগ বজায় রাখা যায়”। রাওয়াত আসলেই সরাসরি  ‘পাকিস্তান’ বলেননি। তিনি কূটনৈতিক দায় এড়াতে সরাসরি নাম না নিয়ে ইঙ্গিত করে ‘ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ’ বলেছেন। আর ‘চীন’ও বলেননি, এর বদলে বলেছেন ‘উত্তর সীমান্তের দেশটা’।

রাওয়াত আরো বলেছেন, আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারত পাকিস্তান দখলে (‘taken over’) নিতে চায়। সেজন্য নাকি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের নিয়ে গিয়ে এরা আসামের জেলাগুলো ভরে ফেলছে। এখানে রাওয়াতের ‘দখল’ কথাটির অর্থ বুঝে নিতে হবে। ভূগোল হিসেবে আসামের জেলাগুলো কোনোভাবেই পাকিস্তানের পড়শি নয়। ফলে পাকিস্তানের পড়শি হিসেবে ভুখন্ড দখল ধরনের কিছু করে ফেলার প্রশ্ন নেই। কারণ, পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে সারা ভারতের সুদীর্ঘ বুক পেরিয়ে এরপর বাংলাদেশে ঢুকে তারও উত্তরে গেলে আসামের দেখা মিলতে পারে। বিপিন রাওয়াতের এটা অজানা নয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, একটা অঞ্চলে বা কয়েক জেলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে গেলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে, এর মানে হল – ওই অঞ্চল পাকিস্তানের দখলে চলে যাওয়া, ‘পাকিস্তান’ হয়ে যাওয়া। এটা খুবই অবাস্তব বক্তব্য, রাস্তার ধারের টঙের চা-দোকানের যে লেবেলের আলাপ হয় এটা সেই তুল্য। কোনো রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান এভাবে লুজ টক করতে পারেন না। মুসলমান মানেই পাকিস্তান, মুসলমান মানেই ভারতের শত্রু –  এতগুলো লুজ টক করে কীভাবে বলেন তিনি। এই অনুমানের কারণে তিনি পাকিস্তান-চীনের কথিত পরিকল্পনার ভেতরে ভারতের জন্য হুমকি দেখেছেন। বলছি না চীন বা পাকিস্তান ভারতের প্রতিপক্ষ নয় বা হতে পারে না। নানা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ-সঙ্ঘাতে তা হতেই পারে; কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে এরা ভারতের শত্রু, এগুলো মূর্খতা বললেও কম বলা হয়। তবে হ্যাঁ, বিজেপির ভোটের রাজনীতি এমন হয় আমরা প্রায়ই হতে দেখি। রাস্তায় মুসলমান লোক ধরে চর থাপ্পর মেরে “হরে রাম” বলায় নিচ্ছে। অথবা দ্রিজে গরুর মাংস রেখে ছে অজুহাতে খুনই করে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে, এর মানে হল,  বিজেপির তৃতীয় শ্রেণীর এসব মাঠকর্মির চিন্তা ও ভাষায় বিপিন কথা বলছেন তা মনে রাখতে হবে। যেমন এখানে রাওয়াতের ঘিন ঘিন করে বের হওয়া মুসলমান ঘৃণা গুলো দেখেন। তাঁর চিন্তার ফর্মুলার মধ্যে ধরে নেওয়া আগাম অনুমানটা হল – বাংলাদেশের মুসলমান = মানেই তারা পাকিস্তানের দালাল কারণ তারা মুসলমান = মানে তারা ভারত শত্রু। এগুলোকে একেবারে গো-মুত্র এর রাজনীতিক চেতনা – বলাই শ্রেয়।

আবার রাওয়াত নিজের কথাগুলো বলতে দুটো বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, এটা “পরিকল্পিত মাইগ্রেশন” (planned immigration)। আর এভাবে তারা চীন-পাকিস্তান এক “প্রক্সিযুদ্ধ” (proxy war) চালাচ্ছে। রাওয়াত একজন সেনাপ্রধান। ফলে ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ বা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’ শব্দের সামরিক অর্থ তিনি না বুঝে লেখেননি। এগুলো তার সচেতনভাবে বেছে নেয়া শব্দ বলে আমাদের মানতেই হয়। তবে হাসিনা সরকার বা আওয়ামী লীগের খুশি হওয়ার কারণ নেই। কারণ, মুসলমানদের ‘পরিকল্পিত মাইগ্রেশনে’ চীন-পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের এখনকার সরকারও জড়িত, এটাই রাওয়াতের দাবি।

ভারতের মিডিয়াতেও অনেকে বলছেন, রাওয়াত আসাম নিয়ে মন্তব্য করতে গেলেন কেন? বিশেষ করে আসামে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী কারা এবং কতজন, তা যখন সরেজমিন সার্ভে করে দেখার কাজ চলছে এবং এর নিবন্ধন তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। গত সপ্তাহে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও আগামী জুন মাসের মধ্যে সে তালিকা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমাদের প্রশ্ন আরো গোড়ায়। রাওয়াত ভারতের মতো দেশের সেনাপ্রধান। এই ইনস্টিটিউশন বাই ডিফল্ট নিজগুণে ও নিজ স্বার্থে অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকার কথা। ফলে প্রমাণিত ডাটা বা ফ্যাক্টস ছাড়া কোন অনুমিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া, সেনাপ্রধানের মুখ থেকে বের হওয়া শুধু খুবই বিপজ্জনক তা নয়, এটা অপরাধ। তাই প্রশ্ন করতে হয়, বাংলাদেশ থেকে ‘স্রোতের মতো (ইনফ্লাক্স)’ এবং ‘মুসলমানেরা’ আসামে গিয়েছে বা যাচ্ছে- এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? আসামের জনগণনা, নাগরিকত্ব যাচাই ও নিবন্ধন  তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আদালতও আগামী জুনে সে তালিকা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এর সোজা অর্থ- কারো কাছে এ বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই, তৈরি হচ্ছে। মানে এযাবৎ যা উল্লেখ হচ্ছে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণিত তথ্য বা সত্য কোথাও নেই, সব অনুমাননির্ভর। তবুও একজন সেনাপ্রধান নেহায়েত অনুমাননির্ভর কথা বলেন কী করে? দ্বিতীয়ত, ওই নিবন্ধন তালিকা তৈরি করতে যাচাই হচ্ছে কেবল কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, এতটুকুই।  আর কেউ ভারতীয় নাগরিক না হলেই সে বাংলাদেশি এই অনুমান ভিত্তিহীন। কারণ কেউ বাংলাদেশী কি না এমন কোন কিছু সেখানে যাচাই করা হচ্ছে না। তাদের কাজও নয় সেটা। তাহলে প্রমাণ ছাড়া, অনুমাননির্ভর বলা যে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসীর স্রোত আসছে, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের উৎস কোথায়? এসব মনগড়া তথ্যের প্রপাগান্ডায় রাওয়াত নেমেছেন কেন? তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তাকে বাংলাদেশকে অবশ্যই দিতে হবে। আসলে এ ধরনের প্রপাগান্ডা আসামে চলছে আর তাতে প্রধান মদদদাতা হল মোদির বিজেপি এবং তাদের সাথে কিছু স্থানীয় দল, আমরা জানি। এগুলা তারা করে চলেছে তাদের সস্তা ভোটের রাজনীতির স্বার্থে। রাওয়াত নিশ্চয়ই জানেন, রাজনৈতিক দলের বিভেদমূলক প্রপাগান্ডায় একজন সেনাসদস্যের যোগদানের অর্থ কী।

রাওয়াত আসামের অনুপ্রবেশ ইস্যুতে নিজের আপত্তির কারণ নিজেই প্রকাশ করেছেন এভাবে – ‘যেহেতু মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে’। লক্ষ করেন, রাওয়াতের বক্তব্য ওরা ভারতীয় অথবা অনুপ্রবেশকারী কি না, সেটা নয়। তার আপত্তি বা ভারতের কথিত নিরাপত্তার হুমকি দেখতে পাওয়ার একমাত্র কারণ, ওরা মুসলমান। সেই মুসলমানেরা বেড়ে যাচ্ছে সংখ্যায়। এর সোজা অর্থ – আসলে তিনি এক চরম মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তিত্ব। তার বিচার্য পয়েন্ট হওয়ার কথা ছিল, ওরা ভারতীয় নাগরিক নাকি অনুপ্রবেশকারী! এটাই। আসামের নাগরিক নিবন্ধনের কাজেও এটাই যাচাই চলছে। ওরা মুসলমান কীনা এটা সেখানে অবান্তর প্রশ্ন।

থ্যাঙ্কস জেনারেল বিপিন রাওয়াত। এ রকম স্পষ্ট ‘বিদ্বেষ’ অনেকেই দেখাতে পারেন না, মনের মাঝে লুকিয়ে রাখেন; কিন্তু আপনি পেরেছেন। এর অর্থ – ভারতের মুসলমান নাগরিকেরাও আপনার চোখে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। যা হোক, সে বিচার ভারতের রাষ্ট্র ও নাগরিকেরা করবেন। আমতা আর কী বলতে পারি! ‘সেকুলার’ ভারতের সেনাপ্রধান একজন মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তি – এই তথ্য আমাদের জন্য আসলে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক না আসলে একটা সার্কাস। তবে উদ্বেগেরও এ জন্য যে, বাংলাদেশ থেকে মুসলমানেরা নাকি স্রোতের মতো আসামে চলে যাচ্ছে; কোনো প্রমাণ ছাড়া এ কথা তিনি বলছেন। বাংলাদেশ যদি অর্থনীতির দিক থেকে আসামের চেয়ে পিছিয়ে পড়া হয়, তবেই বাংলাদেশ থেকে বেটার লাইফের আকর্ষণে আসামে ‘মুসলমান’ মাইগ্রেশন হতে পারে। এটা যেকোন মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে এই মৌলিক শর্ত পূরণ হতে দেখা যায়। কাজেই রাওয়াতকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে বাংলাদেশের চেয়ে আসামের অর্থনীতি আগিয়ে আছে, অথবা কাজ পাবার সুবিধা আর ভোগ্যপণ্য উপভোগের সুযোগের দিক থেকে জীবনযাত্রার মান বা  লাইফ স্টান্ডার্ড বাংলাদেশের চেয়ে আসাম লোভনীয়। এটা না পারলে আমাদেরকে রাওয়াতের বক্তব্য ফালতু কথা মনে করতেই হবে।

‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ ও ‘প্রক্সিযুদ্ধ
মি. বিপিন রাওয়াত, আপনি বলছেন, চীন ও পাকিস্তান নাকি ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ চালাচ্ছে আর এর মধ্য দিয়ে এটা একটা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’। একজন ভারতীয় সেনাপ্রধানের জানা থাকার কথা, বাংলাদেশে একটা সরকার আছে। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি দাবি করছেন, আমাদের সরকারসহ আমরা জনগণ সবাই চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা পুতুল, পাপেট। নইলে আমরা চীন-পাকিস্তানের কথায় আসামে ‘মুসলমান’ পাঠিয়ে দেয়ার কাজ করলাম কেমনে! অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়ার ভাষ্য হল – গত ১০ বছরে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভারতবান্ধব সরকার। তাহলে বোঝা গেল ভারতের মিডিয়া ও সরকার রাওয়াতের ভাষ্যের সাথে একমত নয়, বরং উলটা। আচ্ছা মিস্টার  রাওয়াত আপনার কথা অনুসারে আমরা আসলে ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- তাই তো? ঠিক আছে, আমরা জনগণের বেশির ভাগ আপনার দাবিমতো না হয় কাঠপুতলি হলাম। আমরা সারাক্ষণই শুনছি বাংলাদেশের সরকারের বিরোধীদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হবে, ‘পাকিস্তানি মন’ আমাদের ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে এ আর নতুন কী? কিন্তু রাওয়াতের ভাষায় আওয়ামী লীগের হাসিনা সরকারও ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- এ কথা বেশ কৌতুককর। কথা আরো আছে। রাওয়াত বলছেন, “বাংলাদেশী মুসলমানদের অনুপ্রবেশে আসামের চারটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা থেকে বেড়ে এখন ৯টি জেলা হয়ে গেছে, আর এই পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন” – (inversion has taken place whichever be the government)। এ অংশটি বেশ উপভোগ্য। এর সোজা অর্থ – রাওয়াত আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে কোনো ফারাক করেননি। দু’টি দলই সমানে নাকি আসামে মুসলমানের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে মুসলিমবিদ্বেষী বিপিন রাওয়াতের চোখে হাসিনা সরকার কী তা জানা গেল। অর্থাৎ এ সরকার যতই ভারতকে সার্ভিস দিক, ভারতবান্ধব সরকারের খেতাব পাক না কেন, কাকাবাবুকে চেয়ারে বসিয়ে দাস হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে বসে ছবি তুলুক না কেন,  জেনারেল রাওয়াতের চোখে হাসিনাও খালেদার মতো একজন মুসলমানই। তদুপরি, তিনি এমন মুসলমান যে, আসামের জেলাগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সব জেলাকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা করে তুলছেন; ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুলের’ মত আচরণ করছে, ‘প্লান্ড ইমিগ্রেশন আর প্রক্সিযুদ্ধ’ করছেন।

আসলে রাওয়াত এক ঘোরতর মুসলমানবিদ্বেষী অসুখে ভুগছেন, এমন আরও একটা বড় প্রমাণের দিক নজর করা যাক।  আসামের স্থানীয় রাজনীতিতে বারবার মুসলমান নিধনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে বোড়ো পাহাড়িদের হাতে স্থানীয় মুসলমানদের হত্যা ও বিচারহীনতার পটভূমিতে ২০০৫ সালে All India United Democratic Front, AIUDF নামে একটা দলের জন্ম হয়েছিল। দলটির প্রধান নেতা সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল এবং দলটির প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের সমর্থন বেশি।  এটাই হল অপরাধ। ঐতিহ্যগত ও পারিবারিকভাবে সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল আতরের ব্যবসা করেন। তার আতর বিখ্যাত কারণ এটা আসামের জঙ্গলের বিশেষ আগর গাছ থেকে  সংগৃহিত। সবচেয়ে বড় কথা AIUDF কেবল মুসলমানদের দল নয় অথবা ‘ইসলাম কায়েম’ তার লক্ষ্য এমন দল নয়। অর্থাৎ এটা কেবল একটি সম্প্রদায়ের দল নয়। তাদের ঘোষিত আদর্শ : ‘National Inclusiveness with a regionalist political position’ । এ ছাড়া দলটা নামের মধ্যেও নিজেদেরকে মুসলমানের দল বলে কোনো দাবি করা হয়নি। ফলে এটা একেবারে ভারতের কনষ্টিটিশন মানা রেজিষ্টার্ড আইনসম্মত লিবারেল রাজনৈতিক দল।  গত ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় আসামের জন্য বরাদ্দ ১৪টি আসনের মধ্যে তিনটাতে দলটি জয়ী হয়েছে। তারা হলেন- বদরুদ্দিন (ধুবড়ি) এবং তার ভাই সিরাজউদ্দিন (বড়পেটা)। আর তৃতীয় আসনটিতে জয়ী হয়েছেন রাধেশ্যাম বিশ্বাস। ইনি বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। এতসব তথ্য সত্বেও, রাওয়াত AIUDF দলের দ্রুত বিকাশকে মুসলমানদের আসামে সংখ্যা বৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ বলে হাজির করেছেন, প্রকাশ করেছেন উষ্মা। বলেছেন, ১৯৮৪ সালে বিজেপির (তখনকার নাম ছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ) আসন ছিল দু’টি, সেই দলও এত দ্রুত বাড়েনি। (‘AIUDF have grown in a faster time-frame than the BJP grew over the years. When we talk of Jan Sangh with two MPs & where they have reached, AIUDF is moving at a faster pace in the state of Assam,’ said Rawat.)। আসলেই এক বিরাট জ্ঞানীর জ্ঞানের কথা এটা।  রাওয়াত মুসলমানদেরকে কী ও কেমন ঘৃণার চোখে দেখেন, মুল্যায়ন করেন এর এক আদর্শ প্রমাণ এটা।

প্রথমত, তার এই তুলনাই মুসলিমবিদ্বেষের প্রকাশ। AIUDF আইনসম্মত দল কি না, কোনো আইন ভঙ্গ করেছে কি না – সেটা দেখার সরকারি দফতর আছে। যেমন আমাদের বেলায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন । কিন্তু ভারতের সেই দফতরের পক্ষ থেকে এই দলের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি করা হয়নি। এই দল দ্রুত না ধীরে বাড়ল, দলটা ইসলামি কি না এমন কোন অভিযোগ ঐ দফতরের আছে এমন নয়। আর তা থাকলেও তাতে কোন অপরাধ হয়েছে কি না সেগুলো বিচার বিবেচনা করে দেখার দায়িত্ব ভারতের সেনাপ্রধানের নয়। তবে সেনাপ্রধানের কোনো আপত্তি থাকলে ওই দফতরে গিয়ে তিনিও অভিযোগ জানাতে পারেন। তা তিনি করেন নাই। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোনো দলের দ্রুত বাড়া কি অপরাধ? অথবা, ব্যাপারটা কী এরকম যে, এই দলটা কথিত অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে গড়া দল? রাওয়াত কিন্তু এ অভিযোগ পরিষ্কার করে আনছেন না। কেবল অমূলক ইঙ্গিতে বলা সন্দেহ ছড়িয়ে কথা বলছেন। দলের সভাপতি আজমল একজন মুসলমান, এটাই যেন তার বিরাট অপরাধ। আর দ্রুত বাড়াই যদি সমস্যা হয় তাহলে সেনাবাহিনী কি গত ১৯৮৪ সালে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির সময় এমন একই প্রশ্ন তুলেছিল? নাকি সেটা বিজেপি বলে খুশি হয়ে চুপ ছিল? এই প্রশ্নে রাওয়াতের জবাব কী? ইন্ডিয়া যদি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তাহলে কয়েকটা জেলায় মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমস্যা কী? এতে কী এসে যায়? এ ক্ষেত্রে আইনি সমস্যাই বা কী?

আসলে বিজেপি বা বিপিন রাওয়াত যদি অহিন্দু কোনো ধর্মের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করেন, তবে বুঝতে হবে তারা ভারতকে হিন্দুত্ব রাষ্ট্রের ভারত বলে অনুমানে ধরে নিয়েছেন, এমনটাই কামনা করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আরএসএস বা শিবসেনার রাজনৈতিক লোক কীংবা কোন রেসিস্ট কীট হন তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু নিজ পদ পদবির সাথে এসব নোংরা অবস্থান তিনি অবলীলায় জড়াচ্ছেন। বরং সাংবিধানিক পদে থেকে কোনো ধর্মের (যেমন মুসলমানের) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করে ইঙ্গিত করে কথা বলা – এটা ঐ জনগোষ্ঠি-বিদ্বেষী আচরণ ফলে তা অসাংবিধানিক এবং তা ফৌজদারি অপরাধ। ভারত যদি রাজনৈতিক সাম্যের দেশ হয়ে থাকে, ভারতে ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকারের সাম্য যদি বিজেপি বা রাওয়াত মানেন, তাহলে তারা শুধু হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চাইতে পারেন না। রাওয়াতের উচিত, আগে ভারতের কনস্টিটিউশনে এ কথা লিখিয়ে নেয়া যে, ‘এখানে নাগরিক নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান নয়।’ আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, মোদির বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া এতে কী হয়, কী তামাশা সেখানে করে!
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা যায়, বিজেপি বা বিপিন রাওয়াতরা মুসলমান অথবা যেকোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যখনই কোনো এক ‘ভারত’ (যেমন হিন্দুত্বের ভারত) গড়তে চাইবেন, আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, ওই বৈষম্য ও বিভাজনই মহাবিপদ ডেকে আনবে। ১৯৪৭ সালে এটাই হয়েছিল। যে মুসলমান ইনক্লুসিভ ভাবে, ভারতে সমান মর্যাদায় নাগরিক থাকবে, সে কখনো ভারতের জন্য হুমকি হবে না। একথার বিপরীতে যখন ভাবা হবে মুসলমান তাই ওরা ভারতের শত্রু বা হুমকি – এটাই রেসিজম। মনের গভীর গহীনে এক দগদগে ঘৃণার অসুখ! মনে এত ঘৃণা নিয়ে উনি ঘুমান কী করে!

তবে একথা মনে করার কোন কারণ নাই যে ভারতে জ্ঞানবুদ্ধি-ওয়ালা লোকের কোন অভাব আছে। বরং এটা বুঝা যায় যে তাদের চাপিয়ে পিছনে ফেলে রাখা হয়েছে। যেমন এক ‘শ্রীনাথ রাঘবন’ এক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ। তিনি দিল্লীরই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ’ এর সিনিয়র গবেষক সদস্য। রাওয়াতের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,… “চীন-পাকিস্তানের তত্বাবধানে এক পরিকল্পিত মাইগ্রেশন আমরা নাকি দেখতে পাচ্ছি – এটা এক অবান্তর বাড়িয়ে চাড়িয়ে বলা কথা”। [To suggest that we are witnessing “planned immigration” overseen by Pakistan and China appears to be an absurd overstatement.] হিন্দুস্তান টাইমসে লেখা এক মন্তব্য কলামে তিনি এটা লিখেছেন। তাঁর লেখার শিরোনামে তিনি দুটো শক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন – বলেছেন রাওয়াতের বক্তব্য ‘অ-ইতিহাস’ [ইতিহাসের সত্যতা নাই] এবং ‘অপুষ্টির বিচার’ [ahistorical, poorly judged]। পুরা লেখায় একজনের গবেষকের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তিনি সেখানে রাওয়াতকে ন্যাংটা করে তাঁর সমস্ত দাবি প্রচুর যুক্তি তুলে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন। আগ্রহিরা পড়ে দেখতে পারেন।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

গৌতম দাস
১১ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2pL

আসামে ‘বাংলাদেশী’ বা ‘মুসলমান’ নামে আর এক ক্লিনজিং ও নিধন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে সীমাহীন দুর্দশা আর শরণার্থীর ঢল – এসব দৃশ্য কী আমাদের দেখতে হবে? হলে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের কাঁধে বন্ধুক রেখে এই হত্যাকান্ড ঘটবে? এর দায়ভার কী আদালত বইতে পারবে? ভারত হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ডুবে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে আর মাত্র ১৬ মাস বাকী। মোদীর অর্থনীতির ডুবে যাওয়া আর কাজ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা আর লুকানো নয়, গত সপ্তাহে এবার এটা একেবারে ষ্টাটিস্টিক্যালি প্রকাশিত। সেখানে দেখা যায় মোদীর গত চার বছরের শাসনের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি এবার, সাড়ে ছয় পারসেন্টে নেমেছে। ফলে ধরে নেয়া যায় আগামী নির্বাচনের মোদীর অস্ত্র হবে একটাই – উগ্র হিন্দুত্ব ও মুসলমানবিদ্বেষ। আর তাতে এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে পরিণতি কী হবে!

রোহিঙ্গা সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সুরাহার দেখা পাওয়া যায় নাই এখনও, অথচ এর আগেই প্রায় একই ধরনের নতুন আরেক ফেনোমেনা ‘আসাম মুসলমান নিধন নিপীড়ন’ – ব্যাপকভাবে উঠে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তারা কথিত ‘বাংলাদেশী’, ‘মুসলমান’, ‘ফরেনার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি বলে অত্যাচার-নির্যাতন নিয়মিত শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। আসলে এক কথায় বললে আসাম বা অসমিয়রা এক চরম জেনোফোবিয়াতে ভুগছে। ইংরেজি জেনোফোবিয়া (Xenophobia) শব্দের ‘জেনো-‘ এর তুল্য প্রচলিত বাংলা হবে – ফরেনার বা বিদেশী। এভাবে পুরো শব্দের অর্থ হল – ফরেনার বা বিদেশী ভীতি। যদিও এই শব্দের আসল গভীর অর্থ হল – ‘অ-পর’; যে আমার মতো নয়, এমন অপর-ভীতি। ফলে তাকে দেখতে পারি না, ঘৃণা করি। যেমন – কেউ আমার মতো নয়, সে আমার ধর্মের নয়, অথবা আমার মত অহমিয়া নয়, অথবা আমার মতো এশিয়ান নয় ইত্যাদি। ফলে সে আমার ‘অ-পর’। “অসমে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমিয়াদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সব গ্রাস করে ফেলছে” – এই হল অসমিয়াদের সবচেয়ে কমন আক্ষেপ ও বিদেশ- বিরোধী প্রপাগান্ডা। এই ‘অপর-ভীতি’ বা জেনোফোবিয়াতে ভুগছে আসাম। অথবা সম্ভবত বলা ভালো, জেনোফোবিয়াতে ভোগানো হচ্ছে। কারা ভোগাচ্ছে, কারা এরা?
বলাবাহুল্য, ‘অপরে আমাদের সব গ্রাস করে ফেলল’ – এই আক্ষেপের বয়ান তৈরির পেছনে আধা সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প তারা জড়ো করেছে, অনুমান করা যায়। এখানেই সবচেয়ে বড় মিল দেখা যাবে বর্মিজদের সাথে। বর্মিজদের অপর-ভীতি রোহিঙ্গা নিধনের পিছনের মূল কারণ। এদিকে এখানে বর্মিজদের আসাম দখল থেকে অসমিয়াদের অপর-ভীতির সুত্রপাত। দ্বিতীয় এঙ্গলো-বার্মিজ যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৫১ সালে। এর আগেই, (১৮২৪-১৮৩৮) সালের মধ্যে অহম রাজা ও আশপাশের অন্যান্য রাজা যেমন কাছাড় রাজ্য মিলিয়ে পুরো আসামই ব্রিটিশ কলোনির দখলে ও শাসনাধীন চলে যায়। বার্মিজ রাজার আসাম অঞ্চল দখল নিতে যাওয়া থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল।  তাই অসমিয়াদের একালের আক্ষেপের বয়ানে গল্পের একটি উপাদান হল – ব্রিটিশ কলোনি তাদের দখল করে নিয়েছিল। আগে তারা কত সুন্দর দিন কাটাইত। যদিও এর জন্য এখনকার বাংলাদেশ বা এর কোনো বাসিন্দা আমরা কেউ দায়ী নই। তবু এক জেনোফোবিয়ায় ভিকটিম-বোধের গল্প এখান থেকে শুরু হয়েছে। এর ওপর আদি পাপ আমরা তো মুসলমান, সেটা তো আছেই, যা জুড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো সমস্যার জন্য মুসলমানদের দায়ী করা সহজ। তবে আমাদের আরেক অপরাধ ছিল যে, যেহেতু ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক অধীনে একটি ব্রিটিশ কমিশনারেটের কর্তৃত্বে রেখে শাসন করা হয়েছিল, আর তা হয়েছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। ফলে বৃটিশেরা নয়, বাঙালিরাই যেন এতে দায়ী। আর এর জন্য যেন বাংলাদেশ, মুসলমান বা বাঙালিরা দায়ী, এমন বলে নানান অনুমান ও গল্পও তাদের ঝুলিতে আছে। ভিকটিম-হুড যারা বিক্রি করে, তারা এমনই করে।
আর ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হলে আসামকে পুরা বেঙ্গলের সাথে আর না, বরং সরাসরি পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ করা হয়। তাতেও তারা আরো বেশি অখুশি  হয়েছিল। যদিও (১৯০৫-১৯১১) মাত্র এই ছয় বছর আসাম পূর্ববঙ্গের সাথে ছিল। তবে ততদিনে আসাম ব্রিটিশদের চোখে নগদ অর্থকরী ফসল, চা উৎপাদনের এক খনি যেন, এভাবে হাজির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেকালের চা উৎপাদনের শ্রমিক কারা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশেরা স্থানীয় অসমিয়াদের পছন্দ না করে বিপুল শ্রমিক মাইগ্রেট করে এনেছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক রিপোর্টের মতে, এই শ্রমিকেরা মূলত ট্রাইবাল, তবে ছোটনাগপুর উপত্যকা মানে সেকালের বিহারের ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড (যে দুটোই এখন আলাদা রাজ্য) থেকে এবং বিহারের বাকি অংশ থেকে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (তেলেঙ্গনা, কয়েক বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আলাদা হওয়া রাজ্য) এসব অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া লর্ড কার্জনের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেন পূর্ববঙ্গ থেকেও আনা হয়। সম্ভবত পড়শি ও দক্ষ কৃষিকাজ জানা লোক বলে। [People – mostly tribals – were brought in from the Chota Nagpur plateau and its adjoining areas covering present-day Jharkhand, Chhattisgarh, and parts of Bihar, West Bengal, Odisha, Telengana and Andhra Pradesh to work in the newly-opened tea plantations from the mid 19th century; the British encouraged the migration of Muslim farmers from East Bengal after Lord Curzon became Viceroy of India (1899-1905). ]
তবে এর আরেকটা বড় কারণ আছে। ব্রিটিশ-ভারতের ‘ভারত শাসন আইন-১৯৩৫’ অনুসারে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা প্রথম স্থানীয় নেটিভদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় শাসনে সিলেক্টেড স্থানীয় নেতা নেয়া হত। তার পুরো আনুষ্ঠানিক নাম মৌলবি সাইদ স্যার মোহম্মদ সাদদুল্লাহ। গৌহাটির সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাদদুল্লাহ পরে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ও সরকারি প্লিডারও ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের আসাম প্রদেশের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত)। এর আগে তিনি ১৯১৯ সালের সরকারেও সিলেক্টেড প্রতিনিধি ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গোপীনাথ বরদোলাই। এমনকি স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার কাজে যে ৯ সদস্যের খসড়া কমিটি হয়েছিল, তিনি সেখানে একজন ছিলেন। তিনিও পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষক নিয়ে গেয়েছিলেন, ধান চাষে বাংলার অভিজ্ঞতায় বেশি ফসল এরা ফলাতে পারে এই বিশ্বাসে। এসব মিলিয়ে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা জাম্প করেছিল। তবে তা সবই ১৯৪১ সালের মধ্যে, এরপরে নয়। যেমন ১৯০১ সালে আদমশুমারিতে মুসলমান ছিল আসামের মোট জনসংখ্যার ১২.৪ শতাংশ। এরপর বিপুল মাইগ্রেটেড হয়ে আসা জনসংখ্যার কারণে পরের ৪০ বছরের মধ্যে ১৯৪১ সালে তা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছিল, ২৫.৭২ শতাংশে। তবে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সবচেয়ে বড় মুসলিম মাইগ্রেশন। মনে রাখতে হবে এটা হয়েছিল, ব্রিটিশ-ভারতে যখন দাওয়াত দিয়ে জমি ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পুর্ববঙ্গ থেকে মাইগ্রেট করে বাঙালি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের ৩০ বছরে দেখা যায় ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশ কমে ২৪.৫৬ হয়েছিল। এরও পরের ১০ বছরে এই প্রথম মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৮১ সালে ৪ শতাংশ বেশি হয়ে ২৮.৪৩ শতাংশ হয়। এর পরের ১০ বছরে জনসংখ্যা ১৯৯১ সালে আরো ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৩০.৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে এখন মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশ।
নিচের গ্রাফ নেওয়া হয়েছে, সাথে দেয়া লিঙ্ক ফলো করেন। 
ASSAM muslim population
তাই সবচেয়ে হইচই শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এক উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মুসলমান অনুপ্রবেশ’ হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ করে এমন কোন তথ্য না থাকলেও একথা বলা হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এই বিচারে এটা একটি মিথ, একটি পারসেপশন মানে ভোটে জেতার পারসেপশন। এ ছাড়া অনেক গবেষক দেখিয়েছেন এর কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে ১৯৭১ সালের শুমারিতে দেখা গেছে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়েনি। এ ছাড়া অন্য যেসব ‘রাজনৈতিক পারসেপশনের অভিযোগ’, যেমন – বাংলাদেশের সাথে আসামের সীমান্ত এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বেশি। অথচ কোন শুমারির গণনাতে দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করা হয়নি। আবার এমনই আরেক অভিযোগ হল, অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের তুলনায় আসামের মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নাকি বেশি, মানে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী” এসেছে। সেটাও তুলনীয় ফিগার দিয়ে গ্রাফ একে তুলনা করে দেখা গেছে, এই অভিযোগও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আদমশুমারির তথ্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধারণাকে সমর্থন করে না। তবে এটা হতে পারে যে, আসামের ভেতরেই ১৯৮১ সাল থেকে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানদের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এর অর্থ মুসলমান মোট জনসংখ্যা বেড়েছে তা নাও হয়ে পারে। কারণ মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানদের শতকরা হার যেহেতু এটা একটা শতকরা হিসাব অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শতকরা যোগফল ফিক্সড বা ১০০ থাকতে হবে, তাই। এতে কোন কারণে হিন্দুদের জন্মহার কমাটাও তুল্যপরিমাণ মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে বলে দেখাবে। অথচ মুসলমান মোট জনসংখ্যা আসলে হয়ত বাড়েই নাই – এমন হতে পারে।
এমনিতেই সাধারণভাবে কোন জনগোষ্ঠির শতকরা হার এর বাড়া-কমা ঘটার পিছনের কারণ হিসাবে দেখা যায় – আরবানাইজেশন বা শহরায়নের হার বেশি হলে জন্মহার কমে। হিন্দুদের শহরায়ন বা শহুরে চাকরিজীবী পেশা গ্রহণ মুসলিমদের তুলনায় বেশি হলে হিন্দু জন্মহার কমেছে – এর একটা কারণ হতে পারে। মূল কারণ হল, কৃষিকাজ বা প্রত্যক্ষ শ্রম বেচে খাওয়া বাবা-মায়েদের সন্তান বেশি নেয়ার ঝোঁক থাকে। কারণ সেক্ষেত্রে সন্তান কম বয়স থেকেই নিজেই আয় করতে পারে বা উল্টা বাবাকে শ্রম-আয় দিয়ে সাহায্য করতে পারে। যেটা শহুরে বা শিক্ষিত চাকুরে পেশার বাবা-মায়ের বেলায় উল্টা হয়। কারণ তাদের সন্তান শিক্ষিত করতে গিয়ে সন্তানের পিছনে খরচ করতে হয়। তাদের মানুষ করার এই খরচ কমাতে বাবা-মায়েরা জন্মহার কম রাখার পথে যায়। মুসলিম জন্মহারের তুলনায় বেশি দেখানোর সম্ভাব্য কারণ এটিই। আরও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আসাম ভেঙ্গে আরও নতুন চারটা প্রদেশ করা হয়েছে। আর ঐ প্রদেশগুলো হওয়ার কারণে পুরান আসাম প্রদেশ থেকে (মুসলমান জনসংখ্যার তুলনায়) বেশি হিন্দু জনসংখ্যাই বের হয়ে গেছে। তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যা কম বের হওয়াতে মোট সংখ্যাটা একই থাকলেও শতকরা হারের দিক থেকে মুসলমানের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া সম্ভব। তবে মূল কথা, কেন শতকরা হিসাবে মুসলমানের পার্সেন্টেজ বেশি দেখাচ্ছে এর আসল কারণ পরিসংখ্যান ফিগার ঘেঁটে বের করা যেত। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাই মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীর’ উপস্থিতির প্রমাণ – এদিকে অনুপ্রবেশের রাজনীতি, মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় নাই। অথচ এটা একটা অপ্রমাণিত বা ভিত্তিহীন কথা।
আসলে ১৯৪৭ সালের পর থেকেই এক মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় উঠেছিল। এরই সাক্ষ্য হয়ে আছে ১৯৫১ সালের ‘NRC 1951’ (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন)। এটা এই প্রথম ভারতের একটাই প্রদেশে যাচাই করে নাগরিক তালিকা তৈরি করা। ভারতে নিয়মিত প্রতি দশ বছর পরপর আদমসুমারি হয়ে থাকে। সে হিসাবে ১৯৫১ সালের আদমশুমারির পরই সেই ডাটা থেকে সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র আসাম প্রদেশেই “রেজিস্টার্ড নাগরিকদের তালিকা” তৈরি করা হয়েছিল; অর্থাৎ অন্য কোনো রাজ্যে তাদের কোন NRC করা হয় নাই। আসামে ‘মুসলমানেরা বেড়ে গেল কি না’ এই উছিলা তুলে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা তখন থেকেই। এমনকি এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধ’ আসামের হিন্দু বাঙালিদেরও বিপক্ষে। বিশেষ করে সিলেটের লাগোয়া আসামের তিন জেলার (কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি) হিন্দু বাঙালি যাদেরকে বরাক উপত্যকা বিধৌত অঞ্চলের লোক বলা হয়। আর শুরুতে এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস। তাই বরাক অঞ্চলের লোকেরা এখন ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, প্রথম আলোতে প্রকাশিত নাগরিকত্ব নিয়ে সোচ্চার বরাকের বাঙালিরা” এই রিপোর্ট এখনও আসামের বরাকের তিন জেলার হিন্দু বাঙালির প্রতিবাদ। যদিও এরাই ১৯৪৭ সালে সিলেট নিয়ে ভোটাভুটিতে আসামের পক্ষে পতাকা উড়িয়েছিল। এদের মোহভঙ্গ হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। বিশেষত ১৯৫১ সালে কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদোলাই যখন মুখ্যমন্ত্রী এবং  ১৯৬১ সালে, যখন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ ‘উগ্র অহমিয়াবাদের’ শুরুর দিকে এর নেতৃত্বে ছিল প্রদেশ কংগ্রেস।
যদিও খোদ নেহরু বা পরে ইন্দিরা গান্ধী এই উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ পছন্দ করেননি। আবার এদের দুজনের কেউই প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে থামাতেও পারেননি। এর নিট ফলাফল হল – এর পর থেকে আসামের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব কংগ্রেসের দেখানো পথেই থাকে কিন্তু নেতৃত্ব অন্যান্য দল বা গোষ্ঠির হাতে চলে যায়। আর সেটাই এখন বর্তমানে বিজেপির হাতে। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই ‘অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ সংক্ষেপে আসু [AASU] এটাই আসামের বড় ছাত্র সংগঠন। অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করে বললে, ভারত স্বাধীনের পরে কংগ্রেস আর কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠন সব রাজ্যে আলাদা হয়ে যায়। ব্যতিক্রম আসাম। এখানে ভাগ না হওয়া সংগঠনটাই হল আসু। সম্ভবত ‘উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ’ সেকালে উত্তাল হয়ে উঠা – এমন অবিভক্ত থেকে যাওয়ার কারণ।  AASU এই সংগঠন ১৯৭৯ সালে (NRC) এনআরসির নাগরিকের তালিকা তৈরি শেষ করে এর ভিত্তিতে ‘কথিত অনুপ্রবেশকারীদের’ বের করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে ছাত্র সংগঠনের তরফে এমন দাবির তোলা হয়েছিল। এর অর্থ তাতপর্য হল, কংগ্রেস দলের কেন্দ্র বা হাই কমান্ড, প্রদেশ কংগ্রেসের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদে মোড় নেয়ার বিপক্ষে তাদের মুখ বন্ধ রেখেছিল, এরই প্রতিক্রিয়া। এজন্য পরিণতিতে আমরা দেখি পরবর্তিতে এই ছাত্র সংগঠনই নতুন রাজনৈতিক দল (অসম গণ পরিষদ) খুলেছিল, যেটা তখন জন্ম হয় নাই। ১৯৭৯ সালের আসুর আন্দোলন শুরুর পরে ১৯৮৩ সালে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার নির্বাচনের আয়োজন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আসু এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। ফলে কংগ্রেস ছাড়া এতে আর কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু মুসলমান ভোটারেরা কংগ্রেসের প্ররোচণায় ভোট দিতে গিয়েছিল। এখান থেকে এক মহা-বিপর্যয়ের শুরু।
আসামের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান চারটির একটি – বোড়ো (Bodo) ট্রাইব, অনেকে এদেরই আদি অহমিয়া মনে করে। ট্রাইবের নামে এক আঞ্চলিক দল (National Democratic Front of Bodoland) আছে তাদের (পরে অবশ্য দুটা ভাগ হয়ে গেছে)। বিজেপির বাজপেয়ি সরকারের আমলে ২০০৩ সালে বোড়ো সংখ্যাগুরু চারটি জেলা (Kokrajhar, Baksa, Chirang and Udalguri ) নিয়ে এক  স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ও আলাদা নির্বাচিত প্রশাসন, Bodoland Territorial Council (BTC) গঠন করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে BTC তে মোট ৪০ আসনের মধ্যে ৭৫ ভাগ সংসদীয় আসন বোড়োদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই সমস্যা উল্টা হয়। কারণ সর্বসাকুল্যে বোড়ো জনসংখ্যা ৪৮% এর কম। আর পরের বড় অংশ হল ২৭% মুসলমান, এছাড়া অন্যান্য ধর্ম বা ট্রাইব ইত্যাদির লোক আছে। অর্থাৎ ঐ চার জেলাতেই মুসলমানসহ অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আছে। বোড়োরা এখন এসব কোন সংখ্যালঘুদেরকে ক্ষমতায় কোন প্রতিনিধিত্ব দিতে চায় না।  উল্টা রুখে দিতে চায়, রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত করতে চায়। এমনকি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিতে বাধা দেয়, হত্যা ম্যাসাকার করে ইত্যাদি। আগ্রহিরা এই রিপোর্টের পুরাটা পড়ে দেখতে পারেন। এটা ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের অধীনে করা হয়েছেন। সেখান থেকে, [ This year 2014, between May 1 and May 3, nearly 50 unarmed Muslims were shot dead in three separate incidents in the Bodo Territorial Administered Districts. These killings, according to the report, were a retaliation by Bodo militants because a host of non-Bodo communities, including Muslims, had collectively put up an election candidate from the United Liberation Front of Assam to contest for the Kokrajhar Lok Sabha election seat against Bodo candidates.] এরাই ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিও নিলা ম্যাসাকার (Nellie massacre) ঘটিয়েছিল। প্রায় হাজার খানেক বোড়ো অধিবাসী দল বেধে প্রায় মোট প্রায় তিন হাজার (অফিসিয়ালি দুহাজারের কম) মুসলমান জনগোষ্ঠির লোককে হত্যা করেছিল।  ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে আসামের নওগাঁ জেলার নিলা ও এর আশেপাশের গ্রাম এলাকায় মুসলমানকে হত্যা করার সাথে শিশু ও নারীদের আহত এবং নির্যাতিত হয়, এটাই নিলা ম্যাসাকার নামে এটি পরিচিত। পরবতিতে একটা ডকুমেন্টারি সিনেমা হয়েছে এই হত্যাকান্ডের সার্ভাইভারদের নিয়ে। পরে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনেও (মোদি এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর) একইভাবে আক্রমণ নিপীড়ন করা হয়েছিল।

১৯৮৩ সালের মুসলমান নিধন হলেও এ নিয়ে আজো কোনো বিচার আদালত কিছু হয়নি। তবে ইন্দিরা গান্ধীর (তিনি তখনো বেঁচে, নিহত হয়েছেন অক্টোবর ১৯৮৪) প্রতিক্রিয়া কিছু টের পাওয়া যায় তার এক কাজে। তিনি এই হত্যার ব্যাপারটা যতদুর সম্ভব চেপে গিয়েছিলেন, কথা সত্য। কিন্তু একটা কাজ করেছিলেন। ভারতের ভুখন্ডে কোন ‘বিদেশির অনুপ্রবেশ’ ইস্যু ডিল করতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় “১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট” [The Foreigners Act, 1946.] এই আইন। তা সত্ত্বেও ঐ হত্যাকান্ডের পরে কেবল আসামে প্রয়োগের জন্য ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’ [Illegal Migrants (Determination by Tribunal) Act, 1983] বলে নতুন আইন করেন তিনি। এই আইনের সারকথা হল – কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এ ছাড়াও অভিযোগকারীকে কথিত অনুপ্রবেশকারির বাসার ১০০ গজের মধ্যে বসবাস করতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে ভারত থেকে বের করে দেয়া খুবই কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধী  (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) মারা গেলে  পরে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। তিনি এবার ‘আসু’র সব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৮৫ সালের আগষ্টে  ‘আসাম চুক্তি বা আসাম অ্যাকর্ড’ সই করেন। অর্থাৎ NRC ১৯৫১ তালিকা আপডেট করে এর ভিত্তিতে অবৈধ বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার আন্দোলনকারিদের দাবি মেনে এর বাস্তবায়নে চুক্তি করেন তিনি। এছাড়াও তিনি ১৯৮৩ সালের রাজ্য নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য নতুন নির্বাচন দেন। অর্থাৎ রাজীব গান্ধী যা করলেন এর অর্থ তাতপর্য হল, তিনি স্বেচ্ছায় চাইলেন আসু এরপরে নিজেদের নতুন দল খুলুক, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতে আসু সরকার গড়ুক। এবং ১৯৮৫ সালে তাই হয়েছিল। আর  আসুর নতুন গড়া স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নাম হল ‘অসম গণ পরিষদ’ (Asom Gana Parishad, AGP) আর আসুর নেতা প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত এই দলের সভাপতি ও ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ রাজীব গান্ধীর অনুমান ও ভীতি ছিল একটাই, এমন না হতে দিলে আসাম ভারত থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে যেত। অতএব রাজীব গান্ধী টাইম বায়িং বা সময় কেনার পথ ধরেছিলেন। আর মোহান্তর কি হয়েছিল পরে? পরের বারের (১৯৯০) নির্বাচনে মোহান্ত গোহারা হেরে যান। তবে কোনোমতে তার পরের বার (১৯৯৫) জিতেছিলেন । আর সেটাই শেষ। এখন ঐ দল ভেঙ্গে দুইটা, আর প্রতিবারের রাজ্য নির্বাচনে আসামের মোট ১২৬ আসনের রাজ্য সরকারে দলের অর্জনে থাকে ১০-১৪ আসন।

এদিকে এখনকার আসাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন সর্বানন্দ সনোয়াল, তিনি আসলে ছিলেন AGP নেতা এবং আসুরও নেতা সভাপতি (১৯৯২-৯৭)। তিনি ২০০৫ সালে, নিজ নামে ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’-কে [IMDT এক্ট] কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে  একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে  ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণায় বাতিল করে দেন। ফলে এখন অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে বের করে দেয়া সহজ। আসলে এই পরিকল্পনাগুলো ছিল বিজেপির। এবার সে পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তিনি AGP ছেড়ে প্রকাশ্যে ২০১১ সালে এবার বিজেপিতে যোগ দেন। রাজ্য নির্বাচনে সেই প্রথম তিনি বিজেপির পক্ষ থেকে এর আগে যেটা ছিল অনুপ্রবেশ বা বাঙালি বা বাংলাদেশি খেদাও এর ইস্যু সেটাকে তিনি সরাসরিভাবে এবার “মুসলমান খেদাও” বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। সর্বানন্দ পরে ২০১৪ সালের বিজেপি থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হন। আর ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবে ২০১৪ সালের ঐ নতুন ভাষ্যে ‘মুসলমান খেদাও’ এতে প্রায় ৫০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল বলা হয়।  এদিকে আসামে কংগ্রেস এর মাঝের (২০০৬, ২০১১)  আবার দুইবার মুখ্যমন্ত্রী ও সরকার গড়েছিল।  তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল এই যে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে রাজীব গান্ধীর দলসহ সকলে অনুপ্রবেশ বা মুসলমান ইস্যুকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় যাবার জন্য। যারাই রাজ্য সরকারে এসেছে সবাই এটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু সবাই জানে এর বাস্তবায়ন কী কঠিন ও ভীষণ বিপদের। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি খেদাও অথবা অনুপ্রবেশকারী অথবা বিদেশী মাইগ্রেন্টের কোনো না কোনো একটি আসাম রাজনীতির ইস্যু ছিল। আর সবসময়ই ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই ‘বাংলাদেশী’ ইস্যুটি ব্যবহার করতে কেউ দ্বিধা করেনি। কিন্তু এক স্থানীয় এনজিও ইস্যুটাকে সেবার সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে যায়,  আর এর বাস্তবায়ন দাবি করেছিল। সেই থেকে এটা কোর্টের মনিটরিংয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালতও ঐ মিথ বিশ্বাস করেছে যে একটা বড় বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠি ১৯৮১ সালের পরে আসামে এসেছে।

কিন্তু এরপর কী?
সবচেয়ে ভয়াবহ এক অবস্থার জন্য যেন আসামের সব দল বা পক্ষ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও।  কেন? কারণ আসামের নাগরিকের তালিকা কী হচ্ছে, কতদূর হচ্ছে এর বাস্তবায়ন ‘নির্বাহী সরকার’ নিজে করছে না। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধানে, নির্দেশ ও মনিটরিংয়ে এটা সরকার বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু ঘটনা হল যদি ‘কেউ ভারতের নাগরিক’ এটা প্রমাণ করতে পারল না – এর মানেই সে অ-ভারতীয় হয়ত, কিন্তু সে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমানিত হল না, হবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে কারও কাছেই যার জবাব নেই তা হল, তাহল, এই কথিত ‘অ-ভারতীয় বা অবৈধদের’ কোথায় ঠেলে ফেলা হবে? এর জবাব সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নেই। কেউ অ-ভারতীয় এটুকু বলেই আদালত পার পেতে চায়। কিন্তু আদালত এ নিয়ে কিছু না বললে অন্যেরা, কোন না কোন রাজনৈতিক শক্তি এরা কী বসে থাকবে? সুযোগসন্ধানীরা কেউ বসে থাকবে না। বরং ‘বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার ক্রেডিট’ নিজে নিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এর দায় কে নেবে? সবচেয়ে আজব ব্যাপার, সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো আসামের সবাই মনে করছে, নাগরিক তালিকা পূর্ণ হলেই ওটাই সব সমাধান। অথচ এটাই হবে দাঙ্গার উৎস। নতুন ও গভীর ক্ষত তৈরি ও সঙ্কটের শুরু। ভারতের এক গবেষণা থিংক ট্যাংকও (দিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য।) এতে সায় দিয়ে বলছে, আসামের এই তালিকা একটি ‘টাইম বোমা’। তবে ভিন্ন কারণে।

ঘটনার আসল দিকটা হল, আসামের প্রধান সমস্যা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব। আসাম ঠিক ল্যান্ডলকড ভুখন্ড নয়। প্রবেশ বা একসেস আছে কিন্তু সেগুলো কেবল এক কোনা, আসামের কেবল পশ্চিম দিক শিলিগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে, ফলে সহজ না। কখনও পাচগুণ পথ ঘুরতে হয়, পুর্ব দিক থেকে আসলে। অথচ সব রিসোর্সে আসামের সহজে প্রবেশের উপায় হতে পারে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের সাহায্য ও সুসম্পর্ক হতে পারত এর জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বস্তু। কিন্তু মিথ্যা মিথ ও ভ্যানিটি আর ‘অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে পাহাড় ও মনের ঘেরার ভেতর আটকে গেছে অসমিয়রা। অসমিয়াদের যদি মিথের তালাশে দিন কাটে, বিদেশি বা অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ এর মুডে থাকে তবে এই অসমিয়াদেরকে কোন বাংলাদেশ সহায়তা করবে? কেন করবে? কেউ বিদেশি মানে সে আমার জনগোষ্ঠির স্বার্থ-বিরোধী – এসব ধারণা ও কথা বার্তা বড় জোর সত্তর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর আর নাই। বুঝমান মানুষ বুঝেছে এটা ডাহা মিথ্যা আর ভিত্তিহীন কথা। যে মানুষ ‘বিনিময়’ শব্দটার অর্থ তাতপর্য শুনে নাই, খেয়াল করে বুঝে নাই সে তো অচল। দুনিয়ার বাকী সবার জন্য সে এক অচল সিকির মত দায়!

যে ‘বিদেশী’ ঘৃণা করে বাইরের সব রিসোর্সে তাকে অ্যাকসেস দেবে কে? আসামের আসলে ত্রাতা হতে পারে কথিত এই ‘মুসলমানের বাংলাদেশই’, অথচ আসাম মুসলমান ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে। তাকে কে বাঁচাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৯ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আসাম পাহাড়ে আর মনের ঘৃণায় আটকে গেছে সঙ্কট“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

গৌতম দাস
২৬ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:২৩

https://wp.me/p1sCvy-2pc

গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ অর্থাৎ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ থেকে এক ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে স্বীকৃতি দেয়ার সময় হয়েছে।’ কিন্তু কেন তিনি এমন বললেন? এখনইবা বললেন কেন? এছাড়া, ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে দুনিয়ার কোথায় কোথায় কী কী ইস্যুতে এর ইতি অথবা নেতি প্রভাব পড়বে? আর তাতে আমরা বাংলাদেশীরা কোথায় কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবো? সবচেয়ে বড় কথা ন্যায়-অন্যায়ের আলোকে এতে অন্যায়টা কী করছেন ট্রাম্প? এবিষয়গুলো নিয়ে বুঝাবুঝি করতে হবে আমাদের।

ওদিকে আর এক প্রশ্ন আমাদের মনে জাগা স্বাভাবিক যে ইসরাইলের জন্মের (১৪ মে ১৯৪৮) প্রায় ৭০ বছর পরে এসে এখন ট্রাম্পকে কেন স্বীকৃতির ঘোষণা দিতে হচ্ছে কোনটা ইসরাইলের রাজধানী? কারণ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুসারে, জেরুসালেম একটা অকুপায়েড বা অবৈধ দখলি এলাকা। অথবা আরও বলা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকেই জেরুজালেম কোন রাষ্ট্রের অংশ হবে সেই বিচারে এটা অমীমাংসিত এলাকা, ফলে কারও না।  জাতিসংঘের আইনি ভাষায় “corpus separatum”। যার অর্থ, জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন। তাই আইনত এটা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে থাকা এলাকা । ১৯৪৭ সালের জাতিসঙ্ঘের ১৮১ নম্বর রেজুলেশন অনুসারে জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন (corpus separatum — a separate entity under international jurisdiction)। এই রেজুলেশন বা গৃহিত প্রস্তাব অনুসারে – ওর PART III অংশে,  ‘City of Jerusalem’ শিরোনামের অধীনে উপশিরোনাম হল – A. SPECIAL REGIME।
সেখানে লেখা আছে,
“The City of Jerusalem shall be established as a corpus separatum under a special international regime and shall be administered by the United Nations. The Trusteeship Council shall be designated to discharge the responsibilities of the Administering Authority on behalf of the United Nations.” ….  দেখুন A. SPECIAL REGIME, City of Jerusalem, PART III.

এ ছাড়া পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে, বিশেষ করে যেটাকে পূর্ব জেরুসালেম বলা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেঃ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেম পুরো অংশ (ঐ যুদ্ধের আগে পর্যন্ত সেটা জর্ডানের অংশ ছিল) দখল করে নেয়। তাই এ নিয়ে পরে জাতিসঙ্ঘের পাস করা প্রস্তাব হল, এটা দখল করা এলাকা। ইসরাইল তার সংসদে পুরো জেরুসালেমকে নিজের রাষ্ট্রের অংশ-ভূমি বলে দেখিয়েছে। এর বিরুদ্ধেই জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশনটা হয়েছিল। কারণ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইসরাইল তাঁর সংসদ, প্রেসিডেন্ট হাউজ, প্রধানমন্ত্রীর অফিসসহ বহু কিছু জেরুসালেমে বানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে  জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ছিল – জাতিসংঘের ঐ রেজুলেশন, নম্বর ৪৭৮, ২০ আগষ্ট ১৯৮০।   ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ঐ সিদ্ধান্তে, বিদেশী সব মিশন বা অ্যাম্বাসির অফিস  জেরুসালেমের বাইরে নিতে সব সদস্য রাষ্ট্রকে বলা হয়।

  1. Decides not to recognize the “basic law” and
    such other actions by Israel that, as a result of this law,
    seek to alter the character and status of Jerusalem and
    calls upon:
    (a) All Member States to accept this decision;
    (b) Those States that have established diplomatic
    missions at Jerusalem to withdraw such missions from
    the Holy City;

এখানে “বেসিক ল” মানে হল ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে, ঐ “বেসিক ল” বলে পুরা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখল করা এলাকা বলে জায়েজ করা হয়েছে। তাই জাতিসংঘ গৃহিত ঐ প্রস্তাবে “বেসিক ল” এর ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় নাই বলা হচ্ছে। তাই 5(b) অনুচ্ছেদে, সকল সদস্য রাষ্ট্রকে জেরুজালেমে কেউ ইতোমধ্যে অফিস খুলে থেকে থাকলে তা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

বাস্তবে তাই এই কারণেই ইসরাইলে অন্য সব রাষ্ট্রের অ্যাম্বাসি জেরুসালেম থেকে ৬৫ কিমি দূরে তেল আবিবে স্থাপিত। অর্থাৎ আমেরিকাসহ কোনো রাষ্ট্রই ইসরাইলের দখলি এলাকায় নিজের অফিস খুলে নিজেকে বিতর্কিত করতে চায়নি।

এবার সর্বশেষে,  ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রস্তাব আনা হয়েছিল। স্বভাবতই ভেটোদানের ক্ষমতাবান সদস্য হিসেবে আমেরিকার সেই প্রস্তাবকে ভেটো দিয়ে স্থগিত করে দেয়। ওই ভেটো দেয়ার আগে জাতিসঙ্ঘে আমেরিকান স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি নিম্রতা হ্যালির (হা, তিনি মাইগ্রেটেড ভারতীয় শিখ পরিবারের সন্তান, শিখ অরিজিন আমেরিকান ও রিপাবলিকান) দেয়া বক্তৃতায় বলেন, “সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা নিজের অ্যাম্বাসি কোথায় বানাবে, আদৌ বানাবে কিনা তা নিজে ঠিক করবে। ফলে যারা প্রস্তাব এনেছিল তারা আমেরিকাকে অপমান করতেই এই প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করেছিল”। নিকির এই মন্তব্য শুনে পাঠকেরা অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন যে, হ্যাঁ, তাই তো আমেরিকান সাবভৌমত্বের কথা তো ঠিক মনে হচ্ছে। না বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। কারণ জেরুসালেম হলো অন্যের ভূমি, যা ইসরাইলের দখল করা। কারো কোনো দখলি ভূমিতে অ্যাম্বাসি খোলার অধিকার আমেরিকা বা ইসরাইলেরও নেই। আরো বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হলো ওটা দখলি ভূমি, corpus separatum। অর্থাৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ইসরাইল ও আমেরিকার এমন বহু সিদ্ধান্ত আছে। সিএনএনকে দেয়া ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিকির সাক্ষাতকার দেখুন, কিছু নমুনা পাবেন এই ক্লিপে। সে জাতিসংঘের কোন রেজুলেশন যে আছে তা লুকিয়ে কথা বলে যাচ্ছে।  তাহলে মূলকথা হলো জর্ডান-ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে নিয়ে তা নিজের (‘বেসিক ল’) বলে দাবি করে সেখানে ইসরাইল তার রাজধানী গড়েছে। আর ওদিকে এবার কথা ঘুরিয়ে বলছে, ইসরাইলের রাজধানী কোথায় হবে এটা ঠিক করার অধিকার ইসরাইলের সার্বভৌম অধিকার। হ্যাঁ, অবশ্যই তার অধিকার যদি সেটা কোনো দখলি জমিতে না হয়।

ঠিক একই মিথ্যা যুক্তিতে জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশন অমান্য করে, ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় একটি আইন পাস হয়েছিল। তার নাম ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’, এই পিডিএফ লিঙ্ক থেকে আগ্রহিরা তা নামিয়ে নিতে পারেন। এই আইন আমেরিকান সিনেট ও সংসদে ১৯৯৫ সালে পাস হয়ে ও পরে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হয়েছিল। ওই আইনের সেকশন দুইয়ের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে জেরুসালেমের দুই অংশ এক হয়ে যায়।’ [(6) In 1967, the city of Jerusalem was reunited during the conflict known as the Six Day War.]

কিন্তু কীভাবে এটা ঘটেছিল? দুই অংশ নিজেরাই হেঁটে হেঁটে দুই বোনের মিলনের মত? নাকি যুদ্ধে মানুষ মেরে, খেদিয়ে দখল করে নেয়াতে? এ কথা সেখানে বলা নেই। এই আইনটি হল (মূল কথায় বললে), আমেরিকা যেন ১৯৯৯ সালের ৩১ মের মধ্যে ইসরাইলে তাদের অ্যাম্বাসি তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নেয় সেজন্য আমেরিকার নির্বাহী রাষ্ট্রপতিকে আইনগত বাধ্যবাধকতায় আনার জন্য প্রণীত আইন এটা। তবে একটি ছাড় আছে সেখানে যে, প্রেসিডেন্ট এটা করতে ব্যর্থ হতে পারবেন কেবল এক শর্তে; যদি তিনি আগাম কংগ্রেসকে জানান যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণে তিনি এটা নির্ধারিত সময়ে করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর এভাবে তিনি ছয় মাস ছয় করে বার বার সময় বাড়িয়ে চলতেই থাকতে পারবেন। গত ১৯৯৫ সালে বিল ক্লিনটনের আমলে এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ক্লিনটনের পরের ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকান উভয় প্রেসিডেন্টই ওই আইনের সেকশন সাত-এর ‘প্রেসিডেন্টের ওয়েভার’ বা ছাড় [SEC. 7. PRESIDENTIAL WAIVER.] এর সুবিধা নিয়ে ওই আইন বাস্তবায়ন না করে ছাড় ছয় মাস করে করে বাড়িয়েই চলে আসছেন। এবার ট্রাম্প বলছেন তিনি ছাড় না নিয়ে আইনটা সরাসরি বাস্তবায়ন করবেন, এই হল ঘটনা।

১৯৪৮ সালে ইসরাইল জন্মের সময় থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল তার স্বপক্ষে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। সেটা ইসরায়েলের কাছে একেবারে “না হলে নয় এর মতো প্রয়োজনীয়” ছিল, ফলে কঠিন বিষয়। কিন্তু তা সফল হয়েছিল আমেরিকার সমর্থনে। সেই থেকে আমেরিকান জনমত নিজের পক্ষে রাখা হয়ে আছে ইসরাইলের ধ্যানজ্ঞান। ট্রাম্পের তাই নিজে কেন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন এর স্বপক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছেন এভাবে যে, আগের প্রেসিডেন্টরা সবাই নির্বাচনের সময় ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন, তাই তিনি হচ্ছেন সেই সাচ্চা বীর যে এটা বাস্তবায়ন করছেন।

স্বভাবতই ট্রাম্পের এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া হয়েছে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে। জাতিসঙ্ঘের ভেতরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে, নিরাপত্তা কাউন্সিলের আমেরিকাবিরোধী প্রস্তাবে আমেরিকা ভেটো দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারলেও এরপর প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শোচনীয়ভাবে আমেরিকা হেরে যায়। আমেরিকার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে মানা- এটা ‘null and void’ বলে বাতিল করে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে ভোটাভুটি নেয়া হয়। তোলা এই প্রস্তাবের পক্ষে ১২৮ রাষ্ট্র ভোট দিয়ে প্রস্তাবকে জিতিয়ে দেয়। ওদিকে মাত্র ০৯ রাষ্ট্র বিপক্ষে আর ৩৫ রাষ্ট্র বিরত থেকে ভোটদান সম্পন্ন করেছিল। [The United Nations has voted by a huge majority to declare a unilateral US recognition of Jerusalem as Israel’s capital “null and void”.]

এখানে নিউ ইয়র্ক টাইমস ব্যতিক্রমি আমেরিকান মিডিয়া হিসাবে একটা সততার কাজ করেছে। তাঁর এক বিশেষ রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত জেরুজালেম নিয়ে জাতিসংঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করেছে” [Trump’s Move Departs From U.N. Resolutions on Jerusalem]। এই রিপোর্টের তাতপর্য হল, সমস্ত আমেরিকান মিডিয়া এবং প্রশাসন যখন জেরুজালেম যে দখলি এলাকা সেকথা লুকিয়ে যাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের রেজুলেশনের অস্তিত্ব লুকিয়ে কথা বলে যাছে; সেখানে ট্রাম্পের ঘোষণার পরের দিন নিউ ইয়র্ক টাইমস  ০৭ ডিসেম্বরে এসে সরাসরি এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এখানে আমেরিকা জাতিসংঘের মোট নয়টা রেজুলেশন (UN Resolution UN Resolution 1073 Sep 1996UN Resolution 1322 Oct 2000UN Resolution 1397 Mar 2002UN Resolution 181UN Resolution 2334 Dec 2016UN Resolution 242 Nov. 1967UN Resolution 252 May 1968UN Resolution 465 Mar 1980UN Resolution 478 Aug 1980UN Resolution 672 Oct 1990,) ভঙ্গ করেছে এর একটা তালিকা করে দেয়া হয়েছে।

ওদিকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে, তাঁর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পক্ষে ইউরোপের বন্ধুদের মন পাওয়ার চেষ্টায় সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন সফরে বের হয়ে একেবারে খালি হাতে ফিরে আসেন। কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্র ট্রাম্পকে সমর্থন করতে রাজি হয়নি। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও কোনো সমর্থক রাষ্ট্র পাওয়া যায়নি। সারাক্ষণ ইরান-ভীতিতে থাকা সৌদি আরব ও তার বন্ধুরা ইসরাইলকে বাস্তবে কাছের ও নিজের মনে করলেও, সৌদি আরব বা তার বন্ধুরা কেউই এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ায়নি। বরং সৌদি আরবও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘নিন্দা করে গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের এই দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছিল সাধারণ পরিষদের ভোটেও। বলা যায় সারা দুনিয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেয়ে প্রস্তাব নিয়েছে।  নিকি হ্যালির মতো রিপাবলিকান জন বোল্টনও বুশের আমলে (২০০৫-৬) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। যে কোন ভোটাভুটিতে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে আমেরিকার পক্ষে রাখার ও পক্ষে ভোট নেয়ার আবিষ্কারক তিনি। এবার নিকি হ্যালিও সেই জন বোল্টনের পুরনো পথে নেমেছেন। তবে এবার এর বিশেষত্ব হল, এটা খুবই ন্যাংটা। কারণ তিনি প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন যেটা বোল্টন কখনো করেননি। অথচ নিকি বলেছেন, ভোট না দিলে এইড বন্ধ হয়ে যাবে, দেখে নেবো ইত্যাদি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি, উল্টো আমেরিকার ইজ্জত গেছে। নিকি আসলে ভুলে গেছেন এটা আর সেই আমেরিকার রুস্তমির দিন নয়, তা শেষ। তাই এক ইসরাইল ছাড়া আমেরিকার পক্ষে বাস্তবে ন্যূনতম গুরুত্ব দেবার মতো কোনো রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি।

ট্রাম্পের ইউরোপের সমর্থন না পাওয়ার মূল কারণ কী? আমেরিকা জাতিসংঘ রেজুলেশন অমান্য করে  ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’ আইন করেছে।  বলা যায় সেটা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পুর্ব জেরুজালেমকে অবৈধ ও গায়ের জোরে জমিদখলকে স্বীকৃতি দিয়ে এর উপর দাঁড়িয়ে বানানো। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান জাতিসঙ্ঘের রেকর্ড অনুসরণ করে নেয়া  অবস্থান। শুধু তাই না এটা যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তাও ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক পত্র দিয়ে জানিয়েছে বহু আগেই ।  সে মোতাবেক, ১৯৯৯ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক রেজুলেশন হলো যে জেরুসালেম corpus separatum।

এছাড়া এদিকে ইউরোপের বিবেচনায় এখন ট্রাম্পের এই প্রস্তাব কোনো জরুরি অথবা রাজনৈতিক লাভালাভের ইস্যু ছিল না। এ ছাড়া, বেশির ভাগ ইউরোপীয় বন্ধুরা বলছেন, তারা মনে করছে এতে আমেরিকার ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে, যেটা হবে এক কাউন্টার প্রডাকটিভ কাজ। আসলে বেশির ভাগ রাষ্ট্রই “দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়ে ফেলা” ভুল হবে এই যুক্তিকেই বেশি সামনে আনছেন। কারণ এই অবস্থানটা আসলে ‘জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী কিনা’ এই বিতর্কে কোনো অবস্থান না নিয়ে থাকার অবস্থান। এ ছাড়াও এতে জেরুসালেম ইস্যুটা আলোচনা নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরসিত হোক, এই আকাঙ্খার অবস্থানে থাকা যায়। তবে সার কথা, আমেরিকা এখন পুরাপুরি একঘরে হয়ে গেছে, সেটা আনন্দবাজারেরও নজরে এসেছে

তাহলে ট্রাম্প এমন অবস্থান তিনি নিজেকে নিয়ে গেলেন কেন? যেখানে এমনকি এটাও এখন জানা যাচ্ছে যে, এই সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্পের মতামতদানের বৈঠকে প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্রসহ সব উপদেষ্টারা সবাই তাকে না করেছিলেন। তিনি কারও কথা শোনেননি। এ অবস্থার একটি ব্যাখ্যা বা উত্তর দিয়েছে, আমেরিকার শতবর্ষী পুরনো এক গবেষণা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান – ব্রুকিংস (Brookings)। তাদের এক রিপোর্ট এর শিরোনাম হল, মূলত খ্রিষ্টান ইভানজেলিকদের খুশি করতে বা তাদের বিজয়ী করতে ট্রাম্প এটা করেছেন। [Trump’s Jerusalem decision is a victory for Evangelical politics] কথাটা ব্যাখ্যা করতে ‘খ্রিষ্টান-জায়নিস্ট’ বলে একটা টার্ম এনেছে ব্রুকিংস। [লিখেছে, in particular the views of Christian Zionists, who believe that the return of the Jews to the Holy Land is in accordance with God’s will, and biblical prophecy.] এছাড়া, এ প্রসঙ্গে তারা বেশ কিছু জনমত সার্ভেও করেছে, যার হদিস আছে ওদের রিপোর্টে সেখানে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

ট্রাম্পের আমেরিকা কী আসলে সন্ত্রাস-দমন চায়?
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ট্রাম্পের এই ‘ইসরাইলি’ সিদ্ধান্ত – বলতে গেলে আসলে সারা পশ্চিমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১৭ বছর ধরে পশ্চিমের নাম্বার ওয়ান গ্লোবাল কর্মসূচি হল, ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাস-দমন। কাউকে সন্ত্রাসী মনে হলে পশ্চিম তাকে অস্তিত্বহীন করে দিতেও দ্বিধাহীন থাকে। এদিকে এটা বুঝতে কাউকে গবেষকও হতে হয় না যে, পশ্চিম যাকে ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বলছে এই ফেনোমেনা আসলে এই বেইনসাফির প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। যেখানে হয়ত কাম্য ধরণের প্রতিক্রিয়া এটা নয়। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া  হাজির হবার পিছনে সবচেয়ে বড় এক কারণ হল, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, ভূমি দখল, অবাধ্য ইসরাইল- ফলে ফিলিস্তিদের প্রতি বে-ইনসাফ, উদাসীন্য, তাদের দীর্ঘ মানবেতর জীবনে ফেলে রাখা ইতাদি। তাই এই ‘গ্লোবাল টেররিজম’ ফেনোমেনার একমাত্র ও আল্টিমেট জবাব ও করণীয় হল, মজলুমের পক্ষে সবলে দাঁড়ানো ও ইনসাফ দেয়া। অথচ ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন উল্টো। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সারা দুনিয়াতে মানুষ বে-ইনসাফিতে তাদের অসহায়বোধ আরও চরমে উঠছে। উল্টা বললে, তাহলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত, এটা কি গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্মসূচি নয়? ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্তা কি তাহলে ট্রাম্প হতে চাচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাব ট্রাম্পকে দিতে হবে, আজ অথবা কাল।

অন্যের জমি দখলের ও একাজের পক্ষে সাফাইদানে ওস্তাদ ইসরায়েল
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের ফলে আমরা বেশ কিছু প্রো-ইসরাইলি ভাষ্য ও ভাষ্যদাতাদের চিনতে পেরেছি। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো বোস্টনের ‘দা আটল্যান্টিক’, মাসিক এই ম্যাগাজিন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি। কেন তা নিয়ে এক আর্টিকেল ছেপেছে তারা, শিরোনাম- ‘অবশেষে এই প্রেসিডেন্টকে পাওয়া গেল যে ইসরাইলকে লজিক্যালি দেখেছে’। [Finally, a President Who Looks at Jerusalem Logically]। তারা ট্রাম্পের কাজের মধ্যে এই প্রথম যুক্তি খুঁজে পেয়েছে, কী আর করা!

এছাড়া, আর সবচেয়ে ভয় পাওয়া এক আর্টিকেল দেখা গেছে হংকং থেকে প্রকাশিত অনলাইন ‘এশিয়া টাইমসে’। পশ্চিমের বাইরে এশিয়ায় দু’টি ব্যাপক কাভারেজের উঠতি পত্রিকার একটা হলো এটা। এর কলামিস্ট হলেন ডেভিড পি গোল্ডম্যান যিনি  SPENGLER ছদ্মনামে লেখেন। অথচ তার লেখা কলামের শিরোনাম হলো, ‘অমর্যাদা করে মুখ ঠেসে ধরা : মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ’ (Humiliation – the only path to peace for the Middle East)।

ডেভিডের যুক্তি খুব সহজ। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে বিরোধের ফয়সালাকেই দুনিয়ার সব বিতর্ক বিবাদের সঠিক ও ন্যায্য ফয়সালা মনে করেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা হল, ‘হারু পার্টি আরবরা হেরেও ইসরাইলের কাছে হার স্বীকার করে না এমন নাছোড়বান্দা’। তাই তিনি এবার নতুন ওষুধের প্রেসক্রপশন হিসেবে বলছেন, “যুদ্ধে পরাস্তের পরে আরেক ধাপ হল ওদেরকে মানে হারু পার্টিকে মুখ মাটিতে ঠেসে ধরার মতো চরম অমর্যাদার অবস্থায় ফেলে দিতে হবে, তাহলে এবার তাঁরা হার মানবে। আর ঝামেলা করবে না। দেখেন না জাপানে কী হয়েছিল! দুটি আণবিক বোমা মেরে দেয়াতে মাটিতে ওদের মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। তাই চুপ মেরে গেছে…।” এই হল ডেভিড পি গোল্ডম্যান। ‘এখন আমরা সুজনেরা বুঝে ফেলেন কী বলতে চাইলেন ডেভিড। ডেভিড আমাদেরকে যেটা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হল – দুনিয়ায় ন্যায়-অন্যায়, ন্যায্য-অন্যায্য, মানে ইনসাফের ধারণা এগুলো খামোখা, কিছু না। ফলে কেউ যুদ্ধে হারলে বুঝতে হবে সে অন্যায়কারী, অন্যায্য। অর্থাৎ যার গায়ের জোর বেশি সেই সঠিক ও ন্যায্য।

এটাই জায়নিস্ট বুঝ। তা আমরা আগেও দেখেছি। যে অন্যের জমিতে তারা ইসরাইল রাষ্ট্র গড়েছে তা তাদের হল কী করে, কিসের ভিত্তিতে? এটা বুঝাতে এরা সবসময় ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার কথা আনে’ আমরা দেখেছি। যেহেতু গায়ের জোরে তারা অন্যের ভূমি দখল করেছে, ফলে তা ন্যায্য। এই তত্ত্বই তারা কপচাতে থাকে। ফলে সেটাই সঠিক ও ন্যায্য। হিটলারের হাতে নির্মম মার খেয়ে এরা ইনসাফের ওপর আস্থাহীন বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তবু ইনসাফ ফিরে আসবেই। আমাদের তা লাগবে। ইনসাফ কায়েম করতেই হবে। সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে ইনসাফের ওপর। ইনসাফের ওপর সমাজের আয়ু, শ্রীবৃদ্ধি ও টিকে থাকা নির্ভর করে। যদিও আবার সাময়িক বে-ইনসাফিও দেখা দিতে পারে। তবে তারও একমাত্র সমাধান ও স্থিতিশীলতা আনার জাদুকাঠি হল ইনসাফ কায়েম। আমেরিকার পরাশক্তি অবস্থান একটু ঢিলা হতে শুরু করলে ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার’ তত্ত্ব আর ইসরাইলকে বাঁচাতে পারবে না; তারা তা আর কপচাবেও না। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জেরুসালেম : একমাত্র সমাধান ইনসাফ’, শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2oJ

ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

কোন মুসলমানকে কেউ নমিনেশন দেয় নাই কেন

বার্মার গত নির্বাচনে কোন মুসলমানকে কেউ নমিনেশন দেয় নাই কেন

গৌতম দাস

০৯ অক্টোবর ২০১৭,  মঙ্গলবার ০০:১৯

http://wp.me/p1sCvy-2iq

মায়ানমারে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হল বার্মিজ; অনেকে এদেরকে বামার বা বর্মানও বলে থাকে। এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০%। বিগত ১৮২৪ সালে বৃটিশ কলোনির বার্মা দখলেরও আগে থেকেই বার্মার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি বামার এবং এরাই নিজ জনগোষ্ঠির নামে দেশের নাম রেখেছিল বার্মা। বার্মিজ ছাড়া বার্মায় অন্যান্য আরও অসংখ্য জনগোষ্ঠি আছে; যেগুলোর মধ্যে একালে তালিকাভুক্ত বা ক্ষমতাসীন  সরকার স্বীকৃত এমন জনগোষ্ঠি হল ১৩৫ টা। এরপরেও রোহিঙ্গারা এই ১৩৫ জনগোষ্ঠির ভিতরের একজন কেউ নয়। অর্থাৎ আগামিতে স্বীকৃতি পেলে রোহিঙ্গারা হবে সম্ভবত ১৩৬তম জনগোষ্ঠি। তাই সারকথায় বললে, বার্মায় ৬০% বার্মিজদের বাইরের ৪০% হল এই ১৩৫+, এতগুলো জনগোষ্ঠি। আবার এই ৪০% জনগোষ্ঠি এরাও এক বড় রকমের সংখ্যা মানতেই হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বৃটিশ শাসনমুক্ত হবার রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরবর্তিতে স্বাধীন বার্মা কায়েম হবার পর ১৯৪৮ সাল থেকেই বার্মিজ জনগোষ্ঠির নেতারা সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভেদমুলক যে রাজনৈতিক কাজ ঘটিয়েছিল তা হল, ঐ স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়া  অ-বার্মিজ সব জনগোষ্ঠিকে সেনাবাহিনী থেকে পদচ্যুত করিয়ে দেয়া এবং রাজনৈতিক গুরুত্বপুর্ণ সব পদ থেকেও তাদের অপসারণ করে দেওয়া। এই দুই কাজ ঘটিয়ে বার্মার ক্ষমতা ও নেতৃত্ব থেকে সব অ-বার্মিজদের মুছে দেয়া হয়েছিল। যে কোন ‘অপর’ এর প্রতি এই মনোভাব, অ-বার্মিজদের প্রতি সে ট্রাডিশন ও চিন্তার চর্চা আজও মায়ানমারে সর্বত্র।  ফলে বার্মা স্বাধীন হবার পরও অন্যান্য জনগোষ্ঠির মুক্তি ও স্বায়ত্বশাসনের দাবি ও লড়াইকে শাসক বর্মী জাতিগোষ্ঠি নির্মমভাবে দমন নির্মুল – একমাত্র এই পথে মোকাবিলা করেছিল। এটা আরও নির্মম নিষ্ঠুর ভাবে ঘটেছিল ১৯৬২ সালে (আসলে ১৯৫৮ সাল থেকেই যখন তিনি সামরিক জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন দুবছরের জন্য) জেনারেল নে উইনের হাতে, যা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল। অ-বর্মিজদের সাথে কোন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদ বা রিসোর্স শেয়ার না করার সিদ্ধান্ত – এটাই সব বার্মার সব সমস্যার গোড়া। বার্মার আদি সমস্যা এই ৪০% অ-বার্মীজ জনগোষ্ঠিকে দাবায় রাখা, নির্মুল করা্র চিন্তা থেকে জাত। আর এর মধ্যেকার মাত্র ৪% হল মুসলমান। তাও এরা সবাই কেবল বার্মার রাখাইন প্রদেশের মুসলমান বাসিন্দা  এমন নয়। বার্মার সব প্রদেশেই স্বল্প হলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলমান জনগোষ্ঠি আছে। এদের সবাই আর সাথে রাখাইন প্রদেশের মুসলমান, এভাবে মিলিয়ে মোট জনগোষ্টির  ৪% হল মুসলমান।

গত ১৯৮৮ সালে নে উইনের পতনের পরে অ-বর্মিজ জনগোষ্ঠিকে দাবিয়ে রাখার  আর এক নতুন কৌশল চালু করা হয়েছিল। এই কৌশলটা হল মুলত আগের বর্মিজ-অবার্মিজ ভাগাভাগিটাই থাকবে কিন্তু সেটাকে আড়ালে পিছনে লুকিয়ে ফেলে রাখার কৌশল নিতে হবে।  জাতিগোষ্ঠির ভিত্তিতে, এদিক থেকে ভাগ করে দেখালে বার্মিজেরা মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগের বেশি হয় না। কিন্তু ভাগটা যদি করা হয় কতভাগ বৌদ্ধ এবং অ-বৌদ্ধ – এই ভিত্তিতে? এতে এক বিরাট লাভ হয়। কারণ তাতে এবার দাড়ায় ৮৮% বৌদ্ধ, ৬% খ্রীশ্চান, ৪% মুসলমান ইত্যাদি। এতে চোখে পড়ার মত মেজরিটি হয়ে যায় বৌদ্ধ। ফলে এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রাজনীতি চালু করে এই আড়ালে এর ভিতরে বর্মানদের পুরান একছত্র শাসনের রুস্তমি সহজে ঢেকে রাখার এক ভাল সম্ভাবনা দেখেছিল জেনারেলেরা। তাই জেনারেলরা সিদ্ধান্ত নেয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মিজদের একছত্র শাসনকে তারা এরপর থেকে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এই আড়াল থেকে চালু রাখবে। যেমন কাচিন বা শান জনগোষ্ঠি যারা নিজ প্রভাবাধীন প্রদেশের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্মিজ দমন-শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতার রাজনৈতিক সংগ্রাম করছে এদের কাছে বার্মিজ শাসক জেনারেলেরা নিজেদেরকে তখন থেকে হাজির করেছিল এভাবে যেন শাসকেরা আর বার্মিজ নয়; বরং কাচিন বা শান জনগোষ্ঠির মতই শাসকেরাও একই বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির লোক। আর এই ভড়ং এর আড়ালে বার্মিজ দানব শাসকের দমনের চেহারাটা যতটা সম্ভব আড়ালে ফেলে রাখতে সুযোগ নেওয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। এটা ছিল আসলে বার্মাকে নতুন করে কমন আকার দেয়া যেন এক “বৌদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির” পরিচয়ে সে উঠে দাড়াতে চাইছে । অথচ যার আড়ালে ততপর থেকে আছে আগের মতই বর্মিজ একছত্র দানব। এই নতুন পরিচয়কে পোক্ত করতেই কমন এনিমি বা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে কমন শত্রু হিসাবে মুসলমানদের দেখানো শুরু হয়েছিল। সাধারণত দেখা যায় কমন এনিমি ব্যাপারটা যতই শানিত বা তাতানো রাখা যায় ততই তা দিয়ে আভ্যন্তরীণ দমণ অসন্তোষকে ভুলিয়ে রাখা যায়।

নে উইন উত্তরকালে নতুন করে দমননীতি আসায় আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মায়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ একে নানা ধরণের অবরোধের মধ্যে রেখেছিল সেই ১৯৯৩ সাল থেকেই। এর ভিতরেই বার্মিজ একচেটিয়া শাসন নিজেকে নতুন আড়ালে নিয়ে বৌদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির পরিচয়ের রাজনীতি হিসাবে হাজির হয়েছিল। তবে মুসলমানদেরকে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের কমন শত্রু হিসাবে হাজির দেখানোর আর এক শেষ পর্যায়টা গড়াটা তখনও বাকি ছিল। যেটা সম্পন্ন করে নেয়া হয়েছিল ২০১১-১৫ সালের সরকারের শাসনকালে।

অর্থনৈতিক অবরোধে আটকে থাকা বার্মা  আমেরিকার ফ্রন্ট-রানার দুতয়াল হিসাবে ভারতকে হাজির পেয়েছিল ২০০৭ সাল থেকে। ফলে পশ্চিমের সাথে কী করলে তারা তাদের অবরোধ তুলে নিবে এর এক নিগোশিয়েশন  আলোচনা শুরু হয়েছিল। বার্মা পশ্চিমকে কোন কোন ব্যবসা-বিনিয়োগের সুযোগ দিবার বিনিময়ে আর কিছু কিছু কোন রাজনৈতিক সংস্কার করলে জেনারেলেরা পশ্চিমের সমাজে নিজ পণ্যসহ নিজেরা অবাধ গম্য হতে পারবে – এসব থাকত সেসব নিগোশিয়েশন  আলোচনার মুল প্রসঙ্গ। অন্যভাবে বললে রাজনৈতিক সংস্কার কথাটা যতই বড় শুনাক না কেন – একছত্র বার্মিজ সামরিক ক্ষমতাকে অটুট রেখে কেবল সুচিকে উপর দিয়ে একটা অলঙ্কার হিসাবে চড়িয়ে দেয়া – এই ছিল সেই সংস্কার। এতটুকুকেই বিরাট সংস্কার করা হয়েছে বলে বার্মিজ জেনারেলদের সার্টিফিকেট দিয়েছিল আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো; আর তাই থেকে এটাই মায়ানমারের আর এক সমস্যা এবং আজকের রোহিঙ্গা সংকটের আর এক উৎস হয়ে যায়। এই ফর্মুলায় বর্মিজ জেনারেলেরা নিজের একছত্র ক্ষমতা তাঁর কেবল নিজের, এই কথা লিখে নিয়েছিলেন যেখানে সেটাকেই ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশন বলে মেনে নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল সু চির পার্টিকে অলঙ্কারিক হিসাবে মেনে নিয়ে ক্ষমতায় আনা হবে বটে তবে তা ২০১০ এর নির্বাচনে নয়; অর্থাৎ এর পরের ২০১৬ সালের নির্বাচনে। এরই পুর্ব- প্রস্তুতি ছিল ২০১০ সালের  তথাকথিত নির্বাচন ও ক্ষমতা। আর একাজের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনী সেই বার নিজেই আগে একটা দল গঠন করে নিয়েছিল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলবমেন্ট পার্টি (USDP)’ নামে। আর এই দলের নামেই তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়েছিল। অনুমান করা হয়, সু চির দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স বা এনএলডি আপোষে ২০১০ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল; আর ২০১৫ সালের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  আবার USDP আসলে ছিল মূলত সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং প্রাক্তন অফিসার-সৈনিকদের রাজনৈতিক দল। যদিও এমনিতেই তখনও সংসদের ২৫ ভাগ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কর্মরত সেনা অফিসারদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

আমাদের আলোচনার প্রাসঙ্গিক সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময়কাল হল এই ২০১০-১৫ সাল, যখন ক্ষমতায় আসীন এই USDP।

ঐ সময়কালে জেনারেলেরা বার্মার রাজনীতির অভিমুখ বেধে দেওয়ার কাজটা করে রেখেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, সু চি ভোটের রাজনীতির মাঠে নামার আগেই বার্মার রাজনীতির অভিমুখ বেধে দেওয়া; ইসলাম বিদ্বেষী এক “চরম উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” ছাড়া অন্য কোন রাজনীতি চলতে না দেওয়া এবং এই রাজনীতি করতেই সু চি সহ সবাইকে বাধ্য করা। এই কাজে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটা বড় অংশকে সামরিক বাহিনী নিজে সংগঠিত করেছিল। এবং সামরিক বাহিনীর নিজ রাজনৈতিক দল USDP এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের এই সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করত।

বুদ্ধিষ্ট ভিক্ষুদের এই সংগঠনের এক সাংগঠনিক নামও দেয়া হয়েছিল; প্রথমে সামাজিক সংগঠন হিসাবে এর নাম ছিল “কমিটি ফর প্রটেকশন অব ন্যাশনিলিটি এন্ড রিলিজিয়ন”। আঞ্চলিক ভাষার যার নাম “মা বা থা” পরে রাজনৈতিক দল হিসাবে এর রেজিষ্ট্রেশনও নেয়া হয়েছিল। যদিও প্রথম আত্মপ্রকাশের সময় এই সংগঠন দাবি করেছিল (টার্গেট করে মুসলমানদের বিরোধী) “রেস ও রিলিজিয়ন” সম্পর্কিত  চারটা আইনের খসড়া তারা তৈরি করবে, আর তা সংসদ থেকে পাশ করিয়ে আনতে প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করবে। এই আইনের পক্ষে প্রচার ও জনমত তৈরির জন্যই মা বা থা সংগঠনের জন্ম দেয়া হয়েছে।  ওদিকে সাবেক জেনারেল থেন সেনের হাত দিয়ে বর্মিজ কর্মরত জেনারেলেরা USDP নামে রাজনৈতিক দল খুলেছিল, দলের সভাপতিও ছিলেন থেন সেন। আবার ২০১০ সালের তথাকথিত নির্বাচনে USDP এর প্রার্থী হিসাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি; আর  সব রাজনৈতিক সংস্কারগুলোও হয়েছিল তার সরকারের হাত দিয়ে। তিনিই ‘মা বা থার’  প্রস্তাবিত চার আইন সংসদে পেশ করেছিলেন। আইনগুলো হল, ১. (মূলত মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে তাদের নিগৃহিত করতে করা) ধর্ম বদল করতে হলে এই আইনে  আগে রেজিষ্ট্রেশন ও অনুমতি নিতে হবে। তা না হলে জেল ও জরিমানা করা হবে। ২. (একইভাবে মুসলমানদের কথা মনে রেখে তাদের জন্য করা) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন প্রদেশের সরকার যদি মনে করে যে তার কোন জনগোষ্ঠির জনসংখ্যা অন্য জনগোষ্ঠির সংখ্যার তুলনায় ভারসাম্য ছাড়িয়ে গেছে ফলে তুলনামূলক বেশি সামাজিক রিসোর্স ভোগ করছে তবে ব্যাপারটাতে সাম্য আনার জন্য প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রকে ব্যবস্থা নিতে বলবে এবং কেন্দ্র ব্যবস্থা নিবে।  (ভারতে বিজেপি-শিবসেনার মত এটা একই আর্গুমেন্ট যে মুসলমানেরা বেশি পয়দা করে, এর সাথে তুলনীয়।) ৩.  আন্তঃধর্মীয় বিয়ে নিষিদ্ধ করতে হবে। ৪। বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করা হবে। এই চার আইনের পক্ষে প্রচার এটাই নতুন “রেস ও রিলিজিয়ন” এর রাজনীতি হাজির করেছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। আসলে যেটা হল এক ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রাজনীতি; এরই দামামা।

এই চার আইনের মধ্যে প্রথম দুইটা ইতোমধ্যে সংসদে অনুমোদিত হয়ে গেছিল। তবে পরের দুটো প্রক্রিয়ায় কোথাও স্থগিত হয়ে আছে। কথিত আছে যে পুর্ব-এশিয়ার আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের সদস্যরা এব্যাপারে বিরূপ মনোভাব রাখাতে বাকি দুই আইনি প্রক্রিয়াকে আর সমাপ্ত করে নেওয়া হয় নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হলে আগেই বলেছি, এটা মূলত গেরুয়া কাপড়ধারী ভিক্ষুদের পরিচালিত এক সংগঠন, যারা সব প্রদেশব্যাপী ইসলাম-বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের পক্ষে ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত প্রবল প্রচার চালিয়েছিল । সেটা কখনও ঐ চার আইনের পক্ষে প্রচার অথবা আইনগুলো পাশ হয়েছে সেই সাফল্যের প্রচার ইত্যাদি নামের আড়ালে। যেমন একটা তথ্য দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিস্কার হবে। গত ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির এনএলডি এর প্রার্থী ছিল ১১৫১ জন। কিন্তু কোন মুসলমান সেই প্রার্থী তালিকায় ছিল না। অন্য কোন দলও কোন মুসলমান সদস্যকে নমিনেশন দেয় নাই। কারণ মুসলমান-বিরোধী প্রচারণাকে ‘মা বা থা’ এত উগ্রতায় ও তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল যে ভোটে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এই ভয়ে সু চি রাখাইন মুসলিম অঞ্চলেও কোন মুসলমানকে নমিনেশন দেন নাই।  ওদিকে ‘মা বা থার’ চরম উগ্র এক নেতা হলেন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু ইউ উইরাথু (ভিন্ন উচ্চারণে ঐরাথু বা ভিরাথু, U Wirathu)। আমেরিকান টাইম ম্যাগাজিন ঐরাথুকে নিয়েই ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এক কুখ্যাত প্রচ্ছদ স্টোরি করেছিল। শিরোনাম দিয়েছিল, “বুদ্ধিষ্ট সন্ত্রাসবাদের মুখচ্ছবি”। ঐরাথু খোলাখুলিই মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তিনি মনে করেন, “মুসলমানেরা দেশের জন্য, দেশের কালচারের জন্য হুমকি। তারা বেশি বাচ্চা পয়দা করে। তারা আমাদের নারীদেরকে রেপ করে। তারা আমাদের দেশ দখল করতে চায়, তাই আমাদেরকে বুদ্ধিষ্ট বার্মা রক্ষা করতে হবে”।  ইত্যাদি।

বাইরে থেকে দেখলে সেই ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই ঐরাথু ও তার নানান সংগঠন  (মা বা থা, ৩৬৫ এধরণের নানান নামে ) সু চির দলের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আসছে। গত নির্বাচনে ঐরাথু তাদের বিখ্যাত ‘ছয় প্রশ্ন’ তারা হাজির করেছিল। যেমন, ১. আপনি কী বুদ্ধিষ্ট? ২. আপনি ‘চার আইন’ সাপোর্ট করেন কি না? ৩. এই আইনগুলো রক্ষা করবেন কী না? ৪. আপনি ১৯৮২ সালের নাগরিক আইন বদলে ফেলবেন নাকি? ৫. কনষ্টিটিউশনের ৫৯ এফ বদলাবেন নাকি যে আইনে বিদেশি বিয়ে করেছে বলে সু চির প্রেসিডেন্ট হতে বাধা দেয়া আছে? ৬। “রেস ও রিলিজিয়ান” আন্দোলন সব সময় উর্ধে তুলে ধরতে প্রতিজ্ঞা করবেন কী না?

“They also urged people to ask six questions to candidates: whether they are Buddhist; do they support the four laws and would they protect them; will they try to change the 1982 Citizenship Law, used to restrict mainly Rohingya Muslims from becoming citizens; would they change section 59f of the constitution that in effect bars Daw Aung San Suu Kyi from the presidency; and would they promise to uphold “race and religion”.”

আজকে সু চির ক্ষমতারোহন ঘটে গেছে।  আর ইতোমধ্যে ৫ লাখ রোহিঙ্গা খেদানো আর হাজার পাচেক রোহিঙ্গা মেরে ফেলার পর সু চির সরকারের অবস্থান আর ভিক্ষু ঐরাথু-র অবস্থানের মাঝে আর কোন ফারাক নাই। অবশ্য বিবিসির মিশেল হুসেন ২০১৬ সালের এক সাক্ষাতকার নিবার সময় থেকে আমরা জানি ব্যক্তিগতভাবেও সু চি মুসলমান-বিদ্বেষে  ভুগছেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল ০৯ অক্টোবর ২০১৭।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

প্রথম পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

http://wp.me/p1sCvy-2hE

 

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

১৯৪৮ সালের বৃটিশ কলোনি শাসকমুক্ত মায়ানমারের জন্মের আগে থেকেই দমন নির্মুল আর নির্বিচারে হত্যা, এই রাষ্ট্রকে ধরে রাখার একমাত্র উৎস হয়ে গেছে ও আছে। বার্মা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যায় আকর্ণ ডুবে থাকার সমস্যা ওর জন্মের সময় থেকেই।  মায়ানমারের সবচেয়ে বড় এথিনিক জনগোষ্ঠি হল  ‘বার্মান’ বা ‘বর্মীজ’; এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ। এই বর্মী জনগোষ্ঠির রাষ্ট্র জন্মের পর থেকেই এর মূল সংকট হল অভ্যন্তরীণ অন্যান্য এথিনিক জনগোষ্ঠির সাথে সংঘাত;  অন্যভাবে বললে, বর্মীছাড়া অন্য এথিনিক জনগোষ্ঠিকে বর্মীজদের নিজেদের কর্তৃত্বের নিচে দাবায় রাখাকেই একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নেওয়া – এটাই সব বৈরীতা ও সংঘাতের উতস। অথচ এক ফেডারেল ব্যবস্থা হতে পারত এর সহজ সমাধান। বৃটিশ শাসনামলেও মায়ানমারে কোথাও কোথাও স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ ছিল।  কিন্তু ১৯৪৮ সালে জন্মের পর থেকে মায়ানমারে কোন ফেডারেল ব্যবস্থা  চেষ্টা না করে বরং পুরানা স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে সবকিছু বর্মীজদের অধীনে আনার জবরদস্তির চেষ্টা করা হয়েছে। আর তা থেকেই শুরু হয়েছে Bamar. Chin. Kachin. Kayin. Kayah. Mon. Rakhine. Shan ইত্যাদি জনগোষ্ঠির বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র ততপরতা। পরে সামরিক ক্যু করে জেনারেল নে উইনের বিগত ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলের পরও সেই বিচ্ছিন্নতাবাদে আকর্ণ ডুবে থাকা  অবস্থা থেকে বের হতে মায়ানমারের সরকারগুলো  “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” চর্চাকে উপায় হিসাবে হাজির করেছে। এই “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর আর নাম  “মায়ানমারিজম”। ফলে মায়ানমার রাষ্ট্রের আকার পরিচয় হয়েছে, “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী” ভিত্তিতে গড়া এক রাষ্ট্র। একমাত্র এতেই তারা ‘এক’ থাকতে পারবে  এমন আঠা বা গ্লু এর নাম হয়েছে “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ”, আর এর জিগির। যদিও এই নামের আড়ালে আসলে এক তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ চর্চা করে এসেছে তারা।  ব্যাপারটা পরিস্কার হবে মায়ানমারকে ধর্মীয় জনসংখ্যার দিক থেকে দেখলে। গত ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মায়ানমারের প্রায় ৮৮ ভাগ বৌদ্ধ,  ৬ ভাগ খ্রীশ্চান ও ৪ ভাগ মুসলমান। জনগোষ্ঠির বড় অংশ বৌদ্ধ বলে, এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বয়ান তৈরি করে ফেলা হয়েছে যা আবার ইসলাম বিদ্বেষী করে সাজানো – একে নিজের রাজনীতিক ভিত্তি হিসাবে বেছে নিয়েছিল নে উইন সরকার। নে উইনের অনুমান ছিল এতে মুসলমান বাদে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী জনগোষ্ঠিগুলোকে (প্রায় সবাই আবার বৌদ্ধ বলে ) “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর পরিচয়ে বেধে রাখতে। এতে  পুরান বর্মীজ আধিপত্যটা উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের (ইসলাম বিদ্বেষ) আড়ালে থেকে শাসনকাজ চালাতে পারবে। আবা ইসলাম বিদ্বেষী এই বয়ানটা  “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে” উগ্র আর গাঢ় হতে সাহায্য করবে। মুসলমানেরা সব বৌদ্ধ জনগোষ্টির কাছে এক ইমাজিনড কমন শত্রু হিসাবে হাজির করবে।  এটাই অনেকে মায়ানমারিজম বলে। এই মায়ানমারিজম তৈরি করতে পারার প্রথম সফলতা আসে ১৯৭৭ সালে। একারণে ১৯৭৭ সাল থেকে নে উইন তৈরি রোহিঙ্গা সমস্যার প্রথম প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিল এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী আসর জোয়ার দেখা গিয়েছিল। পরে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মায়ানমার বেশীর ভাগ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও, আবার ১৯৮২ সালের নতুন ইমিগ্রেশন আইন সবকিছুকে আগের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে যায়।  এরপর ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর এর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত থেমে থেমে সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা নির্মুল অপারেশন বিভিন্ন সময় চলেছে। এরপর আগের ‘মায়ানমারিজম’ সাথে এবার বয়ানে ‘ইসলামি সন্ত্রাসের’ অভিযোগ তুলার সুযোগ যুক্ত হয়েছিল। ফলে তা নিজের দানবীয় উগ্রতার পক্ষে আরও সাফাই নিয়ে হাজির হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে এক বৃটিশ সাংবাদিক ১৯৭১ সালের প্রথমার্ধে অভিযোগ করেছিলেন আপনি পুর্ব-বাংলার শরনার্থী লোকদেরকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করছেন। ইন্দিরার জবাব ছিল, ওরা কোনটা আগে হয়েছে, শরনার্থী না মুক্তিযোদ্ধা? একথার মধ্যে সব জবাব আছে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা বুশ-ব্লেয়ারের ২০০১ সালে ওয়ার অন টেররের যুদ্ধ শুরু আগে থেকেই রোহিঙ্গারা শরনার্থী হয়েছে। কাজেই একথাটা মোদি-সুচির সন্ত্রাসের বয়ান ও অভিযোগকে ভিত্তিহীন করে দেয়।

তাই বলা যায়, মায়ানমারের মুল সংকট রোহিঙ্গা বা মুসলমান ছিল না, নয়। বরং ‘মায়ানমানিজম’ এই বয়ান হাজির করার দরকারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। আর এটা বলা বাহুল্য ৮৮% বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির দেশে ৪% মুসলমান নিজে ভিকটিমই হয়, অত্যাচারিত মজলুমই হয়। অন্যের উপর অত্যাচার নির্যাতনকারি বা অন্যকে নির্মুলের কর্তা সে হতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে সে সুযোগ বিরাজ করে না।

মায়ানমান পরিস্থিতি ২০০৬ -৭ সাল থেকে এক নতুন মাত্রা পায়। আর ততদিনে মায়ানমার ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের নিন্দা ও অভিযোগের মধ্যে আর  আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ রকমের অবরোধের অধীনে। এমনিতেই জেনারেল নে উইনের শাসনামলে (১৯৬২-৮৮) বার্মা ছিল বাকশালী সমাজতন্ত্রের মত এক ‘নে উইনি সমাজতন্ত্রের’ অধীনে;  আর এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ ছিল জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-বিদ্বেষ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মায়ানমার এমন হওয়ার পিছনে ওর দুটা গঠন বৈশিষ্ট উল্লেখযোগ্য।

এর একটা হল জেনোফেবিক যার উৎস হল ভারতবিরোধীতা। ১৮২৪ সালে বৃটিশদের বার্মা দখল নিবার পর থেকে,  বার্মাকে ভারতের এক প্রদেশ (১৮২৪-১৯৩৭) বানিয়ে কলোনি শাসকেরা শাসন চালাত। [১৯৩৭ সালের পর থেকে বার্মা সরাসরি বৃটিশ শাসিত কলোনি হয়েছিল।] এতে ভারতীয় নেটিভদের মাধ্যমে বৃটিশরা শাসন করত, ফলে ভারতীয় কর্মচারি বা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেখানে ইত্যাদি। আর এখান থেকে একধরণের ভারতবিদ্বেষী জেনোফোবিক বৈশিষ্ট বার্মার জনমানসে ও  রাজনীতিবিদদের মধ্যে গেড়ে বসেছিল। ফলে বৃটিশেরা ১৯৪৮ সালে বার্মা ছেড়ে যাবার পর পর বহু ভারতীয় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর একই কারণে, ১৯৬২ সালে নে উইন সামরিক ক্যুতে ক্ষমতা দখলের পরে প্রায় চার লাখ ভারতীয় বার্মা ত্যাগ করেছিল অথবা মারা গিয়েছিল। (see Thant Myint-U’s recent fine historical travelogue, Where China meets India).

আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হল, ১৯৪২ সালের আগে সেকালের জাপান – কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক জাপান – এই কলোনি মাস্টারের হাতে সেকালের বার্মার স্বাধীনতা- যোদ্ধাদের সামরিক ট্রেনিং হওয়া। বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে কেড়ে নিবার পরিকল্পনায়, জাপানিজ কলোনি মাস্টার  মার্শাল তেজোর বাহিনীর হাতে, বেছে নেওয়া ত্রিশজন রাজনৈতিক তরুণ সামরিক ট্রেনিং পেয়েছিল। যারা পরে দেশ ফিরে প্রথম সামরিক সংগঠন ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’ বানিয়েছিল আর ১৯৪২ সালে জাপানিজ বাহিনীর সহায়তায় এরাই বৃটিশদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। সু কি বাবা অং সান (Aung San) এর নেতৃত্বে উ নু (U Nu) আর নে  উইন (Ne win) ও রাখাইন রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ – টপ এদের নেতৃত্বে ছিল সেই ত্রিশজনের দল। এদের নেতৃত্বেই নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে বার্মার সামরিক বাহিনীর ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’  (Burma Independence Army (BIA) গড়া হয়েছিল। বলা হয় জাপানিজদের দেয়া নির্মমতার ট্রেনিং, নির্যাতনের টেকনিক সেই থেকে বর্মীজ সেনাবাহিনীতে বৈশিষ্ট হয়ে যায়। পরে অবশ্য ১৯৪৫ সা্লে এসে এরা সবাই জাপান এম্পায়ারকে ছেড়ে বৃটিশ এম্পায়ারের পক্ষে সুইচ করেছিল। আর পরে এই ত্রিশ কমরেড এরাই ১৯৪৮ সালে নিগোশিয়েশন করে বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেছিল। আজও মায়ানমারে সব রাজনৈতিক সামাজিক গোষ্ঠির মধ্যে তাদের চিন্তা ও বয়ানে (সস্তাবুঝের) দেশপ্রেম ও জাতীবাদের উদাহরণ বা হিরো হয়ে আছে ঐ ত্রিশ জন। গেড়ে বসা ঐ ত্রিশজন সম্পর্কে নানান মিথ এবং তাদের চিন্তা ও বয়ান ভেঙ্গে নতুন করে তা ভেবে দেখা, ফিরে দেখা আর নতুন করে মুল্যায়নের সাহস না হওয়া পর্যন্ত মায়ানমারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি তার নির্মমতা, নির্মুলের সামরিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
কিন্তু এখনকার মূল প্রসঙ্গ হল, কলোনি শাসক জাপানিজদের হাতে জন্ম হবার কারণে ‘রাজনীতি’ বিষয়টাকে এই ‘ত্রিশ জেনারেল’ যতটা ক্ষমতা, সামরিকতার দিক থেকে বুঝেছিলেন ঠিক ততটাই যেন রাজনীতি বলতে একই সাথে আইডিয়া বা চিন্তাও – এদিকটা বুঝতে ব্যর্থ ছিলেন।  রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা ও সামরিকতা নয়, এর অন্যদিকও আছে। অন্যভাবে বলা যায়, একারণে বলা যায় মর্ডান রিপাবলিক স্টেট অথবা আধুনিকতা সম্পর্কে ততটাই তাদের জানাশুনার অভাব দেখা যায় বা তারা কম আগ্রহী ছিলেন। এই ঘাটতির কারণে পরবর্তিকাল  ঐ ত্রিশজনকে দেখা যায় দুটা ঝোঁকের পক্ষে ভাগ হয়ে যেতে; যারা রাজনীতিতে গেলেন আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলেন, এভাবে। সামরিক ধারায় যারা ছিলেন যেমন এদের শিরোমনি জেনারেল নে উইন, তার অভিযোগ রাজনীতিবিদ ধারার শিরোমনি উ নু এর প্রতি যে এরা কম দেশপ্রেমিক, এরা নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবে, এরা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে জানে না (অর্থাৎ কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন) ইত্যাদি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাস হল ঐ ত্রিশজন ও তাদের অনুসারীর – যারা রাজনীতিতে গেল আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলে এই দুভাগ হয়ে যাওয়া – আর পরস্পর পরস্পরের খামতি পুরণে দুপক্ষই অযোগ্য হিসাবে থেকে যাওয়া। যা একালেও রাজনীতিক বনাম সামরিক অফিসার এভাবে ভাগ হয়ে থেকে গেছে। মায়ানমার রাষ্ট্রের বৈশিষ্টেও এর বিরাট ছাপ রয়ে আছে।  মায়ানমারই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কমান্ডার ইন চিফ আর রাজনীতিক রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। এতে যেন খোদ রাষ্ট্রটাই ভাগ হয়ে আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এক ঠিকই কিন্তু তার আবার দ্বৈত-নির্বাহী।  এক ঘরে দুই পীর যেমন বসবাস করে থাকতে পারে না, দ্বৈত-নির্বাহীও তাই। নির্বাহী বা একজিকিউটিভ একজনই হয়, হতে হয়। নইলে সেটা ক্ষমতাই নয়। তাই কার্যত মায়ানমারে প্রধান একজিকিউটিভ হয়ে আছে সামরিক বাহিনী। যেমন ১৯৬২ সাল থেকে  সর্বেসর্বা হয়ে আছে এক মেলেটারী কাউন্সিল। এই কাউন্সিল হল আসলে পিছনে এক সামরিক বাহিনী আছে, যার মধ্যকার ক্ষমতার বিন্যাস বা সাজানো কাঠামোর শীর্ষ স্থানটাই হল কাউন্সিল। এরপর এর কাউন্সিলের অধীনে আবার একটা রাষ্ট্রও আছে। অর্থাৎ যেমন আমরা দেখতে অভ্যস্ত যে, রাষ্ট্রের ভিতরে সামরিক বাহিনী বলে এক প্রতিষ্ঠান থাকে। এখানে এর উলটা; সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানটা হল কাউন্সিল, আর সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটা রাষ্ট্রও আছে।  এখানে আবার  কমান্ডার ইন চীফ আর কাউন্সিল কথাটা সময়ে পাল্টাপাল্টি করে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যখন সামরিক ক্ষমতার একটা অংশ সিভিলিয়ান ফেসে হাজির রাখার অবস্থা তৈরি হয় তখন সামরিক বাহিনীর আবার একটা রাজনৈতিক দলও আছে। বাহিনীতে সক্রিয় চাকরিতে আছে এমন অফিসার আর অবসর নেয়া বুড়া জেনারেলরা এই দলের সদস্য হয়।  এর নাম Union Solidarity and Development Party (USDP)।  গত ২০১০ সালের আগে এটা সামরিক বাহিনীর এক এসোসিয়েশন নামে ছিল। এখন সেটাই এক রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দল। আর সবচেয়ে বড় কথা হল,  কমান্ডার ইন চীফ চাইলে যে কোন নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারে। গত ২০১৫ সালে সংসদ ঐ  USDP দলের দখলে ছিল, তখন একটা প্রস্তাব উঠেছিল ভেটো ক্ষমতা রদ করা হবে কী না এনিয়ে। যদিও বাহিনী শেষ এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।  তা নিয়ে বিবিসির ২০১৫ জুনের এই রিপোর্টটা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
দ্বৈত- নির্বাহী ক্ষমতার কথা উঠেছিল, মায়ানমারের  কমান্ডার ইন চিফ নিজেই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র  ও সীমান্তরক্ষা এই তিন মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে থাকেন আর প্রেসিডেন্ট প্রধান নির্বাহি তিনি বটে, কিন্তু তিনি ঐ তিন মন্ত্রীকে মেনে নিয়ে এবার বাকী মন্ত্রী নিয়োগ দেন। ফলে নে উইনের হাতে আর্মির সেট করে দেওয়া এই বিশেষ রাষ্ট্র বৈশিষ্ট – ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ -এর  ভিতরে অধীনে থেকে সু কি কে নোবেল প্রাইজের ধ্বজাধারী হতে থাকতে হয়, কাজ করতে হয়। এব্যাপারটা সুকি চায় কী চায় না তাতে কোন ফারাক আসে না। অর্থাৎ কার্যত সুকিও এই মায়ানমারিজম চায়। এজন্য গত সপ্তাহে বিবিসি লিখেছে, “মিয়ানমারে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্যানিং  বিবিসিকে বলেছেন তিনি (সু চি) রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। ‘বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’ সেদেশ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাকে সমর্থন না করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে”। আবার একই কারণে সু চি এর জীবনীকার উইন্টেলের বরাতে বিবিসি ঐ রিপোর্টেই লিখছে,” ………তিনি (সু চি) এখন সেনা বাহিনীর পকেটে”। ………”মিস সু চি হাড়ে মজ্জায় বার্মিজ। আমার বলতে খারাপ লাগছে – কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের পশ্চিমে রাখাইনে যা ঘটছে তা চরম জাতিবিদ্বেষী। সেখানে মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সমন্বিত বিদ্বেষ রয়েছে”।

তাহলে ২০০৬ -৭ সাল থেকে মায়ানমার পরিস্থিতি নতুন কী মাত্রা পেয়েছিল? গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৮৮ সালে নে উইন দৃশ্যত পদত্যাগ করলেও ক্ষমতা নেন তারই শিষ্য জেনারেলেরাই। ক্ষমতা ও রাজনীতি বলতে যারা একটাই জানে  – দমন ও নির্মুল – ফলে সেই পুরানা অভিজ্ঞতায় প্রায় কয়েক হাজার লোক মেরে দমিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার কাউন্সিল’ এই নতুন নামে ক্ষমতা নেন এবার জেনারেল স মং (Saw Maung)। পরবর্তিতে অবশ্য তিনি নিজেই মাত্র ৫০০ জন ‘দুষ্ট লোক’ সরিয়ে ফেলার কথা নিজেই গর্ব করে পাবলিককে বলেছিলেন।  এই সময় থেকে কথিত ‘নে উইনি সমাজতন্ত্র’ তিনি নিজেই ও তার সরকারকে সরে যেতে, গড় হাজির হতে শুরু করিয়েছিলেন। আর  ১৯৯০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন দেয়া হয়, কিন্তু বিরোধীরা জিতলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং সে নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করে দেয় জেনারেলেরা।  পরবর্তিতে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মায়ানমার একের পর এক পশ্চিমের (আমেরিকা ও ইউরোপের) স্যাংসন বা বাণিজ্য লেনদেন অবরোধের মুখে পড়ে যায়। এই অবস্থায় বাইরের প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে মায়ানমারের বাণিজ্য বিনিয়োগ লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম থেকে যায় পড়শি চীন। ফলে একমাত্র চীনের ভিতর দিয়ে যতটুকু বাইরের দুনিয়ার সাথে বার্মার সংযোগ সম্পর্ক বজায় ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মায়ানমারে চীনা বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ২০০২-৩ সালের পর থেকে। এমন অবস্থায় ২০০৬ -৭ সালের দিকে এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতি হিসাবে  চীন ও ভারত নিজ নিজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকেই মায়ানমারের গ্যাস কেনার (বুকিং ও চুক্তি) জন্য প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এই সময় থেকেই অবরোধের ব্যাপারটাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়।

ততদিনে আবার, আমেরিকা নীতি পলিসিতে এশিয়ায় ভারতকে কাছে টেনে চীন ঠেকানোর চর্চা পোক্ত নির্দিষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে ভারতের মাধ্যমে বার্মার অবরোধ তুলে নেওয়ার এক ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। এই অবস্থানের পিছনে যে মুল্যায়ন কাজ করেছিল তা হল মায়ানমারের উপর অবরোধ দেওয়াতে কোন লাভ হচ্ছে না। বরং পশ্চিমের অবরোধের সুফল চীন একা খাচ্ছে। তাই ভারতের মধ্যস্থতায় অবরোধ তুলে নেওয়ার নতুন ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। পশ্চিম পরিস্কার জানত, মায়ানমার কোন গণপ্রজাতন্ত্রী নয়, সামরিক বাহিনীর পকেটের রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও  সু চি কে কেবল ঐ কাঠামোর উপরে এক সিভিলিয়ান ফেস হিসাবে সামনে রেখে সামরিক ক্ষমতাটাই চালু রাখার পক্ষে নাম কা ওয়াস্তে এক সংস্কার করার পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। এই হল সেই ফর্মুলা। কেন “দ্বৈত নির্বাহী” এই ভুতুড়ে ধারণার ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসাবে আমরা এখনও মায়ানমারকে দেখছি – এর মূল কারণ এটা। যেমন এর আর এক বৈশিষ্টবলছিলাম যে, এই রাষ্ট্রে কমান্ডার ইন চীফ সরকারের কোন নির্বাহী সিদ্ধান্তের উপর ভেটো প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাহী সরকার একমাত্র বা একক নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী নয়, এটা এক সতীনি ক্ষমতা বলেই এমন বাক্য রচনা এখানে সম্ভব হচ্ছে। আর ২০০৮ সাল থেকে চালু যে কনষ্টিটিউশনে এসব কথা লেখা আছে তা সংশোধন করতে গেলে ওতে শর্ত দেওয়া আছে যে, ৭৫% এর বেশী ভোটের সমর্থন থাকতে হবে। কিন্তু ৭৫% কেন? কারণ প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্র সংসদে ২৫% আসন সব সময় বাহিনীর জন্য রিজার্ভ করে রাখা আছে। অর্থাৎ সারকথায় কমান্ডার ইন চিফ রাজী না থাকলে ঐ ২৫% এর একটু সমর্থনও পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, ফলে কোন সংশোধনীও সম্ভব নয়।

আসলে সব কথার এক কথা বা সেই মূল কথাটা হল, ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছিল এই কনষ্টিটিউশন। আর তা একা মনের মাধুরি মিশিয়ে সামরিক বাহিনীই এককভাবে নিজের খাতিরে লিখেছিল। কিন্তু যারা কনষ্টিটিউশন লিখেছে এরা কারা? এদের হাতে ক্ষমতা দিল কে, কী তাদের ক্ষমতার ভিত্তি – এসব প্রশ্নের ভিতরে সব জবাব আছে। যার সোজা অর্থ মায়ানমার এখনও প্রি-ষ্টেট মানে রাষ্ট্রগঠনের আগের অবস্থায় বা কোন গণপরিষদ বা সংবিধান সভা বসার আগের অবস্থায় আছে।  এই অর্থে মায়ানমার এখনও কোন মর্ডান রিপাবলিকই নয়।

ফলে এই রাষ্ট্রের কাছে মানবাধিকার, জনগণের মৌলিক অধিকার এসব কথা অর্থহীন। আর ‘ডেমোক্রাসির নেতা সু চি’ এই শব্দ আর বাক্যগুলো তো আরও হাস্যকর।

অতএব পশ্চিম সংস্কারের নামে যেটা করেছে সেটা হল ঐ সামরিক স্বৈরক্ষমতাকে সিভিলিয়ান সু চির টোপর পরিয়ে ঐ ক্ষমতাকে উদ্ভোধন বা হালাল করে দিয়েছিল। বিনিময়ে তারা নিজের ব্যবসা বিনিয়োগের করার সুযোগ বুঝে নিয়েছিল। এমনকি এই লক্ষ্যে কোন ধরণের সংস্কারের কাজ শুরু হবার আগেই এমনকি তা আসলেই কতটুকু কী সংস্কার হয় তা দেখার আগেই ২০১০ সালেই আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম নিজের বিনিয়োগ নিয়ে  মায়ানমারে ঢুকে পড়েছিল। তবে এটা নিয়ে চীনের সাথে মায়ানমারের জান্তার কোন বিরোধ দেখা দেয় নাই। চীনের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক অটূট রেখে আপোষেই তা হয়েছিল। জেনারেলেরা বিশেষ করে প্রাক্তন জেনারেল ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি থেন সিন (যিনি ২০১৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন) চীনকে বুঝাতে পেরেছিল যে পশ্চিমের অবরোধ উঠে যাওয়া মায়ানমারের জন্য কতটা জরুরি। ফলে চীন যেন জায়গা ছেড়ে দেয়।  চীনও সেটা সহজেই মেনে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। আর এসবের ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই হঠাত কেবল ২০১০ সালেই মায়ানমারে বিদেশি ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হয়েছে ২০ বিলিয়ন, আর এর অর্ধেক হল একা চীনের।

কিন্তু ভারতের অর্জন কী এতে? না তেমন কোন বৈষয়িক বিনিয়োগ ব্যবসা, না প্রভাব – কোনটাই অর্জন হয় নাই ভারতের।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনদিনের মায়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। চলতি রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরনার্থী হওয়া প্রসঙ্গে,   সু চি বলেছেন,  “অসত্য খবর প্রচার করে রাখাইনে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে”। সু চি হামলাকারিদের “টেররিস্ট” বলেছেন। আর মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”।  কিন্তু এই সাফাই যুগিয়ে দেয়ায় ভারতের কোন লাভ হয় নাই। তবে মায়ানমার সফর থেকে মোদি কী অর্জন করতে চান এই প্রশ্নে বিবিসি কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিককে সাক্ষী মেনে অনেক কথা বলিয়ে নিয়েছেন। সুবীর ভৌমিক এই কথাগুলো ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তরফ থেকে আমাদের কাছে পৌছাতে চেয়েছেন, এটাও ধরে নিতে পারি। সুবীর বিবিসিকে বলছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য বিবৃতির মূল্য উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা”। মি ভৌমিক বলছেন, “রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার”। “মুসলিমদের প্রশ্নে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী এবং কট্টর বৌদ্ধরা মি মোদি এবং তার দল বিজেপির সাথে একাত্ম বোধ করে”। ভারত যে সম্প্রতি বিশেষ অভিযানের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেছেন, সেটাকেও দেখা হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনা অভিযানের প্রতি দিল্লির সমর্থন হিসাবে”। উপরে সি রাজামোহনের লেখায় দেখেছিলাম ভারতের বিনিয়োগ মুরোদহীনতার কথা। অর্থাৎ ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রশ্নে কোন অর্জন নাই। বরং বর্মীজ জেনারেলদের ইসলামবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়ার জন্য ভারত কাজ করছে। এই কাজটাই ২০০৮ সাল থেকে ভারত করে জেনারেলদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা হত্যার বড় ঘটনাগুলো ঘটতে পেরেছে বলে মনে করা হয়।

এবারের নতুন সংযোজন মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমার মাইন পুতে রেখেছে। মায়ানমার অল্প কিছু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা যে মাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ জাতিসংঘের কনভেনশন স্বাক্ষর না করা দেশ। বাংলাদশ এখন পর্যন্ত এনিয়ে জাতিসংঘে নালিশ বা সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতে যায় নাই। পলায়নপর আশ্রয়প্রার্থিদের জন্য মাইন পুতে রাখা হয়েছে, এরা কী কোন বিদ্রোহী? অর্থাৎ নিরীহ সাধারণ মানুষ কোন আশ্রয়ও না পাক, মায়ানমারের হাতেই তাকে মরতে হবে এই স্যাডিজম এখানে কাজ করছে।  আর এই স্যাডিজমকে মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”। তার মানে ব্যাপারটা দাড়াল যেহেতু ভারতের নিজ বিনিয়োগের সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাড়ানোর মুরোদ নাই, তাই তাকে নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে। বর্মী জেনারেলরা গণহত্যার ক্লিনজিং অপারেশনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকছেন ক্রমাগত, ভারতের এই মনোরঞ্জনে কোন জেনারেলের দায় কী কমছে? অথবা বার্মার সাথে চীনের সম্পর্কে কোন ফাটল? ভারতের উতসাহে বার্মার জেনারেলরা গত ফেব্রুয়ারির রোহিঙ্গা হত্যা অপারেশন ঘটানোর পরেও কী, এই এপ্রিলে চীনের সাথে বর্মার প্রেসিডেন্ট ১০ বিলিয়ন ডলারের বন্দর নির্মাণ চুক্তি করেন নাই?  তাহলে ভারতের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অর্জন কোনটাকে ধরেন? স্যডিজমে অন্যের শরীরে কষ্টের পিন ফুটানোতে সুখ?

[এই লেখা এপর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হয়েছে। তবে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। সেটা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

গৌতম দাস

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

http://wp.me/p1sCvy-2hx

 

গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

[প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার

গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-2go

 হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গড়া ও দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হল ভারত। এই রাষ্ট্র গঠনের সময় মনে করে করা হয়েছিল যে, বিভিন্ন প্রাদেশিক বৈশিষ্টে বিভক্ত রাজ্যের (এখন ২৯ রাজ্যে বিভক্ত) ভারতকে ‘হিন্দুত্ব’ এই আঠা না থাকলে একে এক রাখার আর কোনো উপায় নেই; এই ধারণাটা ভুল যদিও। ভারতের উগ্র হিন্দুসমাজ মুসলমানসমাজকে নিজের অধীনে আনা ও চাপে রাখার জন্য কী না করতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এরই আদর্শ নমুনা। ভারতে গরুর (মহিষ উট গবাদিসহ সব পশু) গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ। [The notification covers bulls, bullocks, cows, buffaloes, steers, heifers and calves, as well as the camel trade.] মানে, বেচাবিক্রি, জবাই ও খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য হল, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে আধিপত্যে থাকা সংখ্যাগুরু কমিউনিটির পছন্দসই বিধিব্যবস্থার অধীনে মুসলমান কমিউনিটিকে আনা, দাবড়ানো। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নয়, জারি করা হয়েছে এক অদ্ভুত কায়দায়। কংগ্রেসের নেহরু আমলে তারা এর প্রথম কায়দাটা বের করেছিলেন। তা হল ভারতীয় রাষ্ট্র “পশু-প্রেমী” হয়ে গিয়েছিল। তারা ‘প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেল অ্যাক্ট ১৯৬০’ নামে এক আইন পাস করে ফেলেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য ‘সোসাইটি ফর প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেলস’ নামে সমিতি গড়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মুল কথা ছিল, “পশুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যথা বা কষ্ট দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা করা যাবে না” এর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এই আইনটা লেখা হয়েছিল। আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব জায়গায় একই কথা বলা হয়েছিল যে, ‘পশুকে অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও কষ্ট দেয়া রোধ’ করাই উদ্দেশ্য। আইনটি কেমন তা বোঝার সবচেয়ে ভালো এক উপায় হল, এতে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ লক্ষ করতে হবে। যেমন ‘পশুর কল্যাণ, ‘পশুর ব্যথা’, ‘পশুর কষ্ট’, ‘পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ বোধ বা অনুভূতিগুলো (ফলে শব্দগুলো) আসলে মানুষের, মানুষ সম্পর্কিত। কিন্তু সেগুলোকে অবলীলায় পশুর ওপর প্রয়োগ করে ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর এখানে সবচেয়ে তামাশার শব্দ হল, ‘পশুর কল্যাণ বা ওয়েলফেয়ার’। বিগত ১৯৬০ সালের ভারতে তো বটেই, এখনকার ভারতেও কোনো কোনো আম-মানুষের অবস্থা এমন যে, পশুর ওপর তো বটেই, আপন সন্তান বা স্ত্রীসহ পরিবারের আপন সদস্যদের ওপর “ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা” দেখানো ছাড়া নিজের পেটের ভাত জোগাড়ের আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ সেই দেশে মানুষের বদলে পশুর ওয়েলফেয়ার নিয়ে আইন করা হয়েছিল, চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। আসলে আইনটি করেছিল অবস্থাপন্ন শ্রেণী। করেছিল মুসলমান কমিউনিটিকে হেয় করে দেখাতে যে, তারা ‘ব্যথা ও কষ্ট দিয়ে বা নিষ্ঠুরতা করে’ গরুর গোশত খায়। অতএব এটা বন্ধ করতে হবে। এক কথায় একটা ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছিল। তবে অবশ্য এটা ছিল এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি-কিক, এক পরোক্ষ আইন। কারণ এই আইনের সেকশন ২৮-এ এক ফাঁকে একটা ছাড় দেয়া ছিল। [Section 28 of the Act 1960, mandates that “nothing contained in this Act (1960 Act) shall render it an offence to kill any animal in a manner required by the religion of any community.”]। বাংলা করলে বলা হয়েছিল, “কোনো কমিউনিটির ধর্মীয় আচার হিসেবে বিধান মতে যদি জবাই করা হয়, পশুকে ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়, তবুও সে ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না”।

কিন্তু গত ১৯৬০ সালের সেই আইনের ওপরে এবং সেই আইনের সীমার মধ্যে থেকে নতুন করে দু’টি বিধি তৈরি করেছে মোদি সরকার। এর একটা হল,
Prevention of Cruelty to Animals (Regulation of Livestock Markets) Rules, 2017, &
Prevention of Cruelty to Animals (Care and Maintenance of Case Property Animals) Rules, 2017

সোজা বাংলায় বললে, প্রথমটা মুল অর্থ হল, পশুর হাট বা মার্কেট ভেঙে দেয়া। অর্থাৎ জবাই করার উদ্দেশ্যে মার্কেটে থেকে কোন পশু কেনা অথবা বেচা যাবে না- এরই আইন এটা। কারণ দেখা গেছে, প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে জবাইয়ের গরুটা হাট/মার্কেট হয়ে আসে। তাই প্রথম আইনটার ২২ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো পশু কোনো মার্কেটে তোলা, কেনাবেচা করা যাবে না’। [22 (iii) stating that the cattle has not been brought to market for sale for slaughter;] আর সাথে এই কথাটাই হাটে যে কোন গরু উঠানোর পর  ‘রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে আর সেখানে শপথ করে বলতে হবে” ইত্যাদি তো আছেই। আর দ্বিতীয় আইন হলটা হল কেয়ার মেন্টেনেন্স না করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সেসব সংক্রান্ত।

হাটে পশু উঠবে, রেজিস্ট্রেশন হবে, কানে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার লাগবে, কেনাবেচা হবে; তবে তা কেবল পশু কৃষিকাজের ব্যবহারের উদ্দেশ্য। গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতা এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেবল হাটে গরু বেচা ও ক্রয় করতে পারবে।  তাহলে মূল কথাটা হল,  গরুর গোশতের জন্য গরু কেনাবেচা করা যাবে না। এমনকি পশু মারা গেলে বা পশু অসুস্থ হয়ে মরা অথবা আয়ু শেষে মরা যা-ই হোক, সব ক্ষেত্রেই মরা গরু একেবারে সোজা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন ভাবেই মরা গরুর বা মারা গরুর চামড়া ছিলানো যাবে না। অথবা মারা বা কাটা গরুর হাড়গোড়সহ কোনো অবশেষই সংগ্রহ ও বিক্রি করা যাবে না। চামড়াও বিক্রি করা যাবে না।

এই হলো মোটা দাগে আইনটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া যেখানে দেখা যাচ্ছে শুরু থেকেই এই আইনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবোধক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায়, “পশুর উপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর” নামে কংগ্রেস আমলেই মুসলমানের প্রতি বৈষম্যটা করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্বলভাবে। আর সেটাকেই এখন সবলভাবে করতে চাইছেন বিজেপি-আরএসএসের নেতা মোদি। গত ২৩ মে গেজেটেড বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন আইন সম্পর্কে মোদি সরকার সবাইকে “নোটিফাই করে” জানিয়েছে। আর এই আইন জারি করে তা সেই পুরনো আইনের ওপর দাঁড় করানো বলে এটা কংগ্রেসকেও বেকায়দায় ফেলতে পেরেছে, যাতে কংগ্রেস মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে থেমে যায়। কারণ তাতে ১৯৬০ সালের নেহরুকেই সমালোচনা করা হয়ে যায়। আবার ‘পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানো’র নামে এবার সবলভাবে ইসলামবিদ্বেষটা মোদি সফলভাবে দেখাতে পারেন। তবে আরো কারণও আছে।

একটা কথা পরিস্কার রাখা দরকার। এতদিন গরু জবাই দেয়া, বেচাকেনা ও খাওয়া সম্পর্কে যেসব খবর আমরা শুনে আসছিলাম তা কেন্দ্রীয় বা মোদি সরকারের কোনো আইন ছিল না। এমনকি ২০১৫ সালে মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফকে ‘বাংলাদেশের গরু খাওয়া বন্ধ করা’র যে তাতানো বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটাও আসলে মন্ত্রীর অনধিকারচর্চা ছিল। কারণ গরু জবাই বন্ধ করা কেন্দ্রের বা রাজনাথদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন ছিল না, আবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারেরও কোনো আইন ছিল না সেটা। তবে দুই বছর আগে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখানে এ আইন পাস করা হয়েছিল। আর তা সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছিল বা বিজেপি প্রচার করেছিল। এজন্য এটা যে কোন কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর জন্য অনধিকার ছিল।  তবে এবার প্রথম কেন্দ্র নিজেই আইন জারি করা হলো। কিন্তু এতে বিভিন্ন অ-বিজেপি রাজ্যসহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকেও বিরোধিতা প্রবল হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজ সংশ্লিষ্ট এই বিষয় ‘রাজ্যসরকারের এখতিয়ার’ এমন দাবি বা এই প্রশ্ন উঠিয়েছে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। কথা সত্য ইস্যুটায় রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিবার এক্তিয়ার।  মমতা ব্যানার্জি এই আইনকে কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্য রাজ্যকেও তারা আপত্তি তোলার আহ্বান রেখেছিলেন। শেষে গত ২ জুন ‘মোদির সেনাপতি’ অরুণ জেটলি বলেন, ‘নতুন বিজ্ঞপ্তি রাজ্যসরকারের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়।’ দৈনিক আনন্দবাজার এই কথার অর্থ করেছে, ‘গবাদিপশু জবাইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাজ্যের হাতেই থাকছে’। মোদির খাস লোক তার অর্থমন্ত্রী জেটলির মন্তব্যের একটা ব্যাখ্যা আনন্দবাজার হাজির করে বলছে, ‘এখন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, তাতে রাজ্যের আইনে হস্তক্ষেপ হচ্ছে না। এটি শুধু গবাদিপশুর কেনাবেচার স্থানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। কৃষকেরা গবাদিপশু শুধু বাজারে বেচতে পারবেন নাকি বাজারের বাইরে থেকেও কেনা যাবে, বিজ্ঞপ্তি শুধু সেটি নিয়েই। কিন্তু তাদের জবাই করার জন্য রাজ্যের আইনই বলবৎ থাকবে”।

কিন্তু আইনগত দিক থেকে মোদির এই আইন কি আদালতে টিকবে, নাকি কনস্টিটিউশনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বাতিল হয়ে যাবে? গুজরাটের হাইকোর্টের (ময়ূর) বিচারপতি গোমূত্র পানে ও প্রশংসায় বেহুঁশ, তা আমরা জেনেছি। কিন্তু শক্ত তর্ক উঠেছে দক্ষিণে তামিলনাড়–তে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চে। সেখানকার রিট পিটিশনের পয়েন্ট খুবই শক্তিশালী। যেমন তারা বলছেন, “নতুন আইনটা প্যারেন্ট আইনের বাইরে যেতে পারে না”। ১৯৬০ সালের আইনে যেকোনো কমিউনিটির ধর্মীয় শরিয়ত বা রিচুয়াল হিসেবে পশু কেনাবেচা, কোরবানি এবং গোশত খাওয়ার ওপরে এই আইন প্রযোজ্য করা হয় নাই, বাইরে ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছিল। কাজেই এখনও কেন্দ্রের কোনো এখতিয়ার নেই সেটা লঙ্ঘন করার। এ ছাড়া ভারতীয় কনস্টিটিউশনে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারবিষয়ক ২৫ ধারায় ‘অবাধে ধর্মপালন নাগরিকের অধিকার’ এবং ২৯ ধারায় ‘সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অধিকারই মোদির নতুন আইনে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া আর একটা পয়েন্ট আনা হয়েছে তা হলো, ভারতীয় কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১৯ (১)(জি) অনুসারে কোনো পেশার লোককে বেকার করে দেয়া যাবে না। এখানে কসাইসহ চামড়া ইত্যাদির প্রক্রিয়াজাত করা যাদের পেশা তাদেরকে কাজ-পেশাহীন করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটাও অভিযোগের একটি জোরালো যুক্তি।
ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও একটা জনস্বার্থ বা পাবলিক লিটিগেশনের মামলা হয়েছে। সেখানেও উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও একটা বাড়তি পয়েন্ট হল, পুরনো আইনের ১১ অনুচ্ছেদ। সেখানে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশু জবাইকে খাদ্য জোগাড় হিসেবে দেখা হয়েছিল, নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা হয়নি। তবে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া ও নিষ্ঠুরতা না করা সাপেক্ষে তা করতে হবে। তাই এবার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ১১ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেছেন আর সরকারকে জবাব তৈরি করে আসতে বলেছেন। এই মামলার বাদি হলো হায়দরাবাদের এক এনজিও, বাদির দাবি- মোদির দুই নতুন আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিতে হবে।

তবে আগেই বলেছিলাম মোদির আইনে ‘পশুর ওয়েলফেয়ার’ কথাটার সত্যিই বিষ্ময়কর। এক ধরনের ওয়েলফেয়ার সংগঠনের কথা আইনে অনেকবার রেফার করা হয়েছে। আর এটাই হল, বিজেপি- আরএসএসের লোকাল ‘পশুর ওয়েলফেয়ার কমিটি’ যাদের হাতে পশু ব্যবসায়ীরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং তারা পাবলিক লিঞ্চিং বা প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। আশা করা যায়, এ বিষয়গুলোও আদালত আমলে নেবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মোদির আইন দু’টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি তা হয়, তবে এটা ভারত রাষ্ট্রকে বাড়তি কিছু আয়ু দেবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৯ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

গৌতম দাস

বৃহষ্পতিবার ২৭ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2f3

 

ঘটনার শুরু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলায়, যা ৯/১১ বলে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে বিশেষ ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেয় এবং তা নির্মূল করবার জন্য নতুন ধরণের যুদ্ধের সূচনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ‘আল কায়েদা’কে দায়ী করে। বুশের নেতৃত্বে আমেরিকা আল-কায়েদার রাজনীতি ও হামলা মোকাবিলার যে নীতি গ্রহণ করে তার বৈশিষ্টগুলো হলোঃ

১. খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় আল কায়েদা নির্মূলের যুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিশ্চান জগতের ক্রুসেড সাব্যস্ত করে লড়া।

২. “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়া, এই ডাকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে পক্ষে টানা। সবাইকে সতর্ক করা যে এটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সামিল হয়ে এই হামলা মোকাবিলা করার কমন লাইন হলো, ওয়ার অন টেরর।

৩.“হয় তুমি আমার পক্ষে নইলে তুমি আমার শত্রু” – এই নীতির ভিত্তিতে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নৌকায় উঠতে বাধ্য করা, ভূগোল জুড়ে এই বিভাজনের ভিত্তিতে নতুন এক অক্ষশক্তি তৈরি করা যার লক্ষ্য হচ্ছে যারা এই ক্রুসেডের পক্ষে নয় তাদের নির্মূল করা।

৪. এই যুদ্ধকে খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় ক্রুসেড বলে মনে করলেও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে আবার সেকুলারিজমের রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলে দাবি করা ও প্রচার চালানো। ক্রুসেডের মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশাবে তৈরি হওয়া এই সেকুলারিজমের সোজা মানে দাঁড়ালো, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়া। ইসলাম ডাকনামে যত রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রকাশ দুনিয়ায় আছে সবকিছুকেই শত্রুর কাতারে ফেলা। দুষমন জ্ঞান করে নির্মূল করা, ইত্যাদি।

 

যুদ্ধের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা
আমাদের নিশ্চয় স্মরণ হবে ৯/১১ হামলার সময় বাংলাদেশ ছিল একটা সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। তবুও তাকে আফগানিস্তান হামলায় বিমানের রিফুয়েলিং ও এয়ার স্পেস ব্যবহার করতে অনুমতি দিতে হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যুদ্ধ চাহিদা মেটানোর দায় কবুল করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত কোন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলেও এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লতিফুরকে নিতে হয়েছিল ।

একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশকে ওয়ার অন টেররের নৌকায় তুলে নেয়ার কাজটাতে একটা পজ দিতে হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ আগেই ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে কো্ন দল ক্ষমতায় আসে সেটা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসকে এটা মানতে হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যে, ওয়াশিংটনের পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস যে-লাইনে আগানোর পরিকল্পনা নেয় সেটা হলো, ইসলামের নাম-গন্ধ আছে এমন সব দল ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার কায়েম করা। নির্বাচিত বিএনপির জোটের সরকারকে ক্রুসেড নীতি্র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তা বাস্তবায়নের জনু উপযুক্ত মনে হয় নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মোকাবিলার একটা জাতীয় সরকার গঠিত হোক। তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ওয়ার অন টেররের নৌকায় উঠুক। প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার উদ্যোগ ছিল এটাই।

জোট সরকার ও মার্কিন যুদ্ধের অংশীদারিত্ব নেবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা
মোটা দাগে বললে, বিএনপি বাংলাদেশ সরকারকে বুশের নৌকায় ওঠানো এড়িয়ে যেতে পারে নাই। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ক্ষমতা শেয়ার আর ইসলামী রাজনীতির যাবতীয় প্রকাশগুলোকে শত্রু গণ্য করে একটা ভাগ তৈরির পলিসি জোট সরকার মানে নাই, এই দিকটা এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে আবার র‍্যাব গঠন, পশ্চিমের টার্গেট করা লোকদের ধরে নির্যাতন করে তথ্য আদায় ও তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ, ইত্যাদি কাজে জোট সরকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সহযোগী ভূমিকাই পালন করেছে। এককথায় রেনডিশনের কাজে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে বিশেষ সিকিউরিটি স্টেট আকারে সাজানো, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস ও পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলকে জোট সরকার মোটামুটি আস্থায় নিতে পেরেছিল। সেটাও সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। বেচারা বদরুদ্দোজার পদত্যাগ এসবেরই প্রতীকি প্রকাশ।

তখনকার মত পরিস্থিতি এভাবে থিতু হওয়াতে হাসিনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে হতাশ হাসিনা এই ঘটনার ভিতর থেকে পশ্চিমের চাহিদাটা ভাল করে বুঝেছিলেন। এই চাহিদা হবহু পূরণ করে দিতে পারলে তিনি পশ্চিমের চোখে একচ্ছত্র প্রার্থী হতে পারেন – এই সম্ভাবনার কথা ভেবে পরবর্তীতে তিনি এই লাইনেই রাজনীতি করবেন বলে মনস্থ করেন। শেখ হাসিনা পশ্চিমের ওয়ার অন টেররের চাহিদা বুঝে তাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের দিকে পা বাড়ান। সিদ্ধান্ত নেন এই চাহিদা মোতাবেক নিজে ও দলকে ঢেলে সাজাবেন। সে মোতাবেক রাজনৈতিক কৌশল তৈরিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির চেয়ে নিজেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি আন্তরিক ও উপযুক্ত খেদমতগার হিশাবে পশ্চিমের বাজারে হাজির করা। এই কাজের জন্য তিনিই একমাত্র ক্যান্ডিডেড হিসাবে নিজেকে বিক্রির কাজটা করতে পারা। ওয়ার অন টেররের উপযুক্ত সৈনিক হিশাবে আমেরিকান সমর্থন যোগাড় করা তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। এই লক্ষ্যকেই ধ্যানজ্ঞান করে ২০০২ সাল থেকে শেখ হাসিনা কাজ করে গেছেন।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশল, লোকাল এজেন্ডা
নিজের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ হাসিনার কৌশল হলো, ওয়ার অন টেররের আমেরিকান নৌকায় তিনি সদলবলেই উঠবেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এর নাম দিবেন “যুদ্ধাপরাধের বিচার”। আবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে তিনি একনিষ্ঠ – এই ভাব ধরে “স্বাধীনতার চেতনার” নামে নতুন এক রাজনীতি তিনি কায়েম করবেন। হাসিনার এই “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতির মানে হোল নিজের বাইরের আর সব রাজনীতি, চিন্তা, তৎপরতার যা কিছু বাংলাদেশে আছে তাকে নির্মূল করবার পথে অগ্রসর হওয়া। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের যে দাবি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গুমরে মরছিল, তাকে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়নের অধীনে এনে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের বীজ তিনি বপন করলেন তার কুফল শাহবাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে পড়ল। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে পারে নি, তাদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যারা করেছিল তাদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। সুষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া মেনে ও দেশে বিদেশে সকলের কাছে বৈচারিক নীতির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য একটি বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুষিয়ে রাখা এই দাবি মেটানোই ছিল সঠিক পথ। শেখ হাসিনা সেই পথে অগ্রসর হন নি।

ওয়ার অন টেররের ছাতার নীচে পপুলার এক উন্মত্ততা (ফ্যাসিজম) তৈরি করে কঠোরভাবে তার নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও নির্মূল করবার পথে তিনি গেলেন। ‘নির্মূল’ করাটা আক্ষরিক অর্থেই, অর্থাৎ ফিজিক্যালি বা শারিরীক ভাবে নির্মূল করা। এছাড়া হাসিনা যেভাবে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বুঝেছেন, তিনি চেয়েছেন চেতনার জয়গান। তার গান গাওয়াই হবে বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। খাঁটি বাঙালি তারাই যারা তার চেতনা ধারণ করে। শেখ হাসিনার “স্বাধীনতার চেতনায়” সওয়ার হয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোও বাঙালির খাঁটি চেতনা পয়দা করবার কাজে নেমে পড়ল। এই খাঁটি চেতনা, খাঁটি ইতিহাস, খাঁটি বাঙালি ধারণা, খাঁটি বাঙালি (পাঠ্য পুস্তকসহ) বই পুস্তক ছাড়া বাকি সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক উন্মাদনা তিনি আনলেন। নিজের এই খাঁটি বাঙালিত্ব বাদে আর সমস্ত চিন্তাকে রাজাকারি বা রাজাকারের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগিয়ে নির্মুল করবেন। একেই আমরা “বাঙালী জাতীয়তাবাদের” উগ্রতার চরম ও ৭১ এর পরের নব উত্থান এবং একই সাথে শেষ পর্যায় বলতে পারি। যারা গত পাঁচ-ছয় বছরের বাংলা ব্লগ ট্রেন্ড খেয়াল করেছেন তারা ভাল বুঝবেন এই নব উত্থিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ আক্ষরিক অর্থে তার প্রতিপক্ষকে ফিজিকালি নির্মূল করবার আকাংখা কিভাবে চর্চা করেছে। এই নির্মূলের আকাংখার তাগিদেই তাদের কদম কদম বাড়বৃদ্ধি হয়েছে। সেতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তচিন্তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে। এই উন্মাদনায় ধর্ম বা ইসলাম আমাদের সব চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান শত্রু এই ধারণা ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে আবার শুরু হয় আস্তিক-নাস্তিক ইত্যাদি নানান বিতর্কের ঝড়।

এতটুকু তাও সহনীয় ছিল। সব সমাজে নাস্তিকতা থাকে,আমাদের সমাজেও অনেকদিন থেকে আছে। কিন্তু এবারের আক্ষরিক অর্থে বিনাশ বা শারিরীক ভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মুলের আকাঙ্খা এতোই উন্মত্ত ছিল যে আস্তিক-নাস্তিক ঝগড়া সহজেই ইসলামের আখেরি নবীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চর্চার নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কারণ এই রাজনীতির অনুমান হচ্ছে লাখ দুয়েক রাজাকার ও রাজাকারের সহযোগী বলে যাদের ট্যাগ লাগানো হবে তাদের সবাইকে নির্মূল করে দিলে “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতিকে একচ্ছত্র করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয় নিশ্চিত করা যাবে। এই নির্মূল পরিকল্পনা আক্ষরিক অর্থেই এক ক্লিনজিং অপারেশানের মতো, এই ধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক ভাবে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবার এটাই উপযুক্ত পথ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রেখে এই যুদ্ধ চালাবার এটাই মোক্ষম সময়। দ্বিতীয় পজন্মের মুক্তিযুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এভাবেই বিশুদ্ধ এক বাঙালির বাংলাদেশ কায়েম করতে হবে। আরেকবার রক্তে স্নান করে একাত্তরের যুদ্ধের দায় মুক্তি ঘটবে।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশলের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি
কিন্তু হাসিনার এই নতুন যুদ্ধবাজ রাজনীতির বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা আছে।

১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বড় জোর একটা ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার হতে পারে। এটাকে ওয়ার অন টেরর বা পশ্চিমের চোখে সন্ত্রাস দমনের কাজ হিসাবে কতটুকু হাজির করা সম্ভব যাতে পশ্চিমারা আগ্রহী হবেন?

২. জামাত একটা সংবিধান মেনে চলা দল, যারা কনস্টিটিউশনাল রাজনীতি করে। পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা মানে এবং সেখানে অংশ গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য তা বিশ্বাসও করে। এমন একটি লিবারাল নির্বাচনমুখী ইসলামী দলকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাস্তবেও এটা সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন তৈরির দল। বাংলাদেশের শ্রেণি-গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশেরই আশা আকাঙ্খার দল। শেখ হাসিনা একে একটা ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসাবে হাজির করবেন কি করে? জামাত যতটুকু ত্রাস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তা অন্য দুই প্রধান পার্লামেন্টারী দল আওয়ামী বা বিএনপির চাপাতি, পিস্তল বা কাটা রাইফেলের ত্রাস সৃষ্টি করতে পারার মতই। কিন্তু একটা পার্লামেন্টারী রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী দল বলে হাজির করতে গেলে অন্ততপক্ষে তাকে নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠন বলে হাজির করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। যে দল ভোট চাইতে জনগণের কাছে যায় তাকে একটা গোপন, সহিংস বা সশস্ত্র দল হিসাবে দেশে বিদেশে চেনানো কঠিন।

৩. বাংলাদেশে জামাতই একমাত্র ইসলামী দল নয় বা ইসলামী রাজনীতির একমাত্র প্রকাশ নয়। যারা আফগানিস্তান ফিরে এসেছে তারা কেউ জামাতের রাজনীতি করে না, কখনও করে নাই। বরং তারা আওয়ামী লীগ করে এমন নজিরই বরং আছে। আবার মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নয়। কিম্বা ইসলামি বিপ্লবও নয়। জামাতে ইসলামি ক্যাডার ভিত্তিক রেজিমেন্টেড সৎ চরিত্রের মানুষ গড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল। এই দিক থেকে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল ‘সুশীল’দের রাজনীতির। যারা জামাতে ইসলামির মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক চায়। মওলানা মওদুদি মনে করতেন ঈমানের দুর্বলতার জন্য রাষ্ট্রের সদর্থক উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায় । তার মানে আল্লাভীরু সৎ চরিত্রের লোকের রাষ্ট্রনায়কী নেতৃত্বের অভাবে। সমস্যাটা নৈতিকতার। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে তার চিন্তায় মধ্যে বিপুল ওসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতা আছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হচ্ছে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বহুদিক ইসলামী ঈমান আকিদা ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা করলেও শেষমেষ ‘আধুনিক রাষ্ট্রই কায়েম করতে চেয়েছেন। অথচ ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র কায়েম আদৌ ইসলামের লক্ষ্য হতে পারে কিনা সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিশাবে হাজির হয়েছে।

অন্যদিকে ‘৭২ সালের পর থেকে মওলানা মওদুদির নিজের চিন্তার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের পুরানা রাজনীতিতে তিনিই আর থাকেননি। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাকি ৭ বছর তার কেটেছে সৌদি আরবে। ইরানী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশে ইসলামের রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক আঁচ থেকে বাঁচানোর কাজটা সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। জামাতে ইসলামি সে কারনে সোদি রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণহয়ে ওঠে । সুন্নি বাংলাদেশে সৌদি রাজতন্ত্রকে সেই সার্ভিস আন্তরিকতার সঙ্গেই জামাত দিয়েছে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। মোগল আমল থেকেই সামাজিক সৌজন্য আকারে আমরা বিদায় বেলায় “খোদা হাফেজ” বলতে অভ্যস্ত। আমাদের বয়স্ক প্রজন্ম এখনও তাই বলেন। কিন্তু এখন এটা “আল্লাহ হাফেজ” হয়ে গেছে। কখন থেকে কিভাবে এটা ঘটে গেছে কেউ টের পাইনি।

কোন ধরণের রেডিক্যাল ইসলামী রাজনীতি জামাতের লক্ষ্য নয় সেটা ১৯৭৯ সালের পরের সময়কালে জামাতের ভুমিকা আরও সাক্ষ্য দেয়। রাজনৈতিক দল হিশাবে জামাতে ইসলামি কখনই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন ক্ষেত্রেই জালিমের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু ভূমিকার চর্চা করে নি, বরং সবসময়ই নিজের ভাবমূর্তি এভাবেই তৈরী করেছে যে কোন প্রকার বিপ্লবী ইসলামী রাজনীতি তার স্বার্থের বিরোধী। ইরানী বিপ্লব থেকে কেউ যেন কোন ইতিবাচক পাঠ না নেয় জামাত সেই কাজটাই সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিক ভাবে করে গিয়েছে। ইসলামী রাজনীতির পরিমণ্ডলে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামির সখ্যতা গভীর। এককথায় বললে বলতে হয় ইসলামের নামে কোন রাডিক্যাল রাজনীতি যেন বাংলাদেশে জেগে না ওঠে ও দানা বাঁধতে না পারে পাশ্চাত্যের পক্ষে জামাতে ইসলামি তারই খেদমতগারি করে গিয়েছে। এই ধরণের মিত্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের চোখে শত্রু প্রমাণ করা শেখ হসিনার জন্য কঠিন একটি কাজ।

টাইম বাউন্ডিং দুর্বলতা বা গ্লোবাল যুদ্ধ কৌশলে বদল
উপরে শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতির যেসব বড় দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বললাম সেগুলো স্থায়ী। কিন্তু আর এক বিশাল দুর্বলতার দিক আছে যাকে বলা যায় “টাইম বাউন্ডিং” বা সময় নির্ধারিত দুর্বলতা। মানে, কোন্‌ সময়ে তিনি তার রাজনীতিটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতিটার ২০০৭-৮ সালের আগে করতে সক্ষম হলে এক রকম হত, কিন্তু এর পরের যে কোন সময়ে করতে চাওয়াটা এক বিরাট বাধা। কেন? মুল কারণ ২০০৮ সালের পর খোদ আমেরিকাই আর বুশের নীতিতে থাকেনি। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট যুদ্ধনীতি বদলে ফেলেছে। এটা ২০০৮ সালে বুশের বদলে ওবামা জিতেছে বলে নয়। বুশের সম্মুখ সমরে ইসলাম মোকাবিলার নীতি তার ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরে নিজস্ব মুল্যায়ন রিপোর্টে ঐ নীতি অকেজো প্রমাণিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষের নাম লক্ষণ নাই বরং তা আফগানিস্তান বা ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর সবকিছুর উপরে যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের উপরে দাঁড়ানো বলে পরিণতিতে এটা একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা (২০০৭-৮) হিসাবে হাজির হয়।

এর ফলে বুশের সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে অল-রাউন্ড যুদ্ধ মোড় বদলাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধকৌশল মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক খুজে বের করার দিকে ধাবিত হয়, যার বাইরের নাম আরব স্প্রিং। ব্যাড মুসলিম আর গুড মুসলিমের ভাগাভাগি শুরু হয়। ওয়ার অন টেররের বাগাড়ম্বর স্তিমিত কিম্বা অবস্থা বিশেষে গায়েব হয়ে যায়। যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো আর বাড়ানো নয় বরং কত দ্রুত (২০১৪ সাল টার্গেট) সবগুলোকে গুটিয়ে নেয়া যায় – এটাই হয়ে যায় মার্কিন নীতি। কিন্তু হাসিনার স্থানীয় যুদ্ধকৌশল তো বুশের একরোখা ওয়ার অন টেররের উপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ইতমধ্যে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া হয়ে ওঠে ওবামা প্রশাসনের কাছে আগামি দিনের সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ আর সেকারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুকরাষ্ট্র কতোটা সমর্থন তা এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ওবামা আমলে আমেরিকার নতুন নীতি ও যুদ্ধকৌশলের সীমার ভিতরে হাসিনার নেয়া স্থানীয় ইসলাম নির্মূল কৌশল আনফিট ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ এই দিকটা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূল নীতির পালে হাওয়া লাগা অসম্ভব কিছু নয়। টাইম বাউন্ডিং বা সময় দ্বারা নির্ধারিত এই দুর্বলতার দিকটা বাদ রেখে হাসিনা তার দুর্বলতাগুলো কিভাবে কাটিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলোচনা এখন সেদিকে নেবো।

শেখহাসিনা-নির্মুল কমিটির পরিপূরক সম্পর্ক
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দুর্বলতাগুলো পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখেন শাহরিয়ার কবীর ও তার নির্মুলের রাজনীতি। এটাকে হাসিনার কৌশলের সাথে শাহরিয়ারের রাজনীতির পারফেক্ট ম্যাচ মেকিং বলা যায়। হাসিনার নতুন কৌশলটা শাহরিয়ার কবীরই সবচেয়ে পছন্দ করেছিলেন। সেই ২০০২ সাল থেকে নির্মুলের রাজনীতি প্রচার ও চর্চার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছিলেন তিনি। একাজে তিনি নতুন শত্রুর যে ভাগটা তৈরি করেন তা হলো, ব্রড হেডলাইনে ইসলাম আর তার প্রকাশ মানেই হলো জামাত। এভাবে তিনি কি করেছিলেন এবং কেন তা পেরেছিলেন এর তিনটা কারণ উল্লেখ করা যায়।

১. বাংলাদেশে আলকায়েদা বা তালেবানদের মত ইসলামী রাজনীতির সোল এজেন্ট, একমাত্র সম্ভাব্য দল হলো জামাত -এই মিথ্যা ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে তিনি একাজ করেছেন। এছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামাত মানেই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সকল ধারা ও প্রবণতার উৎপত্তি কারণ, উৎস ও প্রতীক। এভাবে বয়ান তৈরির সম্ভব হয়েছিল কারণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তো বটেই কমিউনিস্টরাও দুনিয়ায় বা বাংলাদেশের ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে কোনটার সাথে কোনটার মৌলিক রাজনৈতিক তফাত কি, কোন ইস্যুতে তাদের পার্থক্য, কোথায় তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক — এইসবের কোন খবর জানে না, রাখার দরকারও মনে করে না। বরং মনে করে মানুষের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ হলো ধর্ম, মানে ইসলাম। ফলে ধর্ম উৎখাত তাদের বিশাল রাজনৈতিক কর্তব্য। এই পরিস্থিতি শাহরিয়ারকে তার বয়ান তৈরি করতে সহায়তা করেছে।

২. ১৯৭১ সালে জামাতের রাজনীতি আর একালের তালেবান রাজনীতির কোন মিল থাকুক আর নাই থাকুক জামাতের ৭১ সালের ভুমিকাই হোল অকাট্য প্রমাণ যে জামাত তালেবানের মত একটা “সন্ত্রাসী” দল। জামাতের ৭১ এর ভুমিকা নিয়ে জনগনের মনে যে সেন্টিমেন্ট আছে তা কচলে ব্যবহার করে সাধারণভাবে সব ইসলামী রাজনীতিকে দানব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এই জবরদস্তি শাহরিয়ারের দরকার ।

৩. আফগান ফেরতদের দলগুলোর নানান তৎপরতা এবং জেএমবির স্বল্পকালীন উত্থান (২০০৫) এই ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবীরদের দারুণ কাজে লেগেছিল। শহুরে মধ্যবিত্তকে জঙ্গী ইসলামের নিশ্চিত আবির্ভাব সম্পরক্কে ভীত ও আতংকিত করা গেছে। জেএমবির উত্থান রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে অন্ধ অবস্থা তৈরী করেছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছিলে নির্মূলের রাজনীতি। জামাতের রাজনীতির সাথে জেএমবির রাজনীতির কোনই মিল নাই। কিন্তু মিল না থাকলেও মধ্যবিত্ত, সেকুলার,কমিউনিস্ট আর মিডিয়ার চোখে এদের জামাতি বলে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ঘটলো যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটা আর ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার থাকল না। বিচারের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকল না। বয়ানের পাটাতন একেবারে বদলে গিয়ে হয়ে দাড়ালো, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে সবকিছুরই নির্মুল, বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে ঝেড়ে মুঝে সাফ করে ফেলা। একাকার করা এই বয়ানে এক দড়িতে ফাঁসি হয়ে গেল “বিচার” আর ইসলামের।

এতে দ্বিতীয় আরেক বিপদ তৈরি হলো। ধরা যাক ঠিক বিচার নয়, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ আছে সেগুলোকেই মোকাবিলা করতে চান শাহরিয়ার ও তার নির্মুল কমিটি। তাতে একটু না হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার কথাটা ঢাল হিসাবেই ব্যবহারই তিনি করেছেন। এভাবেই যদি ধরি তো সেক্ষেত্রেও যে প্রশ্ন আমাদের ছাড়ে না তা হলো,ইসলাম নামে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশগুলোর মোকাবিলা কি নির্মূল বা ইসলাম ক্লিনজিং করে করা যায়, নাকি সম্ভব? অর্থাৎ কাজটা কি নির্মুল বা ক্লিনজিং -এর? যার যার মাথায় ইসলামী চিন্তা আছে এমন লোকদের এক এক করে ধরে মাথা কেটে ফেলার ব্যাপার ? মোটেই না। চিন্তার মোকাবিলা একমাত্র আরো অগ্রসর চিন্তা দিয়েই করা সম্ভব। নইলে তার পরাস্ত হবার কোন সম্ভবনাই নাই। । অর্থাৎ চিন্তা বা ভাবাদর্শগত ভাবে পরাস্ত করা এবং সেভাবে পরাস্ত করবার রাজনীতির মানে আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করা নয়। ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়া মানে মানুষের পুনর্গঠন আর পুনর্গঠিত সেই নারী ও পুরুষের নতুন সম্পর্ক রচনা — দুনিয়া থেকে পুরুষ নির্মূলের কর্মসুচী নয়। মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব সংঘাত শ্রেণীযুদ্ধ বটে কিন্তু কোনভাবেই এটা সমাজের মালিক অথবা শ্রমিক কাউকেই ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। বরং এটা সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্গঠনের যাতে সমাজে একদিকে পুঁজিপতি আর অন্যদিকে শ্রমিক উৎপাদন করতে না পারে। অর্থাৎ সামাজিক মানুষ যেন দুই বিবাদমান শ্রেণি হয়ে উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত না হয়, ইত্যাদি।

ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে অনেকের মনে হতে পারে বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষমতার জন্ম দিতে গেলে একটা যুদ্ধ তো হবেই, সেটা কি? সেটা আর যাই হোক কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং অপারেশান নয়। বিদ্যমান ক্ষমতাকে পরাস্ত করে নতুন ক্ষমতা কায়েমের জন্য যতোটুকু বলপ্রয়োগ লাগে ততোটুকুই। বৈপ্লবিক রূপান্তরে প্রাণের ক্ষয় ঘটে ঠিক, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়, নতুন ক্ষমতার জন্ম দেওয়া এবং নতুন আইন ও নীতিনৈতিকতার জন্ম দিয়ে নিজের নতুন ক্ষমতার বৈধতা ও ন্যায্যতা প্রমান করা। নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা যেন নতুন মানুষ তৈরী হতে পারে। কোনভাবেই সেটা ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। । এমন বাসনা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা কেউ একা বা দলবদ্ধভাবে তৈরি করা নয়। সমাজের সংস্কার বা বিপ্লব প্রতিহিংসার চর্চা হতে পারে না। জিঘাংসার আকাঙ্খা যে উন্মাদনা তৈরি করে বাস্তবে একা বা গোষ্ঠিসহ কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং করা মানেই হলো আরেকটি যুদ্ধাপরাধ ঘটানো।

সমাজে চিন্তা ও ভাবাদর্শগত লড়াইকে খুনোখুনি করে সস্তায় সেরে ফেলতে চেয়েছেন শাহরিয়ার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে হাসিনা আর নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার, মুনতাসির ইত্যাদিরা মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে গেছেন আর সমর্থকদের মনে সফল ভাবে ঢুকিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর ক্লিনজিং-এর আকাঙ্খা। নির্মূল বাসনার এক অসুস্থ উন্মত্ততা।

শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ারের এই যৌথ প্রকল্পের খবর অনেকেই রাখেননি। বলা বাহুল্য শেখ হাসিনার সাথে শাহরিয়ারের এই মহামিলন ও তাদের প্রজেক্টের অভিমুখ ও পরিণতি হলো হাসিনার কারজাই হওয়া। আর প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই এটা তালেবান রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা। ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে শাহরিয়ার আজীবন নির্মূলের মধ্যেই তার সমাধান দেখেছেন। তার সাফল্য হলো,এই উন্মাদনাকে তিনি বাংলাদেশের সমাজে একটা মানসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পেরেছেন। এখন বলে বুঝিয়ে এদের কাউকে বিরত করা যাবে মনে হয় না। কারণ এই উন্মাদনা চেপে বসেছে। তাদের অনুমানে দুলাখ ইসলামপন্থীদের নির্মূলের পথে নিয়া যাবার জন্য এরা তাদের মন ও সেকুলার জিঘাওংসাকে পুরাপুরি বেঁধে ফেলেছেন।

শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নির্মূল বাসনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটাচ্ছে সেটা বিচার করবার সাথে সাথে আমাদের কাছে একটা দিক পরিস্কার থাকতে হবে। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত একটি ইস্যু। বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ায় এর ফয়সালা না করলে নানান পেটি স্বার্থে এই জাতীয় ইস্যুটি সবসময় রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতেই থাকবে। যেমন শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর যেভাবে করছেন।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শাহরিয়ারের যুদ্ধ প্রস্তাব
তবু শেষ বিচারে হাসিনা আর শাহরিয়ারের রাজনৈতিক আকাঙ্খা কিন্তু এক নয়। শেখ হাসিনার আকাংখা ও পথ হোল যে-রাজনৈতিক লাইন বুকে ধরে তিনি গত দশ বছর এগিয়েছেন তা দিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার কাজে এই পথটাকে ব্যবহার করা। এই বিচারে শাহরিয়ার কিন্তু সৎ ও নির্মূলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর নিজের ভাষাতেও “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করতে চান। এজন্য তিনি VOA এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছে হস্তক্ষেপ সহায়তা চেয়েছেন। হাসিনা পশ্চিমের সমর্থনে একনিষ্ঠ “ওয়ার অন টেররের” একনিষ্ঠ খেদমতগার হয়ে বিনিময়ে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চান, নিজস্ব “স্বাধীনতার চেতনার” বাইরে থাকা বাকি সবাইকে মেরে কেটে সাফ করা যার লক্ষ্য, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আতাত ও আপোষ করতে বাধা নাই। । শাহরিয়ার চান একই “ওয়ার অন টেররের” খেদমতগার হওয়া, কিন্তু কোন আঁতাত বা আপোষ নয়। কারন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন তার উদ্দেশ্য নয়। বরং “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করবার কাজে একনিষ্ঠ থাকতে চান। এই কাজে তিনি শেখ হাসিনার ওপর পুরাপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। বরং সরাসরি আমেরিকার সমর্থন, লজিস্টিক , সৈন্য সব কিছুই চান। কোথায় তাদের মিল আর কোথায় পার্থক্য সেটা আমাদের বুঝতে হবে। একই সাথে শাহবাগের অংশ গ্রহণকারীরা যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে নিজেদের পৃথক দাবি করে, তারা শাহরিয়ারের নির্মূলের রাজনীতি ধারণ করে বলেই সে কথা বলে। ঠিক যে শাহবাগ শেখ হাসিনার আশু রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলিত থাকলেও শাহবাগের রাজনীতি শেখ হাসিনার রাজনীতি নয়। সেটা একান্তই শাহরিয়ার কবীরের নির্মূল বা ক্লিনজিং-এর রাজনীতি।

লক্ষ্য করার বিষয় ভয়েস অব আমেরিকার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার কিন্তু আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলছেন না। বলছেন ওয়ার অন টেররের খাঁটি লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন”। এটাই চান তিনি। বিষয়টা শাহরিয়ারের কাছে স্পষ্টতই এখন আর আদালত পাড়ার বিষয় নয়, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবার বিষোয়।। তাই তিনি প্রকাশ্যে সাক্ষ্যতকারে দাবি করছেন,“জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”। কিন্তু প্রশ্ন হোল এখন তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকারঙ্করে সবাইকে জানাচ্ছেন কেন? এতদিন আড়ালে যেভাবে চলছিল সেই পর্দা উঠিয়ে ফেলার কী দরকার ছিল।

কারণ শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ার – প্রতীকি নামের দুই রাজনৈতিক আকাঙ্খা হাত ধরাধরি করে চলতে থাকলেও তাদের উদ্দেশ্যে পার্থক্য ছিল। এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও এতদিন তাদের সহাবস্থানে অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এখন সেটা দিনকে দিন সেটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ারের নির্মূল ধারা মনে করছে হাসিনা যথেষ্ঠ কঠোর পথে যাচ্ছেন না। কি সেই কঠোর পথ? সুনির্দিষ্ট করে বললে, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে দানব হয়ে মাঠে নেমে পড়া, দাবড়ানো, খুনোখুনি। জিতি অথবা মরি জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে হাসিনা নির্বাহি ক্ষমতায় আছেন আর শাহরিয়ার আছেন একই নির্মূলের আদর্শে, চিন্তায় রাজনৈতিক লাইনে, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকার ঠেলা বা বিপদ শাহরিয়ারের বুঝের বাইরে। পোলাপান অনেক কিছুই আবদার করে। কিন্তু বাবাকে টাকা কামিয়ে, সেই কামানো অনুপাতে ব্যয় করতে হয়। তার পর আবদার কতক অংশ পুর্ণ করতে পারে কতক অংশ পারে না। পোলাপানের আবদারকে ভিত্তি মেনে বাবার চলা অসম্ভব। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার মানে ও পরিণতি কী সেটা না বুঝে শেখ হাসিনা পা ফেলতে পারেন না। বিশেষত সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার সায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আগে নিতে হবে। তা না নিয়ে লাঠি হাঁকাতে পারেন না তিনি। সন্ত্রাস দমন আইন দিয়ে ক্লিনজিংয়ে্র লাইনে ঝাপিয়ে পড়ার মানে শুধু পরিস্থিতি লেজে গোবরে করে ফেলা না, কিম্বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও না, বরং নিজের জান বাচানোও এতে সঙ্গীন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, লজিষ্টিক বা রসদের সরবরাহ পাওয়া না পাওয়ার কথা নাইবা তুললাম।

শেখ হাসিনাএখন একটা স্ববিরোধিতায় পড়েছেন। তিনি সচেতন ভাবে ক্লিনজিংয়ের ধারণা দিয়ে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠিকে তাতিয়েছেন। শুধু আওয়ামী পন্থী নয়, যারা আওয়ামী লীগ করে না সেকুলারিষ্ট, বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক, তরুণ ভোটার -ইত্যাদি সকলকে জিঘাংসার উন্মাদনায় শেখ হাসিনা উন্মত্ত করেছেন। তিনি এসব করেছেন এই উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ভাবে প্রবাহিত করে নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করার কাজে একে ব্যবহার করতে। অন্যদিকে শাহরিয়ার চাইছেন, উন্মাদনাকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মত্ত ব্যবহারে প্রয়োগ করতে, ক্লিনজিংয়ের কাজে লাগাতে। এজন্য তিনি পরিষ্কার করেই এখন বলছেন আদালতে কোন ‘বিচার’ এমনকি শাহবাগের মত ফাঁসিও না, একেবারে নির্মুল বা ক্লিনজিং করবার কাজ সম্পন্ন করতে চান তিনি। চান চিরতরে “জঙ্গি মৌলবাদ দমন”। একাজেই “আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”।

শাহরিয়ার কবীরের এই নির্মূল বাসনা আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যে তীব্র সংঘাত চলছে তার প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তাহ তিনেক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির এক টকশো তে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর প্রয়োগের পক্ষে আর বিপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুব। ওখানে মাহবুব বারবার আর্গু করছিলেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আর ব্যারিষ্টার আমিরুল ততই বারবার আর্গু করছিলেন সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ধরে নিতে পারি হাসিনা অন্তত বোঝেন “সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯” বাংলাদেশের হলেও আইনটা কার্যত আমেরিকার। আমেরিকার আগ্রহে ও ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি গাইড লাইন মেনে এটা তৈরি। এই আইন ব্যবহার করে নির্মুল বা ক্লিনজিং-এর পথে যেতে গেলে আমেরিকার আশির্বাদ লাগবে। কিন্তু শাহরিয়ার, মুনতাসির বা আমিরুল সেটা বেখবর। ফলে তারা বালখিল্য আচরণ করছেন। কান্নাকাটি করছেন, আমেরিকা কেন আফগানিস্তান বা ইরাকের মত বাংলাদেশেও একটা নতুন তালেবান মোকাবিলার ফ্রন্ট খুলছে না।

সন্ত্রাস দমন আইন এমন আইন যা কোথাও ব্যবহার করলে এর সব একটিভিটি রিপোর্ট আমেরিকাকে দিতে হয়। কেন? সেটা আমরা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ বুঝি সেই সহজ বোঝাবুঝি ছাড়াও আরও ভিন্ন দিক থেকে বোঝার ব্যাপার আছে। আমেরিকাকে না জানিয়ে হাসিনা যদি এই আইন একার বুদ্ধিতে ব্যবহার করে তবে সে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠবে। সেটা একটা তালেবান পরিস্থিতি তৈরি করবে, প্রথম চোটে যার অভিমুখ হবে এন্টি-আমেরিকান, বাংলাদেশের সব পশ্চিমা ইনষ্টলেশন এর টার্গেট হবে। অল-রাউন্ড একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট ওপেন করলে যেমন ঘটে। শুধু তাই নয়,এর উপচে পড়া প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশে না, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বার্মাসহ পুরা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের প্রতিদিনের আঞ্চলিক ঝগড়া দ্বন্দ্ব বিবাদ সবসময়ে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মায়ানমারে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিবাদ হিসাবে চলছে এগুলো সমন্বিত হবে আর তার নির্দিষ্ট অভিমুখ হবে পশ্চিমা-বিরোধী। স্থানীয় যে কোন বিরোধ এভাবে গ্লোবাল বিরোধ হয়ে হাজির হতে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য আত্মরক্ষামূলক ধরণের হলেও সেই সীমিত লক্ষ্যের নতুন ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতা তৈরি করে ফেলবে। ফলে সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ দেখতে বাংলাদেশের মনে হলেও এর প্রয়োগ ও পরিণতি শতভাগ আঞ্চলিক ও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। এদেশে যারা দুলাখ জামাত ও রাজাকারি ট্যাগ লাগানো লোক মেরে নির্মুলের মধ্যে ঘটনার সুখকর সমাপ্তি দেখছেন তাদের বেহুঁশ ও বালখিল্য বললে কম বলা হয়। আমেরিকার যুদ্ধ বালখিল্য ব্যাপার নয়। যদি তাই হোত তাহলে সারা দুনিয়ার উপর সাম্রাজ্যের ছড়ি ঘুরাতে পারত না। তাহলে কি শাহরিয়ারের লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন” কাজে আমেরিকাকে ডাকার চেষ্টাটা ভূয়া? এতে কিছু হবে না? কোন বিপদ নাই?

না ভূয়া বলছি না। বলতে পারলে ভাল লাগত। গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো,আওয়ামী লীগ, অ-আওয়ামী লীগার, সেকুলারিস্ট,বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক –সকলেই একপ্রকার জিঘাংসার উন্মাদনায় আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তাতানোর ফলাফল এটা। এটা পটেনশিয়াল ও খুবই বিপজ্জনক। যে কোন দিকে এর মোড় নেবার সম্ভাবনা আছে। হাসিনা একে তার নির্বাচনী বা ক্ষমতা লাভালাভের কাজের মধ্যে পরিণতি টানবার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। শাহবাগ নামে যা ফেটে বের হয়েছে। আবার শাহবাগের অনেকেই যেমন বলে শাহবাগের অভিমুখ একটা না, ভিতরে অনেক অভিমুখ আছে। এর ভিতরের একটা শক্ত অভিমুখকে চিনিয়ে দেই। যেমন ষ্টেজে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আছেন সবসময় ইমরানের পাশে। নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একই সাথে হাসিনা ও নির্মূল কমিটির প্রতীক। ওখানে যে আইকন বা ছবি তোলা হয়েছে সেটা “বঙ্গবন্ধুর” না, নির্মুল কমিটির জাহানারা ইমামের । বেঁচে থাকলে জাহানারা নির্মূলের রাজনীতি করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তার ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটির পটেনশিয়ালিটি নিশ্চয় নতুন করে বলবার কিছু নাই।

কোথায় নিয়ে যাবে এরা?
পটেনশিয়ালিটি – মানে কিছু ঘটিয়ে দেবার উন্মত্ততা। শেখ হাসিনা কিন্তু এখনো তৈরি হওয়া এই উন্মত্ততা দিয়ে কিছু ঘটিয়ে ফেলার পটেনশিয়াল নিস্তেজ করতে পারেন নি। ওদিকে শাহরিয়ার, মুনতাসির বা ব্যারিস্টার আমিরুলের নির্মুলের রাজনৈতিক আকাঙ্খা জীবিত আছে, সরব হচ্ছে। হাসিনার টালবাহানা দেখে শাহরিয়ার সরাসরি আমেরিকার কাছে আহ্বান নিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে নির্মুল কমিটির ধারাটাই উন্মত্ততার উপযুক্ত ও কার্যকর ক্যারিয়ার হতে পারে। এই হোল পটেনশিয়াল বিপদ তৈরি হয়ে থাকার দিক। ওদিকে আমেরিকাও বাংলাদেশে কোন নতুন ফ্রন্ট খোলার কোন তাগিদ দেখাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও অর্থ খরচের সামর্থ হারাচ্ছে তারা। অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উন্মত্ততার লাইন প্রথম ঝাপ্টায় ইতোমধ্যে দেড়শ লোক মেরে ফেলেছে, কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। প্রথম দফার রক্তারক্তির পর উভয় পক্ষই সমাজকে স্ব স্ব পক্ষে নতুন শক্তি ও শ্রেণি বিন্যাস তৈরির জন্য সময় নিচ্ছে। কোন পক্ষই টোন ডাউন করবে এমন বাস্তবতা নাই। কিছু ঘটাবার সক্ষমতা উভয় পক্ষেই আছে। এটাই অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা আর অনিচ্ছুক আমেরিকাকে যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতায় টেনে নিতে পারে। একটা লোকাল ঘটনা রিজিওনাল ও গ্লোবাল হয়ে উঠতে পারে। এর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাকে কিছু তো করতে হবে, অন্তত আত্মরক্ষামূলক। লিবিয়ার “আরব স্প্রিং” উন্মাদনার এত বড় ঘটনায় খরচের কথা চিন্তা করে আমেরিকা কোন মেরিন পাঠানোর পথে যায় নাই। এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু গাদ্দাফি উত্তরকালে নিজের রাষ্ট্রদুত খুন হবার পর কিন্তু সে মেরিন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সোজা মানে হলো, মেরিন পাঠানোর অবস্থা তার এখনও নাই বললে চলে, একান্ত বাধ্য হয়ে না গেলে। খরচ সামলানো মুশকিল। এখন কম খরচে ন্যূনতম কিছু করতে হলে সেটা হবে ড্রোন হামলা।

এসব বিবেচনায় করেই প্রতীকি ভাবে ড্রোনের কথা এসেছে। কিন্তু মুল বিষয় হলো, যে পটেনশিয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে তা যে কোন দিকে মোড় নেবার ঝুঁকি রাখে। উন্মত্ততা নিস্তেজ করবে কে, কি দিয়ে এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে না। এখন এই সম্ভাবনা আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

 

[এই লেখাটির একটি প্রাথমিক খসড়া সর্বপ্রথম তোলা হয়েছিল গত ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ফেসবুকে নোট আকারে। শিরোনাম ছিল, ‘শাহরিয়ার ও শাহবাগ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে’সেই লেখাটি এক সম্পাদিত রূপ এরপর ছাপা হয়েছিল চিন্তা নামের ওয়েব পত্রিকায়।  চিন্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল দুদিন পড়ে  ২৪ মার্চ ২০১৩ সালে। এখানে চিন্তা পত্রিকার ভার্সানটাই আবার এখানে হুবহু তুলে আনা হল, সংরক্ষণের জন্য।]