বিচারপতি গগৈ বিজেপির সাথে আসাম মিশনে

বিচারপতি গগৈ বিজেপির সাথে আসাম মিশনে

গৌতম দাস

২৩ মার্চ ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Vh

 

মোদী ও গগৈ_

আজব খবরটা হল, ভারতের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ভারতের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট বা উচ্চকক্ষ বলে পরিচিত- রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন। তিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত; সব মিলিয়ে এক বছরের কিছু বেশি সময়। অর্থাৎ গগৈ মাত্র চার মাস আগেও ভারতের প্রধান বিচারপতি ছিলেন ।

একজন বিচারপতির সাথে  পার্লামেন্টের কোন এমপি বা আইনপ্রণেতার সম্পর্ক হল – আইনপ্রণেতা কনস্টিটিউশন মেনে আইন প্রণয়ন করছেন কি না, সেটা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচারপতির। অর্থাৎ একজনের কাজে চেক এন্ড ট্র্যাকে আনার দায়িত্ব অন্যজনের। কাজেই কোনো বিচারপতি  অবসরে গিয়ে নিজেই আইনপ্রণেতা হয়ে যেতে পারেন এটা অকল্পনীয়। এসব বিচারে কোন বিচারপতিরই অবসরে যাবার পরেও নির্বাহী বিভাগের ভিতরে কাজে ঢুকে পড়া, কর্মচারি হয়ে পড়া ইত্যাদি এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। ঠিক যেমন একজন বিচারপতি যে কোন সামাজিক আসরে এমনকি কখনও কখনও পারিবারিক আসরে অংশও নিতে পারেন না, কারণে সেখানে এমন কোন লোকের সাথে সাক্ষাত হয়ে যেতে পারে যিনি আদালতে বিচারাধীন কোন মামলায় কোন পক্ষের লোক। এটা কোন অযাচিত সন্দেহ সৃষ্ট করে ফেলতে পারে। তাই এমন আসর তার এড়িয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করা হয়।  হয়ত তিনি বাস্তবে খুবই সৎ তবুও নিজে থেকেই কারও কোন সন্দেহের উর্ধে থাকতে ও এড়াতে এসবের বাইরে হাত পরিস্কার থাকতে তাকে সাহায্য করে। এভাবে অনেকেই বিচারকদের এসব  এড়িয়ে চলাই সঠিক মনে করেন।  প্রশ্নটা বিচারকের ব্যক্তিজীবনের অধিকারের প্রশ্নের চেয়েও নিজেকে যেচে স্বচ্ছ ও পরিস্কার রাখার প্রশ্ন।

তবু অনেকে মরিয়া আর গোয়াড় হয়ে তর্ক তুলেছেন ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকারও তো রাজ্যসভার মনোনয়ন গ্রহণ করেছেন। তাহলে প্রধান বিচারপতি গগৈর এর বেলায় দোষ কী? এখানে আসলে যারা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগের আলাদা রেখে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না তাদেরকে এসব বুঝানো যাবে না।   একজন ক্রিকেটারের নির্বাহি বিভাগের সাথে লাভজনক সম্পর্ক তেমন কোনই সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যেমন একজন বিচারক এটা একেবারেই পারেন না। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে আইন করেই বিচারককে এজন্য দূরে রাখা হয়েছে।

রঞ্জন গগৈকে রাজ্যসভার সদস্য পদে মনোনয়ন দিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। ভারতের রাজ্যসভা বা কাউন্সিল অব স্টেটস ( রাজ্যসভার অফিসিয়াল ইংরাজি নাম Council of States) হল রাজ্যগুলোর স্বার্থের একধরণের পরামর্শক সভা-প্রতিষ্ঠান।  রাজ্যসভার সদস্যরা মূলত ভারতের মোট ২৮টা রাজ্যের (সাথে কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেরও) বিধানসভার মাধ্যমে মনোনীত হয়ে থাকেন। যেখানে বিধানসভা মানে ভারতের রাজ্য (প্রাদেশিক) পার্লেমেন্ট। রাজ্যসভার জন্য মনোনীত এমন মোট সদস্য ২৩৮ জন। এর সাথে আরও সর্বোচ্চ ১২ জন থাকেন প্রেসিডেন্টের মনোনীত। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৮০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী – সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা এবং সামাজিক বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্টের হাতে রাজ্যসভার সদস্য পদে মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে। এই যুক্তিতে একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিকে প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি মনোনীত করতে সরাসরি আইনগত বাধা না থাকলেও এই মনোনয়ন মরালিটির কিংবা রাষ্ট্রের ন্যায়-নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ও দায়ের দিক থেকে স্ববিরোধী। সাবেক বিচারপতিরা অবসরে যাওয়ার পরে সরকারি পদে নিয়োগ বা সুযোগ সুবিধা নিতে পারবেন না – এমন কথা রাজ্যসভার রাষ্ট্রপতির মনোনয়নের বেলায় স্পষ্ট করে আইনে উল্লেখ না থাকাতেই এখানে গগৈ-এর মনোনয়ন পাবার সুযোগ দেয়া ও নেয়া হয়েছে। যেমন, রঞ্জন গগৈ শপথ গ্রহণের পরে সাফাই গেয়ে বলেছেন, “প্রেসিডেন্টের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেন নাই” [President requests for your services, you don’t say no.]। এই অজুহাত খুবই হাস্যকর ও তাঁর অসততার পক্ষে সাফাই। গগৈ কী জানেন না রাষ্ট্রপতির এসব মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে একাজের পরামর্শ সরাসরি নির্বাহি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আসে। সেই মর্মে প্রধানমন্ত্রী অফিস থেকে পরামর্শের ফাইল প্রেরণ করা হয়। এবং তা অনুসরণ করা প্রেসিডেন্টের কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা!  কাজেই নমিনেশন দানের জন্য এভাবে প্রেসিডেন্টকে ভগবানের আসনে বসানো অপ্রয়োজনীয়। বাস্তব নানা স্বার্থের দুনিয়ার ঘটনায় কোন ‘পবিত্রতা’ আরোপ ভাল লক্ষণ বা কাজ না।

রাজ্যসভার কিছু বৈশিষ্ঠঃ
রাজ্যসভা প্রসঙ্গে সারকথাটা হল, রাজ্যসভার সদস্যরা ভারতের প্রাদেশিক বা রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের দ্বারা মনোনীত হয়ে থাকেন। মানে রাজ্যসভার সদস্যরা নাগরিকদের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হন না; তারা রাজ্য বিধানসভার সদস্যের ভোটে নির্বাচিত/মনোনীত হন। তাই রাজ্যগুলোরই এক অ্যাসোসিয়েশন বা পরিষদ হল এই উচ্চকক্ষ। উদ্দেশ্য, লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের সাথে রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতা কমানো। তাই এর ইংরেজি নাম কাউন্সিল অব স্টেটস। ভারতের কয়টা রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের দল রাজ্য-ক্ষমতায় নির্বাচিত থাকে – এভাবে বেশির ভাগ রাজ্য সরকারে যারা ক্ষমতায় সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটা বড় প্রভাব থাকে রাজ্যসভায়। অবশ্য রাজ্যসভার নির্বাচনগুলো কখনই লোকসভার সাথে মিলিয়ে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় না। তাছাড়া, আরও ব্যাপার আছে।  রাজ্যসভার মোট ছয় বছরের মেয়াদে প্রতি দুই বছর পরে পরে নির্বাচন অনুষ্ঠুত হয়  আর সেক্ষেত্রে কেবল এর খালি আসনগুলোর নির্বাচন হয়ে থাকে। আবার ভারতের রাজ্যসভা ব্যবস্থাকে আমেরিকার সিনেটের সাথে তুলনীয় বলে যেন আমরা বিবেচনা না করি। মূল কারণ, ভারত কোন ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; বরং এককেন্দ্রিক বা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার এক রাষ্ট্র। যদিও ভারতে ইউনিয়ন রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। তবু  ‘ফেডারেল’ শব্দের কোনো ব্যবহারই এর কনস্টিটিউশনে নেই। কাজেই রাজ্যসভা ভারতের (আমেরিকার সাথে তুলনীয় অর্থে) কোন সিনেট  নয়। আর একটা বিষয় – অর্থবিল ছাড়া অন্য সব বিলের বেলায় তা দুই সংসদেই (লোকসভা ও রাজ্যসভা দুটোতেই) বিল আকারে পেশ করা ও পাশ হওয়া ছাড়া তাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সাপেক্ষে তা কখনও আইনে পরিণত হয় না।

“সেপারেশন অব পাওয়ার”
ইতিহাসে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন ও চালু হওয়ার বহু আগে থেকেই ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও ইস্যু হয়ে আছে। অর্থাৎ সমাজে ইনসাফ নিশ্চিত করতে চাইলে বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার বাইরে স্বাধীন ও মুক্ত রাখতে হবে; যাতে নির্বাহী ক্ষমতা কোন বিচার প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। কারণ এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে আদালতকে নির্বাহী ক্ষমতার কোনো হস্তক্ষেপ বা চাপের মধ্যে পড়তে হয়। তাই আদালতগুলো ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’ অর্থে স্বাধীনভাবে নিজের বিবেচনা প্রভাবহীনভাবে প্রয়োগ করে কাজ করার পরিবেশ থাকা চাই। যদিও শেষ কথা হল, বাস্তবে যতটুকু সেপারেশন সম্ভব  ও নিরপেক্ষতা সম্ভব – এমন রিয়েলিস্টিক অর্থে, বাস্তবে বাস্তবায়ন যোগ্য অর্থে কথাগুলো নিতে হবে।

এ জন্য কোনো আদালতের উপর নির্বাহী ক্ষমতার হস্তক্ষেপ করার সুযোগ হাতের নাগালে আসার একটি  অবস্থা আসে বিচারকেরা  অবসরে যাওয়ার পরে যদি তাঁরা আবার কোনো সরকারি ও লাভজনক পদে নিয়োগ পাওয়া বা সরকারি সুবিধা নিতে চায় বা দেয়া হয়। আসলে এমন নিয়োগ বা অযাচিত সুবিধা নেয়া মানেই, নির্বাহী ক্ষমতার অনুগ্রহ লাভ করা এবং সুনজরে পড়া। আর এখান থেকেই কথা উঠে – “বিচারক থাকাকালে সরকারের পক্ষে ফেভারেবল রায় দিয়ে যাও আর অবসরে যাওয়ার পরে এর বেনিফিট তুলে নাও”। এটাই সেই নীতি। বাংলাদেশের সুপ্রীমকোর্টের পঞ্চম সংশোধনীবিষয়ক রায় দেয়ার ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ আছে। এমন অভিযোগ মোকাবেলা করতেই ‘অবসর-পরবর্তীকালীন লোভ-লালসার সুযোগ থাকা ও নেয়া থেকে বিচারকদের বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত’ করে রাখার জন্য আলাদা আইন দরকার বলে অনেকে উল্লেখ করে থাকেন। এটাকে insulated from ‘post-retirement allurements’ ধরনের আইন বলা হয়ে থাকে।

রঞ্জন গগৈ-এর এবার ভারতীয় রাজ্যসভার পদ গ্রহণের পরপরই এমনই এক মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা হয়েছে। সেখানে আবেদন করা হয়েছে “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ সম্মুন্নত রাখতে এব্যাপারে আদালত যেন নির্দেশনা দেয়। এ ছাড়া, ভারতের মিডিয়া ও আদালতপাড়া সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাও ইস্যুটা নিয়ে সোচ্চার। অর্থাৎ একটা ন্যায়নীতি বা ন্যায়ের দণ্ড পিছলিয়ে হাত থেকে পড়ে গেছে, ধুলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে – এমন অনুমান থেকেই এসব আপত্তি। রঞ্জন গগৈ ইতোমধ্যেই রাজ্যসভায় শপথ নেয়া শেষ করেছেন। আর সেখানে তাকে নিয়ে টিটকারি দেয়া আর হইচই হয়েছে। একজন বিচারপতি রাজনৈতিক দলাদলি ও টিটকারির মধ্যে পড়েছেন, এটা কেউ আশা করে না আর এটা তাঁর জন্য বিরাট অসম্মানের; যদি আত্মসম্মানবোধ তখনো তাঁর শক্ত থাকে। একজন বিচারকের আসলে নিজের কাছে আজীবন শপথ থাকার কথা যে – রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বিতর্ক থেকে তিনি দূরে থাকবেন।  কারণ ইঙ্গিতেও যেন বিচারককে নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মিশে যাওয়া বা সম্পর্ক পাতিয়েছেন এমন কোনো ইমেজ তার জীবনে না থাকে। কোনো নির্বাহী ক্ষমতা বা এর ছায়া কোনো বিচারক শেয়ার করতে পারেন না, আজীবন। এতে ন্যায়বিচার প্রদান এবং এর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপস করা হয়ে যেতে পারে। যদও অনেক দেশেই উল্টাটা পাওয়া যায়। তাই তারা এমন বাক্য লেখা দেখে হেসে উঠতে পারেন। কথা সত্য, অনেক দেশেই বিভারপতিরা বুক ফুলায় নির্বাহি ক্ষমতার অনুগ্রহ নিয়ে নেন। অথবা নির্বাহি প্রধানমন্ত্রী বিচারক প্রভাবিত করে নিজের ক্ষমতার ব্যপ্তি ও সক্ষমতার তারিফ করে থাকেন।

তবে  রঞ্জন গগৈর রাজনৈতিক পদ গ্রহণ থেকে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য যে, তার সময়কালে সেনসিটিভ চূড়ান্ত রায় যেগুলো তিনি দিয়েছেন, সেগুলো কি তাহলে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে অনুগ্রহ প্রদানে করে মানে ফেবার[favor] করে দেয়া হয়েছে? এর বিনিময়ে প্রাপ্ত ‘চেক’ এখন তিনি অবসরে ক্যাশ করছেন কি না!  তাঁর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ ও সেনসিটিভ  কিছু রায়গুলো হল – অযোধ্যা (বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার দাবির ক্ষেত্রে মন্দিরকে জায়গা দেয়া আর মসজিদকে দূরে বাইরে জায়গা করে দেয়া রায়), শবরীমালা (কেরলের এই মন্দিরে মেয়েদের, মূলত গর্ভবতীদের বেলায় চালু থাকা প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া রায়) এবং রাফায়েল (ফ্রান্সের ‘রাফায়েল’ বিমান কেনায় দুর্নীতির মামলা থেকে সরকারকে খালাস দেয়া) মামলা। এছাড়া, সবচেয়ে বিতর্কিত রায় হল আসামের এনআরসি ইস্যু। আদালতের সরাসরি অধীনে এর বাস্তবায়ন কাজে নেমে পড়ার পক্ষে ২০১৩ সালের রায় দিয়েছিলেন এবং শেষে ২০১৮ সালে এসে পারসেপশনের উল্টা ১৪ হাজার হিন্দু ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেও- মেনে নিতে বাধ্য করে দেয়া রায়।

আতাঁত? কিন্তু কোন আঁতাতের কথা বলা হচ্ছেঃ
তাই এখন সবাই প্রশ্ন তুলছে- ২০১৩ সাল থেকেই বিজেপির সাথে আঁতাত করে এনআরসি বাস্তবায়ন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর একটা কাজ হলেও গগৈ তা নিজ আদালতের মানে, নিজের অধীনে নিয়েছিলেন। মূলত তিনি আসামের এক কট্টর অসমিয়া জাতিবাদী  এবং জাতিবাদী জগতে বুদ্ধিজীবী এলিট ও গণ্যমাণ্য ব্যক্তি বলে পরিচিত।  দাবি করা হয় তিনিই প্রথম ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চল থেকে  প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। ফলে সব অসমিয়া জাতিবাদীর মতো তারও দৃঢ় বিশ্বাস বা পারসেপশন হলো মুসলমান বা বাংলাদেশের বাঙালিদের কথিত অনুপ্রবেশই অসমিয়াদের সব দুঃখ ও কষ্টের কারণ। অথচ আসল কারণ ভারতের তথাকথিত কেন্দ্রের মিলিটারি স্ট্রাটেজি।  তাই বিচারপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি এনআরসি বাস্তবায়নের নির্বাহী কাজ নিজের অধীনে সম্পন্ন করার পক্ষে ২০১৩ সালে রায় দিয়েছিলেন। এ কাজে বিজেপির হিন্দুত্ব আর অসমিয়া জাতিবাদ ষড়যন্ত্রে হাত মিলিয়েছিল এবং ‘বুঝাপড়া’ করে নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।  এর এক বৃহত্তর বহিঃপ্রকাশ হল, অসমিয়া জাতিবাদ মনে করে বাংলাদেশি আর  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা আসামে অনুপ্রবেশে করেছে। ফলে তাদের বের করে দিতে এনআরসি বাস্তবায়ন ততপরতা দরকার।  বিপরীতে বিজেপির রাজনৈতিক লাইন হল বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা নয় কেবল বাংলাদেশের মুসলমানেরাই অনুপ্রবেশকারি। এই দুই ধারার বয়ান হাত মিলিয়েছিল। অসমিয়া জাতিবাদীরা নিশ্চুপ থেকে বিজেপিকে ওয়াকোভার দিয়েছিল ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনে। এভাবে  ২০১৬ সালে মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণা তুঙ্গে তুলে আসাম রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল। এভাবে এই আঁতাত খারাপ চলছিল না।  কিন্তু এনআরসির চূড়ান্ত গণনায় দেখা গেল  – ১৯ লক্ষ মোট অপ্রমাণিত নাগরিকের মধ্যে ১৪ লক্ষই হল হিন্দু। [এখানে ভুল করে নয়াদিগন্তের ছাপা ভার্সানে লক্ষের জায়গায় ‘হাজার’ লেখা হয়ে গেছিল। পত্রিকার পাঠকেরা আমাকে এ’ভুলের জন্য মাফ করবেন। ]  আর এটা প্রকাশ পাওয়াতেই অসমিয়া জাতিবাদী পারসেপশন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়ে যায়।  অর্থাৎ তাদের মুসলমান ও বাংলাদেশি বিদ্বেষ পুরাপরি ন্যাংটা হয়ে ধরা পড়ে যায়।  উপায়ান্তর না পেয়েও গগৈ নতুন কোনো ষড়যন্ত্র করতে রাজি হননি।  অথচ বিজেপি ওপেন আদালতেই প্রস্তাব দিয়ে চেয়েছিল যে, বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে মুসলমানদের গণনা সঠিক হয়নি বলে দাবি করে মুসলমানদের নাগরিকত্ব প্রমাণিত পাওয়া যায়নি বলে পুরায় গণনা চালানোর অনুমতি। যাতে তাতে বেশিরভাগ  মুসলমানই নাগরিকতে প্রমাস্ন করতে পারেন এমন ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া যায়। কিন্তু এত বড় জুয়াচুরিতে গগৈ রাজি হননি। তাই নাগরিক গণনা্র আগের লিস্টই ফাইনাল বলে তিনি রায় দিয়ে দিলেন। তাতে ব্জেপি নাখশ হয়। তাই থেকে বিজেপি গণনা ও ফলাফলের সব দায় কিছুটা আদালতের আর পুরাটা  সমন্বয়ক আমলা প্রতীক হাজেলার ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজ ইমেজ বাঁচাতে নেমে পড়েছিল। আর তখন থেকে অসমিয়া জাতিবাদের সাথে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী বিজেপির আঁতাত দুর্বল হয়ে যায়।

পরিণতিতে অসমিয়া জাতিবাদীরা ১৯৮৫ সালের স্টাইলে আবার মাঠের আন্দোলন শুরু করে দেয়, কিন্তু এবার বিজেপির বিরুদ্ধে। এরই ফলে বিজেপি রাজ্য সরকারে এখনো ক্ষমতায় বহাল আছে বটে, কিন্তু মিটিং-মিছিল করতে পারে না; জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওদিকে অসমিয়া জাতিবাদীরা আবার বিদেশবিরোধী পুরনো স্লোগান তুলে অসমিয়া সমাজে ও মাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। আর বিজেপি একেবারে কোণঠাসা। এর মধ্যে মোদী তিনবার আসাম সফরের কর্মসূচি ঠিক করেছিলেন এই ভেবে যে নতুনভাবে অসমিয়া জাতিবাদের সাথে একটা আপোষ প্যাচআপ করা যায় কিনা! কিন্তু অসমিয়া জাতিবাদের তাজা অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে শেষে তিনবারই তা বাতিল করে দিয়েছেন। কেবল একবার আসামের বোড়ো অঞ্চলে বোড়ো ইস্যুতে সংক্ষেপে সফর সেরে এসেছিলেন। এদিকে আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পরই অথবা একই সাথে আসামেও আবার রাজ্য নির্বাচন হবে ২০২১ সালের মে মাসের দিকে। তাই রঞ্জন গগৈকে রাজ্যসভায় সদস্য করে দেয়া – এটাকে মোদী সরকারের  আবার নির্বাচনের আগে নতুন করে অসমিয়া জাতিবাদীদের সাথে বিজেপির আঁতাতেরই এক মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গে আরেক খবর হল, রঞ্জন গগৈর ছোট ভাই হলেন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল অঞ্জন গগৈ। তাকেও দুই মাস আগে রঞ্জন গগৈর মতোই মোদীর সরকার ‘নর্থ-ইস্টার্ন কাউন্সিল’ বলে স্থানীয়দের সংযুক্ত করে এক আঞ্চলিক সরকারি পলিসি সুপারিশের প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ওয়্যার [WIRE] পত্রিকায় ‘দুই গগৈ ভাইয়ের নিয়োগের গল্প’- এই রিপোর্ট পাঠ করা যেতে পারে।  অতএব, বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নিয়োগ বিজেপির নতুন আসাম মিশনেরই অংশ। রঞ্জন গগৈর ডিগবাজি খাওয়া দেখে তারই এক কলিগ আরেক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ খুবই কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন [‘Surprised How Ex-CJI Compromised on Judiciary’s Independence’, Says Justice Kurian Joseph]।  তিনি বলেন, রাজ্যসভার সদস্যপদ গ্রহণ করে গগৈ ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’- নীতির সাথে এক বিরাট আপস করলেন [“According to me, the acceptance of nomination as member of Rajya Sabha by a former CJI, has certainly shaken the confidence of the common man on the independence of judiciary……]। অথচ আমরা চার বিচারক একবার একসাথে জনগণের সামনে এ নিয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলাম।

এদিকে রাজ্যসভায় শপথ গ্রহণ শেষ করা পর রঞ্জন গগৈ এসব বক্তব্যের পালটা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাক্ষাতকার দিয়েছিল।  সেখানে তিনি মিডিয়ার বিভিন্ন সমালোচনার বিরুদ্ধে সাফাই হাজির করতে চেয়েছেন। কিন্তু পেরেছেন কী?  এক মিডিয়ায় মন্তব্য হল গগৈ “quid pro quo” করেছে, যে প্রবাদের মানে হল  “কোন কিছুর বিনিময়ে কোন কিছু” দিয়েছেন। তিনি এই অভিযোগের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানে করেছেন যে তিনি অর্থের বিনিময়ে ফেবার করেছেন। অথচ অর্থ এর একমাত্র অর্থ নয়। তিনি দাবি করেছেন রাজ্যসভার সদস্য হয়ে অর্থগত লাভালাভ একজন প্রধান বিচারকের আয়ের মতই। তার এটা নাকি প্রমাণ যে তিনি সওদা করেন নাই। রঞ্জন গগৈ বোকাবোকা কথা বলে নিজেকে বাচাতে চাইলেন। খুব সম্ভবত বিজেপির সাথে বিনিময় বা সাওদাটা অরথের অবশ্যই নয় বরং অহমিয়া জাতিবাদী স্বার্থে তার পুরানা পদকে বিজেপির সাথে ব্যবহার ও বিনিময়-সওদা।  তার মনের সাফাইটা হল তিনি তো বিজেপির সাথে এর পক্ষে কাজ করে মানে সওদা করে অর্থ নেন নাই, বরং অহমিয়া স্বার্থের লাভালাভ পেতে বিনিময় করেছেন। সুতরাই এটা সৎ বা ব্যক্তিস্বার্থ নয়।  অথচ ফ্যাক্টস হল, তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থ নির্বাহি মোদী সরকারের কাছে বেঁচে দিয়েছেন।  আর এতে স্বার্থ বা লাভালাভ গেছে গগৈ-এর পেয়ারের তথাকথিত অহমিয়া জাতের পক্ষে।  এই প্রীতি মারাত্মক অগ্রহণযোগ্য ও না-জায়েজ।

তিনি সেখানে আরও দাবি তুলেছেন যারা (মানে তিনি যোসেফ কুরিয়ানকে বুঝিয়েছেন) এমন বিবৃতি দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আদালতের অবমাননার মামলা করবেন বলে তিনি আশা করেন [he hoped the Supreme Court will initiate contempt proceedings ]। তিনি এতটুকু বলেই থামেন নাই। আরও বলেছেন, যে তিনি মনে করেন শেষে দেখা যাবে সুপ্রীম কোর্ট এমন মামলা করবেনই নাই [“I don’t think it’ll happen, though it should happen,”] ।  গগৈ-এর এই মন্তব্য ভারতের বিচারক পাড়াকে সোজা আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের রাজনৈতিক মেরুকরণে দ্বিবিভক্ত করে দিয়েছে।

এ লেখা পড়ে অনেকের মনে হতে পারে বিজেপিই বোধহয় একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা বিচারপতিদের লোভ-লালসায় ফেলে দিয়েছে। এ কথা ভুল, রঞ্জন গগৈর ঘটনাটা সম্ভবত পঞ্চম ঘটনা। আগের তিনটি ঘটনা কংগ্রেসের আমলের। বিচার বিভাগকে আলাদা রাখা, হস্তক্ষেপ না করা, যাতে সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত থাকে- এ ব্যাপারে বিজেপির মতো কংগ্রেসেরও কমিটমেন্ট নেই। আর বিজেপি অনেক সোজাসাপ্টা, তারা পাবলিকের কাছে রাষ্ট্র এমন তেমন স্বচ্ছ হবে বলে কোনো প্রতিশ্রুতিই দেয় না। কারণ বিজেপির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কেমন হবে বা সে নির্মাণ করবে কত ভাল ও মহান হবে সেয়া  এমন ব্যাপারে তার কোনো বিশেষ চিন্তা বা ফোকাসই নেই। ভারতকে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র হতে হবে, সম্ভব হলে হিন্দুরাষ্ট্র গড়তে হবে- বরং এই হল তার প্রতিশ্রুতি। এর বিপরীতে কংগ্রেস মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি আবার অবলীলায় ভাঙবে।  এই হল কংগ্রেস। যেমন রঞ্জন গগৈর ঘটনায় কংগ্রেস খুবই সোচ্চার ও নিন্দা জানিয়েছে। অথচ নিজেদের আমলের একই ব্যত্যয়ের ঘটনা সম্পর্কে তারা একেবারে নিশ্চুপ। ভারত রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ার এটাও একটা বড় লক্ষণ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২১ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  বিচারপতি গগৈ বিজেপির আসাম মিশনের অংশ“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

গৌতম দাস

০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Us

 

Shringla’s visit, Independent Online /UNB

ভারত-রাষ্ট্র টিকে থাকার ন্যায়ভিত্তি হেলে গেছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নুন্যতম কিছু নৈতিকতা-সম্পন্ন একটা ন্যায়ের ভিত্তি থাকতেই হয়, নইলে সে প্রতিষ্ঠান টিকে না। রাষ্ট্র বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম একটা ন্যায়ভিত্তির উপর না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে সবার আগে প্রতিষ্ঠান মরাল [moral, নৈতিক শক্তি] হারায়, নৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। ভারত-রাষ্ট্র সেই সঙ্কটে আটকে গেছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেছে। কারণ, মোদীর ভারত নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী, তার সরকার ও দলই এর প্রযোজক বলে অভিযুক্ত। গত ২০০২ সালের গুজরাট ম্যাসাকারের সময় গুজরাট কোনো রাষ্ট্র ছিল না, একালের ভারতও নিছক কোনো রাজ্য নয়, এটা রাষ্ট্র। কাজেই কোনও কিছুই ২০০২ সালের মত ঘটবে না। পুনরাবৃতি ঘটবে না।  এদিকে নরেন্দ্র মোদী দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে এপর্যন্ত মুখ খোলেননি। একটা কথাও বলেন নাই। যে নৈতিক সঙ্কটে ভারত পড়েছে এই নির্বাক থাকায় সেটা আরো জটিল হবে। মোদীর সরকার ভারতের বাসিন্দাদের এই নৈতিক সঙ্কটে ফেলে দিয়ে গেছে যা ক্রমে নাগরিকদের হত্যা ও ম্যাসাকারের দায়বোধের অস্বস্তিতে বেঁধে ফেলবে। তাই সরকারি আমলা হিসেবে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এসময় বাংলাদেশ সফরে এসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা বলার শক্ত নার্ভ দেখিয়ে ফিরে গেলেন! এটাই তাঁর অর্জন! ওদিকে, সিল্লি ঘটনা বিস্তারিত ঠিক কী ঘটেছে এবং তা কিভাবে, এর ফ্যাক্টসের কিছু এর মধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরুও হয়েছে।

কেন শ্রিংলাঃ
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা এবার তাঁর দু’দিনের (২-৩ মার্চ) সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন। কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কোনও দেশ সফরের আগে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশ সফরে আসেন। আর তা মূলত নির্বাহী প্রধানের সফরকে নিশ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এ ছাড়াও, সফরে কেন ও কী কী ইস্যু উঠবে আর তাতে উভয়ের অবস্থান কী হবে এসব চূড়ান্ত করাও এর লক্ষ্য। যদিও এরপরেও অনেক কিছুই থেকে যায়, যাবে বা রেখে দেয়া হয় যা সফরকালে দুই শীর্ষ প্রধানের আলাপে ফাইনাল করা হবে। দেখা যাচ্ছে, মোদীর  বাংলাদেশ সফরের আগে সে উপলক্ষে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সচিবকে পাঠিয়েছিলেন। সেটা কোনো দোষ বা বড় ব্যতিক্রমের বিষয় না হলেও, অনুমান করা যায় সেটা ঘটেছে এই বিবেচনায় যে, ঢাকায় শ্রিংলার ‘তাজা বন্ধু’ অনেক বা তাঁর অন্য ভারতীয় কলিগদের চেয়ে তিনি এগিয়ে। কারণ, এই তো গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর কাটিয়ে  তিনি এদেশ ছেড়ে গেছেন। তার সেসব তৎপরতা ও স্মৃতি এখনো তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি কলিগদের সবার চেয়ে বেশি ‘তাজা’ বলে আর তখন যেসব বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক তিনি জমিয়েছিলেন, তা এখন কাজে লাগানোর বিচারে তিনি অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ঘনিষ্ট বন্ধুদেশ’  গভীর ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ অথবা কখনোবা বলা হচ্ছে এরা নাকি ‘স্বামী-স্ত্রী’ অথবা আরো কত কী যেগুলো সত্যিই ইউনিক, একেবারে তুলনা নাই। দুনিয়ার কোনো কূটনৈতিকপাড়ায় এমন অকূটনৈতিক অর্থহীন ও বোকা বোকা শব্দের ব্যবহার নেই। যদিও তা আসলে বাংলাদেশকেই গায়ে পড়ে নিচে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।

পশ্চিম এখন বুঝছে ‘হিন্দুত্ব’ কেন হুমকির বাপঃ
এই পটভূমিতে, শ্রিংলাকেই বেছে পাঠানোর এই ঘটনা – মোদীর ভারত যে ভালই বিপদে আছে এর আরেকটা প্রকাশ। শ্রিংলাকে এমন একটা সফরে আসতে হয়েছে যখন দুনিয়াজুড়ে মোদীর ভারতরাষ্ট্র নাগরিকের হিউম্যান রাইট রক্ষার দিক থেকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। এদিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ার সঙ্কটে পড়া এক রাষ্ট্র বলে ভারতকে দেখা হচ্ছে।  এধরণের ব্যর্থতাবিষয়ক মামলায়  জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইটস সংগঠন [UN-OHCHR] এই ব্যর্থতা নিয়ে আদালতের শুনানিতে অবজারভার হতে চেয়েছিল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এমিকাস কিউরি (amicus curiae OR  “friend of the court”] হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী আগাম ভয় পেয়ে, আপাতত এটা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণ হবে এই অজুহাত তুলে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং তেমন আলোকে বিবৃতি দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। এছাড়া অন্যদিকে জাতিসংঘের অবজারভার হয়ে চাওয়াকে মিথ্যা করে প্রপাগান্ডা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি মামলায় আবেদনকারি বা পিটিশনার হয়ে চেয়েছে। এনিয়ে দক্ষিণের দৈনিক দ্যা হিন্দুর নিজ লেখা সম্পাদকীয় আগ্রহীরা পরে দেখতে পারেন।

এদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ ভারত-রাষ্ট্রে নিয়ে আলোচনা পশ্চিমে এখন আর সংসদীয় কমিটির ছোট্ট পরিসরে আর নয়। মুসলমান হত্যার মোদীর ভারতকে সামলাতে এখন পশ্চিম সরাসরি স্ব স্ব পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নিয়েই মোদী-অমিতের তান্ডব আর হুমকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে BRUT Debate বা আমেরিকার সংসদে (প্রতিনিধি পরিষদে) দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব এখন একটা হট ইস্যু। ভারত থেকে মুসলমান উদ্বাস্তুর ঢল নামবে কি না আর সেক্ষেত্রে আগাম তা ঠেকানোর উপায় কী, আগানোর কৌশল কী, এটাই মুলত তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ভারত ১৩৫ কোটি মানুষের ভোক্তা-বাজারের এর দেশ। কিন্তু এর প্রতি লোভের চেয়েও ওখান থেকে সম্ভাব্য উদ্বাস্তুর ঢল অনেক বেশি বিপর্যয় আনবে, এটাই এখানে মুখ্য দুঃচিন্তা আর হুমকিবোধ।

দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিল্লিতে ৫৮ জনেরও বেশি মানুষ, মুসলমান বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে তিনি কোনো কথা, বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া কোনো কিছুই দেননি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের পক্ষ থেকে কোন আশ্বাস, ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়ানো, কোন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বসানো, হামলাকারিদেরকে আইনের আওতায় আনা ইত্যাদি যেগুলো এমন পরিস্থিতিতে সব রাষ্ট্রই নুন্যতম রুটিন কাজ হিসাবে করে থাকে – এমন কোন পদক্ষেপ মোদী নেন নাই।

মোদী-অমিত এখন এতই নিলাজ আর বেপরোয়া যে তাঁরা খোলাখুলিই ভারতের পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এতে প্রকারন্তরে ম্যাসাকারের দায় তাদের উপর সরাসরি এলেও তারা বেপরোয়া। অর্থাৎ মোদী তবু মূলত প্রতিক্রিয়া শুন্য। এই প্রতিক্রিয়াহীনতা অ-প্রধানমন্ত্রীসুলভ, তাই অগ্রহণযোগ্য; এমনকি মারাত্মক অস্বাভাবিক। আর এটাই মোদীর আর তাঁর সরকারের এতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে তীব্র করছে। এছাড়া এটাই  তাঁর সরকারকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার এক বিরাট সঙ্কট তৈরি করেছে।  আরও বড় কারণ হল, আপনি মুসলমান হলেই আপনাকে দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগানোর পর এবার তাই আপনাকে নিপীড়ন করে হত্যা করা জায়েজ – এই হল এখনকার নয়া নরমাল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা। এটা ভয়ঙ্কর!

অর্থাৎ মোদীর সরকার এখন নাগরিক বৈষম্যহীনতা কায়েম করা দূরে থাক,  ন্যূনতম ন্যায়নীতি পালন ও রক্ষারও অযোগ্য – এমন এক পরিচয় তুলে ধরতে বেপরোয়া হয়েছে। অথচ শ্রিংলার বিপদ হল, এই নৈতিকতার সঙ্কটে থাকা সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করতে তাকেীই সময় বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ লোক মুসলমান।

এসব বিচারে ভারতের হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে আমরা দেখছি তিনি ব্যাকফুটে ও নিষ্প্রভ। তা না হয়ে তার উপায় কী? এমনকি শ্রিংলার ঢাকায় থাকা অবস্থায় ৩ মার্চ আনন্দবাজারের এক রিপোর্টও তার সঙ্কটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পত্রিকা শিরোনাম করেছে বেসুরো ঢাকায় সফর শ্রিংলার“- আর তাতেই শ্রিংলার দফা-রফা। লিখেছে, “সিএএ-এনআরসি বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। দিল্লির হিংসা, সেই ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে দেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের একাধিক জনের ভারত সফর বাতিল করেছিল হাসিনা সরকার। আজ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন, বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফর”। এই খবর মোদী ও শ্রিংলার জন্য বিরাট অস্বস্তির সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি তারা সেন্সে থাকে!

বাংলাদেশের স্পিকারের ভারত সফর ছিল গত ২-৫ মার্চ। তিনি সফর বাতিলের ঘোষণা দেন মাত্র একদিন আগে, ১ মার্চ; যেনবা শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরে আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি। নিশ্চিত হতেই তিনি শেষ বেলায় এসে ঘোষণা দিয়ে দেন। শ্রিংলা ঢাকা আসেন পরের দিন ২ মার্চ। অর্থাৎ শ্রিংলা বাংলাদেশের স্পিকারের সফর বাতিলের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি বা তা পারেননি। মানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত “বড়ভাই” সুলভ ডাট দেখাবেন এমন অবস্থা – না ভারতের না শ্রিংলার সে মুরোদ আর অবশিষ্ট আছে মনে হচ্ছে না। এমনই করুণ অবস্থা! অর্থাৎ এটা মেনে নিয়ে হলেও ব্যাকফুটে থাকাতেই স্বস্তিবোধ করছেন শ্রিংলা।

শ্রিংলার সেমিনারঃ
শ্রিংলা ২ মার্চ সকালে বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় হাইকমিশনের সহ-আয়োজক হয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করেছিল। এটা ছিল ‘”বাংলাদেশ ও ভারত : একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ” এই শীর্ষক এক সেমিনার।   কিন্তু এবারের সফরে শ্রিংলার দুর্ভাগ্য যে, তাকে সরাসরি ডাহা অসত্য বলেই পার পেতে হবে, অন্য রাস্তা নেই। তাই তিনি আসলে ঐ সেমিনারে  ভান করলেন যে, এনআরসি ইস্যুটা যেন এখনো কেবল আসামেই সীমাবদ্ধ বা  সেখনেই কেবল আটকে আছে।  তাই শ্রিংলা বললেন, “ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে” – এমন ডাহা মিথ্যা চোখ বুঝে বললেন। অথচ  তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেননি যে, তিনি এবার “ভারতজুড়ে এনআরসি করবেন”। অথচ অমিত এটা কোনো জনসভায় বলেননি,  খোদ সংসদে এবং মন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। কাজেই এটা কোনো দলের নয়, ভারতের সরকারি অবস্থান। এছাড়া এটা তো ভারতের কোন বিরোধী দল, এমনকি কোন মিডিয়া মানে নাই। এছাড়া মোদী এমনকি দিল্লিতে নির্বাচনে হারের পরেও বলেছেন, আপাতত এনআরসি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর ভারতজুড়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএর বাস্তবায়নে মেতে উঠবেন তিনি।

তাহলে শ্রিংলা কেন এখনও এনআরসিকে ‘আসামের ঘটনা’ বলছেন? ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা মিডিয়াও তো তার কথা মেনে নেয় না। এযুগে ভারতের সরকারের কে কী প্রতিদিন বলেন তা বাংলাদেশে বসে জানা কি খুবই কঠিন! এনআরসি এখন ভারতজুড়ে বাস্তবায়নের ইস্যু আর এটা এখন এনআরসি-সিএএ ইস্যু। অথচ শ্রিংলা সেমিনারে বলে গেলেন এনআরসি ‘প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায়’ চলছে। তাই তিনি দাবি করলেন, ” … সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের ওপর এর কোনো প্রভাব থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি”।  আসলে তিনি জানতেন কেউ তার এ কথা এ দেশে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু তবু এই চাতুরী ছাড়া কিইবা তিনি করতে পারতেন? সম্ভবত এত অসহায় অবস্থায় হয়ত তিনি এর আগে নিজেকে দেখেননি!

তিনি আরো বানিয়ে বলেছেন, সিএএ বা “নাগরিকত্ব বিল কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়”।  বলেছেন দ্বিতীয়ত, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে এসে যারা ভারতে আছেন, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব দেয়াই এর উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়ত, এটা (বাংলাদেশের) বর্তমান সরকারের সময়ের জন্য কার্যকর হবে না। কার্যকর হবে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসক ও অন্য সরকারগুলোর সময়ে, যারা এখানে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি”। এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। কারণ সিএএ আইন প্রযোজ্য হবে বা এর কাট অফ ডেট হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪। মানে এর আগে যারা ভারতে প্রবেশ করবে তাদের সবার উপরে প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেবল ‘১৯৭৫-পরবর্তী’ সময়টার ক্ষেত্রে  এই আইন প্রযোজ্য হবে এই কথাটাই পুরা ভুয়া, ভিত্তিহীন। বুঝাই যায় হাসিনা সরকারের মন পাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সিএএ আইনের মধ্যে তিন দেশে থেকে আসা সম্ভাব্য হিন্দুদের কথা বলার সময় বাংলাদেশের নাম সরাসরি আইনে উল্লেখ করা আছে এবং তা আছে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ বাংলাদেশ সরকার হিসাবে।  কাজেই এটা সরাসরি হাসিনা সরকারকেও ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ অভিযুক্ত করেই আইনটা লেখা হয়েছে।  অথচ, ভারত এখন বাংলাদেশকে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে’ আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পেশের আগে না দিয়ে আবার উলটা  আইনের ভাষ্যটা শ্রিংলা বা ভারত সেকথা লুকাতেছেন।  মূলত বাংলাদেশের নাম না উল্লেখ করলে  বিজেপি দলের লাভ হয় না। কারণ  আইনের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছে এজন্য যে – পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণ করতে বা হিন্দু ভোট সব নিজের রাজনৈতিক ঝুলিতে পেতে এমনটাই বিজেপির দরকার; সেক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যাটা যাই হোক।

অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বন্টনের মুলাঃ
বাংলাদেশে এই সফরে শ্রিংলা আরেক বিরাট মুলা ঝুলিয়েছেন – তিস্তার পানি তো বটেই, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৪ যৌথ নদীর মধ্যে আরো নাকি ছয়টি নদীর পানি ভারত দিবে এই চুক্তি নাকি প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এটা শ্রিংলার দাবি। এটা অবিশ্বাস্য আর ভারতকে বিশ্বাস করার মত আমাদের আস্থা তারা অনেক আগেই হারিয়েছে। আসলে ঐ সেমিনারে শ্রিংলা এমন সব কথা বলেছেন, যা দেখেই বুঝা যায় বানানো কথা বলছেন। আর মিথ্যা বলে  মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, “এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত”। এটা কোনভাবেই ভারতের মনের কথা না কারণ এটা ভারত অনুসরণ করে আসছে অথবা এখনও করছে এমন নীতি পলিসিই নয়। এককথায় এখন এটা ভারতের অবস্থানই নয়, এ’পর্যন্ত ভারতের অনুসৃত নীতিই নয়। কার্যত তাদের অবস্থানটাই উল্টা।

আমরা দেখছি ‘পরিবেশের’ কথা তিনি বলেছেন। যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনায় টেকনিক্যাল নিয়ম হল, নদীর “অবাধ” প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। অথচ এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশবোধ শূন্য এবং তাদের ভূমিকা পরিবেশবিরোধী। ভারত বহু আগে থেকেই হয় নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়েছে, না হলে আন্তঃনদী যুক্ত করার মতো চরম পরিবেশবিরোধী প্রকল্প নিয়েছে। আর তাও না হলে নদীর মূল প্রবাহ থেকে বড় খাল কেটে পানি বহু দূরে টেনে নিয়ে গেছে। এই হলো ভারতের কথিত পরিবেশবোধের বাস্তব অবস্থা।
আর টেকসই? নদীর উপর যথেচ্ছাচার যেসব বাড়াবাড়ি ভারতে হচ্ছে তাতে নদীর “অবাধ” প্রবাহ ধ্বংস করে যা কিছু করা হয়েছে সেগুলো একটাও টিকবে না, বরং মূল নদীই শুকিয়ে যাবে ক্রমেই। ফারাক্কা ইতোমধ্যেই এ অবস্থায়। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ভারতের বিহারে প্রতি বছর বন্যার কারণ বলে অভিযোগ উঠছে এখন লাগাতর প্রতিবছর।
আর ন্যায়সঙ্গত বণ্টন? মানে যৌথ নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনটা কী ? যেকোন যৌথ নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রাপ্য, সমান হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত আইনত বাধ্য। এছাড়া আমাদের সম্মতি ছাড়া বাঁধসহ নদীর প্রবাহকে যেকোনভাবে বাধাগ্রস্ত করাটাই বেআইনি। অথচ ভারতের সাথে নদীর পানি বণ্টনের যেকোন আলোচনায় তাদের দাবি অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হতে হবে – “ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পরে পানি থাকলে তবেই তা বাংলাদেশ পাবে”। মানে তারা হল জমিদার – এই নীতিতেই ভারত চলে। একারণে  প্রায় সব সময়ের বাড়তি যুক্তি হল ‘এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই আরো কম পানি পাবে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ ভাটির দেশ হিসেবে পানি আমাদের প্রাপ্য এই আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তারা কখনও মানে নাই। কথা হল, ভারতের পানির প্রয়োজনের কী কোনো শেষ  থাকবে?
সোজা কথা ‘পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন’ এই শব্দগুলো শ্রিংলা তুলেছেন- কথার কথা হিসেবে এবং মন ভুলাতে। অথচ না পরিবেশ রক্ষা, না আন্তর্জাতিক নদী আইন – কোনটাই ভারতের চলার ভিত্তি বা সরকারের নীতি নয়। মিথ্যা বলাটা সবাই পারে না, বুক কাঁপে। আসলে শ্রিংলা দেখালেন, পুরো মিথ্যা বানোয়াট কথা বলার মত শক্ত নার্ভ তার আছে। আর সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, বাংলাদেশ তবুও তাকে বিশ্বাস করবে বা আস্থা রাখবে – সেটা যাক তাকে মিথ্যাই বলতে হবে!

দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?
আবার ফিরে যাই, এবার দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?  বাংলাদেশে এসে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লি ম্যাসাকার নিয়ে একটা কথাও বলেননি। এক্ষেত্রে তাঁর অজুহাত সম্ভবত, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তাই। কিন্তু বাস্তবতা হল – লাগাতার তিন দিন ধরে এ হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকার চলেছে; দিল্লি জ্বলেছে, কমপক্ষে ৫৮ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের বাড়িঘর যতটুকু যা যা বাড়িঘর সম্পদ সব কিছু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন সবার একভাবে যায় না। এই প্রথম কারা সুনির্দিষ্টভাবে দিল্লি ম্যাসাকার করেছে তার কিছু তথ্য সামনে আসা শুরু হয়েছে।

দিল্লি ভারতের বিশেষ মর্যাদার টেরিটরি, তা সত্ত্বেও ওর ভিতরেই দিল্লি একটা রাজ্য। তাই রাজ্যের ‘বিধানসভা’ নামের একটা সংসদ (প্রাদেশিক পার্লামেন্ট) আছে। সেখানে রাজ্য নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করতে পারে, যা কেবল নিজ রাজ্যের ওপর প্রযোজ্য। দিল্লির বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে এমনই একটা আইন পাস করা হয়েছিল, যার নাম ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট ১৯৯৯’। ব্যাপারটা তুলনা করে বললে এদিকে বাংলাদেশে একটা ‘মানবাধিকার কমিশন’ আছে। আর তা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যত স্বাধীন নয়। আইনের মারপ্যাঁচ ও দুর্বলতায় এটা আমাদের নির্বাহী ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়েই চলে। সে তুলনায় ভারতের অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কমিশনগুলো এত ঠুঁটো নয়। বরং এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এবং ভারতের আদালতের পর্যায়ে স্বাধীন। যেমন ভারতের “জাতীয় নারী কমিশন” যথেষ্ট প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ব রাখে। তেমনি ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে দিল্লি রাজ্য সরকার এক ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন’ (ডিএমসি) গঠন করে রেখেছে। এখানে ঘোষিত মাইনরিটি হল, – The notified Minority Communities, as per the Act, are Muslims, Christians, Sikhs, Buddhists and Parsis.। আর এর মূল কাজ হল, ‘সংখ্যালঘু বা মাইনরিটিদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা’ [To safeguard the rights and interests], যা যা ভারতের কনষ্টিটিউশন মাইনরিটিদেরও নাগরিক অধিকারে সমতা-সাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই DMC কমিশনের ক্ষমতা পুরোটাই আদালতের পর্যায়ের না হলেও তারা অনেক ক্ষমতাই রাখেন। যেমন গত ২৫ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে নর্থ দিল্লিতে কার্ফু জারি করতে তারাই  অনুমোদন দিয়ে চিঠি দেওয়াতে পুলিশ তা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পরে ম্যাসাকার, তান্ডব কমে আসলে পরে, সেই ডিএমসি সরেজমিন দিল্লির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর শেষে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এছাড়া অচিরেই একটা “ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি” গড়ে তারা মাঠে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, যে কমিটিতে আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছে। এই কমিশন বা ডিএমসির চেয়ারম্যান হলেন জাফরুল ইসলাম খান [Zafarul-Islam Khan] ও অন্য সদস্য হলেন কারতার সিং কোচ্চার [Kartar Singh Kochhar]। এরাই প্রথম সরেজমিন রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ বর্ণনা আছে সেই রিপোর্টে। তাদের প্রথম কথা হল, এই হামলা ‘একপক্ষীয়’ এবং ‘পূর্বপরিকল্পিত’ [‘one-sided, well-planned’]। অর্থাৎ এটা কোনধরণের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি বা রায়ট নয়। অথবা এটা হঠাৎ উত্তেজনায় ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং আগেই পরিকল্পনা করে ঘটানো এক ম্যাসাকার-সন্ত্রাস। এছাড়া এই প্রত্যক্ষ মাঠ-সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তাদের কথা বলার সময় জাফরুল ইসলাম খান সাহেবের করা আরও কিছু মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

তাঁর ফাইন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় মন্তব্য হল, প্রায় দুই হাজার বহিরাগতকে পরিকল্পিতভাবে নর্থ-ইস্ট দিল্লিতে এনে, কয়েকটা স্কুলে রেখে তাদের দিয়ে এই ম্যাসাকার, হত্যা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। [“There were approximately 1,500 to 2,000 people who had come to these areas from outside to create trouble,” ]। এর প্রমাণ হিসেবে এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ান তারা সংগ্রহ করেছেন। তার নাম রাজকুমার। তিনি রাজধানী স্কুলের এক গাড়ির ড্রাইভার। তিনি বলেছেন, এরকম ৫০০ বহিরাগত যাদের মুখে মুখোশ ছিল। এরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই স্কুলে অবস্থান করেছিল। তারা সাথে পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র ছিল আর এক ধরনের ‘বড় গুলতি’ ব্যবহার করেছিল উঁচু দালান থেকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারার জন্য। কমিশনও বলেছে, তারা এমন কিছু ব্যক্তির ফুটেজও সংগ্রহ করেছেন।

“Mr. Kumar told us that some 500 persons barged into his school around 6.30 p.m. on February 24. They wore helmets and hid their faces. They remained there for the next 24 hours and went away next evening after the arrival of police force in the area. They were young people who had arms and giant catapults which they used to throw petrol bombs from the school rooftops,”

এ ছাড়া জাফরুল ইসলামের দাবি, তারা জেনেছেন প্রত্যেক গলি থেকেই স্থানীয় অন্তত দু-একজন সহযোগী ছিল যারা মুসলমানদের বাড়ি , দোকান, গুদাম বা সম্পদ কোনগুলো, তা দেখিয়ে দিয়েছে। যাতে কেবল সেগুলোতেই আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এভাবেই ‘যমুনা বিহার’ এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই কেবল বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পদ পোড়ানো হয়েছে।

Muslim-owned shops like a travel agency and motorcycle showroom were looted and torched while Hindu-owned shops were left untouched.

এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা নিয়ে আবার লুকোচুরি শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ ‘মেনস্ট্রিম মিডিয়া’ এটা ছাপেইনি। সবচেয়ে বিস্তারিত ও সাহসী ভাবে ছেপেছে দক্ষিণের ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। এ ছাড়া ওয়েব পত্রিকা ওয়াইর (wire) আর নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এটা ছেপেছে। আরো কিছু পত্রিকা ছেপেছে, তারা কেবল সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের শর্ট ভার্সনটা ছেপেছে। তবে একটা ইউটিউব ভার্সন পাওয়া যায় এমন এক সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ‘এইচডব্লিউ নিউজ নেটওয়ার্ক (HW News Network) থেকে। সেখানে এ নিয়ে নিউজ ছাড়াও চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ফ্যাক্টস বাইরে আসা শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেও মোদী-অমিত কোনো কৌশল গ্রহণ করবেন, ধামাচাপা দিবার চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০৭ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে নৈতিক ভিত্তি হারানো একটি সফর – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব 

ভারতে হচ্ছেটা কী?
প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব!

গৌতম দাস

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Tr

 

‘Are you Hindu or Muslim?’: TOI photojournalist

সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু কেউ আমল করে নাই। সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
ঘটনা হল, টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিউটিরত এক ফটোসাংবাদিক অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে দিল্লিতে বজরং দলের গুন্ডারা প্যান্ট খুলিয়ে তাঁর “নাগরিকত্ব  টেস্ট” করেছে। এরপর সে “মুসলমান নয়” এটা নিশ্চিত হয়ে তবেই ছেড়ে দিয়েছে।

গত সোমবার থেকে  রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর হামলার আগুন লেগেছে  দিল্লিতে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী বা তাদেরকে দেয়া কাজের ব্রিফিং কী ছিল তানিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়ার ভাষ্যে ইতোমধ্যে ছবি প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ পুলিশের দিকে আঙুল উঠানো হয়ে গেছে।  এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?

ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনার দায় রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়।

কিন্তু দিল্লি এসব কিছুর ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে এর সাফাইটা হল, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’ [NCT] মানে, কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে বা অবস্থিত।  এই বিশেষ আইনের কারণে দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা অপেক্ষায় আদালতে মুলতবি আছে।
বিজেপি চলতি মাসেই শোচনীয়ভাবে দিল্লিতে হেরেছে । দিল্লি এই রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় বলছি  এজন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা কৃতিত্বের(!) রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের মুসলমান-টার্গেট করে করা হামলা ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। এক জিঘাংসা। এই বিশ্বাসে কঠিন অকল্পনীয় নির্যাতন আর চাপের মধ্যে ফেলতে পারলে বিজেপি-বিরোধিতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে।  মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
গত তিনদিনের ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ঐ রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
ইতোমধ্যে অবশ্য লক্ষণীয় ভাবে ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। [যা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার সরকারবিরোধী হইয়ে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ] দিল্লির এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই বলে। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে ‘মোদি মোদি’ বলে স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
ফটো জার্নালিস্ট হলেন কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি। সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে দিতে তার কেটেছিল। বা বলা যায় বিজেপির ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তাঁর কপালে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা সেই হিন্দুসেনার ডায়লগ ছিল, “তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে… আপনিও তো হিন্দু; কাজেই এতে ক্ষতি কী?”।
সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, “আপনিও তো হিন্দু, কেন তবে ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল তাদের একজন বলে ওঠে “তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান?” এরপরই তাঁরা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার ঐ এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভার এক গরীব ছাপোষা বলে মন গলিয়ে তবেই সে যাত্রায় তারা পার পায়।
উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়া – এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলো সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।

এই রিপোর্টের শুরুতে, লেখক ওসব বিজেপি-সেনা কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে গেছে। এরা “মিসগাইডেড ইয়ুথ”। “আইন হাতে তুলে” নিয়ে “ভায়োলেন্স” ছড়াচ্ছে। এরা “ধর্মীয় আইডেনটিটি” ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে। ইত্যাদি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কী মোদীর ভারতে চালু ছিল না? কেউ মুসলমান হলে নিপীড়ন করে “জয় শ্রীরাম” বলানোতে বাধ্য করা,  গরু ব্যবসায়ী হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা, এমন যে কাউকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথি মারার অজস্র ক্লিপ কী আমরা সোশাল মিডিয়ায় দেখিনাই?  অথচ সামাজিক প্রতিবাদ দূরে থাকে ঐ ঘটনাস্থলের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মজা দেখা এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে “এধরণের ঘটনাগুলো সব গুজব বলে” – এগুলোর কোন অস্তিত্ব নাই বলে মোদীর সংখ্যালঘু মন্ত্রীর বয়ান কী ভারতের মিডিয়া ছাপেনি? কোন মিডিয়াই কী মন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে একটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেছিল? নাকি তখন কি কেবল মনে হয়েছিল “আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর!  কাজেই সমস্যাটা আমার না” – এমন মনে হয়েছিল তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা জানাতে চাচ্ছে কেন?  কে শুনবে? মোদী না অমিত শাহ? কী আশা করেছিলেন আপনি?

বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন? কেন এতদিন চুপ ছিলেন? মুসলমানদের উপর হচ্ছিল বলে? তুচ্ছ করে? তাহলে আপনি কী?

সারা ভারত আর সাথে এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই মুসলমান মারা বা নির্যাতন করার নষ্ট “মেরুকরণের” বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি?  এটা ভারতের কনষ্টিটিউশন-বিরোধী ততপরতা – এই দায়ে বিজেপির উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দিয়ে গেছে? তাই, আজ আঁতকে উঠে লাভ কী, অনিন্দ্য?  সবই তো শেষ!

বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে তা আবিস্কার হয়েছিল এমন নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া ধরণের আবিস্কার সেগুলো।। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনাতে এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই “নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ”। কারণ কে মুসলমান কেবল এটা জানতেই তো বিজেপির এত আয়োজন। তাই নয় কী? তাহলে এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবেপ্রিন্টে ‘নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!”এই শিরোনামে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

গৌতম দাস

 ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2RG

‘Don’t worry about NRC’, Modi tells Hasina – New York, Sept 27 (UNB)

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছেই, তাতে যতই এটাকে সুপ্ত করে ফেলে রাখা অথবা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন! এটা লুকিয়ে থাকছে না। এর চেয়ে বড় কথা, সব হারানো মরিয়া মোদীর হাতে আমাদের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দরজায় কড়া নাড়ছে। বিগত ২০০৯ সালে এই সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ‘বন্ধু-রাষ্ট্র’ বলে সোনার-পাথরের বাটি ধরনের এক অর্থহীন শব্দ দিয়ে। অথচ যা সোনার তৈরি তা আবার পাথরেরও, এমন হওয়ার সুযোগ কোথায়? অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ মাত্রই তো তা আপনা-আপনা। যদি না দলীয় বা ক্ষমতায় থাকার স্বার্থের সাথে একে মাখিয়ে ফেলা হয়। একালে এসে যেটা আবার হয়েছে ‘স্বামী-স্ত্রী’ বলে আরেক ফালতু শব্দে। কূটনীতির জগৎ সম্পর্কে মন্ত্রীদের ন্যূনতম ধারণা থাকলে এসব শব্দ ব্যবহার আমাদের শুনতে পাওয়ার কথা নয়। সরকারকে কৌশলগত কাভার দেয়ার জন্য অনেক শব্দ অনেকসময় ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তাই বলে এভাবে এসব শব্দ দিয়ে নিজেই নিজেকে খাটো নিচা করে দেখানো, বেইজ্জত করা কাম্য নয়। তবে কথিত স্বামী-স্ত্রীর অধস্তনতার সম্পর্ক যে এখন বড় ধরণের সঙ্কটে মুখোমুখি হয়েছে আর মতবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে যাচ্ছে এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল দুবাই থেকে প্রকাশিত এক ইংরাজি দৈনিক গালফ নিউজ পত্রিকায়  সম্প্রতি দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতকার [শিরোনাম “Citizenship Amendment Act is India’s internal matter, Sheikh Hasina says”]। বলতে গেলে তিনি সেখানে সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন [Citizens Amendment Act, CAA] বা সিএএ-কে সমালোচনা করে “অপ্রয়োজনীয়” বলেছেন, “We don’t understand why [the Indian government] did it. It was not necessary,” । এটা আমাদের জন্য খুবই কৌতুহলের যে গত দশ বছরে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সম্ভবত এই প্রথম ভারতের বা মোদী সরকারের খোলাখুলি ও প্রকাশ্য এমন সমালোচনা করলেন, নিজের অসম্মতি অপছন্দের দিক প্রকাশ করলেন। নিঃসন্দেহে এটা প্রকাশ্য মতবিরোধ বা স্বার্থবিরোধে। তবে এটাকে তিনি এখন কোথায় কোনদিকে কতদুর নিতে চান তা বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে ও চোখ খোলা রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই সাক্ষাতকারকে একই সাথে আন্তর্জাতিকভাবে আম-পাবলিকের কাছে মোদীর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে বিচার দেয়া হিসাবেও পড়া যেতে পারে। ব্যাপারটা হল, ভারত সরকারের সিএএ বা এনআরসির কারণে ভারতের সম্ভাব্য বিতারিত মুসলমানেরা বাংলাদেশ অভিমুখে লাইন লাগিয়ে রওনা দিবে না। কারণ সিএওএ বা এনআরসি এগুলো ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। একথাগুলোই হাসিনার গত অক্টোবর ২০১৯ সালে ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন [… Modi has in person assured me]। এই কথাগুলো গালফ নিউজে সাক্ষাতকারের মুখ্য ফোকাস হয়ে হাজির করা হয়েছে। তাই এটা মোদীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ নালিশ অবশ্যই, কিন্তু নিজ সরকার টিকানোর ফ্যাক্টর ভারত – এই অধস্থন ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের দশ বছর পার হবার পর এখন এর কোন মুল্য তাতপর্য কী আছে? নাকি তাতপর্য বা সব মানে হারিয়েছে বলেই এটা এখন আম-পাবলিকের দ্বারস্ত – আমরা কি এভাবে পড়ব?

সিএএ বাস্তবায়নঃ
ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ অফিসিয়ালি গত ১০ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গেজেট হয়েছে। আর এদিকে কঠিন বাস্তবতা এমন যে বিজেপি বা মোদী সরকারকে এই সিএএ বাস্তবায়ন করতে যেতেই হবে। মোদী এমনই কোণের এক চিপায় পড়েছে। বিজেপির জন্য মরি আর বাঁচি ধরনের এক মরিয়া নিরুপায় অবস্থা এটা। কেন? কারণ, ভারতের অর্থনীতির নিম্নগতির মুখে আর বিশেষ করে সহসা এর রিকভারির সম্ভাবনা কম বলে, সরকারের ইমেজের প্রশ্নে আর সরকার চালানো ও লাগাতার আগামি রাজ্য নির্বাচনগুলোতে পাবলিকের মুখোমুখি হতে হলে বিজেপির কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। ফলে এমনিতেই চরম হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির হাতে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সামাজিক পোলারাইজেশন উসকে তুলে টিকে যেতে পারলে তবেই হয়ত তার রক্ষা – এখন সে এই অনুমানে গিয়ে ঠেকেছে। নইলে জন্ম থেকেই বিজেপি-আরএসএস যেমন সারা জীবনে ক্ষমতার ধারে কাছে যেতে পারেনি সেই রকমের দিনগুলোতে তাকে চিরদিনের মত আবার ফিরে যেতে হবে।
তাহলে অবজেকটিভ বাস্তবতাটা হল, বিজেপি বা মোদী সরকারকে মরিয়া হয়ে যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়ন করতেই হবে, হিন্দুত্বের হুজুগ তুলতে পারতে হবে।

কিন্তু সিএএ বাস্তবায়ন মানে আসলে কী? ঠিক কী হবে এতে এখানে? ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছে এমনকি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাও। তারা সরাসরি কথাগুলো নিজের পত্রিকার কোনো রিপোর্ট হিসেবে নয়, সম্পাদকীয় হিসেবে মানে নিজেদের কথা হিসেবে দায়িত্ব নেয়া ভাষ্য হিসেবে প্রকাশ করেছে। সেখানে বলেছে, “নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ ১০ জানুয়ারি গেজেটে বিজ্ঞাপিত হল অর্থাৎ সরকারিভাবে চালু হল। কৌতুহলের বিষয়, তার পাঁচ দিন আগেই উত্তরপ্রদেশ সরকার ঘোষণা করে, তারা আইনটি কার্যকর করতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসকদের বলা হয়েছে (একটি রিপোর্ট অনুসারে কেবল মৌখিকভাবে) এই আইনে উপকৃত ব্যক্তিদের, অর্থাৎ নির্দিষ্ট তিন দেশ থেকে আগত ছয়টি ধর্মের ‘শরণার্থী’দের, শনাক্ত করতে; সেই সঙ্গে সপ্তম যে ধর্মটি ছাড় পাচ্ছে না, তার ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ চিহ্নিত করতে”। আনন্দবাজারও ব্যাপারটা টের পেয়ে সহ্য করতে না পেরে সরাসরি লিখেছে – তবে কি দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটাই প্রধান,অর্থাৎ ‘বেআইনি’ মুসলিম বাসিন্দাদের চিহ্নিত করা?

তাহলে এটা হল, ভারতের ‘মুসলমান খেদানোর’ প্রোগ্রাম। অর্থাৎ সরাসরি বললে, ভারতের মুসলমান বিতাড়নের প্রোগ্রামে নেমে পড়েছে বিজেপি সরকার আর আশা করছে এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতে সামাজিক-রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে, পরিণতিতে ব্যাপকভাবে হিন্দুত্বের উত্থান-জাগরণে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে। তাতে ওই বিতাড়িত মুসলমানদের কী হবে, তারা কোথায় যাবে, তাতে বাংলাদেশের কী হবে ইত্যাদি দিক নিয়ে ভাবার দায় নেয়ার অবস্থায় বিজেপি বা মোদি-অমিতেরা নেই। মনে হচ্ছে, তাদের এখন আপনি বাঁচলে বাপের নাম অবস্থা!

এই অবস্থার বিপরীতে বাংলাদেশের সরকারের হাতে কী আছে? আছে এক ‘আশ্বাস’। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রধানমন্ত্রীর দু’বারের সাক্ষাতে ‘মোদী আশ্বাস’ দিয়েছিলেন বলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।  উপরে গালফ নিউজে ছাপা সাক্ষাতকারেও আমরা একই রেফারেন্স দেখলাম। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই আশ্বাস কী এখন কার্যকর আছে অথবা থাকবে? এর বাস্তব মূল্য কী? প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সমালোচনা দেখে মনে হচ্ছে তিনিও ভরসা পাচ্ছেন না!

আসলে, কঠিন বাস্তবতাটা হল, এটা “ভরসা অযোগ্য” হয়ে গেছে। আমরা যখন দেখতে পাই ও বুঝি যে বিজেপি বা মোদী সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া দশায়, অর্থাৎ আমাদের আশ্বাসদাতারই মরি-বাঁচি অবস্থা – তখন আশ্বাসের মূল্য অনুমেয়! উত্তরপ্রদেশে সিএএ বাস্তবায়ন নিয়ে কী হচ্ছে তা আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে আমরা দেখলাম। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রীর সরকার ক্ষমতায়। আর উত্তরপ্রদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ২০%।

এছাড়া, মোদীর আশ্বাসের ভাষ্যের একটা টেকনিক্যাল দিক আছে। ‘মোদীর আশ্বাস’ ছিল এই বক্তব্য যে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু” হয়ে থাকবে। তাই মোদী এখন কি বলে বসতে পারেন যে, তিনি এনআরসি ইস্যুতে আশ্বাস দিয়েছিলেন কিন্তু সিএএ ইস্যুতে দেননি? তা অবশ্য আমরা এখনো জানি না। তবে ভারতেই অভ্যন্তরীণভাবে মোদী সরকার তার বিরোধীদের সাথে এখন একটা বড় বিতর্ক করছে যে, “এনআরসি আর সিএএ আলাদা” ইস্যু। আর এনআরসি নিয়ে মোদী সরকার নাকি এখনো কোনো ‘কাজই শুরু’ করেনি। আরও পয়েন্ট তুলে বলতে পারেন, বাংলাদেশকে দেয়া কথিত আশ্বাস যখন দেয়া হয়েছিল তখনো ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী (সিএএ) তাদের সংসদে আনাই হয়নি।

আর এখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মোদি সরকার যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া হবে তা আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি। কারণ মোদী এটাকে তার দলের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে ফেলেছে। কাজেই ‘আশ্বাসের’ ওপর যে ভরসা রাখা যাচ্ছে না অথবা যায় না সেটা বাংলাদেশ সরকারের কাজ-কারবারেও স্পষ্ট যে সে এটা ওয়াকিবহাল। যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উত্তেজনা যে আছে ও বাড়ছে তা নিয়ে প্রকাশ্যে যতই আড়ালে রাখা হোক তা আড়ালে থাকছে না। দেশে-বিদেশে তা চর্চার বিষয় হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের সাক্ষাৎ সব একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তত এই তথ্যকে কেন্দ্র করে এটা এখন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ইস্যু। এ নিয়ে ভারতের মিডিয়াতেই বেশি প্রকাশিত রিপোর্ট এটা, যার সর্বশেষ হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের ভারত সফর বাতিল। যদিও এখানে কারণ বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্য সফরে সঙ্গী হতে গিয়ে সেই প্রায়োরিটিতে প্রতিমন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হয়েছে।

এখন বলাই বাহুল্য, সিএএ বাস্তবায়নের পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া কী হতে যাচ্ছে বা হতে পারে তা নিয়ে গ্লোবাল পরিসরে রাজনৈতিক (হিউম্যান রাইট) দিক ছাড়িয়ে তা এখন অর্থনৈতিক দিক থেকেও শঙ্কা সৃষ্টি করবে, এটাও স্বাভাবিক। কারণ কোন ইকোনমিই আর লোকাল নয়, ইকোনমি মাত্রই তা গ্লোবাল ও কানেকটেড। যেমন এত দিন জাপান ছিল অবকাঠামো খাতে কম সুদে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় ঋণদাতা- সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বা এশিয়ান-দাতা আইডিবির মাধ্যমে ঋণদাতা। গত তিন বছরের ফেনোমেনা হল, এর সাথে আরও যোগ হয়েছে – ব্যাপক ‘ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট’ মানে বাংলাদেশে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ নিয়ে জাপান এখন হাজির।

বাংলাদেশে তুলনামূলক সস্তা আর ভাল মানের শ্রমের লোভে জাপানি ম্যানুফ্যাকচারিং এখন স্থানান্তর হচ্ছে এখানে। তাই সোজা ভাষায় বললে, স্বাভাবিকভাবেই মোদীর এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন অধিকার-লঙ্ঘনের তৎপরতার খবরে যা সবাংলাদেশকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল করে ফেলার ইঙ্গিত – এটা নিয়ে, এসব বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত। এরই একটা ঝলক আমরা দেখতে পাই জাপানি মিডিয়ায়। বিনিয়োগকারীদের পছন্দের এমন এক মিডিয়া হল – ‘নিক্কি এশিয়ান রিভিউ [Nikkei Asian Review ]। সেখানেই প্রকাশিত এক রিপোর্টে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে – এটা কী বাংলাদেশে ‘আরেক রোহিঙ্গা সঙ্কট’ তৈরি করতে যাচ্ছে? ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, “আরেকটি রোহিঙ্গা-সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে ভারতের নাগরিকত্ব আইন, আশঙ্কা বাংলাদেশের”।
ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার মাহমুদের কিছু বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে যে আশ্বাস দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মনে করেন যে ভারতের এনআরসি বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না”। তবে শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।’
নিক্কি রিভিউয়ে যদিও লেখা হয়েছে যে, এর মানে হল ওই মহাপরিচালক “এই আশঙ্কাকে পাত্তা দিচ্ছেন না”। হ্যাঁ, সে কথা সত্য। কিন্তু বুঝতে হবে মহাপরিচালকের ভাষ্যটা বাংলাদেশের ‘অফিসিয়াল’ কূটনীতিক ভাষ্য। অফিসিয়ালি বাংলাদেশ সরকার এখনও ‘মনের শঙ্কার’ কথা অফিসিয়ালি বাইরে আনার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে নিক্কির ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের এক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৈহিদ হোসেনের বক্তব্যও এনেছে। সেটা হল, তৈহিদ হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, “বাংলাদেশের মাথার ওপর সিএএ একটি খাঁড়ার মতো ঝুলে আছে। যেকোনো সময় এটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে”। আসলে এটাই জেনুইন ভাষ্য। আমাদের সরকার এই ‘প্রাক্তন’ মুখগুলোকেই অ্যাক্টিভ করে মনের কথাগুলো আরো বেশি করে ইনফরমালি বাইরে আনার চেষ্টা করতে পারে।

বাংলাদেশের সরকার বিষয়টা নিয়ে ওয়াকিবহাল। কিছু প্রস্তুতির প্রকাশ্য দিকটাও আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই। যেমন সীমান্তের এক কিলোমিটার এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক চাইলে যেন বন্ধ করে রাখা যায়, এর কার্যকারিতা ইতোমধ্যে এক মহড়ায় টেস্ট করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কিছু সঙ্কীর্ণ নির্বুদ্ধিতাও আছে। এ ছাড়া সরকারের কিছু স্থায়ী নিজ দুর্বলতা আছে, যা ফলাফলে সরকারকে ভারতের সাথে তোষামোদকারীর ভুমিকায় হাজির করে রাখে বা রেখেছে। এটাই স্থায়ী সমস্যা, যা সমালোচকরা অনেকসময় বাংলাদেশকে ভারতের বাঁদী-রাষ্ট্র বা ভেসেল রাষ্ট্র বলে মূল্যায়ন করে দেখিয়ে থাকে।

নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ- এই আইনটা দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মূলত হিন্দুরা সরকার বা রাষ্ট্রের নিপীড়নে বা ‘পারসিকিউশনে’ [Persecution] আছে – এটা স্পষ্ট করে লিখে দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই দাবির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হল, “এটা বিএনপি আমলে হয়েছে”। আর শাহরিয়ার কবিরকে দিয়ে বলানো হয়েছিল যে, বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা নাকি ২% বেড়েছে। কারণ তারা ভারত থেকে ফিরে এসেছে। সরকারের এসব প্রতিক্রিয়াকে নির্বুদ্ধিতা বললেও কম বলা হবে।
প্রথমত, ভারত সিএএ আইনে অভিযোগ করছে বাংলাদেশ হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’। তাহলে, ভারত ফেরত পাঠানোর সময় সেই হিন্দুদের না পাঠিয়ে কেবল এবং একমাত্র মুসলমানদেরই আনছে কেন? এই প্রশ্ন ওদের মুখে ছুড়ে দেয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া ভারত যদি নিশ্চিত চিহ্নিত করেই হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’ কথা জানে তাহলে তো কাজটা সহজ। তাহলে এর প্রমাণগুলো বাংলাদেশের কাছে বুঝিয়ে দিলে বাংলাদেশ বিনাবাক্যে তাদের ফিরিয়ে নেবে, পুনর্বাসিত করবে এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ দিতে পারে, প্রতিকার হিসাবে দেয়া উচিতও। ফলে দিয়ে দিক। আর যে নিপীড়িত হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছে এখন আগেই তাদের সীমান্তে পাঠিয়ে হয়রানি না করে তাদের সেসব ‘নিশ্চিত চিহ্নিত’ ডকুমেন্ট আগেই বাংলাদেশের কাছে পেশ করে তাদের ফেরত নেয়ার একটা মেকানিজম তৈরিতে বাংলাদেশ রাজি আছে সে প্রস্তাব দিলেই তো হয়।
এখানে ‘গায়েবি’ অভিযোগের সুযোগ বন্ধ করাই হতে পারে বাংলাদেশের মূল স্বার্থ। সেখানে বাংলাদেশও ‘বিএনপি আমলে হয়েছে’ আর ‘২% ফেরত’- এসব গায়েবিভাবে বক্তব্যে তুলে ধরেছে। এটা আত্মঘাতী ও নির্বুদ্ধিতা। আবার দেখা যাচ্ছে,  সরকার ধরেই নিয়েছে এই ইস্যুতে যাদের শুনানোর জন্য এই ভাষ্য সরকার দিচ্ছে, তারা যেনবা বাংলাদেশের পাবলিক। অথচ সরকার বাস্তবে এই ভাষ্যের খাতক হবার কথা ভারতের মোদী-অমিত। কিন্তু আবার এর মানে কি সরকার ভারতের কাছে বিএনপির নামে বিচার দিচ্ছে? সে ক্ষেত্রে এটা কি কোনো সরকারের কাজ হতে পারে, না সাজে? সরকার চালানো কি খেলাপাতি খেলা! যে কীছু হলেই আমি না বিএনপি! বলতে হবে?
উল্টোদিকে, বাংলাদেশে ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে পরে ‘আওয়ামী লীগকে কেন হিন্দুরা ভোট দেয়’ এই অজুহাতে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ সেকালেরই অনেক লিডিং মিডিয়ায় এসেছিল। কিন্তু আমাদের অনেকের ধারণা সরকারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের তদন্ত করালে এবং একেবারে বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করালে সেটা বোধহয় সরকারের বিরুদ্ধেই যায়!  এটা স্বল্পবুদ্ধি ও কূটচিন্তার মানুষের ধারণা।  বিএনপিও এটাই বুঝেছিল। অথচ বিএনপি সরকার যদি সেকালে ওই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করে রাখত, তাহলে আজ না ভারত না বর্তমান সরকারের পক্ষে ইচ্ছামত কোনো অভিযোগ তোলা সম্ভব হত। কাজেই তদন্ত না করাটা সবসময় কোন সরকারের পক্ষেই যাবেই এই অনুমান ভিত্তিহীন।
নিরপেক্ষ তদন্ত করা সেকালে হয়ে থাকলে সেই ভাষ্যটাই এখন সব আটকে দিতে পারত। মূল কথাটা হল, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে পালালে তো হবে না, মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দায় নিতে হবে। উপযুক্ত প্রতিকার দিতে হবে। এতে কমপক্ষে পুরা দল নিজেকে পরিষ্কার আর অভিযোগমুক্ত রাখতে পারবে। যেটা আসলে একটা দলের জন্য বিরাট অ্যাসেট। বিএনপি নিশ্চয়ই আজ মানবে সে কথা। সেকালে দলের বিশেষ কিছু লোকের কুস্বার্থে আজ অন্যের সব আবর্জনা আর খারাপ উদ্দেশ্যের দায় বিএনপির মাথায় আসছে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের সংসদের বক্তৃতায় অমিত শাহ্ দাবি করেছিল বাংলাদেশে নাকি ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ স্বাধীনতার পর থেকেই হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো সরকারের আমলকেই তিনি বাদ দেননি। এমনকি বিজেপি-আরএসএসের প্রতিনিধি বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক বা প্রিয়া সাহার অভিযোগও তো তাই। কাজেই মোদী-অমিতের কাছে বিএনপির নামে অভিযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সরকার কোথায় পালাতে চায়? সরকার চালানো খেলাপাতি না যে সব মুখে অস্বীকার করে অন্যের ওপর দায় দিতে হবে- এসব কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়। আজ অবস্থা তৈরি হয়েছে এমন যে মোদী-অমিত আমাদের সরকারের ‘আমরা না, বিএনপি’ টাইপের ছেলেখেলাকেই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে বলবে যে, বাংলাদেশের সরকার বলেছে যে ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ হয়েছে। অর্থাৎ অমিত শাহরা চাইলে বলতে পারবে যে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ বিলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে রাখা জায়েজ আছে।
এ কারণেই আমাদেরকে অন্য সরকারের অভিযোগ সিরিয়াসলি নিতে হবে, প্রমাণ চাইতে হবে। প্রমাণিত হলে দায় নিতে হবে। প্রতিকার দিতে হবে। আর প্রমাণ না দিতে পারলে মাফ চাইতে বাধ্য করতে হবে।

সরকারের স্থায়ী দুর্বলতাঃ
সাধারণভাবে আমরা সবাই বুঝতে পারি ভারতের মোদী-অমিতের এসব ন্যুইসেন্স আর ইসলামবিদ্বেষ জাগিয়ে ভারতের ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, মেজরিটি মানুষ খুবই বিক্ষুব্ধ। অথচ এটাকে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে নিতে বা এই বিক্ষোভের ভয়েস ও প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে হাজির করতে সরকার অপারগ। কারণ গত ১০ বছর এর উল্টা লাইনেই হেঁটেছে সরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের গণভিত্তি তৈরি করে নেবে সে পথেও সরকার নেই। সম্ভবত সে পথে ফেরার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে, সরকারের অনুমান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলতে পারার ক্ষেত্রে বিদেশীরা (মূলত আমেরিকা) বিরাট হুমকি। ঠিক যেমন করে ২০০৭ সালে বিদেশীরা এক সরকার এনেছিল। পরিণতিতে এই সরকার বসেছিল। অতএব এই হুমকি কাউন্টার করতে ভারতকে পাশে রাখতে হবে, তোষামোদ করতে হবে – ভারত নির্ভরশীলতা এখান থেকেই – সরকারের অনুমান এমন বলে মনে হয়। ফলাফলে, মোদী-অমিতের সব ন্যুইসেন্সের বিরুদ্ধে জনগণ তৈরি হলেও সরকার তা ব্যবহার করার ‘জনপ্রতিনিধি’ হওয়ার সুযোগ নিতে পারছে না। এই হলো বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সঙ্কট।
আজ এটা পরিষ্কার মোদী-অমিতের এখন আর নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু হাতে নেই। মোদি-অমিতের বিচারে ‘মুসলমান খেদানো’র প্রোগ্রাম এখন তাদের একমাত্র সম্ভাবনা -আয়ু ও বাঁচোয়া! বাকি সব হারিয়েছে তারা। এখন জায়গা মত সুযোগ পেলে বাংলাদেশের সরকারকেও তাদের লক্ষ্যে বেচে দেয়ার চেষ্টা করবে, এমনই তলানিতে ঠেকেছে তারা! একারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এনআরসি বা সিএএ ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসাবে রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্বেও অমিত শাহ্‌ ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত যে কোন নির্বাচন এলেই  “অনুপ্রবেশকারী” মানে “মুসলমান খেদানো”, আর তেলাপোকা বা উইপোকা বলে গালি দিয়ে তুচ্ছ করে তাদের পিষে মারার কথাই বেপরোয়া বলে চলেছেন। এটাই প্রমাণ যে কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষার অবস্থায় বিজেপি বা মোদী-অমিতেরা নাই। অসুস্থ, বর্ণবাদী এরা এমনই বেপরোয়া!

কিন্তু আমাদের সরকার নিজে বা খোদ বাংলাদেশ কী মোদী-অমিতের ন্যুইসেন্স থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? আমরা আশঙ্কিত! কারণ, সরকার ভুল রাস্তায় হাঁটছে। এছাড়া, আমাদের সরকারগুলো স্বাধীনতার পর থেকেই ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ করে থাকলে নির্যাতনের শিকার সেই হিন্দুদের বদলে মুসলমানদের সীমান্তে জড়ো করা হচ্ছে কেন? এই সাধারণ স্ববিরোধিতাটাকেও প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে আমাদের সরকার!

এরই ভিতরে সরকারের মুজিববর্ষ পালনের গুরুত্বপুর্ণ  “মুলবক্তা” অতিথি হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  মুসলমানবিদ্বেষী এত ঘৃণার চাষাবাদ যার মনের কোণে কোণে তিনি আরও প্রায় তিন মাস সিএএ বাস্তবায়ন করে কত কিছু যে করে আসবেন কে জানে? আবার আসার পর বাংলাদেশে তার কেমন লাগবে, কাটবে; আর আমরাই বা তাকে কীভাবে নিব? ভাববার আছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৮ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির নিজ সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

গৌতম দাস

২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2PW

Modi-Amit from swarajyamag.com

নেক হয়েছে। এই অঞ্চলকে অনেকদূর বেপথে নিয়েছেন। এবার মোদী-অমিত, আপনাদের হার শুরু। আপনাদের হারের  চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠতে শুরু করেছে! আপনি পেছন ফিরে পালাতে চাচ্ছেন, নরেন্দ্র মোদী! মোদি-অমিতের সেই পিছু হটে পালানোর চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠছে, মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেয়া শুরু করেছে। আপনারা হার মানছেন এমন সব চিহ্ন ফুটে উঠছে। বুঝব কিভাবে?

চিহ্ন একঃ মোদী-অমিতের সরকার এবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসে.) সকালে অনেকগুলো উর্দু ও হিন্দি পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপানো হয়েছে – শিরোনামে “গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে” (“rumours and incorrect information being spread”.) । কিন্তু কোনটা গুজব আর অসত্য? বলতে পারছে না।  দাবি করছে যে, ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে – এমন কোন সরকারি ঘোষণা নাকি এখনও দেয়া হয়নি।  এই ডিটেইলটা ছাপা হয়েছে  ভারতের ইংরাজি ওয়েব পত্রিকা scroll.in. লিখেছে, [On Thursday morning, the Modi government put out advertisements in multiple Hindi and Urdu papers alerting people about “rumours and incorrect information being spread”.]

এতে মিডিয়াজুড়ে তোলপাড়ে প্রায় প্রত্যেক মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে, আগে কবে কোথায় অমিত শাহ ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেসবের রেফারেন্স প্রমাণ তুলে এনে রিপোর্ট ছাপানো শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বরাত দেয়া হয়েছে অমিত শাহের নিজের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে করা টুইটকে। সেখানে বলা হয়েছিল, “ভারতজুড়ে এনআরসি আমরা নিশ্চিত করব”।
এরপরও ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আবার অমিত শাহরা আরও বড় করে নিজেদের বেইজ্জতি ডেকে আনতে তাঁরা এবার সেই পুরান ১১ এপ্রিলের টুইটই মুছে ফেলেছে। আসলে বিরাট এক কেলেঙ্কারির অবস্থায় এখন বিজেপি। আনন্দবাজার থেকে টুকে আনা সেই টুইটটা [নিচে স্কান কপি দেখেন] ছিল এরকমঃ “We will ensure implementation of NRC in the entire country. We will remove every single infiltrator from the country, except Buddha, Hindu and Sikhs: @Amitshah #NaMoForNewIndia

চিহ্ন দুইঃ মমতার তৃণমূল কংগ্রেস দলের হয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতা হিসাবে সংসদে দলের স্বার্থে লিড ভুমিকা নেন আর ইস্যুগুলো দেখাশোনা করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক ও ব্রায়েন। তিনি টুইট করে লিখেছেন, “বিজেপির আইটি সেল টুইট মুছে দিতেই পারে। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সব রাজ্যে এনআরসি হবেই। তা মুছতে পারবে না ওরা”। কথা সত্য, সংসদের রেকর্ড মুছবার ক্ষমতা কোনো একটা দলের নেই।

উপরের এই টুইট-টাই এখন মুছে দেয়া হয়েছে যা ছিল গত ১১ এপ্রিলে লেখা।   আর প্রায় কাছাকাছি একই ভাষ্যের ২২ এপ্রিল লেখা অমিতের আর এক টুইট  এর কপি বরাত দিয়ে  স্ক্রোল [scroll.in] পত্রিকা দেখাচ্ছে সেখানেও অমিত শাহ সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করার কথা বলছেন। যেমন নিচে  দেখেন তা হল,
First, we will bring Citizenship Amendment Bill and will give citizenship to the Hindu, Buddhist, Sikh, Jain and Christian refugees, the religious minorities from the neighboring nations.
Then, we will implement NRC to flush out the infiltrators from our country.

এছাড়া গত অক্টোবরের ১ তারিখে কলকাতায় বক্তৃতা দিতে এসে অমিত শাহ বলেছিলেন, সারা ভারতে এনআরসি করে খুঁজে খুঁজে কিভাবে তেলাপোকা উইপোকা অনুপ্রবেশকারী (মুসলমান) মেরে তিনি  তাড়িয়ে দিবেন। সেই বর্ণনা দিয়ে ভোটার উত্তেজিত করার সহজ পথ নিয়েছিলেন। আজ মিডিয়াগুলো সেই রেফারেন্সটাই বের করে সরকারকে আরও বেইজ্জতি করেছে।

তাহলে এত জায়গায় রেফারেন্স থাকা সত্ত্বেও এবং এমন রেফারেন্স যা লুকানো বা মুছে ফেললেও, তা জানাজানি হয়ে যাবে – এসব জানা সত্ত্বেও মোদী-অমিতের সরকার এমন মিথ্যা কথা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে গেল কেন?

এর সোজা মানে হলে মোদী-অমিতেরা এমন বিপদের জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাদের হাতে কিছুই নাই। তাই “যদি লাইগা যায়” ধরণের কামকাজ শুরু করেছে – এমনই দশা।  খড় কুটো আঁকড়ে ধরছে।  বিশেষ করে এনআরসির সাথে নাগরিক বিলের কোন সম্পর্ক নাই একথা যদি পাবলিককে বিশ্বাস করাতে পারে আর তাতে যদি একথা মেনে নিয়ে রাস্তার আন্দোলন কিছু থিতু হয় এই হল অমিতদের শেষ আশা।
অর্থাৎ পাবলিক ঠান্ডা করার এর চেয়ে ভাল ও আস্থাবাচক কোনো বক্তব্য-হাতিয়ার বিজেপির কাছে নেই। আর এটাই মোদী-অমিতের হেরে যাবার সবচেয়ে বড় চিহ্ন। মোদি-অমিত এতই ফেঁসে গেছেন যে, এর চেয়ে ভাল বা বেশি বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য তাদের হাতে নেই। এ ছাড়া সরাসরি মিথ্যা বলা বা প্রপাগান্ডা করে সদর্পে মিথ্যা বলার দিকে বিজেপির ঝোঁক আগেও ছিল আমরা দেখেছি। তারা মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে অনেকদূর যাওয়া যায়, কেবল পাক্কা ব্যবহারকারি হতে হয়। যেমন সেই অর্থে ভারতের মুসলমানেরা বিজেপির আসলে কোনো শত্রু না, তা তারা জানে। বরং অ্যাসেট। কিভাবে? কারণ মুসলমানদের নামে ঘৃণা ছড়িয়েই তো কেবল হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে ঢুকাতে পারে! মুসলমানেরা না থাকলে সে কার ভয় দেখাত বা কার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াত। আর এটাই তো বিজেপির রাজনীতির কৌশল।

বোকা অমিতের স্ববিরোধী দাবি
সবাই জানি বিজেপির চোখে আমরা মুসলমানেরা সব উইপোকা তেলাপোকা, তুচ্ছকিট; তাই সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করে মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দিবে। বিশেষ করে কেন তাড়িয়ে দিবে? কারণ নাকি মুসলমানেরা স্থানীয়দের কাজ বা চাকরি সুযোগ নিয়ে নিচ্ছি। তা ভাল, কী আর বলা। এনআরসির সপক্ষে আপাত চোখে যুক্তির বিচারে সবচেয়ে ভাল যুক্তির বক্তব্য মনে হয় এটাই।
কিন্তু অমিত শাহ আপনার কপাল খারাপ। কারণ আপনার দিল সাফ নাই। অনৈতিক ও অসততার উপর দাঁড়ানো আপনার কথা। তাই আজ না হলে কাল আপনি ধরা পড়ে যাবেন। এবং গেলেন। কীভাবে?
আপনি এখন বলছেন বাংলাদেশসহ আরও তিন দেশ থেকে মূলত হিন্দুদের নিয়ে এসে আপনি ভারতের নাগরিকত্ব দিবেন এজন্য নতুন বিল এনেছেন। যদিও ঐ তিন দেশ থেকে কোন মুসলমান আসলে এই সুবিধা আপনি তাদের দিবেন না। মুসলমানবিদ্বেষী আপনি আমরা জানি তাই এনিয়ে এখানে কোন কথাই তুললাম না।
কিন্তু লক্ষ্য করেন আপনাদের দাবি হল কেউ মুসলমান হলেই সে ভারতের বাইরের লোক, আর এবার দাবি করতে থাকা যে এরা ভারতের বাসিন্দাদের চাকরি বা কাজ নিয়ে নিচ্ছে বলে আপনারা এনআরসি করছেন তাদের তেলাপোকার মত তাদের ভাগাবেন বলে তোলপাড় করে তুলছেন। তাহলে আবার বাংলাদেশসহ তিন দেশ থেকে সেখানকার হিন্দুদের নিতে চাইছেন কেন? হিন্দুরা কী ভারতে গিয়ে মূলত হিন্দুদের কাজ চাকরিতে ভাগ বসাবে না? তাহলে এনআরসিতে লোক খেদানো আবার নাগরিকত্ব বিলে লোক আমদানি এদুইয়ের রহস্য কী বা এই স্ববিরোধীতা কেন? তাহলে অন্তুত এতটুকু সৎ হয়ে বলেন যে “বিদেশিরা কাজ-চাকরি নিয়ে নিচ্ছে” একথা সত্য না। সত্যিই, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক মাহাত্ব সাংঘাতিক!

আসলে এখনকার ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপির ভিতরের মূল্যায়ন হল, একটু কৌশলে ভুল হয়ে গেছে, সেটা সংশোধন করে নিতে পারলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ভুলটা হল, সারা ভারতে এনআরসি করার কথা আগে না বলে আগে কেবল নাগরিকত্ব সংশোধিত বিল পাস করে নিতে হত, বিজেপিকে। এতে মুসলমান বাদে সব ধর্মের বললেও মূলত অন্যদেশের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে নিলে এরপরেই কেবল সারা ভারতে এনআরসি করার কথা তুলতে হত। তাহলে আজ যেভাবে ভারতের শহরের পর শহর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে উত্থাল হয়ে উঠছে সব উপড়ে ফেলতে শুরু করেছে, সেটা নাকি হত না। এই হল তাদের মুল্যায়ন। কিন্তু  এটা অবশ্যই তাদের মন-সান্ত্বনা!
বাস্তবতা অনেক গভীরে চলে গেছে, যার খবর আর বিজেপি নিতে পারবে না। কেন? ভারতের সাধারণ মানুষই বা মোদী-অমিতের উপর এত খেপে গেল কেন?

সমাজতন্ত্র নিয়ে আমরা জানি অথবা আমাদের অনেক প্রত্যক্ষ আছে। এর গালগল্প শুনিয়ে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে একেবারে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ হয়েছিল এর সবচেয়ে ভুক্তভোগী, কষ্টভোগী এবং ভিকটিমও বলা চলে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে বললে, উনিশশ ষাট সালের মধ্যেই যাদের জন্ম বা চুয়াত্তর সালের মধ্যেই যাদের টিনএজে প্রবেশ ঘটেছিল এদের সরাসরি সচেতন অভিজ্ঞতা আছে কিছু শব্দের যেমন রেশন, টিসিবি, আর কিছু স্মৃতি – ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের হাহাকার। এক পিস সাধারণ লাইফবয়  সাবান কিনতে পারার জন্য কয়েক ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। আর তাতে রেশন, লাইনে দাঁড়ানো আর সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল প্রায় সমার্থক শব্দ। আর মানুষের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে হতাশ করে ফেলার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর হয় না।  মানুষ ভাত জোগাড়ের চেষ্টা করবে না লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে? জীবনের উদ্দেশ্যই বা আসলে কী? কোন কিছুর সদুত্তর কারও জানা ছিল না।
সৌভাগ্যবশত মোটামুটি পঁয়ষট্টি সালের পরে যাদের জন্ম এরা টিনএজে এসে এদের আর রেশন, লাইন দেখতে হয়নি। জিয়ার আমল প্রায় শেষ করে এসে এটা আস্তে আস্তে এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এতে অন্তত  রাষ্ট্র  পরিচালনাকারি সরকার আর সাথে গরিব জনগণও সবারই বুঝাবুঝিতে আক্কেল হয়ে যায় যে রেশন-সমাজতন্ত্রে দেশ চালানো কী জিনিস! আর একালে এসে ট্রাকে করে চালবিক্রির চাল কেনাতে মানুষ উৎসাহী হয় তখনই যখন এতে যে পরিমাণ পয়সা বাঁচে তা অতিরিক্ত সময় ব্যায়ের তুলনায় লাভজনক বিবেচিত হয়, কেবল তখন। আসলে সেকালে পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকত যাদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে অফুরন্ত সময়ও সম্ভবত থাকত ফলে পোষাত; কিন্তু এমন দিন আর এখন সমাজের ভিতরেই তেমন নেই। কিন্তু লক্ষ করা গেছে যে, কোনকালের নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই কষ্টের দিকটা আমল করেছেন, গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন – না, কোনোকালেই এমনটা দেখা যায় নাই।
বরং দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে ভারতের মোদীর সরকার সবচেয়ে গোঁয়াড় আর দানব। একালে এই ২০১৬ সালে নোট বাতিলের ঘটনাটাকেই দেখেন। এই নোট বাতিলকে কেন্দ্র করে মোদী মানুষকে বাধ্য করেছিল – কাজকাম ধান্ধা ফেলে সকলে ছুটেছিল নোট বদলাবার জন্য ব্যাংকে লাইন ধরতে। মানুষের মুল ওয়ার্কিং আওয়ার নষ্ট করে দেয়া মানেই গরীব মানুষের সরাসরি আয়-ইনকামে ক্ষতি করে দেয়া। অথচ এই ক্ষতিটাই অবলীলায় করা হয়েছে। বিশেষ করে গরিব-মেহনতি মানুষের যে আয়ে ক্ষতি এর কোনোই ক্ষতিপূরণ নিয়ে কারও কোন বিকার নাই – ব্যাপারটা মোদী বা তাঁর নীতিনির্ধারকদের আমলেই নেই। অথচ কথাটা হল, সরকার যা দিতে পারে না, মুরোদ নেই, তা সরকার অন্তত কেড়েও নিতে পারে না। যোগ্যতা থাকতে পারে না। চাকরি বা আয়ের সুযোগ দেয়ার কথা সরকারের। তা না দিতে পারলে অন্তত আয়ের সুযোগ কেড়ে নেয়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাজ হতে পারে না। অথচ মোদীর সরকার-প্রশাসন এদিকটা আমল না করেই, কোন বিকল্প বা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা না করেই  নোট বাতিলের পথে গেছিল।
আর ঠিক একই সেই জিনিস ঘটিয়েছে  আসামের প্রশাসন ও মোদী । এনআরসির নামে দীর্ঘ ছয় বছর (২০১৩-১৯) ধরে মানুষকে প্রায়শই তাদের জীবন লাইনে দাঁড় করিয়ে পার করেছে। এখনও যা শেষ হয় নাই, সমাধান নাই। আর এর চেয়েও বেশি কষ্টকর অমানবিক অবস্থায় ফেলেছে ডকুমেন্ট জোগাড়ের ছোটাছুটি আর মানসিক অনিশ্চয়তা – যদি তালিকায় নাম না উঠে? একে তো গরিব মানুষ ভাত জোগাড়ে সব সময় হিমশিম খায়, সেখানে তাঁদের কোনমতে বেচে থাকা জীবনে এর চেয়েও প্রধান শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তালিকায় নাম ঊঠানো বা, নাগরিকত্ব হাসিল করা!  ভাতের অভাবের চেয়ে এ’এক কঠিনতর শাস্তি! অথচ যে এই শাস্তির আয়োজক সে একেবারেই নির্বিকার!

সারকথাটা হল, এনআরসির বেলাতেও এরা গরিব মেহনতিদের কষ্ট  – দিনভর লাইনে দাঁড়ানো, অনিশ্চয়তা, ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ভয় ও শঙ্কা, আয়-ইনকাম বন্ধ ইত্যাদি কোন কিছুর দিকটাই নীতিনির্ধারকরা আমল করেনি। বরং বিজেপির ভোটের বাক্সে হিন্দুভোট পোলারাইজেশন ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। তাই নির্বিকার লক্ষ্য।

তাহলে কেন এবার সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বিলের পক্ষে থাকবে? কেন এর ভেতর দিয়ে প্রতিবাদের সুযোগ পেলে সেটাকে প্রবলে সে কাজে লাগাবে না? মোদী-অমিত তাঁদের সীমাহীন কষ্টের দিকটা দেখেননি, দলের স্বার্থ আর ভোট ও ক্ষমতার লালসায়  সবকিছুকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে গেছে।  আজকে পাবলিক মোদী-অমিতকে উপেক্ষা করার একটু সুযোগ দেখেছে। সেটা তুলে নিয়ে কাজে লাগাবে না কেন? এটাই তো সব দানব সিদ্ধান্তগুলো উপড়ে ফেলার ভাল সুযোগ!
আবার এতদিন সবকিছুতে সর্বক্ষণ হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা হয়েছে। সেটা গরীব মানুষকে ভাল না লাগলেও খারাপ লাগেনি হয়ত, তাই পাশ কাটিয়ে থাকা শ্রেয় ভেবেছে। হয়ত ভেবেছে এটা আমার কী, এটা কেবল মুসলমানের সমস্যা হয়ত। কিন্তু এবার আসামের এনআরসিতে? এবার এতদিনে সকলেই বুঝে গেছে ব্যাপারটা স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে আরামে বসে বসে কেবল মুসলমানের কষ্ট দেখার ব্যাপার নয়। বরং ব্যাপারটা সবারই। ডকুমেন্ট, আধার কার্ড [AADHAAR card, আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সমতুল্য] ইত্যাদি জোগাড়ের অসম্ভব ছোটাছুটির অনিশ্চয়তা। আবার ভারতের আধার কার্ড মানে এই ন্যাশনাল আইডি দেয়া ও দেখাশুনা করা হয় তাদের পোস্ট-অফিসগুলো থেকে। ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব বা এনআরসির ক্যাচালে সবাই ছুটছে পোস্ট-অফিসে অথচ, পোস্ট অফিসে সেজন্য মোদী-অমিতেরা স্টাফ বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করেনি, হয়নি। হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে আনার কাজের বাইরে অন্য কোন দিকে মনোযোগ দিবার সময় কই তাদের? এনিয়ে আনন্দবাজার একটা ভাল বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন এখানে। লিখেছে, প্রায় সকলেই জানিয়েছেন, এনআরসি-র ভয়েই আধার কার্ড ঠিক করার জন্য লোকজন মরিয়া। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কারও তারিখ দু-তিন মাস পরে, কারও আবার বছরখানেক পরে। অর্থাৎ অমিত শাহের নিজনিজ ভোটের বাক্সের স্বার্থে মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ও ভোগান্তিতে ফেলছে অথচ স্টাফ বাড়ানো, কাজটা সহজ করতে বাড়তি স্টাফ দেয়ার আগ্রহ তাদের নেই। ব্যাপারটা তাঁদের মনোযোগের ভিতরেই আসে নাই। তাহলে কেন সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেলে তা উপড়ে ফেলে দিতে চাইবে না? এছাড়া এতদিতে তাঁরা বুঝে গেছে বিজেপির হিন্দুত্ব জিনিষটা এত মিঠা না!

সার কথায় বললে, পাবলিক পারসেপশন এখন আগের তুলনায় পরিপক্ব রূপ নিয়েছে মনে হচ্ছে।  একারণে, হিন্দুত্বের রুস্তমিতে হিন্দুগিরি বা হিন্দু-সুরসুরি তুললেই তা আর সমাজে তেমন কাজ করছে না সম্ভবত, ঢিলা দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থের দেনাপাওনার চোখ দিয়ে নাগরিকত্ব বা এনআরসি ইস্যুতে সরাসরি নিজের লাভক্ষতি দিতে বুঝতে চাচ্ছে মানুষ; বিশেষ করে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ।  আর এর সাথে এসে যোগ দিয়েছে  স্টুডেন্ট আর সাধারণ মানুষ। তাই তাঁরা নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেয়ে পুরা ষোল আনা কাজে লাগাচ্ছে, বলে মনে হচ্ছে। জীবন এমনিতেই প্রচন্ড ভারী, সেই ভারকে আর বাড়তি ভারী না করে নাগরিকত্ব বা এনআরসি থেকে মুক্ত করতে চাইছে সবাই!

অতএব প্রশ্নটা এনআরসির বাস্তবায়ন এটা মোদী-অমিতেরা  হিন্দুত্বের ক্ষমতার লালসায় নাগরিকত্ব বিলের আগে না পরে হবে সেটা তাদের কাছে এখানে কোনো ইস্যুই নয়। পাবলিক পারসেপশনের লেবেলে এর কোনো ফারাক নেই। বিজেপি সম্ভবত মুখরক্ষার জন্য এমন “সারা ভারতে এনআরসি বিজেপি চায়নি” বলে ক্ষিপ্ত পাবলিকের মনোযোগ সরানোর অজুহাত খুঁজছে। কিন্তু বিজেপির মুল সমস্যা হল মোদী-অমিতের উপর পাবলিক বিলা হয়ে গেছে। আস্থা হারিয়ে গেছে বা বিশ্বাস তুলে নিয়েছে মনে হচ্ছে। কাজেই এনআরসি না নাগরিকত্ব বিল কোনো ইস্যুতেই পাবলিক আর সরকারকে বিশ্বাস করছে না। যার সোজা মানে হল, মোদী-অমিতের বিজেপি সরকারকে – এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল – এদুটোকেই প্রত্যাহার  করা হয়েছে এই ঘোষণা করানোর দিকেই আগাচ্ছে।

বাংলাদেশের চলতি সরকারকেও বিজেপি বিক্রি করেছে
ইদানীং লক্ষণীয় যে, ভারতের মিডিয়া এবার প্রকাশ্যেই লিখছে বাংলাদেশের সরকার নাকি ‘খোলাখুলিভাবে কাজে ও বাক্যে বছর দশেক ধরে প্রো-ইন্ডিয়ান’ [Prime Minister Sheikh Hasina, who has been openly pro-India in word and deed since coming to power a decade ago]। কথাটা দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছে একজন এমন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ সরকারকেও অমিত শাহ অপব্যবহার করেছে তা বুঝাবার জন্য। কথা সত্য। অমিত শাহ ভারতের সংসদে  নতুন নাগরিকত্ব সংশোধিত বিলের পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য বাংলাদেশে সরকার হিন্দুদের ‘নির্যাতন করছে’, ‘সুরক্ষা করে নাই’  – এসব কথা সরাসরি বিলের ভাষায় অথবা সংসদে অমিত শাহের কথায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নাম সরাসরি বিলের ভাষায় পর্যন্ত উঠে এসেছে। সেটা আসায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করছে। তাহলে এর তথ্য ও প্রমাণাদি কই?   একথা খুবই সত্য যে অমিত শাহের নাগরিকত্ব বিল দাঁড়িয়ে আছে “বাংলাদেশ সরকারের হিন্দুদের উপর ধর্মীয় নির্যাতন করে চলেছে” একথা যদি নিশ্চিত ভাবে ধরে নেই একমাত্র তাহলেই।
অথচ কূটনৈতিক করণীয় অর্থের দিক থেকে বললে, এ নিয়ে আগে কোন আলোচনার এজেন্ডা সেট করা, কোনো আলাপ আলোচনা অথবা কোনো প্রমাণ পেশ ইত্যাদির কিছুই করা হয়নি। আবার বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করার বিনিময়েই এমন ভাষ্যের উপরের এই বল আনার যৌক্তিকতা ও সাফাই দাঁড়িয়ে আছে। আবার এটাই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে বিজেপির এর ফলাফলে হিন্দুভোট পোলারাইজেশনে বাক্স বোঝাইয়ের পরিকল্পনা ও উপায়। মানে হল ভারতের বিজেপি সরকার নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ সরকারকে বেঁচে দিয়ে একে নিজের ভোটের ক্ষমতা পোক্ত করার উপায় হিসেবে হাজির করেছে। এটা পানির মতই পরিস্কার।
আবার ওদিকে আসামের রাজ্য সরকার সেটাও বিজেপি দলের সরকার। আসাম সেই দেশ ভাগের সময় থেকে বাংলাদেশের কথিত  ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুসলমানদেরকে  তাঁদের সব দুঃখের জন্য দায়ী করে আসছে। তাঁরা নাকি স্থানীয়দের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে অসমীয়দের সমাজ-সংস্কৃতি সব ধবংস করে দিচ্ছে। অথচ এনআরসি তালিকাতে দেখা গেল তাদের এই অসমীয় পারসেপশন ভিত্তিহীন। ছিটেফোঁটাও সত্যি নয়। এনআরসিঢ় ফাইনাল তালিকা প্রকাশের পর এখন জানা যাচ্ছে  আসামের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার ১%-এর (প্রায় পাঁচ লাখ মাত্র) মত মুসলমান জনগোষ্ঠী তালিকায় নাম তুলতে পারেনি। অর্থাৎ একটা মিথ্যা পারসেপশনের উপরে তারা এখনো চলছে আর মুসলমানবিরোধী ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে।  [আমরা যেন না ভুলে যাই অরিজিনাল মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানোর শুরুকর্তা কিন্তু এই অসমীয়রা যারা তাদের মথ্যা পারসেপশন প্রমাণ করতে না পারলেও এখনও তা জারি রেখেছে। আর বিজেপি পরে এই দাবিটা কুড়িয়ে নিয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে রাজনীতি করছে।] আর এবার নাগরিকত্ব বিলের পরে অসমীয়দের ফোকাস গেছে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর যে, তারা এবার নাগরিকত্বের লোভে আসাম দৌড়াবে হয়ত। তবে এটা অবশ্যই মোদি-অমিত সরকারের ভোটবাক্স ভরবার ইস্যু। এই অর্থে  সেটা সত্যি সত্যিই ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু।
কিন্তু তামাসাটা হল,  বিজেপির এই আসাম সরকারকেই আবার বাংলাদেশ সরকার ফ্রিচার্জে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বের হতে ট্রানজিট আর বন্দর ব্যবহার সুবিধা দিতে যাচ্ছে। আসামের সরকার ও জনগণ কোন ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও সাফাইয়ের বলে এই সুবিধাগুলো নেবে? সম্প্রতি নাগরিক বিলবিরোধী জনঅসন্তোষ চলার সময় আসামে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর অফিসের সাইনবোর্ড ভাঙচুর ও গাড়িতে হামলা হয়েছে। এগুলো কী বিনা পয়সায় বাণিজ্যিক সুবিধা সহযোগিতা নিবার ও পাবার নমুনা?
আসলে বলাই বাহুল্য, অসমীয় জনগণ ও তাদের সরকার আসলে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়, কেমন সম্পর্ক চায় সেটা স্পষ্ট করে বলার হাই-টাইম চলে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ থেকে যেকোনো ট্রানজিটসহ, পোর্ট ফেসিলিটি ব্যবহার নিয়ে কোনো কথা শুরুর আগে ‘বাঙালি খেদাও’-এর ঘৃণাচর্চা নিয়ে তাদের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত নয় কী? যার প্রতি এত ঘৃণা তার কাছ থেকে কিছু নিবে্ন কেমন করে আর সে দিবেই-বা কেন, এমনকি আপনারা সঠিক চার্জ পুরাটা দিলেও দিবে কেন? সেও এক জেনুইন প্রশ্ন!

তাহলে মো্দী-অমিত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রমেই উইকেট পতন চলছে। আগামী সাত-দশ দিনে আর কয়টা রাজ্য বা শহরে আন্দোলনে প্রভাবিত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে- এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বলা হচ্ছে ইতোমধ্যে বড়ছোট মিলিয়ে ভারতের ২৮ রাজ্যের মধ্যে ১৬ রাজ্য আন্দোলন ছড়িয়েছে। অন্তু একবার সরকারবিরোধী মিছিল হয়েছে। এমনকি বিজেপি রাজ্য সরকারে আছে এমন রাজ্যেও তা হয়েছে।  অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যে বামেজর রাজ্যে বিক্ষুব্দ আন্দোলন হতে দেখলে সেক্ষেত্রে মোদী-অমিতের জন্য সেটা খুবই বিপদের কিছু হবে। কিন্তু সাবধান। কারণ বিশেষ করে মোদী-অমিতরা যত অসহায় হবেন ততই তাদের পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধাবার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। এছাড়া পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘাত বাধানোর সম্ভাবনাও বাড়বে। যেমন আমরা হাতে নাতে দেখেছিলাম নির্বাচনের আগে। এছাড়া সবার উপরে আমেরিকান জেনোসাইড ওয়াচের ভাষায়, ভারত ধাপে ধাপে সেদিকেই আগাচ্ছে, ‘ভারতে গণহত্যার প্রস্তুতি চলছে” – সেটা তো আছেই!’

শেষে বাড়তি কিছুঃ
এখানে একটা ছোট তথ্য ও রিপোর্টের খবর দিয়ে রাখি। আজ মানে ২২ ডিসেম্বর আনন্দবাজারের অগ্নি মিত্রের লেখা একটা রিপোর্ট আছে, শিরোনাম – “প্রিয়ঙ্কা নিয়েই ক্ষোভের শুরু ঢাকা-দিল্লিতে”। সেখানে সারকথাটা যা বলা হয়েছে তা হল, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর সাথে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা গত অক্টোবরে ভারত সফরের সময় দেখা  করা থেকেই মনোমালিন্য “ক্ষোভের” শুরু হয়েছিল। প্রথমত, এই রিপোর্টে যতটা অতিনাটকীয়তা আছে ততটাই সত্যতা নাই। আনন্দবাজারি রিপোর্ট অবশ্য এমনই ঝোঁকের সাধারণত হয়।  তবে গান্ধী পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা দেখাতে যাওয়াটা – ঠিক সেটা এখানে ইস্যু না। মূল ইস্যু বা শুরুর ইস্যু হল, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিজেপি-আরএসএস করুক বা সেদিকে ঝুকুক এব্যাপারে  ভারতের আরএসএস আমাদের সরকারের কাছে সহযোগিতা চাইলে অন্তত ২০১৮ সালে বা তারও  আগের কালে সরকার সম্মতি দিয়েছিল। কিছু কাজ ও প্রশ্রয় দেওয়া করেছিল। যার খেসারত হল প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছ পর্যন্ত গিয়ে অভিযোগ তোলা। গোবিন্দ প্রামাণিকের ঢাকায়  “আরএসএস” খুলে বসা, সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কথা বলা। রানা দাসগুপ্তের বেচাইন হয়ে খোদ মোদীর কাছে নালিশ পরে অস্বীকার ইত্যাদি। এছাড়া আগে থেকেই আবুল বারাকাতকে সরকারি তেল ঘি খাইয়ে পেলেপুষে তাঁর যে “ঐকিক নিয়মের বিশেষ পরিসংখ্যান” বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাই এখন বিজেপির পক্ষের অস্ত্র য়ার আমাদের বিরুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে হাজির হয়েছে। এসব কিছু বুঝতে বুঝতে হাসিনা সরকার বেশ কিছু ক্ষতি করে ফেললেও সবছিন্ন করে শেষমেশে শক্ত সিদ্ধান্তের কথাটা তিনি অক্টোবর সফরে পরিস্কার করে এসেছিলেন।
ঐ অক্টোবর সফরকালে তাই বলে বা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল হাসিনা সরকার আগে যা কথাই হোক সেখান থেকে এই বিষয়ে নো কমিট্মেন্টে” ফিরে যাচ্ছে। সরকার যে একথা বুঝিয়ে দিয়েছিল এর দুটা চিহ্ন আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই।  এক. শাহরিয়ার কবিরের কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকা সাক্ষাতকারে সে ইঙ্গিত রেখেছেন। [এনিয়ে সেকালে আমার লেখাটার লিংক এখানে। ] তার দাবি করে বলা  -বাংলাদেশে আরএসএস বলে কিছু নাই, “তাদের কোন ততপরতা নাই” ইত্যাদি – সে প্রমাণ।  আর দুই. রানা দাসগুপ্ত সেই থেকে এখন অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে হিন্দু নেতা হিসাবে “সরকারের অবস্থান” বহন করেন। কোন বেচাইনি রাখেন না। তিনি গত মাসদুয়েক আগে ভোলার ঘটনার সময় হেফাজতের শফি হুজুরের সাথে দেখা করে এসেছেন যেটা ফলাও করে প্রচার পেয়েছিল – সম্প্রীতির প্রতীক হিসাবে। এককথায় সরকারের অবস্থান হল – “আরএসএস-কে আর পৃষ্টপোষণ নয়”।  আর এখান থেকেই মোদী-আরএসএসের আমাদের সরকার প্রধানকে অসহযোগিতা , প্রকাশ্য অসম্মান করা ইত্যাদি। এক শুস্ক টেনশ্নের শুরু।

এদিকে এসবের মাঝেই মোদী-অমিতেরা এনআরসি-নাগরিকত্ব নিয়ে নিজেরাই নিজের জনগণের কাছে গ্যাড়াকলে পরে গেছেন। আর এই সুযোগটা ভাল্ভাবেই নিতে পেরেছে হাসিনা সরকার। নেওয়াটাই স্বাভাবিক ও উচিত। নড়বড়েরা যে এটা পারছে সেটাই শুকরিয়া। আবার এনিয়ে মোদী-অমিতের বলারও বিশেষ কিছু নাই। কেবল ভারতের মাস-পাবলিকের মুডের উঠানামার দিকে খেয়াল করে চললে, সে অনুসারে কখন মোদীকে আবার গুরুত্ব দিবে বা দিবেনা  তা  আগা-পিছা করলে আমাদের সরকারের অসুবিধা হবার কথা নয়। কাজেই সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক। কেবল একটাই সমস্যা, আমাদের নেতারা ভুলে থাকতে চায় যে তারা নিজেকে সম্পুর্ণ দান করে দিয়ে ভারতের সাথে  বিশাল ব্যক্তিগত সম্পর্কের জগত গড়তে ভারতের পায়ের কাছে শুয়ে থাকলেও ওদের চোখ আমরা কেবল নিচা “মুসলমান” – এটাই থাকব।  তারা তুচ্ছ করবে। যেন এখনও আমরা জমিদারের প্রজা যারা কখনই বন্ধু বা সমান হতে পারবে না। এই কথাগুলো আমাদের মনে থাকে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদি-অমিতের হারের চিহ্ন এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

গৌতম দাস

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2OV

 

 

_https://indianexpress.com/article/north-east-india/tripura/tripura-citizenship-bill-protest-northeast-india-tribal-parties-6150368/

এবার নাগরিকত্ব বিল। মানে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আনা এক সংশোধনী বিল [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)]। এর সোজা অর্থ হল আসামে এখন এবং ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যে এনআরসি তালিকা করার পর মুসলমান যারা বাদ পড়বেন, তাঁরা একেবারেই বাদ। আর তাঁরা বাদে বাদ পড়া অন্য সব ধর্মের সবাইকে যেন আবার ভারতের নাগরিকত্ব সহজেই দেয়া যায়; এরই এক খোলাখুলি নাগরিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হবে এটা। এই লক্ষ্যে মোদী সরকার আগামী সপ্তাহে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ওপর একটা সংশোধনী বিল আনতে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে মোদীর মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। আগামি সোমবার (৯ ডিসেম্বর) লোকসভায় পেশ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল।

বিজেপি-আরএসএসের একেবারে ওপরের নেতারা জানেন, মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো এটাই তাদের রাজনীতি। কেন? মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুরা ভাল – না, ঠিক এটা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাজ বা রাজনীতি নয়। তাদের মূল কাজ হল পোলারাইজেশন, মানে ভোটার মেরুকরণ। অন্য ভাষায় কাজটা হল হিন্দুদের আলাদা করা, হিন্দুরা আলাদা, ভালো আর সব কিছু তাদেরই- এটা সব সময় প্রমাণ করে চলা ও এই দাবি তাতিয়ে রাখা। কেন? কারণ এমনটা শুধু প্রমাণ করে রাখা তাদের কাজ নয়। বরং কাজের লক্ষ্য হল, হিন্দু হিসেবে তারা যেন এরপর দলবেঁধে কেবল বিজেপির প্রার্থীকেই ভোট দেয়। মানে বিজেপির বাক্সে সব হিন্দু-ভোট যেন এসে ঢুকে।

এই শেষ বাক্যটাই হলো আসল লক্ষ্য। অর্থাৎ মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুমাত্রই ভাল, এটা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার সময় আধা সত্য বা মিথ্যা যা খুশি কিছু প্রচার করা হল। এতে ধর্মীয় পোলারাইজেশন বা হিন্দু মেরুকরণ ঠিকঠাক করা হলো। কিন্তু কোনো কারণে বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট ঢুকল না। তাহলে কিন্তু এটা আর বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হবে না। বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে ফেলা- এটাই বিজেপির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চর্চা করার মূল লক্ষ্য।

স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ
এদের রাজনীতির বুঝও আজীব; মূলত তিনটি শব্দের- স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম বলে এ দুই শব্দের অর্থহীন কিছু আবেগী সুড়সুড়ি তুলে ফেলা আর তৃতীয়টা হল জাতীয়তাবাদ : মানে উগ্র-হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ রাষ্ট্র, অধিকার, নাগরিক, রিপাবলিক, কনস্টিটিউশন ইত্যাদি এসবই এদের কাছে একেবারে অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ও ধারণা। রাষ্ট্র বলে কোন ধারণা এদের কাছে অপ্রয়োজনীয় থাকে, তাই এর কোনো নীতিগত দিক যেমন নাগরিকের কিছু মৌলিক অধিকার থাকবে; যা রক্ষা করতে, সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- এটা বিজেপির রাজনীতিতে কোনো বিষয় নয়। অথবা ধরা যাক, রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে কোনো অধিকারবৈষম্য করতে পারবে না, আইনের চোখে সবাইকে সমান দেখবে ও আচরণ করবে ইত্যাদি বিষয়গুলো? রাষ্ট্রের এমন পালনীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটাও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিতে কোন আমলযোগ্য ব্যাপারই নয়। কেবল কেউ বিজেপি কি না, সে হিন্দুত্ব চিন্তার লোক কি না – সেটার দিকে চোখ রেখে চলে বিজেপির বাক্স ভরানোই এই রাজনীতিতে যথেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে বিজেপি-আরএসএস বা তাদের কর্মীরা কি কেবল এক হিন্দুত্বের আবেগের মধ্যেই তীব্রভাবে ডুবে থাকে- যেন কেবল এক হিন্দুত্বের ভাবাবেগের সুড়সুড়িই তাদের জন্য সব কিছু, ডুবে বুঁদ হয়ে থাকা? তাই কী? না, সম্ভবত তা একেবারেই নয়। যেমন আমরা পরীক্ষা করতে পারি এবার ভারতে পেঁয়াজ-উৎপাদক অঞ্চল বা রাজ্যে বন্যায় তা নষ্ট হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজসঙ্কট খাড়া করেছে। বাংলাদেশের মত ভারতেও নিজের বাজারেও পেঁয়াজের সঙ্কট চলছে। চড়া মূল্যের বাড়াবাড়ি হয়ত বাংলাদেশের মত না। কিন্তু মজার ঘটনাটা হল, তুরস্ক ভাল সহনশীল দামে ভারতকে পেঁয়াজ দিতে রাজি হওয়ায় সেই তুরস্ক ভারতের কাশ্মির নীতির কঠোর সমালোচনা করে ধুয়ে দিলেও এ ব্যাপারে মোদীর ভারত সরকার চুপচাপ। যেমন ভারতের অনলাইন ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় একটা খবরের শিরোনাম হলো, ‘মোদি সরকার তুরস্কের কাশ্মির সমালোচনা শুনেও চোখ বুজেছে; কারণ ভারতের এখন তুরস্কের পেঁয়াজ দরকার” [Modi govt ignores Turkey’s Kashmir criticism — because India needs its onions]।

আবার প্রায় একই রকমভাবে মালয়েশিয়ার মাহাথির গত সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে ভারতকে কাশ্মিরে ভারত ‘দখলদার বাহিনী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাতে ভারত প্রথমে ছদ্মরাগ দেখিয়েছিল যে, তারা আর মালয়েশিয়ার পামঅয়েল কিনবে না। কিন্তু দামে সস্তা পাওয়ায় ভারত এখন আগের মতোই মালয়েশিয়ার পামঅয়েল আমদানি করতে শুরু করেছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াল, উগ্র হিন্দুত্বের তথাকথিত আবেগ নয়, এমনকি মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়েও নয়; সুখ বলতে তা এখনো তাদের কাছে বিষয়-আশয়ের বস্তুসুখের মধ্যেই, সেখানে হুঁশ জাগ্রত রেখে খাড়া বৈষয়িক লাভালাভেই তাদের সুখ।

কাজেই ভুয়া হলেও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হল বাছবিচার হুঁশহীন এক উগ্র হিন্দুত্বই। যদিও সম্প্রতি তাদের পরপর দুইটা বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একটা হল মোদী সরকারের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মাপ জিডিপিতে ধস নেমেছে। আসলে বলতে হবে, এবারের ধস আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। দুই বছর আগে যেটা  ৮ শতাংশ বলে মোদী দাবি করেছিল, কিন্তু সেটা আসলে আড়াই পার্সেন্ট বাড়িয়ে বলা হচ্ছিল।  সেই বাড়ানো ফিগারটাও এখন কমতে কমতে এবার ৪.৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এটা সমাজের সব কোনায় হাহাকার তুলে ফেলেছে। কাজেই এটা ঢাকা দিতে এখন আবার কোনো এক জবরদস্ত মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণার ইস্যু দরকার।

এ ছাড়া তাদের আরেক বিপর্যয় ঘটেছে আসামের এনআরসি ইস্যুতে। তারা হিন্দুমনকে খুব তাতিয়েছিল যে, নিশ্চয় লাখ লাখ নাগরিকত্ব অপ্রমাণিত মুসলমান থেকে যাবে এমন-তারা তালিকায় দেখতে পাবে আশা করেছিল। কিন্তু হিন্দুদেরই হাহাকার উঠেছে কারণ নাগরিক-প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া মোট ১৯ লাখের ৭৫ শতাংশ হলো হিন্দু। এখন উঠতে-বসতে বিজেপিকে বদ দোয়া দেয়া আসামের এই হিন্দুদেরকে সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে বিজেপির। অন্যের জন্য খুড়ে রাখা গর্তে পড়ে এখন উলটা বিজেপিরই জান যায় অবস্থা।
তাই বিজেপি এখন অছিলা খুঁজছে দু’টি- ১. তৈরি হওয়া আসামের এনআরসি তালিকাই বাতিল বলে ঘোষণা করে দিতে আর ২. ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন।

বিজেপির মূল লক্ষ্য আসলে ‘বিদেশী’ বলে বা ‘মুসলমান’ বলে একটা কল্পিত স্থায়ী শত্রু খাড়া করে ফেলা; যারা সব সময় নাকি ভারতের ‘হিন্দুস্বার্থের বিরোধিতা’ যাচ্ছে এভাবে এমন একটা গল্প ও ইমেজ বিজেপি খুজছে যা দিয়ে সে একটা স্থায়ী শত্রুরূপ দান সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। বিজেপির ইচ্ছা কল্পিত এমন শত্রুর বিরুদ্ধেই সারাজীবন সে লড়াই করে যাচ্ছে তা দেখাতে পারে। যেন সে এই চেক ভেঙে ভেঙে সব সময় খেয়ে চলতে পারে, পোলারাইজেশন ও ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতি করে যেতে পারে। সে কাজে এমন স্থায়ী এক ইস্যু হতে পারে যেমন সেটা হতে পারে এমন যে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এই শ্লোগান।

তবে আসলে এটা আর অনুমান হিসেবে নেই, গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো এই বয়ানেই একমাত্র বিজেপি রাজনীতি করবে ও করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মোদি-অমিতের দানবগোষ্ঠী।

অর্থনীতিতে ডুবে গিয়ে এরা এখন এমন অবস্থায় যে ‘ভারতজুড়ে এনআরসি’ আর, বিদেশী খুঁজতে হবে- এটাই তাদের একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনার রাজনীতি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আঁচ করে দক্ষিণী প্রাচীন পত্রিকা দা হিন্দু এডিটোরিয়াল লিখে বলেছে The Centre should focus on the economy and address issues of real concern] কেন্দ্র সরকারের উচিত অর্থনীতির দিকে যেটা প্রকৃত উদ্বেগের ইস্যু সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।
যেমন এখন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নির্বাচন চলছে, সেখানে অমিত শাহ নির্বাচনী জনসভা বক্তৃতা করেছে- “ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে”, এই লাইন নিয়ে। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং- “আপনার পাশের লোকটা বিদেশী নয়তো, চেক করেছেন কী”- এমন বিদেশীভীতি বা জেনোফোবিয়া ছড়ানোর উদ্যোগ-রাস্তা ধরেছে। এটাকে এক মানসিক অসুস্থতা বললেও খুব কমই বলা হবে।

কিন্তু এর আগে ইতোমধ্যে আসামে যে ড্যামেজ ঘটে গেছে, তা হলো এনআরসি মোট ১৯ লাখ বাদ পড়াদের মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু। তাই এখন উলটা আসামের সমাজ থেকে এদের বাদ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হবে বিজেপিকে। তাই, এদেরকে বাঁচানোর ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে আগামী সপ্তাহে আনা হচ্ছে, ১৯৫৫ সালের পুরনো নাগরিকত্ব বিলের এক সংশোধনী। এটাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৯। যাতে তাদেরকে আবার নতুন করে নাগরিকত্ব দেয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে এই বিলে বলা হবে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানরা (কিন্তু মুসলমানরা বাদ) অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং উল্টো যেমন বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অভিবাসী এবং বৈধভাবে আসা অভিবাসী (কিন্তু যাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে), তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আসলে আগের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে কোনো অবৈধ অভিবাসী (ভিসা ছাড়াই ঢুকে পড়া বা ভিসার মেয়াদ শেষেও থাকা) বিদেশী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে না। সোজা কথায় মোদী নতুন আইনে এই বাধা তুলে দিতে চাইছে; কিন্তু মূলত মুসলমান ছাড়া বাকি সব ধর্মের মানুষের জন্য সুযোগ রেখে দিয়ে- এভাবে আনা হবে এই সংশোধনী। এটাই এর প্রত্যক্ষ মুসলমানবিদ্বেষ এবং মুসলমানবৈষম্য।

এমন এই বিদ্বেষ ও বৈষম্য তৈরি করা – এটাই হবে বিজেপি-আরএসএসের রাজনৈতিক পুঁজি। স্থায়ী ঘৃণাবিদ্বেষ তৈরি ও ছড়ানোর উৎস; যাতে এটা কেনাবেচা থেকেই স্থায়ীভাবেই পোলারাইজেশনে বিজেপি প্রার্থীর বাক্স ভরার রাজনীতি করে যাওয়া যায়। এক দিকে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এর রাজনীতি চালিয়ে অস্থির ঘৃণাবিদ্বেষ উত্তেজনা তাতিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা, মুসলমান তাড়িয়ে খাঁটি হিন্দুদের ভারত কায়েম করা- এ এক বিরাট মাইলেজের স্থায়ী ইস্যুর রাজনীতি বিজেপি-আরএসএস নিজের জন্য তৈরি করতে চাইছে। আর এ কাজ করতে গিয়ে কোনো হিন্দু এতে ফেঁসে নাগরিকত্ব খোয়ালে তাকে আবার নাগরিকত্ব দিয়ে আগের মতোই ভারতে রেখে দেয়া যাবে। এই সুবিধা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপি-আরএসএস-কে তাদের ঘৃণ্য-রাজনীতির ইস্যু সরবরাহের নিয়মিত খোরাক হয়ে থাকতে হবে, আর স্থায়ীভাবে নাগরিকবৈষম্যের শিকার হতে থাকতে হবে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের এই মুসলমান ‘বলি’ দিয়ে দেয়ার রাজনীতি- তা আবার ‘ভারত জুড়ে এনআরসি’ বা বিদেশী খোঁজো যে নামেই আসুক তা কি টিকেই যাবে? বিজেপি-আরএসএস এরাই কি একমাত্র সত্য হয়ে যাবে? আগাম কোনো কিছু শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা যায়।

এনআরসি নামে মোদি-অমিতের দানব শয়তানি শুরু ও শেষ হলে পরিণতি কী হয় তা মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে আসামের সবার তা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। অহমিয়া বা বিজেপি যতই এটা ‘বিদেশী’ বা মুসলমানরাই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে খুশিতে থেকেছিল বটে, কিন্তু সবশেষে এটা তাদের নিজের জন্যই খানাখন্দ খুঁড়ে রাখার মতো কাজ হয়েছে। এখন হাহাকার উঠেছে। শুধু তাই নয়, পড়শি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও এ বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষের তর্কে ওই বাংলাও এখন বুঝে গেছে যে, নাগরিকত্বের ডকুমেন্ট সার্টিফিকেট আর কার্ড জোগাড়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি কী জিনিস। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের যারা ইতোমধ্যে বিজেপিতে যোগ দিয়ে হিন্দুত্বে সুবিধা খাওয়া আর মুসলমানের রাস্তায় গড়াগড়ি যাওয়া ব্যালকনিতে বসে আরামে দেখা যাবে বলে ভেবেছিল, এরা নিজেই ইতোমধ্যে বুঝে গেছে এনআরসি কী জিনিস। এটা যে হিন্দু-মুসলমান বাছবিচার ছাড়াই নির্বিশেষে যে কাউকে চরমতম হয়রানির শিকার বানিয়ে ফেলতে পারে, সেটা এখন আসামের পরিণতি দেখে সবাই বুঝতে পেরেছে।

এনআরসিতে নাগরিক প্রমাণের দায় নাগরিকের, রাষ্ট্রের না। অথচ একটা ডকুমেন্ট ব্যক্তিপর্যায়ে রক্ষা সংরক্ষণ যতটা কঠিন রাষ্ট্রের হেফাজতখানা, সেটা রক্ষা উল্টো ততই সহজ। ব্যক্তি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে পারে সবচেয়ে সহজে। তাই স্বাভাবিক ছিল, কেউ নাগরিক নয় তা প্রমাণের দায় থাকা রাষ্ট্রের কাঁধে। ইন্দিরার আমলে একসময় এটা তাই ছিল।

এ ছাড়া এমনিতেই দুনিয়া এখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের- এর প্রধান স্বভাব বৈশিষ্ট্য তাই এমন যে পুঁজি আর শ্রমের (মানুষের) মাইগ্রেশন এখানে হবেই, তারা নিরন্তর ঘুরে বেড়াবে। শুধু মানুষ নয়, পুঁজিও এখানে দেশী-বিদেশী পরিচয় নেবে, ঘটবে। তাই ব্যাপক ইকোনমিক মাইগ্রেশন মানে বৈধ-অবৈধ লেবার মাইগ্রেশন সবচেয়ে কমন ঘটনা হবে এখানে। এর ওপর ভারতবর্ষের দেশভাগ- এটা নিজেই সবচেয়ে স্থায়ী এক রাজনৈতিক মাইগ্রেশনের ফেনোমেনা। যা কখনই একেবারে শেষ হয়নি, হবে না। ফলে এখানে একটা নিচু মাত্রার বা কিছু মাত্রার মাইগ্রেশন সব সময় আছে এবং আশা করি আরো অনেক দিন থাকবেই। একমাত্র বদ মতলব থাকলেই কেবল এটাকে কেউ ইস্যু হিসেবে হাজির করতে চাইবে, আর কেবল মুসলমানবিদ্বেষ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

‘মাত্র ছয় মাস। তার মধ্যেই ভগ্নমনোরথ দশা কাটিয়ে নিমেষে চাঙ্গা হয়ে উঠল তৃণমূল। তিনটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চমকে দেয়া পুনরুত্থান ঘটালেন নিজের দলের। তৃণমূলের ২১ বছরের ইতিহাসে কোনো দিন জয় মেলেনি যে দুই আসনে, সেই কালিয়াগঞ্জ এবং খড়গপুর সদর আসনও ছিনিয়ে নিল ঘাসফুল। আর লোকসভা নির্বাচনে করিমপুরে যে ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল, এবার জিতল তার চেয়ে অনেকটা বেশিতে।’ এটা এ মাসের শুরুর দিনে আনন্দবাজারের এক রিপোর্ট টুকে এনেছি।

গত মে মাসে মোদির আরো বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি প্রাদেশিক আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল এসেছে। তাতে এর তিন আসনই পেয়েছে মমতার দল। অথচ এ তিনটির দু’টিতে মমতার দল গত ২১ বছরে কখনো জিততে পারেনি। এই তিনটি আসনই হয় মুসলমান প্রধান অথবা বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া নয়তো বা আসাম লাগোয়া আসন। আর এসব সত্ত্বেও এগুলোর দু’টি ছিল সিপিএম বা কংগ্রেসের দখলে। আর একটি এমন রাজ্য বা বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন, যা গত কেন্দ্র নির্বাচনে প্রথম বিজেপি দখলে যাওয়া আসনের অন্তর্গত। তাই এবারের নির্বাচনের শেষে ফলাফল দেখে সব পক্ষই একবাক্যে স্বীকার করেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সবাই এনআরসি আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে, ভুগছে। এনআরসি তাদের আক্রমণ করে ফেলেছে। কলকাতার বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও স্বীকার করে নিয়েছেন বলে রিপোর্ট বলছে, Dilip Ghosh on Saturday identified “fear and confusion over NRC” ।

তাই সেই আতঙ্কের একমাত্র ত্রাতা হিসেবে মমতা তাদের আশ্রয় হয়ে ধরা দিয়েছে। তাই মমতার বিজয়। আগে তারা ভেবেছিল বিজেপির উত্থানে মুসলমানের কোণঠাসা হওয়া দেখতে তাদের খারাপ লাগবে না হয়তো। কারণ, ‘মমতা নাকি চাপে থাকা মুসলমানদের রশি আলগা করে মাথায় তুলেছিল।’ আর এখন বেলকনিতে বসে “মুসলমানদের কষ্ট পাওয়া দেখার মজা” দেখতে চাওয়ারা বুঝে গেছে, ব্যাপারটা এমন মজা-তামাশার নয়। এনআরসি মানে নিজেই নিজের জন্য হয়রানি ডেকে আনা, পকেটের পয়সা খরচ করে দুঃখ কেনা। তারা প্রত্যেকে ছোট চাকরি বা ব্যবসায় স্বল্প আয়-ইনকামে অস্থির থাকতে হয় এমন জীবন যাপন করেন। সেখানে উটকো নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের টেনশন? এই হয়রানি ডেকে আনা তাদের জীবনের অর্থ কী! কলকাতায় ইতোমধ্যে রেশন কার্ড বা ডকুমেন্ট ইত্যাদি জোগাড়ের নীরব দৌড়াদৌড়ি কেউ কেউ শুরু করে দিয়েছেন। কাজেই কেউ পারলে তাদের সেই ত্রাতা হতে পারেন মমতা- এই মেসেজই তারা হাজির করে ফেলেছেন!

ইতোমধ্যে আর একটা বড় ডেভেলপমেন্ট আছে। গত মে মাসে শেষ হওয়া নির্বাচনে এক ব্যাপক কারচুপি হয়েছে আর তা মূলত ডিজিটাল ব্যালট-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার সুযোগে। এটা বিজেপি ছাড়া মূলত সব আঞ্চলিক দল বিশ্বাস করে। যদিও হাতেনাতে দেয়ার প্রমাণ হাজির করা মুশকিল। এ ধারণা আরো জোরদার এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রিম কোর্ট গত নির্বাচনে খোদ মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যায়নি। পাশ কাটিয়ে চলেছে। সেটিও আবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল যে, যদি তা করতে হয়, তবে আগ্রাসী মোদির নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়ার রিস্ক তাদের নিতেই হতো। যদিও কনস্টিটিউশনালি সে ক্ষমতা তাদের দেয়াই আছে। কিন্তু কেউই আসলে সঙ্ঘাতে যেতে চায়নি। এমনকি একজন সক্রিয় আপত্তিকারী কমিশনার এখনো মোদির নির্বাহী ক্ষমতার হয়রানির শাস্তি ভোগ ও মোকাবেলা করে চলেছেন।

তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ইতোমধ্যে তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সংসদে ১৯টা বিজেপি-বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়েছে। ‘নির্বাচনী সংস্কার, ব্যালট ফেরানোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে’ রাজ্যসভায় স্বল্পমেয়াদি আলোচনার জন্য যৌথভাবে নোটিশ দিয়েছেন এ দলগুলোর নেতারা। এমন ইস্যুগুলো আস্তে ধীরে বড় ও সফল হয়ে উঠতে পারে, যা বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে পারে। আপাতত আগামী সপ্তাহের উত্তেজনা নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল নিয়ে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা গত  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

আসাম এনআরসির নখরা করবে, না পোর্ট-করিডোর নিবে?

আসামকে একটা বেছে নিতে হবে
এনআরসির নখরা করবে, না পোর্ট-করিডোর নিবে

গৌতম দাস

২৫ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2NS

 

 

আর না, এবার আসাম নিয়ে ভারতকে বাংলাদেশের একথা বলার সময় হয়েছে যে, বাংলাদেশকে আসাম কিভাবে দেখতে চায় তার একটা বেছে নিতে হবে – হয় আসাম এনআরসি করতে আবার মেতে উঠবে, আর না হয় বাংলাদেশের পোর্ট-করিডোর ব্যবহার করতে চায় বলে আবেদন করবে। এদুটো একসাথে ভারত বা আসাম করতে পারবে না। এদুটো এক সাথে করার জিনিষ না। আসামকে পরিস্কার করে বলতে পারতে হবে যে আসাম মুল সমস্যা কোনটা? বিদেশি অনুপ্রবেশ? যেজন্য তাকে আবার এনআরসি করার রংঢং করতে যেতে চাচ্ছে? নাকি, অনুপ্রবেশ বা মাইগ্রেশন সমস্যা নয়। আসামের মূল সমস্যা যোগাযোগহীনতা; পশ্চিমবঙ্গ বা বাকি ভারতের সাথে আসামের ভাল কোন যোগাযোগ নাই, এটাই মূল সমস্যা। যদি তাই মানে তবে কোন ফেয়ার শর্তে আসামের বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর ফেসিলিটি দরকার এটা বলতে হবে। আর সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য, করিডোর পাবার পরে বিদেশি অনুপ্রবেশ বা মাইগ্রেশনকে আর কোন সমস্যা বলার কিছু থাকবে না।
আর আমাদেরকেও ভারতকে (আসাম প্রসঙ্গে) পরিস্কার করে জানিয়ে দিতে হবে। আমাদেরকেও সরাসরি রেকর্ডের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারতে হবে, আর তা টোন সটান রেখে বলতে হবে। মুসলমানবিদ্বেষ বা বাঙালি খেদানোর আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার চর্চা সমুলে বন্ধ করতে হবে। মোদী-অমিতের এভাবে ধর্মীয় পোলারাইজেশনের জজবা তুলে ভোটের বাক্স ভর্তি করার রাজনীতি ও কৌশল বন্ধ করতে হবে। অন্তত, বাংলাদেশের সরকারের ঘাড়ে বন্দুক রেখে এই রাজনীতি করা যাবে না। মোদী-অমিতের আরএসএস যদি মনে করে ইসলাম ঘৃণা ছড়িয়ে হিন্দুভোট বাক্সে ভরা এটা তাদের রাজনীতির কোর [Core] কৌশল তাই তারা ছাড়তে পারবে না সেক্ষেত্রে আসাম কোন ফেয়ার শর্তেও বাংলাদেশের করিডোর পেতে পারে না। আসামের কোর সমস্যা যদি বাংলাদেশের কথিত মুসলিম অনুপ্রবেশ হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় করিডোর না পেলেও আসামের তাতে কোন সমস্যাই নাই।  অতএব আসামকে বেছে নিতে হবে, সে ঠিক কী চায়।
আসলে বটম লাইনটা হল,  যত কিছুই জুলুম-বেইনসাফি করেন, চাই কি অন্যের ক্ষতি করার জন্য গর্ত খুঁড়েও রাখতে পারেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায়-ইনসাফের জয়ডঙ্কা বেজেই উঠে; আর আপনারই সেই গর্তে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবেই। সম্ভবত এ জন্যই আমরা শুনি, ধর্ম বা ন্যায়ের কল বাতাসে নড়ে বেজে ওঠে। এনআরসি ইস্যুতে আসামে বিজেপি এখন স্বীকার করছে তারাই বুমেরাংয়ের শিকার হয়ে নিজের গোল নিজেরাই খেয়েছে। কলকাতার ইংরাজি দৈনিক টেলিগ্রাফের শিরোনাম Assam final NRC boomerangs মানে এনআরসি বিজেপির জন্যই বুমেরাং হয়েছে।

তথ্য লুকিয়ে রাখাঃ
এখনকার মোদী-অমিতের জন্য সবচেয়ে বেকায়দার বিষয় হল, প্রকাশিত হয়ে পড়া একটা তথ্য। আসামের এনআরসি তৈরিতে ফাইনাল যে তালিকা, তাতে বলা হয়েছিল ১৯ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে নানা কারণে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু জনগোষ্ঠীর – তথ্যের এই অংশটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯ লাখের মধ্যে কতজন হিন্দু ও মুসলমান এই ভাগ করা দেখানো ফিগার, এটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।  কখনোই কোনো সরকারি অফিস তা প্রকাশ করেনি।

এবার এই তথ্যই এখন আনন্দবাজার ও ইংরেজি টেলিগ্রাফ স্পষ্ট করে বলছে, এই সংখ্যা ১৪ লাখ।  টেলিগ্রাফ লিখেছে  প্রায় চৌদ্দ লাখই হল হিন্দু [ …19 lakh people excluded from the NRC in Assam, as many as 14 lakh were Hindus.]। আর আনন্দবাজার লিখেছে, “…এনআরসির-র চূড়ান্ত তালিকায় বাদ যান ১৯ লক্ষ মানুষ। যাদের মধ্যে অন্তত ১৩-১৪ লক্ষই হিন্দু”।

অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে মুসলমান মাত্র পাঁচ লাখ। অর্থাৎ বিদেশী বলে কাউকে যদি আসাম দায়ী করতে চায় তবে সেক্ষেত্রে সিংহভাগ দায় একা হিন্দু জনগোষ্ঠীর, চার ভাগের তিন ভাগই। অথচ এত দিন তাদের প্রবল বিদেশী ঘৃণা তারা জমা করেছিল মূলত মুসলমানদের জন্য। কাজেই এখন এটা প্রমাণিত যে ১৯৫১ সাল থেকে আসামের বাসিন্দারা একটা আন্দাজ অনুমানের ধারনা নিয়ে মিথ্যা বলে আসছিল। তারা মিথ্যা নাকিকান্না গেয়ে আসছে বিদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশের কথা তুলে।

তাই আসামের ফাইনাল এনআরসির ফলাফলে এটা এখন একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়া নিজের পায়েই কুড়াল মারা। আসামজুড়ে এখন হতাশা আর হাহাকার; এমনকি আত্মহত্যাও। হতাশা, হাহাকার আর মন খারাপের কান্না উঠেছে মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। পুষে রাখা ‘বিদেশী ঘৃণা” এখন প্রয়োগের জায়গা মিলছে না। কারণ, তারাই ওঁৎ পেতে বসেছিল যে, এবার বিদেশী বাঙালি-মুসলমানদের তারা ধরেই ছাড়বে! আর ফলাফলে বাদ পড়াদের মধ্যে হিন্দুদের বিশাল সংখ্যা দেখে  বিজেপি পালিয়ে বেড়াচ্ছে, মুখ লুকিয়ে রাখছে।

পরিশেষে এখন বয়ান বদলে বলছে, এনআরসি তালিকা হয়েছে আদালতের হুকুমে, তাই এর ফল প্রকাশ হলেও আসাম সরকার নাকি তা অনুমোদন করেনি। নর্থ-ইস্টের এক ছোট অমিত শাহ আছেন, নাম হিমন্তবিশ্ব শর্মা। তিনি বিজেপির আঞ্চলিক সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ও আসামের অথর্মন্ত্রীও। তিনি অমিত শাহের সাথে আওয়াজ তুলেছেন আসামের এনআরসি বাতিল হতে যাচ্ছে [Sarma said the Assam government had not accepted the final NRC,…]।

বাঙালিবিরোধী বিশেষত মুসলিম বাঙালিবিরোধী  স্থানীয় অসমীয় সবগুলো পক্ষ কিছু আন্দাজি অনুমানে মনে ঘৃণা পুষে রাখতে রাখতে নিশ্চিত বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে, তাদের সব দুঃখের কারণ বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু-মুসলমান। যেটা আবার ২০১৬ সালের রাজ্য-নির্বাচনের পর বিজেপির রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসে হিন্দুত্ববাদের ইসলামবিদ্বেষের কারণে তা এবার হয়ে যায় যে, আসামের সব দুঃখের কারণ নাকি বাংলাদেশের মুসলমান। এমনকি তারা এটাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, কথিত এই দেশান্তরীরা নাকি স্থানীয় মোট অসমীয় জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য ধাবমান। মনে রাখা দরকার, আসামের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। আর এনআরসিতে নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারার ঝামেলায় আছে যারা, তারা মোট মাত্র ১৯ লাখ।  কোনো পারসেপশনকে নিশ্চিত বিশ্বাস করে ফেললে এমনই হয়।

তাহলে আসামের প্রকৃত সমস্যা কীঃ
এই ঘটনা-প্রচারণার শুরু সেই ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৫১ সাল থেকে। কংগ্রেসসহ অসমীয় সব রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন এতে শামিল ছিল। অর্থাৎ যেটাকে ইংরেজিতে বলে পারসেপশন মানে প্রমাণ ছাড়াই অনুমান, তা অসমীয় সমাজে খুবই প্রবল করে তোলা হয়েছিল। আসলে এক জেনোফোবিক [Xenophobic] বা মনের মধ্যে বিদেশী ঘৃণার চাষাবাদ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে আসামে কখনো লোক যায়নি তা সত্য নয়। এমনকি ব্রিটিশ আমলে সরকার পরিকল্পিতভাবে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে বাংলা থেকে লোক ডেকে নিয়ে ছিল। এ ছাড়া আইনত সেসময় আসাম তো তখন বিদেশও ছিল না। এরপর ১৯৭৯ সালে এসে এটাই সারা আসামের অসমীয় সব রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ সবাই এক প্রবল আন্দোলন গড়ে ফেলেছিল যে, এনআরসি National Register of Citizens (NRC)  বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদেশী বা মুসলমানদের বের করে দিতে হবে। বলা হয়ে থাকে, পরিণতিতে সে কালের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এই দাবির সাথে আপস না করলে আসাম ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দিকে চলে যেত; তাই তিনি ১৯৮৫ সালে “আসাম একর্ড ১৯৮৫’ (Assam accord 1985) নামে চুক্তিতে সই করে আন্দোলন থামিয়েছিলেন।

তবে  আসামের প্রকৃত সঙ্কটের মূল কারণ একেবারেই অন্য খানে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হয়ে ভাগ হয়ে গেলে পশ্চিমবঙ্গ আর পুরো নর্থ-ইস্ট (আসামসহ) এ দুইয়ের একেবারে মাঝখানের ভূখণ্ডটাই হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের এই অবস্থান হওয়াতে ভারতের এ দুই ভূখণ্ডকে তা একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। যদিও কেবল উত্তর-পশ্চিম কোণে, ২২ কিলোমিটারের এক “শিলিগুড়ি করিডোর” থেকে যায় যা এ দুই ভারত ভূখণ্ডের একমাত্র যোগাযোগ সূত্র। আর এতে মাঝের সাড়ে তিন শ’ কিলোমিটারের দূরত্ব হয়ে পড়ে সতের শ’ কিলোমিটার। আর মূল ভারতের সাথে মূলত আসামের (নর্থ-ইস্টের) এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি ও এর প্রভাবেই আসামের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছিল। সেই থেকে আসামের প্রকৃত সব দুঃখের মূল কারণ হয়ে যায় এটাই।

কিন্তু অসমীয় সাধারণের চোখে এই অর্থনৈতিক নেতি প্রতিক্রিয়ার বিরাট ঘটনা তারা খালি চোখে দেখতে পাওয়ার চেয়ে সামনাসামনি বাঙালিদেরই তাদের বেশি চক্ষুশূল মনে হতে লেগেছিল। এমন হতে প্রচার-প্রপাগান্ডাও করা হয়েছিল। আসলে তারা নেতি প্রতিক্রিয়া বা ইমপ্যাক্টকে বুঝেছিল যথেষ্ট কাজ আর না পাওয়া যাওয়ার দিক বলে এই প্রপাগান্ডাই জয়লাভ করেছিল। অতএব, তাদের ব্যাখ্যা ছিল যে, বাঙালিরাই আসামে তাদের কাজ নিয়ে নিচ্ছে, ভাগ বসাচ্ছে। আর এখান থেকেই মনগড়া পারসেপশন যে বাঙালিরাই (মুসলিম) নাকি সংখ্যায় আসামে অসমীয়দের চেয়ে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর এখান থেকে জেনোফোবিক বা বিদেশী ঘৃণার মানসিকতা বিকশিত হয়ে পড়ার শুরু।

মজার কথা হল কেউই চোখ খুলে দেখেনি ব্যাপারটা আসলে কী, এমনকি শিক্ষিত  মধ্যবিত্ত অসমীয়রাও নয়। বরং তাদের মধ্যে এখান থেকেই এক অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক সাজার জোয়ার উঠেছিল। সম্ভবত চিন্তা করা ও বুঝাবুঝির কষ্ট করার চেয়ে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক হয়ে যাওয়া ইতিহাসে সব সময় খুবই সহজ গণ্য হয়ে থাকে। সস্তা জাতীয়তাবাদকে এভাবে বেশি শক্তিশালী মনে হয়, এটাও তাই। তাই ১৯৭৯-৮৫ সালের ওই অন্ধ-শক্তিশালী আন্দোলন ঘটেছিল আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ/ আসু, এই নামে সবাইকে নিয়ে।  বাংলায় লেখা আসু এর মানে হল AASU (All Assam Students’ Union)। আর আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ বা Assam Gana Sangram Parishad (AAGSP) এই সংগঠনটিই ছিল মূলত শিক্ষিত অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিকদের সমর্থনের ওপর দাঁড়ানো সব অসমীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। রাজীব গান্ধী চুক্তিও করেছিলেন এ’দুই সংগঠনের সাথেই। এই চুক্তি করতে রাজীব গান্ধীকে বাধ্য করার পিছনে অসমীয় উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ গোষ্ঠির মুসলমান ও বাঙালি বলে এক {নেলি ম্যাসাকার বা, Nellie massacre and Khoirabari massacre} জবাই ম্যাসাকার করার ঘটনা ঘটিয়েছিল।  কিন্তু আসাম একর্ড চুক্তি হয়ে যাওয়ার পরের আসামের কোনো রাজ্য সরকার চুক্তির বাস্তবায়ন মানে  এনআরসি নিয়ে কোন কাজ শুরু করতে পারেনি বা করতে আগ্রহী হয়নি। শেষে ব্যাপারটা আদালতে নিয়ে গিয়েছিল আরেক অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমী এনজিও; নাম [Assam Public Works, an NGO]। আর যার তত্বাবধানে এর বাস্তবায়ন তিনি এক অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক একজন বিচারপতি রঞ্জন গোগোই। তিনিই আবার ভারতের প্রধান বিচারপতি হয়ে গেলে তাঁর আমলেই এটা শেষ হয়। সমস্যা হল এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা প্রকাশ হয়ে পড়ার পরে তাদের এই বিশেষ অর্জনের ভাগ নেয়া বা উতযাপন করার জন্য  সেই অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিকদের এখন দেখা যাচ্ছে না। কারণ তাদের অর্জনের চেয়েও অনেক বেশি হল এনআরসিতে ফেল করা ১৪ লাখ হিন্দুর কান্না ও হাহাকারের আওয়াজ, যার নিচে এরা সবাই নিজেরা লুকিয়ে যাবার সুযোগ নিয়েছে।

রঞ্জন গোগোই সদ্য অবসরে যাওয়া তিনি প্রধান বিচারপতি। কিন্তু তামসাটা হল, লম্বা ছয় বছরের কাজটি করেছেন একটা নির্বাহী বিভাগের কাজ হিসেবে ও নিজ তত্ত্বাবধানে। ইতিহাসের এ এক বিরল দৃষ্টান্ত  এবং প্রবল ব্যতিক্রম যে, বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের ভূমিকায় কাজে নেমে গিয়েছিল। কারণ এটাকে আসামীয়দের স্বার্থরক্ষার এক বিরাট বিপ্লবী কাজ মনে করত আসামীয়রা। যা এক বিরাট পবিত্র কাজই বটে।   আর গোগোই এটাকে নিজের অসমীয় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম দেখানোর বিরাট সুযোগ মনে করেছিল। যদিও এখন আসামে তিনি উলটা পরিণত হয়েছেন কলঙ্কিতদের আরেকজন। অন্তত বিজেপির চোখে তো বটেই, আর আসামের পুরানা অসমীয় বিপ্লবীর চোখেও। অথচ পুরো প্রক্রিয়ায় বিজেপি সরকারের সাথে গোগোই-এর আঁতাত তিনি আড়াল করতে পারেননি। মধ্যপ্রদেশ ক্যাডার সার্ভিস থেকে প্রতীক হাজেরা – একে কে রঞ্জন গোগোই-এর জন্য বেছে এনে দিয়েছিল? আর গোগোই একে নিয়েই এনআরসি বাস্তবায়নের প্রধান আমলা কর্মকর্তা বানিয়েছিলেন কেন? এছাড়া আবার এনআরসি ফাইনাল তালিকা ঘোষণার কাজ শেষে, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত কোনো কারণ না দেখিয়ে এই প্রধান বিচারপতি গোগোই-ই তাকে মধ্যপ্রদেশে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। অর্থাৎ অসমীয় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের সাথে হিন্দুত্ববাদের প্রবল হাত ধরাধরি আমরা দেখেছিলাম, যদিও তাতে কারও শেষ রক্ষা হয়নি।

আঁতাত শেষ পর্যন্ত টেকেনি। এনআরসির তালিকা এখন সব পক্ষের কাছে পরিত্যাজ্য, অপ্রয়োজনীয় অনাদরের এক দলিল। তাহলে এখন সেই ১৯৭৯ সাল থেকে যারা এনআরসি ঘোষণার জন্য আন্দোলন করেছেন; আজ এর পরিণতি দেখে তাদের মূল্যায়ন কী?

তাদের পারসেপশন এখন পুরোটাই মিথ্যা প্রমাণিত। আর খোদ আসামের হিন্দু বাসিন্দারাই সবচেয়ে অখুশি! আপসোস আর হায় হায় চলছে চার দিকে। আগেও প্রমাণিত ছিল, এখনো প্রমাণিত যে আসামের মূল সমস্যা বিদেশী বা মুসলমানেরা নয়; আসামের সমস্যা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও এর দুর্বলতা। কিন্তু এত দিন তাহলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নর্থ-ইস্টের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান বা বিকল্প খুজতে নিয়ে কিছু করেনি কেন? কারণ, এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারগুলোর কিছু সুনির্দিষ্ট মনোবাঞ্ছা আছে। প্রথমত, তাদের ভয় হলো, নর্থ-ইস্টের রাজ্যগুলো ভারত ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে যেতে পারে, চাই কি পড়শি চীনের সাথে যুক্ত হওয়া অথবা স্বাধীন হয়ে যেতে পারে। ভারত সরকার সব সময় এসবকেই প্রবল ভয় করে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, ভারত আবার আসামের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কোনো করিডোর জোগাড় করে আনতে পারলেও তা এত দিন আসামকে দিলে ভারত নিজেই স্বস্তি অনুভব করবে না বলে মনে করে, এ জন্য মূলত এত দিন জোগাড় করেনি। ভারতের ভয় হয়, বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এমন করিডোর দেয়া যাবে না, যা আসামের সীমান্তের অপর পারের চীনা ভুখন্ড এই অঞ্চলও ঐ প্রাপ্ত ব্যবহার করতে চেয়ে বসতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ করিডোর কেবল ভারতের ব্যবহারের জন্য এক্সক্লুসিভ নয়, একই সাথে তা চীনকেও ব্যবহার করার অফার ও সুযোগ দিতে চাইতে পারে। সম্ভাব্য সে ক্ষেত্রে চীনের ভারত-সীমান্তের লাগোয়া ঐ চীনা অঞ্চলের জন্য চীনও ভারতের কাছেও করিডোর চেয়ে বসতে পারে। আর তাতে চীন  ভারতের নর্থ-ইস্টের ওপর দিয়ে পাওয়া হবু করিডোর পার হয়ে, এরপর একইভাবে বাংলাদেশের করিডোর (যা ভারতেরও পাওয়া একই করিডোর ফ্যাসিলিটি হবে) পার হয়ে বঙ্গোপসাগরে যেতে চাইবে বা বন্দর ব্যবহার করতে চাইবে। এটাই ভারত একেবারেই  চায় না। এটা ভারত অনেকবার প্রকাশ করে জানিয়েছে। কারণ ভারতের ভয় হল এতে আসাম আগামিতে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এ জন্য ভারতের চাওয়া বাংলাদেশ ভারতকে একা করিডোর দেবে, এক্সক্লুসিভ।

তবে ইতোমধ্যে গত ১০ বছরে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশ পর্যন্ত কোন এক্সক্লুসিভ করিডোর দিতে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নাই – সেটি বিদ্যুৎ এর খুঁটি, মাটির নিচের জ্বালানি তেলের পাইপলাইন, রেল ও সড়ক অবকাঠামো যোগাযোগ, নাব্য নদীপথ ও বন্দর, সরাসরি দু-দু’টি সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া, সরাসরি কলকাতা পর্যন্ত বাস যোগাযোগ ইত্যাদি প্রায় সব ক্ষেত্রে। আর সবই এক্সক্লুসিভ, কেবল ভারত ব্যবহার করবে। এক কথায় এটা কোনো আঞ্চলিক করিডোর নয়, যা অঞ্চলের সবাই বাণিজ্যিক ব্যবহার করবে এমন নয়। এমনকি ভাইসভারসাও নয়। যে বিনিময়ে আমরা ভারত পেরিয়ে আমরা নেপাল বা ভুটানে যেতে পারব বা নেপাল-ভুটান বাংলাদেশে আসতে পারবে। আবার অবকাঠামো করিডোর সুবিধাগুলো- বিনিয়োগ ও পরিচালনার খরচের কী হবে তা অনিশ্চিত। আর নয়তো খুবই নামকাওয়াস্তে অর্থের বিনিময়ে। এই প্রসঙ্গে আনন্দবাজারে ছাপা হওয়া আজকের আহ্লাদিত রিপোর্টের দুটা লাইন এরকম – “সম্প্রতি ভারতের অনুরোধে ঢাকা তাদের দেশের ভিতর দিয়ে অসম-ত্রিপুরায় পণ্য পরিবহণের জন্য ‘ফি’ এক ধাক্কায় টন প্রতি ১০৫৪ টাকা থেকে কমিয়ে করেছে ১৯২ টাকায়“। এই ভাষ্যগুলো আমার লেখা একেবারেই না। খোদ আনন্দবাজারেরই খুশি আর আহ্লাদে লেখা ভাষ্য।

স্পষ্ট কথা স্পষ্ট বলা ও বুঝাবার সময় এটাঃ
এক কথায় বললে তাই, আর নয়; আমাদের এখন স্পষ্ট কথা স্পষ্ট বলা ও বুঝাবার সময়  এসেছে। করিডোর বাণিজ্যিক জিনিষ তাই এখানে প্রেমের একান্ত উপহার দেয়ানেয়া ভাবা বা চালানো চলতে পারে না। এটা কাজ করবে না, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ আছে – এটা আমরা উপেক্ষা করতে পারবই না। আমরা সাধু-সন্ন্যাসি হয়ে গেলেও পারবে না। কারণ সন্ন্যাসিদেরও খেতে হয়, খাবার যোগাড় করতে হয়। করিডোরের অবকাঠামো বিনিয়োগ পরিচালনার খরচ তাহলে কে বইবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি? কেন? কার কোন আবদারে?

ভারতের স্বার্থ যাই থাক, বাংলাদেশের জেনুইন স্বার্থের দিক থেকে বিচারে সে একমাত্র ভায়াবলভাবে করিডোর খুলতে পারে প্রথমত ও একমাত্র কেবল রিজিওনাল বা আঞ্চলিক করিডোর হিসাবে। এক্সক্লুসিভ করিডোর এই আত্মঘাতি চিন্তার প্রশ্নই আসে না। ব্যাপারটা রাষ্ট্রস্বার্থ তাই এটা আমাদের কারও ব্যক্তিগত মামা-খালা বা স্বামীস্ত্রীর ব্যাপার কখনই নয়, হতেই পারে না।  এছাড়া মৌলিক ও সম্ভাব্য কিছু শর্তের দিকে যেখানে খেয়াল রাখতেই হবেঃ;

যেমন করিডোরে দেয়ার চিন্তাটা করতে হবেঃ ১. কাউকেই আগাম কেউ দেশপ্রেমিক নয় বলে প্রচারে যাওয়া এই ঝগড়াটা কাউন্টার প্রডাকটিভ হবে। এরচেয়ে বরং পজিটিভ এপ্রোচে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ও দেশের স্বার্থগুলো নিয়ে কথাবলা ও চর্চা করতে হবে। এতে জনস্বার্থ ও দেশের স্বার্থবিরোধী চিন্তাগুলোকে সহজেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারব।  ২. করিডোর দেয়া হবে একমাত্র  আঞ্চলিকভাবে তবে সেই সাথে (নিরাপত্তার বিষয়টাসহ) তা বাংলাদেশের নিজ রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত।  ৩. অবশ্যই কেবল বাণিজ্যিকভাবে অর্থাৎ কোন রাষ্ট্রের (স্পষ্ট করেই বলা দেয়া ভাল,  চীন অথবা ভারতের তো নয়ই এমনকি আমেরিকারও নয়) কৌশলগত বা অন্য কোন স্বার্থ  বিবেচনার দায় আমরা না নিয়ে। গত বিশবছরে শ্রীলঙ্কাকে আমরা দেখছি যেমন প্রায়ই সে ‘ভাগের বউ’ হয়ে যাচ্ছে, কখনও এর কখনও ওর। এমন বাংলাদেশ যদি আমরা  এমন দুরবস্থায় না দেখতে চাই তাহলে এটাই আমাদের জন্য একমাত্র পথ, আগাম সাবধান হবার সম্ভবত শেষ সুযোগ। ৪. করিডোর অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও পরিচালনা আমাদের কর্তৃত্বে হতে হবে অবশ্যই, তবে পারস্পরিক স্বার্থ বুঝে পেলে পোষালে যে কেউ থেকে সহযোগিতা নেয়া যাবে। ৫. আঞ্চলিক করিডোর ব্যবহারকারী রাষ্ট্র সবাইকেই পরস্পরকে নিজ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে অন্যকে বাণিজ্যিক করিডোর দিতে নীতিগতভাবে রাজি থাকতে হবে। ৬. বাংলাদেশের আঞ্চলিক করিডোরে আরও অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা বাংলাদেশই নিবে। ব্যবহারকারিরা তাদের ব্যবহারের স্বার্থের দিক থেকে পরামর্শ অবশ্যই রাখবে। টেকনিক্যাল ও রাজনৈতিক কনসালটেটিভ কমিটিতে ব্যবহারকারিরা তাদের স্বার্থ ও পরামর্শের কথা যেন জানাতে পারে সেব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই একা চুড়ান্ত করবে। আর তা দিবার নীতিগত দিক হবে – তা দেবে শতভাগ বাণিজ্যিকভাবে এবং কেবল বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য এবং এক্সক্লুসিভ বাংলাদেশের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে সাজানো নিরাপত্তা- নিশ্চয়তাসহ সব সার্ভিস দেয়া হবে। আর অবশ্যই কোন অবকাঠামো ফেসিলিটি  এই সার্ভিস কোন সামরিক স্বার্থে ও উদ্দেশ্যে কোনো রাষ্ট্রকে দেয়াই হবে না, ব্যবহারকারি সকলকেই এর আগাম নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্রুতি দেয়া থাকবে আর তা কঠোরভাবে মেনটেন করতে হবে। ইত্যাদি।

ভারতের প্রণব মুখার্জি তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে অনেক বছর ভারতের অর্থ বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল। তিনি ২০০৯ সালের দিকে বলতেন, “ভারতকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিকভাবে করিডোর দেয়ার কথা ভাবতে হবে”। বলাই বাহুল্য, ভারত নিজেই এখন সে জায়গায় নেই।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, বাণিজ্যিক করিডোর সুবিধাকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ভায়াবল করতে গেলে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার, মানে এর আঞ্চলিক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। এ দিকটি গুরুত্বপূর্ণ, না হলে কোনো করিডোর ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে টিকতে পারবে না। ফি’ এক ধাক্কায় টন প্রতি ১০৫৪ টাকা থেকে কমিয়ে করেছে ১৯২ টাকায় – এটা কোন বুদ্ধিমান গ্রহিতা বা দাতার ব্যবস্থা হতেই পারে না। কোন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কী একপক্ষীয় লাগাতর লোকসানে চলতে পারে? এই ব্যবস্থা ডুবতে আর অকার্যকর হয়ে ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। একথাটাই প্রমাণ যে দাতা ও গ্রহিতা এখানে কোন লেবেলের নাদান। কোন বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয় এভাবে চলতে ও টিকতেই পারে না। বাংলাদেশের সরকার চাইলেও এর খরচ একা ভার বয়ে বা ভর্তুকি দিয়ে এটা চালাতেই পারব না।  আর একাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ যদি দেউলিয়া হয়ে যায়, স্বভাবতই তাতে করিডোর সুবিধা যদি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় এতে ভারতেরও ক্ষতি কোন অংশে কম হবে না। আর তাতে আসাম আবার ১৯৫১ সালের সময়ের অবস্থায়, প্যাভেলিয়নে ফিরে যাবে। রাষ্ট্র চালানো যা আসলে এখানে আঞ্চলিক রাষ্ট্রস্বার্থ পরিচালনা – এগুলো নিম্ন মধ্যবিত্ত এর সংসার চালানো নয়। কাজেই ১০৫৪ টাকা থেকে কমিয়ে করেছে ১৯২ টাকায় – এটাতে ভারতের মেলা লাভ হয়েছে এভাবে ব্যপারটাকে দেখা এটা মারাত্মক পেটি-মধ্যবিত্তের চিন্তা। ফি দেয়াকে কম বা না দেয়ার অবস্থায় নিলে এই করিডোর সার্ভিসটাই বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। কারণ বাংলাদেশে একবার করিডোর চালু হয়ে গেলে আসামে বিপুল বিনিয়োগ (রাষ্ট্রীয় ও প্রাইভেট ) আসা ও ঢেলে দেয়া শুরু হয়ে যাবে। এখন বাংলাদেশকে ফি না দেওয়াতে যদি করিডোর সার্ভিস হঠাত বন্ধ হয়ে যায় তাতে ভারতের এই বিনিয়োগগুলো অবশ্যই পথে বসবে – সে ক্ষতি বাংলাদেশের নিজস্ব যা হবে তা তো হবেই; কিন্তু ক্ষতি ভারতের যা হবে সেটাও কী বাংলাদেশের হবে? ভারতে বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী থাকলে তারা এটা আগেই ধরতে পারবে। এতে ভারতের কোন লাভটা হাসিল হবে – এদিকটা চিন্তা করার ক্ষমতা মারাত্মক ক্ষতিকর আত্মধবংসী পেটি-মধ্যবিত্তের থাকে না। আনন্দবাজার সেই মারাত্মক পেটি-মধ্যবিত্ত লেবেলর চিন্তাকারিদের পত্রিকা।

যে রাষ্ট্র কোন প্রকল্পে কোনটা নিজের আসল অর্থনৈতিক স্বার্থ বা এমন বিবেচনাগুলো আমল করতেই অক্ষম সে নিজে ডুবে যাবেই, পড়শি রাষ্ট্রকেও ডুবাবে।

কিছু উপসংহারঃ
আসামসহ পুরো নর্থ-ইস্টকেই বাংলাদেশের করিডোর সুবিধার অনেক কিছুই দেয়া শুরু হয়ে গেছে। এতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু কী দেখা হয়েছে, কিংবা হয়নি এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা-সমালোচনা তোলার বিরাট দিক আছে। সেটি যাই হোক, কিন্তু বাস্তবতা হল – করিডোর সুবিধা দেয়া হয়ে গেছে। এর সরল অর্থ আসামের মূল সমস্যার সমাধানকেই আমলে নিয়ে তা সরাসরি সমাধান করা শুরু হয়েছে বলা যায়। আর  সেখানেই বাংলাদেশ এক বিরাট সহযোগিতা দাতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। অথচ এদিকটা এই গুরুত্বপুর্ণ দাতা তাকে এখনও  বিপ্লবী অসমীয় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমীরা সহ সারা নর্থ-ইস্ট এখনও চিনতেই  পারে নাই। গুরুত্বটাই বুঝতে পারে নাই। তাই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু  কী দিয়ে তা বুঝা গেল?

বহু পুরানা দিন থেকে – মুসলমান অনুপ্রবেশকারী, উইপোকা, তেলাপোকা এসব বলা অমিত শাহ এন্ড গং এরা করে চলে আসছে। আমরা বুঝি ও জানি মুসলমান অনুপ্রবেশকারী, উইপোকা, তেলাপোকা এসব বলে ধর্মীয় পোলারাইজেশন করা বিজেপির নির্বাচনী রাজনীতি। যার সোজা মানে হল সারা অসমীয় জনগোষ্ঠি অমিত শাহের এই ঘিনঘিনে ঘৃণার বক্তব্য খুবই স্বাদ করেছে খেয়েছে। মজা পেয়েছে। খুব ভাল লেগেছে তাদের – কেমন ভাল লেগেছে এর প্রমাণ হল গত ২০১৬ সালে তারা বিজেপিকে প্রথম আসামে ক্ষমতায় এনেছে, সে সরকার গেড়ে বসেছে।

অর্থাৎ প্রতিটা অসমীয় মানুষের কোর-স্বার্থের সমাধান-দাতা হল বাংলাদেশ।  কিন্তু সারা আসামসহ ভারতে বাংলাদেশের মুসলমানেরা হল উল্টা আসামি। কারণ তাদের অপরাধ তারা মুসলমানপ্রধান।  নৃশংস অমিত শাহ এই তেলাপোকা পিষে মারার প্রচার করে চলেছে। আবারও করবে সেই হুমকিও দেয়া শুরু করেছে। কারণ ২০২১ সালে আবার আসাম নির্বাচন। এর সোজা অর্থ ভারত বাংলাদেশ থেকে করিডোর নেওয়ার ও পাবার জন্য যোগ্য পার্টনারই নয়।

কাজেই আমাদের দিক থেকে কথাটা হল,  আসামের মৌলিক সমস্যার দিকটি স্বীকার না করে এত দিন বিদেশী, মুসলমান, তেলাপোকা, উইপোকা ইত্যাদি বলে যে কৃত্রিম কারণ দেখিয়ে চলেছিল তা একেবারেও অগ্রহণযোগ্যই শুধু নয়, বরং প্রমাণই হয়েছে যে
মুসলমান অনুপ্রবেশকারী, উইপোকা, তেলাপোকা ইত্যাদি বলে যারা ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে দমকে দমকে তারাই সব সমস্যার মূল। তাহলে এখন এটা স্পষ্ট ভারতকে যদি আসামের জন্য বাংলাদেশ থেকে যে শর্তেই করিডোর নিতে চাইতে হয় তবে মুসলমানবিদ্বেষ সমুলে ছাড়তে হবে, বার বার এনআরসির নামে  নখরা তাকে সবার আগে বন্ধ করতে হবে।

অথচ বিজেপির ক্রমাগত সারা ভারত জুড়ে মুসলমানবিদ্বেষের দামামা বাজিয়েই চলেছে। ভারত কী নিজের স্বার্থেই এমন কিছুই করতে বা বলতে পারে না, যার ঢেউ বা আঁচ বাংলাদেশে এসে পড়ে বা আমরা শঙ্কিত হই অথবা সীমান্তে মানুষের ঢল নামে অথবা ঢল নামে কি না সে শঙ্কা তৈরি হয়।  আল্লাহ ভারতকে অন্তত কিছু জ্ঞানবুদ্ধি ওয়ালা মানুষ দেক এমন সকল নাগরিককে বিশেষত আসামের কে নিজ স্বার্থের কথা ভাবতে যোগ্যতা দেক, দোয়া করি।

ভারত ও আসামকে তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়? করিডোর পাওয়ার আগ্রহ থাকলে এনআরসির অছিলায় কোনো নির্বাচনী নুইসেন্স, মুসলমানবিদ্বেষ বিজেপির বন্ধ করতেই হবে। করিডোর পেতে চাইলে উপযুক্ত যোগ্য ও দায়ীত্ববান পার্টনার হতে হবে।

আসাম ঠিক কী চায় সে এনআরসির নামে মুসলমান খেদানোর চেষ্টার মত্ত উন্মাদ হবে নাকি দায়ীত্ববান হিসাবে বাংলাদেশ থেক পোর্ট-করিডোর নিতে চায় – কোনটা সে চায় এটা স্পষ্ট করে বলতেই হবে।  ঘটনা কিন্তু ইতোমধ্যেই করিডোর বাস্তবায়ন করতে অক্ষম হয়ে পড়বে, এই সুবিধা ব্লক হয়ে যাবে এঅবস্থার সেদিক মোড় নেয়া শুরু করেছে, যেটা বাংলাদেশের সরকার চাইলেও ঠেকাতে পারবে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ২৩ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আসাম এনআরসি করবে না পোর্ট-করিডোর নেবে?এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

নিজ পারসেপশনের ফাঁদে নিজেই আটকে পড়া

নিজ পারসেপশনের ফাঁদে নিজেই আটকে পড়া

গৌতম দাস

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Im

অবশেষে আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া এনআরসির নামে জেনো-ফোবিয়া [Xenophobia] বা বিদেশিবিদ্বেষ ব্যর্থ হয়ে থেমেছে। কোন যাচাই প্রমাণ ছাড়াই বিদেশিরাই আসামের দুঃখের কারণ – এই ছিল তাঁদের খুবই শক্ত এক অনুমান। সব জিনিষ নিয়ে আন্দাজি কথা বলা যায় না, খুবই বিপদজনক আত্মঘাতি হয়ে যেতে পারে তা। আসামের এনআরসি [NRC, National Register of Citizens] তাই প্রমাণ করল। আন্দাজে বলা কথা, মানে যা প্রমাণ হয় নাই অথচ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেছে এবং তা পপুলার ধারণা – একেই বলে পারসেপশন [Perception]। বাস্তবে প্রমাণ করা বা প্রমাণ পাবার আগেই সারা অসমিয়দের [Assamese] এক দৃঢ় ধারণা, পারসেপশন চলে আসছে সেই 1951 সাল থেকে যে, বিদেশিরাই আসামের দুঃখের কারণ। যে বিদেশি বলতে তারা বুঝাত কথিত বাংলাদেশ থেকে  আসা বাঙালি, আর যেটাকে বিজেপির কল্যাণে ২০১৬ সালের পর থেকে হয়ে গেছিল বাঙালাদেশি মুসলমান। আজ সেই মনে মনে মিঠাই খাওয়ার সুখ – সেই পারসেপশন হয়ে উঠেছে নিজেরই গলার দড়ি। আসামের এনআরসি অবশেষে  প্রায় ১৯ লাখ লোকের নাগরিকত্ব নাই করে দিতে পেরেছে।

ভারতে ইংরাজিতে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নামে পত্রিকা আছে। ওর এক বাংলা ভার্সান আছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা। সেখানে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল,  –‘হিন্দু বিরোধী এনআরসি’, বিজেপি বিধায়ক-সাংসদদের পদত্যাগ দাবি বরাকের হিন্দু সংগঠনের।  অর্থাৎ নাগরিকত্ব হারানো ভুক্তভোগী বা তাদের বন্ধুরা এখন তাদের প্রাণের এনআরসি কে নিজেরাই “হিন্দুবিরোধী” বলছে। শুধু তাই না, ঐ রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “এনআরসি তালিকা থেকে বাদপড়া ১৯ লক্ষের মধ্যে ১১ লক্ষ হিন্দু রয়েছেন তাই এই তালিকাটি ত্রুটিপূর্ণ”।  আর ভিতরে লিখেছে, “……সারা আসাম বাঙালি হিন্দু এসোসিয়েশনের সভাপতি বাসুদেব শর্মা বলেন, ১৯ লক্ষের মধ্যে মাত্র ছয় লক্ষ মুসলমান এবং এর দ্বিগুণ হিন্দু রয়েছেন”। তাই এনিয়ে এলাকার লোকেরা এখন তাদের সংসদদেরকে দায়ী অভিযুক্ত করছেন। লিখেছে, “শনিবার সকালে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, বিজেপির সভাপতি রঞ্জিত দাস, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কবীন্দ্র পুরকায়স্থ-সহ বিভিন্ন নেতারা এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন”। এজন্যই কী প্রবাদে বলে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে তাতে ঐ গর্তে নিজের পড়ারই সম্ভাবনা তৈরি হয়! এনআরসি আজ বুমেরাং সেই প্রশ্ন উঠে গেছে!

শুধু তাই না আসাম বিজেপি এখন এমনই কোনঠাসা যে মানুষের এই গালমন্দ ক্ষোভ যেন পত্রিকায় রিপোর্টেড হয়ে আরও সামাজিক আলোচনা বা সোসাল মিডিয়ায় চর্চায় না বাড়তে পারে তাই  “আসামকে প্রটেক্টেড এরিয়া” ঘোষণা করা হয়েছে।  এর সুবিধা হল, প্রোটেক্টেড এরিয়া ক্যাটেগরির অন্তর্গত এলাকায় সংবাদমাধ্যমের বিচরণে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। বিদেশ থেকে আসা কোনও সাংবাদিক বিনা অনুমতিতে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না।

ওদিকে, প্রতীক হাজেলা [Prateek Hajela]। আসামের সব পক্ষ এখন দোষী করার মত এক ব্যক্তিত্ব পেয়ে বেঁচে গেছে। সবাই একমাত্র তাকেই দায়ী করে, সব দোষ তার মাথায় ঢেলে দিয়ে নিজ নিজ হাত-পা ধুয়ে নিতে চাচ্ছে। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া এনআরসির বাস্তবায়নে প্রধান আমলা, এই ব্যক্তিত্বের নাম প্রতীক হাজেলা। আমাদের বিসিএসের মত প্রশাসনিক ক্যাডার অফিসার, যদিও মধ্যপ্রদেশের এক আইটি গ্র্যাজুয়েট তিনি। ২০১৩ সালে তিনি ছিলেন আসাম রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব। সে সময়ের আদালত নিজের তত্ত্বাবধানে হবু এনআরসি শুরু করতে চেয়ে এর জন্য প্রধান আমলা কে হতে পারেন, এমন সম্ভাব্য নামের প্রস্তাব দিতে বললে তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগোই, প্রতীক হাজেলার নামই প্রস্তাব করেছিলেন।

ভারতের আসাম রাজ্য, যার আরও সারা উত্তরের বাদিকের নিরীহ ভুটানকে বাদ দিলে  বাকিটা চীনা সীমান্ত আর দক্ষিণ দিকে বাংলাদেশ সীমান্ত, এভাবে পুরানা আসাম চিপায় পড়া এক ভূখণ্ড মাত্র। যার কেবল পশ্চিম দিকে এক ছোট্ট কোনা দিয়ে শিলিগুড়ি হয়ে সে পশ্চিমবঙ্গ মানে মূল ভূখণ্ড ভারতের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। ভারতের পলিটিক্যাল এলিট এই অঞ্চলটা নর্থ-ইস্ট বলতে ভালবাসে। বাংলায় কেউ কেউ সাত ভাই বলে। আসলে ভারত স্বাধীনের পর থেকে  নর্থ-ইস্ট বলতে পুরা আসাম প্রদেশ আর ততসংলগ্ন কিছু ট্রাইবাল এরিয়া আর প্রাক্তন কিছু প্রিন্সলি স্টেট এলাকাকে মিলিয়ে বুঝাত। পরে বিভিন্ন সময়ে (১৯৬৩ সালে নাগাল্যান্ড আলাদা হওয়া থেকে সর্বশেষ সম্ভবত ১৯৮৭ সালে অরুণাচলের আলাদা রাজ্য হওয়া ) সেই মূল আসামকে ভেঙে সাতটা ছোট ছোট নতুন রাজ্যের জন্ম দেয়া হয়েছে। এভাবে সব মিলিয়ে সাত ভাই হল – Arunachal Pradesh, Assam, Meghalaya, Manipur, Mizoram, Nagaland and Tripura।

চীন ১৯৬২ সালের ভারত আক্রমণ করেছিল। কথিত আছে, চীনের অভিযোগ ছিল নেহরুর ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় সীমান্তে সিআইএ তৎপরতা চালাতে দিয়েছিল, যা মূলত ছিল চীনের উপর গোয়েন্দাগিরির কাজ। এ ছাড়া ভারত-চীন সীমান্তের এ দিকটায় বহু অংশই পুরানা সেই কলোনি আমল থেকেই বিতর্কিত সীমানার, অর্থাৎ উভয় পক্ষ একমতে মেনে নেয়নি, এমন অনেক পকেট আছে। এসব মিলিয়ে কিছু উত্তেজনা, খোঁচাখুঁচি শুরু হতেই চীন ভারত আক্রমণ করে বসেছিল, “ভারতকে শিক্ষা দেয়ার” জন্য। সে সময় ভারত আসাম ভূখণ্ড রক্ষা করতে আসেনি বা পারেনি। আর বিপরীতে ক্ষমতার সক্ষমতা দেখানোর জন্য চীন আসাম দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু পরে নিজে থেকেই নিজের সৈন্য প্রত্যাহার করে পুরানা চীন-আসাম সীমান্তে ফিরে গিয়েছিল। এখান থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতা ও সরকারগুলোর চোখে আসাম কী, এর একটা ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। সেই থেকে ভারতের এক দুঃস্বপ্ন বা ট্রমার নাম হয়ে থেকে যায় আসাম।

সেকালে সেই ঘটনার বর্ণনা একালে এই গত মাসে আবার কিছুটা তুলে এনেছেন এক ভারতীয় সাংবাদিক দেবাশীষ রায় চৌধুরী [Debasish Roy Chowdhury], যিনি হংকং থেকে প্রকাশিত পত্রিকা “সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট”-এর চায়না ডেস্কের এক ডেপুটি এডিটর। আসাম এনআরসির নাগরিক তালিকা প্রসঙ্গে এর প্রকাশের চার দিন আগে ২৬ আগস্ট তিনি তার এক রিপোর্ট লেখা শুরু করেছিলেন এভাবেঃ –
“১৯৬২ সালের শীতকালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জনগণকে আতঙ্ক গ্রাস করেছিল। রণভঙ্গ দিয়ে পালাতে থাকা ভারতীয় বাহিনীর পিছে ধাওয়া করে চীনের সেনারা আসামে চলে আসার উপক্রম হয়। চীনারা এসে পড়ছে এই ভয়ে সরকারি অফিসাররা সব কাগজপত্র পুড়িয়ে পালিয়ে যাচ্ছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় লোকজনও পালাতে শুরু করে। আতঙ্কে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে থাকা নোট পোড়ানো শুরু হয় এবং কারাগার থেকে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত বন্দীদের ছেড়ে দেয়া হয়। স্থানীয়রা দেখে যে কয়েদিরা চীনের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে। এতে তারা মনে করে চীনারা তাদের ছেড়ে দিয়েছে”।
“২০ নভেম্বর রেডিও ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু জাতিকে পরাজয়ের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, তার হৃদয় আসামের জনগণের সাথে রয়েছে। নয়া দিল্লি আসামকে পরিত্যাগ করবে বলে কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও আসামবাসী মনে মনে সেই ধারণা করে নিয়েছিল। কিন্তু বেইজিং হঠাৎ করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে সেনাদের ফিরিয়ে নেয়। এক মাস আগে হঠাৎ করে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। আসাম ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়। কিন্তু সুরো দেবীর সংগ্রাম তখন শুরু হয়।…”।
দেবাশীষ এটা লিখছিলেন আসলে কথিত ওই সুরো দেবীর জীবনকাহিনী বলতে যেয়ে, যে তখন ওই যুদ্ধ শেষের সময় থেকে এক পরিত্যক্ত এতিম শিশু। পরবর্তীকালে পালিত হিসেবে বড় হয়ে তার বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু কোন সন্তান জন্মানোর আগেই স্বামীর মৃত্যু হয়। এখন সুরো এক বৃদ্ধের দেখভালের কাজ করে বেঁচে আছেন। কিন্তু এনআরসি তাকে নাগরিকত্বহীনের তালিকায় ফেলেছে। দেবাশীষের এই লেখার সাথে আমাদের সম্পর্ক আপাতত এতটুকুতেই।

আমরা দেবাশীষের লেখার এই অংশটুকে এনেছি এ জন্য যে, সেই যুদ্ধের পর থেকে আসামের সাথে ভারতের সম্পর্কও একধরনের এতিমের, সে সমান্তরাল টেনে ধরিয়ে দেয়ার জন্য। ভারতের এক দুঃস্বপ্ন বা ট্রমার নাম হয়ে থেকে যায় আসাম। যে তাকে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার অনুভূতি দিয়েছে। আর সেই থেকে ভারতের ক্ষমতার জগতে এই ট্রমা আর এক মিক্সড অনুভূতি থেকেই আসামের অবকাঠামো উন্নয়ন করা, রাস্তাঘাটসহ সব কিছুতে বিনিয়োগ করা আদৌ ঠিক হবে কি না, এ নিয়ে ভারতের ক্ষমতার করিডোরে  দ্বিধাদ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। না, ঠিক আসামকে শাস্তি দেয়ার জন্য নয়। তবে অনেকটা নিজের প্রসব করা অবৈধ সন্তানের প্রতি যেমন মিশ্র অনুভূতি থাকে, এটা তেমনই একটা কিছু। যার সারকথাটা হল, আসামের অবকাঠামো ভাল উন্নত করে দিলে তা তো চীনেরই ভোগে লাগবে হয়ত। কারণ, যদি চীন আবার আসে?

যদি চীন আবার আসে! ওই অবকাঠামো ব্যবহার করে সহজেই আরও ভারতের ভিতরে চলে আসে? অথবা এই নেতিবাচক অনুমানের বদলে আর একটা যেটা ঠিক যুদ্ধের মতো নয়। সেটা হল, সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আসামের উন্নত অবকাঠামো ব্যবহার করে চীন যদি এরপর বাংলাদেশ হয়ে (বাংলাদেশের সাথে বরাবরই চীনের সম্পর্ক ভালো বলে) এর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেতে আসামের উপর দিয়ে হাঁটাচলা শুরু করে যদি, তাহলে? তবে ভারত কিভাবে চীনকে না করবে অথবা না করতে কি পারবে? সব মিলিয়ে এক বিরাট সিদ্ধান্তহীনতা। যেটা ভারতের নেতাদের মনে পুরানা ট্রমার ওপর বাড়তি এক অনুষঙ্গ। এরই নীট ফলাফল হল, আসামকে সেই থেকে অনুন্নত অবকাঠামো করে ফেলে রাখা।

আসামের এই কোণায় পড়ে থাকা, বাকি ভারতের সাথে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, এটা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে মানে বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান)-এর জন্মের পর যখন থেকে, আসাম আর বাকি ভারতের মাঝখানে বাংলাদেশ ঢুকে থাকা থেকেই। সে কারণে প্রথম এনআরসি বা নাগরিক তালিকা করার তৎপরতা ১৯৫১ সালের। আর এরপর আবার ১৯৬২ যুদ্ধের ট্রমা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আসামের অনুন্নত অর্থনীতির মূল কারণ যোগাযোগ দুর্বল অবকাঠামো, যেখান থেকে কাজ চাকরি সৃষ্টিতে অভাব ও সামাজিক সুযোগ সুবিধার অভাব দেখা দেয়ার শুরু। কিন্তু সে দিকে না তাকিয়ে, কারণ হিসেবে অবকাঠামো দুর্বলতাকে চিহ্নিত না করে বরং আসামে মানুষ বেশি হয়ে গেছে, “বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা মনে করা”, এই বিদেশী বিদ্বেষ [Xenophobia] জেগে উঠা বা পরিকল্পিতভাবে উঠানো, আর তা কেন্দ্র সরকারের হাতে তার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা- এটাই আসামের  অরিজিনাল বা মূল সঙ্কট।

কিন্তু এসবের চেয়েও এসব থেকেই আর এক বড় সঙ্কট এখন ‘পারসেপশন’ [Perception]। কিসের পারসেপশন? পারসেপশন মানে যাচাইয়ে প্রমাণ হওয়া ছাড়াই আন্দাজে একটা অনুমান দাঁড় করানো, এবং দৃঢ়ভাবে তা বিশ্বাস করা। এমনভাবে বিশ্বাস করা  যা থেকে মানুষ এরপর থেকে ভুলে যায় যে সেটা একটা অপ্রমাণিত অনুমান মাত্র ছিল। যেমন, আসামে বহিরাগত বাঙালিরাই আসল সমস্যা কি না তা কি বাস্তবে মাঠে যাচাই করা হয়েছে? জবাব হল, না, কখনোই হয়নি। এ ছাড়া আগে এতক্ষণ এটাই বলেছি, আসামের মূল সমস্যা সব ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামো দীর্ঘ দিন বিনিয়োগহীন পড়ে থাকা বা কেন্দ্রের ফেলে রাখা। কিন্তু বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা- এই পারসেপশন শুধু জেঁকে বসে গেছে শুধু তাই নয়, এর ওপর দাঁড়িয়ে পুরো আসাম সমাজ সে সময় (১৯৭৯-৮৫) এতই উন্মত্ত হয়ে গেছিল যে তারা ভারত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হতে নিচ্ছিল। আর তা ঠেকাতে সেকালের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী “১৯৮৫ সালের ‘আসাম একর্ড” চুক্তি করেছিলেন, যার মূল পয়েন্ট ছিল “বহিরাগত খেদাও”।

কোন পারসেপশন আর বিচার-আদালত একসাথে চলতে পারে না। চালাতে চাইলে ওর নাম হয় শাহবাগ।  বিচার-আদালত মানেই তাতে কোন একটা জিনিষ সত্য প্রমাণিত হতেও পারে, আবার না-ও পারে। বিচার শেষের আগে এর কোনোটাই সঠিক বলা যাবে না। এই দু’টি অপশনই ঘটতে পারার সুযোগ খুলে রাখতে হবে। কোন বিচারে বসার আগেই যদি আগাম তা না খুলে রাখা হয়, তবে ঐ বিচার শুরু করার মানেই হয় না। ওটা বিচার বলাই যাবে না। কারণ, যদি ধরেই নেই পারসেপশনই সত্য তাহলে আর যাচাই-বিচারে বসার দরকার কী?

আসামের তাই বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা – এই পারসেপশন, এটা আর সত্য কি না তা আর যাচাইয়ের কোনো সুযোগই নেই। অন্তত যতক্ষণ এটা ‘পারসেপশন’ জারি থাকবে। হয় চোখ বন্ধ করে একে মেনে নিতে হবে আর নাহলে পারসেপশন ফেলে দিয়ে সত্যতা যাচাইয়ে নামতে হবে। একসাথে বিচার আর পারসেপশন চলতে পারবে না।

কিন্তু আসামে তা হচ্ছে না। হয়নি; অথচ তারা এনআরসি করতে নেমে গিয়েছিল। মানে যাচাই করতে নেমেছিল। কারা নাগরিক তা যাচাইয়ে নেমেছিল। কিন্তু এর ফলাফলে তাদের পারসেপশন ভুল প্রমাণ হলে, আসামের বাসিন্দারা কি তা মেনে নেবে? জবাব হল যে কখনোই না।
সে সুযোগ রাখা হয়নি। না রেখেই এনআরসি বা নাগরিকত্বের বাছবিচারে নামা হয়েছে। এমনকি আদালতের বিচারকেরাও ছিল বিরাট বেকুব। একটা বিদেশী বা বহিরাগত খেদাওয়ের আন্দোলন সফল হয়ে গেছে, একটা চুক্তি হয়েছে তাদেরই পক্ষে। এটা তো আদালতের জানাই ছিল। তাহলে তা আবার আদালতের মাধ্যমে “নাগরিকত্ব যাচাইয়ে নামার” মানে কী?  কারণ, “বহিরাগত খেদাওয়ের” আন্দোলন করা ভুল ছিল তা প্রমাণও হতে পারে, সেই অপশন ত খুলে রাখা হয়নি।

কাজেই এই অপশন খুলে না রাখার কারণে ২০১৩ সালে আদালত তো মূলত নাগরিকত্ব যাচাই বিচারের প্রক্রিয়া শুরুর আদেশ দিতেই পারে না। তবু হয়ত হতে পারত এক শর্তে যে, আদালতকে পরিষ্কার ঘোষণা দিতে হত, নাগরিকেরা যেন তাদের মনে গেড়ে বসা অনুমান বা পারসেপশন ভুল প্রমাণ হয়ে যেতে পারে, সে জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। অথচ আদালত এমন কোনো ঘোষণা দিয়ে রাখেননি। মানুষকে সাবধান করেনি। দেখা যাচ্ছে, আসলে আদালতও ছিলেন অহমীয়দের মত একই পারসেপশনের শিকার।

এসবেরই ফলাফল হল, এখন এনআরসির পরিণতি দেখে আসামের সব পক্ষই অখুশি। যদিও বিজেপি জানত যে এটাই হতে যাচ্ছে। তাই তা আগে টের পেয়ে দুই মাস আগে আদালতের কাছে আবার বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তের ২০ শতাংশ ডাটা রি-ভেরিফিকেশন বা পুনঃ যাচাই এর দাবি তুলেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল আবার যাচাইয়ের নামে এবার তারা ডাটায় হাত ঢুকাবে আর ‘পারসেপশন’ মোতাবেক ফল বের করে আনবে।

কিন্তু আদালত এমন পুনঃ যাচাইয়ের আবেদন নাকচ করে দেয় এই অজুহাতে যে, প্রতীক হাজেলা নিয়মিত যে অগ্রগতি রিপোর্ট দিত, এর শেষ রিপোর্টে বলা ছিল, ইতোমধ্যে ২৭ শতাংশ ডাটা পুনঃযাচাই করা হয়ে গেছে। আর এতেই বিজেপির কূটকৌশল মারা পড়ায় সবার আগে তারাই এনআরসির সব ব্যর্থতার জন্য প্রতীক হাজেলাকেই দায়ী করে মিটিং করেছিল। এরপর আসামের বহিরাগত খেদাও – এই পারসেপশনের সব পক্ষই বিজেপিকে অনুসরণ করে প্রতীক হাজেলার মাথায় সব ব্যর্থতার ভার চাপিয়ে দিয়েছে।

আবার এখনো যা করা হচ্ছে যে সব ব্যর্থতার ভার চাপানো – সেটাও তো ঠিক হাজেলার অপরাধ নয়। কারণ ব্যাপারটা হল, নিজের অজান্তে তিনি একটা সত্যি কথা বলে রাখার জন্য বিজেপির এতে পরবর্তিতে হাত ঢুকানোর সুযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়া- এটা তো হাজেলার কোন অপরাধ নয়। এখন যদি কোনো টেকনিক্যাল কারণে প্রতীক হাজেলাকে দায়ী করার সুযোগ না থাকত তাহলে কী হতো? সোজা হিসাব, ‘পারসেপশনে’ মজে থাকা আসামের সব পক্ষই আদালতকে দায়ী করত, এর একটা বিরাট সম্ভাবনা ছিল।

এদিকে আদালতের নির্দেশে প্রতীক হাজেলা এখন সব ধরনের পাবলিক উপস্থিতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। এর লাভালাভ আদালতের পক্ষেও কম যাচ্ছে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

_

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “নিজের পারসেপশনে আটকে পড়া“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু মনে করতে পারি না, এটা অবৈধঃ

গৌতম দাস

২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৭ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2GL

 

20 Aug 2019, Dhaka, Press Conference.

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তাঁর দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য চলে আসছে, তা আমাদের কারও অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে সব ছেড়ে দিয়ে আরেকবার লুঠ হবার বা হেরে যারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন নির্বাচন করেই হোক, চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও চলতি বছরের মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে ইতোমধ্যে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। ওদিকে রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হল, আসামের এনআরসি [NRC] ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও উৎপাত তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ’ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি, এখন মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন – এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিয়ে চলছিলেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রায় দুসপ্তাহ আগে ভারতে গত ৭ আগস্ট দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক  আলোচনার এজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু তা সত্বেও ভারতের [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart] কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই আমরা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও আমাদের সরকারকে সতর্ক [আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না] করেছিলাম।  ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছিলাম দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় [‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মতান্তর, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি] কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠক নিয়ে আলাদা আলাদা যার যার দেশের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ’প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১৪ দিনের মাথায় এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ [Assam NRC is India’s internal matter: Jaishankar] বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এই এক ইস্যু আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট, আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু যতই উত্তেজনা আর উস্কানি তৈরির চেষ্টা হোক না কেন ভারতের সরকারী অবস্থান হল, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যার মানে হল আসামের এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণ প্রক্রিয়ায় কেউ নিজেকে নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলেও এজন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না, কারণ, বাংলাদেশ এব্যাপারে সংশ্লিষ্টই নয় বলে ভারত মনে করে। তাই এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করার চেষ্টা কমে আসবে হয়ত, এছাড়া কোন সরকার সংশ্লিষ্ট সদস্য এমন অভিযোগ তোলার কথাই না। তাও কেউ তুললে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি এই প্রথম আমাদের হাতে এল, যা আমাদের সরকার বা যে কেউ ব্যবহার করতে পারব। একটা উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া যাওয়াতে আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ নই।

NRC in Assam is India’s internal matter, says MEA S Jaishankar, S External Affairs Minister. File photo   –  The Hindu

দুঃখের কথা হল, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” [Mr. Jaishankar said, “It’s an internal matter.” – এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার প্রায় কেউই ধরতেই পারেন নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জয়শঙ্করের এই সফরে কোন কোন ইস্যুগুলো মুখ্য হয়ে উঠবে এসব আগেই জানা না থাকার কোন কারণ নাই। বুঝা যাচ্ছে এনিয়ে মিডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিটের কারও এব্যাপারে কোন হোমওয়ার্ক নাই।  জয়শঙ্করের এই সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে ভেসে উঠা বা উঠতে পারত এমন ইস্যুগুলো হল, ১। তিস্তা বা ৫৪ নদীর পানি,  ২। সীমান্ত হত্যা, ৩। অসম বাণিজ্য, ৪। আসাম এনআরসি ইস্যু, আর ভারতের দিক থেকে ৫। বাংলাদেশের পোর্টগুলো ব্যবহারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, ৬। ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ, ৭।  কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি অন্য কিছু। এসবের মধ্যে আসাম এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের মিডিয়ার চোখে হওয়া উচিত ছিল এক নম্বর ইস্যু। কারণ, ৩১ আগষ্ট তারিখে আসামে ফাইনাল নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশবিরোধী প্রচার আর অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে শ্লোগানে সব ছেয়ে ফেলার হতে পারে যে “অনুপ্রবেশকারিরা ফেরত যাও” । কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের মিডিয়াও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে এব্যাপারে ছিল পুরাই উদাসীন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, এমনকি জয়শঙ্করের সফরে সাংবাদিক সম্মেলন কাভার করে যে মিডিয়া রিপোর্ট পরদিন ছাপা হয়েছে সেখানেও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে প্রায় কিছুই নাই বললেই চলে। অথচ জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” সংলগ্ন যেকোন বক্তব্য হওয়ার কথা ছিল শিরোনাম। পারলে এই কয়েক শব্দে দেয়া জয়শঙ্করের বক্তব্যের ভিডিওসহ রিপোর্টিং হত সবচেয়ে উপযুক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন কোন জায়গায় আছে এর এক বিরাট মাপকাঠি হয়ে গেল – জয়শঙ্করের সফর বা “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” নিয়ে রিপোর্ট। কোনভাবেই এখানে হাসিনার ফ্যাসিজমের শাসন, মিডিয়ার উপর সরকারি চাপ ইত্যাদির অজুহাত তোলারও সুযোগ নাই। কারণ মিডিয়া মূলত ১. কোন ইস্যুটা এই সফরে এক নম্বরের সে ইস্যুটাই বুঝে নাই, এটা প্রমাণিত। ২. ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয় যে আমাদের মিডিয়ায় জয়শঙ্কর বলেছেন “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” এটাকে প্রধান শিরোনাম করলে বা ভিডিওওতে দেখালে সরকারের বা ভারতের দিক থেকে আপত্তির কিছু আছে। কাজেই এটা ছিল সরকারি কোন চাপ ছাড়া ইস্যু। ৩. এটা ছিল বাংলাদেশের বার্ণিং আর জেনুইন স্বার্থের ইস্যু। ৪। এমন রিপোর্ট হাসিনার পক্ষেই যায়। কাজেই হাসিনাকে দোষ দিয়ে মিডিয়ার নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার কোন সুযোগই নাই।
এছাড়া উলটা করেও দেখানো যায়  – আমাদের মিডিয়া বিকল্প কী বা কাকে তারা শিরোনাম করেছে? – এটা থেকেও প্রমাণ হয় যে মিডিয়া ইস্যুটা বুঝেই নাই। দেখা গিয়েছে বেশির ভাগের কাছে ইস্যু হয়েছে  – তিস্তা ইস্যু। যার সার কথা হল তিস্তা নিয়ে কিছু হল না এটা দেখিয়ে ভারতকে বেইজ্জতি করব, হাসিনা কত অযোগ্য তা দেখাব। এগুলো সম্ভবত বামপন্থি মধ্যবিত্তের চোখ ও সেই মাপের বুঝাবুঝি। যেমন দেখেন বাম গণতান্ত্রিক জোট – এদের কারবার [জয়শঙ্করের সফর : তিস্তা চুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস না থাকায় বাম জোটের ক্ষোভ]। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা নিজেদের সবার উপরের নিজেদের বুঝমান মনে করে। তাই তাদের বুঝে আসাম এনআরসিতে কি হচ্ছে সেটা না, তিস্তা এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ।  কেউ কেউ আরও বাম বুদ্ধিমান হতে চেয়ে  – “ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ” এটাকে মূল শিরোনাম করেছে। এমনকি যাকে প্রফেশনাল পত্রিকা বলে মানতে চায় অনেকে সেই প্রথম আলোও  দেখা গেছে ইস্যুটা বুঝেই নাই। তাদেরও আমলে আসে নাই। তাই  শিরোনাম, ২২ আগষ্টের –  “জয়শঙ্করের সফর: বাংলাদেশের বিষয়গুলো আসেনি, ভারত স্বস্তি পেয়েছে—বামজোট”। ২২ আগষ্টের  শিরোনাম,  “মোদির কিছু বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”

জয়শঙ্করের নিজে যেচে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে স্বীকার করে নিবার অর্থ হল, যে ভারত নীতিগতভাবে মানল যে ১। ভারতে কেউ নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণে করতে না পারলেও – এর পরের বাক্য হবে – সেটাও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।  ২। ভারত অফিসিয়ালি বলতে পারবে না যে ঐ লোক তাহলে বাংলাদেশের; অথবা বাংলাদেশের থেকে আসা গোপনে প্রবেশকারি বা অনুপ্রবেশকারি। ৩। বাংলাদেশকে বলতে পারবে না যে আসেন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি।

তাহলে দাড়াঁলো কী? যেটা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল যে, জয়শঙ্করের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরের দিনে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার লীড হেডলাইন হত – আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর। সেটা হয় নাই। এতে আমাদের মিডিয়া সেন্সের করুন হাল আমরা দেখলাম। এমনকি পুরা জয়শঙ্করের সফর কাভার ছাড়াও আলাদা করে আর একটা রিপোর্ট দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। আমার কথাটা বুঝা যাবে শুধু Jaishankar bangladesh NRC – এই তিনটা শব্দ লিখে গুগুলে সার্চ দেন দেখবেন সার্চের ফলাফলে প্রথম দুই পাতা জুড়ে ভারতীয় পত্রিকার নাম আসবে যাদের রিপোর্টের শিরোনাম হল, “NRC in Assam India’s internal matter: Jaishankar”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের মিডিয়া কিন্তু ঠিকই বুঝেছে তাদের রিপোর্টের শিরোনাম কী করতে হবে।  এমনকি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য আরও কী নতুন অর্থ-তাতপর্য তৈরি করছে সেটা নিয়ে দ্যা হিন্দু পত্রিকা লিখেছে,   His statement is significant as it indicates India’s official position just days before the final NRC list is to be published on August 31. In July, Mr. Momen had expressed concern about the possible fallout of the final list on Bangladesh.

তাহলে দাঁড়ালো যা তা হল, আমরা কমিউনিস্ট প্রগতিশীল ধরণের বুঝমান খেতাব পেতে যত আগ্রহী, সাধারণ কান্ডজ্ঞান দেখাতে ততটাই বেখবর। কি আর করা – কাজেই এখন আসেন আমরা আপাতত দোয়া-কামনা করি যাতে কান্ডজ্ঞান জাগে। আর এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। এখনও বিরাট এক কাজ রয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আসামের এনআরসি ইস্যুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন আগামী ৩১ আগস্ট। কাজেই ভারতের সরকারী অবস্থান বাংলাদেশকে জড়ানো বা দায়ী করার না হলেও বাংলাদেশবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী পিছন থেকে সংগঠিত তথাকথিত “অসমিয়া স্বার্থের” দাবি তোলা হতে পারে।  তাই আগে থেকেই এর পাল্টা আমাদের বয়ান অবস্থান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। এছাড়া জয়শঙ্করের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কেমন গুরুত্ব দিতে হবে সেখানে এব্যাপারটা বুঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এর আলোকে কোন মিডিয়া রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।
যেমন বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “আসামের নাগরিকত্ব ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। ভিতরে লিখেছিল – “সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি”।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে – ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান …’। এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বুঝানো হচ্ছে যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর কেন এত সহজে ‘এনআরসি অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানলেন?
জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হল, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হল, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে শহরের বাইরের ক্যাম্পে রাখবে তারা; এসব ক্যাম্প ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে; আর যদিও অনেক পরে এদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মত নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। আর সম্ভবত অ-মুসলমানদের বেলায় এটা ঘটবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ এমনভাবে  করতে চান।
দুই. সামনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কাজ, দম ফেলার সময় নাই। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে এবার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা নিজের অবস্থানের পক্ষে রাষ্ট্রগুলোকে আনার কাজে – মুখোমুখি হবার সময় তাদের। তাই  অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হল ভারতের কাছে এখনকার আসাম এনআরসির চেয়েও আরেক বড় ইস্যু হল কাশ্মীর, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে  এখন থেকেই আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,  ২৪-২৬ আগষ্টে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক চলছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, সে এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদী দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা নেতারা কথা বলতে চায়। মোদী সেখানে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, এখন অলরেডি তিনি প্যারিসে, যেখানে এবারের জি৭ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

India’s risky Kashmir power grab, VOX

এর এক সোজা অর্থ কাশ্মীর আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু একেবারেই নয়, তা প্রকারান্তরে এখানে মেনে নেয়া হয়েছে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথের এক দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আরও রাষ্ট্রকে পক্ষে আনতে ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভাগুলো শুরু হয়ে যাবে; যেখানে বলাই বাহুল্য কাশ্মীর সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু-সমর্থক জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে – ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। এছাড়া আর একটা দিক আছে। ভারতের হিন্দু-মনের চোখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আসলে পুরান একক পাকিস্তান – “মুসলমানের” পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু বলে মেনে নেওয়া – এর অর্থ বাংলাদেশ যতটা ভাল দেশ ইমরানের পাকিস্তান ততই খারাপ, সহি না – এমন ইঙ্গিত তৈরি হয় এখানে। এটাকে ভারত তার বড় পাওয়া মনে করে, আর যেখানে কাজে লাগবে সেখানে ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি।

কিন্তু কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, একেবারেই না। সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং যে কোন জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু আমরা মনে করতে পারি না, কারণ জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী এটা অবৈধঃ
কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। মুল কারণ, কাশ্মীর সমস্যা আসলে জাতিসংঘের চার্টারের [Charter of the United Nations] আলোকে মিটাতে আমরা বাধ্য। আর কাশ্মীর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হল, কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কোন রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরি দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে এটা মেনে নেওয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের কেউ নয়। বরং কাশ্মীরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক। কাজেই হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, কোন চুক্তি করে দিয়েছে – এই তুলে দেওয়া বা চুক্তি আইনত অকেজো, মুল্যহীন। কারণ জাতিসংঘের দৃষ্টিতে কোন রাজা অথবা উপনিবেশ মালিকপ্রভু কোন ভুখন্ডের মালিক হতে পারে না। ঐ ভুখন্ডের মালিক, শাসক কে তা নির্ধারণের একমাত্র হকদার ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়ার মত হয়ে যাবে। এর ফলশ্রুতিতে ঐ দখলকারি দেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যেতেও পারে। সাদ্দামের ইরাকের কুয়েত দখল করা যেভাবে অবৈধ গণ্য হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। নিজ ভুখন্ডের শাসক নাগরিক নিজে অথবা তার সম্মতি নেয়া এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকার। নিজ ভুখন্ডের শাসক হল নাগরিক নিজে বা তার সম্মতি নেয়া প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।  তাই কোন ভুখন্ডের উপরে ওর বাসিন্দাদের বাইরে অন্য কোন রাজতন্ত্রী (Monarchy) অথবা কলোনিয়াল (Colonial) মালিকানা শাসক দাবি করাকে জাতিসংঘ অবৈধ মনে করে। অবৈধ দখলদার মনে করে।

UN Declaration 1942

জাতিসংঘের জন্ম দলিল ও ভিত্তি

  • ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই নীতি মেনে ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
  • পরে ঐ বছর শেষে ১৯৪২ সালের ০১ জানুয়ারি এতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। অর্থাৎ ঐদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এবং আগের চার্চিল ও রুজভেল্ট এভাবে মোট চার রাষ্ট্র আর এক ছোট দলিলে লেখেন ও স্বাক্ষর করেন এই বলে যে তারা আগের  Atlantic Charter  এর যৌথ ঘোষণার সাথে একমত হয়ে এই স্বাক্ষর করছেন।
    পরবর্তিতে এই চার রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত দলিল এটাই জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা [1942: Declaration of The United Nations] মানা হয়।
  • পরের দিন ০২ জানুয়ারি ১৯৪২, আরও ২২ রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেছিল। জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করা হয় এভাবে।
  • পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালে পুর্ণ গঠন দলিল লেখা শেষ হলে যেটাকে জাতিসংঘের চার্টারের [UN Charter]  বলা হয়, ওর ১১০ নম্বর ধারা মতে ঐ গঠন দলিলে অন্যান্য রাষ্ট্গুলো স্বাক্ষর করাতে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছে

এই ভিত্তিতেই পরবর্তিতে অসংখ্য গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থগত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। একালে সেসব কনভেনশন, আইন ইত্যাদির হেফাজতকারি ও তদারককারি হল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিল (UNHRC)। কাজেই জাতিসংঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

এছাড়া আর সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীর প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ
১। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,  রাজা হরি সিং ভারতের নেহেরুর সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে  কাশ্মীরের বৈধ প্রতিনিধি না।
কাশ্মীরের জনগণের কোন রায় নিয়ে তিনি নেহেরুর কাছে যান নাই।
২। গিয়েছিলেন রাজা হিসাবে, একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন রাজা হিসাবে।
তাই জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,এই চুক্তি অবৈধ, অকেজো মুল্যহীন।
৩। যদি ধরেও নেই এই দলিল বৈধ তাতেও সমস্যা হল এটা ঠিক কোন একসেশন চুক্তি নয়। এটা আসলে করদ রাজ্য চুক্তি। ঠিক যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে হরি সিংয়ের প্রিন্সলি স্টেট চুক্তি ছিল – হরি সিং নেহেরুর সাথে তেমনই এক চুক্তি করেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘের চোখে করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি সেটা আরও অগ্রহণযোগ্য, তাই অবৈধ। কারণ এর ভিত্তি কলোনি বা কলোনিয়ালিজম। নেহেরুর রিপাবলিক ভারত কী করে কাশ্মীরের জনগণকে এক কলোনিয়ান করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি করতে পারেন?
৪। আটল্যান্টা চুক্তি বা জাতিসংঘ ঘোষণার সারকথা ও মূখ্য ভিত্তি হল “কলোনিয়ালিজম অবৈধ, তাই বাতিল”। ভুখন্ডের শাসক বা মালিক ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা। বিদেশি কলোনি মাস্টার ভুখন্ডের কেউ নয়।  মনে রাখতে হবে আটল্যান্টিক চার্টারের কথা। কলোনি মাস্টার চার্চিল সেখানে তৃতীয় ধারায় স্বীকার করে নিচ্ছেন যে – ” Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them; । অর্থাৎ কোন ভুখন্ডের মালিক সেই ভুখন্ডের বাসিন্দা এই নীতি মেনেই ঐ চার্টার চুক্তিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দাসখতের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে নিয়েছিলেন রুজভেল্ট। আর এই শর্তেই তিনি হিটলারের হাতে থেকে বৃটিশসহ ইউরোপকে বাচিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারাই ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদেরককে অর্থ ও অস্ত্রসহ সবরকম সহায়তা করেছিলেন।

অতএব ভারতের কনষ্টিটিউশনে বা ৩৭০ ধারাতে যাই লেখা থাক, অথবা এই মাসে এখন ৩৭০ ধারা রদ -বাতিল করে ভারতের রাষ্ট্রপতির যে ঘোষণাই দেয়া হোক কাশ্মীর নিয়ে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিসহ সবই অবৈধ। মূল কারণ, কোথাও কাশ্মীরের জনগণ – সেই মুল বাসিন্দাদের – কোন ম্যান্ডেট বা রায় নেয়া হয় নাই কোথাও।

তাই কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘ চার্টার, জাতিসংঘের নানান গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসংঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। অন্তত জাতিসংঘের সদস্যপদ বজায় রেখে। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগই নেই যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মিটাতে হবে।

সুতরাং জাতিসংঘ চার্টার অমান্য করে বাংলাদেশেরও – কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু মনে করা, ঘোষণা করা ভিত্তিহীন। শুধু তাই না এটা আত্মঘাতি। এটা যেকোন পর্যায়ে বাংলাদেশেরই সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]