ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু মনে করতে পারি না, এটা অবৈধঃ

গৌতম দাস

২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৭ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2GL

 

20 Aug 2019, Dhaka, Press Conference.

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তাঁর দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য চলে আসছে, তা আমাদের কারও অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে সব ছেড়ে দিয়ে আরেকবার লুঠ হবার বা হেরে যারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন নির্বাচন করেই হোক, চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও চলতি বছরের মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে ইতোমধ্যে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। ওদিকে রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হল, আসামের এনআরসি [NRC] ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও উৎপাত তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ’ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি, এখন মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন – এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিয়ে চলছিলেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রায় দুসপ্তাহ আগে ভারতে গত ৭ আগস্ট দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক  আলোচনার এজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু তা সত্বেও ভারতের [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart] কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই আমরা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও আমাদের সরকারকে সতর্ক [আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না] করেছিলাম।  ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছিলাম দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় [‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মতান্তর, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি] কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠক নিয়ে আলাদা আলাদা যার যার দেশের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ’প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১৪ দিনের মাথায় এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ [Assam NRC is India’s internal matter: Jaishankar] বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এই এক ইস্যু আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট, আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু যতই উত্তেজনা আর উস্কানি তৈরির চেষ্টা হোক না কেন ভারতের সরকারী অবস্থান হল, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যার মানে হল আসামের এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণ প্রক্রিয়ায় কেউ নিজেকে নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলেও এজন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না, কারণ, বাংলাদেশ এব্যাপারে সংশ্লিষ্টই নয় বলে ভারত মনে করে। তাই এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করার চেষ্টা কমে আসবে হয়ত, এছাড়া কোন সরকার সংশ্লিষ্ট সদস্য এমন অভিযোগ তোলার কথাই না। তাও কেউ তুললে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি এই প্রথম আমাদের হাতে এল, যা আমাদের সরকার বা যে কেউ ব্যবহার করতে পারব। একটা উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া যাওয়াতে আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ নই।

NRC in Assam is India’s internal matter, says MEA S Jaishankar, S External Affairs Minister. File photo   –  The Hindu

দুঃখের কথা হল, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” [Mr. Jaishankar said, “It’s an internal matter.” – এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার প্রায় কেউই ধরতেই পারেন নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জয়শঙ্করের এই সফরে কোন কোন ইস্যুগুলো মুখ্য হয়ে উঠবে এসব আগেই জানা না থাকার কোন কারণ নাই। বুঝা যাচ্ছে এনিয়ে মিডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিটের কারও এব্যাপারে কোন হোমওয়ার্ক নাই।  জয়শঙ্করের এই সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে ভেসে উঠা বা উঠতে পারত এমন ইস্যুগুলো হল, ১। তিস্তা বা ৫৪ নদীর পানি,  ২। সীমান্ত হত্যা, ৩। অসম বাণিজ্য, ৪। আসাম এনআরসি ইস্যু, আর ভারতের দিক থেকে ৫। বাংলাদেশের পোর্টগুলো ব্যবহারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, ৬। ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ, ৭।  কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি অন্য কিছু। এসবের মধ্যে আসাম এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের মিডিয়ার চোখে হওয়া উচিত ছিল এক নম্বর ইস্যু। কারণ, ৩১ আগষ্ট তারিখে আসামে ফাইনাল নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশবিরোধী প্রচার আর অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে শ্লোগানে সব ছেয়ে ফেলার হতে পারে যে “অনুপ্রবেশকারিরা ফেরত যাও” । কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের মিডিয়াও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে এব্যাপারে ছিল পুরাই উদাসীন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, এমনকি জয়শঙ্করের সফরে সাংবাদিক সম্মেলন কাভার করে যে মিডিয়া রিপোর্ট পরদিন ছাপা হয়েছে সেখানেও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে প্রায় কিছুই নাই বললেই চলে। অথচ জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” সংলগ্ন যেকোন বক্তব্য হওয়ার কথা ছিল শিরোনাম। পারলে এই কয়েক শব্দে দেয়া জয়শঙ্করের বক্তব্যের ভিডিওসহ রিপোর্টিং হত সবচেয়ে উপযুক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন কোন জায়গায় আছে এর এক বিরাট মাপকাঠি হয়ে গেল – জয়শঙ্করের সফর বা “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” নিয়ে রিপোর্ট। কোনভাবেই এখানে হাসিনার ফ্যাসিজমের শাসন, মিডিয়ার উপর সরকারি চাপ ইত্যাদির অজুহাত তোলারও সুযোগ নাই। কারণ মিডিয়া মূলত ১. কোন ইস্যুটা এই সফরে এক নম্বরের সে ইস্যুটাই বুঝে নাই, এটা প্রমাণিত। ২. ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয় যে আমাদের মিডিয়ায় জয়শঙ্কর বলেছেন “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” এটাকে প্রধান শিরোনাম করলে বা ভিডিওওতে দেখালে সরকারের বা ভারতের দিক থেকে আপত্তির কিছু আছে। কাজেই এটা ছিল সরকারি কোন চাপ ছাড়া ইস্যু। ৩. এটা ছিল বাংলাদেশের বার্ণিং আর জেনুইন স্বার্থের ইস্যু। ৪। এমন রিপোর্ট হাসিনার পক্ষেই যায়। কাজেই হাসিনাকে দোষ দিয়ে মিডিয়ার নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার কোন সুযোগই নাই।
এছাড়া উলটা করেও দেখানো যায়  – আমাদের মিডিয়া বিকল্প কী বা কাকে তারা শিরোনাম করেছে? – এটা থেকেও প্রমাণ হয় যে মিডিয়া ইস্যুটা বুঝেই নাই। দেখা গিয়েছে বেশির ভাগের কাছে ইস্যু হয়েছে  – তিস্তা ইস্যু। যার সার কথা হল তিস্তা নিয়ে কিছু হল না এটা দেখিয়ে ভারতকে বেইজ্জতি করব, হাসিনা কত অযোগ্য তা দেখাব। এগুলো সম্ভবত বামপন্থি মধ্যবিত্তের চোখ ও সেই মাপের বুঝাবুঝি। যেমন দেখেন বাম গণতান্ত্রিক জোট – এদের কারবার [জয়শঙ্করের সফর : তিস্তা চুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস না থাকায় বাম জোটের ক্ষোভ]। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা নিজেদের সবার উপরের নিজেদের বুঝমান মনে করে। তাই তাদের বুঝে আসাম এনআরসিতে কি হচ্ছে সেটা না, তিস্তা এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ।  কেউ কেউ আরও বাম বুদ্ধিমান হতে চেয়ে  – “ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ” এটাকে মূল শিরোনাম করেছে। এমনকি যাকে প্রফেশনাল পত্রিকা বলে মানতে চায় অনেকে সেই প্রথম আলোও  দেখা গেছে ইস্যুটা বুঝেই নাই। তাদেরও আমলে আসে নাই। তাই  শিরোনাম, ২২ আগষ্টের –  “জয়শঙ্করের সফর: বাংলাদেশের বিষয়গুলো আসেনি, ভারত স্বস্তি পেয়েছে—বামজোট”। ২২ আগষ্টের  শিরোনাম,  “মোদির কিছু বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”

জয়শঙ্করের নিজে যেচে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে স্বীকার করে নিবার অর্থ হল, যে ভারত নীতিগতভাবে মানল যে ১। ভারতে কেউ নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণে করতে না পারলেও – এর পরের বাক্য হবে – সেটাও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।  ২। ভারত অফিসিয়ালি বলতে পারবে না যে ঐ লোক তাহলে বাংলাদেশের; অথবা বাংলাদেশের থেকে আসা গোপনে প্রবেশকারি বা অনুপ্রবেশকারি। ৩। বাংলাদেশকে বলতে পারবে না যে আসেন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি।

তাহলে দাড়াঁলো কী? যেটা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল যে, জয়শঙ্করের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরের দিনে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার লীড হেডলাইন হত – আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর। সেটা হয় নাই। এতে আমাদের মিডিয়া সেন্সের করুন হাল আমরা দেখলাম। এমনকি পুরা জয়শঙ্করের সফর কাভার ছাড়াও আলাদা করে আর একটা রিপোর্ট দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। আমার কথাটা বুঝা যাবে শুধু Jaishankar bangladesh NRC – এই তিনটা শব্দ লিখে গুগুলে সার্চ দেন দেখবেন সার্চের ফলাফলে প্রথম দুই পাতা জুড়ে ভারতীয় পত্রিকার নাম আসবে যাদের রিপোর্টের শিরোনাম হল, “NRC in Assam India’s internal matter: Jaishankar”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের মিডিয়া কিন্তু ঠিকই বুঝেছে তাদের রিপোর্টের শিরোনাম কী করতে হবে।  এমনকি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য আরও কী নতুন অর্থ-তাতপর্য তৈরি করছে সেটা নিয়ে দ্যা হিন্দু পত্রিকা লিখেছে,   His statement is significant as it indicates India’s official position just days before the final NRC list is to be published on August 31. In July, Mr. Momen had expressed concern about the possible fallout of the final list on Bangladesh.

তাহলে দাঁড়ালো যা তা হল, আমরা কমিউনিস্ট প্রগতিশীল ধরণের বুঝমান খেতাব পেতে যত আগ্রহী, সাধারণ কান্ডজ্ঞান দেখাতে ততটাই বেখবর। কি আর করা – কাজেই এখন আসেন আমরা আপাতত দোয়া-কামনা করি যাতে কান্ডজ্ঞান জাগে। আর এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। এখনও বিরাট এক কাজ রয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আসামের এনআরসি ইস্যুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন আগামী ৩১ আগস্ট। কাজেই ভারতের সরকারী অবস্থান বাংলাদেশকে জড়ানো বা দায়ী করার না হলেও বাংলাদেশবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী পিছন থেকে সংগঠিত তথাকথিত “অসমিয়া স্বার্থের” দাবি তোলা হতে পারে।  তাই আগে থেকেই এর পাল্টা আমাদের বয়ান অবস্থান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। এছাড়া জয়শঙ্করের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কেমন গুরুত্ব দিতে হবে সেখানে এব্যাপারটা বুঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এর আলোকে কোন মিডিয়া রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।
যেমন বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “আসামের নাগরিকত্ব ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। ভিতরে লিখেছিল – “সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি”।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে – ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান …’। এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বুঝানো হচ্ছে যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর কেন এত সহজে ‘এনআরসি অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানলেন?
জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হল, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হল, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে শহরের বাইরের ক্যাম্পে রাখবে তারা; এসব ক্যাম্প ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে; আর যদিও অনেক পরে এদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মত নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। আর সম্ভবত অ-মুসলমানদের বেলায় এটা ঘটবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ এমনভাবে  করতে চান।
দুই. সামনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কাজ, দম ফেলার সময় নাই। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে এবার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা নিজের অবস্থানের পক্ষে রাষ্ট্রগুলোকে আনার কাজে – মুখোমুখি হবার সময় তাদের। তাই  অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হল ভারতের কাছে এখনকার আসাম এনআরসির চেয়েও আরেক বড় ইস্যু হল কাশ্মীর, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে  এখন থেকেই আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,  ২৪-২৬ আগষ্টে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক চলছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, সে এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদী দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা নেতারা কথা বলতে চায়। মোদী সেখানে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, এখন অলরেডি তিনি প্যারিসে, যেখানে এবারের জি৭ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

India’s risky Kashmir power grab, VOX

এর এক সোজা অর্থ কাশ্মীর আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু একেবারেই নয়, তা প্রকারান্তরে এখানে মেনে নেয়া হয়েছে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথের এক দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আরও রাষ্ট্রকে পক্ষে আনতে ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভাগুলো শুরু হয়ে যাবে; যেখানে বলাই বাহুল্য কাশ্মীর সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু-সমর্থক জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে – ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। এছাড়া আর একটা দিক আছে। ভারতের হিন্দু-মনের চোখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আসলে পুরান একক পাকিস্তান – “মুসলমানের” পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু বলে মেনে নেওয়া – এর অর্থ বাংলাদেশ যতটা ভাল দেশ ইমরানের পাকিস্তান ততই খারাপ, সহি না – এমন ইঙ্গিত তৈরি হয় এখানে। এটাকে ভারত তার বড় পাওয়া মনে করে, আর যেখানে কাজে লাগবে সেখানে ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি।

কিন্তু কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, একেবারেই না। সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং যে কোন জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু আমরা মনে করতে পারি না, কারণ জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী এটা অবৈধঃ
কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। মুল কারণ, কাশ্মীর সমস্যা আসলে জাতিসংঘের চার্টারের [Charter of the United Nations] আলোকে মিটাতে আমরা বাধ্য। আর কাশ্মীর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হল, কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কোন রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরি দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে এটা মেনে নেওয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের কেউ নয়। বরং কাশ্মীরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক। কাজেই হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, কোন চুক্তি করে দিয়েছে – এই তুলে দেওয়া বা চুক্তি আইনত অকেজো, মুল্যহীন। কারণ জাতিসংঘের দৃষ্টিতে কোন রাজা অথবা উপনিবেশ মালিকপ্রভু কোন ভুখন্ডের মালিক হতে পারে না। ঐ ভুখন্ডের মালিক, শাসক কে তা নির্ধারণের একমাত্র হকদার ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়ার মত হয়ে যাবে। এর ফলশ্রুতিতে ঐ দখলকারি দেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যেতেও পারে। সাদ্দামের ইরাকের কুয়েত দখল করা যেভাবে অবৈধ গণ্য হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। নিজ ভুখন্ডের শাসক নাগরিক নিজে অথবা তার সম্মতি নেয়া এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকার। নিজ ভুখন্ডের শাসক হল নাগরিক নিজে বা তার সম্মতি নেয়া প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।  তাই কোন ভুখন্ডের উপরে ওর বাসিন্দাদের বাইরে অন্য কোন রাজতন্ত্রী (Monarchy) অথবা কলোনিয়াল (Colonial) মালিকানা শাসক দাবি করাকে জাতিসংঘ অবৈধ মনে করে। অবৈধ দখলদার মনে করে।

UN Declaration 1942

জাতিসংঘের জন্ম দলিল ও ভিত্তি

  • ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই নীতি মেনে ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
  • পরে ঐ বছর শেষে ১৯৪২ সালের ০১ জানুয়ারি এতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। অর্থাৎ ঐদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এবং আগের চার্চিল ও রুজভেল্ট এভাবে মোট চার রাষ্ট্র আর এক ছোট দলিলে লেখেন ও স্বাক্ষর করেন এই বলে যে তারা আগের  Atlantic Charter  এর যৌথ ঘোষণার সাথে একমত হয়ে এই স্বাক্ষর করছেন।
    পরবর্তিতে এই চার রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত দলিল এটাই জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা [1942: Declaration of The United Nations] মানা হয়।
  • পরের দিন ০২ জানুয়ারি ১৯৪২, আরও ২২ রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেছিল। জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করা হয় এভাবে।
  • পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালে পুর্ণ গঠন দলিল লেখা শেষ হলে যেটাকে জাতিসংঘের চার্টারের [UN Charter]  বলা হয়, ওর ১১০ নম্বর ধারা মতে ঐ গঠন দলিলে অন্যান্য রাষ্ট্গুলো স্বাক্ষর করাতে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছে

এই ভিত্তিতেই পরবর্তিতে অসংখ্য গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থগত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। একালে সেসব কনভেনশন, আইন ইত্যাদির হেফাজতকারি ও তদারককারি হল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিল (UNHRC)। কাজেই জাতিসংঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

এছাড়া আর সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীর প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ
১। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,  রাজা হরি সিং ভারতের নেহেরুর সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে  কাশ্মীরের বৈধ প্রতিনিধি না।
কাশ্মীরের জনগণের কোন রায় নিয়ে তিনি নেহেরুর কাছে যান নাই।
২। গিয়েছিলেন রাজা হিসাবে, একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন রাজা হিসাবে।
তাই জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,এই চুক্তি অবৈধ, অকেজো মুল্যহীন।
৩। যদি ধরেও নেই এই দলিল বৈধ তাতেও সমস্যা হল এটা ঠিক কোন একসেশন চুক্তি নয়। এটা আসলে করদ রাজ্য চুক্তি। ঠিক যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে হরি সিংয়ের প্রিন্সলি স্টেট চুক্তি ছিল – হরি সিং নেহেরুর সাথে তেমনই এক চুক্তি করেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘের চোখে করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি সেটা আরও অগ্রহণযোগ্য, তাই অবৈধ। কারণ এর ভিত্তি কলোনি বা কলোনিয়ালিজম। নেহেরুর রিপাবলিক ভারত কী করে কাশ্মীরের জনগণকে এক কলোনিয়ান করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি করতে পারেন?
৪। আটল্যান্টা চুক্তি বা জাতিসংঘ ঘোষণার সারকথা ও মূখ্য ভিত্তি হল “কলোনিয়ালিজম অবৈধ, তাই বাতিল”। ভুখন্ডের শাসক বা মালিক ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা। বিদেশি কলোনি মাস্টার ভুখন্ডের কেউ নয়।  মনে রাখতে হবে আটল্যান্টিক চার্টারের কথা। কলোনি মাস্টার চার্চিল সেখানে তৃতীয় ধারায় স্বীকার করে নিচ্ছেন যে – ” Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them; । অর্থাৎ কোন ভুখন্ডের মালিক সেই ভুখন্ডের বাসিন্দা এই নীতি মেনেই ঐ চার্টার চুক্তিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দাসখতের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে নিয়েছিলেন রুজভেল্ট। আর এই শর্তেই তিনি হিটলারের হাতে থেকে বৃটিশসহ ইউরোপকে বাচিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারাই ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদেরককে অর্থ ও অস্ত্রসহ সবরকম সহায়তা করেছিলেন।

অতএব ভারতের কনষ্টিটিউশনে বা ৩৭০ ধারাতে যাই লেখা থাক, অথবা এই মাসে এখন ৩৭০ ধারা রদ -বাতিল করে ভারতের রাষ্ট্রপতির যে ঘোষণাই দেয়া হোক কাশ্মীর নিয়ে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিসহ সবই অবৈধ। মূল কারণ, কোথাও কাশ্মীরের জনগণ – সেই মুল বাসিন্দাদের – কোন ম্যান্ডেট বা রায় নেয়া হয় নাই কোথাও।

তাই কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘ চার্টার, জাতিসংঘের নানান গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসংঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। অন্তত জাতিসংঘের সদস্যপদ বজায় রেখে। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগই নেই যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মিটাতে হবে।

সুতরাং জাতিসংঘ চার্টার অমান্য করে বাংলাদেশেরও – কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু মনে করা, ঘোষণা করা ভিত্তিহীন। শুধু তাই না এটা আত্মঘাতি। এটা যেকোন পর্যায়ে বাংলাদেশেরই সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]