পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

গৌতম দাস

১১ নভেম্বর ২০১৯, ০১:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2MQ

 

পাকিস্তানের রাজনীতিতে যেন ‘বিনা মেঘে বৃষ্টি’ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে সম্ভবত সেখানে এসে যাচ্ছে একেবারে ঘূর্ণিঝড়, যাতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে। ফলে অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। যেমন অসময়ে কিলিয়েও কাঁঠাল পাকানো যায় না, এমনকি ফল পাকানোর ওষুধ দিয়েও না, সেই অবস্থা এটা। আসলে সব কাজে টাইমিং বা সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর!
সীমাহীন অব্যবস্থাপনা আর গরীবদেশের নিত্যসঙ্গী দুর্নীতিতে ডুবে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থাকে টেনে তুলতে আশার আলো দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিলেন। ওদিকে এরই মধ্যে কাশ্মীরে নরেন্দ্র মোদীর ভারত “দখলদার বাহিনী” হিসেবে হাজির হওয়ায় এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স্তরে কাশ্মীরিদের পক্ষে লড়ার জন্য দৃশ্যত এই প্রথম পাকিস্তান এমন এক নেতা পেয়েছে যিনি সৎ হিসেবে পরিচিত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলি যার চেনাজানা এবং নয়া দৃষ্টিতে ও নয়া উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানকে সাজাতে যার আগ্রহ এক নেতা হয়ে হাজির ইমরান খান। এবারের ইমরানের জাতিসংঘ-বক্তৃতার প্রশংসা করেনি বা এটা তাঁকে স্পর্শ করেনি, এমন সংবেদনশীল মানুষ কমই পাওয়া যাবে। আমরা ‘মুখের উপর কঠিন সত্য ছুড়ে দেয়া’ বলি যেটাকে, ঐ বক্তৃতা তেমন। তাই প্রতিপক্ষ ভারত এই বক্তৃতার বিরোধিতায় না গিয়ে পাশ কাটিয়ে ‘মোকাবেলা’ করার পথ ধরেছিল।
এক দিকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া আর কোনো নেতা ইমরানের পর্যায়ে পপুলার নন বলে তাঁর ভক্তদের দাবি। অথচ আমেরিকার স্বার্থে ওয়ার অন টেররে ব্যবহৃত হতে হতে পাকিস্তান বলতে গেলে, নিজস্বার্থের পাকিস্তান-রাষ্ট্র হওয়ার কথা যেন সে ভুলেই গিয়েছে। এই দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় পুরানা রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিল এই সুযোগে লুটপাট ছাড়া তাঁরা আর কী করার থাকতে পারে! আমেরিকার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে তারা ভেবেছেন, দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। এ ছাড়া তাদের যেন কোনো কাজ-ভূমিকা নেই। আর তাতে স্বভাবতই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে ছারখার। এই চরম হতাশার মাঝে গত বছরের নির্বাচনে ‘আশা-ভরসার একক নেতা’ ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরানের উত্থান ঘটতে দেখেছিল পাকিস্তান। বলাই বাহুল্য, এই পাবলিক তারা কেউই আশা করে না যে, ইমরানের হাতে কোনো চেরাগ আছে যেটা ঘষা দিলে অথবা ভেঙে পড়া অর্থনীতির উপর ইমরান স্রেফ হাত বুলিয়ে দিয়েই সব কিছু আবার ঠিক করে ফেলবেন তিনি।
তারা এতটুকু অন্তত বুঝতে পারা ‘পাবলিক’। তাই আশা ছিল একজন ন্যূনতম সৎ লোক, যার বিদেশে চুরির অর্থ রাখার অ্যাকাউন্ট নাই, যিনি সৎভাবে ও ঈমানের সাথে নতুন নতুন উদ্যোগে আন্তরিক চেষ্টা করবেন অর্থনীতিকে পতিত অবস্থা থেকে উঠিয়ে আনার জন্য। এমনই  ছোট আশার আলো দেখিয়েই উঠে এসেছিলেন ইমরান। পাকিস্তানের অর্থনীতি যত নিচে ডুবে ছিল এখনো তার রেশ কাটেনি। তাতে ইমরানের সরকার অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ফেললেও তার সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
পাকিস্তান আসলে বিদেশী স্বার্থে ও তাদের দায় মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে চলেছিল। আর এই সুযোগে দেশী শাসক-চোরদের হাতে লুটের শিকার হয়ে পাকিস্তান ফোকলা হয়ে গিয়েছিল। সরকার চালানোর মতো যে নগদ কিছু বৈদেশিক মুদ্রা লাগে, সে খরচের মাত্র তিন মাস ভার বইবার বা সরকার চালানোর মত সক্ষমতাও সে দেশের ছিল না- এমন অবস্থায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল।
আর তাতেই ইমরান খান নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। অবশ্য এই অভিযোগও ছিল এবং এখনো আছে যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা পেতে অন্যায় প্রভাব খাটিয়েছে। আবার এর পাল্টা সাফাইও অনেকে দেয় যে, সেনাবাহিনী ঠিকই বুঝেছিল এই ফোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনীতি ও জনজীবনকে টেনে তুলতে হলে নতুন মুখ ও নতুন উদ্যোগ লাগবে- এই বিবেচনায় তারা ইমরানকে অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোক হিসেবে দেখেছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ‘হাত ঢুকিয়ে থাকা’- এটা বহু পুরনো সত্য হলেও একমাত্র সত্য নয়। অন্তত আরো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হল – এক. কোল্ড ওয়ারের জমানায় (১৯৫৩-৯১) আমেরিকা নিজ ব্লকের খুব কম রাষ্ট্রকেই সেনাসরকার বসানো ছাড়া চালাতে পেরেছিল।
দুই. কাশ্মীর ইস্যুর কারণে জন্ম থেকেই ছোট অর্থনীতির দেশ হলেও দক্ষ সেনা আর ব্যাপক খরচের সংস্থান করতে হয়, এমন দেশ হতে হয়েছে পাকিস্তানকে। তাতে বাহিনীর পেছনে সরকারি সমর্থন যে মাত্রায় দরকার, সেই প্রয়োজন নিজেরাই সরকারে্র ক্ষমতায় থাকলে পাওয়া যাবে বলে সেনারা সঠিক অথবা ভুলভাবে মনে করত। তবে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা যাই হোক না, তাদের ক্ষমতায় ব্যাপক অপব্যবহারের বড় বড় নেতিবাচক ভূমিকাই অনেক বেশি।
আর তিনঃ বাস্তবতা হল, ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লব আর এর প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল- আর তা থেকে শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোর মার্কিন বিদেশনীতিতে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থপূরণের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান আমেরিকান স্বার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিল। আর এথেকে পাকিস্তান ততটা নিজের থাকতে পারে নাই, যদিও সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানো সেটা পাকিস্তানের নিজের স্বার্থও ছিল বটে। কিন্তু বড় কথা যেটা যে তালেবান আমলে এসে যতদিন গিয়েছে পাকিস্তান আর তখন নিজের জন্য পাকিস্তান থাকতে পারে নাই। বাধ্য করা হয়ঞ্ছিল তাকে [প্রেসিডেন্ট মোশাররফের লেখা “লাইন অন ফায়ার” বইটা এর বড় স্বাক্ষী। ], আমেরিকার স্বার্থ বাস্তবায়নের এক হাতিয়ার রাষ্ট্র হয়ে গেছিল পাকিস্তান। যেন আমেরিকান যুদ্ধের জাম্পিং প্যাড বা লঞ্চিং প্যাড [ launching pad]।

তাই সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বড় বড় ব্যর্থতা আর চরম হতাশার মধ্যেও এখন ইমরানই এক আশার আলো, আশা-ভরসার প্রতীক। মনে হয়, ২০ বছর পরে পাকিস্তান এই প্রথম নিজের জন্য নিজে কিছু করার চেষ্টা করছে, পাকিস্তানের পাবলিক পারসেপশন এখন এটাই। পাকিস্তানের কলামিস্ট ইকরাম সেহগাল লিখছেন, “নতুন সরকার আগের সরকারগুলোর হাতে বিধ্বস্ত একটি অর্থনীতির উত্তরসূরি হয়েছিল। মাওলানার দুর্ভাগ্যময় মার্চ তখনই হচ্ছে, যখন এই অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার প্রথম লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছে”। কোন মাওলানার কথা বলছেন তিনি?

এরই মধ্যে এখন এক বৈপরীত্য – একটা নাম চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছে – “মাওলানা ফজলুর রহমান”। এই মাওলানার কথাই বলছিলেন সেহগাল।  দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাকে এখন “ডিজেল মওলানা” বলে কুৎসা করার চেষ্টা হয়েছে, দেখা গেছে। এটা তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের ভাল পথ বা সঠিক উপায় না। অতীতে পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতিকে কিছু কমন ইস্যুতে (জিয়াউল হকের আমল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে) একটা জোটে সবাইকে আনার ক্ষেত্রে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল, এ কথা অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু তাতে আসলেই “ইসলামী রাজনীতি” বলে কিছু এগিয়েছিল কি না অথবা ইসলামী নাম দিয়ে বসলেই তা ভালো কিছু হওয়ার গ্যারান্টি কিনা – এসব প্রশ্ন, এমন বুঝাবুঝির ক্ষেত্রে বহু কিছু এখনও বাকি থেকে যায় – এ বিষয়গুলো পুনর্মূল্যায়ন করা বা ফিরে দেখা দিন চলে যাচ্ছে!

পাকিস্তানে এখন যেসব রাজনীতিবিদ দুর্নীতির দায়ে জেলে অথবা দুর্নীতি করার অভিযোগে “দুর্নীতিবিরোধী ইসলামী আইনে” ব্যাপক সংখ্যায় যারা গত নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে, আদালতের রায়ে আনফিট বা অযোগ্য হয়ে গেছিলেন – এসব ক্ষেত্রে তারা নিজেদেরই তৈরি ‘ইসলামী আইনে’ তারা নিজেরাই ফেঁসে গেছিলেন। কারণ কিছু নুন্যতম পড়াশুনা করতে হয় আর বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি লাগে।  আধুনিক রাষ্ট্র ও এর আইনের বৈশিষ্ঠ সম্পর্কে নুন্যতম শিক্ষা ধারণা ও জানাশুনা না রেখে এক জেনারেল তাঁর নিজস্বার্থে কিছু সুবিধা পেয়েছে বলেই একটা ইসলামি রাজনীতি বলে কোন কিছুকে চালু করা যায় না। সেটা ইসলামিওও হয়ে যাবার গারান্টি নাই। সবকিছুর সামনে “ইসলাম” শব্দ বসায় দিয়েই পার পাওয়া যায় না।   আইন প্রণয়নের সময় ইসলামের নামে অর্থহীন অস্পষ্ট শব্দ রেখে দিলে তাতে ভবিষ্যতে  নিজেই তাতে বলি-শিকার হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাদেরই বিরুদ্ধে ঐ আইন ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে ফজলুর রহমানসহ পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতির নেতারা ভূমিকা রেখেছিলেন। জেলারেল মোশাররফের শাসন সমাপ্তিতে নওয়াজ শরিফ বা ভুট্টোর দল পরবর্তীতে এসব আইন সংশোধনের (সংসদীয় একটা কনস্টিটিউশনাল রিভিউ কমিশন গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে ১৮তম সংশোধনী আনতে) সুযোগ পেয়েও তাঁরা নেয়নি; বরং নওয়াজের দল বাধা দিয়েছিল। অথচ পরবর্তী সময়ে এর প্রথম শিকার হয়েছিলেন নওয়াজ শরীফ নিজেই। তিনি এই ইসলামি আইনেই ডিস-কোয়ালিফাইয়েড মাই অযোগ্য বিবেচিত ও পদচ্যুত।

আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন এখানে ২০১৭ সালের এক রিপোর্ট, জিয়াউল হকের আমলের পাকিস্তান কনষ্টিটিউশনের সম্পর্কিত ৬২ ও ৬৩ ধারা, যা দাবি করে – জনপ্রতিনিধিকে ‘সাদিক’ বা সত্যবাদী ও ‘আমিন’ বা বিশ্বস্ত হতে হবে। [Under Article 62(1)(f) of the Constitution, a person cannot be qualified as member of the national or provincial legislatures, if he is not ‘Sadiq and Ameen’ – truthful and trustworthy.] অন্যথায় হাইকোর্টের বিচারক তাকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। নওয়াজ এই আইনেই অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের এক বিচারপতি, বিচারপতি খোসা; তার মন্তব্য থেকে অনেক কিছু পরিস্কার জানা যায়ঃ
[Two years ago, Justice Khosa in Ishaq Khan Khakwani case had described the words ‘Sadiq’ and ‘Ameen’ as obscure and impracticable and had also talked about ‘nightmares of interpretation and application that they involved’.
Justice Khosa had said that some provisions of Article 62 of the Constitution certainly contained strong moral overtones but those provisions introduced into the Constitution by General Ziaul Haq had not been undone by the popularly elected parliaments in the last many decades.]

আর পরে গত নির্বাচনে পরোক্ষে সেনাবাহিনী এই আইন ব্যবহার করেই মুসলিম লীগ ও পিপলস পার্টির বহু (কমপক্ষে ৭০ জন) সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেয়নি, অর্থাৎ দৃশ্যত অযোগ্য করে দিয়েছিল। কাজেই কোনটা “ইসলামি আইন” আর সেটা কার জন্য তৈরি করা হয়েছিল অথবা কার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল এর এক ব্যাপক ও প্রকৃত মূল্যায়ন কি তারা মাওলানা ও তার ইসলামি বন্ধু রাজনীতিকরা এখন করবেন? করতে সক্ষম হবেন? এমন কোনো ইচ্ছার কথা আমরা শুনিনি।

তাহলে এখন মাওলানা ‘ফজলুর রহমানের আন্দোলন’ হচ্ছে কেন? এর অর্থ ও তাৎপর্য কী?
একটা অনুমান হল, পাকিস্তান তার অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার সঙ্কট থেকে বের হওয়ার একটা পথ বের করতে পেরেছে; যদিও সঙ্কট থেকে এখনও বের হয়ে যায়নি, এটা হতে সময় লাগবে। এই অর্থে ইমরানের সরকার কিছুটা থিতু হয়ে বসতে শুরু করেছে। কিন্তু মাওলানা ফজলুর রহমানসহ রাজনীতিক যারা বিরোধী দলে আছেন, বিশেষত যারা জেলে আছেন অথবা গত নির্বাচনে যারা অযোগ্য বিবেচিত হওয়াতে দাঁড়াতেই পারেননি বা পরাজিত হয়েছেন- তারা এখন খুবই খারাপ অবস্থায় আছেন। তারা নিজেদের জন্যও কিছু সুবিধার অর্থে কিছু আনুকূল্য ভাগ চাইছেন সরকারের কাছে। কিন্তু মাওলানার পক্ষের মিডিয়া ক্যাম্পেইন বা গুজব ছড়ানোর অনেক ক্ষমতা আছে বুঝা যাচ্ছে। যেমন আমাদের ইনকিলাব এসব নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে যার শিরোনামে লেখা হয়েছে এভাবেঃ “ইসলামাবাদে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা; দুশ্চিন্তায় ইমরান খান”। এটাকে “টু মাচ” ছাড়া আর কীবা বলার আছে! এখন সবকিছুই আর সবার কাছেই নিশ্চয় সবাই তা বাস্তবে বুঝতে পারছেন।  যুগান্তরের আর এক এমন ম্যানুফ্যাকচারড রিপোর্ট কোথা থেকে নিয়েছে তা বলে নাই।

যেকথায় ছিলাম আমরা যে,  বিরোধীরা এখন যে খারাপ অবস্থায় আছেন, সেটা অবশ্য ইমরানের কৃতিত্ব নয়; বিরোধীদের নিজেদের ব্যর্থতাই এর কারণ যে তারা আদালত মোকাবিলায় ব্যর্থ। তবু এরা সবাই পুনরায় অন্তত বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় তৎপর হতে চাইছেন। কিন্তু সমস্যা হল এরা নিজ মুরোদে তা নিশ্চিত করতে পারছেন না। কিন্তু তারা একটা ‘তৃতীয় পক্ষ’ – মধ্যপ্রাচ্যকে কামনা করেছেন আর তা পেয়ে গেছেন এবং নিয়েছেন; যা তাদেরকে সরকারের সাথে দর কষাকষিতে সহায়তা করতে পারে।

লক্ষণীয়, মাওলানা ফজলুর রহমানকে সামনে রেখে পিছনে নওয়াজ (PML-N) ও ভুট্টোর(PPP) দল দুটো এরা তিন দলীয় ভাবে নয় বরং মাওলানার আন্দোলনকে বাইরে থেকেই সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ এটা মূলত একা এই মাওলানার আন্দোলন। কোনো “ইসলামী” রাজনীতির যে দায়দায়িত্ব, তাতে নওয়াজ-ভুট্টোরা নিজেকে জড়াচ্ছেন না। আর মূলত ফজলুর রহমানের প্রতিই সৌদি সরকারের সমর্থন। কিন্তু যুবরাজরা কেন তাকে সমর্থন করতে আগ্রহী?

এখনকার সৌদি আরবঃ
এখনকার সৌদি আরবের বিরাট সঙ্কট কেবল রাজতন্ত্র টিকানো নয় অথবা ইরানি হুমকি থেকেই কেবল নিজের রাজত্ব বাঁচানো নয়। সঙ্কট অন্যত্র এবং তা বাস্তব ও অবজেকটিভ। মানে, যা কোন ব্যক্তি বা দেশ দায়ী নয়। যেমন বলা হচ্ছে, আগামী ২০ বছরের মধ্যে চলতি দুনিয়ায় আর ফসিল ফুয়েল [fossil fuel] বা মাটির নিচের তেল ব্যবহার করে চলতে চাইবে না বা পারবে না। বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গ্লোবাল অভিমুখ চলে যাবে যা ইতোমধ্যেই যাচ্ছে ধীরে ধীরে হলেও। সৌরবিদ্যুৎ বা ব্যাটারিচালিত যানবাহন বা ইঞ্জিন আবিষ্কার বা তা চালুর পক্ষে ব্যাপক বিনিয়োগ ঢেলে দেওয়ার ব্যাপারটা নজর করলে, এ ব্যাপারে কিছুটা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। তাই সৌদি আরব দুনিয়ায় এই মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যাবার আগেই নিজের ব্যবসা-বিনিয়োগ সব কিছুকে আর তেল বিক্রিনির্ভর নয়, অন্যান্য ব্যবসা-বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল করে স্থানান্তত করে নিতে চায়। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে পৌঁছাতে চায় বলে দেশটা বিরাট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যদিও  এটা খুবই ঝুঁকিবহুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা। বহু ইফ, নট আর বাট [if, not, but] এসবে ঢাকা প্রতি পদক্ষেপ।

প্রথম কারণ, অনেক দেরিতে এটা ‘বুড়ো বয়সে’ এসে সৌদি আরবে শুরু করা হয়েছে। যেমন সৌদিদের চেয়ে দশ ভাগের এক ভাগেরও কম পুঁজি নিয়ে, আমিরাতের দুবাই একা অন্যান্য ব্যবসায় ঢুকে গেছে গত শতক থেকেই। গত ২০০০ সাল থেকেই দুবাই এক নম্বর এয়ারলাইন্স কোম্পানি (এমিরেটস) আর বিরাট এয়ারপোর্ট (দুবাই) প্যাসেঞ্জার হাব চালু করে ফেলেছে। শেখেরা চাইলে যে তাঁরা কেবল আয়েশি জীবন কাটানোর মানুষ নয়; বড় বিনিয়োগ-ম্যানেজমেন্ট নাড়াচাড়া ও সামলানোর মালিক হতে পারে এটা তার বড় প্রমাণ। অথচ দুবাইয়ের সাথে তুলনায়, তেলভিত্তিক নয় এমন বড় প্রকল্পের কথা সৌদিরা জীবনেও ভাবে নাই। তেলবিক্রির মুনাফা তারা ব্যাঙ্কে জমা রেখে খেয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং বিনিয়োগের আগ্রহ নেয় নাই। এখন সৌদিরা একালে এসে তাদের অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ নিয়ে যেতে চাইছে। সৌদিরা এ বছর পাকিস্তানে ২০ বিলিয়ন আর ভারত প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে গেছে, যার বড় অংশ তেল শোধনাগারে।

সমস্যা আরও আছে, বাড়বাড়ন্ত। আমেরিকা এখন আর সৌদি বা পুরা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ১৯৭৩ এর হাত ধরে তেল অবরোধের পালটা পদক্ষেপ হিসাবে তৈরি কিসিঞ্জারের হাতের “আমেরিকার মিডিল-ইস্ট পলিসির” জন্ম হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যা বিখ্যাত আর আরবদের কাছে যা কুখ্যাত। ইসরায়েলকে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে শায়েস্তা করা বা চাপে রাখার কৌশল তখন থেকেই চালু হয়েছিল। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিও যার গুরুত্বপুর্ণ অংশ। আমেরিকার এগুলো সব ব্যবহার বা প্রয়োগ করার সুযোগ এখনও আগের মতই আছে। কিন্তু আমেরিকা আর সৌদি বা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। কারণ আমেরিকা এখন তেল রপ্তানিকারক দেশ, যেটা মূলত ফ্রেকিং অয়েল ( শুকনা কাদামাটির শ্লেট চাপে-তাপে পিষে ভেঙ্গে বের করা তেল)। যার একটাই ডি-মেরিট যে এর উতপাদন খরচ ৫০ ডলারের বেশি। তা সত্বেও এটাই এখন বাজারে সৌদি তেলের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বি। তবুও নিজের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে আমেরিকা এখনো কোন পরিবর্তন আনে নাই। ফলে সৌদি আরব উলটা আরও বেশি একপক্ষীয়ভাবে আমেরিকা-নির্ভরশীল হয়ে গেছে।

আসলে এটা এখন প্রমাণিত যে সৌদি আরব ইতোমধ্যে তার রাষ্ট্রের বইবার সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শত্রু  সৃষ্টি ও তাদের মোকাবিলা-নির্ভর করে নিজ নীতি সাজিয়ে চলে এসেছে। সর্বশেষ ২০১৯ সেপ্টেম্বর মাসে ইরানি ড্রোন-হামলা খেয়ে উলটা সৌদিদের দুঃস্থ অবস্থা  আরও প্রকাশ হয়ে পড়েছিল, তারা হামলা খেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া স্পষ্ট করে ফেলেছিল। সৌদি আরব নিজেকে প্রটেক্ট করতে কতটা অসহায়, আর ওদিকে তার এপর্যন্ত নেওয়া অনুসরণ করা বিদেশনীতি কতই অকেজো – এটা স্পষ্ট সবাই জেনে যায়। অস্ত্র কেনাসহ নানা উছিলায় আমেরিকাকে অর্থদান-সহ ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের দায়দেনা দেউলিয়াত্বের পিছনে অর্থব্যায় করা – সৌদি বাদশারা এতদিন কী না করেছে। অথচ কাজের সময় এগুলোর কিছুই তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ট্রান্সশ্লেটেড হয় নাই।  কাজে আসে নাই।

এছাড়াও আর একটা বড় সমস্যা হলঃ তাদের ‘রাজাগিরি’ স্বভাব। মানে,  ফিউডাল বা সামন্ততান্ত্রিক ও বোকা রাজার স্বভাব; তাই সব কিছুকে তাঁরা ভুয়া রাজকীয় ভ্যানিটিতে আঘাত পেয়েছে বলে খাশোগির মত সবকিছুই টুকরা করে কেটে ফেলার মতো সহজ মনে করে – আর এর সম্ভাবনা কিন্তু সব সময়। কাজেই তাদের রাজত্ব টিকানোর ভয়ও সব সময়। একালে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থ খরচ করে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বাড়ানোর জন্য যাতে অন্তত ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা হয়। কিন্তু সৌদিরা অর্থ খরচ করে নিজের েসব আজীব স্বভাব আর রাজত্ব রাজাগিরি টিকানোর জন্য।

তুলনায় আর এক রাজতন্ত্রী কিন্তু একেবারেই ভিন্ন ও স্মার্ট’ ব্যবসায়ী এবং উতপাদক হল কাতার রাজ পরিবার। সে ট্যাংকার-জাহাজে ভরে (গ্লোবাল সেকেন্ড হায়েস্ট রিজার্ভ আছে কাতারে) গ্যাস রফতানিতে বিরাট বিনিয়োগকারি ও হাইটেক এক উতপাদক ও ব্যবস্থাপনা তাকে সামলাতে হয়। এছাড়াও আছে অ্যালুমিনিয়াম, নিজের খনি থেকে তুলে তা থেকে অন্তত ছয় ধরনের ফিনিশড প্রোডাক্ট উৎপাদন করে রফতানি করে এমন হাইটেক বিজনেস করে চলেছে।  এসব কাজ বসে বসে তেল বেচা অর্থ ভোগ-খরচের রোয়াবি না,  রাজতান্ত্রিক মধ্যপ্রাচ্যের  রূপান্তরে – আর কী  ম্যানুফ্যাকচারিং মডেল হতে পারে – এর আরেক উদাহরণ এখন কাতার। কিন্তু সৌদি আরব যার নিজ নিরাপত্তার ঠিক নাই সে কাতারকে বোকার মত সামরিক হুমকি দিয়ে বসেছিল। মূল অভিযোগ ব্রাদারহুডকে সাহায্য ও আশ্রয়দান। আর তাতে কাতার দ্রুত তুরস্কের সাথে সামরিক চুক্তি করে তুর্কি সেনাবাহিনীর স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলেছে খোদ রাজধানী দোহা-তে। এতে কী লাভ হল সৌদিদের? এটা কেন তারা আগে বুঝে নাই? এরই নিট ফলাফল হল, শুধু ইরানই নয়; তুরস্কও সৌদি আরবের আর এক বড় সামরিক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়ে উঠল। সৌদিরা এক ইরানের ঠেলায় বাঁচে না তাতে আবার তুরস্ক!

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অর্থ না থাকুক; তবু অনেক দেশের চেয়ে পাকিস্তান অনেক বিকশিত ও উন্নত। বড় কারণ, দেশটা একটা মডার্ন রিপাবলিক। ন্যাটো সদস্য তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের এখন প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত অস্ত্র বা উপকরণ বিনিময় বেচাবিক্রিতে সম্পর্ক গভীর। এদিকে ইমরানের উদ্যোগের কারণে ইরান-পাকিস্তান অস্পষ্ট সম্পর্ককে এখন ধোয়ামোছা করার ফলে তারা খুবই ঘনিষ্ঠ। এর আগের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা ভাবতেন সৌদি রাজতান্ত্রিক দেশের ওপর নির্ভর হয়ে থাকা , মাঝে মধ্যে অনুদান নেওয়া আর প্রতিদানে ইরানকে খামাখা উপেক্ষায় ফেলে রাখা, এটাই পাকিস্তানের একমাত্র ও বেস্ট কূটনীতি। বিপরীতে ইমরান প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, তিনি ২০ বিলিয়ন সৌদি বিনিয়োগও আনতে পারেন, সাথে সৌদি অনুদানের কিছু মিলিয়ন ডলারও আনতে পারেন আবার যুবরাজ এমবিএস এর বিশেষ বন্ধু হতে পারেন। তদুপরি, ইরানের সাথে সম্পর্কের জট খুলে তাদেরও ঘনিষ্ঠ হতে পারেন। শুধু তাই নয়, এমনকি ইরান-সৌদি বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার চেষ্টাও করতে পারেন। তাহলে  পাকিস্তানের পটেনশিয়াল কী ছিল তা কি এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নওয়াজ শরিফ কিংবা অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট বেনজিরের উত্তরসূরিরা দেখতে পাচ্ছেন?
মনে হচ্ছে না! বরং তামসা হইতেছে আমাদের মাওলানা ফজলুর রহমান পোক্ত যুক্তি আর যথেষ্ট খোজ খবর ছাড়াই তার আন্দোলন থেকে  দাবি করেছেন ইমরানের আমলে নাকি পাকিস্তান বন্ধুহারা হয়ে গেছে!

একালের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরন আলাদা। এটা আর কোল্ড ওয়ারের (১৯৫৩-১৯৯১) যুগ নয়। এ কালে চীন-ভারত প্রচণ্ড বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিযোগিতা করবে আবার একই সময়ে ভিন্ন ইস্যুতে প্রচণ্ড সহযোগিতা করবে, স্থায়ী কিছু বোঝাবুঝির ভিত্তিও তৈরি করবে। সবই চলবে ইস্যুভিত্তিক, একেকটা ইস্যুতে একেক রকম কৌশল ও অবস্থান; কখনো মিত্র তো কোনটায় চরম বিরোধীতা শত্রুতা। দু’টি দেশের মধ্যে কোনো ইস্যুতে মারামারি লেগে যায় অবস্থা, আবার কোনো ইস্যুতে সহযোগিতা।

এই পটভুমিতে খুব সম্ভবত সৌদি যুবরাজের ধারণা, পাকিস্তানের ইমরানের তুরস্ক ঘনিষ্ঠতাকে একটা ছেঁটে দেয়া বা সাইজ করার জন্য একটু চেষ্টা করা যাক। কোনো চাপ সৃষ্টির সুযোগ পাওয়া যায় কি না, চেষ্টা করে দেখা যাক। মাওলানা ফজলুর রহমানকে ‘ব্যাক’ করার ফলাফল এমনটাই হয়ে যেতে পারে। এই হল সেই অনুমান। এতে যুবরাজকে ইমরানের পাল্টা যুক্তি হবে, আপনি তো আমার পাশাপাশি ভারতেও বিনিয়োগ দিয়েছেন। আবার দুবাইকে দিয়ে মোদীর ‘কাশ্মির দখল’কে সমর্থন দেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।

কাজেই এখন  যুবরাজ বা মাওলানার চাপ উপেক্ষা করে ইমরান মাথা উচা রেখেই উঠে দাঁড়াতে পারেন কিনা অথবা কতটা পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। যদিও মাওলানা ফজলুর রহমানদের খারাপভাবে  ‘হেরে যাওয়ার’ অনেক দ্রুতই সম্ভাবনা বাড়ছে।

কারণ, টাইমিং জ্ঞান। প্রথমত ইমরানের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠানোর জন্য এটা উপযুক্ত বা পরিপক্ক সময় একেবারেই নয়। না পাকিস্তান দেশের ভেতরে না আন্তর্জাতিক জগত-পরিসরে। প্রায় এবছর জুড়ে এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমেরিকার তেমন কোনো অভিযোগ-অনুযোগই নেই। আবার জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা দিয়ে এখন ইমরান যেন ‘হিরো’। মুসলমানেরা ও যারা সাধারণভাবে ন্যায়বিচারের দুনিয়ার পক্ষে, তারা সবাই ইমরান তাদের মনের কথাই বলেছেন বলে মনে করছে। এই ইমেজ কী দিয়ে মাওলানা ভাঙ্গবেন! নিজেকে ইসলামের খেদমতের লোক বলে হাজির করবেন? সেই ইসলামি রাজনীতিরইবা কোন ভাল ইমেজ কই? ইমরানের ইমেজের কাছে এখন এর রেটিং সর্বনিম্ন! এছাড়া, দেশের ভেতরে ইমরান আশা-ভরসা ও ভালো দিনের প্রতীক। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলা আর তা প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন। কিলিয়ে কাঠাল পাকানোও বোধহয় সম্ভবত তুলনায় সহজ ও সম্ভব। বিশেষ করে যখন কোনটা ‘ইসলামী’ রাজনীতি বা ইসলামি স্বার্থ তা পুরাই অস্পষ্ট। পাকিস্তানের “ইসলামিজম” পুরাই ব্যর্থ এখানে আপাতত।

সম্ভবত প্রকৃতিও বিরুদ্ধে। সমুদ্রে নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই রাস্তায় যেখানে আন্দোলনকারীরা এক তারিখ থেকে বসে আছেন, তা বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে, কতটা হানে দেখতে হবে। কর্মসূচি শেষ ঘোষণা করার আগেই এগিয়ে আসছে প্রকৃতির আক্রোশরূপী ‘বুলবুল’! কোন কিছুই মাওলানা ফেবারে নাই, মনে হচ্ছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত  ০৯ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ধাঁধাএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

Last updated: OCT 28, 2019 @ 23:01:35

https://wp.me/p1sCvy-2LG

 

 

ঢাকায় ইসকনের একটি মিছিল

Ratha Yatra In Dhaka City By Shamibag Iskcon Temple 2017

ইসকন এখন বাংলাদেশে নানান জল্পনা-কল্পনায় প্রবল আলোচ্য বিষয়। এরই মাঝে বাংলাদেশের ২৪ অক্টোবর সকালটা শুরু হয়েছে আনন্দবাজারে প্রকাশিত ইসকন নিয়ে গুজবের গল্প পাঠ করে। গুজব বলছি কারণ যে খবরের সোর্স বা উৎসের ঠিকঠিকানা নাই, এই অর্থে। মানে, আবার সেই কোনো মিডিয়ার পেজ-বিক্রি, যেখানে এবারের মিডিয়া হল কলকাতার আনন্দবাজার, আর পত্রিকার পাতার ক্রেতা হল ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ। কথিত বেনামি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতের নামে বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন গল্প ছড়ানো হয়েছে সেখান থেকে।

এবারের গল্পটা দেখে  বিগত ২০১৪ সালের শেষভাগে কথিত “বর্ধমান জেএমবি বোমার গল্পটার” কথা মনে পড়ে যেতে পারে অনেকের। তখন মোদী কেবল প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছেন (মে ২০১৪), এর প্রায় ছয় মাসের মধ্যকার গল্প। অভিযোগের ফোকাস ছিল, কথিত মমতা-সারদা-জামায়াত-জেএমবি চক্র। আর ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্ট বর্ধমান জেলা। অমিত শাহ খুঁটি গেড়ে কলকাতায় বসে গিয়েছেন। সারদা মানে হল, প্রায় আমাদের দেশের মতই “ডেসটিনি” নামের প্রতিষ্ঠানের পাবলিকের টাকা মেরে ফেরার হয়ে যাওয়ার মত এক ঘটনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম।  তবে বাড়তি হল, এখানে অভিযোগ সাজানো হয়েছিল যে কথিত সারদার টাকা এসেছিল ঐ বোমা হামলার জন্য” বলে অমিত শাহ অভিযোগ তুলেছিলেন। আর পুরা ঘটনায় অমিত শাহের টার্গেট ২০১৬ কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে মমতার তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে পরাজয় ঘটানো, নির্মুল করা। তাই জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলা।  কলকাতার মুসলমানদের এক নেতাকে রাজ্যসভায় মমতার দলের নমিনেশন দেয়া থেকে জ্বলে উঠে এই প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল। কলকাতার মুসলমানেরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে, মমতা তাদের তোষামোদ করছেন ইত্যাদি এই সার অভিযোগ তুলে পরের ২০১৬ সালের রাজ্য সরকার ভোটের কথা মনে রেখে কলকাতার হিন্দু ভোটারদের মনে উস্কানি তৈরি করা। এই ছিল মূল ঘটনা। এমনকি একপর্যায়ে কলকাতার সিপিএম দলও এই একই অভিযোগের বয়ানের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশ-জামায়াত-মুসলমান ও জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে মমতাকে দায়ী করে  কলকাতার ব্রিগেডের মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করেছিল।

অভিযোগের প্রপাগান্ডা ডালি সাজিয়ে ভারতে বলা হয়েছিল, এটা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের খবর। আবার পরে একই গুজব বাংলাদেশে প্রচার করা হয়েছিল এটা ভারতের গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া খবর বলে। আর বাংলাদেশে তাতে শামিল হয়েছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির খালেদ মহিউদ্দিন [যিনি এখন জার্মানিতে বসে উলটা সরকারের বিরুদ্ধে ভোকাল হওয়ার চেষ্টা করছেন], চ্যানেল আই এমনকি প্রথম আলো ইত্যাদি অনেক মিডিয়া। সেকালের মোদীর ভারতের নতুন সংসদে এ নিয়ে ঝড় তোলা হয়েছিল। আর, গায়ক নতুন প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের অভিযোগের ডালি সাজিয়ে বসা আর সর্বশেষ কলকাতায় অমিত শাহের জনসভায় (০১ ডিসেম্বর ২০১৪) মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর আক্রমণের ডালি তুলে ধরা, সবই ঘটেছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎ সব ফুস, বেলুন চুপসে যায়।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটা পারসোনাল বিভাগ বা বাংলায় আমরা বলি সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিসের “আপন বিভাগ” আছে। আমাদের বেলায় এই বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্বাবধানে আর ভারতের বেলায় এর মাঝে আছেন এক প্রতিমন্ত্রী। ঘটনাওগুলোর অনেক কিছু স্মৃতি থেকে লিখা হল। তবে এখন হাতের কাছে একটা ভিডিও রিপোর্ট পাওয়া গেল। এনডিটিভির। তাতে দেখা যাচ্ছে মোদীর অফিসের ঐ প্রতিমন্ত্রীর নাম ছিল জিতেন্দ্র সিং। তাকে দিয়ে হঠাৎ এক বিবৃতির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যার সারকথা ছিল যে আপাতত ওই বর্ধমান মামলা স্থগিত রাখা হচ্ছে, আরো তদন্তের পরে ভবিষ্যতে এটা আবার দেখা যাবে। [Three days after Amit Shah, the president of the BJP, alleged in Bengal that funds involved in the Saradha scam were used for terror, the government appears to have contradicted him] ইতোমধ্যে অমিত শাহ কলকাতা ত্যাগ করেন কারণ জীতেন্দ্র সিং-ই অমিত শাহের দাবির বিরোধিতা করে সংসদে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তবে বাবুল সুপ্রিয়ই সবচেয়ে বেকুব হয়েছিলেন। ধরা খেয়ে বেকুব হয়ে তিনি কী বলেছিলেন সেটাও এনডিটিভিও ভিডিও ক্লিপে পাওয়া যাবে।  কারণ, তার ভুয়া অভিযোগ-আক্রমণই ছিল সবার শেষে মানে প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্রের ঘোষণা ঠিক আগে। কিন্তু কেন হঠাৎ পশ্চাৎপসারণ? খুব সম্ভবত কোনও কারণে বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে লড়বার নির্বাচনী কৌশল বদল করেছিল তাই। তবে এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, পরবর্তীকালে ঐ ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে মমতা আগেরবারের চেয়ে বেশি, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছিলেন। সেই ২০১৪ সাল থেকে আজও আর কখনো সেই জঙ্গিবাদের গল্প আর ঝাঁপি খোলেনি।

অতএব সাধু সাবধান। এসব পেজ বিক্রির আনন্দবাজারি গল্প আমাদের কাছে আবার আনা কি ঠিক হলো? যদিও এবারের ঘটনা মোদীর গুরু প্রতিষ্ঠান আরএসএসের ষ্ট্রাটেজিক ও ধর্মীয় সংগঠন “ইসকন”-কে নিয়ে। অনুমান করি, বাংলাদেশে লিগ্যাল স্ট্যাটাসের দিক থেকে ইসকন এক বিদেশী এনজিও হিসেবে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড ও তৎপর। আর বাংলাদেশের এখনকার মাঠের বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে ইসকন সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে, আধা সত্য-আধা গুজবে মাখামাখিতে ইসকন এক খুবই খারাপ ইমেজ নিয়ে হাজির; যা বাংলাদেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর এই ধারণায় ভরপুর হয়ে উঠছে ক্রমাগত ও দ্রুতগতিতে। সবচেয়ে বড় কথা ইসকনের এই ষড়যন্ত্রকারি ইমেজ এটা খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে, যা যেকোন সময় সামাজিক দাঙ্গা লাগিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে হাজির হওয়ার জন্য খুবই পটেনশিয়াল।

এই পটেনশিয়াল দিকটার কথা যদি মনে রাখি, তবে ভারতের বা কলকাতার এই গুজবের গল্প ছড়ানো খুবই অবিবেচক কাজ হয়েছে। অবশ্য যদি না ডেলিবারেট কোনো দাঙ্গা বাধানোর মধ্যে ভারতের সরকার ও গোয়েন্দাদের কোনো খায়েশ থেকে থাকে যা আমরা জানি না, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা আলাদা।

ইসকন [ISKCON]
ইসকন নিজেদের “ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘ- এভাবে একটি হিন্দু বৈষ্ণবধর্মীয় প্রতিষ্ঠান” বলে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত আমেরিকা ব্যক্তিবাদের ধারণাকে [individualism] চরমতম অর্থের দিক থেকে নেয়াতে আর সেটাই পপুলার ধারণা বলে পরিণতিতে সেখানে ব্যক্তিমাত্রই খুবই একা ও বিচ্ছিন্ন, এক সম্পর্কহীনতার অবস্থার দিকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হয়ে রয়ে যায় সবাই। কিন্তু স্বভাব হিসেবে মানুষমাত্রই রিলেটেড-সম্পর্কিত মানুষ তো বটেই, অন্ততপক্ষে এক জীবনসঙ্গীর “আকাঙ্খাসম্পন্ন” মানুষ। ফলে মানুষ একা তো নয়ই, অন্তত দোকা তো বটেই এবং মানুষের অস্তিত্বই  গভীরভাবে সামাজিকও। এর বাইরের দিকে তাকিয়ে সেটা অমান্য করতে চাইলেও ভিতরে এটা তাই-ই থাকে।  তাই তার গভীর স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদাও আছে। স্পিরিচুয়ালিটিই আসলে মানুষের নানান সম্পর্ক ও এথেকে জাত কামনার অর্থ তাৎপর্য ব্যাখ্যাও তুলে ধরে। এটা মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তি ও স্বভাবে আছে, কিন্তু পশ্চিমা চরমব্যক্তিবাদের সমাজ সেই স্বভাব ও আকাঙ্খাকে চাপা দিয়ে রেখেছে। এই স্পিরিচুয়ালিটি বলতে তা সে দার্শনিক অর্থে স্পিরিট [spirit] বা প্রজ্ঞা হোক অথবা থিওলজির অর্থে বা ভাষ্যে আত্মা-রুহু – সেটা যে যাই করুক বা বুঝুক না কেন – শেষ বিচারে এটা মানুষের অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক করা, সম্পর্কিত থাকা ও সম্পর্কিত অনুভবের আকাঙ্খা-চাহিদার সপক্ষেই দাঁড়িয়ে কথা বলে। এরই বৃহত্তর অর্থ হল মানুষের পরমসত্তা অনুভবের দিক। থিওলজিক্যাল অর্থে ও ব্যাখ্যায় এটাই মানুষের যার যার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভবের অথবা আল্লাহর মাধ্যমে মধ্যস্ততায় জগতের সকল অপর মানুষ ও সত্বার সাথে নিজেকে যুক্ত ও লিপ্ত অনুভব করার দিক। থিওলজি বলবে মানুষ তাই রূহুর চাহিদায় সাড়া না দিয়ে পারে না।

এটাই, ঠিক এটাই পশ্চিমের এক স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদার ক্ষেত্রে এক বড় ভ্যাকুয়াম হয়ে আছে দেখা যায়। তুলনায় এটাই এশিয়ান যেকোনো থিওলজির প্রভাব যথেষ্ট স্যাচুরেটেড বা পুষ্ট হয়ে আছে। অন্তত কোনো ভ্যাকুয়াম-শূন্যতা নেই। এখন এশিয়ান এই থিওলজিক্যাল পূর্ণতাকে এবার পশ্চিমের চাহিদার কথা খেয়াল করে এর উপস্থাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাবে, এক কৃষ্ণপ্রেম বিলিয়ে বেড়ানোর দিক থেকে ইসকন ভালো প্রভাব ছড়িয়ে আমেরিকায় নিজের যাত্রা শুরু বা ভিত গাড়তে পেরেছিল। আবার মানুষের সম্পর্ককে একটু ভিন্ন [সেক্সচুয়ালিটি] উপস্থাপনের দিক থেকে আর এক গুরু রজনীশও ভালই আমেরিকান চাহিদা ধরতে পেরে পসার জমাতে পেরেছিল। ভারতের গুরুরা এসব সহজেই তুলে ধরতে পারে বলে [এমনকি যোগ ব্যায়ামেরও স্পিরিচুয়াল দিক আছে তা ব্যাখ্যা করে থাকে অনেকে] এদের গড়ে তোলা নানান আশ্রম ও ব্যাপক ভক্তকুল আমরা আমেরিকাতে দেখতে পাই। এভাবে এমনই এক উদ্যোগ হল ইসকন – নানান উঠতি পড়তির মধ্যদিয়ে ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইসকন আমেরিকাতে খারাপ চলে নাই। তবে এসব ততপরতাগুলো সেকালে কোনোটাই ভারত-রাষ্ট্রের স্বার্থের কোনো রাজনৈতিক উপস্থাপন ছিল না। কিন্তু এই পরিস্থিতিটাই বদলে যায় ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার পর থেকে। বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে। বুশের আমেরিকা তার ওয়ার অন টেররের পক্ষে এশিয়ার এক কুতুব হিসাবে ভারতের সমর্থন পেতে, ভারতের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমর্থনের এক অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছিল, সেখান থেকে ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে।

কাশ্মীর সংকট ও এর “সীমা পার কী আতঙ্কবাদ” হয়ে উঠা
বলা হয়ে থাকে, ১৯৮৭ সালের জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাদেশিক নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ঘটানো হয়েছিল। পরিণতিতে এটা সেই থেকে  নির্বাচনী ধারার কাশ্মীরের রাজনীতি এর নিজ সমাজেই আস্থা হারিয়ে একে এক সশস্ত্র রাজনৈতিক ধারার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৪৯ সাল থেকে কাশ্মীর ইস্যু বিভক্ত ও অমীমাংসিত এমনই থেকে যাওয়া সত্ত্বেও এর রাজনীতি একটা নির্বাচনী ধারাতেই প্রবাহিত হয়েছিল, যেটা ১৯৮৭ সালের পরে কাশ্মীরে আর তেমন থাকেনি। এনিয়ে প্রচুর একাদেমিক গবেষণা স্টাডি হয়েছে। [যার রিপোর্ট ও ফাইন্ডিংস-গুলো (1987 March kashmir elections rigging লিখে) নেটে সার্চ দিলেই যেকেউ দেখতে পাবে।] আর সশস্ত্রতার রসদ তারা সংগ্রহ করেছিল সেকালে আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী আমেরিকা সমর্থিত লড়াকু মুজাহিদীনদের কাছ থেকে, পাকিস্তান হয়ে।

আর এথেকে কাশ্মীরের রাজনীতি পারস্পরিক খুনোখুনি রক্তারক্তির এক বাস্তবতায় ঢুকে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা হল, বড় সংখ্যায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যা করা আর পরিণতিতে তাদের কাশ্মীরে নিজ ভিটা-সম্পত্তি ত্যাগ করতে হয়েছিল। এতে কে কাকে কী বলে দায়ী করবে সে এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কারণ, সবাই জানত কাশ্মীরের সমস্যার কোন জবরদস্তি বা সামরিক সমাধান নাই, তবু পক্ষগুলো পরস্পরকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। [যেটা আজ আবার সেই একই বেকুবি পথে মোদী-আরএসএস ঠেলতে শুরু করেছে।]  তবু সেকালে পরবর্তী সময়ে নব্বই দশকের অস্থির সময়ে বিজেপি নেতা বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকে এরই পাল্টা সংগঠিত এক প্রপাগান্ডা শুরু হয় – “সীমা পাড় কা আতঙ্কবাদ” বলে। অর্থাৎ কাশ্মীরের সমস্যার মূলে আছে আফগান বা পাকিস্তান থেকে আসা  সশস্ত্রতা (কথিত টেররিজম)। মানে ভারতের রাষ্ট্র বা সরকারের কোন দায় নাই, ভুল বা অন্যায় শুরু করা নাই; সব দায় হল বাইরে থেকে আসা সশস্ত্রতার। কাশ্মীর রাজনীতিতে  নির্বাচনী কারচুপি করা যে বিরাট আত্মঘাতী পদক্ষেপ ছিল, কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতিতে কারচুপি আমদানি করলে যে হতাশগ্রস্থতা শুরু হয় তা থেকে যেকেউ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে নিয়ে চলে যেতে পারে – এটাই সেই আত্মঘাতী পথ। তাই এটা সেই মেসেজ দিয়েছিল যে কাশ্মীরে নির্বাচনী রাজনীতির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ফলে সশস্ত্রতাই একমাত্র বিকল্প- এই ভাবনাই যে পরবর্তীকালে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল, তা কমবেশি সব পক্ষের কাছেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই মনমরা হিন্দুমনে ধীরে ধীরে পাল্টা নতুন মরাল জাগানোর কাজটাই করেছিলেন বাজপেয়ি; এই বলে যে, সব দোষের গোড়া হল, বাইরে মানে পাকিস্তান থেকে আসা সশস্ত্রতা।

তবু এ কথা বলাতেই শুরুতে তখনও তা তেমন পাত্তা পায়নি। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর (১৯৮৯ সাল থেকে ধরলে ) ভারতকে সাফার করতে হয়েছিল, কোনো গ্লোবাল বন্ধু-সাথী রাষ্ট্রকে ভারত পাশে পায়নি। যার মূল কারণ সেকালে কাশ্মীরে পাওয়া সহজ হয়ে যাওয়া অস্ত্রের মূল উৎস তো আসলে আমেরিকা, আর সাথে এছাড়া স্বল্প কিছু ফেলে যাওয়া বা দখলি সোভিয়েত অস্ত্র। তাই এক লম্বা পথ বা ঘটনাক্রম  – সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার, পরে আমেরিকার আফগানিস্তানকে বিশৃঙ্খলতায় ফেলে চলে যাওয়া, শেষে একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে আফগানিস্তানে তালিবানদের আবির্ভাব, আর এতে তালিবানদেরক এক তুলনামূলক স্থিতিশীলতা আনার শক্তি হিসাবে দেখে আমেরিকা তাদের সমর্থন করলেও শেষে ক্রাইসিস মেটেনি। কারণ, পরে তালেবানি শাসকেরা আলকায়েদার প্রভাবে চলে যায়। আর তা থেকে আমেরিকায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলা – এই পুরা চক্র সমাপ্তি শেষ হতে দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। পরে বুশের ওয়ার অন টেরর প্রোগ্রামকে ভারত সমর্থন করেছিল, কাশ্মীরের সশস্ত্রতা পরিস্থিতিতে ভারতের সামরিক অবস্থান এবং ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিকে নষ্ট করা নয়, বরং “সীমা পারকে আতঙ্কবাদ” সবকিছুর জন্য দায়ী এই বয়ানের প্রতি আমেরিকার সমর্থন আদায়ের বিনিময়ে।

আর এথেকে আরও ডালপালা গজিয়ে তখন থেকেই শুরু হয় আমেরিকার সাথে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে ভারতের লম্বা খাতির সম্পর্কের যুগ। আর তা শুধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অফিস স্তরেই নয়, আমেরিকান এমপি (প্রতিনিধি পরিষদ) ও সিনেটেও ভারতের পক্ষে নিরন্তর লবি করার জন্য আমেরিকাতেই বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দেরকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগানোর বেশকিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এরই সমন্বয়কের ভুমিকা নিয়েছিল আমেরিকায় ভারতীয় এমবেসি (গোয়েন্দা বিভাগ)। এই লক্ষ্যে ২০০৩ সালে জন্ম হয় ” হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন”। যারা আমেরিকায় জন্ম নেয়া ভারতীয়-অরিজিন বাবা-মার পরের প্রজন্ম, যদিও তারা আমেরিকান নাগরিক, এরাই এর সদস্য। তারা গর্ব করে বলে আমরা ভারতীয় নই, আমেরিকান হিন্দু। কিন্তু বাস্তবে এরা ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার সংগঠন, ভারতীয় বিদেশনীতির বাস্তবায়ক। তাদের মুরুব্বিরাও তাদের পিছনে, অফ-সিনে। ১২০ মিলিয়ন ভারতের বাজারে ব্যবসা দেয়ার বিনিময়ে আমেরিকান ব্যক্তি ব্যবসায়ী আর এর সাথে এমপি ও সিনেটর মিলিয়ে এক চক্র যা লবি ও প্রেসার গ্রুপ, কোটারি গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল। লবি ও প্রেসার গ্রুপ তৈরি আমেরিকায় বৈধ। তাই আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্রে রেখে এরা আরো সংগঠিত করেছিল এক এমপি তুলসি গাব্বার্ড, ভারতীয় নানান সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন [ইসকন যার মধ্যে একটা বিশেষ] বা প্রবাসী ভারতীয়-অরিজিন আমেরিকান ব্যক্তিত্বকে।

ইসকন আর কৃষ্ণপ্রেম বিলায় না, ভারতরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার, হিন্দুত্ববাদ বিলি করে
এতে স্বভাবতই আগের শতকের আমেরিকান ইসকন, আগের কৃষ্ণপ্রেম বিলানো ইসকন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের খাঁচায় বিরহ একাকিত্বে আটকে থাকা সাদা আমেরিকানদের মুক্ত করতে আসা ইসকন, এমনকি তাই এর আগের নেতৃত্ব কোন কিছুই এক থাকেনি। সেই ইসকনের মৃত্যু হয়। ফোকাস বদলে যায়। নতুন ইসকন জন্ম নেয় যার কাজ ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার হওয়া। [Strategic বা স্ট্রাটেজিক মানে এখানে, রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নেয়া কৌশল ও পরিকল্পনা ]  কংগ্রেস আমলে যেটা ছিল সফট [soft] হিন্দুত্ব তাই এখন হয়ে উঠেছে আরও এগ্রেসিভ, আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদ। প্রথমত এর তৎপরতার ক্ষেত্রে তখন থেকে আর পশ্চিমাদেশ থাকেনি, বাংলাদেশও হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা ভৌগোলিক পকেটের হিন্দুজনগোষ্ঠির উপস্থিতি থাকলেই (যেমন আফ্রিকান অনেক দেশেই ইসকন সংগঠন পাওয়া যাবে) সেখানে ভারত রাষ্ট্র-সরকারের নীতি ও স্বার্থ স্ট্রাটেজির পক্ষে সকলকে জড়ো করা, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের বোধ জাগিয়ে তোলা, কমপক্ষে সহানুভূতিশীল করে তোলা – এসবই ইসকনের মুখ্য কাজ হয়ে ওঠে। এতে ভারত রাষ্ট্রই যে প্রকাশ্যে হিন্দু-রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে – ভারতীয় নাগরিককে সে “হিন্দু হিসাবেই” (এটা ভারত-রাষ্ট্রের কাজ ছিল না) সংগঠিত করছে, সাথে পাশে কোন অন্যদেশের হিন্দু থাকলে তাকেও হিন্দু হিসাবে ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে অবলীলায় শামিল করেছে।

একটা জিনিষ পরিস্কার থাকতে হবে, কোন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক-স্বার্থ বিষয়ক নানান সিদ্ধান্ত সে রাষ্ট্র অবশ্যই নিবে। আমাদের তাতে না করার কিছু নাই। আর বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। ব্যতিক্রম স্বল্প কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বাদে তা কখনও অন্য-রাষ্ট্রেরও পক্ষেও যাবে না। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল অন্য রাষ্ট্রের যে সিদ্ধান্ত যা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক তা প্রত্যাখান ও প্রতিরোধে করতে সক্ষম হতেই হবে। এটা ন্যায়-অন্যায়ে বিষয়ক ইস্যু যত না এর চেয়ে বেশি নিজ স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ও সক্ষম হওয়া, আপোষ করে বিক্রি না হয়ে যাওয়ার বিষয়। ইসকনের ততপরতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনের তদারকি ও লাইসেন্সিং প্রতিষ্ঠান “এনজিও ব্যুরোর” মাধ্যমে আর “ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন এক্ট ১৯৭৮” (যেটা সর্বশেষ ২০১৬ তে সংশোধিত হয়েছে) – এই আইন দিয়েই প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর আমাদের এটা করতে পারতেই হবে। আর সার কথাটা মনে রাখতে হবে ভিন্ন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক প্রতিষ্ঠানকে আমরা আমাদের দেশে ততপরতা চালাতে দিতে পারি না। বিদেশি এনজিও হিসাবে তো আরও নয়, তাও আবার ধর্ম-প্রচারের উসিলায়।

আসলে ইসকনের বাংলাদেশে উপস্থিতিটাই এর কথাকাজের বেমিলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, আমেরিকায় গিয়ে ইসকনের জন্ম হতে পেরেছিল মূলত একাকিত্বের আমেরিকান সমাজের শূন্যতার হাহাকার পূরণে। তাহলে ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ তার কাম্যভূমি হতেই পারে না, ম্যান্ডেটে কাভার করে না। কারণ বাংলাদেশ পশ্চিমাদেশ নয়, অন্তত স্পিরিচুয়ালিটির ভ্যাকুয়াম এখানে নাই। বাংলাদেশে হিন্দুদের ধর্মীয় সংগঠন – মন্ত্র জানা, শাস্ত্র জানা, বামুন পুরুত বা মন্দিরের কমতি এখানে ঘটে নাই – কখনও ছিল না। তাহলে আমেরিকায় যে কারণে ইসকনের জন্ম, ঠিক সে কারণেই বাংলাদেশে ইসকনকে হিন্দুদের দরকারই নেই।  তাই ইসকন ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠিত হওয়া থেকে বাংলাদেশে  ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের জন্যই এর জন্ম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

আর তাই অন্তত এই একটা কারণে, বাংলাদেশের সরকার ইসকনকে বিদেশি এনজিও হিসাবে এনজিও ব্যুরো থেকে রেজিষ্ট্রেশন দিতে পারে না।  ইসকন আসলে ধর্মীয় নয় ভারত রাষ্ট্রের হাতিয়ার রাজনৈতিক সংগঠন। আবার কোন ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠনকে এনজিও ব্যুরোর রেজিষ্ট্রেশন দেয়া হারাম – আপন রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধী বলে নিষিদ্ধ। কেবল রিলিফ বিতরণের কাজ, দাতব্য কাজ করতে পারে – সেজন্য অনুমতি পেতে পারে।

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব, ভারত সরকারের আমাদের সরকারের ওপর সবখানে প্রভাব বিস্তারের বিরোধী  – এমন মনোভাব প্রচন্ড বাড়ছে, এ নিয়ে আমাদের সমাজের কোনো কোণে বা কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বিমত পাওয়া যাবে না। তবে আবার দ্বিমত হবে এর মাত্রা নিয়ে। সরকারি পক্ষের হলে কেউ বলবেন ভারতের প্রভাব অনেক কম বা স্বাভাবিক। বিপরীতে অন্যরা বলবেন ভারতের প্রভাব চরম, সীমাহীন অসহ্য বা অনাকাঙ্খিত ইত্যাদি। আর এরই মধ্যে ইসকনের নাম ও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিরূপ মনোভাব ক্ষোভ ক্রমেই চড়ছে। এরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে চাইছে – এমন এগ্রেসিভ।  ইসকন সাধারণ্যে চোখে পড়া শুরু করে ২০১৬ সালে সিলেটের সঙ্ঘাত থেকে আর এ কালে চট্টগ্রাম শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে ‘প্রসাদ খাইয়ে’ কৃষ্ণনাম গাওয়ার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ হয়ে পড়া থেকে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে সনদ প্রদান বা তারা ইসকনের সদস্য বলে প্রচার চলা থেকে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই হয়ত অনুমান করে বলা, আধা সত্য অথবা প্রপাগান্ডা বা একেবারেই গুজব হয়ত।

গুজবের আসল অর্থ হল ফ্যাক্টসের সাপ্লাই না থাকা। সাধারণত  সরকারের বুঝে না বুঝে বোকা হয়ে খাড়িয়ে থাকা উদাসীন্যতা থেকে এর জন্ম হয়। এছাড়া, যারা বুঝতেই পারে না সঠিক বিশ্বাসযোগ্য ও স্পষ্ট তথ্য সমাজে সহজেই পাওয়া না যাওয়া অবস্থায় রাখা কত আত্মঘাতী। এটা আসলে চাইলেই পাওয়া যায় এমন করে রাখা হয়নি, এই পরিস্থিতি। তাই গুজব মোকাবেলার উপযুক্ত উপায় হচ্ছে, তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয় এভাবে হাজির রাখা। সমাজের বিভ্রান্তি সম্পর্কে খবর রাখা আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে আগে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য হাজির রাখা। নিশ্চুপ থাকলে বা গুজবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা গুজবের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বাড়তে পারে। কখনো তা ফেটে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।

ইসকন ও এনজিও ব্যুরো
বাংলাদেশে আইনে ইসকনের ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে ততপরতা করতে অনুমোদন, বিদেশী অর্থ নিয়ে আসা ও বিতরণের অনুমোদন জোগাড় করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০১৬, এই আইন পেরিয়ে বিদেশী স্বার্থ প্রতিফলিত হয় এমন তৎপরতার ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকে সেজন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন বিদেশী ধর্মীয় এনজিও প্রতিষ্ঠানের দেশে সহজে কোনো তৎপরতা চালানোর বিরুদ্ধে এভাবেই সাজানো। কারণ, তারা যেন কোনো ধর্মান্তকরণ বা ধর্মে প্রভাবিত করার কাজ না করতে পারে।

বাস্তবত ইসকন এখন কৃষ্ণপ্রেম বিলানোর চেয়ে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নের পার্টনার। ওদিকে সাধারণভাবে বললে কোন বিদেশী রাষ্ট্রের কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান অন্য দেশে  নিজ দেশের নীতি বা স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি পেতে বা চাইতেই পারে না। বিশেষত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাজের সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেয়া ছাড়াও বিদেশী অর্থ আনার অনুমোদনই পেতে পারে না। বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থ বলে কিছু নিয়ে তৎপরতা চালানো অথবা [এমনিতেই ইসকন আমেরিকান অরিজিনের] ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুনীতি নিয়ে তৎপরতা- এর কোনোটাই ইসকন বা  কোনো এনজিওকে বাংলাদেশে করতেই দিতে পারে না।  এটা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী হবে, তাই।
অথচ আনন্দবাজারের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে যে, কথিত জঙ্গি হামলা হতে পারে এই অজুহাত তুলে যেন বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থে  “জঙ্গী” মারার অজুহাতে কাজ করতে তৎপর হয়। এতে বাংলাদেশের সরকারের কী হাল হবে? তার নিজের স্বার্থ কোথায় এতে?

আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম কাজটি হল, এব্যাপারে নিজের হাত পরিষ্কার রাখা। সরকারকে নিজ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা, না হতে দেয়া, যেসব গুজব ইতোমধ্যেই উঠেছে তা বিনাশ করা। গুজবের বিনাশ করতে যেটা করতে পারে যে ইসকন কী হিসেবে রেজিস্টার্ড তা পরিষ্কার ও সরাসরি পাবলিককে জানানো। যেমন এটা কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, না রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান? এ কাজটা সরকার নিজে অথবা কোনো বিশাসযোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্বের অধীনে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করতে পারে।

যেমন ইসকন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমতিপ্রাপ্ত হলেও ‘প্রসাদ’ বিতরণ সে করতে পারে না, সেটা পুরোপুরি বেআইনি। ‘প্রসাদ’ বিলানো মানে যেটা ধর্মীয় এনজিও হিসেবে রেজিস্টার্ড (যে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার কথা নয়) কেবল সেই করতে পারে। এছাড়া ‘প্রসাদ’ বিলানো আর কাউকে দুপুরের খাওয়ার প্যাকেট বিতরণ এক কাজ নয়। আবার যেমন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়ে এবং অর্থ ছাড় করে সেই টাকায় ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা বেআইনি হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে পাবলিকের কাছে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ নিয়ে সরকারের কোন দায় নেয়ার অথবা কোন আড়াল টেনে দেওয়া  প্রয়োজন নেই। আমাদের আইন পারমিট না করলে সরকারের কিছুই করার নেই। আবার আমাদেরও ইসকন সম্পর্কে কিছু বুঝে না বুঝে জেনে ইসকন তাবলীগের মত এক সংগঠন ধরনের কোন সাফাই দেওয়ারও কিছু নাই। আর এতে “অসাম্প্রদায়িক” এই সার্টিফিকেট পাইবেনই অথবা এই সার্টিফিকেটের কোন মূল্য থাকবে এসবেরও কোন নিশ্চয়তা নাই। আমাদের দরকার আসলে ফ্যাক্টস – কোন গুজবও না, কোন সাফাইও না।

আবার এক শিক্ষকের ভাই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারের পর দেখা যাচ্ছে সে ইসকনের সদস্য অথবা সরকারি কর্মচারী ইসকনের পদক মেডেল বা সংবর্ধনা নিয়েছে বা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এখন এই ইসকনের সদস্য হওয়া কী জিনিস? কোনো বিদেশী এনজিও এখানে কাউকে ধর্মীয় দল গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য বানানোর কার্যক্রম নিতে পারে না। এনজিও বলতে মূলত বস্তুগত জিনিসের দাতব্য হতে হবে। এটাই কাম্য।

এনজিও করতে আসা চ্যারিটির কথা বলে কোনও “ভাব” (ধর্মীয় বা রাজনীতির) প্রচার করতে অনুমতি দেয়া হয় না, যায় না। তবে বড়জোর সেটা (ধর্মীয় নয়) সামাজিক সচেতনতা ধরনের কাজ যেমন অধিকারবিষয়ক, দক্ষতা শেখানো, স্বাস্থ্য বা পরিবেশবিষয়ক ইত্যাদি এ রকম হতে পারে। সরাসরি রাজনীতি অথবা ধর্ম প্রচার- এটা আমাদের এনজিও আইনে একেবারেই নিষিদ্ধ। আসলে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরে কী কার্যক্রম নেবে এর বিস্তারিত বর্ণনা, কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করবে ইত্যাদির হবু কার্যক্রমের বিস্তারিত সব কিছু কর্মসুচি আগেই এনজিও ব্যুরোতে জমা দিতে হয়। দেওয়ার কথা। আর আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ তা সরেজমিন যাচাই করে ইতি রিপোর্ট দিলে তবেই সে বিদেশী এনজিও অর্থ ছাড়ের অনুমতি পায়। আর এর ব্যতিক্রম করলে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ আইনে জেল-জরিমানার কথা লেখা থাকলে সেটাও প্রয়োগ হতে পারে।

বাংলাদেশের ইসকনের ততপরতা সম্পর্কে সরকারের ভাষ্য দেয়ার পিক আওয়ার চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইসকন নিয়ে এক সরজমিনে রিপোর্ট, যা খুবই ভয়াবহ অবস্থা নির্দেশ করেছে, তা প্রকাশিত হয়েছে। ওর শিরোনামই বাংলাদেশে বেপরোয়া ইসকন,‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’য় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা।

একটা রাষ্ট্র-সরকার চালাতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে নরমে-গরমে অথবা বিশেষ খাতিরের অনেক রূপের সম্পর্ক রাখার দরকার হতে পারে। কিন্তু এসব ডিলিং বা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের যা প্রচলিত আইন তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা বা আইন বাঁকা করে ফেলার তো দরকার নেই বা তা কাম্যও নয়। নিশ্চয়ই প্রতিবেশীসহ যে কোন রাষ্ট্র যার যারটা-সহ সব দেশের আইনি সীমার কথা বুঝবে ও মান্য করবে, এটাই কাম্য। এনজিও প্রসঙ্গে আমাদের প্রচলিত আইন যথেষ্ট স্বচ্ছ। কাজেই রেকর্ড স্পষ্ট রাখা আর সেসব রেকর্ড পাবলিকের জন্য খুলে রাখা হল সব কিছু জটিলতা থেকে পরিত্রাণ ও দূরে থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। বাংলাদেশের মানুষকে জানাতেই হবে বাংলাদেশে ইসকন ঠিক কী কী করার অনুমতি পেয়েছে? কোন আইনে? আর ইসকনের ততপরতা দেশের আইনসম্মত আছে কী না?
তথ্য স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য রাখার পরও কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উত্তেজনা বা বিভেদ তৈরি করার কেউ চেষ্টা করলে সরকারের তা মোকাবেলা সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়। এছাড়া এমন সমাজে গুজব বিভ্রান্তি বা প্রপাগান্ডাও আসলে শুরু করাই কঠিন থাকে। কাজেই স্বচ্ছতা সরকারের সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র। আমরা কী তা বুঝব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২৬ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছেএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু মনে করতে পারি না, এটা অবৈধঃ

গৌতম দাস

২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৭ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2GL

 

20 Aug 2019, Dhaka, Press Conference.

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তাঁর দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য চলে আসছে, তা আমাদের কারও অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে সব ছেড়ে দিয়ে আরেকবার লুঠ হবার বা হেরে যারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন নির্বাচন করেই হোক, চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও চলতি বছরের মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে ইতোমধ্যে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। ওদিকে রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হল, আসামের এনআরসি [NRC] ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও উৎপাত তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ’ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি, এখন মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন – এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিয়ে চলছিলেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রায় দুসপ্তাহ আগে ভারতে গত ৭ আগস্ট দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক  আলোচনার এজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু তা সত্বেও ভারতের [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart] কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই আমরা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও আমাদের সরকারকে সতর্ক [আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না] করেছিলাম।  ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছিলাম দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় [‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মতান্তর, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি] কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠক নিয়ে আলাদা আলাদা যার যার দেশের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ’প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১৪ দিনের মাথায় এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ [Assam NRC is India’s internal matter: Jaishankar] বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এই এক ইস্যু আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট, আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু যতই উত্তেজনা আর উস্কানি তৈরির চেষ্টা হোক না কেন ভারতের সরকারী অবস্থান হল, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যার মানে হল আসামের এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণ প্রক্রিয়ায় কেউ নিজেকে নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলেও এজন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না, কারণ, বাংলাদেশ এব্যাপারে সংশ্লিষ্টই নয় বলে ভারত মনে করে। তাই এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করার চেষ্টা কমে আসবে হয়ত, এছাড়া কোন সরকার সংশ্লিষ্ট সদস্য এমন অভিযোগ তোলার কথাই না। তাও কেউ তুললে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি এই প্রথম আমাদের হাতে এল, যা আমাদের সরকার বা যে কেউ ব্যবহার করতে পারব। একটা উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া যাওয়াতে আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ নই।

NRC in Assam is India’s internal matter, says MEA S Jaishankar, S External Affairs Minister. File photo   –  The Hindu

দুঃখের কথা হল, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” [Mr. Jaishankar said, “It’s an internal matter.” – এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার প্রায় কেউই ধরতেই পারেন নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জয়শঙ্করের এই সফরে কোন কোন ইস্যুগুলো মুখ্য হয়ে উঠবে এসব আগেই জানা না থাকার কোন কারণ নাই। বুঝা যাচ্ছে এনিয়ে মিডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিটের কারও এব্যাপারে কোন হোমওয়ার্ক নাই।  জয়শঙ্করের এই সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে ভেসে উঠা বা উঠতে পারত এমন ইস্যুগুলো হল, ১। তিস্তা বা ৫৪ নদীর পানি,  ২। সীমান্ত হত্যা, ৩। অসম বাণিজ্য, ৪। আসাম এনআরসি ইস্যু, আর ভারতের দিক থেকে ৫। বাংলাদেশের পোর্টগুলো ব্যবহারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, ৬। ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ, ৭।  কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি অন্য কিছু। এসবের মধ্যে আসাম এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের মিডিয়ার চোখে হওয়া উচিত ছিল এক নম্বর ইস্যু। কারণ, ৩১ আগষ্ট তারিখে আসামে ফাইনাল নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশবিরোধী প্রচার আর অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে শ্লোগানে সব ছেয়ে ফেলার হতে পারে যে “অনুপ্রবেশকারিরা ফেরত যাও” । কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের মিডিয়াও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে এব্যাপারে ছিল পুরাই উদাসীন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, এমনকি জয়শঙ্করের সফরে সাংবাদিক সম্মেলন কাভার করে যে মিডিয়া রিপোর্ট পরদিন ছাপা হয়েছে সেখানেও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে প্রায় কিছুই নাই বললেই চলে। অথচ জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” সংলগ্ন যেকোন বক্তব্য হওয়ার কথা ছিল শিরোনাম। পারলে এই কয়েক শব্দে দেয়া জয়শঙ্করের বক্তব্যের ভিডিওসহ রিপোর্টিং হত সবচেয়ে উপযুক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন কোন জায়গায় আছে এর এক বিরাট মাপকাঠি হয়ে গেল – জয়শঙ্করের সফর বা “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” নিয়ে রিপোর্ট। কোনভাবেই এখানে হাসিনার ফ্যাসিজমের শাসন, মিডিয়ার উপর সরকারি চাপ ইত্যাদির অজুহাত তোলারও সুযোগ নাই। কারণ মিডিয়া মূলত ১. কোন ইস্যুটা এই সফরে এক নম্বরের সে ইস্যুটাই বুঝে নাই, এটা প্রমাণিত। ২. ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয় যে আমাদের মিডিয়ায় জয়শঙ্কর বলেছেন “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” এটাকে প্রধান শিরোনাম করলে বা ভিডিওওতে দেখালে সরকারের বা ভারতের দিক থেকে আপত্তির কিছু আছে। কাজেই এটা ছিল সরকারি কোন চাপ ছাড়া ইস্যু। ৩. এটা ছিল বাংলাদেশের বার্ণিং আর জেনুইন স্বার্থের ইস্যু। ৪। এমন রিপোর্ট হাসিনার পক্ষেই যায়। কাজেই হাসিনাকে দোষ দিয়ে মিডিয়ার নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার কোন সুযোগই নাই।
এছাড়া উলটা করেও দেখানো যায়  – আমাদের মিডিয়া বিকল্প কী বা কাকে তারা শিরোনাম করেছে? – এটা থেকেও প্রমাণ হয় যে মিডিয়া ইস্যুটা বুঝেই নাই। দেখা গিয়েছে বেশির ভাগের কাছে ইস্যু হয়েছে  – তিস্তা ইস্যু। যার সার কথা হল তিস্তা নিয়ে কিছু হল না এটা দেখিয়ে ভারতকে বেইজ্জতি করব, হাসিনা কত অযোগ্য তা দেখাব। এগুলো সম্ভবত বামপন্থি মধ্যবিত্তের চোখ ও সেই মাপের বুঝাবুঝি। যেমন দেখেন বাম গণতান্ত্রিক জোট – এদের কারবার [জয়শঙ্করের সফর : তিস্তা চুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস না থাকায় বাম জোটের ক্ষোভ]। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা নিজেদের সবার উপরের নিজেদের বুঝমান মনে করে। তাই তাদের বুঝে আসাম এনআরসিতে কি হচ্ছে সেটা না, তিস্তা এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ।  কেউ কেউ আরও বাম বুদ্ধিমান হতে চেয়ে  – “ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ” এটাকে মূল শিরোনাম করেছে। এমনকি যাকে প্রফেশনাল পত্রিকা বলে মানতে চায় অনেকে সেই প্রথম আলোও  দেখা গেছে ইস্যুটা বুঝেই নাই। তাদেরও আমলে আসে নাই। তাই  শিরোনাম, ২২ আগষ্টের –  “জয়শঙ্করের সফর: বাংলাদেশের বিষয়গুলো আসেনি, ভারত স্বস্তি পেয়েছে—বামজোট”। ২২ আগষ্টের  শিরোনাম,  “মোদির কিছু বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”

জয়শঙ্করের নিজে যেচে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে স্বীকার করে নিবার অর্থ হল, যে ভারত নীতিগতভাবে মানল যে ১। ভারতে কেউ নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণে করতে না পারলেও – এর পরের বাক্য হবে – সেটাও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।  ২। ভারত অফিসিয়ালি বলতে পারবে না যে ঐ লোক তাহলে বাংলাদেশের; অথবা বাংলাদেশের থেকে আসা গোপনে প্রবেশকারি বা অনুপ্রবেশকারি। ৩। বাংলাদেশকে বলতে পারবে না যে আসেন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি।

তাহলে দাড়াঁলো কী? যেটা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল যে, জয়শঙ্করের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরের দিনে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার লীড হেডলাইন হত – আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর। সেটা হয় নাই। এতে আমাদের মিডিয়া সেন্সের করুন হাল আমরা দেখলাম। এমনকি পুরা জয়শঙ্করের সফর কাভার ছাড়াও আলাদা করে আর একটা রিপোর্ট দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। আমার কথাটা বুঝা যাবে শুধু Jaishankar bangladesh NRC – এই তিনটা শব্দ লিখে গুগুলে সার্চ দেন দেখবেন সার্চের ফলাফলে প্রথম দুই পাতা জুড়ে ভারতীয় পত্রিকার নাম আসবে যাদের রিপোর্টের শিরোনাম হল, “NRC in Assam India’s internal matter: Jaishankar”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের মিডিয়া কিন্তু ঠিকই বুঝেছে তাদের রিপোর্টের শিরোনাম কী করতে হবে।  এমনকি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য আরও কী নতুন অর্থ-তাতপর্য তৈরি করছে সেটা নিয়ে দ্যা হিন্দু পত্রিকা লিখেছে,   His statement is significant as it indicates India’s official position just days before the final NRC list is to be published on August 31. In July, Mr. Momen had expressed concern about the possible fallout of the final list on Bangladesh.

তাহলে দাঁড়ালো যা তা হল, আমরা কমিউনিস্ট প্রগতিশীল ধরণের বুঝমান খেতাব পেতে যত আগ্রহী, সাধারণ কান্ডজ্ঞান দেখাতে ততটাই বেখবর। কি আর করা – কাজেই এখন আসেন আমরা আপাতত দোয়া-কামনা করি যাতে কান্ডজ্ঞান জাগে। আর এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। এখনও বিরাট এক কাজ রয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আসামের এনআরসি ইস্যুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন আগামী ৩১ আগস্ট। কাজেই ভারতের সরকারী অবস্থান বাংলাদেশকে জড়ানো বা দায়ী করার না হলেও বাংলাদেশবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী পিছন থেকে সংগঠিত তথাকথিত “অসমিয়া স্বার্থের” দাবি তোলা হতে পারে।  তাই আগে থেকেই এর পাল্টা আমাদের বয়ান অবস্থান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। এছাড়া জয়শঙ্করের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কেমন গুরুত্ব দিতে হবে সেখানে এব্যাপারটা বুঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এর আলোকে কোন মিডিয়া রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।
যেমন বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “আসামের নাগরিকত্ব ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। ভিতরে লিখেছিল – “সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি”।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে – ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান …’। এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বুঝানো হচ্ছে যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর কেন এত সহজে ‘এনআরসি অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানলেন?
জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হল, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হল, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে শহরের বাইরের ক্যাম্পে রাখবে তারা; এসব ক্যাম্প ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে; আর যদিও অনেক পরে এদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মত নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। আর সম্ভবত অ-মুসলমানদের বেলায় এটা ঘটবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ এমনভাবে  করতে চান।
দুই. সামনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কাজ, দম ফেলার সময় নাই। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে এবার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা নিজের অবস্থানের পক্ষে রাষ্ট্রগুলোকে আনার কাজে – মুখোমুখি হবার সময় তাদের। তাই  অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হল ভারতের কাছে এখনকার আসাম এনআরসির চেয়েও আরেক বড় ইস্যু হল কাশ্মীর, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে  এখন থেকেই আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,  ২৪-২৬ আগষ্টে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক চলছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, সে এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদী দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা নেতারা কথা বলতে চায়। মোদী সেখানে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, এখন অলরেডি তিনি প্যারিসে, যেখানে এবারের জি৭ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

India’s risky Kashmir power grab, VOX

এর এক সোজা অর্থ কাশ্মীর আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু একেবারেই নয়, তা প্রকারান্তরে এখানে মেনে নেয়া হয়েছে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথের এক দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আরও রাষ্ট্রকে পক্ষে আনতে ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভাগুলো শুরু হয়ে যাবে; যেখানে বলাই বাহুল্য কাশ্মীর সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু-সমর্থক জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে – ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। এছাড়া আর একটা দিক আছে। ভারতের হিন্দু-মনের চোখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আসলে পুরান একক পাকিস্তান – “মুসলমানের” পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু বলে মেনে নেওয়া – এর অর্থ বাংলাদেশ যতটা ভাল দেশ ইমরানের পাকিস্তান ততই খারাপ, সহি না – এমন ইঙ্গিত তৈরি হয় এখানে। এটাকে ভারত তার বড় পাওয়া মনে করে, আর যেখানে কাজে লাগবে সেখানে ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি।

কিন্তু কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, একেবারেই না। সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং যে কোন জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু আমরা মনে করতে পারি না, কারণ জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী এটা অবৈধঃ
কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। মুল কারণ, কাশ্মীর সমস্যা আসলে জাতিসংঘের চার্টারের [Charter of the United Nations] আলোকে মিটাতে আমরা বাধ্য। আর কাশ্মীর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হল, কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কোন রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরি দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে এটা মেনে নেওয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের কেউ নয়। বরং কাশ্মীরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক। কাজেই হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, কোন চুক্তি করে দিয়েছে – এই তুলে দেওয়া বা চুক্তি আইনত অকেজো, মুল্যহীন। কারণ জাতিসংঘের দৃষ্টিতে কোন রাজা অথবা উপনিবেশ মালিকপ্রভু কোন ভুখন্ডের মালিক হতে পারে না। ঐ ভুখন্ডের মালিক, শাসক কে তা নির্ধারণের একমাত্র হকদার ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়ার মত হয়ে যাবে। এর ফলশ্রুতিতে ঐ দখলকারি দেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যেতেও পারে। সাদ্দামের ইরাকের কুয়েত দখল করা যেভাবে অবৈধ গণ্য হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। নিজ ভুখন্ডের শাসক নাগরিক নিজে অথবা তার সম্মতি নেয়া এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকার। নিজ ভুখন্ডের শাসক হল নাগরিক নিজে বা তার সম্মতি নেয়া প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।  তাই কোন ভুখন্ডের উপরে ওর বাসিন্দাদের বাইরে অন্য কোন রাজতন্ত্রী (Monarchy) অথবা কলোনিয়াল (Colonial) মালিকানা শাসক দাবি করাকে জাতিসংঘ অবৈধ মনে করে। অবৈধ দখলদার মনে করে।

UN Declaration 1942

জাতিসংঘের জন্ম দলিল ও ভিত্তি

  • ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই নীতি মেনে ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
  • পরে ঐ বছর শেষে ১৯৪২ সালের ০১ জানুয়ারি এতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। অর্থাৎ ঐদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এবং আগের চার্চিল ও রুজভেল্ট এভাবে মোট চার রাষ্ট্র আর এক ছোট দলিলে লেখেন ও স্বাক্ষর করেন এই বলে যে তারা আগের  Atlantic Charter  এর যৌথ ঘোষণার সাথে একমত হয়ে এই স্বাক্ষর করছেন।
    পরবর্তিতে এই চার রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত দলিল এটাই জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা [1942: Declaration of The United Nations] মানা হয়।
  • পরের দিন ০২ জানুয়ারি ১৯৪২, আরও ২২ রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেছিল। জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করা হয় এভাবে।
  • পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালে পুর্ণ গঠন দলিল লেখা শেষ হলে যেটাকে জাতিসংঘের চার্টারের [UN Charter]  বলা হয়, ওর ১১০ নম্বর ধারা মতে ঐ গঠন দলিলে অন্যান্য রাষ্ট্গুলো স্বাক্ষর করাতে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছে

এই ভিত্তিতেই পরবর্তিতে অসংখ্য গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থগত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। একালে সেসব কনভেনশন, আইন ইত্যাদির হেফাজতকারি ও তদারককারি হল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিল (UNHRC)। কাজেই জাতিসংঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

এছাড়া আর সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীর প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ
১। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,  রাজা হরি সিং ভারতের নেহেরুর সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে  কাশ্মীরের বৈধ প্রতিনিধি না।
কাশ্মীরের জনগণের কোন রায় নিয়ে তিনি নেহেরুর কাছে যান নাই।
২। গিয়েছিলেন রাজা হিসাবে, একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন রাজা হিসাবে।
তাই জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,এই চুক্তি অবৈধ, অকেজো মুল্যহীন।
৩। যদি ধরেও নেই এই দলিল বৈধ তাতেও সমস্যা হল এটা ঠিক কোন একসেশন চুক্তি নয়। এটা আসলে করদ রাজ্য চুক্তি। ঠিক যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে হরি সিংয়ের প্রিন্সলি স্টেট চুক্তি ছিল – হরি সিং নেহেরুর সাথে তেমনই এক চুক্তি করেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘের চোখে করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি সেটা আরও অগ্রহণযোগ্য, তাই অবৈধ। কারণ এর ভিত্তি কলোনি বা কলোনিয়ালিজম। নেহেরুর রিপাবলিক ভারত কী করে কাশ্মীরের জনগণকে এক কলোনিয়ান করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি করতে পারেন?
৪। আটল্যান্টা চুক্তি বা জাতিসংঘ ঘোষণার সারকথা ও মূখ্য ভিত্তি হল “কলোনিয়ালিজম অবৈধ, তাই বাতিল”। ভুখন্ডের শাসক বা মালিক ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা। বিদেশি কলোনি মাস্টার ভুখন্ডের কেউ নয়।  মনে রাখতে হবে আটল্যান্টিক চার্টারের কথা। কলোনি মাস্টার চার্চিল সেখানে তৃতীয় ধারায় স্বীকার করে নিচ্ছেন যে – ” Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them; । অর্থাৎ কোন ভুখন্ডের মালিক সেই ভুখন্ডের বাসিন্দা এই নীতি মেনেই ঐ চার্টার চুক্তিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দাসখতের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে নিয়েছিলেন রুজভেল্ট। আর এই শর্তেই তিনি হিটলারের হাতে থেকে বৃটিশসহ ইউরোপকে বাচিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারাই ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদেরককে অর্থ ও অস্ত্রসহ সবরকম সহায়তা করেছিলেন।

অতএব ভারতের কনষ্টিটিউশনে বা ৩৭০ ধারাতে যাই লেখা থাক, অথবা এই মাসে এখন ৩৭০ ধারা রদ -বাতিল করে ভারতের রাষ্ট্রপতির যে ঘোষণাই দেয়া হোক কাশ্মীর নিয়ে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিসহ সবই অবৈধ। মূল কারণ, কোথাও কাশ্মীরের জনগণ – সেই মুল বাসিন্দাদের – কোন ম্যান্ডেট বা রায় নেয়া হয় নাই কোথাও।

তাই কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘ চার্টার, জাতিসংঘের নানান গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসংঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। অন্তত জাতিসংঘের সদস্যপদ বজায় রেখে। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগই নেই যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মিটাতে হবে।

সুতরাং জাতিসংঘ চার্টার অমান্য করে বাংলাদেশেরও – কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু মনে করা, ঘোষণা করা ভিত্তিহীন। শুধু তাই না এটা আত্মঘাতি। এটা যেকোন পর্যায়ে বাংলাদেশেরই সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]