হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

গৌতম দাস

০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Co

 

Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

গৌতম দাস

০৯ জুন ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2s2

 

 

কখনও কখনও কারো কারো কোন কথা বিশ্বাস হতে চায় না। তেমনই এক অবস্থা তৈরি হয়েছে ভারতের কিছু রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদেরকে নিয়ে। সত্যি কথাও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। ধরা যাক, এমন একটা বাক্য পত্রিকার পাতায় পাওয়া গেল যেখানে ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা অথবা মন্ত্রী বলছেন, “ধর্মের নামে জনগণের মাঝে বিভক্তি আনার কথা বলা অনুচিত”। অথবা বাক্যটা একটু এরকম যে বলা হয়েছে, “ভারত এমন এক দেশ যেখানে জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারও প্রতি বৈষম্য করার সুযোগ নেই। এটা কখনো বরদাস্ত করা হবে না”। বলাই বাহুল্য এমন বক্তব্য নিশ্চয় ভারতের কোনো সেকুলার বা কমিউনিস্ট নেতার বক্তব্য বলেই আমরা ধরে নিব।

কিন্তু না। এই অনুমান ও ধারণা অবিশ্বাস্যভাবে শতভাগ ভুল। আসলে প্রথম কথাটা বলেছেন, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। আর পরের কথাটা বলেছেন, ভারতের মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এদের দু’জনের বক্তব্য একই প্রসঙ্গে একই দিনে। ভারতের লিডিং সব ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকাতে গত ২২ মে অথবা পরের দিন এই খবর পাওয়া যাবে। এমনকি গ্লোবাল নিউজ এজেন্সি রয়টার্সও একই খবর পাঠিয়েছে। ফলে পাঠককে আশ্বস্ত করে বলা যায়, এখানে দেখতে বা পড়তে কোনো ভুল হয়নি।

ওদিকে আবার, আমরা যদি দেখি কেউ কাউকে “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা” করতে পরামর্শ দিচ্ছেন, আমরা ধরে নিতে পারি যে, ওই পরামর্শদাতা আর যাই হোক বিজেপি কোনো নেতা বা মন্ত্রী নিশ্চয় নন। কিন্তু না, এখানেও বিস্মিত হওয়ার পালা। মোদী সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক এক মন্ত্রী আছেন যার নাম মুক্তার আব্বাস নাকভি। তিনি বলেছেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার। আমরা তাদের এটাই বলতে পারি যে, প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন”। এখানেও আগের একই প্রসঙ্গে মন্ত্রী নাকভিও এই বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে কী সেই প্রসঙ্গ, যা থেকে অবিশ্বাস্য সব কথা বের হয়ে আসছে বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীদের মুখ দিয়ে?

রয়টার্স লিখেছে, “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান। কাগজকলমে ভারত সেকুলার হলেও পাঁচ ভাগের চার ভাগ মানুষ এদেশে হিন্দুধর্ম চর্চা করে”। [Christians constitute less than 3 percent of Hindu-majority India’s 1.3 billion people. India is officially secular, but four-fifths of its population profess the Hindu faith.] এই তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সারা ভারতেই ছড়িয়ে আছে, দক্ষিণ ভারতে তুলনামূলকভাবে এর ঘনত্ব বেশি। আর রাজধানী দিল্লির ক্ষমতা কাঠামোর করিডোরে অথবা একাডেমিক বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিও দৃশ্যমান। বিশেষ করে নাম কামানো মিশনারি স্কুল ও কলেজগুলোর কারণে ঐ সমাজে তারা অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। আবার সারা দুনিয়ার মতো ভারতেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধারা রয়েছে। দিল্লির ক্যাথলিক ধারার আর্চবিশপ হলেন অনিল কুটো (Anil Couto)। তিনি তাঁর ধারার অন্যান্য বিভিন্ন চার্চ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এক অভ্যন্তরীণ চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমরা একটা টালমাটাল রাজনৈতিক আবহাওয়া প্রত্যক্ষ করছি, যেটা আমাদের কনষ্টিটিউশনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং আমাদের জাতীয় সেকুলার নীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে”। [“We are witnessing a turbulent political atmosphere which poses a threat to the democratic principles enshrined in our Constitution and the secular fabric of our nation,”]। তাই ঐ চিঠিতে তিনি আহ্বান জানান আগামী বছরের নির্বাচন পর্যন্ত তাদের অনুসারী শাখাগুলো যেন এ জন্য এক ‘বিশেষ প্রার্থনা কর্মসূচি’ হাতে নেয়। এই চিঠি তিনি লিখেছিলেন গত ৮ মে। সেটা দু’সপ্তাহ পরে হলেও প্রকাশ্যে বিজেপির নজরে আসাতে তারা আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এই চিঠির ‘বিপদ’ টের পেয়ে যান। এই চিঠিটা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী জোট খাড়া করে ফেলার উপাদানে ভরপুর, তা বুঝতে বিজেপির দেরি হয়নি।

যদিও এই চিঠিতে যে একশনের আহ্বান জানানো হয়েছে তা খুবই ‘হেদায়েতি ভাষ্য’। বলা হয়েছে – যিশু ও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে। অর্থাৎ কোনো মিছিল মিটিং করার আহ্বান দূরে থাক, আলোচনা সভাও করতে বলা হয়নি। আর প্রতি শুক্রবার “জাতির জন্য উপাস থাকা’ পালন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এর সোজা মানে করে বললে এটা হল, বড় জোর আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ধরনের একটা ততপরতা। এর মধ্যে ন্যূনতম কোনো আক্রমণাত্মক ভাষ্য নেই। সাদামাটা এ বক্তব্যের মধ্যে স্পিরিচুয়্যাল শক্তির প্রার্থনা, নালিশ ও আহ্বান আছে অবশ্যই। সেই সাথে, সব ধর্মের লোকদের মাঝে পারস্পরিক ঘৃণা বা হিংসার সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় যেন থাকে, এ কামনায় প্রার্থনা করতে বলেছেন আর্চ বিশাপ।

কিন্তু এটাও সহ্য করার অবস্থায় নাই বিজেপি। কারণ এই চিঠিতে খ্রিস্টান, অখ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার প্রতি আবেদন রেখে সবাইকে মানবিক স্পর্শে ছুয়ে ফেলে মিলিত এক শক্তি হয়ে ওঠার মতো বহু উপাদান ও ক্ষমতা আছে। এটাই এই চিঠির শক্তির দিক। আর আসন্ন (২০১৯ সালে) নির্বাচনে এটা বিজেপির রাজনীতির জন্য বিরাট বিপদের দিক ঠিক ততটাই। তাই, সহজেই অনুমান করা যায় এই ধারণা থেকেই বিজেপি ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসভাবে নিয়ে পাল্টা চাপ তৈরি ও অভিযোগ অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিজেপির মূল আদর্শিক সংগঠন আরএসএস (RSS), সেও উপায়ান্তর না দেখে নিজেই ‘সেকুলার’ হয়ে গেছে। দাবি করেছে, আর্চবিশপের এই চিঠি “ভারতের সেকুলারিজম ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ”। […the RSS claimed it was a “direct attack on Indian secularism and democracy].’ আর তা থেকেই ২২ মে, অমিত শাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথসহ বিজেপি অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীদের সব অবিশ্বাস্য বক্তব্য।

কিন্তু বিজেপির কাছে সমস্যা দেখা দেয় যে, বিজেপি কী বয়ান দিয়ে এই চিঠির বিরোধিতা করবে? কারণ এই চিঠির অভিযোগের বিরোধিতা করতে গেলে খোদ বিজেপির রাজনীতিরই বিরুদ্ধে ও বাইরে চলে যেতে হবে। যেমনঃ এখানে সবচেয়ে বড় তামাশার শব্দ হয়ে উঠেছে ‘পোলারাইজেশন’- যার বাংলা হল, “জনগণের মাঝে বিভক্তি” অথবা “সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্তি”। এখানে আর্চবিশপের চিঠির অভিযোগকে মিথ্যা বলে বিজেপি অস্বীকার করে কোনো পাল্টা বয়ান খাড়া করতে গেলে তাতে ভারত রাষ্ট্র ও সরকারের জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারো প্রতি বৈষম্য করার বিরোধিতা করতে হবে অথবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি করার বিরোধিতা করতে হবে। এটাই মডার্ন রিপাবলিক কোনো রাষ্ট্রের “সাম্য নীতির” মূল কথাঃ কোনো পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সবাইকে সমান গণ্য করতে হবে, রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ, বা সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে না।

কিন্তু বিজেপির রাজনীতির মূল কথাই হচ্ছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজকে পোলারাইজ করতে বা বিভক্তি টানতে হবে। এটা তারা করে যতটা হিন্দুত্বকে ভালোবেসে এর চেয়েও বেশি হল, ‘হিন্দুত্বের ভোট’ বাক্সের প্রতি ভালোবাসা। প্রধানত, হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশে ‘হিন্দুত্বের ভোট’-এর জোর অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এটাই দলটা সবচেয়ে ভাল করে জানে। তাই বিজেপি মানেই সমাজকে হিন্দুত্বে উসকে পোলারাইজ করা; ভোটের বাক্স ভর্তি করা।

কিন্তু আর্চবিশপের অভিযোগ বিজেপিকে কুপোকাত করে দিয়েছে। তাই উপায় কী, নরম ভাষায় হলেও, বিজেপিকে নির্বাচনের বছরে খ্রিষ্টান কমিউনিটির অভিযোগ তো ঝেড়ে অস্বীকার করতেই হবে। নিরুপায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবার তাই সুশীল ভদ্র হয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘It’s not appropriate if anyone is talking about polarising people in the name of religion । আসলে নিজেরই দলের স্বভাব ও রাজনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, “পোলারাইজেশন হারাম”। একইভাবে, অগত্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কনস্টিটিউশনের সাম্যনীতি আঁকড়ে ধরে হুঙ্কার (আসলে নিজের বিরুদ্ধেই) দিচ্ছেন, “… no discrimination against anyone on the basis of caste, sect or religion. Such a thing cannot be allowed,” – কোনো বৈষম্য বরদাস্ত করা হবে না। আর বিজেপি সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নাকভি সোজা মিথ্যা বলেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো রকম ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার”। আর সেই সাথে তিনি আবার ‘প্রগতিশীল’ বলে শব্দটাও ধার করেছেন, তা বিজেপি রাজনীতির পরিভাষা নয় অবশ্যই। বলেছেন, “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুন”।  আসলে বিজেপির মূল অবস্থান হল, আর্চবিশপ অনিল কুটোর অভিযোগ যেভাবেই হোক অস্বীকার করতে হবে, তাতে বিজেপির নিজ রাজনীতির বিরোধিতা করে হলেও। দলটার এতই দিশেহারা অবস্থা। তবে আর একটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা হল – উল্টা আর্চবিশপের ওপর অভিযোগ আনা যে, তিনি খ্রিষ্টান-অখ্রিষ্টান বিভেদ তুলছেন এবং বিশপের বক্তব্য রাজনৈতিক, এই অভিযোগ তোলা।

এদিকে ভারতের মিডিয়ার অবস্থা ‘ভয়াবহ’ বললে কম বলা হয়। সম্প্রতি বিজেপির এক ছদ্ম সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে [sting operation] শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২৫ টিভি চ্যানেলকে তারা বিজেপির হিন্দুত্বের পক্ষে টাকার বিনিময় প্রচার চালাতে চায় কী না – এই অফার দিলে দেখা গেছে দুইটা বাদে তারা প্রায় সবাই রাজি। এই অপারেশন চালানোর পর ‘কোবরাপোস্ট’ https://www.cobrapost.com    নামে এক ওয়েবসাইট থেকে ইউটিউবে সব কথোপকথন ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। তেমনি এক নিউজ এজেন্সি এএনআই টিভি, (ANI TV) তারা এই ইস্যুতে বিজেপিকে সার্ভিস দিতে নিউজ ক্লিপ তৈরি করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আসলে বিজেপির দিক থেকে আর্চবিশপকে দেয়া হুমকিমূলক বার্তায় ভরপুর বলা যায়। বিজেপির আর এক মন্ত্রী গিরিজা সিং সেখানে আর্চবিশপের চিঠির ঘটনাতে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে।’ [Giriraj Singh as saying that “every action has a reaction”]। বিজেপির আর এক নেতা বিনয় কাতিয়ার বলছেন, আর্চবিশপের মন্তব্য বিভিন্ন ‘সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা, অসন্তোষ তৈরি’ করতে পারে [archbishop’s comments could lead to “communal tensions”.]। মোদী সরকারের টুরিজম মন্ত্রী বলেছেন, Union minister of tourism KJ Alphons said Couto’s remarks were “unfair” to the government and that “godmen” should stay away from politics. অর্থাৎ এটা হলো দাঙ্গা তৈরির অপবাদ দিয়ে ভয় দেখানো। স্বভাবতই এতে খ্রিষ্টান ধর্মের অন্য প্রায় সব ধারার নেতারা আর্চবিশপের পদক্ষেপ ও অভিযোগকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।

আর্চবিশপের অভিযোগের ফলে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়ার পক্ষে তা ভূমিকা রাখতে পারে ভেবে বিজেপি আজ ‘ভেজা বিলাই’ সাজছে, সব অভিযোগ অস্বীকার করছে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ২০১৫ সাল থেকেই নিয়মিতভাবে বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠন, ‘ঘর ওয়াপাসি’ প্রোগ্রামের নামে নির্বিচারে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, সম্পত্তি দখল, চার্চ ও মসজিদে হামলা, হত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে। গত ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসীন হবার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় ও পরবর্তিতে, তিনি সরবে ও প্রকাশ্যে মোদি সরকারের খ্রিস্টান ও মুসলমান দলনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভারত রাইজিং ইকোনমির দেশ হয়ে চাইলে এগুলো বন্ধ করতে হবে, এগুলো নেতি ইমেজ তৈরি করে। ওবামা বলেছিলেন,  “ভারত সফল হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ধর্মীয় লাইনে বিচ্ছিন্নতা বিভক্ত হয়ে পড়া ঠেকাতে পারবে [India will succeed as long as it is not ‘splintered’ on religious lines: Obama]

ফলে পরে চাপের মুখে মোদী এবিষয়ে তাঁর সরকারের নীতি কী তা পাবলিকলি ঘোষণা করেছিলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। তিনি বলেছিলেন,  “যেকোন নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা রক্ষা’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব” – এটাই নিজের সরকারি নীতি বলে দিল্লির এক চার্চে্র অনুষ্ঠানে তিনি লিখিতভাবে এই বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছিলেন। কথাগুলো মোদীর মুখ থেকে বের হয়েছে ভেবে অবাক অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু এই লিখিত কথাগুলা মোদীর নিজস্ব ওয়েব সাইটে এখনও আছে। সেখান থেকে আমি এখনই টুকে আনলাম। অন্যান্য নিউজ অন লাইনেও পাবেন।

My government will ensure that there is complete freedom of faith and that everyone has the undeniable right to retain or adopt the religion of his or her choice without coercion or undue influence. My government will not allow any religious group, belonging to the majority or the minority, to incite hatred against others, overtly or covertly. Mine will be a government that gives equal respect to all religions.

উপরের অংশটুকুর বাংলা অনুবাদ আমার করাঃ ভারতের পক্ষ থেকে, আমার সরকারের পক্ষ থেকে বললে আমি ঘোষণা করছি আমার সরকার ওপরের ঘোষণার প্রতিটা শব্দ ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমার সরকার ধর্মবিশ্বাসের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে যে প্রত্যেক নাগরিক সে কোনো ধর্ম ধরে রাখা অথবা গ্রহণ করা তার পছন্দের বিষয় এবং এটা কোনো ধরনের কারো বলপ্রয়োগ অথবা অন্যায্য প্রভাব ছাড়াই সে করবে এটা নাগরিকের অ-অমান্যযোগ্য অধিকার। আমার সরকার কোনো ধর্মীয় গ্রুপ, তা সে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যে ধরনেরই হোক, সঙ্গোপনে অথবা খোলাখুলি অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহ্য করবে না। সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান দেবে আমার এই সরকার।

মোদীর পুরা বক্তৃতার টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করা পাবেন এখানে, আমার আগের লেখায় শেষ অংশ।

কিন্তু তার এই কথায় যে ফাঁক ছিল তা হল, তিনি “মোদী সরকারের” নীতি শুনিয়েছিলেন। “মোদীর দল বিজেপির” নীতি নয়। এছাড়া  আসলে দুঃখের বিষয়, মোদী নিজেই এরপরে বিজেপি দলে, বিশেষ করে আরএসএসে নিজ প্রতিদ্বন্দ্বিদের ঠেলাগুতা চাপ পড়ে নিজেই “সংখ্যালঘু মত” হয়ে যান। বিশেষ করে  ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির মূল পরিচালক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (আরএসএস এর অঙ্গ সংগঠন) প্রভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে হেরে যান। ‘ঘর ওয়াপসি’ কথার আক্ষরিক মানে হল “ঘরে ফিরিয়ে আনা”। সোজা মানে হল, এর আগে কোন ভারতীয় যে কেউ খ্রিষ্টান বা মুসলমান হয়েছে তাকে এবার বাধ্য করে হিন্দুত্বে ফিরিয়ে আনার তাণ্ডব তৈরি করা। অথবা সুনির্দিষ্ট ঘটনা অভিযোগ থাকুক না থাকুক, ভুয়া অভিযোগে চার্চ বা মসজিদে আক্রমণ করা, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কিংবা জোর করে কোনো মুসলমান নাগরিককে নির্যাতনে বাধ্য করে “জয় শ্রীরাম” বলানো ইত্যাদি। এরই বর্ধিত আর এক রূপ হল গোমাংসকে নিয়ে তান্ডব তৈরি করা। [‘মাংসমাত্রই তা গরুর মাংস’; এই অনুমান ও এই অভিযোগে মাংস খাওয়া, রাখা, বহন করা নিয়ে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো। ]

ফলে মোদী সরকারের “ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার নীতি” নিছকই তা কাগুজে ঘোষণা হয়ে থেকে যায়। আর বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ আরএসএসের সহযোগী সব দলের ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি আগের মতোই সরকারের দিক থেকে প্রশাসনিক বাধাহীন, অবাধে চলতে থাকে। কেবল গরুর মাংসের বিরুদ্ধে করা মোদির আইন (জবাই, কেনাবেচা, বহন ও খাওয়া ইত্যাদি) ও বিতর্কের ব্যাপারে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আপত্তির কারণে শেষে সরকার নিজেই “আইনটা আপাতত প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে আদালতকে জানিয়ে নিষ্পত্তি করেছিল। কিন্তু তাতে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু ঘটানো – এগুলো বন্ধ হয় নাই। এই তো গত মাসেই (২৮ মে ) উত্তরপ্রদেশের কাইরানা নির্বাচনি এলাকায় উপ-নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বিজেপির পুরানা কৌশল গরুর মাংস খাওয়ার ভুয়া অপরাধে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। যাতে এই টেনশনে হিন্দুত্ব ভোটের জিগির উঠে, পোলারাইজেশন ঘটে। যদিও আগে এটা বিজেপির আসন ছিল। তবুও এই উপনির্বাচনে বিজেপি হেরে যায়।

আসলে বিজেপির মূল রাজনৈতিক কৌশলই হল, এভাবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজে পোলারাইজেশন ঘটানো, ‘জোশ-জজবা’ তোলা – একাজ করেই বিজেপি আগিয়ে চলেছে। এভাবে ভোটের বাক্সে হিন্দুত্বের ভোট জোগাড় করে ভরে তোলা। এই নীতিতেই মোদির ভারত গত চার বছর পার করেছে। তাই, সার কথাটা হল, মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লির আর্চবিশপের অভিযোগ শতভাগ সঠিক। তবে তাঁর এখনকার এই পদক্ষেপ ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদীকে কতটা ঠেকাতে পারবে তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে নগদ লাভ হল, অমিত শাহ আর রাজনাথের ‘পোলারাইজেশন বিরোধিতা’র ‘ভক্ত’ হয়ে যাওয়া, এই তামশা দেখার সুযোগ হলো আমাদের।

আর একটা দিক আছে, অনেকেই ইস্যুটাকে (পোলারাইজেশন বিরোধী অবস্থান নেয়া) সেকুলারিজম বা প্রগতিশীলতা বলে বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করছেন। এটা শতভাগ ভুল। আসলে এটাই এদের নিজ ইসলামবিদ্বেষী অবস্থানের লুকানোর জায়গা। বিষয়টার মূলধারণাটা হচ্ছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাম্যের নীতি রক্ষা, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি পালন করে চলল কিনা। নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এই হলো ইস্যু। অথচ রাষ্ট্র ধারণা বুঝে না বুঝে বিভ্রান্তিকরভাবে এই ইস্যু ও ভাবটাকে ‘সেকুলার’ শব্দ দিয়ে খামোখা বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করতে দেখা হয়। আর এই ‘সেকুলার’ শব্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ।

অনিল কুটো ধরনের ব্যক্তিরাও বুঝে না বুঝে ‘জাতীয় সেকুলার নীতির’ কথা তুলে নিজেদের বিভ্রান্তিতে ও অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় ঢুকিয়ে রাখেন। এভাবে ভুতুড়ে না-বুঝা এক ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আড়ালে ধর্মবিদ্বেষ জারি থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় এটাকে ‘ধর্মের সাথে রাজনীতি’ মেলানো বা না-মিলানোর বাজে বিতর্ক হিসেবে হাজির হতে দেন। অথচ পরিষ্কার ভাষায় বললে, রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি, নাগরিকের জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যহীনতার নীতি, সুরক্ষার নীতি পালন করে চলল কিনা; এবং নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এটাই হলো দাবি ও মূল ইস্যু।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৭ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

গৌতম দাস

২৬ জুলাই ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gz

 

কখন কোন জিনিষ যে কার প্রতীক হয়ে উঠে বলা মুশকিল। যেমন, ভারতের গরু প্রীতি ও পূজা। এটাই এখন ভারতের হিন্দুত্ব-ভিত্তিক রাষ্ট্র ও মোদির বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি দুটোরই মুখ্য প্রকাশ ও প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই মাস আগে গত ২৫ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি, ভারতের গ্রাম বা শহরের কোন হাট-বাজারে  জবাইর উদ্দেশ্যে নিয়ে গরু কেনাবেচা করা যাবে না; এটা নিষিদ্ধ বলে এক আইন জারি করেছিলেন। গরু কেনাবেচার আগে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে এক কমিটি বিস্তর ফর্ম পুরণ করে নেয়, তাতে প্রায় শপথ করিয়ে নেওয়ার মত যে ঐ গরু জবাই করার জন্য কেনাবেচা হচ্ছে না; কৃষিকাজ বা অন্যকিছুর জন্য কেনাবেচা হচ্ছে। সেই আইনে (ঐ আইনের এক পিডিএফ কপি আগ্রহিরা এখানে দেখতে পারেন) গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সমাজের এর প্রবল প্রভাব পড়েছিল মুখ্যত  দুই জায়গায়। চামড়া ও মাংস সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ দিনের সব ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে (রপ্তানি বাণিজ্যসহ) এবং এসব সংশ্লিষ্ট কসাইসহ নানান পেশাজীবিদের জীবনে। আর অপর সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া হয়েছিল যে, এক পাবলিক লিঞ্চিং উন্মাদনা দেখেছিল সারা ভারত। পাবলিক লিঞ্চিং যাকে আমরা গণপিটুনি, হাটুরে মার ইত্যাদি বলি। যার সার কথা হল মানুষ খেপিয়ে কাউকে কাউকে বিচার বহিবহির্ভুতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অথবা আরএসএসের সমর্থক হিন্দুত্ববাদী নানান ব্রান্ডের সংগঠনের সদস্যদেরকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয় এই আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কী না এর তদারকি বা ভিজিলেন্সের নামে। স্বভাবতই গরু অথবা মাংস নিয়ে চলাচলকারি কেউ এদের হাতে পড়লে সে পাবলিক লিঞ্চিং তাণ্ডবের শিকার হবেই। ভিজিলেন্স শব্দটা ইংরাজি পত্রিকা আর মোদির বক্তৃতার ভাষ্য থেকে এসেছে।  মোদির ঘোষিত জবাই নিষিদ্ধ আইন বাস্তবায়িত কারি দলীয় ক্যাডারদের ভাষায় এই ভিজিলেন্স টিমের সদস্যদের আদর করে এরা ‘গোরক্ষক’ ডাকত। এই নামে তারা শুরুতে হাজির হয়েছিল। এক কথায় বললে, এরা ছিল এক ফ্যাসিজমের তাণ্ডব বাহিনী। ‘আইনকানুন হীনতা’র এক চরম প্রকাশ। এতে যে কেউ যখন তখন একদল লোকের হাতে পরিকল্পিতভাবে আক্রান্ত, নিগৃহীত বা নিহত হয়ে যেতে পারেন; বিশেষ করে তিনি যদি মুসলমান নাগরিক হন অথবা কোনো মুসলমান ধর্মীয় চিহ্ন শরীরে প্রকাশিত থাকে। ভারতের নিউজ টিভিমিডিয়া এনডিটিভির হিসাবে গত ২২ মাসে ১৭ ব্যক্তি হত্যা অথবা আক্রান্ত হয়েছে এই গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স টিমের হাতে। প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ভিতর বসে থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় নাই, নিহত হয়েছেন।

গত দুই মাস ধরে এই পরিস্থিতি চলে আসার পর এখন সাময়িক হলেও এক ইতিবাচক খবর হল, মোদির ওই আইন গত ১১ জুলাই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘স্থগিত’ ঘোষণা করেছে। এর সাথে সরকারি সলিসিটর জেনারেল আদালতকে জানিয়েছেন, সরকার আদালতে উঠা আপত্তিগুলোকে আমলে নিয়ে সংশোধিতরূপে আইনটা আবার চালু করবে।

এখানে আদালতের আদেশটা পরিস্কার করে বলা ভাল। এটা ছিল সুপ্রীম কোর্টের আদেশ। আর এর আগে গরুজবাই নিষিদ্ধ আইন প্রথমে মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ পেয়েছিল। সে আদেশ এরপর সুপ্রীম কোর্টে আপিলের জন্য এসে এবার সর্বভারতীয় স্তরে প্রযোজ্য বলে মোদির আইন স্থগিতাদেশ পেল। তবে এবার আদালতে উঠা আপত্তিগুলো আমলে নিয়ে পুরান আইনটাকেই ঝেড়েপিছে মোদি যে  আবার নতুন করে আনবেন এটা পরিস্কার।

শুরুতে বলেছিলাম, মোদির জবাই নিষিদ্ধ আইনটা ২৫ মে ২০১৭ চালু হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ১৯৬০ সালের একটা আইনকেই (Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960) নতুন করে মোদির হাতে ঝেড়ে মুছে হাজির করা আইন; ঠিক নতুন আইন নয়। অর্থাৎ বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আইনটা ১৯৬০ সালে কংগ্রেসের শাসন আমলে করা হয়েছিল এবং খুবই চতুরভাবে, পশুদের কষ্ট নিবারণের উদ্যোগ হিসেবে। ‘পশুদের অনেক কষ্ট, তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা করা হচ্ছে, মানুষ (মুসলমান) নিষ্ঠুর’ …… এসব বয়ানের আড়ালে এই আইন সেকালে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এখন কংগ্রেসের কাঁধে চড়ে মোদি সেটাতেই একালে নতুন শব্দ বাক্য সংযোজন করে নিয়ে বলছেন – জবাই করার উদ্দেশ্যে গরু কোনো হাটে কিনতে পাওয়া যাবে না; জবাইয়ের এর কাজে গরু কিনবে এমন কোন হাটবাজারই আর কার্যকর নাই অথবা নিষিদ্ধ।

এখন কথা হল, এই বছরে মোদি এই আইন করতে উৎসাহী হলেন কেন? অথবা আদালতে সদ্য স্থগিত হওয়া আইন আবার নতুন করে আপত্তিগুলো সামলিয়ে চালু করার তাড়া বা তাগিদ বিজেপির কেন?
এককথায় বললে, এর পেছনের মূল বিষয়, সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচন। সদ্য অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ঐ নির্বাচনে, গত মার্চ মাসে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছিল। ওই নির্বাচনের পর থেকেই বিজেপির নীতিনির্ধারকেরা বলা শুরু করেছিলেন ‘আমরা এতদিন যে নির্বাচনী ফর্মুলা খুঁজে ফিরছিলাম সেটা এবার পেয়ে গেছি’। যেমন গত ১৯ মার্চ আনন্দবাজার লিখেছিল, “বিজেপি সূত্রের মতে, এ বার উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, মেরুকরণের তাস খেলেই জাত-পাতের অঙ্ককে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া গিয়েছে। হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে একজোট করা গিয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে সেটিকেই আরও কাজে লাগাতে চাইছে দল”।  কিভাবে সেটা? বাইরে থেকে দেখতে শুনতে ভারতে হিন্সদু জনগোষ্ঠির সবাইকে একাট্টা হিন্দু মনে হলেও আসলে ভেতরে জাত-পাতের বিভক্তি, ছোঁয়াছুঁয়ি, ক্ষমতা কাঠামোতে অবস্থান ইত্যাদির বিভক্তিতে একাট্টা হিন্দু-স্বার্থ বলে ভোটের বাজারে সব না হলেও মেজরিটি ভোট এক জায়গায় করা বিজেপির জন্য সবসময় খুবই কঠিন কাজ মনে করা হয়ে এসেছে। এবং আসলেই তা কঠিন। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের মতো এত বড় অঞ্চল (ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ ৫৪১ টা এর মধ্যে একাই উত্তরপ্রদেশ ৮০ টি আসনের) যা নানা জাত-উপজাত, এর ওপর আবার রয়েছে মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সিতে (কোন কোন কনষ্টিটুয়েন্সিতে ৩০% পর্যন্ত মুসলমান ভোটার) এর বিভক্ত হয়ে থাকা।  উত্তর প্রদেশে এছাড়া আবার অব্রাক্ষ্মণ যাদব, মুসলমান, দলিত এবং  ব্রাহ্মণ ইত্যাদি সব বড় বড় ভাগের জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল আছে। এর মধ্যে মুসলমান বাদে অভিন্ন সব জাতের দল হিসেবে বিজেপিকে কেবল সব হিন্দুদের দল হিসেবে হাজির করার ফর্মুলাটাই বিজেপি খুঁজছিল। তাই বিজেপি এবার দাবি করছে যে তারা সেটা এবার পেয়ে গেছে। ফলে এরই প্রকাশ দেখেছি আমরা। তা হল, যেমন দাঙ্গাবাজ যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কিন্হতু এর চেয়েও তাতপর্লেযের ঘটনা হল সাথে উপ-মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন দু’জন। দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য এবং দীনেশ শর্মা। এদের একজন ব্রাহ্মণ আর একজন দলিত। অর্থাৎ সব হিন্দু্দের মধ্যেই কিছু না কিছু সুবিধা বা  ক্ষমতা বিতরণ, এটাকেই বিজেপি সম্ভবত ‘সেই ফর্মুলা পেয়ে যাওয়া’ মনে করেছিল। এটাকে বলা যায়, সব জাতের সব হিন্দু ভোটকে একই বিজেপি প্রার্থীর পক্ষে জড়ো করা, তারা এভাবেই উত্তর প্রদেশে জিতেছে- এটাই হল বিজেপির দাবি।

কিন্ততু বিজেপির এই দাবি সত্ত্বেও আমরা আগের মতোই বর্ণহিন্দুদের অত্যাচারে দলিতদের ধর্মান্তরিত হয়ে বৌদ্ধ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে আমরা দেখিনি।  বরং ওই নির্বাচনের পরেও তা বন্ধ হয়নি। দলিতদের পালটা সংগঠন ভীমসেনার ততপরতা নিয়ে রিপোর্টটা দেখুন।   তবু বিজেপির উপলব্ধি হল, এটা তাদের জন্য গরু রক্ষার রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব উথাল পাথাল করে ফেলার সময়। এতে সহজেই মুসলমানকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে ভোটবাক্স ভরাট করার রাজনীতি খোলাখুলি করতে হবে। এই বিচার থেকেই এখন গরু জবাই নিষেধ বা হাটে গরু কেনাবেচা নিষিদ্ধের আইন; মোদিকে এমন আইন চালু করতে হয়েছিল। বিশেষ করে এখন ছয়টা রাজ্যসরকার বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড। এসব এলাকায় আইনের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এই ছয় রাজ্যকে চিহ্নিত করেছে যাতে এখানে বাড়তি কিছু পদক্ষেপ আদালত নিতে বাধ্য করতে পারে ভিজিলেন্সের বিরুদ্ধে। আদালতে আইনটা স্থগিত হয়ে এক্সাবার পরও এবার আনন্দবাজার লিখছে, “গো-রক্ষকদের তাণ্ডব কী করে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে কেন্দ্র ও ছ’টি বিজেপি শাসিত রাজ্যের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট”।

তার মানে সবখানে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল জবাই নিষিদ্ধ আইন স্থগিতের আগে অথবা পরে, তা হল ‘ভিজিলেন্স’। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলের ভিজিলেন্স টিম আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাবলিক লিঞ্চিং (গণনির্যাতন) শুরু করাতে এটা এমন বড় হইচই সৃষ্টি করে যে, এনডিটিভির মতে, গত ২২ মাসে ১৭ জন নিহত বা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উপায়ন্তর না দেখে ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী মোদি তখন নিজেই ভিজিলেন্সের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করা শুরু করেন। নিজেই এদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি, নিন্দা শুরু করে দেন। হাত-পা ধুয়ে ফেলা শুরু করেছিলেন। এছাড়া গত ১৬ জুলাই দ্বিতীয়বার তিনি একইভাবে এসবের বিরুদ্ধে আবার হুঁশিয়ারি দেন।   কারণ ততদিনে আদালতে তিনি হেরে গেলেছে ফলে সর্বদলীয় বৈঠক করছেন। মূলত  রাস্তায় রাস্তায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর সদস্যকে হয়রানি জনমত বিগড়ে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে সাহায্য করেছিল। আর ঠিক এ সময়ই সুপ্রিম কোর্টে শুনানিগুলো চলছিল বলে আদালতের পরিস্থিতি জবাই নিষিদ্ধ আইনটির বিপক্ষে চলে যায়। ওদিকে আদালতে শুনানি চলাকালে তথাকথিত ভিজিলেন্স কমিটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কার দায়িত্ব? কেন্দ্র না রাজ্য- এই প্রশ্নে মোদি সরকার দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাজ্যসরকারের, কেন্দ্রের নয়। এই কথা বলে নিজের দায় এড়ানোর সুযোগ করে নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এ কথা সত্যি, ভারতে প্রাথমিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কর্তব্য রাজ্যের। আর রাজ্য সেকাজ  নিজে না পারলে সে কেন্দ্রের কাছে বাড়তি ফোর্স চাইবে। তাতে কেন্দ্রীয় ফোর্স বাড়তি হিসেবে এলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায় আসলে রাজ্যের।

এদিকে সব ভিজিলেন্স টিমের তাণ্ডবের দায় আদালতের চোখ এড়িয়ে মোদি সরকার রাজ্যের ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হলেও আসলেই কি মোদি সরকার দায়শূন্য? হাত-পা ধোয়া?
একেবারেই না। কারণ প্রথমত, যাদেরকে ভিজিলেন্স টিম বলা হচ্ছে, যতই তাদেরকে উৎসাহী সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখানো হোক না কেন, এরা মূলত বিজেপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। কিন্তু তাতেো মোদির দায় কি অতটুকুই যে, মোদি বিজেপি দলের নেতা, তাই? না অতটুকু নয়, বরং ওই টুক দায়িত্ব মোদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফেলে দিতেই পারেন। কারণ ওর চেয়েও মোদির বড় পরিচয় হলো, উনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

মোদি প্রধানমন্ত্রী। এবং তার সরকারের আনা আইনের কারণেই এককভাবে মোদিকে ভিজিলেন্স টিমের জন্য দায়ী করা যায়। কিভাবে? মোদির ‘গরু জবাই নিষিদ্ধ’ আইনের পিডিএফ কপি নেটে পাওয়া যায়। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি। ঐ আইনে একটা শব্দ আছে Society for Prevention of Cruelty to Animals (SPCA)। এটাই এর প্রমাণ। আসলে এই আইন বাস্তবায়নের সময় জনসম্পৃক্ততার অজুহাতে একটা ‘গণকমিটি’ গড়ে নেয়ার কথা আছে যাদের কাজ হবে ওই আইন বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতা করা। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এলাকার জনগণ নিয়ে ওই SPCA গঠন করে নিতে হবে। আর বাস্তবে বিজেপির অঙ্গসংগঠনের লোকজন নিয়েই গঠিত হয় ওই SPCA কমিটি। আর এই কমিটিই কার্যত ‘ভিজিলেন্স টিম’; এভাবেই আইনটি বাস্তবায়নের সব ক্ষমতা দলীয় লোকদের হাতে।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার হবে। আমাদের দেশে সরকার যদি বলে, কাল থেকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নামবে আর তাদেরকে জনগণের পক্ষ থেকে সহায়তা করবে ছাত্রলীগ, এ কথা বললে যা হবে তাই হয়েছে ওখানে। আর স্বভাবতই গণপিটুনির নামে ওখানে লীগের পিটুনিই হবে।
অতএব, ওই আইনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এই ‘SPCA কমিটি’। এটাই কার্যত সেই পাবলিক লিঞ্চিং কমিটি। ভারতের একজন একাডেমিক শিক্ষক লিখছেন, Public lynching, a barbaric form of political expression, seems to have become the new norm in India since the Modi government came to power at the centre. কিন্তু মোদি যদি আইনেই ওই লিঞ্চিং কমিটি গড়ার বৈধ ব্যবস্থা রেখে দেন, তবে পিটুনি ঠেকাবে কে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৫ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]