মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

গৌতম দাস

২০ মে ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ap

 

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচন প্রায় শেষ। এটা ভারতের ১৭তম লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন।  নির্বাচনের ছয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছিল আগেই। আজ ১৯ মে রোববার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এরপর ২৩ মে সকাল থেকে একযোগে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। ঐদিনই দুপুর ১২টা নাগাদ কোন প্রার্থী কে কোথায় এগিয়ে থাকছেন তা আঁচ পাওয়া শুরু হয়ে যাবে। কোন দল সরকার গড়তে যাচ্ছে এর অভিমুখ আন্দাজ করাও ঐদিনই সন্ধ্যার পর থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কে কোন আসনে জিততে যাচ্ছে; কোন দলের প্রাপ্ত মোট আসন সংখ্যা কেমন হবে ইত্যাদিও। আর প্রাপ্ত সে ফলাফলের ভিত্তিতে পরেরদিন ২৪ মে থেকে প্রত্যেক দলের জোট গড়ার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যাবে। ফলাফল কী হতে পারে এপ্রসঙ্গে প্রায় সবারই অনুমান ভারতে একটা কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

আসলে ভারতে কোয়ালিশন সরকার এবারই নতুন না। বরং গত ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সব সরকারই ছিল আসলে কোয়ালিশন সরকার। এমনকি মোদীর চলতি সরকারে বিজেপির মারজিনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এটাও ছিল এক কোয়ালিশন সরকার। তবে এ পর্যন্ত এসব কোয়ালিশন সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল হয় কংগ্রেস না হয় বিজেপির নেতৃত্বে। সেকালে এ’দুই পার্টির কোন একটা কোয়ালিশনের নেতা না থাকলে সরকার টিকে নাই। যেমন, ১৯৯৬ সালে দেবগৌড়া-জ্যোতি বসুর কোয়ালিশন ছিল এমন এক ব্যতিক্রম যা ১৮ মাসের বেশি টিকে নাই। তবে এবারই কংগ্রেস অথবা বিজেপিকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও এরকম আরও কয়েকজন যেমন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা মায়াবতী বা অন্ধ্রপ্রদেশের সিটিং মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুও আছেন যারা এমন সরকারের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। আর মমতাই এমন ভিন্ন ধরণের কোয়ালিশন সরকারের বিশেষত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে একে আলাদা নাম, ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর সরকার বলে ডাকছেন।

দুনিয়াতে  রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিপরীত ধারণা হিসেবে ইতিহাসের একপর্যায়ে উঠে আসে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা। যার মূল বৈশিষ্টগত ফারাক ও নতুনদিকটা হল,  রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার বলতে এটা পাবলিকের গণসম্মতির রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রে এর ক্ষমতার উতস – নাগরিক লোকক্ষমতা।  এছাড়াও এমন রাষ্ট্রের আবার আরও একটা রূপ আছে। বিশেষত কাঠামোর দিক থেকে বিচারে দুনিয়ায় সেই রাষ্ট্র-রূপটার নাম – ফেডারেল রিপাবলিক রাষ্ট্র। একে ফেডারেল বলার কারণ হল, এখানে রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রদেশ নিয়ে গঠিত বা বলা যায় রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রাদেশিক ইউনিট বা রাজ্যে বিভক্ত থাকে। তবে ফেডারল রাষ্ট্রের  বৈশিষ্টের মূল জায়গাটা হল, এখানে রাষ্ট্রের  কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও সম্পদ ইত্যাদি কী ভিত্তিতে রাজ্যগুলোও এসব উতস ব্যবহারের সমান সুযোগ [access] পাবে তা আগেই বিস্তারিত এর লিখিত নিয়ম বলা থাকে, একটা ন্যায্যতার ভিত্তিও যেন সেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাজ্য বা রাজ্য-সরকারকে দেয়া বরাদ্দ যেন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানের পছন্দের বা অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে, এভাবে এখানে রাজস্বসহ সব বরাদ্দ হতে হয়। রাজস্ব, সম্পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদিতে কোনো কোনো রাজ্য যেন কোন বৈষম্যের শিকার না হয়- এমন কাঠামোগত প্রটেকশন ব্যবস্থা থাকাই ফেডারেল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। ভারত আমেরিকার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় দলগুলোর সমন্বয়ে একটা কেন্দ্রীয় সরকার গড়া অর্থে মমতা এটাকে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ [Fedaral Front]- এর সরকার বলছেন।

গত ১৭ মে ছিল শেষপর্বের এবং পুরা নির্বাচনের প্রচারণার সর্বশেষ দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী ততপরতা ও কার্যক্রমের সমাপ্তি হিসেবে দলের প্রধান অমিত শাহকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। অমিত শাহ মুখস্থ কথার মত সেখানে বিজেপির জোট তিন শতাধিক আসন পাবে বলে দাবি করে আসছিলেন। মজার কথা হল, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক পাশে বসা মোদীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বলছিল না। ঐ সাংবাদিক সম্মেলনের পুরা সভা পরিচালনা ও শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সবই অমিত একাই করছিলেন, মাঝে মোদী কেবল একবার তার প্রশাসনের পাঁচ বছর সমাপ্ত হল বলে নিজের কিছু অনুভূতি প্রকাশ ও শেয়ার করেছিলেন। তবে কোনো কারণে তিনি এদিন সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি, সব অমিত একাই সামলেছেন। দ্যা হিন্দু পত্রিকা বলছে, এটা গত পাঁচ বছরের শেষে এক বড় ব্যতিক্রম [At his first press conference in 5 years, Modi says Amit Shah will take questions]। তবে মোদীর বক্তব্যের শরীরী-ভাষ্য ছিল ভিন্নররকম। যেন তিনি বলতে চাইছিলেন, গত পাঁচ বছরের শাসন আর এই নির্বাচনী প্রচারণা মিলিয়ে যা কিছু পেরেছি সব করলাম। যেন তিনি এখন ভগবান ভরসায় আছেন যদি তিনি আবার তাঁকে ক্ষমতায় আনেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় তিনি আবার ফিরে আসছেনই এমন কনফিডেন্স, গত ২০১৪ সালের মত, মোদির নিজের ওপর আস্থা বা মোদি-জ্বর ইত্যাদি কোনটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিবিসি (১৮ মে দিবাগত) রাত দশটায় এক খবর ছেপেছে যেখানে বলা হয়েছে মোদী উত্তরপ্রদেশেরও আরও উত্তরে প্রাচীন কেদারনাথ মন্দিরে ধ্যানে বসেছেন। বিবিসি শিরোনামে বলেছে এটা মোদীর “স্পিরিচুয়াল ব্রেক” [spiritual break]। ঘটনা হল তিনি নিজেই বা তাঁর দল টুইটারে ছবিসহ এই খবর দিয়েছে। একই ছবি দিয়ে তবে বিবিসির একটু আগে মধ্যপ্রাচ্যের এক ইংরাজি দৈনিক গালফ টুডে রিপোর্ট করেছে যে এই  ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। টুইটারেও অনেকে  মন্তব্য লিখেছে। একজন বলছে তিনি গতদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের সময় থেকেই তিনি ধ্যানে [@Bhai_saheb: Yesterday modiji was meditating in press conference and today at kedarnath]। সে যাই হোক মোদীর “মন অশান্ত” এটা স্বপ্রকাশিতভাবে বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ আগেরদিনের সাংবাদিক সভায় মোদীর শরীরী ভাষায় যে তিনি নিজেকে “হবু বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী” হিসাবে কনফিডেন্ট মনে করতে পারছিলেন মনের সেই অস্থিরতার কথাই আজকের টুইটারের ম্যাসেজ থেকেও প্রতিষ্ঠিত হল। এমনিতেই মোদী চরম মিথ্যাবাদী বলে মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করেছিল দুদিন আগে যে – ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট তিনি অনেক আগেই ব্যবহার জানতেন বলে এমন আগের সময়ে তিনি দাবি করেছেন সেটা ভারতে বাণিজ্যিকভাবে  ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট চালু হবার বছর পাঁচেক আগের ঘটনা হয়ে যায়।

   ______________________

সর্বশেষঃ  আজ ১৯ মে সন্ধ্যা থেকে এই প্রথম এক্সিট পোলের মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য আসতে শুরু করেছিল। এক্সিট পোল মানে ভোটের বুথ ফেরত কিছু সংখ্যক লোকের সাথে কথা বলা – এমন নমুনার ভিত্তিতে সংগৃহিত তথ্যের বিশ্লেষণ মন্তব্য। এমন আটটা  কোম্পানি থেকে প্রকাশিত আট এক্সিট পোলের ফলাফল  মানে অনুমান-মন্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ছয়টাই বলেছে মোদীর জোট  আবার ক্ষমতায় ফিরবে। মানে ২৭২ এর বেশি আসন পাবেন। কেবল দুটা এক্সিট পোলের ফলাফল-অনুমান-মন্তব্যে একটা বলছে ২৪২, অন্যটা বলছে ২৬৭ আসন পাবে। বলাই বাহুল্য এগুলো খাটি অনুমান মাত্র, সত্যি ফলাফল নয়। আর ভারতের নির্বাচনে এর আগে এক্সিট পোলের অনুমানের পুরা উলটা ফলাফল বাস্তবে হয়েছে এমন রেকর্ডও আছে। তাই  আসল ফলাফল পেতে ২৩ মে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আমরা সতর্কতা হিসাবে ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি
(প্রাক্তন বিজেপি নেতা) ভেঙ্কায় নাইডু বলছেন, “Exit polls do not mean exact polls...Since 1999, most of the exit polls have gone wrong”- উনার এই কথাটা মনে রাখতে পারি।______________________

ওদিকে  কেবল নন-কনফিডেন্ট মোদী কেবল চেহারাতেই নয়, মোদী সম্ভবত যে ফিরে ক্ষমতায় আসতে পারছেন না সে ব্যাপারটা চার দিকে সেভাবেই খবর ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অন্তত নির্বাচন শুরুর পর থেকে। প্রায় পাঁচ জোড়া নির্বাচনী-বিশ্লেষক গ্রুপ কেউই নির্বাচন শুরুর (১১ এপ্রিলের) পর থেকে আর ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে, মোদী আবার ক্ষমতায় আসছেন। শুধু তাই না, এবার মিডিয়াগুলোও তাদের মূল্যায়নে বলা শুরু করেছে, মোদির বিজেপি ও তাঁর জোট এনডিএ-কে সাথে নিলেও সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসন ) বিজেপি পাচ্ছে না। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোকে ভাগিয়ে নিজ নিজ জোটে ঢুকিয়ে নিতে ফলাফল ঘোষণা হবার পরে হর্সেস ট্রেডিং বা  এমপি কেনা-বেচার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠল। আর কংগ্রেসের বেলায় বলা হচ্ছে, ফলাফলে যদি তার মোট প্রাপ্ত আসন এক শ’র নিচে হয়, তবে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি ছেড়ে দেবেন আগেই; আর সেই সাথে জোটের অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবেন [কুর্সিতে অনড় নয় কংগ্রেস,বার্তা আঞ্চলিক দলগুলিকে]। আর যদি দেড় শ’র বেশি আসন পান, সে ক্ষেত্রেই কেবল জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল দরকষাকষিতে নামবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস যদি এক শ’র নিচে আসন পায় তবে আর কংগ্রেসের পক্ষের জোট ইউপিএ-এর পক্ষের কাউকে ভাগিয়ে মোদী তার এনডিএ জোটকে মোট ২৭২ এর উপরে নিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরাই ফেডারেল ফ্রন্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন করার সম্ভাবনা হাজির হয়ে যাবে।

নির্বাচন কেমন হলো?
এবারের নির্বাচন কেমন হলো? এক কথায় জবাব, খুবই খারাপ। ভারত-রাষ্ট্র আরেকবার আরেক ধাপ দুর্বল হয়ে গেল। এটা বলাই বাহুল্য যে কোন নির্বাচন কমিশন যখন নিরপেক্ষতা সততা স্বচ্ছতায় একটা সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাতে সবচেয়ে সবল হয়ে উঠে খোদ রাষ্ট্রটাই। ওর প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যত দৃঢ় হয়।  কিন্তু এবারের ভারতের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই এসব ক্ষেত্রেই অসফল; ফলে এই কমিশনই  ভারত-রাষ্ট্রকে পরাজিত করে দিল। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেল।

কিন্তু “আরেকবার” কেন? আর দুর্বল হওয়া মানেইবা কী?
সাধারণভাবে বললে, ভারত-রাষ্ট্র মূলত চালায়, চালিয়ে আসছে এর ব্যুরোক্র্যাটেরা। সেটাই হবার কথা এবং একমাত্র বিকল্প। কারণ ১৪০ কোটির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এক রাষ্ট্র, একে দক্ষ ব্যুরোক্র্যাটরাই একমাত্র চালাতে পারবে – এটাই স্বাভাবিক। অনেকে ভাবতে পারেন যে, কেন এভাবে বলা হচ্ছে যেখানে বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা তো সমাজে নেতিবাচক ধারণার বলে মনে করা হয়। হা তা থাকলেও মনে রাখতে হবে  বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা আসলে ইতিবাচক পজিটিভ এবং প্রয়োজনীয় শব্দ। প্রথমে এর সেই ইতিবাচক অর্থ বুঝতে হবে বুর‍্যোক্রাসির আসল মানে কী? আমাদের পরিবারগুলোর প্রধান ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা আমাদের মায়েরা। মা সন্তান, স্বামীসহ সব মেম্বারদের নিয়ে সবাইকে ভাত বেরে খাওয়ায় এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু ধরা যাক পরিবার বড় হয়ে যাবার কোন কারণে মা সন্তানদের মাথার কাছে নিয়ে হাত বুলিয়ে ভাল বেড়ে আর ভাত খাওয়াতে পারছেন না। তাই ম্যানেজ করার সুবিধার্থে মা নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছেন। এতে খাবার সবার পাতে পাতে আর তুলে না দিয়ে বাটিতে বাটিতে তরকারি বেড়ে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যেখানে কোনটা কার বাটি তা বুঝতে বাটির নিচে চিরকুটে নাম লিখে রাখা হয়ছে। এতে মার পক্ষে বড় সংসারটা ম্যানেজ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে, স্বাশ ফেলার সময় পাচ্ছেন। আর এখানেও মায়ের স্নেহ-মমতা প্রকাশ আছে অবশ্যই, তা টের পাওয়া যায় কিন্তু একটু পরোক্ষে। এটাই বুর‍্যোক্রেসি, এক বুর‍্যোক্রেটিক ম্যানেজমেন্ট।  বড় হয়ে যাওয়া যে কোন কাজ একমাত্র এভাবেই ম্যানেজ করা সম্ভব। এক লিখিত নির্দেশিকা বইয়ের মাধ্যমে বড় কাজ পরিচালনা।
এখন মা যাকে ম্যানেজার বা কেয়ারটেকার রেখে এই নতুন ব্যবস্থাপনা চালু রেখেছেন সেই ম্যানেজার এবার নিজের অসৎ কোন স্বার্থে মায়ের নির্দেশের উলটা মানে করল বা প্রয়োগ করল, আর মাও আবার তদারকি মনিটরিং করা ঢিলা দিল বা ভুলে গেল। অথবা মায়ের এক দুষ্ট সন্তান যে জানে, ডাক্তারের নির্দেশে তার এক বোনের বিশেষ যত্ন নিতে সেই  ভাগের বাটিতে বেশি মাংস থাকছে আজকাল  তাই  সেই দুষ্টু সন্তান এবার ম্যানেজারের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বাটি অদলবদল করে নিয়েছে ইত্যাদি  – এই যে পরিস্থিতি এখানে এসে এবার বুর‍্যোক্রাসির অর্থ হয়ে দাড়াবে নেগেটিভ। বুর‍্যোক্রাসির মানে হয়ে যাবে এবার অবহেলা, হ্যারাসমেন্ট দুর্নীতি ইত্যাদির এক ব্যবস্থা। তাহলে সারকথায় কোন কাজ ততপরতা যখ্ন বড় হয়ে যায় তা ম্যানেজ করতে বুর‍্যোক্রাসির বিকল্প কোন উপায় নাই। তাই আবার তদারকি মনিটারিং এর ভাল ব্যবস্থাপনা দিয়েই একে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বুর‍্যোক্রাসির অর্থ ইতিবাচক করাই একমাত্র পথ।

কাজেই যেখান থেকে কথা উঠেছিল,.১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতকে পরিচালনা করতে পারে কেবলমাত্র এক দক্ষ ও করিৎকর্মা এক বুর‍্যোক্রাসিই।  তবে এদের উপরে বসে রাজনৈতিক নির্দেশ দিতে, ভালো রাজনীতি ও রাজনীতিবিদও অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র চালানো শুধু ব্যুরোক্র্যাটদের কাজ নয়। এ ছাড়া শক্ত এক বিচার বিভাগও আরেকটা খুবই প্রয়োজনীয় অঙ্গ। ওদিকে নির্বাচন কমিশনও আছে – এরাও মূলত ব্যুরোক্র্যাটেরই অংশ। তাই তাদেরও শক্ত ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বলা হয়ে থাকে, সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (১৯৯০-৯৬) টিএন সেশন – তিনি তার আমলে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ও কঠোর সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে, আর সেটাই নির্বাচন কমিশনের আজকের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রধান উৎস। কিন্তু তবু এবারের নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশন ‘পরাজিত’।  অনুমান করা হচ্ছে রাজনীতিবিদের কারণে প্রভাবিত হয়ে দ্বিতীয়বার ভারত-রাষ্ট্রের পরাজয় ও দুর্বল হওয়ার ঘটনা ঘটল। চলতি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনাস্থা জমেছে পাহাড় প্রমাণ।

এবারের নির্বাচন ছিল পরিচালনের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এক নির্বাচন। যার মূল কারণ হল, মোদীর অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। আর তা থেকে পালাতে আড়ালে যেতে তিনি নির্বাচনকে সাজিয়েছেন “হিন্দুত্বকে” মুখ্য বা কেন্দ্র করে। হিন্দুত্বই শ্রেষ্ট এবং সবকিছু – এই বক্তব্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান হিসাবে মোদী তাঁর সব সংজ্ঞায়িত বা অসংজ্ঞায়িত ক্ষমতাকে অপব্যাবহারে কাজে লাগাতে নেমে গেছেন যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ভোটের স্বার্থে মুচড়ে ব্যবহার করা যায়। এতে তাঁর সৃষ্ট এই অযাচিত চাপ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা দ্বিধাগ্রস্থতা থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই বিশেষত মোদীর বিরুদ্ধে একশন নেবার ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে গেছে।  দ্বিতীয় সদস্য তাঁকে কোনঠাসা ও উপেক্ষা করে রেখেছে প্রধানসহ অন্য জন – মিডিয়াতেই এই অভিযোগ এসে গেছে।
এককথায় বললে, রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান যখন আইন মানতে চান না বা তাঁর বিরুদ্ধে যখন আইন প্রয়োগ করা যায় না বা প্রয়োগ কর্তা ভীত হয়ে এড়িয়ে চলতে চায় – এটা হল সেই অবস্থা। মূলত এটা রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া, অকেজো নন-ফাইশনাল হয়ে পড়ার পুর্বলক্ষণ। এমন অসহায় অবস্থার প্রকৃত  মানে বা ইঙ্গিতটা হল, রাষ্ট্রকে আবার ঢেলে সাজানো, নতুন করে প্রজাতন্ত্র গড়বার মুরোদ দেখানোর জন্য রাষ্ট্র আহবান জানাচ্ছে।

এমনই, প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি আসন থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘কারচুপি করে’ জিতেছিলেন – এই অভিযোগে ১৯৭১ সালেই মামলা হয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টে। এরই রায় এসেছিল ১২ জুন ১৯৭৫ সালে। সেবার আদালত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে সশরীরে এসে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিলেন, এমনকি আদালত পুলিশের নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর আদালতে প্রবেশ অনুমোদন করে নাই। বরং আইন সংশ্লিষ্ট সব পেশার লোক যারা আদালতে আসেন তাদের নিয়ে গড়া এক হিউম্যান চেইন – এর ভিতরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে রেখে আদালতের এমন নিজস্ব নিরাপত্তায় ইন্দিরা গান্ধী এজলাসে উঠে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু  রায় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে যায়, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাতে ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আপিল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত করেছিল আর কয়েকমাস পরে, ৭ নভেম্বর বিস্তারিত শুনানিতে সব শাস্তি রদ করে দেন। কিন্তু এর অনেক আগেই ঘটনা অন্য দিকে গড়ায় ও গতিমুখ বদলে যায় ।

হাইকোর্ট তার মূল রায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনে জিতবার দায়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওই কারচুপির নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে দেন। এছাড়া ইন্দিরার প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এর আগেই অন্য কাউকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়ার সংসদীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী ২০ দিন সময় দিয়ে ঐ নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু এখানেই নির্বাহীপ্রধান ইন্দিরা আইনের উর্ধে উঠে যেতে চাইলেন।

ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে যেন ক্ষমতা ছাড়তে বা সাজা খাটতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে পরবর্তি ২০ দিন শেষ হওয়ার আগেই ২৫ জুন ১৯৭৫ সারা দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে বসেন। এতে তিনি নাগরিক মৌলিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার, মিডিয়ায় সেন্সরশিপ আরোপ ইত্যাদি প্রায় সবকিছু করার সুযোগ নেন, সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। কনস্টিটিউশনাল জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে তিনি পাল্টা দাবি করেছিলেন যে, ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং তা ঠেকাতে’ এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। এভাবে স্রেফ নিজেকে বাঁচাতে তিনি রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশনকে অকার্যকর ও দুর্বল করে ফেলেন, খরচের খাতায় ঠেলে  দেন।
প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতাকে বা ক্ষমতাকেন্দ্র একক রাখতে হয় বিভাজ্য করা যায় না। একে বিভক্ত বা কোনো শরিকানা করার ভুল করা যায় না। একথা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে এই ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্যও কিছু পদক্ষেপ থাকতে হয়। যেমন কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও নির্বাহী প্রধানের বৃহত্তর অধীনেই রেখে; তবে ব্যক্তি না বরং নন-পারসনাল, অবজেকটিভভাবে ওর ক্ষমতা স্ট্যাটুটরি বিধানে বর্ণিত করে রেখে দেয়া হয়। যেমন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিষ্ঠান, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কম্প্রোটোলার জেনারেল নিয়োগ ইত্যাদির বেলায়। অথবা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে (তুলনামূলক অর্থে) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে স্বাধীন করে রেখে দেয়া খুবই দরকার হয়; যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া বা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় এবং যাবেই। কারণ শত আইন করে, লিখে রেখে এমন বিপর্যয়গুলোকে বন্ধ করা যাবে না। কারণ নির্বাহীপ্রধানই যদি আইনের উর্ধে উঠে যেতে চান তখন কী হবে! এর জবাবে বলা হয়, যাদের দিয়ে ক্ষমতার এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হবে, ক্ষমতার চর্চা হবে তারা নিজেরা প্রজ্ঞাবান হবেন – এটাই এর একমাত্র প্রতিকার। বিশেষ করে নির্বাহী প্রধানের হাতে এবং যার যার এখতিয়ার পেরিয়ে অন্যের সীমানায় ঢুকে পড়া, কোনো সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। আর সর্বোপরি, কেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে এমন করে রাখা হয়েছে, এর সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

কিন্তু না হলে?  অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন (যেটা সাধারণত নির্বাহী প্রধানের হাতে ঘটে থাকে, সেই ইংল্যান্ডের রাজার আমল থেকেই) ঘটলে তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা ও ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার কারণে রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়বে। তাই ঘটেছিল।

ভারতের জরুরি আইন জারির প্রায় দুবছর পরে ইন্দিরা গান্ধী (২১ মাসের) জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে, ১৯৭৭ সালে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিলেন এবং গোহারা হেরেছিলেন। তিনি নিজে এবং বড় সন্তান সঞ্জয় গান্ধী এতে পরাজিত হন অর্থাৎ পরোক্ষে শাস্তি পেয়েছিলেন বলা হয়। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতার দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এরই একটা দাগ হল এবারের নির্বাচনে এই দুরবস্থা।

কারণ ইন্দিরার ঐ ঘটনা এরপর থেকে ভারতের বিচার বিভাগ বা প্রশাসনে জড়িয়ে থাকা পেশাদার ব্যক্তিরা একটা শিক্ষা নিয়ে থাকবেন সম্ভবত – সেটা হলঃ  তারা কোনো দুর্দমনীয় নির্বাহী প্রধান মানে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে যাবেন না। বরং পরোক্ষে (কমন বন্ধুকে পাঠিয়ে) তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকবেন; আর বাস্তবে মুখোমুখি কোনো সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টা করবেন। খুব সম্ভবত ইন্দিরার ঐ ঘটনা সম্পর্কে তাদের মুল্যায়ন হল আদালতের ঐ একশন শেষ বিচারে কাউন্টার প্রডাকটিভ। তাই মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে মুখ বাঁচাতে হবে, সেটাই বেটার।  যেমন ওই মামলাতেই লক্ষণীয় হল, সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই সাজার রায় উল্টে দিয়েছিলেন। যদিও জরুরি আইন জারি থাকায় সে আমলে এটা করা তত জরুরি ছিল না। কিন্তু আসলেই কী এটা “বেটার”!

নরেন্দ্র মোদীর এই পাঁচ বছরে নির্বাহী ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অনেকবার তিনি ঘটিয়েছেন।  রিজার্ভ ব্যাংকের গর্ভনরের উপর চাপ সৃষ্টি অথবা নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা সিবিআই এর প্রধানকে অপসারণ করা নিয়ে বেপরোয়া হয়ে অনেক জল ঘোলা করেছেন। সেসব রেখে কেবল এবারের নির্বাচনের কথায় আসি। অন্যান্য বারের মত এবারের নির্বাচনের আগেও ভারতের নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ এক আচরণবিধি জারি করেছিল। সেখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে কোনো নির্বাচনী বক্তব্য দেয়া যাবে না, কাশ্মিরে পুলওয়ামায় প্যারামিলিটারি গাড়িবহরে হামলা বা এরপরে পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত ভারতের বিমান হামলা – এগুলোকে নির্বাচনী বক্তব্য বা পোস্টারে আনা যাবে না। বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু মোদী নিজেই  এসবগুলো আচরণবিধির সবই ভঙ্গ করেছেন। যেমন তিনি “তাঁর সেনাবাহিনীর” সাফল্য, যারা বালাকোটে সন্ত্রাসীদের বোমা মেরে ধ্বংস করে এসেছে “তাদের সম্মানে দেশপ্রেমে” এবারই প্রথম ভোটার’ যারা সে তরুণেরা যেন মোদীকে ভোট দেয়- এরকম প্রচারণার সব অভিযোগ মোদীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল।

কমপক্ষে পাঁচটা এমন সিরিয়াস আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এসেছিল মোদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক গড়িমসির পরে সব অভিযোগ থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীকে খালাস দিয়ে দেয় [EC’s clean chit to PM came amid dissent]। এটা দ্যা হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ঐ খালাস দেয়াটাই শেষ কথা নয়। কোনায় একতা শব্দ আছে “amid dissent”। যার মানে হল, Ashok Lavasa নামে এক নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে।

এছাড়া প্রথম দু-তিনটা অভিযোগ বা মামলার ক্ষেত্রে সে অভিযোগ প্রায় মাসখানেক ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রায় কাছাকাছি অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ৪৮ ঘণ্টা, আর এক বিরোধী নেতা মায়াবতীকে ৩৬ ঘন্টা নির্বাচনি প্রচার ততপরতা চালানো থেকে বিরত থাকার শাস্তি দেয়া হয়েছিল। যোগী আদিত্যনাথও ঐ একই “মোদি কা আর্মি” বলে সম্বোধন করে মোদীর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। এছাড়া আবার অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ যেখানে রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন কমিশন শাস্তি দিয়েছিল, সেখানে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে কমিশনের কেন্দ্র দিল্লির অফিসে।

ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল তাদের পদক্ষেপ-হীন অভিযোগ ফেলে রাখার  নানান উদাহরণ দিয়ে। কিন্তু তবু আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক রায় শুনাতে যায় নাই। এর স্বপক্ষে অবশ্য আদালতের শক্ত যুক্তি আছে যা ভ্যালিড। তাই আদালত রায়ে বলেছে,  ‘কমিশন স্বাধীনভাবে এসব ব্যাপার নিজেই বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি দিতে পারে’  – এভাবে বলে এক উৎসাহিত করার রায় দিয়েছে। এর পেছনের সুপ্রিম কোর্টের শক্ত অবস্থান আছে বলে  আমরা নিজেরাই অনুমান করতে পারি। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের মতোই নির্বাচন কমিশনের নিজেরও বিচারিক ক্ষমতা আছে। ফলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হল, আগেই নিজে হস্তক্ষেপ না করা, বরং কমিশনের নিজের বিচারিক ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালনের জন্য যে ক্ষমতা আছে, তা ব্যবহার প্রয়োগ করতে পর্যাপ্ত সময় সুযোগ করে দেয়া, যাতে কমিশন তা ব্যবহার করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট আগেই হস্তক্ষেপ করতে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠত। ফলে এটা এড়ানো সুপ্রীম কোর্টের সঠিক পদক্ষেপ।

কিন্তু আমরা দেখছি, নির্বাচন কমিশন মোদীর নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাত করতে চায় নাই, এড়িয়ে যাবার পথ ধরেছে গেছে। এটা এখন দগদগেভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা মিডিয়াও প্রসঙ্গটা তুলেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে  যথেষ্ট সক্ষম ও দক্ষ এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। যদিও বাংলাদেশের গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি দল হয়ে এসে কী ভূমিকা নিয়েছিল আমরা জানতেই পারি নাই। বলাই বাহুল্য তাদের সফর কূটনীতির বুদ্ধিতেই পরিচালিত হয়েছিল, কমিশন পর্যায়ের বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ হয়নি।

সাম্প্রতিককালে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অপব্যবহার করে কিছু স্টাটুটারি প্রতিষ্ঠান যেমন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা তদন্ত প্রতিষ্ঠান সিবিআইর প্রধানসহ অনেকের সাথে, তাদের তুলনামূলক স্বাধীন থাকার ক্ষমতা ক্ষুন্ন করতে গিয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছিলেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হয়তো বিজেপি দলের; কিন্তু স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও ক্ষতযুক্ত করে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী দাগ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় এর ‘কাফফারা’ দিতে হতে পারে।

খুব সম্ভবত মোদীর আগের এসব তৎপরতা দেখেই এর প্রতিক্রিয়ায় এবার নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে। কিন্তু তাতে কী? ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল করে ফেলার দুর্ঘটনা কী এড়াতে পেরেছে – সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে! এটা ভারত-রাষ্ট্রকে অনবরত তাড়া করতেই থাকবে; সম্ভবত কখন কোন কাফফারা আদায় করে নিবে, কে জানে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৮ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)মোদির শরীরী ভাষা তা নয় এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

গৌতম দাস

১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2Ae

 

চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

“কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে” এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মাহাথির কায়দায় ‘ঋণফাঁদে’র গল্প মোকাবেলা

মাহাথির কায়দায় ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলা

গৌতম দাস

২৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2zH

 

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ, বাংলাদেশে তাকে চেনেন না এমন লোক খুব কমই আছে। অবশ্য নিজ স্বার্থে কেউ কেউ নিজের আকামের পক্ষের সাফাই হিসাবে তাঁর নাম মুখে নিয়ে থাকেন  ঢাল হিসেবে মাহাথিরকে ব্যবহার করে থাকে। মালয়েশিয়ার টানা পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী আর ১৯৮১-২০০৩ সাল, এই ২২ বছরের সক্রিয় রাজনীতিবিদ তিনি। প্রাকটিসিং সরকারি ডাক্তারির চাকরি রেখে ১৯৬৪ সাথে প্রথম পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল। তার শাসনকালের প্রধান সাফল্য মনে করা হয়, মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে তিনি বিপুল উঁচু স্তরে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ার শিল্পায়িত ভবিষ্যত তাঁর হাতেই আলো দেখেছিল। আবার তিনিই এমন রাজনীতিবিদ ষাটের দশকের শেষভাগে যেটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথমপর্যায় ছিল, তখন  তারই লেখা একটা বই – তারই দলের সরকার এর প্রকাশনা ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরিণতিতে যা তাঁকে রাজনীতি ও দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কারণ প্রকাশিত “মালয় ডিলেমা” নামে ঐ বইয়ে তিনি স্থানীয় মালয়বাসীর পক্ষে, তাদের জীবনে অসাম্য দূর করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। মালয়েশিয়া মূল চারটা নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠির [race or ethnic groups] দেশ মনে করা হয়। [এই কথাগুলো মালয়েশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান বিভাগের এই রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে।] সেখানে ২০১০ সালের জনসংখ্যা রিপোর্টের উপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলা হয়েছে। ঐ চার এথনিক গোষ্ঠি মধ্যে ভুমিপুত্র [Bumiputera (inclusive of Malay and Indigenous)]  মিলিয়ে এরা ৬০ ভাগ বলা হয়েছে [Bumiputera, the main ethnic constituted 60.3 per cent]। আর চীনা-অরিজিন মালয়েশিনেরা ২২.৯% [Chinese and Indians at 22.9 and 6.8 per cent] বলা হয়েছে।  ভুমিপুত্ররা সংখ্যায় বেশি কিন্তু চীনা-অরিজিন মালয়েশিয়ানদের চেয়ে বেশি গরীব বলে মাহাথির ঐ বইয়ে দাবি করেছিলেন ভুমিপুত্রদের সামাজিক-অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধায় কিছুদিন বেশি দেয়া হোক। (আমাদের পাহাড়ি কোটার মত যেটাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘এফারমেটিভ একশন'[affermative action] বলা হয়ে থাকে।) কিন্তু ততকালীন প্রধানমন্ত্রী আব্দুল রহমান [Prime Minister Abdul Rahman] এসব কথা তোলাতে এথনিক বিবাদ লড়াই না উস্কে উঠে এই ভয়ে তা চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এথেকেই সেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এগুলো সবই ১৯৭২ সালের আগের ঘটনা। তবে ১৯৭২ সালে ঐ প্রধানমন্ত্রীর টার্ম শেষ হয়ে তিনি অবসরে গেলে, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে, মাহাথির আবার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যান। এর পর থেকে তার রাজনৈতিক জীবনের কালো দিন কেটে যায়, তাকে আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি। ১৯৭৪ সালে তিনি মন্ত্রীসভায় স্থান পান, আর ১৯৮১ সালের পর থেকে টানা পাঁচ টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্বের দিন শুরু হয়ে যায়। তবে তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁর গৃহিত অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য দিয়েই তিনি বিভক্ত এথনিক জনগোষ্ঠিগত অসাম্য দূর করেছিলেন। [Mahathir sought to bridge Malaysia’s ethnic divisions by increasing general prosperity. ]

এ সময়কালে এক দিকে তার পরিচালিত সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য যেমন সত্য, তেমনি অন্য দিকে তিনিই ১৯৮৭ সালে ‘ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ [Internal Security Act] নামে কালো আইন পাস ও তা আরোপ করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। এভাবে ২০০৩ সালে তিনি তাঁর পাঁচ টার্ম প্রধানমন্ত্রীত্ব শেষ করে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের দিনে (২০১৮ সালের নির্বাচন থেকে) তিনি আবার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জোটসঙ্গী করে নির্বাচনে জিতে এখন ক্ষমতায়। যদিও সেকালে ঐ ১৯৮৭ সালের কালো আইন দিয়েই মাহাথির, আনোয়ার ইব্রাহিমসহ বহু বিরোধী নেতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টকে বন্দী করে রেখেছিলেন। এতে সেসময় মোট চারটি দৈনিক পত্রিকা বন্ধ এবং মোট প্রায় ১০৬ জন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাকে গ্রেফতার করেছিলেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ক্ষমতা খর্ব এবং কাউকে কাউকে পদত্যাগ করতে বাধ্যও তিনিই করেছিলেন। এভাবে বেপরোয়া মানবাধিকার কেড়ে নেয়াতে আমেরিকাসহ দেশী-বিদেশী অনেকের ভাষায় ও চোখে তিনি ‘স্বৈরশাসক ও নিপীড়ক’ হয়ে উঠেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই বৈপরীত্যের কারণে আমাদের কালের অনেক “স্বৈরশাসক” নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে মাহাথির মোহাম্মদের নামের আড়ালে নিজেদের অপকর্ম লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকেন।

২০০৩ সালে মাহাথির রাজনীতি থেকে অবসরে চলে গেলেও তিনি মালয়েশিয়ার নির্বাচনে (গত ২০১৮ সালের মে মাসে) কোয়ালিশন জোটে বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছেন এবং ৯৩ বছর বয়সে এখন আবার প্রধানমন্ত্রী। একালের মাহাথিরসহ তাঁর জোটসঙ্গীদের দাবি, এই জোট গড়ার মূল কারণ নাজিব রাজাকের অপশাসন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাকের আমলের কুশাসন ও ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতি থেকে মালয়েশিয়াকে বাঁচাতে জেলে বন্দী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথেই জোটবদ্ধ হয়ে মাহাথির আবার নির্বাচনে নামেন এবং বিজয়ী হয়ে জোটের বোঝাপড়া অনুসারে, এখন প্রথম দুই-তিন বছরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আছেন।

আমাদের আজকের আলোচনার বাকি অর্ধেক অংশের প্রসঙ্গ চীন। এটাকে বলা যেতে পারে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের চীন অথবা নতুন করে চলতি চীন-মালয়েশিয়া গভীর সম্পর্ক স্থাপন কেন সম্ভব হল, সেটাই প্রসঙ্গ।

আগের প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের শাসনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল, ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট। আর এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ঘটনা হল 1MDB প্রকল্প। 1MDB মানে ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলবমেন্ট লিমিটেড” (মালয় ভাষায় বেরহাড) নামে এক কোম্পানি। এটা মালয়েশিয়ান অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজ মালিকানাধীনে  “উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার চিন্তায়” নেয়া এক কোম্পানির নাম। আগ্রহিরা প্রভাবশালি মিডিয়া ব্লুমবার্গের এই রিপোর্ট-টা পড়ে নিতে পারেন।  কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা কখনো নিজ-সক্ষমতার [insolvent] কোম্পানি হয়ে উঠতে পারে নাই। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে অচচ্ছভাবে  লেনদেন, মানি লন্ডারিং, অর্থ নয়ছয় ও চুরির অভিযোগে নজরদারিতে পরে যায়। ব্লুমবার্গ এনিয়ে রিপোর্টের শিরোনাম থেকেই একে মহা অর্থ-কেলেঙ্কারি Scandal বলে চিহ্নিত করেছে।

বলা হয়েছিল, এটা আসলে মালয়েশিয়া সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন প্রকল্প, লক্ষ্য ফান্ড সংগ্রহ; কিন্তু বাস্তবে এটা আমেরিকা-সুইজারল্যান্ডসহ সাত দেশের বিভিন্ন বিনিয়োগ ফান্ড কোম্পানির সাথে মিলে দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ নিয়ে যাওয়াসহ বহু অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির এক প্রকল্প হিসেবে হাজির হয়। মোট প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার এখানে ‘নয়ছয়’ হয়েছে। এ ছাড়া, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের গত কয়েক বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ষ বিনিয়োগ কোম্পানি “গোল্ডম্যান স্যাস” [Goldman Sachs ] এতে জড়িত বলে আমেরিকার আইন বিভাগ সে অভিযোগ তদন্তে নেমেছে, মামলা করেছে। স্যাক্সের অন্তত তিনজন ব্যাঙ্কার এই মামলায় আসামি।  ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাক ও তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে এই প্রকল্প থেকে প্রায় বিলিয়ন ডলার অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কীভাবে এত অর্থ রাজাকের একাউন্টে এল, গত নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাজাক এর কোন সদুত্তর দিতে পারেন নাই। এভাবে এক মহা-কেলেঙ্কারির দুর্নীতি মামলায় রাজাক ও তার স্ত্রী এখন জেলে।

East Coast Rail Link (ECRL) from railprofessional.com

ওদিকে এই 1MDB প্রকল্প ছাড়াও আরও এর বাইরে চীনের সাথে নেয়া বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্পে মালয়েশিয়াকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে মাহাথির জোটের অভিযোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হল, চীনের সাথে নেয়া “ইস্ট কোস্ট রেল লিঙ্ক প্রকল্প” (East Coast Rail Link, ECRL)। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এটা এক বড় প্রকল্প এবং  নির্মিত হয়ে গেলে এটা চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত ও অংশ হয়ে যাবে। মালয়েশিয়ার পূর্ব-পশ্চিম দু’দিকেই সমুদ্রসীমানা। এই প্রকল্প পূর্বের কেলানতান বন্দর থেকে উপকূল বরাবর নেমে পশ্চিমে গিয়ে সেখানকার ক্লাঙ্গ বন্দরের সাথে যুক্ত হবে – এমন রেল যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রকল্প এটা। বলা হয়, নাজিব সরকার বিপুল ব্যয় করে এই প্রকল্প নিয়েছিল ‘ভালো কমিশন’ পাওয়ার স্বার্থে। তাই এত বড় বিনিয়োগের ভার তাদের অর্থনীতি বইতে পারবে কি না সে দিক উপেক্ষা করেছিল।

মাহাথির এবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ২০১৮ সালের মে মাসের নির্বাচনে। এর তিন মাসের মধ্যে আগষ্ট ২০১৮ তিনি চীন সফরে চলে যান যার মূল ইস্যু এই ECRL প্রকল্প। সেকালে এই প্রকল্প নিয়ে মাহাথিরের জনসমক্ষে বলা প্রধান যুক্তি ছিল, “আমার দেশ এত বড় বিনিয়োগের ভার সইতে পারবে না, অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে”।  তিনি চীনাদেরকে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পরে যেতে পারা – এই দুর্দশার দিকটা আমল করতে বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ভুল বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প – এমন বলছেন না। এদিকে চীনা ঠিকাদার কোম্পানির হাতে প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে, মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হয়েই চীনের সাথে কথা বলে প্রকল্পের কাজ স্থগিত করিয়ে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন।

একালে এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ব্যাপক হারে অবকাঠামো খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেখা যায়। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই আবার চীনা ‘বেল্ট-রোড’ মহাপ্রকল্পে যুক্ত হওয়ার কথা। তাই  চীন-ঠেকানোর বুদ্ধিতে স্বভাবতই এসব প্রকল্পের চরম বিরোধী অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্পের আমেরিকা। সাথে কিছু থিংক-ট্যাংক প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এমনই এক প্রপাগান্ডা শব্দ-চিহ্ন হল – “ঋণের ফাঁদ” [Debt Trap]।

এই প্রপাগান্ডার সারকথা বা দাবি হল, চীন বিভিন্ন দেশকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে নিজের কব্জায় নিয়ে ফেলছে। এমন অভিযোগ সত্তর দশকে এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রথম আগমনের সময় থেকে বিশ্বব্যাংকের, মানে আমেরিকার বিরুদ্ধেও ঊঠেছিল বা দেয়া হত। মজার বিষয় হল, আমেরিকা এখন সেই ভাষাতেই  চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা-অভিযোগ আনছে। এটা চীনবিরোধী মোক্ষম প্রপাগান্ডা বলে তা ভারতের (বিশেষ করে তার মিডিয়ার) কাছেও খুবই লোভনীয়। নিয়মিতভাবেই ভারতের মিডিয়া এই ফাঁদের প্রপাগান্ডায় মেতে আছে।  একারণে “ঋণের ফাঁদ” বিষয়ক ভারতীয় উৎসের যেকোন রিপোর্ট পাঠ বা রেফার করার সময় সতর্কতা থাকা জরুরি যাতে ভারতীয় মিডিয়া-প্রপাগান্ডার শিকার না হতে হয়। ভারতের কৌশলগত কূটনৈতিক অবস্থান হল চীন-ঠেকানোর এই প্রপাগান্ডায় অংশ নেয়া। কিন্তু ঘটনা হল, এমনকি জেনে অথবা না জেনে আমাদের প্রথম আলোতেও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

চীনা “ঋণের ফাঁদ” বা বেল্ট-রোড বিরোধী প্রপাগান্ডার এপর্যন্ত সবচেয়ে মোক্ষম রিপোর্ট হল, থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভলবমেন্টের রিপোর্ট। আবার এর যুক্তিগুলোকে কেটে পালটা বক্তব্যের অবস্থানও আছে এখানে এক ডাচ কনসালটেন্টের বক্তব্যে।

কিন্তু ভারতের চীনের বিরুদ্ধে আপত্তির বিপরীতে একটা মজার দিক আছে। সেটা হল, খোদ ভারতেও চীনা বিনিয়োগের অর্থে নেয়া এমন অবকাঠামো প্রকল্প কম নয়। এমনকি চীনা ‘ব্রিকস’ উদ্যোগে নেয়া ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (যা বিশ্বব্যাংকের মত প্রায় একই কাঠামোতে চলে) নামে একটা অবকাঠামো ব্যাংক আছে – যার বিনিয়োগ প্রকল্পের একমাত্র খাতক হল ভারত; কিন্তু এসব চীনা প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের জন্য তা ‘ঋণের ফাঁদ’ এমন কোনো অভিযোগ নেই ভারতের। এর মানে, অন্তত বোঝা গেল যে, চীনা ‘ঋণফাঁদের’ খারাপ স্বভাব চরিত্র ভারতে এলে ভাল হয়ে যায়। যেন খারাপ “চীনা খাসিলত” আর কাজ করে না।

তবে লক্ষণীয় হল, এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান বা মালয়েশিয়ায়- যেখানে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয়েছে- সরকার বদলের সাথে সাথে সব দেশেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব আপত্তি নিয়ে নতুন সরকারগুলো চীনা সরকারের সাথে কোনো সঙ্ঘাতের সম্পর্কে যাওয়া ছাড়াই বরং আপস আলাপ আলোচনা সব ক্ষেত্রই আপত্তি মীমাংসা করতে পেরেছে। অর্থাৎ সে সুযোগ ছিল এবং তা নেয়া হয়েছে বোঝা গেছে। আর এই আলোচনা শেষ হয়েছে পুনরায় নেগোসিয়েশন ও আগের চুক্তিটা সংশোধিত ও নবায়ন করার ভেতর দিয়ে। সারকথায় কোথাও কোনো প্রকল্প অমীমাংসিত বিতর্কে আটকে যায়নি। বড় জোর এক বছরের মধ্যে নিরসন করা হয়েছে মানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যায়নি এবং এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই হয়েছে। চীন কোন আদালত ‘আইন’ দেখায় নাই;  বাড়তি ক্ষতিপূরণ দাবি, জোরাজুরি বা চাপ দিচ্ছে এমন অভিযোগ কোথাও – এমনকি আমেরিকান প্রপাগান্ডার ভেতরেও নেই।

যদিও একথা সত্যি যে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চীনা প্রকল্প নেয়ার সময় এশিয়ার সরকারগুলোকে প্রকল্প থেকে বেনামে কমিশন দেয়া হয়েছে। আর একালের বিশ্বব্যাংকের নেয়া প্রকল্পের সাথে তুলনা করলে বলা যায়, এ ব্যাপারে চীনা প্রকল্প কম স্বচ্ছ এবং এ’পর্যন্ত দাঁড়ানো বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা যেন ওর লক্ষ্যই নয়।

যা হোক, মাহাথিরের ক্ষেত্রেও এবার তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তিন মাসের মধ্যে (আগস্ট ২০১৮) চীন সফরে প্রকল্প নিয়ে তার আপত্তি একইভাবে চীন আমলে নিয়েছিল। সফর থেকে ফিরে তিনি বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্পের খরচ বেশি, যা আমাদের বইবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই, তাই এখনকার মতো এটা বাতিল করতে হচ্ছে।’  [‘We just can’t pay’: Mahathir ] তবে ‘চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক অটুট থাকবে, কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলা ছাড়াই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’ [Malaysia has seen a change of government, its foreign policy concerning China remains the same.”]।

পরে এ বছর জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা এই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে মালয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বরাতে রয়টার্স জানাচ্ছে, অর্থমন্ত্রীও একই কারণ জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রকল্প বাতিলের জন্য ক্ষতিপূরণ কত দিতে হবে এ নিয়েও ঠিকাদারের সাথে কথা চলছে বলে জানিয়েছিলেন।

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল ভারতসহ আমেরিকান প্রপাগান্ডিস্টরা। চীনা প্রকল্প নিয়ে কতগুলো দেশ পরে সরকার বদলের সাথে প্রকল্প বাতিল বা সংশোধিত চুক্তি করেছে, এই উদাহরণের তালিকায় মালয়েশিয়াকে যুক্ত করে আরেকটা দেশ হিসেবে দেখিয়ে কথিত চীনা ‘ঋণের ফাঁদের’ কথিত ভয়াবহতা তুলে ধরতে শুরু করেছিল তারা। এর পর থেকে প্রপাগান্ডা জোরে শোরে চলছিল চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এক আমেরিকার ভদ্রলোক লিখেছিলেন, “the debt-trap argument gained further credence after Malaysian Prime Minister Mahathir Mohamed cancelled $23 billion in BRI projects and warned China against falling prey to ‘a new version of colonialism,’” according to Haenle.

কিন্তু গত ১২ এপ্রিল এই প্রসঙ্গে হংকংয়ের এক মিডিয়া  “সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট” সব উলটে যাবার খবর দিয়ে লিখছে , ১২ এপ্রিল মালয়েশিয়া জানিয়েছে যে, বাতিল হয়ে যাওয়া রেল প্রজেক্ট নিয়ে তারা আবার এক নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরো লিখছে, গত কয়েক মাসে কিছু ভুল কথা আর মাহাথিরের দুই ধরনের বক্তব্যের পরে এই চুক্তি আবার স্বাক্ষর হলো” [after months of false starts and contradictory statements from Prime Minister Mahathir Mohamad’s government on the future of the multibillion-dollar project”.।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে এবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হলো প্রপাগান্ডিস্টদের। কিন্তু কেন এমন ঘটল? কেন বাতিল চীনা রেল প্রকল্প মালয়েশিয়ায় আবার ‘জিন্দা’ হলো?

গরিবের অনাদরে পড়ে থাকা খাদ্য পামবীজ বা তা থেকে পিষে তৈরি করা পামঅয়েলকে মাহাথিরের মালয়েশিয়া দুনিয়াজুড়ে ভোজ্যতেলের প্রধান উৎস হিসেবে হাজির করেছিল। গুরুত্বপুর্ণ হল, তা আমেরিকান সয়াবিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এর ছাঁকনি টেকনোলজিসহ তেল বের করার পুরা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক টেকনিক্যাল অগ্রগতি হলে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসহ ওই অঞ্চলই ভোজ্যতেলের প্রধান সরবরাহকারী এলাকা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও সয়াবিন নামে যা বিক্রি হয় এর বেশির ভাগই আসলে রিফাইনড পামঅয়েল। এগুলো আমরা কমবেশি সবাই জানি। আমেরিকার সয়াবিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব সময় আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিত থাকতে হয় মালয়েশিয়াসহ উৎপাদক দেশগুলোকে। এভাবে ইউরোপের বাজারেও একটা বড় মার্কেটশেয়ার তৈরি করে ফেলেছিল মালয়েশিয়া; কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চলা কানাঘুষা এবার বোঝা গেল সত্যি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ‘পামঅয়েল চাষাবাদের কারণে ব্যাপকভাবে বনজঙ্গল ধ্বংস ঠেকাতে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পামঅয়েল ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেবে”[This month, the European Commission concluded that palm oil cultivation results in excessive deforestation and its use in transport fuel should be phased out by 2030.]।

খবরটা শুনে মাহাথির স্বভাবতই খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি এটাকে ইইউ’র বিবাদ-সঙ্ঘাত লাগিয়ে চলার মনোভাব হিসেবে দেখে বলেন, আমরা পামঅয়েল বিপ্লব ঘটানোতে যেখানে ‘এটা এখন চকোলেট থেকে লিপস্টিকসহ প্রসাধনী ও সাবানের প্রধান কাঁচামাল হয়ে গেছে- তখন ইইউ নিজের পণ্য, রাইসরিষার তেলের বাজার সংরক্ষণের জন্য এই দুশমনি’ শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ এমন ভালো জিনিস নয় যে, আমরা তা প্রমোট করতে চাই। কিন্তু তা বলে বড়লোকের দেশের গরিব দেশের মানুষকে আরো গরিবি হালে ফেলার চেষ্টা- এটা মারাত্মক অবিচার” [Mahathir, 93, said the EU’s increasingly hostile attitude towards palm oil, a commodity used in everything from chocolate spread to lipstick, was an attempt to protect alternatives that Europe produced itself, like rape seed oil.]।
এই মারাত্মক অবিচারের প্রশ্ন তুলতে পারা- এটাই মাহাথির যে আসল নেতা- এর পরিচয়। তিনি ইইউ’র বাজার দখল করার দিকটাকে সামনে আনলেন।

গত জানুয়ারি মাসে রেল লিঙ্ক প্রকল্প বাতিল করার পর থেকে নানা প্রসঙ্গে মাহাথির চীনের নেতৃত্ব নিয়ে নিজে অনেক ক্রিটিকাল হয়ে ভালমন্দের বিচার করেছেন। তবে ইতিবাচকভাবে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে আমেরিকার নেতৃত্বে কথিত “ঋণের ফাঁদের” কথা তোলা অথবা চীন নিজের হুয়াওয়ে ফাইভ-জি মোবাইল টেকনোলজি দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে ইত্যাদি প্রপাগান্ডা প্রসঙ্গে একপর্যায়ে তিনি পাশ্চাত্যবিরোধী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি সরাসরি স্পষ্ট করে বলে বসেন, ‘ধূর্ত আমেরিকানদের মোকাবেলা করতে ধনী চীনাদের পক্ষ নেবো” [I’d side with rich China over fickle US: Malaysia’s Mahathir Mohamad”]। শুধু তাই নয়, চীন প্রসঙ্গে তার অবস্থান আরো স্পষ্ট করতে তিনি বলেছেন, ‘উদীয়মান শক্তি চীন থেকে ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়ার চেয়ে ওদের সাথে কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলার একটা ভালো উপায় বের করতে হবে আমাকে” […to find ways of working with the rising power rather than to let fears…]। আবার বলছেন, ‘আমরা যখন থেকে চীনের সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছিলাম সে সময়ের গরিব চীনের দিকে আমরা ভীত চোখে তাকাতাম। আজ চীন বড়লোক, এখনো আমরা ভীত। এটা চলবে না। আমার মনে হয়, চীনের সাথে সম্পর্ক পাতানোর একটা ভালো উপায় আমাদের বের করতে হবে” [I think we have to find some way to deal with China.]।

মাহাথিরের সে উপায় হল, চীনের সাথে বাজার শরিক করার সম্পর্ক ও বুঝাবুঝি তৈরি করা। এই ফর্মুলায় সহজেই তিনি বিভিন্ন চুক্তিতে উপনীত হয়ে গেলেন। তাতে এখন থেকে আমেরিকান সয়াবিন নয়, বরং চীন হবে মালয়েশিয়ান পামঅয়েলের একচেটিয়া ভোক্তা। সেই খুশিতে মাহাথির এবার সেই পরিত্যক্ত চীনা রেল লিঙ্ক প্রকল্প- এতে বিভিন্ন জায়গায় সংশোধনী এনে হলেও আবার চীনের সাথেই এ নিয়ে চুক্তি করে ফেলেছেন। [Malaysia to ‘take advantage’ of ECRL deal to sell China more palm oil: Mahathir Mohamad]। তিনি চীনাদেরকে ভাল ব্যবসায়ী বলে প্রশংসা করে এক লম্বা ইন্টারভিউ দিয়েছেন এখানে, Chinese by nature are very good businesspeople’: Malaysian Prime Minister ।

শুধু তাই নয়, গত ২৫ এপ্রিল চীনে দ্বিতীয় বেল্ট-রোড সামিট মানে, বেল্ট-রোড ফোরামের সম্মেলন শুরু হয়েছে। আড়ম্বরের সাথে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তিন-চারজন অতিথি-বক্তার একজনও তিনি।

হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা “ঋণফাঁদের” অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মাহাথিরের পক্ষ পত্রিকা খোদ এডিটোরিয়াল লিখেছে। Editorial by SCMP Editorial।

কারও প্রপাগান্ডায় ভয় পাওয়া কোনো কাজের কথা নয়; বরং নিজ বুদ্ধিতে চীনের সাথে চলার উপায় বের করে আগানো শিখতে চাইলে মাহাথির আমাদের সামনে শিক্ষণীয় হয়ে থাকলেন। আমরা কী এই শিক্ষা চর্চার জন্য যোগ্য হতে পারব না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৭ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলার মাহাথির-পথ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

গৌতম দাস

২২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2zq

 

নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী ও সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তি – ছবি : TOI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, যা ভারতের ভাষায় “লোকসভার নির্বাচন” [General Election To Lok Sabha, 2019], তা অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় পর্ব গত ১৮ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। এভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ ভারতের ভোটপ্রদান  এবারও মোট সাত পর্বে এক মাসেরও বেশি দিন ধরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা করে পর্বের নির্বাচনের সমাপ্ত হবে। এভাবে নির্বাচন শেষ হবে সপ্তম পর্বটা আগামী মাসে, ১৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে। এরপর বাক্সবন্দী করে সব যার যার কেন্দ্রেই রাখা ভোট, ২৩ মে সকাল থেকে একসাথে গণনা শুরু হবে। এতে আশা করা যায়, ঐদিন বেলা ১১টার পর থেকে কে কোন আসনে এগিয়ে আছে, সেই অভিমুখ স্পষ্ট হতে শুরু করবে, আর সেখান থেকে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, সেই অভিমুখ বা ইঙ্গিতও জানা শুরু হয়ে যাবে। এভাবে দিন শেষে সন্ধ্যার পরে সব ফলাফল না এলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসছে।

এটা ভারতজুড়ে ৫৪৩ আসনের লোকসভা নির্বাচন; অর্থাৎ ভারতে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় যেতে হলে কোন দল বা জোটকে মোট ২৭২ ছাড়িয়ে (২৭২+) এরও বেশি আসন পেতে হয়। কারণ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত আরো দু’টি আসনও আছে তা যোগ হলে মোট আসন ৫৪৫ হবে।

ভারতের টিভি মিডিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন ড. প্রণয় রায়। তাঁর মিডিয়া প্রফেশনাল স্ত্রী রাধিকা রায় এনডিটিভি গ্রুপ কোম্পানি খোলার প্রথম উদ্যোক্তা। এর একমাস পরে প্রণয় রায় তাতে সহ-উদ্যোক্তা হিসাবে যোগ দেন। এভাবে দুজনে মিলে ১৯৮৮ সালে ‘এনডিটিভি’ মিডিয়া গ্রুপ চালু করেছিলেন। দু’জনে মিলে তাঁরা এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের শেয়ার মালিক। এই প্রণয় রায় ব্যতিক্রম অনেক অর্থে। তিনি অন্য মিডিয়া মালিক বা সম্পাদনার নির্বাহীদের সবার থেকে আলাদা এ জন্য যে, তিনি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, অর্থনীতির ডক্টরেট সেই সাথে ব্রিটেনে পড়ালেখা করা পেশাদার চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট।

এ ছাড়া যখন টিভি বলতে একমাত্র সরকারি টিভি বুঝত মানুষ, সেই যুগে তিনি ভারতীয় “দূরদর্শনে” অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করতেন। আরও সেই সাথে ভারতের নির্বাচনের সময় প্রাপ্ত নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য এবং অভিমুখ বিশ্লেষণ – এটা তখ থেকেই তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।ইংরাজিতে psephologist (উচ্চারণ “সিফোলজিস্ট”) বলে একটা শব্দ আছে। যার অর্থ নির্বাচনতাত্বিক; অর্থাৎ যিনি দক্ষতার সাথে  নির্বাচনে ভোটারেরা কোনদিকে ও কেন ভোট দিল সে তাতপর্য ও প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ভারতের মিডিয়া একমাত্র তাকেই নামের আগে ‘সিফোলজিস্ট’ বিশেষণ লাগিয়ে বলে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখা যায়।  যেমন  তামিলনারু ভিত্তিক দক্ষিণী ১৪০ বছরের প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক “দ্যা হিন্দু” লিখেছে, প্রণয় রায় সম্পর্কে –  “১৯৮০ সাল থেকে প্রণয় আর ভারতের নির্বাচন প্রায় সমার্থক কথা হয়ে গেছে। তাকে দিয়েই ভারতে “নির্বাচনতাত্বিক” শব্দটার ব্যবহার শুরু”। [“Prannoy Roy has been synonymous with elections since 1980. He pioneered opinion polls in India and introduced psephology to the country.”]।

পরবর্তীকালে ১৯৮৮ সালে নিজের “এনডিটিভি” চালু হলে ‘নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য ও অভিমুখ বিশ্লেষণ” করার ভারতের বাজারে তিনি আরও বিস্তারে পাইওনিয়ার বা অগ্রগামী বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। ইনি চলতি নির্বাচনের আগে এপ্রসঙ্গ নিয়ে তার বই [দ্যা ভারডিক্ট : ডিকোডিং ইন্ডিয়ান ইলেকশন… (The Verdict: Decoding India’s Elections. প্রকাশ করেছেন। বইটি হল, ভারতের নির্বাচনে ভোট প্রদানের অর্থ-তাতপর্য কী করে বের করতে হয়, তা নিয়ে। এরই এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

প্রণয়ের সেই বিচারে ১৯৫২ সাল  ভারতের লোকসভা নির্বাচনে শুরু হওয়ার পর থেকে, ভারতের ভোটারদের ভোট দেয়ার প্যাটার্নকে তিন আলাদা যুগে (একেকটা প্রায় ২৫ বছরে) তিনি ভাগ করতে চান। প্রথম ২৫ বছর ধরে (১৯৫২-১৯৭৭) ভোটারেরা একনাগাড়ে, স্বাধীন ভারত পাওয়ার আবেগ ও জোশে কংগ্রেসকেই মানে সরকারের পারফরম্যান্স যেমন হোক তাদেরকেই আবার জেতাতে হবে- এই ছিল তখনকার আবেগ বা ফর্মুলা। তাই ৮০% ক্ষেত্রে আগের সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছিল। এটার নাম তিনি দিয়েছেন পুরান “ক্ষমতাসীন-মুখি ভোট”। একবার জিতে যাবার পর সারা পাঁচবছর এলাকায় চেহারা না দেখালেও পরের বার আবার তিনি নির্বাচিত হতে পারতেন। কারণ সেটা ছিল বিশ্বস্ত ভোটারদের যুগ। ভোটারদের নেতাদের উপর অগাধ বিশ্বাস কাজ করত। প্রণয় বলছেন, এটাকে আপনারা “বোকা ভোটার” বা “গভীর আশাবাদী” ভোটারও বলতে পারেন।

প্রণয় বলছেন এরপর ১৯৭৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব – যার নাম তিনি দিয়েছেন – “ক্রুদ্ধ ভোটারদের [angry voter] যুগ”, ১৯৭৭-২০০২ সাল পর্যন্ত। এটা শুরু হয়েছিল  ১৯৭৭ সালের মার্চের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচন থেকে। এই নির্বাচন ছিল আগের ২১ মাসের (১৯৭৫-৭৭) ধরে ইন্দিরার “জরুরি আইন জারি” করে বিরোধী দমন নির্যাতন চালানোর সমাপ্তিতে। তাই সেটাই ছিল প্রথম  কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে পুনরায় বিজয়ী না করে শুরু হয় দ্বিতীয় যুগ পর্ব। অর্থাৎ এই ক্রদ্ধ ভোটার যুগের বৈশিষ্ঠ ছিল, যার পারফরম্যান্স খারাপ তাকে পরের নির্বাচনে নির্বিচারে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়া। প্রণয় বলছেন এই দ্বিতীয় যুগে যেকোন ক্ষমতাসীন সরকার [incumbency] পরের বার নির্বাচনে ৭০% ক্ষেত্রে উতখাত হয়ে গেছে। প্রণয়ের ব্যাখ্যা হল পাবলিক এতই ক্রুদ্ধ থাকত যে একট ভাল অথবা একটু খারাপ বলেও কাউকে মাফ করে নাই, নির্বিচারে পুরান হলেই তাকে বাদ – এই ছিল ফর্মুলা বা নীতি।

আর সর্বশেষ এখনকার যুগপর্ব, নতুন শতকের শুরুতে ২০০২ সাল থেকে যার উত্থান। তখন থেকে শুরু হয় আর একেবারে নির্বিচার নয়, এবার বিচার করে দেখেশুনে পুরান কোনো সরকারকে রেখে দেয়াও শুরু হয়েছে, যদিও কাউকে কাউকে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়াও, সে তো আছেই। প্রণয়ের রায়ের ভাষায়, এরা অনেক “বিবেচক ভোটার”। এখানে এপর্যন্ত ৫০% ক্ষেত্রে দেখা গেছে  ভোটাররা নেতাকে পুণর্নিবাচিত আর ৫০% ক্ষেত্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।   অর্থাৎ একথার সুত্র ধরে বললে, প্রণয় রায় মোদীর আবার বিজয় সম্ভাবনাকে তিনি একেবারে অসম্ভব বলে ঠিক ফেলে দেননি। ভারতের মিডিয়া জগতে প্রণয় ও তার টিভির চলতি বা সাবেক কলিগরা সবাই যারা এখন ভারতের মিডিয়া জগতের প্রভাবশালী ও মাথা পরিচালক। আর সম্ভবত একজন বাদে (অর্ণব গোস্বামি যে প্রকাশ্যেই বিজেপির পক্ষে) বাকিরা সবাই মোদি-বিরোধী বা কঠোর সমালোচক বলে মনে করা হয়।
তবে তিনি এই তৃতীয় পর্বে আর এক নতুন উপাদানের কথা বলেছেন; জানাচ্ছেন, এই পর্বে বিপুলভাবে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ঘটেছে। তাই তাদের সংখ্যার কারণে তারা এখন ভোটের ফলাফলে অন্তত এটাও আর একটা নির্ধারক উপাদান।

প্রণয় রায়ের বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হল, ভারতে সরকার গঠন এখন সরাসরি ঠিক ভোটারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সেটা ভোটারের ভোটের চেয়েও “জোট” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কেমন করে আপনি জোট করছেন, কাকে জোটসঙ্গি বেছে নিচ্ছেন, কেন, কী বুঝে – এভাবে জোটবন্ধু বেছে নেয়া – এটাই এখন মুখ্য নির্ধারক যে, শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে।

উল্টা করে বললে প্রণয় আসলে বলতে চাইছেন, ভারতে কোনো একক দলের একা নিজের সামর্থ্যে সরকার গঠনের দিন শেষ। সারা ভারতের ভোটারদের আস্থা আছে এমন কোন দল বলতে আর কেউ বাকি নাই। আর একটু এগিয়ে বললে তাহলে এখন কিসের দিন? অর্থাৎ কিসের ভিত্তিত্ব সরকার গঠন হয় বা হবে? এর জবাব হবে, এখনকার ভোট দেয়া ও সরকার গঠনে সমর্থ হওয়ার অভিমুখ হল সঠিক “জোট” টা গড়া। কিন্তু কার সাথে কার জোট? ভারতে সর্বভারতীয় বা ভারত-জুড়ে আছে এমন দল আছে মাত্র দুটা, আর তারা পরস্পর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি – বিজেপি ও কংগ্রেস। কাজেই এদের দুইয়ের মধ্যে জোট হবার প্রশ্নই আসে না, তা বলা হচ্ছে না। তাহলে জোট কাদের সাথে?

ভারতে আঞ্চলিক বা রিজিওনাল দল কথাটার মানে হল ঠিক কোন অঞ্চল নয় আসলে সেগুলো একেকটা রাজ্যভিত্তিক (প্রাদেশিক) দল। যেমন মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এর ততপরতা নাই বললেই চলে, অন্তত প্রার্থী দিবার মত অবস্থা নাই। এভাবে  ২৯ রাজ্যের ভারতে, প্রায় প্রত্যেক রাজ্যেই অন্তত দুই বা এর বেশি সংখ্যক আঞ্চলিক দল আছে। এরা মূলত প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনেও এরা দাঁড়িয়ে গিয়ে বিপর্যয় তৈরি করে ফেলতে পারে, ফেলে থাকে। বিশেষত এমন আঞ্চলিক দলগুলো যারা রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় থাকে। তাই তাদের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে বড় আসন পেয়ে যাবার সম্ভাবনাও তৈরি থাকে। যেমন তৃণমুল গত ২০১৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ মোট ৪২ আসনের মধ্যে ৩৪টাই পেয়েছিল। এ’কারণে আঞ্চলিক দলগুলোকে -কংগ্রেস না বিজেপি- কে আগে নিজের জোটে জুড়ে নিবে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কংগ্রেসের এমন জোটের নাম ইউপিএ [United Progressive Alliance, UPA] আর বিজেপির এমন জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance, NDA]। ভারতের নির্বাচনি রাজনীতির এই ঝোঁক একেই প্রণয় রায় বলছেন ভোটের চেয়েও সঠিক “জোট” গড়তে পারা – এটা বেশি নির্ধারক। ভারতে রাজনীতির এই নতুন ঝোঁক তৈরি ও তা স্থায়ী হয়ে গেছে সেই ১৯৮৫ সাল থেকে।

এজন্য বলা হচ্ছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকেই ভারতজুড়ে দল বলতে কংগ্রেস বা বিজেপির একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আসার দিন শেষ হয়েছে। আর শুরু হয়েছে, তাই “জোটের” সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসার দিন।  কিন্তু এই নতুন ধারাবাহিকতাতেও গতবার  মানে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস আর এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। ভোট পরিসংখ্যান বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি একা তো নয়ই, জোট হিসাবে ক্ষমতায় যেতে চাইলেও নিজ দলকে নুন্যতম কিছু আসন পেতেই হয়। এপর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে সেই সংখ্যাটা হল ১১৫। আর এই বিচারে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস নিজে পেয়েছিল মাত্র ৩৮ আসন আর, জোট হিসেবে সর্বনিম্ন, মাত্র ৬০ আসন। অর্থাৎ কংগ্রেসের ঝোঁক এবার আরও পতনের দিকে। আর ওদিকে এবারের চলতি নির্বাচন থেকে একইভাবে বিজেপিরও পতন শুরু হয়ে যেতে পারে।

তাই যদি এবারও কংগ্রেসের এই ট্রেন্ড অব্যাহত থাকে, তবে সেটা হবে জোট হিসাবেও কংগ্রেস আর লায়েক থাকবে না, এমন স্থায়ী পতন। অর্থাৎ আঞ্চলিক দলগুলোও আর কংগ্রেসের সাথে কোন জোট করতে চাইবে না। নতুন সেই অভিমুখের অর্থ হবে আঞ্চলিক দল বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দল – এমন ছোট দলগুলোই এবার উল্টা বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে না নিয়ে নিজেরা নিজেরাই জোট সরকার গঠন করার শুরুর দিন। কলকাতার মমতার ভাষায় এটাই, “ফেডারেল ফ্রন্ট” এর সরকার গড়া। এই রচনার শুরুতে যে ছবি ব্যবহৃত হয়েছে তাতে, তৃতীয় ফ্রন্ট বা থার্ড ফ্রন্ট বলতে এর কথাই বুঝানো হয়েছে। এদিকটাই আরেক ভাষায় আমলে নিয়ে প্রণব রায় বলছেন ভারতের এবার “এটা কোন জাতীয় নির্বাচন নয়”। বরং এটা হল রাজ্যগুলোর এক ফেডারেশনের নির্বাচন। [“2019 is not a national election at all, it’s a federation of states election,”]। মমতার “ফেডারল” শব্দের সাথে মিলের দিকটা লক্ষ্যণীয়।

বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রণয় রায়ের তৃতীয় মন্তব্য ছিল সরাসরি কংগ্রেস সম্পর্কে; এবং বলা বাহুল্য তা খুবই করুণ! তিনি বলছেন, ‘কংগ্রেস সম্ভবত ২০৫০ সালের নির্বাচনের কথা চিন্তা করে এবারের নির্বাচন লড়ছে”। এ কথার সোজা মানে হল, কংগ্রেস দিশা হারিয়েছে। তাই কারো সাথে জোট করতে চাচ্ছে না, বুঝছে না অথবা পারছে না। এমনকি সম্ভবত অন্যরাও কংগ্রেসকে তাদের জোটে নিলে কোনো লাভ হবে না, কংগ্রেসকে এমন অযোগ্য দল মনে করছে। তবে প্রণয় সব কারণের জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করছেন। বলতে চাইছেন কংগ্রেসের নিজের ওজন সম্পর্কেই নিজেরই কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা ধারণা নেই। যেন রাহুল দলের সভাপতি হয়ে যাওয়ার পরে তার মনে একটা ভাব এসেছে যে, এবার বাপ-দাদার কংগ্রেসের যুগ ফিরে এসেছে বা আসবেই। অথচ নিজের পায়ের নিচে মাটিই নেই, বেখবর!

ভারতের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে একা উত্তর প্রদেশ এই রাজ্যে সর্বোচ্চ আসন, একমাত্র রাজ্য যেখানে আসন সংখ্যা ৮০টি। এর পরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন অনেক নিচে; তা হলো মহারাষ্ট্র ৪৮, আর এর পরে তৃতীয় সর্বোচ্চ পশ্চিমবঙ্গ ৪২, এভাবে। অর্থাৎ উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে খুবই নির্ধারক, গত নির্বাচনে একা বিজেপিই এখানে পেয়েছিল ৭২টি। অর্থাৎ একা এখানে বেশি আসন পাওয়ার সাথে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারা সম্পর্কিত ফেনোমেনা। সেই উত্তর প্রদেশে এবার দুই প্রধান আঞ্চলিক দল [এসপি (সমাজবাদী পার্টি) আর বিএসপি (বহুজন সমাজবাদী পার্টি)] যারা মূলত গরিব, অন্তজ, দলিত ও মুসলমানদেরকে প্রতিনিধিত্ব করে, – ঠাকুরদের বিরুদ্ধে যাদব-  এমন দল। এরা সবার আগে এবার নিজেরাই বিজেপিকে ঠেকাতে প্রথম কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে জোট বাঁধে। প্রত্যেকে সমান ৩৮ আসন নিয়ে দুদলে মোট ৭৬। আর বাকি চারের কংগ্রেস নিতে চাইলে দু’টি গান্ধী পরিবারের মা-ছেলের জন্য। আর অন্য দু’টি আর এক ছোট আঞ্চলিক দলের (রাষ্ট্রীয় লোকদল) জন্য। এই জোট গড়তে সবচেয়ে নমনীয় হল সমাজবাদী পার্টি। তাই নিজের ভাগের ৩৮ সিট থেকে সে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার আগ্রহ যে দেখাতে পারছে।

কিন্তু মূল কথা যেটা, বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়ে সব রাজ্যেই এক “জোট” গড়তে না পারার জন্য আঞ্চলিক দলগুলো মূলত দায়ী করছে কংগ্রেসকে। কারও পাটাতনে না দাঁড়িয়ে উপর থেকে দেখলে, খুব সম্ভবত আসল জটিলতাটা হল – কংগ্রেসের স্বার্থের সাথে প্রতিটি আঞ্চলিক দলের স্বার্থই সঙ্ঘাতমূলক। অন্তত কংগ্রেস সেখান থেকেই দেখছে। এ ছাড়া সাথে আরও আছে কংগ্রেসের নিজের সম্পর্কে অতি-মূল্যায়ন। ফলে এ জন্য কোনো আঞ্চলিক দলের সাথেই এবার কংগ্রেসের কোনো রাজ্যে কোনো আসন সমঝোতা করতে সক্ষম হয়নি। যেমন এখন রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন দিল্লিতে এমন আঞ্চলিক দল হল আম আদমি পার্টি, ওদিকে কলকাতা, কেরালা বা ত্রিপুরায়  এমন দল হল সিপিএম, পাঞ্জাবেও প্রভাব আছে এমন দল আম আদমি, এছাড়া আর উত্তর প্রদেশের অবস্থা তো জানলাম উপরে ইত্যাদি; এভাবে আঞ্চলিক দলগুলো সকলে কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ। কারণ কোথাও কংগ্রেসের সাথে কারো শেষ পর্যন্ত কোনো জোট, বা আসন ভাগাভাগি হয়নি। এমনকি উত্তর প্রদেশে এসপি আর বিএসপির জোট ঘোষিত হওয়ার পরে সেটাকেও উপেক্ষায় এরপরেও আবার কংগ্রেস ঘোষণা করেছিল যে, রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা এবার প্রথম নির্বাচন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল, তাতে কংগ্রেস সবখানেই এবার একা নির্বাচন করছে। আবার প্রিয়াঙ্কার নিজে নির্বাচন করাও অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে যার সোজা মানে হল, কংগ্রেসের একা চলার এমন ততপরতার কারণে  এবার সবখানেই বিজেপি-বিরোধী ভোটগুলো কংগ্রেসের কারণেই সবচেয়ে বেশি ভাগ হবে। যার পুরা সুফলটা ভোগ করবে বিজেপি। এজন্য অনেকে টিটকিরি দিয়ে বলছে প্রিয়াংকার আগমনটা মূলত মোদীকে সহায়তা করতে।

অর্থাৎ কংগ্রেস যত আঞ্চলিক দলগুলোর ভোট কাটবে ঠিক তত ভোটই বিজেপির এগিয়ে যাবে। আর ততটাই বিজেপির জন্য তা সুবিধা বয়ে আনবে। এমনকি কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও মারাত্মক। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তর প্রদেশের ৩০টি আসনে কংগ্রেস একক ও শক্ত প্রার্থী দিবে, তাদের নাকি বিপুল সম্ভাবনা। মানে ওই ৩০ আসনে সে ‘শক্ত’ করে ভোট নষ্ট করবে আর বাকি ৫০টি আসনে ‘দুর্বল’ভাবে নষ্ট করবে। এ কারণে কংগ্রেসের এবারের ভোট কৌশলের কোনো তাল নেই বেতাল দশা; উদ্দেশ্যবিহীনের মতো আচরণ করছে কংগ্রেস। এ দিকটা খেয়াল করে প্রণয় রায় বলছেন সঠিকভাবে “জোট” করা যেখানে জেতার জন্য নির্ধারক বিষয়, কংগ্রেস সেখানে ততটাই যেন বেখবর, ভবঘুরে। তাই কংগ্রেসের লক্ষ্য চলতি ২০১৯ সাল না যেন সুদুর ২০৫০ সালের নির্বাচনের লক্ষ্যে এক অস্পষ্ট সময়ের দিকে তাকিয়ে কংগ্রেসের সব সিদ্ধান্ত।

প্রণয় রায়ের তিন মন্তব্য নিয়ে কথা শেষ, এখন অন্যান্য প্রসঙ্গ। ভারতের নির্বাচন তাই স্বভাবতই আমরা অনেকেই আগ্রহ নিয়ে সময় দিব, জানতে চাইব। বিশেষ করে নানান কারণ যারা আবার নিয়মিত ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিক-অভিমুখ জানতে ততটা সময় দিতে পারিনি, তারাও এখন জানতে চাইব। সব নির্বাচনেই মূল দু’টি দল থাকে, অনেকটা আমাদের লীগ-বিএনপির মত। আর ভারতের এমন দুই দল হল বিজেপি ও কংগ্রেস। এটাই আমাদের বহু পুরনো সময় থেকে চেনা ধারণা। কিন্তু সরি! এবার এই অনুমান নিয়ে ভারতের নির্বাচন বুঝতে গেলে সব হিসাবে ভুল হবে। কেন?

Source: Election Commission data | Shivam Vij/ThePrint

গত প্রায় ৩০ বছরের (১৯৮৪-২০১৪) একটা ভোটের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ বলছে, যে আসন কখনো কংগ্রেস হারাচ্ছে তা বিজেপি বা আঞ্চলিক দল পাচ্ছে; বেশি সময়ে বিজেপি পাচ্ছে। কিন্তু বিজেপি যে সিট হারাচ্ছে তা কংগ্রেস ফিরে পাচ্ছেই না। বেশির ভাগই আঞ্চলিক দল পাচ্ছে। তাই আগ্রহিরা এই খবর অনুসরণ করতে পারেন যে বলছে – ২০১৯ সালের নির্বাচন থেকে “কংগ্রেসমুক্ত ভারত” – বিজেপির এই শ্লোগান বাস্তবে ত্বরান্বিত হয়ে উঠতে পারে।

এর সোজা মানে হল, বিজেপির বিকল্প দল বলতে সেটা আর কংগ্রেস নয়, আঞ্চলিক দল। এক কথায় আঞ্চলিক দলের প্রভাব ক্রমশ বড় করে বেড়ে চলা – এটাই ভারতের রাজনীতির মূল অভিমুখ। আর এটাই কংগ্রেসের কথিত অনুমিত স্বার্থের সাথে প্রত্যেক আঞ্চলিক দলের অনুভূত স্বার্থবিরোধ অথবা বিজেপি-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কারো সাথেই কংগ্রেসের জোট না হওয়া। তাই এবার বিজেপি ফল খারাপ করলে এর অর্থ কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে তা নয়। এবারো তা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর মমতা ঠিক এই কারণের বেশির ভাগ আঞ্চলিক দলের কংগ্রেসবিরোধিতার ভোকাল মুখপাত্র। ভোট চাইতে গিয়ে তিনি পাবলিক মঞ্চে উঠে সরাসরি বলছেন, কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। প্রবল উত্তেজিত মমতার আরো একধাপ এগিয়ে দাবি এবার বিজেপি ১০০ আসনও পাবে না: মমতা।

জনমত সমীক্ষা
ভারতের নির্বাচনের ফল সম্পর্কে জনমতের সমীক্ষা (বা বুথ ফেরত ভোটার সমীক্ষা) চালিয়ে আগাম অনুমান করা সব সময় খুবই কঠিন একটা কাজ। এর মূল কারণ বিপুলসংখ্যক ভোটার (প্রায় ১০০ কোটি) যার তুলনায় স্যাম্পল সাইজ যত বড় আর ছড়ানো হওয়া উচিত তা না হওয়া বা নেয়া। তবুও এই নির্বাচনের ভারতের অন্তত পাঁচটা সমীক্ষা গ্রুপের কথা জানা যায়, যারা গত বছর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে (মোদির পক্ষে) সে অনুমান দিয়ে যাচ্ছে। আগে যাই থাক, গত ১৯ মার্চ এমনই এক অনুমিত গণনা রিপোর্ট বলে চলছিল বিজেপির-বন্ধু জোট আবার সরকার গঠন করে ফেলবে ২৮৩ আসন পেয়ে।

এই জনমত সমীক্ষা চালিয়েছিল “টাইমস নাউ ও ভিএমআর”। যারা অবশ্য প্রো-বিজেপি সমীক্ষা গ্রুপ বলে প্রচার আছে। আমরা লক্ষ্য করছি এদের প্রচারটাই আমাদের প্রথম আলোতে বেশি আসছে। কিন্তু ১১ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে সবার হাতে আর অনুমিত ডাটা নয়, অন্তত মোট ভোট প্রদানের শতকরা হার কত সে ফ্যাক্টস এখন প্রকাশিত। এর ফলে দেখা গেছে অন্তত দু’টি সমীক্ষা গ্রুপ এখন পিছু হটছে। এমনই একটা গ্রুপ ‘সিএসডিএস’ তাদের প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হল, ‘প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি কী অসুবিধায় পড়ছে?’ [Is it disadvantage BJP post first phase polling?] তারা এবার বিশ্লেষণে বলছে, প্রথম পর্যায়ে উত্তর প্রদেশের আট আসনে নির্বাচন হয়েছে। যার দু’টি বাদে বাকি ছয়টাতে বিজেপির অবস্থা খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা, যেখানে গত ২০১৪-তে এই আট আসনই বিজেপির ছিল। এখানে এবার ভোট প্রদানের হার কম আর ওই ছয়টা আসনেই মুসলমান ভোটার সংখ্যায় আধিক্য বলে এই যুক্তি তুলে এরা এখন সরে এসে বলছে- এই আট আসনের ছয়টাতেই বিজেপি খারাপ করবে।……the BJP would be down six in UP in the first round.

একইভাবে আরেক সমীক্ষা গ্রুপ ‘সি-ভোটার’- যারা মোদির ‘পাবলিক রেটিং’ কেমন যাচ্ছে তা নিয়ে কথা বলে এসেছে। আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি এরা দাবি করেছিল পাকিস্তানে কথিত ‘বিমান হামলা’ করে আসাতে মোদির রেটিং বেড়ে ৬২ শতাংশ হয়েছিল। এরপর এক মাসে তা অল্প করে কমলেও তা হয়েছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর এবার তারা বলছে, সেটা আরো কমে এবার ৪৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মোদির গ্রহণযোগ্যতা এখন ১৯ শতাংশই কমে গেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটপ্রদান অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত ১৮ এপ্রিল। তাতেও দেখা গেছে ভোট প্রদানের হার ২০১৪ সালের চেয়ে বাড়েনি, তবে অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। [On 7 March, the Modi government’s approval rating was at 62.06 percent. Despite a minor decrease it remained in the 50s till 22 March. But on 12 April, a day after the first phase of polling, the Modi government’s approval rating had fallen to 43.25 percent, a fall of almost 19 percent in about five weeks.] মোটকথা সমীক্ষা গ্রুপগুলোই আর জোর দিয়ে মোদির সম্ভাব্য ভালো ফল করার কথা বলতে চাচ্ছে না। তাতে আসল ফলাফল আগামী মাসে যাই আসুক না কেন।

এই নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য তার আশা কী? তার আশা হবে এই লেখার শুরুতে যে ছবি তৃতীয় শক্তি বা ফেডারল ফ্রন্টের কথা বলা হয়েছে এর সাফল্য ও বিজয়। এতে  নাগরিকদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ভারত রাষ্ট্র কোন কোটারি নয়, কোন ভুতুড়ে ক্ষমতার “কেন্দ্র” এর রাষ্ট্র নয় – এই বিচারে এখানকার চেয়ে তুলনায় ভাল গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র হবে। দানব ভারত, হিন্দুত্বের ভারতের বদলে এর তুলনামূলক গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে।  তার তাতেই বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২০ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের নির্বাচনে কী হচ্ছে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

“বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

গৌতম দাস

৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yW

BRI-2, First China freight train arrives in London 2017
BELT-ROAD SUMMIT-2,  আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – ছবি : সংগ্রহ

গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বদলে চীন মূল ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে চীন এগিয়েই চলেছে এবং এই পরিবর্তনে চীনের জিডিপি সব সময় ইতিবাচক থেকেছে, যদিও সময়ে তা কম-বেশি হয়েছে। অগ্রগতির সে বিচারে গত কয়েক মাস ছিল চীনের দিক থেকে খুবই নির্ধারক কিছু ঘটনার যা, চীন ইতিবাচক সাফল্যের সাথে পার হয়েছে। আর এমন সাফল্যের ওপর চড়ে চলতি এপ্রিল মাসে চীন আরেক সাফল্য লাভ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ইতিহাসে চীনা উত্থানের দ্বিতীয় পর্যায় বলেই চিহ্নিত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?

চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) বা [Belt and Road Initiative (BRI) ] সম্পর্কে এতদিনে আমরা সবাই কমবেশি জেনে গেছি যে, এটা ৬৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে একসাথে ভৌত অবকাঠামোগতভাবে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে কানেক্ট করার এক মহাপ্রকল্প। কাঠামোগতভাবে এটা  মহাদেশীয় পর্যায়ের সংযোগ প্রকল্প; যা মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপ এদুই মহাদেশকে সংযুক্ত করে ফেলার প্রকল্প এবং আরও। তাই এর সাথে এ’দুই মহাদেশের মাঝখানে সেন্ট্রাল এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের সবাই যুক্ত হবে। আর ওদিকে এই কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আরেক প্রান্ত কেনিয়া ও ইথিওপিয়া দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সাথেও সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া পুরো প্রকল্পই স্থানে স্থানে ছয়টিরও বেশি গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের পণ্য পরিবহণের সাথেও যুক্ত থাকবে। আইডিয়া হিসেবে বিআরআই উদ্যোগের মূল ধারণা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাজির করেছিলেন তাঁর কাজাখাস্তান সফরের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। তখন এর নাম বেল্টরোড, সিল্করোধ, সিল্করুট ইত্যাদি নানান নামে হাজির করা হয়েছিল। সে ঘটনাক্রম সম্পর্কে এখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।  তবে গত ২০১৭ সালের মে মাসে এর প্রথম সামিট (বা সদস্য রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের নিয়ে সভা, বেল্ট রোড সামিট) এর সময় তা “বেল্ট রোড উদ্যোগ” (BRI) নামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মূল ফোকাস ছিল – কোন কোন রাষ্ট্র এই বড় প্রকল্পের অংশ হতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। আজ এই ২০১৯ সালের চলতি এপ্রিল মাসের শেষে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এবারের নাম Belt and Road Forum বলতে দেখা যাচ্ছে। এর জন্য নতুন খোলা পোর্টাল এখানে।]  এই সামিট টু কেন গুরুত্বপূর্ণ বা এর মূল তাৎপর্য কী হতে যাচ্ছে?

বেল্ট রোড অবকাঠামো প্রকল্পের মূল কাঠামো হল মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপকে সব উপায়ে সংযুক্ত করে ফেলা। অর্থাৎ এশিয়ার অপরপ্রান্ত হবে ইউরোপ, এত দিন যা খুবই সীমিত সুযোগে কানেক্টেড ছিল। আর এখানে ইউরোপ মানে সারা ইউরোপ; অর্থাৎ ২৫ সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও সংখ্যায় ২৫ অনেক বেশি, কিন্তু আসলে ইউরোপের প্রভাবশালী মাতবর রাষ্ট্র – চার থেকে আট রাষ্ট্র, যারা যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক। এই প্রথম চার রাষ্ট্রের মধ্যে মূল দুই রাষ্ট্র আবার হলো ফ্রান্স ও জার্মানি। এর সাথে বাকি দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন আর ইতালি। এমনিতে আমেরিকান মাতবরিতে চলা গত ৭০ বছরের দুনিয়া বিচারে, আমেরিকা একা একা চলে নাই; সাগরেদ রাষ্ট্রসহ দলেবলে চলেছে। এভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রজোট হল ‘গ্রুপ সেভেন’ বা জি-৭। একটু বিস্তারিত জানতে এই ফাইনান্সিয়াল বিনিয়োগ-পিডিয়া সাইট, ইনভেস্টোপিডিয়া – এটা দেখা যেতে পারে।  ইউরোপের সেই চার রাষ্ট্র – ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি – এই চার রাষ্ট্রই হল ‘গ্রুপ সেভেন’-এর চার ইউরোপীয় সদস্য; আর বাকি কানাডা, আমেরিকা ও জাপান মিলে পূর্ণ হয় ‘গ্রুপ সেভেন’।

বেল্ট-রোড উদ্যোগের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে এই কাঠামোতে এখানে এশিয়ার অপর প্রান্ত ইউরোপ। অথচ ২০১৭ সালে প্রথম বেল্ট রোড সামিট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এর অগ্রগতি ও অর্জন মেপে দেখলে সেখানে বড় খামতির দিক ছিল যে, সেকালে পর্যন্ত ইউরোপের কে কে বা বিশেষ করে প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রের কাউকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহী করাতে পারেনি বা কমপক্ষে কাউকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়াদা চীন আদায় করতে পারেনি। সেই খামতিই এবার পূরণ হতে চলেছে।
তবে এত দিন চীন কেন তা পারেনি তা বুঝতে প্রথমত চীনের কাছে জি-৭ কী, এটা বুঝলে অনেকটাই স্পষ্ট হবে সমস্যার জটিলতা কোথায়? গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত চীন ও আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকার জায়গা নিতে চায় চীন। তাহলে ইউরোপ? এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপ কেউ নয়। কারণ ইউরোপ বিগত-যুবা। ফলে সে ঐ দু’য়ের লড়াইয়ে কারও জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। তবে আমরা ইতিহাস হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, যদিও ইউরোপও একসময় দুনিয়ার নেতা এবং তাঁর সেখানে রুস্তমি ছিল; তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এবং সেটা ছিল কলোনি রুস্তমি।  আর ঐ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ হয়েছিল আমেরিকার এক নম্বর সাগরেদ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় (১৯৪২) থেকেই গ্লোবাল নেতৃত্ব আমেরিকা নিজের হাতে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে যায়; আর সারা ইউরোপ ছোট-বড় সবাই হয়ে যায় আমেরিকার অনুগ্রহ প্রার্থী। এমনকি মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করা হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালি অথবা এশিয়ার জাপান বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার পর আরও বেশি করে আমেরিকার অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়। ওদিকে ঐ বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের প্রায় সবাইকে যুদ্ধে সবরকম সাহায্য করা, প্রধান খরচগুলো নিজে বহন করা, অনুদান দেয়া তো বটেই এমনকি যুদ্ধ সমাপ্তিতে ইউরোপের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্বাসনের যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সেটাও একা আমেরিকা জুগিয়েছিল। তাই আমেরিকা ও ইউরোপের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় যেন, আমেরিকা একাই ত্রাতা ও দাতা আর  ইউরোপ ওরই পাণিপ্রার্থী। সে সম্পর্কই সেই থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসছে জি-সেভেন ধরনের গ্রুপেও, এক উঁচু-নিচু সম্পর্কে। আমেরিকা কী বলে বা সে কী চায়, তা আমল করে শুনতে ইউরোপ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যদিও ১৯৪৪ সাল থেকে গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম, যা বহুরাষ্ট্রীয় নানান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, তা গড়তে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ও নেতারা আমেরিকার সাগরেদ হয়ে পাশে থেকে নিজেদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ করে নিয়েছিল। এভাবে ইউরোপের প্রভাবশালী চার-ছয় রাষ্ট্র আমেরিকার পাশে ছোট-তরফ বা সাগরেদ হয়ে উঠতে জায়গা পেয়েছিল।

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, একালে আমেরিকাকে সরিয়ে গ্লোবাল নেতৃত্বের সে জায়গা চীন নিতে চাইলে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকেও চীনমুখী করে নিতে হবে আগে। “আমেরিকা-ইউরোপের” সম্পর্কের বদলে একে ছাপিয়ে “চীন-ইউরোপের” মধ্যে সম্পর্ককে খাঁড়া হতে হবে আরও প্রবল প্রভাবশালী সম্পর্ক হিসাবে। আর এটাই হবে বাস্তবত আমেরিকাকে দুনিয়ায় কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া। অতএব, বিশাল হইচই ফেলে দেয়া ঘটনা হল – ইতালির বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা। এবছরের মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি-এর সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফর ছিল। আর সেখানেই স্বাক্ষরিত ১৭টি চুক্তির মধ্যে একটি হলো চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রাথমিক বোঝাবুঝিগুলো’ (এমওইউ বা MOU ) দলিল করে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর চলতি মাসের বেল্ট রোড সামিট টু-তে অংশ নেয়ার সময় তা পূর্ণতা পাবে।

ইটালির এই যোগদান-সম্মতির চীনা উত্থানের জন্য এক মাইলস্টোন তাতপর্যের। কারণ ইতালিই হল প্রথম জি-৭ গ্রুপের সদস্য যে খোলাখুলি আমেরিকান মেরু ত্যাগ করল। শুধু তাই নয় ইতালিই প্রথম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যে (আমেরিকার হাত ছেড়ে) চীনের সাথে “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” – সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। [The communique said the two sides have agreed to advance China-Italy comprehensive strategic partnership…… ] অর্থাৎ চীন-ইতালি সম্পর্কটা কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নয়। [এপ্রসঙ্গ আরও একটু বিস্তারিত পরের প্যারায়।] বৃটেনসহ অন্যান্যরাও ইতোমধ্যে অনেক দূর গিয়েছে কিন্তু সেগুলো ছাড়াছাড়া। যেমন এলেখার শিরোনামের ছবিটা; এছবি বেল্ট-রোড ব্যবহার করেই প্রথম ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, চীন থেকে লন্ডন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন ব্যবহারের। যেটা অনেকটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসায় একটা সংযোগ নেওয়ার মত। কিন্তু সেটা ঐ বিদ্যুৎ কোম্পানির সাথে মালিকানা-বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

কিন্তু ইতালি ইউরোপের বাকি সবার আগে এত গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রধান বস্তুগত স্বার্থের দিক হল – পুরো বেল্ট রোড প্রকল্পে ইউরোপীয় আর এক প্রভাবশালী প্রান্ত বা শেষ মাথা হবে ইতালি। তাতে ইউরোপের যে গভীর সমুদ্রবন্দর বেল্ট রোডের সড়ক ও রেলকে সংযুক্ত করাবে, সেই বন্দর গড়ে উঠবে ইতালিতে। যার মানে হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতা মুসোলিনি, তিনি হিটলারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে – সেই থেকে পিছিয়ে পড়া আর ধুঁকে চলা অর্থনীতির ইতালি এবার সামনের সারিতে চলে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ডাচ রটারডামকে ছাড়িয়ে ইতালি হয়ে উঠবে ইউরোপের হাব [hub] – সড়ক, রেলের সাথে সমুদ্রপথ যুক্ত হওয়ার বড় সংযোগস্থল। সব দিকের সাথে কানেক্টিভিটির এই বিশেষ সুবিধার জন্য ইতালি হয়ে উঠবে বুড়ো শরীরে আবার যৌবনের জোয়ার – ইতালি হবে এখন ইপিজেড-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের হাবও। তাই নিজ বিপুল সম্ভাবনার সামনে এখন থেকে আমেরিকার হাত হালকা করে ধরা আর ইউরোপের অন্যরা – ফ্রান্স, জর্মানি বা ব্রিটেন- এদের সবাইকে টপকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চীনের হাত শক্ত করে জাপটে ধরা হবে ইতালির কাছে খুবই জায়েজ।

কিন্তু তাই বলে জার্মান, ফ্রান্স বা ব্রিটেনকেও চীন বিমুখ করেছে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়। বিস্তারে তা বুঝতে আরেকটা ধারণার সাথে পরিচয় করাতে হবে। “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” [Comprehensive Strategic Partner]’ হলো সেই নতুন শব্দগুচ্ছ – যা চীন একালে ব্যাপক ব্যবহার করছে। বাংলায় “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” – চীন দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে এমন “কৌশলগত মিত্র” হিসেবে পেতে চায়। এটা একটা (বেল্ট রোড) প্রকল্পেই কেবল চীন সবাইকে পেতে চায় তা নয়, বরং আরও এবং সামগ্রিক। আসলে খোদ বেল্ট রোড প্রকল্পটি চীনের একটি কৌশলগত প্রকল্প। কেবল বাণিজ্যিক নয়।

স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বলতে এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অর্থ হল, যা কেবল অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটাই নয়, আরও অনেক কিছু। কী সেটা? অন্তত আপাতত অর্থ হল, আমেরিকাকে বাইরে রেখে বাকিদের নেয়া হয়েছে এমন এক পক্ষজোট- যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি সব (এই অর্থে তা সামগ্রিক) স্বার্থেই এখানে চীনের নেতৃত্বে সকলে আছে। এই অর্থে এটা আমেরিকাকে বাইরে রেখে এক রাষ্ট্রস্বার্থ জোট। আবার এই জোটের কাম্য সদস্যরা মানেই এরা সবাই বড় ক্ষমতার রাষ্ট্র, ঠিক তা নয়। যেমন হাসিনার বাংলাদেশ (অন্তত ঘোষণা মোতাবেক), আমরাও চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ব্যাপারটা আর একটু বিস্তার করতে আরেক দিকে আলো ফেলব।

ক্রাইস্টচার্চ ম্যাসাকার সামলানোর জন্য সদ্য সুখ্যাতি অর্জন করা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা, এ মাসের ১ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে চীনের “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” হয়ে এসেছেন। এমন মিত্র হওয়াতে এর অর্থ বুঝতে হবে এভাবে; নিউজিল্যান্ড বেল্ট রোড প্রকল্পের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হয়েছে ও নিয়েছে। অর্থাৎ চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার না হয়েও কেউ বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও জেসিন্ডা স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হওয়া বেশি লাভজনক মেনেছেন। আর বিপরীতে কেবল বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হলে স্বভাবতই সে ক্ষেত্রে সেটা কেবল “বাণিজ্যিক স্বার্থ” ধরনের সম্পর্ক হত। ফলে চীনের দেয়া অন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সে পেত না। যেমন- কোন রাষ্ট্র যদি কোন কারণে ঋণের কিস্তি শোধ দিতে পারছে না অবস্থায় পড়ে। এমন ক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্র আবার চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হলে চীন ব্যাপারটাকে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখে থেমে থাকবে না। চীন তাকে বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে, বিপদ থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেওয়াসহ সব সাহায্য করবে। চীনের এখনকার সাধারণ নীতি-কৌশল হল সব রাষ্ট্র বা প্রকল্পের সম্পর্ককে সব সময় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা। যদি পার্টনার রাজি থাকে কেবল তখন সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়, কিন্তু চীনের দিক থেকে আগ্রহ জারি থাকে সব ক্ষেত্রে ও সময়ে।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ কেন আনলাম? কারণ, ঠিক এর বিপরীত ঘটনা বা রাষ্ট্র হলো অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রায় সময় একসাথে উচ্চারিত শব্দ। মূল কারণ তারা একইভাবে, একই ভাগ্যে রকই সময়ে ব্রিটেনের কলোনি হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থ ও নীতিগত মিল এক হতে বেশির ভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায়। যদিও চীন না আমেরিকা কোন ক্যাম্পে থাকবে প্রশ্নে তাদের ভিন্নতা দেখা দিল। আর জেসিন্ডা প্রমাণ করলেন অষ্ট্রেলিয়া ভুল করেছে।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই অন্তত ওবামা আমল থেকে,  তবে চাদরের নিচে থেকে আস্তে আস্তে প্রকট হয়ে ভেসে উঠছিল। যা কেবল এ’কালে ট্রাম্পের আমলে এসেই চাদর উঠে গেছে। আর সবচেয়ে বড়ভাবে আরেকবার চাদর উঠেছিল ২০১৫ সালে, চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক – এআইআইবি [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ] গড়ার সময়ে। ওবামা লজ্জার মাথা খেয়ে খোলাখুলি সেই সময়ে এই নতুন ব্যাংক প্রকল্পে যেন এশিয়ার জাপান, কোরিয়া তাইওয়ান বা অস্ট্রেলিয়া (যারা আমেরিকার বহু পুরনো বন্ধু মনে করা হয়) এরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও কেউ যেন যোগ না দেয় এর লক্ষ্যে, কান-পড়া দিয়ে কার বিয়ে ভেঙে দেয়ার মত, করে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও আপত্তিতে ছেয়ে ফেলেছিল। যদিও ফলাফলে আমেরিকার হার হয়েছিল; শেষে প্রায় সব রাষ্ট্রই ওই ব্যাংক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু চীনের নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট আর আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট সেই থেকে প্রায় প্রকাশ্যেই তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এআইআইবি ব্যাংকে সদস্য হয়েও আমেরিকার জোটেই যোগ দিয়েছিল। এছাড়া আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোটে আর সদস্য হয়েছিল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মত রাষ্ট্রগুলো এবং স্বভাবতই আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেয়া ভারত তো ছিল।

এমনকি অস্ট্রেলিয়া আরও একধাপ এগিয়ে নিজের উপকূলে এক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন (২০১৬ সালে চালু হয়) করতে দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় সবাই ধরা খেয়ে যায় ট্রাম্পের আমলে এসে, তাঁর জাতীবাদি ট্রাম্প হয়ে উঠার কারণে। কারণ ট্রাম্পের সারকথা, বিড়াল যেন বলছে আর মাছ খাবো না। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের অর্থনীতিতে রূপান্তর মানে দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক পণ্য বিনিময়ের গ্লোবাল সমাজের দুনিয়া গড়তে নেতৃত্ব দেয়া সেই আমেরিকা, ট্রাম্পের হাতে পড়ে হয়ে গেল অ্যান্টি-গ্লোবাল। এক জাতিবাদি আমেরিকা; আমেরিকা ফাস্টের নীতি চর্চা শুরু করল। ফলে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক জোট মুখ থুবড়ে পড়লেও বিপরীতে চীনেরটা সদর্পে আরও এগিয়ে যেতে সুযোগ পেয়ে যায়। সেটারই স্পষ্ট সফলতা এই প্রথম এখন প্রমাণ হল গত মাসের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর ইউরোপ সফরে। মুখ পোড়ানো অস্ট্রেলিয়ার অতি উৎসাহ যে ভুল ছিল তা যেন আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়ার অকেজো স্ট্র্যাটেজিক জোটের পাল্টা চীনা স্ট্র্যাটেজিক জোটে যোগ দিল।

এদিকে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকেই ইউরোপের জার্মানি – যে ট্রাম্পের “অ্যান্টি-গ্লোবাল” অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পাল্টা সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিল এবং ভোকাল ছিল, সেই জার্মানির সাথেই চীনের সম্পর্ক গভীর হয়ে যায়। চীনা শিল্প-উদ্যোগের যুগ এখন দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যার সারকথা প্রত্যেক ট্রেডকেই হাইটেকে বা উচ্চ প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়া। যেখানে প্রথম পর্যায়টা ছিল বাল্ক উতপাদন করে উতপাদন খরচ নামিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করে ফেলা। তাই এবার হাইটেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে – এখানেই জার্মানির সাথে চীন গভীর পার্টনারশিপ হয়। ব্যাপারটা জার্মানির দিক থেকে দেখলে, চীনের মতো বড় আর ব্যাপক এবং হাইটেকের চাহিদার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাওয়া জার্মানির জন্য তা বিরাট কিছু। সাধারণভাবে হাইটেকে আর বিশেষত গাড়ি তৈরির অটো শিল্পে চীনের মূল পার্টনার এখন জার্মানি।  জার্মানরা বিনিয়োগ নয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। চীনে গত তিন বছরে লাগাতার  জার্মান সংশ্লিষ্টতা ও বিনিয়োগ বেড়ে চলা চলছেই, গ্রোথ রেট ১৪০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্স সফরে এক মূল সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রেসিডেন্ট শিং-এর জর্মান চ্যান্সেলার মার্কেলের সাথে বৈঠকের মিডিয়া রিপোর্ট বলছে [China was Germany’s largest trading partner for a third consecutive year in 2018, with a nearly 140 percent increase in German companies’ actual investment in China, he said.]। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে এই বৈঠক থেকে চীনের সাথে জর্মানির ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে কোন সুর ভেসে আসে নাই। কিন্তু তা সত্বেও চ্যান্সেলার মার্কেল জানাচ্ছেন তিনি ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ফোরামে জার্মানি যোগ দিচ্ছে। [Germany would like to deepen its economic and trade relations with China in the digital age, and is willing to actively participate in the second Belt and Road Forum for International Cooperation, Merkel said.]।

ওদিকে ফ্রান্সের সাথে চীনের সম্পর্ক আর এক মাত্রায় হাজির। এবার প্রেসিডেন্ট শি-এর সফরে ইতালির বাইরে আরেক গুরুত্বের সফরের জায়গা ছিল ফ্রান্স। এই সফরে যত না চীনের খুশির, এর চেয়ে বড় খুশি প্যারিসের, সে গদগদ। মূল কারণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ফরাসি পণ্য-ক্রয়ের চুক্তি।  চীন, আমেরিকার বোয়িংয়ের চলতি খারাপ সময়ে ইউরোপের ফ্রান্সের বড় শেয়ারের (চীনে অবস্থিত ফ্যাক্টরি থেকে) এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, জার্মান ও ফ্রান্স চীনের পক্ষে কৌশলগত জোটের প্রত্যক্ষ পার্টনার না হলেও তারা ঘনিষ্ঠ; অন্তত তারা আমেরিকার জোটের নয়।

ইউরোপের চার কুতুবকে নিয়ে কথা বলতে এবার বাকি থাকল বৃটেন। ব্রিটেন এত বাছবিচার না রেখে খোলাখুলি বেল্ট রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে লম্বা পরিকল্পনা নিয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় হংকং ব্যাংকের এক সাবেক চেয়ারম্যান ডগলাস ফ্লিন্টকে বিশেষ দুত ও প্রধান করে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে এ লক্ষ্যে কাজ ও পরিকল্পনা শুরু করতে।[Sir Douglas Flint, who was appointed as the Special Envoy to BRI of the British Treasury in December 2017]। ফ্লিন্ট জানাচ্ছেন, The Belt and Road Initiative (BRI) “is a real opportunity” to strengthen UK-China cooperation। বেল্ট রোড সামিট টু ব্রিটেনের জন্য এক বিরাট সুযোগ বলে ডগলাস ফ্লিন্ট প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন।

তাই এককথায় বললে, চলতি এপ্রিলের ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ থেকে এর ওলটপালট ঝড় আসন্ন হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনের আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তা আর এক ধাপ উঠে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ?
বেল্ট-রোড প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান সরাসরি বিরোধিতার। গত ২০১৭ সালের সামিটের দাওয়াত তাই সরাসরি প্রত্যাখান করেছিল। আর বাংলাদেশ গত ২০১৭ সালে বেল্ট রোড সামিট-ওয়ানের সময় ভারতের মন রক্ষা করতে বাংলাদেশ লো-প্রোফাইলে থেকেছিল।  তবে বেল্ট রোড প্রকল্পে চীনের সাথে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত লুকাতেও চায়নি বা পারেনি। বরং অক্টোবর ২০১৭ সালে ভারতকে বুঝিয়ে রাজি করার এক  উদ্যোগ নিয়েছিল যে ভারত যেন আমাদেরকে এই সম্পর্কে যেতে আপত্তি না করে বা ভালভাবে নেয় – তা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। বরং আমাদের পররাষ্ট্র সচিবকে একাজে ভারতে পাঠানোয় উলটা ভারতের সাথে আমাদের অবস্থান-ভিন্নতা আরো প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। আজ দুবছর পরে এই ইস্যুটা এখন যে  অবস্থায় চলে গেছে তাতে এখন  ভারতের মুখ চেয়ে স্থবির হয়ে থাকা যাবে সে জায়গাতেও আর নেই। মূল কারণ বটম লাইনটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বেল্ট-রোড প্রকল্পে হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে

মূল প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীনের (কুনমিং প্রদেশে) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে কী না? যেখানে কলকাতাও বাংলাদেশ হয়ে যুক্ত থাকবে। এটাই বিসিআইএম (BCIM যা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর) প্রকল্প। তবে এই প্রকল্পের আর এক অনুষঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। আসলে উলটা – মূলত এই গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করেই এই চার দেশের ঐ অঞ্চলটার মূলত ল্যান্ড লকড দশায়; তাই সে অবস্থা ছুটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ল্যান্ড লক কথাটা আমাদের বন্দর আছে কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর নাই – এই অর্থে বুঝতে হবে। বাস্তবে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজের বন্দর, যার কানেকটিং গভীর সমুদ্র বন্দরটা সিঙ্গাপুরে। তাই চার দেশের এই বদ্ধ অঞ্চল – এটাকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে উন্মুক্ত করাটাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে সোনাদিয়া ছাড়াই কেবল রেল ও সড়কের BCIM প্রকল্পের আওয়াজ উঠতে উঠতে এখন সেই প্রকল্পের সব কিছুই মুখ থুবড়ে গায়েব। কেন?

ভারতের যুক্তি চীন BCIM প্রকল্পকে এখন বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত করতে চায়। অবশ্যই চায়। বাংলাদেশও চায়। আর প্রশ্নটায় এখন তখনের কিছু নাই। বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য এটা খুবই জরুরি যে আমরা আন্তঃমহাদেশীয় প্রকল্প বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত থাকি। তাই BCIM প্রকল্প যুক্ত থাকুক – এটাই তো আমাদের স্বার্থ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হাতে গুনে মনে রাখতে হবে – হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে বেল্ট-রোডে জড়িয়ে না থাকে বা থাকতে না পারে তবে আমাদেরকে আজন্ম এর কাফফারা দিতে থাকতে হবে। আর ভারতের এখন-তখনের যুক্তির পালটা কথাটা হল, BCIM প্রকল্পের মূল আইডিয়ায় সোনাদিয়া বন্দর ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সেটাই বা বাদ দেয়া হয়েছিল কেন? কেন হাসিনার ২০১৪ সালের চীন সফরের কালে সোনাদিয়া বন্দর চুক্তিতে বাধা দেয়া হয়েছিল?

ভারত যদি মনে করে আর চায় তাহলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত না হয়ে এই প্রকল্প হবে না। নো প্রবলেম। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে ঢাকা-বার্মা-কুনমিং হবে অর্থাৎ BCM প্রকল্প হবে অসুবিধা কী! আর এই প্রকল্পের কেন্দ্র সোনাদিয়া বন্দরও একই সাথে।  সেইসাথে বেল্ট-রোড প্রকল্পেও BCM -এটাও অবশ্যই যুক্ত থাকবে। কিন্তু   ভারতের এতে আপত্তি বা  একমত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ভারতের অবস্থানটা হল  – সে  নিজে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে বেল্ট-রোডসহ কোন প্রকল্পই সে হতে দিবে না।

কেন? কারণ চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্প  সম্পন্ন হতে দিলে আর তাতে ভারত জড়িয়ে থাকলে  তাতে চীন বহু আগিয়ে যাবে আর ভারত চীনের অধীনস্ত হয়ে যাবে। তা হতেও পারে, অসম্ভব না। কারণ ব্যাপারটা মুরোদের – সক্ষমতা ও যোগ্যতার। ভারতের মুরোদ না থাকলে তার বা কারও কী আর করার আছে? কিন্তু তাই বলে, কান-পড়া দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার মত  ভারত কূট-ষড়যন্ত্রের পথ ধরবে? যেটা কোন কাজের কথা নয়।  নাকি গঠনমূলকভাবে, ভারত চীনের এখনকার সহযোগিতাগুলো কাজে লাগানো আর নিজের মুরোদ অর্জন করা্র দিকে যাবে? যাতে কোন একদিন চীনকেও ভারত ছাড়িয়ে যেতে পারে! আজকের চীনের অবস্থাই কী এর প্রমাণ নয়। এককালে আমেরিকার সাহায্য নিয়েই কী আজ চীন এজায়গায় নয়? তাতে সে কী এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে না!

এভাবে  ভারতের মুরোদ অর্জন বিকল্প কূট-ষড়যন্ত্রের পথ – এটা কখনই নয় হতে পারে না। এমনকি ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা তো নয়ই! পাকিস্তান কাশ্মীরের উপর দিয়ে বেল্ট-রোডের মূল বা পাকিস্তান করিডোর গিয়েছে – ভারতের এটা ফর্মাল আপত্তির যুক্তি। সেটাও আসলে খাটে না। কারণ পাকিস্তান অংশসহ পুরা কাশ্মীর ভারতের কী না এটা তো কোন বিতর্কই নয়। কারণ, বিতর্ক হল সারা কাশ্মীরিরা কীভাবে কার হাতে শাসিত হতে তারা সম্মত হবে? ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে শাসিত হবে নাকি নিজেরাই আলাদা হবে?  এরপরেই কেবল, পুরা কাশ্মীর ভারতের হবে কীংবা হবে না তা তখন মীমাংসিত হতে পারে। এর আগে কোন কাশ্মীরই ভারতের নয়, কেউ না।

অতএব ঈর্ষা বা প্রতিহিংসাবশত  বেল্ট-রোডে যোগ না দেওয়ার ভারতের কোন বিদেশনীতি যদি হাজির থাকে তবে তা ভারতেরই থাক। তা আমাদের তো নয়ই, আমাদের দায়ও নয়। তাই আমরা কী করব তা ভারতকে জিজ্ঞাসারও কিছু নাই। আমাদের স্বার্থ, আমাদের ভাল-মন্দ ক্ষতি সব আমাদেরই বইতে হবে। যদিও এব্যাপারে বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বশেষ কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে আমাদের নির্বাচন পরবর্তি সময়কালে।

এ বছর আমাদের নির্বাচনের পরে আমরা দেখেছিলাম, কারও পরোয়াহীন এক  চীনা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন। আর বিশেষ করে সিএনএন-নিউজ১৮ (CNN-NEWS18) নামে ভারতীয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই বোল্ড ছিল। এবং তা এক স্থির সিদ্ধান্তের প্রকাশ দেখিয়ে ফেলেছিল যে, সোনাদিয়া বন্দরসহ বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে হাসিনা সরকার আর থামবে না। এমনকি ওই সাক্ষাৎকার আসলে খোদ ভারতকেই চীনের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে আহ্বান রাখা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের আলো অনুসরণে চিন্তা করলে মনে হয়, এবারের এপ্রিলে বেল্ট রোড সামিট টু-তে চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা দেখব।

কিন্তু এর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, ভারতে এখন রুটিন সরকার; মানে মোদীসহ রাজনৈতিক নেতাদের সময় নেই এনিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার। এর চেয়ে নিজ নিজ এলাকায় মাঠের নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করা তাদের এখন প্রায়োরিটি, একমাত্র কাজ। আগামী মাসে ২৩ মের আগে ভারতে সরকারে কে আসবে, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তা জানার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় এক কথায় বললে, ভারতের নিজের বেল্ট রোড সামিট টু-এর পক্ষে কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশকে এবারো কি তারা ঠেকাতে পারবে?

ঠেকাতে ২০১৭ সালে আগেরবারই পারেনি। ফলে এবারো পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে, সাক্ষাৎকার দিয়ে বলা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দিক থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা। যদি তা আমরা না দেখতে পাই, তবে বুঝতে হবে সরকার আবার আপস করল। সেটা হবে বাংলাদেশের প্রবল সব সম্ভাবনাগুলোর মাথা মুড়িয়ে ফেলে রাখা আর পিটিয়ে কাউকে খাটো বামন বানিয়ে রাখার মতই একটা কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৬ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

গৌতম দাস

০১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yM

প্রেসিডেন্ট দাবিদার হুয়ান গুয়াইদো ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো – ফাইল ছবি

ল্যাটিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। এই ভেনিজুয়েলারই নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ [Hugo Chávez] কমিউনিস্টদের নয়নমণি, তাদের সাফল্যের প্রতীক ছিলেন। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অসুস্থতায় তিনি মারা যান। যদিও সেনাবাহিনীর এই সাবেক লে. কর্নেল ক্ষমতায় তার উত্থান এই সেদিন, মানে ১৯৯৮-৯৯ সালের এবং তা স্বল্পকালীনও – মাত্র ১৪ বছরের শাসন। ভেনিজুয়েলায় যা তার উল্লেখযোগ্য অবদান বলে কমিউনিস্টেরা মনে করে তা হল একধরনের “সমাজতন্ত্র কায়েম” করেন তিনি, বিশেষত ২০০৭ সালের পর থেকে। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। খুবই মার্জিনাল (৫০.৬২%) ভোটে তিনি সেবার জিতেছিলেন।

আর এর পরের টার্মের নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। কিন্তু এখানে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিরোধীরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবুও মাদুরো নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শপথ নেন। ওদিকে গত ২০১৫ সালে ভেনিজুয়েলার পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল, যার ফলাফল ছিল বিরোধী দলের বিজয়-প্রাধান্যে। তাই মাদুরোর শপথের প্রতিক্রিয়ায় পার্লামেন্ট হয়ে উঠে বিরোধীদের বিকল্প ক্ষমতা প্রদর্শনের কেন্দ্র। মাদুরোর এই দ্বিতীয় শপথের পর থেকে পার্লামেন্টে থেকে তারা মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট না মানার তৎপরতাও শুরু করেছিল। তারা পাল্টা প্রস্তাব পাস করে, মাদুরো সঠিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নন, তাই পার্লামেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংসদের বিরোধী দলের নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে [Juan Guaidó] মনোনীত করছে [declared himself interim president on 23 January ]। এতে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকার উপস্থিতি ও স্বার্থ খুবই খোলাখুলি হয়ে যায়। আর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, এক রাষ্ট্রে দুই প্রেসিডেন্টের দাবিদার – বলাই বাহুল্য, এটা ঐ রাষ্ট্রের ইমেজের জন্য খুবই খারাপ।

দেশে-বিদেশে এর বিভক্ত প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। তবুও এক সোজা লাইন টেনে বলা যায়, দেশের ভেতরে তবে পার্লামেন্টের বাইরে আর কেউই এটা মানেনি বা প্রভাব নেই। অর্থাৎ নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মাদুরোর নিয়ন্ত্রণে স্বভাবতই সব সরকারি অফিস প্রশাসন তো আছেই; সেই সাথে বিচার বিভাগও তার পক্ষে। ফলে দাঁড়ায়, পার্লামেন্ট ছাড়া রাষ্ট্রের অবশিষ্ট দুই মূল প্রতিষ্ঠান মাদুরোর পক্ষে। তবে সেই সাথে নির্ধারক সেনাবাহিনীর জেনারেলরাও মাদুরোর পক্ষে। মাদুরো জেনারেলদের সাথে ক্ষমতা ও বৈষয়িক সুবিধা শেয়ার করেন বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু দেশের বাইরে?

ট্রাম্পের আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আঞ্চলিক দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র জোট  ওএএস [ Organization of American States, OAS] , এসব মিলিয়ে মোট প্রায় ষাটেরও বেশি বিভিন্ন রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর পাল্টা রাশিয়া এবং চীন থেকে ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক, এরা মাদুরোর পক্ষে। এক কথায় যেন নতুন করে এক ‘কোল্ড ওয়ার’-এর দুই পক্ষ দল। এ ঘটনায় সবচেয়ে বাজে দিক হল এটাই। যার কারণেই হোক, পরিস্থিতিকে ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকা’ এমন দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে কোল্ড ওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধেরীক লড়াই যেন ফিরে এসেছে – এমন ভাব তৈরি করা, এভাবে ফেলে দেয়া একেবারেই ঠিক হয়নি। কারণ, দুনিয়াকে আমরা চাইলেই আবার ‘দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়’ ফেলে দিতে পারব না। কারণ, দুনিয়ায় এমন কিছুই আর বাস্তবে নেই। এ জন্য এমন ভান ভনিতা ছায়ার সাথে লড়াই – এটা কারো পক্ষেই কোনো কাজের কাজ হয়নি। এটা দুই পক্ষের জন্যই এক অচলাবস্থা।

আরও কঠিন বাস্তবতার দিকটা হল, এখন কথিত সেই ‘সমাজতন্ত্র’ কোথাও আর টিকে থাকতে পারেনি, টিকে নেই কোথাও। কাজেই ভান করে যেন মাদুরোর পক্ষে এক “সমাজতান্ত্রিক জোট” উঠে দাড়িয়েছে, এই ভাব ধরার সুযোগ নেই। কারণ, রাষ্ট্রের সব কিছুই একমাত্র সরকারি মালিকানায় – এমন চিত্রের সেই সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্র বলতে একালে আর কেউ অবশিষ্ট নাই। ফলে যে চিত্রের রাষ্ট্রগুলো এখন আর নাই তাই এদেরই কোন “সোভিয়েত” ব্লক বা আলাদা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোন রাষ্ট্র-জোট আর নাই। গত ১৯৯১ সালের পর থেকে বলা যায়, সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার অন্তর্গত। এমনকি মিয়ানমার অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বলতে হয় উত্তর কোরিয়াও এখন মূলত চীনের মাধ্যমে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থায় যুক্ত। কাজেই এ কালে প্রতারণা করা ছাড়া, “কথিত সমাজতন্ত্রী” ভাব ধরার আর কিছুই নেই। ‘সমাজতন্ত্র’ কারও কাছে খুব ভালো জিনিস হয়ত। ছিল অথবা আছে এখনও। তবুও দুনিয়ায় এমন কিছু একটা এককালে চালু থাকলেও এখন সেটা “এক মৃত অভিজ্ঞতা” ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই এ কালের রাশিয়া অথবা প্রেসিডেন্ট পুতিন মানেই “সমাজতন্ত্রী” নয়। এমন আকার ইঙ্গিত করা,  ভং-চং ধরারও কিছু নাই। এমনকি তার সাগরেদ হিসেবে ইঙ্গিতে চীনকে সাথে দেখতে পেলেও কথা একই থাকে।

বরং, একালে বলা যায় চীন-রাশিয়া মিলে তারা হয়ত আমেরিকার বিরোধীও। তবুও তা যেকোনো দুই বিরোধী স্বার্থের রাষ্ট্রের মতই। এর বেশি গুরুত্ব বা  তাতপর্য এর নাই।  এটা “সাম্রাজ্যবাদ” হিসেবে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়া কোন অবস্থান এমন মানের ইঙ্গিত দিয়ে নৈতিকতার সুড়সুড়ি তুলতে হবে – এমন চেষ্টা ফাঁপা কাজ তো বটেই, তা অগ্রহণযোগ্য ও খারাপ কাজ। কাজেই ‘সমাজতন্ত্রের’ পক্ষ নেয়া হচ্ছে মনে করে এখনকার রাশিয়া বা চীনকে সমর্থন করা কিংবা সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে থাকা বুঝা; কিংবা আমেরিকার ও ইইউর বিরোধিতা করা কিংবা ভেনিজুয়েলার মাদুরোকে কোলে তুলে নেয়া – এসব প্রতিটি কাজই এখন নিজের সাথে প্রতারণা, মিথ্যা প্রবোধ দেয়া হয়ে দাঁড়াবে। এর চেয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া কাজের হতে পারে। ভেনিজুয়েলা সঙ্কটের গোড়া কোথায় তা নতুন করে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি।

কমিউনিস্টরা বলতে পছন্দ করবেন হয়ত যে শ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ জাতীয়করণ করেছেন, গরিবের জন্য তেল বিক্রির অর্থ পাকা বহুতল বাড়ি, শিক্ষা-চিকিৎসায় ব্যয় ইত্যাদির ‘সমাজতন্ত্র কায়েম’ করেছিলেন; সে জন্য “সাম্রাজ্যবাদীরা” ভেনিজুয়েলার জন্য বাধা ও নানান সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ভেনিজুয়েলার বর্তমান সঙ্কটে রাশিয়া ঠিক এ ব্যাখ্যাই দিচ্ছে।

আসলে তেল জাতীয়করণ আর গরিবের জন্য খরচ ব্যাপারটাকে সমাজতন্ত্র বলি আর না বলি, ভেনেজুয়েলার সঙ্কট সেজন্য হয়নি। আবার যদিও বেজ ফ্যাক্টস হল, ভেনিজুয়েলায় তেল জাতীয়করণ শ্যাভেজ করেননি, এটা ১৯৭৬ সাল থেকে আগেই করা ছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি (PDVSA) -এর জন্ম তখন থেকেই। শ্যাভেজ ২০০৭ সালে যেটা করেছেন, সেটা কী তাহলে? দুনিয়ায় যা তেল প্রতিদিন ভোগ-ব্যবহার হয়ে যায়, ভেনিজুয়েলা এর ১৩ শতাংশ একা উৎপাদন করে থাকে বা সক্ষম। কিন্তু তার এই সক্ষমতার প্রধান তেলক্ষেত্র এমন এলাকাকে বলে ‘অরিনোকো বেল্ট’। [ ভেনেজুয়েলায় একুশশত কিলোমিটার লম্বা বিস্তৃত অরিনোকো নদীর দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে দুনিয়ার বৃহত্তম এই তেল ক্ষেত্রে ]।  কিন্তু যেখানকার তেল তুলতে বড় বাধা ছিল যে, প্রথম দিকে এই তেল ক্ষেত্রে প্রস্তুত করতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল।

সে কারণে সরকারি মালিকানাধীন তেলক্ষেত্রের উপরই তা তেল তোলার অবস্থায় আনতে “তেল উত্তোলন বিনিয়োগ প্রকল্প” নেয়া হয়েছিল। আর বিদেশী কোম্পানিকেই বিনিয়োগ এনে এই প্রকল্প চালাতে দেয়া হয়েছিল।  আসলে মুল কারণ ছিল, দুনিয়াতে তেলের চাহিদা ক্রমে বাড়তে থাকায়  ১৯৯৭ সালের দিকে ভেনেজুয়েলার ‘অরিনোকো বেল্ট’ এর তেল উত্তোলনে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এভাবে কূপ তৈরি বহু আগেই শেষ করে কোম্পানিগুলো, যখন বহু আগেই উৎপাদনেও চলে গেছিল, এরই কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে ওই কোম্পানিগুলোকেই হুগো শ্যাভেজের সরকার চাপের মুখে দেশ থেকে বের করে দেয়। এ কাজকে ‘সমাজতন্ত্র’ বলে দাবি কমিউনিস্টরা করুক আর যা-ই করুক, আইনি দিক থেকে ব্যাপারটা হল একটা প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে যে পার্টনার, তাকেই কোম্পানি থেকে গায়ের জোরে বের করে দেয়ার মত। তাই এসব ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে যেমনটা হয়, তেমনই এখানেও ক্ষতিপূরণ মামলা হবেই, হয়েছিলও। আর তাতে কোন কোনটার মালিকানা বিতর্ক মামলায় ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে গেছে, আবার কোনটার মামলা এখনো পেন্ডিং। এখন একে ‘সমাজতন্ত্র’ নামে ডেকে কেউ সুখ পেতে চাইলে পেতে পারে, প্রপাগান্ডা করতে চাইলে করতে পারে।

তবে হুগো শ্যাভেজ এর চেয়েও আরো গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট তৈরি করেছিলেন অন্যখানে। আমরা সে দিকটা বুঝতে যাবো। মাটির নিচের তিন ডলারের তেল ১৭০ ডলারে বেচার চেয়ে আরামের কাজ আর কী হতে পারে! এর চেয়ে আরামের ‘সমাজতন্ত্র’ আর কী হতে পারে! শ্যাভেজ এ মজাই খেয়েছেন। দুনিয়ায় তেলের দাম কিন্তু সব সময়ই সাব্যস্ত হয়েছে কোন ‘সমাজতন্ত্র’ ব্যবস্থা নয় বরং, ‘বাজার’ মানে, একেবারে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারব্যবস্থা দিয়ে। ২০০৭ সালের দিকে তেলের বাজার তখনও তুঙ্গে ছিল, কারণ চীনের জিডিপি তখনো ডাবল ডিজিটে। তাই চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিতে তার জ্বালানি চাহিদা মানে চীনের সম্ভাব্য ব্যাপক তেলের চাহিদাও ছিল তুঙ্গে ফোরকাস্ট। এ দিকটায় নজর করে তেলের বাজারের ফোরকাস্ট খুবই তেজী ছিল।  যদিও ২০০৭ সালের শেষে (২০০৭-০৮) এসে, আমেরিকা টের পায় যে আফগান-ইরাক ওয়ার অন টেররের অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকান রাষ্ট্র নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়িয়ে খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু ওদিকে যুদ্ধ শেষেরও কোন নামগন্ধ নাই। সামগ্রিক পরিণতিতে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতিতে (দ্বিতীয়) মহামন্দা হাজির হয়েছিল।

এতে আমেরিকা-ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়লেও কিন্তু চীনের অর্থনীতির গতি কিছু কমে  সিঙ্গেল ডিজিটের জিডিপিতে এসে আটকে বহাল ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষে (এনার্জি স্টাটিস্টিক্সের প্রতিষ্ঠান, US Energy Information Administration (EIA); এটা আমেরিকান সরকারের হলেও তেলের বাজারে সবার কাছে বিশ্বস্ত) EIA -এর দেয়া চাহিদার ফোরকাস্ট (নিম্নহার) প্রকাশ পায়। এর ফলে তেলে বিনিয়োগকারীরা সদলে আগেই পুঁজি তুলে নেয়া শুরু করেছিল। এতে এরপর থেকে তেলের দাম প্রবলভাবে ক্রমেই কমতে কমতে একপর্যায়ে ৩০ ডলারেও গেছিল, যা এখন ৫৫-৬০ ডলার/ব্যারেলের মধ্যে। সেই থেকে এর ধাক্কা ভেনিজুয়েলার মতো রাষ্ট্র ও ‘সমাজতন্ত্রী’ সরকার আর সহ্য করতে পারেনি। তত দিনে অবশ্য শ্যাভেজ মারা (২০১৩) গেছেন, মাদুরো এসেছেন ক্ষমতায়।

তাহলে ভুলটা কোথায়? মফস্বলের এক দোকানদার বাবা তার দুই ছেলেকে নিয়ে ব্যবসা করেন। সারা দিন তার দোকান খোলা থাকে আর প্রতিদিন তার ক্যাশবাক্স ভর্তি হতে থাকে নগদ ও গোনা হয়নি এমন পরিমাণ টাকায়, তার ব্যবসা এমনই চালু। কিন্তু প্রতিদিন সেই বাবা সন্তানদের সাবধান করে একটা কথাই কেবল বলেন, বাবারা মনে রাখবা, বাক্সের সব টাকা আমার নয়। ব্যবসায় লভ্যাংশ যেটা, কেবল সেটা আমার, সেই টাকা থেকে সংসারে খরচ করতে পার। কেন? কারণ তিনি আসলে বলছিলেন ব্যবসার পুঁজিতে হাত না দিতে, পুঁজি না খেয়ে ফেলতে। ক্যাশবাক্সের কাঁড়ি কাঁড়ি মোট টাকা মানে তা হল ব্যবসায় বিনিয়োগ আর মুনাফার যোগফল। কাজেই, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দেখে ছেলেদের যেন মাথা খারাপ না হয়ে যায়।

সমাজতন্ত্রী শ্যাভেজ-মাদুরোরা বাজার খুবই অপছন্দ করেন, কিন্তু ফুলে-ফেঁপে ওঠা ১৭০ ডলারের তেলের বাজার কামনা করেন, ব্যাপারটা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৭০ ডলার এক ব্যারেল তেলের মধ্যে ১৭০ ডলার পরিমাণ ভ্যালু (value addition) ভেনিজুয়েলা যোগ করেনি। তবুও ওই দামেই তা বিক্রি হয়েছে, কারণ বাজারের প্রবল চাহিদা। আর সেটা আবার কোনো স্থানীয় বাজার না গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারে সেটি নির্ধারিত। ফলে এই বিপুল আয়ের ওপর চোখবুজে ভরসা করে খরচের ফর্দ আর দায় নিয়ে ফেলা অনুচিত হলেও শ্যাভেজরা তাই করেছিল। সরকার সমাজতন্ত্রের নামে ‘গরিবের জন্য অর্থ ব্যয়ের পপুলার কর্মসূচি’ খুলে বসেছিল। ফলে এটা স্থায়ী সরকারি ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছিল। বিপরীতে আয়ের সংস্থানের ব্যবস্থাটার কোন স্থায়ীত্ব না থাকলেও। তাই তেলের দাম পড়ে গেলে তখন এই ব্যয় নির্বাহে সরকার হিমশিম। ফলাফলে অতিরিক্ত টাকা ছাপানো, ফাইন্যান্সিয়াল মিসম্যানেজমেন্ট, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি।

তবে দ্বিতীয় আরো বড় ভুলটা হল, তেল বেচে পাওয়া অর্থ থেকে সরাসরি পপুলার সামাজিক কর্মসুচিতে খরচ না করে বরং একে আগে কোনো উৎপাদনে, কোনো কৃষি বা শিল্প কাজে বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। এরপর সেই উৎপাদনের লাভালাভ থেকে একটা অংশই কেবল ‘গরিবের জন্য অর্থব্যয়ের পপুলার কর্মসূচিতে ব্যয়’ বা ব্যবহার করা উচিত ছিল। এতে শুরুতে গরিবের জন্য কর্মসূচি চালু করতে কয়েক বছর একটু দেরি হত অবশ্যই। কিন্তু ক্রমেই একবার চালু করতে পারলে তা স্থির ও দৃঢ়ভাবে চলত। মাঝপথে তেলের দাম পড়ে গেলেও তা রাষ্ট্রের জন্য দায় হয়ে উঠত না। তেলের আয়ের সাথে গরিবের জন্য ব্যয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না করা ছিল এর সূত্র বা চাবিকাঠি।

ক্যাপিটালিজমের স্বভাব না বুঝে ক্যাপিটালিজমের বিরোধিতা, খামখা সব পদক্ষেপ আর উদ্ভট দাবি অনেক অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে পারে। সমাজতন্ত্রীরা আজীবন এগুলোই করে এসেছে। সমাজতন্ত্রী চিন্তার আরেক আজিব বৈশিষ্ট্য হল – নাগরিকের সব মৌলিক খরচের (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান) দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে – তা সবার আগেই দাবি করে অথবা ধরে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্র কোথা থেকে তা জোগাড় করবে, সামর্থ্য আছে কি না, হয়েছে কি না বা কতটা সেসব কোনো কিছু দেখা ছাড়াই এমন দাবি তারা করে থাকে। তারা ধরে নেয় রাষ্ট্রের এই সামর্থ্য আছে বা থাকবেই বা থাকে। অথচ প্রথম কাজ ছিল রাষ্ট্রের আয় ও খরচের সামর্থ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়া।  আর পরে বাড়া সামর্থের অনুপাতে খরচের পরিকল্পনা করা।

আফ্রিকার দেশগুলো কলোনিমুক্ত স্বাধীন হয়েছিল মোটামুটি ষাটের দশকের শুরু থেকে। তাদের কাছেও সমাজতন্ত্র-ভাবনা এমন এক কাঙ্খিত বটিকাও ছিল। আফ্রিকার  জাম্বিয়া ১৯৬২ সালে স্বাধীন হয়েছিল। এর এমন স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্টের নাম কেনেথ কাউন্ডা। এ কালে চাকরি সুত্রে জাম্বিয়ায় বসবাস কালে শুনেছি, তিনি নাকি সেকালে বাসায় তৈরি মদ খেয়ে জনগণের পেট খারাপের কষ্ট পাওয়া পছন্দ করতেন না। তাই কারখানায় তৈরি মদ ট্যাঙ্ক লরিতে নিয়ে বিতরণের ব্যবস্থা করতে গেছিলেন। সম্ভবত মদও যেহেতু এক প্রকার খাওয়া্‌ মানে অন্নের সংস্থান। ফলে সেটাও রাষ্ট্রের খাওয়ানোর দায় নিতে গেছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের পর এসে জাম্বিয়া রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে গেছিল, যা এখন একালে আবার অনেক কষ্টে ধীরেসুস্থে বিদেশী (চীনা ও বিশ্বব্যাংকের) বিনিয়োগ, দান-অনুদানে আবার জাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভেনিজুয়েলার সঙ্কট অবশ্য ওপরে যেগুলো বললাম, এগুলোই সব নয়। এর উপরে আরো নানান ডালপালাও আছে। যেমন ওই ২০০৭ সালের আরো ঘটনা হল, যখন সমগ্র দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র এক মৃত অভিজ্ঞতা মাত্র, (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ভেঙে গেছে) যা নিজ উদ্যোগে ভেঙে পড়েছে তা সবাই জানে। কিন্তু তবু শ্যাভেজ সেখান থেকে কোন শিক্ষা , সাবধানতা সতর্কতা ছারাই ভেনিজুয়েলার টেলিকম, বিদ্যুৎ, পানি, সিমেন্ট, স্টিল, ব্যাংক ইত্যাদি সব কিছু জাতীয়করণ করেন। পরবর্তীকালে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনের বিস্তারিত সব দিক প্রসঙ্গ যদি সরিয়েও রাখি, তবুও ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে এর প্রধান প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল এবং এখনও হয়ে আছে – এগুলোর অদক্ষভাবে প্রচুর খরচে পরিচালনা।

আর সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া দিক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া, সেটা তো আছেই। সরকারের হাতে মালিকানা রাখলে সে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট বা পরিচালনা যে এক অসহনীয় সমস্যা, এ কথা তো ২০০৭ সাল নাগাদ সমগ্র দুনিয়ার সমাজতন্ত্রীদের কানে ঢুকে যাওয়ার কথা। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেটা ঘটেনি। ভেনেজুয়েলার দুর্নীতি জনমনে কত মারাত্মক উদ্বেগের তা একটা চিহ্ন হল – এ বছর জানুয়ারিতে মাদুরো প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে তিনি তা উল্লেখ করে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ নেবেন। [He concluded by highlighting that the recovery of Venezuela’s economy and the fight against corruption and indolence are the government’s priorities for the near future,]। এমন সব কিছু অব্যবস্থার প্রভাব কত প্রবল তা বোঝার আরেক সহজ জায়গা হল মুদ্রাস্ফীতি। আপনার যদি ১০ হাজার টাকা থেকে থাকে, তবে এক বছর পর ওর মূল্য ভেনিজুয়েলায় এখন ৫৯ পয়সা। বলা হচ্ছে, ভেনিজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০৮৭.৫২ শতাংশ। [which means that bolívar savings worth $10,000 at the start of the year dwindle to 59 cents by the end. ]

অনেকে ইঙ্গিতে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, ভেনিজুয়েলা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সে জন্য নাকি পুতিনের রাশিয়ার সাথে খুব দহরম-মহরম। এমন ভিত্তিহীন অনুমান অনেকের মনে কাজ করে থাকে। কিন্তু পুতিনের সাথে সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক কী? পুতিন বা রাশিয়া কী এমন দাবি করেছে  যে রাশিয়া সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, আছে? তবু এমন “সমাজতন্ত্র- বিক্রেতা” এখনও আছে। এরা আসলে রাশিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থের তাঁবেদার ও ভাঁড়। বাস্তবে, ভেনিজুয়েলা এখন রাশিয়ার বিরাট বিনিয়োগের ক্ষেত্র, ২০০৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট বিনিয়োগ প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার [Since 2006 Russia has lent Venezuela at least $17bn. ]। ইকোনমিস্ট এক রিপোর্টের শিরোনাম বলছে, [Vladimir Putin fights for his own future ] অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে মাদুরোকে যদি শেষে বিদায়ই নিতে হয়, তবে নিজের বিনিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাশিয়া।

অর্থনীতি ভেঙে পড়া, দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া ও অব্যবস্থায় অচল ইত্যাদির সরকারের ক্ষেত্রে যা হয়, এখানে তা ঘটেছে। এর একপর্যায়ে সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের পক্ষে সরাসরি ক্যাডার গুণ্ডা বা মিলিশিয়া নামাতে হয়, বিরোধী জমায়েতে হামলা করতে হয় যারা আবার পুলিশবাহিনীর প্রটেকশন পেয়ে থাকে – এসবই ঘটে গেছে ভেনিজুয়েলায়। জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থাকার সব কর্মাদি এখানে সম্পন্ন করা হয়েছে। সবার ওপরে মাদুরোকে  আবার কেউ উলটে ফেলে দেয় তা থেকে রক্ষা করতে পুতিনের দেয়া প্রটেকশন, সেটা তো আছেই।

ইকোনমিস্টের আরেক অবজারভেশন হল – […hollowing out of institutions and the privatisation of state power is precisely what Russia and Venezuela have in common]। অর্থাৎ এখানে মাদুরো আর পুতিনের মধ্যে এক বড় মিল আছে। সেটা হল, উভয় ব্যক্তিরই দখলে থাকা বা পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যার যা ভূমিকা তা হল, প্রশাসন পাবলিকের পক্ষ থেকে গণস্বার্থ দেখা ও মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি সব দায়িত্ব বাদ দিয়ে এখন উলটা্ “প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ফোকলা” আর অকেজো করে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনিক বিজনেস রুলের রুল বই দিয়ে এগুলো আর পরিচালিত নয়। এগুলো পরিচালিত হয় ব্যক্তি-মুখের নির্দেশে। এটা যেন ‘রাষ্ট্রক্ষমতারই এক প্রাইভেটাইজেশন’ এমন ঘটে গেছে। আর কে না জানে, যখন রাষ্ট্রের নির্বাহীদের কেউ কব্জা করে নেয়, তখন তার রাষ্ট্রীয় সম্পদও তাদের দখলে চলে যায়, রাষ্ট্র এক পরিত্যক্ত এলাকা হয়ে যায়।

এসবের মিলিত এখন আর এক রূপ হল, ‘প্রাইভেট আর্মির’ সমাধান। ইকোনমিস্ট-সহ অনেকে জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে মাদুরোর কোনো সম্ভাব্য ক্ষমতাচ্যুতি ঠেকাতে রাশিয়া ইতোমধ্যে কয়েক শ’ রাশিয়ান ‘প্রাইভেট আর্মি’ বা ওয়াগনার (Wagner mercenaries) পাঠিয়েছে।

‘প্রাইভেট আর্মি’- এটা ইদানীংকালের আরেক নতুন ফেনোমেনা। তবে সাবধান, এটা পুতিনের রাশিয়াই প্রথম দেখিয়েছে তা মোটেও নয়। ইরাকে বা আফগানিস্তানে ব্লাক-ওয়াটার[Blackwater] বাহিনীর কথা আমরা শুনেছিলাম। এরাই ছিল সেখানে আমেরিকান ‘প্রাইভেট আর্মি’ সরবরাহের কোম্পানি। পরে অবশ্য এক স্থানিয় বাজারে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গুলি ছুড়ে মারার অভিযোগে কেলেঙ্কারিতে পড়ে এই বাহিনী আমেরিকায় ফিরে যায়। মজার ব্যাপার হল, মিয়ানমারের এক ইংরেজি দৈনিক খবরে দাবি করা হয়েছে যে, চীন সেই ব্লাক-ওয়াটার কোম্পানিকেই নতুন নামে মিয়ানমারে নিয়োগ করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার চুলায় যাক, আমেরিকা, রাশিয়া অথবা চীন প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে প্রাইভেট গুন্ডাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও তা করতে চায়। এব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন নীতিগত ফারাক নাই।

ভেনিজুয়েলাবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলার ক্ষেত্রে আরেক বিরাট অবদান ট্রাম্পের আমেরিকার। এ কালে আমেরিকা যার ওপরে ইচ্ছা “অবরোধ আরোপ” করে রাখছে। এই অবরোধের সোজা মানে, সেই রাষ্ট্রের পক্ষে ডলারে কোনো কিছু বেচা/কেনা করা বন্ধ করে দেয়া। ফলে ভেনিজুয়েলার এখন ডলারে তেল বিক্রি বন্ধ। এ ছাড়া ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয়গুলো পণ্যের আমদানিতেও এর বাধা তোইরি করে রাখা  তো আছেই। অথচ ১৯৪৪ সালে ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে গ্রহণ করার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল নিজে অন্য রাষ্ট্রকে ডলারে পণ্য কেনাবেচা করতে বাধা দিবার সুযোগ নিজের হাতে রাখবে এমন কোনো শর্ত ছিল না।

সামগ্রিক দিক থেকে দেখলে ভেনিজুয়েলার বিরাট আরেক ভুলটা হল বিপ্লবীপনার মোহে শেষে রাশিয়া ও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার ফাঁদে পড়া। অথচ সরাসরি কারো কব্জায় পড়া এড়িয়ে যাওয়া – এই নীতি অনুসরণ করে পথ চলা সঠিক ছিল। এ ছাড়া নিজ দেশের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ যতই বিরোধ থাক, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবিতর্কিত রাখা খুবই জরুরি। অন্যথায় আভ্যন্তরীণ বিরোধকে ছোট বা সীমিত  ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে যায়। কারণ, সমাজে নানা রকম স্বার্থদ্বন্দ্ব থাকবেই, যা এক চলমান ঘটনা। কিন্তু তা এক ‘পারমিশিবেল রেঞ্জের’ মধ্যে রাখতে পারতে হয়। আমরাই একমাত্র ভাল অথবা সমাজতন্ত্রী এসব প্রচার করে সমাজকে অন্তত গভীর দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেললে নিজের দেশ বাইরের দেশ ও লোকের স্বার্থের ঘুঁটি হয়েই ওঠে। ভেনিজুয়েলার অবস্থা হয়েছে এটাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভেনিজুয়েলা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

 

সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

গৌতম দাস

২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yD

 

গত ২২ মার্চ ছিল শুক্রবার; অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডে গত ১৫ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এক জোড়া মসজিদে হামলায় ৫০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পরের শুক্রবার সেটা। এ দিন নিউজিল্যান্ডের প্রতিটি শহর দুপুরে, বিশেষ করে ঘটনাস্থল ক্রাইস্টচার্চ সিটিতে ‘হেডস্কার্ফ’ (Headscarf, ওড়না জড়িয়ে মাথা ঢাকা) লাগানো নারীদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠেছিল। কারণ, ২২ মার্চ শুক্রবার ছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে আগের শুক্রবারে হামলায় নিহতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের পরিবার এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের সাথে নাগরিক সবাইকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সরকার ও প্রশাসনের সংহতি প্রকাশের দিন। এটা ছিল আসলে ধর্মীয় এবং সামাজিক ধরণের জমায়েতের এক মিশাল। ফলে তা মুসলমান ধর্মীয় আবার অন্যধর্মের লোকেদেরও সংশ্লিষ্ট হবার সুযোগ রাখা হয়েছে বা সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। যাতে সকলে মিলে সংহতি প্রকাশ করা যায়। আর “সংহতি” মানেই তো ধর্মসহ সব নির্বিশেষে সকলে মিলে যা পালন করা হয়। কিন্তু কিসের বিরুদ্ধে এই “সংহতি” সেকথাও মনে রাখা দরকার। “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” [White Supremist] – এমন চিন্তা ও বয়ান আর এর চর্চার বিরুদ্ধে এই সংহতি। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের এক ব্যাপক জনসমাগমে প্রধান ধারা হিসাব এই বক্তব্য উঠে এসেছিল  যে তারা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী-দের” বিরুদ্ধে এবং ধর্ম-নির্বিশেষে তাঁরা সংহত – এককাট্টা।  তাই এই আয়োজন করা হয়েছিল ঐদিনের জুমার নামাজের জমায়েতের সাথে একসাথে। আর সেই উপলক্ষে আয়োজনস্থল ছিল দুই মসজিদে হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বা নিহত হওয়া আল নূর মসজিদের সামনের স্থানীয় ‘হাগলে পার্ক’ [Hagley Park ]। সেখানেই বয়স-নির্বিশেষে নারীরা সবাই মাথায় হেডস্কার্ফ পরে যোগ দেন, যাতে তা তাদের প্রকাশিত সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়।

স্বভাবতই মসজিদে হামলায় একসাথে পঞ্চাশজন মেরে ফেলার পর এর একটা মানসিক যাতনার প্রভাব তৈরি হয়েছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে।  মুসলমান জনগোষ্ঠি বিশেষ করে নারীরা যাদের সাধারণত মুসলমান পরিচয় মানে ওড়নায় মাথা জড়ানো হয়েই বের হতে দেখা যায়, ফলে তারা চিহ্নিত – ফলে তারা আবার হামলা আক্রমণের শিকার হন কিনা এই ভয়বোধ জেকে-বসা খুবই স্বাভাবিক। মুসলমান সহকর্মি বা পড়শিদের কাছে তাদের এই ভয়ভীতিবোধের কথা জানতে পেরে নিউজিল্যান্ডের একই সাধারণ মানুষ যাদেরও গায়ের রঙ সাদা তারা এতে অস্বস্তি আর কিছুটা অপরাধবোধেও ভুগতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মসজিদে হামলার ঘটনা কেবল নিউজিল্যান্ডের মাত্র ১% মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই নয় প্রধান ধারার সাধারণ মানুষকেও আলোড়িত করে এক নেতি প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। আর সেখান থেকে সাদা-বাদীদের প্রত্যাখান করে মুসলমা্নদের ভয়বোধ আর সাধারণ মানুষের অস্বস্তি ও অপরাধবোধ – সবকিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে উঠে দাড়ানোর, রুখে উঠার প্রয়োজনীয়তা হাজির হয়েছিল। আর সেটাই ছিল হেডস্কার্ফে প্রকাশিত প্রতীকে “সংহতি” প্রদর্শনের কড়া বার্তা। এককথায় বললে, এই সংহতি প্রকাশের ফলে মসজিদে হামলার সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের যে উদ্দেশ্য ছিল যে নিউজিল্যান্ডের সাদাচামড়ার সাধারণ মানুষকে উস্কানি দেয়া, মুসলমান বা মাইগ্রেন্টদের বিরুদ্ধে তাদের শুড়শুড়ি দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলা ইত্যাদি সবকিছুই মাঠে মারা যায়। উলটা সাদাচামড়ার খ্রীশ্চান সাধারণ মানুষই মুসলমানদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বসে।

মাথায় স্কার্ফ লাগিয়ে মসজিদের ঘটনায় নিহত বা ভিকটিম পরিবারের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, সান্ত্বনা-সহানুভূতি জানানোর রেওয়াজ শুরু করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নারী প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডেন [Jacinda Arden], হামলার ঘটনার পরের দিন থেকেই। এক আদর্শ প্রধানমন্ত্রীর মতই তিনি কাজটা করেছেন। এসব সময়ে ধর্ম-নির্বিশেষে ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো আর জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত হতে না দেয়া, ঐক্য ধরে রাখা – এটাই তো তার আসল কাজ। তাই স্বভাবতই সেটা দেশ-বিদেশে খুবই প্রশংসিত হয়েছে। আর সেখান থেকেই নিউজিল্যান্ড জুড়ে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা ধর্মনির্বিশেষে এক নাগরিক ঐক্য ও সহমর্মিতা বোধ তৈরিতে লেগে পড়েছিলেন এবং তিনি তাতে সফল তা বলা যায়। তিনি বারবার বক্তৃতায় বার্তা দিয়ে গেছেন যে, ‘হামলাকারী ব্রেনটন ও তার সাদারাই শ্রেষ্ঠ এই তত্ত্ব “অগ্রহণযোগ্য এবং স্বভাবতই তা আমাদের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ তৈরি করতে ব্যর্থ হবে, কারণ আমরা এক”। বলা যায় ব্রেনটন ও তার সাদাবাদিতাকে উপড়ে তুলে সমাজ-কমিউনিটি থেকে বাইরে ফেলে দিতে এখানেই তিনি এবার সক্ষম ও সফল হয়ে যান। তার এই শক্ত অবস্থান ও প্রচেষ্টা জনমনে ইতিবাচক আবেদন সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। তাই সে্টাকেই আরো বড় করে ছড়িয়ে দিতে সোস্যাল মিডিয়ায় ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ [Headscarf-for-Harmony] নামে হ্যাশট্যাগ গ্রুপ গঠন হয়ে যায়। বলা হচ্ছে অকল্যান্ড শহরের এক ডাক্তার তাঁর এক মুসলমান সহকর্মির কাছ থেকে তাঁর ভয়ভীতিবোধের ব্যাপারটা জেনে কিছু করার তাগিদ থেকে এই হ্যাশটাগ আন্দোলন আহবান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই গ্রুপের উদ্যোগেই জুমাবারে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে সমন্বয়ে ঐ ‘হেগল পার্কের’ সমাবেশে দুই মিনিটের নিস্তব্ধতা পালন করে সংহতি প্রকাশের প্রোগ্রাম সবাই মিলে বাস্তবায়ন করেছিল।

রাজনৈতিক-সামাজিক বড় ঘটনায় সবসময়ই কিছু অতি-বাদী এরাও হাজির থাকে। সবকিছুতেই অতিরিক্ত মানে, পরিস্থিতি যতটুকু দাবি করে তার চেয়ে বেশি করে ফেলা, এমন হয় এরা। এরা হতে পারে – অতি-বাম, নয়ত অতি-ইসলামি বা অতি-নারীবাদী ইত্যাদি ধারার কাউকে কাউকে পাওয়া যায়ই। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। যেমন সামাজিক মিডিয়ায় অনেককে দেখা গেছে এক “ষড়যন্ত্র তত্ব” নিয়ে হাজির হতে। এরা বলতে চাচ্ছেন যে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার স্কার্ফে নিজেকে প্রকাশ ও সহমর্মিতা প্রদর্শন – এটা “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”। এটা আসলে কেবল দেখানো জন্য। কেন? কারণ সাদা শ্রেষ্ঠ্ত্ববাদী খ্রীশ্চান ব্রেনটন= নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী খ্রীশ্চান জেসিন্ডা। অর্থাৎ খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। এতে মানে দাড়ালো যে জেসিন্ডাই ব্রেনটন। সেকারণে হামলা করে এসে এখন জেসিন্ডা কালো স্কার্ফ পড়ে হাজির হলেও তিনি আসলে মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। এদের এমন এই চিন্তার কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে ১. খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। ২. খ্রিশ্চান মানেই সে এন্টি-মুসলমান। মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। ৩। খ্রীশ্চান কখন মুসলমানের জন্য ভাল কিছু করতে পারে না; ইত্যাদি এসব বক্তব্যের ভিত্তির উপর।

কিন্তু এমন চিন্তা যেকোন মুসলমানের জন্যই ভীষণ বিপদজনক। কেন? কারণ এই বক্তব্যের যুক্তির প্যাটার্ণ অনুসারে তাহলে সারা দুনিয়াতে ঘটা যত খুন খারাবি, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এমনকি সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য করা কাজসহ যাবতীয় কাজ আছে যা কোন না কোন মুসলমান জড়িয়ে আছে সেসবের জন্য দায়ী দুনিয়ার সব মুসলমানেরা – একথা মেনে নিতে হবে! আসলে এমন চিন্তা অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। মুসলমান মানেই সে ভাল অথবা খ্রীশ্চান মানেই খারাপ – এটা অতি-সরলিকরণ এক ভিত্তিহীন চিন্তা। একইভাবে এক মুসলমানের কাজের দায় সব মুসলমানের – এমন চিন্তাও অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। আসলে এগুলো খুবই কম চিন্তা করে বলে ফেলা কথা। যেমন, বলা হল এক মানুষের নাম রহিম। অতএব মানুষ মাত্রই তাঁর নাম রহিম – এমন মনে করা। এগুলো হল ‘সাধারণ’ আর ‘বিশেষ’ – এই দুই এর সম্পর্কে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা। যেখানে মানুষ আমাদের সাধারণ নাম। আর রহিম বিশেষ নাম। তাই রহিম একই সাথে মানুষ হলেও মানুষ মাত্রই সে রহিম হবে তা কখনও নয়।  তবু চিন্তায় সতর্ক না থাকলে চিন্তার এমন এই পা-পিছলানি ঘটে।

মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে বিভিন্ন প্রতীক বা আচার-রিচুয়াল [ritual] ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকে। ফলে সেখানে কোন জিনিসটি প্রতীক হয়ে উঠছে, এর চেয়েও কী উদ্দেশ্য মানুষের সবার সেই ঐক্য সংহতি প্রকাশ তারই ভাব-প্রভাব নিয়ে হাজির হয়ে যায় সেই প্রতীক। এখানে তা-ই হয়েছে। এখানেও যে স্কার্ফ যা মূলত ইসলামী নারীদের কারণে ইসলামের প্রতীক মনে করা যায় সেই স্কার্ফকেই এখানে নিউজিল্যান্ডবাসী ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের প্রতীক হিসাবে – সেই সংহতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। হামলাকারি ব্রেনটন যদি নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানদের বার্তা দিয়ে থাকে যে স্কার্ফ বা মুসলমান দেখলেই তাদের “নির্মুল কর” তাহলে সেক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানেরা পালটা বার্তা তৈরি করেছে যে না তাঁরা বরং ব্রেনটন ও সাদা শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তাকে প্রত্যাখান করছে। শুধু তাই না। শোকে দুঃখে থাকা মুসলমানদের সাথে মিলে সহমর্মিতায় ঐ স্কার্ফকেই সংহতির প্রতীক হিসাবে তুলে ধরছে।

কিন্তু ঐদিনই স্কার্ফের বিরুদ্ধে আবার আপত্তি তুলে ধরেছেন কিছু অতি-নারীবাদী। এটা “সস্তা প্রতীকী প্রদর্শনী” বলেছেন। [In an unsigned opinion piece on Stuff.co.nz, a Muslim woman called the movement “cheap tokenism”.] তাদের দাবি স্কার্ফ হল নারীদেরকে ঘেরটোপের মধ্যে আটকে রাখার মুসলমানের ধর্মীয় ব্যবস্থা ও চিহ্ন। অতএব স্কার্ফ ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক হতে পারে না। আগেই বলেছি এটা অতি-নারীবাদী অবস্থান। প্রথমত, স্কার্ফকে সুনির্দিষ্টভাবে এই ঘটনায় ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক বলে গ্রহণ করতে কেউ কাউকে বাধ্য করে নাই। এমনকি মুসলমানেরাও নয়। সোশাল মিডিয়ায় কেউ একজন প্রস্তাব করেছিল আর তাতে ধর্মনির্বিশেষে সকলের তা মনে ধরেছিল – এত টুকুই। স্কার্ফের আর অন্য মানে যাই থাক সুনির্দিষ্ট এখানে এই সবচেয়ে ‘ওপেন চয়েজ’ এর মাধ্যমে যার যার বেছে নেয়া ও সাড়া দেওয়া – এটা বিরাট তাতপর্যময় এবং গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। অতি-নারীবাদী অবস্থান এটা দেখতে মিস করেছে। এটা পরিস্কার যে এখানে স্কার্ফের অন্য কোন মানে/প্রতীক আছে কিনা অথবা যাই থাক তা এদের বিবেচনার বিষয়ই ছিল না। মুল বিষয় ছিল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তা ও ব্রেনটনের বার্তাকে” নাকচ করা। এবং নিজেদের সংহতি জানানো। কিন্তু স্কার্ফ মাত্রই “গা-চুলকানি বোধ” এটা তো যাদের এমন অনুভব তাদের চিন্তায় অসর্তকতার সমস্যা। এখানে বরং সবচেয়ে কড়া মেসেজ ছিল – ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নারকীয় খুনি ব্রেনটনের বার্তাকে নাকচ করা। অর্থাৎ স্কার্ফ ইসলামের প্রতীক কি না, ইসলাম ভাল অথবা মন্দ কিনা সেসব বিষয় উহ্য রেখে এবং একে ছাপিয়ে গিয়ে  ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নৃশংস খুনের কাজকে কোন জায়গা না দেয়া, প্রত্যাখ্যান।
কিন্তু তবু স্কার্ফ কেন? এটা বুঝতে অনেকেই মারাত্মকভাবে মিস করেছেন। অনেক সময় বিরাট চিন্তাবিদ তাত্বিক হতে গিয়ে আমরা বাস্তবতা বা ব্যবহারিক দিক ভুলে যাই। সুনির্দিষ্ট বাস্তব দিকটা নজর দিতে গাফিলতি করে বসি। নিউজিল্যান্ডের মুসলমান মোট জনসংখ্যার ১% বলছেন অনেকে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক লাখ হয়ত। আমাদেরকে কল্পনা করতে হবে ্সেখানকার ঐ সংখ্যালঘু মুসলমান নারী-পুরুষের জায়গায় বসে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হামলার পর থেকে এদের মনে কী তীব্র ভয়ভীতি নিরাপত্তাহীনতা  দানা বেধেছিল। অথচ বেচে থাকার স্বাভাবিক কাজ কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ নিজেই করতে হয় বলে সেজন্য মুসলমান নারী-পুরুষ সকলকেই ঐ শহরে বাইরে বের হতেই হবে। অথচ বাইরের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের চামড়ার রঙ তো সাদা! তাহলে এরা সবাই কী মুসলমানদের জন্য ঘাতক, একেক জন মুসলমানদেরকে হামলার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে? এমন যেন এই হামলে পড়ল বলে?  এটাই সেই ভয়ঙ্কর দুঃসহ ভীতি! এটা আমরা যারা দূরে বসি আছি আমাদের অনুভব করতে হবে। তাহলে বুঝব। না হলে সবই কারও ষড়যন্ত্র বলে মনে হবে।

সহকর্মি বা পড়শি যারা মুসলমানদের পাশে বসবাস করে দেখা হয় এদের মধ্যে যাদের কে তবু কাছের মনে হয় তাদের সাথে মুসলমানেরা স্বভাবতই তাদের অনুভব শেয়ার করবে। তাই ঘটেছিল। কিন্তু সেকথা শুনে ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কী মনে হয়েছিল? ঐ খ্রীশ্চান পড়শিরা এই প্রথম টের পেয়েছিল যে মসজিদে হামলাকারি ব্রেনটন তাদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে! অথচ মসজিদে হামলার ব্যাপারটা আগে হয়ত ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কাছে অনেক দুরের ঘটনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু খ্রীশ্চান পড়শি এবার টের পেল ব্রেনটন তাদের সবাইকেই পড়শি মুসলমানদের কাছে  একেকজন খ্রীশ্চান সন্দেহভাজন খুনি  বানিয়ে ছেড়েছে  – যে সম্ভাব্য খুনিরা এখনই বুঝিবা রাইফেল বের করে মুসলমানের উপর  ঝাপিয়ে পড়বে এমনই দানব!

স্বভাবতই যা সে নয় এমন পরিচয়ের দাগ তার গায়ে লাগাতে চিত্রিত হতে বেশির ভাগ মানুষই রাজি হবে না। এর সোজা মানেটা হল মুসলমানের মনে হামলা ভয়ভীতির দুঃস্বপ্ন আর সাধারণ খ্রীশ্চান পড়শিরা এদের সবার গায়ে একেকটা দানব এই পরিচয় লেপ্টে দেয়া একই কথা। অতএব একপক্ষের মনে ভীতি আর অপরপক্ষকে দানব পরিচয় লেপ্টে দেয়া – দুপক্ষই সবই এসব কিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে  উঠে দাড়াতে মনস্থ করা থেকেই স্কার্ফ প্রতীকের উদ্ভব। আর মুসলমান মেয়েরা স্কার্ফ ব্যবহার করে বলে না চাইতেই তারা মুসলমান বলে জনসমক্ষে চিহ্নিত। সম্ভবত সে থেকেই  ধর্মনির্বিশেষে সকলেই যদি প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে স্কার্ফ পড়ে তাহলে অন্তত মুসলমান নারীরা সেফ ফিল করবে – এমন ভাবনার উদ্ভব। অতএব এই স্কার্ফ প্রতিবাদের সারকথা ছিল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্রত্যাখ্যান। মুসলমান পড়শির মনে সাহস ফেরানো – এক কমিউনিটি ঐক্য। অতএব মুলত একেবারে ব্যবহারিক প্রয়োজন বোধ ছিল কমিউনিটিতে মুসলমান নারীদের ভয়ভীতি তাড়ানো আর নিরাপত্তাবোধ আনা।  আর সেই অভিযোগের দাগ থেকে সাদা চামড়ার সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা। নিউজিল্যান্ডের মুসলমানেরা ভয়ভীতি দূর করে বাসা থেকে বের হবার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা এক অগ্রপক্ষেপ।
সুতরাং একেবারেই মুল তাগিদ ছিল নিউজিল্যান্ডের কমিউনিটি-সমাজে এক ব্যবহারিক সমস্যা দূর করা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে  নানান কিসিমের অতি-বোধ তৈরি হচ্ছে ইস্যু বা সমস্যার ব্যবহারিক দিক থেকে তা দেখতে না পারা থেকে। অতি-ইসলামবাদীরা ভাবছেন সকলেই স্কার্ফ চাপালে তো বিপ্লবের জোশ কমে যাচ্ছে ফলে নিশ্চয় এটা ব্রেনটনের খ্রীশ্চান বোন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার ষড়যন্ত্র। অথচ তারা দেখতে পাচ্ছেন না ভয়ভীতিতে নিরাপত্তার অভাববোধে ঘরবন্দী মুসলমান নারী-পুরুষ বাইরে বের হবার পক্ষে নির্বিশেষ কমিউনিটি-সাহসের জন্ম হোক, উঠে দারাক – সেটা খুঁজে ফেরা থেকেই এই স্কার্ফ সংহতির জন্ম। এমনকি মুসলমানদের মনে সাহস আনার জন্য জেসিন্ডা নিউজিল্যান্ডের মত হামলা ঘটবার দেশ-শহরে পালটা অত্যন্ত দৃঢতা দেখিয়ে ঐ শুক্রবারে টিভিতে জুমার আজান প্রচারের ব্যবস্থা করেন। 

প্রায় একই ধরণের এক ব্যাখ্যা ও এর প্রয়োগ করতে গিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজের বিপদ ডেকে আনতে গিয়েছিলেন। তবে তাঁর সৌভাগ্য যে তিনি তা সামলে নিতে, নিজেকে কারেক্ট করে নিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তিনি সাহসের সাথে তা নিয়েছেন। তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন। কোন নির্বাচনে আভ্যন্তরীণ বহু হিসাবকিতাব থাকে, বুদ্ধিমানেরা সে হিসাবের সব বক্তৃতা বিবৃতিকে সেগুলা যেন দেশের বাইরে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে কথা বলেন, ব্যবস্থা করে রাখেন। এরদোগান ব্রেনটনের হামলায় নিজেকে এর প্রতিরোধের বীর হিসাবে দেখাতে বক্তৃতা করেছিলেন, হামলার ভিডিওও দেখিয়েছেন। বাইরের দুনিয়া এসব  জানলেও প্রথমদিকে  উপেক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এরদোগান একবার সীমা ছাড়িয়ে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে খামোখা হুমকি দিয়ে বসেন। তিনি বলেন ব্রেনটনের বিচার যদি অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড না করতে সক্ষম হয় তবে যেভাবেই হোক তিনি এর বিচার করবেন [“If New Zealand fails to hold the attacker accountable, one way or another we will hold him to account.”]। এটা তো বিনা মেঘে বজ্রপাত। কারণ অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ব্রেনটনের বিচার করতে চাইছে না বা পারছে না – এমন কোনকিছুর অন্তত ইঙ্গিতও তো আগে থাকতে হবে! এরপরে না বিচার করার “অন্য কারও” সুযোগ আসবে? তাই এটা গায়ে পড়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য হিসাবে হাজির হয়েছিল। স্বভাবতই এই বেহিসাবি বক্তব্য অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে খারাপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। তবে এরদোগানের সৌভাগ্য যে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড গঠনমূলক ভাবে আগায়, এরদোগানকে পিছনে ফিরে যাবার সুযোগ তৈরি করে দেয়  – এমনভাবে কথা বলেন। এরদোগান সেই সুযোগটা নিয়ে পরেরদিন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বক্তৃতা দিয়ে সে উত্তেজনার সমাপ্তি টানেন [Turkey’s President Erdoğan praises Jacinda Ardern in an op-ed for the Washington Post]। ভিতরে কূটনৈতিক দৌড়ঝাপও ব্যবপ ছিল স্বভাবতই যেমন এরদোগানের এক অফিস কর্তা পরিস্থতি নরম করতে বলছেন, [“President #Erdogan’s words were unfortunately taken out of context,” ]। এরদোগান বিশাল পা-পিছলানি ঘটনার প্রধান দিকটা হল, তিনিও – ব্রেনটন= সাদাবাদী খ্রীশ্চান= জেসিন্ড, এই ভুল ও ভিত্তিহীন সাজানো অনুমানের সমীকরণ টেনে এর উপর দাঁড়িয়ে কল্পিত শত্রু খাড়া করে কথা বলে গেছেন। অথচ হামলার ঘটনার পর প্রথম সুযোগ থেকেই শেষ পর্যন্ত জেসিন্ডা বলে আসছেন [‘We are one’] ও অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ব্রেনটন ও তাঁর রাজনীতিকে কোন প্রশ্রয় নয় বরং নিন্দা করছেন; সমাজচ্যুত করতে কথা বলে গেছেন।

এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, খ্রীশ্চান ইউরোপের অনেক দোষত্রুটি বা স্বার্থ আছে অবশ্যই। কিন্তু নতুন করে আবার কোন ক্রুসেডে খ্রীশ্চান-মুসলমানের লড়াই – এমন ভাষ্য তুলে এনে কোন বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনরা (সাদা শ্রেষ্টত্ববাদী পকেট গ্রুপেরা না) আর কখনও তুলবে না, তাদের সামাজিক অভিমুখ সেদিকে নয়। কারণ এতে বড় ক্ষতিটা তাদেরই। কারণ তাদের আভ্যন্তরীণ সমাজে কোন ধর্মতাত্বিক বিতর্কে বা এর আবহ খোদ তাদের রাজনৈতিকতাকেই [Polity] আড়াল করুক বা পেছনে ফেলে দিক, এটা তাদের স্বার্থ নয়। খ্রীশ্চান বিভিন্ন ধারা বা ফেকড়াতে পড়ে এতে দগদগে ঘৃণা লড়াই মারামারির বহু কষ্টকর পথ পেরিয়ে, তারা সেসব বিভক্তিতে তা থেকে গৃহযুদ্ধ শেষে  আজ তারা এক থিতু সমাজের অবস্থায় পৌচেছে। রাজনীতিকরা নিজের স্বার্থে সহজেই এটা ভাঙতে দিবে না।

যদিও আজ আমরা দেখছি, মসজিদে নামাজিদের ওপর হামলাকারী ব্রেন্টন- ‘সাদারাই শ্রেষ্ঠ ও ক্ষমতাবান’ এই বক্তব্যের পূজারী। যাদের নিজের ইতিহাস-পাঠ খুবই দুর্বল, আর গোঁজামিলের। একথাও সত্য যে, গ্লোবাল ইতিহাসের পুরো দুই-আড়াই শ’ বছরের কলোনি শাসনামলও দাঁড়িয়ে ছিল  সাদাদের এমনই এই সাফাই-বয়ানের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, সব রেসিজমই কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে তথাকথিত এক “শ্রেষ্ঠত্বের” একটা বয়ান খাড়া করে তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আলোচ্য ক্ষেত্রেও সেই তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান হল- ‘আমরা সাদা, তাই আমরা শ্রেষ্ঠ।’ হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের দাবি – পুরনো কলোনি আমলের জবরদস্তি বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের সেই রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

ঘটনা হল, যেকোনো রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কখনো নিজের দাবির পক্ষে (মানুষ মানে এমন) ঠিকঠাক সাফাই হাজির করে কথা বলতে পারে না। কারণ, তারা বয়ানের জোরে অথবা সততা, ন্যায় বা ইনসাফের জোরে কথা বলতে পারে না; তারা গায়ের জোরে কথা বলে। অথচ কেউ সাদা চামড়ার লোক হলেই তাকে আমাদের শ্রেষ্ঠ মানতে হবে কেন? এ কথার ভিত্তি কই? অথবা ধরা যাক সাদারাই মূলত দুনিয়াজুড়ে অন্যের দেশ-সম্পদ দখল করে কলোনি শাসন করে গেছে। কিন্তু এই কারণে এই জবরদস্তি এখনও মেনে নিতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে কেন? এসব সহজ, ছোটখাটো সাদা প্রশ্নের জবাবই তাদের কাছে নেই। বিশেষত যখন একালে রিপাবলিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট হল “নাগরিক বৈষম্যহীনতা”, যেটাকে ইতিবাচক দিক থেকে নাগরিক সাম্য [equality] বলা হয়। কিন্তু নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা বা সুযোগ কই?  এছাড়া এর সাথে আছে ইনসাফ আর মানুষের মর্যাদার ভিত্তির কথা।  এর মানে হল, যারা তাদের তাত্বিক [mentor] মানে যারা ব্রেন্টনদেরকে সাদা-শ্রেষ্ঠবাদী হতে উসকানি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে তারা খুবই নাবালক-চিন্তার লোক।

দ্বিতীয়ত, আরো বড় প্রশ্ন হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরের দুনিয়া তো আর এক ছিল না; আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে গেছিল। এটা সাদা চোখেই জানা-বুঝা যায়। যেমন প্রথম ফারাক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি মালিক দেশের দখলদারিত্বে দুনিয়ার বাকি সব (এশিয়ার, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা) দেশই দখল ও কলোনি হয়ে গেছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উল্টো চিত্রঃ কলোনি দখলদার ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফরাসিরাসহ সকলেই একের পর এক কলোনি ছেড়ে চলে গেছিল। এতে উপনিবেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেছিল। কেন?

কারণ, ব্রিটেন-ফ্রান্সের মতো ইউরোপ কলোনি মালিক-দখলদারেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে জিততে হলে এর একমাত্র নির্ধারক বাস্তবতা ছিল আমেরিকাকে নিজেদের পক্ষে পাওয়া – এর উপরে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমেরিকান শর্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে ইউরোপের জিতে যাওয়ার পরে ইউরোপের সবাইকে কলোনি দখলগিরি ছেড়ে দিতে হবে। ইউরোপ এই শর্ত মেনেছিল উপায়হীন হয়ে। এই শর্তের কারণেই দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে যায়। শুধু তাই নয়, গায়ের জোর থাকলেই অন্যের দেশ ও সম্পদ দখল করা যাবে না, সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে, – এসব আমেরিকান শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল। যা তদারকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘের জন্ম (১৯৪৪) হয়ে যায়। এ ছাড়া ইচ্ছামত মারধর নৃশংতা হত্যার যুদ্ধ করা যাবে না, বরং যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি হয়ে যায়, যেগুলো মেনে চলতে হবে। জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালে এর জন্ম, আর এর আগে ১৯৪৮ সালের হিউম্যান রাইট চার্টার রচিত হয়ে যায়। এ ছাড়া, আরো পরে ১৯৬৬ সালের জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক সিভিল ও পলিটিক্যাল রাইট (ICCPR) রচিত হয়ে যায়। সংক্ষেপে বললে, এ সবগুলো আইন, কনভেনশন বা চুক্তির সারকথা হল, গায়ের জোর থাকলেই আর সবকিছু করা যাবে না।
কাজেই অন্যের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব অমান্য, দেশ দখল, নাগরিক মানুষের অধিকার না মানা- এসব ইত্যাদি পেরিয়ে এসে গ্লোবাল ইতিহাস আজকের দুনিয়াতে দাঁড়িয়ে – ফলে কেবল ‘আমি সাদা তাই আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নাও”- বলে একালে শুধু এই সাদাবাদীরা কতদুর যাবে; এ কথা বলে কতটুকু তারা আগাতে পারবে? তবে হ্যাঁ পরোক্ষ শাসন সম্ভব, যদিও তা দূর থেকে প্রভাব রাখা প্রভাবিত করা অর্থে হতে হবে। একালে আমেরিকা ইরাক দখল করেছে, ছেড়েও দিয়েছে। পুতুল শাসক রেখে শাসন করেছে- এসব পরোক্ষ কাজ সম্ভব। যদিও কফি আনানের মুখ থেকে – ইরাকে আমেরিকা ‘দখলদার বাহিনী’- এই রায় শুনেও ক্ষমতাধর আমেরিকাকেও চুপচাপ সেকথা হজম করে থাকতে হয়েছে।

এসবের সারকথা হল, যে কলোনি শাসন আমলের সাদা শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন এরা এখন আঁকছে; অথচ সেই শাসন বহাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, পরে নয়। দুনিয়া এখন সে জায়গায় নেই। খোদ ইউরোপের সব রাষ্ট্রকেই কলোনি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। পরবর্তিতে সাদা চামড়ার গরম বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই তারা কিছু রক্ষা করতে পারেনি। তাই প্রধান প্রশ্ন – ইউরোপের এখন যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে বা থাকবে, তাদের সকলকেই এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক ধারাগুলোকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। করতে বাধ্য নইলে, জাতিসঙ্ঘে জবাবদিহি করতে হবে। সভ্যতার গরম ফুটা হয়ে যাবে। হয়ত এর আগে বিরাট একদল লোক এই আত্মগ্লানিতেই মারা যাবে।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের যে উসকানি দেয়া হচ্ছে, এর মেনটর যারা, তারা হয় নাদান আর নাহলে নরেন্দ্র মোদির মতো চিন্তা্ আর দলের লোক এরা। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য হল, সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের উসকানি – এই ন্যাশনালিজমের আওয়াজ তুলে আসলে ভোটের বাক্স ভর্তি আর ক্ষমতা পাওয়া। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের কোন দুনিয়া কায়েম এদের আসল লক্ষ্য নয়, কম্মো না। সে মুরোদ নাই তা তারা জানে। ঠিক যেমন মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল ভোটের বাক্স ভর্তি ও সরকারে আসা – আর এক হিন্দুত্বের ফ্যাসিজম কায়েম করে বিরোধী নির্মূল করা। তবে ইউরোপ নিশ্চয়ই ভারত নয়। স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক ইউরোপের নাগরিক্দেরকে তাদের চিন্তার উপর সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া কায়েমের স্বপ্ন ও লোভ দেখিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে এক ফ্যাসিজম কায়েম- সেটা বেশ কষ্ট কল্পিত অবশ্যই।

এ ছাড়া আর একটা দিক আছে। একালের ক্যাপিটালিজম মানে কোনো একটা রাষ্ট্রের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ এমন কোনো ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটালিজম’ বলে কিছুই আর নেই। এক এবসার্ড কল্পনা মাত্র। ক্যাপিটালিজম মাত্রই গ্লোবাল। অন্য রাষ্ট্রের সাথে লেনদেন- পণ্য, পুঁজি, বাজার, বিনিয়োগ ইত্যাদি সব কিছুই এখন গভীরভাবে সম্পর্কিত থেকে বিনিময় এক্সচেঞ্জ করতে আমরা সবাই বাধ্য। এ অবস্থায় কোনো ‘সাদাদের ক্যাপিটালিজম’- এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বরং উল্টো, সাদা লোকদের উৎপাদিত পণ্য প্রডাক্টের ক্রেতা কেবল সাদা চামড়ার লোকেরাই হোক, সেটা সাদা মানুষের চাওয়া হতেই পারে না।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের সাফাইয়ের ঠিক-ঠিকানা নেই। অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ। যদিও উসকানি আছে চরমে। তবে এমন যেকোনো দাবিদারদের বয়ানে একটা কমন জিনিস আমরা দেখতে পেয়ে থাকি। তা হলো যে আইডেনটিটি বা পরিচয় (যেমন- এখানে আমরা সাদা চামড়ার খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী পরিচয়) তারা দাঁড় করাক না কেন, তা তারা করবে এর কোনো অতীত অর্জনকে টেনে এনে। আর সেকালের এমন অর্জন বলে কোন কিছু থাক বা না থাক ঐ জনগোষ্ঠীর অতীতে অনেক শান-শওকত ছিল, প্রভাবশালী ছিল এমন গল্পগাথা তৈরি করে প্রচার করবেই তারা। এটাই সাদা-বাদী সুড়সুড়ি।

দেখা যাচ্ছে, ব্রেন্টনের মেন্টর-পীরেরা গল্পগাথা তৈরির এ কাজে ক্রুসেডকেও তুলে এনেছে। কিন্তু ঘটনা হল, খ্রিষ্টান ইউরোপ তো ক্রুসেড জিতেনি। এ ছাড়া ক্রুসেড মূলত বারো-তেরো শতাব্দীর পরে ইউরোপেই আর কখনও জাগেনি। বরং পনেরো শতাব্দীর পর থেকে প্রধান শাসকগোষ্ঠী বা শ্রেণী বলতে ইউরোপ তা আর ধর্মতাত্ত্বিক-ভিত্তির কোনো শাসকগোষ্ঠীর হাতে থাকেনি; বরং ম্যানুফাকচারার, জাহাজ ব্যবসায়ী, কলোনি দখলকারি মাস্টার – এসব, আর ওদিকে আরেক চিত্র, মোটের ওপর যারা ছিল রাজতন্ত্রবিরোধী। এসব বৈশিষ্ট্যের মডার্ন রিপাবলিক রাজনৈতিক ধারার শাসন কায়েম হয়ে যায়। ক্রুসেডের সাথে যারা স্বার্থ আর বয়ানের দিক থেকে যোজন যোজন দূরে। তাহলে একালে এসে আবার ফিরে ত্রুুসেডের গর্ব তুলে অথবা হেরে যাওয়ার সহানুভূতি সে কার কাছে বেচবে? কার থেকে পাবে বলে আশা করে? মডার্নিস্ট ইউরোপের জনগণ কি ক্রুসেডের গর্ব অথবা মুসলমানদের হাতে হেরে যাওয়ার সহানুভূতির ভেতর আশ্রয় নিতে রাজি হবে? আসলে এটাকে এক কষ্ট-কল্পিত ফ্যান্টাসি বললেও কম বলা হয়।

আর এক চরম স্ববিরোধিতাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, মাইগ্রেন্টবিরোধিতা [অভিবাসী=migrant]। যেটা আসলে ‘অপর’ বা বিদেশী ভীতি ও বিরোধিতা; যাকে বলা যায় জেনোফোবিয়া [Xenophobia]। এটা অবশ্য সব ধরনের জাতিবাদেরই কমন ফিচার যে, তারা বিদেশী-বিরোধী হয়। তবুও ইউরোপের কোনো ধারার বয়ানধারীদের একালে মাইগ্রেন্টবিরোধী হওয়ার ক্ষেত্রে তা অবশ্যই শক্ত সাফাই তৈরিতে ব্যর্থ হবে। কারণ, যে ইউরোপের উত্থান বা ওর তরুণ বয়স কেটেছে অন্যের দেশ দখল করে, কলোনি শাসন করে সেই পুরান কলোনি-দেশ থেকে কয়েকজন নেটিভ মাস্টারের দেশে এসে বসবাস শুরু করলে তা না জায়েজ, এমন কথা সে কিসের ভিত্তিতে বলবে? সে কারণে এদের এই তথাকথিত মাইগ্রেন্টবিরোধিতার বয়ান বর্ণনা তৈরির ভিত্তি দেয়া মুশকিল হবেই। তা ছাড়া, মাইগ্রেন্টরা তো নিজে জোর করে ইউরোপে ঢুকে যায়নি। ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চললে বাড়তি লেবার দরকার, তাই মাইগ্রেন্টদের স্বাগত জানানোর নীতি নিয়েছিল তারা, বলেই মাইগ্রেন্টরা এসেছে। অর্থনীতি খারাপ গেলে এখন এদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে খেদিয়ে দিতে চাইলেই ব্যাপারটা তত সরল হবে না, এতাই স্বাভাবিক।

তবুও আচ্ছা ধরা যাক। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানদাতাদের অভিবাসীবিরোধিতা জায়েজ। সে ক্ষেত্রে তারা আসলে  ত সাধারণভাবে বিদেশীবিরোধী হওয়ার কথা। আর সেই বিদেশী কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু তাহলে ব্রেনটনেরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে কেন? মুসলমানবিদ্বেষী কেন? এটা তো সাদাবাদীদের বয়ানের সাথে মিলল না! যেমন- হিন্দু ভারতীয় এমন নাগরিকেরা ইউরোপে ঢুকেছে এমন ক্ষেত্রে তারাও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানের চোখে মাইগ্রেন্ট বলে গণ্য হবে? আমরা নিশ্চিত, মনে হয় না। আসলে সাদাবাদীরা কি অভিবাসীবিরোধী নাকি মুসলমানবিরোধী – সে ফয়সালা তাদের আগে করতে হবে। কারণ – দু’টার সাফাই তো দুই রকম হতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুখে তারা অভিবাসীবিরোধী কিন্তু কাজে ইসলামোফোবিক। তাদের বয়ান এমনই সব গরমিলে ভর্তি। তবে খুব সম্ভবত ওয়ার অন টেররের কারণে পাশ্চাত্য একালে সঙ্গোপনে অথবা প্রকাশ্যে মূলত ইসলামোফোবিক। এই ফোবিয়ার তেলে নিজেদের মাছ ভাজতে সাদাবাদীরা বাস্তবে ইসলামোফোবিক হয়ে উঠছে।

তবে এই প্রথম আমরা দেখছি সাদা চামড়ার প্রধান ধারা (সাদাবাদী নয় যারা) এমন আমপাবলিকেরা অপরাধবোধে ভুগছে। কারণ, সাদাবাদীদের নৃশংসতার দায় তাদের উপরও এসে পড়ছে। সেটাই নিউজিল্যান্ডে আমরা ঘটতে দেখছি। তাই সাদাবাদীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখাতে তাদের এই হেডস্কার্ফ প্রতীক নিয়ে সংহতি প্রকাশ। আপাতত এতটুকু বিচার করেই বলা যায়, সাদাবাদীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিশেষত নিউজিল্যান্ডের মত প্রধানমন্ত্রীর  নুন্যতম অবস্থান যদি সে দেশে থাকে। বাকিটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা এ ভাবটাই পৌঁছে দিতে শতভাগ সফল হয়েছেন বলে প্রশংসিত। আমাদের স্বার্থেই জেসিন্ডার পাশে, প্লুরালিজমের [Pluralism] পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।

যে কোন শ্রেষ্ঠত্ববাদই বিপদজনক, যা আপনাকে কোন না কোন একটা রেসিজমে পৌছে দিবে। ফলে সাবধান!

তবে তামাসা উপভোগের জন্য বলিতেছি – উগ্র জাতিবাদী আনন্দবাজারও জেসিন্ডার পক্ষে দাঁড়িয়ে মূল এক সম্পাদকীয় লিখিয়াছে – আগ্রহিরা ইহার সাধু-ভাষার মজা উপভোগ করিতে পারেন; যার শিরোনাম অ-স্বীকার।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা বয়ানের গরমিলে হারবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বফিরানোর খোয়াব

গৌতম দাস

১৮ মার্চ ২০১৯, সোমবার ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yu

The judge ruled images of the suspect in court must blur his face. Photo: Mark Mitchell-Pool/Getty Images,  from this link.

প্রায় লাগোয়া দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ নিউজিল্যান্ড। এর উত্তরের দ্বীপে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী শহর ওয়েলিংটন আর দক্ষিণের দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ক্রাইস্টচার্চ [Christchurch]। এবার ১৫ মার্চ ২০১৯, সেই ক্রাইস্টচার্চ উঠে আসে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া শিরোনামে – “মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা”। শহরের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে আসতে ১০ মিনিট লাগে এমন দুরত্বে দুটো মসজিদ আছে – আল নুর [Al Noor Mosque] আর লিনউড [Linwood mosque] মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় একের পরে অন্যটায় পরপর, হামলাকারী মারাত্মক ও বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা চালায়।  মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম ‘ব্রেনটন ট্যারান্ট’ [Brenton Tarrant]। সে মূলত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে প্রায়ই পাশের নিউজিল্যান্ডে আসেন। চিন্তার দিক থেকে “খ্রিষ্টান এবং ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা চামড়ার লোকদের কথিত শ্রেষ্ঠত্বে” বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ব্রেনটনের পরিচয় হল – ২৮ বছর বয়সী এই সাদাচামড়ার পুরুষ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারের [28-year-old white male from a low-income, working-class family]। আর সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৪৯ জন ইতোমধ্যেই মৃত, আরো প্রায় ২০ জন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মিডিয়ায় বলছেন, ‘এটা খুবই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ [“well-planned terrorist attack”]।

Jacinda Ardern, prime minister of New Zealand, described the shootings as a “well-planned terrorist attack”, and said this is one of the country’s “darkest days”..

অর্থাৎ আমরা দেখলাম তিনি এখানে “মুসলমানেরাই ভিকটিম” বলে এটাকে ‘টেররিজম’ বলবেন কি না এমন দ্বিধা দেখাননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এটাকে “সন্ত্রাসী হামলা’ [extremist terrorist attack] বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতিতে এটাকে “টেররিজম” বলা হয়েছে। এমনকি ভারতের বিদেশমন্ত্রী বা কানাডার সরকারও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে “খুবই পরিকল্পিত” [well-planned] বলছেন কেন? আর একটা বিশেষ দিক হল, এই হামলার পুরো সময় ১৭ থেকে ২০ মিনিটের; যার ১৭ মিনিটেরই লাইভ শো ফেসবুকে অন-লাইনে দেখানো হয়েছে। আর তা এমন ভয়ডর-পরোয়াহীন তাণ্ডব যে, রাইফেলের মাথায় বসানো ক্যামেরা থেকে নেয়া অনলাইন লাইভ ছবি নামাজ পড়তে আসা অসহায় মুসল্লিদের প্রতি গুলি ছোড়ার লাইভ ছবি – সাথে সাথেই ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল। এ ছবিগুলো যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তা এএফপি নিজেরা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করে [AFP determined the video was genuine] এই রিপোর্ট ছেপেছে।

হামলাকারী কে বা কারা? তাদের রাজনৈতিক বা চিন্তাগত পরিচয় কী? পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা মোট চারজন, যার তিনজনই সম্ভাব্য সহযোগী। আর চতুর্থজন যে দৃশ্যমান হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হামলার পরই এবং মানুষ হত্যার মামলায় অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অন্যদের নিয়ে তদন্ত চলছে। গত ২০১১ সালে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষ হত্যা করেছিল এন্ডার্স ব্রেইভিক [Anders Breivik]। হামলাকারী ব্রেনটনের পছন্দের ব্যক্তিত্ব যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানিয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির একজন হলেন এই ব্রেইভিক আর অন্যজন হলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ব্রেনটন এই দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের চিন্তা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। অনুমান করা যায়, এর মূল কারণ এরা দু’জনই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white supremacist] চিন্তা ধারণ করেন।

White Supremacist কারা?
“দুনিয়ায় সাদাচামড়ার লোকেদের শাসন-কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে কারণ সেটা ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ যুগ” – এই বক্তব্য বিশ্বাসে চলা পাশ্চাত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক গ্রুপ এরা।  মূলত এরা ইনসাফ বা ন্যায়-অন্যায় মুল্যবোধ থেকে বিচার করে পথ চলে না, এমনই মানুষ। “আমি আর এক মানুষের সহায়-সম্পত্তি বা ওর পুরা দেশটাই দখল করে নিব – কারণ আমি সুপার – আমি ক্ষমতাবান, বলশালী” – এই সাফাই বয়ানের উপর দাঁড়ানো এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তারা বলতে চায় পশ্চিমের সাদা চামড়ার লোকেরা আমরা এটাই করে এসেছি, কলোনি দখল করেছি, দুনিয়া লুটে শাসন করেছি, দাবড়ায় রেখেছি – কাজেই আমরা শ্রেষ্ট। তাই আবার “সেদিন” ফেরত আনতে হবে। তাদের মুল বক্তব্য এটাই।  এক ধরণের ‘সাদাদের ক্ষমতা’ বা হোয়াইট পাওয়ারের [White Power] পুজারি তাঁরা।
এছাড়া এরা দাবি করে তারা মাইগ্রেন্টবিরোধী। মানে গরিব দেশ থেকে মানুষের (যুদ্ধের শরণার্থী হওয়াসহ) নানা কারণে পশ্চিমের দেশে বসবাস করতে আসাকে (ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট) অনুমোদন দেয়ার এরা তীব্র বিরোধী।
কোন তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ না থাকলেও এরা প্রচার প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসেন যে মাইগ্রেন্টরা “নোংরা”, এরা তাদের শহর নোংরা করে থাকে আর শহরে সব অপরাধের জন্য দায়ী হল এই মাইগ্রেন্টরা। এককথায় যারা তাদের মত নয় এমন “অপর” [other] যেকোন মানুষই নিকৃষ্ট, খারাপ। তাদের আচার আচরণ কালচার সব খারাপ। শুধু তাই না।  এখানে  হোয়াইট-সুপ্রিমিস্টদের পরিচয়ের আর এক অর্থ আছে। তারা বিশ্বাস করে সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠিরা ছাড়া বাকি অন্যেরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। আর তাতে কোন সাদা চামড়ার দেশে এরা সহজেই তাদের ছাড়িয়ে জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যায়। (মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের মোদীর বিজেপি-আরএসএস সংগঠন ও তাদের কর্মীদের বিশ্বাস ও ভাষ্যও প্রায় একই রকম মিল দেখতে পাওয়া যায়।) তাই, সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠি ছাড়া এমন “অপর” লোকেদেরকে বুঝাতে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকে – “ইনভেডর” [invader] – মানে অনুপ্রবেশকারি-দখলদার। হামলাকারি ব্রেনটন ও তাঁর বন্ধুরা কথিত অনুপ্রবেশকারিদেরকে হত্যা করা তাদের টার্গেট ও একাজ জায়েজ মনে করে থাকে। যদিও এরা সাধারণভাবে “ইনভেডর” বলে ডাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা ইনভেডর বলতে মূলত কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই বুঝিয়েছে। অনেকটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর  মত। আমরা মনে রাখতে পারি, তিনি ও তাঁর দল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত মাইগ্রেন্টদের “মুসলমান” এবং কখনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা “তেলাপোকা” ইত্যাদি মানুষের জন্য অমর্যাদাকর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

হামলাকারি ব্রেনটন সম্পর্কে উপরের এতকিছু তথ্য জানার উপায় বা উতস কী? হামলা ঘটে যাবার পরে ব্রেনটন সম্পর্কে খোঁজ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি [AFP] আমাদের জানাচ্ছে যে, এক মাস ধরে ফেসবুক ও টুইটারে ব্রেন্টন একটা গ্রুপ হিসেবে প্রকাশ্যেই সক্রিয় ছিল। [The Twitter profile had 63 tweets, 218 followers and was created last month.] ‘যে কেউ’ বা এনোনিমাস হিসেবে তারা একটা গ্রুপ চালিয়ে গেছে, যে গ্রুপের নাম ‘8chan’ ফোরাম [Politically Incorrect” forum on 8chan, a online discussion site ]। এই গ্রুপ যে খুলেছে, তার নাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের নাম। একই ‘মালিক’ হিসেবে একই নামে এক টুইটার অ্যাকাউন্টও [@brentontarrant] আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলার পুরো বর্ণনা এখান থেকেই প্রচারে দেয়া হয়েছে। কেন এই হামলা তা বিস্তারে বর্ণনা করতে তাদের ‘ম্যানিফেস্টো’ বলে ৭৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এই সাইট থেকে নামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ ডকুমেন্টের শিরোনাম হল- ‘The Great Replacement’ বলা হয়েছে, এই ম্যানিফেস্টো লিখতে প্রণোদনাদাতাদের নাম হল ‘হোয়াইট জেনোসাইড’। মানে এরা নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে ডাকছে। সাধারণত ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা’ নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে থাকে। এ ছাড়া, নিজেদের বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কিছু শব্দ ও ধারণা যেমন, ডাইভারসিটি (Diversity বা বহুমুখিতা) বা মাল্টিকালচারিজমের [Multi-culturalism বা সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা] এসবের ঘোরতর বিরোধী বলে দাবি করে থাকে।

ডাইভারসিটি বা মাল্টিকালচারিজম ধারণার এখানে সারকথা হলটা – অনেক ধরণের দেশের ভুগোল ও সংস্কৃতির মানুষের একসাথে এক শহরে এই রাষ্ট্রে এসে বসবাস করা – একই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর ‘বৈষম্যহীন’ এক “নাগরিক সাম্য” বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশনের অধীনে।

এনিয়ে ইউরোপের তর্কবিতর্কের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেন রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ‘মাল্টিকালচারিজম’ মেনে চলা তাদের জন্য সঠিক নীতি বলে মনে করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্স ঘোষিতভাবেই মাল্টিকালচারিজম অপছন্দ করে থাকে। এর বদলে তাদের পছন্দ হল ‘এসিমিলিয়েশন’[assimilation] নীতি। যার বাংলা ও খুলে বলা অর্থ হল – ইংরেজি assimilate (বাংলায় সব-একই-ধরণ বা এককরণ করা) থেকে এসিমিলিয়েশন। এই এসিমিলিয়েশন শব্দের মূল বিষয়টা হল, ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিসহ সব কলোনি-দখলদারেরা আমাদের মত দেশকে এককালে কলোনি বানিয়ে, দখল করে লুটতে গিয়েছিল। পরবর্তিতে সেই সূত্রে আবার সস্তা শ্রম পাওয়ার লোভে তারা আমাদেরকে (কালো চামড়ার নেটিভদেরকে) কালক্রমে নিজ নিজ ইউরোপীয় দেশেও নিয়ে গিয়েছিল। “নেটিভরা” একসময়ে কলোনি মালিকের দেশেই তারা স্থায়ীভাবে পরিবারসহ  নাগরিক হিসাবে বসবাসও শুরু করেছিল। কারণ যেমন কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়াকে কার্যত মূল বৃটিশ ভুমিরই এক্সটেনশন মনে করা হত। কিন্তু একালে এসে ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়াতে ব্যবসা বানিজ্যের ভাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এই নেটিভরাই তখন চক্ষুশুল হয়ে গেলে যা হয়, তাই। কলোনি মালিকের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের দেশে যাওয়া নেটিভদেরকেই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বি গণ্য করছে। এই ব্যাপারটা বৃটিশেরা যেমন সহনীয়ভাবে দেখে ফরাসীরা তেমন নয়। তাই ফরাসি নীতি হল, নেটিভদের সবাইকেই ফরাসি কালচারই অনুসরণ করতে হবে। নেটিভরা নিজ দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্তন হতে হবে। তদুপরি, নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্ম পালনও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্তন হয়ে পালন করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই । ফরাসি দেশে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ এ ‘যুক্তি’তেই। জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে,নেটিভেরা নিজ দেশ থেকে আনা শুধু সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্থন হতে হবে তাই না। নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্মপালনটাও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্থন হয়ে করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই assimilation নীতি। যেমন ফরাসি দেশে বোরখা পড়া আইনত নিষিদ্ধ, এই যুক্তিতেই। এটাকেই ফরাসি রাষ্ট্র তার “এসিমিলিয়েশন” এর নীতি বলে সাফাই দিয়ে চলে থাকে। এই দুই নীতির তুলনা নিয়ে গত ২০১৫ সালে আমার এক পুরানা লেখা এখানে সময় করে আবার পড়তে পারেন।

হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা হিটলারেরও ভক্ত। যেমন এরা হিটলার বা তার সংগঠন নাৎসি পার্টির নানান চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে থাকে। হিটলারের বাণী নিজেরা পুনর্ব্যবহার করে। হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের রাইফেলের গায়ে এর ওপরে কমপক্ষে ছয়টা নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আঁকা আছে। এর একটি হল, ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ (Fourteen Words) চৌদ্দ শব্দের এক বাণী। আর তা হল – আমাদেরকে অবশ্যই “আমাদের মানুষের” অস্তিত্ব ও আমাদের “সাদা সন্তানদের” ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে। [“We must secure the existence of our people and a future for white children.”]।  এটাকে অনেকে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের একটা মূল ‘মন্ত্র’ বলে থাকে। এখানে ‘our people’ বা ‘white children’ বলে এরা বর্ণবিদ্বেষ জাগানোর চেষ্টা করে থাকে।

ব্রেন্টনের মত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা বলতে চায় তারা মাইগ্রেশনবিরোধীকিন্তু আসলেই কি তাই?
আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড এসব রাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা কারা? আর কারা এর অবৈধ দখলদার? অথবা তাঁদের ভাষায় অনুপ্রবেশকারি-দখলদার? নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী [aborigine] হল ‘মাউরি’-রা [Māori]। ইউরোপ থেকে বিশেষত ডাচ বণিক ‘আবেল তাসমান’ [Abel Janszoon Tasman] প্রথম ইউরোপীয়, যিনি মাউরি সভ্যতা ও এর ভূমির সন্ধান পাওয়ায় (১৬৪২) পরবর্তী সময়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নাম দিয়ে দখল করে, কালক্রমে নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের কলোনি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে ইউরোপীয় সাদা চামড়ার লোকজনই কি অনুপ্রবেশকারী-দখলদার নয়? হামলাকারী ব্রেনটন নিজেই (বা তাঁর পূর্বপ্রজন্ম) অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের আসল অনুপ্রবেশকারী-দখলদার। অতএব, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিজেকে না বলে (মুসলমানসহ) অন্য কাউকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা প্রহসন মাত্র। ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানদেরকে “হোয়াইট জেনোসাইডার” ব্রেনটন এর বিদেশি বা তথাকত্থিত “মাইগ্রেশনবিরোধীতার” তামাশা হল এটাই যে খোদ মাইগ্রেন্ট মাইগ্রেশনবিরোধীতার ভান করতে নেমে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে।

তবে এখানে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে যে বুশ-ব্লেয়ারের “ওয়ার অন টেরর” আর হোয়াইট বা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামার” উত্থান  – এদুটো একই ফেনোমেনা নয়। বরং একেবারেই আলাদা। তবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামাকারিরা” ইচ্ছা করে ইনভেডর বা অনুপ্রবেশকারী-দখলদার বলতে কথাটা সংকীর্ণ করে কেবল “মুসলমান” বুঝাচ্ছে – যাতে তারা খ্রীশ্চান-পশ্চিমাবাসীদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করা সহজ হয়।

সারকথা : আমাদের যথেষ্ট মাথা তুলে যেটা দেখতে হবে যে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান কেন এখন দেখা যাচ্ছে? তারা অটোমানদের সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা অথবা ইউরোপিয়ান খ্রিশ্চানিটির জেরুসালেম দখল চেষ্টার অতীত লড়াইগুলোকে এখন কেন রেফারেন্সে আনছে?

আমরা গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটা পর্বে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম পর্ব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। যেটাকে “কলোনি অর্থনীতির যুগ” বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্ব হল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে গত শতাব্দী (বিশ শতক) পর্যন্ত, যেটা  আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্লোবাল অর্থনীতির যুগ”। আর তৃতীয় পর্বকে বলা যায়, চলতি শতকে আমেরিকান নেতাগিরির পতন আর ক্রমেই সেই জায়গা নিতে “চীনের উত্থিত গ্লোবাল নেতৃত্ব”।

পশ্চিমের, বিশেষত ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চলছে কি না তা বুঝবার সহজ তরিকা বা নির্ণায়ক হল – মাইগ্রান্ট ইস্যু। অর্থনীতি ভাল চললে দেখা যাবে, তারা সবাই ভুলে যায় যে মাইগ্রান্ট তাদের একটি সমস্যা। কারণ, তখন পশ্চিমের বাড়তি শ্রম দরকার; ফলে মাইগ্রান্ট শ্রমিক খুব দরকারি। আবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলেই মাইগ্রান্ট বিষয়টিকে মানে, ওই বাড়তি শ্রমের বিষয়টিকে পাশ্চাত্য এক বিরাট সমস্যা মনে করে থাকে। তারা তাদের মধ্যবিত্তদেরকে মাইগ্রান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে উঠায়। অথবা যেমন আমরা এখন ফ্রান্সে দেখছি। ফরাসি নেতা মেরিন লি পেনের National Front পার্টির উগ্র ন্যাশনালিস্টরা (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) তাদের মধ্যবিত্তকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন। তবে তারা আসলে “কী রাজনীতি” করছেন তা বুঝবার কিছু ইঙ্গিত দেয়া যাক। তার দলের দুই ভাইস-প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিপো [Florian Philippot] সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। যা তিনি বলছেন বাধ্য করা হয়েছে। ফিলিপোর দাবি তাদের দলের আভ্যন্তরীণ বিতর্ক আসলে এখন এক সরে যাওয়া ইস্যু। “আমরা আগে আসলে দাবি করতাম এক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। যেটা এখন “মাইগ্রান্ট আর ফরাসি আইডেন্টিটি” – তার এই পুরানা ট্রাডিশনাল অবস্থানকেই মুল রানোইতিক ফোকাস বলে হাজির করেছে। এটা আসলে এক ভয়ঙ্কর পিছনের দিকে পিছলে পড়া”। [Philippot said the debate within the FN about a shift away from his focus on economic nationalism back to its traditional priorities of immigration and French identity were “a terrible backward slide”].
এই বক্তব্য থেকে আমরা “অর্থনৈতিক জাতীবাদ” থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদ কোথায় আলাদা তা বুঝে নিতে পারি।

গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে এসে আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে ইউরোপ এর আগে নিজেদের কলোনি শাসনের অর্থনীতির সমাপ্তি সমর্পণের ঘোষণা দিতে হয়েছিল
এখন চীনা উত্থানের পর্বে এসে ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্স আরেক দফা (তবে এবার আমেরিকাসহ) চীনেরও পেছনে থাকতে শুরু করতে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এই  সাদা চামড়ার আইডেনটিটি- ধরনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। দাবি উঠছে তাদের আগের “কলোনি যুগ” সবচেয়ে ভালো ছিল। কারণ, সেটা ছিল শান-শওকতের যুগ। তাই কলোনি লুণ্ঠনের সেকালে ফিরে যেতে হবে”। ইউরোপের প্রবীণ প্রজন্ম এখন তরুণদের কাছে সাদা চামড়ার সুপ্রিমেসির গল্প শুনিয়ে উসকানি দিচ্ছে।

সময় কখনো পেছনে ফেরে না। যেমন আমরা চাইলেই এখন “দাস-প্রথা” আবার ফিরে দুনিয়াতে চালু করতে পারব না। একইভাবে কলোনি লুণ্ঠন একালে আবার বৈধ বলে দাবি করা, সাদা চামড়ার বর্ণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব একালে আবার ন্যায্য বলে সাফাই গাওয়া- এসব অসম্ভব। দুনিয়ার অভিমুখ আর সেটা নয়। এগারো-বারো শতকের জেরুসালেম দখলের জোশ- ক্রুসেডের সেই উসকানি একালে আবার তৈরি করা, সেটাও অসম্ভব। মডার্ন রাষ্ট্র ও শাসন দুনিয়ায় এসে যাওয়ার পরে পুরনো ‘ক্রুসেড’ আর হবে না। যদি তাই হত তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ব্রিটেন জেরুসালেম দখলের চেষ্টায় বারবার হেরে যাওয়ার শোধ তুলতে আবার ক্রুসেড লড়ে জেরুসালেমের দখল করতে চেষ্টা করত। “কামাল তুনে কামাল কিয়ার” তুরস্ক গড়ার পথে হাঁটত না। বরং আমরা দেখেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রুসেড’ শব্দটি মুখেও আনেনি।

আমরা এখন যেমন চাকরি, পড়াশোনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পশ্চিমমুখী হই। সামনের দিনে ইউরোপীয়দের অন্তত চাকরি বা অধিকতর সুযোগ-সুবিধার জন্য এশিয়ামুখী হয়ে ধাবমান হতে দেখা অসম্ভব নয়। এটাকেই তারা হার মনে করছে। পাশ্চ্যাতের সমাজে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার” নামে অস্থিরতার কারণ এখানেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ কি ফিরবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]