“সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

“সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

গৌতম দাস

১৮ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-30x


গত ১৪ মে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ঢাকার একটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে করা পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে তিনি করোনাভাইরাসেও আক্রান্ত ছিলেন। তবে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও ভুগছিলেন। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পাওয়া বাংলাদেশী একজন একাডেমিক। যে কোনো মৃত্যুই শোকের। আমরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।

তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের প্রথমেই যে কথাটা বলতে হয় তা হল বাংলাদেশ সরকারের যত সর্বোচ্চ পদক বা সম্মাননা আছে তার সম্ভবত কোনো কিছুই লাভ বা অর্জন করা থেকে তিনি বাদ যাননি। তাই বর্তমান সরকারের ‘ইডিওলজিক্যাল আইকন’ মনে করা যেতে পারে তাকে। শুধু তাই না, তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা – ‘পদ্মভূষণ’ পদকও লাভ করেছেন।

গত বারো বছরের নানান রাজনৈতিক উলটপালটে বাংলাদেশের সমাজ এখন মতভিন্নতার এক বিপদজনক জায়গায় পৌছে গেছে। যদিও কোন দেশের সমাজে রাজনৈতিক মতামতে নানাবিধ ভিন্নতা থাকে, এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় এটা আর এখন নিছক মতভিন্নতা নয় বরং তীব্র এক সামাজিক পোলারাইজেশনের পর্যায়ে চলে গেছে। ড. আনিসুজ্জামান এই মেরুকরণে একটা পক্ষের অন্যতম আইকন ছিলেন, এটা তার ভূমিকায় প্রমাণিত।

পাকিস্তান কায়েমের সুবিধাভোগী কে নয় কিন্তু, ঘটনা ইতিহাসে স্বীকার নাইঃ
১৯৪৭ সালের আগষ্টে পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান  আর কোন আইডিয়েল [ideal] বা কল্পনা থাকে না, ছুয়ে-ছেনে দেখা ও স্পর্শ করা যায় এমন রিয়েল [real] বা বাস্তব সত্য হয়েছিল। কিন্তু তবু সেই থেকে বুঝে না বুঝে পাকিস্তান এক নিন্দার জিনিষ, খারাপ কাজ হয়ে আছে আমাদেরই অনেকের কাছে। সে সময় থেকেই আমরা পাকিস্তান পছন্দ করি আর না করি এমন নির্বিশেষে আমাদের জন্য কঠিন সত্যটা হল, পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা প্রত্যেকেই পাকিস্তান জন্মের বেনিফিসিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়েছিলাম।  এতে ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল কেবল জমিদার ও জমিদার হিন্দুরস্বার্থ ও হেজিমনি বজায় থাকলে ওরই ভিতরে যারা নিজের স্বার্থ দেখতেন, এরাই সেই ব্যতিক্রম।  জুলুম অত্যাচার ও লুন্ঠনকারীরা তো সংখ্যাল্প ও ব্যতিক্রম হবেনই। এতদিন এভাবে রাজত্ব ও রুস্তমি করা এই গোষ্ঠি – এদেরকে বাদে একজনও কেউ সুবিধাভোগের বাইরে ছিল না। বিশেষ করে এই মহাসত্যের কারণে যে, সাতচল্লিশের আগে এই বাসিন্দারাই যেখানে ছিলেন জমিদারের প্রজা অথচ পাকিস্তান কায়েমের পরে তাদের সেই প্রজা- মুক্তি ঘটে গিয়েছিল। প্রজা-পরিচয় থেকে মুক্তি বলতে শুধু জমিদারি উচ্ছেদই নয়, ১৯৫১ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950  ইংরাজিতে মুল আইনটা  [The State Acquisition And Tenancy Act, 1950] গৃহিত হইয়ে যাওয়াতে স্বাধীন পাকিস্তানে আগে প্রজা হিসাবে  চাষাবাদের জমির ভোগদখলের দলিল ‘চাষা’রা এবার নিজের নামে পেয়ে গেছিলেন।  ধর্ম বা দল নির্বিশেষে মূলত সবাই প্রত্যেকেই এতে লাভবান। এমনকি যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেননি, করা পছন্দ করেন নাই অথবা পাকিস্তান কায়েম হওয়া পছন্দ করেননি তারাও হয়েছেন লাভবান। এককথায়, অতএব আপনি-আমি স্বাধীন পূর্ব-পাকিস্তানের বাসিন্দা, নাগরিক হওয়াতে, পাকিস্তান কায়েমের বাস্তবতায় এদের চেয়ে বড় লাভবান হওয়া বেনিফিসিয়ারি আর কেউ নাই।
কিন্তু আজব ঘটনাটা হল, স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হবার পরবর্তী কালের বাস্তব পাকিস্তানে ‘সাতচল্লিশের দেশভাগ’ যে সঠিক কাজ হয়েছিল এমন কোনো বয়ান ইতিহাসে দেখা যায় না। পাকিস্তান কায়েম ‘সঠিক’ বলে ইতিহাসে তা লিখতে তাদের দ্বিধা ছিল। তাই টেক্সটবুকে পাকিস্তান কায়েমের পক্ষে সাফাই বক্তব্যের দেখা মেলে না। সেটা এখনো এমনই আছে।  যেমন এটা কী সম্ভব যে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পরের লিখিত ইতিহাসে টেক্সটবইতে এই স্বাধীনতার পক্ষে সাফাই থাকবে না! কিন্তু পাকিস্তানের বেলায় তাই হয়েছিল।  যেন পাকিস্তানের জন্ম ‘অবৈধ’, আর অবৈধ  সন্তান বলে যেন এর দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না । অথচ এর বাসিন্দারাই  এর আসল সুবিধাভোগী। জমিদারি আইন উচ্ছেদের সুবিধা আমাদের বাপ-দাদা পুর্বসূরিরা প্রত্যেকে ভোগ করে গেছেন, এখনো করছে। তবুও ১৯৪৭-১৯৭১ এ সময়টা আমাদের ইতিহাসে যেন একটা ভ্যাকুয়াম, ফাঁকা কিছু ঘটেনি। অথবা যা ঘটেছে তা ঘটা উচিত ছিল না। তার মানে কী এরও আগের জমিদারি শাসনটাই (১৭৯৩-১৯৪৭) কী সঠিক ও বৈধ ছিল, কাম্য ছিল?

অথচ এ্মনকি পাকিস্তান আমলের (১৯৪৭-৭১) এই পঁচিশ বছরের মধ্যে  চুয়ান্ন সাল পর্যন্ত না হলেও অন্ততপক্ষে যেখানে একান্ন সালের জমিদার উচ্ছেদ আইন পাস এই অর্জনকে যদি আমরা আপন না করে নেই, তবে এর মানে হবে আমাদের আত্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়া। পাকিস্তানের জন্ম যদি আমাদের কাছে অগ্রহণীয় হয়, কাম্য নয় ও অবৈধ মনে হয় আমাদেরকে তাহলে এই উত্তর দিতে হবে যে আমাদের বাপ-দাদারা সকলে জমি কোথা থেকে পেয়েছেন? কারণ ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের নিরানব্বই ভাগই ত জমিদারের প্রজা ছিলেন?

আমাদের প্রগতিবাদীসহ সকলের চিন্তায় অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি হল আমরা যদি পাকিস্তান জন্মানোকে আপন মনে না করি তবে এটা  তখন কী ছিল? অথবা কী হয়েছিল সেটা কী আমরা কেউ বলতে স্বীকার করতে চাই না! তাহলে এককালে জমিদারের প্রজা চাষা  ‘এরা’ জমির মালিকানা পেলেন কী করে? কেউ বলতে চান না। তারা সম্ভবত বলতে চান, পাকিস্তান কায়েম হওয়াটাই ভুল ছিল।  সেক্ষেত্রে প্রকারন্তরে এর মানে নয় তাহলে জমিদারি শাসনটাই ভাল ছিল। অথচ পাকিস্তান জন্মানোর পরে আমাদের অন্যান্য নতুন রাজনৈতিক চাহিদা বা অভিমুখ তৈরি হতেই পারে। এই আমরাই আবার খোদ পাকিস্তানই ভাঙতেও চাইতে পারি। কিন্তু সে জন্য তো পাকিস্তান কায়েম হবার ঘটনাটা মিথ্যা নয়। তা মিথ্যা একথা বলার কোন দরকারও পড়ে না। আসলে আগের সেই জমিদার হিন্দুর স্বার্থ ও হেজিমনি – সামাজিক কালচারাল আধিপত্য সেটাকেই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে কেউ অলক্ষ্যে।
ইতিহাস জিনিসটা এমন যে নানান দেশ, রাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপটে, এর ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য তৈরি হবেই। এমনকি একই দেশের ভেতরেও কমপক্ষে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্য সাধারণত দেখা যায়। সব দেশেই এমন হয়ে থাকে।  ঐতিহাসিকদের মধ্যে তা নিয়ে বিভক্তি ও বিতর্কও চলতে থাকে।  যেকথা বলছিলাম বুদ্ধিমান হলে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্যই টিকে থাকতে পারে আর সেক্ষেত্রে সবগুলো ভাষ্যেরই মৌলিক গল্পকাঠামোটা মোটামুটি একই থাকে, আর কিছু অংশ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে। আর ঐতিহাসিকেরা সতিকারের পেশাদার হলে বুঝমান ও দায়ীত্ববান হলে একসময় ভাষ্য-ভিন্নতা নিরসিত হয়ে কোন ইতিবাচক ব্যাখ্যা বয়ানে পৌছাতে পারি, নইলে দেশ ইতর-বয়ানে শার্প বিভক্ত হোয়ার দিকেও যেতে পারে।  আদালতকে দিয়ে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করার ঘটনাও দেখা যেতে পারে।  যদিও আবার দুটো ভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই পুরা বয়ানই ভিন্ন হয়ে যাবে। যেমন ১৯৭১ নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভাষ্য-বয়ান ভিন্ন তো হবেই। ১৯৭১ সাল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাষ্যও হবে ভিন্ন। যেমন ভারত  ১৯৭১ কে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ বলে তাদের সরকারি ইতিহাস লিখেছে।

বাস্তব পাকিস্তান কায়েমের পরে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজের লিখিত ভাষ্য-বয়ান না থাকায়, মানে পূর্ব পাকিস্তানিরা আপন করে নেয় এমন কোনই বয়ানভাষ্য না থাকায় এর পরিণতি কী হয়েছে? এমন লিখিত ইতিহাস ভাষ্য না থাকলে যেটা হবার কথা, কলকাতায় প্রচলিত টেক্সটবুকের ভাষ্যবয়ান কিছু দিন পরে এখানে চালু হয়ে গেছে। কারণ, বয়ান তো খালি থাকে না। একপর্যায়ে বাংলাদেশেরই কেউ হয়ত কলকাতার সেসব বই পড়ে তা থেকে নিজেই কলকাতার বয়ানে বাংলাদেশের ইতিহাস লিখে বসেছে। আর তা চালু হয়ে গেছে। এসব শুনে এখন কেউ বোকাবোকা উদার বুঝ থেকে জানতে চাইতে পারে আমরা কলকাতার বয়ানে ইতিহাস পড়লে অসুবিধা কী?  ক্ষতি কী?  আমরা একই বাংলা, একই দেশ তো ছিলাম? তাহলে? আসলে কথাটা হল এমন যেন বলা যে ১৯৭১ সালের আগে তো পাকিস্তান আর বাংলাদেশ  “তো একই দেশ ছিলাম” কাজেই একাত্তরের পরেও আমরা পাকিস্তানের পাঠ্য ইতিহাসটাই গ্রহণ করে নিয়ে আমাদের পাঠ্য করে নিলে অসুবিধা কী? এখন নিশ্চয় এই জবাব প্রশ্নকর্তার ভাল লাগবে না।
কলকাতার বয়ানে ইতিহাস নিয়ে আমাদের অসুবিধাটা হল, ওটা আসলে কলকাতার জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে এক সাফাই-ভাষ্য হবে।  আরও স্পষ্ট করে বললে ভারত বা কলকাতা যেটাকে বলে “স্বদেশি আন্দোলন –  সোজা সাপ্টা জমিদারি স্বার্থবয়ানের উপর আধারিত ইতিহাস হবে সেটা। কাজেই এটা আমরা প্রজাদের নিজের স্বার্থবয়ান করে লেখা ইতিহাস হতেই পারে না। দুঃখের কথা আর কারে বলব, পাকিস্তান কায়েমের পর থেকে সাতচল্লিশের আগের শাসক জমিদারহিন্দুরা  শাসন আধিপত্য হারিয়ে কমিউনিস্ট রূপ ও রাজনীতি ধারণ করে সমাজে হাজির থেকেছে। ফলে আগের জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে সাফাই-ভাষ্যটাই  এবার নব্য প্রগতিবাদী কমিউনিস্টরা গ্রহণ ও প্রচার শুরু করেছিল। আমাদের ইসলামবিদ্বেষের শুরু এখান থেকেই। কমিউনিজমের নামে তারা ইসলামবিদ্বেষ করে পাকিস্তানের জমিদার উচ্ছেদের প্রতিশোধ নিয়েছে।
আরও কঠিন সত্য মানে ফ্যাক্টস হল, ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ আইন  অর্থাৎ বড় হয়ে যাওয়া আগের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রশাসনের নজর প্রধাণত কেবল কলকাতা ও এর আশেপাশে আটকে পড়েছিল, এতে ওদিকে পুর্ববঙ্গ অংশে বা এরও বাইরে আসাম পর্যন্ত এলাকায় প্রশাসন আরো শিথিল হয়ে পড়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিকশিত হয় নাই।  তাই প্রশাসন চালানোতে দক্ষতা আনতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বাংলা প্রদেশ আর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বলে ভাগ করাকে কেন্দ্র করে হিন্দু জমিদারেরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।  কারণ এতে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়াত ঢাকা।  আবার জনসংখ্যার দিক থেকে পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট ছিল।  অর্থাৎ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কায়েমের পর থেকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থ আর কলকাতার অধীনস্ততায় না থেকে  বের হয়ে নিজেই কলকাতার সমান্তরাল ক্ষমতা ও শাসন হয়ে উঠতে সুযোগ পেয়ে গেছিল। এটাই  জমিদার হিন্দু আধিপত্যের কলকাতা সহ্য করতে পারে নাই, চায় নাই।  এই দ্বন্দ্ব খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়।  এখানে জমিদারহিন্দু শাসন আধিপত্য এতই বড় ক্ষুন্ন হয়েছিল যে তারা বৃটিশদের বা বঙ্গভঙ্গ করার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার ফ্যান্টাসিও করতে গিয়েছিল – যেটা অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুটা গ্রুপের কথা জানা যায়।  কাজেই অনুশীলন ও যুগান্তর ছিল জমিদার স্বার্থেরই সশস্ত্র উদ্যোগ। অথচ কোন সশস্ত্র উদ্যোগ মানে তা “বিপ্লবী” এমন ধরে নেওয়ার কিছু নাই। কিন্তু প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ঢেকে দেয়া হয়েছিল। কারণ অনুশীলন ও যুগান্তর পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে বিলিন হয়েছিল। এমন তামাসা সম্ভবত দুনিয়ার কোথায় দেখা যাবে না যে  বাংলার জুলুমবাজ  খোদ জমিদারেরাই এখানে সশস্ত্র।  এরাই কমিউনিস্ট নামে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই জুলুম নিপীড়নে অত্যাচারি  জমিদারদের সশস্ত্র স্বার্থ-ততপরতাকেই বলা হয়েছে এটা নাকি “স্বদেশি আন্দোলন” – এটা নাকি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা?  জমিদারের স্বার্থহানি ঘটেছে কলোনি প্রশাসনিক পরিবর্তনে। অতএব এটাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা বলে চালায় দিতে হবে – কি ফকফকা তামসা! পুর্ববঙ্গের স্বার্থ  এমন জমিদারদের স্বার্থ ও তাদের সশস্ত্র ততপরতার বিপক্ষে ছিল বলে তারা এটাকে কোন “স্বদেশি আন্দোলন” বলে মানে নাই। অতএব তারা কলকাতার লিখিত ইতিহাস পড়তে পারে না। এত কড়া সত্য কথা অনেকের মানতে কষ্ট হতে পারে। অথচ কড়া সত্য হল, দুই দুবারই বাংলা ভাগ হলে (১৯০৫ ও ১৯৪৭ সালে) এটাকে পুর্ববঙ্গ তাদের জন্য ভাল হয়েছেই মনে করেছিল। যেটা জমিদারদের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ছিল। আমরা জমিদার আর প্রজার স্বার্থ দৃষ্টিভঙ্গি এক হলনা কেন এমন আবদার বা জবরদস্তি তুলতে পারি না! কিন্তু তাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। পুর্ববঙ্গ অবশ্যই চাইবে ঢাকা কলকাতার মত ও কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি এক শহর হোক, সমান হোক, কাছাকাছি হোক। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাতই সব গল্পের মুখ্য বিষয় যেখানে সবসময় আমাদেরকে দাবড়িয়ে অধস্থন করে রাখার অপচেষ্টা আছে।

কিন্তু আনিসুজ্জামানের মুল্যায়ন প্রসঙ্গে এসে জমিদার স্বার্থবিরোধী পুর্ববঙ্গের কথা উদাম করছি কেন?
ড. আনিসুজ্জামান আমাদের কাজ কিছুটা সহজ করে দিয়েছেন প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ২০১৪ সালে, যা আসলে তার লিখিত বই তিনটারই কিছু সারকথা।  আর সেলেখা  উনার মৃত্যুদিনেই বিকেলে নতুন শিরোনামে প্রথম আলোতে পুনঃমুদ্রিত হয়েছে।  ড. আনিসুজ্জামানের প্রকাশিত তিনটা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা ধরণের বইয়ে তাঁর সবকথাই ছড়িয়ে আছে । প্রথম আলোতে ২০১৪ সালে যার পুরানা শিরোনাম ছিল, “বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার“;  আর এরই পুনঃমুদ্রিত ১৪ এপ্রিল ২০২০ এর শিরোনাম হল, মানুষের ভালোবাসা যথেষ্ট পেয়েছি: আনিসুজ্জামান। এই সাক্ষাতকারে যা তিনি বলছেন এর সারাংশ হল, বাবা-মাসহ তার পরিবার কলকাতায় থাকার সময় তারা সকলে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষেই ছিলেন, স্লোগান দিয়েছেন। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পরে পরে পশ্চিমবাংলার ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও পুরা পরিবারই নতুন পাকিস্তানে এসে পড়েছিলেন। নতুন পাকিস্তানের নানা সুযোগ- সুবিধা নিতে খুলনায় পুরা পরিবার মোহাজের হয়ে বসবাস শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে আসার পর এবার মুসলিম লীগের সমর্থন ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। মেরু বদল করে নেন তিনি। কেন?

তিনি বলছেন, কলকাতার “১৯৪৬ সালে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার সময়” থেকে “আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল”। তিনি বলছেন, “হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু, এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়”। এর পরের প্যারায় আরেকটু পরিষ্কার করে বলছেন, “একদিকে সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি”। তার মানে, পাকিস্তানের টিকে থাকাটাকে তিনি নেতিবাচক বলছেন আর দাবি করছেন এই টিকে থাকাটা এক “সাম্প্র্রদায়িকতা”। আর শেষে বলছেন, “তখন সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে”। অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি তার চিন্তা ও মনের হিসাবে ‘শত্রু’ বলে তিনি যাকে চিনেছেন তা হলো ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা বলে তিনি কি আসলেই কিছু চিনেছেন? জবাব হল, একেবারেই না। মনে হয় না। তিনি বরং সাম্প্র্রদায়িকতা বলে আবছা এক আড়ালে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। কেন?

আনিসুজ্জামানের ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’ মানে কী?
বুঝা যাচ্ছে সেটাই বুঝতে হবে আগে।
তিনি কী বলতে চাইছেন ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা থেকে আজ পর্যন্ত যত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঘটেছে, তার সবগুলোর জন্য দায়ী একেচেটিয়াভাবে মুসলমানরাই? হা, আনিসুজ্জামান হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘটা দাঙ্গাকেই ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ বলতে ভালোবাসেন এবং কেবল মুসলমানদেরকেই এই দাঙ্গার দায়ী জন্য করেন। এটাই তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে অভিযোগে তোলা।
প্রথমত, সমাজে দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট পাড়া বা এলাকায় যে আগে থেকেই আধিপত্য ও বড় প্রভাব অবস্থানে থাকে, সেই ‘অপরপক্ষ’কে উৎখাত ও বিনাশ করে তাকে ঐ এলাকা ছাড়া করার উদ্যোগ নিতেই আমরা সব জায়গায় দেখে থাকি, প্রায় অবশ্যম্ভাবী ঘটনার মত। এটাই সাধারণ ঝোঁক হতে দেখা গেছে।  এর কারণ হল, সমাজ দুটো সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানে, তারা তখন উভয়েই পরস্পরের কাছে থাকা অনিরাপদ বোধ করা শুরু করে। এই নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে যারা শক্তির আধিপত্যে আছে, তারা বিপক্ষকে প্রথমে নির্মূল করে এলাকায় কেবল নিজেরা, নিজেদের একক হুকুমে এলাকা চলবে এই ভিত্তিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা – এটা একমাত্র পথ বলে সাব্যস্থ করে থাকে। আর এতেই  তারা আগে দাঙ্গার সুত্রপাত করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনেও ভয় থাকে যদি দুর্বল হলেও অপরপক্ষে আগে আক্রমণ করে বসে। এই অজানা টেনশন দ্বিমুখি নিরাপত্তাবোধের অভাব থেকেই সাধারণত বলশালিরাই আগে হামলা করে থাকে যদিও  তাতে শেষে কে মরবে-বাঁচবে তা অন্য কথা। কাজেই দাঙ্গা হলেই তাতে হিন্দু অথবা মুসলমান কোনো একটা সম্প্রদায়কে আগাম ও একচেটিয়াভাবে দায়ী করা ভিত্তিহীন ও ভুল। আমরা  আগেই যেকোন একটা সম্প্রদায়কে দায়ী বলে প্রিজুডিস হয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে পারি না। এমন চিন্তা করতে থাকলে একসময় এমন চিন্তাই এক রেসিজমে পৌছাবেই যে ঐ জাতটাই খারাপ, ওদের রক্তের দোষ ইত্যাদি এসব। সারকথায়  এটা আগাম নির্ধারিত পক্ষপাতিত্ব। আর কোথায় একটা দাঙ্গা হয়ে গেলে পরস্পর পরস্পরকে দায়ী করবে এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের মধ্যে মুল কথা এটা না যে কে দায়ী – এটা জানলে আমরা কোনদিকে আগাতে পারব। কারণ মূল কথাটা হল পরস্পর থেকে পরস্পর নিজ নিজ নিরাপত্তার অভাববোধ করার অবস্থায় চলে গেছে – এই সামাজিক পরাজয়  আগে ঠেকাতে হবে বা রিপেয়ার করতে হবে।
কিন্তু এসবেরও আগে আরেক কথা মনে রাখতে হবে। দাঙ্গার মত অবস্থা কেন তৈরি হচ্ছে  সেটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।  যেমন এক্ষেত্রে দাঙ্গার পিছনের কারণ হল আগের ২০০ বছর ধরে জমিদারি জুলুম অত্যাচার নির্যাতনে ফলে যে ক্ষোভগুলোর জন্ম ও এর নানান মাত্রা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছিল তা গ্রাহ্য না করে জমিদারি চালিয়ে যাওয়াতে  একদিন এমন পরিণতিই তো হবে। আমরা এটা আমল করি নাই।  তা কেন কেউ ভাবেনি? এখন কোন একটা পক্ষের প্রতি ভিকটিমহুড দেখিয়ে সহানুভূতি পাইয়ে দিতে চাইলে তা কতটা কাজের হবে? কাজেই ডঃ আনিসুজ্জামানের সাম্প্রদায়িকতা এই বয়ান মারাত্মক মুসলমানবিদ্বেষী ও  সুক্ষভাবে জমিদারের পক্ষপাতিত্ব করা। ভিকটিমহুডের নেকাব চড়িয়ে। কিন্তু তবু নিশ্চয় কোন দাঙ্গাই পবিত্র নয় হতে পারে না। আমাদের অবস্থান হতে পারে না।  কোন পক্ষকে জিতিয়ে দেয়ার দাঙ্গাই কাম্য নয় হতে পারে না, জায়েজ নয়  এবং সাফাই অযোগ্য।

বুঝা যাচ্ছে এই দাঙ্গার পুরা ঘটনায় এক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের কাছে তার কয়েন করা শব্দ  ‘সাম্প্রদায়িকতার’ অর্থ হল, তার চোখে “সাম্প্রদায়িকতা” মানেই মুসলমানরা দায়ী। অথচ হিন্দু ডোমিনেটিং এলাকায় সে মুসলমানকে কোপাবে- এটাও স্বাভাবিক। আর যদি কোন মুসলমানেরা বেশি এমন এলাকা হয় তবে এর ঠিক উল্টাটাই হবে – স্বাভাবিক।   ঐ একই পরস্পরকে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধের অভাব। তাই আগাম আক্রমণ – সেই একই ফর্মুলা। অনেকে আবার এসব মেনে নিয়েও এবার কায়দা করে কে কম কে বেশি, এসব কূট তর্ক শুরু করতে পারে। তবে দেখা গেছে প্রশাসনের ভুমিকা গুরুত্বপুর্ণ। আদর্শ হল, কোন দাঙ্গা সংগঠিত হতে দেয়া ছাড়াই প্রশাসন যদি উত্তেজনা নিরসন করতে পারে।   এভাবে সব ক্ষোভ নিরসন করতে পারা একটা সাফল্য হতে পারে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি প্রশাসনের ইতি ভুমিকার কারণ দুই সম্প্রদায় নিজ নিজ নিরাপত্তাবোধ ফিরে পেয়েছে – এটাও হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অতএব আনিসুজ্জামানের এই ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বুঝ কোন ভাল বা কার্যকর কিছু আনতে পারে না। শুধু তাই না এটা একপেশেও তাই অর্থহীন।  এছাড়া এর আরেক মস্ত ভ্রান্তির দিক আছে।  আমাদের জ্বর হওয়া হল রোগের লক্ষণ,  তা  আসলে রোগ নয়। জ্বর হলে বুঝতে হবে আমার অন্য কোন রোগ হয়েছে। শরীরের কোন ইন্টারনাল অঙ্গ ডিসওর্ডার আছে, ঠিক্ মত কাজ করছে না। সেটা খুজে বের করতে হবে আগে ও সেরে উঠতে হবে। শুধু প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর তারানো যাবে রোগ তাড়ানোর কিছু হবে না।  ঠিক তেমনি কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ সমাজের কোন মূল সমস্যা নয়, এটা কোন গভীর সমস্যার বাইরের লক্ষণ। তাই কেন দাঙ্গা লেগেছে সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বলে হিন্দু অথবা মুসলমানকে অভিযুক্ত করা নিরর্থক। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করেই একমাত্র স্থায়ী সমাধান পেতে হবে।
তৃতীয়ত, এটা একটু বড় আর সিরিয়াস। কলোনিমুক্ত স্বাধীন অখণ্ড ভারত গড়তে ১৮১৫ সাল থেকেই রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগ আর সেখান থেকে শুরু করে  মাঝে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম পেরিয়ে ১৯৪৭ পর্যন্ত –  ভারতের ‘সকলকে’ নিয়ে কখনও নেহরু-গান্ধীসহ কেউই একটা ভারত গড়ার কোনো কার্যকর প্রস্তাব তারা করতেই পারেন নাই। কারণ তাদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটির দিকটা হল, তারা মনে করেন ধর্মই তাদের কথিত জাতি ধারণার মূল ভিত্তি, আর এটা ধরে নিয়ে একটা হিন্দু-নেশন স্টেট গড়তে প্রস্তাব করে যাচ্ছিলেন তারা। কারণ তাদের সকলের কাছেই রাষ্ট্র গড়া বলতে তা এক জাতি-রাষ্ট্র গড়াই একমাত্র তারা বুঝতেন। রামমোহনের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রবর্তনের চিন্তাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। কিন্তু পরবর্তিতে ব্রাহ্মধর্ম প্রকল্প পরের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই ব্যর্থ ও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে হাজির যায়।  এই ব্যর্থতাই তাদের মনে এক সাফাই হিসাবে হাজির হয় যে কথিত ব্রাহ্মধর্ম ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র যেহেতু চেষ্টা করে তারা পারেন নাই, তাই নিরুপায় হয়েই এবার এক “হিন্দু নেশন স্টেট” করতেই তারা এগিয়ে গেছেন। একাজটাই পরবর্তিতে করে গেছেন বঙ্গিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রমুখ সকলেই।  যদিও কংগ্রেসের জন্ম হয়েছেও যতটা সম্ভব এই “হিন্দু নেশন স্টেট” কামনা আড়াল করে, কিন্তু কার্যন্ত তা প্রকাশিত থেকেই গেছে। কিন্তু এই ঝুটা সাফাইয়ের উপর  যে আমরা বিকল্প চেষ্টা করেছিলাম পারি নাই।  কিন্তু মুখ্য প্রশ্ন, অন্য ধর্মের লোকেরা কেন “হিন্দু নেশন স্টেট” এর কল্পনা মানবে এর স্বপক্ষে কোন জবাব কোন সাফাই দেওয়ারও চেষ্টাই করে নাই কংগ্রেসের কোন নেতা। যার সোজা অর্থ হল  তারা জবরদস্তিতে এটা করবেন, চাপিয়ে দিবেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  এখানেই কংগ্রেসের সাথে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের দারুন মিল। অতএব কলকাতাসহ সারা ভারত জানত  বাস্তবে তাদের “হিন্দু নেশন স্টেট” চিন্তা আর এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।  আর এরই পরিণতিতে কংগ্রেসের দেখানো পথে এখান থেকেই আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দাবি ওঠে এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল মুসলিম লীগের হাতে। “হিন্দু নেশন স্টেট” এই চিন্তা ও কামনার কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে দেখানো পথেই তাই মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

মজার কথা হল রাষ্ট্র বলতে যে “হিন্দু নেশন স্টেট” মানে ধর্ম ছাড়া নেশন হয় না আর নেশন স্টেট ছাড়া আর রাষ্ট্র ধারণা হয় না – এই দুই ভুল চিন্তা আমাদের উপমহাদেশের রূট সমস্যা। কিন্তু এটা  চিন্তা করে ধরতে ও বুঝবার অসমর্থতা আজও যায় নাই।  কংগ্রেস নেতারা হয়ত সীমাবদ্ধতাটা বুঝত কিন্তু তারা আবার নিজেদের নিরুপায়ও মনে করে মিথ্যা  সাফাই খাড়া করতেন। আর সবচেয়ে বড় কথা তাদের “কথিত হিন্দুস্বার্থ” – এর বাইরে তারা যেতে পারেন না এটাই মনে করতেন। আর কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা “নেশন স্টেট” চিন্তাটাই যে সমস্যার আর তা যে মারাত্মক ভুল তা ই বুঝতে সক্ষম তা কোথাও প্রমাণ রাখেন নাই।  তামসার কথা হল তাদের দাবি অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্র-বুঝ নাকি “শ্রেণীরাষ্ট্র” বুঝের। যদি তাই হয় তবে “নেশন স্টেট” এর পক্ষে চলে যাওয়া আর তার উপর আবার তলে তলে সেটা “হিন্দু নেশন স্টেট”  – এই ধারণা তারা হজম করেন কী করে?   অর্থাৎ “শ্রেণীরাষ্ট্র” কথাটা বইয়ের ভিতর তাত্বিক রেখে দিয়েছেন আর বাস্তবের ভারতে কার্যত “হিন্দু নেশন স্টেট” ধারণা কাঁধে নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির সাথে পেস মিলিয়ে এখনও হাটছেন।

ওদিকে এসব প্রগতিবাদী দাবি করেন তারা নাকি সবার আগে ও উপরে রেনেসাঁ-বুঝের প্রগতিপন্থি। যদি তাই হয় তবে তাদের ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু রাজা রামমোহন কেন এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন?  এদিকটা কোন বামপন্থি বা কমিউনিস্ট কখনও টের পেয়েছেন, ঝামেলাটা ধরতে পেরেছেন তাই জানা যায় না। অথচ কমিউনিস্টদের মধ্যে  ইসলামবিদ্বেষ তাদের মজ্জাগত। আর এই সুত্রে এরা উলটা জিন্নাহকে দায়ী করে যে তিনি “ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান’ কায়েম করেছে বলে।

কমিউনিস্টদের মাথায় আরেক আজব চিন্তা লক্ষ্য করা যায় ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ বলে একটা ধারণা।  তারা “নেশন স্টেট” কথাটা শুনলেও এর সাথে জাতীয়তাবাদ ধারণাকে মিলায় না। বরং জাতীয়তাবাদ ধারণাটা নেশন-স্টেট ধারণা থেকা আলাদা এবং তাদের কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বন্ধু মনে করে।  অনেক মনে করে জাতিয়তাবাদ হল  কমিউজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বাস্তবায়নে যাবার আগের ধাপ তাই এটা বন্ধু ধারণা।  অথচ ইউরোপের তিনশ বছরের মর্ডানিটি ও রাষ্ট্র ধারণাটা বলতে তা সব সময়ই নেশন স্টেট ধারণা। জাতীয়তাবাদ শব্দটা ইউরোপে তেমন ব্যবহার নাই তবে কেউ তা করলে সেটাও নেশন স্টেট ধারণা অর্থেই। খুব সম্ভবত এর কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলোনি্মুক্তির যুগে এরা সোভিয়েত ব্লকে গিয়ে ঢুকলে তাদেরকে ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে প্রশ্রয়ের খেতাব ও বন্ধু মানা হত।  তারা সমাজতন্ত্রে পৌছানোর আগের ধাপে থাকা রাষ্ট্র বলে সার্টিফিকেট দেয়া হত। এই সার্টিফিকেট অনুসারে নেহেরু-গান্ধীর কংগ্রেস হল ‘জাতীয়তাবাদী’  কিন্তু জিন্নাহর পাকিস্তান? না না। এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, তাই অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়।

তবু মনে রাখতে হবে  সব সম্ভাবনা শেষ হবার এর আগে ১৯২৮ সালে সর্বশেষ একটা প্রস্তাব ছিল।  সেটা জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’। বাংলাদেশের একমাত্র বদরুদ্দিন উমরকে দেখা যায় এর জিকির করেছেন। ওর প্রথম দফা ছিল যে প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে এরপর ফেডারেল আমেরিকার মত প্রদেশগুলোর এক অখণ্ড ‘কনফেডারেটেট ইন্ডিয়া’ গড়ার দাবি তুলেছিলেন। বলাই বাহুল্য, নেহরু-গান্ধীরা জিন্নাহর এহেন প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। প্রস্তাব বাতিল করে দেয়া সহজ কাজ। কিন্তু এর অর্থ যে, পরিস্থিতিকে দাঙ্গার দিকে ঠেলে দেয়া, এ দিকটা কেউ ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না।
এত দূর পর্যন্ত চিন্তা করতে পারেননি ড. আনিসুজ্জামানরা।  ডঃ আনিসুজ্জামানদের মত যারা চিন্তা করেন তাদের সমস্যা হল,তারা মুসলমানদের উপর সব দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চান। “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা” শব্দটা তাদের কাছে ভাল ওজনদার ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডার এক শব্দ। ্তাই দাঙ্গার পিছনের কারণ কী সেদিকে এরা কোনভাবেই যাবেন না।  অথচ “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা”  বলতে যদি সব মুসলমানরাই দায়ী হয় তাহলে ভারতের সব দাঙ্গাগুলোর জন্যও মুসলমানরাই দায়ী এটাই কী আনিসুজ্জামান মনে করতেন!

তবে দাঙ্গার পিছনের কারণ কী এতদুরে আনিসুজ্জামান যাবেন ক্ষতিয়ে দেখতে সক্ষম হবেন এটা আশা করাও ঠিক হবে না। কারণ তিনি রাজনীতিবিদ তো নন বা এ বিষয়ে ভাবার উপযুক্ত কোন একাদেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিও তিনি এমন ধারণা আমাদের নাই। যদিও  এটা ব্যক্তি আনিসুজ্জামানের জন্য দোষেরও নয়। কিন্তু এটা  অবশ্যই এক বিরাট সমস্যা হয়ে হাজির হল, যখন তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে রোগের এক লক্ষণকেই রোগ বলে ঠাউরে বসতে চাইছেন। বরং ‘সাম্প্রদায়িকতা’ কে সব সমস্যার গোড়া বলে প্রপাগান্ডা দিয়ে হারানো জমিদার হিন্দুর রাজনীতি ও স্বার্থের পক্ষে থাকা – এভাবে খাড়া হয়ে যাওয়া তাঁর অনুচিত।

কিন্তু এত শব্দ থাকতে “সাম্প্রদায়িকতা”, এই শব্দটাকেই তাঁরা এত পছন্দের বিষয় করলেন কেন? এছাড়া অবশ্য তাঁরা সময়ে আরো সামনে বাড়েন। যেমন তাদের আরেক শব্দ আছে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ (অথবা সময়ে বলেন ‘সেকুলারিজম’), যেটা আরেক ভুয়া শব্দ এবং তা জমিদারের রাজনীতি ও স্বার্থ লুকানোর এক কৌশল।

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’। জমিদারেরা বেশির ভাগ বর্ণহিন্দু ছিলেন বলে জমিদারি সামাজিক ব্যবস্থাটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপ্রথারও ধারাবাহিকতা হয়ে উঠেছিল সহজেই। মুসলমানেরা বাঙালি নয় সেটা না হয় ফতোয়া দেয়া গেল। কিন্তু এদিকে মুসলমানরা তো হিন্দু বাঙালি সমাজেই পাশাপাশি বসবাস করত, তাই চাইলেই ফেলে দিতেও পারেনি। তবে বর্ণহিন্দুর জাতিভেদপ্রথায় মুসলমানদের জন্যও তাদের জাত-অবস্থান ঠিক করে দেয়া হয়। আর সেটা বলাই বাহুল্য তা ছিল নমঃশূদ্র, চর্মকারদেরও দু’ধাপ নিচে। এভাবেই জমিদারি ক্ষমতার হাতেই কথিত “বাঙালিয়ানা” যাত্রা শুরু করেছিল, মুসলমানদের বাইরে উপেক্ষিত রেখে। এওখন এই কলকাতার বাঙালিয়ানা এরা কেমন করে আশা করে যে, তাদের এই সাজানো বাগানে আগুন লাগবে না , ব্যাকফায়ার করবে না? এসব তৎপরতার কোনো চরম ব্যাকফায়ার লন্ডভন্ড প্রতিক্রিয়া হবে না? তাহলে দাঙ্গা জিনিষটা কী যেন?

তাহলে সেই থেকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এই যে সাজানো মনোরম বাগান মানে জমিদার বাবুর “বাঙালি সমাজ”, এতে প্রবেশ করতে গেলে মুসলমানদের “অনুমতি” নিতে হবে। ঘটনাচক্রে কোনো মুসলমানকে যদি এই ‘বাঙালি সমাজ বসতে উঠতে জায়গা পেতে হত, অফিসে বা ক্লাসরুমে যেমন ততদিনে আবার বৃটিশ ইন্ডিয়াতে মডার্ন এডুকেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরি এসে গেছিল, মাস্টারি ওকালতি পেশকার ধরণের নানান কাজও। এসব কিছুর সুযোগ যদি পেতে হত তবে মুসলমানদের প্যান্ট বা ধুতি পরতে হত, মাথায় টুপি চাপাতে পারতেন না। এই ইতিহাস আমাদের সকলের জানা  অন্তত ষাটের উপরে যাদের বয়স।  এটা কি এনাফ নয় সে সময়টাকে ধরবার জন্য! মডার্নিটি নামের আড়ালে জমিদার হিন্দুর কালচার বা তাদের ঠিক করে দেয়া বৈশিষ্ট্য মুসলমানদের অনুসরণ করতেই হবে, কেন? নইলে? নইলে আপনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ডাকা হবে। আর মনে রাখবেন, একবার সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগিয়ে দিলে ‘বাঙালি সমাজে’ আপনার প্রবেশ নিষিদ্ধ, অচল হয়ে যাবেন সেখানে। শিক্ষা, চাকরি কিছুই জোগাড় করতে না পেরে এখন না খেয়ে মরবেন, আপনি! আর যারা এখনকার ২০-৩০ বছর বয়সের তাদেরও দুঃশ্চিন্তার কারণ নাই। মমতার আমলে কিছু হয়ত বদলাতে চাইছে। তবু এখনও কলকাতা চলে যান, দেখে আসেন মনোযোগ দিয়ে। তাহলে আনিসুজ্জামান আমাদের কী অসাম্প্রদায়িকতা শিখাতে এসেছেন?

আর  ‘অসাম্প্রদায়িক’ হওয়া মানে কী? জমিদারির আধিপত্যে সাজানো ‘বাঙালি সমাজে’ প্রবেশ ওঠা-বসার সুযোগ ও অধিকার পেতে হলে শাসক জমিদার বাবুর নির্ধারিত যে কোড আপনাকে মেনে চলতে হবে, অভ্যস্ত হতে হবে, এটাই “অসাম্প্রদায়িকতা”। আবার অসাম্প্রদায়িকতার ট্রেনিং ও ওরিয়েন্টেশন শেষে ওই সমাজে প্রবেশ করতে পারলে ভেবেন না আপনি তখন বাঙালিও হয়েছেন। আপনি সেই তখন বড় জোর হিন্দু বাঙালির এক পড়শি কেবল।

অনেকের মনে আছে হয়ত ২০১৩ সালের আগষ্টে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের একাত্তর টিভির এক টকশো ক্লিপ পাওয়া যায় ইউটিউবে, সেখানে “বাঙালি মেয়ে কারা” তা নিয়ে মিতা হকের দেয়া এর বর্ণনা আছে। তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর ঐ বক্তব্যের টেক্সট পাবেন এখানে। সেটি মিলিয়ে দেখতে পারেন, তাতে আমার কথা আরো ভাল বাস্তব উদাহরণে বুঝা যেতে পারে। মিতা হকের বক্তব্য আমে দেখতে বলছি আমি যা বলতে চাইছি এর রেফারেন্স বা উদাহরণ হিসাবে।  তার বক্তব্যের পক্ষ নেয়া বা নিন্দা করা কোনটাই এখানে উদ্দেশ্য নয়। ওথচ কেউ বাঙালি কি না এর সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা হল, সে তার মায়ের সাথে কী ভাষায় কথা বলে, কিভাবে ডাকে ইত্যাদি। অথচ আনিসুজ্জামানের মত যারা চিন্তা করেন তারা ধর্ম বা পোশাক ইত্যাদির একধরনের লাইন টেনে দিতে চায় জমিদার কর্তৃক নির্ধারিত অসাম্প্রদায়িকতার কোড বলে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে।এটাও কি ব্যাকফায়ার করবে না? আসলে ‘মাদার টাঙ’ তো লুকানো যায় না, ভুলা যায় না।

কিন্তু তা না হয় বুঝা গেল, তবু কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক বা সম্প্রদায়, এসব ডাকাডাকির ট্যাগ দেয়া কেন? কারণ খুব সহজ। জমিদারির হিন্দু কালচার বলতে চায় তারা তাদের বাঙালি সমাজ বলে এক বাগান সাজিয়েছে। সেখানে তাদের কোডের বাইরে আলাদা পোষাক বা আচার অথবা কোন চিহ্ন হাজির করা মানে হল তাদের সম্প্রদায়ের সেট আপের মধ্যে আমি আমার মুসলমান সম্প্রদায়েরও  চিহ্ন দেখিয়ে মাথা তুলতে চাচ্ছি। অতএব তাদেরটা নয় আমারটাই কেবল ‘সম্প্রদায়গত বিভক্তি’ চিহ্ন, যা আমি শো করছি বলে তারা দাবি করবে। কারণ রাজত্ব তো তাদের, আমরা তো প্রজা। তাদের সাজানো বাগানে আমরাই যেন হস্তক্ষেপ করছি! এটাকে তারা তাদের সাজানো বাগানে অন্যরাই যেন হস্তক্ষেপ করছে – এভাবে দেখতে চাচ্ছে। অতএব আমরা সাম্প্রদায়িক! এই হল ডঃ আনিসুজ্জামানের রপ্ত করে নেয়া ভাষ্য।
সেই জমিদার শ্রেণীর আধিপত্যে ও নেতার হাতে চালু করা সমাজ আজও একইভাবে চলছে। আর পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা আজো ‘অসাম্প্রদায়িক’ চিহ্ন রপ্ত করতে করতে একেবারে ট্রেইন্ড। কারণ সে জানে এটাই এখনো তার পাসপোর্ট, না হলে বাঙালি সমাজে উঠতে দেয়া হবে না।

আনিসুজ্জামান সম্ভবত আমরা অনুমান করতে পারি “কলকাতার মুসলমান” হিসেবে ছোট থেকেই কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠতে ট্রেইন্ড হয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর মনে অজানা ভয় কাজ করেছে যে, গোষ্ঠী বিশেষের আধিপত্যের তৈরি করা কোনো গাইড লাইন বা কোড ভঙ্গ করলে সমাজের কোথায় না আবার অপমানিত হতে হয়। মজার কথা হল, কলকাতার মুসলমান যখন পূর্ব-পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে আসেন, তখনও তাদের ‘ট্রমা’ যায় না। পিছু ছাড়ে না। কারণ ব্যাপারটা অভ্যাসের গভীরে ঢুকে গেছে – গভীর ট্রমা আর ভয়ে।  উল্টো তারা বাংলাদেশের মুসলমানদেরও ঐ একই ধরনের তথাকথিত মাই ফুট “অসাম্প্রদায়িক” হতে সবক দিয়ে বসেন।

ঠিক এটাই প্রবলভাবে ঘটেছিল বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের দিকে আওয়ামি লীগের জন্মের সময়। কলকাতায় পড়ালেখা করে ফেরত শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত হয়ে যায় লীগের বুদ্ধিজীবী অথবা কালচারাল ভ্যানগার্ড। একারণেই সেকাল থেকেই লীগের অসাম্প্রদায়িক বা কথিত ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার অহেতুক কসরত দেখেছিলাম আমরা।

ব্যাপারটা হল কোন মডার্ন ভ্যালু বা সরাসরি ইন্ডিভিজুয়ালিজম যদি চর্চা করতেই হয় তো করেন না? সমস্যার তো কিছু নাই।  তবে বুঝে শুনে করেন, মন লাগিয়ে। কিন্তু পুরানা জমিদার বা সামন্ত আধিপত্যের ভ্যালুর জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘোরা তো একেবারেই অপ্রয়োজনীয় আর হাস্যকর! কেবল খেয়াল রাখবেন, সহনাগরিক কারো অধিকার লঙ্ঘন করে যেন না বসেন, পায়ে মাড়াবেন না কাউকে। কারণ তারাও আপনারই সমান অধিকার; তাদেরও বৈষম্যহীন অধিকার আছে। এটা খুবই শক্তভাবে মেনে চললে দেখেন ভুয়া কথাবার্তার কবল থেকে বহু আগেই আর সহজেই রেহাই পেয়ে যেতে পারেন। খেয়াল রাখবেন কারণ সাবর্ডিনেট হওয়া যাবে না, মানা যাবে না।

এবার কিছু সারকথা। বাঙালি মুসলমান তা সে যেখানকারই হোক, তার আর কারো কাছ থেকে সে ‘বাঙালি’ কি না, এই স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট অপ্রয়োজনীয়। পুরানা জমিদার গোষ্ঠীর আধিপত্যের কোনো কিছুকে সে আর গুরুত্ব দেয় না বিশেষত ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। দিলে তো সে সেই থেকে কলকাতার অধীনেই থেকে যেত। প্রধান কারণ পাকিস্তান কায়েমের পরই পুরা পুর্ব-পাকিস্তান থেকেই জমিদারি উৎখাত করে হয়েছিল। তাই এই জমিদারি-হারানি পরাস্ত স্ট্যাটাস আর তাকে কাউকে বাঙালি সনদ দেবার-না- দেবার কোনো মুরোদ রাখে না। তবে ওই জমিদার ও তার স্বধর্মী সঙ্গীরাই এখন সব ক্ষমতা আর আধিপত্য হারালেও বাম ভেক নিয়ে নতুন করে হাজির আছে। তারা মাঝে মাঝে বাঙালি মুসলমানকে এইবার কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িকতা শেখানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু বাঙালিয়ানা? না সে মুরোদ বা বাস্তবতা আর নেই। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে প্রধানত মুসলমান বাঙালি প্রমাণ করে রেখেছে যে, নিজের বাঙালি স্বীকৃতি আর অপরের কাছে নয়, নিজেই নিজের বাঙালি স্বীকৃতি, নিজেই তা হাসিল করে নিয়েছে। এরজন্য এই জায়গায় এসে শেখ মুজিব আমাদের একটা প্রশংসার দাবি রাখেন। দেখেন তিনিও কলকাতায় বড় হওয়া, পড়তে যাওয়া তাদেরই আরেকজন। কিন্তু কোয়ালিটি একেবারে উলটা। জেনুইন কোর মুসলিম লীগার। ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ কাহিনী তিনি গুমোর ফাঁক করে বুঝতেন। তাই মোহ ছিল না।

তাহলে ডঃ আনিসুজ্জামান তিনি আসলে কে?
তিনি হলেন পতিত কিন্তু হার স্বীকার না করা জমিদার হিন্দুর রিয়েল রিপ্রেজেন্টেটিভ।  কলকাতায় জমিদারি এখন আর নাই। আমাদের দেখাদেখি ১৯৫৫ সালের তারাও উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কলকাতার হিন্দুমনের ফাউন্ডেশন  ও মেজাজ এই জমিদারের হাতে শুরুর দিকে তার রমরমা আমলেই এর নির্ধারক টাচগুলো হস্তান্তর করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের উপর থেকে চরম ও প্রাকটিক্যাল অর্থে হারানি জমিদার হিন্দুর আধিপত্য বা সমস্ত ধরণের প্রতিপত্তির কিছু অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু কলকাতা (বৃহত্তর অর্থে এটা এখন সারা ভারত) হাল ছেড়ে দেয় নাই , হার স্বীকার করে নাই।  চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে হারানি জমিদারের খাসিলতের কথা বললাম ডঃ আনিসুজ্জামান আধিপত্য প্রতিপত্তি হারানো হিন্দু মনের প্রতিটা রক্তফোটার গতিবিধি আকাঙ্খা তিনি বুঝতেন। একারণে বাংলাদেশের কেউ যদি একালে ভারতের সাথে গাটছাড়া বেধে চলতে চান তাহলে তাকে দেখাতে হত যে তিনি ডঃ আনিসুজ্জামানকে আদর খাতির কেমন করেন, কোথায় রাখেন।  আবার ডঃ আনিসুজ্জামান এর দিক থেকে দেখলে তিনিও এসব জানতেন, বুঝতেন তার কোয়ালিটির বাজারদর কোথায় ও কত। ফলে তিনি সে মোতাবেক দাম চাইতেন ও পেতেন। ডঃ আনিসুজ্জামানের মৃত্যতে এই যুগের সমাপ্তি ঘটল।

কিন্তু কলকাতায় বড় হওয়া মুসলমানরা এখনো এক ট্রমায় ভুগছেন। যেমন মনে করুন, ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের অনেক বন্ধু মিলে কোনো আলাপ করছেন। সেখানে নিজেদের মনের মধ্যে কারো কোনো অসাম্য বা নিচু বোধ নেই। ফলে  যা বলতে ও লিখতে ইচ্ছা করছে, তাই করতে তারা অভ্যস্থ অর্থে মুক্ত। কিন্তু যদি আপনারই কোনো কলকাতার মুসলমান বন্ধু এসে গেছে সেখানে এমন হয়! লক্ষ্য করবেন, সে আপনার সাহস ও মর্যাদাবোধ দেখে তো কাঁপছে আর হয়তো বারবার আপনাকে, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে, জামা টেনে ধরছে। তাহলে বুঝতে হবে, কলকাতায় থাকতে থাকতে এটা আপনার বন্ধুর ট্রমা, কোড মেনে চলার তাগিদের ট্রমা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ১৭ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  ডঃ আনিসুজ্জামান ও “সাম্প্রদায়িকতা” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীকে আচ্ছা শিক্ষা দিল এক দুবাই রাজকুমারি

মোদীকে আচ্ছা শিক্ষা দিল এক দুবাই রাজকুমারি

গৌতম দাস

১১ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Zt

কিছুই নজর এড়াবে না, দুবাইয়ের রাজকীয় থাপ্পড় ThePRINT_

তেজস্বী সূর্য [Tejasvi Surya] – এটা ভারতের এক তরুণ বিজেপি এমপির নাম, যার বয়স এখন সবে ২৯ বছর। পুরা নাম Lakya Suryanarayana Tejasvi বা লক্ষ সুর্যনারায়ন তেজস্বী। নামগুলো এখানে বাংলা উচ্চারণ  অনুসরণ করলে যেমন হয় মানে বাংলা ফোনেটিক করে লেখা হয়েছে। তিনি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু এর এমপি। অর্থাৎ কর্ণাটক রাজ্য মানে ভারতের ‘কন্নড়’ নামের জনগোষ্ঠী ও তাদের  কানাড়া ভাষা , এই দ্রাবিড়ীয় ভাষাভাষীদের রাজ্য।  গত বছর ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রের নির্বাচনে তিনি দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণ বেঙ্গালুরু থেকে  এমপি বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে মাত্র এক বছরের মধ্যে  তিনি ভারতের বাইরে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বড় এক ‘কুখ্যাতি’ কামিয়ে ফেলেছেন। ভারতের যারা বাইরে দুনিয়াদারির খবর রাখেন তারা বুঝে যান যে, তেজস্বীর পাশে দাঁড়ানো যাবে না বরং ওর দায় না নিয়ে তাকে নিন্দা করতে হবে। ওর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আর ভারতের যারা বিজেপি দলের প্রভাবে ইতোমধ্যেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণায় অন্ধ হয়ে গেছেন এবং হিটলারি জাতিবাদী-বর্ণবাদী উগ্র চিন্তা ধারণ করেন তারা মনে করেন তেজস্বীর বদনামের প্রতিশোধ নিতে ভারতের মুসলমানদের উপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যদিও ব্যাপারটা মোটেও ঢিল-পাটকেলের মত পাল্টাপাল্টি ইস্যু ছিল না বা নয়।

এমনিতেই ভারতের অর্থনীতির ঢলে পড়ার খবর গত বছরের শেষ থেকে উদাম প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল ( গত ২০১৯ মে এর নির্বাচন পর্যন্ত ওই সব তথ্য  প্রকাশ বহুকষ্টে মোদী ঠেকিয়ে রেখেছিলেন) যে,  ভারতের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই খুবই খারাপ দিকে মোড় নিয়ে ফেলেছে। এর উপর আবার নতুন বছরের শুরু থেকেই অর্থনীতির আরও ঢলে পড়া স্পষ্ট হতে থাকে, করোনার কারণে অর্থনীতি আরেক বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে তাই। এই খারাপ ধাক্কায় সরকার অজনপ্রিয় হতে পড়তে যাচ্ছে, তা টের পেয়ে মোদি মুসলমানবিদ্বেষী কড়া হিন্দুত্ববাদে উসকানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। যেমন এখন আবার গত কয়েকদিন ধরে পাকিস্তান সীমান্তে  উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।   যাতে মুসলমানদের উপরে হিন্দুরা শ্রেষ্ঠ – এমন সুপ্রিমিস্ট চিন্তার উসকানি ও বর্ণবাদী নাগরিক ভেদাভেদ-চিন্তা ছড়িয়ে তাদের মধ্যে একটি জোশও এনে দেয়, আর তা দিয়ে পাবলিক লাইফে মোদীর অর্থনীতির চাপ ও কষ্ট থেকে তাদেরকে যতটা ভুলিয়ে রাখা যায় আর কী!

টার্গেট মওলানা সা’দ, মুসলমানেরা নিচা জাতঃ
ভারতে লকডাউন পালন কার্যত শুরু করা হয়েছিল গত ২৩ মার্চ বিকেল থেকে। আর এবছরে দিল্লির তাবলীগ জামাত সমাবেশ শুরু ও শেষ হয়েছিল এর অন্তত ১০ দিন আগেই; অর্থাৎ এর আয়োজনে কোনো আইনভঙ্গ করা হয়নি, বরং সরকারি অনুমতি নিয়েই ঐ সমাবেশ করা হয়েছিল। লকডাউন শুরু হওয়ার পর কারা কারা করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত সমাজের বিভিন্ন কোণে এদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে সমাবেশফেরত কিছু মুসল্লিদেরকেও (সমাজের আর সব কোণের মত) অনুসন্ধানে তাদের বাড়ি বাড়িতে অনেকের মধ্যে (বিবিসির ভাষায় অন্তত তিনশো জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ পাওয়ার পরে……) করোনা পজিটিভ পাওয়া গিয়েছিল।  কিন্তু এতে এবার বিজেপি এ ঘটনাকে তাদের মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণার বিষয় – এই প্রপাগান্ডা-হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছিল। তারা বলা শুরু করেছিল যে, মুসলমানদের জীবন আচার-অভ্যাসই নীচু ধরনের, ওরা খারাপ, তারা নিম্ন কালচারের, ধর্মীয় জাতিগতভাবে তারা নীচুসহ প্রভৃতি এমন সব বয়ান তৈরি করে জাতবিদ্বেষী, প্রবল রেসিজমের এক জোয়ার তুলেছিল সামাজিক নেটওয়ার্কজুড়ে।

মানুষ ও প্রকৃতিঃ মাঝখানে চামচ কেন
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী ও কেমন এটা কমবেশি সব ধর্মতত্বেরই মুখ্য বিষয়। এনিয়ে শিক্ষালাভের এক সহজ ও প্রধান উতস আমাদের ধর্মতত্বগুলো। যেসব সভ্যতা আধুনিকতার নামে এসব দিকর কিছু বুঝেই নাই বা অবজ্ঞা করেছে তারাই বিজ্ঞানবাদী হয়ে কথিত শিল্প-বিপ্লবের নামে  প্রকৃতি ধবংস করে এখন হাহুতাশ করছে। যা ক্ষতি করে ফেলেছে তা এখন আরেক পরিবেশবাদ বলে কিছু একটা বুঝে ছুটা ছুটি করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু শান্তি হচ্ছে না।  তবু মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্ক ধরতে পারার এরা ধারেকাছেও আসতে পারে নাই। প্রাণ কোথায়, কী খুজে পায় না! কারণ স্পিরিচুয়ালিটির কোন ধারণা নাই, আকাঙ্খা নাই, চাহিদাও নাই – সেটা না দার্শনিক জ্ঞান চর্চায় না ধর্মতাত্বিক চর্চা দিক থেকে। অথচ এগুলো আমাদের সমাজের স্বাভাবিক চর্চা থেকেও অন্তত কিছু জেনে নেওয়া যায়।
আমরা চামচ দিয়ে খাওয়া অভ্যাস রপ্ত করলাম না কেন? কেন সরাসরি হাত দিয়ে খাই? একেবারে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে অনুভব করে ধরে সম্পর্ক পাতিয়ে স্পর্শ, গন্ধ স্বাদ সব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানতে হবেই আমাকে তবেই তা প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের আকাঙ্খা পূরণ হবে – এভাবে। এটাই ছোট থেকেই আমাদের শিক্ষা , ওরিয়েন্টেশন।  তাতে কেন এটা করতে হবে তা বুঝি আর না বুঝি। আর সেটা বড় হয়ে নিজে চিন্তা করলেই অনেক কিছু কারণ বুঝে যাওয়া যায়, আমরা বুঝি। প্রকৃতির যা খেলাম তাই তো আমার শরীর হয়? আমি হই! তাহলে প্রকৃতি কে, কী হয় আমার?  এসব নানান প্রশ্ন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয়, ইসলামেরও। যার অনেক জবাব নির্দেশ রূপে আমরা পেয়েছি ইসলাম থেকেও। আঙুল দিয়ে খাব কেন, চেটে চেটে প্লেট থেকে খাব কেন? এর ভিতর সেসব ইঙ্গিত বা  ম্যাসেজ আছে। এখন আপনি যদি বিজ্ঞানবাদী বা হঠাত ‘সাহেব’ বনে গিয়ে আমাকে বলেন আমি ‘নোংরা’, আমার খাওয়ার স্বভাব আচার খারাপ, আমি নিচা  তাহলে আসলে অজ্ঞ কে? আপনি যে প্রকৃতি চিনেন না, সম্পর্ক বুঝেন না সে আপনি না আমি? আপনি যে বুঝের জায়গায় উঠেন নাই সেতাই আপনি বুঝেন না!
আসলে আপনি মোদী ও ভগত এখন মুসলমান ঘৃণা ছড়িয়ে মিথ্যা এবং বিপদজনক হিন্দু-জাত-শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কায়েমের উদ্দেশ্যে এগুলো করছেন। অথচ সিভিলাইজেশন অর্থে প্রাচীন হিন্দুরীতিতে প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক পাতানোর অনুভব আর ইসলাম থেকে পাওয়া রীতির মৌলিক অমিলটা কোথায়? এবিষয়ে আমরা কী ইসলাম থেকেও সমৃদ্ধ হই নাই!  প্রাচীন হিন্দুরীতি অনুযায়ী  আঙুল দিয়ে খাওয়া, চেটে খাওয়া ইত্যাদি কী নাই, প্লেট চাটাও কী নাই? অথচ এই নব্য হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করছে তারা নাকি হিন্দুকালচারের রক্ষক! তারাই আবার প্লেট চেটে খাওয়াকে নিচা কালচার বলতে চাইছে! অদ্ভুত? তাদের মুসলমান বিদ্বেষে এতই প্রবল ঘৃণায় মারাত্মক যে তারা এখন সাহেব বা বিজ্ঞানবাদী হয়ে হলেও মুসলমান কোপাতে উঠেপড়ে লেগেছে!

হিন্দু-জাত-শ্রেষ্ঠত্ব কায়েমের উন্মাদনায় ঘৃণা ছড়ানোটা বিজেপি সংগঠিত ও প্রবলভাবে করেছিল তাদের আইটি সেল ও ক্যাম্পেইনের প্রধান অমিত মালব্যের নেতৃত্বে। এটা ঠিক যে ভারতে ইতোমধ্যে কবে থেকে করোনাভাইরাস সমাজে প্রান্তরে  ইতোমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছে তা সরকারের জানা ছিল না। এখন বুঝা যাচ্ছে ভারতে লকডাউনের সিদ্ধান্ত আরও আগেই নেয়া উচিত ছিল।  সেটা সরকারেরও বুঝতে অজানা থেকে গিয়েছিল, আর এতে শুধু মুসলমান নয় হিন্দু ধর্মের নানা সমাবেশকেও  তাই একইভাবে সরকার অনুমতি দিয়েছিল। সুতরাং আইনি দিক থেকে দেখলে তাবলিগ জামাত কোন আইনভঙ্গ করে নাই তাই দোষীও নয়। তাবলীগের সমাবেশ মানেই বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আসা মানুষের সমাবেশ। যদিও তারা দলবদ্ধভাবে নিজেরা বিভিন্ন দেশের ঘটনার প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেরাই স্বেচ্ছায় আগাম সতর্কতা হিসাবে সমাবেশ করা থেকে এবার বিরত বা দেরি করতে পারলে এর সুবিধা সবাই পেতে পারত। এতটুকুই।  কিন্তু  আবার বলছি, এটা তাবলীগের কোন ক্রাইম নয়। বিদেশ থেকে উড়ে জাহাজে কী আর লোক আসেনি? অন্য ধর্মীয় সমাবেশ কী হয় নাই। কাজেই একমাত্র উতস তাবলীগ তা তো নয়। আর অন্যদেশ থেকে বিমানবন্দরে তাবলীগের লোকদেরকে বাধা দিয়ে কোয়ারানটাইনে না রেখে বাধাহীন সমাবেশে যেতে দেওয়ার দায়ভার অবশ্যই সরকারের সংশিষ্ট অফিসের। তবে যা কেউই ইচ্ছা করে করে নাই। ভারতে  তাহলে তো মোদী সরকারই সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল যে সে লকডাউনের সিদ্ধান্ত  দিতে দেরি করেছে। তবে অনেক নামাজি মুসলমানেদের বা আল্লার পথে থাকা মুসলমানদের কোরোনা ধরে না – এই জাতীয় নামাজি আবেগ ভরা কথা আমরা শুনেছি, এগুলো তাদের কোন কাজে আসেনি। উলটা অন্যের খোঁচাখুচি বা টিটকারি করে বলা কথাবার্থা শুনার কারণ হয়েছে। আবার নিশ্চয় যারা নামাজি হয়েও আবার করোনা আক্রান্ত হয়েই গেছেন তারা এজন্য কাউকে দোষারাপ করতে আগ্রহী হবেন না। কারণ, এগুলো এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের।
আসলে ভারত জুড়ে মুসলমান ঘৃণা ও বিদ্বেষ তো কেবল আজকের ঘটনা নয়, বিশেষত গত  শতকের শুরু থেকেই তা চলে আসছে।  দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। এরই প্রভাব এখনও আছে আর তাতে এখন ভাল করে হাওয়া দিচ্ছে বিজেপি-আরএসএস। দেখেন, এরই প্রভাবে এক সময়ে কলকাতার বাংলা সিনেমার (উত্তম কুমারের শেষ আমলের) নায়িকা এখন বামপন্থিদের সাথে নানান সামাজিক ইস্যুতে সচেতন হিসাবে বিবৃতিদাতা অপর্ণা সেন, তিনি এবার ধরা পড়ে গেছেন।  তিনিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদের জোশে ভেসে গিয়ে “ভারতের তাবলীগ জামাতকে ভারতে করোনাভাইরাস বৃদ্ধির জন্য দায়ী করে শনিবার (৪ এপ্রিল) টুইট করে” বসেছেন।  এটা ঠিক ইদানিং মোদীর বিপক্ষে জনস্বার্থের নানান ইস্যুতে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের বিপুল চাপ এমনকি মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল অপর্ণা সেনদের গ্রুপটাকে। তাই হয়ত ভেবেছিলেন এ সুযোগে না জেনে বুঝে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের গান একটু গেয়ে দিলে মোদী হয়ত তাদের প্রতি নরম হবেন। তিনি তাবলীগ জামাতের কাজকে ‘ক্রিমিন্যাল অ্যাক্ট’ বলে তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন। এতে বুঝা গেল তার মেন্টর বা বুদ্ধিদাতারই আইনি জ্ঞানে বিশাল ঘাটতি আছে আর অপর্ণা সেন  সেই ফাঁদে পড়ে গেছেন। এছাড়া ঐ বিবৃতির পরে, সোশাল মিডিয়ায় অপর্ণা সে্নের বিরুদ্ধেই প্রশ্ন উঠতে থাকে যে তিনি কেবল মুসলমানদের জমায়েত করার দিকে এর বিরুদ্ধে বলছেন কেন? প্রায় একই সময়ে হিন্দু ধর্মীয় জমায়েতগুলোও কী হয় নাই? পত্রিকাটা লিখেছে  “অপর্ণার এমন মন্তব্য করে নেটিজেনদের তোপের মুখে পড়েন। কেউ অপর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘শুধু জামাত নিয়ে কথা বলে কী হবে? মন্দির বা রামনবমী নিয়ে বলছেন না কেন?’ অপর্ণা সরাসরি সমস্যার গভীরে না গিয়ে শুধু মন্তব্য করে ‘মাঙ্কি ব্যালেন্সিং’ করছেন।’ বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ”।

তবে অমিত মালব্য এন্ড গংদের মিথ্যা কিন্তু সংগঠিত প্রপাগান্ডা শক্ত ছিল। কারণ, এমনিতেই করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে  দুর্বিষহ কষ্টকর জীবনে ছিল, ভারতের সাধারণ মানুষ, তাদেরই মনে সেই সুযোগে এই ঘৃণা ঢুকানো হয়েছিল। এতে ভারতজুড়ে হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্বের সুপ্রিমিস্ট ধারণা, এক গভীর রেসিজমে ভারতকে ঢেকে ফেলেছিল। বিজেপি-আরএসএস তাদের এমন ‘পারফরম্যান্স’ দেখে বেজায় খুশি। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! পাপ বাপকেও ছাড়ে না!

বিজেপির তরুণ এমপি তেজস্বী সুর্য-এর বেয়াদবিঃ
বিজেপির তরুণ এমপি তেজস্বী সূর্য, তার এমন এক ‘পুরনো পাপের ঘটনা ছিল গত ২০১৫ সালে মার্চের। তিনি আরব নারীদের সম্পর্কে খুবই আপত্তিকর ও অসম্মানজনক মন্তব্য টুইট করেছিলেন তখন। লিখেছিলেন, “৯৫ শতাংশ আরব নারী যৌন-সন্তুষ্টি জিনিসটাই জীবনে বুঝেন নাই। তাদের প্রতিটি মা ভালোবাসায় যৌন-সন্তুষ্টির দিকটা কী তা না বুঝেই খালি বাচ্চা পয়দা করে যাচ্ছে”। বলাবাহুল্য, আরব নারীদের সম্পর্কে   ইতরচিতজ্ঞানে এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য সম্ভবত আর হয় না। এর মানে, যার মনে যেই-ই তার মত নয় – এক অপর – এমন তাদের প্রতি দগদগে ঘৃণা চুড়ে দেয়া ছাড়া তার আর কাজ নাই।  নিজেদের জাতশ্রেষ্ঠত্বের অসুখে ভোগা এক গভীর বর্ণবাদ বা রেসিজম এটা।

মানব জনগোষ্ঠী দুনিয়ার বসতি স্থাপন করে যাত্রা শুরু করেছিল দুনিয়াটার নানা কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়েই, আর শুরুতে তা ছিল পরস্পর একেবারেই যোগাযোগবিহীন। এ ছাড়া সবাই দুনিয়াতে একসাথেই বসতি স্থাপন শুরু করেনি, আগে-পিছেও আছে।  আবার ভুমিগঠন, মাটি প্রকৃতি আর আরহাওয়া মানুষের প্রতি ফেবার সবার বেলায় একই রকম ছিল না। ফলে প্রত্যেকেরই জীবন অভিজ্ঞতা বৈচিত্রে ভরা। তবু নৃতত্ত্ববিদদের কড়া মন্তব্য হল, দুনিয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিটি মানবসভ্যতা তার নিজের বিকাশে সবাই শ্রেষ্ঠত্বের গুণসম্পন্ন হওয়ার সক্ষমতা নিয়েই বেড়ে উঠে। প্রকৃতির সাথে নানানভাবে সম্পর্ক পাতে, অদ্ভুত বৈচিত্রের ভিন্নতায় জীবনের নানান রূপ হাজির করে থাকে। কিন্তু পরে নানা দখলদার সভ্যতার চাপে নিজেদের আর আলাদা বৈশিষ্ট্যে ও অভুতপুর্ব সম্ভাবনাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, অবিকশিত থেকে যায় বা চাপা পড়ে থাকে। আর এই দখলদার সভ্যতাগুলোই নিজেদের বেইনসাফি জুলুমের কাজগুলোকে সাফাই দিতেই জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণার মিথ্যা সাফাই নিয়ে আসে।
মানে সারকথায় তাঁরা বলতে চেয়েছেন; কাজেই সভ্যতার বিকাশে বড় ছোট বলে কিছু নেই, সবাই নানান দিকে শ্রেষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনাময় হয়েই জন্মায়। বরং পরে এমন জাতশ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে যারা মানে, আসলে এবাই অন্যায় কলোনি দখলের পক্ষেই মিথ্যা সাফাই দেয়া। অথবা ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে নিজেদের জুলুমকেই বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। তবে খুশির কথা, দুই বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেছে, অনেক কিছু শিখিয়েছে। বিশেষ করে হিটলারের চরম বর্ণবাদ দেখার পর থেকে বর্ণবাদবিস্তারে এসবের বিরুদ্ধে গ্লোবাল মানুষ নানা আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশন তৈরি করে ফেলেছে। চলতি শতক থেকে একে জাতশ্রেষ্ঠত্বের বর্ণবাদ বা রেসিজম বলে চিহ্নিত করে  একে বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন আদালত- সবই এখন অনেক শক্ত বুঝাবুঝির ভিতের উপরও প্রতিষ্ঠিত এবং জনমতও প্রবল সোচ্চার।
কিন্তু ২০১৫ সালে করা তেজস্বী সূর্যের ঘৃণামূলক মন্তব্য নিয়ে সে সময়ে ততটা প্রতিবাদ না হলেও এবার ২০২০ সালে তা ফিরে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। এর মূল কারণ ইতোমধ্যে “তাবলিগের কারণেই ভারতে করোনা ছড়িয়েছে” অথবা “মুসলমানরা নীচু ধর্মীয় ও সভ্যতার আচার ও কালচারের মানুষ” এসব প্রপাগান্ডা করে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ এবার ভারতে মোদীরা প্রবল করাতে এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে না চাইতেই এক বিরাট রেজিষ্ঠান্স বা প্রতিরোধ সংগঠিত হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে কাজ করে  মোটাদাগে এমন নিম্ন আয়ের শ্রমদাতা অথবা হোয়াইট কলার ম্যানেজার, সেমি ম্যানেজার ধরনের সব পদই ভরিয়ে রেখেছে ভারতীয়রা। যেমন কোন রেসিডেন্সিয়াল হোটেলে কেবল মালিক বা মালিকেরাই হয়ত আরব। কিন্তু এছাড়া এর নিচের সমস্ত নির্বাহী থেকে মিডলসহ তারও নিচের সব লেভেলের ম্যানেজার পর্যন্ত এরা সবাই প্রধাস্নত একচেটিয়া দক্ষিণ ভারতের। আর এরও নিচের স্টাফ বাকি সবাই – নিচের দারোয়ান পর্যন্ত সকলেই এশিয়ান আর সব দেশের। তাই এবার করোনাকালে মধ্যপ্রাচ্যের ঐসব ভারতীয়দের সবার মন-মানসিকতাতে ভারত থেকে আমদানি করা চিন্তার প্রভাবে যে মুসলমানদের ওপরে হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা বয়ান তা সহজেই স্থান পেয়েছিল। আর সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সোশ্যাল মিডিয়ার হিন্দু ভারতীয়রা তাদের বিভিন্ন স্ট্যাটাসে যেহেতু আরবরাও মুসলমান, ফলে তাদের সম্পর্কেও অবাধে হিন্দুশ্রেষ্ঠত্বের বোধে বিভিন্ন বর্ণবাদী মন্তব্য লেখা শুরু হয়ে যায়।  তারা ভুলে গেছিল তাদের ভাত-কাপড় যোগান দিচ্ছে কে?  আর এ সময়েই একপর্যায়ে একজন ২০১৫ সালে তেজস্বী সূর্যের ঐ পুরানা আবার মন্তব্যও সামনে নিয়ে আসে একজন। আর এভাবে পুরো ব্যাপারটাতে শুরু হয় আরব সমাজ ও সরকারগুলোর কড়া প্রতিরোধ ও অ্যাকশন। তারা মন্তব্য নিয়ে ঐ মন্তব্যকারীদের অফিসকে  নোটিফাই করাতে এবার ঐ অফিস থেকে তাদের চাকরিচ্যুতির এবং দেশ থেকে বের করে দেয়ার নোটিশ হাতে ধরিয়ে দেয়া শুরু করেছিল।
কারণটা হল, কোন বনেদি ব্যবসায়ী কখনই চাইতে পারে না যে তার ক্রেতা কেবল একটা ধর্মের লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। এটা বাণিজ্য বিকাশের পরিপন্থি। কারণ ক্রেতা কম হবে, সীমিত হয়ে যাবে। তাই ধর্ম নির্বিশেষে সকল ক্রেতাই তার কাছে কাম্য ও  আদরণীয় হয়। এমনকি তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন্ ধর্ম বা ভুগোলের মানুষকে তেমন পছন্দ না করলেও সেকথা চেহারায় কোনভাবেই ফুটে উঠতে দেন না, একান্ত ব্যক্তিগত করে রেখে দেন বরং কার্যকর চেহারাটা হল  তিনি সবার সহবস্থানই পছন্দ করেন। তাই তিনি মুসলমানদেরকে গালি দিচ্ছে, নিচা দেখাচ্ছে এমন ভারতীয় কর্মচারিকে সবার আগে চাকরিচ্যুত করবেন, এরপর ঐ কর্মচারির জন্য  দেশত্যাগ করানোর একশন নিয়েছেন সেটাই দেখাতে চাইবেন যাতে সকল ক্রেতাদের আস্থা বাড়ে ও অটুট থাকে। তাই এককথায় দুরতক চিন্তা করা বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী মাত্রই তিনি সহবস্থান-বাদী।  মোদী ও তার দলের চরম বেকুবি আত্মঘাতি অবস্থানটা এখানেই। এটাই এখনকার স্টান্ডার্ড গ্লোবাল বিজনেস কালচার। মোদী ও তার দল  যেখানে তুলনায় ঘোরতর  মফস্বলি সংকীর্ণ এক নাদান বালক! কুয়ার ব্যাঙ মাত্র!

ভারতের দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা বলছে, অ্যাকশন শুরু হয়েছিল দুবাইয়ের এক আরব নারী ব্যবসায়ীর উদ্যোগ থেকে [Among the first to call out Surya was Dubai-based businesswoman Noora AlGhurair,…]। তিনি প্রথম এক টুইটে লিখেছেন, ‘করুণা হয় সেই শিক্ষাকে যা তোমাকে নারীদের অসম্মান করতে শিক্ষা দিয়েছে” [“pitied his upbringing that has taught him to disrespect women”.।’ এ ছাড়া তিনি “আরব দেশের ভিসা নিয়ে ঘুরে বেরিয়ে আবার আরব নারীদের অপমান করার ব্যাপারে” সতর্ক করে, এমপি সূর্যের পুরনো টুইটটাকে সাথে গেঁথে দিয়ে নতুন করে টুইট করে দিলেন। স্বভাবতই এবার এটা ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি আসলে একই সাথে ভারতে মুসলমানদের সাথে অসাম্য ও অধস্তন আচরণের ব্যাপারে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন।

“করুণা হয় সেই শিক্ষাকে যা তোমাকে নারীদের অসম্মান করতে শিক্ষা দিয়েছে” – Noora AlGhurair

দ্বিতীয় উদ্যোগ বা সতর্কবাণী আসে আরেক আরব নারীর কাছ থেকেও। তিনি দুবাই রাজপরিবারের রাজকুমারী এক বিদুষী, হেন্দ আল কাসেমি [Princess Hend Al Qassimi]। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যারা এই খোলাখুলি রেসিজম এবং মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টির চোখে দেখে মন্তব্য করছেন যা দুবাইয়ের আইন অনুসারে জরিমানাযোগ্য অপরাধ এবং এ কারণে দেশ থেকে বের করে দেয়া হতেও পারে”। Anyone that is openly racist and discriminatory in the UAE will be fined and made to leave. তিনি আরও হুমকি দিয়ে বলেন “এসব ইসলামফোবিক কাজের প্রত নজর রাখা হবে”।  এর পর থেকে এক চেইন রিঅ্যাকশনে মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলো থেকে প্রতিক্রিয়া ও অ্যাকশনের ঝড় বইতে শুরু করে। অনেকেই চাকরি হারায় এবং অনেককে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়। অনেকেই সরাসরি মোদীকে “একশন দেখতে চাই বলে”  টুইট করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি এর প্রতিক্রিয়ায় মুখরক্ষার দায় ঠেলা এম মন্তব্য করেন টুইটে বলেন,  করোনা কোনো ধর্ম মানে না। তাই সংক্রমণে আক্রান্তের জাত ধর্ম বিচার ঠিক নয়।’অথচ বাস্তবে মোদীর দলের নেতাকর্মীরা মুসলমানদের নীচু দেখানো আর করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য দায়ী করে আগের প্রপাগান্ডা চালাতেই থাকেন।
এদিকে ভারতের এক নারী তেজস্বী সূর্যকে উদ্দেশ করে আর্টিকেল লিখে তাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, নারী-পুরুষের সম্পর্কের সমস্যাটা কোন আরব-অনারবের সমস্যাই নয়। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ভারতীয় নারীদের অবস্থা কী, সেটা খুঁজে না দেখে সে সমস্যা কেবল আরব নারীদের বলে দাবি করতে গেছেন কেন? এটাই তো বর্ণবাদ।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে এই তরুণ সূর্য আরব নারীদের অপমান করে নীচু করছেন কেন? বিশেষত পাঁচ বছর আগে তিনি যখন মাত্র ২৪ বছরের তরুণ?
এর সম্ভাব্য কারণ হল, প্রথমত এই তরুণ কেবল বিজেপির নয়, একেবারে আরএসএসের “স্বয়ংসেবক” সদস্য। মানে এর কোর মেম্বার ও প্রশিক্ষিত ভলিন্টিয়ার। কোন প্রশিক্ষণ? গত ১৯২৫ সালে আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার যিনি হেডগেওয়ারের পরে আরএসএসের পরবর্তী সর্বোচ্চ প্রধান নেতা হয়েছিলেন, তিনি হিটলারের বর্ণ-বিশুদ্ধতার মতবাদে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাদের হাতে এই প্রশিক্ষণের মূল নীতি নির্ধারিত হয়েছিল। হিটলার বেঁচে থাকা অবস্থায় এরা হিটলারের এসব তত্ব শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাই হিটলারের জাতের ‘খাঁটিত্ব’ তারাও মানতেন। আর সেখান থেকে এটা তাদের প্রশিক্ষণের ম্যানুয়াল ও গাইডলাইনে উঠে বসে। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জাতবর্ণবাদী বক্তব্যের উত্থান এবং পতন এবং ফিজিক্যালি তার মৃত্যু ও বিনাশ এসব মিলিয়ে সারা ইউরোপ এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের রাষ্ট্রের গঠনভিত্তিটাই বদলে নিয়েছিল। সারা ইউরোপের গঠন ভিত্তি বলতে মোটামুটি (১৬৫০-১৯৫০) তিনশ বছর ধরে একই গড়ন। সেটা হল এরা সব রাষ্ট্র গুলোই ছিল আসলে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট। অর্থাত সেগুলো আধুনিক রিপাবলিক বলে নিজেদের দাবি করলেও আদতে সেগুলোর মূল বৈশিষ্ঠ ছিল নেশন স্টেট। সারকথায় ‘জাতের ধারণা’ ফলে জাতিঘৃণাও প্রবল এমন এক ‘জাত-রাষ্ট্র (nation state) সেগুলা। আর এখান থেকেই এর সবচেইয়ে চরম রূপটাই হল হিটলারি জাতশ্রেষ্ঠত্ব, এক রেসিজম। তাই এই ভিত্তিটাকেই বদলে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল ইউরোপ। ১৯৫৩ সাল ইউরোপের ৪৭ টা রাষ্ট্র তাদের গঠনভিত্তি বদলাতে এক কনভেনশনে মিলিত হয়েছিল। যেখান থেকে নেশনস্টেটের বদলে তাদের প্রত্যেক রাষ্ট্রের গঠনভিত্তি হয় নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। আর এর গৃহিত কনভেনশনটা সদস্য সকলে মানছে কিনা তা তদারকের জন্য, এবং তা সকলের জন্য মানা বাধ্যতামূলক এমন একটা সুপ্রীম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু বিজেপি ইউরোপের এসব  সংশোধণ আর এসব শিক্ষানেয়ার তাতপর্য কখনও বুঝেও নাই, গ্রহণও করে নাই। তবে এই সমস্যাটা একা বিজেপি-আরএসএস নয় সারা ভারতের নেহেরু-গান্ধী বা কোন কমিউনিস্টসহ সব রাজনৈতিক দলের ভিতরই রাষ্ট্রধারণা বলতে nation state ধারণাটাই শুরু প্রবল নয় বরং একমাত্র অর্থ হয়ে গৃহিত থেকে আছে। ততফাত সম্ভবত এতটুকুই যে বিজেপি-আরএসএস সবসময়ই তাদের উগ্র জাতিবাদ প্রকাশ্যে বলে চর্চা করে। আর কমিউনিস্টসহ অন্যেরা সকলেই কঠিন জাতিবাদী। কিন্তু মুলকথাটা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের চরম উত্থান-পতন থেকে জাতি রাষ্ট্র ধারণা একেবারেই পরিত্যাগ করার যে শিক্ষা দিয়ে গেল, ইউরোপ অন্তত তাদের রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি বদলে যেটার স্বীকৃতি দিয়ে গেল – এই শিক্ষার কোন প্রভাব – কোন জানাশুনা, কোন আলোচনা কোথাও নাই। এমনকি কোন একাদেমিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব ধারণা এসেছে আমাদের জানা নাই। এছাড়া সুনির্দিষ্ট করে কমিউনিস্টদের দায় হল, তারা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে নয়, এর ব্যাপারেই সিরিয়াস নয় শুধু তাই নয়। কখনও এটা স্টাডির বিষয়ও করে নাই। বরং এমনকি অধিকার বা রাষ্ট্র ধারণা এগুলো তার রাজনীতিও নয় কোন এজেন্ডাও নয় মনে করে থাকে এখনও। একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত নতুন নেপাল। অথচ ্মনের ভিতরে সকলেই কোর ধারণায় একেকজন nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী। মজার কথা আমাদের বাঙালি জাতিবাদও একই nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী।  এমনকি পাহাড়িভায়েরাও এর বাইরে নয়। জুম্মু জাতিবাদও একই nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী। আসলে কেউই চোখ খুলে তাকায় দেখে নাই, দুনিয়া যুদ্ধের পর কোনদিকে গিয়েছে, আবার কেমন করে দেখতে হবে তাও কখনও জানা হয় নাই। বরং সারা ইউরোপের যে তিনশ বছরের জাতিরাষ্ট্র ধারণা চ্চালু ছিল, চোখ বন্ধ করে সেটাই কপি করে চলেছে এরা।
তাহলে দাড়ালো চিন্তা ও চর্চার সমস্যার সংকীর্ণতা এটা একা বিজেপি-আরএসেওএসের না। যদিও বিজেপিত-আরএসএসের বেলায় তা সবচেয়ে উগ্রভাবে প্রকাশিত।  তাদের ট্রেনিং সিলেবাস এমন চিন্তা এক খোলাখুলি বিষয়। যার পরিণতি এখন হাতেনাতে মোদী পাচ্ছেন। যদি মোদী এখন থেকে কোন শিক্ষা পাবেন সে সম্ভাবনা দেখা যায় না।
যদিও উগ্র জাতি রাষ্ট্র মানা না মানার ব্যাপারে আরএসএসের চেয়ে বিজেপিতে শিথিলতা কিছুটা রাখা হয়েছে। এ কারণে যারা সরাসরি আরএসএসের সদস্য তারা এত কট্টর বেশি। তেজস্বী সূর্য আরএসএসের সদস্য হিসেবেই সবিশেষ প্রশিক্ষিত। এ ছাড়া তেজস্বী সূর্য বেঙ্গালুরু বিজেপির আইটি সেলের প্রধান।  যে আইটি সেল মানে হল অমিত মালব্যের অধীনে মূলত মুসলমানবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা সেল। গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক তদন্ত করেছিল ইউরোপের ভিতরে বসে ভারতের কারা মুসলমান নাম নিয়ে ফেক ওয়েবসাইট চালায়। তাতে যাদের নাম প্রকাশিত হয়েছিল তাদেরই একজন হল তারেক ফাতাহ।  এখানে একটা রিপোর্টে তার নাম ও ছবি আছে। তিনি মূলত পাকিস্তানি-কানাডিয়ান। তিনি বিজেপিকে ভুয়া ওয়েবসাইট আয়োজন করে দিয়ে অর্থ কামিয়ে নিয়ে থাকেন। এতাই তার পেশা।
এখানে এক মজার দিক হল  তেজস্বী সূর্য যে টুইট করে কুখ্যাতি পেয়েছেন,  সেটা এবার ভাইরাল হয়ে গেলে পর তিনি দাবি করেছেন- এই ভাষ্য তার নয়। এটা নাকি ওই (ভাড়াটে) তারেক ফাতাহ  মন্তব্য। যা হোক এই মন্তব্য অন্যের নামে চালিয়ে এমপি সুর্যের কোন অসতকাজের দায়ে পড়েনি বলে মনে করছেন। কারণ তিনি মূলত যেন নাম ভাড়া দেয়া অথবা ফেক ওয়েব সাইট ভাড়া দেয়া ভাড়াটঙ্কে কিনেছেন।  অমিত মালব্যের সাথে তারেক ফাতাহ এর সম্পর্ক এই সুত্রে, অমিত হল ক্রেতা এবং ফেক মুসলমানবিদ্বেষী খবরের অর্ডারদাতা। আর সেখান থেকেই তারেক ফাতাহ আর তেজস্বী সূর্য-এরা হয়ে যান নানান ছোটবড় ছিচকে কিন্তু ঘৃণিত অপধাধের সাগরেদ। তেজস্বী সূর্য তারেক ফাতাহ এর নামে নিজের অপরাধ চালিয়ে দিলেও কেন তিনি ভাড়াটের মন্তব্য ব্যবহার করলেন , সে জবাব দেননি।
এখন এ দিকে সর্বশেষ  হল, দুবাইয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পবন কাপুর ঐ ২১ এপ্রিলই বুঝেছিলেন মোদী ও তার দল যাই করুক অফিসিয়ালি তাকে ভারত রাষ্ট্রের হয়ে কিছু একশনে যেতে হবে। তাই তিনি ঐদিনই ভারতীয়দের সতর্ক করতে টুইট করে বলেছেন, ‘ভারত ও আরব আমিরাত (দুবাই) একই নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতিতে বিশ্বাসী [India and UAE share value of non-discrimination, says ambassador] ফলে সবাই যেন সতর্ক থাকেন”। এই শুকনা কথায়ই কি মধ্যপ্রাচ্য রাজি হবে, বিশ্বাস করবে, অপমান ভুলতে পারবে? স্বভাবতই তা হবার কথা না। তাহলে?

সর্বশেষটা দেখতে পাচ্ছি আজকে। মোদী আপোষ প্রস্তাব দিচ্ছেন।  এতদিন  দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজ মসজিদে তাবলিগ জামাতের প্রধান মওলানা সা্দকে  হয়রানি আর হেস্তনেস্তের চরমে নেয়া হচ্ছিল। মুসলমানেরা নিচাজাতের বলে সারা ভারতজুড়ে জাতঘৃণাটা এই মওলানা সাদের কান্ধে বন্ধুক রেখে  ঐ মামলার ভয় দেখিয়ে চাপে ফেলে করা হচ্ছিল। দিল্লি পুলিশের প্রচার তুঙ্গে উঠেছিল মওলানা সা’দ নাকি পরিকল্পিতভাবে ভাইরাস ছড়িয়েছেন আর এর ভিডিও ফুটেজ আছে পুলিশের কাছে। অথচ আজকের রিপোর্ট হল সেই দিল্লি পুলিশই বলছে, মাওলানা সা’দের নামে প্রচারিত সেই অডিও ক্লিপ ভুয়া, এডিট করা, ফেক ভিডিও।  এর মানে হল, মোদী-অমিত এখন সা’দের বিরুদ্ধের  মামলাকে ফেক বলে স্বীকার করে তা উঠিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে সওদা করতে চাইছেন, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর এখন তিনি চাইবেন বিনিময়ে মওলানা সা’দ ও তার বন্ধুরা যেন এখন মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও  শাসকদের কাছে মোদী সরকারের পক্ষে সুপারিশ করেন। যাতে ইতোমধ্যে ভারতীয়দের যা ক্ষতি হয়ে গেছে গেছে তবে তা আবার স্বাভাবিক পুরানা সুবিধাদির জায়গায় যেন ফিরে আসে। ইতোমধ্যে গত পরশুদিন টুইটারকে মোদী সরকার সরকারি তরফ থেকে এক চিঠি দেয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে ইতোমধ্যে যে ১২১ টা টুইট করা হয়েছে মোদীর দলের নেতা এমপি বা মন্ত্রীর তরফ থেকে, মওলানা সা’দকে টেররিস্ট বলে অথবা ইসলামের বিরুদ্ধে নন্দা বা আপত্তিকর শব্দে – যেন এসব টুইট মুছে সরায়ে বা মুছে ফেলা হয়। কিন্তু এতে কার ভাগ্য খুলল টুইটারের বা মোদীর? আসলে মোদী এখানে নিজের ইজ্জত রক্ষার্থে এই পদক্ষেপ নিল। তাহলে এতদিন সা’দের বিরুদ্ধে এগুলো চলতে দিয়েছিলেন কেন? এটা কী  সরকার চালানোর কোন নীতি হতে পারে? এত নিলজ্জ ও ইতরচিত! তাহলে শিক্ষাটা কী এখানে? শিক্ষাটা হল দুবাইয়ের একজন রাজকুমারিও জানেন কোনটা রেসিজম-জাতবর্ণবাদ এবং কেন এটা পরিত্যাজ্য ও অপরাধ। অথচ একজন প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তার দলবল আরএসএস পর্যন্ত এর সাগরেদেরা – এদের কেউই তা জানে না, শিখতে পারলও না! হায়্ হিন্দুত্ব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ০৯ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর বিজেপির শ্রেষ্ঠত্ববোধ বিপদে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

 

ভেটো সদস্যপদ জাতিসঙ্ঘকেই না বুঝলে ভারত পাবে না

 ভেটো সদস্যপদ জাতিসঙ্ঘকেই না বুঝলে ভারত পাবে না

গৌতম দাস

০৪ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2YP

 

Can-un-security-council-make-the-reform-happen-in-september

_

জাতিসংঘ [United Nations] সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা অনেকে যা করেন অথবা এমন কিছু যা দৃঢ় আশা করেন  তা হল এই যে, এর সদস্যরাষ্ট্র সবার ক্ষমতা সমান আছে বা থাকবে। মানে, এখানে ইউনিভার্সালি সব রাষ্ট্রকে সমান ক্ষমতার সদস্যপদ দানের প্রতিষ্ঠান এমন বোধহয় এটা হয়ে আছে অথবা হওয়া উচিত। অথচ পপুলার শব্দে বললে এখানে “সমান ক্ষমতার গণতন্ত্র” বলে কোন ধারণা নাই। এমনকি আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এখানে সব (তবে কিছু হয়) সিদ্ধান্ত হয় না।

এখানে প্রথম যে ব্যতিক্রম তা হল এর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিবার কমিটি বা বডি কোনটা তা নিয়ে আর তা কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় সে প্রসঙ্গে। যেমন প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো সকলে সমবেত হয় এক সাধারণ সভায় (General Assembly বা UNGA) তা এক অর্থে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ কমিটি। আর এর সিদ্ধান্ত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে।  কিন্তু আবার না। কেন?  কারণ নিরাপত্তা পরিষদ বলে জাতিসংঘের আরও ক্ষমতাধর অন্য এক কমিটি আছে। আর তা সব সময় প্রতীকী ভাবে বসে থাকা অর্থে সাময়িক মূলতবিতে থাকে (যা যেকোন সময় ডেকে বসানো যায়), এটা এমন এক রাজনৈতিক কমিটি। এটাই যেকোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিবার সর্বোচ্চ কমিটি, আর তা  অবশ্যই সাধারণ পরিষদের (UNGA) চেয়ে উপরে। এই রাজনৈতিক কমিটিই বা এই বডির নাম হল সিকিউরিটি কাউন্সিল বা বাংলায় নিরাপত্তা পরিষদ।  সাধারণ পরিষদ সভার সিদ্ধান্তের উপর দিয়ে চাইলে এই সিকিউরিটি কাউন্সিল (নিরাপত্তা পরিষদ) UNSC সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

সবাই মিলে ১৯৩ বনাম ভেটো ৫
জাতিসংঘে সাধারণ সভার সদস্য হল সবাই, যেকোন সদস্য রাষ্ট্রই, যা এখন মোট ১৯৩ টা রাষ্ট্র।  আর তুলনায় নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য মাত্র মোট ১৫ টা রাষ্ট্র।  অথচ নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের সবগুলো কমিটির উপর দিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এছাড়া আরও কথা আছে। নিরাপত্তা পরিষদের মোট ১৫ সদস্যের আর এই পনেরোর অন্তত দশ সদস্য এরা প্রতিনিধিত্বমূলক বলে তারা দাবি করে।  মানে এই দশ রাষ্ট্র কেবল নিজেই নিজের প্রতিনিধি না বরং  নিজ মহাদেশের বাকি সবারও প্রতিনিধি আর নির্বাচনও হয় নিজ মহাদেশের অন্যান্য সদস্যবাষ্ট্রের ভোটে, লবিংয়ে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল এই ১৫ রাষ্ট্রের  সবাই সমান ক্ষমতার নয় বরং এদের মধ্যে আবার ভাগ আছে। এখানে সবার ক্ষমতা সমান না। যেমন ঐ বডিতে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তাব উঠলে ঐ ১৫ রাষ্ট্রের মধ্যে বিশেষ পাঁচ রাষ্ট্র আছে যাদের যেকোন একটা রাষ্ট্র আপত্তি দিলে ঐ বডিতে উঠা যেকোন প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাবে, পাশ হয় নাই মনে করা হবে; এমনকি তাতে বাকি ১৪ সদস্যই প্রস্তাবের পক্ষে থাকলেও তা নাকচ বলে বুঝতে হবে। ঐ পাঁচ বিশেষ সদস্য হল আমেরিকা, রাশিয়া আর ইউরোপের দুই রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স আর এশিয়ায় চীন। এরাই বিশেষ সদস্য বা ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন সদস্য। মানে  যারা একাই আপত্তি দিয়ে যেকোন সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব গ্রহণ বাতিল করে দিতে পারে।  এটাই ভেটো [VETO] বা আপত্তি দেয়া।
আরও একটা দিক হল, ঐ পাঁচ ভেটো সদস্যপদধারীরা স্থায়ী সদস্য। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের মোট ১৫ সদস্যের অবশিষ্ট দশ সদস্যপদ অস্থায়ী ও রোটেশনাল [rotational] মানে, ঘুরে ঘুরে একেকবার একেকজন। মানে এই দশ পদ মাত্র দুবছর মেয়াদের আর প্রতিদুবছর পর পর  তা আনুপাতিক হারে  বিভিন্ন মহাদেশের মধ্য থেকে নির্বাচিত করে নিয়ে পূরণ করা হয়।  মানে একবার এশিয়া থেকে ভারত বা জাপান সদস্য হলে দুবছর পরে, পরের বার হয়ত লবিতে বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানকে তাদেরকে পালটা নির্বাচিত করে দিতে হবে। এভাবে এশিয়া-আফ্রিকা মহাদেশ মিলে এখান থেকে পদ আছে মোট পাঁচটা, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্রের জন্য পদ দুইটা, পুর্ব ইউরোপের জন্য একটা, পশ্চিম ইউরোপের ও বাকিরাষ্ট্রের জন্য দুইটা পদ, এভাবে মোট ১০টা অস্থায়ী পদ।

কিন্তু  জাতিসংঘের গঠননীতিতে আপতিক দৃষ্টিতে সদস্যদের মধ্যে যা  “বৈষম্যমূলক মনে হচ্ছে” তা এমন কেন? প্রথমত, এটা সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত কোন রাষ্ট্রজোট বা ক্লাব-সমিতি নয়। বরং জাতিসংঘ যে এমন সংগঠনই নয় সেটা নিয়েও কোন লুকাছুপিও নাই। তাহলে এমন সংগঠন গড়তে সদস্যরা রাজি হল কেন?

বিচার ও সমাজের সম্পর্কঃ
বিচার আর সমাজ শব্দ দুটোর মধ্যে সম্পর্ক হল, এরা পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। যদি কোথায় কোন সমাজ গড়তে চাই তবে সেখানে আগে বিচার প্রতিষ্ঠা করে নিতেই হবে। অথবা এভাবে বলা যায় বিচার-ইনসাফ থাকলে বুঝতে হবে এবার এটা সমাজ হয়ে উঠতে পারবে। ঘটনা হল, মানুষ এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকলে সেখানে মানুষের মাঝে নানান পারস্পরিক স্বার্থবিরোধ দেখা দিবেই। এই বিরোধ মীমাংসা দুটা পথ হতে পারে। এক, গায়ের জোর খাটিয়ে মীমাংসা। যার গায়ের জোর বেশি সে ঐ জোর খাটিয়ে মীমাংসা নিজের মত করে করে নিবে, আর এতে “যার গায়ে জোর বেশি সেই সঠিক” – এই ভিত্তিতে এমন অবস্থাটাই বাকিদের মেনে নিতে হবে। আসলে বলা বাহুল্য, এখানে কোন ন্যায়-অন্যায় ইনসাফের ধারণা কার্যকর থাকবে না। আর অন্য দ্বিতীয় পথটা হল, অনেক পরিপক্ক ধারণা। এখানে বিরোধ মীমাংসা গায়ের জোরে বা সামরিক জোরে একেবারেই নয় বরং আগেই যেকোন বিরোধে মীমাংসা কোন নিয়মনীতিতে ফয়সালা করা হবে তা সকল সদস্যের মতামত নিয়ে ঠিক করে রাখা হবে। এগুলোকে কনভেনশন (Convention) বা আন্তর্জাতিক আইনে গৃহিত সকলের অবস্থান বলে বলা হয়। আর ঐ নিয়মনীতির ভিত্তিতে যেকোন রাষ্ট্রবিরোধ মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয় এখানে। জাতিসংঘ এই দ্বিটিয় পথটা অনুসরণ করে আগানোর চেষ্টা করে থাকে।

এই আইডিয়ার আলোকের গ্লোবাল প্রতষ্ঠান জাতিসংঘ গড়ার প্রস্তাবটাই করেছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেন্ট ১৯৪২ সালে, সবার আগে রাশিয়ার স্টালিন আর বৃটেনের চার্চিলের কাছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দেয় তাঁরা এতে রাজি হবেন কেন? কেননা তাদের ভয় হয়েছিল, ধরা যাক সংখ্যাগরিষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে যেহেতু তাতে, হবু রাষ্ট্রসমিতিতে আমেরিকা যদি বাকি গরীব সদস্য রাষ্ষ্ট্রগুলোকে ছলে বলে চাপে নিজের পক্ষে নিয়ে এবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোন সিদ্ধান্ত পাশ করিয়ে ফেলে তখন রাশিয়ার কী হবে? বিশেষ করে রাশিয়ার হাতে ত সামরিক শক্তি আছেই – কিন্তু এটা হাতে সাথে থাকা সত্বেও কেন সে অমন কোন  রাষ্ট্রসমিতির সদস্য হতে যাবে যারা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত রাশিয়ার উপর চাপিয়ে দিবে? অর্থাৎ প্রথম সমস্যা দেখা দেয় আমার হাতে সামরিক শক্তি থাকা সত্বেও কেন আমি অন্যের সাথে কোন কমিটিতে বাধ্যবাধকতার দায় নিয়ে বসতে যাব?  আর এতে যেখানে আমার হাত বাধা পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে? তাই মূলত এটা সমাধান করতেই এবার প্রস্তাব সংশোধন করে ভেটো আইডিয়া এনে বলা হয় যে কোন সিদ্ধান্ত নিজের বিপক্ষে গেলে এই ভেটো-ক্ষমতাধর পাঁচ রাষ্ট্রের যে কেউ আগেই সেটা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত নয় বলে ভেটো প্রয়োগ বা  সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিতে পারবে। তার মানে এতে দাঁড়াল ঐ পাঁচ রাষ্ট্র যেসব ইস্যুতে সকলেই একমত কেবল সেটাই জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বলে পাস হতে পারবে। সেটা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বলে পাস হবার সম্ভাবনা। আর তাতে বাকি সকল সদস্যের সাথে নিতে দিবে বা পারবে।  যেকোন ইস্যুতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত হতে হবে ঐ পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে অবশ্যই ঐক্যমতে থাকতে হবে।   এই হল ভেটো বা স্থায়ী ইত্যাদি এসব শব্দগুলোর আসল অর্থ ও ব্যবহারিক তাতপর্য। রুজভেল্ট এভাবে সংশোধিত করে প্রস্তাব করতে পেরেছিলেন বলেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠান জন্ম হতে পেরেছিল।

রুজভেল্টের ইচ্ছা উদ্দেশ্য ছিল কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক আইন বলে গৃহিত আগাম নির্ধারিত নীতিগুলোর ভিত্তিতে দুনিয়ার সম্ভাব্য রাষ্ট্রবিরোধগুলো যতটা সম্ভব কমানো যায়, যুদ্ধ লাগা দেরি করিয়ে দেয়া যায় – এরই এক উদ্যোগ হবে জাতিসংঘ।  আর অবশ্যই এটা তখনকার মত করে করা এক উদ্যোগ বলে এটা তখনকার হিসাবে দুনিয়ায় কারা কারা সম্ভাব্য গ্লোবাল সামরিক  ও অর্থনৈতিক শক্তি বিবেচনা করা হয়েছিল – সেই ভিত্তিতেই ভেটো সদস্য দেয়া হয়েছিল ঐ ৫ রাষ্ট্রকে। যেটা এখন দিনকে দিন অনেক উত্থানপতন ঘটছে যেমন আমেরিকার জায়গা নেওয়ার দিকে ভেসে উঠছে চীন, এরকম আরও অনেক কিছু।  এজন্য এই পাঁচ কারা হবে এটাই আবার সেকালের জাতিসংঘ গড়ার প্রধান লিমিটেশন বা অস্থায়ীত্বের একটা বড় প্রমাণ।

দ্বিতীয় পর্বঃ ভারতের ভেটো ক্ষমতার সদস্য হবার খায়েস
শুধু খায়েশ বা আকাঙ্ক্ষা থাকলেই কিছু হয় না, স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়, সেইসাথে সামর্থ্য আর বিস্তর ইতিবাচক ও ব্যাপারটা নিয়ে পুরাপুরি জানাশোনা হোমওয়ার্ক থাকতে হয়। শুধু ক্ষোভ থাকলে যে ভেটো ক্ষমতা  কিছুতেই পাওয়া যাবে না তা আগেই বলে দেয়া যায়। ভারতের হয়েছে এই দশা। এছাড়া আরেক প্রধান শর্ত হতে হয় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের জাতিসংঘ সেকালের এই ফেনোমেনাটা – এমন এক প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য আমেরিকা কেন এত ডেসপারেট ছিল এসব কিছু বুঝতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা কেবল একা রুজভেল্টের বাসনা নয়, বরং এটা ছিল এক পুরা আমেরিকান ড্রিম, বা বাসনা বলতে পারি। যেমন , প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) পরেও ততকালিন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তিনিও প্রায় একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর তাঁর সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ হল – “লীগ অব নেশন”, এর জন্ম হওয়া।  লীগ অব নেশন (১৯২১) – এটাকে বলা যায় জাতিসংঘের আগের রূপ বা উদ্যোগ কিন্তু ব্যর্থ ভার্সান। এটা টিকে নাই, ১৯৩০  সালের পর থেকে এটা কার্যত নাই হয়ে গেছিল। কিন্তু এখনকার প্রসঙ্গের প্রাসঙ্গিক মুল কথাটা হল, ভারত জাতিসংঘ জন্মের ফেনোমেনা বুঝেছে, সে পরিপক্ক হয়েছে  এটা বিশ্বাস করা এখনও খুবই কঠিন হয়েই আছে। বিশেষ করে আগে সেকালে নেহেরু তো বটেই আর একালের মোদী কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে যেভাবে দায়ীত্বজ্ঞানহীন খেলা করছে।

সৈয়দ আকবরউদ্দিন, ভারতের একজন পেশাদার আমলা ডিপ্লোম্যাট, মাত্র গত ৩০ এপ্রিল তিনি অবসরে গেছেন। জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি পদে থাকা অবস্থায় তিনি অবসরে গেলেন। আমলা চাকরিজীবীর এক ব্যক্তিদিক থেকে চোখ ফেললে, তাঁরা যত উপরের পদে আসীন হতে থাকেন ততই অশান্তি-অনিশ্চয়তা, কনুই মারামারিতে দিন কাটে তাদের। সেইসাথে একটা কথার সাথে ততই তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে, কথাটা হল ‘কপাল’। সব প্রচেষ্টা ও উদ্যোগগুলোর উপরে দাঁড়িয়ে ভেসে থাকে এই ‘কপাল’। কপালে না থাকলে পোস্টিংয়ের ভাগ্যের চাকা ফিরবে না, তাই এসব বাক্যে ততই গভীর আস্থাভাজন হয়ে পড়তে থাকেন আমলারা। বিশেষ করে রাষ্ট্রটা যখন ভারত, যা চালায় বা চলে এসব মূলত পেশাদার শক্তিশালী আমলাগোষ্ঠির মাধ্যমে।

এসব আমলাজাত সমস্যা অন্যদের মত আকবরের ভাগ্যেও ঘটেছিল ব্যাপকভাবেই। গত ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সর্বশেষ যখন ‘তিস্তাচুক্তি না হওয়া-খ্যাত’ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তখন আকবর ছিলেন – ভারতের ফরেন অফিসের  মুখপাত্র ও নিয়মিত ব্রিফিংদাতা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রায় সব আমলারই এক লালিত স্বপ্ন থাকে চাকরির মেয়াদশেষে বিদেশমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার। ভারতে অনেকে হয়েছেনও। আর সেটি না হতে পারলেও অবসরে যাওয়ার আগে যদি পররাষ্ট্রসচিবও না হতে পারেন তবে ‘জীবনই বৃথা’- ধরনের অনুভূতি হয় তাদের। গত ২০১৩ সালের কংগ্রেসের দুই টার্মের সরকার সমাপ্তিকালে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি শুধু না তা একেবারে সঙ্ঘাতময় ‘টিট ফর ট্যাটও’  হয়ে উঠেছিল। টেনশন বেড়েই চলেছিল। তাই, পরের বছরে ২০১৪ সালে মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী জামানার শুরুতে আমেরিকা ও ভারত উভয়েই প্রবল আগ্রহে দ্রুত খারাপ সম্পর্কটা কী করে মিটমাট স্বাভাবিক করে নেয়া যায়, কার্যকর রুটিনে ফিরে শুরু করা যায় তা করতে উভয়ে উদগ্রীব থাকায়,  তা সহজেই হয়েই গিয়েছিল। এদিকে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্কও জটিল এবং “কন্ট্রাডিক্টরি অনেক ফ্যাক্টরে” প্রায় সবসময়ই পরিপূর্ণ থাকে। চীনের থেকে বিনিয়োগ পুঁজি পাওয়া, চীনের সস্তা পণ্য আমদানি করা, চীনের বাজারে প্রবেশ করতে পারা এসবই ভারতের কাম্য। আবার এই চীনই ভারতের চোখে সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকি; ১৯৬২ সালে ভারতের আসাম দখল করাতে সেই চীনা হামলার ট্রমা ও এর খারাপ স্মৃতি এখনও ভারতের মনে টগবগে। তাই দেখা যায়, এদুই দেশ আমেরিকা ও চীন  ক্ষেত্রে ভারতের বেস্ট অবস্থানগুলো কীকী হতে পারে তা নিয়ে সবচেয়ে ভালো হোমওয়ার্ক করা থাকা ভারতের কূটনীতিকদের জন্য পদ পাবার আসল সিড়ি।  এই বিচারে সেকালের রাষ্টদূত সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর ছিল বাস্তবত সবার উপরে। সেই সূত্রে তিনি অস্থির মোদীর চোখে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। মোদী তাকে তাই সটান সব বাধা ভেঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব করে নেন। আর শুধু তাই না, জয়শঙ্করের অবসরে যাবার পর ২০১৯ সালে মোদীর দ্বিতীয় টার্মের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়ে যান তিনি। আর এসবের ঝাপটা লেগে ততই আকবরউদ্দিনের “কপাল” ক্রমশ ঢলে পড়া। যদিও সচিব তিনি হতে পারেননি, তবে জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হতে পেরেছিলেন; আর সেটিই ছিল তার চাকরির মেয়া্দে শেষ পদবি।

ভারতের দক্ষিণের প্রাচীন ও বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’ [THE HINDU], ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৮ সালে এর জন্ম। এই ‘দ্য হিন্দুর’ আমেরিকায় স্থায়ী সংবাদদাতা রাখার সামর্থ্য আছে, তিনি হলেন শ্রীরাম লক্ষ্মণ। আকবরউদ্দিনের অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে শ্রীরাম নিজ পত্রিকার জন্য আকবরের এক বড় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেখানে প্রসঙ্গের ফোকাস করা হয়েছে –  জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়া এবং এর সম্ভাবনা।

জাতিসঙ্ঘ কী? কেন এবং ইতিহাসের কোন পটভূমি ও পরিপ্রেক্ষিতে এর জন্মচিন্তা এসেছিল বা জন্ম দেয়া দরকার হয়েছিল ও এর জন্ম হতে পেরেছিল, তা জানা ও নিজে ব্যাখ্যা করতে পারা, তাতপর্য বুঝা খুবই জরুরি। অন্তত আকবরুদ্দিনের। তাতে ভারতের রাজনীতিবিদেরা বেজার হলেও সত্য কথাটা তাকেই উচ্চারণ করতে হত।  ভারতে এই কাজটা রাজনীতিবিদ তো বটেই, কোনো একাডেমিকও সম্যক বুঝেছেন ও এর তাৎপর্য অন্যকে বুঝাতে পারেন এমন খুব কমই দেখা যায়। এমনকি জাতিসঙ্ঘের ভবিষ্যৎ কী, তাতে কোন দিকে আসন্ন কী অথবা এর সম্ভাবনা এবং লিমিটেশন কী, এসব নিয়ে কথা বলার মত ভারতীয় একাডেমিকও খুব বেশি দেখা পাওয়া যায় না। ভারতের আজন্ম ভুল হচ্ছে, হয়েছে কী তা বোল্ড মুখের উপরে উচ্চারণের লোক এখনও দেখা যায় নাই।

এর মূল কারণ সেই ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে অল্প কথায় যা বলা যায়ঃ ইউরোপের লেখা ইতিহাসে জাতিসংঘের জন্ম তাতপর্য নিয়ে আলোকিত করার দিক, এ’ব্যাপারে আমেরিকার চেয়ে তারা সবসময় পিছিয়েই থেকেছে।  এর মূল কারণ, আসলে ইউরোপের দুনিয়ার উপর রুস্তমি নেতাগিরি-কলোনিগিরিটাই  হারানোর দাসখত লিখে দিয়েই জাতিসঙ্ঘের জন্ম ইউরোপকে মেনে নিতে হয়েছিল। ঐ দাসখতে, যুদ্ধ শেষে তারা আর কলোনিগিরি করবে না ছেড়ে দিবে  – এই বলে দাসখত দিয়েই জাতিসংঘকে তাদের মেনে নিতে হয়েছিল।  তাই জাতিসংঘের জন্মকে বেশি গ্লোরিফাই অন্তত আমেরিকার লেভেলে তুলে করা সম্ভব ছিল না। আর এসব কিছুর প্রভাব পড়েছিল ব্রিটিশ কলোনি ভারতেও, ভারতীয় এলিট ও রাজনীতিবিদদের উপরেও। কারণ এসব এলিটেরা দুনিয়া সম্পর্কে ধারণা হয়েছে বৃটিশ পত্রিকা বা বই পড়ে, য়ামেরিকান রাইটিংস তাদের তেমন লাগালেই ছিল না।  ইউরোপ কালচারালি আমাদের কলোনিয়াল কাজিন ও মাস্টার, ফলে  পথ প্রদর্শক।  সম্ভবত সেকারণে, জাতিসংঘের গ্লোরিফাই প্রশ্নে আমরা বৃটিশদের চেয়েও নিচে। ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা একাডেমিকও তাই জাতিসঙ্ঘের বৈশিষ্ট্য, তাৎপর্য, সম্ভাবনা ও লিমিটেশন সম্যক বুঝেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ নেহেরু নিজে।  এমনকি নেহরু থেকে মোদী পর্যন্ত (ফাঁকে মন্ত্রী/রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জিও) ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা জাতিসঙ্ঘ নিয়ে ঠিক কী বুঝতেন, কী ধারণা রাখেন এর ভাল প্রমাণ হল – জাতিসঙ্ঘের কাছে তারা কী চেয়েছেন, নিজ আমলে ঠিক কী আশা করেছিলেন এর মধ্যেই প্রকাশিত হয়ে আছে। আর সবার ক্ষেত্রেই এর সবচেয়ে ভাল আর স্থায়ী ও পোক্ত উদাহরণ হল কাশ্মির ইস্যু, যা ভারতের কপালে এক গভীর অবুঝ বা না-বুঝের লজ্জা হয়ে এখনও ঝুলে আছে।

আলোচ্য সাক্ষাৎকারে আকবরউদ্দিনও ভারতকে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ দেয়ার দাবি করেছেন, যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেখানে মুল যুক্তির পয়েন্ট ভারতের জনসংখ্যা বেশি। অথচ জাতিসংঘের গঠনভিত্তি্র বাক্য বা চিন্তায় কার জনসংখ্যা কী তা কোথাও একেবারেই ফ্যক্টর বা বিবেচ্য নয়। তবু তিনি তা করেছেন।   কিন্তু কার কাছে? স্থায়ী সদস্যপদ কী কারো কাছে দাবি করতে হয়? অথবা খোদ সদস্যপদ জিনিসটাই কী কারো থেকে দাবি করে নেয়ার বিষয়? তাহলে আরো গোড়ার প্রশ্ন, জন্মের শুরুতে জাতিসঙ্ঘের স্থায়ী সদস্যপদ যারা পেয়েছিলেন তারা কার কাছে দাবি করে পেয়েছিলেন? এমনকি তাদের সদস্যপদ লাভ বা অর্জন করার ভিত্তি কী ছিল? সেটি কি একালের আকবরসহ সেকালের নেহরুরাও জানতেন?

এখানে প্রণব মুখার্জির কথা জুড়ে দিলাম এজন্য যে, তিনিও ভারতের জাতিসঙ্ঘের ইতিহাসবোধ কোন পর্যায়ে এর মস্ত উদাহরণ। গত ২০০৯ সালে শুরু হওয়া আওয়ামী রাজত্বের বর্ষপূর্তিতে পরের বছর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা প্রথম ভারত সফরে গেলে সেটা ছিল ভারতের প্রধান “বাংলাদেশ-ডিলার” অর্থ/পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রণবের বোনা-ফসলের লাভালাভ বুঝে নেয়ার সময়। তখন ঐ সফর উপলক্ষে প্রায় ৫০ দফার দুদেশের এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত  হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল- “বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ দাবি সমর্থন করছে” […Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council……]। তবে যদিও আমরা আজও ঠিক জানি না আমরা তা কেন সমর্থন করেছিলাম, কীইবা পেতে। তার চেয়ে বড় কথা, তখন বা এখন আমরা যেন হলাম ‘ঘরে বেঁধে রাখা প্রিয় মুরগি’, কিন্তু যখন খুশি যাকে জবেহ করে খেয়ে ফেলা যায়। সেই আমাদেরই আবার এই সমর্থনের ওজন কী এতটাই? কাজেই এতে ভারতের লাভ কী হয়েছে আমরা জানি না। তবে বান্ধা মুরগি আরেকবার জবেহ দেওয়া হয়েছে বলা যায়। আর বিরাট লাভালাভের দিকটা হল,  জাতিসঙ্ঘ সম্পর্ক প্রণব মুখার্জির জানাশোনা কেমন এতে তা প্রকাশ পেয়েছিল। আর এর মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের মাত্রা ছড়িয়েছিলেন।

জাতিসঙ্ঘ সম্পর্কে বলা যায়, এটা ছিল সেকালে গত শতকের চল্লিশের দশকে বসে “আমেরিকান সেঞ্চুরি কায়েম হবে” [টাইম ম্যাগাজিনের মালিক সম্পাদক ‘হেনরি লুস’ – এর হাউজ থেকে ১৯৪১ সালে প্রকাশিত নতুন পত্রিকা লাইফ এ প্রকাশিত একেমিকান সেঞ্চুরি নামের আর্টিকেল] আগ্রহিরা যোগাড় করে পড়তে পারেন। ] – এমন এক হবু দুনিয়া সম্পর্কে আমেরিকার স্বপ্ন, আইডিয়া ও ইমাজিনেশনের প্রকাশ – এই হল আমেরিকার জাতিসংঘ বিষয়ক স্বপ্ন। আর বিশেষ করে তা ব্যক্তি হিসেবে ততকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট (১৯৩২-৪৫) রুজভেল্টেরই আইডিয়া। আবার ইউরোপের সাথে এই আইডিয়ার সম্পর্ক হল – ইউরোপ এর সাথে একমত হয়ে যায় এজন্য যে, মানে রুজভেল্টকে ইউরোপ নেতারা (মূলত হিটলার বাদে বৃটিশ-ফরাসী) নেতা মেনে নিলে হিটলারের হাতে তাদেরকে আর বেঘোরে মারা যেতে হয় না এবং তা সমূলে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার একটা বিরাট  পথ ও সুযোগ হতে পারে। এ কারণে জাতিসঙ্ঘ জন্মের প্রধান তাৎপর্য হল, মার্কিন নেতা ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের সাহায্য পাওয়ার লোভে ইউরোপ হিটলারকে পরাজিত করার পরবর্তী দুনিয়াতে নিজেদের কলোনি দখল-ব্যবসা ত্যাগ করতেও রাজি, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলেছিল।

কিন্তু জওয়াহেরলাল নেহরুসহ ভারতীয় রাজনীতিবিদরা না এই ফ্যাক্টস জেনেছিলেন বা এর তাৎপর্য বুঝেছিলেন। এনিয়ে এখনো ভারতের কোনো মহলের স্টাডি আছে বলে জানা যায় না। তবে জানা যে নাই এর বড় প্রমাণটা হল- ভারতের এখনো – কাশ্মিরকে ভারতের বলে দাবি করার ভিত্তি তদানীন্তন রাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষর, তিনি অ্যাকসেশন (ভারতে অন্তর্ভুক্তি হতে দলিলে স্বাক্ষর) চুক্তিতে স্বাক্ষর দেয়াকে মনে করা হয়। জাতিসঙ্ঘের গঠনভিত্তি যে নীতি বা বাক্যের ওপরে দাঁড়ানো সে মূলনীতি অনুসারে, রাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষর মূল্যহীন বা কাশ্মিরের হয়ে কথা বলার আসল বা বৈধ কোনো অথরিটিই হরি সিং নন। কারণ, জাতিসঙ্ঘের জন্মনীতি অনুসারে- যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগোষ্ঠী সম্মিলিত মতামতই একমাত্র অথরিটি যারা বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করবে তারা কিভাবে শাসিত হতে চান, কোথায় যুক্ত হতে চান অথবা আলাদা ভুখন্ড রাষ্ট্র থাকতে চান কিনা।

সার কথাটা হলো – কলোনিমুক্তিতে ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘের ভিত্তিনীতি জানে না বা সে অনুসারে এই নীতি আমলই করেনি। তাই, ১৯৪৮ সাল থেকে কাশ্মির দখল করে আছে অথচ প্রধানমন্ত্রী নেহরু নিজেই কাশ্মীর ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের কাছে  মীমাংসা করে দিতে  নিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ জাতিসঙ্ঘ নিজের জন্মভিত্তি অনুসারে কাশ্মির ইস্যু মীমাংসার জন্য গণভোট করার রায় দিবে এটা  তো জানা কথা। অথচ, জাতিসঙ্ঘ যে এমন রায়ই তো দেবে, নেহরু এটা জানতেনই না। মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মনীতি তার জানা ছিল না বলেই জানতেন না তাই তিনি জাতিসঙ্ঘে গিয়েছিলেন। সেই থেকে জাতিসঙ্ঘ সংক্রান্ত এর তাতপর্য ও জন্মনীতি বুঝাবুঝি ’ সারা ভারতের একাডেমিক, রাজনীতিবিদসহ সবার কাছে ‘নিজের চায়ের কাপ নয়’ হয়ে আছে। অর্থাৎ, ভারতের কথিত দেশপ্রেম যেটা আসলে হিন্দু-জাতিপ্রেমে হাবুডুবু খাওয়া রাষ্ট্রচিন্তা, গড়াগড়িতে ডুবে আছে বা বলা যায়, এসব চিন্তাভাবনা তলায় চাপা পড়ে আছে। কারণ জাতিসঙ্ঘের ভিত্তি বুঝে গেলে নিজ দেশের কাশ্মির নীতি ভুল এবং তা জাতিসঙ্ঘের মূল নীতিবিরোধী বলে অবস্থান নিতে হবে।

মজার কথা হল – এই জাতিসঙ্ঘেরই স্থায়ী ভেটো সদস্যপদ লাভের জন্য ভারত আবার প্রবল আকাঙ্ক্ষী। যত তীব্র তার আকাঙ্ক্ষা, ততই তীব্র ও গভীর তার অজানা হল – ভেটো সদস্যপদ পাওয়া যায় কী করে! জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ওই পাঁচ রাষ্ট্র তা পেয়েছিলই বা কী করে, তা কখনো জানা হয়নি।

‘সরি আকবর উদ্দিন! আপনিও ফেল করলেন’। কারণ তিনি ওই সাক্ষাৎকারে দাবি করছেন, যেহেতু ভারত দুনিয়ার বড় জনসংখ্যার দেশ, তাই তাকে ভেটো ক্ষমতা বা স্থায়ী সদস্যপদ দিতে হবে। বোঝা গেল, হোমওয়ার্ক তিনিও যথেষ্ট করেননি। তাই ফেল করলেন। সবার আগে জানতে হবে, ওই পাঁচ রাষ্ট্র স্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছিল ঠিক কিসের ভিত্তিতে। তাই আপাতত আকবরের কথা ভারতের কারো কাজে লাগবে না, হিন্দুত্বের মোদীর কাছেও না। সুতরাং তার কপালও আর খুলবে না।

আসলে মূল কথাটা হল যদি কখনো আবার দুনিয়ার বা গ্লোবাল নেতৃত্ব চেঞ্জ হয়, কখনো নতুন করে আরেক জাতিসংঘের জন্ম হয় অথবা সংস্কার করে আর একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ার পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়, সর্বোপরি গ্লোবাল পলিটিক্যাল নতুন কিছু কমন ভিত্তি তৈরি হয়, তবেই জাতিসংঘে এমন কোনো পরিবর্তন হতে পারে। এর আগে কিছুই ঘটবে না। যদি এর আগে এক খসড়া কমিটি আগে গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা এখন ফ্রিজে ঢুকে গেছে। ট্রাম্পের উত্থান ফেনোমেনা বলে এটা এমনই হওয়ার কথা। গ্লোবাল নেতা আমেরিকা এখন এক জাতিবাদী আমেরিকা হতে চাইলে সেটা মসকরা ছাড়া অন্যকিছু হবে না।  আর তত দিনে ভারতের কী হবে? ক্রমেই ভারত নিজ সংহতিতে টিকে থাকতে পারবে কি না সেই  চ্যালেঞ্জ বড় আর মুখোমুখি হতে থাকবে। সেটি সামলে ভারত টিকে থাকতে পারবে কি না, এটাই তার চ্যালেঞ্জ। মুরোদ থাকলে নতুন করে ভারতের সবাইকে ইনক্লুসিভ এক রাজনৈতিক ভিত্তি খাড়া করে ভারত গড়তে পারে কি না দেখা উচিত। এর ভিতরেই ভারতের আগামি ভারতের ভবিষ্যত এবং ভবিষ্যতের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি ঘটতে পারে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ০২ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর জাতিসঙ্ঘের ভেটো সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষা” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ভারতের বাংলাদেশে ‘সৈন্য পাঠানো’ শখ

ভারতের বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ শখ

গৌতম দাস

২৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Yj

 

গত ২১ এপ্রিল ভারতের অনেক  প্রিন্টেড মিডিয়া তাদের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই এর বরাতে একটা রিপোর্ট ছাপায় যে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। পরে তৃতীয় দিনে ২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের কাছে সেখানকার ভারতীয় হাইকমিশন জানায় যে এই খবরটা মিথ্যা (This claim is false )।

পিটিআই এর এটাকে বলে স্রেফ ইতরামো – মোদী সরকার, তার সরকারী বার্তা সংস্থা আর তার গোয়েন্দা বিভাগের সবচেয়ে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও নিচু একটা কাজ তারা করেছে।  দেখা যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় সরকারি বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই), এরা বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমেছে, বাংলাদেশে কথিত ভারতীয় সেনা পাঠানোর প্রপাগান্ডায় নেমে এনিয়ে বানানো খবর ছেপে দিয়েছে। যাতে বাংলাদেশকে নিচা দেখানে যায় আর তাতে তাদের দেশ ও দেশপ্রেমের ভারতকে যেন দেখানো যায় অনেক উপরে।  বাংলাদেশকে মোদীর অধীনস্ত করে দেখালে তাতে নরেন্দ্র মোদী ভারতকে অনেক উপরে উঠায়ছেন দেখান যাবে এই হল তাদের বিশ্বাস। তাই, প্রচারিত সেই খবরটা হল ভারত নাকি “বাংলাদেশে আর্মি পাঠাচ্ছে” [Indian Army to send teams to Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan & Afghanistan to fight Covid-19]। আর এই মিথ্যা খবরটা ছড়িয়েছে সরকারি সংস্থা পিটিআই।

এই খবরের ভাষ্যে ভাবটা এমন যেন ভারত যেন তার পড়শি ‘কলোনিগুলোকে’ দেখভাল ও  রক্ষার্থে এসব দেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটা হল প্রপাগান্ডা। কিন্তু এই পিটিআই কী জানে না কোনটা নিউজ আর কোনটা ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা? এটা অবিশ্বাস্য তাই, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষত করে ভারতে প্রায়ই সে দেশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে “পেজ-বিক্রি” করা খবর ছাপা হয়, এটা যদি মনে রাখি। অনেকের মতে, ভারতে মিডিয়ায় এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে, কোনো পত্রিকার ফাইন্যান্সিয়াল অবস্থা যত খারাপ গোয়েন্দা বিভাগের কাছে সে তত বেশিবার নিজেকে বিলিয়ে দিবে, ‘পেজ বিক্রি’ করে অর্থ বা সুবিধা সংগ্রহ করবে।  আর সেক্ষেত্রে বিনিময়ে গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে যা খুশি ছাপতে চায়, সেভাবে তা যেন ছাপাতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে এই ইতরামো করে চলতে প্রায়ই দেখি আমরা। আর ভারতের গোয়েন্দাবিভাগকেও এদের এই দুরবস্থার সুযোগের সদব্যবহার করতে প্রায়ই দেখা যায়। গোয়েন্দাবিভাগেরও হাতেও মিডিয়া-বাজেট মানে মিডিয়াকে প্রভাবিত করার বাজেট থাকে সেটাই এখানে ব্যবহৃত হয়। ছপ্পড় ফেরে এই বাজেটের লোভ লাগিয়ে দেয়া হয়। ভারতে প্রধানধারার বাইরের অনেক ইন্ডেপেন্ডেন্ট মিডিয়া দাঁড় করার উদ্যোগ আছে, যেমন থাকে সবদেশেই.  যেমন, WIRE, SCROLL, CARAVAN ইত্যাদি। কিন্তু অনেককে দেখি হঠাত করে একটা ‘খেপ’ মেরে বসেছে। যেমন ২০১৪ সালে অমিত শাহের মমতার বিরুদ্ধে জঙ্গি প্রপাগান্ডা ও আক্রমণ। দাবি পশ্চিমবঙ্গের “বর্ধমানে জেএমবি বোমা হামলা ঘটনা” পাওয়া গেছে। আর এতে তখনও কিছু মিডিয়া পয়সা কামিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর দেখা গেলে মোদীর অফিসের প্রতিমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং ‘এসব কিছু না’ বলে হঠাত ঘটনায় ঠান্ডাপানি ঢেলে দিয়েছিলেন। এটাই  ভারতের দুস্থ মিডিয়ার এই সাধারণ ঝোঁক যেটা সব সময় দেখা যায়।

আলোচ্য ঘটনাটা আরো অনেক বড় গুরুত্বের এজন্য যে, দেখা যাচ্ছে এবার সরকারি পিটিআই নিজেও এই বানোয়াট খবরের ব্যবসায় এসে গিয়েছে অথচ, পিটিআই ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা। শুধু তাই না আরও দিক আছে।  যেমন একটা বার্তা সংস্থা বানোয়াট প্রপাগান্ডার কনট্যাক্ট নিউজ বা চুক্তিতে ছাপানো খবর ডেস্কে রাখলেই তা ঐ সংস্থার সব “প্রাহক মিডিয়া” যেমন ধরা যাক ওয়েব পত্রিকা “দ্যাপ্রিন্ট” – তাকেও নিউজটা  গ্রহণ ও নিজ পত্রিকায় তা ছাপাতেই হবে ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। উলটা এমনকি “দ্যাপ্রিন্ট” চাইলে এর পালটা নিজস্ব ইনভেস্টিগেটিভ রহস্যভেদী কোন রিপোর্টও ছাপতে পারে। কিন্তু ঘটেছে উলটা। দাপ্রিন্ট প্রপাগান্ডা খবরটা যত্ন করে ছাপিয়েছে।

তাহলে শেখর গুপ্তা যিনি এতই  বর্ষীয়ান সম্পাদক, ভারতের অনেক কয়টা প্রধান দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক  ও তাঁর ইন্ডেপেন্ডন্ট মিডিয়ার বড়াই – বর্তমানে “দ্যাপ্রিন্ট” এর চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা, তাঁর এত বড় বড় কথা বলে লাভ হল কী?   সেই “দ্যাপ্রিন্ট”-ও পিটিআইয়ের প্রপাগান্ডা নিউজটা ছেপেছে  এবং সবার চেয়ে হুবহু বেশি আর নিষ্ঠার সাথে।  তাকেও কী দিয়ে ব্যাখ্যা করব? শেখর গুপ্তের নিজের পত্রিকা ‘দ্য প্রিন্ট’- তারও এই দশা কেন? এমনকি এই নিউজ প্রসঙ্গে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর চেয়ে ‘দ্য হিন্দুর’ প্রেজেন্টেশন অনেক শোভন। কিন্তু ‘দ্য প্রিন্ট’ পড়ে মনে হয় পিটিআইয়ের ভাষ্যটা হুবহু না তুলে  লিখলে যেন ‘দ্যাপ্রিন্ট’ পেমেন্ট কম পাবে, এই ভয়ে আছে। তাই আলোচ্য কেসটা আসলেই আরো বড়। আচ্ছা, ভারতীয় হাইকমিশন এখন  জানিয়ে দিছেন যে পিটিআইয়ের এই  খবরটা মিথ্যা – “This claim is false. There is no decision to send the Indian army …,”।  – এখন মিডিয়ার স্বাধীনতা ইনডিপেন্ডেন্টস নিয়ে মুখের ফেনা তোলা শেখর গুপ্তারা কী বলবেন? কী বা কোন “দেশপ্রেমের” আড়ালে নিজেকে  লুকাবেন? বলবেন যে “ভারতীয় হিন্দুজাতির স্বার্থে রাষ্ট্রের দেশপ্রেমে এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা হলেও সরকারের পক্ষে থাকতে হয়েছিল! হায় রে দুস্থ হাভাতে হতভাগার দেশপ্রেম!

বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ওয়াকেবহাল যারা পিটিআইয়ের বানোয়াট কারবারটা দেখেছেন ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বুঝতে  তাদের বাড়তি কিছু মনোযোগ দিতে হতে পারে।  আমাদের বার্তা সংস্থা বাসস বা ইউএনবিকে দিয়ে ভারতের পিটিআই এর ধারণা নেয়া যাবে না। কারণ এদের তুলনায় পিটিআই মহীরূহ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, ভারতের মিডিয়া ব্যবসায় খবর সংগ্রহের খরচ কমানোর জন্য এত বড় ভারতজুড়ে নেটওয়ার্ক ছড়ানো আছে একমাত্র পিটিআই এর। এ কারণে ভারতের সব রাজ্যের সব পত্রিকার প্রধান ও প্রায় একমাত্র খবরের উৎস এই প্রতিষ্ঠান। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে  কোন বার্তা সংস্থার ভূমিকা অনেক কম। কারণ আমাদের এখানে বাংলাদেশের প্রতিটা মিডিয়া হাউজেরই সবার মূলত নিজস্ব আলাদা  রিপোর্টার স্টাফ সেট থাকে। তবে তাদের সংগৃহীত খবরের খুব ছোট একটা অংশ তারা সরকারি-বেসরকারি বার্তা সংস্থা থেকেও নিয়ে থাকেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিটের সাংবাদিক আছে।  অর্থাৎ সরকথায় ভারতের নিউজ মিডিয়া জগতে বার্তা সংস্থা হিসাবে পিটিআই-এর ভুমিকা অনেক বড় প্রভাবের।

নিউজমিডিয়ায় বার্তা সংস্থার খবর ছাড়া আর এক ধরনের ‘উৎস’ থাকতে দেখা যায় – যেমন ‘আমাদের “নিজস্ব সোর্স” বা সূত্র বলেছে’। যদিও কখনওবা কথিত ‘সোর্স’ অথবা ‘সূত্র মোতাবেক’ এর কথা বলে আড়ালে গুজব বা প্রপাগান্ডাও চালিয়ে দেয়া হয়। ভারতে পেজ বিক্রি এভাবেই হয়ে থাকে। তবে “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” বা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সোর্স-এগুলো বিশ্বাসযোগ্যও হয় অনেকসময়। তবে পিটিআইয়ের ‘আমার সোর্স বলছে’ বা ‘সূত্র মোতাবেক’ বলে এমন উৎসের খবর ছাপানোর সুযোগ কম। মূল কারণ এটা সরকারি তো বটেই; এছাড়া একটা বার্তা সংস্থা সাধারণত ‘সূত্র-খবরের’ উপরে কাজ করে না। এছাড়া ‘সূত্র-খবরের’ ধরনের কাজগুলো মূলত ব্যক্তি বা গ্রুপ মালিকের পত্রিকাগুলোর জন্যই যেন মূলত বরাদ্দ। এই সূত্রে আমরা কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে সে দেশের কম-প্রচারিত পত্রিকাগুলোর সাথেই মূলত সরাসরি ‘কেনাবেচা’ করতে দেখি।

এসব বিচারে ‘ভুয়া সোর্সের নামে’ পিটিআই ভারতে ‘পেজ বিক্রি’ করেছে- এমন আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এগুলো প্রাইভেট মিডিয়া আউটলেট এরাই মূলত করে থাকে। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখলাম সরকারি পিটিআই এমন প্রপাগান্ডায় লিপ্ত হয়েছে।

ঐ রিপোর্টে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও আফগানিস্তান এই চারটা দেশের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে- ভারতীয় সৈন্য এসব দেশে আলাদা আলাদা গ্রুপে পাঠাতে প্রস্তুত করা হচ্ছে [The sources said the teams for Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan and Afghanistan are being readied ]। আর তাতেই চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম- এই প্রপাগান্ডা খবর অস্বীকার করেছে [Dhaka needs no Indian army ……] দৈনিক নিউ এজ -কে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এ মোমেন। এর পরে তা করেছেন আরেকটু পরিষ্কার ও কঠোরভাবে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কমল গুণরত্নে [No need of military assistance from other countries… ]। শ্রীলঙ্কার বক্তব্য বেশি ক্যাটাগরিক্যাল এবং বোল্ড। তিনি বলেছেন, “সৈন্য পাঠানো প্রসঙ্গে দু’রাষ্ট্রে আমাদের মধ্যে কোনো ডায়লগও হয়নি” [there was no such dialogue that had taken place between two nations.]। অর্থাৎ তিনি বুদ্ধিমানের মত প্রকারন্তরে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম দেশ। ফলে কোন ডায়লগ ছাড়া আমি রাজি না হলে আপনি মোদী আমার দেশে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনি কে? মনে হচ্ছে আমাদের অবশ্য এত সাহস হয় নাই।  মানে শ্রীলঙ্কা তার প্রতিক্রিয়া অন্যদের চেয়ে আরেকটু কড়া বা জোরদার করতে পেরেছিল বলা যায়। কারণ শ্রীলঙ্কার অন্তত দু’টি মিডিয়া এখবরের সত্যতা নিয়ে কলম্বোর স্থানীয় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে প্রশ্ন করলে (যেমন, শ্রীলঙ্কার ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকাকে)  ভারত জানিয়েছে এমন ‘খবর মিথ্যা’ (“This claim is false. ) বলে খবরটাকে অস্বীকার করেছে।

এখন এখানে এক মজার তামাশা দাঁড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হল, ভারত সরকারের একটি অফিস আরেকটি অফিসের দাবিকে ‘মিথ্যা বলছে’, অস্বীকার করছে। শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশন মানে হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের অংশ প্রতিষ্ঠান। কাজেই তাদের বক্তব্য ওজনদার। কাজেই এখন এর একমাত্র ফয়সালা প্রধানমন্ত্রী মোদীই করতে পারবে সম্ভবত!
এর মানে হল, পিটিআইয়ের ইজ্জত-লজ্জা কিছু থাকলে তাদেরই এখন ‘ঝুলে পড়া উচিত’। কারণ শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশনই বলেছে তারা মিথ্যা বলেছে। অথচ পিটিআইয়ের দাবি এমন খবর নাকি “বিশেষ সূত্রের খবর”। এই বিশেষ সুত্র এরা তাহলে এখন কোথায়? তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে? সবচেয়ে তামাসাটা হল এমন নিউজ প্রকাশের জন্য পিটিআই কোন জবাবদীহি করেছে আমরা এখনও শুনি নাই।  সরকার বা পিটিআই কাউকে ‘সরি’ বলে নাই।
এর মানে প্রমাণ হল  পিটিআই-এর এডিটরের পক্ষে দিল্লির কোন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও কোন টংয়ের দোকান চালানোর যোগ্যতাও তাঁর নাই।  মোদীকে কাপড় পড়ায়ে ঢাকতে গিয়ে পিটিআই-এডিটর নিজেই ন্যাংটা হয়ে গেছেন!  অবস্থা এখন এমন  কোন ভারতীয় হাইকমিশন মানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলছে,  পিটিআই-এডিটর এক ভুয়া নিউজ করেছে। এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য পিটিআই-এডিটর এর জন্য আর কী হতে পারে?

তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে?
খুব সম্ভবত এটা নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী আর বিজেপির ইমেজ বাড়ানোর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। আর এদিকে একাজ করে দিয়ে অর্থ বা পদ-পদবির লোভ ভারতের কিছু সরকারি কর্মচারী সামলাতে পারেননি, এরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য হয়ত (মোদী সরকারের বিশেষ স্বার্থ বা দেশপ্রেম বলে ভুয়া কথার আড়ালে) গোয়েন্দা বিভাগ আর পিটিআইকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল। যার মূল ভাষ্যটা হল- এটা দেখানো যে এই মোদী সরকার এতই উঁচুতে ভারতকে নিয়ে গেছে যে, পড়শি চার-চারটা রাষ্ট্রকে এখন মোদী পকেটে রেখে চালায়। আর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সেগুলো দেখভাল আর ঠিকঠাক করে রাখতে হয়”। এই ভাষ্যটা যেন বলতে চাইছে, ওসব দেশে সরকার বা প্রধানমন্ত্রী এক আধজন থাকে বটে তবে মোদীই সেগুলোকে মূলত চালায়ে থাকেন। – মোটামুটি এটাই সম্ভবত ছিল গগন-ফাটানো “মোদীগল্প”। আর এদিকে আমরা হয়েছি যেন মোদীগল্প বাস্তবায়ন করে দেয়ার চাকর-বাকর; কিন্তু তাতে আমরা অস্বস্তিহীন হয়ে গেলাম কিনা সে খবর নাই। “ভারতের ব্যগেজ” বইতে বইতে আমাদের মান-ইজ্জত বলে আর কিছু নাই। থ্যাঙ্কস টু শ্রীলঙ্কান জার্নালিস্ট!

পিটিআইয়ের ঐ প্রপাগান্ডা রিপোর্টে একটা বাক্য ছিল যে অংশটা কোনো পত্রিকা কপি করতে  বাদ দেয়নি। বাক্যটা হল, “সার্ক রিজিয়নে করোনা মহামারী ঠেকানোর জন্য একটা কমন ফ্রেমওয়ার্ক গড়ার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এগিয়ে রয়েছে ভারত  [New Delhi has also been playing a key role in pushing for a common framework in dealing with the crisis.]”। কিন্তু মোদীকে এই – “প্লেয়িং কী রোল” –  করতে তারে কে এত ডাকতেছে?
আচ্ছা মোদীর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী  সার্কের করোনা বৈঠক করতে গেছিলেন কেন? এই কী রোল দেওয়ার জন্য নয় তো? চাঁদাই বা দিয়েছিলেন কেন? মোদীকে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে দেয়া- ‘প্লেয়িং কী রোল’ করার জন্য নয় নিশ্চয়? কিন্তু এতে খুশি হয়ে তিনি যখন খুশি তখন, কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই কিছু দেশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিতে পারেন? তাই কী? সত্যি অবিশ্বাস্য! অথচ ‘সার্বভৌমত্ব’ বলে একটা শব্দ আছে! মনে হয় না ভারতের কেউ শব্দটা শুনেছে!

এখানে আলোচ্য পিটিআইয়ের ঐ মিথ্যা রিপোর্টের কিছু অসংলগ্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাকঃ
একঃ  পিটিআইয়ের ওই রিপোর্টে মাত্র চারটি দেশের নাম আছে। কিন্তু পাকিস্তান বা নেপালের নাম নেই কেন?  ভারত বা মোদীর কী নাম নিতে ভয় লেগেছে! না কোনো ‘ঝাপ্টা’ খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল? সার্কের সদস্য তো অন্তত সাত রাষ্ট্র।

দুইঃ ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মোদি সরকারের বন্ধুত্ব-সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে মহামারী সামলাতে ৫৫টা দেশে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন পাঠানো হয়েছে, আর তা আমেরিকাতেও” [As part of its policy to help friendly countries to deal with the pandemic, India is also supplying anti-malarial drug hydroxychloroquine to 55 countries] । কিন্তু ঘটনা হল, এই তথ্য অর্ধসত্য অথবা কোথাওবা পুরাটাই অসত্য। যেমন, এই ওষুধ ভারতের প্রয়োজনের তুলনায় দশ গুণ উৎপাদিন হওয়া সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ভারত থেকে তা রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গোঁফে তা দিয়ে যেন দাম বাড়াবার আনন্দ উপভোগ করতে চায় ভারত। কিন্তু পরে ট্রাম্পের হুমকি-ধমক খেয়ে তৎক্ষণাৎ সব রফতানি বাধা খুলে দিয়েছিল মোদী সরকার। শুধু তাই নয়। এরপর থেকে মোদি দাবি করছেন, এখন তিনি উদার হয়ে গেছেন, ৫৫টি দেশে ভারতীয় ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  পাঠাবেন।

তিনঃ কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য ও তথ্য হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনাভাইরাস নিরাময়ের কোন ওষুধই নয়। এটা মূলত ম্যালেরিয়া তাড়ানোর ওষুধ। অথচ ভারত সরকার গত দুই সপ্তাহের বেশি ধরে এমন ভাব আনছে যেন ক্লোরোকুইনই করোনাভাইরাসের ওষুধ এবং ভারতই এই মহা-ওষুধের আবিষ্কারক, অথবা যেন এবারই এটা প্রথম আবিষ্কার হল। অথচ এই কথাগুলোর কোনটাই সত্য নয়। অনেক আগেই এই ওষুধ আবিষ্কৃত আর ভারতের ম্যালেরিয়া রোগীর জন্য তাদের নিজেদেরই এটা অনেক লাগে, তাই অনেক প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তবু এটা আগে বা কখনো করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদিতই নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO  বা হু) ’র কাছেও অনুমোদিত নয়।

চারঃ ঐ একই রিপোর্টের পরের বাক্যও অসত্য।
যেমন পরের বাক্যে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন অ্যামেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশনের দ্বারা করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ট্রিটমেন্ট বলে চিহ্নিত করা হয়েছে…”। এটা শতভাগ মিথ্যা তথ্য – [ Hydroxychloroquine has been identified by the US Food and Drug Administration as a possible treatment for COVID-19] ।

মজার কথা হল, মিথ্যা করে হলেও ২১ এপ্রিলের এই রিপোর্টেই প্রথম অ্যামেরিকায় যে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) বলে ওষুধের অনুমোদনদাতা বা অথরিটি প্রতিষ্ঠান বলে কেউ আছে, তা নিয়ে প্রথম ভারতের মিডিয়ায় কোন স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল। কারণ, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতের প্রতিটি দৈনিকসহ মিডিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন নিয়ে তুঙ্গে তুলে আলাপ করা হচ্ছিল এভাবে যে ১. ভারতেই করোনার ওষুধ পাওয়া গেছে। ২. তা ভারতের হাতেই আছে। ৩. তা বিশাল ‘গেম চেঞ্জার’, ‘ভারত খেলা বদলে দিতে পারে’ ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বাইরে আসল কথাটা যে এই ওষুধের এফডিএ অনুমোদন নাই – এটা কোন মিডিয়ায় উল্লেখ করা হচ্ছিল না। অর্থাৎ প্রমাণিত কার্যকারিতার প্রমাণ  বা অনুমোদনই নেই এবং কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় – এ দিকটা ভারতের সব মিডিয়া চেপে চলেছিল।

কেন?
প্রথমত এর জন্য মূলত দায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর সেই আড়ালে লুকাতে চেয়েছে ভারতের ব্যবসায়ী-মহলসহ ক্ষমতাসীন মোদীর দলবল। তাই তারা এই ওষুধ একবার ব্যবহারে শুরু হয়ে গেলে তারা সবাই কত বিলিয়ন ডলারের মুনাফায় লালে লাল হয়ে যাচ্ছে- এই লোভে মশগুল ছিল।  ট্রাম্পের ঘনিস্ট বন্ধুরা এবং তিনি নিজেও এই ওষুধের প্রস্তুতকারি কোম্পানির SONAFI এর কিছু শেয়ারের মালিক বলে, ট্রাম্প এই ওষুধের পক্ষে একটা প্রপাগান্ডা বলয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা –  শুরু থেকেই প্রমাণিত যে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হার্টের রোগীর জন্য  নিষিদ্ধ ও ব্যবহার মারাত্মক হতে পারে। বিশেষত অসংলগ্ন অস্থির হার্টবিটের চাপের মুখে রোগী পড়ে যেতে পারেন। অথচ তা ভারতের কেউ বলছেন না। তবে ট্রাম্প এই ওষুধের গ্লোবাল কোম্পানি সানোফির শেয়ারের মালিক বলে তিনিও এটাকে ‘প্রমাণিত’ ওষুধ বলে চালিয়ে দিয়ে চান। এফডিএ-এর ওপর তিনি চাপ দিয়ে যতটুকু করতে পেরেছেন, তা সত্ত্বেও এখনো ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’কে  এফডিএ এখনও করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবু এটা বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেটা ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে। কোনো ডাক্তার এই ওষুধকে কেবল ‘অফ ড্রাগ’ হিসেবে ব্যবস্থা দিতে পারেন শর্তসাপেক্ষে। সেটা কেবল মরণাপন্ন করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই। তবে রোগীকে জানিয়ে ব্যাখ্যা করে ‘সজ্ঞান-সম্মতি’ লিখিতভাবে নিয়ে, রোগী যদি রিস্ক নিতে রাজি থাকেন কেবল এমন বিশেষ পরিবেশে ও শর্তে তা সম্ভব বলে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে। এটাও ট্রাম্প করেছেন এফডিএ’র কমিশনারের ওপর চাপ সৃষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত গত সংখ্যায় লিখেছিলাম।

সবচেয়ে বড় কথা মাত্র গত ২৩ এপ্রিল ভারতের প্রথম যে পত্রিকা ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের অনুমোদনহীনতার কথা ভারতে প্রকাশ করে দিয়েছে –   মিথ্যা লোভ ভেঙেছে ও রিপোর্ট করে দিয়েছে- সেটা কলকাতার ইংরেজি ‘টেলিগ্রাফ’। এর রিপোর্টের বাংলা শিরোনাম- ‘লোভ-লালসার ড্রাগ থেকে সাবধান হয়ে যান’ (ওয়ার্নিং অন কাভেটেড ড্রাগ, Warning on coveted drug)।  এতে যে খবরটা আগেও সত্য ছিল তা ভারতের ভিতরেই আরও মেলে তুলে ধরেছিল কলকাতা টেলিগ্রাফ।  ঐ রিপোর্ট আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্কুল অব মেডিসিনের স্টাডি-গবেষণার ফলাফলের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলছে, ‘এজিথ্রোমাইসিন নামে অন্য ওষুধের সাথে অথবা একা –  ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধের করোনাভাইরাসের নিরাময়ে কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ নেই” [……had found no evidence that hydroxychloroquine (HCQ), used with or without the antibiotic azithromycin, reduced mortality or the need for ventilation in hospitalised Covid-19 patients.]।

কিন্তু তবু আজ ২৬ এপ্রিল ভারত নিজেদের তৈরি ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন যা আসলে করোনার জন্য অনুমোদনহীন, আ বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তাহলে ৫৫টা দেশে ভারতের অকার্যকর ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধকে পাঠাবার মোদীর উদ্দেশ্য তাহলে কী?  এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অকার্যকর ওষুধ পাঠিয়ে বাজার ধরা? মোদী তো দেখা যাচ্ছে একদম ট্রাম্পের পারফেক্ট শিষ্য!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর প্রসঙ্গ : বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ট্রাম্প যখন লোভী সেলসম্যান, টোটকা ক্যানভাসার

ট্রাম্প যখন লোভী সেলসম্যান, টোটকা ক্যানভাসার

গৌতম দাস

 ২০ এপ্রিল ২০২০, ০২:৩৯

https://wp.me/p1sCvy-2Xm

Anti-malarial drug Hydroxychloroquine – NYT

করোনাকাল! মানে এখনকার দুনিয়ায় যখন করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাই সবখানে বর্তমান হয়ে আছে। আমরা এরই জীবন্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে এর ভেতরেই জীবন-মৃত্যুর মধ্যে প্রতিদিন বসবাস করছি। বিশেষত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যখন কোন পরীক্ষিত ও প্রমাণিত ওষুধ বা কোনো প্রতিকার প্রতিষেধক মানুষের নাগালে মধ্যে এখনও নেই।

আমরা অপেক্ষা করছি ভ্যাকসিন প্রতিষেধক হাতে পাওয়ার। কারণ এ ধরনের ভাইরাসের প্রতিষেধক মানবদেহ আত্রান্ত হলে প্রতিক্রিয়ায় নিজেই শরীরের ভেতরে তৈরি করে থাকে। আর যত দিন ও ক্ষণ এটা  আক্রান্তদের শরীরে ব্যাপকসংখ্যক পাল্টা তৈরি না হয়ে যায় তত দিনই আমরা ঝুঁকিতে এবং কষ্টে থাকি। এমনকি স্টাডি বলছে মোট আক্রান্ত লোকের কমপক্ষে দুই পার্সেন্ট  আক্রমণ সামলাতে টিকতে বা সহ্য করতে না পেরে মারাও যেতে পারে। এটাকে আমরা ভাইরাস প্রতিরোধী হয়ে উঠা মানুষ বা নতুন শরীর বা অ্যান্টিবডি [Anti-boby] বলে থাকি। মানব প্রজাতির জন্মলগ্ন থেকে আমাদের দুনিয়াতে মানুষের পাশাপাশি এধরনের কোটি কোটি অসংখ্য ভাইরাস এ পর্যন্ত হাজির হয়েছে আর আমরা আমাদের শরীরে এমন ভাইরাস প্রতিটিরই অ্যান্টিবডি হাজির করিয়ে টিকে গেছি। এই বিচারে এবারও অবশ্যই সফল হব আশা করা যায়। তবে এখনকার সময়কালটা হচ্ছে মেজরিটির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় দেয়ার, আর তত দিন কোনো মতে বেঁচে টিকে যাওয়ার সময়। আর ওদিকে ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধকের আবিষ্কার হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকছি, যা পাওয়া গেলে তা এরপর থেকে আক্রান্তের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে মানুষকে সহায়তা করবে। অর্থাৎ শেষ বিচারে মানুষের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়া একমাত্র পরিত্রাণ ও থিতু অবস্থায় পৌছানো।  এসব বিচারে এখনকার সময়টা এটাই হল মানব-প্রজাতির জন্য ক্রুশিয়াল ‘করোনাকাল’। মানে ‘নিও করোনাভাইরাস’ (বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া স্টান্ডার্ড নাম, কোভিড-১৯) নামে জীবাণুর সংক্রমণের কাল এটা। যে কেউ এর শিকার হয়ে পড়লে তা থেকে মৃত্যুও হতে পারে। এমন আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আমরা সবাই এই করোনাকালে জীবন্ত বসবাস করছি। বলাই বাহুল্য, এটা দুনিয়ার মানব-প্রজাতির জন্য   সাময়িক এক অসহায় তবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা।

খারাপ সময়ে অনেক কিছু ধরে রাখা যায় না; অন্তত খুবই কঠিন হয়ে যায়। পরিচিত চিরচেনা দুনিয়াটাও সে সময়ে হঠাৎ করে খুবই অপরিচিত মনে হতে থাকে। কারণ কোনো কিছুই আর আগের অর্ডার বা পরিচিত নিয়মশৃঙ্খলের মধ্যে নেই, থাকে না দেখতে পাই। আমরাও অধৈর্য হয়ে উঠতে থাকি। কারণ বেঁচে থাকাটাই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে থাকে।

এ সময় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় পড়ে মানুষের মূল্যবোধ [value]। তা ধরে রাখতে হিমশিম খাওয়া মানুষের মধ্যে বিপর্যয়ও দেখা দিতে পারে।  ভ্যালু বা মুল্যবোধ মানে, মানুষ কী করে আর কী করে না; করবে না, করতে পারে না – এ পর্যন্ত তৈরি হওয়া ও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর শাণিত হতে থাকা এ নিয়ে নতুন বিকশিত ভাবনাগুলো – যাকে আমরা মানুষের মূল্যবোধ বলি, তা ধরে রাখা খুবই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই করোনাকাল মানুষের মূল্যবোধ রক্ষা বা ধরে রাখার পরীক্ষায় চরম এক ক্রান্তিকাল হয়েও উঠতে পারে। যেমন ইতোমধ্যেই পরিবারের আপন বাবা-মা করোনায় মারা গেলে তাঁকে ফেলে পালানো বা জানাজায় কোন দায় না নেয়ার ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। নিজ পাড়ার আশেপাশে হাসপাতাল করতে না দেওয়া বা কবরস্থান করতে না দেওয়ার মতামত প্রবল হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যুক্তি বা বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নয় বরং এক অজানা আশঙ্কা, অহেতুক স্বার্থপরতায় চরমে উঠে পড়তে চাইছি আমরা। অন্যকে মেরে হলেও নিজে বেঁচে থাকতে চাইছি – এমন ঝোঁক আমাদের মধ্যে বাড়ছে! এ’হলো করোনাকালের ফেনোমেনা!

গত চার শ’ বছরের দুনিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসকে যদি আলোচনায় আনি তবে একে তিনটা বড় কালপর্বে ভাগ করে দেখতে পারি। প্রথমটা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত; যেটাকে ‘কলোনি ইকোনমি’ বা কলোনি-শাসনের ইতিহাস বলতে পারি। বিষয়টাকে অনেকে অর্থনৈতিক ইতিহাসের পর্যায় না বলে, ক্যাপিটালিজম’ শব্দ ব্যবহার করে বললে তা বেশি অর্থবোধক বলে মনে করে থাকেন। সেভাবে  এই প্রথম সময়কালটাকে আমরা ইউরোপের নেতৃত্বে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের যুগ” বলতে পারি। আর এরই দ্বিতীয় পর্যায় বা রূপটা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে  “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যুগ” যা গত শতকের মোটা দাগে শেষ পর্যন্ত জারি ছিল ধরতে পারি। আর তৃতীয় পর্যায় ও রূপটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল চলতি শতকের শুরু থেকে (প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সাল থেকে বলা যায়) চীনের নেতৃত্বে এবং ক্রমেই যা আমেরিকার বদলে চীনের প্রভাব দখল নিয়ে বা জায়গা নেয়া হয়ে বেড়েই চলছে।

দ্বিতীয় পর্যায়টায় ভাল এবং মন্দ বহু দিকই আছে, যার সবকিছু আমেরিকার নেতৃত্বে ঘটেছে। সেযুগেই প্রথম বহুরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জন্ম নেয় জাতিসংঘ। আর সাথে বাণিজ্য অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময় সুসম্পন্ন করার প্রথম বহুরাষ্ট্রীয় নিয়ম শৃঙ্খলার জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। যার মন্দ দিকটা হল এটা পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও তার ভায়রাভাই রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর পক্ষে কান্নি মেরে গড়ে তোলা। তবুওও উপরে এর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাওয়ার সময়কাল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সাল বলা হয়েছে এজন্য যে ২০০৯ সালেই প্রথম প্রশ্ন উঠে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকে আগে সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ার ছিল আমেরিকার (১৮%) সেখানে চীন তার মালিকানা শেয়ার বাড়াতে চেয়ে প্রস্তাব দেয়। আভ্যন্তরীণভাবে টেকনোক্রাটেরা চীনকে ভিতরেই রাখতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর ভিতরেই জায়গা বড় করে আটিয়ে নেওয়ার পক্ষে প্রস্তাব তৈরি করে অ্যামেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিশেষ করে সিনেটে এই ফাইল গেলে তা কখনই অনুমোদিত না হয়ে ওর মৃত্যু ঘটেছিল। যে সিদ্ধান্তের প্রাকটিক্যাল মানে হল আমেরিকা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর ভিতরে প্রভাব বিস্তারের ঝগড়ার খাতা খুলার চেয়ে বাইরে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সতীন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে চীন লড়ে নেক – এভাবে লড়ার দিকে চীনকে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  আর তা থেকেই চীনা প্রধান শেয়ারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর প্যারালাল সতীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্ম ও বিস্তারলাভের তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

আগেই বলেছিল গ্লোবাল অর্থনীতির উপর প্রতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় যুগ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যার প্রভাব পরিণতি ভালো-মন্দ দুটো মিলিয়েই ছিল। তবু বড় কথা সেখানে একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নিয়মশৃঙ্খলা আনা প্রথম শুরু  হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় পর্যায়ে নতুন নেতা চীনের আগমনে আমেরিকার চাপ প্রভাব বাংলাদেশের মত দেশগুলোর উপর অনেকটাই হালকা হয়ে গেছিল। আমাদের হাসিনা সরকার বিশ্বব্যাংকের (আমেরিকার) প্যারালাল উতস চীনা ঋণ পাবার দরজা খুলে গেছিল।   কিন্তু তবু আগে দ্বিতীয় পর্বকালে আমেরিকার কর্তৃত্বে তৈরি হয়ে থাকা নেতৃত্ব ও অর্ডার এই প্রথম খোদ এক অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট  মানে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তাঁর আমেরিকা নিজেই গ্লোবাল নেতাগিরি ও দায় ছেড়ে দিতে শুরু করেছিল। এক অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছায় গ্লোবাল কর্তৃত্ব ত্যাগ করা শুদ=রু করেছিল। আর এতেই পুরনো গ্লোবালিস্ট নেতা আমেরিকা হতে  শুরু করেছিল ন্যাশনালিস্ট, মানে এক জাতিবাদী আমেরিকা। গত এক শ’ বছরে আমেরিকার এই রূপ দুনিয়া আগে দেখেনি।

যেকোনো সমাজে যার অর্থসম্পদ বেশি সমাজের দাতব্য কাজের উদ্যোগগুলোতে এর ব্যয়ভারের বড় অংশ তাকেই বইতে দেখা যায়। এটা বাস্তব এবং তিনি সামর্থ্যবান বলে এটা গ্লোবাল সমাজসহ লোকাল সমাজ সবখানেই সবচেয়ে স্বাভাবিক। এটা সেকালে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা বলে তো বটেই, এছাড়া আমেরিকা বড় জনসংখ্যা মানে বড় অর্থনীতির দেশ বলেও জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ব্যয়ভারগুলোর বড় অংশের আমেরিকা থেকে জোগান এসেছে, গত ৭০ বছর ধরে। অথচ এই প্রথম আমরা লক্ষ্য করছি – এসব ব্যয়ভার আর বইবে না বলে আমেরিকা থেকে হুমকি দেয়া শুরু হয়েছে। প্রথম এমন হুমকি এসেছিল খাপছাড়া ভাবে জুনিয়র বুশের আমলে। আর এবার করোনাকালে জাতিসঙ্ঘের এজেন্সি সংগঠন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার [World Health Org – WHO] পুরো চাঁদাদানই বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন ট্রাম্প।  আমেরিকার এপর্যন্ত প্রদেয় চাঁদা ছিল বাতসরিক ৪০০ মিলিয়ন ডলার।  তুলনায় এখন চীনের প্রদেয় ৪৪ মিলিয়ন। তবে এখনই এক কথায় বলাযায়, চাদা না দেওয়ার হুমকি আত্মঘাতি হবার সম্ভাবনাই বেশি। সম্ভবত অচিরেই আমরা দেখব একা চীনই ৪০০ মিলিয়ন দিচ্ছে কারণ স্বভাবতই সেক্ষেত্রে ঐ সংস্থায় চীনের প্রভাব সর্বোচ্চ হয়ে যাবে। এমনিতেই ট্রাম্পের অভিযোগ খুবই ঠুনকো ও অপ্রতিষ্ঠিত যে, এই সংস্থা চীনের সাথে কাজ করেছে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি মাসেও খোদ ট্রাম্পই সার্টিফিকেট দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছিল যে চীন উদার ভাবে করোনা নিয়ে সব তথ্য বা ডাটা সবার সাথে শেয়ার ও উন্মুক্ত করেছে। এমনকি অ্যামেরিকান গবেষকদেরকেও প্রবেশাধিকার দিয়েছে।  কিন্তু ট্রাম্প তখন করোনাকে তুচ্ছ করেছিল, হালকা করে দেখেছিল, সম্ভাব্য করোনা আক্রমণকে দুর্বল ভেবে অপ্রয়োজনীয় মিথ্যা বড়াই প্রকাশ করেছিল। আজ সেসব মিথ্যা বড়াই সামনে এসে যাওয়াতে সে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উপর আক্রমণ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। তাই এখন ট্রাম্পকে পালটা যে চরম সমালোচনা শুনতে হচ্ছে তা হল  চাঁদাদান বন্ধ করার টাইমিং। বিশেষত সারা দুনিয়া যখন করোনা সংক্রমণ মোকাবেলা ও লড়াইয়ে সবাই সক্রিয় প্রাণপণ লড়ছে আর প্রয়োজনমত গাইড লাইন ও সমন্বয় তারা এই সংস্থা থেকে পাচ্ছে।  আবার খোদ নিউ ইয়র্ক যখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ তিন হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া করোনা মৃত্যুর শহর। অথচ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও এই ফ্যাক্টরগুলোর কোনোটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে না। অর্থাৎ করোনা-উত্তরকালেও যে সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারতেন, সেই সিদ্ধান্ত তিনি এখন কোন বিবেচনায় নিলেন- এর সদুত্তর নেই। অর্থাৎ এই প্রথম আমেরিকা শুধু গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে নিজেকে খারিজ হয়ে যাচ্ছে না বরং খোদ রাষ্ট্রটা নিজের জন্যও মূল্যবোধে খামতি বা সঙ্কট তৈরি করছে।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটা ওষুধ কোম্পানির পণ্য বা ওষুধের পক্ষে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। তিনি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন [ Hydroxy-chloroquine] এই জেনেরিক নামের এক ওষুধের পক্ষে ওকালতি শুরু করে দিয়েছেন। এটা করোনাভাইরাসের নিরাময়ে আবিস্কৃত কোন ওষুধ নয়। এর কার্যকারিতা  মূলত ম্যালেরিয়া নিরাময়ের ক্ষেত্রে; সেকাজের জন্য কেবল পরীক্ষিত ওষুধ এটা। এর কার্যকারিতা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রেও আদৌ কার্যকর হবে কি না;  হলে কতটা অথবা কোন বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে এটা একেবারেই প্রয়োগ করা যাবে না কিনা ইত্যাদি কোন কিছুই এখন সব পরীক্ষা ও কার্যকারিতা প্রমাণ শেষ করে অনুমতিপ্রাপ্ত হয় নাই এই ওষুধ।  কেবল প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী কিছু করোনা রোগীর উপর এটা প্রয়োগ করা হয়েছিল বলেই মনে করা হচ্ছে যে এটা সম্ভাব্য ওষুধ হতে পারে, তাই।

ওষুধ কোন সাধারণ পণ্য নয় যেটা সরাসরি আর পাঁচটা কোন পণ্যের মত বাজারে বিক্রির জন্য তোলা যায়। এমনিতেই কোন ড্রাগ অথবা কোন মুখে খাওয়ার খাদ্য বা শরীরে ব্যবহারের কোন কেমিকেল ইত্যাদি ভোগ্যপণ্য বাজারে তোলার আগে প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই নির্ধারিত অনুমতিদাতা প্রতিষ্ঠান থাকে – যেখান থেকে পরীক্ষিত ও ঐ পণ্যের কার্যকারিতা সত্য কিনা সেই সার্টিফিকেট আগাম পেয়ে নিতে হয়। কাজেই এটা কোন প্রেসিডেন্টের সুপারিশেই বিষয় নয় যে যেমন আমার চাল বা গম খেতে খুব সুস্বাদের এটা নিয়ে যান বলে যে কেউ ফেরি করতে পারে। এসবই কোন ওষুধ-পণ্যকে  বাজারে তোলা ও বিক্রি করার টেকনিক্যাল শর্তও। এই শর্তপূরণ না করে কোন ওষুধ বাজারে কেনাবেচা করার চেষ্টা এক মারাত্মক ক্রিমিনাল অপরাধ।  কারণ, ঐ ওষুধ যথার্থ নয় বলে সেকারণে এটা খেয়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে বা কেউ মারা গেলে এর দায়দায়িত্ব কে নিবে তা চিহ্নিত ও দায়ী করার জন্যই এই সতর্কতা। এতো গেল টেকনিক্যাল দিক।

অন্যদিকে, সাধারণত কোন রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রেসিডেন্টের ব্যক্তি-ব্যবসায়িক স্বার্থ যদি প্রেসিডেন্টের কোনো সিদ্ধান্তের ইস্যুতে জড়িয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সেই নির্বাহী  ঐ স্বার্থের ইস্যুতে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। মূলত এজন্যই কেউ প্রধান নির্বাহী বা মন্ত্রী হলে শপথগ্রহণের আগেই তিনি কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির মালিকানা বা নির্বাহী পদে থেকে থাকলে আগেই  পদত্যাগ করে থাকেন যাতে দুমুখি স্বার্থ সঙ্ঘাতের [conflict of interest] বালাই না থাকে। যেমন, কোনও প্রেসিডেন্ট কোনও ওষুধ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হলে তিনি ওই কোম্পানির ওষুধ সরকারকে দিয়ে কিনাতে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে ফেলতে পারেন। এমনটা যেন না হয় তাই তিনি আগেই কোম্পানির মালিকানা-পদত্যাগ করে থাকেন।  এই হল, রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতাধারীদেরকে (মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি এমন এদেরকে) একই সাথে তাদের প্রাইভেট ব্যবসায়িক কাজ থেকে দূরে রাখার নীতি।

ট্রাম্প ও তাঁর বন্ধুদের শেয়ার মালিকানাঃ
এসব দিক নিয়ে বিস্তর ঘাটাঘাটি করে তথ্য তুলে এনেছে আমেরিকার ফোর্বস গ্রুপের ম্যাগাজিন ‘FORBES’। ফোর্বস বলছে ট্রাম্পের এক ক্ষুদ্র মালিকানা আছে সানোফিতে, [ has a “small personal financial interest” in Sanofi, a French drug-maker that produces a brand-name……]।  তবে পাঠকেরা ক্ষুদ্র মালিকানা শুনে আবার যেন বিভ্রান্ত না হয়ে যায়। ফোর্বস তাই এই ক্ষুদ্র মানে কত ডলার এর একটা  এস্টিমেটও সাথে দিয়েছে – সেটা পরিমাণ হল ২.১ বিলিয়ন ডলার

“Trump’s three family trusts have investments in a Dodge & Cox mutual fund, with Sanofi as the largest holding, according to the Times.
Forbes estimates the value of Trump’s Sanofi holdings to be less than $3,000; for context, Forbes estimates Trump’s total net worth at $2.1 billion”

অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, ট্রাম্প কোন নীতির কোনটাই মানছেন না। তাই আমরা দেখছি এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন – যেটা আসলে  ‘সানোফি [SANOFI]’ নামের ফ্রান্সের এক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির পণ্য -সেই কোম্পানির মালিকানায় আছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধুজনেরা; এমনকি খোদ ট্রাম্পও এই কোম্পানীর এক ছোট শেয়ারের মালিক – এমন খবর ছেপেছে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। ইঙ্গিত করছেন ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধুরা এ কারণেই এই ওষুধের পক্ষে টাউটিং [touting] বা দালালিতে নেমেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ যদি একবার করোনাভাইউরাসে আক্রান্তদের অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে কার্যকারিতা আছে বলে প্রমাণিত হয়ে যায় [যদি লাইগ্যা যায়] তবে মুনাফায় লালে লালে হয়ে পারেন – এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে এরা সকলে মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে।

“If hydroxychloroquine becomes an accepted treatment, several pharmaceutical companies stand to profit, including shareholders and senior executives with connections to the president. Mr. Trump himself has a small personal financial interest in Sanofi, the French drug-maker that makes Plaquenil, the brand-name version of hydroxychloroquine.” – NYT

অথচ ট্রাম্প অ্যামেরিকান বাস্তবতা সেসব ফ্যাক্টসের পরোয়া না করে, উল্টো এই ওষুধ ব্যবহারের পক্ষে অন্ততপক্ষে পাঁচটি পাবলিক হাজিরাতে প্রকাশ্যে যুক্তি খাড়া করেছেন। তার এক কুখ্যাত আরগুমেন্টের মূল বক্তব্য হল- ‘আপনার আর কী ক্ষতি হবে’ (হোয়াট ডু ইউ হ্যাভ টু লুজ,‘What do you have to lose?’ )। এই কথা তুলে তিনি অপ্রমাণিত কার্যকারিতার ওষুধের পক্ষ নিয়ে প্রকাশ্য দালালি শুরু করে দিয়েছেন যা কোনো অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের মুখে খুবই অশোভন। ট্রাম্প বলতে চান যেহেতু ‘করোনাভাইরাসের ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনো আবিস্কৃত নাই, তাই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত না হলেও এটা ব্যবহার করে দেখুনই না। এটা কাজে লেগেও যেতে পারে। এতে ক্ষতি কী?” নিউইয়র্ক টাইমস লিখছে, “What do you have to lose?” he asked five times on Sunday. এছাড়া ট্রাম্পের আহাম্মকি নিয়ে কথা বলাটাও একটা লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। যেমন তিনি নিচের উদ্ধৃত অংশের শেষে বলছেন,  “তাহলে ক্ষতি কী ব্যবহার শুরু করে দেন,……  আমি ডাক্তার না, কিন্তু আমার কমন সেন্স আছে …”। এর মানে দাড়াল তিনি নিজেই স্বীকার করে বলছেন তিনি ডাক্তার নন। তাহলে তিনি ওষুধ ফেরি করছেন কেন? তাঁর দাবি এটা তিনি কমন সেন্স দিয়ে বলছেন। আচ্ছা কমন সেন্সের উপর ভর করে প্রেসিডেন্ট একটা ওষুধ খেতে পাবলিককে বলতে পারেন? ওষুধ কী কমন সেন্স দিয়ে, তাও আবার অন্যের কমন সেন্সের উপর ভর করে খাওয়ার কথা, না খাওয়া যায়?  ঐ ওষুধ খাবার পর কোন জটিলতা দেখা দিলে বা ব্যক্তি মারা গেলে সে দায়দায়িত্ব কে নিবে? সেটা তো তখন এক খুনের মামলা দায়ের হবে! এছাড়াও কোন প্রেসিডেন্ট কোন বিশেষ পণ্য ভোগ-ব্যবহারের পক্ষে ওকালতি করা গর্হিত অপরাধ ও পক্ষপাতিত্ব। কারণ তিনি ঐ পণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বি কোম্পানীর স্বার্থের ক্ষতি করছেন নিজের প্রেসিডেন্ট পদকে অপব্যবহার করে।

Once again, according to a person briefed on the session, the experts warned against overselling a drug yet to be proved a safe remedy, particularly for heart patients. “Yes, the heart stuff,” Mr. Trump acknowledged. Then he headed out to the cameras to promote it anyway. “So what do I know?” he conceded to reporters at his daily briefing. “I’m not a doctor. But I have common sense.”

সোজা কথা, ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা হল, এক. ওষুধসহ যেকোনো পণ্যের পক্ষেই কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট টাউটিংয়ে নামতে পারেন না। এটা আইনি দিক থেকে গর্হিত কাজ। কিন্তু ট্রাম্প এখানে আরেকটা আড়াল নিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে এই ওষুধ তার সরকারকে দিয়ে কিনিয়ে বিপুল সরকারি স্টক গড়েছেন। অথচ ওষুধটার কার্যকারিতা প্রমাণিত বা উপযুক্ত ছাড়পত্র-প্রাপ্ত নয়।  তিনি দাবি করছেন চলতি এই করোনার খারাপ সময়ে যতটুকু কার্যকর ওষুধ পাওয়া যায় তার সবটাই তিনি সংগ্রহ করার সুযোগ নিয়েছেন। তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে বলছেন “আরও স্টাডির জন্য আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। কারণ রোগীরা মারা যাচ্ছে”।

But Mr. Trump on Sunday dismissed the notion that doctors should wait for further study.

“We don’t have time to go and say, ‘Gee, let’s take a couple of years and test it out,’ and let’s go out and test with the test tubes and the laboratories,” Mr. Trump said. “I’d love to do that, but we have people dying today.”

Saying that the drug is “being tested now,” Mr. Trump said that “there are some very strong, powerful signs” of its potential, although health experts say that the data is extremely limited and that more study of the drug’s effectiveness against the coronavirus is needed.

President Trump prevented Dr. Anthony S. Fauci from answering a question on hydroxychloroquine – NYT

কিন্তু কোনো ওষুধ কার্যকর কি না, তা বলার বা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে, টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত ট্রাম্প একজন প্রেসিডেন্ট হলেও তা নিবার এক্তিয়ার তার নাই, তিনি নিতে পারেন না। এটা তাঁর কোন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট বা কমিটি তাকে পরামর্শ দিলে এরপর তিনি নিতে পারেন। কারণ তিনি পেশাদার ডাক্তার নন বা ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত-মন্তব্য করা তার এখতিয়ারের ভিতরেও পড়ে না। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এখনই তাঁর সরকারের অন্তত দুজন এক্সপার্ট (Dr. Anthony Fauci and Dr. Deborah L. Birx,)  এই ওষুধ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।  প্রথমজন ফাউচি হলেন সরকারি “অ্যালার্জি ও সংক্রামক রোগবিষয়ক ইনস্টিটিউটের” পরিচালক এবং ট্রাম্পের করোনা সম্পর্কিত টাস্ক ফোর্স কমিটির একজন লিড মেম্বার। আর ডা. দেবরা ট্রাম্পের করোনাভাইরাসবিষয়ক কোর্ডিনেটর।  ফাউচি তার আপত্তির কথা সরকারি অভ্যন্তরীণ এক পরামর্শ সভায় উচ্চারণ করেছেন। এই ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি সন্দেহ পোষণ করেছেন।  ডা: এন্থনি ফাউচি মনে করেন, এখনো এটা “কান কথা” (এনেকডোটাল এভিডেন্স, anecdotal evidence ) পর্যায়ের তথ্য, ফলে প্রমাণিত সত্য নয়। এমনকি ট্রাম্পের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিএনএনের এক সাংবাদিক প্রকাশ্যেই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ওষুধের কার্যকারিতার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে বিফ্রিংয়ে উপস্থিত, ফাউচির বক্তব্য জানতে চান। কিন্তু ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ফাউচিকে মুখ খুলতে বাধা দেন।  “ফাউচি কথা বলবেন না”  বলে সরাসরি তাঁকে থামিয়ে দেন। মানে, যা বলার ট্রাম্প নিজেই বলবেন। ট্রাম্প এমনকি তার এফডিএ [FDA] কমিশনার স্টেফান হান – এর উপরও চাপ প্রয়োগ করে রেখেছেন যাতে ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিষ্ট্রেশনের কমিশনার হিসাবে তিনি কোন নেতি মন্তব্য না করে বসেন।

ট্রাম্পের এই টোটকা কানভাসিং টাউটারি এত ভয়াবহ পর্যায়ে গেছে যে এক মেডিকেল রিসার্চ প্রকাশ করা জার্নাল [International Journal of Antimicrobial Agents (IJAA).] বিবৃতি দিয়ে এই ওষুধ বিতর্ক থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ঐ জার্নাল বলেছে তাদের প্রফেশনাল সমিতি ISAC [International Society of Antimicrobial Chemotherapy ] এর বোর্ড মনে করে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন প্রসঙ্গে যে আর্টিকেল তাদের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তা তাদের আকাঙ্খিত স্টান্ডার্ডের নয়। [The ISAC Board believes the article does not meet the Society’s expected standard]।

আমেরিকার কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী, সব নির্বাহী ক্ষমতা একহাতে – সেটা প্রেসিডেন্টের হাতে রাখা হয়েছে।  তাই প্রেসিডেন্টের অসংখ্য উপদেষ্টা – পরামর্শক থাকে কিন্তু নির্বাহী তিনি একা। এতে বলাবাহুল্য এর সব দায়দায়িত্বও কিন্তু ঐ একব্যক্তির। তাই ্তার হোয়াইট হাউজে “সিচুয়েশন” রুম [situation room] বলে একটা শব্দ চালু ও বিশেষ রুম আছে। মানে হল যেখানে প্রেসিডেন্ট এসব পরামর্শকদের আলোচনা ও বাদানুবাদের ভিতর দিয়ে ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আমেরিকার এক্সিসিয়স বা AXIOS বা নামের এক ওয়েব সাইট ঐ সিচুয়েশন রুমের বিতর্ক কেমন ছিল এর এক উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা তুলে ধরেছে। যেখানে ট্রাম্প নিয়োজিত এক ব্যবসাবিষয়ক এজেন্ট পিটার নাভাররো [economic adviser Peter Navarro] কে ডাক্তার গবেষক ফাউচি [Dr. Anthony Fauci ] আচ্ছা করে ধোলাই করে দিয়েছেন। ফাউচি সরাসরি বলেন, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  ওষুধের পক্ষে যা বলা হচ্ছে তা আসলে এখনো কানকথা মাত্র [Fauci pushed back against Navarro, saying that there was only anecdotal evidence that hydroxychloroquine works against the coronavirus.]।

অর্থাৎ মুনাফা কামানোর চকচকে লোভে ট্রাম্প যাচ্ছেতাই করে বেড়াচ্ছেন। আর কোন ওষুধের টেকনিক্যালবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ারকে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতায় নেয়া এখতিয়ার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। যেন কোনো রোগী দেশের প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করে বেছে ওষুধ খাবেন – এটাই ট্রাম্প দাবি করলেন।  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প এই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  ওষুধের ব্যবসাটা ধরতে এতই মরিয়া যে, তিনি এক পর্যায়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে হুমকি ধমকি দিয়ে বসেন [Hydroxychloroquine: The unproven ‘corona drug’ Trump is threatening India for]।

Hydroxychloroquine: The unproven ‘corona drug‘ Trump is threatening India forBBC

ম্যালেরিয়া ও দুই চাপাবাজ সরকার প্রধানঃ
ম্যালেরিয়া মূলত এশিয়ায় বা আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়। তাই বলা যায় এদিকের রোগ।  তাই দুনিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ উৎপাদনে বড় উতপাদক দেশগুলো হল এশিয়ায়, বিশেষত বড় জনসংখ্যা বা বাজারের দেশ ভারতে। ভারতের তিনটি কোম্পানি ভারতের বার্ষিক চাহিদার চেয়েও ১০ গুণ বেশি পর্যন্ত কাঁচামাল উৎপাদন ও তা থেকে এই ওষুধ পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষম। তাই ট্রাম্প ভারতের মোদীকে ফোন করে আমেরিকায় হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধ রফতানি-সরবরাহের অনুরোধ জানান। অর্থাৎ ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণিত হোক আর না হোক, ট্রাম্প আমেরিকার সরকারি স্টক হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের সরবরাহ দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে চেয়েছেন। যেন ট্রাম্প একটা পাবলিক ইমেজও চাচ্ছিলেন যে, করোনার কথিত ওষুধ সংগ্রহে তিনি কত তৎপর। ওদিকে এই অনুরোধ পেয়ে  মোদিও দেখলেন এটা তারও কথিত ‘দেশপ্রেম’ দেখানোর এবং গলাবাজি একটা বিরাট সুযোগ। তিনি পাল্টা ট্রাম্পকে জানিয়ে দিলেন, নিজ দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে তিনি সাপ্লাই করতে পারছেন না। আসলে এটাও একটা মিথ্যা কথা।  কারণ ভারতের বছরের চাহিদা সর্বোচ্চ ২২ মিলিয়ন পিস। আর উৎপাদন সক্ষমতা ২০০ মিলিয়ন। কিন্তু মোদি আসলে নিজ দেশে দেখাতে চাইছিলেন, তিনি কতই না দেশপ্রেমিক। তাই তিনি ট্রাম্পের ফোন পাবার পরে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ভারত থেকে রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন।  অথচ বড় কথাটা হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা পরীক্ষিত ওষুধও নয়। ভবিষ্যতে তা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কারণ, ভাইরাসের প্রতিষেধক মূলত ভ্যাকসিন বা টিকা। হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ব্যবহার বড়জোর যেন টোটকা ও সাময়িক। তাও আবার হার্টের অসুখের রোগীর ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মারাত্মক, সেটা রোগীকে মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলার মতো হতে পারে।

তার মানে মোদী আর ট্রাম্প দু’জনই পাবলিককে বোকা বানাচ্ছেন আর দেশপ্রেম বেচছেন!

কিন্তু এতে ঘটনা হল উলটা। ব্যাপারটা ট্রাম্প-মোদী দুজনেরই বেকুবিতে তাদের ইজ্জতের ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় যায়। তাই  হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট মোদী আমেরিকাকে সরবরাহের অপারগতা জানানোকে ট্রাম্প খুবই সিরিয়াসলি নিয়ে মোদীকে পাল্টা হুমকি দিয়ে বসেন। ট্রাম্প পাবলিকলি বলে দেন, হয় মোদি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন সাপ্লাই করবেন, না হলে এর পরিণতি ভোগ করবেন [US could “retaliate” if India does not release stocks …]। তামাশার কথা হলো, দুই চাপাবাজ এবার মুখোমুখি হয়ে যাওয়াতে শেষে মোদি দ্রুত সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এবার ‘উল্টো গান’ ধরেন। করোনাকালে দরকারের সময় তিনি মহান উদার সরবরাহদাতা সেজে গেলেন। এবার তিনি আমেরিকার ট্রাম্পকে তো বটেই; সার্কের পড়শিদের মধ্যে বাংলাদেশকেও নিজে থেকে তা সরবরাহের অঙ্গীকার ঘোষণা করলেন।

এদের বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান আর সরকারপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা কতটুকু তা এখানেই ধরা পড়ে যায়। যেমন- ওষুধ আর পাঁচটা পণ্য নয় যেটা যেকোনো ব্যবসায়ীই আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নিজেই যথেষ্ট। কাজেই বাংলাদেশ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের আমদানির অনুমতি দেবে কি না সেটি মোদী তো নয়ই, এমনকি এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইস্যু বা এখতিয়ারই নয়। আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের টেকনিক্যাল সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া এই ওষুধ আমদানিযোগ্য নয়। বলাই বাহুল্য, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের প্রমাণিত কার্যকারিতার সার্টিফিকেট না পেলে আমাদের  ওষুধ প্রশাসন এই অনুমতি দিতে পারে না। লন্ডনের বিখ্যাত মেডিকেল প্রফেশনাল জর্ণাল ল্যনসেট [LANCET], এই জর্নালে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে সাবধান করেছে।  বাচ্চাদের  রিমোটিক ফিভার অথবা বয়স্কদের আর্থারাইটিস খুবই জটিল রোগ। সারা দুনিয়া ভুগেছে। বহুকষ্টে ইউনিসেফে ক্যাম্পেইন টিকা ও ওষুধে  যেগুলো দেওয়া হয় তাতে এটা এখন নিয়ন্ত্রিত।  লানসেট বলছে এটা এখন নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলে হলেও এই ওষুধের ব্যবহার  আর্থারাইটিস ও রিমোটিক ফিভার রোগকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

আসলে ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমেরিকার ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) দুনিয়ায় আদর্শ স্থানীয় বলে মানা হত। এর নিজস্ব ল্যাবে প্রমাণিত ও অনুমোদিত না হলে আমেরিকার কোনো উৎপাদক তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক পণ্য আমেরিকায় বাজারজাত করতে পারে না। কারণ নাগরিক ভোক্তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক সঠিক ও অক্ষতিকর পণ্য ভোগের অধিকার রক্ষার্থেই এফডিএ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। আর এটাকে আদর্শ মেনেই ১৯৮২ সালে এর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের ১৯৮২ সালের বিখ্যাত ওষুধ নীতিতে বাংলাদেশেও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর খোলা হয়েছিল। যদিও ১৯৮২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ওষুধ মালিক দরবেশেরা  এই দপ্তরের যে শক্ত দাঁত বসানোর ক্ষমতা ছিল তা ক্রমশ ভোঁতা করে দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষার বদলে একে ওষুধ মালিকদের অধী্নস্ত করে ফেলা হয়েছে বলে মনে করা হয়।  আমেরিকার এফডিএর সমতুল্য ইউরোপেরও প্রতিষ্ঠান আছে। তবে সুনাম ও স্ট্যান্ডার্ডের দিক থেকে এফডিএ দুনিয়ায় সেকালে অনুসরণযোগ্য মানা হত।

কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা শুধু তার গ্লোবাল নেতৃত্বের কৃতিত্ব ও গৌরবই হারায়নি, বহু বিশ্ব স্ট্যান্ডার্ডও ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। ব্যবসা ও মুনাফার স্বার্থের কাছে কোনটা ওষুধ কোনটা নয়, এর ভেদাভেদ গুণ বিচারও লুটিয়ে দিয়েছে। আর ট্রাম্প নাকি সবচেয়ে বড় ওষুধ বিশেষজ্ঞ!

“Day after day, the salesman turned president has encouraged coronavirus patients to try hydroxychloroquine with all of the enthusiasm of a real estate developer…”

তাই নিউ ইয়র্ক টাইম বলেছে, ট্রাম্প যে মূলত একজন ব্যবসায়ী মূলত হাউজ বিল্ডিং ডেভেলপার, তার মানে যিনি ‘একজন সেলসম্যান তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন’, তিনিই এখন করোনা সংক্রমণে কোন ওষুধ খেতে হবে, এর বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন!”

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ১৮ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর ট্রাম্প যখন ওষুধের ক্যানভাসার“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

গৌতম দাস

১৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2WY

 

  Image MSN.COM,করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন

করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত শুক্রবার সারা দুনিয়ায় মোট মৃত্যু এক লাখ ছাড়িয়েছে। এদিকে বাংলাদেশেও করোনাবিষয়ক খবরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ হয়ে উঠেছে “লকডাউন”। শব্দটা একটা গোটা জেলাশহর তো বটেই, আবার একটা পাড়া বুঝাতেও সময়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কিন্তু লকডাউন শব্দটার অর্থ একটা নয়, দুটা। বলা সম্ভবত ভাল যে এটা যুগ্ম অর্থের শব্দ। এমনকি এমন এক দ্বৈত বা যুগ্ম অর্থের শব্দ যেটা সাধারণত দেখা যায় যে, এসব শব্দ একটা অর্থে ব্যবহৃত হলে শব্দের অন্য অর্থটা সেখানে আর হাজির থাকে না। কিন্তু লকডাউন শব্দটার দুই-অর্থই সবখানে বজায় থেকে চলে। লকডাউন কথার মূল অর্থ কোন এলাকা যেটা একটা দেশ বা জেলা বা পাড়াও হতে পারে, সেই এলাকাকে ওর সব পড়শি সব এলাকা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা শব্দটা তাই ব্যবহার করছি স্বাস্থ্য সুরক্ষার্থে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে যেমন, ল্যাবে কোন পরীক্ষিত ফলাফলে মানে, প্রমাণিত কোনো ভাইরাস সংক্রমণের কেস হলে, এটা এরপর যাতে সেই পরিবার-সমাজে আর না ছড়িয়ে পড়ে তাতে বাধা দেয়ার জন্য,রোগীকে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে আমরা বলি, লকডাউন করা হয়েছে।

লকডাউনের দ্বিতীয় অর্থ হল, অর্থনৈতিক অর্থে যেখানে এতে অর্থনীতিটাও পরিণতিতে লকডাউন হয়ে গেছে। কাজেই একটা পাড়াকে লকডাউন করা  মানে ঐ পাড়ার সাথে (ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথে) অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময়ও বন্ধ করা হয়ে যায়, বিচ্ছিন্ন  করা হয়ে যায়। যদিও সেক্ষেত্রে কেবল খুবই সীমিত পর্যায়ের একটা ‘একমুখী কিছু ভোগ্যপণ্য সরবরাহ’ সেখানে চালু রাখা হয়। তাই, এভাবে লকডাউন শব্দটা না চাইলেও সবসময় একই সাথে এ দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে যায়।

অতএব দুনিয়াজুড়ে ভাইরাসের আতঙ্কে বিচ্ছিন্নকরণ করা মানে একই সাথে অর্থনীতিও বিচ্ছিন্নকরণ। তাই অর্থনৈতিক  বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এখন দুনিয়াজুড়ে। আর অর্থনীতিকেও ‘বিচ্ছিন্ন’ করার অর্থ হল অর্থনীতির ঢলেপড়া, স্তব্ধ বা স্থবির মৃত হয়ে যাওয়া। তাই ভাইরাসের শঙ্কার পাশাপাশি লকডাউনের ফলে দুনিয়াজুড়ে এখনকার আরেক সবচেয়ে বড় শঙ্কা হল করোনার দশায় পড়া বন্ধ অর্থনীতি কি দুনিয়াজুড়ে আবার কখনও জীবিত হবে, চালু হবে? হলে কবে, কিভাবে হবে? নাকি অর্ধেক বা ত্রিশ ভাগের বেশি ওচল থেকে যাবে যা আর কখনোই চালু হবে না? নাকি একে কোনো চাবুক দিয়ে চাবকাতে হবে মানে প্রণোদনা দিয়ে চালু করতে হবে ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্ন এখন চার দিকে। এই আশঙ্কা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বা কম প্রভাবের নয়।

একটা উদাহরণ নেয়া যাক। বাংলাদেশে এখন চৈত্র-বৈশাখের গরম চলছে। এরই মধ্যে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্তও পৌঁছেছিল কয়েক দিন। আমরা তা খেয়ালও করেছি হয়তো কেউ। প্রতি বছরের মত এবারও আমাদের টিভিগুলোতে চৈত্র- বৈশাখ মাসের মত করে বিজ্ঞাপনের ধরণও বদলে ছিল। যেমন এবারের গরমের জন্য নতুন এয়ার কন্ডিশনার  ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্সের এড; অথবা ট্যালকম পাউডার কিংবা বৈশাখী উৎসব আসন্ন বলে ক্রেতার মনে সুড়সুড়ি তোলার এড বা পণ্যের লোভ দেখানোও শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তাতে ছন্দপতন ঘটে যায়। লকডাউনের দিন বাড়ানোর নির্দেশ আসাতেই  এখন প্রায় সব বন্ধ। উতপাদক-বিক্রেতারা এথেকে বুঝে যায় যে এই লকডাউন অবস্থায় এখন আর এড দেখানোটা মাঠে মারা যাবে। কারণ দোকানপাট মানে বেচাবিক্রিই বন্ধ। ওদিকে টিভিতে গান-নাটক ইত্যাদির বিনোদন ধরনের প্রোগ্রামে নতুন রেকর্ডেড আগে তৈরি অনুষ্ঠান প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কারণ নতুন রেকর্ডিং বন্ধ। আর এসব মিলিয়ে টিভির আয় হিসাবে পাওয়া বিজ্ঞাপনে টান পড়তে শুরু করেছে। এই টানাটানি এখন ক্রমশ কর্মী মানে তাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাবে। এর ফলাফল এই পরিবারগুলো এখন সাবসিস্টেন্স (নুন্যতম “টিকে থাকার” ) মানে, ন্যূনতম খাওয়ার পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কিনবে না। এটা আসলে হাজার হাজার এমন উদাহরণের একটা মাত্র। এভাবে সবাই যদি “টিকে থাকার” [[subsistence] ক্রেতা হয়ে যাই, এর মিলিত ফলাফল হল অর্থনীতি শুকিয়ে ক্ষীণ হয়ে আসা; সবাই মিলে ডুবে মরার মত হবে। এটাই সামগ্রিক অর্থনীতির ঢলে পড়া।
আসলে এর উল্টোটা ছিল স্বাভাবিক সময়ে; যখন তা চালু থাকে, তখন পণ্যের ভোক্তা যখন বাড়ে তাতে উৎপাদনও পাল্লা দিয়ে বাড়ে, তাতে নতুন কাজ সৃষ্টিতেও বৃদ্ধি ঘটে আর তাতে আবার নতুন ভোক্তাও বাড়ে। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়, সব মিলিত যার ফলাফল হল, সবার প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলা। আর এখন ঠিক এটারই উলটা – সাবসিষ্টেন্স লেবেলে পৌছানোর দিকে সকলের ধেয়ে চলা।

এই হল অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর অদ্ভুত ও কঠিন খেলা।  সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে আসতে চাইছে। যদিও অর্থনীতিতে এমন চাকা ঘুরার বা ঘুরানোর নিয়ম হল একটা চাকা ঘুরলেই তা ধীরে ধীরে অসংখ্য চাকাকে ঘুরিয়ে তুলতে পারে। তাহলে এখনকার জন্য আমাদের নির্ধারক প্রশ্ন হল – কোন চাকা সবার আগে ঘুরানোর চেষ্টা করব? অনেকে চাকা ঘুরানোর প্রসঙ্গটা চাহিদার চাকার দিক থেকে শুরু করতে চাইতে পারেন। চাহিদা নতুন চাহিদা সৃষ্টি করে; ফলে তা নতুন উৎপাদন আর নতুন কাজও। যেসব চাহিদা সহজেই প্রথমে পূরণ করে দেয়া সম্ভব ও উপযুক্ত যাতে তা চালু করে দিলে বা বাড়িয়ে তুললে তা অন্যসব চাহিদার চাকাকে ঘুরাতে, চালু করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটা প্রাইম মুভার (প্রথমে যে চাকা ঘুরে অন্যদের ঘুরায়) [Prime mover] বা এমন মূল চাকার সন্ধান পেতে হবে আমাদের সবাইকে।

একইভাবে গ্লোবাল অর্থনীতির চাকাকেও আবার সচল রাখা বা দেখতে চাওয়া যাদের প্রথম মাথাব্যাথা বা যারা মূল দায়িত্বে বা সংশ্লিষ্ট সেই পরিসরে যেমন আই এমএফ বা জি২০-এর সভায়, সেখানে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে তাদের ঐকমত্য হল বাজারে প্রচুর অর্থঢালা ব্যয় বাড়ানোতে যেতে হবে। মানে কৃচ্ছতার উল্টোটা। যেমন এব্যাপারের সবচেয়ে প্রচলিত চিত্র হল, গ্লোবাল পরিসরে সরকারি বন্ড আগে থেকেই বাজারে থাকলে তাতে লভ্যাংশ বাড়িয়ে বেশি দিয়ে এগুলোকে ফিরে সরকার কিনে নিয়ে বাজারে অর্থ সরবরাহ সাধারণত বাড়ানো হয়ে থাকে।  এভাবে মোট অর্থঢালা ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এক ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে গত জি২০ রাষ্ট্রগুলোর [What is the G20] বিশেষ সভা থেকে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ-ভারতের মত দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার ক্ষেত্রে কোথায় আঘাত করা উচিত, মানে কোথায় প্রাথমিক চাহিদা বাড়াবার উদ্যোগ নিলে অন্য সব চাকাকে সে সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে সচল করে ফেলতে পারে – সেই জায়গাটা কী হতে পারে?

কোথায় প্রণোদনার অর্থ ঢালবেনঃ
এর আগে গত বছর (২০১৯) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কলকাতায় জন্ম নেয়া অভিজিত-এস্থার নোবেল দম্পতির কথা বলেছিলাম। গত সপ্তাহে ভারতের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সমিতি মানে চেম্বার অব কমার্সের কলকাতা রাজ্য শাখা, অনলাইনে কথা বলার এক ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। যেখানে অভিজিত-এস্থার ছিলেন মূল বক্তা-অতিথি তাদের (আমেরিকায়) বোস্টনের বাসাতে বসেই।

ভারত বা বাংলাদেশে আমদের সরকারগুলো ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে শুরু করে দিয়েছে , নানান প্যাকেজ ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি।  কেবল ব্যবসায়ীদেরকে দেয়াকে কেন্দ্র করে এসব প্রণোদনার অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করা মানে বুঝা যাচ্ছে এখানে সরকারের  পিছনের-অনুমান হল হল এসব প্যাকেজই চাহিদা বা উদপাদন বাড়ানোর প্রাইম মুভার বলে সে নিশ্চিত হয়েছে।  অর্থাৎ এসবের কোন প্রমাণ সাথে হাজির না করলেও এই সরকারি উদ্যোগগুলো বুঝাতে চাইছে, এই প্রণোদনাই একমাত্র প্রাইম মুভার ফলাফল আনবে।

কিন্তু এই প্রসঙ্গে অভিজিতের প্রস্তাব এখানে একেবারে রেডিক্যাল এবং আলাদা। তার সাহসী পরামর্শ হল, গরিবের হাতে টাকা পৌঁছানো, যাদের এটা এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার।

নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ-এর রেডিক্যাল প্রস্তাব হল, ঘরে খাবার নাই এমন গরীবের হাতে টাকা পৌছানো। যাদের  এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার। 

ফলে তাঁদের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোটা আমাদের প্রায়োরিটি হতে হবে। মোদীর গত টার্মে ২০১৫ সালের একটা সফল প্রকল্প ছিল “জনধন প্রকল্প”।  যার সারকথাটা হল, যেখানে গরিব কৃষককে ১০ টাকা দিয়ে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সরকার যাতে সরাসরি এমন গরীব উৎপাদকের হাতে প্রয়োজনে যেকোন অর্থ সরাসরি পৌঁছাতে পারে। অভিজিত এই প্রকল্পের অবকাঠামো সুবিধা নিয়ে সরাসরি গরিব কৃষকের চাহিদা পূরণ করে দিয়ে অর্থনীতির প্রাইম চাকাকে ঘুরাতে চাওয়ার পক্ষপাতী। এটাই তাঁর আসল কথা।

যদিও তাঁর বক্তব্যের এই মূল অংশ চাপা পড়ে যায় তাঁর বক্তব্যের অন্যকিছু সহ-মন্তব্যের কারণে।  ভারতের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা হল, করোনা আক্রমণে ছেয়ে ওঠার আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি স্থবির হয়েই ছিল। তাই এখন অভিজিতের গরীব-প্রণোদনার প্রস্তাবে এমন  প্রশ্ন উঠা ছিল স্বাভাবিক যে, সরকারের হাতে তো এখন এমন যথেষ্ট বাড়তি অর্থ নেই। সে কথা চিন্তা করে  তাই অভিজিত আগাম বলেছিলেন, “নতুন টাকা ছাপিয়ে হলেও” সরকারের এটা করা উচিত।

এদিকে এটা এখন গ্লোবালি প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে যে, আমরা ইতোমধ্যেই এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দায় প্রবেশ করে গেছি। বিশেষত আইএমএফের প্রধানের এ নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যের পরে আর কোনো তর্ক থাকে না। সে কথা মনে রেখে অভিজিতের প্রস্তাব, এই অবস্থায় ভারতের ম্যাক্রো বা সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় ডুবে গিয়ে চিন্তা করার চেয়ে কিছু সদর্প সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেছেন, “প্রথাগত, সাবধানি পথে হেঁটে এই পাহাড়প্রমাণ সমস্যার মোকাবেলা করা শক্ত। চাহিদার চাকা সচল রাখতে প্রয়োজনে টাকা ছাপিয়েও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো জরুরি। তাতে মূল্যবৃদ্ধির হার মাথাচাড়া দেবে কি না, সেসব ভাবার সময় এখন নয়। কারণ, এই অবস্থায় তা না করলে, অর্থনীতিকে চড়া মাশুল দিতে হতে পারে বলে সম্ভাবনা থাকছে”। কলকাতার আনন্দবাজারে এভাবেই লেখা হয়েছে। এনিয়ে ইংরাজি টেলিগ্রাফের রিপোর্টিংও এখানে

এমনকি তিনি ‘আর্গু’ করছিলেন – তিনি মানছেন স্বভাবতই একটা মুদ্রাস্ফীতি হবে এতে। কিন্তু তিনি বলছেন, এটা পরে আলাদা করে মোকাবেলা করা যাবে এবং তা সম্ভব। তাঁর একথা অবশ্যই তা সত্যি কারণ, একালে প্রত্যেক রাষ্ট্রে একটা কেন্দ্রীয় (রিজার্ভ) নিয়ন্ত্রক ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংকের মত) থাকায় এবং এর হাতে ম্যাক্রো অর্থনীতির পরিচালনার যেমন এর ঘোষিত ফিসক্যাল বা মনিটরি পলিসি ঘোষণা ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকার কারণে বাজারে মুদ্রার (টাকার) প্রবাহ বাড়ানো বা কমানোর মেকানিজমে যদি সদিচ্ছা থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ কাজ। যদিও সাবধান, আজকাল টাকা ছাপানো বলতে এর অর্থ বাজারে মদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া বুঝায়। অ্যামেরিকান ফেড (ফেডারল রিজার্ভ) এটাই করে। এভাবে বুঝতে হবে।

কিন্তু অভিজিতের পরামর্শের উজ্জ্বল দিকটা হল তিনি চাহিদা বাড়ানো বা চাহিদা ধরে রাখার প্রাথমিক চাকা হিসেবে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিবার কথা তিনি বলেননি। সেদিকে তিনি যানই নাই। বরং তিনি উলটা বলেছেন, গরিব মানুষের পকেটে টাকা দিতে। তিনি আসলে জোর দিয়েছেন এই জনগোষ্ঠির বিপল সংখ্যাটার দিকে। এক বিরাট ভোক্তা বাজার এটা। এটাকে তিনি আসলে পালটা শক্তি হিসাবে দেখে সেই শক্তিকে ব্যবহার করতে রেডিক্যাল হতে চেয়েছেন। সারা পশ্চিমের কোনো রাষ্ট্রের যে সুবিধাটাই নেই। এ কারণে এটা অপ্রচলিত, কিন্তু বাস্তব।

বাংলাদেশে চিত্রটা এর কাছাকাছিই। আমরাও আমাদের লকডাউন করেছিলাম; কিন্তু দিন এনে খাওয়া লোকগুলোর ঘরে চাল নেই।  এই পরিকল্পনা এখনও করি নাই।  তাদের ঘরে খাবার কোন ব্যবস্থা না করেই।  তাঁরা চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে আকুতি জানিয়ে রাস্তায় ভিড় করছে, সৈনিকের পায়ে ধরে আকুতি জানাচ্ছে তাকে রাস্তা-ছাড়া না করতে। নারায়নগঞ্জের এমন এক ছবি আমরা দেখেছি; চিত্রটা খুবই মর্মান্তিক। নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এখানে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে? আমরা অন্তত এক মাসের বিনা পয়সায় রেশন বরাদ্দের কথা তুলছি না। কিন্তু সরকার এটা না যেন বাকি সব কিছুই করতে আগ্রহী।

নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এর ভিতরে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে আমরা গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। গরীবের না খেয়ে হলেও তাদের ঘরে থাকার বিনিময়ে আমরা বাকিরা নিজেরা ভাইরাসমুক্ত থাকতে চাইছি। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে?

আবার যেটুকু  দশ টাকা কেজি চাল কিনার ব্যবস্থা আছে [মানে যার হাতে অন্তত দশটা টাকা আছে কেবল তাদের জন্য] তাতে প্রতিদিন ‘দশ টাকার চাল’ চুরি করার ঘটনার লুটপাট রিপোর্টেড হচ্ছে। আমরাও কি আমাদের “না-আয়ের” সব গরিবের  হাতে চাল তুলে দিয়ে একটা প্রোগ্রাম চালু করতে পারি না? এমন চার কোটি লোকের চাহিদা মেটানো আমাদের অর্থনীতিতে এক প্রণোদনা হতে পারে। এ জন্য এক-দুই মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির আছে। আবার চাইলে বিশ্বব্যাংকের করোনা ‘রিকভারি ফান্ড’ আছে। সেখান থেকে চাওয়া যেতে পারে। এছাড়া তাদের কোনো অনুদান ফান্ড আছে কি না, তাও চেক করা যেতে পারে। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি সরকার আইএমএফের কাছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা  দেয়েছে .[..to mitigate the economic impact of the coronavirus crisis] – করোনায় অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে। ওদিকে ভয়ে অব আমেরিকা জানিয়েছে এমন মোট পাঁচ দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ চাওয়ার মোট পরিমাণ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার।

তবে আমাদের ক্ষেত্রে ঘরে একমাসের বিনা পয়সার রেশন পৌছানো – এটাই অভিজিতের মত করে বলা প্রস্তাব। অভিজিতের মত করে এই প্রস্তাবের সারকথাটা হল, আমাদের সমাজের যেসব চাহিদা প্রবল তাকে কাজে লাগানো, হারিয়ে যেতে না দেয়া। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে বা উদ্ধার পেতে চাইলে কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাহিদাকে আমরা মেরে ফেলতে বা মরে যেতে দিতে পারি না। কারণ বিপুল জনসংখ্যার দেশে এটাই আমাদের অ্যাসেট।

তবে অভিজিতের প্রস্তাবে আইএমএফ খুশি হয়নি, যদিও সেটা তাদের আলাদা বিবেচ্য বিষয়ের কারণে। আর কলকাতায় ওদিকে সেটা ছিল ব্যবসায়ী উৎপাদকদের চেম্বার সমিতির আয়োজিত কর্মসূচি, ফলে তারাও তেমন খুশি হয়েছে অথবা গা-করেছে মনে হয়নি। তবে আইএমএফের পক্ষে অভিজিতকে সমর্থন না দেয়ার কারণ একেবারেই ভিন্ন। মূলত তাদের অন্য সমস্যা আছে সেকারণে।

চলতি পরিস্থিতিতে আমাদের গ্লোবাল মহামন্দায় প্রবেশ যেটা এখন ঘটে গিয়েছে, অভিজিত-এস্থারসহ অনেকেই মনে করেন সেটা ব্যাপকতার দিক থেকে ১৯৩০ সালের মহামন্দার সাথে  তুলনীয়। সেই সময় ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র আয়ের চেয়ে যুদ্ধে ব্যয় বেশি করাতে তা মিটানোর অক্ষমতায় যার যার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। মানে, তারা বিস্তর টাকা ছাপিয়েছিল তখন। আর সবাই মিলে একসাথে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটানোয় – এই মূল কারণেই গ্লোবাল মহামন্দা হাজির হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আর এই মূল্যায়নের ওপরে দাঁড়িয়েই বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হয়েছিল। তাই ‘সম্মিলিত মুদ্রা অবমূল্যায়ন’ ঘটানো আইএমএফের চোখে লিখিত জন্মনীতি হিসাবে হারাম ধরনের কাজ মনে করা হয় সেই থেকে।

ফলে আইএমএফ  অভিজিতকে বলতে চাইবে- অবমূল্যায়ন নয়, সে বরং ঋণ দিতে চায়। তবে সেটা যা হোক, অভিজিতের কথা আমরা আক্ষরিকভাবে না নিয়ে তার মূলকথা গরিব মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছানো; এর বাস্তবায়ন করতে পারি। এটাকে একটা সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ মনে করতে পারি আমরা। বাংলাদেশের লকডাউনে অভুক্ত গরিবদের জন্য এটা কি আমরা করতে পারি না? দায়িত্ববানদের ভেবে দেখা উচিত।

ওদিকে চরম ক্রাইসিসে টাকা ছাপানো জায়েজ আছে – উদাহরণও আছে – একথা বলে লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইম রীতিমত এক নিজ সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে গত ০৬ এপ্রিল ২০২০। যা বলা যায় পরোক্ষে নোবেল বিজয়ী অভিজিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। লিখেছে “Printing money is valid response to coronavirus crisis”।

“Printing money is valid response to coronavirus crisis” – London Financial Times

তাদের দাবি ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডও জন্ম থেকেই এমন অর্থ ছাপিয়ে নিয়ে সরকারকে সাহায্য করে আসছেই। কানাডার এক স্থানীয় পত্রিকা দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোও নাকি তাই করেছে।

তবে আমাদের জন্য সারকথা, বাংলাদেশেও টাকা ছাপানো নয়, চাল কিনতে  হাতে টাকা নাইদের ঘরে একমাসের চাল পৌছে দেওয়া প্রকল্প আমরা নিতেই পারি।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে  করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

করোনার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখা

করোনার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখা

গৌতম দাস

০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Wv

BBC Image, https://www.bbc.com/bengali/news-52171393

যেদিকেই যাই যেকোনো দু’জনের মধ্যে আলাপের সাবজেক্ট একটাই- করোনাভাইরাস। মনে হচ্ছে এটা চলতি এপ্রিল মাস তো বটেই, এমনকি যতটুকু দূরে অনুমান করে দেখা যায় তাতে অন্তত আগামী জুন মাসের শেষ পর্যন্ত এমনটাই চলবে। বরং ভাইরাস পরিস্থিতি আরো মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বাংলাদেশে ভাইরাস বিস্তার কেমন মাত্রায় ঘটেছে, কত দূর ঘটেছে, আমরা কোন অবস্থায় আছি, সে চিত্রটা দেখানোর ক্ষেত্রে এখনো কেউ পাবলিকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেন নাই। মুল কারণ, আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য বা ডাটা সংগৃহীত নাই।  আমরা যথেষ্ট  সংখ্যক সম্ভাব্য আক্রান্তদেরকে টেস্ট করি নাই। কোন নিশ্চিত আক্রান্ত রোগী থেকে তিনি কতদুর ছড়িয়েছেন এর নিশ্চিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নাই, একই কারণে।  তাই ডাটাও সংগৃহীত হয় নাই।  ডাটা নাই তো সত্য বা আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য ধারণাও নাই।  যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিং ও ডেইলি সরকারি আপডেট দেয়া জারি আছে – যতটুকু টেস্ট করা হচ্ছে সেই ভিত্তিতে।  তবে, নতুন খবর এসেছে যে, ভাইরাসের আরো পরীক্ষা কেন্দ্র ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে মোট ১৪টা স্থানে স্থাপনের উদ্যোগ চলছে  বা কোনটা চালু করা হয়েছে। যেটা সবমিলিয়ে মোট ২৮টা পর্যন্ত করা হবে সম্ভবত। মনে হচ্ছে টেকনিক্যাল সক্ষমতা বা ইকুইপমেন্ট-গুলোর স্টক বাড়ার সাথে এর সম্পর্ক আছে। তবে ইকুইপমেন্ট ঘাটতি ছাড়াও ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানের মধ্যে জড়তা বা উৎসাহ কম হবার পেছনে যদি ভয়ও একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে তবে তা কাটাবার সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে কিছু কার্যকর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা।

 করোনার পিক পিরিয়ডঃ
এ পর্যন্ত অনেকের মধ্যে দেখেছি কী হতে যাচ্ছে এনিয়ে এক উদ্বিগ্নতা। বিশেষ করে, সরকার কি এগারো এপ্রিল তারিখের পরে সব অথবা আংশিক খুলে দেবে? যেমন ধরা যাক, গার্মেন্টস-সহ ছোটবড় কারখানা উৎপাদন ও যানবাহন খুলে দেয়া হবে? আর একবার যদি খুলে দেয়, মানুষ ঢাকায় ফিরে আসবে এরপর সম্ভবত তাঁরা আবার ফিরে যেতে বা ঘরে বন্ধ থাকতে চাইবে না।  তখন কী হবে? মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এর পিক পিরিয়ড মানে সর্বোচ্চ আক্রমণ ও ক্ষয়ক্ষতির কাল কী আমরা পেরিয়ে গেছি? মানে আমাদের নতুন আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা কি কমতে শুরু করেছে? তা জানা নেই। কারণ পিক পিরিয়ডের সময়ের পরে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকে বা হঠাৎ করে একসাথে অনেক নিচে নেমে যায়। এটাই পিক আওয়ার পেরিয়ে যাওয়ার লক্ষণ। সেক্ষেত্রে এসব দিকের স্টাডি থেকে সুবিধা পেতে গেলে উপযুক্ত, অবাধ ও প্রচুর ডাটা সংগ্রহে থাকতে হয়। কেবল তবেই এথেকে কোন অর্থপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব যে, করোনাভাইরাসের প্রভাব কমতে শুরু করেছে বা তা চলে যাচ্ছে। কিন্তু যারা টেস্টই কম করে করেছে তাই ডাটাই নাই তাদের পক্ষে লকডাউন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হবে স্রেফ আন্দাজে, কোন ভিত্তি ছাড়াই হয়ত তা ব্যবসার সুবিধার দিকে তাকিয়ে, স্বভাবতই যার ফল হতে পারে করুণ এবং আত্মঘাতি। সেটা এমনও হতে পারে  যে দেখা গেল লকডাউন তুলে নেওয়ার পরেপরেই সত্যিকারের পিক পিরিয়ডটা শুরু হয়েছে আর তাতে না আবার লকডাউন কায়েম বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে, না তাতে ব্যাপক সংক্রমণ শুরু হওয়াতে তা মোকাবিলার সক্ষমতা বা বাস্তবতা আছে।

এর বিপরীতে বাংলাদেশের তথ্যহীন আনাড়ি পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ক্ষতি একটু বেশি হলেও একটা উপায় হতে পারে লকডাউন অতিরিক্ত বাড়িয়ে দিয়ে সম্ভাব্য মানুষ মারা যাওয়ার রিস্ক কমানো।  গতকাল ৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত মনে হচ্ছিল সরকার সম্ভবত এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। কিন্তু রাত আটটার পর থেকে গার্মেন্টস মালিকদের কারখানা খোলার তোড়জোড় দেখে বুঝা যাচ্ছিল মালিকদের লোভ আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা চরমে [BGMEA’s cruel joke] উঠতেছে আর তাদের  লোভের কাছে সরকার হেরে যাচ্ছে।

যেখানে পরিস্থিতিটা হল, আমাদের সংক্রমণের পিক পিরিয়ড আর জানার সুযোগ নাই। কাজেই যত তাড়াহুড়া করে কারখানা খুলব ততই বেশি সম্ভাব্য লোক আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার রিস্ক নেওয়া হবে।  এছাড়া টেস্ট করার কথিত ২৮ কেন্দ্র খুলে সজ্জিত হতে যেখানে এপ্রিলের পুরা মাসটাই লেগে যেতে পারে বলে সরকার থেকে ধারণা দেয়া হচ্ছে।

আবার গত ০৩ এপ্রিল রাতের একটা ডেভেলবমেন্ট জেনে মনে হচ্ছিল সরকার বোধহয় ভাল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। আমাদের লকডাউনের কাল সরকার বোধহয় বাড়াচ্ছে। এমন অনুমান হবার  কারণ, গত ০৩ এপ্রিল রাত সাড়ে দশটার বাংলাভিশন টিভির খবরে দেখা গেল ঢাকা মেডিক্যালের অধ্যক্ষ মতামত রাখছেন যে, আগামী দুই সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক নির্ধারক সময়। তাই ১১ তারিখ পর্যন্ত ছুটি যেটা আছে সেটাকে এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দিতে তিনি সরকারের কাছে পরামর্শ রেখেছেন। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিবেচনা করার মতো অন্যান্য ইস্যু থাকতে পারে: সেগুলো সাথে নিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’ এগুলোই ছিল তার কথার সারাংশ। ফলে মনে হচ্ছিল সরকারি সিদ্ধান্ত এমনটাই হতে যাচ্ছে। এটা হলে একটা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারত। কিন্তু না তা হয় নাই।

যদিও এর আবার অন্য পরিণতি আছে। যেমন ঐ ৩ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ঢাকারই নিম্ন আয়ের মানুষের যেসব নিউজ দেখা গেছে তা এক কথায় খুবই উদ্বেগজনক। রাস্তায় রাস্তায় দান-সদকা টুকিয়ে চলতে তারা রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এজন্য মরিয়া ভাব আছে তাদের মধ্যে, যারা কাজকাম হারা এবং দিন এনে খায়, তারা নিরুপায় – এটাই এর সার কারণ। কিন্তু দান খয়রাতে এরা দু-চার দিন চলতে পারে কিন্তু বেশি দিন চলতে পারবে না। পুরো এপ্রিল বলতে গেলে এ নিয়ে শক্ত ও কমিটেড বিনামূল্যের সরকারি রেশন ধরনের ব্যবস্থা সেক্ষেত্রে তাদের লাগবেই। ইতোমধ্যে রাজশাহী শহরের বাসিন্দাদের অবস্থা নিয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে [রাজশাহীতে ত্রাণের আশায় মোড়ে মোড়ে গৃহবধূরা] তা রীতিমত গভীর এলার্মিং। এটা সব জেলাগুলোর জন্যই কমবেশি এক প্রতীকী চিত্র। এটাকে সাবধান হবার এবং একশন নিবার খবর হিসাবে না নিলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। এব্যাপারে বিশ্বব্যাংক কী কোন কাজে আসতে পারে?

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সহায়তাঃ
হা অবশ্যই পারে। কারণ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক আগে থেকেই করোনার সম্ভাব্য ক্ষতিতে সদস্য দেশের মধ্যে বিতরণের জন্য পায় তিনশ বিলিয়ন ডলার  আলাদা করে রেডি করেছে। ইতোমধ্যেই আশিটারও বেশি দেশ এর সুবিধা নিতে আবেদল জানিয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের ব্যাপারে নিউজ হল, আমরা ইতোমধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলারের অনুমোদন পেয়েছি। তবে এই অর্থের খাতটা মুলত টেকনিক্যাল সক্ষমতা বাড়ানো বা শক্তিশালী করার কাজে ব্যয়ের জন্য […to help upgrade selected health facilities and laboratories to detect, manage and treat suspected and confirmed COVID-19 cases ] এমন ফান্ড। অর্থাৎ এটা মূলত, medical and testing facilities, and the national health system বাড়ানো ও শক্তিশালী করার জন্য। তবে এটা ছাড়াও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বা রিকভারির জন্য যেমন,  দুস্থ ও গরীবদের [15 months to protect the poor and vulnerable] সুরক্ষার জন্য আলাদা করে মোট ১৬০ বিলিয়ন ডলারের আরেক ফান্ড আছে। কিন্তু এই ফান্ড থেকে সহায়তা চাওয়া হয়েছে কিনা তা এই রিপোর্টে স্পষ্ট নয়।

‘জীবন না জীবিকা’, কোনটার অগ্রাধিকার
গত বছর অর্থনীতিতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন সম্মিলিতভাবে তিনজন। এদের মধ্যে কলকাতায় জন্ম নেয়া আমেরিকান নাগরিক ‘অভিজিত ব্যানার্জি’ ও ফ্রান্সের ‘এস্থার দুফলো’ এরা দু’জন ঘটনাচক্রে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। আর সাথে তৃতীয় অর্থনীতিবিদের নাম মাইকেল ক্রেমার। তাদের মধ্যে প্রথমে দু’জন করোনাভাইরাস নিয়ে এক কথোপকথন বা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলাপ করেছেন; যার ভিডিও ক্লিপ ও বাংলায় ট্রান্সস্ক্রিপ্ট ছাপিয়েছে কলকাতার ‘আনন্দবাজার’। সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ছিল এই ভাইরাস আক্রমণের প্রেক্ষিতে কোন রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান – আজকের এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে জীবন না জীবিকা কোনটার ওপর বেশি জোর দিবেন?  কোনটা করা ঠিক হবে? কারণ অর্থনীতির দিকে বেশি প্রায়োরিটি বা মনোযোগ দিতে পারলে ভাইরাস-পরবর্তী সময়ে মানুষের বিশেষ করে জীবিকা বাঁচানো সহজ হতে পারে। যদিও অভিজিতের শেষ কথা হল ” আমি জানি না” [ তিনি বলেছেন, “প্রাণ বাঁচানোর কাজে একটু খারাপ করলে অর্থনীতিকে বাঁচানোর কাজটা হয়তো একটু সহজ হতে পারে … আমি জানি না। বলছি না যে বেছে নেওয়া সহজ কাজ হবে”]।

অর্থাৎ কেউ যদি সেক্ষেত্রে লকডাউন কম সময় রাখা বা শিথিল করে রাখা হতে পারে – এই লাইন ফলো করে তাতে কিন্তু বিপরীতে আবার খোদ জীবনই সঙ্কটে পড়ে যেতে পারে এবং বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। তাহলে?
এখন পর্যন্ত্ প্রকাশিত বাংলাদেশের ঝোঁকটা হল, বিজনেসের স্বার্থকে যথেষ্ট প্রায়োরিটি দেওয়া। এমনকি সময়ে স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে ফেলে হলেও এর বিনিময়ে বিজনেস স্বার্থের পক্ষে থাকা। যেমন, গত দুদিন ধরে গার্মেন্টস খুলে দিবার চেষ্টা করে কর্মিদের জীবনকে দুর্বিষহ করে ফেলা হচ্ছিল। অথচ সরকার শিথিলতা দেখিয়ে এখানে নিজে কোন নির্দেশ দেয় নাই, হস্তক্ষেপ করে নাই। উলটা মালিকদের হাতে সব সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছে। য়ার এতেই বিশৃঙ্খলা চরমে পৌচেছে। এরই মধ্যে আজ ৫ এপ্রিল কিছু কারখানা খুলে উতপাদনেও গিয়েছে। বিশেষ করে আশুলিয়া ইপিজেড। অথচ এতে গভীর স্বাস্থ্য-ঝুঁকি তৈরি করেছে, আর তা কোন কেয়ার করা হয় নাই। আবার কিছু মালিক কর্মিদের ঢাকায় ডেকে এনেও নিজেরা কারখানা না খুলেই (কেউ কেউ আবার দুপুর একটা পর্যন্ত কাজ করিয়ে) বিনা বকেয়া বেতনে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।

এদিকে আবার সরকার  ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বলবত লকডাউন আবার বাড়াবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। যদিও  [ঘোষণা না করা] একটা ঝোঁক হল, লকডাউন আর না বাড়ানো, অন্তত কারখানা ও যানবাহন খুলে দেওয়া।  শেষে এটা ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত অল্প বাড়ানো ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বাড়ানোর এই ধরণটাই সরকারের সিদ্ধান্তের ঝোঁক কোনদিকে তা নির্দেশ করে। যদিও দেশি-বিদেশি টেকনিক্যাল বা ডাক্তারদের পরামর্শ হল বাংলাদেশে  লকডাউন একমাস বাড়ানো অন্তত পুরা এপ্রিল মাস জুড়ে জারি রাখা। বিশেষ করে যখন আমরা আমাদের পিক পিরিয়ড সম্পর্কে কোন ধারণা রাখার সুযোগ নাই।

সারকথায় যত দ্রুত লকডাউন তুলে নেওয়া হবে ততই আমরা মানুষকে তত বেশি স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে ফেলব।  তাই যত দেরি সেটাই ভাল। এই ভিত্তিতে এরপর দরকার একটা ‘অপটিমাম’ অবস্থান। বলাই বাহুল্য তাতে সেটা অবশ্যই জীবন বাঁচানোকে প্রায়োরিটি দিতে হবে।  অভিজিতও বলছিলেন, একজন ভালো নির্বাহী প্রধানের জন্য – জীবন না জীবিকা প্রশ্নে এভাবে বিবেচনা করে একটা ভারসাম্যের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া খুব সহজ কাজ নয়। তাই এখানে প্রুডেন্সি ও দুরদর্শিতা হতে পারে একটা ভাল গাইড। কারণ, এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল সিদ্ধান্তের জন্য বড় খেসারত দিতে হতে পারে। [বাংলাদেশের কিছু ওয়েব পত্রিকাও আনন্দবাজারের রেফারেন্স দিয়ে লেখাটা ছেপেছে।]

ভালো অর্থনীতির মুলাঃ
কেউ কেউ ইতোমধ্যে ভাইরাস-উত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপেক্ষা করছে যেন এক ‘স্বর্ণযুগ’ না হলেও “ভাল সময়” আসবে বলে দেখছেন ও দেখানো শুরু করে দিয়েছেন। এ ধরনের মন্তব্যগুলো নেহায়েতই চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে কথার কথা হিসেবে হলে সে ক্ষেত্রে তাদের এমন কথাগুলো না বলাই ভাল হত। ধরে নিচ্ছি, এগুলো নিছক চাঙ্গা করার জন্য কথার কথা নয়। সে আলোকে : প্রথমত, ব্যাপারটা হল, উত্তর পরিস্থিতিতে ভাইরাস থেকে কে কী দশায় সার্ভাইভ করে আর তা কত কম ক্ষতিতে ইত্যাদি- সেই সার্ভাইভালের গুরুতর প্রশ্ন আছে। সেই পরিস্থিতিটা ভালো দশা হবে কি না তা নিশ্চিত না হয়ে কোনো স্বপ্ন দেখার মানে হয় না। বরং আগেই ‘স্বপ্নে পোলাও-কোরমা খাওয়া’ই মানসিক আঘাত হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ভাইরাস-উত্তর সার্ভাইভাল বা বেঁচে থাকা যদি মারাত্মক লোকসংখ্যার হানি ঘটিয়ে হয় তবে এরপর সেই শক কাটিয়ে থিতু হওয়াই অনিশ্চয়তায় ডুবে যাওয়া অবস্থা হয়ে যেতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যতই আকর্ষণীয় হয়ে হাজির থাকুক তাতে কিছু আসবে যাবে না।

অতএব প্রথম টার্গেট-কাজ-সফলতা হতে হবে যত কম প্রাণহানি ও মানুষের ক্ষতি কম ঘটিয়ে সার্ভাইভ করা বা টিকে যাওয়া। এটা খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপর নির্ভর করছে আমাদের নিজেকে পুনর্গঠনে লিপ্ত হওয়ার যোগ্য থাকব কি না আর সেটা কতটা। এছাড়াও গ্লোবাল পরিসরকে গ্লোবাল ইকোনমি কতটা আর কত দ্রুত চাঙ্গা হতে পারবে আমরা জানি না। এর চেয়েও বড় কথা আমাদের নিয়ন্ত্রণে এটা একেবারেই নাই। বরং আমরা এরই শিয়ার। যেমন। পশ্চিমের ক্রেতা বাজার কত দ্রুত স্বাভাবিক ও থিতু হবে আর এর চেয়ে বড় কতটা ক্রয়ক্ষমতা ফিরে পেয়ে ফিরবে আমরা জানি না। অথচ এটাই আমাদের রপ্তানি, মুদ্রা আয়ের নির্ণায়ক। অর্থাৎ এর জোনটা পুরাই আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন ও অনিশ্চিত।   কাজেই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার সুযোগ নেয়াতে সুফল বেশি আসার সম্ভাবনা বরং বেশি।

এদিকে দেশে বলা শুরু হয়েছে, এক-দেড় মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠবে। গতবার ধান সংগ্রহের পারফরমেন্স ছিল খুবই খারাপ। ‘গোডাউনে জায়গা নেই’ অজুহাতে ধান প্রায় কেনাই হয়নি। পরে তা যতটুকু কেনা হয়েছে সেটাও মিলমালিক থেকে। সব মিলিয়ে সংগ্রহ মূল্য কম ছিল বলে ধান উৎপাদকদের অসন্তোষ উঠেছিল চরমে। এবারের বাস্তবতাটা হল, এক দিকে নিম্ন আয়ের মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে হলে বিনামূল্যে এক-দু’মাসের রেশন দিতে হবে, অন্য দিকে বোরো সংগ্রহের জন্য গুদামে জায়গা থাকতে হবে, বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করে উৎপাদকদের একটা ভালো দাম দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি। এসব দিক ছাড়াও বিবেচনার বিষয় থাকতে পারে। সব মিলিয়ে এ নিয়ে একটা ‘ভালো সিদ্ধান্ত’  সরকারকে একটা ভালো ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে। আবার এ থেকে পাবলিকের মনে এমন ধারণা হতে পারে যে, তাদের জন্য একটা সরকার আছে।

এর উল্টোটাও আছে। পাবলিকের মনে হতে পারে- তাদের জন্য কেউ নেই। আবার ভাইরাস থেকেও পরিত্রাণ নেই। কেউ তাদের জন্য কিছু করার নাই। আবার ভাইরাসে মরব তো, পরে যদি খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি। কাজেই ভাইরাসের কথা ভুলে আগে খাবার সংগ্রহে নামি। এ ছাড়া যাদের খাওয়ার সমস্যা নেই তারা ভাবতে পারে সরকার কিছু করতে পারবে না, কেউ কারো জন্য নয়। কাজেই সরকারের ভরসায় না থেকে অন্যের ঘাড়ে চড়ে তাঁকে মেরে হলেও নিজেই ভাইরাস থেকে আগে বাঁচার চেষ্টা করি। এর মিলিত ফলাফল হতে পারে এক বিশৃঙ্খলা; চরম আস্থাহীনতায় নিয়ম আইন সব ভেঙে পড়া। এমন অবস্থা যেন তৈরি না হয় সে জন্য আমরা কি নুন্যতম কিছু ভাল কিছু আশা করতে পারি না? সেটি কি বিরাট আশা করা হবে?

তেল সর্বনিম্ন মূল্যেঃ
জ্বালানি তেলের মূল্য নেমে তলানিতে ঠেকেছে। গ্লোবালি কলকারখানা মেশিন যান সব স্থবির হয়ে যাওয়ার আরেক বড় চিহ্ন এটা। অতএব তেলের বিক্রি নেই, দাম সর্বনিম্ন তাই। কিন্তু কত নিচে?

অ্যামেরিকান ওয়েষ্টার্ণ টেক্সাস (বেঞ্চমার্ক) মার্কা জ্বালানি তেল যেটা – এটাই ভাইরাসের প্রকোপের আগে ৫৩ ডলারে ছিল, যেখান থেকে নেমে তা মাত্র ২১ ডলারেও পৌঁছেছিল। তবে আজ তা ২৭ ডলার। গত দু-তিন বছরে তেলের দামের প্রধান নিয়ামক হয়ে আছে সৌদি আরব যার পলিসি হল, টেক্সাস ক্রুডকে চাপে রাখা। পঞ্চাশ ডলারের আশপাশে দাম রাখলেই টেক্সাস চাপে থাকে। এ ক্ষেত্রে আরেক প্লেয়ার, পুতিনের রাশিয়া এতে খুশি যা আবার কিছু দুঃখ মিশানোও। কারণ এক দিকে আমেরিকা চাপে থাকলে সে খুশি। এটাই সে লবি করার চেষ্টা করে সৌদিদের সাথে। আবার অখুশি, কারণ সে নিজেও তেল বেচে বেশি দাম পায় না। গত ২০০৮ সালের দিকে ১৭৩ ডলারের তেল- মনে হয় না সে দিন দুনিয়াতে আর কোনো দিন ফিরবে।

এক কথায় এখন গ্লোবাল সব উৎপাদন প্রায় একসাথে সব খানে স্থবির হয়ে আছে অর্থাৎ চাহিদা পড়ে গেছে। কিন্তু আগামিতে অর্থনীতি আবার চলতে শুরু করলে দাম আবার বেড়ে আগের জায়গায় যাবে। ৫০-৫৩ ডলারের আশপাশে ফিরে আসবে, অবশ্যই। অতএব, যারা এখন তেলের কম দাম এটা দেখিয়ে ভাইরাস-উত্তর আসছে দিন ভাল হবে বলে আশার বাতি দেখাচ্ছেন এটা বাস্তবত তেমন আশার কিছু নয়। এটা অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যা আশা। কারণ, এমনিতেও ৫০-৫৩ ডলারের তেল গ্লোবাল অর্থনীতির জন্য তেমন বেশি মনে করা হয় না। তেলের দাম নয়, আসলে মূল ফোকাস হতে হবে গ্লোবাল অর্থনীতির ভালো চলতে দেখা। যেমন ভারত। তেলের দাম যখন ৫০-৫৩ ডলারের মধ্যে ছিল, তা সত্ত্বেও এর সুবিধা ভারত তখন তেমন নিতে পারেনি। কারণ অন্য নানা কারণে ভারতের খোদ অর্থনীতিই স্থবির হয়ে আছে। অতএব, সারকথা গ্লোবাল ইকোনমি একটু ভালো হতেই (ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসতেই) তেলের দামও আবার ৫০-৫৩ ডলারের স্তরে উঠে যাবে। কাজেই এখন তেলের দাম কম থাকা নিয়ে লোভ দেখানোর কিছু নেই। আর তেলের দাম কম থাকার চেয়েও গ্লোবাল অর্থনীতি চাঙ্গা থাকা এটা বরং আমাদের মতো অর্থনীতির জন্য একটা ভালো সময়ের নির্ণায়ক। অবশ্য সৌদি কোয়ালিটির (ব্রেন্ট) তেল সব সময় ৬-১০ ডলার বেশি থাকে, মানে সেটাও ৬০-৬৩ ডলারে চলে যাবে।

টাকার অবমূল্যায়নঃ
অনেকে করোনাভাইরাস-উত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়নের জন্য পরামর্শ রাখছেন। এটা কোন ভালো পরামর্শ না এমন মনে করার কারণ আছে। সাধারণত কোন একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধসে গেলে বা ডুবে গেলে কেবল সেই পরিস্থিতিতেই অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিলে তা কার্যকর হতে পারে। অবমূল্যায়ন কথাটার খাড়া মানে হল, যেন নদীতে ডুবে যাওয়ার পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে ফেলে দেয়া। উদ্দেশ্য, বাজারের সবার ক্রেতাকে আমার ক্রেতা বানানো, কাছে আনা। কারণ সবাই (ধরাযাক) এক ডলারে একটা শার্ট দিলে আমি বেশি, (ধরাযাক) দুটো দেই। এটাই টাকার ‘অবমূল্যায়ন’।

এটা কাজ করে কেন? কারণ য়ামার অবমুল্যায়নে আমাকে অন্যরা তুলতে এলে আমি অন্যদের কিছু কিছু করে ডুবিয়ে বিনিময়ে অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে উঠতে পারার সুবিধা নিতে পারি। টার্কিশ লিরা (২০০৯ সালে) ডুবে গেছিল; সেই লিরা অবমূল্যায়ন করেই নিজেকে বাচিয়েছিল। অর্থাৎ একটা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমস্যা হলে এটা কার্যকর হবে। একইভাবে ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বস নামিয়েছিল জর্জ সোরেসের হেজ ফান্ড কোম্পানী। সেখানেও রিংগিতের অবমূল্যায়নে পরিত্রাণ পাওয়া গিয়েছিল। মূল কারণ, একটাই রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল তাই।

কিন্তু অবমূল্যায়ন পুরোটাই অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। কখন? যখন সময়টা গ্লোবাল রিসেশন বা মহামন্দায় আছে বা সম্ভাবনা আছে এমন সময়ে। অর্থাৎ একসাথে অনেক রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ এমন এক গ্লোবাল পরিস্থিতি।  দেখা গেছে, এমন সময়ে একটা রাষ্ট্র নিজের মুদ্রার অবমূল্যায়নে গেলে তার লেজ ধরে অন্য সবাই অবমূল্যায়নে চলে যেতে পারে। এতে সামগ্রিক এফেক্ট বা ফলাফল হবে শূন্য। এই অবমূল্যায়নে কোনো একটা রাষ্ট্র বা কেউ বেশি ক্রেতা পেয়ে যাবে না। কিন্তু সব পণ্যের মূল্যই পড়ে যাবে। আজ পর্যন্ত সব গ্লোবাল মহামন্দার কালেই এমন গণ-অবমূল্যায়ন ঘটানো হয়েছিল। ফলে সকলেই আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তাই একালের একটা চোস্ত প্রমাণ হল, গ্লোবাল রিসেশন বা মহামন্দার বিপদের গন্ধ পেলেই আইএমএফ দ্রুত জি৭ গ্রুপের মিটিং ডাকার জন্য লবিং শুরু করে। আর সেই মিটিং থেকে প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয় যে, কেউ অবমূল্যায়নের পথে যাবে না। কারণ এক রাষ্ট্র অবমূল্যায়নে গেলে বাকি সবাই একই পথে গিয়ে ফলাফল শূন্য করতে চাইবে। তাতে এই প্রতিযোগিতাই গ্লোবাল মহামন্দাকে নিশ্চিত করে ফেলে।

তাই, গ্লোবাল মহামন্দার আমলে আমাদের টাকার অবমূল্যায়ন করতে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। সার কথায়, যখন শান্ত নদী তখন ডুবে যাওয়ার চেষ্টা বা অবমূল্যায়নের চেষ্টা করা যেতে পারে এবং তা কার্যকর করা যাবে। কিন্তু যখন নদী অশান্ত, তখন ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করলে অন্যরা সবাই আমাকে তোলার বদলে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে উঠতে চেয়ে পরিণতিতে সবাই ডুবে যায় বলে এটা অকার্যকর এবং এর পরিণতি গ্লোবাল রিসেশন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ০৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  ভাইরাসের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী

গৌতম দাস

 ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2VO

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। এখন কোনো দেশী অথবা বিদেশী মিডিয়া যেটাই খুলা যাক, দেখা যাবে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ নিউজের বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে এই ভাইরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। দুনিয়াতে এখন এই ভাইরাসের প্রভাব এতই মারাত্মক। আরেক অদ্ভুত দিক হল – যা আমাদের ঘরে ঘরে ঠিক তা দুনিয়াজুড়েও – আগে দেখা যায়নি এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি।  শুধু আমরাই যার যার ঘরে বন্দি নয়, এটা সারা দুনিয়ারই চিত্র। ভাইরাস দাবি করছে “নো কনটাক্ট”, কোন যোগাযোগ লেনদেন ্সব বন্ধ করতে হবে। অথচ  ব্যবসা বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের যোগাযোগই অর্থনীতি।  তাই সোজা মানে দাঁড়াল, আমরা ভাইরাস মোকাবিলায় যত সচেষ্ট ও সফল ততই যেন অর্থনীতি বিকল হবে – এ’এক অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে এখন আমরা দুনিয়ার সকলে।  সামগ্রিক এই পরিস্থিতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা একটা গ্লোবাল মহামন্দার দিকে যাচ্ছি, কেউ কেউ অবশ্য দাবি করছেন, আমরা ইতোমধ্যেই মন্দায় প্রবেশ করে ফেলেছি [Clear We Have Entered Recession That Will Be Worse Than 2009: IMF Chief]।

জি৭  ও জি২০
মহামন্দার শঙ্কা যে সবাইকে ভীত করে ফেলেছে এর সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হল, অকালে প্রথমে ‘জি৭ [G7]’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠক। আর পরে ‘জি২০’ [G20] অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক। কিন্তু এর আয়োজনের ধরন বলে দিচ্ছে, এ ধরনের গ্লোবাল সামিট হচ্ছে যার যার দেশে বসে ভার্চুয়ালি মানে ভাবের মধ্যে, যা দেড় ঘণ্টার এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ মাত্র। এখনকার আরেক গ্লোবাল হয়ে ওঠা শব্দ হল ‘ডিস্টান্সিং’ [distancing]। এর মানে হল, কাছে এলেও দূরে দূরে থাকা। প্রথমত আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বন্দী হয়ে বাস করতে হবে সবাইকে কিছু দিন বা হয়ত মাস। আর এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে যদি দেখা করতেই হয় তবে পাঁচ-সাত ফুট দূরে দূরে থেকে কথা বলতে বা লেনদেন করতে হবে। স্বভাবতই এমন গ্লোবাল পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার ঘণ্টা বাজারই এমন সময়ে ইমার্জেন্সি গ্লোবাল সামিট হবে দেড় ঘণ্টার, এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ – এটাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রজোট জি৭ সদস্য রাষ্ট্রগুলো হল – আমেরিকা, কানাডা আর সাথে আরো চার ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং এশিয়ার একমাত্র জাপান। এভাবে গ্লোবাল (মুলত) অর্থনীতিক পলিসিতে  সাত রাষ্ট্রের এক সমন্বয় গ্রুপ জি৭। এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপ জি৭-এর কোন রাজনৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা না থাকলেও তারা এক বিশেষ ক্ষমতার। কারণ কোনো ইস্যুতে (সাধারণত অর্থনীতির ও গ্লোবাল ইস্যু) তারা একমত হয়ে গেলে এর প্রভাব বাকি সব রাষ্ট্রের উপর অনেক বড় ও নির্ধারক হয়ে ওঠে। এর একটা বড় কারণ হিসেবে যেমন বিশ্বব্যাংকের মালিকানাই ধরা যাক; জি৭ দেশগুলোর বিশ্বব্যাংকের মালিকানা সব মিলিয়ে মোট ৩৫% এর বেশি হবে, যেখানে আমেরিকার একা মালিকানা  ১৮% এর মত। ফলে স্বভাবতই তাদের ঐক্যমতের সিদ্ধান্ত বাকি সবার জন্য অনেক ভারী ও খুবই নির্ধারক।
তবে উপরের কথাগুলো অতীত ঘটনা হিসেবে বলা সম্ভবত বেশি সঙ্গত।  কারণ এরা ‘পুরান জমিদার’, যার ঠাটবাট আছে কিন্তু বাস্তব মুরোদ আর নেই; শুকিয়ে ফোকলা হয়ে গেছে। পুরানা মাতবর আমেরিকার জায়গায় চীন এসে প্রবেশ করাতে আস্তে আস্তে অনেক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে, রঙ ফিকে হয়ে পড়ছে। আর সেই সাথে নতুনের আভা দেখা যাচ্ছে।
যদিও জি৭ নিয়ে অনেকে সবচেয়ে বিরক্তিকর ভাষায় বলার চেষ্টা করেন, এরা নাকি “সেভেন ডেমোক্রেসিজ”। কেন? চীনের বিরুদ্ধে পুরান ডাট দেখানোর জন্য। এমনিতেই ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটাই তৈরি করা হয়েছিল পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোপানোর জন্য   অ্যামেরিকান শব্দ হিসাবে। অরিজিনাল ক্লাসিক শব্দটা ছিল রিপাবলিক, এর বদলে ডেমোক্রেসি শব্দের আমদানি।  এছাড়া, একালে একা চীনা নেতৃত্বেই পাল্টা বিকল্প-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক হতে চাইবার মত প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে গেছে। জি৭ বা এর সদস্যরা এখনো (মুরোদ না থাকলেও গুণ-মানে) চীনের চেয়ে তারাই ভাল, এমন ভাব ধরার জন্য এটা বলে থাকে। ফ্যাক্টস হল একা চীনের এখন ঋণ- বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি। সে কারণে চীনা নেতৃত্বের নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই মাথা তুলছে, প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। মূলকথা, ইতোমধ্যেই তারা বিকল্প হিসেবে নিজেদের হাজির করে ফেলেছে। যেমন এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিশ্বব্যাংকের বদলে সরাসরি চীনের বা চীনের ‘বিশ্বব্যাংকে’র কাছে অবকাঠামো ঋণ নিতে যেতে পারেন।
আসলে লাশের বাক্সে শেষ পেরেকটা মেরেছে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street]। মানে, গ্লোল্ডম্যান স্যাসের [Goldman Sachs] মত দানবীয় বড় বড় অর্থবিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতীকী উপস্থিতি বা প্রধান অফিস যেখানে। গত ২০০৯ সালে তারা আওয়াজ তুলে বলেছিল জি৭ গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। কারণ এদের অর্থনীতি আর আগের মতো নয়, তাকত নাই বরং ঢলে পড়েছে। আর পালটা ততই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছে “রাইজিং ইকোনমি” [Rising Economy] বলে পরিচিত আরেক ক্যাটাগরির দেশগুলো যাদের জিডিপি সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে দ্রুত বাড়ছে। কাজেই ‘তাদেরও পুরানা জি৭-এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে আলাদা পরিসরে  জি২০ নামে জোট গড়া হোক। এই দাবি ছিল এমনই এক বাস্তবতা, যে তাই জি২০ গ্রুপ কার্যকর হয়ে যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করেন এরা দুনিয়ার টপ ২০টা ইকোনমির একটা গ্রুপ। সেটা যতটা না সত্যি, এর চেয়েও সত্য হল, চীন মানে যার নিজের আছে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাবাজার, সাথে আছে এর চেয়েও বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্য দেশে ঋণ-বিনিয়োগদাতা হয়ে হাজির হবার সক্ষমতা; আর পাশে ভারত যার অভ্যন্তরীণ ১৩৬ কোটির বড় ভোক্তাবাজার আর, উৎপাদন সক্ষমতার পটেনশিয়াল আছে; এ ছাড়া ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকা থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত মিলে গঠিত হয়েছে এই জি২০। তাই গত সপ্তাহে (২৬ মার্চ) জি২০ এর ভিডিও কনফারেন্সের নয় দিন আগে (১৭ মার্চ) জি৭-এর একই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হইয়ে যায়। বলাবাহুল্য, জি৭ জি২০ এর অংশ অবশ্যই। আর প্রতিটি জি২০ বৈঠকের আগে জি৭-এর সভা হয়ে যায়, যাতে ‘জি৭-ওয়ালা’রা মাতবরি নিবার সুযোগ পেয়ে গেলে জি২০-এর বৈঠকে একই স্বরে কথা বলতে পারে।

এদিকে ভাইরাসের ব্যাপকতায় এখন আর লুকানো থাকছে না যে, আসন্ন এক গ্লোবাল মহামন্দার মখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা সকলে। তাই জি২০ অর্থমন্ত্রীদের ভিডিও কনফারেন্সের মূল কথাটা ছিল, তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন অর্থ ঢালবেন যাতে গ্লোবাল বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এনিয়ে তাই রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম G20 leaders to inject $5 trillion into global economy in fight against coronavirus। জি২০ এর এখনকার চেয়ারম্যান সৌদি আরব। তার নেতৃত্বেই এ ঘোষণা দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার মানুষের চাকরি আর আয়ের ক্ষতি থেকে তাদের রক্ষা ও তা ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এনিয়ে আলজাজিরার শিরোনাম হল, ‘কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে গ্লোবাল অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াইয়ে জি২০-এর পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি [  G20 pledges $5 trillion to defend global economy against COVID-19]।

কিন্তু তাহলে জি৭-এর বিবৃতি বা রিপোর্ট কই? সেখানে কী বলা হয়েছে?
সরি, সেটা নাই। কেন?  এর কারণ আসলে জি৭-এর সভা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেখান থেকে কোনো যৌথ বিবৃতি দিতেই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে। আর বলতে গেলে, এর কয়েকদিন পরে জি২০ থেকে ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

কেন জি৭ ব্যর্থ হল? কারণ, আমেরিকা একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে।  তাই এর খাড়া জবাব হুল, ট্রাম্পের আমেরিকা এক দায়িত্বজ্ঞানহীন তৎপরতা এর জন্য দায়ী। সেটা কীভাবে? এবার জি৭-এর সভা ছিল মূলত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে ঐ সভায় উপস্থিত মানে ভার্চুয়ালি ওয়েব কনফারেন্সে হাজির ছিলেন। আর তিনি যেন চাকরি রক্ষার্থে পাগলা প্রেসিডেন্টের আনুগত্যের এক চরম দশা দেখাতেই নিজের কোন বিদ্যাবুদ্ধিও খরচ করেন নাই। আর তাতেই বিবৃতি ড্রাফটের সময় তিনি গোঁ-ধরে বসেন যে, ভাইরাসটাকে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নয়, বরং ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলতে হবে। আর এতে স্বভাবতই ইউরোপীয়সহ কোনো সদস্য রাষ্ট্রই তা মানতে রাজি না হওয়ায় সব নস্যাৎ হয়ে যায়। সদস্যরা আর একমত হতে পারে নাই। কারণ তারা মনে করেছিল যখন ভাইরাস সামলাতে ঐক্য দরকার তখন একাজ হবে বিভক্তি তৈরি করা  [viewed it as needlessly divisive at a time when international cooperation is required to slow the global pandemic …]। ফলে ড্রাফট আর ফাইনাল পর্যন্ত যায় নাই। তবে এতে পরবর্তিতে ট্রাম্পকেই এর সব ‘কাফফারা’চুকাতে হয় অবশ্য।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী নভেম্বর মাসে। আর ট্রাম্প এবারো এতে প্রার্থী। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি চীনের বিরুদ্ধে এক বিরাট লড়াকু যিনি এই প্রথম জাতিবাদী-আমেরিকান হয়ে চীনের বিরুদ্ধে কথিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ লড়ছেন। এ্মন ইমেজ আর প্রপাগান্ডা জোরদার করতেই তিনি কোভিড-১৯ কে ‘য়ুহান ভাইরাস’ [চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী য়ুহানে সর্বপ্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়] বলে ডাকার বালকসুলভ আবদার ধরে বসেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, এমন প্রপাগান্ডায় কোন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তা করতে ট্রাম্প পারেন নাই। অক্ষম; তা এখন প্রমাণিত। কেন?
প্রথমত, সারা দুনিয়া মারাত্মকভাবে ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছে; হিমশিম খাচ্ছে যে, কী করে নিজ নিজ দেশের মানুষকে বাঁচানো যায়, মৃতের সংখ্যা কমানো যায়। যাতে এতে ন্যূনতম সফলতা আসা শুরু হলেই, এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা যাতে ভাইরাসের ক্ষতির উপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে না পারে তাই এর মোকাবেলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। অথচ ট্রাম্প এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে তিনি আছেন তার ব্যক্তিগত সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, তথা নির্বাচন নিয়ে। এছাড়া ট্রাম্পের এই অবস্থান নেয়া গ্লোবাল ঐক্যের বদলে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।
দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ী করার জন্য ট্রানপের দাবিই তো ধারাবাহিক নয়। যেমন, ঘটনার শুরুর দিকে তিনিই বিবৃতি দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছেন যে, চীন উদার হয়ে এই ভাইরাস সম্পর্কে সব তথ্য ও আপডেট খোলাখুলিভাবে আমাদেরসহ সবাইকে জানাচ্ছে শেয়ার করছে বলে। নিচের টুইট দেখেন।

কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিক সিনেটর টম কটন “করোনা চীনের জীবাণুযুদ্ধের অস্ত্র” যা “সম্ভবত হাত ছুটে বাইরে এসে পড়েছে” বলে অভিযোগ তোলেন। আর তা থেকেই ট্রাম্পের বয়ান ও অবস্থানও বদলে যায়। অথচ কটন তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি [Cotton provided no evidence for the claim and asserted that it was the Chinese government’s job to disprove it.]। বরং একটা ‘সম্ভবত’ বলেছেন। অর্থাৎ নিশ্চিত করে, এমন শব্দ দিয়ে নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে চীনও আমেরিকাই এই জীবাণু চীনে ছড়িয়েছে বলে পাল্টা দাবি জানায়। এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই ট্রাম্প ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলে তার প্রপাগান্ডা চালু করে দিয়েছিলেন। আর চীন এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয়া শুরু করে ছিল ১৭ মার্চ থেকেই।  কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থানের অসঙ্গতি হল, তাহলে শুরুতে তিনি কেন চীনের প্রশংসা আর ভাইরাস সামলানো ও তথ্য সবার সাথে শেয়ার করার প্রশংসা করেছিলেন।
ট্রাম্পের প্রপাগান্ডা করার ব্যাপারটাকে পাঠকের নিজেই বিচার ও বুঝে দেখার জন্য একটা ভিডিও এখানে আছে আগ্রহিরা এটা দেখতে পারেন
তৃতীয়ত, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপ  অসংলগ্ন অবস্থানের ট্রাম্প-এর হাত ছেড়ে দেয়া ছাড়া নিজেরাই নিরুপায় বোধ করেছিল। সে কারণে ‘জি৭’ ভিডিও কনফারেন্স  হয়ে পড়েছিল অকার্যকর ও স্থবির। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতির দুর্দশার মুখে নতুন উদ্যোগের এক ধারাও শুরু হয়েছিল। এর লিড নিতে আসে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু [WHO, World Health Org]। সংস্থাটি পরিষ্কার করে বলেছে এভাবে ‘উহান ভাইরাস’ বলে চীন-এশিয়া বা কোনো অঞ্চলকে দায়ী করা ঠিক নয়। এ কারণেই আমরা এর নাম কোভিড-১৯ বলে স্থির করেছিলাম”। ’সবচেয়ে কড়া কথাটা বলে ট্রাম্পকে সাবধান করেছেন হু এর এক নির্বাহী পরিচালক ডঃ  মাইক রায়ান। তিনি বলেন, ভাইরাসের কোন রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। আপনি কোন জাতি কোন রেস, গায়ের রঙ কী অথবা ব্যাঙ্কে আপনার কত টাকা আছে ইত্যাদি এসবের পরোয়া করে না। অতএব ভাষা ব্যবহারের সময় সাবধান – এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমরা এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারি না যেটা কোন বিশেষ জনগোষ্ঠির জাত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি তৈরি করে বসতে পারে”।

“Viruses know no borders and they don’t care about your ethnicity, the color of your skin or how much money you have in the bank. So it’s really important we be careful in the language we use lest it lead to the profiling of individuals associated with the virus,”  Dr. Mike Ryan, the executive director of WHO’s emergencies program,

বলতে গেলে ট্রাম্পকে তিনি একেবারে ছেঁচা দিয়ে যেন বলেছেন – আপনি কথা বলার আদব জানেন না; দায়ীত্বজ্ঞানহীন।  এযেন বলা আপনি ট্রাম্প এক রেসিষ্ট[racist], তাই আপনি চীন বা এশিয়ার কোন অঞ্চলের মানুষদেরকে নিচা দেখাতে তাদের দায়ী করছেন। আর এঘটনার পর সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে তাঁর রেসিজম বা বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য ছেঁকে ধরেন। উপরের লিঙ্কটা এক অ্যামেরিকান মিডিয়া CNBC থেকে নেয়া। ওখানে শুরুতে একটা ভিডিও ক্লিপ আছে আগ্রহীরা তা দেখে নিতে পারেন।

এরপরেই আসলে দ্রুততার সাথেই অবশেষে একটা সন্ধি হয়। যার প্রকাশ ঘটানো হয় আমেরিকায় চীনের রাষ্ট্রদূত, অন্য কথা প্রসঙ্গে আমেরিকান এক প্রেসের কাছে কথা বলার সুযোগ নিয়ে “চীন-আমেরিকার পারস্পরিক অভিযোগ তোলা থেকে” তিনি “দূরে থাকতে চান” বলে জানিয়ে দেন।  এই কথাটাকে হংকং এর এক মিডিয়া লিখেছে, “এতে পরিপক্ক আচরণ আবার শুরু হয় যখন চীনা বিবৃতিতে আকুল আবেদন জানানো হয় যে প্যান্ডেমিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, আর এতে ট্রাম্পও তারপর থেকে চাইনিজ ভাইরাস বলা বন্ধ করেন [Adult behaviour resumed as statements out of China urged the world to unify against the pandemic; Trump stopped calling it a “Chinese virus”.]।

ট্রাম্প এবার ২৪ মার্চে  প্রেসের কাছে বলেন যে, “তিনি করোনার জন্য জন্য চীন বা এশিয়ার কেউ দায়ী বলে মনে করেন না”।  মানে পুরা উলটা সুর এবার।  আর তাতে কয়েকদিন কূটনীতিতেই জি৭-এর ব্যর্থতার পরও ২৬ মার্চ জি২০-এর ভার্চুয়াল সভা থেকে সাফল্য আসে, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে ভাইরাসকে সবার জন্য বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে সবার জন্য ‘কমন হুমকি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।  ইতোমধ্যে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ডলার ছাড় করার জন্য তার পরিকল্পনা এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দেন। এক কথায় বললে, ট্রাম্পকেই নিজের ফেলা থুথু চেটে তুলে নিয়ে বিতর্ক শেষ করতে হয়। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো রিপোর্টিং করেছে হংকংয়ের ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। তারা ট্রাম্পের কান্ডকারখানা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনি কখন কী বলেছেন এনিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে।

ঘরের খবরঃ
এবার ‘ঘরের খবরে’র দিক। করোনাভাইরাস মানেই, এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে, যা মানুষ জানে তা হল, মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখা বা থাকা। আইসোলেশন বা ঘরে বন্দী হয়ে থাকা। ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে ছোঁয়া এড়িয়ে থাকা। কিন্তু এটা খুবই ব্যয়বহুল প্রতিকার। কেন?
দেশের মানুষকে তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাস (বা হয়ত এরও বেশি) একনাগাড়ে ঘরে বন্দী করে রাখার সোজা মানে হল, ওই সময়ের জন্য অর্থনীতি স্তব্ধ অচল করে রাখা। প্রতিটা স্থানীয় দেশের এবং গ্লোবাল দুই অর্থেই। অথচ সবার খরচ আগের মতোই। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন এক এস্টিমেট হচ্ছে ভারতের ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ৮০ কোটিকেই তাদের ভর্তুকি বা পুরা রেশন সরবরাহ করতে হবে, তাতে ভারতের রাজস্ব আয়ের ঘরের অবস্থা যাই থাকুক না কেন [The government aims to distribute 5kg of wheat or rice for each person free of cost every month, with 1kg of pulses for every low-income family, helping to feed about 800 million poor people over the next three months.]। ওদিকে পাকিস্তান করোনায় আক্রান্তদের ১২ হাজার রুপি করে অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ঘোষণা খুবই অপ্রতুল বা অগোছালো মনে হয়েছে। সব ঘটনা-দুর্ঘটনা একদিন না একদিন শেষ হয়েই যায়, করোনার প্রভাবও একদিন শেষ হবে। কিন্তু ততদিন আমাদের মানুষদের নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে হবে। এভাবে এথেকে যদি টিকে যেতে পারি, তা হলে আবার নতুন উদ্যোমে অর্থনীতি চালু করার সংগ্রামে নামতে পারব। কিন্তু ততদিন (অন্তত তিন-ছয় মাস) নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।  অথচ  আমাদের সরকার কেবল গার্মেন্টসশ্রমিকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেছেন। এর বাইরে শহরের রিকশাচালক থেকে গ্রামের দিনমজুর পর্যন্ত কথিত ইনফরমাল শ্রমিকদের কথা ভেবে আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা থাকতে হবে যা আমরা দেখছি না। যদিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু আছে হয়ত স্থানীয় উদ্যোগে। কারণ, তাঁরা যদি না খেয়ে ঘরে বা রাস্তায় মরে পড়ে থাকলে সেটা নিশ্চয় আমাদের জন্য ভাল অভিজ্ঞতা হবে না। বরং সেটা মহাবিপর্যয়কর কিছু একটা হবে। নিজের মুখ নিজেকে দেখানো  যাবে না এমন অবস্থা হবে। তাই যেভাবেই হোক এর জন্য ফান্ড জোগাড় করার  দায় আমাদের সরকারকে নিতেই হবে। অন্তত কথা বলতে হবে।
ইতোমধ্যেই মোট প্রায় ১৯০ এর বেশি সদস্যের মধ্যে  ৮০টি সদস্যরাষ্ট্র আইএমএফের কাছে লোন চেয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা কী, ঋণ-অনুদানের ব্যবস্থা কী আছে, জানতে হবে। এসবের মধ্যেই পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকদের দুর্দশা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ওদেরকে পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করে সামলানো যাবে না। এটা কোনো সমাধানই নয়। রাস্তায় গরীব মানুষ কাজে বা কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়লে কী করতে হবে এনিয়ে পুলিশের প্রতি নির্দেশ বাস্তবসম্মত, সম্মানজনক ও উপযুক্ত হতে হবে। এটা ২০২০ সাল। এখনো না খেয়ে মানুষ মরলে তা ঘটবে একমাত্র কুশাসনের কারণে। প্রধানমন্ত্রীকে ইনোভেটিভ হতে হবে। বিকল্প খুজতে হবে প্রোএকটিভ হয়ে। যারা বুড়া বয়েসে নির্বাহী প্রধানের ধামাধরা সুযোগ না পেলে নিজ উদ্যোগে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মসংস্থানের আর যোগ্যতা রাখে না এরা ইনোভেটিভ হবে এটা কষ্টকল্পিত। খেটে খাওয়া মানুষদের বাঁচাতে হবে। এটাই এক সফলতার চিহ্ন হবে। আর তা যদি সফল হই তবেই এরপরে আসন্ন গ্লোবাল মহামন্দা মোকাবিলার যোগ্য হব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  ভাইরাসে বেঁচে গেলেও গ্লোবাল অর্থনীতিতে কী হবে“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

বিচারপতি গগৈ বিজেপির সাথে আসাম মিশনে

বিচারপতি গগৈ বিজেপির সাথে আসাম মিশনে

গৌতম দাস

২৩ মার্চ ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Vh

 

মোদী ও গগৈ_

আজব খবরটা হল, ভারতের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ভারতের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট বা উচ্চকক্ষ বলে পরিচিত- রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন। তিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত; সব মিলিয়ে এক বছরের কিছু বেশি সময়। অর্থাৎ গগৈ মাত্র চার মাস আগেও ভারতের প্রধান বিচারপতি ছিলেন ।

একজন বিচারপতির সাথে  পার্লামেন্টের কোন এমপি বা আইনপ্রণেতার সম্পর্ক হল – আইনপ্রণেতা কনস্টিটিউশন মেনে আইন প্রণয়ন করছেন কি না, সেটা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচারপতির। অর্থাৎ একজনের কাজে চেক এন্ড ট্র্যাকে আনার দায়িত্ব অন্যজনের। কাজেই কোনো বিচারপতি  অবসরে গিয়ে নিজেই আইনপ্রণেতা হয়ে যেতে পারেন এটা অকল্পনীয়। এসব বিচারে কোন বিচারপতিরই অবসরে যাবার পরেও নির্বাহী বিভাগের ভিতরে কাজে ঢুকে পড়া, কর্মচারি হয়ে পড়া ইত্যাদি এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। ঠিক যেমন একজন বিচারপতি যে কোন সামাজিক আসরে এমনকি কখনও কখনও পারিবারিক আসরে অংশও নিতে পারেন না, কারণে সেখানে এমন কোন লোকের সাথে সাক্ষাত হয়ে যেতে পারে যিনি আদালতে বিচারাধীন কোন মামলায় কোন পক্ষের লোক। এটা কোন অযাচিত সন্দেহ সৃষ্ট করে ফেলতে পারে। তাই এমন আসর তার এড়িয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করা হয়।  হয়ত তিনি বাস্তবে খুবই সৎ তবুও নিজে থেকেই কারও কোন সন্দেহের উর্ধে থাকতে ও এড়াতে এসবের বাইরে হাত পরিস্কার থাকতে তাকে সাহায্য করে। এভাবে অনেকেই বিচারকদের এসব  এড়িয়ে চলাই সঠিক মনে করেন।  প্রশ্নটা বিচারকের ব্যক্তিজীবনের অধিকারের প্রশ্নের চেয়েও নিজেকে যেচে স্বচ্ছ ও পরিস্কার রাখার প্রশ্ন।

তবু অনেকে মরিয়া আর গোয়াড় হয়ে তর্ক তুলেছেন ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকারও তো রাজ্যসভার মনোনয়ন গ্রহণ করেছেন। তাহলে প্রধান বিচারপতি গগৈর এর বেলায় দোষ কী? এখানে আসলে যারা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগের আলাদা রেখে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না তাদেরকে এসব বুঝানো যাবে না।   একজন ক্রিকেটারের নির্বাহি বিভাগের সাথে লাভজনক সম্পর্ক তেমন কোনই সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যেমন একজন বিচারক এটা একেবারেই পারেন না। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে আইন করেই বিচারককে এজন্য দূরে রাখা হয়েছে।

রঞ্জন গগৈকে রাজ্যসভার সদস্য পদে মনোনয়ন দিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। ভারতের রাজ্যসভা বা কাউন্সিল অব স্টেটস ( রাজ্যসভার অফিসিয়াল ইংরাজি নাম Council of States) হল রাজ্যগুলোর স্বার্থের একধরণের পরামর্শক সভা-প্রতিষ্ঠান।  রাজ্যসভার সদস্যরা মূলত ভারতের মোট ২৮টা রাজ্যের (সাথে কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেরও) বিধানসভার মাধ্যমে মনোনীত হয়ে থাকেন। যেখানে বিধানসভা মানে ভারতের রাজ্য (প্রাদেশিক) পার্লেমেন্ট। রাজ্যসভার জন্য মনোনীত এমন মোট সদস্য ২৩৮ জন। এর সাথে আরও সর্বোচ্চ ১২ জন থাকেন প্রেসিডেন্টের মনোনীত। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৮০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী – সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা এবং সামাজিক বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্টের হাতে রাজ্যসভার সদস্য পদে মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে। এই যুক্তিতে একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিকে প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি মনোনীত করতে সরাসরি আইনগত বাধা না থাকলেও এই মনোনয়ন মরালিটির কিংবা রাষ্ট্রের ন্যায়-নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ও দায়ের দিক থেকে স্ববিরোধী। সাবেক বিচারপতিরা অবসরে যাওয়ার পরে সরকারি পদে নিয়োগ বা সুযোগ সুবিধা নিতে পারবেন না – এমন কথা রাজ্যসভার রাষ্ট্রপতির মনোনয়নের বেলায় স্পষ্ট করে আইনে উল্লেখ না থাকাতেই এখানে গগৈ-এর মনোনয়ন পাবার সুযোগ দেয়া ও নেয়া হয়েছে। যেমন, রঞ্জন গগৈ শপথ গ্রহণের পরে সাফাই গেয়ে বলেছেন, “প্রেসিডেন্টের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেন নাই” [President requests for your services, you don’t say no.]। এই অজুহাত খুবই হাস্যকর ও তাঁর অসততার পক্ষে সাফাই। গগৈ কী জানেন না রাষ্ট্রপতির এসব মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে একাজের পরামর্শ সরাসরি নির্বাহি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আসে। সেই মর্মে প্রধানমন্ত্রী অফিস থেকে পরামর্শের ফাইল প্রেরণ করা হয়। এবং তা অনুসরণ করা প্রেসিডেন্টের কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা!  কাজেই নমিনেশন দানের জন্য এভাবে প্রেসিডেন্টকে ভগবানের আসনে বসানো অপ্রয়োজনীয়। বাস্তব নানা স্বার্থের দুনিয়ার ঘটনায় কোন ‘পবিত্রতা’ আরোপ ভাল লক্ষণ বা কাজ না।

রাজ্যসভার কিছু বৈশিষ্ঠঃ
রাজ্যসভা প্রসঙ্গে সারকথাটা হল, রাজ্যসভার সদস্যরা ভারতের প্রাদেশিক বা রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের দ্বারা মনোনীত হয়ে থাকেন। মানে রাজ্যসভার সদস্যরা নাগরিকদের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হন না; তারা রাজ্য বিধানসভার সদস্যের ভোটে নির্বাচিত/মনোনীত হন। তাই রাজ্যগুলোরই এক অ্যাসোসিয়েশন বা পরিষদ হল এই উচ্চকক্ষ। উদ্দেশ্য, লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের সাথে রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতা কমানো। তাই এর ইংরেজি নাম কাউন্সিল অব স্টেটস। ভারতের কয়টা রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের দল রাজ্য-ক্ষমতায় নির্বাচিত থাকে – এভাবে বেশির ভাগ রাজ্য সরকারে যারা ক্ষমতায় সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটা বড় প্রভাব থাকে রাজ্যসভায়। অবশ্য রাজ্যসভার নির্বাচনগুলো কখনই লোকসভার সাথে মিলিয়ে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় না। তাছাড়া, আরও ব্যাপার আছে।  রাজ্যসভার মোট ছয় বছরের মেয়াদে প্রতি দুই বছর পরে পরে নির্বাচন অনুষ্ঠুত হয়  আর সেক্ষেত্রে কেবল এর খালি আসনগুলোর নির্বাচন হয়ে থাকে। আবার ভারতের রাজ্যসভা ব্যবস্থাকে আমেরিকার সিনেটের সাথে তুলনীয় বলে যেন আমরা বিবেচনা না করি। মূল কারণ, ভারত কোন ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; বরং এককেন্দ্রিক বা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার এক রাষ্ট্র। যদিও ভারতে ইউনিয়ন রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। তবু  ‘ফেডারেল’ শব্দের কোনো ব্যবহারই এর কনস্টিটিউশনে নেই। কাজেই রাজ্যসভা ভারতের (আমেরিকার সাথে তুলনীয় অর্থে) কোন সিনেট  নয়। আর একটা বিষয় – অর্থবিল ছাড়া অন্য সব বিলের বেলায় তা দুই সংসদেই (লোকসভা ও রাজ্যসভা দুটোতেই) বিল আকারে পেশ করা ও পাশ হওয়া ছাড়া তাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সাপেক্ষে তা কখনও আইনে পরিণত হয় না।

“সেপারেশন অব পাওয়ার”
ইতিহাসে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন ও চালু হওয়ার বহু আগে থেকেই ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও ইস্যু হয়ে আছে। অর্থাৎ সমাজে ইনসাফ নিশ্চিত করতে চাইলে বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার বাইরে স্বাধীন ও মুক্ত রাখতে হবে; যাতে নির্বাহী ক্ষমতা কোন বিচার প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। কারণ এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে আদালতকে নির্বাহী ক্ষমতার কোনো হস্তক্ষেপ বা চাপের মধ্যে পড়তে হয়। তাই আদালতগুলো ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’ অর্থে স্বাধীনভাবে নিজের বিবেচনা প্রভাবহীনভাবে প্রয়োগ করে কাজ করার পরিবেশ থাকা চাই। যদিও শেষ কথা হল, বাস্তবে যতটুকু সেপারেশন সম্ভব  ও নিরপেক্ষতা সম্ভব – এমন রিয়েলিস্টিক অর্থে, বাস্তবে বাস্তবায়ন যোগ্য অর্থে কথাগুলো নিতে হবে।

এ জন্য কোনো আদালতের উপর নির্বাহী ক্ষমতার হস্তক্ষেপ করার সুযোগ হাতের নাগালে আসার একটি  অবস্থা আসে বিচারকেরা  অবসরে যাওয়ার পরে যদি তাঁরা আবার কোনো সরকারি ও লাভজনক পদে নিয়োগ পাওয়া বা সরকারি সুবিধা নিতে চায় বা দেয়া হয়। আসলে এমন নিয়োগ বা অযাচিত সুবিধা নেয়া মানেই, নির্বাহী ক্ষমতার অনুগ্রহ লাভ করা এবং সুনজরে পড়া। আর এখান থেকেই কথা উঠে – “বিচারক থাকাকালে সরকারের পক্ষে ফেভারেবল রায় দিয়ে যাও আর অবসরে যাওয়ার পরে এর বেনিফিট তুলে নাও”। এটাই সেই নীতি। বাংলাদেশের সুপ্রীমকোর্টের পঞ্চম সংশোধনীবিষয়ক রায় দেয়ার ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ আছে। এমন অভিযোগ মোকাবেলা করতেই ‘অবসর-পরবর্তীকালীন লোভ-লালসার সুযোগ থাকা ও নেয়া থেকে বিচারকদের বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত’ করে রাখার জন্য আলাদা আইন দরকার বলে অনেকে উল্লেখ করে থাকেন। এটাকে insulated from ‘post-retirement allurements’ ধরনের আইন বলা হয়ে থাকে।

রঞ্জন গগৈ-এর এবার ভারতীয় রাজ্যসভার পদ গ্রহণের পরপরই এমনই এক মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা হয়েছে। সেখানে আবেদন করা হয়েছে “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ সম্মুন্নত রাখতে এব্যাপারে আদালত যেন নির্দেশনা দেয়। এ ছাড়া, ভারতের মিডিয়া ও আদালতপাড়া সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাও ইস্যুটা নিয়ে সোচ্চার। অর্থাৎ একটা ন্যায়নীতি বা ন্যায়ের দণ্ড পিছলিয়ে হাত থেকে পড়ে গেছে, ধুলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে – এমন অনুমান থেকেই এসব আপত্তি। রঞ্জন গগৈ ইতোমধ্যেই রাজ্যসভায় শপথ নেয়া শেষ করেছেন। আর সেখানে তাকে নিয়ে টিটকারি দেয়া আর হইচই হয়েছে। একজন বিচারপতি রাজনৈতিক দলাদলি ও টিটকারির মধ্যে পড়েছেন, এটা কেউ আশা করে না আর এটা তাঁর জন্য বিরাট অসম্মানের; যদি আত্মসম্মানবোধ তখনো তাঁর শক্ত থাকে। একজন বিচারকের আসলে নিজের কাছে আজীবন শপথ থাকার কথা যে – রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বিতর্ক থেকে তিনি দূরে থাকবেন।  কারণ ইঙ্গিতেও যেন বিচারককে নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মিশে যাওয়া বা সম্পর্ক পাতিয়েছেন এমন কোনো ইমেজ তার জীবনে না থাকে। কোনো নির্বাহী ক্ষমতা বা এর ছায়া কোনো বিচারক শেয়ার করতে পারেন না, আজীবন। এতে ন্যায়বিচার প্রদান এবং এর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপস করা হয়ে যেতে পারে। যদও অনেক দেশেই উল্টাটা পাওয়া যায়। তাই তারা এমন বাক্য লেখা দেখে হেসে উঠতে পারেন। কথা সত্য, অনেক দেশেই বিভারপতিরা বুক ফুলায় নির্বাহি ক্ষমতার অনুগ্রহ নিয়ে নেন। অথবা নির্বাহি প্রধানমন্ত্রী বিচারক প্রভাবিত করে নিজের ক্ষমতার ব্যপ্তি ও সক্ষমতার তারিফ করে থাকেন।

তবে  রঞ্জন গগৈর রাজনৈতিক পদ গ্রহণ থেকে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য যে, তার সময়কালে সেনসিটিভ চূড়ান্ত রায় যেগুলো তিনি দিয়েছেন, সেগুলো কি তাহলে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে অনুগ্রহ প্রদানে করে মানে ফেবার[favor] করে দেয়া হয়েছে? এর বিনিময়ে প্রাপ্ত ‘চেক’ এখন তিনি অবসরে ক্যাশ করছেন কি না!  তাঁর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ ও সেনসিটিভ  কিছু রায়গুলো হল – অযোধ্যা (বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার দাবির ক্ষেত্রে মন্দিরকে জায়গা দেয়া আর মসজিদকে দূরে বাইরে জায়গা করে দেয়া রায়), শবরীমালা (কেরলের এই মন্দিরে মেয়েদের, মূলত গর্ভবতীদের বেলায় চালু থাকা প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া রায়) এবং রাফায়েল (ফ্রান্সের ‘রাফায়েল’ বিমান কেনায় দুর্নীতির মামলা থেকে সরকারকে খালাস দেয়া) মামলা। এছাড়া, সবচেয়ে বিতর্কিত রায় হল আসামের এনআরসি ইস্যু। আদালতের সরাসরি অধীনে এর বাস্তবায়ন কাজে নেমে পড়ার পক্ষে ২০১৩ সালের রায় দিয়েছিলেন এবং শেষে ২০১৮ সালে এসে পারসেপশনের উল্টা ১৪ হাজার হিন্দু ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেও- মেনে নিতে বাধ্য করে দেয়া রায়।

আতাঁত? কিন্তু কোন আঁতাতের কথা বলা হচ্ছেঃ
তাই এখন সবাই প্রশ্ন তুলছে- ২০১৩ সাল থেকেই বিজেপির সাথে আঁতাত করে এনআরসি বাস্তবায়ন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর একটা কাজ হলেও গগৈ তা নিজ আদালতের মানে, নিজের অধীনে নিয়েছিলেন। মূলত তিনি আসামের এক কট্টর অসমিয়া জাতিবাদী  এবং জাতিবাদী জগতে বুদ্ধিজীবী এলিট ও গণ্যমাণ্য ব্যক্তি বলে পরিচিত।  দাবি করা হয় তিনিই প্রথম ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চল থেকে  প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। ফলে সব অসমিয়া জাতিবাদীর মতো তারও দৃঢ় বিশ্বাস বা পারসেপশন হলো মুসলমান বা বাংলাদেশের বাঙালিদের কথিত অনুপ্রবেশই অসমিয়াদের সব দুঃখ ও কষ্টের কারণ। অথচ আসল কারণ ভারতের তথাকথিত কেন্দ্রের মিলিটারি স্ট্রাটেজি।  তাই বিচারপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি এনআরসি বাস্তবায়নের নির্বাহী কাজ নিজের অধীনে সম্পন্ন করার পক্ষে ২০১৩ সালে রায় দিয়েছিলেন। এ কাজে বিজেপির হিন্দুত্ব আর অসমিয়া জাতিবাদ ষড়যন্ত্রে হাত মিলিয়েছিল এবং ‘বুঝাপড়া’ করে নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।  এর এক বৃহত্তর বহিঃপ্রকাশ হল, অসমিয়া জাতিবাদ মনে করে বাংলাদেশি আর  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা আসামে অনুপ্রবেশে করেছে। ফলে তাদের বের করে দিতে এনআরসি বাস্তবায়ন ততপরতা দরকার।  বিপরীতে বিজেপির রাজনৈতিক লাইন হল বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা নয় কেবল বাংলাদেশের মুসলমানেরাই অনুপ্রবেশকারি। এই দুই ধারার বয়ান হাত মিলিয়েছিল। অসমিয়া জাতিবাদীরা নিশ্চুপ থেকে বিজেপিকে ওয়াকোভার দিয়েছিল ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনে। এভাবে  ২০১৬ সালে মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণা তুঙ্গে তুলে আসাম রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল। এভাবে এই আঁতাত খারাপ চলছিল না।  কিন্তু এনআরসির চূড়ান্ত গণনায় দেখা গেল  – ১৯ লক্ষ মোট অপ্রমাণিত নাগরিকের মধ্যে ১৪ লক্ষই হল হিন্দু। [এখানে ভুল করে নয়াদিগন্তের ছাপা ভার্সানে লক্ষের জায়গায় ‘হাজার’ লেখা হয়ে গেছিল। পত্রিকার পাঠকেরা আমাকে এ’ভুলের জন্য মাফ করবেন। ]  আর এটা প্রকাশ পাওয়াতেই অসমিয়া জাতিবাদী পারসেপশন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়ে যায়।  অর্থাৎ তাদের মুসলমান ও বাংলাদেশি বিদ্বেষ পুরাপরি ন্যাংটা হয়ে ধরা পড়ে যায়।  উপায়ান্তর না পেয়েও গগৈ নতুন কোনো ষড়যন্ত্র করতে রাজি হননি।  অথচ বিজেপি ওপেন আদালতেই প্রস্তাব দিয়ে চেয়েছিল যে, বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে মুসলমানদের গণনা সঠিক হয়নি বলে দাবি করে মুসলমানদের নাগরিকত্ব প্রমাণিত পাওয়া যায়নি বলে পুরায় গণনা চালানোর অনুমতি। যাতে তাতে বেশিরভাগ  মুসলমানই নাগরিকতে প্রমাস্ন করতে পারেন এমন ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া যায়। কিন্তু এত বড় জুয়াচুরিতে গগৈ রাজি হননি। তাই নাগরিক গণনা্র আগের লিস্টই ফাইনাল বলে তিনি রায় দিয়ে দিলেন। তাতে ব্জেপি নাখশ হয়। তাই থেকে বিজেপি গণনা ও ফলাফলের সব দায় কিছুটা আদালতের আর পুরাটা  সমন্বয়ক আমলা প্রতীক হাজেলার ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজ ইমেজ বাঁচাতে নেমে পড়েছিল। আর তখন থেকে অসমিয়া জাতিবাদের সাথে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী বিজেপির আঁতাত দুর্বল হয়ে যায়।

পরিণতিতে অসমিয়া জাতিবাদীরা ১৯৮৫ সালের স্টাইলে আবার মাঠের আন্দোলন শুরু করে দেয়, কিন্তু এবার বিজেপির বিরুদ্ধে। এরই ফলে বিজেপি রাজ্য সরকারে এখনো ক্ষমতায় বহাল আছে বটে, কিন্তু মিটিং-মিছিল করতে পারে না; জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওদিকে অসমিয়া জাতিবাদীরা আবার বিদেশবিরোধী পুরনো স্লোগান তুলে অসমিয়া সমাজে ও মাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। আর বিজেপি একেবারে কোণঠাসা। এর মধ্যে মোদী তিনবার আসাম সফরের কর্মসূচি ঠিক করেছিলেন এই ভেবে যে নতুনভাবে অসমিয়া জাতিবাদের সাথে একটা আপোষ প্যাচআপ করা যায় কিনা! কিন্তু অসমিয়া জাতিবাদের তাজা অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে শেষে তিনবারই তা বাতিল করে দিয়েছেন। কেবল একবার আসামের বোড়ো অঞ্চলে বোড়ো ইস্যুতে সংক্ষেপে সফর সেরে এসেছিলেন। এদিকে আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পরই অথবা একই সাথে আসামেও আবার রাজ্য নির্বাচন হবে ২০২১ সালের মে মাসের দিকে। তাই রঞ্জন গগৈকে রাজ্যসভায় সদস্য করে দেয়া – এটাকে মোদী সরকারের  আবার নির্বাচনের আগে নতুন করে অসমিয়া জাতিবাদীদের সাথে বিজেপির আঁতাতেরই এক মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গে আরেক খবর হল, রঞ্জন গগৈর ছোট ভাই হলেন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল অঞ্জন গগৈ। তাকেও দুই মাস আগে রঞ্জন গগৈর মতোই মোদীর সরকার ‘নর্থ-ইস্টার্ন কাউন্সিল’ বলে স্থানীয়দের সংযুক্ত করে এক আঞ্চলিক সরকারি পলিসি সুপারিশের প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ওয়্যার [WIRE] পত্রিকায় ‘দুই গগৈ ভাইয়ের নিয়োগের গল্প’- এই রিপোর্ট পাঠ করা যেতে পারে।  অতএব, বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নিয়োগ বিজেপির নতুন আসাম মিশনেরই অংশ। রঞ্জন গগৈর ডিগবাজি খাওয়া দেখে তারই এক কলিগ আরেক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ খুবই কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন [‘Surprised How Ex-CJI Compromised on Judiciary’s Independence’, Says Justice Kurian Joseph]।  তিনি বলেন, রাজ্যসভার সদস্যপদ গ্রহণ করে গগৈ ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’- নীতির সাথে এক বিরাট আপস করলেন [“According to me, the acceptance of nomination as member of Rajya Sabha by a former CJI, has certainly shaken the confidence of the common man on the independence of judiciary……]। অথচ আমরা চার বিচারক একবার একসাথে জনগণের সামনে এ নিয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলাম।

এদিকে রাজ্যসভায় শপথ গ্রহণ শেষ করা পর রঞ্জন গগৈ এসব বক্তব্যের পালটা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাক্ষাতকার দিয়েছিল।  সেখানে তিনি মিডিয়ার বিভিন্ন সমালোচনার বিরুদ্ধে সাফাই হাজির করতে চেয়েছেন। কিন্তু পেরেছেন কী?  এক মিডিয়ায় মন্তব্য হল গগৈ “quid pro quo” করেছে, যে প্রবাদের মানে হল  “কোন কিছুর বিনিময়ে কোন কিছু” দিয়েছেন। তিনি এই অভিযোগের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানে করেছেন যে তিনি অর্থের বিনিময়ে ফেবার করেছেন। অথচ অর্থ এর একমাত্র অর্থ নয়। তিনি দাবি করেছেন রাজ্যসভার সদস্য হয়ে অর্থগত লাভালাভ একজন প্রধান বিচারকের আয়ের মতই। তার এটা নাকি প্রমাণ যে তিনি সওদা করেন নাই। রঞ্জন গগৈ বোকাবোকা কথা বলে নিজেকে বাচাতে চাইলেন। খুব সম্ভবত বিজেপির সাথে বিনিময় বা সাওদাটা অরথের অবশ্যই নয় বরং অহমিয়া জাতিবাদী স্বার্থে তার পুরানা পদকে বিজেপির সাথে ব্যবহার ও বিনিময়-সওদা।  তার মনের সাফাইটা হল তিনি তো বিজেপির সাথে এর পক্ষে কাজ করে মানে সওদা করে অর্থ নেন নাই, বরং অহমিয়া স্বার্থের লাভালাভ পেতে বিনিময় করেছেন। সুতরাই এটা সৎ বা ব্যক্তিস্বার্থ নয়।  অথচ ফ্যাক্টস হল, তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থ নির্বাহি মোদী সরকারের কাছে বেঁচে দিয়েছেন।  আর এতে স্বার্থ বা লাভালাভ গেছে গগৈ-এর পেয়ারের তথাকথিত অহমিয়া জাতের পক্ষে।  এই প্রীতি মারাত্মক অগ্রহণযোগ্য ও না-জায়েজ।

তিনি সেখানে আরও দাবি তুলেছেন যারা (মানে তিনি যোসেফ কুরিয়ানকে বুঝিয়েছেন) এমন বিবৃতি দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আদালতের অবমাননার মামলা করবেন বলে তিনি আশা করেন [he hoped the Supreme Court will initiate contempt proceedings ]। তিনি এতটুকু বলেই থামেন নাই। আরও বলেছেন, যে তিনি মনে করেন শেষে দেখা যাবে সুপ্রীম কোর্ট এমন মামলা করবেনই নাই [“I don’t think it’ll happen, though it should happen,”] ।  গগৈ-এর এই মন্তব্য ভারতের বিচারক পাড়াকে সোজা আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের রাজনৈতিক মেরুকরণে দ্বিবিভক্ত করে দিয়েছে।

এ লেখা পড়ে অনেকের মনে হতে পারে বিজেপিই বোধহয় একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা বিচারপতিদের লোভ-লালসায় ফেলে দিয়েছে। এ কথা ভুল, রঞ্জন গগৈর ঘটনাটা সম্ভবত পঞ্চম ঘটনা। আগের তিনটি ঘটনা কংগ্রেসের আমলের। বিচার বিভাগকে আলাদা রাখা, হস্তক্ষেপ না করা, যাতে সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত থাকে- এ ব্যাপারে বিজেপির মতো কংগ্রেসেরও কমিটমেন্ট নেই। আর বিজেপি অনেক সোজাসাপ্টা, তারা পাবলিকের কাছে রাষ্ট্র এমন তেমন স্বচ্ছ হবে বলে কোনো প্রতিশ্রুতিই দেয় না। কারণ বিজেপির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কেমন হবে বা সে নির্মাণ করবে কত ভাল ও মহান হবে সেয়া  এমন ব্যাপারে তার কোনো বিশেষ চিন্তা বা ফোকাসই নেই। ভারতকে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র হতে হবে, সম্ভব হলে হিন্দুরাষ্ট্র গড়তে হবে- বরং এই হল তার প্রতিশ্রুতি। এর বিপরীতে কংগ্রেস মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি আবার অবলীলায় ভাঙবে।  এই হল কংগ্রেস। যেমন রঞ্জন গগৈর ঘটনায় কংগ্রেস খুবই সোচ্চার ও নিন্দা জানিয়েছে। অথচ নিজেদের আমলের একই ব্যত্যয়ের ঘটনা সম্পর্কে তারা একেবারে নিশ্চুপ। ভারত রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ার এটাও একটা বড় লক্ষণ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২১ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  বিচারপতি গগৈ বিজেপির আসাম মিশনের অংশ“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

গৌতম দাস

 ১৬ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2UI

_

 

 

করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি আসলে দুই পরস্পরের বিরোধী ফেনোমেনা। মানুষে মানুষে সব ধরণের যোগাযোগ-লেনদেন-সম্পর্কই (কমিউনিকেশন) কোন অর্থনীতির মুল কথা। অথচ করোনাভাইরাস হাজির হচ্ছে ঠিক এর উল্টা দাবি নিয়ে যে – কমিউনিকেশন সীমিত করতে হবে, পারলে বন্ধ করে দিতে হবে – যদি ভাইরাসের বিস্তার বা নতুন সংক্রমণ বন্ধ ও ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই।  তাই আমরা এখন এমন এক কালে যে করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি এদুই পরস্পরবিরোধী ফেনোমেনার ভিতরে আমাদের বসবাস।

‘করোনাভাইরাস’ শব্দটা এখন আর কোন একটা শহরের “টক অব দ্য টাউন” নয়, বরং এটা এখন “টক অব দ্য গ্লোব”‘; বিশ্বের আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ঘটনার শুরু গতবছরের ডিসেম্বরে, চীনের য়ুহান [Wuhan] শহর থেকে।  ইতোমধ্যে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ আমরা পার হয়ে এসে পড়েছি। এই হিসাবে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বা ছড়িয়ে পড়ার তৎপরতার ‘বয়স’ মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের।  আলজাজিরা টিভির ওয়েব সাইটে একটা ঘটনা-কালপর্ব তৈরি করা হয়েছে। সেটা অনুসারেও, করোনার বিস্তার মাত্র গত তিন মাসের ঘটনা। সেখানে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসঙ্ঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানতে পারে, চীনের য়ুহান শহরে অপরিচিত এক ধরনের ‘নিউমোনিয়া’ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

এটাকেই শুরুতে চীনাদের তরফে “নিও করোনাভাইরাস” বলা হয়েছিল। এখন জাতিসঙ্ঘের দেয়া এরই আন্তর্জাতিক নাম হল কোভিড-১৯ [COVID-19]; মানে করোনাভাইরাস ডিজিজ-২০১৯। কোনো রোগ ছড়ানোর ঘটনা কেবল একটা পাড়ার কোণে ছড়ালে ও সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে একে ইংরেজিতে ‘এন্ডেমিক’ [Endemic] বা স্থানীয় রোগ বলা চলে। আর সেটা একটা শহরে অথবা একই দেশের পরস্পর লাগোয়া বা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কয়েকটা শহরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে এমন ঘটনাকে এপিডেমিক [Epidemic] বা ‘মহামারী’ বলি আমরা। নিও করোনাভাইরাসকে জাতিসঙ্ঘ ‘প্যানডেমিক’ [Pandemic] বা বিশ্ব-মহামারী বলে ঘোষণা করেছে। কারণ এ পর্যন্ত ১৫৩টার মতো রাষ্ট্রে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। যদিও এমন নাম দেওয়ার ব্যাপারটা সবটাই টেকটিক্যাল নয়, এসব নামকরণে একই সাথে  জড়িয়ে থাকে নানান রাজনৈতিক বিবেচনাও ।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই রোগের মূল বৈশিষ্ট্য হল – এটা ছোঁয়াচে, মানে মানুষের পরস্পরের ছোঁয়াছুঁয়িতেই (যেমন কোলাকুলি বা হ্যান্ডশেক) এটা অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে বা প্রবেশ করতে পারে। তবে একেবারেই শুকনা ধরনের ছোঁয়াছুঁয়ি নয় বরং ড্রপলেট [droplet] বা জলীয়বাষ্প-কণা ধরনের (হাঁচি-কাশিতে বের হওয়া) সংস্পর্শ সেখানে থাকতে হবে। আসলে  দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এমন কোন রোগের মানেই হল সেটা ছোঁয়াচে। তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ এ ধরনের রোগের জীবাণুর ছড়িয়ে পড়া উপস্থিতি সেখানে আছে।

নিও করোনার এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া থেকে অনুমান করা হয় যে, একালের দুনিয়ায় এটা হতে পেরেছে মূলত তিনটি বৈশিষ্ট্যের কারণে। যেমন এটা ‘কন্টাজিয়াস” [Contagious]’ মানে, সংক্রামক বা ছোঁয়াচে। দ্বিতীয়ত, করোনা এক নতুন ভাইরাস আক্রমণ থেকে আসা রোগ বলে এর কোন ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক ওষুধ এখনই মানুষের কাছে নেই। তাই এর ছড়িয়ে পড়াকে থামানো যাচ্ছে না। আর তৃতীয় কারণ-বৈশিষ্ট্য হল, একালে এটা গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়, এই বাস্তবতার যুগ। আমরা আসলে এখন দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া বা পড়া পণ্য-লেনদেন-বিনিময় ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করেছি, সেখানে কোনো উৎপাদনই আর স্থানীয় নয়। মানে ওই উৎপাদিত পণ্যের আসল বা শেষ-ভোক্তা বহু দূরের কোথাও- দুনিয়ার অন্য কোন কোণে বাস করতে পারে। তাই কেবল একই দেশে তো নয়ই, সেটা বরং অন্য মহাদেশে তো বটেই এবং দুনিয়ার একেবারেই অন্য কোনো প্রান্তে হওয়ারই সম্ভাবনা। যেমন, আফ্রিকার উগান্ডার কোনো গ্রামে বাংলাদেশের কেয়া সাবান কিনতে পাওয়া যাচ্ছে দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই এখন স্বাভাবিক। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আবার এক্ষেত্রে আরো ‘বিশেষ’ হয়ে উঠেছে, কারণ এ ভাইরাসের উৎস দেশটা চীন – দ্য রাইজিং চায়না। আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন আসন্ন নেতা।

চীনের বিপুল পুঁজি ও এর বিনিয়োগ সক্ষমতা অথবা চীনে তৈরি করা কাঁচামাল বা পণ্য অথবা চীনের বাজারে অন্যদের পণ্য বা প্রবেশ- এসব কিছু মিলিয়ে একালে এটা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ; পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কে আমরা পরস্পর সব রাষ্ট্র এতে জড়িয়ে গেছি বা আছি। সারকথাটা হল, একদিকে গ্লোবাল অর্থনীতির অভিমুখ হল গ্লোবাল হয়ে উঠা লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক আর অন্যদিক এই করোনা ভাইরাস বলছে এই ভাইরাসের অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে গেলে সব কমিউনিকেশন বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। করোনা আর অর্থনীতি এই দুই বিপরীত পথ ধরেছে।

একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমাদের গ্লোবাল হয়ে ওঠা পণ্য-লেনদেন-বিনিময় সম্পর্কের কথা এখানে যেমন বলছি, তেমনি এর উল্টো পরিস্থিতি বা ধারণাটা হল, গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়ের ব্যবস্থাটাই আবার ঢলে পড়া বা শ্লথ হয়ে পড়া- যেটাকে রিসেশন [recession] বা ‘মহামন্দা’ বলা হয়- তেমনটাও ঘটা স্বাভাবিক। আর ১৯৩০ সালে তা ঘটেছিল, যাকে প্রথম গ্লোবাল মহামন্দা বলা হয়। সময়টা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, প্রায় ২১ বছরের এমন বিরতির কালে। এই মহামন্দার মূল কারণ বা দায়ী ছিল ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই; বিশেষ করে অন্তত কলোনি দখলদার রাষ্ট্রগুলো যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নিজ নিজ খরচ, এই বিপুল ব্যয়ভার মিটাতে গিয়ে নিজ নিজ আয়ের চেয়ে ছাড়িয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। তাই যুদ্ধ শেষে সেই ঘাটতিটা পূরণ করতে চেয়ে পরিকল্পিত মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছিল প্রত্যেক রাষ্ট্র। এতে সবাই নিজ নিজ মুদ্রার মূল্যমান ফেলে দিয়ে রফতানি-বিক্রি বাড়ানোর জন্য  পরস্পর আত্মঘাতী এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। এর সামগ্রিক প্রভাব ও ফলাফলই হল ঐ মহামন্দা। আবার এখান থেকে বের হতে গিয়ে, হিটলারি-জাতিবাদকে মুখে পড়েছিল তারা।  আবার সেটা ঠেকাতে গিয়েই আরো বড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া- এভাবে এক ধারাবাহিক চক্রে পড়ে ইউরোপ নিজের সব ইতিবাচক সক্ষমতা বা সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছিল।

এই পরিস্থিতির সমাধান হিসাবে যুদ্ধশেষে এখান থেকেই আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের জন্মের সময় তাদের কর্মসীমা বা ম্যান্ডেটে যে মুখবন্ধ লেখা হয়েছিল তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল, ১৯৩০ সালের মত মহামন্দা আবার যাতে দুনিয়াতে না আসে তা ঠেকানোও এ দুই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য হবে। তবুও অর্থনৈতিক মহামন্দা দুনিয়ায় আবার এসেছিল ২০০৭ সালের শেষে আর ২০০৮ এর শুরুতে। বলা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের দ্বিতীয় ও শেষ জমানায় শুরু হয়ে পরের প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ সব প্রেসিডেন্টকেই এর ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল। এখনো হচ্ছে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত রিসেশনের ভয় ও প্রভাব দুনিয়া থেকে আর কখনো যায়নি, এভাবেই দিন কাটছে।

তবে ২০০৭ সালের যে মহামন্দা, সেখানেও মূল কারণ কী ছিল? আসলে তখনও কারণ একই, রাষ্ট্রের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলা। কিন্তু কেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ২০০১ সালে শুরু করেছিলেন আফগান-ইরাক দখলের যুদ্ধ; যেটাকে আমেরিকা নিজের ইজ্জত ঢাকতে, পর্দার আড়ালে ফেলতে বলে থাকে ‘ওয়ার অন টেরর’, বা সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও এক পর্যায়ে আমেরিকার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। আর এর চেয়েও আরেকটা বড় বিষয় ছিল, আমেরিকা এই যুদ্ধে জয়লাভের অযোগ্য তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।  ফলে তা হয়ে পড়েছিল সমাপ্তির টার্গেটবিহীন এক অনন্ত যুদ্ধ। অথচ এমন যুদ্ধের খরচ বইবার সামর্থ্য আমেরিকার অর্থনীতির ছিল না। তাই আমরা স্মরণ করতে পারি পরের প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্তকে। আফগান যুদ্ধ কবে শেষ হবে সেই টার্গেট থেকে নয়, বরং আমেরিকান অর্থনীতি কষ্টেসৃষ্টে হলেও সর্বোচ্চ কত দিন যুদ্ধের ব্যয় বইতে সক্ষম হতে পারে বা বহন করা ঠিক হবে- এই ভিত্তিতে টার্গেট ঠিক হয়েছিল যে যুদ্ধে জয়লাভ আসুক আর না আসুক, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব মার্কিন সৈন্য ফেরত আনতেই হবে। এভাবেই যুদ্ধের খরচ থামানোর প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছিলেন ওবামা। আর এই চলতি বছরে এবার আর একটা ধাপ শেষ করার জন্য  ট্রাম্প আফগানদের সাথে চুক্তি করল। তবে আমেরিকার আর সঙ্গী ইউরোপের যারা ভেবেছিল লোভ-লিপ্সার কথিত যুদ্ধজয়ের থেকে উচ্ছিষ্ট কিছু নিজের ভাগেও আসবে, সেটারও তেমন কোনকিছু না হওয়াতে তাদের অর্থনীতিও একই সময়ে মহামন্দায় বিপর্যস্ততার মুখে পড়েছিল। কিন্তু যে কথাটা বলার জন্য এখানে এত আয়োজন, তাহল – ঐ ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার ধাক্কা প্রধানত লেগেছিল আমেরিকা-ইউরোপে, মানে পশ্চিমা দেশে। অন্য মহাদেশে তেমন নয়। এমনকি সেকালের ক্রমশ দৃশ্যমান, উত্থিত (১৯৯০-২০১০ বিশ বছরের রাইজিং চীন) হতে থাকা চীন – এই চীনের উপর ঐ মহামন্দার পরোক্ষ প্রভাব কমই হয়েছিল। আমাদের এশিয়াতেও এর প্রভাব হয়েছিল আরো কম। কেন?

এর সোজা অর্থ-তাতপর্য হল, তত দিনে পশ্চিমের সাথে এশিয়ার পণ্য-বিনিময় লেনদেন সম্পর্ক হাল্কা হতে শুরু হয়ে গিয়েছিল; আবার অন্যদিকে চীনের  সাথে এশিয়ার প্রায় সকলের নতুন করে ততটাই সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাই।

আমরা আসলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি একটা ইকোনমিক গ্লোবালাইজেশনকে, অন্য ভাষায় পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক গ্লোবাল হয়ে ওঠার ফেনোমেনাটাকে। মনে রাখতে হবে, গত শতকের (১৯০০-৯৯) শেষ অর্ধেক মানে ১৯৫০ সালের পর থেকে, বিশেষ করে শেষ বিশ বছর (১৯৮০ থেকে) ছিল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কের (এই প্রথম) ব্যাপক গ্লোবাল হয়ে পড়ার দিকে বিকশিত হতে শুরু করারই সময়কাল। আমাদের গার্মেন্টেসে উত্থানও সে কালেরই ঘটনা। পরে নতুন শতকের শুরু থেকেই আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো পশ্চিমের চেয়ে বেশি করে, চীনের অভিমুখী হওয়া শুরু করেছিল। আমাদের মত দেশ বা চীনের উপর গত ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার প্রভাব তেমন না পড়াকে সম্ভবত এভাবেই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

মূলত কোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতি ব্যর্থ হলে ওর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অর্থনীতিতেও কতটা ধস নামে এর মাত্রাটাই বলে দেয় যে, আমরা ওই ধসনামা রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে কত গভীরে জড়িয়ে আছি।

কিন্তু এবার, করোনাভাইরাসের কালে?
এত দিনে এশিয়া তো বটেই, পশ্চিমও এখন চীনের সাথে অনেক অনেক বেশি গভীর সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে ও রয়েছে। তার প্রধানতম চিহ্ন-লক্ষ্য হল, দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা অর্থনীতির সারপ্লাস (surplus) এখন সঞ্চিত (accumulation) হওয়ার প্রধান অভিমুখ ও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে চীন। যা তিন ট্রিলিয়নেরও বেশি। এই সারপ্লাসেরই আরেক নাম ‘পুনঃবিনিয়োগ সক্ষমতা’; যে সক্ষমতা আছে চীনের। ইউরোপও চীনা উত্থানের সাথে যুক্ত হয়ে পড়তে বেল্টরোডে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে আগানো শুরু করে দিয়েছে। আবার তাই আমরাও অন্তত এশিয়ার সবাই এখন আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো প্রধানত চীনমুখী করে ফেলেছি বা করতে বাধ্য হয়েছি।  এই চীনা-নির্ভরশীল হয়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠার একটা আরেক বড় কারণ আমাদের সব উৎপাদনেরই কাঁচামালের পুরোটাই বা অন্তত কোনো-না-কোনো একটার নির্ভরযোগ্য উৎস – সেটি মূল্যের দিক কম হওয়া থেকে বা সহজ নির্ভরযোগ্য প্রাপ্যতার উতস চীন হাজির হয়েছে বলে  – এটা  প্রধানত এখন চীন।

তাই সার কথায় করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আমাদের- অন্তত এশিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে; স্থবির করবে বা থামিয়ে দেবে। যেমন চীনা কাঁচামাল বা তৈরি করা পণ্যের ভোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের বাজারে তাই বাজারের ভাষায় ‘সাপ্লাই বন্ধের’ আওয়াজ উঠা শুরু হয়েছে।  সবার মুল জিজ্ঞাস্য যে এমন সাপ্লাই বন্ধ অবস্থা কতদিন সহ্য করতে হতে পারে?  কারণ এই স্থবির পরিস্থিতি আরও ছয়মাসে বেশি হলে তা আমরা সম্ভবত আর সহ্য করতে পারব না। বিকল্পের জন্য মরিয়া হয়ে যেতে হবে।

ওদিকে ভারতের অবস্থা আরো কাহিল। ইন্ডিয়ান মিডিয়া বলছে, সাধারণভাবে চীনা-বিকল্প হাতে পাওয়ার দিক থেকে ভারতের হাতে অপশন খুবই কম, প্রায় নেই [India doesn’t have too many options to deal with economic impact of coronavirus]। যেমন ভারতের ওষুধ কোম্পানির ব্যবসা কাঁচামালের দিক থেকে বলতে গেলে পঞ্চাশ ভাগের মতো উৎস হলো চীন। ফলে ব্যাপক নির্ভরশীলতা চীনের ওপর। ভারতের সব পণ্যের মোট আমদানির ১৪ শতাংশের উৎস চীন। [more than half of India’s imports in 19 categories come from China……] আর ১৯টা আমদানি আইটেমের ৪০ শতাংশের আমদানি উৎস চীন। ভারতের ক্ষেত্রে এসব কিছুর মূল কারণ চীনা পণ্য দামে সস্তা হওয়া।

আসলে করোনাভাইরাস এমন অনেক অপ্রকাশ্য বাস্তবতাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরছে। ভারতীয় দেশপ্রেম বলে বেড়ায় যে সে মনে করে চীন তার প্রধানতম শত্রু। যে রাষ্ট্রের সাথে আগামিতে ভারতের সম্ভাব্য যুদ্ধ লাগতে পারে সেটা চীন।  তাই যদি ভারতের বিশ্বাস, অনুমান হয়ে থাকে তাহলে সেই ভারত কোনভাবেই  চীনের কাঁচামালের উপরই ভারতের আভ্যন্তরীণ ওষুধের প্রাপ্যতা চরম নির্ভরশীল করে নিজেকে সাজাতেই পারে না। কথাই নয়। এর মানে এসব সস্তা দেশপ্রেম ছেদো মানে এতে বড় ছিদ্র আছে তা বলাই বাহুল্য। তাহলে ঘটনাটা আসলে কী? খুব সম্ভবত ব্যাপারটা হল, ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতে হেরে যাওয়ায় ও তাতে ভারতের পুরা নর্থ-ইষ্ট আসাম পার হয়ে চীনাসৈন্যের ভিতরে  ঢুকে পড়েছিল। আর এসবেরই নীট ফলাফল হল এক ট্রমা; চীনের সাথে আবার হেরে যাবার এক ভীতিজাত এই ট্রমা । ফলে চীনেওর সাথে কোন যুদ্ধে জিতার চেয়ে এই ট্রমা ভারতীয়-মন থেকে দূর করার উদ্যোগ নেয়া – এটা কম গুরুত্বপুর্ণ নয়! সে যাই হোক!
আমার এখান থেকে এই প্রশ্নও উঠে যে একালের পোষ্ট কোল্ড ওয়ার যুগের  ব্যাপক গ্লোবাল  বাণিজ্যিক সম্পর্কের দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শত্রুতার ধারণা আগের মত থাকা, বাণিজ্য নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলা – সেটা আর বজায় রাখা সম্ভব নয় সম্ভবত! এটা স্বীকার করে নিতে হবে!

[ইতোমধ্যে আমরা দেখছি “সার্ক ভিডিও কনফারেন্স” বলে এক নতুন লোক হাসানো শুরু হয়েছে। প্রথমত ভারত বহু আগে থেকেই সার্ককে [SAARC] কবর দিয়ে রেখেছে। সেটা শুধু নিজের মন থেকে না, লিখেও বলে থাকে ভারতের বিদেশ বিভাগ। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন [ORF] এক ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাংক।  বাংলাদেশে ভারতের এক  রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী চাকরি শেষে সাবেক হওয়ার পরে এখন এই প্রতিষ্ঠানের এক ফেলো ও সংযুক্ত। কলকাতার অভাবের সংসারের কোন এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত সাধারণত যে ভাষায় কথা বলে সেই একই ভাষায় কটু কথা বলতে তিনি ভীষণ পারদর্শী। গত ২০১৬ সালে তিনি  অ-কুটনীতিক ভাষায় সার্কের বিরুদ্ধে অজস্র বমি উগলেছিলেন।  বিরাট শখ কিন্তু সাধ্য নাই অথবা  কেউ-মানে-না এমন কোন মোড়লের ভাষায় তিনি বলেছিলেন – সার্ক মৃত। ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন”। সেকালে ভারতের বিদেশ বিভাগও এই লাইনে অনেক কাজ ও ভুমিকা রেখেছিল। সে সময়ে আমাদের সাংবাদিকদের একটা দল ভারত সফরে গেলে পিনাক রঞ্জন তাদেরকে প্রকাশ্যে গর্ব করে জানিয়েছিল, সার্ক ভুলে যেতে, সার্ক মৃত। সার্ককে তো ভারত এতদিন বাস্তবতই মৃত করে রেখেছিল। মূলত মোদীর বিজেপি আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলমানবিদ্বেষী ও পাকিস্তানবিরোধী হাওয়া তুলে ভোট যোগাড় – এই নীতি ফলো করতে গিয়েই সার্কের বিরুদ্ধে কামান দেগেছিল। আজ হঠাত মোদীর আবার সেই সার্কের ভক্ত হয়ে উঠা এটা যেন পিনাক রঞ্জনের উগরানো বমিকেই আবার উঠিয়ে গিলে খাওয়া বললেও কম বলা হবে। সার্কের বিরোধী হবার ভারতের মূল ইচ্ছার কারণ হল পাকিস্তানকে বাদ দেয়া বা পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে অন্যভাবে জোট গড়ে তোলা।  এছাড়া একালে সদ্য দিল্লি ম্যাসাকার ঘটানোর পরে মোদী যখন বিদেশিদের সাথে কোন আসরে বসার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কটে আছে তখন ভারতের সাথে তাল দেওয়া আমাদের কাজ হতে পারে না।  ভারতের এধরণের পিছলে চলার সাথে আমাদেরকে কেন তাল দিয়ে চলতে হবে অথবা কেনই বা হল সেটা বাংলাদেশের সরকার অথবা কারও কাছে পরিস্কার বলে মনে হয় না। এটা আমাদের সরকারকেই নতুন বিপদে বা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে নিয়ে যাবে তা মনে করার কারণ আছে।]

তাহলে বাস্তব ভাইরাস পরিস্থিতিতে এখান থেকে বের হওয়ার পথ কী? আশার আলো কী? যদি ভাইরাসের প্রতিষেধক পাওয়া যাবে কি না বা সেটি কবে – এটা একটা আশার আলো হিসাবে মনে করে থাকি তবে এই প্রশ্নের জবাব হলো চলতি বছরে তা হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তবে দ্বিতীয়ত, আরেক পথ-সম্ভাবনার চিহ্ন হল, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বেড়েচলার একটা চরমকাল থাকে যারপর থেকে এতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেখা যায় কমতে শুরু করে – সেই পিক টাইম [Pic time] বা চরমকাল কবে অথবা তা কী ইতোমধ্যে আমরা ছেড়ে এসেছি? এটা জানার জন্য অনেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কারণ মানুষের মধ্যে সেলফ রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়া শুরু হলে অন্তত একটা সময় গোনা শুরু করা যায় যে, য়ার কত দিনে রিকভারি বা ক্ষতি থেকে বের হওয়া সম্ভব! চীনা সরকার এ ধরনের একটা ধারণা-ইঙ্গিত এখনই দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে এটা চীনা এই ইঙ্গিত আস্থার সাথে গ্রহণ করা যায়,  তাতে দেশী-বিদেশী লোকেরা আস্থা এখনো রাখতে পারেননি। তারা কথাটা বরং আরও  নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে শুনতে চেয়ে অপেক্ষা করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশের চীনা রাষ্ট্রদূত আবেদন রেখেছেন, বাংলাদেশের অন-অ্যারাইভাল ভিসা যেটা দেয়া সাময়িক বন্ধ রেখেছে আমাদের সরকার সেটা যেন আবার আগের মত চালু করা হয়। বলাই বাহুল্য, এটা টু আর্লি বা ‘খুব তাড়াতাড়ি’ হয়ে যায়। সম্ভবত এই বিবেচনায় বাংলাদেশও তাতে সাড়া দেয়নি। চীনে করোনাভাইরাস আক্রমণের চরম সময় পেরিয়েছে কি না সেটা জানতে পারা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেটি জানা যায়, তবুও পরবর্তী ছয় মাসের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।

আমাদের জন্য এখন প্রধান সমস্যাটা হল – জনসমাবেশ ঘটাতে হয় এমন কোনো কিছুই এই ভাইরাস অনুমোদন করে না। কারণ নুন্যতম জনসমাবেশ এই ভাইরাসের বিস্তারের জন্য খুবই সহায়ক। অথচ যেমন, পঞ্চাশজনের একই বাসে ভ্রমণ বা দেড়-দু’শজনের বিমানে ভ্রমণ, স্কুলের ক্লাসে বা কারখানার কাজে কিংবা বাজারে, স্টেশনে যেকোনো ছোট জনসমাবেশই এ’কারণে বিরাট ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। অথচ এমন ঝুঁকিগুলো এখনো আমরা নিচ্ছি।  আর এই কারণেই সব মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতি বিরাট ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। এর মধ্যে আবার আমাদের গার্মেন্ট কোম্পানিগুলোকে ইউরোপের বায়ারদের ধীরে চলতে বলা নিঃসন্দেহে আরেক খারাপ লক্ষণ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ১৪ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে করোনাভাইরাস ও অর্থনীতি – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]