মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

গৌতম দাস

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2S0

 

মুসলমানবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল ভারতের সংসদের দুই কক্ষেই পাস হয়েছে গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ এর মধ্যে। আর পরদিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা আইনে পরিণত হয়েছে। সংক্ষেপে বিভিন্ন মিডিয়ায় একে ‘সিএএ’ (CAA) (সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) এভাবে ডাকা ও লেখা হচ্ছে। আগামি মার্চ মাসে ব্রাসেলসে ইন্ডিয়া-ইইউ শীর্ষ সামিটে যোগ দিতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। প্রকৃতপক্ষ এটা হয়ে উঠবে ভারত নাগরিক অধিকার কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র বা সরকার হয়ে থাকবে কীনা এর প্রতিশ্রুতিদানের সভা। সম্প্রতি সিএএ- আইন পাশের পর এর নিন্দা বা আপত্তি প্রকাশ নিয়ে প্রস্তাব স্থগিত করে রাখা হয়েছে, মার্চ মাসের এই সামিট পর্যন্ত।

এই বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো তাদের চরম উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়েছে। এবার সুনির্দিষ্ট করে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের (এমইপি বা MEP) সদস্যরা পার্লামেন্টে তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা অনুসারে সংগঠিত ছয়টি গ্রুপের পক্ষ হয়ে প্রথমে ছয়টা আলাদা প্রস্তাব এনেছিল; যাতে এবার তা পার্লামেন্টে সবার আলোচনার পর এক নিন্দা প্রস্তাব হিসেবে পাস হয়। অথবা আরো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আলাদা আলাদা প্রস্তাবের সবগুলোকে একত্রে একটা প্রস্তাব হিসেবে আলোচনার পর তা পাস করা হয়। এভাবে কোন একটা প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে, বলাই বাহুল্য ভারতের জন্য সেটা হবে চরম বিব্রতকর ও লজ্জার। এনিয়ে ভারতের এনডিটিভি লিখেছে, ‘ভারত এখন এক বিরাট কূটনৈতিক বিপর্যয় বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখার মুখোমুখি। কারণ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সিএএ নিয়ে আর কাশ্মিরে ধরপাকড় নিয়ে হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে”। [India is facing a major diplomatic backlash from the European Union (EU) parliament on the Citizenship Amendment Act and the clampdown on Jammu and Kashmir…। এছাড়া ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে যদি আরো কঠোর অবরোধ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাস হয়, তবে তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভারতের জন্য ক্ষতিকর হবে ।
আবার প্রায়ই কথায় কথায় আমরা যেমন দাবি শুনি ভারত নাকি “বৃহৎ গণতন্ত্রের” দেশ  – এমন সেই ভ্যানিটি থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ পালক এখন এথেকে খসে পড়বে তা বলার অপেক্ষা করে না। এই পরিস্থিতিতে ভারতের দিক থেকে এসবের পাল্টা পদক্ষেপে কোথাও হাত জোড় করে নরম অথবা কোথাও ব্যবসা-সুবিধা না দেয়ার গরম হুমকি ইত্যাদি সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতের কূটনীতিকরা মাঠে নেমে পড়েছে, লবি চলছে, সব দিকে সব কিছুর এক বড় তোড়জোড় চলছে।
ভারতকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (EP) এই নড়াচড়াকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কারণ এর ৭৫১ জন (বেক্সিট কার্যকর হবার পর হয়ে যাবে ৭০৫)  সদস্যের  EP মধ্যে সিএএ’র বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছে অন্তত ৬২৬ জনই। যদিও অনেকে বলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের MEP এরা কাগুজে বাঘ মাত্র, যারা হুঙ্কার দেয় যতটা কামড় বসানোর ক্ষমতা বা প্রভাব ততই কম এদের –  পুর্ব অভিজ্ঞতায় এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা অনেকে বলবেন অবশ্যই। কিন্তু ব্যাপারটা এবারও কী তাই হবে? দেখা যাক!

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা এসব প্রস্তাবে আপত্তিগুলোর একেবারে শীর্ষের কথা হল, ভারতের নতুন নাগরিক আইন, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে বৈষম্যমূলক। মানে ‘নাগরিক অধিকার’ হল আনা ঐ প্রস্তাবগুলোর ফোকাস। ‘নাগরিক অধিকার’ ব্যাপারটা আসলে কী ও কোথা থেকে এনিয়ে খুব সংক্ষেপে বললে, আমাদের চলতি বিশ্বের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্টান্ডার্ড এবং এর সবচেয়ে বড় কমন কাম্য দিকটা হল ‘অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ হতে হবে। অর্থাৎ রাজতন্ত্র নয়, কলোনি-মালিকের দখলাধীন কলোনি-রাষ্ট্র নয় বরং স্বাধীন রিপাবলিক ও গণক্ষমতার রাষ্ট্র যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে হবে যেন এগুলো নাগরিকের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হয়।

ফলে এর কমন বৈশিষ্ট্যই শুধু নয়, এক কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং হল নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া। অন্তত নীতিগত ভিত্তি হিসাবে ১৯৪২ সালে  ১ জানুয়ারি সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন (যদিও তখনও তা মাওয়ের চীন নয়) – এই দুই রাষ্ট্র আমেরিকা ও বৃটেনের সাথে একমত হয়ে গ্লোবাল রাজনীতিক ব্যবস্থার নতুন ভিত্তি মানতে লিখিত ঐক্যমত প্রকাশ করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি এমন সময় থেকেই এই মূল মেরুকরণ শুরু হয়েছিল। আমেরিকার নেতৃত্বের কাম্য সেই নতুন দুনিয়াতে কলোনি আর নয়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র – হিটলার ও তার সঙ্গীদের রাষ্ট্রজোটের বিপরীতে এই পক্ষই জয়লাভ করে ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। আর সেই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ সব রাষ্ট্রের এক অ্যাসোসিয়েশনের জন্ম হয় জাতিসঙ্ঘ নামে। এরপর জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবাই বসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ‘আইন ও কনভেনশন’ থেকে অধিকারের চার্টার লেখা হয়েছিল। আর স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশের ওপর আইন ও কনভেনশনগুলো বাধ্যতামূলক পালনীয় হয়ে যায়।

অবশ্য এর সাথে তৈরি হয়ে যায় নানা ফাঁকফোকরও। বিশেষ করে আইন ও কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন কে কার উপর করবে, কিভাবে করবে, কতটা করবে নাকি ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে নিজেকে আড়াল করবে – এসব প্রশ্নে। এছাড়া সবার উপরে তো আছেই রাষ্ট্রের বৈষয়িক লাভালাভের স্বার্থ আর এই ভিত্তিতে পক্ষে-বিপক্ষে থাকা অথবা না থাকার জোট বাঁধা। দেখা গেছে, বৈষয়িক স্বার্থের লোভে কোনো রাষ্ট্র অন্যকে অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে আপস বা ছাড় দিয়ে বসতে দেখা যায়। যেমন, রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেও মায়ানমার যেভাবে বেচে যাচ্ছে। অথবা ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ভারতের বাজার সুবিধা পেতে পশ্চিমের অনেক রাষ্ট্রই ভারতের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে মোদী সরকারকে ছাড় দিয়ে বা উপেক্ষা করে বসে আছে। এসব সমস্যা থেকে দুনিয়া একেবারে মুক্ত হতে পারেনি এখনো, সে কথা সত্য। কিন্তু তাই বলে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড গড়ে বা অধিকার বিষয়ক নানান আইন ও কনভেনশনের প্রটেকশন গড়ে তুলে কোনোই লাভ হয় না অথবা এ নিয়ে ব্যত্যয় ঘটলে কারো বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলা হয় তাকে বিব্রত করার জন্য এমন কথাও ভিত্তিহীন অবশ্যই। এছাড়াও যদিও জাতিসঙ্ঘের অধীনের বিচার বা তদারকি কাঠামো- এই ব্যবস্থার মধ্যে কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও তা প্রমাণ করা বা প্রস্তাব পাস করে আনা খুব সহজ কাজ নয়। অভিযোগ সবটা বা সবার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে কখনো সমর্থ না হলেও কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে এমন উদাহরণের বাস্তবতা নেই।

তবে সবচেয়ে কমন ঝোঁক হল, কোনো রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন বা অধিকার বৈষম্যের অভিযোগে নিন্দা প্রস্তাব উঠলে নিরুপায় সে রাষ্ট্র তখন অন্যের অভিযোগ তোলাটাকে নিজের ‘সার্বভৌমত্বের’ লঙ্ঘন বা ভিন রাষ্ট্রের বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’ বলে দাবি করতে থাকে। এভাবে নিজ মুখ রক্ষার চেষ্টা করে থাকে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে অন্তর্বর্তী রায়ে অভিযুক্ত হয়ে ধরা খেয়ে মিয়ানমারও  এই কাজটা করেছে। আর সিএএ ইস্যুতে এবার ভারতের প্রতিক্রিয়াও তাই। এটা ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ “entirely internal to India” বলে দাবি করা হয়েছে। মানে বলতে যাচ্ছে যেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা প্রস্তাবের কথা তুলে ইউরোপ যেন ভারতের পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন করেছে। এ ব্যাপারে পুরানা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো আরো সরেস। তাদের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসা মাত্রই তারা একে ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বা ‘হস্তক্ষেপ’ বলে প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকে। আবার খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেও কখনও অভিযোগ উঠলে সেও কম যায় না। সে নিজে জাতিসঙ্ঘের ওই অঙ্গসংগঠন থেকে নিজের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়ে অথবা আর কখনো চাঁদা দিব না বলে অথবা  খোদ জাতিসংঘ বা ঐ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে অকেজো করার হুমকি দিয়ে থাকে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে কলোনি ব্যবস্থার সমাপ্তি ও অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক ধারণার রাষ্ট্রের প্রস্তাবক হলেন সেকালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নিজে। শুধু প্রস্তাবকই নয়, যুদ্ধে নিজের অংশ গ্রহণ ও মিত্রদের সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি বলেছিলেন একথাটা।

সেকালে হিটলারের কাছে হেরে যাবার ভয়ে নিরুপায় হয়ে হিটলার-বিরোধী ইউরোপীয় “মিত্র-রাষ্ট্রগুলো” [Allied powers] আমেরিকান প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। তবে এর আগে থেকেই যদিও ইউরোপ দাবি করত যে, তারা সবাই নাকি আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুদ্ধ শেষে সবার আগে তারা নিজেই নিজেদের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা কাঠামো ব্যবস্থা সংস্কার করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়েছিল। অর্থাৎ মানে দাঁড়িয়েছিল যে, আগে নিজেদের আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও সেবার মেনেই নিয়েছিল যে তারা “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র আসলে ছিল না।  যারা অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস অরিস্কার করে বুঝতে চান তাদের জন্য যুদ্ধোত্তর এই নতুন ইউরোপকে চেনা ও বুঝতে চেষ্টা করা খুব গুরুত্বপুর্ণ। ইউরোপের বেশির ভাগ যেসব রাষ্ট্র বিনাবাক্য ব্যয়ে বা কোন ওজর আপত্তি না তুলে এভাবে নবজন্ম লাভ করে নিতে আগিয়ে এসেছিল এমন ৪৭ টা রাষ্ট্রের একটা জোট তখনই গড়ে তোলা হয়েছিল। এর নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe). এবিষয়ে আরও জানতে আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন – Who we are – the Council of Europe ।  আর একই সাথে লক্ষ্যণীয় একই প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষে নাগরিক-অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রের নব-দুনিয়া গড়ার আমেরিকান প্রস্তাবে বৃটেনের চার্চিলসহ স্টালিনের সোভিয্যেন ইউনিয়ন ও চিয়াং কাইসেকের  সমগ্র চীন স্বেচ্ছায় এবিষয়ে একমতের দলিলে স্বাক্ষরকারী। এবং  ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি আমেরিকা, বৃটেন, সোভিয়েন ইউনিয়ন ও চীন এই চার রাষ্ট্র স্বাক্ষরিত এই দলিলকেই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা (Declaration of The United Nations 1942) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম ইউরোপ নিজেকে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe) গঠনের মাধ্যমে সংশোধন বা পুনঃজন্মলাভ করে নিলেও এবং চিয়াং কাইসেকের বা পরবর্তিতে মাওয়ের চীনসহ স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এদুই রাষ্ট্রের মধ্যে  “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র গড়ার ইস্যুতে কোন প্রভাব পড়ে নাই। যদিও সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা  এই দলিলে স্বাক্ষর করে স্টালিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ইউরোপের নিজেকে  নাগরিক অধিকারভিত্তিক করে পুনর্গঠনে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামি সংগঠিত হয়েছিল। আসলে এটা ছিল জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর ভুলকে সংশোধন করে   নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিজেদেরকে পুণর্গঠন। এভাবে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামে ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্রের জোট গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। আর এর মধ্যেকার কেবল ২৮ রাষ্ট্রের আরও ফরমাল ও আরও ঘনিষ্ঠতার রাষ্ট্রজোটে হচ্ছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বা ইইউ (European Union)।  এই হল, ইইউ এর সাথে  কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE এর সম্পর্ক ও  ফারাক।

১৯৫৩ সালে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE শুধু গঠন করা নয়, বরং নিজেদের সব নাগরিকের জন্য এক কমন অধিকারের চার্টার রচনা কাজ করে নিয়েছিল সদস্য রাষ্টড়্গুলোর এক কনভেনশন ডেকে, যার নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অ্ন হিউম্যান রাইট (European Convention on Human Right, ECHR) । আর এটা বাধ্যতামূলক প্রযোজ্য করা হয়েছিল কাউন্সিল অব ইউরোপ নামে নিজেদের নবগঠিত ৪৭ ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোটের সব রাষ্ট্রের ওপর। আর অধিকার সম্পর্কিত ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রের কোন নাগরিকের অভিযোগ তদারকির জন্য আলাদা সুপ্রিম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল যার নাম ইউরোপীয় কোর্ট অব হিউম্যান রাইট বা (ECtHR) নামে। আসলে এটাই ছিল আগামির কোন হিটলারের ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদ বা জাতনিধনের বিরুদ্ধে ইউরোপের নিজেকে রক্ষাকবচ।

মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ অতীতের কারণে আজকের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ-বিরোধিতা করে অধিকারবিষয়ক যেকোনো প্রস্তাব আলাদা গুরুত্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া আরো একটি কারণে এখনকার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে প্রস্তাব আনা আলাদা বিশেষ গুরুত্বের। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন সে জায়গা নিতে চাচ্ছে বা যাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় চীনকে ঘায়েল করতে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে হিউম্যান রাইট ইস্যু ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে চীনের প্রতি ইইউর অবস্থান ভিন্ন। কমিউনিস্ট কাঠামোর রাষ্ট্র হিসেবে চীনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ড সবসময় খারাপ থাকে। আর আমেরিকার পলিসি হল চীনকে দাবড়ে রাখা। তাই আমেরিকা তে চিনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ডের কথা তুলে চিনকে ঘায়েল করতে চায়। কিন্তু ইইউর অবস্থান আমেরিকার মতো ঘায়েল করা নয়। বরং ইইউ এর পলিসি নিয়েছে, চীনকে হিউম্যান রাইট মেনে চলা কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র করে গড়ে উঠতে সাহায্য-সহযোগিতা করা। আর এভাবে চীন-ইইউর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। গত ২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্রাসেলসে চীন-ইইউ এক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখান থেকে ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটাই হিউম্যান রাইট প্রসঙ্গে চীন-ইইউ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়তে চাওয়ার এক প্রামাণ্য দলিল।

কিন্তু মোদির কপাল সত্যিই খারাপ। আগামী মার্চ ২০২০ সালে ভারতের সাথেও একই রকমভাবে ভারত-ইইউ সামিট হতে যাচ্ছে ব্রাসেলসে। তাই ওই সময়ে মোদির ব্রাসেলস সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই যারা ভাবছেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা আগের মতোই কোনো মামুলি ব্যাপার অথবা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে কোনো শক্তিশালী প্রভাব ফেলার মতো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাপার নয় তারা সম্ভবত ভুল প্রমাণিত হবেন। আগের ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট শক্ত অথবা নরম যাই ভূমিকা নিয়ে থাকুক না কেন এবারের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আগের চেয়ে ভিন্ন এটা প্রমাণিত হবেই। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইটের নীতির ভিত্তিতে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন থেকে তারা সাজাবেনই, এ নিয়ে তারা নিজেদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সেটা এ জন্য যে, এমন নীতি ভিত্তিতে আরো আগে না দাঁড়াতে পারার জন্য চীনকে বিশেষ করে বেল্ট-রোড ইস্যুতে চিনের সাথে যুক্ত হওয়া বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ইইউ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রায় সবাই আলাদা এককভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক করতে প্রায় চলেই গিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে সেখান থেকে সরে আসতে সক্ষম হয়েছিল অবশ্য।  এরপর তারা ইইউ হিসেবে একসাথে চীনকে মোকাবেলা করতে সমর্থ হওয়া থেকেই চীনকেও হিউম্যান রাইট মেনে চলতে বাধ্য ও রাজি করানোর পর্যায়ে আসতে পেরেছে তারা। এর ফলেই সব বিপর্যয় এড়িয়ে নিজেদের ভাঙন এড়িয়ে ও শক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে বলে মনে করে। এতে এমনকি এরপর গত বছরের মে মাসে চীনে বেল্ট-রোড টু এর সম্মেলনও এই নীতির ভিত্তিতেই ২৯ রাষ্ট্রপ্রধানের এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল।

সর্বশেষ অবস্থা হল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে এবারের ঐ ছয় প্রস্তাব একসাথে একটা প্রস্তাব হিসেবে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে নিজেদের আরো আলোচনা ও তা পাস হওয়ার ব্যাপারটা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। এর মূল কারণ সম্ভবত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট  নতুন নাগরিকত্ব আইন  ভারতের কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করেছে বা বিরোধী হয়েছে কিনা সে মামলার বিচার করতে গিয়ে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে ৪০ দিন সময় দিয়েছে। অর্থাৎ আদালত এই বিতর্কিত আইন বাতিল করে দেয় কিনা বা কী রায় দেয়  সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছে। কিন্তু ভারতের কিছু পত্রিকা লিখছে এই স্থগিত করাকে মোদি সরকার নিজের কূটনৈতিক বিজয় মনে করছে।

এটাও ভুল প্রমাণিত হবে। কারণ মার্চ মাসেই ভারত-ইইউর সামিট (India-EU Summit 2020) অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে মোদি সিএএ’র ব্যাপারে পিছিয়ে সরে এসে যদি হিউম্যান রাইট মেনে চলার জোরালো অঙ্গীকার না করেন তবে এর পরিণতি খুবই খারাপ দিকে যেতে পারে। তবে বড়জোর ভারত হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য আরো সময় চাইতে পারে। কিন্তু সেটা কেবল এই শর্তে যে, তত দিন নতুন নাগরিক আইন ও এনআরসির বাস্তবায়ন স্থগিত করতে হবে। অন্যথায় চরম খারাপ দিকটা হল, ইইউ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা পর্যন্ত গিয়ে বসতে পারে। এক কথায় সিএএ-এনআরসি বাস্তবায়ন আর ইইউর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক- এই দুটো আর আগের মতো একসাথে চলতে পারবে না।

এমনকি বাংলাদেশের চলতি নির্বাচন নিয়ে যে ‘পর্যবেক্ষণ’ ইস্যুতে তর্কাতর্কি চলছে। এটাকেও হাল্কা বিষয় হিসেবে দেখা হয় যদি, এটাও ভুল হবে। ইইউ হিউম্যান রাইট মেনে চলা বা এর কমপ্লায়েন্স ইস্যু এখন থেকে খুবই কঠোরভাবে অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। কেবল বাস্তবায়নের জন্য সময় বেশি চাইলে অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে তা করতে চাইতে পারি। তবুও সেটা সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতির অধীনেই কেবল হতে পারে।

হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স এটা হতে যাচ্ছে ধীরে ধীরে – অর্ডার অব দ্যা কামিং ডেজ! ফলে এটা এখন দেখার বিষয় মোদী কিভাবে নিজেকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে হাজির করেন!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মানবাধিকার ইস্যুতে সিরিয়াস”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

গৌতম দাস

০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৪৬ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2My

 

গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় একটা ছোট নিউজ ছাপা হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল, “চীন আপাতত বাংলাদেশে কোনো নতুন প্রকল্পে আর অর্থ জোগাবে না’ [China won’t bankroll new projects for now]। কেন?

বাংলাদেশকে নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা না বলে, ভুল লাইনের রেষারেষি চলে, এটা বলাই ভাল। ব্যাপারটাকে সারকথায় বললে, “বাংলাদেশে যে সরকার আছে সেটা তো ভারতেরই” – এমন দম্ভ ভারতের মিডিয়ায় প্রায়ই প্রকাশ হতে দেখা যায়। ভারতের সরকারি পাতিনেতা বা মন্ত্রীরাও অনেক সময় এমন মন্তব্য করে থাকেন। তারা বলতে চায়, বাংলাদেশের সরকার তাদেরই বসানো। ফলে চীন কেন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ হতে চাইবে বা ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করবে – তাদের বক্তব্যের সারকথাটা আকার ইঙ্গিতে ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে এরকমই থাকে।

কিন্তু বাংলাদেশে কে ভাল বিনিয়োগের সক্ষমতা দেখিয়েছে – চীন না ভারত, কার অবকাঠামো বিনিয়োগ বেশি – এই প্রসঙ্গ এলে এবার অবশ্য আবার তারা নিজেরাই কুঁকড়ে গিয়ে বলে ভারতের তো বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তাই বাংলাদেশে আমরা চীনের কাছে হেরে যাই। তবু এমন ভারতের ন্যূনতম মুরোদ না থাকলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত চীনের সাথে সে টক্কর দিয়ে চলছে এই ভাব তাকে দেখাতেই হবে, এমনই জেদ ও গোঁয়ার্তুমি ঘটতে আমরা সবসময় দেখে থাকি। শুধু তাই নয়, ভারত চীন নিয়ে অজস্র ভুয়া বা নেতি-মিথ ছড়িয়ে রেখেছে, যার প্রবক্তা ও শিকার আমাদের ও ভারতে মিডিয়াও।

যেমন আবার ভারতকে পিছনে ফেলে চীন বাংলাদেশকে দখল করে ছেয়ে ফেলছে বা নিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে? না, চীন বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক উপস্থিত হয়ে আছে বা বিনিয়োগ করে আছে। কিন্তু ফ্যাক্টস অর্থে বাস্তবতা হল এটা একেবারেই কেবল সেদিনের ফেনোমেনা; যে চীন বাংলাদেশে ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। গত ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে আসার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের কোন উল্লেখ করার মত বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রায় ছিলই না। তাই এ কথাগুলোও পুরোপুরি ভিত্তিহীন। তবে ২০১৬ সালের আগের সেই সময়কালে বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটা কন্ট্রাক্টর বা বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে, বিনিয়োগকারি হিসাবে না। এছাড়া বাংলাদেশে চীনের অনেকগুলো প্রকল্প যেমন কয়েকটা বুড়িগঙ্গা মৈত্রী সেতু অথবা মৈত্রী অডিটোরিয়াম ধরনের ছোটখাটো বিনিয়োগ প্রকল্প এসব অনেক পুরনো। এগুলো টেনে আনলে এমন ছোট ছোট চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই আছে। কিন্তু কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বিনিয়োগকারী হিসেবে চীন ছিল না। বরং চীনা প্রেসিডেন্টের ২০১৬ সালের অক্টোবরে ঐ বাংলাদেশ সফর থেকেই ব্যাপক বিনিয়োগ আসা শুরু হয়, সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলেন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের। এ নিয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে সে সময় ভারতের এনডিটিভি-তে লাইভ-ইনহাউজ, চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে একটা টকশো ধরনের আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের ক্ষমতাসীনেরা পাতিনেতাসহ যেমন বলে থাকেন, বাংলাদেশ তো তাদেরই, এটাই মিডিয়াও শুনে আসছে। তাই যদি হয় তবে চীনা প্রেসিডেন্ট এত ঘটা করে বাংলাদেশে আসছেন এটা তারা দেখতে পাচ্ছে কেন? তাদের এই চোখ আর কানের বিবাদ মেটানো, এই বিষয়টা পরিষ্কার করা ছিল এনডিটিভির উদ্দেশ্য।

তাদের ঐ আলোচনা থেকে তাদেরই করা হতাশ উপসংহার ছিল “দিল্লি আসলে অনেক দূরে”। মানে কী? মানে, চীনের সক্ষমতার তুলনায় ভারত কোনও বিনিয়োগকারীই নয় এখনও। খোদ ভারতই যেখানে বিনিয়োগ-গ্রহীতা। কাজেই বিনিয়োগের, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের দিক থেকে বাংলাদেশে ভারত কেউ না। তাই এনিয়ে চীনের সাথে ভারত কোন তুলনার যোগ্য না। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশে সরকারকে ভোটবিহীন অর্থে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতায় থাকতে হলে ভারতের সমর্থন পাওয়া আমাদের সরকারের জন্য জরুরি এমন বুঝের ক্ষেত্রে একটা ফ্যাক্টর অবশ্যই, বলে মনে করা হয়। যদিও এটা একটা পারসেপশনই কেবল। কারণ কখনই এটা পরীক্ষা করে দেখা হয় নাই বা এই ধারণাটা চ্যালেঞ্জ করে কেউ দেখে নাই কখনও যে আদৌও ভারতের সমর্থন অনিবার্য কিনা বা কেন? তবে সেটা যাই হোক তবু ভোটারবিহীন ক্ষমতা কায়েম থাকার ইস্যুতে আবার চীন ভারতের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। অথবা চীন আগ্রহী হতে চায় এমন কখনও দেখা যায় নাই তা  বলাই বাহুল্য। অতএব ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর – সেটাই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে মিডিয়ায় ব্যাপক হইচই পড়বে হয়ত সেটা স্বাভাবিক। এ ছাড়া ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে আসা সেটাও তো কোন হাতের মোয়া নয়। চীন নিজেই সেই সফরকে “মাইলস্টোন” বলেছিল, আর তাতে বাংলাদেশে প্রো-ইন্ডিয়ান বিডিনিউজ২৪সহ আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াগুলোও সবাই অনুরণিত করেছিল যে, এটা চীনা প্রেসিডেন্টের “মাইলস্টোন” সফর। এমনটা না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। যেমন সফর শেষে ফাইনালি দেখা গেল, মোট ২৭টা প্রকল্পের জন্য প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারে চুক্তি বা এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছিল তখন।

এছাড়া আরও ঘটনা হল, সেটা আবার এখন ২০১৯ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই ফিগারটাও ছাড়িয়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে। আর তাহলে এরপর এখন?

খুব সম্ভবত, “কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে” চীন একটু দম নিতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, দম নেয়াই বলছি; অর্থাৎ সাময়িক বিরতি। মানে এটা ঠিক মুখ ফিরিয়ে নেয়া নয়। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের চীনা দূতাবাসের বাংলাদেশকে ফিরতি জবাব লেখা চিঠির বরাতে লিখেছে, “চলতি ২৫ বিলিয়ন ডলারের ২৭ প্রজেক্টের বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কিছুতে চীন এখন মন দেবে না। [It has also requested Bangladesh to concentrate more on the timely execution of existing 27 projects for which it pledged more than $25 billion.]

এছাড়া ঐ জবাবি চিঠিতে আরও জানিয়েছে, “বিগত নেয়া প্রকল্প কাজগুলোর একটা মূল্যায়ন করতে সে লম্বা সময় নেবে’। [China will take a long time to evaluate and implement the listed projects involving large amounts, said a letter sent to the external relations division of finance ministry recently] তাই বাংলাদেশ সরকার যেন আপাতত নতুন আরও কোনো প্রকল্প নিতে নতুন প্রস্তাব না পাঠায়।

আসলে ঘটনাটা শুরু হয়েছিল একটা নতুন প্রকল্পের অনুরোধ নিয়ে। আমাদের দেশের সরকার জি-টু-জি সহযোগিতার অধীনে চীনের কাছে বরিশাল-পটুয়াখালি-কুয়াকাটা চার লেনের সড়ক প্রকল্প নেয়া যায় কিনা সেই অনুরোধ করে এক প্রস্তাব পাঠালে এর জবাবে এসব চীনা প্রতিক্রিয়া বাইরে এসেছিল।

এই খবর থেকে বাংলাদেশ জুড়ে একটা কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে যে, তাহলে চীনও কী হাত গুটিয়ে নিচ্ছে? তারা কী সরকারের ওপর নাখোশ? সরকারকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে? সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে? বাংলাদেশ কী আর কোনো চীনা বিনিয়োগ কোনোদিন পাবে না? ইত্যাদি নানান অনুমানের কানাঘুষা গুজব শুরু হতে দেখা গেছে। এর সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে সেটাই এখানে আলোচনার মূল প্রসঙ্গ।

সার কথায় বললে, খুব সম্ভবত এটা নতুনভাবে নতুন নিয়ম-কানুনে চীনের আবার বিনিয়োগে বাংলাদেশে ফিরে আসার পূর্বপ্রস্তুতি নেয়ার কালপর্ব। এ কারণে এটা সাময়িক বিরতি। যে ধরনের সম্পর্ক কাঠামো বা চুক্তি-কাঠামোর মধ্যে চীন এতদিন অবকাঠামো বিনিয়োগ করে এসেছে, তাকে আরো স্বচ্ছ করে নিতেই সম্ভবত চলতি বিরতি এটা। আর এই ঢেলে সাজানোটা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, এটা যেকোনো দেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগের বেলায় নেয়া এমন পরিবর্তন হাওয়া বইবার কথা।
আমাদের এই সম্ভাব্য অনুমান যদি সঠিক হয় তবে আমাদের কথা শুরু হতে হবে ‘জিটুজি’ থেকে। জিটুজি মানে ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ বা সরকারের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি। কী নিয়ে বুঝাবুঝি?

জিটুজি ও কনসালটেন্টঃ
চীনের সাথে নেয়া বাংলাদেশের বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্প এগুলো আসলে জিটুজির অধীনে নেয়া। যার সোজা অর্থ হল, কোন প্রকল্প নির্মাণে কত মূল্য বা খরচ পড়বে তা নির্ধারণ নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডার এখানে হবে না, তাই সবার জন্য কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ডাকা আর সেখান থেকে সে মূল্য যাচাই করে নেয়া হবে না। কিন্তু এমন টেন্ডারবিহীনতাকে আইনে বাঁচাতে এখানে ‘সরকারের সাথে সরকারের চুক্তি’ হয়েছে বলে এই উসিলায় ‘খরচের কাহিনী’ আন্ডারস্টান্ডিং করে নির্ধারিত হয়েছে বলা হবে। এটা চীনা বিনিয়োগের অস্বচ্ছ দিক নিঃসন্দেহে; এক কথায় উন্মুক্ত টেন্ডার না হওয়া যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই একটা কালো দিক, তা বলাই বাহুল্য।
এছাড়া আর একটা দিক। যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ওর টেকনিক্যাল দিক থেকে ঐ প্রকল্প ব্লু-প্রিন্ট মোতাবেক ঠিক ঠিক নির্মিত হয়েছে কি না, তা নির্মাণ কোম্পানি সম্পন্ন করেছে কি না তা প্রকল্প-গ্রহীতা মানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে এক আলাদা কনসালটেন্ট কোম্পানি। মানে সরকার একাজে আলাদা একটা ইঞ্জিয়ারিং কনসালটেন্ট কোম্পানিকে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এটা প্রকল্পে স্বচ্ছতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকল্প-গ্রহীতা রাষ্ট্র নিজস্বার্থে প্রকল্প বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে সাধারণত এক বিদেশী কনসালটেন্ট কোম্পানিকে দিয়ে। যেমন বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প যমুনা সেতুর বেলায় তাই দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু এর আবার এক খারাপ দিক আছে। এই কনসালটেন্ট কোম্পানিই হয়ে দাঁড়ায় ঘুষের অর্থ সরানোর উপায় কোম্পানি। নির্মাণ কন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে ঘুষের অর্থ নিয়ে সরকার বা সরকারের লোকের কাছে পৌঁছে দেয়ার কোম্পানি। কারণ কাজের বিল ছাড় করতে অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে ঐ কনসালট্যান্ট কোম্পানির হাতে।
কিন্তু চীনা জিটুজির বেলায় চীন কোন কনসালট্যান্ট রাখা পছন্দ করে না। তবে, প্রকল্পের খরচে না হলেও গ্রহীতা-রাষ্ট্র চাইলে নিজ আলাদা খরচ করে  সমান্তরালভাবে কোনো কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে প্রকল্পে নিয়োগ দিতে পারে। এটা সে অনুমোদন করে। তাহলে কী চীন বিশ্বব্যাংকের নিয়মের চেয়ে স্বচ্ছ দাতা? যেহেতু এখানে কনসালটেন্ট কোন কোম্পানিই রাখে না?

না, সেটা একেবারেই নয়। কারণ বিশ্বব্যাংকের বেলায় প্রথমত তো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া কাজ দেয়ার নিয়মই নেই। আর টেন্ডারে কাজ দেবার পর সেখানে এক বিদেশি কনসালটেন্ট কোম্পানিও বিশ্বব্যাংকের নিয়মে নিয়োগ পায়! যদিও ঘুষের সুযোগ থাকে সেখানে। কানাডার লাভালিন তেমনই এক কোম্পানি ছিল।  তাহলে?
আসলে চীন বলতে চায় যেহেতু এটা জিটুজি, ফলে সরকারই অন্য সরকারকে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারে। তাহলে কনসালটেন্টের আর প্রয়োজন কী? কিন্তু তাহলে এক্ষেত্রে কী ঘুষের ব্যাপার নাই? বা থাকলে ঘুষের অর্থ স্থানান্তরের প্রতিষ্ঠান কে হয়? সহজ উত্তর, চীনা নির্মাণ কোম্পানির এক স্থানীয় বাংলাদেশী এজেন্ট কোম্পানি থাকতে দেখা যায়। সাধারণত এটাই সেই অর্থ স্থানান্তরের কোম্পানি হয়ে থাকে।
অন্যদিকে আবার কনসালট্যান্ট কোম্পানি রেখেই বা লাভ কী হয়? সে প্রশ্নও ভ্যালিড। কারণ, যমুনা সেতু নির্মাণের ১০ বছরের মাথায় কিছু ফাটল বা নিচের বেয়ারিং বদলের প্রয়োজন দেখা গিয়েছিল। এর দায় কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে নিতে দেখা যায়নি। এ কথাটাও তো সত্যই। তাই সার কথাটা হল, কনসালটেন্ট সম্পর্কিত একটা অস্বচ্ছতা থেকেই যায় সবখানে। এছাড়া টেন্ডার না হওয়াতেও প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল্য ইচ্ছামত সাজিয়ে নিবার অভিযোগ সামলানোর কোন উপায় এখানে থাকে না। তাই জিটুজি তুলনামুলক একটা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থা।

ঋণের ফাঁদঃ
এদিকে ইতোমধ্যে গত দুই বছর ধরে চীনবিরোধী বিশেষ করে গত বছর আমেরিকান সরকারি উদ্যোগে কিছু একাডেমিককে দিয়ে একটা প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল, যার সার বক্তব্য হল যে, বিভিন্ন দেশে চীনের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ-ঋণ দেওয়ার নামে চীন “ঋণের ফাঁদ’ তৈরি করছে ও ঋণগ্রহীতা দেশকে এতে ফেলছে। এ নিয়ে চীনবিরোধী ব্যাপক ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছিল।

পশ্চিমা ঋণ মানে মূলত সিংহভাগ যার আমেরিকান অবকাঠামো-ঋণ, তা রাষ্ট্র নিজে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করে, দুনিয়াজুড়ে এটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠেছিল। কম কথায় বললে, আগে কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো বিশ্বযুদ্ধের শেষে মুক্ত-স্বাধীন দেশ হতে হয়েছে; এরপরই বিশ্বযুদ্ধের শেষেই কেবল খোদ বিশ্বব্যাংকেরই জন্ম হতে হয়েছে। আর এরও পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো তারা বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে শেষে লোন নেয়া শুরু করেছিল। এ কারণে সবটাই বিশ্বযুদ্ধের পরের ফেনোমেনা। তাও আবার আরো কাহিনী আছে। জাপান বাদে যে এশিয়া, এর বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল অন্তত আরও ২০ বছর পরে। এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক – সেটা ষাটের দশকের আগে একেবারেই আসে নাই। অর্থাৎ ১৯৪৫ সাল থেকে পুরো ষাটের দশক পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপ ও এদিকে একমাত্র জাপানকে পুনর্গঠনে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ দিয়ে সাহায্য করেছিল। যার চিহ্ন হিসেবে সেই থেকে “রি-কনস্ট্রাকশন” শব্দটা বিশ্বব্যাংকের নামের সাথে জড়িয়ে যায়; এভাবে “ব্যাংক অব রি-কন্সট্রাকশন এন্ড ডেভেলবমেন্ট”। আর সেই বিনিয়োগ যা সেকালে আমেরিকান ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত ছিল, তা ইউরোপে  বিনিয়োগ ঢেলে স্যাচুরেটেড কানায় কানায় ভর্তি হয়ে উপচিয়ে না পড়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক ইউরোপ আর জাপান থেকে সরেনি, এশিয়াতেও আসেনি। বরং এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক পুরোদমে ঋণ দিতে শুরু করেছিল ১৯৭৩ সালের পর থেকে। ততদিনে আবার বিশ্বব্যাংক প্রথম ম্যান্ডেট (যেটা হল, সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে তবেই সমতুল্য মুদ্রা ছাপানো শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা) অকার্যকর হয়ে গেছিল ও এই পরাজয় সামলাতে পরে ১৯৭৩ সালে নতুন ম্যান্ডেটে বিশ্বব্যাংকের পুনর্জন্ম হয়েছিল। আর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রথম তৎপরতায় এসেছিল ১৯৭৫ সালের শেষভাগে। তবুও সেই থেকে বাংলাদেশে গত ৪৫ বছরে বিশ্বব্যাংক যে মোট ঋণ দিয়েছে তা গত তিন বছরে চীন একা যে অবকাঠামো ঋণ দিয়েছে তার চেয়েও কম। মূল কথা, বিশ্বব্যাংকের মোট সামর্থ্যরে চেয়ে চীনা সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু এতদিনে বিশ্বব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পেশাদারিতে ও ইন্ট্রিগিটিতে নিজেকে যতটা তুলনামূলক বেশকিছুটা স্বচ্ছ করতে সক্ষম হয়েছে, আর এই বিচারে আবার চীন অনেক পেছনে আছে, একথা মানতে হবে।

যদিও এ ব্যাপারে অবশ্য চীনের কিছু পাল্টা যুক্তি ও শেল্টার আছে।
কোনো দেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা ও সেই নির্মাণকাজ ধরা প্রসঙ্গে চীনের যুক্তিটা অনেকটা এরকম যে গ্রহীতা রাষ্ট্র-সরকার চোর হলে আমরা ওর সহযোগী হয়ে যাই ও বেশ করে ঘুষের ব্যবস্থা করে দেই। আবার তারা যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার সরকার হয় সে ক্ষেত্রেও আমরা তার সহযোগীই হয়ে যাই। যার বাংলা মানে হল, আমরা ঘুষ না দেয়ার কারণে কাজ হারাতে চাই না।

এছাড়াও চীন বলতে চায় (বুর্জোয়া) আমেরিকার চেয়ে তবু আমরা ভাল। কারণ ঐ ঋণগ্রহীতা দেশে ক্ষমতায় কে আসবে বসবে তা নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। দেখাই না। কিন্তু আমেরিকার ষোল আনা আছে। আমরা বরং এসবক্ষেত্রে আমেরিকার কাছে নিশ্চয়তা নিয়ে নেই যে, তার পছন্দে নির্ধারিত হবু যেকোনো সরকার যেন আমার অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে দেয়। তাহলে আমেরিকা সরকার বানাতে সেদেশ কী করছে এটা নিয়ে আমরা আর মাথাব্যাথা দেখাই না। চীন আসলে বলতে চায়, চীনের অর্থনীতির উত্থান ও বিকাশের এই পর্যায়ে তৃতীয় দেশে সরকারকে প্রভাবিত করতে আপাতত আমেরিকার সাথে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না জড়ানোর নীতিতে চলে চীন। এটাই চীনের আপাতত অবস্থান ও কৌশল।

কিন্তু উত্থিত অর্থনীতির চীনের বিরুদ্ধে বাস্তব এমন পরিস্থিতিতে, শুরু থেকেই বিশেষত একালে “চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প” নিয়ে হাজির হওয়ার পর  তবুও আমেরিকার পক্ষে আর বসে থাকা সম্ভব হয়নি। আমেরিকা চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে, নিজের গ্লোবাল নেতৃত্বকে চীনের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিরোধ দেখিয়েছিল চীনের বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ [AIIB] ব্যাংকের জন্মের সময় থেকে। এক কথায় দিন কে দিন আমেরিকা স্পষ্ট জানছিল যে, সত্তর বছর ধরে তার পকেটে থাকা গ্লোবাল নেতৃত্ব এটা চীন কেড়ে নিতে চ্যালেঞ্জ করতে উঠে আসছে। আর তাতে আমেরিকা ২০০৯ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, চীনের এই উত্থানকে আমেরিকা নিজের পাশাপাশি সমান্তরালে উঠতে বা চলতে দিতে চায় না। বরং যতদূর ও যতদিন পারে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে – এই নীতি নিয়েছিল। এই নীতিরই এক সর্বশেষ অংশ হল চীন ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলতে চাচ্ছে, এই ক্যাম্পেইন শুরু করা।

এই ক্যাম্পেইনে আমেরিকা যা প্রচার করতে চায় তা হল, প্রথমত, চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলা যে, চীন দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে আসেনি। বরং ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলে চাপ দিয়ে লুটপাট, মুনাফা লাভালাভ এই বাড়তি সুবিধা নেয়া আর অর্থ কামানো, যেন এটাই চীনের ব্যবসা। এমন একটা প্রচারণার আবহ তৈরি করেছে আমেরিকা যেটা ডাহা ভিত্তিহীন ক্যাম্পেইন। এমনকি সত্তর-আশির দশকের বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেও যেসব অভিযোগ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা করত এটা তাঁর তুল্য নয়। যেমন অভিযোগ করত যে, ঋণের অর্থ বিশ্বব্যাংক অপচয় বা নিজের কর্মীদের সে অর্থ পকেটে ভরা অথবা কনসালট্যান্টের নামেই ঋণের অর্ধেক টাকা মেরে দেয়া বা ফিরিয়ে নেয়ার অভিযোগ ইত্যাদি। অবশ্য যারা এই অভিযোগ তুলত এদের জানাই নেই যে, কনসালটেন্সিতে দাবি করা অর্থ মোট প্রকল্পের পাঁচ শতাংশের বেশি দেখানোও প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব। তবু এসব অভিযোগ চালু ছিল, আর তাতে যতটুকু বাস্তবতা ছিল, একালে চীনবিরোধী এই ক্যাম্পেইনে তাও নেই। তবে আবার চীনের বিরুদ্ধে কোনই অভিযোগই নেই, সে কথাও মিথ্যা। ঠিক যেমন বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এ কথাও ডাহা মিথ্যা।

প্রথমত কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়াই তথাকথিত জিটুজিতে প্রকল্প নেয়া, এটাই তো চীনা প্রকল্পের সবচেয়ে কালো আর বড় অগ্রহণযোগ্য দিক। যা চূড়ান্তভাবে অস্বচ্ছ। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক অন্তত নব্বুইয়ের দশকের শেষ থেকে সতর্ক ও সংশোধিত হয়েছে। কঠোর ইন্ট্রিগিটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও তা দিয়ে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া এখন নিয়ম হল যে, অবকাঠামো ঋণের দাতা যে দেশই হোক না কেন, তাতে ওই প্রকল্পের কাজ সেকারণে দাতাদেশকেই টেন্ডারে পাইয়ে দিতে এমন কোন সম্ভাবনা নাই। বরং বিশ্বাসযোগ্য খোলা টেন্ডার হতে হবে – বিশ্বব্যাংক যেখানে ইতোমধ্যেই এই নীতিতে পরিচালিত [যমুনা সেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা ছিল জাপান। কিন্তু জাপান এই সেতু প্রকল্পে কোন নির্মাণ কাজ পায় পাই।] , চীনা ঋণ নীতি এখনো এই মান অর্জন করতে পারেনি। কাজেই  টেন্ডার-ছাড়া কাজ পাওয়া এই চীনা অবস্থান গ্রহণযোগ্য হতেই পারে না।
তবে চীনের ক্ষেত্রে আবার এ কথাও সত্য যে, ঋণগ্রহীতা দেশ ঋণ-পরিশোধের সমস্যায় পড়ে যায় এমন বেশি ঋণ যদি হয়েও যায়, তবে চীন তা গ্রহীতা দেশের ঘটিবাটি সম্পত্তি বেঁধে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়, তা-ও কখনোই ঘটেনি। বরং পুরা বিষয়টাই পুনর্মূল্যায়ন করে – সুদ কমিয়ে দেয়া বা পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেয়া থেকে শুরু করে এক কথায় যেকোনো রি-নিগোশিয়েশনের সুযোগ এ পর্যন্ত সব দেশের ক্ষেত্রেই চীন দিয়েছে। যেমন মালয়েশিয়া বা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আমরা তাই দেখেছি। আর শ্রীলঙ্কার বন্দর নির্মাণের ঋণ পরিশোধের জটিলতার যেটা নিয়ে চীনা “ঋণের ফাঁদ” হিসাবে একে সবচেয়ে বড় উদাহরণ বলে ক্যাম্পেইন করা হয় তা মূলত শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির খেয়াখেয়ি থেকে উঠে এসেছে। নিজের মাজায় জোর নেই এমন শ্রীলঙ্কার একটা রাজনৈতিক দলকে বাগে এনে ভারত তাকে কাছে টেনে উসকানি দেয়া থেকে এটা তৈরি হয়েছে। যার কারণে অনেক বাড়তি সমস্যা উঠে এসেছিল। বন্দর তৈরি হয়ে যাওয়ার পরও তা চালু করা যায়নি। পরের পাঁচ বছর এটা অকেজো ফেলে রাখা হয়েছিল ও এতে আয়হীন ঋণের দায় আরো বাড়ছিল। তাই বলে আবার চীন ওই বন্দর নির্মাণ ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছিল এমন কোনো ব্যাপার সেখানে ছিলই না। কিন্তু  তারা নিজেরাই দুই দলের টানাটানি সামলাতে না পেরে নির্মিত এই বন্দরের মালিকানা শ্রীলঙ্কা নিতে অপারগ বলে চীনকে  জানালে চীন এক প্রস্তাব দেয়। যে ঐ বন্দর নিজে অপারেট করে চালিয়ে আয় তুলে আনার কোম্পানি হিসেবে চীন বাধ্য হয়ে অন্য এক চীনা কোম্পানি সামনে এনেছিল।  ঐ কোম্পানি পুরাটাই দায় নিতে চেয়েছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকার বন্দরের ৭০% মালিকানা কিনে নিতে দিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার সরকারের ঋণের দায় মুক্তি ঘটেছিল।  ব্যাপারটা আসলে ফয়সালা হয়েছিল এভাবে যে বন্দর নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার কোন ঋণ নাই। কারণ বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। আর শ্রীলঙ্কায় চীনা ঐ কোম্পানীর একটা সম্পত্তি আছে – সেটা হল ঐ বন্দর। আর এর পরিচালনা ও নিরাপত্তার ভার কেবল শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীই নিবে [চীনা নৌবাহিনী নিবে বলে প্রপাগান্ডা করা হয়েছিল], এটাই বাস্তবায়ন হয়েছিল।

ঋণের ফাঁদ – এই বিতর্কে আবার আর এক গুরুত্বপুর্ণ দিক হলঃ  প্রথমত, কোনো রাষ্ট্রে ‘অতিরিক্ত ঋণ” নিয়েছে – এটা বুঝাবুঝি ভিত্তি বা ক্রাইটিরিয়া কী?  এই তর্কের ভিত্তি কী তা কোনো দিনই সাব্যস্ত করা যায়নি যা, দিয়ে বুঝা যাবে অতিরিক্ত ঋণ নেয়া বা গছানো হয়েছে?  যে সব যুক্তি আমেরিকান প্রপাগান্ডার একাদেমিকেরা তুলেছেন তা হল ঋণ জিডিপির অনুপাত।  কিন্তু  নেয়া-ঋণ, জিডিপির কত পার্সেন্ট হয়ে গেলে সেটা অতিরিক্ত ঋণ বলে গণ্য হবে এর সর্ব-গ্রহণযোগ্য নির্ণায়ক কোথায়? তা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে কিস্তি না দিলে টুঁটি চেপে ধরতে হবে, চীনের এমন কোনো নীতিই নেই। কোন উদাহরণ নাই। আবার এই নীতি মানলে ভুটানে ভারতের বিনিয়োগও একই দোষে দুষ্ট। মানে ভুটানে ভারতও ঋণের “ফাঁদ পেতেছে” – এই একই যুক্তিতে অভিযোগ উঠানো যাবে, এর কী হবে?

আসলে কোন নেয়া-ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি, কিন্তু সাথে পরিশোধের সক্ষমতাও যদি বেশি হয় – অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি ভাল থাকে তাহলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও হারও কোনই সমস্যা নয়। আসলে কোন বড় প্রকল্প নেয়ার পরেই ওর ইকোনমিক ভায়াবিলিটি বা ফিজিবিলিটি টেস্ট করে নেয়া মানে সুনির্দিষ্ট ঐ দেশের ঐ সময়ের অর্থনীতি ঋণ পরিশোধের জন্য যোগ্য কিনা – এনিয়ে একটা স্টাডি করে নিলেই সব বিতর্কের মীমাংসা হয়ে যায়। যমুনা সেতুর বেলায় এই টেস্ট করা হয়েছিল আর তাতে পাস করেছিলাম আমরা। আবার বাস্তবে যমুনা সেতুর ঋণ পরিশোধের হার (যেহেতু এই সেতুর ব্যবহার অনুমিতের চেয়ে বেশি মানে ট্রাফিক বেশি, তাই টোল আদায় বেশি) অনুমিত হারের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই ঋণ যদি অনেক বেশিও হয় তাহলেই চীন “ঋণের ফাঁদ” পেতেছে এটা যেমন মিথ্যা, তেমনি আবার চীনের অবকাঠামো ঋণ নীতি সব স্বচ্ছ; তাও একেবারেই সত্যি নয়। এমনকি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীন আপটুডেট এখনকার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে, তাও সত্যি নয়।

সার কথায়, আমেরিকার এসব তৎপরতা নেতিবাচক ও চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা। আর ভারতও সুযোগ বুঝে এতে সামিল হয়েছে আর নিজের মিডিয়ায় এসবের প্রগান্ডায় ভরিয়ে ফেলেছে। এমনকি আমাদের প্রথম আলোও নিজস্ব কোন বাছবিচার বা ক্রিটিক্যাল অবস্থান না নেয়া ছাড়াই ভারতের মিডিয়ার খবর অনুবাদ করে ছাপাচ্ছে। ইদানীং অবশ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, হঠাৎ এমন প্রপাগান্ডায় ভাটা পড়েছে। হতে পারে প্রপাগান্ডাকারীদের সাথে আমেরিকার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে!

ইইউ চীনের বেস্ট বন্ধুঃ প্রপাগান্ডা করে খাওয়ার দিন যে শেষ করে দিবে
সেটা যাই হোক, আমরা আরও ইতিবাচক জায়গায় ইতোমধ্যে পৌছে গেছি। আসলে নতুন অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। ব্যাপ্যারটা হল, এই বিতর্ক বা প্রপাগান্ডাকে মেরে ফেলতে সক্ষম এমন নতুন এক স্টেজ তৈরি হয়ে গেছে। সেই আসরের প্রধান ইতিবাচক নেতা ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর এর সূত্রপাত, চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে চীন সারা ইউরোপকে সাথী হিসেবে পেতে যাচ্ছে – নতুন এই বাস্তবতা এখান থেকে। অথবা কথাটা উল্টা করে বলা যায়, চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পের ইউরোপে বিস্তৃতিকে ইইউ নিজের জন্য বিরাট সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছে ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর ঠিক এ কারণে আমেরিকার যেমন অবস্থান হলো চীনকে কোনো সহযোগী স্থান না দেয়া, চীনের সাথে কোন সহযোগিতা নয়। চীনের সাথে মিলে কোন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা নয় বরং চীনের স্ট্যান্ডার্ড নাই বলে অভিযোগ তুলে নাকচ করে চীনকে কোণঠাসা করা। ঠিক এরই বিপরীতে ইইউয়ের অবস্থান হলঃ চীনকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে উঠে আসতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সেই স্ট্যান্ডার্ড যৌথভাবে আরো উঁচুতে উপরে উঠাতে ভূমিকা নিতে হবে। আর এই শর্তেই কেবল বেল্ট-রোডসহ চীনকে আপন করে নিতে হবে।

এ ব্যাপারে গত ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল  চীন-ইইউ যৌথ সম্মেলনসহ ঘটনা অনেক দূর এগিয়ে কাজে নেমে গেছে। আর ঐ দিনই একমতের করণীয় নিয়ে এক যৌথ ঘোষণাও ফুল টেক্সট এখানে প্রকাশিত হয়ে গেছে। যদিও অবকাঠামো ঋণদানসহ অর্থনৈতিক তৎপরতায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি কথাটা শুনতে যত সহজ মনে হয়, ব্যাপারটা ততই সহজ-সরল নয়।
মূল কারণ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কথাটা বলা মানেই আপনা থেকেই উঠে আসবে জাতিসংঘের কথা। জাতিসংঘের ঘোষণা, জাতিসংঘের চার্টার, নানান আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন  – এককথায় অধিকারবিষয়ক সবকিছুই। মূল কারণ জাতিসংঘ দাঁড়িয়ে আছে ‘অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ – এরই একটা সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে।

কিন্তু তাতে সমস্যা কী?
সমস্যা বিরাট। মৌলিক সমস্যাটা হল কমিউনিস্ট রাজনীতি অধিকারভিত্তিক রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা নয়। যদিও জাতিসঙ্ঘের পাঁচ ভেটোওয়ালা রাষ্ট্রের দুটাই কমিউনিস্ট। অন্তত চীন ও রাশিয়া কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের রাষ্ট্র। যার সোজা অর্থ হল ‘অধিকারের রাষ্ট্র’ কথাটায় কমিউনিস্টদের ‘ঈমান’ কম। অধিকারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি এটা কমিউনিস্টদের রাজনীতি নয়, কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক এজেন্ডাও নয়। অথচ কমিউনিস্টরাও বহাল তবিয়তেই জাতিসঙ্ঘে সক্রিয় আছে। কিন্তু জাতিসংঘের যেসব জায়গায় অধিকারবিষয়ক নীতি বা কথাবার্তায় প্রাবল্য আছে, সেসব সেকশন বা বিভাগ অথবা ইউএন- হিউম্যান রাইট ধরণের উপ-সংগঠনে কমিউনিস্টরা তেমন অংশ নেয় না বা পাশ কাটিয়ে চলে। কখনও আড়ালে টিটকারীও দেয়। এগুলো এতদিনের রেওয়াজের কথা বলছি।
কিন্তু আমরা যদি এ নিয়ে চীন-ইইউয়ের যৌথ ঘোষণা পাঠ করি, তাহলে বুঝব ঘটনা আর সে জায়গায় নেই। পানি অনেকদূর গড়িয়েছে। উল্টা এই প্রথম যৌথ ঘোষণায় জাতিসঙ্ঘের অধিকারবিষয়ক ভিত্তিগুলোর রেফারেন্স উল্লেখ করে বলা হয়েছে চীন ও ইইউ এগুলোকে মেনে চলে ও ভিত্তি মনে করে – একমতের সাথে। এমনকি বলা হয়েছে, এখন থেকে প্রতি বছর চীন ও ইইউ জাতিসংঘের মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝি বাড়াতে ও একমত হতে আলাদা করে নিজেদের যৌথ সেশনের আয়োজন করবে।

আরও অগ্রগতিঃ
এমনকি চীন-ইইউ ঐ সম্মেলনের পরে এ বছরের চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনেও [২৭ এপ্রিল ২০১৯] যে যৌথ ঘোষণা গ্রহীত হয়েছে সেই যৌথ ঘোষণাও আসলে চীনা-ইইউয়ের আগের যৌথ ঘোষণার ছাপে তৈরি করা।

এই সবগুলো অভিমুখ বিচারে, বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগে বিরতি এবং চীনা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের কথা যেগুলো শোনা যাচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হল চীন অভ্যন্তরীণভাবে অবকাঠামোতে ঋণদান বা বিনিয়োগ নীতি বদলাচ্ছে। এরই ছাপ এখানে পড়ছে বলে অনুমান করা আশা করি ভুল হবে না। লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট! চীন আবার আরও স্বচ্ছ নীতিতে অবকাঠামো ঋণ দিতে এগিয়ে আসবেই। এসব তারই পুর্বপ্রস্তুতি!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত  – এর ১৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে পদার্পন উপলক্ষে গত  ২৭ অক্টোবর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে বাংলাদেশে কেন স্থগিত হলো চীনা ঋণ!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]