উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

গৌতম দাস

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

http://wp.me/p1sCvy-2hx

 

গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

[প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

গৌতম দাস

২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

http://wp.me/p1sCvy-2hm

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

“I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে, দুনিয়া মজলুমের পক্ষেই দাঁড়াবে

গৌতম দাস

১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার ০০ঃ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2g5

 

ট্রাম্পের সৌদি সফরে (২০-২১ মে ২০১৭) সৌদি ড্যান্সের তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরব আবার খবরের প্রধান শিরোনাম। যদিও এবার সাথে নিয়েছে বা বলা ভাল এবারের সৌদি টার্গেট কাতার। কাতারকে সাইজ করা। সংক্ষিপ্ত করে বললে খবরটা হল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজাতন্ত্রী ছয় রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্র-জোট আছে নাম GCC জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল।  কাতার, সৌদি আরব, ইউএই (এটা আবার দুবাই ও আবুধাবিসহ সাত আমির-শাসিত রাষ্ট্র বা আমিরাতের এক ফেডারেশন), ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এই ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে জিসিসি গঠিত। হঠাৎ করে গত ৫ জুন ২০১৭ এর খবর হল,  জিসিসির সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন আর জিসিসির বাইরের মিসর, এই চার রাষ্ট্র কাতারের সাথে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করেছিল। আর, নৌ, আকাশ ও সড়ক পথ ও সীমান্ত বন্ধ করে সব বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।  কাতারি কূটনীতিকদেরকে এই চার রাষ্ট্র, তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিল।  প্রাথমিক খবর হিসাবে প্রথম কয়েক ঘন্টা আমরা শুনেছিলাম যে, সরকারি ‘কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি বাদশাকে নিন্দা করে কিছু খবর প্রচার করা হয়েছিল। তা থেকেই নাকি ক্ষুব্ধ সৌদি প্রতিক্রিয়া এটা। গত ২৩ মে, সেঘটনার ধোঁয়া থেকে সব শুরু। খুব সংক্ষেপে মুল ঘটনাটা বললে, ট্রাম্পের সৌদি সফরের পরের দিন কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি কাতারের মিলিটারি একাদেমি সফর করতে গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি ট্রাম্পের ঐ সফর আর সৌদি বাদশার সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন আর সেটাই সরকারী কাতার নিউজ এজেন্সী প্রচার করেছিল। আর এই খবরকে রেফার করে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে খবর প্রচার করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পালটা বার্তা দিয়ে কাতারের আমির জানায়, এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা। হ্যাকারের হাতে কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাকড হয়ে এটা একটা মিথ্যা খবর প্রচার করা থেকে এটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা রয়টার নিউজ এজেন্সীকে কাতারী আমীর জানিয়েছিলেন যে তিনি মিলিটারি একাদেমিতে গেছিলেন কথা সত্য কিন্তু তিনি সেখানে কোন বক্তৃতাই সেখানে দেন নাই, অথবা কোন বিবৃতিও দেন নাই।  এদিকে জুনের ঐ ৫ তারিখেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনলাম ‘কাতার নিউজ এজেন্সীর ওয়েব সাইট হ্যাকের ঘটনার সাথে – আমেরিকায় দুবাইয়ের রাষ্ট্রদুতের ইমেল একাউন্ট – এর সংশ্লিষ্টতা আছে এর প্রমাণ মিলেছে।  কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টার মধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে ঐ চার রাষ্ট্রের সরব অভিযোগ যেমন – কাতার নিউজ এজেন্সীর কথিত খবর, কাতারের আমীরের সৌদি বাদশার নিন্দা ইত্যাদি সব ছেড়ে এবার সৌদিসহ অভিযোগকারিরা তাদের ‘আসল’ অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করে।

সার কথায় সেসব অভিযোগ হল, কাতার এক “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র”, কারণ সে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। যেমন বিবিসি [যদিও বিবিসির রিপোর্ট ও ভুমিকা বড়ই তামাসাময়  ও খুবই নিচা স্টান্ডার্ডের। কাতারের আমীরের কোন বক্তব্যই না দিয়ে কেবল সৌদি বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে পুরা স্টোরি তৈরি করে হয়েছে।] তারা কেবল সৌদি বয়ানের উপর ভর করে এসম্পর্কে সৌদি সরকারি এজেন্সীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল,”সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিপদ থেকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংরক্ষণকে নিরাপদ করতে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে”। ঐ একই বিবিসি রিপোর্টে আবুধাবিও একই রকম মন্তব্যে জানিয়েছিল, “তারা মনে করে কাতারের দোহা সরকার, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে চলে ও তাদেরকে সমর্থন ও অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে”। অর্থাৎ কে কী প্রচার করেছে সেটা আর প্রসঙ্গ নয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, অর্থ দেয়া প্রশ্রয় দেয়া ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এটাই আসল ইস্যু, আর তা সামনে এসে গেছে।

কিন্তু কাতার ‘সন্ত্রাসবাদী’, এটা আবার কোন সন্ত্রাসবাদ? কাছকাছি সময়ের ঘটনায় “এই সন্ত্রাসবাদের” স্পষ্ট হদিস রেফারেন্স পাওয়া যায় গত ২০-২১ মে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরকালে। “ইরান সন্ত্রাসবাদ করে” আর এর বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। আর এটা বলতেই যেন সৌদি বাদশা তাকে হায়ার করে এনেছিলেন। আর এই সন্ত্রাসবাদ বলতে – প্যালেস্টাইনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড এদের ততপরতাকে ট্রাম্পের আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে। এটা আমেরিকার অনেক পুরানা বয়ান, [যদিও মাঝে “আরব স্প্রিংয়ের চলার সময়” আমেরিকা ও সৌদি আরব উভয়েই ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করা ভুলে গেছিল, বলা যায় সন্ত্রাসী মনে করতে বিরতি বা ক্ষমা দিয়েছিল। তারা ব্রাদারহুডকে মিসরে ক্ষমতায় আনতে একসাথে কাজ করেছিল। যাই হোক, সৌদি আরবের যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা ফর্মুলায় আমেরিকাকে অনুসরণ করে যাকে পছন্দ হয় না, হুমকি মনে হয় তার গায়ে সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগায় দেয় তারা। ফলে ইরান সন্ত্রাসী, আর কাতার সন্ত্রাসী। এই “বাড়তি সন্ত্রাসবাদ”  ধারণা, সৌদি আরব ট্রাম্পকে তাল দিতে নিজে দেশে ডেকে এনে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছিল। ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ রাষ্ট্র + জার্মানি এই (পি৫+১) এরা একসাথে এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ইরানের সাথে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছিল কী করে?

কিন্তু কাতার জিসিসির সদস্য হয়েও এসব প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনকে, বিশেষ করে হামাসকে সর্বতভাবে সমর্থন করে, তাদের ততপরতার  প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সমর্থন দেয়, আশ্রয় দেয় সহযোগিতা করে। এই সুত্রে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ। আমেরিকান “সন্ত্রাসবাদ” ধারণাকেও নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ মোতাবেক টেনে লম্বা করে নেওয়া।

এখন তাহলে পুরা ঘটনায় একেবারে আসল, মূল বিষয়টা কী? এক শব্দে বললে, বিষয়টা হল, সৌদি রাজতন্ত্রের আয়ু সমস্যা। এখানে রাষ্ট্র বা ভুখন্ড হিসাবে সৌদি আরবের আয়ুর কথা বলা হচ্ছে না। ঐ রাষ্ট্র পরিচালনের সিস্টেম হিসাবে “রাজতন্ত্র” – এর ভবিষ্যত বা আয়ুর কথা বলা হচ্ছে। সম্ভবত আরও সঠিক ভাষ্য হবে – সৌদি রাজ-সরকার নিজের ভবিষ্যত, আয়ূ বা হুমকি প্রসঙ্গে নিজের পারসেপশন বা ধারণা কী সেটাই এখানে মূল ইস্যু বা সমস্যা।

সৌদি আরব মনে করে তার রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরের ইরান। দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামি জনগোষ্ঠি নিজেদের মাঝে ইসলামের নানা ফ্যাকড়ায় তাদের বিভক্তি বা ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠিই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রথম আর সবচেয়ে কমন অবস্থান হল – কাম্য সিস্টেম হিসাবে তারা রাজতন্ত্রকে নাকচ করা। আর খুবই সহজে ইরান এই কথাটাই তাদের মনে করিয়ে দেবার কাজ করে ফেলতে পারে — এটাই সৌদি আরবের চোখে সবচেয়ে বড় “সন্ত্রাসী” কাজ। সবাই জানেন ইরান সুন্নি নয়, তাসত্ত্বেও হামাস, হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের মত দলের রাজনৈতিক প্রতিরোধ  লড়াই সংগ্রামের প্রতি ইরানের সক্রিয় সমর্থন অবস্থান এটা ইরান মুল্যায়নে খুবই নির্ধারক।  কারও ইরানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন থাকলেও তাসত্ত্বেও ইরানের সারা দুনিয়ার মজলুমদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয়  সমর্থন দেয় এই কারণে – এই ভুমিকাকে মুসলমানেরা অন্তর থেকে ইতিবাচক মনে করে।

তবে সৌদি আরবের ইরান মুল্যায়ন শেষে তার দ্ব্যার্থহীন অবস্থান হল,

একঃ যে কেউ শিয়া বা সুন্নি যাই হোক, ইরানের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখে সে সৌদি আরবের শত্রু। তাকে কোন ধরণের সহানুভুতি বা সমর্থন, অনুমোদন কিছুই দেয়া যাবে না। শুধু তাই নয় তাকে উচ্ছেদ করে দেওয়াতেই সৌদি আরবের শান্তি, এটাই তার নীতি।

দুইঃ সৌদি রাজতন্ত্রের ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স স্বভাবতই তার নিজ সেনা বাহিনী। আর এর পরের বলয় হল জিসিসি; যার মূল পরিচয় এরা সৌদির  মতই মধ্যপ্রাচ্য ভুগোলের রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র। এছাড়া জিসিসি কেবল সাধারণ কোন রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এই ছয় রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক সক্ষমতাগুলোকে একপাত্রে নিয়ে কমন একটা অবস্থান থেকে পরস্পরকে রক্ষায় তা ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য জিসিসির স্টিয়ারিং হাতে রাখা সৌদি আরব  – মূলত সৌদি প্রভাবে, ইয়েমেনে হুতিদের দমনে কাতারের ভিন্নমত দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও নিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে যোগ দিতে সেও বাধ্য হয়েছে। তাতে বিষয়টাতে কাতারের যতই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাক। আর ওদিকে জিসিসির পরের লাইন অব ডিফেন্স হল, একদিকে অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যা-প্রধান রাষ্ট্রগুলো (তবে খোদ জনগোষ্ঠি নয়, কেবল সরকার) আর অন্যদিকে বড় কুতুব আমেরিকা।

তিনঃ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অস্বস্তিকর দুস্থবোধ এনে দিয়েছিল ওবামা, ২০১৪ সাল থেকে। এবিষয়ে আরও বিস্তারিতের জন্য আগের লেখা  এখানে দেখুন।  সে বছর থেকে ইরান বিপ্লবের পরে এই প্রথম প্রকাশ্য সমঝোতায়  ইরান-আমেরিকা ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’ (পি+৫) করার আলাপ শুরু হয়েছিল। যদিও ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের এতদিন পরে ওবামা প্রশাসনের হঠাত এই মতি বদলের পিছনে প্রধান কারণ ছিল ইরাকে আইএস ততপরতা বৃদ্ধি আর তা নিজে সামলাতে গেলে আমেরিকাকে আবার মাঠে আমেরিকান মেরিন নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হত। যে খরচ বিতে সে অপারগ। তাই এই কাজটা সে ইরান এবং ইরান প্রভাবিত ইরাক এবং শিয়া মিলিশিয়া ইত্যাদি দিতে করাতে চাওয়ার আমেরিকান  স্বার্থ এটাই ইরানের সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক পাতানোর তাগিদ অনুভবের  মূল কারণ ছিল। তাই ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’  মানে নিউক্লিয়ার অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা সে আর করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আর তা মনিটরিং করতে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে আমেরিকাসহ পশ্চিম এবার সব অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নিবে এই নিগোশিয়েশন শুরু হয়েছিল। এই সফল নিগোশিয়েশন  আলাপের সমাপ্তিতে গত  ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়ে যায়। মনিটরিংসহ নানা শর্ত সাপেক্ষে হলেও এতে অবরোধ তুলে নেওয়াতে ইরান বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে উঠে আসতে থাকে। অর্থনীতি আবার প্রাণ পায়। আর তাই উলটা দিকে সৌদি আরবের ভালনারেবল অবস্থা ভীতি অস্বস্তি বোধ – সেখান থেকে।  গত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরও সৌদি আরব এমন দুস্থ অসহায় বোধ করে নাই। অথচ এই চুক্তির কারণে, ইরানের সাথে আমেরিকার নীতি অবস্থান স্বার্থবিরোধ কিছু কিন্তু মিটে যায় নাই। কেবল একটা একসাথে সহবস্থানের একটা ওয়ার্কেবল অবস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র। যা আবার স্থায়ী নয়, প্রতি বছর মনিটরিং মুল্যায়নের অধীনে ও ভাল রিপোর্ট সাপেক্ষে চালু থাকবে, আছে। তবু এটাও সহ্য করা সৌদি আরবের কাছে অসম্ভব, অগ্রহণযোগ্য।
আমেরিকা-ভিত্তিক ‘সৌদি-আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এফেয়ার্স কমিটি’  – এটা এক লবিষ্ট ফার্ম এর নাম। এর সভাপতি  সালমন আল-আনসারি। তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট সৌদি আরবের পক্ষে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে বলেছেন, “কাতারের আমীর – সন্ত্রাসবাদী ইরান সরকারের পক্ষে তোমার অবস্থান আর কাস্টডিয়ান অব টু হলি মস্ক – তাকে অপমান করেছ। আমি তোমাকে মনে করায় দিয়ে চাই মিসরের মোরসি ঠিক একই কাজ করেছিল আজ সে খতম হয়ে গেছে, জেলে পচতেছে”।   আনসারির এই কথা গুলো খুবই প্রতীকী, সৌদি মনোভাব অবস্থানের আসল প্রতিফলন। এভাবে বলা কথাটা ‘সহি কিনা’ সেটা এখানে একেবারেই বিচার্য নয়।

চারঃ সৌদি আরব যা বলতে চাইছে এর সারকথা হল,  কাতারে বিদেশনীতি আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারবে না। কাতার নুন্যতম ভিন্ন চোখে ইরানকে দেখতে পারবে না।  কাতার সেটা করার চেষ্টা করেছে তাই সে কাতারকে আসলে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ না, কাতারকে সে সাধারণ খাদ্য ও পণ্যেও সরবরাহের বিরুদ্ধে অবরোধ করবে। কোন ব্যবসা করতেও দিব না। আমার কথা না শুনলে এমনকি তোমাকে সরিয়ে তোমার কোন জ্ঞাতি ভাইকেও ক্ষমতার আনার চেষ্টা করব।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-যুবেইর প্যারিস সফরে ছিলেন। সেখান থেকে রয়টারের সংগৃহিত তাঁর বক্তব্য পরের দিন ছয় জুন ছাপা হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে সৌদিদের মনের অনেক কথা বলে দিয়েছেন।  তার সোজা কথা, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে কাতারকে অবশ্যই হামাস এবং ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক ছিন্নসহ আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। [Qatar must take several steps, including ending its support for the Palestinian group Hamas and the Muslim Brotherhood, to restore ties with other Arab states.]  তিনি আরও বলছেন, “সন্ত্রাসবাদী চরমপন্ন্থা (এটা বলতে হামাস, ব্রাদারহুড বুঝতে হবে),  হোস্টাইল বা বেয়াদব মিডিয়াকে সোজা করা (আল জাজিরা পড়তে হবে) আর ভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ (এটা বলতে বাহারাইনের আন্দোলনকারিদের প্রতি সহানুভুতি বুঝতে হবে) বন্ধ করবে“ – বিগত কয়েক বছরে আমরা এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছি আর কাতার তাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন কাতার এগুলো বাস্তবায়ন করেছে আমরা দেখতে চাই”। এই বক্তব্য রয়টার থেকে কোট-আনকোট নেয়া। সরাসরি ইংরাজিটা তুলে দিচ্ছি, “We want to see Qatar implement the promises it made a few years back with regard its support of extremist groups, regards its hostile media and interference in affairs of other countries,” Jubeir told reporters in Paris.

যুবেইরের এসব মন্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ হল, তিনি বলছেন কাতার “প্যালেস্টাইন অথরিটি আর মিসর সরকারকে আন্ডারমাইন” করেছে বা নীচা দেখিয়েছে।  আসলে তিনি বলতে চাইছেন আমাদের ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অবস্থানের ফলে পরে পাওয়া সুবিধায় মিসরের সিসি এখন আরামে ক্ষমতায় আছে। আর আমরা সেই সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে সিসির চোখ বন্ধ করা সমর্থন আমাদের পক্ষে পেয়েছি। আসলে  তিনি স্পষ্ট করেই বলছেন, হামাসের নেতা মিশেল অথবা ব্রাদারহুডের কোন নেতা-কর্মীকে ভাত-কাপড়-আশ্রয় কিছু দেয়া যাবে। বাস্তবে আসলে চাপে পড়ে, কাতারের আমীর  অনেক আগেই সবাইকে বের করে দিতে হয়েছে। সম্ভবত এখন ইসলামি স্কলার কারযাভিকেই একমাত্র আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাতেও সৌদিরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। বেচারা থানি, তিনি কাতারের আমীর হলেও তার একটা শক্ত নীতি হল, কোন মানুষ সে যেই হোক সে আশ্রয় চাইলে তাকে তিনি ভাত-কাপড় আশ্রয় দিতে নিজের কাছেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমীর থানির মেহমানেরা সৌদি চাপে আশ্রয়দাতার দুরবস্থা দেখে আমীর তাদেরকে কিছুই না বললেও  নিজেই নিজের করণীয় হিসাবে কাতার ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন।  এরপরেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঐ বক্তব্য শেষে হুমকি দিয়ে বলছেন,   “সঠিক পথ নিতে কাতারের ‘কমন সেন্স ও লজিক’ জাগবে। আর যদি না হয় তবে আমার মনে হয় না কাতারিরা এর মুল্য পরিশোধ করতে পারবে”। আসলে পুরা পরিস্থিতিতে সৌদি-ইচ্ছার সারকথা এখানে আছে।

কিন্তু বিরাট একটা লিগ্যাল প্রশ্ন আছে। যুবেইরের ফরমাল এই অবস্থান এটা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, ফলে একারণে সৌদি আরবকেই অভিযুক্ত করা সম্ভব। কাতার কী বিদেশ নীতি নিবে তা করতে বাধ্য করার চেষ্টা এটা কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এছাড়া সৌদি ইচ্ছায় বিদেশনীতি না সাজালে কাতারের বাসিন্দাদেরকে খাদ্য পাণীয়ের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে – এটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। WTO এর আইন অনুযায়ী না-হক কাজ।  উপরে ম্যাপের ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখবে কাতার আসলে ঠিক ল্যান্ড-লকড দেশ নয়। বরং সৌদি আরবের তীরে, পারস্য উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে কাতারের চারদিকের প্রায় ৮০ ভাগ  সীমানা এলাকাই উপসাগরের স্পর্শে। অর্থাৎ পোর্ট সুবিধা চাইলে তৈরি করা সম্ভব। আর ২০ ভাগ এলাকা সরাসরি ভুমিতে সৌদি আরবের সাথে সীমান্ত। সম্ভবত নিজ জনসংখ্যা মাত্র ২৩ লাখ (2.235 million (2015) World Bank) বলে নিজ খরচে আলাদা এক্সক্লুসিভ নিজ ভুখন্ডে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে যায় নাই। এর চেয়ে খুবই চালু  গভীর সমুদ্র বন্দর পাশের দুবাইয়ে বলে, সেই পোর্টে মালামাল নামিয়ে ট্রাকে করে সৌদি আরব হয়ে সে পণ্য নিজ দেশে প্রবেশ করে নেয়।  কিন্তু এখন  সৌদি ভুমি দিয়ে ট্রাক প্রবেশ এটাকেই চাপ দিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে – এই সুবিধা নিয়ে সৌদি আরব ট্রাক চলাচল আটকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি করার সুবিধা নিচ্ছে। যাহোক, তবে দেরিতে হলেও এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আল জাজিরা কিছু প্কিরচার রিপোর্ছুট তৈরি করাতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছে। এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাতে  খোদ ট্রাম্প সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।  কাতারে বসবাসকারি দেশি বিদেশি সাধারণ মানুষের স্বার্থে ট্রাম্প নিজেই শিথিলভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আহবান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে এটা ছিল ট্রাম্পের সৌদি সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘনের দায় তিনি সৌদিদের কাধে ফেলায় দিলেন। ট্রাম্প এটা কেন করলেন? কারণ ইতোমধ্যে তিনি এক বিরাট কেলেঙারির

পাঁচঃ ট্রাম্পের আমেরিকা; অনেকেই বিভ্রান্ত আমেরিকার অবস্থান ঠিক কোথায়? এনিয়ে। হা ট্রাম্প, নিজ অবস্থানের সবচেয়ে উপর পর্দা দিয়ে সেটা বিভ্রান্ত করে রেখেছেন। সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা আমেরিকান রাজনীতিতে   “লবি ব্যবসা” (বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশাসনে লবি করে দেওয়ার জন্য ভাড়া খাটার ব্যবসা”) এর স্বার্থের ভিতরেই বসবাস করেন ও আর এর মধ্যেই কাজ করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সেটা খুবই এক বাড়াবাড়ি জায়গায় গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দোস্ত-বেরাদরেরা  বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে  লবির ফি এর নামে কমিশন নিয়েছেন (আমেরিকান আইনে এটা আইন বিভাগের রক্ষিত খাতায় নিজে গিয়ে লিখিত বলে দিতে হয় এবং তাহলে এটা আর অবৈধ না। ইতোমধ্যে ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাহিনী আমরা নিইয়র্ক টাইমসে দেখেছি।)  এমন দোস্ত-বেরাদরেরা ট্রাম্পের একদম চারপাশে ও কোলের মধ্যে বসে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য  এমনকি মনে হয়, ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকেও বলে দিয়েছেন যে, এডমিনিষ্ট্রেশনের অবস্থান-বক্তব্যেরও থেকে দূরে তিনি ভান করে কখনও কখনও সরে যাবেন, কখনও ভুয়া কথার কথায় “লিপ-সার্ভিস” দিবেন। যেন ট্রাম্পের দোস্ত বেরাদরেরা যে ফি নিয়েছেন তা কাভার দিয়ে যায়েজ করে নিতে পারেন – তা বলে দিয়েছেন তিনি। তবে  মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকে তিনি বলতে চাচ্ছেন  কিন্তু তাসত্ত্বেও তোমরা তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের মুল অবস্থান-বক্তব্যের মধ্যেই থেকে যাবা, কাজ করে যাবা। এখানে মজার কথা হল, এতদিন আমেরিকান রাজনীতির ভোকাবুলারিতে – ‘এডমিনিষ্ট্রেশন’ বলতে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির ফরমাল নীতি-অবস্থান বুঝাত। যেমন ‘ওবামা প্রশাসন’ কথাটার মানে ওবামার নিজের কথা আর তাঁর আমলা, নীতি-নির্ধারকদেরসহ সবারই ফরমাল অবস্থান – এটা  বুঝাত। তবে যদিও এই ফরমাল অবস্থানের নিচে আবার ‘আন্ডারকারেন্ট’ হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর পেন্টাগণের অবস্থানের লড়াই ঝগড়ায় খুচরা নানা অবস্থান ভিন্নতাও থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে আমরা দেখছি,  ট্রাম্পের বক্তব্য (লিপ সার্ভিস) আর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান-বক্তব্য এই দুটা এক নাও হতে পারে। ফলে ট্রাম্প – এটা ভুয়া কথা বলে লবি ব্যবসা ধরার এক স্বর্ণযুগ তৈরি করেছেন বলা যায়।
তাই এর আরেক তামাসার দিকটা হল, সৌদি আরবেরও সেটা অজানা নয়। তাঁরা ট্রাম্পের লিপ-সার্ভিসও জেনে শুনে কিনতে চায়। সেটাই তাদের কাছে নাকি অনেক। গত মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরে এসে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” – এই ফাঁপা বাড়তি বা এক্সটেনডেড মিথ্যা সংজ্ঞা আউড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ এটা আমেরিকা প্রশাসনের অবস্থান নয়। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ওবামা আমলের শেষ বছরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে করা ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ – এটা “সঠিকভাবেই চুক্তির শর্ত মোতাবেক কোন ব্যার্তয় না ঘটিয়ে” আগিয়ে যাচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারশনের লিখিত স্বাক্ষ্য- রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে  জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের যে চাপাবাজি ছিল যে নির্বাচিত হলে তিনি ‘ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’  বাতিল করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখন ইতোমধ্যেই ঐ চুক্তি “ঠিকঠাক” চলছে, মানে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে স্বাক্ষ্য-রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেসকে।
ফলে ট্রাম্পের ইরান বিরোধী চাপাবাজি নির্বাচনের আগের অবস্থান যাই থাক তিনি এখন ওবামার ইরানী “নিউক্লিয়ার ডিল” সহি বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। এটা গত ১৮ মে এর খবর। তাই, ২০ মে সৌদি আরবে গিয়ে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” বলে যা কিছু চাপাবাজি করেছেন সেটা তাহলে আসলে লিপ সার্ভিস ছাড়া কিছু ছিল না। আর এটাই সৌদি আরব ‘কিনেছে’।

এমনকি কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার পর সৌদি আরব আবার লিপ সার্ভিস কিনতে এসেছে, দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের এবারের চাপাবাজি হল তিনি টুইট করছেন আর এই ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিজে নিবার চেষ্টা করছেন।  টুইট করতে আমোদ পাওয়া ট্রাম্প এক টুইট করে  বলছেন যে, “আমার সৌদি সফর ফল দেওয়া শুরু করেছে। কাতারের দিকে আঙ্গুল তুলে টেররিষ্ট ফান্ডিং এর বিরুদ্ধে তারা সবাই শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অচিরেই টেররিজমের ভীতিকর দিন শেষ হবে”। “So good to see the Saudi Arabia visit with the King and 50 countries already paying off. They said they would take a hard line on funding extremism, and all reference was pointing to Qatar. Perhaps this will be the beginning of the end to the horror of terrorism!” Trump wrote on Twitter.     একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কত নিচে নামতে পারে এর উদাহরণ হয়ে থাকল এটা। কিন্তু এটাও ট্রাম্পের নীচা হবার শেষ নয়। তিনি ঐদিক শুধু টুইট নয়, বক্তৃতা করে বলেছিলেন, কাতারকে নাকি টেররিজম ফাইন্যান্সিং করে আর এটা তাকে ছাড়তেই হবে। কিন্তু পরের দিনই তার একেবারে উলটা মুর্তি। সিএনএনের ভাষায় অলিভ গাছের ডাল মাথায় বেধে নিয়ে (এটা শত্রু বা বিরোধীকে ইঙ্গিত দেয়া যে বিরোধীর সাথে আপনি এখন আপোষ করতে চান।) ট্রাম্প কাতারের আমীরকে ফোন করেছেন। নানান মিঠা কথা বলেছেন কারণ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাটি আছে কাতারে। এছাড়া আর এক কারণ হল, ঐদিক তিনি যখন কাতারকে ধুয়ে ফেলতেছিলেন, সৌদিদের কোলে উঠে প্রশংসা করতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলার সন ঠিক তার উলটা কথা বলছিলেন, যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে আরবদের অবরোধ শেষ করা উচিত কারণ এতে ঐ “সামরিক ঘাটির ততপরতা ব্যহত হচ্ছে”। অর্থাৎ টিলারসন কাতার ক্রাইসিস থেকে আমেরিকাকে নিউট্রাল জোনে নিতে চাচ্ছেন। আর ট্রাম্প সেখানে কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিচ্ছেন। এই স্ববিরোধীতা সামলে নিতে, বেকুবি আড়াল করতে ট্রাম্প তাই মিষ্ট কথায় ফোন করেছেন কাতারের আমীরকে। এছাড়া রয়টার্স লিখছে,  ট্রাম্প যখন কাতার ইস্যুতে এভাবে আরবদের পিঠ চাপড়াচ্ছিলেন, পেন্টাগন ঠিক তখন  কাতারের সাথে ফোনে ছিলেন আর প্রশংসা করছিলেন যে, “কাতার সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কাতারে আমেরিকান সামরিক ঘাটির হোস্ট হিসাবে নিরলস খেদমত করে যাচ্ছেন আমরা এর প্রশংসা করি”। এভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাতারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে আমেরিকান মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। [U.S. Defense Secretary Jim Mattis spoke on Tuesday by phone with his Qatari counterpart, a Pentagon spokesman said, without disclosing the details of their discussion] রয়টার্স আমেরিকান এক কূটনৈতিকের বরাতে জানাচ্ছে, “ট্রাম্পের টুইট একটু অস্বস্তিকর হলেও আমেরিকা নিরবে সৌদি আর কাতারের উত্তেজনা ঠান্ডা করার পক্ষে কাজ করছে কারণ কাতার আমাদের কাছে সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপুর্ণ”।

এই হল লিপ সার্ভিসের কথা। তবু কাতার সরকারকে সৌদিরা উঠিয়ে ফেলে দিতে পারে, নিজ পছন্দের যে কাউকে আমীর বানাতে পারে। এককথাট বললে সৌদিরা কাতারে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, তা মিটিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তুরস্কের এরদোগান। প্রথম দিন তিনি এক বিবৃতি দিয়ে বয়ানে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। বলেন যে কাতারের বিরুদ্ধে ‘টেররিজমের অভিযোগ সত্য’ হলে তিনি নিজেই আগে ব্যক্তিগতভাবে আমল ও হস্তক্ষেপ করতেন। [ “Presenting Qatar as a supporter of terrorism is a serious accusation,” the Turkish leader said. “I know [Qatar’s leaders] well and if that had been the case, I would have been the first head of state to confront them.”] অর্থাৎ তিনি আসলে বলছেন, টেররিজমের অভিযোগ ছাড়েন, কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আমি দিব না।

এটাকে বলা যায়, সৌদিরাই কী দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রধান নেতা হবেন? নাকি নাকি তিনি কেউ নন?  – এই প্রশ্নে এরদোগানের জিত হয়েছে। তিনি আসলে বলেছেন আমি দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মনঃকামনা পুরণের নেতা।  আর তাই পরেরদিন তুরস্ক ২০১৪ সালের এক চুক্তি মোতাবেক কাতারে এক সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে, জানতে পারি।  তুরস্কের পার্লামেন্ট এটা অনুমোদন দিয়েছে।  আর এটাই সম্ভাব্য যে কোন সৌদি সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক বিরাট ডিটারেন্ট, পাল্টা অবস্থান যা সৌদিদের যে কোন গোপন-প্রকাশ্য ইচ্ছাকে একাবারে নাকচ করে ফেলেছে। তাই এক কথায় বলা পরিস্থিতি এখন স্টেলমেট। অর্থাৎ গায়ের জোর বা সামরিক মাসল দেখানোর আর সুযোগ নাই। এখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতি বাতচিত ডায়লগ এই লাইনে আগাবে ও শেষ হবে – বিবদমান সবপক্ষের জন্য এটাই একমাত্র খোলা পথ।  ওদিকে জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পকে কাতার পরিস্থিতির জন্য এক হাত নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাসহ ট্রাম্পের এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এটাও কম তাতপর্যপুর্ণ নয়।

খুব সম্ভবত সৌদিদের হার এখন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকবে। রাশিয়া সফররত কাতারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সন্তান থানি) যখন মিডিয়া সাক্ষাতে বলেন “হামাস রাজনৈতিকভাবে এক বৈধ  প্রতিরোধ আন্দোলন” – এই বয়ানের ওজন ভয়ানক। মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠি এই বয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

এঘটনায় সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে সৌদি বাদশার। তিনি চাইলে ছেলের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা নিতে পারেন। নাকি ২০৩০ সালে সব শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান! আমরা অপেক্ষা করব হয়ত দেখার জন্য।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

গৌতম দাস

২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-29P

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

দুইঃ
হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

সাবধান, ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

সাবধান,  ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

গৌতম দাস
১৬ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-26g

গত সপ্তাহে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প । প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- এই দুই দলেরই (বাইপার্টিজান) এলিটরা মিলিতভাবে নিজ নিজ দলের কথা চিন্তা বাদ দিয়ে ‘ট্রাম্প ঠেকাও’-এর কাজে নেমে পড়েছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ০২ নভেম্বর  সিএনএন রিপোর্ট করেছিল ৩৭০ জন অর্থনীতিবিদ (যাদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়া অর্থনীতিবিদও আছেন), তারা সবাই এক বিবৃতিতে কেন ট্রাম্পকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না, তা জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের আগেই একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যে  ট্রাম্পের বোধ হয় আর কোনো সম্ভাবনা নেই; তাকে হারিয়ে হিলারিই জিতে যাইতেছেন। রয়টার্সের মতো মিডিয়া বলা শুরু করেছিল, হিলারি জিততেছেন এটা নাকি প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের জেতার আর যেন কোনো সম্ভাবনা নেই, চার দিকে সে কথাই কেবল প্রচার হচ্ছিল। কিন্তু ফলাফল এখন সবাই জানেন, মিডিয়ার সবার সব অনুমান সেখানে উল্টে গেছে।  তাহলে এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল কেন, আর প্রপাগান্ডার সব কিছু আসলে এক মিথ্যা ফানুস ছিল – এমনইবা শেষে প্রমাণ হলো কেন?

এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা সেই আমেরিকা যে এখনো গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, নির্ধারক রাষ্ট্র – যদিও এটা শেষযুগে যৌবন ঢলে পড়ার কালে। সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, তারই নির্বাচন এটি। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে একে প্রভাবিত করতে সরব মুখ খোলার কথা সমগ্র দুনিয়ার নানান স্বার্থের গোষ্ঠী-মানুষের। তবে মনে রাখতে হবে, সামগ্রিক দিক বিচারে বললে এই নির্বাচনে আসলে মোটা দাগে তিনটি পক্ষ ছিল। এক পক্ষ হল আমেরিকার বাইরের গ্লোবাল স্বার্থ-সুত্রে সম্পর্কিত মানুষ। অন্য দিকে যারা আমেরিকার ভেতরের, এদের মধ্যে আবার আরও দুই পক্ষ। এভাবে মোট তিনটা পক্ষ। মুল প্রসঙ্গটা আমেরিকান ভোটারের, ফলে এখানে ভেতরের মানে আমেরিকান নাগরিক যে ভোটার আর, বাইরের অ-নাগরিক মানে না-ভোটারের। ভেতরের মধ্যে মোটা দুই পক্ষের এক পক্ষ – এই দলে পড়বেন যারা আমেরিকাকে চালায় এমন বড়লোক, এলিট, নীতিনির্ধারক, ইন্টেলেক্ট, ওয়াল স্ট্রিটসহ ব্যবসায়ী জগৎ প্রভৃতি, যাদেরকে এখানে বলার সুবিধার্থে এখন থেকে একসাথে অভ্যন্তরীণ ‘এলিট’ বলে ডাকব। এলিট অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরের ‘আম-ভোটার’দের থেকে যারা আলাদা। এই এলিটরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ রাখেন। সাধারণ সময়ে আমেরিকার বাইরের অ-নাগরিক আর ভেতরের এই এলিট অংশ এরাই মূলত মিডিয়া দখল করে রাখেন, কেবল এদের বয়ানই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেটা একমাত্র নির্বাচনের সময়। এই সময় এই দুই কুতুবের বাইরে নিরব কুতুব যারা সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।  মিডিয়ার বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেরও ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ওদের বাইরেও তৃতীয় (অভ্যন্তরীণভাবে দেখলে দ্বিতীয়) পক্ষ, এঅংশটি হল ‘আম-ভোটার’। ভোটে এরাই নির্ধারক, প্রবল সংখ্যাধিক্যের কারণে। আর সবচেয়ে বড় এই অংশটাই  মিডিয়ার অগোচরেই থেকে যায়, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। অতএব ভোটের সময় এরা স্থানীয় মিডিয়ায় যদি থেকে যায় সেকথা বাইরে থেকে আমরা জানতে পারি না। এই ‘আম-ভোটার’ অংশটি সবচেয়ে বড় বলে ভোট দেয়া ও গণনায় সময় তাদের ভূমিকা নির্ধারক। অন্য যেকোনো গ্রুপের চেয়ে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর ভোটের সময়ের ঠিক এর উলটা দশা হল প্রথম দুই পক্ষের (বাইরের অনাগরিক আর ভেতরের এলিট)। কারণ এদের মধ্যে কেবল ভেতরের এলিটদের কিছু ভোট দেয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যটার ভোট নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকান নির্বাচনে একমাত্র নির্বাচনের সময়ই সবচেয়ে নির্ধারক হল – আম-ভোটার। অথচ আম-ভোটারদের চেয়ে যাদের ভোটই নেই অথবা ন্যূনতম কিছু ভোট আছে  এরাই নির্বাচনে পুরো মিডিয়া দখল করে রাখে এবং সেখানে কেবল তাদের স্বার্থের বা গ্লোবাল স্বার্থের কথা বয়ানগুলোকে মুখ্য করে রাখে। অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আম-ভোটারকে অ্যাড্রেস করতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা কী ভাষায়, কী চাতুরীতে বা কী কৌশলে কথা বলবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে এই আম-ভোটারের কাছে পৌঁছবে, প্রভাবিত করবে, এটা খুবই নির্ধারক। জিততে চাইলে প্রভাবিত করার সেই ভাষ্য অবশ্যই মিডিয়ার আমেরিকার বাইরের ও ভেতরের এলিটদের ভাষ্য থেকে ভিন্ন করাই হবে সহজ কৌশল। ট্রাম্প সম্ভবত তাই করেছেন। তিনি ব্যাপক আম-ভোটারের ভাষারপ্ত করে তাদের তাতিয়ে কথা বলেছেন। তার সেসব কথা মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের চোখে হয়তো অচল। তবুও তা পরোয়া না করে এই ভোটারদের জীবনধারায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি, চাওয়া-পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভোট চেয়ে কথা বলেছেন। কারণ মনে রাখতে হবে, আম-ভোটারদের কাছে তাদের নেতারা বিষয়ে তাদের মুখ্য বিবেচ্য একটাই – তা হল, সরকার তাদের জন্য অনেক কাজ আর ভাল বেতনের ব্যবস্থা করতে পারছেন কিনা, অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পেরেছেন কিনা ইত্যাদি। যদি পারেন আর তা পারতে গিয়ে অন্য দেশের তেল লুট করে নাকি মানুষ খুন করে সব সাফা করে এনেছেন এসব তাদের বিবেচনার কোন বিষয় হয় না। কারণ তারা জানে এলিটরা হার-হারামজাদা। এলিটরা একমাত্র নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের ধান্ধায় পরিচালিত। আর এটাই আম-ভোটারদেরকেও বিপরীত এক সংকীর্ণ স্বার্থের ভিতর দিয়ে নিজেদের দেখতে বাধ্য করে থাকে। ফলে ভিন দেশে গিয়ে আমেরিকান নেতা বা সরকার খারাপ বা অনৈতিক কী করছেন সে বিচারে বসার অবস্থায় তাঁরা থাকেন না। অন্তত নেতাদের আকামের বিচারে বসার চেয়ে বরং তাদের নিজের জন্য অনেক কাজ ও ভাল বেতনের বিষয় – এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যেমন ট্রাম্প কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বললেন; মেক্সিকো বা চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড বেরিয়ার (আমদানি বাণিজ্যে বাধার নীতি) ইত্যাদিতে কথা বলেছেন। সে বিষয়গুলো আম-ভোটাররা নিজের স্বার্থের দিক থেকে দেখবেন, গ্লোবাল মিডিয়ার দিক থেকে নয়। এ ছাড়া আরেকটা বিরাট দিক আছে – মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী শ্রমিক। অথবা রিফিউজি নামে প্রবাসী বা বিদেশী শ্রমিক। এটা এমন এক জিনিস, যখন অর্থনীতি ভাল চলে তখন সরকার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশী শ্রমিকও কাজের প্রাচুর্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে না। কোন সমস্যা দেখে না। বরং সুবিধার দিকটা দেখতে পায়। ফলে কে দেশের বাইরে থেকে এল, বিদেশী কিনা  তা তার কাছে বিবেচ্য হয় না। অর্থনীতি ভালো চললে, বাইরের শ্রম মানেই তুলনায় সস্তায় পাওয়া শ্রম, যে শ্রম তখন সবার দরকারও। তাই তা আদরণীয়। অথচ অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেলে ঠিক এর উল্টো। তখন মনে হয়, কালো বা বাদামি, বিদেশী বা মুসলমান সব খেদাও, এরাই নিয়ে গেল সব। জাতীয়তাবাদের জিগির উঠবে। এসব ক্রাইসিসের দিক খেয়াল রেখে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ট্রাম্প জেতার উপযুক্ত ভাষ্যটি সঠিক বানিয়েছিলেন। সেই ভাষায় কথা তুলে যিনি ভোট চাইবেন, স্বভাবতই তিনি সফল হবেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল শ্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” (make America Great again) – ’। আম-ভোটারদের আকৃষ্ট করার ভাষ্য হিসাবে, এটাই সঠিক শ্লোগান। শেষের ঐ ‘এগেইন’ শব্দটা গুরুত্বপুর্ণ। হৃত-গৌরব মনে করিয়ে দিয়ে সুরসুরি দেয়া। আন্তর্জাতিক দিক নয়, জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। আমরা ট্রাম্পের যত রকম কথা শুনেছি, সেগুলো আমরা আসলে ট্রাম্পের আম-ভোটারের চোখ দিয়ে না দেখে বরং ওর বাইরের অন্য দুই পক্ষের দিক থেকে দেখেছি। সমগ্র দুনিয়ার আমরা প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ স্থানীয় প্রেক্ষিত থেকে অথবা গ্লোবাল প্রেক্ষিতে। আমরা ভুলে গেছি, আমেরিকার বাইরের যারা, তারা যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তারা তো ভোটার নন। আর এটা তো আসলে কেবল ভোটেরই লড়াই। ফলে যারা বাইরের লোক বা সংখ্যায় ক্ষুদ্র দেশি-এলিট এদের নিন্দা-মন্দ কথা আমল করার কী আছে? কিছু নেই। নিন্দা-মন্দ আমল করলে তাতে ভোট সংখ্যা বাড়বে না।  ট্রাম্প এটা ঠিকই ধরেছেন। আর তাঁর জয়লাভের মূল কারণ সম্ভবত এখানে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আমেরিকার বাইরের অনাগরিক বা ভেতরের এলিট এসব স্বার্থ সন্তুষ্ট করে ভাষ্য তৈরি করে কোনো লাভ নেই। ভোটের বাক্সে এর কোনো প্রভাব নেই। তাই এ’দুই পক্ষের দিকে তাকিয়ে তিনি কথা বলেননি। দ্বিতীয়ত, একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল, হাতির দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবায়ও না, খায়ও না। চিবানোর দাঁত আলাদা। অথচ আমরা দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবানো দেখতে চাচ্ছি। ট্রাম্প ভোটে জিতে যাবার পর আমরা এখন চাচ্ছি ট্রাম্প যেন ভোট চাইবার ভাষাতেই তার হবু সরকারের নীতি সাজাক। আর তাতে আমরা যেন আরামে ট্রাম্পের গুষ্ঠি উদ্ধাস্র করতে পারি। আমরা ভোট পাওয়ার জন্য দেয়া পপুলার শ্লোগান (বা বয়ান) আর জিতে যাবার পর তা ‘হুবহু’ সরকারের নীতি-পলিসি করা যেন বাধ্যবাধকতা! অথচ দেখানো আর চিবানোর দাঁত তো আলাদা, তা আলাদাও হতে পারে, হয়। এটা খেয়াল করে দেখি নাই।
আমেরিকা রাষ্ট্রের বাইরের মানুষ, ভিনদেশী আর সাথে ভিতরের কেউ কেউ এমন অনেকেই মনে করে যে ট্রাম্প খুবই খারাপ মানুষ – রেসিস্ট, রেপিস্ট ইত্যাদি ধরনের সব কিছু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে আনা যায়, নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ তারা এখানে এথিকস এবং স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন ভঙ্গের কথা তুলছেন, তুলবেন। এ কথাও ঠিক যে ট্রাম্পের অনেক কথায় এথিকস ও আইনের ফিল্টার পার হবে না, আটকে যাবে এবং তা আসলে খুবই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে?

ট্রাম্পের বয়ান-অবস্থানের কী সমালোচনা করা যাবে না? সমালোচনা করা কি ভুল হবে? এক কথায় এর জবাব, অবশ্যই যাবে। তবে থিতু হতে একটু অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে তিনি কী কী বলেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত নোট নেন। কিন্তু কোনোভাবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেয়া ঠিক হবে না। আগামী বছর ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেবেন। এর আগেই ও পরে কিছু কিছু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘আসল’ (অর্থাৎ খাবার দাঁত) নীতি-পলিসি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচনে দেয়া তার বিভিন্ন বক্তব্যে কোথায় কোথায় এখন তিনি ফিল্টার দেবেন, ফাইন টিউন করে এরপর তা তার সরকারের নীতি-পলিসি হিসেবে ঘোষণা করবেন, তা বোঝা যাবে। এর আগে ট্রাম্প প্রসঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল হবে। এ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যেমন, ইতোমধ্যে ট্রাম্প তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্য সেটা তিনি নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে সর্বশেষ আর এক খবর হল – ওবামার স্বাস্থ্য বীমা পলিসি (অনেকে যেটা তামসা করে ওবামা-কেয়ার বলে), সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘রিপিল’ করবেন বলেছিলেন। ইংরেজি রিপিল মানে ফিরিয়ে নেয়া, প্রত্যাহার করা বা উল্টো আইন করে বাতিল করে দেয়া। এখন তিনি জানাচ্ছেন, “আমি সম্ভবত রিপিল করছি না। তবে কিছু সংস্কার করব”। এই গুমোর খুলেছেন তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া ট্রাম্পের প্রথম ইন্টারভিউয়ে। এর কিছু পরে ১২ নভেম্বর বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঐ ইন্টারভিউয়ের উপর একটা রিপোর্ট করে বিস্তারিত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাষায় এটা ট্রাম্পের ইউটার্ণ; খবরের শিরোনাম হল, “Donald Trump: I may not repeal Obamacare, President-elect says in major U-turn”।

একটা অবজারভেশন হিসাবে বলা যায়, নির্বাচনের সময় সমগ্র দুনিয়ায় প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা চাঁছা-ছোলা খোলা কথা বলে থাকে। কিন্তু জিতলে পরে যেটার ওপর কম অথবা বেশি ফিল্টার চড়ানো হয়, টোপর পরানো হয় বা ফাইন টিউনে একে বিচার-বিবেচনা করে বদলে নেবার পরেই কেবল তা  সরকারের নীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দেখা গেছে, সময়ে কোন রাষ্ট্রের ক্রাইসিস যত তীব্র থাকে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা তখন চাঁছা-ছোলা আনফিল্টার করে বলা হতে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কথার প্রতিশ্রুতির সাথে এরপর জিতে তা সরকারের নীতি হুবহু না হওয়াতে তা নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনের ফল হবার পরে তা নিয়ে খুব বেশি আগানো যায় না বা কাজে লাগে না। আর একটা প্রশ্ন থেকেই যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যাই তাই পরে সেটা তখনও কল্পনা তা সবাই মনে রাখে। তুলনায় পরে কংক্রিট ভাষায় সরকারের নীতিতে কী থাকছে সেটাই আসল, বাস্তব। ফলে নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষ কল্পনার চেয়ে বাস্তব নিয়েই কথা বলা অর্থপুর্ণ মনে করে। তবে হ্যা নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে  কোনো প্রার্থীর সমালোচনা একমাত্র তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাজে লাগে। এবং সেটা কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে , পরে আর নয়।  তাই আমাদের উচিত, চোখ-কান খুলে অপেক্ষা করা।

তাহলে ট্রাম্পই কি প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে দেয়া ‘হুবহু’ প্রতিশ্রুতিতে চলেন না? বরখেলাপ করেন? না, তা একেবারেই নয়। লিবারেল সুশীলদের প্রতিভূ শ্রী ওবামার কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর নির্বাচন চলাকালীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিতলে তিনি রেনডিশন প্রথা (আমাদের মতো দেশে তাদের আসামি পাঠিয়ে টর্চার করিয়ে আনা, কারণ ওমন টর্চার নির্যাতন করা আমেরিকান আইনে নিষিদ্ধ ) বন্ধ করে দেবেন, গুয়ানতানামো বে কুখ্যাত কারাগার উঠিয়ে দেবেন, আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবেন ইত্যাদি। যার একটিও তিনি করেননি এবং পরবর্তিতে তিনি নিজে সরাসরি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে আফগানিস্তানে ১০ হাজার আমেরিকান সৈন্য রেখে হলেও বাকিটা প্রত্যাহার করেছেন। আর এক উদাহরণঃ গত ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে মোদি হুঙ্কার ও ভয় পাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জিতলে জেতার পরের দিন থেকে ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত মোদির সে কথার পরবর্তী কথা কাজ বা তৎপরতা নেই। যেন এমন কথা তিনি কখনও বলেননি অথবা নিজেই ভুলে গেছেন।

তাহলে আমি কি বলতে চাইছি ট্রাম্পের ওবামা বা মোদীর মতই সব কথা ভুয়া, তাল ঠিক নেই? না, তাও একেবারেই সত্যি নয়। বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প দিচ্ছেন যে খুব সম্ভবত আমেরিকান রাষ্ট্রনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসন্ন। আজকের যে আমেরিকাকে আমরা দেখে অভ্যস্ত, চিনি এই আমেরিকার গড়ন আকার লাভ করে থিতু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে; আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়া নতুন অর্ডারে সাজিয়ে হাজির হয়ে আছে তখন থেকে। সে অবস্থাকে বলা হয় আমেরিকা দুনিয়ার এক এম্পায়ারের (সাম্রাজ্যবাদ নয়) ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছিল। এরপর থেকে তা সরাসরি আমেরিকার  নিজের প্রত্যক্ষ ভোগে বা কাজে লাগুক আর  নাই লাগুক – এমন বহু বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম এরপর থেকে তা চলে এখনও টিকে আছে। আর এর পরিচালন চালিয়ে টিকিয়ে রাখার পুরা দায়ভার আমেরিকাকেই বইতে হয়ে আসছে। মুখস্ত বা অভ্যাসের মত, সেই থেকে কোন রিভিউ ছাড়াই এগুলো চলে আসছে। এমন সব প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের দায়দায়িত্ব এই প্রথম রিভিউ করে কাটছাঁট ও পুনর্গঠন করা হতে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে যেমন, ন্যাটো। এর ৭৩ শতাংশ খরচ আমেরিকা একা বহন করে। ট্রাম্প এটা রিভিউ করার পর ঠিক করতে চান, এটা নিয়ে কী করা হবে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কোল্ড ওয়ার লড়াইয়ের যুগ শুরুর শুরুতেই ১৯৪৯ সালে গঠন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক মোকাবোলায় ন্যাটোর সদস্য সকল রাষ্ট্রের একসাথে এক্ট করতে একটা বাধ্যবাধকতা চালু করা, যাতে তা বড় এক রক্ষাকবজ নয়। ট্রাম্প যাকে আমাদের পাগল বেতাল লোক বলে প্রমাণ করতে চাইছি, বা যা মনে চায় তা বলে নির্বাচনে জিতার লোক মনে হচ্ছে – এমন প্রপাগান্ডা হয়েছে হচ্ছে যার নামে  – সেই ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই কবে ভেঙ্গে গেছে, দুনিয়াতে এখন সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে সম্পর্কিত হয়ে আছে – অর্থাৎ সেই শত্রুতাও আর তেমন নাই। উলটা এখনকার একমাত্র জলন্ত হুমকি হল “টেররিজম”। তাহলে ন্যাটোকে একইভাবে রেখে দেওয়ার মানে কী? ন্যায্যতা কোথায়? অন্তত এবিষয়ে একটা  রিভিউ  করে এটা ভেঙ্গে দেয়া যায় কী না তা দেখা উচিত। আর দরকার হলে “টেররিজমের” মোকাবোলায় উপযোগী কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম দেয়া হক।  ব্যাপারটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ইউরোপের অনেকের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কথা ফেলনা নয়, যুক্তি আছে।

একইভাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন – ট্রেড ব্যারিয়ার বা অবাধ পণ্য চলাচলে বাধা প্রসঙ্গে। চীনের সাথে বাণিজ্যে তিনি সস্তা জাতীয়তাবাদী হয়ে বাধা দেবেন না। তবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় নেগোশিয়েট করে একটা তুলনামূলক ভালো ডিল (আমেরিকানদের জন্য চাকরি বা আউটসোর্সিং) তিনি পেতে চাইবেন। স্বভাবতঅই এটাই নির্বাচন উত্তর থিতু ভাষ্য। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোটের লোভে এই বিষয়টাকেই তিনি চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কারের মত শোনায় একন ভাষাতেই বলেছিলেন।

আবার সিরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। তাতে আসাদ থাকল না গেল, সেখান থেকে সরে আসবেন। রাশিয়ার ওপর আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রের অবরোধ উঠানো নিয়ে কথা আগাবেন। আইএস মোকাবেলা ও দমনে রাশিয়ার সাথে দায় শেয়ার করবেন সম্ভবত। এগুলো সবই বিশ্বাযোগ্য কথা ও পদক্ষেপ তিনি নিতে যাচ্ছেন।  কেবল একটা জায়গায় ফাঁকি দিক ছিল। খুব সম্ভবত তিনি হিলারির বিরুদ্ধে পুতিনের দেয়া ইন্টেরলিজেন্স ব্যবহার করতে পুতিনের সাথে অপ্রমাণিত ডিল করেছিলেন। ট্রাম্প বলতে পারেন যে হিলারিও তো ওবামার প্রভাব ব্যবহার করে “সরকারী মেল ব্যক্তিগত সার্ভারে রেখে” তিনি ঠিক করেন নাই তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ হয় এমন কিছু ঘটান নাই বলে ছাড়পত্র এনেছিলেন। অর্থাৎ ওবামা-হিলারি এসব তথাকথিত লিবারেলরা কোন ধোয়া তুলসিপাতা নয় এটা মনে রাখতে হবে।  ওবামা-হিলারিরা কোন স্টান্ডার্ড বা আদর্শ নয়।

সৌদি, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যেখানে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে সে ঘাঁটি রাখার খরচ কে বইবে – এই প্রশ্নটা  ট্রাম্প সামনে আনতে চান।  অথবা রাখা আদৌ আমেরিকার জন্য কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান। এটা খুবই জেনুইন প্রশ্ন। এককালে আমেরিকার অর্থভান্ডারের অবস্থা ভাল ছিল পরে নিজ খরচে ভিন দেশে ঘাঁটি পোষা হয়ত গায়ে লাগত না। এখন লাভ-ক্ষতি হিসাব করা, বাস্তববাদী হওয়া অবশ্যই জায়েজ।

আমরা যদি মনে রাখি, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, তাহলে ট্রাম্পকে বুঝতে আমাদের তা কাজে লাগতে পারে।  উপরের সবগুলো প্রসঙ্গের একটা কমন দিক আছে। সেই বিচারে সবগুলো ইস্যু সম্পর্কিত। আমেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা খাটো হয়েও গেছে, শুকিয়েছে। ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি মোতাবেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার নতুন করে সাজানোর সময় পার হয়ে গেছে।  সারকথায় আমেরিকার এখনকার মানে শুকানো ভুমিকা মোতাবেক বড় খরুচে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ঢেলে সাজানো যায়। এককথায় যেটাকে দক্ষ সরকার – ম্যানেজমেন্ট এবং খরচের দিক থেকে স্মার্ট চটপটে সরকার কায়েম করার উদ্যোগ – নিঃসন্দেহে অনেক সুদুর প্রসারি ও বাস্তব চিন্তা।

আর একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর এক মজার মন্তব্য করেছেন। তিনি চীনা নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক এআইআইবি (AIIB), এই ব্যাংক জন্মের সময় ওর গঠন উদ্যোগের বিরোধিতা করা আমেরিকার দিক থেকে  ‘স্ট্র্যাটেজিক মিসটেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমন মন্তব্য খুবই উলটা বাওয়া মন্তব্য হলেও কথা মিছা না। বাস্তবতা হল এক আমেরিকা আর তাঁর পার্টনারস ইন ক্রাইম জাপান – এই দুই দেশ ছাড়া এখন AIIB সদস্য হতে কোন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ দেশ বাকী নাই। সর্বশেষ আমেরিকার পিছনে পিছনে চলা কানাডাও ঐ ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে। আর সেই বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে পিছেপিছে চলা শুরু করেছিল ইউরোপ। এই প্রথম নিজের স্বার্থ আমেরিকার চেয়ে আলাদা বলে অনুভব ও দাবি করে এরাও (মানে ইউরোপের প্রধান তিন প্রভাবশালী – জর্মন, বৃটিশ ও ফরাসী) চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগে পতাকা তুলতে দেরি করে নাই।  যদিও এই প্রসঙ্গে খোস ট্রাম্প কী অবস্থান নিবেন এখনও কিছুই জানা যায় নাই।

ওবামার এক আদরের নীতি হল বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি বা চুক্তি জোট গড়া। ওসব উদ্যোগে ওবামা মুখ্য বিশেষ্যত্ব হল ঐ চুক্তি বা বাণিজ্য জোট গুলোতে চীনকে বাদ রাখতে হবে।  চীনকে বাদ দিয়ে এরপর বাকিদের নিয়ে আমেরিকাসহ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি অথবা নাফটা) – এগুলো পুনর্গঠনের পক্ষে ট্রাম্প কথা বলছেন।খুব সম্ভবত চীনকে বাদ রাখা এটা খুব কাজের মানে কার্যকর সুবিধা আমেরিকাকে দিবে না অসুবিধা ডেকে আনবে – এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের কাছে ইস্যু।

এক কথায় বললে চীনের উত্থানে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন বিন্যাস ও অবস্থানের দিক থেকে আমেরিকার ভূমিকা কী? আর যাই হোক এতা নিশ্চয় আর আগের মত জায়গায় নাই। ফলে যে সব কোর বিশ্বাস বুঝাবুঝির উপরত আমেরিকার গত সত্তর বছর ধরে দাড়িয়ে ছিল তা বদলবার স্ময় হয়েছে।  ট্রাম্প সম্ভবত এ বিষয়গুলো এই প্রথম ঢেলে ভিন্ন দিক থেকে দেখে নতুন কিছু করতে চাইছেন। স্বভাবতই ট্রাম্পের প্রসঙ্গগুলো যত বিশাল, সে তুলনায় আমাদের কাছে তথ্য যেন আপাতত ততই কম। ফলে কোথায় তা কত দূর যেতে পারবে, আদৌ সম্ভব কি না তা দেখা-বোঝার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনোভাবেই বিষয়গুলোকে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব রেঠরিক মাত্র এই সংকীর্ণতা দিয়ে বুঝতে চাওয়া অর্থহীন হবে। একবাক্যে বললে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইছেন যেদিক থেকে আগে কখনই দেখা হয় নাই। যদিও বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রকাধ্য হয় নাই এখনও।

এ প্রসঙ্গের লেজ ধরে আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহলে সামনে উদয় হয়। চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে এখন থেকে কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইলে স্বভাবতই ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে ভারতের অথবা বাংলাদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। কারণ চীন দাবড়াতে হবে – এই অনুমানের উপরেই বর্তমান বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলো সাজানো। অতএব ট্রাম্পের নতুন দৃষ্টভঙ্গীতে এর ভেতর কোনো বিশেষ এবং নতুন দিক থাকবে কি না সে বিষয় এশিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ এই দুই দেশেই আপাতত ক্লুহীন। হাসিনার দ্বিধা মনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোটা সে আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে চীনের সাথে ট্রাম্পের নতুন সম্পর্ক সাজানোর দিকটি মাথায় রাখলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ওপর তার কিছু কিছু ছাপ, নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়ার কথা। সম্ভবত ওবামার ‘চীন ঠেকানো’ টাইপের অবস্থান – – এটাকেই  ট্রাম্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। ট্রাম্প এ রকম বহু প্রসঙ্গ তুলেছেন তা চূড়ান্ত নয়, বরং এগুলো ডেভেলপিং বলাই ভাল। তাই এক কথায় সব কিছুই  – ওয়েট অ্যান্ড সি, ডোন্ট কনক্লুড।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল।  আজ ১৬ নভেম্বর ঐ লেখা আরো সংযোজন ও এডিট করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

 

নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

 নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

গৌতম দাস
০৪ অক্টোবর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RL

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে জনসভায় জানিয়েছেন যে তিনি সামরিক যুদ্ধ বা যুদ্ধের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা করতে চান না। বরং কোন দেশ কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এর প্রতিযোগিতা করতে চান। ফলে সেই প্রতিযোগিতার আহ্বান জানাতে জনসভা থেকে তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে বক্তব্য রেখেছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধ বিষয়ে যেন তা লেগেই যাচ্ছে এইভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গরম কথা বলে মোদি নিজ জনগণকে আগে তাতিয়েছিলেন, শেষে কোঝিকোড়ে শহরের বক্তৃতায় সব উত্তেজনায় নিজেই ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন যুদ্ধ নয়, তিনি উন্নয়ন চান। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে তিনি যাবেন না। ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ কথার অর্থ কী, সেটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, পাকিস্তানকে তিনি ‘টেরোরিজমের’ অভিযোগে বড় প্রভাবশালী বা ছোট রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার চালিয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। এখন আমরা দেখছি “সার্জিক্যাল অপারেশনএর” নামে আবার এক বুঝরুকি। মোদীর প্রপাগান্ডার লড়াই, যা এখন উভয় পক্ষের দিক থেকেই প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে।  অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মোদী সবশেষে কোন সিরিয়াস যুদ্ধের দিকে যদি না-ই যাবেন, তিনি তা হলে গরম কথায় যুদ্ধের মত হুমকি দিয়েছিলেন কেন?
আমাদের ভুললে চলবে না, মূল ইস্যু ছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন। যেটা এখন প্রায় ৮০ দিনের বেশি টানা কারফিউ এর সত্ত্বেও চলছে। ওদিকে কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ইসলামি ঐক্য সংস্থা গত মাসে ২১ আগষ্ট ২০১৬ শক্ত ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেছিলেন । (OIC Secretary General Iyad Ameen Madani Monday expressed concern over the situation in Kashmir and called for an immediate cessation of atrocities by India, urging the Indian government for peaceful settlement of the dispute ‘in accordance with wishes of Kashmiri people and the UNSC resolutions’.।) বিগত ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নেয়া এক প্রস্তাব হল কাশ্মীরবাসী ভারতে থাকতে চায় কি না তা জানতে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। ওআইসি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানায়েছিল।  ওআইসি কাশ্মীরের প্রতিরোধ লড়াইকে তাদের “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য লড়াই” মনে করে, তাও জানিয়েছিলেন। কাশ্মীরের নিরস্ত্র গ-আন্দোলনের ধারার রাজনৈতিক দল হুরিয়াত কনফারেন্স। ওআইসির বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে তাদের বিবৃতির ভাষা ছিল আরও কড়া। তারা তুরস্ক সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন পাঠাবার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছিল।  ওদিকে এ বিষয়ে জাতিসংঘে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পরস্পরের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস সংগঠন হিউম্যান রাইট কাউন্সিল  দুই রাষ্ট্রের দুই কাশ্মির অংশেই সরেজমিন গিয়ে তদন্ত ও প্রত্যক্ষ দেখে যাচাই করে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারত উভয় সরকারের কাছে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অনুমতি চেয়েছিল। জবাবে পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ রাজি বলে জানালেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ওদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং তা মিডিয়ায় আসা শুরু করেছিল এই বলে যে, ক্রসফায়ারের নামে গ্রাম ঘিরে তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানিকে খুঁজে বের করে হত্যা করলে যে জনগণ কার্ফু ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যাবে – এ’সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী কিছুই আগাম জানাতে পারে নাই। এখানেই এবং এ’ঘটনা থেকেই ভারতের কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মারাত্মক গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতার কারণেই কাশ্মিরের বহু জেলা শহর এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিয়মিত আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মোদি সরকারের কাছে এসব বিপদের দিক তুলে ধরেছিল। আর প্রতিদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী মিডিয়া এই ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগে জনগণের দৃষ্টিকে ও মিডিয়াকে কাশ্মির থেকে সরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছিলেন মোদি। তাই ভারতের সীমান্ত শহর উরির ব্যারাকে হামলায় ১৮ সেনা হত্যা – তা সে যেই ঘটাক, একে ইস্যু করে মোদি দৃষ্টি সরানোর কাজ করতে সফল হন। মিডিয়া ও জনগণ থেকে কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন বা লাগাতর কারফিউ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটনার উল্লেখ এতে হাওয়া হয়ে যায়। নতুন প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আসন্ন কি না’, আর ‘পাকিস্তান থেকে আসা কথিত জঙ্গি’ এসব হয়ে যায় মিডিয়ার মূল প্রসঙ্গ। এগুলোই যেনবা সব সমস্যার কারণ। এই দৃষ্টি ঘুরাতেই মরিয়া হয়ে যুদ্ধের হুমকির গরম বক্তৃতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল মোদিকে।
কিন্তু তাতে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়  – ম্যালেরিয়া হওয়াতে রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু এখন কুইনাইনের প্রভাব প্রতিক্রিয়া শরীরে ছেয়ে মারাত্মক হয়ে গেছে, ফলে তা কমানো হবে কী দিয়ে? নিজেরই বাজানো ও ঝড় তোলা যুদ্ধের দামামা এখন কমাবে কী দিয়ে? অবস্থা দেখে খোদ বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরাই নাখোশ, হতাশ হয়ে পড়েছিল। সব দিক বিবেচনা শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে নেতাকর্মীদের হতাশার মধ্যেই সবার আগে পাবলিক বক্তৃতায় ‘যুদ্ধ নয়, উন্নয়ন চাই’ আর ‘কেবল কূটনীতি হবে চরম পদক্ষেপ’ বলে নিজের মূল অবস্থান পরিষ্কার ও প্রচার করে নেন মোদী।

আর এর সাথে পরদিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোদি নিয়েছিলেন। এক হল, সর্বদলীয় মানে সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা সভা থেকে নিজের ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে উপস্থিত সবার সমর্থন নিয়ে নেন তিনি। দুই. তিনি সব মিডিয়ার কাছে ওই নীতির পক্ষে সমর্থন চান। স্বভাবতই তা অন্তরালে। এটি এক কমন ফেনোমেনা এবং চর্চা যে ভারতের জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো আর সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিরোধিতা করে না। এবং সেই সাথে সব মিডিয়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। ফলে পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর কেউ কেউ মোদির বক্তৃতার নেতি রিপোর্ট ও সমালোচনা করলেও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় মিডিয়া মোদির ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি একযোগে মোদী সরকারের পক্ষে সামলে নিয়ে আসতে শুরু করে। বলা যায়, দুই দিনের মাথায় পরিস্থিতি মোদির পক্ষে ঘুরে যায়। এ কাজে মিডিয়াও আবার সাহায্য নিয়েছিল কয়েকটি ইস্যুর। যেমন এক. আগামী সার্ক সম্মেলনে একসাথে চার সদস্য দেশের যোগদানের অনীহা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। চার দেশের যোগ না দিতে অনীহার কারণ আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু তা ভারতের কূটনৈতিক লবির কারণে একসাথে প্রকাশ হওয়াতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটার কনস্টিটোয়েন্সির কাছে ব্যাপারটাকে ‘মোদির প্রতিশ্রুতি কাজ করছে’ এটা সাফল্য হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয় ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ছিল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি বাতিলের হুমকি। গত ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মিটিয়ে এই চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল এই দুই রাষ্ট্র। আসলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী মোট ছয়টি। ওই চুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র তিনটি করে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভাগ করে নেয়, যাতে প্রতি তিন নদীর পানিপ্রবাহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এক এক রাষ্ট্রের। এভাবে ওই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল। উভয় পক্ষই এতে এত দিন খুশি ছিল, এখনো পানির পরিমাণ ও ভাগের দিক দিয়ে উভয়ই খুশি। কিন্তু একটি টেকনিক্যাল দিক আছে। তা হল, ওই ছয়টি নদীরই উজানের দেশ হল ভারত। অর্থাৎ ভাটির দেশ হল পাকিস্তান। সোজা কথায় প্রথমে ভারত হয়ে, এরপর ওইসব নদী পাকিস্তানে প্রবেশ করে। ঠিক বাংলাদেশের মত। ফলে নদীর পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ করার ভূ-অবস্থানগত সুবিধাগুলো ভারতের পক্ষে। যদিও আন্তর্জাতিক নদী আইনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশকে প্রাপ্য পানিবঞ্চিত করা সম্পুর্ণ বেআইনি। কিন্তু মোদি ব্যাপারটিকে অন্তত প্রোপাগান্ডায় নেয়ার জন্য ওই চুক্তিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার জন্য সরকারি আমলা ও টেকনিক্যাল লোকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। বাস্তবে ভারত এই চুক্তি ভঙ্গ ও অমান্য করবে কি না, বাঁধ অথবা কোনো বাধা তৈরি করবে কি না সেটা অনেক পরের ব্যাপার; কিন্তু ইতোমধ্যে মোদির ওই নির্দেশ ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক প্রচারে নিয়ে গেছে। মোদী হুশিয়ারী দিয়ে বলছেন, “রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না, হুঁশিয়ারি মোদীর”। ফলে সাধারণ ভারতীয়দের মনে মোদী যুদ্ধ করার উসকানি যতটা তাতিয়েছিল, তা অনেকটাই এবার প্রশমিত হয়েছে এতে। যদিও মিডিয়ার এক কোণে ভারতীয় টেকনিক্যাল লোক বা প্রকৌশলীরা মন্তব্য করেছেন, এই পানি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ এটি প্রবল খরস্রোতা ও খাড়া প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। আবার পাকিস্তান থেকেও ওখানকার মিডিয়ায় পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে বলা হয়েছে, বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তবে সুবিধা হল, ভারতীয় মিডিয়া এই খবরটাকে নিজ দেশে তেমন প্রচারে নেয়নি। অবশ্য প্রথম দিন রাশিয়া-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বনির্ধারিত এক যৌথ মহড়া এ সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর তা যথাসময়েই শুরু হয় বলে এটাকে ভারতের জনগণের মন খারাপ করা খবর ও ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ভারতের মিডিয়া সেটাও সফলভাবেই সামলে নেয়।

অপর দিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আরেক খবর ছাপে যে, লাহোরে চীনা অ্যাম্বাসির কনসাল জেনারেল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই) সাথে দেখা করার সময় ভারত-পাকিস্তান বিরোধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে বলে জানিয়েছে। শাহবাজের তরফ থেকে বিবৃতির সূত্রে খবরটি ছাপা হয়। এই খবরটি পাক্কা দুই দিন টিকে থাকতে পেরেছিল। দুই দিন পরে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ে এমন খবর তাদের জানা নেই বলে জানায়। তবে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান প্রকাশ করে। তা হল, উভয় দেশ যেন সামরিক বিরোধে না জড়িয়ে বসে ডায়ালগে সমাধান খোঁজে, চীন এর আহ্বান জানায়। ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটি ব্যাপক প্রচারে নিয়ে যাওয়াতে এটিও মোদির পক্ষে জনগণের সমর্থন আনতে সাহায্য করে মিডিয়া। শুধু তাই নয়, ভারতের মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে যে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে আছে। যেমন- আনন্দবাজারের এক খবরের শিরোনাম হলো, ‘চাপের মুখেও পাক তর্জন, মার্কিন প্রশাসন পাশে আছে ভারতের।’ কিন্তু এটাকে প্রোপাগান্ডা বলছি কেন? অথবা আসলেই চীন ও আমেরিকার ভারত-পাকিস্তান বিরোধে অবস্থান কী, কেন? আর সেটাই বা কত দিন থাকবে বা জেনুইন কি না? পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার সমস্যা হিসেবে কংগ্রেস নেতা, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কেরালার এমপি শশী থারুর তাকে উদ্ধৃত করে হংকংয়ের এক মিডিয়া জানাচ্ছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। আমেরিকার আফগানিস্তানের কারণে পাকিস্তানকে দরকার। চীন পাকিস্তানে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এক একক বড় প্রকল্প নিয়েছে। যেটা দক্ষিণে বেলুচ সমুদ্রসীমায় এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সেখান থেকে দক্ষিণ থেকে উত্তর অবধি পাকিস্তানের বুক চিরে এরপর চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, এমন সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বছর শেষে তা প্রথম পর্যায় শেষ করা হবে। উদ্দেশ্য, এই সড়ক চীনের একমাত্র মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত যাবে। এভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ভূমিবেষ্টিত এই প্রদেশকে সমুদ্র পর্যন্ত এক্সেস দেয়া, যাতে পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে যায়। এটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নামে পরিচিত। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চীন থেকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন।

এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ আছে- গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থাৎ গ্লোবাল ক্যাপিটালের স্বার্থ। গত মাসে চীনে জি-২০ এর সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জি-২০ মানে হল, অর্থনীতির সাইজের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপরের দিকের রাষ্ট্র যারা – এমন টপ ২০টি বড় অর্থনীতির দেশের সম্মেলন। উদ্দেশ্য গ্লোবাল অর্থনীতিতে কিছু কমন সাধারণ স্বার্থের দিক নিয়ে একমত হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমন এবারের মূল ঐকমত্য হল, গ্লোবাল মন্দা বিষয়ে। দুনিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় ১৯৩০ সালে প্রথম মহামন্দা আসে। মহামন্দার সারার্থ হলো, সব রাষ্ট্রের নিজ মুদ্রার মান-দাম কমিয়ে অন্যের ওপর বাজার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা। এই ঘটনার লেজ ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল, যা থেকে প্রতিকার হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম। এ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো আবার যাতে মন্দা না হয় তা ঠেকানো। তবুও ২০০৭-০৮ সালে আবার মন্দা দেখা দিয়েছিল। আফগানিস্তান-ইরাকে যুদ্ধে গিয়ে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপুল যুদ্ধ খরচের এই ভারসাম্যহীনতা থেকে এর জন্ম বলে মনে করা হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিপুল অর্থ ঢেলে ব্যক্তি-কোম্পানিগুলোর ধস ঠেকায়। অথচ পশ্চিমের বাইরে চীন তখনো ডাবল ডিজিটের অর্থনীতি টেকাতে পেরেছিল, কারণ সে যুদ্ধের বাইরে। ফলে পশ্চিমাদের চোখে গ্লোবাল মন্দা ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে এক ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। চীন টিকলে তার ছোঁয়া ও প্রভাবে পশ্চিম তার সঙ্কট কাটাতে সুবিধা পাবে তাই। মন্দা দুনিয়াজুড়ে ছেয়ে যেতে বাধা হবে চীন তাই। পশ্চিম সেই থেকে মন্দা একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ওদিকে গত দুই বছর চীনের অর্থনীতি নিচের দিকে; কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতে আগের কংগ্রেস আমলে ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি এবার মোদির আমলে এখনো উঠতির দিকে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিই উঠতির দিকে পশ্চিমের চোখে সে আকর্ষণীয় ও আদরের। অতএব কোনোভাবেই ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা আবার ফিরে আসুক তা ঠেকাতে সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এবারের জি-২০ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল। ফলে এবার জি-২০ এর সর্ব সম্মতিতে, সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্ত নেয়, সঙ্কটের মুখে নিজ মুদ্রার মান-দাম কমানো এমন পদক্ষেপের পথে কেউ যাবে না। এ কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ফলাফলে তা গ্লোবাল অর্থনীতিকে ডুবিয়ে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। অতএব এই বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থের কারণে বড় অর্থনীতির কোনো রাষ্ট্রই সম্ভাব্য এই যুদ্ধকে নিজের স্বার্থের বিপক্ষে, নিজের জন্য বিপদ হিসেবে দেখে। যেন বলতে চায়, যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেয়ার বা পাওয়ার এটা সময় নয়।
গ্লোবাল উদ্বেগ ও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এ দিকটি সম্পর্কে মোদির জানা, সবাই তাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু তবুও মোদির কিছু একান্ত স্বার্থ আছে। একালে দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উত্তর প্রদেশে (সাথে পাঞ্জাবসহ আরো কয়েকটি) রাজ্য সরকারের নির্বাচন। এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোদি বা বিজেপি এখানে হেরে গেলে এখান থেকেই নীতিশ-মমতার নেতৃত্বে আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জোট গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা।
ওপরে লিখেছিলাম, মিডিয়াসহ মোদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর তৃতীয়টি হল, খুবই সীমিত পর্যায়ে সামরিক অ্যাকশন, যাতে আগামি ভোটে মোদির মুখ রক্ষা হয়। ভোটের বাক্স ভরে উঠে। এক কথায় বললে, “যুদ্ধ না উন্নয়ন আর কূটনীতি” এই নীতির পক্ষে ভারতের মিডিয়া একযোগে দাঁড়িয়েছিল খুবই সফলভাবে। মানুষের মন থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার পক্ষে আগের তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করে আনতে পেরেছিল; কিন্তু সম্ভবত সামরিকবাহিনীকে আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা তৈরি করে আনতে বলেছিলেন, যা তারা হাজির করেছিল একা মিডিয়াই তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করতে পারার পরে। সেই অর্থে আবার এই সামরিক এডভেঞ্চার তা ছোটখাট বলা হলেও মোদীর সেদিকে না গেলেও চলত।  কিন্তু সম্ভবত লোভে পড়ে, বাড়তি লাভের আশায় মোদী এই সামরিক অ্যাকশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেন। এই পরিকল্পনা মোতেও ছট খাটও নয়, রিস্কবিহীনও নয়। বরং মোদীর ভারতের জন্য আগুন নিয়ে খেলার মত রিস্কি। কিন্তু মোদী আগামি ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচনে ভাল করার লোভে এই আগুন নিয়ে খেলা খেলতে গিয়েছেন। এর অর্থ এখন মূল্যায়ন বসলে পরিস্কার দেখা যাবে, আগামী নির্বাচনে ভোটে সুবিধা দেয়ার কাজেই সামরিক বাহিনী ও এর ঐ পরিকল্পনা দেশের নয় দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। বিশেষত সামরিক হামলা তা যত ছোট দিয়ে শুরু হোক না কেন, এখন পাল্টাপাল্টি বড় থেকে আরো বড় হামলার দিকে দুই দেশ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। এ সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। শেষে এটা পুর্ণ যুদ্ধে না পরিণত হয়। যেটা তারা উভয়ে কেউ চায় না; কিন্তু সেখানেই গিয়ে পৌঁছবে। বিশেষ করে ভারত “সার্জিক্যাল অপারেশন” এই গালভরা নামের হামলা করতে গিয়ে যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইচ্ছা না থাকলেও ভারতকে এরপর আরেক দফা হামলায় যেতে হবে। কারণ ভারতের ঐ গালভরা নামের হামলায় এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে ধরা পরে আছে। ভারত প্রথম হামলা করার পর  মিডিয়াকে বীরদর্পে জানিয়েছিল, নিজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তারা নাকি পাকিস্তানের ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। যেন বলা হচ্ছিল, এখন ভারতের মিডিয়া মোদীর পক্ষে নির্বাচনী ক্রেডিট বিতরণ করতে নেমে পড়তে পারে। কিন্তু সন্ধ্যা লাগতেই জানা গেল, এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে আটকা পড়ে আছে। অথচ এটা আগে থেকেই এটা জানা সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনীর নেতারা তা লুকিয়ে অস্বীকার করে রেখেছিলেন। এটা ছাড়া যেটা এখন আর এক সবচেয়ে বড় সমস্যা তা হল – দুই দেশের বাহিনীই এখন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ঢুকে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ সত্যতা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে কি পূর্ণ যুদ্ধের (পারমাণবিক বোমা পকেটে রেখে) দিকেই যাবে বা যাচ্ছে পরিস্থিতি? সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। দুই পক্ষই তা না চাইলেও নিজ নিজ জনগণের কাছে বীরত্ত্ব আর  ‘ইজ্জত রক্ষার স্বার্থ’ দেখাতে গিয়ে পূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভাল সম্ভাবনা আছে।  এই সম্ভাবনা প্রবলতর হবে যদি না মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীন-আমেরিকা যৌথভাবে এগিয়ে আসে ও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় । পুরনো ইতিহাস বলছে, মধ্যস্থতাকারীর কিছু ভূমিকা আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০২ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে ০৩ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ]

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন
গৌতম দাস
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RC

 

 

যেকোনো আন্দোলন, বিক্ষোভ বা প্রতিরোধের পন্থা দেখা যায় – হয় সেটা গণ-আন্দোলন না হয়, সশস্ত্র তৎপরতায় পথে ঘটে। ভারতের দখলকৃত কাশ্মীরে জনগণের আন্দোলন শুরু থেকেই নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এটা সেখানে প্রতিষ্ঠিত যে ভারতের দখলের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গণ-আন্দোলনের পথ এখানে বেশি কার্যকর। আর সেখান থেকেই অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স নামে এক সামাজিক রাজনৈতিক জোটের জন্ম এবং এর নেতা হিসাবে সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক অথবা ইয়াসিন মালিক ইত্যাদি নামে গণ-আন্দোলন পন্থার নেতাদের আবির্ভাব। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সময়ে সশস্ত্রভাবে ভারতীয় সেনা ব্যারাকে গিয়ে দুটো সেনা মেরে আসার চেয়ে রাজপথের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী ও ফলদায়ক। সামরিকভাবে হামলার চেয়ে কার্ফু ভেঙ্গে রাস্তায় সাধারণ মানুষের নেমে আসা অথবা জানাজায় অংশগ্রহণ, কোন গৃহবধুর রাস্তায় নামা ইত্যাদি এগুলো অনেক বেশী শক্তিশালী। কাশ্মীরে দিল্লীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখানে উদোম করে চোখ আঙুল দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখানো সহজ হয়ে যায়। এই কারণ কাশ্মীরে সশস্ত্র প্রতিরোধ চলুক এটা দিল্লীর সরকারেরও পছন্দের দিক। দিল্লী তাই এই প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলার পথ একটাই – এদেরকে জঙ্গী বলে প্রপাগান্ডা করা। এরা জঙ্গি, পাকিস্তান থেকে আসা “সীমা পারকে আতঙ্কবাদী” অর্থাৎ কাশ্মীর ভারতের দখলকৃত থাকার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগণের কোন চাওয়া নাই, কোন প্রতিরোধ নাই – সব সমস্যার গোড়া হল “শান্তির” কাশ্মীরে পাকিস্তান থেকে পাঠানো সন্ত্রাসবাদ। এই বলে প্রপাগান্ডা করা। অতএব “ওরা জঙ্গী” এটা বলতে পারলেই একমাত্র ভারত সরকারের তাদেরকে সরাসরি গুলি করে মারার পক্ষে ন্যায্যতা হাজির করতে পারে। এসব কারণে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থার স্তরে গণ-আন্দোলন বেশী ফলদায়ক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বর্তমান স্তরে বলেছি, সব সময় বলি নাই।  কারণ কে না জানে বিজয় লাভ করতে হলে চুড়ান্ত দিনগুলোতে সাধারণত সশস্ত্র পথেই তা ঘটাতে দেখা যায়। কারণ সব পথ তখন একটাই, সশস্ত্র প্রতিরোধ, মোকাবিলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এর এক আদর্শ উদাহরণ। এগুলো সবাই জানে। কিন্তু যেটা মানুষ কম জানে বা খেয়াল করেনি, তা হলো ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলে একটি ব্যাপার আছে। ‘সফট ল্যান্ডিং’ ধারণাটি উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট, সেখান থেকে ধার করে এনেছি। এর মানে হল, উড়োজাহাজে যাত্রা আকাশে যতই আরামদায়কভাবে উড়ুক বা ঘটুক না কেন, সেটা আসল আরামদায়ক ভ্রমণ কি না, এর বিচার করা হবে ওই উড়োজাহাজের মাটিতে নামা মসৃণ ছিল কি না তা দিয়ে। অর্থাৎ মাটিতে নামার সময় ল্যান্ডিং বা নেমে আসাকে অবশ্যই কোনো বড় ঝাঁকুনি বা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে একেবারে মসৃণভাবে ঘটতেই হবে। নইলে সব বৃথা। ঠিক সে রকম আন্দোলন যদি গণ-আন্দোলন থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের স্তরে যাওয়ার সময় মসৃণ না হয়, পরিপক্ব হওয়ার আগে অস্ত্র ধরা হয় অথবা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্ত্র ধরা হয়- দুই ক্ষেত্রেই ওই আন্দোলন ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এতে তা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। উড়োজাহাজের  গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ার মত হবে।
কাশ্মিরের নিরস্ত্র গণ-আন্দোলন বিক্ষোভ প্রতিরোধ পঁচাত্তর দিনেরও বেশি কারফিউ অমান্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উরির ব্যারাকে হামলা করিয়ে কেউ না কেউ অপরিপক্ব অবস্থায় ওর মধ্যে সশস্ত্রতার আমদানি ঘটিয়ে দিয়েছে। কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ব্যারাক উরিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক হামলায় ১৮ জন সেনার মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারত দাবি করে যে, এই হামলা পাকিস্তান থেকে এসে ‘সীমা পার কি জঙ্গীরা’ করেছে। জবাবে স্বভাবতই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটা প্রমাণহীন এবং কোনো ইনভেস্টিগেশন বা তদন্তের আগেই করা প্রপাগান্ডা বলে দাবি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘‘পাকিস্তানের মাটি থেকে কোনও রকম অনুপ্রবেশ হয়নি।’’

কিন্তু আসল ব্যাপার হল, এমন দাবি আর পাল্টা দাবিতে কে ঠিক বলছে, তাতে আর কিছুই আসে যায় না। কারণ ভারতের নিট উদ্দেশ্য লাভ এতে ঘটে গিয়েছে। কাশ্মিরে লাগাতার প্রায় তিন মাস হতে চলা বিক্ষোভ আর সেটা মোকাবেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাম ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দিল্লি সরকার যখন ছেঁড়াবেড়া অবস্থা, তখন মোদির সরকার এখন স্থানীয়সহ গ্লোবাল মিডিয়াকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে যে, আসল ইস্যু ছিল কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন এবং এতে নির্যাতন-নিপীড়ন। তা আর আজ ইস্যু নয়। এখন ইস্যু হল ভারত-পাকিস্তানের বিবাদ। মূলকথা উরির সামরিক ব্যারাকে হামলা যেই করুক, কাশ্মিরে চলা গণ-আন্দোলনকে আড়ালে ফেলে ভারত-পাকিস্তানের সম্ভাব্য যুদ্ধকে সফলভাবে সামনে এনে ভারত গণ-আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করতে পেরেছে। আর এরই নিট বেনিফিট নিয়েছে, বেনিফিসিয়ারি হয়ে মোদি সরকার যুদ্ধের ঢোল পেটাচ্ছে। কি মজা!
গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই জানতে চেয়েছে, যুদ্ধ কি লেগে যাবে নাকি? তাদের আশঙ্কার বড় কারণ জানা গেল যে, শেখ হাসিনা সরকার এই ইস্যুতে ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলে বিবৃতিতে জানিয়েছে সেখান থেকে। ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলাতে আমাদের এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই সেকথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করে কথা বলা সহজ হয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত মানে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিডিয়ায় যা এসেছে, তাতে যুদ্ধ আসন্ন- এমন মনে করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে মূলকথা হল, সেনাছাউনিতে সশস্ত্র হামলার ঘটনার বেনিফিসিয়ারি হিসেবে মোদি ভারত-পাক যুদ্ধের দামামা তুলতে পেরেছে। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, উরির ঘটনার চিত্রনাট্য ইন্ডিয়ার নিজেরই তৈরি কি না। প্রথমে প্রশ্নটা তুলেছিল পাকিস্তানি মিডিয়া, পরে খোদ ইন্ডিয়ান মিডিয়া। এবিষয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, কিন্তু একই ভাবে উরি হামলার মুহূর্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমও। তবে সেই ভারতের মিডিয়া এই সন্দেহের কথা তুলেছিল কিছু ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের বরাতে, পরোক্ষভাবে। যেমন, ভারতের দাবি অনুসারে চারজন কথিত হামলাকারী জয়স-ই মোহাম্মদ জঙ্গি। ব্যারাকে জঙ্গি হামলায় পরে নাকি এরা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিটায়ার্ড এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কেকের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস প্রশ্ন তুলছে- এই চার জঙ্গির দাফনের জন্য কেন এত তাড়াহুড়া করা হলো। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, (“Should India have waited? ‘Hurried’ burial for Uri attackers raises eyebrows”) “দাফন করতে ভারতের দেরি করা উচিত ছিল।’ তাড়াহুড়া না করে এর বদলে তারা এই লাশগুলো সংরক্ষণ করে পাকিস্তানের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারত।

কপিল কেক পুরানা রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, এ ধরনের জঙ্গি হামলার ক্ষেত্রে সাধারণত ‘হামলাকারীদের মৃতদেহগুলা সংরক্ষণ করা হয়, পাকিস্তানকে তলব করা হয়, প্রমাণাদি পেশ করা হয়। মৃতের পরিবারকে খবর দিতে বলা হয়, যাতে তারা লাশ নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ কপিল বলছেন, কমন প্র্যাকটিস হলো… “এর আগে গত জানুয়ারি মাসে পাঠানকোট এয়ারবেজ হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের লাশ চার মাস ধরে রাখার পর দাফন হয়েছিল। আর ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় নিহত ৯ জন লস্কর-ই তাইয়্যেবা জঙ্গির লাশ প্রায় এক বছর মর্গে রাখা হয়েছিল। ২০০১ সালের পার্লামেন্ট ভবনে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় পাঁচ জঙ্গির লাশ দাফন করা হয়েছিল প্রায় এক মাস বাদে”। এ ছাড়া সব ক্ষেত্রেই লাশ নিয়ে গিয়ে দাফন-কাফন করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, যদিও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অথচ উরিতে শেষ রাতের এই হামলা ঘটে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর জানানো হলো যে, এই জঙ্গিরা সবাই পাকিস্তানি। এমনকি এ ক্ষেত্রে জঙ্গি হামলার লাশ দাফনের প্রচলিত জায়গাও বদলানো হয়েছে।
আবার ২১ সেপ্টেম্বরের হিন্দুস্তান টাইমস পাঁচটা পয়েন্ট তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, কেন পাকিস্তানে হামলা করা ভারতের জন্য সহজ হবে না। এ ছাড়া ওই রিপোর্টে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক কমিউনিটি কে কিভাবে দায়সারা করে এই হামলার নিন্দা করছে তা উল্লেখ করেছে। প্রায় প্রত্যেকেই শুধু হামলার নিন্দা করছে কিন্তু কেউ পাকিস্তানের নাম নেয়নি, দায়ী করে নাই বা উল্লেখ করেনি। এমনকি বাংলাদেশের নিন্দার বিবৃতিতেও পাকিস্তানের নাম নেয়া হয়নি। অর্থাৎ হামলায় ভারতীয় ভাষ্য বাইরের দুনিয়ার প্রায় সবাই এড়িয়ে গেছে, সম্ভবত এই দাবি প্রমাণসাপেক্ষ বলে। যেমন রাশিয়ার পুতিন মন্তব্য করেছেন কোনো দায়দায়িত্ব না নিয়ে খুব সাবধানে। বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী’। (stating: “We are also concerned about the fact that, according to New Delhi, the army base near Uri was attacked from Pakistani territory.”) আমেরিকানদের বক্তব্যও একই রকম সাবধানের, পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলেছে কাশ্মির (“an attack in the Valley”) ‘ভ্যালিতে যে হামলা হয়েছে আমরা তার নিন্দা করি”। – ওদিকে ব্রিটিশ সরকার উল্টা ডুবিয়েছে। উরি হামলার নিন্দা করে তারা বলেছে, ‘ইন্ডিয়া অ্যাডমিনিস্ট্রেডেট কাশ্মির’ (Uri as a part of “India-administrated Kashmir)। অর্থাৎ বলতে চেয়েছে যেন কাশ্মির ভূখণ্ডটি আসলে ঠিক ভারতের না।
ওদিকে বিবিসি ‘ভারত কি পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারবে?’ এই শিরোনামে ২০ সেপ্টেম্বর এক রিপোর্ট করেছে। লিখেছে, ভারতের একজন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অজয় শুক্লা মনে করেন, “নরেন্দ্র মোদি সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রেখেছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী হামলার বিপরীতে কড়া জবাব দেয়ার মতো সামরিক শক্তি এবং পরিকল্পনা তৈরি করেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। এখন মনে হচ্ছে সরকার তার নিজের বাগাড়ম্বরের মধ্যেই আটকা পড়ে গেছে”। অর্থাৎ মোদি কাশ্মিরের গণপ্রতিরোধ থেকে দেশি বিদেশি সবার চোখ সরাতে পেরেছেন ঠিকই, কিছু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বা মুডে নেই। ওই রিপোর্টের শেষ বাক্য হল, “অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ভারতকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সুচিন্তিত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বিপরীতে শুধু রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর করলে সেটি শুধু ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষতি করবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন”। অথচ ঠিক সেই সমস্যাই ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছেন মোদি।
মোদিসহ বিজেপি নেতারা এখন কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে, শনিবার ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী বিজেপির জাতীয় কমিটির সভা চলছে। ভারতের মিডিয়াতে এক নতুন শব্দের আমদানি হয়েছে- jingoism বা ‘জিঙ্গ-ইজম’। যার অর্থ উগ্র জাতীয়তাবাদী গরম কিন্তু ফাঁপা কথা বলে যুদ্ধের দামামা বাজানো। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ান গানবোটের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতির সপক্ষে একটা বাগাড়ম্বর গান লেখা হয়েছিল, সেখানে jingo বলে এক শব্দ ছিল। তাদের কারবারকে ঠাট্টা করতে “jingoism’ শব্দ দিয়ে তাদেরকে চিনানো শুরু হয়েছিল। তাই থেকে ‘জিঙ্গ-ইজম’ এই শব্দের উৎপত্তি। সমালোচকদের সবার অভিযোগ মোদিসহ দলের নেতারা ‘জিঙ্গ-ইজমে’ ভুগছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তবু এতে জনগণ দূরে থাক, নিজ বিজেপি দলের কর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা জবাব দিতে পারছেন না নেতারা। আনন্দবাজার গত প্রায় দশ দিনের বেশি হবে কাশ্মির ইস্যুতে সরকারের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কাহিনী নিয়ে বিস্তারিত লিখে চলছিল। শনিবার ২৪ তারিখের আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক সম্পাদকীয়তে দুঃখ জানিয়ে লিখছেন, ‘যুদ্ধের বিরোধিতাও যেন দেশদ্রোহিতার নামান্তর!’ এরপর ওইদিনের এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “কড়া জবাব কোথায়, ফুঁসছে বিজেপি, নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদি এখন নিজ দলের কর্মীদের সামলাতে হয়রান হয়ে গেছে – নিজের কর্মীরাই ফুঁসছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল প্রথম দিনেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন যিনি, তার গলাতেই আজ নরম সুর”। এটা বলতে আনন্দবাজার বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের কথা বুঝিয়েছে। মোদির সবচেয়ে বিশ্বস্ত লাঠি হল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। আর তাঁর পরের ব্যক্তিত্ব, মূল সংগঠন ‘সঙ্ঘ পরিবার’ থেকে এসে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক এই নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন রাম মাধব। তিনি এক গরম বক্তৃতায় আগের দিন ‘দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল’ খুলে নেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই বরাতে আনন্দবাজারের ওই কথা। রিপোর্টে আনন্দবাজার এর পরে লিখেছে, “পাকিস্তানকে জবাব দিতে কূটনীতি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপের হদিস দিতে পারেননি” রাম মাধব। অসন্তুষ্ট ক্ষুব্ধ দলের কর্মীদের চাপের মুখে পরে দলের আরেক সচিব শ্রীকান্ত শর্মা বোঝানোর চেষ্টা করেন, “প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনার তরফে গোড়া থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেনাকে পদক্ষেপ করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এবার সেনা কিভাবে কাজ করবে, সেটি তাদের এখতিয়ারে পড়ে। এর বেশি আর কী করা যেতে পারে এ মুহূর্তে?” – আনন্দবাজার থেকে কোট করে আনা কথাগুলো।  ওদিকে কাশ্মীর ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রীর মতভেদ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কয়েকটা গুরুত্বপুর্ণ সভায় উপস্থিত থাকেন নাই এমন রিপোর্টও ভারতীয় মিডিয়ায় এসেছে।  কেরালায় বিজেপির অভ্যন্তরীণ ঐ সভার প্রথম দিন পাকিস্তান প্রসঙ্গে মোদি কী করতে চান, তা তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি কোঝিকোড়ে শহরে এক জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ওই বক্তৃতা থেকে কোট করে তা দশটা পয়েন্ট হিসেবে তুলে এনে ছাপিয়েছে। এই দশটা পয়েন্ট পড়লে যে কেউ বুঝবে মোদি পাকিস্তানের সাথে কোনো যুদ্ধের চিন্তা করছেন না, এটা তার মাথাতেই নেই।

ওই দশ পয়েন্টের দ্বিতীয় এবং সাত থেকে দশ নম্বর পয়েন্ট- এগুলো পড়লে যে কেউ এটা বুঝবে। দ্বিতীয় পয়েন্টটি হল, ‘উরিতে যে আঠারোজন সেনা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করবে”। (Indians will never forget the gruesome act of killing 18 soldiers in Uri.) অর্থাৎ সম্ভবত এর মানে হল, ওই আঠারোজনই সবচেয়ে বড় সংখ্যার ‘শহীদ’। এরা ছাড়া আগামিতে আর কোন সেনা শহীদ হচ্ছে না। মোদি ইতোমধ্যে তা জেনে গেছেন। আর ওই আঠারোজনের জীবনের বিনিময়েই মোদী কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হলেন- সেজন্য কি? এর জবাব আগামীতে পরিষ্কার হবে।
পরের সাত ও আট নম্বর পয়েন্টে দেখা যাচ্ছে মোদি পাকিস্তানের সরকারের বদলে পাকিস্তানের জনগণের সাথে কথা বলতে চাইছেন। সেজন্য তাদের অ্যাড্রেস করে বক্তব্য রেখেছে। কংগ্রেস মোদীর বক্তৃতার সেদিকটাতে খোচা দিতে পরেরদিন টিপ্পনি করে বলেছে, মোদী সম্ভবত আগামি নির্বাচন “পাকিস্থান থেকে লড়বেন”।  অর্থাৎ সার কথা হল, তিনি যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছেন না, এর ইঙ্গিত সেটা। যেমন সাত নম্বরের প্রথম বাক্যটা হল, তিনি “পাকিস্তানের জনগণকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন- আসেন একটা যুদ্ধ লড়ি।’ এটুকু পড়ে পাঠকের মনে সামরিক যুদ্ধের কথাই ভেসে উঠবে। কিন্তু না, মোদি সামরিক যুদ্ধের কথা বলছেন না। পরের বাক্যে জানা গেল যে – “কে কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এরই প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে জেতার চ্যালেঞ্জ” দিচ্ছেন তিনি। বলছেন, “এটা হবে কে আগে বেশি চাকরি সৃষ্টি করা, দারিদ্র্য দূর করা আর শিক্ষার হার বাড়াতে পারে- এরই চ্যালেঞ্জ”। এ কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, তিনি আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের বয়ানে৪ও নাই। এখন “উন্নয়নের” (তার শ্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’) চিন্তার ভেতরেই সরে আসতে চাইছেন। যুদ্ধে যাওয়ার মানে উন্নয়ন-বিরোধী কাজ, (যা তিনি করেছেন সব ডুবে যাবে, সব বেপথে যাবে- এটা পরিষ্কার করে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ফলে মোদির পরিষ্কার যুদ্ধবিরোধী পথের ইঙ্গিত।
আট নম্বর পয়েন্টও একই ইঙ্গিত। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের জনগণের তাদের নেতাদেরকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, “আমরা দুই দেশ একই সময়ে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আমরা করি সফটওয়্যার রফতানি আর পাকিস্তান করে সন্ত্রাসবাদ রফতানি, কেন”। অর্থাৎ একই চিন্তা কাঠামোর বক্তব্য- “যুদ্ধ বনাম উন্নয়ন আর তিনি উন্নয়নের পক্ষে”। এরপর ৯ নম্বর পয়েন্ট। এটা হলো পাকিস্তান বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ কী করবেন, সে প্রসঙ্গে। এক কথায় বললে, কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং এটাই হবে সেই সর্বোচ্চ করণীয়। তিনি পাকিস্তানকে পশ্চিমাসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, কূটনীতি তার পথ।
শেষে দশ নম্বর পয়েন্ট। এটা বদ দোয়া দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। মোদি বলছেন,”একদিন পাকিস্তানের জনগণ নিজ ঘরের তৈরি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে”। যুদ্ধের ভুয়া দামামা বাজানোর চেয়ে তবুও এটা ভালো নিঃসন্দেহে। দশ পয়েন্টের সারকথা, যুদ্ধ বনাম উন্নয়নে মোদি উন্নয়নের পক্ষে।
আনন্দবাজারের রিপোর্টের শেষ দুই বাক্য এ রকম- “পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি এই বিদ্রোহী নেতাদের আগামীকাল সংবর্ধনা দেবেন। তার পরই “গরিবি হটাওয়ের স্লোগান দেবেন তিনি। লক্ষ্য, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাবের ভোট”। অর্থাৎ লক্ষ্যণীয় যে মোদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা পরিচয় করাচ্ছে এই বলে যে, তিনি হলেন- ‘পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি।’ এরপর আর কোনো মন্তব্য নিঃপ্রয়োজন। যুদ্ধ বিষয়ে কোনো খবর আর নেই। কাজকর্ম যেমন চলছিল, তেমনি রুটিন। সামনের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, আর এর কৌশল নির্ধারণ। বিজনেস এজ ইউজুয়াল! আসলে হিন্দুত্ত্ব – এর শ্লোগান তুলে ভোটের বাক্স ভরে তোলা যায় হয়ত তবে যুদ্ধের বাজারে এই শ্লোগান একেবারেই অচল। কোনই কাজে আসে না, উলটা মিথ্যার ভান্ড ফুটে যাবার  বিপদ ঢেকে আনে। বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে ২৬ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

 

কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়
গৌতম দাস
১৮ আগস্ট ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1Hu

সম্প্রতিকালের বাংলাদেশ ‘জঙ্গী’ হামলার ব্যাপকতা দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। গত এক-দেড় বছর ধরে কিছু বিশেষ ধরণের সশস্ত্র হামলা, গলা কেটে দেওয়া বা বোমা হামলার মত ঘটনাগুলো আমরা দেখছিলাম। হামলার বৈশিষ্ঠের দিক থেকে এগুলোর কোনটাই ঠিক হামলাকারির আত্মঘাতি ধরণের তৎপরতা ছিল না। এর পরবর্তিতে আমরা বড় ব্যতিক্রম দেখলাম গুলশানের ‘হলি আর্টজান বেকারি’ নামের রেস্টুরেন্টে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ঘটনা। এটাকে ব্যতিক্রম বলছি এজন্য যে এই ঘটনাটা প্রথমে জিম্মি করা আর পরে সকলকে হত্যা করা ধরণের। যদিও এরপর সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কালে পাঁচজন হামলাকারির মৃত্যু ঘটে। এই অর্থে হামলাকারিরা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বা আত্মঘাতি প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়েই এই হামলা চালিয়েছিল বলা যায়। এর আগে কখনও এমন  বৈশিষ্ঠের হামলা আমরা দেখি নাই। আগে হামলাকারিরা কখনও আক্রমণস্থলে নিহতও হন নাই। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারি গ্রেফতারও না হয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এসব দিক থেকে বিবেচনায় গুলশানের হামলার ধরনটা ভিন্ন – জিম্মি করে হত্যা করা আর শেষে নিজেরাও নিহত হওয়া – এটা একেবারে নতুন।

এই নতুনত্ব শুধু হামলার ধরণেই নয় আরও অনেক জায়গায় নতুনত্ব এনেছে। যেমন আগে সমাজে ‘জঙ্গিবিষয়ক’ নানা আলাপ হতে দেখা যেত, যেখানে সত্য-মিথ্যা প্রচারণা করতে দেখা যেত। যার বিবেচনা যে তাঁর শত্রু সে আসলে জঙ্গি হোক আর নাই হোক তাঁর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ প্রচারণায় নামতে আমরা দেখেছিলাম। অথবা, কারা জঙ্গী হয় এই প্রশ্নে একচেটিয়া বাছবিচার ছাড়া মাদ্রাসাগুলোকে দায়ী করে প্রচারণা ইত্যাদি এসবও আমরা দেখে আসছি গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। কিন্তু এবার বড় ব্যতিক্রম। স্পষ্ট হাতেনাতে প্রমাণে জানা গেল হামলাকারিরা সমাজেরই উচু ঘরের। একেবারে রাজধানী শহরের সবচেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের শিক্ষালাভ দেশের মর্ডান ইংলিশ স্কুলের ও দেশি বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এককথায় বললে তা মাদ্রাসা তো নয়ই, বরং তারা একেবারে আধুনিক উচ্চস্তরের শিক্ষা, মর্ডান কারিকুলামের ভিতরে থেকে তাদের পড়াশুনা করছিলেন। ফলে হামলাকারিদেরকে ‘পশ্চাদপদ’ বলে নাক সিটকানো, গরীব মাদ্রাসার তুচ্ছ ও দায়ী করা অথবা লজিক্যাল র‍্যাশনাল মন থাকলে সবকিছুর সমাধান পাওয়া যেত ইত্যাদিতে আধুনিকতার শ্রেষ্ঠত্ব ধারণা যা এতদিন করে খাচ্ছিল সেই ভ্যানিটি আর মিথ্যা গৌরব সবকিছুই এবার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছিল। এটাও একটা বিশাল ব্যতিক্রমি ঘটনা মানতে হয়। এরকম করে হয়ত আরও  অনেক ব্যতিক্রমী দিক আমরা খুঁজলে বের করতে পারব। কিন্তু আসল  উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম যা এখানে লেখার মুল প্রসঙ্গ তা হল, হামলাকারি ‘জঙ্গিদের’ মৃত্যু পরবর্তি জটিলতা। অর্থাৎ মৃত ‘জঙ্গিদের’ মাটি পাওয়া বা দেওয়া। যতদুর মিডিয়া দেখে জানা গেছে তাতে মৃত ‘জঙ্গিদেরকে’ মাটি দেওয়া বা সৎকারের কাজ করার ব্যাপারে খোদ নিজ পরিবারের প্রধানদেরকে প্রকাশ্য অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এমনকি লাশ গ্রহণ না করার পক্ষেই প্রকাশ্যে ঘোষণা বা অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

মানুষ মারা গেলে সে তখন লাশ মাত্র – একে সৎকার করতে হবে। এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়। গোত্র বা ধর্মীয় নানান রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণে করে দুনিয়ার সব সমাজ কমিউনিটিই তা পালন করে থেকে। আমাদের যার যার ধর্ম ও সমাজ সভ্যতার রীতিনীতি সম্পর্কে যত প্রাচীন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় সব ধরণের কমিউনিটিতে লাশের সৎকার করার বাধ্যবাধকতা সব সমাজেই আছে থাকে দেখা যায়। এছাড়া আর একটা দিক হল, জীবিত অবস্থায় মানুষ কারও কাছে অথবা অনেক মানুষের কাছে বন্ধু হয়,আবার শত্রুও হয়। একারণে মানূষের কাজ ততপরতার মুল্যায়নে জীবিত অবস্থাতেই সে খুবই ঘৃণিতও হয়, হতেই পারে। প্রচন্ড অন্যায়কারি বা অত্যাচারিও হতে পারে। আবার মানুষের যা কিছু স্বভাব বা বদস্বভাব এর মুল্যায়ন শুধু তার জীবতকালে এবং মারা যাবার পরও চলে, চলতে থাকে। তবে মারা যাবার পর কেবল একটা জায়গায় তফাত হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে নানান মূল্যায়ন তখনও জারি থাকে। যেটা থাকে না তা হল মুল্যায়ন-উত্তর করণীয় একশন – অর্থাৎ মুল্যায়নে যদি দোষ পাওয়া যায় তবুও ওখানেই তার সমাপ্তি টানা হয়। দোষের জন্য আমরা কোন বিচার বা শাস্তির পদক্ষেপ আর থাকে না। মানে আমাদের মুল্যায়নে যদি দেখা যায় যে উনি জীবিত অবস্থায় খারাপ ছিলেন, ধরা যাক অত্যাচারি ছিলেন – তবুও মারা যাবার পর এর জন্য তাকে কোন শাস্তি দেওয়া, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ইত্যাদি থেকে আমরা বিরত থাকি। কারণ তখন এগুলো অর্থহীন। কিন্তু পরিস্কার রাখার জন্য মনে করিয়ে দেই, মৃত মানুষের মুল্যায়ন মৃতের-বাসায় না হোক সমাজে বন্ধ হয় না। কিন্তু তবু মুল্যায়ন করার পর সেটা আর বিচার শাস্তি বা অভিযোগের পদক্ষেপের দিকে যায় না, আমরা নেই না। কারণ বাস্তবে সে তখন শাস্তির উর্ধে।  এধারণাটাই অনুসরণ করে আধুনিক রাষ্ট্রের আদালতেও মৃত ব্যক্তির পক্ষে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট দাখিল করলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কিন্তু মৃত অপরাধীকেও আদালত ঐ ব্যক্তির নামে আনা সব অভিযোগ থেকে তাকে রেহাই ও মুক্ত করার রায় দেন।

মুল্যায়ন বিচার কথাটা ব্যাপক দিক থেকে দেখলে, মানুষের বিচার দুই দুনিয়াতেই হয় বলে মনে করা হয়। এই দুনিয়ার বিচার মানে রাষ্ট্রের আইন আদালত। রাষ্ট্রের আদালত কোন মৃত মানুষের বেলায় দুনিয়ায় তাঁর কৃতকাজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত বলে রায় দেয়। আর অন্য দুনিয়া বেলায়, সেখানে আবার  বিচারের এক্তিয়ার আর আমাদের নয়, একমাত্র আল্লাহর। এই পরেরটার ব্যাপারে আমরা কেউ জানি না সেই বিচারে কার কী হবে, কে কীসে দোষী না বেকসুর বলে সাব্যস্ত হবে। আমাদের মানুষের এক্তিয়ারের বাইরে সেটা। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ মারা যাবার পর মুল্যায়ন তখনও চলে কিন্তু বিচার বা মুল্যায়ন-পরবর্তি কোন একশন আর চলে না। মানুষের সাধ্য নাগালের বাইরে এটা। তাহলে দাঁড়াল, দুনিয়ার আদালত তাকে মুক্ত করেই দেয়। আর আল্লাহর এক্তিয়ার তো আমাদের নয়। এটা আল্লাহর উপরই ছেড়ে রাখতে হয় আর সেটাই বিধানও বটে।

এই অর্থে সারকথাটা হল,মানুষ মারা গেলে সে সব বিচার-শাস্তির উর্ধে চলে যায়। কারণ সব অভিযোগ তখন অর্থহীন হয়ে যায়।

গুলশান ঘটনার পর সরকারের দিক থেকে সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার তাগিদ অনুভব খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। সরকার জনগণের সাথে বন্ধুমুলক মানে যাকে ফ্রেন্ডলি বা পপুলার বলি – তা হোক আর নাই হোক সব সরকারই এমন ঘটনার পর হামলা ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টাই করে থাকে। এদিক থেকে তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তুই কতদুর এটা স্বাভাবিক? যতদুর তা মাটি দেওয়ার বিরুদ্ধেও জনমত তৈরির ব্যাপার পর্যন্ত প্রসারিত না হয়।

তাহলে অভিভাবক পিতারা কেন অনীহা দেখাচ্ছেন,কেন প্রকাশ্যে লাশ নিতে চাচ্ছেন না? মনে হচ্ছে তারা বাবা হিসাবে নিজ মৃত সন্তানের সৎকারের দায় আর ব্যক্তি বা সমাজের একজন হিসাবে দায় – এই দুইয়ের মধ্যে গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে আমাদের এমন গন্ডগোলে পড়ার কথা না। সমাজে একই মানুষের একই সাথে নানান রকমের ভুমিকা পালন করতে হয়, থাকে। মুল ব্যাপারটা হল, নিজ সন্তান ‘জঙ্গি’ হবার পথে গিয়েছে অথবা কাউকে হত্যা করে শেষে নিজেও নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম কথা হল, যেভাবে যাই ঘটুক, শেষ বিচারে সাবালক সন্তানের কৃতকর্মের দায় ঐ সন্তানের। লিগাল দায় সন্তানের, পিতা বা অভিভাবকের নয়। রাষ্ট্রীয় আইন আদালতের ক্ষেত্রেও এটা এমনই। এমনকি শুধু সন্তান কেন, যে কোন একজনের দায়ে অন্য জনকে শাস্তি দেওয়া যায় না। আর ওদিকে ধর্মীয় বা আখিরাতের বিচারেও দুনিয়ায় যার যার কৃতকর্মের দায় তাঁর নিজের। এমনকি, চুরি ডাকাতি করে সংসার চালানো পিতার ঐ সংসার থেকে ভরণপোষণ পাওয়া পোষ্য সদস্যদের কারও উপর কোন চুরি ডাকাতির দায় বর্তায় না। না এই দুনিয়া না সেই দুনিয়ার বিচারে। যদিও সন্তান ‘জঙ্গী’ বলে পিতা বা অভিভাবকের মনে অস্বস্তি থাকতে পারে, সন্তাহ হারানোর বেদনাও সেখানে  থাকে, এমনকি সন্তান যাকে হত্যা করেছে তার বা তাঁর পরিবারের প্রতিও সমবেদনা থাকে – সেগুলো আলাদা জিনিষ।

অতএব ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ততপরতার বিরুদ্ধে সমাজ বা রাষ্ট্র জনমত তৈরি করলে সেখানেও  কোন মৃত ‘জঙ্গির’ পিতাও সমাজের একজন হিসাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি একইসাথে কোন মৃত সন্তানের পিতা হন আর নাই হন। স্বাভাবিক অংশগ্রহণই তিনি করবেন। এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি যদি নিন্দা জানাতে মনস্থ করেন সক্রিয় অথবা নিষ্ক্রিয়ভাবে – তবে তাও করবেন, একদম স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তাই বলে সেই একই পিতা সন্তানের সৎকারের প্রসঙ্গে তার করণীয় যা, সৎকারে আয়োজনের ক্ষেত্রে পিতার যা ভুমিকা হয় তাও পালন করবেন, তাকে করতে হবে। কেননা এটা শুধু পিতা বলে নয়। মনে রাখতে হবে, এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়ও।

আমরা আশা করব অভিভাবক পিতারা ‘জঙ্গী’ ততপরতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ব্যাপারের অংশগ্রহণের সাথে সাথে, মৃত সন্তানের  লাশ গ্রহণ ও  সৎকারের  প্রসঙ্গে পিতা হিসাবে তার যা কিছু দায় তারও প্রতিটা তিনি পালন করবেন। এই দুইয়ের মধ্যে কোন স্ববিরোধ নাই।

আচ্ছা, কোন পিতা বা অভিভাবক যদি লাশ না নেন, অস্বীকার করেন তাহলে সেক্ষেত্রে লাশের কী হবে? এখান একটা কথা মনে রাখতে হবে – ধর্মীয় রীতিনীতি যাই থাক, জীবিত মানুষ নিজের ব্যবহারিক স্বার্থেই মৃত মানুষকে কবরস্ত করে। পাশে রেখে ঘুমায় না। এটাও জীবন বাস্তবতার আর এক দিক। কারণ লাশ পাশে রেখে বা পচিয়ে ঘর সংসার পরিবার করা চলে না। পচনশীলতার ম্যানেজমেন্ট দিক থেকে সে হিসাবেও লাশ সম্মানের সাথে কবরস্তই সঠিক ও বাস্তব বিধান। একাজ  মৃতের  পিতা বা অভিভাবক না করলেও সমাজ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে না কাউকে তা করতেই হবে। এবং সেটা করতে হবে একেবারে সম্মানের সাথে। কারণ মৃত মানুষের ভিতরে আমরা জীবিতরা  প্রত্যেকেই নিজেকে দেখতে পাই। আমার মৃত্যুর পর যেহেতু  আমিও আমার অসম্মান দেখতে চাইতে পারি না। তাই আমার মৃত্যুর আগেই সমাজে সৎকার ব্যবস্থা – এটা সমাজের রেওয়াজ হিসাবে গড়ে উঠুক, আমরা সবাই তা চাই। তাই আমরা দুনিয়ার সব লাশ এমনকি একেবারে অচেনা অজানা লাশকেও অজান্তে মনের গভীর থেকে সম্মান করি। তবুও কেউ কেউ, কাউকে হত্যা করে সেই লাশের উপর নৃত্য করার রেফারেন্স দিতে চাইতে পারেন।  হা পারেন তবে সেটাকে আমরা জিঘাংসা বলি। জিঘাংসা এক মানসিক রোগ যা থেকে বের হয়ে আসার উপায় বা পাথেয় হল মনোরোগের চিকিৎসা। কী আর করা,  জিঘাংসা মানুষের মৌলিক স্বভাব না হলেও আমরা অনেক মানুষকে জিঘাংসার ভিতর সুখ খুজতে দেখি।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
গৌতম দাস
০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1lk

তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

[এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1yl

গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
সব শেষ।

আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]