সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের সাথে প্রথম অস্ত্রবিরতি

সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের প্রথম অস্ত্রবিরতি

গৌতম দাস

২৩ জুন ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sl

 

 

SCO, সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন – এই সংগঠন শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো। এর আজকের জায়গায় আসার পেছনে কয়েকটা ঘটনা পটভূমি হয়ে আছে। সেখান থেকে জানা যায়, এসসিও বা সাংহাই গ্রুপের আজকের ভূমিকা এবং এর সম্ভাবনা ও অভিমুখ। এসসিও (SCO) বা সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন কী ও কেন?

এমনিতেই পুরনো ইতিহাস অর্থে সাধারণভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়ার (মধ্য এশিয়া বলতে পাঁচ রাষ্ট্র বুঝায় কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। যদিও এর বাইরে মঙ্গোলিয়াসহ অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের অংশকেও মধ্য এশিয়া বলতে বুঝানো হয়ে থাকে।) সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ঘটনা ঘটেছিল ইসলাম যখন বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় (abbasid dynasty) খলিফা শাসন (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) আমলে। আগের শাসক চীনা ‘তাং রাজবংশ’ (Tang dynasty) আব্বাসীয়দের হাতে পরাজিত হলে সেন্ট্রাল এশিয়া সদলবলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আর দ্বিতীয় বড় প্রভাবের ঘটনা হল, কলোনি দখলদারি যখন দুনিয়ার মুল অভিমুখ ও সাম্রাজ্য শাসনের স্টাইল সেই আমলে রাশিয়ান জার এম্পায়ারের। সে আমলে ১৮৩৯-৮৫ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে নানান যুদ্ধে রাশিয়ার প্রাচীন জার সাম্রাজ্যের সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়। যতক্ষণ না এর পালটা বৃটিশ এম্পায়ার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার দিক থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্থানে না পৌছেছিল।

আর একালের প্রথম ঘটনা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া (১৯৯১) যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য ছিল রাশিয়াসহ সেন্ট্রাল এশিয়ার ঐ পাঁচ রাষ্ট্রই। তবে রাশিয়াসহ কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরঘিজস্তান এরা সবাই এখন সাংহাই গ্রুপের সদস্য। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে এক জোট গঠন তাদের হাতে শুরু হয়েছিল ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ- এই নাম দিয়ে ১৯৯৬ সালে; তবে তখনো উজবেকিস্তান এতে যোগ দেয়নি বলে তখন ছিল পাঁচ রাষ্ট্র, তাই ‘সাংহাই ফাইভ’।

দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় যে ভয়ে সবসময় দিন কাটাতে হত তা হল, আমেরিকা বা ইউরোপ অর্থে, পশ্চিমা শক্তি যেন ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত থেকে আলাদা হয়ে পড়া ১৫ রাষ্ট্র বিশেষ করে, সেন্ট্রাল এশিয়ার কোন রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব ও খাতির জমিয়ে ঢুকে না পড়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক ধরণের সম্পর্ক জমিয়ে এগিয়ে যেতে না শুরু করে। যদি তা পারে তাহলে প্রায় ১৮৮৫ সালের পর থেকে নিশ্চিত থাকা রাশিয়ার এশিয়ার দিক থেকে নিরাপত্তা এবার হুমকির মুখে পড়বে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়া সবসময় চেষ্টা করে গেছে নানা উছিলা, নানান জোট, সামাজিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক করে এর মধ্য দিয়ে সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকতে। [তবে সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে একটা রাষ্ট্রের কথা এতক্ষণ বাদ পড়ে যাচ্ছে, তা হলো তুর্কমেনিস্তান। কারণ, দেশটি সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশনের সদস্য নয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে না।]

এখন গুরুত্বপূর্ণ কথা, সেন্ট্রাল এশিয়ার নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হল এটা ল্যান্ডলকড এবং চার দিকে পাহাড় পর্বতের ভেতর ডুবে থাকা, এক কথায় বদ্ধ। এশিয়ার সর্বোচ্চ উত্তরে, গহীন পাহাড়ি অঞ্চল। ফলে যত বিদেশী শাসক এর জীবনে এসেছে শেষ বিচারে সে কলোনিপ্রভু এ যেমন সত্য, ততোধিক সত্য হয়ে যে, সেইই তার বদ্ধ-দশা বিশেষত বদ্ধ অর্থনৈতিক জীবনে প্রাণ সঞ্চারের ভূমিকা ও গতি আনার ক্ষেত্রে, ত্রাতা হয়ে কম বেশি ভূমিকা রেখেছে। সেন্ট্রাল এশিয়া গহীন পাহাড় ঘেরা অঞ্চল বলে সেকালের পশ্চিমা শক্তি ইউরোপও এদের দখলে নিতে আসতে পারেনি অথবা এটা তাদের পোষায়নি। তবু শেষ দিকে ব্রিটিশেরা একবার উঁকি মেরেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ এম্পায়ার তার উপনিবেশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে আজকের পাকিস্তান তথা পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা চালাতেই সেন্ট্রাল এশিয়া আরো নিশ্চিতভাবে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে পোক্ত হয়ে যায়।

বলা যায়, সেই থেকে জার সম্রাটের উপনিবেশ হয়ে গিয়েছিল সেন্ট্রাল এশিয়া। এই সত্য পূর্ণ স্বীকার করেও বলা যায়, এই সম্রাট ও সাম্রাজ্যই ছিল তার একমাত্র আশার বাতি। কেন? কারণ ল্যান্ডলকড সেন্ট্রাল এশিয়ার আবদ্ধতা ঘোচানোর ক্ষেত্রে তিনিই একটু সম্ভাবনা। এখান থেকে বের করে সমুদ্রে পৌঁছানোর রাস্তা অথবা অন্য রাষ্ট্রের ভূমি পেরোনোর পর সমুদ্রে পৌঁছানোর সুযোগ কেউ যদি দেখাতে পারেন, তিনি হলেন ঐ উপনিবেশবাদী শাসক জার সম্রাট। ইতোমধ্যে জার সম্রাটের উচ্ছেদ ঘটিয়ে লেনিনের বিপ্লব (১৯১৭) হয়ে গেলেও ‘সেন্ট্রাল এশিয়া হল পুরনো জারের কলোনি’- এই সম্পর্কটাই থেকে যায় কিছুটা নতুন সোভিয়েত কাঠামোতেও। যা হোক, আজো সেন্ট্রাল এশিয়ায় যা কিছু কলকারখানা তা সোভিয়েত সূত্রের এবং তার সমুদ্র দর্শনও। আর অনেক কথার এক কথা হিসেবে বলা যায়, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরে, এখনো সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচ রাষ্ট্রের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অনবরত রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন। এটা তাদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। হয়তো নিজ নিজ স্কুলগুলোতে রুশ ভাষা শেখার সুযোগ আগের মতোই তারা এখনও চালু রেখেছেন।

আর একাল? পুতিনের রাশিয়ার উদ্বেগের মূল কথা উপরে বলেছি। কিন্তু সামর্থ্য বা মুরোদ পুতিনের নেই। সেন্ট্রাল এশিয়ায় আমেরিকাসহ পশ্চিমের কোনো প্রভাব ঠেকাতে হলে আগেই ব্যাপক অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যয় ও বিপুল বিনিয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে। তা হলেই হয়ত সেন্ট্রাল এশিয়ায় পশ্চিমা প্রভাব ঠেকানো সম্ভব। এই বিবেচনা থেকেই পুতিনের সব সামর্থের মূল উৎস হল চীন। পুতিনকে সাথে নিয়ে চীন ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ তৈরি করেছিল। এটা একই সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক জোট হিসেবে হাজির হয়েছিল। তুলনায় আর অন্য সব জোটের কথা আমরা শুনি এরা মূলত সবগুলোই অর্থনৈতিক জোট। এছাড়া এই জোটের ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যে আরো সহজেই আগানোর সুযোগ এর হাতে আসে।

নাইন-ইলেভেনের (২০০১) হামলার পর আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাক হামলা সাংহাই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে প্রথম ধাক্কায় মনে হলেও পরে (২০১১) বুঝা যায়, এটা আসলে আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, নাইন-ইলেভেনের আগেই ২০০১ সালের জুন মাসে আগের ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ নিজেকে SCO, (সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন)- এই নতুন নামে ও ম্যান্ডেটে নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিয়েছিল। এই লেখায় সংক্ষেপে এরপর থেকে একে ‘সাংহাই গ্রুপ’ লিখব।

ওবামার আমেরিকার ২০১১ সালে এসে আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে এ দেশকে বিধস্ত করে ফেলে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূল কারণ ওই যুদ্ধ অনন্তকাল অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এ ছাড়াও যুদ্ধের ব্যয় বেড়েই চলেছিল। এ এক বিরাট জগাখিচুড়ি। জট পাকানো এই দশা থেকে বের হওয়ার সব উপায় আমেরিকা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদিকে যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমেরিকা অপারগ হয়ে শুধু নিজ অর্থনীতি ভেঙে ফেলা নয়, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাও ডেকে এনেছিল। এই পরিস্থিতিই SCO -এর জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়।

লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে সাংহাই গ্রুপের সদস্য সবাই আফগানিস্তানের পড়শি এবং আফগানিস্তানের সাথে তাদের সীমান্ত আছে। ফলে আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পরের পরিস্থিতিতে কারা তালেবান ও প্রো-আমেরিকান আফগান সরকারকে সহায়তা করবে, কে শান্তি স্থিতিশীলতার দিকে নেবে, এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা কারা তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার কোন রফায় পৌঁছাতে পারবে – এমন শক্তির অনুপস্থিতি ও অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, ওই অঞ্চলের সবকিছুকে গভীর সঙ্কটে হ-য-ব-র-ল করে ফেলা আমেরিকা নিজেরও স্বার্থ ছিল এখানে। কিন্তু সে কাজে তার নিজের কোনো ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতা কোথাও ছিল না।

স্বভাবত এই পরিস্থিতিতে চীনের নেতৃত্বে সাংহাই গ্রুপ দুনিয়াজুড়ে সবার কাছেই ‘একমাত্র ত্রাতা’ হয়ে হাজির হয়। কারণ আফগানিস্তানে পশ্চিমা শক্তির তুলনায় যে কারো চেয়ে চীন হল সবচেয়ে বড় গ্রহণযোগ্য শক্তি। এর মূল কারণ, আফগানিস্তানে একমাত্র চীনের হাতেই কোনো অস্ত্র নেই। ফলে অসহায় আমেরিকা প্রকাশ্যে চেয়েছে এবং স্বীকার করেছে চীন আফগানিস্তানে ভূমিকা নিক। সাংহাই গ্রুপ ভূমিকা রাখুক। অন্তত যুদ্ধে ভেঙে পড়া আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে, অবকাঠামো গড়তে।

মোটামুটি ২০১৫ সাল থেকেই চীন আফগান তালেবানদের সাথে ডায়লগে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তবে এর আগেও এবং পাশাপাশি, আফগানিস্তানে সামাজিক পুনর্বাসন, পুনর্গঠনসহ বহু অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে তৎপর হয়ে গেছিল। এ ছাড়াও আফগানিস্তানকে এখন সাংহাই গ্রুপের ‘অবজারভার সদস্য’ করে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রই এ বছর থেকে এর পূর্ণ সদস্য। ফলে সব মিলিয়ে আফগানিস্তান বুঝে গিয়েছিল আমেরিকার মতো চীনের হাতে অস্ত্র নেই, অথচ চীনের হাতে আছে পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশনের সামর্থ্য ও যোগ্যতা। আর শান্তি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যা প্রধান উপাদান, মানুষকে পুনরায় অর্থনৈতিক জীবন ও তৎপরতায় ফিরিয়ে নেয়ার বাস্তব শর্ত- বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা একমাত্র চীনের এবং সে তা দিতে অপেক্ষা করছে।  ফলে চীনা উদ্যোগ এবং তার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা – সহজেই কাজ করতে শুরু করেছিল। এখন শুধু কাজ করতে নয়, ফল দিতেও শুরু করেছে।

এটা টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটা রিপোর্ট। এখানে মূল ঘটনাটা হল চীনের তালেবান ইস্যুতে অর্জন। ঘটনাটা হচ্ছে, সদ্য শেষ হওয়া এই ঈদে তালেবান বনাম সরকার যুদ্ধে এই প্রথম উভয় পক্ষ তিন দিনের অস্ত্রবিরতি পালন করেছে। তাই খবরের শিরোনাম, “Taliban agrees to unprecedented Eid ceasefire with Afghan forces”।  ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এই প্রথম এক সত্যিকারের ঈদ অনুভব। তাঁরা এই প্রথম আত্মীয়স্বজনে মিলে ঈদ পালন করেছে। ওই রিপোর্ট লিখছে, ‘তালেবানেরা ২০০১ সালের পর এই প্রথম আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে। চিন্তাও করা যায় না এমন ঘোষণাটা আসে আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা সপ্তাহব্যাপী স্থগিত ঘোষণা করার দু’দিন পরে। [“The Taliban announced its first ceasefire in Afghanistan since the 2001 US invasion today against the country’s security forces.  The unexpected move came two days after the Afghan government’s own surprise announcement of a week-long halt to operations against the Taliban.] তবে তালেবানদের শর্ত ছিল, এই বিরতি ‘বিদেশী দখলদার’ [আমেরিকা বা তার বন্ধুদের বুঝানো হয়েছে] জন্য প্রযোজ্য হবে না।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মিডিয়া রিপোর্ট হল, পাকিস্তান ও চীনের প্রবল তৎপরতার কারণেই কেবল তালেবানেরা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। [Afghan Eid truce ‘backed by Pakistan, China’] কারণ এব্যাপারে তালেবান নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, “কেবল চীন ও পাকিস্তান গ্যারান্টার হলে তবেই আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাবো। কারণ আমরা বাকিদের (আমেরিকা) বিশ্বাস করি না”।

ডিপ্লোম্যাট মহলে এখন এমন আলোচনা উঠেছে, চীন এমন এক ক্ষমতাবান মধ্যস্থতাকারীর আস্থা অর্জন করেছে যে, চাইলে এক দিকে আফগান সরকারের ওপর চাপ খাটাতে পারে, অন্য দিকে সে কারণে চাপ খাটাতে পারে তালেবানদের ওপরেও। কেন এবং কী করে এটা সম্ভব হয়েছে? কারণ, গত ডিসেম্বর থেকে আফগান-পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চীন নিয়মিত ডায়লগ অনুষ্ঠান করে আসছে। ফলে স্বভাবতই এখন যেকোনো সময় আফগানিস্তানে অস্ত্রবিরতি ডাকা, নেগোসিয়েশনে বসানো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে চীন ঘন ঘন দেখতে পা্রবে বলে সবাই আশা করছে। নিঃসন্দেহে, এটা এক বিরাট আশার আলো।

এখন এর পাল্টা ঘটনাটা স্মরণ করা যেতে পারে। ঘটনাটা হল, গত বছরের আগস্টে ট্রাম্পও তাঁর আফগান পলিসি দিয়েছিলেন। সেখানে ভারতকে আফগানিস্তানে ব্যবসার সুবিধা নিতে ডাকা হয়েছিল আর পাকিস্তানকে তালেবানদের (হাক্কানি গ্রুপ) সহায়তার দায়ে অভিযুক্ত করে সাবধান করা হয়েছিল। সাথে আমেরিকান ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। আসল ঘটনা ছিল অন্য।

পাক-আফগান সীমান্ত চিহ্নিতকরণ নিয়ে বিতর্ক সেই ১৮৯৩ সালের আফগান যুদ্ধ-পরবর্তী “ডুরান্ড লাইন” টানা থেকে। এটা অবাস্তাবায়িত থেকে যাওয়ার মূল কারণ মূল পশতুন বা পাঠান জনগোষ্ঠিকে ভাগ করে ফেলে এই লাইন। ফলে লাইন ফেলে রেখে সীমান্ত পোস্ট বৃটিশ আমল থেকেও বৃটিশ-ভারতের [বর্তমান পাকিস্তান] ভিতরে গাড়া হয়, তাতেও সুরাহা আসে নাই।  এ ছাড়া একালের কয়েক লাখ আফগান উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে এসেছে, এখন তারা প্রায় স্থায়ী। ফেরার নাম নাই।  স্থানীয় পাকিস্তানিদের মতোই সব ব্যবসায় ওরা জড়িত। এসব খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু। এর বিতর্ক খুবই গভীর কিন্তু তালেবান ইস্যু সামনে থাকাতে এর আড়ালে তা কাজ করে থাকে।  খুব সম্ভবত আগাম পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজ প্রভাব তৈরির কথা ভেবে কিছু তৎপরতা পরিচালনা করে থাকে। তাই আফগান তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপের সাথে পাকিস্তান বিশেষ সম্পর্ক রাখে। এটাকেই ট্রাম্প প্রচার করেছেন যেন ‘পাকিস্তানের প্ররোচনাতেই তালেবানেরা তালেবান হয়েছে’- এমন প্রপাগান্ডায় শামিল হয়ে। অপর দিকে, এটাই ট্রাম্পের সাথে ভারতের নীতির মিল। ‘পাকিস্তান মানে তালেবান’- এই প্রপাগান্ডা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে মাইলেজ দেয়। ট্রাম্পের এই প্রপাগান্ডা যেন বলতে চায়, পাকিস্তানই টুইন টাওয়ারে হামলা করেছিল। পাকিস্তানই তালেবানের জনক। অথচ কঠিন বাস্তব তা হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের প্রতিক্রিয়া থেকে পাকিস্তান আমেরিকার ইচ্ছায় বাধ্য হয়ে তালেবান দায় নিয়ে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ করে গেছে, যাচ্ছে।

যা হোক, ট্রাম্পের আমেরিকার পাশাপাশি চীনা কূটনীতির অ্যাপ্রোচ লক্ষণীয়। চীন শুরু করেছে পাক-আফগান অমীমাংসিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা থেকে এবং তাদের ডায়লগ এখান থেকেই। ট্রাম্পের মত পাকিস্তানকে তালেবান বলে গালি দিয়ে, সব দায় চাপিয়ে ওরা শেষ করেনি।
এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট, গ্লোবাল এম্পায়ার বা লিডারের কিছু ভূমিকায় ইতোমধ্যেই চীন আমেরিকাকে সরিয়ে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, ক্রমশ আগিয়ে আসছে চীন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সাংহাই গ্রুপ ও তালেবানের প্রথম অস্ত্রবিরতি”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

গৌতম দাস

২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

http://wp.me/p1sCvy-2hm

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

“I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]