রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

গৌতম দাস

০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2wC

 

 

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যেভাবেই হোক, শেষ হয়েছে। সেই সাথে শেষ হয়েছে এ নিয়ে ইতি বা নেতিবাচক বিভিন্ন উচ্ছ্বাসও। এই নির্বাচনে বিদেশী মিডিয়ার নজর পড়া যথেষ্টই ছিল বলা যায়। নির্বাচনি খবর সংগ্রহ করতে এসে তাদের তৎপরতা দেখা গিয়েছিল নির্বাচনের আগে-পরে মিলিয়ে মোট প্রায় দশ দিনের মত, যা এখন আস্তে আস্তে কমে আসছে বা নেই।

নির্বাচনের আগে বা ফল প্রকাশের পরে বিদেশী মিডিয়া বিশেষ করে যারা অর্থনীতি-ফোকাসের মিডিয়া যেমন, লন্ডন ইকোনমিস্ট বা আমেরিকার ব্লমবার্গ– এদের রিপোর্ট হল মুখ্যত জিডিপি-দেখা কেন্দ্রিক। আর এদের সাফাইয়ের সরল বয়ান কাঠামোটা হল – ‘বাংলাদেশের জিডিপি ভাল মানে, বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে, অতএব হাসিনা আবার জিতবে’, অথবা ‘জিতেছে’। এ ছাড়া  আরও যারা বাংলাদেশে নির্বাচনি ইস্যুতে এসেছিলেন এমন অন্যদের মধ্যে ছিল যেমন, লন্ডনের গার্ডিয়ান, আমেরিকার ভোয়া, গ্লোবাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স, দক্ষিণ ভারতের দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয় অথবা নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম ইত্যাদি- এরা সবাই অন্য যে বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে তা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের নাগরিক অধিকারহীনতার দুর্দশা। অর্থাৎ নাগরিক অধিকারের খবর নাই, জিনিষটাই অনুপস্থিত বা গায়েব। ফলে এর অনুষঙ্গ – গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা তথা বিরোধী দল বা সরকার-বিরোধীদের গায়েবি মামলা থেকে পালিয়ে বেড়ানো বা গ্রেফতার; অথবা কোনমতে নির্বাচনে থাকলেও  সমান সুযোগ না পাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ এরাই মূলত রাজনৈতিক দিক মুখ্য করে লেখা রিপোর্ট বা আসল রিপোর্ট করেছে।  যদিও এই দ্বিতীয় তালিকার মিডিয়াগুলোও তাদের দ্বিতীয় পয়েন্ট হিসাবে “ভাল জিডিপি” বিষয়টাকে সরকারের পুনর্বার জিতবার ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হিসাবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ কমবেশি সব বিদেশী মিডিয়া যে তর্কের চক্কর তৈরি করে রিপোর্ট লিখেছে তা পশ্চিমের ভাষায় বললে – ‘ডেমোক্রেসি বনাম ডেভেলপমেন্ট’- এর নির্বাচন। অর্থাৎ রাষ্ট্রে ‘নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার’ [Political Right] থাকাটা জরুরি নাকি ‘উন্নয়ন’ হলেই চলে – এভাবে তর্কটাকে হাজির করে এবার দাবি করা যে ‘উন্নয়নের’ কারণে হাসিনার জেতা উচিত বা জিতবে। এই হলো বয়ান।

খুবই চাতুরি তর্ক সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেক রূপে এই তর্কের হাজিরা অনেক পুরনো, সেই পাকিস্তান আমলের। আইয়ুব খানের শাসনের দশককে (১৯৫৮-৬৮) প্রশংসা আর সাফাই যোগান দিতে তখন যা বলা হত ওর সার কথা ছিল – পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে ঠিকমত কখনই ওর একটা কনস্টিটিউশন রচনা করতে ক্ষমতাসীনরা সক্ষমতা দেখাতে না পারলেও সেকালের শাসক আইয়ুব খান প্রচুর ‘উন্নয়ন’ করেছিলেন। সুতরাং আইয়ুবের শাসন জায়েজ। আর তাই ঢং করে বলা হত “আয়ুবি ডেভেলবমেন্ট ডিকেড”। পুরনো সেই তর্কটাই এবার আবার বাংলাদেশে ভেসে উঠেছে। কিন্তু কবে থেকে? অনেকে আবার সেটা খেয়াল করেনিই হয়ত।

ব্যাপারটা ঘটেছিল গত ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকার গড়ার পরে। আসলে সে সময় হাসিনার ওই “বিশেষ নির্বাচন ও সরকারের” পক্ষে একটা সাফাই যোগাড় ও খাড়া করে দেয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা দেয়ালে চিকা মারা দেখেছিলাম যে “হাসিনা হলেন বাংলাদেশের মাহাথির”। মাহাথির-এর নাম নেয়া এজন্য যে,যারা উন্নয়নের আড়ালে সব রাজনৈতিক দুর্বলতা ও খামতি ঢেকে ফেলতে দক্ষ তাঁরা বলেন মালয়েশিয়ার “উন্নয়নের” প্রতীক মাহাথির, তবে তাঁরা সাবধান থাকেন যাতে তা নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের নেতা বলে কেউ ভুলে না বুঝে। তবে বাংলাদেশে এবারের নির্বাচন শুরুর এক বছর আগে থেকেই উন্নয়নের স্লোগান দিয়েই হাসিনা আসন্ন ভোট বা পাবলিক মোকাবেলা বা তাঁর সমালোচনা মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।

সব জিনিসের বিকল্প হয় না, আমরা করি না। একটার বদলে অন্য একটা হলেও চলে এই অর্থে বিকল্প খুঁজি না বা সন্তুষ্ট হই না। মানুষের জীবন চাহিদায় এমন বহু কিছু বিষয় আছে। এ রকম বিষয়টা বুঝাতে ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে ‘নন-নিগোশিয়েবল’(non-negotiable)। মানুষের জীবনের যেসব বিষয়ের বিকল্প হয় না বলে মনে করা হয়, আমরা বিকল্প খুঁজিই না, সেগুলোই আসলে নন-নিগোশিয়েবল । যেমন ‘মায়ের ইজ্জত’ নিয়ে নিগোশিয়েশন চলে না, তাই এটা নন- নিগোশিয়েবল। ঠিক তেমন কোন রাষ্ট্রে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার বা মৌলিক মানবিক অধিকার একেবারেই  নন-নেগোশিয়েবল। কথাটার বইয়ের ভাষা থুয়ে, ব্যাপারটা আর ভেঙে বলা যাক। যেমন বলা হল – রাষ্ট্র আপনাকে পেট পুরে খেতে দেবে, চাকরি, আরামসহ আরো বহু কিছু দেবে এবং একদম নিশ্চয়তার সাথে। কিন্তু আপনি বেমালুম গুম, খুন হয়ে যেতে পারেন সে সম্ভাবনাও সাথে আছে; রাষ্ট্রের দিক থেকে এসব থেকে কোন সুরক্ষার নিশ্চয়তা নেই, প্রতিশ্রুতি নেই। এখন আপনি কি রাজি আছেন? এটাই উন্নয়ন দিয়ে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করা বা ভাবার প্রশ্ন। আসলে রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করে ফেলা যায় মনে করা আর এর বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নতিকে মুখ্য ও বিকল্প কাম্য মনে করা – এটাই ‘উন্নয়নের রাজনীতির’ ভাবনা। দুনিয়ার সব স্বৈর শাসকের কমন লক্ষণ এটা।

বস্তুত নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার নন-নেগোশিয়েবল। আমরা উন্নয়ন খেয়ে এর বিনিময়ে গুম-খুন হয়ে যেতে রাজি হতেই পারি না।  তাই এটা নেগোশিয়েবল বলে মনে করার সোজা মানে হল, আসলে আপনার রাষ্ট্রটাই নাই। কারণ রাষ্ট্র- এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য ও কাজ হল নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়া, বাস্তবে এই সুরক্ষা দেয়া, প্রতিরক্ষা বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র যদি তা না করতে পারে, না দেয় তাহলে সে রাষ্ট্র অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এর বদলে রাষ্ট্র হয়ে যায় তখন বড়জোর একটা পৌরসভা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনই পৌরসভা নয়। রাষ্ট্রের কাজ ও ভুমিকা – পানি বিদ্যুত ড্রেনেজ রাস্তা ইত্যাদির মত উন্নয়ন দেয়া নয়। সেকাজের জন্য একটা পৌরসভা বা মিউনিসিপাল্টিই যথেষ্ট। রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা, ইনসাফ দেয়া, সিরক্ষা এগুলোর নিশ্চিতের জন্যই মূলত আমাদের রাষ্ট্রগঠন নির্মাণ দরকার। তাই উন্নয়ন এর কথা বলা মানেই রাষ্ট্রকে পৌরসভায় নামিয়ে আনা। অথচ রাষ্ট্র [State] কোনভাবেই পৌরসভা নয়।

কাজেই কোনো দেশের নির্বাচনের আসরে এসে বিদেশী বা দেশী মিডিয়ায় সরকারের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার রেকর্ডের আলোচনাকে পেছনে ফেলা বা আড়াল করে ফেলাটা খুবই খারাপ ধরণের চাতু্রি। জেনে বা না জেনে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল বিষয় করে ফেলা – বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন বা জিডিপির ফিরিস্তি তোলার মিডিয়া রিপোর্ট – এটা সেই বিরাট চাতুরী। তারা অর্থনীতির মিডিয়ার লোক তাই রাজনীতি বোঝে না – এমন বুঝে নাই ভাব ধরে এরা পিঠে ছুরি মারে।
অথবা এই চাতুরী যেন উট আর বিড়ালের গল্প। যেমন একবার এক হাটে এক উট বিক্রেতা উটের দাম চাচ্ছে মাত্র এক টাকা। কিন্তু শর্ত হল ওই উটের সাথে একটা বিড়াল নিতেই হবে; যে বিড়ালের দাম পাঁচ লাখ টাকা।

এই ব্যাপারগুলো বিদেশী প্রভাবশালী মিডিয়াতেই বেশি হচ্ছে ও হয়ে থাকে। এর পেছনের মূল কারণ, এই মিডিয়াগুলো মূলত আমাদের মত দেশে দেখতে আসে বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের চোখ – এমন মিডিয়া হিসাবে। বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের পয়সাতেই তাদের আয় ও জীবিকা। তাই উন্নয়ন ও জিডিপি দিয়ে তাদের একটা নির্বাচন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার ঝোঁক দেখা যায়।
বাংলাদেশে নির্বাচন উপলক্ষে প্রকাশিত যাদের রিপোর্ট আমাদের নজরে এসেছে এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে অনেকে ব্লমবার্গকে (Bloomberg) মনে করেন। কারণ এই মিডিয়াটা “ওয়াল স্ট্রিট” ধরণের বিনিয়োগ কোম্পানীর সরাসরি মালিকানা বা বিনিয়োগ আছে। এবারের বাংলাদেশ নির্বাচনের আগে, তাদের রিপোর্টের সার কথাকে শুরুতে দেয়া দুই বুলেট বাক্য হল – ১. দ্রুত বেড়ে চলা অর্থনীতি হাসিনাকে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আনতে পারে। ২. বিরোধী নেতা জেলে বলে ভায়োলেন্স নতুন করে বাড়তে পারার শঙ্কা।

  • Fast-growing economy may propel Hasina to third term in power
  • Fears of fresh violence grow as opposition leaders jailed

অর্থাৎ এখানে সরাসরিই বলা হচ্ছে, রাজনীতিক অধিকারের দশা পরিস্থিতি নয়, জিডিপিই নির্বাচনে বিজয়ের একমাত্র নির্ণায়ক – এই আগাম অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে আবার বলে রাখা ভালো যে, ব্লমবার্গ- এই মিডিয়া গ্রুপ না হলেও অন্য অনেকে আবার অনেক সময় ‘পেজ-বিক্রি’ করার কারণেও এমন রিপোর্ট করে থাকে।

কিন্তু তবুও জিডিপিভিত্তিক আগাম অনুমানের এমন রিপোর্ট – যেটা দাবি করছে যে বাংলাদেশের জিডিপি ভাল এর মানে এটা হাসিনা মেলা উন্নয়ন করেছে তার প্রমাণ – একথা কী গ্রহণযোগ্য? সম্ভবত না।  এটাও যথেষ্ট সাফাই নয় বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ জিডিপি বাড়লেই তা সরকারের সাফল্য কি না, এর সপক্ষে ঐ রিপোর্টে সরাসরি কোনো সাফাই নাই। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতি    খুবই ব্যতিক্রমী ধরণের। তাই জিডিপি বাড়া মানেই তা সরকারের প্রত্যক্ষ সাফল্য এটা নাও হতে পারে। বাংলাদেশ  বিশেষ বৈশিষ্ট্যের তাই গতানুগতিক চোখে কেবল জিডিপির বাড়া-কমা দিয়ে সাফল্য মাপতে যাওয়া, হদিস করা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন, দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ১৭০ দিন হরতাল থাকলেও জিডিপিতে এর প্রভাব নেই। জিডিপি একই রকম থেকেছে।

যদিও এর সম্ভাব্য কারণ কী, এ নিয়ে কোনো ফরমাল স্টাডি নাই। তবুও এর সম্ভাব্য কারণ বলে যা অনুমান করা হয় সেই ফ্যাক্টরটা হল – রেমিট্যান্স। খুব কম দেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স এমন ফ্যাক্টর হয়ে থাকে। তাই এটা আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ বৈশিষ্ট বা ব্যতিক্রম। বিদেশে গরিব শ্রমিকের শ্রম বেচা অর্থ – বিদেশী মুদ্রা নিয়মিত আসে। এটা বলাই বাহুল্য, যে দেশের হরতালের সাথে এই আয়ের কম-বেশি হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই। এ ছাড়া আরেক গুরুত্বপর্ণ দিক হল, ৯০ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার আয় আসে গার্মেন্টস থেকে। এখন এর থেকে কাঁচামাল, মেশিনারিসহ ইত্যাদি্র বৈদেশিক মূল্য পরিশোধে বাদ দেয়ার পর যা নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় থাকে; দেখা যায় প্রতি বছর এর পরিমাণ যদি ১৪ বিলিয়ন ডলার হয়, তবে মোট রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও দেখা যায় আরও ১৪ বিলিয়ন ডলার, মানে প্রায় এর সমান। অর্থাৎ রেমিটেন্স আর রপ্তানি আয় প্রায় কাছাকাছি।

এখন যদি রপ্তানি আয়ের জন্য সরকারকে ক্রেডিট দেই তাহলে ঠিক আরও সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আয়ের অবদানের জন্য তো কাউকে ক্রেডিট দিতে হয়! অথচ ফ্যাক্টস হল,  রেমিট্যান্স আয় লাভের সাথে সরকারের পারফরমেন্স খুব কিছু সম্পর্ক নাই। মূলত এ কারণেই আমাদের অর্থনীতিকে বলা হয় রুটিন অর্থনীতি, মানে বিশেষ সরকারের খুবই বিশেষ ভূমিকা এখানে থাকে না। বিদেশি সাংবাদিকেরা এসব দিক আমল না করে যেকোনো দেশের মত শুধু জিডিপি দেখে ধারণা বা অর্থনীতি বুঝতে চাওয়া তাৎপর্যহীন। তবে কোন মিডিয়া রিপোর্ট যদি জিডিপি ফিগারকে দেখিয়ে তা সরকারের প্রত্যক্ষ পারফরমেন্স বলে দাবি করতেই চায়, সে ক্ষেত্রে তাকে সবার আগে – সম্পর্ক বা প্রমাণ দেখাতে হবে যে সরকারের অমুক বিশেষ নীতি-পলিসি-পদক্ষেপের কারণে জিডিপি বেড়েছে। এমন দেখানোর আগে কোন দাবি হবে অমূলক ভিত্তিহীন। আমরা কোথাও এমন প্রমাণ এখনও দেখি নাই। তাই জিডিপি বৃদ্ধিকে সরকারের পারফরমেন্স এর সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করা ভিত্তিহীন।

তাই সার কথাটা দাড়াচ্ছে, জিডিপি বা উন্নয়নের সাফাই দিয়ে বিদেশি মিডিয়ার নির্বাচনী রিপোর্ট- এগুলো সারবত্তাহীন প্রপাগান্ডা; কোন ভিত্তি প্রতিষ্ঠা আগে না করে করা উড়া দাবি মাত্র।

সবশেষঃ
এক বিরাট স্ববিরোধী বিষয় আমরা দেখেছি লন্ডন ইকোনমিস্ট গ্রুপের ইকোনমিস্ট ইকোনমিক গ্রুপের ফলাফল প্রেডিকশন। বোঝাই যাচ্ছিল এটা পেজ বিক্রি ধরণের কান্ড। তবে নির্বাচনের পরে সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার রিপোর্টই এর সাক্ষ্য বা প্রমাণ। এই রিপোর্টে কি ধরণের নির্বাচন হয়েছে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সারকথায়, ইকোনমিস্ট গ্রুপের এক মিডিয়া অপর মিডিয়ার বক্তব্যকে নাকচ করেছে, স্ববিরোধী ফাইন্ডিং হাজির করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৫ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিদেশী মিডিয়ার নির্বাচনী কাভারেজ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

কোটা বনাম নির্বাচনী ব্রান্ডিং – মুক্তিযুদ্ধ

কোটা বনাম নির্বাচনী ব্রান্ডিং – মুক্তিযুদ্ধ

গৌতম দাস

২৬ এপ্রিল ২০১৮, বৃহষ্পতিবার, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2rq

 

 

এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন মনে হচ্ছে শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছরই সরকারি বিশেষত; বিসিএস চাকরিতে চেপে বসা কোটা, সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন আমরা হতে দেখেছি। সেটা আরও বেশি করে ঘটেছে সম্ভবত সরকারি চাকরিতে বেতন কাঠামো প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলার পর থেকে। অর্থাৎ সরকারি বিসিএস চাকরির প্রতি গ্রাজুয়েটদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ারই বিশেষ প্রকাশ হিসেবে আমরা দেখছি। প্রতি বছরের পাস করে বের হওয়া গ্রাজুয়েটদের মধ্যে ওপরের ভালো ফল করা চাকরিপ্রার্থীদের দৃষ্টিতে বিসিএস চাকরি লোভনীয় হয়ে উঠেছে। সার করে কথাটাকে বলা যায়, গ্রাজুয়েট চাকরির বাজারে বিসিএস প্রথম পছন্দের চাকরি হয়ে উঠেছে তখন থেকে। কিন্তু  এখানে চাকরিপ্রার্থী হতে এসে এবার তারা প্রধান বাধা হিসেবে আবিষ্কার করছে এই কোটা পদ্ধতিকে। কারণ এখানে ৫৬ শতাংশ আসন পূরণ করা হয়ে থাকে নানা ধরনের কোটার ভিত্তিতে। আর এই ৫৬ শতাংশের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হল ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এর পর বাকি মেধার আসন পূরণ হওয়ার প্রশ্ন।

স্বভাবতই শিক্ষার্থীদের নিজের ভেতর বঞ্চনার উপলব্দি এখান থেকেই। তবে বঞ্চনার উপলব্দির তীব্রতাও বেশ যথেষ্ট। সম্ভবত, এর মূল কারণ মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে ভুয়াপ্রার্থীদের অপব্যবহার। মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখা ন্যায্য কী না এর চেয়েও বড় আপত্তির বিষট হল ভুয়া সনদ সার্টিফিকেটের ছড়াছড়ি। প্রশাসনের সর্বোচ্চপদ সচিব থেকে শুরু করে একটি সাধারণ সরকারি চাকরিতেও ভুয়ামুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটের জয়জয়কার। আর সেই সাথে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স কত হবে তা নিয়ে সরকারের প্রায় প্রতি বছর একে  নামাতে থাকা। অর্থাৎ এই জুয়াচুরিতে সরকারের প্রচ্ছন্ন সায় দেয়া। এসবেরই নীট ফলাফল হল, মুক্তিযোদ্ধা এই সেন্টিমেন্ট বা আবেগ নিজ নৈতিকতাকে নিজেই ঢিলা করে ফেলেছে।

দু-একদিন পরপর মিডিয়াতে কোনো না কোনো এক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া কাণ্ডকারখানা ছাপা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা যেন এক ব্যাকডোর, ফাঁকি দিয়ে চাকরিতে ঢুকে পড়ার এক সহজ রাস্তা হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের বঞ্চনার উপলব্দির তীব্রতা এখন থেকেই। তবে আসল বটম অব দা ফ্যাক্ট হল – মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধ তা যতই আবেগের জিনিষ হোক না কেন; এর ছত্রছায়ায় বা আড়ালে আমরা কেউ অন্যায্যকে ন্যায্য বলে বা অন্যায়কে ন্যায় বলে চালাতে চাইলে তা চলবে না।  এতে তৈরি হওয়া অস্বস্তিটা শুরুর দিকে পাবলিক হয়তো প্রকাশ্যে আনবেন না আনেন না, কিন্তু একটা পর্যায়ে যখন এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসবে তখন এটা বিস্ফোরিত হয়ে উঠতে পারে। যেমন অনেক খোদ মুক্তিযোদ্ধা বা কমিউনিস্ট নেতাই আবেগাক্রান্ত না হয়ে গোড়ার প্রশ্ন তুলছেন। দেখা যাচ্ছে তারা যুক্তি তুলছেন যে কোনো মুক্তিযোদ্ধার গুণ, আদর্শ বা ব্যক্তিত্ব এগুলো কি জেনিটিক্যালি মানে, বংশ পরম্পরায় রক্তে বাহিত হয়ে বয়ে চলে; এমন জিনিষ? কথা তো সত্যি। মুক্তিযোদ্ধা গুণ কোন রক্তে প্রবাহিত বংশ স্বভাব তা  তো  নয়। তাহলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পেরিয়ে নাতিপুতি পর্যন্ত কোটার আওতায় থাকবে এর ন্যায্যতা কই? আর যদি প্রশ্ন হয় কোন মুক্তিযোদ্ধার আর্থিক অস্বচ্ছলতার; তবে এর জন্য বিসিএসের চাকরি ছাড়াও আরও বহু পথে সাহায্য করার রাস্তা আছে। এছাড়া প্রশাসনে মেধাবী প্রার্থীদের আকর্ষণ করার খুবই দরকার। এতদিন সেটা করা যায়নি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বেসরকারি চাকরির সাথে প্রতিযোগিতামূলক ছিল না বলে।

এ দিকে এখন কোটাটাই এক বিরাট সমস্যা হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য। তাঁর ক্ষমতার পুরাটাই গত ১০ বছর ধরে তার ব্রান্ডিং ছিল ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ইস্যু। কিন্তু এরচেয়েও বড় প্রসঙ্গ হলো আগামী সম্ভাব্য এ বছরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচনী ইস্যু তিনি ঠিক করেছেন ‘উন্নয়ন’ আর এই ‘মুক্তিযুদ্ধ’কেই। শিক্ষার্থীদের এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার অনেক আগেই প্রধানমন্ত্রী ‘মুক্তিযুদ্ধকে’ তার নির্বাচনী ব্রান্ডিং ঠিক করে ফেলেছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে এর সমস্যার দিকটি যথেষ্ট মনোযোগে খেয়াল করেননি তিনি। ফলে এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে পরে তিনি শিক্ষার্থীদেরকে তার নির্বাচনী ব্রান্ডিং নিয়ে আপত্তি তুলতে হুঁশিয়ার করার প্রয়োজন অনুভব করেন। হয়তো ভেবেছিলেন, শিক্ষার্থীরা তার দৃঢ়তা দেখলে থেমে যাবে। তাই গত ২১ মার্চ পটিয়ার জনসভায় দৃঢ় ভাবে জানিয়ে দেন যে “মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে”। দেখুন মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে: প্রধানমন্ত্রী (প্রথম আলো)। তিনি যুক্তি তুলে বলেন যে “মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, এ কথাটা ভুললে চলবে না। কাজেই তাদেরকে আমাদের সম্মান দিতেই হবে। তাদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, পুতি পর্যন্ত যাতে চাকরি পায়, সে জন্য কোটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোটা যদি পূরণ না হয়, তাহলে শূন্য পদে সাধারণ চাকরিপ্রার্থী মেধাবীদের নিয়োগ দিতে কোটার বিষয়টি শিথিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, যদি মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন না করতেন, তাহলে কেউ আমরা কোনো চাকরি পেতাম না”।

অর্থাৎ, তিনি কোটা সংস্কারের দাবিকারীদের জবাব দিলেন, যে উনি নিজের ব্রান্ডিং – “মুক্তিযুদ্ধ” থেকে সরতে পারবেন না। কারণ, এটা চলতি নির্বাচনী বছরে তার নির্বাচনী ব্রান্ডিং। কিন্তু তাতে ফল হল উল্টা। শিক্ষার্থীরা বুঝল তাদের এবার আরও শক্ত সংগঠিতভাবে আন্দোলন করতে হবে। আসলে এত বছর কোটা  সংস্কার ইস্যুতে আন্দোলন হয়েছে কিন্তু সেটাকে তেমন অ্যাড্রেস না করেই প্রধানমন্ত্রী ইস্যুটাকে ভালো ম্যানেজ করতে পেরেছিলেন। এবার অ্যাড্রেস করতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেছেন। তবে এবার তা না করে তিনি আদৌ সামনে যেতে পারতেন কি না সেটাও এক প্রশ্ন অবশ্য। তবে আমাদের যেন চোখ না এড়ায় যে, প্রধানমন্ত্রীর মূল সমস্যা তার অন্যতম নির্বাচনী ব্রান্ডিং ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এটা মারা পড়ল না বেঁচে উঠল তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো আবেদন নেই। সে আবেদন তৈরি করতে প্রধানমন্ত্রী পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। সেখান থেকেই সব সমস্যার শুরু। অবশ্য এমন হবারই কথা সব সময় ছিল। কারণ, অতি-ব্যবহারে আর সবকিছুতে মুক্তিযুদ্ধ বিক্রি করতে করতে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ শক্তিহীন, ধারহীন, আবেদনহীন আর কিছু দলবাজ মাফিয়ার আপন ভাগ্যগড়ার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটা কতদূর উঠেছে এর রেকর্ড হল – কয়েকজন সচিবের মত পদমর্যাদার লোকের ভুয়া সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চাকরির এক্সটেনশন নেয়া থেকে বুঝা যায়। ফলে এসবের সারকথা হল – প্রধানমন্ত্রী আসলে সবশেষে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের কাছে এখানে হেরে গেছেন।

যদিও ১১ এপ্রিল সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আবার খুবই কৌশলে সেই হার স্বীকার করেছেন। ‘কোটাই রাখব না’ ধরনের জিদের ভাষায় তিনি তা করেছেন। তবে এখনও নিজ ঘোষণার স্বপক্ষে কোনো গেজেট প্রকাশ করেননি। অথবা জনপ্রশাসন দফতরকে কোনো নির্দেশনাও দেননি। বরং ২৪ এপ্রিল অন্তত তার দুই মন্ত্রী পাল্টা সমাবেশের আয়োজন করার কথা বলেছেন। একজন (মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী) ১৮ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় বলছেন, কোটা বাতিলের ঘোষণায় ‘মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে’। আর একজন, নৌপরিবহন মন্ত্রী ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম সমন্বয় পরিষদ’ নামের সংগঠন থেকে ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন যার সার কথা- এবার তাদের কথা শুনতে হবে। তিনি নিজেই ১৫ এপ্রিল বলছেন, “যেসব ছাত্র জামায়াত-শিবির, রাজাকারদের সন্তান, তাদের কি চাকরি দেয়া উচিত?”  মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে চাকরি দেয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “স্বাধীনতার বিপক্ষের মেধাকে চাকরি দেয়া যাবে না” (বাংলা ট্রিবিউন)।

অর্থাৎ, এককথায় বললে, কোটা ইস্যু বনাম নির্বাচনী ব্র্যান্ডিং ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এই দুইয়ের লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রীর হার হয়েছে। যদিও হারটা তিনি কীভাবে মানবেন মনে হচ্ছে তা  নিয়ে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে।   তিনি হয়তো তা নানা কৌশলে অস্বীকার করে এখন ধামাচাপা দেয়ার পথ ধরতে পারেন। দুই মন্ত্রীর ততপরতা তেমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাতে এভাবে তিনি ইস্যুটাকে আরও জীবন্ত করে জাগিয়ে তুলবেন, আর এতে তুলনামূলক এই ছোট হার তাকে বড় হারের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। এখনো পর্যন্ত কোটা ইস্যুটা ঠিক তার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে তেমন নয়।  তবে তার নতুন সব কৌশলই তার ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে থাকবে।

একটি কথা আমরা প্রায়ই শুনি “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ বা বিপক্ষ শক্তি”। এটা দিয়ে অনেক কিছু বুঝাতে চায় প্রগতিবাদীরা। যা বুঝানো যায় না তাও। অনেকে পত্রিকায় মতামত-কলামও লিখে থাকেন, “রাজাকার আলবদরের সন্তানদের জন্যে আইন করতে হবে”, এমন শিরোনামে। অথবা মন্ত্রী শাজাহান খান যেমন দাবি তুলছেন, “স্বাধীনতার বিপক্ষের মেধাকে চাকরি দেয়া যাবে না” অথবা “জামায়াত-শিবির-রাজাকার সন্তানদের চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ করতে হবে”। এসব বক্তব্যগুলো কি আগাম অনুমান ধরে নিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সে প্রসঙ্গের কিছু কথা।

দুনিয়ার সব রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা (বা ধর্মীয় বিচারব্যবস্থাও) কোনো অপরাধীর অপরাধের জন্য তার সন্তানকেও কখনও অভিযুক্ত করেনি। কখনও করে না, করার সুযোগ রাখেনি। অনেক ধর্মে চোরের চুরির পয়সায় সংসার চালানোতে চোরের স্ত্রী-সন্তানেরা ওই চুরির আয় ভোগ করলেও তারা “চুরির দায়মুক্ত” বলে রায় দিয়ে রেখেছে। আমাদের কনস্টিটিউশনও এই নীতি অনুসরণ করেছে, এর বাইরের নয়। কিন্তু তবু আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তিরা’ এটা সুবিধাভোগী এক কোটারি গোষ্ঠী, যাদের সময় নেই এদিকগুলো ভেবে দেখার। এরা সারা দুনিয়ার এই নীতিগত দিক নিয়ে পড়াশুনা বা জানার আগ্রহ রাখেন না। বরং সেন্টিমেন্টাল উস্কানিতে নীতিগত দিকটা আড়ালে রাখতে চান। আর এতে ঘিন ঘিনে ঘৃণা ছড়ায় কেবল। এরা ‘জামায়াত-শিবির-রাজাকার’, এদের অপরাধের দায়ভার সন্তানদের ওপর চড়াতে খুবই ব্যাকুল। এরা অপরাধকে অপরাধ হিসাবে দেখতে রাজি না বরং অপরাধীর “রক্তের দোষ” থাকে, “অপরাধীরা দুষিত” এমন ধরণের বর্ণবাদী রেসিজম এর বয়ান খাড়া করতে আগ্রহী। রক্তের দোষ দেখতে পাওয়া এটাই হিটলারি রেসিজম। তবে নিজ কোটারি স্বার্থে টনটনে হয়ে এই রেসিজম ব্যবহার করে। কেবল রগেরগে ঘৃণার জোশে এরা নিজের কোটারি স্বার্থের পক্ষে নানা সময় নানা দাবি তুলে।

এদের বক্তব্যগুলোর পেছনের আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হল, অপরাধীর অপরাধ এই দোষটা জেনিটিক্যালি বংশগতভাবে রক্তে প্রভাবিত হয়। আচ্ছা ধরা যাক এটা যদি তাই হত তাহলে এর মানে কী দাড়ায়? তবে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ফৌজদারি আদালতে বিচারে যারা অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন তাদের সন্তান-সন্ততিদের সবাইকেই তো শাস্তির আওতায় আনতে হয়। এতে এমন লোক যার বংশের কেউ অপরাধ করেনি ফলে সে শাস্তিভোগের বাইরে থাকবে এমন কাউকেই আর সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা এই দাবি জানাচ্ছে এদের সবাইও নিজ বংশের কারও না কারও অপরাধের দায়ের বাইরে থাকবে তা কে নিশ্চিত করতে পারে? এদিকটা কি তারা ভেবেছেন? রেসিজম আমাদের কোথায় নিয়ে যায়, কীভাবে অন্ধ করে দেয়!

সবশেষে, কোটা নিয়ে যেকোনো আধুনিক রাষ্ট্রের মূলনীতি কী, তা নিয়ে দু’টো কথা। প্রথমত, যেই রাষ্ট্র তার নাগরিক নির্বিশেষে মানে – নাগরিকের ধর্ম পরিচয়, গায়ের রঙ, পাহাড়ি-সমতলি, ভুগোল ইত্যাদি নির্বিশেষে  সব বিভেদ চিহ্নের উর্ধে সমান গণ্য না করে,  এই সাম্যতার নীতিতে গড়ে না তুলে – সেটা কোনো রাষ্ট্রই নয়। তাতে সেটা যেকোনো (কমিউনিস্ট, ইসলামিস্ট ইত্যাদি) আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রই হোক না কেন! জনস্বার্থের রাষ্ট্র গড়তে গেলে সাম্যের এই নীতি আমরা মানতে বাধ্য। একইভাবে কোনো রাষ্ট্র এমন আইন করতে পারে না যা সবার ওপর সমান প্রযোজ্য হবে না। উল্টা করে বললে যা সবার ওপর প্রযোজ্য নয় তা কোন আইনই নয়। অর্থাৎ, আইনকে মুখ দেখে কারও কারও উপর অপ্রযোজ্য করে রাখা যাবে না। এ ছাড়া নাগরিক-ভেদে কোনো কিছুতেই রাষ্ট্র কোন বৈষম্য করতে পারে না। এসব হল রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠনের একেবারে আদি কিছু মৌলিক নীতি। কিন্তু নীতি না মানলে কী হবে? প্রথমত, এতে নাগরিক সাম্যের নীতি লঙ্ঘন করা হল। আর ওই রাষ্ট্রের উচ্চ আদালতকে স্বত্ব ক্ষমতা দেয়া থাকে, যে ‘সাম্যের নীতি লঙ্ঘন’ করে কোন আইন প্রণীত হলে সেই আইন বাতিল বলে ঘোষণা করবে। আমাদের রাষ্ট্রের মূল তিন নীতির একটি হল এই ‘নাগরিক সাম্য’; যেটা কোনো রাষ্ট্রকে চিনবার, এটা কেমন রাষ্ট্র এটা বুঝবার এক মৌলিক চিহ্ন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গৌরব্বোজ্জ্বল মুল্যবোধ হল এই “নাগরিক সাম্য” প্রতিষ্ঠাকে নীতি হিসাবে আকড়ে ধরা, মূল নীতি হিসাবে আর করণীয় বলে ঘোষণা করা। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে যদি মনে রাখে তবে এই “নাগরিক সাম্য” এই মূলনীতির জন্যই আর এর প্রতিষ্ঠার জন্যই মনে রাখবে। কোটা বা কোন বৈষয়িক সুবিধার লোভ দেখিয়ে মানুষকে “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে” রাখা যাবে না। তাহলে এখন আসি, নাগরিক সাম্যের নীতি আকড়ে ধরলে এসব রাষ্ট্রে আবার কোটা পদ্ধতি চালু করা যাবে কী করে?

কারণ, কোটা মানে তো কাউকে অন্যের ওপরে বিশেষ সুবিধা দেয়া, মানে বৈষম্য করা! এ কারণে এক্ষেত্রে বাড়তি একটি যুক্তি দেয়া হয়ে থাকে এবং বলা থাকতেই হয় যে এটা সাময়িক। সেই যুক্তির সার কথাটা হল,  কনস্টিটিউশন চালুর আগে থেকেই নিজ সমাজের বিকাশ অসম ছিল, এই অসম বিকশিত হওয়াতে যে বৈষম্য আগেই তৈরি হয়ে আছে কেবল সেগুলোকে সবার আগে এক সাম্যের জায়গায় আনা প্রয়োজন। কেবল এমন এমন ক্ষেত্রে এসব কোনো ইস্যু থাকলেই তখন কেবল কোটা আনা যাবে এবং অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট সময় পরে কোটা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই কাজকে affirmative action বলা হয় এবং কোটা চালুর সময়ই এটা কতদিন থাকবে সেই সময় উল্লেখ রাখতে হয়। অর্থাৎ, নাগরিক সাম্যের মূলনীতি লঙ্ঘন না করেই কেবল কোটা নামে এক সাময়িক ব্যবস্থা চালু করা যায়।

কিন্তু মূলকথা মনে রাখতে হবে, সমাজের অসম বিকাশ আগেই যা তৈরি হয়ে আছে যেমন, নারীরা সামাজিক সুবিধায় আগে থেকেই হয়ে থাকা অসাম্যের কারণে পুরুষের চেয়ে তারা পিছিয়ে আছে। অথবা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের এলাকায় পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক অবকাঠামো না থাকায় তারা বাঙালি জনগোষ্ঠীর চেয়ে পিছিয়ে আছে। তাই কেবল এসব ক্ষেত্রে তাদেরকে সাম্যে না আনা পর্যন্ত একটা কোটা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে বা যেতে পারে। কিন্তু এই বিচারে মুক্তিযোদ্ধা বলে কোটা করার সুযোগই নেই। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে কেন এই কোটা থাকবে এর সাফাই বা ন্যায্যতা হাজির করা ছাড়াই এটা চলে আসছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা কোন ‘সামাজিক অসাম্যকে’ সমান করতে affirmative action তা আমরা এখনো জানি না। যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখতে চান তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। তবে যুক্তি না পেলেও, মুক্তিযুদ্ধ এই আবেগের বিরুদ্ধে যাওয়া এড়াতে আমরা খুলে কিছু বলি না। আর এরই সুযোগ নিতে চাচ্ছে কথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি’।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কোটা বনাম নির্বাচনী ব্রান্ডিং  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]