নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2sO

Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

[Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

[New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

গৌতম দাস
১২ এপ্রিল ২০১৮,  বৃহস্পতিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rh

 

ভারতকে নেপালে পানিবিদ্যুতের ড্যাম নির্মাণ প্রকল্পের কাজ না দিয়ে তা চীনকে দিলে ভারত ওই উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজেও কিনবে না আর নেপালের বাইরে কাউকে বিক্রি করতেও দেবে না। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি গত সপ্তাহে (৬-৮ এপ্রিল) দু’দিনের ভারত সফর করে গেলেন।

গত ডিসেম্বর ২০১৭ সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পরে গত মাসের ১১ মার্চ নেপালের প্রথম নির্বাচিত সংসদে ৮৮ শতাংশ আস্থা ভোট পাওয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি। তার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট (UML) এবং অপর কমিউনিস্ট মাওবাদী দলের সাথে মিলে জোট করে নির্বাচনে লড়েছিল তাঁরা এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতেছিল। আর নির্বাচন সম্পন্ন হবাব পর ফলাফলে দেখা যায় বড় দুই মাধেসি আঞ্চলিক দলই কেবল মূলত মাধেসি অঞ্চলের আসনগুলো লাভ করে। ফলে  এদেরকেও  ঐ কমিউনিষ্ট জোটে সাথে নেওয়াতে সংসদের মোট ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী কে পি অলির দল সরকার গঠন করেছিল গত মাসে। আর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে এক যৌথ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে দুই কমিউনিস্ট পার্টি, তারা এবার এক পার্টি হওয়ার পথে আগাচ্ছে।

ভারতের বাধা উপেক্ষা করে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের মাধ্যমে নেপালে নতুন সংবিধানের কার্যকারিতা শুরু হয়েছিল। পরে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নেপালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সাল থেকেই নেপালে ভারতের প্রভাব খর্ব হওয়ার মতো একের পর এক আনুষ্ঠানিক পরাজয় শুরু হয়েছে। যার সর্বশেষ বড় পরাজয় ছিল সাধারণ নির্বাচনে দুই কমিউনিস্ট জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ, দুই পার্টি আবার এই এপ্রিল মাসেই এক পার্টি হতে যাচ্ছে। আর এই জোটবদ্ধতা বেড়ে ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকারে পরিণত হওয়া। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই পরিবর্তন আসলে ভারতের বিদেশনীতির পরোক্ষ অবদান। ভোটের হিসাবেও বলা যায়, ৮৮ শতাংশ আসন বা ভোটার সমর্থকেরা এখন ভারতবিরোধী। ভারতের বিদেশনীতি বা নেপালনীতির এমনই নেতিগুণ।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০১৭-এর সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত এই সময়কালের মধ্যে সারা নেপালে ভারতবিরোধিতা সবচেয়ে চরমে উঠেছিল। আর এই সময়কালে ভারতের সর্বশেষ আর একমাত্র আশ্রয় হয়েছিল মাধেসি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো। অথচ গত মাসে ওলির সরকার গঠনের সময় থেকে মাধেসি অঞ্চলের প্রায় সব আসন পাওয়া আঞ্চলিক দুই দলও অলির জোটকে সমর্থন করে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে। ফলে ভারতের সমর্থক নেপালের রাজনৈতিক দল বলতে এখন রয়ে গেছে নেপালি কংগ্রেস। ভারতের সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জ্যোতি মালহোত্রা কেবল এই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে লেখা তার নিয়মিত রিপোর্টে ভারত সরকার তার ভুল স্বীকার ও সংশোধন করছে বলে জানিয়েছেন। এপ্রিলের চার তারিখে “Winning the neighbourhood শিরোনামে তিনি লিখেছেন,

As India stoops to conquer Nepal by laying out the red carpet for the visit of prime minister Khadga Prasad Oli later this week, it is indicating a new self-awareness that its foreign policy missteps have allowed China to gain ground in the neighbourhood, and demonstrating its willingness to sweat behind the scenes to make up for lost time.

জ্যোতি মালহোত্রার ভাষায় ভারত ‘stoops to conquer Nepal’ মানে নেপালের মন জয়ের জন্য নিজেকে বাকা বা নমনীয় করেছে। এটা নাকি ভারতের “foreign policy missteps” বিদেশনীতির ভুল পদক্ষেপ সম্পর্কে আত্মসচেতন বা নিজে নিজের ভুল সংশোধনের নজির।

ভারত এক ভিন্ন রাষ্ট্র হয়েও নেপাল রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত কনষ্টিটিউশনে তার অনধিকারে অযাচিত আপত্তি জানিয়েছিল। আর কারণ হিসাবে বলেছিল, নেপালের সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ এতে ক্ষুন্ন হয়েছে। এরই আপত্তি করছে ভারত। অর্থাত ভারতই যেন নেপালের ঐ অঞ্চলের অযাচিত ও স্বঘোষিত জনপ্রতিনিধি।

নেপালে কমিউনিস্ট জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচনে জয়ী হবার পরে ভারত সরকার তার বিগত দুবছরের নেপাল নীতি পদক্ষেপের ভুল স্বীকার করে নতুন পথে হাটতে গত ১ ফেব্রুয়ারি নেপাল সফরে আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।  তাই জ্যোতি মালহোত্রা লিখছেন, in Kathmandu, she told Oli that Delhi is ready to deal with Nepal as an important neighbour, irrespective of how it wants to discriminate against the people of the Terai. মানে সুষমা বলেছেন তারা আর তরাই অঞ্চল নিয়ে মাথা গলাবে না তাতে নেপাল তরাই অঞ্চলের সাথে বৈষম্যমূলক রাখুক কিংবা না।

আসলে ভারতের এমন উপলব্দি স্বীকার খাওয়াটাই বাহুল্য। কারণ সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের যতগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে তারা দুই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই হোক কিংবা আঞ্চলিক বড় দুই মাধেসি দলের – এরা সকলেই এখন ওলির সরকারের সমর্থনে দাঁড়িয়ে আছে। অলির সরকারের পার্টনার। এটা যেন দুধ আর আম এক হয়ে যাওয়া আর (ভারতের) আমের আঠি হয়ে দূরে হেলায় গড়াগড়ি যাওয়া!  ফলে সুষমা স্বরাজ একথা না বলে আর কী করবেন!

নেপালের বিগত সরকারের পাঁচ বছর কেটেছিল নানান কোয়ালিশন সরকারে। সে সময়ের নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত আসন এমন ছিল যে, প্রতি দু’টি মিলে কোয়ালিশন করলেই সংখ্যার দিক থেকে তা সরকার গঠন করার জন্য যথেষ্ট হত, আর এভাবেই কমপক্ষে চারবার কোয়ালিশন সরকার  (ভেঙ্গে ও গড়ে) গড়ে নেপালের রাজনীতি কেটেছিল। এরই সর্বশেষ ঘটনা ছিল, প্রত্যেকে ১১ মাস করে গঠিত দুই সরকার যার প্রথমটা ছিল মাওবাদী পুষ্পকমল দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার আর শেষেরটা নেপালি কংগ্রেসের দুবের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার।

নেপালের রাজনীতিতে দুই কমিউনিস্ট দলের প্রধান দাহাল ও অলির মধ্যে তুলনা করলে দাহালের ভূমিকা হল, দেশের দলগুলোর যেকোনো বিভক্ত মতামত (দলের ভেতরে বা বাইরে) ও উদ্যোগ নাই পরিস্থিতিতে তিনিই হাজির হন কাণ্ডারি হিসেবে। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা মতামত বা কমন অবস্থানে সবাইকে (সব বিবদমান দল বা পক্ষকে) নিয়ে এসে এবার সঙ্কট কাটিয়ে করে এগিয়ে যাওয়ার পথ রচনা করেন। এভাবে প্রতিবার নানান রাজনৈতিক বাধা কাটিয়ে নেপালকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে কাজ করে যাওয়া নেপালের রাজনীতিতে অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব হলেন দাহাল। বিপরীতে খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি, তিনি ভিন্ন নরম কমিউনিস্ট পার্টির। গত ২০১৩ সালের দ্বিতীয় কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচনের সময় থেকে তিনি মূলত ক্রমেই ভারতবিরোধী অবস্থান নেয়া শুরু করেন। যদিও তার দল ও দলের রাজনীতি কখনই কোনো রেডিক্যাল কমিউনিস্ট অবস্থানের দল নয়; বরং গত নব্বইয়ের দশকে নেপাল-ভারতের যৌথ নদী, মহাকালি নদীর পানিবণ্টনের ঝগড়া মীমাংসার ক্ষেত্রে মন্ত্রী হিসাবে অলি নিজ দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভারতপন্থী অবস্থান নিয়েছিলেন সে ইতিহাস আছে।

সেই অলি গত সেপ্টেম্বরে ২০১৫ সালে কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের পরে কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে চরম ভারতবিরোধী অবস্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষত ওই সময়টা যখন টানা প্রায় পাঁচ মাস নেপালে সব পণ্য আমদানিতে ভারত অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল। ফলে সারা নেপাল গরিব-ধনী নির্বিশেষে ভারতবিরোধী হয়ে উঠেছিল আর সবচেয়ে কষ্টকর দুর্বিষহ জীবন হয়ে উঠেছিল গরিব ও নারীদের। কারণ রান্নার গ্যাস বা যানবাহন চলাচলের জ্বালানির সরবরাহও বন্ধ করে রেখেছিল ভারতের ওই পণ্য অবরোধ। তাই বলা চলে অবরোধের কারণে নেপালের জনগণের মধ্যে যে চরম ভারত বিরোধিতার সেন্টিমেন্ট উঠেছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলি পরিপূর্ণভাবে এর সাথে ছিলেন এবং ঐ আবেগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই সময় থেকে তার ভারতবিরোধী অবস্থান তিনি এখনো স্থায়ী করে রেখেছেন। আর তার সাথে দাহালকে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি যেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার প্রবক্তা হওয়ার কাজ অলিকেই একছত্রভাবে দিয়ে দিয়েছেন। আর নিজে ভারতের তৈরি মাধেসি ইস্যুর জট কাটানো, অনিশ্চিত হয়ে থাকা কনস্টিটিউশন সংশোধনীর কাজ শেষ করা, প্রদেশে ভাগ করে সীমানা টানার অসমাপ্ত কাজ ঐকমত্য গড়ে সমাপ্ত করা, বিগত ২০ বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়নি, তা অনুষ্ঠিত করা এবং থিতু এক কনস্টিটিউশনে পৌঁছানো এবং সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার পথ খুলে দেয়া ইত্যাদি জটিল সব কাজ সমাপ্ত করার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এ যেন অলি আর দাহালের মধ্যে একধরনের শ্রমবিভাজন, যা তাদের পরস্পরের পরিপূরক।

দাহাল যেন জানতেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার মূল প্রবক্তা তিনিও হতে পারতেন, কিন্তু তাতে ভারতের বিষিয়ে তোলা মাধেসি জনমতের সাথে একটা নিগোশিয়েশন ও ঐকমত্য তৈরিসহ একটা সমঝোতায় পৌঁছানো, আর এই উদ্যোগের নেতা হয়ে কাজ শেষ করা তার জন্য কঠিন হত।

যেকথা বলছিলাম মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস – এই দুই দলের চুক্তিতে  সর্বশেষ ১১ মাসের করে কোয়ালিশন সরকার গঠনের করে ক্ষমতায় থাকার কথা। পুষ্পকমল দাহাল তার প্রথম ১১ মাসের প্রধানমন্ত্রীর আমলে নেপালের বুধি-গান্ডাকি (Budhi Gandaki) নদীতে আড়াই বিলিয়ন ডলারের ‘বুধি-গান্ডাকি ড্যাম ও পানিবিদ্যুৎ (১২০০ মেগাওয়াট) নির্মাণ প্রকল্পের’ (Budhi Gandaki project) চুক্তি করেছিলেন চীনের এক কোম্পানীর সাথে। কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে চলে যায়। মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস এই দুই দলের চুক্তি অনুযায়ী শেষের ১১ মাসের সরকার গঠন করে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি শের বাহাদুর দুবের সরকার (২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল)। ক্ষমতায় এসে তিনি প্রথম ভারত-তোষণে অবস্থান নেয়া শুরু করেন। ভারতীয় প্ররোচনায় দুবে চীনের সাথে করা ওই পানিবিদ্যুত প্রকল্প চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা দেন। আর ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট ছড়িয়েছিল যে, (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১৫ নভেম্বর ২০১৭) ওই প্রকল্প ভারতের সরকারি করপোরেশনকে (NHPC) দেয়া হচ্ছে। শিরোনামেই লিখেছিল , “Nepal scraps hydro project with Chinese company; Indian company to get it?”।

এটা ছিল নির্বাচনের এক মাস আগের ঘটনা। নির্বাচনের পরে অলির দলের কমিউনিস্ট জোট ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে আর অলির দলই সবচেয়ে বেশি আসন পেলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, এটা নিশ্চিত হয়ে যায়। এশিয়ার প্রভাবশালী দুই দৈনিকের একটা হংকংয়ের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট পত্রিকায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক সাক্ষাৎকার দেন হবু প্রধানমন্ত্রী অলি। সেখানে তিনি ওই বিদ্যুৎ প্রকল্প আবার চালু করার কথা বলেন।  তিনি ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে,  “Political prejudice or pressure from rival companies may have been instrumental in scrapping of the project. But for us, hydropower is a main focus and come what may, we will revive the Budhi Gandaki project,” । অর্থাৎ তিনি বলছেন, “ওই প্রকল্পের কাজ পেতে বিবদমান প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির সাথে  আসা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও চাপের কারণে প্রকল্প বাতিল হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে বিদ্যুৎ পাওয়াই মূল বিষয়। তাই আমরা প্রকল্প আবার চালু করব”।

এছাড়া অলি ভারতের জন্য অস্বস্তিকর ও ধরা পড়ে যাবার মত ইস্যু কিন্তু নেপালের জন্য যা খুবই জেনুইন কিছু স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি  ‘১৯৫০ সালের নেপাল-ভারত শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি’ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে কথাটা এভাবে বলেন যে তিনি ঐ চুক্তির ‘আপডেট’ করা ও ‘সমকালীন উপযোগী’ করতে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনের কথাও তুলেছিলেন ওই সাক্ষাৎকারে। এ ছাড়া নেপালের গোর্খা সৈনিকেরা এক চুক্তি অনুসারে ভারতীয় সেনা ও প্যারামিলিটারি বাহিনীতে নিযুক্ত হয়ে আছে। ওই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাদের দেশের নিজবাহিনীতে ফিরিয়ে নেয়াসহ ভারতের জন্য অস্বস্তিকর বহু ইস্যু নিয়ে খোলামেলা কথা তুলেছিলেন। যদিও নির্বাচনে কমিউনিস্টদের ব্যাপক বিজয় ও ফলাফলে অলি সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকেই হাওয়া বদলে যায়। স্পষ্টত ভারতের নেপালনীতি হেরে যাওয়ায় নতুন সংশোধিত নীতি হিসেবে মোদি সরকার সুর নরম করে ফেলেন। তিনি দুইবার অলিকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করেছিলেন আর অলিকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একই সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে গত ফেব্রুয়ারিতে পালে পাঠিয়েছিলেন। আর অলির সফর ছিল ৬-৮ এপ্রিল।

কিন্তু ভারতের মনের যত খারাপ দিক ও কলোনিয়াল বাসনা ফুটে উঠতে শুরু করে ওলির সফরের দিন ৬ তারিখ থেকে। ঐদিন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় আবার এক বেনামি সরকারি মন্তব্য ও মনোভাব ছাপা হয়। যার শিরোনাম হল, “যদি চীন তোমার ড্যাম নির্মাণ করে দেয় তাহলে ইন্ডিয়া তোমার বিদ্যুৎ কিনবে না : মোদি অলিকে বলবেন।’ [If China builds your dams, India won’t buy energy: PM Narendra Modi to tell KP Oli।]। বেনামী “সিনিয়র সরকারি অফিসিয়ালের” বরাতে এই খবর ভারত সরকার ছেড়ে দেয়।  ভারত সকারের এই বিরক্তিকর বীরত্বের রিপোর্টে একটা অসত্য বা ‘সত্য লুকানোর’ ঘটনা আছে। যদিও আপতিকভাবে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, প্রকল্প নির্মাণ চীন করলে ওতে উতপাদিত বিদ্যুৎ ভারতকে কেনার বাধ্যবাধকতার কথা আসবে কেন, ফলে কোন কিছুরই দায় বর্তায় না। এই কথাই সঠিক।  ফলে ভারত খুবই ন্যায্য কথা বলেছে বলে মনে হয়। কিন্তু সরি, ব্যাপারটা তা না। ব্যাপারটা বুঝতে তাই, বরং প্রশ্ন করা যাক উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারতের কেনা বা না কেনার প্রশ্ন উঠছে কেন?

ভোক্তা হিসাবে নেপালকে বিচার করলে, ১২০০ মেগাওয়াট উতপাদিত বিদ্যুৎ দেশটির ছোট অর্থনীতির বিচারে বেশি বা বাড়তি। ফলে এর কিছু অংশ বিক্রি করতেই হবে। কিন্তু স্বাধীনভাবে নেপাল এই বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে কি?  এটাই মুখ্য প্রশ্ন। যেমন-  এই বিদ্যুৎ   বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করলেই তো হয়, বিশেষত পানিবিদ্যুৎ বলে এটা জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের উতপাদন খরচ তুলনায় অনেক সস্তা পড়বে। বাংলাদেশের হিসাবে ২৫-৩৫ পয়সা ইউনিট। না, নেপাল তা বিক্রি করতে পারবে না। এখানেই ভারতের লুকানো গোপন করা সত্য আছে। নেপাল-ভারত তথাকথিত শান্তি বন্ধুত্ব চুক্তি অনুযায়ী, নেপালে উৎপাদিত কোনো পণ্য তা ভারতীয় বা নেপালি কোম্পানি যারই উতপাদিত হোক, তা নেপালের বাইরে বিক্রির কোম্পানি হতে হবে ভারতীয় মালিকের। আর উতপাদন অথবা  বিক্রির কোম্পানি নেপালি কোম্পানি হলে সেটা প্রতিটি কেসের বেলায় ভারত সরকারের কাছে আগাম অনুমতি নিতে হবে। সেই অনুমতি পাওয়া সাপেক্ষেই কেবল বিক্রি করতে পারে। আসলে এই অনুমতি পাওয়া যাবে না। মূলকথা নেপালের পণ্য তৃতীয় দেশে বিক্রি করতে গেলে কেবল ভারতীয় ব্যবসায়ীরাই তা করতে পারবেন। এই হল সেই কলোনি সম্পর্কে দাবড়ে রাখা চুক্তি। ফলে নেপালকে কেবল ভারতীয়দের কাছেই বিক্রি করতে হবে বা এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। আর এ কারণেই এখানে “ভারতের কেনার” প্রসঙ্গ আসছে। এতে একেবারে মূলকথা দাঁড়াচ্ছে, ভারতের সরকার বা ব্যবসায়ীর ইচ্ছাতেই কেবল নেপালে কোনো পণ্য উৎপাদন করা যাবে। এই দাসখত কলোনি চুক্তি দিয়ে ভারত নেপালকে বেঁধে রাখতে চায়। বামন অবিকশিত নেপাল করে রাখতে চায়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে নাম পরিচয় ছুপানো সরকারি কর্তা নেপালের জন্য এক লাল দাগের লক্ষণ রেখা টেনে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ঐলাইন ক্রশ করলে নেপালের উপর তারা ঝাপায় পড়বেন। […….will be couched in the niceties of diplomatic prose, but there will be no denying “India’s red lines,” a senior government official told The Indian Express.] এর মানে হল এখনও ভারতের আক্কেল হয় নাই।

তাই ভারতের নীতি ও পদক্ষেপের ধরণ ও  অভিমুখ বিচার করে বলা যায়, এশিয়ার বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক আরো বড় সঙ্ঘাতময় হয়ে উঠার সম্ভাবনা সামনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমনকি বাংলাদেশে যদি হাসিনা সরকারের মতো সরকার থাকে তাহলেও। এই সঙ্ঘাতের মূল কারণ হবে, ভারতের কলোনি বৈশিষ্ঠের বিদেশনীতি অথবা বলা যায় এই একুশ শতকে এসেও কলোনিয়াল মনোভাবে গড়ে ওঠা বিদেশনীতির কারণে।  ভারত অকর্মন্য ও উত্থানরহিত অথচ সে ভাবে তার অর্থনীতির এই খামতি যেন বা কলোনি স্টাইলের নীতি দিয়ে উতরানো যাবে। তবে আর এক দিক থেকে বলা যায় এর মৌলিক বৈশিষ্ট হল, এক শব্দে ‘হামবড়া’। যার অর্থ হল আক্ষরিক অর্থে আমি বড় বা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এতটুকুই না; এর আরো অর্থ হল, বিশেষত যখন কেউ নিজে বড় বা বিশেষ কেউ না হওয়া সত্ত্বেও মিছাই নিজেকে ওভার-এস্টিমেট করে বড় বা ক্ষমতাবান মনে করে।

সক্ষমতা অর্থে ক্ষমতাকে যদি দু’টি প্রকরণে ভাগ করে বলি, তবে এর একটা হল অবজেকটিভ। মানে বৈষয়িক বা ফিজিক্যাল দিক থেকে যা বাস্তব। আর অপরটি হলো সাবজেকটিভ, মানে কর্তাসাপেক্ষ। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের এক বিশাল অবজেকটিভ সক্ষমতা। সাধারণভাবে বললে এটি আসলে একটি বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা যেখানে লাগাবে যেভাবে লাগাবে এর ওপর নির্ধারিত হবে আগামী দিনের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে। যদি যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করে বা বাধ্য হয়, তাহলে তা এক রকম হবে। যদি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ হিসাবে ব্যবহার করে, যার আবার দু’টি ধরণ হয়; স্বল্পসুদের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ আর সরাসরি (এফডিআই) বাণিজ্যিক বিনিয়োগ – এ দুইয়ের এক ভারসাম্য অনুপাত বিনিয়োগ হয় তবে আরেক রকম হবে। এটা অবজেকটিভ ক্ষমতা।

একুশ শতকের এখনকার দুনিয়ায় সবচেয়ে নির্ধারক শক্তি চীনের এই সক্ষমতা আছে। অপর দিকে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেটা সাবজেকটিভ, এরা ওই অবজেকটিভ ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চাইলে বা না চাইলেও চীনের এই সক্ষমতা থেকে যাবে। কিন্তু আরেকটা পরিস্থিতিও কল্পনা করা যাক। ধরা যাক চীনের অবজেকটিভ পটেনশিয়াল বা সক্ষমতা নেই বা থাকলেও তবে সেটা তেমন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের আকাঙ্খা প্রবল এবং খুবই ভালো স্বপ্ন ও পরিকল্পনাও আছে – তাহলে কী হবে? সেটাই হলো ওই ‘হামবড়া’ পরিস্থিতি। আর এ অবস্থাই হলো ভারতের। সক্ষমতা নাই কিন্তু স্বপ্ন আছে। ভারতের এই ‘হামবড়া’ বৈশিষ্ট্যের বিদেশনীতি এশিয়ার ভারতসহ আমাদের সবার জন্য বিরাট দুঃখের কারণ।

যেমন চীনকে দেয়া আড়াই বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের মতই বহু আগে ভারতকে কার্যাদেশ দিয়ে দেয়া এমনই এক প্রকল্প আছে, যা গত দুবছর ধরে পড়ে আছে, কোন কাজও শুরু হয় নাই। কিন্তু দেখেন ভারতের অবস্থান হল সে পারুক আর নাই পারুক নেপাল তা ভারতকেই দিবে। এই বক্তব্য আমার নয়, নভেম্বর ২০১৭ সালে চুক্তি বাতিলের সময় খোদ সুবীর ভৌমিক ভারতের নীতির এই দশা অকর্মন্যতার কথা তুলে ভারত নিজে যতটুকু পারে তাতে মনোযোগ দিতেও পরামর্শ রেখেছিল।

নেপালে স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট সার্ভিস একচেটিয়া সরবরাহকারি ছিল ভারত। সম্প্রতি চীনও সেখানে বিকল্প সরবরাহকারি হিসাবে হাজির হয়ে একচেটিয়া ভেঙে দিয়েছে। ফলে এখন ভাল সার্ভিস দেওয়ার ও মুল্যের  প্রতিযোগিতা করেই ভারতকে টিকতে হবে। এধরণের বিষয়গুলোর ভারতের কলোনি মালিকের মত আচরণের পিছনের মূল কারণ। স্বভাবতই এখনই নিশ্চিত করেই বলা যায় কলোনি মালিকেরা নিপাত যাবে, হেরে যাবে।

তাহলে নেপাল এখন কোন দিকে যাবে? বলা বাহুল্য, ভারতই নেপালকে এখন তথাকথিত ১৯৫০ সালের চুক্তি ভাঙার পথে ঠেকে দিচ্ছে ও যাবে। মনে রাখতে হবে, ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকার এখন নেপালে। দেশটির জনগণের সামনে এই ভারতীয় নিগড়, এই চুক্তি ভাঙা, ছুড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই বাস্তবতা আরও প্রকট হবে সামনের দিনে। নেপালকে সেদিকে ঠেলে দিচ্ছে ভারত।

চীনের সক্ষমতার সাথে পেরে না উঠে ভারত কলোনি স্টাইলে নিগড়ে নেপালকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেপালের জনগণেরই বিজয় হবে। আর ভারতের ভাগ্যে জুটবে চিরদিনের ঘৃণা। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক আইন ক্রমেই নেপালের মতো রাষ্ট্রের স্বার্থের দিকে মানে ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের পক্ষে হাজির হচ্ছে। অন্য রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে অবাধ পণ্য আনা নেয়া “ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের অধিকার” হিসেবে জাতিসঙ্ঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সুবিন্যস্ত করে হাজির হচ্ছে।

ভারত একদিকে নিজেই স্বীকার করছে নেপালে নিজের ভুলনীতি ও পদক্ষেপের কারণে সেখানে চীন ঢুকে পড়েছে। অথচ নিজে সংশোধন হয়ে যাবার কথা বলে আবার সেই একই পথে হাটছে। ভারতের  নিজের অবজেকটিভ অসক্ষমতা সম্ভবত তাকে এই ভুল করতে প্ররোচিত করছে। মিথ্যা হামবড়া বোধ, যা সে নয় এমন এক কল্পিত বোধ তাকে বারবার স্বপ্নে পোলাও খেতে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এটাই এশিয়ার দুঃখ হয়ে থাকবে অনেকদিন!

ওদিকে অলির ভারত সফরে স্বাগত  জানাতে এয়ারপোর্টে মোদি নিজে না গিয়ে হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথকে পাঠিয়েছেন। সোজাসাপ্টা করে বললে এতে নেপালবাসীকে অপমান করা হয়েছে এবং এটা অপ্রয়োজনীয় ও অযাচিত সস্তা আচরণ, তাই অগ্রহণযোগ্য। রাষ্টাচারের কনভেনশনে ছোট রাষ্ট্র বা বড় রাষ্ট্র বলে কিছু নাই। আছে মূলত নাগরিক জনগণের সম্মান, যা অলংঘনী্‌ যা ওভারস্টেপ করা যায় না। এমন আচরণ নেপালও করতে পারে। যদিও এগুলো কোনো বাহাদুরি নয়। ফলে এটা কাম্য নয়। কোন রাষ্ট্রদ্বয়ের পরস্পর রাজনৈতিক স্বার্থ না মিললে কোনো সম্পর্ক হবে না, কিন্তু নেপালের জনগণকে অপমান করার অধিকার মোদীর নাই। এটা কোন প্রধানমন্ত্রীর নয়, ভাংড়ির দোকানদারের আচরণ হয়েছে। এটা মোদীর ভুলা উচিত নয়।  মোদীকে একদিন  চুকাতে হবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালে ভারতের ‘হামবড়া’ কূটনীতি  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

গৌতম দাস
০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহষ্পতিবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lW

 

নতুন করে রাষ্ট্রগড়া বা একটা মর্ডান রিপাবলিক গঠন কালে এর গঠনসভা, একে ইংরাজিতে কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি (Constituent Assembly) বলা হয়; বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭২ সালে ধারণাটাকে বাংলায়  “গণপরিষদ” – এই বাংলাটা নেয়া হয়েছিল। আম-ধারণা হিসাবে নির্বাচন বলতে বা ‘ভোট আসছে’ বলে আমরা যা বুঝি ও বুঝাই সেটাই “সাধারণ নির্বাচন”। আবার কোন নতুন রাষ্ট্র গঠনসভারও সদস্য কারা কিভাবে নির্বাচিত হবেন এর জন্যও একটা নির্বাচন হয়। তবে সেটাকে “সাধারণ নির্বাচন” নয় বরং একে “গঠনসভার সদস্য নির্বাচন” বলে। যদিও বাইরে থেকে দেখতে সেটা সাধারণ নির্বাচনের মতই মনে হতে পারে।

‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ এর মধ্যে মৌলিক ফারাক হল –  উদ্দেশ্য। ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য হল ওখানে ঐ নির্বাচিত কমিটি একটা কনষ্টিটিউশন রচনা করতে বসে, সেকাজ শেষ হলে নিজেরা  অনুমোদন দেয়। পরে এক গণভোটে তা পাশ করিয়ে আনে। আর ফাইনালি  ‘নতুন কনষ্টিটিউশন চালু হল’ বলে এক প্রোক্লেমশন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। মূলত এই কাজটাকেই আরেক ভাষায় বলে ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হল। আর গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হল ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরে নির্বাচিত ঐ গঠনসভার অস্তিত্ব ঐ পর্যন্তই, এরপরে সে নিজে নিজেই আপনাতেই ভেঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরা হয়। এইবার রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে গঠিত নতুন কনষ্টিটিউশন মোতাবেক। যার প্রথম পদক্ষেপ হল, কনষ্টিটিউশনে যেভাবে লেখা আছে সে মোতাবেক  কারা জাতীয় সংসদের সদস্য হবেন নির্বাচন কমিশন এর নির্বাচন আয়োজন করতে থাকে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর। এই নির্বাচনকে ‘সাধারণ নির্বাচন’ বলা হয়। মনে রাখতে হবে “সাধারণ নির্বাচন” ঘটার ক্ষেত্রে সবসময় আগে থেকে একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন  থাকে আর সে মোতাবেক ঐ সাধারণ নির্বাচন আয়োজিত হয়ে থাকে।  ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য একটা কনষ্টিটিউশন লেখা আর এই নির্বাচন একবারই হয়; বিপরীতে সাধারণ নির্বাচনের বেলায় আগে থেকে থাকা একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন মোতাবেক সাধারণ নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়।

তবে কনষ্টিটুয়েন্সির দিক বিচারে এই দুই ধরণের নির্বাচনের কনষ্টিটুয়েন্সি অনেক রাষ্ট্রের বেলায় ভিন্ন দুরকম হয়, অনেক ক্ষেত্রে আবার একই থাকে। কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা মানে হল কোন কোন প্রশাসনিক এলাকা অর্থাৎ কোন কোন ইউনিয়ন বা উপজেলার ভোটারদের নিয়ে একেকটা কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত হবে। অনেক সময় এটাকে নির্বাচনী আসন এলাকাও বলতে দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশে এমন কনষ্টিটুয়েন্সি মোট ৩০০ টা। তবে  অনেক দেশে ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ – দুই ক্ষেত্রে কনষ্টিটুয়েন্সি বা আসন এলাকা ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। সাধারণত দেখা যায়, ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ আসন সংখ্যা বা নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা তুলনায় বেশি থাকে। যেমন নেপালে ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ মোট আসন ছিল ৬০১, আর সাধারণ নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা হল ২৭৫। এছাড়া ‘গঠনসভার নির্বাচনের’ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষে প্রক্লেমেশন আর এরও পরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকে ও পরিচালিত হয় এক অন্তর্বর্তিকালীন বা অস্থায়ী সরকারের অধীনে।  গঠনসভার নির্বাচিত সদস্যরাই ঐ অস্থায়ী সরকার গঠন করে থাকে। এই হল ভেঙ্গে বিস্তার করে বলা একটা নতুন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া অথবা পুরা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস।

আমাদের পড়শি নেপাল তাদের প্রাচীন রাজতান্ত্রিক শাসন উতখাত শেষে (২০০৬ সালে),  দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস সম্পন্ন করার পরে, এখন নেপালে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন চলছে। কিন্তু প্রায় দশ বছর লাগল কেন? এটা তো বরং চার-পাঁচ বছর বা তারও আগে (বাংলাদেশ একবছরেরও কম সময়ে হয়েছিল) শেষ করে ফেলার কথা। আর কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে কোন জনগোষ্ঠি যত লম্বা সময় নিবে পুরা জনগোষ্ঠিকে ততদিন ভয়ঙ্কর সব বিপদের মধ্যে থাকতে হবে। এ যেন অন্যের হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদে থাকা। আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করব, নতুন রাষ্ট্রগঠন করব ইত্যাদি অনেকের স্বপ্ন আমাদের থাকে। কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বিপদজনক অধ্যায় হল  একটা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শুরু করেও শেষ না করতে পারা বা প্রক্লেমশন না দিতে পারা। ব্যাপারটা অনেকটা যেন রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা হয়েছে, পেট কাটা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই এবার নানান জটিলতায় পরে সেলাই দিয়ে পেট আর বন্ধ করা যায় নাই। এমন বাজে অবস্থা আর কারও হয় না। স্বভাবতই সেক্ষেত্রে তখন রোগীর জীবন চলে যাওয়ার বিপদ মাথার উপর টিকটিক করবে। নেপাল হল সেই দুর্ভাগ্যের জনগোষ্ঠি যারা প্রথমবার  কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচিত করেও (২৮ মে ২০০৮ থেকে, ২৮ মে ২০১২ সাল সময়কালের মধ্যে) ঐ নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে পারে নাই। এদিকে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নিজেই আয়ু শেষ করে ভেঙ্গে যায়। ফলে পুরা জনগোষ্ঠি দেশবাসী এক লিম্ব বা ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর উপায়ন্ত না দেখে সব রাজনৈতিক দল মিলে সুপ্রীম কোর্টের কাছে আদালতকে সাক্ষী রেখে বিশেষ পরিস্থিতি ও বিবেচনার দোহাই দিয়ে আবেদন করেছিল আর একটা সুযোগ দিতে; আর নিজ জনগোষ্ঠির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এবার আর ব্যর্থ হবে না। এথেকেই আর একবার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচনের বৈধতার ভিত্তি তৈরি করেছিল নেপাল। এটা সৌভাগ্য যে নেপাল যে সুযোগ পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয়বার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নির্বাচন হয়েছিল নভেম্বর ২০১৩ সালে। পড়শি কারও হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদ পেরিয়ে বড় কোন ক্ষতি ছাড়াই ঐ নির্বাচন শেষে নেপাল আবার নতুন করে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার ফেরা ও কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি্তে কনষ্টিটিউশান রচনার কাজ  শুরু করার সুযোগ পেয়েছিল। তবে  নেপালি জনগোষ্ঠির জন্য এরচেয়েও বড় সৌভাগ্য হল এবার দ্বিতীয় সুযোগে শত বাধা সত্ত্বেও (বিশেষ করে ভারতের বাধা) ‘কনষ্টিটিশন গঠন কাজ শেষ’ হয়েছে বলে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তারা প্রক্লেমশন জারিতে সফল  হয়েছিল। আর তা সম্ভব হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ ছিল নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল  (দাহালের মাওবাদী দল, আর বাকি দু দল হল,  আমাদের সিপিবির মত নির্বাচনমুখি কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস) একজোটে পরস্পরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা যে তারা ভারতের কোন প্ররোচনায়  না পড়ে প্রথম সুযোগেই কনষ্টিটিউশনাল রচনার কাজ শেষ করবে। দুবছরের মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সক্ষম হয়েছিল, যদিও ভারত শেষ চেষ্টা করেছিল মাধোসি জনগোষ্ঠিকে উস্কে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নিতে, কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারিতে বাধা দিতে। কিন্তু সেসব কার্যকর করতে ভারত শেষে ব্যার্থ হয়। তবে নেপালে প্রদেশ কয়টা হবে, কিভাবে ৭৭টা জেলা কোন প্রদেশে কিভাবে  অন্তর্ভুক্ত হবে এটা অমীমাসিত রেখেই ঐ তিন দল কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারি করে দিয়েছিল। আর পরবর্তিতে ঐ অমীমাংসিত কাজ শেষ করা হয়েছিল।

এখন নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর অর্থ গত দুবছরে সেসব জনগোষ্ঠিগত স্বার্থবিরোধ মিটিয়ে তারা অসমাপ্ত অংশগুলোও পুর্ণ করে ফেলেছে। এটাই নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সফলতার আসল  তাতপর্য।

এটা সাধারণ নির্বাচন, এখানে ‘সাধারণ’ শব্দটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। কারণ এটা জানাচ্ছে  নেপালে কনষ্টিটিউশন রচনার কাজ পুরাটাই সমাপ্ত হয়েছে। তবে এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই পর্বে। কারণ এই শীতের সিজনে দুর্গম পাহাড়ে চলাচলের অসুবিধার কারণে মাঝে দুসপ্তাহের ফারাকে দুই আলাদা দিনে ভোট নেওয়া হচ্ছে।  দুই পর্বের ভোটগ্রহণের প্রথম পর্ব ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে আর দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ ডিসেম্বর।

সাধারণভাবে বললে, নেপাল সম্পর্কে ভারতের কল্পনা হল – এটা ‘নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি’ বা তালুক যেন। ফলে সেখানে যা হবে তা ভারতকে তার ইচ্ছাকে অমান্য করে হতে পারবে না। এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে এখন বাস্তব পুরোটাই উল্টেপাল্টে ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ভারতের বিদেশনীতির বিরাট পরাজয়ের আজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে নেপাল। আর এতে  ভারতের রাজনীতিক ও বিশেষ করে তার আমলা-গোয়েন্দাগোষ্ঠি যেন খোদ ভারতের স্বার্থের শত্রু।

নেপালকে ভারত নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি মনে করার পটভূমি হাজির হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া ছেড়ে ব্রিটিশ শাসকের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৪৭-পূর্ব যুগে একদিকে খোদ বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর অন্যদিকে রাজতান্ত্রিক নেপাল – দুটোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল, তবে দুই অর্থে। আর এতে বিরাট তফাতটা হল, ১৯৩৭ সালের পর থেকে ভারতে ধীরে ধীরে নেটিভরা অন্তত স্থানীয় বা প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকার নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে নিয়ে যেতে পেরেছিল। এর বিপরীতে নেপাল তখন নিজস্ব এক রাজতান্ত্রিক সরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ এক করদরাজ্য। নেপালের সাথে বৃটিশদের “নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩”, এটাই ছিল দ্বিতীয় ও শেষ চুক্তি, যার মেয়াদ উল্লেখ ছিল ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। যদিও সেটা নেপালের রাজাদের স্বার্থের দিক থেকে খারাপ চলছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা ১৯৪৭ সালে ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় নেহরুর-ভারত যেন ‘নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩’-এর ব্রিটিশ অংশের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। ফলে আগের ওই চুক্তিই এবার ১৯৫০ সালে নতুন করে, ব্রিটিশ সরকারের জায়গায় ভারতের নাম বসিয়ে ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’ নামে পুনর্লিখিত  করা হয়েছিল। সেই থেকে নেহরুর-ভারতের দৃষ্টিতে ও মনোভাবে রিপাবলিক ভারত যেন আসলে নতুন এক ‘কলোনি মাস্টার’।

সুনির্দিষ্ট করে নেপালের বেলায় বললে, নেহরুর-ভারত এমন ভাববার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কারণ নেপাল ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া তার বাইরে বের হওয়ার বা পণ্য আমদানি-রফতানির উপায় নেই। তিন দিকে ভারত আর উত্তরে চীন। কিন্তু চীনের দিকের অংশে তা আরো দুর্গম উঁচু পর্বতে ঢাকা ফলে পুরাটাই অগম্য এলাকা। কেবল একালে এসে রাইজিং চীন বিপুল বিনিয়োগ করে পাহাড় ডিঙিয়ে নেপালের সাথে স্থল যোগাযোগ (বিশেষ করে হাজারের দুয়েকের কিমি বেশি দীর্ঘ রেল লাইন পেতে) স্থাপনে রত হয়েছে। যদিও তা ঠিক নেপালের জন্য না, চীনের নিজের ঐ অঞ্চলও ল্যান্ডলকড, ওর বিকাশের জন্য।

রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্র তার কোনো পড়শি বা বিদেশ-রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করা মানেই সেটা ভারতের কলোনি বানানোর বা কলোনি-সম্পর্কের চেষ্টা করে যেতে হবে – নয়াদিল্লির এই মনোভাব, এই অনুমান ও বোধ স্বাধীন ভারত জন্ম হওয়ার সময় থেকেই। ভারতের এই অনুমান যে মারাত্মক ভুল, আত্মঘাতি, আর এর জন্য ভারতকে উলটা কাফফারা দিতে হবে, এটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্রমান্বয়ে শিক্ষা পেয়ে চললেও তা থেকে কোনো শিক্ষা ভারত নিচ্ছে – এমন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভারতের পড়শি প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে একটা কলোনি সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করার যুগ যে এটা আর নয়, তা বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে- এই শিক্ষা পেলেও তা গ্রহণ করার অবস্থায় ভারত গিয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

তাই ২০০৬ সালের পর থেকে ক্রমেই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নেপালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং যদিও তাতে ভারত নির্ধারক ভূমিকায় নেপালকে ইতি-সহায়তা দিয়েছিল তা সত্ত্বেও নেপালের এই বিরাট পরিবর্তনের তাৎপর্য কী তা ভারত কখনো ধরতে পারেনি। কারণ ভারতের রাজনীতিক ও আমলা-গোয়েন্দা এই স্টাবলিশমেন্ট-চক্র আসলে, পড়শি রাষ্ট্র-সম্পর্ক বলতে কলোনি-সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু হতে পারে তা এখনো কল্পনা করে না। তাই এক দিকে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শেষে নেপালের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে নিজেকে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হওয়া  – এটা নেপালের জন্য একটা বিরাট বিজয়। আর ভারত ততই অযথা নেপালের জন্য এক নম্বর ভিলেনের ভূমিকায় ক্রমান্বয়ে হাজির হওয়া – এটা ভারতের বিরাট পরাজয়। একালে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার একমাত্র উপায়, ওর ওপর কলোনি সম্পর্ক চাপিয়ে দেয়া নয়, বরং এটা কাউন্টার প্রডাক্টিভ; মানে উল্টো ফল দেয়া কাজ। এটা ভারতের স্টাবলিশমেন্ট-চক্রের এন্টেনায় ধরা পড়া, হুশ  ও নতুন মুল্যায়নে আসার আগে পর্যন্ত, সে নিজেও শান্তি পাবে না, পড়শিদেরও শান্তি দিবে না।

ভিন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে কলোনি নয় বরং মর্যাদার সম্পর্ক হিসাবে দেখা আর একে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখে আগানো – এমন অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ, এটাই অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই বোধের  -পানি ভারতের কানে ঢোকা – দুরঅস্ত। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ‘কলোনি অ্যাপ্রোচ’ যে তার আদি সমস্যা এটা ভারত এখনো উপলব্ধি করে না। আর এখন তো ভারতের এমন বেকুবিপনার নীতির পক্ষে আরো বড় সাফাই এসে গেছে। তা হচ্ছে রাইজিং অর্থনৈতিক প্রভাবের চীন। যেমন নেপালের ক্ষেত্রেও ভারত হয়তো সাফাই দিতে চাইবে, নেপালে ভারতের এমন দুর্দশা হয়েছে চীনের প্রভাব মোকাবেলার করতে গিয়ে – এসব বাজে কথার সাফাই গাইবে। যদিও ভারতও জানে, এটা ১০০ ভাগ মিথ্যা। নেপালের বেলায় চীনের প্রভাব বা চীনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে নেপালের নেয়া এটা একেবারেই নতুন ‘ফেনোমেনা’, মাত্র ২০১৫ সাল বা এর পর থেকে। অথচ নেপাল যেন একটা নতুন কনস্টিটিউশনের ভেতর দিয়ে নতুন করে রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করে থিতু হতে না পারে, বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে এর সপক্ষে নেতিবাচক তৎপরতায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল ভারত। দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচন করতে হয়েছে নেপালকে, তবু ভারতের নেতিবাচক ভূমিকা শেষ হয়নি। অবশেষে দ্বিতীয়বারের (২০১৩) কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচনের পর নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল এক হয়ে ভারতের বাধা মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে গেলে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিপাবলিক নেপাল হিসেবে নতুন কনস্টিটিউশনের ঘোষণা দিতে নেপাল সক্ষম হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে কূটনীতিতে পরাজিত ভারত ঐ ঘোষণারও বিরোধিতা করেছিল। এরপর ভারতের শেষ অবলম্বন হয়েছিল, নেপাল-ভারত সীমান্তের নেপাল অংশের সমতলভূমির বাসিন্দা মাধেসি জনগোষ্ঠীর ত্রাতা সাজার।

ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপালের সমতলি-পাহাড়ি স্বার্থবিরোধ যেন কোনো মীমাংসায় না পৌঁছায় – এভাবে কাজ করে গেছিল ভারত। নেপালকে কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ২০১৫ সালে ঘোষণা দেয়া হলেও এর অভ্যন্তরে প্রদেশগুলো কিভাবে বিভক্ত করার কাজ অসমাপ্ত ছিল মানে, অভ্যন্তরীণ সীমানা টানার কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও এতদিন আয়োজন করাও যায়নি। বিগত দুই বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত বাধা দিয়ে একাজগুলো যেন শেষ না নয়, পাহাড়ি-সমতলি জনগোষ্ঠীগুলো যেন তাদের স্বার্থের ঝগড়ার ব্যাপারে আলোচনা করে কোন একটা মীমাংসায় না পৌঁছাতে পারে, এ ক্ষেত্রে নেপালকে ঠেকিয়ে রাখার সব চেষ্টা করা ছিল ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য।

এই পটভূমিতে চলতি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের তাৎপর্য হল, ভারতের সব প্রচেষ্টাকে নেপালের জনগণ পরাজিত করে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিজেদের সব বিতর্ক-বিবাদ নিরসন করে নেপাল নিজেকে সাত প্রদেশে ভাগ করে  ও প্রদেশ গঠন সম্পন্ন করেছে। এটা একটা বিরাট অর্জন। বিগত ২০ বছর নেপালে কোথাও (আমাদের ইউপি ও উপজেলার মত) স্থানীয় নির্বাচন হয়নি। অনেকটা, সীমানা টানা বা চিহ্নিত করা হয়নি বলে আমাদের উপজেলার নির্বাচন না করতে পারলে যেমন হত তাই। এই বছরে এসে কনস্টিটিউশনের অসমাপ্ত এসব কাজ সমাপ্ত হয়েছে। আর সব কিছুই হয়েছে ইতিবাচকভাবে। তাই বলা হচ্ছে, ২০১৭ সাল ছিল নেপালের জন্য ‘নির্বাচনের বছর’; ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এই তিন নির্বাচনই এবছর সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এক বছর আগেও এটা আদৌ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রায় সবার মনে সংশয় ছিল। কোনো আশার আলো কোথাও ছিল না। আমাদের অনুমান, নেপালের জনগণ এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট দেবে সম্ভবত নেপালি মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডকে। না, এটা তার রাজনৈতিক আদর্শ ভাল কি মন্দ তা বিচার করে বলা কোন কথা নয়। নেপালের সর্বশেষ সংসদে ৬০০ আসনের মধ্যে মাওবাদীদের ছিল মাত্র ৮০ আসন। আর ওদিকে নেপালি কংগ্রেসের ছিল ১৯৬ আসন আর কমিউনিস্ট নেতা অলির ইউএমএলের ১৭৫ আসন। ফলে নেপালের প্রধান তিন দলের কারোই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তবে সব মিলিয়ে একসাথে মোট আসনের কমপক্ষে ৭৫ ভাগ আসন তাদের দখলে ছিল। ফলে গত পাঁচ বছরে তিনবার এই তিন দলের তিন ধরনের কম্বিনেশনে সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে সেটা সব সময় আগাম আপস আলোচনাতেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে কোনো অচলাবস্থার মধ্যে তাদের যেতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে দাহালের কৃতিত্ব হল, তিনি ছিলেন সেই আশার আলো; প্রতিটি বিবাদের ইস্যুতে সমঝোতা টানার উদ্যোক্তা।  আর বাকি দুই দল – আমাদের সিপিবি দলের মতো নির্বাচনী কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস এদের ভূমিকা ছিল যে এরা নিজেদের রাজনৈতিক বিবাদের সমাধানে নিজেরা উদ্যোক্তা হতে না পারলেও দাহালের প্রদত্ত সমাধান প্রস্তাবগুলোতে সমর্থন এবং ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তা সফল করা। বিশেষ করে ভারতের কোনো প্ররোচনার ফাঁদে বা লোভে না পড়া। অবশ্য পুরো নেপালের জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গরিব মানুষের কাছে ভারতের কোনো ইতিবাচক ইমেজ আর নেই। কারণ, ২০১৫ সালে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে ভারত একনাগাড়ে পাঁচ মাস ল্যান্ডলকড নেপালে ভারত থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি ভারত বন্ধ করে রেখেছিল। বিশেষ করে সব ধরনের জ্বালানি আমদানি, যার ফলে কষ্ট সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়েছিল  নেপালের গরিব জনগণকে।

সমঝোতার সরকার হিসেবে বর্তমানে নেপালে শেষ বা তৃতীয় কোয়ালিশন চলছে  এটা নেপালি কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার, যার পার্টনার দাহালের মাওবাদী দল। এটাই শেষ ১১ মাসের সরকার, যার আগের ১১ মাসে দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বে সরকার ছিল। নেপালে সাত না আটটি প্রদেশ থাকবে, কোন কোন জেলা কোন প্রদেশে থাকবে- এ বিষয়টিকে মোটা দাগে বললে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ ছিল স্বার্থবিরোধ বিবাদের সবচেয়ে জটিল ইস্যু। আর ভারত এই বিবাদে মাধেসিদের কান ভারী করে বিবাদ আরো বড় করে তা লাগিয়ে রেখেছিল যেন সমাধান না মেলে – এটাকেই ভারত নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ বলে নির্ধারণ করে পথ রেখেছিল। গত ২২ মাসে নেপালের বিরাট অর্জন হল – প্রদেশ ইস্যুতে অমীমাংসিত বিরোধ মিটিয়ে এগুলোর সীমানা নির্ধারণ শেষ করা। এর পরপরই শুধু প্রাদেশিক নয়, স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন আয়োজনের সব বাধা খুলে যায়। ফলে ২০ বছর পরে এই প্রথম ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এরপর দুই পর্বে প্রাদেশিক (সরকার) ও ফেডারেল (কেন্দ্রীয় সরকার)- এ দুই ক্ষেত্রে নির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে যা হবে তা হল, নেপাল মোট ৭৭টি জেলা আর সাতটি প্রদেশে আপোষে বিভক্ত হয়ে থাকবে।

চলতি সাধারণ নির্বাচনে নেপালে সারা দেশ থেকে মোট ২৭৫ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (আমাদের ভাষায় কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হয়ে আসবেন। তারা একটি ফেডারেল সংসদ গঠন করবেন। এই সংসদের সংখ্যাগরিস্ট দলের সদস্যরা একটি কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠন করে নেবেন। এ ছাড়াও সাতটি প্রদেশে আলাদা আলাদা প্রাদেশিক সংসদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেকাজে সাত প্রদেশে মোট প্রাদেশিক সদস্য নির্বাচিত হবেন ৫৫০ জন। নেপালের সাফল্য হল নেপাল রাষ্ট্রের ক্ষমতার তিন স্তর ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এর অমীমাংসিত অংশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা। আর সেই সাথে এ বছরই তিন স্তরের নির্বাচন সফলভাবে শেষ করা। ফলে এখন নেপাল দাবি করতে পারবে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রগঠন পর্ব সফলভাবে শেষ করে সে এখন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। স্বভাবতই এটা নেপালের জনগণের জন্য যতটা সফলতা ও অর্জনের বিষয়, ঠিক ততটাই ভারতের সরকারের জন্য একধরনের পরাজয়ের বিষয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক অবস্থান নেয়ায় ভারতের নেপালনীতি আজ পরাজিত। নেপালের নির্বাচন কাভার করা ভারতের মিডিয়াগুলোর সম্পাদকীয় দেখলে বোঝা যায় যে, অন্তত তারা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। আর নেপালের জনগণের কাছেও ভারত যে একটা প্রবল নেতি-শক্তি এবং নেপালের গরিব মানুষের জীবনকেও দুর্বিষহ, আরো কঠিন ও কষ্টকর করে দিতে পিছপা হয় না, তা প্রমাণিত করে গেছে। ১০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে নেপালের কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেসে ভারত এক বিরাট নেতিবাচক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে, যা থেকে ভারতের জন্য পরাজয় আর নেপালি জনগণের ধিককার কুড়ানো ছাড়া কোনো অর্জন নেই। এর ফাঁকে ভারতের নেতি-রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সুযোগ পাওয়ায় নেপালি জনগণের কাছে অনেকটা অপরিচিত চীন, আজ নেপালি জনজীবনের কষ্ট লাঘবে বহুল আকাঙ্খিত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগকারী ‘ত্রাতা’ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের ফলাফলে কমিউনিস্টদেরকে আগিয়ে রাখছেন। এই নির্বাচন হচ্ছে মূলত দুই পক্ষের মধ্যে। এক পক্ষে মাওবাদী, অন্য পক্ষে কমিউনিস্ট ইউএমএল আর বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি। ভট্টরায়, তিনি রাজতন্ত্র উৎখাতের সময় মাওবাদী দলের সাথে দ্বিতীয় প্রধান হিসাবে ছিলেন। এ তিন কমিউনিস্ট দলের জোট বনাম নেপালি কংগ্রেস এবং এর সাথে ছোটখাটো দলের গণতন্ত্রী জোট। এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে যদি জনগণের মন-মেজাজের ইঙ্গিত বলে আমরা মানতে চাই তবে কমিউনিস্ট জোট বিপুল ভোটে জিতবে, বলা হচ্ছে। [Based on the results of Nepal’s recently concluded local level polls, there is a better chance that the left alliance of CPN-UML and CPN (Maoist Center) will gain a majority and form the government] এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে অবশ্য প্রকৃত ফলাফল জানা যাবে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সে পর্যন্ত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে নির্বাচন আয়োজনে সফলতা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নেপাল-ভারতের সীমান্ত হত্যা থেকে শিক্ষা

নেপাল-ভারতের সীমান্ত হত্যা থেকে শিক্ষা

গৌতম দাস

১৪ এপ্রিল ২০১৭,  শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2ev

 

প্রবাদ আছে- কারো উপর বেইনসাফি আর জুলুম করলে সে কাজের কাফফারাও চুকাতে হয়। কিন্তু অনেকের বেলায় এমন হয় যে, কাফফারা পরিশোধ আর যেন শেষ হতে চায় না। সেই দশাকে খুবই খারাপ সময় বলতে হয়। নেপাল-ভারত সম্পর্কের বেলায় ভারতের জন্য এখন সেই ‘খারাপ সময়’ চলছে, যখন তার কাফফারা চুকানো যেন আর শেষ হতে চাচ্ছে না। নেপালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রজাতান্ত্রিক(রিপাবলিক) নেপাল হওয়ার লড়াই বিজয়ী হয়েছে সম্প্রতিকালে। তাতে আমেরিকার অনেক নেতি ভুমিকা থাকলেও শেষে  ইতিবাচক ভুমিকায় সে নেপালের লড়াইয়ে সাথে থাকতে পেরেছিল। আমেরিকার ইতিবাচক অবস্থানের সাথে  মিলে ভারতেরও অনেক ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। সময়ে নির্ধারক ভুমিকাও ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। এককথায়, ভারত সে লড়াইয়ের সাথে পরিশেষে ইতিবাচক পথ ধরেই হাঁটতে পেরেছিল। যদিও এরও পরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গঠনের কালে  ভারতের ভুমিকা তা আর থাকে নাই। ভারত কল্পনাও করতে পারে নাই যে  আগের রাজতন্ত্রী নেপাল-ভারতের কলোনিয়াল দাসত্ব চুক্তির বাইরে নতুন নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভিন্ন কিছু হবে;  স্বভাবতই দিন বদলেছে- সেটা বুঝতে ভুল করেছিল এখানেই। অথচ ভারত প্রাকটিক্যাল হতে পারলে অন্য কিছু হতে পারত হয়ত। বলা বাহুল্য, সেটা কখনোই হয়নি। হওয়ার আর সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন উঠছে।আর উল্টো নেপালের মূল তিনটি রাজনৈতিক দল (নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল বা ট্র্যাডিশনাল কমিউনিস্ট আর সশস্ত্র ধারার নতুন মাওবাদী কমিউনিস্ট) যারা একসাথে সংসদের মোট ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসনে প্রতিনিধিত্ব করে- এদের সবার সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে যায়। নতুন রিপাবলিক নেপালের তাৎপর্য ভারত বুঝতে ভুল করেছিল। বলা যায়, ভারত নেপালের পরিবর্তনের গুরুত্ব ধরতে পারে নাই। ভারতের সম্ভবত এমন ভাববার কারণ হল সে ভেবেছিল, নতুন নেপাল রিপাবলিক হলেও তাতে কী? সে তো আগের মতই ল্যান্ডলকড যা ছিল তাই, ভারত দিয়ে ভৌগোলিকভাবে ঘেরা। ফলে সে ধরে নিয়েছিল, নতুন নেপালও আগের মতোই ভারতের অনুগ্রহে এবং ভারতের আরো নিয়ন্ত্রণের নেপালই হবে। ভারতের এমন আচরণ দেখলে মনে হয়, ভারতে প্রশাসনের চোখে, আমলা-গোয়েন্দার ইমাজিনেশনে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ‘সম্পর্ক’ বলতে কলোনিয়াল সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা কখনোই তাদের জানা হয়নি। ফলে ভারত সীমান্তসংলগ্ন মাধেসি ও তরাই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সাথে নেপালের প্রধান ধারার জনগোষ্ঠীর, পাহাড়ি-সমতলী স্বার্থবিরোধকে উসকে দিয়ে তা থেকে নেপালের রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর শেষ চেষ্টাই ছিল ভারতের শেষ ভরসা। কিন্তু এটা করতে গিয়ে সব হারিয়ে ফেলেছে ভারত।
নেপাল ল্যান্ডলকড এই অবস্থাটির অর্থ কেমন, তা সহজেই  বোঝা যায় নেপালের শুধু ছোট-বড় শহুরের জ্বালানি ব্যবহার করা দেখলে। নেপালের গ্রাম হয়তো লাকড়ি দিয়ে চলে, কিন্তু একটি সেমি-আরবান শহরও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অভ্যস্ত এবং নির্ভরশীল; তবে অবশ্যই ভারত যদি সেই গ্যাস নেপালে আসতে দেয়। শুধু গ্যাস নয়, নেপালের জনগোষ্ঠী বরাবরই একমাত্র ভারতের ভেতর দিয়ে রান্নার গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করে আসছিল। কিন্তু ভারত নেপালের সব শ্রেণীর জনগণের এই মৌলিক চাহিদা জ্বালানিসহ ভোগ্যপণ্যের চাহিদাকে পণবন্দী করে চাপ প্রয়োগের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিশেষত নেপালের ওই তিন প্রধান দল পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নেপালে ভারতের সব প্রভাব ও স্বার্থ অস্বীকার করেছিল। এরই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওই তিন দল সমন্বিতভাবে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা। এই ঘোষণা দেয়া মাত্র যেন নেপালের রাজনীতিতে ভারত আসলেই সব নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব হারিয়ে ফেলেছে, সেটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। তাই দিগবিদিক হারিয়ে ভারত পাঁচ মাস ধরে সব ধরনের পণ্য নেপালে যেতে বাধা দিয়ে অবরোধ করে রাখে। এই চরম পদক্ষেপের পথ ধরাতে নেপালের গরিব সাধারণ মানুষের স্তরেও জন-মন থেকে ভারতের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এত দিন সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল রাজনীতিকদের স্তরে, তা এবার সেখানে সীমিত না থেকে সর্বস্তরের আমজনতা লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছিল। হতে পারে ভারত এ দিকটি নিয়ে যথেষ্ট ভাবেনি অথবা তার সব কার্ড ফুরিয়েছিল। তবে সব হারানো ভারত চিন্তাও করেনি এর কাফফারা কী হতে পারে। কারণ পণ্য অবরোধের মূল ধাক্কা বিশেষ করে জ্বালানি অবরোধের ধাক্কা খেয়েছিল স্বল্প আয়ের মানুষ। এদের জীবনও ভারত পণবন্দী করে ফেলেছিল। এরই ফলাফল হিসেবে নেপাল-ভারত সম্পর্কের মধ্যে এখন জনগণের পর্যায়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভারতবিরোধী মনোভাব।
নেপাল-ভারত সীমান্ত প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার। সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আগে যেখানে ছিল আরেক পাড়ায় গিয়ে সওদা কেনার মত, আজ সেই সম্পর্কের মধ্যেও যেন আগুন লেগেছে। সীমান্তে এক কালভার্ট নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। আর তাতে আলাপ-আলোচনার পথে গিয়ে নয়, ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দিয়ে নেপালিদের সাথে এই বিরোধ মোকাবেলা করতে গিয়ে গুলি করায় এক নেপালি তরুণের (গোবিন্দ গৌতম) মৃত্যু হয়। ভারতের দুর্দশা এখন এমন যে, ক্ষুব্ধ মারমুখী নেপালি সাধারণ জনগণকে মোকাবেলা করতে ভারতকে নিজের রক্ষীবাহিনীর ওপর ভর করতে হচ্ছে। অথচ ভারত গত বছর প্রায় পাঁচ মাস ধরে নেপালে পণ্য চলাচল আটকে রেখেছিল, কনস্টিটিউশনের বিরোধিতা করেছিল। এসব নাকি নেপালের সীমান্তবর্তী জনগণের স্বার্থেই! আজ নেপালি পুলিশের ভূমিকা হলো লড়াকু নেপালিদের ফেরানো, যেন তারা ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মারমুখী না হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ও সারসংক্ষেপ হল, সীমান্তে নেপালের কালভার্ট নির্মাণকে কেন্দ্র করে কিছু ভারতীয় দাবি করে, কালভার্টের অপর পার নোম্যান্সল্যান্ডে পড়েছে, তাই তাদের আপত্তি আছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নেপালি পক্ষের বক্তব্যও জোরালো। কারণ তাদের কথা হল, সীমান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক টেবিলে বসে ঠিক করা হোক। আর আসলেই তা টেবিলেই ছিল। কিন্তু সেটাকে বল প্রয়োগের স্তরে নিয়ে গিয়েছে ভারতীয় পক্ষই। আর কেন এতে এক নেপালিকে হত্যা করা হলো? ফলে তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।
নেপালের ‘মাই রিপাবলিকা’ ইংরেজি দৈনিক গত ১১ মার্চ নেপালি সরকারি কর্মকর্তার বরাতে লিখছে, ভারতীয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ঐকমত্য ভঙ্গ করে নেপাল-ভারত সীমান্তে কাঞ্চনপুর জেলায় আনন্দবাজারে নির্মীয়মাণ কালভার্ট ভেঙে দিয়েছে। আর তা থেকে ডেকে আনা মুখোমুখি সঙ্ঘাতে একজন নেপালি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে গত ৯ মার্চ। নেপালের স্থানীয় সমাজকর্মী হরি লামসাল বলছেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে উভয় দেশের স্থানীয়রা ও নিরাপত্তা সদস্যরা মিলে একমত হয় যে, কালভার্ট নির্মাণ হবে। কিন্তু পরে এই একমত হওয়া বিষয়টি না মেনে তারা কালভার্ট ভেঙে দেয়।’ কাঞ্চনপুর জেলার এসপি প্রকাশ বাহাদুর চাঁদও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, ‘দুই দেশের কর্তৃপক্ষ একমত হয়েছিল এই নির্মাণে। অথচ পরে ভারতীয় পক্ষ এককভাবে এটা ভেঙে দিচ্ছে। এটাই সীমান্ত উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।’

ঘটনাস্থল ভারত-নেপাল সীমান্তে নেপালের কাঞ্চনপুর জেলার ‘পুনর্বাসন মিউনিসিপালিটির’ অন্তর্গত। ওই মিউনিসিপালিটির প্রধান নির্বাহী শের বাহাদুর বুধা বলেন, তারা নেপালের মাটিতে ওই কালভার্ট নির্মাণের জন্য পাঁচ লাখ টাকা মঞ্জুর করেছিলেন। নেপাল ও ভারতীয় পক্ষ কালভার্ট নির্মাণে একমত হওয়ার পরই ওই ফান্ড মিউনিসিপালিটি অনুমোদন করেছিল। ওই জেলা পুলিশ অফিসার এবং তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ গত ২০ ফেব্রুয়ারি দু’জনে বসে ওই নির্মাণের বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। সেই সূত্রে নেপালের সংশ্লিষ্ট উপপ্রধান জেলা অফিসার (ডেপুটি ডিসি) ও তার ভারতীয় প্রতিপক্ষও পরের দিন একসাথে বসে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্থানীয় ভারতীয়রা বুধবার সন্ধ্যা (৮ মার্চ) ৬টার দিকে কালভার্টটি ভাঙা শুরু করেছিল আর স্বভাবতই তা নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়।
বাংলাদেশের সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের ভারতীয় রক্ষীবাহিনী নাম যেমন বিএসএফ, নেপাল-ভারত সীমান্তে এখানে সে বাহিনীর নাম এসএসবি (সশস্ত্র সীমা বল)। রিপাবলিকা লিখছে, ‘ভারতীয় এসএসবির একজন এএসপি আর কে মোড়ল স্বীকার করেছেন, কালভার্টটি দুই দেশের সম্মতি অনুসারে নির্মিত হচ্ছিল।’ এ ছাড়া কাঞ্চনপুরের পাশের জেলা কাইলালির (এটাও নেপালের আরেক ভারতীয় সীমান্ত জেলা শহর) চিফ জেলা অফিসার (ডিসি) গোবিন্দ রিজালের বরাতে আরো জানিয়েছে, রিজাল পরের দিন (১০ মার্চ) ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করেছেন। তিনি জানান, ‘আমরা তাদের বলেছি, দ্বিপক্ষীয়ভাবে একমত হওয়ার ভিত্তিতে এরপর তৈরি করা কালভার্ট তারা একতরফা ভেঙে দিতে পারে না।
৯ মার্চ সকাল থেকেই ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেপালিরা সঙ্ঘবদ্ধ হতে থাকে। কোনো কোনো মিডিয়ার (যেমন নিউইয়র্ক টাইমস), অনুমানে তারা প্রায় ১০ হাজারের বেশি। তারা ভাঙা কালভার্টের স্থানে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। আর তা রুখতে সীমান্ত সীমার অপর পারে ভারতীয় এসএসবিও সমবেত হয়। ৯ তারিখের রিপাবলিকা এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে লিখেছে, এসএসবির লোকাল ইউনিট চিফ যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘থানেদার’ ডাকা হয়, পিস্তল বের করে পরপর চারটি ফায়ার করেন এবং চতুর্থ শটটি গোবিন্দকে কোমরে আঘাত করে। কথাগুলো বলছিলেন, দেবেন্দ্র খাড়কা, তিনি মৃতব্যক্তির এলাকার। খাড়কা বলেন, ‘বুলেটটি গোবিন্দের কোমর বরাবর আঘাত করলে সাথে সাথে ও পড়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘থানেদার অরবিন্দ কুমার শুক্লা গুলি ছোড়ার আগে নেপালি প্রতিবাদকারীদের ছোড়া পাথরে আঘাত পেয়েছিলেন। গুলিতে আহত গোবিন্দকে ধানগাড়ী সিপি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি।’
ঐকমত্যে নির্মিত কালভার্ট ভেঙে দেয়া আর এসএসবির গুলি ছোড়ার ঘটনায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। কিন্তু তাতে আরো ঘি ঢেলে দেয় নেপালের ভারতীয় হাইকমিশন। এ ঘটনায় হাইকমিশন এক টুইট বিবৃতি প্রচার করে। কিন্তু সেটা সব দায় অস্বীকার করা এক বক্তব্য। ‘কাঞ্চনপুরের আনন্দবাজার সীমান্তে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যেখানে এসএসবি গুলি ছুড়েছে’ বলে ওই বিবৃতি সব কিছুই অস্বীকার করেছিল। বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা ছিল খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপেশাদার কাজ।
এতে স্বভাবতই ফুঁসে ওঠা নেপালি সাধারণ মানুষ, ভারতবিরোধী স্লোগান তুলে সারা নেপাল তোলপাড় করে ফেলেছে। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠায় ভারত এক দিন পরই অবস্থান বদলায়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, তাদের অবস্থানের রেকর্ড ঠিক রাখার চেষ্টা হিসেবে এসএসবি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে । আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির হয়ে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। তিনি নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সহমর্মিতা জানান এবং তদন্ত করে দেখছেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। ইতোমধ্যে নেপাল সরকার গুলিতে নিহত গোবিন্দ গৌতমকে শহীদ ঘোষণা করে এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কাঞ্চনপুর জেলার ডোডা নদীর তীরে তার সৎকারের আয়োজন শুরু করে।
এ ব্যাপারে ভারতের অবস্থান যে ভুল ছিল এর প্রতিফলন ঘটে ভারতের এনিডিটিভির এক রিপোর্টের শিরোনামে। তা হলো ‘সীমান্ত হত্যায় প্রতিবাদ প্রতিরোধ বেড়েই চলছে। ফলে ভারত নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে তদন্ত করার প্রতিজ্ঞা করেছেন।’ ইতোমধ্যে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যালাস্টিক পরীক্ষার রিপোর্টেও নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন, এই বুলেট এসএসবির। ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওই রিপোর্ট তিনি হস্তান্তর করেছেন। সুষমা শাস্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি অভ্যন্তরীণ যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন।
অপর দিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখার নির্বাহী পরিচালক আকার পাতিল নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দাবি করেন, বিশেষ করে ভারতীয় এসএসবির সদস্যরা ‘প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ করেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে দাবি জানান। নেপালে এবারের ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয়, মিডিয়ায় রিপোর্টিংয়ে সঠিক আইনি ভাষা প্রয়োগ। বেশির ভাগ মিডিয়া শুরু থেকেই খুব বেছে একটা শব্দ প্রয়োগ করেছে- ‘হাইহ্যান্ডেডনেস’। কথাটির আইনি অর্থ হলো- কোনো নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, যেমন কাউকে গ্রেফতার করে গাড়িতে উঠানোর সময় কোনো বাধা না দিলেও তাকে টেনেহিঁচড়ে অথবা অযথা কোমরে একটা রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে মেরে তোলা অথবা প্রতিহিংসামূলকভাবে বল প্রয়োগ ইত্যাদি। মাই রিপাবলিক পত্রিকা আইনি শব্দে নেপালিদের ভাষ্য খুবই সফলভাবে তুলে ধরেছে। যেমন পর্যবেক্ষণ ধরনের ১১ মার্চের এই রিপোর্ট লিখছে, ‘একটা দেশের একজন নাগরিক অন্য দেশের (বাহিনীর) ছোড়া গুলিতে মারা যাওয়া; এটা খুবই সিরিয়াস ইস্যু। এটা এমন এক ইস্যু যা সর্বোচ্চ সতর্কতা, যতœ ও সূক্ষ্ম সেনসিটিভ বিষয়াদির দিকে খেয়াল রেখে নাড়াচাড়া করা উচিত।’ পত্রিকাটি কথাগুলো বলছিল ভারতীয় হাইকমিশনের দায় অস্বীকার করা বিবৃতি দেখে। তাই আরো বলছিল, ‘ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সেই টেনশন কমানোর বদলে হাইকমিশনের ঘটনার দায় অস্বীকার করা; এমনকি এসএসবির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ন্যূনতমভাবেও এটাই বলতে পারেনি যে, আমরা ব্যাপারটা আরো খুঁজে বা যাচাই করে দেখব। অ্যাম্বাসি অফিসিয়ালদের এমন আচরণ যদি চলতে থাকে তবে নেপালে ভারতের দীর্ঘ পণ্য অবরোধে ইতোমধ্যেই (২০১৫ সালে) দাগ লেগে থাকা নেপাল-ভারত সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটবে। এ সবের ফলাফলে ভারতবিরোধী যে জ্বর এখন নেপালে বয়ে যাচ্ছে, তা দিয়ে নেপালে ভারতের কোন স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল। এভাবে ভারত প্রসঙ্গে আমাদের মুখ যদি এত তেতো হয়ে যায়, তাতে স্বভাবতই এর প্রতিফল হিসেবে জনগণের ভেতর থেকে একটা চাপ প্রবল হতে থাকবে যে, চীনের সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করো। স্বভাবতই এটা ভারতের জন্য সবচেয়ে বাজে এক ব্যাপারে হবে। সেজন্য নেপালের পাবলিক সেন্টিমেন্টের বিষয়ে আরো সেনসিটিভ হতে নেপালে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আহ্বান জানাই। নেপাল-ভারত সম্পর্ক ইতোমধ্যে অনেক জটিল হয়ে গেছে, একে আর জটিল করবেন না।’
ভারতের সাথে নেপালের সীমান্তবিরোধ কী করে মোকাবেলা করতে হয়- তা সবার জানা-বোঝার জন্য নেপালের জনগণ এখানে কিছু শিক্ষা রেখে গেল।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ০৯ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
গৌতম দাস
২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

http://wp.me/p1sCvy-1Jc

 

 

নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]

 

নেপালে আবার নড়াচড়া

নেপালে আবার নড়াচড়া
গৌতম দাস
১৭ মে ২০১৬,  মঙ্গলবার
http://wp.me/p1sCvy-1bK

ভারতের সাথে তার সব পড়শি রাষ্ট্রের সম্পর্কই নানান রকম খটমট ও সঙ্ঘাতে পরিপূর্ণ। ব্যতিক্রম বা ভারতেরই ভাষায় ‘সফলতা’, কেবল বাংলাদেশে। গত সপ্তাহে ৯ মে নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারির সরকারিভাবে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা হওয়ার কথা ছিল ভারতের রাষ্ট্রপতির অতিথি হিসেবে তাঁর ভারত সফর। কিন্তু সফরের মাত্র দুই দিন আগে ৬ মে নেপাল থেকে সরকারিভাবে জানানো হয় যে, নেপালের রাষ্ট্রপতি এই সফর বাতিল করেছেন। এই খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। কিন্তু খবরটার গুরুত্ব ছিল আরো কয়েক গুণ বেশি। কারণ একটা বাড়তি খবরও সাথে ছিল, নেপাল সরকার ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদূত দীপ কুমার উপাধ্যায়কেও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কূটনীতিতে ‘প্রত্যাহার’ শব্দটির বিশেষ অর্থ আছে। অর্থাৎ প্রত্যাহার বা recall এই শব্দটি কী কী অর্থ নিশ্চিত করে আর কী কী করে না, তা সুনির্দিষ্ট থাকে। যেমন নিশ্চিত অর্থ হল, তার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে  ঐ রাষ্ট্রদুতকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এরপর, কেন বলা হয়েছে এর কারণের দিক থেকে এর আবার দুটো মানে হতে পারে- এক. ঐ রাষ্ট্রদূতকে চাকরিচ্যুত বা দায়িত্বচ্যুত করা হয়েছে। অথবা দুই. কেবল ওই দেশ থেকে রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে কিন্তু তাঁর চাকরি বহাল আছে। ফলে এরপর অন্য কোথাও তাঁকে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু নেপালের রাষ্ট্রদূতের বেলায় তার প্রত্যাহারের কারণও মিডিয়ায় উল্লিখিত হতে থাকে। আর কারণটা সরকার নিজে মিডিয়ায় প্রচার করতে না চাইলেও মিডিয়া নিশ্চিত করছে যে নেপালি সরকার রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত হিসেবে অভিযোগ তিনটার: প্রথমটাই বড় সাঙ্ঘাতিক, কাটমান্ডুতে থাকার সময় চলতি প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির (K P Sharma OLI অথবা K P OLI নামে তিনি বেশি পরিচিত) সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় অভিযোগ, দিল্লিতে বসে অফিস চালিয়েছেন এমনভাবে যে সেখানে তিনি কী করছেন কিভাবে করছেন তা নিজ দেশে তার কাজের হিসাব নেয়া রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানানো। আর তৃতীয় অভিযোগ, ভারতের রাষ্ট্রদূত রণজিত রায়ের (Ranjit Rae) সাথে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত সফরে গিয়েছেন অথচ দেশের নিজ মন্ত্রণালয়কে কিছুই জানাননি। অনুমান করা যায়, মূল অভিযোগ আসলে শেষেরটাই। আর সেটা করতে গিয়ে প্রথম দু’টি অভিযোগ তৈরির অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।

আসলে গত ৬ মে ছিল নেপালের জন্য ঘটনাবহুল দিন। সেটা শুধু রাষ্ট্রপতির সফর বাতিল আর ভারত থেকে নেপালি রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাহারে ঘটনার কারণে নয়। এ দুটো যদি দেশের বাইরের ঘটনা বলি তবে ঐদিনের বাকি ঘটনাবলি ছিল অভ্যন্তরীণ। এর আগের দিন মানে, ৫ মে অলি সরকারের অন্য পার্টনার দল হল নেপাল মাওবাদী পার্টি, যার সমর্থনে (কিন্তু তারা সরকারে অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছে) অলির সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে সেই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ড মিডিয়ায় জানিয়ে দিয়েছিলেন তার দল ওলি সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। তবে এও জানিয়েছিলেন ঐদিনের সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর মিটিং আছে। পরের দিন ৬ মে প্রচন্ড জানান, তিনি আপাতত সমর্থন প্রত্যাহার করছেন না; বরং এপ্রসঙ্গে নয় দফা দাবিতে তাদের সমঝোতা হয়েছে। ফলে সরকার আগের মতোই থাকছে।
এরপর ঘটনাবলী নিয়ে আরো কিছু বর্ণনায় যাওয়ার আগে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনের পটভূমি সংক্ষেপে বলে নেয়া ভালো হবে যাতে এখনকার অবস্থা বুঝতে সুবিধা হয়।
সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনের ফল অনুসারে নেপালের মোট ৬০১ আসনের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রধান তিন দলের মোট আসন সংখ্যা, এরা প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা ৪৫১ আসন দখল করে আছে। কিন্তু কেউই নিরঙ্কুশ বা অর্ধেকের বেশি ৩০১ আসন পায়নি বলে, কেউ একক সরকার গঠনে সক্ষম নয়। আর আসনসংখ্যা অনুসারে ওপরের প্রথম দল নেপালি কংগ্রেস (১৯৬ আসন), দ্বিতীয় (চলতি প্রধানমন্ত্রীর) নেপালি কমিউনিস্ট ইউএমএল (১৭৫ আসন) আর তৃতীয় মাওবাদী কমিউনিস্ট (৮০ আসন)। বিগত রাজতান্ত্রিক সরকার উচ্ছেদ করার পরে নেপালে প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের স্থাপন করার ক্ষেত্রে সোচ্চার মূলত মাওবাদীরা হলেও এদের সাথে অপর দুই দলও ছিল। ফলে এই তিন দল সে সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা ছিল দ্বিতীয় প্রচেষ্টার নির্বাচনী ফলাফল। কারণ প্রথম প্রচেষ্টা ফেল করেছিল। আর এই তিন দলের আসন সংখ্যা মোট করে দেখানোর কারণ হল, ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর এই তিনটা দলই ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। খুব সম্ভবত এই তিন দলের মধ্যে ভারত প্রসঙ্গে কমন কিছু অবস্থান আছে, যা ইনফরমাল এবং অপ্রকাশ্য। এটাই ভারত থেকে চরমভাবে এই তিন দলকে দূরে নিয়ে যায় আবার এটাই তাদের পরস্পরের মধ্যে বন্ধনের হেতু, ও ভিত্তি।
আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের (মে ২০০৮) পরে, প্রথমবারের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টায় নির্বাচিত সরকার গঠনের পর থেকে ভারতের সাথে এক এক করে প্রধান তিনটি দলেরই সঙ্ঘাতময় সম্পর্ক হয়ে যায়। অথচ রাজতন্ত্র উচ্ছেদে রাজনৈতিক পরিকল্পনার শুরুর সময় থেকে ভারতের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। সেসময় আমেরিকানদের কূটনীতির সহযোগী অবস্থান ছিল খুবই নির্ধারক। ফলে আমেরিকার সাথে সমন্বিত ভারতের সে ভূমিকা ছিল গঠনমূলক। কিন্তু রাজতন্ত্র উচ্ছেদ উতখাতের পর তৎকালীন প্রথম অন্তর্বর্তি নির্বাচিত সরকার ছিল মাওবাদীদের সরকার। আর ভারত ক্রমেই কাজের ও স্বার্থের দিক থেকে গড়ে ওঠা এতদিনের ভালো সম্পর্ককে প্রথমে মাওবাদী সরকারের সাথে ও পরে অন্য দুই পার্টির সাথে ক্রমেই আস্থা হারিয়ে তিক্ত করে ফেলেছিল। ফলে মাওবাদী সরকার সংবিধান রচনা সম্পন্ন হয়েছে, এ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়। বলা যায়, তিন পার্টির সাথে সম্পর্ক হারিয়ে, ‘কনষ্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছে’ এই ঘোষণা ঠেকিয়ে দেয়াকেই ভারত নিজের সাফল্য মনে করেছিল। ভারত নেপালের প্রধান এই তিনটি দলকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ লক্ষ্যণীয়, ভারতের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সেখানে ছিল না। সংক্ষেপে কয়েক বাক্যে এর কারণ চিহ্নিত করলে বলতে হবে- ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই নেহরুর হাতে যে ভারত হাজির হয়েছিল, তাতে পড়শিনীতি বা বিদেশনীতির মৌলিক কিছু জন্মত্রুটি ছিল। যেমন নেহরু যেন মনে করতেন, পড়শি বা বিদেশনীতি মানেই বিগত ব্রিটিশ কলোনির বিদেশনীতিই। কথাটা এভাবে বলার পিছনের কারণ হল, মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পঞ্চাশের দশক ছিল দুনিয়া ব্যাপী “উপনিবেশ মুক্তির” যুগ। [কিন্তু খুব সতর্কভাবে ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার  মানে বুঝতে হবে।  এসম্পর্কে বাড়তি বিস্তারিত কিছু কথা আলাদা করে নিচে সবশেষের কয়েক প্যারায় আনা হয়েছে।  আগ্রহীরা এসম্পর্কে বিস্তারিত সেখানে পড়তে পারেন।] নেহেরুর চোখে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ উপনিবেশকালীন রূপ – ‘প্রভু-দাস’ এই রূপেরই ধারাবাহিকতা। এরই ছাপ আমরা দেখি নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তিতে। সেই থেকে ভারতের পড়শি বা বিদেশ নীতি এই আলোকে সাজানো হয়ে আছে। মানে জবরদস্তি, চাপ খাটানো, অন্যের সার্বভৌমত্বকে সম্মানের কোনো বিষয় সেখানে রাখার দরকার কী এমন ভাবনায় পরিচালিত এক অবস্থা! অথচ উপনিবেশ-উত্তর সে যুগে উপনিবেশ মুক্তিই বা পড়শির সাবভৌমত্বকে সম্মান করার বিষয় তখন স্পষ্ট প্রধান বিষয় হয়েছিল। এসব পালনীয় শেষ করে বা সুরক্ষিত রেখেও ভারত পড়শি দেশসহ যেকোন দেশে বিদেশ নীতি পরিচালনা করা সম্ভব করতে পারত। ভারতের জনসংখ্যা বড় মানে অর্থনীতিও বড়। এছাড়া ভারত ভাগ হয়েছে বটে কিন্তু কলোনিয়াল শাসনকালের মাখনটা মূল ভারত ভুখন্ডেই থেকে গিয়েছে। পরবর্তিতে আজ পর্যন্ত একটা ভাল রকমের পুজিতান্ত্রিক বিকাশ এই ভারতে ঘটে গিয়েছে। এই অগ্রসর অবস্থার কারণে পড়শী যেকোন দেশের সাথে ভারতের পণ্য বাণিজ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেয়ার এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক হলেও সেখানে পড়ে পাওয়া ভাবে ঐ বিনিময়ের ভারসাম্য ভারতের পক্ষেই থাকবে। ফলে এক দেয়ানেয়ার ফেয়ারনেস-ন্যায্যতা বজায় রাখলেও সেই অর্জন ভারতের জন্য যথেষ্ট। অথচ প্রজাতান্ত্রিক ভারতের জন্মের পরে সত্তর বছর পেরিয়ে একুশ শতকে এসেও ভারতের বিদেশনীতির পুরনো তরিকাকেই আছে আর একেই তার নীতি ও সাফল্যের কাঠি মনে করে যাচ্ছে। ল্যান্ডলকড কোনো কিছু শর্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রেরও পড়শির সমুদ্রবন্দরের প্রবেশ ও ব্যবহারের অধিকার আছে- জাতিসঙ্ঘের এমন আইন কনভেনশন যখন প্রণীত হতে যাচ্ছে তখন এই আমলে ল্যান্ডলকড নেপালকে প্যাঁচে ফেলে তার সাথে কলোনি-দাসের মতো আচরণ করতে চাইলে পালটা ঝাপ্টা তো খেতেই হবে।
নেপালের জনগণ নিজ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে একে উচ্ছেদ করেছে। সে কাজে ভারতের সাহায্য পেয়েছে, কিন্তু সেটা ফিরে আবার ভারতের কলোনি হওয়ার জন্য নয় নিশ্চয়ই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভুল নীতিতে পরিচালনের কারণে নেপালের প্রধান তিনটি দলই এর পর থেকে ভারতের প্রভাবের একেবারে বাইরে চলে গেছে। ভুল বিদেশনীতিতে সব হারিয়ে উপায়হীন হয়ে ভারত এর পর থেকে মাধেশি ও জনজাতির জনগোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে নিজের শক্তি দেখাতে গিয়েছে। ফলে একদিকে সরকারসহ তিন নেপালি দল আর অন্যদিকে ভারত – এরকম পক্ষাপক্ষিতে পরস্পরের প্রতি শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা হলো গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ – ওই তিন দলের নেপালের সংবিধান রচনা সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে বসা। আর তা প্রতিরোধে ভারত নিজের সীমান্ত শুল্ক বিভাগ আর সাথে মাধেশি অঞ্চলের ছোট দলের মাধ্যমে ভারত থেকে ল্যান্ডলকড নেপাল অভিমুখে পণ্য চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। যদিও মুখে তা স্বীকার করে নাই। এখানে প্রথমত যে প্রশ্নটা ওঠে, নেপালের সংবিধান ঘোষণাতে এর বিরুদ্ধে ভারতের কী বলার আছে! ভারত ভিন রাষ্ট্র, তার কী বলার থাকে না থাকতের পারে? ভারত কী নেপালের মাধোশি বা জনজাতি জনগোষ্ঠিগুলোর প্রতিনিধি? নাকি ভারত ভিন রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিনিধি হবার কোন সুযোগ সেখানে আছে?  এভাবে আজিব প্রতিনিধি সাজার চেষ্টা এটাই তো ভারতের জন্য বিপদজনক। বাজে উদাহরণ নয় কী? ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও আমলারা নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকতে এন অবস্থার সৃষ্টি করেছে।  কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন গৃহিত হবার ঘোষণার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারে সে দেশেরই কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠী। পড়শির আপত্তি করার বিষয়ই নয় এটা। লিগ্যাল এই পয়েন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখান থেকেই পড়শির ওপর হস্তক্ষেপের জেনুউন অভিযোগ উঠে আসে। এটা সম্ভবত দুনিয়ায় প্রথম উদাহরণ এবং ভারতের দিক থেকেও খুবই বাজে উদাহরণ। কারণ এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়িয়ে সেই পড়শি রাষ্ট্রের  বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার পথ দেখিয়ে রাখল ভারত। অথচ বিষয়টা এত জটিল ছিল না। একটা স্থিতিশীল নেপালের জন্য অথবা অন্য কোনো যুক্তিতে ভারতের নিজ স্বার্থের দিক থেকে উদ্বেগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ভঙ্গী খুব গুরুত্বপুর্ণ। ভারতকে সেটা প্রকাশ করতে গেলে অবশ্যই ন্যুনতম পড়শির সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করেই তা হতে হবে এবং তা করা সম্ভবও। সে লক্ষ্যে ভারত পড়শি সরকার বা দল্গুলোকে লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু এটা যে প্রচেষ্টা করা হয়েছে তা খুবই নিকৃষ্ট। আসলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাতে সাহায্য সহযোগিতা করার সময় থেকেই ভারত নিজেরও স্বার্থগুলো স্পষ্ট করে এই প্রধান তিন দলের মধ্যে বুঝিয়ে রাজি করার উদ্যোগ নিতে পারত। যেটাকে আমরা পারশু (pursue) বা লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা বলি। কিন্তু ভুল বিদেশনীতি, ভুয়া আত্মগরিমা, নকল উপনিবেশী ভ্যানিটি ভারতকে সে পথে যেতে দেয়নি। এই ভুলের মূল্যায়ন ভারতের ভেতর থেকেই একদিন উঠে আসবে। কারণ তবেই ভারতের সামনে আগানোর বাধা সরাতে সক্ষম হবে।
এমনিতেই টানা সাড়ে চার মাস ধরে চলা নেপালের সাথে পণ্য চলাচলে অবরোধের ফলাফলও শেষ বিচারে ভারতের বিপক্ষে গেছে। উদ্দেশ্য ছিল নেপালি জনগণকে শাস্তি দেয়া। কিন্তু ভারতের শাস্তিও কম হয় নাই। এই সাড়ে চার মাস আসলে যেন উভয় পক্ষের কার কত দূর সহ্যক্ষমতা তারই পরীক্ষা চলেছে। পরিশেষে এতে নেপালের দিক থেকে দেখলে তার বিজয়ের দিকটি হল, নেপালের জনগণের কাছে এত দিন যেটা অকল্পনীয় মনে হয়েছিল যে ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া তাদের অন্যভাবে অন্য কোন দিক দিয়ে বাইরের দুনিয়ায় বের হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু ভয়াবহ ঐ নিরুপায় পরিস্থিতিই অপর পড়শি চীনের ভেতর দিয়ে বের হওয়ার বিকল্প উপায় অবরোধের এই দুর্যোগের সময়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অলি চীনের সাথে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলেছেন। নানান সুবিধাজনক স্পটে ৯টা রেল ও সড়কপথ হবে বের হবার পথ। আর এরই লক্ষ্যে সার্বিক পরিকল্পনা, ভায়াবিলিটি স্টাডি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ভারতের মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, একবার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে গেলে সেই নেপালকে আর কোনো কথাই শুনানো ভারতের পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং এত দিন ভারতের দাবড়ে মুখচাপা দিয়ে রাখা আচরণের বিরুদ্ধে সব অর্গল খুলে ওই নেপালি জনগণ যা করার তাই করবে। বলা বাহুল্য সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানগত। ওদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে নতুন রেল ও সড়কপথে ব্যয় শুরুতে কিছুটা বেশি হলেও এক দিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাম চুকানোর স্বার্থে আশা করা যায় নেপালের জনগণ তা বইতে রাজি হবে। আর এতে ক্রমেই আরো বাড়তি উৎপাদন ও চলাচল বেড়ে যাওয়ার মুখে আস্তে আস্তে ব্যয়ও কমে আসতে শুরু করবে। তবে এখান থেকে এমন মনে করা ভুল হবে যে চীন এটাকে পড়ে পাওয়া ফায়দা হিসেবে দেখবে কি না। এ প্রসঙ্গে চীন অনেক আগেই পরিষ্কার করে রেখেছে। এশিয়ার অর্থনৈতিক পড়শি শক্তি হিসেবে ট্র্যাডিশনালি বা নিজ যোগ্যতায় যেসব বাজার বা সম্পর্ক সুবিধা তার আছে এর শেয়ার ভারতকে দেয়া চীন নিজের বৃহত্তর স্বার্থের দিক থেকে করণীয় মনে করে। কারণ সে জানে ও মানে দুনিয়াতে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কায়েমের ক্ষেত্রে ভারত তার সঙ্গী। নতুন অর্ডার তৈরির ক্ষেত্রে চলতি নেতা আমেরিকা হবে অতীত নেতা আর ভারত হবে আগামী সহযোগী। ভারত সেসবের পক্ষে নিজের ভূমিকা বুঝে এগিয়ে আসার আগেই চীন ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে নিজ আমন্ত্রণের মনোভাব স্পষ্ট করে রাখতে চায়।
যেমন নেপালের আমদানি তেলের চাহিদার মাত্র ১৩ ভাগ চীন থেকে আসার চুক্তি হয়েছে। এখন বাকিটা নির্ভর করে ভারতের ওপর। ভারত যদি অবরোধ-সম্পর্কের পথেই থাকতে চায়, তবে এই ভাগের হার শতভাগ হওয়ার দিকে যাওয়া ছাড়া যে উপায় থাকবে না তা বলাই বাহুল্য।
ইতোমধ্যে ভারত আরেক হুমকি তৈরির চেষ্টা করেছে। ভারতের ভাষায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। বিগত মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি পরিচালনার সময়ের পুরনো মানবাধিকার ভঙ্গের মামলা, এ ছাড়া একালে সাড়ে চার মাসের অবরোধের সময় মাধেশি জনগোষ্ঠীর অনেকে আহত, নিহত হয়েছেন। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ বা ইউপিআরের মুখোমুখি হতে হয়। গত বছরের শেষে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নেপাল প্রসঙ্গের সভায় ভারত ওপরের উল্লেখ করার দুই ইস্যুতে আপত্তি দায়ের করে। যাতে সরকার ও মাওবাদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ এখানেও ভারত একইভাবে নিজের বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো দেশের অভিযোগের আঙুল উঠানোর রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। যেমন সেই অভিযোগ হতে পারে ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মির ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত। এটা ভারতও জানে। ফলে ভারতের এক মিডিয়া জানাচ্ছে ইউপিআর ইস্যু নিয়ে বেশি দূর যেতে ভারতের ইচ্ছা নেই।
কিন্তু তবু এই পদক্ষেপের কথা ভেবেই মাওবাদী দলনেতা প্রচন্দ অলির ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন গত ৫ মে, নতুন কিছু পালটা পদক্ষেপে নিতে চেয়েছিলেন। তার প্রস্তাব ছিল, এই তিন দলের সমন্বয়ে একটা সর্বসম্মতির সরকার হোক যাতে সম্মিলিত কৌশলে ভারতের যেকোনো সিদ্ধান্ত মোকাবেলা করতে পারে। আর যদি তা না করা যায়, সবাই রাজি না হয়, সে ক্ষেত্রে নেপাল কংগ্রেস দলের সমর্থনে সে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে সরকার গড়তে চায়। এমন সিদ্ধান্তের কারণ, অলি সরকারের ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। যার মূল কারণ সরকারের অদক্ষতা বা নন-পারফরম্যান্স। আর সবচেয়ে বড় হলো, এখন অবরোধ উঠে গেলেও জ্বালানি তেল, চিনি ইত্যাদি এজাতীয় জিনিসের দাম কমেনি। ব্যাপক চোরাচালানি মজুদদারি কারবার চলছে সরকার ও দলের প্রশ্রয়ে। ফলে কোনো পদক্ষেপ ছাড়া ওলির হাতে সরকার ছেড়ে রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না মাওবাদী নেতা প্রচন্দ। এতে গত ৬ মে নেপাল ঘটনাবহুল হওয়ার পেছনে ভারতের চাপ সামলানোর নতুন কৌশল ও পদক্ষেপ হিসেবে কী করা যায়, এর অংশ মনে করা যেতে পারে। আর এ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়ার ব্যাখ্যা হলো, অলি সরকার এসব ঘটনায় ভারতকে দায়ী করে নিজ জনগণের কাছে দেখাতেই নেপালের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর আচমকা বাতিল করায়। এতে নিজ সরকারের ব্যর্থতার অনেক কিছুই আড়াল করার কিছু সুযোগ পেতে পারেন, এটাও ভেবে থাকতে পারেন।

[ওদিকে ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার পর্ব খুবই খারাপভাবে শেষ হয়। রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের আদেশ মানতে অস্বীকার করেন। ফলে স্বভাবতই অলি সরকার তাঁকে বরখাস্ত করেন এবং ভারত সরকারকে নোটিফাই করেন। পরে এই ঘটনা আর এক মোড় নেয়। কূটনৈতিক পাড়ায় খবর উঠতে থাকে৪ যে এই ইস্যুতে নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদুত রণজিত রাওকে নেপালে “পারশন নন গ্রাটা” বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। কোন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে হোস্ট দেশ কোন ক্রিমিনাল চার্জ আনার সুযোগ নাই জেনেভা কনভেন অনুসারে। তিনি যে অপরাধই করেন না কেন। এর বদলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা হল ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা। যার বাস্তব ফলাফল ঐ দেশ থেকে বের করে দেয়া। এই প্রচার তুঙ্গে উঠার এক পর্যায়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতি দিতে এই জল্পনাকল্পনা নাকচ করেন।]

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা গতকাল ১৬ মে অনলাইনে (আজ প্রিন্টে ) দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আবার নানা সংযোজনে ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

ফুটনোটঃ
‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার অর্থ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা ইউরোপের ইতিহাস আমরা বৃটিশদের চোখ দিয়ে পড়েছি ও জানি।  ফলে ঐ যুদ্ধে “আর কখনও কলোনি করব না” আমেরিকাকে দেয়া বৃ্টিশদের এই দাসখতের কথা আমাদের জানা হয় নাই। এই যুদ্ধ সম্পর্কে এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস বৃটিশ বয়ান এডিয়া গিয়েছে। সোজা কথায় বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার কৃতীত্ব হল সে সারা ইউরোপের কলোনি প্রভুদের কাছ থেকে কলোনি আর না করার দাসঅখত লিখায় নিয়েছে। আর সারা দুনিয়াকে এক ‘উপনিবেশ মুক্ত দুনিয়া’ উপহার দেবার রাস্তা খুলে দিয়েছে।  অনেকের কাছে এটা অবাক লাগতে পারে। তারা “আটলান্টা চার্টার” পড়ে দেখতে পারেন, যেটা আসলে কলোনি প্রভুদের আমেরিকাকে দেয়া দাসখত। আর আমাদের সৌভাগ্য যে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীট বুঝেছিল দুনিয়া থেকে উপনিবেশ তুলে দেয়াই তার স্বার্থ, ক্যাপিটালিজম আরও গ্লোবাল ও  বিকাশিত হয়ে উঠার পুর্বশর্ত। ফলে হিটলারের হাত থেকে আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত কলোনি প্রভু-শিরোমনি বৃটিশসহ ইউরোপকে  বাচাতে আমেরিকা এগিয়ের আসার পুর্বশর্ত হিসাবে এই দাসখত স্বাক্ষর করিয়ে নেবার সুযোগ নিয়েছিল।
কিন্তু আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য সেসব কথার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুই যে জওহরলাল নেহেরুও দুনিয়া থেকে উপনিবেশ উঠে যাবার উপরে উল্লেখিত দিকটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ছিলেন না। তাঁর বিচারে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ কেবল একটাই, মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু ও দাস এর বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না।  নেপালের সাথে পুরানা বৃটিশ-নেপাল ১৯২৬ সালের চুক্তির আদলে করা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তি করা এই সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। নেহেরু ধরতেই পারেন নাই আটলান্টা চার্টার চুক্তি কেমন আগামি দুনিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।  ফলে এখন থেকে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ আর কেবল কলোনি মাস্টারের প্রভু-দাস রূপ ছাড়াও অন্যরূপে বিকশিত হবার শর্ত তৈরি হয়েছে।  এবসলিউট অর্থে নয় তবে এটা তুলনামূলক অর্থে আগের সরাসরি উপনিবেশ রূপের চেয়ে লিবারেল রূপ সম্পর্ক আকারে হাজির হবে।

১. ল্যাণ্ড-লকড নেপালঃ অতীত ও বর্তমানের ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা

১. ল্যাণ্ড-লকড নেপালঃ অতীত ও বর্তমানের ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা
 গৌতম দাস

 [এখানে তুলে আনা আমারই লেখা  আগে ১১ অক্টোবর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায়। এখানে হুবহু কাট পেস্ট করে তুলে আনা হয়েছে – কপি সংরক্ষণের জন্য আর আমার এখানের পাঠকদেরকেও জানানোর জন্য। ]

নেপালি জনগণের নতুন গঠতন্ত্র প্রণয়ন এবং গঠনতান্ত্রিক সভায় তা অনুমোদন ও গ্রহণ নেপালের প্রতি বাংলাদেশে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নেপালের জনগণ সম্পর্কে জানা এবং বোঝা বাংলাদেশের জন্য জরুরী। লেখা কোথা থেকে শুরু করতে হবে সে এক জটিল বিষয়। নেপাল প্রসঙ্গের ডাইমেনশন অনেক। অনেক দিক থেকে প্রসঙ্গ তুলে কথা বলতে হবে। আবার সব মিলিয়ে এক সামগ্রিক অর্থপুর্ণ চিত্র সাজিয়ে তোলা দরকার। কোন বিষয়ের পরে কোন বিষয় কতোটুকু আসবে সেটাও গুরুত্বপুর্ণ। সেসব নিয়ে তথ্য জোগাড় করা, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্তে আসা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সর্বোপরি কিভাবে আনলে তা সহজে বাংলাদেশের পাঠকের বোধগম্যতায় আনা যাবে সেই বিষয়েও ভাবনার দরকার আছে। নেপাল নিয়ে বিভিন্ন বিষয় ধরে ধরে আলোচনা এখানে আলাদা আলাদা কিস্তি হিসাবে পেশ করা হচ্ছে।

নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সরাসরি তার ভূগোল অর্থাৎ ল্যান্ডলক হবার সঙ্গে জড়িত। ল্যান্ড-লকড হবার কারনেই নেপাল পড়শি রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে এক প্রকার অদৃশ্য অথচ ব্যবহারিক-বাস্তবিক অর্থেই কলোনী বা ঔপনিবেশিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। নেপালের জনগণের লড়াই সে কারণে নেপালের ভৌগলিক অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত ঔপনিবেশিক সম্পর্ক থেকে মুক্তির লড়াই — অসম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে চাওয়ার আদর্শ উদাহরণ।

জাতিসংঘের অধীনে এমন রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন প্রণয়ন ও কর্মসুচী গ্রহণের উদ্যোগ চলছে। জাতিসংঘের আঙ্কটার্ড এর অধীনে নিবন্ধিত এমন ল্যান্ডলক রাষ্ট্রের সংখ্যা ৩১ টা। আঙ্কটার্ডের অধীনে ২০১৪-২৪ সালের মধ্যে অর্জন করতে হবে এমন কিছু প্রোগ্রাম আছে। নেপাল ইতোমধ্যেই ঐ কর্মসুচী নেপালে বাস্তবায়নের দাবী তুলেছে, আন্তর্জাতিক সংগঠনের দৃষ্ট আকর্ষণ করেছে।

নেপাল ও ভারতের বিরোধ বৃটিশ কলোনী মাস্টার ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকে। আর এর উৎস হচ্ছে নেপাল ‘ল্যান্ডলক’। ভূমিবেষ্টিত। ফলে অন্য দেশের ভিতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া সরাসরি সমুদ্রে বা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের কোন উপায় তার নাই। তাই ল্যান্ড লক কথাটার সহজ অর্থ হচ্ছে যে দেশের সমুদ্র বন্দর নাই। এই বাস্তবতায় থেকে মুক্তি চাওয়া থেকেই ভারতের সঙ্গে নেপালের সংঘাতের সূত্রপাত। ভূগোল কিভাবে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের নির্ণায়ক হয়ে ওঠে নেপাল তার ভাল একটি নজির। ফলে ভারত যতই অসংখ্য রাজার রাষ্ট্রের বদলে সংগঠিত একক কোন কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে বড় রাষ্ট্র হয়ে হাজির হয়েছে ততই সেই একক ভারত নেপালকে ল্যান্ডলক দেশ হিসাবে হাজির করেছে। আর নেপালকে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে দেবার বিনিময়ে নিজের ‘করদ’ রাজ্যে পরিণত করে রাখার সুযোগ বেড়েছে, বা রাখা সহজ হয়েছে। মোগল আমলে অবশ্য এমন সমস্যার কথা জানা যায় না।

ভারত ১৭৫৭ সালে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে দখল ও গোলাম হয়ে যাবার পর থেকে এর প্রভাব নেপালের উপর হয় মারাত্মক। নেপাল ও বৃটিশদের (ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর) যুদ্ধ যা এংলো-নেপালিজ যুদ্ধ নামে খ্যাত তা চলেছিল ১৮১৪-১৬ সাল, দুবছর ধরে। যুদ্ধের ফলাফল কোম্পানীর পক্ষে যায়। ফলে এই যুদ্ধ শেষে বাস্তবে করদ রাজ্যের মত বৃটিশদের সাথে চুক্তির কিছু শর্ত সাপেক্ষে নেপালকে সীমিত স্বাধীনতা মেনে নিতে হয়। এই চুক্তির নাম সুগৌলি চুক্তি ১৮১৬ (Treaty of Sugauli)। এটা নেপালকে “ভাগ করে নেয়ার চুক্তি” বলেও পরিচিত। কারণ ঐ চুক্তি অনুসারে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নেপালের ভুমি — বিশেষত যেগুলো কোম্পানীর চোখে ষ্ট্রাট্রজিক গুরুত্বসম্পন্ন বলে মনে করা হয়েছিল সে ভুমিগুলো বৃটিশ-ভারতের সাথে রেখে দেওয়া হয়। যেমন দার্জিলিং, সিকিম, পুরানা কুমাউন রাজত্ব, গোড়য়াল রাজত্ব, আজকের উত্তর ভারতের মিথিলা, নৈনিতাল এবং আজকের নেপালের হটস্পট দক্ষিণে সমতলী তরাই এলাকার বেশীর ভাগ অংশ – নেপালের এইসব এলাকা।

Sanguli

এছাড়া নেপালের গোর্খা অঞ্চল থেকে কোম্পানী নিজের সেনাবাহিনীর জন্য অবাধে জনবল সংগ্রহ করতে পারবে, কোম্পানী ছাড়া আর কোন পশ্চিমা নাগরিকের নেপালে আনাগোনা্র উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় – এগুলো শর্তও ছিল।

বৃটিশ কোম্পানীর প্রবল ক্ষমতা ও আধিপত্যের মুখে নেপালের রাজা তোষামোদীর ছলে বৃটিশ নীতি সমর্থন করে তাদের খুশি করার বিনিময়ে নিজের কাজ উদ্ধার করার রাস্তা ধরেছিল। ফলে পরবর্তিতে ১৮৫৭ সালে বৃটিশ-ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের সময় নেপালের রাজা কোম্পানীর পক্ষে অবস্থান নেয়। বিদ্রোহ দমন শেষে এতে খুশি হয়ে বৃটিশ কোম্পানী (ততদিনেবৃটিশ-রাজ শাসক সরাসরি কোম্পানী অধিগ্রহণ করে নেয়) নেপালের পুরা এক তৃতীয়াংশ ফেরত নেয়, তবে ব্যাঙ্কে, বারদিয়া, কাইলালি, কাঞ্চনপুর এসব আগের নেপালের জেলা ও এভাবে তড়াই সহ কিছু অঞ্চল নেপালী রাজাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তা সত্ত্বেও সিকিম এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

এভাবে পরবর্তিতে ১৯২১ সালে আরও কিছু ছাড় আদায়ের পরিস্থিতির উদয় হয়। মূলত সেটা ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ সরকারকে নেপালের রাজার দেয়া সমর্থন ও সার্ভিসের কারণে। ফলশ্রুতিতে ১৯২৩ সালে “নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯২৩” স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি আগের সুগৌলি চুক্তিকে প্রতিস্থাপিত অর্থে বাতিল করছে বলে লেখা হয়েছিল। সাত দফার এই চুক্তিতে প্রথমেই নেপালকে স্বাধীন দেশ বলে মেনে নেওয়া হয়। বৃটিশদের সাথে আগের সমস্ত চুক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। অর্থাৎ এখন থেকে একমাত্র চুক্তির বাঁধন ১৯২৩ সালের চুক্তি। এর দ্বিতীয় দফা বলছে, বৃটিশ-ভারতের স্বার্থহানি ঘটে এমন অবস্থা দেখা দিলে তা আগাম বৃটিশদেরকে নেপাল জানাবে যাতে এথেকে কোন সংঘাত বা ভুল বুঝাবুঝি তৈরি না হয়। একে অপরের নিরাপত্তার দিক খেয়াল রেখে অন্যের ভুমি ব্যবহার করবে। অর্থাৎ নেপালের আলাদা স্বাধীন কোন নিরাপত্তা নীতি থাকতে পারবে না। নেপাল ভারতের ভিতর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ যে কোন মালামাল আমদানী করতে পারবে – যতক্ষণ বৃটিশ-ভারত মনে করবে নেপালের আচরণ বন্ধুত্বপুর্ণ এবং ভারতের জন্য তা হুমকি নয়। মালামাল আমদানিতে ভারতের বন্দর ব্যবহারের সময় ভারত সরকার আবার এর উপর কোন শুল্ক আরোপ করবে না, অবাধে কেবল বন্দর ফি দিয়ে নেপাল যে কোন পণ্য আমদানি করতে পারবে। এই ছিল চুক্তির সারকথামূলক দিক।

অর্থাৎ ১৯২৩ সালের এই চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে ইতোমধ্যে বৃটিশ স্বার্থের পক্ষে সবসময় নেপালের রাজার অবস্থান নেয়া এবং সার্ভিস খেদমতে সন্তুষ্টি হবার পরই এবার ল্যান্ডলক নেপালের স্বার্থের ব্যাপারে কি করা যায় এটা এখানে এবারের চুক্তিতে মুখ্য হয়ে ভেসে উঠতে পেরেছে। এই চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হল – আগের দিনের করদ রাজ্য বা প্রিন্সলি ষ্ট্রেটের ধরণটা হত – প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় দুটাকেই বৃটিশ কলোনী মাস্টারের হাতে ছেড়ে দেওয়া; আর সাথে কিছু রাজস্ব শেয়ার করা। এই দুটো করলে তবেই বৃটিশ আমলে করদ রাজ্যের রাজা হয়ে থেকে যাওয়া যেত। কিন্তু ল্যান্ডলক নেপালের রাজার বেলায় বৃটিশরা যে ফর্মুলা অনুসরণ করেছিল তা হল, সাধারণভাবে “মাস্টারের সন্তুষ্টি” সাপেক্ষে রাজার দেশ সবই করতে পারবে। এভাবে বলার সুবিধা হল, অসন্তুষ্টির [এই আবছা অস্পষ্ট গ্রে এরিয়ার সুযোগে] কথা বলে যে কোন প্রদত্ত সুবিধাই যে কোন সময় প্রত্যাহার করে নেয়া যায়।

সামগ্রিকভাবে এভাবেই নেপাল বৃটিশ মুখাপেক্ষি থেকে যায়। অন্যদিকে আবার বৃটিশ-ভারতের ভুমি ব্যবহার করে নেপালের বাইরের সাথে সব ধরণের যোগাযোগের অধিকার বৃটিশ কলোনী মাস্টার নিজে একেবারে যেচে না চাইতেই চুক্তিতে উন্মুক্ত করে রেখেছিল। বৃটিশদের এতে সুবিধা হল, বিনিময়ে নেপালের সর্বত্র ভারতের বিচরণের সুযোগ অবধারিত হয়ে যায়। অথচ নেপালের দিক থেকে দেখলে ভারতে প্রবেশ এবং ব্যবহারের সব সুবিধা থাকা নেপালের রাষ্ট্রস্বার্থ হিসাবে জরুরি না হলেও এবং নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে অক্ষম হলেও তা তাকে নিয়েছি বলতে হচ্ছে। কিন্তু সমতুল্য সুযোগ ভারতকে দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে ভারতের একচেটিয়া বাজারে পরিণত হওয়া ছাড়া নেপালের আর কোন গতি থাকছে না।

দুনিয়ায় এখন জাতিসংঘ আছে, এই কালে কোন রাষ্ট্রকে কলোনী করে রাখা কোন দখলদারের পক্ষে খুব আরামের বা সুখকর অনুভুতি নয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্যাপারটা এমনকি ন্যায্য বলেও এক ধরণের সম্মতি পেতে দেখা যেত। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের কলোনী যুগের বিচারে ১৯২৩ সালের চুক্তিটা নেপালের আগের যে কোন চুক্তির চেয়ে্ তুলনায় কাম্য ছিল। কিন্তু এখনকার বিচারে এটা একেবারেই কাম্য নয়।

ঐ চুক্তিতে কবে এর কার্যকারিতা শেষ হবে এমন তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। বৃটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে চলে গেলে স্বভাবতই চুক্তির আইনী দায় এবং দায়িত্বের মালিক হয় নেহেরুর ভারত। কিন্তু নেহেরুর গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত নিজের জন্য কলোনীতন্ত্র উৎখাত হয়ে যাবার ষোল আনা সুবিধা নিলেন। কিন্তু নেপালের বেলায় সেটা হতে দিলেন না। নেপালের কলোনী মাস্টার হিসাবে বৃটিশের জায়গায় নেহেরুর ভারতকে বসিয়ে নিলেন। ফলে বৃটিশ কলোনী নেপালের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে যে নীতিগত দিক অনুসরণ করেছিল সবজায়গায় সেটাই হুবহু নীতি নেহেরুর ভারত অনুসরণ করেছিল। নেপালকে গণপ্রজাতন্ত্রী-ভারতের কলোনী করে রাখার কোন সুযোগ নেহেরু হারাতে চান নাই। তাই পুরাণ চুক্তির নীতিগত আদলে নতুন করে “১৯৫০ জুলাইতে ভারত-নেপাল তথাকথিত মৈত্রী ও বন্ধুত্ব চুক্তি” করা হয়। এবার চুক্তিতে দশটা পয়েন্ট। কিন্তু সার কথা হল একই – সন্তুষ্টি বা ভারতের নিরাপত্তার কথা তুলে নেপালকে ভারতের মুখাপেক্ষি করে রাখা। যেদিকটা মাথায় রেখে চুক্তির খসড়া করা হয়েছে তা হল, নেপালের কোন স্বাধীন পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা বা অর্থনীতি – এককথায় কোন স্বাধীন নীতিই যেন সম্ভব না হয়। নেপাল যেন ভারতের মুঠো থেকে বেরিয়ে না যায় – যেটা কলোনি আমলে করদ রাজ্যের বেলায় অনুসরণ করা হত। মোটাদাগে বললে, ১৯৫০ সালের চুক্তি পুরানা ১৯২৩ সালের চুক্তিরই প্রতিচ্ছবি। কেবল “বৃটিশ” এই শব্দের জায়গায় যেন ভারত বসানো। প্রথম পাঁচ দফাও প্রায় হুবহু এক। নেপাল বাইরে থেকে অস্ত্র ও যুদ্ধের মালামালসহ যেকোন মালামাল আনার অনুমতি প্রসঙ্গে পুরান চুক্তিতে বৃটিশ “সন্তুষ্টির” কথা বলা হয়েছিল। এখানে কায়দা করে বলা হয়েছে সবই আনতে পারবে। কিন্তু কি ব্যবস্থাপনায় তা আনতে পারবে তা চুক্তিতে স্পষ্ট বলা নাই। সে প্রসঙ্গে বলা হয়েছে সেটা চুক্তির বাইরে প্রত্যেক কেস ভিত্তিতে দুই দেশ বসে ঠিক করবে। অর্থাৎ এখানে এটা আরও অনিশ্চিত করে রাখা হয়েছে। কোন সাধারণ নীতি এখানে লিখিত না থাকায় সাধারণভাবে অনুসরণযোগ্য কোন নীতি না লিখে রাখার সুযোগ এখানে নেওয়া হয়েছে; ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি আগের চুক্তির বৃটিশ “সন্তুষ্টির” চেয়েও বড় বাপ হয়ে আছে।

অথচ মূল কথা হল, নেপালের মূলত দরকার সমুদ্র বন্দরে প্রবেশাধিকার এবং সে বন্দর থেকে নিজের ভুসীমান্ত পর্যন্ত সে মালামাল নিয়ে আসা বা পাঠানোর অধিকার। অথচ চুক্তিতে তাকে দেয়া হয়েছে – ভারতে বসবাস, সেখানে সম্পত্তি কেনা, ব্যবসা করা ইত্যাদির অবাধ অধিকার – এগুলো নেপাল চায় নাই, তার জন্য জরুরিও নয়। এগুলো নেপাল কাজে লাগাতে না পারলেও বা কাজে না লাগলেও নেপালকে দেয়া হয়েছে। ভ্রত চেয়েছে এগুলো চুক্তির কাগজে লেখা থাকুক। তাহলে পালটা বিনিময় অধিকার হিসাবে নেপালকে ভারতীয়দের জন্যও এসব সুবিধাগুলো উন্মুক্ত অবারিত করে দিতে হবে। আর কে না জানে ভারতের অর্থনীতির সাইজ সক্ষমতা অগ্রগতির তুলনায় নেপালের অর্থনীতি নস্যি। ফলে উন্মুক্ত নেপালে পাওয়া সুযোগ ভারতীয়দের নেয়ার সক্ষমতা নেপালকে সমান সুযোগ ভারতে দিলেও এর সুবিধার নেপালীরা নিতে সক্ষম নয়, পারবে না। পাল্লা ভারতের দিকেই যাবে। ফলে ভারতের অর্থনীতির অধিনস্ত হয়ে ভারতের অনুগ্রহের অর্থনীতি হওয়াই নিবার্য ভাবেই নেপালের ভাগ্য হবে।

এছাড়া ওদিকে দফা নম্বর ছয় নেপালের জন্য ভয়ঙ্কর। বলা হচ্ছে ভারতীয়দেরকে নেপালে ব্যবসা করার জন্য নেপালীদের মতই সমান “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” দিতে হবে। যেমন কোন ব্যবসায় ব্যাংক নেপালী ব্যবসায়ীকে ঋণ দিলে একই সুবিধা ভারতীয় ব্যবসায়ীকেও দিতে হবে। স্বভাবতই এর পালটা নেপালীরা একই সুবিধা ভারতে পেলেও এই বিনিময় সুবিধা নেপালীরা কাজে লাগাতে সক্ষমই নয় এখনও। ফলে সমান “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” বিষয়টা নেপালীদের বিরুদ্ধেই যাবে। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” বিনিময় করা তো নেপালের উদ্দেশ্য বা দরকার ছিল না। নেপালের দরকার নিজেকে ল্যান্ডলক মুক্ত করা।

ভারতের ভিতর দিয়ে নেপালের সমুদ্র বন্দরে প্রবেশাধিকারের সমতুল্য সুবিধার বিপরীত হতে পারে নেপালের ভিতর দিয়ে ভারত কোথায় যেতে চাইলে একই সুযোগ। কেবল ততটুকু। যদিও স্বভাবতই ভারত তখন প্রশ্ন তুলবে ঐ সুবিধা ভারতের জন্য জরুরি নয়। তবে ভারত যদি এই যুক্তি দিতে চায় যে নেপালকে অবাধে প্রবেশ ও যাতায়াতের সুবিধা দিবার মোট বিনিময়মুল্য হল সারা নেপালকে ভারতের কাছে বন্ধক থাকতে হবে – এটাও খারাপ হয় না। কারণ নেপালকে প্রবেশাধিকার দিলে ভারত এখানে নেপালে নিজের ব্যবসায়িক সুবিধা হারায়। তাই এসব কিছু এর কাফফারা। এটা খুবই ভাল কথা। তাহলে স্বভাবতই বাংলাদেশের কাছে থেকে ট্রানজিট আদায়ের সময়ও তো ভারতের এই নীতিই আমাদের অনুসরণ করা উচিত। ভারত কি সেক্ষেত্রে রাজি হবে? অর্থাৎ নেপালকে চাপে ফেলে নিজের আজ্ঞাবহ রাজ্যই বানিয়ে রাখতে চায় ভারত – ঠিক তেমন?

হাসিনার আমলে ভারতের সাথে চুক্তিতে যেমন ট্রানজিটের বেলায় অহেতুক ভারতকে দেয়া সুবিধার বিপরীতে রেসিপ্রোকাল সাম্যের উছিলায় বাংলাদেশকেও সুবিধা দেয়ার কথা লেখা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের কাছে সেসব সুবিধা নিজের কাজে লাগানোর সুবিধা নয় মোটেও।

এসব বিষয়গুলো নিয়েই মাওবাদীদের ৪০ দফায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে যে ৪০ দফা দাবিতে তারা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল সেখানে এসব প্রশ্ন তুলে ১৯৫০ সালের চুক্তি বাতিলের কথা লেখা আছে। এছাড়া মাওবাদীরা ভারতকে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে প্রধান শত্রু মনে করে। ভারতকে সামন্ততন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের দোসর বলে আখ্যায়িত করেছিল।

এদিক থেকে দেখলে নেপালের জনগণের সব সংগ্রামের সারকথা ল্যান্ডলক দেশ হবার অভিশাপের কারণে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তির উপায় খুজে ফেরা। অমীমাংসিত সেই লড়াইয়ের ছায়াতেই নেপালের উপর ভারতের চলতি অবরোধ আরোপ এবং তা নেপালের জনগণের মেনে না নেওয়ার সংগ্রাম। ফলে একদিক থেকে যেটাকে রাজতন্ত্র উৎখাতের সংগ্রাম বলে মনে হয় সেটাই আবার অন্যদিক থেকে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তির সংগ্রাম।

মাওবাদীরা ২০০৮ সালে প্রথম সরকার গঠন করার পরে এবিষয়ে একই মুল্যায়নে ও অবস্থানে থাকতে পারে নাই। দল তিনভাগ হয়ে গিয়েছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

২. নেপালি মাওবাদ ও গণরাজনৈতিক পরিসর নির্মানের চ্যালেঞ্জ
গৌতম দাস

[এখানে তুলে আনা আমারই লেখা  আগে ১১ অক্টোবর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায়। এখানে হুবহু কাট পেস্ট করে তুলে আনা হয়েছে – কপি সংরক্ষণের জন্য আর আমার এখানের পাঠকদেরকেও জানানোর জন্য। ]

নেপালে রাজতন্ত্রের পতন ও উৎখাতের ঘটনা ২০০৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু। প্রথম চোটে রাষ্ট্রের  সেনাবাহিনী ও পুলিশকে রাজার অধীনস্থতা ও নির্দেশে পরিচালিত হবার আইন বাতিল করে তাদেরকে জাতীয় সংসদ, অর্থাৎ জনগণের অধীনে আনা হয়। এটা ছিল এর আগে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (UCPN) বা যারা পপুলারলি মাওবাদী (Maoist) বলে পরিচিত তাদের সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল।

নেপালের মাওবাদীরা  ১৯৯৬ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে নেপালের তৎকালীন সরকারের কাছে ৪০ দফা দাবীনামা পেশ করে। সরকারকে তারা জানিয়েছিল, যদি এই দাবি মেনে না নেওয়া হয়, অর্থাৎ  আগামি দুসপ্তাহের মধ্যে  দাবি না মেনে নেবার  ইঙ্গিত দেখলে  সেক্ষেত্রে উপস্থিত রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিতে আমরা বাধ্য হব”। লিখিত এই পত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন মাওবাদী পার্টির দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়। তিনি ছিলেন মূলত  মাওবাদী সহ কয়েকটি ছোট দলের জোট “ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্ট” এর তৎকালীন চেয়ারম্যান। আর তখন মাওবাদী পার্টির চেয়ারম্যান হলেন পুস্পকমল দাহাল, দলে যার পরিচিতি  নাম ‘প্রচণ্ড’।

সুতরাং নেপালে রাজতন্ত্রের উৎখাত এক সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিণতি। লেনিনের ধ্রুপদি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণার আলোকে  নেপালের রাজনীতিতে কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি – অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠনের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভায় নেপালের জন্য একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়নের ধারণা নিয়ে আসেন মাওবাদীরা। সশস্ত্র সংগ্রামের সফলতার এক পর্যায়ে কিভাবে বিপ্লবী অর্জনকে রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের রাজনীতিতে রূপান্তর করতে হয় নেপালের মাওবাদ সেই দিক থেকে বিপ্লবী রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নজির। এখানেই নেপালের মাওবাদের বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও সঠিক সময়ে কৌশলে আগু-পিছু করে নেয়ার দিক থেকেও মাওবাদীরা বিভিন্ন সময় খুব ফলপ্রসূ নীতি পদক্ষেপ নিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। 

যেমন ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে “আর্মড পুলিশ ফোর্সের” আইজিকে এক মাওবাদী অপারেশনে হত্যা করা হয়। নেপালের আর্মড পুলিশ ফোর্স আমাদের র‍্যাব এর সমগোত্রীয়। মাওবাদীদের দমনে এটা আলাদা করে গঠন করা হয়েছিল ২০০১ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু এর পরেও পরিস্থিতির উপর মাওবাদীদের নিয়ন্ত্রণ বহাল ছিল। দেখা যায় এঘটনা সত্ত্বেও পরে মে মাসে সরকারের সাথে সাময়িক অস্ত্রবিরতিতে তারা আসতে পারছে। অস্ত্রবিরতির কোড অব কনডাক্ট সম্পন্ন করতে পারছে। আবার খুব সফলতার সাথে তারা ঠিক সময়ে একতরফাভাবে অস্ত্রবিরতি ভেঙেও দিয়েছে, অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের শক্তি প্রদর্শন ও সমঝোতার দুই নীতিই কাংখিত রাজনৈতিক ফলাফল আদায় করে নেবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে। সমরক্ষেত্র ও রাজনীতির ক্ষেত্র দুই ক্ষেত্রেই লড়াই চালিয়েযেতে পেরেছে।  তারপরও নেপালের মাওবাদ সম্পর্কে বিস্তর সমালোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। তাদের সফলতা-ব্যর্থতার খতিয়ান নেওয়া দরকার। তবে এখানে আমরা তার সফলতার মধ্য দিয়ে যে বৈশিষ্ট্যসূচক দিক ফুটে উঠেছে সেই দিকেই নজর দেবো। এর কারণ নেপালের জনগণের লড়াই সংগ্রাম থেকে শিক্ষণীয় সারবস্তু বের করে আনাই আমাদের প্রাথমিক কাজ।

মাওবাদীদের দাবিনামার মূল সুর ছিল নেপালের রাজনৈতিক সংকটে নেপালের করণীয় নির্ধারণ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি নেপালের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে একমতে আনা। রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য করণীয় নির্ধারণের ব্যাপারে সকল পক্ষকে একটি সর্ব সম্মত সাধারণ অবস্থানে নিয়ে আসা। বলাবাহুল্য বিপ্লব ও উদার গণতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে মাওবাদীদের মধ্যে তর্ক ছিল না তা নয়, এছাড়া দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও বিরোধ ছিল। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের ধারণাই শেষাবধি প্রাধান্য পেয়েছিল। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করবার কৃতিত্ব মাওবাদীদের। তাই নতুন কনস্টিটিউশান বা গঠনতন্ত্র  প্রণয়নের প্রসঙ্গ শুরু হয়েছিল রাজতন্ত্র উৎখাতের সঙ্গে সঙ্গেই। আবার নেপালে প্রথম কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি বা  নির্বাচিত গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভা (বা সংবিধান সভা) গঠিত হয় ২০০৮ সালে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই সভা একটা কনস্টিটিউশন বা রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্নকে কোন গঠনতান্ত্রিক দলিলে রূপ দিতে পারে নি।  সকলকে নিয়ে এমন কোন ঐক্যের স্তরে পৌছাতে পারে নি, যাতে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে নেপালের শক্তিশালী আবির্ভাব ঘটতে পারে।  কিন্তু খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসাবে নেপাল আবার  দ্বিতীয়বার নতুন করে সংবিধান সভার নির্বাচন করতে সক্ষম হয় ২০১৪ সালে। এই হিসাবে  ইতিহাসের সাত বছর পর দ্বিতীয় গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভায়  নেপালে নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং গঠনতান্ত্রিক সভায় তা অনুমোদন ও গ্রহণের ঘোষণা এসেছে।

বিগত ২০০৬ সালে রাজতন্ত্রকে নড়বড়ে করে দেবার পর থেকে পুরানা  রাজতন্ত্রের খুঁটি বর্গা ভেঙ্গে পড়েছিল ঠিকই কিন্তু  নতুন করে নেপাল রাষ্ট্র গঠন সম্পন্ন হচ্ছিল না। ফলে দেশে স্থিতিশীলতা আসছিল না, এখন অন্তত কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ঘোষণা ও দাবি করার জায়গায় নেপাল পৌঁছাতে পারল। যদিও অমীমাংসিত কিছু বিষয় নতুন চেহারা ধারণ করে হাজির রয়েছে এবং ভারত সীমান্ত সংলগ্ন ত্বরাই  অঞ্চলের মাধেসি ও থারুদের নিয়ে সংকট রয়েছে।  তবু গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নেপালের  গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভায় নতুন গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়েছে বলে যে প্রোক্লেমেশন জারি হয়েছে তা নিঃসন্দেহে নেপালের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

নেপাল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘কনস্টিটিউশন’, ‘গঠনতন্ত্র’, ‘রাষ্ট্র গঠন’, ‘কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি’ বা‘রাষ্ট্রগঠন’  ইত্যাদি শব্দগুলো বারে বারে এসেছে। বিপ্লবী রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা হচ্ছে বিপ্লব একান্তই সশস্ত্র বল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের ব্যাপার মাত্র। ফলে মাওবাদী কমিউনিস্টরা সশস্ত্র সংগ্রামের এক পর্যায়ে সমাজের অন্যান্য ক্ষমতাশালী শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে মৈত্রী রচনায় মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়ার শুরু করবে, সেটা বাংলাদেশে আমরা সাধারণত চিন্তা করতে পারি না। এর ফলে বাংলাদেশের বহু বিপ্লবী তরুণে জীবন বিসর্জন দেবার পরেও বাস্তবিক রাজনীতি দূরের কথা ধারণাগত ক্ষেত্রগুলোতেও আমরা অগ্রসর হতে পারি নি। অথচ বিপ্লবের স্তর অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ভাবে কী ধরনের রাষ্ট্র গঠন কর্তব্য তা সবসময়ই ধ্রুপদী  বিপ্লবী রাজনীতির নীতি ও কৌশলগত তর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বাংলাদেশে ‘বিপ্লব’ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে যে ধরণের অনুমান কাজ করে সেই বুঝের জায়গা থেকে নেপালে মাওবাদীদের কৃতিত্বের দিকটি বোঝা যাবে না। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অন্যান্য শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মৈত্রী রচনায় সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মাওবাদীদের সম্পর্কে ভিন্ন সমালোচনা বা পর্যালোচনা থাকলেও এই দিকটার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশে  বিপ্লবী চিন্তায় রেওয়াজে ‘কনস্টিটিউশান’ বিষয়টা যেন বা “বুর্জোয়াদের” বিষয় এমনই মনে করা হয়।  এনিয়ে কোন আলোচনাই প্রায় হয় না।  যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা নয়াচীনের বিপ্লব নিয়ে সারা দুনিয়ার বিপ্লবীদের উচ্ছ্বাস থাকলেও এই দুই বিপ্লবে ক্ষমতা দখলের পরে “কনস্টিটিউশন” বা “রাষ্ট্রগঠন” বলে কোন পর্যায় তাদের ছিল কি না আমরা তা খুব কমই খুঁজতে যাই। পুরানা  ট্রাডিশনাল  বিপ্লবী চিন্তায় কোন বিপ্লবী রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দখলের পরে রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র তৈরির বিষয়ের উপর জোর দেয়া, গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ প্রক্রিয়া সফল ভাবে  সম্পন্ন করার কর্তব্য গুরুত্ব পায় না। এককথায় পুরানা রাজতন্ত্র বা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জায়গায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন গুরুত্বপুর্ণ কর্তব্য ও করণীয় হয়ে ওঠে না।  বরং এগুলোকে সবসময়ই খুবই অপ্রয়োজনীয় “বুর্জোয়া” কাজ মনে করা হয়েছে। একারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা নয়াচীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশান তৈরির বিষয় ইতিহাসের তেমন কোন গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায় বলে বাংলাদেশের বিপ্লদের কাছে বিবেচিত ছিল না। একারণে আমরা আশির দশকে বিপ্লবী বয়সে রাশিয়া বা চীনের অনেক বিপ্লবের ইতিহাস পড়েছি; মুখস্থ না করলেও অনেক কিছু নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু এই দুই বিপ্লবী রাষ্ট্রের “কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস”  বলে আদৌ কিছু ছিল কিনা আমরা তা খতিয়ে দেখি নি। কোন তাগিদও বোধ করি নি। বা থাকলেও নিষ্ঠার সঙ্গে তা জানবার বা বুঝবার অধ্যবসায় চর্চা করি নি।

গঠনতন্ত্র প্রণয়ন উল্লেখযোগ্য কোন ইতিহাস বা ঘটনা বলেও মনে করা হয় না, কোন সামাজিক অথবা রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের ভিতর দিয়েও গঠনতন্ত্র প্রণয়নের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির মুর্ত ভাবে হাজির হবার প্রশ্ন জড়িত সেটাও বাংলাদেরশের বিপ্লবী রাজনীতির ডিসকোর্সে দেখা যায় না।  বরং কনস্টটিউশনালিজম বা গঠনতন্ত্রকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিষয়টাকে নিছকই “বুর্জোয়া” বা আজাইরা কচকচানি বলে নাক সিটকানোর চর্চা বাংলাদেশে আশির দশক অবধি প্রবল ও প্রকট ভাবেই ছিল। এখনও আমরা অনেক এভাবেই  ভাবতে অভ্যস্ত রয়ে গিয়েছি।  তবে পরবর্তিতে রাষ্ট্র বিষয়ক ধারণা গুলো আরও পরিস্কার  ও পুষ্ট হওয়াতে আগে সেসব যে ভুল হয়েছিল তা একালে বিপ্লবী চিন্তা ও চর্চায় অনেক পরিষ্কার হয়েছে। ফলে একালে সশস্ত্র গণযুদ্ধ এবং সেই সংগ্রামের একটি পর্যায়ে সমাজের অন্যন্য গণতান্ত্রিক শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে মৈত্রী ও গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে পুরানা রাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য গঠনতন্ত্র সভা আহ্বান এবং নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন – এই ধাপগুলোর প্রয়জনীয়তা ও অনিবার্যতা অনেক পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর কথাটার ব্যবহারিক অর্থ আগের তুলনায় বিপ্লবীদের কাছে অনেক স্বচ্ছ। গণ-অভুত্থানের মধ্য দিয়ে কোন বিপ্লবী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে তার পরের পদক্ষেপ হিসাবে ‘কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস’ বা গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ শুরু করার গুরুত্ব অপরিসীম ।  নেপাল তাই নতুন দিনের বিপ্লবের উদাহরণ। এই দিক থেকে বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির ভবিষ্যতের দিক থেকে আমাদের হাতের কাছের নেপাল নতুন, কিন্তু খুবই ভাল  উদাহরণ হয়ে উঠেছে,  যা আরও  খুঁটিয়ে দেখা, বোঝা ও বিচার করার সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে।  

নেপালের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে ২০০৬ সালের ৬ এপ্রিল খুবই তাৎপর্যপুর্ণ। এদিন রাজার ক্ষমতার বিরুদ্ধে মাওবাদীরা সহ সব রাজনৈতিক দল  সারা নেপালবাসীর এক গ্রান্ড এলায়েন্স গঠন ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে সক্ষম হয়। বলাবাহুল্য পরিণতিতে সেটাই রাজার পরাজয়ের কাল হয়ে ওঠে।

কিন্তু এমন মৈত্রী গঠিত হবার পিছনের পটভুমির খবর আমাদের নিতে হবে। মাওবাদীদের সশস্ত্র আন্দোলন নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে এবং  নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে। আগেই বলেছি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। নেপালে ২০০২ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে ক্ষমতার ভাগিদার বা স্টেক হোল্ডাররা হল এরকমঃ  এক. রাজতন্ত্রী রাজনীতির সমর্থকরা সহ খোদ রাজা। দুই. রাজতন্ত্রী কিন্তু কনস্টিটিউশন মেনে চলা আইনী দলগুলো (মাওবাদীরা বাদে মূলত নেপালি কংগ্রেস, ওর ভাঙা দলছুট অংশ এবং সিপিএন(ইউএমএল – যারা ভারতের সিপিআই, সিপিএমের নেপাল ভার্সন) ও ছোটখাট নানান কমিউনিস্ট বা লিবারেল দল। সবমিলিয়ে এমন মোট ৭টা দল । তিন. কস্টিটিউশানাল রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লক্ষ্যে সশস্ত্র মাওবাদী দল; চার. ল্যান্ডলকড নেপালের উপর ছড়ি ঘুরানো ভারত। আর ৫. আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমাস্বার্থ। – এভাবে পাঁচটা পক্ষ।

দেখা যায় ২০০৫ সালের প্রথমার্ধের আগে পর্যন্ত এই পাঁচ পক্ষের চার পক্ষই একদিকে এবং মাওবাদীর বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ থাকতে পেরেছিল।  উপযুক্ত কৌশল ব্যবহার করে ঐ চার  পক্ষীয় জোটে ভাঙন আনা, তাদের একসাথে কাজ করা অসম্ভব করে তোলা এবং মাওবাদী  রণকৌশলের মধ্য দিয়ে সফল ভাবে মৈত্রী স্থাপনের রাজনৈতিক শর্ত তৈরি করা সেই সময় সহজ ছিল না। সর্বোপরি একমাত্র দায়িত্ববান সম্ভাবনার যে রাস্তা মাওবাদীরা খুঁজে নিতে সক্ষম হয়। সে রাস্তার কথা যে মাওবাদীরা প্রস্তাব করতে পারে এবং দায়িত্ব নিয়ে তারা করেছেও বটে তা প্রশংসার যোগ্য। মাওবাদীদের রাজনৈতিক কৌশলের কারনে রাজার পক্ষের বাকী  তিন পক্ষই রাজার হাত ছেড়ে দিয়ে মাওবাদীদের সাথে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়েছিল। বা বলা যায়, মাওবাদীদের সঙ্গে থাকাটাই রাজনোইতিক দিক থেকে ব্যাটার অপশান মনে করেছিল।  ২০০৫ সালের প্রথমার্ধের পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে, পরে ডিসেম্বর ২০০৫ সালে  ১২ দফা ঐক্যমতের দাবীনামা — যেটা পরবর্তিতে ২০০৬ সালের এপ্রিলে রাজার বিরুদ্ধে গ্রান্ড এলায়েন্সের পিছনের পটভুমি হিসাবে কাজ করেছে – মাওবাদীদের ক্রম বিজয় সুস্পষ্ট হতে শুরু করে।  দেখা যায় মোট পাঁচ পক্ষের রাজা ও মাওবাদী ছাড়া মোট তিন পক্ষ ২০০৫ সালের আগে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে রাজার পক্ষেই থেকেছিল। আর ২০০৫ সালের পরে মাওবাদীদের পক্ষে আর রাজার বিপক্ষে চলে যেতে বাধ্য হয়। কথিত এই তিন পক্ষ হল, ভারত, আমেরিকা এবং রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো (নেপাল কংগ্রেস ও ভা্রতের সিপিআই, সিপিএমের মত নেপালী কমিউনিস্ট)। এদেরকে মাওবাদীরা নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতি আস্থায় আনতে সক্ষম হল কেন? এই প্রশ্নটি ব্যাখ্যা করা যাক।

সশস্ত্র মাওবাদী বলতে প্রচলিত ধারণা বা ছবিটা হল ১. যারা কবে সশস্ত্রতা শেষ করবে তার কোন দিন ঠিকানা তাদের নিজেরই জানা নাই। চিন্তাও করে না; ২. সশস্ত্রতার কৌশল  কাজ করুক, ফল দিক আর নাই দেক,  কৌশল আগে পিছে করার কোন ইচ্ছা যাদের নাই, কিম্বা থাকলেও কিভাবে সেটা সম্ভব যা তাদের জানা নাই; ৩. রাজনৈতিক লড়াই শেষে কোন স্থিতিশীল রাষ্ট্রগঠন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে আনার লক্ষ্যে বাস্তব কৌশল নিতে যারা জানে না;  ৪. “বুর্জোয়া, পুজিবাদী” নির্বিশেষে সকলের সাথে রাজনৈতি পরিসর নির্মাণের খাতিরে কথা বলতে ও ডায়লগ করতে জানে না, ইচ্ছুক নয় এবং দরকারিও মনে করে না;  ৫.  তাদের রাজনীতির ভিতর সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ তুলনামূলকভাবে অন্যদের চেয়েও সবচেয়ে ভাল ভাবে অন্তর্ভূক্ত এবং একমাত্র তাদের নেতৃত্বেই সেই স্বার্থ  রক্ষিত হতে পারে বলে যারা দেখাতে পারে না; ৬. সর্বোপরি সকলকে সাথে নিয়ে  রাষ্ট্রগঠন, কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন এবং বহুবিধ দলের সাথে ইনক্লুসিভভাবে কাজ করার পরিকল্পনা এবং মানুষের মন জয় করে মানুষকে বদলানোর কাজ করতে যারা জানে না। সশস্ত্র মাওবাদী কিম্বা যে কোন সশস্ত্র শ্রেণি সংগ্রামে বিশ্বাসী রাজনীতি সম্পর্কে এটাই মানুষের বদ্ধমূল ধারণা। মাওবাদীরা নেপালে এই ছকবাঁধা বদ্ধমূল  ধারণা ভেঙ্গে ইতিবাচক সম্ভাবনার দল হিসাবে নিজেদের হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল।

নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীদের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত, আমেরিকা এবং রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো  দিনকে দিন রাজার সাথে একসাথে ঐক্য বজায় রেখে টিকে থাকা অসম্ভব দেখছিল। এই তিন পক্ষের সঙ্গে রাজার সম্পর্ক দূরবর্তী হয়ে উঠছিল। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হোল যখন তারা টের পেল মাওবাদী হলেও  নেপালের মাওবাদী ভিন্ন রকম। সশস্ত্র রাজনৈতিক দল সম্পর্কে যে প্রথাগত ধারণা রয়েছে নেপালি মাওবাদীরা সেই রকম নয়। বিশেষ করে সশস্ত্র রাজনীতি প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান হল এই যে, তারা বাধ্য হয়ে সশস্ত্র হয়েছে, রাজতন্ত্রের বদলে রিপাবলিক বা জনরাষ্ট্র গড়তে রাজি হলেই তারা স্থিতিশীল রাষ্ট্রগঠন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে আনা, সশস্ত্রতা শেষ করে নিজেদেরকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা –  সব কিছুতেই তারা আগ্রহী। তারা যে জনরাষ্ট্রীয় বা গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্রের জন্য একনিষ্ঠভাবে লড়ছে এবং বহুদলের ইনক্লুসিভ রাজনীতিতে  তাদের কোন আপত্তি নাই — এসব জানার পর ভারত, আমেরিকা ও রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর কাছে মাওবাদীরা নমস্য না হোক –কথা না বলা বা সংলাপ  না করবার কোন কারণ থাকে নি। আমেরিকার দিক থেকে ২০০৫-৬ সালে ওয়ার অন টেররে ব্যতিব্যস্ত থাকার সময় এটা ছিল হাতে চাঁদ পাবার মত। নইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে  ইসলামি ছাড়াও এই অঞ্চলে মাওবাদীদের দমন করবার জন্য আরেকটি ফ্রন্ট খুলবার ঝুঁকি নিতে হত।

মাওবাদীদের সশস্ত্র আন্দোলন নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে সময় লেগেছিল ।  ২০০২ সালের অক্টোবরের আগে মাওবাদী এমন ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে নাই যে তাদের বাদে বাকী ভাগীদারেরা একজোট হয়ে কাজ করার সক্ষমতাকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। অবশ্য সেসময় এক সুবিধা ছিল যে আর্মিকে মাওবাদী মোকাবোলায় নামানো হয় নাই। রেগুলার পুলিশ আর নতুন বানিয়ে নেয়া রক্ষীবাহিনীর মত প্যারামিলিটারি ‘আর্মড পুলিশ ফোর্স’ দিয়ে মাওবাদীদের মোকাবেলা করা হত। ভারত আর আমেরিকার সহযোগিতা ও উৎসাহে, আর রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলের সহযোগিতায় রাজা সহজেই চলতে পেরেছিল। কিন্তু দিনকে দিন মাওবাদীদের আক্রমণের সক্ষমতা বাড়তে থাকায়  ক্ষমতাসীনদের প্রত্যেক পক্ষই  মনে করতে থাকে যে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের পরামর্শ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মেনে না চলার কারণে  ব্যার্থতা বাড়ছে। ফলে প্রত্যেকেই অপরের উপর অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।

২০০১ সালের জুন ১ তারিখে রাজপরিবারে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে পারস্পরিক খুনাখুনি শেষে রাজা জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নেপালী কংগ্রেসের কৈরালার বদলে একই দলের শের বাহাদুর দুবেকে প্রধানমন্ত্রী করেন। ২০০১ সালের ২৬ নভেম্বর, নতুন রাজা জ্ঞানেন্দ্র দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন আর মাওবাদী মোকাবোলায় সারা দেশে আর্মি নামিয়ে দেন। ২০০২সালের শুরুতে আমেরিকা ১২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয় সেনা ট্রেনিং ও অস্ত্র সাহায্যের জন্য। মে মাসে আর্মি প্রথমবারের মত মাওবাদী চেয়ারম্যান পুস্পকমল দাহালসহ চার নেতার ছবি প্রচার করে। ২২ মে তারিখে নতুন প্রধানমন্ত্রী দুবে সংসদ ভেঙ্গে দেন যাতে বিরোধীরা সেখানে রাজার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় না তুলতে পারেন। এককথায় বললে, এই প্রথম নতুন রাজার সাথে রাজতন্ত্রী কনষ্টিটিউশনাল দলগুলোর বিরোধ শুরু হয়। রাজা একেকবার একেক সেটকে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বানিয়ে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে থাকেন। এভাবে পরের দুবছর দুমাসে ৪টা সরকার গঠন করেন আর ভেঙ্গে দেন। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা হল ২০০২ সালের ৪ অক্টোবর। রাজা এদিন প্রথম রাষ্ট্রের নির্বাহি ক্ষমতাও নিজের হাতে নেন। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে মাওবাদীদের দিক থেকে বিরাট সাফল্যের ঘটনা হল,  আর্মড পুলিশ ফোর্স এর আইজিকে হত্যা করা। মাঝের বছরগুলোতে প্রায় সময়ই মাওবাদীরা ডাক দিয়ে একক যুদ্ধবিরতি পালন করেছে, এক বা তিন মাসের জন্য। মূলত এগুলো তারা করেছে কৌশলের আগাপিছু করা, কি কারণে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম সেকথা জনগণকে মনে করিয়ে দেয়া, পপুলার করা। সার কথায় মনে করিয়ে দেয়া যে তারা অস্ত্র-পাগল কেউ নয়, তাদের হাতে অস্ত্র শেষ উপায় মাত্র। রাজতন্ত্র উচ্ছেদ এবং রিপাবলিকান জনগণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র  প্রণয়নের ঘোষণা দিলেই তারা অস্ত্র ত্যাগের ঘোষণা দিবে। তেমনই এক যুদ্ধবিরিতি ঐ ২০০২ সালের  আর্মড পুলিশ ফোর্স এর আইজিকে হত্যা করার পরও দেয়া হয়েছিল। কি করে যুদ্ধবিরতি পালিত হবে এর কিছু আচরণবিধিও নির্ধারিত ও স্বাক্ষর হয়েছিল মে মাসে। কিন্তু আগস্ট মাসে এসে মাওবাদী হুমকি দিয়ে জানায় যে তাদের দাবীর ব্যাপারে কোন সাড়া শব্দ না পাওয়াতে তারা একশনে ফিরে যাবে।  ২০০৩ সালের শেষাশেষি এসে দেখা যায়, ততদিনে রাজার সাথে  রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর বিরোধ চরমে উঠেছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না। আমেরিকান সেক্রেটারি অব ষ্টেট ক্রিস্টিনা রাকা নেপালে এসেছিলেন  ২০ ডিসেম্বর ২০০৩, বিরোধ মিটাতে কিছু করা যায় কিনা শেষ চেষ্টা করতে। নেপালের ইংরাজী দৈনিক কাটমান্ডু পোষ্টের ২১ ডিসেম্বর সংখ্যার চারটা রিপোর্টের শিরোনাম হল,

১। Anti-king remarks intolerable: Lohani, ২। Rocca mum over US support to parties, ৩। Crisis resolution need of hour: Nepal, ৪। Exchange of intelligence required to hook Maoist leaders: Indian envoy,

প্রথমটার লোহানী হলেন রাজার আজ্ঞাবহ এক্টিং প্রধানমন্ত্রী, প্রকাশ লোহানী। তিনি একাধারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। তিনি একথা বলছেন কারণ ততদিনে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোও রাজাকে হাসি তামাশার পাত্র বানানো শুরু করে দিয়েছে। দ্বিতীয় খবরটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ, আমেরিকান এসিট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিশ্চিনা রাকা এসে বিরোধ মিটাতে গিয়ে হয়রান হয়ে গেছেন। পত্রিকার রিপোর্ট বলছে এই সত্যিকার দিকটা লুকিয়ে নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন(ইউএমএল) মুখে বলছেন,“পরাশক্তিগুলো রাজা ও তাদের দলগুলোর ইউনিটি দেখতে চায়, গণতন্ত্রের ব্যাপারে আমেরিকা ইতিবাচক”। ওদিকে আসলে এই দল দুটো রাকাকে চেপে ধরেছে রাজার বিরুদ্ধে অজস্র অভিযোগের বাক্স খুলে। আর জবাবে হয়রান হয়ে রাকা বলছে বিশ্বাস করেন আমি মনে করি রাজা ইতিবাচক, কিন্তু সব কথা ডিপলোমেটিক কারণে আমি বলতে পারছি না। এই জবাবটা রাকা দিচ্ছেন সিপিএন(ইউএমএল) উপনেতা এন অলিকে। অলি বর্তমানে এই নেপালি সিপিএম দলের প্রধান নেতা।

আসলে পরবর্তিকালে দেখা যাচ্ছে রাকার এই সফরটা ছিল মাওবাদী বিরোধী রাজতন্ত্রীর পক্ষে ভারত-আমেরিকাসহ চার  স্টেক হোল্ডারের সর্বশেষ জোটবদ্ধ অবস্থান। কিন্তু এরপরেই পাশার দান উলটে যায়। প্রত্যেকে এরপর রাজার হাত ছেড়ে দিয়ে,  রাজাকে ত্যাগ করে, কত দ্রুত মাওবাদীদের  হাত ধরা যায়, সেই এলায়েন্স খুজতে শুরু করেছিল। রাকা ঐ সফরে এরপর পালটা রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোকে আক্রমণ করে বলেছিল আপনাদের মধ্যে ঐক্য নাই বলেই তো  সব সমস্যা। শুধু তাই নয় উলটা রাকার  চলে যাবার পরে  রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো যেন রাজার সাথে বিরোধে জড়িয়ে না পড়ে সেটা নিশ্চিত করবার শেষ চেষ্টা রাকা করেছিলেন। তাই রাকা মনে করিয়ে দিতে বলেছিলেন, “কারণ, তাদের বিরোধ তো আসলে কমন শত্রু মাওবাদী  বিরুদ্ধে”।    রাকার এই সফরের পর থেকেই ক্রমশ  আমেরিকার উলটা দিকে অবস্থান নেয়া শুরু হয়।

সেসময়ের ভারতীয় অবস্থান নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। ভারত সেসময় আমেরিকার সাথে রাজার পক্ষে। দিল্লি সরাসরি চেয়ারম্যান পুস্পদাহাল  ও দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়কে গ্রেফতার করার প্রয়োজনের কথা তুলে নেপালি ইনটেলিজেন্সের উপর নিজেদের প্রভাব বাড়াবার চেষ্টা করছে। পত্রিকা রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রদুত শ্যামশরণ বলেছেন, চেয়ারম্যান পুস্পদাহাল  ও দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়কে ধরার জন্য ইনটেলিজেন্স তথ্য বিনিময় দরকার। বলছেন সেজন্য দুদেশের মধ্যে গোপন তথ্য বিনিময় ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। মাওবাদীদেরকে তিনি দুদেশের শত্রু হিসাবে উল্লেখ করেন। তরুণ জার্নালিস্টদের এক সভায় তিনি এসব কথা বলছিলেন।  ২১ ডিসেম্বর ২০০৩ এই দিনের পত্রিকার খবর বিস্তারিত  বললাম কারণ এরপরের ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারীর আগে পর্যন্ত প্রায় এক বছরে রাজার পক্ষে ধামাধরা রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে একেকবার একএকজনকে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী করে কাজে লাগানোর সব সুযোগ নিঃশেষ করে ফেলে। এরপর পয়লা ফেব্রুয়ারী ২০০৫ সালে রাজা নিজেই নিজেকে  নির্বাহি ক্ষমতায় বসান। এবং জরুরি অবস্থা জারি করেন। এতে একটা জিনিষ পরিস্কার হয়, তাহল নেপালী কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট সিপিএন-ইউএমএলের মত রাজতন্ত্রী দলগুলোর পক্ষে রাজা জ্ঞানেন্দ্রের চামচা হয়ে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী হবার যে শেষ সুযোগ ছিল সেটাও আর থাকল না। কারণ রাজা নিজেই এবার প্রধান নির্বাহী হয়ে গেছেন। অন্যদিক থেকে বললে, রাজার এই সিদ্ধান্ত রাজতন্ত্রী দলগুলোকে কনস্টিটিউশনাল নিয়মতান্ত্রিক দল হিসাবে ফাংশনাল  থাকার শর্ত ও সুযোগ নাই করে দিলেন। ফলে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। ফলে ভারত এবং আমেরিকার পক্ষে আর রাজার পক্ষে সমর্থন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তুলনায় মাওবাদীরা নিজেদেরকে সকলের কাছে ব্যবহারিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে অবস্থান পরিস্কার করে ফেলে। এতে মাওবাদীদের সাথে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর এলায়েন্সের কমন পয়েন্টগুলো কি হতে পারে তা স্পস্ট হয়ে যায়। এই দুই ধরণের রাজনীতির মধ্যে পুরা নিগোশিয়েশনটা কোথায় কোন পয়েন্টে হয়েছে এর সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিল হল, এদের পারস্পরিক বুঝাবুঝির কমন দলিল – ১২ পয়েন্ট মতৈক্য। বিশেষত ওর দ্বিতীয় পয়েন্ট পড়লেই জানা যায়। সেখানে বলা হয়েছে —

“মাঠে সক্রিয় সাত বিরোধী দলীয় জোট [মাওবাদী বাদে এতদিন যারা রাজতন্ত্রী সাংবিধানিক আইনী রাজনৈতিক দল হিসাবে কাজ করত] সর্বশেষ পার্লামেন্টকে যাকে রাজা বাতিল বলে ঘোষণা করেছে তাকে আবার কার্যকর করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এবং এই সিদ্ধান্ত অর্থাৎ পার্লামেন্ট চালু হলে তা যেসব কাজ করবে তা হল, সর্বদলীয় সরকার গঠন, মাওবাদীদের সাথে ডায়লগ করে তাআদের সাথে নিয়ে একটা কনষ্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির (রাষ্ট্র গঠন সভা) নির্বাচনের পথে অগ্রসর হওয়া। তারা মনে করে এটাই বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাত শেষ করে বেরিয়ে আসা এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একমাত্র পথ। মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি কথা দিয়েছে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে নিয়ে এক জাতীয় রাজনৈতিক কনভেনশন আয়োজন করবে।  সেই সভা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিভাবে হবে সে  বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে, কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির (রাষ্ট্র গঠন সভার) সদস্য কারা হবেন তা নির্ধারণের নির্বাচন আয়োজন করবে যাতে আমাদের সকলের সম্মতিতে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা যায়। সাত দলীয় জোট এবং সিপিএন-মাওবাদী দল এক ডায়লগে বসবে এবং পদ্ধতিগত দিকগুলো নিয়ে ঐক্যমতের পথ খুঁজে বের করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে জনগণের ক্ষমতাই একমাত্র বিকল্প – বলে সকলে একমত হয়েছে”। [১২ দফা ঐক্যমতের দ্বিতীয় দফার হুবহু অনুবাদ]

সারমর্মে আমরা বলতে পারি নেপালের মাওবাদ থেকে শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রাম বিপ্লবী রাজনীতির নীতিগত দিক নয়, কৌশলগত দিক, তা নেপালের মাওবাদীরা দেখাতে পেরেছে। অর্থাৎ যা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে অর্জন সম্ভব সেই ভাবে তা অর্জনের কৌশল অবলম্বনে তাদের যেমন সায় আছে, আবার সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে সশস্ত্র যুদ্ধে তা আদায় করে নিতে মাওবাদীরা পিছপা নয়। তারা দেখাতে পেরেছে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে রাজতন্ত্র বিরোধী সমাজের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার এবং নেপালি জনগণের সার্বভৌমত্ব কায়েম করবার পূর্বশর্ত হচ্ছে একটি জনপরিসর বা গণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষেত্র গড়ে তোলা যার মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের দাবি দাওয়া প্রকাশ ও রাজনৈতিক বিষয়ে জানাজানির ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায়। নেপালের বাস্তবতায় যতোটুকু সাফল্য অর্জন সম্ভব, বলা যায় তার চেয়ে অধিক সাফল্যই তারা অর্জন করেছে। আগামি দিনে নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরা প্রধান দল হিসাবে থাকবে কিনা কিম্বা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কিনা তা দিয়ে মাওবাদীদের সফলতা ব্যর্থতার খতিয়ান টানা যাবে না। আজ নেপাল যেখানে এসেছে – ১. রাজতন্ত্র থেকে নেপালকে জনরাষ্ট্রে (Republic) রূপান্তরের সাফল্য, ২.স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নেপালি জনগণের মধ্যে ঐক্য, ৩. ল্যাণ্ড-লকড হবার কারনে ভারত যে ঔপনিবেশিক সুবিধা পাচ্ছে ও আদায় করে নিচ্ছে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং সর্বোপরি জনগণের মধ্যে বিপ্লবী দীক্ষা ও চেতনার সম্প্রসারণ – ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে মাওবাদিরা নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে। এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।