এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

গৌতম দাস

৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Qz

_

চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

গৌতম দাস

১১ নভেম্বর ২০১৯, ০১:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2MQ

 

পাকিস্তানের রাজনীতিতে যেন ‘বিনা মেঘে বৃষ্টি’ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে সম্ভবত সেখানে এসে যাচ্ছে একেবারে ঘূর্ণিঝড়, যাতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে। ফলে অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। যেমন অসময়ে কিলিয়েও কাঁঠাল পাকানো যায় না, এমনকি ফল পাকানোর ওষুধ দিয়েও না, সেই অবস্থা এটা। আসলে সব কাজে টাইমিং বা সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর!
সীমাহীন অব্যবস্থাপনা আর গরীবদেশের নিত্যসঙ্গী দুর্নীতিতে ডুবে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থাকে টেনে তুলতে আশার আলো দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিলেন। ওদিকে এরই মধ্যে কাশ্মীরে নরেন্দ্র মোদীর ভারত “দখলদার বাহিনী” হিসেবে হাজির হওয়ায় এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স্তরে কাশ্মীরিদের পক্ষে লড়ার জন্য দৃশ্যত এই প্রথম পাকিস্তান এমন এক নেতা পেয়েছে যিনি সৎ হিসেবে পরিচিত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলি যার চেনাজানা এবং নয়া দৃষ্টিতে ও নয়া উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানকে সাজাতে যার আগ্রহ এক নেতা হয়ে হাজির ইমরান খান। এবারের ইমরানের জাতিসংঘ-বক্তৃতার প্রশংসা করেনি বা এটা তাঁকে স্পর্শ করেনি, এমন সংবেদনশীল মানুষ কমই পাওয়া যাবে। আমরা ‘মুখের উপর কঠিন সত্য ছুড়ে দেয়া’ বলি যেটাকে, ঐ বক্তৃতা তেমন। তাই প্রতিপক্ষ ভারত এই বক্তৃতার বিরোধিতায় না গিয়ে পাশ কাটিয়ে ‘মোকাবেলা’ করার পথ ধরেছিল।
এক দিকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া আর কোনো নেতা ইমরানের পর্যায়ে পপুলার নন বলে তাঁর ভক্তদের দাবি। অথচ আমেরিকার স্বার্থে ওয়ার অন টেররে ব্যবহৃত হতে হতে পাকিস্তান বলতে গেলে, নিজস্বার্থের পাকিস্তান-রাষ্ট্র হওয়ার কথা যেন সে ভুলেই গিয়েছে। এই দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় পুরানা রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিল এই সুযোগে লুটপাট ছাড়া তাঁরা আর কী করার থাকতে পারে! আমেরিকার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে তারা ভেবেছেন, দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। এ ছাড়া তাদের যেন কোনো কাজ-ভূমিকা নেই। আর তাতে স্বভাবতই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে ছারখার। এই চরম হতাশার মাঝে গত বছরের নির্বাচনে ‘আশা-ভরসার একক নেতা’ ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরানের উত্থান ঘটতে দেখেছিল পাকিস্তান। বলাই বাহুল্য, এই পাবলিক তারা কেউই আশা করে না যে, ইমরানের হাতে কোনো চেরাগ আছে যেটা ঘষা দিলে অথবা ভেঙে পড়া অর্থনীতির উপর ইমরান স্রেফ হাত বুলিয়ে দিয়েই সব কিছু আবার ঠিক করে ফেলবেন তিনি।
তারা এতটুকু অন্তত বুঝতে পারা ‘পাবলিক’। তাই আশা ছিল একজন ন্যূনতম সৎ লোক, যার বিদেশে চুরির অর্থ রাখার অ্যাকাউন্ট নাই, যিনি সৎভাবে ও ঈমানের সাথে নতুন নতুন উদ্যোগে আন্তরিক চেষ্টা করবেন অর্থনীতিকে পতিত অবস্থা থেকে উঠিয়ে আনার জন্য। এমনই  ছোট আশার আলো দেখিয়েই উঠে এসেছিলেন ইমরান। পাকিস্তানের অর্থনীতি যত নিচে ডুবে ছিল এখনো তার রেশ কাটেনি। তাতে ইমরানের সরকার অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ফেললেও তার সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
পাকিস্তান আসলে বিদেশী স্বার্থে ও তাদের দায় মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে চলেছিল। আর এই সুযোগে দেশী শাসক-চোরদের হাতে লুটের শিকার হয়ে পাকিস্তান ফোকলা হয়ে গিয়েছিল। সরকার চালানোর মতো যে নগদ কিছু বৈদেশিক মুদ্রা লাগে, সে খরচের মাত্র তিন মাস ভার বইবার বা সরকার চালানোর মত সক্ষমতাও সে দেশের ছিল না- এমন অবস্থায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল।
আর তাতেই ইমরান খান নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। অবশ্য এই অভিযোগও ছিল এবং এখনো আছে যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা পেতে অন্যায় প্রভাব খাটিয়েছে। আবার এর পাল্টা সাফাইও অনেকে দেয় যে, সেনাবাহিনী ঠিকই বুঝেছিল এই ফোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনীতি ও জনজীবনকে টেনে তুলতে হলে নতুন মুখ ও নতুন উদ্যোগ লাগবে- এই বিবেচনায় তারা ইমরানকে অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোক হিসেবে দেখেছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ‘হাত ঢুকিয়ে থাকা’- এটা বহু পুরনো সত্য হলেও একমাত্র সত্য নয়। অন্তত আরো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হল – এক. কোল্ড ওয়ারের জমানায় (১৯৫৩-৯১) আমেরিকা নিজ ব্লকের খুব কম রাষ্ট্রকেই সেনাসরকার বসানো ছাড়া চালাতে পেরেছিল।
দুই. কাশ্মীর ইস্যুর কারণে জন্ম থেকেই ছোট অর্থনীতির দেশ হলেও দক্ষ সেনা আর ব্যাপক খরচের সংস্থান করতে হয়, এমন দেশ হতে হয়েছে পাকিস্তানকে। তাতে বাহিনীর পেছনে সরকারি সমর্থন যে মাত্রায় দরকার, সেই প্রয়োজন নিজেরাই সরকারে্র ক্ষমতায় থাকলে পাওয়া যাবে বলে সেনারা সঠিক অথবা ভুলভাবে মনে করত। তবে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা যাই হোক না, তাদের ক্ষমতায় ব্যাপক অপব্যবহারের বড় বড় নেতিবাচক ভূমিকাই অনেক বেশি।
আর তিনঃ বাস্তবতা হল, ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লব আর এর প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল- আর তা থেকে শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোর মার্কিন বিদেশনীতিতে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থপূরণের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান আমেরিকান স্বার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিল। আর এথেকে পাকিস্তান ততটা নিজের থাকতে পারে নাই, যদিও সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানো সেটা পাকিস্তানের নিজের স্বার্থও ছিল বটে। কিন্তু বড় কথা যেটা যে তালেবান আমলে এসে যতদিন গিয়েছে পাকিস্তান আর তখন নিজের জন্য পাকিস্তান থাকতে পারে নাই। বাধ্য করা হয়ঞ্ছিল তাকে [প্রেসিডেন্ট মোশাররফের লেখা “লাইন অন ফায়ার” বইটা এর বড় স্বাক্ষী। ], আমেরিকার স্বার্থ বাস্তবায়নের এক হাতিয়ার রাষ্ট্র হয়ে গেছিল পাকিস্তান। যেন আমেরিকান যুদ্ধের জাম্পিং প্যাড বা লঞ্চিং প্যাড [ launching pad]।

তাই সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বড় বড় ব্যর্থতা আর চরম হতাশার মধ্যেও এখন ইমরানই এক আশার আলো, আশা-ভরসার প্রতীক। মনে হয়, ২০ বছর পরে পাকিস্তান এই প্রথম নিজের জন্য নিজে কিছু করার চেষ্টা করছে, পাকিস্তানের পাবলিক পারসেপশন এখন এটাই। পাকিস্তানের কলামিস্ট ইকরাম সেহগাল লিখছেন, “নতুন সরকার আগের সরকারগুলোর হাতে বিধ্বস্ত একটি অর্থনীতির উত্তরসূরি হয়েছিল। মাওলানার দুর্ভাগ্যময় মার্চ তখনই হচ্ছে, যখন এই অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার প্রথম লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছে”। কোন মাওলানার কথা বলছেন তিনি?

এরই মধ্যে এখন এক বৈপরীত্য – একটা নাম চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছে – “মাওলানা ফজলুর রহমান”। এই মাওলানার কথাই বলছিলেন সেহগাল।  দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাকে এখন “ডিজেল মওলানা” বলে কুৎসা করার চেষ্টা হয়েছে, দেখা গেছে। এটা তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের ভাল পথ বা সঠিক উপায় না। অতীতে পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতিকে কিছু কমন ইস্যুতে (জিয়াউল হকের আমল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে) একটা জোটে সবাইকে আনার ক্ষেত্রে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল, এ কথা অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু তাতে আসলেই “ইসলামী রাজনীতি” বলে কিছু এগিয়েছিল কি না অথবা ইসলামী নাম দিয়ে বসলেই তা ভালো কিছু হওয়ার গ্যারান্টি কিনা – এসব প্রশ্ন, এমন বুঝাবুঝির ক্ষেত্রে বহু কিছু এখনও বাকি থেকে যায় – এ বিষয়গুলো পুনর্মূল্যায়ন করা বা ফিরে দেখা দিন চলে যাচ্ছে!

পাকিস্তানে এখন যেসব রাজনীতিবিদ দুর্নীতির দায়ে জেলে অথবা দুর্নীতি করার অভিযোগে “দুর্নীতিবিরোধী ইসলামী আইনে” ব্যাপক সংখ্যায় যারা গত নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে, আদালতের রায়ে আনফিট বা অযোগ্য হয়ে গেছিলেন – এসব ক্ষেত্রে তারা নিজেদেরই তৈরি ‘ইসলামী আইনে’ তারা নিজেরাই ফেঁসে গেছিলেন। কারণ কিছু নুন্যতম পড়াশুনা করতে হয় আর বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি লাগে।  আধুনিক রাষ্ট্র ও এর আইনের বৈশিষ্ঠ সম্পর্কে নুন্যতম শিক্ষা ধারণা ও জানাশুনা না রেখে এক জেনারেল তাঁর নিজস্বার্থে কিছু সুবিধা পেয়েছে বলেই একটা ইসলামি রাজনীতি বলে কোন কিছুকে চালু করা যায় না। সেটা ইসলামিওও হয়ে যাবার গারান্টি নাই। সবকিছুর সামনে “ইসলাম” শব্দ বসায় দিয়েই পার পাওয়া যায় না।   আইন প্রণয়নের সময় ইসলামের নামে অর্থহীন অস্পষ্ট শব্দ রেখে দিলে তাতে ভবিষ্যতে  নিজেই তাতে বলি-শিকার হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাদেরই বিরুদ্ধে ঐ আইন ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে ফজলুর রহমানসহ পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতির নেতারা ভূমিকা রেখেছিলেন। জেলারেল মোশাররফের শাসন সমাপ্তিতে নওয়াজ শরিফ বা ভুট্টোর দল পরবর্তীতে এসব আইন সংশোধনের (সংসদীয় একটা কনস্টিটিউশনাল রিভিউ কমিশন গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে ১৮তম সংশোধনী আনতে) সুযোগ পেয়েও তাঁরা নেয়নি; বরং নওয়াজের দল বাধা দিয়েছিল। অথচ পরবর্তী সময়ে এর প্রথম শিকার হয়েছিলেন নওয়াজ শরীফ নিজেই। তিনি এই ইসলামি আইনেই ডিস-কোয়ালিফাইয়েড মাই অযোগ্য বিবেচিত ও পদচ্যুত।

আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন এখানে ২০১৭ সালের এক রিপোর্ট, জিয়াউল হকের আমলের পাকিস্তান কনষ্টিটিউশনের সম্পর্কিত ৬২ ও ৬৩ ধারা, যা দাবি করে – জনপ্রতিনিধিকে ‘সাদিক’ বা সত্যবাদী ও ‘আমিন’ বা বিশ্বস্ত হতে হবে। [Under Article 62(1)(f) of the Constitution, a person cannot be qualified as member of the national or provincial legislatures, if he is not ‘Sadiq and Ameen’ – truthful and trustworthy.] অন্যথায় হাইকোর্টের বিচারক তাকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। নওয়াজ এই আইনেই অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের এক বিচারপতি, বিচারপতি খোসা; তার মন্তব্য থেকে অনেক কিছু পরিস্কার জানা যায়ঃ
[Two years ago, Justice Khosa in Ishaq Khan Khakwani case had described the words ‘Sadiq’ and ‘Ameen’ as obscure and impracticable and had also talked about ‘nightmares of interpretation and application that they involved’.
Justice Khosa had said that some provisions of Article 62 of the Constitution certainly contained strong moral overtones but those provisions introduced into the Constitution by General Ziaul Haq had not been undone by the popularly elected parliaments in the last many decades.]

আর পরে গত নির্বাচনে পরোক্ষে সেনাবাহিনী এই আইন ব্যবহার করেই মুসলিম লীগ ও পিপলস পার্টির বহু (কমপক্ষে ৭০ জন) সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেয়নি, অর্থাৎ দৃশ্যত অযোগ্য করে দিয়েছিল। কাজেই কোনটা “ইসলামি আইন” আর সেটা কার জন্য তৈরি করা হয়েছিল অথবা কার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল এর এক ব্যাপক ও প্রকৃত মূল্যায়ন কি তারা মাওলানা ও তার ইসলামি বন্ধু রাজনীতিকরা এখন করবেন? করতে সক্ষম হবেন? এমন কোনো ইচ্ছার কথা আমরা শুনিনি।

তাহলে এখন মাওলানা ‘ফজলুর রহমানের আন্দোলন’ হচ্ছে কেন? এর অর্থ ও তাৎপর্য কী?
একটা অনুমান হল, পাকিস্তান তার অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার সঙ্কট থেকে বের হওয়ার একটা পথ বের করতে পেরেছে; যদিও সঙ্কট থেকে এখনও বের হয়ে যায়নি, এটা হতে সময় লাগবে। এই অর্থে ইমরানের সরকার কিছুটা থিতু হয়ে বসতে শুরু করেছে। কিন্তু মাওলানা ফজলুর রহমানসহ রাজনীতিক যারা বিরোধী দলে আছেন, বিশেষত যারা জেলে আছেন অথবা গত নির্বাচনে যারা অযোগ্য বিবেচিত হওয়াতে দাঁড়াতেই পারেননি বা পরাজিত হয়েছেন- তারা এখন খুবই খারাপ অবস্থায় আছেন। তারা নিজেদের জন্যও কিছু সুবিধার অর্থে কিছু আনুকূল্য ভাগ চাইছেন সরকারের কাছে। কিন্তু মাওলানার পক্ষের মিডিয়া ক্যাম্পেইন বা গুজব ছড়ানোর অনেক ক্ষমতা আছে বুঝা যাচ্ছে। যেমন আমাদের ইনকিলাব এসব নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে যার শিরোনামে লেখা হয়েছে এভাবেঃ “ইসলামাবাদে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা; দুশ্চিন্তায় ইমরান খান”। এটাকে “টু মাচ” ছাড়া আর কীবা বলার আছে! এখন সবকিছুই আর সবার কাছেই নিশ্চয় সবাই তা বাস্তবে বুঝতে পারছেন।  যুগান্তরের আর এক এমন ম্যানুফ্যাকচারড রিপোর্ট কোথা থেকে নিয়েছে তা বলে নাই।

যেকথায় ছিলাম আমরা যে,  বিরোধীরা এখন যে খারাপ অবস্থায় আছেন, সেটা অবশ্য ইমরানের কৃতিত্ব নয়; বিরোধীদের নিজেদের ব্যর্থতাই এর কারণ যে তারা আদালত মোকাবিলায় ব্যর্থ। তবু এরা সবাই পুনরায় অন্তত বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় তৎপর হতে চাইছেন। কিন্তু সমস্যা হল এরা নিজ মুরোদে তা নিশ্চিত করতে পারছেন না। কিন্তু তারা একটা ‘তৃতীয় পক্ষ’ – মধ্যপ্রাচ্যকে কামনা করেছেন আর তা পেয়ে গেছেন এবং নিয়েছেন; যা তাদেরকে সরকারের সাথে দর কষাকষিতে সহায়তা করতে পারে।

লক্ষণীয়, মাওলানা ফজলুর রহমানকে সামনে রেখে পিছনে নওয়াজ (PML-N) ও ভুট্টোর(PPP) দল দুটো এরা তিন দলীয় ভাবে নয় বরং মাওলানার আন্দোলনকে বাইরে থেকেই সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ এটা মূলত একা এই মাওলানার আন্দোলন। কোনো “ইসলামী” রাজনীতির যে দায়দায়িত্ব, তাতে নওয়াজ-ভুট্টোরা নিজেকে জড়াচ্ছেন না। আর মূলত ফজলুর রহমানের প্রতিই সৌদি সরকারের সমর্থন। কিন্তু যুবরাজরা কেন তাকে সমর্থন করতে আগ্রহী?

এখনকার সৌদি আরবঃ
এখনকার সৌদি আরবের বিরাট সঙ্কট কেবল রাজতন্ত্র টিকানো নয় অথবা ইরানি হুমকি থেকেই কেবল নিজের রাজত্ব বাঁচানো নয়। সঙ্কট অন্যত্র এবং তা বাস্তব ও অবজেকটিভ। মানে, যা কোন ব্যক্তি বা দেশ দায়ী নয়। যেমন বলা হচ্ছে, আগামী ২০ বছরের মধ্যে চলতি দুনিয়ায় আর ফসিল ফুয়েল [fossil fuel] বা মাটির নিচের তেল ব্যবহার করে চলতে চাইবে না বা পারবে না। বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গ্লোবাল অভিমুখ চলে যাবে যা ইতোমধ্যেই যাচ্ছে ধীরে ধীরে হলেও। সৌরবিদ্যুৎ বা ব্যাটারিচালিত যানবাহন বা ইঞ্জিন আবিষ্কার বা তা চালুর পক্ষে ব্যাপক বিনিয়োগ ঢেলে দেওয়ার ব্যাপারটা নজর করলে, এ ব্যাপারে কিছুটা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। তাই সৌদি আরব দুনিয়ায় এই মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যাবার আগেই নিজের ব্যবসা-বিনিয়োগ সব কিছুকে আর তেল বিক্রিনির্ভর নয়, অন্যান্য ব্যবসা-বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল করে স্থানান্তত করে নিতে চায়। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে পৌঁছাতে চায় বলে দেশটা বিরাট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যদিও  এটা খুবই ঝুঁকিবহুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা। বহু ইফ, নট আর বাট [if, not, but] এসবে ঢাকা প্রতি পদক্ষেপ।

প্রথম কারণ, অনেক দেরিতে এটা ‘বুড়ো বয়সে’ এসে সৌদি আরবে শুরু করা হয়েছে। যেমন সৌদিদের চেয়ে দশ ভাগের এক ভাগেরও কম পুঁজি নিয়ে, আমিরাতের দুবাই একা অন্যান্য ব্যবসায় ঢুকে গেছে গত শতক থেকেই। গত ২০০০ সাল থেকেই দুবাই এক নম্বর এয়ারলাইন্স কোম্পানি (এমিরেটস) আর বিরাট এয়ারপোর্ট (দুবাই) প্যাসেঞ্জার হাব চালু করে ফেলেছে। শেখেরা চাইলে যে তাঁরা কেবল আয়েশি জীবন কাটানোর মানুষ নয়; বড় বিনিয়োগ-ম্যানেজমেন্ট নাড়াচাড়া ও সামলানোর মালিক হতে পারে এটা তার বড় প্রমাণ। অথচ দুবাইয়ের সাথে তুলনায়, তেলভিত্তিক নয় এমন বড় প্রকল্পের কথা সৌদিরা জীবনেও ভাবে নাই। তেলবিক্রির মুনাফা তারা ব্যাঙ্কে জমা রেখে খেয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং বিনিয়োগের আগ্রহ নেয় নাই। এখন সৌদিরা একালে এসে তাদের অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ নিয়ে যেতে চাইছে। সৌদিরা এ বছর পাকিস্তানে ২০ বিলিয়ন আর ভারত প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে গেছে, যার বড় অংশ তেল শোধনাগারে।

সমস্যা আরও আছে, বাড়বাড়ন্ত। আমেরিকা এখন আর সৌদি বা পুরা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ১৯৭৩ এর হাত ধরে তেল অবরোধের পালটা পদক্ষেপ হিসাবে তৈরি কিসিঞ্জারের হাতের “আমেরিকার মিডিল-ইস্ট পলিসির” জন্ম হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যা বিখ্যাত আর আরবদের কাছে যা কুখ্যাত। ইসরায়েলকে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে শায়েস্তা করা বা চাপে রাখার কৌশল তখন থেকেই চালু হয়েছিল। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিও যার গুরুত্বপুর্ণ অংশ। আমেরিকার এগুলো সব ব্যবহার বা প্রয়োগ করার সুযোগ এখনও আগের মতই আছে। কিন্তু আমেরিকা আর সৌদি বা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। কারণ আমেরিকা এখন তেল রপ্তানিকারক দেশ, যেটা মূলত ফ্রেকিং অয়েল ( শুকনা কাদামাটির শ্লেট চাপে-তাপে পিষে ভেঙ্গে বের করা তেল)। যার একটাই ডি-মেরিট যে এর উতপাদন খরচ ৫০ ডলারের বেশি। তা সত্বেও এটাই এখন বাজারে সৌদি তেলের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বি। তবুও নিজের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে আমেরিকা এখনো কোন পরিবর্তন আনে নাই। ফলে সৌদি আরব উলটা আরও বেশি একপক্ষীয়ভাবে আমেরিকা-নির্ভরশীল হয়ে গেছে।

আসলে এটা এখন প্রমাণিত যে সৌদি আরব ইতোমধ্যে তার রাষ্ট্রের বইবার সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শত্রু  সৃষ্টি ও তাদের মোকাবিলা-নির্ভর করে নিজ নীতি সাজিয়ে চলে এসেছে। সর্বশেষ ২০১৯ সেপ্টেম্বর মাসে ইরানি ড্রোন-হামলা খেয়ে উলটা সৌদিদের দুঃস্থ অবস্থা  আরও প্রকাশ হয়ে পড়েছিল, তারা হামলা খেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া স্পষ্ট করে ফেলেছিল। সৌদি আরব নিজেকে প্রটেক্ট করতে কতটা অসহায়, আর ওদিকে তার এপর্যন্ত নেওয়া অনুসরণ করা বিদেশনীতি কতই অকেজো – এটা স্পষ্ট সবাই জেনে যায়। অস্ত্র কেনাসহ নানা উছিলায় আমেরিকাকে অর্থদান-সহ ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের দায়দেনা দেউলিয়াত্বের পিছনে অর্থব্যায় করা – সৌদি বাদশারা এতদিন কী না করেছে। অথচ কাজের সময় এগুলোর কিছুই তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ট্রান্সশ্লেটেড হয় নাই।  কাজে আসে নাই।

এছাড়াও আর একটা বড় সমস্যা হলঃ তাদের ‘রাজাগিরি’ স্বভাব। মানে,  ফিউডাল বা সামন্ততান্ত্রিক ও বোকা রাজার স্বভাব; তাই সব কিছুকে তাঁরা ভুয়া রাজকীয় ভ্যানিটিতে আঘাত পেয়েছে বলে খাশোগির মত সবকিছুই টুকরা করে কেটে ফেলার মতো সহজ মনে করে – আর এর সম্ভাবনা কিন্তু সব সময়। কাজেই তাদের রাজত্ব টিকানোর ভয়ও সব সময়। একালে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থ খরচ করে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বাড়ানোর জন্য যাতে অন্তত ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা হয়। কিন্তু সৌদিরা অর্থ খরচ করে নিজের েসব আজীব স্বভাব আর রাজত্ব রাজাগিরি টিকানোর জন্য।

তুলনায় আর এক রাজতন্ত্রী কিন্তু একেবারেই ভিন্ন ও স্মার্ট’ ব্যবসায়ী এবং উতপাদক হল কাতার রাজ পরিবার। সে ট্যাংকার-জাহাজে ভরে (গ্লোবাল সেকেন্ড হায়েস্ট রিজার্ভ আছে কাতারে) গ্যাস রফতানিতে বিরাট বিনিয়োগকারি ও হাইটেক এক উতপাদক ও ব্যবস্থাপনা তাকে সামলাতে হয়। এছাড়াও আছে অ্যালুমিনিয়াম, নিজের খনি থেকে তুলে তা থেকে অন্তত ছয় ধরনের ফিনিশড প্রোডাক্ট উৎপাদন করে রফতানি করে এমন হাইটেক বিজনেস করে চলেছে।  এসব কাজ বসে বসে তেল বেচা অর্থ ভোগ-খরচের রোয়াবি না,  রাজতান্ত্রিক মধ্যপ্রাচ্যের  রূপান্তরে – আর কী  ম্যানুফ্যাকচারিং মডেল হতে পারে – এর আরেক উদাহরণ এখন কাতার। কিন্তু সৌদি আরব যার নিজ নিরাপত্তার ঠিক নাই সে কাতারকে বোকার মত সামরিক হুমকি দিয়ে বসেছিল। মূল অভিযোগ ব্রাদারহুডকে সাহায্য ও আশ্রয়দান। আর তাতে কাতার দ্রুত তুরস্কের সাথে সামরিক চুক্তি করে তুর্কি সেনাবাহিনীর স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলেছে খোদ রাজধানী দোহা-তে। এতে কী লাভ হল সৌদিদের? এটা কেন তারা আগে বুঝে নাই? এরই নিট ফলাফল হল, শুধু ইরানই নয়; তুরস্কও সৌদি আরবের আর এক বড় সামরিক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়ে উঠল। সৌদিরা এক ইরানের ঠেলায় বাঁচে না তাতে আবার তুরস্ক!

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অর্থ না থাকুক; তবু অনেক দেশের চেয়ে পাকিস্তান অনেক বিকশিত ও উন্নত। বড় কারণ, দেশটা একটা মডার্ন রিপাবলিক। ন্যাটো সদস্য তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের এখন প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত অস্ত্র বা উপকরণ বিনিময় বেচাবিক্রিতে সম্পর্ক গভীর। এদিকে ইমরানের উদ্যোগের কারণে ইরান-পাকিস্তান অস্পষ্ট সম্পর্ককে এখন ধোয়ামোছা করার ফলে তারা খুবই ঘনিষ্ঠ। এর আগের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা ভাবতেন সৌদি রাজতান্ত্রিক দেশের ওপর নির্ভর হয়ে থাকা , মাঝে মধ্যে অনুদান নেওয়া আর প্রতিদানে ইরানকে খামাখা উপেক্ষায় ফেলে রাখা, এটাই পাকিস্তানের একমাত্র ও বেস্ট কূটনীতি। বিপরীতে ইমরান প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, তিনি ২০ বিলিয়ন সৌদি বিনিয়োগও আনতে পারেন, সাথে সৌদি অনুদানের কিছু মিলিয়ন ডলারও আনতে পারেন আবার যুবরাজ এমবিএস এর বিশেষ বন্ধু হতে পারেন। তদুপরি, ইরানের সাথে সম্পর্কের জট খুলে তাদেরও ঘনিষ্ঠ হতে পারেন। শুধু তাই নয়, এমনকি ইরান-সৌদি বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার চেষ্টাও করতে পারেন। তাহলে  পাকিস্তানের পটেনশিয়াল কী ছিল তা কি এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নওয়াজ শরিফ কিংবা অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট বেনজিরের উত্তরসূরিরা দেখতে পাচ্ছেন?
মনে হচ্ছে না! বরং তামসা হইতেছে আমাদের মাওলানা ফজলুর রহমান পোক্ত যুক্তি আর যথেষ্ট খোজ খবর ছাড়াই তার আন্দোলন থেকে  দাবি করেছেন ইমরানের আমলে নাকি পাকিস্তান বন্ধুহারা হয়ে গেছে!

একালের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরন আলাদা। এটা আর কোল্ড ওয়ারের (১৯৫৩-১৯৯১) যুগ নয়। এ কালে চীন-ভারত প্রচণ্ড বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিযোগিতা করবে আবার একই সময়ে ভিন্ন ইস্যুতে প্রচণ্ড সহযোগিতা করবে, স্থায়ী কিছু বোঝাবুঝির ভিত্তিও তৈরি করবে। সবই চলবে ইস্যুভিত্তিক, একেকটা ইস্যুতে একেক রকম কৌশল ও অবস্থান; কখনো মিত্র তো কোনটায় চরম বিরোধীতা শত্রুতা। দু’টি দেশের মধ্যে কোনো ইস্যুতে মারামারি লেগে যায় অবস্থা, আবার কোনো ইস্যুতে সহযোগিতা।

এই পটভুমিতে খুব সম্ভবত সৌদি যুবরাজের ধারণা, পাকিস্তানের ইমরানের তুরস্ক ঘনিষ্ঠতাকে একটা ছেঁটে দেয়া বা সাইজ করার জন্য একটু চেষ্টা করা যাক। কোনো চাপ সৃষ্টির সুযোগ পাওয়া যায় কি না, চেষ্টা করে দেখা যাক। মাওলানা ফজলুর রহমানকে ‘ব্যাক’ করার ফলাফল এমনটাই হয়ে যেতে পারে। এই হল সেই অনুমান। এতে যুবরাজকে ইমরানের পাল্টা যুক্তি হবে, আপনি তো আমার পাশাপাশি ভারতেও বিনিয়োগ দিয়েছেন। আবার দুবাইকে দিয়ে মোদীর ‘কাশ্মির দখল’কে সমর্থন দেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।

কাজেই এখন  যুবরাজ বা মাওলানার চাপ উপেক্ষা করে ইমরান মাথা উচা রেখেই উঠে দাঁড়াতে পারেন কিনা অথবা কতটা পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। যদিও মাওলানা ফজলুর রহমানদের খারাপভাবে  ‘হেরে যাওয়ার’ অনেক দ্রুতই সম্ভাবনা বাড়ছে।

কারণ, টাইমিং জ্ঞান। প্রথমত ইমরানের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠানোর জন্য এটা উপযুক্ত বা পরিপক্ক সময় একেবারেই নয়। না পাকিস্তান দেশের ভেতরে না আন্তর্জাতিক জগত-পরিসরে। প্রায় এবছর জুড়ে এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমেরিকার তেমন কোনো অভিযোগ-অনুযোগই নেই। আবার জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা দিয়ে এখন ইমরান যেন ‘হিরো’। মুসলমানেরা ও যারা সাধারণভাবে ন্যায়বিচারের দুনিয়ার পক্ষে, তারা সবাই ইমরান তাদের মনের কথাই বলেছেন বলে মনে করছে। এই ইমেজ কী দিয়ে মাওলানা ভাঙ্গবেন! নিজেকে ইসলামের খেদমতের লোক বলে হাজির করবেন? সেই ইসলামি রাজনীতিরইবা কোন ভাল ইমেজ কই? ইমরানের ইমেজের কাছে এখন এর রেটিং সর্বনিম্ন! এছাড়া, দেশের ভেতরে ইমরান আশা-ভরসা ও ভালো দিনের প্রতীক। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলা আর তা প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন। কিলিয়ে কাঠাল পাকানোও বোধহয় সম্ভবত তুলনায় সহজ ও সম্ভব। বিশেষ করে যখন কোনটা ‘ইসলামী’ রাজনীতি বা ইসলামি স্বার্থ তা পুরাই অস্পষ্ট। পাকিস্তানের “ইসলামিজম” পুরাই ব্যর্থ এখানে আপাতত।

সম্ভবত প্রকৃতিও বিরুদ্ধে। সমুদ্রে নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই রাস্তায় যেখানে আন্দোলনকারীরা এক তারিখ থেকে বসে আছেন, তা বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে, কতটা হানে দেখতে হবে। কর্মসূচি শেষ ঘোষণা করার আগেই এগিয়ে আসছে প্রকৃতির আক্রোশরূপী ‘বুলবুল’! কোন কিছুই মাওলানা ফেবারে নাই, মনে হচ্ছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত  ০৯ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ধাঁধাএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]