মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

গৌতম দাস

২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2PW

Modi-Amit from swarajyamag.com

নেক হয়েছে। এই অঞ্চলকে অনেকদূর বেপথে নিয়েছেন। এবার মোদী-অমিত, আপনাদের হার শুরু। আপনাদের হারের  চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠতে শুরু করেছে! আপনি পেছন ফিরে পালাতে চাচ্ছেন, নরেন্দ্র মোদী! মোদি-অমিতের সেই পিছু হটে পালানোর চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠছে, মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেয়া শুরু করেছে। আপনারা হার মানছেন এমন সব চিহ্ন ফুটে উঠছে। বুঝব কিভাবে?

চিহ্ন একঃ মোদী-অমিতের সরকার এবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসে.) সকালে অনেকগুলো উর্দু ও হিন্দি পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপানো হয়েছে – শিরোনামে “গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে” (“rumours and incorrect information being spread”.) । কিন্তু কোনটা গুজব আর অসত্য? বলতে পারছে না।  দাবি করছে যে, ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে – এমন কোন সরকারি ঘোষণা নাকি এখনও দেয়া হয়নি।  এই ডিটেইলটা ছাপা হয়েছে  ভারতের ইংরাজি ওয়েব পত্রিকা scroll.in. লিখেছে, [On Thursday morning, the Modi government put out advertisements in multiple Hindi and Urdu papers alerting people about “rumours and incorrect information being spread”.]

এতে মিডিয়াজুড়ে তোলপাড়ে প্রায় প্রত্যেক মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে, আগে কবে কোথায় অমিত শাহ ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেসবের রেফারেন্স প্রমাণ তুলে এনে রিপোর্ট ছাপানো শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বরাত দেয়া হয়েছে অমিত শাহের নিজের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে করা টুইটকে। সেখানে বলা হয়েছিল, “ভারতজুড়ে এনআরসি আমরা নিশ্চিত করব”।
এরপরও ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আবার অমিত শাহরা আরও বড় করে নিজেদের বেইজ্জতি ডেকে আনতে তাঁরা এবার সেই পুরান ১১ এপ্রিলের টুইটই মুছে ফেলেছে। আসলে বিরাট এক কেলেঙ্কারির অবস্থায় এখন বিজেপি। আনন্দবাজার থেকে টুকে আনা সেই টুইটটা [নিচে স্কান কপি দেখেন] ছিল এরকমঃ “We will ensure implementation of NRC in the entire country. We will remove every single infiltrator from the country, except Buddha, Hindu and Sikhs: @Amitshah #NaMoForNewIndia

চিহ্ন দুইঃ মমতার তৃণমূল কংগ্রেস দলের হয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতা হিসাবে সংসদে দলের স্বার্থে লিড ভুমিকা নেন আর ইস্যুগুলো দেখাশোনা করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক ও ব্রায়েন। তিনি টুইট করে লিখেছেন, “বিজেপির আইটি সেল টুইট মুছে দিতেই পারে। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সব রাজ্যে এনআরসি হবেই। তা মুছতে পারবে না ওরা”। কথা সত্য, সংসদের রেকর্ড মুছবার ক্ষমতা কোনো একটা দলের নেই।

উপরের এই টুইট-টাই এখন মুছে দেয়া হয়েছে যা ছিল গত ১১ এপ্রিলে লেখা।   আর প্রায় কাছাকাছি একই ভাষ্যের ২২ এপ্রিল লেখা অমিতের আর এক টুইট  এর কপি বরাত দিয়ে  স্ক্রোল [scroll.in] পত্রিকা দেখাচ্ছে সেখানেও অমিত শাহ সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করার কথা বলছেন। যেমন নিচে  দেখেন তা হল,
First, we will bring Citizenship Amendment Bill and will give citizenship to the Hindu, Buddhist, Sikh, Jain and Christian refugees, the religious minorities from the neighboring nations.
Then, we will implement NRC to flush out the infiltrators from our country.

এছাড়া গত অক্টোবরের ১ তারিখে কলকাতায় বক্তৃতা দিতে এসে অমিত শাহ বলেছিলেন, সারা ভারতে এনআরসি করে খুঁজে খুঁজে কিভাবে তেলাপোকা উইপোকা অনুপ্রবেশকারী (মুসলমান) মেরে তিনি  তাড়িয়ে দিবেন। সেই বর্ণনা দিয়ে ভোটার উত্তেজিত করার সহজ পথ নিয়েছিলেন। আজ মিডিয়াগুলো সেই রেফারেন্সটাই বের করে সরকারকে আরও বেইজ্জতি করেছে।

তাহলে এত জায়গায় রেফারেন্স থাকা সত্ত্বেও এবং এমন রেফারেন্স যা লুকানো বা মুছে ফেললেও, তা জানাজানি হয়ে যাবে – এসব জানা সত্ত্বেও মোদী-অমিতের সরকার এমন মিথ্যা কথা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে গেল কেন?

এর সোজা মানে হলে মোদী-অমিতেরা এমন বিপদের জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাদের হাতে কিছুই নাই। তাই “যদি লাইগা যায়” ধরণের কামকাজ শুরু করেছে – এমনই দশা।  খড় কুটো আঁকড়ে ধরছে।  বিশেষ করে এনআরসির সাথে নাগরিক বিলের কোন সম্পর্ক নাই একথা যদি পাবলিককে বিশ্বাস করাতে পারে আর তাতে যদি একথা মেনে নিয়ে রাস্তার আন্দোলন কিছু থিতু হয় এই হল অমিতদের শেষ আশা।
অর্থাৎ পাবলিক ঠান্ডা করার এর চেয়ে ভাল ও আস্থাবাচক কোনো বক্তব্য-হাতিয়ার বিজেপির কাছে নেই। আর এটাই মোদী-অমিতের হেরে যাবার সবচেয়ে বড় চিহ্ন। মোদি-অমিত এতই ফেঁসে গেছেন যে, এর চেয়ে ভাল বা বেশি বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য তাদের হাতে নেই। এ ছাড়া সরাসরি মিথ্যা বলা বা প্রপাগান্ডা করে সদর্পে মিথ্যা বলার দিকে বিজেপির ঝোঁক আগেও ছিল আমরা দেখেছি। তারা মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে অনেকদূর যাওয়া যায়, কেবল পাক্কা ব্যবহারকারি হতে হয়। যেমন সেই অর্থে ভারতের মুসলমানেরা বিজেপির আসলে কোনো শত্রু না, তা তারা জানে। বরং অ্যাসেট। কিভাবে? কারণ মুসলমানদের নামে ঘৃণা ছড়িয়েই তো কেবল হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে ঢুকাতে পারে! মুসলমানেরা না থাকলে সে কার ভয় দেখাত বা কার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াত। আর এটাই তো বিজেপির রাজনীতির কৌশল।

বোকা অমিতের স্ববিরোধী দাবি
সবাই জানি বিজেপির চোখে আমরা মুসলমানেরা সব উইপোকা তেলাপোকা, তুচ্ছকিট; তাই সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করে মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দিবে। বিশেষ করে কেন তাড়িয়ে দিবে? কারণ নাকি মুসলমানেরা স্থানীয়দের কাজ বা চাকরি সুযোগ নিয়ে নিচ্ছি। তা ভাল, কী আর বলা। এনআরসির সপক্ষে আপাত চোখে যুক্তির বিচারে সবচেয়ে ভাল যুক্তির বক্তব্য মনে হয় এটাই।
কিন্তু অমিত শাহ আপনার কপাল খারাপ। কারণ আপনার দিল সাফ নাই। অনৈতিক ও অসততার উপর দাঁড়ানো আপনার কথা। তাই আজ না হলে কাল আপনি ধরা পড়ে যাবেন। এবং গেলেন। কীভাবে?
আপনি এখন বলছেন বাংলাদেশসহ আরও তিন দেশ থেকে মূলত হিন্দুদের নিয়ে এসে আপনি ভারতের নাগরিকত্ব দিবেন এজন্য নতুন বিল এনেছেন। যদিও ঐ তিন দেশ থেকে কোন মুসলমান আসলে এই সুবিধা আপনি তাদের দিবেন না। মুসলমানবিদ্বেষী আপনি আমরা জানি তাই এনিয়ে এখানে কোন কথাই তুললাম না।
কিন্তু লক্ষ্য করেন আপনাদের দাবি হল কেউ মুসলমান হলেই সে ভারতের বাইরের লোক, আর এবার দাবি করতে থাকা যে এরা ভারতের বাসিন্দাদের চাকরি বা কাজ নিয়ে নিচ্ছে বলে আপনারা এনআরসি করছেন তাদের তেলাপোকার মত তাদের ভাগাবেন বলে তোলপাড় করে তুলছেন। তাহলে আবার বাংলাদেশসহ তিন দেশ থেকে সেখানকার হিন্দুদের নিতে চাইছেন কেন? হিন্দুরা কী ভারতে গিয়ে মূলত হিন্দুদের কাজ চাকরিতে ভাগ বসাবে না? তাহলে এনআরসিতে লোক খেদানো আবার নাগরিকত্ব বিলে লোক আমদানি এদুইয়ের রহস্য কী বা এই স্ববিরোধীতা কেন? তাহলে অন্তুত এতটুকু সৎ হয়ে বলেন যে “বিদেশিরা কাজ-চাকরি নিয়ে নিচ্ছে” একথা সত্য না। সত্যিই, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক মাহাত্ব সাংঘাতিক!

আসলে এখনকার ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপির ভিতরের মূল্যায়ন হল, একটু কৌশলে ভুল হয়ে গেছে, সেটা সংশোধন করে নিতে পারলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ভুলটা হল, সারা ভারতে এনআরসি করার কথা আগে না বলে আগে কেবল নাগরিকত্ব সংশোধিত বিল পাস করে নিতে হত, বিজেপিকে। এতে মুসলমান বাদে সব ধর্মের বললেও মূলত অন্যদেশের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে নিলে এরপরেই কেবল সারা ভারতে এনআরসি করার কথা তুলতে হত। তাহলে আজ যেভাবে ভারতের শহরের পর শহর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে উত্থাল হয়ে উঠছে সব উপড়ে ফেলতে শুরু করেছে, সেটা নাকি হত না। এই হল তাদের মুল্যায়ন। কিন্তু  এটা অবশ্যই তাদের মন-সান্ত্বনা!
বাস্তবতা অনেক গভীরে চলে গেছে, যার খবর আর বিজেপি নিতে পারবে না। কেন? ভারতের সাধারণ মানুষই বা মোদী-অমিতের উপর এত খেপে গেল কেন?

সমাজতন্ত্র নিয়ে আমরা জানি অথবা আমাদের অনেক প্রত্যক্ষ আছে। এর গালগল্প শুনিয়ে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে একেবারে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ হয়েছিল এর সবচেয়ে ভুক্তভোগী, কষ্টভোগী এবং ভিকটিমও বলা চলে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে বললে, উনিশশ ষাট সালের মধ্যেই যাদের জন্ম বা চুয়াত্তর সালের মধ্যেই যাদের টিনএজে প্রবেশ ঘটেছিল এদের সরাসরি সচেতন অভিজ্ঞতা আছে কিছু শব্দের যেমন রেশন, টিসিবি, আর কিছু স্মৃতি – ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের হাহাকার। এক পিস সাধারণ লাইফবয়  সাবান কিনতে পারার জন্য কয়েক ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। আর তাতে রেশন, লাইনে দাঁড়ানো আর সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল প্রায় সমার্থক শব্দ। আর মানুষের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে হতাশ করে ফেলার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর হয় না।  মানুষ ভাত জোগাড়ের চেষ্টা করবে না লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে? জীবনের উদ্দেশ্যই বা আসলে কী? কোন কিছুর সদুত্তর কারও জানা ছিল না।
সৌভাগ্যবশত মোটামুটি পঁয়ষট্টি সালের পরে যাদের জন্ম এরা টিনএজে এসে এদের আর রেশন, লাইন দেখতে হয়নি। জিয়ার আমল প্রায় শেষ করে এসে এটা আস্তে আস্তে এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এতে অন্তত  রাষ্ট্র  পরিচালনাকারি সরকার আর সাথে গরিব জনগণও সবারই বুঝাবুঝিতে আক্কেল হয়ে যায় যে রেশন-সমাজতন্ত্রে দেশ চালানো কী জিনিস! আর একালে এসে ট্রাকে করে চালবিক্রির চাল কেনাতে মানুষ উৎসাহী হয় তখনই যখন এতে যে পরিমাণ পয়সা বাঁচে তা অতিরিক্ত সময় ব্যায়ের তুলনায় লাভজনক বিবেচিত হয়, কেবল তখন। আসলে সেকালে পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকত যাদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে অফুরন্ত সময়ও সম্ভবত থাকত ফলে পোষাত; কিন্তু এমন দিন আর এখন সমাজের ভিতরেই তেমন নেই। কিন্তু লক্ষ করা গেছে যে, কোনকালের নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই কষ্টের দিকটা আমল করেছেন, গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন – না, কোনোকালেই এমনটা দেখা যায় নাই।
বরং দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে ভারতের মোদীর সরকার সবচেয়ে গোঁয়াড় আর দানব। একালে এই ২০১৬ সালে নোট বাতিলের ঘটনাটাকেই দেখেন। এই নোট বাতিলকে কেন্দ্র করে মোদী মানুষকে বাধ্য করেছিল – কাজকাম ধান্ধা ফেলে সকলে ছুটেছিল নোট বদলাবার জন্য ব্যাংকে লাইন ধরতে। মানুষের মুল ওয়ার্কিং আওয়ার নষ্ট করে দেয়া মানেই গরীব মানুষের সরাসরি আয়-ইনকামে ক্ষতি করে দেয়া। অথচ এই ক্ষতিটাই অবলীলায় করা হয়েছে। বিশেষ করে গরিব-মেহনতি মানুষের যে আয়ে ক্ষতি এর কোনোই ক্ষতিপূরণ নিয়ে কারও কোন বিকার নাই – ব্যাপারটা মোদী বা তাঁর নীতিনির্ধারকদের আমলেই নেই। অথচ কথাটা হল, সরকার যা দিতে পারে না, মুরোদ নেই, তা সরকার অন্তত কেড়েও নিতে পারে না। যোগ্যতা থাকতে পারে না। চাকরি বা আয়ের সুযোগ দেয়ার কথা সরকারের। তা না দিতে পারলে অন্তত আয়ের সুযোগ কেড়ে নেয়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাজ হতে পারে না। অথচ মোদীর সরকার-প্রশাসন এদিকটা আমল না করেই, কোন বিকল্প বা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা না করেই  নোট বাতিলের পথে গেছিল।
আর ঠিক একই সেই জিনিস ঘটিয়েছে  আসামের প্রশাসন ও মোদী । এনআরসির নামে দীর্ঘ ছয় বছর (২০১৩-১৯) ধরে মানুষকে প্রায়শই তাদের জীবন লাইনে দাঁড় করিয়ে পার করেছে। এখনও যা শেষ হয় নাই, সমাধান নাই। আর এর চেয়েও বেশি কষ্টকর অমানবিক অবস্থায় ফেলেছে ডকুমেন্ট জোগাড়ের ছোটাছুটি আর মানসিক অনিশ্চয়তা – যদি তালিকায় নাম না উঠে? একে তো গরিব মানুষ ভাত জোগাড়ে সব সময় হিমশিম খায়, সেখানে তাঁদের কোনমতে বেচে থাকা জীবনে এর চেয়েও প্রধান শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তালিকায় নাম ঊঠানো বা, নাগরিকত্ব হাসিল করা!  ভাতের অভাবের চেয়ে এ’এক কঠিনতর শাস্তি! অথচ যে এই শাস্তির আয়োজক সে একেবারেই নির্বিকার!

সারকথাটা হল, এনআরসির বেলাতেও এরা গরিব মেহনতিদের কষ্ট  – দিনভর লাইনে দাঁড়ানো, অনিশ্চয়তা, ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ভয় ও শঙ্কা, আয়-ইনকাম বন্ধ ইত্যাদি কোন কিছুর দিকটাই নীতিনির্ধারকরা আমল করেনি। বরং বিজেপির ভোটের বাক্সে হিন্দুভোট পোলারাইজেশন ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। তাই নির্বিকার লক্ষ্য।

তাহলে কেন এবার সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বিলের পক্ষে থাকবে? কেন এর ভেতর দিয়ে প্রতিবাদের সুযোগ পেলে সেটাকে প্রবলে সে কাজে লাগাবে না? মোদী-অমিত তাঁদের সীমাহীন কষ্টের দিকটা দেখেননি, দলের স্বার্থ আর ভোট ও ক্ষমতার লালসায়  সবকিছুকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে গেছে।  আজকে পাবলিক মোদী-অমিতকে উপেক্ষা করার একটু সুযোগ দেখেছে। সেটা তুলে নিয়ে কাজে লাগাবে না কেন? এটাই তো সব দানব সিদ্ধান্তগুলো উপড়ে ফেলার ভাল সুযোগ!
আবার এতদিন সবকিছুতে সর্বক্ষণ হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা হয়েছে। সেটা গরীব মানুষকে ভাল না লাগলেও খারাপ লাগেনি হয়ত, তাই পাশ কাটিয়ে থাকা শ্রেয় ভেবেছে। হয়ত ভেবেছে এটা আমার কী, এটা কেবল মুসলমানের সমস্যা হয়ত। কিন্তু এবার আসামের এনআরসিতে? এবার এতদিনে সকলেই বুঝে গেছে ব্যাপারটা স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে আরামে বসে বসে কেবল মুসলমানের কষ্ট দেখার ব্যাপার নয়। বরং ব্যাপারটা সবারই। ডকুমেন্ট, আধার কার্ড [AADHAAR card, আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সমতুল্য] ইত্যাদি জোগাড়ের অসম্ভব ছোটাছুটির অনিশ্চয়তা। আবার ভারতের আধার কার্ড মানে এই ন্যাশনাল আইডি দেয়া ও দেখাশুনা করা হয় তাদের পোস্ট-অফিসগুলো থেকে। ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব বা এনআরসির ক্যাচালে সবাই ছুটছে পোস্ট-অফিসে অথচ, পোস্ট অফিসে সেজন্য মোদী-অমিতেরা স্টাফ বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করেনি, হয়নি। হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে আনার কাজের বাইরে অন্য কোন দিকে মনোযোগ দিবার সময় কই তাদের? এনিয়ে আনন্দবাজার একটা ভাল বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন এখানে। লিখেছে, প্রায় সকলেই জানিয়েছেন, এনআরসি-র ভয়েই আধার কার্ড ঠিক করার জন্য লোকজন মরিয়া। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কারও তারিখ দু-তিন মাস পরে, কারও আবার বছরখানেক পরে। অর্থাৎ অমিত শাহের নিজনিজ ভোটের বাক্সের স্বার্থে মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ও ভোগান্তিতে ফেলছে অথচ স্টাফ বাড়ানো, কাজটা সহজ করতে বাড়তি স্টাফ দেয়ার আগ্রহ তাদের নেই। ব্যাপারটা তাঁদের মনোযোগের ভিতরেই আসে নাই। তাহলে কেন সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেলে তা উপড়ে ফেলে দিতে চাইবে না? এছাড়া এতদিতে তাঁরা বুঝে গেছে বিজেপির হিন্দুত্ব জিনিষটা এত মিঠা না!

সার কথায় বললে, পাবলিক পারসেপশন এখন আগের তুলনায় পরিপক্ব রূপ নিয়েছে মনে হচ্ছে।  একারণে, হিন্দুত্বের রুস্তমিতে হিন্দুগিরি বা হিন্দু-সুরসুরি তুললেই তা আর সমাজে তেমন কাজ করছে না সম্ভবত, ঢিলা দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থের দেনাপাওনার চোখ দিয়ে নাগরিকত্ব বা এনআরসি ইস্যুতে সরাসরি নিজের লাভক্ষতি দিতে বুঝতে চাচ্ছে মানুষ; বিশেষ করে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ।  আর এর সাথে এসে যোগ দিয়েছে  স্টুডেন্ট আর সাধারণ মানুষ। তাই তাঁরা নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেয়ে পুরা ষোল আনা কাজে লাগাচ্ছে, বলে মনে হচ্ছে। জীবন এমনিতেই প্রচন্ড ভারী, সেই ভারকে আর বাড়তি ভারী না করে নাগরিকত্ব বা এনআরসি থেকে মুক্ত করতে চাইছে সবাই!

অতএব প্রশ্নটা এনআরসির বাস্তবায়ন এটা মোদী-অমিতেরা  হিন্দুত্বের ক্ষমতার লালসায় নাগরিকত্ব বিলের আগে না পরে হবে সেটা তাদের কাছে এখানে কোনো ইস্যুই নয়। পাবলিক পারসেপশনের লেবেলে এর কোনো ফারাক নেই। বিজেপি সম্ভবত মুখরক্ষার জন্য এমন “সারা ভারতে এনআরসি বিজেপি চায়নি” বলে ক্ষিপ্ত পাবলিকের মনোযোগ সরানোর অজুহাত খুঁজছে। কিন্তু বিজেপির মুল সমস্যা হল মোদী-অমিতের উপর পাবলিক বিলা হয়ে গেছে। আস্থা হারিয়ে গেছে বা বিশ্বাস তুলে নিয়েছে মনে হচ্ছে। কাজেই এনআরসি না নাগরিকত্ব বিল কোনো ইস্যুতেই পাবলিক আর সরকারকে বিশ্বাস করছে না। যার সোজা মানে হল, মোদী-অমিতের বিজেপি সরকারকে – এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল – এদুটোকেই প্রত্যাহার  করা হয়েছে এই ঘোষণা করানোর দিকেই আগাচ্ছে।

বাংলাদেশের চলতি সরকারকেও বিজেপি বিক্রি করেছে
ইদানীং লক্ষণীয় যে, ভারতের মিডিয়া এবার প্রকাশ্যেই লিখছে বাংলাদেশের সরকার নাকি ‘খোলাখুলিভাবে কাজে ও বাক্যে বছর দশেক ধরে প্রো-ইন্ডিয়ান’ [Prime Minister Sheikh Hasina, who has been openly pro-India in word and deed since coming to power a decade ago]। কথাটা দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছে একজন এমন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ সরকারকেও অমিত শাহ অপব্যবহার করেছে তা বুঝাবার জন্য। কথা সত্য। অমিত শাহ ভারতের সংসদে  নতুন নাগরিকত্ব সংশোধিত বিলের পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য বাংলাদেশে সরকার হিন্দুদের ‘নির্যাতন করছে’, ‘সুরক্ষা করে নাই’  – এসব কথা সরাসরি বিলের ভাষায় অথবা সংসদে অমিত শাহের কথায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নাম সরাসরি বিলের ভাষায় পর্যন্ত উঠে এসেছে। সেটা আসায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করছে। তাহলে এর তথ্য ও প্রমাণাদি কই?   একথা খুবই সত্য যে অমিত শাহের নাগরিকত্ব বিল দাঁড়িয়ে আছে “বাংলাদেশ সরকারের হিন্দুদের উপর ধর্মীয় নির্যাতন করে চলেছে” একথা যদি নিশ্চিত ভাবে ধরে নেই একমাত্র তাহলেই।
অথচ কূটনৈতিক করণীয় অর্থের দিক থেকে বললে, এ নিয়ে আগে কোন আলোচনার এজেন্ডা সেট করা, কোনো আলাপ আলোচনা অথবা কোনো প্রমাণ পেশ ইত্যাদির কিছুই করা হয়নি। আবার বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করার বিনিময়েই এমন ভাষ্যের উপরের এই বল আনার যৌক্তিকতা ও সাফাই দাঁড়িয়ে আছে। আবার এটাই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে বিজেপির এর ফলাফলে হিন্দুভোট পোলারাইজেশনে বাক্স বোঝাইয়ের পরিকল্পনা ও উপায়। মানে হল ভারতের বিজেপি সরকার নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ সরকারকে বেঁচে দিয়ে একে নিজের ভোটের ক্ষমতা পোক্ত করার উপায় হিসেবে হাজির করেছে। এটা পানির মতই পরিস্কার।
আবার ওদিকে আসামের রাজ্য সরকার সেটাও বিজেপি দলের সরকার। আসাম সেই দেশ ভাগের সময় থেকে বাংলাদেশের কথিত  ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুসলমানদেরকে  তাঁদের সব দুঃখের জন্য দায়ী করে আসছে। তাঁরা নাকি স্থানীয়দের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে অসমীয়দের সমাজ-সংস্কৃতি সব ধবংস করে দিচ্ছে। অথচ এনআরসি তালিকাতে দেখা গেল তাদের এই অসমীয় পারসেপশন ভিত্তিহীন। ছিটেফোঁটাও সত্যি নয়। এনআরসিঢ় ফাইনাল তালিকা প্রকাশের পর এখন জানা যাচ্ছে  আসামের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার ১%-এর (প্রায় পাঁচ লাখ মাত্র) মত মুসলমান জনগোষ্ঠী তালিকায় নাম তুলতে পারেনি। অর্থাৎ একটা মিথ্যা পারসেপশনের উপরে তারা এখনো চলছে আর মুসলমানবিরোধী ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে।  [আমরা যেন না ভুলে যাই অরিজিনাল মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানোর শুরুকর্তা কিন্তু এই অসমীয়রা যারা তাদের মথ্যা পারসেপশন প্রমাণ করতে না পারলেও এখনও তা জারি রেখেছে। আর বিজেপি পরে এই দাবিটা কুড়িয়ে নিয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে রাজনীতি করছে।] আর এবার নাগরিকত্ব বিলের পরে অসমীয়দের ফোকাস গেছে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর যে, তারা এবার নাগরিকত্বের লোভে আসাম দৌড়াবে হয়ত। তবে এটা অবশ্যই মোদি-অমিত সরকারের ভোটবাক্স ভরবার ইস্যু। এই অর্থে  সেটা সত্যি সত্যিই ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু।
কিন্তু তামাসাটা হল,  বিজেপির এই আসাম সরকারকেই আবার বাংলাদেশ সরকার ফ্রিচার্জে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বের হতে ট্রানজিট আর বন্দর ব্যবহার সুবিধা দিতে যাচ্ছে। আসামের সরকার ও জনগণ কোন ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও সাফাইয়ের বলে এই সুবিধাগুলো নেবে? সম্প্রতি নাগরিক বিলবিরোধী জনঅসন্তোষ চলার সময় আসামে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর অফিসের সাইনবোর্ড ভাঙচুর ও গাড়িতে হামলা হয়েছে। এগুলো কী বিনা পয়সায় বাণিজ্যিক সুবিধা সহযোগিতা নিবার ও পাবার নমুনা?
আসলে বলাই বাহুল্য, অসমীয় জনগণ ও তাদের সরকার আসলে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়, কেমন সম্পর্ক চায় সেটা স্পষ্ট করে বলার হাই-টাইম চলে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ থেকে যেকোনো ট্রানজিটসহ, পোর্ট ফেসিলিটি ব্যবহার নিয়ে কোনো কথা শুরুর আগে ‘বাঙালি খেদাও’-এর ঘৃণাচর্চা নিয়ে তাদের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত নয় কী? যার প্রতি এত ঘৃণা তার কাছ থেকে কিছু নিবে্ন কেমন করে আর সে দিবেই-বা কেন, এমনকি আপনারা সঠিক চার্জ পুরাটা দিলেও দিবে কেন? সেও এক জেনুইন প্রশ্ন!

তাহলে মো্দী-অমিত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রমেই উইকেট পতন চলছে। আগামী সাত-দশ দিনে আর কয়টা রাজ্য বা শহরে আন্দোলনে প্রভাবিত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে- এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বলা হচ্ছে ইতোমধ্যে বড়ছোট মিলিয়ে ভারতের ২৮ রাজ্যের মধ্যে ১৬ রাজ্য আন্দোলন ছড়িয়েছে। অন্তু একবার সরকারবিরোধী মিছিল হয়েছে। এমনকি বিজেপি রাজ্য সরকারে আছে এমন রাজ্যেও তা হয়েছে।  অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যে বামেজর রাজ্যে বিক্ষুব্দ আন্দোলন হতে দেখলে সেক্ষেত্রে মোদী-অমিতের জন্য সেটা খুবই বিপদের কিছু হবে। কিন্তু সাবধান। কারণ বিশেষ করে মোদী-অমিতরা যত অসহায় হবেন ততই তাদের পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধাবার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। এছাড়া পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘাত বাধানোর সম্ভাবনাও বাড়বে। যেমন আমরা হাতে নাতে দেখেছিলাম নির্বাচনের আগে। এছাড়া সবার উপরে আমেরিকান জেনোসাইড ওয়াচের ভাষায়, ভারত ধাপে ধাপে সেদিকেই আগাচ্ছে, ‘ভারতে গণহত্যার প্রস্তুতি চলছে” – সেটা তো আছেই!’

শেষে বাড়তি কিছুঃ
এখানে একটা ছোট তথ্য ও রিপোর্টের খবর দিয়ে রাখি। আজ মানে ২২ ডিসেম্বর আনন্দবাজারের অগ্নি মিত্রের লেখা একটা রিপোর্ট আছে, শিরোনাম – “প্রিয়ঙ্কা নিয়েই ক্ষোভের শুরু ঢাকা-দিল্লিতে”। সেখানে সারকথাটা যা বলা হয়েছে তা হল, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর সাথে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা গত অক্টোবরে ভারত সফরের সময় দেখা  করা থেকেই মনোমালিন্য “ক্ষোভের” শুরু হয়েছিল। প্রথমত, এই রিপোর্টে যতটা অতিনাটকীয়তা আছে ততটাই সত্যতা নাই। আনন্দবাজারি রিপোর্ট অবশ্য এমনই ঝোঁকের সাধারণত হয়।  তবে গান্ধী পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা দেখাতে যাওয়াটা – ঠিক সেটা এখানে ইস্যু না। মূল ইস্যু বা শুরুর ইস্যু হল, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিজেপি-আরএসএস করুক বা সেদিকে ঝুকুক এব্যাপারে  ভারতের আরএসএস আমাদের সরকারের কাছে সহযোগিতা চাইলে অন্তত ২০১৮ সালে বা তারও  আগের কালে সরকার সম্মতি দিয়েছিল। কিছু কাজ ও প্রশ্রয় দেওয়া করেছিল। যার খেসারত হল প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছ পর্যন্ত গিয়ে অভিযোগ তোলা। গোবিন্দ প্রামাণিকের ঢাকায়  “আরএসএস” খুলে বসা, সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কথা বলা। রানা দাসগুপ্তের বেচাইন হয়ে খোদ মোদীর কাছে নালিশ পরে অস্বীকার ইত্যাদি। এছাড়া আগে থেকেই আবুল বারাকাতকে সরকারি তেল ঘি খাইয়ে পেলেপুষে তাঁর যে “ঐকিক নিয়মের বিশেষ পরিসংখ্যান” বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাই এখন বিজেপির পক্ষের অস্ত্র য়ার আমাদের বিরুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে হাজির হয়েছে। এসব কিছু বুঝতে বুঝতে হাসিনা সরকার বেশ কিছু ক্ষতি করে ফেললেও সবছিন্ন করে শেষমেশে শক্ত সিদ্ধান্তের কথাটা তিনি অক্টোবর সফরে পরিস্কার করে এসেছিলেন।
ঐ অক্টোবর সফরকালে তাই বলে বা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল হাসিনা সরকার আগে যা কথাই হোক সেখান থেকে এই বিষয়ে নো কমিট্মেন্টে” ফিরে যাচ্ছে। সরকার যে একথা বুঝিয়ে দিয়েছিল এর দুটা চিহ্ন আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই।  এক. শাহরিয়ার কবিরের কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকা সাক্ষাতকারে সে ইঙ্গিত রেখেছেন। [এনিয়ে সেকালে আমার লেখাটার লিংক এখানে। ] তার দাবি করে বলা  -বাংলাদেশে আরএসএস বলে কিছু নাই, “তাদের কোন ততপরতা নাই” ইত্যাদি – সে প্রমাণ।  আর দুই. রানা দাসগুপ্ত সেই থেকে এখন অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে হিন্দু নেতা হিসাবে “সরকারের অবস্থান” বহন করেন। কোন বেচাইনি রাখেন না। তিনি গত মাসদুয়েক আগে ভোলার ঘটনার সময় হেফাজতের শফি হুজুরের সাথে দেখা করে এসেছেন যেটা ফলাও করে প্রচার পেয়েছিল – সম্প্রীতির প্রতীক হিসাবে। এককথায় সরকারের অবস্থান হল – “আরএসএস-কে আর পৃষ্টপোষণ নয়”।  আর এখান থেকেই মোদী-আরএসএসের আমাদের সরকার প্রধানকে অসহযোগিতা , প্রকাশ্য অসম্মান করা ইত্যাদি। এক শুস্ক টেনশ্নের শুরু।

এদিকে এসবের মাঝেই মোদী-অমিতেরা এনআরসি-নাগরিকত্ব নিয়ে নিজেরাই নিজের জনগণের কাছে গ্যাড়াকলে পরে গেছেন। আর এই সুযোগটা ভাল্ভাবেই নিতে পেরেছে হাসিনা সরকার। নেওয়াটাই স্বাভাবিক ও উচিত। নড়বড়েরা যে এটা পারছে সেটাই শুকরিয়া। আবার এনিয়ে মোদী-অমিতের বলারও বিশেষ কিছু নাই। কেবল ভারতের মাস-পাবলিকের মুডের উঠানামার দিকে খেয়াল করে চললে, সে অনুসারে কখন মোদীকে আবার গুরুত্ব দিবে বা দিবেনা  তা  আগা-পিছা করলে আমাদের সরকারের অসুবিধা হবার কথা নয়। কাজেই সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক। কেবল একটাই সমস্যা, আমাদের নেতারা ভুলে থাকতে চায় যে তারা নিজেকে সম্পুর্ণ দান করে দিয়ে ভারতের সাথে  বিশাল ব্যক্তিগত সম্পর্কের জগত গড়তে ভারতের পায়ের কাছে শুয়ে থাকলেও ওদের চোখ আমরা কেবল নিচা “মুসলমান” – এটাই থাকব।  তারা তুচ্ছ করবে। যেন এখনও আমরা জমিদারের প্রজা যারা কখনই বন্ধু বা সমান হতে পারবে না। এই কথাগুলো আমাদের মনে থাকে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদি-অমিতের হারের চিহ্ন এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

গৌতম দাস

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2OV

 

 

_https://indianexpress.com/article/north-east-india/tripura/tripura-citizenship-bill-protest-northeast-india-tribal-parties-6150368/

এবার নাগরিকত্ব বিল। মানে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আনা এক সংশোধনী বিল [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)]। এর সোজা অর্থ হল আসামে এখন এবং ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যে এনআরসি তালিকা করার পর মুসলমান যারা বাদ পড়বেন, তাঁরা একেবারেই বাদ। আর তাঁরা বাদে বাদ পড়া অন্য সব ধর্মের সবাইকে যেন আবার ভারতের নাগরিকত্ব সহজেই দেয়া যায়; এরই এক খোলাখুলি নাগরিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হবে এটা। এই লক্ষ্যে মোদী সরকার আগামী সপ্তাহে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ওপর একটা সংশোধনী বিল আনতে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে মোদীর মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। আগামি সোমবার (৯ ডিসেম্বর) লোকসভায় পেশ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল।

বিজেপি-আরএসএসের একেবারে ওপরের নেতারা জানেন, মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো এটাই তাদের রাজনীতি। কেন? মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুরা ভাল – না, ঠিক এটা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাজ বা রাজনীতি নয়। তাদের মূল কাজ হল পোলারাইজেশন, মানে ভোটার মেরুকরণ। অন্য ভাষায় কাজটা হল হিন্দুদের আলাদা করা, হিন্দুরা আলাদা, ভালো আর সব কিছু তাদেরই- এটা সব সময় প্রমাণ করে চলা ও এই দাবি তাতিয়ে রাখা। কেন? কারণ এমনটা শুধু প্রমাণ করে রাখা তাদের কাজ নয়। বরং কাজের লক্ষ্য হল, হিন্দু হিসেবে তারা যেন এরপর দলবেঁধে কেবল বিজেপির প্রার্থীকেই ভোট দেয়। মানে বিজেপির বাক্সে সব হিন্দু-ভোট যেন এসে ঢুকে।

এই শেষ বাক্যটাই হলো আসল লক্ষ্য। অর্থাৎ মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুমাত্রই ভাল, এটা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার সময় আধা সত্য বা মিথ্যা যা খুশি কিছু প্রচার করা হল। এতে ধর্মীয় পোলারাইজেশন বা হিন্দু মেরুকরণ ঠিকঠাক করা হলো। কিন্তু কোনো কারণে বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট ঢুকল না। তাহলে কিন্তু এটা আর বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হবে না। বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে ফেলা- এটাই বিজেপির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চর্চা করার মূল লক্ষ্য।

স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ
এদের রাজনীতির বুঝও আজীব; মূলত তিনটি শব্দের- স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম বলে এ দুই শব্দের অর্থহীন কিছু আবেগী সুড়সুড়ি তুলে ফেলা আর তৃতীয়টা হল জাতীয়তাবাদ : মানে উগ্র-হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ রাষ্ট্র, অধিকার, নাগরিক, রিপাবলিক, কনস্টিটিউশন ইত্যাদি এসবই এদের কাছে একেবারে অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ও ধারণা। রাষ্ট্র বলে কোন ধারণা এদের কাছে অপ্রয়োজনীয় থাকে, তাই এর কোনো নীতিগত দিক যেমন নাগরিকের কিছু মৌলিক অধিকার থাকবে; যা রক্ষা করতে, সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- এটা বিজেপির রাজনীতিতে কোনো বিষয় নয়। অথবা ধরা যাক, রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে কোনো অধিকারবৈষম্য করতে পারবে না, আইনের চোখে সবাইকে সমান দেখবে ও আচরণ করবে ইত্যাদি বিষয়গুলো? রাষ্ট্রের এমন পালনীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটাও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিতে কোন আমলযোগ্য ব্যাপারই নয়। কেবল কেউ বিজেপি কি না, সে হিন্দুত্ব চিন্তার লোক কি না – সেটার দিকে চোখ রেখে চলে বিজেপির বাক্স ভরানোই এই রাজনীতিতে যথেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে বিজেপি-আরএসএস বা তাদের কর্মীরা কি কেবল এক হিন্দুত্বের আবেগের মধ্যেই তীব্রভাবে ডুবে থাকে- যেন কেবল এক হিন্দুত্বের ভাবাবেগের সুড়সুড়িই তাদের জন্য সব কিছু, ডুবে বুঁদ হয়ে থাকা? তাই কী? না, সম্ভবত তা একেবারেই নয়। যেমন আমরা পরীক্ষা করতে পারি এবার ভারতে পেঁয়াজ-উৎপাদক অঞ্চল বা রাজ্যে বন্যায় তা নষ্ট হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজসঙ্কট খাড়া করেছে। বাংলাদেশের মত ভারতেও নিজের বাজারেও পেঁয়াজের সঙ্কট চলছে। চড়া মূল্যের বাড়াবাড়ি হয়ত বাংলাদেশের মত না। কিন্তু মজার ঘটনাটা হল, তুরস্ক ভাল সহনশীল দামে ভারতকে পেঁয়াজ দিতে রাজি হওয়ায় সেই তুরস্ক ভারতের কাশ্মির নীতির কঠোর সমালোচনা করে ধুয়ে দিলেও এ ব্যাপারে মোদীর ভারত সরকার চুপচাপ। যেমন ভারতের অনলাইন ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় একটা খবরের শিরোনাম হলো, ‘মোদি সরকার তুরস্কের কাশ্মির সমালোচনা শুনেও চোখ বুজেছে; কারণ ভারতের এখন তুরস্কের পেঁয়াজ দরকার” [Modi govt ignores Turkey’s Kashmir criticism — because India needs its onions]।

আবার প্রায় একই রকমভাবে মালয়েশিয়ার মাহাথির গত সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে ভারতকে কাশ্মিরে ভারত ‘দখলদার বাহিনী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাতে ভারত প্রথমে ছদ্মরাগ দেখিয়েছিল যে, তারা আর মালয়েশিয়ার পামঅয়েল কিনবে না। কিন্তু দামে সস্তা পাওয়ায় ভারত এখন আগের মতোই মালয়েশিয়ার পামঅয়েল আমদানি করতে শুরু করেছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াল, উগ্র হিন্দুত্বের তথাকথিত আবেগ নয়, এমনকি মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়েও নয়; সুখ বলতে তা এখনো তাদের কাছে বিষয়-আশয়ের বস্তুসুখের মধ্যেই, সেখানে হুঁশ জাগ্রত রেখে খাড়া বৈষয়িক লাভালাভেই তাদের সুখ।

কাজেই ভুয়া হলেও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হল বাছবিচার হুঁশহীন এক উগ্র হিন্দুত্বই। যদিও সম্প্রতি তাদের পরপর দুইটা বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একটা হল মোদী সরকারের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মাপ জিডিপিতে ধস নেমেছে। আসলে বলতে হবে, এবারের ধস আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। দুই বছর আগে যেটা  ৮ শতাংশ বলে মোদী দাবি করেছিল, কিন্তু সেটা আসলে আড়াই পার্সেন্ট বাড়িয়ে বলা হচ্ছিল।  সেই বাড়ানো ফিগারটাও এখন কমতে কমতে এবার ৪.৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এটা সমাজের সব কোনায় হাহাকার তুলে ফেলেছে। কাজেই এটা ঢাকা দিতে এখন আবার কোনো এক জবরদস্ত মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণার ইস্যু দরকার।

এ ছাড়া তাদের আরেক বিপর্যয় ঘটেছে আসামের এনআরসি ইস্যুতে। তারা হিন্দুমনকে খুব তাতিয়েছিল যে, নিশ্চয় লাখ লাখ নাগরিকত্ব অপ্রমাণিত মুসলমান থেকে যাবে এমন-তারা তালিকায় দেখতে পাবে আশা করেছিল। কিন্তু হিন্দুদেরই হাহাকার উঠেছে কারণ নাগরিক-প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া মোট ১৯ লাখের ৭৫ শতাংশ হলো হিন্দু। এখন উঠতে-বসতে বিজেপিকে বদ দোয়া দেয়া আসামের এই হিন্দুদেরকে সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে বিজেপির। অন্যের জন্য খুড়ে রাখা গর্তে পড়ে এখন উলটা বিজেপিরই জান যায় অবস্থা।
তাই বিজেপি এখন অছিলা খুঁজছে দু’টি- ১. তৈরি হওয়া আসামের এনআরসি তালিকাই বাতিল বলে ঘোষণা করে দিতে আর ২. ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন।

বিজেপির মূল লক্ষ্য আসলে ‘বিদেশী’ বলে বা ‘মুসলমান’ বলে একটা কল্পিত স্থায়ী শত্রু খাড়া করে ফেলা; যারা সব সময় নাকি ভারতের ‘হিন্দুস্বার্থের বিরোধিতা’ যাচ্ছে এভাবে এমন একটা গল্প ও ইমেজ বিজেপি খুজছে যা দিয়ে সে একটা স্থায়ী শত্রুরূপ দান সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। বিজেপির ইচ্ছা কল্পিত এমন শত্রুর বিরুদ্ধেই সারাজীবন সে লড়াই করে যাচ্ছে তা দেখাতে পারে। যেন সে এই চেক ভেঙে ভেঙে সব সময় খেয়ে চলতে পারে, পোলারাইজেশন ও ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতি করে যেতে পারে। সে কাজে এমন স্থায়ী এক ইস্যু হতে পারে যেমন সেটা হতে পারে এমন যে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এই শ্লোগান।

তবে আসলে এটা আর অনুমান হিসেবে নেই, গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো এই বয়ানেই একমাত্র বিজেপি রাজনীতি করবে ও করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মোদি-অমিতের দানবগোষ্ঠী।

অর্থনীতিতে ডুবে গিয়ে এরা এখন এমন অবস্থায় যে ‘ভারতজুড়ে এনআরসি’ আর, বিদেশী খুঁজতে হবে- এটাই তাদের একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনার রাজনীতি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আঁচ করে দক্ষিণী প্রাচীন পত্রিকা দা হিন্দু এডিটোরিয়াল লিখে বলেছে The Centre should focus on the economy and address issues of real concern] কেন্দ্র সরকারের উচিত অর্থনীতির দিকে যেটা প্রকৃত উদ্বেগের ইস্যু সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।
যেমন এখন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নির্বাচন চলছে, সেখানে অমিত শাহ নির্বাচনী জনসভা বক্তৃতা করেছে- “ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে”, এই লাইন নিয়ে। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং- “আপনার পাশের লোকটা বিদেশী নয়তো, চেক করেছেন কী”- এমন বিদেশীভীতি বা জেনোফোবিয়া ছড়ানোর উদ্যোগ-রাস্তা ধরেছে। এটাকে এক মানসিক অসুস্থতা বললেও খুব কমই বলা হবে।

কিন্তু এর আগে ইতোমধ্যে আসামে যে ড্যামেজ ঘটে গেছে, তা হলো এনআরসি মোট ১৯ লাখ বাদ পড়াদের মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু। তাই এখন উলটা আসামের সমাজ থেকে এদের বাদ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হবে বিজেপিকে। তাই, এদেরকে বাঁচানোর ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে আগামী সপ্তাহে আনা হচ্ছে, ১৯৫৫ সালের পুরনো নাগরিকত্ব বিলের এক সংশোধনী। এটাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৯। যাতে তাদেরকে আবার নতুন করে নাগরিকত্ব দেয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে এই বিলে বলা হবে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানরা (কিন্তু মুসলমানরা বাদ) অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং উল্টো যেমন বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অভিবাসী এবং বৈধভাবে আসা অভিবাসী (কিন্তু যাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে), তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আসলে আগের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে কোনো অবৈধ অভিবাসী (ভিসা ছাড়াই ঢুকে পড়া বা ভিসার মেয়াদ শেষেও থাকা) বিদেশী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে না। সোজা কথায় মোদী নতুন আইনে এই বাধা তুলে দিতে চাইছে; কিন্তু মূলত মুসলমান ছাড়া বাকি সব ধর্মের মানুষের জন্য সুযোগ রেখে দিয়ে- এভাবে আনা হবে এই সংশোধনী। এটাই এর প্রত্যক্ষ মুসলমানবিদ্বেষ এবং মুসলমানবৈষম্য।

এমন এই বিদ্বেষ ও বৈষম্য তৈরি করা – এটাই হবে বিজেপি-আরএসএসের রাজনৈতিক পুঁজি। স্থায়ী ঘৃণাবিদ্বেষ তৈরি ও ছড়ানোর উৎস; যাতে এটা কেনাবেচা থেকেই স্থায়ীভাবেই পোলারাইজেশনে বিজেপি প্রার্থীর বাক্স ভরার রাজনীতি করে যাওয়া যায়। এক দিকে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এর রাজনীতি চালিয়ে অস্থির ঘৃণাবিদ্বেষ উত্তেজনা তাতিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা, মুসলমান তাড়িয়ে খাঁটি হিন্দুদের ভারত কায়েম করা- এ এক বিরাট মাইলেজের স্থায়ী ইস্যুর রাজনীতি বিজেপি-আরএসএস নিজের জন্য তৈরি করতে চাইছে। আর এ কাজ করতে গিয়ে কোনো হিন্দু এতে ফেঁসে নাগরিকত্ব খোয়ালে তাকে আবার নাগরিকত্ব দিয়ে আগের মতোই ভারতে রেখে দেয়া যাবে। এই সুবিধা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপি-আরএসএস-কে তাদের ঘৃণ্য-রাজনীতির ইস্যু সরবরাহের নিয়মিত খোরাক হয়ে থাকতে হবে, আর স্থায়ীভাবে নাগরিকবৈষম্যের শিকার হতে থাকতে হবে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের এই মুসলমান ‘বলি’ দিয়ে দেয়ার রাজনীতি- তা আবার ‘ভারত জুড়ে এনআরসি’ বা বিদেশী খোঁজো যে নামেই আসুক তা কি টিকেই যাবে? বিজেপি-আরএসএস এরাই কি একমাত্র সত্য হয়ে যাবে? আগাম কোনো কিছু শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা যায়।

এনআরসি নামে মোদি-অমিতের দানব শয়তানি শুরু ও শেষ হলে পরিণতি কী হয় তা মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে আসামের সবার তা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। অহমিয়া বা বিজেপি যতই এটা ‘বিদেশী’ বা মুসলমানরাই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে খুশিতে থেকেছিল বটে, কিন্তু সবশেষে এটা তাদের নিজের জন্যই খানাখন্দ খুঁড়ে রাখার মতো কাজ হয়েছে। এখন হাহাকার উঠেছে। শুধু তাই নয়, পড়শি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও এ বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষের তর্কে ওই বাংলাও এখন বুঝে গেছে যে, নাগরিকত্বের ডকুমেন্ট সার্টিফিকেট আর কার্ড জোগাড়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি কী জিনিস। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের যারা ইতোমধ্যে বিজেপিতে যোগ দিয়ে হিন্দুত্বে সুবিধা খাওয়া আর মুসলমানের রাস্তায় গড়াগড়ি যাওয়া ব্যালকনিতে বসে আরামে দেখা যাবে বলে ভেবেছিল, এরা নিজেই ইতোমধ্যে বুঝে গেছে এনআরসি কী জিনিস। এটা যে হিন্দু-মুসলমান বাছবিচার ছাড়াই নির্বিশেষে যে কাউকে চরমতম হয়রানির শিকার বানিয়ে ফেলতে পারে, সেটা এখন আসামের পরিণতি দেখে সবাই বুঝতে পেরেছে।

এনআরসিতে নাগরিক প্রমাণের দায় নাগরিকের, রাষ্ট্রের না। অথচ একটা ডকুমেন্ট ব্যক্তিপর্যায়ে রক্ষা সংরক্ষণ যতটা কঠিন রাষ্ট্রের হেফাজতখানা, সেটা রক্ষা উল্টো ততই সহজ। ব্যক্তি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে পারে সবচেয়ে সহজে। তাই স্বাভাবিক ছিল, কেউ নাগরিক নয় তা প্রমাণের দায় থাকা রাষ্ট্রের কাঁধে। ইন্দিরার আমলে একসময় এটা তাই ছিল।

এ ছাড়া এমনিতেই দুনিয়া এখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের- এর প্রধান স্বভাব বৈশিষ্ট্য তাই এমন যে পুঁজি আর শ্রমের (মানুষের) মাইগ্রেশন এখানে হবেই, তারা নিরন্তর ঘুরে বেড়াবে। শুধু মানুষ নয়, পুঁজিও এখানে দেশী-বিদেশী পরিচয় নেবে, ঘটবে। তাই ব্যাপক ইকোনমিক মাইগ্রেশন মানে বৈধ-অবৈধ লেবার মাইগ্রেশন সবচেয়ে কমন ঘটনা হবে এখানে। এর ওপর ভারতবর্ষের দেশভাগ- এটা নিজেই সবচেয়ে স্থায়ী এক রাজনৈতিক মাইগ্রেশনের ফেনোমেনা। যা কখনই একেবারে শেষ হয়নি, হবে না। ফলে এখানে একটা নিচু মাত্রার বা কিছু মাত্রার মাইগ্রেশন সব সময় আছে এবং আশা করি আরো অনেক দিন থাকবেই। একমাত্র বদ মতলব থাকলেই কেবল এটাকে কেউ ইস্যু হিসেবে হাজির করতে চাইবে, আর কেবল মুসলমানবিদ্বেষ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

‘মাত্র ছয় মাস। তার মধ্যেই ভগ্নমনোরথ দশা কাটিয়ে নিমেষে চাঙ্গা হয়ে উঠল তৃণমূল। তিনটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চমকে দেয়া পুনরুত্থান ঘটালেন নিজের দলের। তৃণমূলের ২১ বছরের ইতিহাসে কোনো দিন জয় মেলেনি যে দুই আসনে, সেই কালিয়াগঞ্জ এবং খড়গপুর সদর আসনও ছিনিয়ে নিল ঘাসফুল। আর লোকসভা নির্বাচনে করিমপুরে যে ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল, এবার জিতল তার চেয়ে অনেকটা বেশিতে।’ এটা এ মাসের শুরুর দিনে আনন্দবাজারের এক রিপোর্ট টুকে এনেছি।

গত মে মাসে মোদির আরো বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি প্রাদেশিক আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল এসেছে। তাতে এর তিন আসনই পেয়েছে মমতার দল। অথচ এ তিনটির দু’টিতে মমতার দল গত ২১ বছরে কখনো জিততে পারেনি। এই তিনটি আসনই হয় মুসলমান প্রধান অথবা বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া নয়তো বা আসাম লাগোয়া আসন। আর এসব সত্ত্বেও এগুলোর দু’টি ছিল সিপিএম বা কংগ্রেসের দখলে। আর একটি এমন রাজ্য বা বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন, যা গত কেন্দ্র নির্বাচনে প্রথম বিজেপি দখলে যাওয়া আসনের অন্তর্গত। তাই এবারের নির্বাচনের শেষে ফলাফল দেখে সব পক্ষই একবাক্যে স্বীকার করেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সবাই এনআরসি আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে, ভুগছে। এনআরসি তাদের আক্রমণ করে ফেলেছে। কলকাতার বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও স্বীকার করে নিয়েছেন বলে রিপোর্ট বলছে, Dilip Ghosh on Saturday identified “fear and confusion over NRC” ।

তাই সেই আতঙ্কের একমাত্র ত্রাতা হিসেবে মমতা তাদের আশ্রয় হয়ে ধরা দিয়েছে। তাই মমতার বিজয়। আগে তারা ভেবেছিল বিজেপির উত্থানে মুসলমানের কোণঠাসা হওয়া দেখতে তাদের খারাপ লাগবে না হয়তো। কারণ, ‘মমতা নাকি চাপে থাকা মুসলমানদের রশি আলগা করে মাথায় তুলেছিল।’ আর এখন বেলকনিতে বসে “মুসলমানদের কষ্ট পাওয়া দেখার মজা” দেখতে চাওয়ারা বুঝে গেছে, ব্যাপারটা এমন মজা-তামাশার নয়। এনআরসি মানে নিজেই নিজের জন্য হয়রানি ডেকে আনা, পকেটের পয়সা খরচ করে দুঃখ কেনা। তারা প্রত্যেকে ছোট চাকরি বা ব্যবসায় স্বল্প আয়-ইনকামে অস্থির থাকতে হয় এমন জীবন যাপন করেন। সেখানে উটকো নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের টেনশন? এই হয়রানি ডেকে আনা তাদের জীবনের অর্থ কী! কলকাতায় ইতোমধ্যে রেশন কার্ড বা ডকুমেন্ট ইত্যাদি জোগাড়ের নীরব দৌড়াদৌড়ি কেউ কেউ শুরু করে দিয়েছেন। কাজেই কেউ পারলে তাদের সেই ত্রাতা হতে পারেন মমতা- এই মেসেজই তারা হাজির করে ফেলেছেন!

ইতোমধ্যে আর একটা বড় ডেভেলপমেন্ট আছে। গত মে মাসে শেষ হওয়া নির্বাচনে এক ব্যাপক কারচুপি হয়েছে আর তা মূলত ডিজিটাল ব্যালট-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার সুযোগে। এটা বিজেপি ছাড়া মূলত সব আঞ্চলিক দল বিশ্বাস করে। যদিও হাতেনাতে দেয়ার প্রমাণ হাজির করা মুশকিল। এ ধারণা আরো জোরদার এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রিম কোর্ট গত নির্বাচনে খোদ মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যায়নি। পাশ কাটিয়ে চলেছে। সেটিও আবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল যে, যদি তা করতে হয়, তবে আগ্রাসী মোদির নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়ার রিস্ক তাদের নিতেই হতো। যদিও কনস্টিটিউশনালি সে ক্ষমতা তাদের দেয়াই আছে। কিন্তু কেউই আসলে সঙ্ঘাতে যেতে চায়নি। এমনকি একজন সক্রিয় আপত্তিকারী কমিশনার এখনো মোদির নির্বাহী ক্ষমতার হয়রানির শাস্তি ভোগ ও মোকাবেলা করে চলেছেন।

তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ইতোমধ্যে তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সংসদে ১৯টা বিজেপি-বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়েছে। ‘নির্বাচনী সংস্কার, ব্যালট ফেরানোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে’ রাজ্যসভায় স্বল্পমেয়াদি আলোচনার জন্য যৌথভাবে নোটিশ দিয়েছেন এ দলগুলোর নেতারা। এমন ইস্যুগুলো আস্তে ধীরে বড় ও সফল হয়ে উঠতে পারে, যা বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে পারে। আপাতত আগামী সপ্তাহের উত্তেজনা নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল নিয়ে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা গত  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

গৌতম দাস

০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2Os

ভারতের অর্থনীতির দুরবস্থা আর লুকিয়ে রাখা গেল না। এবছর মোদীর দ্বিতীয়বারের সরকার ক্ষমতায় বসার পর দ্বিতীয়-ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে গত ২৯ নভেম্বর। এবারও জিডিপি আরো অর্ধশতাংশ কম। অর্থাৎ গত কোয়ার্টারে ছিল ৫ শতাংশ, সেই জিডিপি এবার হয়েছে আরো কমে, ৪.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এটা আগের তিন মাসের চেয়েও আরো কম।

গত ২০১৬ সাল থেকে তথ্য লুকিয়ে বা আড়াল করে না হলে, গণনার ভিত্তিবছর বদলানো বা অন্য কোনো ছলে আড়ালে দিয়ে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে মোদী সরকার যে খেলা করে আসছিল  সেসব এবার আর অস্বীকার করার বা লুকিয়ে ফেলে পালাবার সুযোগ অনেক কিছুই আর থাকল না। তবে শেষে এসে এখন তর্কটা হল, জিডিপি ৪.৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে, সেটা তো লুকানোর নাই। তাই এখন বিরোধীদের সাথে তর্কের পয়েন্ট হল, অর্থনীতি ধীরগতি বা শ্লথগতির এটা স্বীকার করে নিয়েও মোদীর অর্থমন্ত্রী গলাবাজির করে বলছে এটা এখনও অর্থনৈতিক “মন্দা” [recession] বলে ডাকা যাবে না। ভারতের পার্লামেন্টে এই তর্কই চলছে এখন।

রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে নজর বা খেয়াল রাখার মূল কাজটা হল “মনিটরিং”। উৎপাদনের সামগ্রিক এবং ঘুঁটিনাটিতেও তথ্য-পরিসংখ্যানে অর্থনীতি কোথায় কমল না বাড়ল এবিষয়গুলো যেকোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নিয়মিত চোখে চোখ রাখা হয়। এই চোখ রাখা বা মনিটরিং ডাটা সংগ্রহের ব্যাপারটার সাধারণ স্ট্যান্ডার্ড হল প্রতি বছর এটা চারবার মানে প্রতি তিন মাস শেষের ডাটা সংগ্রহ করে পুরো হিসাবনিকাশ গণনা প্রক্রিয়া শেষ করা হয় একবার করে, এভাবে বছরে চারবার বা চার কোয়ার্টারে। আর প্রতি বছর এই চারবারের গড়টাই আবার বছরের জিডিপির মান বলে প্রকাশিত হয়। গতকাল ২৯ নভেম্বর ভারতের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক বা কোয়ার্টারের (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) জিডিপির হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সেকেন্ড কোয়ার্টারের জিডিপি ৪.৫ শতাংশ। কিন্তু এর তাৎপর্য কী?

প্রথমত, বাইরে প্রকাশ্যে যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এই অর্থে, কথাটা হল, এক বিরাট ধরনের হতাশা ছেয়ে বসেছে ভারতের  অর্থনৈতিক জীবনে, সর্বত্র। ইংরেজি দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা থেকে টুকে আনা কিছু তথ্য দেখা যাচ্ছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯ এই কোয়ার্টারে ম্যানুফ্যাকচারিং কমেছে ১ শতাংশ, কৃষিতে বেড়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ হারে, স্থাপনা-কাঠামো ৩.৩ শতাংশ বেড়েছে ও বিদ্যুৎ বেড়েছে ৩.৬ শতাংশ, ইত্যাদি। [Data released by the National Statistical Office showed that while manufacturing contracted by 1 per cent in the July-September quarter, agriculture grew by 2.1 per cent, construction by 3.3 per cent and electricity generation by 3.6 per cent.]।

এছাড়া ইন্ডিয়া রেটিং ও রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইকোনমিস্ট সুনীল কুমার সিনহার উদ্ধৃতি দিতে একই পত্রিকা লিখেছে, এবারের জিডিপি এমন কমে যাবার পিছনে তিনি দুটা কারণ উল্লেখ করেন – “কেনাকাটা কমিয়ে দেয়া মানে ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন আর রপ্তানিতে ধবস নামা”  […slowdown in GDP growth is largely on account of the slump in consumption expenditure and de-growth in export]।

এসব আবার অবশ্যই হঠাৎ করে ঘটে নাই। যেমন কারখানা উৎপাদনের মধ্যে গত তিন মাস ধরে প্রাইভেট কার উতপাদনের কোম্পানিগুলোর অবিক্রীত গাড়ির তথ্য ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছিল বানের জলের মত। অবিক্রীত গাড়ির সংখ্যা সেখানে দেখিয়েছিল বছরের উৎপাদিত গাড়ি্র ৪৫ শতাংশই  অবিক্রীত।

আসলে ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যানের হিসাবে এর ধারাবাহিক পতনের শুরু হতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের মার্চের পর থেকে। মানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শেষ কোয়ার্টার জানুয়ারি-মার্চ -এর পর থেকে, সেবারই ছিল শেষ উঁচু জিডিপি ৮.১ শতাংশ। এর পর থেকে গত দেড় বছর ধরে চলছে টানাভাবে ওই শেষ উঁচু জিডিপিরই পতনের কাল। এটাই ধারাবাহিকভাবে প্রতি কোয়ার্টারে কমতে কমতে এসে এবার হয়েছে সাড়ে চার শতাংশ। যেটা এর আগের কোয়ার্টারে (এপ্রিল-জুন ২০১৯) ভারতের জিডিপি ছিল ৫ শতাংশ।

জিডিপিকে আবার উপমহাদেশের ভিত্তিতে ভাগ করে দেখে এর ভিন্ন কিছু তাৎপর্য বুঝা যেতে পারে। যেমন, এখানে বলে রাখা যায়, এশিয়ান জিডিপি হিসাবে সাড়ে চার শতাংশ হওয়ার অর্থ এটা খারাপ জোনের মধ্যে পড়ে যাওয়া, মনে করা হয়। সে হিসাবে পাঁচ বা এর বেশি শতাংশকে ভাল জিডিপির শুরু মনে করা হয়। আবার তুলনায় ইউরোপ-আমেরিকা্‌ সেখানে কোন রাষ্ট্রের চার শতাংশ জিডিপি হয়ে যাওয়া মানে এটা খুবই ভাল উন্নতি। সাধারণত ইউরোপ-আমেরিকা এই জোনের দেশ এক-দুই শতাংশের জিডিপিতেই আটকে থাকে। মূল কারণ পুরনো কলোনি মালিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অর্থনীতি বা উন্নত অর্থনীতির আমেরিকা বলতে এরা আসলে পুর্ণ-সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড [saturated] অর্থনীতি বলে মানা হয়। তাই এটা যা আছে তাতে টিকে থাকতে পারা সেটাকেই অনেক সাফল্য মনে করা হয়।

তুলনায় এশিয়ান যেকোনো অর্থনীতি মানেই  কয়েক শত বছর ধরে থেকে উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজি পাচার হয়েই চলে গেছে এমন অর্থনীতিই হবে সেটা। এই কারণে কলোনিমুক্ত স্বাধীন হওয়া পরেও একালে এসব দেশে অবকাঠামো ও উৎপাদনে বিনিয়োগের ব্যাপক পিছিয়ে থাকা ঘাটতি মেটাতে বিদেশী পুঁজি ধারে নিয়ে তা সুদসহ ফেরত দিয়েও এসব রাষ্ট্রের অনেক আগানো-উন্নতির পটেনশিয়াল থাকে। এরই থ্রেসহোল্ড জিডিপি মানে ন্যূনতম পা-রাখার জায়গা হল ৫ শতাংশ জিডিপি। আবার দেশ যোগ্য দল ও নেতৃত্ব পেলে এরা এর চেয়েও অনেক উপরে উঠতে পারে। কিন্তু এসব দেশের জিডিপিকে ন্যূনতম আট শতাংশের উপরে না নিতে পারলে বিরাট পরিবর্তনের স্বপ্ন আশা করা, স্বপ্ন দেখা অবান্তর। আবার ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে যেমন চীন, ১৯৯০-২০০৭ এই সময়কালে অনেক বারই ডাবল ডিজিট বা ১৩.৬ শতাংশ পর্যন্ত নিজের জিডিপি উঠিয়েছিল।

আবার ওদিকে আরেক ফেনোমেনা দেখা দিয়েছে একালে। দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস ফিগারের মধ্যে  বাইরে থেকে হাত ঢুকিয়ে দেয়া –  বিভিন্ন দেশে আজকাল এটা অনেক বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এভাবে আজকাল তথ্য-পরিসংখ্যান সাজিয়ে-বানিয়ে নেয়া ও ভাল পরিসংখ্যানের দাবি করা হচ্ছে অনেক বেশি। অনেকে এমন দাবি উঠে আসা কেন – এর মূল কারণ হিসাবে – ভোট বা পপুলার রাজনীতিকে দায়ী করেন। মানে এই প্রবক্তারা বলতে চায় রাজনীতিতে ‘পপুলারিটি’ বা ভোটের রাজনীতি আজকাল এতই প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ এরা বলতে চাচ্ছে আগে এটা এত বড় বিষয় ছিল না। এই প্রবক্তারা যেন বলতে চায়, আগে পাবলিক অনেক রয়েসয়ে ভোটের সিদ্ধান্ত নিত। আর এখন হয়েছে উল্টো। এই কথাটা সত্য যে, খারাপ পারফরম্যান্স বা খারাপ অর্থনীতিতেও ওর তথ্য ঠিকঠাক লুকিয়ে রেখে অনেক শাসক অনেকদূর তথ্য আড়াল করে কাটিয়ে দিতে পারে ও পারতে দেখা যাচ্ছে।

অবশ্য আমাদের নিজের দেশে ভোট না হলেও এখানে পপুলারিটি মানে মিথ্যা যেকোনো কিছু পরিসংখ্যান দাবি করার সুযোগ কত বেশি- সেটা বুঝতে হবে। তবে আমাদের দেশের মতই ভারতেও তথ্য-পরিসংখ্যান লুকানোর একটা ভালো উপায় হল, গণনার ভিত্তিবছর বদলে দেয়া। অর্থনীতির পরিসংখ্যান গণনা প্রক্রিয়ায় বিরাট অংশটাই তুলনামূলকভাবে বলা হয় এমন ভাষ্য। অর্থাৎ কোন কথা বলার সময় তাতে কোন একটা বছরকে ভিত্তি বছর ধরে এর ধারণা তৈরি করে কথা বলা হয়। কিন্তু এখনকার প্রবল প্রচলন হল ভিত্তি বছর কিভাবে কোন বছরকে ধরলে আমার আমলের পরিসংখ্যানগুলো বড় ফিগার দেখাবে, উজ্জ্বল্ হয়ে উঠবে সেভাবে ভিত্তি বছর বদলে নেয়া হচ্ছে। এমন মিথ্যা বলার সহায়ক পরিসংখ্যানবিদও আজকাল অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এটা আমাদের দেশে হচ্ছে, মনমোহনের আমলে অভিযোগ ছিল, মোদীর আমলে সে অভিযোগ আরো বেশি।

গতকালের (৩০ নভেম্বর) আনন্দবাজার,  জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক অধ্যাপিকা জয়তী ঘোষের বরাতে মনে করাচ্ছে, “মোদী জমানায় জিডিপি মাপার পদ্ধতি বদলে দেওয়া হয়। সেই পদ্ধতি নিয়েই বিতর্ক রয়েছে”।  পত্রিকা আরও লিখেছে, “বস্তুত, মোদী সরকারের প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনই বলেছিলেন, নতুন পদ্ধতিতে জিডিপি মাপায় তা ২ থেকে ২.৫ শতাংশ অঙ্ক বেশি হচ্ছে। তাঁর কথা মানলে আদতে আর্থিক বৃদ্ধির হার ২ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে”। অর্থাৎ পরশু যে জিডিপি ফিগার ৪.৫% বলে দেখানো হয়েছে এটাও আগের প্রকৃত হিসাবে এখন এটা মাত্র ২%।

ভারত চেম্বারের সভাপতি সীতারাম শর্মার আশঙ্কা, কেন্দ্র ব্যবস্থা না-নিলে দেশকে মন্দার হাত থেকে বাঁচানো কঠিন। তাঁর দাবি, ‘‘আর্থিক হাল ফেরানোর কোনও ব্যবস্থাই ফল দেয়নি। চাহিদা বাড়ানোর ব্যবস্থা চাই।’’ অনেকেরই আশঙ্কা, বৃদ্ধির হার আর যদি না-ও কমে, তবু বছর দুয়েকের মধ্যে তার মাথা তোলার সম্ভাবনা কম।

সে যাই হোক, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদীকে অর্থনীতিতে প্রথম নেতি প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় ‘ডিমনিটাইজেশন’ [demonetization] নিয়ে। মানে প্রচলিত ভাষায় যাকে সরকারের “নোট বাতিলের” সিদ্ধান্ত বলা হয় সেটা।  মানে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় হঠাত, মোদীর পাঁচশ ও হাজার রুপির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছলেন সেকথাই বলা হচ্ছে। এটা ছিল অর্থনীতিতে নেতি প্রতিক্রিয়া-পরিস্থিতিকে যেন মোদীর নিজেই ডেকে আনার এক কাজ।

যেন এতে মোদীর সরকার বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ধরে ফেলতে পারবেন, আর তাতে একক হাতে বিরাট ছক্কা মেরে দেবেনই, এই মিথ্যা লোভে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে ভারতের অর্থনীতি উলটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। বিরাট ইতিবাচক ফলাফলের আশা অথবা অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে ইত্যাদি এমন কিছু আশা ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মোদী।  কিন্তু না, এমন কোনো কিছুই আসেনি, এমন কোনো কিছু মোদির কপালে জোটেনি। উলটো ভারতের অর্থনীতি প্রবলভাবে ধাক্কা খেয়েছিল। সেই থেকে মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আর কখনো তার কোনো অর্থনৈতিক সাফল্য আছে এ কথা বলতে পাবলিকলি সামনে যান নাই।

‘ইনফরমাল সেক্টর’ [informal sector] বলে একটা কথা আছে। অনেক ঝকমারি কথা মনে হলেও আসলে তা নয়। ফরমাল সেক্টর কথাটার সোজা অর্থ হল, একটা গ্রামে যদি একটা গাড়ির কারখানা বসিয়ে ধরা যাক ৬০০ লোককে কারখানার ভেতরে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যায় তবে ওই এলাকায় ঐ শ্রমিকদের একেকজন পিছু আরও ছয়জন করে মোটামুটি প্রায় আরো ছত্রিশ শত লোকে বিভিন্ন কাজ পাবার অবস্থা হবে, এটা ধরা হয়। এতে ৬০০ জনের ফরমাল চাকরি হলে, মানে তাদের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ সৃষ্টি করলে এতে অপরিকল্পিতভাবে আর বাকিরা (ছত্রিশ শত) ইনফরমাল শ্রমিক হিসেবে কাজ পাবে।  যদিও এরা কারখানার ভিতরে কাজ পাবে না। বাইরে নানা সহায়ক পেশা যোগাড় করে নিবে। এদের মধ্যে বাদামভাজা বেচতে আসা অথবা শ্রমিকদের ভাত রান্নার লোক, কিংবা চা দোকানি, সবজি বা মুদি দোকানি বা হকার ইত্যাদি – এরা এমন বিভিন্ন পেশার লোক হবে।

মোদির ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণায় সয়লাব করা সবচেয়ে বড় নেতি প্রভাব হল, মোদীর নোট বাতিলের ঘোষণায় কাজ হারিয়ে ‘বলি’ হয়ে গিয়েছিল ভারতের এই ইনফরমাল সেক্টর। ভারতের শিল্পে অগ্রসর রাজ্য বলতে মুম্বাই, গুজরাটকে ধরা হয়। এ কথার আরেক প্রমাণ হল, ২০১৬ সালের আগে এখানের নিম্ন মধ্যবিত্তের হাতে  আয়-ইনকাম ভাল হওয়াতে কিছু বাড়তি সঞ্চয়ও আসত। আর তা আসত বলেই সেই সূত্রে কলকাতার স্বর্ণকাররা প্রতি ওস্তাদ সাথে তার ছয় সগরেদকে নিয়ে মুম্বাই বা গুজরাটে সেখানে দোকান দিয়ে বসতে দেখা যেত।

এতে স্বর্ণকার ওস্তাদ-সাগরেদরা নিয়মিত কলকাতায় পরিবারে টাকা পাঠাতে পারত। মানে সব পক্ষেরই আয়-ইনকাম নিয়ে বেচে থাকা একটু ভাল হচ্ছিল। কিন্তু হঠাত সবই ডুবে গিয়েছিল মোদীর ঐ ‘নোট বাতিলে’। কারণ সবারই আয়-ইনকাম এলোমেলো হয়ে যায় এতে। বিশেষ করে বাড়তি কাজ বা আয়ের সুযোগ যেখানে ছিল সেখানে সব, সবার আগে ছেঁটে পড়েছিল। তাই সেই শকিং ফলাফল বাস্তবতার মুখে ওস্তাদ-সাগরেদেরা সবকিছু গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে চলে গেছিল। অর্থাৎ ফরমাল কাজ দিতে না পা্রার ব্যর্থতা ভারতের অর্থনীতির বহুদিনের। কিন্তু তা থাকলেও ইনফরমাল কাজ যোগাড় করে আধপেটে খেয়ে হলেও নিজের সারভাইবাল মানুষ কষ্ট করে যোগাড় করে নিচ্ছিল। কিন্তু মোদীর   ডিমনিটাইজেশন খুবই অবিবেচক সিদ্ধান্ত বলে হাজির হয়েছিল। ডিমনিটাইজেশন গরীব জীবনকে আরও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছিল। মূল কারণ বাজারে লেনদেন করার মত মুদ্রার অভাব আর তা থেকে ছড়িয়ে পড়া অনাস্থা। সেখান থেকে শঙ্কা। সার কথায় মোদীর অর্থনীতিও মানুষকে ফরমাল চাকরি তো দিতেই পারে নাই, কিন্তু মোদী ডিমনিটাইজেশন করে মানুষের ইনফরমাল কাজ-চাকরিটাও খেয়ে ফেলেছিল।

ভারতের অর্থনীতির আরেক পুরানা মূল সমস্যা হল, এখানে ফরমাল সেক্টরে যে কাজ পেল পরের ছয় প্রজন্মের সন্তানেরও হয়ত আর ফরমাল চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।  কথাটা অন্যভাবে বললে, কষ্ট করে কোন সরকারের একটা টার্ম অর্থনীতি ভালো চললেও পরেরবার এটা শেষ, ঢলে পড়বেই। মনমোহনের আমলে তাই হয়েছিল। তাই দ্বিতীয়বার কংগ্রেস-জোট (২০০৯) আবার জেতার পর মনমোহন সরকারের অর্থনীতির ঢুবে সব শেষ হয়ে গেছিল। আবার পরে ২০১৪ সালে মোদী প্রথমবারই ক্ষমতায় আসার দু’বছর পরে (২০১৬) খারাপ দিন চলে এসেছিল। আর এখন তো খারাপ দিন শুরু হয়ে গেল সম্ভবত।

এ দিকে, গতকালই মনমোহন সিং এক বিরাট বাণী দিয়েছেন মোদীকে। সেটা ঠিক বিরোধী রাজনীতিকের বক্তব্য নয়, যেন পেশাদার অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরামর্শ, এমন মানে দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রায় ৮০০ শব্দের এক পরামর্শ বক্তব্য। না অবশ্যই, সব সমস্যার ধনন্বরি সমাধান মনমোহন বা তার কংগ্রেস দলের কাছে এখন আছে অথবা তাদের আমলেও হাতে ছিল ব্যাপারটা তা একেবারেই নয়। বরং সেকালে মনমোহনের দ্বিতীয় টার্মের যে অর্থনৈতিক ধস নেমেছিল, দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কোনো সমাধান সে সময় মনমোহনের হাতেও ছিল না। কেবল মোদী তখন উলটো মনমোহনের বদলে তিনিই পারবেন কারণ গুজরাট চালানোর অভিজ্ঞতা তার আছে এই ভুয়া আশ্বাস তৈরি করে তিনি পরে (২০১৪) ক্ষমতায় জিতে আসতে মনমোহনের সেই ব্যর্থতাকে পুঁজি করতে পেরেছিলেন কেবল।

গতকালের মনমোহনের সেই লিখিত বক্তৃতার সার কথাটার শিরোনাম হল ‘ভয়ের রাজত্ব’ [“climate of fear” ]। মনমোহন আসলে অভিযোগ তুলে বলছেন যে, মোদী এখন ভারতে এক ‘ভয়ের রাজত্ব’ সৃষ্টি করে রেখেছেন। অনুবাদ করা সেই দু’লাইন হল এ রকমঃ
“উল্লেখযোগ্য ভয় ও অবিশ্বাস আছে অর্থনীতিতে নানান অংশগ্রহণকারীদের মনে। রাষ্ট্রের থেকে তুলনামূলক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষগুলো, তদন্ত-গোয়েন্দা দফতরগুলো ইত্যাদি – এদের উপর আমাদের জনআস্থার সব কিছু ক্ষয়ে গেছে। আমাদের সমাজের এক গভীর অনাস্থা, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ভয় ও অসহায়ত্ববোধ – এসবের বিষাক্ত মিশ্রণে আমাদের অর্থনৈতিক তৎপরতার দমবন্ধ হয়ে আসছে, আর তা থেকেই অর্থনৈতিক উন্নতিও দমবন্ধ হয়ে আসছে” [“There is profound fear and distrust among our various economic participants. Public trust in independent institutions such as the media, judiciary, regulatory authorities, and investigative agencies has been severely eroded. This toxic combination of deep distrust, pervasive fear and a sense of hopelessness in our society is stifling economic activity and hence economic growth,” ] ।

অর্থাৎ মূলত এক পলিটিকো গভীর অভিযোগ তুলে মনমোহন মোদীকে ভাল বিধিঁয়েছেন।

কিন্তু এগুলো সম্ভবত ঘটনার আসল দিক নয়। কারণ, আগামী আরো চার বছর তাহলে মোদী-আরএসএস রাজ্য নির্বাচনগুলো করবে কিভাবে, কী হাতে নিয়ে? আরো বেশি করে হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়! – মানে এনআরসি, সিটিজেনশিপ, গরু বা লিঞ্চিং ইত্যাদির তাণ্ডব দিয়ে! তাই নয় কি?

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ৩০ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির অর্থনীতির ঘণ্টা বেজে গেল!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

আসছে, আবার বাবরি মসজিদ!

আসছে, আবার বাবরি মসজিদ!

গৌতম দাস

 ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Mh

SC has asked the special judge conducting the trial to deliver judgement within 9 months ইন্ডিয়া টুডে

ভারতের প্রধান বিচারপতি চলতি মাসে অবসরে যাচ্ছেন। খুব সম্ভবত ১৭ নভেম্বরের মধ্যে। এদিকে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ইস্যু আমাদের মনে কিছুটা আবছা হয়ে এলেও ইস্যুটা মুছে যায়নি। সেটা আবার উঠে আসতে যাচ্ছে এ মাসেই; কারণ ভাঙ্গা মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ হবে কিনা সে বিষয়ে আদালতের রায় প্রকাশিত হবে। আর তা হওয়ার কথা প্রধান বিচারপতির অবসরে যাবার আগেই।

লাগাতার তিন বছর ধরে নানান তোড়জোড়ের পর আরএসএস-বিজেপি হিন্দুত্বের জিগির তুলে সেই ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এটা যে  কথিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানুষ এর পরিকল্পিত দাঙ্গাহাঙ্গামার আয়োজন দিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল এনিয়ে এক স্টিং অপারেশন বিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, ২০১৪ সালে।  আর পাবলিকলি উন্মোচিত বিষয় হয়েই ছিল এটা যে আরএসএস-বিজেপির নানান অঙ্গসংগঠনসহ প্রধানত “বিশ্ব হিন্দু পরিষদের” নেতৃত্বে উন্মাদনার দাঙ্গা বাধিয়ে এই মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এক্ষেত্রে, তাদের অভিযোগ বা অজুহাত ছিল যে, এখানে আগে রামমন্দির ছিল, তাই তারা পুনরায় সেই মন্দির স্থাপন করতে চেয়ে মসজিদ ভেঙ্গেছিল।
মসজিদ ভেঙে ফেলার পরে ইস্যুটা এরপরে একপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টে আসে। তবে তা এই বলে যে, ঐ ভাঙা মসজিদের  স্থানে রামমন্দির গড়া আইনানুগ হবে কি না, এরই বিচার হবে আদালতে। কিন্তু দীর্ঘ দিন নানা অছিলায় এটা ঘুরেফিরে বন্ধ থাকার পর এ বছর থেকে শুনানির তারিখ পড়তে শুরু করেছিল।

মসজিদ ভাঙ্গা, আজ প্রায় ২৭ বছর আগের সেই ঘটনা এটা। এ ছাড়া বিজেপি এখন ক্ষমতায়। তাই বুক ফুলিয়েই এখন বিজেপি প্রকাশ্যেই বলছে, হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে সেই উন্মাদনাকে ক্যাশ করে ভোটের বাক্স ভরানোর লক্ষ্যেই তারা বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল। এছাড়া তাদের এই হিন্দুত্ববাদের জিগির তোলা, “এর ফায়দা ও মুনাফা নাকি কংগ্রেস” বা অন্য কেউ নিতে পারবে না।

সম্প্রতি এই কথাগুলোই টেনে এনেছেন ‘শেষাদ্রি চারি’[SESHADRI CHARI]।  শেষাদ্রি বিজেপি দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য আর, ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ [The Print] নামে এক অনলাইন পত্রিকায় তিনি, এক মতামত-কলাম লিখেছেন। ‘দ্য প্রিন্ট’ ভারতের ঠিক মেইনস্ট্রিম না হলেও মেইনস্ট্রিম পত্রিকার কিছু সম্পাদক ও সিনিয়রদেরই নিজস্ব এক পত্রিকা, তাই একটু ব্যতিক্রমী ও আমলযোগ্য। কলাম লেখক শেষাদ্রি চারি আবার আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে তিনি ‘অরগানাইজার’ [The Organiser] পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক। কোন ‘অরগানাইজার’ পত্রিকা? এর এত বিখ্যাতিই বা কী? ১৯৪৭ সালের ভারতভাগের কিছুদিন আগে থেকে প্রকাশিত শুরু হওয়া আরএসএস-হিন্দু মহাসভার প্রধান মুখপাত্র ও প্রাচীন দলীয় সংগঠক পত্রিকা এই অরগানাইজার; যেটা, সেই থেকে এখনও প্রকাশিত হয়ে চলেছে।

শেষাদ্রির লেখা সেই কলামের শিরোনাম হল, “বিজেপি জানে – এক ব্যাংক-চেক দু’বার ভাঙানো যায় না, অযোধ্যা এমনই এক ইস্যু [“BJP knows Ayodhya issue is a ‘cheque that cannot be encashed twice” ]।’ বাবরি মসজিদ ভাঙার ইস্যুটা উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বলে একে “অযোধ্যা” ইস্যু বা কখনো সেই স্থানে রামমন্দির বানাতে চায় বলে একে “রামমন্দির আন্দোলনের” ইস্যু বলে অনেকে ডাকে। শেষাদ্রির এই লেখায় তিনি সেখানে স্পষ্ট করেই বলেছেন, আজকের (২০১৯) দ্বিতীয়বার বিজয়ী মোদী সরকার পর্যন্ত বিজেপির যে ধারাবাহিক উত্থান, এর শুরুটাই হয়েছিল সেই ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার লাভালাভ থেকেই। লাভালাভ বুঝাতে তিনি লুকোছাপা না করে পরিস্কার দু’টি শব্দ বা ধারণা ব্যবহার করেছেন – এক. বলেছেন ‘পলিটিক্যাল ডিভিডেন্ট’ [political dividends ] বা রাজনৈতিক লাভের ভাগ-মুনাফা।
এছাড়া দুই. ‘নির্বাচনী ইস্যুতে একে ব্যবহার’ [utility as an electoral issue] অর্থে এই ইস্যুর ব্যবহারযোগ্যতা। অর্থাৎ বাবরি মসজিদ ভেঙে দিয়ে ভারতের জনগণের হিন্দু ধর্মীয় আবেগকে উসকে তুলে সামাজিক বিভক্তি বা হিন্দু-অহিন্দু পোলারাইজেশন করে ফেলা আর এরপর সেই আবেগকে বিজেপির ভোটের বাক্সে ক্যাশ করে নেয়া – এই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আর এটা ব্যবহার করেই তারা ১৯৯২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিস্তর লাভ তুলে চলেছে। এ পর্যন্ত ক্ষমতার শিখরে উঠে এসেছে।
মানুষের জীবন চলে যাচ্ছে, গেছে অথচ এরা ডিভিডেন্ট খুজছে এর ভিতরে! ধিক এই রাজনীতি!

“Ayodhya is no longer an issue that can yield political dividends for any party, regardless of whether it opposes or supports the Ram Mandir movement. While the Ram Mandir-Babri Masjid dispute remains an emotive issue, it has outlived its utility as an electoral issue. To borrow a phrase used by a late BJP leader, it is a ‘cheque that cannot be encashed twice’ ”.

গত ১৯৯২ সাল থেকে শুরু করে তিনি পরের প্রতিটি নির্বাচনে ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৯ এভাবে, বিজেপির নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে বারবার বাবরি মসজিদ ইস্যু কিভাবে ছিল – মসজিদ ভাঙা স্থানে সেখানে রামমন্দির নির্মাণ করতে হবে – এই ইস্যু সব সময় কিভাবে হাজির ছিল বর্ণনায় সেটা উল্লেখ করছেন। আবার এটাও বলছেন, কিন্তু বিজেপির সরকার ১৯৯৮ সালের নির্বাচনের সময় থেকে নিজে জবরদস্তি মন্দির নির্মাণ না করে আইনি পথে (মানে আদালতের রায়-নির্দেশে) এর বাস্তবায়নের কথা বলে গেছে মেনিফেস্টোতে। কেন?
শেষাদ্রির ব্যাখ্যা হল, তার লেখার শিরোনামে যা বলা হয়েছে – চেক দু’বার ভাঙানো যায় না। অর্থাৎ বিজেপি মন্দির নির্মাণ ইস্যু থেকে আবার দ্বিতীয়বার অর্থ বা ফয়দা তুলতে পারবে না। যদিও এখন থেকে মন্দির নির্মাণ আসলে সে অবশ্যই করবে – ভুলে আয় নাই যাবে না। তবে ‘আদালতে রায়ে যেভাবে বলবে’ সেভাবে। অর্থাৎ এতে দায় হবে আদালতের। আবার তিনি স্পষ্ট করে দিচ্ছেন, এই মন্দির নির্মাণ ইস্যু থেকে কংগ্রেস চাইলেও বিজেপিকে বাদ দিয়ে ইস্যুটাকে নিজের ভোটবাক্স ভরতে কাজে লাগাতে পারবে না।

কথা ঠিক বটে। কারণ বিজেপি যেমন ন্যাংটা হয়ে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভারতীয়দের নাগরিক নয়, ‘হিন্দু’ হয়েই ভোট দিতে আহ্বান জানায়, এই সুযোগটা তাদের মত করে কংগ্রেস দলটাও নিতে পারবে না। শুধু তাই নয়। বিজেপির প্রত্যক্ষ ইসলামবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতা করে বিরোধী বক্তব্য দেয়ারও মুরোদ নেই কংগ্রেসের; বরং এমন কাজ করলে “হিন্দু পরিচয়ের ভোট” তাতে আরও টান পড়বে; তা আর তার বাক্সে না যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাস্তবে এটাই স্পষ্ট ধরা পড়েছিল গত নির্বাচনেও। আর ২০১৬ সালের আসামের রাজ্য নির্বাচন চলাকালীন সময় থেকেই আগেই প্রস্তুতি নেয়া একটা সার্ভ-স্টাডি করা হয়েছিল। সেই রিপোর্টের ফাইন্ডিংসও তাই ছিল। এই কারণে, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীও গত নির্বাচনে (মে ২০১৯) বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ন্যূনতম কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতা দূরে থাক নিজেই “আরেক ব্র্যান্ডের হিন্দুত্ব” নিয়ে ভোট চাইতে নেমেছিলেন। আবার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন যে, তাঁর এটা “সফট হিন্দুত্ব”। অর্থাৎ এটাও আর এক ব্র্যান্ডের হিন্দুত্বই। মানে হিন্দুত্বই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের বা প্রধান দুই দলের জন্য একমাত্র রাজনীতির বয়ান-কাঠামো।

আবার শেষাদ্রি আর এ্ক ইঙ্গিত দিয়ে বলছেন, রামমন্দির নির্মাণ ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন রায় কোনো-না-কোনোভাবে, কোনো-না-কোনো শর্তে এক রামমন্দির নির্মাণ করার পক্ষেই যাবে বলে তিনি মনে করেন। সারা ভারতে এখন প্রবল হিন্দুত্বের জোয়ার বইছে, বিশেষ করে কাশ্মীরে ভারতের দখলদার হয়ে ওঠার পর থেকে পরিকল্পিত আবেগ জাগিয়ে মানুষের মাঝে ধ্বংসাত্মক জিগিরে পৌঁছানো হয়েছে। এটাই শেষাদ্রির অনুমান বা পরিস্থিতি নিয়ে রিডিং।

কয়েক বছর ধরে আদালত রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে মামলা ফেলেই রাখা ছিল, শুনানির কোনো তারিখও ফেলা হয় নাই, বলা যায়। মনে হয়েছে ২০১৯ সালের মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে আদালত কোনো তারিখ ফেলতে চায়নি। তবে মে মাসের পর গত তিন মাসে একনাগাড়ে চল্লিশ কার্যদিবস ধরে শুনানি সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা ও শুনাশুনির তর্ক চলেছিল। পরে সেসব প্রক্রিয়ার সমাপ্তিও ঘোষণা করা হয়েছে। এখন রায় দেয়ার অপেক্ষায়, তবে তারিখ ঘোষণা হয়নি। কিন্তু প্রধান বিচারপতির অবসরে যাওয়ার আগে শেষ কার্যদিবস ১৭ নভেম্বর বলে সবার অনুমান, এর আগেই রায় ঘোষণা তিনি করে যাবেন।

ভারতে এই রায় বাস্তবে শেষে কী আসে, তাতে ভারতে কী প্রতিক্রিয়া হয়, আর তাতে সীমান্ত ছাপিয়ে বাংলাদেশে কী প্রতিক্রিয়া হয় – এ নিয়ে আমাদের স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে কানখাড়া উদ্বিগ্নতা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়ায়ও একটা কমন অনুমান আছে যে, রায় যা-ই আসুক অমিত শাহ তা থেকে নির্বাচনী ফয়দা ঘরে তোলার লক্ষ্যে কিছু-না-কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছেন বলে তাদের অনুমান।

অন্যদিকে, ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থায় ধস নেমেছে, সে কথা আর ঢাকা থাকছে না। যদিও আমরা সেই ২০১৬ নোট বাতিলের সময় থেকেই এটা শুনে আনছি। কিন্তু পরিসংখ্যান-তথ্য লুকিয়ে রাখা, ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেখা, নির্বাচনের পর এসব তথ্য রিলিজ দেয়া বা হিন্দুত্বের নানা রকম জোয়ার তুলে ইত্যাদিতে খবর দাবিয়ে রেখে মোদী এ’পর্যন্ত চলে এসেছেন। তাতে শেষ বিচারে সেই ২০১৬ সাল থেকেই, নির্বাচনে অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রভাব খুব কমই দেখা গেছে। আবার, কোথাও ভোটারেরা স্বীকারও করেছেন যে, অর্থনৈতিক হাল খারাপের খবর তারা জেনেও একে কম গুরুত্ব দিয়েই তারা হিন্দুত্ব-জিগির সংশ্লিষ্ট ইস্যুর প্রভাবে মোদীকেই আবার ভোট দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন। বলাই বাহুল্য, হিন্দুত্ববাদের রঙ এতই গাঢ়। তবু গত মাসে এই প্রথম মহারাষ্ট্র-হরিয়ানা এই দুই রাজ্যের নির্বাচনে সম্ভবত অর্থনৈতিক হাল খারাপের খবর প্রভাব ফেলেছে। বিজেপি সে কারণে ফল খারাপ করেছে বলে মানে করা হচ্ছে। যদিও শতভাগ নিশ্চিত কেউই নয়, কারণ পরবর্তীকালে এর আরও ধারাবাহিক প্রভাব থাকে কিনা দেখতে সবাই অপেক্ষা করতে চাইছে।

সবচেয়ে বড় উলটা কথাটা হল, বিজেপি ছাড়া ভারতের সমাজের রাজনৈতিক-সামাজিক সব শক্তি তবুও হিন্দুত্ববাদের চাপে উল্টো নিজেরাই কোণঠাসা হয়ে আছে। এদিন সহসাই কাটছে কি না, কাটবে কি না বা কবে? কেউ বলতে পারে না। কিন্তু খেয়ে-না-খেয়ে হিন্দুত্ববাদ, হিন্দুইজম বা হিন্দুগিরি এভাবে সারা ভারতের কোনায় ছড়িয়ে পড়ল কেন? এর জবাব কী?

লক্ষণীয় যে ভারতে এমন কোন বিরোধী দল বলে কেউ নেই যে, হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলে বা হিন্দুত্ববাদের বয়ানের পাল্টা কোনো বয়ান হাজির করতে গিয়েছে বা পেরেছে। বরং সবার ভয় ও ধারণা যে, তাতে তাদের আরো ভোট হারানোর সম্ভাবনা। সে কারণে তারা কেউ মুখ খোলে না। হিন্দুত্ববাদের এতই দাপট! তাই আবার সেই প্রশ্ন, ভারতের পরিস্থিতি কেন এমন হল?

এককথায় জবাব, রামমোহন রায় থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই স্বাধীন ভারত বলতে একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতই বুঝেছে, আর এরই বাস্তবায়নে কাজ করে গেছে আজীবন, এমন রাষ্ট্রেরই ভিত্তি গড়ে চলেছে। আরো সোজা করে বললে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন স্বাধীন ভারত হতে পারে, এটা তাদের চিন্তা-কল্পনার অতীত ছিল। আর বলা বাহুল্য, এখানে ধর্মীয় বলতে এক হিন্দু জাতীয়তাবাদই তারা বুঝেছিলেন। ভারতের ন্যাশনাল আর্কাইভে গান্ধী রচনাবলী সংকলনে “হিন্দুইজম কী” – এই শিরোনামে আসলে ‘গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদ কী’- এমন লেখাগুলোর একটা আলাদা সঙ্কলন আছে। ভারতে “ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইন্ডিয়া” নামে কেন্দ্রীয় সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রকাশনা সংস্থা আছে। তারা এটা প্রকাশ করেছে। এর আবার অনলাইন পিডিএফ ভার্সনও [What is Hinduism, by MAHATMA GANDHI, First Edition 1994] পাওয়া যায় এই লিঙ্কে। এছাড়া বাংলাদেশের এক প্রকাশনা সংস্থাও এরই এক প্রিন্টেড বই প্রকাশ করেছে (2011) গান্ধীর “হিন্দু ও হিন্দুধর্ম কী” নামে। গান্ধীর রাজনীতি যে গান্ধীর হিন্দুইজম বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ – এরই প্রমাণ ছড়িয়ে আছে এসমস্ত লেখাগুলোয়।
অথচ ভাবসাবে সবাই মনে করে, নেহরু-গান্ধীরা এক আধুনিক রিপাবলিক ভারতই গড়ে গিয়েছেন। অথচ কঠিন সত্যিটা হল, এই ভিত্তিহীন ধারণার রিভিউ বা পুনর্পাঠ মূল্যায়ন করে সংশোধন করে নেওয়ার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। যেমন গান্ধীর কোনো নাগরিক ধারণা নেই, পাওয়া যায় না। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা বা নাগরিকের মানবিক মৌলিক অধিকারের ধারণাও নেই। তবে হিন্দুইজমের ধারণা আছে। এছাড়া কথিত “হিন্দু-মুসলমানের মিলন বা ঐক্য” – কিভাবে হবে এ নিয়ে তার ব্যাপক কথা, চর্চা তৎপরতা বা বাণী আছে।

এখন কথা হল, আপনি গান্ধী যদি “হিন্দু জাতীয়তাবাদই” করবেন তাহলে আবার হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য খুঁজতে যাচ্ছেন কেন? হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের দূত হওয়ার খায়েশ কেন? আর কেমনেই বা হবেন? কারণ, আপনাকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানাতে হবে- এই খায়েশেটাই তো সব দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের উৎস! এছাড়া আবার হিন্দু-মুসলমানের দুটা আলাদা ধর্মকে এক বানাবেন? এটা কি আদৌ সম্ভব? আর এর চেয়েও বড় কথা এটা কি আদৌ দরকারি? মানে এসেনশিয়াল? কেন? এটা কেমনে একটা রাষ্ট্র নির্মাণের পূর্বশর্ত হতে পারে? এই ধারণা তিনি কোথায় পেয়েছেন?

অথচ এক ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হইতে হইবে’- গোঁ-ধরা এই না-বুঝ, অবুঝের চিন্তা- এটাই তো সব সমস্যার গোড়া। আবার দেখেন যারা হিন্দু নয় অথবা যারা হিন্দু হয়েও হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র চায় না তাদেরকে কেন হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত তাদেরও কাম্য বলে মানতে হবে? এর কোন সুযোগ গান্ধী রাখেন নাই! অথচ তিনি নাকি মহাত্মা? ভারতের বিবেক?

আবার আরও কথা হল, গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানালে পরে সেটাকে আরও উগ্র হিটলারি ব্যাখ্যার আর একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যেটাই আসলে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ সেটাও তো আসবেই। হিন্দুত্বের পোলারাইজেশন বিভক্তি তুলে নিজের ভোটের বাক্স মোদী-অমিতরা তো ভর্তি করতে আসবেই – তাদের ঠেকাবেন কী দিয়ে? গান্ধী নিজের জীবদ্দশাতেই তিনি হিন্দু মহাসভা-আরএসএস এদেরকে  ঠেকাতে পারেননি। ব্যর্থ হয়ে এদের হাতেই তিনি গুলি খেয়ে মরেছেন।

আরএসএস সংগঠন (১৯২৫) জন্মের পর থেকে এ’পর্যন্ত চারবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। এর দ্বিতীয়বারেরটা হয়েছিল নাথুরাম গডসের হাতে গান্ধীর গুলিতে মৃত্যুর (৩০ জানু ১৯৪৮) পরবর্তীকালে বা পরিণতিতে। আর সর্বশেষ নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার সংশ্লিষ্টতায়। আর এখন সেই আরএসএস আবার খুব সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে ভাইব্রেন্ট তৎপর সংগঠন। আর ভারতের রাজনীতির অবস্থা পরিস্থিতি হল, হিন্দুত্বের জোয়ার উচ্ছ্বাস উন্মাদনার সামনে সেই গান্ধীর কংগ্রেস বা নেতা রাহুল গান্ধী কোণঠাসা- তারা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের কোন সমালোচনাই করতে পারে না, অক্ষম। উল্টো নিজেরাই নিজেদের তৎপরতাকে “সফট হিন্দুত্ববাদ” বলে ডাকে, মেনে নিয়েছে! এই হল গান্ধী ও তাঁর হিন্দুইজমের পরিণতি!

তবু সেই নেহরু-গান্ধীরাই সৌভাগ্যবান। কারণ, হিন্দু জাতীয়তাবাদী হওয়ার পরও তারাই কমিউনিস্ট প্রগতিবাদী চোখে প্রগতিশীলতার প্রতীক। আর দোষী হলো জিন্নাহ ও পাকিস্তান। জিন্নাহ-রাই নাকি ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান বানিয়েছে, দেশভাগ করেছে।

আচ্ছা, গান্ধী যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানাতে চান তাহলে এই কাজ ও ততপরতা – এটাই কী জিন্নাহ ও পাকিস্তানকে মুসলিম জাতীয়তাবাদ করার দিকে ঠেলে দেয়া, নয়? গান্ধীরা যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদ করতে চলে যায় তাহলে তা জিন্নাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ করার দিকে বাধ্য করে ঠেলে দেওয়াই। অথচ তা থেকেই কেবল জিন্নাহরাই ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার অপরাধে অপরাধী ! তাহলে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজ কারা শুরু করেছিল – তা বুঝাবুঝি ঢাকনা খুলতে কেউ আগ্রহি বা রাজী না। বুঝাই যাচ্ছে এই প্রগতিবাদীরা গান্ধী সম্পর্কে কিছুই পড়ে দেখেনি। এটা তাদের গভীর মুসলমান অন্ধবিদ্বেষ ও বিপরীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রীতি। তবে মূল সমস্যা সম্ভবত এখানে যে, রাষ্ট্র চিনতে বুঝতে হয় কিভাবে এটাই তাদের কখনো জানাই হল না!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০২ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আবার বাবরি মসজিদ!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

Last updated: OCT 28, 2019 @ 23:01:35

https://wp.me/p1sCvy-2LG

 

 

ঢাকায় ইসকনের একটি মিছিল

Ratha Yatra In Dhaka City By Shamibag Iskcon Temple 2017

ইসকন এখন বাংলাদেশে নানান জল্পনা-কল্পনায় প্রবল আলোচ্য বিষয়। এরই মাঝে বাংলাদেশের ২৪ অক্টোবর সকালটা শুরু হয়েছে আনন্দবাজারে প্রকাশিত ইসকন নিয়ে গুজবের গল্প পাঠ করে। গুজব বলছি কারণ যে খবরের সোর্স বা উৎসের ঠিকঠিকানা নাই, এই অর্থে। মানে, আবার সেই কোনো মিডিয়ার পেজ-বিক্রি, যেখানে এবারের মিডিয়া হল কলকাতার আনন্দবাজার, আর পত্রিকার পাতার ক্রেতা হল ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ। কথিত বেনামি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতের নামে বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন গল্প ছড়ানো হয়েছে সেখান থেকে।

এবারের গল্পটা দেখে  বিগত ২০১৪ সালের শেষভাগে কথিত “বর্ধমান জেএমবি বোমার গল্পটার” কথা মনে পড়ে যেতে পারে অনেকের। তখন মোদী কেবল প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছেন (মে ২০১৪), এর প্রায় ছয় মাসের মধ্যকার গল্প। অভিযোগের ফোকাস ছিল, কথিত মমতা-সারদা-জামায়াত-জেএমবি চক্র। আর ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্ট বর্ধমান জেলা। অমিত শাহ খুঁটি গেড়ে কলকাতায় বসে গিয়েছেন। সারদা মানে হল, প্রায় আমাদের দেশের মতই “ডেসটিনি” নামের প্রতিষ্ঠানের পাবলিকের টাকা মেরে ফেরার হয়ে যাওয়ার মত এক ঘটনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম।  তবে বাড়তি হল, এখানে অভিযোগ সাজানো হয়েছিল যে কথিত সারদার টাকা এসেছিল ঐ বোমা হামলার জন্য” বলে অমিত শাহ অভিযোগ তুলেছিলেন। আর পুরা ঘটনায় অমিত শাহের টার্গেট ২০১৬ কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে মমতার তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে পরাজয় ঘটানো, নির্মুল করা। তাই জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলা।  কলকাতার মুসলমানদের এক নেতাকে রাজ্যসভায় মমতার দলের নমিনেশন দেয়া থেকে জ্বলে উঠে এই প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল। কলকাতার মুসলমানেরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে, মমতা তাদের তোষামোদ করছেন ইত্যাদি এই সার অভিযোগ তুলে পরের ২০১৬ সালের রাজ্য সরকার ভোটের কথা মনে রেখে কলকাতার হিন্দু ভোটারদের মনে উস্কানি তৈরি করা। এই ছিল মূল ঘটনা। এমনকি একপর্যায়ে কলকাতার সিপিএম দলও এই একই অভিযোগের বয়ানের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশ-জামায়াত-মুসলমান ও জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে মমতাকে দায়ী করে  কলকাতার ব্রিগেডের মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করেছিল।

অভিযোগের প্রপাগান্ডা ডালি সাজিয়ে ভারতে বলা হয়েছিল, এটা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের খবর। আবার পরে একই গুজব বাংলাদেশে প্রচার করা হয়েছিল এটা ভারতের গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া খবর বলে। আর বাংলাদেশে তাতে শামিল হয়েছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির খালেদ মহিউদ্দিন [যিনি এখন জার্মানিতে বসে উলটা সরকারের বিরুদ্ধে ভোকাল হওয়ার চেষ্টা করছেন], চ্যানেল আই এমনকি প্রথম আলো ইত্যাদি অনেক মিডিয়া। সেকালের মোদীর ভারতের নতুন সংসদে এ নিয়ে ঝড় তোলা হয়েছিল। আর, গায়ক নতুন প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের অভিযোগের ডালি সাজিয়ে বসা আর সর্বশেষ কলকাতায় অমিত শাহের জনসভায় (০১ ডিসেম্বর ২০১৪) মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর আক্রমণের ডালি তুলে ধরা, সবই ঘটেছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎ সব ফুস, বেলুন চুপসে যায়।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটা পারসোনাল বিভাগ বা বাংলায় আমরা বলি সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিসের “আপন বিভাগ” আছে। আমাদের বেলায় এই বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্বাবধানে আর ভারতের বেলায় এর মাঝে আছেন এক প্রতিমন্ত্রী। ঘটনাওগুলোর অনেক কিছু স্মৃতি থেকে লিখা হল। তবে এখন হাতের কাছে একটা ভিডিও রিপোর্ট পাওয়া গেল। এনডিটিভির। তাতে দেখা যাচ্ছে মোদীর অফিসের ঐ প্রতিমন্ত্রীর নাম ছিল জিতেন্দ্র সিং। তাকে দিয়ে হঠাৎ এক বিবৃতির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যার সারকথা ছিল যে আপাতত ওই বর্ধমান মামলা স্থগিত রাখা হচ্ছে, আরো তদন্তের পরে ভবিষ্যতে এটা আবার দেখা যাবে। [Three days after Amit Shah, the president of the BJP, alleged in Bengal that funds involved in the Saradha scam were used for terror, the government appears to have contradicted him] ইতোমধ্যে অমিত শাহ কলকাতা ত্যাগ করেন কারণ জীতেন্দ্র সিং-ই অমিত শাহের দাবির বিরোধিতা করে সংসদে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তবে বাবুল সুপ্রিয়ই সবচেয়ে বেকুব হয়েছিলেন। ধরা খেয়ে বেকুব হয়ে তিনি কী বলেছিলেন সেটাও এনডিটিভিও ভিডিও ক্লিপে পাওয়া যাবে।  কারণ, তার ভুয়া অভিযোগ-আক্রমণই ছিল সবার শেষে মানে প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্রের ঘোষণা ঠিক আগে। কিন্তু কেন হঠাৎ পশ্চাৎপসারণ? খুব সম্ভবত কোনও কারণে বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে লড়বার নির্বাচনী কৌশল বদল করেছিল তাই। তবে এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, পরবর্তীকালে ঐ ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে মমতা আগেরবারের চেয়ে বেশি, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছিলেন। সেই ২০১৪ সাল থেকে আজও আর কখনো সেই জঙ্গিবাদের গল্প আর ঝাঁপি খোলেনি।

অতএব সাধু সাবধান। এসব পেজ বিক্রির আনন্দবাজারি গল্প আমাদের কাছে আবার আনা কি ঠিক হলো? যদিও এবারের ঘটনা মোদীর গুরু প্রতিষ্ঠান আরএসএসের ষ্ট্রাটেজিক ও ধর্মীয় সংগঠন “ইসকন”-কে নিয়ে। অনুমান করি, বাংলাদেশে লিগ্যাল স্ট্যাটাসের দিক থেকে ইসকন এক বিদেশী এনজিও হিসেবে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড ও তৎপর। আর বাংলাদেশের এখনকার মাঠের বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে ইসকন সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে, আধা সত্য-আধা গুজবে মাখামাখিতে ইসকন এক খুবই খারাপ ইমেজ নিয়ে হাজির; যা বাংলাদেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর এই ধারণায় ভরপুর হয়ে উঠছে ক্রমাগত ও দ্রুতগতিতে। সবচেয়ে বড় কথা ইসকনের এই ষড়যন্ত্রকারি ইমেজ এটা খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে, যা যেকোন সময় সামাজিক দাঙ্গা লাগিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে হাজির হওয়ার জন্য খুবই পটেনশিয়াল।

এই পটেনশিয়াল দিকটার কথা যদি মনে রাখি, তবে ভারতের বা কলকাতার এই গুজবের গল্প ছড়ানো খুবই অবিবেচক কাজ হয়েছে। অবশ্য যদি না ডেলিবারেট কোনো দাঙ্গা বাধানোর মধ্যে ভারতের সরকার ও গোয়েন্দাদের কোনো খায়েশ থেকে থাকে যা আমরা জানি না, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা আলাদা।

ইসকন [ISKCON]
ইসকন নিজেদের “ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘ- এভাবে একটি হিন্দু বৈষ্ণবধর্মীয় প্রতিষ্ঠান” বলে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত আমেরিকা ব্যক্তিবাদের ধারণাকে [individualism] চরমতম অর্থের দিক থেকে নেয়াতে আর সেটাই পপুলার ধারণা বলে পরিণতিতে সেখানে ব্যক্তিমাত্রই খুবই একা ও বিচ্ছিন্ন, এক সম্পর্কহীনতার অবস্থার দিকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হয়ে রয়ে যায় সবাই। কিন্তু স্বভাব হিসেবে মানুষমাত্রই রিলেটেড-সম্পর্কিত মানুষ তো বটেই, অন্ততপক্ষে এক জীবনসঙ্গীর “আকাঙ্খাসম্পন্ন” মানুষ। ফলে মানুষ একা তো নয়ই, অন্তত দোকা তো বটেই এবং মানুষের অস্তিত্বই  গভীরভাবে সামাজিকও। এর বাইরের দিকে তাকিয়ে সেটা অমান্য করতে চাইলেও ভিতরে এটা তাই-ই থাকে।  তাই তার গভীর স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদাও আছে। স্পিরিচুয়ালিটিই আসলে মানুষের নানান সম্পর্ক ও এথেকে জাত কামনার অর্থ তাৎপর্য ব্যাখ্যাও তুলে ধরে। এটা মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তি ও স্বভাবে আছে, কিন্তু পশ্চিমা চরমব্যক্তিবাদের সমাজ সেই স্বভাব ও আকাঙ্খাকে চাপা দিয়ে রেখেছে। এই স্পিরিচুয়ালিটি বলতে তা সে দার্শনিক অর্থে স্পিরিট [spirit] বা প্রজ্ঞা হোক অথবা থিওলজির অর্থে বা ভাষ্যে আত্মা-রুহু – সেটা যে যাই করুক বা বুঝুক না কেন – শেষ বিচারে এটা মানুষের অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক করা, সম্পর্কিত থাকা ও সম্পর্কিত অনুভবের আকাঙ্খা-চাহিদার সপক্ষেই দাঁড়িয়ে কথা বলে। এরই বৃহত্তর অর্থ হল মানুষের পরমসত্তা অনুভবের দিক। থিওলজিক্যাল অর্থে ও ব্যাখ্যায় এটাই মানুষের যার যার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভবের অথবা আল্লাহর মাধ্যমে মধ্যস্ততায় জগতের সকল অপর মানুষ ও সত্বার সাথে নিজেকে যুক্ত ও লিপ্ত অনুভব করার দিক। থিওলজি বলবে মানুষ তাই রূহুর চাহিদায় সাড়া না দিয়ে পারে না।

এটাই, ঠিক এটাই পশ্চিমের এক স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদার ক্ষেত্রে এক বড় ভ্যাকুয়াম হয়ে আছে দেখা যায়। তুলনায় এটাই এশিয়ান যেকোনো থিওলজির প্রভাব যথেষ্ট স্যাচুরেটেড বা পুষ্ট হয়ে আছে। অন্তত কোনো ভ্যাকুয়াম-শূন্যতা নেই। এখন এশিয়ান এই থিওলজিক্যাল পূর্ণতাকে এবার পশ্চিমের চাহিদার কথা খেয়াল করে এর উপস্থাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাবে, এক কৃষ্ণপ্রেম বিলিয়ে বেড়ানোর দিক থেকে ইসকন ভালো প্রভাব ছড়িয়ে আমেরিকায় নিজের যাত্রা শুরু বা ভিত গাড়তে পেরেছিল। আবার মানুষের সম্পর্ককে একটু ভিন্ন [সেক্সচুয়ালিটি] উপস্থাপনের দিক থেকে আর এক গুরু রজনীশও ভালই আমেরিকান চাহিদা ধরতে পেরে পসার জমাতে পেরেছিল। ভারতের গুরুরা এসব সহজেই তুলে ধরতে পারে বলে [এমনকি যোগ ব্যায়ামেরও স্পিরিচুয়াল দিক আছে তা ব্যাখ্যা করে থাকে অনেকে] এদের গড়ে তোলা নানান আশ্রম ও ব্যাপক ভক্তকুল আমরা আমেরিকাতে দেখতে পাই। এভাবে এমনই এক উদ্যোগ হল ইসকন – নানান উঠতি পড়তির মধ্যদিয়ে ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইসকন আমেরিকাতে খারাপ চলে নাই। তবে এসব ততপরতাগুলো সেকালে কোনোটাই ভারত-রাষ্ট্রের স্বার্থের কোনো রাজনৈতিক উপস্থাপন ছিল না। কিন্তু এই পরিস্থিতিটাই বদলে যায় ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার পর থেকে। বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে। বুশের আমেরিকা তার ওয়ার অন টেররের পক্ষে এশিয়ার এক কুতুব হিসাবে ভারতের সমর্থন পেতে, ভারতের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমর্থনের এক অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছিল, সেখান থেকে ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে।

কাশ্মীর সংকট ও এর “সীমা পার কী আতঙ্কবাদ” হয়ে উঠা
বলা হয়ে থাকে, ১৯৮৭ সালের জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাদেশিক নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ঘটানো হয়েছিল। পরিণতিতে এটা সেই থেকে  নির্বাচনী ধারার কাশ্মীরের রাজনীতি এর নিজ সমাজেই আস্থা হারিয়ে একে এক সশস্ত্র রাজনৈতিক ধারার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৪৯ সাল থেকে কাশ্মীর ইস্যু বিভক্ত ও অমীমাংসিত এমনই থেকে যাওয়া সত্ত্বেও এর রাজনীতি একটা নির্বাচনী ধারাতেই প্রবাহিত হয়েছিল, যেটা ১৯৮৭ সালের পরে কাশ্মীরে আর তেমন থাকেনি। এনিয়ে প্রচুর একাদেমিক গবেষণা স্টাডি হয়েছে। [যার রিপোর্ট ও ফাইন্ডিংস-গুলো (1987 March kashmir elections rigging লিখে) নেটে সার্চ দিলেই যেকেউ দেখতে পাবে।] আর সশস্ত্রতার রসদ তারা সংগ্রহ করেছিল সেকালে আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী আমেরিকা সমর্থিত লড়াকু মুজাহিদীনদের কাছ থেকে, পাকিস্তান হয়ে।

আর এথেকে কাশ্মীরের রাজনীতি পারস্পরিক খুনোখুনি রক্তারক্তির এক বাস্তবতায় ঢুকে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা হল, বড় সংখ্যায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যা করা আর পরিণতিতে তাদের কাশ্মীরে নিজ ভিটা-সম্পত্তি ত্যাগ করতে হয়েছিল। এতে কে কাকে কী বলে দায়ী করবে সে এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কারণ, সবাই জানত কাশ্মীরের সমস্যার কোন জবরদস্তি বা সামরিক সমাধান নাই, তবু পক্ষগুলো পরস্পরকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। [যেটা আজ আবার সেই একই বেকুবি পথে মোদী-আরএসএস ঠেলতে শুরু করেছে।]  তবু সেকালে পরবর্তী সময়ে নব্বই দশকের অস্থির সময়ে বিজেপি নেতা বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকে এরই পাল্টা সংগঠিত এক প্রপাগান্ডা শুরু হয় – “সীমা পাড় কা আতঙ্কবাদ” বলে। অর্থাৎ কাশ্মীরের সমস্যার মূলে আছে আফগান বা পাকিস্তান থেকে আসা  সশস্ত্রতা (কথিত টেররিজম)। মানে ভারতের রাষ্ট্র বা সরকারের কোন দায় নাই, ভুল বা অন্যায় শুরু করা নাই; সব দায় হল বাইরে থেকে আসা সশস্ত্রতার। কাশ্মীর রাজনীতিতে  নির্বাচনী কারচুপি করা যে বিরাট আত্মঘাতী পদক্ষেপ ছিল, কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতিতে কারচুপি আমদানি করলে যে হতাশগ্রস্থতা শুরু হয় তা থেকে যেকেউ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে নিয়ে চলে যেতে পারে – এটাই সেই আত্মঘাতী পথ। তাই এটা সেই মেসেজ দিয়েছিল যে কাশ্মীরে নির্বাচনী রাজনীতির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ফলে সশস্ত্রতাই একমাত্র বিকল্প- এই ভাবনাই যে পরবর্তীকালে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল, তা কমবেশি সব পক্ষের কাছেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই মনমরা হিন্দুমনে ধীরে ধীরে পাল্টা নতুন মরাল জাগানোর কাজটাই করেছিলেন বাজপেয়ি; এই বলে যে, সব দোষের গোড়া হল, বাইরে মানে পাকিস্তান থেকে আসা সশস্ত্রতা।

তবু এ কথা বলাতেই শুরুতে তখনও তা তেমন পাত্তা পায়নি। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর (১৯৮৯ সাল থেকে ধরলে ) ভারতকে সাফার করতে হয়েছিল, কোনো গ্লোবাল বন্ধু-সাথী রাষ্ট্রকে ভারত পাশে পায়নি। যার মূল কারণ সেকালে কাশ্মীরে পাওয়া সহজ হয়ে যাওয়া অস্ত্রের মূল উৎস তো আসলে আমেরিকা, আর সাথে এছাড়া স্বল্প কিছু ফেলে যাওয়া বা দখলি সোভিয়েত অস্ত্র। তাই এক লম্বা পথ বা ঘটনাক্রম  – সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার, পরে আমেরিকার আফগানিস্তানকে বিশৃঙ্খলতায় ফেলে চলে যাওয়া, শেষে একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে আফগানিস্তানে তালিবানদের আবির্ভাব, আর এতে তালিবানদেরক এক তুলনামূলক স্থিতিশীলতা আনার শক্তি হিসাবে দেখে আমেরিকা তাদের সমর্থন করলেও শেষে ক্রাইসিস মেটেনি। কারণ, পরে তালেবানি শাসকেরা আলকায়েদার প্রভাবে চলে যায়। আর তা থেকে আমেরিকায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলা – এই পুরা চক্র সমাপ্তি শেষ হতে দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। পরে বুশের ওয়ার অন টেরর প্রোগ্রামকে ভারত সমর্থন করেছিল, কাশ্মীরের সশস্ত্রতা পরিস্থিতিতে ভারতের সামরিক অবস্থান এবং ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিকে নষ্ট করা নয়, বরং “সীমা পারকে আতঙ্কবাদ” সবকিছুর জন্য দায়ী এই বয়ানের প্রতি আমেরিকার সমর্থন আদায়ের বিনিময়ে।

আর এথেকে আরও ডালপালা গজিয়ে তখন থেকেই শুরু হয় আমেরিকার সাথে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে ভারতের লম্বা খাতির সম্পর্কের যুগ। আর তা শুধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অফিস স্তরেই নয়, আমেরিকান এমপি (প্রতিনিধি পরিষদ) ও সিনেটেও ভারতের পক্ষে নিরন্তর লবি করার জন্য আমেরিকাতেই বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দেরকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগানোর বেশকিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এরই সমন্বয়কের ভুমিকা নিয়েছিল আমেরিকায় ভারতীয় এমবেসি (গোয়েন্দা বিভাগ)। এই লক্ষ্যে ২০০৩ সালে জন্ম হয় ” হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন”। যারা আমেরিকায় জন্ম নেয়া ভারতীয়-অরিজিন বাবা-মার পরের প্রজন্ম, যদিও তারা আমেরিকান নাগরিক, এরাই এর সদস্য। তারা গর্ব করে বলে আমরা ভারতীয় নই, আমেরিকান হিন্দু। কিন্তু বাস্তবে এরা ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার সংগঠন, ভারতীয় বিদেশনীতির বাস্তবায়ক। তাদের মুরুব্বিরাও তাদের পিছনে, অফ-সিনে। ১২০ মিলিয়ন ভারতের বাজারে ব্যবসা দেয়ার বিনিময়ে আমেরিকান ব্যক্তি ব্যবসায়ী আর এর সাথে এমপি ও সিনেটর মিলিয়ে এক চক্র যা লবি ও প্রেসার গ্রুপ, কোটারি গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল। লবি ও প্রেসার গ্রুপ তৈরি আমেরিকায় বৈধ। তাই আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্রে রেখে এরা আরো সংগঠিত করেছিল এক এমপি তুলসি গাব্বার্ড, ভারতীয় নানান সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন [ইসকন যার মধ্যে একটা বিশেষ] বা প্রবাসী ভারতীয়-অরিজিন আমেরিকান ব্যক্তিত্বকে।

ইসকন আর কৃষ্ণপ্রেম বিলায় না, ভারতরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার, হিন্দুত্ববাদ বিলি করে
এতে স্বভাবতই আগের শতকের আমেরিকান ইসকন, আগের কৃষ্ণপ্রেম বিলানো ইসকন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের খাঁচায় বিরহ একাকিত্বে আটকে থাকা সাদা আমেরিকানদের মুক্ত করতে আসা ইসকন, এমনকি তাই এর আগের নেতৃত্ব কোন কিছুই এক থাকেনি। সেই ইসকনের মৃত্যু হয়। ফোকাস বদলে যায়। নতুন ইসকন জন্ম নেয় যার কাজ ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার হওয়া। [Strategic বা স্ট্রাটেজিক মানে এখানে, রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নেয়া কৌশল ও পরিকল্পনা ]  কংগ্রেস আমলে যেটা ছিল সফট [soft] হিন্দুত্ব তাই এখন হয়ে উঠেছে আরও এগ্রেসিভ, আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদ। প্রথমত এর তৎপরতার ক্ষেত্রে তখন থেকে আর পশ্চিমাদেশ থাকেনি, বাংলাদেশও হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা ভৌগোলিক পকেটের হিন্দুজনগোষ্ঠির উপস্থিতি থাকলেই (যেমন আফ্রিকান অনেক দেশেই ইসকন সংগঠন পাওয়া যাবে) সেখানে ভারত রাষ্ট্র-সরকারের নীতি ও স্বার্থ স্ট্রাটেজির পক্ষে সকলকে জড়ো করা, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের বোধ জাগিয়ে তোলা, কমপক্ষে সহানুভূতিশীল করে তোলা – এসবই ইসকনের মুখ্য কাজ হয়ে ওঠে। এতে ভারত রাষ্ট্রই যে প্রকাশ্যে হিন্দু-রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে – ভারতীয় নাগরিককে সে “হিন্দু হিসাবেই” (এটা ভারত-রাষ্ট্রের কাজ ছিল না) সংগঠিত করছে, সাথে পাশে কোন অন্যদেশের হিন্দু থাকলে তাকেও হিন্দু হিসাবে ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে অবলীলায় শামিল করেছে।

একটা জিনিষ পরিস্কার থাকতে হবে, কোন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক-স্বার্থ বিষয়ক নানান সিদ্ধান্ত সে রাষ্ট্র অবশ্যই নিবে। আমাদের তাতে না করার কিছু নাই। আর বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। ব্যতিক্রম স্বল্প কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বাদে তা কখনও অন্য-রাষ্ট্রেরও পক্ষেও যাবে না। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল অন্য রাষ্ট্রের যে সিদ্ধান্ত যা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক তা প্রত্যাখান ও প্রতিরোধে করতে সক্ষম হতেই হবে। এটা ন্যায়-অন্যায়ে বিষয়ক ইস্যু যত না এর চেয়ে বেশি নিজ স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ও সক্ষম হওয়া, আপোষ করে বিক্রি না হয়ে যাওয়ার বিষয়। ইসকনের ততপরতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনের তদারকি ও লাইসেন্সিং প্রতিষ্ঠান “এনজিও ব্যুরোর” মাধ্যমে আর “ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন এক্ট ১৯৭৮” (যেটা সর্বশেষ ২০১৬ তে সংশোধিত হয়েছে) – এই আইন দিয়েই প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর আমাদের এটা করতে পারতেই হবে। আর সার কথাটা মনে রাখতে হবে ভিন্ন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক প্রতিষ্ঠানকে আমরা আমাদের দেশে ততপরতা চালাতে দিতে পারি না। বিদেশি এনজিও হিসাবে তো আরও নয়, তাও আবার ধর্ম-প্রচারের উসিলায়।

আসলে ইসকনের বাংলাদেশে উপস্থিতিটাই এর কথাকাজের বেমিলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, আমেরিকায় গিয়ে ইসকনের জন্ম হতে পেরেছিল মূলত একাকিত্বের আমেরিকান সমাজের শূন্যতার হাহাকার পূরণে। তাহলে ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ তার কাম্যভূমি হতেই পারে না, ম্যান্ডেটে কাভার করে না। কারণ বাংলাদেশ পশ্চিমাদেশ নয়, অন্তত স্পিরিচুয়ালিটির ভ্যাকুয়াম এখানে নাই। বাংলাদেশে হিন্দুদের ধর্মীয় সংগঠন – মন্ত্র জানা, শাস্ত্র জানা, বামুন পুরুত বা মন্দিরের কমতি এখানে ঘটে নাই – কখনও ছিল না। তাহলে আমেরিকায় যে কারণে ইসকনের জন্ম, ঠিক সে কারণেই বাংলাদেশে ইসকনকে হিন্দুদের দরকারই নেই।  তাই ইসকন ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠিত হওয়া থেকে বাংলাদেশে  ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের জন্যই এর জন্ম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

আর তাই অন্তত এই একটা কারণে, বাংলাদেশের সরকার ইসকনকে বিদেশি এনজিও হিসাবে এনজিও ব্যুরো থেকে রেজিষ্ট্রেশন দিতে পারে না।  ইসকন আসলে ধর্মীয় নয় ভারত রাষ্ট্রের হাতিয়ার রাজনৈতিক সংগঠন। আবার কোন ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠনকে এনজিও ব্যুরোর রেজিষ্ট্রেশন দেয়া হারাম – আপন রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধী বলে নিষিদ্ধ। কেবল রিলিফ বিতরণের কাজ, দাতব্য কাজ করতে পারে – সেজন্য অনুমতি পেতে পারে।

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব, ভারত সরকারের আমাদের সরকারের ওপর সবখানে প্রভাব বিস্তারের বিরোধী  – এমন মনোভাব প্রচন্ড বাড়ছে, এ নিয়ে আমাদের সমাজের কোনো কোণে বা কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বিমত পাওয়া যাবে না। তবে আবার দ্বিমত হবে এর মাত্রা নিয়ে। সরকারি পক্ষের হলে কেউ বলবেন ভারতের প্রভাব অনেক কম বা স্বাভাবিক। বিপরীতে অন্যরা বলবেন ভারতের প্রভাব চরম, সীমাহীন অসহ্য বা অনাকাঙ্খিত ইত্যাদি। আর এরই মধ্যে ইসকনের নাম ও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিরূপ মনোভাব ক্ষোভ ক্রমেই চড়ছে। এরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে চাইছে – এমন এগ্রেসিভ।  ইসকন সাধারণ্যে চোখে পড়া শুরু করে ২০১৬ সালে সিলেটের সঙ্ঘাত থেকে আর এ কালে চট্টগ্রাম শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে ‘প্রসাদ খাইয়ে’ কৃষ্ণনাম গাওয়ার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ হয়ে পড়া থেকে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে সনদ প্রদান বা তারা ইসকনের সদস্য বলে প্রচার চলা থেকে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই হয়ত অনুমান করে বলা, আধা সত্য অথবা প্রপাগান্ডা বা একেবারেই গুজব হয়ত।

গুজবের আসল অর্থ হল ফ্যাক্টসের সাপ্লাই না থাকা। সাধারণত  সরকারের বুঝে না বুঝে বোকা হয়ে খাড়িয়ে থাকা উদাসীন্যতা থেকে এর জন্ম হয়। এছাড়া, যারা বুঝতেই পারে না সঠিক বিশ্বাসযোগ্য ও স্পষ্ট তথ্য সমাজে সহজেই পাওয়া না যাওয়া অবস্থায় রাখা কত আত্মঘাতী। এটা আসলে চাইলেই পাওয়া যায় এমন করে রাখা হয়নি, এই পরিস্থিতি। তাই গুজব মোকাবেলার উপযুক্ত উপায় হচ্ছে, তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয় এভাবে হাজির রাখা। সমাজের বিভ্রান্তি সম্পর্কে খবর রাখা আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে আগে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য হাজির রাখা। নিশ্চুপ থাকলে বা গুজবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা গুজবের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বাড়তে পারে। কখনো তা ফেটে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।

ইসকন ও এনজিও ব্যুরো
বাংলাদেশে আইনে ইসকনের ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে ততপরতা করতে অনুমোদন, বিদেশী অর্থ নিয়ে আসা ও বিতরণের অনুমোদন জোগাড় করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০১৬, এই আইন পেরিয়ে বিদেশী স্বার্থ প্রতিফলিত হয় এমন তৎপরতার ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকে সেজন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন বিদেশী ধর্মীয় এনজিও প্রতিষ্ঠানের দেশে সহজে কোনো তৎপরতা চালানোর বিরুদ্ধে এভাবেই সাজানো। কারণ, তারা যেন কোনো ধর্মান্তকরণ বা ধর্মে প্রভাবিত করার কাজ না করতে পারে।

বাস্তবত ইসকন এখন কৃষ্ণপ্রেম বিলানোর চেয়ে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নের পার্টনার। ওদিকে সাধারণভাবে বললে কোন বিদেশী রাষ্ট্রের কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান অন্য দেশে  নিজ দেশের নীতি বা স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি পেতে বা চাইতেই পারে না। বিশেষত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাজের সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেয়া ছাড়াও বিদেশী অর্থ আনার অনুমোদনই পেতে পারে না। বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থ বলে কিছু নিয়ে তৎপরতা চালানো অথবা [এমনিতেই ইসকন আমেরিকান অরিজিনের] ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুনীতি নিয়ে তৎপরতা- এর কোনোটাই ইসকন বা  কোনো এনজিওকে বাংলাদেশে করতেই দিতে পারে না।  এটা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী হবে, তাই।
অথচ আনন্দবাজারের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে যে, কথিত জঙ্গি হামলা হতে পারে এই অজুহাত তুলে যেন বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থে  “জঙ্গী” মারার অজুহাতে কাজ করতে তৎপর হয়। এতে বাংলাদেশের সরকারের কী হাল হবে? তার নিজের স্বার্থ কোথায় এতে?

আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম কাজটি হল, এব্যাপারে নিজের হাত পরিষ্কার রাখা। সরকারকে নিজ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা, না হতে দেয়া, যেসব গুজব ইতোমধ্যেই উঠেছে তা বিনাশ করা। গুজবের বিনাশ করতে যেটা করতে পারে যে ইসকন কী হিসেবে রেজিস্টার্ড তা পরিষ্কার ও সরাসরি পাবলিককে জানানো। যেমন এটা কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, না রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান? এ কাজটা সরকার নিজে অথবা কোনো বিশাসযোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্বের অধীনে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করতে পারে।

যেমন ইসকন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমতিপ্রাপ্ত হলেও ‘প্রসাদ’ বিতরণ সে করতে পারে না, সেটা পুরোপুরি বেআইনি। ‘প্রসাদ’ বিলানো মানে যেটা ধর্মীয় এনজিও হিসেবে রেজিস্টার্ড (যে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার কথা নয়) কেবল সেই করতে পারে। এছাড়া ‘প্রসাদ’ বিলানো আর কাউকে দুপুরের খাওয়ার প্যাকেট বিতরণ এক কাজ নয়। আবার যেমন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়ে এবং অর্থ ছাড় করে সেই টাকায় ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা বেআইনি হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে পাবলিকের কাছে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ নিয়ে সরকারের কোন দায় নেয়ার অথবা কোন আড়াল টেনে দেওয়া  প্রয়োজন নেই। আমাদের আইন পারমিট না করলে সরকারের কিছুই করার নেই। আবার আমাদেরও ইসকন সম্পর্কে কিছু বুঝে না বুঝে জেনে ইসকন তাবলীগের মত এক সংগঠন ধরনের কোন সাফাই দেওয়ারও কিছু নাই। আর এতে “অসাম্প্রদায়িক” এই সার্টিফিকেট পাইবেনই অথবা এই সার্টিফিকেটের কোন মূল্য থাকবে এসবেরও কোন নিশ্চয়তা নাই। আমাদের দরকার আসলে ফ্যাক্টস – কোন গুজবও না, কোন সাফাইও না।

আবার এক শিক্ষকের ভাই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারের পর দেখা যাচ্ছে সে ইসকনের সদস্য অথবা সরকারি কর্মচারী ইসকনের পদক মেডেল বা সংবর্ধনা নিয়েছে বা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এখন এই ইসকনের সদস্য হওয়া কী জিনিস? কোনো বিদেশী এনজিও এখানে কাউকে ধর্মীয় দল গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য বানানোর কার্যক্রম নিতে পারে না। এনজিও বলতে মূলত বস্তুগত জিনিসের দাতব্য হতে হবে। এটাই কাম্য।

এনজিও করতে আসা চ্যারিটির কথা বলে কোনও “ভাব” (ধর্মীয় বা রাজনীতির) প্রচার করতে অনুমতি দেয়া হয় না, যায় না। তবে বড়জোর সেটা (ধর্মীয় নয়) সামাজিক সচেতনতা ধরনের কাজ যেমন অধিকারবিষয়ক, দক্ষতা শেখানো, স্বাস্থ্য বা পরিবেশবিষয়ক ইত্যাদি এ রকম হতে পারে। সরাসরি রাজনীতি অথবা ধর্ম প্রচার- এটা আমাদের এনজিও আইনে একেবারেই নিষিদ্ধ। আসলে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরে কী কার্যক্রম নেবে এর বিস্তারিত বর্ণনা, কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করবে ইত্যাদির হবু কার্যক্রমের বিস্তারিত সব কিছু কর্মসুচি আগেই এনজিও ব্যুরোতে জমা দিতে হয়। দেওয়ার কথা। আর আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ তা সরেজমিন যাচাই করে ইতি রিপোর্ট দিলে তবেই সে বিদেশী এনজিও অর্থ ছাড়ের অনুমতি পায়। আর এর ব্যতিক্রম করলে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ আইনে জেল-জরিমানার কথা লেখা থাকলে সেটাও প্রয়োগ হতে পারে।

বাংলাদেশের ইসকনের ততপরতা সম্পর্কে সরকারের ভাষ্য দেয়ার পিক আওয়ার চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইসকন নিয়ে এক সরজমিনে রিপোর্ট, যা খুবই ভয়াবহ অবস্থা নির্দেশ করেছে, তা প্রকাশিত হয়েছে। ওর শিরোনামই বাংলাদেশে বেপরোয়া ইসকন,‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’য় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা।

একটা রাষ্ট্র-সরকার চালাতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে নরমে-গরমে অথবা বিশেষ খাতিরের অনেক রূপের সম্পর্ক রাখার দরকার হতে পারে। কিন্তু এসব ডিলিং বা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের যা প্রচলিত আইন তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা বা আইন বাঁকা করে ফেলার তো দরকার নেই বা তা কাম্যও নয়। নিশ্চয়ই প্রতিবেশীসহ যে কোন রাষ্ট্র যার যারটা-সহ সব দেশের আইনি সীমার কথা বুঝবে ও মান্য করবে, এটাই কাম্য। এনজিও প্রসঙ্গে আমাদের প্রচলিত আইন যথেষ্ট স্বচ্ছ। কাজেই রেকর্ড স্পষ্ট রাখা আর সেসব রেকর্ড পাবলিকের জন্য খুলে রাখা হল সব কিছু জটিলতা থেকে পরিত্রাণ ও দূরে থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। বাংলাদেশের মানুষকে জানাতেই হবে বাংলাদেশে ইসকন ঠিক কী কী করার অনুমতি পেয়েছে? কোন আইনে? আর ইসকনের ততপরতা দেশের আইনসম্মত আছে কী না?
তথ্য স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য রাখার পরও কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উত্তেজনা বা বিভেদ তৈরি করার কেউ চেষ্টা করলে সরকারের তা মোকাবেলা সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়। এছাড়া এমন সমাজে গুজব বিভ্রান্তি বা প্রপাগান্ডাও আসলে শুরু করাই কঠিন থাকে। কাজেই স্বচ্ছতা সরকারের সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র। আমরা কী তা বুঝব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২৬ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছেএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

গৌতম দাস

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ja

          হিন্দিতে ক খ গ লেখা, এনডিটিভি থেকে নেয়া, ১৪ সেপ্টে ২০১৯

[সার-সংক্ষেপঃ আরএসএস -বিজেপি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদের পরে এবার মোদী-অমিত চেষ্টা করছেন হিন্দি জাতীয়তাবাদ মানে, সাথে ভাষার জাতীয়তাবাদও হাজির করার চেষ্টা করছেন। চলতি প্রজন্ম হয়ত জানে না। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রথম দল কংগ্রেস ও এর নেতা জওহরলাল নেহর্‌ এটা আগেই চেষ্টা করে  ও পরাজিত হয়ে গেছিলেন। ১৯৬৩ সালে এরই প্রচেষ্টায় তিনি The Official Languages Act, 1963 করেছিলেন। কিন্তু তা দক্ষিণের দ্রাবিড়ীয়দের আন্দোলনের মুখে ব্যর্থ হয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি ভারতের “জাতীয় ভাষা” আর নয়। মোদী-অমিত আবার সেই পুরানা ব্যর্থ প্রচেষ্টাটাই নতুন করে জবরদস্তিতে আনতে চাইছেন, যা ইতোমধ্যেই নেহরুর হাতে পরীক্ষিত ও পরাজিত। কংগ্রেসের এখনকার বিবৃতিই এর প্রমাণ।]

এবারের ১৪ সেপ্টেম্বর নাকি ভারতের “হিন্দি দিবস” [Hindi Divas] ছিল। মানে পালিতও হল। বুঝা গেল, ভারতের অমিত শাহ এবার হিন্দুত্বের পরে নতুন মোদী-হিটলারি লাঠি – হিন্দি” নিয়ে হাজির হলেন। ব্রিটিশেরা চলে যাবার পরে স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন যখন লেখা হচ্ছিল সেই ১৯৪৯ সালে ১৪ সেপ্টেম্বরকে একটা হিন্দি দিবস ঘোষণা করে রাখা ছিল। রাখা ছিল বলছি এ জন্য যে এটা রেখে কোনো লাভ হয়নি, পরে হিন্দিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। খুব একটা কিছু আগায়নি। কী আগায়নি?

ব্রিটিশ আমল থেকেই, রাজনীতি জিনিসটা কী – তা অস্পষ্ট বোল-এর উচ্চারণে আধা-বুঝাবুঝির সময় থেকেই ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে একমাত্র একটা জাতীয়তাবাদী দলই বুঝা হত। আবার এই জাতীয়তাবাদ বলতে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব ছাড়া আর অন্য কিছু হতে পারে না- এই অনুমান নিয়েই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদিও হিন্দুনেতাদের নিজেদের মধ্যে একটা তফাত বা বিতর্ক ছিল যে, তারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র বলতে যে একটা হিন্দুত্ব-রাষ্ট্র বুঝছেন তা স্পষ্ট করেই বলা হবে, না তা কৌশলে আড়াল রাখা হবে, এ নিয়ে কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভা (একালের নাম আরএসএস) গোষ্ঠির মধ্যে ভিন্নতা ছিল। কিন্তু হিন্দু রাজনীতিক মাত্রই প্রায় সবাই মানত যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া ভিন্ন কোনো রাজনীতি করা এবং রাষ্ট্র গড়া ও থাকা অসম্ভব, তা হতেই পারে না। ঠিক এ কারণেই তারা অ-হিন্দু, বিশেষ করে ভোকাল মুসলমানদের সামনে নিজেদের হিন্দুত্ব চিন্তার ন্যায্যতা কী তা প্রতিষ্ঠা করতে না পারা থেকেই কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

পরিণতিতে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু মুসলমানেরা রাষ্ট্রে আলাদা হয়ে যাওয়া সত্বেও তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের “রাষ্ট্র ধারণা” বুঝের মধ্যে এর কোন প্রভাব পড়েনি। তারা হিন্দুত্ব আঁকড়ে ধরেই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশন বানানোর পরবর্তিতে বাস্তবত ১৯৬৩ সালের মধ্যে,  শুরু হয়ে যায় এর পতন; অর্থাৎ ডিজেনারেশন [degeneration]  বা ভেঙে পড়া। মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের চিন্তা ও রাষ্ট্র বাস্তবায়ন শুরুর পর্যায়েই এরা টের পেতে থাকে যে সব ভেঙে পড়ছে।

অনেকের ধারণা যে, কোনো জনগোষ্ঠীর আশি-নব্বই পার্সেন্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়তে কোনো সমস্যা হয় না। এ ধারণা ভুয়া, ভিত্তিহীন। এর মানে, এই অনুমান অনুসারে ভারতের মুসলমানেরা ভেঙে আলাদা নিজের রাষ্ট্র গড়ে বেরিয়ে গেলে তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গড়তে আর অসুবিধা হবে না, পোক্ত হবে। তাই তো হওয়ার কথা, কিন্তু ভারতে তা হয়নি। মাত্র তেরো বছরের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের নামে দক্ষিণের ওপর হিন্দি-বলয়ের কর্তৃত্ব উপড়ে ফেলে দিয়েছিল। কর্নাটকের প্রধানত কন্নড় ভাষা, কেরালার মালয়ালম ভাষা, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু ভাষা, তামিলনাড় তামিল ভাষা এদেরকে একসাথে দ্রাবিড়িয়ান ভাষা বলে। অনেকে তাই দক্ষিণের এই চার রাজ্যকে দ্রাবিড়িয় রাজ্য বলে। অনেকে আবার ভৌগলিকভাবে (এটা আসলে পুব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটা উঁচা প্লাটো[Plateau] বা মালভুমি যার নাম ডেকান) এটা বুঝাতে দাক্ষিণাত্য বা ইংরেজিতে ডেকান [Deccan] বলে থাকে। এরাই মূল লড়াকু যারা উত্তর ভারতের (হিন্দুভাষী বা হিন্দিবলয়ের) আধিপত্যের চরম বিরোধী।

এমনকি এই বিরোধিতার বা বলা ভাল উত্তরের আর্যদের প্রতিরোধ লড়াইয়ের উৎস হিন্দু ধর্মের মতোই প্রাচীন। উত্তর ভারতে মানে মূলত এখনকার উত্তরপ্রদেশ, এখানে আর্যদের আগমনের পরে আশপাশের রাজ্য-এলাকায় বিস্তার লাভের পরে আরও দক্ষিণ দিকে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রবেশের আগে থেকেই  পরে আর আগাতে পারেনি। আরও দক্ষিণে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে সেই এলাকাটাই দাক্ষিণার্থ বা দ্রাবিড়িয় অঞ্চল। অর্থাত ডেকান মালভুমি পেরিয়ে এরও পরে এখনকার তামিলনারু বা আরও পশ্চিম বরাবর কোস্টাল রাজ্য কেরালায় এদিকে আর আর্যরা বিস্তৃত হতে পারে নাই। একইভাবে পুবদিকে আর্যদের বিস্তার ঘটেছিল মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিহার পর্যন্ত। আর এর পরেই  (পুব ও পশ্চিম) বাংলা অঞ্চল। এখানেও আর্যরা কত ভিতরে এসেছিল বা আসেনি সে তর্ক ছাপিয়ে বলা যায়, বাংলার প্রতিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দূরবর্তী হলেও ভাষা বা কালচারে আর্যদের প্রভাব বাংলার উপর পরেছিল বা আছে এ নিয়ে তর্ক নেই। আর্যদের বিস্তার প্রসঙ্গে এই ফ্যাক্টসটাই একালেও সব ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। সাতচল্লিশের ভারত ভাগের পরের ভারত মূলত হিন্দি-বলয়ের (যেন পুরানা দখলি নিয়ে বসা আর্যদের) ক্ষমতা হয়েই সারা ভারতকে শাসনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে চেয়েছে। পুরা ভারতের উপর এটাই – উত্তরের শাসন, হিন্দি বলয়ের শাসন, হিন্দিভাষীদের শাসন ইত্যাদি নানান থাকে থেকে গেছে।  এটাই মর্ডান ভারতে এক কাশ্মীরি ব্রাক্ষণ জওহরলাল নেহেরু ভুতুড়ে উত্তরের ক্ষমতার শাসন সর্বপ্রথম কায়েম করতে গিয়েছিলেন। যা প্রথম বড় আঘাত পেয়ে থমকে গিয়েছিল ১৯৬৩ সালে, দ্রাবিড়ীয় প্রতিরোধে। আর সেটাই আবার তবে এবার গুজরাতি মোদী-অমিত নেহেরুর ব্যার্থতার জুতা পায়ে গলিয়ে ভুতুড়ে সেই উত্তরের ক্ষমতার শাসনটাই আবার জাগানোর চেষ্টায় নেমেছেন। নেহেরুই প্রথম ১৯৬৩ সালে হিন্দুত্ব পাশে থুয়ে রেখে হিন্দি চাপানোর ভাষা-জাতীয়তা চালু করেছিলেন। বলা বাহুল্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতাকেই আবার কাঁধে উঠায় নিলেন মোদী-অমিত।

সারকথায়, উত্তরের শাসন, যেটা নেহেরুর হাতে নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের আড়ালে কার্যকর থাকতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক রেওয়াজ রিনিউ করে এরই প্রবল বিরোধী হল দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চল। একালে গত কয়েক বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার যে মোদী বা হিন্দির বিরোধিতা সেটা পুরানা ঐতিহাসিক বিরোধিতারই এক নব অধ্যায়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, দ্রাবিড়ীয় ও বাংলাএই দুই অঞ্চল থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা উঠে এসেছিল। হিন্দুধর্মের পক্ষে  থেকে নিজের ন্যায্যতা দিতে গিয়ে এর সবচেয়ে দুর্বল দিক হল, এর ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদের বয়ান – এটা উদাম হয়ে যায়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চলের মিল পাওয়া যায়। বাংলায় সুলতান শাসন আমলের (১২০৫-১৫৭৬) শেষের দিকে নদীয়াকেন্দ্রিক চৈতন্যের ও পরবর্তীতে লালনের জাতপাতবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কথা অনেকেই জানি।

আর ওদিকে ব্রিটিশ আমল থেকেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় সরাসরি ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল তামিল সমাজ। আজকের তামিলনাড়ুতে যে দুই স্থানীয় দলের হাতে এই রাজ্য পালটাপালটি শাসিত হয়ে আসছে সে মূল দলের নাম ডিএমকে [DMK]। ইংরেজি আদ্যক্ষরে বলা এই দলের নাম দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম (দ্রাবিড় প্রগেসিভ ফেডারেশন) [Dravida Munnetra Kazhagam ( transl. Dravidian Progress Federation] থেকেই ডিএমকে। আর সেটা থেকে ভেঙে পরে (১৯৭২) অন্য আরেক অংশের দলের নাম এআইএডিএমকে [AIA-DMK]। ততকালীন মাদ্রাজে (তামিলনাড়ু) ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণের ঝগড়া তীব্র উঠেছিল বৃটিশ আমলেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় চরম বৈষম্য থেকে।  সেখান থেকেই  ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল জাস্টিস পার্টি, ১৯২০ সালেরও আগে থেকে।  এই দলেরই কয়েকজন পরে ১৯৪৪ সালে নিজেরা পুনর্গঠিত হয়ে জন্ম দেন দ্রাবিড়া কাজাঘাম [Dravidar Kazhagam, DK] দল। ব্রাহ্মণের সামাজিক আধিপত্যের বিরোধীতা এই ছিল তাদের মূল ইস্যু; তাই তারা সাম্যের সমাজ ছিল তাদের মূল শ্লোগান। কিন্তু প্রধান দুই নেতার বিরোধ থেকে ১৯৪৯ সালে এক অংশ দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম [Dravida Munnetra Kazhagam] ডিএমকে খুলে বসেন। নেতা আনাদুরাই -এর নেতৃত্বের এই দল, এদের ব্রাহ্মণ বিরোধিতা এতই তুঙ্গে ছিল যে এরাই প্রথম কোন ব্রাক্ষণ ছাড়াই সামাজিক-ধর্মীয় বিয়ের নতুন প্রথা চালু করেছিল। এটাকেই আইনি কাঠামো দিয়ে  তারা এর নাম দিয়েছিল আত্মসম্মানের আইনে বিয়ে [Self-respect marriages Act]।

কিন্তু  সবাইকে ছাড়িয়ে ডিএমকে দল বিখ্যাত হয়েছিল নেহেরুর হিন্দি-জাতিবাদের বিরোধীতার আন্দোলনে সফল হয়ে।  নেহরুর যুগে.১৯৬৩ সালে ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের ভারত বানানোর প্রচেষ্টা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল দ্রাবিড়িয়দের বিশেষ করে ডিএমকে দলের হাতেই। দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান পাবার পরে, মূল নেতা মুসলিম লীগের জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তানে ভিলেন হয়ে যান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রশ্নে। কিন্তু মজার কথা হল, ঠিক একই ধরণের ভাষা-জাতিবাদী চিন্তায় জিন্নাহর মতই একই কাজ করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তাঁর আমলেই হিন্দিকে সরকারি ভাষা করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই হিন্দি দিবস বলে একটা দিন চালু ও পালন করা হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।

আর ১৯৪৯ সালে এর আইনটা লেখা হয়েছিল এভাবে, ভারতের জাতীয় ভাষা (National language) হিসাবে হিন্দি, প্রথম সরকারি দফতরের ভাষা (Official language), আর ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু থাকবে”। তবে এখানে দুইটা “কিন্তুও” ছিল। প্রথমত, ভাষার নাম হিন্দি হবে, ঠিক তা বলা হয়নি। বলা ছিল হিন্দুস্থানী ভাষা”। তা আরও ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছিল, তা দেবনাগরি অক্ষরে (এখন ভারতে যে অক্ষরে হিন্দি লেখা হয়) বা ফার্সি অক্ষরে হতে পারবে। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, এই নিয়ম বা আইনটা , পরবর্তি ১৫ বছর পর্যন্ত চালু থাকবে। এরপর পার্লামেন্ট নিজে বসে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এরপরে কী হবে।

এই হিসাবে ১৯৬৩ সালে “হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ” কায়েমের জোশে, মহান সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়ে জিন্নাহর মতনই নেহরুও হিন্দিকে জাতীয় ভাষা ও একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা ঘোষণা করে সংসদে পাস করা এক আইন জারি করেন। এছাড়া এর আগেই অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামে হিন্দি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে অহিন্দি রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে দ্রাবিড়িয় অঞ্চলে। সেখানে ক্ষোভ প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে পাঁচজন মানুষ নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিল। সাথে ঐ আন্দোলনে দুজন পুলিশেরও মৃত্যু হয়েছিল। কেরালায় বহু কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে আগুন দেয়া হয়েছিল। অবশেষে বাধ্য হয়ে কংগ্রেস সরকার আইনটা প্রত্যাহার করে নিয়ে আন্দোলন থামিয়েছিল। পরের বছর ১৯৬৪ [২৭ মে ১৯৬৪] সালে নেহরুর মৃত্যু হয়।  আর ১৯৬৪ সালে [০৯ জুন ১৯৬৪]  নতুন প্রধানমন্ত্রী হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আর স্বভাবতই তাঁর প্রথম কাজ ছিল একটা ভাষা প্রশ্নে একটা আপোষ ফর্মুলা বের করা। তাঁর আমলেই নতুন করে আগের official language act 1963 এর মধ্যে সংশোধন এনে জানুয়ারি ১৯৬৫ সালে এটাকে আগের মতই হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি সরকারি দাপ্তরিক ভাষা ফিরে করা হয়। তবে জাতীয় ভাষা কী হবে তা উহ্য রাখা হয়। আসলে এটাই ছিল দ্রাবিড়িয় রাজ্যগুলোর সাথে আপসনামা রফায় সংশোধিত অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট ১৯৬৩। এইবিষয়টা পড়ে গুজরাত হাইকোর্টের ২০১০ সালের এক রায়েও স্বীকৃত হয়।  সেকালে মামলাটা ছিল্ভিন্ন প্রসঙ্গে যে, এক ব্যক্তি আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মামলা করেছিল যেসব্ব পণ্যের গায়ে হিন্দিতে বর্ণনা লেখা বাধ্যতামূলক করা হোক। কিন্তু আদালত অপারগতা জানিয়ে বলে, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে গুজরাট হাইকোর্টের এক রায়ে এটাই স্বীকার করা হয়েছে যে, ভারতে জাতীয় ভাষা বলে কোনো কিছুই নেই।

সারকথাটা হল, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র গড়ার দাবিদারেরা বিশেষত নেহরুর কংগ্রেস ১৯৬৩ সালেই এই প্রথম সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়। যেটা আসলে হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত  ও উন্মোচিত হয়ে মার খেয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান এসবের জাতীয়তাবাদ আসলে হতভম্ব হয়ে বিভ্রান্ত ও ফিকে হয়ে যেতে থাকে।

বহুবার বলেছি, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান অথবা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের কামনা কেবল কংগ্রেসের নয়, এটা হিন্দু মহাসভা বা পরে এদেরই নতুন নাম আরএসএস-জনসংঘ বা একালের বিজেপির কামনা ছিল সবসময়। তফাত শুধু এই যে, হিন্দুত্বকে কংগ্রেস সেকুলার জামার আড়ালে রেখে ফেরি করতে চায়। আর বিজেপি হিন্দুত্বকে গর্ব করে প্রকাশ্যে বলতে চায়। তবে ১৯৬৫ সালের মধ্যেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে হিন্দি ও হিন্দুত্বের মার খেয়ে যাওয়া- এ প্রসঙ্গটা কংগ্রেসের কাছে প্রচন্ড হতাশার অবশ্যই কিন্তু কোনো বিকল্প করণীয় ছাড়াই।

কংগ্রেসের এই ঢিলেঢালা অবস্থাতেই চলতে চলতে ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকেই হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে ওই ১৯৬৩ সালে কংগ্রেসের প্রথম পরাজয়ের পর থেকে ডিএমকেই কংগ্রেসের পরে প্রথম (আঞ্চলিক) রাজনৈতিক দল, যারা ১৯৬৭ সালের নির্বাচন থেকে এককভাবে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই থেকে দ্রাবিড় অঞ্চল থেকে হিন্দিভাষী দলের হারিয়ে যাওয়া শুরু। তবে ১৯৭২ সালে ডিএমকে তে একদভা ভাঙনে তৈরি হয়েছিল এআইএডিএমকে [AIA-DMK] বা আন্না ডিএমকে। তাই ঐ ১৯৬৭ সাল থেকেই তামিলনাড়ূতে ডিএমকে অথবা আন্নাডিএমকে পাল্টাপাল্টি করে রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসেছে।

কিন্তু এই পরাজয় সম্পর্কে বা সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র কামনা সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির ভাষ্য ও মূল্যায়নটা হলো, কংগ্রেস লিবারেল বা দুর্বল ঈমানের হিন্দুত্ব করে বলেই হেরে গেছে। আগ্রাসী-হিন্দুত্ব নিয়ে আগালে হিন্দুত্ব কখনো হারত না।

অনুমান করা যায় এসব ব্যাকগ্রাউন্ড মনে রাখার কারণেই, মোদীর দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে বিজেপি এবার আস্তে ধীরে নিজেদের মূল্যায়নের ঝাঁপি খুলে ধরতে শুরু করেছে। কাজেই মোদি সরকার-টু, এটা আসলে (১৯৪৭-৬৩) সময়কালের কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও দর্শন যে মিথ্যা, অকেজো ও অকার্যকর প্রমাণ হয়েছিল সেই হিন্দুত্বকেই এবার আবার ধুয়ে মুছে কিন্তু  প্রচন্ড আগ্রাসী-হিন্দুত্ব হিসেবে হাজির করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসছেন মোদি-অমিত গোষ্ঠী। বলাই বাহুল্য, হাস্যকর জিনিস করার উদ্যোগে প্রথমবারের ব্যর্থতার পরও দ্বিতীয়বার তা নিলে সেটা এবার তামাসার পরিণতি নিয়েই ফেরে। এই হাস্যকর জিনিসটা হলো হিন্দুত্বের জাতীয়তবাদ- যা এখন জয় শ্রীরাম বলে পরিচিত!

হিন্দি দিবস এতদিন ধুলা ময়লায় পড়ে কোথাও কোণে অবহেলায় গড়াগড়ি যাচ্ছিল। ওদিকে  এতদিনে সরকারি দপ্তরের ভাষা, হিউম্যান রিসোর্স  বা  বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ডিফল্ট ভাষা হয়ে উঠেছে ইংরাজি। কংগ্রেস হাত-পা ছেড়ে এটাই একবাক্যে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু অমিত শাহ এবার সেই ধুলা ময়লা পড়া “হিন্দি দিবস” তা ঝেড়ে পুছে নিয়ে এবার আবার পালন করে বসলেন। যদিও সেটা বড় তেমন কোন কিছু নয়। কেবল এক টুইটার স্টেটমেন্ট তাও আবার তা হিন্দিতেই হতে হয়েছে। তবে সেই স্টেটমেন্টটাই গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই। সেটার আনন্দবাজারের করা বাংলা অনুবাদটা হল এরকম – ‘‘ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন,যাকে বিশ্ব স্বীকৃতি দেবে ভারতীয় ভাষা হিসেবে। যদি কোনও ভাষা দেশকে বাঁধতে পারে,তা হিন্দি”।

প্রথমত লক্ষণীয় হল, অমিত শাহ কোন প্রধানমন্ত্রী নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কাজেই ভাষা নিয়ে বিবৃতি এটা তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজই নয়। ভারতে হিউম্যান রিসোর্স  বলে মন্ত্রণালয় আছে, সেই মন্ত্রী যদি এই হিন্দি দিবস পালনের বিবৃতি দিতেন তাও একটা কথা ছিল!  তাহলে অমিত শাহ কেন? একটা টেনেটুনে সাফাই অনেকেই করতে চাইবে হয়ত যে অমিত শাহ দলের সভাপতি, তাই। কিন্তু না। কাজটা রাষ্ট্রের তরফের, দল না। খুব সম্ভবত এর আসল অর্থ হল, হিন্দি জাতীয়তাবাদ করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালের কংগ্রেসের মত এবার আগ্রাসী-হিন্দুত্বতে তা করতে গিয়ে যদি এবারও তা মার খেয়ে যায় তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যেন পশ্চাদ-অপসারণটা ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, অমিতের বিবৃতিতে প্রথম দুই বাক্যে বলা হয়েছে, “ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে”। এর মানে হল তারা ১৯৬৩ সালের পরাজয়টা আমল করেছেন। তাই আগাম প্রলেপ দিয়ে নিলেন। কিন্তু আরএসএস-বিজেপির মূল যুক্তিটা জানা গেল পরের বাক্য  – “দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন”।  এছাড়া ইতোমধ্যেই মোদীর খসড়া শিক্ষানীতি ২০১৯-এ দেখা গেছে, হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা আছে সেখানে – যেখানে স্বয়ং নেহেরু পরাজিত হয়ে পিছু হটে গিয়েছিলেন।

অমিত আসলে বলতে চাইছেন “ভারতের একটা হিন্দি-হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন”। কেন? সেই পুরানা বেকুবি যুক্তি। আর সেটাকেই  আনন্দবাজারের তার শিরোনাম করে লিখেছে – [ভারতকে বাঁধতে পারে হিন্দিই”,এক রাষ্ট্র, এক ভাষা চান অমিত শাহ]।
এই যুক্তিটা আসলে রাষ্ট্র না-বুঝ যারা এদের। এরা একই সঙ্গে যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের হিটলার একেকজন – “জয় শ্রীরাম” – এদের যুক্তি।
অমিতের কথা অনুযায়ী ভারতকে বাঁধতে পারে এমন “রশি” বা ভাল “আঠা” দরকার অমিতের। আচ্ছা নাগরিক কী বেধে রাখার জিনিষ? অমিত মনে করেন হাঁ; এজন্য দরকার একটা হিন্দুত্ব মানে, হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ। না হলেও একটা হিন্দি ভাষার জাতীয়তাবাদ।

মোদী-অমিত শাহরা আসলে অসুস্থ চিন্তার লোক।  কোন রাষ্ট্র গড়বার জন্য না হিন্দুত্বের মত কোন আদর্শ, না কোন ধরণের জাতীয়তাবাদ – কোনটার কোনই দরকার নাই। কোন দিন ছিলও না। কিন্তু ভুল বুঝা হয়েছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন –স্টেট বলে এক সোনার পাথর বাটি ধারণা এসেছে। আর নাগরিককে রাষ্ট্রে ধরে রাখার জন্য কোন ভাষাগত ঐক্য বা ধর্মীয় ঐক্য অপ্রয়োজনীয়। যদি তাই হত তবে দ্রাবিড়ীয়রা কী হিন্দু ধর্মের বাইরের? পাঞ্জাব কী বৃহত্তর হিন্দি ধর্ম বা কালচারের বাইরের? এই ডিএমকে ১৯৬২ সালের আগে পর্যন্ত স্বায়ত্বশাসন বা বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়ার দল ছিল। পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতার সমস্যা এখনও একেবারে মিটে গেছে তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমাদের ধর্মীয় ঐক্য থাকা সত্বেও কী আমরা বিচ্ছিন্ন হই নাই! কেন এমন হয়েছিল?

রাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ থাকতে মূল প্রয়োজন, অনিবার্য  দরকার আসলে  –  বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার, নাগরিক নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ – এমন এক “রাজনৈতিক নীতির ঐক্য”। এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি কায়েম। এমন নাগরিক অধিকার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং এর বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রে জুলুম বন্ধ করুন, নাগরিক নির্বিশেষে কোন জুলুমে ভুক্তভোগী সবাইকে একটা ইনসাফ দেন। এমন ব্যবস্থা কায়েম করেন। মানুষকে বেধে রাখতে হবে না, কোনো বাড়তি রশি, আঠা কিছুই লাগবে না।

রাষ্ট্রগড়া প্রসঙ্গে, সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় টেনে আনা শব্দ বা নামটা আসলে নেশন, জাতি বা জাতীয়তাবাদ।
আমেরিকা রাষ্ট্রটা আদর্শ নয়। অনেক খুঁত ও ব্যর্থতাও এর আছে অবশ্যই। তবু খুঁটিয়ে দেখেন তো- আমেরিকান রাষ্ট্র গড়তে কোনও ধরনের জাতীয়তাবাদের ব্যবহার আছে কিনা? আমেরিকানেরা কারা ও কোন ‘জাতি’? পঞ্চাশ রাজ্যের সমাহার আমেরিকা। ভারতের চেয়েও বড়। তবু কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নাই কেন? নাগরিক বা খোদ কোন রাজ্যের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ওখানে রশি বা আঠা বলে কিছু, কোনো জাতীয়তাবাদ কী আছে? খুজে দেখেন!

তাহলে আমেরিকা-রাষ্ট্রটা টিকে আছে কী করে? অনেক দুর্বলতা আছে এর, কিন্তু ভাঙার, ভেঙ্গে পড়ার, এক না থাকার কোন কথা নেই।
আর ভারতের বেলায় দেখেন, কংগ্রেসের নিজের পরাজয় ঘটে গেছে বহু আগেই। আর দলটা এখন শুকিয়ে যাওয়াতে কংগ্রেসের আর ভারত ভাঙার কারণ হওয়ার সুযোগ বা উসিলা নেই। বিপরীতে এ থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুল করতে হিটলারি আগ্রাসী হয়ে হিন্দুত্ব, এক “জয় শ্রীরাম” হাতে এগিয়ে আসছে মোদি-অমিতেরা।

এরা আসলে হিন্দুত্বে ডুবে অসুস্থ হয়ে গেছে, আর ততটাই এরা রাষ্ট্র ধারণা ও চিন্তায় অবুঝ। এদের ধারণা হিন্দুর সবকিছুতে শত্রু হল মুসলমান। আচ্ছা তাহলে দ্রাবিড়ীয় যত নেতা আছেন, ডিএমকে এর নেতা স্টালিনসহ এরা কী মূসলমান? কলকাতার সিপিএম বা মমতা এরা? তা হলে? কথা হল, দ্রাবিড়িয়রা বা বাঙালিরা হিন্দু হলেও তারা অমিত-মোদীদের বিরোধী হবেই। কারণ তারা হিন্দি বলয়ের ক্ষমতার নামে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটার বিরোধী। অমিত-মোদীরা এই চোরা আর ভুতুড়ে ক্ষমতায় বিশ্বাসী, এটাই তো আসল সমস্যা।

যেমন দেখেন, কেন্দ্রের হাতে জমা হওয়া রাজস্ব তা বিলি বন্টনে কোন রাজ্য কত পাবে কিসের ভিত্তিতে? – এটা রেখে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর খেয়ালের হাতে, ব্যক্তি-ইচ্ছার বাইরে নিরপেক্ষতা ও অবজেকটিভ নিয়ম বা সুত্র রাখা হয়নি। যেমন মমতা মোদীর দলের না হওয়াতে তিনি মমতাকে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন? মমতাকে যেকোন বিরোধিতার শাস্তি দিতে পারেন। এটা কি ইনসাফ? এর সোজা মানে এক রাজ্যের কাঁধে চড়ে আরেক রাজ্য খাচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী নিজে অথবা যাকে ইচ্ছা তাকে এটা খাইতে দিবেন। এটারই একমাত্র প্রতিকার ছিল ফেডারেলিজম [Federalism]। আমেরিকার মত ভারতেরও এক ফেডারল রাষ্ট্র হওয়া। এটা তো প্রমাণিত এখন যে “মহান” নেহেরু সাহেবের ভারত রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকেই এনিয়ে কোন বুঝাবুঝি ছিল না। আস্থা ও সাহসের ঘাটতিও ছিল। কোন প্রমাণ রাখেন নাই যে তিনি ফেডারেলিজম বুঝতেন।

আবার মোদীকে দেখেন। ভারতের সিবিআই, ইডি বা গোয়েন্দা র – এসব প্রতিষ্ঠান তো আগে থেকেই ছিল। তাতেও মোদি সন্তুষ্ট নন, সম্ভবত  পুরানগুলাকে ততখানি নিজদলীয় মনে হয় নাই। অথবা দলীয় করতে সময় লাগবে, যে সময় তার নাই। এখন বিজেপির প্রভাবে এন্টি টেররিজমের নামে গড়ে নেয়া হয়েছে অল্প বয়সী (২০০৯) নতুন আরেকটা এনআইএ (NIA)।  আর এরপর এধরণের সব প্রতিষ্ঠানকে মোদী ব্যবহার করছেন (আগে কংগ্রেসও কমবেশি করেছে) বিরোধীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের নামে তাদের শায়েস্তা করতে, এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়রানি করতে পারেন এমন হাতিয়ার হিসেবে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীন সরকারের অপব্যবহার থেকে স্বাধীনভাবে কাজের আইন, নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে দেয়ার বদলে উলটা তা ব্যাহত করে নিজদলীয় স্বার্থে এদের ব্যবহার করছেন মোদী। যেমন দেখেন, মোদীর প্রথম গত পাঁচ বছরে বিরোধীদের সমর্থন ছাড়া রাজ্যসভায় তাঁর সরকার কোন বিল পাস করতে পারেননি। এবার সিবিআই, ইডি, র ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে বিরোধীদের বাগে এনেছেন। আর তা দিয়ে এবার মোদী-টু সরকারের প্রথম তিন মাসের আগেই “কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল” – পাস করে নিয়েছেন। বিরোধীরা যে বাগে এসেছে এটা টেস্ট করার জন্য এর আগে মোদী-টু এর নতুন সরকার, তিনি  “তিন তালাক বিল পাস” করে নিয়েছেন। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র একটা অন্ধকারের ক্ষমতা একটা দাগী ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসেবে রেখে দিতে চান মোদী-অমিতেরা। আর মুখে বুলি জয় শ্রীরাম আর হিন্দুত্ব। হিন্দি বা হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, এটা দিয়ে নাকি রাষ্ট্র এক রাখবেন!

মোদী-অমিত হিন্দি-হিন্দুত্বের আড়ালে এসব যা করছেন মূলত এজন্যই ভারত ভেঙে যাবে। ভারত ভাংবার কারণ হবেই মোদী-অমিত। আর তাদের অন্ধকারের ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ।

ভারতে কেন আঞ্চলিক দলের এত ছড়াছড়ি? মানে, রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন ডিএমকে বা মমতার তৃণমূল – বিভিন্ন রাজ্যে এমন দলের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে কেন? এর সোজা জবাব, মূলত দায়ী নেহেরু ও তার কংগ্রেস। মানে তাদের  রাষ্ট্র-চিন্তায় কিছু মারাত্মক ত্রুটি বা ঘাটতি। তাদের সর্বভারতীয় দলের নামে (১৯৪৭-৮৫) উত্তর ভারতের কোটারি ক্ষমতা দিয়ে সারা ভারতের সব রাজ্যকে দাবড়িয়ে চলেছিলেন। এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, অন্ধকারের একটা দাগী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রথম জনক এরা।  আর এখন একেই একেবারে হুবহু কিন্তু আরও আগ্রাসী-হিন্দুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজিয়ে, এবার কংগ্রেসকেই অনুসরণ করছে বিজেপি। আর  প্রথম জমানায় কংগ্রেসের  কালো ভুতুড়ে ক্ষমতার অত্যাচারেই আঞ্চলিক দল খুলার হিড়িক লেগেছিল। এরই ফলশ্রুতিতে বিগত (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময় কালে লাগাতরভাবে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারই একমাত্র বাস্তবতা ছিল।  মানে কংগ্রেস অথবা বিজেপি একা নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠাতার মুরোদে নয়, আঞ্চলিক দলের সাথে একমাত্র  কোয়ালিশন করেই এরা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। এই সময়কালে রেকর্ড বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি এইদুইয়ের যে দল কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের মোট ৫৪২ আসনের মধ্যে নিজ দলের মুরোদে তা প্রাপ্ত মোট আসন তা ১১৫ ছাড়িয়েছিল তারাই গোটা দশেক আঞ্চলিক দলের সহায়তায় কেন্দ্রে সরকার করেছিল; যেখানে হাফ মার্ক বা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল ২৭২ আসন। এটাই ছিল (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময়কালের ফ্যাক্টস ও রেকর্ড।  এর মানে এই সময় কালে কংগ্রেস বা বিজেপির চেয়ে সরকার গঠনে সবসময় আঞ্চলিক দলগুলো মোট সংখ্যা মানে ভুমিকাটা ছিল মুখ্য ও বেশি।

অথচ অমিত এখন “বাণীদাতা” হয়েছেন। উলটা বলতেছেন “আঞ্চলিক দলগুলোই নাকি ভারতের “অনৈক্যের” কারণ“। এটা হল রোগের লক্ষণকেই রোগ বলে চালানো চেষ্টা। ভারত-রাষ্ট্রগঠন কাঠামোর মধ্যে মূল সমস্যা হল, এখানে এক রাজ্যের অন্য রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে খাওয়ার সুযোগ আছে। এই সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। কারণ উত্তরপ্রদেশের কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ নেহেরু ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। কারণ তার ধারণা ও বুঝ ছিল যে ভারতকে জবরদস্তিতে এক রাখতে চাইলে এমন ক্ষমতা কাঠামোই তাকে মাইলেজ বা বিশেষ সুবিধার ক্ষমতা দিবে।  ভারতকে তথাকথিত এক রাখার ভুয়া ডরে নেহেরু এমন কাঠামোতেই ভারত গড়েছেন। এতে  কেন্দ্র যার হাতে থাকে সে এই নির্ধারণ ক্ষমতাটা পায় যে কে কার ঘারে চড়বে ও খাবে। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ব্যবস্থা গড়ার সময়ের মৌলিক কাঠামোগত ত্রুটির জন্য এটা সম্ভব হয়ে আসছে। আর এর লক্ষণ হিসাবে মাত্র প্রায় ৩৮ বছরের মধ্যে কংগ্রেসের একক ক্ষমতার দল হিসাবে বিদায়, পরাজয় ও রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল জন্মানোর হিড়িক দেখা দিয়েছিল। কংগ্রেসের বদলে ঠিক সে জায়গাটাই নিতে আজ নতুন কুতুব হতে চেষ্টা করছে মোদীর -অমিতের বিজেপি। তাই এখন লক্ষণকেই রোগ বলে চালানোর চেষ্টা করছে। অমিত শাহ রাষ্ট্র-ক্ষমতা “জ্ঞানের” বিরাট তাত্বিক হয়ে উঠেছেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার লিখেছে,
আজ দিল্লির অল ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনএর অনুষ্ঠানের মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা আসলে ব্যর্থ কি না? ওই ব্যবস্থা কি দেশবাসীর লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে?’’ তার পরে নিজেই জবাব দিয়েছেন,‘‘মানুষ আশাহত”। তাঁর দাবি,আঞ্চলিক দলগুলি আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। 

এই ইস্যুটাকে ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া দেশে এক দলীয় শাসনের ইঙ্গিত হিসাবে রিপোর্ট করেছে,। কলকাতার টেলিগ্রাফ একদলীয় পার্টির শাসনের ইঙ্গিত বলেছে। এভাবে ডিএনএ, লাইভমিন্ট, এশিয়ান-এজ অনেকেই।
কংগ্রেস বিবৃতি দিয়ে বিজেপির জোট এনডিএ-এর কোয়ালিশন দলগুলোকে জবাব দিবার দাবি জানিয়েছে।  সারকথায় অমিতের যুক্তি হল, কংগ্রেস শক্তহাতে “হিন্দুত্ব” কায়েম এর এক কর্তৃত্ববাজ শাসন জারি করতে পারে নাই দেখেই এসব ঘটেছিল। কাজেই এখন শক্ত হাতে সেটা পূরণ করতে আগ্রাসী হয়ে বিজেপি  শাসন করবে। কী তামসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে অমিতের হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

গৌতম দাস

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2IQ

 

Om Birla during Hindu Mahasabha event (Facebook/om birla) by NEWS18, India

ভারতের আরএসএস বা বিজেপির অঙ্গসংগঠন অনেক। এগুলোর একটা হল, “অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভা”। শুধু ব্রাহ্মণদের নিয়ে সংগঠন এমন আরো আছে – ‘অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ একতা পরিষদ, সর্বব্রাহ্মণ মহাসভা, পরশুরাম সর্বকল্যাণ, ব্রাহ্মণ মহাসভা’ ইত্যাদি। অবশ্য বুঝাই যায় হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিচরণ ধর্মকে পেশা হিসেবে নেয়া অসংখ্য ব্যক্তি বা তাদের দলের মধ্যেই হবে।

গত নির্বাচনের (মে ২০১৯) পরে, ভারতের লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছিল রাজস্থানের এক এমপি, ওম বিড়লাকে। তার পরিচিতি পড়ে তিনি কোনো বড় কেউকেটা কেউ নন মনে হচ্ছে। এমনকি তিনি আইনের ছাত্রও নন। সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পিকাররা আইন পেশার ব্যক্তিত্ব হন। বিড়লা আগে ছিলেন রাজস্থানের প্রাদেশিক সংসদের (ভারতের ভাষায় বিধান সভা বা Assembly) তিনবারের এমএলএ। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বিজেপির যুব সংগঠন – ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার সাবেক রাজ্য সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্থান রাজ্যের কোটা শহরে অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভার এক সভায় যোগ দিয়েছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। কোটা স্পিকারের নিজের নির্বাচনী কনস্টিটুয়েন্সিও। তবে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের শুরু ওই সভায় তার বক্তৃতা থেকে।

তিনি সেখানে ঠিক কী বলেছেন এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বলাটা ঠিক হয়েছিল কিনা, এটাই বিতর্কের বিষয়। কারণ আসলে অনুষ্ঠানস্থল ছিল – রাজস্থান রাজ্যের রাজধানীও নয়, তৃতীয় বড় শহর এই কোটা, যেটা আসলে এক জেলা শহর মাত্র। তাই, ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে সেখানে ভারতের প্রধান পত্রিকাগুলোর সাংবাদিক অনুমান করা যায়, খুব কমই উপস্থিত ছিলেন। তবে সব পত্রিকাতেই ঘটনার নিউজ হয়েছে ছোট, কিন্তু অথেনটিক। কারণ স্পিকার নিজেই এক টুইট করেছেন বা ফেসবুকে ছবি দেয়েছেন ওই সভা প্রসঙ্গে। সেটাই সবার খবরের উৎস। তবে মাত্র তিনটা বাক্যের এক টুইট, তা আবার হিন্দিতে লেখা। অথেনটিক তিনটা বাক্যই সব বিতর্কের উৎস।

স্পিকার বিড়লা তার টুইটারে অনুষ্ঠানের কয়েকটা ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, “সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। যে স্থান তাদের ত্যাগ ও তপস্যার ফল। এ কারণেই সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময় পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন”।

“Brahmins have always had a high status in society. This status is a result of their sacrifice and dedication. This is the reason that Brahmins have always been the guiding light for society,” – নিউজ১৮, এটা একটা টিভির ওয়েব পেজ, থেকে নেওয়া।

কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্ট পড়লে মনে হয়, পত্রিকাটি যেন সবসময় ক্লাস টুয়ের বাচ্চাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ও শেখানোর লক্ষ্যে লিখছে। তবে বলাই বাহুল্য, তারা আবার ঝোপ বুঝে চলে। এবার মনে হচ্ছে কোপ দেয়ার সুযোগ দেখেছে, তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের প্রথম বাক্য, “ব্রাহ্মণেরা সমাজে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য করে বিতর্ক বাধালেন স্পিকার ওম বিড়লা”। আর ও প্রকাশের হিন্দি বক্তব্যের আনন্দবাজারের করা বাংলাটা হল, ‘‘ত্যাগ ও তপস্যার কারণে ব্রাহ্মণেরা বরাবরই সমাজে উচ্চ স্থানে আসীন। তাঁরা সমাজে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন।’’

কিন্তু কথা হচ্ছে এটাই কি ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ভারতীয় হিন্দু সমাজের প্রধান ও সত্য বয়ান নয়!  তাই এমন কথা কী ওম বিড়লাই  প্রথম! ব্রাহ্মণের জাতভেদের বয়ানের ওপর দাঁড়িয়েই কি তাদের সমাজ বিভক্ত নয়? এছাড়া  একালে বিজেপির উসকানি-প্রটেকশনে পুরানা দিন ফিরিয়ে এনে একে ব্রাহ্মণ্য বলশালী কর্তৃত্বের বয়ান হিসেবে সমাজে তা ফেরত আনার চেষ্টা কী চলছে না? দোষ একা যেন কেবল স্পিকারের – আনন্দবাজারের এমন ভান করার দরকার কী?

এই তো গত মার্চ মাসে (২০১৯) ভারতের প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক গিয়েছিলেন উড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির দর্শনে। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ, ব্রাহ্মণমতে একজন দলিত বা নীচু জাতের মানুষ। তাই তার মন্দিরে “প্রবেশ নিষেধ”। এই যুক্তিতে ঐ মন্দিরের ভক্ত ও সেবায়েত- তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের পথরোধ করে বাধা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, এটা “শকিং, চরম বিব্রতকর ও বেয়াদবি আচরণ”। [In a shocking and an extremely embarrassing incident …‘misbehaved with’ ]  আরো লিখেছিল, মন্দির পরিচালনা প্রশাসনের মিটিংয়ে আলাপ হয়েছে, এমন রেকর্ড মোতাবেক কথিত সেবায়েতরা প্রেসিডেন্ট পত্নিকে তাঁর চলার পথের সামনে বাধা দিয়ে তাকে ‘ধাক্কা মেরেছেন” [The group had also shoved the First Lady, as per the minutes of a meeting occurred……… ]। অথচ এনিয়ে কোনো আইনি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোথায় হয়নি। এটাই কি বাস্তবের ভারতীয় হিন্দু সমাজ নয়?

আসলে মন্দিরের দেবতা-রক্ষকদের দাবি মতে, ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে উল্টা, যেন দেবতা নন, দলিতেরা এতই ‘পাওয়ার ফুল’ যে তাঁরা কোনো মন্দির কেন, এমনকি খোদ দেবতাকে ছুঁয়ে দিলে অচ্ছুতেরাই সব কিছুকেই অপবিত্র করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতীয় হিন্দু সমাজের জাত-বিভক্তির উঁচা-নিচা সত্যি খুবই ‘আধুনিক’!

ভারতের স্পিকার ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে যতগুলো অভিযোগ উঠেছে, এসবের মূল কথাটা হল, এটা “জাতবাদ” বা “জাতের শ্রেষ্ঠত্ববাদ”; মানে এটা বর্ণবাদের [racism] মতই আর এক নস্টামি। যেমন, কংগ্রেসের এক প্রাক্তন এমপি, দিল্লির উচ্চ আদালতের নামকরা উকিল কপিল সিবাল বলেছেন, এটা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধযুক্ত মনের, এক মন্তব্য” [senior Congress leader Kapil Sibal said that his mindset reeks of casteism]। তিনি আরও বলেন, “It is this mindset that caters to a caste-ridden unequal India. We respect you Birlaji not because you are a Brahmin but because you are our Speaker in Lok Sabha,” tweeted Kapil Sibal.]। “বিড়লাজি, আমরা আপনাকে সম্মান করি কারণ আপনি স্পিকার, কিন্তু আপনি ব্রাহ্মণ বলে না”।

কথাটা সঠিক। কিন্তু সমস্যাটা হল, কেউ যখন কটু বা পঁচা গন্ধের কোন কিছু নিয়ে সারাক্ষণ সারাদিন নাড়াচাড়া করতে থাকে তাতে একসময় তার শরীর ওই খারাপ গন্ধ-প্রুফ হয়ে যায়। খারাপ গন্ধটা এতই গা-সওয়া হয়ে যায় যে, তার কাছে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি কেউ তাকে মনে করিয়ে দিলেও সে এটা বিশ্বাস করতে বা মানতে চায় না। বিজেপি-আরএসএসের অবস্থাটা হয়েছে তাই। তারা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধপ্রুফ” বা গা-সওয়া হয়ে গেছেন।

হিন্দু-ধর্ম চর্চাকারী সমাজের প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য জাত-ভেদ [caste system]। সমাজের সব মানুষকেই উচা-নিঁচার বিভিন্ন স্তরে এখানে ভাগ করা হয়ে থাকে। তাই হিন্দু ধর্ম মানেই এই জাত-ভেদ প্রথা তার প্রধান অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য। যদিও মানুষের আধুনিক জীবন যাপনের বা শহরায়নের সাথে সাথে জাত-ভেদ ধারণা ও এর চর্চার প্রাবল্য কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই বিজেপির আমলে এটা এখন আবার উল্টামুখী। জাত-ভেদ ব্যবস্থাটাকে অনেক ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ [Brahminism] বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এই সিস্টেমে এর ভিত্তি বা চিন্তাটা হল, ব্রাহ্মণকে শীর্ষে রেখে এটা সমাজের বাকি সব মানুষকে অধস্তন বানায়। এভাবে একটা জাত-ভেদের ব্যবস্থামূলক ধর্ম হয়ে তা নিজেকে হাজির করে থাকে। এই “অধস্তনতার বয়ান” বাস্তবে সক্রিয় ও সত্যি হয়ে যায় এজন্য যে, ওখানে দাবি করা হয়, যাগ-যজ্ঞ-পূজার একমাত্র অধিকারি ব্রাহ্মণের। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ, সবার উপরে।

অনেক হিন্দু ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ শব্দ ও এর অর্থটা না বুঝে ভুল আচরণ, প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন। তাই না বুঝে মনে করে বসে যে কেউ ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ লিখেছে সুতরাং এটা নিশ্চয় হিন্দুদেরকে গালি দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা একেবারেই এমন না। যেমন ইতিহাসবিদ বা প্রাক্তন সাব-অল্টার্ন গ্রুপের সদস্য গৌতম ভদ্র, তিনিও ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তিনি মনে করেন ও  লিখেছেন, বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক”। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দটা কোন গালি নয়, একটা বিশেষ ধরণের চিন্তা ও সেই আদর্শ ও বৈশিষ্ঠকে চিনানোর একটা শব্দ বা নাম এটা।

থিওলজিক্যাল স্কলারদের মধ্যেও, সেই প্রাচীন কালে এমন জাতভেদমূলক-ব্যবস্থা কেন করা হয়েছিল এর এক ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, সেকালের জনগোষ্ঠির পক্ষে সন্তান জন্মদান বা প্রজন্ম টিকানো কঠিন ছিল বলে এটা চালু হয়েছিল। কিন্তু তাতে এটা ন্যায্য-সাফাই হোক আর না হোক, একালে সমাজের হিসেবে এই জাত-ভেদ প্রথা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মূল কারণ এটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের আমল। এখানে নাগরিক অধিকারে অসাম্য, বা মানুষ সকল সমান না এমন বক্তব্যের পক্ষে সাড়া পাওয়া কঠিন। সেটা যাই হোক, এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, কালক্রমে সমাজের এই জাতিভেদ  ব্যবস্থাটাই হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে – একজনের ঘাড়ে চড়ে অন্যদের বা কথিত উঁচু জাতের দাবিদারদের আয়েশি জীবন যাপনের ব্যবস্থার উৎস।

আর যারা একবার জাতের স্তরভেদের সুবিধা লুটেছে তারা আর তা ছাড়তে চাইবে কেন! চাওয়ার কারণ নেই। শুধু তাই না, সমাজের কাছে জাতভেদ প্রথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওই উঁচু জাতের দাবিদারেরাই নিজের অন্যায় সুবিধা অপরিবর্তনীয়, এটা স্থায়ী এমন এক ধারণা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে এখনো। অর্থাৎ ধর্মের নামে জাত-ভেদের ওপর আস্থা বিশ্বাসটা একালে শিথিল বা বাস্তবে তত প্রবল নয় এমন হয়ে পড়লেও, বাড়তি সুবিধা ভোগের লোভে কথিত উচ্চবর্ণরা সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর স্তরে জাত-ভেদের বয়ান বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তা আঁকড়ে সেখান থেকে দাপটের সাথে সব সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। বরং এখানে তাদের মূল অজুহাত হল – তোমরা জাতভেদ মানো না, এর মানে তোমরা ধর্ম মান না। এই যুক্তি তুলে ভয় দেখিয়ে সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে স্তরে জাত-ভেদ কে ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

তবে, এখানে আমাদের একটু সাবধান হতে পরামর্শ রাখব। ব্যাপারটা হল,  সবার কাছেই সবার ধর্মই সবচেয়ে ভাল, এমন মনে করা এটাই স্বাভাবিক। আবার, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করা ঠিক না। তর্ক চলে না সেখানে। তাই এখানে সমাজের আমরা পরস্পরকে একটু স্পেস বা জায়গা করে দিতে হবে। যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অছিলায় কোনো ঘৃণা ছড়ানোর কাজে আমরা যেন নেমে না যাই সেদিকটা খেয়াল রাখাই কাম্য। আর “ব্রাহ্মণরা বদ লোক তাদের উদ্দেশ্য খারাপ” – পাঠককে এমন কোনো ধারণা দেয়া অনুচিত। ফলে সেটা বলা এখানে কোন উদ্দেশ্য নয়। এমন অনুমান সেটা ঠিক হবে না শুধু তাই নয়, বরং অতি সরলীকরণ দোষ হবে।

তাহলে মূল কথাটা কী? সেটা হল, আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে জাত-ভেদ প্রথার চিন্তাকে দুয়ারের বাইরে জুতার মত খুলে রেখে আসতে হবে। অথবা এটা রাষ্ট্রের সাথে সঙ্ঘাতের নয় এমন ব্যাখ্যা বয়ানে, এমন নন-কনফ্রন্টেশনাল ভাবে হাজির করতে হবে।

কারণ জাতভেদ প্রথার সারকথাটা হল, মানুষ সকলে এখানে সমান নয়, সমান হিসেবে গণ্য নয়, মানুষে-মানুষে জাত বলে ভেদাভেদ আছে। অথচ একটা মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ওর কনস্টিটিউশন, গঠন ও মৌলিক ভিত্তি ইত্যাদির বিচারে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রেই সবাই সমান। কোনো অসাম্য সেখানে নেই, রাষ্ট্র তা অনুমোদন করে না। সবাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান, বৈষম্যহীনভাবে আচরণ পাওয়ার যোগ্য, সব সুবিধা সমান পাওয়ার যোগ্য – তাতে নাগরিক মানুষের ধর্ম-বর্ণ-জাত ইত্যাদি যা হোক না কেন।  এবং রাষ্ট্র নাগরিককে বৈষম্য থেকে প্রটেক্ট করতে বাধ্য। কাজেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার আছে, এমন সব বিষয়ে জাতভেদ প্রথার ধর্মীয়-সামাজিক বয়ান নন-কনফ্রন্টেশনাল হয়ে জায়গা ছেড়ে রাখবে।

কিন্তু বাস্তবে ভারত হল এমন – যেখানে পত্নীসহ খোদ প্রেসিডেন্টকেই চরম বৈষম্যের শিকার করা হয়েছে। এক এমএলএ আরেক সহ-এমএলএকে প্রকাশ্যেই ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। অথচ সমাজ নির্বিকার, কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কেউ কেউ এখন বলার চেষ্টা করছেন স্পিকার পদটা নিরপেক্ষ, তাই তার পদত্যাগ করা উচিত। আনন্দবাজার লিখেছে, “নিরপেক্ষতার শপথ নিয়ে যিনি সাংবিধানিক পদে বসেছেন, তিনি কিভাবে একটি বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে সওয়াল করতে পারেন,তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবিলম্বে ওমকে স্পিকারের পদ থেকে সরানোর দাবিও উঠেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা- সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির সুরে কথা বললে এখন সাত খুন মাফ হয়ে যায়। ওমও ছাড় পেয়ে যেতে পারেন। কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের কাছে তাদের আদর্শই শেষ। সংবিধান মূল্যহীন”।

খেয়াল রাখতে হবে যে, ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব সঠিক কি না এটা নিয়ে রাষ্ট্রের বলবার কিছু নেই। কারণ কোন ধর্ম কেমন হবে বা হতে হবে তা নিয়ে কথা বলা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ ছাড়া কোন ধর্মের সংস্কার করা আদৌও দরকার তা, দেখাও রাষ্ট্রের কাজ না।  রাষ্ট্র কেবল বৈষম্যহীন এক নাগরিক সমাজ বজায় রাখা আর মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া ছাড়াই আপসহীন থাকবে। কারণ এটা মৌলিক বিষয়।

ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রায় সব মিডিয়া এখানেই শেষ হয়ে গেছে।  কিন্তু আরও এগিয়ে আনন্দবাজার কিছু একাদেমিকের মন্তব্য এখানে যোগ করেছে। আনন্দবাজার লিখেছে ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র বলেছেন, “বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে ব্রাহ্মণদের মতো অত্যাচারী আর কেউ নেই। ধর্মপদে বলা হয়েছে, মন্ত্র দিয়ে ব্রাহ্মণ হয় না। গুণ থাকতে হয়। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ জাতিভেদ প্রথাকে তুলে ধরে। বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক। ব্রাহ্মণের মূল ক্ষমতা ছিল যজ্ঞের অধিকার। তাই বুদ্ধদেব যজ্ঞের বিরোধী ছিলেন। যজ্ঞের বিরোধিতার মাধ্যমেই সমাজে ব্রাহ্মণদের কার্যত অর্থহীন করে দেয়া হয়েছিল”।  এছাড়া আরো এক সমাজতত্ত্ববিদ অভিজিৎ মিত্রের সাথে কথা বলেছে। মিত্র বলেছেন, “যে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারেন। যিনি গুণের অধিকারী এবং যে গুণ মঙ্গলময় তিনিই ব্রাহ্মণ। তিনি যে কোনও শ্রেণীর প্রতিনিধি হতে পারেন। জ্ঞানের দিক থেকে একটি উচ্চতায় পৌঁছলে সেই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ধরা হতো। সেটাই ছিল ধারণা”। আনন্দবাজার বলছে,  “অভিজিৎ বাবুর বক্তব্য, ‘বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ব্রাহ্মণেরা ব্যর্থ হয়েছেন”।
“ফারাক আছে ব্রাহ্মণে-ব্রাহ্মণেও। যিনি অপরের কাছ থেকে বেশি দান গ্রহণ করেন, তাদের ব্রাহ্মণেরাই নীচু চোখে দেখেন।’ ব্রাহ্মণ হওয়ার অধিকার একটি বর্ণের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করেন অভিজিৎ বাবু”।

কিন্তু আমাদের বক্তব্য এমন হওয়া ঠিক হবে না। কারণ, উপরের দুটা বক্তব্যই মূলত ধর্ম-সংস্কারমূলক। এগুলো একটাও রাজনীতি বা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা নয়। বক্তা একাদেমিক দুজনই ধর্ম সংস্কারের আলাপ করেছেন, তাঁরা আলাপ করেছেন ব্রাহ্মণের তাতপর্য, তাদের কী হওয়া উচিত, না উচিত ইত্যাদি এসব নিয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-রাজনীতির আলাপ করেননি তারা। কিন্তু রাষ্ট্র তো সব ধর্মের নাগরিক সবার। তাই এর এখতিয়ার নেই যে, কোনো ধর্মের সংস্কার হওয়া উচিত কিনা, কেমন হওয়া উচিত এমন কোন আলাপে মগ্ন হয়ে ওঠা। বরং রাষ্ট্র বলবে, জাত-ভেদের আলাপ আপনার ধর্মে থাকুক আর না থাকুক, নাগরিক সবার স্বার্থে আপনাদেরকে আমার নীতিকে – নাগরিক সাম্যের নীতি ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার নীতি – একে সবার উপরে প্রাধ্যন্য দিয়ে মেনে চলতে হবে।

এদিকে, “সিভিল লিবার্টি” নিয়ে কাজ করে এমন এক সংগঠনও ভারতে আছে দেখা যাচ্ছে। আনন্দবাজার আরো জানাচ্ছে, “পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস (পিইউসিএল)- স্পিকারের ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এর রাজস্থান শাখার সভাপতি কবিতা শ্রীবাস্তব”। তাঁর দাবি, “স্পিকারকে ওই মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে”। কবিতা বলেন, “একটি বর্ণ বা জাতকে অন্যদের চেয়ে ভালো বলা বা একটি জাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এটা এক দিকে অন্য বর্ণকে খাটো করে দেখায়, তথা জাতিভেদ প্রথাকে আরো উৎসাহিত করে”।

বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, দল হিসাবে অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

কিন্তু কথা কনস্টিটিউশনে থাকা আর বাস্তবে চর্চা এক নয়। বাস্তবে যদি থাকতই তাহলে তো বিজেপি রাজনৈতিক দল হিসেবে অনুমোদনই পেত না। বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাগরিকবোধের চেয়ে হিন্দুত্ববোধ যদি কারো চিন্তা ও বুদ্ধিতে ওপরে চড়ে থাকে তবে অবস্থা এরকমই হবে।

তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিন্দা করা মন্তব্য দিয়েছেন গুজরাট রাজ্য সংসদের এক এমএলএ ও এক্টিভিস্ট – জিগনেস মাভানি। তিনি তাঁর টুইটে লিখেছেন, “ভারতের জাত ব্যবস্থার পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা – এটা শুধু নিন্দাযোগ্যই না এটা  বিব্রতকরভাবে পিছন-দিকে-হাঁটা। এটা আমাদের জন্য এক তামাশা যে এমন জাত-বর্ণবাদী একজন লোক আমাদের লোকসভার স্পিকার। জনগণের কাছে তার আচরণের জন্য মাফ চাওয়া উচিত”।
এটা একটা ট্রাজেডি যে কনষ্টিটিউশন জাত ব্যবস্থার উচ্ছেদ চায় সেই কনষ্টিটিউশন রক্ষার শপথ নিয়েছেন এই ব্যক্তি।
[Gujarat MLA Jignesh Mevani sought Birla’s apology. “This celebration of Indian caste system is not only condemnable but also cringe-worthy,” he tweeted. “It’s a joke on us that a casteist like him is our Lok Sabha speaker. He should publicly apologise for this attitude.”
He added: “It’s a tragedy that such people take oath on our Constitution that wants to annihilate the caste system.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জাত ভেদের সমাজে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]