ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

গৌতম দাস

২৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১৩

https://wp.me/p1sCvy-2vc

Paro locals question project DANTAK welcome sign, kuenselonline

ভুটানের পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে, দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি বা DNT) – এই দল বিজয়ী হয়েছে। এই দলের নেতা মেডিক্যাল ডাক্তার লোটে শেরিং প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
গত ১৮ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হওয়া এটা ছিল ভুটানের দ্বিতীয় ও শেষ রাউন্ডের নির্বাচন। ভুটানের কনষ্টিটিউশন অনুসারে এর নির্বাচন পদ্ধতি দুই স্তরে সম্পন্ন হতে হয়। প্রথম পর্বের সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় দলকে নিয়ে আবার নির্বাচনে নির্ধারিত হয় কে বিজয়ী বা কোন দল ক্ষমতাসীন হবে। এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে আমরা জেনেছিলাম ক্ষমতাসীন পিডিপি শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছে। ‘শোচনীয়’ বলা হচ্ছে এ জন্য যে, প্রথম পর্বের ফলাফলেই পিডিপি তৃতীয় অবস্থানে চলে যায়। প্রথম রাউন্ডেই তৃতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া দলের আর দ্বিতীয় রাউন্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।
ভুটানের মোট জনসংখ্যা প্রায় আট লাখ, যার মধ্যে এবারের ভোটদানে যোগ্য ভোটার ছিল প্রায় তিন লাখ। প্রথম রাউন্ডে এমন মোট ভোটগুলা প্রধান তিন দলের মধ্যে ভাগ হয়েছিল এভাবে – দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি) ৯২ হাজার ৭২২ ভোট, দ্রুক ফুয়েনসাম শোগপা (ডিপিটি) ৯০ হাজার ২০ ভোট আর পিউপুলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) ৭৯ হাজার ৮৮৩ ভোট। তৃতীয় হওয়ায় ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যায়। আর প্রথম রাউন্ডে প্রথম হয়েছিল ডিএনটি; সেই দলটি এবার শেষ রাউন্ডের নির্বাচনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। ভুটানের পার্লামেন্টে মোট আসন ৪৭। এর মধ্যেই ডা: লোটে শেরিংয়ের বিজয়ী দল ডিএনটি, এরা পায় ৩০টি আসন, আর বিরোধী ডিপিটি পায় ১৭টি। ইতোমধ্যে এটাও নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশ থেকে পাস করে যাওয়া ডাক্তার শেরিং-ই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।

কিন্তু ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে গেছে  এই কথার লেজ ধরে  নতুন ইঙ্গিত কী এই যে, তাহলে এখন এর বদলে হবু ক্ষমতার দল যেটা আসছে সে চীনমুখী? না, তা নয়। মজার কথা হল, তা কেউ বলছে না। এমনকি আগ্রাসী আচরণের কোনো ভারতীয় ব্যক্তি বা মিডিয়াও এ কথা বলছেন না। যেমন ভারতের সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক, [বিদেশি পয়সার এনজিও নয়, নিজ ব্যবসায়ীদের পয়সায় চলা দাতব্য প্রতিষ্টান (ORF), Observer Research Foundation] ওআরএফ। এর এক ফেলো মনোজ যোশির এই প্রসঙ্গে তাঁর লেখার শিরোনাম লিখেছেন, “ভুটানের হবু সরকারের ভারতের প্রতি মনোভাব অস্পষ্ট। এটা ভারতের উদ্বেগের কারণ হতে পারে”। [New Bhutan government’s attitude towards India is not clear, this should worry India]।

একথা আবার তিনি লিখেছেন আগ্রাসী নয় বরং দুঃখ করার মুডে। তার এই পুরা লেখাটাই এক হারুপার্টি বা পরাজিতের ভঙ্গিতে লেখা, আর একটা ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিতে তো বটেই। প্রথমেই নিজেদেরকে আত্মদোষী করে বলছেন, ‘ভুটানের নির্বাচন ভারতের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অথচ ভারতের মিডিয়া সেটা আমল করতে পারেনি। এ থেকে, পড়শির প্রতি আমরা কেমন গুরুত্ব দেই আমাদের সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন এটা”।

হারুপার্টি বা পরাজিত কথাটা এখানে আক্ষরিক অর্থেই বলা হয়েছে। কারণ ঘটনা হল, গত ২০১৩ সালের ভুটানের নির্বাচনের আগের দিন ততকালীন মনমোহন সরকার ভুটানে ভারতের সরবরাহ করা তেল গ্যাস জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সেবার এতে ভারতমুখি দল পিডিপির জয়লাভ আর প্রতিদ্বন্দ্বি ডিপিটি দলের হারের কারণ মনে করা হয়। আর ডিপিটি দলের উপর ভারতের এমন বিরাগ ও সাজা দিবার কারণ তার নেতা ২০১২ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাত করেছিল। তাই ভর্তুকি প্রত্যাহার করে যেন এটা বুঝাতে যে ভারতের কত ক্ষমতা বা ভারতের ইচ্ছার দাম কত, তাই তা ভুটানিজদের কতটা গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে হবে। এদিকে প্রায় এমন একই ঘটনা, তবে আরো ভয়াবহভাবে ঘটেছিল নেপালে; ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোদী সরকারের সিদ্ধান্তে। ভারতের অপছন্দকে আমলে না নিয়ে নেপাল তার নতুন কনষ্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ায়, ভারত জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ সব পণ্যের ভারতের উপর দিয়ে নেপালে আমদানির সব সড়ক ভারত অবরোধ করে রেখেছিল দীর্ঘ ছয়মাস ধরে। নেপাল ও ভুটানকে মূলত ভারতের ওপর দিয়ে বাইরে বের হতে হয়, এমন ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। আর এর সুযোগ নিয়ে নেহরু ১৯৪৯-৫০ সালে এ দুই রাষ্ট্রকে আলাদা দুই কলোনি সম্পর্কের চুক্তিতে বেঁধে ফেলে। যার সার কথা হল, নেপাল বা ভুটান দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সব সুযোগ এককভাবে ভারতকে দিতে হবে।
যেমন – নেপাল বা ভুটান তাদের উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারত ছাড়া তৃতীয় আর কোনো বিদেশী রাষ্ট্রে বিক্রি করা যাবে না; অথবা ভারতীয় কোম্পানির মাধ্যমে তৃতীয় রাষ্ট্রে বিক্রি করতে হবে, নিজে পারবে না। ভৌগলিকভাবে উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত বলে ঐ উচ্চতার পাহাড়ি নদী বা পানি ঢলকে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে খুব সহজেই পানি-বিদ্যুৎ উতপাদন করা যায়। আর পানিবিদ্যুত বলে এর উতপাদন খরচ সবচেয়ে কম, ২৫-৫০ পয়সা প্রতি ইউনিট। তাই বিদেশি মুদ্রা আয়ের এই বড় উৎস পানিবিদ্যুত হলেও ভারতের একচেটিয়া আর অযাচিত আধিপত্যের কারণে এর সুফল নেপাল বা ভুটানের ঘরে ঠিকমত উঠে না। আর আসলে এই লুটে নেয়া সুবিধার কিঞ্চিত ফেরৎ হিসাবে (তথাকথিত রেসিপ্রোকাল, reciprocal) ভূটানে জ্বালানি তেল ও সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ ভারতের অভ্যন্তরীণ দরে ভর্তুকিতে ভারত দিয়ে আসছিল। ভারত এটা দেয়, যাতে ভুটানে ঋণ ও বিনিয়োগ নিয়ে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে হাজির হতে না দেয়া যায়। ব্যবসা কেবল নিজের হাতে আর প্রভাবে বজায় থাকে। এই ঘটনাটার সবচেয়ে বেশি প্রতিফলন দেখতে পাব আমরা যে, ভুটানের ঋণগ্রস্ততা এখন বিশাল আর এর পরিমাণ ভুটানের জিডিপির ১১৮%। আর এই মোট ঋণের ৬৪% এর দাতা, ঋণ-মহাজন হল ভারত। ভুটানের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস পানিবিদ্যুৎ। তাই ভুটানের অর্থনৈতিক নুয়ে পড়া দশার বড় উৎস এখানেই।  ভারতের কাছে নেয়া ও পরিশোধ না হওয়া বৈদেশিক (মূলত পানিবিদ্যুতের জন্য) ঋণ ব্যাপারটা এত ভয়াবহ যায়গায় পৌচেছে যে ভারতের প্রাচীন পত্রিকার  দ্যা হিন্দু  বৈদেশিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার লিখছেন, ভারত যদি কিছু না করে তবে খোদ ভারতই এবার ভুটানকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলার পরিকল্পনা আটছে বলা হবে; যে অভিযোগের প্রপাগান্ডা ভারত এতদিন চীনের বিরুদ্ধে করে আসছে।   [……And unless India finds ways to help, it will be accused of the same sort of “debt-trapping” that China is accused of today.]

কিন্তু পালটা সুযোগ ভুটানের দোরগোড়ায় সম্ভবত টোকা দিচ্ছে। ভারতের দিক থেকে ভুটানকে এভাবে বেঁধে রাখা, এটাই একালে ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। এর প্রধান অবজেকটিভ কারণ মানে ভারত চাইলেও ঠেকিয়ে রাখতে পারে না এমন কারণ হল, চীনের কাছ থেকে আমাদের মত দেশের ঋণ বা বিনিয়োগপ্রাপ্তি সহজলভ্য হয়ে গেছে একালে; তাই “আমার বাড়ির পিছন বাগানে (মানে পড়শি দেশে) অন্যকে ঢুকতে দেবো না” বলে অক্ষম ভারতের প্রবল নাকিকান্না দেখছি আমরা।

কিন্তু এবিষয়টা ভারতের বদলে চীন মানে চীন “ভাল” আর ভারত ‘খারাপ’ – অতএব এখন আমাদের সবাইকে চীন-ভক্ত হয়ে যেতে হবে, এখন চীনের পক্ষে ঢোল পিটাতে হবে – এমন ভাড়ামো বা দালালির বিষয় নয় একেবারেই। বরং একচেটিয়া ভারত ভুটানে ব্যবসা ও বিনিয়োগের একমাত্র উৎস হয়ে থাকার বদলে পাশে চীনও আরেক উৎস হয়ে থাকলে, ভারতের একচেটিয়াত্ব ভাঙবে। ভুটান তুলনা করে দেখতে সুযোগ পাবে। এখান থেকে দেখতে হবে। মূলকথা, ভুটানকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া যে সে কোনটা নেবে, কাকে কোন ব্যবসা দিবে কিংবা আদৌও দিবে না – এগুলো বেছে নেয়ার সুযোগ পেতে হবে তাকে। এটা ভুটানের অধিকার।
এ ছাড়া ভারতের পাশাপাশি চীনও যদি ভুটানকে ট্রানজিট দেয়, (নেপাল যেমন সম্প্রতি পেয়ে নিয়েছে) আর সেই ট্রানজিট ব্যবহার করতে ভুটানে নতুন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও তা গড়ে দেয় সেটা হবে ভুটানবাসীর ভাগ্য খুলে যাওয়া। সবচেয়ে বড় পাওনা হবে ভারতের একচেটিয়া নাগপাশ থেকে  ভুটান অন্তত একটু মুক্ত, সেই বাধন ঢিলা হবে এতে।

একালে ভুটানের জনগণ বিশেষ করে কাজ-চাকরিপ্রার্থী তরুণেরা, এদের কাছে বিষয়গুলো তাদের না বুঝার বা আমল না করার কিছু নেই। সহজেই তারা বুঝতে পারে। এছাড়া পেটের তাগিদ বাড়ছে। এক হিশাবে বলা হচ্ছে তরুণ জনসংখ্যার প্রায় ১০% বেকার। এছাড়া বিশেষ করে নেপাল তাদের সামনে এক মুক্তির মডেল হয়ে যেখানে হাঁটছে। আমরা মনে রাখতে পারি যে ‘ভারত-নেপাল’ আর ‘ভারত-ভুটান’ এই দুই কলোনি-দাসত্ব চুক্তি একই ছাঁচ বা ড্রাফটের উপর করা হয়েছে। আসলে ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি তুলে নেয়ার পর থেকে ভুটানের জনমনে প্রথমে ভীতি জন্মায়। পরে তা থেকে ক্ষোভ আর শেষে এক তোলপাড়-বুঝাবুঝি-সচেতনতা ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়ে যায়। ভুটানের সরব তরুণদের টগবগে ফেসবুক পেজ বা গ্রুপ দেখলে তা বুঝা যায়।

এককথায় ভুটান বদলে যাচ্ছে। স্থবির ভুটান যেন সামনে আলো দেখছে। একটা ছোট ঘটনার বর্ণনা দেই। ভুটানের আকাশ থেকে নামলেই আপনি বিমান বন্দরে একটা স্বাগতম বোর্ড দেখতে পেতেন। এই লেখায় শুরুতে যে ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা খেয়াল করতে পারেন। এটা গতবছর ২০১৭ এপ্রিল ১১ এর আগের ছবি। এই সাইনবোর্ড নিয়ে আপত্তি-বিতর্কের ফলাফলে সেটার বদলে এখন নতুন সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে। নতুন সাইনবোর্ডের লিঙ্ক এখানে। এটা স্রেফ একটা সাইনবোর্ড বদল নয়, প্রতীকীভাবে এটা ভারতের হাত থেকে ভুটানের হারানো সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার লড়াই। ভুটানের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ মূলত ভারত নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। ঠিক যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ রেখে দিয়েছে। এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ভারত যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করে থাকে সেই ১৯৬১ সাল থেকে সেটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধীনস্ত এক প্রতিষ্ঠান যার নাম Border Roads Organisation। এক ভারতীয় ব্রিগেডিয়ারকে চীফ ইঞ্জিনিয়ার করে এর অধীনেই নেয়া কনষ্ট্রাকশন প্রজেক্টের নাম Dantak। ফলে সংক্ষেপে একে  DANTAK-BRO অথবা Dantak (ড্যানটক) বলা হয়ে থাকে। শুরুতে দেয়া ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভুটানের প্রধান এয়ারপোর্ট, “পারো এয়ারপোর্টে” ভিজিটরদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে ড্যানটক। এটা নিয়ে স্থানীয় পাবলিক জনমনে ঘোরতর অস্বস্তি আপত্তি তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে মিডিয়ায় যারা কথা বলেছেন তাদের মধ্যে আছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ট্যুর গাইড, প্রাক্তন আমলা  ইত্যাদি। তাদের বক্তব্য হল ড্যানটক ভারতীয় আর্মির সংগঠন ফলে তারা ভুটানের ভিজিটরদের স্বাগত জানানোর কেউ না; আর রাস্তার সাইনবোর্ড টাঙ্গানোর  অথরিটিও তারা নয়। বরং রাস্তায় “পথচারি সাইন” টাঙ্গানোর ভূটানিজ স্থানীয় যে আইন তা ভঙ্গ করে ভারত একাজ করেছে। মূলকথা হল, ভুটানে কেউ আসলে সেই ভিজিটরদের ভারতীয় কেউ স্বাগত জানাবে এটা ভুটানিজরা পছন্দ করছে না। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা বছর খানেক আগে ভুটানের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ক্স মন্ত্রণালয় এই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলতে চিঠি দিলেও ড্যানটক তা উপেক্ষা করে চলেছে তো বটেই এমনকি স্থানীয় এক ইংরাজি পত্রিকাকে সাক্ষাতকার দিয়ে ঐ ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার যিনি ড্যানটকের চীফ ইঞ্জিনিয়ার, খোলাখুলি বলছেন যে এনিয়ে বিরূপ পাবলিক সেন্টিমেন্ট তিনি “অগুরুত্বপুর্ণ” মনে করে উপেক্ষা করেছেন।  এছাড়া তিনি উদ্ধতের সঙ্গে বলছেন “ড্যানটক-কে অন্যান্য বিদেশি দাতা সংস্থার সঙ্গে তুলনা করাতে উলটা তিনিই ক্ষুব্ধ। কারণ ড্যানটক অবিচ্ছেদ্য অংশ [DANTAK has been an integral part of the infra-structure development ……]”। যেন ভুটান ভারতেরই অংশ। গতবছরের এপ্রিলে সেবার অসন্তোষের প্রকাশটা এই সাক্ষাতকারের কারণে  তুঙ্গে উঠেছিল। আর তা থেকে এবার ছয়দিনের মাথায় এপ্রিলে ভুটানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবার নিজেই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলে নিজেদের সাইনবোর্ড স্থাপন করেছিল। সারা পারো শহরে এধরণের বিলবোর্ড বহু জায়গায় ছড়িয়ে ছিল, আর রাস্তার পেভমেন্টেও ভারতীয় পতাকার তে-রং দিয়ে রাঙিয়ে রাখা হয়েছিল।

মূল কথাটা হল এখানে প্রদর্শিত এটিচ্যুড, আর কূটনৈতিক মনোভাব বা শিষ্টাচারের অভাব অথবা ভুটানের সার্বভৌমত্বকে  সম্মান  না জানানো – এগুলোর কোনকিছুই এখানে কাজ করে নাই। যেন ড্যানটক নিজেই অবকাঠামো গড়ার কাজ করতে ভুটানে এসেছে, ভুটানের সরকারের কেউ তাকে “ওয়ার্ক-অর্ডার” দেয় নাই। এর পিছনের ভারতের ধরে নেয়া ভয়ঙ্কর অনুমানটা হল, খোদ ভুটান তো ভারতেরই। ভারতের এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান বাকা-করে বলা কথা নয়।

যেমন প্রথমত, গত বছর ২০১৭ সালের চীন-ভারতের কথিত “ডোকলাম সঙ্কট”। ডোকলাম ভুটানের ভুমি, এটা ভারতও অস্বীকার করে না। ভুটানের সঙ্গে চীনের অচিহ্নিত সীমানা বিতর্ক দীর্ঘদিনের, সেই কলোনি আমলের। একালে তা আপোষে মীমাংসার জন্য উভয় রাষ্ট্রই তাদের বিভিন্ন স্থানের “ভুখন্ড বিনিময়” করে এই বিতর্ক মিটানোর চেষ্টা করছে। এখন এর ২৫তম রাউন্ডের আলোচনা বৈঠক চলছে। এরই অংশ হিশাবে ডোকলামের কিছু অংশ চীনের সাথে বিনিময়ে দিয়ে দেওয়াতে এরপর, চীনে সেখানে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে  ভারত সামরিকভাবেই তাতে বাধা দেয়। পরবর্তিতে হুমকি-আলোচনা শেষে, ৭৩ দিন পরে ভারত সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়াতে ঐ সঙ্কট দৃশ্যত মিটে যায়। তাহলে ব্যাপার হল, ভুটানের ভুমিকে ভারত নিজের মনে করে, চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। এছাড়া দ্বিতীয়ত, ভূটান এখন মোট ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ে কূটনৈতিক সম্পর্কে স্বীকৃতিতে আবদ্ধ। ভুটানের মাত্র দুই পড়শি – ভারত ও চীন। ভৌগলিকভাবে ভারতেরই সমানতুল্য আর এক প্রতিবেশি চীন হলেও ভুটানের সাথে চীনের কুটনৈতিক স্বীকৃতি নাই। গুরুত্বপুর্ণ হল এই কুটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করতে, এখানে দেশি-বিদেশি আইনি কোন বাধা নাই। কারণ সার্বভৌম ভুটান কোন রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করবে এটা ভারতের নাকগলানোর বিষয় নয়। কিন্তু বাধা হল বড়ভাই, বড়ভাই মাইন্ড করবে। ভারত অসন্তুষ্ট হবে এটাই আকারে-প্রকারে বুঝিয়ে ঠেকায়, চাপ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

আসলে ভারত ভূটানের ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ের বেলায় আপত্তি না করলেও চীনের ব্যাপারে ছুপা আপত্তি কেন? এককথায় বললে, অন্যান্য রাষ্ট্র কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করার পরে, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ যে সম্পর্কই করুক তা ভারতের ভুমি দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে তা বাধাগ্রস্থ করা না করা ভারতের ইচ্ছাধীনে থাকে। মানে ভারতের অনুমতি সাপেক্ষেই কেবল কোন কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু চীন –  সে ভুটানের  অপর পড়শি বলে ভারতের কোন বাধাই পরোয়া না করে সরাসরি চীন থেকে ভুটানে সব ধরণের যোগাযোগ  স্থাপন করতে পারে। অর্থাৎ ভুটানকে চুক্তিতে আটকিয়ে কলোনি করে রাখার ভারতের কূট-বুদ্ধি এখানে অচল। একারণেই, সারকথায় ভুটানকে ভারতের নিজেরই ভুখন্ড মনে করে চলা – এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান চীনের কারণ বাস্তবতা হারাবে, এটা ভারত ভালই বুঝে। এই কারণে, চীন-ভূটান কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময়ে ভারতের ছুপা আপত্তি।

এসব কিছু মিলিয়ে ভুটানের জনমনে বিশেষ করে তরুণদের মনে যে ক্ষোভ তা এখন প্রবল এবং সংগঠিত হয়ে উঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তাদের ক্ষোভের একটা বড় পয়েন্ট হল, ভুটান কেন নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে চীনের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক করবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সম্প্রতি ভুটানিজ স্থানীয় বিশেষ করে তরুণদের প্রতিরোধী মনোভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি একটা রিপোর্ট করেছে যেটা হংকং থেকে প্রকাশিত  সাউথ চায়না মর্ণিং পোষ্টে ছাপা হয়েছে। সেখান থেকে টুকছিঃ  “থ্রিম্পুতে ২১ বছর বয়স্ক কলেজ ছাত্র বিমলা প্রধান বলেন, ভারত ও ভুটান যদি ভালো বন্ধু হয়, তবে আমাদের বন্ধুত্ব অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের কারণে প্রভাবিত হবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, সবকিছুর জন্যই ভারতের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় ভুটানকে। ভারত সবসময়ই অন্যদের আগে আসবে। কিন্তু ভারতের উচিত হবে না ঈর্ষান্বিত বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করা”। ঠিক এমনই আর অনেক কথোপকথন আছে সেখানে। [এর এক বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে এখানে] এএফপি আরও লিখছে, ” ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংজাং দর্জি ভুটানের কূটনীতি সম্পর্কে মাথা ঘামাতে চান না। তবে তিনি বিদেশী বিনিয়োগের মূল্য বোঝেন। তিনি বলেন, ভুটানের উচিত হবে অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। তিনি বলেন, অনেক চীনা পর্যটক এখানে আসতে শুরু করেছে। তারা অনেক টাকা নিয়ে আসে”।

এই ব্যাপারটা ইদানিং এতই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তা টের পায় মানে স্বীকার করে ভারতের কিছু মিডিয়া। গত মাসে প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে ভারত-মুখি পিডিপির শোচনীয় হার দেখার পরে,  টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টার সরাসরি ভারত সরকারকে  ভুটানে জ্বালানিতে ভর্তুকি তুলে নেয়ার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দায়ে অভিযুক্ত করেছিল।
উপরে থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো মনোজ যোশির ‘পরাজিত মনোভঙ্গির’ কথা বলছিলাম। অনুমান করা যায়, তাঁরও এদিকগুলো আমল না করতে পারার কথা নয়। এর পরও তিনি আক্ষেপ করছেন যে এই নির্বাচনের ইস্যু হিশাবে ভারত বা ভুটান-ভারত সম্পর্ক কোন প্রকাশ্য বিষয় ছিল না। তিনি লিখে চলেছেন, “এর আগের ভারতমুখী পিডিপির সরকার থাকাতে ও সে সহযোগিতা করাতে ভারত তখন চীনের সাথে ‘ডোকলাম সঙ্কট’ আরামে মেটাতে পেরেছিল”। [The defeat of the incumbent government headed by Tshering Tobgay could not have been comfortable for New Delhi. This is especially because along with the Bhutanese government, New Delhi had managed the crisis over Doklam successfully last year.] এটা আসলেই যোশির কল্পনা আর আক্ষেপের কথা; বাস্তবতা নয়। এই অর্থে এটা একটা চাপাবাজি, ভিত্তিহীন কথা।

কারণ, প্রথম কথা ভারতীয় সৈন্য প্রায় স্থায়ীভাবে ভুটানে এখনো আছে। আর ভুটানের অপর পাড়ে চীনের সীমান্ত শুরু হবার আগে  পর্যন্ত সেটা ভুটানের আর ভুটানের যেহেতু অতএব তা, যেন ভারতেরই ভূমি ও সীমান্ত – এমন চিন্তার অভ্যাস ও বিশ্বাস জন্মে গেছে ভারতের। ঘটনা হল – সীমান্ত নিয়ে বিতর্ক কলোনির সেকাল থেকে যখন কলোনি শাসক ব্রিটিশ, চীনের সেকালের রাজারা আর নেপাল-ভুটানের করদ রাজা – এদেরই রাজ্য-সাম্রাজ্যের অমীমাসিত সীমানা। এদের পারস্পরিক সীমান্তের বহু অংশ সেকাল থেকেই বিতর্কিত ছিল, যা ভিন্ন ভিন্ন দাবির সীমানা হয়েই তখন থেকে এখনো রয়ে গেছে। চীন-ভারত সীমান্তের বিতর্ক এমনই উদাহরণ। তেমনিভাবে, চীন-ভুটানের এমন বিতর্কিত সীমান্ত একালে চীন ও ভুটান পরস্পর এক অংশের দাবি ত্যাগ করে অপর অংশ পেয়ে নিয়ে তারা আপস মিটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আয়তনের দিক থেকে সেখানে চীন ভুটানকে বেশি এলাকা দিয়ে দিতে চায়। কারণ ভুটান থেকে পাওয়া ভূমির কৌশলগত মূল্য চীনের কাছে বেশি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চীন-ভুটানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো নাই; বড়ভাই ভারত আইনি বাধা না দিতে পারলেও সে অখুশি হবে, তার অস্বস্তি হবে এগুলো চিন্তা করে ভুটান এই সম্পর্ক করতে আগাতে পারে নাই।
তাসত্বেও চীনের ভাইস পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত জুলাইয়ে ভুটান সফর করে গেছেন। এছাড়া তৃতীয় দেশে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস তারা ভিজিট করে থাকে। এমনকি ভারতে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস নিয়মিত ভিজিট করে থাকেন। বিশেষ কারণ, দিল্লিতে চীনের এমবেসি ভুটানেরও প্রক্সি এমবেসি বা কুটনৈতিক অফিস হিশাবে কাজ করে থাকে। এই বিষয়গুলো চীন-ভূটান যোগাযোগ ও নানান স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট বাধা। এসব কারণ সবাই শেরিংয়ের হবু সরকারের আমলে এ বাধা অপসারণ হবে এটা সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান এজেন্ডা ও প্রবল কামনা। মনোজ যোশি লিখছেন, “ডোকলাম যেটা চীনের দাবি করা, কিন্তু দৃশ্যত ভুটানের জায়গা”। [Doklam, which was ostensibly about Bhutanese territory claimed by China, did not figure in the elections.] কিন্তু ডোকলামকে ভুটান কেন নির্বাচনে ইস্যু করেনি এই তাঁর আপত্তি বা অবজারভেশন। যোশি এখানে প্রকারন্তরে স্বীকার করছেন ডোকলাম ভারতের নয়। ফলে তা চীনের হোক কিংবা ভুটানের তাতে ভারতের কী? এর কোন জবাব যোশি কথায় পাওয়া যায় না। অথচ “ডোকলাম ভুটানের” ভারতের এই ভুয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে সৈন্য হাঁকিয়েছিল ভারতই। আর তাতে তো ভারত নিজের জন্য তা সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। পরে ডোকলাম ভুটান-চীনের ইস্যু – এটা স্বীকার করে সৈন্য প্রত্যাহারের ফলেই ভারতের ইজ্জত বেচেছিল। তাই এখন সেসময়ে “ভুটানে পিডিপির দলের সরকার ছিল বলে” ভারত ডোকলাম সমস্যা সহজে মিটাতে পেরেছিল, এ কথা ভিত্তিহীন, মুখরক্ষার কথা। বরং সেসময়ে ভুটান ভারতের ওপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে একেবারেই নিশ্চুপ নির্বাক ছিল। অনাহূত ভারত সেসময়ে “ভুটানের ডোকলাম রক্ষার নামে”  চীনকে বাধা দিতে গেছে, এটা ভুটান একেবারেই পছন্দ করেনি।
আসলে তখন থেকেই ভারত বুঝেছিল দিন বদলে যাচ্ছে। এটা আর আগের ভুটান নয়। ‘বৌদ্ধ নিশ্চুপতা’ এক বিরাট শক্তি। দুর্বলের “নির্বাক থাকা” সময়ে এক বিশাল শক্তি হয়ে উঠে। এটা ভারত দ্রুত বুঝলেই তার জন্য ভাল। কেন?

কারণ, “ভুটান ভারতের যেন কলোনি। যেন ভুটানের মালিক অথবা মা-বাবা সে।” এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের ছড়ি ঘুরানো আর কত? জনসচেতনতা, ক্ষোভের কারণে তা এখন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। এটাই মূল ইস্যু হলেও ভারত খোড়া যুক্তিতে হয়ত বলতে চাইবে, আমার ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ কোনো যুদ্ধাবস্থার সময় চীন দখল নিতে পারে। হা, হয়তো পারে। কিন্তু সে কারণে ভুটানকে ভারতের কলোনি (১৯৪৯ সালের চুক্তি) হয়ে থাকতে হবে, কেন? এটাই কি ভারত বলতে চাইছে? চাইলে খুলে বলুক! এ কারণেই কি ভুটান-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে পারবে না? আসলে ডোকলাম ভূটানের নির্বাচনি ইস্যু কেন হতে হবে? ভারত চাইলে সে নিজেই এটাকে ভারতের নির্বাচনী ইস্যু বানাক!

আবার বলা হচ্ছে, হবু-ক্ষমতাসীন বিজয়ী ডিএনটি দল খুবই বোকা। যোশি বলতে চাইছেন। কারণ, “তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে কোনো ফরেন পলিসির চ্যাপ্টার ছিল না”। [The DNT had no section on external affairs in its manifesto.] ফলে “চীন-ভারত বা ডোকলাম ইস্যুতে দলগুলার কোনো বক্তব্য রাখার সুযোগ ছিল না। অবশ্যই তা সত্যি। কিন্তু এনিয়ে, অন্ধের হস্তি দেখার মত কেউ বলছেন, DNT এই দলটা আসলে নাকি রাজার অনুগত দল। তাই তাদের বিদেশনীতি নেই। ওরা নাকি অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে, অর্থনীতির উন্নতি নিয়ে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছড়িয়ে দিতে চায় ইত্যাদি নিয়েই কেবল নির্বাচনে ব্যস্ত ছিল। ভারতের ইমেরিটাস প্রফেসর এস ডি মুনি তারও [হংকংয়ের scmp পত্রিকায়] এক আর্টিকেলে এমনটা দাবি করা হয়েছে। বলছেন, Foreign and security policy issues were left out। তিনি বলছেন, “ধনী-গরীবের সম্পদের গ্যাপ কমাতে হবে” এমন অর্থনৈতিক শ্লোগান দিয়ে ডিএনটি দলের শেরিং নির্বাচন করেছেন। হা অবশ্যই, দৃশ্যত একথা সত্য। কিন্তু তবু তারা সবটা দেখতে পায়নি অথবা দেখেও ভিন্ন কথা বলছেন।কেন? একথার মানে কী?

ব্যাপার হল, সামরিক ক্ষমতাই একমাত্র ক্ষমতা নয়। যারা সামরিক অথবা লোকবলের দিক থেকে দুর্বল তাদেরকে অন্য যেকোন কিছু যেমন “চার চোখের ক্ষমতা” বা “বুদ্ধি খাটিতে” চলতে হয়। ২০০৭ সালে ভুটানের পশ্চিমা শিক্ষিত রাজা বুঝে গিয়েছিলেন ভুটানকে ভারতের হাত থেকে টিকানো ও বাঁচানো জন্য অন্য রাস্তা ধরতে হবে। “রাজকীয়” রাষ্ট্র কাঠামো দিয়ে আট লাখ জনগণের রাষ্ট্র ভারতের হাত থেকে বাচানো কঠিন। তাই তিনি  যেচে রাজার শাসন বা মনার্কিজম ছেড়ে নিজেই সোজা ভুটানকে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন। এক কথায় বললে, ক্ষমতায় জনগণকে সংশ্লিষ্ট করা, জনগণের ভেতর দিয়ে এক গণক্ষমতা তৈরি করা। এগুলোই একটি রাষ্ট্রকে টিকাতে পারে। ভারতের কলোনি চক্ষুকে উপেক্ষা করতে পারে। জনগণ নিজের রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষক নিজেই হতে পারে।  ছোট আট লাখ জনসংখ্যার রাষ্ট্রে এটা এক উপযুক্ত ও বিরাট অগ্র-পদক্ষেপ ছিল।

খেয়াল করলে আমরাও সকলেই জানব যে, ভারতের কৌশল হল পড়শি দেশে এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলকে নিজের ভাঁড় বানানো। ক্ষমতায় রাখার নামে ঐ দল বা ব্যক্তিকে ভারতের দালাল বানানো, পুতুল বানানো। গত ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি উঠানো থেকে ভুটান এ বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছে। ভুটানে রাজার প্রভাব এখনো অনেক। রাজা এখন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনাল প্রধানও বটে।  তিনি ভারতের কৌশল অকেজো করে দিয়েছেন। সে কারণে এই নির্বাচনে কোনো বিদেশনীতি বিশেষত ভারত অথবা চীন সম্পর্কিত ইস্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক তোলা যাবে না – এই নীতিতে সকল দলকে আসতে রাজি করিয়েছেন। এটাই এখন নির্বাচনী আইন এবং এটা কেউ ভঙ্গ করলে নির্বাচন কমিশন জরিমানা করতে পারবে, এই নিয়ম জারি করেছে। [গত নির্বাচনে দুটা দলকে ২০০ ডলার করে ফাইন-ও করেছিল কমিশন।]  আর আসলে ওদিকে রাজার মধ্যস্থতা বা সভাপতিত্বে চীন-ভারত বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মিলে একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করবে, যেটা ক্ষমতাসীন দল সে অনুযায়ী চলবে, এই হলো সেই কৌশল। অর্থাৎ চীন-ভারত ইস্যুতে পপুলার প্রপাগান্ডা চলবে না। কেবল সুনির্দিষ্ট ফোরামে বসে সিরিয়াস তর্কবিতর্ক করতে হবে। আর এতে এক বড় লক্ষ্য হল ভারত যেন কোনো একটা দলকে তার দালাল বা পুতুল বানাতে যাতে না পারে। ফলে এই অর্থে এখন সব দলই দৃশ্যত “রাজার অনুগত”।  নতুন হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং বলছেন, বিদেশ নীতি প্রসঙ্গ নিয়ে তারা না, রাজা বলবেন। অতএব অচিরেই, হবু ক্ষমতাসীন ডিএনটি দলই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনসহ ভারতের কলোনি নিগড় ছিন্ন করে ভুটান বিদেশনীতি সাজাচ্ছে – খুব সম্ভবত এটাই দেখব আমরা।

এছাড়া ওদিকে লক্ষ্য করলে দেখব, আসলেই কী হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং কেবল অর্থনৈতিক ইস্যুতে নির্বাচন করলেন? শেরিংয়ের দল  ডিএনটি বলছে, ভুটানের অর্থনীতি অতিমাত্রায় পানিবিদ্যুৎ উতপাদন ও বেচাকেন্দ্রিক। বৈদেশিক ঋণের ৮০% এর কারণ এই অব্যবস্থাপনার পানিবিদ্যুত। ভূটানে এটা বদলাতে হবে। নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বের করতে হবে। এর অর্থ – ভারতের নিয়ন্ত্রিত এই পানিবিদ্যুৎ আর সীমিত বিনিয়োগের ও বৈচিত্রহীন বিনিয়োগের ভারতীয় খাঁচা থেকে ভুটানকে বের হতে হবে। তাহলে এখন এটা কি আর অভ্যন্তরীণ নীতির নির্বাচন থাকল?

এসবের কিছু খবর অন্তত ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পেয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ভারত সরকারকে কড়া সাবধান করে তার এক সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে,  আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। ওর শিরোনাম হল – “ভারতকে ভুটানের আকাঙ্খার সাথে নিজের কৌশলগত স্বার্থ ভারসাম্যপূর্ণ করে গড়তে হবে”। এসব ব্যাপার, এগুলো কিসের লক্ষণ? এরা বলতে চাচ্ছেন, ভুটান-চীনের কূটনৈতিকসহ সব সম্পর্ক হওয়া একেবারে নেপালের মত ভারতের বিকল্প চীনের ভিতর দিয়ে ট্রানজিট পাওয়া পর্যন্ত আরও কিছু হওয়া ঠেকানো আর অসম্ভব। আর একভাবে বললে, এএফপির ভুটানিজ তরুণদের মনোভাব নিয়ে রিপোর্ট যেটা হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এটারই স্বপক্ষে ভারতের অধ্যাপক এস ডি মুনি র লেখা সেটাও হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপানো ছিল পালটা, তবে ইতিবাচক জবাব। প্রফেসর মুনি লিখছেন, “এটা বিশ্বাস না করার কারণ নাই যে আগামিতে চীন-ভূটানের কূটনৈতিক সম্পর্ক হওয়া ভারত কাছে অগ্রহণীয় হবে, যদি নিরাপত্তা, শান্তি ও ইতিবাচক ব্যবসার পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে ভারতের কোর স্বার্থকে তা ক্ষতিগ্রস্থ না করে”। [There is no reason to believe India would not accept Bhutan’s establishment of diplomatic relations with China in future if its core interests of preserving security, peace and a positive business climate are not disturbed.] অর্থাৎ শর্ত সাপেক্ষে [খুব সম্ভবত শিলিগুড়ি করিডোর মাথায় রেখে] তিনি রাজি হচ্ছেন। তবে একটা মজার দিক হল দুটো রিপোর্টেরই শিরোনামে বলতে চাইছে ভারতের কপাল পুরেছে, ভারতকে আগের অবস্থানে ছাড় দিতে হবে। যেমন এএফপি লিখছে “at the expense of rival India”। আর কমিউনিস্ট প্রফেসর মুনি অহেতুক ন্যাশনালিস্ট হয়ে লিখছেন, “with India’s blessing”। মানে বলতে চাচ্ছেন যে, “মহান দাতা ভারতের আশীর্বাদ” পেলে পরে, চীন-ভুটান মিলতে পারবে।  মানে একজন খই খাচ্ছিল, তার কিছু খই বাতাসে উড়ে গেলে সেটা ঠাকুর গোবিন্দের নামে দান করে দেয়া হল বলে চালিয়ে দেয়া।

একটা তথ্য দিয়ে শেষ করা যাক। সার্ক (BBIN) Motor Vehicles Agreement চুক্তি বলে একটা বিষয় ছিল যেটার সারকথা হল, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একই মটরযান নিয়ে ভ্রমণের চুক্তি। সেই সময়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভুটানের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে নিজেকে তারা ঐ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কারণ বলা হয়েছিল, প্রচুর যানবাহনের হাঙ্গামায় শান্ত বৌদ্ধ ভুটানিজ ধ্যানে বাধাগ্রস্থ হতে পারে একারণে আর তাদের অত যানবাহন সামলানোর মত অবকাঠামো নাই বলে। খেয়াল করতে হবে সেটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু পার্লামেন্টের। মানে বিরোধীদের বাধা, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ছিল তাই সরকার পিছু হটে ছিল। কিন্তু এর পিছনের আসল কারণ এখন বলা হচ্ছে।  বিরোধীরা তারাই আসলে ঐ সময় থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল এবং এরই প্রথম বিজয়ী পদক্ষেপ ছিল সেটা। সব ব্যাপারে “ভারতের অনুমতি নিতে হয়”  – এই অনুমতিদানের ভারত একে প্রতিহত করে স্বাধীন ইচ্ছার সিদ্ধান্তের ভুটান, এর কায়েমই ছিল তাদের কমন লক্ষ্য।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভুটানে সব ভারতের হাতছূটে চলে যাচ্ছে, এটা আমল হওয়া শুরু হয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সুজন হয়, একমাত্র তবেই এর বিপদ বুঝবে।

এদিকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার ভুটান যদি নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করতে পারে, আমাদের মধ্যে কী কেউ কেউ নিশ্চয় বুদ্ধিমান হবেন, এমন পাওয়া যাবে না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভুটানের বুদ্ধিমান রাজা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sr

 

থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!

কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।

যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে  থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.

এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে  আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।

আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।

এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল।  “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে”  দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।

সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল,  ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও  বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে।  তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন  হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে  নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে  ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ  এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।

চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।

মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন,  ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।

মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের  নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট।  তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”।  এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।

তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো  মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা।  সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে।  আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]।  ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।

এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।

আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।

ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।

সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই  ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে?  তিনি লিখেছেন,

Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]