ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বফিরানোর খোয়াব

গৌতম দাস

১৮ মার্চ ২০১৯, সোমবার ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yu

The judge ruled images of the suspect in court must blur his face. Photo: Mark Mitchell-Pool/Getty Images,  from this link.

প্রায় লাগোয়া দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ নিউজিল্যান্ড। এর উত্তরের দ্বীপে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী শহর ওয়েলিংটন আর দক্ষিণের দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ক্রাইস্টচার্চ [Christchurch]। এবার ১৫ মার্চ ২০১৯, সেই ক্রাইস্টচার্চ উঠে আসে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া শিরোনামে – “মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা”। শহরের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে আসতে ১০ মিনিট লাগে এমন দুরত্বে দুটো মসজিদ আছে – আল নুর [Al Noor Mosque] আর লিনউড [Linwood mosque] মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় একের পরে অন্যটায় পরপর, হামলাকারী মারাত্মক ও বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা চালায়।  মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম ‘ব্রেনটন ট্যারান্ট’ [Brenton Tarrant]। সে মূলত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে প্রায়ই পাশের নিউজিল্যান্ডে আসেন। চিন্তার দিক থেকে “খ্রিষ্টান এবং ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা চামড়ার লোকদের কথিত শ্রেষ্ঠত্বে” বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ব্রেনটনের পরিচয় হল – ২৮ বছর বয়সী এই সাদাচামড়ার পুরুষ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারের [28-year-old white male from a low-income, working-class family]। আর সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৪৯ জন ইতোমধ্যেই মৃত, আরো প্রায় ২০ জন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মিডিয়ায় বলছেন, ‘এটা খুবই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ [“well-planned terrorist attack”]।

Jacinda Ardern, prime minister of New Zealand, described the shootings as a “well-planned terrorist attack”, and said this is one of the country’s “darkest days”..

অর্থাৎ আমরা দেখলাম তিনি এখানে “মুসলমানেরাই ভিকটিম” বলে এটাকে ‘টেররিজম’ বলবেন কি না এমন দ্বিধা দেখাননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এটাকে “সন্ত্রাসী হামলা’ [extremist terrorist attack] বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতিতে এটাকে “টেররিজম” বলা হয়েছে। এমনকি ভারতের বিদেশমন্ত্রী বা কানাডার সরকারও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে “খুবই পরিকল্পিত” [well-planned] বলছেন কেন? আর একটা বিশেষ দিক হল, এই হামলার পুরো সময় ১৭ থেকে ২০ মিনিটের; যার ১৭ মিনিটেরই লাইভ শো ফেসবুকে অন-লাইনে দেখানো হয়েছে। আর তা এমন ভয়ডর-পরোয়াহীন তাণ্ডব যে, রাইফেলের মাথায় বসানো ক্যামেরা থেকে নেয়া অনলাইন লাইভ ছবি নামাজ পড়তে আসা অসহায় মুসল্লিদের প্রতি গুলি ছোড়ার লাইভ ছবি – সাথে সাথেই ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল। এ ছবিগুলো যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তা এএফপি নিজেরা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করে [AFP determined the video was genuine] এই রিপোর্ট ছেপেছে।

হামলাকারী কে বা কারা? তাদের রাজনৈতিক বা চিন্তাগত পরিচয় কী? পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা মোট চারজন, যার তিনজনই সম্ভাব্য সহযোগী। আর চতুর্থজন যে দৃশ্যমান হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হামলার পরই এবং মানুষ হত্যার মামলায় অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অন্যদের নিয়ে তদন্ত চলছে। গত ২০১১ সালে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষ হত্যা করেছিল এন্ডার্স ব্রেইভিক [Anders Breivik]। হামলাকারী ব্রেনটনের পছন্দের ব্যক্তিত্ব যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানিয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির একজন হলেন এই ব্রেইভিক আর অন্যজন হলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ব্রেনটন এই দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের চিন্তা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। অনুমান করা যায়, এর মূল কারণ এরা দু’জনই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white supremacist] চিন্তা ধারণ করেন।

White Supremacist কারা?
“দুনিয়ায় সাদাচামড়ার লোকেদের শাসন-কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে কারণ সেটা ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ যুগ” – এই বক্তব্য বিশ্বাসে চলা পাশ্চাত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক গ্রুপ এরা।  মূলত এরা ইনসাফ বা ন্যায়-অন্যায় মুল্যবোধ থেকে বিচার করে পথ চলে না, এমনই মানুষ। “আমি আর এক মানুষের সহায়-সম্পত্তি বা ওর পুরা দেশটাই দখল করে নিব – কারণ আমি সুপার – আমি ক্ষমতাবান, বলশালী” – এই সাফাই বয়ানের উপর দাঁড়ানো এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তারা বলতে চায় পশ্চিমের সাদা চামড়ার লোকেরা আমরা এটাই করে এসেছি, কলোনি দখল করেছি, দুনিয়া লুটে শাসন করেছি, দাবড়ায় রেখেছি – কাজেই আমরা শ্রেষ্ট। তাই আবার “সেদিন” ফেরত আনতে হবে। তাদের মুল বক্তব্য এটাই।  এক ধরণের ‘সাদাদের ক্ষমতা’ বা হোয়াইট পাওয়ারের [White Power] পুজারি তাঁরা।
এছাড়া এরা দাবি করে তারা মাইগ্রেন্টবিরোধী। মানে গরিব দেশ থেকে মানুষের (যুদ্ধের শরণার্থী হওয়াসহ) নানা কারণে পশ্চিমের দেশে বসবাস করতে আসাকে (ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট) অনুমোদন দেয়ার এরা তীব্র বিরোধী।
কোন তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ না থাকলেও এরা প্রচার প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসেন যে মাইগ্রেন্টরা “নোংরা”, এরা তাদের শহর নোংরা করে থাকে আর শহরে সব অপরাধের জন্য দায়ী হল এই মাইগ্রেন্টরা। এককথায় যারা তাদের মত নয় এমন “অপর” [other] যেকোন মানুষই নিকৃষ্ট, খারাপ। তাদের আচার আচরণ কালচার সব খারাপ। শুধু তাই না।  এখানে  হোয়াইট-সুপ্রিমিস্টদের পরিচয়ের আর এক অর্থ আছে। তারা বিশ্বাস করে সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠিরা ছাড়া বাকি অন্যেরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। আর তাতে কোন সাদা চামড়ার দেশে এরা সহজেই তাদের ছাড়িয়ে জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যায়। (মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের মোদীর বিজেপি-আরএসএস সংগঠন ও তাদের কর্মীদের বিশ্বাস ও ভাষ্যও প্রায় একই রকম মিল দেখতে পাওয়া যায়।) তাই, সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠি ছাড়া এমন “অপর” লোকেদেরকে বুঝাতে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকে – “ইনভেডর” [invader] – মানে অনুপ্রবেশকারি-দখলদার। হামলাকারি ব্রেনটন ও তাঁর বন্ধুরা কথিত অনুপ্রবেশকারিদেরকে হত্যা করা তাদের টার্গেট ও একাজ জায়েজ মনে করে থাকে। যদিও এরা সাধারণভাবে “ইনভেডর” বলে ডাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা ইনভেডর বলতে মূলত কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই বুঝিয়েছে। অনেকটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর  মত। আমরা মনে রাখতে পারি, তিনি ও তাঁর দল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত মাইগ্রেন্টদের “মুসলমান” এবং কখনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা “তেলাপোকা” ইত্যাদি মানুষের জন্য অমর্যাদাকর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

হামলাকারি ব্রেনটন সম্পর্কে উপরের এতকিছু তথ্য জানার উপায় বা উতস কী? হামলা ঘটে যাবার পরে ব্রেনটন সম্পর্কে খোঁজ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি [AFP] আমাদের জানাচ্ছে যে, এক মাস ধরে ফেসবুক ও টুইটারে ব্রেন্টন একটা গ্রুপ হিসেবে প্রকাশ্যেই সক্রিয় ছিল। [The Twitter profile had 63 tweets, 218 followers and was created last month.] ‘যে কেউ’ বা এনোনিমাস হিসেবে তারা একটা গ্রুপ চালিয়ে গেছে, যে গ্রুপের নাম ‘8chan’ ফোরাম [Politically Incorrect” forum on 8chan, a online discussion site ]। এই গ্রুপ যে খুলেছে, তার নাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের নাম। একই ‘মালিক’ হিসেবে একই নামে এক টুইটার অ্যাকাউন্টও [@brentontarrant] আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলার পুরো বর্ণনা এখান থেকেই প্রচারে দেয়া হয়েছে। কেন এই হামলা তা বিস্তারে বর্ণনা করতে তাদের ‘ম্যানিফেস্টো’ বলে ৭৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এই সাইট থেকে নামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ ডকুমেন্টের শিরোনাম হল- ‘The Great Replacement’ বলা হয়েছে, এই ম্যানিফেস্টো লিখতে প্রণোদনাদাতাদের নাম হল ‘হোয়াইট জেনোসাইড’। মানে এরা নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে ডাকছে। সাধারণত ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা’ নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে থাকে। এ ছাড়া, নিজেদের বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কিছু শব্দ ও ধারণা যেমন, ডাইভারসিটি (Diversity বা বহুমুখিতা) বা মাল্টিকালচারিজমের [Multi-culturalism বা সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা] এসবের ঘোরতর বিরোধী বলে দাবি করে থাকে।

ডাইভারসিটি বা মাল্টিকালচারিজম ধারণার এখানে সারকথা হলটা – অনেক ধরণের দেশের ভুগোল ও সংস্কৃতির মানুষের একসাথে এক শহরে এই রাষ্ট্রে এসে বসবাস করা – একই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর ‘বৈষম্যহীন’ এক “নাগরিক সাম্য” বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশনের অধীনে।

এনিয়ে ইউরোপের তর্কবিতর্কের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেন রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ‘মাল্টিকালচারিজম’ মেনে চলা তাদের জন্য সঠিক নীতি বলে মনে করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্স ঘোষিতভাবেই মাল্টিকালচারিজম অপছন্দ করে থাকে। এর বদলে তাদের পছন্দ হল ‘এসিমিলিয়েশন’[assimilation] নীতি। যার বাংলা ও খুলে বলা অর্থ হল – ইংরেজি assimilate (বাংলায় সব-একই-ধরণ বা এককরণ করা) থেকে এসিমিলিয়েশন। এই এসিমিলিয়েশন শব্দের মূল বিষয়টা হল, ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিসহ সব কলোনি-দখলদারেরা আমাদের মত দেশকে এককালে কলোনি বানিয়ে, দখল করে লুটতে গিয়েছিল। পরবর্তিতে সেই সূত্রে আবার সস্তা শ্রম পাওয়ার লোভে তারা আমাদেরকে (কালো চামড়ার নেটিভদেরকে) কালক্রমে নিজ নিজ ইউরোপীয় দেশেও নিয়ে গিয়েছিল। “নেটিভরা” একসময়ে কলোনি মালিকের দেশেই তারা স্থায়ীভাবে পরিবারসহ  নাগরিক হিসাবে বসবাসও শুরু করেছিল। কারণ যেমন কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়াকে কার্যত মূল বৃটিশ ভুমিরই এক্সটেনশন মনে করা হত। কিন্তু একালে এসে ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়াতে ব্যবসা বানিজ্যের ভাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এই নেটিভরাই তখন চক্ষুশুল হয়ে গেলে যা হয়, তাই। কলোনি মালিকের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের দেশে যাওয়া নেটিভদেরকেই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বি গণ্য করছে। এই ব্যাপারটা বৃটিশেরা যেমন সহনীয়ভাবে দেখে ফরাসীরা তেমন নয়। তাই ফরাসি নীতি হল, নেটিভদের সবাইকেই ফরাসি কালচারই অনুসরণ করতে হবে। নেটিভরা নিজ দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্তন হতে হবে। তদুপরি, নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্ম পালনও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্তন হয়ে পালন করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই । ফরাসি দেশে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ এ ‘যুক্তি’তেই। জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে,নেটিভেরা নিজ দেশ থেকে আনা শুধু সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্থন হতে হবে তাই না। নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্মপালনটাও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্থন হয়ে করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই assimilation নীতি। যেমন ফরাসি দেশে বোরখা পড়া আইনত নিষিদ্ধ, এই যুক্তিতেই। এটাকেই ফরাসি রাষ্ট্র তার “এসিমিলিয়েশন” এর নীতি বলে সাফাই দিয়ে চলে থাকে। এই দুই নীতির তুলনা নিয়ে গত ২০১৫ সালে আমার এক পুরানা লেখা এখানে সময় করে আবার পড়তে পারেন।

হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা হিটলারেরও ভক্ত। যেমন এরা হিটলার বা তার সংগঠন নাৎসি পার্টির নানান চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে থাকে। হিটলারের বাণী নিজেরা পুনর্ব্যবহার করে। হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের রাইফেলের গায়ে এর ওপরে কমপক্ষে ছয়টা নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আঁকা আছে। এর একটি হল, ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ (Fourteen Words) চৌদ্দ শব্দের এক বাণী। আর তা হল – আমাদেরকে অবশ্যই “আমাদের মানুষের” অস্তিত্ব ও আমাদের “সাদা সন্তানদের” ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে। [“We must secure the existence of our people and a future for white children.”]।  এটাকে অনেকে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের একটা মূল ‘মন্ত্র’ বলে থাকে। এখানে ‘our people’ বা ‘white children’ বলে এরা বর্ণবিদ্বেষ জাগানোর চেষ্টা করে থাকে।

ব্রেন্টনের মত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা বলতে চায় তারা মাইগ্রেশনবিরোধীকিন্তু আসলেই কি তাই?
আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড এসব রাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা কারা? আর কারা এর অবৈধ দখলদার? অথবা তাঁদের ভাষায় অনুপ্রবেশকারি-দখলদার? নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী [aborigine] হল ‘মাউরি’-রা [Māori]। ইউরোপ থেকে বিশেষত ডাচ বণিক ‘আবেল তাসমান’ [Abel Janszoon Tasman] প্রথম ইউরোপীয়, যিনি মাউরি সভ্যতা ও এর ভূমির সন্ধান পাওয়ায় (১৬৪২) পরবর্তী সময়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নাম দিয়ে দখল করে, কালক্রমে নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের কলোনি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে ইউরোপীয় সাদা চামড়ার লোকজনই কি অনুপ্রবেশকারী-দখলদার নয়? হামলাকারী ব্রেনটন নিজেই (বা তাঁর পূর্বপ্রজন্ম) অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের আসল অনুপ্রবেশকারী-দখলদার। অতএব, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিজেকে না বলে (মুসলমানসহ) অন্য কাউকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা প্রহসন মাত্র। ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানদেরকে “হোয়াইট জেনোসাইডার” ব্রেনটন এর বিদেশি বা তথাকত্থিত “মাইগ্রেশনবিরোধীতার” তামাশা হল এটাই যে খোদ মাইগ্রেন্ট মাইগ্রেশনবিরোধীতার ভান করতে নেমে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে।

তবে এখানে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে যে বুশ-ব্লেয়ারের “ওয়ার অন টেরর” আর হোয়াইট বা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামার” উত্থান  – এদুটো একই ফেনোমেনা নয়। বরং একেবারেই আলাদা। তবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামাকারিরা” ইচ্ছা করে ইনভেডর বা অনুপ্রবেশকারী-দখলদার বলতে কথাটা সংকীর্ণ করে কেবল “মুসলমান” বুঝাচ্ছে – যাতে তারা খ্রীশ্চান-পশ্চিমাবাসীদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করা সহজ হয়।

সারকথা : আমাদের যথেষ্ট মাথা তুলে যেটা দেখতে হবে যে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান কেন এখন দেখা যাচ্ছে? তারা অটোমানদের সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা অথবা ইউরোপিয়ান খ্রিশ্চানিটির জেরুসালেম দখল চেষ্টার অতীত লড়াইগুলোকে এখন কেন রেফারেন্সে আনছে?

আমরা গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটা পর্বে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম পর্ব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। যেটাকে “কলোনি অর্থনীতির যুগ” বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্ব হল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে গত শতাব্দী (বিশ শতক) পর্যন্ত, যেটা  আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্লোবাল অর্থনীতির যুগ”। আর তৃতীয় পর্বকে বলা যায়, চলতি শতকে আমেরিকান নেতাগিরির পতন আর ক্রমেই সেই জায়গা নিতে “চীনের উত্থিত গ্লোবাল নেতৃত্ব”।

পশ্চিমের, বিশেষত ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চলছে কি না তা বুঝবার সহজ তরিকা বা নির্ণায়ক হল – মাইগ্রান্ট ইস্যু। অর্থনীতি ভাল চললে দেখা যাবে, তারা সবাই ভুলে যায় যে মাইগ্রান্ট তাদের একটি সমস্যা। কারণ, তখন পশ্চিমের বাড়তি শ্রম দরকার; ফলে মাইগ্রান্ট শ্রমিক খুব দরকারি। আবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলেই মাইগ্রান্ট বিষয়টিকে মানে, ওই বাড়তি শ্রমের বিষয়টিকে পাশ্চাত্য এক বিরাট সমস্যা মনে করে থাকে। তারা তাদের মধ্যবিত্তদেরকে মাইগ্রান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে উঠায়। অথবা যেমন আমরা এখন ফ্রান্সে দেখছি। ফরাসি নেতা মেরিন লি পেনের National Front পার্টির উগ্র ন্যাশনালিস্টরা (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) তাদের মধ্যবিত্তকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন। তবে তারা আসলে “কী রাজনীতি” করছেন তা বুঝবার কিছু ইঙ্গিত দেয়া যাক। তার দলের দুই ভাইস-প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিপো [Florian Philippot] সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। যা তিনি বলছেন বাধ্য করা হয়েছে। ফিলিপোর দাবি তাদের দলের আভ্যন্তরীণ বিতর্ক আসলে এখন এক সরে যাওয়া ইস্যু। “আমরা আগে আসলে দাবি করতাম এক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। যেটা এখন “মাইগ্রান্ট আর ফরাসি আইডেন্টিটি” – তার এই পুরানা ট্রাডিশনাল অবস্থানকেই মুল রানোইতিক ফোকাস বলে হাজির করেছে। এটা আসলে এক ভয়ঙ্কর পিছনের দিকে পিছলে পড়া”। [Philippot said the debate within the FN about a shift away from his focus on economic nationalism back to its traditional priorities of immigration and French identity were “a terrible backward slide”].
এই বক্তব্য থেকে আমরা “অর্থনৈতিক জাতীবাদ” থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদ কোথায় আলাদা তা বুঝে নিতে পারি।

গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে এসে আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে ইউরোপ এর আগে নিজেদের কলোনি শাসনের অর্থনীতির সমাপ্তি সমর্পণের ঘোষণা দিতে হয়েছিল
এখন চীনা উত্থানের পর্বে এসে ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্স আরেক দফা (তবে এবার আমেরিকাসহ) চীনেরও পেছনে থাকতে শুরু করতে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এই  সাদা চামড়ার আইডেনটিটি- ধরনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। দাবি উঠছে তাদের আগের “কলোনি যুগ” সবচেয়ে ভালো ছিল। কারণ, সেটা ছিল শান-শওকতের যুগ। তাই কলোনি লুণ্ঠনের সেকালে ফিরে যেতে হবে”। ইউরোপের প্রবীণ প্রজন্ম এখন তরুণদের কাছে সাদা চামড়ার সুপ্রিমেসির গল্প শুনিয়ে উসকানি দিচ্ছে।

সময় কখনো পেছনে ফেরে না। যেমন আমরা চাইলেই এখন “দাস-প্রথা” আবার ফিরে দুনিয়াতে চালু করতে পারব না। একইভাবে কলোনি লুণ্ঠন একালে আবার বৈধ বলে দাবি করা, সাদা চামড়ার বর্ণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব একালে আবার ন্যায্য বলে সাফাই গাওয়া- এসব অসম্ভব। দুনিয়ার অভিমুখ আর সেটা নয়। এগারো-বারো শতকের জেরুসালেম দখলের জোশ- ক্রুসেডের সেই উসকানি একালে আবার তৈরি করা, সেটাও অসম্ভব। মডার্ন রাষ্ট্র ও শাসন দুনিয়ায় এসে যাওয়ার পরে পুরনো ‘ক্রুসেড’ আর হবে না। যদি তাই হত তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ব্রিটেন জেরুসালেম দখলের চেষ্টায় বারবার হেরে যাওয়ার শোধ তুলতে আবার ক্রুসেড লড়ে জেরুসালেমের দখল করতে চেষ্টা করত। “কামাল তুনে কামাল কিয়ার” তুরস্ক গড়ার পথে হাঁটত না। বরং আমরা দেখেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রুসেড’ শব্দটি মুখেও আনেনি।

আমরা এখন যেমন চাকরি, পড়াশোনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পশ্চিমমুখী হই। সামনের দিনে ইউরোপীয়দের অন্তত চাকরি বা অধিকতর সুযোগ-সুবিধার জন্য এশিয়ামুখী হয়ে ধাবমান হতে দেখা অসম্ভব নয়। এটাকেই তারা হার মনে করছে। পাশ্চ্যাতের সমাজে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার” নামে অস্থিরতার কারণ এখানেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ কি ফিরবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ইউরোপের মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

ইসলামবিদ্বেষের ছায়ায় দেখা
মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-qH

২০১৫ ডিসেম্বর ২৯

আইএস কারা, কোথা থেকে কোন দেশ থেকে এসেছে; কী ধরণের মানুষ এরা যারা আইএস সংগঠনে এসে যোগ দিচ্ছে ইত্যাদি প্রশ্নে আমরা জানি মূলত এদের এক বিশাল অংশ পশ্চিমা সমাজগুলো থেকে। কিন্তু পশ্চিমা সমাজের কারা কারা কোন ধরণের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক ব্যকগ্রাউন্ডের সন্তানেরা আইএসে যোগ দিচ্ছে এনিয়ে পশ্চিমা সমাজগুলোর অভ্যন্তরে বিশেষত ইউরোপের দেশগুলোতে পরিচালিত সামাজিক গবেষণার শেষ নাই। কী ধরণের মানুষেরা বিশেষ করে আইএস সংগঠনে যোগ দিচ্ছে এবিষয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো মিথ্যা দাবি করে – আমেরিকান উচু কদরের দ্বিমাসিক জর্নাল “ফরেন এফেয়ার্স” এর চলতি ডিসেম্বরে প্রকাশিত জানু-ফেব্রু ২০১৬ সংখ্যায় – এক রিপোর্ট করেছে। যারা পশ্চিমা নেতা দেশ- দুনিয়া চালায় ও নীতি নির্ধারক, এমন গুরুত্বপুর্ণ লোকেদের চিন্তা ও পাঠের জন্য জরুরি বলে মনে করা হয় এই জর্নালকে – এই অর্থে এটা প্রেস্টিজিয়াস জর্নাল বলেন কেউ কেউ। যেমন হিলারি ক্লিনটন, ওবামা সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট থাকা অবস্থাতে এখানে লেখা ছেপেছেন। সেই জর্নালে আলোচ্য আর্টিকেলটা লিখেছেন ভারতে জন্ম বৃটিশ নাগরিক কেনান মালিক ()।
মানুষ কেন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শ (র‍্যাডিক্যালিজম) আপন করে নেয় এবিষয়ে মোটা দাগে প্রচলিত চারটা তত্ত্বের কথা তুলেছেন লেখক কেনান মালিক।  সেগুলোর “প্রথম তত্ত্ব বলে – লোকে জঙ্গী হয় কারণ তারা ধর্মীয় অনুমোদন পিছনে আছে  এমন কিছু জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সহজে তাদের  নাগালে আসে, তাই। কেনান বলছেন, কিন্তু বৃটিশ আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগ ২০০৮ সালে MI5 পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে (লিক হয়ে বেরিয়ে পড়া রিপোর্ট) “ধর্মীয় জোশ উন্মাদনায় উজ্জীবিত হওয়া দূরে থাক বরং যোগদানকারীদের বিরাট এক অংশ নিয়মই ধর্মকর্ম পালন করে না”। (• Far from being religious zealots, a large number of those involved in terrorism do not practice their faith regularly. Many lack religious literacy and could actually be regarded as religious novices. ) ওদিকে দ্বিতীয় তত্ত্ব বলে, অন্যান্য জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সাধারণত যেভাবে মানুষে অর্জন করে তা থেকে ভিন্ন ভাবে এরা ভাবাদর্শ লাভ করে। প্রচলিত ধরে নেয়া ধারণা হল এদের ভাবাদর্শ ঘৃণা-ছড়ানী-প্রচারকদের থেকে এসেছে “ideology comes from hate preachers”, তাই। গবেষণায় এর পক্ষেও সমর্থন মিলেনি। তৃতীয় তত্ত্ব বলে, এটা যেন ভারী কিছুকে যান্ত্রিকভাবে বইবার এক কনভেয়ার বেল্ট এর মত; যার শুরু হয়  ক্ষোভ অসন্তোষে মানুষের ঐ বেল্টের উপর উঠে বসা থেকে। এরপর তা এক ধর্মভাবের ভিতর দিয়ে পার হয়ে এমন এক রেডিকেল বিশ্বাসের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয় যা পরিণতিতে সন্ত্রাসবাদে পৌছায়। কেনান বলছেন কিন্তু ২০১০ সালের আর এক বৃটিশ গবেষণা রিপোর্টও কনভেয়ার বেল্ট তত্ত্বকে নাকচ করে বলেছে এটা ভাবাদর্শ বিষয়টাকে অযথা ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখিয়েছে। ……conveyor belt thesis “seems to both misread the radicalization process and to give undue weight to ideological factors.”। আর চতুর্থ তত্ত্ব , এরা বারেবারে বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সন্ত্রাসবাদে যোগদানকারীরা হল সমাজের সেই গ্রুপ যারা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার শিকার। ফলে মানুষ অমন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শকে আপন করে নেয়। কিন্তু কেনান বলছেন, লন্ডনের কুইন মেরী কলেজের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, “সন্ত্রাসবাদীওরা আর যাই হোক এরা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার ভুগা ব্যাকগ্রাউন্ডের জনগোষ্ঠী থেকে আসা কেউ নয়। বরং যারা জিহাদী্ গ্রুপে যোগ দিয়েছে এরা  বয়সে আঠারো থেকে বিশ বছরের মধ্যে, এরা অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান, বাসায় ইংরাজিতে কথা বলে, হাইস্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত; কখন কখনো তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরও। আসলে  তারুণ্য, অর্থসম্পদ ও শিক্ষিত – এ’তিনটাই গুরুত্ত্বপুর্ণ নির্ণায়ক; এমন ক্যটাগরিই সন্তানদের বেশি বিপদজনক”।

কেনান মালিক এভাবে সামাজিক গবেষণার ক্রিটিকগুলো জড়ো করে দাবি করে বলছেন, “পশ্চিমের সমস্যা হল, তারা এইসব পুর্ব-অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাদের আভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী নীতি সাজিয়েছে; যেগুলোর সবই ভুল”। ইউরোপে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক গবেষণার বরাতে কেনান মালিক এবার নিজ বরাতে এর কারণ বলছেন এভাবেঃ “দেখা গেছে যোগ দেয়া বেশির ভাগ তরুণ টিনএজ বয়সের – এই to little interaction with others in the society. Theirs is a much more existential form of alienation. তরুণেরা জিহাদী সন্ত্রাসে যোগ দিবার কারণ হল কিছু একটা তারা খুঁজে ফেরে যেগুলো খুব বেশি বর্ণনা করা যায় না তবু সেগুলো যেমনঃ পরিচয় খুঁজে ফেরা, অর্থ খোঁজ করা, সামিল বোধ করা, সম্মানবোধ করা। আর এটা মোটেও সত্যি না যে হবু জিহাদীরা মুল সমাজের সাথে দুর্বলভাবে যুক্ত থাকে এই অর্থে যে তারা স্থানীয়ভাষা বলতে পারে না অথবা স্থানীয় আদব-কায়দা রপ্ত নাই অথবা সমাজের অন্যান্যদের সাথে আলাপ আলোচনায় অংশ নিতে পারে না বা নেয় না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ত্বমানতাবোধ বিষয়ক এক বিচ্ছিন্নতাবোধ আছে”।

শেষের এই বাক্যটা বলার জন্য লেখক কেনান মালিকের এতক্ষণকার কসরত। “বিচ্ছিন্নতাবোধ”। এই শব্দ ও ধারণা মার্কসবাদীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। বিশেষত সাহিত্যের এস্থেটিকস বা সৌন্দর্যতত্ত্ব চর্চায়। “বিচ্ছিন্নতাবোধ” ধারণাটা সার কথায় বললে, ক্যাপিটালিজম উতপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার এক নতুন ফেনোমেনা হল, এখানে শ্রমিক নিজের উতপাদ্য বা প্রডাক্ট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। নিজ উতপাদ্য, নিজের সৃষ্টির ভিতর  নিজে কোথায় সে অস্তিত্ত্বমান আছে তা খুজে পায় না। অন্তত কোনটা তাঁর শ্রমের অংশ বা ক্রেডিট তা চিনতে পারে না। এথেকে  অর্থাৎ উতপাদন থেকে উতপাদকের বিচ্ছিন্নতাবোধ, এক বিরহ সৃষ্টি হয়। এই অর্থে যে, উতপাদনের আগে বাজার দরে শ্রমিককে শ্রমমুল্য দিলেও তা উতপাদিত পণ্যে হাজির হবার পর ওর বাজার মুল্য আগের মোট সব খরচের চেয়ে বেশি হবে – যেটাকে আমরা মুনাফা বলে ধরে নেই। অর্থাৎ পণ্যের আসল এডেড ভ্যালু  ওর কাঁচামাল, মেশিনারিস ই্ত্যাদির উপর পরিশোধিত শ্রমমুল্য এসবের যোগফলের সমানের চেয়ে বেশি হবে। প্রতিটা উতপাদিত পণ্যের সাথে তৈরি হয় এই বাড়তি মুল্য। এটাই মার্কসের সারপ্লাস ভ্যালু বা “বাড়তি মুল্য তত্ত্ব”। বাড়তি মুল্য থেকে প্রমিক বঞ্চিত হয়ে চলেছে সব সময়। এটাই মুল্য হিসাবে  তা না পাবার কারণে তাঁর বিচ্ছিন্নতাবোধ  অথবা বলা যায় উতপাদিত পণ্যকে নিজের মনে না করতে পারার বিচ্ছিন্নতাবোধ। এছাড়া, কাঁচামাল থেকে  ফিনিশ প্রডাক্ট যত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে  ততই প্রডাক্টের কোন অংশটা কোন শ্রমিকের শ্রমে তৈরি তা আলাদা করা মশকিল হয়ে যাবে। সবমিলিয়ে এক বিচ্ছিন্নতা বা বিরহ বোধের সৃষ্টি হবে। অনেকা যেন বাচ্চা জন্ম দিবার পর কোন কারণে মা বাচ্চার সাথে সম্পর্কিত বা টান বোধ না জাগা ধরণের সমস্যা। মানুষের মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ঠগুলোকে মুখ্য করে সিনেমা বানানো বা সিনেমায় সেগুলোকে আনার ক্ষেত্রে  Rainer Werner Fassbinder নামের এক জর্মন ফিল্মমেকারের কথা অনেকেই জানেন; যিনি এনিলিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধের উপর সিনেমা বানিয়ে খ্যাত।

বুঝা যাচ্ছে, আমাদের আলোচনার কেনান মালিক  আসলে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ তত্ত্বের একজন খাতক। সার করে বললে, কেনান মনে করেন পশ্চিমকে রেডিক্যাল ইসলামি বিপ্লবীর সমস্যার মুখোমুখি  হতে হয়েছে তাদের জিহাদী ভাবাদর্শের জন্য – একথা তিনি মানতে নারাজ। ইসলামি রেডিক্যালিজম এর কোন কারণ নয়। এজন্য নানান গবেষণা ফলাফল হাজির করে তিনি তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তবে তিনি মানেন এক ধরণের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপরের প্রতি টান বা আগ্রহ কমে যাবার সমস্যা পশ্চিমা সমাজে আছে, তৈরি হয়ে আছে  এটা তিনি মানেন।আসলে তিনি ইউরোপসহ পশ্চিমকে এসবের খাস জবাব বিচ্চিন্নতাবোধ দিয়ে দিতে চান, দেয়া সম্ভব দাবি জানাতেই এই রচনা।

তিনি বলছেন,  ইতোমধ্যেই হবু জিহাদীরা প্রধান ধারার সংস্কৃতি, ভাব এবং আচারনিয়ম ইত্যাদিতে ভালভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও তা ত্যাগ করেছে আর এর বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গীর খোঁজে নেমেছে। এটা মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, জিহাদী হতে ইচ্ছুক অনেকে হয় নতুন করে ইসলামে ধর্মান্তরিত নয়ত, মুসলিম যারা দেরিতে নিজেদের ধর্মের দিকে নজর ফিরিয়েছে এমনও আছে। তবে উভয় ক্ষেত্রে তাদের সমাজ নিরাসক্ততা, বিচ্ছিন্নতা তাদেরকে সাদা-কালো ভাবে মরাল কোডের চরম ইসলামিজমের দিকে ঝুকিয়ে ফেলেছে। ফলে “এটা ঠিক কোন রেডিক্যাল ভাবাদর্শের বিষাক্ত করে ফেলা নয় বরং এটা অবশ্যই সমাজের প্রচলিত প্রধান ধারার মরাল কাঠামোর প্রতি অনাস্থা এবং একই সাথে এক বিকল্পের খোঁজে লেগে পরা”। কেনন বলছেন, “অতীতে সমাজের প্রধান ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন সহানুভুতিহীন মানুষ রাজনৈতিক রূপান্তরের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, চরম বাম ধারা থেকে শ্রমিক আন্দোলন অথবা কোন রেসিজম- বিরোধী আন্দোলন এমন অনেক কিছুতেই যোগ দিয়েছেন”। ফলে কেনন বলছেন, স্বভাবতই সামিল থাকাহীনতা, সংশ্লিষ্টহীনতা বোধ, “এটা কোন মুসলিম সমস্যা নয়”। মুসলিম সমস্যা বলে ালিয়ে দেয়া যাবে না।

কেননের মুখে মুসলমানেদের দায়ী না করে দেখে – এটা দেখে আমাদের ঠিক খুশি হবার কিছু নাই। আর কেনন কারণ মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন পশ্চিমের বিশেষত ইউরোপের শত শত মুলত টিনএজ তরুণ আইএস এর মত সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এটা আশির দশকে পপুলার বিচ্ছিন্নতাবোধ বা এলিনিয়েশন বা (মানুষ বা শ্রম তার উৎপাদিত উৎপন্নের ভিতর নিজেকে খুজে পায় না) তত্ব দিয়ে একালে আর ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সস্তা একপেশে এবং বস্তুবাদী। এটা অর্থনীতিবাদী বা স্টালিনিস্ট ধারণাও বটে। কারণ ‘আধুনিক রাষ্ট্রে’ মানুষ (বা তাঁর শ্রম) যেমন নিজের বস্তুগত সৃষ্টির থেকে বিচ্ছিন্নতা বোধ করে, এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় ঠিক একইভাবে মানুষের প্রতি মানুষের স্পিরিচুয়াল টান অনুভব, সকলের সাথে একই তৌহিদে মিলিত হবার আকুতি ও আকাঙ্খাও তাঁর ভিতর কাজ করে। এরও এক অভাব বোধ হয়। কারণ মানুষ শুধু শ্রমের এক আধার, বৈষয়িক অর্থনীতির এলিমেন্ট মাত্র নয়; বরং একই সাথে সে স্পিরিচুয়াল বিয়িং। সকল অপরের সাথে সম্পর্কহীনতা – এই অভাব মানুষের মধ্যে এক হাহাকারের জন্ম দেয়, সে অস্থির হয়ে উঠে, দমবন্ধ লাগে। এটাও আর এক চরম বিচ্ছিন্নতাবোধ। অতএব বিচ্ছিন্নতাবোধ মানেই কেবল বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ নয়; স্পিরিচুয়াল বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্ভবত প্রভাবে এর দিক থেকে বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ এর চেয়েও বড়। এদিকটাই কেনান মিস করেছেন। তিনি আশির দশকে পড়ে থাকতে চাইছেন। কেননের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে আমাদের এই সমালোচনা আরো জায়েজ মনে হয় এজন্য যে তিনি এরপরে লিখছেন, “একালের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যে মানুষের নিরাশক্তবোধ, রাজনৈতিকভাবে স্বরবিহীন থাকা অবস্থা ছেয়ে গেছে। এধরনের উদ্বেগ ও অভাবগুলোকে কোন চার্চ বা ট্রেড ইউনিয়ন বুঝবে না”। অর্থাৎ কেনান একালে ২০১৫ সালে এসে এখনও বস্তবাদ-সর্বস্ব “এলিনিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ” তত্ত্ব আউড়িয়ে সব রোগ সারানোর ধনন্তরি ওষুধ মনে করতে চাইছেন। বিচ্ছিন্নতা্বোধ চার্চ, মসজিদ মন্দির – বলে নজর আন্দাজ করতে চাইছেন। আমাদের দেশে “বিরহ” বলে গানের ধারা আছে; ময়মনসিংহ থেকে মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া ইত্যাদি। যারা আমাদের এলিনিয়েশন ত্ত্ত্ব বুঝবার নাগাল পাবার অনেক আগে থেকে স্পিরিচুয়াল আবহে “বিরহ” গান করে আসছে।

কেননের এই রচনার ছোট শিরোনাম “ইউরোপের বিপদজনক মাল্টিকালচারালিজম”। অর্থাৎ ভারতীয় অরিজিনের বৃটিশ  নাগরিক হলেও তিনি বৃটিশ মাল্টিকালচারালিজম নীতির সমালোচক। আবার এটাই তাঁর একই নিশ্বাসে ইউরোপের ফ্রান্সের ক্ষেত্রে ফরাসি এসিমিলিয়েশন বা ‘সবাইকে একরকম করণ’ নীতির পক্ষে দাঁড়ানো। আসলে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন – কথা দুটোরই কোন সারবত্তা নাই। তবুও বুঝবার জন্য শব্দদুটোর অর্থ খোলসা করা দরকার। মাল্টিকালচারালিজম বলতে বৃটিশ বুঝটা হল – বৃটিশ সমাজটাকে সে নানান কমিউনিটির মিলিত এক বড় কমিউনিটি হিসাবে রাখতে, দেখতে চায়। বৃটিশ কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে কলোনি প্রজা দেশ থেকে আসা সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই “উপরি এক বৃহত্তর বৃটিশ সমাজের”নিচে এক বৃটিশ পরিচয়ে বড় হোক; এটাই চায়। বিপরীতে ফরাসী পছন্দের এসিমিলিয়েশন (এক ছাঁচে ঢালাই করার নীতি) শুনতে ভাল লাগলেও কিন্তু আসলে অনেক বেশী বলপ্রয়োগে জবরদস্তি করে নাগরিক সবাইকে একরকম করণের প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ এখানে আর ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নাই। বরং সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা ফরাসীরা আড়ালে রাখতে চায় বা থেকে যায়। সবাইকে “সুন্দর” ইউনিফর্ম একরকম করার নামে (ইংরাজি সিমিলার বা একরকমকরণ থেকে এসিমিলিয়েশন ) জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা। যতটুকু ও যেভাবে বর্ণনা করলাম তা থেকে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন এর ভিন্নতা্র সবটা বুঝা বা বুঝানো যাবে না। কারণ এসব ভারি কথার আড়ালে মুল আরও এক বিষয়কে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রথম কথা হল, পশ্চিম মাইগ্রেন্ট শ্রমিকের আমদানি ঘটায় একেবারে একমাত্র নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে, সস্তা শ্রম পাবার স্বার্থে, সবসময় এটাই সে করে এসেছে। নইলে লো-স্কিল না নো-স্কিল লেবার নিতে হত কেবল নিজ দেশীয় চামড়া থেকে ফলে এর মুল্য কমপক্ষে দ্বিগুণ তাদের যোগাতে হত। ফলে একমাত্র সস্তা মাইগ্রেন্ট শ্রমিক পাবার স্বার্থেই তাকে নিজের সমাজে এসব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” বলে বকোওয়াজের জন্ম দিতে হয়েছে। এটা প্রথম সত্য। তবে নিজ অর্থনীতি সমৃদ্ধিতে ভাল চলা অথবা মন্দা হয়ে চলার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্য চামড়ার শ্রমিক কতজনকে আসতে সে অনুমতি দিবে এটা সময়ে সময়ে তাকে কড়া নিয়ন্ত্রণে করতে যেতে হয়। অর্থনীতি ভাল মানে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন নইলে উলটা হলে সব খেদাও – এটাই হল আসল নীতি। সবারই নীতি তবে দোষ দেয়া হয় তথাকথিত ডানপন্থি্র।

এরপর দ্বিতীয় আর এক আজব সত্য হল, কলোনি দখলের ফেলে আসা বছরগুলোতে  কপাল গুণে বৃটিশের কলোনির তুলনায় ফরাসি কলোনির বাসিন্দারা বেশির ভাগই মুসলমান বা ইসলাম ধর্মপালনকারী। এরফলে কলোনি প্রজা দেশ থেকে সস্তা শ্রমের মধ্যে মুসলমান প্রজার হার ফ্রান্সের বেলায় বেশি। তাই সস্তা শ্রম ঢুকার অনুমতি দিতে গিয়ে একই ইউরোপে বৃটিশ ও ফরাসী হয়েও তাদের নীতি ও অভিজ্ঞতা একই রকম নয়। এভাবে ফ্রান্সে মুসলমানের সংখ্যা বলা হয় ৫০ লাখ। এসব তথ্যের দিকে নজর করে আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ফরাসী সরকার পছন্দ করেছে – এসিমিলিয়েশন নীতি। কারণ এসিমিলিয়েশনের কথা বলে স্কার্ফ হিজাব বা কোন মুসলমান চিহ্ন প্রকাশিত হওয়া ঠেকিয়ে দেয়া যায়। ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি যেকোন পরিচয় বা চিহ্ন ভুলে গিয়ে সব কিছু ফরাসি হতেই হবে বলে বাধ্য করা যায়। অতএব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” – ফরাসি না বৃটিশ কোনটা ভাল – এসব কথা তাই আসল কথা লুকিয়ে বকোওয়াজ।

তাহলে কথা দাড়ালো, সস্তা শ্রম থেকে বেশি মুনাফার লোভে ক্যাপিটালজম কলোনি প্রজা দেশ থেকে শ্রম আনতে বাধ্য। আবার সেই শ্রম কে কীভাবে ম্যানেজ করার সুবিধা দেখে সে ভিত্তিতে “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর কূটতর্কও সে হাজির করবে। কারণ নইলে আসল কথাগুলো সরাসরি বলতে হবে। কেনান মালিক তবু “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর ভুয়া তর্কের মধ্যে “মাল্টিকালচারালিজমকে বেশি বিপদজনক বলছেন। কারণ বৃটিশরা নাকি “মাল্টিকালচারালিজমের কথা বলে মুসলমান ধর্মীয় নেতাদেরকে কমিউনিটির প্রতিনিধি মনে করেন ভুল করে, বেশি গুরুত্ব দেন; ইত্যাদি। কেনানের কথা শুনে বৃটিশদেরকে বোকা ভাবার কোন অর্থ নাই। আবার বৃটিশদের নীতিটা বেশি ভাল তাও নয়। ব্যাপারটা হল ম্যানেজমেন্ট। নাগরিকদের বা অপজিশনকে লিবারেল স্পেসের মধ্যে রাখলে তাদের কথা বলতে দেয়া, বিরোধীতা করতে দেয়ার আইনি সুযোগ যতটা সম্ভব বেশি রাখলে তাদের সকলের বিরোধীতা সামলে রাখা তুলনামুলক সহজ হবে বলে মনে করা হয়। বৃটিশ প্রশাসন মনে করে এই লিবারেল নীতি তাদের জন্য বেশি ফলদায়ক হচ্ছে। আর ধর্মীয় নেতার প্রসঙ্গটা হল, ধর্মীয় নেতারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বী কোন নেতার চেয়ে বেশি প্রভাবশালি হন তাহলে বৃটিশ প্রশাসন কী তা অস্বীকার করার মত বোকামি করতে পারে? বরং একথা বলাতে কেনানের কথায় ইসলাম বিদ্বেষের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কেনান মালিক নিজেই বলেছেন “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” দুটোর মধ্যেই ভাল মন্দ দুটাই আছে। তবু কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি শিরোনামে “মাল্টিকালচারালিজমকে” বেশি বিপদজনক বললেন। এথেকেও মনে করার কারণ রয়েছে যে তিনি ফরাসিদের মত ইসলাম-বিদ্বেষ জারি রাখার সুযোগটা হারাতে চান না।

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২১ ডিসেম্বর তারিখে। অনেক জায়গায় অপুষ্ট বা সংক্ষিপ্ত রেখেই তা ছাপতে হয়েছিল। এখানে সেসবের অনেক কিছু পরিপূরণ করে, সংযোগ ও সম্পাদনা করে আবার এখানে ছাপা হল। ]