করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

গৌতম দাস

 ১৬ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2UI

_

 

 

করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি আসলে দুই পরস্পরের বিরোধী ফেনোমেনা। মানুষে মানুষে সব ধরণের যোগাযোগ-লেনদেন-সম্পর্কই (কমিউনিকেশন) কোন অর্থনীতির মুল কথা। অথচ করোনাভাইরাস হাজির হচ্ছে ঠিক এর উল্টা দাবি নিয়ে যে – কমিউনিকেশন সীমিত করতে হবে, পারলে বন্ধ করে দিতে হবে – যদি ভাইরাসের বিস্তার বা নতুন সংক্রমণ বন্ধ ও ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই।  তাই আমরা এখন এমন এক কালে যে করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি এদুই পরস্পরবিরোধী ফেনোমেনার ভিতরে আমাদের বসবাস।

‘করোনাভাইরাস’ শব্দটা এখন আর কোন একটা শহরের “টক অব দ্য টাউন” নয়, বরং এটা এখন “টক অব দ্য গ্লোব”‘; বিশ্বের আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ঘটনার শুরু গতবছরের ডিসেম্বরে, চীনের য়ুহান [Wuhan] শহর থেকে।  ইতোমধ্যে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ আমরা পার হয়ে এসে পড়েছি। এই হিসাবে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বা ছড়িয়ে পড়ার তৎপরতার ‘বয়স’ মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের।  আলজাজিরা টিভির ওয়েব সাইটে একটা ঘটনা-কালপর্ব তৈরি করা হয়েছে। সেটা অনুসারেও, করোনার বিস্তার মাত্র গত তিন মাসের ঘটনা। সেখানে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসঙ্ঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানতে পারে, চীনের য়ুহান শহরে অপরিচিত এক ধরনের ‘নিউমোনিয়া’ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

এটাকেই শুরুতে চীনাদের তরফে “নিও করোনাভাইরাস” বলা হয়েছিল। এখন জাতিসঙ্ঘের দেয়া এরই আন্তর্জাতিক নাম হল কোভিড-১৯ [COVID-19]; মানে করোনাভাইরাস ডিজিজ-২০১৯। কোনো রোগ ছড়ানোর ঘটনা কেবল একটা পাড়ার কোণে ছড়ালে ও সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে একে ইংরেজিতে ‘এন্ডেমিক’ [Endemic] বা স্থানীয় রোগ বলা চলে। আর সেটা একটা শহরে অথবা একই দেশের পরস্পর লাগোয়া বা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কয়েকটা শহরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে এমন ঘটনাকে এপিডেমিক [Epidemic] বা ‘মহামারী’ বলি আমরা। নিও করোনাভাইরাসকে জাতিসঙ্ঘ ‘প্যানডেমিক’ [Pandemic] বা বিশ্ব-মহামারী বলে ঘোষণা করেছে। কারণ এ পর্যন্ত ১৫৩টার মতো রাষ্ট্রে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। যদিও এমন নাম দেওয়ার ব্যাপারটা সবটাই টেকটিক্যাল নয়, এসব নামকরণে একই সাথে  জড়িয়ে থাকে নানান রাজনৈতিক বিবেচনাও ।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই রোগের মূল বৈশিষ্ট্য হল – এটা ছোঁয়াচে, মানে মানুষের পরস্পরের ছোঁয়াছুঁয়িতেই (যেমন কোলাকুলি বা হ্যান্ডশেক) এটা অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে বা প্রবেশ করতে পারে। তবে একেবারেই শুকনা ধরনের ছোঁয়াছুঁয়ি নয় বরং ড্রপলেট [droplet] বা জলীয়বাষ্প-কণা ধরনের (হাঁচি-কাশিতে বের হওয়া) সংস্পর্শ সেখানে থাকতে হবে। আসলে  দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এমন কোন রোগের মানেই হল সেটা ছোঁয়াচে। তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ এ ধরনের রোগের জীবাণুর ছড়িয়ে পড়া উপস্থিতি সেখানে আছে।

নিও করোনার এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া থেকে অনুমান করা হয় যে, একালের দুনিয়ায় এটা হতে পেরেছে মূলত তিনটি বৈশিষ্ট্যের কারণে। যেমন এটা ‘কন্টাজিয়াস” [Contagious]’ মানে, সংক্রামক বা ছোঁয়াচে। দ্বিতীয়ত, করোনা এক নতুন ভাইরাস আক্রমণ থেকে আসা রোগ বলে এর কোন ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক ওষুধ এখনই মানুষের কাছে নেই। তাই এর ছড়িয়ে পড়াকে থামানো যাচ্ছে না। আর তৃতীয় কারণ-বৈশিষ্ট্য হল, একালে এটা গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়, এই বাস্তবতার যুগ। আমরা আসলে এখন দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া বা পড়া পণ্য-লেনদেন-বিনিময় ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করেছি, সেখানে কোনো উৎপাদনই আর স্থানীয় নয়। মানে ওই উৎপাদিত পণ্যের আসল বা শেষ-ভোক্তা বহু দূরের কোথাও- দুনিয়ার অন্য কোন কোণে বাস করতে পারে। তাই কেবল একই দেশে তো নয়ই, সেটা বরং অন্য মহাদেশে তো বটেই এবং দুনিয়ার একেবারেই অন্য কোনো প্রান্তে হওয়ারই সম্ভাবনা। যেমন, আফ্রিকার উগান্ডার কোনো গ্রামে বাংলাদেশের কেয়া সাবান কিনতে পাওয়া যাচ্ছে দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই এখন স্বাভাবিক। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আবার এক্ষেত্রে আরো ‘বিশেষ’ হয়ে উঠেছে, কারণ এ ভাইরাসের উৎস দেশটা চীন – দ্য রাইজিং চায়না। আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন আসন্ন নেতা।

চীনের বিপুল পুঁজি ও এর বিনিয়োগ সক্ষমতা অথবা চীনে তৈরি করা কাঁচামাল বা পণ্য অথবা চীনের বাজারে অন্যদের পণ্য বা প্রবেশ- এসব কিছু মিলিয়ে একালে এটা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ; পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কে আমরা পরস্পর সব রাষ্ট্র এতে জড়িয়ে গেছি বা আছি। সারকথাটা হল, একদিকে গ্লোবাল অর্থনীতির অভিমুখ হল গ্লোবাল হয়ে উঠা লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক আর অন্যদিক এই করোনা ভাইরাস বলছে এই ভাইরাসের অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে গেলে সব কমিউনিকেশন বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। করোনা আর অর্থনীতি এই দুই বিপরীত পথ ধরেছে।

একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমাদের গ্লোবাল হয়ে ওঠা পণ্য-লেনদেন-বিনিময় সম্পর্কের কথা এখানে যেমন বলছি, তেমনি এর উল্টো পরিস্থিতি বা ধারণাটা হল, গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়ের ব্যবস্থাটাই আবার ঢলে পড়া বা শ্লথ হয়ে পড়া- যেটাকে রিসেশন [recession] বা ‘মহামন্দা’ বলা হয়- তেমনটাও ঘটা স্বাভাবিক। আর ১৯৩০ সালে তা ঘটেছিল, যাকে প্রথম গ্লোবাল মহামন্দা বলা হয়। সময়টা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, প্রায় ২১ বছরের এমন বিরতির কালে। এই মহামন্দার মূল কারণ বা দায়ী ছিল ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই; বিশেষ করে অন্তত কলোনি দখলদার রাষ্ট্রগুলো যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নিজ নিজ খরচ, এই বিপুল ব্যয়ভার মিটাতে গিয়ে নিজ নিজ আয়ের চেয়ে ছাড়িয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। তাই যুদ্ধ শেষে সেই ঘাটতিটা পূরণ করতে চেয়ে পরিকল্পিত মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছিল প্রত্যেক রাষ্ট্র। এতে সবাই নিজ নিজ মুদ্রার মূল্যমান ফেলে দিয়ে রফতানি-বিক্রি বাড়ানোর জন্য  পরস্পর আত্মঘাতী এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। এর সামগ্রিক প্রভাব ও ফলাফলই হল ঐ মহামন্দা। আবার এখান থেকে বের হতে গিয়ে, হিটলারি-জাতিবাদকে মুখে পড়েছিল তারা।  আবার সেটা ঠেকাতে গিয়েই আরো বড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া- এভাবে এক ধারাবাহিক চক্রে পড়ে ইউরোপ নিজের সব ইতিবাচক সক্ষমতা বা সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছিল।

এই পরিস্থিতির সমাধান হিসাবে যুদ্ধশেষে এখান থেকেই আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের জন্মের সময় তাদের কর্মসীমা বা ম্যান্ডেটে যে মুখবন্ধ লেখা হয়েছিল তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল, ১৯৩০ সালের মত মহামন্দা আবার যাতে দুনিয়াতে না আসে তা ঠেকানোও এ দুই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য হবে। তবুও অর্থনৈতিক মহামন্দা দুনিয়ায় আবার এসেছিল ২০০৭ সালের শেষে আর ২০০৮ এর শুরুতে। বলা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের দ্বিতীয় ও শেষ জমানায় শুরু হয়ে পরের প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ সব প্রেসিডেন্টকেই এর ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল। এখনো হচ্ছে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত রিসেশনের ভয় ও প্রভাব দুনিয়া থেকে আর কখনো যায়নি, এভাবেই দিন কাটছে।

তবে ২০০৭ সালের যে মহামন্দা, সেখানেও মূল কারণ কী ছিল? আসলে তখনও কারণ একই, রাষ্ট্রের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলা। কিন্তু কেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ২০০১ সালে শুরু করেছিলেন আফগান-ইরাক দখলের যুদ্ধ; যেটাকে আমেরিকা নিজের ইজ্জত ঢাকতে, পর্দার আড়ালে ফেলতে বলে থাকে ‘ওয়ার অন টেরর’, বা সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও এক পর্যায়ে আমেরিকার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। আর এর চেয়েও আরেকটা বড় বিষয় ছিল, আমেরিকা এই যুদ্ধে জয়লাভের অযোগ্য তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।  ফলে তা হয়ে পড়েছিল সমাপ্তির টার্গেটবিহীন এক অনন্ত যুদ্ধ। অথচ এমন যুদ্ধের খরচ বইবার সামর্থ্য আমেরিকার অর্থনীতির ছিল না। তাই আমরা স্মরণ করতে পারি পরের প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্তকে। আফগান যুদ্ধ কবে শেষ হবে সেই টার্গেট থেকে নয়, বরং আমেরিকান অর্থনীতি কষ্টেসৃষ্টে হলেও সর্বোচ্চ কত দিন যুদ্ধের ব্যয় বইতে সক্ষম হতে পারে বা বহন করা ঠিক হবে- এই ভিত্তিতে টার্গেট ঠিক হয়েছিল যে যুদ্ধে জয়লাভ আসুক আর না আসুক, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব মার্কিন সৈন্য ফেরত আনতেই হবে। এভাবেই যুদ্ধের খরচ থামানোর প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছিলেন ওবামা। আর এই চলতি বছরে এবার আর একটা ধাপ শেষ করার জন্য  ট্রাম্প আফগানদের সাথে চুক্তি করল। তবে আমেরিকার আর সঙ্গী ইউরোপের যারা ভেবেছিল লোভ-লিপ্সার কথিত যুদ্ধজয়ের থেকে উচ্ছিষ্ট কিছু নিজের ভাগেও আসবে, সেটারও তেমন কোনকিছু না হওয়াতে তাদের অর্থনীতিও একই সময়ে মহামন্দায় বিপর্যস্ততার মুখে পড়েছিল। কিন্তু যে কথাটা বলার জন্য এখানে এত আয়োজন, তাহল – ঐ ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার ধাক্কা প্রধানত লেগেছিল আমেরিকা-ইউরোপে, মানে পশ্চিমা দেশে। অন্য মহাদেশে তেমন নয়। এমনকি সেকালের ক্রমশ দৃশ্যমান, উত্থিত (১৯৯০-২০১০ বিশ বছরের রাইজিং চীন) হতে থাকা চীন – এই চীনের উপর ঐ মহামন্দার পরোক্ষ প্রভাব কমই হয়েছিল। আমাদের এশিয়াতেও এর প্রভাব হয়েছিল আরো কম। কেন?

এর সোজা অর্থ-তাতপর্য হল, তত দিনে পশ্চিমের সাথে এশিয়ার পণ্য-বিনিময় লেনদেন সম্পর্ক হাল্কা হতে শুরু হয়ে গিয়েছিল; আবার অন্যদিকে চীনের  সাথে এশিয়ার প্রায় সকলের নতুন করে ততটাই সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাই।

আমরা আসলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি একটা ইকোনমিক গ্লোবালাইজেশনকে, অন্য ভাষায় পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক গ্লোবাল হয়ে ওঠার ফেনোমেনাটাকে। মনে রাখতে হবে, গত শতকের (১৯০০-৯৯) শেষ অর্ধেক মানে ১৯৫০ সালের পর থেকে, বিশেষ করে শেষ বিশ বছর (১৯৮০ থেকে) ছিল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কের (এই প্রথম) ব্যাপক গ্লোবাল হয়ে পড়ার দিকে বিকশিত হতে শুরু করারই সময়কাল। আমাদের গার্মেন্টেসে উত্থানও সে কালেরই ঘটনা। পরে নতুন শতকের শুরু থেকেই আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো পশ্চিমের চেয়ে বেশি করে, চীনের অভিমুখী হওয়া শুরু করেছিল। আমাদের মত দেশ বা চীনের উপর গত ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার প্রভাব তেমন না পড়াকে সম্ভবত এভাবেই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

মূলত কোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতি ব্যর্থ হলে ওর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অর্থনীতিতেও কতটা ধস নামে এর মাত্রাটাই বলে দেয় যে, আমরা ওই ধসনামা রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে কত গভীরে জড়িয়ে আছি।

কিন্তু এবার, করোনাভাইরাসের কালে?
এত দিনে এশিয়া তো বটেই, পশ্চিমও এখন চীনের সাথে অনেক অনেক বেশি গভীর সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে ও রয়েছে। তার প্রধানতম চিহ্ন-লক্ষ্য হল, দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা অর্থনীতির সারপ্লাস (surplus) এখন সঞ্চিত (accumulation) হওয়ার প্রধান অভিমুখ ও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে চীন। যা তিন ট্রিলিয়নেরও বেশি। এই সারপ্লাসেরই আরেক নাম ‘পুনঃবিনিয়োগ সক্ষমতা’; যে সক্ষমতা আছে চীনের। ইউরোপও চীনা উত্থানের সাথে যুক্ত হয়ে পড়তে বেল্টরোডে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে আগানো শুরু করে দিয়েছে। আবার তাই আমরাও অন্তত এশিয়ার সবাই এখন আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো প্রধানত চীনমুখী করে ফেলেছি বা করতে বাধ্য হয়েছি।  এই চীনা-নির্ভরশীল হয়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠার একটা আরেক বড় কারণ আমাদের সব উৎপাদনেরই কাঁচামালের পুরোটাই বা অন্তত কোনো-না-কোনো একটার নির্ভরযোগ্য উৎস – সেটি মূল্যের দিক কম হওয়া থেকে বা সহজ নির্ভরযোগ্য প্রাপ্যতার উতস চীন হাজির হয়েছে বলে  – এটা  প্রধানত এখন চীন।

তাই সার কথায় করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আমাদের- অন্তত এশিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে; স্থবির করবে বা থামিয়ে দেবে। যেমন চীনা কাঁচামাল বা তৈরি করা পণ্যের ভোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের বাজারে তাই বাজারের ভাষায় ‘সাপ্লাই বন্ধের’ আওয়াজ উঠা শুরু হয়েছে।  সবার মুল জিজ্ঞাস্য যে এমন সাপ্লাই বন্ধ অবস্থা কতদিন সহ্য করতে হতে পারে?  কারণ এই স্থবির পরিস্থিতি আরও ছয়মাসে বেশি হলে তা আমরা সম্ভবত আর সহ্য করতে পারব না। বিকল্পের জন্য মরিয়া হয়ে যেতে হবে।

ওদিকে ভারতের অবস্থা আরো কাহিল। ইন্ডিয়ান মিডিয়া বলছে, সাধারণভাবে চীনা-বিকল্প হাতে পাওয়ার দিক থেকে ভারতের হাতে অপশন খুবই কম, প্রায় নেই [India doesn’t have too many options to deal with economic impact of coronavirus]। যেমন ভারতের ওষুধ কোম্পানির ব্যবসা কাঁচামালের দিক থেকে বলতে গেলে পঞ্চাশ ভাগের মতো উৎস হলো চীন। ফলে ব্যাপক নির্ভরশীলতা চীনের ওপর। ভারতের সব পণ্যের মোট আমদানির ১৪ শতাংশের উৎস চীন। [more than half of India’s imports in 19 categories come from China……] আর ১৯টা আমদানি আইটেমের ৪০ শতাংশের আমদানি উৎস চীন। ভারতের ক্ষেত্রে এসব কিছুর মূল কারণ চীনা পণ্য দামে সস্তা হওয়া।

আসলে করোনাভাইরাস এমন অনেক অপ্রকাশ্য বাস্তবতাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরছে। ভারতীয় দেশপ্রেম বলে বেড়ায় যে সে মনে করে চীন তার প্রধানতম শত্রু। যে রাষ্ট্রের সাথে আগামিতে ভারতের সম্ভাব্য যুদ্ধ লাগতে পারে সেটা চীন।  তাই যদি ভারতের বিশ্বাস, অনুমান হয়ে থাকে তাহলে সেই ভারত কোনভাবেই  চীনের কাঁচামালের উপরই ভারতের আভ্যন্তরীণ ওষুধের প্রাপ্যতা চরম নির্ভরশীল করে নিজেকে সাজাতেই পারে না। কথাই নয়। এর মানে এসব সস্তা দেশপ্রেম ছেদো মানে এতে বড় ছিদ্র আছে তা বলাই বাহুল্য। তাহলে ঘটনাটা আসলে কী? খুব সম্ভবত ব্যাপারটা হল, ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতে হেরে যাওয়ায় ও তাতে ভারতের পুরা নর্থ-ইষ্ট আসাম পার হয়ে চীনাসৈন্যের ভিতরে  ঢুকে পড়েছিল। আর এসবেরই নীট ফলাফল হল এক ট্রমা; চীনের সাথে আবার হেরে যাবার এক ভীতিজাত এই ট্রমা । ফলে চীনেওর সাথে কোন যুদ্ধে জিতার চেয়ে এই ট্রমা ভারতীয়-মন থেকে দূর করার উদ্যোগ নেয়া – এটা কম গুরুত্বপুর্ণ নয়! সে যাই হোক!
আমার এখান থেকে এই প্রশ্নও উঠে যে একালের পোষ্ট কোল্ড ওয়ার যুগের  ব্যাপক গ্লোবাল  বাণিজ্যিক সম্পর্কের দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শত্রুতার ধারণা আগের মত থাকা, বাণিজ্য নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলা – সেটা আর বজায় রাখা সম্ভব নয় সম্ভবত! এটা স্বীকার করে নিতে হবে!

[ইতোমধ্যে আমরা দেখছি “সার্ক ভিডিও কনফারেন্স” বলে এক নতুন লোক হাসানো শুরু হয়েছে। প্রথমত ভারত বহু আগে থেকেই সার্ককে [SAARC] কবর দিয়ে রেখেছে। সেটা শুধু নিজের মন থেকে না, লিখেও বলে থাকে ভারতের বিদেশ বিভাগ। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন [ORF] এক ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাংক।  বাংলাদেশে ভারতের এক  রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী চাকরি শেষে সাবেক হওয়ার পরে এখন এই প্রতিষ্ঠানের এক ফেলো ও সংযুক্ত। কলকাতার অভাবের সংসারের কোন এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত সাধারণত যে ভাষায় কথা বলে সেই একই ভাষায় কটু কথা বলতে তিনি ভীষণ পারদর্শী। গত ২০১৬ সালে তিনি  অ-কুটনীতিক ভাষায় সার্কের বিরুদ্ধে অজস্র বমি উগলেছিলেন।  বিরাট শখ কিন্তু সাধ্য নাই অথবা  কেউ-মানে-না এমন কোন মোড়লের ভাষায় তিনি বলেছিলেন – সার্ক মৃত। ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন”। সেকালে ভারতের বিদেশ বিভাগও এই লাইনে অনেক কাজ ও ভুমিকা রেখেছিল। সে সময়ে আমাদের সাংবাদিকদের একটা দল ভারত সফরে গেলে পিনাক রঞ্জন তাদেরকে প্রকাশ্যে গর্ব করে জানিয়েছিল, সার্ক ভুলে যেতে, সার্ক মৃত। সার্ককে তো ভারত এতদিন বাস্তবতই মৃত করে রেখেছিল। মূলত মোদীর বিজেপি আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলমানবিদ্বেষী ও পাকিস্তানবিরোধী হাওয়া তুলে ভোট যোগাড় – এই নীতি ফলো করতে গিয়েই সার্কের বিরুদ্ধে কামান দেগেছিল। আজ হঠাত মোদীর আবার সেই সার্কের ভক্ত হয়ে উঠা এটা যেন পিনাক রঞ্জনের উগরানো বমিকেই আবার উঠিয়ে গিলে খাওয়া বললেও কম বলা হবে। সার্কের বিরোধী হবার ভারতের মূল ইচ্ছার কারণ হল পাকিস্তানকে বাদ দেয়া বা পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে অন্যভাবে জোট গড়ে তোলা।  এছাড়া একালে সদ্য দিল্লি ম্যাসাকার ঘটানোর পরে মোদী যখন বিদেশিদের সাথে কোন আসরে বসার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কটে আছে তখন ভারতের সাথে তাল দেওয়া আমাদের কাজ হতে পারে না।  ভারতের এধরণের পিছলে চলার সাথে আমাদেরকে কেন তাল দিয়ে চলতে হবে অথবা কেনই বা হল সেটা বাংলাদেশের সরকার অথবা কারও কাছে পরিস্কার বলে মনে হয় না। এটা আমাদের সরকারকেই নতুন বিপদে বা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে নিয়ে যাবে তা মনে করার কারণ আছে।]

তাহলে বাস্তব ভাইরাস পরিস্থিতিতে এখান থেকে বের হওয়ার পথ কী? আশার আলো কী? যদি ভাইরাসের প্রতিষেধক পাওয়া যাবে কি না বা সেটি কবে – এটা একটা আশার আলো হিসাবে মনে করে থাকি তবে এই প্রশ্নের জবাব হলো চলতি বছরে তা হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তবে দ্বিতীয়ত, আরেক পথ-সম্ভাবনার চিহ্ন হল, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বেড়েচলার একটা চরমকাল থাকে যারপর থেকে এতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেখা যায় কমতে শুরু করে – সেই পিক টাইম [Pic time] বা চরমকাল কবে অথবা তা কী ইতোমধ্যে আমরা ছেড়ে এসেছি? এটা জানার জন্য অনেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কারণ মানুষের মধ্যে সেলফ রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়া শুরু হলে অন্তত একটা সময় গোনা শুরু করা যায় যে, য়ার কত দিনে রিকভারি বা ক্ষতি থেকে বের হওয়া সম্ভব! চীনা সরকার এ ধরনের একটা ধারণা-ইঙ্গিত এখনই দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে এটা চীনা এই ইঙ্গিত আস্থার সাথে গ্রহণ করা যায়,  তাতে দেশী-বিদেশী লোকেরা আস্থা এখনো রাখতে পারেননি। তারা কথাটা বরং আরও  নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে শুনতে চেয়ে অপেক্ষা করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশের চীনা রাষ্ট্রদূত আবেদন রেখেছেন, বাংলাদেশের অন-অ্যারাইভাল ভিসা যেটা দেয়া সাময়িক বন্ধ রেখেছে আমাদের সরকার সেটা যেন আবার আগের মত চালু করা হয়। বলাই বাহুল্য, এটা টু আর্লি বা ‘খুব তাড়াতাড়ি’ হয়ে যায়। সম্ভবত এই বিবেচনায় বাংলাদেশও তাতে সাড়া দেয়নি। চীনে করোনাভাইরাস আক্রমণের চরম সময় পেরিয়েছে কি না সেটা জানতে পারা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেটি জানা যায়, তবুও পরবর্তী ছয় মাসের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।

আমাদের জন্য এখন প্রধান সমস্যাটা হল – জনসমাবেশ ঘটাতে হয় এমন কোনো কিছুই এই ভাইরাস অনুমোদন করে না। কারণ নুন্যতম জনসমাবেশ এই ভাইরাসের বিস্তারের জন্য খুবই সহায়ক। অথচ যেমন, পঞ্চাশজনের একই বাসে ভ্রমণ বা দেড়-দু’শজনের বিমানে ভ্রমণ, স্কুলের ক্লাসে বা কারখানার কাজে কিংবা বাজারে, স্টেশনে যেকোনো ছোট জনসমাবেশই এ’কারণে বিরাট ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। অথচ এমন ঝুঁকিগুলো এখনো আমরা নিচ্ছি।  আর এই কারণেই সব মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতি বিরাট ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। এর মধ্যে আবার আমাদের গার্মেন্ট কোম্পানিগুলোকে ইউরোপের বায়ারদের ধীরে চলতে বলা নিঃসন্দেহে আরেক খারাপ লক্ষণ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ১৪ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে করোনাভাইরাস ও অর্থনীতি – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব 

ভারতে হচ্ছেটা কী?
প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব!

গৌতম দাস

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Tr

 

‘Are you Hindu or Muslim?’: TOI photojournalist

সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু কেউ আমল করে নাই। সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
ঘটনা হল, টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিউটিরত এক ফটোসাংবাদিক অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে দিল্লিতে বজরং দলের গুন্ডারা প্যান্ট খুলিয়ে তাঁর “নাগরিকত্ব  টেস্ট” করেছে। এরপর সে “মুসলমান নয়” এটা নিশ্চিত হয়ে তবেই ছেড়ে দিয়েছে।

গত সোমবার থেকে  রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর হামলার আগুন লেগেছে  দিল্লিতে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী বা তাদেরকে দেয়া কাজের ব্রিফিং কী ছিল তানিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়ার ভাষ্যে ইতোমধ্যে ছবি প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ পুলিশের দিকে আঙুল উঠানো হয়ে গেছে।  এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?

ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনার দায় রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়।

কিন্তু দিল্লি এসব কিছুর ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে এর সাফাইটা হল, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’ [NCT] মানে, কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে বা অবস্থিত।  এই বিশেষ আইনের কারণে দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা অপেক্ষায় আদালতে মুলতবি আছে।
বিজেপি চলতি মাসেই শোচনীয়ভাবে দিল্লিতে হেরেছে । দিল্লি এই রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় বলছি  এজন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা কৃতিত্বের(!) রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের মুসলমান-টার্গেট করে করা হামলা ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। এক জিঘাংসা। এই বিশ্বাসে কঠিন অকল্পনীয় নির্যাতন আর চাপের মধ্যে ফেলতে পারলে বিজেপি-বিরোধিতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে।  মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
গত তিনদিনের ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ঐ রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
ইতোমধ্যে অবশ্য লক্ষণীয় ভাবে ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। [যা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার সরকারবিরোধী হইয়ে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ] দিল্লির এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই বলে। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে ‘মোদি মোদি’ বলে স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
ফটো জার্নালিস্ট হলেন কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি। সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে দিতে তার কেটেছিল। বা বলা যায় বিজেপির ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তাঁর কপালে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা সেই হিন্দুসেনার ডায়লগ ছিল, “তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে… আপনিও তো হিন্দু; কাজেই এতে ক্ষতি কী?”।
সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, “আপনিও তো হিন্দু, কেন তবে ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল তাদের একজন বলে ওঠে “তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান?” এরপরই তাঁরা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার ঐ এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভার এক গরীব ছাপোষা বলে মন গলিয়ে তবেই সে যাত্রায় তারা পার পায়।
উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়া – এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলো সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।

এই রিপোর্টের শুরুতে, লেখক ওসব বিজেপি-সেনা কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে গেছে। এরা “মিসগাইডেড ইয়ুথ”। “আইন হাতে তুলে” নিয়ে “ভায়োলেন্স” ছড়াচ্ছে। এরা “ধর্মীয় আইডেনটিটি” ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে। ইত্যাদি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কী মোদীর ভারতে চালু ছিল না? কেউ মুসলমান হলে নিপীড়ন করে “জয় শ্রীরাম” বলানোতে বাধ্য করা,  গরু ব্যবসায়ী হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা, এমন যে কাউকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথি মারার অজস্র ক্লিপ কী আমরা সোশাল মিডিয়ায় দেখিনাই?  অথচ সামাজিক প্রতিবাদ দূরে থাকে ঐ ঘটনাস্থলের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মজা দেখা এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে “এধরণের ঘটনাগুলো সব গুজব বলে” – এগুলোর কোন অস্তিত্ব নাই বলে মোদীর সংখ্যালঘু মন্ত্রীর বয়ান কী ভারতের মিডিয়া ছাপেনি? কোন মিডিয়াই কী মন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে একটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেছিল? নাকি তখন কি কেবল মনে হয়েছিল “আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর!  কাজেই সমস্যাটা আমার না” – এমন মনে হয়েছিল তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা জানাতে চাচ্ছে কেন?  কে শুনবে? মোদী না অমিত শাহ? কী আশা করেছিলেন আপনি?

বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন? কেন এতদিন চুপ ছিলেন? মুসলমানদের উপর হচ্ছিল বলে? তুচ্ছ করে? তাহলে আপনি কী?

সারা ভারত আর সাথে এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই মুসলমান মারা বা নির্যাতন করার নষ্ট “মেরুকরণের” বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি?  এটা ভারতের কনষ্টিটিউশন-বিরোধী ততপরতা – এই দায়ে বিজেপির উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দিয়ে গেছে? তাই, আজ আঁতকে উঠে লাভ কী, অনিন্দ্য?  সবই তো শেষ!

বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে তা আবিস্কার হয়েছিল এমন নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া ধরণের আবিস্কার সেগুলো।। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনাতে এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই “নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ”। কারণ কে মুসলমান কেবল এটা জানতেই তো বিজেপির এত আয়োজন। তাই নয় কী? তাহলে এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবেপ্রিন্টে ‘নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!”এই শিরোনামে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

দিল্লিতে নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

দিল্লি নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

গৌতম দাস

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2SL

 

দিল্লি প্রাদেশিক বা রাজ্য নির্বাচনে মোদী-অমিতের বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। আম আদমি পার্টি (আপ বা AAP) দলের আগের ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মতই এবারো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে তারা ৭০ আসনের দিল্লির ৬০-এর বেশি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জার্মান সরকারের ডয়েচে ভেলে [Deutsche Welle] গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে অত জনপ্রিয় না হলেও ফেলনা গুরুত্বের নয়। সেই ডয়েচে ভেলের (ইংরেজি সংস্করণ) এক রিপোর্টের শিরোনাম, “দিল্লির নির্বাচনী হার : প্রধানমন্ত্রী মোদীর শেষ দিনের শুরু?” [Delhi election losses: The beginning of the end for PM Modi?]।

এটা ঠিক যে, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA) প্রায় সব প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশে এক ব্যাপক নাড়াচাড়া দিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতের লোকসংখ্যা বা ভোক্তা বাজার প্রায় ১৩৬ কোটির; সে কথা পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় খুবই মনে রাখে। তারা তাই এমন কিছুই বলতে চায় না পাছে তা এই বাজার হাতছাড়া হওয়ার কারণ হাজির করে ফেলে। কিন্তু মোদী-অমিতের বৈষম্যমূলক ও মুসলমানবিদ্বেষী করে সাজানো নতুন নাগরিকত্ব আইন পশ্চিমাদেশের জন্য ঐ ভোক্তা বাজারের লোভের চেয়েও আরো বড় বিপদের। সাধারণভাবে তারা আতঙ্কিত এ জন্য যে, তাদের আশঙ্কা এই আইন দুনিয়াতে বিপুল রিফিউজির ঢল তৈরি করতে পারে যারা আবার রাষ্ট্রচ্যুত। মোদীর এই আইন আগামীতে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন রিফিউজির সারিবদ্ধ ঢল নামাতে পারে, যেটা সদ্য মোকাবিলা করা সিরিয়ান রিফিউজিদের চেয়েও হবে ভয়ঙ্কর। কারণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি বৈশিষ্ট্য হল, এরা হবে রাষ্ট্রহীন; ‘থেকেও নাই’ এমন রাষ্ট্রচ্যুত বলে তাড়ানো এক জনগোষ্ঠী।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘এই আশঙ্কার’ ওপর দাঁড়ানো এক নিন্দা প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আনা হয়েছিল আর যা এখন আগামি মধ্য মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করে রাখা আছে। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এনিয়ে কী রায় দেয় মূলত সেটা দেখতে আর মার্চে মোদী ইইউ সামিটে এসে কী প্রতিশ্রুতি দেন না দেখার জন্য। নতুন রিফিউজির ঢলের উদ্ভব বা মানবাধিকার রক্ষার দায় হিসেবে এর ভাগ বা দায়ভার গ্রহণ প্রশ্নে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও বেশি ভীত, বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতির স্থবিরতা দুনিয়াতে যখন প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়া দশা সেই পরিপ্রেক্ষিতে। ডয়েচে ভেলের এই শিরোনাম এসব আশঙ্কায় আক্রান্ত বলে এমন হয়ে থাকতে পারে। তা আমরা অনুমান করতে করি।

দিল্লির রাজ্যনির্বাচন শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজেপিবিরোধী মূলত দিল্লির এক আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি (আপ) এবারের নির্বাচনে ৬২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতেছে। আর সেই থেকে অসংখ্য কর্নার থেকে কেন ফলাফল এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মিডিয়াগুলো ভরপুর হয়ে উঠেছে। রাজ্য হিসেবে দিল্লি খুবই ছোট; যেখানে ভারতের পুরনো মাঝারি সাইজের রাজ্যগুলোতে ২০০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে আসন থাকে। সেই বিচারে এগুলোর তিন ভাগের একভাগ সাইজের রাজ্য হল দিল্লি। তবুও দিল্লির এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ অনেক বেশি। কেন?
মূল কারণ, মোদী-অমিতের নাগরিক বৈষম্যমূলক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ পাস করার পরের ভারতজুড়ে আপত্তি ও প্রতিক্রিয়া; আর তা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এটা ছিল কোন রাজ্যে অমিত শাহের প্রথম নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া। এছাড়া এমনিতেও দিল্লির নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্বে ছিলেন অমিত। যেমন শুরুতে বিজেপির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক ভোটে কী হয়েছিল সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ভাষায়, “কিন্তু নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংহ, জগৎপ্রকাশ নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহই আস্থা জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দিল্লি বার করে নেবেন। মেরুকরণই হবে প্রধান অস্ত্র। তখনই স্থির হয়, শাহিন বাগই হবে প্রধান ‘প্রতিপক্ষ’। আর প্রচারে শাহ বলেছিলেন, ‘‘ইভিএমের বোতাম এত জোরে টিপুন যেন শাহিন বাগে কারেন্ট লাগে। “। তাই তখন থেকেই দিল্লি নির্বাচনে ঠিক কী বলে, কোন কৌশলে বিজেপি ভোটে অংশ নেয় আর তাতে ভোট প্রদানের ধরনের মধ্যে কী মেসেজ ফুটে ওঠে – এসব জানার জন্য সব মহলের ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর তা থেকেই এত বিশ্লেষণ।
এসব বিশ্লেষণগুলোতে কমন ব্যাখ্যার ধারাটা হল, এটা ‘উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু’ – এরই লড়াই যেখানে ‘উন্নয়ন’ জিতেছে। কিন্তু এখানে ‘উন্নয়ন’ মানে কী? আমাদের দেশের মতই, হাসিনার ‘উন্নয়ন’ বনাম নাগরিক অধিকার, এর কোনটা চান- এর মত? না, ঠিক তা নয়। তবে হয়ত কিছু কাছাকাছি। দিল্লির বেলায় এর মানে হল, নাগরিক মিউনিসিপ্যাল সুবিধা ও সার্ভিসগুলো; যেমন পানি, বিদ্যুৎ, নিষ্কাশন, বাসভাড়া, শিক্ষা ইত্যাদিতে সার্ভিস ব্যবস্থাপনা আর এর স্বল্প চার্জ বা মওকুফ করা চার্জ- এভাবে আপ দলের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গত পাঁচ বছর কাজ করে সাফল্য এনেছেন। এটাকেই এখানে ডাকা হচ্ছে “উন্নয়ন” বলে। আর এর বিপরীতে ‘কেন্দ্রের ইস্যু’ জিনিষটা কী?
এখানে কেন্দ্রের ইস্যু হল যেমন, সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু সিএএ বা এর সাথে এনআরসি; এ ছাড়া ধীরগতির ধসে পড়া অর্থনীতি, কাজ সৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরেকভাবে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা আছে। যেমন নির্বাচনী ফলাফল কী হতে পারে সেই আগাম অনুমিত ফলাফল জানার লক্ষ্যে করা সার্ভেতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হল, “জাতীয় নিরাপত্তা”। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই প্রলেপ লাগানো শব্দ। আসলে কদর্য কিছু ধারণাকে লুকিয়ে রাখতে বলা এক ‘ভদ্র শব্দ’। কারণ এর পেছনের মূল কথাটা হল, ‘মুসলমানবিদ্বেষী উসকানি দিয়ে প্রচারণার” পক্ষে কারা। এটাকে আবার বিজেপি নিজেও আরেকটা শব্দ – ‘পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ’ বলে প্রকাশ করে থাকে। যেমন এই নির্বাচনে অমিত শাহ ও তার দলের বিদ্বেষী ভাষ্য হল, কেজরিওয়াল একজন ‘জঙ্গি’ নেতা, সে পাকিস্তানের বন্ধু, মুসলমান তোষণকারী ইত্যাদি। দিল্লির এক মুসলমান-প্রধান এলাকা শাহীনবাগ, এখানকার সিএএ-বিরোধীদের মূলত নারীদের একটা স্থায়ী প্রতিবাদ মঞ্চ আছে। এ সম্পর্কে অমিতের মন্তব্য এটা নাকি এক ‘মিনি-পাকিস্তান’। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কথাটার আসল মানে হল মানে, এই ক্যাটাগরিটা আসল অর্থ হল – বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও এর প্রপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিয়ে কারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – তাদের কথা বুঝানো হচ্ছে। এরাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে দেয়া ভোটার। এমনকি আনন্দবাজারের ভাষাতেও – এটা হলো “বিজেপির (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং হিন্দু ভোট একাট্টা করার কৌশল”। অর্থাৎ হিন্দুত্বের জোশ তুলে সব হিন্দু ভোট যেন বিজেপির বাক্সে আসে, বিজেপির নেয়া এই কৌশল । এটাও অনেকসময় আরেকটা সার শব্দে প্রকাশ করা হয় – পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। “হিন্দুর হিন্দুকে ভোট দিতে হবে আর সেটা কেবল বিজেপিকেই” – এটাই হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা কৌশলের সারকথা। এটাকেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদ নিজেদের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ অথবা এটা “বিজেপির কৌশল” বলে প্রকাশ্যেই দাবি করে থাকে।
দিল্লির নির্বাচনের পরে ভারতের টিভির এক টকশোতে এসেছিলেন শেষাদ্রি চারি [SESHADRI CHARI]। তিনি হচ্ছেন, আরএসএসের ভাবাদর্শী পর্যায়ের এক নেতা , তিনি আবার আরএসএসের মুখপত্র এক প্রাচীন পত্রিকা ‘অরগানাইজার’-এর সাবেক সম্পাদক। তিনি বিজেপির এই ‘ঘৃণা তৈরির’ নিন্দনীয় কাজ ও ততপরতাকেও “অনৈতিক” বলে মানতে রাজি হননি। বরং দাবি করেছেন এটাই ‘বিজেপি রাজনীতির কৌশল’। দেখুন, not hate politics but strategy.।
ভারতের কনস্টিটিউশন এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া বেআইনি। কিন্তু যেখানে সারা ভারতই এখন ‘হিন্দুত্বে’ ভাসছে সেখানে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলবে কে? আর নির্বাচন কমিশন সেখানে কোনো প্রশ্ন না তুলে আরামে কাজ করার পথ ধরবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
ঠিক এ’কারণে বিজেপির অমিত শাহের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ এবার কিভাবে কাজ করে, আদৌ করে কিনা, সেটি সবাই দেখতে চেয়েছিল। কঠিন বাস্তবতা হল, এবারই এটা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, খোদ অমিত শাহ এবার তা নিজ মুখে প্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন।
“ভারতে হিন্দুরাই রাজত্ব করবে, অন্য কারও কথা চলবে না। যারা অমান্য করবে তারা ‘দেশকে গদ্দারকো, গোলি মারো শালো কো’।  এভাবে বিজেপির সমাবেশ মঞ্চ থেকে স্লোগান দেয়া শুধু নয়, লিখিত বিবৃতি মানে ঠাণ্ডা মাথায় লেখা এমন এক বিবৃতি পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে দুদিন ধরে অমিত শাহের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ থেকে গায়েব ছিলেন। বেচারা অমিত “খুব শরমিন্দা আর শোকে” ভুগছে মনে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসেও যান নাই। দু’দিন পরে ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রেসের সামনে তিনি বলেন, “গোলি মারো বলে বিবৃতি দেয়া অথবা ‘ইন্দো-পাক ম্যাচ’ ধরনের মন্তব্য করাটা আমাদের ঠিক হয়নি। আমাদের দল এসব মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়”। এছাড়াও, তিনি স্বীকার করে নেন যে, খুব সম্ভবত এমন মন্তব্যের জন্যই “দিল্লিতে আমাদের পরাজয় ঘটেছে”। এর সাথে তিনি এটাও স্বীকার করে নেন যে, দিল্লি নির্বাচন সম্পর্কে “তার আগাম অনুমানে ভুল ছিল”। ভেবেছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। আমার বেশির ভাগ মূল্যায়ন ঠিক হয়,এ বার ভুল হল”। সাথে সাথেই অবশ্য বড় ধূর্ততার সাথে নিজেই বলে রাখেন – “কিন্তু তাই বলে ‘দিল্লিতে বিরোধীদের বিজয় সিএএ-এনআরসি বিরোধী কোনো গণরায় নয়”।

এটা সে গণরায় কি না তা সামনে স্পষ্টই বুঝা যাবে। এখনই বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে দিল্লি রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা যেখানে ১৩% সেখানে মুসলমান ভোটারদের ৭৫% (আর এরই সাথে শিখ ভোটের ৪২%) আপ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। [The AAP got the lion’s share of the Muslim vote, significant in a city-state with 13 per cent Muslims.] শাহীনবাগ যে কনস্টিটিউয়েন্সিতে পড়েছে এর নাম ‘ওখলা’ [Okhla]। সেখানে এবার ভোটারের উপস্থিতি রেকর্ডসংখ্যক। মোট উপস্থিত ভোটারের হার যেখানে ৬২% এর মতো সেখানে ওখলাতে তা ৬৬%-এর মত। আর ‘আপ’ দলের আমানতুল্লাহ খান এখানে জিতেছেন (1,30,367 votes) প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর (Braham Singh  58,540 votes) চেয়ে ডাবলের বেশি ভোটে।  এমনিতেও দেখা গেছে বেশির ভাগ আসনে ভোটাভুটির ফয়সালা হয়েছেও ষাট হাজার ভোটের কাছাকাছি।

উত্তরপ্রদেশের ‘গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী’ যোগী আদিত্যনাথ যার একমাত্র যোগ্যতা মুসলমানদের মারব-ধরব বলে গালিগালাজ করা, তাকে উওরপ্রদেশ রাজ্যের পড়শি রাজ্য দিল্লিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল প্রায় ১৩টা বিজেপি কনস্টিটিউয়েন্সিতে প্রধান সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তিনি কেজরিওয়ালকে “জঙ্গি মদদদাতা, দেশদ্রোহী গাদ্দার, পাকিস্তানের বন্ধু ইত্যাদি বলে বক্তৃতা করেছিলেন। ফলাফল নিম্ন চাপ!  ঐ ১৩ আসনের ১১টাতেই বিজেপি অনেক ব্যবধানেই পরাজিত হয়েছে
অনেকেই অমিত শাহের স্বীকারোক্তিকে তার দলের এই হারের ফলাফল পাঠ করে, করা মন্তব্য বলে দেখেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এখন থেকে তাহলে ভালো হয়ে গেলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি?

অমিত শাহকে নিজ দলে “ম্যাজিসিয়ান” বলা হয়। গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গাতেই তার জয়জয়কার। তিনি নাকি যেটা চান তাই করে আনতে পারেন। দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত আহত-নিহত হন, তাদেরও ভোট তিনি ব্যাগে ভরতে জানেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরবাদের দাঙ্গায় তিনি তাই ঘটিয়েছিলেন।  সেই ‘দাঙ্গা-ওস্তাদ’ তিনিই এবার দিল্লিতে হেরে গেছেন। না, তবু এর পরেও তাঁর স্বভাব বদলাবে না। কারণ তিনি কেবল এই ‘দাঙ্গা’ কাজটাই ভালো পারেন।
এ ছাড়া আরো বড় ফ্যাক্টর হল, ২০১৬ সালের নোট বাতিলের পর থেকে ডুবে যাওয়া অর্থনীতির চিহ্নগুলো মোদী লুকিয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ এর প্রথমার্ধ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাই সেই থেকে “মোদী-ম্যাজিক” বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতএব, আগামী সব নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে “হিন্দুত্ববাদ” এর জজবা বা মেরুকরণ। কাজেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েই তাকে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। হয়তো পরের বার আরো ভাল ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঘৃণা ছড়াবেন। এক কংগ্রেস নেতা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, তার কাছে নাকি গোপন সংবাদ আছে, ‘‘পাকিস্তান এ বারে দিল্লি থেকে বিহারের পথে রওনা হয়েছে’’। কেন?  আগামী অক্টোবরে বিহারে রাজ্য নির্বাচন। দেখুন মেরুকরণের ভবিষ্যত

তাহলে, কেজরিলালের উন্নয়নের বিজয় কী জিনিষ ও তা কতটা সত্য?
বড় সত্যটা হল, কোন রাজ্য নির্বাচনেই ভারতের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলো ভোটার-মানুষ ভুলে যায় না, যেতেই পারে না। যদিও এর পরেও এক্ষেত্রে একটা কিন্তু আছে। সেটা হল দিল্লির “গঠন প্রকৃতির” বিশেষত্ব। যেমন দিল্লি ছিল এক রাজধানী শহর কিন্তু আসলে ছিল এক জেলা শহর মাত্র। পরবর্তিতে তার পড়শি রাজ্য একদিকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা (মানে মুল ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য ভেঙে হরিয়ানা বলে আলাদা রাজ্য করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর হরিয়ানাই দিল্লির লাগোয়া পড়শি। ) আর অন্য দিকে উত্তর প্রদেশ – এদুই রাজ্য থেকে কেটে আনা জেলা শহর নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে আজ দিল্লি রাজ্য হয়েছে – ১১ জেলা শহরের। এভাবে অন্তর্ভুক্তি আবার এক দিনে হয়নি, ১৯৯৭ থেকে সর্বশেষে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে। এর সোজা অর্থ, এই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া জেলাগুলোতে  একটা রাজধানী শহরে  যেমন থাকা উচিত সেই পানি-বিদ্যুৎ-বাস-স্কুল টাইপের নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলোর কিছুই ছিল না। এসব অভাব চরমে  উঠা আর নাগরিক ক্ষোভ থেকেই একে পুঁজি করে আম আদমি পার্টির জন্ম ২০১২ সালে। আর গুছিয়ে ক্ষমতায় থেকে গত পাঁচ বছরে এই ব্যবস্থার চরম উন্নতি ঘটিয়েছে কেজরিলালের আপ দলটা। এই সময়ে রাজ্যের রাজস্ব আয় তিনি বাড়িয়েছেন ৩১%। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লির তথ্য নিয়ে লিখেছে,

ভারতের মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপাত্ত বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দিল্লির রাজস্ব আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আর এ আয় গেছে স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নে। যদিও এ সময়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৭ শতাংশ কমেছে। দিল্লি ভারতের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এর নেতা কেজরিওয়াল আদর্শ মুখ্যমন্ত্রী। পদত্যাগী এই সাবেক আমলা ম্যানেজমেন্ট বোঝেন ভালোই। তিনি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বড়লোকদের বিদ্যুতের রেট তুলনায় বেশি ধরে সে আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের ভর্তুকির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। একই ব্যবস্থা পানি ব্যবহারেও। আবার নারী বাসযাত্রীর ভাড়া ফ্রি। স্কুল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তাতে ইংলিশ স্কুল ছেড়ে অবস্থাপন্নরাও সরকারি স্কুলে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন। আজ আনন্দবাজার লিখেছে, মহিলা ভোটেই কুর্সিতে কেজরী, বলছে ফল-পরবর্তী সমীক্ষা। একারণে মূলত নারীরা তুলনায় আপ পার্টিকে ভোট দিয়েছে বেশি। এমনকি নাকি স্বামীরা বিজেপি-কংগ্রেসের সমর্থক হলেও স্ত্রীরা আপ দলকে ভোট দিয়েছে।  আর এসব ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্বের মূল সুফলভোগী হল সরাসরি স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে আপ দলের মূল ক্ষমতার ভিত্তি হয়েছে এই স্বল্প আয়ের লোকেরা।  নির্বাচনে কেজরিওয়াল নিজের এই সফলতাকেই তুলে ধরেছেন, আর প্রতিদান চেয়েছেন। এমনকি ভোটারদের বলেছেন, আপনি বিজেপি বা কংগ্রেসের সদস্য বা সমর্থক হয়েও থাকেন তবে দল ত্যাগ না করে আমার কাজের প্রতিদান ও আমাকে উৎসাহ দিতে আমার দলকে একটা ভোট দিন। আসলেই তো তিনি ‘স্বল্প আয়ের মানুষের বন্ধু’। না হলে দিল্লির মত ব্যয়বহুল রাজধানী শহরে গরীবদের বসবাস করা আরো কঠিন হয়ে যেত। কাজেই দিল্লির এই বিশেষ গঠন প্রকৃতি – এটা উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু – এই নাম দিয়ে ডাকা ও দেখা সবটা সত্যি নয়। আর এর মানে এই নয় যে, সিএএ-এনআরসি ইস্যু বা কাজ সৃষ্টির ইস্যুতে তাদের কিছু এসে যায় না।

তবে সার কথা হল, দিল্লিই প্রথম কথিত ম্যাজিসিয়ান অমিত শাহ ও তার দলের যে সারা ভারতে “অপরাজেয়” ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই দর্প এবার চূর্ণ করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ভাঙা আত্মবিশ্বাস কতটা অমিতরা ফেরত আনতে পারেন তা এখন দেখার বিষয়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘দিল্লিতে পরাজয়ের তাৎপর্য”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

গৌতম দাস

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2S0

 

মুসলমানবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল ভারতের সংসদের দুই কক্ষেই পাস হয়েছে গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ এর মধ্যে। আর পরদিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা আইনে পরিণত হয়েছে। সংক্ষেপে বিভিন্ন মিডিয়ায় একে ‘সিএএ’ (CAA) (সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) এভাবে ডাকা ও লেখা হচ্ছে। আগামি মার্চ মাসে ব্রাসেলসে ইন্ডিয়া-ইইউ শীর্ষ সামিটে যোগ দিতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। প্রকৃতপক্ষ এটা হয়ে উঠবে ভারত নাগরিক অধিকার কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র বা সরকার হয়ে থাকবে কীনা এর প্রতিশ্রুতিদানের সভা। সম্প্রতি সিএএ- আইন পাশের পর এর নিন্দা বা আপত্তি প্রকাশ নিয়ে প্রস্তাব স্থগিত করে রাখা হয়েছে, মার্চ মাসের এই সামিট পর্যন্ত।

এই বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো তাদের চরম উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়েছে। এবার সুনির্দিষ্ট করে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের (এমইপি বা MEP) সদস্যরা পার্লামেন্টে তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা অনুসারে সংগঠিত ছয়টি গ্রুপের পক্ষ হয়ে প্রথমে ছয়টা আলাদা প্রস্তাব এনেছিল; যাতে এবার তা পার্লামেন্টে সবার আলোচনার পর এক নিন্দা প্রস্তাব হিসেবে পাস হয়। অথবা আরো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আলাদা আলাদা প্রস্তাবের সবগুলোকে একত্রে একটা প্রস্তাব হিসেবে আলোচনার পর তা পাস করা হয়। এভাবে কোন একটা প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে, বলাই বাহুল্য ভারতের জন্য সেটা হবে চরম বিব্রতকর ও লজ্জার। এনিয়ে ভারতের এনডিটিভি লিখেছে, ‘ভারত এখন এক বিরাট কূটনৈতিক বিপর্যয় বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখার মুখোমুখি। কারণ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সিএএ নিয়ে আর কাশ্মিরে ধরপাকড় নিয়ে হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে”। [India is facing a major diplomatic backlash from the European Union (EU) parliament on the Citizenship Amendment Act and the clampdown on Jammu and Kashmir…। এছাড়া ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে যদি আরো কঠোর অবরোধ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাস হয়, তবে তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভারতের জন্য ক্ষতিকর হবে ।
আবার প্রায়ই কথায় কথায় আমরা যেমন দাবি শুনি ভারত নাকি “বৃহৎ গণতন্ত্রের” দেশ  – এমন সেই ভ্যানিটি থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ পালক এখন এথেকে খসে পড়বে তা বলার অপেক্ষা করে না। এই পরিস্থিতিতে ভারতের দিক থেকে এসবের পাল্টা পদক্ষেপে কোথাও হাত জোড় করে নরম অথবা কোথাও ব্যবসা-সুবিধা না দেয়ার গরম হুমকি ইত্যাদি সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতের কূটনীতিকরা মাঠে নেমে পড়েছে, লবি চলছে, সব দিকে সব কিছুর এক বড় তোড়জোড় চলছে।
ভারতকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (EP) এই নড়াচড়াকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কারণ এর ৭৫১ জন (বেক্সিট কার্যকর হবার পর হয়ে যাবে ৭০৫)  সদস্যের  EP মধ্যে সিএএ’র বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছে অন্তত ৬২৬ জনই। যদিও অনেকে বলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের MEP এরা কাগুজে বাঘ মাত্র, যারা হুঙ্কার দেয় যতটা কামড় বসানোর ক্ষমতা বা প্রভাব ততই কম এদের –  পুর্ব অভিজ্ঞতায় এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা অনেকে বলবেন অবশ্যই। কিন্তু ব্যাপারটা এবারও কী তাই হবে? দেখা যাক!

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা এসব প্রস্তাবে আপত্তিগুলোর একেবারে শীর্ষের কথা হল, ভারতের নতুন নাগরিক আইন, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে বৈষম্যমূলক। মানে ‘নাগরিক অধিকার’ হল আনা ঐ প্রস্তাবগুলোর ফোকাস। ‘নাগরিক অধিকার’ ব্যাপারটা আসলে কী ও কোথা থেকে এনিয়ে খুব সংক্ষেপে বললে, আমাদের চলতি বিশ্বের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্টান্ডার্ড এবং এর সবচেয়ে বড় কমন কাম্য দিকটা হল ‘অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ হতে হবে। অর্থাৎ রাজতন্ত্র নয়, কলোনি-মালিকের দখলাধীন কলোনি-রাষ্ট্র নয় বরং স্বাধীন রিপাবলিক ও গণক্ষমতার রাষ্ট্র যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে হবে যেন এগুলো নাগরিকের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হয়।

ফলে এর কমন বৈশিষ্ট্যই শুধু নয়, এক কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং হল নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া। অন্তত নীতিগত ভিত্তি হিসাবে ১৯৪২ সালে  ১ জানুয়ারি সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন (যদিও তখনও তা মাওয়ের চীন নয়) – এই দুই রাষ্ট্র আমেরিকা ও বৃটেনের সাথে একমত হয়ে গ্লোবাল রাজনীতিক ব্যবস্থার নতুন ভিত্তি মানতে লিখিত ঐক্যমত প্রকাশ করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি এমন সময় থেকেই এই মূল মেরুকরণ শুরু হয়েছিল। আমেরিকার নেতৃত্বের কাম্য সেই নতুন দুনিয়াতে কলোনি আর নয়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র – হিটলার ও তার সঙ্গীদের রাষ্ট্রজোটের বিপরীতে এই পক্ষই জয়লাভ করে ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। আর সেই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ সব রাষ্ট্রের এক অ্যাসোসিয়েশনের জন্ম হয় জাতিসঙ্ঘ নামে। এরপর জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবাই বসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ‘আইন ও কনভেনশন’ থেকে অধিকারের চার্টার লেখা হয়েছিল। আর স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশের ওপর আইন ও কনভেনশনগুলো বাধ্যতামূলক পালনীয় হয়ে যায়।

অবশ্য এর সাথে তৈরি হয়ে যায় নানা ফাঁকফোকরও। বিশেষ করে আইন ও কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন কে কার উপর করবে, কিভাবে করবে, কতটা করবে নাকি ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে নিজেকে আড়াল করবে – এসব প্রশ্নে। এছাড়া সবার উপরে তো আছেই রাষ্ট্রের বৈষয়িক লাভালাভের স্বার্থ আর এই ভিত্তিতে পক্ষে-বিপক্ষে থাকা অথবা না থাকার জোট বাঁধা। দেখা গেছে, বৈষয়িক স্বার্থের লোভে কোনো রাষ্ট্র অন্যকে অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে আপস বা ছাড় দিয়ে বসতে দেখা যায়। যেমন, রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেও মায়ানমার যেভাবে বেচে যাচ্ছে। অথবা ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ভারতের বাজার সুবিধা পেতে পশ্চিমের অনেক রাষ্ট্রই ভারতের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে মোদী সরকারকে ছাড় দিয়ে বা উপেক্ষা করে বসে আছে। এসব সমস্যা থেকে দুনিয়া একেবারে মুক্ত হতে পারেনি এখনো, সে কথা সত্য। কিন্তু তাই বলে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড গড়ে বা অধিকার বিষয়ক নানান আইন ও কনভেনশনের প্রটেকশন গড়ে তুলে কোনোই লাভ হয় না অথবা এ নিয়ে ব্যত্যয় ঘটলে কারো বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলা হয় তাকে বিব্রত করার জন্য এমন কথাও ভিত্তিহীন অবশ্যই। এছাড়াও যদিও জাতিসঙ্ঘের অধীনের বিচার বা তদারকি কাঠামো- এই ব্যবস্থার মধ্যে কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও তা প্রমাণ করা বা প্রস্তাব পাস করে আনা খুব সহজ কাজ নয়। অভিযোগ সবটা বা সবার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে কখনো সমর্থ না হলেও কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে এমন উদাহরণের বাস্তবতা নেই।

তবে সবচেয়ে কমন ঝোঁক হল, কোনো রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন বা অধিকার বৈষম্যের অভিযোগে নিন্দা প্রস্তাব উঠলে নিরুপায় সে রাষ্ট্র তখন অন্যের অভিযোগ তোলাটাকে নিজের ‘সার্বভৌমত্বের’ লঙ্ঘন বা ভিন রাষ্ট্রের বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’ বলে দাবি করতে থাকে। এভাবে নিজ মুখ রক্ষার চেষ্টা করে থাকে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে অন্তর্বর্তী রায়ে অভিযুক্ত হয়ে ধরা খেয়ে মিয়ানমারও  এই কাজটা করেছে। আর সিএএ ইস্যুতে এবার ভারতের প্রতিক্রিয়াও তাই। এটা ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ “entirely internal to India” বলে দাবি করা হয়েছে। মানে বলতে যাচ্ছে যেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা প্রস্তাবের কথা তুলে ইউরোপ যেন ভারতের পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন করেছে। এ ব্যাপারে পুরানা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো আরো সরেস। তাদের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসা মাত্রই তারা একে ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বা ‘হস্তক্ষেপ’ বলে প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকে। আবার খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেও কখনও অভিযোগ উঠলে সেও কম যায় না। সে নিজে জাতিসঙ্ঘের ওই অঙ্গসংগঠন থেকে নিজের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়ে অথবা আর কখনো চাঁদা দিব না বলে অথবা  খোদ জাতিসংঘ বা ঐ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে অকেজো করার হুমকি দিয়ে থাকে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে কলোনি ব্যবস্থার সমাপ্তি ও অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক ধারণার রাষ্ট্রের প্রস্তাবক হলেন সেকালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নিজে। শুধু প্রস্তাবকই নয়, যুদ্ধে নিজের অংশ গ্রহণ ও মিত্রদের সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি বলেছিলেন একথাটা।

সেকালে হিটলারের কাছে হেরে যাবার ভয়ে নিরুপায় হয়ে হিটলার-বিরোধী ইউরোপীয় “মিত্র-রাষ্ট্রগুলো” [Allied powers] আমেরিকান প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। তবে এর আগে থেকেই যদিও ইউরোপ দাবি করত যে, তারা সবাই নাকি আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুদ্ধ শেষে সবার আগে তারা নিজেই নিজেদের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা কাঠামো ব্যবস্থা সংস্কার করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়েছিল। অর্থাৎ মানে দাঁড়িয়েছিল যে, আগে নিজেদের আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও সেবার মেনেই নিয়েছিল যে তারা “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র আসলে ছিল না।  যারা অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস অরিস্কার করে বুঝতে চান তাদের জন্য যুদ্ধোত্তর এই নতুন ইউরোপকে চেনা ও বুঝতে চেষ্টা করা খুব গুরুত্বপুর্ণ। ইউরোপের বেশির ভাগ যেসব রাষ্ট্র বিনাবাক্য ব্যয়ে বা কোন ওজর আপত্তি না তুলে এভাবে নবজন্ম লাভ করে নিতে আগিয়ে এসেছিল এমন ৪৭ টা রাষ্ট্রের একটা জোট তখনই গড়ে তোলা হয়েছিল। এর নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe). এবিষয়ে আরও জানতে আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন – Who we are – the Council of Europe ।  আর একই সাথে লক্ষ্যণীয় একই প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষে নাগরিক-অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রের নব-দুনিয়া গড়ার আমেরিকান প্রস্তাবে বৃটেনের চার্চিলসহ স্টালিনের সোভিয্যেন ইউনিয়ন ও চিয়াং কাইসেকের  সমগ্র চীন স্বেচ্ছায় এবিষয়ে একমতের দলিলে স্বাক্ষরকারী। এবং  ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি আমেরিকা, বৃটেন, সোভিয়েন ইউনিয়ন ও চীন এই চার রাষ্ট্র স্বাক্ষরিত এই দলিলকেই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা (Declaration of The United Nations 1942) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম ইউরোপ নিজেকে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe) গঠনের মাধ্যমে সংশোধন বা পুনঃজন্মলাভ করে নিলেও এবং চিয়াং কাইসেকের বা পরবর্তিতে মাওয়ের চীনসহ স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এদুই রাষ্ট্রের মধ্যে  “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র গড়ার ইস্যুতে কোন প্রভাব পড়ে নাই। যদিও সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা  এই দলিলে স্বাক্ষর করে স্টালিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ইউরোপের নিজেকে  নাগরিক অধিকারভিত্তিক করে পুনর্গঠনে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামি সংগঠিত হয়েছিল। আসলে এটা ছিল জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর ভুলকে সংশোধন করে   নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিজেদেরকে পুণর্গঠন। এভাবে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামে ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্রের জোট গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। আর এর মধ্যেকার কেবল ২৮ রাষ্ট্রের আরও ফরমাল ও আরও ঘনিষ্ঠতার রাষ্ট্রজোটে হচ্ছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বা ইইউ (European Union)।  এই হল, ইইউ এর সাথে  কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE এর সম্পর্ক ও  ফারাক।

১৯৫৩ সালে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE শুধু গঠন করা নয়, বরং নিজেদের সব নাগরিকের জন্য এক কমন অধিকারের চার্টার রচনা কাজ করে নিয়েছিল সদস্য রাষ্টড়্গুলোর এক কনভেনশন ডেকে, যার নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অ্ন হিউম্যান রাইট (European Convention on Human Right, ECHR) । আর এটা বাধ্যতামূলক প্রযোজ্য করা হয়েছিল কাউন্সিল অব ইউরোপ নামে নিজেদের নবগঠিত ৪৭ ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোটের সব রাষ্ট্রের ওপর। আর অধিকার সম্পর্কিত ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রের কোন নাগরিকের অভিযোগ তদারকির জন্য আলাদা সুপ্রিম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল যার নাম ইউরোপীয় কোর্ট অব হিউম্যান রাইট বা (ECtHR) নামে। আসলে এটাই ছিল আগামির কোন হিটলারের ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদ বা জাতনিধনের বিরুদ্ধে ইউরোপের নিজেকে রক্ষাকবচ।

মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ অতীতের কারণে আজকের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ-বিরোধিতা করে অধিকারবিষয়ক যেকোনো প্রস্তাব আলাদা গুরুত্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া আরো একটি কারণে এখনকার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে প্রস্তাব আনা আলাদা বিশেষ গুরুত্বের। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন সে জায়গা নিতে চাচ্ছে বা যাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় চীনকে ঘায়েল করতে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে হিউম্যান রাইট ইস্যু ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে চীনের প্রতি ইইউর অবস্থান ভিন্ন। কমিউনিস্ট কাঠামোর রাষ্ট্র হিসেবে চীনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ড সবসময় খারাপ থাকে। আর আমেরিকার পলিসি হল চীনকে দাবড়ে রাখা। তাই আমেরিকা তে চিনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ডের কথা তুলে চিনকে ঘায়েল করতে চায়। কিন্তু ইইউর অবস্থান আমেরিকার মতো ঘায়েল করা নয়। বরং ইইউ এর পলিসি নিয়েছে, চীনকে হিউম্যান রাইট মেনে চলা কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র করে গড়ে উঠতে সাহায্য-সহযোগিতা করা। আর এভাবে চীন-ইইউর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। গত ২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্রাসেলসে চীন-ইইউ এক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখান থেকে ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটাই হিউম্যান রাইট প্রসঙ্গে চীন-ইইউ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়তে চাওয়ার এক প্রামাণ্য দলিল।

কিন্তু মোদির কপাল সত্যিই খারাপ। আগামী মার্চ ২০২০ সালে ভারতের সাথেও একই রকমভাবে ভারত-ইইউ সামিট হতে যাচ্ছে ব্রাসেলসে। তাই ওই সময়ে মোদির ব্রাসেলস সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই যারা ভাবছেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা আগের মতোই কোনো মামুলি ব্যাপার অথবা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে কোনো শক্তিশালী প্রভাব ফেলার মতো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাপার নয় তারা সম্ভবত ভুল প্রমাণিত হবেন। আগের ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট শক্ত অথবা নরম যাই ভূমিকা নিয়ে থাকুক না কেন এবারের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আগের চেয়ে ভিন্ন এটা প্রমাণিত হবেই। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইটের নীতির ভিত্তিতে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন থেকে তারা সাজাবেনই, এ নিয়ে তারা নিজেদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সেটা এ জন্য যে, এমন নীতি ভিত্তিতে আরো আগে না দাঁড়াতে পারার জন্য চীনকে বিশেষ করে বেল্ট-রোড ইস্যুতে চিনের সাথে যুক্ত হওয়া বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ইইউ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রায় সবাই আলাদা এককভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক করতে প্রায় চলেই গিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে সেখান থেকে সরে আসতে সক্ষম হয়েছিল অবশ্য।  এরপর তারা ইইউ হিসেবে একসাথে চীনকে মোকাবেলা করতে সমর্থ হওয়া থেকেই চীনকেও হিউম্যান রাইট মেনে চলতে বাধ্য ও রাজি করানোর পর্যায়ে আসতে পেরেছে তারা। এর ফলেই সব বিপর্যয় এড়িয়ে নিজেদের ভাঙন এড়িয়ে ও শক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে বলে মনে করে। এতে এমনকি এরপর গত বছরের মে মাসে চীনে বেল্ট-রোড টু এর সম্মেলনও এই নীতির ভিত্তিতেই ২৯ রাষ্ট্রপ্রধানের এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল।

সর্বশেষ অবস্থা হল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে এবারের ঐ ছয় প্রস্তাব একসাথে একটা প্রস্তাব হিসেবে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে নিজেদের আরো আলোচনা ও তা পাস হওয়ার ব্যাপারটা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। এর মূল কারণ সম্ভবত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট  নতুন নাগরিকত্ব আইন  ভারতের কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করেছে বা বিরোধী হয়েছে কিনা সে মামলার বিচার করতে গিয়ে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে ৪০ দিন সময় দিয়েছে। অর্থাৎ আদালত এই বিতর্কিত আইন বাতিল করে দেয় কিনা বা কী রায় দেয়  সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছে। কিন্তু ভারতের কিছু পত্রিকা লিখছে এই স্থগিত করাকে মোদি সরকার নিজের কূটনৈতিক বিজয় মনে করছে।

এটাও ভুল প্রমাণিত হবে। কারণ মার্চ মাসেই ভারত-ইইউর সামিট (India-EU Summit 2020) অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে মোদি সিএএ’র ব্যাপারে পিছিয়ে সরে এসে যদি হিউম্যান রাইট মেনে চলার জোরালো অঙ্গীকার না করেন তবে এর পরিণতি খুবই খারাপ দিকে যেতে পারে। তবে বড়জোর ভারত হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য আরো সময় চাইতে পারে। কিন্তু সেটা কেবল এই শর্তে যে, তত দিন নতুন নাগরিক আইন ও এনআরসির বাস্তবায়ন স্থগিত করতে হবে। অন্যথায় চরম খারাপ দিকটা হল, ইইউ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা পর্যন্ত গিয়ে বসতে পারে। এক কথায় সিএএ-এনআরসি বাস্তবায়ন আর ইইউর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক- এই দুটো আর আগের মতো একসাথে চলতে পারবে না।

এমনকি বাংলাদেশের চলতি নির্বাচন নিয়ে যে ‘পর্যবেক্ষণ’ ইস্যুতে তর্কাতর্কি চলছে। এটাকেও হাল্কা বিষয় হিসেবে দেখা হয় যদি, এটাও ভুল হবে। ইইউ হিউম্যান রাইট মেনে চলা বা এর কমপ্লায়েন্স ইস্যু এখন থেকে খুবই কঠোরভাবে অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। কেবল বাস্তবায়নের জন্য সময় বেশি চাইলে অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে তা করতে চাইতে পারি। তবুও সেটা সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতির অধীনেই কেবল হতে পারে।

হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স এটা হতে যাচ্ছে ধীরে ধীরে – অর্ডার অব দ্যা কামিং ডেজ! ফলে এটা এখন দেখার বিষয় মোদী কিভাবে নিজেকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে হাজির করেন!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মানবাধিকার ইস্যুতে সিরিয়াস”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]