নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

গৌতম দাস

০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Us

 

Shringla’s visit, Independent Online /UNB

ভারত-রাষ্ট্র টিকে থাকার ন্যায়ভিত্তি হেলে গেছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নুন্যতম কিছু নৈতিকতা-সম্পন্ন একটা ন্যায়ের ভিত্তি থাকতেই হয়, নইলে সে প্রতিষ্ঠান টিকে না। রাষ্ট্র বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম একটা ন্যায়ভিত্তির উপর না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে সবার আগে প্রতিষ্ঠান মরাল [moral, নৈতিক শক্তি] হারায়, নৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। ভারত-রাষ্ট্র সেই সঙ্কটে আটকে গেছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেছে। কারণ, মোদীর ভারত নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী, তার সরকার ও দলই এর প্রযোজক বলে অভিযুক্ত। গত ২০০২ সালের গুজরাট ম্যাসাকারের সময় গুজরাট কোনো রাষ্ট্র ছিল না, একালের ভারতও নিছক কোনো রাজ্য নয়, এটা রাষ্ট্র। কাজেই কোনও কিছুই ২০০২ সালের মত ঘটবে না। পুনরাবৃতি ঘটবে না।  এদিকে নরেন্দ্র মোদী দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে এপর্যন্ত মুখ খোলেননি। একটা কথাও বলেন নাই। যে নৈতিক সঙ্কটে ভারত পড়েছে এই নির্বাক থাকায় সেটা আরো জটিল হবে। মোদীর সরকার ভারতের বাসিন্দাদের এই নৈতিক সঙ্কটে ফেলে দিয়ে গেছে যা ক্রমে নাগরিকদের হত্যা ও ম্যাসাকারের দায়বোধের অস্বস্তিতে বেঁধে ফেলবে। তাই সরকারি আমলা হিসেবে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এসময় বাংলাদেশ সফরে এসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা বলার শক্ত নার্ভ দেখিয়ে ফিরে গেলেন! এটাই তাঁর অর্জন! ওদিকে, সিল্লি ঘটনা বিস্তারিত ঠিক কী ঘটেছে এবং তা কিভাবে, এর ফ্যাক্টসের কিছু এর মধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরুও হয়েছে।

কেন শ্রিংলাঃ
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা এবার তাঁর দু’দিনের (২-৩ মার্চ) সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন। কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কোনও দেশ সফরের আগে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশ সফরে আসেন। আর তা মূলত নির্বাহী প্রধানের সফরকে নিশ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এ ছাড়াও, সফরে কেন ও কী কী ইস্যু উঠবে আর তাতে উভয়ের অবস্থান কী হবে এসব চূড়ান্ত করাও এর লক্ষ্য। যদিও এরপরেও অনেক কিছুই থেকে যায়, যাবে বা রেখে দেয়া হয় যা সফরকালে দুই শীর্ষ প্রধানের আলাপে ফাইনাল করা হবে। দেখা যাচ্ছে, মোদীর  বাংলাদেশ সফরের আগে সে উপলক্ষে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সচিবকে পাঠিয়েছিলেন। সেটা কোনো দোষ বা বড় ব্যতিক্রমের বিষয় না হলেও, অনুমান করা যায় সেটা ঘটেছে এই বিবেচনায় যে, ঢাকায় শ্রিংলার ‘তাজা বন্ধু’ অনেক বা তাঁর অন্য ভারতীয় কলিগদের চেয়ে তিনি এগিয়ে। কারণ, এই তো গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর কাটিয়ে  তিনি এদেশ ছেড়ে গেছেন। তার সেসব তৎপরতা ও স্মৃতি এখনো তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি কলিগদের সবার চেয়ে বেশি ‘তাজা’ বলে আর তখন যেসব বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক তিনি জমিয়েছিলেন, তা এখন কাজে লাগানোর বিচারে তিনি অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ঘনিষ্ট বন্ধুদেশ’  গভীর ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ অথবা কখনোবা বলা হচ্ছে এরা নাকি ‘স্বামী-স্ত্রী’ অথবা আরো কত কী যেগুলো সত্যিই ইউনিক, একেবারে তুলনা নাই। দুনিয়ার কোনো কূটনৈতিকপাড়ায় এমন অকূটনৈতিক অর্থহীন ও বোকা বোকা শব্দের ব্যবহার নেই। যদিও তা আসলে বাংলাদেশকেই গায়ে পড়ে নিচে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।

পশ্চিম এখন বুঝছে ‘হিন্দুত্ব’ কেন হুমকির বাপঃ
এই পটভূমিতে, শ্রিংলাকেই বেছে পাঠানোর এই ঘটনা – মোদীর ভারত যে ভালই বিপদে আছে এর আরেকটা প্রকাশ। শ্রিংলাকে এমন একটা সফরে আসতে হয়েছে যখন দুনিয়াজুড়ে মোদীর ভারতরাষ্ট্র নাগরিকের হিউম্যান রাইট রক্ষার দিক থেকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। এদিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ার সঙ্কটে পড়া এক রাষ্ট্র বলে ভারতকে দেখা হচ্ছে।  এধরণের ব্যর্থতাবিষয়ক মামলায়  জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইটস সংগঠন [UN-OHCHR] এই ব্যর্থতা নিয়ে আদালতের শুনানিতে অবজারভার হতে চেয়েছিল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এমিকাস কিউরি (amicus curiae OR  “friend of the court”] হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী আগাম ভয় পেয়ে, আপাতত এটা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণ হবে এই অজুহাত তুলে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং তেমন আলোকে বিবৃতি দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। এছাড়া অন্যদিকে জাতিসংঘের অবজারভার হয়ে চাওয়াকে মিথ্যা করে প্রপাগান্ডা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি মামলায় আবেদনকারি বা পিটিশনার হয়ে চেয়েছে। এনিয়ে দক্ষিণের দৈনিক দ্যা হিন্দুর নিজ লেখা সম্পাদকীয় আগ্রহীরা পরে দেখতে পারেন।

এদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ ভারত-রাষ্ট্রে নিয়ে আলোচনা পশ্চিমে এখন আর সংসদীয় কমিটির ছোট্ট পরিসরে আর নয়। মুসলমান হত্যার মোদীর ভারতকে সামলাতে এখন পশ্চিম সরাসরি স্ব স্ব পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নিয়েই মোদী-অমিতের তান্ডব আর হুমকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে BRUT Debate বা আমেরিকার সংসদে (প্রতিনিধি পরিষদে) দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব এখন একটা হট ইস্যু। ভারত থেকে মুসলমান উদ্বাস্তুর ঢল নামবে কি না আর সেক্ষেত্রে আগাম তা ঠেকানোর উপায় কী, আগানোর কৌশল কী, এটাই মুলত তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ভারত ১৩৫ কোটি মানুষের ভোক্তা-বাজারের এর দেশ। কিন্তু এর প্রতি লোভের চেয়েও ওখান থেকে সম্ভাব্য উদ্বাস্তুর ঢল অনেক বেশি বিপর্যয় আনবে, এটাই এখানে মুখ্য দুঃচিন্তা আর হুমকিবোধ।

দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিল্লিতে ৫৮ জনেরও বেশি মানুষ, মুসলমান বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে তিনি কোনো কথা, বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া কোনো কিছুই দেননি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের পক্ষ থেকে কোন আশ্বাস, ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়ানো, কোন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বসানো, হামলাকারিদেরকে আইনের আওতায় আনা ইত্যাদি যেগুলো এমন পরিস্থিতিতে সব রাষ্ট্রই নুন্যতম রুটিন কাজ হিসাবে করে থাকে – এমন কোন পদক্ষেপ মোদী নেন নাই।

মোদী-অমিত এখন এতই নিলাজ আর বেপরোয়া যে তাঁরা খোলাখুলিই ভারতের পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এতে প্রকারন্তরে ম্যাসাকারের দায় তাদের উপর সরাসরি এলেও তারা বেপরোয়া। অর্থাৎ মোদী তবু মূলত প্রতিক্রিয়া শুন্য। এই প্রতিক্রিয়াহীনতা অ-প্রধানমন্ত্রীসুলভ, তাই অগ্রহণযোগ্য; এমনকি মারাত্মক অস্বাভাবিক। আর এটাই মোদীর আর তাঁর সরকারের এতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে তীব্র করছে। এছাড়া এটাই  তাঁর সরকারকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার এক বিরাট সঙ্কট তৈরি করেছে।  আরও বড় কারণ হল, আপনি মুসলমান হলেই আপনাকে দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগানোর পর এবার তাই আপনাকে নিপীড়ন করে হত্যা করা জায়েজ – এই হল এখনকার নয়া নরমাল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা। এটা ভয়ঙ্কর!

অর্থাৎ মোদীর সরকার এখন নাগরিক বৈষম্যহীনতা কায়েম করা দূরে থাক,  ন্যূনতম ন্যায়নীতি পালন ও রক্ষারও অযোগ্য – এমন এক পরিচয় তুলে ধরতে বেপরোয়া হয়েছে। অথচ শ্রিংলার বিপদ হল, এই নৈতিকতার সঙ্কটে থাকা সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করতে তাকেীই সময় বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ লোক মুসলমান।

এসব বিচারে ভারতের হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে আমরা দেখছি তিনি ব্যাকফুটে ও নিষ্প্রভ। তা না হয়ে তার উপায় কী? এমনকি শ্রিংলার ঢাকায় থাকা অবস্থায় ৩ মার্চ আনন্দবাজারের এক রিপোর্টও তার সঙ্কটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পত্রিকা শিরোনাম করেছে বেসুরো ঢাকায় সফর শ্রিংলার“- আর তাতেই শ্রিংলার দফা-রফা। লিখেছে, “সিএএ-এনআরসি বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। দিল্লির হিংসা, সেই ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে দেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের একাধিক জনের ভারত সফর বাতিল করেছিল হাসিনা সরকার। আজ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন, বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফর”। এই খবর মোদী ও শ্রিংলার জন্য বিরাট অস্বস্তির সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি তারা সেন্সে থাকে!

বাংলাদেশের স্পিকারের ভারত সফর ছিল গত ২-৫ মার্চ। তিনি সফর বাতিলের ঘোষণা দেন মাত্র একদিন আগে, ১ মার্চ; যেনবা শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরে আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি। নিশ্চিত হতেই তিনি শেষ বেলায় এসে ঘোষণা দিয়ে দেন। শ্রিংলা ঢাকা আসেন পরের দিন ২ মার্চ। অর্থাৎ শ্রিংলা বাংলাদেশের স্পিকারের সফর বাতিলের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি বা তা পারেননি। মানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত “বড়ভাই” সুলভ ডাট দেখাবেন এমন অবস্থা – না ভারতের না শ্রিংলার সে মুরোদ আর অবশিষ্ট আছে মনে হচ্ছে না। এমনই করুণ অবস্থা! অর্থাৎ এটা মেনে নিয়ে হলেও ব্যাকফুটে থাকাতেই স্বস্তিবোধ করছেন শ্রিংলা।

শ্রিংলার সেমিনারঃ
শ্রিংলা ২ মার্চ সকালে বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় হাইকমিশনের সহ-আয়োজক হয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করেছিল। এটা ছিল ‘”বাংলাদেশ ও ভারত : একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ” এই শীর্ষক এক সেমিনার।   কিন্তু এবারের সফরে শ্রিংলার দুর্ভাগ্য যে, তাকে সরাসরি ডাহা অসত্য বলেই পার পেতে হবে, অন্য রাস্তা নেই। তাই তিনি আসলে ঐ সেমিনারে  ভান করলেন যে, এনআরসি ইস্যুটা যেন এখনো কেবল আসামেই সীমাবদ্ধ বা  সেখনেই কেবল আটকে আছে।  তাই শ্রিংলা বললেন, “ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে” – এমন ডাহা মিথ্যা চোখ বুঝে বললেন। অথচ  তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেননি যে, তিনি এবার “ভারতজুড়ে এনআরসি করবেন”। অথচ অমিত এটা কোনো জনসভায় বলেননি,  খোদ সংসদে এবং মন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। কাজেই এটা কোনো দলের নয়, ভারতের সরকারি অবস্থান। এছাড়া এটা তো ভারতের কোন বিরোধী দল, এমনকি কোন মিডিয়া মানে নাই। এছাড়া মোদী এমনকি দিল্লিতে নির্বাচনে হারের পরেও বলেছেন, আপাতত এনআরসি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর ভারতজুড়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএর বাস্তবায়নে মেতে উঠবেন তিনি।

তাহলে শ্রিংলা কেন এখনও এনআরসিকে ‘আসামের ঘটনা’ বলছেন? ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা মিডিয়াও তো তার কথা মেনে নেয় না। এযুগে ভারতের সরকারের কে কী প্রতিদিন বলেন তা বাংলাদেশে বসে জানা কি খুবই কঠিন! এনআরসি এখন ভারতজুড়ে বাস্তবায়নের ইস্যু আর এটা এখন এনআরসি-সিএএ ইস্যু। অথচ শ্রিংলা সেমিনারে বলে গেলেন এনআরসি ‘প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায়’ চলছে। তাই তিনি দাবি করলেন, ” … সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের ওপর এর কোনো প্রভাব থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি”।  আসলে তিনি জানতেন কেউ তার এ কথা এ দেশে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু তবু এই চাতুরী ছাড়া কিইবা তিনি করতে পারতেন? সম্ভবত এত অসহায় অবস্থায় হয়ত তিনি এর আগে নিজেকে দেখেননি!

তিনি আরো বানিয়ে বলেছেন, সিএএ বা “নাগরিকত্ব বিল কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়”।  বলেছেন দ্বিতীয়ত, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে এসে যারা ভারতে আছেন, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব দেয়াই এর উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়ত, এটা (বাংলাদেশের) বর্তমান সরকারের সময়ের জন্য কার্যকর হবে না। কার্যকর হবে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসক ও অন্য সরকারগুলোর সময়ে, যারা এখানে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি”। এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। কারণ সিএএ আইন প্রযোজ্য হবে বা এর কাট অফ ডেট হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪। মানে এর আগে যারা ভারতে প্রবেশ করবে তাদের সবার উপরে প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেবল ‘১৯৭৫-পরবর্তী’ সময়টার ক্ষেত্রে  এই আইন প্রযোজ্য হবে এই কথাটাই পুরা ভুয়া, ভিত্তিহীন। বুঝাই যায় হাসিনা সরকারের মন পাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সিএএ আইনের মধ্যে তিন দেশে থেকে আসা সম্ভাব্য হিন্দুদের কথা বলার সময় বাংলাদেশের নাম সরাসরি আইনে উল্লেখ করা আছে এবং তা আছে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ বাংলাদেশ সরকার হিসাবে।  কাজেই এটা সরাসরি হাসিনা সরকারকেও ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ অভিযুক্ত করেই আইনটা লেখা হয়েছে।  অথচ, ভারত এখন বাংলাদেশকে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে’ আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পেশের আগে না দিয়ে আবার উলটা  আইনের ভাষ্যটা শ্রিংলা বা ভারত সেকথা লুকাতেছেন।  মূলত বাংলাদেশের নাম না উল্লেখ করলে  বিজেপি দলের লাভ হয় না। কারণ  আইনের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছে এজন্য যে – পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণ করতে বা হিন্দু ভোট সব নিজের রাজনৈতিক ঝুলিতে পেতে এমনটাই বিজেপির দরকার; সেক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যাটা যাই হোক।

অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বন্টনের মুলাঃ
বাংলাদেশে এই সফরে শ্রিংলা আরেক বিরাট মুলা ঝুলিয়েছেন – তিস্তার পানি তো বটেই, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৪ যৌথ নদীর মধ্যে আরো নাকি ছয়টি নদীর পানি ভারত দিবে এই চুক্তি নাকি প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এটা শ্রিংলার দাবি। এটা অবিশ্বাস্য আর ভারতকে বিশ্বাস করার মত আমাদের আস্থা তারা অনেক আগেই হারিয়েছে। আসলে ঐ সেমিনারে শ্রিংলা এমন সব কথা বলেছেন, যা দেখেই বুঝা যায় বানানো কথা বলছেন। আর মিথ্যা বলে  মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, “এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত”। এটা কোনভাবেই ভারতের মনের কথা না কারণ এটা ভারত অনুসরণ করে আসছে অথবা এখনও করছে এমন নীতি পলিসিই নয়। এককথায় এখন এটা ভারতের অবস্থানই নয়, এ’পর্যন্ত ভারতের অনুসৃত নীতিই নয়। কার্যত তাদের অবস্থানটাই উল্টা।

আমরা দেখছি ‘পরিবেশের’ কথা তিনি বলেছেন। যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনায় টেকনিক্যাল নিয়ম হল, নদীর “অবাধ” প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। অথচ এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশবোধ শূন্য এবং তাদের ভূমিকা পরিবেশবিরোধী। ভারত বহু আগে থেকেই হয় নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়েছে, না হলে আন্তঃনদী যুক্ত করার মতো চরম পরিবেশবিরোধী প্রকল্প নিয়েছে। আর তাও না হলে নদীর মূল প্রবাহ থেকে বড় খাল কেটে পানি বহু দূরে টেনে নিয়ে গেছে। এই হলো ভারতের কথিত পরিবেশবোধের বাস্তব অবস্থা।
আর টেকসই? নদীর উপর যথেচ্ছাচার যেসব বাড়াবাড়ি ভারতে হচ্ছে তাতে নদীর “অবাধ” প্রবাহ ধ্বংস করে যা কিছু করা হয়েছে সেগুলো একটাও টিকবে না, বরং মূল নদীই শুকিয়ে যাবে ক্রমেই। ফারাক্কা ইতোমধ্যেই এ অবস্থায়। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ভারতের বিহারে প্রতি বছর বন্যার কারণ বলে অভিযোগ উঠছে এখন লাগাতর প্রতিবছর।
আর ন্যায়সঙ্গত বণ্টন? মানে যৌথ নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনটা কী ? যেকোন যৌথ নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রাপ্য, সমান হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত আইনত বাধ্য। এছাড়া আমাদের সম্মতি ছাড়া বাঁধসহ নদীর প্রবাহকে যেকোনভাবে বাধাগ্রস্ত করাটাই বেআইনি। অথচ ভারতের সাথে নদীর পানি বণ্টনের যেকোন আলোচনায় তাদের দাবি অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হতে হবে – “ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পরে পানি থাকলে তবেই তা বাংলাদেশ পাবে”। মানে তারা হল জমিদার – এই নীতিতেই ভারত চলে। একারণে  প্রায় সব সময়ের বাড়তি যুক্তি হল ‘এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই আরো কম পানি পাবে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ ভাটির দেশ হিসেবে পানি আমাদের প্রাপ্য এই আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তারা কখনও মানে নাই। কথা হল, ভারতের পানির প্রয়োজনের কী কোনো শেষ  থাকবে?
সোজা কথা ‘পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন’ এই শব্দগুলো শ্রিংলা তুলেছেন- কথার কথা হিসেবে এবং মন ভুলাতে। অথচ না পরিবেশ রক্ষা, না আন্তর্জাতিক নদী আইন – কোনটাই ভারতের চলার ভিত্তি বা সরকারের নীতি নয়। মিথ্যা বলাটা সবাই পারে না, বুক কাঁপে। আসলে শ্রিংলা দেখালেন, পুরো মিথ্যা বানোয়াট কথা বলার মত শক্ত নার্ভ তার আছে। আর সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, বাংলাদেশ তবুও তাকে বিশ্বাস করবে বা আস্থা রাখবে – সেটা যাক তাকে মিথ্যাই বলতে হবে!

দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?
আবার ফিরে যাই, এবার দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?  বাংলাদেশে এসে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লি ম্যাসাকার নিয়ে একটা কথাও বলেননি। এক্ষেত্রে তাঁর অজুহাত সম্ভবত, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তাই। কিন্তু বাস্তবতা হল – লাগাতার তিন দিন ধরে এ হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকার চলেছে; দিল্লি জ্বলেছে, কমপক্ষে ৫৮ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের বাড়িঘর যতটুকু যা যা বাড়িঘর সম্পদ সব কিছু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন সবার একভাবে যায় না। এই প্রথম কারা সুনির্দিষ্টভাবে দিল্লি ম্যাসাকার করেছে তার কিছু তথ্য সামনে আসা শুরু হয়েছে।

দিল্লি ভারতের বিশেষ মর্যাদার টেরিটরি, তা সত্ত্বেও ওর ভিতরেই দিল্লি একটা রাজ্য। তাই রাজ্যের ‘বিধানসভা’ নামের একটা সংসদ (প্রাদেশিক পার্লামেন্ট) আছে। সেখানে রাজ্য নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করতে পারে, যা কেবল নিজ রাজ্যের ওপর প্রযোজ্য। দিল্লির বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে এমনই একটা আইন পাস করা হয়েছিল, যার নাম ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট ১৯৯৯’। ব্যাপারটা তুলনা করে বললে এদিকে বাংলাদেশে একটা ‘মানবাধিকার কমিশন’ আছে। আর তা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যত স্বাধীন নয়। আইনের মারপ্যাঁচ ও দুর্বলতায় এটা আমাদের নির্বাহী ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়েই চলে। সে তুলনায় ভারতের অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কমিশনগুলো এত ঠুঁটো নয়। বরং এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এবং ভারতের আদালতের পর্যায়ে স্বাধীন। যেমন ভারতের “জাতীয় নারী কমিশন” যথেষ্ট প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ব রাখে। তেমনি ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে দিল্লি রাজ্য সরকার এক ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন’ (ডিএমসি) গঠন করে রেখেছে। এখানে ঘোষিত মাইনরিটি হল, – The notified Minority Communities, as per the Act, are Muslims, Christians, Sikhs, Buddhists and Parsis.। আর এর মূল কাজ হল, ‘সংখ্যালঘু বা মাইনরিটিদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা’ [To safeguard the rights and interests], যা যা ভারতের কনষ্টিটিউশন মাইনরিটিদেরও নাগরিক অধিকারে সমতা-সাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই DMC কমিশনের ক্ষমতা পুরোটাই আদালতের পর্যায়ের না হলেও তারা অনেক ক্ষমতাই রাখেন। যেমন গত ২৫ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে নর্থ দিল্লিতে কার্ফু জারি করতে তারাই  অনুমোদন দিয়ে চিঠি দেওয়াতে পুলিশ তা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পরে ম্যাসাকার, তান্ডব কমে আসলে পরে, সেই ডিএমসি সরেজমিন দিল্লির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর শেষে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এছাড়া অচিরেই একটা “ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি” গড়ে তারা মাঠে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, যে কমিটিতে আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছে। এই কমিশন বা ডিএমসির চেয়ারম্যান হলেন জাফরুল ইসলাম খান [Zafarul-Islam Khan] ও অন্য সদস্য হলেন কারতার সিং কোচ্চার [Kartar Singh Kochhar]। এরাই প্রথম সরেজমিন রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ বর্ণনা আছে সেই রিপোর্টে। তাদের প্রথম কথা হল, এই হামলা ‘একপক্ষীয়’ এবং ‘পূর্বপরিকল্পিত’ [‘one-sided, well-planned’]। অর্থাৎ এটা কোনধরণের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি বা রায়ট নয়। অথবা এটা হঠাৎ উত্তেজনায় ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং আগেই পরিকল্পনা করে ঘটানো এক ম্যাসাকার-সন্ত্রাস। এছাড়া এই প্রত্যক্ষ মাঠ-সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তাদের কথা বলার সময় জাফরুল ইসলাম খান সাহেবের করা আরও কিছু মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

তাঁর ফাইন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় মন্তব্য হল, প্রায় দুই হাজার বহিরাগতকে পরিকল্পিতভাবে নর্থ-ইস্ট দিল্লিতে এনে, কয়েকটা স্কুলে রেখে তাদের দিয়ে এই ম্যাসাকার, হত্যা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। [“There were approximately 1,500 to 2,000 people who had come to these areas from outside to create trouble,” ]। এর প্রমাণ হিসেবে এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ান তারা সংগ্রহ করেছেন। তার নাম রাজকুমার। তিনি রাজধানী স্কুলের এক গাড়ির ড্রাইভার। তিনি বলেছেন, এরকম ৫০০ বহিরাগত যাদের মুখে মুখোশ ছিল। এরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই স্কুলে অবস্থান করেছিল। তারা সাথে পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র ছিল আর এক ধরনের ‘বড় গুলতি’ ব্যবহার করেছিল উঁচু দালান থেকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারার জন্য। কমিশনও বলেছে, তারা এমন কিছু ব্যক্তির ফুটেজও সংগ্রহ করেছেন।

“Mr. Kumar told us that some 500 persons barged into his school around 6.30 p.m. on February 24. They wore helmets and hid their faces. They remained there for the next 24 hours and went away next evening after the arrival of police force in the area. They were young people who had arms and giant catapults which they used to throw petrol bombs from the school rooftops,”

এ ছাড়া জাফরুল ইসলামের দাবি, তারা জেনেছেন প্রত্যেক গলি থেকেই স্থানীয় অন্তত দু-একজন সহযোগী ছিল যারা মুসলমানদের বাড়ি , দোকান, গুদাম বা সম্পদ কোনগুলো, তা দেখিয়ে দিয়েছে। যাতে কেবল সেগুলোতেই আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এভাবেই ‘যমুনা বিহার’ এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই কেবল বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পদ পোড়ানো হয়েছে।

Muslim-owned shops like a travel agency and motorcycle showroom were looted and torched while Hindu-owned shops were left untouched.

এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা নিয়ে আবার লুকোচুরি শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ ‘মেনস্ট্রিম মিডিয়া’ এটা ছাপেইনি। সবচেয়ে বিস্তারিত ও সাহসী ভাবে ছেপেছে দক্ষিণের ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। এ ছাড়া ওয়েব পত্রিকা ওয়াইর (wire) আর নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এটা ছেপেছে। আরো কিছু পত্রিকা ছেপেছে, তারা কেবল সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের শর্ট ভার্সনটা ছেপেছে। তবে একটা ইউটিউব ভার্সন পাওয়া যায় এমন এক সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ‘এইচডব্লিউ নিউজ নেটওয়ার্ক (HW News Network) থেকে। সেখানে এ নিয়ে নিউজ ছাড়াও চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ফ্যাক্টস বাইরে আসা শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেও মোদী-অমিত কোনো কৌশল গ্রহণ করবেন, ধামাচাপা দিবার চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০৭ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে নৈতিক ভিত্তি হারানো একটি সফর – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব 

ভারতে হচ্ছেটা কী?
প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব!

গৌতম দাস

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Tr

 

‘Are you Hindu or Muslim?’: TOI photojournalist

সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু কেউ আমল করে নাই। সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
ঘটনা হল, টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিউটিরত এক ফটোসাংবাদিক অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে দিল্লিতে বজরং দলের গুন্ডারা প্যান্ট খুলিয়ে তাঁর “নাগরিকত্ব  টেস্ট” করেছে। এরপর সে “মুসলমান নয়” এটা নিশ্চিত হয়ে তবেই ছেড়ে দিয়েছে।

গত সোমবার থেকে  রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর হামলার আগুন লেগেছে  দিল্লিতে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী বা তাদেরকে দেয়া কাজের ব্রিফিং কী ছিল তানিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়ার ভাষ্যে ইতোমধ্যে ছবি প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ পুলিশের দিকে আঙুল উঠানো হয়ে গেছে।  এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?

ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনার দায় রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়।

কিন্তু দিল্লি এসব কিছুর ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে এর সাফাইটা হল, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’ [NCT] মানে, কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে বা অবস্থিত।  এই বিশেষ আইনের কারণে দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা অপেক্ষায় আদালতে মুলতবি আছে।
বিজেপি চলতি মাসেই শোচনীয়ভাবে দিল্লিতে হেরেছে । দিল্লি এই রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় বলছি  এজন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা কৃতিত্বের(!) রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের মুসলমান-টার্গেট করে করা হামলা ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। এক জিঘাংসা। এই বিশ্বাসে কঠিন অকল্পনীয় নির্যাতন আর চাপের মধ্যে ফেলতে পারলে বিজেপি-বিরোধিতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে।  মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
গত তিনদিনের ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ঐ রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
ইতোমধ্যে অবশ্য লক্ষণীয় ভাবে ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। [যা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার সরকারবিরোধী হইয়ে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ] দিল্লির এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই বলে। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে ‘মোদি মোদি’ বলে স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
ফটো জার্নালিস্ট হলেন কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি। সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে দিতে তার কেটেছিল। বা বলা যায় বিজেপির ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তাঁর কপালে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা সেই হিন্দুসেনার ডায়লগ ছিল, “তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে… আপনিও তো হিন্দু; কাজেই এতে ক্ষতি কী?”।
সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, “আপনিও তো হিন্দু, কেন তবে ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল তাদের একজন বলে ওঠে “তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান?” এরপরই তাঁরা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার ঐ এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভার এক গরীব ছাপোষা বলে মন গলিয়ে তবেই সে যাত্রায় তারা পার পায়।
উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়া – এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলো সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।

এই রিপোর্টের শুরুতে, লেখক ওসব বিজেপি-সেনা কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে গেছে। এরা “মিসগাইডেড ইয়ুথ”। “আইন হাতে তুলে” নিয়ে “ভায়োলেন্স” ছড়াচ্ছে। এরা “ধর্মীয় আইডেনটিটি” ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে। ইত্যাদি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কী মোদীর ভারতে চালু ছিল না? কেউ মুসলমান হলে নিপীড়ন করে “জয় শ্রীরাম” বলানোতে বাধ্য করা,  গরু ব্যবসায়ী হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা, এমন যে কাউকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথি মারার অজস্র ক্লিপ কী আমরা সোশাল মিডিয়ায় দেখিনাই?  অথচ সামাজিক প্রতিবাদ দূরে থাকে ঐ ঘটনাস্থলের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মজা দেখা এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে “এধরণের ঘটনাগুলো সব গুজব বলে” – এগুলোর কোন অস্তিত্ব নাই বলে মোদীর সংখ্যালঘু মন্ত্রীর বয়ান কী ভারতের মিডিয়া ছাপেনি? কোন মিডিয়াই কী মন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে একটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেছিল? নাকি তখন কি কেবল মনে হয়েছিল “আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর!  কাজেই সমস্যাটা আমার না” – এমন মনে হয়েছিল তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা জানাতে চাচ্ছে কেন?  কে শুনবে? মোদী না অমিত শাহ? কী আশা করেছিলেন আপনি?

বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন? কেন এতদিন চুপ ছিলেন? মুসলমানদের উপর হচ্ছিল বলে? তুচ্ছ করে? তাহলে আপনি কী?

সারা ভারত আর সাথে এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই মুসলমান মারা বা নির্যাতন করার নষ্ট “মেরুকরণের” বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি?  এটা ভারতের কনষ্টিটিউশন-বিরোধী ততপরতা – এই দায়ে বিজেপির উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দিয়ে গেছে? তাই, আজ আঁতকে উঠে লাভ কী, অনিন্দ্য?  সবই তো শেষ!

বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে তা আবিস্কার হয়েছিল এমন নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া ধরণের আবিস্কার সেগুলো।। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনাতে এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই “নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ”। কারণ কে মুসলমান কেবল এটা জানতেই তো বিজেপির এত আয়োজন। তাই নয় কী? তাহলে এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবেপ্রিন্টে ‘নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!”এই শিরোনামে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

গৌতম দাস

 ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2RG

‘Don’t worry about NRC’, Modi tells Hasina – New York, Sept 27 (UNB)

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছেই, তাতে যতই এটাকে সুপ্ত করে ফেলে রাখা অথবা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন! এটা লুকিয়ে থাকছে না। এর চেয়ে বড় কথা, সব হারানো মরিয়া মোদীর হাতে আমাদের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দরজায় কড়া নাড়ছে। বিগত ২০০৯ সালে এই সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ‘বন্ধু-রাষ্ট্র’ বলে সোনার-পাথরের বাটি ধরনের এক অর্থহীন শব্দ দিয়ে। অথচ যা সোনার তৈরি তা আবার পাথরেরও, এমন হওয়ার সুযোগ কোথায়? অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ মাত্রই তো তা আপনা-আপনা। যদি না দলীয় বা ক্ষমতায় থাকার স্বার্থের সাথে একে মাখিয়ে ফেলা হয়। একালে এসে যেটা আবার হয়েছে ‘স্বামী-স্ত্রী’ বলে আরেক ফালতু শব্দে। কূটনীতির জগৎ সম্পর্কে মন্ত্রীদের ন্যূনতম ধারণা থাকলে এসব শব্দ ব্যবহার আমাদের শুনতে পাওয়ার কথা নয়। সরকারকে কৌশলগত কাভার দেয়ার জন্য অনেক শব্দ অনেকসময় ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তাই বলে এভাবে এসব শব্দ দিয়ে নিজেই নিজেকে খাটো নিচা করে দেখানো, বেইজ্জত করা কাম্য নয়। তবে কথিত স্বামী-স্ত্রীর অধস্তনতার সম্পর্ক যে এখন বড় ধরণের সঙ্কটে মুখোমুখি হয়েছে আর মতবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে যাচ্ছে এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল দুবাই থেকে প্রকাশিত এক ইংরাজি দৈনিক গালফ নিউজ পত্রিকায়  সম্প্রতি দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতকার [শিরোনাম “Citizenship Amendment Act is India’s internal matter, Sheikh Hasina says”]। বলতে গেলে তিনি সেখানে সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন [Citizens Amendment Act, CAA] বা সিএএ-কে সমালোচনা করে “অপ্রয়োজনীয়” বলেছেন, “We don’t understand why [the Indian government] did it. It was not necessary,” । এটা আমাদের জন্য খুবই কৌতুহলের যে গত দশ বছরে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সম্ভবত এই প্রথম ভারতের বা মোদী সরকারের খোলাখুলি ও প্রকাশ্য এমন সমালোচনা করলেন, নিজের অসম্মতি অপছন্দের দিক প্রকাশ করলেন। নিঃসন্দেহে এটা প্রকাশ্য মতবিরোধ বা স্বার্থবিরোধে। তবে এটাকে তিনি এখন কোথায় কোনদিকে কতদুর নিতে চান তা বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে ও চোখ খোলা রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই সাক্ষাতকারকে একই সাথে আন্তর্জাতিকভাবে আম-পাবলিকের কাছে মোদীর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে বিচার দেয়া হিসাবেও পড়া যেতে পারে। ব্যাপারটা হল, ভারত সরকারের সিএএ বা এনআরসির কারণে ভারতের সম্ভাব্য বিতারিত মুসলমানেরা বাংলাদেশ অভিমুখে লাইন লাগিয়ে রওনা দিবে না। কারণ সিএওএ বা এনআরসি এগুলো ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। একথাগুলোই হাসিনার গত অক্টোবর ২০১৯ সালে ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন [… Modi has in person assured me]। এই কথাগুলো গালফ নিউজে সাক্ষাতকারের মুখ্য ফোকাস হয়ে হাজির করা হয়েছে। তাই এটা মোদীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ নালিশ অবশ্যই, কিন্তু নিজ সরকার টিকানোর ফ্যাক্টর ভারত – এই অধস্থন ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের দশ বছর পার হবার পর এখন এর কোন মুল্য তাতপর্য কী আছে? নাকি তাতপর্য বা সব মানে হারিয়েছে বলেই এটা এখন আম-পাবলিকের দ্বারস্ত – আমরা কি এভাবে পড়ব?

সিএএ বাস্তবায়নঃ
ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ অফিসিয়ালি গত ১০ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গেজেট হয়েছে। আর এদিকে কঠিন বাস্তবতা এমন যে বিজেপি বা মোদী সরকারকে এই সিএএ বাস্তবায়ন করতে যেতেই হবে। মোদী এমনই কোণের এক চিপায় পড়েছে। বিজেপির জন্য মরি আর বাঁচি ধরনের এক মরিয়া নিরুপায় অবস্থা এটা। কেন? কারণ, ভারতের অর্থনীতির নিম্নগতির মুখে আর বিশেষ করে সহসা এর রিকভারির সম্ভাবনা কম বলে, সরকারের ইমেজের প্রশ্নে আর সরকার চালানো ও লাগাতার আগামি রাজ্য নির্বাচনগুলোতে পাবলিকের মুখোমুখি হতে হলে বিজেপির কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। ফলে এমনিতেই চরম হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির হাতে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সামাজিক পোলারাইজেশন উসকে তুলে টিকে যেতে পারলে তবেই হয়ত তার রক্ষা – এখন সে এই অনুমানে গিয়ে ঠেকেছে। নইলে জন্ম থেকেই বিজেপি-আরএসএস যেমন সারা জীবনে ক্ষমতার ধারে কাছে যেতে পারেনি সেই রকমের দিনগুলোতে তাকে চিরদিনের মত আবার ফিরে যেতে হবে।
তাহলে অবজেকটিভ বাস্তবতাটা হল, বিজেপি বা মোদী সরকারকে মরিয়া হয়ে যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়ন করতেই হবে, হিন্দুত্বের হুজুগ তুলতে পারতে হবে।

কিন্তু সিএএ বাস্তবায়ন মানে আসলে কী? ঠিক কী হবে এতে এখানে? ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছে এমনকি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাও। তারা সরাসরি কথাগুলো নিজের পত্রিকার কোনো রিপোর্ট হিসেবে নয়, সম্পাদকীয় হিসেবে মানে নিজেদের কথা হিসেবে দায়িত্ব নেয়া ভাষ্য হিসেবে প্রকাশ করেছে। সেখানে বলেছে, “নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ ১০ জানুয়ারি গেজেটে বিজ্ঞাপিত হল অর্থাৎ সরকারিভাবে চালু হল। কৌতুহলের বিষয়, তার পাঁচ দিন আগেই উত্তরপ্রদেশ সরকার ঘোষণা করে, তারা আইনটি কার্যকর করতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসকদের বলা হয়েছে (একটি রিপোর্ট অনুসারে কেবল মৌখিকভাবে) এই আইনে উপকৃত ব্যক্তিদের, অর্থাৎ নির্দিষ্ট তিন দেশ থেকে আগত ছয়টি ধর্মের ‘শরণার্থী’দের, শনাক্ত করতে; সেই সঙ্গে সপ্তম যে ধর্মটি ছাড় পাচ্ছে না, তার ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ চিহ্নিত করতে”। আনন্দবাজারও ব্যাপারটা টের পেয়ে সহ্য করতে না পেরে সরাসরি লিখেছে – তবে কি দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটাই প্রধান,অর্থাৎ ‘বেআইনি’ মুসলিম বাসিন্দাদের চিহ্নিত করা?

তাহলে এটা হল, ভারতের ‘মুসলমান খেদানোর’ প্রোগ্রাম। অর্থাৎ সরাসরি বললে, ভারতের মুসলমান বিতাড়নের প্রোগ্রামে নেমে পড়েছে বিজেপি সরকার আর আশা করছে এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতে সামাজিক-রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে, পরিণতিতে ব্যাপকভাবে হিন্দুত্বের উত্থান-জাগরণে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে। তাতে ওই বিতাড়িত মুসলমানদের কী হবে, তারা কোথায় যাবে, তাতে বাংলাদেশের কী হবে ইত্যাদি দিক নিয়ে ভাবার দায় নেয়ার অবস্থায় বিজেপি বা মোদি-অমিতেরা নেই। মনে হচ্ছে, তাদের এখন আপনি বাঁচলে বাপের নাম অবস্থা!

এই অবস্থার বিপরীতে বাংলাদেশের সরকারের হাতে কী আছে? আছে এক ‘আশ্বাস’। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রধানমন্ত্রীর দু’বারের সাক্ষাতে ‘মোদী আশ্বাস’ দিয়েছিলেন বলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।  উপরে গালফ নিউজে ছাপা সাক্ষাতকারেও আমরা একই রেফারেন্স দেখলাম। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই আশ্বাস কী এখন কার্যকর আছে অথবা থাকবে? এর বাস্তব মূল্য কী? প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সমালোচনা দেখে মনে হচ্ছে তিনিও ভরসা পাচ্ছেন না!

আসলে, কঠিন বাস্তবতাটা হল, এটা “ভরসা অযোগ্য” হয়ে গেছে। আমরা যখন দেখতে পাই ও বুঝি যে বিজেপি বা মোদী সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া দশায়, অর্থাৎ আমাদের আশ্বাসদাতারই মরি-বাঁচি অবস্থা – তখন আশ্বাসের মূল্য অনুমেয়! উত্তরপ্রদেশে সিএএ বাস্তবায়ন নিয়ে কী হচ্ছে তা আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে আমরা দেখলাম। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রীর সরকার ক্ষমতায়। আর উত্তরপ্রদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ২০%।

এছাড়া, মোদীর আশ্বাসের ভাষ্যের একটা টেকনিক্যাল দিক আছে। ‘মোদীর আশ্বাস’ ছিল এই বক্তব্য যে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু” হয়ে থাকবে। তাই মোদী এখন কি বলে বসতে পারেন যে, তিনি এনআরসি ইস্যুতে আশ্বাস দিয়েছিলেন কিন্তু সিএএ ইস্যুতে দেননি? তা অবশ্য আমরা এখনো জানি না। তবে ভারতেই অভ্যন্তরীণভাবে মোদী সরকার তার বিরোধীদের সাথে এখন একটা বড় বিতর্ক করছে যে, “এনআরসি আর সিএএ আলাদা” ইস্যু। আর এনআরসি নিয়ে মোদী সরকার নাকি এখনো কোনো ‘কাজই শুরু’ করেনি। আরও পয়েন্ট তুলে বলতে পারেন, বাংলাদেশকে দেয়া কথিত আশ্বাস যখন দেয়া হয়েছিল তখনো ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী (সিএএ) তাদের সংসদে আনাই হয়নি।

আর এখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মোদি সরকার যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া হবে তা আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি। কারণ মোদী এটাকে তার দলের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে ফেলেছে। কাজেই ‘আশ্বাসের’ ওপর যে ভরসা রাখা যাচ্ছে না অথবা যায় না সেটা বাংলাদেশ সরকারের কাজ-কারবারেও স্পষ্ট যে সে এটা ওয়াকিবহাল। যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উত্তেজনা যে আছে ও বাড়ছে তা নিয়ে প্রকাশ্যে যতই আড়ালে রাখা হোক তা আড়ালে থাকছে না। দেশে-বিদেশে তা চর্চার বিষয় হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের সাক্ষাৎ সব একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তত এই তথ্যকে কেন্দ্র করে এটা এখন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ইস্যু। এ নিয়ে ভারতের মিডিয়াতেই বেশি প্রকাশিত রিপোর্ট এটা, যার সর্বশেষ হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের ভারত সফর বাতিল। যদিও এখানে কারণ বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্য সফরে সঙ্গী হতে গিয়ে সেই প্রায়োরিটিতে প্রতিমন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হয়েছে।

এখন বলাই বাহুল্য, সিএএ বাস্তবায়নের পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া কী হতে যাচ্ছে বা হতে পারে তা নিয়ে গ্লোবাল পরিসরে রাজনৈতিক (হিউম্যান রাইট) দিক ছাড়িয়ে তা এখন অর্থনৈতিক দিক থেকেও শঙ্কা সৃষ্টি করবে, এটাও স্বাভাবিক। কারণ কোন ইকোনমিই আর লোকাল নয়, ইকোনমি মাত্রই তা গ্লোবাল ও কানেকটেড। যেমন এত দিন জাপান ছিল অবকাঠামো খাতে কম সুদে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় ঋণদাতা- সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বা এশিয়ান-দাতা আইডিবির মাধ্যমে ঋণদাতা। গত তিন বছরের ফেনোমেনা হল, এর সাথে আরও যোগ হয়েছে – ব্যাপক ‘ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট’ মানে বাংলাদেশে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ নিয়ে জাপান এখন হাজির।

বাংলাদেশে তুলনামূলক সস্তা আর ভাল মানের শ্রমের লোভে জাপানি ম্যানুফ্যাকচারিং এখন স্থানান্তর হচ্ছে এখানে। তাই সোজা ভাষায় বললে, স্বাভাবিকভাবেই মোদীর এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন অধিকার-লঙ্ঘনের তৎপরতার খবরে যা সবাংলাদেশকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল করে ফেলার ইঙ্গিত – এটা নিয়ে, এসব বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত। এরই একটা ঝলক আমরা দেখতে পাই জাপানি মিডিয়ায়। বিনিয়োগকারীদের পছন্দের এমন এক মিডিয়া হল – ‘নিক্কি এশিয়ান রিভিউ [Nikkei Asian Review ]। সেখানেই প্রকাশিত এক রিপোর্টে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে – এটা কী বাংলাদেশে ‘আরেক রোহিঙ্গা সঙ্কট’ তৈরি করতে যাচ্ছে? ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, “আরেকটি রোহিঙ্গা-সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে ভারতের নাগরিকত্ব আইন, আশঙ্কা বাংলাদেশের”।
ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার মাহমুদের কিছু বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে যে আশ্বাস দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মনে করেন যে ভারতের এনআরসি বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না”। তবে শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।’
নিক্কি রিভিউয়ে যদিও লেখা হয়েছে যে, এর মানে হল ওই মহাপরিচালক “এই আশঙ্কাকে পাত্তা দিচ্ছেন না”। হ্যাঁ, সে কথা সত্য। কিন্তু বুঝতে হবে মহাপরিচালকের ভাষ্যটা বাংলাদেশের ‘অফিসিয়াল’ কূটনীতিক ভাষ্য। অফিসিয়ালি বাংলাদেশ সরকার এখনও ‘মনের শঙ্কার’ কথা অফিসিয়ালি বাইরে আনার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে নিক্কির ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের এক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৈহিদ হোসেনের বক্তব্যও এনেছে। সেটা হল, তৈহিদ হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, “বাংলাদেশের মাথার ওপর সিএএ একটি খাঁড়ার মতো ঝুলে আছে। যেকোনো সময় এটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে”। আসলে এটাই জেনুইন ভাষ্য। আমাদের সরকার এই ‘প্রাক্তন’ মুখগুলোকেই অ্যাক্টিভ করে মনের কথাগুলো আরো বেশি করে ইনফরমালি বাইরে আনার চেষ্টা করতে পারে।

বাংলাদেশের সরকার বিষয়টা নিয়ে ওয়াকিবহাল। কিছু প্রস্তুতির প্রকাশ্য দিকটাও আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই। যেমন সীমান্তের এক কিলোমিটার এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক চাইলে যেন বন্ধ করে রাখা যায়, এর কার্যকারিতা ইতোমধ্যে এক মহড়ায় টেস্ট করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কিছু সঙ্কীর্ণ নির্বুদ্ধিতাও আছে। এ ছাড়া সরকারের কিছু স্থায়ী নিজ দুর্বলতা আছে, যা ফলাফলে সরকারকে ভারতের সাথে তোষামোদকারীর ভুমিকায় হাজির করে রাখে বা রেখেছে। এটাই স্থায়ী সমস্যা, যা সমালোচকরা অনেকসময় বাংলাদেশকে ভারতের বাঁদী-রাষ্ট্র বা ভেসেল রাষ্ট্র বলে মূল্যায়ন করে দেখিয়ে থাকে।

নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ- এই আইনটা দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মূলত হিন্দুরা সরকার বা রাষ্ট্রের নিপীড়নে বা ‘পারসিকিউশনে’ [Persecution] আছে – এটা স্পষ্ট করে লিখে দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই দাবির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হল, “এটা বিএনপি আমলে হয়েছে”। আর শাহরিয়ার কবিরকে দিয়ে বলানো হয়েছিল যে, বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা নাকি ২% বেড়েছে। কারণ তারা ভারত থেকে ফিরে এসেছে। সরকারের এসব প্রতিক্রিয়াকে নির্বুদ্ধিতা বললেও কম বলা হবে।
প্রথমত, ভারত সিএএ আইনে অভিযোগ করছে বাংলাদেশ হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’। তাহলে, ভারত ফেরত পাঠানোর সময় সেই হিন্দুদের না পাঠিয়ে কেবল এবং একমাত্র মুসলমানদেরই আনছে কেন? এই প্রশ্ন ওদের মুখে ছুড়ে দেয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া ভারত যদি নিশ্চিত চিহ্নিত করেই হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’ কথা জানে তাহলে তো কাজটা সহজ। তাহলে এর প্রমাণগুলো বাংলাদেশের কাছে বুঝিয়ে দিলে বাংলাদেশ বিনাবাক্যে তাদের ফিরিয়ে নেবে, পুনর্বাসিত করবে এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ দিতে পারে, প্রতিকার হিসাবে দেয়া উচিতও। ফলে দিয়ে দিক। আর যে নিপীড়িত হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছে এখন আগেই তাদের সীমান্তে পাঠিয়ে হয়রানি না করে তাদের সেসব ‘নিশ্চিত চিহ্নিত’ ডকুমেন্ট আগেই বাংলাদেশের কাছে পেশ করে তাদের ফেরত নেয়ার একটা মেকানিজম তৈরিতে বাংলাদেশ রাজি আছে সে প্রস্তাব দিলেই তো হয়।
এখানে ‘গায়েবি’ অভিযোগের সুযোগ বন্ধ করাই হতে পারে বাংলাদেশের মূল স্বার্থ। সেখানে বাংলাদেশও ‘বিএনপি আমলে হয়েছে’ আর ‘২% ফেরত’- এসব গায়েবিভাবে বক্তব্যে তুলে ধরেছে। এটা আত্মঘাতী ও নির্বুদ্ধিতা। আবার দেখা যাচ্ছে,  সরকার ধরেই নিয়েছে এই ইস্যুতে যাদের শুনানোর জন্য এই ভাষ্য সরকার দিচ্ছে, তারা যেনবা বাংলাদেশের পাবলিক। অথচ সরকার বাস্তবে এই ভাষ্যের খাতক হবার কথা ভারতের মোদী-অমিত। কিন্তু আবার এর মানে কি সরকার ভারতের কাছে বিএনপির নামে বিচার দিচ্ছে? সে ক্ষেত্রে এটা কি কোনো সরকারের কাজ হতে পারে, না সাজে? সরকার চালানো কি খেলাপাতি খেলা! যে কীছু হলেই আমি না বিএনপি! বলতে হবে?
উল্টোদিকে, বাংলাদেশে ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে পরে ‘আওয়ামী লীগকে কেন হিন্দুরা ভোট দেয়’ এই অজুহাতে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ সেকালেরই অনেক লিডিং মিডিয়ায় এসেছিল। কিন্তু আমাদের অনেকের ধারণা সরকারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের তদন্ত করালে এবং একেবারে বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করালে সেটা বোধহয় সরকারের বিরুদ্ধেই যায়!  এটা স্বল্পবুদ্ধি ও কূটচিন্তার মানুষের ধারণা।  বিএনপিও এটাই বুঝেছিল। অথচ বিএনপি সরকার যদি সেকালে ওই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করে রাখত, তাহলে আজ না ভারত না বর্তমান সরকারের পক্ষে ইচ্ছামত কোনো অভিযোগ তোলা সম্ভব হত। কাজেই তদন্ত না করাটা সবসময় কোন সরকারের পক্ষেই যাবেই এই অনুমান ভিত্তিহীন।
নিরপেক্ষ তদন্ত করা সেকালে হয়ে থাকলে সেই ভাষ্যটাই এখন সব আটকে দিতে পারত। মূল কথাটা হল, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে পালালে তো হবে না, মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দায় নিতে হবে। উপযুক্ত প্রতিকার দিতে হবে। এতে কমপক্ষে পুরা দল নিজেকে পরিষ্কার আর অভিযোগমুক্ত রাখতে পারবে। যেটা আসলে একটা দলের জন্য বিরাট অ্যাসেট। বিএনপি নিশ্চয়ই আজ মানবে সে কথা। সেকালে দলের বিশেষ কিছু লোকের কুস্বার্থে আজ অন্যের সব আবর্জনা আর খারাপ উদ্দেশ্যের দায় বিএনপির মাথায় আসছে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের সংসদের বক্তৃতায় অমিত শাহ্ দাবি করেছিল বাংলাদেশে নাকি ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ স্বাধীনতার পর থেকেই হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো সরকারের আমলকেই তিনি বাদ দেননি। এমনকি বিজেপি-আরএসএসের প্রতিনিধি বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক বা প্রিয়া সাহার অভিযোগও তো তাই। কাজেই মোদী-অমিতের কাছে বিএনপির নামে অভিযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সরকার কোথায় পালাতে চায়? সরকার চালানো খেলাপাতি না যে সব মুখে অস্বীকার করে অন্যের ওপর দায় দিতে হবে- এসব কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়। আজ অবস্থা তৈরি হয়েছে এমন যে মোদী-অমিত আমাদের সরকারের ‘আমরা না, বিএনপি’ টাইপের ছেলেখেলাকেই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে বলবে যে, বাংলাদেশের সরকার বলেছে যে ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ হয়েছে। অর্থাৎ অমিত শাহরা চাইলে বলতে পারবে যে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ বিলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে রাখা জায়েজ আছে।
এ কারণেই আমাদেরকে অন্য সরকারের অভিযোগ সিরিয়াসলি নিতে হবে, প্রমাণ চাইতে হবে। প্রমাণিত হলে দায় নিতে হবে। প্রতিকার দিতে হবে। আর প্রমাণ না দিতে পারলে মাফ চাইতে বাধ্য করতে হবে।

সরকারের স্থায়ী দুর্বলতাঃ
সাধারণভাবে আমরা সবাই বুঝতে পারি ভারতের মোদী-অমিতের এসব ন্যুইসেন্স আর ইসলামবিদ্বেষ জাগিয়ে ভারতের ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, মেজরিটি মানুষ খুবই বিক্ষুব্ধ। অথচ এটাকে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে নিতে বা এই বিক্ষোভের ভয়েস ও প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে হাজির করতে সরকার অপারগ। কারণ গত ১০ বছর এর উল্টা লাইনেই হেঁটেছে সরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের গণভিত্তি তৈরি করে নেবে সে পথেও সরকার নেই। সম্ভবত সে পথে ফেরার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে, সরকারের অনুমান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলতে পারার ক্ষেত্রে বিদেশীরা (মূলত আমেরিকা) বিরাট হুমকি। ঠিক যেমন করে ২০০৭ সালে বিদেশীরা এক সরকার এনেছিল। পরিণতিতে এই সরকার বসেছিল। অতএব এই হুমকি কাউন্টার করতে ভারতকে পাশে রাখতে হবে, তোষামোদ করতে হবে – ভারত নির্ভরশীলতা এখান থেকেই – সরকারের অনুমান এমন বলে মনে হয়। ফলাফলে, মোদী-অমিতের সব ন্যুইসেন্সের বিরুদ্ধে জনগণ তৈরি হলেও সরকার তা ব্যবহার করার ‘জনপ্রতিনিধি’ হওয়ার সুযোগ নিতে পারছে না। এই হলো বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সঙ্কট।
আজ এটা পরিষ্কার মোদী-অমিতের এখন আর নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু হাতে নেই। মোদি-অমিতের বিচারে ‘মুসলমান খেদানো’র প্রোগ্রাম এখন তাদের একমাত্র সম্ভাবনা -আয়ু ও বাঁচোয়া! বাকি সব হারিয়েছে তারা। এখন জায়গা মত সুযোগ পেলে বাংলাদেশের সরকারকেও তাদের লক্ষ্যে বেচে দেয়ার চেষ্টা করবে, এমনই তলানিতে ঠেকেছে তারা! একারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এনআরসি বা সিএএ ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসাবে রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্বেও অমিত শাহ্‌ ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত যে কোন নির্বাচন এলেই  “অনুপ্রবেশকারী” মানে “মুসলমান খেদানো”, আর তেলাপোকা বা উইপোকা বলে গালি দিয়ে তুচ্ছ করে তাদের পিষে মারার কথাই বেপরোয়া বলে চলেছেন। এটাই প্রমাণ যে কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষার অবস্থায় বিজেপি বা মোদী-অমিতেরা নাই। অসুস্থ, বর্ণবাদী এরা এমনই বেপরোয়া!

কিন্তু আমাদের সরকার নিজে বা খোদ বাংলাদেশ কী মোদী-অমিতের ন্যুইসেন্স থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? আমরা আশঙ্কিত! কারণ, সরকার ভুল রাস্তায় হাঁটছে। এছাড়া, আমাদের সরকারগুলো স্বাধীনতার পর থেকেই ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ করে থাকলে নির্যাতনের শিকার সেই হিন্দুদের বদলে মুসলমানদের সীমান্তে জড়ো করা হচ্ছে কেন? এই সাধারণ স্ববিরোধিতাটাকেও প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে আমাদের সরকার!

এরই ভিতরে সরকারের মুজিববর্ষ পালনের গুরুত্বপুর্ণ  “মুলবক্তা” অতিথি হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  মুসলমানবিদ্বেষী এত ঘৃণার চাষাবাদ যার মনের কোণে কোণে তিনি আরও প্রায় তিন মাস সিএএ বাস্তবায়ন করে কত কিছু যে করে আসবেন কে জানে? আবার আসার পর বাংলাদেশে তার কেমন লাগবে, কাটবে; আর আমরাই বা তাকে কীভাবে নিব? ভাববার আছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৮ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির নিজ সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

গৌতম দাস

 ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Rl

অমিত শাহ্ যে গুজরাটের দাঙ্গাবাজ পুরান গুণ্ডা, দিল্লিতে এসেও তিনি সে প্রমাণ আবার রাখলেন।
ভারতের একাডেমিক জগতের ও হবু শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কোনটা? ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচার ও চোখে নামকরা, উঁচু প্রেস্টিজের বিশ্ববিদ্যালয় বলতে সম্ভবত সবাই বলবে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে জেএনইউ [JNU]

সেই জেএনইউতে গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যার অন্ধকারে রাস্তার আলো নিভিয়ে সব গেটে পুলিশি সহযোগিতায় পাহারা বসিয়ে কেবল বিজেপি সমর্থকদের লাঠিসোটা নিয়ে প্রবেশ ঘটানো হয়েছিল। এরপর তাদের দিয়ে হলে হলে ঢুকে বিরোধী শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতাদের নির্বিচারে হামলা করে পিটানো হয়েছে। আবার কয়েক ঘণ্টা পর হামলাকারীদের অবাধে জেএনইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করে, সব রাস্তার বাতি জ্বেলে দিয়ে সব গেট থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তিতে এসব হামলাকারীর কিছু ছবি মিডিয়াতে দেখা গেছে। তাতে হামলাকারী সবারই মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা দেখা ছিল। এই হামলায় ছাত্র সংসদের ভিপি ঐশী ঘোষ ও কয়েকজন শিক্ষকসহ প্রায় ৩০ জন গুরুতর আঘাতের শিকার হয়েছেন। আনন্দবাজার লিখেছে, ‘প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জন পড়ুয়াকে (পিজি) এমস-এ ভর্তি করা হয়েছে। অন্তত দু’জনের অবস্থা গুরুতর। শুধু হস্টেল নয়, ক্যাম্পাসে গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পাথর ছোড়া হয়। মেয়েদের হস্টেলে এসিড নিয়েও হামলার চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ” [গেরুয়া’ হামলায় রক্তাক্ত জেএনইউ]। “প্রতিবাদ করতে গিয়ে মার খেতে হয় জেএনইউয়ের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট’-এর অধ্যাপিকা সুচরিতা সেন-সহ একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে। সুচরিতাকে এমস-এ [AIIMS] ভর্তি করতে হয়েছে”। এখানে লক্ষণীয়, হামলাকারীরা এসিডও বহন করছিল আর তা নিয়ে হামলা হয়েছে।

ইংরেজি ওয়েব মিডিয়া ‘দ্য স্ক্রল [THE SCROLL]’ চারটি প্রশ্ন তুলে এক আর্টিকেল লিখেছে। এক. ফুটপাথের আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছিল কেন? দুই. কেন গেটের পুলিশ বেছে কাউকে ঢুকতে দিয়েছিল, আর কাউকে দেয়নি? তিন. যারা আগ্রাসীভাবে ও সশস্ত্র হয়ে ঢুকছিল পুলিশ কেন তাদের আটক করে রাখেনি? চার. গেটেই সন্ত্রাসী গ্যাংটাকে পুলিশ কেন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি?

বলা বাহুল্য, এই চার প্রশ্নেই সব জবাব ও পুলিশের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ আছে।

তবে মূল কথা, মুখ ঢেকে মুখোশ পরে হামলা করলেও মিডিয়ায় বা সামাজিক স্তরে হামলাকারীরা আর ‘অজ্ঞাত’ নয়। মিডিয়াতেই এটা প্রতিষ্ঠিত যে হামলাকারীরা আরএসএসের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি (অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, ABVP), তাদের নেতৃত্বই এই হামলা হয়েছে। আনন্দবাজার লিখেছে, “বিকেল থেকেই ক্যাম্পাসে ভিড় জমতে শুরু করে। মুখোশধারী গুণ্ডারা প্রথমে সাবরমতী ধাবার বাইরে জড়ো হয়। পড়ুয়াদের অভিযোগ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপি নেতা-নেত্রীরা ভাড়াটে গুণ্ডাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে। রড, লাঠি, বাঁশ নিয়ে পড়ুয়াদের ওপর চড়াও হয় তারা। হস্টেলের আলো নিভিয়ে দিয়ে হামলার পাশাপাশি সাবরমতী, কাবেরী, পরিয়ার হস্টেলে ভাঙচুরও চলে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন”। ……”ভিতরে যখন হামলা চলছে, তখন গেটের বাইরে স্লোগান ওঠে ‘গোলি মারো শালো কো’, ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘জয় শ্রী রাম’ “।   এছাড়া আর এক রিপোর্টে লেখা হয়েছে, “বিরোধীদের অভিযোগ, মোদী-অমিতের তত্ত্বাবধানেই হামলাকারীরা বাইরে থেকে জেএনইউয়ে ঢুকেছিল। হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে বিজেপি ও সঙ্ঘের স্থানীয় নেতাদের চিহ্নিত করে নাম প্রকাশ করে দিয়েছে কংগ্রেস। প্রকাশ্যে আসা ভিডিয়োগুলো সঙ্ঘের অস্বস্তি বাড়িয়েছে”।

জেএনইউ নিয়ে গর্ব বা একে নামকরা বলার পেছনে অনেক কারণ বা বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এর সাবেক ছাত্ররা ভারতের একাডেমিক বা কর্মজগতে বড় বড় জায়গা নিয়ে আছেন। আবার অনেক গরিব বা সামাজিক স্ট্যাটাসের বিচারে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীও এখানে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে থাকেন। মূলত মেধাবী হওয়ার কারণে এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে গড়ে নিতে পেরেছেন। বলা যায় চেপে বসা সামাজিক স্ট্যাটাস বা স্তরভেদ তারা উলটে দিয়েছেন তাতে, তিনি মুসলমান বা দলিত অথবা গরিব যাই হোন না কেন! এসব মিলিত কারণে জেএনইউতে সাবেক স্টুডেন্ট বা সাবেকি শব্দটাও বেশ গর্বের। কিন্তু সেটা এই হামলার ঘটনায় বিজেপির বিরুদ্ধে গেছে। হামলা চলাকালীন বা পরে বা দূরে থেকেও এই সাবেকরাই ঘটনার নিন্দা করে পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আর তাতে এমনকি মোদি সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নিজের সাবেকি পরিচয়ের গৌরব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে হামলার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়ে বসেন। এমনকি কেন্দ্র সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ হামলার নিন্দা করেন। যেটা অন্য অনেক মন্ত্রী আর সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছকাছি বা পক্ষের মতো শোনায় এমন বিবৃতি দিয়েও ভারসাম্য আনা সম্ভব হয়নি। হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ এমন প্রাক্তন স্টুডেন্টদের কিছু প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে একটা রিপোর্ট [মনোবল চুরমার করতেই কি হস্টেলে হামলা] এখানে আছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

কেন  জেএনইউ’র বিরুদ্ধে অমিত শাহের এত রাগ ক্ষোভঃ
সাধারণভাবে জেএনইউতে কমিউনিস্ট চিন্তা এখনো তুলনায় প্রভাবশালী ও ডমিনেটিং ধারা। সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি তার আমলে জেএনইউ স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (সংসদ) প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গত তিন সেশনে এখানে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কমিউনিস্ট। এমনিতেও শাসক-চিন্তা বা শাসক-বয়ান বিরোধিতা করে চলার এক ঐতিহ্য জেএনইউতে ছিলই। তবে এটা সম্ভব হয়েছে জেএনইউ “স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়” আইনে চলা ও শুরু থেকেই তা চর্চা করা হয়ে আসছে বলে। তাই এটা কমিউনিস্ট চিন্তা-চর্চারও এক সেন্টার হতে সুযোগ পেয়েছিল, এমনকি এর কমিউনিস্ট নকশালী অপর ধারাও। তবে এমন কমিউনিস্ট প্রভাব কেবল ছাত্রছাত্রীদের কারণে নয়, মূলত ফ্যাকাল্টি মেম্বাররাও অনেকে “প্রগতিশীল ও বামপন্থার” অনুসারী বলে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু গত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সারা দুনিয়াতেই ‘প্রগতিশীলতা’ বা ‘বামপন্থা’ সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তাধারা মনে করার এই ভ্যানিটি ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। ফলে দুনিয়াজুড়ে এই চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়ার শুরু এঘটনা থেকে। এছাড়াও পরে তা আবার আরেক বড় ধাক্কা খেয়েছিল। নতুন শতাব্দীতে ২০০১ সালের পর আল কায়েদা ফেনোমেনার কারণে গ্লোবাল নতুন মস্ত ইস্যু হাজির হয়ে যায় – ‘ইসলাম প্রশ্ন’। ‘ইসলাম ইস্যু’ এমন অজস্র গুরুত্বপূর্ণ ও সিরিয়াস প্রশ্ন তুলে এনেছিল যেমন ধরা যাক, স্পিরিচুয়ালিটি কী? শুধু তাই নয়, আরো দিক হল এই প্রশ্নের জবাব পাওয়াটা কী খুব এসেনসিয়াল মানে অনিবার্য প্রয়োজন? এসব গুরুতর প্রশ্নের জবাব কোনো প্রগতিশীলের কাছে তৈরি ছিল না। বরং এগুলো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন মনে করে তারা ফেলে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু সমসাময়িক প্রধান প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে না পারলে, তৈরি না থাকলে যেকোনো চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়তে বাধ্য। আসলে, শুধু তাই নয়, এক ধর্মবিদ্বেষ বিশেষত ইসলামবিদ্বেষ দিয়ে এই জবাবহীনতার খামতি ঢেকে রাখা হয়েছিল এতদিন। তবে অবশ্যই আবার ব্যাপারটা এমন নয় যে, প্রশ্নকর্তাদের কাছেও জবাবটা আছে বা ছিল। তাই সার-অবস্থাটা হল, যে বুঝতে বা আমল করতে চায় সে বুঝবে চিন্তা-জগতের বিরাট ঘাটতির গর্তটা কোথায় লুকিয়ে আছে! কারণ এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আসলে ঘাটতি লুকাতে চাইলে এই দুর্দশাকে ‘টেরর বা সন্ত্রাসীদের’ কারবার বলে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের কোলে উঠে পড়ার রাস্তা খোলা ছিল। তাই অনেকে সেকালের ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ বুশের কোলে উঠেও নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবি করছিল।

আর যারা নিজেকেই ফিরে দেখা – মানে রিভিউ আর ক্রিটিক্যাল চোখ ফেলে মানে নিজেরই পর্যালোচক হয়ে নিজেকে ঢেলে সাজিয়ে নেয়ার সাহস রাখে তারা নিজেকে পুনর্গঠনের পথ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই পথে বাংলাদেশও যতটা এগিয়েছে ভারত এর ধারেকাছেও আসেনি। খুব সম্ভবত এর একটা কারণ ভারতের রুলিং বা শাসক শ্রেণীর বয়ান। নিজের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন কম্বিনেশন ও বিকাশের কারণে ভারতের একাডেমিক জগতও এখানে স্বাধীনভাবে না বরং শাসক-বয়ানের নিরিখে সমস্যাটাকে দেখেছিল। এই বড় গুরুত্বপুর্ণ দিকটা আমল না করে পাস কাটাতে চেয়েছিল। তাই নিজ চিন্তার খামতি নয় বরং ব্যাপারটাকে ‘টেররিজম’ হিসেবে দেখার বয়ান মেনে নিয়েছিল। তাই ‘ইসলাম প্রশ্ন’ ভারতের  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ কোনো একাডেমিক দুনিয়ায়, এখনো তেমন জবাব না জানা প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে – স্টাডি খোঁজাখুঁজি গবেষণা চলছে এমন জানা যায় না। যদিও ভারতের স্ট্রাটেজিক ইনস্টিটিউট অনেকগুলোই আছে যেখানে রাষ্ট্রের ডিফেন্সের চোখে ক্ষমতাকে রক্ষার আলাপ সেখানে চলে, তা দরকারিও হয়ত। কিন্তু নিজ চিন্তার দোষত্রুটি, নিজ ইসলামবিদ্বেষের বোঝা বা নিজ চিন্তায় ঘাটতি বুঝার বিষয়টা সেখানে ইস্যু হওয়ার সুযোগ পায় নাই। তা না হওয়ারই কথা, অবশ্য। এক কথায় এসবের মিলিত কারণে ভারতের একাডেমিক ভ্যানিটি এখনো প্রগতিশীল ও বামপন্থার অনুসারী হয়েই আটকে আছে। তবু ভারতের অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন প্রগতিশীলতা ও বামপন্থার প্রভাব দেখা যায়- জেএনইউ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। তবে জেএনইউ তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের চোখে, তাদের হিন্দুত্ববাদের চোখে তাকে বধ করতে, তার বয়ান ফুটো করে দিতে, তাকে প্রভাবহীন করতে প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলার এখনো ক্ষমতা রাখে ও পারে এই প্রগতিশীল ও বামপন্থার বয়ান। তাই বয়ানের সক্ষমতা এ’প্রসঙ্গে বিজেপি তাকে চ্যালেঞ্জ করা প্রতিপক্ষ হিসাবে কংগ্রেসের চেয়েও কমিউনিস্টদের প্রধান শত্রু মনে করে। এর অবশ্য অন্য একটা বড় কারণ আছে। বিষয়টা ভোট বাক্সের, বয়ানের তত নয়।

ভারতের প্রধান ধারার সব রাজনৈতিক দলই একটা পর্যায় পর্যন্ত কমবেশি মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী। তা চিনার উপায় হল, যারা-ই ‘জাতি’ ধারণাটা অনিবার্য ভেবে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে গ্রহণ করেছে মানে রাজনীতিকে রাষ্ট্র-নাগরিক-অধিকার এই ফ্রেমে না ভাবতে পারে না। বুঝে না বা বুঝতে চায় না বা বুঝেনি, বরং  ব্যাপারটাকে রাষ্ট্র নয় “জাতি” হিসেবে বুঝেছে। যেমন ভারতীয় “জাতি” বা হিন্দু “জাতি”  হিসেবে- এমন এরা সবাই এই দলের এই ধারার। যে অর্থে কমিউনিস্টরাও জাতীয়তাবাদকে সহযোগী মনে করে ও পাশে রেখেই হাঁটে। তুলনায় কংগ্রেস মূলত হিন্দুইজমের জাতি-বাদী রাজনীতির ধারক এবং আগের তুলনায় কম প্রকাশ্য এই অবস্থান একালে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের সাথে মোকাবিলা করতে  গিয়ে রাহুল গান্ধী হিন্দু ভোট হারাবার ভয়ে বিজেপিকে “হিন্দুত্ববাদকে সমালোচনা করতে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। বরং নিজেই নিজেকে “সফট হিন্দুত্ববাদী” বলে লেভেল দেয়। এর বিপরীতে কেউ হিন্দু বলে কমিউনিস্টদের ভোট দেবে তা অবশ্য কমিউনিস্টদের মনে আশা নাই বলে তাদের পরোয়াও নাই। এ কারণে বিজেপির হিন্দুত্বের সমালোচনায় কমিউনিস্টরা তুলনায় অন্তত কংগ্রেসের চেয়ে এগিয়ে ও বেপরোয়া। এ কারণেই কমিউনিস্ট প্রভাব অমিত শাহের বিশেষভাবে চক্ষুশূল। এ জন্যই কমিউনিস্টদের “টুকরে টুকরে গ্যাং” বলে নাম দিয়ে তুচ্ছ করা শুরু করেছেন অমিত শাহ্। বিজেপির চোখে ‘হিন্দু-জাতির’ জন্য ‘দেশপ্রেম’ একটা আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য আর যাদের তা নেই তারা দেশদ্রোহী- এই বিচারে কমিউনিস্টরা নাকি “দেশদ্রোহী”। মুখ ঢেকে অন্ধকারে হামলার সময় তাই বিজেপি কর্মীদের স্লোগান ছিল- এই “দেশদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে। এই প্রতিহিংসা এটা নাকি তাদের আসলে ‘মরাল-শক্তি’ যোগানদার উৎস।

অমিত শাহের দৃঢ়বিশ্বাস ভারতে মোদী-অমিতের যে বাধাহীন তাণ্ডব বা প্রভাব বাড়ছিল তা হঠাৎ নাগরিকত্ব ইস্যুতে পা-হড়কে পড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ এই কমিউনিস্টরা, অন্যেরা ততটা না। সংখ্যায় এরা কিছুই না কিন্তু ‘এরা গ্যাং’। বিরাট উসকানিদাতা, যা হিন্দুত্ববাদের সুড়সুড়ি বা বিজেপির তৈরি পোলারাইজেশন উল্টে দিতে পারে। অতএব, এদের দৈহিকভাবে হামলা করো, ভয় দেখাও, যেভাবে পারো দমাও।

অমিত শাহের এই হিসাবটাও ভুল। বর্তমানে নাগরিকত্ব ইস্যুতে বিজেপিবিরোধী এই আন্দোলনের আসলে এখন পর্যন্ত মূল শক্তি ঠিক কমিউনিস্টরা নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরা যাদের মধ্যে কমিউনিস্টরাও আছে অবশ্য। একজন মানুষ কেবল মুসলমান বলে তাকে অধিকারবঞ্চিত করতে হবে, আর এর দায় বিজেপি ঐ শিক্ষার্থীদেরও নিতে ও সমর্থন করতে বলবে – এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে শিক্ষার্থী তরুণদের কাছে।  বিজেপির এই ঘৃণার মূল্যবোধ তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম (নর্থ-ইস্ট) বাদে (এদুটো স্ব স্ব সমাজের মেজরিটি অংশ বলে ফোরফ্রন্টে) বাকি রাজ্যে এবারের আন্দোলনের মূল শক্তি কিন্তু এই তরুণ শিক্ষার্থীরাই। সম্ভবত এটা বলা সেফ হবে যে, গত প্রায় ছয় বছর মোদী-অমিতেরা মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলানোর বল প্রয়োগ বা লিঞ্চিং-এর হুজুগে যে তরুণদের সংগঠিত করেছিল তারা আলাদা, তারা অন্য সেটের তরুণ। লিঞ্চিংয়ের তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় সমাজের কম শিক্ষিত ও কম শহুরে অংশের। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীরা এখনো কম শিক্ষিত ও কম শহুরে তরুণদের রিপ্লেস করে নিজের ডমিনেটিং জায়গা ধরে রাখতে পারছে, লিঞ্চিংয়ের তরুণদের মাঠছাড়া করে রাখতে পারছে।

তবে কম শিক্ষিত ও কম শহুরে আগের তরুণদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের সমর্থক ও পাশে এসে দাঁড়ানোর মত জনগোষ্ঠী সমাজে সংখ্যাগরিস্ট মনে হচ্ছে। যেমন এমন জনগোষ্ঠির মধ্যে সমাজের মুসলমানরা তো আছেই সেই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে যারা বিজেপিবিরোধী এমন সবাই এদের সাথে শামিল হয়েছে।

কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যুতে যারা মোদী-অমিতের সরকারের বিরোধী, যারা প্রতিবাদের সংগঠক বা পালটা বয়ানদাতা তারা সবাই-ই কমিউনিস্ট এমন ধারণা সত্য নয়। তবে মূল গোষ্ঠিটা যারা – সাধারণভাবে বললে এরা “আধুনিক মনের ফ্রিডম”’ পছন্দের তরুণ বলা যায়। যাদের সাথে বিজেপির মূল্যবোধের ফারাক বা গ্যাপ অনেক বড়।

তবে কেউ শাসক হিসেবে সামনে গণপ্রতিরোধ দেখলে তাদের পিটিয়ে, ভয় দেখিয়ে ঠাণ্ডা করতে হবে – এই চিন্তা, এটা হিটলারি চিন্তা চর্চা করার পথ। এতে মনের প্রতিহিংসা কিছু মিটে বা কমে হয়ত, এছাড়া আরও কোন লাভ নাই লাভ হয়নি কোনদিন, লাভ হয় না। তাই নিরাপদেই বলা যায়, বিজেপির মুল্যবোধ আসলে প্রতিহিংসা মাখানো মানে প্রতিহিংসা-সম্পন্ন। বিজেপির ভবিষ্যত আটকে আছে অন্তত এখানেই।  কিন্তু আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি একারণে বিজেপি এখন জবরদস্তি মানে বল্প্রয়োগের রাস্তা ধরার সম্ভাবনা বাড়বে। তাহলে সব মিলিয়ে অমিত শাহের চোখে এসব কিসের ইঙ্গিত?

পরিকল্পিত দাঙ্গা করে সেখান থেকে নিজেই নিজের লক্ষ্য বের করে আনাতে অমিত শাহ্ নিজেকে সিদ্ধহস্ত মনে করেন। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলমান মেরে হাত পাকিয়ে তার এই গভীর আস্থা অর্জনের শুরু। সেই অমিত শাহ্ এখন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর ওদিকে জেএনইউ দিল্লির কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্তর্গত। অর্থাৎ জেএনইউ দিল্লির রাজ্য সরকারের এখতিয়ারের এলাকা নয়। এই সুযোগ নিয়ে অমিত শাহ্ দিল্লির পুলিশ কমিশনার অমূল্য পট্টনায়কের অধীনে জেএনইউয়ের তাণ্ডব ঘটিয়েছেন। ক্যাম্পাসে এবিভিপিকে ঢুকিয়ে গুণ্ডামি করে আবার তাদের সেফ এক্সিটের ব্যবস্থাও করে দিয়ে পুলিশ ফিরে গেছে। কিন্তু তবু অমিত শাহ্ এখানে পরাজিত। এখনও জেএনইউয়ে ছাত্র-শিক্ষক পেটানো নিয়ে টুঁ শব্দ করেন নাই প্রধানমন্ত্রী মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত। তবুওও তারা পরাজিত এবং এই হামলার কিছুই লুকানো থাকবে না। কেন?

কারণ ইতোমধ্যেই পরের দিন মানে সাত জানুয়ারির এক টিভি টকশোতেই সব ফাঁস হয়ে যায়। ভারতের টকশো বাংলাদেশের টকশোর মতো নয়, ভয়ের কোন খাঁড়া ঘাড়ের ওপর ঝুলছে- ঠিক এ রকম নয়, তুলনামূলক অর্থে স্বাধীন। আর ভাল টকশো মানে ভার টিআরপি- এটা প্রতিযোগিতামূলক টিভি-মিডিয়ার ভারতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঐ কথিত টকশোতে, এক টিভি চ্যানেলে বিজেপির পক্ষ থেকে ছিলেন এবিভিপির দিল্লি শাখার এক যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর। টকশোতে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে চাপ সামলাতে না পেরে একপর্যায়ে ওই মুখোশ-হামলার পক্ষে সাফাই দিতে গিয়ে তিনি সব স্বীকার করে ফেলেন। তিনি বলেন, “সেদিন এমনই ‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি হয় যে, ‘আত্মরক্ষায়’ রড, লাঠি এমনকি এসিড সাথে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। নির্দেশও তেমনই ছিল-” এটা আনন্দবাজার লিখেছে। আরো লিখেছে, “অনিমার দাবি, বামপন্থী পড়ুয়াদের ‘লাগাতার আক্রমণের’ মুখে এবিভিপির সদস্য ও নেতারা এত ‘ভীত-সন্ত্রস্ত্র’ ছিলেন যে, ঘর থেকে বাইরে বেরোলে সাথে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম রাখতে বলা হয়েছিল প্রত্যেককে। লাঠি, রড, গোলমরিচ গুঁড়ার স্প্রে, এসিড – যে যা হাতে পেয়েছেন, তা-ই সাথে নিয়ে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি। টিভি চ্যানেলে তিনি এ-ও মেনে নিয়েছেন যে, বিকাশ এবিভিপির কর্মী [যাকে বিভিন্ন মিডিয়ায় ছবিতে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল।] বেফাঁস বলছেন বুঝতে পেরেই অবশ্য বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাঠি হাতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনিই বিকাশ কি না, তা নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বলেন, ‘কোনো হস্টেলে এসিড আক্রমণের ঘটনাও তার জানা নেই”।

এক কথায় বললে, অমিত শাহ্ এখন পুরা ধরা খেয়েছেন। সব কিছুই এখন ওপেন সিক্রেট। ঘটনা এখন আদালত পর্যন্ত যদি যায় বা যখন যাবে তাতে পুলিশ অফিসারসহ অনেকেই নিজেকে শাস্তি বা চাকরিচ্যুতি থেকে বাঁচাতে পারবেন মনে হয় না। তাতে পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট এখন অমিত শাহ্ যেভাবেই লেখান না কেন!

তাহলে এখন অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেবেন? এটা বলাই বাহুল্য, মুখোশ পরে এমন বেধড়ক মারের দেয়ার উদ্যোক্তা অমিত শাহকে সামনে আরও অনেকবার করতে হবে, বুঝাই যাচ্ছে। এছাড়া তার পক্ষে আরো চার বছর ক্ষমতায় থাকা মুশকিল হবে। তাহলে উপায়?

একটাই সহজ উপায় আছে। আর অমিত শাহ্ ধীরে ধীরে তাই গ্রহণ করতে যাচ্ছেন সম্ভবত!
সেটা হল – জরুরি আইনকরে দেওয়ার ‘ঘোষণা দেয়া। না, ভারতে জরুরি আইন কোন অপ্রচলিত বা নতুন তা নয়। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের জুনে এর নমুনা রেখে গিয়েছেন। জরুরি আইন মানে এতে বিরাট সুবিধা হল, সমস্ত “নাগরিক মানবিক অধিকার” স্থগিত করে রেখে দিতে পারে রাষ্ট্র ও সরকার। তাতে মিডিয়াসহ বহু কিছুই এখানে নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া যায়। যেমন, মিডিয়ায় টকশো চালু রেখে জেএনইউ’র মত মুখোশ-হামলা ঘটনা চালাতে যাওয়াতেই তো সব সমস্যা, অমিতের বিরাট ভুল হয়েছে।   আগেই যদি জরুরি আইন জারি কথা থাকত তাহলে মিডিয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখা যেত। কাজেই যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকরকে টিভি টকশোতে জবাবদীহীতা করতে আসতে হত না।  কাজেই জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ করতে চাইলে ‘জরুরি আইন’ জারি করে নেয়ার চেয়ে ভালো বিকল্প নেই। যেমন এছাড়া এবার সবই তো ঠিক ছিল কিন্তু যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর টকশোতে কথা বলতে গিয়েই সব কেঁচে গিয়েছে। কাজেই এই টকশোটা বন্ধ থাকলে এসবের ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগই থাকত না। তাহলে নিশ্চয় অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাখবেন।
অতএব মোদী-অমিত কী এখন জরুরি আইন ঘোষণার গন্তব্যের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “ মোদি-অমিত কি জরুরি আইনের দিকে?”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]