ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী

গৌতম দাস

 ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2VO

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। এখন কোনো দেশী অথবা বিদেশী মিডিয়া যেটাই খুলা যাক, দেখা যাবে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ নিউজের বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে এই ভাইরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। দুনিয়াতে এখন এই ভাইরাসের প্রভাব এতই মারাত্মক। আরেক অদ্ভুত দিক হল – যা আমাদের ঘরে ঘরে ঠিক তা দুনিয়াজুড়েও – আগে দেখা যায়নি এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি।  শুধু আমরাই যার যার ঘরে বন্দি নয়, এটা সারা দুনিয়ারই চিত্র। ভাইরাস দাবি করছে “নো কনটাক্ট”, কোন যোগাযোগ লেনদেন ্সব বন্ধ করতে হবে। অথচ  ব্যবসা বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের যোগাযোগই অর্থনীতি।  তাই সোজা মানে দাঁড়াল, আমরা ভাইরাস মোকাবিলায় যত সচেষ্ট ও সফল ততই যেন অর্থনীতি বিকল হবে – এ’এক অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে এখন আমরা দুনিয়ার সকলে।  সামগ্রিক এই পরিস্থিতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা একটা গ্লোবাল মহামন্দার দিকে যাচ্ছি, কেউ কেউ অবশ্য দাবি করছেন, আমরা ইতোমধ্যেই মন্দায় প্রবেশ করে ফেলেছি [Clear We Have Entered Recession That Will Be Worse Than 2009: IMF Chief]।

জি৭  ও জি২০
মহামন্দার শঙ্কা যে সবাইকে ভীত করে ফেলেছে এর সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হল, অকালে প্রথমে ‘জি৭ [G7]’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠক। আর পরে ‘জি২০’ [G20] অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক। কিন্তু এর আয়োজনের ধরন বলে দিচ্ছে, এ ধরনের গ্লোবাল সামিট হচ্ছে যার যার দেশে বসে ভার্চুয়ালি মানে ভাবের মধ্যে, যা দেড় ঘণ্টার এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ মাত্র। এখনকার আরেক গ্লোবাল হয়ে ওঠা শব্দ হল ‘ডিস্টান্সিং’ [distancing]। এর মানে হল, কাছে এলেও দূরে দূরে থাকা। প্রথমত আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বন্দী হয়ে বাস করতে হবে সবাইকে কিছু দিন বা হয়ত মাস। আর এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে যদি দেখা করতেই হয় তবে পাঁচ-সাত ফুট দূরে দূরে থেকে কথা বলতে বা লেনদেন করতে হবে। স্বভাবতই এমন গ্লোবাল পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার ঘণ্টা বাজারই এমন সময়ে ইমার্জেন্সি গ্লোবাল সামিট হবে দেড় ঘণ্টার, এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ – এটাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রজোট জি৭ সদস্য রাষ্ট্রগুলো হল – আমেরিকা, কানাডা আর সাথে আরো চার ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং এশিয়ার একমাত্র জাপান। এভাবে গ্লোবাল (মুলত) অর্থনীতিক পলিসিতে  সাত রাষ্ট্রের এক সমন্বয় গ্রুপ জি৭। এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপ জি৭-এর কোন রাজনৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা না থাকলেও তারা এক বিশেষ ক্ষমতার। কারণ কোনো ইস্যুতে (সাধারণত অর্থনীতির ও গ্লোবাল ইস্যু) তারা একমত হয়ে গেলে এর প্রভাব বাকি সব রাষ্ট্রের উপর অনেক বড় ও নির্ধারক হয়ে ওঠে। এর একটা বড় কারণ হিসেবে যেমন বিশ্বব্যাংকের মালিকানাই ধরা যাক; জি৭ দেশগুলোর বিশ্বব্যাংকের মালিকানা সব মিলিয়ে মোট ৩৫% এর বেশি হবে, যেখানে আমেরিকার একা মালিকানা  ১৮% এর মত। ফলে স্বভাবতই তাদের ঐক্যমতের সিদ্ধান্ত বাকি সবার জন্য অনেক ভারী ও খুবই নির্ধারক।
তবে উপরের কথাগুলো অতীত ঘটনা হিসেবে বলা সম্ভবত বেশি সঙ্গত।  কারণ এরা ‘পুরান জমিদার’, যার ঠাটবাট আছে কিন্তু বাস্তব মুরোদ আর নেই; শুকিয়ে ফোকলা হয়ে গেছে। পুরানা মাতবর আমেরিকার জায়গায় চীন এসে প্রবেশ করাতে আস্তে আস্তে অনেক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে, রঙ ফিকে হয়ে পড়ছে। আর সেই সাথে নতুনের আভা দেখা যাচ্ছে।
যদিও জি৭ নিয়ে অনেকে সবচেয়ে বিরক্তিকর ভাষায় বলার চেষ্টা করেন, এরা নাকি “সেভেন ডেমোক্রেসিজ”। কেন? চীনের বিরুদ্ধে পুরান ডাট দেখানোর জন্য। এমনিতেই ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটাই তৈরি করা হয়েছিল পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোপানোর জন্য   অ্যামেরিকান শব্দ হিসাবে। অরিজিনাল ক্লাসিক শব্দটা ছিল রিপাবলিক, এর বদলে ডেমোক্রেসি শব্দের আমদানি।  এছাড়া, একালে একা চীনা নেতৃত্বেই পাল্টা বিকল্প-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক হতে চাইবার মত প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে গেছে। জি৭ বা এর সদস্যরা এখনো (মুরোদ না থাকলেও গুণ-মানে) চীনের চেয়ে তারাই ভাল, এমন ভাব ধরার জন্য এটা বলে থাকে। ফ্যাক্টস হল একা চীনের এখন ঋণ- বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি। সে কারণে চীনা নেতৃত্বের নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই মাথা তুলছে, প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। মূলকথা, ইতোমধ্যেই তারা বিকল্প হিসেবে নিজেদের হাজির করে ফেলেছে। যেমন এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিশ্বব্যাংকের বদলে সরাসরি চীনের বা চীনের ‘বিশ্বব্যাংকে’র কাছে অবকাঠামো ঋণ নিতে যেতে পারেন।
আসলে লাশের বাক্সে শেষ পেরেকটা মেরেছে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street]। মানে, গ্লোল্ডম্যান স্যাসের [Goldman Sachs] মত দানবীয় বড় বড় অর্থবিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতীকী উপস্থিতি বা প্রধান অফিস যেখানে। গত ২০০৯ সালে তারা আওয়াজ তুলে বলেছিল জি৭ গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। কারণ এদের অর্থনীতি আর আগের মতো নয়, তাকত নাই বরং ঢলে পড়েছে। আর পালটা ততই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছে “রাইজিং ইকোনমি” [Rising Economy] বলে পরিচিত আরেক ক্যাটাগরির দেশগুলো যাদের জিডিপি সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে দ্রুত বাড়ছে। কাজেই ‘তাদেরও পুরানা জি৭-এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে আলাদা পরিসরে  জি২০ নামে জোট গড়া হোক। এই দাবি ছিল এমনই এক বাস্তবতা, যে তাই জি২০ গ্রুপ কার্যকর হয়ে যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করেন এরা দুনিয়ার টপ ২০টা ইকোনমির একটা গ্রুপ। সেটা যতটা না সত্যি, এর চেয়েও সত্য হল, চীন মানে যার নিজের আছে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাবাজার, সাথে আছে এর চেয়েও বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্য দেশে ঋণ-বিনিয়োগদাতা হয়ে হাজির হবার সক্ষমতা; আর পাশে ভারত যার অভ্যন্তরীণ ১৩৬ কোটির বড় ভোক্তাবাজার আর, উৎপাদন সক্ষমতার পটেনশিয়াল আছে; এ ছাড়া ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকা থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত মিলে গঠিত হয়েছে এই জি২০। তাই গত সপ্তাহে (২৬ মার্চ) জি২০ এর ভিডিও কনফারেন্সের নয় দিন আগে (১৭ মার্চ) জি৭-এর একই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হইয়ে যায়। বলাবাহুল্য, জি৭ জি২০ এর অংশ অবশ্যই। আর প্রতিটি জি২০ বৈঠকের আগে জি৭-এর সভা হয়ে যায়, যাতে ‘জি৭-ওয়ালা’রা মাতবরি নিবার সুযোগ পেয়ে গেলে জি২০-এর বৈঠকে একই স্বরে কথা বলতে পারে।

এদিকে ভাইরাসের ব্যাপকতায় এখন আর লুকানো থাকছে না যে, আসন্ন এক গ্লোবাল মহামন্দার মখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা সকলে। তাই জি২০ অর্থমন্ত্রীদের ভিডিও কনফারেন্সের মূল কথাটা ছিল, তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন অর্থ ঢালবেন যাতে গ্লোবাল বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এনিয়ে তাই রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম G20 leaders to inject $5 trillion into global economy in fight against coronavirus। জি২০ এর এখনকার চেয়ারম্যান সৌদি আরব। তার নেতৃত্বেই এ ঘোষণা দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার মানুষের চাকরি আর আয়ের ক্ষতি থেকে তাদের রক্ষা ও তা ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এনিয়ে আলজাজিরার শিরোনাম হল, ‘কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে গ্লোবাল অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াইয়ে জি২০-এর পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি [  G20 pledges $5 trillion to defend global economy against COVID-19]।

কিন্তু তাহলে জি৭-এর বিবৃতি বা রিপোর্ট কই? সেখানে কী বলা হয়েছে?
সরি, সেটা নাই। কেন?  এর কারণ আসলে জি৭-এর সভা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেখান থেকে কোনো যৌথ বিবৃতি দিতেই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে। আর বলতে গেলে, এর কয়েকদিন পরে জি২০ থেকে ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

কেন জি৭ ব্যর্থ হল? কারণ, আমেরিকা একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে।  তাই এর খাড়া জবাব হুল, ট্রাম্পের আমেরিকা এক দায়িত্বজ্ঞানহীন তৎপরতা এর জন্য দায়ী। সেটা কীভাবে? এবার জি৭-এর সভা ছিল মূলত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে ঐ সভায় উপস্থিত মানে ভার্চুয়ালি ওয়েব কনফারেন্সে হাজির ছিলেন। আর তিনি যেন চাকরি রক্ষার্থে পাগলা প্রেসিডেন্টের আনুগত্যের এক চরম দশা দেখাতেই নিজের কোন বিদ্যাবুদ্ধিও খরচ করেন নাই। আর তাতেই বিবৃতি ড্রাফটের সময় তিনি গোঁ-ধরে বসেন যে, ভাইরাসটাকে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নয়, বরং ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলতে হবে। আর এতে স্বভাবতই ইউরোপীয়সহ কোনো সদস্য রাষ্ট্রই তা মানতে রাজি না হওয়ায় সব নস্যাৎ হয়ে যায়। সদস্যরা আর একমত হতে পারে নাই। কারণ তারা মনে করেছিল যখন ভাইরাস সামলাতে ঐক্য দরকার তখন একাজ হবে বিভক্তি তৈরি করা  [viewed it as needlessly divisive at a time when international cooperation is required to slow the global pandemic …]। ফলে ড্রাফট আর ফাইনাল পর্যন্ত যায় নাই। তবে এতে পরবর্তিতে ট্রাম্পকেই এর সব ‘কাফফারা’চুকাতে হয় অবশ্য।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী নভেম্বর মাসে। আর ট্রাম্প এবারো এতে প্রার্থী। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি চীনের বিরুদ্ধে এক বিরাট লড়াকু যিনি এই প্রথম জাতিবাদী-আমেরিকান হয়ে চীনের বিরুদ্ধে কথিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ লড়ছেন। এ্মন ইমেজ আর প্রপাগান্ডা জোরদার করতেই তিনি কোভিড-১৯ কে ‘য়ুহান ভাইরাস’ [চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী য়ুহানে সর্বপ্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়] বলে ডাকার বালকসুলভ আবদার ধরে বসেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, এমন প্রপাগান্ডায় কোন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তা করতে ট্রাম্প পারেন নাই। অক্ষম; তা এখন প্রমাণিত। কেন?
প্রথমত, সারা দুনিয়া মারাত্মকভাবে ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছে; হিমশিম খাচ্ছে যে, কী করে নিজ নিজ দেশের মানুষকে বাঁচানো যায়, মৃতের সংখ্যা কমানো যায়। যাতে এতে ন্যূনতম সফলতা আসা শুরু হলেই, এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা যাতে ভাইরাসের ক্ষতির উপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে না পারে তাই এর মোকাবেলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। অথচ ট্রাম্প এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে তিনি আছেন তার ব্যক্তিগত সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, তথা নির্বাচন নিয়ে। এছাড়া ট্রাম্পের এই অবস্থান নেয়া গ্লোবাল ঐক্যের বদলে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।
দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ী করার জন্য ট্রানপের দাবিই তো ধারাবাহিক নয়। যেমন, ঘটনার শুরুর দিকে তিনিই বিবৃতি দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছেন যে, চীন উদার হয়ে এই ভাইরাস সম্পর্কে সব তথ্য ও আপডেট খোলাখুলিভাবে আমাদেরসহ সবাইকে জানাচ্ছে শেয়ার করছে বলে। নিচের টুইট দেখেন।

কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিক সিনেটর টম কটন “করোনা চীনের জীবাণুযুদ্ধের অস্ত্র” যা “সম্ভবত হাত ছুটে বাইরে এসে পড়েছে” বলে অভিযোগ তোলেন। আর তা থেকেই ট্রাম্পের বয়ান ও অবস্থানও বদলে যায়। অথচ কটন তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি [Cotton provided no evidence for the claim and asserted that it was the Chinese government’s job to disprove it.]। বরং একটা ‘সম্ভবত’ বলেছেন। অর্থাৎ নিশ্চিত করে, এমন শব্দ দিয়ে নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে চীনও আমেরিকাই এই জীবাণু চীনে ছড়িয়েছে বলে পাল্টা দাবি জানায়। এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই ট্রাম্প ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলে তার প্রপাগান্ডা চালু করে দিয়েছিলেন। আর চীন এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয়া শুরু করে ছিল ১৭ মার্চ থেকেই।  কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থানের অসঙ্গতি হল, তাহলে শুরুতে তিনি কেন চীনের প্রশংসা আর ভাইরাস সামলানো ও তথ্য সবার সাথে শেয়ার করার প্রশংসা করেছিলেন।
ট্রাম্পের প্রপাগান্ডা করার ব্যাপারটাকে পাঠকের নিজেই বিচার ও বুঝে দেখার জন্য একটা ভিডিও এখানে আছে আগ্রহিরা এটা দেখতে পারেন
তৃতীয়ত, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপ  অসংলগ্ন অবস্থানের ট্রাম্প-এর হাত ছেড়ে দেয়া ছাড়া নিজেরাই নিরুপায় বোধ করেছিল। সে কারণে ‘জি৭’ ভিডিও কনফারেন্স  হয়ে পড়েছিল অকার্যকর ও স্থবির। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতির দুর্দশার মুখে নতুন উদ্যোগের এক ধারাও শুরু হয়েছিল। এর লিড নিতে আসে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু [WHO, World Health Org]। সংস্থাটি পরিষ্কার করে বলেছে এভাবে ‘উহান ভাইরাস’ বলে চীন-এশিয়া বা কোনো অঞ্চলকে দায়ী করা ঠিক নয়। এ কারণেই আমরা এর নাম কোভিড-১৯ বলে স্থির করেছিলাম”। ’সবচেয়ে কড়া কথাটা বলে ট্রাম্পকে সাবধান করেছেন হু এর এক নির্বাহী পরিচালক ডঃ  মাইক রায়ান। তিনি বলেন, ভাইরাসের কোন রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। আপনি কোন জাতি কোন রেস, গায়ের রঙ কী অথবা ব্যাঙ্কে আপনার কত টাকা আছে ইত্যাদি এসবের পরোয়া করে না। অতএব ভাষা ব্যবহারের সময় সাবধান – এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমরা এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারি না যেটা কোন বিশেষ জনগোষ্ঠির জাত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি তৈরি করে বসতে পারে”।

“Viruses know no borders and they don’t care about your ethnicity, the color of your skin or how much money you have in the bank. So it’s really important we be careful in the language we use lest it lead to the profiling of individuals associated with the virus,”  Dr. Mike Ryan, the executive director of WHO’s emergencies program,

বলতে গেলে ট্রাম্পকে তিনি একেবারে ছেঁচা দিয়ে যেন বলেছেন – আপনি কথা বলার আদব জানেন না; দায়ীত্বজ্ঞানহীন।  এযেন বলা আপনি ট্রাম্প এক রেসিষ্ট[racist], তাই আপনি চীন বা এশিয়ার কোন অঞ্চলের মানুষদেরকে নিচা দেখাতে তাদের দায়ী করছেন। আর এঘটনার পর সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে তাঁর রেসিজম বা বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য ছেঁকে ধরেন। উপরের লিঙ্কটা এক অ্যামেরিকান মিডিয়া CNBC থেকে নেয়া। ওখানে শুরুতে একটা ভিডিও ক্লিপ আছে আগ্রহীরা তা দেখে নিতে পারেন।

এরপরেই আসলে দ্রুততার সাথেই অবশেষে একটা সন্ধি হয়। যার প্রকাশ ঘটানো হয় আমেরিকায় চীনের রাষ্ট্রদূত, অন্য কথা প্রসঙ্গে আমেরিকান এক প্রেসের কাছে কথা বলার সুযোগ নিয়ে “চীন-আমেরিকার পারস্পরিক অভিযোগ তোলা থেকে” তিনি “দূরে থাকতে চান” বলে জানিয়ে দেন।  এই কথাটাকে হংকং এর এক মিডিয়া লিখেছে, “এতে পরিপক্ক আচরণ আবার শুরু হয় যখন চীনা বিবৃতিতে আকুল আবেদন জানানো হয় যে প্যান্ডেমিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, আর এতে ট্রাম্পও তারপর থেকে চাইনিজ ভাইরাস বলা বন্ধ করেন [Adult behaviour resumed as statements out of China urged the world to unify against the pandemic; Trump stopped calling it a “Chinese virus”.]।

ট্রাম্প এবার ২৪ মার্চে  প্রেসের কাছে বলেন যে, “তিনি করোনার জন্য জন্য চীন বা এশিয়ার কেউ দায়ী বলে মনে করেন না”।  মানে পুরা উলটা সুর এবার।  আর তাতে কয়েকদিন কূটনীতিতেই জি৭-এর ব্যর্থতার পরও ২৬ মার্চ জি২০-এর ভার্চুয়াল সভা থেকে সাফল্য আসে, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে ভাইরাসকে সবার জন্য বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে সবার জন্য ‘কমন হুমকি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।  ইতোমধ্যে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ডলার ছাড় করার জন্য তার পরিকল্পনা এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দেন। এক কথায় বললে, ট্রাম্পকেই নিজের ফেলা থুথু চেটে তুলে নিয়ে বিতর্ক শেষ করতে হয়। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো রিপোর্টিং করেছে হংকংয়ের ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। তারা ট্রাম্পের কান্ডকারখানা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনি কখন কী বলেছেন এনিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে।

ঘরের খবরঃ
এবার ‘ঘরের খবরে’র দিক। করোনাভাইরাস মানেই, এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে, যা মানুষ জানে তা হল, মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখা বা থাকা। আইসোলেশন বা ঘরে বন্দী হয়ে থাকা। ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে ছোঁয়া এড়িয়ে থাকা। কিন্তু এটা খুবই ব্যয়বহুল প্রতিকার। কেন?
দেশের মানুষকে তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাস (বা হয়ত এরও বেশি) একনাগাড়ে ঘরে বন্দী করে রাখার সোজা মানে হল, ওই সময়ের জন্য অর্থনীতি স্তব্ধ অচল করে রাখা। প্রতিটা স্থানীয় দেশের এবং গ্লোবাল দুই অর্থেই। অথচ সবার খরচ আগের মতোই। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন এক এস্টিমেট হচ্ছে ভারতের ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ৮০ কোটিকেই তাদের ভর্তুকি বা পুরা রেশন সরবরাহ করতে হবে, তাতে ভারতের রাজস্ব আয়ের ঘরের অবস্থা যাই থাকুক না কেন [The government aims to distribute 5kg of wheat or rice for each person free of cost every month, with 1kg of pulses for every low-income family, helping to feed about 800 million poor people over the next three months.]। ওদিকে পাকিস্তান করোনায় আক্রান্তদের ১২ হাজার রুপি করে অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ঘোষণা খুবই অপ্রতুল বা অগোছালো মনে হয়েছে। সব ঘটনা-দুর্ঘটনা একদিন না একদিন শেষ হয়েই যায়, করোনার প্রভাবও একদিন শেষ হবে। কিন্তু ততদিন আমাদের মানুষদের নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে হবে। এভাবে এথেকে যদি টিকে যেতে পারি, তা হলে আবার নতুন উদ্যোমে অর্থনীতি চালু করার সংগ্রামে নামতে পারব। কিন্তু ততদিন (অন্তত তিন-ছয় মাস) নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।  অথচ  আমাদের সরকার কেবল গার্মেন্টসশ্রমিকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেছেন। এর বাইরে শহরের রিকশাচালক থেকে গ্রামের দিনমজুর পর্যন্ত কথিত ইনফরমাল শ্রমিকদের কথা ভেবে আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা থাকতে হবে যা আমরা দেখছি না। যদিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু আছে হয়ত স্থানীয় উদ্যোগে। কারণ, তাঁরা যদি না খেয়ে ঘরে বা রাস্তায় মরে পড়ে থাকলে সেটা নিশ্চয় আমাদের জন্য ভাল অভিজ্ঞতা হবে না। বরং সেটা মহাবিপর্যয়কর কিছু একটা হবে। নিজের মুখ নিজেকে দেখানো  যাবে না এমন অবস্থা হবে। তাই যেভাবেই হোক এর জন্য ফান্ড জোগাড় করার  দায় আমাদের সরকারকে নিতেই হবে। অন্তত কথা বলতে হবে।
ইতোমধ্যেই মোট প্রায় ১৯০ এর বেশি সদস্যের মধ্যে  ৮০টি সদস্যরাষ্ট্র আইএমএফের কাছে লোন চেয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা কী, ঋণ-অনুদানের ব্যবস্থা কী আছে, জানতে হবে। এসবের মধ্যেই পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকদের দুর্দশা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ওদেরকে পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করে সামলানো যাবে না। এটা কোনো সমাধানই নয়। রাস্তায় গরীব মানুষ কাজে বা কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়লে কী করতে হবে এনিয়ে পুলিশের প্রতি নির্দেশ বাস্তবসম্মত, সম্মানজনক ও উপযুক্ত হতে হবে। এটা ২০২০ সাল। এখনো না খেয়ে মানুষ মরলে তা ঘটবে একমাত্র কুশাসনের কারণে। প্রধানমন্ত্রীকে ইনোভেটিভ হতে হবে। বিকল্প খুজতে হবে প্রোএকটিভ হয়ে। যারা বুড়া বয়েসে নির্বাহী প্রধানের ধামাধরা সুযোগ না পেলে নিজ উদ্যোগে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মসংস্থানের আর যোগ্যতা রাখে না এরা ইনোভেটিভ হবে এটা কষ্টকল্পিত। খেটে খাওয়া মানুষদের বাঁচাতে হবে। এটাই এক সফলতার চিহ্ন হবে। আর তা যদি সফল হই তবেই এরপরে আসন্ন গ্লোবাল মহামন্দা মোকাবিলার যোগ্য হব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  ভাইরাসে বেঁচে গেলেও গ্লোবাল অর্থনীতিতে কী হবে“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

গৌতম দাস

 ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2T2

সবার মাতৃভাষা রক্ষার পক্ষ নিতে হবে তবে, জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবেঃ
গত শুক্রবার ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই নিজ উন্মেষ ও বিকাশের জন্য নিজ মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ অবাধ ও  নিশ্চিত দেখতে চায়; এটা তাঁর অধিকার আর এই অধিকার রক্ষা করা তাই আমাদের সকলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একুশে ফেব্রুয়ারির সারকথা এটাই। এই দিনটা তাই আমাদের মাতৃভাষা চর্চার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এক স্মরণীয় দিন। উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম হওয়ার প্রাক্কালে সে সময় থেকেই হবু পাকিস্তানে, মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের দিক থেক্‌ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। এতে পুবের ভাগ্য যে পশ্চিমের আধিপত্যের তলায় চাপা পড়ে যাবে – বুঝে না বুঝে  “মুসলিম জাতিবাদের” উচ্ছ্বাসে পড়ে সেটা আমল করতে অনেকের মধ্যেই  অনীহা দেখা দিতে শুরু করেছিল। আর তা থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম বেসুরো হতে শুরু হয়েছিল। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে আমাদের মাতৃভাষা চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে টের পেয়ে আমাদের আপত্তি প্রতিবাদ লড়াইয়ের শুরু এখান থেকেই। আর এখান থেকেই আস্তে আস্তে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের রাষ্ট্রের দিকে চলে যাই আমরা।

তবে একালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ করতে আমাদের দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক ধারাকেই কম-বেশি এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তবুও এর মধ্যে কোথাও জানি একটা ভাগাভাগি বজায় রয়েই গেছে টের পাওয়া যায়। যদিও সব পক্ষ বা ধারার মধ্যে কমন বুঝাবুঝি ঐক্য দেখা যায় তা হল – যেকোন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চার ‘অধিকার’ সমুন্নত রাখতে হবে। পালনের এই ধারার বাইরে অন্য দিকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ অন্য আর ধারাটা হল, ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের দিক থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে তুলে ধরার চেষ্টা।

কারো মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা হয়ে যায়- এটা করে কারা? কেন আসে এরা – এটা বুঝা খুব গুরুত্বপুর্ণ। আসলে একই সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যেকার এথনিক-বিভক্তির কারণে ভিন্নতা বা পড়শি জনগোষ্ঠির উপর আধিপত্য করার আগ্রহ বা সুযোগ নিতে চাওয়া থেকেই অন্যের মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা শুরু হয়।  যদিও শুরুর দিকে “ঐক্য রক্ষার স্বার্থে” এই আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে এমন কথায় অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে স্বেচ্ছায় না বুঝে এই আধিপত্য মেনে নেয়। যেমন আমাদের ভিতর অনেককেই পাওয়া যাবে যারা মনে করে দুনিয়ায় সব মুসলমানের ভাষা আরবী হওয়া উচিত বা না হলেও আরবীর অধীনে সবার আসা উচিত। অথবা এমন হলে খুব ভাল হত এমন মনে করে থাকে।  মানে, ভিন্ন রেস [race] অর্থে জাতি বা ভিন্ন এথনিক [ethnic] গোষ্ঠি অর্থেও জাতি – এমন নির্বিশেষে দুনিয়ার সব ভুগোলের মুসলমানকে আরবী ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে। একথা সত্য যে আরবী ভাষা-সংস্কৃতির অনেক কিছু থেকেই ইসলামকে আলাদা করা মুসকিল। তবু এমন দাবি বা ভাবনার প্রতি সমর্থন তৈরি হয় সাধারণত ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও সৎ আবেগ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাস্তবে এমন সম্ভবত দেখা যাবে না। বরং উলটা পরিস্থিতিই তৈরি করবে।  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে ব্যাপারটা অনারব বা আরব নয় যারা তাদের উপর আরবী ভাষাভাষীদের এক দুর্বিষহ অত্যাচার, প্রবল এক আধিপত্য, সব সুযোগ-সুবিধা আগে আরবেরা পাবে ইত্যাদি এমন এক চরম অবস্থা তৈরি করে তা অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা বা খুনোখুনিতে শেষ হবে। এর মানে কী আমি বলতে চাচ্ছি যে দুনিয়া সব ধারণের মানুষের মধ্যে নুন্যতম কোন ঐক্য রচনা করা বা কাছাকাছি আসা সম্ভবই না। অবশ্যই সম্ভব, তবে একটা পর্যায়ে যখন আমরা আমাদের অপরের রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ রক্ষা করা, যেমন অন্যের মাতৃভাষা রক্ষা করার দায়কর্তব্য – আমি ভিন্ন রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠের হলেও বুঝে যাব এবং রক্ষা করব।  যদিও আর সবার আগে মনে রাখতে হবে কারও মাতৃভাষায় হাত দেওয়া যায় না, যাবে না। আসলে  কারও এথনিক বৈশিষ্টে হাত লাগানো বা চাপিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর এটা অপরাধ হবে সেদিকটা তো আছেই। তাই এই ভুল এড়িয়ে চলতে হবে। মাতৃভাষা মানে মা যে ভাষায় বাচ্চাকে প্রথম কথা শিখায়, কমিউনিকেশন করে। যা বলছিলাম এমন বুঝাবুঝি জাগা সম্ভব হয় এমন সহায়ক  সমাজ ও রাষ্ট্র যা আধিপত্যকে রুখে দেয় তা আগে হাজির থাকতে হবে। অবশ্য দুনিয়ার সব ভাষা আর রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ সবই আল্লাহ সৃষ্টি – এভাবে থিওলজিক্যাল অর্থেও ব্যাপারটা বুঝতে পারি। ফলে একটা ভাষা অন্যটার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা বা চাপিয়ে দেয়া একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
এতসব দিক চিন্তা না করেই সরল মনে ও বিশ্বাসে আমরা অনেকেই এমন সমর্থন দিয়ে ফেলব কারণ তাতে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বাড়বে এমন একটা কিছু চিন্তা করে। অনেকে এটাকে ‘উম্মার শুরু’ বলে ভুলে অতি উতসাহও দেখিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সবকিছুই শেষে অন্যের আধিপত্য মোকাবিলাতেই আমাদের জীবন কাটবে এমন অবস্থাতেই পৌছাবে।
উপরে যেটাকে আধিপত্য বলছি এটাই অন্যের উপনিবেশ বা কলোনি দখলে পড়ে যাওয়া বলতে আমরা যা বুঝি সেই উপনিবেশ ধারণারই ছোট রূপ। মানে আমার উপর কারও বড় ও ব্যাপক আধিপত্য ছেয়ে বসা এটাই তার কলোনি বা উপনিবেশ হয়ে যাওয়া। যদিও শেষ বিচারে কারও আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া এই পুরা ব্যাপারটাই ‘জাতি’ চিন্তার বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সমস্যাজাত। সে কোন এক কল্পিত জাতির স্বার্থে আমার উপরে চেপে বসেছে  এমন সাফাই সেখানে থাকবেই।  যেমন মুসলিম জাতিবাদের স্বার্থে, ইসলামের স্বার্থে  – এই জাতীয় স্বার্থে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া উচিত – এই ছিল পাকিস্তান জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সপক্ষে সাফাই।  অর্থাৎ ব্যাপারটা আসলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তা যাকে অনেক আমরা ‘নেশন-স্টেট’ বলে বুঝি- এই বুঝ থেকে উদ্ভুত সমস্যা।

এই নেশন [nation] বা জাতি ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটা হল এটা অপর জনগোষ্ঠীর ওপর নিজ আধিপত্য বিস্তার ও কায়েমের হাতিয়ার হয়ে যায়। এই আধিপত্য কায়েমের বড় ও প্রবল ধারণাটাই হল অন্য কারও ঘাড়ে উপনিবেশি-কর্তা হয়ে চড়ে বসা অথবা নিজের ঘাড়ে কারও উপনিবেশত্ব কায়েম হতে দেখা।

আধুনিক রাষ্ট্র এই ফেনোমেনার শুরু
আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম এই ফেনোমেনা দুনিয়ায় এসেছিল মোটাদাগে বললে ১৬৫০ সালের দিকে। আধুনিক রাষ্ট্র মানে, মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। অর্থাৎ মনার্কি বা রাজতন্ত্রের শাসনের কবল থেকে বের হতে গিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা শাসন কাঠামো ও ব্যবস্থা দুনিয়ায় কায়েম হতে শুরু করেছিল। কারণ, রাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অগ্রহণযোগ্য দিক ছিল – রাজতন্ত্র বলতে পারে না কে তাকে ক্ষমতা দিয়েছে বা তার ক্ষমতার উৎস কী?
অনেকে অবশ্যই এসব প্রশ্নের অস্বস্তি কাটাতে সমাজের কিছু প্রভাবশালী এলিট তাদের পছন্দের বেছে নেওয়া শাসনকর্তা – এই অর্থে কোন রাজাকে গ্রহণীয় মনে করে বসে। মনকে প্রবোধ দেয়। এই প্রবোধ সম্ভবত স্বীকার করতে চায় না যে আসলে  এগুলোও আরেক ফ্যাকড়ার রাজতন্ত্র মাত্র। কোণ রাজতন্ত্রকে চিনবার সবচেয়ে সহজ চিহ্ন হল এগুলো সার্বজনীনের পছন্দ বা অনুমোদনে তৈরি হয় না, সমাজের সকলে তাকে নির্বাচিত করে না। একটা খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু অবস্থাপন্ন প্রভাবশালী ক্ষমতাবান গোষ্ঠি এই ‘শাসনকর্তা’ খাড়া করে থাকে।  এছাড়া এই শাসনকর্তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন এদের আরেক প্রধান লক্ষণ চিহ্ন হল কিছুদিনের মধ্যেই এটা একটা ডায়নেস্টি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ডায়নেস্টি – মানে রাজার (শাসকের) ছেলে রাজা হবে।

ফিরে যাই মুলকথায় – ক্ষমতার উতস কী? কে দিয়েছে ক্ষমতা? এখানে যদি মেনে নেই যে রাজতন্ত্রে শাসন ক্ষমতার উৎস ‘গায়ের জোর’ মানে, রাজার নিজের বলপ্রয়োগের সক্ষমতাই রাজার ক্ষমতার উৎস, সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে তাহলে রাজাও অন্য কারও যে রাজার উপর আরও বেশি বলপ্রয়োগে সক্ষমতা রাখে তার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হবে ও মারা পড়বে এবং এ কথাটাও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে মানে, এটা জায়েজ তা মানতে হয়।   অর্থাৎ এখানে এসে দেখা যাচ্ছে  ক্ষমতাকে ন্যায়-অন্যায় বা ইনসাফের প্রশ্ন মোকাবেলার সামনে পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে সেকালে উপায় না দেখে রাজা জনসমর্থনকে  ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ভিত্তি বলে খাড়া করতে চায়। যেন যে রাজার পক্ষে ‘জনসমর্থন’ আছে তার সেই ক্ষমতাটা জায়েজ মনে করা হবে। যদিও বেশির ভাগ রাজাই নিজ ক্ষমতার উতস ঐশ্বরিক বা আল্লাহ দিয়েছে ধরণের কথা নিম্নস্বরে বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে  ‘জনসমর্থন’ এর কথা যেটা বলছিলাম, এর যুগটা কম লম্বা নয়। আর এখান থেকে ইংরাজি করোনেশন [Coronation] বা বাংলায় রাজ্যভিষেক বা রাজার ক্ষমতার অভিষেক বা পাবলিক অনুমোদন এর ধারণা হাজির হয়েছিল দেখতে পাই।
কিন্তু সেখান থেকে  বিস্তারে আরও নতুন প্রশ্ন উঠেছিল যে, যদি গণসমর্থনই ক্ষমতার ন্যায্যতার ভিত্তি হয়ে থাকে তাহলে কে রাজা হবে বা কার শাসন-ক্ষমতাকে মেনে নেয়া হবে, অনুমোদিত হবে সেটার সবকিছু ‘পাবলিকই’ ঠিক করে দেক। আর এখান থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ বা নাগরিক। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। এবং জনগণই সেই ক্ষমতা ডেলিগেট [delegate] করে দিবে। মানে, সাময়িক হস্তান্তরিত করতে এক শাসক নির্বাচন করে তার হাতে দিবে- এসব ধারণা বিস্তার লাভ করা শুরু হয়েছিল। যদিও সেটা আরো অনেক কিছুর পরে হয়েছিল। কিভাবে? না, রিপ্রেজেন্টেশন [Representation] বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে নির্বাচিতের হাতে সাময়িকভাবে (পরের নির্বাচন পর্যন্ত) তাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে এসব দিকে ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল। এই হল ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ইনসাফের কার্যকারিতা দিয়ে পাওয়া ক্ষমতা ও এর বৈধতার সমাধান। এক কথায় এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রক্ষমতা, বাংলায় আমরা বলি – গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ধারণা। ফলে স্বভাবতই এখানে রাষ্ট্রক্ষমতার আর কোনও চোরা-ক্ষমতা নয়, বরং এক সুবিন্যস্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়া ডিফাইনড [Defined] ক্ষমতা বা নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো মূলত ইউরোপের ভূখণ্ডে বিকশিত বা পরবর্তিতে তা ফেডারেল রিপাবলিক (১৭৭৬) আমেরিকা্তেও। আর তা থেকে দুনিয়াব্যাপী ব্যাপক রাষ্ট্ররূপগুলোতে এটাই কম-বেশি অনুসরণ করতে দেখা যায়। যেমন নয়া চীনে এসে, চীনের ভাষায় এটা ‘পিউপিলস রিপাবলিক’ [People’s Republic]। এমনকি লেনিনের রাশিয়া তারা নিজেদের রাষ্ট্রকে ভিন্ন দাবি করলেও সোভিয়েত রাষ্ট্র নিজেকে এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র বলেই মেনেছে।

কিন্তু তবু সব সমস্যা মিটে নাই। রিপাবলিক রাষ্ট্রের সাধারণ রেওয়াজ ও রিচুয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে নির্বাচনের দিন থেকে শপথের দিন পর্যন্ত এখানে  ‘গণক্ষমতা’ তৈরির এক প্রক্রিয়া চলে থাকে। এই লক্ষ্যে প্রতিনিধি নির্বাচন ও সাময়িক ক্ষমতা হস্তাস্তর সম্পন্ন করে ক্ষমতার অভিষেক ঘটিয়ে নেয়া অবধি- এই সময়কালটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেয়াল করেন আমরা এখন দাঁড়িয়ে গেছি নির্বাচনেরও আগের ‘এক নিশীথে’। আর চার দিকে হা-হুতাশে।

কলোনি দখল আর জাতিরাষ্ট্রের হাত ধরাধরিঃ
রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও ক্ষমতা তৈরির রেওয়াজ দুনিয়ায় মোটাদাগে চালু হতে দেখা গেছিল ১৬৫০ সালের দিকে; কিন্তু তাতে এর পরেও বড় বিপথগামিতা ঘটেছে, দেখা যায়। মানে চোরাবালিতে পা আটকে যাওয়া বা ভুল রাস্তায় চলে যাওয়া আছে আমরা দেখি। আর এরই নাম হল , নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা। মূলত ‘জাতি’ ধারণাটাই সমস্যার, এটা এক নষ্টা ধারণা হিসেবে হাজির হয়েছিল। রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণার প্রতিশ্রুতি ছিল বা হওয়ার কথা ছিল যে জনগণের সব অংশকেই অন্তর্ভুক্ত করে এখানে এক ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি” নির্মাণ করা হবে। রাষ্ট্রগঠন বা Constitute শব্দের অরিজিনাল অর্থ ছিল এটাই। তাই এটাই আসল রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন হওয়ার কথা। কিন্তু এটা বিপথে চলে যায়। গিয়ে হয়ে যায় জাতি নির্মাণ বা ‘জাতিগঠন’[Nation State]। আর এতে ‘রাজনৈতিক কমিউনিটি’ এভাবে রাষ্ট্র গঠনের ধারণাটাই হারিয়ে যায়।

খেয়াল রাখা দরকার ইউরোপে যখন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বাস্তবায়নের নানা উদ্যোগ কসরত চলছে ঠিক একই সময়ে প্যারালাল আর এক  ফেনোমেনার উত্থানের যুগ সেটা। কলোনি দখলের যুগ সেটা। তাই একই সাথে দুনিয়াতে ব্যাপকভাবে ‘কলোনি দখলের’ শুরু হয়েছিল সেকালে। এটা আরো সম্ভব হয়েছিল সূক্ষ্মমাত্রা [Precision] ও গুণাগুণের স্টিলের আবিষ্কার ও ব্যবহার আর সাথে বারুদ অস্ত্র কম্পাস এসব মিলিয়ে  ব্যাপারটা এক বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ হিসাবে হাজির হয়েছিল। প্রধান বিনিয়োগের আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল যুদ্ধজাহাজ ব্যবসা। যুদ্ধজাহাজ কথার আসল মানে,, পাল তুলে বেরিয়ে পড়া কলোনি দখল ও লুটের কাজে। একাজেরই  এক মডেল ধরণ হল – একেকটা “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” খুলে বসা।  তবে ব্যাপারটা শুধু জাহাজ-বিজ্ঞানের উন্নতি বা বিনিয়োগ ব্যবসার স্বর্ণযুগের নয় বা শুধু তা দিয়ে ঘটেনি। এসবই হতে পেরেছিল এর সাথেই সবচেয়ে নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল এক ভাবাদর্শ বা আইডিয়া। সেটি হলো “জাতি” ধারণা- এর যোগ ঘটা। ব্যাপারটা ইউরোপের যার যার দেশ-রাষ্ট্রের ব্যক্তিমালিক কোম্পানির জাহাজে বিনিয়োগের ব্যবসা হিসেবে তা সে ব্রিটিশ, ফরাসি বা ডাচ ইত্যাদি এরা নিজের একেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলেছিল। আর এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে কলোনি দখলে ঝাঁপিয়ে পড়া ধরনের হয়ে ঘটেছিলও। কিন্তু সাথে আরো কিছু ছিল- তা হলো কলোনি দখলে প্রতিযোগিতা। একে অপরের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া। কিন্তু এরই সাথে ঘটা আরেক বড় ঘটনা ছিল – কোম্পানিগুলো নিজস্ব একান্ত স্বার্থ আর লাভালাভের এই প্রতিযোগিতাকে যেন নিজেদের নিজ নিজ দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে মিথ্যা হলেও তা দেখাতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলোনি দখল প্রতিযোগিতায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ে কতটা বেশি দখল সম্পন্ন করতে পেরেছে – যেন এটা হয়ে যায় কোম্পানিওগুলোর একান্ত বিনিয়োগ স্বার্থ নয়, তা নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ। এই মিথ্যা বয়ান ও তা উপস্থাপনটাই সব কিছু বদলে দিয়েছিল। আর তা করা গিয়েছিল এক ‘জাতি’ ধারণা দিয়ে, দেশ-রাষ্ট্রকে একটা জাতিরাষ্ট্র যেমন, তা এটা ‘জাতীয় স্বার্থ’ এ ধরনের বুলি দিয়ে। এভাবে কোম্পানির স্বার্থ হয়ে যায় কথিত ‘জাতীয় স্বার্থ’। এতে অন্যের দেশকে কলোনি দখলের কাজ এটা যেন আর কোম্পানিগুলোর স্বার্থ নয়- ব্রিটিশ বা ডাচ ‘জাতীয় স্বার্থ’ হয়ে উঠেছিল।
আর তা থেকেই কলোনি দখল আর কোনো ‘অন্যায়’ বা অপরাধ কাজ নয় বরং ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তামাশার দিকটা হল, দেশের অভ্যন্তরে যে রাষ্ট্র নিজের জন্য একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়াকে নিজের কাজকর্তব্য মনে করে, নিজ দেশের বাইরে সেই রাষ্ট্রই আবার অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়াকে জায়েজ মনে করেছিল কিভাবে? এর জবাব কারো কাছে ছিল না। তবে এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যেন নিজেরা একেকটা জাতি, আর তাদের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হল অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়া। এটা জায়েজ মনে করা হতে থাকার মূল কারণ নষ্টা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অথবা তা থেকে উপজাত আরও নষ্টা এক “জাত শ্রেষ্ঠত্বের” ধারণা। [আজকের দিনে যা এক সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হয়ে আবার হাজির হতে দেখা যাচ্ছে] ব্রিটিশরা ফরাসি বা ডাচদের চেয়ে ‘জাতশ্রেষ্ঠ’ শুধু তাই নয় বরং,  অন্য  মহাদেশের যেসব রাষ্ট্র এরা কলোনি-দখল করছিল এমন সবকাজের সপক্ষে সাফাইয়ে সার কত্থাটা হল  জাতিবাদ, জাত শ্রেষ্ঠত্ব অথবা যেমন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব।

অথচ জাতি বা জাতিগঠন ধারণার সাথে মূল রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার ধারণার কোনোই মিল বা সম্পর্ক নাই। একই কথা তো কখনো নয়, ছিল না। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল যেমন ব্রিটেনের বেলায়- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজের ব্যক্তিস্বার্থটাকে কল্পিত এক ‘ব্রিটিশ জাতির’ স্বার্থ বা জাতিরাষ্ট্র স্বার্থ বলে বয়ান তৈরি করে হাজির করেছিল। আর এটাকেই যেন এক ব্রিটিশ রিপাবলিক রাষ্ট্র ও এর স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই ‘জাতি’ ‘জাতিগঠন’ শব্দটাই আসলে কলোনি দখল, অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা – এধরনের কাজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আর এভাবেই ব্রিটিশদের সেকালের ইন্ডিয়াকে কলোনি-দখল যেন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটা কাজ! এভাবে পুরা ইউরোপই রাষ্ট্র গঠনকে কথিত ‘জাতি গঠন’ বুঝেই করে গিয়েছিল; কিন্তু কত দিন?

প্রায় তিনশ বছর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল পর্যন্ত।  এই তিনশ বছর ধরে কলোনি দখল, লুটে খাওয়া আর উদ্বৃত সারপ্লাস পাচার এসবই চলেছিল। কিন্তু এর পরেও হুঁশ এসেছিল কি? হ্যাঁ, অবশ্যই কিন্তু বিশাল খেসারত দেয়ার পরে। জর্মান হিটলারের আগমন ও উত্থান ঘটেছিল সেই খেসারত হিসেবে।

কলোনি দখল যদি জায়েজ হয়, আর  নিজ জাতিরাষ্ট্রের জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখানো আর বড়াই করা যদি সব আকামের সাফাই হয় তাহলে, হিটলারের জার্মানিরও আরো চরম জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে ইউরোপের ব্রিটেন, ফ্রেঞ্চ দেশ-রাষ্ট্রসহ সবার কলোনিগুলা পাল্টা দখল করে নিলে সেটা নাজায়েজ হবে কেন? এভাবে ইউরোপের সব জাতিরাষ্ট্রই হিটলারের তাণ্ডবের ভেতর নিজ জাতশ্রেষ্ঠ বোধের পরিণতি দেখেছিল। এটাই জাতিবাদের পরিণতি, সবার প্রতিচ্ছবি- দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের গ্রেটেস্ট তাৎপর্য। ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তার চরম পরিণতি ইউরোপের সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিল।

অবশ্য এতটুকুই ইউরোপের রাষ্টড়চিন্তায় বদল আসার একমাত্র কারণ না। এর সাথে আরও ভূমিকা রেখেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের (বৃটিশ-ফ্রেঞ্চসহ মিত্রশক্তির) আমেরিকান সামরিক-অর্থনৈতিক সাহায্য পাবার শর্ত যে, ইউরোপকে কলোনি-দখলের দিন শেষ করতে হবে। এটা নাজায়েজ ও অপরাধ মানতে হবে। রাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকারের উপর দাঁড়াতে হবে। সার্বজনীন মানবাধিকার মানবার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ইত্যাদি। যুদ্ধ শেষে ঐ শর্ত মোতাবেক ইউরোপ এভাবে নিজেকে ব্যাপকভাবে বদলে নিয়েছিল।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আরেক অদ্ভুত ঘটনা হল আমাদের এদিকে।, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশগুলোর ট্রেন্ড হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া। কিন্তু কেমন স্বাধীন রাষ্ট্র? বাস্তবে এরা  রাষ্ট্র বলতে তখনও জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বলেই বুঝেছিল। অর্থাৎ একদিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ কলোনি মুক্তির হলেও আর এক দিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ এই তিন মহাদেশে আসলে ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ গড়ার দিকে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের বুঝ তাদের আসেনি। এলোই না।

আর এর সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়েছিল নেহরু-গান্ধীর ভারত। যেমন আজও কাশ্মীর ইস্যুতে, কাশ্মীর আসলে কে শাসন করবে এর একমাত্র নির্ধারক হল খোদ কাশ্মীরের বাসিন্দারা। কোনো রাজা নয়, রাজ যদি কাউকে একসেশন চুক্তি করে) কাশ্মীর দিয়েও দেয় তবুও সে রাষ্ট্রও নয়। এই হল বিশ্বযুদ্ধে শেষের শর্ত ও বুঝাবুঝির কনভেনশন হিসাবে পরের  দুনিয়ার নতুন নীতি। যে নীতি অনুসরণে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল আর সেখানে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে গিয়ে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গিয়েছিল, নেহরু-গান্ধী একটা স্বাধীন ভারত পেয়েছিল। অথচ নেহরু আজীবন ছিল এ সম্পর্কে বেখবর। জবরদস্তিতে তিনি কাশ্মীর দখল করে রেখেছেন।

অন্য বড় বিপর্যয়টা হলো রাষ্ট্র বলতেই তা ‘জাতিরাষ্ট্র’ বলে বুঝা। বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র ধারণা কী পরিণতি হয়েছিল, আর এতে ইউরোপে কী বদল এলো এসব নিয়ে নেহরু-গান্ধীর হুঁশ বা বুঝাবুঝি শূন্য থেকে যায়। তাই ভারত হয় একটা সেই জাতিরাষ্ট্রই। য়ার বলারই বাহুল্য ঘটনা সেখানেই থামে নাই, থামার কথাও না। তাই দেখা যায় ভারত জাতিরাষ্ট্র হয়ে হাজির হওয়ার একটা চেন-রিঅ্যাকশন আছে।

নেহরু-গান্ধীর তথা পুরা কংগ্রেসেরই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝার সমস্যা হল, তারা আসলে একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের কল্পনা করছেন বা এমন ধারণার লালন ও অনুসারি হচ্ছেন। আর এটা গ্রহণে মুসলমানদের মনে অস্বস্তি হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে নাগরিক বৈষম্য তৈরি হবেই- এটাই হল সারকথা। জবরদস্তিতে তাই করতে যাওয়া হয়েছিল। যার সোজা মানে হল বেপরোয়া ভাবে মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র গড়তে সেদিকে ঠেলে দেয়া। এর পরেও ১৯২৮ সালে জিন্নাহর ‘১৪ দফা প্রস্তাব একটা খুবই সুচিন্তিত প্রস্তাব ছিল [ইংরাজিতে পেতে এখানে]। কিন্তু এই সমাধানও আমলই করা হয় নাই। আর তা থেকে জিন্নাহ ফাইনালি কংগ্রেসের সম্ভাবনার হাত ছেড়ে  মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের পাকিস্তান গড়ার দিকে চলে যান। অথবা বলা যায় পরিস্থিতি এদিকে চলে যায়। যদিও তাতেও সমস্যার শেষ হয় না। পরবর্তিতে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে হবে- বলাতে পূর্ব পাকিস্তান ভীত হয়ে পড়ে, বিপদ দেখতে পায় অসাম্যের যে পশ্চিমের আধিপত্যের নিচে সে চাপা পড়তে যাচ্ছে। তাই ক্রমে সেই আবার একই – রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদে পৌঁছায় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু জাতিরাষ্ট্র বুঝ আমাদের কাউকে ছাড়ে নাই। একই প্রশ্ন, একই আধিপত্য কায়েমের অভিযোগ এবার পাহাড়িদের দিক থেকে উঠে। কিন্তু তাজ্জবের ব্যাপার হল, পাহাড়িদের চোখেও এর সমাধান হল আবার সেই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝবার চিন্তা আর তা থেকে এক “জম্মু জাতিবাদ”! দেখাই যাচ্ছে এটা এক লম্বা চেন-রিঅ্যাকশন। কিন্তু দুনিয়ার অভিমুখ আঁচ করা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র চিন্তা আমাদের ছুঁতে পারেনি।

রামমোহন রায় ও তাঁর ব্রাহ্ম প্রকল্পঃ
এর ভিতরে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে  ‘প্রগতিশীলেরা’। কারণ তারাও মূলত জাতিরাষ্ট্রবাদী। আর এরা আবার জাতি বলতে সেটা আবার ছুপা হিন্দু-জাতি বুঝ।
যার আদর্শ প্রমাণ রামমোহন রায় ও তার নতুন করে এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করার প্রচেষ্টা। রামমোহনকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা ভারতে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করেন। কিন্তু রেনেসাঁর গুরু তিনি নতুন ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন কেন? অথচ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত ‘প্রগতিশীলরা’ এতে আপত্তিকর কিছু দেখেনি। চেপে গেছেন। পরবর্তিতে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করে যায়।
এ দিকে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করাতে এই ব্যর্থতাই আবার সাফাই হিসেবে হাজির হয় যে জাতি বলতে হিন্দু-জাতি বুঝি হবে। আর তা থেকে এবার এরা সবাই মিলে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ধারণার অনুসারী হয়ে যান। আর এমনটা তারা এতই অবলীলায় হয়ে যান যে জাতি বলতে যে তারা এক্সক্লুসিভ হিন্দু-জাতি বলে বুঝতেছেন এটাও আর অনুভব করেন না। তাই কোনো জিন্নাহ বা কোনো মুসলমান হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে প্রশ্ন বা আপত্তি তুললে উল্টা তাকেই ‘সাম্প্রদায়িক লোক’ অথবা ‘ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চাওয়া লোক’ ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে ঘৃণাবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন তারা। একাজই তাদের প্রগতিশীলতার শুরু এখান থেকে। অথচ বাস্তবতা হল, সমস্যাটা রাষ্ট্র বলতে তা একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বলে বুঝা থেকে শুরু।

অতএব একালের বড় শিক্ষা হল, সব জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চা সুযোগ থাকা বা রাখা এটা তার মৌলিক অধিকার বলে মানতে হবে। কিন্তু এরপর এ থেকে কোণভাবেই জাতিরাষ্ট্র চিন্তার অনুসারী হওয়ার পথে যাওয়া যাবে না। বরং, জাতিরাষ্ট্র এই চিন্তা বা ধারণাটাই আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র; সবার এক পরিচয়, সবাই নাগরিক এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে। আর সেই সাথে তা হতে হবে- সবাই একই পরিচয় নাগরিক এবং বৈষম্যহীন সমান নাগরিক। সাম্য, মর্যাদা আর ইনসাফের এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘মাতৃভাষার পক্ষ নিলে তা জাতিবাদ নয়”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

গৌতম দাস

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Sm

বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও তার ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতা অব্যাহত আছে তো বটেই বরং বেড়েছে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। মানে, বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বা সংশোধিত নাগরিক আইন পাস করার পরে এ নিয়ে বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি বাড়িয়েই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারা এখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধিদের “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে;  নিজ কর্মীদের নিয়ে গুলি করে মারার শ্লোগান তুলেছে। এরই মধ্যে লন্ডনের ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন এই ইস্যুতে গত সপ্তাহে এক আর্টিকেল ছেপেছে। শিরোনাম “ইকোনমিস্ট এক্সপ্লেনস, দ্যা ইরোশন অব সেকুলার ইন্ডিয়া” [The Economist explains, The erosion of secular India]
‘Explains’ – শিরোনামে উল্লেখ থাকে এমন টাইপের লেখা সাধারণত অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হয় দেখা যায়; যাতে পাঠক ওই ইস্যুর খুঁটিনাটি দিকগুলো ঐ লেখা থেকে জেনে নিতে আগ্রহী হয়। ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেলটা তেমনি ধরনের এক লেখা, যেটার শিরোনাম হল – আমরা “ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা করে বলছি, ভারতের সেকুলারিজমে ক্ষয় ধরে গিয়েছে”।
এই আর্টিকেলের লেখক দিল্লিতে বসে লিখেছেন তা নিজেই জানিয়েছেন। আর এ ধরনের লেখাকে পত্রিকার নিজের অবস্থান, অন্তত কিছু দায়দায়িত্ব নিয়ে লেখা মনে করা হয়ে থাকে।
কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হল “সেকুলার” শব্দের ব্যবহার। সারা ভারতে সেকুলার শব্দের এধরণের বিশেষ আবিষ্কার ও বিরক্তিকর ব্যবহার প্রচলিত আছে সেই ১৯৪৭ সালের আশেপাশের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। সেটা এখন ‘লন্ডন ইকোনমিস্ট’ পর্যন্ত এতে সওয়ার হয়েছে এটা দেখতে পাওয়াটা বড়ই চমকপ্রদ ও তামাশার নিঃসন্দেহে! ইকোনমিস্ট এখানে ধরে নিয়েছে যে, ভারত একটা সেকুলার রাষ্ট্র, অন্তত সেকুলার রাষ্ট্র ছিল – ইকোনমিস্ট এই সার্টিফিকেট এখানে বিতরণ করেছে। কিন্তু ‘সেকুলা’র মানে কী? আর কোনটা সেকুলার কোনটা না, তা চেনার উপায় কী?

যারা দাবি করে থাকে যে সে সেকুলার অথবা তাদের অমুক রাষ্ট্র সেকুলার তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তিনি সেকুলারিজম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কনসেপ্ট সম্পর্কে আসলে খুবই কম কিছুই জানেন। যেমন এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় যে, ওমুক রাষ্ট্র বা ভারত সেকুলার কি না! ইউরোপে কোন রাষ্ট্র সেকুলার আর কোনটা না- এমন প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। এমনকি আমেরিকা কি সেকুলার রাষ্ট্র? এই প্রশ্ন করতে দেখা যায় না কেন? এছাড়া আবার ঠিক কী প্রয়োজন মিটাতে কোন রাষ্ট্রের সেকুলার হওয়া জরুরি কেন? এর জবাব কী তারা জানেন? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন- কোনো রাষ্ট্র সেকুলার কিনা তা বুঝার উপায় কী?

ইকোনমিস্টের এই লেখায় কোথাও অবশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কী অর্থে ভারতে ‘সেকুলারিজম আছে বা ছিল’ বলা হচ্ছে। এটা বলতেই বা আসলে কী বুঝান হয়েছে? তবুও ঐ লেখায় লেখকের এক দাবি হল- “১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত ভারতে সেকুলার ভিশন বজায় ছিল এবং তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নাই” , [“It was the secular vision which prevailed and which remained pretty much unchallenged until the 1980s.”] অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, সেকুলার শব্দের পাশে একটা ‘ভিশন’ শব্দ লাগানো হয়েছে; মানে সেকুলার জিনিসটা একটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে ব্যাখ্যা করতে দেখছি। এমনিতে অবশ্য ভারতের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ভারত সেকুলার কি না’ এই গর্ব বা তর্কের মীমাংসা করার পদ্ধতিটা দেখা যায়, খুবই সহজ। ভারতে একজন মুসলমানকে প্রেসিডেন্ট বানানো হলে এটাই তাদের কাছে সেখানে প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে গৃহীত হয়ে যায় যে, ভারত সেকুলার। অথচ ইস্যুটা অমন লোক দেখানোর মোটেই নয়। রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে যারা সিরিয়াস তাদের কাছে এসব আমলযোগ্য কথা হতে পারে না।

এ ছাড়া ঐ আর্টিকেলের শুরুতে বলা হয়েছে, ভারতের যারা মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ছিল (মানে কংগ্রেসকে কল্পনা করা হয়েছে) এরা নাকি ‘সেকুলারিজমের স্বপ্ন’ ও ‘ইনক্লুসিভ রিপাবলিক’-এর স্বপ্ন দেখতেন, [Whereas the mainstream of India’s independence movement envisioned a secular, inclusive republic……]। কিন্তু সরি, লেখক মহাশয়! আপনার এই কথা বাস্তবের সাথে মিলে না। ফলে, এটা অগ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো ধারণা প্রকাশ করা আমেরিকানদের চালু করা শব্দ। এ ছাড়া কোল্ড ওয়ার যুগ শেষের আগে আমাদের এদিকে এই শব্দ দেখা যায়নি। বিশেষ করে গ্লোবালি ইসলামী রাজনীতিতে একালে তা বাধ্যতামূলক আমলযোগ্য ইস্যু হয়ে পড়ার পর এটা আমেরিকানদের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশের পরই কেবল এটা এক ভাষ্য হয়ে উঠেছে; আগে না। ইসলামী রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র বা শাসন ধারণার “খেলাফত” শব্দে আমেরিকার আপত্তি তারা এভাবেই এই শব্দ দিয়েই প্রকাশ করে থাকে যে রাষ্ট্র মাত্র তাতে বসবসকারি সকল অংশকে সাথে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করতে হবে। কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, উপেক্ষায় ফেলে রাখা সুযোগ নেয়া যাবে না।

এছাড়া মূলত কংগ্রেস কখনই “ইনক্লুসিভ রিপাবলিক” বলে কোনো ধারণা ব্যবহার করে নাই। এমনকি ১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার সময় রুটিন কাজ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা ব্যবহার করা ছাড়া আর ভারতের আর কোথাও শব্দটাই ব্যবহার করা হয়নি। আসলে রিপাবলিক শব্দটাই আমাদের এশিয়ায় এদিকে প্রয়োজনীয় ধারণা মনে করার রেওয়াজ নাই। খুব সম্ভবত আমেরিকানেরা কমিউনিস্ট ঠেকাতে চালু করা এক ভুয়া শব্দ “ডেমেক্রেসি” – এটা চালু করার কারণে গুরুত্বপুর্ণ ‘রিপাবলিক’ ধারণাটা চাপ দিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই  এই দুর্দশা।  আর সোজা হিসাবে এদিকে ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটার ব্যবহার কংগ্রেস দলের নেতা ব্যক্তিত্বরা  যদি বুঝেই থাকত ও মেনে নিত, তবে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার দিকে যেত না। অথবা বলা যায় তাঁরা যেতে দিয়েছিল কী করে? তাহলে নেহরুর “অখণ্ড ভারত” দখলের ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা,  যেটা তাঁর ষোলোআনা ছিল, তার কী হবে? আমরা তো সেটার এখনো সহজেই এর প্রমাণ পাই। মনে রাখতে হবে, অখণ্ড ভারত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সবাইকে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ ভারত রাষ্ট্র গড়া- এ দুটো কারও কারও কাছে অতি উতসাহে শুনতে কাছাকাছি মনে হবে হয়ত। কিন্তু এ দুটো- একই বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও, এরা একেবারেই ভিন্ন বিষয়। আসলে একটা হল, স্রেফ ভূখণ্ডের লোভ। আর একটা হল সবাইকে একই ও সমান নাগরিক মানুষ হিসেবে একত্রে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ও গণ্য করে গড়ে তুলতে চাওয়া।
ওদিকে আবার, গান্ধী ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন; এর প্রমাণ দেখা যায় না।  বরং আসলে তা হবার কথাই না। কারণ  গান্ধী-নেহেরুর রাষ্ট্র-চিন্তা – সেটা এক জাতিরাষ্ট্র পাবার চিন্তা। আর জাতিরাষ্ট্র চিন্তায় “খেলাফত কোন অনিবার্য প্রয়োজনীয় ধারণা নয়।  বরং, তাদের কথিত “দেশপ্রেমিক জাতি” হলেই চলে। গান্ধী বরং তাঁর খামতি চিন্তার অপুষ্টির কারণে  সারাজীবন তিনি “হিন্দু আর মুসলমান’ – এভাবে পরিচয়মূলক শব্দ আওড়ায়ে গেছেন। নন-আইডেনটিটি-মূলক সিটিজেন বা নাগরিক শব্দ কখনই ব্যবহার করতে পারেন নাই।  আসলে মূলত তিনি ‘হিন্দু-মুসলমান এক করতে হবে’ এই হাল্কা ও অর্থহীন ভাষ্য আউড়িয়ে গেছেন। একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে দুটো আলাদা ধর্ম হিন্দু-মুসলমান, এদের এক করতে হবে কেন? এর চেয়েও বড় কথা- দুটো আলাদা ধর্মকে এক করা কি আদৌ সম্ভব, না এর দরকার আছে? এদিকগুলো তিনি ভাবতে সক্ষম ছিলেন মনে হয় না।
দুনিয়াতে ‘আধুনিক রিপাবলিক’ রাষ্ট্রধারণা আসা ও এটা গড়ার চিন্তা এসেছে কবে থেকে? জবাবে সবাই মেনে থাকেন যে, এটা মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর থেকে। একটা ভুল ধারণাও এখানে আছে যা অনেকে ধারণ করে থাকতে পারে। ১৬৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত জন্ম নেয়া সব রাষ্ট্র একই ধরনের রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রধারণা, তা কিন্তু নয়। সহজে চিনবার জন্য বললে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আর পরের ধারণা আলাদা এভাবে মনে রাখলেই চলে। এই যুদ্ধ সব বদলে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে ফারাকটা কী ছিল? তা হল, ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বলতে একমাত্র তা নেশন-স্টেট বলে বুঝা হত। আর পরে সেগুলো সবই হয়েছে অধিকারভিত্তিক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্রের “কাউন্সিল অব ইউরোপ” গঠনকে যদি  লক্ষ্য করা যায়। এর জন্ম-উদ্দেশ্যই ছিল এক হিউম্যান রাইটস কনভেনশন ডাকা (নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস, ECHR)। নিজেদের রাষ্ট্র-ভিত্তি কথিত “জাতি” ধারণা থেকে বদলে হিউম্যান রাইটে রূপান্তরিত করে নেয়া যায়।  যাতে ওই কনভেনশন শেষে একমত হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা, এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোকে জাতিরাষ্ট্র থেকে হিউম্যান রাইটসভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র আকারে ভিত্তি বদলে নেয়া যায়।

অতএব যে ইউরোপের কথা আমরা শুনি জানি, যার এক নমুনা হল সেকালের কলোনি-মালিক ব্রিটিশ রাষ্ট্র; এটা আসলে সেকালে ছিল এক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট; মানে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। আর তাই যে জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে সেকালের রেনেসাঁ-চিন্তা ব্রিটিশের হাত ধরে ভারতবর্ষে এসেছিল সেই রেনেসাঁ ছিল মূলত একটা জাতিরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ও ধারণা। কমিউনিস্ট সার্টিফিকেট অনুসারে সেকালের রাজা রামমোহন রায়কে ‘ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু’ মানা হয়। সেই রামমোহনের সক্রিয়তার কাল (১৮১৫) থেকে পরিশেষে ১৯৪৭ সালের আশপাশের সময়কালের নেহরু-গান্ধীর রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি এখনো সেই রাষ্ট্রধারণাটা মূলত একটা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৪৭ সালের পর  ‘গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত’ আসলে এক নেশন-স্টেট হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু ভারত নেশন-স্টেট বুঝের ভারত হলে, তাতে কী সমস্যা?

এক্কথায় এর জবাব হল, নেশন-স্টেট ধারণা “নাগরিক অধিকার” বা “হিউম্যান” রাইট ধারণা বুঝতেই পারে না। আর নেশন-স্টেট ধারণা এসেছে – রাষ্ট্রগড়া বলতে যেখানে মুল কর্তব্য ছিল একটা “রাজনৈতিক কমিউনিটি” গড়া – এই কাজ থেকে বিচ্যুতি [derailment] হিসাবে।
এছাড়া রাষ্ট্র বলতে এক ‘জাতিরাষ্ট্রে’র স্বপ্ন-কল্পনা থাকলে গঠনকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, কাকে তারা ‘জাতি’ হিসেবে নেবে? যেমন রামমোহন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র দেখে এক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু খেয়াল করতে হবে তার এই জাতি ধারণাটা আসলে (এথনিক অর্থে) এক ধর্মীয়-জাতি ধারণা। ঠিক যেমন এই একই  বিচারে ব্রিটিশরা হল, এঙলো-ক্যাথলিক খ্রিশ্চান, আর এই ধর্মের ভিত্তিতে তারা এক ব্রিটিশ জাতি। আর এখান থেকেই রামমোহন একটা একক ধর্মের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতির কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এতে হিন্দুধর্ম তার ‘ঐ’ প্রয়োজন মিটাতে পারবে, তা তিনি মনে করেননি। কারণ এই হিন্দুধর্ম জাতভেদ প্রথায় ডুবে অসংখ্য জাতে বিভক্ত। এছাড়া ভারতে আরো ধর্মও আছে। এছাড়াও তিনি কোন একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম হলে তা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হবে বলে মনে করতেন। কারণ হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার ধারণাকে তিনি এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনের দিক থেকে দেখে সমস্যা ভাবতেন। এসব চিন্তা থেকেই ১৮১৫ সালে তিনি একেশ্বরবাদী ‘ব্রাহ্মধর্মের’ প্রচলন করেছিলেন।
কিন্তু এই “জাতি” ধারণা প্রয়োজনে ধর্ম-প্রকল্প বাস্তবায়ন রামমোহন বা তার অনুসারীরা কেউ সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আর ১৮৭২ সালের দিকেই, খোদ ব্রাহ্মধর্মই দু’ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ সবাইকে এক ধর্মের অনুসারী করে জাতিরাষ্ট্র বানানো দূরে থাক ব্রাহ্মধর্ম নিজেই বিভক্ত হয়ে যায়। তাই, এটা উদ্যোক্তাদের কাছে অবাস্তব প্রকল্প মনে হতে থাকে আর ততই পরবর্তিকালে বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-বঙ্কিমচন্দ্রসহ সবার কাছেই “ব্রাহ্ম-প্রকল্প বাদ দিয়ে” হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একমাত্র বাস্তবতা বলে নিরুপায় ‘সাফাই’ হয়ে উঠতে থাকে। কংগ্রেসের জন্মের (১৮৮৫) পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা- এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন গান্ধী। পরের বছরের মধ্যে তিনি কংগ্রেসের হাল ধরেন । তখন থেকেই এবং মূলত ১৯২৩ সালের ‘লক্ষৌ প্যাক্ট’-এর ঐক্য ব্যর্থ হয়ে যারার পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একেবারে নির্দিষ্ট হয়ে জায়গা পেয়ে যায়। তবে গান্ধীর কৌশলে, এটা হিন্দুধর্মভিত্তিক বা এটা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সে কথা সরাসরি না বলে আবছা করে রাখা হয়। আর তখন থেকে বিপদে পড়লে হিন্দু শব্দটা ঠিক ধর্ম নয়, সভ্যতা বলে বুঝতে হবে বলে দাবি করার চাতুরী তারা করে গেছেন।

আসলে জাতিরাষ্ট্র বুঝের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এখানে ‘জাতি’ মানেই কোনো একটা আইডেনটিটির জাতি মানে, ভাষা ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়কে ভিত্তিতে জাতি ধরেই এখানে আগাতেই হয়। আর এতেই অন্যান্য ধর্ম অথবা অন্য আইডেনটিটিগুলোও কেন জাতির ভিত্তি হিসেবে তাদেরটা নেয়া হবে না, সে দাবিদারির প্রশ্ন উঠে নতুন অসন্তোষ তো অবশ্যই উঠে কিন্তু সবচেয়ে বড় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব খাড়া হয় যে নাগরিকদের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে একটা না একটা অসাম্য রাষ্ট্র নিয়মিত তৈরি করতে থাকে।

তুলনায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলো মীমাংসিত। যদিও কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার পরে এবার তা বাস্তবায়ন করাটা মূল কাজ যে, ধর্ম বা যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সারকথাটা হল গান্ধী-নেহরুরা হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা আঁকড়ে থাকাতে তারা জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বা কোনো মুসলমানের প্রতি বৈষম্যের কোন সদুত্তর বা সন্তোষজনক জবাব তৈরি করতে পারেননি। পরিণতিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি বড় হয়ে শেষে তারা আলাদা হয়ে যায়; যদিও অনেক মুসলমান দেশত্যাগ করলে নিজের বৈষয়িক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার হবু আশঙ্কায় ভয়ে আপসে ভারতেই থেকে যান।

এর সার কথাটা হল, এখান থেকেই হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণার কারণে ভারতের সব প্রধান দলই কমবেশি ‘হিন্দুত্ব’- এই জাতিবাদের অনুসারী থেকে যায়। এর মধ্যে সেকালের আরএসএস কে (একালের বিজেপি) বলা যায় ‘চরম’ হিন্দুত্ববাদের দল। এ কারণে লক্ষ্যণীয় যে বিজেপির চোখে এখনও ‘নাগরিক’ বলে কোনো ধারণা নেই। তাই সহজেই, মুসলমান বা অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার কোনো দায় অনুভব করে না বিজেপি। তাদের দলের কোনো দলিলেও এর স্বীকৃতি নেই।

তাহলে এটা কী কংগ্রেসের কি আছে? না তাও নেই। কারণ ভারত মূলত ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার দল দিয়েই গঠিত ও পরিচালিত। ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণা ও বোধের দল দিয়ে নয়, তাতে সে দল কমিউনিস্ট হোক কি বিজেপি!

উনিশ শ’ আশির দশকের শেষের দিক থেকে ভারতে কংগ্রেস দলের প্রভাব ও আধিপত্যের পতন শুরু হয়ে যায়। আর এটা লক্ষ্য করেই ইকোনমিস্টের লেখক দাবি করছেন সেকুলারিজমের ক্ষয় তখন থেকে। তিনি ‘কংগ্রেস’ শব্দের জায়গায় ‘সেকুলারিজম’ বসিয়ে কাজ সেরেছেন যেন এর আগে ভারত বিরাট সেকুলার ছিল। এর আগে যেন বছর বছর দাঙ্গা হয়নি। কাশ্মিরে নির্বাচনে ভোটে কারচুপি করে ভোটের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো আর রাজনীতিতে সশস্ত্রতার আমদানি কি ১৯৮৭ সালে কংগ্রেস আমলে হয়নি? তাই, একা বিজেপি সব দোষের ভাগী এ কথা ভিত্তিহীন। রাহুল গান্ধী কি একালে ‘সফট হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছেন না?

তাহলে এখন সত্যিকারভাবে চিনতে হয় কী করে যে, রাষ্ট্র সেকুলার কিনা? রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও বোধের অভাব আর সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে সেকুলারিজম সম্পর্কে সব অদ্ভুত ধারণা আমরা দেখতে পাই। সেটা মুসলমান রাষ্ট্রপতি দেখানো মানে, তা সেকুলারের লক্ষণ পর্যন্ত। এমনকি এটা কনস্টিটিউশনে ওই রাষ্ট্র সেকুলার বলে ঘোষণা দেয়া আছে কিনা অথবা রাষ্ট্রের মূলনীতির একটা সেকুলারিজম কিনা, ইত্যাদি দেখিয়ে যারা দাবি করে, আমার বা অমুকের রাষ্ট্রটা সেকুলার তারা রাষ্ট্র বা সেকুলারিজমের কিছুই বুঝে না। এটা আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। তবে একাজটা তারা করে তাদের একটাই উদ্দেশ্য হল, মূলত ধর্মীয় সংখালঘুদের ভোট এই উপায়ে হাসিল করা।

তাহলে আবার প্রশ্ন সেকুলারিজম বুঝব কেমন করে?  এপর্যন্ত আমরা দেখেছি সেকুলারিজম যেন অবশ্যই ধর্মবিষয়্ক একটা ইস্যু। হা আপতিকভাবে তা মনে হতে পারে কিন্তু এটা মূলত নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষম্যের ইস্যু। কোন দুই নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সাম্য বজায় না রাখার সমস্যা।  যেমন দেখেন, আমাদের রাষ্ট্র এখন ছাত্রলীগের বা আওয়ামি কোন অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইনভঙ্গ করে হলেও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। তাদের কৃত কোন অপরাধ বা রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকে উপেক্ষা বা প্রশ্রয় দিচ্ছে।  রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইন ভঙ্গ করে হলেও ছাড় দিচ্ছে, বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে – এগুলো যথেষ্ট প্রমাণ যে, এই রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষমাই করছে – ফলে বৈষম্যের রাষ্ট্র। নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র নয়। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক বৈষম্য করা মানে তা যদি হয় ধর্ম পরিচয়ের কারণ-সংশ্লিষ্ট তখন এটাকে রাষ্ট্র সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করছে বলা হয়। তাই ‘সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গ’ কথার মূল অর্থ হল নাগরিক বৈষম্য করা।
যেমন মোদীর সিএএ – এই আইনে মুসলমানদের বেলায় বৈষম্য করা হয়েছে তাই এই আইন সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে – এভাবে বলা যায়।  যদিও এখানে মূল কথাটা হল নাগরিকের মধ্যে অধিকার বৈষম্য করা। আর কেমন ধারার বৈষম্য এর উত্তরে বলা যায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিক বলে সংখ্যালঘু বলে তাদের সাথে করা বৈষম্য এটা।
আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এটাও বৈষম্য করা। ধর্মের কারণেসহ যেকোনো কারণে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা, বৈষম্যের চোখে দেখা ও আচরণ করা এটাই মূলত নাগরিক সাম্য বজায় রাখার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।  কেবল ধর্মীয় বৈষম্য নয়, বরং যেকোনো নাগরিক বৈষম্যই নাগরিক-সাম্যের নীতি ভঙ্গ করা।
এরপরে আর একটা দিক আছে। আলাদা করে “আমাদের রাষ্ট্র সেকুলার” – একথা কনস্টিটিউশনে লিখে রাখা বা না রাখাটা গুরুত্বপুর্ণ না। কারণ মূলত রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কারণের বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হয়ে দাড়ানোই  নাগরিক সাম্যনীতি।  তাই  রাষ্ট্র সেকুলার কিনা  এটা বুঝবার আসল জায়গা হল ঐ রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেখানে তাকাতে হবে।  আমার রাষ্ট্র সেকুলার – আলাদা করে একথা লিখা রাখা না রাখা এজন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।  মানে লিখে রাখলেও সেকুলারিজম কায়েম হবে না। এজন্যই যারা এই লিখে রাখাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এরা সেকুলারিজম ইস্যুটা বুঝে কিনা সন্দেহ করা যায়। রাষ্ট্রের চোখে দেশের সবার পরিচয় যাই থাক, মূল বিষয় হবে তাদেরকে কমন “নাগরিক” পরিচয়ে আমল করা হচ্ছে কি না, সে সমান অধিকারের নাগরিক বলে মানা হচ্ছে কি না, কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার সে হচ্ছে কি না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এগুলোর সদুত্তর হল সেকুলার রাষ্ট্রের চিহ্ন। নাগরিক সাম্যের ব্যত্যয় ঘটলেই মানে, অধিকারে বৈষম্য ঘটলেই আসলে  নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ হবে। আর নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ মানে সেখানে সেকুলারিজম নীতিভঙ্গও ঘটবেই। তাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলার লেখা আছে কি না এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেদিকে পরীক্ষা করতে হবে।

ওদিকে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র না হলে নাগরিক সাম্য বজায় থাকা বা বৈষম্যহীনতা রক্ষা করা আশা করা যায় না। আর সেকুলারিজম চিনার উপায় হল রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের বেলায় বৈষম্যমূলক কিনা মানে নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না এটা চেক করে দেখতে হব।

জন্ম থেকেই ভারত হিন্দুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই ভারতের নাগরিক জীবনে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতা বজায় থাকার দাবি বা এই বোধ সরব বা সক্রিয় নয়। একই কারণে তাই সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের উপর নাগরিকের দাবি বা চাপ তেমন নেই। জেলা শহরভিত্তিক মফস্বলে বিজেপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা, মুসলমান বলে কোনো মানুষকে ধরে নির্যাতন করছে, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর লাফ দিয়ে জোড়া পায়ে উঠছে। অথচ গোল হয়ে চার পাশে মানুষ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে এই নির্যাতন উপভোগ করছে। অথচ  কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তাদের। এমন ভিডিও ক্লিপ মোদীর একালে আমরা অনেক দেখেছি। এর মানে হল,  নির্যাতিতকে কেউ তাঁরা তারই মত সমান মর্যাদা ও অধিকারের নাগরিক মনে করছে না। এটাই এর অর্থ তাতপর্য। আবার গত নির্বাচনে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি বা রায় দেয়নি। কেন? বিজেপি দলের ম্যানিফেস্টোতে নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই কেন? নির্বাচন কমিশন কোনো আপত্তি তুলেনি কেন? আবার বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়াতে এই ভাবনার উৎস হিসেবে দলের দলিল তালাশ করে কী কমিশন কখনও দেখেছে?  কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছে?  মনে হয় না। অথচ এগুলো সবই নাগরিক অসাম্যের মামলা। মানে সেকুলারিজমের নীতিও ভঙ্গের মামলা। অথচ ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে সেকুলারিজম শব্দের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ করা ও উল্টা বৈষম্য করা সবই যেন বৈধ।
এখন দিল্লির নির্বাচন চলছে। বিজেপি নেতা কাপিল গুজ্জর গুলি ছুড়ে হুমকি দিয়ে বলেন  এই দেশে কেবল হিন্দুরা যাই বলবে তাই চলবে On 1 February, Kapil Gujjar fired shots at Shaheen Bagh saying, “Iss desh mein sirf Hinduon ki chalegi (Only Hindus will have their say in this country).”। এগুলো গুরুতর নাগরিক বৈষম্য করার মামলা। এবং সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গের মামলা।

এভাবে এক হিন্দুত্ববাদ ছেয়ে বসছে চারদিকে; যেন হিন্দুত্ববাদই, অর্থাৎ এর এই বৈষম্য ও অবিচারের আধিপত্যই একালের নিয়ম!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘ইকোনমিস্টের’ মোদি-পাঠ”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

গৌতম দাস

৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Qz

_

চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

গৌতম দাস

১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৫, সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Nl

 

[সার সংক্ষেপঃ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কোন মুল্যায়ন চোখে পড়ে না। ফাঁপা আবেগী কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের পুজা বা স্তুতি দেখা ছাড়া। কেউ সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বোধের চিহ্ন বা রাজনৈতিক অবস্থান – তা নাও হতে পারে। নেতাজী সুভাষ এই তিন গুণের ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্র বা রাজনীতি জ্ঞান বলে কিছু ছিল তা জানা যায় না। জাপানি রেসিস্ট শাসকের ফ্যাসিজমের রাজনীতি ছিল। “নেতাজী” তিনি তাদের ট্রেনিং পেয়েছিলেন। ঠিক যেমন বার্মিজ জেনারেলেরা পেয়েছিলেন। এবং জাপানি সামরিক সহযোগিতায় এই জেনারেলেরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্য-মুক্ত করেছিলেন। কাজেই নেতাজী সুভাষ যদি জাপানি সামরিক সহায়তায় সশস্ত্রভাবে ভারতকে স্বাধীন করে ফেলতেন তবে তিনিও বার্মিজ  জেনারেলদের মত যাদের কৃতিত্ব হল নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো, ক্লিনজিং আর রেসিজম, ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি বৈশিষ্ঠের – এদের মতই নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! ]

ROAR বাংলা থেকে নেয়াঃ হিটলারের সাথেও সাক্ষাত করেছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসু; Source: commons.wikimedia.org

আসল নাম সুভাষচন্দ্র বসু, সংক্ষেপে সুভাষ বোস [Subhas Chandra Bose]। বৃটিশ-ভারতে অবিভক্ত বাংলার এক রাজনীতিবিদ, কংগ্রেস দলের দু’বারের সর্বভারতীয় সভাপতি। কিন্তু কলকাতার হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্তের যারা ঢবঢবে ইমোশনাল, এদের চোখে তিনি ‘নেতাজী’। প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে মধ্যবিত্তের সস্তা আবেগের নেতা হলেন সুভাষ বোস। এদেরই স্বীকার করে নেয়া সুভাষ বসুর খেতাবি নাম হল ‘নেতাজী’।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনসীমা খুবই ছোট, ১৯২১-১৯৪৫ সাল। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর ১৯২০ সালে বৃটিশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে না দিতেই সেই চাকরি ছেড়ে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর অপরপ্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, তিনি  বৃটিশ কলোনির এক বাসিন্দা হয়েও বৃটিশ-প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানি ও জাপানের সামরিক সাহায্য নিয়ে ছোট হলেও এক সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধে বৃটিশদেরকে পরাজিত করবেন ভেবে জাপানি সহযোগিতায় জাপানে বসে নিজস্ব এক সেনাবাহিনী (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা INA) বা আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়েছিলেন। যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ মেরুকরণের দিক বিচার করে বললে,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা-বৃটিশ-রুশ ইত্যাদি ‘মিত্রবাহিনীর’ কাছে জার্মানি, ইতালি ও জাপান ‘অক্ষশক্তির’ জোটের পরাজয় ঘটেছিল। ফলে সুভাষের বাহিনীকেও ১৯৪৫ সালে বৃটিশদের কাছে সারেন্ডার করতে হয়েছিল। কিন্তু এরপর দেশে ফিরতে যে সামরিক বিমানে তিনি উঠেছিলেন, এখান থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ বলেন তাইপেই-য়ের (এখন তাইওয়ানের রাজধানী) আকাশে প্লেন ক্রাশ করে  মারা গেছেন, কিন্তু সেই লাশ কই কেউ জানে না।  এরপর ঠিক কী হয়েছিল সুনিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না বরং ব্যাপারটা রহস্য আবৃতই থেকে যায়। কিন্তু এ’ঘটনাটাই আবার আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগ আরও সপ্তমে তুলতে ভুমিকা রেখেছে।

বয়সের হিসাবে নেহরু সুভাষের চেয়ে ৮-৯ বছরের বড়। তবে একসাথে কাজ করেছেন। যেমন, ১৯২৮ সালের কংগ্রেস দলের সম্মেলনে, গান্ধী আর মতিলাল নেহরু (জওয়াহেরলাল নেহরুর বাবা) এরা হেদায়েত করছিলেন “বৃটিশ ডমিনিয়ান রুল” দাবি করে দলের প্রস্তাব পাস করাতে। ডমিনিয়ান [Dominion] মানে হল, ভারতকে বৃটিশ শাসন কর্তৃত্বের অধীনেই রেখে ও মেনে, কেবল নিজেদের জন্য এক সীমিত স্বায়ত্বশাসন চাওয়া। আর এক্ষেত্রে গান্ধীর বিপরীতে তারুণ্যের অবস্থান নিয়েছিলেন জওয়াহেরলাল নেহরু আর সুভাষ বোষ, তাদের দাবি ছিল”পূর্ণ স্বাধীনতা”। সেকালে ‘পূর্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হত ডমিনিয়ান শব্দটা নাকচ করতে। যদিও নেহরু আর সুভাষ কংগ্রেসের একই উপধারার রাজনীতির লোক ছিলেন না। এটা ছিল তাদের  সিনিয়রদের বিরুদ্ধে কমন এক অবস্থান নেয়া।

সুভাষ বোস ছিলেন মূলত সব সময় আপাত ‘রেডিক্যাল’ বা সশস্ত্রতার রাজনীতির পক্ষে। আর একভাবে বলা যায় তিনি গান্ধীর আপোষকামী ও অহিংস ধারার রাজনৈতিক এপ্রোচের বিপরীতে বৃটিশের বিরুদ্ধে সংঘাত করে করে আগানো – এই লাইনের লোক।

সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই।

এখানে একটা কথা খুব পরিস্কার করে আমাদের মনে পরিস্কার রাখা দরকার। সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই। এই স্বল্প পরিসরে এর কিছু বুঝতে, একটা চিহ্নের কথা বলা যেতে পারে। যেমন সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা দিয়ে কেউ এমনকি “দেশ স্বাধীনও” করে ফেলতে পারে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে এরা দেশ বুঝে কিন্তু রাষ্ট্র বুঝে না। স্বাধীনতা অর্জনের পরে এরা কী রাষ্ট্র গড়বে? কী রাষ্ট্র গড়বে, কেমন? এরা জানে না। কারণ চিন্তা করে নাই। কলকাতার নেতাজী, সুভাষচন্দ্র বসু এমনই দেশপ্রেমী বিপ্লবী!

যদিও সুভাষ তাঁর দল খুঁজে নিয়েছিলেন ঐ কংগ্রেসকেই; তবে সেটা তিনি আসলে তার গুরু চিত্তরঞ্জন দাশের (মৃত্যু হয় ১৯২৫ সালে) কংগ্রেস দলেই এসে যোগ দিয়েছিলেন। এটা বড় প্রভাবক ছিল। কিন্তু আবার রেডিক্যাল যদি তিনি হবেনই, তবে কংগ্রেস দলে যোগ দিতে গিয়েছিলেন কেন? এর কোনো সদুত্তর বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আবার তিনি কোনও কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট রাজনীতিও করতেন না। ফলে এ কারণে তার চিন্তাকে রেডিক্যাল যদি বলি, তবে সে কথা টেকানোও মুশকিল। কোন এক আবছা রংয়ের সোশালিজমও তিনি পছন্দ করতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনটা হলেও ব্রিটানিকাও তাঁকে প্রমাণহীনভাবে সোশালিস্ট বলতে চেয়েছে। তা খুব সম্ভবত সেকালের যেসব ট্রেড ইউনিয়নিস্ট বা কৃষক আন্দোলনের নেতা যারা আবার দল হিসাবে কংগ্রেসেই থাকতেন আর যারা সারাজীবন কংগ্রেস দলের ভিতর গান্ধীর গালমন্দ খেয়ে কোনঠাসা হয়ে থাকতেন – এদেরকে আনুকুল্য দিতেন সুভাষ – এই কারণে।

তবে সুভাষের সশস্ত্রতা এর আরও বৈশিষ্ট আছে। যেমন তা আবার বৃটিশদের শত্রু হিসেবে খোদ হিটলার, তারই সাথে সখ্য গড়ে, সামরিক সাহায্য নিয়ে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেন – এমন লোক হলেন সুভাষ। এমনকি এই ‘নেতাজী সুভাষ’ আবার গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেসের ১৯৩৭ সালের প্রথম (বাংলাসহ সাত প্রদেশে) প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি জার্মান-জাপানের সহযোগিতায় বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে এমনই বদ্ধধারণায় ডুবে মোহাচ্ছন্ন ছিলেন যে, ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভারত ছেড়ে পালিয়ে তিনি জর্মানিতে গিয়ে খোদ হিটলারের সাথে দেখা করেন।

কিন্তু হিটলার, এত দূর সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা এসে জড়িয়ে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন বলে তিনি না করে দিলে, সুভাষ সেখান থেকে হিটলারের সহায়তায় জাপান চলে যান। হিটলারের যুদ্ধের বন্ধু জাপানের শাসক মার্শাল তেজোর [Tōjō Hideki] সাথে দেখা করেন আর সেখান থেকেই নেতাজী সুভাষের সামরিক সহায়তা পাওয়ার কপাল খুলে যায়। জাপানি সহায়তায় বাহিনী গড়ে নিয়ে সুভাষ একসময় বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে যান। তিনি বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর বার্মা সীমান্ত দিয়ে জাপানি বিমান হামলার কাভার বা ছত্রছায়ায় দুটো বৃটিশ সীমান্ত চৌকি আক্রমণ করে (ইম্ফল ও কোহিমা, দুটোই আজকের মনিপুর ও নাগাল্যান্ড ছোট দুই রাজ্যের রাজধানী) দখল করেছিলেন বলা হয়। এটাই তাঁর সর্বসাকুল্যে কৃতিত্ব ধরা হয়।

এর আগে তিনি যে অনেক দিন ধরেই (সম্ভবত ১৯২৭ সাল থেকে) জার্মান-জাপানের শাসকদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন তা কংগ্রেস দলের সিনিয়রেরা অনেকেই জানত। সুভাষ বোস কংগ্রেস দলে নিজ গ্রুপিং শক্তিশালী করে ১৯৩৮ সালে প্রথম কংগ্রেস দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি পরের বছরও একই প্রভাবে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হবার শেষে গান্ধী পরে আলটিমেটাম দেন যে, সুভাষকে পদত্যাগ করতে হবে; না হলে কমিটির বাকি নির্বাহী সদস্যরাও পদত্যাগ করবে। এর মূল কারণ ততদিনে সুভাষের জার্মান-জাপানের সাথে যোগাযোগ-সম্পর্কটা খুবই পরিপক্ক হয়ে উঠে স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তাই কংগ্রেসের রাজনীতিকে সশস্ত্রতার পক্ষে হেদায়েত করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তাই সুভাষের হেদায়েতি ঠেকাতেই গান্ধীর এই আলটিমেটাম এসেছিল। তখনই সুভাষ নিজের গ্রুপকে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ [Forward Bloc] নাম দিয়ে আলাদা দল হিসেবে প্রকাশ করেন। ফরওয়ার্ড ব্লক নামে দলটা এখনো কলকাতায় আছে আর তা “বামফ্রন্ট” নামে কলকাতাকেন্দ্রিক যে কমিউনিস্টদের জোট আছে তারই এক শরিক দল। মজার কথা হল, এই “ফরওয়ার্ড ব্লক” দল নিজেদেরকে এক কিসিমের কমিউনিস্ট দল বলে দাবি করে। কিন্তু কোন সূত্রে তারা কমিউনিস্ট, এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সম্ভবত আবছা জোড়াতালির ভাষ্যটা হবে এ রকম যে, তারা সশস্ত্রভাবে ‘দেশ স্বাধীন’ করার লোক। সুতরাং তারা ‘বিপ্লবী’ না হয়ে যায় না। আর বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিবাদী তো বটেই। অতএব…।

কিন্তু তাহলে আসল কথায় আসি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ মানে অবিভক্ত বাংলার থেকে পূর্ববঙ্গের আলাদা প্রদেশ ও ঢাকা এর রাজধানী হয়ে যাওয়ায় হিন্দু-জমিদারদের এর প্রবল বিরোধিতা শুরু করেছিল, পাগল হয়ে গেছিল। সেই ইস্যুতে অথবা খোদ জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদে পূর্ববঙ্গের দাবির প্রতি সুভাষ বসুর অবস্থান কী ছিল? এক কথায় ভিন্ন কিছুই না। একেবারেই আর পাঁচটা হিন্দু কংগ্রেসের নেতা, গান্ধী-নেহরুর মতই ছিল সুভাষের অবস্থান। অর্থাৎ হিন্দু-জমিদারি স্বার্থের নেতাই তিনিও। মূলত এ কারণেই নেতাজী (সুভাষচন্দ্র বসু) কংগ্রেস দলে গান্ধী-নেহরুর বিরোধী ক্যাম্পের নেতা হলেও তিনি পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তখন বা এখন কেউ হতে পারেন নাই, নন। যদিও সুভাষ কংগ্রেসে যোগ দেন অনেক পরে ১৯২১ সালে আর ততদিনে মানে ১৯০৫ সাল থেকেই এসব ভাগাভাগি ঘটে গিয়েছিল।

এরপরেও আমরা দেখব, বাংলাদেশে খুঁজে পাবো কেউ কেউ সুভাষ বোসের ছবি বা মূর্তি সাজিয়ে রেখেছেন ড্রয়িংরুমের শোকেসে। যেমন বাংলাদেশে টাটা গাড়ির এজেন্ট কোম্পানির মালিক অথবা কোন দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারের কেউ। সম্ভবত তাদের সাধারণ বুঝাবুঝি অবস্থানটা হল – কংগ্রেস দল যে হিন্দুইজমের দল, এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দল, তা অনেকে জেনেও লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। করে বলতে চায় কংগ্রেস  মানে তো প্রগতিশীলতা, কাজেই কংগ্রেস দলের কোনো নেতার চিহ্ন তো ধারণ করাই যায়।  তা দোষের নয়। অথবা উপরে বলা আগের ফর্মুলা যে সশস্ত্রতা মানেই বিপ্লবীপনা মানেই প্রগতিশীলতা। এ রকমই কিছু একটা ধামাচাপা বুঝ!

সম্প্রতি মোদীর এই জমানায় বিজেপির হাতে কিছু পুরানা বিতর্ক টেনে তোলা হয়েছে। মোদী বা বিজেপি দলের ধারণা নেতাজী সুভাষ যেহেতু কংগ্রেসের নেহরু-গান্ধীর বিরোধী ধারার, কাজেই হিন্দু কোলকাতার ‘নেতাজী’ আবেগে কৌশলগত সুড়সুড়িতে সমর্থন দিলে আখেরে বিজেপির তাতে লাভ আছে। তাই গত নির্বাচনে নেতাজীর এক ভাতিজার ছেলে চন্দ্রকুমার বসু, তিনি বিজেপির প্রার্থী হিসেবে কলকাতা থেকে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও জিততে পারেননি। সম্প্রতি সুবীর ভৌমিক এনিয়ে লিখেছেন। তিনিও একই নেতাজী আবেগ আঁকড়ে লিখেছেন – মোদী-বিজেপিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “গেরুয়ারা অপরিহার্যভাবেই বদহজমে ভুগবে”।

কারণ, পরবর্তিতে এসে হঠাৎ সেই চন্দ্রকুমার মোদীর বিজেপিকে এক হুঁশিয়ারির কথা বলে বিপদে ফেলে দিয়েছেন। বলেছেন, “মোদীর দল যদি ঐক্যবদ্ধ ভারতের নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ অনুসরণ না করে, তবে দেশ টুকরা টুকরা হয়ে যাবে”। কথাটা বিজেপির নেতাদের জন্য বিব্রতকর সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু এটা কোন অর্থপূর্ণ কথা তিনি বলেননি। কারণ, চন্দ্রবসু যদি এ কথাই আওড়াবেন তবে বিজেপির টিকিট নেয়ার তো তাঁর কথা নয়। তিনি বিজেপিতে গেছিলেন কেন? আবার বিজেপি যে তাঁর এই বয়ান বা নতুন রাজনীতির কেউ না, সেটা তো সকলেই আগে থেকেই জানে। কাজেই এই তামাশা অর্থহীন। স্টান্টবাজি করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

এ ছাড়া আবার চন্দ্রকুমারের উদ্ধৃত ও কথিত ‘নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ’- এটা আবার কী জিনিস? চন্দ্রবসু নিজেই এর জবাবে বলছেন যেহেতু, “নেতাজীর সেনাবাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম-শিখ ইত্যাদি” সব ধর্মের লোক ছিল তাই এটাই নাকি “নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ”। এসব কথা আসলে সোনার-পাথরের বাটি ধরণের। একজন কথিত মুসলমান প্রেসিডেন্ট থাকলেই ভারত একটা সেকুলার দেশ, এসব পোলাপানি বোকা-বুঝের রাজনীতি অনেক দিন ধরে চলে আসছ্‌ দেখেছি আমরা। এগুলো অর্থহীন, না বুঝে কথা বলা। যারা রাষ্ট্র ধারণা রাখেন না, এই ইস্যুতে কোন বুঝাবুঝি না রেখে আন্দাজে বলা কথা এগুলো। এরা না বুঝে মর্ডান রাষ্ট্র না বুঝে কোন সেকুলারিজম! তবু আন্দাজে কথা বলে যায়।

আসলে ব্যাপারটা হল, শত বিপ্লবীপনা ফলালেও ভারতের স্বাধীনতা কোনও সশস্ত্র আন্দোলনের ফলাফলে অর্জন হয় নাই। টেবিলে বসে আপোষ-আলোচনায় পাওয়া স্বাধীনতা এটা। এই আত্মশ্লাঘা নিয়ে  আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের মনে মেলা আপসোস আছে। এই ফাঁপা আবেগী জোশ মেটাতে “নেতাজী” এক ভাল টোটকার নাম। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা যায়, নেতাজীর অবদান কী? তখন আবার আরেক প্রশ্ন, কারও অবদান মাপে কেমনে? কারণ এটা তো জানা নাই। তবু তাতে যেমন যদি বলা হয়, তিনি জাতীয়তাবাদী ছিলেন? এখন জাতীয়তাবাদী মানে কী? অথবা তিনি কী রাষ্ট্র বুঝতেন? কেউ জানে না। আচ্ছা তাহলে বলেন যে, আপনার নেতাজীর ভারত রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে অবদান কী? এবার কবিরা একেবারেই নীরব হয়ে যাবে। অনেকে বলতে চাইবেন তাঁর মৃত্যুরহস্য কী কিছু না? মানে তিনি বলতে চাইছেন, এখানে গোয়েন্দা গল্পের প্লট আছে। কিন্তু আছে হয়তো তাতে কী?

এতেও নেতাজীর অবদান কী তা দেখানো যায় না। আসেন তাহলে উল্টো জায়গায় তাঁর হিটলারের সাথে দেখা করা বা জাপান যাওয়াকে মূল্যায়ন করি। না, হিটলার খারাপ তাই নেতাজী ভাল হয় কেমনে সেকথা না হয় নাই তুললাম। সেসব বাদ রেখেই আগাই। প্রথমত, জার্মান-জাপান যেতে নেতাজীর ভারত ছেড়ে বের হয়ে পড়া; এটা তার অবসেশন ও এক আবেগ মাত্র। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল  অধিকারভিত্তিক কলোনিমুক্ত রাষ্ট্র ও জাতিসঙ্ঘ জন্ম দেওয়ার এক নতুন ব্যবস্থার দুনিয়া কায়েম বনাম রেসিজম ও ফ্যাসিজমের কলোনি মালিকের দুনিয়া- এ দুয়ের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। যেখানে হিটলাররা দ্বিতীয় বা নেতিপক্ষ। এ দিকটা মূল্যায়নের ক্ষমতা হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগী-গর্বের কলকাতার নেই। আবার সময়ের সেন্সের দিকটা দেখেন। সুভাষ জাপান পৌছেছেন ১৯৪৩ সালের ২ জুলাই। কিন্তু ঘটনা হল ততদিনে যুদ্ধ ঘোরতর জায়গায় পৌছেছে শুধু তাই না। বরং বলা যায় যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেটা হল, হিটলার-তেজো-মুসোলিনির জোটপক্ষ হেরে যাচ্ছেন।  আসলে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকেই আমেরিকান রুজভেল্ট  এর বিজয়ের বাতি জ্বলে উঠে গিয়েছিল। বাকি ছিল তা ঘটতে যে সময়টা লাগে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সুভাষ বোস তা আমল করার যোগ্য বোধবুদ্ধির লোক ছিলেন না।

নেতাজী সুভাষ ভারত স্বাধীন করে ফেললে কী হত?
সবশেষে একটা পরিণতির কথা দেখিয়ে শেষ করব। ধরা যাক নেতাজী সুভাষ ও তাঁর সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিতে গেছেন। তারা ভারত স্বাধীন করে ফেলেছেন।  তাহলে কেমন ভারত দেখতাম আমরা?
আগে বলেছি দুটো সীমান্ত চৌকি তারা দখল করতে পেরেছিলেন, ইম্ফল ও কোহিমায়। কিন্তু এগুলো সবই বার্মা-ভারত সীমান্তে কেন?

এর মূল কারণ বা ঘটনার ভিতরের ঘটনা হলঃ জাপান মানে কলোনি শাসক মার্শাল তেজোর জাপানের সামরিক সহায়তায় ১৯৪২ সালে  বার্মা একবার বৃটিশ শাসনমুক্ত হয়ে গেছিল। ঠিক যেমনটা সুভাষ বোস স্বপ্ন কল্পনা দেখতেছিলেন। সেই জাপানিজ-বার্মায় এবার জাপান থেকে  সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজকে তুলে এনে এর হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিল। আর তাতে এই রাজধানী রেঙ্গুনে বসে ভারত-বার্মা সীমান্তে হামলা করা আর কঠিন কাজ ছিল না। আর তাতেই দুটা সীমান্ত চৌকি মুক্ত করার দাবি।

আসলে আমরা কেমন নেতাজী দেখতাম- এর এককথার জবাব হল, বার্মার এখনকার রোহিঙ্গা-কচুকাটা করা বীরত্মের জেনারেলদের মতই এক নেতাজী সুভাষের জেনারেলদের ভারত – এটাই দেখতে পেতাম আমরা। বার্মা প্রথমবার বৃটিশ কলোনি দখলে চলে যায় ভারত বৃটিশ-দখলে চলে যাওয়ার ৬৭ বছর পরে, ১৮২৪ সালে। যদিও ১৮৮৫ সালে তৃতীয় ও শেষ বৃটিশ-বার্মার যুদ্ধের পরে সেবার বার্মা স্থায়ী দখল হয়ে যায়। আর এতে বার্মা একই বৃটিশ-ভারত শাসক প্রশাসনের অধীনেই ভারতেরই একটা প্রদেশ (বার্মা প্রদেশ নামে) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ও শাসিত হতে শুরু করেছিল। এর ফলে বার্মার ভিতরে পাবলিকের দিক থেকে ধীরে ধীরে যে সর্বব্যাপী মূল অসন্তোষ দেখা দেয় এর লিড নিয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়্কেন্দ্রিক আন্দোলনকারি জনগণ। তাদের তপ্ত ক্ষোভের কেন্দ্রীয় সার বক্তব্য হল এই বলে যে, বৃটিশরা ভারতীয় সহকারীদের সাথে নিয়ে এসেছে আর তাদের দিয়েই বার্মা প্রশাসন চালাচ্ছে। আর এরই সাথে চাকরি-ব্যবসার পুরা বিষয়গুলোতে ভারতীয়রাই বার্মা এসে জেঁকে বসে গেছে, সব কিছুতে দখল দিয়েছে। বৃটিশ শাসকদের এই ভারতপ্রীতি এই প্রেফারেন্স – বার্মিজদের বদলে পুরনো অভ্যস্ততায় ভারতীয়দের অগ্রাধিকার করে ফেলা এটাই জেনোফোবিক বা বিদেশিবিরোধী করে তুলেছিল বার্মিজ এলিটদেরকেও।

অর্থাৎ বার্মিজ মধ্যবিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ভারতীয়রা বার্মায় চাকরি-ব্যবসা করত। এই অসন্তোষ বৃটিশরা টের পেয়ে ব্যবস্থা নিয়েছিল অনেক পরে ১৯৩৭ সালে। এতে  বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয়, বার্মার জন্য আলাদা বৃটিশ শাসক প্রশাসন কায়েক করতে করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই ১৯৩৭ সালে এসে বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয় ঘোষণা করা হয়। বার্মা আলাদা বৃটিশ-বার্মা কলোনি হিসেবে শাসিত হতে শুরু করেছিল।

কিন্তু ততদিনে বিক্ষুব্ধ বার্মা জাপানের তোজোর নাগাল পেয়ে গিয়েছিল। জাপান “ত্রিশজন বিপ্লবী” তরুণকে সবার আগে জাপানে নিয়ে গিয়ে সরাসরি ট্রেনিং দিয়েছিল। Aung San, U Nu এরা ছিল ঐ ত্রিশজনের মূল নেতা। Aung San হল একালে অং সাং সুচির বাবা।  পরে ঐ ত্রিশের তাদের হাতেই একটা পুরা সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এদেরকে সামনে রেখে পেছনে জাপানি আর্মি মিলে একত্রেএরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্যমুক্ত অর্থে স্বাধীন করে ফেলেছিল। পরে নতুন গঠিত সরকারের আজকের সু চির বাবা ওই ৩০ জনের একজন হিসাবে ১৯৪৪ সালে জাপান সমর্থিত বার্মা সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় ঐ বছরই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। মায়ানমারে এখনও ঐ ত্রিশজনকে বিরাট বিপ্লবী জাতীয় বীর মানা হয় যারা জাতীয় গর্বের। যদিও বলা হয় বর্তমানে ঐ ত্রিশজনের মধ্যে মাত্র দুজন জীবিত। যার একজন আবার ব্যাঙ্কক-এ নির্বাসিত জীবনে আছেন। ওদিকে পরবর্তিতে বার্মায় এই ত্রিশজনের-দলের বিরোধী ছিল যারা এদেরকে ১৯৪৪ সালে এক ফ্যাসিবাদবিরোধী জোটে শামিল করে, সম্মীলিতভাবে বৃটিশরা ফিরে বার্মা দখল করেছিল, বিশ্বযুদ্ধ শেষে। পরে অবশ্য ওই ৩০ জনের বেশির ভাগই বার্মার (১৯৪৮ সালে) নতুন ক্ষমতায় আসীন হয়ে যায়।

দুনিয়াতে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তায় জাপানিজদের অবদান রাখার মত কিছু নাই। ওদিকে সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকার সাথে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তার সাথে জানাশুনা পরিচিত থাকার কোন সম্পর্ক নাই।

তাহলে অসুবিধা কী? মানে নেতাজী ভারত মুক্ত করতে পারলে আমাদের কী অসুবিধা হত? অসুবিধা বিরাট।  বৃটিশরা কলোনি মাস্টার, জাপানের মার্শাল তেজোর সাম্রাজ্যও তাই। কিন্তু আরও বিরাট তফাত আছে। তা হল, বৃটিশদের হাত দিয়ে রেনেসাঁ চিন্তাও এসেছিল, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কী তা জানা গেছিল। আর জাপানের মার্শাল তেজোর হাত ধরে এসেছিল রেসিজম আর ফ্যাসিজম-এসবের জয়জয়কারের ধারণা। নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরানা “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরনো “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” শিক্ষা উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

আজ জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী? মার্শাল তেজোর ফ্যাসিজম? না। কারণ মার্শাল তেজো-দের কাছে রাজনীতি শব্দটাই অপরিচিত ছিল। কোন গণক্ষমতা, কোন রিপাবলিক, জনপ্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি সব মিলিয়ে কোন ধরণের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাই তাদের ছিল না। ছিল এক এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য ধারণা আর ছিল নির্মম বর্ণবাদিতা, ফ্যাসিজম -ইত্যাদি এগুলোই একমাত্র সত্য এই ধারণা। আজ জাপানে পার্লামেন্ট, সিনেট নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা ইত্যাদি আছে। যেগুলো সরাসরি কপি করে গড়ে নেয়া হয়েছে। সমাজে এসব নিয়ে কোন পক্ষও নাই এমনকি বিপক্ষও নাই। এজন্য সাথে অবশ্য আছে এরপর থেকে জন্মগতভাবে হতাশ জাপানি নাগরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তাদের কাছে জবাব নেই যে কেন তারা এমন দানব ছিল, কেন তারা সেকালে চীন আর দুই কোরিয়া এই পুরা অঞ্চল জুড়ে  সকলকে তাদের কলোনি বানিয়ে রেখেছিল? কেন কোরিয়ান মেয়েদের যৌন সেবাদাসী বা “গেইসা” বানানো আর নির্মমতার কিছুই করতে তাদের শাসকেরা বাকি রাখেনি! এই লজ্জা থেকে মুখ লুকাতে, জবাবহীনতা থেকে আপাত মুক্তি পেতে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকান মার্শাল প্লানে নতুন  বিনিয়োগ  পেয়ে, মিথ্যা করে নতুন উদ্যম দেখিয়ে জাপানিজরা “কাজপাগল” [workaholic] সাজার সুযোগ নিয়েছিল। নইলে সদলে আত্মহত্যা করার রাস্তাটাই কেবল তাদের জন্য বাকি খোলা ছিল!  রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হতে পারে এনিয়ে এমন রাজনৈতিক চিন্তায় এক কথায় বললে জাপানের অবদান শুণ্য। হয়ত নেগেটিভ। অথচ জাপান তো বৃটিশ এম্পায়ারের মত একই ধরণের কলোনি দখলদার এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য শক্তি।

আর জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত বার্মা? ওর কপালে যুদ্ধের পরে নতুন কিছু শিখবার সেই সুযোগ আর জোটেনি। তাই সেই আপাত সংশোধনও জোটেনি। তাই একালে বার্মা মায়ানমার হলেও এর মানে আসলে পুরনো জাপান। মার্শাল তেজোর জাপান। কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! আর বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে!

কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন হয়ত! অথবা আর নির্মম ও বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে! রেসিজমে বর্ণবাদীদের একটা “অপর” লাগেই, তাতে একটা না একটা ‘অপর’ হলেই চলে!

কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের এক ভগবান নিশ্চয়ই আছেন, বোধ করি! নইলে কার আশীর্বাদে তাঁরা- নেতাজী, এক বার্মিজ জেনারেলের মত- এক নেতাজী, এমনটা দেখার হাত থেকে বেঁচে গেলেন! সত্যিই সে এক বিষ্ময়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ১৬ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নেতাজী সুভাষ কেন বাংলাদেশের কেউ ননএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম’

 

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম

গৌতম দাস

০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2JS

https://www.kolkata24x7.com থেকে নেওয়া

[সার সংক্ষেপেঃ ছুপা হিন্দু জাতীয়তাবাদী গান্ধী-নেহেরুসহ ভারতের ইমেজ হল গান্ধীরা খুবই ভাল মানুষ। আর জিন্নাহ বেটা খুব খারাপ তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানিয়েছে, এতই খারাপ এরা। কিন্তু কঠিন সত্যি হল কংগ্রেস গান্ধী-নেহেরুসহ এরাই নিজেদের হিন্দুইজমের বাইরে কখনই যায় নাই। একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারতই কায়েম করতে কাজ করে গেছে তারা। আর এর সবচেয়ে বড় তাত্বিক নেতা হল গান্ধী। ফলে এদের হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হতে চাওয়াটাই নিরুপায় মুসলমানদেরকে ঠেলে দিয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান কায়েম করতে। কাজেই নিরুপায় হয়ে জিন্নাহ সঠিকভাবেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কায়েম করেছিলেন। বলা যায় মুসলিম লীগ মুসলিম জাতীয়তাবাদের দিকে কেন গিয়েছিল তা গান্ধী-নেহেরুসহ কংগ্রেসের হাতে নির্ধারিত হয়েছিল।
মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করা বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ কথিত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা যারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার দায় জিন্নাহ’র উপর এককভাবে চাপিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চায় তাদেরকে চ্যালেঞ্জ। এরা মনগড়া কথা বলে এই গল্প তৈরি করেছে। নিজেদের দায় আকাম জিন্নাহর উপর চাপিয়েছে।
এই লেখার একটা সারকথা এটা। তবে গান্ধী বনাম আরএসএসের তর্ক লড়াটাই কী ছিল তা জানার মাধ্যমে মূলত আপনাদেরকে চিনতে হবে গান্ধীর হিন্দুইজম-কে।]

 

আসেন ছুপা হিন্দুবাদীগণকে চিনে নেইঃ
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যাকে আমরা গান্ধী নামে চিনি। অনেকে তাকে আদর করে বা তেল দিয়ে তোয়াজ করতে বাপু বা মহাত্মা নামেও ডাকে। গান্ধী, জিন্নাহ, প্যাটেল- এরা সবাই মোদীর মতই গুজরাতি। যদিও সেকালের গুজরাট বলতে এটা বোম্বাই মানে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল। মাত্র গত ১৯৬০ সালে গুজরাত প্রথম বোম্বাই (মহারাষ্ট্র) থেকে রাজ্য হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। গত দুই অক্টোবর ছিল সেই গুজরা্তি গান্ধীর জন্মবার্ষিকী; তাও আবার ১৫০তম। সম্ভবত সে কারণে তাকে নিয়ে স্তুতিমূলক-মূল্যায়নের ছড়াছড়ি একটু বেশি দেখা গিয়েছিল এবার, এটা বলতে পারলে সহজ হত হয়ত। কিন্তু সমস্যা জটিল করে তুলতে সক্ষম হয়েছে, বিজেপি এবং আরএসএস এ দুই প্রতিষ্ঠানই। তাই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ‘১৫০তম’ জন্মবার্ষিকীই এবারের হইচইয়ের আসল কারণ কি না।

এক কথায় বললে, ভারতের জন্মের সময় থেকে কংগ্রেসের তৈরি সব না হলেও অনেক আইকন অথবা বয়ান এত দিন ধরে আরএসএস-বিজেপি এই গোষ্ঠী, এরা ভাগ বসিয়ে হয় নিজেদের আইকন করে নিয়েছে অথবা একে ম্লান বা পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। বিজেপির তেমনই আর এক এবারের উদ্যোগ হল গান্ধীকে নিজেদের আইকন করে নেয়ার চেষ্টা। খোদ আরএসএস প্রধান মোহন ভগত এ দিন দাবি করেছেন, “গাঁধীর আদর্শেই এগোচ্ছি”
তবে বলাই বাহুল্য, আইকন দখলের সময় বিজেপি-আরএসএস এর আগের বয়ান-মূল্যায়নকে নিজেদের মত করে আকার দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে থাকে। যেমন নেহরুর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গান্ধীঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল- এই প্যাটেলকে ইদানীং বিজেপি-আরএসএস একেবারে নিজেদের নেতা আইকন করে নিয়েছে। গুজরাতে পৃথিবীর দীর্ঘতম স্ট্যাচু এখন প্যাটেলের, মোদীর উদ্যোগে এটা বানিয়ে নেয়া হয়েছে। মোদীর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে ২০১৩ সালে, পরিচালনা কমিটি তৈরি, অর্থ সংগ্রহসহ এর কাজ তিনি উদ্বোধন করেছিলেন। প্যাটেলকে তুলে ধরারও কারণ-সূত্র একটাই। ভারত স্বাধীনের বছরের আগস্টের পরবর্তীকালে ৫৫০-এরও বেশি ছোট-বড় করদরাজ্যের রাজাগুলোকে বলপ্রয়োগে পিটিয়ে নতুন ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এই বলপ্রয়োগের প্রশ্নে নেহরুর সাথে প্যাটেল একমতে থাকলেও, প্যাটেল নিজে ও তার মন্ত্রণালয় ও এর কাজকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক আগ্রাসী ও চরমপন্থা অবস্থানে। আর শুধু সে কারণেই এক আগ্রাসী হিন্দুজাতিবাদী হিসেবে প্যাটেলকে পরিচিতির আইকন লাগিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে মোদি-আরএসএস গোষ্ঠী। তাই এবার খোদ গান্ধীকে দখল নিতে এবারে বিজেপি এক কর্মসুচি শুরু করেছে যার নাম, “গাঁধী সঙ্কল্প যাত্রা”। ভেঙে বললে এটা হল, থেমে থেমে আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে গান্ধীর জন্মের ১৫০ বছর পালনে বিজেপির নেয়া ১৫০ কিলোমিটার পদযাত্রার এক কর্মসূচি।

স্বভাবতই কংগ্রেসের গান্ধী, তাদের এত বড় “জাতির পিতা’ আইকন বিজেপি-আরএসএসের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া- এটা কংগ্রেস এখন দুর্বল ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেও আপত্তি তো তাদের তুলতেই হয়। তারা তুলেছেও, আর সাথে কমিউনিস্টরাও বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সঙ্গ দিয়েছে। বিজেপি-আরএসএসের গান্ধী দখলে এবারের বার্ষিকীতে ঝাপিয়ে পড়া নিয়ে খোঁচা মারাও কম হয় নি। যেমন কংগ্রেস নেতা  মল্লিকার্জুন খড়্গে; তিনি বলেন,  ‘‘এত দিন যাঁরা শুধু গডসের নাম নিতেন, ভোট পেতে তাঁরা গাঁধীর নাম নেওয়া শুরু করেছেন”।  গডসে [Nathuram Vinayak Godse] হল গান্ধীকে গুলি করে [৩০ জানুয়ারী ১৯৪৮] হত্যাকারী সেই আততায়ীর নাম। দলের দায় এড়াতে যে হত্যা করার আগে দিয়ে আরএসএস থেকে নিজে পদত্যাগ করে নিয়েছিল। আর একালে এই সেদিনও প্রকাশ্যেই বিজেপি গডসে কে দলের হিরো মেনেছিল।

ঘটনার এ দিকটা নিয়ে আমাদের আর এতে খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু এই ১৫০তম উপলক্ষে আমরা অন্তত তিনজন একাদেমিকের লেখা বা মন্তব্য জানতে পেরেছি। এদের একজন প্রফেসর ও লেখক রামচন্দ্র গুহ [Ramachandra Guha], যাকে গবেষক বা ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করা সিরিয়াস লেখক বলা যায়। কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি বর্ষ-পুরানা চিবিয়ে রাখা জিনিষটাই আবার চিবাতে থাকেন, এমন ভারতীয় একাদেমিক না। তার চিন্তার ফ্রেম পুরানাদের চেয়ে আলাদা। কাজেই খুব বড় করে পরিচয় না বললেও আপাতত অন্তত এতটুকু বলতেই হবে। তিনি কলকাতার ইংরেজি দৈনিক “হিন্দুস্তান টাইমস” এবং “টেলিগ্রাফে” কলাম লিখে থাকেন। সেখানে যেমন লেখা এক কলামের তিনি শিরোনাম দিয়ে দিয়েছেন – “সোনিয়া গান্ধীর কেন ইবনে খালদুন পড়া উচিত”। অবলীলায় ইবনে খালেদুনের নাম নিয়ে কথা বলা একাদেমিক ভারতে খুব কমই আছেন!

তিনি “গান্ধী ও আরএসএস” [Gandhi and the RSS] – এই শিরোনামে এক কলাম লিখেছেন গান্ধীর ‘১৫০তম জন্মবার্ষিকী’র তিন দিন আগে। এটা ছিল গবেষণাধর্মী দেড় হাজারের বেশি অক্ষরের এক সিরিয়াস লেখা, সাথে সুনির্দিষ্ট বইপুস্তকের রেফারেন্স। যার মূল প্রসঙ্গ হল, ঘটনাকাল ১৯৪৭ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর, এই সময়কালে গান্ধীর সাথে আরএসএসের সম্পর্ক কেমন গিয়েছিল, তা রেফারেন্সসহ তুলে আনা। তাঁর লেখায় ঘটনার মূল পাত্রপাত্রী হল একদিকে গান্ধী আর অন্য দিকে আরএসএস প্রধান গোলওয়ালকার [Golwalker] ও তার দল।  সে সময়ে নানান শহরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ঘটছিল আর গান্ধী সেসব শহরে গিয়ে দাঙ্গা থামানোর উপায় হিসেবে অহিংস প্রতিবাদে দাঙ্গা না থামা পর্যন্ত অনশনে বসছিলেন। এছাড়া এর পাশাপাশি আরএসএসও সেসব শহরে গিয়ে মুসলমান ও গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, হুমকি দিয়ে কিভাবে লিপ্ত হত অথবা তাদের মুখপাত্র “অর্গানাইজার” পত্রিকায় উসকানি দিয়ে কী লিখত, এমনকি গান্ধীর সাথে চিঠি চালাচালি বা একবারের মুখোমুখি সাক্ষাতে কিভাবে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার অভিযোগ অস্বীকারের লুকোচুরি খেলে গান্ধীর প্রচেষ্টাগুলো ভণ্ডুল করে গেছিল – গান্ধী রচনাবলী ও আর্কাইভ ঘেঁটে তা তুলে আনা- সেসবের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এই লেখায় পাব। তিনি বলেছেন, আর দুদিন পরে (জন্মবার্ষিকীতে) মোদী ও আরএসএস গান্ধী সম্পর্কে নানান ভাল ভাল কথার ফুলঝুড়ি [nice things will be said] তুলবে। তাই এর আগেই তিনি সেকালে গান্ধী ও আরএসএসের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নিয়ে এই রেকর্ড হাজির করে রাখতে চান।
এই লেখকের লেখা অনুসারে, পলিটিক্যাল লাইনের দিক থেকে গান্ধীর অবস্থান হল, তিনি বহুধর্মীয় জাতীয়তাবাদের (religiously plural nationalism) ধরণের এক ভারত চাইছেন, সেজন্য লড়েছেন। গান্ধীর এই হিন্দুবাদে হিন্দুধর্ম বলতে এটা ‘এক্সক্লুসিভ রিলিজিয়ান’ নয়। মানে একা হিন্দুধর্ম না, অন্য (মুসলমান) ধর্মও সাথে আছে। [Hinduism was not an exclusive religion]। কিন্তু মূলকথা এই বিশেষ হিন্দুবাদের, একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভারত চাইছেন গান্ধী। বিপরীতে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার চাইছেন মুসলমানদের মেরে কেটে হলেও বাধ্য করে পাকিস্তানে পাঠানো। হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই মুসলমানদের হিন্দুস্তানে রাখে” [no power on Earth could keep them in Hindustan”]। তো এসব লেখা বা কথার সারাংশ হল, একজন মুসলমানদের কচুকাটা করে ভাগাতে চাইছেন তো অন্যজন হিন্দু-মুসলমানের কথিত ঐক্যের পুর্বশর্ত ও এর জোয়ার তুলতে চাইছেন। না হলে অনশনে, না খেয়ে রইছেন। আর একারণে কাজের কাজ কিছু হোক আর না হোক অন্তত সহানুভুতি তার পক্ষে যাচ্ছে। এতে গান্ধীর আপাত জিত ও জাতির পিতা হওয়া তো কার পক্ষে ঠেকানো যায় নাই।

কিন্তু আসল কথা হল, তাতে লাভ কী হয়েছে? ভারত কি হিন্দু-মুসলমানের ভারত হয়েছে? পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলেও ভারতে নিয়মিত দাঙ্গা হয়ে চলেছে। এমনকি চলতি শতকের শুরুতেও গুজরাটে বড় দাঙ্গা হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত নাগরিকের রাষ্ট্র হতে পারেনি। হিন্দুর রাষ্ট্র হয়ে থেকেছে। পারস্পরিক ধর্মীয় বিদ্বেষ কিছুই মেটেনি, দীর্ঘ সময় যাওয়াতে যা যতটুকু চাপা পড়েছিল তা প্রবল হচ্ছে আবার। সারকথা গান্ধীর নিজের আমল থেকেই দাঙ্গা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু কেন? এর জবাব গান্ধী কখনো দেননি। অর্থাৎ গান্ধীর হিন্দুইজমের ভারতরাষ্ট্র এটা কখনই সমাধান হতে পারে নাই। আসলে তা হওয়ার কথাও না।

তবে রামচন্দ্র গুহের এই পরিশ্রমী কাজটির পরও এই লেখা থেকে একালে, মোদি-আরএসএস খারাপ আর গান্ধী মহান- এর বেশি কিছুই প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। গান্ধীর হিন্দুইজমের বিপরীতে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ- এর ভারত আরও শক্ত হয়ে হাজির হয়েছে। এককথায় রামচন্দ্র গুহের পরিশ্রমটার মধ্যে কোন প্রতিকার নাই, ইঙ্গিত নাই। আছে খালি গান্ধী মহান! সে তো আমরা সকলেই জানতামই!

আবার আর দুই শিক্ষাবিদ- গৌতম ভদ্র ও দীপেশ চক্রবর্তী, এদের মন্তব্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করেছে আনন্দবাজার, এখানে “গাঁধীর স্বরাজ আর সঙ্ঘের রাষ্ট্র এক নয়” – এই শিরোনামে। এদুইজনের মিলের দিকটা হল তারা নিজেদের সাবঅল্ট্রান [subaltern] ধারার প্রবক্তা ভাবেন বা ভাবতেন, যদিও তারাই এখন বলে থাকেন, এই ধারা এখন সাংগঠনিকভাবে মৃত। এদের একটা বৈশিষ্ট্য বলা যায় যে, তারা হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোলে বসে সেই চোখে দেখার যে অভ্যস্ত যুগ ও ধারা ছিল এর বাইরের এরা। বরং সমাজের যাদের কথা বা স্বর শোনা হয় না, উপেক্ষিত, নিচু আয়ের, নিচু জাতের মনে করে চাপানো হয় ইত্যাদি তাদের উদ্বেগগুলো উঠিয়ে আনা বা তাদের জায়গায় বসে দেখার পক্ষের লোক। কিন্তু মডার্ন রিপাবলিক গড়তে একটা ‘জাতি’ ধারণা বা একটা না একটা “জাতীয়তাবাদ” অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে এরা মনে করেন কি না- এই প্রশ্নে, প্রশ্নটাই তাদের মাথায় এসেছে এমন প্রমাণ দেখা যায় না।
তবে দীপেশের এখনকার অবস্থানটা হল, ঠিক মোদী মানে উদ্র জাতীয়তাবাদীরা নয় তবে সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ যেহেতু ভারত মেনেই নিয়েছে তাহলে একইভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে জায়গা করে দিতে অসুবিধা কী। প্রথম আলো বা তাদেরই প্রতিচিন্তায় তাঁর কিছু লেখা দেখে এমন মনে হয়েছে। কিন্তু মূল কথা যেটা, কেন ধর্মীয়সহ যেকোন জাতীয়তাবাদ একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয় পুর্বশর্ত মনে করা হয়েছে? এটা ভিত্তিহীন নয় কেন, সে প্রশ্ন এদের অবস্থান দেখা যায় নাই।

এদিকে আনন্দবাজার দীপেশের একটা বড় উদ্ধৃতি এনেছে সেটা হল এরকম, “হেডগেওয়ার ১৯৩৪ সালেই বলে দিয়েছিলেন, রাজনীতি বিষয়ে সঙ্ঘ উদাসীন। অন্য দলের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সে খাদির সমর্থক এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের বিরোধী নয়। তখনকার কংগ্রেস আর সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেস যেমন এক নয়, হেডগেওয়ারের সঙ্ঘ আর আজকের সঙ্ঘও এক নয়”। এই কথাটাকে স্পষ্ট বুঝবার জন্য এখানে ফুটনোট দিয়ে রাখছি। তা হল, আরএসএস –এর পুরা নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংক্ষেপে একে সঙ্ঘ বলে ডাকে অনেকে। এই সঙ্ঘ ১৯২৫ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হেডগেওয়ার (কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার)। আর পরবর্তিতে ৪৭ সালের দিকে আরএসএস-এর প্রধান ছিলেন,  গোলওয়ালকার (মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার); যার নাম এই লেখার প্রথম দিকে নেয়া হয়েছে।

বিপরীতে গৌতম ভদ্র – তার বিজেপি-আরএসএস সমালোচনা অনেক সরাসরি। তার দুটি উদ্ধৃত বক্তব্য ঐ রিপোর্টে এসেছে। যেমন- ভদ্র আরএসএস প্রধানের সমালোচনা করে বলছেন – ‘ভারত আধ্যাত্মিক দেশ। আধ্যাত্মিক পথেই এর উত্থান হবে বলে চেয়েছিলেন গাঁধী” – মোহনের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। বরং আসল বক্তব্য ও ব্যাখ্যা হল, “গাঁধী কখনই আধ্যাত্মিক দেশ বলেননি। তিনি ধর্মের কথা বলেছেন, রামরাজ্যের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই রাম অযোধ্যায় থাকেন না, অস্তিত্বের ভেতরে তার স্বর অনুভব করা যায়। ইনার ভয়েস!”।
আর ভদ্রের দ্বিতীয় উদ্ধৃতি, গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে প্রবন্ধের অর্থ, এখনকার আরএসএস প্রধান মোহন ভগত যেভাবে করেছেন, এর সমালোচনা সংক্রান্ত। মোহন বলেছেন, “পরাধীনতার ফলে তৈরি গোলামি মানসিকতা যে কী ক্ষতি করতে পারে, গাঁধী বুঝতেন। স্বদেশী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তাই এক ছাত্রের চরিত্র এসেছিল। তৎকালীন রাজনীতিবিদেরা দেশের পূর্ব গৌরব ভুলে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ চালিয়ে যেতেন। তার প্রভাব আজও দেখা যাচ্ছে”। শেষে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন, ‘গাঁধীর পথ ধরেই ভারত আবার বিশ্বগুরু হয়ে উঠবে”।
আনন্দবাজার বলছে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে, দুই ইতিহাসবিদই আপত্তি করে তাদের মতে বলছেন, “হিন্দ স্বরাজ নিছক স্বদেশীর কথা বলে না। সে আধুনিকতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর নৈরাজ্যবাদের কথা বলে। সঙ্ঘের রাষ্ট্রবাদের সাথে তার সম্পর্ক নেই”। ‘আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের অসভ্য করে’- ঐ বইয়ে লিখেছিলেন গাঁধী। ‘হিন্দ স্বরাজ’ আর ‘হাউডি মোদি’ মেলে না কিছুতেই! তবে দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, গান্ধীর কাজকে তিনি বলছেন, একে “জেহাদি অহিংসা বলতে পারেন”। গৌতম ভদ্রও এতে একমত। মোটা দাগে তাঁদের সারকথা হল, মোদি ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি নয়। যদিও সেটা তো বলাই বাহুল্য।

আসলে এখান থেকে দু’টি প্রশ্ন উঠে, যা নিয়ে উপরের রামচন্দ্রসহ তিন শিক্ষাবিদের কেউই তোলেননি। তার প্রথমটি হল, যদি মোদী ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি না-ই হয়, তবু মোদী ও আরএসএস গান্ধীকে নিজেদের করে নেয়ার সুযোগ নিতে বা দাবি করতে পারছেন কেন? এই যে দুইটা পক্ষ এদের উভয়ের চিন্তার মিল বা মৌলিক দিকটি কী ছিল?
কংগ্রেস ও আরএসএস ভিন্ন রাজনৈতিক দল অবশ্যই। তবুও তাদের রাজনীতিতে মিলের দিকটি হল – হিন্দু জাতীয়তাবাদ। উভয়েই হিন্দু জাতীয়তাবাদী। আর ফারাক হল, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে দুই দল দু’ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। আরএসএস বলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ- এটাই হিন্দুত্ব। হিন্দু জাতি খাঁটি, পিওর; খাঁটি আর্য রক্তের ধারা হিন্দুরা। এটাই আবার হিটলারের ভাষায় জর্মানিরা পিওর আরিয়ান রেস (খাঁটি আর্য রক্তের)। অর্থাৎ এরা তাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে এই একই জায়গাকে কেন্দ্র করে। এ কারণে হিটলার ও আরএসএসের রেসিজম বা বর্ণবাদিতা, জাত-শ্রেষ্ঠত্ব একই ধরনের।
বিপরীতে গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় তাঁর দাবি হিন্দু বা হিন্দুইজম শব্দ – এটা কেবল একটা হিন্দুধর্ম নয়, অন্য (মুসলমান) ধর্মও। এ নিয়ে তার ব্যাখ্যার পক্ষে বিস্তর কোশেশ আছে। যেমন দাঙ্গার মুখে প্রতিকার হিসেবে তিনি হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলাতে চান আবার, মুসলমানকে জয় শ্রীরাম ধরনের কিছু। এ কারণে গান্ধীর হিন্দুইজমের পূর্বশর্ত হচ্ছে, কথিত এক ফ্যান্টাসির “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য”। এ প্রসঙ্গে গান্ধী নিজ দলীয় কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশ করে বলা ১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বরের এক ভাষণ থেকে রামচন্দ্র গুহের গবেষণায় উদ্ধৃতিটা দেয়া হল এখানেঃ “be true to the basic character of the Congress and make Hindus and Muslims one, for which ideal the Congress has worked for more than sixty years”.

কিন্তু বাস্তবতা হল, গান্ধীর নির্দেশ নিজের দল কতটা মেনেছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ তো বটেই। এ ছাড়া, এমনকি তা পুরোপুরি মেনে চললেও ফলাফল শূন্যই হয়েছিল। তখন ও এখনকার বাস্তবতাই এর প্রমাণ। তাহলে মূল সমস্যা কোথায়? গান্ধীর “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য” কথার আসল মানেই বা কী? এর সোজা অর্থ পরস্পরের ধর্মের পক্ষে জয়গানের স্লোগান দিতে হবে, এটাই বলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য।

কিন্তু তাতে এ থেকেই আবার, হিন্দুদেরকে কেন আল্লাহু আকবর বলতে বলছেন গান্ধী- এই অভিযোগ তুলে আরএসএস তাদের মুখপাত্র অর্গানাইজার পত্রিকায় গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করে তাদের ধুয়ে দিয়েছিল। আসলে এতে উল্টো আরএসএসের পক্ষে দাঙ্গা বাধানোই সহজ হয়ে গেছিল।

এখানে মূল কথা হল, গান্ধীর এই ঐক্যের প্রস্তাবই ছিল অলীক ও অবাস্তব, বাস্তবায়ন অযোগ্য। ধর্ম মানুষের যার যার কোর বিশ্বাসের প্রশ্ন। এখানে চাইলেই এক ধর্মের লোক আর এক ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বলে ধ্বনি দিতে পারে না। এমনকি কোনো মুসলমানের অন্য ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বা মূল শ্লোক বা কালাম উচ্চারণ করার পরে সে আর মুসলমান থাকে কি না সে প্রশ্ন তো উঠবেই! আবার এটা হিন্দুর দিক থেকেও একই ভাইসভারসা। অথচ গান্ধীর প্রস্তাব ও ব্যাখ্যা দাবি করছে একটা ভারত রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এসব অস্বস্তিকর নিজ নিজ ধর্মবিরোধী অবস্থানে নাকি যেতেই হবে। হিন্দু-মুসলমানের তথাকথিত ঐক্য- এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব নাকি এতই।

এক কথায় বললে গান্ধীর কথিত ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ প্রকল্প- এর ধারণাই বাস্তবায়ন অযোগ্য। ফলে তা অবাস্তব হয়ে থেকে গেছে। আর গান্ধী খুন হয়ে মরে যেন বেঁচে গেছেন।

কিন্তু কেন একটা ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ, বিশেষ করে তা কেন ‘হিন্দুইজমের’ হতেই হবে ? এ ছাড়া একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদই কেন দরকার? একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে চাইলে কেন এটা অনিবার্য?

লক্ষণীয় যে, ওপরের তিন ভারতীয়  একাডেমিকের কেউ এসব প্রশ্নগুলোর দিকে যাননি বা যেতে চাননি। কোনো রাষ্ট্র গড়তে চাইলে একটা জাতীয়তাবাদ, তাও আবার একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ- এটাকে কেন এসেনশিয়াল বা অনিবার্য প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। জাতীয়তাবাদ যার গোড়াটা আছে কথিত এক ‘জাতি’ ধারণায়। বাংলায় জাতি বললেও এটা দু’টি আলাদা ধারণা ইংরেজিতে রেস ও এথনিক- এ দুই শব্দের অর্থ বাংলায় একটাই- ‘জাতি’ করা হয়ে থাকে।

লক্ষণীয় যে, ইংরেজিতে এই দু’টি শব্দই অরাজনৈতিক পরিচয়-প্রকাশমূলক শব্দ। যেমন বাঙালি রেসের লোক আর আমার খাদ্যাভ্যাস বা ধর্ম-সংস্কৃতি কী হবে এই এথনিক পরিচয় আমার জন্মের আগে থেকেই নির্ধারিত। এই পরিচয়গুলো আমরা যে কেউ বেছে নিয়ে দুনিয়ায় আসি না বলেই, এগুলো অরাজনৈতিক। এর দায় আমার নয়। এর সাথে আমি কেমন রাষ্ট্র গড়বে এর সম্পর্ক কী? এমন কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই রাষ্ট্র গড়তে চাইলে নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে সংশয় তৈরি করার প্রয়োজন কী?

নিশ্চয় নেহরু-গান্ধীরা কোনো বোকা অবুঝ মানুষ নন! কিন্তু তবু সেই রামমোহনের আমল থেকেই আমরা যেন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ অনিবার্য প্রয়োজনীয়, এমন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তালাশে থাকতে দেখতে পাই আমরা। কেন?

মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের তাবৎ কামনা, বোঝাবুঝি আগ্রহ ইত্যাদি সব কিছুর উৎস হল ব্রিটিশ কলোনি মাস্টারের রাষ্ট্র। রামমোহন থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই বিশ্বাস করতেন [তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় থাকা একমাত্র রাষ্ট্র] যে ব্রিটিশ রাষ্ট্র তারা দেখছে এর নাগরিকদের এক থাকার পেছনে তাদের একই ধর্মীয় পরিচয় ( এংলিকান ক্যাথলিক, Anglican Catholic)- এটাই তাদের কথিত ঐক্য বা এক হয়ে থাকার ভিত্তি হয়ে আছে। কাজেই ভারতেরও একটা রাষ্ট্র হতে গেলে তাদেরও একটা ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে একটা একক ধর্ম থাকতেই হবে। এই ছিল তাদের প্রবল অনুমান। কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভুল ও ভিত্তিহীন। বৃটিশ রাষ্ট্রের ভিত্তি মানে তা এক হয়ে আছে কোন Anglican Catholicism র কারণে নয়।   যদিও আবার এরা সবাই দেখেছিল ভারতে সেটা বাস্তবতা নয়। কারণ অবিভক্ত ভারতে সবার ধর্ম এক হিন্দুত্ব মানে এক হিন্দুধর্ম তা ছিল না। তাই সেখান থেকে রামমোহন বলে গেছিলেন অবিভক্ত ভারতের সবার জন্য একটা ব্রাহ্ম ধর্ম তৈরি করতে, যদিও সেটাও  অলীক ও অপ্রয়োজনীয় বলে ব্যর্থ হয়েছিল। সম্ভবত সেকারণে গান্ধীর পথটা রামমোহন থেকে আলাদা হয়েছিল। যেটা আবার পরবর্তি উদ্যোগ হিসাবে বঙ্কিম চন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) -এর হিন্দুত্বের কাছাকাছিই, ইসলামবিদ্বেষী ছুপা অথবা উদাম।

এককথায়, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে ঐ সমাজে পিছনে একটা একক ধর্মের মিল বা ঐক্য থাকতেই হয়, এই অনুমান মিথ্যা, ভিত্তিহীন। সম্পুর্ণত এক ভুল ধারণা। বরং রাষ্ট্রে নাগরিক এক হয়ে থাকে – নাগরিক ঐক্য থাকে – মূলত বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার বা নাগরিক নির্বিশেষে “সাম্য” কায়েম রাখতে পারলে। এটাকেই অনেকে ক্লাসিক অর্থে সেকুলারিজম (ইসলামবিদ্বেষী সেকুলারিজম নয়) বলেও বুঝে থাকে।

পরবর্তীকালে সেই একই কারণে গান্ধী নতুন ব্যাখ্যা দিলেন যে ভারতের হিন্দুইজম মানে এটা একটা ধর্ম না, বহু। এক রিলিজিয়াস প্লুরালিটি। একে হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্ম বলে, বহু বলে বুঝতে হবে দাবি করতেন। গান্ধীর হিন্দুইজম বলতে তাই ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য’ কথাটা এভাবে বুঝতে হবে। গান্ধীর এই অবাস্তব সোনার পাথরের বাটি ধারণার উৎস এখানে। অথচ হিন্দু ও মুসলমান শুধু নয়, বরং যেকোনো দুই মানুষ এক বোধ, একটা ঐক্যবোধ করতে পারে খুবই সহজে এভাবে যে,  পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রে সব নাগরিক সমান, তাদের নাগরিক অধিকার সমান- এই ভিত্তিতে যদি একটা রাষ্ট্র গড়া যায়। মানুষের এথনিক, রেসিয়াল, নারী-পুরুষ, ভাষা বা ধর্মীয়সহ যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে এক অধিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কায়েম ছিল এর আসল সমাধান। অথচ খুব সম্ভবত হিন্দু বা হিন্দু সভ্যতা এসব কোনো ধারণার আড়ালে গান্ধীসহ সবার মনেই একটা হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব একটা হেজিমনি কায়েমের, এর ধারণা কাজ করত। তাই কোন হিন্দুইজম ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা তারা করতে চান নাই, বা পারেন নাই। অথচ এক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে হিন্দু-মুসলমানকে এক হয়ে যেতে হবে কেন? এছাড়া এই – হিন্দু-মুসলমান এক করে ফেলা – এই প্রকল্পটাই তো অলীক অবাস্তব; এক সোনার পাথরের বাটি!

ফলে বাস্তবত এক দিকে গান্ধীর দেয়া অলীক অবাস্তব প্রস্তাবের কারণে হিন্দু-মুসলমান এরা এক পরস্পর বিরোধাত্মক পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছিল এবং যেটা এখনো আছে। আবার তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য থাকতে হবে বলে পরস্পর একে অপরের ধর্মের পক্ষে চিল্লা দিতে হবে বলে দাবি করছেন, নইলে তিনি অনশনে যাবেন। আর অন্যদিকে আরএসএস গান্ধীর এই অবস্থানকেই যে [হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলতে হবে], গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে আরএসএসের পক্ষে আনার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার ও দাঙ্গায় প্ররোচিত করে গেছে।

সারকথায়, গান্ধী নিজেই দাঙ্গার কারণ, আবার দাঙ্গা উঠে এলে তিনি অনশনে বসে গেছেন! আর এই গান্ধীকেও মোদী ও আরএসএস এখন নিজেদের করে নিতে চাচ্ছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৫ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে গান্ধীর স্ববিরোধী ‘হিন্দুইজম“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

গৌতম দাস

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2IQ

 

Om Birla during Hindu Mahasabha event (Facebook/om birla) by NEWS18, India

ভারতের আরএসএস বা বিজেপির অঙ্গসংগঠন অনেক। এগুলোর একটা হল, “অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভা”। শুধু ব্রাহ্মণদের নিয়ে সংগঠন এমন আরো আছে – ‘অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ একতা পরিষদ, সর্বব্রাহ্মণ মহাসভা, পরশুরাম সর্বকল্যাণ, ব্রাহ্মণ মহাসভা’ ইত্যাদি। অবশ্য বুঝাই যায় হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিচরণ ধর্মকে পেশা হিসেবে নেয়া অসংখ্য ব্যক্তি বা তাদের দলের মধ্যেই হবে।

গত নির্বাচনের (মে ২০১৯) পরে, ভারতের লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছিল রাজস্থানের এক এমপি, ওম বিড়লাকে। তার পরিচিতি পড়ে তিনি কোনো বড় কেউকেটা কেউ নন মনে হচ্ছে। এমনকি তিনি আইনের ছাত্রও নন। সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পিকাররা আইন পেশার ব্যক্তিত্ব হন। বিড়লা আগে ছিলেন রাজস্থানের প্রাদেশিক সংসদের (ভারতের ভাষায় বিধান সভা বা Assembly) তিনবারের এমএলএ। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বিজেপির যুব সংগঠন – ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার সাবেক রাজ্য সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্থান রাজ্যের কোটা শহরে অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভার এক সভায় যোগ দিয়েছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। কোটা স্পিকারের নিজের নির্বাচনী কনস্টিটুয়েন্সিও। তবে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের শুরু ওই সভায় তার বক্তৃতা থেকে।

তিনি সেখানে ঠিক কী বলেছেন এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বলাটা ঠিক হয়েছিল কিনা, এটাই বিতর্কের বিষয়। কারণ আসলে অনুষ্ঠানস্থল ছিল – রাজস্থান রাজ্যের রাজধানীও নয়, তৃতীয় বড় শহর এই কোটা, যেটা আসলে এক জেলা শহর মাত্র। তাই, ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে সেখানে ভারতের প্রধান পত্রিকাগুলোর সাংবাদিক অনুমান করা যায়, খুব কমই উপস্থিত ছিলেন। তবে সব পত্রিকাতেই ঘটনার নিউজ হয়েছে ছোট, কিন্তু অথেনটিক। কারণ স্পিকার নিজেই এক টুইট করেছেন বা ফেসবুকে ছবি দেয়েছেন ওই সভা প্রসঙ্গে। সেটাই সবার খবরের উৎস। তবে মাত্র তিনটা বাক্যের এক টুইট, তা আবার হিন্দিতে লেখা। অথেনটিক তিনটা বাক্যই সব বিতর্কের উৎস।

স্পিকার বিড়লা তার টুইটারে অনুষ্ঠানের কয়েকটা ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, “সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। যে স্থান তাদের ত্যাগ ও তপস্যার ফল। এ কারণেই সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময় পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন”।

“Brahmins have always had a high status in society. This status is a result of their sacrifice and dedication. This is the reason that Brahmins have always been the guiding light for society,” – নিউজ১৮, এটা একটা টিভির ওয়েব পেজ, থেকে নেওয়া।

কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্ট পড়লে মনে হয়, পত্রিকাটি যেন সবসময় ক্লাস টুয়ের বাচ্চাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ও শেখানোর লক্ষ্যে লিখছে। তবে বলাই বাহুল্য, তারা আবার ঝোপ বুঝে চলে। এবার মনে হচ্ছে কোপ দেয়ার সুযোগ দেখেছে, তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের প্রথম বাক্য, “ব্রাহ্মণেরা সমাজে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য করে বিতর্ক বাধালেন স্পিকার ওম বিড়লা”। আর ও প্রকাশের হিন্দি বক্তব্যের আনন্দবাজারের করা বাংলাটা হল, ‘‘ত্যাগ ও তপস্যার কারণে ব্রাহ্মণেরা বরাবরই সমাজে উচ্চ স্থানে আসীন। তাঁরা সমাজে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন।’’

কিন্তু কথা হচ্ছে এটাই কি ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ভারতীয় হিন্দু সমাজের প্রধান ও সত্য বয়ান নয়!  তাই এমন কথা কী ওম বিড়লাই  প্রথম! ব্রাহ্মণের জাতভেদের বয়ানের ওপর দাঁড়িয়েই কি তাদের সমাজ বিভক্ত নয়? এছাড়া  একালে বিজেপির উসকানি-প্রটেকশনে পুরানা দিন ফিরিয়ে এনে একে ব্রাহ্মণ্য বলশালী কর্তৃত্বের বয়ান হিসেবে সমাজে তা ফেরত আনার চেষ্টা কী চলছে না? দোষ একা যেন কেবল স্পিকারের – আনন্দবাজারের এমন ভান করার দরকার কী?

এই তো গত মার্চ মাসে (২০১৯) ভারতের প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক গিয়েছিলেন উড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির দর্শনে। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ, ব্রাহ্মণমতে একজন দলিত বা নীচু জাতের মানুষ। তাই তার মন্দিরে “প্রবেশ নিষেধ”। এই যুক্তিতে ঐ মন্দিরের ভক্ত ও সেবায়েত- তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের পথরোধ করে বাধা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, এটা “শকিং, চরম বিব্রতকর ও বেয়াদবি আচরণ”। [In a shocking and an extremely embarrassing incident …‘misbehaved with’ ]  আরো লিখেছিল, মন্দির পরিচালনা প্রশাসনের মিটিংয়ে আলাপ হয়েছে, এমন রেকর্ড মোতাবেক কথিত সেবায়েতরা প্রেসিডেন্ট পত্নিকে তাঁর চলার পথের সামনে বাধা দিয়ে তাকে ‘ধাক্কা মেরেছেন” [The group had also shoved the First Lady, as per the minutes of a meeting occurred……… ]। অথচ এনিয়ে কোনো আইনি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোথায় হয়নি। এটাই কি বাস্তবের ভারতীয় হিন্দু সমাজ নয়?

আসলে মন্দিরের দেবতা-রক্ষকদের দাবি মতে, ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে উল্টা, যেন দেবতা নন, দলিতেরা এতই ‘পাওয়ার ফুল’ যে তাঁরা কোনো মন্দির কেন, এমনকি খোদ দেবতাকে ছুঁয়ে দিলে অচ্ছুতেরাই সব কিছুকেই অপবিত্র করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতীয় হিন্দু সমাজের জাত-বিভক্তির উঁচা-নিচা সত্যি খুবই ‘আধুনিক’!

ভারতের স্পিকার ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে যতগুলো অভিযোগ উঠেছে, এসবের মূল কথাটা হল, এটা “জাতবাদ” বা “জাতের শ্রেষ্ঠত্ববাদ”; মানে এটা বর্ণবাদের [racism] মতই আর এক নস্টামি। যেমন, কংগ্রেসের এক প্রাক্তন এমপি, দিল্লির উচ্চ আদালতের নামকরা উকিল কপিল সিবাল বলেছেন, এটা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধযুক্ত মনের, এক মন্তব্য” [senior Congress leader Kapil Sibal said that his mindset reeks of casteism]। তিনি আরও বলেন, “It is this mindset that caters to a caste-ridden unequal India. We respect you Birlaji not because you are a Brahmin but because you are our Speaker in Lok Sabha,” tweeted Kapil Sibal.]। “বিড়লাজি, আমরা আপনাকে সম্মান করি কারণ আপনি স্পিকার, কিন্তু আপনি ব্রাহ্মণ বলে না”।

কথাটা সঠিক। কিন্তু সমস্যাটা হল, কেউ যখন কটু বা পঁচা গন্ধের কোন কিছু নিয়ে সারাক্ষণ সারাদিন নাড়াচাড়া করতে থাকে তাতে একসময় তার শরীর ওই খারাপ গন্ধ-প্রুফ হয়ে যায়। খারাপ গন্ধটা এতই গা-সওয়া হয়ে যায় যে, তার কাছে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি কেউ তাকে মনে করিয়ে দিলেও সে এটা বিশ্বাস করতে বা মানতে চায় না। বিজেপি-আরএসএসের অবস্থাটা হয়েছে তাই। তারা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধপ্রুফ” বা গা-সওয়া হয়ে গেছেন।

হিন্দু-ধর্ম চর্চাকারী সমাজের প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য জাত-ভেদ [caste system]। সমাজের সব মানুষকেই উচা-নিঁচার বিভিন্ন স্তরে এখানে ভাগ করা হয়ে থাকে। তাই হিন্দু ধর্ম মানেই এই জাত-ভেদ প্রথা তার প্রধান অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য। যদিও মানুষের আধুনিক জীবন যাপনের বা শহরায়নের সাথে সাথে জাত-ভেদ ধারণা ও এর চর্চার প্রাবল্য কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই বিজেপির আমলে এটা এখন আবার উল্টামুখী। জাত-ভেদ ব্যবস্থাটাকে অনেক ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ [Brahminism] বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এই সিস্টেমে এর ভিত্তি বা চিন্তাটা হল, ব্রাহ্মণকে শীর্ষে রেখে এটা সমাজের বাকি সব মানুষকে অধস্তন বানায়। এভাবে একটা জাত-ভেদের ব্যবস্থামূলক ধর্ম হয়ে তা নিজেকে হাজির করে থাকে। এই “অধস্তনতার বয়ান” বাস্তবে সক্রিয় ও সত্যি হয়ে যায় এজন্য যে, ওখানে দাবি করা হয়, যাগ-যজ্ঞ-পূজার একমাত্র অধিকারি ব্রাহ্মণের। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ, সবার উপরে।

অনেক হিন্দু ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ শব্দ ও এর অর্থটা না বুঝে ভুল আচরণ, প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন। তাই না বুঝে মনে করে বসে যে কেউ ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ লিখেছে সুতরাং এটা নিশ্চয় হিন্দুদেরকে গালি দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা একেবারেই এমন না। যেমন ইতিহাসবিদ বা প্রাক্তন সাব-অল্টার্ন গ্রুপের সদস্য গৌতম ভদ্র, তিনিও ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তিনি মনে করেন ও  লিখেছেন, বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক”। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দটা কোন গালি নয়, একটা বিশেষ ধরণের চিন্তা ও সেই আদর্শ ও বৈশিষ্ঠকে চিনানোর একটা শব্দ বা নাম এটা।

থিওলজিক্যাল স্কলারদের মধ্যেও, সেই প্রাচীন কালে এমন জাতভেদমূলক-ব্যবস্থা কেন করা হয়েছিল এর এক ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, সেকালের জনগোষ্ঠির পক্ষে সন্তান জন্মদান বা প্রজন্ম টিকানো কঠিন ছিল বলে এটা চালু হয়েছিল। কিন্তু তাতে এটা ন্যায্য-সাফাই হোক আর না হোক, একালে সমাজের হিসেবে এই জাত-ভেদ প্রথা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মূল কারণ এটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের আমল। এখানে নাগরিক অধিকারে অসাম্য, বা মানুষ সকল সমান না এমন বক্তব্যের পক্ষে সাড়া পাওয়া কঠিন। সেটা যাই হোক, এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, কালক্রমে সমাজের এই জাতিভেদ  ব্যবস্থাটাই হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে – একজনের ঘাড়ে চড়ে অন্যদের বা কথিত উঁচু জাতের দাবিদারদের আয়েশি জীবন যাপনের ব্যবস্থার উৎস।

আর যারা একবার জাতের স্তরভেদের সুবিধা লুটেছে তারা আর তা ছাড়তে চাইবে কেন! চাওয়ার কারণ নেই। শুধু তাই না, সমাজের কাছে জাতভেদ প্রথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওই উঁচু জাতের দাবিদারেরাই নিজের অন্যায় সুবিধা অপরিবর্তনীয়, এটা স্থায়ী এমন এক ধারণা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে এখনো। অর্থাৎ ধর্মের নামে জাত-ভেদের ওপর আস্থা বিশ্বাসটা একালে শিথিল বা বাস্তবে তত প্রবল নয় এমন হয়ে পড়লেও, বাড়তি সুবিধা ভোগের লোভে কথিত উচ্চবর্ণরা সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর স্তরে জাত-ভেদের বয়ান বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তা আঁকড়ে সেখান থেকে দাপটের সাথে সব সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। বরং এখানে তাদের মূল অজুহাত হল – তোমরা জাতভেদ মানো না, এর মানে তোমরা ধর্ম মান না। এই যুক্তি তুলে ভয় দেখিয়ে সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে স্তরে জাত-ভেদ কে ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

তবে, এখানে আমাদের একটু সাবধান হতে পরামর্শ রাখব। ব্যাপারটা হল,  সবার কাছেই সবার ধর্মই সবচেয়ে ভাল, এমন মনে করা এটাই স্বাভাবিক। আবার, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করা ঠিক না। তর্ক চলে না সেখানে। তাই এখানে সমাজের আমরা পরস্পরকে একটু স্পেস বা জায়গা করে দিতে হবে। যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অছিলায় কোনো ঘৃণা ছড়ানোর কাজে আমরা যেন নেমে না যাই সেদিকটা খেয়াল রাখাই কাম্য। আর “ব্রাহ্মণরা বদ লোক তাদের উদ্দেশ্য খারাপ” – পাঠককে এমন কোনো ধারণা দেয়া অনুচিত। ফলে সেটা বলা এখানে কোন উদ্দেশ্য নয়। এমন অনুমান সেটা ঠিক হবে না শুধু তাই নয়, বরং অতি সরলীকরণ দোষ হবে।

তাহলে মূল কথাটা কী? সেটা হল, আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে জাত-ভেদ প্রথার চিন্তাকে দুয়ারের বাইরে জুতার মত খুলে রেখে আসতে হবে। অথবা এটা রাষ্ট্রের সাথে সঙ্ঘাতের নয় এমন ব্যাখ্যা বয়ানে, এমন নন-কনফ্রন্টেশনাল ভাবে হাজির করতে হবে।

কারণ জাতভেদ প্রথার সারকথাটা হল, মানুষ সকলে এখানে সমান নয়, সমান হিসেবে গণ্য নয়, মানুষে-মানুষে জাত বলে ভেদাভেদ আছে। অথচ একটা মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ওর কনস্টিটিউশন, গঠন ও মৌলিক ভিত্তি ইত্যাদির বিচারে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রেই সবাই সমান। কোনো অসাম্য সেখানে নেই, রাষ্ট্র তা অনুমোদন করে না। সবাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান, বৈষম্যহীনভাবে আচরণ পাওয়ার যোগ্য, সব সুবিধা সমান পাওয়ার যোগ্য – তাতে নাগরিক মানুষের ধর্ম-বর্ণ-জাত ইত্যাদি যা হোক না কেন।  এবং রাষ্ট্র নাগরিককে বৈষম্য থেকে প্রটেক্ট করতে বাধ্য। কাজেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার আছে, এমন সব বিষয়ে জাতভেদ প্রথার ধর্মীয়-সামাজিক বয়ান নন-কনফ্রন্টেশনাল হয়ে জায়গা ছেড়ে রাখবে।

কিন্তু বাস্তবে ভারত হল এমন – যেখানে পত্নীসহ খোদ প্রেসিডেন্টকেই চরম বৈষম্যের শিকার করা হয়েছে। এক এমএলএ আরেক সহ-এমএলএকে প্রকাশ্যেই ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। অথচ সমাজ নির্বিকার, কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কেউ কেউ এখন বলার চেষ্টা করছেন স্পিকার পদটা নিরপেক্ষ, তাই তার পদত্যাগ করা উচিত। আনন্দবাজার লিখেছে, “নিরপেক্ষতার শপথ নিয়ে যিনি সাংবিধানিক পদে বসেছেন, তিনি কিভাবে একটি বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে সওয়াল করতে পারেন,তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবিলম্বে ওমকে স্পিকারের পদ থেকে সরানোর দাবিও উঠেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা- সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির সুরে কথা বললে এখন সাত খুন মাফ হয়ে যায়। ওমও ছাড় পেয়ে যেতে পারেন। কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের কাছে তাদের আদর্শই শেষ। সংবিধান মূল্যহীন”।

খেয়াল রাখতে হবে যে, ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব সঠিক কি না এটা নিয়ে রাষ্ট্রের বলবার কিছু নেই। কারণ কোন ধর্ম কেমন হবে বা হতে হবে তা নিয়ে কথা বলা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ ছাড়া কোন ধর্মের সংস্কার করা আদৌও দরকার তা, দেখাও রাষ্ট্রের কাজ না।  রাষ্ট্র কেবল বৈষম্যহীন এক নাগরিক সমাজ বজায় রাখা আর মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া ছাড়াই আপসহীন থাকবে। কারণ এটা মৌলিক বিষয়।

ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রায় সব মিডিয়া এখানেই শেষ হয়ে গেছে।  কিন্তু আরও এগিয়ে আনন্দবাজার কিছু একাদেমিকের মন্তব্য এখানে যোগ করেছে। আনন্দবাজার লিখেছে ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র বলেছেন, “বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে ব্রাহ্মণদের মতো অত্যাচারী আর কেউ নেই। ধর্মপদে বলা হয়েছে, মন্ত্র দিয়ে ব্রাহ্মণ হয় না। গুণ থাকতে হয়। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ জাতিভেদ প্রথাকে তুলে ধরে। বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক। ব্রাহ্মণের মূল ক্ষমতা ছিল যজ্ঞের অধিকার। তাই বুদ্ধদেব যজ্ঞের বিরোধী ছিলেন। যজ্ঞের বিরোধিতার মাধ্যমেই সমাজে ব্রাহ্মণদের কার্যত অর্থহীন করে দেয়া হয়েছিল”।  এছাড়া আরো এক সমাজতত্ত্ববিদ অভিজিৎ মিত্রের সাথে কথা বলেছে। মিত্র বলেছেন, “যে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারেন। যিনি গুণের অধিকারী এবং যে গুণ মঙ্গলময় তিনিই ব্রাহ্মণ। তিনি যে কোনও শ্রেণীর প্রতিনিধি হতে পারেন। জ্ঞানের দিক থেকে একটি উচ্চতায় পৌঁছলে সেই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ধরা হতো। সেটাই ছিল ধারণা”। আনন্দবাজার বলছে,  “অভিজিৎ বাবুর বক্তব্য, ‘বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ব্রাহ্মণেরা ব্যর্থ হয়েছেন”।
“ফারাক আছে ব্রাহ্মণে-ব্রাহ্মণেও। যিনি অপরের কাছ থেকে বেশি দান গ্রহণ করেন, তাদের ব্রাহ্মণেরাই নীচু চোখে দেখেন।’ ব্রাহ্মণ হওয়ার অধিকার একটি বর্ণের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করেন অভিজিৎ বাবু”।

কিন্তু আমাদের বক্তব্য এমন হওয়া ঠিক হবে না। কারণ, উপরের দুটা বক্তব্যই মূলত ধর্ম-সংস্কারমূলক। এগুলো একটাও রাজনীতি বা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা নয়। বক্তা একাদেমিক দুজনই ধর্ম সংস্কারের আলাপ করেছেন, তাঁরা আলাপ করেছেন ব্রাহ্মণের তাতপর্য, তাদের কী হওয়া উচিত, না উচিত ইত্যাদি এসব নিয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-রাজনীতির আলাপ করেননি তারা। কিন্তু রাষ্ট্র তো সব ধর্মের নাগরিক সবার। তাই এর এখতিয়ার নেই যে, কোনো ধর্মের সংস্কার হওয়া উচিত কিনা, কেমন হওয়া উচিত এমন কোন আলাপে মগ্ন হয়ে ওঠা। বরং রাষ্ট্র বলবে, জাত-ভেদের আলাপ আপনার ধর্মে থাকুক আর না থাকুক, নাগরিক সবার স্বার্থে আপনাদেরকে আমার নীতিকে – নাগরিক সাম্যের নীতি ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার নীতি – একে সবার উপরে প্রাধ্যন্য দিয়ে মেনে চলতে হবে।

এদিকে, “সিভিল লিবার্টি” নিয়ে কাজ করে এমন এক সংগঠনও ভারতে আছে দেখা যাচ্ছে। আনন্দবাজার আরো জানাচ্ছে, “পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস (পিইউসিএল)- স্পিকারের ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এর রাজস্থান শাখার সভাপতি কবিতা শ্রীবাস্তব”। তাঁর দাবি, “স্পিকারকে ওই মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে”। কবিতা বলেন, “একটি বর্ণ বা জাতকে অন্যদের চেয়ে ভালো বলা বা একটি জাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এটা এক দিকে অন্য বর্ণকে খাটো করে দেখায়, তথা জাতিভেদ প্রথাকে আরো উৎসাহিত করে”।

বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, দল হিসাবে অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

কিন্তু কথা কনস্টিটিউশনে থাকা আর বাস্তবে চর্চা এক নয়। বাস্তবে যদি থাকতই তাহলে তো বিজেপি রাজনৈতিক দল হিসেবে অনুমোদনই পেত না। বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাগরিকবোধের চেয়ে হিন্দুত্ববোধ যদি কারো চিন্তা ও বুদ্ধিতে ওপরে চড়ে থাকে তবে অবস্থা এরকমই হবে।

তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিন্দা করা মন্তব্য দিয়েছেন গুজরাট রাজ্য সংসদের এক এমএলএ ও এক্টিভিস্ট – জিগনেস মাভানি। তিনি তাঁর টুইটে লিখেছেন, “ভারতের জাত ব্যবস্থার পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা – এটা শুধু নিন্দাযোগ্যই না এটা  বিব্রতকরভাবে পিছন-দিকে-হাঁটা। এটা আমাদের জন্য এক তামাশা যে এমন জাত-বর্ণবাদী একজন লোক আমাদের লোকসভার স্পিকার। জনগণের কাছে তার আচরণের জন্য মাফ চাওয়া উচিত”।
এটা একটা ট্রাজেডি যে কনষ্টিটিউশন জাত ব্যবস্থার উচ্ছেদ চায় সেই কনষ্টিটিউশন রক্ষার শপথ নিয়েছেন এই ব্যক্তি।
[Gujarat MLA Jignesh Mevani sought Birla’s apology. “This celebration of Indian caste system is not only condemnable but also cringe-worthy,” he tweeted. “It’s a joke on us that a casteist like him is our Lok Sabha speaker. He should publicly apologise for this attitude.”
He added: “It’s a tragedy that such people take oath on our Constitution that wants to annihilate the caste system.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জাত ভেদের সমাজে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

গৌতম দাস

১২ আগষ্ট ২০১৯, ০০;০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Fc

[সার সংক্ষেপঃ অবিভক্ত ভারতে যাদের জন্ম বা উত্তরসুরি আমাদের সকলের এক “আদি-পাপ” হল, সেই রামমোহন রায়ের তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র-ধারণাটা ওর মূল ফিচার অথবা কী পয়েন্ট ও বৈশিস্টগুলো কী থাকতেই হয় তা আমরা রপ্ত করতে পারি নাই। অথচ ভারতে আধুনিকতা এসে গেছে, প্রগতিশীলতাও বলে গর্ব ফুটিয়ে বেড়াই। আসলে তো মনে মনে হিন্দুত্বের বাসনা আর বর্ণহিন্দুর জাতবিচারে শ্রেষ্ঠত্ব ভাবনা সব জায়গায় ঘুরে ফিরে আগের মতই আধিপত্যের আসনে বসে আছে। কিছু বদলাতে দেয় নাই। যে দেশে সমাজের সবখানে  বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথা সক্রিয় ও সবলভাবে টিকে আছে সেদেশে রিপাবলিক রাষ্ট্র কার্যকর আছে , নাগরিক-নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য নাই এমন দাবির রাষ্ট্র আছে – এর চেয়ে ঠাট্টা আর কী হতে পারে?  এছাড়া, এই যেমন ধরেন কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তান কোনদিকে যোগ দিবে?  না, এটা কোন এক হরি সিং রাজার খায়েস কোনদিকে এর দ্বারা নির্ধারিত হবে না, সে মামলা এটা একেবারেই নয়। তাহলে সমস্যাটা কী? গোড়ার সমস্যা হল আপনি হিন্দুত্ব-ছাড়া অন্য কোনভাবে রাষ্ট্র বুঝতে বা গড়তেই রাজি না। এটাই সমস্যার গোড়া। এখন ভেবে দেখেন হিন্দুত্ব-ছাড়া রাষ্ট্র বুঝতে না পারা বা চাওয়ার কারণে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী এক হিন্দুত্বই নির্ধারণ করে দিয়েছে – বলতে পারেন বাধ্য করে বলছে যে মুসলমান তুমি মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র কর। এভাবে একেবারে জবরদস্তিতে এদিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।  অথচ আবার এর জন্য দায়ী করা হয়েছে উলটে মুসলমানদেরকেই।

অথচ সহজ সমাধান ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কোন নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না, কাউকে করতেও দিবে না, হতে দিবে না।  যেকোন ধর্ম, কিংবা পাহাড়ি-সমতলি, সাদা-কাল, বাংলা বা হিন্দিভাষী ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলেই রাষ্ট্রের চোখে সমান নাগরিক হবে – এমন রাষ্ট্র গড়তে হত। এক সমান নাগরিক পরিচয় ছাড়া আর কোন পরিচয়ে রাষ্ট্র কাউকে চিনে না। এই ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র, যেটাকে ইতিবাচকভাবে অনেকে সাম্যের (equality) রাষ্ট্র বলে বুঝে। কিন্তু হিন্দুত্বের নেহেরু ভাবলেন কেউ বুঝে ফেলার আগের সেরে ফেলবেন ব্যাপারটা; তাই তিনি কাশ্মীর যেন হরি সিং-এর ব্যক্তি সম্পত্তি ও সে অনুসারে সিদ্ধান্তের বিষয় বলে চালিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু কথায় আছে, পাপ তো কারও  বাপকেও ছাড়ে না।  তাই আমরা সকলেই আবার ব্যাক-টু-প্যাভেলিয়ান। কাশ্মীর ইস্যু আমাদের সকলকেই আবার ১৯৪৭ এর পুরানা অমীমাংসিত প্রশ্নে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তফাত এটাই যে এখন হিন্দুত্ব দগদগে সর্বাঙ্গে ঘাঁ-এর বিভৎস শরীর নিয়ে সে হাজির। তাই সকলেই চিনে ফেলতে পারছে। হিন্দুত্বকে আজ তাই সহজে সকলেই চিনতে পারে। সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে। আরও ভাঙ্গবে। কিন্তু শুধু চিনতে পারা নয় দরকার এক্ট করা, দৃঢ় পদক্ষেপের একশন।]

 


কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এটা নেহেরু-গান্ধীসহ ততকালীন কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারাও জানতেন ও মানতেন। কেন? কিন্তু এই “অংশই” বা করে নিবার সঠিক বা জনসমর্থিত পথ ও পদ্ধতি হত কোনটা? এটা সেই ১৮১৫ সালের রামমোহনের রেনেসাঁ থেকে একাল পর্যন্ত ভারতের নেতাদের কারই জানা হয় নাই। বরং কমবেশি সকলেরই বেকুবি ধারণাটা হল, ব্যাপারটা বোধ হয় বলপ্রয়োগ করেই করার বিষয়।

বৃটিশ-ইন্ডিয়ার প্রশাসন মানে কীঃ
আমাদের অনেকের ধারণা, অবিভক্ত ভারত মানে একটা একক প্রশাসনিক এলাকা; যা ব্রিটিশেরা ১৯৪৭ সালে চলে যাওয়ার সময় যেন একটা অংশ নেহরু-গান্ধীদের  দিয়ে যায় যা থেকে ভারত আর অপর অংশ মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র বানাতে দিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই ধারণা ভিত্তিহীন। ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়া ছিল প্রধানত তিন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিভক্ত ভারত – বড় তিন প্রেসিডেন্সি (বাংলা,বোম্বাই ও মাদ্রাজ), প্রায় ১৭টা প্রদেশ আর ৫৫০-এরও বেশি প্রিন্সলি স্টেট (Princely State বা করদরাজ্য)। আর এদের প্রত্যেকেই ছিল কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (সংক্ষেপে এখন থেকে “কোম্পানি” লিখব) হেডকোয়ার্টারের অধীনে সরাসরি শাসনে; কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ আর প্রিন্সলি স্টেটগুলো এভাবে এরা সবাই একেকটা আলাদা সত্তা। প্রিন্সলি স্টেটগুলো আবার আরো জটিল এ কারণে যে, সেগুলোর অভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন প্রশাসন কোম্পানির অধীনে নয়, তৈরিও নয়। বরং কেবল বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ- এ বিষয়গুলোই এককভাবে কোম্পানির এক্তিয়ার, দখলে ও অধীনে। এসব ইস্যুতে কোম্পানি যা সিদ্ধান্ত নিবে তাই ফাইনাল। আসলে এর মূল কারণ ছিল বৃটিশ কলোনির প্রতিদ্বন্দ্বি অন্যরা যেমন ফরাসি, ডাচ  এমন অন্য কলোনি মালিকেরা যেন বৃটিশের অধীনের রাজাদের সাথে যোগাযোগ করে বেশি সুবিধা দিবার লোভ দেখায় বৃটিশদের থেকে রাজাদেরকে ভাগায় নিয়ে যেতে না পারে, তাই “নো ফরেন কমিউনিকেশন” নীতি পালন করত তারা।

তবে করদ রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, প্রশাসন ও রাজস্ব আদায় একচেটিয়াভাবে রাজাদের হাতেই থাকত, যদিও রাজারা আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট শেয়ার ব্রিটিশদেরকে দিতে বাধ্য থাকত। এ বিষয়ে প্রত্যেক রাজার সাথেই কোম্পানির আলাদা আলাদা চুক্তি ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম এক শ’ বছর, অর্থাৎ ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে ছিলাম। আর ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটলে, একে দমনের পর থেকে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি কোম্পানির সব কর্তৃত্ব নিজে অধিগ্রহণ করেছিল, আর শাসন করেছিল ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত।

তাই দেশ ভাগের সময় প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগুলো সহজে ও সরাসরি স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে গেলেও প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বলেই ব্রিটিশ সরকার বিদায় নিয়েছিল। কারণ কোম্পানি বা বৃটিশদের সাথে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিতে এমন কিছু লেখা নাই – এই যুক্তিতে তারা ইস্যুটা ফেলে পালিয়েছিল। আবার প্রিন্সলি স্টেট মানে আসলে, কোম্পানির ভারতে জেঁকে বসার আগে থেকেই এরা অসংখ্য ছোট-বড় রাজার রাজ্য ছিল। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে অনেকগুলোকে কোম্পানি পরাস্ত করে নিজ প্রশাসনিক দখলে নেয়নি, কিন্তু কোম্পানির অধীনে করদরাজ্য করে রেখে দিয়েছিল। তাই প্রশাসন রাজার হাতেই থেকে গিয়েছিল।

       প্রিয়জীত দেবসরকার: ‘ত্রিদিব রায় ছিলেন এমন একজন রাজা যিনি ব্যক্তি স্বার্থ-র জন্য তাঁর রাজত্ব হারিয়েছেন’ – বিবিসি বাংলা

কাশ্মীর আর আমাদের পাহাড়ি ইস্যুর মিল কেবল করদ রাজ্য হিসাবেঃ
ভারতের ভাগে পড়া প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে নেহরু নিজের জন্য যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তা হল, সব প্রিন্সলি স্টেটকে নবজাত ভারতে অন্তর্ভুক্ত অংশ করে নেয়া হবে। রাজাদেরকে স্বেচ্ছায় সারেন্ডার করতে হবে নইলে বলপ্রয়োগ করে রাজ্য দখল করে নেয়া হবে। এবং বিনা ক্ষতিপুরণে। অর্থাৎ রাজপরিবারকে কোনো খোরপোশ বা ভাতাও দেয়া হবে না। তবে বসতভিটা বা হাভেলির নামে যা নিতে পারে, নিবে। এই কাজটা নেহেরু বাস্তবায়ন করেছিলেন প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেলকে দিয়ে। বিপরীতে পাকিস্তান প্রিন্সলি স্টেট নিয়ে এত সিরিয়াস ছিল না। একারণেই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাজারা পাকিস্তান “মুসলমানদের” এটা জানা সত্বেও তাদের সাথেই যুক্ত হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এনিয়ে সম্প্রতি একটা পিএইচডি গবেষণা হয়েছে, যাতে এই কারণটাই উঠে এসেছে। এনিয়ে রিপোর্ট বিবিসি বাংলাতে প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০১৫ সালে। বিবিসির মতে, “সেই কাজটি করেছেন লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার, যার বই ‘দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান’ ঐ রিপোর্টের আগের সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছিল”। উপরের ছবিতে সেই বইটাই হাতে তুলে ধরে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কাজেই এরপর আমরা আশা করব পাহাড়ি ইস্যুতে বাংলাদেশকে দোষারোপ অভিযুক্ত করার আগে প্রগতিশীলেরা একটু পড়াশুনা করে নিবে। ইসলামবিদ্বেষী হয়ে বাংলাদেশের যারা কথিত প্রগতিশীলতা বা ভিকটিমহুডের ইমেজ তৈরি করে কাশ্মিরের সাথে পাহাড়ি ইস্যু মিলিয়ে তুলনা করছেন, সেটা ভিত্তিহীন। এই খবর যেন তাদের থাকে। আসলে পাহাড়ি রাজারা, পাকিস্তানে রাজা হিসেবে যোগ দিলেও মডার্ন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভেতরে ‘রাজাগিরি’ অকেজোই থেকে যায়, এই “আধুনিক” বাস্তবতাতে তা নিজেই শুকিয়ে গেছিল। কেবল পাহাড়িদের পুরানা ‘১৯০০ সালের ম্যানুয়াল’ বলে অকেজো কিছু একটা আছে। আর জমির অনেক অংশই এখন বাঙালিদের দ্বারা বেদখল হয়ে আছে, এও আরেক সত্য। কিন্তু সাবধান, এগুলো কেবল ১৯৭৫ সালের পরের, পাহাড়িরা অস্ত্র হাতে তুলে নিবার পরের নতুন ঘটনা। ভারতের প্ররোচনায় পাহাড়িরা আগে-পিছে চিন্তা না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে তাতে ফেল করার ভুল রাজনীতির পরিণতিতে এটি হয়েছে। পাহাড়িদের, যারা যে জমিতে আগে ছিল তাকে সেখানেই অবশ্যই পুনর্বাসন করা সম্ভব, যদি তারা ইতিবাচক রাজনীতির পথে ফিরে, সঠিক বন্ধু বাঙালি রাজনীতিকদের খুঁজে বের করে নেয়ার যোগ্য হয়।

কাশ্মীরের বেলায় নেহেরুর নিজের নীতি ভেঙ্গেছিলেনঃ
যা হোক, নেহরু নিজ নীতি ভেঙে ‘ব্যতিক্রম’ করেছিলেন কাশ্মিরের বেলায়। কাশ্মিরের দুর্ভাগ্য যে, এটা এক প্রিন্সলি স্টেট। এটা না হয়ে যদি কাশ্মির সরাসরি কোম্পানির অধীনস্থ কোনো প্রদেশ হত? তাহলে এর সোজা মানে হত কাশ্মীর মুসলিমপ্রধান অঞ্চল বলে এই কাশ্মীর সরাসরি পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত। কারণ, ১৯৪৭ সালের ডেমোগ্রাফিতে দেখা যায়, পুরো জম্মু-কাশ্মিরের কাশ্মির বা উপত্যকা অংশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নেই বললেই চলে। আর জম্মু অংশেও ৩০ শতাংশের বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠী নাই।  আর এটা বাদে বাকি সারা অবিভক্ত কাশ্মিরে ৯৫-৯৯ শতাংশই মুসলমান। তাই পাকিস্তানে সপক্ষে যোগ দিবার ক্ষেত্রে এটাই হ্ত কাশ্মীরিদের   প্রধান যুক্তি।

কিন্তু কাশ্মীরের পাঞ্জাবি (হিন্দু) রাজা হরি সিং ভারতের সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন এবং ভারতে যোগ দিতে চাওয়ার খায়েশ প্রকাশ করাতে নেহরু প্রলুব্ধ হয়ে উল্টো পথে হাঁটেন। নেহরু প্রিন্সলি স্টেট হায়দরাবাদের নিজাম (রাজা) [একমাত্র মুসলমান রাজা যিনি জমির উদ্বৃত্ব থেকে রাজস্ব আয়ে আয়েসি জীবন কাটিয়ে কিংবা বাঈজি নাচিয়ে জীবনযাপন না করে বরং জমির উদ্বৃত্ব সঞ্চয় জড়ো করে  ইন্ডাস্ট্রি গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে এর পণ্য বেচা এক ব্যতিক্রমি রাজা তিনি], তাকেও নেহরু আর্মি পাঠিয়ে উৎখাত করেছিলেন। সেই নেহরু হরি সিংয়ের কথায় প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। কাশ্মীরের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, একটি মূল ভারতের ভুখন্ডের ভিতরের কোন প্রিন্সলি স্টেট নয়। বরং এর অবস্থান সীমান্তে, ভারতের উত্তর পাশে সীমান্তে তো বটেই, আবার এর বড় এক অন্য ভুখন্ড অংশ পাকিস্তানেরও উত্তর সীমান্তে। তাই কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তানে যুক্ত হবে – এমন দুই রাস্ট্রের যেকোনটাই যোগ দিবার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

বৃটিশেরা ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগের পরে প্রিন্সলি স্টেটগুলো ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার যে প্রচলিত চুক্তির রূপ – একেই বলা হয় কাশ্মীরেr “ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন” [instrument of accession] বা “সংযুক্ত হওয়ার (আইনগত) উপায়”।  তবে হরি সিংয়ের সাথে নেহরু যে একসেশন চুক্তি করেন তা ব্যতিক্রম ফলে শর্তযুক্ত। তা আসলে ব্রিটিশের সাথে কলোনি আমলে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিরই অনুরূপ, মডেলের। এটা মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় ভারতের হাতে দিয়ে দেয়া সাপেক্ষে বাকি ইস্যুতে নিজে করদ-রাজা হয়ে থাকার খায়েসি চুক্তি। অনস্বীকার্য বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল, নেহেরু সংখ্যালঘুর সমর্থনপুষ্ট রাজা হরি সিংয়ের সাথেই “শর্তযুক্ত” একসেশন চুক্তি করেছিলেন। কেন? খুব সম্ভবত, মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মির তো নেহরুর ভারতে যুক্ত হওয়ার কথাই নয়। কাজেই “পড়ে পাওয়া চারআনার” ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শর্তযুক্ত চুক্তি করলেই বা কী? এমন ভাবনার কারণে।

নেহেরু ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ চুক্তি করলেও রাজাগিরি রাখেন নাইঃ
কিন্তু নেহরু এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেন নাই। অর্থাৎ চুক্তি করলেও কাশ্মীর নেহরুর ভারতের নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে দাঁড়ায়নি। নেহরুর হাতে এ কাজে হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন কাশ্মিরের ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের নেতা শেখ আবদুল্লাহ। কাশ্মির ছিল প্রিন্সলি স্টেট মানে, রাজার রাজ্য ছিল বলে সেখানে ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজনৈতিক দল জমেনি। কারণ আমরা বুঝব, কোন রাজার রাজ্যে রাজনীতি থাকতে নাই। বুদ্ধিমান রাজারা তা থাকতে দেয় না। কারণ, রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল  থাকলেই তা রাজতন্ত্রের রাজ্যকে প্রজাতন্ত্র হওয়ার দিকে নিতে রওনা দিবে, যা রাজতন্ত্রের জন্য যম বা মরণকাঠি। তাই রাজার দেশে রাজা কোন পাল্টা ক্ষমতা জন্ম নিবার বীজ ও চিন্তাভাবনা হিসেবে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, জমায়েত এগুলো থাকতে দেয় না। তাই শেখ আব্দুল্লাহর পিঠে হাত রেখে নেহরু ঐ শেখেরই ন্যাশনাল কনফারেন্সকে কাশ্মীরে নেহেরু কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে উঠে আসতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। তাই চুক্তি করলেও কাশ্মীর নয়া দিল্লির নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, রাজার বিকল্প হিসেবে নেহরু শেখ আব্দুল্লাহকেই কাশ্মীরের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে ফেলেন। তবে এটা প্রথম পর্যায়। আর রাজা মনের দুঃখে বনবাসে যাওয়ার অবস্থায়। কালক্রমে রাজা কাশ্মীর থেকে দূরে পুরানা বোম্বাইয়ে বসবাস করতে থাকেন, সেখানেই ১৯৫১ সালে মারা যান। যদিও নেহরুর আসল দুঃখ তাতে ঘোচেনি।

সারা ভারতের যে কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, কাশ্মীর ভারতের অংশ হল কী করে? সবাই একবাক্যে বলবেন হরি সিং লিখে দিয়েছেন। এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ একসেশন চুক্তি অনুযায়ী হরি সিং কিন্তু ভারতকে কেবল মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো হস্তান্তর করেছেন, পুরা কাশ্মীর বা এর কোন ভুখন্ড না। এর অর্থ কাশ্মীর ভারত রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নয় বা ভারতের আইন ও কনস্টিটিউশনের অধীন নয়। তাই হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিতে থাকা কথাগুলোই এবার আবার লিখে ভারতের কনস্টিটিউশনে যে অনুচ্ছেদে সাজিয়ে আনা হয়, সেটাই ৩৭০ ধারা।
কিন্তু এরও আগে নেহরু পরিষ্কার জানতেন, কাশ্মির ভারতের অংশ নয়। বরং এটাই ভারত বা নেহেরুর দুর্বলতা। কিন্তু এই দুর্বলতা কাটাতে গিয়ে তিনি আরেক ভুল করে বসেন। তিনিই প্রথমে নিজে কাশ্মীর ইস্যুকে জাতিসঙ্ঘে তোলেন। যদিও এমনিতেও জাতিসঙ্ঘ এই বিবাদের ভেতরে ঢুকেই ছিল।

কাশ্মীরে এক দিকে ভারত অন্য দিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসঙ্ঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন, এটাই ভারত-পাকিস্তান অবজারভার মিশন [United Nations India-Pakistan Observation Mission (UNIPOM)]। জন্মলগ্নের সেকালে জাতিসঙ্ঘ মধ্যস্থতা করার জন্যই একপায়ে খাড়া থাকত। কেন?

হরি সিং কাশ্মীর কাউকে দিয়ে দেওয়ার কেউই ননঃ
প্রথমত একটা ফ্যাক্টস মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালিত ও শেষ করা হবে কীভাবে কী বৈশিষ্ট চেহারা নিয়ে – এসবের প্রধান নির্দেশক ও স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন সেকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। জাতিসংঘ তাঁরই ইমাজিনেশনের বাস্তব রূপ। যার সারকথাটা হল, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্ব স্ব রাষ্ট্রস্বার্থ নিয়ে যত বিবাদ এর অনেকগুলোই জাতিসংঘের নীতি কনভেনশন মেনে এর মধ্যস্ততায় বিনা যুদ্ধে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। সেকাজেই জাতিসংঘ গড়া। তাই কাশ্মীরে যতই আপাত থিতু এসেছিল ততই একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসংঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন– এভাবে বসে যায়।

হরি সিং একসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭। আর নেহরু কাশ্মীর ইস্যু জাতিসঙ্ঘে তোলেন ১ জানুয়ারি ১৯৪৮। প্রথমত, নেহরুর জাতিসঙ্ঘে যাওয়াটাই প্রমাণ করে যে, কাশ্মীর ভারতের নয় – এটা নেহেরুও মানছেন। এ ছাড়া হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিটা দুর্বল, নেহরুর তা না বুঝবার কথা নয়। সেই দুর্বলা পূরণ করতে, সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন জাতিসঙ্ঘ তাকে ফেভার করতে পারে। কিন্তু তার অনুমানটা ভুল ও ভিত্তিহীন। কাশ্মীর ভারতের, এমন রায় নেহরু জাতিসঙ্ঘ থেকে আনতে পারেননি। এক কথায় তিনি ব্যর্থ। কেন?

নেহরু কত দূর রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারী ছিলেন? তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্ব এনজয় করতেন কী চোখে? নীতি করণীয় ঠিক করতেন কোন মানদণ্ডে? এসব বিচারে এক কথায় তিনি ছিলেন, আসলে একজন কলোনাইজার । শাসক হওয়া বলতে তিনি কলোনি শাসক হওয়া বুঝতেন, আকাঙ্খী ছিলেন। তিনি নিজেকে একজন কলোনি শাসকের বেশি ভাবেননি। তাই ভারত কলোনিমুক্ত হয়ে গেলেও, রাষ্ট্র বলতে তাঁর ইমাজিনেশন বা বুঝ হল – এক কলোনি শাসক তিনি। তিনি মডার্ন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধারণায় জন্ম নেয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এর মর্ম তিনি যাই বুঝে থাকুন না কেন, সেটা তার ব্যবহারিক রাষ্ট্রে ও প্রধানমন্ত্রিত্বে প্রতিফলিত করতে পারেননি – রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে তাঁর কলোনি শাসক বুঝের কারণে। এটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছিল জাতিসঙ্ঘের কাছে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর আশা-কামনার মধ্যে। তিনি সম্ভবত খেয়ালই করেননি কোন বয়ানের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনাকারী ও বিজয়ীরা তা শেষ করেছিল। আর যুদ্ধ শেষে দুনিয়া নতুন করে সাজানো হচ্ছিল কোন মৌলিক ভিত্তিমূলক নতুন ভাবনার ভিত্তিতে।

“কোন  জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রকে কে শাসন করবে, কিভাবে তা শাসিত হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার কেবল ঐ জনগোষ্ঠীর”। রুজভেল্টের [Franklin Delano Roosevelt] এই প্রস্তাব প্রথম চোখবন্ধ মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল (আগষ্ট ১৪, ১৯৪১)  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। পরে রাশিয়াসহ সারা ইউরোপ এটাকে ভিত্তি হিসেবে মানতে রাজি হওয়াতেই রুজভেল্ট হিটলার ঠেকাতে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। রুজভেল্ট রাশিয়াসহ ইউরোপের সবাইকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে যুদ্ধে জিতিয়েছিলেন। আর যুদ্ধ শেষের  দুনিয়াটাকে একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ে সেটাসহ সাজানো হয়েছিল ঐ একই শাসন-নীতির ভিত্তিতে। যে নীতিটা বলে দিয়েছিল বা ওর সারকথাটা ছিল – কলোনি শাসন অবৈধ। এবং রাজাও।

কোন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কে নেবে, তা নির্ধারিত করবে কেবল নিজ নিজ জনগোষ্ঠী – এই নীতিতে যদি কাশ্মীর ইস্যুর ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দেখি, হরি সিং আসলে কাশ্মীরের কেউ নন। বরং কাশ্মিরের জনগণই ঠিক করবে কাশ্মিরের ভাগ্য কী হবে। তাই হরি সিং কোথায় কী চুক্তি অথবা সই করেছেন তা মূল্যহীন। নেহেরু-হরি সিং একসেশন চুক্তি তাই বিশ্বযুদ্ধের পরে সাজানো জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে যে World order, সেই নতুন দুনিয়ার চোখে অকেজো, মুল্যহীন এক কাগজ মাত্র।

নেহেরুর কাছে  রিপাবলিক ধারণা আকর্ষণীয় না, তাই নতুনওয়ার্ল্ড বুঝেন নাই, মনেপ্রাণে কলোনি-ক্ষমতার ভক্তঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মূল মর্ম নেহরু যদি বুঝতেন তিনি কখনই কলোনি শাসকের নকল করতে যেতেন না। ফলে তখন তিনি হরি সিং  একসেশন চুক্তিকে বাইবেল জ্ঞান করতেন না। তিনি জাতিসঙ্ঘেও যেতেন না। কারণ জাতিসঙ্ঘের জন্মই হয়েছে রুজভেল্টের ওই “নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর” শাসননীতিতে। তাই জাতিসঙ্ঘে গেলে, সে প্রতিষ্ঠান হরি সিংয়ের চুক্তিকে ন্যাকড়া মনে করে ফেলে দেয়ারই কথা। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের রায় – রাজা নয়, একমাত্র “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই”  সিদ্ধান্ত নিতে হবেই – এমনই হবে, এটা তো জানা কথাই ছিল। “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই” সব কিছু নির্ধারণের ভিত্তি, একেই মানতে বলবে। এটা নেহরুর জানা থাকা উচিত ছিল। তাই নেহেরুর জাতিসংঘে যাওয়া প্রমাণ করে যে নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ না অসচেতন ছিলেন।

নেহরু তাই জাতিসঙ্ঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করে এরপর সে খামতি নিজেই পূরণ করতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহকে আরো বেশি করে হরি সিংয়ের উপরে তুললেন। আর এখান থেকে জন্ম নিল, আর্টিকেল ৩৭০। এর সারকথা হল, একসেশন চুক্তি যেন ভারতের কনস্টিটিউশনের বিরোধী না হয়ে, সামঞ্জস্যপুর্ণ করে নেয়া যায়। আমাদের দেশী ভাষায় বললে, হালাল করে নেয়া হয়। কারণ একসেশন চুক্তি আসলেই তো ভারতীয় কনস্টিটিউশন-বিরোধী। কারণ, চুক্তিতে কাশ্মীরের জনগোষ্ঠিকে বুঝাতে কাশ্মীরের জনগণ নিজেরা নয়, কোথাকার এক ‘রাজা’কে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি বলে স্বীকার করা ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো রিপাবলিকের চোখে কোনো রাজা এমন গুরুত্ব পেতেই পারেন না। কোনো রাজা বা রাজতন্ত্রের চিন্তাকে কোন প্রজাতন্ত্র স্বীকার করতেই পারে না। তবু নেহরু অ্যাকসেশন চুক্তিকে হালাল করে নিতে কনস্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা যোগ করে। ভারতের কনস্টিটিউশন যারা ড্রাফট করেছেন, এর মূল ভূমিকায় ছিলেন প্রথম আইনমন্ত্রী ড. অম্বেদকার। নেহরু তাকে অনুরোধ করেন, হবু ৩৭০ ধারা ড্রাফট করতে। অম্বেদকার তা করতে অস্বীকার করেন।
ব্রিটিশ আমলে শাসক হিসেবে হরি সিং কাশ্মীরে এক বড় রাজত্বই চালাতেন। ফলে তার আমলাদের যথেষ্ট দক্ষ হতে হয়েছিল। এছাড়া পাশে ব্রিটিশরা থাকাতে তাদের থেকে এরা ট্রেনিং পেতেন সহজেই। এমনকি স্বয়ং হরি সিং স্বল্প বয়সে বাবার পরে কাকাও মারা যাওয়াতে রাজা হন। পরে তাঁর তাবৎ একাডেমিক শিক্ষা ও সামরিক ট্রেনিংও ব্রিটিশদের হাতে হয়েছিল। তাই কাশ্মীরের রাজার মুখ্য আমলা যাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত, তিনি হলেন ব্রিটিশ ট্রেইনড এক তামিল ব্যক্তিত্ব গোপালস্বামী আয়াঙ্গার। এই আয়াঙ্গার আর শেখ আবদুল্লাহ মিলে ৩৭০ ধারা ড্রাফট করেছিলেন।

৩৭০ ধারা আসলে কী?
এই ৩৭০ ধারা কী? ধরেন, আপনার লাখ টাকা আগেই আমি আমার বলে নিয়ে নিলাম। এরপর এই টাকা ফেরত দেয়ার সময় একটা দলিল করলাম। দলিলে লিখলাম, ১. আমিই আপনাকে লাখ টাকা দিলাম। ২. আপনি এই টাকা এখন আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দু’টাই মিলে গেলে, সে মোতাবেক খরচ করবেন। ৩. আপনার বাসায় কাউকে বসবাস করতে দিবেন না; আমার বাসা থেকে কেউ গেলেও না। তবে কাকে দেবেন না দেবেন, সেটি আপনাকে ঠিক করার অনুমতিটা আমিই আপনাকে দিয়ে দিলাম।
এতিনটা ধারার প্রথম দু’টি মিলে হল ৩৭০ ধারা, পাস হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। আর তৃতীয় ধারাটি হলো ৩৫এ, যা প্রেসিডেন্টের আদেশ হিসেবে ১৯৫৪ সালে চালু করা হয়েছিল।

তাহলে এবার মোদী-অমিত ঠিক কী করলেনঃ
আসলে এবার মোদী-অমিত মিলে যা করলেন তা হল – তারা বললেন এখন আর আপনার টাকাই আপনাকে দেয়ার দলিল না। দলিল থাকবে বাদ বা রদ। আর খোদ আপনি পুরাটাই এখন থেকে আমার।
এটাই ‘দ্যা কনস্টিটিউশন (অ্যাপ্লিকেশন টু জম্মু ও কাশ্মির) অর্ডার ২০১৯’  [The Constitution (Application to JAMMU & KASHMIR) Order 2019 ] এই নামে গত ৫ আগস্ট এক প্রেসিডেন্ট আদেশরূপে জারি করা হয়। আর এতে বলা হয়, এটাই “আগের “আর্টিকেল ৩৫এ” কে সুপারসিড’ করল। [It shall came into force at once and shall thereupon supersede the constitution (Application to Jammu & Kashmir) order, 1954……] মানে আগে যা-ই থাক, এখন থেকে এটাই 35A এর জায়গা নিল। এর সোজা মানে – এখন যা হল, একেবারে গায়ের জোরে পুরা কাশ্মীরকে (পাকিস্তান এবং চীনের কাশ্মীর অংশসহ) ভারতের ভুখন্ড বলে দাবি করে নিয়ে নেয়া হল।

এখন তাহলে আগে দলিলে যে লেখা ছিল ‘আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দুটাই মিলে গেলে’ [এই কথাটা বুঝাতে সব সময় সব জায়গায় concurrence শব্দটা ব্যবহার করা আছে।  বাংলায় যার মানে “সমঘটিত”। ] এটাই ভারতের পার্লামেন্টে পাশের পর যেকোন আইন আবার কাশ্মীরের পার্লামেন্টেও পাশ হলে বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটার কী হল? এছাড়া, এটাই ৩৭০ ধারা তে বাতিলের আগে কাশ্মীরিদের মত নেওয়ার পদ্ধতি বলে বুঝানো হয়েছে, তা হল কিভাবে?
এর জবাবে অমিত শাহ বলবেন, কাশ্মীরিদের মতামত মানে তো স্থানীয় প্রাদেশিক পার্লামেন্ন্টটে অনুমোদন, তাই তো? ঘটনা হল, এখন কাশ্মীরে  পার্লামেন্ট নেই, প্রেসিডেন্ট শাসনে আছে রাজ্যটাতে। তাই প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা – এর মানেই তো কাশ্মীরিদের মতামত বুঝতে হবে।

অর্থাৎ, অমিতের  ব্যাখ্যা অনুসারে, কাশ্মীরিদের মতামত=ভারতের প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা।  তাই ৫ আগষ্টের ঐ প্রেসিডেন্টের আদেশে শুরুর বাক্যটা হল এভাবে – আমি আমার সাথে একমত হয়ে… এই আদেশ জারি করলাম।

কিছু বাড়তি প্রসঙ্গঃ
আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো পরের লেখায় আনা যাবে হয়ত। সেখান থেকে কেবল দুটা সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ দিয়ে এখন শেষ করব।
সোশাল মিডিয়ায় দেখলাম সবাই আশা করছে এখন কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান বলতে বন্ধু রাষ্ট্র, দেশ, গ্রুপ বা ব্যক্তির সামরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো – এভাবে বুঝে। মানে মিলিটারি পদক্ষেপ বা যুদ্ধই এর একমাত্র সমাধান। এই অনুমান ভিত্তিহীন। এছাড়া যুদ্ধে যেতে চাইলেও অন্তত ভারত-পাকিস্তান কারই যুদ্ধে যাবার অর্থনৈতিক সামর্থ নাই।
আসলে ইস্যুটার ফোকাস মূলত লিগাল। তাই সেটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠবে। ভারতের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্যের একজনকে যদি পেতে হয়, তবে সম্ভাব্য সেটা হতে পারে আমেরিকা। কিন্তু সেটা ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে পাকিস্তানের গলা চড়ানো পদক্ষেপে।  ভারতের হাত আমেরিকা যতটুকু আড়ালে ধরেছিল, সেটি ছেড়ে এখন আমেরিকা তা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে [No policy change on Kashmir, says U.S.]। আমেরিকার স্টেটস ডিপার্টমেন্টের বা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত Ms. Ortagus এর প্রেস ব্রিফিং থেকে এটা পরিস্কার। অর্থাৎ, পাকিস্তানের কূটনীতির একটা বিরাট ভূমিকা এখানে আছে এবং আগামিতে থাকবে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান যতটুকু করেছে, তাতেই ভারত ইতোমধ্যে ব্যাকফুটে। ভারতের বিবৃতিগুলোতে তা পরিষ্কার।

পাকিস্তানের ডিপ্লোমেটিক প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পাঁচ পদক্ষেপঃ
1. Downgrading of diplomatic relations with India. 2. Suspension of bilateral trade with India.
3. Review of bilateral arrangements. 4. Pakistan to go to UN, including the Security Council.
5. August 14 (Pakistan’s Independence Day) to be observed in “solidarity with brave Kashmiris”. India’s Independence Day will be marked as “Black Day”.
পাকিস্তানের একক সিদ্ধান্ত – ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিচা স্কেলে নামিয়ে আনা – এটাকরে ফেলে নিজ রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার করা ও ভারতকে তারটা ফেরত নিতে বলা – এটা পশ্চিমাদেশের জন্য শক্ত ও সিরিয়াস ম্যাসেজ হিসাবে হাজির হয়েছে। এতে ভারতের প্রতিক্রিয়ার তাদের ভাষায় সেটা বুঝা গেছে। ভারতের the wire পত্রিকার ভাষ্যও তাই। পাকিস্তানের পদক্ষেপের পর ভারতের বিবৃতি বলছে, পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছে [India urged Islamabad to review these measures…।।] দেখে এই পত্রিকা বলছে। পত্রিকাটার ধারণা ইউরোপ, আমেরিকা পাকিস্তানের বিবৃতির পক্ষে চলে যেতে পারে এই ভয়ে ভারত এমন বিবৃতি দিয়েছে।  এছাড়া পত্রিকাটা মন্তব্য করছে, ভারতের বিবৃতিটা কম কড়া বা কম কর্কশ ভাষার [The Indian response seemed comparatively less strident, ]।
ওই দিকে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ভারতের বিরুদ্ধে চলে যাবে ধীরে ধীরে, যেটা উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে দেখা গিয়েছে। ওআইসি ধরনের আন্তর্জাতিক বডিগুলোতে ব্যাপক লবি লাগবে, কারণ আমির ও বাদশাহরা ‘পিছলে ভারতের পক্ষে  চলে যেতে পারে’। যেটা ঠেকাতে পাকিস্তানের কূটনীতির বিরাট ভুমিকা আছে। এসব ব্যাপারে আমাদের উলটা নাদান চিন্তাও প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। পাকিস্তানের জামায়েত বা কিছু ইসলামপন্থি দলগুলোর জোটের প্রতিক্রিয়া হল ইমরান খান কাশ্মীর ইস্যু আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা আসলে পাকিস্তানে কোনঠাসা হয়ে পড়া বিরোধি দলের ইমরানকে আক্রমণের আভ্যন্তরীণ ইস্যু। এতে তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন কিছু প্রমাণ দেয়াটা গুরুত্বপুর্ণ নয় – তাই তারা দেনও নাই। বরং এই আক্রমণটায় মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে কিনা সেটাই বিবেচ্য। তাই অভিযোগটা কাশ্মীরের পক্ষে বা বিপক্ষে গেল কিনা সেটা একেবারেই বিবেচনার বিষয় নয়। বরং আভ্যন্তরীণভাবে পাকিস্তানের বিরোধীদেরকে মাইলেজ দিয়েছে কি না সেটাই বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশ বসে আমাদের পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে কারও মুখপাত্র হওয়ার কোন মানে হয় না। আমাদের কাছে মুখ্য হওয়া উচিত কাশ্মীরের স্বার্থ, পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কে আগিয়ে থাকল সেটা একেবারেই নয়।

সুপ্রীম কোর্ট কী প্রতিকার দিবে, ভরসা করা যায়?
ভারতের সুপ্রীম কোর্ট জনমত শক্ত হয়ে না উঠলে মামলাটাই নেবে না, পিছলাবে মনে হচ্ছে। এটা কিছুটা পরিস্কার হয়েছে এক মামলায় রায়ে [৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে]। আসলে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরার বিরুদ্ধে  নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আদালতের সাজার রায় হলে তিনি পালটা জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। ক্ষমতা ছাড়েন নাই, জেলেও যান নাই। সেই থেকে ভারতের আদালত ও একাদেমিকদের বুঝাবুঝি হল –  নির্বাহী ক্ষমতা বা প্রধানমন্ত্রী আগ্রাসি হয়ে গেলে আদালত মানতে না চাইলে – তাতে সেক্ষেত্রে ওর সামনে না গিয়ে ততটাই পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই সঠিক – এই অবস্থানে যেতে হবে। যদিও এমন সিদ্ধান্তে দুনিয়ার কোথাও রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া ঠেকানো যায় নাই। পারার কথাও নয়। তবু এসব আকাম্মা মধ্যবিত্তসুলভ গা-বাঁচানো চিন্তা এখনও ভারতে ভেসে বেড়াচ্ছে। গত নির্বাচনেও আমরা তাই দেখেছি। মোদীকে নির্বাচন কমিশন কোন নুন্যতম দন্ড দিতেই পারে নাই, কমিশন নিজেই গা-বাঁচিয়ে পালিয়েছে। ফলে আগ্রাসি মোদীর সামনে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া – আদালতের এই অবস্থান হওয়াটা অসম্ভব নয়।  যদিও ২০১৮ সালের অক্টোবরে এক মামলায়, আদালতের রায় দিয়েছিল যে, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।

ভারত ভেঙ্গে পড়ার প্রাথমিক আলামতঃ
ওদিকে রাজ্যগুলোও খুবই ভয় পেয়েছে। কারণ ভারত রাষ্ট্র মানে কথিত এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, “কেন্দ্র” নামে যে জারি আছে। কে তাকে কী ক্ষমতা দিয়েছে, এই ক্ষমতার উৎস কী, কেউ জানে না। কিন্তু এই ক্ষমতা চাইলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কাল থেকে বিধানসভা বলে কোনো প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি নাই – এমন ঘোষণা দিতে পারে। ব্যাপারটা এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে। এই ভুতুড়ে কেন্দ্র এখন, পশ্চিমবঙ্গকেও একটা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। এবং তা কেন্দ্রিয় পার্লামেন্ট অথবারাজ্য বিধান সভাতেও কোন আলোচনা পরামর্শ ছাড়াই।  কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল ইস্যুতে রাজ্যগুলো এটাই দেখল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে আগে শঙ্কিত হয়েছে নাগাল্যান্ড ধরনের ট্রাইবাল ছোট রাজ্যগুলো। এব্যাপারে ভারতেরই এক মিডিয়া পর্যালোচনায় ভীতি ও আশঙ্কা এখানে পড়ে দেখা যেতে পারে [No debate, no discussion, no dissent, and the Constitution is changed]।

মোদীর রাজ্যসভার ভোট ম্যানেজ – ভারতের “দুদুকের” ভয়ে বাঘ বিড়াল যেনঃ
শুধু তাই না। ভারতের কনষ্টিটিউশন অনুসারে কোন বিষয় আইন হতে হলে তা লোকসভা ও রাজ্যসভা এই দুই পার্লামেন্টেই পাশ হতে হবে।  গত পাঁচ বছর মোদী্র লোকসভায় পাশ করা কোন আইনকে পরিপুর্ণতা দিতে রাজ্যসভা থেকে একক বিজেপি-জোটের ভোটে পাশ করাতে পারে নাই। বরং যা কিছু আইন পাশ হয়েছে এর সবই বিরোধী দলেরও ভোট-সমর্থন পাওয়া সাপেক্ষে। মোদীর দ্বিতীয় সরকারের বেলাতেও তাই, এবারও রাজ্য সভায় বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। কিন্তু তিনি কাশ্মীর ইস্যুসহ পরপর দুইটা আইন পাশ করিয়ে নিলেন। কীভাবে?

সোজা বুদ্ধি – যারই বা ঘনিষ্ট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে মামলা আছে – সিবিআই-ইডি [CBI-ED] (আমাদের দুদুক যেমন) এর হয়রানি বা মামলা খাবার ভয় আছে এমন সব দলের সদস্যদেরকে মোদীর পক্ষে ভোট দিবার বিনিময়ে সওদা করা হয়েছে। তাতে রাজ্যসভায় মোদীর দল ও জোটের এখন ১০৬ ভোট আর বিরোধীরা ১০০ ভোট হয়ে গেছে। AGP, YSR, BSP, NCP, TDP অথবা kejrilal  এদের এসব আঞ্চলিক দলের এরা কেউ  গত নিবাচনেও মোদীর দলে বা জোটের পক্ষের কেউ ছিল না। বরং বিপক্ষ জোটে ছিল। কিন্তু তারা সকলে কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর পক্ষে ভোট দিয়েছে।

,এখন, সব মিলিয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, ব্যাপারটা ভুতুড়ে ক্ষমতার কারণে ভারত রাষ্ট্রের ভেঙে টুকরা হয়ে যাওয়ার দিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছে তাই নির্দেশ করে। আর ইতিবাচকভাবে দেখলে, মাথা নাগরিকদের মুরোদ থাকলে এই ভাঙাটাই পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ কোন কিছু না ভাঙলে তা ফিরে গড়বেন কী করে? তবে পুনর্গঠনের মুরোদ যদি থাকে – এই হল মুখ্য প্রশ্ন। যদি তা না থাকে, তখনই এর অর্থ ভারতের ৩৬ টুকরা হয়ে যাওয়া। আর মুরোদ দেখাতে পারলে, পুনরায় আমেরিকার মত এক ফেডারেল ভারত হিসাবে নিজেকে পুনর্গঠিত ভারত হিসেবে আবির্ভূত করে ফেলা। বলাই বাহুল্য, সেক্ষেত্রে সবার আগের করণীয় বা লক্ষ্মণ হল,  “হিন্দুত্ব” কে চিরতরে সামাজিক চিন্তা থেকে ঝেটিয়ে বিদায়, একে  নির্বাসন করতে হবে। কেবলমাত্র এরপরেই ফেডারেল রাষ্ট্রবিষয়ক পাঠ পড়াশুনাগুলা সম্পন্ন করতে হবে বা যেতে পারে। কাশ্মীর তাই আসলে বিরাট ধবংস ও পতনের বীজ এক আইসবার্গ [iceberg], বিরাট বরফের চাঙ্গর, হিমশৈল। বাইরে থেকে এর কেবল উপরে ভেসে থাকা ছোট্ট মাথাটা  দেখা যাচ্ছে। অথচ সে বিরাট জাহাজ ঢুবিয়ে দিয়ে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন! না ভারতের কেউ এটা দেখতে পাচ্ছে, তা মনে হচ্ছে না। কারণ চারিদিকে প্রবল এক হিন্দুত্ব-জ্বর ছেয়ে গেছে, সবাই ভুগছে! এক অধপতিত নস্টা  চিন্তা – কাশ্মীরি নারীর নিয়ে ইতরোচিত অবদমিত ফ্যান্টাসি, হিন্দুত্ব-চিন্তাকে পুষ্ট করে আগাচ্ছে! এক গভীর অসুখে ভুগছে ভারত!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে ভাঙ্গন শুরু হতে পারে কাশ্মীর থেকে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  একই শিরোনামে  বিডিভিউজ  অন লাইনেও ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

গৌতম দাস

২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2DQ

 

-একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

[বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

“বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

২.
এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

আইনি কারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

অর্থনৈতিক কারণঃ
জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]