ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী

গৌতম দাস

 ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2VO

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। এখন কোনো দেশী অথবা বিদেশী মিডিয়া যেটাই খুলা যাক, দেখা যাবে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ নিউজের বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে এই ভাইরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। দুনিয়াতে এখন এই ভাইরাসের প্রভাব এতই মারাত্মক। আরেক অদ্ভুত দিক হল – যা আমাদের ঘরে ঘরে ঠিক তা দুনিয়াজুড়েও – আগে দেখা যায়নি এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি।  শুধু আমরাই যার যার ঘরে বন্দি নয়, এটা সারা দুনিয়ারই চিত্র। ভাইরাস দাবি করছে “নো কনটাক্ট”, কোন যোগাযোগ লেনদেন ্সব বন্ধ করতে হবে। অথচ  ব্যবসা বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের যোগাযোগই অর্থনীতি।  তাই সোজা মানে দাঁড়াল, আমরা ভাইরাস মোকাবিলায় যত সচেষ্ট ও সফল ততই যেন অর্থনীতি বিকল হবে – এ’এক অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে এখন আমরা দুনিয়ার সকলে।  সামগ্রিক এই পরিস্থিতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা একটা গ্লোবাল মহামন্দার দিকে যাচ্ছি, কেউ কেউ অবশ্য দাবি করছেন, আমরা ইতোমধ্যেই মন্দায় প্রবেশ করে ফেলেছি [Clear We Have Entered Recession That Will Be Worse Than 2009: IMF Chief]।

জি৭  ও জি২০
মহামন্দার শঙ্কা যে সবাইকে ভীত করে ফেলেছে এর সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হল, অকালে প্রথমে ‘জি৭ [G7]’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠক। আর পরে ‘জি২০’ [G20] অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক। কিন্তু এর আয়োজনের ধরন বলে দিচ্ছে, এ ধরনের গ্লোবাল সামিট হচ্ছে যার যার দেশে বসে ভার্চুয়ালি মানে ভাবের মধ্যে, যা দেড় ঘণ্টার এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ মাত্র। এখনকার আরেক গ্লোবাল হয়ে ওঠা শব্দ হল ‘ডিস্টান্সিং’ [distancing]। এর মানে হল, কাছে এলেও দূরে দূরে থাকা। প্রথমত আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বন্দী হয়ে বাস করতে হবে সবাইকে কিছু দিন বা হয়ত মাস। আর এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে যদি দেখা করতেই হয় তবে পাঁচ-সাত ফুট দূরে দূরে থেকে কথা বলতে বা লেনদেন করতে হবে। স্বভাবতই এমন গ্লোবাল পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার ঘণ্টা বাজারই এমন সময়ে ইমার্জেন্সি গ্লোবাল সামিট হবে দেড় ঘণ্টার, এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ – এটাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রজোট জি৭ সদস্য রাষ্ট্রগুলো হল – আমেরিকা, কানাডা আর সাথে আরো চার ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং এশিয়ার একমাত্র জাপান। এভাবে গ্লোবাল (মুলত) অর্থনীতিক পলিসিতে  সাত রাষ্ট্রের এক সমন্বয় গ্রুপ জি৭। এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপ জি৭-এর কোন রাজনৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা না থাকলেও তারা এক বিশেষ ক্ষমতার। কারণ কোনো ইস্যুতে (সাধারণত অর্থনীতির ও গ্লোবাল ইস্যু) তারা একমত হয়ে গেলে এর প্রভাব বাকি সব রাষ্ট্রের উপর অনেক বড় ও নির্ধারক হয়ে ওঠে। এর একটা বড় কারণ হিসেবে যেমন বিশ্বব্যাংকের মালিকানাই ধরা যাক; জি৭ দেশগুলোর বিশ্বব্যাংকের মালিকানা সব মিলিয়ে মোট ৩৫% এর বেশি হবে, যেখানে আমেরিকার একা মালিকানা  ১৮% এর মত। ফলে স্বভাবতই তাদের ঐক্যমতের সিদ্ধান্ত বাকি সবার জন্য অনেক ভারী ও খুবই নির্ধারক।
তবে উপরের কথাগুলো অতীত ঘটনা হিসেবে বলা সম্ভবত বেশি সঙ্গত।  কারণ এরা ‘পুরান জমিদার’, যার ঠাটবাট আছে কিন্তু বাস্তব মুরোদ আর নেই; শুকিয়ে ফোকলা হয়ে গেছে। পুরানা মাতবর আমেরিকার জায়গায় চীন এসে প্রবেশ করাতে আস্তে আস্তে অনেক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে, রঙ ফিকে হয়ে পড়ছে। আর সেই সাথে নতুনের আভা দেখা যাচ্ছে।
যদিও জি৭ নিয়ে অনেকে সবচেয়ে বিরক্তিকর ভাষায় বলার চেষ্টা করেন, এরা নাকি “সেভেন ডেমোক্রেসিজ”। কেন? চীনের বিরুদ্ধে পুরান ডাট দেখানোর জন্য। এমনিতেই ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটাই তৈরি করা হয়েছিল পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোপানোর জন্য   অ্যামেরিকান শব্দ হিসাবে। অরিজিনাল ক্লাসিক শব্দটা ছিল রিপাবলিক, এর বদলে ডেমোক্রেসি শব্দের আমদানি।  এছাড়া, একালে একা চীনা নেতৃত্বেই পাল্টা বিকল্প-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক হতে চাইবার মত প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে গেছে। জি৭ বা এর সদস্যরা এখনো (মুরোদ না থাকলেও গুণ-মানে) চীনের চেয়ে তারাই ভাল, এমন ভাব ধরার জন্য এটা বলে থাকে। ফ্যাক্টস হল একা চীনের এখন ঋণ- বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি। সে কারণে চীনা নেতৃত্বের নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই মাথা তুলছে, প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। মূলকথা, ইতোমধ্যেই তারা বিকল্প হিসেবে নিজেদের হাজির করে ফেলেছে। যেমন এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিশ্বব্যাংকের বদলে সরাসরি চীনের বা চীনের ‘বিশ্বব্যাংকে’র কাছে অবকাঠামো ঋণ নিতে যেতে পারেন।
আসলে লাশের বাক্সে শেষ পেরেকটা মেরেছে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street]। মানে, গ্লোল্ডম্যান স্যাসের [Goldman Sachs] মত দানবীয় বড় বড় অর্থবিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতীকী উপস্থিতি বা প্রধান অফিস যেখানে। গত ২০০৯ সালে তারা আওয়াজ তুলে বলেছিল জি৭ গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। কারণ এদের অর্থনীতি আর আগের মতো নয়, তাকত নাই বরং ঢলে পড়েছে। আর পালটা ততই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছে “রাইজিং ইকোনমি” [Rising Economy] বলে পরিচিত আরেক ক্যাটাগরির দেশগুলো যাদের জিডিপি সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে দ্রুত বাড়ছে। কাজেই ‘তাদেরও পুরানা জি৭-এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে আলাদা পরিসরে  জি২০ নামে জোট গড়া হোক। এই দাবি ছিল এমনই এক বাস্তবতা, যে তাই জি২০ গ্রুপ কার্যকর হয়ে যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করেন এরা দুনিয়ার টপ ২০টা ইকোনমির একটা গ্রুপ। সেটা যতটা না সত্যি, এর চেয়েও সত্য হল, চীন মানে যার নিজের আছে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাবাজার, সাথে আছে এর চেয়েও বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্য দেশে ঋণ-বিনিয়োগদাতা হয়ে হাজির হবার সক্ষমতা; আর পাশে ভারত যার অভ্যন্তরীণ ১৩৬ কোটির বড় ভোক্তাবাজার আর, উৎপাদন সক্ষমতার পটেনশিয়াল আছে; এ ছাড়া ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকা থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত মিলে গঠিত হয়েছে এই জি২০। তাই গত সপ্তাহে (২৬ মার্চ) জি২০ এর ভিডিও কনফারেন্সের নয় দিন আগে (১৭ মার্চ) জি৭-এর একই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হইয়ে যায়। বলাবাহুল্য, জি৭ জি২০ এর অংশ অবশ্যই। আর প্রতিটি জি২০ বৈঠকের আগে জি৭-এর সভা হয়ে যায়, যাতে ‘জি৭-ওয়ালা’রা মাতবরি নিবার সুযোগ পেয়ে গেলে জি২০-এর বৈঠকে একই স্বরে কথা বলতে পারে।

এদিকে ভাইরাসের ব্যাপকতায় এখন আর লুকানো থাকছে না যে, আসন্ন এক গ্লোবাল মহামন্দার মখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা সকলে। তাই জি২০ অর্থমন্ত্রীদের ভিডিও কনফারেন্সের মূল কথাটা ছিল, তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন অর্থ ঢালবেন যাতে গ্লোবাল বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এনিয়ে তাই রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম G20 leaders to inject $5 trillion into global economy in fight against coronavirus। জি২০ এর এখনকার চেয়ারম্যান সৌদি আরব। তার নেতৃত্বেই এ ঘোষণা দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার মানুষের চাকরি আর আয়ের ক্ষতি থেকে তাদের রক্ষা ও তা ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এনিয়ে আলজাজিরার শিরোনাম হল, ‘কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে গ্লোবাল অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াইয়ে জি২০-এর পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি [  G20 pledges $5 trillion to defend global economy against COVID-19]।

কিন্তু তাহলে জি৭-এর বিবৃতি বা রিপোর্ট কই? সেখানে কী বলা হয়েছে?
সরি, সেটা নাই। কেন?  এর কারণ আসলে জি৭-এর সভা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেখান থেকে কোনো যৌথ বিবৃতি দিতেই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে। আর বলতে গেলে, এর কয়েকদিন পরে জি২০ থেকে ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

কেন জি৭ ব্যর্থ হল? কারণ, আমেরিকা একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে।  তাই এর খাড়া জবাব হুল, ট্রাম্পের আমেরিকা এক দায়িত্বজ্ঞানহীন তৎপরতা এর জন্য দায়ী। সেটা কীভাবে? এবার জি৭-এর সভা ছিল মূলত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে ঐ সভায় উপস্থিত মানে ভার্চুয়ালি ওয়েব কনফারেন্সে হাজির ছিলেন। আর তিনি যেন চাকরি রক্ষার্থে পাগলা প্রেসিডেন্টের আনুগত্যের এক চরম দশা দেখাতেই নিজের কোন বিদ্যাবুদ্ধিও খরচ করেন নাই। আর তাতেই বিবৃতি ড্রাফটের সময় তিনি গোঁ-ধরে বসেন যে, ভাইরাসটাকে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নয়, বরং ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলতে হবে। আর এতে স্বভাবতই ইউরোপীয়সহ কোনো সদস্য রাষ্ট্রই তা মানতে রাজি না হওয়ায় সব নস্যাৎ হয়ে যায়। সদস্যরা আর একমত হতে পারে নাই। কারণ তারা মনে করেছিল যখন ভাইরাস সামলাতে ঐক্য দরকার তখন একাজ হবে বিভক্তি তৈরি করা  [viewed it as needlessly divisive at a time when international cooperation is required to slow the global pandemic …]। ফলে ড্রাফট আর ফাইনাল পর্যন্ত যায় নাই। তবে এতে পরবর্তিতে ট্রাম্পকেই এর সব ‘কাফফারা’চুকাতে হয় অবশ্য।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী নভেম্বর মাসে। আর ট্রাম্প এবারো এতে প্রার্থী। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি চীনের বিরুদ্ধে এক বিরাট লড়াকু যিনি এই প্রথম জাতিবাদী-আমেরিকান হয়ে চীনের বিরুদ্ধে কথিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ লড়ছেন। এ্মন ইমেজ আর প্রপাগান্ডা জোরদার করতেই তিনি কোভিড-১৯ কে ‘য়ুহান ভাইরাস’ [চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী য়ুহানে সর্বপ্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়] বলে ডাকার বালকসুলভ আবদার ধরে বসেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, এমন প্রপাগান্ডায় কোন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তা করতে ট্রাম্প পারেন নাই। অক্ষম; তা এখন প্রমাণিত। কেন?
প্রথমত, সারা দুনিয়া মারাত্মকভাবে ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছে; হিমশিম খাচ্ছে যে, কী করে নিজ নিজ দেশের মানুষকে বাঁচানো যায়, মৃতের সংখ্যা কমানো যায়। যাতে এতে ন্যূনতম সফলতা আসা শুরু হলেই, এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা যাতে ভাইরাসের ক্ষতির উপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে না পারে তাই এর মোকাবেলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। অথচ ট্রাম্প এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে তিনি আছেন তার ব্যক্তিগত সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, তথা নির্বাচন নিয়ে। এছাড়া ট্রাম্পের এই অবস্থান নেয়া গ্লোবাল ঐক্যের বদলে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।
দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ী করার জন্য ট্রানপের দাবিই তো ধারাবাহিক নয়। যেমন, ঘটনার শুরুর দিকে তিনিই বিবৃতি দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছেন যে, চীন উদার হয়ে এই ভাইরাস সম্পর্কে সব তথ্য ও আপডেট খোলাখুলিভাবে আমাদেরসহ সবাইকে জানাচ্ছে শেয়ার করছে বলে। নিচের টুইট দেখেন।

কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিক সিনেটর টম কটন “করোনা চীনের জীবাণুযুদ্ধের অস্ত্র” যা “সম্ভবত হাত ছুটে বাইরে এসে পড়েছে” বলে অভিযোগ তোলেন। আর তা থেকেই ট্রাম্পের বয়ান ও অবস্থানও বদলে যায়। অথচ কটন তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি [Cotton provided no evidence for the claim and asserted that it was the Chinese government’s job to disprove it.]। বরং একটা ‘সম্ভবত’ বলেছেন। অর্থাৎ নিশ্চিত করে, এমন শব্দ দিয়ে নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে চীনও আমেরিকাই এই জীবাণু চীনে ছড়িয়েছে বলে পাল্টা দাবি জানায়। এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই ট্রাম্প ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলে তার প্রপাগান্ডা চালু করে দিয়েছিলেন। আর চীন এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয়া শুরু করে ছিল ১৭ মার্চ থেকেই।  কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থানের অসঙ্গতি হল, তাহলে শুরুতে তিনি কেন চীনের প্রশংসা আর ভাইরাস সামলানো ও তথ্য সবার সাথে শেয়ার করার প্রশংসা করেছিলেন।
ট্রাম্পের প্রপাগান্ডা করার ব্যাপারটাকে পাঠকের নিজেই বিচার ও বুঝে দেখার জন্য একটা ভিডিও এখানে আছে আগ্রহিরা এটা দেখতে পারেন
তৃতীয়ত, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপ  অসংলগ্ন অবস্থানের ট্রাম্প-এর হাত ছেড়ে দেয়া ছাড়া নিজেরাই নিরুপায় বোধ করেছিল। সে কারণে ‘জি৭’ ভিডিও কনফারেন্স  হয়ে পড়েছিল অকার্যকর ও স্থবির। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতির দুর্দশার মুখে নতুন উদ্যোগের এক ধারাও শুরু হয়েছিল। এর লিড নিতে আসে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু [WHO, World Health Org]। সংস্থাটি পরিষ্কার করে বলেছে এভাবে ‘উহান ভাইরাস’ বলে চীন-এশিয়া বা কোনো অঞ্চলকে দায়ী করা ঠিক নয়। এ কারণেই আমরা এর নাম কোভিড-১৯ বলে স্থির করেছিলাম”। ’সবচেয়ে কড়া কথাটা বলে ট্রাম্পকে সাবধান করেছেন হু এর এক নির্বাহী পরিচালক ডঃ  মাইক রায়ান। তিনি বলেন, ভাইরাসের কোন রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। আপনি কোন জাতি কোন রেস, গায়ের রঙ কী অথবা ব্যাঙ্কে আপনার কত টাকা আছে ইত্যাদি এসবের পরোয়া করে না। অতএব ভাষা ব্যবহারের সময় সাবধান – এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমরা এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারি না যেটা কোন বিশেষ জনগোষ্ঠির জাত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি তৈরি করে বসতে পারে”।

“Viruses know no borders and they don’t care about your ethnicity, the color of your skin or how much money you have in the bank. So it’s really important we be careful in the language we use lest it lead to the profiling of individuals associated with the virus,”  Dr. Mike Ryan, the executive director of WHO’s emergencies program,

বলতে গেলে ট্রাম্পকে তিনি একেবারে ছেঁচা দিয়ে যেন বলেছেন – আপনি কথা বলার আদব জানেন না; দায়ীত্বজ্ঞানহীন।  এযেন বলা আপনি ট্রাম্প এক রেসিষ্ট[racist], তাই আপনি চীন বা এশিয়ার কোন অঞ্চলের মানুষদেরকে নিচা দেখাতে তাদের দায়ী করছেন। আর এঘটনার পর সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে তাঁর রেসিজম বা বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য ছেঁকে ধরেন। উপরের লিঙ্কটা এক অ্যামেরিকান মিডিয়া CNBC থেকে নেয়া। ওখানে শুরুতে একটা ভিডিও ক্লিপ আছে আগ্রহীরা তা দেখে নিতে পারেন।

এরপরেই আসলে দ্রুততার সাথেই অবশেষে একটা সন্ধি হয়। যার প্রকাশ ঘটানো হয় আমেরিকায় চীনের রাষ্ট্রদূত, অন্য কথা প্রসঙ্গে আমেরিকান এক প্রেসের কাছে কথা বলার সুযোগ নিয়ে “চীন-আমেরিকার পারস্পরিক অভিযোগ তোলা থেকে” তিনি “দূরে থাকতে চান” বলে জানিয়ে দেন।  এই কথাটাকে হংকং এর এক মিডিয়া লিখেছে, “এতে পরিপক্ক আচরণ আবার শুরু হয় যখন চীনা বিবৃতিতে আকুল আবেদন জানানো হয় যে প্যান্ডেমিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, আর এতে ট্রাম্পও তারপর থেকে চাইনিজ ভাইরাস বলা বন্ধ করেন [Adult behaviour resumed as statements out of China urged the world to unify against the pandemic; Trump stopped calling it a “Chinese virus”.]।

ট্রাম্প এবার ২৪ মার্চে  প্রেসের কাছে বলেন যে, “তিনি করোনার জন্য জন্য চীন বা এশিয়ার কেউ দায়ী বলে মনে করেন না”।  মানে পুরা উলটা সুর এবার।  আর তাতে কয়েকদিন কূটনীতিতেই জি৭-এর ব্যর্থতার পরও ২৬ মার্চ জি২০-এর ভার্চুয়াল সভা থেকে সাফল্য আসে, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে ভাইরাসকে সবার জন্য বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে সবার জন্য ‘কমন হুমকি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।  ইতোমধ্যে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ডলার ছাড় করার জন্য তার পরিকল্পনা এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দেন। এক কথায় বললে, ট্রাম্পকেই নিজের ফেলা থুথু চেটে তুলে নিয়ে বিতর্ক শেষ করতে হয়। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো রিপোর্টিং করেছে হংকংয়ের ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। তারা ট্রাম্পের কান্ডকারখানা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনি কখন কী বলেছেন এনিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে।

ঘরের খবরঃ
এবার ‘ঘরের খবরে’র দিক। করোনাভাইরাস মানেই, এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে, যা মানুষ জানে তা হল, মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখা বা থাকা। আইসোলেশন বা ঘরে বন্দী হয়ে থাকা। ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে ছোঁয়া এড়িয়ে থাকা। কিন্তু এটা খুবই ব্যয়বহুল প্রতিকার। কেন?
দেশের মানুষকে তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাস (বা হয়ত এরও বেশি) একনাগাড়ে ঘরে বন্দী করে রাখার সোজা মানে হল, ওই সময়ের জন্য অর্থনীতি স্তব্ধ অচল করে রাখা। প্রতিটা স্থানীয় দেশের এবং গ্লোবাল দুই অর্থেই। অথচ সবার খরচ আগের মতোই। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন এক এস্টিমেট হচ্ছে ভারতের ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ৮০ কোটিকেই তাদের ভর্তুকি বা পুরা রেশন সরবরাহ করতে হবে, তাতে ভারতের রাজস্ব আয়ের ঘরের অবস্থা যাই থাকুক না কেন [The government aims to distribute 5kg of wheat or rice for each person free of cost every month, with 1kg of pulses for every low-income family, helping to feed about 800 million poor people over the next three months.]। ওদিকে পাকিস্তান করোনায় আক্রান্তদের ১২ হাজার রুপি করে অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ঘোষণা খুবই অপ্রতুল বা অগোছালো মনে হয়েছে। সব ঘটনা-দুর্ঘটনা একদিন না একদিন শেষ হয়েই যায়, করোনার প্রভাবও একদিন শেষ হবে। কিন্তু ততদিন আমাদের মানুষদের নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে হবে। এভাবে এথেকে যদি টিকে যেতে পারি, তা হলে আবার নতুন উদ্যোমে অর্থনীতি চালু করার সংগ্রামে নামতে পারব। কিন্তু ততদিন (অন্তত তিন-ছয় মাস) নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।  অথচ  আমাদের সরকার কেবল গার্মেন্টসশ্রমিকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেছেন। এর বাইরে শহরের রিকশাচালক থেকে গ্রামের দিনমজুর পর্যন্ত কথিত ইনফরমাল শ্রমিকদের কথা ভেবে আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা থাকতে হবে যা আমরা দেখছি না। যদিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু আছে হয়ত স্থানীয় উদ্যোগে। কারণ, তাঁরা যদি না খেয়ে ঘরে বা রাস্তায় মরে পড়ে থাকলে সেটা নিশ্চয় আমাদের জন্য ভাল অভিজ্ঞতা হবে না। বরং সেটা মহাবিপর্যয়কর কিছু একটা হবে। নিজের মুখ নিজেকে দেখানো  যাবে না এমন অবস্থা হবে। তাই যেভাবেই হোক এর জন্য ফান্ড জোগাড় করার  দায় আমাদের সরকারকে নিতেই হবে। অন্তত কথা বলতে হবে।
ইতোমধ্যেই মোট প্রায় ১৯০ এর বেশি সদস্যের মধ্যে  ৮০টি সদস্যরাষ্ট্র আইএমএফের কাছে লোন চেয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা কী, ঋণ-অনুদানের ব্যবস্থা কী আছে, জানতে হবে। এসবের মধ্যেই পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকদের দুর্দশা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ওদেরকে পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করে সামলানো যাবে না। এটা কোনো সমাধানই নয়। রাস্তায় গরীব মানুষ কাজে বা কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়লে কী করতে হবে এনিয়ে পুলিশের প্রতি নির্দেশ বাস্তবসম্মত, সম্মানজনক ও উপযুক্ত হতে হবে। এটা ২০২০ সাল। এখনো না খেয়ে মানুষ মরলে তা ঘটবে একমাত্র কুশাসনের কারণে। প্রধানমন্ত্রীকে ইনোভেটিভ হতে হবে। বিকল্প খুজতে হবে প্রোএকটিভ হয়ে। যারা বুড়া বয়েসে নির্বাহী প্রধানের ধামাধরা সুযোগ না পেলে নিজ উদ্যোগে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মসংস্থানের আর যোগ্যতা রাখে না এরা ইনোভেটিভ হবে এটা কষ্টকল্পিত। খেটে খাওয়া মানুষদের বাঁচাতে হবে। এটাই এক সফলতার চিহ্ন হবে। আর তা যদি সফল হই তবেই এরপরে আসন্ন গ্লোবাল মহামন্দা মোকাবিলার যোগ্য হব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  ভাইরাসে বেঁচে গেলেও গ্লোবাল অর্থনীতিতে কী হবে“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

গৌতম দাস

 ১৬ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2UI

_

 

 

করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি আসলে দুই পরস্পরের বিরোধী ফেনোমেনা। মানুষে মানুষে সব ধরণের যোগাযোগ-লেনদেন-সম্পর্কই (কমিউনিকেশন) কোন অর্থনীতির মুল কথা। অথচ করোনাভাইরাস হাজির হচ্ছে ঠিক এর উল্টা দাবি নিয়ে যে – কমিউনিকেশন সীমিত করতে হবে, পারলে বন্ধ করে দিতে হবে – যদি ভাইরাসের বিস্তার বা নতুন সংক্রমণ বন্ধ ও ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই।  তাই আমরা এখন এমন এক কালে যে করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি এদুই পরস্পরবিরোধী ফেনোমেনার ভিতরে আমাদের বসবাস।

‘করোনাভাইরাস’ শব্দটা এখন আর কোন একটা শহরের “টক অব দ্য টাউন” নয়, বরং এটা এখন “টক অব দ্য গ্লোব”‘; বিশ্বের আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ঘটনার শুরু গতবছরের ডিসেম্বরে, চীনের য়ুহান [Wuhan] শহর থেকে।  ইতোমধ্যে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ আমরা পার হয়ে এসে পড়েছি। এই হিসাবে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বা ছড়িয়ে পড়ার তৎপরতার ‘বয়স’ মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের।  আলজাজিরা টিভির ওয়েব সাইটে একটা ঘটনা-কালপর্ব তৈরি করা হয়েছে। সেটা অনুসারেও, করোনার বিস্তার মাত্র গত তিন মাসের ঘটনা। সেখানে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসঙ্ঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানতে পারে, চীনের য়ুহান শহরে অপরিচিত এক ধরনের ‘নিউমোনিয়া’ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

এটাকেই শুরুতে চীনাদের তরফে “নিও করোনাভাইরাস” বলা হয়েছিল। এখন জাতিসঙ্ঘের দেয়া এরই আন্তর্জাতিক নাম হল কোভিড-১৯ [COVID-19]; মানে করোনাভাইরাস ডিজিজ-২০১৯। কোনো রোগ ছড়ানোর ঘটনা কেবল একটা পাড়ার কোণে ছড়ালে ও সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে একে ইংরেজিতে ‘এন্ডেমিক’ [Endemic] বা স্থানীয় রোগ বলা চলে। আর সেটা একটা শহরে অথবা একই দেশের পরস্পর লাগোয়া বা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কয়েকটা শহরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে এমন ঘটনাকে এপিডেমিক [Epidemic] বা ‘মহামারী’ বলি আমরা। নিও করোনাভাইরাসকে জাতিসঙ্ঘ ‘প্যানডেমিক’ [Pandemic] বা বিশ্ব-মহামারী বলে ঘোষণা করেছে। কারণ এ পর্যন্ত ১৫৩টার মতো রাষ্ট্রে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। যদিও এমন নাম দেওয়ার ব্যাপারটা সবটাই টেকটিক্যাল নয়, এসব নামকরণে একই সাথে  জড়িয়ে থাকে নানান রাজনৈতিক বিবেচনাও ।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই রোগের মূল বৈশিষ্ট্য হল – এটা ছোঁয়াচে, মানে মানুষের পরস্পরের ছোঁয়াছুঁয়িতেই (যেমন কোলাকুলি বা হ্যান্ডশেক) এটা অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে বা প্রবেশ করতে পারে। তবে একেবারেই শুকনা ধরনের ছোঁয়াছুঁয়ি নয় বরং ড্রপলেট [droplet] বা জলীয়বাষ্প-কণা ধরনের (হাঁচি-কাশিতে বের হওয়া) সংস্পর্শ সেখানে থাকতে হবে। আসলে  দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এমন কোন রোগের মানেই হল সেটা ছোঁয়াচে। তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ এ ধরনের রোগের জীবাণুর ছড়িয়ে পড়া উপস্থিতি সেখানে আছে।

নিও করোনার এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া থেকে অনুমান করা হয় যে, একালের দুনিয়ায় এটা হতে পেরেছে মূলত তিনটি বৈশিষ্ট্যের কারণে। যেমন এটা ‘কন্টাজিয়াস” [Contagious]’ মানে, সংক্রামক বা ছোঁয়াচে। দ্বিতীয়ত, করোনা এক নতুন ভাইরাস আক্রমণ থেকে আসা রোগ বলে এর কোন ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক ওষুধ এখনই মানুষের কাছে নেই। তাই এর ছড়িয়ে পড়াকে থামানো যাচ্ছে না। আর তৃতীয় কারণ-বৈশিষ্ট্য হল, একালে এটা গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়, এই বাস্তবতার যুগ। আমরা আসলে এখন দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া বা পড়া পণ্য-লেনদেন-বিনিময় ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করেছি, সেখানে কোনো উৎপাদনই আর স্থানীয় নয়। মানে ওই উৎপাদিত পণ্যের আসল বা শেষ-ভোক্তা বহু দূরের কোথাও- দুনিয়ার অন্য কোন কোণে বাস করতে পারে। তাই কেবল একই দেশে তো নয়ই, সেটা বরং অন্য মহাদেশে তো বটেই এবং দুনিয়ার একেবারেই অন্য কোনো প্রান্তে হওয়ারই সম্ভাবনা। যেমন, আফ্রিকার উগান্ডার কোনো গ্রামে বাংলাদেশের কেয়া সাবান কিনতে পাওয়া যাচ্ছে দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই এখন স্বাভাবিক। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আবার এক্ষেত্রে আরো ‘বিশেষ’ হয়ে উঠেছে, কারণ এ ভাইরাসের উৎস দেশটা চীন – দ্য রাইজিং চায়না। আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন আসন্ন নেতা।

চীনের বিপুল পুঁজি ও এর বিনিয়োগ সক্ষমতা অথবা চীনে তৈরি করা কাঁচামাল বা পণ্য অথবা চীনের বাজারে অন্যদের পণ্য বা প্রবেশ- এসব কিছু মিলিয়ে একালে এটা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ; পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কে আমরা পরস্পর সব রাষ্ট্র এতে জড়িয়ে গেছি বা আছি। সারকথাটা হল, একদিকে গ্লোবাল অর্থনীতির অভিমুখ হল গ্লোবাল হয়ে উঠা লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক আর অন্যদিক এই করোনা ভাইরাস বলছে এই ভাইরাসের অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে গেলে সব কমিউনিকেশন বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। করোনা আর অর্থনীতি এই দুই বিপরীত পথ ধরেছে।

একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমাদের গ্লোবাল হয়ে ওঠা পণ্য-লেনদেন-বিনিময় সম্পর্কের কথা এখানে যেমন বলছি, তেমনি এর উল্টো পরিস্থিতি বা ধারণাটা হল, গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়ের ব্যবস্থাটাই আবার ঢলে পড়া বা শ্লথ হয়ে পড়া- যেটাকে রিসেশন [recession] বা ‘মহামন্দা’ বলা হয়- তেমনটাও ঘটা স্বাভাবিক। আর ১৯৩০ সালে তা ঘটেছিল, যাকে প্রথম গ্লোবাল মহামন্দা বলা হয়। সময়টা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, প্রায় ২১ বছরের এমন বিরতির কালে। এই মহামন্দার মূল কারণ বা দায়ী ছিল ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই; বিশেষ করে অন্তত কলোনি দখলদার রাষ্ট্রগুলো যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নিজ নিজ খরচ, এই বিপুল ব্যয়ভার মিটাতে গিয়ে নিজ নিজ আয়ের চেয়ে ছাড়িয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। তাই যুদ্ধ শেষে সেই ঘাটতিটা পূরণ করতে চেয়ে পরিকল্পিত মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছিল প্রত্যেক রাষ্ট্র। এতে সবাই নিজ নিজ মুদ্রার মূল্যমান ফেলে দিয়ে রফতানি-বিক্রি বাড়ানোর জন্য  পরস্পর আত্মঘাতী এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। এর সামগ্রিক প্রভাব ও ফলাফলই হল ঐ মহামন্দা। আবার এখান থেকে বের হতে গিয়ে, হিটলারি-জাতিবাদকে মুখে পড়েছিল তারা।  আবার সেটা ঠেকাতে গিয়েই আরো বড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া- এভাবে এক ধারাবাহিক চক্রে পড়ে ইউরোপ নিজের সব ইতিবাচক সক্ষমতা বা সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছিল।

এই পরিস্থিতির সমাধান হিসাবে যুদ্ধশেষে এখান থেকেই আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের জন্মের সময় তাদের কর্মসীমা বা ম্যান্ডেটে যে মুখবন্ধ লেখা হয়েছিল তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল, ১৯৩০ সালের মত মহামন্দা আবার যাতে দুনিয়াতে না আসে তা ঠেকানোও এ দুই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য হবে। তবুও অর্থনৈতিক মহামন্দা দুনিয়ায় আবার এসেছিল ২০০৭ সালের শেষে আর ২০০৮ এর শুরুতে। বলা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের দ্বিতীয় ও শেষ জমানায় শুরু হয়ে পরের প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ সব প্রেসিডেন্টকেই এর ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল। এখনো হচ্ছে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত রিসেশনের ভয় ও প্রভাব দুনিয়া থেকে আর কখনো যায়নি, এভাবেই দিন কাটছে।

তবে ২০০৭ সালের যে মহামন্দা, সেখানেও মূল কারণ কী ছিল? আসলে তখনও কারণ একই, রাষ্ট্রের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলা। কিন্তু কেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ২০০১ সালে শুরু করেছিলেন আফগান-ইরাক দখলের যুদ্ধ; যেটাকে আমেরিকা নিজের ইজ্জত ঢাকতে, পর্দার আড়ালে ফেলতে বলে থাকে ‘ওয়ার অন টেরর’, বা সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও এক পর্যায়ে আমেরিকার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। আর এর চেয়েও আরেকটা বড় বিষয় ছিল, আমেরিকা এই যুদ্ধে জয়লাভের অযোগ্য তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।  ফলে তা হয়ে পড়েছিল সমাপ্তির টার্গেটবিহীন এক অনন্ত যুদ্ধ। অথচ এমন যুদ্ধের খরচ বইবার সামর্থ্য আমেরিকার অর্থনীতির ছিল না। তাই আমরা স্মরণ করতে পারি পরের প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্তকে। আফগান যুদ্ধ কবে শেষ হবে সেই টার্গেট থেকে নয়, বরং আমেরিকান অর্থনীতি কষ্টেসৃষ্টে হলেও সর্বোচ্চ কত দিন যুদ্ধের ব্যয় বইতে সক্ষম হতে পারে বা বহন করা ঠিক হবে- এই ভিত্তিতে টার্গেট ঠিক হয়েছিল যে যুদ্ধে জয়লাভ আসুক আর না আসুক, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব মার্কিন সৈন্য ফেরত আনতেই হবে। এভাবেই যুদ্ধের খরচ থামানোর প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছিলেন ওবামা। আর এই চলতি বছরে এবার আর একটা ধাপ শেষ করার জন্য  ট্রাম্প আফগানদের সাথে চুক্তি করল। তবে আমেরিকার আর সঙ্গী ইউরোপের যারা ভেবেছিল লোভ-লিপ্সার কথিত যুদ্ধজয়ের থেকে উচ্ছিষ্ট কিছু নিজের ভাগেও আসবে, সেটারও তেমন কোনকিছু না হওয়াতে তাদের অর্থনীতিও একই সময়ে মহামন্দায় বিপর্যস্ততার মুখে পড়েছিল। কিন্তু যে কথাটা বলার জন্য এখানে এত আয়োজন, তাহল – ঐ ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার ধাক্কা প্রধানত লেগেছিল আমেরিকা-ইউরোপে, মানে পশ্চিমা দেশে। অন্য মহাদেশে তেমন নয়। এমনকি সেকালের ক্রমশ দৃশ্যমান, উত্থিত (১৯৯০-২০১০ বিশ বছরের রাইজিং চীন) হতে থাকা চীন – এই চীনের উপর ঐ মহামন্দার পরোক্ষ প্রভাব কমই হয়েছিল। আমাদের এশিয়াতেও এর প্রভাব হয়েছিল আরো কম। কেন?

এর সোজা অর্থ-তাতপর্য হল, তত দিনে পশ্চিমের সাথে এশিয়ার পণ্য-বিনিময় লেনদেন সম্পর্ক হাল্কা হতে শুরু হয়ে গিয়েছিল; আবার অন্যদিকে চীনের  সাথে এশিয়ার প্রায় সকলের নতুন করে ততটাই সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাই।

আমরা আসলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি একটা ইকোনমিক গ্লোবালাইজেশনকে, অন্য ভাষায় পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক গ্লোবাল হয়ে ওঠার ফেনোমেনাটাকে। মনে রাখতে হবে, গত শতকের (১৯০০-৯৯) শেষ অর্ধেক মানে ১৯৫০ সালের পর থেকে, বিশেষ করে শেষ বিশ বছর (১৯৮০ থেকে) ছিল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কের (এই প্রথম) ব্যাপক গ্লোবাল হয়ে পড়ার দিকে বিকশিত হতে শুরু করারই সময়কাল। আমাদের গার্মেন্টেসে উত্থানও সে কালেরই ঘটনা। পরে নতুন শতকের শুরু থেকেই আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো পশ্চিমের চেয়ে বেশি করে, চীনের অভিমুখী হওয়া শুরু করেছিল। আমাদের মত দেশ বা চীনের উপর গত ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার প্রভাব তেমন না পড়াকে সম্ভবত এভাবেই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

মূলত কোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতি ব্যর্থ হলে ওর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অর্থনীতিতেও কতটা ধস নামে এর মাত্রাটাই বলে দেয় যে, আমরা ওই ধসনামা রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে কত গভীরে জড়িয়ে আছি।

কিন্তু এবার, করোনাভাইরাসের কালে?
এত দিনে এশিয়া তো বটেই, পশ্চিমও এখন চীনের সাথে অনেক অনেক বেশি গভীর সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে ও রয়েছে। তার প্রধানতম চিহ্ন-লক্ষ্য হল, দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা অর্থনীতির সারপ্লাস (surplus) এখন সঞ্চিত (accumulation) হওয়ার প্রধান অভিমুখ ও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে চীন। যা তিন ট্রিলিয়নেরও বেশি। এই সারপ্লাসেরই আরেক নাম ‘পুনঃবিনিয়োগ সক্ষমতা’; যে সক্ষমতা আছে চীনের। ইউরোপও চীনা উত্থানের সাথে যুক্ত হয়ে পড়তে বেল্টরোডে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে আগানো শুরু করে দিয়েছে। আবার তাই আমরাও অন্তত এশিয়ার সবাই এখন আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো প্রধানত চীনমুখী করে ফেলেছি বা করতে বাধ্য হয়েছি।  এই চীনা-নির্ভরশীল হয়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠার একটা আরেক বড় কারণ আমাদের সব উৎপাদনেরই কাঁচামালের পুরোটাই বা অন্তত কোনো-না-কোনো একটার নির্ভরযোগ্য উৎস – সেটি মূল্যের দিক কম হওয়া থেকে বা সহজ নির্ভরযোগ্য প্রাপ্যতার উতস চীন হাজির হয়েছে বলে  – এটা  প্রধানত এখন চীন।

তাই সার কথায় করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আমাদের- অন্তত এশিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে; স্থবির করবে বা থামিয়ে দেবে। যেমন চীনা কাঁচামাল বা তৈরি করা পণ্যের ভোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের বাজারে তাই বাজারের ভাষায় ‘সাপ্লাই বন্ধের’ আওয়াজ উঠা শুরু হয়েছে।  সবার মুল জিজ্ঞাস্য যে এমন সাপ্লাই বন্ধ অবস্থা কতদিন সহ্য করতে হতে পারে?  কারণ এই স্থবির পরিস্থিতি আরও ছয়মাসে বেশি হলে তা আমরা সম্ভবত আর সহ্য করতে পারব না। বিকল্পের জন্য মরিয়া হয়ে যেতে হবে।

ওদিকে ভারতের অবস্থা আরো কাহিল। ইন্ডিয়ান মিডিয়া বলছে, সাধারণভাবে চীনা-বিকল্প হাতে পাওয়ার দিক থেকে ভারতের হাতে অপশন খুবই কম, প্রায় নেই [India doesn’t have too many options to deal with economic impact of coronavirus]। যেমন ভারতের ওষুধ কোম্পানির ব্যবসা কাঁচামালের দিক থেকে বলতে গেলে পঞ্চাশ ভাগের মতো উৎস হলো চীন। ফলে ব্যাপক নির্ভরশীলতা চীনের ওপর। ভারতের সব পণ্যের মোট আমদানির ১৪ শতাংশের উৎস চীন। [more than half of India’s imports in 19 categories come from China……] আর ১৯টা আমদানি আইটেমের ৪০ শতাংশের আমদানি উৎস চীন। ভারতের ক্ষেত্রে এসব কিছুর মূল কারণ চীনা পণ্য দামে সস্তা হওয়া।

আসলে করোনাভাইরাস এমন অনেক অপ্রকাশ্য বাস্তবতাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরছে। ভারতীয় দেশপ্রেম বলে বেড়ায় যে সে মনে করে চীন তার প্রধানতম শত্রু। যে রাষ্ট্রের সাথে আগামিতে ভারতের সম্ভাব্য যুদ্ধ লাগতে পারে সেটা চীন।  তাই যদি ভারতের বিশ্বাস, অনুমান হয়ে থাকে তাহলে সেই ভারত কোনভাবেই  চীনের কাঁচামালের উপরই ভারতের আভ্যন্তরীণ ওষুধের প্রাপ্যতা চরম নির্ভরশীল করে নিজেকে সাজাতেই পারে না। কথাই নয়। এর মানে এসব সস্তা দেশপ্রেম ছেদো মানে এতে বড় ছিদ্র আছে তা বলাই বাহুল্য। তাহলে ঘটনাটা আসলে কী? খুব সম্ভবত ব্যাপারটা হল, ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতে হেরে যাওয়ায় ও তাতে ভারতের পুরা নর্থ-ইষ্ট আসাম পার হয়ে চীনাসৈন্যের ভিতরে  ঢুকে পড়েছিল। আর এসবেরই নীট ফলাফল হল এক ট্রমা; চীনের সাথে আবার হেরে যাবার এক ভীতিজাত এই ট্রমা । ফলে চীনেওর সাথে কোন যুদ্ধে জিতার চেয়ে এই ট্রমা ভারতীয়-মন থেকে দূর করার উদ্যোগ নেয়া – এটা কম গুরুত্বপুর্ণ নয়! সে যাই হোক!
আমার এখান থেকে এই প্রশ্নও উঠে যে একালের পোষ্ট কোল্ড ওয়ার যুগের  ব্যাপক গ্লোবাল  বাণিজ্যিক সম্পর্কের দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শত্রুতার ধারণা আগের মত থাকা, বাণিজ্য নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলা – সেটা আর বজায় রাখা সম্ভব নয় সম্ভবত! এটা স্বীকার করে নিতে হবে!

[ইতোমধ্যে আমরা দেখছি “সার্ক ভিডিও কনফারেন্স” বলে এক নতুন লোক হাসানো শুরু হয়েছে। প্রথমত ভারত বহু আগে থেকেই সার্ককে [SAARC] কবর দিয়ে রেখেছে। সেটা শুধু নিজের মন থেকে না, লিখেও বলে থাকে ভারতের বিদেশ বিভাগ। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন [ORF] এক ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাংক।  বাংলাদেশে ভারতের এক  রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী চাকরি শেষে সাবেক হওয়ার পরে এখন এই প্রতিষ্ঠানের এক ফেলো ও সংযুক্ত। কলকাতার অভাবের সংসারের কোন এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত সাধারণত যে ভাষায় কথা বলে সেই একই ভাষায় কটু কথা বলতে তিনি ভীষণ পারদর্শী। গত ২০১৬ সালে তিনি  অ-কুটনীতিক ভাষায় সার্কের বিরুদ্ধে অজস্র বমি উগলেছিলেন।  বিরাট শখ কিন্তু সাধ্য নাই অথবা  কেউ-মানে-না এমন কোন মোড়লের ভাষায় তিনি বলেছিলেন – সার্ক মৃত। ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন”। সেকালে ভারতের বিদেশ বিভাগও এই লাইনে অনেক কাজ ও ভুমিকা রেখেছিল। সে সময়ে আমাদের সাংবাদিকদের একটা দল ভারত সফরে গেলে পিনাক রঞ্জন তাদেরকে প্রকাশ্যে গর্ব করে জানিয়েছিল, সার্ক ভুলে যেতে, সার্ক মৃত। সার্ককে তো ভারত এতদিন বাস্তবতই মৃত করে রেখেছিল। মূলত মোদীর বিজেপি আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলমানবিদ্বেষী ও পাকিস্তানবিরোধী হাওয়া তুলে ভোট যোগাড় – এই নীতি ফলো করতে গিয়েই সার্কের বিরুদ্ধে কামান দেগেছিল। আজ হঠাত মোদীর আবার সেই সার্কের ভক্ত হয়ে উঠা এটা যেন পিনাক রঞ্জনের উগরানো বমিকেই আবার উঠিয়ে গিলে খাওয়া বললেও কম বলা হবে। সার্কের বিরোধী হবার ভারতের মূল ইচ্ছার কারণ হল পাকিস্তানকে বাদ দেয়া বা পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে অন্যভাবে জোট গড়ে তোলা।  এছাড়া একালে সদ্য দিল্লি ম্যাসাকার ঘটানোর পরে মোদী যখন বিদেশিদের সাথে কোন আসরে বসার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কটে আছে তখন ভারতের সাথে তাল দেওয়া আমাদের কাজ হতে পারে না।  ভারতের এধরণের পিছলে চলার সাথে আমাদেরকে কেন তাল দিয়ে চলতে হবে অথবা কেনই বা হল সেটা বাংলাদেশের সরকার অথবা কারও কাছে পরিস্কার বলে মনে হয় না। এটা আমাদের সরকারকেই নতুন বিপদে বা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে নিয়ে যাবে তা মনে করার কারণ আছে।]

তাহলে বাস্তব ভাইরাস পরিস্থিতিতে এখান থেকে বের হওয়ার পথ কী? আশার আলো কী? যদি ভাইরাসের প্রতিষেধক পাওয়া যাবে কি না বা সেটি কবে – এটা একটা আশার আলো হিসাবে মনে করে থাকি তবে এই প্রশ্নের জবাব হলো চলতি বছরে তা হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তবে দ্বিতীয়ত, আরেক পথ-সম্ভাবনার চিহ্ন হল, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বেড়েচলার একটা চরমকাল থাকে যারপর থেকে এতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেখা যায় কমতে শুরু করে – সেই পিক টাইম [Pic time] বা চরমকাল কবে অথবা তা কী ইতোমধ্যে আমরা ছেড়ে এসেছি? এটা জানার জন্য অনেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কারণ মানুষের মধ্যে সেলফ রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়া শুরু হলে অন্তত একটা সময় গোনা শুরু করা যায় যে, য়ার কত দিনে রিকভারি বা ক্ষতি থেকে বের হওয়া সম্ভব! চীনা সরকার এ ধরনের একটা ধারণা-ইঙ্গিত এখনই দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে এটা চীনা এই ইঙ্গিত আস্থার সাথে গ্রহণ করা যায়,  তাতে দেশী-বিদেশী লোকেরা আস্থা এখনো রাখতে পারেননি। তারা কথাটা বরং আরও  নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে শুনতে চেয়ে অপেক্ষা করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশের চীনা রাষ্ট্রদূত আবেদন রেখেছেন, বাংলাদেশের অন-অ্যারাইভাল ভিসা যেটা দেয়া সাময়িক বন্ধ রেখেছে আমাদের সরকার সেটা যেন আবার আগের মত চালু করা হয়। বলাই বাহুল্য, এটা টু আর্লি বা ‘খুব তাড়াতাড়ি’ হয়ে যায়। সম্ভবত এই বিবেচনায় বাংলাদেশও তাতে সাড়া দেয়নি। চীনে করোনাভাইরাস আক্রমণের চরম সময় পেরিয়েছে কি না সেটা জানতে পারা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেটি জানা যায়, তবুও পরবর্তী ছয় মাসের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।

আমাদের জন্য এখন প্রধান সমস্যাটা হল – জনসমাবেশ ঘটাতে হয় এমন কোনো কিছুই এই ভাইরাস অনুমোদন করে না। কারণ নুন্যতম জনসমাবেশ এই ভাইরাসের বিস্তারের জন্য খুবই সহায়ক। অথচ যেমন, পঞ্চাশজনের একই বাসে ভ্রমণ বা দেড়-দু’শজনের বিমানে ভ্রমণ, স্কুলের ক্লাসে বা কারখানার কাজে কিংবা বাজারে, স্টেশনে যেকোনো ছোট জনসমাবেশই এ’কারণে বিরাট ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। অথচ এমন ঝুঁকিগুলো এখনো আমরা নিচ্ছি।  আর এই কারণেই সব মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতি বিরাট ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। এর মধ্যে আবার আমাদের গার্মেন্ট কোম্পানিগুলোকে ইউরোপের বায়ারদের ধীরে চলতে বলা নিঃসন্দেহে আরেক খারাপ লক্ষণ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ১৪ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে করোনাভাইরাস ও অর্থনীতি – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]