চীন সফর ইতিবাচক

চীন সফর ইতিবাচক

গৌতম দাস

০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2BN

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই মাসের শুরুতে ১-৬ জুলাই চীন সফরে যাচ্ছেন। এটা তার চলতি গত ১০ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে প্রথম ২০১০ সালের মার্চেরটা সফরটা সহ ধরলে এটা তৃতীয় চীন সফর হবে। তবে আগের ২০১৪ সালের জুনের  সফরটা ছিল ২০১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে। এবারো প্রায় তাই, ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরের ছয় মাস শেষে। গতবারের সফরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর পরিকল্পিত থাকা সত্ত্বেও চীন সফরে গিয়ে তিনি মত বদলিয়ে তাতে স্বাক্ষর করেননি। মনে করা হয়, ভারতের আপত্তিকে গুরুত্ব দিতে তিনি বিরত থেকেছিলেন। যদিও তখন চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প কেবল শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এই মহাপ্রকল্পের কোনো ছাপ বা প্রভাব সেবারের কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই ছিল না। কিন্তু আসল ঘটনা ছিল ভারতের ভাষায় “আমার প্রভাব বলয়ের” বাংলাদেশ কেন চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতায় যাবে, এই মনোভাব। না, এটা কোন জল্পনা-কল্পনা ছিল না। ভারত মনে করত যে, এশিয়ার পড়শি দেশগুলো হল ভারতের খাস তালুক যেন নিজ বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ির উ্ঠান। আর সে জন্য এটা তার “প্রভাববলয়ের” এলাকা। তবে অবশ্য ভারত নিজেই পরে এ থেকে পিছু হটে।

নীচের প্যারা দুটা গত ২০১৮ সালের পুরানা লেখা থেকেঃ

[‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।]

এটা ঘটেছিল ট্রাম্পের আমেরিকার হাতে পড়ে এর আগে আমেরিকা থেকে ভারত যা যা পেত – প্রাপ্ত প্রায় সে সব সুবিধা গুটিয়ে যাওয়া অথবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই যখন ভারত নিজ-কল্পিত দেবতা ট্রাম্পের উপর পুরা হতাশ হয়ে চীনমুখী পথ ধরেছিল; এর শুরুতেই তখন ভারত নিজ মিডিয়াতেই যেচে স্বীকার করে বলেছিল যে, তার এমন মুরোদ নেই। “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক”।

যা হোক, ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে। বাংলাদেশে আমরা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছি বলে বেড়িয়েছি, আবার সময়ে পিছিয়েও গিয়েছি। এ কথাও বলেছি, “আমরা যা দিয়েছি ভারতকে মনে রাখতে হবে”। এমনকি উল্টো ভারতকেই বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে সাহসের সাথে আহবান রেখেছি। আবার পরক্ষণে চাপের মুখে বলেছি, বাংলাদেশের জন্য আমরা “চীন না অন্য বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজছি”। আবার চীনা রাষ্ট্রদূতের সাহসের বলে বাইরে বের হয়ে বলেছি বেল্ট-রোড প্রকল্পে আমরা জিন্দা আছি। আমরা বিএনপিসহ সর্বদলীয় “বাংলাদেশ-চায়না সিল্ক রোড ফোরাম নামে অধিকাংশ দলের এক সমিতি গঠন করে ফেলেছি।

এমনই এক পটভূমি পরিস্থিতিতে আর বিশেষ করে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার চীন সফরে যাচ্ছেন। এখন এবারও কী প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগের সফরের বকেয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তা তুলে ধরে এগিয়ে যেতে পারবে? সার কথায়, যেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ, এর পক্ষে সবলে দাঁড়িয়ে চীনের সাথে গভীর সম্পর্কে গড়তে এগিয়ে যেতে সাহস করবে? এতে কে কী মনে করবে তা পেছনে ফেলে সফলভাবে নিজ লক্ষ্য অর্জনে লিপ্ত হতে পারবে? এগুলো সবই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, সন্দেহ নেই।

তবে প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে এই চীন সফর আয়োজন করে ফেলা – এটাই ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ও সঠিক পদক্ষেপ। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক আপত্তি বা সমালোচনা যা আছে সব সহই এ ঘটনাকে আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারি; অন্তত এ কারণে যে এই সফরটাই ভারতের স্বার্থের অধীন থেকে বা এর কবল থেকে বাইরে বেরিয়ে বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে নেয়া এক ইতিবাচক পদক্ষেপ।

যদিও এখানে একটা লুকোছাপা আছে। ভারতের একটা নিমরাজি সম্মতি আছে এই সফরে। ভারতের নিজ মুখরক্ষার একটা বয়ানও আছে। সেটা হল এমন, যেন নিজে নিজেদেরই সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা আছে। এই সমস্যার হাল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব-শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক ও কিছু মাত্রায় ঘনিষ্ঠতায় যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই। তাই ভারত এটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হতে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব-বলয় আগের মতোই আছে বা থাকছে- এই অনুমান। যেমন আনন্দবাজার এমনই সাফাই দিয়ে লিখেছে,

“এক দিকে ওবর (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) মহাপ্রকল্পে বাংলাদেশকে কাছে টানা, অন্য দিকে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চিন, ভারত, মায়ানমার) অর্থনৈতিক করিডরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। চিনের এই যৌথ কৌশল ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল বলে মনে করছে বিদেশ মন্ত্রক। দেশে নতুন সরকার আসার পরে এই করিডরটি নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করবে চিন, এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এ বার বাংলাদেশের স্বার্থকে করিডরের সঙ্গে আরও বেশি করে তারা যুক্ত রাখবে, যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না”।

রোহিঙ্গা ইস্যুঃ
রোহিঙ্গা ইস্যুকে আমাদের সরকার সামনে নিয়ে এসেছে এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। তবে এ প্রসঙ্গে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসাই মূলত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কথাও খুবই সত্যি যে, এটা ষাটের দশক নয় যখন  কোন জনগোষ্ঠীকে দিনের পর দিন উদ্বাস্তু করে অনিশ্চিত ফেলে রাখা হবে আর তারা চুপচাপ নিরীহ বসে থাকবে। আগে যাই ঘটে থাকুক, এই শতক শুরুই হয়েছে সশস্ত্রতায় – হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া দিয়ে। ফলে গ্লোবাল পরিস্থিতি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার পক্ষে অথবা বলা যায় অভ্যস্ত। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগাতে তৎপর পরস্পরবিরোধী ছোট-বড় স্বার্থ এত বেশি যে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ধরে রাখাই এক কঠিন কাজ। হোস্ট বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে একাজে।

তবে মনে রাখতে হবে চীনকে কোন কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীনা কূটনীতির শক্তি এখানে অর্থনীতিক, ঠিক রাজনৈতিক নয়। চীন রোহিঙ্গা সমস্যাকে দেখে থাকে, রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ বা অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব এটাই মূল কারণ। ফলে চীনের দেখা এর সমাধানও এখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করার মধ্যে – এভাবে। রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ সমস্যা আছে  একথা হয়ত সত্য হলেও কিন্তু সেটাই রোহিঙ্গাদের চরম নিপীড়িত ও উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণ নয়। মূল সমস্যা রোহিঙ্গারা মুসলমান এই রেসিয়াল ঘৃণা তো বটেই; এ ছাড়া বরং নিজ বার্মিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে সবাইকেই এই বার্মিজ জেনারেলরা প্রচন্ড বর্ণবাদী ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। আর একারনেই রোহিঙ্গাসহ জেনারেলদের অপছন্দ এমন সব জনগোষ্ঠীকেই একমাত্র স্মূলে নির্মূল করার মধ্যেই তাঁরা সমাধান দেখে থাকে। এমন বার্মিজ শাসকদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে কাজ আদায়ের কৌশল কতটা কাজ করবে তাতে আস্থা রাখা কঠিন। সারকথায় চীনা এই পদ্ধতিতে কাজ আদায় বা চাপ দেয়া – টুলস হিসেবে খুবই দুর্বল। আসলে বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে নয় “রাজনৈতিক চাপ” সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুরই কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

চাপ হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন তোলা ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশনের জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইট বা বিচারের আইসিসির তৎপরতা ঘটানো – এটাই একমাত্র “রাজনৈতিক চাপ” এর উপায় নয় নিশ্চয় তা হলেও সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু যেকোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের মত চীন এই পথে খুবই দুর্বল। হিউম্যান রাইট কমিউনিস্টদের হাতিয়ার নয়। যদিও অন্য কোন কিছুও হাতিয়ার হতে পারে। যেমন কমিউনিস্ট পটভূমির রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও পশ্চিমের আমেরিকাসহ যারা হিউম্যান রাইট ইস্যুতে চাইলে গ্লোবাল ক্ষমতার করিডোরে খুবই সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে, মিয়ানমারের জেনারেলদের নাস্তানাবুদ করতে পারে – আমেরিকা বা ইউরোপের হিউম্যান রাইট বিষয়ক ততপরতার দিক থেকে এই চাপ এখনও খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে, এই সুযোগ এখনো হারিয়ে যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কেবল চীনামুখী বা চীনা নির্ভরতা হয়ে পড়া হবে মারাত্মক ভুল। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায় আমরা এককভাবে নিয়ে যে ইউরোপসহ পশ্চিমা শক্তিকে রক্ষা করেছি সে কথা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি। আর সেই সাথে  দায়-কর্তব্যের তাদের পার্ট মনে করাতে এক ক্যাম্পেন করতে পারি। এর পরিপূরক হিসেবে অন্তত অর্থনৈতিক দায় বইতে তাদেরও আমাদের সহায়তা দেয়া ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে তাদেরকেও চাপ দেয়া ও বাধ্য করতে পারি।

সারকথায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমাশক্তি আর অন্যদিকে চীন এভাবে সবার চাপ সৃষ্টির শক্তিকে একসাথে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। এটা না করতে পারলে বরং মিয়ানমারের জেনারেলেরা চীনকেই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে ফেলবে, যা করে এত দিন সে টিকে আছে।

এ দিকগুলো বিবেচনা করে কথা বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামার দাভোস সম্মেলনঃ
তবে এই চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও আরেকটা টুপি বা আড়াল আছে তা হল – ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (এখন থেকে সংক্ষেপে কেবল ‘ফোরাম’ লিখব)। অফিশিয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন যাচ্ছেন কারণ ফোরাম-এর “সামার দাভোস সম্মেলন” [Summer Davos“. Organised by the World Economic Forum] চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই আড়ালটা হল, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ১-৩ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সেই- ‘সামার দাভোস সম্মেলনে’ যোগ দিতে যাচ্ছেন। ফোরামের খুব সংক্ষেপে পরিচয় দিলে, এই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জন্ম ১৯৭১ সালে, যা মূলত রাজনীতি ও ব্যবসায়ের নেতা এবং গ্লোবাল সমাজের অন্যান্য নেতাদেরকে একসাথে বসিয়ে গ্লোবাল, রিজিওনাল বা শিল্প-কলকারখানা-বিনিয়োগের নানা ইস্যুতে কথা বলানো, যাতে তা পরিণতিতে এটা দুনিয়াকে নতুন ইতিবাচক আকার দিতে সহায়ক হয় – এমন কথা বলানোরই প্লাটফর্ম হল এই ফোরাম।

একেবারে স্বল্প কথায়, এটা হলো ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বসিয়ে কথা বলানো – কথা বলানোর এক ফোরাম। এতে এর বার্ষিক সম্মেলন একই সময় একাধিক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হবে এভাবে আগাম ঠিক করা ইস্যুতে রাষ্ট্রপ্রধানসহ যে কাউকে বক্তা ও শ্রোতা বানিয়েীটা আয়োজন করা হয়। আয়োজক এই ফোরাম নন-প্রফিট দাতব্য ধরনের সংগঠন, যা নিজেরা নিজেদের ‘প্রাইভেট-পাবলিক’ সংগঠনের মিলনমেলা বলতে পছন্দ করে। বরাবর প্রতি বছর জানুয়ারিতে এই ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ২০০৭ সাল থেকে এর বার্ষিক সম্মেলন দুইবার করে হচ্ছে। প্রতি জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস জেলা শহরের মুল সম্মেলনটা ছাড়াও ২০০৭ সাল থেকে সব সময় চীনে আরেকটা সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের দালিয়ান ও তিয়ানজিং এ দুই শহরের একেকবার একেকটায়, প্রতি জুলাইয়ে তা ঐ একই ফোরামের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এটাকেই ‘সামার দাভোস’ নামে ডাকা হচ্ছে। তবে এখানে প্রাধান্য পায় উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো। একারণে সামার দাভোসের আর এক নাম হল Annual Meeting of the New Champions। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এখানেই যোগ দিতে যাচ্ছেন। আর যেহেতু চীনে যাচ্ছেনই, তাই যেন তিনি চীনের সাথে এই ফাঁকে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৈঠকগুলোো করে নেবেন ৩-৬ জুলাই, ব্যাপারটা হাজির করা হয়েছে অনেকটা এ রকমভাবে।

এই সফরে কী কী চুক্তি স্বাক্ষর হবে সে বিষয়ে মিডিয়ায় যা প্রকাশ হয়েছে তা হল মোট আটটা চুক্তি (বা কোনটা সমঝোতা স্মারক)। যার প্রথম চারটিই হল, পটুয়াখালির পায়রায় যে তেরো শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণ হচ্ছে তা উৎপাদনে গেলে পরে এই বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিতে হলে নতুন কিছু “বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামো” নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ গ্রিড নির্মাণ, লাইন টেনে পরিচালন ও তা বিতরণ ইত্যাদি- এই কাঠামো তৈরিতে যে বিনিয়োগ লাগবে এমন বিষয়ক চুক্তি। এমন প্রথম চার চুক্তির কেবল অর্থমূল্য হিসেবে তা সম্ভবত মোট মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাকি পরের দুই চুক্তি হল, চীনের সাথে যেসব বিনিয়োগ আগামীতে হবে এর টেকনিক্যাল দিক – মানে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতার চুক্তি। এ ছাড়াও অন্য একটা চুক্তি হল, ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎস চীনে, সে অংশ ও আমাদের অংশের প্রবাহবিষয়ক তথ্যবিনিময় ও তা ব্যবহারে সহযোগিতাবিষয়ক। আর শেষের চুক্তিটা হল, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে। এই হল মোট আট চুক্তি।

BCIM প্রকল্পঃ
অতএব, ঠিক বড় বিনিয়োগ আনতে বা এখনই বড় কোনো প্রকল্প চুক্তি হতে যাচ্ছে এই সফর ঠিক তেমন নয়। তা হলে? চোরের মন পুলিশ পুলিশ। ভারতের প্রবল অনুমান যে এই সফরে মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে BCIM প্রকল্প। BCIM নামটা চার রাষ্ট্রের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি। এপ্রসঙ্গে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক খবর ভারতের অনেক মিডিয়াই ছেপেছে। পিটিআই বলছে,  [BCIM] ‘বিসিআইএম(কলকাতা থেকে ঢাকা কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং- এই সড়ক ও রেল সংযোগ) প্রকল্পকে চীনারা সাম্প্রতিককালে আবার জাগিয়েছে” [China lately is making efforts to revive the BCIM.]। আসলে এই প্রকল্প কখনোই বাতিল করা না হলেও ভারত একে মৃত বলতে, এমন রটনা করতে পছন্দ করে থাকে। কারণ ভারত চায় না এই বিসিআইএম প্রকল্পে সে নিজে জড়িয়ে থাকে অথবা তাকে বাদ দিয়ে এটা সফল হয়ে যাক তা-ও চায় না। এখনকার এর কারণ, চীনের নতুন প্রস্তাব হল BCIM প্রকল্প বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হোক,  এতে বাংলাদেশ খুবই আগ্রহী; কিন্তু ভারত একেবারেই নয়। তবে এই প্রস্তাবের আগেও ভারতের অবস্থান ছিল নেহায়তই না বলতে না পেরে যুক্ত থাকা। কারণ আবার ভারত চায়, বিসিআইএম প্রকল্প বলতে এর মানে হোক শুধুই সড়ক ও রেল সংযোগ। কোন গভীর সমুদ্র বন্দর নয়।

অথচ এর বড় এক মূল অনুষঙ্গ ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দর ছাড়া এই “সংযোগ” অবকাঠামো গড়া অর্থহীন। এমনকি তা অর্থনৈতিকভাবে বিচারে এতে বিনিয়োগ করলে তা ভায়াবল হবে কি না বা খরচ উঠবে কি না সন্দেহ। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলেও, ভারত শুরু থেকেই বন্দর নির্মাণকে বিসিআইএম প্রকল্পের অংশ নয় মনে করতে চায়। অতএব চীন-বাংলাদেশের বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা মানেই তা সোনাদিয়া বন্দরসহই। আর এটাই ভারতের জন্য অস্বস্তির।

তবে ভারতের আপত্তির যুক্তি বড়ই অদ্ভুত আর তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বলছে সে চাচ্ছে না ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্টের ভেতর দিয়ে এসে চীন বাংলাদেশের কোনো বন্দর ব্যবহার করুক। আনন্দবাজারের ভাষায় বললে, “বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে। ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”। কিন্তু ঘটনা হল। বিসিআইএমের রুট হল, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে মান্দালয় হয়ে কুনমিং। এটা ভারতের সব মিডিয়া নিজেই লিখছে এই রুট মোট দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটারের। যেমন এভাবে, [The 2800-km BCIM corridor proposes to link Kunming in China’s Yunnan province with Kolkata, passing though nodes such as Mandalay in Myanmar and Dhaka in Bangladesh before heading to Kolkata.]।

অথচ ওদিকে ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্ট হল,  বাংলাদেশের দিনাজপুর-সিলেট এই পুরা উত্তর ভূখণ্ডেরও আরো উত্তরে, যা বিসিআইএম’র রুটেই নয়। বিসিআইএম’র রুট হল বলতে গেলে, কলকাতা-যশোর-ঢাকা হয়ে এবার পুরা দক্ষিণে বা দক্ষিণ-পুবে, আর নর্থ ইস্ট হল এর পুরো উত্তরে। তাহলে?

আসলে BCIM প্রকল্পে চীন বলতে সকলে কুনমিং বুঝলে ও বুঝালেও (কুনমিং আমাদের কক্সবাজার থেকে বার্মার মান্দালয় পার হলে তবেই পৌছানো যাবে) এমন হলেও ভারত জবরদস্তিতে মানে করতে চাচ্ছে – এটা ভারতের নর্থ-ইস্টের অংশ অরুনাচল প্রদেশে চীন-ভারত সীমান্তের ওপারের চীন। হতে পারে ভারতের ভয় এখন চীন বলতে কুনমিং বুঝলেও ভবিষ্যতে প্রকল্প গড়া শেষ হলে চীন তখন আসাম-অরুনাচল সীমান্তের অপর পারের দিক থেকে চীন হিসাবেও আসাম-বাংলাদেশ হয়ে সোনাদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

আর সম্ভাব্য এখানেই চীনকে আসাম করিডোর ব্যবহার করতে দিতে ভারতের ভীতি ও আপত্তি আছে, ধরা যাক ভারত এটাই বলতে চাইছে। ভারতের এই কথার মানে হল, তাহলে কাউকে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ জায়েজ। অতএব, বাংলাদেশ কেন নিজ ভুখন্ড পেরিয়ে ভারতকে নর্থ-ইস্টে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ করবে না।

আবার মজার কথা হল, আসামসহ নর্থ-ইস্টকে চীন করিডোর হিসেবে যাতে ব্যবহার না করতে পারে বা করে ফেলবে এই ভয়ে ভারত নর্থ-ইস্টকে চরম পিছিয়ে পড়া, অবকাঠামোহীন এক অঞ্চল করে গত সত্তর বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রেখেছে। এটাই আসাম সংকটের মূল কারণ; ওখানকার বাসিন্দাদের স্থবির হয়ে থাকা ও রাখা অর্থনৈতিক জীবনের। অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে যে মুসলমানেরা এর কারণ। বাসিন্দাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে ঘৃণা জাগাতে। আর মুসলমান মানেই যেন এরা নিশ্চয় বাংলাদেশের – এই অদ্ভুত প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আর এখান থেকেই এনআরসি (NRC), মুসলমান খেদানো, ৪০ লাখ মানুষকে রিফুউজি ক্যাম্পে মানবেতরে জীবনে ফেলে রাখা ইত্যাদি কী নয়! অর্থাৎ এ যেন, নিজ সন্তান হত্যা করে হলেও প্রতিবেশীর ক্ষতি করতে হবে – এই মনোভাব। সত্যি অদ্ভুত এই হিন্দুত্বের রাজনীতি!

অদ্ভুত এক বাস্তবতা হল, হাসিনার এই আসন্ন সফর নিয়ে ভারতের এই “হিন্দুত্বের রাজনীতি” চরম অস্থির ও খামোখা উদ্বিগ্ন। পিটিআই’র [PTI] ওই রিপোর্ট আরও লিখেছে, ‘সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদি সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের সামিট মিটিংয়ের (১৩-১৪ জুন) সাইডলাইনে কথা বলেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি দীর্ঘ সময়ের পরে বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে কথা তোলেন”। [After a long gap, Xi raised the BCIM project during his meeting with Prime Minister Narendra Modi at Bishkek on the sidelines of the Shanghai Cooperation Organisation summit early this month.]।

লক্ষণীয়, এখানে বিসিআইএম প্রকল্প চীন আগে বাতিল করেছিল তা বলা হয়নি, বলা হয়েছে আফটার লং গ্যাপ- অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পরে প্রেসিডেন্ট শি ইস্যুটা নিয়ে কথা বলেছেন। পিটিআই’র এমন লেখার পেছনের কারণ পাওয়া যায় এখানে, গত ১০ জুন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট [China denies abandoning BCIM corridor। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত প্রতিদিন এক সাংবাদিক প্রেস ব্রিফিং করে থাকে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের কথা ভেবে ভারতীয় সাংবাদিক সেখানে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসে যে, চীন বিসিআইএম প্রকল্প বাতিল করেছে কিনা। স্বভাবতই ব্রিফিং কর্মকর্তা তা নাকচ করেন ও বলেন যে, না তা চালু আছে [“the BCIM has not been abandoned. It is very much on board.”]। আর তা থেকেই হিন্দুত্বের রাজনীতি অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে যে হাসিনার চীন সফরে গুরুত্বপুর্ণ আলোচনার বিষয় বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে কথা হবে। বাংলাদেশ নিজ একান্ত স্বার্থে তার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী স্বাধীনভাবে শেষ পর্যন্ত এবিষয়ে আলোচনা আগিয়ে নিয়ে সক্ষম হবে! আমরা বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছি!

আমেরিকাও কান পাতাঃ
হাসিনার আসন্ন চীন সফর নিয়ে আরেক লক্ষণীয় দিক হল – কেবল ভারত নয়, আমেরিকাও কান পেতে এ সফরকে জানা ও শুনার জন্য গভীর আগ্রহী। এর আগে এসব ক্ষেত্রে দেখা যেত এনিয়ে একটা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার রিপোর্টই তাদের যথেষ্ট ছিল। ইদানীং দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কিছু মিডিয়া হাসিনার চীন সফর নিয়ে ভারতের মতোই আগ্রহী রিপোর্ট ছেপেছে। ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’ বা এর এফিলিয়েটেড ‘বেনার নিউজ’ এমন আমেরিকান সরকারের বিদেশনীতির আলোকে রিপোর্ট লিখেছে। এরা পরস্পর একই রিপোর্ট শেয়ার করে থাকে।  Radio Free Asia, এই নাম বা শব্দের মধ্যে “FREE” শব্দটা ইন্টারেস্টিং। কোল্ড ওয়ারের যুগে সোভিয়েত বিরোধী প্রপাগান্ডা লড়তে আমেরিকার প্রিয় শব্দ ছিল ফ্রি। মানে বদ্ধ সোভিয়েত দুনিয়া থেকে মুক্ত দুনিয়ায় আহবান। ব্যাপারটা এখানেও প্রায় তেমনই। বলা হয়েছে এশিয়ার যেসব দেশের জনগণকে তাদের সরকার সত্যিকথা শুনতে জানতে দেয় না, এই রেডিও তাদের জন্য। অর্থাৎ এটা এখন একালে চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডার কাজে লিপ্ত। যা হোক এটা কেবল রেডিও হলেও এদেরি সহযোগী এফিলিয়েটেড আর প্রতিষ্ঠান হল, BenarNews. এরা ইংরাজি ছাড়া আরও বাংলাসহ চার ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন নিউজ।

বাংলাদেশ কতটা চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চলে গেল এ নিয়ে ভারতের মতই আমেরিকার উদ্বিগ্নতা – এটাই তাদের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কলাপাড়া, পটুয়াখালীতে দুর্ঘটনায় এক স্থানীয় শ্রমিকের মৃত্যু হলে শ্রমিকদের সাথে চীনা ঠিকাদারের ম্যানেজমেন্টের বিরোধে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একজন বাংলাদেশী শ্রমিক ও একজন চীনা টেকনিশিয়ান নিহত হয়েছেন। মূলত নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকের “লাশ গুম হওয়ার গুজব ছড়িয়ে” পড়লে মূলত তা থেকেই সংঘর্ষের শুরু।

এই পরিস্থিতির উত্তেজনা সামলাতে ও ঠান্ডা করতে আপাতত সবাইকে দু’সপ্তাহ ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। বেনার নিউজ লিখছে, It was not immediately clear whether Hasina and the Chinese leaders will discuss the recent fight between Chinese and Bangladeshi workers at a site of a partly built China-funded power plant.]। সারকথাটা বাংলা করে বললে তারা ‘পরিষ্কার নয় যে, এটা ইস্যু হিসেবে চীন-বাংলাদেশ সামিটে আলোচনা হবে কি না’!

আসলেই, এটা Benar এবং RFA এর গভীর উদ্বেগপ্রসূত “আশা”! কিন্তু সমস্যা হল, শকুনের বদ দোয়াতে গরু কখনও মরে না। তবে আমরা পরিস্কার থাকতে পারি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টও লিখে এমন “শকুনি আশা” জানাবে না। ঘটনা হল, এই প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ আবার বাংলাদেশী শ্রমিকের অধিকার রক্ষাও বাংলাদেশের স্বার্থ – দুটোই আমাদের স্বার্থ। দুটোই আমাদের সবল রক্ষা করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এটা নিয়ে “সামিট লেবেল” কথা বলতে হবে? এটা কী চীন-বাংলাদেশ কোন বিরোধ? ঐ রিপোর্ট কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন?  এটা তো রিপোর্টিং নয়, বেয়াদবি খোঁচাখুচি!  ভাষা লক্ষ্য করার মত লিখেছে এটা নাকি “চীনা ও বাংলাদেশি শ্রমিকের ফাইট” [fight between Chinese and Bangladeshi workers] এর ইস্যু। ব্যাপারটা বড়জোর বাংলাদেশী প্রকল্প পরিচালক আর ওই চীনা ঠিকাদার কোম্পানির মিলিতভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক সৎ উদ্যোগ এ সমস্যা মিটিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। অথচ …। বাংলাদেশ-চীনের প্রকল্প ভালো না চললে বা তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেই যেন রিপোর্টারের লাভ, তাই তিলকে তাল। বদ দোয়াই ভরসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন সফর ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2oJ

ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার

http://wp.me/p1sCvy-2kx

 

গত ২২-২৩ অক্টোবর ২০১৭ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এক দিক থেকে দেখলে, এটা একটা বকেয়া সফর এই অর্থে যে, গত আগস্ট মাস থেকেই হবু এই সফর নিয়ে কথা হচ্ছিল; কিন্তু নানান কারণে হতে পারছিল না। অবশেষে অক্টোবর মাসে এসে এটা হতে পেরেছে। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানের ভিন্নতা যখন প্রকটভাবে স্পষ্ট কিন্তু এক দেখানোর চেষ্টাও সমান ততপর চলছে, সে পটভূমিতে এ সফর হয়েছে। তাই বলা যায়, সুষমা স্বরাজের এবারের সফর হলো ভারত ও বাংলাদেশের মতভিন্নতা রেকর্ড করে রাখার সফর।

ভারতের অবস্থান বার্মার রোহিঙ্গা নির্মূলের নীতি ও বর্বরোচিত তৎপরতার পক্ষে  এবং এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। কিন্তু এর কারণ কী? এশিয়াতে ভারতের প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথেই চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। এই সম্পর্কগুলোকে ঠেকানো অসম্ভব। কারণ ভারতের পড়শি দেশগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ উপেক্ষিত হয়ে আছে। অবহেলায় এগুলোকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফেলে রাখায় এসব পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রে বিনিয়োগ পাওয়ার আকাঙ্খা উঠেছে চরমে। অন্য দিকে, একালের চীনের বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এসব দেশের দোরগড়ায় হাজির। তাই, এই দুইয়ের মিলন ঠেকানো অসম্ভব। কিন্তু ভারত চাচ্ছে এসব দেশ বিকশিত না হয়ে ভারতের ক্ষুদ্র সামর্থ্য মোতাবেক এর সাথে তাল মিলিয়ে বামন হয়ে থাকুক; যেটা ভারতের সীমিত মাত্রার অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তুল্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রই নিজ অর্থনীতিকে বামন করে রাখতে পারে না। ফলে ভারতের এহেন নীতির শেষ ফলাফল হচ্ছে – ওসব রাষ্ট্রে ভারতের ভাগে বড়জোর ছোট কোনো অবকাঠামো প্রকল্প ভাগে পাওয়া। বার্মাতে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার ফলও তাই হয়েছে। কিন্তু বার্মিজ সেনাবাহিনী খুবই সাফল্যের সাথে চীন ও ভারত – এই দুই রাষ্ট্রকে রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে সমর্থক হিসেবে হাজির হতে বাধ্য করেছে। চীন ও ভারত উভয়েই প্রতিযোগিতা করে বার্মা সরকারের রোহিঙ্গাদেরকে নির্মূল করে ধুয়েমুছে সাফ করার কাজের স্বপক্ষে  সমর্থন নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। ভারত ও চীন উভয়েরই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে দাঁড়ানোর পেছনে খোঁড়া যুক্তি একটাই, ২৫ আগস্ট আরসা গোষ্ঠী নাকি ‘সন্ত্রাসবাদী’ আক্রমণ চালিয়েছে। তাই ভারত ও চীনের সরকার বার্মিজ সরকারের বিরুদ্ধে কথিত  ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’কে সমর্থন করছে। এ থেকে স্পষ্ট, কথিত ‘আরসা আক্রমণ’ এই অজুহাত চীন, ভারত এবং বার্মার সরকার সবার জন্যই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয় এক সাফাই দাতা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কথিত আরসা (ARSA) আক্রমণ তাহলে আসলে কার পক্ষে সহায়তা করেছে, আরসা কী রোহিঙ্গাদের পক্ষের সংগঠন? নাকি এটা কাদের কাজে লাগছে? আরসা কাদের সংগঠন? নাকি আরসা বলে সক্ষম কোন সংগঠন কী আদৌও আছে?

এর আগে ২০১২ সালের রোহিঙ্গা নির্মূলের সময় ভারত বার্মিজ সরকারের কাছে ‘কৃতিত্ব’ জাহির করেছিল যে, ভারত বাংলাদেশের সরকারকে প্রভাবিত করেছে এমনভাবে যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সে দেশে আশ্রয় নিতে দেয়নি। বাংলাদেশ নিজ সীমান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য খুলে দেয় নাই। ফলে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পার হয়ে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং এ জন্য দুর্যোগের সেই পুরাটা সময় সীমান্ত বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে ২০১৭ সাল এবারও শুরুর দিকে একই কৃতিত্ব নিতে পেরেছিল ভারত। আমাদের সরকারও প্রথম সপ্তাহে সীমান্ত বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু এরপর আর পারেনাই। আভ্যন্তরীণ নিজ জনমতের চাপে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যে, সীমান্ত বন্ধ রাখার চাপ হয়ে গিয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গণবিস্ফোরণের চাপ। সীমান্ত না খুলে দিলে বাংলাদেশ সরকার যেন হয়ে দাঁড়াত রোহিঙ্গাদের ওপর সব নির্যাতনের মূল হোতা। এই বাস্তবতা ভারত বা বার্মিজ সরকারের ইচ্ছামতো বয়ান দেয়া অসম্ভব করে তোলে। অথচ ২০১২ সালে এরাই “রোহিঙ্গারা জঙ্গী” এই বয়ানের সাফাই তুলে সীমান্ত বন্ধ রাখা সম্ভব করেছিল। কিন্তু এবার নিজের বয়ান নিজে গিলে খেয়ে ভুলে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল শরণার্থীদের জন্য। উলটা “মানবাধিকার রক্ষাকর্তা মা” বলে ক্রেডিট দাবি করতে ছুটেছিল। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অবস্থানের মৌলিক ভিন্নতা সেই থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর বার্মা সফরে গিয়ে সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নির্মূলকে ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’র কাজ বলে বাহবা দিয়ে এসেছিলেন। বার্মার এই কথিত সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের কাজে মোদি গভীর উদ্বেগ দেখিয়ে এসেছিলেন। (Prime Minister Narendra Modi said on Wednesday that India shared Myanmar’s concern about “extremist violence” in its Rakhine state, …) এটাই হল রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের প্রকৃত অবস্থান।

অনেকে সুষমা স্বরাজের এবারের বাংলাদেশ সফর থেকে ‘আবিষ্কার’ করছেন, সুষমা তো এবার এই সফরে এসে ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ দাবি জানিয়েছেন। ফলে এটা ভারতের অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন। যেমন ফলাও করে বিবিসি লিখছে, “……বিবৃতিতে সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ না করেই বলেন, ‘আমরা কোফি আনান কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলোর বাস্তবায়নকেও সমর্থন করি’।” যেন এটা ভারতের এক বিরাট অগ্রগতির অবস্থান।

 

বাস্তবে মোটেও তা নয়। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ ইচ্ছা তো খোদ সু চিরও আছে বলে তিনি বহু আগেই জানাচ্ছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সু চির কথায় সাথে একটা ‘যদি বা কিন্তু’ আছে। তা হল, যারা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারবে তিনি কেবল তাদেরই ফেরত নেবেন বা কেবল তাদের বেলায় আনান কমিশনের রিপোর্ট ‘বাস্তবায়ন’ করবেন। সু চি ভাল করেই জানেন যে,  লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ নাগরিকত্বের প্রমাণ তো দিতে পারবেন না। ফলে সু চিকে ‘সাত মণ ঘিও ঢালার দরকার হবে না এবং রাধাও নাচবে না।’ অতএব ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ খায়েশ প্রচার করতে খোদ সু চি নিজের কোনই সমস্যা দেখেন নাই।

আর ঠিক একইভাবে সুষমা স্বরাজও বলেছেন, আমরাও ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন’ সমর্থন করি। এটা বলায় তারও কোনো সমস্যা নেই। কারণ তিনি জানেন, খোদ সু চি যে কথা বলেছেন, সে কথা বলতে সুষমার নিজের বলতেও কোনো অসুবিধা নেই। এ ব্যাপারে বরং ভারতের ‘নীতি’ খুবই সোজাসাপ্টা। খোদ বার্মা যে ভাষায় ও বয়ানে যা অবস্থান নেবে, ভারতও সেটা করবে। এটাই হলো ভারতের বাস্তব অবস্থান। বার্মা সরকার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করে না, কেউ করুক তাও চায় না। ফলে সুষমা স্বরাজের সফরে ভারতের লিখিত ভাষ্য হল, ‘রাখাইন প্রদেশের ডিসপ্লেসড বা বাস্তুচ্যুত’ জনগোষ্ঠীকে ফেরত নিতে হবে। এক কথায় বললে, বার্মার অবস্থানই ভারতের অবস্থান। এটা বোঝাতে অস্পষ্টতা রাখেনি ভারত।
ভারত তার অবস্থান যে একচুল বদলায়নি রোহিঙ্গা ইস্যুতে এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, সুষমা স্বরাজের সফর উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে সেখানে লেখা একটি পুরনো বাক্য হলো- ’I may add that India is deeply concerned at the spate of violence in Rakhine State of Myanmar. We have urged that the situation be handled with restraint, keeping in mind the welfare of the population’. এর প্রথম বাক্যটা পয়দা হয়েছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর মোদির বার্মা সফরকালে, আর দ্বিতীয় বাক্যটা যোগ করা হয়েছিল মোদি সফর শেষ করে ভারতে ফিরে আসার পরে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার পরে।

আমরা বরং সুষমা স্বরাজের সফরকালে বলা, নতুন আর এক বাক্যের কথা মনে রাখতে পারি। সুষমা বলেছেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো, রাখাইন প্রদেশের ব্যাপক আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা ওই প্রদেশে বসবাসকারী সব কমিউনিটির জনজীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে’। সুষমার এবারের সফরে নতুন যোগ হওয়া বাক্য এটা। কিন্তু ভারত যে রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান চায় না, বরং বার্মা সরকারের চোখেই দেখে সঙ্কটটিকে, এর প্রমাণ হচ্ছে এই বাক্যগুলো। রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের সমূলে নির্মূল করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার এ কারণে হচ্ছে না যে, কোনো অসম সুযোগ-সুবিধা তাদের দেয়া হয়েছে। তারা অন্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে কম অথবা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, সঙ্কট সে জন্য নয়। বরং আদৌ রোহিঙ্গারা বার্মার নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবে কি না, কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠী বৌদ্ধদের পাশাপাশি রাখাইন প্রদেশে বাস করতে পারবে কি না, এবং নাগরিক হয়ে থাকতে পারবে কি না, এটাই মূল ইস্যু।
লক্ষণীয় যেটা বিষয় নয়, ইস্যু নয় সেসব কথা সুকৌশলে তুলে আনছেন সুষমা স্বরাজ। আর এভাবেই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কে প্রশ্রয় দেয়া এবং এর বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশের দিক থেকে যেটা এখন অবশ্য করণীয় হয়ে গেছে তা হল, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট  অবস্থান স্থির করা এবং সে অনুযায়ে অবস্থান নেয়া। যাতে একেবারে নিজের জাতীয় স্বার্থে এই অবস্থানের পক্ষে বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এক সাথে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থ একমাত্র এভাবেই অটুট থাকতে পারে। এরপর দেশে-বিদেশে ও জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে এর পক্ষে তৎপরতা চালানো হতে পারে আমাদের সঠিক অবস্থান। একমাত্র সে ক্ষেত্রেই আমরা বার্মার সরকারের ওপর যে চাপ বাড়ছে এর সুবিধা নিতে পারব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]