ছাত্রলীগের সমান্তরাল ক্ষমতার বুয়েট

ছাত্রলীগের সমান্তরাল ক্ষমতার বুয়েট

গৌতম দাস

 ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ks

আবরার হত্যা ও তাঁর বাবার মুখ

[সার সংক্ষেপঃ  আমাদের যতই রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থ থাক, কী অনুভূত হোক, আমরা কী একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিচালনা করতে সেই প্রশাসনের উপরে একটা সরকারী ছাত্র সংগঠনকে বসিয়ে দিতে পারি? রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থের দিক থেকে এটাকে খুবই সুবিধার ও মোক্ষম কার্যকর মনে হলেও এটা চালু করলে কী হয় এরই ক্লাসিক কেস হল চলতি বুয়েট। আবার, সবকিছুরই তো একটা শেষ আছে, এর দায় আছে!  সে দায় কে নিবে? সরকার ইতোমধ্যে হাত ধুয়ে ফেলেছে। বুয়েটের ভিসি সাইফুল ইসলাম ও তাঁর প্রশাসন সঙ্গীরা এখন সারা দেশের করুণার পাত্র। সবচেয়ে তাজ্জব কথা তিনি যে এমন দশায় পড়েছেন তাঁর আচরণ অথবা মুখের দিকে তাকালে মনে হয় না তিনি এটা বুঝেছেন।

বুয়েট একটা বিশেষ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রেক্ষিতে দেখলে তবেই এর গুরুত্ব কিছু বুঝা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীও চাইলে সেটা বুঝতে পারেন। অন্তত তিনি যদি তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থ বুয়েটের সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। বাংলাদেশ অনেক বড়, তুলনায় একটা বুয়েটকে এর বাইরে বিবেচনা করে রাখলে, রাজনৈতিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পড়বে না। এখনও সব শেষ হয়ে যায় নাই। শেষ সুযোগ কী আমরা নিতে পারব? আমাদের নানান স্বার্থ আছে, থাকবে। কিন্তু  প্রফেশনালিজমকে সবার উপরে জায়গা দিতে পারলে আমরা অনেক কিছুই পারব। আমাদের সিনিয়রেরা কী “প্রফেশনাল” হতে পারবেন না!  একটা প্রতিষ্ঠানের মর্ম বুঝতে যোগ্য হব না! নিজের সার্টিফিকেটের মর্ম কী বুঝব না? অপমানিত, ধুলায় লুটাতে দিব? একটা প্রতিষ্ঠান গড়া ও তা ধরে রাখার পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের মর্ম আমরা যদি না বুঝতে পারি তাহলে আর কী! বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যত নাই বুঝতে হবে। ]

সব না হলেও অনেক কিছুই যেন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ভিত-কাঠামোসহ সবকিছু ভেঙ্গে পড়ার ইঙ্গিত আছে তাতে। বাইরে থেকে দেখলে ঘটনা হল, সম্ভাবনাময় এক ছাত্র বুয়েটের আবরার ফাহাদকে নির্মম নির্যাতন করে ছাত্রলীগ নেতার মেরে ফেলেছে। কিন্তু এটা এক হিমশৈল [Iceberg] এর প্রকাশিত উপরের সামান্য চুঁড়া মাত্র। যার নিচে বিরাট বরফের চাঁইয়ের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা। তাই দেখলে চাইলে সব ফকফকা স্বচ্ছ দেখা যাচ্ছে যে সবকিছু ভেঙ্গে পড়ার অপেক্ষায়। একারণেই বলতে হচ্ছে, আবরারের হত্যা, এই বলিদান কী যথেষ্ট? খুব সম্ভবত না! আমাদের হুঁশে আসতে আমাদের আরও অনেক প্রিয় মানুষকে বলি দিতে হবে, ত্যাগ করতে হবে। তাদের লাশ লাগবে! তবেই যদি কিছু পরিবর্তন হয়!

এদিকে বিশৃঙ্খলা আর নির্বিকার কেলাসনেসের [callousness] প্রতীক হয়ে উঠেছেন এখন বুয়েটের ভিসি।
বুয়েটে (BUET) তাঁর বাসস্থান থেকে ঠাণ্ডা শরীর নিয়ে মৃত পড়ে থাকা আবরারের দূরত্ব ছিল মাত্র তিন-চার মিনিটের হাঁটা পথ। এই কয়েক মিনিট তিনি তাঁর নিজের এই জীবনে আর পার হতে বা ছুঁতেই পারলেন না। অবশেষে কোনও মুরুব্বির বকা খেয়ে যখন দৌড় লাগালেন, ইতোমধ্যে ছত্রিশ ঘণ্টা গত হয়ে গেছে। এখন তিনি বলছেন, তাকে কেউ জানায়নি। অথচ তিনিই তো  বুয়েটের প্রশাসনিক প্রধান। তাকে বাইরের কেউ জানাবে কেন, যদি না উনি ভেতরের কাউকে জানানোর দায়িত্ব দিয়ে রাখেন? তিনি তো সেটাও পারেন নাই!
আসলে না কোনো প্রশাসনিক দক্ষতার গুণবিচারে; না মানবিক গুণবিচারে, দু’দিক দিয়েই বুয়েট ভিসি নিজেকে চরমভাবে অযোগ্য ও ব্যর্থ প্রমাণ করেছেন। বকা খেয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী তিনি দৌড়ালেন, শেষে পৌঁছে ছিলেনও বটে; কিন্তু ততক্ষণে আবরার  সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে। আবরারের ক্ষমা তিনি পেলেন না।
তিনি তো ভিসি, ফলে বুয়েটের যেকোন ঘটানায় তাঁকে সামনে দেখতে পাবার কথা! কিন্তু সেই যে ছত্রিশ ঘন্টা পিছিয়ে পড়া, সেই থেকে তিনি এখনও সবসময় ঘটনার পিছনেই দৌড়াচ্ছেন।

আবরার মারা গেছেন ৬ অক্টোবর সারা দিন টর্চার খেয়ে সেদিন পেরিয়ে রাত প্রায় ২টার সময়। আর জানাজানি না হয়ে উপায় ছিল না ভোর ৪টার পর থেকে। তবু ৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত নানান চেষ্টা চালানো হয়েছে ঘটনা লুকানোর জন্য। যুগান্তর অনলাইন সকাল পৌনে ১০টায় লিখেছে, “হল প্রভোস্ট মো: জাফর ইকবাল খান বলেন, রাত পৌনে ৩টার দিকে খবর পাই, এক শিক্ষার্থী হলের সামনে পড়ে আছে। কেন সে বাইরে গিয়েছিল, কী হয়েছিল, তা এখনো জানা যায়নি”। পরে প্রকাশিত ফুটেজে দেখা যাচ্ছে- ছাত্র কল্যাণ পরিচালকসহ প্রভোস্ট ওই ৭ অক্টোবর ভোরে এর আগেই জেনে গেছেন কারা আবরারকে কিভাবে মেরেছে। বুয়েটের ডাক্তারও আবরারের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া আবরার হলের সামনে নয়, ভেতরেই সিঁড়ির মধ্যে পড়ে ছিলেন।

আবার সকাল সাড়ে ১০টায় দৈনিক দেশ রূপান্তর, তখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে সব আড়ালে ঢাকা দেবার। তাই লিখছে,  “বিতর্কিত’ পেজে লাইক, শিবির সম্পৃক্ততা ছিল নিহত বুয়েট ছাত্রের : ছাত্রলীগ নেতা”- এই শিরোনামে রিপোর্ট ছেপেছে। অর্থাৎ তখনও ছাত্রলীগের দিক থেকে খুনের সাফাই জোগাড়ের চেষ্টা চলছে। সহায়তা করছে এই পত্রিকা। আর এরপর থেকেই সব ভেঙ্গে পড়া শুরু হয়ে যায়। কারণ ইতোমধ্যে দুই পুলিশ কমিশনারেরা স্বীকার করে নিয়েছেন, এটা ছাত্রলীগের ছেলেদের কাজ। এ ছাড়া ততক্ষণে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতারও হয়ে গেছিল। বেলা পৌনে ৩টায় বিডিনিউজ২৪ জানাচ্ছে–   সেতুমন্ত্রী বলেছেন, “ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই : কাদের”।

সাবাস সেতু মন্ত্রী!  বিরাট সাহসী বীর আপনি মানতেই হয়! শত কথার এককথা হল – সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই”। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তার একথা বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কত দেরি? না হলেও একেবারে প্রায় এগারো বছর।

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই”। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তার একথা বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কত দেরি? না হলেও একেবারে প্রায় এগারো বছর।

এই সরকার ক্ষমতা নিয়েছিল ২০০৯ সালের শুরুতে। এরপর বিশেষত শাহবাগ আন্দোলন থেকেই যে কাউকে ‘জামাত-শিবির’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারলেই এবার তাকে মেরে ফেলা, নির্যাতন করা বৈধ করে নেয়া শুরু হয়েছিল। এই সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে পাঁচ শতাধিকের বেশি গুম-খুনের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে তোলা অভিযোগ তো আছেই। এসব নিয়ে প্রকাশিত দেশী মিডিয়া রিপোর্টে সরকারকেই ‘জামাত-শিবির’ করার সাফাই বেশি দিতে দেখা গেছে। তাহলে? এগুলোর কী হবে?
ইতোমধ্যে বুয়েটের টর্চার সেলে যারা নিপীড়িত হয়েছেন তাদের বয়ানগুলো ফেসবুকে ভেসে ওঠা শুরু হয়েছে।

বুয়েটে সাধারণ ছাত্রদের প্রতিরোধ দানা বাঁধতে সময় লেগেছিল। পুলিশ কমিশনার আর প্রভোস্ট এসেছিলেন সকালে ফুটেজ নিয়ে চলে যেতে। তাতে বাধা দিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ রক্ষার সময় থেকে শুরু করে বিকেলের মধ্যে নির্যাতিত ভুক্তভোগীরা (অসংখ্য চড়-থাপ্পড়, কান ফাটিয়ে ফেলা, পঙ্গু করে ফেলা ইত্যাদি যাদের সহ্য করতে হয়েছিল) তাদের সহপাঠীদের সমর্থনসহ সংগঠিত হয়ে যায়। ঢাকনা খুলে যায়। গত এগারো বছরের পাথর সরে যায় এই প্রথম। বুয়েটের ঘটনাবলীতে যারা ইতোমধ্যে বুয়েটের ভেতরের বিভিন্ন ফুটেজ দেখতে মনোযোগ দিয়েছেন, তারা হয়তো খেয়াল করেছেন – হলের ভিতরে কোণায় কোণায় ‘র‌্যাগ-নিষিদ্ধ’ বলে হল কর্তৃপক্ষ পোস্টার সাটিয়েছে।

বুয়েটে কোন র‍্যাগ নাই। টর্চার সেলের কাহিনীগুলোকে
‘র‌্যাগ’ বলে আড়ালের ও চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

আর টর্চার সেলের কাহিনীগুলোকে ‘র‌্যাগ’ বলে চালানোর চেষ্টা দেখেই বোঝা যায়, ভিসি থেকে শুরু করে পুরো হল প্রশাসন কেমন দায়িত্বশীল ছিল! বুয়েটের একজন শিক্ষকের আয় কি এতই কম যে, তাদের কোন বাড়তি আয় সুবিধা পাওয়ার লোভে কারও অপরাধকে সহায়তা দিতে হবে!

শাহবাগের সময় থেকেই আস্তে আস্তে কথিত “সিনিয়র-জুনিয়র” কালচারটা পরিকল্পিতভাবে চালু করা হয়েছিল। এটা এর আগে কোনো দিন বুয়েটে ছিল না। এটা আসলে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ বলে কোনো কিছু নয়। এটা হল, হলের সব ছাত্রছাত্রী ও ভিসিসহ প্রশাসন পর্যন্ত সবার ওপর ছাত্রলীগের বলপ্রয়োগপূর্বক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাদের কাজ মূলত দুটা; এক. ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রলীগ নেতারা যেন হলে সর্ব-কর্তৃত্বময় নির্দেশদাতা হয়। এর নিচে ব্যাচের স্তর অনুসারে একটা প্যারালাল কর্তৃত্ব কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে বুয়েট শাসন করা। আর এ কাজের সাফাই হিসেবে, বিএনপি-জামাত-শিবির ট্যাগ লাগিয়ে এই ক্ষমতা কাঠামোর সহায়তায় বিরোধীদের নির্মূল করা। দেখা যাচ্ছে, অনেক চিন্তাভাবনা করেই কাঠামোটা সৃষ্টি করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কাজটা হল, ফার্স্ট ইয়ার থেকেই ছাত্রলীগের নেতাদের প্যারালাল ক্ষমতা কাঠামোটা চালানোর উপযোগী করে গড়া বা ট্রেনিং দেয়া। এটাকেই প্রশ্রয়ের ভাষায় ভিসির প্রশাসন নাম দিয়েছে ‘র‌্যাগিং’। এর ট্রেনিংয়ের ম্যানুয়াল পুলিশের ট্রেনিং স্কুলের মত।

পুলিশ মানে ওভার-পাওয়ারিং। কথিত আসামীর চেয়ে পুলিশের ক্ষমতাবেশি বা উপরে এই ভাব-আবহাওয়া তৈরি করা বিশেষত তা পুলিশটাকে বিশ্বাস করানো – এর লক্ষ্য। আপনি-আমি যেকোন মানুষকে হঠাত একটা সপাটে চড় মারতে পারব না। সামাজিক-মানসিক স্তুরভেদ আর মুরুব্বিসহ মানুষের সাথে সম্মান আদব-লেহাজ কী করতে হবে তা আমাদের ধর্ম ও সামাজিক এথিক্স আচার আমাদেরকে গড়ে তুলে থাকে। সেসব মুল্যবোধ আমাদের পিছনে টেনে রাখবে, তাই। অতএব আমাদেরকে তৈরি করা এই সমাজ থেকেই একজনকে তুলে নিয়ে পুলিশ বানাতে গেলে সবার আগে  আদব-লেহাজ সংক্রান্ত যেসব ভ্যালুজ সামাজিক মানসিকতা ওর তৈরি হয়ে আছে তা আগে ভেঙ্গে দিতে হবে। আর এর বদলে পুলিশের ক্ষমতা কাঠামো অনুসরণে ও পুলিশ প্রশাসনিক কালচারে ওকে রপ্ত করাতে হবে।  আসলে যেকোন বলপ্রয়োগ বাহিনী গড়তে গেলে এমন বাহিনীমাত্রই এমন সবচেয়ে নুন্যতম ট্রেনিং তাদের দিতেই হবে।  কিন্তু সরকারি বিভিন্ন বাহিনী তৈরির ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক হলেও একটা সরকারি ছাত্রলীগ এই ফর্মুলা অনুসারে তৈরি করা এটা ভয়ঙ্কর ও অকল্পনীয় বললে কম বলা হল। এটাই আসলে সমাজের নানান স্তর নিয়ন্ত্রণের হিটলারের ফর্মুলা।

বিশেষত বুয়েটের ছাত্রলীগ এভাবেই ট্রেনিংপ্রাপ্ত। প্রথম বা দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র যখন সহপাঠী বা কাউকে ধরে এনে টর্চার করতে সক্ষম হয় এবং এর পরেও কোনো শাস্তি ছাড়া সদর্পে বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাইরের সমাজে ঘুরতে পারে; এর অর্থ হল, কার্যত সংশ্লিষ্ট ঐ ছাত্রনেতা বা তাঁর ছাত্রলীগের অধীনে চলে যায় ভিসির প্রশাসন আর বাইরেরও পুলিশ প্রশাসনেরও কিছু অংশ। এই হল প্যারালাল ক্ষমতা। জামাত-শিবির দমন ও নির্মূল- এই সাফাই বয়ানের কাভারে। বিরোধী যেকোন পক্ষের উপর ওভার-পাওয়ারিংয়ের ক্ষমতা। অথচ ভিসির ভাষ্যমতে এগুলা নাকি র‍্যাগিং। আর ভিসি ও প্রশাসন  কথিত র‍্যাগবিরোধী কয়েকটা পোস্টার সাটিয়ে মনে করেছেন তাদের দায় শেষ।  আবার শিক্ষামন্ত্রী দীপুমনির র‍্যাগিংয়ের পক্ষে সাফাই দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, যা খুবই আপত্তিকর। প্রশ্রয়মূলক সাফাইয়ে তিনি বলেছেন, “সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কমবেশি র‍্যাগিং আছে: শিক্ষামন্ত্রী”। এটা টু মাচ! মন্ত্রী অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় দায় নিচ্ছেন, প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এটা তাঁর কাজ না। ছাত্রলীগকে দায়মুক্ত রাখার প্রচেষ্টার এই বক্তব্য আত্মঘাতী। এক সময় এটা তাদের সবারই বিরুদ্ধে যাবে। প্রথমত এটা র‍্যাগ নয়, পুলিশি ম্যানুয়ালে ছাত্রলীগের ট্রেনিং। এক প্যারালাল প্রশাসন, এটা মনে রাখতে হবে।

প্রতি বছর সারা দেশের উচ্চমাধ্যমিক পাস স্টুডেন্টদের থেকে বুয়েট নির্বাচনী পরীক্ষার মাধ্যমে ছেঁকে টপ সাড়ে পাঁচ শ’ (একালে সংখ্যাটা বোধহয় প্রায় ডাবলেরও বেশি ) স্টুডেন্টকে তুলে আনে বুয়েট। এই আইডিয়াটার জন্য বুয়েটের প্রথম ভিসি প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুর রশিদকে আমরা এই সুযোগে সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে নিতে পারি। তিনি বুঝতেন (১৯৫৮), নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রকে নিজের পায়ে দাড় করাতে গড়তে মেধাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার কেন পাইওনিয়ার। এবারের বুয়েটের ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে ভারতীয় মিডিয়া ভারতে তাদের নিজের পাঠকের জন্য  – বুয়েট কী, তা বুঝাতে একটা শব্দ ব্যবহার করছে “এলিট’ বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট”। বাংলাদেশের আমরা বুয়েটের ক্ষেত্রে “এলিট” শব্দ ব্যবহার করি না। “এলিট” [elite] শব্দটা মূলত সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে উপরের স্তরের মানুষ বুঝাতে ব্যবহার করা হয়। ছেঁকে টপ সাড়ে পাঁচ শ’ স্টুডেন্টকে বুয়েটে তুলে আনা হয় বলে এবং কেবল ‘মেধা’ অর্থে, বুয়েট অবশ্যই এলিট। কিন্তু সাবধান, একে টাকাপয়সাওয়ালা সামাজিক এলিট বলে বুঝা ভুল হবে। এমনকি আবরার হত্যা ঘটনায় যে উনিশ (বা কিছু বেশি) তরুণ ছাত্র-আসামি তাদের অন্তত একজন ভ্যানচালকের সন্তান। এটা বাংলাদেশে এখনো সম্ভব। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পয়সা লাগে না, মেধা হলেই চলে। তাই এটা সম্ভব। তবে আমাদের সমাজের চোখে বুয়েট এতটা চোখের মণি হয়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হল, তুলনামূলক অর্থে ইঞ্জিনিয়ারের চাকরির সুযোগ বেশি, চাকরিতে সুযোগ সুবিধাও বেশি, আপসে ও বিনা খরচে বিদেশে পড়া বা চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। পশ্চিমা গ্রহীতা দেশে তারাই আগে গ্রিন কার্ড পেয়ে যান ইত্যাদি।

এসব মিলিয়ে বলা যায়, পুরা সত্তর-আশির দশক তো বটেই, এমনকি নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত (তবে কিছুটা শিথিলভাবে) বুয়েট ও এর প্রশাসন তুলনামূলকভাবে মডেল বা আদর্শ ছিল। যেমন সবসময়ই কোনো ছাত্রের অসদাচরণের জন্য যদি প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি বসানো হত, সেটা ছিল যেকোনো ছাত্রের জন্য জীবনের সব স্বপ্ন বরবাদ হয়ে যাওয়ার সমান। কারণ, অল্প কিন্তু সিরিয়াস দোষে সে বহিষ্কৃত হয়ে যেতে পারে। এর মূল কারণ, প্রশাসনের স্বচ্ছনীতিতে চলা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। খুব সম্ভবত রশীদ স্যারের সেট করে দেয়া প্রশাসনিক নিয়ম ও আদর্শ তার উত্তরসূরিদের আকর্ষণ, উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য করতে পেরেছিল। সমাজে-রাষ্ট্রে একটা “প্রতিষ্ঠান” গড়ে তোলার অধ্যবসায় ও পরিশ্রম; আর এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার গুরুত্ব এসময়-গুলো সম্ভবত সবাই বুঝত, অন্তত দায় বোধ করত। এমন হওয়ার আরেক বড় কারণ হল, দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে বুয়েট প্রশাসনের একটা দূরত্ব রাখা। আসলে বুয়েটের ছাত্র বা শিক্ষকরা রাজনৈতিক প্রভাব জোগাড় করে তা খাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুবিধা পাওয়ার চেয়ে নিজ যোগ্যতায় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা সমাজে আরো ঢের বেশি থাকত বলে সে দিকে ছাত্র ও শিক্ষকেরা আগ্রহী হতো না। কিন্তু মোটা দাগে নব্বইয়ের দশক থেকে এর ঢলে পড়া শুরু। বুয়েটের মূল কালো জায়গা ভিসি নির্বাচন, আর সেখান থেকে দলবাজি, দলকানা হয়ে নিয়ম-আইন ও রেওয়াজ ভেঙে ফেলা। খামোখা বড় দুই দলেরই সমর্থক  সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মুখগুলো এসব আত্মঘাতী ও অবিবেচক সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী। আর ২০০৯ সালের পর থেকে এরই নতুন ডাইমেনশন হল – বুয়েটের এক ‘পুলিশ ম্যানুয়ালে’ চলে যাওয়া, যার অর্থ ভিসিসহ প্রশাসন ছাত্রলীগের অধীনে কার্যকর হওয়া।  প্যারালাল ক্ষমতার নির্যাতন কক্ষের বুয়েট – একারণেই আজকের বাস্তবতা।

এটা ভুলে যাওয়ার কিছু নেই যে, গত এগারো বছর ধরে বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ম নিয়ন্ত্রণ সব ভেঙে গেছে। বাইরের এসব প্রভাব ঠেকিয়ে একা বুয়েট কতটা ঠিক থাকবে? কিন্তু তাই বলে, ছাত্রলীগের অধীনে ভিসিসহ প্রশাসন চলে যেতে পারে না। পুলিশ কমিশনার এসে ভিসি-প্রভোস্টসহ প্রশাসনকে না ছাত্রলীগ সেক্রেটারিকে জিজ্ঞেস করবেন, ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকবে কি না!

তবে মূলত সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়ে পরার কারণে আপাতত পরিস্থিতি পালটে গেছে। তাই দৃশ্যত সময়টা এখন সরকারের দিক থেকে সমস্ত  দায় অস্বীকার করার। যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরম ভাষায় পুরা দায়ে দায়ী করেছেন ভিসিসহ বুয়েট প্রশাসনকে। বলেছেন, ‘বুয়েট প্রশাসনের আরেকটু সতর্ক থাকা দরকার ছিল’। কোথায় সতর্ক থাকা দরকার? তিনি উল্লেখ করে বলছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন না ডাক দিলে পুলিশ ভেতরে ঢোকে না জানিয়ে তিনি বলেন, এ জায়গাটিতে” সতর্ক থাকা দরকার। অর্থাৎ আবরারকে হত্যা করার দায় ছাত্রলীগেরও নয়। সরকারেরও না – এককভাবে ভিসিসহ বুয়েট প্রশাসনের!
তাহলে এবার বুঝেছেন ‘কার স্বার্থে’ বুয়েটের ভিসি সাইফুল ইসলাম আপনি, এতদিন ছাত্রলীগের অধীনে প্রশাসন চলতে দিলেন? কেউ দায় নিবে না। নেওয়ার কথা না। সত্যিকারভাবে বললে, ভিসি ও তার প্রশাসন প্রভোস্ট, সহ-প্রভোস্ট, ডিএসডাবলু আপনারা সকলে সীমা পার হয়ে [হত্যায় সহায়তা করা] একটা ক্রিমিনাল অপরাধের জোনে চলে গেছেন। ভেবেছেন সরকার চাইলে আপনাদের কোন দায় নাই। সরি। এটা একেবারেই ভিত্তিহীন ধারণা। আদালত ‘চাইলে’ আপনাদেরকেও অপরাধে সংশ্লিষ্ট করতে পারে। প্রশাসনের ক্ষমতা শেয়ার করার দায় আপনাদেরও।

আবার দেখেন, গত ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলন (‘যুগান্তর’ লিখেছে) প্রসঙ্গে শিরোনাম, “সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হল তল্লাশির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর”। মূলত হলে টর্চার সেল থাকা প্রসঙ্গে কথাটা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোসহ হল তল্লাশির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, হল দখল করে রেখে মাস্তানি করা চলবে না। সারা দেশে খোঁজ-খবর নেয়া হবে’। অর্থাৎ এর সোজা মানে প্রধানমন্ত্রী মানে তাঁর সরকার ও দল এই হত্যার কোন দায় নিচ্ছেন না।

এখন যদি তিনি সিরিয়াস হয়ে বলে থাকেন তাহলে বড়জোর আমরা জানতে চাইতে পারি, ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, আর কী অগ্রগতি হয়েছে তাতে। আর যদি কথার কথা এটা হয়ে থাকে তাহলে পাবলিকের আর কিছু বলার নাই। তবে এতটুকুই কেবল জানিয়ে রাখতে পারি যে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার পরিণতি দেখে পাবলিকের  “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের” উপর আস্থা কতটুকু সেটাও চাইলে তারা খোঁজ নিয়ে নিতে পারেন। এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, আবরার হত্যার এক আসামি ‘অমিত সাহা’, আবরারকে খুনের প্রসঙ্গে তাকে আদালতে তোলার এক ফাঁকে তিনি যুগান্তরকে বলেছেন, ‘বুয়েটের ট্র্যাডিশনই এটা যে, অর্ডার ওপরের (সিনিয়র) থেকে আসে। সিনিয়র ব্যাচ অর্ডার দিলে জুনিয়র ব্যাচ তা করতে বাধ্য। এটা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই”।
এই ‘উপরের’ বলতে কত উপরের? সেটা এক বিরাট প্রশ্ন! জবাব পাওয়া খুবই মুশকিল।  তবে বোকা হয়ে যাওয়া অমিত সাহা হয়ত ভাবছেন এটা বলে তিনি সরকারকে জড়ায় ফেলতে পারবেন!  আমরা খুবই দুঃখিত অমিত সাহা।  আপনি আটকে গেছেন। আপাতত মুক্তি নাই। কিন্তু ‘সিনিয়র ব্যাচ অর্ডার দিলে জুনিয়র ব্যাচ তা করতে বাধ্য’- বুয়েটে কখনও এমন ট্র্যাডিশনের কথা আমাদের জানা নেই। হতে পারে একালে ২০০৯ সালের পরের কথা। কিন্তু তবু নিশ্চিত থাকেন আপনার দায় এখন কেউ নিবে না।

ওদিকে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত প্রমুখ বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে ডঃ আইনুন নিশাতের একটা মন্তব্য দেখেছিলাম টিভি নিউজ ক্লিপে যার সারকথাটা হল – “বুয়েটের হল প্রশাসন আর প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্টের হাতে ছিল না”। যেখানে বুয়েট চলে ছাত্রলীগের পুলিশি ম্যানুয়ালে, সেখানে হল প্রশাসন তো এমনই হওয়ার কথা। প্রশ্ন হল, তাহলে হল প্রশাসনের প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্ট ‘কোন লোভে’ এই বাড়তি প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে আসতেন? ‘চেতনা’ বা লীগ ভালোবাসেন বলে ছাত্রলীগের অধীনে থেকে  প্রশাসন চালাতে তাদের ভালো লাগত? অথবা এটা বাড়তি কোনো সুযোগ সুবিধার অর্জনের খাতিরে!

জামিলুর রেজা চৌধুরীর উপস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপুমনি খুবই নাখোশ। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি, যেটা অবশ্য খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আবার বুয়েট ভিসি ভোয়া এবং যুগান্তরের কাছে বলেছেন যে, কেন জামিলুর রেজা চৌধুরী তার পদত্যাগ চাইলেন? ভিসি উল্টা দাবি করেছেন, তিনি কোনো দোষ করেননি। তাই পদত্যাগ করবেন কেন? তাহলে ভিসি সাধারণ ছাত্রদের সাথে আলোচনায় অন্তত দু’বার ক্ষমা চেয়েছেন। দেখুন ‘যুগান্তরে’, ‘ক্ষমা চাইলেন বুয়েট ভিসি’। এটা কি তাহলে, স্ববিরোধী নয়? আর তাঁর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হল – পুরা বুয়েট প্রশাসন ছাত্রলীগের পুলিশি ম্যানুয়ালে বা কাঠামোতে চলে যাওয়া। এটা তিনি যেতে দিবেন কেন? এটা তাঁকে দেয়া ক্ষমতা, এই ক্ষমতা তিনি কাউকে দিবেন কেন? গেল কী করে? ভিসি ছাত্রদের সাথে ওই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগের সব টর্চারের বিচার করবেন।
এতে আসল কথা হল দুইটা। এক, স্বীকার করলেন, আগে বুয়েটে নির্যাতন হয়েছে। তাহলে তখন কোন অ্যাকশন নিলেন না কেন? এটা কি আপনার গুরুতর ব্যর্থতা নয়? দ্বিতীয়ত, আপনি এখনই এবারে বিচার করতে সক্ষম হবেন কেন? আপনি সরকারের দলীয় হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পারবেন, এর নিশ্চয়তা কিভাবে দিবেন? গত কয়েক বছর ধরে আপনার ওপর ছাত্রলীগের কর্তৃত্ব করা ঠেকাতে পারেননি। ছাত্রলীগের অধীনে চলে গেছেন আপনি। এটাই আপনার চরম ও পরম অযোগ্যতা। আপনার কাছে এখনো দল অনেক বড়, আপনার ভিসি হিসেবে দায়িত্বের চেয়েও বড়। এর চেয়ে বড় অযোগ্যতা আর কী?

বুয়েট এখন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাথে শিক্ষক রাজনীতিও। অনেকেই দেখছি হতাশ; সম্ভবত রাজনীতি নিষিদ্ধ” এই বাক্য কয়টার কারণে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ কথাটার অর্থ বুঝতে হবে। বুঝতে হবে পাশে লেখা ‘শিক্ষক রাজনীতিও নিষিদ্ধ” – এইকথার ভিতর দিয়ে। আসলে সকলে চেয়েছে যেকোন উপায়ে ক্ষমতাসীন সরকারের হস্তক্ষেপের সুবিধা বন্ধ করতে। কিন্তু তা কার্যত সম্ভব নয়। অন্তত আজকের বাংলাদেশে। তাই  সরকারের হস্তক্ষেপ ঘটার যে মাধ্যম “শিক্ষকদের পেটি কামড়াকামড়ি” – এটাকে দূরে রাখতে যদি পারা যায় সেটা আপাতত মন্দের ভাল হতে পারে। আবার সিনিয়র ও শিক্ষকদের অবস্থা বুঝা যাবে চলতি ভিসির সাক্ষাতকার, জামিলুর রেজা চৌধুরীর সম্পর্কে মন্তব্যে, আর পরে ডঃ আইনুন নিশাতের দেয়া প্রথম আলোতে সাক্ষাতকারে। তবে মোটের উপর এটা কতটা কাজ করবে তা নির্ভর করছে সরকারের উপর। হাসিনা যদি এই বুয়েট প্রতিষ্ঠানের মর্ম বুঝে থাকেন, এই প্রতিষ্ঠানের সাথে রাষ্ট্র গঠনের সম্পর্ক উপলব্দি করে থাকেন, তাহলেও অনেক কিছু সম্ভব। হাসিনার নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ পাশে সরিয়ে রেখেও তা তিনি করতে পারেন। তবে শুরুতে এটা চলতি ভিসিকে রেখে এটা একেবারেই অসম্ভব, তা বলাই বাহুল্য।

কাজেই ভিসি নিয়োগের পদ্ধতি বদলানো থেকে শুরু করে সব স্বচ্ছ করা ছাড়া, সর্বোপরি রাজনীতিবিদদের দলীয় ভিসি পাওয়া দরকার-  এই চাহিদা বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত পাবলিকের মুক্তি নেই।

সবশেষে কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের স্ববিরোধী দোলাচাল বা শিফটিংঃ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ, কমিউনিস্ট দল সিপিবির সদস্য। এখানে তাকে কেন্দ্র করে কিছু কথা বলব তবে সেটা ব্যক্তি আকাশ নয়, তাই কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের একজন প্রতিনিধি হিসাবে তাকে বিবেচনা করে এটা পাঠ করলেই সুবিচার হবে।
গত ২০১৫ সালে ১৬ মার্চে সমকাল পত্রিকায় তারই লেখা একটা কলামে তিনি বলেছিলেন, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির এ ক্ষেত্রে যা করণীয় সেটা হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসী শক্তিকে যদি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও দুর্বল ও নিঃশেষিত করতে পারে, তাতে বাগড়া না দেওয়া”। এর সারকথাটা হল, “আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও” জামাত-শিবিরকে “নিঃশেষিত করতে পারে, তাতে বাগড়া না দেওয়া” -।  মানে জামাত-শিবিরের রাজনীতিকে “রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও” নির্মুলে তার আপত্তি নাই, উতসাহ আছে।
তাহলে এখন এবার আবরারের হত্যার পর এক সমাবেশে তিনি সরকারকে অভিযুক্ত করে সরকারের অবস্থান ও নীতিকে ব্যাখ্যা করে বলছেন, “…যে আমি ফ্যাসিবাদি কায়দায় , বক্তব্যের স্বাধীনতা দিবনা”।  অর্থাৎ আবরারের পক্ষে দাঁড়িয়ে এখন তিনি সরকারকে বক্তব্যের স্বাধীনতা না দেওয়ায়,  সরকারকে ফ্যাসিবাদী বলে অভিযোগ আনছেন।

এর অর্থ কী আকাশ কী এখন অবস্থান বদলেছেন? এছাড়া আরও বলছেন, “……কেউ শিবির করলে,যদি সেই শিবির করে,তাহলে তার সেই অধিকার আছে কিনা সেটার তো মীমাংসা করতে হবে”।
এটা একা আকাশের নয় কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের সাধারণ সমস্যা ও লক্ষণ। জামাত-শিবিরের মত বিরোধী মতকে একবার মনে করে এদের নির্মুল মানে জবেহ করা উচিত। আবার আর এক সময় মনে করেন বিরোধী মতকে জায়গা করে দিতে হবে। ছাত্রলীগকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার আইনে মামলা করার। মানে খুন না করে সাইবার আইনে মামলা করতে।
আবার সবশেষে বলছেন, শিবিরের অধিকার কী কী সেটার তো মীমাংসা করতে হবে!
এই সমস্যার সোজা জবাব হল কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের কাছে এর মীমাংসা নাই। বা বলা যায় তারা মীমাংসা করতে পারবে না। মূল কারণ, “অধিকার” অথবা “নাগরিক অধিকার”  কমিউনিস্টদের রাজনীতিই নয়। কাজেই ২০১৫ সালেরটা না এখনকারটা – এদুটোর কোন একটা তাদের কৌশলগত বক্তব্য।

এর সমাধান মীমাংসা পেতে চাইলে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীতার বাইরে দাঁড়াতে হবে।


গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১২ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে দেশে আসলে কী হচ্ছে?এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]