“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

গৌতম দাস

০৪ মার্চ ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2eb

 

দিল্লির নাকি আঞ্চলিক আধিপত্য  ছিল অথবা আছে কিংবা কায়েম করতে হবে – এধনের অনুমানের উপর অনেকেই কথা বলেন দেখা যায়। শিরোনামের “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” কথাটা আমার না। ভারতীয় শাখার থিঙ্কটাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ‘কর্ণেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর সি রাজামোহনের থেকে ধার নেয়া। দিল্লি নাকি এতদিন তাঁর কথা শুনে নাই। তাই  হতাশ হয়ে তিনি বলছেন এটা বাগড়ম্বরা; “……দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”।  এখন “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” তো  বাগড়ম্বরাই তাহলে আর আমাদের সরকারের উপর ভারতের ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ এর চাপাচাপি  – এটা তো আসলে ফালতু কথাবার্তা। হাসিনার আবার “নির্বাচিত” হবার ঠেকা আছে বলে তাকে অপব্যবহার করার সুযোগ নেয়া নয় কী? আসলে কুঁজা লোকেরও চিত হয়ে শোয়ার শখ হয়!

‘সাবমেরিন কেনা’ শব্দটা আমাদের মিডিয়ায় হারিয়ে আস্তে আস্তে যত পেছনে চলে যাচ্ছে, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ ব্যাপারটা ততই ভাসুরের নাম নেয়ার মতো আকার-ইঙ্গিত থেকে এবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এই বিচারে গত পয়লা এপ্রিল ছিল ভারতের সাথে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’-এর পক্ষে বড় ও প্রকাশ্য উচ্চারণের দিন। সংবাদ সংস্থা বাসস জানাচ্ছে, সেদিন ‘ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইক্ল্যাডস) আয়োজনে রাজধানীতে লেকশোর হোটেলে এক গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে। সেখানে আলোচনার শুরুতে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন এর নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ। আগ্রহীরা মো:আবদুর রশীদ এর পুরা লেখাটা পেতে পারেন, দৈনিক সমকাল পত্রিকাতে, সেখানে পুরা লেখাটাই উনার নিজের নামে ছাপা হয়েছে। (দেখুন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’)। লেকশোর হোটেলের ঐ গোলটেবিল বৈঠক এটাকে মূলত সরকারের পক্ষের পেশাজীবীদের সমর্থন সমাবেশ বলা যেতে পারে। সেখানে মো: আবদুর রশীদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, “প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অবয়ব আমরা জানি না এখনো”। অর্থাৎ ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ ভারত কী প্রস্তাব করেছে তা অনেকের মতো তারও জানা নেই। ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ কথাটা ভারতের মিডিয়া থেকে নিয়ে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ধারণাপত্রে সারকথা হলো তিনি শর্তসাপেক্ষে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ স্বাক্ষর করার পক্ষে। তিনি বলছেন, “সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা খর্বের শর্ত না থাকলে এবং সামরিক জোটের ক্ষেত্র বাদ দিয়ে সামরিক সহযোগিতা হতে কোনো বাধা নেই। রাজনৈতিকভাবে বন্ধুকে সামরিকভাবে বৈরী ভাবার কোনো যুক্তি নেই”। যার সোজা অর্থ, ‘নিজ সার্বভৌমত্ব খর্ব’ করা যাবে না আর, ভারতের সাথে কোনো ‘সামরিক জোটে’ ঢুকে পড়া যাবে না। কিন্তু কি হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন বা খর্ব হবে এর ব্যাখ্যা কে দিবে। হয়ত একটা ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ হয়ে যাবার পরেও মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ এর কাছে মনে হতে পারে যে সেটাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হয় নাই। দ্বিতীয়ত  বিএসএফ গুলি করে সীমান্তে বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা চলে । সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষা বা গণপ্রতিরক্ষার সুনির্দিষ্ট নীতি দাঁড় না করালে বিমূর্ত ভাবে ভারতের সঙ্গে ‘সামরিক সহযোগিতা’ কথাটা কোন অর্থ বহন করে না। সেটা কি সহযোগিতা নাকি দাসত্বের দাসখৎ তা আমরা ফাঁপা কথাবার্তা দিয়ে বুঝব না।

সামরিক সহযোগিতা নিয়ে ফিসফিসানি থেকে শুরু করে লেকশোর হোটেলের গোলটেবিল আলোচনা দেখে এখন স্পষ্ট করে বলা যায় যে, বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ‘কথিত’ সামরিক চুক্তি প্রস্তাব নিয়ে চোরাগোপ্তা আলোচনাটা চার মাসের শেষে আর আড়ালে আবডালে রইল না। তবে প্রথম কিঞ্চিত একে প্রকাশ্য দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল ভারতের বরাতে আমাদের মিডিয়ায় বাংলা ট্রিবিউনে গত বছর ডিসেম্বরের ১ তারিখে। দেখুন, “সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ভারতের নতুন প্রস্তাব”। আর এরপর গত ১০ ডিসেম্বর আনন্দবাজার লিখেছিল, “দিল্লিতে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন হাসিনা। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর গোপালকৃষ্ণ প্রভু পর্রীকর ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করেছেন”।  আগ্রহিরা এবিষয়ের আরও দেখতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও দেখতে পারেন (এখানে দেখুন, Bangladesh keen to forge expanded military ties with India)।  ভারতের আনন্দবাজার ৯ ডিসেম্বর রিপোর্ট করেছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ডিফেন্স প্যাক্ট করতে যাবার সফর পিছিয়ে গেল।  (দেখুন, ‘পিছিয়ে গেল সফর, ফেব্রুয়ারি নাগাদ আসতে পারেন হাসিনা’)।

তবু ,এমনকি গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পরেও, আমাদের মিডিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে কোনো রিপোর্ট ছেপেছে বলে দেখা যায়নি। ফলে ভারতের কথিত ডিফেন্স প্যাক্ট’-এ কী আছে তা আমরা কেউই জানি না। তবে ভারতীয় মিডিয়ার বক্তব্য নিয়ে একধরনের কানাঘুষা উঠছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রকে ব্যাশিং নিয়ে। সেটা অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে ডিফেন্স প্যাক্টে কী আছে তা নিয়ে নয়। কিন্তু গত এক সপ্তাহে আমরা দুটো গোলটেবিল হতে দেখলাম। প্রথমটা ২৮ মার্চ প্রথম আলোর আয়োজনে ( দেখুন, ‘ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও ঘাটতি আস্থায়‘); আর পরেরটা এ লেখায় আগেই উল্লিখিত হয়েছে (যুগান্তরের রিপোর্ট দেখতে পারেন, ‘ভারত বিরোধিতা রাজনৈতিক কৌশল, ২ এপ্রিল ২০১৭) ‘। এতে একটা লাভ হয়েছে যে ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে ভারতের প্রস্তাব যে আছে, আমাদের মিডিয়ায় তার স্বীকৃতি মিলল। সরকারের সম্ভবত দ্বিধা ছিল বিষয়টা নিয়ে খোলা আলাপ হলে তা কোথায় গড়ায় তা নিয়ে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশে ভারতের বাংলাদেশ নীতিরযারা সমর্থক তারাও সমস্যায় ভুগছিলেন। কারণ সরকারের পক্ষে তারা চুক্তির সমর্থনে নামুন, তাতে ভারতীয় হাইকমিশন সম্ভবত নিজের স্বার্থ দেখলেও কিছু করা যাচ্ছিল না। ফলে লেকশোর হোটেলের এই গোলটেবিলকে তাদেরই উদ্যোগ হিসাবে দেখা যায়। 

ওদিকে প্রথম আলোর ২৮ মার্চের গোলটেবিলের আগে গত ১৩ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খানের কলামটা ছিল উল্টা অবস্থানের।  (দেখুন,  ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, তিস্তা চুক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা’)।  মিজানুর রহমান, তিনি ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বলে সব নষ্টের গোড়া এক শত্রু হাজির করেছিলেন।  অর্থাৎ মিজান প্রচ্ছন্নে ডিফেন্স প্যাক্টের পক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছিলেন। একই কথা লেকশোর হোটেলের গোলটেবিলে আলাপেও দেখা গিয়েছিল শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্যে; এটা মূলত ভারতীয় কূটনীতির কৌশলগত বয়ান। যাই হোক মিজানের ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বয়ানের পরে ২৮ মার্চ এবার প্রথম আলোর গোলটেবিলে বসে দেখতে পেয়েছে, ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা সাম্প্রতিক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে গেছে। তার পরও দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কে আস্থার সঙ্কট লক্ষ করা যায়’। বাংলাদেশে  ‘ভারতের বাংলাদেশ নীতি’র কোনো সমর্থক যখন দিল্লি-ঢাকার ‘পারস্পরিক আস্থার সঙ্কট’ দেখতে পান, তখন এটা তাৎপর্যপূর্ণ মানতেই হয়। প্রথম আলোর গোলটেবিলের সার মূল্যায়ন হলো, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ অপ্রয়োজনীয়। ওপরে প্রথম আলোর রেফারেন্সেই দেখুন, নিজেই লিখেছে এভাবে: “কোন প্রেক্ষাপটে, কী প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সহযোগিতার রূপরেখা হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে”।

এরপরেও যেটা দুঃসংবাদ হয়ে এখনো রয়ে গেছে তা হলো, যেটাকে শুধু ডিফেন্স প্যাক্টবলে এক বোঝাবুঝির মধ্যে রাখছি তা পুরো ইস্যুটার খুবই ক্ষুদ্র অংশ। মুল ইস্যুটা অনেক ব্যাপক।  পুরা ইস্যুটা আসলে কেবল বাংলাদেশ তো নয়ই, সাথে ভারতকে নিয়েও নয়; রিজিওনাল! হা, আঞ্চলিক তো বটেই, বরং আরো কিছু। এমনকি আগামীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা ভারত সমর্থন করবে কি না এতটুকুতেও সীমিত নয়।

বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় থাকবে ভারতের কেবল এতটুকুর নির্ণায়ক হওয়াতে তা আগামি আর যথেষ্ট হচ্ছে না। এত দিন তো ভারত নির্ণায়ক হয়েই ছিল বা আছে। তা , প্রতীকীভাবে কথাটা বলা যায় এভাবে: গত বছরের অক্টোবর মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ভারত সরকারের সস্তা জাতীয়তাবাদে তাল দিতে ভারতের মিডিয়া সারাক্ষণ চীনা ব্যাশিং করে থাকে। ওদিকে আবার যদিও ভারতের প্রতিটা রাজ্য সরকার কিভাবে গুজরাটের মতো চীনের সাথে বিশেষ সম্পর্ক পাতিয়ে নিজ রাজ্যে বিনিয়োগ-বাণিজ্য আনবে এর জন্য উদগ্রীব আর পরস্পর প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে, তা ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক জানিয়েছেন। ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি থেকে শুরু করে এনডিটিভির অ্যাঙ্কর-সাংবাদিক বরখা দত্ত, সবাই পাবলিক আলোচনায় এটা উল্লেখ করতে ভোলেন না যে, তাদের ফ্রেন্ডলি এক সরকার বাংলাদেশে বসানো আছে। এনডিটিভিতে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকে মাথায় রেখে বরখার এঙ্করে এক টকশোর আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, একটা ধাঁধার উত্তর জানা। তারা সবাই জানেন, বাংলাদেশে তাদের পছন্দের একটা “বন্ধু সরকার” আছে। প্রায় তাদের সব প্রয়োজন পুরণ করতে খেদমত করার জন্য একপায়ে খাড়া হয়ে।  কিন্তু তাহলে এখানে চীনা প্রেসিডেন্ট সফরে আসেন কেমনে? তার সঙ্গে হাসিনার এত কী খাতির? তাইলে কি তাদের ‘ফ্রেন্ডলি সরকার’ ধারণাটা ভুল? এই ধাঁধার জবাব কী? তো ইতোমধ্যে তারা ঐ টকশোতে জানিয়েছে যে প্রেসিডেন্ট শি ওই সফরে বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিতে আসছেন। ফলে আলোচনা শেষে ওই টকশোর কনক্লুশন হলো, ভারত তো আসলে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ গ্রহীতা দেশ। সে নিজেও চীন থেকে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ নিচ্ছে। ফলে ২৪ বিলিয়নের তুলনায় ভারতের ২-৩ বিলিয়ন (তাও অবকাঠামো খাতে নয়, টাটার স্টিলে তৈরি বাস বা রেল পণ্য বিক্রির খাতে) বাংলাদেশে বিনিয়োগ – এদুটা ফিগার কি তুলনীয়? কোনোভাবেই না। তাই তারা বিমর্ষ হয়ে মেনে নিয়েছিল যে, এই খাতে বাংলাদেশে চীনের ভূমিকা ও প্রয়োজন অনেক বেশি আর সেটা ভারতের সাথে তুলনীয়ই নয়। এটা সেদিন অন্তত টকশোর লোকেরা বুঝেছিলেন। কথা আরো আছে; পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এখন বড় প্রজেক্টে বিশ্বব্যাংককে বাদ রেখেই অবকাঠামোর জন্য বিকল্প বিনিয়োগ ভারতের চরম অপছন্দের হলেও হাসিনা ঐ বিনিয়োগ চীন থেকে জোগাড় করে চলেছে। আরও আছে। ভারতকে ট্রানজিট দিতে যশোর থেকে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত নতুন যে রেল যোগাযোগ তৈরি করা হচ্ছে এই বিনিয়োগও চীন দিচ্ছে। সার কথায় ভারতের খায়েশ ট্রানজিট পাওয়া,  কলকাতা-আগরতলা ট্রেন যোগাযোগ অবকাঠামো বাংলাদেশ তৈরি করে দিচ্ছে, চীন থেকে বিনিয়োগ ঋণ নিয়ে।

এদিকে আর একটা বিষয় লক্ষণীয়, ইতোমধ্যে নির্বাচন সরকার বদল করে না বা কাউকে ক্ষমতায় আনে না;  নির্বাচন আর ক্ষমতায় থাকা- এটা আর সম্পর্কিত নয়। হাসিনার সরকার নিজেই এমন নীতিচালু করেছে, সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে সরকারের নতুন স্লোগান হলো, “ভালো নির্বাচন নয়; মূল কথা হলো জনগণের দরকার মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়ন”। আর এই সরকার নাকি উন্নয়নে চ্যাম্পিয়ন। তাই সব ঠিক আছে। একথাগুলো আমরা সবাই কমবেশি জানি। যেটা জানি না বা খেয়াল করা হয় নাই তা হল এই স্লোগান সরকার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এ জন্য যে, সে ভারতের কথা শুনে চীনের সাথে ঘনিষ্টতা ত্যাগ করে নাই। চীনকে হারায় নাই তাই। চীনের সাথে খাতির রেখেই বিনিয়োগ এনেছে। উল্টা বিশ্বব্যাংককে কলা দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক ও পশ্চিমকে মামলা প্রত্যাহার করতেও বাধ্য করেছে। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষমতার উৎস কাকাবাবু- এ কথা্টা একেবারেই সবটা সত্যি নয়। উন্নয়নেরস্লোগান চালু রাখতে গেলে কাকাবাবু না, শিং জিন পিংকেই  হাসিনার দরকার। এটা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি ভালো আর কে বুঝে? ফলে যারা ছদ্ম হাসিনাপ্রেমী সেজে ডিফেন্স প্যাক্ট করতে হাসিনাকে সমর্থন জোগাতে মাঠে নেমেছেন অথবা ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে আস্থাহীনতা দেখছেন এরা কেউ সরকারের সংকট সমস্যার গভীরতা বুঝে কথা বলছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।

সম্প্রতি চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করে গেলেন। বাংলাদেশেও আসার কথা ছিল। তা হয়নি। চীনের গ্লোবাল টাইমস গত ২১ জুন চীনা সাংবাদিক আই জুনের লেখা চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওই সফর নিয়ে এক রিপোর্ট ছাপে। শিরোনাম ছিল, “সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চীনের সংশ্লিষ্ট হওয়া নিয়ে ভারত অহেতুক অস্থির হয়”। দেখুন, (India over-sensitive on China’s engagement in South Asia) এই রিপোর্টে বহু কথা চাঁচাছোলা ভাষায় বলা হয়েছে। ওর কনক্লুশন বক্তব্য হলো, চীন পালটা লড়াই করবে। বলছে, ভারত বাধা সৃষ্টি করলে তাকে এমন ‘পাল্টা লড়ানি’ জবাব দিতে হবে; কারণ এটা চীনের কোর স্বার্থ। এটা মূলত চীনের সাথে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মৌলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক – বিনিয়োগ বাণিজ্যের সম্পর্ক। তবে চীনের কথাটা আবার আরও বড় প্রেক্ষাপট থেকে বলা। সেটা হলো চীনের ‘এক বেল্ট, এক সড়ক’ প্রজেক্ট। সাউথ-ইস্ট এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কারা এই ‘সড়ক ও গভীর সমুদ্র যোগাযোগের প্রজেক্টে’ যুক্ত হতে চায় – চীনের কাছে এখনকার সময়টা হলো, এমন সবার কাছে এই সুবিধা ফেরি করতে যাওয়া। স্বল্পসুদে লম্বা সময়ের এই অবকাঠামো ঋণ চীন সবাইকে দিতে চায়। এমনকি ভারতকেও। প্রেসিডেন্ট শিং এর বিগত বছর ঢাকা সফরের সময় এই প্রস্তাব রেখে গেছেন। গত সপ্তাহে নেপালের মাওবাদী প্রধানমন্ত্রী এই প্রজেক্টে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কাও চিন্তা করছে। আর পাকিস্তান ইতোমধ্যে চীনের কাছ থেকে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট নিয়েছে যা বেল্ট-সড়ক প্রজেক্টের অংশ এবং  অন্তর্ভুক্ত। বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে। এই প্রজেক্ট মূলত অর্থনৈতিক। কিন্তু এত বিশাল প্রজেক্ট, বড় বিনিয়োগের বলে একে প্রতিরক্ষার একটা ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সেই সূত্রে গ্রহীতা এই রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে তাদের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক প্রতিরক্ষা-সাহায্য চীনকে করতে হবে। এখন ভারত যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে খামাখা “পুরা সাউথ-ইস্ট এশিয়াকে নিজের বাড়ির পেছনের আপন বাগানবাড়ি” মনে করে, সেভাবে আচরণ করে — যেমন দেখেন, আজ পর্যন্ত ল্যান্ডলকড ভুটানের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত হতে দেয়নি ভারত, এভাবে যদি চলতে থাকে তবে চীনকে ফাইটব্যাক করতেই হবে, না করে উপায় কী? গ্লোবাল টাইমসে এই কথা গুলোই চাঁচাছোলা ভাবে বলা হয়েছে।

ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকলেও সবাইকে নাকি চীনের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে সম্পর্ক করত হবে ভারত এমন দাবি করে। “চীনের প্রতি পড়শি রাষ্ট্রগুলোর নিউট্রাল অবস্থানকেও” ভারত চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া মনে করে। ‘বল কিন্তু ভারতের কোর্টে’, যা করার সে কী করবে সে সিদ্ধান্ত ভারতকেই নিতে হবে।

ভারতের কৌশলগত বিষয় ও নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলোর বড় অংশটাই আমেরিকান ফান্ডেড। অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে সাজিয়ে খাড়া করার আমেরিকান নীতি – এরই প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে ভারতের নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলো। এরই অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। তিনি ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’- ওয়াশিংটনভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা ‘কার্নেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর। তিনি এখন নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ কলাম লিখেন ম্যানডেলা শিরোনামে। তিনি গ্লোবাল টাইমসের ওই রিপোর্ট নিয়ে লিখেছেন নিজের কলামে। রাজামোহন খুবই হতাশা ব্যক্ত করে নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে দিল্লির প্রস্তুতি নেই।’ ওই কলামের শেষ প্যারাটা অনুবাদ করে দিচ্ছি যেখান থেকে তার কথার একটা সারবক্তব্য পাওয়া যাবে। প্রথম আলোর অনুবাদটাই এডিট করেছি এখানে।

‘… গ্লোবাল টাইমস নয়া দিল্লিকে উপদেশ দিয়েছে, ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ব্যাপারটি দিল্লিকে মেনে নিতে হবে। এসব দেশে বেশি বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান শিকড় গাড়তে শুরু করলে চীন অনিবার্যভাবেই তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করবে। শুধু চীনের নয়,এই অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষার্থেও তাদের এটা করতে হবে।’

তামসার দিক হলো, রাজামোহন স্বীকার করে বলছেন, “ভারত দেরিতে হলেও এই ব্যাপারটা আমলে নিতে শুরু করেছে। দিল্লি এখন বুঝতে পারছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়তে থাকলে এর কৌশলগত রূপও দেখা যাবে, যার মধ্যে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারিও থাকতে পারে”। অথচ তা সত্ত্বেও আমরা দেখছি, ডিফেন্স প্যাক্ট করার জন্য হুদাই ভারত হাসিনাকে চাপাচাপি করছে। যে বাস্তবতা রাজামোহন মেনে নিয়েছেন তা ভারতের মানতে কষ্ট লাগছে। 

  বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে – একথা  এবং বাস্তবতা রাজামোহনও সহজেই মানছেন। তাই আরো বলছেন , কংগ্রেস সরকার চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পকে আপত্তিসহকারে মেনে নিলেও নরেন্দ্র মোদির সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর সম্পর্কেও সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে। ভারত আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা কূটনীতিও জোরদার করেছে। এতে বেইজিং ও দিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত বাড়বে। ভারত যে উপমহাদেশে চীনের ক্ষমতা বিস্তারের ব্যাপারে এত দিন পরে কার্যকরভাবে সাড়া দিলো, সেটাই বরং বিস্ময়ের ব্যাপার। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বহু দিনের সামরিক সম্পর্ক। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান হারে চীনের অস্ত্র বিক্রিকে ভারত এত দিন ভালোভাবে না নিলেও তারা আশপাশের দেশগুলোতে চীনের কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির ব্যাপারে একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। দিল্লি অনেক দিন থেকেই উপমহাদেশে নিজের স্বাভাবিক শক্তি সম্পর্কে আত্মসন্তুষ্ট ছিল”।

রাজামোহন শেষ বাস্তবতা মেনে নিয়েই যেন মানতে চাচ্ছেন না। ব্যাপারটা নাকি মূলক ভারতের “আমলা গোয়েন্দাদের আলস্য” এমন ব্যাখ্যার আড়ালে যেতে চাইছেন। তিনি লিখছেন, “স্বাধীনতার পর ভারত তার আশপাশে পশ্চিমা, বিশেষ করে ইঙ্গ-মার্কিন সামরিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ১৯৮০ সালে আফগানিস্তান দখল করে নেয়, তখন সে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করেছে। কিন্তু বহু দূরের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব আজ ২১ শতকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখন চীনের সামরিক শক্তি ভারতকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন ও রফতানির কথা বলেছেন, কিন্তু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলস্য দূর করাতে পারেননি”।

তিনি বলতে চাইছেন তিনি পরামর্শ দেয়া সত্ত্বেও কেউ শুনে নাই।   বলছেন, এমনকি তিনি “প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রতিরক্ষা কূটনীতির ব্যাপারটা গ্রহণ করাতে পারেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী বারবার অনুনয়-বিনয় করা সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ব্যাপক পরিসরে সামরিক বিনিময় করতে পারেনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মনোভঙ্গি না বদলালে ‘ভারতীয় আঞ্চলিক আধিপত্য’ ও ‘উপমহাদেশের কৌশলগত একতা’ নিয়ে দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”। এখানে এসে তিনি তিনি পুরা হতাশ, দোষারোপ আর হাল ছেড়ে দেয়া অবস্থায়।

আসলে বড় বড় হামবড়া কথার বিরুদ্ধে গ্রাম দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, “ট্যাকা লাগে চাচা! এমনি হইব না!” –  রাজামোহনের এখন সেই অবস্থা।  আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সমগ্র দিক সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ওয়াকিবহাল – আমরা ধরে নিতে পারি। । তাই আমাদের গোলটেবিল-ওয়ালারা তাঁকে চুক্তি করার হাওয়াই সাহস দিচ্ছেন বুঝা যাচ্ছে। রাজামোহনের মত কী আমরা বাস্তবতা মেনে নিব? কঠিন সত্যিটা হলো, চুক্তির বাস্তবতাই নেই- এটা তাদের কে বুঝাবে! আর এই বাস্তবতা বুঝেও কী প্রধানমন্ত্রী ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ যাবেন, শুধু আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন আবার পাবার কথা ভেবে? আর ওদিকে  ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’র পক্ষে চীনের প্রতিক্রিয়া কী স্বাভাবিক থাকবে? নিশ্চিত বলা যায় এটাও প্রধানমন্ত্রীকে আমলে নিতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে সর্ব প্রথম দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইন ০২ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এরপর এর আর এক ভার্সান ‘চিন্তা’ ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর এক ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর সব শেষে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন ও এডিটের পর এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনায় …………

বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনায় …………
গৌতম দাস
০৬ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2ah

বাংলাদেশ সর্বপ্রথম দুটা সাবমেরিন কিনে নিজের প্রতিরক্ষা নৌবহর সক্ষমতাকে কিছুটা ওপরের স্তরে উন্নীত করেছে। এগুলো চীননির্মিত। বাংলাদেশ তুলনায় ছোট অর্থনীতির মানে, তুলনা বিচারে স্বল্প রাজস্ব আহরণের রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্র যে বিপদে থাকে, তা হল নিজের  প্রাকৃতিক সম্পদ ও সীমানা সুরক্ষা ও সংরক্ষণ করতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম স্থায়ী সেনাবাহিনীর চাহিদা-খরচ পূরণে সব সময় টানাটানির মধ্যে থাকে। একারণে অর্থনীতি বড় ও সমৃদ্ধ হবার সাথে সাথে রাজস্ব আয় বাড়ে আর বহু জট খুলার রাস্তা দেখা যায়। সামরিক বাজেট বড় করার সক্ষমতা বাড়ে, পুরানা চাপাপড়া অভাব মিটানোর সক্ষমতা হাজির হয়। এছাড়া অর্থনীতি বড় হলে শত্রুও বাড়ে – সযন্তে রক্ষা করা মত নতুন অনেক স্টাটেজিক স্বার্থ (যেমন,  সমুদ্রপথে পণ্য আনা-নেয়ার প্রবেশপথ সুরক্ষা, সমুদ্র চলাচলের খোলা-জলরাশি (blue water) অবাধ রাখা ইত্যাদি) জলন্ত হাজির হয়ে যায় ফলে নতুন অর্থনীতিক সক্ষমতাসহ সবকিছুর সুরক্ষা এক বাড়তি প্রতিরক্ষা চাহিদা উপস্থিত হয়। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ইন্টেলেক্ট বা চিন্তাভাবনার জগত আস্তে আস্তে লায়েক হচ্ছে। আগের মত “আমাদের সেনাবাহিনীর কী দরকার” ধরণের  যে যেটা বুঝে না তা নিয়ে ফালতু কথা বলার চেষ্টা একেবারেই বন্ধ হয়ে না গেলেও অন্তত নিজেদের অযোগ্যতা খামতি অনেকেই বুঝতে পারছে বলেই মনে হয়। আবার সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে এই বয়ান যে কোল্ড ওয়ারের কালে আমেরিকার বিরুদ্ধে সোভিয়েত প্রপাগান্ডা বৈ অন্য কিছু ছিল না, বিষয়টা যে নিজের বিচারবুদ্ধি খরচ করে বুঝবার বিষয় তা সম্ভবত অনেকেই ইদানিং হুশে আসছেন। যদিও ব্যারাক-ভিত্তিক বাহিনীই প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তার একমাত্র উপায় নয়, জনগণ ও সেনাবাহিনীর দূরত্ব ঘুচানোর ভালো উপায় কী অথবা প্রতিরক্ষায় খরচ কতটা করা উচিত, তা কী কাজে লাগে ইত্যাদি নিয়ে প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় এখনও তর্ক-বিতর্ক আছে। তা পাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়- বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ ও সীমানা রক্ষার জন্য উপযুক্ত সরঞ্জামনির্ভর একটা বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সবাই স্বীকার করবেন। ব্যাপারটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোয়, যাদের তা দেখে বোঝার কথা, তারা বুঝে গিয়েছিলেন- বিশেষ করে বিগতকালে বার্মা বা মিয়ানমারের সাথে আমাদের স্থলসীমান্তে টেনশন এবং সমুদ্রসীমানায় আমাদের অংশে ২০০৮ সালে মিয়ানমারের তেল অনুসন্ধানের কার্যকলাপে বাংলাদেশে বাধা দেয়ার সময় থেকে। ফলে অন্ততপক্ষে মিয়ানমারের সাথে পেরে ওঠার পর্যায়ে আমাদের বাহিনীগুলোকে উন্নীত করা একটা তাগিদ তখন থেকে ছিল। ইতোমধ্যে সমুদ্রসীমানা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধ জাতিসঙ্ঘে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে এখন বলা হচ্ছে, এতে স্থলভাগের চেয়েও দ্বিগুণ বড় সমুদ্র-অঞ্চল এখন বৈধ আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবেই আমাদের ভাগে এসেছে। এগুলো বুঝেশুনে নেয়ার ও অন্তত ধরে রাখার কাজ সম্ভব করতে গেলে উন্নত নতুন স্তরে সশস্ত্রবাহিনীগুলোকে সাজানো খুবই প্রয়োজন। আরেক তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখযোগ্য দিক – বিকশিত হওয়া নতুন ঘটনা হল, বঙ্গোপসাগর নিয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের কাড়াকাড়ির টেনশন দিন দিন বাড়ছে। অনুমান করা যায়, সামনে আরো বাড়বে। এতে কারো দিকে ঝুঁকে না পড়া, কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে হলেও আর শুধু নিজের সীমানা রক্ষা করতে গেলেও ন্যূনতম সামরিক সক্ষমতা থাকা জরুরি। ফলে অনুমান করাই যায়, এসব প্রয়োজন পূরণের পরিকল্পনার অংশ হল সাবমেরিন কেনা। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি তা যতই অস্পষ্ট থাক না কেন তা আসলে কাউকে যেচে আক্রমণাত্মক নয়, নিজেকে সুরক্ষামূলক।
কিন্তু ভারত-চীনের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের মিডিয়া সব সময় আধা সত্য-মিথ্যা মেশানো তথ্য আর উগ্র দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি দিয়ে সবসময় ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে খামাখা উত্তেজিত করে রাখে। কারণ এগুলোই তাদের ভোটের বাজারকে প্রভাবিত করার দিক থেকে খুবই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ উপাদান। অনেক সময়, এই ভোট-বাজারে দেখিয়ে বেড়ানোর নির্বাচনী স্বার্থে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বহু মন্ত্রী পর্যায়ের সফরও ঘটানো হয়। সীমান্তে যুদ্ধাবস্থার ভাব টেনশন তৈরি করা হয় ইত্যাদি। ঠিক তেমনি, আমাদের সাবমেরিন ডেলিভারি পাওয়ার পর এর সাথে সম্পর্কিত ঘটনা নাকি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পাররিকর এর এবার বাংলাদেশ সফর। ভারতীয় বিশ্লেষকেরাই বলছেন, এমন সফর নাকি স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম। অনলাইন বাংলাট্রিবিউনে গত ১৬ নভেম্বর ভারতের সাংবাদিক রঞ্জন বসুর এ নিয়ে একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। টিপিক্যাল আনন্দবাজারি প্রপাগান্ডা স্টাইলের এক রিপোর্ট এটা। পড়লে মনে হবে যেন, যা মনে চায় এমন মিথ্যা আর বাড়ানো-চড়ানো কথা বলে হাটে গামছা বেচতে এসেছেন। এর একটা নমুনা দেখুন, ঐ লেখার প্রথম বাক্য হল, “চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের নৌবাহিনী দুইটি সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পাররিকর এ মাসের শেষে বাংলাদেশ সফরে যাবেন”। মনে হচ্ছে, পাররিকর আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোকে বকা দিতে আসছেন। আর যেন বকা দিয়ে বলবেন – ‘কী, তোমরা আমাদের না জানিয়ে সাবমেরিন কিনে ফেললে কেন?’। সেজন্য সাবমেরিন হাতে পাওয়ার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাররিকর এ দেশে আসতে হচ্ছে। আচ্ছা, এটা কি শিশুদের বাজারে  গিয়ে চুপে চুপে চকোলেট কেনা? তাই বড় ভাইয়ের বকা দিয়ে আসা? রঞ্জন বসু সাবমেরিনকে শিশুর চকোলেট কেনা ভেবেছেন! অথচ এটা সাবমেরিন – তাই কিনতে চাইলে অনেক আগে অর্ডার দিতে হয়। সে মোতাবেক ২০১৩ সালে এর অর্ডার দেয়া হয়েছিল। ফলে তখন থেকে দুনিয়াসুদ্ধ লোক যারা জানতে চায় সবাই প্রকাশ্যেই জানে এটা। তাই এ সাবমেরিন কেনা নিয়ে বাংলাদেশকে যদি জেনুইন কনসার্নে ভারতের কিছু বলার থাকে, তা তিন বছর আগে থেকেই ছিল। বাংলাদেশের সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছু নেই এখানে। তাহলে, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে’ বলে রঞ্জন বসু কী বোঝাতে চাইলেন? যেন বোঝাতে চাইলেন, ভারতের হুকুম ছাড়া বাংলাদেশের গাছের পাতারও নড়ার কথা নয়। সেই পাতা নড়ল কেন, এর জবাব চাইতে পারিকর এসেছিলেন।
রঞ্জন বসুর বোঝাবুঝির দৌড় হাস্যকর বললেও কম হবে। এ যেন রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আদার ব্যাপারীর আলাপের চেয়েও নিচু মানের। তিনি লিখছেন- “কিন্তু এ সপ্তাহের গোড়ায় চীন যেভাবে তাদের লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ান সমুদ্রবন্দরে সফররত বাংলাদেশের নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন আহমেদের হাতে দু’টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন তুলে দিয়েছে, তাতে ভারত মনে করছে পাররিকর এর সফর নিয়ে আর এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই”। এখানে চীন ‘যেভাবে… সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’- এই ‘যেভাবে’ কথার মানে কী? তাহলে, চীন সাবমেরিন বিক্রি করায় ভারতের অসুবিধা হয়নি; শুধু ‘যেভাবে… সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’ তাতেই আপত্তি? ব্যাপারটা কি এ রকম? কিভাবে সাবমেরিন তুলে দিলে আপত্তি হতো না? এ ছাড়া পারিকরের আর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই’- এ কথাটিরও মানে কী? চীন সাবমেরিন বিক্রি করে ভারতের নাকি ক্ষতি করে ফেলেছে, তাহলে পারিকর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ’ না রেখে বাংলাদেশে এলে কী হবে? বাংলাদেশ বকা খাবে? সাবমেরিন ফেরত দিয়ে দিতে ধমক দেবে? লেনদেন বিষয়ে একজন মুদি দোকানদারও যতটা বাস্তবজ্ঞান রাখেন, দেখা যাচ্ছে রঞ্জন বসু সেটাও রাখেন না।

সবাই জানে, এমনকি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীরাও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বলে থাকেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে আজও ভারতের সমর্থন তাদের সরকারের পিছনে আছে; সেই সমর্থনে সরকার টিকে আছে ইত্যাদি। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সমর্থন লেনদেন এক জিনিস, আর তাকে বাংলাদেশের সামরিক ক্রয় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বোঝানো, আরেক জিনিস। বলতে গেলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি বা বড় ধরনের সামরিক কেনাকাটা- এসব বিষয়ের পরিকল্পনা করা বা প্রস্তাব তোলা, এটা এখনো সিভিলিয়ান বা রাজনীতিকেরা করার, অভ্যাস বা চর্চা বাংলাদেশে শুরু হয়নি। কাজেই ভারতের ইচ্ছামত যদি আমাদের সামরিক ক্রয় সম্পন্ন হতে হয়, এর ফলাফল হবে জটিল ও মারাত্মক। বুদ্ধিমান মানুষ এ কথা মনে রেখে মুখ খুলার কথা। জনগণের ভোট বা সমর্থনে নয় ভারতের সমর্থনে সরকার টিকে আছে এর মানে তারা প্রতিরক্ষা ক্রয়ে হস্তক্ষেপ করা পর্যন্ত ক্ষমতাবান – এটা নিজেকে ওভার-এস্টিমেট করা। ফলে অতি-মুল্যায়নের বিপদ তাদের অজানা থাকার কথা নয়।
আরেক কঠিন সত্য হল, সাবমেরিন আমাদের (ভারতের কথিত জান-ই দুশমন) চীন থেকেই কিনতে হবে, ব্যাপারটা মোটেও সে রকম ছিল না। রাশিয়াও এর সাপ্লায়ার হতে পারত। কিন্তু রাশিয়ান কিলো সাবমেরিনের মূল্য এক বিলিয়ন ডলার চাওয়াতে এবং তার বিপরীতে চীনা অফার ৪৫০ মিলিয়ন হওয়াতে এটাই কেনা হয়।
তবে খুশির কথা, ভারতের সবাই রঞ্জন বসু নন। বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধির লোক ভারতে কম থাকার কথাও নয়। তেমনই একজন এম কে ভদ্রকুমার। গত প্রায় ৩০ বছরের কেরিয়ার কূটনীতিক ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। এখন অবসরে গিয়ে, বিভিন্ন দেশী-বিদেশী পত্রিকায় কলাম লেখেন। তিনি অনলাইন স্ক্রোল (Scroll.com) পত্রিকায় বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনা নিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছেন। বলা ভাল মন শয়তানিতে ভরপুর এমন কিছু ভারতীয় ডিপ্লোম্যাটকে তিনি যেন চাবকে দিয়েছেন। কথিত এসব পণ্ডিতদের চিন্তাভাবনার দুরবস্থাকে তিনি তুলোধুনা করেছেন। এদের বেশির ভাগই আসলে আমেরিকার ফান্ডে চালানো প্রতিষ্ঠানের কর্মী। এই ক্যাতাগরিতে আছে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের ভারতীয় শাখা অথবা ভারতেই রেজিষ্টার্ড আমেরিকা ফান্ডেড এনজিও, অথবা আমেরিকার উচ্চ শিক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইত্যাদি ধরণের। এককথায় বললে এগুলো আসলে বেশির ভাগই ভারতের স্বার্থের কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক নয়। এদের পিছনে আমেরিকা পয়সা খরচ করে ভারতের কিছু ইন্টেলেক্টদেরকে আমেরিকার চওখে চীন-বিরোধী করে সাজানো যাতে ভারতীয় নীতি আর শহুরে মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করা যায়। একই কথা বলতে বলতে তিতা করে ফেলা আমেরিকার শিখানো এদের ক্লিশে বয়ানটা হল – “চীন ভারতকে ঘিরে ফেলেছে”,  “মুক্তামালার মত চীন ভারতকে ঘিরে ফেলছে”। সব জায়গায় এরা ঘিরে ফেলা দেখে। যেমন মুক্তমালার মত ভারতের চারদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে (পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ) চীন নাকি ভারতকে ঘিরে ধরার পরিকল্পনা করছে। এ’এক মহা আবিস্কার! এরা নিজের বোধশক্তি বুদ্ধি ব্যবহাস্র করা ভুলে আমেরিকার শিখানো চীন-বিরোধী বয়ান আউড়াচ্ছে। মনে মনে প্রবোধ নিচ্ছে তারা আমেরিকান স্কলারশিপে উচ্চশিক্ষা করছে। কত রাজা উজির মারছে। একএকটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে আর নুন্যতম অনুষঙ্গি বিদ্যুতগ্যাস টার্মিনাল রাস্তাঘাট সহ অবকাঠামো  মিলিয়ে বিনিয়োগ লাগে কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন। সে খবর এদের আছে। তো এই বিনিয়োগ কী সামরিক স্টাটেজিক প্রজেক্ট নাকি পুরাপুরি বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক প্রজেক্ট? যেমন বাংলাদেশের জন্য গভীর সমুদ্র বন্দর কী  সামরিক স্টাটেজিক প্রজেক্ট? এমন স্বপ্ন-দোষ! এটা তো স্বপ্নে বা জ্ঞানতও ভাবা কী উচিত? এরা কী ভাত খাওয়া রক্তমাংসের মানুষ? কিন্তু আমেরিকা এমন মানুষই বানিয়েছে। অন্য আর একটা নমুনা দেখাই। এটা আমাদের সাবমেরিন কিনাতে ভারতের এক প্রাক্তন নেভি অভিসারের প্রতিক্রিয়ায় এক ম্যাগাজিন ডিফেন্স নিউজ-এ এমনই এক দিগগজ লিখছে, “নিঃসন্দেহে এই (সাবমেরিন) হস্তান্তর ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রকে (বাংলাদেশ চীনের ক্লায়েন্ট মানে ধামাধরা রাষ্ট্র) দিয়ে ভারতকে ঘিরে ফেলারই চীনা স্টাটেজি” (“Obviously this transfer is a step further in China’s strategy of encircling India with its client states,” Prakash added.)।

যাহোক অনলাইন স্ক্রোল (Scroll.com) এর ভদ্রকুমারের কথায় ফিরে আসি। তিনি পাররিকরের সফর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এসব দিগগজদের পরোক্ষে জবাব দিয়েছেন। প্রথমত, তিনি পাররিকরের সফরকে ‘বিস্ময়কর’ বলছেন। এরপর বলছেন, ১. “বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারতের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সেকারণে ভারত-বাংলাদেশ মিলিটারি টু মিলিটারি সম্পর্ক অবশ্যই ভাল হতে হবে এটা মোটেও অবশ্যম্ভাবী কোন ব্যাপার নয়। মুখ্যত এর দু’টি কারণ। “প্রথমত, আমাদের (মানে ভারতীয়দের) এক আজব ভুয়া ধারণা হল, পাকিস্তান আর্মির সাথে বাংলাদেশের আর্মি নাকি এক নাভীমূল নাড়ির সম্পর্কের সুতায় বাঁধা আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আর্মিও তাদের দেশের উপর ভারতের কালোছায়া ধরনের ইচ্ছা-মনোভাব সম্পর্কে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ধরণের এক সন্দেহ পোষণ করে”। এটা ফ্যাক্টস। “আসলে দুটা রাষ্ট্রের মধ্যে এ ধরনের মানসিক বাধা বা দূরত্ব কাটাতে সময় লাগে। তাহলে পাররিকরের এই সফরের মানে কি, সেই ‘কালোছায়া’ কেটে গেছে?” – ভদ্রকুমার প্রশ্ন রেখেছেন।
আসলে ভদ্রকুমার নিজ দেশের অনেকের মুখের ওপর অনেক কথাই খাড়াভাবে বলেছেন। এর মূল কারণ সম্ভবত তিনি আমেরিকান সাপোর্টেড কোন থিঙ্কট্যাঙ্কের কেউ নন। তবে  এরপরেও যেসব কথাগুলো কোন কারণে তিনি বলেননি তা হল –

রাষ্ট্রতত্ত্ব বলে, কোন রাষ্ট্র মানেই  তার নিজ জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে ঐ রাষ্ট্রের বাইরের সবার স্বার্থের ওপরে বলে মনে করা হয় যেখানে। ফলে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ অন্য সব রাষ্ট্রস্বার্থের চেয়ে উপরে প্রাধান্য পাবে – এই ভিত্তিতেই কেবল কোন রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, থাকে। তাহলে দুই দেশের মিলিটারি টু মিলিটারি কোন ভাল সম্পর্ক মানে কী? এটা অ্যাবসার্ড, সোনার-পাথর বাটি ধরণের এক আকাশকুসুম। অথবা বড়জোড় একটা ডিপলোমেটিক (বলে এক মানে হয় আর এক) ধরণের কথা। দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে বড়জোর ঘটনাচক্রে, তাও সাময়িক কিছু বিষয়ে মিল হতে পারে। আর যদি তা না ভাল লাগে কারও তাহলে আরেক একমাত্র পথ হল, দুই রাষ্ট্র এক হয়ে যাওয়া- একমাত্র তখন দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থ বলে আর কিছু থাকবে না। একাকার হয়ে যাবে। অন্তত মুখে দাবি করা যাবে। অতএব, দুই সেনাবাহিনী এই শর্ত-সীমার মধ্যেই কেবল যতটুকু সম্ভব ততটুকুই ‘ভাল’ সম্পর্কের অধিকারী হতে পারে।

২. ভদ্রকুমার তুরস্কে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি নিজ দেশের সহকর্মীদের সমালোচনা করেছেন। ভদ্রকুমার বলছেন, “ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, সাবমেরিন বিক্রি চীনের এক অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ। তাই পাররিকর ভারতের তিন বাহিনীর উপপ্রধানদের নিয়ে চীনবিরোধী সফরে বেরিয়ে পড়েছেন। অন্ততপক্ষে ভারতীয় বিশ্লেষকের বরাতে বাংলাদেশের মিডিয়া তাই বলছে। এটা খুব দুর্ভাগ্যের যে, আমরাই আমাদের পড়শিদেরকে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে খাড়া করার বুদ্ধি দিচ্ছি। ভারতীয় বিশ্লেষকদেরই সিদ্ধান্ত হল – চীন ভারতকে ঘিরে ধরতেই সাবমেরিন বিক্রি করেছে। এগুলো এক আজব ব্যাখ্যা”। এই বলে তিনি এবার অনেকগুলো কারণ তুলে ধরে ভারতীয় বিশ্লেষকদের এমন সব ধারণা নাকচ করেছেন। আগ্রহিরা সেসব বিস্তারে জানতে পুরা লেখাটা পড়তে পারেন এখানে।  সেখান থেকে তাঁর এমন দুটো পয়েন্ট হল, তিনি বলছেন, ক. সাবমেরিন কেনা চীনের দেয়া কোনো দান-ধ্যান নয়, এটা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত এবং তারা অর্থ দিয়ে কিনছেন। তাহলে এটা চীনের কাজ আর অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ হলো কী করে? খ. বাংলাদেশের কাছে সম্ভাব্য বিক্রেতা ছিল রাশিয়া ও চীন। একা চীন নয়। বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে চীনকে প্রধানত প্রায় অর্ধেক দামে দিচ্ছে বলে। আর চীনের বেশির ভাগ অস্ত্র সরঞ্জাম বিক্রির সময় কোন লুকানো শর্ত থাকে না (উটের সঙ্গে বিড়াল নিতে হবে ধরণের)। তাহলে এটা ‘চীনের অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ’ তা প্রমাণ হয় কী করে?
আমাদের বরং বাংলাদেশ কিসের তাগিদে সাবমেরিন কিনল, সেটা খুঁজে দেখা দরকার”।

অর্থাৎ এর মানেটা সোজা। আগামিতে এই আমেরিকান সাপোর্টেড ভারতীয় দিগগজেরা আমাদেরকে আরও জ্বালাবে। এসব ফালতু ঈর্ষা আর প্রলাপের মোকাবিলায় পালটা বয়ান প্রস্তুতি আমাদের লাগবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬ অনলাইন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার তবে নতুন ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন ও এডিট করে এবং নতুন শিরোনামে ছাপা হল।]