নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

গৌতম দাস

০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Us

 

Shringla’s visit, Independent Online /UNB

ভারত-রাষ্ট্র টিকে থাকার ন্যায়ভিত্তি হেলে গেছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নুন্যতম কিছু নৈতিকতা-সম্পন্ন একটা ন্যায়ের ভিত্তি থাকতেই হয়, নইলে সে প্রতিষ্ঠান টিকে না। রাষ্ট্র বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম একটা ন্যায়ভিত্তির উপর না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে সবার আগে প্রতিষ্ঠান মরাল [moral, নৈতিক শক্তি] হারায়, নৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। ভারত-রাষ্ট্র সেই সঙ্কটে আটকে গেছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেছে। কারণ, মোদীর ভারত নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী, তার সরকার ও দলই এর প্রযোজক বলে অভিযুক্ত। গত ২০০২ সালের গুজরাট ম্যাসাকারের সময় গুজরাট কোনো রাষ্ট্র ছিল না, একালের ভারতও নিছক কোনো রাজ্য নয়, এটা রাষ্ট্র। কাজেই কোনও কিছুই ২০০২ সালের মত ঘটবে না। পুনরাবৃতি ঘটবে না।  এদিকে নরেন্দ্র মোদী দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে এপর্যন্ত মুখ খোলেননি। একটা কথাও বলেন নাই। যে নৈতিক সঙ্কটে ভারত পড়েছে এই নির্বাক থাকায় সেটা আরো জটিল হবে। মোদীর সরকার ভারতের বাসিন্দাদের এই নৈতিক সঙ্কটে ফেলে দিয়ে গেছে যা ক্রমে নাগরিকদের হত্যা ও ম্যাসাকারের দায়বোধের অস্বস্তিতে বেঁধে ফেলবে। তাই সরকারি আমলা হিসেবে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এসময় বাংলাদেশ সফরে এসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা বলার শক্ত নার্ভ দেখিয়ে ফিরে গেলেন! এটাই তাঁর অর্জন! ওদিকে, সিল্লি ঘটনা বিস্তারিত ঠিক কী ঘটেছে এবং তা কিভাবে, এর ফ্যাক্টসের কিছু এর মধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরুও হয়েছে।

কেন শ্রিংলাঃ
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা এবার তাঁর দু’দিনের (২-৩ মার্চ) সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন। কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কোনও দেশ সফরের আগে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশ সফরে আসেন। আর তা মূলত নির্বাহী প্রধানের সফরকে নিশ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এ ছাড়াও, সফরে কেন ও কী কী ইস্যু উঠবে আর তাতে উভয়ের অবস্থান কী হবে এসব চূড়ান্ত করাও এর লক্ষ্য। যদিও এরপরেও অনেক কিছুই থেকে যায়, যাবে বা রেখে দেয়া হয় যা সফরকালে দুই শীর্ষ প্রধানের আলাপে ফাইনাল করা হবে। দেখা যাচ্ছে, মোদীর  বাংলাদেশ সফরের আগে সে উপলক্ষে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সচিবকে পাঠিয়েছিলেন। সেটা কোনো দোষ বা বড় ব্যতিক্রমের বিষয় না হলেও, অনুমান করা যায় সেটা ঘটেছে এই বিবেচনায় যে, ঢাকায় শ্রিংলার ‘তাজা বন্ধু’ অনেক বা তাঁর অন্য ভারতীয় কলিগদের চেয়ে তিনি এগিয়ে। কারণ, এই তো গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর কাটিয়ে  তিনি এদেশ ছেড়ে গেছেন। তার সেসব তৎপরতা ও স্মৃতি এখনো তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি কলিগদের সবার চেয়ে বেশি ‘তাজা’ বলে আর তখন যেসব বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক তিনি জমিয়েছিলেন, তা এখন কাজে লাগানোর বিচারে তিনি অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ঘনিষ্ট বন্ধুদেশ’  গভীর ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ অথবা কখনোবা বলা হচ্ছে এরা নাকি ‘স্বামী-স্ত্রী’ অথবা আরো কত কী যেগুলো সত্যিই ইউনিক, একেবারে তুলনা নাই। দুনিয়ার কোনো কূটনৈতিকপাড়ায় এমন অকূটনৈতিক অর্থহীন ও বোকা বোকা শব্দের ব্যবহার নেই। যদিও তা আসলে বাংলাদেশকেই গায়ে পড়ে নিচে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।

পশ্চিম এখন বুঝছে ‘হিন্দুত্ব’ কেন হুমকির বাপঃ
এই পটভূমিতে, শ্রিংলাকেই বেছে পাঠানোর এই ঘটনা – মোদীর ভারত যে ভালই বিপদে আছে এর আরেকটা প্রকাশ। শ্রিংলাকে এমন একটা সফরে আসতে হয়েছে যখন দুনিয়াজুড়ে মোদীর ভারতরাষ্ট্র নাগরিকের হিউম্যান রাইট রক্ষার দিক থেকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। এদিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ার সঙ্কটে পড়া এক রাষ্ট্র বলে ভারতকে দেখা হচ্ছে।  এধরণের ব্যর্থতাবিষয়ক মামলায়  জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইটস সংগঠন [UN-OHCHR] এই ব্যর্থতা নিয়ে আদালতের শুনানিতে অবজারভার হতে চেয়েছিল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এমিকাস কিউরি (amicus curiae OR  “friend of the court”] হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী আগাম ভয় পেয়ে, আপাতত এটা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণ হবে এই অজুহাত তুলে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং তেমন আলোকে বিবৃতি দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। এছাড়া অন্যদিকে জাতিসংঘের অবজারভার হয়ে চাওয়াকে মিথ্যা করে প্রপাগান্ডা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি মামলায় আবেদনকারি বা পিটিশনার হয়ে চেয়েছে। এনিয়ে দক্ষিণের দৈনিক দ্যা হিন্দুর নিজ লেখা সম্পাদকীয় আগ্রহীরা পরে দেখতে পারেন।

এদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ ভারত-রাষ্ট্রে নিয়ে আলোচনা পশ্চিমে এখন আর সংসদীয় কমিটির ছোট্ট পরিসরে আর নয়। মুসলমান হত্যার মোদীর ভারতকে সামলাতে এখন পশ্চিম সরাসরি স্ব স্ব পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নিয়েই মোদী-অমিতের তান্ডব আর হুমকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে BRUT Debate বা আমেরিকার সংসদে (প্রতিনিধি পরিষদে) দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব এখন একটা হট ইস্যু। ভারত থেকে মুসলমান উদ্বাস্তুর ঢল নামবে কি না আর সেক্ষেত্রে আগাম তা ঠেকানোর উপায় কী, আগানোর কৌশল কী, এটাই মুলত তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ভারত ১৩৫ কোটি মানুষের ভোক্তা-বাজারের এর দেশ। কিন্তু এর প্রতি লোভের চেয়েও ওখান থেকে সম্ভাব্য উদ্বাস্তুর ঢল অনেক বেশি বিপর্যয় আনবে, এটাই এখানে মুখ্য দুঃচিন্তা আর হুমকিবোধ।

দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিল্লিতে ৫৮ জনেরও বেশি মানুষ, মুসলমান বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে তিনি কোনো কথা, বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া কোনো কিছুই দেননি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের পক্ষ থেকে কোন আশ্বাস, ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়ানো, কোন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বসানো, হামলাকারিদেরকে আইনের আওতায় আনা ইত্যাদি যেগুলো এমন পরিস্থিতিতে সব রাষ্ট্রই নুন্যতম রুটিন কাজ হিসাবে করে থাকে – এমন কোন পদক্ষেপ মোদী নেন নাই।

মোদী-অমিত এখন এতই নিলাজ আর বেপরোয়া যে তাঁরা খোলাখুলিই ভারতের পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এতে প্রকারন্তরে ম্যাসাকারের দায় তাদের উপর সরাসরি এলেও তারা বেপরোয়া। অর্থাৎ মোদী তবু মূলত প্রতিক্রিয়া শুন্য। এই প্রতিক্রিয়াহীনতা অ-প্রধানমন্ত্রীসুলভ, তাই অগ্রহণযোগ্য; এমনকি মারাত্মক অস্বাভাবিক। আর এটাই মোদীর আর তাঁর সরকারের এতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে তীব্র করছে। এছাড়া এটাই  তাঁর সরকারকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার এক বিরাট সঙ্কট তৈরি করেছে।  আরও বড় কারণ হল, আপনি মুসলমান হলেই আপনাকে দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগানোর পর এবার তাই আপনাকে নিপীড়ন করে হত্যা করা জায়েজ – এই হল এখনকার নয়া নরমাল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা। এটা ভয়ঙ্কর!

অর্থাৎ মোদীর সরকার এখন নাগরিক বৈষম্যহীনতা কায়েম করা দূরে থাক,  ন্যূনতম ন্যায়নীতি পালন ও রক্ষারও অযোগ্য – এমন এক পরিচয় তুলে ধরতে বেপরোয়া হয়েছে। অথচ শ্রিংলার বিপদ হল, এই নৈতিকতার সঙ্কটে থাকা সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করতে তাকেীই সময় বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ লোক মুসলমান।

এসব বিচারে ভারতের হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে আমরা দেখছি তিনি ব্যাকফুটে ও নিষ্প্রভ। তা না হয়ে তার উপায় কী? এমনকি শ্রিংলার ঢাকায় থাকা অবস্থায় ৩ মার্চ আনন্দবাজারের এক রিপোর্টও তার সঙ্কটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পত্রিকা শিরোনাম করেছে বেসুরো ঢাকায় সফর শ্রিংলার“- আর তাতেই শ্রিংলার দফা-রফা। লিখেছে, “সিএএ-এনআরসি বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। দিল্লির হিংসা, সেই ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে দেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের একাধিক জনের ভারত সফর বাতিল করেছিল হাসিনা সরকার। আজ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন, বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফর”। এই খবর মোদী ও শ্রিংলার জন্য বিরাট অস্বস্তির সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি তারা সেন্সে থাকে!

বাংলাদেশের স্পিকারের ভারত সফর ছিল গত ২-৫ মার্চ। তিনি সফর বাতিলের ঘোষণা দেন মাত্র একদিন আগে, ১ মার্চ; যেনবা শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরে আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি। নিশ্চিত হতেই তিনি শেষ বেলায় এসে ঘোষণা দিয়ে দেন। শ্রিংলা ঢাকা আসেন পরের দিন ২ মার্চ। অর্থাৎ শ্রিংলা বাংলাদেশের স্পিকারের সফর বাতিলের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি বা তা পারেননি। মানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত “বড়ভাই” সুলভ ডাট দেখাবেন এমন অবস্থা – না ভারতের না শ্রিংলার সে মুরোদ আর অবশিষ্ট আছে মনে হচ্ছে না। এমনই করুণ অবস্থা! অর্থাৎ এটা মেনে নিয়ে হলেও ব্যাকফুটে থাকাতেই স্বস্তিবোধ করছেন শ্রিংলা।

শ্রিংলার সেমিনারঃ
শ্রিংলা ২ মার্চ সকালে বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় হাইকমিশনের সহ-আয়োজক হয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করেছিল। এটা ছিল ‘”বাংলাদেশ ও ভারত : একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ” এই শীর্ষক এক সেমিনার।   কিন্তু এবারের সফরে শ্রিংলার দুর্ভাগ্য যে, তাকে সরাসরি ডাহা অসত্য বলেই পার পেতে হবে, অন্য রাস্তা নেই। তাই তিনি আসলে ঐ সেমিনারে  ভান করলেন যে, এনআরসি ইস্যুটা যেন এখনো কেবল আসামেই সীমাবদ্ধ বা  সেখনেই কেবল আটকে আছে।  তাই শ্রিংলা বললেন, “ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে” – এমন ডাহা মিথ্যা চোখ বুঝে বললেন। অথচ  তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেননি যে, তিনি এবার “ভারতজুড়ে এনআরসি করবেন”। অথচ অমিত এটা কোনো জনসভায় বলেননি,  খোদ সংসদে এবং মন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। কাজেই এটা কোনো দলের নয়, ভারতের সরকারি অবস্থান। এছাড়া এটা তো ভারতের কোন বিরোধী দল, এমনকি কোন মিডিয়া মানে নাই। এছাড়া মোদী এমনকি দিল্লিতে নির্বাচনে হারের পরেও বলেছেন, আপাতত এনআরসি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর ভারতজুড়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএর বাস্তবায়নে মেতে উঠবেন তিনি।

তাহলে শ্রিংলা কেন এখনও এনআরসিকে ‘আসামের ঘটনা’ বলছেন? ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা মিডিয়াও তো তার কথা মেনে নেয় না। এযুগে ভারতের সরকারের কে কী প্রতিদিন বলেন তা বাংলাদেশে বসে জানা কি খুবই কঠিন! এনআরসি এখন ভারতজুড়ে বাস্তবায়নের ইস্যু আর এটা এখন এনআরসি-সিএএ ইস্যু। অথচ শ্রিংলা সেমিনারে বলে গেলেন এনআরসি ‘প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায়’ চলছে। তাই তিনি দাবি করলেন, ” … সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের ওপর এর কোনো প্রভাব থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি”।  আসলে তিনি জানতেন কেউ তার এ কথা এ দেশে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু তবু এই চাতুরী ছাড়া কিইবা তিনি করতে পারতেন? সম্ভবত এত অসহায় অবস্থায় হয়ত তিনি এর আগে নিজেকে দেখেননি!

তিনি আরো বানিয়ে বলেছেন, সিএএ বা “নাগরিকত্ব বিল কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়”।  বলেছেন দ্বিতীয়ত, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে এসে যারা ভারতে আছেন, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব দেয়াই এর উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়ত, এটা (বাংলাদেশের) বর্তমান সরকারের সময়ের জন্য কার্যকর হবে না। কার্যকর হবে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসক ও অন্য সরকারগুলোর সময়ে, যারা এখানে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি”। এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। কারণ সিএএ আইন প্রযোজ্য হবে বা এর কাট অফ ডেট হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪। মানে এর আগে যারা ভারতে প্রবেশ করবে তাদের সবার উপরে প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেবল ‘১৯৭৫-পরবর্তী’ সময়টার ক্ষেত্রে  এই আইন প্রযোজ্য হবে এই কথাটাই পুরা ভুয়া, ভিত্তিহীন। বুঝাই যায় হাসিনা সরকারের মন পাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সিএএ আইনের মধ্যে তিন দেশে থেকে আসা সম্ভাব্য হিন্দুদের কথা বলার সময় বাংলাদেশের নাম সরাসরি আইনে উল্লেখ করা আছে এবং তা আছে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ বাংলাদেশ সরকার হিসাবে।  কাজেই এটা সরাসরি হাসিনা সরকারকেও ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ অভিযুক্ত করেই আইনটা লেখা হয়েছে।  অথচ, ভারত এখন বাংলাদেশকে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে’ আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পেশের আগে না দিয়ে আবার উলটা  আইনের ভাষ্যটা শ্রিংলা বা ভারত সেকথা লুকাতেছেন।  মূলত বাংলাদেশের নাম না উল্লেখ করলে  বিজেপি দলের লাভ হয় না। কারণ  আইনের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছে এজন্য যে – পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণ করতে বা হিন্দু ভোট সব নিজের রাজনৈতিক ঝুলিতে পেতে এমনটাই বিজেপির দরকার; সেক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যাটা যাই হোক।

অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বন্টনের মুলাঃ
বাংলাদেশে এই সফরে শ্রিংলা আরেক বিরাট মুলা ঝুলিয়েছেন – তিস্তার পানি তো বটেই, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৪ যৌথ নদীর মধ্যে আরো নাকি ছয়টি নদীর পানি ভারত দিবে এই চুক্তি নাকি প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এটা শ্রিংলার দাবি। এটা অবিশ্বাস্য আর ভারতকে বিশ্বাস করার মত আমাদের আস্থা তারা অনেক আগেই হারিয়েছে। আসলে ঐ সেমিনারে শ্রিংলা এমন সব কথা বলেছেন, যা দেখেই বুঝা যায় বানানো কথা বলছেন। আর মিথ্যা বলে  মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, “এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত”। এটা কোনভাবেই ভারতের মনের কথা না কারণ এটা ভারত অনুসরণ করে আসছে অথবা এখনও করছে এমন নীতি পলিসিই নয়। এককথায় এখন এটা ভারতের অবস্থানই নয়, এ’পর্যন্ত ভারতের অনুসৃত নীতিই নয়। কার্যত তাদের অবস্থানটাই উল্টা।

আমরা দেখছি ‘পরিবেশের’ কথা তিনি বলেছেন। যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনায় টেকনিক্যাল নিয়ম হল, নদীর “অবাধ” প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। অথচ এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশবোধ শূন্য এবং তাদের ভূমিকা পরিবেশবিরোধী। ভারত বহু আগে থেকেই হয় নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়েছে, না হলে আন্তঃনদী যুক্ত করার মতো চরম পরিবেশবিরোধী প্রকল্প নিয়েছে। আর তাও না হলে নদীর মূল প্রবাহ থেকে বড় খাল কেটে পানি বহু দূরে টেনে নিয়ে গেছে। এই হলো ভারতের কথিত পরিবেশবোধের বাস্তব অবস্থা।
আর টেকসই? নদীর উপর যথেচ্ছাচার যেসব বাড়াবাড়ি ভারতে হচ্ছে তাতে নদীর “অবাধ” প্রবাহ ধ্বংস করে যা কিছু করা হয়েছে সেগুলো একটাও টিকবে না, বরং মূল নদীই শুকিয়ে যাবে ক্রমেই। ফারাক্কা ইতোমধ্যেই এ অবস্থায়। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ভারতের বিহারে প্রতি বছর বন্যার কারণ বলে অভিযোগ উঠছে এখন লাগাতর প্রতিবছর।
আর ন্যায়সঙ্গত বণ্টন? মানে যৌথ নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনটা কী ? যেকোন যৌথ নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রাপ্য, সমান হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত আইনত বাধ্য। এছাড়া আমাদের সম্মতি ছাড়া বাঁধসহ নদীর প্রবাহকে যেকোনভাবে বাধাগ্রস্ত করাটাই বেআইনি। অথচ ভারতের সাথে নদীর পানি বণ্টনের যেকোন আলোচনায় তাদের দাবি অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হতে হবে – “ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পরে পানি থাকলে তবেই তা বাংলাদেশ পাবে”। মানে তারা হল জমিদার – এই নীতিতেই ভারত চলে। একারণে  প্রায় সব সময়ের বাড়তি যুক্তি হল ‘এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই আরো কম পানি পাবে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ ভাটির দেশ হিসেবে পানি আমাদের প্রাপ্য এই আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তারা কখনও মানে নাই। কথা হল, ভারতের পানির প্রয়োজনের কী কোনো শেষ  থাকবে?
সোজা কথা ‘পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন’ এই শব্দগুলো শ্রিংলা তুলেছেন- কথার কথা হিসেবে এবং মন ভুলাতে। অথচ না পরিবেশ রক্ষা, না আন্তর্জাতিক নদী আইন – কোনটাই ভারতের চলার ভিত্তি বা সরকারের নীতি নয়। মিথ্যা বলাটা সবাই পারে না, বুক কাঁপে। আসলে শ্রিংলা দেখালেন, পুরো মিথ্যা বানোয়াট কথা বলার মত শক্ত নার্ভ তার আছে। আর সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, বাংলাদেশ তবুও তাকে বিশ্বাস করবে বা আস্থা রাখবে – সেটা যাক তাকে মিথ্যাই বলতে হবে!

দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?
আবার ফিরে যাই, এবার দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?  বাংলাদেশে এসে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লি ম্যাসাকার নিয়ে একটা কথাও বলেননি। এক্ষেত্রে তাঁর অজুহাত সম্ভবত, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তাই। কিন্তু বাস্তবতা হল – লাগাতার তিন দিন ধরে এ হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকার চলেছে; দিল্লি জ্বলেছে, কমপক্ষে ৫৮ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের বাড়িঘর যতটুকু যা যা বাড়িঘর সম্পদ সব কিছু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন সবার একভাবে যায় না। এই প্রথম কারা সুনির্দিষ্টভাবে দিল্লি ম্যাসাকার করেছে তার কিছু তথ্য সামনে আসা শুরু হয়েছে।

দিল্লি ভারতের বিশেষ মর্যাদার টেরিটরি, তা সত্ত্বেও ওর ভিতরেই দিল্লি একটা রাজ্য। তাই রাজ্যের ‘বিধানসভা’ নামের একটা সংসদ (প্রাদেশিক পার্লামেন্ট) আছে। সেখানে রাজ্য নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করতে পারে, যা কেবল নিজ রাজ্যের ওপর প্রযোজ্য। দিল্লির বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে এমনই একটা আইন পাস করা হয়েছিল, যার নাম ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট ১৯৯৯’। ব্যাপারটা তুলনা করে বললে এদিকে বাংলাদেশে একটা ‘মানবাধিকার কমিশন’ আছে। আর তা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যত স্বাধীন নয়। আইনের মারপ্যাঁচ ও দুর্বলতায় এটা আমাদের নির্বাহী ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়েই চলে। সে তুলনায় ভারতের অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কমিশনগুলো এত ঠুঁটো নয়। বরং এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এবং ভারতের আদালতের পর্যায়ে স্বাধীন। যেমন ভারতের “জাতীয় নারী কমিশন” যথেষ্ট প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ব রাখে। তেমনি ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে দিল্লি রাজ্য সরকার এক ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন’ (ডিএমসি) গঠন করে রেখেছে। এখানে ঘোষিত মাইনরিটি হল, – The notified Minority Communities, as per the Act, are Muslims, Christians, Sikhs, Buddhists and Parsis.। আর এর মূল কাজ হল, ‘সংখ্যালঘু বা মাইনরিটিদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা’ [To safeguard the rights and interests], যা যা ভারতের কনষ্টিটিউশন মাইনরিটিদেরও নাগরিক অধিকারে সমতা-সাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই DMC কমিশনের ক্ষমতা পুরোটাই আদালতের পর্যায়ের না হলেও তারা অনেক ক্ষমতাই রাখেন। যেমন গত ২৫ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে নর্থ দিল্লিতে কার্ফু জারি করতে তারাই  অনুমোদন দিয়ে চিঠি দেওয়াতে পুলিশ তা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পরে ম্যাসাকার, তান্ডব কমে আসলে পরে, সেই ডিএমসি সরেজমিন দিল্লির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর শেষে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এছাড়া অচিরেই একটা “ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি” গড়ে তারা মাঠে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, যে কমিটিতে আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছে। এই কমিশন বা ডিএমসির চেয়ারম্যান হলেন জাফরুল ইসলাম খান [Zafarul-Islam Khan] ও অন্য সদস্য হলেন কারতার সিং কোচ্চার [Kartar Singh Kochhar]। এরাই প্রথম সরেজমিন রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ বর্ণনা আছে সেই রিপোর্টে। তাদের প্রথম কথা হল, এই হামলা ‘একপক্ষীয়’ এবং ‘পূর্বপরিকল্পিত’ [‘one-sided, well-planned’]। অর্থাৎ এটা কোনধরণের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি বা রায়ট নয়। অথবা এটা হঠাৎ উত্তেজনায় ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং আগেই পরিকল্পনা করে ঘটানো এক ম্যাসাকার-সন্ত্রাস। এছাড়া এই প্রত্যক্ষ মাঠ-সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তাদের কথা বলার সময় জাফরুল ইসলাম খান সাহেবের করা আরও কিছু মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

তাঁর ফাইন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় মন্তব্য হল, প্রায় দুই হাজার বহিরাগতকে পরিকল্পিতভাবে নর্থ-ইস্ট দিল্লিতে এনে, কয়েকটা স্কুলে রেখে তাদের দিয়ে এই ম্যাসাকার, হত্যা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। [“There were approximately 1,500 to 2,000 people who had come to these areas from outside to create trouble,” ]। এর প্রমাণ হিসেবে এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ান তারা সংগ্রহ করেছেন। তার নাম রাজকুমার। তিনি রাজধানী স্কুলের এক গাড়ির ড্রাইভার। তিনি বলেছেন, এরকম ৫০০ বহিরাগত যাদের মুখে মুখোশ ছিল। এরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই স্কুলে অবস্থান করেছিল। তারা সাথে পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র ছিল আর এক ধরনের ‘বড় গুলতি’ ব্যবহার করেছিল উঁচু দালান থেকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারার জন্য। কমিশনও বলেছে, তারা এমন কিছু ব্যক্তির ফুটেজও সংগ্রহ করেছেন।

“Mr. Kumar told us that some 500 persons barged into his school around 6.30 p.m. on February 24. They wore helmets and hid their faces. They remained there for the next 24 hours and went away next evening after the arrival of police force in the area. They were young people who had arms and giant catapults which they used to throw petrol bombs from the school rooftops,”

এ ছাড়া জাফরুল ইসলামের দাবি, তারা জেনেছেন প্রত্যেক গলি থেকেই স্থানীয় অন্তত দু-একজন সহযোগী ছিল যারা মুসলমানদের বাড়ি , দোকান, গুদাম বা সম্পদ কোনগুলো, তা দেখিয়ে দিয়েছে। যাতে কেবল সেগুলোতেই আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এভাবেই ‘যমুনা বিহার’ এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই কেবল বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পদ পোড়ানো হয়েছে।

Muslim-owned shops like a travel agency and motorcycle showroom were looted and torched while Hindu-owned shops were left untouched.

এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা নিয়ে আবার লুকোচুরি শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ ‘মেনস্ট্রিম মিডিয়া’ এটা ছাপেইনি। সবচেয়ে বিস্তারিত ও সাহসী ভাবে ছেপেছে দক্ষিণের ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। এ ছাড়া ওয়েব পত্রিকা ওয়াইর (wire) আর নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এটা ছেপেছে। আরো কিছু পত্রিকা ছেপেছে, তারা কেবল সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের শর্ট ভার্সনটা ছেপেছে। তবে একটা ইউটিউব ভার্সন পাওয়া যায় এমন এক সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ‘এইচডব্লিউ নিউজ নেটওয়ার্ক (HW News Network) থেকে। সেখানে এ নিয়ে নিউজ ছাড়াও চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ফ্যাক্টস বাইরে আসা শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেও মোদী-অমিত কোনো কৌশল গ্রহণ করবেন, ধামাচাপা দিবার চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০৭ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে নৈতিক ভিত্তি হারানো একটি সফর – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব 

ভারতে হচ্ছেটা কী?
প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব!

গৌতম দাস

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Tr

 

‘Are you Hindu or Muslim?’: TOI photojournalist

সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু কেউ আমল করে নাই। সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
ঘটনা হল, টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিউটিরত এক ফটোসাংবাদিক অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে দিল্লিতে বজরং দলের গুন্ডারা প্যান্ট খুলিয়ে তাঁর “নাগরিকত্ব  টেস্ট” করেছে। এরপর সে “মুসলমান নয়” এটা নিশ্চিত হয়ে তবেই ছেড়ে দিয়েছে।

গত সোমবার থেকে  রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর হামলার আগুন লেগেছে  দিল্লিতে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী বা তাদেরকে দেয়া কাজের ব্রিফিং কী ছিল তানিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়ার ভাষ্যে ইতোমধ্যে ছবি প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ পুলিশের দিকে আঙুল উঠানো হয়ে গেছে।  এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?

ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনার দায় রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়।

কিন্তু দিল্লি এসব কিছুর ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে এর সাফাইটা হল, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’ [NCT] মানে, কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে বা অবস্থিত।  এই বিশেষ আইনের কারণে দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা অপেক্ষায় আদালতে মুলতবি আছে।
বিজেপি চলতি মাসেই শোচনীয়ভাবে দিল্লিতে হেরেছে । দিল্লি এই রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় বলছি  এজন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা কৃতিত্বের(!) রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের মুসলমান-টার্গেট করে করা হামলা ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। এক জিঘাংসা। এই বিশ্বাসে কঠিন অকল্পনীয় নির্যাতন আর চাপের মধ্যে ফেলতে পারলে বিজেপি-বিরোধিতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে।  মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
গত তিনদিনের ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ঐ রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
ইতোমধ্যে অবশ্য লক্ষণীয় ভাবে ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। [যা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার সরকারবিরোধী হইয়ে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ] দিল্লির এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই বলে। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে ‘মোদি মোদি’ বলে স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
ফটো জার্নালিস্ট হলেন কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি। সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে দিতে তার কেটেছিল। বা বলা যায় বিজেপির ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তাঁর কপালে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা সেই হিন্দুসেনার ডায়লগ ছিল, “তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে… আপনিও তো হিন্দু; কাজেই এতে ক্ষতি কী?”।
সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, “আপনিও তো হিন্দু, কেন তবে ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল তাদের একজন বলে ওঠে “তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান?” এরপরই তাঁরা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার ঐ এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভার এক গরীব ছাপোষা বলে মন গলিয়ে তবেই সে যাত্রায় তারা পার পায়।
উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়া – এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলো সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।

এই রিপোর্টের শুরুতে, লেখক ওসব বিজেপি-সেনা কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে গেছে। এরা “মিসগাইডেড ইয়ুথ”। “আইন হাতে তুলে” নিয়ে “ভায়োলেন্স” ছড়াচ্ছে। এরা “ধর্মীয় আইডেনটিটি” ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে। ইত্যাদি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কী মোদীর ভারতে চালু ছিল না? কেউ মুসলমান হলে নিপীড়ন করে “জয় শ্রীরাম” বলানোতে বাধ্য করা,  গরু ব্যবসায়ী হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা, এমন যে কাউকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথি মারার অজস্র ক্লিপ কী আমরা সোশাল মিডিয়ায় দেখিনাই?  অথচ সামাজিক প্রতিবাদ দূরে থাকে ঐ ঘটনাস্থলের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মজা দেখা এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে “এধরণের ঘটনাগুলো সব গুজব বলে” – এগুলোর কোন অস্তিত্ব নাই বলে মোদীর সংখ্যালঘু মন্ত্রীর বয়ান কী ভারতের মিডিয়া ছাপেনি? কোন মিডিয়াই কী মন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে একটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেছিল? নাকি তখন কি কেবল মনে হয়েছিল “আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর!  কাজেই সমস্যাটা আমার না” – এমন মনে হয়েছিল তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা জানাতে চাচ্ছে কেন?  কে শুনবে? মোদী না অমিত শাহ? কী আশা করেছিলেন আপনি?

বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন? কেন এতদিন চুপ ছিলেন? মুসলমানদের উপর হচ্ছিল বলে? তুচ্ছ করে? তাহলে আপনি কী?

সারা ভারত আর সাথে এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই মুসলমান মারা বা নির্যাতন করার নষ্ট “মেরুকরণের” বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি?  এটা ভারতের কনষ্টিটিউশন-বিরোধী ততপরতা – এই দায়ে বিজেপির উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দিয়ে গেছে? তাই, আজ আঁতকে উঠে লাভ কী, অনিন্দ্য?  সবই তো শেষ!

বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে তা আবিস্কার হয়েছিল এমন নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া ধরণের আবিস্কার সেগুলো।। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনাতে এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই “নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ”। কারণ কে মুসলমান কেবল এটা জানতেই তো বিজেপির এত আয়োজন। তাই নয় কী? তাহলে এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবেপ্রিন্টে ‘নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!”এই শিরোনামে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

দিল্লিতে নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

দিল্লি নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

গৌতম দাস

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2SL

 

দিল্লি প্রাদেশিক বা রাজ্য নির্বাচনে মোদী-অমিতের বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। আম আদমি পার্টি (আপ বা AAP) দলের আগের ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মতই এবারো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে তারা ৭০ আসনের দিল্লির ৬০-এর বেশি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জার্মান সরকারের ডয়েচে ভেলে [Deutsche Welle] গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে অত জনপ্রিয় না হলেও ফেলনা গুরুত্বের নয়। সেই ডয়েচে ভেলের (ইংরেজি সংস্করণ) এক রিপোর্টের শিরোনাম, “দিল্লির নির্বাচনী হার : প্রধানমন্ত্রী মোদীর শেষ দিনের শুরু?” [Delhi election losses: The beginning of the end for PM Modi?]।

এটা ঠিক যে, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA) প্রায় সব প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশে এক ব্যাপক নাড়াচাড়া দিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতের লোকসংখ্যা বা ভোক্তা বাজার প্রায় ১৩৬ কোটির; সে কথা পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় খুবই মনে রাখে। তারা তাই এমন কিছুই বলতে চায় না পাছে তা এই বাজার হাতছাড়া হওয়ার কারণ হাজির করে ফেলে। কিন্তু মোদী-অমিতের বৈষম্যমূলক ও মুসলমানবিদ্বেষী করে সাজানো নতুন নাগরিকত্ব আইন পশ্চিমাদেশের জন্য ঐ ভোক্তা বাজারের লোভের চেয়েও আরো বড় বিপদের। সাধারণভাবে তারা আতঙ্কিত এ জন্য যে, তাদের আশঙ্কা এই আইন দুনিয়াতে বিপুল রিফিউজির ঢল তৈরি করতে পারে যারা আবার রাষ্ট্রচ্যুত। মোদীর এই আইন আগামীতে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন রিফিউজির সারিবদ্ধ ঢল নামাতে পারে, যেটা সদ্য মোকাবিলা করা সিরিয়ান রিফিউজিদের চেয়েও হবে ভয়ঙ্কর। কারণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি বৈশিষ্ট্য হল, এরা হবে রাষ্ট্রহীন; ‘থেকেও নাই’ এমন রাষ্ট্রচ্যুত বলে তাড়ানো এক জনগোষ্ঠী।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘এই আশঙ্কার’ ওপর দাঁড়ানো এক নিন্দা প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আনা হয়েছিল আর যা এখন আগামি মধ্য মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করে রাখা আছে। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এনিয়ে কী রায় দেয় মূলত সেটা দেখতে আর মার্চে মোদী ইইউ সামিটে এসে কী প্রতিশ্রুতি দেন না দেখার জন্য। নতুন রিফিউজির ঢলের উদ্ভব বা মানবাধিকার রক্ষার দায় হিসেবে এর ভাগ বা দায়ভার গ্রহণ প্রশ্নে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও বেশি ভীত, বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতির স্থবিরতা দুনিয়াতে যখন প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়া দশা সেই পরিপ্রেক্ষিতে। ডয়েচে ভেলের এই শিরোনাম এসব আশঙ্কায় আক্রান্ত বলে এমন হয়ে থাকতে পারে। তা আমরা অনুমান করতে করি।

দিল্লির রাজ্যনির্বাচন শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজেপিবিরোধী মূলত দিল্লির এক আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি (আপ) এবারের নির্বাচনে ৬২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতেছে। আর সেই থেকে অসংখ্য কর্নার থেকে কেন ফলাফল এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মিডিয়াগুলো ভরপুর হয়ে উঠেছে। রাজ্য হিসেবে দিল্লি খুবই ছোট; যেখানে ভারতের পুরনো মাঝারি সাইজের রাজ্যগুলোতে ২০০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে আসন থাকে। সেই বিচারে এগুলোর তিন ভাগের একভাগ সাইজের রাজ্য হল দিল্লি। তবুও দিল্লির এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ অনেক বেশি। কেন?
মূল কারণ, মোদী-অমিতের নাগরিক বৈষম্যমূলক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ পাস করার পরের ভারতজুড়ে আপত্তি ও প্রতিক্রিয়া; আর তা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এটা ছিল কোন রাজ্যে অমিত শাহের প্রথম নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া। এছাড়া এমনিতেও দিল্লির নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্বে ছিলেন অমিত। যেমন শুরুতে বিজেপির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক ভোটে কী হয়েছিল সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ভাষায়, “কিন্তু নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংহ, জগৎপ্রকাশ নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহই আস্থা জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দিল্লি বার করে নেবেন। মেরুকরণই হবে প্রধান অস্ত্র। তখনই স্থির হয়, শাহিন বাগই হবে প্রধান ‘প্রতিপক্ষ’। আর প্রচারে শাহ বলেছিলেন, ‘‘ইভিএমের বোতাম এত জোরে টিপুন যেন শাহিন বাগে কারেন্ট লাগে। “। তাই তখন থেকেই দিল্লি নির্বাচনে ঠিক কী বলে, কোন কৌশলে বিজেপি ভোটে অংশ নেয় আর তাতে ভোট প্রদানের ধরনের মধ্যে কী মেসেজ ফুটে ওঠে – এসব জানার জন্য সব মহলের ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর তা থেকেই এত বিশ্লেষণ।
এসব বিশ্লেষণগুলোতে কমন ব্যাখ্যার ধারাটা হল, এটা ‘উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু’ – এরই লড়াই যেখানে ‘উন্নয়ন’ জিতেছে। কিন্তু এখানে ‘উন্নয়ন’ মানে কী? আমাদের দেশের মতই, হাসিনার ‘উন্নয়ন’ বনাম নাগরিক অধিকার, এর কোনটা চান- এর মত? না, ঠিক তা নয়। তবে হয়ত কিছু কাছাকাছি। দিল্লির বেলায় এর মানে হল, নাগরিক মিউনিসিপ্যাল সুবিধা ও সার্ভিসগুলো; যেমন পানি, বিদ্যুৎ, নিষ্কাশন, বাসভাড়া, শিক্ষা ইত্যাদিতে সার্ভিস ব্যবস্থাপনা আর এর স্বল্প চার্জ বা মওকুফ করা চার্জ- এভাবে আপ দলের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গত পাঁচ বছর কাজ করে সাফল্য এনেছেন। এটাকেই এখানে ডাকা হচ্ছে “উন্নয়ন” বলে। আর এর বিপরীতে ‘কেন্দ্রের ইস্যু’ জিনিষটা কী?
এখানে কেন্দ্রের ইস্যু হল যেমন, সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু সিএএ বা এর সাথে এনআরসি; এ ছাড়া ধীরগতির ধসে পড়া অর্থনীতি, কাজ সৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরেকভাবে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা আছে। যেমন নির্বাচনী ফলাফল কী হতে পারে সেই আগাম অনুমিত ফলাফল জানার লক্ষ্যে করা সার্ভেতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হল, “জাতীয় নিরাপত্তা”। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই প্রলেপ লাগানো শব্দ। আসলে কদর্য কিছু ধারণাকে লুকিয়ে রাখতে বলা এক ‘ভদ্র শব্দ’। কারণ এর পেছনের মূল কথাটা হল, ‘মুসলমানবিদ্বেষী উসকানি দিয়ে প্রচারণার” পক্ষে কারা। এটাকে আবার বিজেপি নিজেও আরেকটা শব্দ – ‘পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ’ বলে প্রকাশ করে থাকে। যেমন এই নির্বাচনে অমিত শাহ ও তার দলের বিদ্বেষী ভাষ্য হল, কেজরিওয়াল একজন ‘জঙ্গি’ নেতা, সে পাকিস্তানের বন্ধু, মুসলমান তোষণকারী ইত্যাদি। দিল্লির এক মুসলমান-প্রধান এলাকা শাহীনবাগ, এখানকার সিএএ-বিরোধীদের মূলত নারীদের একটা স্থায়ী প্রতিবাদ মঞ্চ আছে। এ সম্পর্কে অমিতের মন্তব্য এটা নাকি এক ‘মিনি-পাকিস্তান’। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কথাটার আসল মানে হল মানে, এই ক্যাটাগরিটা আসল অর্থ হল – বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও এর প্রপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিয়ে কারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – তাদের কথা বুঝানো হচ্ছে। এরাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে দেয়া ভোটার। এমনকি আনন্দবাজারের ভাষাতেও – এটা হলো “বিজেপির (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং হিন্দু ভোট একাট্টা করার কৌশল”। অর্থাৎ হিন্দুত্বের জোশ তুলে সব হিন্দু ভোট যেন বিজেপির বাক্সে আসে, বিজেপির নেয়া এই কৌশল । এটাও অনেকসময় আরেকটা সার শব্দে প্রকাশ করা হয় – পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। “হিন্দুর হিন্দুকে ভোট দিতে হবে আর সেটা কেবল বিজেপিকেই” – এটাই হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা কৌশলের সারকথা। এটাকেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদ নিজেদের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ অথবা এটা “বিজেপির কৌশল” বলে প্রকাশ্যেই দাবি করে থাকে।
দিল্লির নির্বাচনের পরে ভারতের টিভির এক টকশোতে এসেছিলেন শেষাদ্রি চারি [SESHADRI CHARI]। তিনি হচ্ছেন, আরএসএসের ভাবাদর্শী পর্যায়ের এক নেতা , তিনি আবার আরএসএসের মুখপত্র এক প্রাচীন পত্রিকা ‘অরগানাইজার’-এর সাবেক সম্পাদক। তিনি বিজেপির এই ‘ঘৃণা তৈরির’ নিন্দনীয় কাজ ও ততপরতাকেও “অনৈতিক” বলে মানতে রাজি হননি। বরং দাবি করেছেন এটাই ‘বিজেপি রাজনীতির কৌশল’। দেখুন, not hate politics but strategy.।
ভারতের কনস্টিটিউশন এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া বেআইনি। কিন্তু যেখানে সারা ভারতই এখন ‘হিন্দুত্বে’ ভাসছে সেখানে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলবে কে? আর নির্বাচন কমিশন সেখানে কোনো প্রশ্ন না তুলে আরামে কাজ করার পথ ধরবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
ঠিক এ’কারণে বিজেপির অমিত শাহের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ এবার কিভাবে কাজ করে, আদৌ করে কিনা, সেটি সবাই দেখতে চেয়েছিল। কঠিন বাস্তবতা হল, এবারই এটা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, খোদ অমিত শাহ এবার তা নিজ মুখে প্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন।
“ভারতে হিন্দুরাই রাজত্ব করবে, অন্য কারও কথা চলবে না। যারা অমান্য করবে তারা ‘দেশকে গদ্দারকো, গোলি মারো শালো কো’।  এভাবে বিজেপির সমাবেশ মঞ্চ থেকে স্লোগান দেয়া শুধু নয়, লিখিত বিবৃতি মানে ঠাণ্ডা মাথায় লেখা এমন এক বিবৃতি পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে দুদিন ধরে অমিত শাহের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ থেকে গায়েব ছিলেন। বেচারা অমিত “খুব শরমিন্দা আর শোকে” ভুগছে মনে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসেও যান নাই। দু’দিন পরে ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রেসের সামনে তিনি বলেন, “গোলি মারো বলে বিবৃতি দেয়া অথবা ‘ইন্দো-পাক ম্যাচ’ ধরনের মন্তব্য করাটা আমাদের ঠিক হয়নি। আমাদের দল এসব মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়”। এছাড়াও, তিনি স্বীকার করে নেন যে, খুব সম্ভবত এমন মন্তব্যের জন্যই “দিল্লিতে আমাদের পরাজয় ঘটেছে”। এর সাথে তিনি এটাও স্বীকার করে নেন যে, দিল্লি নির্বাচন সম্পর্কে “তার আগাম অনুমানে ভুল ছিল”। ভেবেছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। আমার বেশির ভাগ মূল্যায়ন ঠিক হয়,এ বার ভুল হল”। সাথে সাথেই অবশ্য বড় ধূর্ততার সাথে নিজেই বলে রাখেন – “কিন্তু তাই বলে ‘দিল্লিতে বিরোধীদের বিজয় সিএএ-এনআরসি বিরোধী কোনো গণরায় নয়”।

এটা সে গণরায় কি না তা সামনে স্পষ্টই বুঝা যাবে। এখনই বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে দিল্লি রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা যেখানে ১৩% সেখানে মুসলমান ভোটারদের ৭৫% (আর এরই সাথে শিখ ভোটের ৪২%) আপ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। [The AAP got the lion’s share of the Muslim vote, significant in a city-state with 13 per cent Muslims.] শাহীনবাগ যে কনস্টিটিউয়েন্সিতে পড়েছে এর নাম ‘ওখলা’ [Okhla]। সেখানে এবার ভোটারের উপস্থিতি রেকর্ডসংখ্যক। মোট উপস্থিত ভোটারের হার যেখানে ৬২% এর মতো সেখানে ওখলাতে তা ৬৬%-এর মত। আর ‘আপ’ দলের আমানতুল্লাহ খান এখানে জিতেছেন (1,30,367 votes) প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর (Braham Singh  58,540 votes) চেয়ে ডাবলের বেশি ভোটে।  এমনিতেও দেখা গেছে বেশির ভাগ আসনে ভোটাভুটির ফয়সালা হয়েছেও ষাট হাজার ভোটের কাছাকাছি।

উত্তরপ্রদেশের ‘গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী’ যোগী আদিত্যনাথ যার একমাত্র যোগ্যতা মুসলমানদের মারব-ধরব বলে গালিগালাজ করা, তাকে উওরপ্রদেশ রাজ্যের পড়শি রাজ্য দিল্লিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল প্রায় ১৩টা বিজেপি কনস্টিটিউয়েন্সিতে প্রধান সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তিনি কেজরিওয়ালকে “জঙ্গি মদদদাতা, দেশদ্রোহী গাদ্দার, পাকিস্তানের বন্ধু ইত্যাদি বলে বক্তৃতা করেছিলেন। ফলাফল নিম্ন চাপ!  ঐ ১৩ আসনের ১১টাতেই বিজেপি অনেক ব্যবধানেই পরাজিত হয়েছে
অনেকেই অমিত শাহের স্বীকারোক্তিকে তার দলের এই হারের ফলাফল পাঠ করে, করা মন্তব্য বলে দেখেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এখন থেকে তাহলে ভালো হয়ে গেলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি?

অমিত শাহকে নিজ দলে “ম্যাজিসিয়ান” বলা হয়। গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গাতেই তার জয়জয়কার। তিনি নাকি যেটা চান তাই করে আনতে পারেন। দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত আহত-নিহত হন, তাদেরও ভোট তিনি ব্যাগে ভরতে জানেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরবাদের দাঙ্গায় তিনি তাই ঘটিয়েছিলেন।  সেই ‘দাঙ্গা-ওস্তাদ’ তিনিই এবার দিল্লিতে হেরে গেছেন। না, তবু এর পরেও তাঁর স্বভাব বদলাবে না। কারণ তিনি কেবল এই ‘দাঙ্গা’ কাজটাই ভালো পারেন।
এ ছাড়া আরো বড় ফ্যাক্টর হল, ২০১৬ সালের নোট বাতিলের পর থেকে ডুবে যাওয়া অর্থনীতির চিহ্নগুলো মোদী লুকিয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ এর প্রথমার্ধ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাই সেই থেকে “মোদী-ম্যাজিক” বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতএব, আগামী সব নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে “হিন্দুত্ববাদ” এর জজবা বা মেরুকরণ। কাজেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েই তাকে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। হয়তো পরের বার আরো ভাল ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঘৃণা ছড়াবেন। এক কংগ্রেস নেতা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, তার কাছে নাকি গোপন সংবাদ আছে, ‘‘পাকিস্তান এ বারে দিল্লি থেকে বিহারের পথে রওনা হয়েছে’’। কেন?  আগামী অক্টোবরে বিহারে রাজ্য নির্বাচন। দেখুন মেরুকরণের ভবিষ্যত

তাহলে, কেজরিলালের উন্নয়নের বিজয় কী জিনিষ ও তা কতটা সত্য?
বড় সত্যটা হল, কোন রাজ্য নির্বাচনেই ভারতের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলো ভোটার-মানুষ ভুলে যায় না, যেতেই পারে না। যদিও এর পরেও এক্ষেত্রে একটা কিন্তু আছে। সেটা হল দিল্লির “গঠন প্রকৃতির” বিশেষত্ব। যেমন দিল্লি ছিল এক রাজধানী শহর কিন্তু আসলে ছিল এক জেলা শহর মাত্র। পরবর্তিতে তার পড়শি রাজ্য একদিকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা (মানে মুল ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য ভেঙে হরিয়ানা বলে আলাদা রাজ্য করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর হরিয়ানাই দিল্লির লাগোয়া পড়শি। ) আর অন্য দিকে উত্তর প্রদেশ – এদুই রাজ্য থেকে কেটে আনা জেলা শহর নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে আজ দিল্লি রাজ্য হয়েছে – ১১ জেলা শহরের। এভাবে অন্তর্ভুক্তি আবার এক দিনে হয়নি, ১৯৯৭ থেকে সর্বশেষে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে। এর সোজা অর্থ, এই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া জেলাগুলোতে  একটা রাজধানী শহরে  যেমন থাকা উচিত সেই পানি-বিদ্যুৎ-বাস-স্কুল টাইপের নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলোর কিছুই ছিল না। এসব অভাব চরমে  উঠা আর নাগরিক ক্ষোভ থেকেই একে পুঁজি করে আম আদমি পার্টির জন্ম ২০১২ সালে। আর গুছিয়ে ক্ষমতায় থেকে গত পাঁচ বছরে এই ব্যবস্থার চরম উন্নতি ঘটিয়েছে কেজরিলালের আপ দলটা। এই সময়ে রাজ্যের রাজস্ব আয় তিনি বাড়িয়েছেন ৩১%। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লির তথ্য নিয়ে লিখেছে,

ভারতের মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপাত্ত বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দিল্লির রাজস্ব আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আর এ আয় গেছে স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নে। যদিও এ সময়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৭ শতাংশ কমেছে। দিল্লি ভারতের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এর নেতা কেজরিওয়াল আদর্শ মুখ্যমন্ত্রী। পদত্যাগী এই সাবেক আমলা ম্যানেজমেন্ট বোঝেন ভালোই। তিনি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বড়লোকদের বিদ্যুতের রেট তুলনায় বেশি ধরে সে আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের ভর্তুকির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। একই ব্যবস্থা পানি ব্যবহারেও। আবার নারী বাসযাত্রীর ভাড়া ফ্রি। স্কুল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তাতে ইংলিশ স্কুল ছেড়ে অবস্থাপন্নরাও সরকারি স্কুলে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন। আজ আনন্দবাজার লিখেছে, মহিলা ভোটেই কুর্সিতে কেজরী, বলছে ফল-পরবর্তী সমীক্ষা। একারণে মূলত নারীরা তুলনায় আপ পার্টিকে ভোট দিয়েছে বেশি। এমনকি নাকি স্বামীরা বিজেপি-কংগ্রেসের সমর্থক হলেও স্ত্রীরা আপ দলকে ভোট দিয়েছে।  আর এসব ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্বের মূল সুফলভোগী হল সরাসরি স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে আপ দলের মূল ক্ষমতার ভিত্তি হয়েছে এই স্বল্প আয়ের লোকেরা।  নির্বাচনে কেজরিওয়াল নিজের এই সফলতাকেই তুলে ধরেছেন, আর প্রতিদান চেয়েছেন। এমনকি ভোটারদের বলেছেন, আপনি বিজেপি বা কংগ্রেসের সদস্য বা সমর্থক হয়েও থাকেন তবে দল ত্যাগ না করে আমার কাজের প্রতিদান ও আমাকে উৎসাহ দিতে আমার দলকে একটা ভোট দিন। আসলেই তো তিনি ‘স্বল্প আয়ের মানুষের বন্ধু’। না হলে দিল্লির মত ব্যয়বহুল রাজধানী শহরে গরীবদের বসবাস করা আরো কঠিন হয়ে যেত। কাজেই দিল্লির এই বিশেষ গঠন প্রকৃতি – এটা উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু – এই নাম দিয়ে ডাকা ও দেখা সবটা সত্যি নয়। আর এর মানে এই নয় যে, সিএএ-এনআরসি ইস্যু বা কাজ সৃষ্টির ইস্যুতে তাদের কিছু এসে যায় না।

তবে সার কথা হল, দিল্লিই প্রথম কথিত ম্যাজিসিয়ান অমিত শাহ ও তার দলের যে সারা ভারতে “অপরাজেয়” ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই দর্প এবার চূর্ণ করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ভাঙা আত্মবিশ্বাস কতটা অমিতরা ফেরত আনতে পারেন তা এখন দেখার বিষয়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘দিল্লিতে পরাজয়ের তাৎপর্য”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

গৌতম দাস

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2S0

 

মুসলমানবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল ভারতের সংসদের দুই কক্ষেই পাস হয়েছে গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ এর মধ্যে। আর পরদিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা আইনে পরিণত হয়েছে। সংক্ষেপে বিভিন্ন মিডিয়ায় একে ‘সিএএ’ (CAA) (সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) এভাবে ডাকা ও লেখা হচ্ছে। আগামি মার্চ মাসে ব্রাসেলসে ইন্ডিয়া-ইইউ শীর্ষ সামিটে যোগ দিতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। প্রকৃতপক্ষ এটা হয়ে উঠবে ভারত নাগরিক অধিকার কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র বা সরকার হয়ে থাকবে কীনা এর প্রতিশ্রুতিদানের সভা। সম্প্রতি সিএএ- আইন পাশের পর এর নিন্দা বা আপত্তি প্রকাশ নিয়ে প্রস্তাব স্থগিত করে রাখা হয়েছে, মার্চ মাসের এই সামিট পর্যন্ত।

এই বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো তাদের চরম উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়েছে। এবার সুনির্দিষ্ট করে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের (এমইপি বা MEP) সদস্যরা পার্লামেন্টে তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা অনুসারে সংগঠিত ছয়টি গ্রুপের পক্ষ হয়ে প্রথমে ছয়টা আলাদা প্রস্তাব এনেছিল; যাতে এবার তা পার্লামেন্টে সবার আলোচনার পর এক নিন্দা প্রস্তাব হিসেবে পাস হয়। অথবা আরো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আলাদা আলাদা প্রস্তাবের সবগুলোকে একত্রে একটা প্রস্তাব হিসেবে আলোচনার পর তা পাস করা হয়। এভাবে কোন একটা প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে, বলাই বাহুল্য ভারতের জন্য সেটা হবে চরম বিব্রতকর ও লজ্জার। এনিয়ে ভারতের এনডিটিভি লিখেছে, ‘ভারত এখন এক বিরাট কূটনৈতিক বিপর্যয় বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখার মুখোমুখি। কারণ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সিএএ নিয়ে আর কাশ্মিরে ধরপাকড় নিয়ে হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে”। [India is facing a major diplomatic backlash from the European Union (EU) parliament on the Citizenship Amendment Act and the clampdown on Jammu and Kashmir…। এছাড়া ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে যদি আরো কঠোর অবরোধ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাস হয়, তবে তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভারতের জন্য ক্ষতিকর হবে ।
আবার প্রায়ই কথায় কথায় আমরা যেমন দাবি শুনি ভারত নাকি “বৃহৎ গণতন্ত্রের” দেশ  – এমন সেই ভ্যানিটি থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ পালক এখন এথেকে খসে পড়বে তা বলার অপেক্ষা করে না। এই পরিস্থিতিতে ভারতের দিক থেকে এসবের পাল্টা পদক্ষেপে কোথাও হাত জোড় করে নরম অথবা কোথাও ব্যবসা-সুবিধা না দেয়ার গরম হুমকি ইত্যাদি সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতের কূটনীতিকরা মাঠে নেমে পড়েছে, লবি চলছে, সব দিকে সব কিছুর এক বড় তোড়জোড় চলছে।
ভারতকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (EP) এই নড়াচড়াকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কারণ এর ৭৫১ জন (বেক্সিট কার্যকর হবার পর হয়ে যাবে ৭০৫)  সদস্যের  EP মধ্যে সিএএ’র বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছে অন্তত ৬২৬ জনই। যদিও অনেকে বলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের MEP এরা কাগুজে বাঘ মাত্র, যারা হুঙ্কার দেয় যতটা কামড় বসানোর ক্ষমতা বা প্রভাব ততই কম এদের –  পুর্ব অভিজ্ঞতায় এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা অনেকে বলবেন অবশ্যই। কিন্তু ব্যাপারটা এবারও কী তাই হবে? দেখা যাক!

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা এসব প্রস্তাবে আপত্তিগুলোর একেবারে শীর্ষের কথা হল, ভারতের নতুন নাগরিক আইন, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে বৈষম্যমূলক। মানে ‘নাগরিক অধিকার’ হল আনা ঐ প্রস্তাবগুলোর ফোকাস। ‘নাগরিক অধিকার’ ব্যাপারটা আসলে কী ও কোথা থেকে এনিয়ে খুব সংক্ষেপে বললে, আমাদের চলতি বিশ্বের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্টান্ডার্ড এবং এর সবচেয়ে বড় কমন কাম্য দিকটা হল ‘অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ হতে হবে। অর্থাৎ রাজতন্ত্র নয়, কলোনি-মালিকের দখলাধীন কলোনি-রাষ্ট্র নয় বরং স্বাধীন রিপাবলিক ও গণক্ষমতার রাষ্ট্র যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে হবে যেন এগুলো নাগরিকের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হয়।

ফলে এর কমন বৈশিষ্ট্যই শুধু নয়, এক কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং হল নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া। অন্তত নীতিগত ভিত্তি হিসাবে ১৯৪২ সালে  ১ জানুয়ারি সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন (যদিও তখনও তা মাওয়ের চীন নয়) – এই দুই রাষ্ট্র আমেরিকা ও বৃটেনের সাথে একমত হয়ে গ্লোবাল রাজনীতিক ব্যবস্থার নতুন ভিত্তি মানতে লিখিত ঐক্যমত প্রকাশ করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি এমন সময় থেকেই এই মূল মেরুকরণ শুরু হয়েছিল। আমেরিকার নেতৃত্বের কাম্য সেই নতুন দুনিয়াতে কলোনি আর নয়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র – হিটলার ও তার সঙ্গীদের রাষ্ট্রজোটের বিপরীতে এই পক্ষই জয়লাভ করে ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। আর সেই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ সব রাষ্ট্রের এক অ্যাসোসিয়েশনের জন্ম হয় জাতিসঙ্ঘ নামে। এরপর জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবাই বসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ‘আইন ও কনভেনশন’ থেকে অধিকারের চার্টার লেখা হয়েছিল। আর স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশের ওপর আইন ও কনভেনশনগুলো বাধ্যতামূলক পালনীয় হয়ে যায়।

অবশ্য এর সাথে তৈরি হয়ে যায় নানা ফাঁকফোকরও। বিশেষ করে আইন ও কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন কে কার উপর করবে, কিভাবে করবে, কতটা করবে নাকি ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে নিজেকে আড়াল করবে – এসব প্রশ্নে। এছাড়া সবার উপরে তো আছেই রাষ্ট্রের বৈষয়িক লাভালাভের স্বার্থ আর এই ভিত্তিতে পক্ষে-বিপক্ষে থাকা অথবা না থাকার জোট বাঁধা। দেখা গেছে, বৈষয়িক স্বার্থের লোভে কোনো রাষ্ট্র অন্যকে অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে আপস বা ছাড় দিয়ে বসতে দেখা যায়। যেমন, রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেও মায়ানমার যেভাবে বেচে যাচ্ছে। অথবা ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ভারতের বাজার সুবিধা পেতে পশ্চিমের অনেক রাষ্ট্রই ভারতের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে মোদী সরকারকে ছাড় দিয়ে বা উপেক্ষা করে বসে আছে। এসব সমস্যা থেকে দুনিয়া একেবারে মুক্ত হতে পারেনি এখনো, সে কথা সত্য। কিন্তু তাই বলে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড গড়ে বা অধিকার বিষয়ক নানান আইন ও কনভেনশনের প্রটেকশন গড়ে তুলে কোনোই লাভ হয় না অথবা এ নিয়ে ব্যত্যয় ঘটলে কারো বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলা হয় তাকে বিব্রত করার জন্য এমন কথাও ভিত্তিহীন অবশ্যই। এছাড়াও যদিও জাতিসঙ্ঘের অধীনের বিচার বা তদারকি কাঠামো- এই ব্যবস্থার মধ্যে কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও তা প্রমাণ করা বা প্রস্তাব পাস করে আনা খুব সহজ কাজ নয়। অভিযোগ সবটা বা সবার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে কখনো সমর্থ না হলেও কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে এমন উদাহরণের বাস্তবতা নেই।

তবে সবচেয়ে কমন ঝোঁক হল, কোনো রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন বা অধিকার বৈষম্যের অভিযোগে নিন্দা প্রস্তাব উঠলে নিরুপায় সে রাষ্ট্র তখন অন্যের অভিযোগ তোলাটাকে নিজের ‘সার্বভৌমত্বের’ লঙ্ঘন বা ভিন রাষ্ট্রের বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’ বলে দাবি করতে থাকে। এভাবে নিজ মুখ রক্ষার চেষ্টা করে থাকে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে অন্তর্বর্তী রায়ে অভিযুক্ত হয়ে ধরা খেয়ে মিয়ানমারও  এই কাজটা করেছে। আর সিএএ ইস্যুতে এবার ভারতের প্রতিক্রিয়াও তাই। এটা ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ “entirely internal to India” বলে দাবি করা হয়েছে। মানে বলতে যাচ্ছে যেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা প্রস্তাবের কথা তুলে ইউরোপ যেন ভারতের পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন করেছে। এ ব্যাপারে পুরানা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো আরো সরেস। তাদের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসা মাত্রই তারা একে ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বা ‘হস্তক্ষেপ’ বলে প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকে। আবার খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেও কখনও অভিযোগ উঠলে সেও কম যায় না। সে নিজে জাতিসঙ্ঘের ওই অঙ্গসংগঠন থেকে নিজের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়ে অথবা আর কখনো চাঁদা দিব না বলে অথবা  খোদ জাতিসংঘ বা ঐ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে অকেজো করার হুমকি দিয়ে থাকে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে কলোনি ব্যবস্থার সমাপ্তি ও অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক ধারণার রাষ্ট্রের প্রস্তাবক হলেন সেকালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নিজে। শুধু প্রস্তাবকই নয়, যুদ্ধে নিজের অংশ গ্রহণ ও মিত্রদের সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি বলেছিলেন একথাটা।

সেকালে হিটলারের কাছে হেরে যাবার ভয়ে নিরুপায় হয়ে হিটলার-বিরোধী ইউরোপীয় “মিত্র-রাষ্ট্রগুলো” [Allied powers] আমেরিকান প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। তবে এর আগে থেকেই যদিও ইউরোপ দাবি করত যে, তারা সবাই নাকি আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুদ্ধ শেষে সবার আগে তারা নিজেই নিজেদের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা কাঠামো ব্যবস্থা সংস্কার করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়েছিল। অর্থাৎ মানে দাঁড়িয়েছিল যে, আগে নিজেদের আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও সেবার মেনেই নিয়েছিল যে তারা “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র আসলে ছিল না।  যারা অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস অরিস্কার করে বুঝতে চান তাদের জন্য যুদ্ধোত্তর এই নতুন ইউরোপকে চেনা ও বুঝতে চেষ্টা করা খুব গুরুত্বপুর্ণ। ইউরোপের বেশির ভাগ যেসব রাষ্ট্র বিনাবাক্য ব্যয়ে বা কোন ওজর আপত্তি না তুলে এভাবে নবজন্ম লাভ করে নিতে আগিয়ে এসেছিল এমন ৪৭ টা রাষ্ট্রের একটা জোট তখনই গড়ে তোলা হয়েছিল। এর নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe). এবিষয়ে আরও জানতে আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন – Who we are – the Council of Europe ।  আর একই সাথে লক্ষ্যণীয় একই প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষে নাগরিক-অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রের নব-দুনিয়া গড়ার আমেরিকান প্রস্তাবে বৃটেনের চার্চিলসহ স্টালিনের সোভিয্যেন ইউনিয়ন ও চিয়াং কাইসেকের  সমগ্র চীন স্বেচ্ছায় এবিষয়ে একমতের দলিলে স্বাক্ষরকারী। এবং  ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি আমেরিকা, বৃটেন, সোভিয়েন ইউনিয়ন ও চীন এই চার রাষ্ট্র স্বাক্ষরিত এই দলিলকেই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা (Declaration of The United Nations 1942) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম ইউরোপ নিজেকে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe) গঠনের মাধ্যমে সংশোধন বা পুনঃজন্মলাভ করে নিলেও এবং চিয়াং কাইসেকের বা পরবর্তিতে মাওয়ের চীনসহ স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এদুই রাষ্ট্রের মধ্যে  “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র গড়ার ইস্যুতে কোন প্রভাব পড়ে নাই। যদিও সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা  এই দলিলে স্বাক্ষর করে স্টালিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ইউরোপের নিজেকে  নাগরিক অধিকারভিত্তিক করে পুনর্গঠনে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামি সংগঠিত হয়েছিল। আসলে এটা ছিল জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর ভুলকে সংশোধন করে   নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিজেদেরকে পুণর্গঠন। এভাবে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামে ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্রের জোট গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। আর এর মধ্যেকার কেবল ২৮ রাষ্ট্রের আরও ফরমাল ও আরও ঘনিষ্ঠতার রাষ্ট্রজোটে হচ্ছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বা ইইউ (European Union)।  এই হল, ইইউ এর সাথে  কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE এর সম্পর্ক ও  ফারাক।

১৯৫৩ সালে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE শুধু গঠন করা নয়, বরং নিজেদের সব নাগরিকের জন্য এক কমন অধিকারের চার্টার রচনা কাজ করে নিয়েছিল সদস্য রাষ্টড়্গুলোর এক কনভেনশন ডেকে, যার নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অ্ন হিউম্যান রাইট (European Convention on Human Right, ECHR) । আর এটা বাধ্যতামূলক প্রযোজ্য করা হয়েছিল কাউন্সিল অব ইউরোপ নামে নিজেদের নবগঠিত ৪৭ ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোটের সব রাষ্ট্রের ওপর। আর অধিকার সম্পর্কিত ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রের কোন নাগরিকের অভিযোগ তদারকির জন্য আলাদা সুপ্রিম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল যার নাম ইউরোপীয় কোর্ট অব হিউম্যান রাইট বা (ECtHR) নামে। আসলে এটাই ছিল আগামির কোন হিটলারের ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদ বা জাতনিধনের বিরুদ্ধে ইউরোপের নিজেকে রক্ষাকবচ।

মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ অতীতের কারণে আজকের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ-বিরোধিতা করে অধিকারবিষয়ক যেকোনো প্রস্তাব আলাদা গুরুত্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া আরো একটি কারণে এখনকার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে প্রস্তাব আনা আলাদা বিশেষ গুরুত্বের। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন সে জায়গা নিতে চাচ্ছে বা যাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় চীনকে ঘায়েল করতে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে হিউম্যান রাইট ইস্যু ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে চীনের প্রতি ইইউর অবস্থান ভিন্ন। কমিউনিস্ট কাঠামোর রাষ্ট্র হিসেবে চীনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ড সবসময় খারাপ থাকে। আর আমেরিকার পলিসি হল চীনকে দাবড়ে রাখা। তাই আমেরিকা তে চিনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ডের কথা তুলে চিনকে ঘায়েল করতে চায়। কিন্তু ইইউর অবস্থান আমেরিকার মতো ঘায়েল করা নয়। বরং ইইউ এর পলিসি নিয়েছে, চীনকে হিউম্যান রাইট মেনে চলা কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র করে গড়ে উঠতে সাহায্য-সহযোগিতা করা। আর এভাবে চীন-ইইউর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। গত ২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্রাসেলসে চীন-ইইউ এক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখান থেকে ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটাই হিউম্যান রাইট প্রসঙ্গে চীন-ইইউ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়তে চাওয়ার এক প্রামাণ্য দলিল।

কিন্তু মোদির কপাল সত্যিই খারাপ। আগামী মার্চ ২০২০ সালে ভারতের সাথেও একই রকমভাবে ভারত-ইইউ সামিট হতে যাচ্ছে ব্রাসেলসে। তাই ওই সময়ে মোদির ব্রাসেলস সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই যারা ভাবছেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা আগের মতোই কোনো মামুলি ব্যাপার অথবা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে কোনো শক্তিশালী প্রভাব ফেলার মতো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাপার নয় তারা সম্ভবত ভুল প্রমাণিত হবেন। আগের ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট শক্ত অথবা নরম যাই ভূমিকা নিয়ে থাকুক না কেন এবারের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আগের চেয়ে ভিন্ন এটা প্রমাণিত হবেই। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইটের নীতির ভিত্তিতে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন থেকে তারা সাজাবেনই, এ নিয়ে তারা নিজেদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সেটা এ জন্য যে, এমন নীতি ভিত্তিতে আরো আগে না দাঁড়াতে পারার জন্য চীনকে বিশেষ করে বেল্ট-রোড ইস্যুতে চিনের সাথে যুক্ত হওয়া বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ইইউ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রায় সবাই আলাদা এককভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক করতে প্রায় চলেই গিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে সেখান থেকে সরে আসতে সক্ষম হয়েছিল অবশ্য।  এরপর তারা ইইউ হিসেবে একসাথে চীনকে মোকাবেলা করতে সমর্থ হওয়া থেকেই চীনকেও হিউম্যান রাইট মেনে চলতে বাধ্য ও রাজি করানোর পর্যায়ে আসতে পেরেছে তারা। এর ফলেই সব বিপর্যয় এড়িয়ে নিজেদের ভাঙন এড়িয়ে ও শক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে বলে মনে করে। এতে এমনকি এরপর গত বছরের মে মাসে চীনে বেল্ট-রোড টু এর সম্মেলনও এই নীতির ভিত্তিতেই ২৯ রাষ্ট্রপ্রধানের এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল।

সর্বশেষ অবস্থা হল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে এবারের ঐ ছয় প্রস্তাব একসাথে একটা প্রস্তাব হিসেবে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে নিজেদের আরো আলোচনা ও তা পাস হওয়ার ব্যাপারটা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। এর মূল কারণ সম্ভবত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট  নতুন নাগরিকত্ব আইন  ভারতের কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করেছে বা বিরোধী হয়েছে কিনা সে মামলার বিচার করতে গিয়ে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে ৪০ দিন সময় দিয়েছে। অর্থাৎ আদালত এই বিতর্কিত আইন বাতিল করে দেয় কিনা বা কী রায় দেয়  সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছে। কিন্তু ভারতের কিছু পত্রিকা লিখছে এই স্থগিত করাকে মোদি সরকার নিজের কূটনৈতিক বিজয় মনে করছে।

এটাও ভুল প্রমাণিত হবে। কারণ মার্চ মাসেই ভারত-ইইউর সামিট (India-EU Summit 2020) অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে মোদি সিএএ’র ব্যাপারে পিছিয়ে সরে এসে যদি হিউম্যান রাইট মেনে চলার জোরালো অঙ্গীকার না করেন তবে এর পরিণতি খুবই খারাপ দিকে যেতে পারে। তবে বড়জোর ভারত হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য আরো সময় চাইতে পারে। কিন্তু সেটা কেবল এই শর্তে যে, তত দিন নতুন নাগরিক আইন ও এনআরসির বাস্তবায়ন স্থগিত করতে হবে। অন্যথায় চরম খারাপ দিকটা হল, ইইউ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা পর্যন্ত গিয়ে বসতে পারে। এক কথায় সিএএ-এনআরসি বাস্তবায়ন আর ইইউর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক- এই দুটো আর আগের মতো একসাথে চলতে পারবে না।

এমনকি বাংলাদেশের চলতি নির্বাচন নিয়ে যে ‘পর্যবেক্ষণ’ ইস্যুতে তর্কাতর্কি চলছে। এটাকেও হাল্কা বিষয় হিসেবে দেখা হয় যদি, এটাও ভুল হবে। ইইউ হিউম্যান রাইট মেনে চলা বা এর কমপ্লায়েন্স ইস্যু এখন থেকে খুবই কঠোরভাবে অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। কেবল বাস্তবায়নের জন্য সময় বেশি চাইলে অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে তা করতে চাইতে পারি। তবুও সেটা সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতির অধীনেই কেবল হতে পারে।

হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স এটা হতে যাচ্ছে ধীরে ধীরে – অর্ডার অব দ্যা কামিং ডেজ! ফলে এটা এখন দেখার বিষয় মোদী কিভাবে নিজেকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে হাজির করেন!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মানবাধিকার ইস্যুতে সিরিয়াস”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]