রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

গৌতম দাস

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Pa

 

[সার সংক্ষেপঃ জিন্নাহকে সব দোষে দোষী করার লোকের অভাব নেই, বিশেষত সাতচল্লিশের পরের জমিদারি হারানো কমিউনিস্টদের চোখ ও ভাষ্যে। অথচ ঘটনা হল, রামমোহন থেকে গান্ধী-নেহরুর আমল পর্যন্ত এসব মহারথীদের চিন্তাকে অনুসরণ ও  মুল্যায়ন করতে খুটিয়ে দেখার চিন্তাগত মুরোদ খুব কমজনেরই থাকতে দেখা যায়।  এদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটি ও তা থেকে বিভ্রান্তির কারণ  হল মূলত “জাতি” ধারণা। যেমন এর একটা নমুনা হল, এই মহারথীরা  সবাই “রাষ্ট্র গঠন” বলতে “জাতি গঠন” বুঝতেন। অথচ যেখানে জাতি মানে আসলে “রাষ্ট্র” কখনোই নয়। এছাড়া একটা অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর ভুল ধারণা হল জাতি [Nation]।   আবার কথা হল, ‘জাতি’ বলতে তারা কেবল আবার “ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন। যেমন তাদের বেলায় “হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন তাঁরা। অর্থাৎ মুল কথাটা হল, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় কেমনে! – এই ছিল তাদের প্রবল ভুল অনুমান।

রাষ্ট্র মানে জাতি আর, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় না –  এই হল তাঁদের ‘দুই ভুল অনুমান। এর উপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত হল বৃটিশেরা চলে গেলে তাঁদের একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারত “জাতি” চাই। অথবা এভাবে বলা যেতে পারে যে, হিন্দু জাতির একটা ভারত ছাড়া আর কীইবা তারা চাইতে পারে! কারণ তাদের চোখে এর অন্যথা কিছুই তো হতে পারে না।  ভারতবর্ষের “হিন্দু জাতি” তো একটা  “হিন্দু জাতির” ভারত ছাড়া অন্য কিছু চাইলেও কায়েম করতে বা হতে পারবে না – এই ছিল  সারকরে তাদের ভুল অনুমান।  রামমোহনের মূল কর্মততপরতার কালের শুরু ১৮১৫ সাল থেকে ১৯৪৮ সালে গান্ধীর মৃত্যু পর্যন্ত এই একশ ত্রিশ বছর হিন্দু জাতি বুঝের তাদের জার্নিটাই ছিল এমন।

লক্ষ্যণীয় উপরের প্যারায় শুরুতে রাষ্ট্র শব্দটা একবারই ব্যবহার হয়েছে, তাও সম্পর্ক দেখানোর জন্য। মূলত “রাষ্ট্র” শব্দটাই তাদের কোন চিন্তা বা অনুমানের মধ্যে থাকত না। রাষ্ট্র শব্দটাই তাঁরা তখনও শিখেনি অথবা এই শব্দের উপযোগিতা কী, কাম কী তারা বুঝে উঠতে পারে নাই।  কারণ তাদের চোখে দিনের আলোর মত পরিস্কার লাগত যে “স্বাধীন ও দেশপ্রেমিক এক হিন্দু জাতি হিসাবে নিজেদের গঠন” – এর বাইরে তারা আর কি করতে পারে।  এজন্য সেকালে রাজনীতি বলতে তারা তিনটা শব্দ বুঝত – স্বাধীনতা, দেশপ্রেম আর জাতি। রাজনীতি বলতে এই তিন শব্দ বুঝার ক্ষেত্রে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার বুঝাবুঝিতে আলাদা কিছু ছিল না।
এতে অসুবিধা কী?
অসুবিধা হল রাষ্ট্র ধারণা তখনও কারও মাথায় নাই অথবা কারও মাথায় আসেনি মানে রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদান নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই। তাই রাষ্ট্র নাই মানে নাগরিক ধারণাই নাই।  আর, নাগরিকের অধিকার ধারণা নাই। অথচ জাতি ধারণা আছে। মানে জাতি বলে বড়জোড় একট কমন স্বার্থের জনগোষ্ঠিগত স্বার্থ বলে ধারণা আছে। এটাই হিন্দু জাতি ধারণা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে জিন্নাহ বৃটিশ-ভারতের হবু রাজনৈতিক জগতে জিন্নাহ’র আবির্ভাবের আগে থেই হিন্দু জাতি ধারণা হাজির আছে। তাহলে জিন্নাহ-ই প্রথম হিন্দু আর মুসলমান এই  দ্বিজাতি তত্বের ধারণা আনলেন এমন দাবি ভিত্তিহীন।
দ্বিতীয়ত, ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্মের পরে যখন নিশ্চিত হয়ে উঠছে যে কংগ্রেস হিন্দু জাতির ভারত-ই একমাত্র কায়েম করতে চায়,  তাহলে কংগ্রেস ও গান্ধীর হিন্দু ‘জাতি গঠন ধারণাকে’ অস্বীকার করে ফেলে দেয়া ছাড়া জিন্নাহর উপায় কী ছিল! এটাই তাদের মুসলমান জাতীয়তাবাদ করতে চলে যাওয়া। অথচ মুলচিন্তায়  জটিলতার কেন্দ্র হল জাতি ধারণা, কাজটা কোন  জাতি গঠন নয়। বরং রাষ্ট্রগঠন। নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্রকে কনষ্টিটিউট করা এই অর্থে রাষ্ট্রগঠন।  এভাবে ব্যাপারটা হলো আসলে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিকের ভিত্তিতে বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রগঠন ও কায়েম হল সব কিছু সমাধান।
আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। জিন্নাহ হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি একথা তিনি এনেছেন। একথা পেরেছেন অবশ্যই। কিন্তু কেন? হিন্দু জাতিগঠন যারা মানবে না তারা যেন আলাদা রাষ্ট্র চাইতে পারে, এই ব্যাপারটার পক্ষে যুক্তি সাজানোর জন্য।  কিন্তু জিন্নাহ লক্ষ্যচ্যুত নন। তিনি নাগরিকত্ব মানে রাষ্টড়-নাগরিক বিষয়ক মৌলিক শিক্ষা ভাঙ্গেন নাই। কিভাবে? তিনি ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব করবেন না। তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিক হবেন এই পাকিস্তানের কথা বলেছেন।

তাই, ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালের বক্তৃতায় জিন্নাহ বুঝিয়ে রেখে যেতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় স্বাদের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব এই পাকিস্তান কায়েমের লোক জিন্নাহ নন। যদিও পরবর্তিতে কনষ্টিটিশনের পাকিস্তান – এমন পাকিস্তান হলেও বাস্তবের পাকিস্তান জিন্নাহর স্বপ্ন হতে পারেনি সেকথাও সত্য। একালের ইমরান খান আবার অনেক কিছুই নতুন চোখে দেখবার আশা করতে উসকানি দিচ্ছেন। কিন্তু অমিত শাহ? আগে ছিল যেগুলো গান্ধীর হিন্দুজাতির ভারত কায়েমের চিন্তা বিষয়ক ভুল। আজ অমিত সেই হিন্দুজাতির আরও বড় ভারতের কলঙ্ক হতে রওনা দিয়েছে। বৈষম্যহীনতার সমান নাগরিকই যেখানে সব কিছুর সমাধান। তবু অমিত শাহরা হিন্দুর স্বার্থ কেবল হিন্দু পরিচয়ের মধ্যে খুজে এক মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে ভোটবাক্স ভর্তি করতে চাইছেন।]

 

রাষ্ট্র মানে জাতিগঠন নয়। বৈষমহীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মামলা।
কাজেই জিন্নাহর, গান্ধীর ‘হিন্দুজাতি’ গঠন ধারণাকে উপড়ে ফেলে দেওয়া ছাড়া কী করার ছিল?

বাসায় চোর পড়লে অনেক সময় এরপর দেখা যায় চোরকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে চুরিতে নিরাপত্তার ফাঁকফোকরগুলোর দিকে নজর ও সংস্কার কাজ শুরু করে দিতে। কারণ, চুরিটা না হলে নিরাপত্তার ঘাটতির দিকগুলোতে আমাদের মনোযোগ যেত না। এই বিচারে আমরাও বাংলাদেশ থেকে এখন অমিত শাহকে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ঘর সুরক্ষার কাজে নামতে পারি। কারণ তিনি আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে নজর ফেলতে পরোক্ষে সুযোগ করে দিয়েছেন, যদিও তা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারব তা এখনই একেবারে নিশ্চিত নই আমরা।
ভারতের নাগরিক সংশোধনী বিল ২০১৯ [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)] উভয় সংসদে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে এখন চালু হয়ে গেছে। অমিত শাহের উচ্চারণ স্পষ্ট, “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”। আনন্দবাজার আশা করে লিখেছে – “রাজ্যসভায় শাহের রাখঢাক নেই”। পত্রিকাটা বলতে চেয়েছে এর আগে লোকসভায় যেভাবে অমিত যেভাবে ঢেকে রেখেছিলেন সেভাবে কেন ঢেকে রাখেন নাই।
কিন্তু তবু অমিতবিরোধী কারও কোন পক্ষ থেকে এর বিপক্ষে কী জবাব দেবে, এর তেমন জোরালো বয়ান দেখা যায়নি। কেন এটা এমন, কেন?
ব্যাপারটা হল এত দিনের যে প্রচলিত “হিন্দুজাতির” ভারত, সেখানে কেউ মুসলমান হলে ও নাগরিকত্ব পালার ইস্যু থাকলে হিন্দুদের পক্ষ থেকে তাকে নাগরিকত্ব না দিতে চাওয়া – এটাই কি স্বাভাবিক ছিল না?  ভারতের সামাজিক পরিসরে রাষ্ট্র বিষয়ে এমন বোধবুদ্ধি, বুঝাবুঝির লজিকই তো ভারতের সমাজে এত দিন ধরে ছড়িয়ে রাখা আছে। অন্তত নেহেরু-গান্ধীর আমল থেকেই।  এটা তো অমিত শাহ হঠাৎ করে বলছেন তা তো না। আর সে জন্যই তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। আর যারা শুনছেন তাদের কাছেও এটা নতুন, অনভ্যস্ত বা প্রথম মনে হচ্ছে না। তাই তেমন প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়াও নাই

অথচ সোজা ঘটনাটা হল এই যে, অমিত বলতে চাইছেন ভারত রাষ্ট্রের মন কেবল কেঁদে উঠবে অন্যদেশের একমাত্র মুসলমান ছাড়া বাকি সবার বেলায়। এমনকি খ্রীশ্চান হলেও কাঁদবে! এই বক্তব্যের পিছনের অনুমান হল যে,.১. যে ভারত রাষ্ট্রের “কমন মন” বলে একটা কিছু এখানে ধরে নেয়া হয়েছে সে মুসলমানবিদ্বেষী অথবা এর ভিতরে কোন মুসলমান নাই। ২. এই বক্তব্যে সার্বজনীন সবার নাগরিকের অধিকারের জন্য হওয়া উচিত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটাকে হাজির করা হয়েছে মুসলমানবিদ্বেষী ভাবে আর মুসলমান বাদে ভারতে দেখা যায় এমন সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য করে। এর অর্থ তারা ভারতকে একটা ধর্মনির্বিশেষে নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র মনে করে নাই।  আসলে এটাই তো গান্ধীর “হিন্দুজাতি” ধারণা।

আবার আসাম, ত্রিপুরাসহ নর্থ-ইস্টে যা দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখছি আমরা, সেটা মোদী-অমিতের সরকারের বিলের বিরুদ্ধে অবশ্যই। কিন্তু  সেটাও  ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের সমান নাগরিকত্ব থাকা উচিত সে অবস্থানের জন্য নয়। বরং বাংলাদেশেরই বিরুদ্ধে। তবে অমিতের পক্ষে নয়। তাহলে? এই নাগরিক সংশোধনী বিল মানে ক্যাব [CAB] বিল ইস্যুতে, সাধারণভাবে নর্থ-ইস্ট মনে করে ও তাদের আশঙ্কা এই যে অমিতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ফলে এখন নর্থ-ইস্টের লাগোয়া বাংলাদেশের সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের হিন্দু যারা আছে, তারা এখন সদলবলে নর্থ-ইস্টের আট রাজ্যে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব নিতে চাইবে। মূলত এর প্রবল বিরোধিতা করতেই তাদের মোদী সরকারবিরোধী দাঙ্গা-হাঙ্গামা। আর ত্রিপুরার ক্ষেত্রে এসব ছাড়াও  তাদেরবাড়তি একটা ইস্যু হল, সেখানের মোট জনগোষ্ঠির (সম্ভবত এক-তৃতীয়াংশ) আমাদের চাকমা, গাড়োরা সহ এদেরই মত মোট আট পাহাড়ি গোষ্ঠির। যারা ইতোমধ্যেই এক ধরণের স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে জেলাভিত্তিক। এরা এখন এই সুযোগে আলাদা রাজ্য চাওয়ার দাবি জোরালো করে তুলেছে। সার কথাটা হল সারা নর্থ-ইস্টেই সমতল (মূলত বাংলাদেশ) থেকে বাঙালিরা তাদের জেলায় এসে পড়া ও আশ্রয় নেয়ার বিরোধী তারা।

অমিত শাহ এই বিল আনার মাধ্যমে জেনে বা না জেনে দীর্ঘদিনের চাপা পড়ে থাকা দেশভাগের প্রায় সব বিতর্ককে আমাদের সামনে আবার জাহির করে দিয়েছে। এর মূল কারণ নেহরু-গান্ধীর জমানা থেকেই ভারতরাষ্ট্র যে নাগরিকে-নাগরিকের মধ্যে ফারাক বা বৈষম্য করতে পারে না। এটা যে হারাম তা তো কখনোই বাস্তবায়ন করতে গেছে তা আমরা দেখিনি। যদিও ভারতের কনষ্টিটিউশনে সেটা যেভাবেই লেখা থাক। যেকোন আধুনিক রিপাবলিক ভিত্তিমূলক যেসব মূলনীতি ধারণা থাকে এ দিক থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই ভারত-রাষ্ট্রকে বুঝা বা বুঝানো ও প্রাকটিশ করার চেষ্টা করা হয়নি।

যেমন মোদীর শাসনের চলতি এই গত ছয় বছরকেই বিচার করলে আমরা পাই  – এখানে মুসলমানদের ওপর যা খুশি জোর তো করাই যায়, বৈষম্য তো করাই যায়। মোদি-অমিত চাইলেই করতে পারে। তাই কি সারা ভারতবাসী দেখে আসেনি? মুসলমানকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো অথবা গরু খাওয়া, গরু বহণ করা ইত্যাদি অভিযোগে রাস্তায় রাস্তায় তা চেক করতে বিজেপির ভিজিলেন্স পার্টি তো বসানোই যায়; আর বসিয়ে এমন মুসলমানের খোঁজ পেলে তাকে রাস্তাতেই পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়- এটাই কি ভারতবাসী দেখেনি?

শুধু তা-ই নয়, এ নিয়ে সারা ভারতে কোথায় মামলা-বিচার কোথাও কিছু হয়নি। সর্বশেষ আবার এমন পিটিয়ে [তাবরিজ আনসারী খুনের ঘটনায়] মামলা হয়েছে যদিও কিন্তু সেটা খুনের না হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যর মামলা বলে।  গরু পালা দুধের ব্যবসায়ী পহেলু খানের হাট থেকে গরু কিনে আনাতে হাটের রশিদ দেখানোর পরেও লিঞ্চিং খুন হলে এর আসামিরা দুর্বল মামলা দেওয়ায় আসামীরা সবাই বেকসুর খালাস হয়ে গেছে। মএব্যাপারে মোদীর দ্বিতীয়বারের চলতি সরকারের আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান হল, ভারতে রাস্তায় পিটিয়ে মারা লিঞ্চিংয়ের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সবই গুজব, সাজানো আবার আরএসএস নেতা ভগত বলেছেন, পিটিয়ে মারা বা লিঞ্চিং শব্দ ব্যবহার না করতে। সারা ভারতে এভাবে এমনকি সাধারণ নাগরিককে বটেই, এক মুসলমান এমপিকে আর এক হিন্দু এমপি জয় শ্রীরাম বলাতে জোর খাটাতে, জনসমক্ষে তর্ক করতে দেখা গেছে।

মজার কথা হল, এসব নিয়ে কোনো জনস্বার্থবিষয়ক মামলা অথবা আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বলে কোনো কিছু হতে দেখা যায়নি; বরং সোস্যাল প্রাকটিস এর বয়ান হল উল্টাটা। যেমন মমতা নাকি মুসলমানদেরকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছেন, তাই পশ্চিমবঙ্গে মুসমানদেরকে দাবিয়ে রাখা নাকি দরকার – এমন ভাষ্য ফেসবুক সোস্যাল মিডিয়ায় ডমিনেটিং পারসেপশন।

সারা দুনিয়াতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রসঙ্গে সকলের একেবারে প্রাইমারি ঐক্যমত্যের বৈশিষ্ট্যগুলো হল –
১. এটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র আর এখানে সব নাগরিক সবার অধিকার সমান।
২. নাগরিক মাত্রই রাষ্ট্র বৈষম্যহীনভাবে সকলকে সমান চোখ দেখতে ও আচরণ করতে বাধ্য।

কাজেই এটা জাতিগড়া বা জাতিগঠনের বিষয়ই নয়। রাষ্ট্রের এটা নাগরিককে তার  নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মামলা। যেখানে নাগরিক আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক হল – নাগরিকেরা হল রাষ্ট্রের গঠনের উপাদান (constituent)। রাষ্ট্র নাগরিক দিয়ে তৈরি (constituted)। আর দলিল অর্থে তৈরি জিনিষ হল constitution। এখানে ‘জাতি’ [nation] বা হিন্দু জাতিগঠন বলে জিনিষটাকে বিভ্রান্ত করা বা বিভ্রান্তি ছড়াবার অন্তত একালে আর কোন সুযোগ নাই।
একারণেই এখানে রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ব্যবহৃত শব্দগুলো হয় – মানবাধিকার, সমানাধিকার, বৈষম্যহীনতা, সাম্য ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে? না এখানে সব কিছুর উপরে এক আজিব শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িক’। (অথবা একই ধারণায় বিপরীত অর্থে ‘অসাম্প্রদায়িক’।)

প্রথমত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার সাথে সম্পর্কিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে সংশ্লিষ্ট কোনো শব্দ-ধারণা দুনিয়ার কোথাও নেই; কিন্তু ভারতে এটা আছে। আর এটা হল মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সংকীর্ণভাবে কেবল তাদের দিক থেকে বলা শব্দ। তারা যাকে বা যে আচরণ বা রীতিকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে দায়ী করবে, সেটাই সাম্প্রদায়িক। সাধারণত মুসলমানদের অভিযুক্ত করতে তাদের এই সংজ্ঞা তারা ব্যবহার করে। যেমন ইসলামী চিহ্ন প্রকাশ হয়ে পড়ে (যেমন টুপি) এমন কোনো কিছু দেখিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করা যাবে না। এটা নাকি সাম্প্রদায়িক। মুল কথাটা হল হিন্দু ডমিনেটিং সমাজে এটাকে তারা তাদের কর্তৃত্ব আধিপত্যকে ঢিলা করে ফেলা বা যেন অস্বীকার করার সুযোগ হিসবে কেউ না নেয়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই “সাম্প্রদায়িক” নামে শব্দ ও বয়ান দিয়ে শাসন করা। কিন্তু সকালে পূজা-অর্চনা করে কপালে ফোঁটা বা ড্রয়িং তিলক এঁকে কাজে বা সংসদেও যাওয়া যাবে।

কিন্তু সারা দুনিয়াতে ‘সম্প্রদায়’ বা ‘কমিউনিটি’ কথাটা খুবই ইতিবাচক। এটা নিচা, হেয় বা খারাপ বুঝানোর শব্দ না।  যেমন ইউরোপের যেকোন শহরে সমাজের জন্য যে কাজ করে, স্বেচ্ছাশ্রম দেয় সে সম্মানিত ‘কমিউনিটি’ ওয়ার্কার। কিন্তু ভারতে কমিউনিটির রুট শব্দ কমিউন [commune] – এটা ব্যবহার করা হয় নেগেটিভ অর্থে। কমিউন থেকে ‘কমিউনাল’[communal] বলে ইংরেজিতে আর এক শব্দ বের করে আনা হয়েছে যেটাr অর্থও ইতিবাচক; ‘সমাজ সম্পর্কিত’ অর্থে। কিন্তু ভারতে এর অর্থ করে নিয়েছে খুবই জঘন্য। আর এরই বাংলা করা হয়েছে “সাম্প্রদায়িক”। মানে এটাই ভারতে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নেতিশব্দ। সাধারণত এটা মুসলমানদের উপর ব্যবহার করা হয়। যার আসল অর্থ হল, হিন্দু সামাজিক কর্ত্তৃত্ব মানতে যে অস্বীকার করে।

আসল কথাটা হল, ব্রিটিশ আমল থেকেই হিন্দু-জমিদারি ক্ষমতায় (এর তৎপরতা কার্যক্রমের শুরু মোটা দাগে বললে ১৮০০ সাল থেকে যেখানে তখন ১৭৯৩ সাল থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি আইন চালু করা হয়ে গেছে কেবল) এর যে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছিল, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল সে সময়ের কোনো শব্দের কী অর্থ হবে। বিশেষ করে তাদের সাজানো সেই আধিপত্য যেন মুসলমানরা ভঙ্গ না করে সেই লক্ষ্য সাজানো সামাজিক অনুশাসন। মুসলমানরা ছিল সেই সময়ের সামাজিক স্তরভেদে নিচে ধরে নেয়া স্তরেরও সবার নিচের স্তরে বলে, এটাই মনে করানো ছিল এর উদ্দেশ্য।

মনে রাখতে হবে, মোটা দাগে ১৮০০ সাল থেকে পরের দেড় শ’ বছর ধরে এই হিন্দু জমিদারি-কেন্দ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য এটাই প্রজা নিয়ন্ত্রণের বয়ান ও এর সংজ্ঞার নির্ধারক ছিল। কৃষি সে সমাজের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই কৃষি মালিকানা ব্যবস্থা হিসাবে চিরস্থায়ী জমি দেয়ার বন্দোবস্ত, যা আমরা জমিদারি বলি বুঝি আর সেখানে বেশির ভাগ জমিদার ছিল হিন্দু, মানে সবমিলিয়ে এরাই মূল রুলিং ক্লাস। এ কারণে তাদের এটাই ছিল সব কিছুর ওপর ডমিনেটিং ফ্যাক্টর, সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এই ক্ষমতাটাই সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ভয়-শঙ্কায় শশব্যস্ত হয়ে থাকত। তাদের ভয় ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতপ্রথার কথা তুলে জারি রেখে ক্ষমতার এই জার-স্তর তৈরি করে তারা এই সামাজিক অনুশাসন তৈরি করেছে। কাজেই মুসলমানেরা ভিন্ন ধর্মের – এই যুক্তি তুলে যদি তারা সাজানো শাসন ব্যবস্থা – মানতে অস্বীকার করে? আর এর মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতার এই সাজানো বাগান ভেঙ্গে দেয় – এই সম্ভাব্য ভঙ্গকারী যারা এরাই “সাম্প্রদায়িক”। তবে সাম্প্রদায়িক নাম দিবার পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে এই হিন্দু আধিপত্য বলতে চায় যে এই সামাজিক অনুশাসন নিয়ম ও কর্তৃত্ব দিয়ে আমি আমার এক সম্প্রদায় খাড়া করেছি। তুমি মুসলমান এর ভিতরে আবার তোমার ভিন্ন নিয়ম ভিন্ন কেন্দ্র চালু করে ফেলতে পার, তা আমি হতে দিব না। তাই তোমাকে আমি তোমার সম্প্রদায়ের বলে আলাদা কোন ক্ষমতার কেন্দ্র বানাতে দিব না। একারণে উলটা আমি তোমাকে বিভেদ আনার শক্তি হিসাবে প্রচার করব। তুমি আলাদা সম্প্রদায় গড়ে ফেলবার সম্ভাব্য শক্তি – অতএব তোমার নাম দিলাম “সাম্প্রদায়িক”। তুমি আমার ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দিতে বা চ্যালেঞ্জ করতে যাতে না পার তাই আগেই তুমি নেতিবাচক, তুন্মি খারাপ এই ট্যাগ লাগিয়ে এক প্রচার চালিয়ে রাখব।
সারকথায়, এই আধিপত্যেরই আবার যা কিছু অপছন্দনীয় বা যা তার নিজ ক্ষমতাকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ করতে পারে অথবা যাকে (মুসলমান) সে আগাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, সেসব কিছুই ‘সাম্প্রদায়িক’ ট্যাগ পাবে। মানে তার সাজানো রাজত্ব এর ভেতরে একটা ভিন্ন ‘সম্প্রদায়’ যেন যে তার সাজানো অর্ডার বিনষ্ট করতে চায়। এমন সব কিছুকে সে আগাম ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে, এই অধিপতি শ্রেণী নিজের সম্ভাব্য শত্রুকে চিনিয়ে রাখে। অনেকটা হিন্দু-জমিদারের নিজের মতো করে তার সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাজানো বাগান এটা সম্ভাব্য আগামীতে যে’জন তছনছ করতে পারে, সেই হলো সাম্প্রদায়িক। এই হলো সাম্প্রদায়িকতার আসল সংজ্ঞা ও উৎপত্তি।
এ কারণে ইংরেজি ‘কমিউনাল’ শব্দটা ইংলিশ সমাজে কেবল ইতিবাচক অর্থে সমাজ-সম্প্রদায় বুঝাতে এর ব্যবহারটাই কেবল দেখতে পাবেন। বিপরীতে কেবল ভারতীয়রাই শব্দটাকে নেতিবাচক ও বিশেষ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে। এই সোজা মানেটা হলো, ১৮০০ বা উনিশ শতকের শুরু থেকেই যে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্যের তৎপরতা শুরু হয়েছিল, এরই স্বার্থের বিরোধী যেকোনো কিছুই (সাধারণত মুসলমান) বোঝাতে ‘কমিউনাল’ শব্দ ব্যবহার শুরু হতে দেখা গেছিল।

কিন্তু কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কিভাবে বলে আমার বৈশিষ্ট হল ‘অসাম্প্রদায়িক’? যেখানে তার দেখার চোখ হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সমান এবং সমান নাগরিক? খাড়া কথাটা হল, হিন্দু ধর্মীয়-সামাজিক গোষ্ঠির মানে বাস্তবে অপসৃয়মান হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য শব্দ সাম্প্রদায়িক – এই শব্দ বা বৈশিষ্ট তো কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টই হতে পারে না – যেখানে ধর্ম-নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান গণ্য রাষ্ট্রকে করতেই হবে! আর এই অধিকার কেউ ভেঙ্গেছে কিনা সেটা বিচার করাই কেবল রাষ্ট্রের কাজ। কাজেই সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক নয়, রিপাবলিক রাষ্ট্রে অধিকারে সমান না বৈষম্য করা হয়েছে এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় এবং এর নির্ণায়ক।  হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কাজ একেবারেই নয়। কাজেই সাম্প্রদায়িক এই শব্দটা দিয়েই আসলে নাগরিক অধিকারের বৈষম্যহীন করবার ধারণাটাকে চর্চায় সামনে আসনে দেয়া ঠেকায় রাখার ক্ষেত্রে ভুমিকা আছে।

এর পাশাপাশি আমরা এখন রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) জমানায় যাবো। কেন রামমোহন? ভারতের প্রগতিবাদী বিশেষত সেকালের (বলতে ১৯২৬ সালের পরের বুঝতে হবে) খোদ কমিউনিস্ট পার্টির চোখে রাজা রামমোহন রায় হলেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ এর আদিগুরু। মানে রামমোহন যিনি ব্রিটিশদের হাত ধরে ইন্ডিয়াতে আসা বা আনা ‘ইউরোপীয় রেনেসাঁ’কে সবার আগে ভারতে পরিচয় করান এবং এর চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করেছিলেন, সেই আদি শুরুকর্তা। রামমোহন সুনির্দিষ্ট একাজটা শুরু করেছিলেন ১৮১৫ সালে, তার “আত্মীয় সভা” নামে সামাজিক সংগাঠনিক তৎপরতায়। এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৮৩৫ সালকে যখন ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন অ্যাক্ট ১৮৩৫’ চালু করবে।
এটাকে “এডুকেশন অ্যাক্ট” বলে অথবা এটাই হল ব্রিটিশ ‘কলোনি প্রশাসন’ এর শুরু করার আইন বলে বুঝতে পারি। এটাই ভারতীয় নেটিভ বা স্থানীয়দেরকেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত করে কলোনি প্রশাসন সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত মনে করেও পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষিত ব্রিটিশদের ব্যয়বহুল পথে (বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া) তাদের এখানে এনে আর নেয়া হবে না। স্থানীয় নেটিভদের শিক্ষিত করে নেয়া এক প্রশাসন গড়তে হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেটা আধুনিক শিক্ষা মানে রেনেসাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলার শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।
রামমোহনের মূল গুরুত্ব হল তিনি ব্রিটিশ মাস্টারের অনুকরণে সেকালের ব্রিটিশ-ভারতে, আমাদেরকে একটা “আধুনিক রাষ্ট্র” করতে হবে – প্রথম তিনিই এমন গড়ার স্বপ্ন দেখে ও এঁকেছিলেন। আবার ঠিক একই কারণে এতে তাঁর করা সব ভুল বা ধারণায় ঘাটতি বা তাতে অস্পষ্টতায় বিপথে যাওয়া এমন ধারণায় সব খামতির উৎপত্তিও তিনি। যদিও আধুনিক প্রগতিবাদীরা বা পরবর্তীকালে বিশ শতকে এসে কমিউনিস্টরাও রামমোহনকে তাদের আদিগুরু নেতা মানেন। বিশেষ করে যারা হিন্দু জমিদারীর “স্বদেশি ইতিহাসের ধারা” রচয়িতা।

কিন্তু তিনি প্রথম নেতা হলেও আধুনিক রিপাবলিক ধারণার মুখ্য বৈশিষ্ট্য যে তা নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র, নাগরিক মাত্রই অধিকার সমান এক বৈষম্যহীন সাম্য ইত্যাদি – এসব মৌলিক ধারণাকে তিনি আমল করতে সক্ষম ছিলেন এর প্রমাণ নাই।  আসলে নাগরিক সাম্য নয়, সম্ভবত রেনেসাঁ তার মুল আগ্রহের বিষয় হয়েই তিনি আটকেও গেছিলেন। অধিকার বা রাষ্ট্র পর্যন্ত আর নিজ চিন্তাকে প্রসারিত করতে পারেন নাই।  এমন চিহ্ন আমরা দেখি না। আরও বড়  কারণ কী?
মূল কারণ হল, রামমোহনদের কাছে কাজটা (উচিত অর্থে) হওয়ার কথা ছিল “রাষ্ট্রগঠন”। কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন “জাতি গঠন” বলে।  এখানে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিমূলক ধারণা ছিল “জাতি” [nation]। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারা রাষ্ট্র কথাটাই ব্যবহার করতেন না। এর বদলে ব্যাপারটাকে “জাতি” বলে কিছু একটা বুঝতে চাইতেন। এই হলো প্রথম ভুল। তবে পরের ভুলটা আরো মারাত্মক। জাতি গঠন বা জাতীয়তাবাদ বলতে তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বুঝতেন। তারা নিশ্চিত হয়ে থাকতেন যে জাতির মূল বৈশিষ্টই তো ধর্ম।  আর ধর্মই তো জাতিকে “জাতি” হয়ে উঠতে আঠার মত সকলকে ধরে রাখতে প্রধান ভুমিকা রাখে। কিন্তু এখনই খুশি হয়ে যেয়েন না, সাবধান হন। পরের বাক্যটার দিকে খেয়াল করেন।
অতএব এত বড় আর প্রাচীন হিন্দু ভুখন্ডে বৃটিশ শাসন-পরবর্তিকালে এক “হিন্দুজাতির ভারত” – এটাই আমাদের কাম্য। কারণ যে “বৃটিশ জাতি” আমাদেরকে শাসন করতে আমরা দেখছি সেটাও একটা ক্রিশ্চানিটিতেই আবদ্ধ, এক বৃটিশ “জাতিগঠন” হয়েই করেই দাঁড়িয়ে আছে।  সেকালে রামমোহন এন্ড গং তাদের বুঝাবুঝির মোটা ভাষ্যটা  সাজিয়ে লিখলে তা হবে এরকমই।
এই একই বুঝ বজায় ছিল অন্তত মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত; ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভুমিকা (১৯১৪-৪৮) এই সময়কালে। অর্থাৎ স্বাধীন দেশপ্রেমিক এক ভারত বলতে তিনিও এক ভারতীয় “জাতিগঠন” করার কর্তব্য ও এর রাজনীতি বলে বুঝতেন। অর্থাৎ হিন্দুজাতি গঠন বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ গড়া বুঝতেন। ঠিক এ কারণেই তাদের কাম্য রাষ্ট্র নাগরিকের রাষ্ট্র হল কিনা অথবা অধিকারে বৈষম্যহীন হলো কি না, নাগরিক মাত্রই সমান অধিকারের রাষ্ট্র হলো কি না- ইত্যাদি এগুলো কখনও  তাদের এজেন্ডা ছিল না।

উল্টো এটা ধর্মীয় জাতিগঠনের জাতীয়তাবাদের বলে আধুনিক রাষ্ট্রকে বোঝার কারণেই এখনো – “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”, কথাগুলো এখনো অবলীলায় উচ্চারিত হতে পারছে। কারও কানেও খটকা লাগছে না।

তাহলে রামমোহন থেকে গান্ধী সবার কাছেই ভারত রাষ্ট্র মানে কোনো বৈষম্যহীন নাগরিক রাষ্ট্র নয়, এ দিক থেকে রাষ্ট্র বোঝাই হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবের যে ভারত -রামমোহন থেকে গান্ধী- এরা কল্পনা বা বাস্তবে দেখেছিলেন এটা আবার সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক বুঝের হিন্দু জমিদারের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাষ্ট্র বলেই বুঝেছেন, দেখেছেন, পেয়েছেন।

এ কারণে যারাই রাষ্ট্রের মধ্যে “অসাম্প্রদায়িকতা” বৈশিষ্ট্য খুঁজে তাদের কাছে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা অর্জন হয়েছে কি না তা কোনো কাম্য বিষয়ই নয়।

অতএব, গান্ধী-নেহরুরা যে ভারতের জন্ম দিয়ে গেছে সেটাই বা সেখানেই তো মোদী-অমিতের হিন্দুত্বের রাষ্ট্র কায়েমের উপযুক্ত জায়গা। অবলীলায় ‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো’ বলতে পারার মতো দেশ-রাষ্ট্র।  এখানে নাগরিক ধারণাটাই পোক্ত না বরং এখনও অপুষ্ট। তাই নাগরিক অধিকারও। এর আকাঙ্খার ভেতরেও তাই নাগরিক বৈষম্যহীনতার আকাঙ্খাই নাই, অনুপস্থিত। একই কারণে সুপ্রিম কোর্টের চর্চাতেও তেমন নাই। নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই। সে কারণে বিজেপির মত দলও কনষ্টিটিউশন মোতাবেক রাজনৈতিক ততপরতা চালাবার জন্য যোগ্য দল বলে অনুমোদন দিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। সুপ্রীম কোর্টও এর মধ্যে কোন সমস্যা দেখে না। অথচ যে রাজনৈতিক দলের চিন্তা বৈষম্যমূলক নাগরিক অধিকারের সেই দল তো অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন পাওয়ারই কথা হয়। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রীম কোর্টও এটা কোন সিরিয়াস দিক মনে করে না। শেষ নির্বাচনে এদিকটা অবস্থা আরও ভয়াবহ। কোন নির্বাচনি ভায়োলেশনের অভিযোগ আমলে নিয়ে মোদীর গায়ে ফুলের টোকা দিতেও তারা রাজি হয় নাই। অবশ্য তারা বলতে চায় একজিকিউটিভ ক্ষমতার গায়ে হাত দিয়ে আমাদের খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিগত ১৯৭৫ সালের জুনে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি আইন যেখান থেকে ঘটেছিল সেই ইস্যুতে। সেই থেকে আদালতের অবস্থান হল, কোন নির্বাচনে যদি এক আগ্রাসী একজিকিউটিভ ক্ষমতা – নির্বাচিত হয়ে আসে তবে সে যতই আগ্রাসী আদালত ততই সংঘাত এড়িয়ে তাকে জায়গা করে দিবে।
কিন্তু তাই বলে কি “নাগরিক বৈষম্যহীনতা করা যাবে না”- একথা ভারতের কনস্টিটিউশনে লেখা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আছে কনস্টিটিউশনে লিখা থাকতে হয় তাই। এর ইমপিলিকেশন কী, ব্যবহার কী এবং কোথায় – কেন থাকতে হয়, গুরুত্ব কী সেসব দিক থেকে কিছুই বুঝা হয়নি, চর্চায় নেয়া হয় নাই। এর মূল কারণ সম্ভবত – “হিন্দুজাতি গঠনের এক ভারত” গড়া হয়েছে – এটাই তো ভারতের জন্ম থেকেই ছিল মূল বিবেচ্য!
তাহলে একালে ভারত কেন “হিন্দুজাতির ভারত” – এই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী কেন? এটা যদি কেউ দেখিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন তারা আড়াল খুঁজে বলে – কেন তারা তো অসাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ এটা ‘অসম্প্রদায়িক’ ও ‘হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী’ ভারত, কাজেই কোনো আর অসুবিধাই নেই।

আচ্ছা রামমোহনের রাষ্ট্রচিন্তা যে জাতিগঠন-বাদী চিন্তা, আর এই জাতিবাদ যে ধর্মীয় এমন দাবির প্রমাণ কী? এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল রামমোহনের ‘ব্রাহ্মধর্ম’ চালু করার তাগিদ। [রবীন্দ্রনাথের দাদু দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন রামমোহনের বন্ধু, অনুসারী। সেই সুত্রে তিনিও ছিলেন ‘ব্রাহ্মধর্ম’ অনুসারী ও প্রধান পৃষ্টপোষক। রবীন্দনাথও  ব্রাহ্ম অনুসারি আর এই সুত্রে তাঁর কালেও পুনর্বার মুখপাত্র তত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। ] সারা ভারতের সবাইকে এক ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী করে এরপর ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিগঠনের  ভারত কায়েম এই ছিল রামমোহনের লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে সবাইকে ব্রাহ্ম করার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে গান্ধী পর্যন্ত  (এদের মাঝে বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ইত্যাদি অনেক ব্যক্তিত্বও কমবেশি সামিল ছিলেন) এসে সবাই মেনে নেয় যে, ঐ স্থলে “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদী ভারতই তাদের কাম্য।
কিন্তু এই বুঝের ভিত্তিতে ১৮৮৫ সালে এসে কংগ্রেস দল জন্ম বা গঠন করার পরে এই প্রশ্ন জোরালো হতে থাকে যে, “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদ মুসলমানরা মেনে নেবে কেন? এর জবাব গান্ধীর কাছেও ছিল না। তিনি বড়জোর হিন্দু কথাটা ধর্মীয় না কালচারাল, এমন তর্কের কথা বলে পাশ কাটাতে চাইলেন। এছাড়া আমরা দেখি  উল্টা গান্ধীর নিজের বুঝের হিন্দু ধর্ম বলতে সেটা কেমন এটাকেই তিনি ‘হিন্দুইজম’ বলে প্রায় ৪২টা বক্তৃতা দিয়েছেন। অনলাইন আকাইভেও তা পাওয়া যায়। অথচ গান্ধীর কাছে মুসলমানরা “হিন্দুইজম কী” – তা শিখতে যাবে কেন? কোন সুখে অথবা দুখে? এমনকি অনেক হিন্দুও কেন তাকেই পছন্দ করবে, গান্ধীর “হিন্দুইজম কী” এর ব্যাখ্যা নিয়ে একমত হবে –  এই প্রশ্নের জবাব নাই  অথচ এই প্রশ্ন উঠেই থেকেছে।

সোজা কথা হল যার রাজনীতি  – রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, সমান অধিকারের রাষ্ট্র কায়েম এমন কেউ কেন “হিন্দুইজম কী” এই মাহাত্য প্রচার করতে যাবেন? গান্ধী যদি মনে করেন যে তাঁর “হিন্দুইজম কী”  ব্যাখ্যাটাই শ্রেষ্ঠ তাহলে এর মানে তিনি ধর্মতত্বের পন্ডিত হতে চাইছেন। অন্তত রাজনীতির না। ঠিক রাজনৈতিক নেতা তিনি না, ধর্মতাত্বিক নেতা হওয়া তার ঝোঁক যদি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রাজনীতির নেতা সেটা বাদ দেয়াই তাঁর উচিত ছিল। কারণ “হিন্দুইজম জানা বা এর  মাহাত্য প্রচার এটা না জানা থাকলেও ফেলো যেকোন ধর্মের নাগরিকের সাথে থাকার যোগ্য বিবেচিত হতে তো কোনই অসুবিধা নাই। এছাড়া এটা তো কোন নাগরিক সাম্যের রাজনৈতিক কাজ না। এগুলাই আসলে  আরও বড় প্রমাণ যে –  নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র কায়েম- এসবে গান্ধী বা নেহরুর কখনই আগ্রহ ছিল না, তারা বা তাদের ভারত এটা কখনই বুঝতেই পারেনি, তাই আমল করে নাই।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
চলতি নাগরিকত্ব বিলের তর্কে জিন্নাহ এখন সবারই অভিযোগ দায়ের করার সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানকে আলাদা হতে দিয়ে কংগ্রেস দ্বিজাতি বাস্তবায়ন হতে দিয়েছে অমিত শাহের এই ছিল অভিযোগ, এর জবাবে বলা সুপ্রীম কোর্টের কংগ্রেসের প্রধান আইনজীবী ও এমপি কাপিল সিবালের বক্তব্য ছিল, অম্বেদকারের বরাতে যে, জিন্নাহ ও সাভারকার (হিন্দু মহাসভা নেতা) দু’জনই ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান এরা দুই জাতি,  এই ধারণার অনুসারী।

তাহলে জিন্নাহই কি সব কিছুর জন্য দায়ী?
প্রশ্নই ওঠে না। উপরে রামমোহন থেকে অন্তত গান্ধী পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্র বলতে ‘জাতি’ বুঝতেন, বলেছি। আবার জাতি বলতে কেবল ধর্মীয় জাতিকে বুঝতেন। এই ছিল তাদের হিন্দু জাতিগঠন এই জাতীয়তাবাদী ভারত এর ধারণা।

কিন্তু এই হিন্দু জাতিগঠনের ভারত প্রশ্নে মুসলমানদের অস্বস্তি ও আপত্তির কারণেই ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। জিন্নাহও ক্রমশ একই ধরণের প্রশ্ন তুলে  কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

কিন্তু কংগ্রেস তার ‘হিন্দু জাতিগঠনের ভারত’ এই নীতি গ্রহণ করাতে মুসলিম লীগও যে জাতিবাদ করতে গেল, সেটাও মুসলিম জাতীয়তাবাদ হয়ে যেতে বাধ্য হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পেরে উঠতে গিয়ে ‘মুসলমানের ভিত্তিতে আলাদা এক জাতি’ এমন কথা বেশি স্পষ্ট প্রধান করে বলতে হয়েছিল। লীগ এ বক্তব্যের পক্ষে বিস্তর সাফাই গাইতে অনেকগুলো সম্মেলন হয়েছিল, যেখানে বিখ্যাত কবি ইকবালের সাফাই বক্তব্যও আমরা দেখে থাকব।

আর বিপরীতে এসব প্রশ্নের ঠেলায় কংগ্রেস ততই  ক্রমশ ছুপা-কৌশল গ্রহণ করে যে, তারা যে কৌশলগতভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত চায় এ কথা মুখে কোথাও স্বীকার করবে না। এর ফলে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ চাওয়ার সব দায় একা জিন্নাহর আর এ জন্যই অখণ্ড ভারত রাখা যায়নি- ভারতের সেই প্রপাগান্ডা সেই থেকে আজো প্রবল। একালে মানে ১৯৪৭ সালের পরে বিশেষ করে এই প্রপাগান্ডার দায় নিয়েছে কমিউনিস্টরা। যদিও তাদের ভাষ্যের প্রধান ফোকাস হলো, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মকে মেশানো খুবই গর্হিত কাজ,কাজেই মূল পাপে পাপী হলো জিন্নাহ।

কিন্তু সব জিনিষ লুকানো যায় না। কিন্তু মুল কারিগর কমিউনিস্ট, তাদের যুক্তিটাই সবকিছু উদোম করে দিয়েছে। কমিউনিস্টদের পয়েন্ট হল, রাজনীতিতে ধর্ম হারাম অথচ জিন্নাহ সেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার কথা খোলাখুলি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু কমিউনিস্টরা এতে নিজেই যেন নিজের জন্য ফাঁদ পেতেছে এমন হয়ে গেছে।  সেকালের সক্রিয় কমিউনিস্ট, পারিবারিকভাবে ব্রাহ্ম ও ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার রামমোহন রায়কে রেনেসাঁর আদিগুরুর ভুমিকায় দাবি করে বসানোর জন্য দায়ী মনে করা হয়।  এতে সমস্যা হল যে সুশোভন হয়ত ধর্মের উপর তত ক্ষেপা নয় কিন্তু সাধারণ কমিউনিস্টরা বিশেষত সাতচল্লিশের পরের কমিউনিস্ট চরম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে পড়েছিল। এই কমিউনিস্টদের এখন সাফাই ও জবাব দিতে হবে রাজনীতিতে ধর্ম যদি এতই হারাম হবে তাহলে রামমোহন রায় নতুন করে নিজেই আর একটা ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম, চালু করেছেন কেন? অন্তত জিন্নাহকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার আগে এটা নিজেরাই লক্ষ্য করে নিজেরাই এর জবাবটা দিয়ে রাখা উচিত ছিল। আর কোন কমিউনিস্ট আজ পর্যন্ত রামমোহনের দিকে আঙুল তুলে নাই কেন?

মজার কথা হল গান্ধী জিন্নাহর তত সমালোচনা করেন নাই, যতটা একালের কংগ্রেসি কিন্তু কমিউনিস্ট-ছাড়ানি প্রগতিধারী কেরালার এমপি শশীথারুর জিন্নাহর সমালোচনা করেছেন। কমিউন্সট পয়েন্টই তার পয়েন্ট, সিপিএমের সীতারাম ইয়াচুরিও একই দশা। ঠিক যেমন বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি। এককথায় এরা সকলেই কখনও  খেয়ালই করেছেন যে  “হিন্দুইজম কী” বলে সংকলিত গান্ধীর  ৪২ আর্টিকেল আছে – বলে মনে হয় না। রামমোহন রায়ের কথা আর বললাম না। কাজেই এরা মনোযোগী পাঠক এমন ধরে নেওয়া আর ঠিক হবে না।

এককথায় বললে এরা জিন্নাহর সাথে অবিচার করেছেন।  উপরে  রামমোহন আর গান্ধীর জাতিগঠন ধারণা তারা আমল করেছেন জানা যায় না। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রমাণ এখন হাজির করব।

সম্পতি পাকিস্তানের এক সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট YASSER LATIF HAMDANI সব তথ্য সাবুদ জড়ো করে একটা আর্টিক্যাল লিখেছেন ভারতের এক পত্রিকায় দ্যা প্রিন্ট – এখানে তা ছাপা হয়েছে। , যার বড় একটা অংশ আবার বিবিসির নিজের করা রিপোর্ট। যার সার কথা জিন্নাহর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতার, আগে যেখানে পাকিস্তানের যোগেন মণ্ডল তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। আর ওই সভা থেকেই যোগেন মণ্ডলকে পরে প্রথম আইনমন্ত্রী বানানো হয়েছিল। জিন্নাহ এই বক্তৃতার রেকর্ড ফলে রেফারেন্স হারিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেটা পরে ভারতের আর্কাইভে পাওয়া যায়। যা ভারত আবার একমাত্র রাইট-টি-ইনফরমেশন আইনে  এক ভারতীয় নাগরিককে অনেক পরে সরবরাহ করেছিল।

সেই সভায় জিন্নাহর বক্তৃতা সেটা। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সম্পর্কে জিন্নাহর মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে মৌলিক অংশটা নিচে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো :

মুল ইংরাজিটাঃ
We are starting in the days where there is no discrimination, no distinction between one community and another, no discrimination between one caste or creed and another. We are starting with this fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one State.
আমার অনুবাদঃ
‘আমরা একটা এমন দিন শুরু করতে যাচ্ছি- যেখানে আজ থেকে কোনো বৈষম্য, সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ, জাত চিহ্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে কোনো ভেদাভেদ গণ্য করা হবে না। আমরা সবাই নাগরিক এবং সমান নাগরিক- এই নাগরিক সাম্যের মৌলিক নীতিতে এক রাষ্ট্রে আমাদের দিন শুরু করতে যাচ্ছি’।

কিন্তু সবখানেই যে সমস্যাটা থাকে তা হলো, কথাটা বলা আর বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে দেখানো এর ফারাক সেটা পাকিস্তানের বেলাতেও আছে। কিন্তু অন্য সবার চেয়ে জিন্নাহ এই জায়গাতেই আলাদা যে তিনি জীবদ্দশাতেই তার ইমাজিন করা রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বৈষম্যহীনতা বা নাগরিক সাম্যের নীতির প্রতি তার প্রবল সমর্থন তিনি উচ্চারণ করে যেতে পেরেছিলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে জিন্নাহর নয়, গান্ধীর ভুল থেকেই…এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

গৌতম দাস

২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2DQ

 

-একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

[বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

“বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

২.
এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

আইনি কারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

অর্থনৈতিক কারণঃ
জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]