“সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

“সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

গৌতম দাস

১৮ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-30x


গত ১৪ মে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ঢাকার একটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে করা পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে তিনি করোনাভাইরাসেও আক্রান্ত ছিলেন। তবে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও ভুগছিলেন। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পাওয়া বাংলাদেশী একজন একাডেমিক। যে কোনো মৃত্যুই শোকের। আমরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।

তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের প্রথমেই যে কথাটা বলতে হয় তা হল বাংলাদেশ সরকারের যত সর্বোচ্চ পদক বা সম্মাননা আছে তার সম্ভবত কোনো কিছুই লাভ বা অর্জন করা থেকে তিনি বাদ যাননি। তাই বর্তমান সরকারের ‘ইডিওলজিক্যাল আইকন’ মনে করা যেতে পারে তাকে। শুধু তাই না, তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা – ‘পদ্মভূষণ’ পদকও লাভ করেছেন।

গত বারো বছরের নানান রাজনৈতিক উলটপালটে বাংলাদেশের সমাজ এখন মতভিন্নতার এক বিপদজনক জায়গায় পৌছে গেছে। যদিও কোন দেশের সমাজে রাজনৈতিক মতামতে নানাবিধ ভিন্নতা থাকে, এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় এটা আর এখন নিছক মতভিন্নতা নয় বরং তীব্র এক সামাজিক পোলারাইজেশনের পর্যায়ে চলে গেছে। ড. আনিসুজ্জামান এই মেরুকরণে একটা পক্ষের অন্যতম আইকন ছিলেন, এটা তার ভূমিকায় প্রমাণিত।

পাকিস্তান কায়েমের সুবিধাভোগী কে নয় কিন্তু, ঘটনা ইতিহাসে স্বীকার নাইঃ
১৯৪৭ সালের আগষ্টে পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান  আর কোন আইডিয়েল [ideal] বা কল্পনা থাকে না, ছুয়ে-ছেনে দেখা ও স্পর্শ করা যায় এমন রিয়েল [real] বা বাস্তব সত্য হয়েছিল। কিন্তু তবু সেই থেকে বুঝে না বুঝে পাকিস্তান এক নিন্দার জিনিষ, খারাপ কাজ হয়ে আছে আমাদেরই অনেকের কাছে। সে সময় থেকেই আমরা পাকিস্তান পছন্দ করি আর না করি এমন নির্বিশেষে আমাদের জন্য কঠিন সত্যটা হল, পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা প্রত্যেকেই পাকিস্তান জন্মের বেনিফিসিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়েছিলাম।  এতে ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল কেবল জমিদার ও জমিদার হিন্দুরস্বার্থ ও হেজিমনি বজায় থাকলে ওরই ভিতরে যারা নিজের স্বার্থ দেখতেন, এরাই সেই ব্যতিক্রম।  জুলুম অত্যাচার ও লুন্ঠনকারীরা তো সংখ্যাল্প ও ব্যতিক্রম হবেনই। এতদিন এভাবে রাজত্ব ও রুস্তমি করা এই গোষ্ঠি – এদেরকে বাদে একজনও কেউ সুবিধাভোগের বাইরে ছিল না। বিশেষ করে এই মহাসত্যের কারণে যে, সাতচল্লিশের আগে এই বাসিন্দারাই যেখানে ছিলেন জমিদারের প্রজা অথচ পাকিস্তান কায়েমের পরে তাদের সেই প্রজা- মুক্তি ঘটে গিয়েছিল। প্রজা-পরিচয় থেকে মুক্তি বলতে শুধু জমিদারি উচ্ছেদই নয়, ১৯৫১ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950  ইংরাজিতে মুল আইনটা  [The State Acquisition And Tenancy Act, 1950] গৃহিত হইয়ে যাওয়াতে স্বাধীন পাকিস্তানে আগে প্রজা হিসাবে  চাষাবাদের জমির ভোগদখলের দলিল ‘চাষা’রা এবার নিজের নামে পেয়ে গেছিলেন।  ধর্ম বা দল নির্বিশেষে মূলত সবাই প্রত্যেকেই এতে লাভবান। এমনকি যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেননি, করা পছন্দ করেন নাই অথবা পাকিস্তান কায়েম হওয়া পছন্দ করেননি তারাও হয়েছেন লাভবান। এককথায়, অতএব আপনি-আমি স্বাধীন পূর্ব-পাকিস্তানের বাসিন্দা, নাগরিক হওয়াতে, পাকিস্তান কায়েমের বাস্তবতায় এদের চেয়ে বড় লাভবান হওয়া বেনিফিসিয়ারি আর কেউ নাই।
কিন্তু আজব ঘটনাটা হল, স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হবার পরবর্তী কালের বাস্তব পাকিস্তানে ‘সাতচল্লিশের দেশভাগ’ যে সঠিক কাজ হয়েছিল এমন কোনো বয়ান ইতিহাসে দেখা যায় না। পাকিস্তান কায়েম ‘সঠিক’ বলে ইতিহাসে তা লিখতে তাদের দ্বিধা ছিল। তাই টেক্সটবুকে পাকিস্তান কায়েমের পক্ষে সাফাই বক্তব্যের দেখা মেলে না। সেটা এখনো এমনই আছে।  যেমন এটা কী সম্ভব যে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পরের লিখিত ইতিহাসে টেক্সটবইতে এই স্বাধীনতার পক্ষে সাফাই থাকবে না! কিন্তু পাকিস্তানের বেলায় তাই হয়েছিল।  যেন পাকিস্তানের জন্ম ‘অবৈধ’, আর অবৈধ  সন্তান বলে যেন এর দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না । অথচ এর বাসিন্দারাই  এর আসল সুবিধাভোগী। জমিদারি আইন উচ্ছেদের সুবিধা আমাদের বাপ-দাদা পুর্বসূরিরা প্রত্যেকে ভোগ করে গেছেন, এখনো করছে। তবুও ১৯৪৭-১৯৭১ এ সময়টা আমাদের ইতিহাসে যেন একটা ভ্যাকুয়াম, ফাঁকা কিছু ঘটেনি। অথবা যা ঘটেছে তা ঘটা উচিত ছিল না। তার মানে কী এরও আগের জমিদারি শাসনটাই (১৭৯৩-১৯৪৭) কী সঠিক ও বৈধ ছিল, কাম্য ছিল?

অথচ এ্মনকি পাকিস্তান আমলের (১৯৪৭-৭১) এই পঁচিশ বছরের মধ্যে  চুয়ান্ন সাল পর্যন্ত না হলেও অন্ততপক্ষে যেখানে একান্ন সালের জমিদার উচ্ছেদ আইন পাস এই অর্জনকে যদি আমরা আপন না করে নেই, তবে এর মানে হবে আমাদের আত্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়া। পাকিস্তানের জন্ম যদি আমাদের কাছে অগ্রহণীয় হয়, কাম্য নয় ও অবৈধ মনে হয় আমাদেরকে তাহলে এই উত্তর দিতে হবে যে আমাদের বাপ-দাদারা সকলে জমি কোথা থেকে পেয়েছেন? কারণ ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের নিরানব্বই ভাগই ত জমিদারের প্রজা ছিলেন?

আমাদের প্রগতিবাদীসহ সকলের চিন্তায় অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি হল আমরা যদি পাকিস্তান জন্মানোকে আপন মনে না করি তবে এটা  তখন কী ছিল? অথবা কী হয়েছিল সেটা কী আমরা কেউ বলতে স্বীকার করতে চাই না! তাহলে এককালে জমিদারের প্রজা চাষা  ‘এরা’ জমির মালিকানা পেলেন কী করে? কেউ বলতে চান না। তারা সম্ভবত বলতে চান, পাকিস্তান কায়েম হওয়াটাই ভুল ছিল।  সেক্ষেত্রে প্রকারন্তরে এর মানে নয় তাহলে জমিদারি শাসনটাই ভাল ছিল। অথচ পাকিস্তান জন্মানোর পরে আমাদের অন্যান্য নতুন রাজনৈতিক চাহিদা বা অভিমুখ তৈরি হতেই পারে। এই আমরাই আবার খোদ পাকিস্তানই ভাঙতেও চাইতে পারি। কিন্তু সে জন্য তো পাকিস্তান কায়েম হবার ঘটনাটা মিথ্যা নয়। তা মিথ্যা একথা বলার কোন দরকারও পড়ে না। আসলে আগের সেই জমিদার হিন্দুর স্বার্থ ও হেজিমনি – সামাজিক কালচারাল আধিপত্য সেটাকেই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে কেউ অলক্ষ্যে।
ইতিহাস জিনিসটা এমন যে নানান দেশ, রাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপটে, এর ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য তৈরি হবেই। এমনকি একই দেশের ভেতরেও কমপক্ষে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্য সাধারণত দেখা যায়। সব দেশেই এমন হয়ে থাকে।  ঐতিহাসিকদের মধ্যে তা নিয়ে বিভক্তি ও বিতর্কও চলতে থাকে।  যেকথা বলছিলাম বুদ্ধিমান হলে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্যই টিকে থাকতে পারে আর সেক্ষেত্রে সবগুলো ভাষ্যেরই মৌলিক গল্পকাঠামোটা মোটামুটি একই থাকে, আর কিছু অংশ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে। আর ঐতিহাসিকেরা সতিকারের পেশাদার হলে বুঝমান ও দায়ীত্ববান হলে একসময় ভাষ্য-ভিন্নতা নিরসিত হয়ে কোন ইতিবাচক ব্যাখ্যা বয়ানে পৌছাতে পারি, নইলে দেশ ইতর-বয়ানে শার্প বিভক্ত হোয়ার দিকেও যেতে পারে।  আদালতকে দিয়ে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করার ঘটনাও দেখা যেতে পারে।  যদিও আবার দুটো ভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই পুরা বয়ানই ভিন্ন হয়ে যাবে। যেমন ১৯৭১ নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভাষ্য-বয়ান ভিন্ন তো হবেই। ১৯৭১ সাল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাষ্যও হবে ভিন্ন। যেমন ভারত  ১৯৭১ কে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ বলে তাদের সরকারি ইতিহাস লিখেছে।

বাস্তব পাকিস্তান কায়েমের পরে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজের লিখিত ভাষ্য-বয়ান না থাকায়, মানে পূর্ব পাকিস্তানিরা আপন করে নেয় এমন কোনই বয়ানভাষ্য না থাকায় এর পরিণতি কী হয়েছে? এমন লিখিত ইতিহাস ভাষ্য না থাকলে যেটা হবার কথা, কলকাতায় প্রচলিত টেক্সটবুকের ভাষ্যবয়ান কিছু দিন পরে এখানে চালু হয়ে গেছে। কারণ, বয়ান তো খালি থাকে না। একপর্যায়ে বাংলাদেশেরই কেউ হয়ত কলকাতার সেসব বই পড়ে তা থেকে নিজেই কলকাতার বয়ানে বাংলাদেশের ইতিহাস লিখে বসেছে। আর তা চালু হয়ে গেছে। এসব শুনে এখন কেউ বোকাবোকা উদার বুঝ থেকে জানতে চাইতে পারে আমরা কলকাতার বয়ানে ইতিহাস পড়লে অসুবিধা কী?  ক্ষতি কী?  আমরা একই বাংলা, একই দেশ তো ছিলাম? তাহলে? আসলে কথাটা হল এমন যেন বলা যে ১৯৭১ সালের আগে তো পাকিস্তান আর বাংলাদেশ  “তো একই দেশ ছিলাম” কাজেই একাত্তরের পরেও আমরা পাকিস্তানের পাঠ্য ইতিহাসটাই গ্রহণ করে নিয়ে আমাদের পাঠ্য করে নিলে অসুবিধা কী? এখন নিশ্চয় এই জবাব প্রশ্নকর্তার ভাল লাগবে না।
কলকাতার বয়ানে ইতিহাস নিয়ে আমাদের অসুবিধাটা হল, ওটা আসলে কলকাতার জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে এক সাফাই-ভাষ্য হবে।  আরও স্পষ্ট করে বললে ভারত বা কলকাতা যেটাকে বলে “স্বদেশি আন্দোলন –  সোজা সাপ্টা জমিদারি স্বার্থবয়ানের উপর আধারিত ইতিহাস হবে সেটা। কাজেই এটা আমরা প্রজাদের নিজের স্বার্থবয়ান করে লেখা ইতিহাস হতেই পারে না। দুঃখের কথা আর কারে বলব, পাকিস্তান কায়েমের পর থেকে সাতচল্লিশের আগের শাসক জমিদারহিন্দুরা  শাসন আধিপত্য হারিয়ে কমিউনিস্ট রূপ ও রাজনীতি ধারণ করে সমাজে হাজির থেকেছে। ফলে আগের জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে সাফাই-ভাষ্যটাই  এবার নব্য প্রগতিবাদী কমিউনিস্টরা গ্রহণ ও প্রচার শুরু করেছিল। আমাদের ইসলামবিদ্বেষের শুরু এখান থেকেই। কমিউনিজমের নামে তারা ইসলামবিদ্বেষ করে পাকিস্তানের জমিদার উচ্ছেদের প্রতিশোধ নিয়েছে।
আরও কঠিন সত্য মানে ফ্যাক্টস হল, ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ আইন  অর্থাৎ বড় হয়ে যাওয়া আগের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রশাসনের নজর প্রধাণত কেবল কলকাতা ও এর আশেপাশে আটকে পড়েছিল, এতে ওদিকে পুর্ববঙ্গ অংশে বা এরও বাইরে আসাম পর্যন্ত এলাকায় প্রশাসন আরো শিথিল হয়ে পড়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিকশিত হয় নাই।  তাই প্রশাসন চালানোতে দক্ষতা আনতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বাংলা প্রদেশ আর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বলে ভাগ করাকে কেন্দ্র করে হিন্দু জমিদারেরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।  কারণ এতে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়াত ঢাকা।  আবার জনসংখ্যার দিক থেকে পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট ছিল।  অর্থাৎ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কায়েমের পর থেকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থ আর কলকাতার অধীনস্ততায় না থেকে  বের হয়ে নিজেই কলকাতার সমান্তরাল ক্ষমতা ও শাসন হয়ে উঠতে সুযোগ পেয়ে গেছিল। এটাই  জমিদার হিন্দু আধিপত্যের কলকাতা সহ্য করতে পারে নাই, চায় নাই।  এই দ্বন্দ্ব খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়।  এখানে জমিদারহিন্দু শাসন আধিপত্য এতই বড় ক্ষুন্ন হয়েছিল যে তারা বৃটিশদের বা বঙ্গভঙ্গ করার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার ফ্যান্টাসিও করতে গিয়েছিল – যেটা অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুটা গ্রুপের কথা জানা যায়।  কাজেই অনুশীলন ও যুগান্তর ছিল জমিদার স্বার্থেরই সশস্ত্র উদ্যোগ। অথচ কোন সশস্ত্র উদ্যোগ মানে তা “বিপ্লবী” এমন ধরে নেওয়ার কিছু নাই। কিন্তু প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ঢেকে দেয়া হয়েছিল। কারণ অনুশীলন ও যুগান্তর পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে বিলিন হয়েছিল। এমন তামাসা সম্ভবত দুনিয়ার কোথায় দেখা যাবে না যে  বাংলার জুলুমবাজ  খোদ জমিদারেরাই এখানে সশস্ত্র।  এরাই কমিউনিস্ট নামে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই জুলুম নিপীড়নে অত্যাচারি  জমিদারদের সশস্ত্র স্বার্থ-ততপরতাকেই বলা হয়েছে এটা নাকি “স্বদেশি আন্দোলন” – এটা নাকি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা?  জমিদারের স্বার্থহানি ঘটেছে কলোনি প্রশাসনিক পরিবর্তনে। অতএব এটাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা বলে চালায় দিতে হবে – কি ফকফকা তামসা! পুর্ববঙ্গের স্বার্থ  এমন জমিদারদের স্বার্থ ও তাদের সশস্ত্র ততপরতার বিপক্ষে ছিল বলে তারা এটাকে কোন “স্বদেশি আন্দোলন” বলে মানে নাই। অতএব তারা কলকাতার লিখিত ইতিহাস পড়তে পারে না। এত কড়া সত্য কথা অনেকের মানতে কষ্ট হতে পারে। অথচ কড়া সত্য হল, দুই দুবারই বাংলা ভাগ হলে (১৯০৫ ও ১৯৪৭ সালে) এটাকে পুর্ববঙ্গ তাদের জন্য ভাল হয়েছেই মনে করেছিল। যেটা জমিদারদের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ছিল। আমরা জমিদার আর প্রজার স্বার্থ দৃষ্টিভঙ্গি এক হলনা কেন এমন আবদার বা জবরদস্তি তুলতে পারি না! কিন্তু তাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। পুর্ববঙ্গ অবশ্যই চাইবে ঢাকা কলকাতার মত ও কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি এক শহর হোক, সমান হোক, কাছাকাছি হোক। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাতই সব গল্পের মুখ্য বিষয় যেখানে সবসময় আমাদেরকে দাবড়িয়ে অধস্থন করে রাখার অপচেষ্টা আছে।

কিন্তু আনিসুজ্জামানের মুল্যায়ন প্রসঙ্গে এসে জমিদার স্বার্থবিরোধী পুর্ববঙ্গের কথা উদাম করছি কেন?
ড. আনিসুজ্জামান আমাদের কাজ কিছুটা সহজ করে দিয়েছেন প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ২০১৪ সালে, যা আসলে তার লিখিত বই তিনটারই কিছু সারকথা।  আর সেলেখা  উনার মৃত্যুদিনেই বিকেলে নতুন শিরোনামে প্রথম আলোতে পুনঃমুদ্রিত হয়েছে।  ড. আনিসুজ্জামানের প্রকাশিত তিনটা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা ধরণের বইয়ে তাঁর সবকথাই ছড়িয়ে আছে । প্রথম আলোতে ২০১৪ সালে যার পুরানা শিরোনাম ছিল, “বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার“;  আর এরই পুনঃমুদ্রিত ১৪ এপ্রিল ২০২০ এর শিরোনাম হল, মানুষের ভালোবাসা যথেষ্ট পেয়েছি: আনিসুজ্জামান। এই সাক্ষাতকারে যা তিনি বলছেন এর সারাংশ হল, বাবা-মাসহ তার পরিবার কলকাতায় থাকার সময় তারা সকলে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষেই ছিলেন, স্লোগান দিয়েছেন। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পরে পরে পশ্চিমবাংলার ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও পুরা পরিবারই নতুন পাকিস্তানে এসে পড়েছিলেন। নতুন পাকিস্তানের নানা সুযোগ- সুবিধা নিতে খুলনায় পুরা পরিবার মোহাজের হয়ে বসবাস শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে আসার পর এবার মুসলিম লীগের সমর্থন ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। মেরু বদল করে নেন তিনি। কেন?

তিনি বলছেন, কলকাতার “১৯৪৬ সালে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার সময়” থেকে “আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল”। তিনি বলছেন, “হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু, এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়”। এর পরের প্যারায় আরেকটু পরিষ্কার করে বলছেন, “একদিকে সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি”। তার মানে, পাকিস্তানের টিকে থাকাটাকে তিনি নেতিবাচক বলছেন আর দাবি করছেন এই টিকে থাকাটা এক “সাম্প্র্রদায়িকতা”। আর শেষে বলছেন, “তখন সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে”। অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি তার চিন্তা ও মনের হিসাবে ‘শত্রু’ বলে তিনি যাকে চিনেছেন তা হলো ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা বলে তিনি কি আসলেই কিছু চিনেছেন? জবাব হল, একেবারেই না। মনে হয় না। তিনি বরং সাম্প্র্রদায়িকতা বলে আবছা এক আড়ালে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। কেন?

আনিসুজ্জামানের ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’ মানে কী?
বুঝা যাচ্ছে সেটাই বুঝতে হবে আগে।
তিনি কী বলতে চাইছেন ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা থেকে আজ পর্যন্ত যত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঘটেছে, তার সবগুলোর জন্য দায়ী একেচেটিয়াভাবে মুসলমানরাই? হা, আনিসুজ্জামান হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘটা দাঙ্গাকেই ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ বলতে ভালোবাসেন এবং কেবল মুসলমানদেরকেই এই দাঙ্গার দায়ী জন্য করেন। এটাই তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে অভিযোগে তোলা।
প্রথমত, সমাজে দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট পাড়া বা এলাকায় যে আগে থেকেই আধিপত্য ও বড় প্রভাব অবস্থানে থাকে, সেই ‘অপরপক্ষ’কে উৎখাত ও বিনাশ করে তাকে ঐ এলাকা ছাড়া করার উদ্যোগ নিতেই আমরা সব জায়গায় দেখে থাকি, প্রায় অবশ্যম্ভাবী ঘটনার মত। এটাই সাধারণ ঝোঁক হতে দেখা গেছে।  এর কারণ হল, সমাজ দুটো সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানে, তারা তখন উভয়েই পরস্পরের কাছে থাকা অনিরাপদ বোধ করা শুরু করে। এই নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে যারা শক্তির আধিপত্যে আছে, তারা বিপক্ষকে প্রথমে নির্মূল করে এলাকায় কেবল নিজেরা, নিজেদের একক হুকুমে এলাকা চলবে এই ভিত্তিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা – এটা একমাত্র পথ বলে সাব্যস্থ করে থাকে। আর এতেই  তারা আগে দাঙ্গার সুত্রপাত করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনেও ভয় থাকে যদি দুর্বল হলেও অপরপক্ষে আগে আক্রমণ করে বসে। এই অজানা টেনশন দ্বিমুখি নিরাপত্তাবোধের অভাব থেকেই সাধারণত বলশালিরাই আগে হামলা করে থাকে যদিও  তাতে শেষে কে মরবে-বাঁচবে তা অন্য কথা। কাজেই দাঙ্গা হলেই তাতে হিন্দু অথবা মুসলমান কোনো একটা সম্প্রদায়কে আগাম ও একচেটিয়াভাবে দায়ী করা ভিত্তিহীন ও ভুল। আমরা  আগেই যেকোন একটা সম্প্রদায়কে দায়ী বলে প্রিজুডিস হয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে পারি না। এমন চিন্তা করতে থাকলে একসময় এমন চিন্তাই এক রেসিজমে পৌছাবেই যে ঐ জাতটাই খারাপ, ওদের রক্তের দোষ ইত্যাদি এসব। সারকথায়  এটা আগাম নির্ধারিত পক্ষপাতিত্ব। আর কোথায় একটা দাঙ্গা হয়ে গেলে পরস্পর পরস্পরকে দায়ী করবে এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের মধ্যে মুল কথা এটা না যে কে দায়ী – এটা জানলে আমরা কোনদিকে আগাতে পারব। কারণ মূল কথাটা হল পরস্পর থেকে পরস্পর নিজ নিজ নিরাপত্তার অভাববোধ করার অবস্থায় চলে গেছে – এই সামাজিক পরাজয়  আগে ঠেকাতে হবে বা রিপেয়ার করতে হবে।
কিন্তু এসবেরও আগে আরেক কথা মনে রাখতে হবে। দাঙ্গার মত অবস্থা কেন তৈরি হচ্ছে  সেটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।  যেমন এক্ষেত্রে দাঙ্গার পিছনের কারণ হল আগের ২০০ বছর ধরে জমিদারি জুলুম অত্যাচার নির্যাতনে ফলে যে ক্ষোভগুলোর জন্ম ও এর নানান মাত্রা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছিল তা গ্রাহ্য না করে জমিদারি চালিয়ে যাওয়াতে  একদিন এমন পরিণতিই তো হবে। আমরা এটা আমল করি নাই।  তা কেন কেউ ভাবেনি? এখন কোন একটা পক্ষের প্রতি ভিকটিমহুড দেখিয়ে সহানুভূতি পাইয়ে দিতে চাইলে তা কতটা কাজের হবে? কাজেই ডঃ আনিসুজ্জামানের সাম্প্রদায়িকতা এই বয়ান মারাত্মক মুসলমানবিদ্বেষী ও  সুক্ষভাবে জমিদারের পক্ষপাতিত্ব করা। ভিকটিমহুডের নেকাব চড়িয়ে। কিন্তু তবু নিশ্চয় কোন দাঙ্গাই পবিত্র নয় হতে পারে না। আমাদের অবস্থান হতে পারে না।  কোন পক্ষকে জিতিয়ে দেয়ার দাঙ্গাই কাম্য নয় হতে পারে না, জায়েজ নয়  এবং সাফাই অযোগ্য।

বুঝা যাচ্ছে এই দাঙ্গার পুরা ঘটনায় এক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের কাছে তার কয়েন করা শব্দ  ‘সাম্প্রদায়িকতার’ অর্থ হল, তার চোখে “সাম্প্রদায়িকতা” মানেই মুসলমানরা দায়ী। অথচ হিন্দু ডোমিনেটিং এলাকায় সে মুসলমানকে কোপাবে- এটাও স্বাভাবিক। আর যদি কোন মুসলমানেরা বেশি এমন এলাকা হয় তবে এর ঠিক উল্টাটাই হবে – স্বাভাবিক।   ঐ একই পরস্পরকে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধের অভাব। তাই আগাম আক্রমণ – সেই একই ফর্মুলা। অনেকে আবার এসব মেনে নিয়েও এবার কায়দা করে কে কম কে বেশি, এসব কূট তর্ক শুরু করতে পারে। তবে দেখা গেছে প্রশাসনের ভুমিকা গুরুত্বপুর্ণ। আদর্শ হল, কোন দাঙ্গা সংগঠিত হতে দেয়া ছাড়াই প্রশাসন যদি উত্তেজনা নিরসন করতে পারে।   এভাবে সব ক্ষোভ নিরসন করতে পারা একটা সাফল্য হতে পারে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি প্রশাসনের ইতি ভুমিকার কারণ দুই সম্প্রদায় নিজ নিজ নিরাপত্তাবোধ ফিরে পেয়েছে – এটাও হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অতএব আনিসুজ্জামানের এই ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বুঝ কোন ভাল বা কার্যকর কিছু আনতে পারে না। শুধু তাই না এটা একপেশেও তাই অর্থহীন।  এছাড়া এর আরেক মস্ত ভ্রান্তির দিক আছে।  আমাদের জ্বর হওয়া হল রোগের লক্ষণ,  তা  আসলে রোগ নয়। জ্বর হলে বুঝতে হবে আমার অন্য কোন রোগ হয়েছে। শরীরের কোন ইন্টারনাল অঙ্গ ডিসওর্ডার আছে, ঠিক্ মত কাজ করছে না। সেটা খুজে বের করতে হবে আগে ও সেরে উঠতে হবে। শুধু প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর তারানো যাবে রোগ তাড়ানোর কিছু হবে না।  ঠিক তেমনি কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ সমাজের কোন মূল সমস্যা নয়, এটা কোন গভীর সমস্যার বাইরের লক্ষণ। তাই কেন দাঙ্গা লেগেছে সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বলে হিন্দু অথবা মুসলমানকে অভিযুক্ত করা নিরর্থক। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করেই একমাত্র স্থায়ী সমাধান পেতে হবে।
তৃতীয়ত, এটা একটু বড় আর সিরিয়াস। কলোনিমুক্ত স্বাধীন অখণ্ড ভারত গড়তে ১৮১৫ সাল থেকেই রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগ আর সেখান থেকে শুরু করে  মাঝে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম পেরিয়ে ১৯৪৭ পর্যন্ত –  ভারতের ‘সকলকে’ নিয়ে কখনও নেহরু-গান্ধীসহ কেউই একটা ভারত গড়ার কোনো কার্যকর প্রস্তাব তারা করতেই পারেন নাই। কারণ তাদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটির দিকটা হল, তারা মনে করেন ধর্মই তাদের কথিত জাতি ধারণার মূল ভিত্তি, আর এটা ধরে নিয়ে একটা হিন্দু-নেশন স্টেট গড়তে প্রস্তাব করে যাচ্ছিলেন তারা। কারণ তাদের সকলের কাছেই রাষ্ট্র গড়া বলতে তা এক জাতি-রাষ্ট্র গড়াই একমাত্র তারা বুঝতেন। রামমোহনের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রবর্তনের চিন্তাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। কিন্তু পরবর্তিতে ব্রাহ্মধর্ম প্রকল্প পরের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই ব্যর্থ ও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে হাজির যায়।  এই ব্যর্থতাই তাদের মনে এক সাফাই হিসাবে হাজির হয় যে কথিত ব্রাহ্মধর্ম ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র যেহেতু চেষ্টা করে তারা পারেন নাই, তাই নিরুপায় হয়েই এবার এক “হিন্দু নেশন স্টেট” করতেই তারা এগিয়ে গেছেন। একাজটাই পরবর্তিতে করে গেছেন বঙ্গিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রমুখ সকলেই।  যদিও কংগ্রেসের জন্ম হয়েছেও যতটা সম্ভব এই “হিন্দু নেশন স্টেট” কামনা আড়াল করে, কিন্তু কার্যন্ত তা প্রকাশিত থেকেই গেছে। কিন্তু এই ঝুটা সাফাইয়ের উপর  যে আমরা বিকল্প চেষ্টা করেছিলাম পারি নাই।  কিন্তু মুখ্য প্রশ্ন, অন্য ধর্মের লোকেরা কেন “হিন্দু নেশন স্টেট” এর কল্পনা মানবে এর স্বপক্ষে কোন জবাব কোন সাফাই দেওয়ারও চেষ্টাই করে নাই কংগ্রেসের কোন নেতা। যার সোজা অর্থ হল  তারা জবরদস্তিতে এটা করবেন, চাপিয়ে দিবেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  এখানেই কংগ্রেসের সাথে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের দারুন মিল। অতএব কলকাতাসহ সারা ভারত জানত  বাস্তবে তাদের “হিন্দু নেশন স্টেট” চিন্তা আর এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।  আর এরই পরিণতিতে কংগ্রেসের দেখানো পথে এখান থেকেই আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দাবি ওঠে এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল মুসলিম লীগের হাতে। “হিন্দু নেশন স্টেট” এই চিন্তা ও কামনার কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে দেখানো পথেই তাই মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

মজার কথা হল রাষ্ট্র বলতে যে “হিন্দু নেশন স্টেট” মানে ধর্ম ছাড়া নেশন হয় না আর নেশন স্টেট ছাড়া আর রাষ্ট্র ধারণা হয় না – এই দুই ভুল চিন্তা আমাদের উপমহাদেশের রূট সমস্যা। কিন্তু এটা  চিন্তা করে ধরতে ও বুঝবার অসমর্থতা আজও যায় নাই।  কংগ্রেস নেতারা হয়ত সীমাবদ্ধতাটা বুঝত কিন্তু তারা আবার নিজেদের নিরুপায়ও মনে করে মিথ্যা  সাফাই খাড়া করতেন। আর সবচেয়ে বড় কথা তাদের “কথিত হিন্দুস্বার্থ” – এর বাইরে তারা যেতে পারেন না এটাই মনে করতেন। আর কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা “নেশন স্টেট” চিন্তাটাই যে সমস্যার আর তা যে মারাত্মক ভুল তা ই বুঝতে সক্ষম তা কোথাও প্রমাণ রাখেন নাই।  তামসার কথা হল তাদের দাবি অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্র-বুঝ নাকি “শ্রেণীরাষ্ট্র” বুঝের। যদি তাই হয় তবে “নেশন স্টেট” এর পক্ষে চলে যাওয়া আর তার উপর আবার তলে তলে সেটা “হিন্দু নেশন স্টেট”  – এই ধারণা তারা হজম করেন কী করে?   অর্থাৎ “শ্রেণীরাষ্ট্র” কথাটা বইয়ের ভিতর তাত্বিক রেখে দিয়েছেন আর বাস্তবের ভারতে কার্যত “হিন্দু নেশন স্টেট” ধারণা কাঁধে নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির সাথে পেস মিলিয়ে এখনও হাটছেন।

ওদিকে এসব প্রগতিবাদী দাবি করেন তারা নাকি সবার আগে ও উপরে রেনেসাঁ-বুঝের প্রগতিপন্থি। যদি তাই হয় তবে তাদের ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু রাজা রামমোহন কেন এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন?  এদিকটা কোন বামপন্থি বা কমিউনিস্ট কখনও টের পেয়েছেন, ঝামেলাটা ধরতে পেরেছেন তাই জানা যায় না। অথচ কমিউনিস্টদের মধ্যে  ইসলামবিদ্বেষ তাদের মজ্জাগত। আর এই সুত্রে এরা উলটা জিন্নাহকে দায়ী করে যে তিনি “ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান’ কায়েম করেছে বলে।

কমিউনিস্টদের মাথায় আরেক আজব চিন্তা লক্ষ্য করা যায় ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ বলে একটা ধারণা।  তারা “নেশন স্টেট” কথাটা শুনলেও এর সাথে জাতীয়তাবাদ ধারণাকে মিলায় না। বরং জাতীয়তাবাদ ধারণাটা নেশন-স্টেট ধারণা থেকা আলাদা এবং তাদের কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বন্ধু মনে করে।  অনেক মনে করে জাতিয়তাবাদ হল  কমিউজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বাস্তবায়নে যাবার আগের ধাপ তাই এটা বন্ধু ধারণা।  অথচ ইউরোপের তিনশ বছরের মর্ডানিটি ও রাষ্ট্র ধারণাটা বলতে তা সব সময়ই নেশন স্টেট ধারণা। জাতীয়তাবাদ শব্দটা ইউরোপে তেমন ব্যবহার নাই তবে কেউ তা করলে সেটাও নেশন স্টেট ধারণা অর্থেই। খুব সম্ভবত এর কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলোনি্মুক্তির যুগে এরা সোভিয়েত ব্লকে গিয়ে ঢুকলে তাদেরকে ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে প্রশ্রয়ের খেতাব ও বন্ধু মানা হত।  তারা সমাজতন্ত্রে পৌছানোর আগের ধাপে থাকা রাষ্ট্র বলে সার্টিফিকেট দেয়া হত। এই সার্টিফিকেট অনুসারে নেহেরু-গান্ধীর কংগ্রেস হল ‘জাতীয়তাবাদী’  কিন্তু জিন্নাহর পাকিস্তান? না না। এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, তাই অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়।

তবু মনে রাখতে হবে  সব সম্ভাবনা শেষ হবার এর আগে ১৯২৮ সালে সর্বশেষ একটা প্রস্তাব ছিল।  সেটা জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’। বাংলাদেশের একমাত্র বদরুদ্দিন উমরকে দেখা যায় এর জিকির করেছেন। ওর প্রথম দফা ছিল যে প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে এরপর ফেডারেল আমেরিকার মত প্রদেশগুলোর এক অখণ্ড ‘কনফেডারেটেট ইন্ডিয়া’ গড়ার দাবি তুলেছিলেন। বলাই বাহুল্য, নেহরু-গান্ধীরা জিন্নাহর এহেন প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। প্রস্তাব বাতিল করে দেয়া সহজ কাজ। কিন্তু এর অর্থ যে, পরিস্থিতিকে দাঙ্গার দিকে ঠেলে দেয়া, এ দিকটা কেউ ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না।
এত দূর পর্যন্ত চিন্তা করতে পারেননি ড. আনিসুজ্জামানরা।  ডঃ আনিসুজ্জামানদের মত যারা চিন্তা করেন তাদের সমস্যা হল,তারা মুসলমানদের উপর সব দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চান। “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা” শব্দটা তাদের কাছে ভাল ওজনদার ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডার এক শব্দ। ্তাই দাঙ্গার পিছনের কারণ কী সেদিকে এরা কোনভাবেই যাবেন না।  অথচ “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা”  বলতে যদি সব মুসলমানরাই দায়ী হয় তাহলে ভারতের সব দাঙ্গাগুলোর জন্যও মুসলমানরাই দায়ী এটাই কী আনিসুজ্জামান মনে করতেন!

তবে দাঙ্গার পিছনের কারণ কী এতদুরে আনিসুজ্জামান যাবেন ক্ষতিয়ে দেখতে সক্ষম হবেন এটা আশা করাও ঠিক হবে না। কারণ তিনি রাজনীতিবিদ তো নন বা এ বিষয়ে ভাবার উপযুক্ত কোন একাদেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিও তিনি এমন ধারণা আমাদের নাই। যদিও  এটা ব্যক্তি আনিসুজ্জামানের জন্য দোষেরও নয়। কিন্তু এটা  অবশ্যই এক বিরাট সমস্যা হয়ে হাজির হল, যখন তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে রোগের এক লক্ষণকেই রোগ বলে ঠাউরে বসতে চাইছেন। বরং ‘সাম্প্রদায়িকতা’ কে সব সমস্যার গোড়া বলে প্রপাগান্ডা দিয়ে হারানো জমিদার হিন্দুর রাজনীতি ও স্বার্থের পক্ষে থাকা – এভাবে খাড়া হয়ে যাওয়া তাঁর অনুচিত।

কিন্তু এত শব্দ থাকতে “সাম্প্রদায়িকতা”, এই শব্দটাকেই তাঁরা এত পছন্দের বিষয় করলেন কেন? এছাড়া অবশ্য তাঁরা সময়ে আরো সামনে বাড়েন। যেমন তাদের আরেক শব্দ আছে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ (অথবা সময়ে বলেন ‘সেকুলারিজম’), যেটা আরেক ভুয়া শব্দ এবং তা জমিদারের রাজনীতি ও স্বার্থ লুকানোর এক কৌশল।

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’। জমিদারেরা বেশির ভাগ বর্ণহিন্দু ছিলেন বলে জমিদারি সামাজিক ব্যবস্থাটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপ্রথারও ধারাবাহিকতা হয়ে উঠেছিল সহজেই। মুসলমানেরা বাঙালি নয় সেটা না হয় ফতোয়া দেয়া গেল। কিন্তু এদিকে মুসলমানরা তো হিন্দু বাঙালি সমাজেই পাশাপাশি বসবাস করত, তাই চাইলেই ফেলে দিতেও পারেনি। তবে বর্ণহিন্দুর জাতিভেদপ্রথায় মুসলমানদের জন্যও তাদের জাত-অবস্থান ঠিক করে দেয়া হয়। আর সেটা বলাই বাহুল্য তা ছিল নমঃশূদ্র, চর্মকারদেরও দু’ধাপ নিচে। এভাবেই জমিদারি ক্ষমতার হাতেই কথিত “বাঙালিয়ানা” যাত্রা শুরু করেছিল, মুসলমানদের বাইরে উপেক্ষিত রেখে। এওখন এই কলকাতার বাঙালিয়ানা এরা কেমন করে আশা করে যে, তাদের এই সাজানো বাগানে আগুন লাগবে না , ব্যাকফায়ার করবে না? এসব তৎপরতার কোনো চরম ব্যাকফায়ার লন্ডভন্ড প্রতিক্রিয়া হবে না? তাহলে দাঙ্গা জিনিষটা কী যেন?

তাহলে সেই থেকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এই যে সাজানো মনোরম বাগান মানে জমিদার বাবুর “বাঙালি সমাজ”, এতে প্রবেশ করতে গেলে মুসলমানদের “অনুমতি” নিতে হবে। ঘটনাচক্রে কোনো মুসলমানকে যদি এই ‘বাঙালি সমাজ বসতে উঠতে জায়গা পেতে হত, অফিসে বা ক্লাসরুমে যেমন ততদিনে আবার বৃটিশ ইন্ডিয়াতে মডার্ন এডুকেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরি এসে গেছিল, মাস্টারি ওকালতি পেশকার ধরণের নানান কাজও। এসব কিছুর সুযোগ যদি পেতে হত তবে মুসলমানদের প্যান্ট বা ধুতি পরতে হত, মাথায় টুপি চাপাতে পারতেন না। এই ইতিহাস আমাদের সকলের জানা  অন্তত ষাটের উপরে যাদের বয়স।  এটা কি এনাফ নয় সে সময়টাকে ধরবার জন্য! মডার্নিটি নামের আড়ালে জমিদার হিন্দুর কালচার বা তাদের ঠিক করে দেয়া বৈশিষ্ট্য মুসলমানদের অনুসরণ করতেই হবে, কেন? নইলে? নইলে আপনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ডাকা হবে। আর মনে রাখবেন, একবার সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগিয়ে দিলে ‘বাঙালি সমাজে’ আপনার প্রবেশ নিষিদ্ধ, অচল হয়ে যাবেন সেখানে। শিক্ষা, চাকরি কিছুই জোগাড় করতে না পেরে এখন না খেয়ে মরবেন, আপনি! আর যারা এখনকার ২০-৩০ বছর বয়সের তাদেরও দুঃশ্চিন্তার কারণ নাই। মমতার আমলে কিছু হয়ত বদলাতে চাইছে। তবু এখনও কলকাতা চলে যান, দেখে আসেন মনোযোগ দিয়ে। তাহলে আনিসুজ্জামান আমাদের কী অসাম্প্রদায়িকতা শিখাতে এসেছেন?

আর  ‘অসাম্প্রদায়িক’ হওয়া মানে কী? জমিদারির আধিপত্যে সাজানো ‘বাঙালি সমাজে’ প্রবেশ ওঠা-বসার সুযোগ ও অধিকার পেতে হলে শাসক জমিদার বাবুর নির্ধারিত যে কোড আপনাকে মেনে চলতে হবে, অভ্যস্ত হতে হবে, এটাই “অসাম্প্রদায়িকতা”। আবার অসাম্প্রদায়িকতার ট্রেনিং ও ওরিয়েন্টেশন শেষে ওই সমাজে প্রবেশ করতে পারলে ভেবেন না আপনি তখন বাঙালিও হয়েছেন। আপনি সেই তখন বড় জোর হিন্দু বাঙালির এক পড়শি কেবল।

অনেকের মনে আছে হয়ত ২০১৩ সালের আগষ্টে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের একাত্তর টিভির এক টকশো ক্লিপ পাওয়া যায় ইউটিউবে, সেখানে “বাঙালি মেয়ে কারা” তা নিয়ে মিতা হকের দেয়া এর বর্ণনা আছে। তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর ঐ বক্তব্যের টেক্সট পাবেন এখানে। সেটি মিলিয়ে দেখতে পারেন, তাতে আমার কথা আরো ভাল বাস্তব উদাহরণে বুঝা যেতে পারে। মিতা হকের বক্তব্য আমে দেখতে বলছি আমি যা বলতে চাইছি এর রেফারেন্স বা উদাহরণ হিসাবে।  তার বক্তব্যের পক্ষ নেয়া বা নিন্দা করা কোনটাই এখানে উদ্দেশ্য নয়। ওথচ কেউ বাঙালি কি না এর সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা হল, সে তার মায়ের সাথে কী ভাষায় কথা বলে, কিভাবে ডাকে ইত্যাদি। অথচ আনিসুজ্জামানের মত যারা চিন্তা করেন তারা ধর্ম বা পোশাক ইত্যাদির একধরনের লাইন টেনে দিতে চায় জমিদার কর্তৃক নির্ধারিত অসাম্প্রদায়িকতার কোড বলে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে।এটাও কি ব্যাকফায়ার করবে না? আসলে ‘মাদার টাঙ’ তো লুকানো যায় না, ভুলা যায় না।

কিন্তু তা না হয় বুঝা গেল, তবু কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক বা সম্প্রদায়, এসব ডাকাডাকির ট্যাগ দেয়া কেন? কারণ খুব সহজ। জমিদারির হিন্দু কালচার বলতে চায় তারা তাদের বাঙালি সমাজ বলে এক বাগান সাজিয়েছে। সেখানে তাদের কোডের বাইরে আলাদা পোষাক বা আচার অথবা কোন চিহ্ন হাজির করা মানে হল তাদের সম্প্রদায়ের সেট আপের মধ্যে আমি আমার মুসলমান সম্প্রদায়েরও  চিহ্ন দেখিয়ে মাথা তুলতে চাচ্ছি। অতএব তাদেরটা নয় আমারটাই কেবল ‘সম্প্রদায়গত বিভক্তি’ চিহ্ন, যা আমি শো করছি বলে তারা দাবি করবে। কারণ রাজত্ব তো তাদের, আমরা তো প্রজা। তাদের সাজানো বাগানে আমরাই যেন হস্তক্ষেপ করছি! এটাকে তারা তাদের সাজানো বাগানে অন্যরাই যেন হস্তক্ষেপ করছে – এভাবে দেখতে চাচ্ছে। অতএব আমরা সাম্প্রদায়িক! এই হল ডঃ আনিসুজ্জামানের রপ্ত করে নেয়া ভাষ্য।
সেই জমিদার শ্রেণীর আধিপত্যে ও নেতার হাতে চালু করা সমাজ আজও একইভাবে চলছে। আর পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা আজো ‘অসাম্প্রদায়িক’ চিহ্ন রপ্ত করতে করতে একেবারে ট্রেইন্ড। কারণ সে জানে এটাই এখনো তার পাসপোর্ট, না হলে বাঙালি সমাজে উঠতে দেয়া হবে না।

আনিসুজ্জামান সম্ভবত আমরা অনুমান করতে পারি “কলকাতার মুসলমান” হিসেবে ছোট থেকেই কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠতে ট্রেইন্ড হয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর মনে অজানা ভয় কাজ করেছে যে, গোষ্ঠী বিশেষের আধিপত্যের তৈরি করা কোনো গাইড লাইন বা কোড ভঙ্গ করলে সমাজের কোথায় না আবার অপমানিত হতে হয়। মজার কথা হল, কলকাতার মুসলমান যখন পূর্ব-পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে আসেন, তখনও তাদের ‘ট্রমা’ যায় না। পিছু ছাড়ে না। কারণ ব্যাপারটা অভ্যাসের গভীরে ঢুকে গেছে – গভীর ট্রমা আর ভয়ে।  উল্টো তারা বাংলাদেশের মুসলমানদেরও ঐ একই ধরনের তথাকথিত মাই ফুট “অসাম্প্রদায়িক” হতে সবক দিয়ে বসেন।

ঠিক এটাই প্রবলভাবে ঘটেছিল বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের দিকে আওয়ামি লীগের জন্মের সময়। কলকাতায় পড়ালেখা করে ফেরত শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত হয়ে যায় লীগের বুদ্ধিজীবী অথবা কালচারাল ভ্যানগার্ড। একারণেই সেকাল থেকেই লীগের অসাম্প্রদায়িক বা কথিত ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার অহেতুক কসরত দেখেছিলাম আমরা।

ব্যাপারটা হল কোন মডার্ন ভ্যালু বা সরাসরি ইন্ডিভিজুয়ালিজম যদি চর্চা করতেই হয় তো করেন না? সমস্যার তো কিছু নাই।  তবে বুঝে শুনে করেন, মন লাগিয়ে। কিন্তু পুরানা জমিদার বা সামন্ত আধিপত্যের ভ্যালুর জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘোরা তো একেবারেই অপ্রয়োজনীয় আর হাস্যকর! কেবল খেয়াল রাখবেন, সহনাগরিক কারো অধিকার লঙ্ঘন করে যেন না বসেন, পায়ে মাড়াবেন না কাউকে। কারণ তারাও আপনারই সমান অধিকার; তাদেরও বৈষম্যহীন অধিকার আছে। এটা খুবই শক্তভাবে মেনে চললে দেখেন ভুয়া কথাবার্তার কবল থেকে বহু আগেই আর সহজেই রেহাই পেয়ে যেতে পারেন। খেয়াল রাখবেন কারণ সাবর্ডিনেট হওয়া যাবে না, মানা যাবে না।

এবার কিছু সারকথা। বাঙালি মুসলমান তা সে যেখানকারই হোক, তার আর কারো কাছ থেকে সে ‘বাঙালি’ কি না, এই স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট অপ্রয়োজনীয়। পুরানা জমিদার গোষ্ঠীর আধিপত্যের কোনো কিছুকে সে আর গুরুত্ব দেয় না বিশেষত ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। দিলে তো সে সেই থেকে কলকাতার অধীনেই থেকে যেত। প্রধান কারণ পাকিস্তান কায়েমের পরই পুরা পুর্ব-পাকিস্তান থেকেই জমিদারি উৎখাত করে হয়েছিল। তাই এই জমিদারি-হারানি পরাস্ত স্ট্যাটাস আর তাকে কাউকে বাঙালি সনদ দেবার-না- দেবার কোনো মুরোদ রাখে না। তবে ওই জমিদার ও তার স্বধর্মী সঙ্গীরাই এখন সব ক্ষমতা আর আধিপত্য হারালেও বাম ভেক নিয়ে নতুন করে হাজির আছে। তারা মাঝে মাঝে বাঙালি মুসলমানকে এইবার কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িকতা শেখানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু বাঙালিয়ানা? না সে মুরোদ বা বাস্তবতা আর নেই। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে প্রধানত মুসলমান বাঙালি প্রমাণ করে রেখেছে যে, নিজের বাঙালি স্বীকৃতি আর অপরের কাছে নয়, নিজেই নিজের বাঙালি স্বীকৃতি, নিজেই তা হাসিল করে নিয়েছে। এরজন্য এই জায়গায় এসে শেখ মুজিব আমাদের একটা প্রশংসার দাবি রাখেন। দেখেন তিনিও কলকাতায় বড় হওয়া, পড়তে যাওয়া তাদেরই আরেকজন। কিন্তু কোয়ালিটি একেবারে উলটা। জেনুইন কোর মুসলিম লীগার। ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ কাহিনী তিনি গুমোর ফাঁক করে বুঝতেন। তাই মোহ ছিল না।

তাহলে ডঃ আনিসুজ্জামান তিনি আসলে কে?
তিনি হলেন পতিত কিন্তু হার স্বীকার না করা জমিদার হিন্দুর রিয়েল রিপ্রেজেন্টেটিভ।  কলকাতায় জমিদারি এখন আর নাই। আমাদের দেখাদেখি ১৯৫৫ সালের তারাও উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কলকাতার হিন্দুমনের ফাউন্ডেশন  ও মেজাজ এই জমিদারের হাতে শুরুর দিকে তার রমরমা আমলেই এর নির্ধারক টাচগুলো হস্তান্তর করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের উপর থেকে চরম ও প্রাকটিক্যাল অর্থে হারানি জমিদার হিন্দুর আধিপত্য বা সমস্ত ধরণের প্রতিপত্তির কিছু অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু কলকাতা (বৃহত্তর অর্থে এটা এখন সারা ভারত) হাল ছেড়ে দেয় নাই , হার স্বীকার করে নাই।  চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে হারানি জমিদারের খাসিলতের কথা বললাম ডঃ আনিসুজ্জামান আধিপত্য প্রতিপত্তি হারানো হিন্দু মনের প্রতিটা রক্তফোটার গতিবিধি আকাঙ্খা তিনি বুঝতেন। একারণে বাংলাদেশের কেউ যদি একালে ভারতের সাথে গাটছাড়া বেধে চলতে চান তাহলে তাকে দেখাতে হত যে তিনি ডঃ আনিসুজ্জামানকে আদর খাতির কেমন করেন, কোথায় রাখেন।  আবার ডঃ আনিসুজ্জামান এর দিক থেকে দেখলে তিনিও এসব জানতেন, বুঝতেন তার কোয়ালিটির বাজারদর কোথায় ও কত। ফলে তিনি সে মোতাবেক দাম চাইতেন ও পেতেন। ডঃ আনিসুজ্জামানের মৃত্যতে এই যুগের সমাপ্তি ঘটল।

কিন্তু কলকাতায় বড় হওয়া মুসলমানরা এখনো এক ট্রমায় ভুগছেন। যেমন মনে করুন, ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের অনেক বন্ধু মিলে কোনো আলাপ করছেন। সেখানে নিজেদের মনের মধ্যে কারো কোনো অসাম্য বা নিচু বোধ নেই। ফলে  যা বলতে ও লিখতে ইচ্ছা করছে, তাই করতে তারা অভ্যস্থ অর্থে মুক্ত। কিন্তু যদি আপনারই কোনো কলকাতার মুসলমান বন্ধু এসে গেছে সেখানে এমন হয়! লক্ষ্য করবেন, সে আপনার সাহস ও মর্যাদাবোধ দেখে তো কাঁপছে আর হয়তো বারবার আপনাকে, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে, জামা টেনে ধরছে। তাহলে বুঝতে হবে, কলকাতায় থাকতে থাকতে এটা আপনার বন্ধুর ট্রমা, কোড মেনে চলার তাগিদের ট্রমা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ১৭ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  ডঃ আনিসুজ্জামান ও “সাম্প্রদায়িকতা” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

গৌতম দাস

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Sm

বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও তার ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতা অব্যাহত আছে তো বটেই বরং বেড়েছে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। মানে, বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বা সংশোধিত নাগরিক আইন পাস করার পরে এ নিয়ে বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি বাড়িয়েই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারা এখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধিদের “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে;  নিজ কর্মীদের নিয়ে গুলি করে মারার শ্লোগান তুলেছে। এরই মধ্যে লন্ডনের ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন এই ইস্যুতে গত সপ্তাহে এক আর্টিকেল ছেপেছে। শিরোনাম “ইকোনমিস্ট এক্সপ্লেনস, দ্যা ইরোশন অব সেকুলার ইন্ডিয়া” [The Economist explains, The erosion of secular India]
‘Explains’ – শিরোনামে উল্লেখ থাকে এমন টাইপের লেখা সাধারণত অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হয় দেখা যায়; যাতে পাঠক ওই ইস্যুর খুঁটিনাটি দিকগুলো ঐ লেখা থেকে জেনে নিতে আগ্রহী হয়। ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেলটা তেমনি ধরনের এক লেখা, যেটার শিরোনাম হল – আমরা “ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা করে বলছি, ভারতের সেকুলারিজমে ক্ষয় ধরে গিয়েছে”।
এই আর্টিকেলের লেখক দিল্লিতে বসে লিখেছেন তা নিজেই জানিয়েছেন। আর এ ধরনের লেখাকে পত্রিকার নিজের অবস্থান, অন্তত কিছু দায়দায়িত্ব নিয়ে লেখা মনে করা হয়ে থাকে।
কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হল “সেকুলার” শব্দের ব্যবহার। সারা ভারতে সেকুলার শব্দের এধরণের বিশেষ আবিষ্কার ও বিরক্তিকর ব্যবহার প্রচলিত আছে সেই ১৯৪৭ সালের আশেপাশের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। সেটা এখন ‘লন্ডন ইকোনমিস্ট’ পর্যন্ত এতে সওয়ার হয়েছে এটা দেখতে পাওয়াটা বড়ই চমকপ্রদ ও তামাশার নিঃসন্দেহে! ইকোনমিস্ট এখানে ধরে নিয়েছে যে, ভারত একটা সেকুলার রাষ্ট্র, অন্তত সেকুলার রাষ্ট্র ছিল – ইকোনমিস্ট এই সার্টিফিকেট এখানে বিতরণ করেছে। কিন্তু ‘সেকুলা’র মানে কী? আর কোনটা সেকুলার কোনটা না, তা চেনার উপায় কী?

যারা দাবি করে থাকে যে সে সেকুলার অথবা তাদের অমুক রাষ্ট্র সেকুলার তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তিনি সেকুলারিজম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কনসেপ্ট সম্পর্কে আসলে খুবই কম কিছুই জানেন। যেমন এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় যে, ওমুক রাষ্ট্র বা ভারত সেকুলার কি না! ইউরোপে কোন রাষ্ট্র সেকুলার আর কোনটা না- এমন প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। এমনকি আমেরিকা কি সেকুলার রাষ্ট্র? এই প্রশ্ন করতে দেখা যায় না কেন? এছাড়া আবার ঠিক কী প্রয়োজন মিটাতে কোন রাষ্ট্রের সেকুলার হওয়া জরুরি কেন? এর জবাব কী তারা জানেন? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন- কোনো রাষ্ট্র সেকুলার কিনা তা বুঝার উপায় কী?

ইকোনমিস্টের এই লেখায় কোথাও অবশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কী অর্থে ভারতে ‘সেকুলারিজম আছে বা ছিল’ বলা হচ্ছে। এটা বলতেই বা আসলে কী বুঝান হয়েছে? তবুও ঐ লেখায় লেখকের এক দাবি হল- “১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত ভারতে সেকুলার ভিশন বজায় ছিল এবং তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নাই” , [“It was the secular vision which prevailed and which remained pretty much unchallenged until the 1980s.”] অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, সেকুলার শব্দের পাশে একটা ‘ভিশন’ শব্দ লাগানো হয়েছে; মানে সেকুলার জিনিসটা একটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে ব্যাখ্যা করতে দেখছি। এমনিতে অবশ্য ভারতের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ভারত সেকুলার কি না’ এই গর্ব বা তর্কের মীমাংসা করার পদ্ধতিটা দেখা যায়, খুবই সহজ। ভারতে একজন মুসলমানকে প্রেসিডেন্ট বানানো হলে এটাই তাদের কাছে সেখানে প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে গৃহীত হয়ে যায় যে, ভারত সেকুলার। অথচ ইস্যুটা অমন লোক দেখানোর মোটেই নয়। রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে যারা সিরিয়াস তাদের কাছে এসব আমলযোগ্য কথা হতে পারে না।

এ ছাড়া ঐ আর্টিকেলের শুরুতে বলা হয়েছে, ভারতের যারা মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ছিল (মানে কংগ্রেসকে কল্পনা করা হয়েছে) এরা নাকি ‘সেকুলারিজমের স্বপ্ন’ ও ‘ইনক্লুসিভ রিপাবলিক’-এর স্বপ্ন দেখতেন, [Whereas the mainstream of India’s independence movement envisioned a secular, inclusive republic……]। কিন্তু সরি, লেখক মহাশয়! আপনার এই কথা বাস্তবের সাথে মিলে না। ফলে, এটা অগ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো ধারণা প্রকাশ করা আমেরিকানদের চালু করা শব্দ। এ ছাড়া কোল্ড ওয়ার যুগ শেষের আগে আমাদের এদিকে এই শব্দ দেখা যায়নি। বিশেষ করে গ্লোবালি ইসলামী রাজনীতিতে একালে তা বাধ্যতামূলক আমলযোগ্য ইস্যু হয়ে পড়ার পর এটা আমেরিকানদের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশের পরই কেবল এটা এক ভাষ্য হয়ে উঠেছে; আগে না। ইসলামী রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র বা শাসন ধারণার “খেলাফত” শব্দে আমেরিকার আপত্তি তারা এভাবেই এই শব্দ দিয়েই প্রকাশ করে থাকে যে রাষ্ট্র মাত্র তাতে বসবসকারি সকল অংশকে সাথে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করতে হবে। কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, উপেক্ষায় ফেলে রাখা সুযোগ নেয়া যাবে না।

এছাড়া মূলত কংগ্রেস কখনই “ইনক্লুসিভ রিপাবলিক” বলে কোনো ধারণা ব্যবহার করে নাই। এমনকি ১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার সময় রুটিন কাজ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা ব্যবহার করা ছাড়া আর ভারতের আর কোথাও শব্দটাই ব্যবহার করা হয়নি। আসলে রিপাবলিক শব্দটাই আমাদের এশিয়ায় এদিকে প্রয়োজনীয় ধারণা মনে করার রেওয়াজ নাই। খুব সম্ভবত আমেরিকানেরা কমিউনিস্ট ঠেকাতে চালু করা এক ভুয়া শব্দ “ডেমেক্রেসি” – এটা চালু করার কারণে গুরুত্বপুর্ণ ‘রিপাবলিক’ ধারণাটা চাপ দিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই  এই দুর্দশা।  আর সোজা হিসাবে এদিকে ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটার ব্যবহার কংগ্রেস দলের নেতা ব্যক্তিত্বরা  যদি বুঝেই থাকত ও মেনে নিত, তবে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার দিকে যেত না। অথবা বলা যায় তাঁরা যেতে দিয়েছিল কী করে? তাহলে নেহরুর “অখণ্ড ভারত” দখলের ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা,  যেটা তাঁর ষোলোআনা ছিল, তার কী হবে? আমরা তো সেটার এখনো সহজেই এর প্রমাণ পাই। মনে রাখতে হবে, অখণ্ড ভারত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সবাইকে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ ভারত রাষ্ট্র গড়া- এ দুটো কারও কারও কাছে অতি উতসাহে শুনতে কাছাকাছি মনে হবে হয়ত। কিন্তু এ দুটো- একই বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও, এরা একেবারেই ভিন্ন বিষয়। আসলে একটা হল, স্রেফ ভূখণ্ডের লোভ। আর একটা হল সবাইকে একই ও সমান নাগরিক মানুষ হিসেবে একত্রে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ও গণ্য করে গড়ে তুলতে চাওয়া।
ওদিকে আবার, গান্ধী ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন; এর প্রমাণ দেখা যায় না।  বরং আসলে তা হবার কথাই না। কারণ  গান্ধী-নেহেরুর রাষ্ট্র-চিন্তা – সেটা এক জাতিরাষ্ট্র পাবার চিন্তা। আর জাতিরাষ্ট্র চিন্তায় “খেলাফত কোন অনিবার্য প্রয়োজনীয় ধারণা নয়।  বরং, তাদের কথিত “দেশপ্রেমিক জাতি” হলেই চলে। গান্ধী বরং তাঁর খামতি চিন্তার অপুষ্টির কারণে  সারাজীবন তিনি “হিন্দু আর মুসলমান’ – এভাবে পরিচয়মূলক শব্দ আওড়ায়ে গেছেন। নন-আইডেনটিটি-মূলক সিটিজেন বা নাগরিক শব্দ কখনই ব্যবহার করতে পারেন নাই।  আসলে মূলত তিনি ‘হিন্দু-মুসলমান এক করতে হবে’ এই হাল্কা ও অর্থহীন ভাষ্য আউড়িয়ে গেছেন। একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে দুটো আলাদা ধর্ম হিন্দু-মুসলমান, এদের এক করতে হবে কেন? এর চেয়েও বড় কথা- দুটো আলাদা ধর্মকে এক করা কি আদৌ সম্ভব, না এর দরকার আছে? এদিকগুলো তিনি ভাবতে সক্ষম ছিলেন মনে হয় না।
দুনিয়াতে ‘আধুনিক রিপাবলিক’ রাষ্ট্রধারণা আসা ও এটা গড়ার চিন্তা এসেছে কবে থেকে? জবাবে সবাই মেনে থাকেন যে, এটা মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর থেকে। একটা ভুল ধারণাও এখানে আছে যা অনেকে ধারণ করে থাকতে পারে। ১৬৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত জন্ম নেয়া সব রাষ্ট্র একই ধরনের রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রধারণা, তা কিন্তু নয়। সহজে চিনবার জন্য বললে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আর পরের ধারণা আলাদা এভাবে মনে রাখলেই চলে। এই যুদ্ধ সব বদলে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে ফারাকটা কী ছিল? তা হল, ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বলতে একমাত্র তা নেশন-স্টেট বলে বুঝা হত। আর পরে সেগুলো সবই হয়েছে অধিকারভিত্তিক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্রের “কাউন্সিল অব ইউরোপ” গঠনকে যদি  লক্ষ্য করা যায়। এর জন্ম-উদ্দেশ্যই ছিল এক হিউম্যান রাইটস কনভেনশন ডাকা (নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস, ECHR)। নিজেদের রাষ্ট্র-ভিত্তি কথিত “জাতি” ধারণা থেকে বদলে হিউম্যান রাইটে রূপান্তরিত করে নেয়া যায়।  যাতে ওই কনভেনশন শেষে একমত হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা, এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোকে জাতিরাষ্ট্র থেকে হিউম্যান রাইটসভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র আকারে ভিত্তি বদলে নেয়া যায়।

অতএব যে ইউরোপের কথা আমরা শুনি জানি, যার এক নমুনা হল সেকালের কলোনি-মালিক ব্রিটিশ রাষ্ট্র; এটা আসলে সেকালে ছিল এক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট; মানে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। আর তাই যে জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে সেকালের রেনেসাঁ-চিন্তা ব্রিটিশের হাত ধরে ভারতবর্ষে এসেছিল সেই রেনেসাঁ ছিল মূলত একটা জাতিরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ও ধারণা। কমিউনিস্ট সার্টিফিকেট অনুসারে সেকালের রাজা রামমোহন রায়কে ‘ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু’ মানা হয়। সেই রামমোহনের সক্রিয়তার কাল (১৮১৫) থেকে পরিশেষে ১৯৪৭ সালের আশপাশের সময়কালের নেহরু-গান্ধীর রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি এখনো সেই রাষ্ট্রধারণাটা মূলত একটা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৪৭ সালের পর  ‘গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত’ আসলে এক নেশন-স্টেট হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু ভারত নেশন-স্টেট বুঝের ভারত হলে, তাতে কী সমস্যা?

এক্কথায় এর জবাব হল, নেশন-স্টেট ধারণা “নাগরিক অধিকার” বা “হিউম্যান” রাইট ধারণা বুঝতেই পারে না। আর নেশন-স্টেট ধারণা এসেছে – রাষ্ট্রগড়া বলতে যেখানে মুল কর্তব্য ছিল একটা “রাজনৈতিক কমিউনিটি” গড়া – এই কাজ থেকে বিচ্যুতি [derailment] হিসাবে।
এছাড়া রাষ্ট্র বলতে এক ‘জাতিরাষ্ট্রে’র স্বপ্ন-কল্পনা থাকলে গঠনকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, কাকে তারা ‘জাতি’ হিসেবে নেবে? যেমন রামমোহন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র দেখে এক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু খেয়াল করতে হবে তার এই জাতি ধারণাটা আসলে (এথনিক অর্থে) এক ধর্মীয়-জাতি ধারণা। ঠিক যেমন এই একই  বিচারে ব্রিটিশরা হল, এঙলো-ক্যাথলিক খ্রিশ্চান, আর এই ধর্মের ভিত্তিতে তারা এক ব্রিটিশ জাতি। আর এখান থেকেই রামমোহন একটা একক ধর্মের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতির কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এতে হিন্দুধর্ম তার ‘ঐ’ প্রয়োজন মিটাতে পারবে, তা তিনি মনে করেননি। কারণ এই হিন্দুধর্ম জাতভেদ প্রথায় ডুবে অসংখ্য জাতে বিভক্ত। এছাড়া ভারতে আরো ধর্মও আছে। এছাড়াও তিনি কোন একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম হলে তা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হবে বলে মনে করতেন। কারণ হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার ধারণাকে তিনি এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনের দিক থেকে দেখে সমস্যা ভাবতেন। এসব চিন্তা থেকেই ১৮১৫ সালে তিনি একেশ্বরবাদী ‘ব্রাহ্মধর্মের’ প্রচলন করেছিলেন।
কিন্তু এই “জাতি” ধারণা প্রয়োজনে ধর্ম-প্রকল্প বাস্তবায়ন রামমোহন বা তার অনুসারীরা কেউ সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আর ১৮৭২ সালের দিকেই, খোদ ব্রাহ্মধর্মই দু’ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ সবাইকে এক ধর্মের অনুসারী করে জাতিরাষ্ট্র বানানো দূরে থাক ব্রাহ্মধর্ম নিজেই বিভক্ত হয়ে যায়। তাই, এটা উদ্যোক্তাদের কাছে অবাস্তব প্রকল্প মনে হতে থাকে আর ততই পরবর্তিকালে বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-বঙ্কিমচন্দ্রসহ সবার কাছেই “ব্রাহ্ম-প্রকল্প বাদ দিয়ে” হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একমাত্র বাস্তবতা বলে নিরুপায় ‘সাফাই’ হয়ে উঠতে থাকে। কংগ্রেসের জন্মের (১৮৮৫) পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা- এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন গান্ধী। পরের বছরের মধ্যে তিনি কংগ্রেসের হাল ধরেন । তখন থেকেই এবং মূলত ১৯২৩ সালের ‘লক্ষৌ প্যাক্ট’-এর ঐক্য ব্যর্থ হয়ে যারার পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একেবারে নির্দিষ্ট হয়ে জায়গা পেয়ে যায়। তবে গান্ধীর কৌশলে, এটা হিন্দুধর্মভিত্তিক বা এটা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সে কথা সরাসরি না বলে আবছা করে রাখা হয়। আর তখন থেকে বিপদে পড়লে হিন্দু শব্দটা ঠিক ধর্ম নয়, সভ্যতা বলে বুঝতে হবে বলে দাবি করার চাতুরী তারা করে গেছেন।

আসলে জাতিরাষ্ট্র বুঝের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এখানে ‘জাতি’ মানেই কোনো একটা আইডেনটিটির জাতি মানে, ভাষা ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়কে ভিত্তিতে জাতি ধরেই এখানে আগাতেই হয়। আর এতেই অন্যান্য ধর্ম অথবা অন্য আইডেনটিটিগুলোও কেন জাতির ভিত্তি হিসেবে তাদেরটা নেয়া হবে না, সে দাবিদারির প্রশ্ন উঠে নতুন অসন্তোষ তো অবশ্যই উঠে কিন্তু সবচেয়ে বড় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব খাড়া হয় যে নাগরিকদের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে একটা না একটা অসাম্য রাষ্ট্র নিয়মিত তৈরি করতে থাকে।

তুলনায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলো মীমাংসিত। যদিও কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার পরে এবার তা বাস্তবায়ন করাটা মূল কাজ যে, ধর্ম বা যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সারকথাটা হল গান্ধী-নেহরুরা হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা আঁকড়ে থাকাতে তারা জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বা কোনো মুসলমানের প্রতি বৈষম্যের কোন সদুত্তর বা সন্তোষজনক জবাব তৈরি করতে পারেননি। পরিণতিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি বড় হয়ে শেষে তারা আলাদা হয়ে যায়; যদিও অনেক মুসলমান দেশত্যাগ করলে নিজের বৈষয়িক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার হবু আশঙ্কায় ভয়ে আপসে ভারতেই থেকে যান।

এর সার কথাটা হল, এখান থেকেই হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণার কারণে ভারতের সব প্রধান দলই কমবেশি ‘হিন্দুত্ব’- এই জাতিবাদের অনুসারী থেকে যায়। এর মধ্যে সেকালের আরএসএস কে (একালের বিজেপি) বলা যায় ‘চরম’ হিন্দুত্ববাদের দল। এ কারণে লক্ষ্যণীয় যে বিজেপির চোখে এখনও ‘নাগরিক’ বলে কোনো ধারণা নেই। তাই সহজেই, মুসলমান বা অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার কোনো দায় অনুভব করে না বিজেপি। তাদের দলের কোনো দলিলেও এর স্বীকৃতি নেই।

তাহলে এটা কী কংগ্রেসের কি আছে? না তাও নেই। কারণ ভারত মূলত ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার দল দিয়েই গঠিত ও পরিচালিত। ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণা ও বোধের দল দিয়ে নয়, তাতে সে দল কমিউনিস্ট হোক কি বিজেপি!

উনিশ শ’ আশির দশকের শেষের দিক থেকে ভারতে কংগ্রেস দলের প্রভাব ও আধিপত্যের পতন শুরু হয়ে যায়। আর এটা লক্ষ্য করেই ইকোনমিস্টের লেখক দাবি করছেন সেকুলারিজমের ক্ষয় তখন থেকে। তিনি ‘কংগ্রেস’ শব্দের জায়গায় ‘সেকুলারিজম’ বসিয়ে কাজ সেরেছেন যেন এর আগে ভারত বিরাট সেকুলার ছিল। এর আগে যেন বছর বছর দাঙ্গা হয়নি। কাশ্মিরে নির্বাচনে ভোটে কারচুপি করে ভোটের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো আর রাজনীতিতে সশস্ত্রতার আমদানি কি ১৯৮৭ সালে কংগ্রেস আমলে হয়নি? তাই, একা বিজেপি সব দোষের ভাগী এ কথা ভিত্তিহীন। রাহুল গান্ধী কি একালে ‘সফট হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছেন না?

তাহলে এখন সত্যিকারভাবে চিনতে হয় কী করে যে, রাষ্ট্র সেকুলার কিনা? রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও বোধের অভাব আর সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে সেকুলারিজম সম্পর্কে সব অদ্ভুত ধারণা আমরা দেখতে পাই। সেটা মুসলমান রাষ্ট্রপতি দেখানো মানে, তা সেকুলারের লক্ষণ পর্যন্ত। এমনকি এটা কনস্টিটিউশনে ওই রাষ্ট্র সেকুলার বলে ঘোষণা দেয়া আছে কিনা অথবা রাষ্ট্রের মূলনীতির একটা সেকুলারিজম কিনা, ইত্যাদি দেখিয়ে যারা দাবি করে, আমার বা অমুকের রাষ্ট্রটা সেকুলার তারা রাষ্ট্র বা সেকুলারিজমের কিছুই বুঝে না। এটা আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। তবে একাজটা তারা করে তাদের একটাই উদ্দেশ্য হল, মূলত ধর্মীয় সংখালঘুদের ভোট এই উপায়ে হাসিল করা।

তাহলে আবার প্রশ্ন সেকুলারিজম বুঝব কেমন করে?  এপর্যন্ত আমরা দেখেছি সেকুলারিজম যেন অবশ্যই ধর্মবিষয়্ক একটা ইস্যু। হা আপতিকভাবে তা মনে হতে পারে কিন্তু এটা মূলত নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষম্যের ইস্যু। কোন দুই নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সাম্য বজায় না রাখার সমস্যা।  যেমন দেখেন, আমাদের রাষ্ট্র এখন ছাত্রলীগের বা আওয়ামি কোন অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইনভঙ্গ করে হলেও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। তাদের কৃত কোন অপরাধ বা রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকে উপেক্ষা বা প্রশ্রয় দিচ্ছে।  রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইন ভঙ্গ করে হলেও ছাড় দিচ্ছে, বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে – এগুলো যথেষ্ট প্রমাণ যে, এই রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষমাই করছে – ফলে বৈষম্যের রাষ্ট্র। নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র নয়। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক বৈষম্য করা মানে তা যদি হয় ধর্ম পরিচয়ের কারণ-সংশ্লিষ্ট তখন এটাকে রাষ্ট্র সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করছে বলা হয়। তাই ‘সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গ’ কথার মূল অর্থ হল নাগরিক বৈষম্য করা।
যেমন মোদীর সিএএ – এই আইনে মুসলমানদের বেলায় বৈষম্য করা হয়েছে তাই এই আইন সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে – এভাবে বলা যায়।  যদিও এখানে মূল কথাটা হল নাগরিকের মধ্যে অধিকার বৈষম্য করা। আর কেমন ধারার বৈষম্য এর উত্তরে বলা যায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিক বলে সংখ্যালঘু বলে তাদের সাথে করা বৈষম্য এটা।
আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এটাও বৈষম্য করা। ধর্মের কারণেসহ যেকোনো কারণে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা, বৈষম্যের চোখে দেখা ও আচরণ করা এটাই মূলত নাগরিক সাম্য বজায় রাখার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।  কেবল ধর্মীয় বৈষম্য নয়, বরং যেকোনো নাগরিক বৈষম্যই নাগরিক-সাম্যের নীতি ভঙ্গ করা।
এরপরে আর একটা দিক আছে। আলাদা করে “আমাদের রাষ্ট্র সেকুলার” – একথা কনস্টিটিউশনে লিখে রাখা বা না রাখাটা গুরুত্বপুর্ণ না। কারণ মূলত রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কারণের বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হয়ে দাড়ানোই  নাগরিক সাম্যনীতি।  তাই  রাষ্ট্র সেকুলার কিনা  এটা বুঝবার আসল জায়গা হল ঐ রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেখানে তাকাতে হবে।  আমার রাষ্ট্র সেকুলার – আলাদা করে একথা লিখা রাখা না রাখা এজন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।  মানে লিখে রাখলেও সেকুলারিজম কায়েম হবে না। এজন্যই যারা এই লিখে রাখাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এরা সেকুলারিজম ইস্যুটা বুঝে কিনা সন্দেহ করা যায়। রাষ্ট্রের চোখে দেশের সবার পরিচয় যাই থাক, মূল বিষয় হবে তাদেরকে কমন “নাগরিক” পরিচয়ে আমল করা হচ্ছে কি না, সে সমান অধিকারের নাগরিক বলে মানা হচ্ছে কি না, কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার সে হচ্ছে কি না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এগুলোর সদুত্তর হল সেকুলার রাষ্ট্রের চিহ্ন। নাগরিক সাম্যের ব্যত্যয় ঘটলেই মানে, অধিকারে বৈষম্য ঘটলেই আসলে  নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ হবে। আর নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ মানে সেখানে সেকুলারিজম নীতিভঙ্গও ঘটবেই। তাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলার লেখা আছে কি না এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেদিকে পরীক্ষা করতে হবে।

ওদিকে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র না হলে নাগরিক সাম্য বজায় থাকা বা বৈষম্যহীনতা রক্ষা করা আশা করা যায় না। আর সেকুলারিজম চিনার উপায় হল রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের বেলায় বৈষম্যমূলক কিনা মানে নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না এটা চেক করে দেখতে হব।

জন্ম থেকেই ভারত হিন্দুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই ভারতের নাগরিক জীবনে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতা বজায় থাকার দাবি বা এই বোধ সরব বা সক্রিয় নয়। একই কারণে তাই সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের উপর নাগরিকের দাবি বা চাপ তেমন নেই। জেলা শহরভিত্তিক মফস্বলে বিজেপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা, মুসলমান বলে কোনো মানুষকে ধরে নির্যাতন করছে, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর লাফ দিয়ে জোড়া পায়ে উঠছে। অথচ গোল হয়ে চার পাশে মানুষ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে এই নির্যাতন উপভোগ করছে। অথচ  কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তাদের। এমন ভিডিও ক্লিপ মোদীর একালে আমরা অনেক দেখেছি। এর মানে হল,  নির্যাতিতকে কেউ তাঁরা তারই মত সমান মর্যাদা ও অধিকারের নাগরিক মনে করছে না। এটাই এর অর্থ তাতপর্য। আবার গত নির্বাচনে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি বা রায় দেয়নি। কেন? বিজেপি দলের ম্যানিফেস্টোতে নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই কেন? নির্বাচন কমিশন কোনো আপত্তি তুলেনি কেন? আবার বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়াতে এই ভাবনার উৎস হিসেবে দলের দলিল তালাশ করে কী কমিশন কখনও দেখেছে?  কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছে?  মনে হয় না। অথচ এগুলো সবই নাগরিক অসাম্যের মামলা। মানে সেকুলারিজমের নীতিও ভঙ্গের মামলা। অথচ ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে সেকুলারিজম শব্দের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ করা ও উল্টা বৈষম্য করা সবই যেন বৈধ।
এখন দিল্লির নির্বাচন চলছে। বিজেপি নেতা কাপিল গুজ্জর গুলি ছুড়ে হুমকি দিয়ে বলেন  এই দেশে কেবল হিন্দুরা যাই বলবে তাই চলবে On 1 February, Kapil Gujjar fired shots at Shaheen Bagh saying, “Iss desh mein sirf Hinduon ki chalegi (Only Hindus will have their say in this country).”। এগুলো গুরুতর নাগরিক বৈষম্য করার মামলা। এবং সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গের মামলা।

এভাবে এক হিন্দুত্ববাদ ছেয়ে বসছে চারদিকে; যেন হিন্দুত্ববাদই, অর্থাৎ এর এই বৈষম্য ও অবিচারের আধিপত্যই একালের নিয়ম!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘ইকোনমিস্টের’ মোদি-পাঠ”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]