আসাম এনআরসির নখরা করবে, না পোর্ট-করিডোর নিবে?

আসামকে একটা বেছে নিতে হবে
এনআরসির নখরা করবে, না পোর্ট-করিডোর নিবে

গৌতম দাস

২৫ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2NS

 

 

আর না, এবার আসাম নিয়ে ভারতকে বাংলাদেশের একথা বলার সময় হয়েছে যে, বাংলাদেশকে আসাম কিভাবে দেখতে চায় তার একটা বেছে নিতে হবে – হয় আসাম এনআরসি করতে আবার মেতে উঠবে, আর না হয় বাংলাদেশের পোর্ট-করিডোর ব্যবহার করতে চায় বলে আবেদন করবে। এদুটো একসাথে ভারত বা আসাম করতে পারবে না। এদুটো এক সাথে করার জিনিষ না। আসামকে পরিস্কার করে বলতে পারতে হবে যে আসাম মুল সমস্যা কোনটা? বিদেশি অনুপ্রবেশ? যেজন্য তাকে আবার এনআরসি করার রংঢং করতে যেতে চাচ্ছে? নাকি, অনুপ্রবেশ বা মাইগ্রেশন সমস্যা নয়। আসামের মূল সমস্যা যোগাযোগহীনতা; পশ্চিমবঙ্গ বা বাকি ভারতের সাথে আসামের ভাল কোন যোগাযোগ নাই, এটাই মূল সমস্যা। যদি তাই মানে তবে কোন ফেয়ার শর্তে আসামের বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর ফেসিলিটি দরকার এটা বলতে হবে। আর সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য, করিডোর পাবার পরে বিদেশি অনুপ্রবেশ বা মাইগ্রেশনকে আর কোন সমস্যা বলার কিছু থাকবে না।
আর আমাদেরকেও ভারতকে (আসাম প্রসঙ্গে) পরিস্কার করে জানিয়ে দিতে হবে। আমাদেরকেও সরাসরি রেকর্ডের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারতে হবে, আর তা টোন সটান রেখে বলতে হবে। মুসলমানবিদ্বেষ বা বাঙালি খেদানোর আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার চর্চা সমুলে বন্ধ করতে হবে। মোদী-অমিতের এভাবে ধর্মীয় পোলারাইজেশনের জজবা তুলে ভোটের বাক্স ভর্তি করার রাজনীতি ও কৌশল বন্ধ করতে হবে। অন্তত, বাংলাদেশের সরকারের ঘাড়ে বন্দুক রেখে এই রাজনীতি করা যাবে না। মোদী-অমিতের আরএসএস যদি মনে করে ইসলাম ঘৃণা ছড়িয়ে হিন্দুভোট বাক্সে ভরা এটা তাদের রাজনীতির কোর [Core] কৌশল তাই তারা ছাড়তে পারবে না সেক্ষেত্রে আসাম কোন ফেয়ার শর্তেও বাংলাদেশের করিডোর পেতে পারে না। আসামের কোর সমস্যা যদি বাংলাদেশের কথিত মুসলিম অনুপ্রবেশ হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় করিডোর না পেলেও আসামের তাতে কোন সমস্যাই নাই।  অতএব আসামকে বেছে নিতে হবে, সে ঠিক কী চায়।
আসলে বটম লাইনটা হল,  যত কিছুই জুলুম-বেইনসাফি করেন, চাই কি অন্যের ক্ষতি করার জন্য গর্ত খুঁড়েও রাখতে পারেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায়-ইনসাফের জয়ডঙ্কা বেজেই উঠে; আর আপনারই সেই গর্তে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবেই। সম্ভবত এ জন্যই আমরা শুনি, ধর্ম বা ন্যায়ের কল বাতাসে নড়ে বেজে ওঠে। এনআরসি ইস্যুতে আসামে বিজেপি এখন স্বীকার করছে তারাই বুমেরাংয়ের শিকার হয়ে নিজের গোল নিজেরাই খেয়েছে। কলকাতার ইংরাজি দৈনিক টেলিগ্রাফের শিরোনাম Assam final NRC boomerangs মানে এনআরসি বিজেপির জন্যই বুমেরাং হয়েছে।

তথ্য লুকিয়ে রাখাঃ
এখনকার মোদী-অমিতের জন্য সবচেয়ে বেকায়দার বিষয় হল, প্রকাশিত হয়ে পড়া একটা তথ্য। আসামের এনআরসি তৈরিতে ফাইনাল যে তালিকা, তাতে বলা হয়েছিল ১৯ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে নানা কারণে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু জনগোষ্ঠীর – তথ্যের এই অংশটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯ লাখের মধ্যে কতজন হিন্দু ও মুসলমান এই ভাগ করা দেখানো ফিগার, এটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।  কখনোই কোনো সরকারি অফিস তা প্রকাশ করেনি।

এবার এই তথ্যই এখন আনন্দবাজার ও ইংরেজি টেলিগ্রাফ স্পষ্ট করে বলছে, এই সংখ্যা ১৪ লাখ।  টেলিগ্রাফ লিখেছে  প্রায় চৌদ্দ লাখই হল হিন্দু [ …19 lakh people excluded from the NRC in Assam, as many as 14 lakh were Hindus.]। আর আনন্দবাজার লিখেছে, “…এনআরসির-র চূড়ান্ত তালিকায় বাদ যান ১৯ লক্ষ মানুষ। যাদের মধ্যে অন্তত ১৩-১৪ লক্ষই হিন্দু”।

অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে মুসলমান মাত্র পাঁচ লাখ। অর্থাৎ বিদেশী বলে কাউকে যদি আসাম দায়ী করতে চায় তবে সেক্ষেত্রে সিংহভাগ দায় একা হিন্দু জনগোষ্ঠীর, চার ভাগের তিন ভাগই। অথচ এত দিন তাদের প্রবল বিদেশী ঘৃণা তারা জমা করেছিল মূলত মুসলমানদের জন্য। কাজেই এখন এটা প্রমাণিত যে ১৯৫১ সাল থেকে আসামের বাসিন্দারা একটা আন্দাজ অনুমানের ধারনা নিয়ে মিথ্যা বলে আসছিল। তারা মিথ্যা নাকিকান্না গেয়ে আসছে বিদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশের কথা তুলে।

তাই আসামের ফাইনাল এনআরসির ফলাফলে এটা এখন একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়া নিজের পায়েই কুড়াল মারা। আসামজুড়ে এখন হতাশা আর হাহাকার; এমনকি আত্মহত্যাও। হতাশা, হাহাকার আর মন খারাপের কান্না উঠেছে মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। পুষে রাখা ‘বিদেশী ঘৃণা” এখন প্রয়োগের জায়গা মিলছে না। কারণ, তারাই ওঁৎ পেতে বসেছিল যে, এবার বিদেশী বাঙালি-মুসলমানদের তারা ধরেই ছাড়বে! আর ফলাফলে বাদ পড়াদের মধ্যে হিন্দুদের বিশাল সংখ্যা দেখে  বিজেপি পালিয়ে বেড়াচ্ছে, মুখ লুকিয়ে রাখছে।

পরিশেষে এখন বয়ান বদলে বলছে, এনআরসি তালিকা হয়েছে আদালতের হুকুমে, তাই এর ফল প্রকাশ হলেও আসাম সরকার নাকি তা অনুমোদন করেনি। নর্থ-ইস্টের এক ছোট অমিত শাহ আছেন, নাম হিমন্তবিশ্ব শর্মা। তিনি বিজেপির আঞ্চলিক সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ও আসামের অথর্মন্ত্রীও। তিনি অমিত শাহের সাথে আওয়াজ তুলেছেন আসামের এনআরসি বাতিল হতে যাচ্ছে [Sarma said the Assam government had not accepted the final NRC,…]।

বাঙালিবিরোধী বিশেষত মুসলিম বাঙালিবিরোধী  স্থানীয় অসমীয় সবগুলো পক্ষ কিছু আন্দাজি অনুমানে মনে ঘৃণা পুষে রাখতে রাখতে নিশ্চিত বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে, তাদের সব দুঃখের কারণ বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু-মুসলমান। যেটা আবার ২০১৬ সালের রাজ্য-নির্বাচনের পর বিজেপির রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসে হিন্দুত্ববাদের ইসলামবিদ্বেষের কারণে তা এবার হয়ে যায় যে, আসামের সব দুঃখের কারণ নাকি বাংলাদেশের মুসলমান। এমনকি তারা এটাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, কথিত এই দেশান্তরীরা নাকি স্থানীয় মোট অসমীয় জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য ধাবমান। মনে রাখা দরকার, আসামের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। আর এনআরসিতে নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারার ঝামেলায় আছে যারা, তারা মোট মাত্র ১৯ লাখ।  কোনো পারসেপশনকে নিশ্চিত বিশ্বাস করে ফেললে এমনই হয়।

তাহলে আসামের প্রকৃত সমস্যা কীঃ
এই ঘটনা-প্রচারণার শুরু সেই ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৫১ সাল থেকে। কংগ্রেসসহ অসমীয় সব রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন এতে শামিল ছিল। অর্থাৎ যেটাকে ইংরেজিতে বলে পারসেপশন মানে প্রমাণ ছাড়াই অনুমান, তা অসমীয় সমাজে খুবই প্রবল করে তোলা হয়েছিল। আসলে এক জেনোফোবিক [Xenophobic] বা মনের মধ্যে বিদেশী ঘৃণার চাষাবাদ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে আসামে কখনো লোক যায়নি তা সত্য নয়। এমনকি ব্রিটিশ আমলে সরকার পরিকল্পিতভাবে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে বাংলা থেকে লোক ডেকে নিয়ে ছিল। এ ছাড়া আইনত সেসময় আসাম তো তখন বিদেশও ছিল না। এরপর ১৯৭৯ সালে এসে এটাই সারা আসামের অসমীয় সব রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ সবাই এক প্রবল আন্দোলন গড়ে ফেলেছিল যে, এনআরসি National Register of Citizens (NRC)  বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদেশী বা মুসলমানদের বের করে দিতে হবে। বলা হয়ে থাকে, পরিণতিতে সে কালের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এই দাবির সাথে আপস না করলে আসাম ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দিকে চলে যেত; তাই তিনি ১৯৮৫ সালে “আসাম একর্ড ১৯৮৫’ (Assam accord 1985) নামে চুক্তিতে সই করে আন্দোলন থামিয়েছিলেন।

তবে  আসামের প্রকৃত সঙ্কটের মূল কারণ একেবারেই অন্য খানে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হয়ে ভাগ হয়ে গেলে পশ্চিমবঙ্গ আর পুরো নর্থ-ইস্ট (আসামসহ) এ দুইয়ের একেবারে মাঝখানের ভূখণ্ডটাই হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের এই অবস্থান হওয়াতে ভারতের এ দুই ভূখণ্ডকে তা একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। যদিও কেবল উত্তর-পশ্চিম কোণে, ২২ কিলোমিটারের এক “শিলিগুড়ি করিডোর” থেকে যায় যা এ দুই ভারত ভূখণ্ডের একমাত্র যোগাযোগ সূত্র। আর এতে মাঝের সাড়ে তিন শ’ কিলোমিটারের দূরত্ব হয়ে পড়ে সতের শ’ কিলোমিটার। আর মূল ভারতের সাথে মূলত আসামের (নর্থ-ইস্টের) এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি ও এর প্রভাবেই আসামের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছিল। সেই থেকে আসামের প্রকৃত সব দুঃখের মূল কারণ হয়ে যায় এটাই।

কিন্তু অসমীয় সাধারণের চোখে এই অর্থনৈতিক নেতি প্রতিক্রিয়ার বিরাট ঘটনা তারা খালি চোখে দেখতে পাওয়ার চেয়ে সামনাসামনি বাঙালিদেরই তাদের বেশি চক্ষুশূল মনে হতে লেগেছিল। এমন হতে প্রচার-প্রপাগান্ডাও করা হয়েছিল। আসলে তারা নেতি প্রতিক্রিয়া বা ইমপ্যাক্টকে বুঝেছিল যথেষ্ট কাজ আর না পাওয়া যাওয়ার দিক বলে এই প্রপাগান্ডাই জয়লাভ করেছিল। অতএব, তাদের ব্যাখ্যা ছিল যে, বাঙালিরাই আসামে তাদের কাজ নিয়ে নিচ্ছে, ভাগ বসাচ্ছে। আর এখান থেকেই মনগড়া পারসেপশন যে বাঙালিরাই (মুসলিম) নাকি সংখ্যায় আসামে অসমীয়দের চেয়ে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর এখান থেকে জেনোফোবিক বা বিদেশী ঘৃণার মানসিকতা বিকশিত হয়ে পড়ার শুরু।

মজার কথা হল কেউই চোখ খুলে দেখেনি ব্যাপারটা আসলে কী, এমনকি শিক্ষিত  মধ্যবিত্ত অসমীয়রাও নয়। বরং তাদের মধ্যে এখান থেকেই এক অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক সাজার জোয়ার উঠেছিল। সম্ভবত চিন্তা করা ও বুঝাবুঝির কষ্ট করার চেয়ে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক হয়ে যাওয়া ইতিহাসে সব সময় খুবই সহজ গণ্য হয়ে থাকে। সস্তা জাতীয়তাবাদকে এভাবে বেশি শক্তিশালী মনে হয়, এটাও তাই। তাই ১৯৭৯-৮৫ সালের ওই অন্ধ-শক্তিশালী আন্দোলন ঘটেছিল আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ/ আসু, এই নামে সবাইকে নিয়ে।  বাংলায় লেখা আসু এর মানে হল AASU (All Assam Students’ Union)। আর আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ বা Assam Gana Sangram Parishad (AAGSP) এই সংগঠনটিই ছিল মূলত শিক্ষিত অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিকদের সমর্থনের ওপর দাঁড়ানো সব অসমীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। রাজীব গান্ধী চুক্তিও করেছিলেন এ’দুই সংগঠনের সাথেই। এই চুক্তি করতে রাজীব গান্ধীকে বাধ্য করার পিছনে অসমীয় উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ গোষ্ঠির মুসলমান ও বাঙালি বলে এক {নেলি ম্যাসাকার বা, Nellie massacre and Khoirabari massacre} জবাই ম্যাসাকার করার ঘটনা ঘটিয়েছিল।  কিন্তু আসাম একর্ড চুক্তি হয়ে যাওয়ার পরের আসামের কোনো রাজ্য সরকার চুক্তির বাস্তবায়ন মানে  এনআরসি নিয়ে কোন কাজ শুরু করতে পারেনি বা করতে আগ্রহী হয়নি। শেষে ব্যাপারটা আদালতে নিয়ে গিয়েছিল আরেক অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমী এনজিও; নাম [Assam Public Works, an NGO]। আর যার তত্বাবধানে এর বাস্তবায়ন তিনি এক অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক একজন বিচারপতি রঞ্জন গোগোই। তিনিই আবার ভারতের প্রধান বিচারপতি হয়ে গেলে তাঁর আমলেই এটা শেষ হয়। সমস্যা হল এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা প্রকাশ হয়ে পড়ার পরে তাদের এই বিশেষ অর্জনের ভাগ নেয়া বা উতযাপন করার জন্য  সেই অসমীয় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিকদের এখন দেখা যাচ্ছে না। কারণ তাদের অর্জনের চেয়েও অনেক বেশি হল এনআরসিতে ফেল করা ১৪ লাখ হিন্দুর কান্না ও হাহাকারের আওয়াজ, যার নিচে এরা সবাই নিজেরা লুকিয়ে যাবার সুযোগ নিয়েছে।

রঞ্জন গোগোই সদ্য অবসরে যাওয়া তিনি প্রধান বিচারপতি। কিন্তু তামসাটা হল, লম্বা ছয় বছরের কাজটি করেছেন একটা নির্বাহী বিভাগের কাজ হিসেবে ও নিজ তত্ত্বাবধানে। ইতিহাসের এ এক বিরল দৃষ্টান্ত  এবং প্রবল ব্যতিক্রম যে, বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের ভূমিকায় কাজে নেমে গিয়েছিল। কারণ এটাকে আসামীয়দের স্বার্থরক্ষার এক বিরাট বিপ্লবী কাজ মনে করত আসামীয়রা। যা এক বিরাট পবিত্র কাজই বটে।   আর গোগোই এটাকে নিজের অসমীয় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম দেখানোর বিরাট সুযোগ মনে করেছিল। যদিও এখন আসামে তিনি উলটা পরিণত হয়েছেন কলঙ্কিতদের আরেকজন। অন্তত বিজেপির চোখে তো বটেই, আর আসামের পুরানা অসমীয় বিপ্লবীর চোখেও। অথচ পুরো প্রক্রিয়ায় বিজেপি সরকারের সাথে গোগোই-এর আঁতাত তিনি আড়াল করতে পারেননি। মধ্যপ্রদেশ ক্যাডার সার্ভিস থেকে প্রতীক হাজেরা – একে কে রঞ্জন গোগোই-এর জন্য বেছে এনে দিয়েছিল? আর গোগোই একে নিয়েই এনআরসি বাস্তবায়নের প্রধান আমলা কর্মকর্তা বানিয়েছিলেন কেন? এছাড়া আবার এনআরসি ফাইনাল তালিকা ঘোষণার কাজ শেষে, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত কোনো কারণ না দেখিয়ে এই প্রধান বিচারপতি গোগোই-ই তাকে মধ্যপ্রদেশে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। অর্থাৎ অসমীয় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের সাথে হিন্দুত্ববাদের প্রবল হাত ধরাধরি আমরা দেখেছিলাম, যদিও তাতে কারও শেষ রক্ষা হয়নি।

আঁতাত শেষ পর্যন্ত টেকেনি। এনআরসির তালিকা এখন সব পক্ষের কাছে পরিত্যাজ্য, অপ্রয়োজনীয় অনাদরের এক দলিল। তাহলে এখন সেই ১৯৭৯ সাল থেকে যারা এনআরসি ঘোষণার জন্য আন্দোলন করেছেন; আজ এর পরিণতি দেখে তাদের মূল্যায়ন কী?

তাদের পারসেপশন এখন পুরোটাই মিথ্যা প্রমাণিত। আর খোদ আসামের হিন্দু বাসিন্দারাই সবচেয়ে অখুশি! আপসোস আর হায় হায় চলছে চার দিকে। আগেও প্রমাণিত ছিল, এখনো প্রমাণিত যে আসামের মূল সমস্যা বিদেশী বা মুসলমানেরা নয়; আসামের সমস্যা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও এর দুর্বলতা। কিন্তু এত দিন তাহলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নর্থ-ইস্টের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান বা বিকল্প খুজতে নিয়ে কিছু করেনি কেন? কারণ, এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারগুলোর কিছু সুনির্দিষ্ট মনোবাঞ্ছা আছে। প্রথমত, তাদের ভয় হলো, নর্থ-ইস্টের রাজ্যগুলো ভারত ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে যেতে পারে, চাই কি পড়শি চীনের সাথে যুক্ত হওয়া অথবা স্বাধীন হয়ে যেতে পারে। ভারত সরকার সব সময় এসবকেই প্রবল ভয় করে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, ভারত আবার আসামের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কোনো করিডোর জোগাড় করে আনতে পারলেও তা এত দিন আসামকে দিলে ভারত নিজেই স্বস্তি অনুভব করবে না বলে মনে করে, এ জন্য মূলত এত দিন জোগাড় করেনি। ভারতের ভয় হয়, বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এমন করিডোর দেয়া যাবে না, যা আসামের সীমান্তের অপর পারের চীনা ভুখন্ড এই অঞ্চলও ঐ প্রাপ্ত ব্যবহার করতে চেয়ে বসতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ করিডোর কেবল ভারতের ব্যবহারের জন্য এক্সক্লুসিভ নয়, একই সাথে তা চীনকেও ব্যবহার করার অফার ও সুযোগ দিতে চাইতে পারে। সম্ভাব্য সে ক্ষেত্রে চীনের ভারত-সীমান্তের লাগোয়া ঐ চীনা অঞ্চলের জন্য চীনও ভারতের কাছেও করিডোর চেয়ে বসতে পারে। আর তাতে চীন  ভারতের নর্থ-ইস্টের ওপর দিয়ে পাওয়া হবু করিডোর পার হয়ে, এরপর একইভাবে বাংলাদেশের করিডোর (যা ভারতেরও পাওয়া একই করিডোর ফ্যাসিলিটি হবে) পার হয়ে বঙ্গোপসাগরে যেতে চাইবে বা বন্দর ব্যবহার করতে চাইবে। এটাই ভারত একেবারেই  চায় না। এটা ভারত অনেকবার প্রকাশ করে জানিয়েছে। কারণ ভারতের ভয় হল এতে আসাম আগামিতে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এ জন্য ভারতের চাওয়া বাংলাদেশ ভারতকে একা করিডোর দেবে, এক্সক্লুসিভ।

তবে ইতোমধ্যে গত ১০ বছরে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশ পর্যন্ত কোন এক্সক্লুসিভ করিডোর দিতে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নাই – সেটি বিদ্যুৎ এর খুঁটি, মাটির নিচের জ্বালানি তেলের পাইপলাইন, রেল ও সড়ক অবকাঠামো যোগাযোগ, নাব্য নদীপথ ও বন্দর, সরাসরি দু-দু’টি সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া, সরাসরি কলকাতা পর্যন্ত বাস যোগাযোগ ইত্যাদি প্রায় সব ক্ষেত্রে। আর সবই এক্সক্লুসিভ, কেবল ভারত ব্যবহার করবে। এক কথায় এটা কোনো আঞ্চলিক করিডোর নয়, যা অঞ্চলের সবাই বাণিজ্যিক ব্যবহার করবে এমন নয়। এমনকি ভাইসভারসাও নয়। যে বিনিময়ে আমরা ভারত পেরিয়ে আমরা নেপাল বা ভুটানে যেতে পারব বা নেপাল-ভুটান বাংলাদেশে আসতে পারবে। আবার অবকাঠামো করিডোর সুবিধাগুলো- বিনিয়োগ ও পরিচালনার খরচের কী হবে তা অনিশ্চিত। আর নয়তো খুবই নামকাওয়াস্তে অর্থের বিনিময়ে। এই প্রসঙ্গে আনন্দবাজারে ছাপা হওয়া আজকের আহ্লাদিত রিপোর্টের দুটা লাইন এরকম – “সম্প্রতি ভারতের অনুরোধে ঢাকা তাদের দেশের ভিতর দিয়ে অসম-ত্রিপুরায় পণ্য পরিবহণের জন্য ‘ফি’ এক ধাক্কায় টন প্রতি ১০৫৪ টাকা থেকে কমিয়ে করেছে ১৯২ টাকায়“। এই ভাষ্যগুলো আমার লেখা একেবারেই না। খোদ আনন্দবাজারেরই খুশি আর আহ্লাদে লেখা ভাষ্য।

স্পষ্ট কথা স্পষ্ট বলা ও বুঝাবার সময় এটাঃ
এক কথায় বললে তাই, আর নয়; আমাদের এখন স্পষ্ট কথা স্পষ্ট বলা ও বুঝাবার সময়  এসেছে। করিডোর বাণিজ্যিক জিনিষ তাই এখানে প্রেমের একান্ত উপহার দেয়ানেয়া ভাবা বা চালানো চলতে পারে না। এটা কাজ করবে না, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ আছে – এটা আমরা উপেক্ষা করতে পারবই না। আমরা সাধু-সন্ন্যাসি হয়ে গেলেও পারবে না। কারণ সন্ন্যাসিদেরও খেতে হয়, খাবার যোগাড় করতে হয়। করিডোরের অবকাঠামো বিনিয়োগ পরিচালনার খরচ তাহলে কে বইবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি? কেন? কার কোন আবদারে?

ভারতের স্বার্থ যাই থাক, বাংলাদেশের জেনুইন স্বার্থের দিক থেকে বিচারে সে একমাত্র ভায়াবলভাবে করিডোর খুলতে পারে প্রথমত ও একমাত্র কেবল রিজিওনাল বা আঞ্চলিক করিডোর হিসাবে। এক্সক্লুসিভ করিডোর এই আত্মঘাতি চিন্তার প্রশ্নই আসে না। ব্যাপারটা রাষ্ট্রস্বার্থ তাই এটা আমাদের কারও ব্যক্তিগত মামা-খালা বা স্বামীস্ত্রীর ব্যাপার কখনই নয়, হতেই পারে না।  এছাড়া মৌলিক ও সম্ভাব্য কিছু শর্তের দিকে যেখানে খেয়াল রাখতেই হবেঃ;

যেমন করিডোরে দেয়ার চিন্তাটা করতে হবেঃ ১. কাউকেই আগাম কেউ দেশপ্রেমিক নয় বলে প্রচারে যাওয়া এই ঝগড়াটা কাউন্টার প্রডাকটিভ হবে। এরচেয়ে বরং পজিটিভ এপ্রোচে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ও দেশের স্বার্থগুলো নিয়ে কথাবলা ও চর্চা করতে হবে। এতে জনস্বার্থ ও দেশের স্বার্থবিরোধী চিন্তাগুলোকে সহজেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারব।  ২. করিডোর দেয়া হবে একমাত্র  আঞ্চলিকভাবে তবে সেই সাথে (নিরাপত্তার বিষয়টাসহ) তা বাংলাদেশের নিজ রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত।  ৩. অবশ্যই কেবল বাণিজ্যিকভাবে অর্থাৎ কোন রাষ্ট্রের (স্পষ্ট করেই বলা দেয়া ভাল,  চীন অথবা ভারতের তো নয়ই এমনকি আমেরিকারও নয়) কৌশলগত বা অন্য কোন স্বার্থ  বিবেচনার দায় আমরা না নিয়ে। গত বিশবছরে শ্রীলঙ্কাকে আমরা দেখছি যেমন প্রায়ই সে ‘ভাগের বউ’ হয়ে যাচ্ছে, কখনও এর কখনও ওর। এমন বাংলাদেশ যদি আমরা  এমন দুরবস্থায় না দেখতে চাই তাহলে এটাই আমাদের জন্য একমাত্র পথ, আগাম সাবধান হবার সম্ভবত শেষ সুযোগ। ৪. করিডোর অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও পরিচালনা আমাদের কর্তৃত্বে হতে হবে অবশ্যই, তবে পারস্পরিক স্বার্থ বুঝে পেলে পোষালে যে কেউ থেকে সহযোগিতা নেয়া যাবে। ৫. আঞ্চলিক করিডোর ব্যবহারকারী রাষ্ট্র সবাইকেই পরস্পরকে নিজ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে অন্যকে বাণিজ্যিক করিডোর দিতে নীতিগতভাবে রাজি থাকতে হবে। ৬. বাংলাদেশের আঞ্চলিক করিডোরে আরও অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা বাংলাদেশই নিবে। ব্যবহারকারিরা তাদের ব্যবহারের স্বার্থের দিক থেকে পরামর্শ অবশ্যই রাখবে। টেকনিক্যাল ও রাজনৈতিক কনসালটেটিভ কমিটিতে ব্যবহারকারিরা তাদের স্বার্থ ও পরামর্শের কথা যেন জানাতে পারে সেব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই একা চুড়ান্ত করবে। আর তা দিবার নীতিগত দিক হবে – তা দেবে শতভাগ বাণিজ্যিকভাবে এবং কেবল বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য এবং এক্সক্লুসিভ বাংলাদেশের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে সাজানো নিরাপত্তা- নিশ্চয়তাসহ সব সার্ভিস দেয়া হবে। আর অবশ্যই কোন অবকাঠামো ফেসিলিটি  এই সার্ভিস কোন সামরিক স্বার্থে ও উদ্দেশ্যে কোনো রাষ্ট্রকে দেয়াই হবে না, ব্যবহারকারি সকলকেই এর আগাম নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্রুতি দেয়া থাকবে আর তা কঠোরভাবে মেনটেন করতে হবে। ইত্যাদি।

ভারতের প্রণব মুখার্জি তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে অনেক বছর ভারতের অর্থ বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল। তিনি ২০০৯ সালের দিকে বলতেন, “ভারতকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিকভাবে করিডোর দেয়ার কথা ভাবতে হবে”। বলাই বাহুল্য, ভারত নিজেই এখন সে জায়গায় নেই।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, বাণিজ্যিক করিডোর সুবিধাকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ভায়াবল করতে গেলে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার, মানে এর আঞ্চলিক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। এ দিকটি গুরুত্বপূর্ণ, না হলে কোনো করিডোর ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে টিকতে পারবে না। ফি’ এক ধাক্কায় টন প্রতি ১০৫৪ টাকা থেকে কমিয়ে করেছে ১৯২ টাকায় – এটা কোন বুদ্ধিমান গ্রহিতা বা দাতার ব্যবস্থা হতেই পারে না। কোন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কী একপক্ষীয় লাগাতর লোকসানে চলতে পারে? এই ব্যবস্থা ডুবতে আর অকার্যকর হয়ে ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। একথাটাই প্রমাণ যে দাতা ও গ্রহিতা এখানে কোন লেবেলের নাদান। কোন বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয় এভাবে চলতে ও টিকতেই পারে না। বাংলাদেশের সরকার চাইলেও এর খরচ একা ভার বয়ে বা ভর্তুকি দিয়ে এটা চালাতেই পারব না।  আর একাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ যদি দেউলিয়া হয়ে যায়, স্বভাবতই তাতে করিডোর সুবিধা যদি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় এতে ভারতেরও ক্ষতি কোন অংশে কম হবে না। আর তাতে আসাম আবার ১৯৫১ সালের সময়ের অবস্থায়, প্যাভেলিয়নে ফিরে যাবে। রাষ্ট্র চালানো যা আসলে এখানে আঞ্চলিক রাষ্ট্রস্বার্থ পরিচালনা – এগুলো নিম্ন মধ্যবিত্ত এর সংসার চালানো নয়। কাজেই ১০৫৪ টাকা থেকে কমিয়ে করেছে ১৯২ টাকায় – এটাতে ভারতের মেলা লাভ হয়েছে এভাবে ব্যপারটাকে দেখা এটা মারাত্মক পেটি-মধ্যবিত্তের চিন্তা। ফি দেয়াকে কম বা না দেয়ার অবস্থায় নিলে এই করিডোর সার্ভিসটাই বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। কারণ বাংলাদেশে একবার করিডোর চালু হয়ে গেলে আসামে বিপুল বিনিয়োগ (রাষ্ট্রীয় ও প্রাইভেট ) আসা ও ঢেলে দেয়া শুরু হয়ে যাবে। এখন বাংলাদেশকে ফি না দেওয়াতে যদি করিডোর সার্ভিস হঠাত বন্ধ হয়ে যায় তাতে ভারতের এই বিনিয়োগগুলো অবশ্যই পথে বসবে – সে ক্ষতি বাংলাদেশের নিজস্ব যা হবে তা তো হবেই; কিন্তু ক্ষতি ভারতের যা হবে সেটাও কী বাংলাদেশের হবে? ভারতে বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী থাকলে তারা এটা আগেই ধরতে পারবে। এতে ভারতের কোন লাভটা হাসিল হবে – এদিকটা চিন্তা করার ক্ষমতা মারাত্মক ক্ষতিকর আত্মধবংসী পেটি-মধ্যবিত্তের থাকে না। আনন্দবাজার সেই মারাত্মক পেটি-মধ্যবিত্ত লেবেলর চিন্তাকারিদের পত্রিকা।

যে রাষ্ট্র কোন প্রকল্পে কোনটা নিজের আসল অর্থনৈতিক স্বার্থ বা এমন বিবেচনাগুলো আমল করতেই অক্ষম সে নিজে ডুবে যাবেই, পড়শি রাষ্ট্রকেও ডুবাবে।

কিছু উপসংহারঃ
আসামসহ পুরো নর্থ-ইস্টকেই বাংলাদেশের করিডোর সুবিধার অনেক কিছুই দেয়া শুরু হয়ে গেছে। এতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু কী দেখা হয়েছে, কিংবা হয়নি এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা-সমালোচনা তোলার বিরাট দিক আছে। সেটি যাই হোক, কিন্তু বাস্তবতা হল – করিডোর সুবিধা দেয়া হয়ে গেছে। এর সরল অর্থ আসামের মূল সমস্যার সমাধানকেই আমলে নিয়ে তা সরাসরি সমাধান করা শুরু হয়েছে বলা যায়। আর  সেখানেই বাংলাদেশ এক বিরাট সহযোগিতা দাতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। অথচ এদিকটা এই গুরুত্বপুর্ণ দাতা তাকে এখনও  বিপ্লবী অসমীয় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমীরা সহ সারা নর্থ-ইস্ট এখনও চিনতেই  পারে নাই। গুরুত্বটাই বুঝতে পারে নাই। তাই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু  কী দিয়ে তা বুঝা গেল?

বহু পুরানা দিন থেকে – মুসলমান অনুপ্রবেশকারী, উইপোকা, তেলাপোকা এসব বলা অমিত শাহ এন্ড গং এরা করে চলে আসছে। আমরা বুঝি ও জানি মুসলমান অনুপ্রবেশকারী, উইপোকা, তেলাপোকা এসব বলে ধর্মীয় পোলারাইজেশন করা বিজেপির নির্বাচনী রাজনীতি। যার সোজা মানে হল সারা অসমীয় জনগোষ্ঠি অমিত শাহের এই ঘিনঘিনে ঘৃণার বক্তব্য খুবই স্বাদ করেছে খেয়েছে। মজা পেয়েছে। খুব ভাল লেগেছে তাদের – কেমন ভাল লেগেছে এর প্রমাণ হল গত ২০১৬ সালে তারা বিজেপিকে প্রথম আসামে ক্ষমতায় এনেছে, সে সরকার গেড়ে বসেছে।

অর্থাৎ প্রতিটা অসমীয় মানুষের কোর-স্বার্থের সমাধান-দাতা হল বাংলাদেশ।  কিন্তু সারা আসামসহ ভারতে বাংলাদেশের মুসলমানেরা হল উল্টা আসামি। কারণ তাদের অপরাধ তারা মুসলমানপ্রধান।  নৃশংস অমিত শাহ এই তেলাপোকা পিষে মারার প্রচার করে চলেছে। আবারও করবে সেই হুমকিও দেয়া শুরু করেছে। কারণ ২০২১ সালে আবার আসাম নির্বাচন। এর সোজা অর্থ ভারত বাংলাদেশ থেকে করিডোর নেওয়ার ও পাবার জন্য যোগ্য পার্টনারই নয়।

কাজেই আমাদের দিক থেকে কথাটা হল,  আসামের মৌলিক সমস্যার দিকটি স্বীকার না করে এত দিন বিদেশী, মুসলমান, তেলাপোকা, উইপোকা ইত্যাদি বলে যে কৃত্রিম কারণ দেখিয়ে চলেছিল তা একেবারেও অগ্রহণযোগ্যই শুধু নয়, বরং প্রমাণই হয়েছে যে
মুসলমান অনুপ্রবেশকারী, উইপোকা, তেলাপোকা ইত্যাদি বলে যারা ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে দমকে দমকে তারাই সব সমস্যার মূল। তাহলে এখন এটা স্পষ্ট ভারতকে যদি আসামের জন্য বাংলাদেশ থেকে যে শর্তেই করিডোর নিতে চাইতে হয় তবে মুসলমানবিদ্বেষ সমুলে ছাড়তে হবে, বার বার এনআরসির নামে  নখরা তাকে সবার আগে বন্ধ করতে হবে।

অথচ বিজেপির ক্রমাগত সারা ভারত জুড়ে মুসলমানবিদ্বেষের দামামা বাজিয়েই চলেছে। ভারত কী নিজের স্বার্থেই এমন কিছুই করতে বা বলতে পারে না, যার ঢেউ বা আঁচ বাংলাদেশে এসে পড়ে বা আমরা শঙ্কিত হই অথবা সীমান্তে মানুষের ঢল নামে অথবা ঢল নামে কি না সে শঙ্কা তৈরি হয়।  আল্লাহ ভারতকে অন্তত কিছু জ্ঞানবুদ্ধি ওয়ালা মানুষ দেক এমন সকল নাগরিককে বিশেষত আসামের কে নিজ স্বার্থের কথা ভাবতে যোগ্যতা দেক, দোয়া করি।

ভারত ও আসামকে তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়? করিডোর পাওয়ার আগ্রহ থাকলে এনআরসির অছিলায় কোনো নির্বাচনী নুইসেন্স, মুসলমানবিদ্বেষ বিজেপির বন্ধ করতেই হবে। করিডোর পেতে চাইলে উপযুক্ত যোগ্য ও দায়ীত্ববান পার্টনার হতে হবে।

আসাম ঠিক কী চায় সে এনআরসির নামে মুসলমান খেদানোর চেষ্টার মত্ত উন্মাদ হবে নাকি দায়ীত্ববান হিসাবে বাংলাদেশ থেক পোর্ট-করিডোর নিতে চায় – কোনটা সে চায় এটা স্পষ্ট করে বলতেই হবে।  ঘটনা কিন্তু ইতোমধ্যেই করিডোর বাস্তবায়ন করতে অক্ষম হয়ে পড়বে, এই সুবিধা ব্লক হয়ে যাবে এঅবস্থার সেদিক মোড় নেয়া শুরু করেছে, যেটা বাংলাদেশের সরকার চাইলেও ঠেকাতে পারবে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ২৩ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আসাম এনআরসি করবে না পোর্ট-করিডোর নেবে?এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]