ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

গৌতম দাস

২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2vW

 

 

এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

গৌতম দাস

০৭ জুন ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2fX

 

চীন ২০১৪ সাল থেকে এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছিল। এআইআইবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য, তবে চীনা নেতৃত্বের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক। গত ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়ে এটা কর্মতৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। এর সেই প্রস্তুতিকালে আমেরিকা তার প্রভাবাধীন এশিয়ার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যেন এই ব্যাংকে যোগ না দেয় তা নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে যে আপত্তি সে তুলেছিল, তা মনে রাখার মতো। বলেছিল, আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়তে গিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে যে স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা সংগঠনে জন্ম দিয়েছে, তার সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চীন ব্যর্থ হবে বলেই আমেরিকা উদ্বিগ্ন। আর এই ‘কথা’ আমেরিকা তার এশিয়ান পার্টনার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জানিয়েছিল- যেটাকে আমেরিকার নেতিবাচক প্রচারণা বলা হয়েছিল সে সময়। চীনের এআইআইবি ব্যাংকের উত্থান এই প্রচারণা দিয়ে আটকে দেয়া যায়নি। বরং শুরু থেকেই এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টাকে তারা ইতিবাচকভাবে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। আজ ৭৭ রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দান হাসিল করে এআইআইবি নিজ মহিমায় নিজের তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এখানকার মূল প্রসঙ্গ হল – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি।
গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানেও একই কথা উঠেছিল। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের, যেখানে ৬৮ রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হবে। ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের যৌথ ঘোষণার এক অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউরোপের নেতা রাষ্ট্রগুলো যেমন জর্মান, ফরাসি এরা। তাদের সার কথা হল, অর্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কালে ওর মান, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি কী হবে? শেষ মুহূর্তে আমেরিকা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ- এদের প্রধান নির্বাহী এবং প্রায় ৩০টি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এতে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।
এখানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার স্ট্যান্ডার্ড কথাটা ভেঙে বললে দাঁড়ায়, বড় অর্থ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে যে কথা বলছি আমরা, এর মালিক কিন্তু হবে আলাদা আলাদা এক একটা খোদ রাষ্ট্র মানে সে দেশের জনগণ। পাবলিক মানি, পাবলিক এসেট বা সম্পদ। ফলে প্রকল্পের মোট খরচ কত, তা ন্যায্য কিনা, প্রকল্পের খরচ অনুমোদনের পর তা কৌশলে দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ করে নেয়া হয়েছে কিনা, কাজের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আদৌ ছিল কিনা, প্রকল্পে দুর্নীতিরোধের কোনো ‘সেলফ চেক’ ব্যবস্থা ছিল কিনা- এ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ামাত্র তো বটেই, না চাইলেও জনগণের দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, ‘পরিবেশ ধ্বংস করা কোনো উপাদান এই প্রকল্পে নাই’, এমন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশী পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল কিনা, কাজ প্রদানে সবস্তরে স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি পাবলিক মানি নাড়াচাড়া সংক্রান্ত  গুরুত্বপুর্ণ  সব কিছুকে বুঝানো হয়েছে।

দুইঃ
বিগত প্রায় পাঁচ শ’ বছরের বিশ্ব বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থাকে মোটা দাগে তিনটি স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে একটা ল্যান্ড মার্ক ধরে বলা যায়, এর আগের যুগ ছিল প্রথম পর্যায় – কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম। মানে আমাদের মতো দেশগুলোকে উপনিবেশীপন্থায় দখল করে কলোনি মালিক সাম্রাজ্যগুলা এক  গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছিল যাকে এখানে আমরা ‘কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম’ বলে নামকরণ করছি । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে যায়, আর কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম, সেটাতে কোন কেন্দ্র বা কোন গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা ছিল না। অর্থাৎ সেটা কোনো গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। যে অর্থে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন ব্যবস্থাটা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীন করে সাজানো।
আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই; টানা ২২ দিন ধরে আমেরিকার হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে ৭৩০ ডেলিগেটের সভা ও তর্ক-বিতর্ক নিগোশিয়েশনের ভেতর দিয়ে । তাই এদের ব্রেটনউড প্রতিষ্ঠানও বলে অনেকে। এখানে প্রথম পর্যায়ের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের পরের দ্বিতীয় পর্যায়কে ব্রেটনউড সিস্টেমের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বলে চেনাব, সংক্ষেপে ব্রেটনউড সিস্টেম বলব।

তাই বলা যায়, কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এ ধরনের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমনকি ‘কলোনি মাস্টার’ যেমন খোদ ব্রিটিশ রাষ্ট্রও খুব নিয়ন্ত্রণ করত না। বরং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ট্রেডিং বা মেরিটাইম কোম্পানি, এদের নেতৃত্বে কর্তৃত্ব প্রভাবে  ম্যানুফ্যাকচারিং-সহ বাকি সব কোম্পানির এক সমাহার ছিল; রাষ্ট্র সেখানে ঠিক নিয়ন্ত্রক নয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো বোঝা যাবে, যদি মনে রাখি একালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) ধারণাটা। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ব্রেটনউড সিস্টেমের সাথে আনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাটা।  ব্রেটনউড সিস্টেমের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। মানে রাষ্ট্র মোটা দাগে আগাম কিছু ষ্টাটুটারি আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়ে থাকে, আর সেগুলোর অধীনে ও সীমার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বশাসিত। সেই আইনি সীমার মধ্যে এই ব্যাংক স্বশাসিতই শুধু নয়, রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপর অন্য সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মতৎপরতার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সে। ব্যাংক ব্যবসা করার নীতি ঘোষণা করা, মনিটরিং এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশ দেয়ার প্রতিষ্ঠান এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে সরকারের মুদ্রানীতি, ফিসক্যাল (অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা) নীতি হাজির করা ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিষ্ঠানও এটা। মুদ্রা ছাপানোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে এত কিছুর পরও এগুলো সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা। এসবের বাইরে আইএমএফের নির্দেশ পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বলা হয় আইএমএফের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়ে থাকে যেন আইএমএফের ডানা বা এক্সটেন্ডেড উইং। ফলে পুরা দুনিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে আইএমএফ।  কোনো রাষ্ট্রের আইএমএফের সদস্যপদ পাওয়ার পূর্বশর্ত হল, ওই রাষ্ট্রের এর আগে একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে হবে। তাই বেশির ভাগ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্ম ১৯৪০ এর দশকে। ব্যতিক্রম কোথাও যদি থাকে তবে তা ভিন্ন কারণে। যেমন আমেরিকার ফেড বা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আমেরিকার উদীয়মান ও বিকাশমান সব রাজ্যে আগে আলাদা স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্যের ব্যাংক ভিন রাজ্যে ব্যবসা ততপরতা করতে পারত না। আবার একই রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন ছাপা নোট ছিল। পরে (মানে অনুমান করি প্রতিটা রাজ্য নিজের পুঁজির স্ফীতিতে উপচে পড়লে বা স্যাচুরেটেড হয়ে গেলে অথবা বড় বড় প্রকল্পে এক সাথে বিনিয়োগের প্রয়োজনে) সব রাজ্য ব্যবস্থাগুলোর সমন্বয়ে এক অভিন্ন, ফেডারেল ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য (যেমন কমন কারেন্সি চালুর জন্য) ১৯১৩ সালে ফেডের জন্ম হয়েছিল। ওদিকে বৃটেনে তাকাই, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সাল থেকেই ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন ব্যাংক। কিন্তু এই ব্যাংকই ব্রিটিশ সরকারের আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট ধারণকারী ব্যাংক। একটা বড় করপোরেশনের মতোই ব্রিটিশ সরকার তার একটা ক্লায়েন্ট। আবার সরকারের অনুমতিধারী একমাত্র মুদ্রা ছাপানোর ব্যাংক এটাই। এভাবেই প্রাইভেট ব্যাংক হিসেবে চলার প্রায় তিনশ বছর পর ১৯৪৬ সালে এই ব্যাংকের জাতীয়করণ হয়, আর ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ সম্পর্কে এত বিস্তারে বলছি আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এই ব্যাংক ছিল না, ফলে তুলনামূলক বিচার করে বুঝবার জন্য। এখন কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ ছিল না, একথার আর এক অর্থ  হল, মানে রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। এই অর্থে বলা যায়, ওই ক্যাপিটালিজম ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের হাতে নিয়ন্ত্রিত হত। এ ছাড়া অনেকেই জানেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার – এটাও প্রাইভেট ব্যাংক বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিদিন ঠিক করে দিত। এ কাজের একচেটিয়া কারবারি, ‘রথশিল্ড ব্যাংকিং পরিবারের’ কথা অনেকেই জানেন। আমাদের অনেকের ধারণা, স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সরকার ছাড়া হয় না, হবে না। এই ধারণাটা বাস্তব নয়। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগে স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল বেসরকারিভাবে, ব্যবসায়ীদের সমিতি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে এবং একটা স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতার মান নিশ্চিত করে। তবে সেকালে এক বিরাট বাড়তি সুবিধা ছিল। তা হল কোন কাগুজে মুদ্রা মানেই তা ছিল ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’। মানে ঐ কাগুজে মুদ্রার সমমানের সোনা ব্যাঙ্কে আগে গচ্ছিত (রিজার্ভ) রেখে তবেই মুদ্রা ছাপানো হয়েছে। ফলে কাগুজে নোট যার হাতে আছে সে ব্যাংকে গিয়ে “চাহিবা মাত্র” ঐ সমতুল্য রক্ষিত সোনা ব্যাংক নোট হোল্ডারকে পরিশোধ করে দিত। এর কারণে প্রতিদিন আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ সহজ ছিল। পরে ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মুদ্রাই আর  ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’ নয়।
কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগ শেষে তা ভেঙে কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা- এই প্রথম এমন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা যেখানে তা এক গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতার (আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের) অধীনে গড়া ও নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থা। আগেই বলেছি এটা পরিচালিত হয় সব সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – আইএমএফের এই ‘ডানা’গুলোর মাধ্যমে। এই অর্থে ‘পড়ে পাওয়া’ সুবিধা হল রাষ্ট্র এরপর থেকে ব্যাংক ব্যবসার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের যুগের সূচনা করেছিল।

আমেরিকাসহ ইউরোপ আজ স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা তুলছে। তা ব্রেটনউড সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানে আসতে সময় লেগেছিল ৫৬ বছর, ২০০১ সালে। অর্থাৎ মাত্র চলতি শতকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে (স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তদারকি নিশ্চিত করতে) শক্তিশালী ও স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ  চালু করা হয়েছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আলাদা এই বিভাগ সরাসরি কেবল বোর্ডের কাছে রিপোর্ট ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কোনো কান্ট্রি অফিসকে কিছু না জানিয়েই সে তার কাজ করতে পারে। তবে এসব কথা শুনে এই বিভাগ বা বিশ্বব্যাংককে ‘সততার দেবতা’ মনে করার কোনো কারণ নেই, তা ভুল হবে। রক্ত মাংসের ও স্বার্থের এই দুনিয়ায় মানুষ যে মানের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেখাতে পেরেছে এর এক নমুনা বলা যায় এই বিভাগকে। তবে এরও আগে আর একটা কথা বলা দরকার। বিশ্বব্যাংকের কাজ দেয়ার টেন্ডার পদ্ধতি খারাপ নয়, এটা বলতেই হবে। এই অর্থে যে, কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে ফান্ডদাতা হয় যে দেশের সরকার; ধরা যাক, একটা প্রকল্পে এর অর্ধেকের বেশি ফান্ড জাপান সরকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রকল্প নির্মাণের কাজ জাপানের কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পায়নি। মানে কেউ ফান্ডদাতা হলে কাজ তাকেই দিতে হবে, এমন কোন কথা নেই। টেন্ডার আলাদা স্বাধীন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা আছে। টেন্ডারে ঠিক হবে কে কাজ পাবে। যেমন যমুনা সেতুতে নদীশাসন কাজ পেয়েছিল নেদারল্যান্ড, দুই কানেকটিং রোড আর মূল ব্রিজ নির্মাণকাজ পেয়েছিল দুই কোরিয়ান কোম্পানি, আর কন্সালটেন্সি পেয়েছিল এক ব্রিটিশ কোম্পানি। তবে আবার বলে রাখি, টেন্ডার ব্যবস্থা চালু করতে পারার জন্য অথবা বিশ্বব্যাংকের ভেতরের প্রসেসিংয়ের তুলনামূলক স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য তারা একেবারে ‘আদর্শের অবতার’, এমন বলা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার যমুনা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতিই ছিল না, এমন অ্যাবসলিউট কোনো কথা বলা হচ্ছে না। তবে অন্তত তুলনামূলক অর্থে ফান্ডদাতা আর কাজ পাওয়াকে আলাদা করে ফেলতে পারা কম অগ্রগতি নয়। আর বিশ্বব্যাংক এটা ২০০১ সালে ইন্টিগ্রিটি বিভাগ খোলার আগেই চালু করতে পেরেছিল। আবার বিশ্বব্যাংকের বদনামের শেষ নাই। ফলে এটাও বলে রাখা ভাল, অর্থের অপচয় আর দুর্নীতির (মানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব) দিক থেকে সত্তরের দশকের বিশ্বব্যাংক ছিল সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেটনউডস সিস্টেম এতটুকু পেরেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হিসাবে খারাপ নয়।

পাঁচ শ’ বছরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়কে  মোটা দাগে চিহ্নিত করে তা চলতি শতক থেকে শুরু তা বলা যায়। আমেরিকার জায়গায় চীনের নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা আজ আর কোন অনুমান করে যা মনে চায় বলা এমন বিষয় নয়। খোদ আমেরিকার সরকারি স্টাডি ও নানা গবেষণাতেও এর স্বীকৃতি আছে। ব্রেটনউডস সিস্টেম বা দ্বিতীয় পর্যায়টা কায়েম হতে, একটা ওলটপালটের ভিতর দিয়ে তা আসতে একটা বিশ্বযুদ্ধের দরকার হয়েছিল। তাই তৃতীয় পর্যায়ে যেতেও একটা বিশ্বযুদ্ধ দরকার, অনেকে অনুমানে এমন কথা বলে থাকেন। কিন্তু এখনো তা স্পষ্ট হয়ে যায়নি। সর্বশেষ আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান; আর হম্বিতম্বিকে চীনের দিক থেকে একে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা এবং আমেরিকার জন্য জায়গা (বাজার, কাজে ছাড় দেয়া) করে দেয়া কোন টেনশন বা যুদ্ধের শঙ্কাকে আপাতত নাকচ করেছে।

কিন্তু এই লেখার মূল প্রশ্ন, একালে তৃতীয় পর্যায়ে, চীনের তৈরি গ্লোবাল প্রভাব নিয়ে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- এআইআইবি, ব্রিক ব্যাংক, আরআইবি ইত্যাদির স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান কী হবে? এক কথায় বললে গ্লোবাল ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়ের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হতে গেলে এগুলোকে অবশ্যই ব্রেটন উডস সিস্টেমের চেয়েও ভাল, মানে যেমন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও আরও ভাল মান দেখাতেই হবে। তবে এ কথা ঠিক, চীনের উত্থানে রেষারেষি প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের স্বার্থটাকে মাখিয়ে তারা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার কথাটা উপস্থাপন করেছে। তাই আমেরিকা বা ইউরোপের স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গ তুলে চীনকে যে অর্থে খোটা দিচ্ছে, নিজের প্রভাবকে বাড়িয়ে নিবার চেষ্টা করছ এর মধ্যে আমাদের মতো দেশের লাভ নেই। আমাদের স্বার্থ আমাদেরকে ভাবতে হবে। যেমন বাংলাদেশের সাথে চীনের রেল-রোড উদ্যোগসহ সব অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের স্বার্থে তা খুবই দরকারি ও নির্ধারক। কিন্তু লক্ষণীয় যে, আমরা এখন টেন্ডার আহ্বানবিহীন সরকার, আর যেকোনো প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে ছয় গুণ ব্যয় বাড়ানোর সরকারে পরিণত হয়েছি। এই বিষয়টা  বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বাদ রেখে বললেও এটা চীনের জন্য বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান- এই বিচারে খুবই খারাপ উদাহরণ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার দিক থেকে এই ব্যবস্থা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এদিকটায় চীনেরও অবশ্যই  মনোযোগ দিতেই হবে। যদিও চীনের হয়ত পাল্টা বলার বিষয় হবে যে, বাংলাদেশের জনগণ যদি একটি অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালো না হওয়া পর্যন্ত চীন হাতগুটিয়ে বসে থাকলে এর সুবিধা চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীরাই নেবে। তবুও এটা ভালো যুক্তি নয়। কারণ এর চেয়েও দুর্নীতিবাজ সরকারের সাথে গত চল্লিশ বছর ধরে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে কাজ করতে হয়েছে। তার পরও তাদের অর্জন খারাপ নয়। আমাদের মতো দেশে সরকারের কার্যকারিতা যতটুকু, এর দক্ষতা যতটুকু, তা তো আপন কোনো রাজনৈতিক সরকারের কারণে হয়নি, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শর্ত দিয়ে তাদের বাধ্য করেছে বলা হয়েছে। যদিও শর্তের খারাপ দিক আছে, তা মেনেও এ কথা বলা যায়। যেমন শেখ মুজিবের আমলের রেশনব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে আগের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ঠিক রেশন নয়, তবে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে কার্যকর আনা আছে। চালের সরকারি মওজুদ আর আগের দরে বাজারে চাল ছেড়ে দিয়ে মুল্য নামানো – এটা খুবই কার্যকর ব্যবস্থা।
মোট কথা, আমরা ব্রেটনউডস সিস্টেমের যুগ পার হয়ে এসেছি- এ কথা চীনকে মনে রেখে আগাতে হবে। আমাদের নতুন আকাঙ্খা পূরণ না করে, আমাদের হতাশ করে চীনের তৃতীয় পর্যায় গড়ে তোলা বা এর নেতা হওয়া অসম্ভব। চীনই ফান্ডদাতা, আবার কোনো টেন্ডার সিস্টেম নেই, কাজ পাবে কেবল চীন– এই ‘জি টু জি’, লোকাল এজেন্টের নামে ঘুষের ব্যবস্থা, প্রকল্পের অর্থ ছয় গুণ বাড়িয়ে নেয়া- এসব অগ্রহণযোগ্য। খুবই খারাপ উদাহরণ। এটাই ‘অপারগ’ চীনের আপাতত স্বার্থ মনে করে চীন নিজ মনকে প্রবোধ দিতে পারে। কিন্তু সাবধান এর মূল্য একদিন চীনকে শোধ করতে হবে। এই একই ফর্মুলায় আমরা বেল্ট-রোড উদ্যোগে যুক্ত হতে না চাইলে না পারলে তা আত্মঘাতী – চীন ও বাংলাদেশের জন্যই।
গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে চীনকে অবশ্যই স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দিক থেকে উন্নত মানের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হাজির করতে পারতে হবে। এমন কাজের নীতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। কোন অজুহাত এখানে অচল এবং আত্মধবংশী।

ভারত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন যোগ দেয় নাই। সেই সিদ্ধান্ত ভারতের স্বার্থে ন্যায্য হয়েছে সেই সাফাই যোগাড়ে মোদি সরকার কাহিল। কারণ এটা ফাঁপা আত্মম্ভরি সিদ্ধান্ত ফলে আত্মঘাতি তা স্পষ্ট। চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে কেউ অভিমানে মাটিতে ভাত রেখে খায় না।  তাই ভারতও এই সুযোগে যেন  ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাবের কারণে যোগ দেয় নাই, এমন ইঙ্গিত দিয়ে নিজের লাজ ঢাকতে চাইছে। তা সে চাইতেই পারে কারণ কেই বা  বেকুবির লজ্জায় নিজেকে রাঙা দেখাতে চায়। তবে এটা ফ্যাক্টস যে সম্মেলনের আগে ভারতের দেখানো যোগ না দেবার কারণগুলোর মধ্যে ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাব বলে কোন কারণ তালিকায় ছিল না।  কাজেই ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’  কথা তুলে সে আড়ালে সুযোগ সন্ধানীও কম নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের মুদ্রার স্বীকৃতি

চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি
গৌতম দাস
০৮ ডিসেম্বর, ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-mF

 

আইএমএফের মালিক শেয়ারহোল্ডার রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি ২৪ সদস্যের নির্বাহী বোর্ড ৩০ অক্টোবরের সভায় চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে আইএমএফে রিজার্ভ জমা রাখার মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃত চারটি (ডলার,ইউরো,পাউন্ড ও ইয়েন) মুদ্রার পাশাপাশি পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংক্ষেপে বললে, দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন আগের টপ চারটি মুদ্রার মতোই চীনা মুদ্রা ইউয়ানকেও এবার আইএমএফ তার পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকার করেছে। এ স্বীকৃতির অর্থ কী? তাৎপর্যই বা কী, সেসব নিয়ে এখানে কথা বলব।

দেশের অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ্যে যেসব ধারণা আলোচনা হয় সেখানে পুঁজিতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বলে ভাসাভাসি কিছু ধারণা থাকলেও সে আলোচনা কখনও মুদ্রা পর্যন্ত যেতে দেখা যায় না। অর্থাৎ মুদ্রার কাজ বা ভূমিকা কী সে সম্পর্কে এর ভালো-মন্দ অলিগলি দিক সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা আরও কম। বলা হয়ে থাকে, কোনো জিনিসকে মুদ্রার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে গেলে ওর তিনটা গুণ থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ মুদ্রা মানে যার ঐ তিন বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এক. গ্রহণযোগ্যতা : অর্থাৎ যে কেউই ওই মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বেচতে রাজি। শুধু তাই না, পণ্য বেচে ওই মুদ্রা পেতে অথবা পাওয়া মুদ্রা দিয়ে অন্য পণ্য কিনতেও সবাই রাজি। সার কথায়, বিনা দ্বিধায় বাজারের যে কেউ ওই মুদ্রায় কিনতে ও বেচতে রাজি। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, লিকুইডিটি : এটাকে বলা যায় গ্রহণযোগ্যতার মাত্রার কমবেশি। যেমন ব্যাংকের চেকের চেয়ে নগদ মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। অর্থাৎ নগদ মুদ্রার লিকুইডিটি সব সময় অন্য যে কোনো ধরনের মুদ্রার চেয়ে বেশি। আবার একেবারে মফস্বলের হাটে ১ হাজার টাকার নগদ নোট দিয়ে সওদা নিতে চাইলে এত বড় নোটের খুচরা পাওয়া সহজ নয় বলে সেখানে ১০ থেকে ২০ টাকার নোটের গ্রহণযোগ্যতা ১ হাজার টাকার চেয়ে বেশি। এভাবে মুদ্রার এই দুই বৈশিষ্ট্যই আসল বৈশিষ্ট্য মনে করা হয়। কেন?
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য, মুদ্রার বদলে সোনা: ব্যাংকে গিয়ে মুদ্রার বদলে সোনা চাইলে তৎক্ষণাৎ তা পাওয়া যায় এমন হতে হবে। এ গুণটা এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। অর্থাৎ আগেকার দিনে যে কোনো ব্যাংক কাগুজে মুদ্রা ছাপার আগে সমমূল্যের সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে নিত। এখন তা আর করে না। বিশেষত আইএমএফের ১৯৪৪ সালে জন্মের সময়ের ম্যান্ডেট বা ঘোষণাপত্রে বদল এনে ১৯৭৩ সালে নতুন করে আইএমএফ গঠন করে নেয়ার পর থেকে কাগুজে মুদ্রার বদলে সোনা ফেরত দেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতাও উঠে গেছে। সারকথায় তাই, এখন মুদ্রা হতে গেলে প্রথম দুই বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট।
উপরের আলোচনায় সাধারণভাবে মুদ্রা নিয়ে কথা তুলা হয়েছে। কিন্তু ওই মুদ্রা কি কোনো একটা রাষ্ট্রের মুদ্রা নাকি একই সঙ্গে তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা, সেটা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। তাই এবার দেশি ও বিদেশি (আন্তর্জাতিক মুদ্রা) এভাবে মুদ্রাকে ভাগ করে, ভাগ মনে রেখে কিছু কথা। একালে দেশি মুদ্রা মানে কাগুজে মুদ্রা যা মূলত রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মুদ্রা। অর্থাৎ নিজ ভূখন্ডের বাইরে যে মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা নেই। বাংলায় বললে, চলে না। নিজ ভূখন্ডের মধ্যে দেশি মুদ্রায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য লেনদেনে একচেটিয়াভাবে চলতে পারে। অন্যভাবে বললে, শুধু নিজ মুদ্রার ওপর নিজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের) একক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের সীমানা পর্যন্ত কার্যকর ও বিস্তৃত থাকে। রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে হলে আর থাকে না। তাহলে সারকথা দাঁড়াল, প্রথমত মুদ্রা ছাড়া কোনো বাণিজ্য লেনদেন নেই, হবে না। আবার দেশি মুদ্রামাত্রই ওর ভূখন্ডগত সীমাবদ্ধতা থাকবে, নিজ রাষ্ট্র সীমানা পার হলেই ওই মুদ্রা অচল হয়ে যাবেই। তাহলে যেকোনো দুই রাষ্ট্র বাণিজ্য বিনিময় করবে কীভাবে, কোন মুদ্রায়? স্বভাবতই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য লেনদেন ঘটাতে চায় বলে সব রাষ্ট্রেরই বাকি সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তবে বেশি দিন আগের কথা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃত মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছিল মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আইএমএফ গঠন করার পেছনে ১৯৪৪ সালে প্রধান যেসব তাগিদ কাজ করেছিল তা হল, এর আগে অচল হয়ে ভেঙে পড়ে থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়কে নতুন করে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে এক সিস্টেম ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করা। এ আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এককথায় বললে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় চালু থাকার পূর্বশর্ত হল এক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা চালু থাকা। এটাই আইএমএফের মুখ্য কাজ। অবশ্য বলা বাহুল্য, আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব বড়লোক রাষ্ট্রের পক্ষে কান্নি মারা। কারণ আইএমএফের মালিকানা শেয়ার যে রাষ্ট্রের ভাগে সবচেয়ে বেশি আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বের ওপর প্রভাব তার সবচেয়ে বেশি। এই নিয়মে সাজানো আছে ও পরিচালিত হয় আইএমএফ। যেমন সর্বশেষ মালিকানা শেয়ার অনুসারে আমেরিকা (একাই ১৬ শতাংশ) ও ইউরোপে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ আর ছয়টা রাষ্ট্র মিলে ৪৩ শতাংশ মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে আছে। আমেরিকা আর ঘনিষ্ঠ ছয় রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশেষ করে গরিব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের ঐকমত্য রক্ষা করার এক ক্লাব সংগঠন আছে, যার নাম গ্রুপ অব সেভেন কান্ট্রিস, সংক্ষেপে ‘গ্রুপ সেভেন’ নামে; প্রতি বছর কমপক্ষে একবার ‘গ্রুপ সেভেন’ রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা বসে থাকে, এমন সম্মেলন তারা নিয়মিত করে থাকে। এ গ্রুপ সেভেন আইএমএফের মালিকানার ৪৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এ সাত রাষ্ট্রের মালিকানার বিপরীতে বাংলাদেশের মতো গরিব রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণত এক পার্সেন্টেরও অর্ধেক হয় বলে গ্রুপ সেভেনের পক্ষে ৪৩% মালিকানা দিয়ে পুরা আইএমএফকে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। কিন্তু তাই বলে আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য ‘আইএমএফ নিপাত যাক’ বলা সঠিক শ্লোগান হবে না। অথবা আইএমএফ আমাদের দরকার নেই সেটাও সঠিক কথা বা দাবি হবে না। কারণ আইএমএফ নিপাত যাওয়া বা নেই এর মানে আমাদের রাষ্ট্রের জন্যও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য ও পুঁজির বিনিময় লেনদেন এবং মুদ্রাও নাই হয়ে যাবে। অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ইত্যাদি আমাদের অবশ্যই দরকার। অর্থাৎ মূল পয়েন্ট হল, ব্যবস্থাটার নিপাত যাওয়া নয় বরং এটা আন ফেয়ার, অসাম্য এক ব্যবস্থা হয়ে আছে একদিকে কান্নি মারা হয়ে আছে। এর অবসান দরকার।
একালের একটা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার মালিকরা যেমন ওই ব্যাংকের পরিচালনার নিয়মকানুন সবটা নিজের ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে এবং দেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালিত হয়ে থাকে, হতে বাধ্য। তবে এ কর্তৃত্বের অধীনে থাকা মেনেও এরপর যতটুকু মালিকানার ইচ্ছা প্রয়োগের সুযোগ থাকে তা অবশ্য করা হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিক মানেই সে-ই মূল নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের অথরিটি নয়। কারণ ব্যাংকের মালিক আর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অথরিটি আলাদা আলাদা। অথচ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা ঠিক উল্টো। আইএমএফের মালিক রাষ্ট্রগুলোর এক বড় শেয়ার মালিকানা একটা মালিক-জোটের হাতে এবং ঐ জোটই আবার এর নিয়ন্ত্রণ অথরিটি এবং তা অনেক সরাসরি। এই সমস্যার রেডিকেল সমাধান দরকার। একথাটাকেই আরেক ভাষায় প্রায়ই হালকা সরল করে বলা হয় যে, আইএমএফের পরিচালনা সিদ্ধান্তে গরিব রাষ্ট্রের গলার স্বর আরও বেশি বা উঁচু করা দরকার। সারকথায় বললে, আইএমএফের ওপর কর্তৃত্বের চলতি কাঠামো এটা ভাঙা দরকার কিন্তু তা অবশ্যই এটা আবার ঢেলে সাজিয়ে গড়ার লক্ষ্যে। শুধু নিপাত যাক বলাটা সম্ভবত আগের বাক্যের ভেঙে আবার গড়া ধারণার সমার্থক নয়, তাই।
তাহলে দাঁড়াল, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের জন্য এক দরকারি প্রতিষ্ঠান। যদিও এর সংস্কারও দরকার। বিশেষত আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন, শ্রমের দক্ষতা বাড়ানোর দিক থেকে এর আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকেও এটা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব এসব অর্জনের পূর্বশর্ত এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা থাকা এটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা নেই তো বাণিজ্য বিনিময় নেই। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রার মান, যেটাকে আমরা অনেক সময় মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট বলি।
নিজের ঘোষণাপত্র অনুসারে আইএমএফের ম্যান্ডেটরি কাজ হচ্ছে মূলত দুইটি। বিভিন্ন সদস্য দেশের মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্য রাষ্ট্রের ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ এর দিকে নজর রাখা। কোনো রাষ্ট্রের বার্ষিক আমদানি-রফতানিতে আয়-ব্যয়ের চলতি হিসাবের খাতায় আয়ের তুলনায় ব্যয় সেটা ঘাটতি বা বাড়তির দিকে, এটাকেই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বলা হয়। সেদিকে নজর রাখা এবং সেক্ষেত্রে ঘাটতি হলে তা মোকাবিলার জন্য ওই রাষ্ট্রকে ধার ও পরামর্শ দেয়া ইত্যাদি। এখানে লক্ষণীয় যে, নিজ রাষ্ট্র অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি ফেলালে তবেই ধার নিতে হবে। আর ধার নেয়া মানেই সঙ্গের শর্ত-পরামর্শও শুনতে হবে। নইলে নয়। মানে ঘাটতি নেই তো উটকো পরামর্শও নেই।
আইএমএফ প্রসঙ্গে আর একটা মৌলিক দিক হল, আইএমএফের সদস্যপদ লাভ করতে চাইলে শুরুতেই চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। এটা ঠিক, চাঁদা বলতে যা বুঝি যে, প্রদেয় চাঁদার অর্থ জমা করার পরে তা প্রতিষ্ঠানের আয় বা সম্পত্তি হয়ে যায়। আইএমএফের বেলায় এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং আইএমএফ প্রতিষ্ঠানে সব সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামে একটা অ্যাকাউন্ট থাকে, প্রদেয় চাঁদা ওই নিজ অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এটা অনেকটা কোনো আমদানিকারকের মাল জেলায় জেলায় বেচার জন্য জেলা পরিবেশক হওয়ার মতই, যেন আমদানিকারকের কাছে আগে প্রদেয় ডিপোজিটেড বা জমা রাখা অর্থ। এর পরিমাণ কত তা ঠিক হবে বছরে কী পরিমাণ মালামাল নিয়ে বিক্রি করতে পারব এ আকারের অনুপাতে। এবং আগাম জমা রাখতে হবে এমন এক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। এরপর যা মালামাল তুলেছি প্রতি তিন মাস পরপর এর বকেয়া মূল্য পরিশোধ করে দিতে হয়। আইএমএফের সদস্য ফি আগাম জমা দেয়া অনেকটা এরকমই এক ব্যবস্থা। কিন্তু এর সুবিধা কী?
সুবিধা হলো, ওপরে যে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা চলতি হিসাবে ঘাটতি আয়-ব্যয়ের কথা বলছিলাম তেমন কোনো পরিস্থিতিতে ঘাটতি মেটাতে আইএমএফ ওই সদস্য রাষ্ট্রকে কতদূর ধার দেবে, তা হিসাব করা হয় এভাবে যে, আইএমএফে আমার রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থের ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

এই ফাঁকে একটা কথা বলার সুযোগ নেই।
আইএমএফের তহবিলে সব সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ হিসাব করা হয় অদ্ভুত নামের এক ভার্চুয়াল (নামে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই) মুদ্রায়। নামটা হল স্পেশাল ড্রয়িং রাইট বা এসডিআর। এজন্য আইএমএফের মুদ্রার নাম বলা হয় এসডিআর। এ মুদ্রার মান মানে, যেমন কয়টা বাংলাদেশী টাকা দিলে তা এক এসডিআরের সমান হবে, তা কীভাবে ঠিক হয়?
প্রতিদিন আইএমএফের ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় দেখা যাবে ওই দিনের এসডিআর রেট দেয়া আছে। যেমন আজ ৬ ডিসেম্বর এক এসডিআর = ০.৭২৯৯৮৮ ডলার। এ হিসাবে এক এসডিআর = ১০৮.৪০ টাকা। এখন প্রতিদিনের এসডিআর রেট এটা কীভাবে হিসাব করা হয় বা সাব্যস্ত করা হয়?
প্রতিদিনে টপ চারটা মুদ্রা আমেরিকান ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড আর জাপানি ইয়েন – এদের বিনিময় হার বাজারে কত ছিল তা থেকে এক গড় বিনিময় হার বের করা হয়। আর সেটাকে ডলারে প্রকাশ করলেই সেটাই ওই দিনের এসডিআর রেট। অর্থাৎ এখন ওই চারটা মুদ্রার গড় বিনিময় হারই ওই দিনের এসডিআর এর মান। আর এসডিআর মান বের করতে শুধু ওই চারটা মুদ্রাকেই বেছে নেয়ার কী কারণ? কারণ, দুনিয়াতে এখন যত ব্যবসা-বাণিজ্যিক লেনদেন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন শীর্ষ চার মুদ্রা ওগুলো তাই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনের মুদ্রা তালিকায় সবার উপরের চার মুদ্রাগুলো তাই। আর প্রতি পাঁচ বছর পরপর মূল্যায়ন করে দেখা হয় শীর্ষ চার মুদ্রা কারা ছিল? যেমন ২০০০, ২০০৫ ও ২০১০ এভাবে। এবারের ২০১৫ সালের মূল্যায়নে এবং গত ১০ বছরের মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছিল চীনের মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমেই বাড়ছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে এবারের আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড সভায় আইএমএফের টেকনিক্যাল কর্মীদের গণনা ফলের সুপারিশ এর পক্ষে শেয়ার মালিকানার নির্বাহী বোর্ড সায় দিয়েছে। তাই পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে গ্রহণ করা হয়। এর ফলে এখন থেকে মিডিয়া রিপোর্টে আর এক টেকনিক্যাল শব্দের দেখা মিলবে ‘কারেন্সি বাস্কেট’ বা ‘বাস্কেট কারেন্সি’। উপরে বলেছিলাম, চারটি টপ আন্তর্জাতিক মুদ্রার গড় বিনিময় হারই হল ওই দিনের এসডিআর মান। তো এজন্য ওই চার আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে আইএমএফের ‘বাস্কেট কারেন্সি’ বলে। যার ভাবটা এরকম যে, এসডিআর মুদ্রার মান নির্ধারণের জন্য একটা ঝুড়িতে থাকা টপ চারটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে ওখান থেকে তুলে আনা হয়েছে। এবার ওই বাস্কেট কারেন্সিতে চীনা ইউয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করে মর্যাদা দেয়া হলো। তবে টেকনিক্যাল রুল হল, আগামী বছর ২০১৬ সাল থেকে এটা কার্যকর হবে। অর্থাৎ আগামী বছর ১ অক্টোবর থেকে ইউয়ানসহ পাঁচ টপ মুদ্রার গড় থেকে আইএমএফের এসডিআর মান নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ তখন থেকে প্রতিদিনের এসডিআর মান কত হবে তা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চীনা ইউয়ান একটা ফ্যাক্টর হবে।
শুধু কী তাই? না আরও আছে। উপরে আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামের এক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখার কথা বলেছিলাম। কত অর্থ সেখানে আগাম জমা রাখতে হবে তা নির্ভর করে আমার অর্থনীতিতে লেনদেনের সাইজ কেমন এরই এক অনুপাতিক পরিমাণ। কিন্তু এতে সাব্যস্ত হওয়া মোট পরিমাণের ৭৫ ভাগ অর্থ জমা রাখতে হয় সোনা অথবা ডলারে। আর বাকি ২৫% নিজ দেশি মুদ্রায়। এটা আইএমএফের জন্মের সময়কার ১৯৪৪ সালের নিয়ম ছিল। কিন্তু দিনকে দিন প্রতিটা সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ বেড়েই চলেছে ফলে সে অনুপাতে আইএমএফের জমা রাখা সোনা ও ডলারের পরিমাণও। কিন্তু দুনিয়াতে সোনা ও ডলার তো অফুরন্ত নয়। তাই এই সমস্যা সমাধানে ১৯৬৯ সালে বাস্কেট কারেন্সি ধারণা চালু হয়েছিল। এর ফলে নতুন সংযুক্তি আইন হল, ডলার ও সোনা ছাড়াও বাস্কেট কারেন্সিতে থাকা অন্যান্য মুদ্রাতেও আইএমএফের সদস্য চাঁদা সম্পদ রিজার্ভ রাখা যাবে। অতএব কোনো রাষ্ট্র এখন ইউয়ানেও তার জন্য ধার্য আইএমএফের সদস্য চাঁদার সম্পদ রিজার্ভ রাখতে পারবে। এর অর্থ শুধু আইএমএফে নয়, দুনিয়ার নানা রাষ্ট্র ব্যক্তি বা কোম্পানি সবাই নিশ্চিন্তে এখন থেকে স্ব-স্ব সম্পদ চীনা ইউয়ানে রূপান্তরিত করে ধরে রাখতে শুরু করবে। আইএমএফের হিসাবে ইউয়ানকে বাস্কেটে স্বীকৃতি দেয়ার আগে বাস্কেট মুদ্রাগুলো কতটা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রার দখলে আছে এর হিসাবে ডলারের ভাগে ৪১.৯ শতাংশ, ইউরো ৩৭.৪ শতাংশ, পাউন্ড ১১.৩ শতাংশ আর ইয়েন ৯.৪ শতাংশ। আর আগামী বছর থেকে তা সম্ভবত হবে ডলার ৪১.৭৩ শতাংশ, ইউরো ৩০.৯৩ শতাংশ, ইউয়ান ১০.৯২ শতাংশ, পাউন্ড পাউন্ড ৮.০৯ শতাংশ আর ইয়েন ৮.৩৩ শতাংশ।
এটা গেল কেবল শুরুতে কার কত বাজার শেয়ার দাঁড়াবে এর হিসাব। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রায় সবাই একযোগে যে কথাগুলো বলছে যেমন, আইএমএফের স্বীকৃতি চীনের দিক থেকে ‘বিরাট রাজনৈতিক অর্জন’ এবং চীনের ওপর আস্থার প্রকাশ ও চীনের জন্য এটা ‘প্রেস্টিজিয়াস বিষয়’। এ ছাড়া মুদ্রা যেহেতু শুধু পণ্য বিনিময়েই কাজে লাগে তাই নয়। সম্পদ ধরে রাখার মুদ্রা হিসেবেও এর কদর আছে। বিশেষত যে আন্তর্জাতিক মুদ্রার মান বা হার স্থিতিশীল, বাজারের উঠতি মুদ্রা এবং আস্থার মুদ্রা সেই মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সম্পদ রাখতে মানুষ আগ্রহী হবেই। এই বিচারে ব্লুমবার্গ ম্যাগাজিন আগাম অনুমান করে বলছে, প্রথম বছরেই ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখার জন্য বাজারে এক প্রবল জোয়ার উঠবে। এর ধাক্কায় আবার পণ্য বিনিময় বাজারে ইউয়ানের বাজার-শেয়ার বেড়ে যাবে। আর ততটাই ডলার বাজার হারাবে। এ রকম কিছু চেন রিয়াকশন বা চক্রাকার প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার কিছু মিডিয়ার ঈর্ষা ছড়ানোর প্রপাগান্ডাও আছে। যেমন কেউ কেউ সন্দেহ বাতিকের রিপোর্ট করেছে, আইএমএফ কি আসলেই ঠিক মতো যাচাই করে দেখে বোর্ডের কাছে সুপারিশ করেছে? এ রকম। তবে খোদ আইএমএফ এ দিকটা আগেই আঁচ করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার দিনেই আইএমএফ নিজ ওয়েব সাইটের প্রথম পাতায় ‘সহসাই যেসব প্রশ্ন উঠে’ শিরোনামে নিজেই প্রশ্নোত্তরে এসব সন্দেহ-কৌতূহলেরও বহু আগাম প্রশ্নের বাড়তি জবাব দিয়ে রেখেছে। অনেক বেশি আন্তরিক আর খোলামেলাভাবে সেসব জবাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের মতো বহুরাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানের চীন ও আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান বিরোধের বেলায় সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকেই আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের ভূমিকা কী হলে সঠিক হবে, সে প্রশ্নে এপর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা একেবারেই প্রফেশনাল অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা পক্ষ নিতে চাননি। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যক্তিনিরপেক্ষভাবে যা সত্য, যা সঠিকÑ এর পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। যেমন, আইএমএফের সংস্কারের দাবি বিষয়ে তাদের অবস্থান সংস্কারের পক্ষে। আর তাদের সুপারিশের ফাইল আমেরিকান সিনেটে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। চীনা ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নেও আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের একই ধারাবাহিকতার অবস্থান দেখা গিয়েছে। ইউয়ানকে আমলে নিয়ে আইএমএফের সম্পদের ইউনিট গণনা আগামী বছর থেকে শুরু হবে বলা হলেও বিভিন্ন ব্যক্তি কোম্পানির ধরে রাখা সম্পদ ইউয়ানে রূপান্তর করে রাখার ঝোঁক এ বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাস্তবে কি দাঁড়ায় সেটি দেখা যাক।

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এবং একই প্রসঙ্গে ০৭ ডিসেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে ছাপা হয়েছিল। সে লেখা দুটো একসাথে মিলিয়ে আরও সংযোজন ও আবার এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

গৌতম দাস
২৩ আগস্ট ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-bb

ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক উদ্যোক্তাদের এবছরের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাস ২০১৫ জুলাইয়ের ৯ ও ১০ তারিখে রাশিয়ার উফা শহরে। আমেরিকার নেতৃত্বে চলতি গ্লোবাল অর্থনীতি বা বিশ্বব্যাপী সক্রিয় পুঁজিতান্ত্রিক গ্লোবাল ব্যবস্থার ওপর ব্রিকস সদস্য অর্থে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানোর ও পালটা নেতৃত্ব কায়েমের লক্ষ্যে পাঁচ ‘রাইজিং ইকোনমি’র উদ্যোগে গঠিত সংগঠনের নাম ব্রিকস। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা এভাবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর থেকে এ নামকরণ। কিন্তু এর লক্ষ্য অনুসারে এপর্যন্ত কাজে তেমন অগ্রগতি ঘটেনি; বরং প্রয়োজনীয় মাত্রার সক্রিয়তার অভাবে বিরাট গ্যাপ আছে সত্য; কিন্তু জন্মের (২০০৯) পর থেকে ব্রিকস প্রতি বছর নিয়মিত তাদের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন করে যাচ্ছে। ব্রিকস এবার সাত বছরে পড়ল। সে তুলনায় চীনের নেতৃত্বে পালটা বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) উদ্যোগ আইডিয়া হাজির করার পরে মাত্র ২ বছরেই প্রায় কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাজির হয়ে গেছে। আগামী বছর থেকে এ ব্যাংক পুরোদমে অপারেশনাল হয়ে যাবে। এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান।
বলা যায়, ৭ বছর ধরে ব্রিকস নিয়ে চীনের নানান চেষ্টা চরিত্রের পরও অগ্রগতি কাঙ্খিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর কারণে চীন হঠাৎ ব্রিকসের বাইরের বন্ধুদের সামনে আলাদা করে এআইআইবি ব্যাংক গড়ার প্রস্তাব হাজির করেছিল; এবং ২ বছর শেষ হওয়ার আগেই বাস্তবায়নের দিকে চলে যায়। ব্রিকস নিয়ে নানা বাধা তৈরি ও ওজর-আপত্তি তুলে ব্যাংকটিকে কার্যকর করার কাজ ধীরগতি করার পেছনে ভারতের অবদান বেশি। এর পিছনে ভারতের নীতি নির্ধারক দ্বিধা ও থিঙ্ক-ট্যাংক জাতীয় পরামর্শকদের ভুল পরামর্শ ও বিভ্রান্তি এবং সর্বপরি ভারতের নিজের সম্পর্কে অতি-মুল্যায়ন এবং আমেরিকান-পো ধরার চেষ্টা, আমেরিকান প্রভাব ইত্যাদি দায়ী। এ প্রসঙ্গে দুইটি প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা করব। এক. ভারতের ওজর-আপত্তির অজুহাতগুলো কী ধরনের এবং কেন? ভারত কেন ব্রিকসের প্রশ্নে ওজর-আপত্তির পথে হাঁটছে কিংবা ব্যাংকটিকে এখনও নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ও সঠিক মনে করছে না- এসব নিয়ে আলোচনা করা। কথাগুলো ব্রিকস বাস্তবায়নের পথের সমস্যা শিরোনাম দিয়েও আলোচনা করা। দুই. এআইআইবি ব্যাংক অপারেশনাল করার জন্য গঠন কাঠামো, আর্টিকেল অনুমোদন সম্পন্ন হয়ে গেছে; অর্থাৎ এআইআইবি ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার ব্যাংক হিসেবে চালু করার পর্যায়ে চলে যাওয়ার পরও এবারের ব্রিকস সম্মেলন আরেক অবকাঠামো ব্যাংক, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে এনডিবি (NDB) চালু করার সিদ্ধান্ত নিল কেন? অর্থাৎ একসাথে দুদুটো অবকাঠামো ব্যাংক উদ্যোগ কেন?

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থার ৭০ বছর
দুনিয়ায় পুঁজিতন্ত্রের বয়স প্রায় ৫০০ বছর। এ সময়ের মধ্যেই এর উত্থান, আন্তঃসম্পর্কিতভাবে দুনিয়াব্যাপী বিস্তার এবং পুঁজির অন্তর্নিহিত লজিক অনুযায়ী বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বর্তমানে এটা গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ৫০০ বছরের মধ্যে চলতি শেষ পর্যায়ের মাত্র ৭০ বছর বাদ দিলে বাকি আগের পুরো সময়টাতে (১৯৪৪ সালের আগের প্রায় ৪৩০ বছর কাল পর্যন্ত) ব্যাংক বা টাকার ব্যবসার উত্থান ও বিকাশ ঘটেছে তথাকথিত প্রাইভেট সেক্টরে, রাষ্ট্রের মালিকানার বাইরে। অর্থাৎ জন্মের শুরু থেকে ক্যাপিটালিজম কলোনি যুগের বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা সহায়তা ছাড়া চলতে সক্ষম হয়েছিল। ক্যাপিটালিজমের কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে প্রথম দুইটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বা মাল্টিল্যাটারাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। এটাই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রথম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বা বলা যায়, আমেরিকার নেতৃত্বে রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ। আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়া, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা। যদিও এর মূল উদ্দেশ্য বা তাগিদ ছিল দুনিয়াব্যাপী সবার জন্য এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কায়েম করা। যে কোনো বাণিজ্য বিনিময় ঘটার পূর্বশর্ত হলো সকল রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা চালু থাকা এবং ওই মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে ঐ আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা হাজির থাকা। ফলে আন্তর্জাতিক এক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম চাওয়া মানেই সেটা আসলে আগে এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা কায়েম করার কাজ হাতে নেয়া। তৎকালে বাণিজ্যের দিক থেকে একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে তার জাতীয় মুদ্রা ডলারকে একইসঙ্গে সব রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। দুনিয়ায় এ প্রথম সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম করে।

পুরানার বিশ্বব্যবস্থার গর্ভে নতুন ব্যবস্থার আগমন
মোটা দাগে বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্কের বিচারে তিনটি পর্যায় আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রথমত, মধ্যযুগ থেকে ১৯৪৪ সালের আগ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই আজকের তুলনায় হয়তো সীমিতভাবে বিকশিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এটাকে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের” হাতে বিকশিত বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থাও বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সাল থেকে চলতি সাল পর্যন্ত আমেরিকান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে কায়েম করে গড়ে তোলা (সেকালে) নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা- পণ্য গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলা যায়। আমেরিকান প্রভাবের এই ব্যবস্থাটা যেটা এখনও চলতি তবে পড়তি অবস্থা, তা এখন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। আর তৃতীয়ত, মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকে আমেরিকান নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জায়গায় চীনের নেতৃত্বে পুরনো ব্যবস্থাটার পুনর্গঠন করে নেয়ার উদ্যোগ – আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো নতুন ধরনের পালটা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব। চলতি সময়টায় একটা গেম চেঞ্জিংয়ের কাল পার হচ্ছি আমরা। একালে এতে ভারতের গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে, পুরনো নেতা আমেরিকা কিংবা হবু নেতা চীন- উভয়ের কাছেই। গুরুত্বটা হলো, ভারত আমেরিকার কোলে বসে পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন ঠেকিয়ে আরও কিছু দিন চলতি ব্যবস্থার আয়ু বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা হতে পারে, একে আরও যতদিন আয়ু দেয়া যায় আমেরিকার প্রভাব তত বেশি দিন বাড়ে। আর এর বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে সুবিধা শুষে নেয়ার কাজে লাগা। তবে মনে রাখতে হবে, এ কম্ম সাময়িক লাভালাভের জন্য এবং এটা নিজের আগামীর বিরুদ্ধে কুড়াল মারাও হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এর বিপরীত পথ হচ্ছে, চীনের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত নিজের জন্য নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়তে ত্বরান্বিত হয়ে কাজে লেগে পড়তে পারে। তবে উভয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারতের এমন গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ভারতের বিশাল জনসংখ্যা। অর্থনীতির দৃষ্টির ভাষায় বলতে হবে, যত জনসংখ্যা তত জোড়া মুখ এবং হাত; এবং ততই বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং শ্রম।
এটা এখন নির্ধারিত যে, চীন ও ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গন্তব্য এক সূত্রে বাঁধা হয়ে গেছে- এখানে তারা উভয়ে ন্যাচারাল অ্যালায়েন্সের অ্যালাই। পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা খাড়া করতে পারার মধ্যেই তাদের আগামী নির্ভরশীল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার ভেতরে চীন কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে জায়গা ছেড়ে দেবে তা সবটা ভারতের দাবি জানিয়ে আদায় করার বিষয় নয়। নতুন ব্যবস্থায় ভারত চীনের কাছে কী কী দাবি করবে সেসবের সঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও অর্জিত সক্ষমতার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে হবে।

ব্রিকসঃ একের ভিতর দুই কাজের ভুমিকায়
একই ব্রিকস উদ্যোগের মধ্যে আসলে দুইটা পালটা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ আছে – একটি আইএমএফের সমতুল্য পাল্টা প্রতিষ্ঠান, অন্যটি বিশ্বব্যাংকের। ভারতের মূল যে প্রস্তাবের কারণে ব্রিকস অগ্রগতি আটকে বাধাগ্রস্ত বা শ্লথ হয়ে আছে তা হল, এখানে পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের সকলের সমান পরিমাণ বিনিয়োগ নিয়েই শুধু প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অসম সক্ষমতার বাস্তবতায় থাকলেও কাউকে বেশি বিনিয়োগ করতে দিয়ে প্রতিষ্ঠান খাড়া করা যাবে না। ভারতের এ ওজর-আপত্তিতে পড়ে পরিশেষে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য অবকাঠামো ব্যাংক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে NDB (এনডিবি) কার্যকর হতে যাচ্ছে পাঁচ সদস্যের প্রত্যেকের সমান ১০ বিলিয়ন করে মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে। অনেকের মনে হতে পারে, সদস্যদের সমান বিনিয়োগ থাকাই সঠিক। কিন্তু আসলে এমন চিন্তা অহেতুক ও অর্থহীন। ঈর্ষাকাতর সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা বলা যেতে পারে। এগুলো দিয়ে কারও প্রভাবশালী উত্থান আসন্ন হলে তা ঠেকিয়ে রাখা যায় না। যেমন আজ চীনের উত্থান কি আমেরিকা ঠেকিয়ে রাখতে পারছে, না রাখা সম্ভব হয়েছে। ভারতের অর্থনীতি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ওই ১০ বিলিয়ন ডলার কাউকে না দিয়ে নিজ নিজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করলেই তো পারত। তা না করে NDB প্রতিষ্ঠানের নামে তা জড়ো করার কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার একটি কমন স্বার্থ ওই পাঁচ রাষ্ট্রের সবার আছে। সেটা হল, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরনো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে বা বাইরে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানো। এখন ‘বিনিয়োগে সবার সমান ভাগ থাকতে হবে’ এই নীতি মানতে গেলে নতুন অর্জিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র থেকে যাবেই। অবকাঠামো ব্যাংক হিসাবে এই পুঁজি খুবই অল্প। আর এমন থেকে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এর হওয়া সম্ভব নয়। অথচ সেটাই ছিল নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গড়ার প্রধান তাগিদ।
যেমন বিশ্বব্যাংকের বর্তমানে মোট বিনিয়োগ সক্ষমতা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, এডিবির ১৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর তুলনায় “সবার সমান বিনিয়োগ হতে হবে” এ জেদাজেদিতে সবার ১০ বিলিয়ন ডলার করে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ব্রিকসের এনডিবি ব্যাংক কতটা প্রভাবশালী হবে বলাই বাহুল্য এবং তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এছাড়া মূলকথা, ভারত অন্য রাষ্ট্রকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দাতা এখনও নয়, বরং নিজেই গ্রহীতার দেশ। ফলে এ পর্যায়ে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ তত্ত্ব ও অবস্থানের সারার্থ হচ্ছে, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে নামিয়ে সবার সমান বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান গড়া। মানে এনডিবি ব্যাংককে বামন করে রাখা। ফলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী কিছুই এটা হতে না দেয়া।

ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থানঃ এক ভুয়া ও অর্থহীন তত্ত্ব
ওদিকে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থান যে ভুয়া ও অর্থহীন এর আর এক বড় প্রমাণ হলো ব্রিকস উদ্যোগের অপর কম্পোনেন্ট, যেটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে তৎপরতা বলেছি সেদিকে তাকালে। [এখনও এটা পুরা আকার নেয় নাই ফলে নাম এখনও নাই। ব্রিকস উদ্যোগের ভিতরে আপাতত ভ্রুন প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গাঠনিক পর্যায়ে আছে বাড়ছে যার আপাত নাম “নয়া আইএমএফ” মনে করে নেয়া যেতে পারে।] ব্রিকসের ‘সমান বিনিয়োগের’ এনডিবি ব্যাংক ছাড়াও হবু “নয়া আইএমএফ” এর জন্য আর একটি ফান্ড তৈরি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্যে কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে তার নিজের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি পরিস্থিতিতে তা মেটাতে সহায়তা করা। এত দিন দুনিয়ায় এ ধরনের সহায়তা বিতরণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল আইএমএফ। ব্রিকস উদ্যোগে এমন ফান্ড মোট ১০০ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এক্ষেত্রে সদস্যরা চাঁদা দেবে অসমভাবে। চীন একাই ৪১ বিলিয়ন, সাউথ আফ্রিকা সবচেয়ে কম মাত্র ৫ বিলিয়ন আর ভারতসহ বাকি তিন সদস্য রাষ্ট্র প্রত্যেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার করে- এভাবে মোট ১০০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই ফান্ড সংগ্রহের বেলায় তা অসম রাখার ন্যায্যতা কী? কেন এখানেও ভারত চীনের সমান অবদান চাঁদা দিচ্ছে না? অর্থাৎ ভারত এখানে নিজেরই ‘সমান মালিকানা তত্ত্বের’ পক্ষে নিজেই দাঁড়াচ্ছে না কেন?
নীতি কথার মানে হল, যে অবস্থানটা সবখানে ইউনিফর্মভাবে প্রয়োগ করা হবে। দেখা যাচ্ছে ভারতের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি অবস্থান নাই, ফলে প্রয়োগে ইউনিফর্মিটি নাই। এই অবস্থা কে বলা যায় ভারতের সিরিয়াসনেসের ঘাটতি আছে, ঘাটতিজাত সমস্যা আছে। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা এটা বুদ্ধিমানের অবস্থান মনে করে। কারণ এটা অজান্তে দোদুল্যমানতা নয়। জেনেশুনে দোদুল্যমান থাকা। ব্রিকসের ভিতরেই থাকা ছেড়ে না যাওয়া। কারণ একমাত্র এভাবে সে ব্রিকস উদ্যোগকে আটকে শ্লথ করে রাখতে পারে। আর এই সার্ভিসটা আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে লাগে বলে আমেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিতর সেখান থেকে বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা আদায় করা। ভারতের এই দ্বৈত ঝোঁকের কারণেই চীন হঠাত করে নিজের ঝুলি থেকে আচমকা ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) এর প্রস্তাব হাজির করে ২০১৪ সালে আর আগামি বছর ২০১৬ থেকে কার্যকর করে ফেলতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা হয়েছে এমনভাবে যে চীন একাই প্রস্তাব করেছে আর ইউরোপসহ [এবং বলা বাহুল্য ভারতও] সকলে ঐ প্রস্তাবের পিছনে পিছনে ছুটেছে হা বলার জন্য। অর্থাৎ এটা প্রমানিত হয়েছে যে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা ও প্রস্তাব করার ব্যাপারে চীন যেভাবে আগাতে চায় তা ঠেকানোর ক্ষমতা ভারত কেন ইউরোপেরও নাই। নাই এজন্য যে বিষয়টা চীনা নেতৃত্বের কোন খামখেয়ালিপনার ইচ্ছা নয়, বিষয়টা হল এক অবজেকটিভ বাস্তবতা – চীনের অর্জিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

ভারতের সিদ্ধান্তের অর্থ তাতপর্য
আর ভারতের দিক থেকে দেখলে এটা তার শর্ট সাইটনেস, সংকীর্ণ দৃষ্টি অর্থাৎ আপাত নগদ লাভের দিকে প্রলুব্ধ হয়ে চলা, আর সেই সাথে নিজের আগামি লংটার্ম স্বার্থের পায়ে কুড়াল মারা। চীনের সাথে ইতিবাচক নয়, আগামির এলাই নয়, ঈর্ষাবাচক প্রতিযোগিতার চোখে পরিস্থিতিকে দেখা। অথচ বাস্তব ফ্যাকটস হলো, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা হল ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ওপর দাঁড়ানো এক অর্থনীতি। এটা এখন দুনিয়ার সর্বোচ্চ। সেজন্য চীন যে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে এর প্রতি ঈর্ষামূলক অবস্থান নেয়া অর্থহীন, কারণ বিষয়টা ঈর্ষা করা নয়। বরং প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেয়াটাই উপযুক্ত পথ, ঈর্ষা নয়। এছাড়া নিজের ওপর আস্থা রাখা উচিত যে, কালক্রমে ভারত রাষ্ট্রের যেটুক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হচ্ছে, হয়েছে; কিন্তু তা অর্জনের পরও আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো ফোরামে সমতুল্য গুরুত্ব ও জায়গা যদি অন্যরা তাকে না দেয় তবে পালটা আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান, ব্রিকস বা AIIB হাজির হবে- ভারত তৈরি করবেই। সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হলে অন্যেরা কেউ চাইলেই ভারতকে বঞ্চিত রাখতে পারবে না। কাজেই ঈর্ষা, সন্দেহ এগুলো কোনো পথ বা কাজের কথা নয়। তবে সংকীর্ণ দৃষ্টির ভারতের নীতিনির্ধারকদের ধারণা যেহেতু নিজের ন্যাচারাল ভবিষ্যতের পথে চীনের সঙ্গে নতুন উদ্যোগে শামিল হতে ঢিলেঢালা, গড়িমসি দেখালে আমেরিকার দিকে ঝুঁকার ভয় দেখিয়ে চীনকে চাপে রাখার সুযোগ আছে, তাই সেটা নেয়া উচিত। এর অর্থ নিজের যেটুকু গুরুত্ব মূল্য পাওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি যেন সে পেতে পারে এমন আবদারে তা পাওয়ার জন্য অযথা ঝুলাঝুলি করা। এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে তা ভারতের জন্য আত্মঘাতী ফল বয়ে আনতে পারে। ব্রিকস উদ্যোগ এত দিন কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি ভারতের এসব ওজর-আপত্তির কারণে।
ভারত-চীনের সামরিক স্বার্থ বিষয়ক টেনশন আছে এটা বাস্তবতা। এর বড় কারণ মার্ক করা বা চিহ্নিত করা হয় নাই এমন বিস্তৃর্ণ কমন রাষ্ট্র সীমান্ত তাদের আছে। বিগত ১৯৬২ সালে চীনের কাছে যুদ্ধে হেরে যাবার খারাপবোধ, ট্রমা আছে। এছাড়া চলতি সময়ে অসম সামরিক সক্ষমতার বাস্তবতা এখানে আছে। এরপরেও এগুলোই একমাত্র বাস্তবতা নয়। কারণ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে আবার উলটা চীনের থেকে সহযোগিতা পাবার (অবকাঠামো ঋণ, আমদানি ব্যবসার বাজার পণ্য ও কাঁচামাল) নেবার স্বার্থ ভারতের আছে। অথচ সবকিছু মিলিয়ে দেখলে অন্তত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অহেতুক চীনভীতি ছড়ানোর চেষ্টা ভারতের মানায় না, কারণ এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ। যেমন ব্রিকস উদ্যোগের NDB ব্যাংক গড়ার ক্ষেত্রে ভারত শর্ত দেয় প্রথম ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট ভারতের হতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এভাবে শর্ত রাখা হয়েছে যে, রোটেশনে চীনের সুযোগ আসবে সবার শেষে, মানে ২০ বছর পর। ফলে আগামী দুই দশক চীন এই এনডিবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই চীনভীতি অহেতুক। তবু চীন তাতেই রাজি হয়েছে। আর ভারতের প্রস্তাবিত ও মনোনীত ব্যক্তি কে ভি কামাথ এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সাথে চীনের আরও কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা-ও জানা যাচ্ছে।
ব্রিকস উদ্যোগের মূল আইডিয়ার মধ্যে চীন বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়াকে আপাতত ব্রিকসের ভেতরে সীমিতভাবে এবং ব্রিকসের বাইরেও পূর্ণভাবে- দুই জায়গাতেই বাস্তবায়ন করার পথে রওনা হয়েছে। দৃশ্যত তাই দেখা যাচ্ছে। ব্রিকসের ভেতরের অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এনডিবি ব্যাংক। আর এউদ্যোগের বাইরের আরও পূর্ণভাবে ব্যাপক পরিসরে অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক। ভারতের খায়েশ ও চীনের প্রতি অর্থহীন সন্দেহ অনুসরণ করে ব্রিকসকে সে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে বামন রাখতে চায়। অথচ ব্রিকস উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হল, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পালটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে গ্লোবাল অর্থনীতির ওপর আমেরিকার বদলে নিজেদের নতুন কর্তৃত্ব লাভ করা। অর্থাৎ এ দুই অবস্থান স্ববিরোধী। আর ভারত এই স্ববিরোধী অবস্থানের উদ্গাতা। এ স্ববিরোধিতা কাটতে পারে একমাত্র, ভারত যদি ব্রিকস উদ্যোগের সাফল্যের ভেতর নিজেকে গ্লোবাল নতুন কর্তৃত্বে চীনের সঙ্গে বড় অংশীদারিত্বে নিজেকে দেখতে চায় তবে, তা সম্ভব একমাত্র চীনের বড় ভূমিকা এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই।
এখান থেকে ভারতের জন্য শিক্ষা হল,
১। বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী একটা অবকাঠামো ব্যাংক গড়ার উদ্যোগ যেটা শেষে AIIB নামে বাস্তবায়িত হল – শেষ পর্যন্ত এমন ঘটনাগুলো ঠেকানোর ক্ষমতা ভারতের নাই, সম্ভব হয় নাই। কারণ এটা সম্ভব নয়। ঠেকানোর চেষ্টাটাও আসলে ভারতের স্বার্থে যায় নাই। ২। গত সাত বছর ধরে এটা ঠেকিয়ে রেখে কি ভারতের লাভ হয়েছিল না কি এখন AIIB হাজির হওয়াতে ভারতের স্বার্থ বেশি আছে তাতে? AIIB ব্যাংক আগে বাস্তবায়িত হলে কি ভারতের জন্য তা বেশি ভাল হত না! আবার চীনের সাথে পক্ষে সক্রিয় থাকলে ব্রিকস উদ্যোগের অধীনেই AIIB ব্যাংক হাজির হত। তাতে বর্তমানের চেয়েও AIIB এর উপর ভারত ব্রিকসের মাধ্যমে বেশি কর্তৃত্ব লাভ করতে পারত। সেটা সে এখন হারাল। তাহলে ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় এতদিন কার পক্ষে কাজ করল? কি লাভ করল? এসব নিয়ে তার অবিলম্বে মুল্যায়নে বসা উচিত।

বিরোধে না জড়ানো বুদ্ধিমান চীন
তবে মজার দিকটা হল, ভারতের এ স্ববিরোধিতার মুখেও চীন তাকে ত্যাগ করেনি। অথবা ব্রিকস উদ্যোগকে চীন স্থবির বা গুটিয়ে ফেলেনি। বুদ্ধিমান ও ইতিবাচকভাবে ভারতকে নাড়াচাড়া মোকাবিলা করেছে। তবে দেখিয়েছে, চীন একা নিজ উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী মূল অবকাঠামো ব্যাংক গড়তে সমর্থ। তাই মাত্র ২ বছরের মধ্যে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের স্ববিরোধী ও দোদুল্যমানতার কারণে চীন আর ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে রেখে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর করার পথে যায়নি আপাতত। এর অর্থ হলো, ভারতের নির্বুদ্ধিতার জন্য চীন এআইআইবি ব্যাংক আপাতত ব্রিকস উদ্যোগের বাইরে নিয়ে রাখল। স্বভাবতই এতে ভারতের ক্ষতি ছাড়া কোনোই লাভ হয়নি। বরং এভাবে হওয়াতে এআইআইবি ব্যাংকের বাস্তবায়নের উপর চীনের একার বক্তব্যের ওজন সবচেয়ে বেশি। এমনকি ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরের এনডিবি ব্যাংকের উপর নিজের প্রভাবের চেয়ে তা বেশি। ফলে সমান বিনিয়োগের গোঁ ধরে ভারতেরই ক্ষতি হল। যদিও এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট কামাথ বলছেন, এআইআইবি ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এনডিবি ব্যাংক রেখে কাজ করবে।

এনডিবি ব্যাংক চেয়ারম্যান আরও বলছেন, তারা শুরুতে শুধু পাঁচ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখবে। এটাও কথার কথা। কারণ ব্রিকসের ভিতরে বাস্তবে অবকাঠামো ঋণ পাওয়ার দরকার আছে, প্রথমত ভারত আর ব্রাজিলের। বাকিরা দাতা অথবা ঋণ কাজে লাগানোর উপযোগী অর্থনীতির রাষ্ট্র নয়। এর মানে দাঁড়াল, আপাতত যেন ভারত শুধু নিজের জন্য ব্যবহার করবে এনডিবি ব্যাংককে। অর্থাৎ ভারত কী চাচ্ছে আর তা পেয়ে ভারতের কী লাভ হচ্ছে – এসবের কোনো ঠায়ঠিকানা ভারত মিলাতে দেখাতে পারছে না। তবু নানান ওজর-আপত্তি তুলতে দেখছি আমরা ভারতকে।
আসলে মূল স্ববিরোধী কঠিন বাস্তবতা হল, ভারত মূলত ঋণগ্রহীতা; কিন্তু সে ঋণদাতার ভূমিকা ও গুরুত্ব পাওয়ার জন্য জিদ ধরেছে।

[এই লেখাটা এর আগে আগষ্ট ২, ২০১৫ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে ছাপা হয়েছিল। পরে সে লেখাটাই আরও বিস্তার করে এবং সম্পাদনা করে এখানে এখন ছাপা হল।]