দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

গৌতম দাস

০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৪৬ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2My

 

গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় একটা ছোট নিউজ ছাপা হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল, “চীন আপাতত বাংলাদেশে কোনো নতুন প্রকল্পে আর অর্থ জোগাবে না’ [China won’t bankroll new projects for now]। কেন?

বাংলাদেশকে নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা না বলে, ভুল লাইনের রেষারেষি চলে, এটা বলাই ভাল। ব্যাপারটাকে সারকথায় বললে, “বাংলাদেশে যে সরকার আছে সেটা তো ভারতেরই” – এমন দম্ভ ভারতের মিডিয়ায় প্রায়ই প্রকাশ হতে দেখা যায়। ভারতের সরকারি পাতিনেতা বা মন্ত্রীরাও অনেক সময় এমন মন্তব্য করে থাকেন। তারা বলতে চায়, বাংলাদেশের সরকার তাদেরই বসানো। ফলে চীন কেন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ হতে চাইবে বা ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করবে – তাদের বক্তব্যের সারকথাটা আকার ইঙ্গিতে ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে এরকমই থাকে।

কিন্তু বাংলাদেশে কে ভাল বিনিয়োগের সক্ষমতা দেখিয়েছে – চীন না ভারত, কার অবকাঠামো বিনিয়োগ বেশি – এই প্রসঙ্গ এলে এবার অবশ্য আবার তারা নিজেরাই কুঁকড়ে গিয়ে বলে ভারতের তো বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তাই বাংলাদেশে আমরা চীনের কাছে হেরে যাই। তবু এমন ভারতের ন্যূনতম মুরোদ না থাকলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত চীনের সাথে সে টক্কর দিয়ে চলছে এই ভাব তাকে দেখাতেই হবে, এমনই জেদ ও গোঁয়ার্তুমি ঘটতে আমরা সবসময় দেখে থাকি। শুধু তাই নয়, ভারত চীন নিয়ে অজস্র ভুয়া বা নেতি-মিথ ছড়িয়ে রেখেছে, যার প্রবক্তা ও শিকার আমাদের ও ভারতে মিডিয়াও।

যেমন আবার ভারতকে পিছনে ফেলে চীন বাংলাদেশকে দখল করে ছেয়ে ফেলছে বা নিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে? না, চীন বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক উপস্থিত হয়ে আছে বা বিনিয়োগ করে আছে। কিন্তু ফ্যাক্টস অর্থে বাস্তবতা হল এটা একেবারেই কেবল সেদিনের ফেনোমেনা; যে চীন বাংলাদেশে ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। গত ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে আসার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের কোন উল্লেখ করার মত বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রায় ছিলই না। তাই এ কথাগুলোও পুরোপুরি ভিত্তিহীন। তবে ২০১৬ সালের আগের সেই সময়কালে বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটা কন্ট্রাক্টর বা বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে, বিনিয়োগকারি হিসাবে না। এছাড়া বাংলাদেশে চীনের অনেকগুলো প্রকল্প যেমন কয়েকটা বুড়িগঙ্গা মৈত্রী সেতু অথবা মৈত্রী অডিটোরিয়াম ধরনের ছোটখাটো বিনিয়োগ প্রকল্প এসব অনেক পুরনো। এগুলো টেনে আনলে এমন ছোট ছোট চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই আছে। কিন্তু কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বিনিয়োগকারী হিসেবে চীন ছিল না। বরং চীনা প্রেসিডেন্টের ২০১৬ সালের অক্টোবরে ঐ বাংলাদেশ সফর থেকেই ব্যাপক বিনিয়োগ আসা শুরু হয়, সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলেন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের। এ নিয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে সে সময় ভারতের এনডিটিভি-তে লাইভ-ইনহাউজ, চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে একটা টকশো ধরনের আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের ক্ষমতাসীনেরা পাতিনেতাসহ যেমন বলে থাকেন, বাংলাদেশ তো তাদেরই, এটাই মিডিয়াও শুনে আসছে। তাই যদি হয় তবে চীনা প্রেসিডেন্ট এত ঘটা করে বাংলাদেশে আসছেন এটা তারা দেখতে পাচ্ছে কেন? তাদের এই চোখ আর কানের বিবাদ মেটানো, এই বিষয়টা পরিষ্কার করা ছিল এনডিটিভির উদ্দেশ্য।

তাদের ঐ আলোচনা থেকে তাদেরই করা হতাশ উপসংহার ছিল “দিল্লি আসলে অনেক দূরে”। মানে কী? মানে, চীনের সক্ষমতার তুলনায় ভারত কোনও বিনিয়োগকারীই নয় এখনও। খোদ ভারতই যেখানে বিনিয়োগ-গ্রহীতা। কাজেই বিনিয়োগের, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের দিক থেকে বাংলাদেশে ভারত কেউ না। তাই এনিয়ে চীনের সাথে ভারত কোন তুলনার যোগ্য না। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশে সরকারকে ভোটবিহীন অর্থে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতায় থাকতে হলে ভারতের সমর্থন পাওয়া আমাদের সরকারের জন্য জরুরি এমন বুঝের ক্ষেত্রে একটা ফ্যাক্টর অবশ্যই, বলে মনে করা হয়। যদিও এটা একটা পারসেপশনই কেবল। কারণ কখনই এটা পরীক্ষা করে দেখা হয় নাই বা এই ধারণাটা চ্যালেঞ্জ করে কেউ দেখে নাই কখনও যে আদৌও ভারতের সমর্থন অনিবার্য কিনা বা কেন? তবে সেটা যাই হোক তবু ভোটারবিহীন ক্ষমতা কায়েম থাকার ইস্যুতে আবার চীন ভারতের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। অথবা চীন আগ্রহী হতে চায় এমন কখনও দেখা যায় নাই তা  বলাই বাহুল্য। অতএব ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর – সেটাই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে মিডিয়ায় ব্যাপক হইচই পড়বে হয়ত সেটা স্বাভাবিক। এ ছাড়া ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে আসা সেটাও তো কোন হাতের মোয়া নয়। চীন নিজেই সেই সফরকে “মাইলস্টোন” বলেছিল, আর তাতে বাংলাদেশে প্রো-ইন্ডিয়ান বিডিনিউজ২৪সহ আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াগুলোও সবাই অনুরণিত করেছিল যে, এটা চীনা প্রেসিডেন্টের “মাইলস্টোন” সফর। এমনটা না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। যেমন সফর শেষে ফাইনালি দেখা গেল, মোট ২৭টা প্রকল্পের জন্য প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারে চুক্তি বা এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছিল তখন।

এছাড়া আরও ঘটনা হল, সেটা আবার এখন ২০১৯ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই ফিগারটাও ছাড়িয়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে। আর তাহলে এরপর এখন?

খুব সম্ভবত, “কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে” চীন একটু দম নিতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, দম নেয়াই বলছি; অর্থাৎ সাময়িক বিরতি। মানে এটা ঠিক মুখ ফিরিয়ে নেয়া নয়। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের চীনা দূতাবাসের বাংলাদেশকে ফিরতি জবাব লেখা চিঠির বরাতে লিখেছে, “চলতি ২৫ বিলিয়ন ডলারের ২৭ প্রজেক্টের বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কিছুতে চীন এখন মন দেবে না। [It has also requested Bangladesh to concentrate more on the timely execution of existing 27 projects for which it pledged more than $25 billion.]

এছাড়া ঐ জবাবি চিঠিতে আরও জানিয়েছে, “বিগত নেয়া প্রকল্প কাজগুলোর একটা মূল্যায়ন করতে সে লম্বা সময় নেবে’। [China will take a long time to evaluate and implement the listed projects involving large amounts, said a letter sent to the external relations division of finance ministry recently] তাই বাংলাদেশ সরকার যেন আপাতত নতুন আরও কোনো প্রকল্প নিতে নতুন প্রস্তাব না পাঠায়।

আসলে ঘটনাটা শুরু হয়েছিল একটা নতুন প্রকল্পের অনুরোধ নিয়ে। আমাদের দেশের সরকার জি-টু-জি সহযোগিতার অধীনে চীনের কাছে বরিশাল-পটুয়াখালি-কুয়াকাটা চার লেনের সড়ক প্রকল্প নেয়া যায় কিনা সেই অনুরোধ করে এক প্রস্তাব পাঠালে এর জবাবে এসব চীনা প্রতিক্রিয়া বাইরে এসেছিল।

এই খবর থেকে বাংলাদেশ জুড়ে একটা কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে যে, তাহলে চীনও কী হাত গুটিয়ে নিচ্ছে? তারা কী সরকারের ওপর নাখোশ? সরকারকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে? সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে? বাংলাদেশ কী আর কোনো চীনা বিনিয়োগ কোনোদিন পাবে না? ইত্যাদি নানান অনুমানের কানাঘুষা গুজব শুরু হতে দেখা গেছে। এর সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে সেটাই এখানে আলোচনার মূল প্রসঙ্গ।

সার কথায় বললে, খুব সম্ভবত এটা নতুনভাবে নতুন নিয়ম-কানুনে চীনের আবার বিনিয়োগে বাংলাদেশে ফিরে আসার পূর্বপ্রস্তুতি নেয়ার কালপর্ব। এ কারণে এটা সাময়িক বিরতি। যে ধরনের সম্পর্ক কাঠামো বা চুক্তি-কাঠামোর মধ্যে চীন এতদিন অবকাঠামো বিনিয়োগ করে এসেছে, তাকে আরো স্বচ্ছ করে নিতেই সম্ভবত চলতি বিরতি এটা। আর এই ঢেলে সাজানোটা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, এটা যেকোনো দেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগের বেলায় নেয়া এমন পরিবর্তন হাওয়া বইবার কথা।
আমাদের এই সম্ভাব্য অনুমান যদি সঠিক হয় তবে আমাদের কথা শুরু হতে হবে ‘জিটুজি’ থেকে। জিটুজি মানে ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ বা সরকারের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি। কী নিয়ে বুঝাবুঝি?

জিটুজি ও কনসালটেন্টঃ
চীনের সাথে নেয়া বাংলাদেশের বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্প এগুলো আসলে জিটুজির অধীনে নেয়া। যার সোজা অর্থ হল, কোন প্রকল্প নির্মাণে কত মূল্য বা খরচ পড়বে তা নির্ধারণ নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডার এখানে হবে না, তাই সবার জন্য কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ডাকা আর সেখান থেকে সে মূল্য যাচাই করে নেয়া হবে না। কিন্তু এমন টেন্ডারবিহীনতাকে আইনে বাঁচাতে এখানে ‘সরকারের সাথে সরকারের চুক্তি’ হয়েছে বলে এই উসিলায় ‘খরচের কাহিনী’ আন্ডারস্টান্ডিং করে নির্ধারিত হয়েছে বলা হবে। এটা চীনা বিনিয়োগের অস্বচ্ছ দিক নিঃসন্দেহে; এক কথায় উন্মুক্ত টেন্ডার না হওয়া যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই একটা কালো দিক, তা বলাই বাহুল্য।
এছাড়া আর একটা দিক। যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ওর টেকনিক্যাল দিক থেকে ঐ প্রকল্প ব্লু-প্রিন্ট মোতাবেক ঠিক ঠিক নির্মিত হয়েছে কি না, তা নির্মাণ কোম্পানি সম্পন্ন করেছে কি না তা প্রকল্প-গ্রহীতা মানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে এক আলাদা কনসালটেন্ট কোম্পানি। মানে সরকার একাজে আলাদা একটা ইঞ্জিয়ারিং কনসালটেন্ট কোম্পানিকে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এটা প্রকল্পে স্বচ্ছতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকল্প-গ্রহীতা রাষ্ট্র নিজস্বার্থে প্রকল্প বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে সাধারণত এক বিদেশী কনসালটেন্ট কোম্পানিকে দিয়ে। যেমন বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প যমুনা সেতুর বেলায় তাই দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু এর আবার এক খারাপ দিক আছে। এই কনসালটেন্ট কোম্পানিই হয়ে দাঁড়ায় ঘুষের অর্থ সরানোর উপায় কোম্পানি। নির্মাণ কন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে ঘুষের অর্থ নিয়ে সরকার বা সরকারের লোকের কাছে পৌঁছে দেয়ার কোম্পানি। কারণ কাজের বিল ছাড় করতে অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে ঐ কনসালট্যান্ট কোম্পানির হাতে।
কিন্তু চীনা জিটুজির বেলায় চীন কোন কনসালট্যান্ট রাখা পছন্দ করে না। তবে, প্রকল্পের খরচে না হলেও গ্রহীতা-রাষ্ট্র চাইলে নিজ আলাদা খরচ করে  সমান্তরালভাবে কোনো কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে প্রকল্পে নিয়োগ দিতে পারে। এটা সে অনুমোদন করে। তাহলে কী চীন বিশ্বব্যাংকের নিয়মের চেয়ে স্বচ্ছ দাতা? যেহেতু এখানে কনসালটেন্ট কোন কোম্পানিই রাখে না?

না, সেটা একেবারেই নয়। কারণ বিশ্বব্যাংকের বেলায় প্রথমত তো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া কাজ দেয়ার নিয়মই নেই। আর টেন্ডারে কাজ দেবার পর সেখানে এক বিদেশি কনসালটেন্ট কোম্পানিও বিশ্বব্যাংকের নিয়মে নিয়োগ পায়! যদিও ঘুষের সুযোগ থাকে সেখানে। কানাডার লাভালিন তেমনই এক কোম্পানি ছিল।  তাহলে?
আসলে চীন বলতে চায় যেহেতু এটা জিটুজি, ফলে সরকারই অন্য সরকারকে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারে। তাহলে কনসালটেন্টের আর প্রয়োজন কী? কিন্তু তাহলে এক্ষেত্রে কী ঘুষের ব্যাপার নাই? বা থাকলে ঘুষের অর্থ স্থানান্তরের প্রতিষ্ঠান কে হয়? সহজ উত্তর, চীনা নির্মাণ কোম্পানির এক স্থানীয় বাংলাদেশী এজেন্ট কোম্পানি থাকতে দেখা যায়। সাধারণত এটাই সেই অর্থ স্থানান্তরের কোম্পানি হয়ে থাকে।
অন্যদিকে আবার কনসালট্যান্ট কোম্পানি রেখেই বা লাভ কী হয়? সে প্রশ্নও ভ্যালিড। কারণ, যমুনা সেতু নির্মাণের ১০ বছরের মাথায় কিছু ফাটল বা নিচের বেয়ারিং বদলের প্রয়োজন দেখা গিয়েছিল। এর দায় কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে নিতে দেখা যায়নি। এ কথাটাও তো সত্যই। তাই সার কথাটা হল, কনসালটেন্ট সম্পর্কিত একটা অস্বচ্ছতা থেকেই যায় সবখানে। এছাড়া টেন্ডার না হওয়াতেও প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল্য ইচ্ছামত সাজিয়ে নিবার অভিযোগ সামলানোর কোন উপায় এখানে থাকে না। তাই জিটুজি তুলনামুলক একটা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থা।

ঋণের ফাঁদঃ
এদিকে ইতোমধ্যে গত দুই বছর ধরে চীনবিরোধী বিশেষ করে গত বছর আমেরিকান সরকারি উদ্যোগে কিছু একাডেমিককে দিয়ে একটা প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল, যার সার বক্তব্য হল যে, বিভিন্ন দেশে চীনের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ-ঋণ দেওয়ার নামে চীন “ঋণের ফাঁদ’ তৈরি করছে ও ঋণগ্রহীতা দেশকে এতে ফেলছে। এ নিয়ে চীনবিরোধী ব্যাপক ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছিল।

পশ্চিমা ঋণ মানে মূলত সিংহভাগ যার আমেরিকান অবকাঠামো-ঋণ, তা রাষ্ট্র নিজে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করে, দুনিয়াজুড়ে এটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠেছিল। কম কথায় বললে, আগে কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো বিশ্বযুদ্ধের শেষে মুক্ত-স্বাধীন দেশ হতে হয়েছে; এরপরই বিশ্বযুদ্ধের শেষেই কেবল খোদ বিশ্বব্যাংকেরই জন্ম হতে হয়েছে। আর এরও পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো তারা বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে শেষে লোন নেয়া শুরু করেছিল। এ কারণে সবটাই বিশ্বযুদ্ধের পরের ফেনোমেনা। তাও আবার আরো কাহিনী আছে। জাপান বাদে যে এশিয়া, এর বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল অন্তত আরও ২০ বছর পরে। এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক – সেটা ষাটের দশকের আগে একেবারেই আসে নাই। অর্থাৎ ১৯৪৫ সাল থেকে পুরো ষাটের দশক পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপ ও এদিকে একমাত্র জাপানকে পুনর্গঠনে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ দিয়ে সাহায্য করেছিল। যার চিহ্ন হিসেবে সেই থেকে “রি-কনস্ট্রাকশন” শব্দটা বিশ্বব্যাংকের নামের সাথে জড়িয়ে যায়; এভাবে “ব্যাংক অব রি-কন্সট্রাকশন এন্ড ডেভেলবমেন্ট”। আর সেই বিনিয়োগ যা সেকালে আমেরিকান ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত ছিল, তা ইউরোপে  বিনিয়োগ ঢেলে স্যাচুরেটেড কানায় কানায় ভর্তি হয়ে উপচিয়ে না পড়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক ইউরোপ আর জাপান থেকে সরেনি, এশিয়াতেও আসেনি। বরং এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক পুরোদমে ঋণ দিতে শুরু করেছিল ১৯৭৩ সালের পর থেকে। ততদিনে আবার বিশ্বব্যাংক প্রথম ম্যান্ডেট (যেটা হল, সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে তবেই সমতুল্য মুদ্রা ছাপানো শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা) অকার্যকর হয়ে গেছিল ও এই পরাজয় সামলাতে পরে ১৯৭৩ সালে নতুন ম্যান্ডেটে বিশ্বব্যাংকের পুনর্জন্ম হয়েছিল। আর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রথম তৎপরতায় এসেছিল ১৯৭৫ সালের শেষভাগে। তবুও সেই থেকে বাংলাদেশে গত ৪৫ বছরে বিশ্বব্যাংক যে মোট ঋণ দিয়েছে তা গত তিন বছরে চীন একা যে অবকাঠামো ঋণ দিয়েছে তার চেয়েও কম। মূল কথা, বিশ্বব্যাংকের মোট সামর্থ্যরে চেয়ে চীনা সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু এতদিনে বিশ্বব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পেশাদারিতে ও ইন্ট্রিগিটিতে নিজেকে যতটা তুলনামূলক বেশকিছুটা স্বচ্ছ করতে সক্ষম হয়েছে, আর এই বিচারে আবার চীন অনেক পেছনে আছে, একথা মানতে হবে।

যদিও এ ব্যাপারে অবশ্য চীনের কিছু পাল্টা যুক্তি ও শেল্টার আছে।
কোনো দেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা ও সেই নির্মাণকাজ ধরা প্রসঙ্গে চীনের যুক্তিটা অনেকটা এরকম যে গ্রহীতা রাষ্ট্র-সরকার চোর হলে আমরা ওর সহযোগী হয়ে যাই ও বেশ করে ঘুষের ব্যবস্থা করে দেই। আবার তারা যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার সরকার হয় সে ক্ষেত্রেও আমরা তার সহযোগীই হয়ে যাই। যার বাংলা মানে হল, আমরা ঘুষ না দেয়ার কারণে কাজ হারাতে চাই না।

এছাড়াও চীন বলতে চায় (বুর্জোয়া) আমেরিকার চেয়ে তবু আমরা ভাল। কারণ ঐ ঋণগ্রহীতা দেশে ক্ষমতায় কে আসবে বসবে তা নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। দেখাই না। কিন্তু আমেরিকার ষোল আনা আছে। আমরা বরং এসবক্ষেত্রে আমেরিকার কাছে নিশ্চয়তা নিয়ে নেই যে, তার পছন্দে নির্ধারিত হবু যেকোনো সরকার যেন আমার অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে দেয়। তাহলে আমেরিকা সরকার বানাতে সেদেশ কী করছে এটা নিয়ে আমরা আর মাথাব্যাথা দেখাই না। চীন আসলে বলতে চায়, চীনের অর্থনীতির উত্থান ও বিকাশের এই পর্যায়ে তৃতীয় দেশে সরকারকে প্রভাবিত করতে আপাতত আমেরিকার সাথে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না জড়ানোর নীতিতে চলে চীন। এটাই চীনের আপাতত অবস্থান ও কৌশল।

কিন্তু উত্থিত অর্থনীতির চীনের বিরুদ্ধে বাস্তব এমন পরিস্থিতিতে, শুরু থেকেই বিশেষত একালে “চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প” নিয়ে হাজির হওয়ার পর  তবুও আমেরিকার পক্ষে আর বসে থাকা সম্ভব হয়নি। আমেরিকা চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে, নিজের গ্লোবাল নেতৃত্বকে চীনের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিরোধ দেখিয়েছিল চীনের বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ [AIIB] ব্যাংকের জন্মের সময় থেকে। এক কথায় দিন কে দিন আমেরিকা স্পষ্ট জানছিল যে, সত্তর বছর ধরে তার পকেটে থাকা গ্লোবাল নেতৃত্ব এটা চীন কেড়ে নিতে চ্যালেঞ্জ করতে উঠে আসছে। আর তাতে আমেরিকা ২০০৯ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, চীনের এই উত্থানকে আমেরিকা নিজের পাশাপাশি সমান্তরালে উঠতে বা চলতে দিতে চায় না। বরং যতদূর ও যতদিন পারে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে – এই নীতি নিয়েছিল। এই নীতিরই এক সর্বশেষ অংশ হল চীন ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলতে চাচ্ছে, এই ক্যাম্পেইন শুরু করা।

এই ক্যাম্পেইনে আমেরিকা যা প্রচার করতে চায় তা হল, প্রথমত, চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলা যে, চীন দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে আসেনি। বরং ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলে চাপ দিয়ে লুটপাট, মুনাফা লাভালাভ এই বাড়তি সুবিধা নেয়া আর অর্থ কামানো, যেন এটাই চীনের ব্যবসা। এমন একটা প্রচারণার আবহ তৈরি করেছে আমেরিকা যেটা ডাহা ভিত্তিহীন ক্যাম্পেইন। এমনকি সত্তর-আশির দশকের বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেও যেসব অভিযোগ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা করত এটা তাঁর তুল্য নয়। যেমন অভিযোগ করত যে, ঋণের অর্থ বিশ্বব্যাংক অপচয় বা নিজের কর্মীদের সে অর্থ পকেটে ভরা অথবা কনসালট্যান্টের নামেই ঋণের অর্ধেক টাকা মেরে দেয়া বা ফিরিয়ে নেয়ার অভিযোগ ইত্যাদি। অবশ্য যারা এই অভিযোগ তুলত এদের জানাই নেই যে, কনসালটেন্সিতে দাবি করা অর্থ মোট প্রকল্পের পাঁচ শতাংশের বেশি দেখানোও প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব। তবু এসব অভিযোগ চালু ছিল, আর তাতে যতটুকু বাস্তবতা ছিল, একালে চীনবিরোধী এই ক্যাম্পেইনে তাও নেই। তবে আবার চীনের বিরুদ্ধে কোনই অভিযোগই নেই, সে কথাও মিথ্যা। ঠিক যেমন বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এ কথাও ডাহা মিথ্যা।

প্রথমত কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়াই তথাকথিত জিটুজিতে প্রকল্প নেয়া, এটাই তো চীনা প্রকল্পের সবচেয়ে কালো আর বড় অগ্রহণযোগ্য দিক। যা চূড়ান্তভাবে অস্বচ্ছ। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক অন্তত নব্বুইয়ের দশকের শেষ থেকে সতর্ক ও সংশোধিত হয়েছে। কঠোর ইন্ট্রিগিটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও তা দিয়ে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া এখন নিয়ম হল যে, অবকাঠামো ঋণের দাতা যে দেশই হোক না কেন, তাতে ওই প্রকল্পের কাজ সেকারণে দাতাদেশকেই টেন্ডারে পাইয়ে দিতে এমন কোন সম্ভাবনা নাই। বরং বিশ্বাসযোগ্য খোলা টেন্ডার হতে হবে – বিশ্বব্যাংক যেখানে ইতোমধ্যেই এই নীতিতে পরিচালিত [যমুনা সেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা ছিল জাপান। কিন্তু জাপান এই সেতু প্রকল্পে কোন নির্মাণ কাজ পায় পাই।] , চীনা ঋণ নীতি এখনো এই মান অর্জন করতে পারেনি। কাজেই  টেন্ডার-ছাড়া কাজ পাওয়া এই চীনা অবস্থান গ্রহণযোগ্য হতেই পারে না।
তবে চীনের ক্ষেত্রে আবার এ কথাও সত্য যে, ঋণগ্রহীতা দেশ ঋণ-পরিশোধের সমস্যায় পড়ে যায় এমন বেশি ঋণ যদি হয়েও যায়, তবে চীন তা গ্রহীতা দেশের ঘটিবাটি সম্পত্তি বেঁধে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়, তা-ও কখনোই ঘটেনি। বরং পুরা বিষয়টাই পুনর্মূল্যায়ন করে – সুদ কমিয়ে দেয়া বা পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেয়া থেকে শুরু করে এক কথায় যেকোনো রি-নিগোশিয়েশনের সুযোগ এ পর্যন্ত সব দেশের ক্ষেত্রেই চীন দিয়েছে। যেমন মালয়েশিয়া বা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আমরা তাই দেখেছি। আর শ্রীলঙ্কার বন্দর নির্মাণের ঋণ পরিশোধের জটিলতার যেটা নিয়ে চীনা “ঋণের ফাঁদ” হিসাবে একে সবচেয়ে বড় উদাহরণ বলে ক্যাম্পেইন করা হয় তা মূলত শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির খেয়াখেয়ি থেকে উঠে এসেছে। নিজের মাজায় জোর নেই এমন শ্রীলঙ্কার একটা রাজনৈতিক দলকে বাগে এনে ভারত তাকে কাছে টেনে উসকানি দেয়া থেকে এটা তৈরি হয়েছে। যার কারণে অনেক বাড়তি সমস্যা উঠে এসেছিল। বন্দর তৈরি হয়ে যাওয়ার পরও তা চালু করা যায়নি। পরের পাঁচ বছর এটা অকেজো ফেলে রাখা হয়েছিল ও এতে আয়হীন ঋণের দায় আরো বাড়ছিল। তাই বলে আবার চীন ওই বন্দর নির্মাণ ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছিল এমন কোনো ব্যাপার সেখানে ছিলই না। কিন্তু  তারা নিজেরাই দুই দলের টানাটানি সামলাতে না পেরে নির্মিত এই বন্দরের মালিকানা শ্রীলঙ্কা নিতে অপারগ বলে চীনকে  জানালে চীন এক প্রস্তাব দেয়। যে ঐ বন্দর নিজে অপারেট করে চালিয়ে আয় তুলে আনার কোম্পানি হিসেবে চীন বাধ্য হয়ে অন্য এক চীনা কোম্পানি সামনে এনেছিল।  ঐ কোম্পানি পুরাটাই দায় নিতে চেয়েছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকার বন্দরের ৭০% মালিকানা কিনে নিতে দিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার সরকারের ঋণের দায় মুক্তি ঘটেছিল।  ব্যাপারটা আসলে ফয়সালা হয়েছিল এভাবে যে বন্দর নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার কোন ঋণ নাই। কারণ বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। আর শ্রীলঙ্কায় চীনা ঐ কোম্পানীর একটা সম্পত্তি আছে – সেটা হল ঐ বন্দর। আর এর পরিচালনা ও নিরাপত্তার ভার কেবল শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীই নিবে [চীনা নৌবাহিনী নিবে বলে প্রপাগান্ডা করা হয়েছিল], এটাই বাস্তবায়ন হয়েছিল।

ঋণের ফাঁদ – এই বিতর্কে আবার আর এক গুরুত্বপুর্ণ দিক হলঃ  প্রথমত, কোনো রাষ্ট্রে ‘অতিরিক্ত ঋণ” নিয়েছে – এটা বুঝাবুঝি ভিত্তি বা ক্রাইটিরিয়া কী?  এই তর্কের ভিত্তি কী তা কোনো দিনই সাব্যস্ত করা যায়নি যা, দিয়ে বুঝা যাবে অতিরিক্ত ঋণ নেয়া বা গছানো হয়েছে?  যে সব যুক্তি আমেরিকান প্রপাগান্ডার একাদেমিকেরা তুলেছেন তা হল ঋণ জিডিপির অনুপাত।  কিন্তু  নেয়া-ঋণ, জিডিপির কত পার্সেন্ট হয়ে গেলে সেটা অতিরিক্ত ঋণ বলে গণ্য হবে এর সর্ব-গ্রহণযোগ্য নির্ণায়ক কোথায়? তা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে কিস্তি না দিলে টুঁটি চেপে ধরতে হবে, চীনের এমন কোনো নীতিই নেই। কোন উদাহরণ নাই। আবার এই নীতি মানলে ভুটানে ভারতের বিনিয়োগও একই দোষে দুষ্ট। মানে ভুটানে ভারতও ঋণের “ফাঁদ পেতেছে” – এই একই যুক্তিতে অভিযোগ উঠানো যাবে, এর কী হবে?

আসলে কোন নেয়া-ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি, কিন্তু সাথে পরিশোধের সক্ষমতাও যদি বেশি হয় – অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি ভাল থাকে তাহলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও হারও কোনই সমস্যা নয়। আসলে কোন বড় প্রকল্প নেয়ার পরেই ওর ইকোনমিক ভায়াবিলিটি বা ফিজিবিলিটি টেস্ট করে নেয়া মানে সুনির্দিষ্ট ঐ দেশের ঐ সময়ের অর্থনীতি ঋণ পরিশোধের জন্য যোগ্য কিনা – এনিয়ে একটা স্টাডি করে নিলেই সব বিতর্কের মীমাংসা হয়ে যায়। যমুনা সেতুর বেলায় এই টেস্ট করা হয়েছিল আর তাতে পাস করেছিলাম আমরা। আবার বাস্তবে যমুনা সেতুর ঋণ পরিশোধের হার (যেহেতু এই সেতুর ব্যবহার অনুমিতের চেয়ে বেশি মানে ট্রাফিক বেশি, তাই টোল আদায় বেশি) অনুমিত হারের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই ঋণ যদি অনেক বেশিও হয় তাহলেই চীন “ঋণের ফাঁদ” পেতেছে এটা যেমন মিথ্যা, তেমনি আবার চীনের অবকাঠামো ঋণ নীতি সব স্বচ্ছ; তাও একেবারেই সত্যি নয়। এমনকি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীন আপটুডেট এখনকার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে, তাও সত্যি নয়।

সার কথায়, আমেরিকার এসব তৎপরতা নেতিবাচক ও চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা। আর ভারতও সুযোগ বুঝে এতে সামিল হয়েছে আর নিজের মিডিয়ায় এসবের প্রগান্ডায় ভরিয়ে ফেলেছে। এমনকি আমাদের প্রথম আলোও নিজস্ব কোন বাছবিচার বা ক্রিটিক্যাল অবস্থান না নেয়া ছাড়াই ভারতের মিডিয়ার খবর অনুবাদ করে ছাপাচ্ছে। ইদানীং অবশ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, হঠাৎ এমন প্রপাগান্ডায় ভাটা পড়েছে। হতে পারে প্রপাগান্ডাকারীদের সাথে আমেরিকার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে!

ইইউ চীনের বেস্ট বন্ধুঃ প্রপাগান্ডা করে খাওয়ার দিন যে শেষ করে দিবে
সেটা যাই হোক, আমরা আরও ইতিবাচক জায়গায় ইতোমধ্যে পৌছে গেছি। আসলে নতুন অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। ব্যাপ্যারটা হল, এই বিতর্ক বা প্রপাগান্ডাকে মেরে ফেলতে সক্ষম এমন নতুন এক স্টেজ তৈরি হয়ে গেছে। সেই আসরের প্রধান ইতিবাচক নেতা ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর এর সূত্রপাত, চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে চীন সারা ইউরোপকে সাথী হিসেবে পেতে যাচ্ছে – নতুন এই বাস্তবতা এখান থেকে। অথবা কথাটা উল্টা করে বলা যায়, চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পের ইউরোপে বিস্তৃতিকে ইইউ নিজের জন্য বিরাট সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছে ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর ঠিক এ কারণে আমেরিকার যেমন অবস্থান হলো চীনকে কোনো সহযোগী স্থান না দেয়া, চীনের সাথে কোন সহযোগিতা নয়। চীনের সাথে মিলে কোন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা নয় বরং চীনের স্ট্যান্ডার্ড নাই বলে অভিযোগ তুলে নাকচ করে চীনকে কোণঠাসা করা। ঠিক এরই বিপরীতে ইইউয়ের অবস্থান হলঃ চীনকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে উঠে আসতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সেই স্ট্যান্ডার্ড যৌথভাবে আরো উঁচুতে উপরে উঠাতে ভূমিকা নিতে হবে। আর এই শর্তেই কেবল বেল্ট-রোডসহ চীনকে আপন করে নিতে হবে।

এ ব্যাপারে গত ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল  চীন-ইইউ যৌথ সম্মেলনসহ ঘটনা অনেক দূর এগিয়ে কাজে নেমে গেছে। আর ঐ দিনই একমতের করণীয় নিয়ে এক যৌথ ঘোষণাও ফুল টেক্সট এখানে প্রকাশিত হয়ে গেছে। যদিও অবকাঠামো ঋণদানসহ অর্থনৈতিক তৎপরতায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি কথাটা শুনতে যত সহজ মনে হয়, ব্যাপারটা ততই সহজ-সরল নয়।
মূল কারণ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কথাটা বলা মানেই আপনা থেকেই উঠে আসবে জাতিসংঘের কথা। জাতিসংঘের ঘোষণা, জাতিসংঘের চার্টার, নানান আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন  – এককথায় অধিকারবিষয়ক সবকিছুই। মূল কারণ জাতিসংঘ দাঁড়িয়ে আছে ‘অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ – এরই একটা সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে।

কিন্তু তাতে সমস্যা কী?
সমস্যা বিরাট। মৌলিক সমস্যাটা হল কমিউনিস্ট রাজনীতি অধিকারভিত্তিক রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা নয়। যদিও জাতিসঙ্ঘের পাঁচ ভেটোওয়ালা রাষ্ট্রের দুটাই কমিউনিস্ট। অন্তত চীন ও রাশিয়া কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের রাষ্ট্র। যার সোজা অর্থ হল ‘অধিকারের রাষ্ট্র’ কথাটায় কমিউনিস্টদের ‘ঈমান’ কম। অধিকারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি এটা কমিউনিস্টদের রাজনীতি নয়, কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক এজেন্ডাও নয়। অথচ কমিউনিস্টরাও বহাল তবিয়তেই জাতিসঙ্ঘে সক্রিয় আছে। কিন্তু জাতিসংঘের যেসব জায়গায় অধিকারবিষয়ক নীতি বা কথাবার্তায় প্রাবল্য আছে, সেসব সেকশন বা বিভাগ অথবা ইউএন- হিউম্যান রাইট ধরণের উপ-সংগঠনে কমিউনিস্টরা তেমন অংশ নেয় না বা পাশ কাটিয়ে চলে। কখনও আড়ালে টিটকারীও দেয়। এগুলো এতদিনের রেওয়াজের কথা বলছি।
কিন্তু আমরা যদি এ নিয়ে চীন-ইইউয়ের যৌথ ঘোষণা পাঠ করি, তাহলে বুঝব ঘটনা আর সে জায়গায় নেই। পানি অনেকদূর গড়িয়েছে। উল্টা এই প্রথম যৌথ ঘোষণায় জাতিসঙ্ঘের অধিকারবিষয়ক ভিত্তিগুলোর রেফারেন্স উল্লেখ করে বলা হয়েছে চীন ও ইইউ এগুলোকে মেনে চলে ও ভিত্তি মনে করে – একমতের সাথে। এমনকি বলা হয়েছে, এখন থেকে প্রতি বছর চীন ও ইইউ জাতিসংঘের মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝি বাড়াতে ও একমত হতে আলাদা করে নিজেদের যৌথ সেশনের আয়োজন করবে।

আরও অগ্রগতিঃ
এমনকি চীন-ইইউ ঐ সম্মেলনের পরে এ বছরের চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনেও [২৭ এপ্রিল ২০১৯] যে যৌথ ঘোষণা গ্রহীত হয়েছে সেই যৌথ ঘোষণাও আসলে চীনা-ইইউয়ের আগের যৌথ ঘোষণার ছাপে তৈরি করা।

এই সবগুলো অভিমুখ বিচারে, বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগে বিরতি এবং চীনা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের কথা যেগুলো শোনা যাচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হল চীন অভ্যন্তরীণভাবে অবকাঠামোতে ঋণদান বা বিনিয়োগ নীতি বদলাচ্ছে। এরই ছাপ এখানে পড়ছে বলে অনুমান করা আশা করি ভুল হবে না। লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট! চীন আবার আরও স্বচ্ছ নীতিতে অবকাঠামো ঋণ দিতে এগিয়ে আসবেই। এসব তারই পুর্বপ্রস্তুতি!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত  – এর ১৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে পদার্পন উপলক্ষে গত  ২৭ অক্টোবর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে বাংলাদেশে কেন স্থগিত হলো চীনা ঋণ!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদুল ফিতর ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯

প্রথম অনলাইন প্রকাশঃ ০৪ জুলাই, ২০১৯

https://wp.me/p1sCvy-2C8

 

[এই লেখাটা গত ঈদে মানে, গত মে মাসে ঈদুল ফিতরের ঈদ সংখ্যা নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে ছাপা হয়েছিল। সে হিসাবে এর প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯। কিন্তু এর কোন অন লাইন ভার্সান তারা করে নাই। সেকারণে  ঐ ছাপা ভার্সানেরই হুবহু সফট কপি, (নতুন কোন এডিট করা ছাড়াই) এখানে নতুন করে আনা হল। সাথে ছাপা ভার্সানের প্রথম পৃষ্ঠার একটা স্কান কপি ছবি আকারে উপরে সাটানো হল। লেখাটা যখন শেষ করে জমা দিয়েছিলাম, সেটা ছিল ১ মে ২০১৯।
ফলে মে মাসের পর থেকে ফোনের ৫জি টেকনোলজি ইস্যুতে চীন ও আমেরিকার গভীর স্বার্থ সংঘাত আর বিপরীতে চীন ও ইউরোপের পারস্পরিক স্বার্থ খাপ খাইয়ে নেয়ার সম্পর্ক সংক্রান্ত যা কিছু ডেভেলবমেন্ট ঘটেছে তা এখানে আপডেট করা নাই। সেসব নিয়ে আলাদা আবার লিখতে হবে। তবে ৫জি নিয়ে চীন-আমেরিকার সংঘাত এখনও চলছে।হুয়াওয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা সাবরিনা মেঙ’ কে আমেরিকার অনুরোধে কানাডা গ্রেফতার করেছিল, সাত মাস আগে। কানাডা-আমেরিকার মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি আছে। তাই আমেরিকায় দায়ের করা এক মামলার অভিযোগ সাবরিনার কানাডা সফরের সময় যেন তাঁকে গ্রেফতার করে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়া হয় – সেই আবেদন আগেই কানাডাকে জানিয়ে রেখেছিল আমেরিকা। তাই  ঐ কর্মকর্তা সাবরিনার কানাডা ট্রানজিট সফরে থাকার সময়ে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল কানাডা; যাতে কানাডারই আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে  কানাডা সরকার তাঁকে আমেরিকার হাতে তুলে দিতে পারে। বর্তমানে সাবরিনা জামিনে তবে কানাডা ত্যাগ করতে পারবে না, এই শর্তে যে মামলা না মিটে যাওয়া অব্দি। আর স্থানীয় থানায় রিপোর্ট, সাথে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে ও মামলা মোকাবিলা করে যেতে হবে। ইতোমধ্যে চীনা ৫জি টেকনোলজি দুনিয়া কাঁপিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।]

চীনা ইন্ডাস্টিইয়াল টেকনোলজি কোন পর্যায়ে আছেঃ
চীনা শিল্প-পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত টেকনোলজি কেমন পর্যায়ের, কেমন মানসম্পন্ন অথবা কোন স্তরে আছে চীনা টেক-শিল্প? এই প্রসঙ্গে চীনা টেকের মান যেন খুবই নিচে এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে চীনকে ব্যঙ্গ করা, নিচা দেখানো বা খোঁটা দিয়ে কথা বলা এমন লোকের কোনো অভাব নেই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে মানে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্ব এখন বাঁক পরিবর্তনের পর্যায়ে আছে, চলছে। এমনই আমাদের চলতি দুনিয়ায় চীনা উত্থানকে, সঠিক অথবা বেঠিকভাবে, যারা নিজ নিজ রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের পরাজয় হিসেবে দেখে থাকে ( ফলে অনেক সময় এতে তাদের অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা চেপে রাখতে পারে না, প্রকাশ হয়ে পড়ে) এমন রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষে আছে ভারত। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, তবু চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন যথেষ্ট গভীর।

ভারতীয় অর্থনীতিতে বিদেশী বিনিয়োগ তা, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অথবা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ (মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট, FDI)  এই দুই অর্থেই ভারতের অর্থনীতিতে চীনা বিনিয়োগ এখন এক বিরাট ভূমিকা ও অবদান নিয়ে হাজির আছে। যেমন ব্রিকস (BRICS) উদ্যোগ হল,  বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের এক বিকল্প গড়তে চীনের সাথে মোট পাঁচ রাষ্ট্রের এক উদ্যোগের নাম, চীন যেখানে মূল উদ্যোক্তা। ভারতও অবশ্যই এই উদ্যোগের সাথে আছে, শুধু তাই না। এই ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) নামে আর এক বিকল্প-বিশ্বব্যাংকও চালু আছে। কাজ ও তৎপরতার ধরনের দিক থেকে এটাও এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের নেতৃত্বে যে মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক আছে (যেখানে চীনের ৩০% মালিকানার পরই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মালিকানা ১০%) এরও বাইরের প্রতিষ্ঠান NDB, আর তা আর এক চীনা বিকল্প-বিশ্বব্যাংক অবশ্যই। যদিও মনে রাখতে হবে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) -এটা এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক থেকে একেবারেই আলাদা এক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তুলনায় খুবই ছোট। তবে এই দুই বিকল্প-ব্যাংকের মধ্যে মূল ফারাক বুঝতে গেলে এটা মনে রাখলেই চলে যে, আসলে ব্রিকস উদ্যোগের নামে চলা যেকোনো তৎপরতা তা কেবল চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তাতে সে তৎপরতা এই (NDB) ব্যাংকের সুবিধাদির গ্রহীতা বা দাতার যে ভূমিকারই হোক না কেন। মানে পাঁচের বাইরের আর কেউ এর সদস্য না, ফলে ব্যাংকের সুবিধাদি তাদের বাইরের কেউ পাবেও না। আবার নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ দেয়া হয়েছে ভারতকে আর সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতা এই ব্যাংকের একমাত্র বিনিয়োগ ‘খাতক’ হল ভারত।  নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কেবল পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের বিপরীতে তাহলে এআইআইবি ব্যাংকের সাথে এর মূল ফারাকটা হল, সর্বশেষ লেবাননকে সাথে ধরলে এআইআইবি ব্যাংকের মোট সদস্য ৮৭ রাষ্ট্র, যারা সবাই এআইআইবি-এর সুবিধাদি পাওয়ার যোগ্য। সার কথায় বোঝা গেল চীনের সাথে ভারতের গাঁটছড়া ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অনেক গভীরের, উপরে উপরে তা যতই রেষারেষির বলে দেখাক না কেন।

কিন্তু তবু ভারতের কূটনীতিতে বাস্তব কৌশলগত তৎপরতাগুলোর সবটাই চীনবিরোধী করে সাজানো। এমনকি সম্প্রতি অভ্যন্তরীণভাবে বিজেপির উদ্যোগের চীনা-পণ্যবিরোধী এক প্রপাগান্ডাও চালু হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া আরো আছে। যেমন ভারতের বাংলার বাইরে, উত্তরে হিন্দি-বলয়ে বা দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য রাজ্যগুলোতে মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হিসেবে দেওয়ালি পালিত হতে দেখা যায়। বাংলায় যেটাকে আমরা কালীপূজা নামকরণ হয়ে পালিত হতে দেখি, এটাই সেই দেওয়ালি। যদিও বাংলার মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হয়ে আছে আবার দুর্গাপূজা। আর কালীপূজা বাংলাতেও আছে, তবে সেটা সেকেন্ডারি উৎসব। এখন এই দেওয়ালিকে বাণিজ্য ও বাজারের দিক থেকে দেখলে, ভারতে এই প্রধান উৎসবে বাজি বা পটকার বাজারটা বিশাল, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মত। এ ছাড়া এই উৎসবের সাজসজ্জার আলোকবাতি, খেলনা বা আনুষঙ্গিক আইটেমসহ ধরলে এমন মোট আমদানি বাজার বছরে ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের। ওদিকে চীন থেকে ভারতের বাজারে বছরে আমদানির মোট পরিমাণ ৭০ বিলিয়নের ওপরে। আর এই আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে বিশেষত বাজি-পটকা এতদিন যা ভারতে স্থানীয়ভাবে তৈরি হত, বিশেষ করে তামিলনাড়ু–র শিবাকাসি শহরে (ভারতের ৯৫ ভাগ পটকা এখানে তৈরি হয়, আর ১০ লাখের মতো লোক কাজ করে) তৈরি পটকার দখলে ছিল এই বাজার। কিন্তু এক্ষেত্রে চীনা পণ্য হল এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিশেষ করে দামের কারণে। সস্তা চীনা পণ্যের ঠেলায় স্বভাবতই ভারতীয় উৎপাদকরা অস্থির ও নাখোশ। তাই গত ২০১৬ সাল থেকে অভ্যন্তরীণভাবে এই চীনা-পণ্যবিরোধী একটা ন্যাশনালিজমের বয়ান তৈরি হতে দেখা গেছিল, যাতে প্রধান তাল দেয়া অবস্থানটা বিজেপির।

মূল বিষয়টা হল, আমাদের মতো দেশে ছোটখাটো সমস্ত পণ্য, যা আগে নিজ নিজ দেশে তৈরি করতে সক্ষমতা ছিল ফলে বাজারও নিজ দখলে ছিল সেই সব বাজারে এখন চীনা সস্তা পণ্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়ে গিয়েছে। এর পেছনের প্রধান কারণ “বাল্ক (bulk) প্রডাকশন লাইন”। কোনো পণ্য উৎপাদনের সময় একেকটা ব্যাচে তা তৈরি হয়। আমাদের মতো দেশের কারখানায় ট্রাডিশনাল উৎপাদনের চেয়ে চীনা উৎপাদনের আলাদা বৈশিষ্ট্য হল সেখানে একেকটা উৎপাদন ব্যাচ আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ লম্বা শুধু তাই না, এক সাথে বসা ব্যাচের সংখ্যাও কয়েকগুণ বেশি। এতে উৎপাদকের সুবিধা হল কাঁচামাল কেনার সময় বিপুল ক্রয়ের সুবিধায় দামে কম পাওয়াসহ পণ্য তৈরির ব্যাচ সাইজের কারণে বহু পর্যায়েই উৎপাদনের ওভারহেড খরচ কমিয়ে ফেলতে পারে। আর এটা এক বাল্ক বা বিপুল সাইজের উৎপাদনের কারণে তাতে চীনা পণ্যমূল্য আমাদের মত দেশের চেয়ে অনেক সস্তা, বিশেষ করে যেমন প্লাস্টিক পণ্যে যা কখনো একেবারে অর্ধেক হয়ে যায়। প্লাস্টিকের সামান্য টুথব্রাশ উৎপাদনের বেলায় চীনা সস্তা দামের ঠেলায় আমাদের উতপাদন সক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে।

এরই প্রতিক্রিয়ায় ভারত বা আমাদের মতো দেশের ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী ‘ন্যাশনালিস্ট’ হওয়ার চেষ্টা করে, ন্যাশনালিজমের ‘বয়ান’ এর গাঁথুনি খাড়া করার চেষ্টা করে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের আবার মোকাবিলার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হল, এসব নাকে-কাঁদুনি “ন্যাশনালিস্ট” হয়ে থাকা বেকার; এরচেয়ে বরং কাজের কিছু পদক্ষেপ তারা নিতে পারে। যেমন প্রাণ গ্রুপ; যেসব প্লাস্টিক পণ্যে, অন্তত মূল্যের দিক থেকে চীনাদের সাথে পারা যাবে না অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেসব পণ্য ‘প্রাণ’ নিজেই চীন থেকে আমদানিকারক হয়ে এনে বিক্রি করতে শুরু করেছে। আর নিজ প্রডাকশন লাইন বদলে অন্য প্রডাকশনে নিয়ে গিয়েছে, অনুমান করা যায়।

যদিও ন্যাশনালিজমের বুঝ থেকে  “দেশে ব্যবহার্য সব জিনিস নিজেদেরই বানাতে পারতে হবে” এটা কতটা সঠিক বুঝ, কাজ হয় কি না ও বাস্তবোচিত কি না অথবা তা আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা এমন  “অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম” এর পালটা-চিন্তা হাজির আছে। অথচ পরীক্ষা করা হয়নি যে এটা আদৌ অর্থপূর্ণ পথ কি না? ভায়াবাল কি না? নাকি এটা জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও শ্রমঘণ্টার অপচয় বা টেকনোলজি ইত্যাদিতে পিছিয়ে পড়ে থাকা হবে? যদিও আবেগের ন্যাশনালিজম বহু আগেই প্রশ্নবিদ্ধ। এখন এই কঠিন বাস্তব প্রশ্নগুলো একালে আরো সামনে এসে গেছে, স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তবুও বারবার সহজেই সস্তা সুড়সুড়ি তৈরি করা যায় বলে দেখা যাচ্ছে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ থেকেই যাচ্ছে, জাগিয়ে উঠানো হচ্ছে।

ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতি উগ্র ন্যাশনালিস্ট, এটাই তার মূল ধারা। ওদিকে আবার চীন-ভারতের অমীমাংসিত সীমান্ত আর তা থেকে সামরিক সঙ্ঘাতের পুরানা (১৯৬২) স্মৃতি বা নতুন করে কিছু ঘটার একটা বাস্তবতা আছে বলে মূলত এসবকে পুঁজি করে ভারতে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ এর উসকানি ধারা খুবই প্রবল। বিশেষ করে ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী বয়ান সহজেই খাড়া করতে পারে। এবং করে লড়তে থাকে। সেখান থেকেই বয়ানের ডালপালা গজায় যে চীনা পণ্যের মান, এর টেকের মান খুবই খারাপ, ঠুনকো ইত্যাদি ইত্যাদি!

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে, লো-টেকনোলজি লাগে এমন পণ্যে – চীনারা পণ্য মান খারাপ করে সস্তা দামে বাজার দখল করে এগোতে হবে – এটাই তাদের সবকালের এগোনোর পথ ও পরিকল্পনা – এমন বুঝের কোনো অনুমান করা ভুল হবে। তাহলে কিভাবে দেখতে হবে? আসলে তাদের মূল বিষয় ছিল আশির দশকে চীনা ক্যাপিটালিজম উত্থানের শুরুর দিকের নিজ সস্তা শ্রমের সুবিধাকে কাজে লাগানো আর “বাল্ক প্রডাকশন লাইনে” উৎপাদন করে বাজারে নেতা হওয়া। যেমন আরেক উদাহরণ, আমাদের মত দেশে কম্পিউটার পণ্য সস্তায় পাওয়ার পেছনে চীনের দুই উতপাদন সূত্র – সস্তা শ্রম ও বাল্ক প্রডাকশন – হল মূল কারণ। আবার যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে মান একটু গুরুত্বপূর্ণ সেই বাজারটা চীনারা তাইওয়ান, ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরের (একালে ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের) হাতে ছেড়ে দিয়েছে বা বাধ্য হয়েছেও বলতে পারি।

ইদানীং চীনা উৎপাদকদের মধ্যে আর এক আওয়াজ জোরদার হচ্ছে যে, চীনা শ্রম আর সস্তা নয়, মানে ন্যূনতম মজুরি চোখে পড়ার মত অনেক বেড়ে গেছে। ফলে আগের সেই বাল্ক প্রডাকশন কোম্পানি এখন চীন ছেড়ে সস্তা শ্রমের কোন ভিন দেশে কারখানা স্থানান্তর করতে চায়, এটা বড় ইস্যু এখন চীনে।

আবার এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চীন নিজের এমন পরিচয় চায় না যে দেশ-বিদেশে মানুষ চীনকে ‘লো-টেকনোলজি’ পণ্যের দেশ হিসেবে চিনুক অথবা এটাই তার ভবিষ্যৎ পরিচিতি হয়ে দাঁড়াক। ফলে যেসব হাই-টেকনোলজি চীনের করায়ত্বে নাই তা আনতে পশ্চিম থেকে কোম্পানিগুলোকে জয়েন্ট ভেঞ্চারের কোম্পানি হিসেবে চীনে আনার তৎপরতাও প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে যেমন গাড়ি তৈরির শিল্পে। পশ্চিমের কোম্পানিগুলোও আসতে খুবই আগ্রহী কারণ পশ্চিমের দিনকে দিন বাজার সঙ্কোচনের বিপরীতে চীনে বাজার উদ্যমী ও সচল (vibrent) বলে।

এভাবে লো আর হাইটেকের ছাড়াও আর এক দিকের চীনা কৌশল হল কোন একটা উতপাদন খাতে লেটেস্ট টেকের শীর্ষ নেতা হওয়া। তেমন সেই খাত হল মোবাইল টেলিফোন। তারবিহীন স্মার্ট টেকনোলজি। চীনা এমন দুই পাইওনিয়ার কোম্পানি হল, বেসরকারি হুয়াওয়ে (HUAWEI) ও সরকারি জেডটিই (ZTE)।

মোবাইল টেকনোলজির ব্যবসা ফলে এর উৎপাদনের পুরাটা বলতে গেলে তা মূল তিন ধরণের উতপাদক কোম্পানিতে বিভক্ত। এক হল, আমরা ব্যবহারকারী পর্যায়ের উতপাদক মানে, ফোন সেটের (mobile phone set) উৎপাদন ও বাজারজাত করা। দুই হল, আমাদের গ্রামীণ বা বাংলালিঙ্কের মত কোম্পানিগুলো; যাদের ভূমিকা হল ব্যবহারকারিদের ফোনের সেটে – নেটওয়ার্ক কানেকশনসহ ফোনের সার্ভিস জোগান দেয়া। এদেরকে ক্যারিয়ার (carrier) কোম্পানিও বলে থাকে অনেকে। আর তৃতীয় ধরণটা হল, আর এক টেক উৎপাদক যারা গ্রামীণদের মত কোম্পানির জন্য বেজ যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে তা সরবরাহ করে থাকে। স্বভাবতই এসব বিপুল যন্ত্রপাতি সাধারণ মানুষ পর্যায়ে সরাসরি ব্যবহার করার জন্য না। তবে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই ক্যারিয়ার কোম্পানিগুলো পাবলিককে সার্ভিস জুুগিয়ে থাকে, তাই পাবলিক এই টেকনোলজির পরোক্ষ ব্যবহারকারী। এ কারণে এমন যন্ত্রপাতিকে ‘ব্যাকঅ্যান্ড’ (back-end) টেক বা পেছন-ঘরে লাগে এমন যন্ত্রপাতি বলে। অর্থাৎ গ্রামীণের মত কোম্পানিগুলোই ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতির মূল ক্রেতা বা গ্রাহক। আর এটা ব্যবহার করেই সাধারণ মানুষকে তারা নানান ফোন সার্ভিস যুগিয়ে থাকে।

এই মোবাইল টেকনোলজিতে চীন শীর্ষপর্যায়ের টেক-উৎপাদন ও সরবরাহকারী পরিচয় হাসিল করে ফেলেছে। টেকনোলজিতে উঁচুমান – এই পরিচয় চীনা পণ্যে লাগানোর ক্ষেত্রে – ফোন কোম্পানির নাম এখন হুয়াওয়ে (HUAWEI)। তবে এই কোম্পানি ফোনসেট এবং ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি  – দুটোই উৎপাদন করে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের কাছেও ‘হুয়াওয়ে’ নামটা পৌঁছে গেছে ও পরিচিত। হুয়াওয়ে ব্যক্তি-মালিকানাধীন কোম্পানি, তা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট কায়দায় এর কর্মচারীরাও প্রত্যেকে স্বল্প হলেও সবাই শেয়ারহোল্ডার মালিক। এ ছাড়া মালিকেরা বা পরিচালক বোর্ডের মেম্বারেরা রোটেশনালি মানে ঘুরে ঘুরে সবাই নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকেন। এমন অনেক কিছুই এর নতুন বা ভিন্ন। এ ছাড়া এই কোম্পানি চীনা সরকাররেও আদরের চোখের মনির মত। কারণ এটা  সামগ্রিকভাবে চীনা টেকনোলজিক্যাল উচ্চতা কত, তা কতটা ওপরে উঠেছে এর চিহ্ন সেট করেছে।

আর ঠিক ততটাই যেন এটা আমেরিকার চক্ষুশূল। অনেকগুলো কারণে। প্রথমত কী দিয়ে বুঝা যাবে হুয়াওয়ে উঁচুমানের টেকনোলজির? মোবাইলে টেকনোলজিতে ওয়ান-জি, টু-জি করে লেটেস্ট হলো ফাইভ-জি। মোবাইলে টেক্সট (লেখা), ভয়েজ (শব্দ) আর ভিডিও (ছবি) পাঠানো – এই তিনটাই আদান-প্রদান করা যায় কি না; আর তা কত দ্রুত যায় এরই প্রকাশ হল – এই ওয়ান থেকে ফাইভ জি (ইংরেজি জি মানে এখানে জেনারেশন বা প্রজন্ম) পাঁচ প্রজন্মের টেকনোলজি।

৫জি এর স্পিড

যার মূল জিনিসটা হল, ফোন নেটওয়ার্কে চলাচলকারী ডাটার গতি। যেমন একটা ধারণা দেয়া যাক, ১৯৯১ সালে চালু ২জি টেকনোলজি দিয়ে একটা পাঁচ গেগাবাইটের পূর্ণ সিনেমার ডাটা নামিয়ে আনতে সময় লাগত এক মাসেরও বেশি। তাই তা করতে যায়নি কেউ। কিন্তু গত ২০১০ সাল থেকে চালু হয়ে থাকা চলতি ৪জি টেকনোলজিতে (যা আমরা বাংলাদেশে দেখি নাই, গল্প আর “কে দিয়েছের” চাপাবাজি শুনেছি। অভিজ্ঞতা পাইনি বলাই ভাল) লাগে ৭ মিনিট। সেই পাঁচ গেগার সিনেমা আসন্ন নতুন ৫জি টেকনোলজিতে লাগবে মাত্র ৪০ সেকেন্ড। [৫জি সাপোর্ট করে এমন ফোনসেট এখনো বাজারে আসনি, তবে এ বছরই আসবে।]

এই ৫জি টেকনোলজি এখন একটা রাষ্ট্রের টেক-উচ্চতা কতটা তা মাপার বিষয় (স্টান্ডার্ড) হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন আমেরিকার কোন কোম্পানি এই টেকনোলজি নিয়ে কখনও কাজই করেনি। বিপরীতে এই টেকনোলজি নিয়ে নিজের ল্যাবে গবেষণা ও উন্নয়ন শেষ করে, এরপর বাণিজ্যিক উৎপাদনে এবং বিক্রিতে চলে গেছে চীনা হুয়াওয়ে। শুধু তাই না, ২০১৮ সালের মোট বিক্রিতে ইতোমধ্যে কিছু ৫জি টেকসহ বিক্রি করেছে ১০৮ বিলিয়ন ডলারের। এই বিক্রি, তাও আবার সরাসরি ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা হুমকির মধ্যে যে চীনা ৫জি টেকনোলজি [বেসরকারি হুয়াওয়ে ও সরকারি জেডটিই ] বাজারে আনা হয়েছে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের গোয়েন্দাগিরির জন্য। অন্যের রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ ও তা নিজ দেশে পাচারের জন্য – এই হল সেই ভীতিকর মিথ্যা প্রপাগান্ডা। শুধু তাই না, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ নির্দেশ জারি করেছে যে কোনো আমেরিকান সরকারি অফিস এ দুই কোম্পানির কোনো কিছু কিনতে ও ব্যবহার করতে পারবে না [President Donald Trump in August, which bars federal agencies and their contractors from procuring its equipment and services]। এই আইনের বিরুদ্ধে খোদ হুয়াওয়ে নিজে আমেরিকার টেক্সাসের আদালতে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নতুন দুনিয়ায় মাতব্বরিতে নেতা আমেরিকার সাথে সবসময় ছোট-তরফ বা প্রধান সাগরেদ হয়ে থেকেছে ইউরোপ। সম্ভবত এবারই প্রথম আমেরিকান নেতাগিরির শেয়ার-ভাগ সাগরেদ নিতে চাইছে না। ইউরোপ আমেরিকার হাত ছেড়ে ভেগে আগে বাড়তে যাচ্ছে।

এ বছর ‘মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস” [Mobile World Congress] যেটা সাধারণভাবে বললে ‘মোবাইল টেকনোলজির গ্লোবাল বাণিজ্যমেলা, তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৫-২৮ ফেব্রুয়ারি, স্পেনের বার্সিলোনায়। কিন্তু ট্রাম্পের প্রপাগান্ডাীখানে এসে ফেল করে যায়। মানে চীনা হুয়াওয়ে সম্পর্কে আমেরিকার প্রপাগান্ডা ও ভীতি ছড়ানো আর তা ইউরোপে কাজ করাতে ব্যর্থ হয় আমেরিকা এই সম্মেলন থেকেই। এটা ফোন ব্যবহারকারি সাধারণ মানুষের মেলা নয়, ফলে সাধারণ ক্রেতাদের বাদে বা তাদের বাইরে, মোবাইল নিয়ে গবেষণা, উৎপাদন থেকে বাণিজ্য বিতরণ পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা টেলিকম এক্সিকিউটিভদের মেলা ছিল এটা। ইউরোপের পলিটিকো ম্যাগাজিনের হিসাব মতে প্রায় এক লাখ [where some 100,000 telecoms executives had gathered] এমন টেলিকম নির্বাহীর সমাগম হয়েছিল এখানে। এমনিতেই এই মেলার বড় খরচের  দায়ভার নিয়েছিল হুয়াওয়ে। সে সাথে নিজের ৫জি টেকনোলজিসহ সব পণ্যের ব্যাপক প্রদর্শনীও করেছিল। এই মেলা থেকেই মোবাইল উতপাদন ব্যবসার দুনিয়ার বড় বড় কুতুবেরা বিশেষ করে যারা ইউরোপীয় যেমন, নরওয়ের নোকিয়া, ব্রিটিশ ভোডাফোন, সুইডিশ এরিকশন ইত্যাদির, আমেরিকান প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এদের আপত্তিগুলো সামনে প্রবলে আসতে থাকে।

তাদের বক্তব্যের সারকথা হল, তারা আমেরিকার কাছে খাস প্রমাণ চাচ্ছে, নইলে তারা হুয়াওয়ের টেকনোলজি কিনতে ও ব্যবহার- সম্পর্ক করতে থামবে না। অর্থাৎ চীন বা হুয়াওয়েকে রাজনৈতিক কারণে কোণঠাসা করার কাজে যুক্ত হতে তারা অস্বীকার করে বসলেন। রয়টার্স বলছে, ওই মোবাইল মেলাতে ভোডাফোনের প্রধান নির্বাহী মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে, আমরা “ফ্যাক্টস ভিত্তিক মূল্যায়ন দেখতে চাই” [“We need to have a fact-based risk-assessed review,” – Nick Read, chief executive of Vodafone]। আর হুয়াওয়ের টেক ব্যবহার করব না বলার খারাপ পরিণতিও আছে। আমরা যদি অস্পষ্ট তর্কে সিদ্ধান্তহীন থাকি তবে ইউরোপ আপডেট টেকনোলজিতে দুই বছর পিছিয়ে যাবে। আর ইতোমধ্যে আমরা যারা হুয়াওয়ের ৪জি টেক ব্যবহার করছি সেগুলোর কী হবে?” [ Read said it was not a simple case of barring Huawei from future 5G networks as the company’s equipment was already in use in 4G networks in Europe that would be the foundation of the new technology……“It will delay 5G in Europe by probably two years,” he said.] ।

ওদিকে ওই মেলা থেকে এক টেকনিক্যাল আলোচনায় হুয়াওয়ের চেয়ারম্যান সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বললেন আমেরিকার হাতে কোন প্রমাণ নাই [The U.S. security accusation on our 5G has no evidence, nothing,”] অথচ প্রপাগান্ডা করছে।  তিনি খোঁচা দিয়ে বলেন, “হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করার মিথ্যা অভিযোগ আনার আগে আমেরিকা স্নোডেনকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারে [those concerned about government spying “can go ask Edward Snowden” ]। (আমেরিকান টেক কন্ট্রাকটারের এক স্টাফ অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেন প্রমাণসহ দেখিয়ে দেন যে আমেরিকান সরকার কিভাবে গ্লোবালি মোবাইল ডাটা হ্যাক করে থাকে। এই তথ্য ফাঁস করা, সেই থেকে তিনি আমেরিকা থেকে পালিয়ে রাশিয়াতে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে বাস করছেন।)

তবে অনেক তর্ক-বিতর্কে উঠার পরে ঐ বার্সেলোনা মেলা থেকেই হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগ হাল্কা হয়ে যেতে থাকে। ইউরোপীয় পলিটিকো বা আমেরিকান ব্লুমবার্গ মিডিয়া বলছে, মূলত ট্রাম্পের একটা মন্তব্য থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি। ব্যাপারটা হল, বর্তমানে চীন ও আমেরিকা এক বাণিজ্য যুদ্ধে পরস্পরের ওপর বাড়তি আমদানি শুল্ক আরোপের ঝগড়ায় আটকে আছে। যার সর্বশেষ অবস্থা হল তারা এখন আলাপ আলোচনার মধ্যে আছে যাতে মনে হচ্ছে তারা একটা আপসের পথ খুঁজে পেতে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই এখনও ফাইনাল নয়। সেই আলোচনার সময়ে এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলে বসেন যে হুয়াওয়ে কেসটা আমাদের আলোচনায় দরকষাকষিতে হাতিয়ার হতে পারে [“President Trump has made a big mistake by allowing the Chinese to draw the conclusion that the two are related”]। এ কথা জেনে যাওয়ার পর থেকে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ফলে তা থেকে টেক কোম্পানিগুলোও হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগগুলো আর গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এরপর থেকে আমেরিকা ইউরোপকে আর নিজের নৌকায় তুলে নিতে পারেনি।

এদিকে বিতর্কেরও কোনো শেষ হয়নি। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এ নিয়ে খুবই ভোকাল। তিনি এক পাবলিক আলোচনাতে বলছেন, তিনি দুটো বিষয়ে নীতিগতভাবে বিশ্বাস করেন না। এক, আমেরিকার এমন সেনসেটিভ নিরাপত্তা-বিষয়ক অভিযোগ পাবলিকলি তুলল কেন? আর দুই-একটা কোম্পানিকে একঘরে করতে হবে কারণ সে একটা বিশেষ দেশের [“First, to discuss these very sensitive security questions publicly, and second, to exclude a company simply because it’s from a certain country.’] – একটা বিশেষ দেশ বলতে বলা বাহুল্য তিনি বুঝিয়েছেন চীনের হুয়াওয়ে] কোম্পানি। এরপর তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে শক্ত এথিক্যাল প্রশ্ন তুলে বলছেন, “চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বলে তার সাথে এভাবে লড়ব। বরং আমাদেরকে অবশ্যই ন্যায্য আইনকানুন ও পারস্পরিক স্ট্যান্ডার্ডের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আর আমরা ‘বহুরাষ্ট্রীয় দুনিয়া ব্যবস্থা’ মাল্টিলেটারিজম ত্যাগ করতে পারব না, [Of course we’re in a systemic competition with China,’’ Merkel said in a separate speech at the same event. “But the answer can’t be that we fight those who are economically strong, we must stand up for fair, reciprocal rules and not give up on multilateralism.’’]।

এ কথাগুলো তিনি বলেছেন কারণ ইতোমধ্যে এ নিয়ে ন্যাটোর মিটিংয়ে চরম তর্কাতর্কি ও আর আমেরিকান হুমকি প্রদর্শন ঘটে গেছে। আমেরিকা হুমকি দেয় যে চীনা ফোন টেকনোলজি ৫জি ব্যবহার জার্মান বন্ধ না করলে তারা আর আগের মত জার্মানির সাথে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করবে না। ন্যাটোর জেনারেল স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, “ন্যাটো ফোর্স জার্মানির সাথে ‘বার্তা যোগাযোগ ছিন্ন” করবে যদি তারা হুয়াওয়ের সাথে সম্পর্ক রেখে কাজ করে’ [The threat escalated when Nato’s Supreme Allied Commander in Europe, US General Curtis Scaparrotti, warned Germany that Nato forces would cut communications if Berlin were to work with Huawei.]। কিন্তু মার্কেলের অবস্থান আসলে খুবই পরিষ্কার। তিনি বলতে চাইছেন, আমরা নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড উন্নত করতে পারি, আলোচনায় চীনকে তা মানতে বাধ্য করতে পারি। কিন্তু চীনা কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না এ কথা বলতে পারি না।

ওদিকে ইটালিকে নিয়েও প্রায় একই রকম বিতর্কে [Italian daily La Stampa ] এক ভুয়া নিউজ ছাপা হয়েছিল। ওর পেছনে আর এক কারণ হল, সেই একই সময়ে ইতালি চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিয়েছে, এমন এক মেমোরেন্ডাম বা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ইতালির মন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যেহেতু এখনও ৫জি ইস্যুতে  নিরাপত্তার জন্য হুমকিমূলক কোনও কিছুই পায়নি। তাই কোনও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে আগ্রহী নয়। ইতালির “টেলিকম ইতালিয়া” কোম্পানি হুয়াওয়ের গ্রাহক। তারাও বলছে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা না পেলে তারা কিছুই বন্ধ করবে না [Italian phone incumbent Telecom Italia has previously said it will keep working with Huawei until told otherwise by the government.]।

মোটা দাগে বললে, হুয়াওয়ে বা চীনা টেকনোলজি ঠেকিয়ে দেয়ার ইস্যুতে আমেরিকা ইউরোপকে নিজের নেয়া ‘নিষেধাজ্ঞার পথে’ আকৃষ্ট বা রাজি করাতে পারেনি। এর মূল কারণ চীন বা হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার আনা গোয়েন্দাগিরি অভিযোগের কোনও প্রমাণ দিতে না পারা। অর্থাৎ আমেরিকান অভিযোগ এখনো ভিত্তিহীন বলে এমন অসৎ পথে আমেরিকার সঙ্গী হতে চায়নি ইউরোপ। ইতোমধ্যে প্রায়ই ট্রাম্পের মুখে শোনা যায় যে চীন আমাদের টেকনোলজি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি হুয়াওয়ের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে আমেরিকান টি-মোবাইল কোম্পানির পক্ষে [T-Mobile, an American wireless carrier] টেকনোলজি চুরির মামলা করা হয়েছিল। লন্ডন ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, সে মামলাতে আদালতের মূল্যায়ন হল, এখানে টি-মোবাইলের কোনো ‘ক্ষতি করা, কারও অন্যায় লাভবান হওয়া এমন কিছু ঘটেনি। এমনকি এটা হুয়াওয়ের দিক থেকে ইচ্ছা করে কিছু ঘটানো এমন কাজ নয়, খারাপ উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজও নয়” [The court found, however, “neither damage, unjust enrichment nor wilful and malicious conduct by Huawei”.।

তবু আমেরিকার দিক থেকে ইউরোপকে নিয়মিতভাবে চীনা ৫জি টেকনোলজি ব্যবহার না করার আবেদন করে চলছিল। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশন আমেরিকার চীনাবিরোধি যা অভিযোগ তা আনুষ্ঠানিক আমল করেনি বলে জানা যাচ্ছে। কিভাবে? কারণ সে তার নিজস্ব কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সেগুলো আসলে উপরে অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের বয়ানে যেটা আমরা দেখেছি সেই অবস্থানই। তা হল, কমিশনের সিদ্ধান্ত হল যে আরো ‘শক্ত নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড’ তৈরি করতে হবে, কিন্তু কোনো দেশকে ঠেকাতে হবে এটা তাদের কোনো পথ নয় [commission officials signalled they prefer to secure Europe’s critical digital infrastructure with a more nuanced approach, rather than bowing to US pressure for blanket bans.]। । আসলে মূলত এ কারণেই ইউরোপের মোবাইল জয়েন্টগুলো হুয়াওয়ের টেকনোলজি কেনার ও সাথে সম্পর্কে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল।

হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইন্যান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা গ্রেফতারঃ
তবু আমেরিকা চীন ও হুয়াওয়েকে বিনা যুক্তিতে স্রেফ নিজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মাতব্বরির স্বার্থে কোন যুক্তি ছাড়া “তাদের ঠেকাতে” একের পর এক বাধা তৈরি করে যাচ্ছে। এমনই আর এক বাধার দেওয়াল হল, হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইনান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা মেঙ ওয়ানঝুয়ের [Huawei CFO Subrina Meng Wanzhou ] কানাডায় গ্রেফতার। যিনি আসলে হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক রন ঝেংফাই এর নিজের মেয়ে। সেই সাবরিনা মেঙ কোম্পানির কাজে হংকং থেকে মেক্সিকো যাচ্ছিলেন, পথে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ছিল তার বিমান বদলের জন্য যাত্রা বিরতি। আর এই ভ্যাঙ্কুভার বিমানবন্দর থেকে কানাডিয়ান পুলিশ তাকে গত ১ ডিসেম্বর ২০১৮, গ্রেফতার করেছে। কিন্তু এর সাথে আমেরিকার কী সম্পর্ক?

কানাডা-আমেরিকার মধ্যে পরস্পরের “বন্দী হস্তান্তর চুক্তির” সম্পর্ক আছে। তাই আমেরিকার অনুরোধে কানাডা সরকার এই গ্রেফতার করেছে। কিন্তু আমেরিকার অভিযোগ কী?
আমেরিকার দিন ফুরিয়ে আসছে এর অনেকগুলো চিহ্ন ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এর একটা হল, যাকে খুশি তাকে যেকোন অপছন্দের রাষ্ট্রকে নিজের একক সিদ্ধান্তে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করে দেয়া। নেতানিয়াহুর জিগরি দোস্ত ট্রাম্প ইরানের ওপর খুবই বেজার। ট্রাম্প ইরানের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছেন। যার সোজা অর্থ হল ইরান কোন ভিন্ন-রাষ্ট্রের সাথে পণ্য কেনা বা বেচাবিক্রির ক্ষেত্রে আমেরিকান ডলারে সেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন না। করলে কী হবে? করলে এর মানে হবে ওই পণ্যের চালানে ডলারে পেমেন্টের কথা উল্লেখ থাকবে আর সেই ডলার দেয়া-নেয়া করতে গেলে তা একমাত্র একটা পর্যায়ে কোন না কোন এক আমেরিকান ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবেই। আর ইরান যেহেতু অবরোধ ঘোষিত তালিকায় আছে তাই আমেরিকান কোনো ব্যাংকের জন্য ওই অবরোধের অর্থ হল, এই লেনদেন ঘটিয়ে দেয়া নিষিদ্ধ। কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি এমন নিষিদ্ধ লেনদেনে সহায়তা করে আর আমেরিকান সরকার যদি এ জন্য তাকে অভিযুক্ত করে তবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ফাইন দিয়ে তাকে রেহাই পেতে হয়। তাহলে ইরান অবরোধের সাথে হুয়াওয়েকে কিভাবে সম্পর্কিত করছে আমেরিকা?

অভিযোগ হল, হুয়াওয়ে তার মোবাইল টেক বিক্রি করেছে ইরানকে। আমেরিকার অভিযোগ এই বিক্রি ঘটেছে হুয়াওয়ে মূল কোম্পানির নাম বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নয়, বেনামে। ‘স্কাইকম’ নামে এক কোম্পানির মাধ্যমে হুয়াওয়ে ইরানের সাথে কেনাবেচা ব্যবসা করেছে। কিন্তু আইনত স্কাইকম হুয়াওয়ের কোনো অধীনস্ত বা সাবসিডিয়ারি কোম্পানি নয় বলে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে সাবরিনা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই মামলাটা হয়েছে এই লেনদেনে মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে। ভয় পাওয়ার মতো তথ্য হল, প্রমাণিত হলে আমেরিকায় এর সাজা কমপক্ষে ৩০ বছর। তবে কানাডার আদালতে এখনকার মামলা হল সাবরিনা মেঙকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তরের অনুমতি পাওয়ার। কানাডার আদালত অনুমতি না দিলে কানাডা সরকার সাবরিনাকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না। তাই সাবরিনা এখন বিশেষ অনেক শর্তের জামিনে আছে, যার একটা হলো তাকে কানাডায় থাকতে হবে, রায় না হওয়া পর্যন্ত।

ঘটনার এখানে শেষ নয়, উপরে বলেছিলাম যে চীন-আমেরিকা যে বাণিজ্য যুদ্ধের সমাপ্তির আলোচনা চলছে ট্রাম্প সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি সাবরিনাকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটাকে তিনি ঐ আলোচনায় বিশেষ সুবিধা আদায়ের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চান।
কিন্তু ব্যাপারটাতে আমেরিকা একাই চালাক তা তো নয়। চীনও অন্তত দুজন কানাডার নাগরিককে পাল্টা ডিটেনশন দিয়ে আটকে রেখেছে [After Meng’s Vancouver arrest, Chinese police also detained two Canadian citizens]। যাদের একজন আমেরিকার প্রাক্তন কূটনৈতিক, এখন “ক্রাইসিস গ্রুপ” নামের থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে কাজ করছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ‘উঠায়ে নেওয়া’, ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা এসবই চালু করার জায়গায় পৌঁছেছে আমেরিকা।

কিন্তু আমেরিকা এক হুয়াওয়েকে নিয়ে এত মরিয়া কেন?
এখানে দুটা প্রসঙ্গ, তবে কমকথায় বলতে হবে। একালে মোবাইল টেকনোলজিতে আমেরিকা আর কুতুব কেউ নয়। বরং সব  টেক কোম্পানিই বেচে-কিনে সারা। আমেরিকান ভ্যানিটি ছিল প্রখ্যাত গ্রাহাম বেলের এটিঅ্যান্ডটি [AT&T]। কিন্তু এত বিখ্যাত এটাই তার নেতি দিক। কোম্পানিটা একচেটিয়া করছে – এই অভিযোগে আমেরিকান এন্টি-ট্রাস্ট আইনের মামলা খেয়েছিল এই কোম্পানি। ফলাফলে দুটা ঘটনা ঘটে। এটিওঅ্যান্ডটি নিজেই নিজের কোম্পানিকে ভেঙ্গে দুইটা করে। মানে লুসেন্ট (Lucent) নামে যন্ত্রপাতি উৎপাদন ইউনিটকে আলাদা কোম্পানি [Lucent Technologies, Inc.] হিসেবে সাজিয়ে নেয়। এতে সেকালে (১৯৯৬) বাজারে প্রবল সাড়া জাগানোতে ইনিশিয়াল ইস্যু করা শেয়ার বেচে তারা তিন বিলিয়ন ডলার জোগাড় করেছিল।

আমাদের অধুনা বিলুপ্ত মোবাইল কোম্পানি সিটিসেলের কল্যাণে “সিডিএমএ” [CDMA] নামে টেকনোলজির কথা কেউ কেউ জানি। বাংলাদেশের মোবাইলে ওই একটাই সিডিএমএ নামে টেকনোলজি ছিল। এ ছাড়া বাকি সবগুলো এখন জিএসএম [GSM]। এই দুটা ছাড়া কাছাকাছি সুবিধা-অসুবিধার অন্যান্য অনেক টেকনোলজি ছিল। আমেরিকান সরকার ১৯৯৬ সালে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে দেশে টেকনোলজির স্টান্ডার্ড বলে কিছু সবাইকে আর মানতে হবে না। “সিডিএমএ” বা “জিএসএম” বা যেকোন স্টান্ডার্ডের মোবাইল সার্ভিস চালু করা যাবে।  সরকার তখন মনে করেছিল এতে একচেটিয়াত্ব বন্ধ হবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে যায়। কারণ, মোবাইল টেকনোলজি ব্যবসার রিস্কি দিকটা হল, এখানে ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কোম্পানিগুলোকে নিরন্তর গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করে যেতে হয়। তাই আমেরিকায় একটা স্ট্যান্ডার্ড না থাকার কারণে সব টেকনোলজির ফোন সার্ভিস বেচে তুলে আনা রাজস্ব সবগুলো টেকনোলজিতেই গবেষণা করতে গিয়ে ভাগ হয়ে যায়। ফলে প্রত্যেকটা টেকনোলজির গবেষণা খরচ জোগানো কঠিন হয়ে যায়। ফলে ২০০১ সালের মধ্যে লিসেন্টের পতন শুরু হতে থাকে। এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মটোরোলা [Motorola] তারও অবস্থা খারাপ। মোটের ওপর আজকের শেষ পরিণতি অবস্থাটা হল – নরওয়ের নোকিয়ার কাছে আমেরিকার লুসেন্ট বা মটোরোলা দুটাই বিক্রি হয়ে গেছে। ওদিকে ফ্রান্সের আর এক কোম্পানি “এলকাটেল” [Alcatel] – সেও এখন নোকিয়ার পেটে, চলে গেছে। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে আমেরিকার নিজের এখন মূল ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতি বানানোর কোন কোম্পানি নেই। সব ইউরোপের হাতে। বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত এর মূল কারণ ইউরোপ শুরু থেকেই কেবল ‘জিএসএম’ [GSM] একেই একমাত্র মোবাইল টেক স্ট্যান্ডার্ড বলে নির্দিষ্ট করে দেয়। ফলে এখানে কোম্পানিগুলোর গবেষণার খরচ জোগান তুলনামূলক সহজ ছিল।
তাহলে সার কথা দাঁড়াল আমেরিকার হাতে কোনো ৫জি টেকনোলজিই নেই। কিন্তু না থাকলে কী? ইউরোপ থেকে কিনে নেবে!
ব্যাপারটা অত সহজ নয়। কেন?

৫জি এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন
মূল কারণ ৫জি কোনো সাধারণ টেকনোলজি নয়। যেমন ২জি থেকে ৩জি অথবা ৩জি থেকে ৪জি এসেছিল – তেমন সাধারণ নয়। কথাটা ভেঙে বলতে হবে।

প্রথমতঃ আগের যেকোনো টেকনোলজি থেকে ৫জি তে আসা – এটা এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন। মানে কী? এত সাংঘাতিক করে ব্যাপারটা হাজির করছি কেন?
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial intelligence, AI) এর কথা একালে আমরা অনেকে শুনেছি। যন্ত্র বা রোবটকে মানুষের বুদ্ধিতে চলার মত করে তৈরি করা। মানুষের শ্রম কম লাগবে। আর এর বিকল্প হিসেবে রোবট সে কাজ করবে। যেমন “রোবট রেস্টুরেন্ট” – মানে এখানে কাস্টমারকে রোবট ঘুরে ঘুরে খাওয়া সার্ভ করছে, অর্ডার নিচ্ছে – এটা আমরা অনেকেই দেখেছি।

এ ছাড়া ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির কথা শুনেছেন অনেকে। এসব আগামীতে আমরা কেমন থাকব, চলব, কেমম কাজ পাবো, করব অথবা আমাদের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুকে বদলে দেবে, প্রভাবিত করবে।

এসবের প্রধান আর কমন বিষয়টা হল, এগুলো গায়েবি নিশ্চয় নয়, বরং মানুষই অনেক দূরে বসে এসব কিছুকে পরিচালিত করবে। যেহেতু অনেক দূর থেকে, একটা বৃত্তের মধ্যে নানান জায়গায় বসে বসবাস করে তাই খুবই দ্রুত আর বাল্ক নির্দেশ পৌঁছানোর উপযুক্ত তারবিহীন টেকনোলজি বা নির্দেশ বহনকারী ওয়ারলেস টেকনোলজি লাগবে। এসব কিছু ঠিকঠাক চলার ব্যাকবোন বা শিরদাড়ার মত কাজ করতে হবে ৫জি ওয়ারলেস টেকনোলজিকে। এর মাধ্যমেই সবাই সব নির্দেশ পাঠাবে, নেবে।

আরো দিক আছে কারখানা পর্যায়েও প্রডাকশন লাইনে নির্দেশ পাঠাতে ব্যবহৃত হবে ৫জি টেকনোলজি। এ জন্য বলা হচ্ছে এই ৫জি মোবাইল বা ওয়ারলেস টেকনোলজিকে আসলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

এই বিপুল পরিবর্তন যা মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটাবে এর ব্যাকবোন  হতে যাচ্ছে ৫জি টেকনোলজি। অথচ আমেরিকার হাতে এটাই নাই, থাকবে না। এখনও যদি শুরু করে তবুও তিন থেকে পাঁচ বছরের পেছনে থাকবে আমেরিকা। এছাড়া অর্থনৈতিক লাভজনকভাবে একে প্রতিস্থাপন সে ত আমেরিকার জন্য আর এক অলীক স্বপ্ন! আর ওদিকে চীন! এখনই সে শীর্ষে। অতএব, বলাই বাহুল্য আমেরিকা কেন এমন হাত-পা ছোড়া ছোট ছেলের মতো অস্থির আচরণ করছে। আমেরিকার জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ও পরিণতি অপেক্ষা করছে বলাই বাহুল্য!

[এই ব্যাপক পরিবর্তনের টেকনিক্যাল দিকটা  থেকে আগ্রহী পাঠকেরা এই আর্টিকেল ও সংশ্লিষ্ট অন্যগুলো পড়ে দেখতে পারেন।]

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

গৌতম দাস

২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2vW

 

 

এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

গৌতম দাস

০৭ জুন ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2fX

 

চীন ২০১৪ সাল থেকে এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছিল। এআইআইবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য, তবে চীনা নেতৃত্বের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক। গত ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়ে এটা কর্মতৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। এর সেই প্রস্তুতিকালে আমেরিকা তার প্রভাবাধীন এশিয়ার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যেন এই ব্যাংকে যোগ না দেয় তা নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে যে আপত্তি সে তুলেছিল, তা মনে রাখার মতো। বলেছিল, আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়তে গিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে যে স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা সংগঠনে জন্ম দিয়েছে, তার সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চীন ব্যর্থ হবে বলেই আমেরিকা উদ্বিগ্ন। আর এই ‘কথা’ আমেরিকা তার এশিয়ান পার্টনার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জানিয়েছিল- যেটাকে আমেরিকার নেতিবাচক প্রচারণা বলা হয়েছিল সে সময়। চীনের এআইআইবি ব্যাংকের উত্থান এই প্রচারণা দিয়ে আটকে দেয়া যায়নি। বরং শুরু থেকেই এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টাকে তারা ইতিবাচকভাবে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। আজ ৭৭ রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দান হাসিল করে এআইআইবি নিজ মহিমায় নিজের তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এখানকার মূল প্রসঙ্গ হল – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি।
গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানেও একই কথা উঠেছিল। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের, যেখানে ৬৮ রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হবে। ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের যৌথ ঘোষণার এক অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউরোপের নেতা রাষ্ট্রগুলো যেমন জর্মান, ফরাসি এরা। তাদের সার কথা হল, অর্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কালে ওর মান, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি কী হবে? শেষ মুহূর্তে আমেরিকা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ- এদের প্রধান নির্বাহী এবং প্রায় ৩০টি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এতে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।
এখানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার স্ট্যান্ডার্ড কথাটা ভেঙে বললে দাঁড়ায়, বড় অর্থ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে যে কথা বলছি আমরা, এর মালিক কিন্তু হবে আলাদা আলাদা এক একটা খোদ রাষ্ট্র মানে সে দেশের জনগণ। পাবলিক মানি, পাবলিক এসেট বা সম্পদ। ফলে প্রকল্পের মোট খরচ কত, তা ন্যায্য কিনা, প্রকল্পের খরচ অনুমোদনের পর তা কৌশলে দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ করে নেয়া হয়েছে কিনা, কাজের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আদৌ ছিল কিনা, প্রকল্পে দুর্নীতিরোধের কোনো ‘সেলফ চেক’ ব্যবস্থা ছিল কিনা- এ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ামাত্র তো বটেই, না চাইলেও জনগণের দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, ‘পরিবেশ ধ্বংস করা কোনো উপাদান এই প্রকল্পে নাই’, এমন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশী পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল কিনা, কাজ প্রদানে সবস্তরে স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি পাবলিক মানি নাড়াচাড়া সংক্রান্ত  গুরুত্বপুর্ণ  সব কিছুকে বুঝানো হয়েছে।

দুইঃ
বিগত প্রায় পাঁচ শ’ বছরের বিশ্ব বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থাকে মোটা দাগে তিনটি স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে একটা ল্যান্ড মার্ক ধরে বলা যায়, এর আগের যুগ ছিল প্রথম পর্যায় – কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম। মানে আমাদের মতো দেশগুলোকে উপনিবেশীপন্থায় দখল করে কলোনি মালিক সাম্রাজ্যগুলা এক  গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছিল যাকে এখানে আমরা ‘কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম’ বলে নামকরণ করছি । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে যায়, আর কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম, সেটাতে কোন কেন্দ্র বা কোন গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা ছিল না। অর্থাৎ সেটা কোনো গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। যে অর্থে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন ব্যবস্থাটা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীন করে সাজানো।
আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই; টানা ২২ দিন ধরে আমেরিকার হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে ৭৩০ ডেলিগেটের সভা ও তর্ক-বিতর্ক নিগোশিয়েশনের ভেতর দিয়ে । তাই এদের ব্রেটনউড প্রতিষ্ঠানও বলে অনেকে। এখানে প্রথম পর্যায়ের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের পরের দ্বিতীয় পর্যায়কে ব্রেটনউড সিস্টেমের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বলে চেনাব, সংক্ষেপে ব্রেটনউড সিস্টেম বলব।

তাই বলা যায়, কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এ ধরনের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমনকি ‘কলোনি মাস্টার’ যেমন খোদ ব্রিটিশ রাষ্ট্রও খুব নিয়ন্ত্রণ করত না। বরং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ট্রেডিং বা মেরিটাইম কোম্পানি, এদের নেতৃত্বে কর্তৃত্ব প্রভাবে  ম্যানুফ্যাকচারিং-সহ বাকি সব কোম্পানির এক সমাহার ছিল; রাষ্ট্র সেখানে ঠিক নিয়ন্ত্রক নয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো বোঝা যাবে, যদি মনে রাখি একালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) ধারণাটা। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ব্রেটনউড সিস্টেমের সাথে আনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাটা।  ব্রেটনউড সিস্টেমের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। মানে রাষ্ট্র মোটা দাগে আগাম কিছু ষ্টাটুটারি আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়ে থাকে, আর সেগুলোর অধীনে ও সীমার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বশাসিত। সেই আইনি সীমার মধ্যে এই ব্যাংক স্বশাসিতই শুধু নয়, রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপর অন্য সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মতৎপরতার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সে। ব্যাংক ব্যবসা করার নীতি ঘোষণা করা, মনিটরিং এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশ দেয়ার প্রতিষ্ঠান এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে সরকারের মুদ্রানীতি, ফিসক্যাল (অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা) নীতি হাজির করা ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিষ্ঠানও এটা। মুদ্রা ছাপানোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে এত কিছুর পরও এগুলো সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা। এসবের বাইরে আইএমএফের নির্দেশ পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বলা হয় আইএমএফের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়ে থাকে যেন আইএমএফের ডানা বা এক্সটেন্ডেড উইং। ফলে পুরা দুনিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে আইএমএফ।  কোনো রাষ্ট্রের আইএমএফের সদস্যপদ পাওয়ার পূর্বশর্ত হল, ওই রাষ্ট্রের এর আগে একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে হবে। তাই বেশির ভাগ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্ম ১৯৪০ এর দশকে। ব্যতিক্রম কোথাও যদি থাকে তবে তা ভিন্ন কারণে। যেমন আমেরিকার ফেড বা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আমেরিকার উদীয়মান ও বিকাশমান সব রাজ্যে আগে আলাদা স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্যের ব্যাংক ভিন রাজ্যে ব্যবসা ততপরতা করতে পারত না। আবার একই রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন ছাপা নোট ছিল। পরে (মানে অনুমান করি প্রতিটা রাজ্য নিজের পুঁজির স্ফীতিতে উপচে পড়লে বা স্যাচুরেটেড হয়ে গেলে অথবা বড় বড় প্রকল্পে এক সাথে বিনিয়োগের প্রয়োজনে) সব রাজ্য ব্যবস্থাগুলোর সমন্বয়ে এক অভিন্ন, ফেডারেল ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য (যেমন কমন কারেন্সি চালুর জন্য) ১৯১৩ সালে ফেডের জন্ম হয়েছিল। ওদিকে বৃটেনে তাকাই, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সাল থেকেই ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন ব্যাংক। কিন্তু এই ব্যাংকই ব্রিটিশ সরকারের আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট ধারণকারী ব্যাংক। একটা বড় করপোরেশনের মতোই ব্রিটিশ সরকার তার একটা ক্লায়েন্ট। আবার সরকারের অনুমতিধারী একমাত্র মুদ্রা ছাপানোর ব্যাংক এটাই। এভাবেই প্রাইভেট ব্যাংক হিসেবে চলার প্রায় তিনশ বছর পর ১৯৪৬ সালে এই ব্যাংকের জাতীয়করণ হয়, আর ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ সম্পর্কে এত বিস্তারে বলছি আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এই ব্যাংক ছিল না, ফলে তুলনামূলক বিচার করে বুঝবার জন্য। এখন কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ ছিল না, একথার আর এক অর্থ  হল, মানে রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। এই অর্থে বলা যায়, ওই ক্যাপিটালিজম ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের হাতে নিয়ন্ত্রিত হত। এ ছাড়া অনেকেই জানেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার – এটাও প্রাইভেট ব্যাংক বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিদিন ঠিক করে দিত। এ কাজের একচেটিয়া কারবারি, ‘রথশিল্ড ব্যাংকিং পরিবারের’ কথা অনেকেই জানেন। আমাদের অনেকের ধারণা, স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সরকার ছাড়া হয় না, হবে না। এই ধারণাটা বাস্তব নয়। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগে স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল বেসরকারিভাবে, ব্যবসায়ীদের সমিতি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে এবং একটা স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতার মান নিশ্চিত করে। তবে সেকালে এক বিরাট বাড়তি সুবিধা ছিল। তা হল কোন কাগুজে মুদ্রা মানেই তা ছিল ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’। মানে ঐ কাগুজে মুদ্রার সমমানের সোনা ব্যাঙ্কে আগে গচ্ছিত (রিজার্ভ) রেখে তবেই মুদ্রা ছাপানো হয়েছে। ফলে কাগুজে নোট যার হাতে আছে সে ব্যাংকে গিয়ে “চাহিবা মাত্র” ঐ সমতুল্য রক্ষিত সোনা ব্যাংক নোট হোল্ডারকে পরিশোধ করে দিত। এর কারণে প্রতিদিন আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ সহজ ছিল। পরে ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মুদ্রাই আর  ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’ নয়।
কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগ শেষে তা ভেঙে কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা- এই প্রথম এমন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা যেখানে তা এক গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতার (আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের) অধীনে গড়া ও নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থা। আগেই বলেছি এটা পরিচালিত হয় সব সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – আইএমএফের এই ‘ডানা’গুলোর মাধ্যমে। এই অর্থে ‘পড়ে পাওয়া’ সুবিধা হল রাষ্ট্র এরপর থেকে ব্যাংক ব্যবসার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের যুগের সূচনা করেছিল।

আমেরিকাসহ ইউরোপ আজ স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা তুলছে। তা ব্রেটনউড সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানে আসতে সময় লেগেছিল ৫৬ বছর, ২০০১ সালে। অর্থাৎ মাত্র চলতি শতকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে (স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তদারকি নিশ্চিত করতে) শক্তিশালী ও স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ  চালু করা হয়েছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আলাদা এই বিভাগ সরাসরি কেবল বোর্ডের কাছে রিপোর্ট ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কোনো কান্ট্রি অফিসকে কিছু না জানিয়েই সে তার কাজ করতে পারে। তবে এসব কথা শুনে এই বিভাগ বা বিশ্বব্যাংককে ‘সততার দেবতা’ মনে করার কোনো কারণ নেই, তা ভুল হবে। রক্ত মাংসের ও স্বার্থের এই দুনিয়ায় মানুষ যে মানের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেখাতে পেরেছে এর এক নমুনা বলা যায় এই বিভাগকে। তবে এরও আগে আর একটা কথা বলা দরকার। বিশ্বব্যাংকের কাজ দেয়ার টেন্ডার পদ্ধতি খারাপ নয়, এটা বলতেই হবে। এই অর্থে যে, কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে ফান্ডদাতা হয় যে দেশের সরকার; ধরা যাক, একটা প্রকল্পে এর অর্ধেকের বেশি ফান্ড জাপান সরকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রকল্প নির্মাণের কাজ জাপানের কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পায়নি। মানে কেউ ফান্ডদাতা হলে কাজ তাকেই দিতে হবে, এমন কোন কথা নেই। টেন্ডার আলাদা স্বাধীন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা আছে। টেন্ডারে ঠিক হবে কে কাজ পাবে। যেমন যমুনা সেতুতে নদীশাসন কাজ পেয়েছিল নেদারল্যান্ড, দুই কানেকটিং রোড আর মূল ব্রিজ নির্মাণকাজ পেয়েছিল দুই কোরিয়ান কোম্পানি, আর কন্সালটেন্সি পেয়েছিল এক ব্রিটিশ কোম্পানি। তবে আবার বলে রাখি, টেন্ডার ব্যবস্থা চালু করতে পারার জন্য অথবা বিশ্বব্যাংকের ভেতরের প্রসেসিংয়ের তুলনামূলক স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য তারা একেবারে ‘আদর্শের অবতার’, এমন বলা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার যমুনা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতিই ছিল না, এমন অ্যাবসলিউট কোনো কথা বলা হচ্ছে না। তবে অন্তত তুলনামূলক অর্থে ফান্ডদাতা আর কাজ পাওয়াকে আলাদা করে ফেলতে পারা কম অগ্রগতি নয়। আর বিশ্বব্যাংক এটা ২০০১ সালে ইন্টিগ্রিটি বিভাগ খোলার আগেই চালু করতে পেরেছিল। আবার বিশ্বব্যাংকের বদনামের শেষ নাই। ফলে এটাও বলে রাখা ভাল, অর্থের অপচয় আর দুর্নীতির (মানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব) দিক থেকে সত্তরের দশকের বিশ্বব্যাংক ছিল সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেটনউডস সিস্টেম এতটুকু পেরেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হিসাবে খারাপ নয়।

পাঁচ শ’ বছরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়কে  মোটা দাগে চিহ্নিত করে তা চলতি শতক থেকে শুরু তা বলা যায়। আমেরিকার জায়গায় চীনের নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা আজ আর কোন অনুমান করে যা মনে চায় বলা এমন বিষয় নয়। খোদ আমেরিকার সরকারি স্টাডি ও নানা গবেষণাতেও এর স্বীকৃতি আছে। ব্রেটনউডস সিস্টেম বা দ্বিতীয় পর্যায়টা কায়েম হতে, একটা ওলটপালটের ভিতর দিয়ে তা আসতে একটা বিশ্বযুদ্ধের দরকার হয়েছিল। তাই তৃতীয় পর্যায়ে যেতেও একটা বিশ্বযুদ্ধ দরকার, অনেকে অনুমানে এমন কথা বলে থাকেন। কিন্তু এখনো তা স্পষ্ট হয়ে যায়নি। সর্বশেষ আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান; আর হম্বিতম্বিকে চীনের দিক থেকে একে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা এবং আমেরিকার জন্য জায়গা (বাজার, কাজে ছাড় দেয়া) করে দেয়া কোন টেনশন বা যুদ্ধের শঙ্কাকে আপাতত নাকচ করেছে।

কিন্তু এই লেখার মূল প্রশ্ন, একালে তৃতীয় পর্যায়ে, চীনের তৈরি গ্লোবাল প্রভাব নিয়ে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- এআইআইবি, ব্রিক ব্যাংক, আরআইবি ইত্যাদির স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান কী হবে? এক কথায় বললে গ্লোবাল ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়ের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হতে গেলে এগুলোকে অবশ্যই ব্রেটন উডস সিস্টেমের চেয়েও ভাল, মানে যেমন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও আরও ভাল মান দেখাতেই হবে। তবে এ কথা ঠিক, চীনের উত্থানে রেষারেষি প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের স্বার্থটাকে মাখিয়ে তারা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার কথাটা উপস্থাপন করেছে। তাই আমেরিকা বা ইউরোপের স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গ তুলে চীনকে যে অর্থে খোটা দিচ্ছে, নিজের প্রভাবকে বাড়িয়ে নিবার চেষ্টা করছ এর মধ্যে আমাদের মতো দেশের লাভ নেই। আমাদের স্বার্থ আমাদেরকে ভাবতে হবে। যেমন বাংলাদেশের সাথে চীনের রেল-রোড উদ্যোগসহ সব অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের স্বার্থে তা খুবই দরকারি ও নির্ধারক। কিন্তু লক্ষণীয় যে, আমরা এখন টেন্ডার আহ্বানবিহীন সরকার, আর যেকোনো প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে ছয় গুণ ব্যয় বাড়ানোর সরকারে পরিণত হয়েছি। এই বিষয়টা  বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বাদ রেখে বললেও এটা চীনের জন্য বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান- এই বিচারে খুবই খারাপ উদাহরণ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার দিক থেকে এই ব্যবস্থা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এদিকটায় চীনেরও অবশ্যই  মনোযোগ দিতেই হবে। যদিও চীনের হয়ত পাল্টা বলার বিষয় হবে যে, বাংলাদেশের জনগণ যদি একটি অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালো না হওয়া পর্যন্ত চীন হাতগুটিয়ে বসে থাকলে এর সুবিধা চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীরাই নেবে। তবুও এটা ভালো যুক্তি নয়। কারণ এর চেয়েও দুর্নীতিবাজ সরকারের সাথে গত চল্লিশ বছর ধরে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে কাজ করতে হয়েছে। তার পরও তাদের অর্জন খারাপ নয়। আমাদের মতো দেশে সরকারের কার্যকারিতা যতটুকু, এর দক্ষতা যতটুকু, তা তো আপন কোনো রাজনৈতিক সরকারের কারণে হয়নি, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শর্ত দিয়ে তাদের বাধ্য করেছে বলা হয়েছে। যদিও শর্তের খারাপ দিক আছে, তা মেনেও এ কথা বলা যায়। যেমন শেখ মুজিবের আমলের রেশনব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে আগের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ঠিক রেশন নয়, তবে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে কার্যকর আনা আছে। চালের সরকারি মওজুদ আর আগের দরে বাজারে চাল ছেড়ে দিয়ে মুল্য নামানো – এটা খুবই কার্যকর ব্যবস্থা।
মোট কথা, আমরা ব্রেটনউডস সিস্টেমের যুগ পার হয়ে এসেছি- এ কথা চীনকে মনে রেখে আগাতে হবে। আমাদের নতুন আকাঙ্খা পূরণ না করে, আমাদের হতাশ করে চীনের তৃতীয় পর্যায় গড়ে তোলা বা এর নেতা হওয়া অসম্ভব। চীনই ফান্ডদাতা, আবার কোনো টেন্ডার সিস্টেম নেই, কাজ পাবে কেবল চীন– এই ‘জি টু জি’, লোকাল এজেন্টের নামে ঘুষের ব্যবস্থা, প্রকল্পের অর্থ ছয় গুণ বাড়িয়ে নেয়া- এসব অগ্রহণযোগ্য। খুবই খারাপ উদাহরণ। এটাই ‘অপারগ’ চীনের আপাতত স্বার্থ মনে করে চীন নিজ মনকে প্রবোধ দিতে পারে। কিন্তু সাবধান এর মূল্য একদিন চীনকে শোধ করতে হবে। এই একই ফর্মুলায় আমরা বেল্ট-রোড উদ্যোগে যুক্ত হতে না চাইলে না পারলে তা আত্মঘাতী – চীন ও বাংলাদেশের জন্যই।
গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে চীনকে অবশ্যই স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দিক থেকে উন্নত মানের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হাজির করতে পারতে হবে। এমন কাজের নীতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। কোন অজুহাত এখানে অচল এবং আত্মধবংশী।

ভারত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন যোগ দেয় নাই। সেই সিদ্ধান্ত ভারতের স্বার্থে ন্যায্য হয়েছে সেই সাফাই যোগাড়ে মোদি সরকার কাহিল। কারণ এটা ফাঁপা আত্মম্ভরি সিদ্ধান্ত ফলে আত্মঘাতি তা স্পষ্ট। চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে কেউ অভিমানে মাটিতে ভাত রেখে খায় না।  তাই ভারতও এই সুযোগে যেন  ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাবের কারণে যোগ দেয় নাই, এমন ইঙ্গিত দিয়ে নিজের লাজ ঢাকতে চাইছে। তা সে চাইতেই পারে কারণ কেই বা  বেকুবির লজ্জায় নিজেকে রাঙা দেখাতে চায়। তবে এটা ফ্যাক্টস যে সম্মেলনের আগে ভারতের দেখানো যোগ না দেবার কারণগুলোর মধ্যে ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাব বলে কোন কারণ তালিকায় ছিল না।  কাজেই ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’  কথা তুলে সে আড়ালে সুযোগ সন্ধানীও কম নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের মুদ্রার স্বীকৃতি

চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি
গৌতম দাস
০৮ ডিসেম্বর, ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-mF

 

আইএমএফের মালিক শেয়ারহোল্ডার রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি ২৪ সদস্যের নির্বাহী বোর্ড ৩০ অক্টোবরের সভায় চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে আইএমএফে রিজার্ভ জমা রাখার মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃত চারটি (ডলার,ইউরো,পাউন্ড ও ইয়েন) মুদ্রার পাশাপাশি পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংক্ষেপে বললে, দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন আগের টপ চারটি মুদ্রার মতোই চীনা মুদ্রা ইউয়ানকেও এবার আইএমএফ তার পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকার করেছে। এ স্বীকৃতির অর্থ কী? তাৎপর্যই বা কী, সেসব নিয়ে এখানে কথা বলব।

দেশের অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ্যে যেসব ধারণা আলোচনা হয় সেখানে পুঁজিতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বলে ভাসাভাসি কিছু ধারণা থাকলেও সে আলোচনা কখনও মুদ্রা পর্যন্ত যেতে দেখা যায় না। অর্থাৎ মুদ্রার কাজ বা ভূমিকা কী সে সম্পর্কে এর ভালো-মন্দ অলিগলি দিক সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা আরও কম। বলা হয়ে থাকে, কোনো জিনিসকে মুদ্রার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে গেলে ওর তিনটা গুণ থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ মুদ্রা মানে যার ঐ তিন বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এক. গ্রহণযোগ্যতা : অর্থাৎ যে কেউই ওই মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বেচতে রাজি। শুধু তাই না, পণ্য বেচে ওই মুদ্রা পেতে অথবা পাওয়া মুদ্রা দিয়ে অন্য পণ্য কিনতেও সবাই রাজি। সার কথায়, বিনা দ্বিধায় বাজারের যে কেউ ওই মুদ্রায় কিনতে ও বেচতে রাজি। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, লিকুইডিটি : এটাকে বলা যায় গ্রহণযোগ্যতার মাত্রার কমবেশি। যেমন ব্যাংকের চেকের চেয়ে নগদ মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। অর্থাৎ নগদ মুদ্রার লিকুইডিটি সব সময় অন্য যে কোনো ধরনের মুদ্রার চেয়ে বেশি। আবার একেবারে মফস্বলের হাটে ১ হাজার টাকার নগদ নোট দিয়ে সওদা নিতে চাইলে এত বড় নোটের খুচরা পাওয়া সহজ নয় বলে সেখানে ১০ থেকে ২০ টাকার নোটের গ্রহণযোগ্যতা ১ হাজার টাকার চেয়ে বেশি। এভাবে মুদ্রার এই দুই বৈশিষ্ট্যই আসল বৈশিষ্ট্য মনে করা হয়। কেন?
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য, মুদ্রার বদলে সোনা: ব্যাংকে গিয়ে মুদ্রার বদলে সোনা চাইলে তৎক্ষণাৎ তা পাওয়া যায় এমন হতে হবে। এ গুণটা এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। অর্থাৎ আগেকার দিনে যে কোনো ব্যাংক কাগুজে মুদ্রা ছাপার আগে সমমূল্যের সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে নিত। এখন তা আর করে না। বিশেষত আইএমএফের ১৯৪৪ সালে জন্মের সময়ের ম্যান্ডেট বা ঘোষণাপত্রে বদল এনে ১৯৭৩ সালে নতুন করে আইএমএফ গঠন করে নেয়ার পর থেকে কাগুজে মুদ্রার বদলে সোনা ফেরত দেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতাও উঠে গেছে। সারকথায় তাই, এখন মুদ্রা হতে গেলে প্রথম দুই বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট।
উপরের আলোচনায় সাধারণভাবে মুদ্রা নিয়ে কথা তুলা হয়েছে। কিন্তু ওই মুদ্রা কি কোনো একটা রাষ্ট্রের মুদ্রা নাকি একই সঙ্গে তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা, সেটা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। তাই এবার দেশি ও বিদেশি (আন্তর্জাতিক মুদ্রা) এভাবে মুদ্রাকে ভাগ করে, ভাগ মনে রেখে কিছু কথা। একালে দেশি মুদ্রা মানে কাগুজে মুদ্রা যা মূলত রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মুদ্রা। অর্থাৎ নিজ ভূখন্ডের বাইরে যে মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা নেই। বাংলায় বললে, চলে না। নিজ ভূখন্ডের মধ্যে দেশি মুদ্রায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য লেনদেনে একচেটিয়াভাবে চলতে পারে। অন্যভাবে বললে, শুধু নিজ মুদ্রার ওপর নিজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের) একক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের সীমানা পর্যন্ত কার্যকর ও বিস্তৃত থাকে। রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে হলে আর থাকে না। তাহলে সারকথা দাঁড়াল, প্রথমত মুদ্রা ছাড়া কোনো বাণিজ্য লেনদেন নেই, হবে না। আবার দেশি মুদ্রামাত্রই ওর ভূখন্ডগত সীমাবদ্ধতা থাকবে, নিজ রাষ্ট্র সীমানা পার হলেই ওই মুদ্রা অচল হয়ে যাবেই। তাহলে যেকোনো দুই রাষ্ট্র বাণিজ্য বিনিময় করবে কীভাবে, কোন মুদ্রায়? স্বভাবতই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য লেনদেন ঘটাতে চায় বলে সব রাষ্ট্রেরই বাকি সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তবে বেশি দিন আগের কথা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃত মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছিল মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আইএমএফ গঠন করার পেছনে ১৯৪৪ সালে প্রধান যেসব তাগিদ কাজ করেছিল তা হল, এর আগে অচল হয়ে ভেঙে পড়ে থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়কে নতুন করে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে এক সিস্টেম ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করা। এ আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এককথায় বললে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় চালু থাকার পূর্বশর্ত হল এক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা চালু থাকা। এটাই আইএমএফের মুখ্য কাজ। অবশ্য বলা বাহুল্য, আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব বড়লোক রাষ্ট্রের পক্ষে কান্নি মারা। কারণ আইএমএফের মালিকানা শেয়ার যে রাষ্ট্রের ভাগে সবচেয়ে বেশি আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বের ওপর প্রভাব তার সবচেয়ে বেশি। এই নিয়মে সাজানো আছে ও পরিচালিত হয় আইএমএফ। যেমন সর্বশেষ মালিকানা শেয়ার অনুসারে আমেরিকা (একাই ১৬ শতাংশ) ও ইউরোপে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ আর ছয়টা রাষ্ট্র মিলে ৪৩ শতাংশ মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে আছে। আমেরিকা আর ঘনিষ্ঠ ছয় রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশেষ করে গরিব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের ঐকমত্য রক্ষা করার এক ক্লাব সংগঠন আছে, যার নাম গ্রুপ অব সেভেন কান্ট্রিস, সংক্ষেপে ‘গ্রুপ সেভেন’ নামে; প্রতি বছর কমপক্ষে একবার ‘গ্রুপ সেভেন’ রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা বসে থাকে, এমন সম্মেলন তারা নিয়মিত করে থাকে। এ গ্রুপ সেভেন আইএমএফের মালিকানার ৪৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এ সাত রাষ্ট্রের মালিকানার বিপরীতে বাংলাদেশের মতো গরিব রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণত এক পার্সেন্টেরও অর্ধেক হয় বলে গ্রুপ সেভেনের পক্ষে ৪৩% মালিকানা দিয়ে পুরা আইএমএফকে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। কিন্তু তাই বলে আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য ‘আইএমএফ নিপাত যাক’ বলা সঠিক শ্লোগান হবে না। অথবা আইএমএফ আমাদের দরকার নেই সেটাও সঠিক কথা বা দাবি হবে না। কারণ আইএমএফ নিপাত যাওয়া বা নেই এর মানে আমাদের রাষ্ট্রের জন্যও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য ও পুঁজির বিনিময় লেনদেন এবং মুদ্রাও নাই হয়ে যাবে। অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ইত্যাদি আমাদের অবশ্যই দরকার। অর্থাৎ মূল পয়েন্ট হল, ব্যবস্থাটার নিপাত যাওয়া নয় বরং এটা আন ফেয়ার, অসাম্য এক ব্যবস্থা হয়ে আছে একদিকে কান্নি মারা হয়ে আছে। এর অবসান দরকার।
একালের একটা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার মালিকরা যেমন ওই ব্যাংকের পরিচালনার নিয়মকানুন সবটা নিজের ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে এবং দেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালিত হয়ে থাকে, হতে বাধ্য। তবে এ কর্তৃত্বের অধীনে থাকা মেনেও এরপর যতটুকু মালিকানার ইচ্ছা প্রয়োগের সুযোগ থাকে তা অবশ্য করা হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিক মানেই সে-ই মূল নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের অথরিটি নয়। কারণ ব্যাংকের মালিক আর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অথরিটি আলাদা আলাদা। অথচ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা ঠিক উল্টো। আইএমএফের মালিক রাষ্ট্রগুলোর এক বড় শেয়ার মালিকানা একটা মালিক-জোটের হাতে এবং ঐ জোটই আবার এর নিয়ন্ত্রণ অথরিটি এবং তা অনেক সরাসরি। এই সমস্যার রেডিকেল সমাধান দরকার। একথাটাকেই আরেক ভাষায় প্রায়ই হালকা সরল করে বলা হয় যে, আইএমএফের পরিচালনা সিদ্ধান্তে গরিব রাষ্ট্রের গলার স্বর আরও বেশি বা উঁচু করা দরকার। সারকথায় বললে, আইএমএফের ওপর কর্তৃত্বের চলতি কাঠামো এটা ভাঙা দরকার কিন্তু তা অবশ্যই এটা আবার ঢেলে সাজিয়ে গড়ার লক্ষ্যে। শুধু নিপাত যাক বলাটা সম্ভবত আগের বাক্যের ভেঙে আবার গড়া ধারণার সমার্থক নয়, তাই।
তাহলে দাঁড়াল, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের জন্য এক দরকারি প্রতিষ্ঠান। যদিও এর সংস্কারও দরকার। বিশেষত আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন, শ্রমের দক্ষতা বাড়ানোর দিক থেকে এর আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকেও এটা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব এসব অর্জনের পূর্বশর্ত এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা থাকা এটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা নেই তো বাণিজ্য বিনিময় নেই। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রার মান, যেটাকে আমরা অনেক সময় মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট বলি।
নিজের ঘোষণাপত্র অনুসারে আইএমএফের ম্যান্ডেটরি কাজ হচ্ছে মূলত দুইটি। বিভিন্ন সদস্য দেশের মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্য রাষ্ট্রের ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ এর দিকে নজর রাখা। কোনো রাষ্ট্রের বার্ষিক আমদানি-রফতানিতে আয়-ব্যয়ের চলতি হিসাবের খাতায় আয়ের তুলনায় ব্যয় সেটা ঘাটতি বা বাড়তির দিকে, এটাকেই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বলা হয়। সেদিকে নজর রাখা এবং সেক্ষেত্রে ঘাটতি হলে তা মোকাবিলার জন্য ওই রাষ্ট্রকে ধার ও পরামর্শ দেয়া ইত্যাদি। এখানে লক্ষণীয় যে, নিজ রাষ্ট্র অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি ফেলালে তবেই ধার নিতে হবে। আর ধার নেয়া মানেই সঙ্গের শর্ত-পরামর্শও শুনতে হবে। নইলে নয়। মানে ঘাটতি নেই তো উটকো পরামর্শও নেই।
আইএমএফ প্রসঙ্গে আর একটা মৌলিক দিক হল, আইএমএফের সদস্যপদ লাভ করতে চাইলে শুরুতেই চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। এটা ঠিক, চাঁদা বলতে যা বুঝি যে, প্রদেয় চাঁদার অর্থ জমা করার পরে তা প্রতিষ্ঠানের আয় বা সম্পত্তি হয়ে যায়। আইএমএফের বেলায় এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং আইএমএফ প্রতিষ্ঠানে সব সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামে একটা অ্যাকাউন্ট থাকে, প্রদেয় চাঁদা ওই নিজ অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এটা অনেকটা কোনো আমদানিকারকের মাল জেলায় জেলায় বেচার জন্য জেলা পরিবেশক হওয়ার মতই, যেন আমদানিকারকের কাছে আগে প্রদেয় ডিপোজিটেড বা জমা রাখা অর্থ। এর পরিমাণ কত তা ঠিক হবে বছরে কী পরিমাণ মালামাল নিয়ে বিক্রি করতে পারব এ আকারের অনুপাতে। এবং আগাম জমা রাখতে হবে এমন এক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। এরপর যা মালামাল তুলেছি প্রতি তিন মাস পরপর এর বকেয়া মূল্য পরিশোধ করে দিতে হয়। আইএমএফের সদস্য ফি আগাম জমা দেয়া অনেকটা এরকমই এক ব্যবস্থা। কিন্তু এর সুবিধা কী?
সুবিধা হলো, ওপরে যে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা চলতি হিসাবে ঘাটতি আয়-ব্যয়ের কথা বলছিলাম তেমন কোনো পরিস্থিতিতে ঘাটতি মেটাতে আইএমএফ ওই সদস্য রাষ্ট্রকে কতদূর ধার দেবে, তা হিসাব করা হয় এভাবে যে, আইএমএফে আমার রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থের ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

এই ফাঁকে একটা কথা বলার সুযোগ নেই।
আইএমএফের তহবিলে সব সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ হিসাব করা হয় অদ্ভুত নামের এক ভার্চুয়াল (নামে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই) মুদ্রায়। নামটা হল স্পেশাল ড্রয়িং রাইট বা এসডিআর। এজন্য আইএমএফের মুদ্রার নাম বলা হয় এসডিআর। এ মুদ্রার মান মানে, যেমন কয়টা বাংলাদেশী টাকা দিলে তা এক এসডিআরের সমান হবে, তা কীভাবে ঠিক হয়?
প্রতিদিন আইএমএফের ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় দেখা যাবে ওই দিনের এসডিআর রেট দেয়া আছে। যেমন আজ ৬ ডিসেম্বর এক এসডিআর = ০.৭২৯৯৮৮ ডলার। এ হিসাবে এক এসডিআর = ১০৮.৪০ টাকা। এখন প্রতিদিনের এসডিআর রেট এটা কীভাবে হিসাব করা হয় বা সাব্যস্ত করা হয়?
প্রতিদিনে টপ চারটা মুদ্রা আমেরিকান ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড আর জাপানি ইয়েন – এদের বিনিময় হার বাজারে কত ছিল তা থেকে এক গড় বিনিময় হার বের করা হয়। আর সেটাকে ডলারে প্রকাশ করলেই সেটাই ওই দিনের এসডিআর রেট। অর্থাৎ এখন ওই চারটা মুদ্রার গড় বিনিময় হারই ওই দিনের এসডিআর এর মান। আর এসডিআর মান বের করতে শুধু ওই চারটা মুদ্রাকেই বেছে নেয়ার কী কারণ? কারণ, দুনিয়াতে এখন যত ব্যবসা-বাণিজ্যিক লেনদেন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন শীর্ষ চার মুদ্রা ওগুলো তাই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনের মুদ্রা তালিকায় সবার উপরের চার মুদ্রাগুলো তাই। আর প্রতি পাঁচ বছর পরপর মূল্যায়ন করে দেখা হয় শীর্ষ চার মুদ্রা কারা ছিল? যেমন ২০০০, ২০০৫ ও ২০১০ এভাবে। এবারের ২০১৫ সালের মূল্যায়নে এবং গত ১০ বছরের মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছিল চীনের মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমেই বাড়ছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে এবারের আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড সভায় আইএমএফের টেকনিক্যাল কর্মীদের গণনা ফলের সুপারিশ এর পক্ষে শেয়ার মালিকানার নির্বাহী বোর্ড সায় দিয়েছে। তাই পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে গ্রহণ করা হয়। এর ফলে এখন থেকে মিডিয়া রিপোর্টে আর এক টেকনিক্যাল শব্দের দেখা মিলবে ‘কারেন্সি বাস্কেট’ বা ‘বাস্কেট কারেন্সি’। উপরে বলেছিলাম, চারটি টপ আন্তর্জাতিক মুদ্রার গড় বিনিময় হারই হল ওই দিনের এসডিআর মান। তো এজন্য ওই চার আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে আইএমএফের ‘বাস্কেট কারেন্সি’ বলে। যার ভাবটা এরকম যে, এসডিআর মুদ্রার মান নির্ধারণের জন্য একটা ঝুড়িতে থাকা টপ চারটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে ওখান থেকে তুলে আনা হয়েছে। এবার ওই বাস্কেট কারেন্সিতে চীনা ইউয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করে মর্যাদা দেয়া হলো। তবে টেকনিক্যাল রুল হল, আগামী বছর ২০১৬ সাল থেকে এটা কার্যকর হবে। অর্থাৎ আগামী বছর ১ অক্টোবর থেকে ইউয়ানসহ পাঁচ টপ মুদ্রার গড় থেকে আইএমএফের এসডিআর মান নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ তখন থেকে প্রতিদিনের এসডিআর মান কত হবে তা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চীনা ইউয়ান একটা ফ্যাক্টর হবে।
শুধু কী তাই? না আরও আছে। উপরে আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামের এক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখার কথা বলেছিলাম। কত অর্থ সেখানে আগাম জমা রাখতে হবে তা নির্ভর করে আমার অর্থনীতিতে লেনদেনের সাইজ কেমন এরই এক অনুপাতিক পরিমাণ। কিন্তু এতে সাব্যস্ত হওয়া মোট পরিমাণের ৭৫ ভাগ অর্থ জমা রাখতে হয় সোনা অথবা ডলারে। আর বাকি ২৫% নিজ দেশি মুদ্রায়। এটা আইএমএফের জন্মের সময়কার ১৯৪৪ সালের নিয়ম ছিল। কিন্তু দিনকে দিন প্রতিটা সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ বেড়েই চলেছে ফলে সে অনুপাতে আইএমএফের জমা রাখা সোনা ও ডলারের পরিমাণও। কিন্তু দুনিয়াতে সোনা ও ডলার তো অফুরন্ত নয়। তাই এই সমস্যা সমাধানে ১৯৬৯ সালে বাস্কেট কারেন্সি ধারণা চালু হয়েছিল। এর ফলে নতুন সংযুক্তি আইন হল, ডলার ও সোনা ছাড়াও বাস্কেট কারেন্সিতে থাকা অন্যান্য মুদ্রাতেও আইএমএফের সদস্য চাঁদা সম্পদ রিজার্ভ রাখা যাবে। অতএব কোনো রাষ্ট্র এখন ইউয়ানেও তার জন্য ধার্য আইএমএফের সদস্য চাঁদার সম্পদ রিজার্ভ রাখতে পারবে। এর অর্থ শুধু আইএমএফে নয়, দুনিয়ার নানা রাষ্ট্র ব্যক্তি বা কোম্পানি সবাই নিশ্চিন্তে এখন থেকে স্ব-স্ব সম্পদ চীনা ইউয়ানে রূপান্তরিত করে ধরে রাখতে শুরু করবে। আইএমএফের হিসাবে ইউয়ানকে বাস্কেটে স্বীকৃতি দেয়ার আগে বাস্কেট মুদ্রাগুলো কতটা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রার দখলে আছে এর হিসাবে ডলারের ভাগে ৪১.৯ শতাংশ, ইউরো ৩৭.৪ শতাংশ, পাউন্ড ১১.৩ শতাংশ আর ইয়েন ৯.৪ শতাংশ। আর আগামী বছর থেকে তা সম্ভবত হবে ডলার ৪১.৭৩ শতাংশ, ইউরো ৩০.৯৩ শতাংশ, ইউয়ান ১০.৯২ শতাংশ, পাউন্ড পাউন্ড ৮.০৯ শতাংশ আর ইয়েন ৮.৩৩ শতাংশ।
এটা গেল কেবল শুরুতে কার কত বাজার শেয়ার দাঁড়াবে এর হিসাব। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রায় সবাই একযোগে যে কথাগুলো বলছে যেমন, আইএমএফের স্বীকৃতি চীনের দিক থেকে ‘বিরাট রাজনৈতিক অর্জন’ এবং চীনের ওপর আস্থার প্রকাশ ও চীনের জন্য এটা ‘প্রেস্টিজিয়াস বিষয়’। এ ছাড়া মুদ্রা যেহেতু শুধু পণ্য বিনিময়েই কাজে লাগে তাই নয়। সম্পদ ধরে রাখার মুদ্রা হিসেবেও এর কদর আছে। বিশেষত যে আন্তর্জাতিক মুদ্রার মান বা হার স্থিতিশীল, বাজারের উঠতি মুদ্রা এবং আস্থার মুদ্রা সেই মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সম্পদ রাখতে মানুষ আগ্রহী হবেই। এই বিচারে ব্লুমবার্গ ম্যাগাজিন আগাম অনুমান করে বলছে, প্রথম বছরেই ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখার জন্য বাজারে এক প্রবল জোয়ার উঠবে। এর ধাক্কায় আবার পণ্য বিনিময় বাজারে ইউয়ানের বাজার-শেয়ার বেড়ে যাবে। আর ততটাই ডলার বাজার হারাবে। এ রকম কিছু চেন রিয়াকশন বা চক্রাকার প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার কিছু মিডিয়ার ঈর্ষা ছড়ানোর প্রপাগান্ডাও আছে। যেমন কেউ কেউ সন্দেহ বাতিকের রিপোর্ট করেছে, আইএমএফ কি আসলেই ঠিক মতো যাচাই করে দেখে বোর্ডের কাছে সুপারিশ করেছে? এ রকম। তবে খোদ আইএমএফ এ দিকটা আগেই আঁচ করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার দিনেই আইএমএফ নিজ ওয়েব সাইটের প্রথম পাতায় ‘সহসাই যেসব প্রশ্ন উঠে’ শিরোনামে নিজেই প্রশ্নোত্তরে এসব সন্দেহ-কৌতূহলেরও বহু আগাম প্রশ্নের বাড়তি জবাব দিয়ে রেখেছে। অনেক বেশি আন্তরিক আর খোলামেলাভাবে সেসব জবাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের মতো বহুরাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানের চীন ও আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান বিরোধের বেলায় সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকেই আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের ভূমিকা কী হলে সঠিক হবে, সে প্রশ্নে এপর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা একেবারেই প্রফেশনাল অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা পক্ষ নিতে চাননি। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যক্তিনিরপেক্ষভাবে যা সত্য, যা সঠিকÑ এর পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। যেমন, আইএমএফের সংস্কারের দাবি বিষয়ে তাদের অবস্থান সংস্কারের পক্ষে। আর তাদের সুপারিশের ফাইল আমেরিকান সিনেটে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। চীনা ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নেও আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের একই ধারাবাহিকতার অবস্থান দেখা গিয়েছে। ইউয়ানকে আমলে নিয়ে আইএমএফের সম্পদের ইউনিট গণনা আগামী বছর থেকে শুরু হবে বলা হলেও বিভিন্ন ব্যক্তি কোম্পানির ধরে রাখা সম্পদ ইউয়ানে রূপান্তর করে রাখার ঝোঁক এ বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাস্তবে কি দাঁড়ায় সেটি দেখা যাক।

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এবং একই প্রসঙ্গে ০৭ ডিসেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে ছাপা হয়েছিল। সে লেখা দুটো একসাথে মিলিয়ে আরও সংযোজন ও আবার এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

গৌতম দাস
২৩ আগস্ট ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-bb

ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক উদ্যোক্তাদের এবছরের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাস ২০১৫ জুলাইয়ের ৯ ও ১০ তারিখে রাশিয়ার উফা শহরে। আমেরিকার নেতৃত্বে চলতি গ্লোবাল অর্থনীতি বা বিশ্বব্যাপী সক্রিয় পুঁজিতান্ত্রিক গ্লোবাল ব্যবস্থার ওপর ব্রিকস সদস্য অর্থে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানোর ও পালটা নেতৃত্ব কায়েমের লক্ষ্যে পাঁচ ‘রাইজিং ইকোনমি’র উদ্যোগে গঠিত সংগঠনের নাম ব্রিকস। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা এভাবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর থেকে এ নামকরণ। কিন্তু এর লক্ষ্য অনুসারে এপর্যন্ত কাজে তেমন অগ্রগতি ঘটেনি; বরং প্রয়োজনীয় মাত্রার সক্রিয়তার অভাবে বিরাট গ্যাপ আছে সত্য; কিন্তু জন্মের (২০০৯) পর থেকে ব্রিকস প্রতি বছর নিয়মিত তাদের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন করে যাচ্ছে। ব্রিকস এবার সাত বছরে পড়ল। সে তুলনায় চীনের নেতৃত্বে পালটা বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) উদ্যোগ আইডিয়া হাজির করার পরে মাত্র ২ বছরেই প্রায় কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাজির হয়ে গেছে। আগামী বছর থেকে এ ব্যাংক পুরোদমে অপারেশনাল হয়ে যাবে। এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান।
বলা যায়, ৭ বছর ধরে ব্রিকস নিয়ে চীনের নানান চেষ্টা চরিত্রের পরও অগ্রগতি কাঙ্খিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর কারণে চীন হঠাৎ ব্রিকসের বাইরের বন্ধুদের সামনে আলাদা করে এআইআইবি ব্যাংক গড়ার প্রস্তাব হাজির করেছিল; এবং ২ বছর শেষ হওয়ার আগেই বাস্তবায়নের দিকে চলে যায়। ব্রিকস নিয়ে নানা বাধা তৈরি ও ওজর-আপত্তি তুলে ব্যাংকটিকে কার্যকর করার কাজ ধীরগতি করার পেছনে ভারতের অবদান বেশি। এর পিছনে ভারতের নীতি নির্ধারক দ্বিধা ও থিঙ্ক-ট্যাংক জাতীয় পরামর্শকদের ভুল পরামর্শ ও বিভ্রান্তি এবং সর্বপরি ভারতের নিজের সম্পর্কে অতি-মুল্যায়ন এবং আমেরিকান-পো ধরার চেষ্টা, আমেরিকান প্রভাব ইত্যাদি দায়ী। এ প্রসঙ্গে দুইটি প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা করব। এক. ভারতের ওজর-আপত্তির অজুহাতগুলো কী ধরনের এবং কেন? ভারত কেন ব্রিকসের প্রশ্নে ওজর-আপত্তির পথে হাঁটছে কিংবা ব্যাংকটিকে এখনও নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ও সঠিক মনে করছে না- এসব নিয়ে আলোচনা করা। কথাগুলো ব্রিকস বাস্তবায়নের পথের সমস্যা শিরোনাম দিয়েও আলোচনা করা। দুই. এআইআইবি ব্যাংক অপারেশনাল করার জন্য গঠন কাঠামো, আর্টিকেল অনুমোদন সম্পন্ন হয়ে গেছে; অর্থাৎ এআইআইবি ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার ব্যাংক হিসেবে চালু করার পর্যায়ে চলে যাওয়ার পরও এবারের ব্রিকস সম্মেলন আরেক অবকাঠামো ব্যাংক, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে এনডিবি (NDB) চালু করার সিদ্ধান্ত নিল কেন? অর্থাৎ একসাথে দুদুটো অবকাঠামো ব্যাংক উদ্যোগ কেন?

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থার ৭০ বছর
দুনিয়ায় পুঁজিতন্ত্রের বয়স প্রায় ৫০০ বছর। এ সময়ের মধ্যেই এর উত্থান, আন্তঃসম্পর্কিতভাবে দুনিয়াব্যাপী বিস্তার এবং পুঁজির অন্তর্নিহিত লজিক অনুযায়ী বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বর্তমানে এটা গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ৫০০ বছরের মধ্যে চলতি শেষ পর্যায়ের মাত্র ৭০ বছর বাদ দিলে বাকি আগের পুরো সময়টাতে (১৯৪৪ সালের আগের প্রায় ৪৩০ বছর কাল পর্যন্ত) ব্যাংক বা টাকার ব্যবসার উত্থান ও বিকাশ ঘটেছে তথাকথিত প্রাইভেট সেক্টরে, রাষ্ট্রের মালিকানার বাইরে। অর্থাৎ জন্মের শুরু থেকে ক্যাপিটালিজম কলোনি যুগের বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা সহায়তা ছাড়া চলতে সক্ষম হয়েছিল। ক্যাপিটালিজমের কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে প্রথম দুইটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বা মাল্টিল্যাটারাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। এটাই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রথম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বা বলা যায়, আমেরিকার নেতৃত্বে রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ। আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়া, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা। যদিও এর মূল উদ্দেশ্য বা তাগিদ ছিল দুনিয়াব্যাপী সবার জন্য এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কায়েম করা। যে কোনো বাণিজ্য বিনিময় ঘটার পূর্বশর্ত হলো সকল রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা চালু থাকা এবং ওই মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে ঐ আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা হাজির থাকা। ফলে আন্তর্জাতিক এক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম চাওয়া মানেই সেটা আসলে আগে এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা কায়েম করার কাজ হাতে নেয়া। তৎকালে বাণিজ্যের দিক থেকে একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে তার জাতীয় মুদ্রা ডলারকে একইসঙ্গে সব রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। দুনিয়ায় এ প্রথম সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম করে।

পুরানার বিশ্বব্যবস্থার গর্ভে নতুন ব্যবস্থার আগমন
মোটা দাগে বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্কের বিচারে তিনটি পর্যায় আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রথমত, মধ্যযুগ থেকে ১৯৪৪ সালের আগ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই আজকের তুলনায় হয়তো সীমিতভাবে বিকশিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এটাকে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের” হাতে বিকশিত বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থাও বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সাল থেকে চলতি সাল পর্যন্ত আমেরিকান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে কায়েম করে গড়ে তোলা (সেকালে) নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা- পণ্য গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলা যায়। আমেরিকান প্রভাবের এই ব্যবস্থাটা যেটা এখনও চলতি তবে পড়তি অবস্থা, তা এখন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। আর তৃতীয়ত, মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকে আমেরিকান নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জায়গায় চীনের নেতৃত্বে পুরনো ব্যবস্থাটার পুনর্গঠন করে নেয়ার উদ্যোগ – আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো নতুন ধরনের পালটা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব। চলতি সময়টায় একটা গেম চেঞ্জিংয়ের কাল পার হচ্ছি আমরা। একালে এতে ভারতের গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে, পুরনো নেতা আমেরিকা কিংবা হবু নেতা চীন- উভয়ের কাছেই। গুরুত্বটা হলো, ভারত আমেরিকার কোলে বসে পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন ঠেকিয়ে আরও কিছু দিন চলতি ব্যবস্থার আয়ু বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা হতে পারে, একে আরও যতদিন আয়ু দেয়া যায় আমেরিকার প্রভাব তত বেশি দিন বাড়ে। আর এর বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে সুবিধা শুষে নেয়ার কাজে লাগা। তবে মনে রাখতে হবে, এ কম্ম সাময়িক লাভালাভের জন্য এবং এটা নিজের আগামীর বিরুদ্ধে কুড়াল মারাও হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এর বিপরীত পথ হচ্ছে, চীনের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত নিজের জন্য নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়তে ত্বরান্বিত হয়ে কাজে লেগে পড়তে পারে। তবে উভয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারতের এমন গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ভারতের বিশাল জনসংখ্যা। অর্থনীতির দৃষ্টির ভাষায় বলতে হবে, যত জনসংখ্যা তত জোড়া মুখ এবং হাত; এবং ততই বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং শ্রম।
এটা এখন নির্ধারিত যে, চীন ও ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গন্তব্য এক সূত্রে বাঁধা হয়ে গেছে- এখানে তারা উভয়ে ন্যাচারাল অ্যালায়েন্সের অ্যালাই। পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা খাড়া করতে পারার মধ্যেই তাদের আগামী নির্ভরশীল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার ভেতরে চীন কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে জায়গা ছেড়ে দেবে তা সবটা ভারতের দাবি জানিয়ে আদায় করার বিষয় নয়। নতুন ব্যবস্থায় ভারত চীনের কাছে কী কী দাবি করবে সেসবের সঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও অর্জিত সক্ষমতার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে হবে।

ব্রিকসঃ একের ভিতর দুই কাজের ভুমিকায়
একই ব্রিকস উদ্যোগের মধ্যে আসলে দুইটা পালটা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ আছে – একটি আইএমএফের সমতুল্য পাল্টা প্রতিষ্ঠান, অন্যটি বিশ্বব্যাংকের। ভারতের মূল যে প্রস্তাবের কারণে ব্রিকস অগ্রগতি আটকে বাধাগ্রস্ত বা শ্লথ হয়ে আছে তা হল, এখানে পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের সকলের সমান পরিমাণ বিনিয়োগ নিয়েই শুধু প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অসম সক্ষমতার বাস্তবতায় থাকলেও কাউকে বেশি বিনিয়োগ করতে দিয়ে প্রতিষ্ঠান খাড়া করা যাবে না। ভারতের এ ওজর-আপত্তিতে পড়ে পরিশেষে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য অবকাঠামো ব্যাংক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে NDB (এনডিবি) কার্যকর হতে যাচ্ছে পাঁচ সদস্যের প্রত্যেকের সমান ১০ বিলিয়ন করে মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে। অনেকের মনে হতে পারে, সদস্যদের সমান বিনিয়োগ থাকাই সঠিক। কিন্তু আসলে এমন চিন্তা অহেতুক ও অর্থহীন। ঈর্ষাকাতর সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা বলা যেতে পারে। এগুলো দিয়ে কারও প্রভাবশালী উত্থান আসন্ন হলে তা ঠেকিয়ে রাখা যায় না। যেমন আজ চীনের উত্থান কি আমেরিকা ঠেকিয়ে রাখতে পারছে, না রাখা সম্ভব হয়েছে। ভারতের অর্থনীতি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ওই ১০ বিলিয়ন ডলার কাউকে না দিয়ে নিজ নিজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করলেই তো পারত। তা না করে NDB প্রতিষ্ঠানের নামে তা জড়ো করার কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার একটি কমন স্বার্থ ওই পাঁচ রাষ্ট্রের সবার আছে। সেটা হল, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরনো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে বা বাইরে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানো। এখন ‘বিনিয়োগে সবার সমান ভাগ থাকতে হবে’ এই নীতি মানতে গেলে নতুন অর্জিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র থেকে যাবেই। অবকাঠামো ব্যাংক হিসাবে এই পুঁজি খুবই অল্প। আর এমন থেকে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এর হওয়া সম্ভব নয়। অথচ সেটাই ছিল নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গড়ার প্রধান তাগিদ।
যেমন বিশ্বব্যাংকের বর্তমানে মোট বিনিয়োগ সক্ষমতা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, এডিবির ১৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর তুলনায় “সবার সমান বিনিয়োগ হতে হবে” এ জেদাজেদিতে সবার ১০ বিলিয়ন ডলার করে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ব্রিকসের এনডিবি ব্যাংক কতটা প্রভাবশালী হবে বলাই বাহুল্য এবং তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এছাড়া মূলকথা, ভারত অন্য রাষ্ট্রকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দাতা এখনও নয়, বরং নিজেই গ্রহীতার দেশ। ফলে এ পর্যায়ে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ তত্ত্ব ও অবস্থানের সারার্থ হচ্ছে, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে নামিয়ে সবার সমান বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান গড়া। মানে এনডিবি ব্যাংককে বামন করে রাখা। ফলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী কিছুই এটা হতে না দেয়া।

ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থানঃ এক ভুয়া ও অর্থহীন তত্ত্ব
ওদিকে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থান যে ভুয়া ও অর্থহীন এর আর এক বড় প্রমাণ হলো ব্রিকস উদ্যোগের অপর কম্পোনেন্ট, যেটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে তৎপরতা বলেছি সেদিকে তাকালে। [এখনও এটা পুরা আকার নেয় নাই ফলে নাম এখনও নাই। ব্রিকস উদ্যোগের ভিতরে আপাতত ভ্রুন প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গাঠনিক পর্যায়ে আছে বাড়ছে যার আপাত নাম “নয়া আইএমএফ” মনে করে নেয়া যেতে পারে।] ব্রিকসের ‘সমান বিনিয়োগের’ এনডিবি ব্যাংক ছাড়াও হবু “নয়া আইএমএফ” এর জন্য আর একটি ফান্ড তৈরি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্যে কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে তার নিজের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি পরিস্থিতিতে তা মেটাতে সহায়তা করা। এত দিন দুনিয়ায় এ ধরনের সহায়তা বিতরণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল আইএমএফ। ব্রিকস উদ্যোগে এমন ফান্ড মোট ১০০ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এক্ষেত্রে সদস্যরা চাঁদা দেবে অসমভাবে। চীন একাই ৪১ বিলিয়ন, সাউথ আফ্রিকা সবচেয়ে কম মাত্র ৫ বিলিয়ন আর ভারতসহ বাকি তিন সদস্য রাষ্ট্র প্রত্যেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার করে- এভাবে মোট ১০০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই ফান্ড সংগ্রহের বেলায় তা অসম রাখার ন্যায্যতা কী? কেন এখানেও ভারত চীনের সমান অবদান চাঁদা দিচ্ছে না? অর্থাৎ ভারত এখানে নিজেরই ‘সমান মালিকানা তত্ত্বের’ পক্ষে নিজেই দাঁড়াচ্ছে না কেন?
নীতি কথার মানে হল, যে অবস্থানটা সবখানে ইউনিফর্মভাবে প্রয়োগ করা হবে। দেখা যাচ্ছে ভারতের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি অবস্থান নাই, ফলে প্রয়োগে ইউনিফর্মিটি নাই। এই অবস্থা কে বলা যায় ভারতের সিরিয়াসনেসের ঘাটতি আছে, ঘাটতিজাত সমস্যা আছে। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা এটা বুদ্ধিমানের অবস্থান মনে করে। কারণ এটা অজান্তে দোদুল্যমানতা নয়। জেনেশুনে দোদুল্যমান থাকা। ব্রিকসের ভিতরেই থাকা ছেড়ে না যাওয়া। কারণ একমাত্র এভাবে সে ব্রিকস উদ্যোগকে আটকে শ্লথ করে রাখতে পারে। আর এই সার্ভিসটা আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে লাগে বলে আমেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিতর সেখান থেকে বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা আদায় করা। ভারতের এই দ্বৈত ঝোঁকের কারণেই চীন হঠাত করে নিজের ঝুলি থেকে আচমকা ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) এর প্রস্তাব হাজির করে ২০১৪ সালে আর আগামি বছর ২০১৬ থেকে কার্যকর করে ফেলতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা হয়েছে এমনভাবে যে চীন একাই প্রস্তাব করেছে আর ইউরোপসহ [এবং বলা বাহুল্য ভারতও] সকলে ঐ প্রস্তাবের পিছনে পিছনে ছুটেছে হা বলার জন্য। অর্থাৎ এটা প্রমানিত হয়েছে যে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা ও প্রস্তাব করার ব্যাপারে চীন যেভাবে আগাতে চায় তা ঠেকানোর ক্ষমতা ভারত কেন ইউরোপেরও নাই। নাই এজন্য যে বিষয়টা চীনা নেতৃত্বের কোন খামখেয়ালিপনার ইচ্ছা নয়, বিষয়টা হল এক অবজেকটিভ বাস্তবতা – চীনের অর্জিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

ভারতের সিদ্ধান্তের অর্থ তাতপর্য
আর ভারতের দিক থেকে দেখলে এটা তার শর্ট সাইটনেস, সংকীর্ণ দৃষ্টি অর্থাৎ আপাত নগদ লাভের দিকে প্রলুব্ধ হয়ে চলা, আর সেই সাথে নিজের আগামি লংটার্ম স্বার্থের পায়ে কুড়াল মারা। চীনের সাথে ইতিবাচক নয়, আগামির এলাই নয়, ঈর্ষাবাচক প্রতিযোগিতার চোখে পরিস্থিতিকে দেখা। অথচ বাস্তব ফ্যাকটস হলো, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা হল ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ওপর দাঁড়ানো এক অর্থনীতি। এটা এখন দুনিয়ার সর্বোচ্চ। সেজন্য চীন যে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে এর প্রতি ঈর্ষামূলক অবস্থান নেয়া অর্থহীন, কারণ বিষয়টা ঈর্ষা করা নয়। বরং প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেয়াটাই উপযুক্ত পথ, ঈর্ষা নয়। এছাড়া নিজের ওপর আস্থা রাখা উচিত যে, কালক্রমে ভারত রাষ্ট্রের যেটুক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হচ্ছে, হয়েছে; কিন্তু তা অর্জনের পরও আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো ফোরামে সমতুল্য গুরুত্ব ও জায়গা যদি অন্যরা তাকে না দেয় তবে পালটা আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান, ব্রিকস বা AIIB হাজির হবে- ভারত তৈরি করবেই। সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হলে অন্যেরা কেউ চাইলেই ভারতকে বঞ্চিত রাখতে পারবে না। কাজেই ঈর্ষা, সন্দেহ এগুলো কোনো পথ বা কাজের কথা নয়। তবে সংকীর্ণ দৃষ্টির ভারতের নীতিনির্ধারকদের ধারণা যেহেতু নিজের ন্যাচারাল ভবিষ্যতের পথে চীনের সঙ্গে নতুন উদ্যোগে শামিল হতে ঢিলেঢালা, গড়িমসি দেখালে আমেরিকার দিকে ঝুঁকার ভয় দেখিয়ে চীনকে চাপে রাখার সুযোগ আছে, তাই সেটা নেয়া উচিত। এর অর্থ নিজের যেটুকু গুরুত্ব মূল্য পাওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি যেন সে পেতে পারে এমন আবদারে তা পাওয়ার জন্য অযথা ঝুলাঝুলি করা। এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে তা ভারতের জন্য আত্মঘাতী ফল বয়ে আনতে পারে। ব্রিকস উদ্যোগ এত দিন কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি ভারতের এসব ওজর-আপত্তির কারণে।
ভারত-চীনের সামরিক স্বার্থ বিষয়ক টেনশন আছে এটা বাস্তবতা। এর বড় কারণ মার্ক করা বা চিহ্নিত করা হয় নাই এমন বিস্তৃর্ণ কমন রাষ্ট্র সীমান্ত তাদের আছে। বিগত ১৯৬২ সালে চীনের কাছে যুদ্ধে হেরে যাবার খারাপবোধ, ট্রমা আছে। এছাড়া চলতি সময়ে অসম সামরিক সক্ষমতার বাস্তবতা এখানে আছে। এরপরেও এগুলোই একমাত্র বাস্তবতা নয়। কারণ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে আবার উলটা চীনের থেকে সহযোগিতা পাবার (অবকাঠামো ঋণ, আমদানি ব্যবসার বাজার পণ্য ও কাঁচামাল) নেবার স্বার্থ ভারতের আছে। অথচ সবকিছু মিলিয়ে দেখলে অন্তত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অহেতুক চীনভীতি ছড়ানোর চেষ্টা ভারতের মানায় না, কারণ এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ। যেমন ব্রিকস উদ্যোগের NDB ব্যাংক গড়ার ক্ষেত্রে ভারত শর্ত দেয় প্রথম ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট ভারতের হতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এভাবে শর্ত রাখা হয়েছে যে, রোটেশনে চীনের সুযোগ আসবে সবার শেষে, মানে ২০ বছর পর। ফলে আগামী দুই দশক চীন এই এনডিবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই চীনভীতি অহেতুক। তবু চীন তাতেই রাজি হয়েছে। আর ভারতের প্রস্তাবিত ও মনোনীত ব্যক্তি কে ভি কামাথ এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সাথে চীনের আরও কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা-ও জানা যাচ্ছে।
ব্রিকস উদ্যোগের মূল আইডিয়ার মধ্যে চীন বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়াকে আপাতত ব্রিকসের ভেতরে সীমিতভাবে এবং ব্রিকসের বাইরেও পূর্ণভাবে- দুই জায়গাতেই বাস্তবায়ন করার পথে রওনা হয়েছে। দৃশ্যত তাই দেখা যাচ্ছে। ব্রিকসের ভেতরের অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এনডিবি ব্যাংক। আর এউদ্যোগের বাইরের আরও পূর্ণভাবে ব্যাপক পরিসরে অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক। ভারতের খায়েশ ও চীনের প্রতি অর্থহীন সন্দেহ অনুসরণ করে ব্রিকসকে সে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে বামন রাখতে চায়। অথচ ব্রিকস উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হল, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পালটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে গ্লোবাল অর্থনীতির ওপর আমেরিকার বদলে নিজেদের নতুন কর্তৃত্ব লাভ করা। অর্থাৎ এ দুই অবস্থান স্ববিরোধী। আর ভারত এই স্ববিরোধী অবস্থানের উদ্গাতা। এ স্ববিরোধিতা কাটতে পারে একমাত্র, ভারত যদি ব্রিকস উদ্যোগের সাফল্যের ভেতর নিজেকে গ্লোবাল নতুন কর্তৃত্বে চীনের সঙ্গে বড় অংশীদারিত্বে নিজেকে দেখতে চায় তবে, তা সম্ভব একমাত্র চীনের বড় ভূমিকা এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই।
এখান থেকে ভারতের জন্য শিক্ষা হল,
১। বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী একটা অবকাঠামো ব্যাংক গড়ার উদ্যোগ যেটা শেষে AIIB নামে বাস্তবায়িত হল – শেষ পর্যন্ত এমন ঘটনাগুলো ঠেকানোর ক্ষমতা ভারতের নাই, সম্ভব হয় নাই। কারণ এটা সম্ভব নয়। ঠেকানোর চেষ্টাটাও আসলে ভারতের স্বার্থে যায় নাই। ২। গত সাত বছর ধরে এটা ঠেকিয়ে রেখে কি ভারতের লাভ হয়েছিল না কি এখন AIIB হাজির হওয়াতে ভারতের স্বার্থ বেশি আছে তাতে? AIIB ব্যাংক আগে বাস্তবায়িত হলে কি ভারতের জন্য তা বেশি ভাল হত না! আবার চীনের সাথে পক্ষে সক্রিয় থাকলে ব্রিকস উদ্যোগের অধীনেই AIIB ব্যাংক হাজির হত। তাতে বর্তমানের চেয়েও AIIB এর উপর ভারত ব্রিকসের মাধ্যমে বেশি কর্তৃত্ব লাভ করতে পারত। সেটা সে এখন হারাল। তাহলে ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় এতদিন কার পক্ষে কাজ করল? কি লাভ করল? এসব নিয়ে তার অবিলম্বে মুল্যায়নে বসা উচিত।

বিরোধে না জড়ানো বুদ্ধিমান চীন
তবে মজার দিকটা হল, ভারতের এ স্ববিরোধিতার মুখেও চীন তাকে ত্যাগ করেনি। অথবা ব্রিকস উদ্যোগকে চীন স্থবির বা গুটিয়ে ফেলেনি। বুদ্ধিমান ও ইতিবাচকভাবে ভারতকে নাড়াচাড়া মোকাবিলা করেছে। তবে দেখিয়েছে, চীন একা নিজ উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী মূল অবকাঠামো ব্যাংক গড়তে সমর্থ। তাই মাত্র ২ বছরের মধ্যে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের স্ববিরোধী ও দোদুল্যমানতার কারণে চীন আর ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে রেখে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর করার পথে যায়নি আপাতত। এর অর্থ হলো, ভারতের নির্বুদ্ধিতার জন্য চীন এআইআইবি ব্যাংক আপাতত ব্রিকস উদ্যোগের বাইরে নিয়ে রাখল। স্বভাবতই এতে ভারতের ক্ষতি ছাড়া কোনোই লাভ হয়নি। বরং এভাবে হওয়াতে এআইআইবি ব্যাংকের বাস্তবায়নের উপর চীনের একার বক্তব্যের ওজন সবচেয়ে বেশি। এমনকি ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরের এনডিবি ব্যাংকের উপর নিজের প্রভাবের চেয়ে তা বেশি। ফলে সমান বিনিয়োগের গোঁ ধরে ভারতেরই ক্ষতি হল। যদিও এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট কামাথ বলছেন, এআইআইবি ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এনডিবি ব্যাংক রেখে কাজ করবে।

এনডিবি ব্যাংক চেয়ারম্যান আরও বলছেন, তারা শুরুতে শুধু পাঁচ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখবে। এটাও কথার কথা। কারণ ব্রিকসের ভিতরে বাস্তবে অবকাঠামো ঋণ পাওয়ার দরকার আছে, প্রথমত ভারত আর ব্রাজিলের। বাকিরা দাতা অথবা ঋণ কাজে লাগানোর উপযোগী অর্থনীতির রাষ্ট্র নয়। এর মানে দাঁড়াল, আপাতত যেন ভারত শুধু নিজের জন্য ব্যবহার করবে এনডিবি ব্যাংককে। অর্থাৎ ভারত কী চাচ্ছে আর তা পেয়ে ভারতের কী লাভ হচ্ছে – এসবের কোনো ঠায়ঠিকানা ভারত মিলাতে দেখাতে পারছে না। তবু নানান ওজর-আপত্তি তুলতে দেখছি আমরা ভারতকে।
আসলে মূল স্ববিরোধী কঠিন বাস্তবতা হল, ভারত মূলত ঋণগ্রহীতা; কিন্তু সে ঋণদাতার ভূমিকা ও গুরুত্ব পাওয়ার জন্য জিদ ধরেছে।

[এই লেখাটা এর আগে আগষ্ট ২, ২০১৫ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে ছাপা হয়েছিল। পরে সে লেখাটাই আরও বিস্তার করে এবং সম্পাদনা করে এখানে এখন ছাপা হল।]