মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

গৌতম দাস

২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yD

 

গত ২২ মার্চ ছিল শুক্রবার; অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডে গত ১৫ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এক জোড়া মসজিদে হামলায় ৫০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পরের শুক্রবার সেটা। এ দিন নিউজিল্যান্ডের প্রতিটি শহর দুপুরে, বিশেষ করে ঘটনাস্থল ক্রাইস্টচার্চ সিটিতে ‘হেডস্কার্ফ’ (Headscarf, ওড়না জড়িয়ে মাথা ঢাকা) লাগানো নারীদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠেছিল। কারণ, ২২ মার্চ শুক্রবার ছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে আগের শুক্রবারে হামলায় নিহতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের পরিবার এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের সাথে নাগরিক সবাইকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সরকার ও প্রশাসনের সংহতি প্রকাশের দিন। এটা ছিল আসলে ধর্মীয় এবং সামাজিক ধরণের জমায়েতের এক মিশাল। ফলে তা মুসলমান ধর্মীয় আবার অন্যধর্মের লোকেদেরও সংশ্লিষ্ট হবার সুযোগ রাখা হয়েছে বা সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। যাতে সকলে মিলে সংহতি প্রকাশ করা যায়। আর “সংহতি” মানেই তো ধর্মসহ সব নির্বিশেষে সকলে মিলে যা পালন করা হয়। কিন্তু কিসের বিরুদ্ধে এই “সংহতি” সেকথাও মনে রাখা দরকার। “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” [White Supremist] – এমন চিন্তা ও বয়ান আর এর চর্চার বিরুদ্ধে এই সংহতি। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের এক ব্যাপক জনসমাগমে প্রধান ধারা হিসাব এই বক্তব্য উঠে এসেছিল  যে তারা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী-দের” বিরুদ্ধে এবং ধর্ম-নির্বিশেষে তাঁরা সংহত – এককাট্টা।  তাই এই আয়োজন করা হয়েছিল ঐদিনের জুমার নামাজের জমায়েতের সাথে একসাথে। আর সেই উপলক্ষে আয়োজনস্থল ছিল দুই মসজিদে হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বা নিহত হওয়া আল নূর মসজিদের সামনের স্থানীয় ‘হাগলে পার্ক’ [Hagley Park ]। সেখানেই বয়স-নির্বিশেষে নারীরা সবাই মাথায় হেডস্কার্ফ পরে যোগ দেন, যাতে তা তাদের প্রকাশিত সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়।

স্বভাবতই মসজিদে হামলায় একসাথে পঞ্চাশজন মেরে ফেলার পর এর একটা মানসিক যাতনার প্রভাব তৈরি হয়েছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে।  মুসলমান জনগোষ্ঠি বিশেষ করে নারীরা যাদের সাধারণত মুসলমান পরিচয় মানে ওড়নায় মাথা জড়ানো হয়েই বের হতে দেখা যায়, ফলে তারা চিহ্নিত – ফলে তারা আবার হামলা আক্রমণের শিকার হন কিনা এই ভয়বোধ জেকে-বসা খুবই স্বাভাবিক। মুসলমান সহকর্মি বা পড়শিদের কাছে তাদের এই ভয়ভীতিবোধের কথা জানতে পেরে নিউজিল্যান্ডের একই সাধারণ মানুষ যাদেরও গায়ের রঙ সাদা তারা এতে অস্বস্তি আর কিছুটা অপরাধবোধেও ভুগতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মসজিদে হামলার ঘটনা কেবল নিউজিল্যান্ডের মাত্র ১% মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই নয় প্রধান ধারার সাধারণ মানুষকেও আলোড়িত করে এক নেতি প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। আর সেখান থেকে সাদা-বাদীদের প্রত্যাখান করে মুসলমা্নদের ভয়বোধ আর সাধারণ মানুষের অস্বস্তি ও অপরাধবোধ – সবকিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে উঠে দাড়ানোর, রুখে উঠার প্রয়োজনীয়তা হাজির হয়েছিল। আর সেটাই ছিল হেডস্কার্ফে প্রকাশিত প্রতীকে “সংহতি” প্রদর্শনের কড়া বার্তা। এককথায় বললে, এই সংহতি প্রকাশের ফলে মসজিদে হামলার সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের যে উদ্দেশ্য ছিল যে নিউজিল্যান্ডের সাদাচামড়ার সাধারণ মানুষকে উস্কানি দেয়া, মুসলমান বা মাইগ্রেন্টদের বিরুদ্ধে তাদের শুড়শুড়ি দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলা ইত্যাদি সবকিছুই মাঠে মারা যায়। উলটা সাদাচামড়ার খ্রীশ্চান সাধারণ মানুষই মুসলমানদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বসে।

মাথায় স্কার্ফ লাগিয়ে মসজিদের ঘটনায় নিহত বা ভিকটিম পরিবারের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, সান্ত্বনা-সহানুভূতি জানানোর রেওয়াজ শুরু করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নারী প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডেন [Jacinda Arden], হামলার ঘটনার পরের দিন থেকেই। এক আদর্শ প্রধানমন্ত্রীর মতই তিনি কাজটা করেছেন। এসব সময়ে ধর্ম-নির্বিশেষে ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো আর জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত হতে না দেয়া, ঐক্য ধরে রাখা – এটাই তো তার আসল কাজ। তাই স্বভাবতই সেটা দেশ-বিদেশে খুবই প্রশংসিত হয়েছে। আর সেখান থেকেই নিউজিল্যান্ড জুড়ে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা ধর্মনির্বিশেষে এক নাগরিক ঐক্য ও সহমর্মিতা বোধ তৈরিতে লেগে পড়েছিলেন এবং তিনি তাতে সফল তা বলা যায়। তিনি বারবার বক্তৃতায় বার্তা দিয়ে গেছেন যে, ‘হামলাকারী ব্রেনটন ও তার সাদারাই শ্রেষ্ঠ এই তত্ত্ব “অগ্রহণযোগ্য এবং স্বভাবতই তা আমাদের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ তৈরি করতে ব্যর্থ হবে, কারণ আমরা এক”। বলা যায় ব্রেনটন ও তার সাদাবাদিতাকে উপড়ে তুলে সমাজ-কমিউনিটি থেকে বাইরে ফেলে দিতে এখানেই তিনি এবার সক্ষম ও সফল হয়ে যান। তার এই শক্ত অবস্থান ও প্রচেষ্টা জনমনে ইতিবাচক আবেদন সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। তাই সে্টাকেই আরো বড় করে ছড়িয়ে দিতে সোস্যাল মিডিয়ায় ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ [Headscarf-for-Harmony] নামে হ্যাশট্যাগ গ্রুপ গঠন হয়ে যায়। বলা হচ্ছে অকল্যান্ড শহরের এক ডাক্তার তাঁর এক মুসলমান সহকর্মির কাছ থেকে তাঁর ভয়ভীতিবোধের ব্যাপারটা জেনে কিছু করার তাগিদ থেকে এই হ্যাশটাগ আন্দোলন আহবান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই গ্রুপের উদ্যোগেই জুমাবারে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে সমন্বয়ে ঐ ‘হেগল পার্কের’ সমাবেশে দুই মিনিটের নিস্তব্ধতা পালন করে সংহতি প্রকাশের প্রোগ্রাম সবাই মিলে বাস্তবায়ন করেছিল।

রাজনৈতিক-সামাজিক বড় ঘটনায় সবসময়ই কিছু অতি-বাদী এরাও হাজির থাকে। সবকিছুতেই অতিরিক্ত মানে, পরিস্থিতি যতটুকু দাবি করে তার চেয়ে বেশি করে ফেলা, এমন হয় এরা। এরা হতে পারে – অতি-বাম, নয়ত অতি-ইসলামি বা অতি-নারীবাদী ইত্যাদি ধারার কাউকে কাউকে পাওয়া যায়ই। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। যেমন সামাজিক মিডিয়ায় অনেককে দেখা গেছে এক “ষড়যন্ত্র তত্ব” নিয়ে হাজির হতে। এরা বলতে চাচ্ছেন যে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার স্কার্ফে নিজেকে প্রকাশ ও সহমর্মিতা প্রদর্শন – এটা “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”। এটা আসলে কেবল দেখানো জন্য। কেন? কারণ সাদা শ্রেষ্ঠ্ত্ববাদী খ্রীশ্চান ব্রেনটন= নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী খ্রীশ্চান জেসিন্ডা। অর্থাৎ খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। এতে মানে দাড়ালো যে জেসিন্ডাই ব্রেনটন। সেকারণে হামলা করে এসে এখন জেসিন্ডা কালো স্কার্ফ পড়ে হাজির হলেও তিনি আসলে মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। এদের এমন এই চিন্তার কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে ১. খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। ২. খ্রিশ্চান মানেই সে এন্টি-মুসলমান। মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। ৩। খ্রীশ্চান কখন মুসলমানের জন্য ভাল কিছু করতে পারে না; ইত্যাদি এসব বক্তব্যের ভিত্তির উপর।

কিন্তু এমন চিন্তা যেকোন মুসলমানের জন্যই ভীষণ বিপদজনক। কেন? কারণ এই বক্তব্যের যুক্তির প্যাটার্ণ অনুসারে তাহলে সারা দুনিয়াতে ঘটা যত খুন খারাবি, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এমনকি সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য করা কাজসহ যাবতীয় কাজ আছে যা কোন না কোন মুসলমান জড়িয়ে আছে সেসবের জন্য দায়ী দুনিয়ার সব মুসলমানেরা – একথা মেনে নিতে হবে! আসলে এমন চিন্তা অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। মুসলমান মানেই সে ভাল অথবা খ্রীশ্চান মানেই খারাপ – এটা অতি-সরলিকরণ এক ভিত্তিহীন চিন্তা। একইভাবে এক মুসলমানের কাজের দায় সব মুসলমানের – এমন চিন্তাও অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। আসলে এগুলো খুবই কম চিন্তা করে বলে ফেলা কথা। যেমন, বলা হল এক মানুষের নাম রহিম। অতএব মানুষ মাত্রই তাঁর নাম রহিম – এমন মনে করা। এগুলো হল ‘সাধারণ’ আর ‘বিশেষ’ – এই দুই এর সম্পর্কে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা। যেখানে মানুষ আমাদের সাধারণ নাম। আর রহিম বিশেষ নাম। তাই রহিম একই সাথে মানুষ হলেও মানুষ মাত্রই সে রহিম হবে তা কখনও নয়।  তবু চিন্তায় সতর্ক না থাকলে চিন্তার এমন এই পা-পিছলানি ঘটে।

মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে বিভিন্ন প্রতীক বা আচার-রিচুয়াল [ritual] ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকে। ফলে সেখানে কোন জিনিসটি প্রতীক হয়ে উঠছে, এর চেয়েও কী উদ্দেশ্য মানুষের সবার সেই ঐক্য সংহতি প্রকাশ তারই ভাব-প্রভাব নিয়ে হাজির হয়ে যায় সেই প্রতীক। এখানে তা-ই হয়েছে। এখানেও যে স্কার্ফ যা মূলত ইসলামী নারীদের কারণে ইসলামের প্রতীক মনে করা যায় সেই স্কার্ফকেই এখানে নিউজিল্যান্ডবাসী ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের প্রতীক হিসাবে – সেই সংহতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। হামলাকারি ব্রেনটন যদি নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানদের বার্তা দিয়ে থাকে যে স্কার্ফ বা মুসলমান দেখলেই তাদের “নির্মুল কর” তাহলে সেক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানেরা পালটা বার্তা তৈরি করেছে যে না তাঁরা বরং ব্রেনটন ও সাদা শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তাকে প্রত্যাখান করছে। শুধু তাই না। শোকে দুঃখে থাকা মুসলমানদের সাথে মিলে সহমর্মিতায় ঐ স্কার্ফকেই সংহতির প্রতীক হিসাবে তুলে ধরছে।

কিন্তু ঐদিনই স্কার্ফের বিরুদ্ধে আবার আপত্তি তুলে ধরেছেন কিছু অতি-নারীবাদী। এটা “সস্তা প্রতীকী প্রদর্শনী” বলেছেন। [In an unsigned opinion piece on Stuff.co.nz, a Muslim woman called the movement “cheap tokenism”.] তাদের দাবি স্কার্ফ হল নারীদেরকে ঘেরটোপের মধ্যে আটকে রাখার মুসলমানের ধর্মীয় ব্যবস্থা ও চিহ্ন। অতএব স্কার্ফ ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক হতে পারে না। আগেই বলেছি এটা অতি-নারীবাদী অবস্থান। প্রথমত, স্কার্ফকে সুনির্দিষ্টভাবে এই ঘটনায় ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক বলে গ্রহণ করতে কেউ কাউকে বাধ্য করে নাই। এমনকি মুসলমানেরাও নয়। সোশাল মিডিয়ায় কেউ একজন প্রস্তাব করেছিল আর তাতে ধর্মনির্বিশেষে সকলের তা মনে ধরেছিল – এত টুকুই। স্কার্ফের আর অন্য মানে যাই থাক সুনির্দিষ্ট এখানে এই সবচেয়ে ‘ওপেন চয়েজ’ এর মাধ্যমে যার যার বেছে নেয়া ও সাড়া দেওয়া – এটা বিরাট তাতপর্যময় এবং গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। অতি-নারীবাদী অবস্থান এটা দেখতে মিস করেছে। এটা পরিস্কার যে এখানে স্কার্ফের অন্য কোন মানে/প্রতীক আছে কিনা অথবা যাই থাক তা এদের বিবেচনার বিষয়ই ছিল না। মুল বিষয় ছিল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তা ও ব্রেনটনের বার্তাকে” নাকচ করা। এবং নিজেদের সংহতি জানানো। কিন্তু স্কার্ফ মাত্রই “গা-চুলকানি বোধ” এটা তো যাদের এমন অনুভব তাদের চিন্তায় অসর্তকতার সমস্যা। এখানে বরং সবচেয়ে কড়া মেসেজ ছিল – ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নারকীয় খুনি ব্রেনটনের বার্তাকে নাকচ করা। অর্থাৎ স্কার্ফ ইসলামের প্রতীক কি না, ইসলাম ভাল অথবা মন্দ কিনা সেসব বিষয় উহ্য রেখে এবং একে ছাপিয়ে গিয়ে  ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নৃশংস খুনের কাজকে কোন জায়গা না দেয়া, প্রত্যাখ্যান।
কিন্তু তবু স্কার্ফ কেন? এটা বুঝতে অনেকেই মারাত্মকভাবে মিস করেছেন। অনেক সময় বিরাট চিন্তাবিদ তাত্বিক হতে গিয়ে আমরা বাস্তবতা বা ব্যবহারিক দিক ভুলে যাই। সুনির্দিষ্ট বাস্তব দিকটা নজর দিতে গাফিলতি করে বসি। নিউজিল্যান্ডের মুসলমান মোট জনসংখ্যার ১% বলছেন অনেকে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক লাখ হয়ত। আমাদেরকে কল্পনা করতে হবে ্সেখানকার ঐ সংখ্যালঘু মুসলমান নারী-পুরুষের জায়গায় বসে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হামলার পর থেকে এদের মনে কী তীব্র ভয়ভীতি নিরাপত্তাহীনতা  দানা বেধেছিল। অথচ বেচে থাকার স্বাভাবিক কাজ কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ নিজেই করতে হয় বলে সেজন্য মুসলমান নারী-পুরুষ সকলকেই ঐ শহরে বাইরে বের হতেই হবে। অথচ বাইরের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের চামড়ার রঙ তো সাদা! তাহলে এরা সবাই কী মুসলমানদের জন্য ঘাতক, একেক জন মুসলমানদেরকে হামলার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে? এমন যেন এই হামলে পড়ল বলে?  এটাই সেই ভয়ঙ্কর দুঃসহ ভীতি! এটা আমরা যারা দূরে বসি আছি আমাদের অনুভব করতে হবে। তাহলে বুঝব। না হলে সবই কারও ষড়যন্ত্র বলে মনে হবে।

সহকর্মি বা পড়শি যারা মুসলমানদের পাশে বসবাস করে দেখা হয় এদের মধ্যে যাদের কে তবু কাছের মনে হয় তাদের সাথে মুসলমানেরা স্বভাবতই তাদের অনুভব শেয়ার করবে। তাই ঘটেছিল। কিন্তু সেকথা শুনে ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কী মনে হয়েছিল? ঐ খ্রীশ্চান পড়শিরা এই প্রথম টের পেয়েছিল যে মসজিদে হামলাকারি ব্রেনটন তাদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে! অথচ মসজিদে হামলার ব্যাপারটা আগে হয়ত ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কাছে অনেক দুরের ঘটনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু খ্রীশ্চান পড়শি এবার টের পেল ব্রেনটন তাদের সবাইকেই পড়শি মুসলমানদের কাছে  একেকজন খ্রীশ্চান সন্দেহভাজন খুনি  বানিয়ে ছেড়েছে  – যে সম্ভাব্য খুনিরা এখনই বুঝিবা রাইফেল বের করে মুসলমানের উপর  ঝাপিয়ে পড়বে এমনই দানব!

স্বভাবতই যা সে নয় এমন পরিচয়ের দাগ তার গায়ে লাগাতে চিত্রিত হতে বেশির ভাগ মানুষই রাজি হবে না। এর সোজা মানেটা হল মুসলমানের মনে হামলা ভয়ভীতির দুঃস্বপ্ন আর সাধারণ খ্রীশ্চান পড়শিরা এদের সবার গায়ে একেকটা দানব এই পরিচয় লেপ্টে দেয়া একই কথা। অতএব একপক্ষের মনে ভীতি আর অপরপক্ষকে দানব পরিচয় লেপ্টে দেয়া – দুপক্ষই সবই এসব কিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে  উঠে দাড়াতে মনস্থ করা থেকেই স্কার্ফ প্রতীকের উদ্ভব। আর মুসলমান মেয়েরা স্কার্ফ ব্যবহার করে বলে না চাইতেই তারা মুসলমান বলে জনসমক্ষে চিহ্নিত। সম্ভবত সে থেকেই  ধর্মনির্বিশেষে সকলেই যদি প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে স্কার্ফ পড়ে তাহলে অন্তত মুসলমান নারীরা সেফ ফিল করবে – এমন ভাবনার উদ্ভব। অতএব এই স্কার্ফ প্রতিবাদের সারকথা ছিল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্রত্যাখ্যান। মুসলমান পড়শির মনে সাহস ফেরানো – এক কমিউনিটি ঐক্য। অতএব মুলত একেবারে ব্যবহারিক প্রয়োজন বোধ ছিল কমিউনিটিতে মুসলমান নারীদের ভয়ভীতি তাড়ানো আর নিরাপত্তাবোধ আনা।  আর সেই অভিযোগের দাগ থেকে সাদা চামড়ার সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা। নিউজিল্যান্ডের মুসলমানেরা ভয়ভীতি দূর করে বাসা থেকে বের হবার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা এক অগ্রপক্ষেপ।
সুতরাং একেবারেই মুল তাগিদ ছিল নিউজিল্যান্ডের কমিউনিটি-সমাজে এক ব্যবহারিক সমস্যা দূর করা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে  নানান কিসিমের অতি-বোধ তৈরি হচ্ছে ইস্যু বা সমস্যার ব্যবহারিক দিক থেকে তা দেখতে না পারা থেকে। অতি-ইসলামবাদীরা ভাবছেন সকলেই স্কার্ফ চাপালে তো বিপ্লবের জোশ কমে যাচ্ছে ফলে নিশ্চয় এটা ব্রেনটনের খ্রীশ্চান বোন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার ষড়যন্ত্র। অথচ তারা দেখতে পাচ্ছেন না ভয়ভীতিতে নিরাপত্তার অভাববোধে ঘরবন্দী মুসলমান নারী-পুরুষ বাইরে বের হবার পক্ষে নির্বিশেষ কমিউনিটি-সাহসের জন্ম হোক, উঠে দারাক – সেটা খুঁজে ফেরা থেকেই এই স্কার্ফ সংহতির জন্ম। এমনকি মুসলমানদের মনে সাহস আনার জন্য জেসিন্ডা নিউজিল্যান্ডের মত হামলা ঘটবার দেশ-শহরে পালটা অত্যন্ত দৃঢতা দেখিয়ে ঐ শুক্রবারে টিভিতে জুমার আজান প্রচারের ব্যবস্থা করেন। 

প্রায় একই ধরণের এক ব্যাখ্যা ও এর প্রয়োগ করতে গিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজের বিপদ ডেকে আনতে গিয়েছিলেন। তবে তাঁর সৌভাগ্য যে তিনি তা সামলে নিতে, নিজেকে কারেক্ট করে নিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তিনি সাহসের সাথে তা নিয়েছেন। তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন। কোন নির্বাচনে আভ্যন্তরীণ বহু হিসাবকিতাব থাকে, বুদ্ধিমানেরা সে হিসাবের সব বক্তৃতা বিবৃতিকে সেগুলা যেন দেশের বাইরে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে কথা বলেন, ব্যবস্থা করে রাখেন। এরদোগান ব্রেনটনের হামলায় নিজেকে এর প্রতিরোধের বীর হিসাবে দেখাতে বক্তৃতা করেছিলেন, হামলার ভিডিওও দেখিয়েছেন। বাইরের দুনিয়া এসব  জানলেও প্রথমদিকে  উপেক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এরদোগান একবার সীমা ছাড়িয়ে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে খামোখা হুমকি দিয়ে বসেন। তিনি বলেন ব্রেনটনের বিচার যদি অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড না করতে সক্ষম হয় তবে যেভাবেই হোক তিনি এর বিচার করবেন [“If New Zealand fails to hold the attacker accountable, one way or another we will hold him to account.”]। এটা তো বিনা মেঘে বজ্রপাত। কারণ অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ব্রেনটনের বিচার করতে চাইছে না বা পারছে না – এমন কোনকিছুর অন্তত ইঙ্গিতও তো আগে থাকতে হবে! এরপরে না বিচার করার “অন্য কারও” সুযোগ আসবে? তাই এটা গায়ে পড়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য হিসাবে হাজির হয়েছিল। স্বভাবতই এই বেহিসাবি বক্তব্য অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে খারাপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। তবে এরদোগানের সৌভাগ্য যে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড গঠনমূলক ভাবে আগায়, এরদোগানকে পিছনে ফিরে যাবার সুযোগ তৈরি করে দেয়  – এমনভাবে কথা বলেন। এরদোগান সেই সুযোগটা নিয়ে পরেরদিন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বক্তৃতা দিয়ে সে উত্তেজনার সমাপ্তি টানেন [Turkey’s President Erdoğan praises Jacinda Ardern in an op-ed for the Washington Post]। ভিতরে কূটনৈতিক দৌড়ঝাপও ব্যবপ ছিল স্বভাবতই যেমন এরদোগানের এক অফিস কর্তা পরিস্থতি নরম করতে বলছেন, [“President #Erdogan’s words were unfortunately taken out of context,” ]। এরদোগান বিশাল পা-পিছলানি ঘটনার প্রধান দিকটা হল, তিনিও – ব্রেনটন= সাদাবাদী খ্রীশ্চান= জেসিন্ড, এই ভুল ও ভিত্তিহীন সাজানো অনুমানের সমীকরণ টেনে এর উপর দাঁড়িয়ে কল্পিত শত্রু খাড়া করে কথা বলে গেছেন। অথচ হামলার ঘটনার পর প্রথম সুযোগ থেকেই শেষ পর্যন্ত জেসিন্ডা বলে আসছেন [‘We are one’] ও অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ব্রেনটন ও তাঁর রাজনীতিকে কোন প্রশ্রয় নয় বরং নিন্দা করছেন; সমাজচ্যুত করতে কথা বলে গেছেন।

এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, খ্রীশ্চান ইউরোপের অনেক দোষত্রুটি বা স্বার্থ আছে অবশ্যই। কিন্তু নতুন করে আবার কোন ক্রুসেডে খ্রীশ্চান-মুসলমানের লড়াই – এমন ভাষ্য তুলে এনে কোন বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনরা (সাদা শ্রেষ্টত্ববাদী পকেট গ্রুপেরা না) আর কখনও তুলবে না, তাদের সামাজিক অভিমুখ সেদিকে নয়। কারণ এতে বড় ক্ষতিটা তাদেরই। কারণ তাদের আভ্যন্তরীণ সমাজে কোন ধর্মতাত্বিক বিতর্কে বা এর আবহ খোদ তাদের রাজনৈতিকতাকেই [Polity] আড়াল করুক বা পেছনে ফেলে দিক, এটা তাদের স্বার্থ নয়। খ্রীশ্চান বিভিন্ন ধারা বা ফেকড়াতে পড়ে এতে দগদগে ঘৃণা লড়াই মারামারির বহু কষ্টকর পথ পেরিয়ে, তারা সেসব বিভক্তিতে তা থেকে গৃহযুদ্ধ শেষে  আজ তারা এক থিতু সমাজের অবস্থায় পৌচেছে। রাজনীতিকরা নিজের স্বার্থে সহজেই এটা ভাঙতে দিবে না।

যদিও আজ আমরা দেখছি, মসজিদে নামাজিদের ওপর হামলাকারী ব্রেন্টন- ‘সাদারাই শ্রেষ্ঠ ও ক্ষমতাবান’ এই বক্তব্যের পূজারী। যাদের নিজের ইতিহাস-পাঠ খুবই দুর্বল, আর গোঁজামিলের। একথাও সত্য যে, গ্লোবাল ইতিহাসের পুরো দুই-আড়াই শ’ বছরের কলোনি শাসনামলও দাঁড়িয়ে ছিল  সাদাদের এমনই এই সাফাই-বয়ানের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, সব রেসিজমই কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে তথাকথিত এক “শ্রেষ্ঠত্বের” একটা বয়ান খাড়া করে তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আলোচ্য ক্ষেত্রেও সেই তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান হল- ‘আমরা সাদা, তাই আমরা শ্রেষ্ঠ।’ হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের দাবি – পুরনো কলোনি আমলের জবরদস্তি বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের সেই রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

ঘটনা হল, যেকোনো রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কখনো নিজের দাবির পক্ষে (মানুষ মানে এমন) ঠিকঠাক সাফাই হাজির করে কথা বলতে পারে না। কারণ, তারা বয়ানের জোরে অথবা সততা, ন্যায় বা ইনসাফের জোরে কথা বলতে পারে না; তারা গায়ের জোরে কথা বলে। অথচ কেউ সাদা চামড়ার লোক হলেই তাকে আমাদের শ্রেষ্ঠ মানতে হবে কেন? এ কথার ভিত্তি কই? অথবা ধরা যাক সাদারাই মূলত দুনিয়াজুড়ে অন্যের দেশ-সম্পদ দখল করে কলোনি শাসন করে গেছে। কিন্তু এই কারণে এই জবরদস্তি এখনও মেনে নিতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে কেন? এসব সহজ, ছোটখাটো সাদা প্রশ্নের জবাবই তাদের কাছে নেই। বিশেষত যখন একালে রিপাবলিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট হল “নাগরিক বৈষম্যহীনতা”, যেটাকে ইতিবাচক দিক থেকে নাগরিক সাম্য [equality] বলা হয়। কিন্তু নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা বা সুযোগ কই?  এছাড়া এর সাথে আছে ইনসাফ আর মানুষের মর্যাদার ভিত্তির কথা।  এর মানে হল, যারা তাদের তাত্বিক [mentor] মানে যারা ব্রেন্টনদেরকে সাদা-শ্রেষ্ঠবাদী হতে উসকানি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে তারা খুবই নাবালক-চিন্তার লোক।

দ্বিতীয়ত, আরো বড় প্রশ্ন হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরের দুনিয়া তো আর এক ছিল না; আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে গেছিল। এটা সাদা চোখেই জানা-বুঝা যায়। যেমন প্রথম ফারাক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি মালিক দেশের দখলদারিত্বে দুনিয়ার বাকি সব (এশিয়ার, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা) দেশই দখল ও কলোনি হয়ে গেছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উল্টো চিত্রঃ কলোনি দখলদার ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফরাসিরাসহ সকলেই একের পর এক কলোনি ছেড়ে চলে গেছিল। এতে উপনিবেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেছিল। কেন?

কারণ, ব্রিটেন-ফ্রান্সের মতো ইউরোপ কলোনি মালিক-দখলদারেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে জিততে হলে এর একমাত্র নির্ধারক বাস্তবতা ছিল আমেরিকাকে নিজেদের পক্ষে পাওয়া – এর উপরে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমেরিকান শর্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে ইউরোপের জিতে যাওয়ার পরে ইউরোপের সবাইকে কলোনি দখলগিরি ছেড়ে দিতে হবে। ইউরোপ এই শর্ত মেনেছিল উপায়হীন হয়ে। এই শর্তের কারণেই দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে যায়। শুধু তাই নয়, গায়ের জোর থাকলেই অন্যের দেশ ও সম্পদ দখল করা যাবে না, সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে, – এসব আমেরিকান শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল। যা তদারকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘের জন্ম (১৯৪৪) হয়ে যায়। এ ছাড়া ইচ্ছামত মারধর নৃশংতা হত্যার যুদ্ধ করা যাবে না, বরং যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি হয়ে যায়, যেগুলো মেনে চলতে হবে। জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালে এর জন্ম, আর এর আগে ১৯৪৮ সালের হিউম্যান রাইট চার্টার রচিত হয়ে যায়। এ ছাড়া, আরো পরে ১৯৬৬ সালের জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক সিভিল ও পলিটিক্যাল রাইট (ICCPR) রচিত হয়ে যায়। সংক্ষেপে বললে, এ সবগুলো আইন, কনভেনশন বা চুক্তির সারকথা হল, গায়ের জোর থাকলেই আর সবকিছু করা যাবে না।
কাজেই অন্যের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব অমান্য, দেশ দখল, নাগরিক মানুষের অধিকার না মানা- এসব ইত্যাদি পেরিয়ে এসে গ্লোবাল ইতিহাস আজকের দুনিয়াতে দাঁড়িয়ে – ফলে কেবল ‘আমি সাদা তাই আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নাও”- বলে একালে শুধু এই সাদাবাদীরা কতদুর যাবে; এ কথা বলে কতটুকু তারা আগাতে পারবে? তবে হ্যাঁ পরোক্ষ শাসন সম্ভব, যদিও তা দূর থেকে প্রভাব রাখা প্রভাবিত করা অর্থে হতে হবে। একালে আমেরিকা ইরাক দখল করেছে, ছেড়েও দিয়েছে। পুতুল শাসক রেখে শাসন করেছে- এসব পরোক্ষ কাজ সম্ভব। যদিও কফি আনানের মুখ থেকে – ইরাকে আমেরিকা ‘দখলদার বাহিনী’- এই রায় শুনেও ক্ষমতাধর আমেরিকাকেও চুপচাপ সেকথা হজম করে থাকতে হয়েছে।

এসবের সারকথা হল, যে কলোনি শাসন আমলের সাদা শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন এরা এখন আঁকছে; অথচ সেই শাসন বহাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, পরে নয়। দুনিয়া এখন সে জায়গায় নেই। খোদ ইউরোপের সব রাষ্ট্রকেই কলোনি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। পরবর্তিতে সাদা চামড়ার গরম বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই তারা কিছু রক্ষা করতে পারেনি। তাই প্রধান প্রশ্ন – ইউরোপের এখন যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে বা থাকবে, তাদের সকলকেই এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক ধারাগুলোকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। করতে বাধ্য নইলে, জাতিসঙ্ঘে জবাবদিহি করতে হবে। সভ্যতার গরম ফুটা হয়ে যাবে। হয়ত এর আগে বিরাট একদল লোক এই আত্মগ্লানিতেই মারা যাবে।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের যে উসকানি দেয়া হচ্ছে, এর মেনটর যারা, তারা হয় নাদান আর নাহলে নরেন্দ্র মোদির মতো চিন্তা্ আর দলের লোক এরা। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য হল, সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের উসকানি – এই ন্যাশনালিজমের আওয়াজ তুলে আসলে ভোটের বাক্স ভর্তি আর ক্ষমতা পাওয়া। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের কোন দুনিয়া কায়েম এদের আসল লক্ষ্য নয়, কম্মো না। সে মুরোদ নাই তা তারা জানে। ঠিক যেমন মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল ভোটের বাক্স ভর্তি ও সরকারে আসা – আর এক হিন্দুত্বের ফ্যাসিজম কায়েম করে বিরোধী নির্মূল করা। তবে ইউরোপ নিশ্চয়ই ভারত নয়। স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক ইউরোপের নাগরিক্দেরকে তাদের চিন্তার উপর সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া কায়েমের স্বপ্ন ও লোভ দেখিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে এক ফ্যাসিজম কায়েম- সেটা বেশ কষ্ট কল্পিত অবশ্যই।

এ ছাড়া আর একটা দিক আছে। একালের ক্যাপিটালিজম মানে কোনো একটা রাষ্ট্রের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ এমন কোনো ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটালিজম’ বলে কিছুই আর নেই। এক এবসার্ড কল্পনা মাত্র। ক্যাপিটালিজম মাত্রই গ্লোবাল। অন্য রাষ্ট্রের সাথে লেনদেন- পণ্য, পুঁজি, বাজার, বিনিয়োগ ইত্যাদি সব কিছুই এখন গভীরভাবে সম্পর্কিত থেকে বিনিময় এক্সচেঞ্জ করতে আমরা সবাই বাধ্য। এ অবস্থায় কোনো ‘সাদাদের ক্যাপিটালিজম’- এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বরং উল্টো, সাদা লোকদের উৎপাদিত পণ্য প্রডাক্টের ক্রেতা কেবল সাদা চামড়ার লোকেরাই হোক, সেটা সাদা মানুষের চাওয়া হতেই পারে না।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের সাফাইয়ের ঠিক-ঠিকানা নেই। অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ। যদিও উসকানি আছে চরমে। তবে এমন যেকোনো দাবিদারদের বয়ানে একটা কমন জিনিস আমরা দেখতে পেয়ে থাকি। তা হলো যে আইডেনটিটি বা পরিচয় (যেমন- এখানে আমরা সাদা চামড়ার খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী পরিচয়) তারা দাঁড় করাক না কেন, তা তারা করবে এর কোনো অতীত অর্জনকে টেনে এনে। আর সেকালের এমন অর্জন বলে কোন কিছু থাক বা না থাক ঐ জনগোষ্ঠীর অতীতে অনেক শান-শওকত ছিল, প্রভাবশালী ছিল এমন গল্পগাথা তৈরি করে প্রচার করবেই তারা। এটাই সাদা-বাদী সুড়সুড়ি।

দেখা যাচ্ছে, ব্রেন্টনের মেন্টর-পীরেরা গল্পগাথা তৈরির এ কাজে ক্রুসেডকেও তুলে এনেছে। কিন্তু ঘটনা হল, খ্রিষ্টান ইউরোপ তো ক্রুসেড জিতেনি। এ ছাড়া ক্রুসেড মূলত বারো-তেরো শতাব্দীর পরে ইউরোপেই আর কখনও জাগেনি। বরং পনেরো শতাব্দীর পর থেকে প্রধান শাসকগোষ্ঠী বা শ্রেণী বলতে ইউরোপ তা আর ধর্মতাত্ত্বিক-ভিত্তির কোনো শাসকগোষ্ঠীর হাতে থাকেনি; বরং ম্যানুফাকচারার, জাহাজ ব্যবসায়ী, কলোনি দখলকারি মাস্টার – এসব, আর ওদিকে আরেক চিত্র, মোটের ওপর যারা ছিল রাজতন্ত্রবিরোধী। এসব বৈশিষ্ট্যের মডার্ন রিপাবলিক রাজনৈতিক ধারার শাসন কায়েম হয়ে যায়। ক্রুসেডের সাথে যারা স্বার্থ আর বয়ানের দিক থেকে যোজন যোজন দূরে। তাহলে একালে এসে আবার ফিরে ত্রুুসেডের গর্ব তুলে অথবা হেরে যাওয়ার সহানুভূতি সে কার কাছে বেচবে? কার থেকে পাবে বলে আশা করে? মডার্নিস্ট ইউরোপের জনগণ কি ক্রুসেডের গর্ব অথবা মুসলমানদের হাতে হেরে যাওয়ার সহানুভূতির ভেতর আশ্রয় নিতে রাজি হবে? আসলে এটাকে এক কষ্ট-কল্পিত ফ্যান্টাসি বললেও কম বলা হয়।

আর এক চরম স্ববিরোধিতাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, মাইগ্রেন্টবিরোধিতা [অভিবাসী=migrant]। যেটা আসলে ‘অপর’ বা বিদেশী ভীতি ও বিরোধিতা; যাকে বলা যায় জেনোফোবিয়া [Xenophobia]। এটা অবশ্য সব ধরনের জাতিবাদেরই কমন ফিচার যে, তারা বিদেশী-বিরোধী হয়। তবুও ইউরোপের কোনো ধারার বয়ানধারীদের একালে মাইগ্রেন্টবিরোধী হওয়ার ক্ষেত্রে তা অবশ্যই শক্ত সাফাই তৈরিতে ব্যর্থ হবে। কারণ, যে ইউরোপের উত্থান বা ওর তরুণ বয়স কেটেছে অন্যের দেশ দখল করে, কলোনি শাসন করে সেই পুরান কলোনি-দেশ থেকে কয়েকজন নেটিভ মাস্টারের দেশে এসে বসবাস শুরু করলে তা না জায়েজ, এমন কথা সে কিসের ভিত্তিতে বলবে? সে কারণে এদের এই তথাকথিত মাইগ্রেন্টবিরোধিতার বয়ান বর্ণনা তৈরির ভিত্তি দেয়া মুশকিল হবেই। তা ছাড়া, মাইগ্রেন্টরা তো নিজে জোর করে ইউরোপে ঢুকে যায়নি। ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চললে বাড়তি লেবার দরকার, তাই মাইগ্রেন্টদের স্বাগত জানানোর নীতি নিয়েছিল তারা, বলেই মাইগ্রেন্টরা এসেছে। অর্থনীতি খারাপ গেলে এখন এদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে খেদিয়ে দিতে চাইলেই ব্যাপারটা তত সরল হবে না, এতাই স্বাভাবিক।

তবুও আচ্ছা ধরা যাক। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানদাতাদের অভিবাসীবিরোধিতা জায়েজ। সে ক্ষেত্রে তারা আসলে  ত সাধারণভাবে বিদেশীবিরোধী হওয়ার কথা। আর সেই বিদেশী কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু তাহলে ব্রেনটনেরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে কেন? মুসলমানবিদ্বেষী কেন? এটা তো সাদাবাদীদের বয়ানের সাথে মিলল না! যেমন- হিন্দু ভারতীয় এমন নাগরিকেরা ইউরোপে ঢুকেছে এমন ক্ষেত্রে তারাও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানের চোখে মাইগ্রেন্ট বলে গণ্য হবে? আমরা নিশ্চিত, মনে হয় না। আসলে সাদাবাদীরা কি অভিবাসীবিরোধী নাকি মুসলমানবিরোধী – সে ফয়সালা তাদের আগে করতে হবে। কারণ – দু’টার সাফাই তো দুই রকম হতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুখে তারা অভিবাসীবিরোধী কিন্তু কাজে ইসলামোফোবিক। তাদের বয়ান এমনই সব গরমিলে ভর্তি। তবে খুব সম্ভবত ওয়ার অন টেররের কারণে পাশ্চাত্য একালে সঙ্গোপনে অথবা প্রকাশ্যে মূলত ইসলামোফোবিক। এই ফোবিয়ার তেলে নিজেদের মাছ ভাজতে সাদাবাদীরা বাস্তবে ইসলামোফোবিক হয়ে উঠছে।

তবে এই প্রথম আমরা দেখছি সাদা চামড়ার প্রধান ধারা (সাদাবাদী নয় যারা) এমন আমপাবলিকেরা অপরাধবোধে ভুগছে। কারণ, সাদাবাদীদের নৃশংসতার দায় তাদের উপরও এসে পড়ছে। সেটাই নিউজিল্যান্ডে আমরা ঘটতে দেখছি। তাই সাদাবাদীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখাতে তাদের এই হেডস্কার্ফ প্রতীক নিয়ে সংহতি প্রকাশ। আপাতত এতটুকু বিচার করেই বলা যায়, সাদাবাদীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিশেষত নিউজিল্যান্ডের মত প্রধানমন্ত্রীর  নুন্যতম অবস্থান যদি সে দেশে থাকে। বাকিটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা এ ভাবটাই পৌঁছে দিতে শতভাগ সফল হয়েছেন বলে প্রশংসিত। আমাদের স্বার্থেই জেসিন্ডার পাশে, প্লুরালিজমের [Pluralism] পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।

যে কোন শ্রেষ্ঠত্ববাদই বিপদজনক, যা আপনাকে কোন না কোন একটা রেসিজমে পৌছে দিবে। ফলে সাবধান!

তবে তামাসা উপভোগের জন্য বলিতেছি – উগ্র জাতিবাদী আনন্দবাজারও জেসিন্ডার পক্ষে দাঁড়িয়ে মূল এক সম্পাদকীয় লিখিয়াছে – আগ্রহিরা ইহার সাধু-ভাষার মজা উপভোগ করিতে পারেন; যার শিরোনাম অ-স্বীকার।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা বয়ানের গরমিলে হারবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

গৌতম দাস

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2xm

 

ডান-বামের রাজনীতির কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি, শুনেছি। কিন্তু এর পিছনের কথা কী? প্রথমত বাম ও দান বলে শ্রেণী ভাগ করা তা বামপন্থীদের করা, তাদের চোখে দেখে চালু করা হয়েছিল। প্রায়ই আমরা বলতে শুনি, অমুকে বামপন্থী রাজনীতি করেন। যেমন, কেউ কাউকে অপছন্দ করলে, তার গায়ে “কালো দাগ” লাগিয়ে দিতে চাইলে শোনা যায়, সে লোকের নামের আগে তিনি ‘ডানপন্থী’ শব্দ বসিয়ে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অথবা দাবি করে বলেন, “উনি তো ডানপন্থী”। আসলে বলতে চান ইনি নেতি বা খারাপ চিন্তার লোক। অর্থাৎ শেষে সার কথা দাঁড়াল, যারা ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ কথাগুলো ব্যবহার করেন তারা বলতে চাচ্ছেন- বামপন্থী মানে ভাল আর ডানপন্থী মানে খারাপ লোক। কিন্তু এই নামকরণ কী সঠিক? আর কিসের ভিত্তিতে এই নামকরণ? কাকে ডান বলব আর কাকে বাম? এই ডান-বাম কোথা থেকে এল?

এ প্রসঙ্গে এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে বটে; কিন্তু এর জবাব আমরা যথার্থ পাই আর না পাই, শেষ বিচারে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্টই রয়ে যায়। তবে, ইতিহাসে এমন ধারণার প্রথম উদ্ভব কবে, কখন, কিভাবে – এই বিচারে বলা যায়, ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ‘ফরাসি বিপ্লবের’ পর তার সোস্যালিস্ট প্রতিনিধিরা সংসদে স্পিকারের বামদিকে সদলবলে একসাথে বসতেন। ফলে বাম দিকে যারা বসেন তাদের রাজনীতি অর্থে বামপন্থা শব্দের উদ্ভব। আর সেখান থেকেই পরে বামপন্থী (left), লেফটিস্ট (leftist), লেফট উইং (left wing) ইত্যাদি বাম-বিষয়ক নানা নামের পরিচিতি চালু হয়ে যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাও এই ব্যাখ্যাকে মেনে সায় দেয়। আর যারা বামেদের বিরোধী, স্বভাবতই বামপন্থীরা তাদের ডানপন্থী নামে ডাকার রেওয়াজও এখান থেকে চালু করে দেন। তবে সাধারণভাবে বললে, এভাবে ডান-বাম শ্রেণীকরণ করা খুবই হালকা চিন্তা বা লুজ টক (loose talk) ধরণের কথা; মানে যথেষ্ট না ভেবে চিন্তা করা বা দুর্বল-চিন্তার ভিত্তিতে দাঁড় করানো বক্তব্য।

এই নামকরণের  ভিতর অনেক ধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলোর মধ্যে প্রধান হল, এই বাম-ডান শ্রেণীকরণ (category) করা – এটা এক ‘বাইনারি’ (binary) ভাবনা। অর্থাৎ যার কেবল দুইটা রূপই হতে পারে বলে আগের সীমা টেনে রাখা হয়। এজন্য অঙ্কের ভাষাতেও বাইনারির অর্থ – শূন্য আর এক এই দুই অঙ্ক। মানে আমাদের পরিচিত (এক দুই থেকে নয় আর শুন্য) এভাবে দশটা অঙ্ক দিয়ে সংখ্যা লেখা নয়। কেবল শুন্য আর এক ব্যবহার করে সংখ্যা লেখা। এই ‘বাইনারি’ কথার সোজা মানে হল – হয় এটা, না হলে ওটা; এর বাইরে কিছু নাই, একথা বলা। হয় তুমি আমার বন্ধুর দলে আসো নইলে, তুমি আমার শত্রু – সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও তাঁর বন্ধুরা এমন বাইনারি বিভাজনের ভাষায় কথা বলতেন। অর্থাৎ এমন দুই অবস্থার বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না বলে আগে থেকেই ধরে নেয়া হয়। অথবা বলা যায়, কাউকে হয় সাদা না হলে কালো হতে হবে- এমন মনে করা। অথচ বাস্তবে সাদা আর কালোর মাঝখানে অনেক রঙ আছে, হতে পারে। কারণ হরেক অনুপাতের সাদা ও কালোর মিশ্রণে আলাদা আলাদা বহু রঙ হতে পারে। তাই কেউ কালো না হলে তা সাদা হবেই, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; তা সহজেই বুঝা যায়। কোনো কিছু সাদা অথবা কালো না হলে, মিশ্রণের হলে তাকে ধূসর বলা যায়। আর ধূসর বলতে আবার একটা নয় অনেক ধরনের ধুসর হতে পারে – যাকে আমরা সাদা-কাল মিশ্রণের নানা শেড (shade) বলি, এমন অসংখ্য শেডের ধূসর আছে, হতে পারে। কম সাদা কিন্তু বেশি কালো, অথবা বেশি সাদা কিন্তু কম কালো এমন বিভিন্ন ধরন বা শেডের ধূসর হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পুরা ব্যাপারটাকে কেবল ‘সাদা না হলে কালো’ বলে জোর করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা – এটাই বাইনারি দাবি করার চেষ্টার মতই অস্পষ্ট কাণ্ড হল – কাউকে ‘বামপন্থী না হলে, ডানপন্থী’ বলা বা নাম দেয়ার মত।

তবে এটা ঠিক যে, ফরাসি বিপ্লবের কিছু বৈশিষ্ট্যও এই ধরণের শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। এমনিতে ফরাসি বিপ্লবের এক বৈশিষ্ট্য হল, সেটা ছিল গরিব ও সাধারণ মানুষের প্রাধান্যে ঘটা একটা বিপ্লব-বিদ্রোহের ঘটনা; আর বিশেষত তা ঘটেছিল সমাজের এলিট, অবস্থাপন্ন, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধেও। তবে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই বিদ্রোহ অভিমুখ-বিহীন ছিল না। আবার অনেকেরই ধারণা, “মডার্ন রিপাবলিকান রাষ্ট্রের” সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল ফরাসি বিপ্লব। যদিও উল্লেখ করার মত ব্যাপার হল, আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬) মানে যেটা কলোনিবিরোধী চরিত্রের প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লব, সেটা ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) চেয়ে তা অন্তত ১৩ বছর আগের ঘটনা। আর রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার মধ্যে যেসব ভিত্তিমূলক চিন্তা – এমন ভিত-উপাদান খুঁজে পাবার দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব যথেষ্ট সমৃদ্ধ; অন্তত ফরাসি বিপ্লবের সাথে তুলনায়। আমেরিকান বিপ্লব এক্ষেত্রে তা কোথাও কোথাও অনন্য ও চমৎকার বটে। তবু অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা ফরাসি বিপ্লবের রেফারেন্স দেন প্রায়ই এবং সহজেই; এর তুলনায় আমেরিকান বিপ্লবের নাম প্রায় নেয়াই হয় না, তাদের। বাস্তবতা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার ভাবনা ও এর বাস্তবায়নের দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কোনো অংশেই কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ফরাসি বিপ্লবের ফলে বাম-ডান ক্যাটাগরি করে কথা বলার ভাবনা আসার পিছনের সম্ভাব্য কারণ হল – গরিব বনাম বড়লোক, এমন ভাবনা ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে ছিল। তাই সেখানে স্বভাবতই গরিব পক্ষকে আপন ও কাম্য বা ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিপরীতে, দেখা যায় আমেরিকান বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় বিষয় হল – অধিকার (ইংরেজিতে right); মানে, মানবিক-নাগরিক অধিকার (human rights) মানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার। [এটাই ফরাসি বিপ্লব আর আমেরিকান বিপ্লবের মুল ফারাকও বটে]। বলা যায়, সাধারণভাবে নাগরিক মাত্রই তাঁর “অধিকার” ধারণার চেয়ে বাম বা কমিউনিস্টদের চিন্তা (গরিব-বড়লোক এমন ভাগে) গরিব দশার প্রতি বেশি আগ্রহী, সহানুভূতি বেশি। এটাই মৌলিক পার্থক্য। যদিও বাম-ডান বলে ভাগ করে মানুষের নামের আগে বিশেষণ লাগানো নিঃসন্দেহে খুবই অস্পষ্ট ও দুর্বল-চিন্তায় আচ্ছন্ন।

আর একটু সরাসরি এবং স্পষ্ট করে বললে, ফরাসি বিপ্লবের সারবস্তু যদি সমাজের এলিট, অবস্থাবান, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধে গরিবদের উঠে দাঁড়ানো হয় এবং এই অর্থে একে বিপ্লব বলি – তা বলতে পারি অবশ্যই। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে, সমাধান পেতে চাইলে কেমন রাষ্ট্র চাই এই অর্থে, “অধিকার” ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের দরকার – এই বোধ সেখানে অস্পষ্ট করে রাখা ছিল। যাদের ভেতর এই বোধ অস্পষ্ট, তারাই মূলত বাম-ডান ভাগের ভক্ত। অথচ নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকারের ভিত্তিতে এবং নাগরিক সাম্যের নীতিতে একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন – এটাই রিপাবলিক ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আগেই বলেছি, বাম-ডান হল এক বাইনারি চিন্তাব্যবস্থা। এর মানে কোন ‘বামপন্থীর’ চোখে আপনি তার গ্রুপের নন, এ কথার মানে হল তিনি বলবেন, আপনি ডানপন্থী। সবকিছুই যেন বাম অথবা ডান হতেই হবে। যদিও বাম ও ডান উভয়েরই আবার উপবিভাগ আছে, করা হয়ে থাকে। যেমন – চরম বাম (extreme left), অতি বাম (far left) – বা ultra left। বাংলায় এখান থেকে ‘চরমপন্থী’ শব্দটা এসেছে। তাই আসলে, বাম-ডান বলে একটা শ্রেণীকরণ আগে আছে- এই বলে আগেই ধরে নেয়া একটা ধারণা আছে বলে ধরে নিলে এর ওপর ‘চরমপন্থী’ শব্দটা দাঁড়ানো পাওয়া যাবে। বামপন্থা ধারণাটার চরম রূপটাকে বুঝাতে এর নাম হয়েছে ‘চরমপন্থী’ (এক্সট্রিমিস্ট, extremist)। এই হল বামপন্থার উপবিভাগ। ওদিকে একইভাবে অতি-ডান (far right) বা চরম ডান (ultra right)- এগুলো ডানেরই নানা উপবিভাগ। এজন্য বামপন্থীদের করা এই চিন্তাব্যবস্থায় ডানের বেলায় – কোনো ধর্মীয় গণতন্ত্রী দল, রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী ইত্যাদিকে তারা ডানপন্থী খাপে ফেলেছে। এ ছাড়া রেসিস্ট (racist) বা ফ্যাসিস্টদের (facist)  বামপন্থিরা ‘চরম ডানপন্থী’ বলে মনে করে খাপে ফেলেছে। আবার সোশ্যালিস্ট, লিবারেল বা কমিউনিস্ট- এদেরও বামের উপবিভাগ বলে মনে করা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ‘বাম-ডান এই শ্রেণীকরণের’ প্রবক্তারা রেসিজম (বর্ণবাদ) এবং ফ্যাসিজমকে ‘ডানপন্থী’ ভাগে ফেলেছেন। কিন্তু এতে চিন্তার বিরাট ঘাপলাটা হল, কমিউনিস্টদের মধ্যে কি রেসিজম এবং ফ্যাসিজমের ছায়া নেই? মুখের দাবিতে তারা হয়ত কমিউনিস্ট, নিজেদের বাম বলে দাবি করছেন। অথচ বাস্তব কাজ ও পদক্ষেপ পরিচয়ে কি তাদের কেউ রেসিস্ট অথবা ফ্যাসিস্ট নন? সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রক্ষমতা মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে অথরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্ববাদিতার কিংবা এমন ক্ষমতার অভিযোগ আছে। অতএব রেসিজম এবং ফ্যাসিজমকে ডানপন্থী ভাগে ফেলা – এটাই আর এক জোরালো প্রমাণ যে, বাম-ডানে ভাগ করা মূলত বামপন্থীদের চালু করা পদ্ধতি। অর্থাৎ বামপন্থীরাই মূলত এই শ্রেণীকরণের প্রবক্তা।

এর আর একটা প্রমাণ হল, যাদেরকে কোন কোন মিডিয়া বা বামপন্থীরা  ডানপন্থী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, বিশেষণ লাগায়- কথিত সেই ডানপন্থীরা কিন্তু নিজেদের ‘ডানপন্থী’ বলে অভিহিত করেন না। এছাড়া, আমেরিকার ভেতরে বাম-ডান বলে কাউকে ডাকার, বিশেষণ লাগানোর সাধারণত তেমন চল নাই। বরং আছে উদার (লিবারেল বা liberal) আর এর বিপরীতে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ বা conservative) বলে ভাগ ও চিহ্নিত করার রেওয়াজ। আবার সেখানে উদারেরা নিজেই নিজেকে উদার এবং তাদের বিপরীতে রক্ষণশীলেরা নিজেকে রক্ষণশীল বলেই পরিচয় দিতে কোনো আপত্তি করেন না। শেষ বিচারে বাম-ডান বলে ডাকার আর এক বড় নেতিবাচক দিক হল – এটা ‘নাগরিক-মানবিক’ অধিকার বিষয়টাকে গৌণ, এমনকি অনেক সময়ে তুচ্ছই মনে করে।

ওদিক আর এক মজার দিক হল – লক্ষ করলে আমরা দেখব, বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রের নামের সাথেও কিন্তু ‘রিপাবলিক’ শব্দটা আছে। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রের নামের মধ্যে (যেমন “চীনের পিপলস রিপাবলিক” অথবা “ইউনাইটেড সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিক” ) এই ‘রিপাবলিক’ শব্দটা লিখে রাখা আসলে তা যেন অভ্যাসবশত, নেহায়েত এক রেওয়াজ যেন। এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিশেষ অর্থ তাতপর্য নেই। তবে এর চেয়েও আরও বড় গুরুত্বের দিকটা হল, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নামে ‘রিপাবলিক’ শব্দ থাকলেও ঐনামের ভিতর ‘অধিকার’ বলে অর্থ অন্তর্ভুক্ত নাই। মানে, “নাগরিকের অধিকার” বলে কোনো ধারণাকে রাখা হয় নাই বা অনুসরণ করে লিখা হয়নি। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার বা মৌলিক অধিকার বলে আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না তাই অস্পষ্ট এবং বাস্তবত তা নেই। বরং “শ্রেণীর” কথা তুলে এগুলো সব ঢেকে ফেলা হয়েছে। বরং কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে দেখা যায় নাগরিকদের বহু বস্তুগত জিনিষ পাওয়ার বা ভোগের “অধিকার” আছে। অন্ন, বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা বাসস্থান যোগানো এগুলো সবই যেন রাষ্ট্রের দায়।  কিন্তু গুম-খুন অথবা নিপীড়িত হওয়া – এগুলো থেকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দিবে কিনা এমন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা নেই। আর এমন চিন্তাভাবনা প্রসূত ধারণারই এক অনুষঙ্গ হল ‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ।

‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ বা কমিউনিস্ট আইডিয়ার আধিপত্য – এটা গত শতক পর্যন্ত ভালই দর্পের সাথে চলতে পেরেছিল বলা যায়। গত শতক ছিল মূলত ‘জাতীয়তাবাদী’ চিন্তার শতক। যদিও “জাতীয়তাবাদের রাজনীতি” বলে এর চলা শতকের শুরু থেকে শুরু হয় নাই। কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এর প্রবল উপস্থিতি শুরু হয়। কারণ এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল পরিণতিতে উপনিবেশ ব্যবস্থা দুনিয়া থেকে উঠে গিয়েছিল। এর পর থেকে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমন আইডিয়া বা ভাবনা হল নানা কিসিমের ‘জাতীয়তাবাদের রাজনীতি’।  আসলে (কমিউনিস্টসহ) যেকোন সার্বভৌম রাষ্ট্র মাত্রই, জাতিবাদের ইঙ্গিত সেখানে থাকবেই। আবার এই সময়ের রাজনীতিতে  মূলত রিপাবলিক রাষ্ট্র হতেই হবে এই মূলসুরের সাথে অনেক জায়গায় আবার অনুসঙ্গে ইসলামও ছিল। তবে তা “জাতীয়তাবাদী ইসলাম” এই ধরনের জাতীয়তাবাদ অর্থে [যেমন, ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান (১৯৪৭) অথবা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান (১৯৭৯)]। তবে সবার উপরেই চিন্তাধারা হিশাবে ‘ডান-বাম বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ’- গত শতক পর্যন্ত এটা ভালোভাবেই ছিল। কিন্তু এখন চলতি নতুন শতকে?

এই শতকের শুরুতে আমরা দেখেছি ‘আলকায়েদা’ ফেনোমেনা। মানে ইসলামও কোন বিপ্লবী তত্ত্বের এক উৎস হতে পারে, এই দাবি। যদি এর viable বা টিকে যাবে এমন রূপটা এখনই পাওয়া গেছে কি না তা স্পষ্ট নয় বা প্রমাণিত হয়নি। তবে এর ফলে মোটের উপর  দুনিয়ার সব রাজনৈতিক চিন্তাতেই “ইসলাম প্রশ্ন” – একটা নতুন শক্ত অনুষঙ্গ হয়ে হাজির হয়ে গেছে। সব রাজনৈতিক চিন্তাকেই এখন  “ইসলাম প্রশ্নে” তার অবস্থান দৃষ্টিভঙ্গি বলতে পারতে হবে – এই বাড়তি দিকটা তৈরি হয়েছে। তাই এই কালে এসে ম্রিয়মান হয়ে পড়া বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া অস্পষ্ট আরো অনেক চিন্তার মত ‘ডান-বাম’ বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ – ক্রমশ ম্লান হয়ে  যাচ্ছে। এর যৌবনের সেই ধার বা সক্ষমতা আর নেই। এর বড় কারণ খোদ ‘আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণাটাও এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে, এর পর্যালোচনার দাবি উঠে গেছে। ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে আমল কতে নিবার দাবি উঠে গেছে। এভাবে এক ‘রিভিউড’ বা ‘ক্রিটিক্যাল রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণা পুনরায় হাজির করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করা হয়। এদিকে, বাম-ডান বলাসহ কোনো অস্পষ্ট বা আধো বোলের কোনো ধারণা – একালে এদের খাতক একেবারেই কমে গেছে, যাচ্ছে।

বরং একালে এসে কেউ যদি কেবল বাম-ডান প্রগতিতে আঁকড়ে পড়ে আছে, থাকে এমন দেখি, সর্বোচ্চ প্রগতির চিন্তা বলে বড়াই করতে দেখি তবে বুঝতে হবে এই শতকে দুনিয়া কোথায় চলে গেছে এই খবর সে রাখে না। দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তাদের চিন্তাব্যবস্থায় প্রগতির বড়াইয়ে বুঁদ হয়ে, এর বাইরে কোন খোঁজ না রাখায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে সেই হিশাবে শীর্ষে উঠে আসা এমন রাষ্ট্র হল ভারত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাম-ডান’ ভাবনার তাৎপর্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]