শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
গৌতম দাস
০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1lk

তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

[এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ
গৌতম দাস
১৩ মে, ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-17R

 

 

পশ্চিমা দেশগুলো “সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম” বলে তাদের “ওয়ার অন টেররের” শত্রুদের  ডেকে থাকে। এই শব্দগুলোকে তাদের শত্রুর সাধারণ ডাকনাম বানিয়ে ফেলেছে। আর এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে আমাদের সরকার তার বিরোধীদের বিশেষ করে যারা সরকারের ক্ষমতা ও প্রধান ধারার রাজনৈতিক বিরোধী  তাদেরকেও ওই একই দড়িতে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করছে। সময়ে তা বিরাট তামাশা হয়ে হাজির হচ্ছে।

যেমন  আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু চেষ্টা করেছেন, পশ্চিমের টেরিরজমের বয়ানের ভিতর একই আগুনে সেকে আমাদের রাজনীতিতে পরিচিত “সামরিক স্বৈরাচার” শব্দটাকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে চালিয়ে দিতে। বলা বাহুল্য এটা তথ্যমন্ত্রীর খুবই অপরিপক্ক ও ব্যর্থ এক প্রচেষ্টা। কিলিয়ে কাঁঠাল পাঠানোর ধারণাও এখানে খাটো।

“সামরিক স্বৈরাচারেরা টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল”
দক্ষিণ ভারতীয় এক প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’, সেখানে বাংলাদেশ বিষয়ক এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। আসলে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সংবাদদাতা কল্লোল বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরে থাকার সময় বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর এক সাক্ষ্যাৎকার নিয়ে এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল ঐ রিপোর্ট। রিপোর্টটা প্রকাশিত হবার পর তা পড়ে মনে করার কারণ আছে যে মন্ত্রীই “একটা নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে, গাড়তে” ঐ পত্রিকার সাথে কথা বলেছিলেন।  দি হিন্দু পত্রিকায় ঐ রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, (Terrorist in tie up with military autocrat) ‘টেররিষ্ট ইন টাই-আপ উইথ মিলিটারি অটক্রাট, সেইজ বাংলাদেশ মিনিস্টার”। যার বাংলা করলে হবে, “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল– বলেছেন  বাংলাদেশের মন্ত্রী”।

“There are thousands of AL-Qaeda-trained extremists in Bangladesh who have links to military autocratic forces as well as international terrorist groups, says Hasanul Haq Inu, Minister of Information in Prime Minister Sheikh Hasina’s government”.এই ছিল ঐ রিপোর্টের শুরুর একটা বাক্য। বাংলাদেশে হাজার হাজার আলকায়েদার ট্রেনিং প্রাপ্ত জঙ্গী আছে যারা সামরিক স্বৈরাচারি শক্তির এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে যুক্ত আছে – বলেছেন বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

স্বাধীনতা পরবর্তি হিসাবে ধরলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মিলিটারি অটোক্রেটিক’ বা ‘সামরিক স্বৈরাচার’  বলতে জিয়ার ১৯৭৫-৮১ সময়কালের শাসন আর এরশাদের ১৯৮২-১৯৯০ সময়কালের শাসন সাধারণত অনেকে এই সময়টাকে বুঝিয়ে থাকেন। অর্থাৎ সারকথায় বললে ১৯৯০ সালের পরের অন্তত ১৫ বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরাচার বলে কেউ ছিল না।  ওদিকে আল-কায়েদা নামটা আমরা প্রথম জানি, নজর করি ৯/১১ বা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলায় হামলাকারিদের নাম হিসাবে। যদিও আল-কায়েদার অপ্রকাশিত জন্ম বলা হয় ১৯৮৮ সালে। তাহলে জিয়া তো বটেই এমনকি এরশাদ এই দুই সামরিক স্বৈরাচার আল-কায়েদার সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকবে কী করে? এমনকি যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই ১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা কেবল জন্ম নিয়েছে ততপর হয় নাই, ততপরতাও শুরু হয় নাই এসময়টাতে সেক্ষেত্রেও একমাত্র এরশাদের জমানার কেবল শেষ  দুবছর তারা আল-কায়েদা নামটা শুনে থাকলেও থাকতে পারে। ট্রেনিং দেয়া অসম্ভব।

বুঝা যাচ্ছে ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞান সম্পর্কে ও হোমওয়ার্কে কাচা দুর্বল থেকেই এই বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া এটাও বুঝা যাচ্ছে যেভাবেই হোক ‘সামরিক স্বৈরাচার’ শব্দটাকে তিনি আল-কায়েদা নামের সাথে বেধে পচাতে চাইছেন। কিন্তু ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞানের অভাবে গল্পটা অপুষ্ট থেকে গেছে। আর ঐ সময়কালের ফ্যাক্টসগুলো মোটা দাগে বললে তা হল, এক. ১৯৭৯ সালের প্রথম অর্ধে ইরানে বিপ্লবী খোমেনী ক্ষমতা দখল করে। দুই. ইরানের পড়শি মুসলিক অধ্যুসিত সেন্ট্রাল এশিয়া যা ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সীমান্ত, সেই সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ নিজ ঘর সামলাতে ভীত হয়ে পড়েছিল। তিনি এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন যদি ইরান বিপ্লবের জোয়ার আছর প্রতিবেশী সেন্টাল এশিয়াতে পড়ে। যদি তারা ইরান বিপ্লবের প্ররোচনায় বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হবার আওয়াজ তোলে। তাই এর প্রতিক্রিয়ায় আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ১৯৭৯ সালে ঐ একই বছর শেষে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে যাতে মাঝের বাফার রাষ্ট্র হিসাবে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করা যায়।  সেন্ট্রাল এশিয়ার যেকোন সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানের উপর বল প্রয়োগ করা যায়। তিন. সোভিয়েত এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমেরিকা পালটা ব্যবস্থা নিতে চায়। আর নিকট পড়শি পাকিস্তানও হুমকি অনুভব করতে থাকে।তাই আমেরিকান প্ররোচনায় ও তার সামরিক ও অর্থ সাহায্যে পাকিস্তান স্থানীয় ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের (নানান গ্রুপের মুজাহেদিন)  সংগঠিত করে ফেলে। এভাবে দীর্ঘ দশ বছর মুজাহেদিনদের সাথে লড়ার পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালের শুরুতেই আফগানিস্থান ছেড়ে চলে যায়, সব সৈন্য প্রত্যাহার করে। চার. সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পরে আল কায়েদা গ্রুপের ভ্রুণ এর জন্ম হয়। আর ইতোমধ্যে ১৯৯৬ সালের দিকে মুজাহেদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে তালেবান গ্রুপ আমেরিকান পরোক্ষ সমর্থনে এবং তারা সরার চেয়ে সংগঠিত ও কার্যকর ছিল বলে পুরা আফগানিস্তানের শাসন হাতে পায়, সরকার গঠন করেছিল। এতে আল-কায়েদা ও তালেবান পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করেছিল ও চিন্তায় প্রভাবিত করতে পেরেছিল, সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।   পাঁচ. তাহলে আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গের দিক থেকে ফ্যাক্টস হল, আমাদের দুই ‘সামরিক স্বৈরাচারের’ আমলে আল-কায়েদা ফেনোমেনা দৃশ্যমান ছিল না বা বা দৃশ্যমান হয়ে উঠার পর্যায়ে যায় নাই।  ছয়. তবে এটা সত্য যে মুলত পুরা নব্বুই এর দশক জুড়েই বা তার আগেও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই জোশ আগ্রহে ইসলামি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা নিতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল, নানান মুজাহিদ গ্রুপের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। আর এরাই ১৯৯৬ সালের পর থেকে দেশে ফিরে এসেছিল। এখানে পাশাপাশি মনে রাখা যেতে পারে, আশির দশকে কমিউনিস্টরাও একইভাবে প্যালেস্টাইনে বিপ্লব বা যুদ্ধের স্বাদ নিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক,মন্ত্রী ইনু হয়ত আফগান ফেরত সেসব যোদ্ধাদের কথা বুঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাবলী এবং এর সময়কাল বাংলাদেশের কোন সামরিক স্বৈরাচারের আমলের ঘটনাই নয়। এটা হতেই পারে,মন্ত্রী ইনুর জিয়াউর রহমানের উপর বা বিএনপির উপর ক্ষোভ আছে। বিশেষত ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে হয়ত। তবু বলতেই হয় এটা তাঁর খুবই দুর্বল ও কাঁচা প্রচেষ্টা। কারণ তিনি সময়কাল মিলাতে পারেন নাই।

তবু দি হিন্দুর রিপোর্টটা অন্য দিক থেকে দেখা যেতে পারে। রিপোর্টটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এর সুনির্দিস্ট ফোকাস এর অভাব আছে, ফলে  খাপ ছাড়া।  খুব সম্ভবত এটা হতে পারে যে, মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতকার নেয়া শেষ করা হয়েছে কিন্তু কোথায় ফোকাস করে পত্রিকা বা ঐ রিপোর্টার রিপোর্টটা প্রকাশ করবেন তা ঠিক হয় নাই। কারণ সে বিষয়ে সম্ভবত মন্ত্রীর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে রিপোর্টারকে তিনি নিজের মতের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রাজি করাতে বা মানাতে পারেন নাই। অথবা এমন হতে পারে যেভাবে মন্ত্রী ব্রিফ করেছিলেন রিপোর্টার সেভাবে বুঝে নাই বা বুঝতে রাজি হয় নাই। ফলে রিপোর্টের একটা বিপর্যয় সেখানে ঘটেছে। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন ফোকাসের ছাড়া একটা রিপোর্ট হয়ে গেছে। সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের আম পাঠকের চোখে – “জিয়া, এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারেরা ইসলামি সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত ছিলেন” – এই নতুন বয়ান তাদের পাতে পড়া অথবা নজরে পড়া দূরে থাক এই বক্তব্য কারও আমলেই আনা যায় নাই। বিশেষত আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার কারণে। সেখানে নতুন বয়ানটা প্রতিষ্ঠা করা সে তো অনেক দুরের ব্যাপার।

মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসে নাই, বাধা স্থানীয় মিডিয়া
মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসতে পারে নাই, আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার বাধার কথা বলছিলাম। কারণ একটা মজার ব্যাপার হল দি হিন্দুর ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃৎ করে বাংলাদেশের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে রিপোর্ট হয়েছিল। কিন্তু কেউই ‘দি হিন্দুর’ শিরোনামকে নিজ রিপোর্টের শিরোনাম করে নাই। এমনকি মন্ত্যরীর পছন্দের সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গটাকে আমলেই নেয় নাই। প্রিন্ট পত্রিকার প্রত্যেকেই নিজস্ব ও ভিন্ন শিরোনাম করেছে।  আমাদের দৈনিক মানবজমিন গতকাল ১৫ এপ্রিল দিনের কোন এক সময়ে অনলাইনে এক রিপোর্ট ছাপতে দেখা গেছে,  যার বডির লেখা এত অল্প যে তার চেয়ে লেখার ব্যানার হেডলাইনটা বড় অথবা  তা না হলেও প্রায় সমান। আর শিরোনাম করেছিল,  “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” এটা হল সেই হেডলাইন। হেডলাইন দিয়ে চমকে দেবার খবর অর্থে এটা চমকপ্রদ খবর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ নিজের দেয়া শিরোনামের ঐ পাঁচটা শব্দই কেবল সব বক্তব্য।  বাক্যগুলো ‘দি হিন্দুর’ লেখার রিপোর্টের বডি থেকে তুলে নেয়া কয়েকটি শব্দ। আবার প্রায় একই হেডলাইন – “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮ হাজার জঙ্গি রয়েছে বাংলাদেশে ” – এটা হল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ঐ দিনের শিরোনাম। কিন্তু এদুটো পত্রিকার কেউই ‘দি হিন্দু’র পত্রিকার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐ রিপোর্টের সুত্রে ও বরাতে ছাপিয়েছে বলে জানিয়েছে ঠিকই কিন্তু কেউই মন্ত্রী ইনু যে বক্তব্যটা ফোকাস চাইছিলেন যে “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল” এদিকটা নিয়ে কোন উতসাহই তাদের ছিল না।  বরং ভারতের দি হিন্দুতে তা ছাপা হওবার পর পরই বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃত করেছে ঠিকই কিন্তু  নিজেরা ভিন্ন ট্রিটমেন্টে  ও ভিন্ন শিরোনাম দিয়ে।  কিন্তু কী তাদের প্ররোচিত করেছিল?

স্থানীয় শিরোনাম হয়ে গেল, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” 
‘দি হিন্দুতে’ শিরোনামটা পড়ার পরই যেকপোন দেশী পাঠকের মনে যে বিরাট খটকা লাগে তা হল বাংলাদেশের ‘সামরিক স্বৈরাচার’ আর ‘সন্ত্রাসবাদ’ এই শব্দদুটো মিলিয়ে কেমনে কোন বাক্য রচনা করা গেল। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকা সেজন্য রিপোর্টার শিরোনাম বদলে তাদের স্থানীয় শিরোনাম, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” করে নাই।

একথা ঠিক যে যেকোন ভারতীয় সাংবাদিকও টেররিজম শব্দটার প্রতি অতিরিক্ত সেনসেটিভ থাকে। কিন্তু এর মানে এই না যে কোন গারবেজ বা যে কোন কিছুকে টেররিজম বলে দাবি করলেই তাদেরকে তা খাওয়ানো যাবে, তারা মেনে নিবে। বাংলাদেশের সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া বা এরশাদ এরা আজকের মতই “ইসলামি জঙ্গী” ছিল অথবা “ইসলামি জঙ্গীবাদের” সাথে যুক্ত ছিল ইনুর এমন বক্তব্য  ইতিহাস-সম্পর্কহীন। একেবারেই ইতিহাসবোধহীনের ম্যানুফ্যাকচারড। দি হিন্দুর সাংবাদিক মন্ত্রীত ইনুর দাবি প্রমাণের দায়িত্ব না নিয়েই তাঁর কথাই ছেপেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবদিকেরা সেদিকে যায়ই নাই। তারা তুলে নিয়েছে, “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  ৮ হাজার জঙ্গি” এই কয়টা শব্দ কেবল। তাও আবার হিন্দুর রিপোর্টের বডি থেকে  কয়েকটা শব্দ। এতে দেশের মিডিয়ায় তথ্যমন্ত্রীর  দাবি আসে নাই, এই অর্থে বেকার হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এতে একটা সুবিধা তথ্যমন্ত্রী পেয়েছেন যে এই রিপোর্টে যে কোন প্রমাণ সম্পর্কহীন উদ্ভট দাবি এখানে আছে তা বাংলাদেশের মিডিয়া আমলই করে নাই। কিন্তু কেন?

গত প্রায় এক বছর ধরে যত সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে তা তে আইএস জড়িত নয়, তারা হাজির নাই, হয় নাই, এটা বলা সরকারি অবস্থান বা ভাষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি এই অবস্থানটাই ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার হল, তথ্যমন্ত্রী ইনু দি হিব্দু পত্রিকার সাক্ষাতকারে দাবি করে ফেলেছেন “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে”। যদিও এটা বলার উদ্দেশ্য তাঁর ভিন্ন ছিল।  কিন্তু একথা বলার আগে তথ্যমন্ত্রী খেয়ালই করেন নাই যে এভাবে বললে “আইএস নাই” প্রসঙ্গে সরকারি অবস্থানের বিরুদ্ধে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি ইনু আর এক মন্ত্রী, খোদ বিরোধীতা করে ফেলছেন। আর স্ববিরোধিতার সেদিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার সুযোগ ঐ দুই দেশি পত্রিকা ছাড়তে চায় নাই।

এখন ফলাফলঃ ফলাফল হল, দি হিন্দুর রিপোর্ট মন্ত্রীর  ঈস্পিত লক্ষ্য তো পূরণ করতে পারেই নাই উলটা বরং ক্ষতি করে ফেলেছে। “বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নাই, সাংগঠনিক কাঠামো নাই” – একথাগুলো বলা এখন সরকারের বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসিয়াল অবস্থান। সরকার মনে করে এগুলো স্বীকার করে নিলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের রাস্তা খুলে দেয়া হবে। আই এস দমাতে তাদের এখন আমাদের দেশে আরও সরাসরি ভুমিকা দরকার বলে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যুক্তি সাজিয়ে বসতে পারে। অনেকটা খালেদা সরকারকে উতখাতে বা ১/১১ এর সরকার কায়েমের পক্ষে যেভাবে যুক্তি সাজানো হয়েছিল। সরকারের এই অনুমানগুলো পটেনশিয়াল। ফলে বিপদজনক হতেও পারে। কিন্তু তথ্যমন্ত্রীর বয়ান অবশ্যই সরকারি ভাষ্যকে দুর্বল করেছে।

মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত

মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত
মোদির পাকিস্তান সফরের অর্থ কী
গৌতম দাস 

http://wp.me/p1sCvy-tV
৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চমক দিতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু ও অবাস্তব শব্দ ও বাজে ধারণাগুলো বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যে কোনো দুইটি রাষ্ট্র মানেই দুইটি আলাদা আলাদা স্বার্থ এবং যে সম্পর্ক আসলে আবার মৌলিকভাবে স্বার্থ-সংঘাতমূলক। কিন্তু তবু এরই ভেতর সাময়িক কোনো কোনো ইস্যুতে এক কমন অবস্থান হাজির করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার সুযোগ নিতে হয়, দরকার হয়ে পড়ে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এক জটিল বিষয়। হয়তো দেখা যাবে, ৯০ ভাগ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থান ফাটাফাটি সংঘাতের, কিন্তু বাকি ১০ ভাগের কমননীতি-অবস্থানের (তবে তা সাময়িক) কারণে কোনো উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অবস্থায় তাকে আনতে হতে পারে, আনা হয়। তো সারকথা হলো, তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কমাত্রই এক জটিল জিনিস। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির এ চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সবসময়; মোদির এই ঝোঁক একদিক থেকে যেন পরোক্ষে তাঁর স্বীকার করে নেয়া যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জিনিসটা জটিল বলেই চমক সৃষ্টি করে মোদি একে সহজ করার কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আবার আরেক দিক থেকে এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক এক গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা থাকে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থ-সংঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে। অতএব এ কথাটাকেই আমরা ভিন্নভাবে বলি যে, মোদি চমক তৈরি করতে ভালোবাসেন।

মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার ২৩ ডিসেম্বর তিনি রাশিয়া পৌঁছেছিলেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। তবে মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজি পাওয়াসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে নানানভাবে ভারতে এর স্থানীয় উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুলেছে। কিন্তু তা খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে অর্থসহ সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবার যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা ছিল। আবার আফগানিস্তান কেন? অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের লোকেরা খুব কমই জানেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা হিসাবে না হাজির হয়ে যায়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, তা ঠেকাতে এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে মান রাখার জন্য ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, যেন সেই ব্যাথা যা তাকে তাড়িত করছে তা রিলিজ বা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। অতএব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে (পাকিস্তানে মোট ব্যয়িত সময় আড়াই ঘণ্টা) দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? ভারতের মোদীকে বেচাইন করেছে আইএস। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টের শিরোনাম থেকে ধার করা ভাষায়, “ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে”।

সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও লাগিয়েছিলেন।

আসল টেররিজম এর পানি কানে ঢুকছে
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং এর প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে পুরানা সেসব দিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের অবস্থায় আছে। এ বিষয়টা মোদীর কাছে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত “টেররিজম” মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে। ভার্তের দাবি করা এতদিন যাকে সে ছলনা করে টেরিজম বলে এসেছে তা অন্ততপক্ষে সেটা “গ্লোবাল টেররিজম” ছিল না,অথবা আমেরিকার ভাষায় যা “টেররিজম” তা এটা ছিল না। এবার আইএসের টেররিজম, “গ্লোবাল টেররিজম” – একে মোকাবেলার জন্য মোদী ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছেন। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, তাতে উপযুক্তভাবে মোকাবিলার কাজে নাও করা যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে অথবা কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা ভারত সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়। হয়ত এটাই মোদির জন্য স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতেই হবে এমনকি তা কেবল নিজ পছন্দমত কান্নি মারা করে হলেও। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে যতটা সম্ভব পাশে পাওয়া চেষ্টা করে যাওয়া। পাকিস্তানের সাথে মোদীর প্রবল তাগিদের উৎস এখানে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, ডায়লগ সেও অবশ্যই করতে চায় কিন্তু কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল এতদিন ভারত-পাকিস্তানের একালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, “টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে” না “কাশ্মীর ইস্যুসহ টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে”।
এই বিরোধে দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, “তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন”। টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, “পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান”। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজের আগের সরকারের আমলে তাঁর সেনাদের সাথে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা তাদের ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার আগের সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের। এ বিষয়টাকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদী জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভাল, কারণ শেষ বিচারে তারাই তা দিতে পারে।
এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করে ডায়লগ ওপেন করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। যদিও এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সব আলাপ প্যারিসের ঐ সাইড-টকে শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক আলাপ অনেক আগে থেকেই চলছিল। নওয়াজের সাথে মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে তা একধরণের ফরমাল বা চুড়ান্ত আকার পেয়েছিল। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
ফলে  আভ্যন্তরীণ মুল্যায়নে ভারতের কখনই ধরে নিবার কারণ নাই যে, এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক। কিন্তু তবুও ভারত কাশ্মীর-কেন্দ্রিক ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকেই কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম বলে, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে নেওয়া। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে ভারতের রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২৫ ডিসেম্বরের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই (WIRE)-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। “In a way, he is sending a signal to everyone that there will be no more U-turns,” said Siddharth Varadarajan, a founding editor at The Wire, an Indian news site. “He is putting his personal political brand on this process. He can’t walk away that easily now.”
মোদী সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, “একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না”।

“সমালোচকদের পাকিস্তা্ন পাঠিয়ে দিবার রাজনীতি” – ভারত আর বাংলাদেশে একই
বিজেপি তার সমালোচককে বাংলাদেশের মতই কিছু হলেই পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ – এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করে থাকে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার চালাতে গেলে তার তো একটা পাকিস্তান নীতি, পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো কিভাবে ডিল করবে তা থাকতেই হবে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনী বক্তৃতায় ভোট পাবার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী উস্কানি, সুড়সুড়ি জাগিয়ে ভোটের বাক্স ভড়তে যা বলা হয় তার সাথে বৈদেশিক পাকিস্তান নীতির কোন সম্পর্ক নাই। ফলে সবসময় তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর তাদের স্ব স্ব কালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। বরং সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখতে গিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সরকারের পাকিস্তান নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের মোট সক্ষমতাটা তাদেরকে দুইভাবে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।

মোদির পাকিস্তান সফরে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
মোদির সফরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে অদ্ভুত ও মারাত্মক; তবে এককথায় এবং দূরে সেভ জায়গায় দাঁড়িয়ে বললে বলতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তো এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে কয়েকটা খোপে ভাগ করে বললে, প্রথম খোপ  হল তারা যারা সরাসরি শুধু ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় লাভালাভের দিক চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এরা হলো খোদ কংগ্রেস, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও তার জনতা দল ইউনাইটেড। খোপ দুই, যারা জম্মু ও কাশ্মীর অথবা পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময় থেকেই লম্বা বিবাদে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন এককথায় বললে, ভারতীয় কাশ্মীরকেন্দ্রিক সব ধরনের দল মোদির পাকিস্তান সফরকে ইতিবাচক বলেছেন। এছাড়া এদের সবার একই কথা “ডায়ালগ”; নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালগই প্রধান কার্যকর করণীয় মনে করেন সবাই। এমনকি যারা কাশ্মীড় ইস্যুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী লাইন অনুসরণ করে তারাও মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রীনগরের মডারেট দল হুরিয়াত এটাকে সরকারের নেয়া “ইতিবাচক সঠিক পদক্ষেপ” বলেছে। আর হার্ডলাইনের আলী শাহ জিলানি বলছেন, “ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তির কিছু নেই”। বর্তমানে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে চলতি জোট সরকার গঠনের পার্টনার স্থানীয় মডারেট দল পিডিপির নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদও খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে ‘সঠিক দিকে পদক্ষেপ’ বলেছেন। ওদিকে হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক এমআইএম দলের নেতা ও কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়ার্সীও মোদির সফরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলেছেন। কাশ্মীরের স্থানীয় দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহর নাতি ওমর আবদুল্লাহও স্বাগত জানিয়েছেন; তবে এমন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না, ছুটে যায় বলেও আক্ষেপ করেছেন। ওদিকে বাম কমিউনিস্টদেরও (সিপিএম, আরএসপি) এই খোপে ফেলা যায়, একই ধরনের স্বাগত জানানোর কারণে। তবে এদের বাড়তি কিছু শব্দ আছে। যেমন তারা ‘টেররিজমও নিপাত যাক’ সঙ্গে যোগ করে তাদের কথা বলেছেন।

এই সফরের খবর ভারতীয় মিডিয়ায় আসার পর কংগ্রেস প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, “এই সফরের কোন তালমিল প্রটোকল রাখা হয়নাই। ফলে এটা একটা ফালতু তামশা ব্যাপার হয়েছে। এর খারাপ পরিণতি হবে। এর আগে বাজপেয়ির এমন সফরের পরে কারগিল যুদ্ধ এসেছিল”। যেমন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, দি হিন্দু,। কংগ্রেস এমন মন্তব্য করার সময় ধরেই নিয়েছে যেন আগে কোন ইনফরমাল আলাপ ছাড়াই মোদী পাকিস্থান সফরে গিয়েছেন। এর আর এক অর্থ আইএস ইস্যুতে মোদীর সরকার কী করে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নিজ দলের সুবিধাই আসল কথা।  সোনিয়ার কংগ্রেসকে কেবল ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় বক্তব্য অবস্থান নেয়া ও প্রকাশের দলে বা খোপে ফেলাতে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা ইদানীং এমন অবস্থাতেই ঠেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা ২০১৪-এর নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরে মোট আসনের মাত্র ১০ ভাগেরও নিচে আসন সংখ্যা হয়ে যাওয়ার পর। যেমন মোদি সরকারের ‘ল্যান্ড বিল’ বা জমি অধিগ্রহণ আইন নামে একটি আইনের প্রস্তাব করেও বিরোধীদের বিরোধীতায় তা শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি, পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। শেষে মোদী বিলটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা বলা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস হয়নি বলে এমনিতেই এটা প্রত্যাহার হয়ে গেছে ধরতে হবে। ওই বিলের সারকথা ছিল একদিকে চাষাবাদের জন্য জমি, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বা শিল্প-কারখানার জন্য জমি এ দুই ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যের লাইনটা কোথায় টানা হলে সঠিক হবে, সব কুল রক্ষা পাবে। এ বিলের ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থান খুবই সঙ্কীর্ণ বিরোধিতার। সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল বিবেচনা ছিল, কোনো চটকদার পপুলার কথা বললে তাতে দল চাঙা হবে। অথচ বিষয়টা একালের সব রাষ্ট্রের জন্যই খুব নির্ধারক এক নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পার্লামেন্টে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী দলের মূল অবস্থান-বক্তব্য রেখেছিলেন। রাহুলের বক্তৃতার পর মিডিয়াসহ কংগ্রেসের নিজের দলের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাহুলের পারফরম্যান্স’। রাহুল ‘কী বলেছেন’ সেটা নয়, ‘কোন অভিনয়ে’ বলেছেন সেটাই বিবেচ্য ও চর্চার বিষয় হয়েছিল। দল কি অবস্থান নিয়েছে, সেদিক নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না। কথাগুলো তুলে আনলাম, ভারতের এখনকার বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজনীতির কোয়ালিটি বোঝানোর জন্য। তবে একথাও ঠিক, বিজেপি যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখনও কমবেশি এসব সমস্যা একই ছিল। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে ভাগ করে দেখা ছাড়াও যদি একই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনীর রাজনীতির অবস্থান আর সরকারের নীতি বা সংসদে আনা বিলের বেলায় অবস্থান এভাবে ভাগ করে দেখি তো সেখানেও বিশাল ফারাক আর ছলচাতুরিতে ভরা অবস্থান দেখতে পাব। নভেম্বরের বিহার নির্বাচনে বিজেপির মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো কাড়াকাড়ি ছড়াছড়ি গেছে। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবসে’ প্রচারণায় নামতে ভারতীয় বাহিনীকে খোদ মোদির টুইট বার্তার আহ্বান জানিয়েছিল। বিজেপির এগুলো সবই ভোটের রাজনীতি। সস্তা ইসলামবিদ্বেষ ছড়ালে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে এ বিশ্বাসে কাজে নেমেছিল। আবার সেই মোদিই এখন পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকলেও এক সিরিয়াস বিজনেসে পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে চান, একথা শতভাগ সত্যি।

সারকথায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই আইএস ইস্যুটা এখনও মুখ্য ইস্যু হতে এবং যথাযথ গুরুত্ব পাবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বিরোধী কোনঠাসার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে  বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

[এই একই প্রসঙ্গে আমার দুটো লেখা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট তুলে  দুটি দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। প্রথমটা ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় আর দ্বিতীয়টা ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ লেখা দুটোর পয়েন্টগুলোকে একসাথে করে এরপর নতুন করে পরিবর্ধন ও এডিট করে এখানে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

goutamdas1958@hotmail.com