সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

গৌতম দাস
১৪ নভেম্বর ২০১৬,সোমবার,

http://wp.me/p1sCvy-21x

গত সেপ্টেম্বর মাসে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক দিনব্যাপী এক আলোচনার আয়োজন করেছিল যার আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন সুহাসিনী হায়দার। তিনি দক্ষিণী ভারতের প্রাচীন এক ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর বা পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক। দেশে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেটা গত ১৪ অক্টোবর “দি হিন্দু” পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
সেই সাক্ষাৎকারটা নেওয়া হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন এ’বছরের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাংলাদেশসহ কিছু দেশের বয়কট এবং বাতিল ঘোষণা হয়েছিল, এর পরপরই। প্রফেশনাল সাংবাদিক সুহাসিনীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হল, তিনি আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্রডকাস্টিং জার্নালিজম বিষয়ে এমএ করেছেন। এরপর প্রায় ২০ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায়। এর আগে তিনি ভারতীয় সিএনএন-আইবিএন টিভির এঙ্কর ও পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ফলে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড আর কেরিয়ার দেখে এটা বলার সুযোগ নেই যে তিনি অভিজ্ঞ নন। তাই, প্রধানমন্ত্রীকে করা তার প্রশ্ন কোনো নাদানের প্রশ্ন তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু লক্ষণীয় দিকটি হল, তার করা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাও বিরক্ত হয়েছেন। আমার ধারণা, যারা এই সরকারের বিরোধী, বাংলাদেশের এমন যে কেউও সুহাসিনীর প্রশ্নে বিরক্ত হবেন এবং অপছন্দ করবেন।
কিন্তু কী ছিল সে সাক্ষাতকারে? বাংলাদেশে গত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪ জানুয়ারি) আগে-পরের সময় থেকে হাসিনা সরকারের নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে। ঐ নির্বাচনের আগের মাসে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে স্পষ্ট প্রকাশ করে দিয়ে যান যে, এক “অনির্বাচিত নির্বাচনই” তাদের পছন্দ ও সমর্থনের। এভাবেই তারা আওয়ামী লীগ সরকারকেই “নির্বাচিত” দেখতে চান। আর সেই থেকে বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অগ্রহণযোগ্য হয়ে আছে; যদিও বাংলাদেশ সরকারের সাথে ব্যবহারিক কাজের সম্পর্ক তারা রেখেছেন। তবে নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে, সেটা জানাতেও ভোলেন না। এরপর থেকে “ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থে” বাংলাদেশ চলে, এমন বয়ান অনেকেই রাখেন। বাংলাদেশ একটা Vassal State বলে জাপানভিত্তিক ‘ডিপ্লোম্যাট’ পত্রিকা এক আর্টিকেল ছেপেছিল। সারকথায়, এটা ভারতের দয়ায় চলা ভারতের দিকে ঝুঁকে থাকা সরকার, এমন অভিযোগ মাথায় নিয়েই এই সরকার চলছে। অনেক সময় মন্ত্রী ও নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে এমন অভিযোগের অনুকূলে কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। এই হলো পটভূমিগত পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতির কথা সুহাসিনী হায়দারের অজানা থাকার কোনো কারণ নেই। এসব বিষয়ে তার নিজেরই অনেক রিপোর্ট আমরা দেখেছি। অথচ ঐ সাক্ষাতকারে ঠিক এর বিপরীত – সুহাসিনীর প্রায় সব প্রশ্নের পেছন এক ধরে নেয়া অনুমান থেকেছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কেন যথেষ্টভাবে ভারতের তল্পিবাহক হচ্ছেন না অথবা তার আরো হওয়া উচিত, এ ধরনের। এ ছাড়া তার প্রায় সব প্রশ্নই ভিতরেই একধরনের বোকামি বা নাদানিতে ভরপুর উপাদান রয়েছে। যেমন সব রাষ্ট্রেরই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন  ইস্যুতে তার নিজস্ব কিছু বয়ান-অবস্থান থাকে, যা একান্তই তার বয়ান। আর সেটা অন্য রাষ্ট্র বা ভিন নাগরিককেও মানতে হবে, এটা সে আশা করে না বা সেদিকে তাকিয়ে ঐ বয়ান অবস্থান নেয় না। কিন্তু এর পরও সে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন মাত্রায় সম্পর্কে জড়ায়। অর্থাৎ নিজের অবস্থানের সাথে অপর রাষ্ট্র একমত না হয়েও সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আগায়। সেখানে  অপর রাষ্ট্রকে নিজ রাষ্ট্রের সাথে একমত হতে হবে এমন কোন পূর্বশর্ত থাকে না বা সেটা জরুরিও নয়। এসব বিষয়গুলো ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর হিসেবে সুহাসিনীর জানা না থাকার কিছু নেই। কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নে সুহাসিনী বলতে চেয়েছেন, হাসিনা কেন বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের বয়ান-অবস্থানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না? কখনও কখনও এটা এমন জায়গায় গেছে যে মনে হয়েছে  হাসিনা কেন ভারতীয় অবস্থান নিচ্ছেন না সে প্রশ্ন তুলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করতে বা জবাবদিহিতা চাইতেই যেন এই সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং বাংলাদেশে এসেছেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার সাংবাদিক কম বরং জাতীয়তাবাদী সৈনিক বেশি হয়ে উঠা বেশি – হয়ে পড়েছিলেন।
তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, এবারের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাতিল হওয়া এবং বাংলাদেশের তাতে না যাওয়া প্রসঙ্গে। তিনি প্রশ্ন করছেন- এর ফলে সার্ক কি শেষ হয়ে গেল?
এখানে আগে এই প্রশ্নের পিছনের কিছু তথ্য বলে নেয়া ভাল। ভারতের উরি সামরিক ঘাঁটিতে কথিত হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য মোদি সরকার জনমতকে ক্ষিপ্ত করে তুলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষে যুদ্ধে না গিয়ে ‘বিদেশের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করব’ এটাই মোদির চরম অ্যাকশন হবে বলে তিনি কথা শেষ করেছিলেন। আর পরদিন থেকে ভারতের সব মিডিয়া ‘জাতীয়তাবাদী জোশে’ বাস্তবতা ভুলে মোদির কথা সফল করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। ফলে সুহাসিনীর প্রশ্নের ভেতর সেই সস্তা জোশই আমরা দেখেছিলাম। যেন সাংবাদিকতায় অবজেক্টিভ থাকার বিষয়টা তিনি  ‘জাতীয়তাবাদী’ থাকা দিয়ে বদলে নেয়েছেন। অথচ সস্তা জাতীয়তাবাদ কোনো পেশাদার সাংবাদিকের সাথে কোনোভাবেই মানানসই নয়। আসলে ভারতের মিডিয়ার এক রেওয়াজ হল, পাকিস্তানের সাথে যে কোন যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে (সত্য-মিথ্যা অথবা সরকারের সংকীর্ণ নিজ দলের পক্ষে ভোট পাবার স্বার্থের কারনে যুদ্ধের হুঙ্কার বা পরিস্থতি তৈরি করলেও) বিচার-বিবেচনা শুণ্য উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে সরকারের পক্ষে দল বেধে দাঁড়িয়ে যাওয়াটাই সাংবাদিকতা হয়ে যায় তখন। সেই রেওয়াজে এবারও ভারতের প্রায় সব মিডিয়া চিন্তাশূন্য হয়ে বেকুবের মতো বিশ্বাস করে নিয়েছিল, মোদির হুঙ্কার সত্যি জেনুইন। অথচ জোশ কিছু ঢিলা হবার পরে এই মিডিয়াই লিখেছিল যে আসন্ন ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভাল রেটিং পাবার সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে মোদী সরকার পাকিস্থানের সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ পেশাদারিত্ব ভুলে  ভারতের মিডিয়া এভাবেই বাস্তবতার বিচার-বিবেচনা শুণ্য হয়ে যাওয়া কোন ব্যাপারই না। যেমন মোদীর যুদ্ধের দামামা বা পাশা উল্টে যাবার পরে, (সুহাসিনীর ঐ প্রশ্ন প্রকাশের ছয় দিন পরে) ২০ অক্টোবর আনন্দবাজার লিখেছিল, “পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী হিসেবে তুলে ধরতে মোদির আহ্বানে সাড়া দেয়নি বেইজিং। …ব্রিকসে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু আগবাড়িয়ে খেলার সেই রণকৌশল নিয়ে আখেরে যে কোনো লাভ হয়নি, বারবার তা সামনে চলে আসছে। চীন, আমেরিকার পরে ব্রিটেনও জানিয়ে দিলো, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী আখ্যা দিয়ে মোদির সুরে সুর মেলাতে রাজি নয় তারা। এমনকি বেইজিংয়ের সুরেই লন্ডনের ব্যাখ্যা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ত্যাগ স্বীকার করেছে ইসলামাবাদ”। অর্থাৎ এবার খোদ আনন্দবাজারই নিজ দেশের সরকারের সমালোচনা করা ছাড়া উপায় দেখে নাই।

ওদিকে  পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করবেনই – মোদীর এমন প্রতিজ্ঞার প্রকাশের পর এটা নিয়েও ভারতের মিডিয়া – ‘রাজা যত বলেন পারিষদ বলে তার ততগুণ’ – অবস্থা করে ছেড়েছিল। যেন মোদী তা করেই ফেলেছেন। ব্রিকস – রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোটের এবারের সামিট সম্মেলন ডাকা হয়ে ছিল ভারতের গোয়ায়। সাথে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল যে ব্রিকসের শেষদিনে আর এক দক্ষিণ এশিয়া জোট (BIMSTEC) (The Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর সাথে মিলে যৌথ বৈঠক হবে। বিমসটেক ((BIMSTEC)) আসলে সার্কের পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বার্মা ও থাইল্যান্ডকে সাথে নিয়ে তৈরি। আর ওদিকে ভারতের কূটনৈতিক খায়েশ ছিল (খায়েশ বলতে হচ্ছে কারণ এটা ভারতের এক এবসার্ড মুরোদধীন কল্পনা। নিজের বাস্তব মুরোদে না, অন্যের ঘাড়ে চড়ে স্বপ্ন-জাল বুনা) যে বিমসটেককে এমনভাবে সামনে আনা যাতে সার্কের প্রয়োজন বা অস্তিত্বের কথা আর মনে না পড়ে। তা সার্কের বিকল্প হয়ে উঠে। ফলে পাকিস্তান বাদ পড়ে। বাস্তবে থাকুক আর নাই, কথার ফুলঝুড়ি তুলতে ওস্তাদ কলকাতার আনন্দবাজার, ০৪ অক্টোবর এক রিপোর্ট লিখেছিল যার শিরোনাম হল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লি” । আর তাতে প্রথম বাক্য লিখেছিল, “পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক সম্মেলন!”। আসলে স্বপ্ন দেখাটা সমস্যা নয়। সমস্যা হল কেন সেই স্বপ্ন বাস্তব হবে না তা ভেবে দেখা ত্যাগ করাটাই সমস্যা।  আর সাথে তো আছেই  ‘মুই কী হনু রে’ ভাব নেয়া। ব্যাপারটা যেন সবচেয়ে বেশি লেপ্টে গেছে বাংলাদেশে ভারতের এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত (২০০৭-০৮ সালে) পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে ঘিরে। তিনি বর্তমানে আমেরিকান সাপোর্টে চলা একটি ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফের (Observer Research Foundation (ORF)) ফেলো। তার ঢাকায় পোস্টেড থাকার সময়ও তিনি ‘মুই কী হনু রে’ ভাব রেখে গেছেন।  প্রায় একই ঐসময়ে বাংলাদেশের কিছু বিশেষ সাংবাদিক ভারতে গিয়েছিলেন। গত ৪ অক্টোবর যুগান্তর সেকথা ছেপেছিল এক রিপোর্ট। পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর জবানে যুগান্তর লিখছিল, তিনি বলেন, “এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই”। কথাগুলো পিনাক বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বলেছেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে  পিনাক চক্রবর্তীও মোদির কথা সত্যি হয়ে গেছে বা আছে বলে বিশ্বাস করেছিলেন।

ব্যাপারটা কীভাবে শেষ হল?  আমাদের প্রথম আলো পত্রিকায় গত ২৬ অক্টোবর এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “সার্কের বিকল্প হচ্ছে না বিমসটেক”। আসলে কোন কিছু বিশ্বাস করার ভিত্তি কী এরা কী করে তা চিন্তা করে আল্লায় জানে। যেন “ভারত চাইছে” – এটুকুই যথেষ্ট সেকথা বিশ্বাস করা জন্য। আসলে গ্লোবাল অর্থনীতির বিকাশ ও এর সাথে ছড়িয়ে পড়া জটিল সম্পর্কের কারণে চীন ও আমেরিকার (আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমাস্বার্থের ওয়ার অন টেররের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় স্প্রিংবোর্ড রাষ্ট্র হল পাকিস্তান) পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের গভীরতা ও নির্ভরশীলতা ভারত পড়তে অক্ষম – এটা তাই প্রমাণ করে। যেন ভারত এমনই এক আদুরে সন্তান যার খেয়ালকে চীনসহ পশ্চিমারাষ্ট্রগুলোকে নিজ স্বার্থ ভুলে গুরুত্ব দিতেই হবে। এবং এটা সম্ভব। এসবের নিট ফয়াফল হল এমন এবসার্ড স্বপ্ন-জাল বুনা। আর এদের চক্কড়ে পড়েছে চিন্তাভাবনা ত্যাগ করা বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়া ও সাংবাদিক। প্রথম আলোর রিপোর্টার রাহীদ এজাজ লিখেছেন, ‘গত মাসে নাটকীয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। এরপর থেকেই গোয়ায় ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোটের নতুন মেরুকরণ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। পাকিস্তানকে ছাড়া সার্ক, এমন একটি ভাবনা সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত সেটি ফলপ্রসূ হয়নি। বিশেষ করে সার্কের বিকল্প জোট হিসেবে বিমসটেক যে যথেষ্ট কার্যকর হবে না, সেটি স্পষ্ট হয়েছে গোয়ায় ১৬ অক্টোবর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর”। এখন কথা হল যে ভারতের মিডিয়া এসব গ্লপগাথা বিশ্বাস করছে করুক কিন্তু প্রথম আলো বা রাহিদ এজাজ এরাও এটা বিশ্বাস করেছিল। কেন? কোন টানে বা সুত্রে?
মূলত এমন ঘটনাগুলো ঘটবার পিছনের আর কিছু সমস্যা হল, এটা ঠিক যে  চীন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে আমেরিকা ভারতকে পাশে চায়। আর তাতে ভারতকে হিতাহিত জ্ঞান ও বাস্তবতা ভুলে অসম্ভব বায়না ধরা বালকের মতো আচরণ করতে হবে কেন? বাস্তবতার মধ্যে বিচরণ করলে তো কোন সমস্যা নাই। তাও হয়তো এটা তেমন সমস্যা মনে হতো না। কারণ আমেরিকার দুর্দশা থেকে ভারত ফায়দা লুটতে চাইলে বলার কী আছে? আর ভারতের তা না নিবার কিছু নাই। কিন্তু বড়ভাই পিঠে হাত রেখেছে বলে, ভারত নিজেই আপনা আপনি এক অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হয়ে গেছে, এই ‘মুই কী হনু রে’-এমন ভাবনাই ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়ার আসল সমস্যা। পিনাকি বা সুহাসিনী এর নমুনা। অথচ মূল সূত্র হল, সবার আগে রাষ্ট্রকে নিজ মুরোদে অর্থনৈতিক অর্থে পরাশক্তি হয়ে উঠতে হয়। সেটাও কেউ বিপদে পড়ে ঘুষ দিয়েছে বা পিঠে হাত রেখেছে- এভাবে অর্জনের জিনিস নয়। দুনিয়ার প্রথম সারির উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ হতে হয় আগে। এটা অর্জনের বিষয়। কারও দান অনুগ্রহে বা বিপদে পড়ে দেয়া ফেবার থেকে এটা অর্জন করা যায় না।

আর এক মজার দিক হল, সার্কের ম্যান্ডেট যেভাবে লেখা আছে সেই ম্যান্ডেট হিসেবে সার্ক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে কথা ওঠার কথাই নয়। ফলে সার্ক বৈঠকে বসতেতে না চাওয়ার পক্ষে কোন শক্ত যুক্তি নাই। তবুও এটাই সত্য যে ভারতের কূটনৈতিক লবির ‘সাফল্য হিসেবে’ বাংলাদেশ ও ভারত এবং আরো দুই রাষ্ট্র সার্ক বর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই বর্জনের আসল কারণ প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে, ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। কিন্তু সুহাসিনী জিদ ধরেছেন, হাসিনাকে প্রশ্নের চাপে ফেলে এটা স্বীকার করাবেনই। তাই তাঁর প্রশ্ন, “পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো দেশ। এটা কি আপনার সার্ক বর্জনের প্রধান কারণ নয়? সার্ক পরিত্যাগ কি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়?”। মহা সমস্যা, এই সুহাসিনীকে কে বুঝাবে যে এই ব্যাখ্যা বয়ান একান্তই ভারতের। এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ কনজাম্পশনের জন্য। ভারতের পক্ষে কাজ করতে চাইলেও হাসিনা এই বয়ান তারও বয়ান-অবস্থান বলে স্বীকার করে নেয়া জরুরি না।  কিন্তু সুহাসিনীরা মনে করেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভারতের পক্ষে সার্ভিস ও কূটনৈতিক সাড়া’ সুহাসিনী যেভাবে দেখতে চাইছেন ঠিক সেভাবে দিতেই হবে। অন্য  কোনভাবে হলে এতেও তার মন ভরবে না। তবুও শেখ হাসিনা ধৈর্য ধরে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিয়ে বলেছেন, “পাকিস্তানের ভেতরের কিছু কারণে (অর্থাৎ পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের জন্য বা ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বে ভারতের পক্ষে থাকার জন্য নয়) আমরা সার্কে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ভারত-পাকিস্তানেরও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ আছে। কিন্তু আমি এটা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। ভারত উরির জন্য সার্কে যায়নি, আর বাংলাদেশের কারণ এ থেকে ভিন্ন”। অর্থাৎ “মন্তব্য করতে না চাওয়ার কথা” বলে হাসিনা ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাকে চাপাচাপি করা সুহাসিনীর ঠিক হচ্ছে না। তবু এমন জবাব পেয়েও সুহাসিনী সন্তুষ্ট নন। তিনি আবার প্রশ্ন করছেন, “আপনি কি কাশ্মিরের সীমান্তরেখা এলওসি পার হয়ে পাকিস্তানে ঢুকে সন্ত্রাসী মারতে ভারতের যাওয়া সমর্থন করেন না?”। হাসিনা আবারো মাথা ঠাণ্ডা রেখে জবাব দিচ্ছেন, “আমার মনে হয়, এলওসি বরাবর উভয় পক্ষের নীরবতা বজায় রাখা উচিত, যাতে তা শান্তি আনে”। কিন্তু সুহাসিনী হাসিনার মুখ দিয়ে যেন ভারতের বয়ান-অবস্থানের ভাষায় কথা বলাবেনই বলে জিদ ধরেছেন। তাই তিনি আবার প্রশ্ন করেছেন, “আপনি কি এর নীতিগতভাবে সমর্থক নন? গত বছর সরকার ঘোষণা করেছিল, তারা সীমানা পেরিয়ে মিয়ানমারে সন্ত্রাসবাদীর সন্ধানে যাবে। আপনি কি বাংলাদেশের এমন অ্যাকশন করা সমর্থন করবেন?”।
এবার হাসিনার পক্ষে আর ধৈর্য রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “শোনেন, এই প্রশ্ন আপনি আপনার সরকার আর প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে করুন। আমি মনে করি, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তরেখা, এই এলওসি মান্য করতে হবে”।

এতে সুহাসিনীর কী শিক্ষা হয়েছিল, তিনি কী বুঝেছিলেন আমরা বলতে পারব না। তবে তার দ্বিতীয় ধারার প্রশ্ন এবারঃ “আপনি কিছু দিন আগে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বলেছিলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তৎপর হতে এত সময় লাগল কেন, বিশেষত যেখানে অনেক মৌলবাদী গ্রুপ এর আগে অনেক হিন্দু আর ব্লগারকে মেরে ফেলেছে?”।
জবাবে অনুমান করি প্রধানমন্ত্রী আবার ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “কথা সত্য নয়। বাংলাদেশই প্রথম সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে গেছে। তদন্ত করতে সময় লাগে, শুধু আমার দেশে নয়, সব দেশেই। তাই বলে এটা বলা ঠিক নয় যে, আমরা তৎপর হচ্ছি ধীরগতিতে”।
এবার সুহাসিনীর রাস্তা ভিন্ন, যা দিয়ে প্রশ্ন করলে শেখ হাসিনা ‘জব্দ’ হবেন আর সুহাসিনীর ক্রেডিট বাড়বে, এমন লাইনের প্রশ্ন।
“মানবাধিকার গ্রুপগুলো অভিযোগ করছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতে থাকা আসামিকে হত্যা, গুম অথবা হাঁটুতে গুলি করছে…”। সুনির্দিষ্ট করে হাটুতে গুলির কথা এসেছে এজন্য যে এর আগের সপ্তাহে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘হাঁটুতে গুলি’ করা নিয়ে এক লম্বা রিপোর্ট করেছিল, সেই বরাতের প্রশ্ন। ফলে এইবার শেখ হাসিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে জবাব দিয়েছেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যের যে, মানবাধিকার গ্রুপগুলো আজকাল ভিক্টিমের মানবাধিকারের বদলে ক্রিমিনালের মানবাধিকার নিয়ে বেশি সোচ্চার। আমেরিকায় কী হচ্ছে? তাদের স্কুলে বা কোথাও যখন টেরর আক্রমণ হয়, তখন তাদের বাহিনীগুলো কী করে? তারা কি আক্রমণকারীদের মেরে মানুষকে উদ্ধার করে না? আমাদের বাহিনী কি সন্ত্রাসীদের মারবে? না, যারা আক্রমণ করেছে, তাদের মারবে?’। মনে হচ্ছে এতে সুহাসিনী কিছু ঠান্ডা হয়েছেন।
এরপর সুহাসিনীর সেই পুরান প্রশ্ন, আইএস আছে, আইএস নেই। “আইএস নিজেই বলছে, প্রধান সন্দেহভাজনদের তারাই ট্রেনিং দিয়েছে। আপনি অস্বীকার করছেন- এই অভিযোগ করলে আপনার জবাব কী?”।
হাসিনা এখানে এসে আগের এতদিনের অস্বীকারের জায়গা থেকে একটু হেলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হতে পারে আইএস ওদের কাউকে কাউকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আমাদের এখানে আইএসের ঘাঁটি নেই। কেউ যদি দাবি করে, তাহলে আগে প্রমাণ দিক। আমরা আক্রমণকারীদের চিহ্নিত করেছি। আমরা জানি, তারা কোথা থেকে এসেছে এবং এরা সবাই স্থানীয়”।
সুহাসিনী বলছেন, “আপনি বলছেন যুদ্ধাপরাধের বিচার জনগণের দাবি। কিন্তু নির্বাচিত জামায়াত নেতারা ফাঁসিতে ঝুলছেন, না হলে জেলে। অনেক বিএনপি নেতা গ্রেফতার না হলেও বিদেশে পালিয়েছেন। আপনি কি আপনার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনকে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন না?”।
“না, এটা আমার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিষয় নয়। আপনি যদি একটা স্বাধীন দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি স্বাধীনতাবিরোধীদের কিভাবে সমর্থন করেন? বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিএনপি নেতাদের নিয়ে মামলার বিষয়গুলো আলাদা, এগুলো হয় দুর্নীতি, না হয় অপরাধের মামলা। যদি এসব নেতা মনে করেন তারা নির্দোষ, তারা বিচারপ্রক্রিয়া মোকাবেলা করুন। আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তারা আমার বিরুদ্ধেও ডজন ডজন মামলা দিয়েছিল”। (এই শেষের বাক্যটি বলে হাসিনা কিন্তু অজান্তে প্রকারান্তরে অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন।)

প্রসঙ্গ আপাতত এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। এই সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা স্বস্তিকর নয়। আমরা জানি না, পরে আর কখনো এই মহিলাকে সাক্ষাৎ দেয়া যাবে না, এমন সিদ্ধান্ত সেখানে হয়েছে কি না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
গৌতম দাস
০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1lk

তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

[এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1yl

গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
সব শেষ।

আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

গৌতম দাস
১৪ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার
http://wp.me/p1sCvy-1uG

গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান কাফের ঘটনা দেশি-বিদেশি সকলকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। সিএনএন, বিবিসি আর আল-জাজিরা এই তিন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল পুরা দশ ঘন্টা জুড়ে সমানে কভার করাতে, এছাড়া সময়ে লাইভ ব্রডকাস্ট করাতে সারা দুনিয়ায় খবরটা এত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এতদিন যে যা নিয়ম-নীতি মেনে অথবা কোন কিছুই না মেনে বেপরোয়াভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই ঘটনা এবার এমন সবাইকে অভিমুখ বদলাতে, বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত এটা আলকায়েদা বা আইএস ধরণের ততপরতায় ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের উপর প্রথম হামলার ঘটনা। যা এর আগে দেখা যায় নাই। ভারতীয় মিডিয়া এই হামলার ঘটনাকে গত ২০০৮ সালের তাদের বোম্বাই হামলার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখাতে চেয়েছে। প্যারালাল টানার চেষ্টাও করছিল। ভারতের মিডিয়ার এই অক্ষম প্রচেষ্টা ২০০১ সালের ৯/১১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার সময় থেকে করে আসছে। অথচ বোম্বাই হামলা – হামলার ঘটনা হিসাবে অনেক ঘটনার সাথে মিললেও আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনাগুলোর উৎস কাশ্মীর কেন্দ্রিক যা কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা না, বড় জোর হয়ত তা আঞ্চলিক ঘটনা বলে দাবি করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা কাশ্মীর ইস্যু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধরণের ক্যাটাগরির ঘটনা। নিশ্চয় আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর গ্লোবাল ইসলামি ফেনোমেনা যা পশ্চিমের চোখে “আন্তর্জাতিক টেরর মুভমেন্ট” – এর তো ফারাক টানতেই হবে। আসলে দুই ধরণের ঘটনাকে মিলিয়ে গুলিয়ে মিডিয়ায় দেখানোর চেষ্টা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির কৌশল মাত্র। এটা দোষের নয় হয়ত, নিজের বয়ান খাড়া করার জন্য অনেক রাষ্ট্রই এমন করে থাকে। তবে স্বভাবতই এমন বয়ানের খাতক সবাই হবে এমন আশা ভারতের মিডিয়ার না থাকাই ভাল। সবাইকে এটা মেনে নিতেই হবে তাও নয়। অন্যদিকে যারা আইএসের উপস্থিতির বিষয়টা যে কোন উদ্দেশ্যে অস্বীকার করে যাচ্ছিল, বলা যায় এরা সবাই এর পরিণতির দিকটা উপেক্ষা করে এক ধরণের বেপরোয়া চলছিলেন একথা সত্যি হলেও তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারটা অজানা ছিল তা নয়। অথচ সকলেই একটা ভান কর গেছে যেন তারা এমন একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে জানতেনই না। অথবা অবস্থান হল যে দেখি না আগে বাস্তবে ঘটুক, ততদিনে আর একটু বেশিক্ষণ সুবিধাদি খেয়ে নেই। এজন্য এরাই হামলার ঘটনা ঘটবার পরেপরেই একেবারে উলটা গান ধরেছে, সব ছেড়ে ভদ্র সভ্য হবার চেষ্টা করছে,সেই সুবিধা খাওয়া শক্তি। হামলার ঘটনার শুরু পয়লা জুলাই রাত প্রায় পোনে নয়টা। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম জিম্মি করার ঘটনা বলে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার দিকটা বুঝতে সকলের সময় লেগেছিল। প্রায় রাত দশটার আগে কেউই ঘটনার মাত্রা ঠাহর করে বুঝতে সক্ষম হন নাই। এরপর সারারাত ধরে উতকন্ঠা শেষে জিম্মি উদ্ধার একশন অভিযান শুরু হয় সকালে অর্থাৎ ২ জুলাই সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। তাতে কী ঘটল সকালে, ফলাফল কী দাড়াল – সকাল দশটার আগে এর নিউজ মিডিয়ায় আসে নাই। তবে এরপর থেকে দিনভর ক্রমশ পরিস্কার হতে থাকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ইদানিং মানে, গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আগেকার দিনে দৈনিক পত্রিকা বলতে আমরা প্রিন্ট পত্রিকাই বুঝতাম। কিন্তু সেগুলো সবই এখন একই সাথে অনলাইনও হয়ে উঠেছে। অনলাইন মানে আগে যেমন ছিল, প্রতিদিনের খবর পরেরদিন সকালে একসাথে প্রিন্ট হয়ে বের হওয়া সে নিয়ম-ছন্দ এখানে ভেঙ্গে ফেলা। দিনের ঘটনা দিনেই যখন ঘটছে প্রায় তখনই প্রকাশিত করে ফেলা হল অনলাইনের বিশেষ বৈশিষ্ঠ। এমনকি ঘটনা উদ্ভাসিত হয়ে ঘটা শেষ পর্যন্ত ডেভেলপিং স্টোরি হিসাবে ক্ষণে ক্ষণে একাধিক রিপোর্ট বের করে ফেলা যায় ও হয় এখানে। এটাও অনলাইন পত্রিকার আর এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ। আনন্দবাজার অনলাইন শুধু হয় নাই, নিয়মিত সম্পাদকের বাইরে অনলাইন সম্পাদক বলে আলাদা লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠক টানার জন্য আনন্দবাজার দিনের শুরুতে সরাসরি পাঠকের মেলবক্সে অনলাইন পত্রিকার লিঙ্ক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আরও আছে। পত্রিকায় আগে যে সাব-ক্যাটাগরি হেডিং করা খবর পরিবেশন করত যেমন – কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের জেলা, রাজ্য, কেন্দ্র এরপর বিদেশ এভাবে মোটা দাগের ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। এবার এর পাশাপাশি –কেন্দ্র আর বিদেশের মাঝখানে ‘বাংলাদেশ’ বলে নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত এক বা একাধিক বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর সেখানে তোলা হয়ে থাকে। আর থাকে নতুন নিয়োগ পাওয়া– সম্ভবত বাংলাদেশ পাতার ভার যার উপর সেই “অমিত বসুর” একটা রিপোর্ট। যদিও এটা রিপোর্ট না কলাম, তা নিশ্চিত কর বলা মুশকিল। তবে যেটা নিশ্চিত তা হল অমিত বসুর রিপোর্ট মানেই – প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, উন্নতি হচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে আগে যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে ভাল বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদির ঢেডা পিটানো প্রশংসাসুচক রিপোর্ট। আর বলা বাহুল্য এসবের বিপরীতে ‘বিএনপি-জামাত’ এর নানান নেতিবাচক ফেনোমেনায় তাদেরকে ভিলেন বানানো থাকে। সবমিলিয়ে এই হল অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর আলাদা সম্পাদকীয়সহ সাজানো অনলাইন আনন্দবাজার, বাংলাদেশ যার বিশেষ ফোকাস।
শুরুতে যেকথা বলছিলাম, ০২ জুলাই সকাল দশটার পর থেকে জিম্মি উদ্ধার কাহিনী নিউজ হয়ে প্রচারিত হওয়া শুরু করেছিল। দুপুর তিনটা চল্লিশ মিনিটে আনন্দবাজার অনলাইনের বাংলাদেশ নিউজ সেকশনে একটা রিপোর্ট আপলোড করা হয়। শিরোনাম “মধ্য এশিয়ার অর্থই অনর্থ ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে!” – যার লেখক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। লেখাটা মন্তব্য প্রতিবেদন ধরণের বলা যেতে পারে। লেখার প্রসঙ্গ বিচার করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের জিম্মি ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া এর উদ্দেশ্য। অথবা হয়ত লেখককে সম্পাদকের অনুরোধটা হয়ত এমনই ছিল।
হোলি আর্টিজানের ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্ট ইন্টারেষ্ট বা কনসার্ণ গ্রুপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রধান কমন প্রতিক্রিয়া হল, স্বভাবতই ভয়ভীতি। এছাড়া এথেকে উতসারিত পরের প্রতিক্রিয়া হল – যতটা সম্ভব দুরত্ত্ব তৈরি করে দাঁড়ানো যাতে তা ভারত ‘অ-সংশ্লিষ্ট’ এই ভাব তৈরি করে। ভারত এসব ছুয়ে নাই তা দেখান। এর মূল উদ্দেশ্য ভারত এসবে সংশ্লিষ্ট না ফলে ভারত যেন বাংলাদেশের সাথে টার্গেট না হয়। হামলা যেন না ছড়িয়ে ভারতে প্রবেশ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা পদক্ষেপ। যেমন এব্যাপারটা সবচেয়ে প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার রূপ হল, কোন স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে অনির্দিষ্ট ও হঠাত করে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বন্ধ করে দেয়া। সাদা চোখে এসব পদক্ষেপ হয়ত অস্বাভাবিক না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জায়গায় আজ এসে পৌছছে তা সে জায়গায় আনতে ভারতের বাংলাদেশ নীতির দায় আছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের নীতি অবস্থানকে সাথে নিয়ে দেখলে তা বুঝা যাবে। সেক্ষেত্রে বলা যায় এটা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে এখন পালিয়ে যাওয়া, সম্পর্ক ও দায়–হীন বলে হাত ধুয়ে ফেলা – এভাবে ভারতের নিজেকে হাজির করার চেষ্টা।
উপরে ভারতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া বুঝাতে প্রথম শব্দটা লিখেছে ‘ভয়ভীতি’। মানুষ ভয় পেলে বয়ান ১৮০ ডিগ্রী বদলে ফেলতে পারে তাই যেন বুঝা গেল সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর এই লেখায়। মোট ৬৭৬ শব্দের এই লেখার প্রথম ৫৩৮ শব্দ তিনি ব্যয় করেছেন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ ব্যাখ্যা করতে বা বলা যায় দায়ী করতে। বলা বাহুল্য সেটা এক অর্থনীতিবাদী ঝোকের ব্যাখ্যা। দুনিয়ার সব অঘটনের জন্য ‘পুঁজিবাদ দায়ী’ করা ধরণের। এছাড়া এই ব্যাখ্যা-ধারা বলতে চায় – দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘটে নৈব্যক্তিকভাবে, বা ঘটবেই ধরণের। ফলে যেন মানুষ দায়ী না, ঘটনার কর্তাও সে নয়। অথবা কর্তা কেউ নয় ও নাই। এই ব্যাখ্যার ঝোক, ঘটনার কর্তা দেখতে পায় না বা চায় না। তবে লেখক সব্যসাচীর লেখায় ‘পুঁজিবাদ’ মূল প্রসঙ্গ নয়, বরং যা তিনি বলবেন এর পটভুমি রচনার উপাদান বলা যায়। কী তিনি বলবেন?
এককথায় বললে তাঁর বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী। ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের এর হামলাকারিরা কোন কিসিমের মাদ্রাসা ছাত্র নয়। বরং একেবারে দেশ-বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা উচু সমাজের সন্তান। এসব প্রকাশ হয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্যাপক অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ এতে ‘সন্ত্রাস’ বিষয়ে তাঁদের সব গালগল্প আর গরীব-ঘৃণা উদোম হয়ে গেছে। লেখক সব্যসাচীও তাদের একজন তবে একটু ভিন্নভাবে। সারকথায় বললে, তিনি বলতে চাইছেন, পুঁজিবাদের কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেটেড লেবার গিয়েছে। সেই লেবাররাই বাংলাদেশের “জঙ্গীবাদ” সমস্যার জন্য দায়ী। সব্যসাচীর নিজের ভাষায় পড়েন, “……পাঠানো অর্থে তাঁদের পরিবারদের সমৃদ্ধ করে তুলছেন, তাঁরা কিন্তু নিজেরা দ্রুত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন ওই দেশগুলোর স্বাভাবিক ‘আফিমের নেশা’ ধর্মীয় উন্মাদনায়, বাড়াবাড়িতে। দারিদ্র্য,অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষার জন্যই এটা হচ্ছে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কড়া ‘ডোজ’-এর মৌলবাদে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর যে বাংলাদেশিরা রুটি-রুজির টানে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছেন, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য তাঁদের তেমন নেই বলে (যাকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বলা হয়) তাঁরা চট করে ওই ‘সোনার হরিণ’-এর টানে মজে গিয়ে ওই ধর্মীয় ‘আফিম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ওই ‘আফিমের নেশা’ (মৌলবাদ) আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে”।
প্রথমত, সব্যসাচীর ভুগোল-বোধে সমস্যা আছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন মিডল-ইষ্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা। কিন্তু শব্দে সেটাকে বলছেন, “মধ্য এশিয়া”। কিন্তু ইষ্ট মানে তো এশিয়া নয়, প্রাচ্য। যে অর্থে ওয়েষ্ট বলতে যেভাবে পাশ্চাত্য বুঝি। আবার সেন্ট্রাল এশিয়া বলে আলাদা রিজিয়ন আছে। বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি সাম্রাজ্যের যুগে যা আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তের রুশ জার সাম্রাজ্য অঞ্চল। ফলে তিনি মধ্য এশিয়া বলতে সেন্ট্রাল এশিয়া বুঝাচ্ছেন কিনা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত সব্যসাচীর আর বাকী দিকটা হল, ইসলাম-বিদ্বেষ। আবার শুধু তাই না, বরং সাথে আছে শ্রেণী ঘৃণা। একেবারে “শিক্ষা,বংশ পরিচয়,সামাজিক কৌলিন্য” কথা তুলে তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এতকিছু করেও সব্যসাচীর কোন লাভ হয় নাই। সব পানিতে পড়ছে। কেন? এই লেখা তিনি লিখছেন ২ জুলাই দুপুরে। আর্টজানের হামলাকারিদের “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” তখনও প্রকাশ হয় নাই। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে দেখা গেছে “হামলাকারি জঙ্গীদের” “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” অর্থাৎ হামলাকারিদের পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত পরিচয় সব্যসাচীরা নিজের জন্য যেমন কাম্য মনে করেন সেই একই শ্রেণীর অথবা সম্ভবত আরও উচু শ্রেণীর। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না সব্যসাচীর ঘৃণাতত্ত্ব বুমেরাং হয়ে ‘ধরা খেয়েছে’। ইংরাজিতে কথা বলা, স্বচ্ছল ঢাকার এলিটদের সন্তান, দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যারা সম্ভবত সব্যসাচীর চেয়ে আপাদমস্তক আধুনিক তারাই আর্টিজান হামলাকারি। ফলে স্পষ্টত সব্যসাচীর গরীব ও মুসলমান-বিদ্বেষী অবস্থান এখানে সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো প্রথম ৫৩৮ শব্দের পরে সব্যসাচীর লেখার শেষ ১৩৮ শব্দ। এটাও ভীষণ কৌতুক কর। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনি – ধরণের। মানুষ অনেক সময় প্রচন্ড ভয় পেলে আগাম ও যেচে অনেক সত্য কথা বলা শুরু করে। এটা যেন তেমনই এক ঘটনা। সরাসরি সব্যসাচীর বক্তব্য উঠিয়ে আনছি, বলেছেন, “৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে ভাবে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে আর সে সব দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশি যুব সমাজের কাছে এই বার্তা যাচ্ছে যে, হাসিনা সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছেন। তাঁরা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন যদি কোনও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হত বা বাংলাদেশি আদালতে ওই মামলাগুলোয় যদি অন্তত এক জন বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত”।

তার মানে সব্যসাচী একটা হামলা খেয়েই সাথে সাথে স্বীকার করছেন যে সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছে। এটা সত্যিই এক দেখার মত তামাশা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কথা সত্য, যা আইনী ভাষায় বললে, এটা আদালতে প্রমাণ করলে তা শাস্তিযোগ্য বিষয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অবিচার আর বেইনসাফি করা হয়েছে। তবে সেটাও তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র বিষয়। এর তুলনায় এঘটনার ভিতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্র আজ অন্যের দাস হয়েছে। রাষ্ট্র আজ ভেঙ্গে পড়ার দশায়। এটা আমার কথা নয়, প্রকারন্তরে এটাই আসলে সব্যসাচীই স্বীকার করছেন। তিনি এটাকে “সরকারের প্রতিশোধস্পৃহায়” করা কাজ বলছেন। তার মানে এখানে কোন বিচার হয় নাই, ‘প্রতিশোধস্পৃহায়’ করা কাজ হয়েছে। কিন্তু এঘটনাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ আউলিয়ে সব ধবংস হয়ে যাবার পর এখন সব্যসাচী এর কারেকশন খুজছেন। আদালতের স্টান্ডার্ড নিয়ে কথা তুলছেন। অর্থাৎ সাব-স্টান্ডার্ড আদালত ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারন্তরে তা বুঝিয়েছেন। বলছেন, যদি “আন্তর্জাতিক আদালতে” বিচার করা হত এবং “বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত” – এসব কথা বলছেন। তাহলে স্বভাবতই এখানে যে প্রশ্নটা নিরুত্তর থেকে যায় যে, এটা এতদিন তিনি আমাদের বলেন নাই কেন? এখন বলে তিনি কী হামলাকারিদের এক্টকে ন্যায্যতা দিলেন না? তবে এখানে একটা ফ্যাক্টস বলে রাখা ভাল। আর্টজানে হামলাকারিরা জামাত রাজনীতির খাতক না, এটা বলা যায়। কারণ আইএস খোদ তাদের মাসিক প্রকাশনাতে জামাতকে “মুরতাদ” মনে করে বলে জানিয়েছে।

কিন্তু অবাক কান্ড যে আনন্দবাজার সব্যসাচীকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ধরণের আর্টিকেলে কারেকশনের কথা বলে সেই আনন্দবাজারই আবার গত ৮ জুলাই এই অবস্থানের ঠিক উলটা কয়েকটা “পেজ ফর সেল” রিপোর্ট ছেপেছে। গত ৮ জুলাইয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ছয়টার বেশি রিপোট ছেপেছে যার সবগুলাই “পেজ ফর সেল” ধরণের রিপোর্ট। অর্থাৎ আনন্দবাজার তার পত্রিকার পাতা বা জায়গা কোন বিশেষ গ্রাহককে বিক্রি করেছে। আর ঐ গ্রাহক ঐ পাতায় যা মনে চায় তাই লিখে ভরিয়েছে। এরপর আনন্দবাজার আবার তা ছাপলেও কিন্তু নিজে মনে করে গ্রাহক ঐ পেজে যা লিখেছে তার দায়দায়িত্ত্ব আনন্দবাজারের নাই। এই হল ‘পেজ ফর সেল’।

গত ৮ জুলাই প্রকাশিত সেসব রিপোর্টের মধ্যে দুই দুখানা হল জমিদারি-রুস্তমি আমলের কিশোরগঞ্জের জমিদারদের জমিদারি চলে যাবার হাহুতাশ ও হাহাকার বিষয়ক। প্রথমত কিশোরগঞ্জ কেন? কারণ এবার ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদের জামাতকে টার্গেট করে সেই মাঠে পৌছানোর রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে কিশোরগঞ্জ এখানে বিষয়। কিন্তু কাদের দিয়ে আনন্দবাজার কিশোরগঞ্জ নিয়ে আর্টকেল লিখে ছাপাচ্ছে? কিশোরগঞ্জের জমিদারের দুই উত্তরাধিকারী। এটাই হল ইন্টারেস্টিং রগড়ের দিক। আমাদের অনেকের পরিচিত The Autobiography of an Unknown Indian বইয়ের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নবগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরী আবার এই শতকে বসেও পুর্ববঙ্গের মানে একালের বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। এটা অবশ্য উনি একা নন, বৃটিশ কলকাতা হল জমিদারির আয় পয়সায় বেড়ে ঊঠা শহর। ভেঙ্গে বললে, বাংলার জমিদার-প্রজা সম্পর্কের কৃষি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত লুটেরা সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে যে শহর গড়ে উঠেছিল তার নাম কলকাতা। আর কলকাতায় এতে যে ধরণের চিন্তা, রাজনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি বা লাইফ ষ্টাইল যা গড়ে উঠেছিল এককথায় এটার প্রতীকী শব্দই “বাঙালী”। সেজন্য শব্দ হিসাবে কলকাতা ও বাঙালী প্রায় সমার্থক শব্দ। তবে এই বাঙালী ধারণাতে অবশ্যই আমরা পুর্ববঙ্গের কেউ অন্তর্ভুক্ত নই, গণ্য নই। আর ঐ কলকাতা বা বাঙালী – এটা জমিদার ঔরসের বাঙালি, বা সংক্ষেপে “জমিদার বাঙালি”। পুর্ববঙ্গের আমরা, আমাদের দুটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার, এক. বাংলার জমিদার প্রজা সম্পর্কের কৃষির সেসময়ের শোষিত প্রজাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ছিল মুসলমান। আর দুই, ‘কলকাতা’ বা ‘বাঙালী’ প্রকল্প প্রজা মুসলমানদের বাঙালি মনে করতে না, স্বীকৃতি ছিল না। ফলে বলা যায় ‘জমিদার বাঙালি’ প্রকল্প খুবই ‘ক্লাস কনশাস’ প্রকল্প ছিল।

সেই সুত্রে এজন্য নীরদ চন্দ্র চৌধুরি (১৮৯৭-১৯৯৯) নিজ জীবদ্দশায় গত আশির দশকেও আনন্দবাজার পত্রিকায় পুর্ব্বঙ্গের মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছিলেন “তথাকথিত বাঙালী”। সেই নীরদ চৌধুরির সন্তান হলেন ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী। আর নীরদ চৌধুরিরই আপন বড় ভাইয়ের মেয়ে হলেন কৃষ্ণা বসু। (কৃষ্ণা বসু নিজেই তার আর এক পরিচয় জানিয়ে বলেছেন তিনি, ভারতের প্রাক্তন লোকসভা সাংসদ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যা।) ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী এবং কৃষ্ণা বসু এরা দুজন আনন্দবাজার পত্রিকায় দুটো আর্টিকেল ছাপিয়েছেন গত ৮ জুলাই। তাদের বাপ-দাদাদের জমিদারি আমলে কিশোরগঞ্জে কত দুধ-ননীর নহর বয়ে যেত এরই বর্ণনা দিয়ে। এবারের ঈদের শোলাকিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে তাদের মনে পড়ছে বাপ-দাদার কিশোরগঞ্জের কথা। তারা তুলনা করছেন বাপ-দাদাদের জমিদারির কিশোরগঞ্জ কত ভাল ও আদর্শ ছিল। যদিও দুজন মানছেন কিশোরগঞ্জ তারা দুজনই প্রায় কখনও যান নাই। আনন্দবাজারের এই প্রজেক্টটাই আসলে ইন্টারেস্টিং। যেন “জঙ্গীবাদ” খেদিয়ে আনন্দবাজার বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আবার জমিদারি ফেরত আনার স্বপ্ন দেখছে! আমরা আজ জঙ্গীবাদের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি এর মানে কী পরিত্যক্ত পরাজিত জমিদারি ব্যবস্থা আমরা এখন ভাল মনে করব? আনন্দবাজারের ধারণা এটাই জমিদার নীরদ চৌধুরির উত্তরাধিকারদের দিয়ে হাহুতাশ ছড়ানোর ভাল সময়। তাই জঙ্গীবাদের চেয়ে জমিদারি শোষণ নিষ্পেষণ ব্যবস্থা ভাল ছিল এমন তুলনা ইঙ্গিত টানছে। অথচ আনন্দবাজারের কী খেয়াল রাখা উচিত ছিল না যে “জমিদারি” শব্দটা কলকাতায় না-বুঝা গৌরবের ভাবতে পারে। ওর বনেদিয়ানাকে কুর্নিস জানাতে পারে এমনকি তা কারো পেয়ারের হলেও বাংলাদেশ “জমিদারি” খুবই ঘৃণিত একটা শব্দ। আর কোন প্রজারই জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের কথা না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দবাজারের চেষ্টা হচ্ছে পরাজিত জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা কিশোরগঞ্জের বর্ণনা একালে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া। বাংলাদেশ মূলত মুসলমান প্রজাদের আবাসভুমি। বৃটিশ উপনিবেশ মাস্টারের কোলে বসে কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা কী মৌতাতে হুকায় টান দিতেন,ইংলিশ নাটক মঞ্চস্থ করতেন কী না এসব গল্পগুলো এপার বাংলাদেশ খাবে না। খাবার কোন কারণ নাই। বরং ক্রোধ হবার সম্ভাবনা।

সবশেষে মুরোদ তত্ত্ব দিয়ে শেষ করব। দানব সরকারের বিরুদ্ধে যখন নিজের গুম খুন হয়ে যাওয়া অথবা সরকারের দাবরানির চোটে নিজের জান বাঁচাতে যখন নুন্যতম সরকার বিরোধীরা সবাই ব্যস্ত ঠিক সেই সময়টাই হল সবচেয়ে বিপদজনক। কেন? কারণ সেই সময় জনগণ মুরোদ ওয়ালাদের খুঁজে,তাদের মর্দানি দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। মানে দানব সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ সশস্ত্র সবল প্রতিরোধ করতে মুরোদ রাখে তাদের দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ ফাঁকা রাজনীতির কথা না “মুরোদ”। তাই এটা আমাদের সবার জন্য ভীষণ বিপদজনক সময়। অন্যভাষায় এটা তাই “জঙ্গীবাদ” জন্মাবার জাগবার সবচেয়ে ফেবারেবল সময়। এভাবে জঙ্গীবাদ জনগণের মৌন সমর্থন পেয়ে যায় ‘যদি’ সেটাই সবার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হবে। অনেকে এধরণের সময়কে নকশাল যুগ বলে। এটাই মুরোদ তত্ত্ব। আশা করি আমরা মুরোদ তত্ত্ব মনে রাখব।

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জুলাই দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১১ জুলাই প্রিন্টে)ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাম ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ
গৌতম দাস
১৩ মে, ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-17R

 

 

পশ্চিমা দেশগুলো “সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম” বলে তাদের “ওয়ার অন টেররের” শত্রুদের  ডেকে থাকে। এই শব্দগুলোকে তাদের শত্রুর সাধারণ ডাকনাম বানিয়ে ফেলেছে। আর এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে আমাদের সরকার তার বিরোধীদের বিশেষ করে যারা সরকারের ক্ষমতা ও প্রধান ধারার রাজনৈতিক বিরোধী  তাদেরকেও ওই একই দড়িতে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করছে। সময়ে তা বিরাট তামাশা হয়ে হাজির হচ্ছে।

যেমন  আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু চেষ্টা করেছেন, পশ্চিমের টেরিরজমের বয়ানের ভিতর একই আগুনে সেকে আমাদের রাজনীতিতে পরিচিত “সামরিক স্বৈরাচার” শব্দটাকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে চালিয়ে দিতে। বলা বাহুল্য এটা তথ্যমন্ত্রীর খুবই অপরিপক্ক ও ব্যর্থ এক প্রচেষ্টা। কিলিয়ে কাঁঠাল পাঠানোর ধারণাও এখানে খাটো।

“সামরিক স্বৈরাচারেরা টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল”
দক্ষিণ ভারতীয় এক প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’, সেখানে বাংলাদেশ বিষয়ক এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। আসলে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সংবাদদাতা কল্লোল বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরে থাকার সময় বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর এক সাক্ষ্যাৎকার নিয়ে এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল ঐ রিপোর্ট। রিপোর্টটা প্রকাশিত হবার পর তা পড়ে মনে করার কারণ আছে যে মন্ত্রীই “একটা নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে, গাড়তে” ঐ পত্রিকার সাথে কথা বলেছিলেন।  দি হিন্দু পত্রিকায় ঐ রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, (Terrorist in tie up with military autocrat) ‘টেররিষ্ট ইন টাই-আপ উইথ মিলিটারি অটক্রাট, সেইজ বাংলাদেশ মিনিস্টার”। যার বাংলা করলে হবে, “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল– বলেছেন  বাংলাদেশের মন্ত্রী”।

“There are thousands of AL-Qaeda-trained extremists in Bangladesh who have links to military autocratic forces as well as international terrorist groups, says Hasanul Haq Inu, Minister of Information in Prime Minister Sheikh Hasina’s government”.এই ছিল ঐ রিপোর্টের শুরুর একটা বাক্য। বাংলাদেশে হাজার হাজার আলকায়েদার ট্রেনিং প্রাপ্ত জঙ্গী আছে যারা সামরিক স্বৈরাচারি শক্তির এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে যুক্ত আছে – বলেছেন বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

স্বাধীনতা পরবর্তি হিসাবে ধরলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মিলিটারি অটোক্রেটিক’ বা ‘সামরিক স্বৈরাচার’  বলতে জিয়ার ১৯৭৫-৮১ সময়কালের শাসন আর এরশাদের ১৯৮২-১৯৯০ সময়কালের শাসন সাধারণত অনেকে এই সময়টাকে বুঝিয়ে থাকেন। অর্থাৎ সারকথায় বললে ১৯৯০ সালের পরের অন্তত ১৫ বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরাচার বলে কেউ ছিল না।  ওদিকে আল-কায়েদা নামটা আমরা প্রথম জানি, নজর করি ৯/১১ বা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলায় হামলাকারিদের নাম হিসাবে। যদিও আল-কায়েদার অপ্রকাশিত জন্ম বলা হয় ১৯৮৮ সালে। তাহলে জিয়া তো বটেই এমনকি এরশাদ এই দুই সামরিক স্বৈরাচার আল-কায়েদার সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকবে কী করে? এমনকি যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই ১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা কেবল জন্ম নিয়েছে ততপর হয় নাই, ততপরতাও শুরু হয় নাই এসময়টাতে সেক্ষেত্রেও একমাত্র এরশাদের জমানার কেবল শেষ  দুবছর তারা আল-কায়েদা নামটা শুনে থাকলেও থাকতে পারে। ট্রেনিং দেয়া অসম্ভব।

বুঝা যাচ্ছে ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞান সম্পর্কে ও হোমওয়ার্কে কাচা দুর্বল থেকেই এই বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া এটাও বুঝা যাচ্ছে যেভাবেই হোক ‘সামরিক স্বৈরাচার’ শব্দটাকে তিনি আল-কায়েদা নামের সাথে বেধে পচাতে চাইছেন। কিন্তু ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞানের অভাবে গল্পটা অপুষ্ট থেকে গেছে। আর ঐ সময়কালের ফ্যাক্টসগুলো মোটা দাগে বললে তা হল, এক. ১৯৭৯ সালের প্রথম অর্ধে ইরানে বিপ্লবী খোমেনী ক্ষমতা দখল করে। দুই. ইরানের পড়শি মুসলিক অধ্যুসিত সেন্ট্রাল এশিয়া যা ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সীমান্ত, সেই সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ নিজ ঘর সামলাতে ভীত হয়ে পড়েছিল। তিনি এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন যদি ইরান বিপ্লবের জোয়ার আছর প্রতিবেশী সেন্টাল এশিয়াতে পড়ে। যদি তারা ইরান বিপ্লবের প্ররোচনায় বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হবার আওয়াজ তোলে। তাই এর প্রতিক্রিয়ায় আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ১৯৭৯ সালে ঐ একই বছর শেষে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে যাতে মাঝের বাফার রাষ্ট্র হিসাবে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করা যায়।  সেন্ট্রাল এশিয়ার যেকোন সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানের উপর বল প্রয়োগ করা যায়। তিন. সোভিয়েত এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমেরিকা পালটা ব্যবস্থা নিতে চায়। আর নিকট পড়শি পাকিস্তানও হুমকি অনুভব করতে থাকে।তাই আমেরিকান প্ররোচনায় ও তার সামরিক ও অর্থ সাহায্যে পাকিস্তান স্থানীয় ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের (নানান গ্রুপের মুজাহেদিন)  সংগঠিত করে ফেলে। এভাবে দীর্ঘ দশ বছর মুজাহেদিনদের সাথে লড়ার পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালের শুরুতেই আফগানিস্থান ছেড়ে চলে যায়, সব সৈন্য প্রত্যাহার করে। চার. সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পরে আল কায়েদা গ্রুপের ভ্রুণ এর জন্ম হয়। আর ইতোমধ্যে ১৯৯৬ সালের দিকে মুজাহেদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে তালেবান গ্রুপ আমেরিকান পরোক্ষ সমর্থনে এবং তারা সরার চেয়ে সংগঠিত ও কার্যকর ছিল বলে পুরা আফগানিস্তানের শাসন হাতে পায়, সরকার গঠন করেছিল। এতে আল-কায়েদা ও তালেবান পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করেছিল ও চিন্তায় প্রভাবিত করতে পেরেছিল, সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।   পাঁচ. তাহলে আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গের দিক থেকে ফ্যাক্টস হল, আমাদের দুই ‘সামরিক স্বৈরাচারের’ আমলে আল-কায়েদা ফেনোমেনা দৃশ্যমান ছিল না বা বা দৃশ্যমান হয়ে উঠার পর্যায়ে যায় নাই।  ছয়. তবে এটা সত্য যে মুলত পুরা নব্বুই এর দশক জুড়েই বা তার আগেও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই জোশ আগ্রহে ইসলামি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা নিতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল, নানান মুজাহিদ গ্রুপের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। আর এরাই ১৯৯৬ সালের পর থেকে দেশে ফিরে এসেছিল। এখানে পাশাপাশি মনে রাখা যেতে পারে, আশির দশকে কমিউনিস্টরাও একইভাবে প্যালেস্টাইনে বিপ্লব বা যুদ্ধের স্বাদ নিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক,মন্ত্রী ইনু হয়ত আফগান ফেরত সেসব যোদ্ধাদের কথা বুঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাবলী এবং এর সময়কাল বাংলাদেশের কোন সামরিক স্বৈরাচারের আমলের ঘটনাই নয়। এটা হতেই পারে,মন্ত্রী ইনুর জিয়াউর রহমানের উপর বা বিএনপির উপর ক্ষোভ আছে। বিশেষত ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে হয়ত। তবু বলতেই হয় এটা তাঁর খুবই দুর্বল ও কাঁচা প্রচেষ্টা। কারণ তিনি সময়কাল মিলাতে পারেন নাই।

তবু দি হিন্দুর রিপোর্টটা অন্য দিক থেকে দেখা যেতে পারে। রিপোর্টটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এর সুনির্দিস্ট ফোকাস এর অভাব আছে, ফলে  খাপ ছাড়া।  খুব সম্ভবত এটা হতে পারে যে, মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতকার নেয়া শেষ করা হয়েছে কিন্তু কোথায় ফোকাস করে পত্রিকা বা ঐ রিপোর্টার রিপোর্টটা প্রকাশ করবেন তা ঠিক হয় নাই। কারণ সে বিষয়ে সম্ভবত মন্ত্রীর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে রিপোর্টারকে তিনি নিজের মতের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রাজি করাতে বা মানাতে পারেন নাই। অথবা এমন হতে পারে যেভাবে মন্ত্রী ব্রিফ করেছিলেন রিপোর্টার সেভাবে বুঝে নাই বা বুঝতে রাজি হয় নাই। ফলে রিপোর্টের একটা বিপর্যয় সেখানে ঘটেছে। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন ফোকাসের ছাড়া একটা রিপোর্ট হয়ে গেছে। সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের আম পাঠকের চোখে – “জিয়া, এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারেরা ইসলামি সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত ছিলেন” – এই নতুন বয়ান তাদের পাতে পড়া অথবা নজরে পড়া দূরে থাক এই বক্তব্য কারও আমলেই আনা যায় নাই। বিশেষত আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার কারণে। সেখানে নতুন বয়ানটা প্রতিষ্ঠা করা সে তো অনেক দুরের ব্যাপার।

মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসে নাই, বাধা স্থানীয় মিডিয়া
মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসতে পারে নাই, আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার বাধার কথা বলছিলাম। কারণ একটা মজার ব্যাপার হল দি হিন্দুর ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃৎ করে বাংলাদেশের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে রিপোর্ট হয়েছিল। কিন্তু কেউই ‘দি হিন্দুর’ শিরোনামকে নিজ রিপোর্টের শিরোনাম করে নাই। এমনকি মন্ত্যরীর পছন্দের সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গটাকে আমলেই নেয় নাই। প্রিন্ট পত্রিকার প্রত্যেকেই নিজস্ব ও ভিন্ন শিরোনাম করেছে।  আমাদের দৈনিক মানবজমিন গতকাল ১৫ এপ্রিল দিনের কোন এক সময়ে অনলাইনে এক রিপোর্ট ছাপতে দেখা গেছে,  যার বডির লেখা এত অল্প যে তার চেয়ে লেখার ব্যানার হেডলাইনটা বড় অথবা  তা না হলেও প্রায় সমান। আর শিরোনাম করেছিল,  “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” এটা হল সেই হেডলাইন। হেডলাইন দিয়ে চমকে দেবার খবর অর্থে এটা চমকপ্রদ খবর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ নিজের দেয়া শিরোনামের ঐ পাঁচটা শব্দই কেবল সব বক্তব্য।  বাক্যগুলো ‘দি হিন্দুর’ লেখার রিপোর্টের বডি থেকে তুলে নেয়া কয়েকটি শব্দ। আবার প্রায় একই হেডলাইন – “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮ হাজার জঙ্গি রয়েছে বাংলাদেশে ” – এটা হল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ঐ দিনের শিরোনাম। কিন্তু এদুটো পত্রিকার কেউই ‘দি হিন্দু’র পত্রিকার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐ রিপোর্টের সুত্রে ও বরাতে ছাপিয়েছে বলে জানিয়েছে ঠিকই কিন্তু কেউই মন্ত্রী ইনু যে বক্তব্যটা ফোকাস চাইছিলেন যে “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল” এদিকটা নিয়ে কোন উতসাহই তাদের ছিল না।  বরং ভারতের দি হিন্দুতে তা ছাপা হওবার পর পরই বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃত করেছে ঠিকই কিন্তু  নিজেরা ভিন্ন ট্রিটমেন্টে  ও ভিন্ন শিরোনাম দিয়ে।  কিন্তু কী তাদের প্ররোচিত করেছিল?

স্থানীয় শিরোনাম হয়ে গেল, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” 
‘দি হিন্দুতে’ শিরোনামটা পড়ার পরই যেকপোন দেশী পাঠকের মনে যে বিরাট খটকা লাগে তা হল বাংলাদেশের ‘সামরিক স্বৈরাচার’ আর ‘সন্ত্রাসবাদ’ এই শব্দদুটো মিলিয়ে কেমনে কোন বাক্য রচনা করা গেল। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকা সেজন্য রিপোর্টার শিরোনাম বদলে তাদের স্থানীয় শিরোনাম, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” করে নাই।

একথা ঠিক যে যেকোন ভারতীয় সাংবাদিকও টেররিজম শব্দটার প্রতি অতিরিক্ত সেনসেটিভ থাকে। কিন্তু এর মানে এই না যে কোন গারবেজ বা যে কোন কিছুকে টেররিজম বলে দাবি করলেই তাদেরকে তা খাওয়ানো যাবে, তারা মেনে নিবে। বাংলাদেশের সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া বা এরশাদ এরা আজকের মতই “ইসলামি জঙ্গী” ছিল অথবা “ইসলামি জঙ্গীবাদের” সাথে যুক্ত ছিল ইনুর এমন বক্তব্য  ইতিহাস-সম্পর্কহীন। একেবারেই ইতিহাসবোধহীনের ম্যানুফ্যাকচারড। দি হিন্দুর সাংবাদিক মন্ত্রীত ইনুর দাবি প্রমাণের দায়িত্ব না নিয়েই তাঁর কথাই ছেপেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবদিকেরা সেদিকে যায়ই নাই। তারা তুলে নিয়েছে, “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  ৮ হাজার জঙ্গি” এই কয়টা শব্দ কেবল। তাও আবার হিন্দুর রিপোর্টের বডি থেকে  কয়েকটা শব্দ। এতে দেশের মিডিয়ায় তথ্যমন্ত্রীর  দাবি আসে নাই, এই অর্থে বেকার হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এতে একটা সুবিধা তথ্যমন্ত্রী পেয়েছেন যে এই রিপোর্টে যে কোন প্রমাণ সম্পর্কহীন উদ্ভট দাবি এখানে আছে তা বাংলাদেশের মিডিয়া আমলই করে নাই। কিন্তু কেন?

গত প্রায় এক বছর ধরে যত সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে তা তে আইএস জড়িত নয়, তারা হাজির নাই, হয় নাই, এটা বলা সরকারি অবস্থান বা ভাষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি এই অবস্থানটাই ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার হল, তথ্যমন্ত্রী ইনু দি হিব্দু পত্রিকার সাক্ষাতকারে দাবি করে ফেলেছেন “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে”। যদিও এটা বলার উদ্দেশ্য তাঁর ভিন্ন ছিল।  কিন্তু একথা বলার আগে তথ্যমন্ত্রী খেয়ালই করেন নাই যে এভাবে বললে “আইএস নাই” প্রসঙ্গে সরকারি অবস্থানের বিরুদ্ধে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি ইনু আর এক মন্ত্রী, খোদ বিরোধীতা করে ফেলছেন। আর স্ববিরোধিতার সেদিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার সুযোগ ঐ দুই দেশি পত্রিকা ছাড়তে চায় নাই।

এখন ফলাফলঃ ফলাফল হল, দি হিন্দুর রিপোর্ট মন্ত্রীর  ঈস্পিত লক্ষ্য তো পূরণ করতে পারেই নাই উলটা বরং ক্ষতি করে ফেলেছে। “বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নাই, সাংগঠনিক কাঠামো নাই” – একথাগুলো বলা এখন সরকারের বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসিয়াল অবস্থান। সরকার মনে করে এগুলো স্বীকার করে নিলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের রাস্তা খুলে দেয়া হবে। আই এস দমাতে তাদের এখন আমাদের দেশে আরও সরাসরি ভুমিকা দরকার বলে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যুক্তি সাজিয়ে বসতে পারে। অনেকটা খালেদা সরকারকে উতখাতে বা ১/১১ এর সরকার কায়েমের পক্ষে যেভাবে যুক্তি সাজানো হয়েছিল। সরকারের এই অনুমানগুলো পটেনশিয়াল। ফলে বিপদজনক হতেও পারে। কিন্তু তথ্যমন্ত্রীর বয়ান অবশ্যই সরকারি ভাষ্যকে দুর্বল করেছে।

মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত

মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত
মোদির পাকিস্তান সফরের অর্থ কী
গৌতম দাস 

http://wp.me/p1sCvy-tV
৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চমক দিতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু ও অবাস্তব শব্দ ও বাজে ধারণাগুলো বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যে কোনো দুইটি রাষ্ট্র মানেই দুইটি আলাদা আলাদা স্বার্থ এবং যে সম্পর্ক আসলে আবার মৌলিকভাবে স্বার্থ-সংঘাতমূলক। কিন্তু তবু এরই ভেতর সাময়িক কোনো কোনো ইস্যুতে এক কমন অবস্থান হাজির করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার সুযোগ নিতে হয়, দরকার হয়ে পড়ে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এক জটিল বিষয়। হয়তো দেখা যাবে, ৯০ ভাগ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থান ফাটাফাটি সংঘাতের, কিন্তু বাকি ১০ ভাগের কমননীতি-অবস্থানের (তবে তা সাময়িক) কারণে কোনো উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অবস্থায় তাকে আনতে হতে পারে, আনা হয়। তো সারকথা হলো, তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কমাত্রই এক জটিল জিনিস। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির এ চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সবসময়; মোদির এই ঝোঁক একদিক থেকে যেন পরোক্ষে তাঁর স্বীকার করে নেয়া যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জিনিসটা জটিল বলেই চমক সৃষ্টি করে মোদি একে সহজ করার কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আবার আরেক দিক থেকে এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক এক গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা থাকে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থ-সংঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে। অতএব এ কথাটাকেই আমরা ভিন্নভাবে বলি যে, মোদি চমক তৈরি করতে ভালোবাসেন।

মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার ২৩ ডিসেম্বর তিনি রাশিয়া পৌঁছেছিলেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। তবে মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজি পাওয়াসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে নানানভাবে ভারতে এর স্থানীয় উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুলেছে। কিন্তু তা খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে অর্থসহ সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবার যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা ছিল। আবার আফগানিস্তান কেন? অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের লোকেরা খুব কমই জানেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা হিসাবে না হাজির হয়ে যায়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, তা ঠেকাতে এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে মান রাখার জন্য ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, যেন সেই ব্যাথা যা তাকে তাড়িত করছে তা রিলিজ বা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। অতএব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে (পাকিস্তানে মোট ব্যয়িত সময় আড়াই ঘণ্টা) দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? ভারতের মোদীকে বেচাইন করেছে আইএস। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টের শিরোনাম থেকে ধার করা ভাষায়, “ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে”।

সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও লাগিয়েছিলেন।

আসল টেররিজম এর পানি কানে ঢুকছে
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং এর প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে পুরানা সেসব দিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের অবস্থায় আছে। এ বিষয়টা মোদীর কাছে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত “টেররিজম” মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে। ভার্তের দাবি করা এতদিন যাকে সে ছলনা করে টেরিজম বলে এসেছে তা অন্ততপক্ষে সেটা “গ্লোবাল টেররিজম” ছিল না,অথবা আমেরিকার ভাষায় যা “টেররিজম” তা এটা ছিল না। এবার আইএসের টেররিজম, “গ্লোবাল টেররিজম” – একে মোকাবেলার জন্য মোদী ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছেন। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, তাতে উপযুক্তভাবে মোকাবিলার কাজে নাও করা যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে অথবা কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা ভারত সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়। হয়ত এটাই মোদির জন্য স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতেই হবে এমনকি তা কেবল নিজ পছন্দমত কান্নি মারা করে হলেও। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে যতটা সম্ভব পাশে পাওয়া চেষ্টা করে যাওয়া। পাকিস্তানের সাথে মোদীর প্রবল তাগিদের উৎস এখানে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, ডায়লগ সেও অবশ্যই করতে চায় কিন্তু কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল এতদিন ভারত-পাকিস্তানের একালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, “টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে” না “কাশ্মীর ইস্যুসহ টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে”।
এই বিরোধে দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, “তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন”। টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, “পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান”। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজের আগের সরকারের আমলে তাঁর সেনাদের সাথে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা তাদের ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার আগের সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের। এ বিষয়টাকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদী জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভাল, কারণ শেষ বিচারে তারাই তা দিতে পারে।
এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করে ডায়লগ ওপেন করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। যদিও এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সব আলাপ প্যারিসের ঐ সাইড-টকে শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক আলাপ অনেক আগে থেকেই চলছিল। নওয়াজের সাথে মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে তা একধরণের ফরমাল বা চুড়ান্ত আকার পেয়েছিল। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
ফলে  আভ্যন্তরীণ মুল্যায়নে ভারতের কখনই ধরে নিবার কারণ নাই যে, এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক। কিন্তু তবুও ভারত কাশ্মীর-কেন্দ্রিক ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকেই কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম বলে, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে নেওয়া। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে ভারতের রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২৫ ডিসেম্বরের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই (WIRE)-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। “In a way, he is sending a signal to everyone that there will be no more U-turns,” said Siddharth Varadarajan, a founding editor at The Wire, an Indian news site. “He is putting his personal political brand on this process. He can’t walk away that easily now.”
মোদী সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, “একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না”।

“সমালোচকদের পাকিস্তা্ন পাঠিয়ে দিবার রাজনীতি” – ভারত আর বাংলাদেশে একই
বিজেপি তার সমালোচককে বাংলাদেশের মতই কিছু হলেই পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ – এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করে থাকে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার চালাতে গেলে তার তো একটা পাকিস্তান নীতি, পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো কিভাবে ডিল করবে তা থাকতেই হবে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনী বক্তৃতায় ভোট পাবার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী উস্কানি, সুড়সুড়ি জাগিয়ে ভোটের বাক্স ভড়তে যা বলা হয় তার সাথে বৈদেশিক পাকিস্তান নীতির কোন সম্পর্ক নাই। ফলে সবসময় তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর তাদের স্ব স্ব কালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। বরং সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখতে গিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সরকারের পাকিস্তান নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের মোট সক্ষমতাটা তাদেরকে দুইভাবে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।

মোদির পাকিস্তান সফরে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
মোদির সফরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে অদ্ভুত ও মারাত্মক; তবে এককথায় এবং দূরে সেভ জায়গায় দাঁড়িয়ে বললে বলতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তো এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে কয়েকটা খোপে ভাগ করে বললে, প্রথম খোপ  হল তারা যারা সরাসরি শুধু ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় লাভালাভের দিক চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এরা হলো খোদ কংগ্রেস, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও তার জনতা দল ইউনাইটেড। খোপ দুই, যারা জম্মু ও কাশ্মীর অথবা পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময় থেকেই লম্বা বিবাদে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন এককথায় বললে, ভারতীয় কাশ্মীরকেন্দ্রিক সব ধরনের দল মোদির পাকিস্তান সফরকে ইতিবাচক বলেছেন। এছাড়া এদের সবার একই কথা “ডায়ালগ”; নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালগই প্রধান কার্যকর করণীয় মনে করেন সবাই। এমনকি যারা কাশ্মীড় ইস্যুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী লাইন অনুসরণ করে তারাও মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রীনগরের মডারেট দল হুরিয়াত এটাকে সরকারের নেয়া “ইতিবাচক সঠিক পদক্ষেপ” বলেছে। আর হার্ডলাইনের আলী শাহ জিলানি বলছেন, “ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তির কিছু নেই”। বর্তমানে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে চলতি জোট সরকার গঠনের পার্টনার স্থানীয় মডারেট দল পিডিপির নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদও খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে ‘সঠিক দিকে পদক্ষেপ’ বলেছেন। ওদিকে হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক এমআইএম দলের নেতা ও কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়ার্সীও মোদির সফরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলেছেন। কাশ্মীরের স্থানীয় দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহর নাতি ওমর আবদুল্লাহও স্বাগত জানিয়েছেন; তবে এমন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না, ছুটে যায় বলেও আক্ষেপ করেছেন। ওদিকে বাম কমিউনিস্টদেরও (সিপিএম, আরএসপি) এই খোপে ফেলা যায়, একই ধরনের স্বাগত জানানোর কারণে। তবে এদের বাড়তি কিছু শব্দ আছে। যেমন তারা ‘টেররিজমও নিপাত যাক’ সঙ্গে যোগ করে তাদের কথা বলেছেন।

এই সফরের খবর ভারতীয় মিডিয়ায় আসার পর কংগ্রেস প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, “এই সফরের কোন তালমিল প্রটোকল রাখা হয়নাই। ফলে এটা একটা ফালতু তামশা ব্যাপার হয়েছে। এর খারাপ পরিণতি হবে। এর আগে বাজপেয়ির এমন সফরের পরে কারগিল যুদ্ধ এসেছিল”। যেমন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, দি হিন্দু,। কংগ্রেস এমন মন্তব্য করার সময় ধরেই নিয়েছে যেন আগে কোন ইনফরমাল আলাপ ছাড়াই মোদী পাকিস্থান সফরে গিয়েছেন। এর আর এক অর্থ আইএস ইস্যুতে মোদীর সরকার কী করে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নিজ দলের সুবিধাই আসল কথা।  সোনিয়ার কংগ্রেসকে কেবল ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় বক্তব্য অবস্থান নেয়া ও প্রকাশের দলে বা খোপে ফেলাতে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা ইদানীং এমন অবস্থাতেই ঠেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা ২০১৪-এর নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরে মোট আসনের মাত্র ১০ ভাগেরও নিচে আসন সংখ্যা হয়ে যাওয়ার পর। যেমন মোদি সরকারের ‘ল্যান্ড বিল’ বা জমি অধিগ্রহণ আইন নামে একটি আইনের প্রস্তাব করেও বিরোধীদের বিরোধীতায় তা শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি, পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। শেষে মোদী বিলটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা বলা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস হয়নি বলে এমনিতেই এটা প্রত্যাহার হয়ে গেছে ধরতে হবে। ওই বিলের সারকথা ছিল একদিকে চাষাবাদের জন্য জমি, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বা শিল্প-কারখানার জন্য জমি এ দুই ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যের লাইনটা কোথায় টানা হলে সঠিক হবে, সব কুল রক্ষা পাবে। এ বিলের ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থান খুবই সঙ্কীর্ণ বিরোধিতার। সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল বিবেচনা ছিল, কোনো চটকদার পপুলার কথা বললে তাতে দল চাঙা হবে। অথচ বিষয়টা একালের সব রাষ্ট্রের জন্যই খুব নির্ধারক এক নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পার্লামেন্টে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী দলের মূল অবস্থান-বক্তব্য রেখেছিলেন। রাহুলের বক্তৃতার পর মিডিয়াসহ কংগ্রেসের নিজের দলের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাহুলের পারফরম্যান্স’। রাহুল ‘কী বলেছেন’ সেটা নয়, ‘কোন অভিনয়ে’ বলেছেন সেটাই বিবেচ্য ও চর্চার বিষয় হয়েছিল। দল কি অবস্থান নিয়েছে, সেদিক নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না। কথাগুলো তুলে আনলাম, ভারতের এখনকার বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজনীতির কোয়ালিটি বোঝানোর জন্য। তবে একথাও ঠিক, বিজেপি যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখনও কমবেশি এসব সমস্যা একই ছিল। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে ভাগ করে দেখা ছাড়াও যদি একই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনীর রাজনীতির অবস্থান আর সরকারের নীতি বা সংসদে আনা বিলের বেলায় অবস্থান এভাবে ভাগ করে দেখি তো সেখানেও বিশাল ফারাক আর ছলচাতুরিতে ভরা অবস্থান দেখতে পাব। নভেম্বরের বিহার নির্বাচনে বিজেপির মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো কাড়াকাড়ি ছড়াছড়ি গেছে। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবসে’ প্রচারণায় নামতে ভারতীয় বাহিনীকে খোদ মোদির টুইট বার্তার আহ্বান জানিয়েছিল। বিজেপির এগুলো সবই ভোটের রাজনীতি। সস্তা ইসলামবিদ্বেষ ছড়ালে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে এ বিশ্বাসে কাজে নেমেছিল। আবার সেই মোদিই এখন পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকলেও এক সিরিয়াস বিজনেসে পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে চান, একথা শতভাগ সত্যি।

সারকথায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই আইএস ইস্যুটা এখনও মুখ্য ইস্যু হতে এবং যথাযথ গুরুত্ব পাবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বিরোধী কোনঠাসার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে  বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

[এই একই প্রসঙ্গে আমার দুটো লেখা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট তুলে  দুটি দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। প্রথমটা ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় আর দ্বিতীয়টা ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ লেখা দুটোর পয়েন্টগুলোকে একসাথে করে এরপর নতুন করে পরিবর্ধন ও এডিট করে এখানে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

goutamdas1958@hotmail.com

নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা

নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা
গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-nD

 

খবরটা প্রথম প্রচারিত হয় ১৫ ডিসেম্বরের বিদেশি মিডিয়ায়। সৌদি আরব নাকি নিজের নেতৃত্বে ৩৪ ইসলামী দেশের এক সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠন করে ফেলেছে। আমাদের দেশে খবরটা পৌঁছায় পরের দিন। দেশে খবরটা আবার প্রচারিত হয়েছে এককাঠি অতিরিক্ত গুরুত্বে যে, বাংলাদেশ ওই জোটে অংশগ্রহণে সম্মতিও প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের দুইজন মন্ত্রীও এ খবরে সায় দিয়ে জানিয়েছেন, খবর পাকা। ফলে খবরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ থাকেনি। কিন্তু গোল বেঁধেছে মূল খবরটা আসলে কী, কিইবা এর তাৎপর্য এসব বিষয়ে। খবরটা নিয়ে মিডিয়ায় যতই  খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, ততই দেখা যাচ্ছে বিভ্রান্তি বাড়ছে; সেটা দেশি এবং বিদেশি মিডিয়া, দুই জায়গাতেই। এই লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে মূল খবরটা আসলে যতটা  প্রচারিত হয়েছে বাস্তবে  জোটের পুর্ন প্রস্তুতির ব্যাপারটা তখনও ততদুর আগায় নাই। অথচ বড় করে তা অনেক আগেই প্রচার হয়ে গেছে এবং করা হয়েছে। এছাড়া খবরের ভেতরেই শুরু থেকে বড় বড় ফাঁক রয়ে গেছে বা রেখে দেয়া হয়েছে। যেমন বেশিরভাগ খবরের শিরোনাম, “সৌদি আরব ৩৪ দেশের এন্টি-টেররিজম কোয়ালিশন গড়েছে” এটা আল জাজিরা থেকে নেয়া। এমন ধরনের শিরোনাম যতটা ভারি ওজনের ভেতরের খবর ততটা ভারি ও পোক্ত মোটেও নয়। যেমন সরাসরি আইএস বিরোধী না বলে  সাধারণভাবে “এন্টি-টেররিজম” জোট বলা হয়েছে। তবু এর অর্থ আইএস বিরোধীতাই হয়েছে। অনেকে সেই কারণেই আইএসের প্রতি ইঙ্গিত থাকে এমন শিরোনাম  দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এটা কী ধরনের জোট? এর ম্যান্ডেট কী? এছাড়া এই জোটের ম্যান্ডেট কী হবে তা নিয়ে কোনো খসড়া কি তৈরি হয়েছে, যা থেকে হবু সদস্যরা পরিষ্কার জানবে কেমন ধরনের জোট হচ্ছে আর ওই জোট ঠিক কী করবে!  জোটে সরকার অংশগ্রহণ করবে বাংলাদেশের মন্ত্রীরা তা স্বীকার করে নেয়াতে এনিয়ে মোটা মোটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ১৭ ডিসেম্বর দৈনিক মানবজমিন ‘মিশ্র প্রতিক্রিয়া’ শিরোনামে রিপোর্ট করেছিল। ওই রিপোর্টে লিখেছিল, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, এটি সামরিক জোট নয়”। স্বভাবতই এ আধা-তথ্যে মানুষ বিষয়টা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু উত্তর পাওয়ার চেয়ে নতুন নিরুত্তর প্রশ্নের সংখ্যাই বাড়াবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘প্রাথমিক আলোচনায় সৌদি আরব আমাদের যে ধারণা দিয়েছে  তা হচ্ছে এটা যুদ্ধ করার সামরিক জোট নয়। এটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি কেন্দ্র হবে। এ জোটের সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই”।  স্পষ্টতই মিডিয়ার খবরগুলো ইতোমধ্যেই যে উচ্ছ্বাস আগ্রহের উত্তাপ বা হাইপ এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে, প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য তাতে পানি ছিটিয়ে গুরুত্ব লঘু করার চেষ্টা। এ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, সৌদি ফরেন অফিস বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলার সময় জোট কী করবে, ফোকাস কী, কোথায় গিয়ে থামবে, সুনির্দিষ্ট কী উদ্দেশ্য ইত্যাদি প্রসঙ্গ ছিল না। বরং এদিকে হওয়ার চেয়ে যেনবা সৌদি ফরেন অফিস থেকে বাংলাদেশকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল সৌদি কোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে কিনা এবং সঙ্গে থাকবে কিনা এতটুকুতেই সীমিত ছিল। জোটের সম্ভাব্য কাজ ভুমিকা ম্যান্ডেট ইত্যাদি ছিল খুব গৌণ। কেবল “সৌদি উদ্যোগ” এই প্রেস্টিজিয়াস জিজ্ঞাসার প্রতি আমরা সমর্থন দিচ্ছি কীনা এটাই মুখ্য বিষয় ছিল। ধাবিত ছিল। ওদিকে ১৮ ডিসেম্বরের প্রথম আলো “সৌদি জোটের ভবিষ্যৎ সংশয়ে” এই শিরোনামে এ’বিষয়ে আরও কিছু সংযোজন করেছে। প্রতিমন্ত্রী ওখানে বলেছেন, “এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দলিল সই হয়ে থাকে। কাজেই এখানেও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আলোচনা করে চূড়ান্ত করার সুযোগ থাকছে”। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য আমাদের অনুমানকে পোক্ত করে। এ বিষয়টাকে তাই আমরা বলছি হবু জোটের ‘উদ্দেশ্য লক্ষ্য’ বিষয়ক কোনো খসড়া এখনও চালাচালিই শুরু হয়নি। তবে একথা ঠিক যে, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিং থেকে বিস্তারিত না জানলেও যা জানা গিয়েছে এসব বিষয়ে ভিন্ন কিছু বক্তব্য ১৫ ডিসেম্বরের রয়টার পরিবেশিত খবর আমাদের আরও কিছু জানাচ্ছে। সেখানে যেমন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়েরকে প্যারিসে সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেছেন “জোটের পক্ষে কোনো সামরিক শক্তি মাঠে নামবে কিনা” এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “সব সম্ভাবনাই টেবিলে আছে”। অর্থাৎ জোটের সামরিক তৎপরতাও থাকতে পারে। তিনি নাকচ করেননি। আবার ৩৪ দেশের জোট গঠনের বিষয়ে সৌদি রাজধানী রিয়াদে ঘোষণা নিয়ে সাংবাদিকের সামনে প্রথম এসেছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহম্মদ বিন সালমান। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, “সন্ত্রাসবিরোধী বলতে তিনি শুধু আইএস নয়, আইএসসহ সব সন্ত্রাসবাদীকেই বুঝিয়েছেন”। তাহলে আমাদের প্রতিমন্ত্রী এখনও অনেক বিষয় আমাদের ব্রিফ করার সময় হয়নি মনে করলেও সেসব প্রশ্নে সৌদি মন্ত্রীদের মনের অনেক ডিটেইল অবস্থান জানা গেছে। তবে একথা ঠিক যে, পূর্বপ্রস্তুতিমূলক বহু কাজ শেষ না করেই এর আগেই সৌদি কূটনীতিকরা মিডিয়ায় হাজির হয়েছিলেন। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের ওপর সৌদি আরবের যে প্রভাব তাকে কাজে লাগিয়ে সৌদি কূটনীতিকদের ঘাটতি তারা আপাতত উতরে গেছেন বা সুবিধা নিয়েছেন। তবে পাকিস্তান তার নাম সৌদিদের তালিকায় দেয়ার আগে কেন তাকে আগে জানানো হয়নি এ নিয়ে প্রথমদিন বিস্ময় প্রকাশ করলেও পরের দিন থেকে তা হজম করে মিটিয়ে ফেলেছে। আর বাংলাদেশ প্রথমদিন থেকেই হাফ ব্রিফিংয়েই সম্মতি জানানোর কথাই সরাসরি স্বীকার করেছে।
ওদিকে এই জোট গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রায় সব বিদেশি মিডিয়া যেদিক প্রশ্ন তুলেছে তা জেনুইন। তারা বলছে, সৌদি প্রস্তাবিত এই জোটে কোনো শিয়া-ইসলাম শাসিত সরকার, যেমন ইরান বা ইরাক সরকারের নাম নেই। ফলে বাস্তবত এটা শিয়া-বিরোধী সুন্নিদেরই জোট হয়ে গেছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুতি প্রশ্নে কয়েক মাস আগেও সৌদিরা এমনই এক জোট (দুবাই, বাহরাইন, জর্ডান, মিসর ও সৌদিদের) তৈরি করে জোটের ব্যানারে নির্বিচারে ইয়েমেনে আকাশ বোমা হামলা চালিয়েছিল। সেখানেও শিয়াবিরোধী সুন্নিদেরই জোটের ছায়া বজায় ছিল এবং ওই বোমাবাজি ৬ হাজার হুতির জীবননাশ ছাড়া ইয়েমেনের সংঘাতের কোনো রাজনৈতিক সমাধানের কিছুই করতে পারেনি। তবে মনের ঝাল হয়তো মিটেছে। এদিকটাতেই সব মিডিয়া ইঙ্গিত করে সৌদি জোট একপেশে শিয়া-বিরোধী জোট হতে চায় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ওদিকে এনিয়ে আমেরিকান প্রতিক্রিয়া বেশ মজার ডিপ্লোম্যাটিক। আমেরিকা স্বাগত জানিয়েছে এং আরও বিস্তারিত শোনার জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ-বিরোধী কোনো অবস্থান তারা নিতে চায়নি। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ১৯৭৩ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকান মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একালে আর সৌদি স্বার্থের সঙ্গে তালমিল রেখে মন যুগিয়ে চলতে পারছে না। বিশেষত যেদিন থেকে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে ‘পারমাণবিক ডিল’ করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল আর শেষে ঐ ডিল স্বাক্ষর হয়েছিল।

মুল বিষয় সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের অবনতি
খুব সংক্ষেপ করে বললে, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর ১৪ বছরে পা দিল অথচ এই যুদ্ধে ন্যূনতম কিছু অর্জন হয়েছে অথবা যুদ্ধ সমাপ্তি বা থামার নামগন্ধ আছে এমন কোন ইঙ্গিতও কোথাও নেই। ওদিকে ২০০৭ সালের শেষ দিক থেকেই এই যুদ্ধের প্রভাব বিশেষত যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে তা ক্রমান্বয়ে ভেঙে ফেলেছে। এককথায় বললে, আমেরিকান সামরিক সক্ষমতা এখনও একই রকম বহাল আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমছে বলে তা সামরিক সক্ষমতার অপারেশনাল কস্ট যোগাতে অযোগ্য হওয়াতে কার্যত তা সীমিত হয়ে গেছে, অকেজো করে ফেলছে। এই দশা থেকে মুক্তি পেতেই আমেরিকাকে ইরানের সঙ্গে ডিল করতে যেতে হয়েছে। কারণ ডিল হওয়াতে এখন আইএস বিরোধ ইরানকেও আমেরিকার পক্ষে মাঠে পাওয়া যাবে। নিজের অক্ষমতার কিছুটা হাল হবে। এটাই আমেরিকান স্বার্থ। আর ঠিক এটাই সৌদি স্বার্থবিরোধী। আসলে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের উতখাতের সময় থেকেই কেবল ইরাক প্রশ্নে কার্যত একটা ঐক্যমত ছিল যে পরবর্তিতে  শিয়াদের দিকে কান্নি মারা এমন একটা ইরাক সরকার হবে যেটা একইসাথে আমেরিকা ও ইরানের পছন্দের। কিন্তু এই ঐক্যমত বা ডিল এর কোন প্রকাশ্য স্বীকৃতি ছিল না। কেবল কার্যত তা প্রতিফলিত হতে দেখা যেত। কিন্তু নতুন করে আইএস হাজির হওয়াতে এই অস্বীকৃত এলায়েন্স আর অপ্রকাশ্য রেখে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। তা থেকেই ইরান-আমেরিকার প্রকাশ্য পারমানবিক ডিল স্বাক্ষর করার বাস্তবতা তৈরি হয়। কিন্তু তাতে আমেরিকার জন্য এক নতুন সমস্যা হাজির হয়। সৌদি সরকার ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর থেকেই কোন ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের ঘোরতর বিরোধী হল। সৌদি রাজতন্ত্র মনে করে খোদ ইরান বিপ্লবসহ ইরানের দুনিয়ায় হাজির থাকাটাই সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি। তবে আগে ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের কোন প্রকাশ্য কিছু না থাকায় এটা সৌদিরা সহ্য করে নিয়েছিল। কিন্তু পারমাণবিক ডিল স্বাক্ষর হয়ে যাবার পর ১৯৭৩ সালের পর থেকে এই প্রথম সৌদি ফরেন পলিসি আমেরিকার থেকে বড় ধরণের ভিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে পরস্থিতি এমন যে  আমেরিকার পক্ষে দুই বগলে দুজন সৌদি আর ইরানকে নিয়ে হেঁটে চলতে সক্ষম থাকা একেবারে অসম্ভব। কারণ এমন কোনো কার্যকর কমন ফর্মুলা নেই, আমেরিকা খুঁজে পায়নি, যাতে সৌদি ও ইরান দুই পক্ষই আমেরিকার সঙ্গে একই সঙ্গে থাকে। এজন্য এরপর থেকে আমেরিকার সঙ্গে পরপর তিনটা সৌদি বিরোধের ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথম ঘটনা মিসরে জেনারেল সিসিকে সৌদিদের ক্ষমতায় আনা এবং এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হল সেটা আমেরিকাকে উপায়হীনভাবে মেনে নিতে হয়েছে। দ্বিতীয়টা হলো, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর সৌদি নেতৃত্বে জোটের বোমা হামলা। এখানেও সৌদি আর আমেরিকান নীতির ভিন্নতা ছিল এবং এখনও আছে। ফলে একা সৌদি ইচ্ছায় ঘটনা গড়িয়েছে। যেটার কোন ফল সৌদিদের পক্ষে আসুক আর নাই আসুক তবে – “আমাদেরটা আমারাই করে নিতে পারি” ধরণের একটা স্বান্ত্বনা সৌদিরা নিজেদের জন্য এনেছে। ইতোমধ্যে সৌদি সরকারের আর এক মরিয়া উদ্যোগ নিয়েছিল যেটা কার্যকর হয় নাই তা হল,আমেরিকার জায়গায় রাশিয়াকে অস্ত্রের সোর্স এবং নিজ ফরেন পলিসি ও রাজস্বার্থের পক্ষে পার্টনার হিসাবে পাবার চেস্টা করে দেখাওপেন দেখা সাক্ষাত আলোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু দুই রাষ্ট্রস্বার্থ এক কমন পয়েন্ট বের করতেে নাই। আর এবারের সৌদি নেতৃত্বে ৩৪ দেশের যে জোট, তা এখনও স্পষ্ট নয় যে, তাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য কী, কোথায় ফোকাস করবে। অথচ সৌদি প্রভাব যা মূলত নগদ অর্থের প্রভাব। এছাড়া বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের জন্য সৌদি প্রভাবে সায় না দিলে নিয়োজিত শ্রম চাকরিচ্যুতি ঘটিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে, এই ভয়। যেটাকে আমরা প্রভাব বলছি। অথচ আমাদের বিপরীত স্বার্থ হলো, আমরা কী সৌদিদের পো-ধরার মাধ্যমে আইএসের খামোখা চক্ষুশূল হওয়ার রিস্ক নিচ্ছি না!এভাবে শত্রুকে দাওয়াত দিয়ে আনছি কিনা সে প্রশ্ন উঠবেই।
ওদিকে এখনও আমাদের সরকারি ভাষ্য হলো, বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই। সর্বশেষ গত সপ্তাহেও আমেরিকান সচিব প্রতিমন্ত্রী নিশা দেশাইদের সাক্ষাতের সময় এটাই বলা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আরও ভালোভাবে উঠবে যে, সৌদি জোটে আমরা যাব কেন? অর্থাৎ আর পাঁচ জায়গায় সরকার যেমন তার সিদ্ধান্তের পক্ষে কোন ন্যায্যতা দেখাতে বা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও গায়ের জোরে তা বাস্তবায়ন করে যায়। ফলে এখানেও আমাদের সৌদি ইচ্ছাকে কদর করতে হবে। এছাড়া খামোখা শিয়া-সুন্নি কোন সম্ভাব্য গোষ্ঠীদাঙ্গায় বিপজ্জনক সম্প্রদায়গত পক্ষ নিতে হবে।

এখানে আর একটা দিক আছে। গত মাসে প্যারিস হামলার পরের পরিস্থিতিতে সেটা আরও উন্মোচিত। এককথায় বললে, একেবারে মরিয়া বা অস্তিত্ব ঠেকে যাওয়া অবস্থা না হলে সারা পশ্চিমের কোন রাষ্ট্র কারও পক্ষেই আইএসের বিরুদ্ধে শুধু আকাশ বোমা নয়, মাঠে নেমে মোকাবিলার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। যুদ্ধের খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। তাই হামলার পরে ফরাসি প্রেসিডেন্টের মেলা হম্বিতম্বির আইওয়াশ আমরা দেখলাম। আইএসবিরোধী জোট এই হয়ে যাচ্ছে, সর্বাত্মক যুদ্ধ এই তো সামনে যেন। অথচ সব ভুয়া শো-আপ মাত্র। আসলে তারা কেবল আকাশ পথে বোমা হামলার খরচটাই শেয়ার করল। এসব আলাপের শেষের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির অনুরোধে ওআইসির এক মিটিং ডাকা হয়। কেরির ইচ্ছা ছিল যদি কিছু খরচ শেয়ার করতে সৌদিরা রাজি হয়! কিন্তু আমরা দেখলাম, সৌদিরা আবার স্বমূর্তিতে; ইয়েমেনের হুতি ইস্যুতে অকেজো নীতির মতোই আবার এক নীতি নিয়ে সৌদিরা হাজির। এ নীতি শুনতে অনেক ভালো লাগছে যে, ৩৪ দেশের জোট। কিন্তু সৌদি নেতৃত্বে এটা কতদূর যাবে, যেতে পারে! এতে আমেরিকার অবস্থা বেয়ারা বাচ্চার বাবার মতো। না সে বাচ্চা বাবার কথা শোনে, না বাবা তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, না শাসন করতে পারে। সেজন্য আমেরিকা সৌদি উদ্যোগকে সরাসরি বিরোধিতা বা উড়িয়ে না দিয়ে কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সৌদি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে এবার বিস্তারে পরিকল্পনা কী তা জানাতে বলছে। আসলে প্রকারান্তরে বলতে চাচ্ছে, সৌদিরা কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দিতে পারবে না। ফলে হতাশ হয়ে যদি সে আমেরিকার নীতির কাছে আবার ফিরে যায়!
সর্বশেষ দেখা গেল চীনও সৌদিদের সমর্থন জানিয়েছে। এটাও চীনের কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান। আমেরিকার কুটনৈতিক দুর্দশার সময়ে সৌদিদেরকে “চালিয়ে যাও” বলে পিঠ চাপড়ে দেয়া।

তবে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্বেগ জানিয়ে যত প্রতিক্রিয়া আমরা প্রকাশিত হতে দেখেছি তা জেনুইন। এই জোট যদি কার্যকর হওয়ার একটু-আধটু চেষ্টা করে তবে তা হবে শত্রুকে একেবারেই দাওয়াত দিয়ে ঘরে ডেকে আনার মতো ঘটনা। এছাড়া আমাদের বাড়তি এক বোনাস মিলবে – শিয়া-বিদ্বেষী এক জনগোষ্ঠী পরিচয়। অন্যের জন্য ভাড়া খাটা।

[লেখাটার প্রথম ভার্সন এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা : রাশিয়া পশ্চিমের নজর চায়

তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা
রাশিয়া পশ্চিমের জোটে অন্তর্ভুক্তি, অবরোধ তুলে নেয়া ইত্যাদিতে নজর চায়

গৌতম দাস ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-iw

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে সেই কবে পঁচিশ বছর আগে। শুধু তাই নয় ভেঙ্গে রাশিয়া নামে এমন এক ক্ষুদ্র আকার নিয়েছে যে সেই রাশিয়া এখন সব গাইগুই ছেড়ে পুঁজিতান্ত্রিক মুল ধারা বা গ্লোবাল অর্ডারের অংশ। সোভিয়েত ধারার অর্থনীতি বলতে কিছুই ওর ভিতর অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু সোভিয়েত ভক্ত পুরান কমিউনিষ্টদের মাথা ঠেকিয়ে ভক্তি দিবার জায়গার অভাব হয় নাই। তারা এখনও প্রবল ভক্তি সহকারে একালের মাফিয়া রাষ্ট্র পুতিনের রাশিয়াকে পুরান সোভিয়েৎ ইউনিয়নের জায়গায় বসিয়ে ভক্তি সেবা দেয়। মাফিয়া রাশিয়ার হয়ে প্রপাগান্ডায় মেতে উঠে। এটা সত্যিই এক আশ্চর্যের বিষয়। প্রেমের আবেগের সামনে জ্ঞান বুদ্ধি বিবেচনার যে আজও অচল সেটাই বরং আবার প্রমাণিত।
আজকের দুনিয়ার আইএস বা ইসলামী স্টেট ইস্যুটা দিনকে দিন বিশ্ব-রাজনীতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। ব্যাপারটি অনেকটা ‘কুইনাইন সারাবে কে’ অবস্থার মত। ম্যালেরিয়া তাড়ানোর জন্য রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। এতে কুইনাইনে ম্যালেরিয়া তাড়ানো গিয়েছিল কিনা, সেকথা চাপা পড়ে গিয়ে এর চেয়েও বড় ঘটনা হয়ে গিয়েছিল নতুন রোগ – কুইনাইন এ নতুন রোগ ডেকে এনেছে। তা থেকে আবার আরও অনেক নতুন নতুন রোগের বিস্তার ঘটেছে। এই অবস্থা। এভাবে সর্বশেষ জটিল ঘটনাটি হল, তুরস্কের বোমারু এফ-১৬ বিমান এক রাশিয়ান বোমারু এসইউ-৩০ বিমানকে গোলা মেরে ভূপাতিত করেছে। আগেই বলেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের চোখে রাশিয়াই এখন সেই তাদের চোখে পুরান সহানুভূতি পাবার রাষ্ট্র হিসেবে সে জায়গা নিয়েছে। সিরিয়াতে সেই রাশিয়ার বিমান হামলা শুরু হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে। প্রথম এক সপ্তাহ টানা বোমাবাজি করে এরপর থেকে থেমে থেমে যেন গড়ে দিনে একটা করে এবং বেছে বেছে জায়গায় বোমা ফেলা, যেখানে ফেললে তা আসাদের রাষ্ট্র যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে সুবিধা পায়- এভাবে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়ার নতুন যুদ্ধবিমান খুয়ানোর ঘটনাটা ২৪ নভেম্বরের। ওই দিন তুরস্কের বোমারু বিমান রাশিয়ান এক বোমারু বিমানকে গোলা মারার ঘটনাটা ঘটে। এ ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া কার কী ধরনের, কে কী বলেছে এর একটা সঙ্কলন রিপোর্ট তৈরি করেছে আল জাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক। সেই রিপোর্ট অনুসরণ করে এখানে কথা এগোব।

তবে এর আগে কেন তুরস্ক রাশিয়ান বোমারু বিমান ভূপাতিত করল সেদিকে কিছু আলোকপাত করা যাক। বিষয়টা নিয়ে এর স্বপক্ষে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর রাশিয়ান প্রপাান্ডা থাকলেও সিরিয়া-তুরস্কের সীমান্তে হামলা হওয়া ওই অঞ্চলের কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্যের দিকে মনোযোগ দেব। যে অঞ্চলে তুরস্ক-রাশিয়ান বোমারু বিমানে হামলা হয়েছে, অথবা বলা যায় সিরিয়ার যে অঞ্চলে রাশিয়া বিমান হামলা করতে গিয়েছিল সেটা সিরিয়া-তুরস্কের একেবারে সীমান্ত অঞ্চল। সিরিয়ার দিক থেকে তা লাটকিয়া প্রদেশ আর তুরস্কের দিক থেকে সেটা হাতায়ে প্রদেশ- এই হলো দুই প্রদেশের সীমান্ত সেটা। শুধু তাই না, ওই অঞ্চলের বসবাসকারীরা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা টানার বহু ঐতিহাসিক যুগ আগে থেকেই সিরিয়ার ‘সিরিয়ান টার্কম্যান’ বা অরিজিনাল টার্কি বংশোদ্ভূত তবে সিরিয়ায় বসবাসরত বলে সিরিয়ান। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যেহেতু আজকের সিরিয়া বলে কোনো আলাদা রাষ্ট্র ছিল না; বরং আজকের সিরিয়া, ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যই তুরস্কের শাসনাধীন একই অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সীমানা অঞ্চল ছিল। ফলে আজকের সিরিয়ান তুর্কিরা তুরস্কের মূল তুর্কি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার একই অংশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সুলতানের পরাজয়ের পর ওই সাম্রাজ্য ব্রিটিশ-ফরাসিরা গোপন চুক্তির কারণে ভাগাভাগিতে সিরিয়া বলে আলাদা রাষ্ট্র সীমানা টানার সময় লাটকিয়া অঞ্চল নতুন রাষ্ট্র সিরিয়ার ভাগে চলে যায়। এ হলো পুরনো ঐতিহাসিক দিক। আর একালের সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই তথ্য হলো- এক. সিরিয়ান আরব স্প্রিং বা সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই সিরিয়ান টার্কম্যানরা আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে লিপ্ত হয়েছিল এবং এখনও আছে। আর রক্ত এবং আত্মীয়তা সূত্রে তুরস্ক থেকে সব ধরনের সাহায্যপ্রাপ্তিও সেই থেকে তারা পেয়ে আসছে। তুরস্কের সরকারের দিক থেকে সরকারও নিজ টার্ক-জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক সূত্রে সিরিয়ান টার্কম্যানদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা নিজের সমাজের দা্বি । তথ্য দুই. এটা আমাদের প্রসঙ্গের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লাটকীয়া অঞ্চল সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই আইএস অথবা পরবর্তীতে যারা আইএস হয়ে হাজির হচ্ছে তাদের কোনো তৎপরতা বা প্রভাব এখানে নেই, তাদের অনাগ্রহের এলাকা বা মুক্ত এলাকা।
কিন্তু রাশিয়ান বিমান ধ্বংস হওয়ার পর রাশিয়ান বয়ানে সুনির্দিষ্ট করে কেন রাশিয়ার বিমান লাটকিয়ায় গিয়েছিল, তা কোথাও উল্লেখ করে নাই, করতে চায় না। শুধু সামগ্রিকভাবে দাবি করে চলছে যে, পুরো সিরিয়াতে তারা আইএসের ওপর বোমাবাজি করতেই গিয়েছিল। অথচ মাঠের তথ্য হলো, লাটকিয়া প্রদেশ টার্কি বংশোদ্ভূত সিরিয়ানদের সশস্ত্র প্রতিরোধ তৎপরতা সিরিয়া-তুরস্কের এক ধরনের ঘরোয়া মামলা, যার মধ্যে আইএস নেই, স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কিছু নেই। অতএব রাশিয়া লাটকিয়াতে আইএস মারতে গিয়েছিল- এ বয়ান অচল; কারও হজম হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে রাশিয়া ওখানে আইএস মারার উসিলায় আসাদ সরকারকে সামরিক সুবিধা দিতে আর সিরিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ হাসিলে আসাদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ান টার্কম্যানদের উচ্ছেদ করতে গিয়েছিল। এ কাজ করতে যাওয়ার আগে রাশিয়া স্পষ্টত যেদিকটা আমলে নেয়নি তা হল, লাটকিয়ার বাসিন্দাদের রক্ষা করার স্বার্থ তুরস্ক সরকারেরও আছে। রক্ত ও আত্মীয়তা সূত্রে সিরিয়ায় থেকে যাওয়া টার্কদের রক্ষা করতে নিজ জনগণের কাছে তুরস্ক সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তাহলে সার কথা দাঁড়াচ্ছে, লাটকিয়া আসলে সিরিয়া ও তুরস্কের পারস্পরিক স্বার্থে সরাসরি সংঘাতের এক ইস্যু। সিরিয়ায় সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ সংঘাতের শুরু থেকেই লাটকিয়ার বাসিন্দাদের তুরস্ক সব সময় সিরিয়ান বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা করে গেছে। একালে রাশিয়া আইএস মারার উসিলায় তুরস্ক-সিরিয়ার স্বার্থ সংঘাতের ইস্যুতে নিজের হাত ঢুকালে তুরস্ক একইভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াবে এবং তা-ই দাঁড়িয়েছে। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করছিল আল জাজিরা টিভি। তুরস্কের নিজের এই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণকেই ওখানে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে স্বভাবতই তুরস্কের এ স্বার্থের কথা তিনি পটভূমি হিসেবে বলছিলেন। রাশিয়ান বিমান ভুপাতিত করে দেয়ার পক্ষে আইনি বা কূটনৈতিক যুক্তি হিসেবে নয়। হামলার পক্ষে তুরস্কের আইনি যুক্তি হল- রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশসীমা ভঙ্গ করে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং তুরস্ক বিমান বাহিনীর পাঁচ মিনিটে ১০ বার ওয়ার্নিং রেডিও মেসেজ দেয়ার পরও রাশিয়ানরা তা উপেক্ষা করেছে। তুরস্ক ওই মেসেজের অডিও মিডিয়ায় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আল জাজিরায় প্রচারিত মেসেজে শোনা যাচ্ছে ওই সাবধান বাণী। সেই সঙ্গে রাশিয়ান ওই বিমানের দুই পাইলটের বেঁচে যাওয়া একজন পাইলটের দাবিও আল জাজিরা আমাদের দেখিয়েছে। ওখানে তিনি দাবি করছেন, তুরস্ক থেকে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হয়নি।
অবস্থাদৃষ্টে সবমিলিয়ে বললে, বয়ানের ন্যায্যতা ও গাথুনির দিক থেকে রাশিয়া পিছিয়ে পড়েছে। রাশিয়া নিজ বয়ানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।

বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতিক্রিয়া যেটা রয়টার্স থেকে আল জাজিরা টুকে এনেছে; ওখানে দেখা যাচ্ছে, পুতিনের ভাষ্যটা যেন হার স্বীকার করা হারু পার্টির ভাষ্য। যেমন- পুতিন দাবি করছেন, বিমানটা বোমার গোলা খাওয়ার পর ওর ভাঙা অবশেষ সীমান্তে সিরিয়ার দিকে চার কিলো ভেতরে পড়েছে। অতএব আমরা সিরিয়ান সীমার ভেতরেই ছিলাম, তুরস্কের সীমানায় ঢুকিনি। – এগুলো খুবই হাস্যকর যুক্তি। কোন মীমাংসায় আসা যায় না এমন দাবি, তবে মুখ রক্ষায় কাজে লাগে এমন যুক্তিও। সাধারণত যে কোনো বোমারু বিমান এক মিনিটে কমপক্ষে ১০-১৫ কিলোমিটার পার হয়ে যায়, এছাড়া টার্কিশ আকাশ সীমায় গুলি খেয়েও কোনো বিমানের পড়ার মাটি সিরিয়া হতেও পারে। সুনির্দিষ্টভাবে এক্ষেত্রে তুরস্কও দাবি করছে, রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং ১৭ সেকেন্ড ধরে ছিল। কাজেই সিরিয়া-তুরস্কের এসব সেকেন্ড-মিনিট দিয়ে মিডিয়া বয়ান কারও নিজের পক্ষে প্রমাণ হিসাবে কাজে আসবে না। বরং যে প্রশ্নে রাশিয়ানরা চুপচাপ তা হল, লাটকিয়া আইএসবিহীন অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ান বিমান ওখানে কেন গিয়েছিল! সেখানে আমাদের জবাব খুঁজতে হবে। যুদ্ধবিমান গোলা খাওয়ার পরে পুতিন অভিমানের ভাষায় বলছেন, “বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।” এছাড়াও বলছেন, “তারা (মানে তুরস্ক) কি ন্যাটোকে আইএসের পক্ষে খেদমতে লাগাতে চায়?” পুতিনের এ দুই বয়ানের পিঠে আগাম ধরে নেয়া আছে যে, রাশিয়ান পাইলটরা যেন আইএস মারতে ওখানে গিয়েছিল আর সেই যোদ্ধা রাশিয়ার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অথচ রাশিয়ান পাইলটরা ওখানে কোনো আইএস মারতে গিয়েছিল, তাই তো প্রতিষ্ঠিত নয়। পুতিন আমাদের ধরে নিতে বলছেন, সিরিয়ার যে কোনো জায়গায় রাশিয়ান বিমানের যাওয়া মানেই তা শুধু আইএসের ওপর বোমা মারতে যাওয়া। অথচ রাশিয়ার ভালোভাবেই জানা থাকার কথা যে, লাটকিয়ায় সিরিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ আর তুরস্ক রাষ্ট্রের স্বার্থ সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে আইএসবিহীন ওই অঞ্চলে রাশিয়া যাওয়ার অর্থই হল আসাদের পক্ষে ভারসাম্য আনতে সরাসরি তুরস্কের বিপক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। অতএব তুরস্কের গুলি খেয়ে বিমান হারানোর রিস্ক রাশিয়া তো আগে থেকেই জেনেশুনে নিজেই নিয়েছে। এছাড়া যেদিন রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত হয় সেদিনই রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের কথা ছিল, যা ঐদিনের ঘটনা প্রেক্ষিতে পরে বাতিল করা হয়। ফলে কোনো বিশেষ কারণে রাশিয়াকে যদি লাটকিয়ায় বোমারু বিমান নিয়ে যেতেই হয়, তবে তা নিয়ে ওই সম্ভাব্য সভায় তুরস্কের সাথে মুখোমুখি বসে আগেই রাশিয়ার সিদ্ধান্ত সমন্বয় করে নেয়া যেত। অথচ রাশিয়া যেন ধরেই নিয়েছিল, আইএস মারার নাম করে রাশিয়া আসাদের পক্ষে মাঠের পরিস্থিতি এনে দেবে আর কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না!
এ বিষয়ে ওবামার বক্তব্যের ভেতর একটা বাক্য আছে। ওবামা বলছেন, লাটকিয়ায় রাশিয়ানরা ‘মডারেটবিরোধী’ (মানে আইএস বাদে অন্য মধ্যপন্থী আসাদবিরোধীরা) বিরুদ্ধে অ্যাকশনে চলে গেছে। অর্থাৎ ওবামাও তার বক্তব্যে পুতিনকে বকা দিয়ে কথা বলেছেন।
সেকালের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধী আমেরিকা ও ইউরোপের মিলিত যুদ্ধজোট হল ন্যাটো বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন,যার জন্ম ১৯৪৯ সালে। আর তুরস্ক ওর সদস্যপদ পায় বা নেয় ১৯৫২ সালে।
ফলে রাশিয়ান বিমানের ভূপাতিত হওয়ার পর এ ইস্যুতে সাধারণভাবে সব ন্যাটো সদস্যই তুরস্কের পক্ষে দাঁড়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের কারণে বাধ্য। তাই দেখা যায়, হামলার পরের বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমবাক্যেই তুরস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু পরের বাক্যে তুরস্ক ও রাশিয়ার দুই রাষ্ট্রের প্রতি আবেদন রেখেছেন যেন সামরিক টেনশন আর না বাড়ানোর ব্যাপারে দুই পক্ষ সংযত থাকে। অর্থাৎ ইঙ্গিতটা হলো, বাকি ন্যাটো সদস্যরা তুরস্কের পক্ষে দাঁড়ালেও ন্যাটোর কোনো সদস্য বিষয়টা নিয়ে আরও কোনো উত্তেজনা, কোনো সামরিক সংঘাতের দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে না। তারা বরং মূল শত্রু আইএসের ব্যাপারে সবাই একজোট হয়ে অ্যাক্ট করতেই চাচ্ছে।
এ ব্যাপারে সিরিয়ান সরকারের বিবৃতি স্বভাবতই রাশিয়ার পক্ষে। তবে রাশিয়ার পক্ষে এক আইনি যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করেছে সিরিয়া। রাশিয়ার বিমান ভূপাতিত করায় তুরস্কের এ কাজকে “অ্যাক্ট অব এগ্রেশন” বলে চিহ্নিত করেছে সিরিয়া। এটা জাতিসংঘের আইনি ভাষা। অর্থ “আইন লঙ্ঘন কর হামলা করা”।
তাই তুরস্ক সরকারের বিবৃতিতে সিরিয়ান অভিযোগের পাল্টা জবাব দেয়া হয়েছে। বলেছে, “তুরস্কের তৎপরতা (বিমান ভূপাতিত করা) অন্যের ভূমিতে বেআইনি প্রবেশ করে হামলাকারী হওয়ার মতো কাজ নয়”। এই হল, তোলা অভিযোগ আর এর বিরুদ্ধে কাটান দেওয়ার কেচাল। এসবের বাইরে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এসব পাল্টাপাল্টির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা। কারণ তাঁর রাষ্ট্রস্বার্থ আইএস বিরোধী জোটে রাশিয়ান অন্তর্ভুক্তি দেখতে চাওয়ার তাগিদ আছে। তিনি বলছেন, (রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে) সামরিক উত্তেজনা আর যেন না ঘটে, সেদিকে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আইএস দমনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিক্রিয়া এবং ওবামার প্রতিক্রিয়ার প্রথম অংশ এভাবে সবারই প্রতিক্রিয়ার সাধারণ দিক হল, সবাই জোর দিচ্ছেন রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আর না বাড়ানো এবং আইএসবিরোধী জোটে সবাইকে সামিল করা।
সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নিট ক্ষতিটা হলো রাশিয়ার। রাশিয়ান এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান একেবারেই নতুন হাইটেক বিমান- এমন যুদ্ধবিমান রাশিয়াকে খোয়াতে হল। অথবা বলা যায়, আইএসবিরোধী পশ্চিমা জোটে অন্তর্ভুক্তি পেতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমা অবরোধের মধ্যে থাকা রাশিয়াকে যে মূল্য দিতে হল তা বোধহয় বেশ বেশি। তবু এটা রাশিয়াকে পশ্চিমের সাথে জোটে ঢুকিয়ে দেয়ার পক্ষে তা এক কদম আগাম পদক্ষেপ। রাশিয়ার কাছে এটা যথেষ্ট দামি। তবে মাঝখান থেকে রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বিনিময় অচল হয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধবিমান হারিয়ে রাশিয়া তুরস্কের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। পুতিনের রাগ, ক্ষোভ তো কারও কারও ওপর পড়ে তবেই না প্রশমিত হতে হবে! তবে লাটকিয়ায় পুতিনের বেকুবি থেকে তিনি কী কোনো শিক্ষা নেবেন? দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

দুইঃ

বিশ্বযুদ্ধ কোন ছেলেখেলা নয়!
রাষ্ট্র মাত্রই ওর পরিচালনার মধ্যে নিজের পক্ষে প্রপাগান্ডা করা একটা কাজ। কিন্তু সে প্রপাগান্ডা আপনি বিশ্বাস করে বসবেন কিনা,ঐ প্রপাগান্ডাকে সত্যি মনে করে নিজের চিন্তা সে আলোকে মানে নিজেকেও সাজাবেন কী না এর দায়দায়িত্ব সম্পুর্ণ আপনার নিজের। কানাডায় রেজিষ্টার্ড অফিস নিয়ে বসা রাশিয়ার এক প্রপাগান্ডা ওয়েব সাইট আছে, “গ্লোবাল রিসার্চ” নামে। রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের বরাতে বা বরাত উল্লেখ করা ছাড়াই বিভিন্ন খবর ওখানে ছাপা হয়। অর্থাৎ বুঝা যায় রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্স ডাটা ও রিপোর্টে ঐ গ্লোবাল রিসার্চের কর্তাদের একসেস বা প্রবেশাধিকার আছে। তা খারাপ কী! ওয়েষ্টার্ণ সুত্রর বরাতের বাইরে এই উছিলায় আমরা কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা ওখান থেকে পেতে পারি। কিন্তু সেসব তথ্য নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের অবশ্যই সাবধান হতে হবে, ‘ইন-বিটুইন দা লাইন’ নিজের মত করে পাঠ নিতে হবে কারণ ওসব তথ্যের সাথে আবার রাশিয়ান প্রপাগান্ডা-স্বার্থও মিশান আছে। ফলে টুইষ্ট আছে। সেদিকে খেয়াল রেখে তা বাদ রেখে বেছে পড়তে হবে। ঐ সাইটের টার্গেট পাঠক আপনিও হতে পারেন যদি দেশে দেশে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রগতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের একজন খাতক হিসাবে আপনি নিজেকে এখনও মনে করেন। আর সেই সাথে যদি মনে করেন রাশিয়ান রাষ্ট্রের স্বার্থই আপনার স্বার্থ,মানে রাশিয়ান রাষ্ট্রের বৈদেশিক স্বার্থ-ব্যাগেজ বইবার দায় আপনি নিয়েছেন।
তো ঐ সাইটের অনেক প্রপাগান্ডা ইস্যু ও মেটেরিয়ালের মধ্যে একটা হল “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” এমন একটা দামামা বছরের পর বছর ধরে বাজিয়ে চলা। প্রায়ই বাংলাদেশে দেখা যায় অনেক পুরান কমিউনিষ্ট পুরান অভ্যাসে বাছবিচারহীনভাবে ঐ দামামা বাজানোতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তেমনই এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২৬ নভেম্বর দৈনিক মানবজমিনে – “মুখোমুখি তুরস্ক-রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী আসন্ন?” – এই শিরোনামে।
দুনিয়াতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন দিন হতে পারে না – এমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে না কেন; হলে আমেরিকার পতন হবে ফলে এমনটা দেখতে চাওয়ার একটা প্রবল কামনা রাশিয়ার আছে। এবং সেটাও হয়ত তেমন দোষেরও কিছু নয় যতক্ষণ না এটা যুক্তিবুদ্ধি বিচারহীন ম্যানিয়াক হয়ে না চাওয়া হয়, প্রপাগান্ডার ঘ্যানর ঘ্যানর করে ফেলা না হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য রাশিয়ার বিশেষত পুতিনের রাশিয়ার সে সমস্যা প্রবল। ১৯৯১ সালের আগে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন (আজকের রাশিয়ার পুর্বসুরি) আমেরিকার সাথে পরাশক্তিগত টক্কর দিত রাশিয়ার আর সেই যৌবন নাই। অথচ আমেরিকা অটুট আছে শুধু না, ইতোমধ্যে এক মেরুর দুনিয়া ভোগ করার সুবিধা নিয়েছে। এটা যেন রাশিয়ার কিছুতেই আর সহ্য হয় না। যদিও আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াও আর টিকছে না। সেই নেতৃত্বে বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলা একালে ক্রমশ ভাঙছে এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তা ঘটাবার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোন ভুমিকা নাই; এটা রাশিয়ার হাতে নাই – না এটা ঘটাতে, না এটা ত্বরান্বিত করতে। বরং সবচেয়ে বড় নির্ধারক ভুমিকা আছে চীনের, তবে সেটাও অবজেকটিভ। অর্থাৎ এটা চীনা নেতাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রসুত নয় বরং চীনের বৈষয়িক অর্থনৈতিক অর্জন উন্নতির কারণে পরোক্ষে পড়ে পাওয়া লাভ। এটা ঠিক আমেরিকার দুনিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্দেশ্যেই করা চীনের ততপরতা নয় বরং নিজের অর্থনৈতিক উত্থানের পক্ষে কাজ করে যাওয়া চীনের কারনে যেটা পরোক্ষ অর্থে – আমেরিকার দুরবস্থা এবং বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলার নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও নতুন অর্ডার জন্ম আসন্ন হয়ে উঠা। এই পালাবদলটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে ষ্টাডি, আগাম অনুমান করা বলতে পারা ইত্যাদির জন্য বারদিকে বিস্তর গবেষণা পড়ালেখা চলছে। গত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ সংখ্যায় লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এবিষয়ে এক রিপোর্ট ছেপেছে। ওর সারকথা হল, দুনিয়াতে একালের পালাবদল পরিবর্তন বিষয়টার কিছুটা সমতুল্য পুরান ঘটনা হল ১৩৫ বছর আগের। সেটা হল, ১৮৮০ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আমেরিকান অর্থনীতি যখন দিনকে দিন ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। আর দুনিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য ১৯১৩ সালের দিক আর পাউন্ড-স্টার্লিংয়ে না ঘটে বরং এর চেইয়ে বেশি আমেরিকান ডলারে হওয়া শুরু করেছিল। ইকোনমিষ্টের উদ্দেশ্য হল, সেকালের ঘটনাবলি পাঠ করে সেখান থেকে একালে কোন আগাম অনুমান করা যায় কীনা! কতটা করা যায় ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে জিনিষটা সুনির্দিষ্টভাবে নিজের মত ঠিক করা লম্বা পা ফেলে আগাচ্ছে এবং যার উপর রাশিয়ার কোন হাত নাই তা নিয়ে প্রপাগান্ডা করা যে – “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” বলে দামামা বাজানো যে কোন সময় বুমেরাং হতে পারে। বিশেষ করে আজকের রাশিয়ান অর্থনীতি হল, মাটির নিচের তেল-গ্যাস সম্পদ বিক্রি করে জমিদারি ফিউডাল দশায় যেন ফিরে যাওয়া অর্থনীতি, যার কোন শিল্প-ইন্ডাষ্টি ভিত্তি নাই। একালে রাশিয়ার যা আছে তুলনায় সেটা উন্নত শিল্প ভিত্তির ইউরোপের কোন রাষ্ট্র দূরে থাক, দক্ষিণ কোরিয়া লেবেলেরও নয়। সার কথায় রাশিয়ার পরাশক্তি ষ্টাটাস খুবই নড়বড়ে, কোন শক্ত শিল্প অর্থনৈতিক ভিতের উপর তা দাঁড়ানো নয় বরং তেল-গ্যাস বেচা অর্থনীতি। ফলে খুব সহজেই ৪০ ডলারে নেমে যাওয়া তেলের কারণে আর এর উপরে পশ্চিমা দেশের অবরোধে রাশিয়ার অর্থনীতি আরও চরম দুর্দশায় পড়েছে, পশ্চিম এঅবস্থায় রাশিয়াকে ফেলতে পেরেছে। সারকথায় আমেরিকান অর্থনীতি দুর্বল হয়ে তার বিশ্ব-অর্থনৈতিক অর্ডারে নিজের নেতৃত্বের স্থান থেকে চ্যুত হওয়াটা বাস্তবে চীন বা অন্যান্য রাষ্ট্রের রাইজিং অর্থনৈতিক অর্জনের মধ্য দিয়ে ঘটাবার, বাস্তবে করে দেখানোর মত কাজ। এটা প্রপাগান্ডা চালিয়ে অর্জন করার মত কাজ নয়। এছাড়া শকুনের বদ-দোয়ার কারণে বেশি বেশি করে গরু মরে ভাগাড়ে আসে না। এটা তো জানা পুরান প্রবাদের কথা। ফলে বদ-দোয়া দিয়ে, কামনা করে, প্রতিহিংসা দিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে দুর্বল করা যাবে না। হবে না।
এছাড়া বারবার যে কথা বলি, কোল্ড ওয়ার (১৯৫০-৯০) কালের চল্লিশ বছরে একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবার সম্ভাবনা যত বেশি ছিল সে তুলনায় এখন বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা ঠিক এর উলটা, অর্থাৎ আরও কম। এর মূল কারণ সেকালে বিবদমান পক্ষ রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাবের লেনদেন বিনিময় তেমন কিছু ছিলনা বললেই চলে। দুটা দুই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন লেনদেনহীন অর্থনীতি ছিল। সে তুলনায় আজ রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাসহ সবাই একই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ; পরস্পর পরস্পরের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাব ইত্যাদির লেনদেনে আষ্টেপৃষ্ঠে সংশ্লিষ্ট ও একে অন্যের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে চীনের বোমায় আমেরিকা ধবংস হয়ে গেলে সেটাতে চীনেরই ক্ষতি হয় এবং তা আমেরিকার বোমার বেলায়ও ভাইস ভারসা। অতএব একটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটে যাবার সম্ভাবনা এখন আগের মানে কোল্ড ওয়ার সময়ের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম। অবশ্য এর অর্থ আবার এমন নয় যে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতেই পারে না। ঠিক এই জিনিষটাই প্রতিফলিত হয়েছে এই সপ্তাহে তুরস্কের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় রাশিয়ান বোমারু বিমান ভুপাতিত হবার পরের পরিস্থিতি। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের বাধ্যবাধকতায় বাকী সদস্য সারা পশ্চিমাদেশ তুরস্কের পক্ষে দাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু সাথে যোগ করা এক নিঃশ্বাসে বলা তাদের পরের বাক্যই হল – তুরস্ক ও রাশিয়া যেন আর উত্তেজনা না বাড়ার দিকে খেয়াল রাখে; এছাড়া আইএসের বিরুদ্ধে সকলের সমন্বয় গড়ে তোলা এখনকার করণীয়। ওদিকে মানবজমিনের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, যেসব বিশ্লেষণ মেনে সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয় ছড়াচ্ছে তা সবই রাশিয়ান উৎসের বয়ান। যা এমনকি পারমানবিক যুদ্ধ বাধাবার ইঙ্গিত হুমকিতে ভরপুর। আসলে এটা রাশিয়ার এক নতুন যুদ্ধবিমান হারিয়ে এবার ইজ্জত ইমেজ রক্ষার ততপরতা মাত্র।
আর আমরা? অনেক তো হল, এবার আমাদের পরিপক্ক হওয়া দরকার। একালে রাশিয়ান বেকুবি, রাষ্ট্রের মাফিয়াগিরি আর রাশিয়ান স্বার্থের প্রপাগান্ডা দূরে রেখে নিজ হুশ জ্ঞানে বাস্তবতা বুঝা ও ব্যাখ্যা করতে পারার তাকত অর্জন দরকার। আমাদের সে তৌফিক হোক এই কামনায় -।

 

[লেখাটা আর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ২৮ নভেম্বর সংখ্যায় এবং শেষের অংশ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৩ ডিসেম্বর সংখ্যায় এর আগে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা নতুন করে আরও সংযোজন ও এডিট করে সর্বশেষ এডিটেড ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

 

কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

কানে পানি গেছে,
এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

গৌতম দাস
০১ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-hR

বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

দুই.
ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২