নিজ পারসেপশনের ফাঁদে নিজেই আটকে পড়া

নিজ পারসেপশনের ফাঁদে নিজেই আটকে পড়া

গৌতম দাস

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Im

অবশেষে আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া এনআরসির নামে জেনো-ফোবিয়া [Xenophobia] বা বিদেশিবিদ্বেষ ব্যর্থ হয়ে থেমেছে। কোন যাচাই প্রমাণ ছাড়াই বিদেশিরাই আসামের দুঃখের কারণ – এই ছিল তাঁদের খুবই শক্ত এক অনুমান। সব জিনিষ নিয়ে আন্দাজি কথা বলা যায় না, খুবই বিপদজনক আত্মঘাতি হয়ে যেতে পারে তা। আসামের এনআরসি [NRC, National Register of Citizens] তাই প্রমাণ করল। আন্দাজে বলা কথা, মানে যা প্রমাণ হয় নাই অথচ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেছে এবং তা পপুলার ধারণা – একেই বলে পারসেপশন [Perception]। বাস্তবে প্রমাণ করা বা প্রমাণ পাবার আগেই সারা অসমিয়দের [Assamese] এক দৃঢ় ধারণা, পারসেপশন চলে আসছে সেই 1951 সাল থেকে যে, বিদেশিরাই আসামের দুঃখের কারণ। যে বিদেশি বলতে তারা বুঝাত কথিত বাংলাদেশ থেকে  আসা বাঙালি, আর যেটাকে বিজেপির কল্যাণে ২০১৬ সালের পর থেকে হয়ে গেছিল বাঙালাদেশি মুসলমান। আজ সেই মনে মনে মিঠাই খাওয়ার সুখ – সেই পারসেপশন হয়ে উঠেছে নিজেরই গলার দড়ি। আসামের এনআরসি অবশেষে  প্রায় ১৯ লাখ লোকের নাগরিকত্ব নাই করে দিতে পেরেছে।

ভারতে ইংরাজিতে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নামে পত্রিকা আছে। ওর এক বাংলা ভার্সান আছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা। সেখানে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল,  –‘হিন্দু বিরোধী এনআরসি’, বিজেপি বিধায়ক-সাংসদদের পদত্যাগ দাবি বরাকের হিন্দু সংগঠনের।  অর্থাৎ নাগরিকত্ব হারানো ভুক্তভোগী বা তাদের বন্ধুরা এখন তাদের প্রাণের এনআরসি কে নিজেরাই “হিন্দুবিরোধী” বলছে। শুধু তাই না, ঐ রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “এনআরসি তালিকা থেকে বাদপড়া ১৯ লক্ষের মধ্যে ১১ লক্ষ হিন্দু রয়েছেন তাই এই তালিকাটি ত্রুটিপূর্ণ”।  আর ভিতরে লিখেছে, “……সারা আসাম বাঙালি হিন্দু এসোসিয়েশনের সভাপতি বাসুদেব শর্মা বলেন, ১৯ লক্ষের মধ্যে মাত্র ছয় লক্ষ মুসলমান এবং এর দ্বিগুণ হিন্দু রয়েছেন”। তাই এনিয়ে এলাকার লোকেরা এখন তাদের সংসদদেরকে দায়ী অভিযুক্ত করছেন। লিখেছে, “শনিবার সকালে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, বিজেপির সভাপতি রঞ্জিত দাস, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কবীন্দ্র পুরকায়স্থ-সহ বিভিন্ন নেতারা এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন”। এজন্যই কী প্রবাদে বলে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে তাতে ঐ গর্তে নিজের পড়ারই সম্ভাবনা তৈরি হয়! এনআরসি আজ বুমেরাং সেই প্রশ্ন উঠে গেছে!

শুধু তাই না আসাম বিজেপি এখন এমনই কোনঠাসা যে মানুষের এই গালমন্দ ক্ষোভ যেন পত্রিকায় রিপোর্টেড হয়ে আরও সামাজিক আলোচনা বা সোসাল মিডিয়ায় চর্চায় না বাড়তে পারে তাই  “আসামকে প্রটেক্টেড এরিয়া” ঘোষণা করা হয়েছে।  এর সুবিধা হল, প্রোটেক্টেড এরিয়া ক্যাটেগরির অন্তর্গত এলাকায় সংবাদমাধ্যমের বিচরণে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। বিদেশ থেকে আসা কোনও সাংবাদিক বিনা অনুমতিতে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না।

ওদিকে, প্রতীক হাজেলা [Prateek Hajela]। আসামের সব পক্ষ এখন দোষী করার মত এক ব্যক্তিত্ব পেয়ে বেঁচে গেছে। সবাই একমাত্র তাকেই দায়ী করে, সব দোষ তার মাথায় ঢেলে দিয়ে নিজ নিজ হাত-পা ধুয়ে নিতে চাচ্ছে। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া এনআরসির বাস্তবায়নে প্রধান আমলা, এই ব্যক্তিত্বের নাম প্রতীক হাজেলা। আমাদের বিসিএসের মত প্রশাসনিক ক্যাডার অফিসার, যদিও মধ্যপ্রদেশের এক আইটি গ্র্যাজুয়েট তিনি। ২০১৩ সালে তিনি ছিলেন আসাম রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব। সে সময়ের আদালত নিজের তত্ত্বাবধানে হবু এনআরসি শুরু করতে চেয়ে এর জন্য প্রধান আমলা কে হতে পারেন, এমন সম্ভাব্য নামের প্রস্তাব দিতে বললে তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগোই, প্রতীক হাজেলার নামই প্রস্তাব করেছিলেন।

ভারতের আসাম রাজ্য, যার আরও সারা উত্তরের বাদিকের নিরীহ ভুটানকে বাদ দিলে  বাকিটা চীনা সীমান্ত আর দক্ষিণ দিকে বাংলাদেশ সীমান্ত, এভাবে পুরানা আসাম চিপায় পড়া এক ভূখণ্ড মাত্র। যার কেবল পশ্চিম দিকে এক ছোট্ট কোনা দিয়ে শিলিগুড়ি হয়ে সে পশ্চিমবঙ্গ মানে মূল ভূখণ্ড ভারতের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। ভারতের পলিটিক্যাল এলিট এই অঞ্চলটা নর্থ-ইস্ট বলতে ভালবাসে। বাংলায় কেউ কেউ সাত ভাই বলে। আসলে ভারত স্বাধীনের পর থেকে  নর্থ-ইস্ট বলতে পুরা আসাম প্রদেশ আর ততসংলগ্ন কিছু ট্রাইবাল এরিয়া আর প্রাক্তন কিছু প্রিন্সলি স্টেট এলাকাকে মিলিয়ে বুঝাত। পরে বিভিন্ন সময়ে (১৯৬৩ সালে নাগাল্যান্ড আলাদা হওয়া থেকে সর্বশেষ সম্ভবত ১৯৮৭ সালে অরুণাচলের আলাদা রাজ্য হওয়া ) সেই মূল আসামকে ভেঙে সাতটা ছোট ছোট নতুন রাজ্যের জন্ম দেয়া হয়েছে। এভাবে সব মিলিয়ে সাত ভাই হল – Arunachal Pradesh, Assam, Meghalaya, Manipur, Mizoram, Nagaland and Tripura।

চীন ১৯৬২ সালের ভারত আক্রমণ করেছিল। কথিত আছে, চীনের অভিযোগ ছিল নেহরুর ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় সীমান্তে সিআইএ তৎপরতা চালাতে দিয়েছিল, যা মূলত ছিল চীনের উপর গোয়েন্দাগিরির কাজ। এ ছাড়া ভারত-চীন সীমান্তের এ দিকটায় বহু অংশই পুরানা সেই কলোনি আমল থেকেই বিতর্কিত সীমানার, অর্থাৎ উভয় পক্ষ একমতে মেনে নেয়নি, এমন অনেক পকেট আছে। এসব মিলিয়ে কিছু উত্তেজনা, খোঁচাখুঁচি শুরু হতেই চীন ভারত আক্রমণ করে বসেছিল, “ভারতকে শিক্ষা দেয়ার” জন্য। সে সময় ভারত আসাম ভূখণ্ড রক্ষা করতে আসেনি বা পারেনি। আর বিপরীতে ক্ষমতার সক্ষমতা দেখানোর জন্য চীন আসাম দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু পরে নিজে থেকেই নিজের সৈন্য প্রত্যাহার করে পুরানা চীন-আসাম সীমান্তে ফিরে গিয়েছিল। এখান থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতা ও সরকারগুলোর চোখে আসাম কী, এর একটা ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। সেই থেকে ভারতের এক দুঃস্বপ্ন বা ট্রমার নাম হয়ে থেকে যায় আসাম।

সেকালে সেই ঘটনার বর্ণনা একালে এই গত মাসে আবার কিছুটা তুলে এনেছেন এক ভারতীয় সাংবাদিক দেবাশীষ রায় চৌধুরী [Debasish Roy Chowdhury], যিনি হংকং থেকে প্রকাশিত পত্রিকা “সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট”-এর চায়না ডেস্কের এক ডেপুটি এডিটর। আসাম এনআরসির নাগরিক তালিকা প্রসঙ্গে এর প্রকাশের চার দিন আগে ২৬ আগস্ট তিনি তার এক রিপোর্ট লেখা শুরু করেছিলেন এভাবেঃ –
“১৯৬২ সালের শীতকালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জনগণকে আতঙ্ক গ্রাস করেছিল। রণভঙ্গ দিয়ে পালাতে থাকা ভারতীয় বাহিনীর পিছে ধাওয়া করে চীনের সেনারা আসামে চলে আসার উপক্রম হয়। চীনারা এসে পড়ছে এই ভয়ে সরকারি অফিসাররা সব কাগজপত্র পুড়িয়ে পালিয়ে যাচ্ছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় লোকজনও পালাতে শুরু করে। আতঙ্কে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে থাকা নোট পোড়ানো শুরু হয় এবং কারাগার থেকে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত বন্দীদের ছেড়ে দেয়া হয়। স্থানীয়রা দেখে যে কয়েদিরা চীনের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে। এতে তারা মনে করে চীনারা তাদের ছেড়ে দিয়েছে”।
“২০ নভেম্বর রেডিও ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু জাতিকে পরাজয়ের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, তার হৃদয় আসামের জনগণের সাথে রয়েছে। নয়া দিল্লি আসামকে পরিত্যাগ করবে বলে কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও আসামবাসী মনে মনে সেই ধারণা করে নিয়েছিল। কিন্তু বেইজিং হঠাৎ করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে সেনাদের ফিরিয়ে নেয়। এক মাস আগে হঠাৎ করে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। আসাম ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়। কিন্তু সুরো দেবীর সংগ্রাম তখন শুরু হয়।…”।
দেবাশীষ এটা লিখছিলেন আসলে কথিত ওই সুরো দেবীর জীবনকাহিনী বলতে যেয়ে, যে তখন ওই যুদ্ধ শেষের সময় থেকে এক পরিত্যক্ত এতিম শিশু। পরবর্তীকালে পালিত হিসেবে বড় হয়ে তার বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু কোন সন্তান জন্মানোর আগেই স্বামীর মৃত্যু হয়। এখন সুরো এক বৃদ্ধের দেখভালের কাজ করে বেঁচে আছেন। কিন্তু এনআরসি তাকে নাগরিকত্বহীনের তালিকায় ফেলেছে। দেবাশীষের এই লেখার সাথে আমাদের সম্পর্ক আপাতত এতটুকুতেই।

আমরা দেবাশীষের লেখার এই অংশটুকে এনেছি এ জন্য যে, সেই যুদ্ধের পর থেকে আসামের সাথে ভারতের সম্পর্কও একধরনের এতিমের, সে সমান্তরাল টেনে ধরিয়ে দেয়ার জন্য। ভারতের এক দুঃস্বপ্ন বা ট্রমার নাম হয়ে থেকে যায় আসাম। যে তাকে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার অনুভূতি দিয়েছে। আর সেই থেকে ভারতের ক্ষমতার জগতে এই ট্রমা আর এক মিক্সড অনুভূতি থেকেই আসামের অবকাঠামো উন্নয়ন করা, রাস্তাঘাটসহ সব কিছুতে বিনিয়োগ করা আদৌ ঠিক হবে কি না, এ নিয়ে ভারতের ক্ষমতার করিডোরে  দ্বিধাদ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। না, ঠিক আসামকে শাস্তি দেয়ার জন্য নয়। তবে অনেকটা নিজের প্রসব করা অবৈধ সন্তানের প্রতি যেমন মিশ্র অনুভূতি থাকে, এটা তেমনই একটা কিছু। যার সারকথাটা হল, আসামের অবকাঠামো ভাল উন্নত করে দিলে তা তো চীনেরই ভোগে লাগবে হয়ত। কারণ, যদি চীন আবার আসে?

যদি চীন আবার আসে! ওই অবকাঠামো ব্যবহার করে সহজেই আরও ভারতের ভিতরে চলে আসে? অথবা এই নেতিবাচক অনুমানের বদলে আর একটা যেটা ঠিক যুদ্ধের মতো নয়। সেটা হল, সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আসামের উন্নত অবকাঠামো ব্যবহার করে চীন যদি এরপর বাংলাদেশ হয়ে (বাংলাদেশের সাথে বরাবরই চীনের সম্পর্ক ভালো বলে) এর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেতে আসামের উপর দিয়ে হাঁটাচলা শুরু করে যদি, তাহলে? তবে ভারত কিভাবে চীনকে না করবে অথবা না করতে কি পারবে? সব মিলিয়ে এক বিরাট সিদ্ধান্তহীনতা। যেটা ভারতের নেতাদের মনে পুরানা ট্রমার ওপর বাড়তি এক অনুষঙ্গ। এরই নীট ফলাফল হল, আসামকে সেই থেকে অনুন্নত অবকাঠামো করে ফেলে রাখা।

আসামের এই কোণায় পড়ে থাকা, বাকি ভারতের সাথে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, এটা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে মানে বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান)-এর জন্মের পর যখন থেকে, আসাম আর বাকি ভারতের মাঝখানে বাংলাদেশ ঢুকে থাকা থেকেই। সে কারণে প্রথম এনআরসি বা নাগরিক তালিকা করার তৎপরতা ১৯৫১ সালের। আর এরপর আবার ১৯৬২ যুদ্ধের ট্রমা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আসামের অনুন্নত অর্থনীতির মূল কারণ যোগাযোগ দুর্বল অবকাঠামো, যেখান থেকে কাজ চাকরি সৃষ্টিতে অভাব ও সামাজিক সুযোগ সুবিধার অভাব দেখা দেয়ার শুরু। কিন্তু সে দিকে না তাকিয়ে, কারণ হিসেবে অবকাঠামো দুর্বলতাকে চিহ্নিত না করে বরং আসামে মানুষ বেশি হয়ে গেছে, “বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা মনে করা”, এই বিদেশী বিদ্বেষ [Xenophobia] জেগে উঠা বা পরিকল্পিতভাবে উঠানো, আর তা কেন্দ্র সরকারের হাতে তার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা- এটাই আসামের  অরিজিনাল বা মূল সঙ্কট।

কিন্তু এসবের চেয়েও এসব থেকেই আর এক বড় সঙ্কট এখন ‘পারসেপশন’ [Perception]। কিসের পারসেপশন? পারসেপশন মানে যাচাইয়ে প্রমাণ হওয়া ছাড়াই আন্দাজে একটা অনুমান দাঁড় করানো, এবং দৃঢ়ভাবে তা বিশ্বাস করা। এমনভাবে বিশ্বাস করা  যা থেকে মানুষ এরপর থেকে ভুলে যায় যে সেটা একটা অপ্রমাণিত অনুমান মাত্র ছিল। যেমন, আসামে বহিরাগত বাঙালিরাই আসল সমস্যা কি না তা কি বাস্তবে মাঠে যাচাই করা হয়েছে? জবাব হল, না, কখনোই হয়নি। এ ছাড়া আগে এতক্ষণ এটাই বলেছি, আসামের মূল সমস্যা সব ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামো দীর্ঘ দিন বিনিয়োগহীন পড়ে থাকা বা কেন্দ্রের ফেলে রাখা। কিন্তু বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা- এই পারসেপশন শুধু জেঁকে বসে গেছে শুধু তাই নয়, এর ওপর দাঁড়িয়ে পুরো আসাম সমাজ সে সময় (১৯৭৯-৮৫) এতই উন্মত্ত হয়ে গেছিল যে তারা ভারত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হতে নিচ্ছিল। আর তা ঠেকাতে সেকালের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী “১৯৮৫ সালের ‘আসাম একর্ড” চুক্তি করেছিলেন, যার মূল পয়েন্ট ছিল “বহিরাগত খেদাও”।

কোন পারসেপশন আর বিচার-আদালত একসাথে চলতে পারে না। চালাতে চাইলে ওর নাম হয় শাহবাগ।  বিচার-আদালত মানেই তাতে কোন একটা জিনিষ সত্য প্রমাণিত হতেও পারে, আবার না-ও পারে। বিচার শেষের আগে এর কোনোটাই সঠিক বলা যাবে না। এই দু’টি অপশনই ঘটতে পারার সুযোগ খুলে রাখতে হবে। কোন বিচারে বসার আগেই যদি আগাম তা না খুলে রাখা হয়, তবে ঐ বিচার শুরু করার মানেই হয় না। ওটা বিচার বলাই যাবে না। কারণ, যদি ধরেই নেই পারসেপশনই সত্য তাহলে আর যাচাই-বিচারে বসার দরকার কী?

আসামের তাই বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা – এই পারসেপশন, এটা আর সত্য কি না তা আর যাচাইয়ের কোনো সুযোগই নেই। অন্তত যতক্ষণ এটা ‘পারসেপশন’ জারি থাকবে। হয় চোখ বন্ধ করে একে মেনে নিতে হবে আর নাহলে পারসেপশন ফেলে দিয়ে সত্যতা যাচাইয়ে নামতে হবে। একসাথে বিচার আর পারসেপশন চলতে পারবে না।

কিন্তু আসামে তা হচ্ছে না। হয়নি; অথচ তারা এনআরসি করতে নেমে গিয়েছিল। মানে যাচাই করতে নেমেছিল। কারা নাগরিক তা যাচাইয়ে নেমেছিল। কিন্তু এর ফলাফলে তাদের পারসেপশন ভুল প্রমাণ হলে, আসামের বাসিন্দারা কি তা মেনে নেবে? জবাব হল যে কখনোই না।
সে সুযোগ রাখা হয়নি। না রেখেই এনআরসি বা নাগরিকত্বের বাছবিচারে নামা হয়েছে। এমনকি আদালতের বিচারকেরাও ছিল বিরাট বেকুব। একটা বিদেশী বা বহিরাগত খেদাওয়ের আন্দোলন সফল হয়ে গেছে, একটা চুক্তি হয়েছে তাদেরই পক্ষে। এটা তো আদালতের জানাই ছিল। তাহলে তা আবার আদালতের মাধ্যমে “নাগরিকত্ব যাচাইয়ে নামার” মানে কী?  কারণ, “বহিরাগত খেদাওয়ের” আন্দোলন করা ভুল ছিল তা প্রমাণও হতে পারে, সেই অপশন ত খুলে রাখা হয়নি।

কাজেই এই অপশন খুলে না রাখার কারণে ২০১৩ সালে আদালত তো মূলত নাগরিকত্ব যাচাই বিচারের প্রক্রিয়া শুরুর আদেশ দিতেই পারে না। তবু হয়ত হতে পারত এক শর্তে যে, আদালতকে পরিষ্কার ঘোষণা দিতে হত, নাগরিকেরা যেন তাদের মনে গেড়ে বসা অনুমান বা পারসেপশন ভুল প্রমাণ হয়ে যেতে পারে, সে জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। অথচ আদালত এমন কোনো ঘোষণা দিয়ে রাখেননি। মানুষকে সাবধান করেনি। দেখা যাচ্ছে, আসলে আদালতও ছিলেন অহমীয়দের মত একই পারসেপশনের শিকার।

এসবেরই ফলাফল হল, এখন এনআরসির পরিণতি দেখে আসামের সব পক্ষই অখুশি। যদিও বিজেপি জানত যে এটাই হতে যাচ্ছে। তাই তা আগে টের পেয়ে দুই মাস আগে আদালতের কাছে আবার বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তের ২০ শতাংশ ডাটা রি-ভেরিফিকেশন বা পুনঃ যাচাই এর দাবি তুলেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল আবার যাচাইয়ের নামে এবার তারা ডাটায় হাত ঢুকাবে আর ‘পারসেপশন’ মোতাবেক ফল বের করে আনবে।

কিন্তু আদালত এমন পুনঃ যাচাইয়ের আবেদন নাকচ করে দেয় এই অজুহাতে যে, প্রতীক হাজেলা নিয়মিত যে অগ্রগতি রিপোর্ট দিত, এর শেষ রিপোর্টে বলা ছিল, ইতোমধ্যে ২৭ শতাংশ ডাটা পুনঃযাচাই করা হয়ে গেছে। আর এতেই বিজেপির কূটকৌশল মারা পড়ায় সবার আগে তারাই এনআরসির সব ব্যর্থতার জন্য প্রতীক হাজেলাকেই দায়ী করে মিটিং করেছিল। এরপর আসামের বহিরাগত খেদাও – এই পারসেপশনের সব পক্ষই বিজেপিকে অনুসরণ করে প্রতীক হাজেলার মাথায় সব ব্যর্থতার ভার চাপিয়ে দিয়েছে।

আবার এখনো যা করা হচ্ছে যে সব ব্যর্থতার ভার চাপানো – সেটাও তো ঠিক হাজেলার অপরাধ নয়। কারণ ব্যাপারটা হল, নিজের অজান্তে তিনি একটা সত্যি কথা বলে রাখার জন্য বিজেপির এতে পরবর্তিতে হাত ঢুকানোর সুযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়া- এটা তো হাজেলার কোন অপরাধ নয়। এখন যদি কোনো টেকনিক্যাল কারণে প্রতীক হাজেলাকে দায়ী করার সুযোগ না থাকত তাহলে কী হতো? সোজা হিসাব, ‘পারসেপশনে’ মজে থাকা আসামের সব পক্ষই আদালতকে দায়ী করত, এর একটা বিরাট সম্ভাবনা ছিল।

এদিকে আদালতের নির্দেশে প্রতীক হাজেলা এখন সব ধরনের পাবলিক উপস্থিতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। এর লাভালাভ আদালতের পক্ষেও কম যাচ্ছে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

_

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “নিজের পারসেপশনে আটকে পড়া“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

Advertisements

আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

গৌতম দাস

০৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2EJ

 

[সার সংক্ষেপঃ ভারতে আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯,  ভয়েজ অব আমেরিকার সাথে সাক্ষাতকারে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার বক্তব্যঃ
“ভারতে কোন অবৈধ বাংলাদেশি থাকার খবর ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধরনের খবর উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের পলিটিক্স।’
স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশি সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?’
বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই।”

তাহলে আগামি ০৭ আগষ্ট ২০১৯, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে তাঁর সাথে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বৈঠকে, আসামের এনআরসি ইস্যুর কোন কিছুই এজেন্ডাতেই আসতে পারে না। অথচ ভারতীয় মিডিয়ার দাবি এটাই এজেন্ডায় আছে।]

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে,
আসামের এনআরসি আলোচনার কোন এজেন্ডাই হতে পারে নাঃ
ভারতের এনআরসি [National Register of Citizens (NRC)]  মানে আসামের তথাকথিত বৈধ ভারতীয় নাগরিক বাছাই। শেষে এটা দাড়িয়েছে এমন যেন – কারা ভারতীয় নয়, তা খুঁজে বের করার নামে এক মুসলমানবিদ্বেষী প্রক্রিয়া। যার পেছনের বিদ্বেষী ভাবনাটা হল যে, আসামের কোথাও কোন মুসলমানকে পাওয়া গেলেই তা আগাম নিশ্চিত ধরে নেয়া যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু। এটা আরও বেশি হয়েছে, ২০১৬ সালে আসাম রাজ্য সরকারে বিজেপির কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নিবার পর থেকে। আর এর আগে মানে  ২০১৬ সালের আগের এব্যাপারে ভার্সানটা ছিল এমন যে কোন মুসলমান বা বাঙালি পেলেই বাছবিচার  ছাড়া আগাম ধরে হত যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু।  এমনই পরিস্থিতিতে গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, তার নিজের তত্ত্বাবধানে এনআরসি বা নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা শুরুর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে এই নাগরিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ করে এক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে – এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

ইতোমধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ডেডলাইন অনেকবারই বদলানো হয়েছে। এমন চারবার বদলানোর পরে এক খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর ৩১ জুলাই ২০১৮। ভারতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী (২০১৬), আসামের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৩৯ লাখ। এখন সাড়ে তিনকোটির কিছু বেশি হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ হিন্দু ও মুসলমান নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি বলে দাবি তালিকা প্রণয়নকারীদের। যদিও এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রায় প্রতিদিনই খবর আসছে। যেমন বাবা-মা নাগরিক অথচ সন্তান নয় এমন কেস সামনে আসছে।  আবার কাছাকাছি নাম, বা নামের মিলের জন্য অন্যজনকে ধরে আনার ঘটনা আছে। এমন বহু আজিব কাহিনীও আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা এই প্রজন্মের ধারণা নাই, রেশন মানে কী? কেরোসিন, চিনি, লুঙ্গি, সাবান এসবের জন্য সারাদিন ধরে লাইন ধরে পড়ে থাকা – এই অভিজ্ঞতা যার নাই সে বুঝবে না এটা কী।  এককথায় বললে মানুষের নুন্যতম মর্যাদাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয় এতে – পুরা ডি-হিউম্যানাইজ। পুরা আসামের সবাইকে বিশেষত মুসলমানদেরকে নাগরিক্ত্বের প্রমাণ করার নামে মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়েছে। কারণ কাজের পুরা পদ্ধতিটাই সেই সত্তর দশকের চিন্তায়, রেশনের লাইনে পাবলিককে সারাদিন খাড়া করায় রাখার মত। যখন এডুকেটেড মানুষও জানত কী “ম্যানেজমেন্ট” মানে কী?

এখন পর্যন্ত এই ৪০ লাখসহ পরে ঘোষিত আরো প্রায় এক লাখ বাদে বাকি জনসংখ্যা নাগরিক তালিকায় বৈধ নাগরিক বলে ভুক্তি ঘটেছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে ওই খসড়া তালিকায়। আর গতমাসে ৩১ জুলাই ২০১৯ এই খসড়ারই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালতের নির্ধারিত সেই ডেডলাইন এ পর্যন্ত মোট ছয়বার বদলানোর পরে গত মাসের (জুলাই ২০১৯) শুনানিতে আর একবার মাত্র এক মাস বাড়িয়ে চূড়ান্ত তারিখ (সম্ভবত এবারই শেষ) আদালত দিয়েছে ৩১ আগস্ট ২০১৯।

কিন্তু এবার তামাশার দিকটা হল – এতে কেউ, ভারতের কোনো পক্ষই সন্তুষ্ট নয়। না অসমিয়া বাসিন্দা, না কেন্দ্র বা রাজ্য বিজেপি, না আসাম কংগ্রেস না আসামের পাহাড়ি উপজাতিসহ আর কোনো রাজনৈতিক দল।  আসাম কংগ্রেসের নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গোগোই এর দাবি আসাম এক নির্ভুল নাগরিক তালিকার বদলে আসাম একটা কাগজের তেনা পাইতে যাইতেছে [Assam won’t get an error free NRC on August 31: Tarun Gogoi ]। আর প্রতীক হাজেলা নামের মুখ্য আমলা – যাকে এই প্রকল্পের মুখ্য সমন্বয়-কর্তা হিসেবে আদালত সরাসরি নিজের অধীনে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই প্রতীক হাজেলাকে দায়ী করে সবপক্ষই এখন যার যার নিজেদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।  গত মাসের শুনানিতে আদালতে খোদ আসাম রাজ্য সরকারও অন্যদের সাথে জানিয়েছিলেন তৈরি খসড়া তালিকাও “ভুলমুক্ত” নয়। তাই একে শুদ্ধ করে তুলতে সময় অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে হবে, যাতে তা একটা ভুলমুক্ত তালিকা হয়ে উঠতে পারে – এই বলে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত সে আবেদনে সাড়া দেননি। কেবল ৩১ জুলাইয়ের ফাইনাল ডেডলাইনটা মাত্র এক মাস পিছিয়ে ৩১ আগস্ট করেছেন।

ওই আবেদন করেছিল মূলত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার আলাদা দরখাস্তে, কিন্তু একই ভাষায়, [In identical but separate applications, they urged the Supreme Court ] অর্থাৎ মূলত বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ, যিনি এখন নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার কথাতেই এই আবেদন। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার বলতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই ছিল ঐ আবেদনকারী। আর এখন জানা যাচ্ছে, কেন অমিত শাহ আবার সময় চাচ্ছিলেন। আদালতে পেশ করা ওই আবেদনে লেখা ছিল, খসড়া তালিকাটা ‘নির্ভুল’ নয়।

কেন্দ্রিয় সরকারের এটর্নি তুষার মেহতা আদালতে পাবলিকের  অনুমানের [perception] দোহাই দিয়ে  দাবি করেছিলেন,
“There is a growing perception. They must have done excellent work, but mistakes have crept in. The quantum of people included in certain areas is more… Wrongful inclusions are manifold in the bordering districts, lakhs of illegal immigrants have been included in the draft NRC list.”। অর্থত পাবলিক পারসেপশন হল তালিকা নির্ভুল না।
তাই ঐ দাবির আবেদনে বলা হয়েছিল, অতএব এক নির্ভুল নাগরিক তালিকা করতে বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর আসামের জেলাগুলো থেকে খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ২০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায় এরা। এ ছাড়া এরা বাকি পুরো আসামের খসড়া নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ১০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায়। আদালত যদিও এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন, কিন্তু অমিত শাহদের এতে উদ্দেশ্য কী ছিল?

কথা সত্য, যে আসামে কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা তৈরি করা গেছে বলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। কেন? পাবলিক পারসেপশন [Public perception] কথাটার মানে হল – জনমনে যে অনুভব বা ধারণা তৈরি হয়ে আছে। এই অনুভব কিন্তু বাস্তবে সত্যি হতে পারে আবার মিথ্যাও।
কিন্তু আসামে কয়েক যুগ ধরে চলা উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলন – এমন একটা জনমনের অনুভব বা শক্ত পারসেপশন তৈরি করেছে যে  – “বিদেশি” বা “বাংলাদেশি বাঙালি”, “অনুপ্রবেশকারি”, “মুসলমান” ইত্যাদি শব্দগুলো – এগুলাই তাদের সব দুঃখের কারণ। এক শব্দে বললে “বিদেশিরাই” [xenophobia] এমন এক “বিদেশি-আতঙ্ক”  সব দুঃখের কারণ মনে গেথে দেওয়া হয়েছে।  কাজেই সত্যিকার নাগরিক তালিকা তৈরি মানে কিন্তু আসলে জনমনের এই অনুভব বা পারসেপশন সত্যি কিনা এর যাচাইমনে গেথে বসা ধারণাটার পক্ষে বিনা বিচারে কোন সাফাই তৈরি করার প্রকল্প নয় এটা।   কিন্তু পুরা আসাম NRC তৈরির কাজটাকে দেখেছে এভাবে যে এই প্রক্রিয়াটা হল তাদের “জনমনের অনুভব” এর পক্ষে সাফাই তৈরির কাজ এর প্রক্রিয়া হিসাবে।
অথচ সত্যতা যাচাই মানে তো সাফাই তৈরির কাজ না। তাই এই কারণের আসাম কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা পাবে না। 

ইতোমধ্যে আসামের রাজ্য (প্রাদেশিক) পার্লামেন্টে পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী রাজ্যভিত্তিক এনআরসির খসড়া ডাটা প্রকাশ করে দিয়েছেন। গত ০১ আগষ্ট ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা [With district-wise data, Assam govt. pushes for NRC ] এবিষয়ে জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশের সীমান্ত আসামের জেলাগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমান নাগরিক তারা সবাই খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আসামের মুসলমান অধ্যুষিত ধুবরি, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও সাউথ সালমারা জেলায় যথাক্রমে ৯১.৭৮ শতাংশ, ৯২.৩৩ শতাংশ, ৯১.৯৬ শতাংশ ও ৯২.৭৮ শতাংশ মানুষ খসড়া বৈধ নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এটাই বিজেপির বিরাট মাথাব্যথার মূল কারণ। আসামের পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী এই তথ্য তুলে ধরে এখন হায় হায় করছেন। কারণ, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এই ডাটা,  এটা অসমিয়া ও বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী যে প্রপাগান্ডা আছে যে, “মুসলমান মাত্রই এরা সবাই বাংলাদেশী” একে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে। সারকথা হল, আসামের অমুসলমান সবগুলো স্থানীয় পক্ষ এবং সাথে বিজেপি- এদের সবারই মুসলমানবিরোধী যে বয়ান তা হল, সীমান্ত এলাকা বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানে সব ভরে গেছে। অর্থাৎ মুসলমানবিরোধী সবগুলো পক্ষের অনুমানের বয়ান আর বাস্তবতা এ দুটোর বিরাট অমিল – এই খসড়া নাগরিক তালিকায় দেখা দিয়েছে। তাই তাদের আহাজারি উঠেছে।

তাই অমিত শাহ-দের ইচ্ছা ছিল যদি ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেক করার সুযোগ – এই অজুহাত তারা পেত, তবে “কিছু একটা” তারা করার চেষ্টা করত, যাতে ১৯৮৫ সালের চুক্তির বয়ান আর একালে বিজেপির মুসলমানবিরোধী বয়ানকে সত্য বলে হাজির করা যেত যে, এরা বেশির ভাগই বাংলাদেশী।

কিন্তু আদালত তাদের আবেদন পুরাই নাকচ করে সব মাটি করে দিয়েছে। যদিও আদালতের যুক্তি ছিল ভিন্ন। আদালত বলেছিল, আগেরবার তারিখ বাড়িয়ে নেয়ার আবেদন নিয়ে শুনানিতে প্রতীক হাজেলা আদালতে পেশ করা রিপোর্টে নিজেই স্বীকার করে জানিয়েছিলেন, প্রায় ২৭ শতাংশ ডাটা ইতোমধ্যে দু’বার চেক করা হয়ে গেছে। তাই এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আদালত বলেছিল যে তাহলে এখন আবার ২০ শতাংশের দাবি কেন? বরং আরো বেশি ২৭ শতাংশ ডাটা দু’বার চেক যেহেতু হয়েই গেছে, সেই যুক্তিতে আবার সময় দেয়া আর ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেকিংয়ের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য।  গত মাসে ২৩ জুলাই ২০১৯, শুনানি শেষে আদালত পুরো সে আবেদনই নাকচ করে দিয়েছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে বাঙালিবিরোধী অহমিয়া (অসমিয়া) ও মুসলমানবিরোধী বিজেপি সবারই রাজনৈতিক বয়ান ও দাবির পক্ষে সাফাই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দেখে এই অসন্তুষ্টিতে তারা সবাই এখন সব দোষারোপ ঢেলে দিচ্ছেন প্রতীক হাজেলার ওপর। অনেক স্থানীয় পত্রিকা প্রতীক হাজেলাকে “বিশ্বাসঘাতক’ বলতে দ্বিধা করেছেন না। নর্থ ইস্টের এমন এক পত্রিকা লিখছে- “আসাম-বিজেপির এক সভা থেকে প্রতীক হাজেলার ‘অবস্থানকে সন্দেহজনক’ বলে এক প্রস্তাব প্রকাশিত” হয়েছে [প্রান্তজ্যোতি প্রতিবেদন, গুয়াহাটি ২৬ জুলাই ২০১৯]। এছাড়া ‘নয়া ঠাহর’ নামে এ রকম আর এক পত্রিকার ভাষায় ২৫ জুলাই,   [পত্রিকাটার অসমিয়া স্টাইলের বাংলা হুবহু রেখে দেয়া হয়েছে এখানে] “আসামের জনসাধারণ,কেন্দ্র, রাজ্য সরকারকে অন্ধকারে রেখে একটি ত্রুটিপূর্ণ বিদেশী নাম যুক্ত এনআরসি প্রকাশের জন্য প্রতীক হাজেলা এক বিশেষ শক্তির নির্দেশে কাজ করছে বলে মনে হয়েছে । প্রতিক হাজেলার এমন পরিস্থিতি অসমীয়া জাতির জন্য এক অশুভ ইঙ্গিত বহন করে করছে বলে আসাম বিজেপি এক বিবৃতি যোগে প্রকাশ করেছে”।
পত্রিকাটি আরো লিখেছে, “উল্লেখ্য, প্রতীক হাজেলার উচ্চতম ন্যায়ালয়ের কোনো নির্দেশ না হওয়ার আগেই খসড়াতে সন্নিবিষ্ট লোকের ২৭ শতাংশ পুনরায় পরীক্ষণ করা হয়েছে বলে উচ্চতম ন্যায়ালয়ে দাখিল করা বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আসামের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের প্রতি লক্ষ রেখে রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসিতে নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নাগরিকের ২০ শতাংশ নাগরিকের নাম পুনরায় পরীক্ষার জন্য উচ্চতম ন্যায়ালয়কে আবেদন জানিয়েছিল। এই আবেদন সম্পর্কে ন্যায়ালয়ের নির্দেশ না হওয়ার আগেই ২৭ শতাংশ নাগরিকের পুনরায় পরীক্ষণ হাওয়ার কথা বলে প্রতীক হাজেলা যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় বলেই বিজেপি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে”।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরঃ
মনে হচ্ছে, এই অবস্থায় ইতোমধ্যে অমিত শাহরা আরেক বড় পরিকল্পনা এঁটেছে। আগেই বলেছি, অমিত শাহ এবারের দ্বিতীয় মোদী সরকারে নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। খবর বেরিয়েছে, তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে আগামী ৭ আগস্ট দিল্লিতে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। কোন বৈঠকের অনেক আগেই বৈঠকের অ্যাজেন্ডা কী হবে তা যেকোনো পক্ষই প্রস্তাব করতে পারে। এরপর দু’পক্ষই একমত হলে তবেই তা আলোচ্যসূচি বা এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশের মিডিয়ায় এই বৈঠকের এজেন্ডা কী তা নিয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে তা হল – ‘সীমান্তে পাচার, ভারতীয় ভুয়া মুদ্রা, ভারতীয় বিদ্রোহী গ্রুপ, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও জনগণ সম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যু।’ কিন্তু এসবের বাইরে আরেক বিশেষ এজেন্ডার কথা প্রকাশিত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের ‘ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকায়, ৩০ জুলাই। লেখা হয়েছে, ‘অমিত শাহ অবৈধ মাইগ্রেন্ট ইস্যু নিয়ে কথা তুলবেন” [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart]। আরো বলা হয়েছে, India is keen to ink a deportation deal…। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের সাথে একটা একেবারে “বিতাড়িত করার চুক্তি” করতে ভারত খুবই আগ্রহী। কী নিয়ে? না, আসামের নাগরিক তালিকাতে যে ৪০ লাখ লোক বাদ পড়েছে তাদের নিয়ে। কী আজব কথা!

এটি আসলে বিনা মেঘে বজ্রপাতের থেকেও বড় কোন ঘটনা।
প্রথমত এটা কোনোভাবেই দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের এজেন্ডাতেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। বাংলাদেশ রাজি হতে পারেনা। কারণ, এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের ঘোষিত অবস্থানের বিরোধী এটা। যেমনঃ প্রথম পয়েন্ট – গত ২০১৮ সালের আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে [শিরোনাম ছিল, NRC is India’s ‘local internal matter’ with ‘ethnic undertones’: Bangladesh] আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “প্রথমত আমরা এটিকে ভারতের আসাম রাজ্যের এক অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় রাজনৈতিক ইস্যু মনে করি”[“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। এ ছাড়া কেন আমরা এটা মনে করি তা নিয়ে এক শক্ত যুক্তি দেখিয়ে পরের বাক্যে তিনি বলেছিলেন, “যেহেতু এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, বন্ধু পড়শি রাষ্ট্রের ব্যাপার, তাই এ নিয়ে ভারতের সাথে কথা তোলার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। এছাড়া গত ৪৮ বছরে ভারত সরকার কখনোই এমন ইস্যু নিয়ে আমাদের কাছে কোনো কথা তোলেনি” [“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbour.”]।
এবার দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, গত বছর ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯, স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার। আমাদের ইত্তেফাক ঐ সাক্ষাৎকার থেকে নেয়া এক টেক্সট রিপোর্ট ছেপেছিল পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সেখানে লেখা দেখা যাচ্ছে- ‘শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশী সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?”  বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সাথে তার কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই”। অর্থাৎ শেষ বাক্যটাই সব জল্পনা-কল্পনার সব কিছুর ওপর পানি ঢেলে দেয়। সার কথাটা হল, আসামের এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান কী, আমাদের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী পাবলিককে তা জানিয়েছেন এবং তা খুবই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

তাহলে আসন্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে, আসামের এনআরসি অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে – তা আলোচনার এজেন্ডায় উঠে আসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

অথচ উদ্বেগের ব্যাপার হল, ভারতের ইকোনমিক টাইমস ৩০ জুলাই এমন রিপোর্ট করার পরে এর উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন আর যমুনা টিভির নিউজ ওয়েবসাইটে রিপোর্টটি একই দিনে বাংলায় ছাপা হলেও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের বা বাংলাদেশের ছাপা রিপোর্ট নিয়ে আমাদের আম-পাবলিককে কিছুই জানায়নি। কোন সাড়াশব্দও নাই। বাংলাদেশের প্রকাশ্যে গৃহীত অবস্থান ছাপিয়ে ভারতের সাথে একটা আলোচনার একে এক অ্যাজেন্ডা বলে হাজির করানোর দাবি করা হয়েছে, অথচ এর বিরুদ্ধে আমাদের সরকার পুরো নিশ্চুপ।

ওই দিকে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন চলতি বছরের শুরুতে প্রথম ভারত সফরে বলে বসেছিলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নাকি স্বামী-স্ত্রীর। এমন লুজটক করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার কেউ কখনো দেখেছে জানা যায় না। তিনি গত মাসে আর এক লুজটক করে ভারতের স্ক্রোল পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নিয়ে অনেক বিপদে আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। এই গ্রহে বাংলাদেশই সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ” [We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”। অর্থাৎ তিনিও খেয়াল রাখেননি, খোঁজ নেননি আসামের এনআরসি ইস্যুতে ইতোমধ্যে আমাদের গৃহীত অবস্থান কী? আমাদের তো এনআরসি ইস্যুতে ভারতের সাথে কথা বলাই উচিত না। বললে বরং সেটা আমাদেরই স্ববিরোধী অবস্থান হবে। এছাড়া, রাষ্ট্রের বিদেশনীতির প্রথম কথাই হচ্ছে নীতিগত অবস্থানের রেকর্ড স্ট্রেট রাখা, পরিষ্কার করে রাখা আর তা মেনে চলার ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখা। এর বাইরে কোনো লুজটক না করা।

তাহলে এর মানে কী, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এই ভারত সফরে, আসামের এনআরসি নিয়ে অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে কি কোনো চুক্তি করতে যাচ্ছেন? অথবা তাহলে হচ্ছেটা কী? পাবলিক তা কার কাছ থেকে জানবে?

অথচ হওয়া উচিত ছিল উলটা। ঐ অমিত শাহ এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। এর আগে যখন কোন মন্ত্রী বা সরকারের কেউ ছিলেন না তখন তিনি বাংলাদেশিদেরকে তেলাপোকা, উইপোকা, পিষে মেরে ফেলবেন, ছুড়ে ফেলে দিবেন ইত্যাদি বলে পাবলিক বক্তৃতা করতেন। এখন গত মাসে  ১৭ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় তিনি আবার বলেছেন, “দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি থেকে অবৈধ ভাবে বসবাসকারী অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বার করবে সরকার। এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদের ফেরত পাঠাবে”। ইউটিউবে দেখুন, [“Illegal Immigrants Living On Every Inch Will Be Deported”: Amit Shah] একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এধরণের কথার কোন জবাবদিহিতার ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আদায়ের আগে এই লোকের সাথে তো আমাদের কোন বৈঠকই করা উচিত না!

এদিকে, আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা ঘোষণার দিন চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট ২০১৯, টিকটিক করে এগিয়ে আসছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসামের এনআরসি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর কি সম্পর্কিত?” এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2D0

 

ভারতের এনআরসি মানে ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স’ (National Register of Citizens (NRC))। কিন্তু এটা কেবল আসামের এক ইস্যু। ভারতের নর্থ-ইস্টে সাত রাজ্যের বড়টা হল আসাম। আসলে উল্টাটা। বড় আসামকে ভেঙ্গেই পরে সাত রাজ্য (ত্রিপুরাকেও সাথে ধরে) বানানো। নানান জনগোষ্ঠীর ট্রাইবাল পরিচয়ের ভিত্তিতে আগের আসাম রাজ্যকে বিভক্ত করার কাজটা হয়েছিল মূলত ১৯৭২ সালে, ভাগ করে মোট সাতটি আলাদা রাজ্য করা হয়েছিল। এরপরের যে আলাদা নতুন আসাম কেবল তারই এনআরসির সোজা মানে হল, কেবল আসামের নাগরিকদের জাতীয় তালিকার রেজিস্টার। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটা দিয়ে সারা ভারতের নাগরিক তালিকা বুঝানো হয়নি, কেবল ‘আসামের নাগরিকদের তালিকা’ বুঝতে হবে। কিন্তু কেবল আসামে কেন?

এনআরসির তৈরির কাজ শুরুর পর থেকে এর ফাইনাল তালিকা করা কবে শেষ হবে ও প্রকাশিত হবে এনিয়ে বহু মোচড়ামুচড়ির পরে ঘোষণা করার সর্বশেষ তারিখ ছিল, চলতি মাসের শেষে, ৩১ জুলাই। কিন্তু আবার গড়িমসি করা শুরু হয়ে গেছে। আবার আদালতে তারিখ পেছানোর দরখাস্ত পেশ করা হয়েছে। আর খুব সম্ভবত এবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে “মুসলমানেরা দায়ী”, “মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা দায়ী”- এ কথাগুলো প্রবল করার বিজেপি-আরএসএসের জল্পনা-পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।  তাই একটা চাপ তৈরি করার চেষতা হচ্ছে। এদিকে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপেশাদার আচরণও ইস্যুটাকে আরও বিপজ্জনক  করে তুলছে। এমনিতেই ভারতের কিছু মিডিয়া বলা শুরু করেছে যে, এনআরসির তালিকা তৈরি করার কাজটা শেষে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থেকে অম্পুর্ণ ও ব্যর্থ হবে। শেষ করতে পারবে না ইত্যাদি। কেউ কেউ চার-পাঁচ সম্ভাব্য কারণও ছাপিয়ে ফেলেছে [5 reasons why NRC implementation is bound to fail] । অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের লেখা, “এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর ভারত কি সত্যিই কাউকে ফেরত পাঠাতে পারে”। আর ভারতের এমন মিডিয়ার তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার নাম। এদের সর্বশেষ রিপোর্টের শিরোনাম ‘এনআরসি বিপর্যয় : প্রক্রিয়ার ত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্র ও আসাম” [NRC Disaster: Center and Assam virtually admit flaws in the process – এটা প্রকাশিত হয়েছে দুদিন আগে ১৭ জুলাই।

কেবল আসামে কেন- সেই প্রশ্ন থেকে শুরু করতে প্রথমে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা অবশ্যই প্রশাসনিক, মানে নির্বাহী সরকার করবে। কিন্তু আসামের ক্ষেত্রে এই এনআরসি তৈরির কাজটা চলছে মোদী অথবা তার আগের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা বা আদেশে নয়। তাহলে কী এটা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকারের আদেশে বা ইচ্ছায় হচ্ছে? না, তা-ও নয়। এটা আসলে চলছে বিচার বিভাগের নির্দেশে। না, এনআরসি তৈরিতে কাজে নেমে পড়ার আদেশ বলতে, একটা আদালতের রায় যেমন হয়, এটা ততটুকুই নয়। রায় তো দিয়েছেনই, সেই সাথে খোদ আদালতই এনআরসি কাজের তদারককারী, তত্ত্বাবধায়ক। তা-ও আবার “আদালত” বলতে আসাম রাজ্যের হাইকোর্ট নয়, একেবারে দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে। তবে ‘সমন্বয়কারী’ নামে পদে এক হেড বুরোক্র্যাট (প্রতীক হাজেলা, [Prateek Hajela]) আছেন বটে, কিন্তু তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে জবাবদিহির অধীনে। অর্থাৎ তিনি কেন্দ্রের মোদীর (বা আসাম রাজ্যের) নির্বাহী সরকারের হুকুমের অধীনস্থ কেউ নন। সোজা কথায় বিচার বিভাগ, এব্যাপারে নির্বাহী বিভাগের কাজকাম নিজের দখলে নিয়েছে। যেমন ধরেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল আইডি তৈরির কাজ আমাদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন শেষ বিচারে নির্বাহী বিভাগের অন্তর্গত। কারণ এটি কনস্টিটিউশনে উল্লেখ থাকা প্রতিষ্ঠান বলে রাষ্ট্রপতির অধীনে, আর সেই সূত্রে সে রাষ্ট্রপতির অফিস ঘুরে সেই নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই। এখন বাংলাদেশে এটা যদি সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তদারকিতে সম্পন্ন হলে যা হত, তাই হচ্ছে আসামের এনআরসিতে।

এতে একটা অসুবিধা বললাম যে, সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্বাহী আর বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা থাকে, সে নিয়ম এখানে ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে, নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন নির্বাহী ক্ষমতা মানে তো সরকার, মানে রাজনীতিবিদদের কাজ বা দায়িত্বের এরিয়া। কিন্তু সেই এরিয়ায় বিচারপতিরা কেন ঢুকবেন? বা ঢুকলে কী বিপদ হবে? সমাজের রাজনৈতিক তর্ক-ঝগড়া রাজনীতির মাঠে সমাধান হতে হয় – সঙ্ঘাত, আপস ইত্যাদির মাধ্যমে। অথবা অমীমাংসিত থাকলে সেটাও রাজনীতির মাঠে-পরিসরেই পরে থাকবে; উঠবে পরবে – এভাবেই চলবে। মানে সবকিছু সেখানেই। কারণ যা রাজনীতিক স্বার্থের প্রশ্ন তা তো রাজনৈতিকভাবেই ফয়সালা হতে হবে – সংঘাতে না হয় আপোষে। রাজনৈতিক সমস্যার আইনি সমাধানই হয় না। ওর কাজ না সেটা। এ জন্য রাজনীতিকদের এরিয়ায় বিচার বিভাগ কখনো আসবে না, তার কজ এটা না তাই। আদালত তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখবে যেন  সমাজ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো ফয়সালা করতে দিবার জন্য এবং একে নিজের ভুমিকা ও ফাংশনগুলোকে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু এনআরসি করাটাই আসাম সমাজের রাজনৈতিক সমাধান কি না- এ নিয়ে রায় দিয়ে দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এটাই সবেচেয়ে বড় ব্লান্ডার। এরপর আবার তা বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হয়ে গেছেন আদালত নিজেই, যা আরেক ব্লান্ডার। এটা বিশাল অকাজ, অনধিকার চর্চা। নিজের সীমা, কাজের ধরণ না বুঝে কাজ করা হয়েছে। ধরেই নেয়া হয়েছে আদালত রাজনৈতিক বিতর্ক, স্বার্থ-দ্বন্দ্ব সমাধান দিতে পারে। বা এটা তার কাজ। এখন যদি মিডিয়ার আশঙ্কা অনুসারে এনআরসি প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় [যেমন চলতি মাসে আসাম রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথভাবে (যার দুটোই বিজেপির দলের সরকার) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, যাতে ফাইনাল তালিকা প্রকাশ করার শেষ তারিখ ৩১ জুলাই থেকে পিছিয়ে তা অনির্দিষ্টকাল করা হয়।] যার অর্থ এটা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কোর্টের। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেন একটা রাজনৈতিক পক্ষ হয়ে উঠবে, যার বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক পক্ষ বা স্বার্থগুলো সোচ্চার হবে। অথচ এটা অকল্পনীয় যে, আদালত বা বিচারকেরা নিজেই এক রাজনৈতিক পক্ষ হবেন! এ কারণেই দুনিয়ার আদালতগুলো সব সময় বুদ্ধিমানের মত [Jurisprudence বা জুরিসপ্রুডেন্সের] প্রুডেন্ট হয়ে, দূরদর্শিতা দেখিয়ে আগাম কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা বিপক্ষ হওয়া থেকে দূরে থাকে। তাই আদালতের কাছে কেউ মামলা নিয়ে গেলেই আদালতের তাতে আমল করে রায় দিতে ঝাপায় পড়া – এটা দুরদর্শী আদালত কখনও করে না। ওর প্রথম বিবেচনা ইস্যুটা রাজনৈতিক কিনা। যদি দেখে হা তবে একে আমল না করে  ততক্ষণাত সমাজের রাজনৈতিক পরিসরে, মাঠে ফেরত নিয়ে যেতে অনুরোধ করে। মামলা ফিরিয়ে দেয় এই যুক্তিতে। কোন সমাজের সব সমস্যা আইনি না। সমাজের নানান সমস্যার  সবকিছুর সমাধান দেওয়ার আদালতই একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। আদালত সবকিছুতে নাক গলানোর মানে সবকিছুকে আইনি সমস্যার হিসাবে ও চোখে দেখে নামিয়ে এনে সেই খাপে ভরে দেয়া। আর এতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুমিকা রাখা ফাংশনাল হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়া হবে। তাই আদালতকে এসব দিক বিবেচনা করে দেখার মত যোগ্য আর বুদ্ধিমান হতে হয়। আইডিয়ালি এটাই হওয়ার কথা।

এনআরসি করার দাবিকে কেন আসাম সমাজের ‘রাজনৈতিক সমস্যা ও দ্বন্দ্ব’ বলেছি?
ভৌগোলিকভাবে এই নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারতের মাঝখানে আছে বাংলাদেশ। যদিও একেবারেই এক প্রান্তের শিলিগুড়ি করিডোরের এক “চিকন গলা” দিয়ে নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারত সংযুক্ত অবশ্যই।  এখন যদি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সরাসরি যাওয়া হয় (যদি বাংলাদেশ যেতে দেয়) তবে কলকাতা থেকে আসামের সবচেয়ে কাছের জেলার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশ অনুমতি না দিলে ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ হয়ে ঘুরে কলকাতা আসতে সেই দূরত্ব বেড়ে হয়ে যায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তান (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে  ১৭০০ কিলোমিটার দুরত্বের ফ্যারে পরে যায় আসাম। এটাই আসামের দুঃখের মূল উৎস। আসামের সাথে বাকি ভারতের সহজ যোগাযোগ ‘নাই’ হয়ে যায়। যোগাযোগ খারাপ তো লেনদেন বিনিময় ব্যবসা খারাপ। মানে ‘মানি সার্কুলেশন’ নাই, অর্থনীতি নাই, অবকাঠামো নাই, এভাবে সব কিছু নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। তবু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের নেহরু সরকার এভাবে আসামকে স্থবির ফেলেই রেখে দিয়েছিল। কেন?

কারণ তার ভয় আসাম নেহেরুর ভারতকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। আসামের আরও উত্তরের সীমান্ত হল – চীন সীমান্ত। আসামের স্বার্থে ভারত বাংলাদেশের সাথে কোনো ‘ফেয়ার ডিল’, এক “উপযুক্ত পালটা সুবিধার বিনিময়” করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম-কলকাতা যোগাযোগ সহজ করে নিতে পারে অবশ্যই।  কিন্তু জন্ম থেকেই ভারতের কেন্দ্র বা নেহেরু সরকার এতে আগ্রহ দেখায় নাই। কারণ, তাদের ভয় হল, আসামের জন্য বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া করিডোর পাওয়া গেলে এতে একই সাথে এবার বৃহত্তর আসাম সীমান্তের লাগোয়া অপর পাড়ের চীনের প্রদেশগুলোও আসামের ওপর দিয়ে, বাংলাদেশ হয়ে কোনো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ বা চীন তখন আসামের উপর দিয়ে চীনের জন্য করিডোর পাওয়া – এই প্রবেশাধিকার, ভারতকে দেয়া বাংলাদেশের সুবিধার বিনিময়ে শর্ত হিসেবে হাজির করে ফেলতে পারে? এটা ভারত একেবারেই চায় না। এব্যাপারে আনন্দবাজার ঠিক এই প্রসঙ্গে না বিসিআইএম [BCIM] প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লিখেছে ,“বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ (এই প্রকল্প নিয়ে)ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ‘ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল [মানে আসাম] চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে।’ ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”।

সারকথায় চীনকে এসব আলোচনার ভিতরে ঢুকতে দিতে চায় না ভারত, কারণ আলোচনায় একবার ঢুকে পড়লে শেষে চীন আসামের ওপর দিয়ে করিডোর না পেয়ে যায়। সম্ভবত ভারতের মনে ভয়, নর্থ-ইস্ট কখনো যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যেতে চায়, একই ভারত রাষ্ট্রে যদি না থাকতে চায়, তাহলে কী হবে? যদি স্বাধীন হতে চায় বা চীনের সাথে যুক্ত হতে চায় তাহলে কী হবে? সারকথা বিষয়টা হল, ভারত থেকে আসামের বেরিয়ে যাওয়ার ভয়। ভারতের শাসকেরা এপর্যন্ত তাদের মনের এই ভয়কেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে সব সময়। আর তাতে ব্যাপারটা হয়ে গেছে অনেকটা,  নিজের সন্তানকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে রাখার মত, যাতে সে পালিয়ে না যায়, তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো যায়। আর সে জন্য পুরো নর্থ-ইস্টকে জন্মের পর থেকেই ভারত যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক দিয়ে প্রায় অচল করে রেখেছে।

তাই কেবল গত দশ বছরের ঘটনা হল, এবার ভারত একা সব সুবিধা হাসিল করেছে। এই সুযোগ সুবিধা মানে বিনা পয়সার বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোরের একক সুবিধা ভারত এখন নিয়েছে। কারণ এটা আমেরিকার “চীন ঠেকানো” স্বার্থে ভারতের ভাড়া খাটার বিনিময়ে পাওয়া  বাংলাদেশ এখন মোস্ট ভারত-ফেভারেবল বাংলাদেশ পেয়েছে।  এখানে বাংলাদেশে করিডোরের বিনিময় চাওয়ারই কেউ নাই। এটা একপক্ষীয় করিডোরসহ সব সুবিধা। এমনকি মেজর অবকাঠামো তৈরির দায়ও বাংলাদেশের। আনন্দবাজার লিখছে, আসামে উপর দিয়ে চীন বাংলাদেশে আসুক সেটা চায় না। মানে, ভারত একপক্ষীয় করিডোর চায়।

কিন্তু এতদিন আসামের মানুষের একারনে জীবনযাপনে যে গরিবি হাল হয়ে আছে এর কারণ কাকে দেখানো হবে? এটাকে আড়াল বা দায়ী করার জন্য বয়ান তৈরি করা হয়েছে যে, আসামে বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) অনুপ্রবেশকারী, এদের ( বিদেশীরা) ঢুকে পড়া সবকিছু জন্য দায়ী। কথাটা আসলে উল্টোভাবে সত্য। কারণ ব্রিটিশ আমলে ধান ফলাতে বৃহত্তর রংপুর বা টাঙ্গাইল থেকে দক্ষ বাঙালি গৃহস্থকে আসামে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা, যাতে সেখানে ধানের উৎপাদন বাড়ে। বিশেষত চল্লিশের মহাযুদ্ধের সময়ে সেনাদের জন্য খাদ্যশস্যের খুবই বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ সেই মাইগ্রেশনটা অভাবে পড়ে মাইগ্রেশনও ছিল না এই অর্থে যে, এটা একই ব্রিটিশ কলোনির মধ্যেই এক প্রদেশ থেকে অন্য আর এক প্রদেশে মাইগ্রেশন ছিল। এছাড়া বৃটিশ শাসকেরা নিজে কর্মসূচি নিয়ে এটা ঘটিয়েছিল।

কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এ ব্যাপারটাকে দেখানো হল, আসামের ‘সব দুঃখের মূল কারণ’ হিসেবে – এই বলে যে বাঙালি বা মুসলমানেরাই দায়ী। আসামের মূল জনগোষ্ঠী হলো অসম (বা অহমীয়), বাঙালি (মুসলমানসহ) আর ট্রাইবাল বোড়ো। এ ছাড়া সাথে ছোট ছোট অনেক ট্রাইব বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও আছে। ‘বিদেশী’ বা কথিত পূর্ব বাংলার লোক, এদেরকে বের করে দিতে হবে- এই অছিলায় সেকালে কংগ্রেস আন্দোলন করেছিল। কথা বিদেশি বলে ঘুরিয়ে দিতে সেই প্রথম ১৯৫১ সালে নাগরিক তালিকা [NRC 1951] বা প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা ফাইনালি হয়েছিল আসলে আসামে বসবাসকারী সব বাসিন্দার আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি। অর্থাৎ এ থেকে কাউকে কী পদ্ধতিতে বের করে দেয়া হবে, কী করে বুঝবে সে বিদেশি ইত্যাদি সেই পর্যন্ত আর আগানো হয়নি। আর এই ক্ষোভ জমতে জমতে তা থেকেই পরে ১৯৭৯ সালে মূলত মাঠের ছাত্র আন্দোলন হিসাবে অতি উগ্র “অসমীয় জাতীয়তাবাদীরা” সাথে বোড়োদের সমর্থনে মূলত বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙালি খেদাও’ বলে আন্দোলন শুরু করেছিল। এটাই একপর্যায়ে চরমে উঠে, আসামেরই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করলে তা ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর সরকার দ্রুত আপসে ১৯৮৫ সালে ‘আসাম অ্যাকর্ড’ [Assam accord, 1985] নামে ছাত্রদের সাথে এক আপোষচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। সেখানেই বলা ছিল, ১৯৫১ সালের এনআরসিকে বিদেশী চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে আপডেট করা হবে। তাতে কে বিদেশী তা চিহ্নিত করে ওদের বের করে দেয়া হবে। এর পর থেকে ওই ছাত্ররাই এবার রাজনৈতিক দল খুলে বসে ‘অহম গণপরিষদ’ [AGP] নামে বা ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট’ নামে।

ওদিকে ১৯৮৫ সালের ‘আসাম অ্যাকর্ড’ চুক্তি হলেও এর বাস্তবায়ন ২০০৯ সাল পর্যন্ত কিছু না হওয়াতে একটি স্থানীয় দাতব্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান  – নাম ‘আসাম পাবলিক ওয়ার্কস’ – এই ইস্যুটাকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যায়, তারা রিট পিটিশন করে। ব্যাপারটা যেন খুবই গর্বের, দেশের কাজ আর বিরাট দেশপ্রেমের কাজ হয়েছে এই ভাব ধরে গত বছর কলকাতার ইংরাজি টেলিগ্রাফ এই রিপোর্ট ছাপছিল [Couple who set NRC ball rolling]।  আর ঐ রীট মামলার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শেষে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই হয়ে গেছিল আসাম সমাজের রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কের নিষ্পত্তির নির্বাহী বাস্তবায়ক।  এনআরসি তৈরির কাজের নিয়মকানুন কী হবে সেটাও আদালত ঠিক করে দেয়। বিচারকদের পা-পিছলানির ঐতিহাসিক ঘটনা এটা। কিন্তু এটা কেন “রাজনৈতিক ইস্যু”, যাতে বিচারকেরা পা পিছলে ঢুকে পড়েছিল – একথা বলছি?

মাইগ্রেশন মানে কাজ বা পেশায় সুবিধা পেতে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস; এর মূল কারণ বা চালিকাশক্তি হল অর্থনীতি। কেউ চাইলে এটাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্থানীয় লোকাল ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল হয়ে ওঠা, এমন “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ফেনোমেনা” বলতে পারেন। একটা দেশে যেকোনো কারণে ব্যাপক উদ্বৃত্ত বাড়তি সঞ্চয় ঘটে গেলে আর সেই সঞ্চয় অর্থনীতিতে আবার বিনিয়োজিত হতে চাইলে তাতে এবার ওই দেশে প্রাপ্ত জনসংখ্যার (লেবার) চেয়ে লেবারের চাহিদা বেশি হয়ে গেলে কী হবে? ঐ দেশে তখন অন্য দেশ থেকে মাইগ্রেশন হবেই। আর সেই দেশের আইনকানুন ও সীমান্তও চাইবে বিদেশী লেবার মানে শ্রমিক আসুক, তারা খুবই স্বাগত। কিন্তু  পরবর্তিকালে কখনও কোন কারণে যদি ঐ অর্থনীতি ভালো না? ভুবতে থাকে, মন্দা দেখা দেয়? তাহলে এবার, সেখানে বিদেশীবিরোধী আন্দোলন শুরু হবে, মাইগ্রেশনবিরোধী দল ক্ষমতায় আসবে ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিদেশীরা কত খারাপ, কত বেশি বেশি পয়দা করে বা মাইগ্রেটেড এরা তো স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, ওরা বেশি পয়দা করে, ওরা অসভ্য, ওদের ধর্ম নৃশংসতায় ভর্তি ইত্যাদি কত কিছু খুত আবিস্কার করে এসব বয়ান বলে এদের কুপিয়ে কেটে গণহত্যা করে ভাগাও- এসবই হবে ওদের সমাজের পপুলার রাজনীতির বয়ান। সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ডের শুটিং গণহত্যা বা ফ্রান্সের উগ্রপন্থী লি-পেনের দলের কাণ্ডকারখানা অথবা আমেরিকায় ট্রাম্পের ইমিগ্রেশনবিরোধীতা ( বিদেশীবিরোধী) ও মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলার বয়ান  – সবকিছু এই একই কারণে।

এগুলোই আসলে বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধিতার আড়ালে চরম নোংরা বর্ণবাদ। ওমুকেরা জাতে খারাপ, এমন বয়ান। ১৯৭৯ সালের পর থেকে আসামের পুরো সমাজ এমন বাঙালি বা বিশেষত মুসলমান বিরোধি ঘৃণাতেই ভেসে চলছিল।

আবার মনে করিয়ে দেই, আসামের মূল সমস্যা বা শুরুটা কিন্তু ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে আসামের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা এবং যা থেকে তৈরি খুবই খারাপ ও অবকাঠামোহীন, বিনিয়োগহীন এক স্থবির জনজীবন। এখন ধরা যাক, আসামে যাদের কথিত বাংলাদেশী বলা হচ্ছে যদি এদের সংখ্যা একই রকম থাকে, আর কালকেই যদি কোনো জাদুতে আসামের যোগাযোগ অবকাঠামো সহজ, বিনিয়োগের অভাব নেই, অর্থনীতি প্রবল চাঙ্গা ইত্যাদি – এমন এক অবস্থা হয় যাতে প্রাপ্ত লেবার যা আছে তা-ও কম পড়েছে দেখা যায়, তবে ঐ ঘাটতি পুরণে সেই আসামই আবার আরও নতুন মুসলমান ‘বিদেশীদের’কেও দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনবে। তাই বলছি, আসামের মূল সমস্যা আসলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক। অথচ সবাই ভাবছে, বিশ্বাস করে বসে আছে আসামের প্রধান ইস্যু এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা কবে ঘোষণা হবে; যেন এটা হয়ে গেলেই অসমিয়াদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অথচ এটা এমনি হিংসা ঘৃণায় ঢুবে থাকা জনজীবন যে ঐ সমাজে কারও বাস্তবতায় চোখ মেলার মুরোদ নাই, কারণ এটা তো আসলে এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। এরা অভিবাসী বা মাইগ্রেশন জিনিষটা নিয়ে কখনও বুঝে দেখেনি।  এরা আসলে চিন্তা করে দেখেনি যে, আসামের অর্থনীতি আরো খারাপ হলে তারা নিজেরাও অভিবাসী হতে ঘর ছাড়বে। যেমন ইতোমধ্যেই গুজরাত বা মুম্বাইয়ের মত শিল্প-শহরগুলোর অর্থনীতি আসামের চেয়ে প্রবল সচল। তাই ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষিত আধা শিক্ষিত অসমিয়া ওসব রাজ্যে ছুটছে, এই হার বেড়ে গেছে।

এ অবস্থায়, ৩১ জুলাই ফাইনাল তালিকা ঘোষণা হওয়ার আগে বিজেপি সভাপতি ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কী চাচ্ছেন? তিনি চাচ্ছেন মূলত অনির্দিষ্টকালের জন্য ফাইনাল তালিকা ঘোষণা পিছিয়ে দিতে। এই আবেদন আদালতে করা হয়েছে যৌথভাবে, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে। ইতোমধ্যে মিডিয়ায় লোকজন নামানো হয়েছে যেন এই লাইনের পক্ষে কথা বলে [OPINION | Why the Deadline For Final NRC Draft Should be Extended Beyond July 31]। যার সার আর্গুমেন্ট হল, যে তারা খুবই খাটিবাদী। কোনকিছু খাটি না হলে তাদের চলেই না। তাই তারা খুবই সঠিক নির্ভুল একটা তালিকা চান।

তাই, অমিতের কথিত যুক্তি হল, ২০ শতাংশ রি-ভেরিফিকেশন। মানে তালিকায় যাদের উঠানো হয়েছে অথবা বাইরে ফেলা হয়েছে এমন সব ডাটারই ২০% আবার খুলে চেক করা। এই কাজের জন্য তিনি কেন্দ্র্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে (এজি) দিয়ে তিনি যুক্তি দেয়াচ্ছেন যে, এনআরসি তৈরি “আগে কল্পনা করা যায় নাই এমন জটিল কাজ” [“unprecedented large scale of complexities” involved in the NRC process]। তাই এইটা আসামের পাবলিকের ধারণা, এই তালিকা সঠিক নয়। গত বছর প্রকাশিত প্রথম ড্রাফট তালিকাতে আসামের প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। তাই এক শুদ্ধ তালিকা পেতে.২০% ডাটা আবার খুলে চেক করতে সময় বাড়াতে হবে।

এদিকে অনেক রাজনীতিবিদ দাবি করছেন, এই ৪০ লাখের মধ্যে ২৫ লাখই হিন্দু। হতে পারে অমিত শাহের তারিখ পিছাতে চাওয়ার পিছনে এটা একটা উদ্বেগের কারণ। তবে সরকারি হিসাবে ৈ ৪০ লাখের মধ্যে ধর্মীয় ভাগের অনুপাত নিয়ে কিছুই জানানো হয়নি। এই সুযোগে অমিত শাহ এজিকে দিয়ে বলাচ্ছেন যে, ২০ পার্সেন্ট ডাটা আবার চেক করে দেখতে হবে। আর তা বিশেষ করে ঘটাতে হবে সীমান্ত জেলাগুলোতে। মানে বাংলাদেশের সীমান্তে। কারণ সেখানে নাকি (মুসলমান) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কোন তাল-ঠিকানা নেই। এভাবে যেভাবেই হোক বিচারকদের কিছু একটা বুঝ দিয়ে হলেও তারিখ পেছাতে এজি একেবারেই মরিয়া। কিন্তু আদালত এখনো রাজি না হয়ে ২৩ জুলাই তারিখ পর্যন্ত আরও শুনানি – এটা মুলতবি রেখেছে।

ওই দিকে আরেক কাণ্ড ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের স্ক্রোল [SCROLL] পত্রিকা বলছে, তিনি নাকি কোনো স্থানীয় টিভিতে বলেছেন, “যদিও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়, তবু পত্রিকার রিপোর্ট দেখে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে”। এভাবে আমাদের উদ্বিগ্নতা আছে, আবার নাই – এমন মাজা শক্ত না করা হা-না করে কথা বলছি কেন আমরা? এ ছাড়া গত বছর আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইনুর এক বিবৃতির রেফারেন্স দিচ্ছে ভারতের স্ক্রোল অন লাইন মিডিয়া। ইনু বলেছিলেন, “প্রথমত এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আসামের স্থানীয় সমস্যা” [“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। আরো বলেছিলেন, “এ নিয়ে তাই বাংলাদেশের কিছু করার নেই। ভারত সরকার আমাদের সাথে কখনো এ নিয়ে কথা বলেনি। তাই আমাদের কোনো অভিপ্রায় নেই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে তাদের সাথে কথা তোলার”[“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbor”.] আসলে এই কথাগুলো ইনু বলেছিলেন ১ আগষ্ট ২০১৮তে মূলত কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায়। সেটাই রেফারেন্স করা হয়েছে। ঐ বক্তব্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা বাক্যটা হল, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হবার ৪৮ বছর হয়ে গেল কিন্তু ভারত কখনও এনিয়ে প্রশ্ন তুলে নাই, আমাদের সাথে কথা বলে নাই। যার সোজা পরের অর্থ হল,  তাহলে এনিয়ে এখন আসছে কেন?  এর আমরা কিছুই জানি না, সংশ্লিষ্টই নই। কাজেই এখনও যদি কখনও তুলে তাতেও আমরা এটা আমল করব না।

তাহলে ইনুর ইনুর এই কথার পর এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের “আমাদের কিছু উদ্বিগ্নতা রয়েছে” বলার দরকার পড়ল কেন? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।  মোমেন বলছেন, “যারা দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে ওখানে আছে তারা ওদের নাগরিক, আমাদের নয়”। এই কথা থেকে পরিষ্কার, এ কথার চেয়ে আগে ইনুর- ‘এটা আমাদের ইস্যু নয়, কোনো দায়দায়িত্ব নেই’- বলা অনেক ভালো ছিল। সে তুলনায় এখন এক দুর্বল অবস্থান নেয়া হল। কারণ, ভারতে কেউ ৭৫ বা ১০০ বছর ধরে আছে কি না তাতে আমাদের কী? আর তারা কোথাকার নাগরিক তা নিয়ে আমাদের বলারও কিছু নেই। এর চেয়ে বরং “ভারতের কোনো সরকার এ নিয়ে আমাদের সাথে কখনো কথা তোলেনি’- এটাই সবচেয়ে ভালো ডিফেন্স, ভাল যুক্তি ছিল। এক কথায় বললে মোমেনের কথা ইনুর কথা থেকে সরে গেছে। এ ছাড়া বোকা কিসিমের আরেক কথা বলেছেন মোমেন। তিনি বলেছেন, “আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ঝামেলায় আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। বাংলাদেশ দুনিয়াতে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, “We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”]।

এত কেলাস কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত এর আগে দুনিয়া দেখে নাই। আমরা আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিছি তাই আর নিতে পারব না- এটা কি কোনো ডিপ্লোমেটিক কথা হল? এটা কী আরও নিব কিনা সেই কথা উঠে গেছে? প্রথমত, তিনি যেচে শরণার্থী নেয়া-না নেয়ার কথা কেন তুলছেন? ভারত কি এ প্রসঙ্গ তুলেছে আমাদের সাথে? তোলেনি।  ডিপলোমেসি খাউজানি আলাপ না, যে একটু অকারণে চুলকায় নিলাম। এখানে প্রতিটা শব্দ গুরুত্বপুর্ণ ও মাপা ও প্রয়োজনীয় হতেই হয়। আর এরচেয়ে ার এক গুরুত্বের বিষয় “ডকুমেন্ট” বা রেফারেন্স’। আগে কী বলেছি এর বাইরে যাওয়া যাবে না। যখন যেমন এটা তো চলবেই না। তাই এখানে আগে কী আছে এর রেফারেন্স খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এছাড়া মোমেনের কথায় মানে হয়েছে যেন, আমরা যদি কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী না নিয়ে থাকতাম তাহলে কি এখন আসামের শরণার্থী নিতাম- ব্যাপারটা কি এটাই? আবার, দুনিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ না হলে আমরা আসামের শরণার্থী নিতাম, তাই কি? সবচেয়ে বড় কথা, এ পর্যন্ত আমাদের সাথে কখনো ভারতের এ নিয়ে কথা হয়নি- এটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। অথচ প্রশ্ন এবং প্রসঙ্গ না বুঝেই অতিরিক্ত কথা বলা ও অকূটনীতিসুলভ কথা বলা নির্বুদ্ধিতা বটে। তাঁর প্রফেশনাল যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। সম্ভবত তিনি আমাদের আরো বড় বিপদে ফেলে দিবেন!

সর্বশেষঃ
চলতি জুলাই মাসের শুরুতে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের (UN-OHCHR) স্বাধীন এক্সপার্টেরা ভারতের আসামে এনআরসির ততপরতা নিয়ে বিরাট উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে [UN experts: Risk of statelessness for millions and instability in Assam, India]। এনআরসি নিয়ে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আপত্তির পয়েন্ট হল, আসামে নাগরিকত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি ঠিক নয়। কারণ কেউ নাগরিক নয় সেটা প্রমাণের দায় সবখানে হয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু আসামে এটা চাপানো হয়েছে নাগরিকের উপর, [“In nationality determination processes, the burden of proof should lie with the State and not with the individual,” said the experts, noting the discriminative and arbitrary nature of the current legal system.]। তাই এটা বৈষম্যমূলক ও খামখেয়ালিমূলক আইনি ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছে।

লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এটাকে সরাসরি মুসলমানদের টার্গেট করা এক প্রক্রিয়া বলে চিহ্নিত করেছে [India’s hunt for “illegal immigrants” is aimed at Muslims]।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাংলাদেশ কি এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছে? এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ


ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ

গৌতম দাস

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2qj

 

 

সম্ভবত এক ‘বিরাট জ্ঞানী’ জেনারেলের সাক্ষাৎ পেয়েছে ভারত। কোন কথা কোথায় বলতে হয় আর কোথায় তা বলা উচিত নয় – এই বিবেচনা তার লোপ পেয়েছে বলেই মনে হয়। ইতিহাস-ভূগোল বোধ থাকলে এমন করার কথা নয়। কোনটা সামরিক অপারেশনাল বোর্ডরুমে বসে বলার কথা আর কোনটা পাবলিক মিটিংয়ে বা স্টেডিয়ামে, এমন হুঁশজ্ঞান যার নেই – এমন ব্যক্তি হলেন ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। কিন্তু অনেকে আবার বলছেন, এটা আসলে বোকা ও গাড়োল মানুষের চালাকি।

যাই হোক ঘটনা হল, রাওয়াত এবার নয়াদিল্লিতে ‘নর্থ ইস্ট রিজিয়ন অব ইন্ডিয়া- ব্রিজিং গ্যাপ অ্যান্ড সিকিউরিং বর্ডার্স’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে কিছু মন্তব্য করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের সিনিয়র ব্যক্তিরাও ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

‘প্রথম আলো’র ভাষ্য দিয়েই বলা যাক। কারণ, অনেকের অনুমান হল, এদের অনুবাদভাষ্য তুলনামূলকভাবে নমনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য, এমন অনুমানের একদল পাঠক আছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি “চীনের মদদে পাকিস্তান বাংলাদেশিদের ভারতে ঢোকাচ্ছে: ভারতীয় সেনাপ্রধান” – এই শিরোনামে প্রথম আলো লিখেছে, “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তার অভিযোগ, এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে”। এটা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, শুনতে কেউ কোথাও ভুল করেছে কি না। তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু উদ্ধৃতি আনা যাক। এ ব্যাপারে আনন্দবাজারের বক্তব্য এ রকম – “ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই সুপরিকল্পিতভাবে এমন করছে ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ এবং তাতে সমর্থন জোগাচ্ছে উত্তর সীমান্তের দেশটি, যাতে ওই অঞ্চলে গোলযোগ বজায় রাখা যায়”। রাওয়াত আসলেই সরাসরি  ‘পাকিস্তান’ বলেননি। তিনি কূটনৈতিক দায় এড়াতে সরাসরি নাম না নিয়ে ইঙ্গিত করে ‘ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ’ বলেছেন। আর ‘চীন’ও বলেননি, এর বদলে বলেছেন ‘উত্তর সীমান্তের দেশটা’।

রাওয়াত আরো বলেছেন, আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারত পাকিস্তান দখলে (‘taken over’) নিতে চায়। সেজন্য নাকি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের নিয়ে গিয়ে এরা আসামের জেলাগুলো ভরে ফেলছে। এখানে রাওয়াতের ‘দখল’ কথাটির অর্থ বুঝে নিতে হবে। ভূগোল হিসেবে আসামের জেলাগুলো কোনোভাবেই পাকিস্তানের পড়শি নয়। ফলে পাকিস্তানের পড়শি হিসেবে ভুখন্ড দখল ধরনের কিছু করে ফেলার প্রশ্ন নেই। কারণ, পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে সারা ভারতের সুদীর্ঘ বুক পেরিয়ে এরপর বাংলাদেশে ঢুকে তারও উত্তরে গেলে আসামের দেখা মিলতে পারে। বিপিন রাওয়াতের এটা অজানা নয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, একটা অঞ্চলে বা কয়েক জেলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে গেলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে, এর মানে হল – ওই অঞ্চল পাকিস্তানের দখলে চলে যাওয়া, ‘পাকিস্তান’ হয়ে যাওয়া। এটা খুবই অবাস্তব বক্তব্য, রাস্তার ধারের টঙের চা-দোকানের যে লেবেলের আলাপ হয় এটা সেই তুল্য। কোনো রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান এভাবে লুজ টক করতে পারেন না। মুসলমান মানেই পাকিস্তান, মুসলমান মানেই ভারতের শত্রু –  এতগুলো লুজ টক করে কীভাবে বলেন তিনি। এই অনুমানের কারণে তিনি পাকিস্তান-চীনের কথিত পরিকল্পনার ভেতরে ভারতের জন্য হুমকি দেখেছেন। বলছি না চীন বা পাকিস্তান ভারতের প্রতিপক্ষ নয় বা হতে পারে না। নানা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ-সঙ্ঘাতে তা হতেই পারে; কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে এরা ভারতের শত্রু, এগুলো মূর্খতা বললেও কম বলা হয়। তবে হ্যাঁ, বিজেপির ভোটের রাজনীতি এমন হয় আমরা প্রায়ই হতে দেখি। রাস্তায় মুসলমান লোক ধরে চর থাপ্পর মেরে “হরে রাম” বলায় নিচ্ছে। অথবা দ্রিজে গরুর মাংস রেখে ছে অজুহাতে খুনই করে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে, এর মানে হল,  বিজেপির তৃতীয় শ্রেণীর এসব মাঠকর্মির চিন্তা ও ভাষায় বিপিন কথা বলছেন তা মনে রাখতে হবে। যেমন এখানে রাওয়াতের ঘিন ঘিন করে বের হওয়া মুসলমান ঘৃণা গুলো দেখেন। তাঁর চিন্তার ফর্মুলার মধ্যে ধরে নেওয়া আগাম অনুমানটা হল – বাংলাদেশের মুসলমান = মানেই তারা পাকিস্তানের দালাল কারণ তারা মুসলমান = মানে তারা ভারত শত্রু। এগুলোকে একেবারে গো-মুত্র এর রাজনীতিক চেতনা – বলাই শ্রেয়।

আবার রাওয়াত নিজের কথাগুলো বলতে দুটো বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, এটা “পরিকল্পিত মাইগ্রেশন” (planned immigration)। আর এভাবে তারা চীন-পাকিস্তান এক “প্রক্সিযুদ্ধ” (proxy war) চালাচ্ছে। রাওয়াত একজন সেনাপ্রধান। ফলে ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ বা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’ শব্দের সামরিক অর্থ তিনি না বুঝে লেখেননি। এগুলো তার সচেতনভাবে বেছে নেয়া শব্দ বলে আমাদের মানতেই হয়। তবে হাসিনা সরকার বা আওয়ামী লীগের খুশি হওয়ার কারণ নেই। কারণ, মুসলমানদের ‘পরিকল্পিত মাইগ্রেশনে’ চীন-পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের এখনকার সরকারও জড়িত, এটাই রাওয়াতের দাবি।

ভারতের মিডিয়াতেও অনেকে বলছেন, রাওয়াত আসাম নিয়ে মন্তব্য করতে গেলেন কেন? বিশেষ করে আসামে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী কারা এবং কতজন, তা যখন সরেজমিন সার্ভে করে দেখার কাজ চলছে এবং এর নিবন্ধন তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। গত সপ্তাহে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও আগামী জুন মাসের মধ্যে সে তালিকা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমাদের প্রশ্ন আরো গোড়ায়। রাওয়াত ভারতের মতো দেশের সেনাপ্রধান। এই ইনস্টিটিউশন বাই ডিফল্ট নিজগুণে ও নিজ স্বার্থে অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকার কথা। ফলে প্রমাণিত ডাটা বা ফ্যাক্টস ছাড়া কোন অনুমিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া, সেনাপ্রধানের মুখ থেকে বের হওয়া শুধু খুবই বিপজ্জনক তা নয়, এটা অপরাধ। তাই প্রশ্ন করতে হয়, বাংলাদেশ থেকে ‘স্রোতের মতো (ইনফ্লাক্স)’ এবং ‘মুসলমানেরা’ আসামে গিয়েছে বা যাচ্ছে- এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? আসামের জনগণনা, নাগরিকত্ব যাচাই ও নিবন্ধন  তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আদালতও আগামী জুনে সে তালিকা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এর সোজা অর্থ- কারো কাছে এ বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই, তৈরি হচ্ছে। মানে এযাবৎ যা উল্লেখ হচ্ছে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণিত তথ্য বা সত্য কোথাও নেই, সব অনুমাননির্ভর। তবুও একজন সেনাপ্রধান নেহায়েত অনুমাননির্ভর কথা বলেন কী করে? দ্বিতীয়ত, ওই নিবন্ধন তালিকা তৈরি করতে যাচাই হচ্ছে কেবল কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, এতটুকুই।  আর কেউ ভারতীয় নাগরিক না হলেই সে বাংলাদেশি এই অনুমান ভিত্তিহীন। কারণ কেউ বাংলাদেশী কি না এমন কোন কিছু সেখানে যাচাই করা হচ্ছে না। তাদের কাজও নয় সেটা। তাহলে প্রমাণ ছাড়া, অনুমাননির্ভর বলা যে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসীর স্রোত আসছে, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের উৎস কোথায়? এসব মনগড়া তথ্যের প্রপাগান্ডায় রাওয়াত নেমেছেন কেন? তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তাকে বাংলাদেশকে অবশ্যই দিতে হবে। আসলে এ ধরনের প্রপাগান্ডা আসামে চলছে আর তাতে প্রধান মদদদাতা হল মোদির বিজেপি এবং তাদের সাথে কিছু স্থানীয় দল, আমরা জানি। এগুলা তারা করে চলেছে তাদের সস্তা ভোটের রাজনীতির স্বার্থে। রাওয়াত নিশ্চয়ই জানেন, রাজনৈতিক দলের বিভেদমূলক প্রপাগান্ডায় একজন সেনাসদস্যের যোগদানের অর্থ কী।

রাওয়াত আসামের অনুপ্রবেশ ইস্যুতে নিজের আপত্তির কারণ নিজেই প্রকাশ করেছেন এভাবে – ‘যেহেতু মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে’। লক্ষ করেন, রাওয়াতের বক্তব্য ওরা ভারতীয় অথবা অনুপ্রবেশকারী কি না, সেটা নয়। তার আপত্তি বা ভারতের কথিত নিরাপত্তার হুমকি দেখতে পাওয়ার একমাত্র কারণ, ওরা মুসলমান। সেই মুসলমানেরা বেড়ে যাচ্ছে সংখ্যায়। এর সোজা অর্থ – আসলে তিনি এক চরম মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তিত্ব। তার বিচার্য পয়েন্ট হওয়ার কথা ছিল, ওরা ভারতীয় নাগরিক নাকি অনুপ্রবেশকারী! এটাই। আসামের নাগরিক নিবন্ধনের কাজেও এটাই যাচাই চলছে। ওরা মুসলমান কীনা এটা সেখানে অবান্তর প্রশ্ন।

থ্যাঙ্কস জেনারেল বিপিন রাওয়াত। এ রকম স্পষ্ট ‘বিদ্বেষ’ অনেকেই দেখাতে পারেন না, মনের মাঝে লুকিয়ে রাখেন; কিন্তু আপনি পেরেছেন। এর অর্থ – ভারতের মুসলমান নাগরিকেরাও আপনার চোখে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। যা হোক, সে বিচার ভারতের রাষ্ট্র ও নাগরিকেরা করবেন। আমতা আর কী বলতে পারি! ‘সেকুলার’ ভারতের সেনাপ্রধান একজন মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তি – এই তথ্য আমাদের জন্য আসলে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক না আসলে একটা সার্কাস। তবে উদ্বেগেরও এ জন্য যে, বাংলাদেশ থেকে মুসলমানেরা নাকি স্রোতের মতো আসামে চলে যাচ্ছে; কোনো প্রমাণ ছাড়া এ কথা তিনি বলছেন। বাংলাদেশ যদি অর্থনীতির দিক থেকে আসামের চেয়ে পিছিয়ে পড়া হয়, তবেই বাংলাদেশ থেকে বেটার লাইফের আকর্ষণে আসামে ‘মুসলমান’ মাইগ্রেশন হতে পারে। এটা যেকোন মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে এই মৌলিক শর্ত পূরণ হতে দেখা যায়। কাজেই রাওয়াতকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে বাংলাদেশের চেয়ে আসামের অর্থনীতি আগিয়ে আছে, অথবা কাজ পাবার সুবিধা আর ভোগ্যপণ্য উপভোগের সুযোগের দিক থেকে জীবনযাত্রার মান বা  লাইফ স্টান্ডার্ড বাংলাদেশের চেয়ে আসাম লোভনীয়। এটা না পারলে আমাদেরকে রাওয়াতের বক্তব্য ফালতু কথা মনে করতেই হবে।

‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ ও ‘প্রক্সিযুদ্ধ
মি. বিপিন রাওয়াত, আপনি বলছেন, চীন ও পাকিস্তান নাকি ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ চালাচ্ছে আর এর মধ্য দিয়ে এটা একটা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’। একজন ভারতীয় সেনাপ্রধানের জানা থাকার কথা, বাংলাদেশে একটা সরকার আছে। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি দাবি করছেন, আমাদের সরকারসহ আমরা জনগণ সবাই চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা পুতুল, পাপেট। নইলে আমরা চীন-পাকিস্তানের কথায় আসামে ‘মুসলমান’ পাঠিয়ে দেয়ার কাজ করলাম কেমনে! অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়ার ভাষ্য হল – গত ১০ বছরে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভারতবান্ধব সরকার। তাহলে বোঝা গেল ভারতের মিডিয়া ও সরকার রাওয়াতের ভাষ্যের সাথে একমত নয়, বরং উলটা। আচ্ছা মিস্টার  রাওয়াত আপনার কথা অনুসারে আমরা আসলে ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- তাই তো? ঠিক আছে, আমরা জনগণের বেশির ভাগ আপনার দাবিমতো না হয় কাঠপুতলি হলাম। আমরা সারাক্ষণই শুনছি বাংলাদেশের সরকারের বিরোধীদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হবে, ‘পাকিস্তানি মন’ আমাদের ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে এ আর নতুন কী? কিন্তু রাওয়াতের ভাষায় আওয়ামী লীগের হাসিনা সরকারও ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- এ কথা বেশ কৌতুককর। কথা আরো আছে। রাওয়াত বলছেন, “বাংলাদেশী মুসলমানদের অনুপ্রবেশে আসামের চারটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা থেকে বেড়ে এখন ৯টি জেলা হয়ে গেছে, আর এই পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন” – (inversion has taken place whichever be the government)। এ অংশটি বেশ উপভোগ্য। এর সোজা অর্থ – রাওয়াত আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে কোনো ফারাক করেননি। দু’টি দলই সমানে নাকি আসামে মুসলমানের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে মুসলিমবিদ্বেষী বিপিন রাওয়াতের চোখে হাসিনা সরকার কী তা জানা গেল। অর্থাৎ এ সরকার যতই ভারতকে সার্ভিস দিক, ভারতবান্ধব সরকারের খেতাব পাক না কেন, কাকাবাবুকে চেয়ারে বসিয়ে দাস হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে বসে ছবি তুলুক না কেন,  জেনারেল রাওয়াতের চোখে হাসিনাও খালেদার মতো একজন মুসলমানই। তদুপরি, তিনি এমন মুসলমান যে, আসামের জেলাগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সব জেলাকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা করে তুলছেন; ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুলের’ মত আচরণ করছে, ‘প্লান্ড ইমিগ্রেশন আর প্রক্সিযুদ্ধ’ করছেন।

আসলে রাওয়াত এক ঘোরতর মুসলমানবিদ্বেষী অসুখে ভুগছেন, এমন আরও একটা বড় প্রমাণের দিক নজর করা যাক।  আসামের স্থানীয় রাজনীতিতে বারবার মুসলমান নিধনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে বোড়ো পাহাড়িদের হাতে স্থানীয় মুসলমানদের হত্যা ও বিচারহীনতার পটভূমিতে ২০০৫ সালে All India United Democratic Front, AIUDF নামে একটা দলের জন্ম হয়েছিল। দলটির প্রধান নেতা সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল এবং দলটির প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের সমর্থন বেশি।  এটাই হল অপরাধ। ঐতিহ্যগত ও পারিবারিকভাবে সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল আতরের ব্যবসা করেন। তার আতর বিখ্যাত কারণ এটা আসামের জঙ্গলের বিশেষ আগর গাছ থেকে  সংগৃহিত। সবচেয়ে বড় কথা AIUDF কেবল মুসলমানদের দল নয় অথবা ‘ইসলাম কায়েম’ তার লক্ষ্য এমন দল নয়। অর্থাৎ এটা কেবল একটি সম্প্রদায়ের দল নয়। তাদের ঘোষিত আদর্শ : ‘National Inclusiveness with a regionalist political position’ । এ ছাড়া দলটা নামের মধ্যেও নিজেদেরকে মুসলমানের দল বলে কোনো দাবি করা হয়নি। ফলে এটা একেবারে ভারতের কনষ্টিটিশন মানা রেজিষ্টার্ড আইনসম্মত লিবারেল রাজনৈতিক দল।  গত ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় আসামের জন্য বরাদ্দ ১৪টি আসনের মধ্যে তিনটাতে দলটি জয়ী হয়েছে। তারা হলেন- বদরুদ্দিন (ধুবড়ি) এবং তার ভাই সিরাজউদ্দিন (বড়পেটা)। আর তৃতীয় আসনটিতে জয়ী হয়েছেন রাধেশ্যাম বিশ্বাস। ইনি বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। এতসব তথ্য সত্বেও, রাওয়াত AIUDF দলের দ্রুত বিকাশকে মুসলমানদের আসামে সংখ্যা বৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ বলে হাজির করেছেন, প্রকাশ করেছেন উষ্মা। বলেছেন, ১৯৮৪ সালে বিজেপির (তখনকার নাম ছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ) আসন ছিল দু’টি, সেই দলও এত দ্রুত বাড়েনি। (‘AIUDF have grown in a faster time-frame than the BJP grew over the years. When we talk of Jan Sangh with two MPs & where they have reached, AIUDF is moving at a faster pace in the state of Assam,’ said Rawat.)। আসলেই এক বিরাট জ্ঞানীর জ্ঞানের কথা এটা।  রাওয়াত মুসলমানদেরকে কী ও কেমন ঘৃণার চোখে দেখেন, মুল্যায়ন করেন এর এক আদর্শ প্রমাণ এটা।

প্রথমত, তার এই তুলনাই মুসলিমবিদ্বেষের প্রকাশ। AIUDF আইনসম্মত দল কি না, কোনো আইন ভঙ্গ করেছে কি না – সেটা দেখার সরকারি দফতর আছে। যেমন আমাদের বেলায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন । কিন্তু ভারতের সেই দফতরের পক্ষ থেকে এই দলের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি করা হয়নি। এই দল দ্রুত না ধীরে বাড়ল, দলটা ইসলামি কি না এমন কোন অভিযোগ ঐ দফতরের আছে এমন নয়। আর তা থাকলেও তাতে কোন অপরাধ হয়েছে কি না সেগুলো বিচার বিবেচনা করে দেখার দায়িত্ব ভারতের সেনাপ্রধানের নয়। তবে সেনাপ্রধানের কোনো আপত্তি থাকলে ওই দফতরে গিয়ে তিনিও অভিযোগ জানাতে পারেন। তা তিনি করেন নাই। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোনো দলের দ্রুত বাড়া কি অপরাধ? অথবা, ব্যাপারটা কী এরকম যে, এই দলটা কথিত অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে গড়া দল? রাওয়াত কিন্তু এ অভিযোগ পরিষ্কার করে আনছেন না। কেবল অমূলক ইঙ্গিতে বলা সন্দেহ ছড়িয়ে কথা বলছেন। দলের সভাপতি আজমল একজন মুসলমান, এটাই যেন তার বিরাট অপরাধ। আর দ্রুত বাড়াই যদি সমস্যা হয় তাহলে সেনাবাহিনী কি গত ১৯৮৪ সালে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির সময় এমন একই প্রশ্ন তুলেছিল? নাকি সেটা বিজেপি বলে খুশি হয়ে চুপ ছিল? এই প্রশ্নে রাওয়াতের জবাব কী? ইন্ডিয়া যদি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তাহলে কয়েকটা জেলায় মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমস্যা কী? এতে কী এসে যায়? এ ক্ষেত্রে আইনি সমস্যাই বা কী?

আসলে বিজেপি বা বিপিন রাওয়াত যদি অহিন্দু কোনো ধর্মের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করেন, তবে বুঝতে হবে তারা ভারতকে হিন্দুত্ব রাষ্ট্রের ভারত বলে অনুমানে ধরে নিয়েছেন, এমনটাই কামনা করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আরএসএস বা শিবসেনার রাজনৈতিক লোক কীংবা কোন রেসিস্ট কীট হন তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু নিজ পদ পদবির সাথে এসব নোংরা অবস্থান তিনি অবলীলায় জড়াচ্ছেন। বরং সাংবিধানিক পদে থেকে কোনো ধর্মের (যেমন মুসলমানের) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করে ইঙ্গিত করে কথা বলা – এটা ঐ জনগোষ্ঠি-বিদ্বেষী আচরণ ফলে তা অসাংবিধানিক এবং তা ফৌজদারি অপরাধ। ভারত যদি রাজনৈতিক সাম্যের দেশ হয়ে থাকে, ভারতে ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকারের সাম্য যদি বিজেপি বা রাওয়াত মানেন, তাহলে তারা শুধু হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চাইতে পারেন না। রাওয়াতের উচিত, আগে ভারতের কনস্টিটিউশনে এ কথা লিখিয়ে নেয়া যে, ‘এখানে নাগরিক নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান নয়।’ আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, মোদির বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া এতে কী হয়, কী তামাশা সেখানে করে!
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা যায়, বিজেপি বা বিপিন রাওয়াতরা মুসলমান অথবা যেকোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যখনই কোনো এক ‘ভারত’ (যেমন হিন্দুত্বের ভারত) গড়তে চাইবেন, আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, ওই বৈষম্য ও বিভাজনই মহাবিপদ ডেকে আনবে। ১৯৪৭ সালে এটাই হয়েছিল। যে মুসলমান ইনক্লুসিভ ভাবে, ভারতে সমান মর্যাদায় নাগরিক থাকবে, সে কখনো ভারতের জন্য হুমকি হবে না। একথার বিপরীতে যখন ভাবা হবে মুসলমান তাই ওরা ভারতের শত্রু বা হুমকি – এটাই রেসিজম। মনের গভীর গহীনে এক দগদগে ঘৃণার অসুখ! মনে এত ঘৃণা নিয়ে উনি ঘুমান কী করে!

তবে একথা মনে করার কোন কারণ নাই যে ভারতে জ্ঞানবুদ্ধি-ওয়ালা লোকের কোন অভাব আছে। বরং এটা বুঝা যায় যে তাদের চাপিয়ে পিছনে ফেলে রাখা হয়েছে। যেমন এক ‘শ্রীনাথ রাঘবন’ এক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ। তিনি দিল্লীরই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ’ এর সিনিয়র গবেষক সদস্য। রাওয়াতের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,… “চীন-পাকিস্তানের তত্বাবধানে এক পরিকল্পিত মাইগ্রেশন আমরা নাকি দেখতে পাচ্ছি – এটা এক অবান্তর বাড়িয়ে চাড়িয়ে বলা কথা”। [To suggest that we are witnessing “planned immigration” overseen by Pakistan and China appears to be an absurd overstatement.] হিন্দুস্তান টাইমসে লেখা এক মন্তব্য কলামে তিনি এটা লিখেছেন। তাঁর লেখার শিরোনামে তিনি দুটো শক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন – বলেছেন রাওয়াতের বক্তব্য ‘অ-ইতিহাস’ [ইতিহাসের সত্যতা নাই] এবং ‘অপুষ্টির বিচার’ [ahistorical, poorly judged]। পুরা লেখায় একজনের গবেষকের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তিনি সেখানে রাওয়াতকে ন্যাংটা করে তাঁর সমস্ত দাবি প্রচুর যুক্তি তুলে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন। আগ্রহিরা পড়ে দেখতে পারেন।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]