ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1pe

ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলে জানা গেল সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যাওয়ার পক্ষে হয়েছে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটের ফলাফলে ত্যাগের পক্ষ জয়ী হয়েছে শতকরা ৫২-৪৮ অনুপাতে। এতে গণভোট-উত্তর পরিস্থিতি যা হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল তা একের পর এক ঘটা শুরু হয়েছে। ফলাফলের নেতিবাচক গ্লোবাল প্রভাব পড়েছে সর্বব্যাপী। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে তা সংশ্লিষ্টরা মানছেন। গতকাল  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদকে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের “পোশাক খাত চ্যালেঞ্জের মুখে” পড়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যে প্রতি বৃটিশ পাউন্ড গণভোটের আগের তুলনায় দশ টাকা করে মূল্য হারিয়েছে। পরিস্থিতি আরো কতটা খারাপের দিকে যাবে তা নিয়ে অনুমান চলছে।
এ নিয়ে গভীরে প্রবেশের আগে কিছু ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। যেমন- ব্রিটেনের ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া মানে কী? ব্যাপারটা কী, বিভিন্ন রাষ্ট্র যেমন নানান কিসিমের রাষ্ট্রজোটে অন্তর্ভুক্ত হয় যার কোনটা অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক বা সামরিক ইত্যাদি সে রকম কোনো রাষ্ট্র-জোট ত্যাগ করা? অথবা ধরা যাক,  জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় জোট প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের তা ছেড়ে যাওয়া সেরকম?  অথবা  বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিল্যাটারাল) ক্যাটাগরির আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কে ওর কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ছেড়ে যাওয়া, এ ধরনের? অথবা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন ধরা যাক, আমাদের সার্ক জোট ছেড়ে গেলে কী হবে তেমন একটা কিছু? এরকম নানা ধরনের রাষ্ট্রজোটের উদাহরণ আর না বাড়িয়ে এবার উত্তরের দিকে যাওয়া যাক। প্রথমত কোনো সদস্য রাষ্ট্রের জোট ত্যাগ করার উদাহরণ খুব একটা নেই, তুলনায় জোটের অকার্যকর হয়ে পড়ার উদাহরণ পাওয়া যাবে। তবে আলোচনা সেদিকে নিব না। তাহলে আমরা এখানে কথা বলছি – ইইউ ধরণের বিশেষ রাষ্ট্রজোটের।
ব্রিটেনসহ ধরলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছিল মোট ২৮ সদস্য-রাষ্ট্রের। এখন এই ইইউ ধরনের রাষ্ট্রজোটের সাথে অন্য আর সব ধরনের রাষ্ট্রজোটের একটা প্রধান ফারাক আমরা এখন টানব। তা হল, ইইউ ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রজোটের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্র একেকটা সার্বভৌম ইউনিট, এটা বজায় রেখে বা মেনে নেয়ার পরই এসব রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক রাষ্ট্র নিয়ে জোট অথবা জাতিসঙ্ঘের মতো প্রায় সব (বর্তমানে ১৯৩ সদস্যের) রাষ্ট্রের রাষ্ট্রজোট হবার পরও জাতিসংঘ নিজে এর যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্বধারী কোনো সুপার স্টেট নয়। যেমন বাংলাদেশ সম্পর্কে যেকোনো ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, জাতিসঙ্ঘ অথবা এর অধীনস্থ কোনো প্রতিষ্ঠান বা কমিটির নয়। জাতিসঙ্ঘ কি সার্বভৌম – এই ধারণার উপরে জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান? যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপরে কী জাতিসংঘ সার্বভৌম ক্ষমতা, এখতিয়ার রাখে? এককথায় জবাব মোটেও না। প্রশ্নই আসে না। প্রত্যেক সদস্য-রাষ্ট্রই কেবল সার্বভৌম যার উপর কেউ নাই, আর কোন মাতব্বর নাই।  ফলে জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্ত মানার ব্যাপারটি কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটে কী এই অর্থে যে, ওই সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে জাতিসঙ্ঘের সব সদস্যের সম্মতিতে অনুমোদিত হয়েছে শুধু সেজন্য? না সেজন্য নয়। বরং ওই আইনের অনুরূপ করে লেখা একটা আইন (যেটা রেটিফিকেশন বলে পরিচিত) আমরা আমাদের সংসদে পাস করিয়ে নিয়েছি সেজন্য। সারকথায় জাতিসঙ্ঘের কোনো আইন বা কনভেনশন ইত্যাদি আমরা মানি এ জন্য যে, সেটার অনুরূপ এক আইন আমাদের নিজের সংসদ পাস করে নিয়েছে, তাই। নিজের আইন তো নিজে মানবই। জাতিসঙ্ঘ কখনোই এমন কোনো তৎপরতা দেখায় না বা এমন কোনো রেওয়াজ নেই, যা থেকে আমরা অর্থ করতে পারি যে সে আমাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে অথবা আমাদের রাষ্ট্রের ওপরে অবস্থিত এক চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কর্তৃপক্ষ হল জাতিসঙ্ঘ। বরং রাষ্ট্রই সার্বভৌমত্বের শেষ কথা। এর ওপর কাউকে রাখা হয়নি। এভাবে দুনিয়ার যেকোনো রাষ্ট্রজোট তার আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অটুট রেখেই নানান রাষ্ট্রজোটের অংশ হয়।

কিন্তু এই ধারণার একমাত্র ব্যতিক্রম বা ব্যতিক্রম হওয়ার উদ্যোগ হল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কী অর্থে? যেহেতু ইইউ গড়ার লক্ষ্য হল সদস্যরাষ্ট্রগুলো একটা লম্বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিন প্রত্যেকের আলাদা রাষ্ট্ররূপ বিলুপ্ত করে সবাই মিলে একক এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে এখনই সেই প্রক্রিয়ার পুরোটা সম্পন্ন হয়ে যায়নি। তাই ইইউ এখনই কোনো সার্বভৌম অস্তিত্ব নয়। তবে ইইউর কিছু কিছু ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক হয়েছে। এই অর্থে ওসব জায়গায় ইইউ নিজের সদস্যরাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম কর্তৃপক্ষ।  যেমন ইইউর ফোরামে গৃহীত প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রে কাজের দৈনিক শ্রমঘণ্টা  কত হবে- এ বিষয়ক ইইউ ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য এখনই বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট এখানে ইইউর ভূমিকা সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সুপার স্টেট ধরনের। আর এটাই প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র তার নিজ নিজ সংসদে আগে অনুমোদন দিয়েছে যে ঐসব ক্ষেত্রে ইইউ এর সিদ্ধান্ত সদস্য-রাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম, তাই এটা বৈধ। সারকথায় রাষ্ট্রজোটের নানা ধরনের মধ্যে একমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন হল আলাদা ধরণের কারণ এটা হবু সুপার স্টেট। এক সুপার ষ্টেট হবার লক্ষ্যে সে আগাচ্ছে তাই।
ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণ সিদ্ধান্ত জানাল যে ব্রিটেন ইইউর মধ্যে নিজ রাষ্ট্র একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিলীন করার যে সিদ্ধান্ত সে আগে নিয়েছিল (ব্রিটেন ১৯৭৩ সালে ইইউতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল) সে সিদ্ধান্ত বদল করে তারা এবার নিজের ব্রিটেন রাষ্ট্রই অটুট রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটেনের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রক্ষণশীল টোরি আর লিবারেল লেবার- এরা কেউই ইইউ ত্যাগের পক্ষে নয়, বরং ইইউর সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষে বলে দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রচারও করেছিল। ফলে আর অন্য ছোট দল হিসেবে যারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ও প্রচার চালিয়েছিল, তেমন এক দল হলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি)। গণভোটের ফলাফল ত্যাগের পক্ষে যাওয়ার পর মিডিয়া এই পার্টির সেক্রেটারিকে প্রশ্ন রেখেছিল- কেন তারা জিতলেন বলে মনে করেন? তিনি বললেন, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা জনগণ নিজেরাই নিতে চাই, তাই। এটা অবশ্যই সঠিক জবাব নয়। একই ভাবে আর এক নেতা তিনি “না-ভোট প্রচারক” কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক। নাম (Michael Gove) বা মাইকেল গভ। কিন্তু তিনি আসলে আবার মাইকেল ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল টোরি পার্টির এমপি। তিনি তার ওয়েব সাইটে তাঁর নাভোটের পক্ষে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে তিনিও UKIP দলের মত বললেন। এককথায় বললে, যেসব নেতারা ইইউ-ত্যাগের পক্ষে কাজ করেছেন, এরা মূলত সাধারণ মানুষের নানান ক্ষোভ অসন্তোষকে সস্তা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী সুরসুরি দিয়ে আরও বড় করে কাজে লাগিয়েছেন। যেমন মাইকেল লিখছেন, তার আপত্তি্র পয়েন্ট হল তাঁর “রাষ্ট্র বৃটেনের ভাগ্য অন্য জাতেই রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদের ঠিক করছেন “decided by politicians from other nations”। এটা খুবই বাজে ও ফালতু যুক্তি। এক রংপুরের রাজনীতিবিদ যদি বলে, বাংলাদেশের বাজেট দিচ্ছেন এক (ভিন্ন জেলা অর্থে ভিনজাতের) সিলোটি নেতা … এটা বললে যেমন বুঝতে হবে এগুলো মাথায় শয়তান ভর করা লোকের সস্তা সুরসুরি মার্কা কথা – ঠিক তেমনি। আমরা নানা জেলার মানুষ মিলিয়েই বাংলাদেশ গঠন করেছি। ফলে কেউ যদি সংসদে সিলেটি হয়ে রংপুরের ভাগ্য নির্ধারণ করে তবে কোথাও আবার রংপুরিয়াও সিলটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ইইউ তে বৃটিশ না হয়েও ধরা যাক সে জর্মন, যাদের সিদ্ধান্ত বৃটেনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে, বৃটিশের সিদ্ধান্তও অন্য কোথাও জর্মনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে। সুতরাং এটা কোন পয়েন্টই না। পরিস্কার দগদগে উগ্র জাতিবাদি বিদ্বেষ, রেসিজম। যদি ইইউ ভাইস ভারসা ভাবে জর্মনী বা অন্য জাতি রাষ্ট্রের উপর বৃটিশ (ইইউ এমপি বা MEP )র সিদ্ধান্ত কার্যকর না হত তাহলে এসব কথা বলার সুযোগ থাকত। এছাড়া সবার উপরে বৃটেন কী স্ব-ইচ্ছায় ১৯৭৩ সালে ইইউ তে যোগ দেয় নাই? স্ব-ইচ্ছায় যোগ দেয়ার মানে কী  এটা না যে অ-বৃটিশেরও মতামত মাতব্বরি শুনতে ইউ তে যোগ দিতে যাওয়া হচ্ছে?  অতএব এসব ফালতু জাত-বিদ্বেষী বক্তব্যকে যদি জবাব হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হয়, তবে মানতে হবে এত দিন বেআইনি বা অবৈধভাবে ব্রিটেনবাসীকে বঞ্চিত করে, তাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইইউ সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, যেন সেটার অবসান ঘটালেন তারা গণভোটে ভোট দিয়ে। কিন্তু না তা তো নয়। আইনে যা লেখা আছে তা মেনেই সেই ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হওয়া এক ক্রমপ্রক্রিয়ায় ব্রিটেন ইইউর ভেতরে বিলুপ্ত হওয়ার লক্ষ্যে ও সেজন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। ইইউ তো কোন জবরদস্তি প্রক্রিয়া তো ছিল না।
আবার সেই ইইউ প্রক্রিয়া যেহেতু এখনো শেষ বা সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি, ফলে ২০০৭ সালের লিসবন চুক্তি, যার আরেক নাম ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি, যেটা তার আগের করা ইইউ বিষয়ক সব চুক্তির আপডেটেড বা সর্বশেষ রূপ, এর আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রক্রিয়া থেকে এখনও যেকোনো সদস্যের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ বৈধভাবেই ছিল। যেটার সুযোগ নিতেই ব্রিটেনের জনগণ তাদের আগের সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ নিয়েছে এই গণভোট করে। এটাও বৈধ। ফলে ১৯৭৩ সালে ইইউতে ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত এবং এই গণভোটে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুটোই আইনি দিক থেকে বৈধ সিদ্ধান্ত। তাহলে আসলে এখন কী ঘটেছে? আর কেন সেটা ঘটল?

সাধারণ নির্বাচন বা গণভোট মানে ঐ একবারই যখন সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণের পর্যায়ে নেমে আসে। কার তুলনায়? সরকার গঠন হয়ে গেলে যে সংকীর্ণ গোষ্ঠি এবার সরকারের নীতি-সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের ক্ষমতার তুলনায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে বা গ্লোবাল কাপিটালিজমে অনেক প্রভাবশালী অর্থনীতি আছে। এরাসহ সব আধুনিক রাষ্ট্রেই পুঁজি ব্যবসায়ী, শিল্পকারখানা বা ট্রেডার ব্যাংকার সমাজের এ অংশটিই তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে। নির্বাচন একবার হয়ে গেলে পরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত এসময়গুলোতে রাষ্ট্র কার্যত থাকে এই গোষ্ঠির প্রভাবে। মূলত এসব সময়গুলোতে নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ জনগণ ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিল। যেমন ২০০৮ সাল থেকে চলে আসা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এখনো গ্লোবাল অর্থনীতিতে কাটেনি। আর ওই মন্দা আসলে ডেকে এনে ছিল যেন এক প্রতিযোগিতা! কীসের? ঐ মহামন্দায় দেইলিয়া হয়ে পড়া কোম্পানী পুঁজির কারবারিদের দায়দেনা ও ক্ষতি জনগণ বা রাষ্ট্রের কাঁধে কেমন লটকিয়ে দেয়া যায় এরই প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ঢেলে সব ব্যক্তি কর্পোরেট কোম্পানীর দায়দেনা ও ক্ষতি মিটানো হয়েছিল। এরপর আবার শুরু হল (austerity) অস্টারিটি মানে অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন। অর্থাৎ রাষ্ট্র তখন আর সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিবে আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ধরনের সামাজিক বেনিফিটে কাটছাঁট করবে, যার সবচেয়ে আর সব দিক থেকে চাপটা এসে পড়বে কেবল শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সমাজের নিচের কম আয়ের জনগণের ওপর। এর ওপর আবার বিগত ২০০১ সাল থেকেই –  ‘ইসলামি জঙ্গি’ মারতে গিয়ে লম্বা শেষ নাই এমন যুদ্ধে আটকে গিয়েছে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। এর অর্থনৈতিক দায় বইতে পশ্চিমা রাশ্ট্রগুলোর অসমর্থ হওয়া ছিল সব কিছুর  প্রধান ফ্যাক্টর।  ঐ যুদ্ধের ঘটনার লেজে লেজে যেখান থেকে আবার দুনিয়াতে রিফিউজি বা উদ্বাস্তু সমস্যা খাড়া হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ইউরোপেরই নিচের মানুষদের চেয়েও কম বেতনে রিফিউজিরা খারাপ দুস্থদশায় বলে কাজ করতে রাজি – ফলে এরাই প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রমজীবীদের বাজারে হাজির হতে চাইছে। ফলে ইউ যেটাকে যুদ্ধের রিফুইজি ঠেলে ফেলতে পারে না, জাতিসংঘ উদ্বাস্তু কমিশনে কমিটমেন্ট ইত্যাদির কারণে রফুইজি নিচ্ছে বা প্রতিদানে অর্থের সংস্থান করেদিচ্ছে। এগুলো প্রতিটার ক্ষেত্রে  ইউরোপেরই নিচের মানুষদের স্বার্থ আর তাদের শাসকদের স্বার্থ পরস্পুর মুখোমুখি। ফলে শ্রমজীবিদের চোখে ইইউ এক ভিলেন। ফলে সব কিছুকে উল্টে ফেলে দেয়ার অছিলা খুঁজছিল ইউরোপেরই নিচা আয়ের জনগণ। কারণ স্ব স্ব রাষ্ট্রে এসব সিদ্ধান্ত ও কাজ করা হচ্ছিল ইইউর আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, ইইউ এর ওমুক আইনের বাধা আছে অথবা যেমন- ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের রুল আছে তাই অস্টারিটি করতে হচ্ছে অথবা ইইউর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাই উদ্বাস্তু নিতে হবে- এভাবে ইইউকে দেখিয়ে সামনে রেখে নিজের রাষ্ট্র এগুলো করছিল। ফলে স্বভাবতই জনগণ সেই ইইউ নামে ভুতুড়ে ক্ষমতাকেই উপড়ে ফেলার পক্ষে চলে যায়। অর্থাৎ সমাজে এসব অসন্তোষ বাড়ছিল। এই অসন্তোষ নিরসন বা আমলে নেয়ার নামে ক্যামেরন ভেবেছিলেন ইইউতে থাকা না থাকাকে গণভোটে দিলে আবার ইইউতে থাকাই জিতবে। ফলে গণক্ষোভ প্রশমিত করার রাস্তা তার নাগালেই আছে। তাই আগবাড়িয়ে ২০১৩ সালে তিনি গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ দিকে সমাজের ওপরের অংশ এবং দুই প্রধান দল ধরেও নিয়েছিল, গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ জিততেই পারে না। এটা তাদের কাছে অসম্ভব কল্পনা মনে হয়েছিল। কিন্তু যত গণভোটের নির্ধারিত দিন এগিয়ে আসতে থাকে ততই গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে পরিচালনের রাষ্ট্রনেতা, বিভিন্ন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান নেতারা ততই ইইউ ত্যাগ করে গেলে কী বিপর্যয় ঘটবে, একের পর এক এর ভয়াবহতা উল্লেখ করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়া হয় আরো নেতিবাচক। বিবিসি যে আটটা কারণ তুলে ধরেছে, তার এক নম্বর কারণ হিসেবে “ব্রেক্সিটের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবে উল্টো ফলকে” । ব্রিটিশ সাধারণ ভোটাররা ব্যাপারটিকে তাদেরকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়া হিসেবে দেখেছিল। ফলে চাপের ভেতরে তাদের দিশেহারা অবস্থা। এর ওপর আবার সর্বক্ষণ হবু সুপার স্টেট ইইউর দোহাই দেয়াতে এই ভুতুড়ে আড়ালি ক্ষমতাকেই মাস জনগণ সবার আগে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা মনে করা যেতে পারে।
ব্রিটেনের ভাষায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি) হলো এক ‘ডানপন্থী’ পার্টি। এরা এই গণভোটকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিটানোর মহাসুযোগ পাওয়া গেছে হিসেবে নিয়েছিল। এভাবে তারা জনগণকে মিথ্যা আওয়াজ তুলেছে যেন উগ্র জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুললে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সব সঙ্কট দূর হয়ে যাবে। ইসলামি জঙ্গি মারার নামে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যে সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তোলা হয়েছে, তা আপনাআপনিই মিটে যাবে, এই মিথ্যা স্লোগান দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংস্কৃতি মূল্যবোধ সবার চেয়ে ভালো এই উগ্র প্রচার করেছে। ফলে বৃটিশরা  নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে মূল সমস্যা থেকে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণের দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হয়েছিল। এসব কিছুর নিট ফলাফল হলো গণভোটের ইইউর ত্যাগের সিদ্ধান্তের জয় লাভ।

ইইউ ত্যাগের পক্ষের প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসন ও অন্য প্রবক্তারা জানেন, যে তারা মিথ্যা প্রলোভনে ত্যাগের পক্ষকে জিতিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসনকে মিথ্যা বলার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বরিস জনসনের ছবিসহ ঐ সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল ব্রেক্সিটের প্রবক্তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।   অথচ সবাই জানত ইইউ-ত্যাগের পক্ষে জিতলেও গরিব শ্রমজীবীর মূল ক্ষোভ অসন্তোষ এতে কাটবে না। তাই নিউইয়র্ক টাইমস গত ২৬ জুন আর এক রিপোর্টে বলছে ইইউ-ত্যাগ ভোটের জিতার পরে অনেক নেতা উলটা প্যাডেল মেরে ভাগতেছে কারণ জিতলে তারা কী করবে এনিয়ে তাদের কোন অর্থনৈতিক পরকল্পনা ছিল না।  প্রতিদিন ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড নাকি ইইউকে দিতে হত খামোখা বলে বরিস জনসনরা প্রচার চালিয়েছিল। এখন স্বীকার করছে ওটা ভুল ছিল।  তাই তারা এখন ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যত দেরিতে শুরু করা যায়, এর পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যেমন ইইউ ত্যাগের আইনগত পদ্ধতি হলো কোনো সদস্যরাষ্ট্র নিজ রাষ্ট্রের আইন বা কনস্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা পালনের মুখোমুখি হয়ে পড়লে (যেমন- বৃটেন এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য) সে ইইউ ছেড়ে যাওয়ার জন্য সবার আগে ইইউকে নোটিশ দেবে। এটাই সর্বশেষ লিসবন ইইউ চুক্তির আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইইউ ত্যাগ করতে চাওয়া দেশের ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। অর্থাৎ বৃটেনে গণভোট হয়ে ফলাফল চলে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ এখনো বৃটেনের কাছ থেকে ত্যাগের ইচ্ছার কথা জানে না। আর এই ইচ্ছা জানানোর এখতিয়ার বা জানানোর পার্টি হল, যে ত্যাগ করতে চায়। সে হিসেবে কেবল ব্রিটেন। তাই সাবেক মেয়র বরিস জনসন আর্টিকেল ৫০ স্মরণ করিয়ে বলছেন, এটা তাদের এখতিয়ার এবং তারা আগামী অক্টোবরের আগে ইইউকে আনুষ্ঠানিক নোটিফাই করতে চিঠিই দেবেন না। ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে আর্টিকেল ৫০-কে সক্রিয় করে জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করলে এর পরের কমপক্ষে দুই বছরের আগে এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শেষ হবে না। ফলে যারা ইইউ-ত্যাগ পক্ষকে জিতিয়েছেন, সেই প্রবক্তারা তাই যদ্দুর সম্ভব আগামীতে নিজেদের সম্ভাব্য ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নিতে চান। বিপরীতে যে ছয় রাষ্ট্র ১৯৫১ সালে ইইউর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল সেই মূল ছয় রাষ্ট্র- জর্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লেদারল্যান্ডস, ইতালি ও লুক্সেমবার্গ- এদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিলিত হয়ে এক যৌথ আহ্বান রেখেছেন ব্রিটেনের প্রতি। দাবি করেছেন ইতোমধ্যেই গণভোটের ফলাফল গ্লোবাল বাজারের আনাচে-কানাচে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মার্কেটে উথাল পাথাল ঘটা শুরু হয়েছে। ফলে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করতে ব্রিটেন যেন দ্রুত শুরু করে, যাতে ব্রিটেন বাদে ইইউ (২৭ সদস্যরাষ্ট্র) নিজেদের আরো কোনো বিপর্যয়ের হাতে না পড়ে এর বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এই বিচ্ছেদ কি সহজেই ঘটতে পারবে, নাকি আরো গ্লোবাল বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে দুনিয়ার সবাইকে- এটাই এখন দেখার বিষয়!
দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের এখানেই শেষ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখার প্রথম পর্ব যার শিরোনাম ছিল, “ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু” ঐ লেখা বিগত ১৯ জুন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় আগে ছাপা হয়েছিল। আর চলতি শেশাহ পর্বের লেখাটা আগে ২৬ জুন ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তে ছাপা হয়েছিল। দুটো লেখায় আবার নানান সংযোজন ও সম্পাদনার পর এখানে ছাপা হল।

ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু

ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : ভাঙন মানেই ভাঙাগড়া
গৌতম দাস
২৯ জুন ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-1j7

আজ প্রথম পর্বঃ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র বৃটেন বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে এক গণভোটে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত এখনও আভ্যন্তরীণ। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ কে এখনও জানায় নাই। ইতোমধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এর উল্টাপাকল্টা প্রভাব পড়া শুরু করেছে। বৃটেনের গণভোটের এই সিদ্ধান্তে গ্লোবাল প্রভাবশালী শেয়ার বাজারগুলোতে টালমাটাল অবস্থা শুরু হয়রছে। এই প্রেক্ষিত মাথায় রেখে বর্তমান লেখাটা শুরু করেছিলাম গত ২৩ জুন গণভোট অনুষ্ঠানের আগে। চলতি পর্ব সেটাই। এছাড়া গণভোটের পরেও এলেখা শেষ অংশ লেখা হয়েছে যা পরবর্তিতে দ্বিতীয় বা শেষ পর্ব আকারে এখানে প্রকাশিত হবে।

ব্রেক্সিট, একটা নতুন শব্দ। নতুন পরিস্থিতিতে পড়ে জন্ম নেয়া একটা নতুন শব্দ এটা। দু’টি শব্দ – ব্রিটেন আর এক্সিট, এদুইয়ের সংমিশ্রণ করা হয়েছে। পুরনো শব্দ দু’টি মিলিয়ে পয়দা করা হয়ে হয়েছে নতুন শব্দ ব্রেক্সিট। কেন? বিগত ১৯৭৩ সাল থেকে  ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য। ব্রিটেন ইইউ ছেড়ে যাবে কি না তা জানতে গণভোট ডাকা হয়েছে। ব্রিটেন ইউরোপের পুরনো ও বড় মাতবর । কলোনি ইতিহাস সাথে ধরে নিলে দেশটা কলোনি সাম্রাজ্যকালের মাস্টার রাষ্ট্রগুলোরও শিরোমণি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগীজ বা স্পানিশ ইত্যাদি  সবার কলোনি সাম্রাজ্যের মাস্টারি পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। কিন্তু তা  গেলেও এর পরবর্তীকালে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন করে সাজানো দুনিয়াতে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ব্রিটেন ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে জায়গা দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। আজ যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন যা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে আর আলাদা আলাদা না থেকে ক্রমশ ধাপে ধাপে এক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবার পরিকল্পনা সেই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে। ইতোমধ্যে ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ প্রায় প্রতিবছর নতুন নতু কমন আইনের অনুমোদনে রাষ্ট্রগুলো এক ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হবার পথে অনেক দূর এগিয়ে যায়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হলেও এরমধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন রাষ্ট্র হয়ে থাকে – বৃটেন ও বাকি দু’টি ফ্রান্স ও জার্মানি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য দেশগুলো একই কারেন্সি হিসেবে ইউরোকে গ্রহণ করে ১৯৯৯ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে। যদিও ব্রিটেন এর পরও বিশেষ বিবেচনায় তার নিজ মুদ্রা পাউন্ড নিয়েই ইউরো জোনের বাইরে থেকে যায়। ব্রিটেনকে ইইউ’র সদস্য হয়ে থেকেও বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে ইউরোর বাইরে থাকতে জায়গা করে দেয়া হয়েছিল। চলতি মাসেই ২৩ জুন ব্রিটেনে এক গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে নাগরিকেরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে থাকবে না বের হয়ে যাবে এই প্রশ্নে গণভোটে মতামত দেয়। অর্থাৎ গণভোটের ফলাফলে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় এসেছে বলে ব্রিটেন এখন আর “ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকবে না”। এর প্রাথমিক শর্ত পুরণ হয়েছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউকে জানানোর পরে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই আনুষ্ঠানিকতা ও নিগোশিয়েশন শেষ হতে কমপক্ষে দুই বছর লাগবে।
গণভোটের ঘটনাটাকে মনে হতে পারে সাধারণ যেকোনো একটা রাষ্ট্রের গণভোটের ইস্যু। আইনি আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা তাইও। কিন্তু এটা শুধু বৃটেন নয় খোদ গ্লোবাল ইকোনমিতেই ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এক কথায় বললে, এর প্রধান কারণ দুনিয়াতে এখন একটাই অর্থনীতি, পরস্পর পরস্পরের সাথে আষ্টপৃষ্টে জড়িয়ে যাওয়া নির্ভরশীল হয়ে পড়া একক অর্থনীতি। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই সেই একক গ্লোবাল অর্থনীতির একেকটা অংশ মাত্র। যারা পরস্পর পরস্পরের সাথে পণ্য, বিনিয়োগ, বাজার কাঁচামাল ইত্যাদি মাখামাখি একাকার হয়ে শেয়ার করে চলে। পরস্পর বিনিময় লেনদেনে জড়িয়ে আছে, ফলে তাদের সব কিছুই গভীরভাবে আবদ্ধ ও পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ও সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। কথাগুলো গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থেও সত্য, এমনকি আবার ইইউ’র সাথে ব্রিটেনের সম্পর্ক অর্থেও সত্যি।
নেদারল্যান্ডের মাসট্রিক্ট শহরে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ১৯৯২-৩ সালের স্বাক্ষরিত চুক্তির ভেতর দিয়ে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ এক রাষ্ট্র জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। যে এই জোট বাধা শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে ভিন্নভাবে কেবল ইউরোপীয় উৎপাদক কোম্পানিগুলো কিছু পণ্যের কমন বাজার জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশে। বিগত ১৯৫১ সালে জন্ম নেয়া ঐ প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি’। পরবর্তীকালে এটা আর কয়েকটি পণ্য থেকে শুধু সব পণ্যই বিক্রির কমন বাজারের জোট নয় – কমন মুদ্রা, কমন শ্রমবাজার ও কমন পণ্যবাজার ইত্যাদি বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রের জন্য এক কমন মার্কেট কায়েম করে ফেলেছিল। এটাই আরো এগিয়ে কমন আদালত, কমন পার্লামেন্ট, বিভিন্ন ইস্যুতে যেমন পরিবেশ বিষয়ে এক কমন নীতি ইত্যাদি শেষ করে এগিয়ে যাচ্ছিল যার লক্ষ্য ছিল কমন এক রাষ্ট্রে পৌঁছানো। এ সব কিছুর মূল তাৎপর্য ছিল নিজেদের বিশাল কমন বাজার। যেকোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রের কোন পণ্য উৎপাদক কোম্পানী কমন ইউরোপীয় বাজারের আয়তনের কথা চিন্তা করে নিজ উৎপাদন পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতা সাজাতে পারে। কমন ইউরোপীয় একজোটের শক্তি হয়ে এবার গ্লোবাল বাজার শেয়ার কতটা নিজের জোটের পক্ষে আনা যায় এজন্য লড়তে পারে। আবার চাকরিজীবী বা শ্রম অবাধে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো জায়গায় ভ্রমণ করতে ও অবাধে চাকরি নিতে পারে। মূলত এই দিকগুলোর সুবিধার কথা ভেবে সব সদস্য রাষ্ট্রের ভোটাররা এক ইইউ’র পক্ষে থাকার ভোট দিয়ে থেকেছে। অর্থাৎ ইইউ’র পক্ষে থাকলে বিরাট কমন বাজারের সুবিধা পাবে এটা কোম্পানীগুলো যার যার জায়গা থেকেই দেখতে পায়। আর যেকোনো শ্রমজীবী চাকরি খোঁজার বিরাট বাজার পাবে, এই লোভে ইইউ’র পক্ষে থাকে।
এগুলো গেল ইইউ’র অভ্যন্তরীণ দিকের সুবিধা। আবার বাইরের দিক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের কলোনি মালিকদের কলোনি ক্যাপিটালিজমের রুস্তমির দিন শেষ হয়ে যায়। শুরু হয় আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানির ক্যাপিটালিজমের যুগ। এখানে আমেরিকার সাথে তুলনায় ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রই আর প্রতিযোগী হিসেবে হাজির হওয়া দূরে থাক,  আমেরিকান অর্থনীতির ধারে-কাছে গোনায় ধরার মতো কেউ ছিল না। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনে বাজার, শ্রম ও মুদ্রার কমন ব্যবস্থা তৈরির পেছনে প্রধান প্রণোদনা ছিল যে এই নতুন উদ্যোগের পরিণতিতে তারা আমেরিকার প্রতিযোগী না হতে পারলেও অন্তত গোনায় ধরার মত অবস্থায় পৌছাবে আর গ্লোবাল পণ্য বাজার শেয়ারের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যেন ইইউ’র দখলে আসে। এই লক্ষ্যে তাই তাদের মূল চালিকাশক্তির মৌলিক অবস্থান ছিলঃ নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা করে শক্তি ক্ষয় না করা, বরং আপন সক্ষমতাগুলোর সমন্বয় করা। আর সেই মিলিত সম্মিলিত ক্ষমতা দিতে ইইউ’র বাইরের সবার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা করা। এভাবে গ্লোবাল বাজার শেয়ার নিজেদের পক্ষে বাড়ানো। তবে ব্রিটেন শুরু থেকেই অমনোযোগী ছাত্রের মত আচরণ করে গেছে। ১৯৫১ সালের ইইউ উদ্যোগে যোগ দিয়েছে ১৯৭৩ সালে। এভাবে ইইউ’র একই মুদ্রা ইউরো তো ঢুকেই নাই এ’বাদে প্রায় সব কিছুতে ইইউ’র সাথে নানান স্পেশাল খাতিরের শর্তে। ফলে এভাবে এক কথায় বললে বিগত প্রায় ষাট বছরের বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে। আর এখন এক দিনের গণভোটের ফলাফলে ইইউ ভেঙে ব্রিটেন বেরিয়ে চলে যাওয়ার পথে।
গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ যে জিতেছে সেটা মূলত কার ওপর নির্ভর করে? সমাজের কোন অংশ?  বলা বাহুল্য সাধারণ ভোটার, চাকরি বা শ্রমজীবী এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্থাৎ ইইউ ত্যাগের পক্ষে গেলে ব্রিটেনবাসী আমজনতার চাকরি পাওয়ার সুবিধা বাড়বে  এই বিবেচনা এটা এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। চাকরির সুবিধা বাড়বে কি না সেটা তো এখন বোঝা যাবে না। বাস্তবে কী দাঁড়াবে তা তো বোঝা যাবে বাস্তবে ইইউ ত্যাগ করে যাওয়া কার্যকর হবার পরে। তাহলে এখন কিসের ওপর নির্ভর করবে? নির্ভর করবে কাজ-চাকরির সুবিধা বাড়বে কি না এ নিয়ে যে পারসেপশন, মানুষের যে ধারণা অনুমান (অনুমান মানে শ্রেফ আন্দাজে অনুমান, যা সত্যি নাও হতে পারে) তার ওপর। এই পারসেপশন তৈরি করছে কী কী ফ্যাক্টর তা খুঁজে দেখতে হবে। তবে তা বলার আগে আমাদের কাছে এ বিষয়ে একটা আগের উদাহরণ হলো গ্রিস। গ্লোবাল মহামন্দা (২০০৮)-এর ধাক্কা  দুনিয়ার সবাইকে কম-বেশি সবাইকে সহ্য করতে হলেও তা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় গ্রিসে। বাস্তবতা হলো রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যায় এতে। আর তা থেকে ছুটে বের হতে গ্রিস শেষে ইইউ’র কাছে আগামি  ত্রিশ বছর ঋণগ্রস্ত গোলাম হয়ে থাকার পথ বেছে নেয়। আর এর অন্যথা অন্য একটা ছিল – ইইউ থেকে মানে ইউরো মুদ্রার জোন থেকে বেরিয়ে গ্রিসের নিজ পুরানা মুদ্রায় ফিরে যাওয়া, যার সার কথা নতুন মুদ্রার মূল্য ইউরোর প্রায় অর্ধেক বলে ঘোষণা দেয়া বা ডিভ্যালুয়েশন। কিন্তু গ্রীসে এ নিয়ে কয়েকবার গণভোট বা সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পরও দেখা গেল গ্রিসে তবু ইইউ এ থেকে যাওয়ার পক্ষ জয় লাভ করেছে। এর সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয় যে, কেবল গ্রিসের বদলে সারা ইউরোপে কাজ খোঁজা ও পাওয়ার সুবিধা পাওয়া যাবে, সাধারণ ভোটার চাকরিজীবী, শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই লোভ ত্যাগ করতে পারল না বা কাজ পাওয়ার দিক থেকে ইইউ ত্যাগ সেটা বেশি বড় বিপদের মনে করল।
গ্রিস ইইউ থেকে বের হয়ে আসবে কীনা তা নিয়ে উঠা তখনকার সামাজিক রাজনৈতিক  উত্তাপ এখনকার ব্রিটেনের চেয়ে কয়েক গুণে উত্তপ্ত ও সরব ছিল। কিন্তু গ্রীসে বারবার ভোটের ফলাফল দেখা যায়,  ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষ জিতেছে। ব্রিটেনের পরিস্থিতিতে জনমত জরিপ অবশ্য আগে থেকেই ইঙ্গিতে বলছিল যে ইইউ-ত্যাগের পক্ষ জয় লাভ করবে। অনেকে যদিও বলছে ইদানীং জরিপের ফল বাস্তবের উল্টা দিচ্ছে। সে কথাও ঠিক।
তবে সাধারণ ভোটার বলতে চাকরিজীবী বা শ্রমজীবীদের সবাইকে এক কাতারে সাধারণ করে দেখিয়েছি বটে, কিন্তু ভোটের প্যাটার্নের দিক থেকে এরা সবাই একমুখী নয়। যেমন বাংলাদেশী অরিজিন, যারা হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সাথে জড়িত তারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দিয়েছে বলা হচ্ছে। তাদের কাছে সারা ইউরোপ কাজ চাকরি পাওয়ার দিকটি ততটা লোভনীয় নয়। এর চেয়ে ত্যাগ-পক্ষ জিতলে তাহলে তাদের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনকার প্রতিদ্বন্দ্বী রোমানীয়রা ব্রিটেন ছেড়ে বিদায় নেবে। এতেই তারা তাদের ফায়দা দেখে নাকি ভোট দিয়েছে। আপাতত এটাই তাদের মুখ্য লক্ষ্য। ফলে তাদের ধরনের কাজ ব্রিটেনেই পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বলে তারা আশা করছে।
এত গেল শ্রমের কাজ পাওয়া না পাওয়ার পারসেপশন। কিন্তু ত্যাগ পক্ষের জিতে যাওয়ার অর্থ হবে ভয়াবহ; এর অর্থ হবে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, টাক্স বেড়ে যাওয়া, বাজেট কাটছাঁট করা, হাউজিংয়ের মতো খাত ধসে পড়া এটাই একলা চলতে চাওয়া ব্রিটেনের অর্থ। সাধারণভাবে এর মূল কারণ হল, ইইউতে অন্তর্ভুক্ত থাকা মানে বাজার বড় বলে অনেক খরচই ভাগাভাগি হয়ে কমে যায়, একই অবকাঠামো সবাই শেয়ার করা যায় বলেও খরচ কমে আসে। বহু অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায় পরস্পরের সক্ষমতা  খোয়ানো তাতে এড়িয়ে যাওয়া যায়। তাই ইইউ ত্যাগ করলে এই খরচগুলো এবার চেপে বসবে। এ কারণে ইইউ ত্যাগ না করার পক্ষে ব্যবসায়ী, ট্রেডার ব্যাংকার বা বিনিয়োগকারী ধরণের সবাই সোরগোল তুলেছে। যদিও এটা ঠিক কেবল ব্যবসায়ী, ট্রেডার ব্যাংকার বা বিনিয়োগকারী ধরনের লোকদের স্বার্থের বিষয় নয়। আবার যদিও টপ সাত শিল্পায়িত রাষ্ট্রপ্রধানের ক্লাব জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন বহু আগে থেকেই রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে সুপারিশ করে যাচ্ছিল, যাতে গণভোটে ব্রিটেন ইইউ ত্যাগের পক্ষে সিদ্ধান্ত না নেয়। ইতোমধ্যে আইএমএফও ত্যাগের বিপক্ষে বিরাট বিরাট বিপদের হুঁশিয়ারির কথা বলে গিয়েছিল। এর প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চান লাগার্ডে বলেছিলেন, শেয়ার মার্কেট ক্রাশ করতে পারে। ইতোমধ্যে তা হওয়ার আলামত শুরু হয়ে গেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, অর্থনৈতিক মহামন্দা চেপে বসতে পারে। ইতোমধ্যে চীনের শেয়ারবাজার শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বড় কারণ ব্রিটেন হল, চীনা ইউয়ান মুদ্রা বিনিময়ের বাজার, ইউয়ান ভাঙ্গিয়ে অন্য গ্লোবাল মুদ্রায় নিয়ে যাওয়ার মূল মার্কেট। ব্যাংকার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জর্মানির দুটো ব্যাংক, যারা ব্রিটেনে ব্যবসা করে এরাও প্রায় একই রকম বিপদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি প্যারিস সফরে গেলে প্যারিসের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে থাকতে বলেছিলেন। ত্যাগ-পক্ষ জিতলে ফ্রান্সে আশ্রয় নেয়া রিফিউজিরা ব্রিটেনে চলে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে, সীমান্তে ভিড় করতে পারে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে এগুলো পড়ার সময় মনে রাখতে হবে এসব মন্তব্যগুলো তখন কেবল ব্রিটেনের ক্ষতির কথা ভেবে বলা হয় নাই। কারণ ব্রিটেন বের হয়ে গেলে ইইউও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা বিখ্যাত পত্রিকা লল্ডন ইকোনমিস্টের অবস্থান। ফলে চেইন রিয়াকশনে সারা গ্লোবাল ইকোনমিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এসব ভেবে এই হুঁশিয়ারি।
এবার শেষ করব, আরেক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার কথা বলে। আমেরিকার একটি পত্রিকাটির নাম ‘ফাইনান্সিয়াল সেন্স’। নাম শুনে কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন অনেকে যে, এটা ওয়াল স্ট্রিট বা বিশাল বিনিয়োগ পুঁজি বা পুঁজিবাজার কোম্পানির আড়ত মোকাম আছে ওয়াল স্ট্রিট নামে ঐ জগতের পত্রিকা। এই আর্টিকেলের লেখক ড্যানিয়েল পার্ক পুঁজিবাজারের বিশেষজ্ঞ পরামর্শক, তাদেরই মন্তব্যের পত্রিকা এটা। ঐ রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘ব্রেক্সিট গণভোট তো শুরু কেবল’। কিন্তু কিসের শুরু? কিসের কথা বলছেন তিনি? তার কথাগুলো সার করে এখানে বলব।

তিনি বলছেন মূল সমস্যা হলো, “একবার যদি মানুষের হাতের সঞ্চয় ফুরিয়ে যায়, আয় বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় আর সেই সাথে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার স্থবির পালা হয়ে চলাচলহীন জমে ওঠে ফলে যা আবার ধার দিবার জন্য উদ্গ্রীব – খুবই নিচু শূন্যের কাছাকাছি অথবা শূন্য সুদে ধার দেয়ার জন্য তৈরি  হয়ে বসে আছে, কিন্তু বিতরণ করতে পারছে না কারণ বাজারে ধার গ্রহণের লোক নেই, ঋণ গ্রহিতা ক্রেতা নাই, ক্রেতার বাজার নেই বা ক্রেতারা বাজারে নাই”। এবার তিনি এক বিজ্ঞাপন সাথে এনেছেন তার কথাটা প্রমাণ করার জন্য।নিচে বিজ্ঞাপনটা কপি করে দেয়া হল। DODGE – এটা আমেরিকান এক গাড়ী প্রস্তুতকারক কোম্পানীর নাম।

https://i0.wp.com/www.financialsense.com/sites/default/files/users/u199/images/2016/June-Zero-No-Payments-238x488-Website-Panos-en-0002-caravan-238x488.jpg

তিনি বলছেন, আজকের গাড়ি বিক্রির বাজারে ঠিক এই বাস্তবতাই আমরা দেখছি। ডজ গাড়ি বিক্রির এক বিজ্ঞাপন দেখিয়ে তিনি বলছেন, “এরা শূন্য সুদে তিন, পাঁচ বা সাত বছরের (৮৪ মাস) জন্য ঋণ দিতে চাচ্ছে। এর উপর আবার প্রথম ৯০ দিন কোনো কিস্তি দিতে হবে না বলছে। এছাড়া পরবর্তিতে নতুন নতুন মডেলের গাড়িতে আপগ্রেড করে নেয়ার সুযোগের অফার দিচ্ছে”। ‘ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, আমার ক্রেতা খুবই কম অথবা নেই। তাই আমি আমার সম্ভাব্য ক্রেতার হাতে অর্থ তুলে দিয়ে হলেও আমার ব্যবসার সার্কুলেশন চক্র চালু রাখতে চাচ্ছি। দেনার ওপর দেনা বাড়িয়ে হলেও টিকে থাকতে চাচ্ছি। ঋণ-গ্রহীতার বাজারের এমনই দুরবস্থায় পৌঁছেছে।” তাহলে কিসে তিনি এ থেকে সমাধান দেখছেন?
তিনি বলছেন রেডি হওয়ার জন্য। কিসের জন্য রেডি? তিন দশক ধরে যে দম ধরা অবস্থা চলছে এর ভেঙেচুরে পড়া বা ছেদ সমাপ্তি দরকার, তিনি চান। সব দেউলিয়া হয়ে ভেঙ্গে পড়ুক, এরপর পুনর্গঠন করে নিবার সুযোগ আসবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা আসুক  – ইত্যাদি সব এগুলো দেখার জন্য তৈরি হতে হবে। দুনিয়া এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এর পরিশুদ্ধতা ( খ্রিষ্ট ধর্মীয় এক শব্দ ও  ধারণা -‘ক্যাথরেসিস’ ব্যবহার করেছেন তিনি) দরকার। এ জন্য প্রবল উদ্যমী একটা ‘সৃষ্টিশীল ধবংসের’ (ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন) কথা তিনি প্রস্তাব করেছেন, যা পরিশেষ আমাদের বাসাবাড়িগুলোতে বসবাসকারিদের হাতে সঞ্চয়ের ঢল নামাবে। এটা ঘটার আগে ‘ব্রেক্সিট মেক্সিট বহু কিছু বিপর্যয় আমরা দেখব। এভাবে আমরা বহু ভাঙন আর পুনর্গঠন দেখতে পাবো, কিন্তু তাতে আমরা যেন আঁতকে না উঠি।’

[আগামিকাল দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত হবে।]