ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

গৌতম দাস

৩০ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৩

http://wp.me/p1sCvy-2fK

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশ সফর সমাপ্ত করলেন। নয়দিন ব্যাপী এই সফর ট্রাম্পের সৌদি আরব সফর দিয়ে শুরু হয়ে বেলজিয়াম  সফর দিয়ে শেষ হয়েছে। বেলজিয়াম বলা হলেও এটা আসলে ছিল আমেরিকার ইউরোপের বন্ধুদের সাথে নীতি সমন্বয়ের সফর যেখানে অন্তর্ভুক্ত গ্রুপ সেভেন ( G7, মানে শীর্ষ সাত বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রজোট বা ক্লাব)  এর মিটিং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মিটিং আর ন্যাটোর সাথে মিটিং।

চলতি মে মাসের ২০-২১ তারিখে ছিল ট্রাম্পের রাজকীয় সৌদি আরবে সফর। এটা সেই একই ট্রাম্প, যিনি গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েই তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘মুসলিম ব্যান’ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, সব মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সেটা তাঁর মুরোদে না কুলালেও অন্তত সাত মুসলমান দেশ থেকে রওনা দিয়ে এসে আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি। তবে তিনি তার সেই আদেশও টিকাতে পারেননি। আমেরিকান আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে সেটা রদ হয়ে যায়, এবং পরপর তা দু’বার। সেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মুসলমানদের খুবই গুরুত্বপুর্ণ দেশ, সৌদি আরব সফরে গেছিলেন। তাঁকে যেতেই হয়েছিল, সবই ভাগ্যের পরিহাস! কারণ প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার প্রথম বিদেশ সফর এই সৌদি আরবেই। আর আমেরিকান সরকারের জন্য খুবই লোভনীয় কিছু সেখানে হাজির হয়েছিল, তাই।  ফলে কী ছিল এই লোভনীয় সফরে?

মাত্র ২৫ বছর ব্যবধানের (১৯১৪ আর ১৯৩৯) দুনিয়া দুই বিশ্বযুদ্ধ দেখেছিল।  দুনিয়ার ইতিহাস ভুগোলের আগা-পাশ-তলার বহু কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছিল সে যুদ্ধ। বিশেষ করে ইসলামি জনগোষ্ঠীর সর্বশেষ এক খলিফার শাসনাধীন অটোম্যান সাম্রাজ্যকে প্রথমে ভেঙে দুই বড় টুকরোয় ভাগ করে নিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী ততকালীন ব্রিটিশ আর ফরাসি সরকার। এরপর দুই অংশেরই তস্য টুকরো টুকরা করা শুরু করেছিল। ব্রিটিশ অংশ থেকে এক বড় টুকরা ভাগ নিয়ে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা (আবদুল-আজিজ আল-সৌদ) ইবনে সৌদের হাতে ১৯৩২ সালে রাজতন্ত্রী সৌদি আরব রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অবশ্য তাহলেও আমেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষে, ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মিসর সফরে এসে কিছু আরব নেতার সাথে দেখা করেছিলেন। সে সময় বাদশাহ ইবনে সৌদ আর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে প্রথম শীর্ষ বৈঠক হয়েছিল সুয়েজ খালে নোঙর করা আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কুইনসে বসে। সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক অনেক পুরনা, সৌদি আরবের জন্মের মাত্র ১৩ বছর পর থেকে যা এখনও বর্তমান। সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘এশিয়ান টাইমস’ গত ১৮ মে সংখ্যায় এসব পুরনো ইতিহাস স্মরণ করেছে।
এক রাজকীয় রেওয়াজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি বাদশাহ এক কাপ কড়া সৌদি কফি পান করতে দিয়েছিলেন তার বিশেষ অতিথি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে। প্রেসিডেন্ট শান্তভাবে সে কফি পান করার পরে রাজা ওই কাপ মেঝেতে আছড়ে ভেঙে ফেলে বলেছিলেন, “আপনি আমার কাছে খুবই বিশেষ একজন। তাই এই কাপ আপনার পর আর কেউ যেন ব্যবহার করতে না পারে তাই ভেঙে ফেললাম”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই নায়ক রুজভেল্ট দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ওই সফরের দু’মাসের মাথায় সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই মারা যান; তবু বলা যায়, এই রিচুয়াল দিয়ে সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ভালোভাবেই কার্যকর হতে পেরেছিল। এশিয়ান টাইমস লিখছে, “ইবনে সৌদের সাথে রুজভেল্টের চুক্তি হয়েছিল যে, সৌদি তেলের বিনিময়ে আমেরিকা ইবনে সৌদ ও তার উত্তরাধিকারীদের সৌদি সরকারগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে”। (In exchange for Saudi oil, the Americans promised to support the kingdom, militarily and politically, under Ibn Saud and all of his successors. )। পরে এই সম্পর্ক আরেক উঁচুপর্যায়ে পৌঁছেছিল প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে ১৯৭৪ সালে। বলা ভালো, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর শেষ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের হার হয়েছিল আর এর প্রতিক্রিয়ায় পরের ছয় মাস ধরে তেল অবরোধ চলেছিল।
ইসরায়েল সমর্থক আমেরিকা ও তাদের বন্ধু অন্য রাষ্ট্রগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল এই তেল অবরোধে। এই অবরোধের সমাপ্তিতে নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে সৌদি-আমেরিকা পরস্পরের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হিসেবে অনুভব করেছিল। সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন এমন  প্রথম আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি সফরে গিয়ে তাদের সেই সম্পর্ক আরো পাকা করেছিলেন। ফলে সৌদি আরবের মনে হয়েছিল আমেরিকান প্রটেকশনের প্রতিশ্রুতিতে সৌদি আরব শাসনে রাজতন্ত্র ব্যবস্থার আয়ু আরো দীর্ঘ হয়েছে এবং তা যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে থিতু অবস্থায়। কিন্তু সৌদি আরবের সেই সুখ অনুভব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব আবার এক অনিশ্চয়তা হিসেবে সৌদি রাজ শাসনের উপর ছায়া ফেলেছিল। ইরানের বিপ্লব রাজতান্ত্রিক শাসনের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন তুলে নড়বড়ে করে দেয়ার ক্ষমতা নিয়ে হাজির হয়েছিল। তবে আরেক দিক থেকে দেখলে ইরানের এই বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি আমেরিকাও। কারণ সে শাহের ইরান হারিয়েছিল এবং বিপ্লবের ফলে ইরানের সাথে আমেরিকার আবার সহসাই কোনো ধরনের সম্পর্ক ফিরে  তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে ইরান-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্ক সেই থেকে খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়ে যায়। তবে উল্টা দিকে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের প্রায় স্থায়ী হয়ে যাওয়া খারাপ সম্পর্ক সৌদি আরবকে স্বস্তি দিয়েছিল। সৌদিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময়ই এবং এই সঙ্ঘাতের দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্যেই সৌদি আরব রাজতন্ত্রের ভাগ্য নিহিত। পরের ৩৫ বছর ধরে ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময় থেকেছে। তদুপরি, ইরানের ওপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে যথেষ্ট ভুগিয়েছে।
সবশেষে ২০১৫ সালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসনের আমলে এক ‘নিউক্লিয়ার ডিল’-এর বিনিময়ে, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেয়া শুরু হয়েছিল। আর সেই থেকে সৌদি আরবের অস্বস্তি আর অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। রাজপরিবার সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম চিন্তিত হয়ে পড়ে।
ওবামা প্রশাসন ইরানের সাথে ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ কেন করতে গিয়েছিল এর প্রধান কারণ ছিল আইএস মোকাবেলায় ইরানকে পাশে পাওয়া এবং অনেক দায় ও খরচ ইরানের ওপর দেয়ার সুযোগ নেয়া। কারণ ইরাকের ওপর আইএসের আক্রমণ ও তৎপরতার চাপ বাড়ছিল। ওবামা প্রথম টার্মে তো বটেই, দ্বিতীয় টার্মেও সামগ্রিকভাবে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে ‘আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার’ আর বিশেষ করে ‘মাঠের সৈন্য প্রত্যাহার’ এই নীতিতে পরিচালিত হচ্ছিলেন। এর মূল কারণ ছিল, আমেরিকান অর্থনীতির যুদ্ধের খরচ মিটাতে অপারগতা হয়ে পড়েছিল। ফলে ২০১৪ ডিসেম্বরকে আগেই কাট-অফ ডেট ঘোষণা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ এটাও ছিল যে, আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়া অন্তহীন যুদ্ধে থেকে দেশকে বের করে আনা। অথচ ২০১৫ সালের আইএসের তৎপরতা সেখানে মাঠের সৈন্য বাড়াবার তাগিদ হাজির করছিল। এই অপারগ পরিস্থিতিতে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ জোট তৎপরতায় ওবামা ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করে পেতে চাইলেন। বিশেষ করে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকার ইরাক দখলের পরের ইরাক ইরান প্রভাবিত মালেকী সরকারের হাতেই চলছিল। ফলে ওবামার হিসাব হলো, ইরাক সরকারের সাথে ইরান এসে যোগ দিয়ে তারাই ইরাকে আইএস তৎপরতা রোধের বাড়তি দায়িত্বে নিক। তাতে খরচের ও সামরিক দায়ের এক বড় অংশ ইরান সরকারই বহন করবে।
আর ওবামার এই নতুন নীতিকে সৌদি সরকার ঘোরতরভাবে নিজ স্বার্থবিরোধী এবং বিশেষ করে নিজ রাজতন্ত্রের আয়ূর দিক থেকে বড় বিপদ হিসেবে দেখেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকার ওপর সৌদি ক্ষোভ আর হতাশা কত তীব্র হয়েছিল তা বুঝার একটা উপায় হলো সৌদি আরব রাশিয়ার পুতিনের সাথে নিজের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলেছিল। আমেরিকার বদলে নিজের সুরক্ষার কাজ রাশিয়ার সাথে করা যায় কিনা, রাশিয়াকে দেয়া যায় কিনা সে আলোচনায় বসেছিল। তখনও রাশিয়া থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের অস্ত্র সৌদি আরবের দিক থেকে ক্রয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কিন্তু শর্ত ছিল, সিরিয়াসহ পুরা ইরানি ব্লক থেকে রাশিয়াকে দূরে সরে আসতে হবে। কিন্তু রাশিয়ার কাছে স্থায়ী ও কৌশলগত সম্পর্কের দিক থেকে ইরান-সিরিয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার বলে গণ্য করে, দখল করে আছে। ফলে সেই প্রস্তাবিত রাশিয়ান ডিল কোনো ইতি পরিণতি পায়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রার্থিতার মধ্যে আশার আলো দেখেছিল সৌদি আরব। কারণ, যেটা বুঝা গিয়েছিল, কোন ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট ফিরে এলে ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ উল্টে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে রিপাবলিকান হলে কিছু হলেও সম্ভাবনা আছে, যদি সবটা নেই। কারণ এটা শুধু ইরান-আমেরিকান সমঝোতা নয় বরং এটা জার্মানিসহ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের (৫+১) সাথে একযোগে ইরানের ডিল।
তবু এক কথায় বললে, ট্রাম্পের এই সৌদি সফর ছিল এক পুরোপুরি আই ওয়াশ। দেখানো হয়েছে, সৌদি উদ্যোগে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিলের নেতৃত্বে এক “আরব ন্যাটো” গঠন করা হয়েছে।আর আসলে  তা অপ্রকাশ্যে হল এক ইরানবিরোধী সুন্নি রাষ্ট্র জোট। আর কাজের সৌদি উদ্দেশ্য হল,  সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর জনগণ না হোক অন্তত সরকারগুলোকে নিজের রাজতন্ত্রের পক্ষে ‘বুক’ করে রাখা। যাতে সৌদি আরবের রাজতন্ত্র ভিত্তি কোন ক্রাইসিসে পড়লে এই সরকারগুলোকে সৌদি আরব আগে থেকেই নিজের পক্ষে পাবে।  তামাশার দিকটা হলো এই ‘আরব ন্যাটো’ এটা করা হলো ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি রাষ্ট্রজোট’ বলে। আর এই জোটের উদ্বোধন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে দিয়ে করিয়ে তার মুখ দিয়ে ইরানবিরোধী বুলি হাজির করা হলো। তার মানে এখানে “সন্ত্রাসবাদ” বলা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই সন্ত্রাসবাদী হল ইরান!
তাই এমন কোনো মিডিয়া দেখা যায়নি, আমেরিকা্নর ভিতরের বা বাইরের, যে ট্রাম্পের এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে অথবা ফেসভ্যালুতেই সম্মেলন যা কিছু বলা হয়েছে তা বিশ্বাস করেছে। যেমন  সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট তার আর্টিকেলের শিরোনাম করেছে, “New tricks Donald Trump’s reset on Islam” যার ভিতরে প্রায় প্রতিটা বাক্যই ট্রাম্পের শঠতা প্রসঙ্গে লেখা। লিখেছে, ট্রাম্পের এই সফরকে ওবামার ২০০৯ সাল কায়রো সফরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ঐ সফরে ওবামা তার আগের প্রেসিডেন্ট বুশের ওয়ার অন টেররের নীতির কারণে ক্ষুব্ধ মুসলমানদের অভিযোগ শুনে তাদের মানায় নেবার চেষ্টায় বক্তৃতা করেছিলেন। আর এখন ট্রাম্প হাজির হয়েছেন নিজের ইসলামোফোবিক যতসব বকোয়াজ নিয়ে নিজেই এক বোঝা হিসাবে হাজির হয়েছেন। (“But whereas Mr Obama attempted to mend the damage wrought by the war in Iraq, Mr Trump was burdened by his own Islamophobic rhetoric)“। ইকোনমিস্ট আরো বলছে, ট্রাম্প এই সফরে চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়ার কথা বলেছেন। আবার বলেছেন এই যুদ্ধ বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেকার লড়াই নয় এটা নাকি ভাল মানুষ আর শয়তানের লড়াই (“not a battle between different faiths”, but “between good and evil”)।  ট্রাম্প সেখানে ইরানের  মানবাধিকারের রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন বলেছেন, ইরানকে ঝাড়ি দিয়েছেন। অথচ ট্রাম্পের হোস্ট সৌদি আরব তার রেকর্ডই আরও বেশি খারাপ। আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে ইরানের চেয়ে সৌদি লোক বেশি।

ওদিকে নিউইয়র্ক টাইমস ২১ মে আর এক রিপোর্ট বের করেছে যার শিরোনাম হল, “ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্প সৌদি আরবে সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর কাছে পৌচেছেন” (In Saudi Arabia, Trump Reaches Out to Sunni Nations, at Iran’s Expense)। ঐ রিপোর্টে টাইমস লিখেছে ট্রাম্প তার বক্তৃতায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আরব স্বৈরশাসকদের সাথে আমেরিকার বিশেষ শখ্যতার যে পুরান নীতি আমেরিকার ছিল তাতে তিনি  ফিরে আসতে চলেছেন। তাতে এসব স্বৈরশাসকদের মানবাধিকার রেকর্ড যতই খারাপ হোক না কেন; আর এদের কারণে বিভিন্ন জায়গায় আমেরিকার বদনাম বা স্বার্থহানি যা কিছুই হোক না কেন – প্রেসিডেন্ট আরব রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (In using the headline address of his first foreign trip as president to declare his commitment to Sunni Arab nations, Mr. Trump signaled a return to an American policy built on alliances with Arab autocrats, regardless of their human rights records or policies that sometimes undermine American interests.)

এসব ত গেল আরব স্বৈরশাসকের সাথে আমেরিকার মহান নেতা ট্রাম্প কী করবেন, কী শখ্যতা গড়বেন  আর নতুন তাদের বয়ানে ইরানই হল সন্ত্রাসবাদের নেতা – এসব পুরান ধান্দার কথা আমরা কমবেশি জানি। ফলে এই সফর আসলে ছিল ট্রাম্পের “ইরান ব্যাসিং” (ঝাড়ি মারা) করে আরব স্বৈরশাসকদের কোলে উঠে পড়া।  কিন্তু তাহলে ইরান-আমেরিকান যে “নিউক্লিয়ার ডিল”  ওবামা দুবছর আগে রচনা করে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী তা ফেলে দিয়েছেন? ঐ চুক্তিত স্টাটাস কি এখন?

ফ্যাক্টস হল এই সফরে ইরানের বিরুদ্ধে  ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন চাপা মারুন না কেন, বাস্তবতা হল, ট্রাম্প ওবামার ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ থেকে একচুলও পিছু হটেন নাই। বরং আমেরিকার প্রভাবশালী রেডিও-এর ওয়েব সাইট এনপিআর (NPR,ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও) এর ১৭ মে-এর রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্প প্রশাসন (ইরান অবরোধ প্রয়োগ না করে ছাড় দেয়ার ওবামা নীতি বজায় রাখছেন, নিউক্লিয়ার ডিল্কে বাচিয়ে রাখছেন” (Trump Administration Upholds Iran Sanctions Waiver, Keeping Nuclear Deal Alive)। এরপর ঐ রিপোর্ট ব্যাখ্যা করেছে কেন ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের পথে। লিখেছে, “ইরানের সাথে এই চুক্তির অংশীদার একা আমেরিকা নয়, সাথে ইইউ রাশিয়া এবং চীনও। ফলে আসলে ট্রাম্প প্রশাসন এই ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি ভাঙ্গার দায় নিয়ে পারবে না। কারণ এরপর তাহলে আর  কোন পার্টনার খুজে বের করা অসম্ভব হবে। এবং সেসব পার্টনারেরা এখনও এই চুক্তি ধরে রাখার পক্ষে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে”।

ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি অনুসারে, ইরান তার উপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ পশ্চিম শিথিল করবে আর এর বিনিময়ে ইরান নিজের নিউক্লিয়ার কর্মসুচি কাটছাট করে সীমিত করে আনবে। কিন্তু যেসব অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে তা নিয়মিত সময় অন্তর পরীক্ষা করে দেখে সব ঠিক থাকলে তা রিনিউ করে দেয়া দরকার। গত ১৭ মে ছিল ট্রাম্পের আমলে এসে এর প্রথম ডেডলাইন।  এই পটভুমি  পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আর এক গুরুত্বপুর্ণ পত্রিকা “মনিটর” জানাচ্ছে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ফরেন সেক্রেটারী টিলারসন বলেছেন “১৮ এপ্রিল কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে তিনি সার্টিফাই করে জানিয়েছেন, ইরানি ডিলে ইরান সঠিকভাবে তার করণীয় শর্তাবলি মেনে চলছে”। (Secretary of State Rex Tillerson certified in an April 18 letter to Congress that Iran was adhering to the nuclear deal)।  আরেক কর্মকর্তা বলছেন, আমরা যদিও এখনো পর্যন্ত ইরানি ডিল পুরোটাই পর্যালোচনা করে দেখছি। কিন্তু এইদিন পর্যন্ত যা দেখেছি  তার সবকিছুই ইরান ঠিকঠাক পালন করেছে ফলে তারা চুক্তি বজায় রাখার পক্ষে থাকবে।

 

তাহলে পাগলা ট্রাম্প “উল্টা হাওয়া হয়ে” সৌদি আরবে গেল কেন? কারণ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি হলে ক্রেতার সন্তুষ্টিতে কিছু তো করা দরকার! বোম্বাস্টিং চাপাবাজি কিছু অন্ততঃ! একটু তলোয়ার নাচ নেচে আসলেন – এই আর কী!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২৮ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া ২৯ মে অনলাইন দুরবিন -এ তেও অন্সেয এক ভার্সান ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা

নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা
গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-nD

 

খবরটা প্রথম প্রচারিত হয় ১৫ ডিসেম্বরের বিদেশি মিডিয়ায়। সৌদি আরব নাকি নিজের নেতৃত্বে ৩৪ ইসলামী দেশের এক সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠন করে ফেলেছে। আমাদের দেশে খবরটা পৌঁছায় পরের দিন। দেশে খবরটা আবার প্রচারিত হয়েছে এককাঠি অতিরিক্ত গুরুত্বে যে, বাংলাদেশ ওই জোটে অংশগ্রহণে সম্মতিও প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের দুইজন মন্ত্রীও এ খবরে সায় দিয়ে জানিয়েছেন, খবর পাকা। ফলে খবরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ থাকেনি। কিন্তু গোল বেঁধেছে মূল খবরটা আসলে কী, কিইবা এর তাৎপর্য এসব বিষয়ে। খবরটা নিয়ে মিডিয়ায় যতই  খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, ততই দেখা যাচ্ছে বিভ্রান্তি বাড়ছে; সেটা দেশি এবং বিদেশি মিডিয়া, দুই জায়গাতেই। এই লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে মূল খবরটা আসলে যতটা  প্রচারিত হয়েছে বাস্তবে  জোটের পুর্ন প্রস্তুতির ব্যাপারটা তখনও ততদুর আগায় নাই। অথচ বড় করে তা অনেক আগেই প্রচার হয়ে গেছে এবং করা হয়েছে। এছাড়া খবরের ভেতরেই শুরু থেকে বড় বড় ফাঁক রয়ে গেছে বা রেখে দেয়া হয়েছে। যেমন বেশিরভাগ খবরের শিরোনাম, “সৌদি আরব ৩৪ দেশের এন্টি-টেররিজম কোয়ালিশন গড়েছে” এটা আল জাজিরা থেকে নেয়া। এমন ধরনের শিরোনাম যতটা ভারি ওজনের ভেতরের খবর ততটা ভারি ও পোক্ত মোটেও নয়। যেমন সরাসরি আইএস বিরোধী না বলে  সাধারণভাবে “এন্টি-টেররিজম” জোট বলা হয়েছে। তবু এর অর্থ আইএস বিরোধীতাই হয়েছে। অনেকে সেই কারণেই আইএসের প্রতি ইঙ্গিত থাকে এমন শিরোনাম  দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এটা কী ধরনের জোট? এর ম্যান্ডেট কী? এছাড়া এই জোটের ম্যান্ডেট কী হবে তা নিয়ে কোনো খসড়া কি তৈরি হয়েছে, যা থেকে হবু সদস্যরা পরিষ্কার জানবে কেমন ধরনের জোট হচ্ছে আর ওই জোট ঠিক কী করবে!  জোটে সরকার অংশগ্রহণ করবে বাংলাদেশের মন্ত্রীরা তা স্বীকার করে নেয়াতে এনিয়ে মোটা মোটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ১৭ ডিসেম্বর দৈনিক মানবজমিন ‘মিশ্র প্রতিক্রিয়া’ শিরোনামে রিপোর্ট করেছিল। ওই রিপোর্টে লিখেছিল, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, এটি সামরিক জোট নয়”। স্বভাবতই এ আধা-তথ্যে মানুষ বিষয়টা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু উত্তর পাওয়ার চেয়ে নতুন নিরুত্তর প্রশ্নের সংখ্যাই বাড়াবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘প্রাথমিক আলোচনায় সৌদি আরব আমাদের যে ধারণা দিয়েছে  তা হচ্ছে এটা যুদ্ধ করার সামরিক জোট নয়। এটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি কেন্দ্র হবে। এ জোটের সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই”।  স্পষ্টতই মিডিয়ার খবরগুলো ইতোমধ্যেই যে উচ্ছ্বাস আগ্রহের উত্তাপ বা হাইপ এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে, প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য তাতে পানি ছিটিয়ে গুরুত্ব লঘু করার চেষ্টা। এ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, সৌদি ফরেন অফিস বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলার সময় জোট কী করবে, ফোকাস কী, কোথায় গিয়ে থামবে, সুনির্দিষ্ট কী উদ্দেশ্য ইত্যাদি প্রসঙ্গ ছিল না। বরং এদিকে হওয়ার চেয়ে যেনবা সৌদি ফরেন অফিস থেকে বাংলাদেশকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল সৌদি কোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে কিনা এবং সঙ্গে থাকবে কিনা এতটুকুতেই সীমিত ছিল। জোটের সম্ভাব্য কাজ ভুমিকা ম্যান্ডেট ইত্যাদি ছিল খুব গৌণ। কেবল “সৌদি উদ্যোগ” এই প্রেস্টিজিয়াস জিজ্ঞাসার প্রতি আমরা সমর্থন দিচ্ছি কীনা এটাই মুখ্য বিষয় ছিল। ধাবিত ছিল। ওদিকে ১৮ ডিসেম্বরের প্রথম আলো “সৌদি জোটের ভবিষ্যৎ সংশয়ে” এই শিরোনামে এ’বিষয়ে আরও কিছু সংযোজন করেছে। প্রতিমন্ত্রী ওখানে বলেছেন, “এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দলিল সই হয়ে থাকে। কাজেই এখানেও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আলোচনা করে চূড়ান্ত করার সুযোগ থাকছে”। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য আমাদের অনুমানকে পোক্ত করে। এ বিষয়টাকে তাই আমরা বলছি হবু জোটের ‘উদ্দেশ্য লক্ষ্য’ বিষয়ক কোনো খসড়া এখনও চালাচালিই শুরু হয়নি। তবে একথা ঠিক যে, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিং থেকে বিস্তারিত না জানলেও যা জানা গিয়েছে এসব বিষয়ে ভিন্ন কিছু বক্তব্য ১৫ ডিসেম্বরের রয়টার পরিবেশিত খবর আমাদের আরও কিছু জানাচ্ছে। সেখানে যেমন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়েরকে প্যারিসে সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেছেন “জোটের পক্ষে কোনো সামরিক শক্তি মাঠে নামবে কিনা” এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “সব সম্ভাবনাই টেবিলে আছে”। অর্থাৎ জোটের সামরিক তৎপরতাও থাকতে পারে। তিনি নাকচ করেননি। আবার ৩৪ দেশের জোট গঠনের বিষয়ে সৌদি রাজধানী রিয়াদে ঘোষণা নিয়ে সাংবাদিকের সামনে প্রথম এসেছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহম্মদ বিন সালমান। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, “সন্ত্রাসবিরোধী বলতে তিনি শুধু আইএস নয়, আইএসসহ সব সন্ত্রাসবাদীকেই বুঝিয়েছেন”। তাহলে আমাদের প্রতিমন্ত্রী এখনও অনেক বিষয় আমাদের ব্রিফ করার সময় হয়নি মনে করলেও সেসব প্রশ্নে সৌদি মন্ত্রীদের মনের অনেক ডিটেইল অবস্থান জানা গেছে। তবে একথা ঠিক যে, পূর্বপ্রস্তুতিমূলক বহু কাজ শেষ না করেই এর আগেই সৌদি কূটনীতিকরা মিডিয়ায় হাজির হয়েছিলেন। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের ওপর সৌদি আরবের যে প্রভাব তাকে কাজে লাগিয়ে সৌদি কূটনীতিকদের ঘাটতি তারা আপাতত উতরে গেছেন বা সুবিধা নিয়েছেন। তবে পাকিস্তান তার নাম সৌদিদের তালিকায় দেয়ার আগে কেন তাকে আগে জানানো হয়নি এ নিয়ে প্রথমদিন বিস্ময় প্রকাশ করলেও পরের দিন থেকে তা হজম করে মিটিয়ে ফেলেছে। আর বাংলাদেশ প্রথমদিন থেকেই হাফ ব্রিফিংয়েই সম্মতি জানানোর কথাই সরাসরি স্বীকার করেছে।
ওদিকে এই জোট গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রায় সব বিদেশি মিডিয়া যেদিক প্রশ্ন তুলেছে তা জেনুইন। তারা বলছে, সৌদি প্রস্তাবিত এই জোটে কোনো শিয়া-ইসলাম শাসিত সরকার, যেমন ইরান বা ইরাক সরকারের নাম নেই। ফলে বাস্তবত এটা শিয়া-বিরোধী সুন্নিদেরই জোট হয়ে গেছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুতি প্রশ্নে কয়েক মাস আগেও সৌদিরা এমনই এক জোট (দুবাই, বাহরাইন, জর্ডান, মিসর ও সৌদিদের) তৈরি করে জোটের ব্যানারে নির্বিচারে ইয়েমেনে আকাশ বোমা হামলা চালিয়েছিল। সেখানেও শিয়াবিরোধী সুন্নিদেরই জোটের ছায়া বজায় ছিল এবং ওই বোমাবাজি ৬ হাজার হুতির জীবননাশ ছাড়া ইয়েমেনের সংঘাতের কোনো রাজনৈতিক সমাধানের কিছুই করতে পারেনি। তবে মনের ঝাল হয়তো মিটেছে। এদিকটাতেই সব মিডিয়া ইঙ্গিত করে সৌদি জোট একপেশে শিয়া-বিরোধী জোট হতে চায় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ওদিকে এনিয়ে আমেরিকান প্রতিক্রিয়া বেশ মজার ডিপ্লোম্যাটিক। আমেরিকা স্বাগত জানিয়েছে এং আরও বিস্তারিত শোনার জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ-বিরোধী কোনো অবস্থান তারা নিতে চায়নি। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ১৯৭৩ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকান মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একালে আর সৌদি স্বার্থের সঙ্গে তালমিল রেখে মন যুগিয়ে চলতে পারছে না। বিশেষত যেদিন থেকে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে ‘পারমাণবিক ডিল’ করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল আর শেষে ঐ ডিল স্বাক্ষর হয়েছিল।

মুল বিষয় সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের অবনতি
খুব সংক্ষেপ করে বললে, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর ১৪ বছরে পা দিল অথচ এই যুদ্ধে ন্যূনতম কিছু অর্জন হয়েছে অথবা যুদ্ধ সমাপ্তি বা থামার নামগন্ধ আছে এমন কোন ইঙ্গিতও কোথাও নেই। ওদিকে ২০০৭ সালের শেষ দিক থেকেই এই যুদ্ধের প্রভাব বিশেষত যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে তা ক্রমান্বয়ে ভেঙে ফেলেছে। এককথায় বললে, আমেরিকান সামরিক সক্ষমতা এখনও একই রকম বহাল আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমছে বলে তা সামরিক সক্ষমতার অপারেশনাল কস্ট যোগাতে অযোগ্য হওয়াতে কার্যত তা সীমিত হয়ে গেছে, অকেজো করে ফেলছে। এই দশা থেকে মুক্তি পেতেই আমেরিকাকে ইরানের সঙ্গে ডিল করতে যেতে হয়েছে। কারণ ডিল হওয়াতে এখন আইএস বিরোধ ইরানকেও আমেরিকার পক্ষে মাঠে পাওয়া যাবে। নিজের অক্ষমতার কিছুটা হাল হবে। এটাই আমেরিকান স্বার্থ। আর ঠিক এটাই সৌদি স্বার্থবিরোধী। আসলে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের উতখাতের সময় থেকেই কেবল ইরাক প্রশ্নে কার্যত একটা ঐক্যমত ছিল যে পরবর্তিতে  শিয়াদের দিকে কান্নি মারা এমন একটা ইরাক সরকার হবে যেটা একইসাথে আমেরিকা ও ইরানের পছন্দের। কিন্তু এই ঐক্যমত বা ডিল এর কোন প্রকাশ্য স্বীকৃতি ছিল না। কেবল কার্যত তা প্রতিফলিত হতে দেখা যেত। কিন্তু নতুন করে আইএস হাজির হওয়াতে এই অস্বীকৃত এলায়েন্স আর অপ্রকাশ্য রেখে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। তা থেকেই ইরান-আমেরিকার প্রকাশ্য পারমানবিক ডিল স্বাক্ষর করার বাস্তবতা তৈরি হয়। কিন্তু তাতে আমেরিকার জন্য এক নতুন সমস্যা হাজির হয়। সৌদি সরকার ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর থেকেই কোন ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের ঘোরতর বিরোধী হল। সৌদি রাজতন্ত্র মনে করে খোদ ইরান বিপ্লবসহ ইরানের দুনিয়ায় হাজির থাকাটাই সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি। তবে আগে ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের কোন প্রকাশ্য কিছু না থাকায় এটা সৌদিরা সহ্য করে নিয়েছিল। কিন্তু পারমাণবিক ডিল স্বাক্ষর হয়ে যাবার পর ১৯৭৩ সালের পর থেকে এই প্রথম সৌদি ফরেন পলিসি আমেরিকার থেকে বড় ধরণের ভিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে পরস্থিতি এমন যে  আমেরিকার পক্ষে দুই বগলে দুজন সৌদি আর ইরানকে নিয়ে হেঁটে চলতে সক্ষম থাকা একেবারে অসম্ভব। কারণ এমন কোনো কার্যকর কমন ফর্মুলা নেই, আমেরিকা খুঁজে পায়নি, যাতে সৌদি ও ইরান দুই পক্ষই আমেরিকার সঙ্গে একই সঙ্গে থাকে। এজন্য এরপর থেকে আমেরিকার সঙ্গে পরপর তিনটা সৌদি বিরোধের ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথম ঘটনা মিসরে জেনারেল সিসিকে সৌদিদের ক্ষমতায় আনা এবং এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হল সেটা আমেরিকাকে উপায়হীনভাবে মেনে নিতে হয়েছে। দ্বিতীয়টা হলো, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর সৌদি নেতৃত্বে জোটের বোমা হামলা। এখানেও সৌদি আর আমেরিকান নীতির ভিন্নতা ছিল এবং এখনও আছে। ফলে একা সৌদি ইচ্ছায় ঘটনা গড়িয়েছে। যেটার কোন ফল সৌদিদের পক্ষে আসুক আর নাই আসুক তবে – “আমাদেরটা আমারাই করে নিতে পারি” ধরণের একটা স্বান্ত্বনা সৌদিরা নিজেদের জন্য এনেছে। ইতোমধ্যে সৌদি সরকারের আর এক মরিয়া উদ্যোগ নিয়েছিল যেটা কার্যকর হয় নাই তা হল,আমেরিকার জায়গায় রাশিয়াকে অস্ত্রের সোর্স এবং নিজ ফরেন পলিসি ও রাজস্বার্থের পক্ষে পার্টনার হিসাবে পাবার চেস্টা করে দেখাওপেন দেখা সাক্ষাত আলোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু দুই রাষ্ট্রস্বার্থ এক কমন পয়েন্ট বের করতেে নাই। আর এবারের সৌদি নেতৃত্বে ৩৪ দেশের যে জোট, তা এখনও স্পষ্ট নয় যে, তাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য কী, কোথায় ফোকাস করবে। অথচ সৌদি প্রভাব যা মূলত নগদ অর্থের প্রভাব। এছাড়া বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের জন্য সৌদি প্রভাবে সায় না দিলে নিয়োজিত শ্রম চাকরিচ্যুতি ঘটিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে, এই ভয়। যেটাকে আমরা প্রভাব বলছি। অথচ আমাদের বিপরীত স্বার্থ হলো, আমরা কী সৌদিদের পো-ধরার মাধ্যমে আইএসের খামোখা চক্ষুশূল হওয়ার রিস্ক নিচ্ছি না!এভাবে শত্রুকে দাওয়াত দিয়ে আনছি কিনা সে প্রশ্ন উঠবেই।
ওদিকে এখনও আমাদের সরকারি ভাষ্য হলো, বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই। সর্বশেষ গত সপ্তাহেও আমেরিকান সচিব প্রতিমন্ত্রী নিশা দেশাইদের সাক্ষাতের সময় এটাই বলা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আরও ভালোভাবে উঠবে যে, সৌদি জোটে আমরা যাব কেন? অর্থাৎ আর পাঁচ জায়গায় সরকার যেমন তার সিদ্ধান্তের পক্ষে কোন ন্যায্যতা দেখাতে বা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও গায়ের জোরে তা বাস্তবায়ন করে যায়। ফলে এখানেও আমাদের সৌদি ইচ্ছাকে কদর করতে হবে। এছাড়া খামোখা শিয়া-সুন্নি কোন সম্ভাব্য গোষ্ঠীদাঙ্গায় বিপজ্জনক সম্প্রদায়গত পক্ষ নিতে হবে।

এখানে আর একটা দিক আছে। গত মাসে প্যারিস হামলার পরের পরিস্থিতিতে সেটা আরও উন্মোচিত। এককথায় বললে, একেবারে মরিয়া বা অস্তিত্ব ঠেকে যাওয়া অবস্থা না হলে সারা পশ্চিমের কোন রাষ্ট্র কারও পক্ষেই আইএসের বিরুদ্ধে শুধু আকাশ বোমা নয়, মাঠে নেমে মোকাবিলার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। যুদ্ধের খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। তাই হামলার পরে ফরাসি প্রেসিডেন্টের মেলা হম্বিতম্বির আইওয়াশ আমরা দেখলাম। আইএসবিরোধী জোট এই হয়ে যাচ্ছে, সর্বাত্মক যুদ্ধ এই তো সামনে যেন। অথচ সব ভুয়া শো-আপ মাত্র। আসলে তারা কেবল আকাশ পথে বোমা হামলার খরচটাই শেয়ার করল। এসব আলাপের শেষের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির অনুরোধে ওআইসির এক মিটিং ডাকা হয়। কেরির ইচ্ছা ছিল যদি কিছু খরচ শেয়ার করতে সৌদিরা রাজি হয়! কিন্তু আমরা দেখলাম, সৌদিরা আবার স্বমূর্তিতে; ইয়েমেনের হুতি ইস্যুতে অকেজো নীতির মতোই আবার এক নীতি নিয়ে সৌদিরা হাজির। এ নীতি শুনতে অনেক ভালো লাগছে যে, ৩৪ দেশের জোট। কিন্তু সৌদি নেতৃত্বে এটা কতদূর যাবে, যেতে পারে! এতে আমেরিকার অবস্থা বেয়ারা বাচ্চার বাবার মতো। না সে বাচ্চা বাবার কথা শোনে, না বাবা তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, না শাসন করতে পারে। সেজন্য আমেরিকা সৌদি উদ্যোগকে সরাসরি বিরোধিতা বা উড়িয়ে না দিয়ে কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সৌদি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে এবার বিস্তারে পরিকল্পনা কী তা জানাতে বলছে। আসলে প্রকারান্তরে বলতে চাচ্ছে, সৌদিরা কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দিতে পারবে না। ফলে হতাশ হয়ে যদি সে আমেরিকার নীতির কাছে আবার ফিরে যায়!
সর্বশেষ দেখা গেল চীনও সৌদিদের সমর্থন জানিয়েছে। এটাও চীনের কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান। আমেরিকার কুটনৈতিক দুর্দশার সময়ে সৌদিদেরকে “চালিয়ে যাও” বলে পিঠ চাপড়ে দেয়া।

তবে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্বেগ জানিয়ে যত প্রতিক্রিয়া আমরা প্রকাশিত হতে দেখেছি তা জেনুইন। এই জোট যদি কার্যকর হওয়ার একটু-আধটু চেষ্টা করে তবে তা হবে শত্রুকে একেবারেই দাওয়াত দিয়ে ঘরে ডেকে আনার মতো ঘটনা। এছাড়া আমাদের বাড়তি এক বোনাস মিলবে – শিয়া-বিদ্বেষী এক জনগোষ্ঠী পরিচয়। অন্যের জন্য ভাড়া খাটা।

[লেখাটার প্রথম ভার্সন এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]