ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্পের পলায়ন

ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্পের পলায়ন

গৌতম দাস

২৪ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Bo

 

ড্রোন বিতর্ক, ইরানের হামলা খেয়ে হরমুজ প্রণালিতে কোথায় পড়েছিল
[ড্রোন বিতর্ক, ইরানের হামলা ভুপাতিত আমেরিকান ড্রোন হরমুজ প্রণালিতে কোথায়, সেই ছবি – নিউইয়র্ক টাইমসের সৌজন্য]
শুক্রবারের সকালটা শুরু হয়েছিল অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্যভাবে। প্রথমে হালকাভাবে শুরু হলেও দিন শেষে পরিণতি ছিল ‘পাক্কা’। আসলে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্টের বেইজ্জতি হওয়ার দিন যেন শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকার ‘প্লেবয়’ প্রেসিডেন্ট Trump এবার এক বোকা-ক্যাবলা হয়ে হাজির হয়েছেন। গতকাল প্রথম দেখা গেল – ঢলে পড়া হলেও এখনও গ্লোবাল নেতা আমেরিকা; অথচ এর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন বন্ধুহীন, ইউরোপও তাঁকে বিশ্বাস করে না, তাঁর সাত-পাঁচে নেই বা থাকে না। এমনকি আন্তর্জাতিক মিডিয়াও তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না, তাঁরা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বাইরে খবর খোঁজে। কেন?

বাংলাদেশের শুক্রবার সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে জানা গেল রয়টার্সের ব্রেকিং নিউজ জানাচ্ছে,[ United Airlines suspends Newark-Mumbai flights…] আমেরিকার ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের নিউ ইয়র্ক-মুম্বাই ফ্লাইটটা বাতিল করা হয়েছে।কারণ হিসেবে বলা হয়েছে আগের দিনের এক ঘটনা। আমেরিকান একটি ড্রোন (সামরিক কিন্তু মানুষবিহীন রোবট) বিমান ইরানের আকাশে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়েছিল, যেটা ইরান মিসাইল ছুড়ে ধ্বংস ও ভূপাতিত করে ফেলেছে, এরই প্রতিক্রিয়ায় ঐ ফ্লাইট বাতিল। এ খবর কিছুটা গরমিলের আবার কিছুটা টেনশনেরও মনে হয়েছিল। কারণ, আগের দিন ইরান আমেরিকান ড্রোন [RQ-4 Global Hawk, Drone] ফেলে দিয়েছে কথা সত্য এবং ইরান-আমেরিকা উভয় পক্ষই এটা মিডিয়ায় স্বীকার করেছে। তবে যেটা গুরুত্বপুর্ণ – এটা কোন খেলনা ড্রোন নয়, বরং খুবই উঁচুমানের বা হাইটেক সফিস্টিকেটেড। এর একেকটার মূল্য ১৩০ মিলিয়ন ডলার। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্যাসেঞ্জার বিমান চলাচল করে ৩০-৪২ হাজার ফুট উচ্চতায়। কিন্তু এই ড্রোন ৬০ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় চলাচল এবং নিখুঁত ছবি বা নানান তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তাই আমেরিকার কাছে এটা ছিল মহাবিস্ময় যে, এত উচ্চতার এই ড্রোনও নিখুঁতভাবে ভূপাতিত করার সক্ষমতা ইরানের আছে। এধরণের ড্রোন ভুপাতিত করার জন্য উপযুক্ত একমাত্র টেকনোলজি হল মিসাইল ছুড়ে একে নামানো। তা করতে হলে, ভূমি থেকে আকাশে ছুড়ে যুদ্ধবিমান নামানো যায় – এমন টেকনোলজির মিসাইল দিয়ে এটা করা সম্ভব। ইরান সম্ভবত রুশ ‘এস-৪০০’ [Russian S-400 missile] এখানে ব্যবহার করেছে, যা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।

খবরের গরমিলটা হল – সাধারণত কোনো রাষ্ট্রের আকাশসীমা নিরাপদ মনে না হলে তা এড়িয়ে ঘুরপথে অন্য দেশের ওপর দিয়ে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল করে থাকে। সে ক্ষেত্রে বড়জোর বাড়তি সময় লাগে এবং তেল বেশি খরচ হতে পারে মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে একেবারে ফ্লাইট বাতিল করা হলো কেন?

দিন গড়াতেই সেসব প্রকাশ পেয়ে গেল। বাংলাদেশের বেলা ১১টার মধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমসে পাওয়া গেল বিস্তারিত [Strikes on Iran Approved by Trump, Then Abruptly Pulled Back] আসল খবরটা হল, ড্রোন ভূপাতিত করার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের ওপর হামলা পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা গত শুক্রবার ভোরবেলায় (আমেরিকান সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে) ঘটার কথা ছিল। ওই নির্দেশ পাওয়ার পরে আমেরিকান যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুতিতে নেমেও পড়েছিল। কিন্তু হামলা শুরুর মাত্র ১০ মিনিট আগে হঠাৎ পাল্টা নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প ওই হামলার নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেন। ইরানের ওপর কোন বিদেশী হামলার বিরুদ্ধে তাদের নেয়া যেসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে যেমন- রাডার, মিসাইল ব্যাটারি ইত্যাদির এমন তিনটা টার্গেটে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

খবরটা তখনও আর কোন মিডিয়া বা কোন সরকারি ভাষ্য- কোথাও আসেনি।  এমন প্রাথমিক পর্যায় বলে সেজন্য নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, [Here’s what we know so far… Here’s what we don’t know…] কেন ট্রাম্প ওই হামলা স্থগিত বা বাতিল করলেন তা এখনো জানা যায়নি, এমনকি ওই হামলা আবার করা হবে কি না, তাও জানা যায়নি।

পরবর্তিতে আমেরিকান সময় সন্ধ্যা ৭টা, ২১ জুনে ট্রাম্প নিজে দুইখানা টুইট করেন। আর সেখানেই মুখরক্ষার সাফাই দেন তিনি, এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে হামলার নির্দেশ বাতিল করেছেন। 

তিনি টুইটে যা লেখেন এর সারকথা হল, ‘আমার জিজ্ঞাসায় যখন জেনারেলরা বললেন, এই হামলায় ১৫০ জনের মতো লোক মারা যাওয়ার সম্ভাবনা, তখন এটা অসামঞ্জস্য [disproportionate] হবে মনে করে বাতিল করে দিই। তবে এখানে তার “অসামঞ্জস্য” বলার যুক্তি সম্ভবত এই যে, মানুষবিহীন ড্রোন হারানোর বিরুদ্ধে দেড় শ’ মানুষ মারা – এভাবে তুলনা। কিন্তু এগুলো মুখরক্ষার মিছা কথা। কারণ এর মানে হল, ট্রাম্পের এমন উপদেষ্টা কেউ নেই যিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈঠকে মানুষ মারা যাওয়ার ব্যাপারটা আমলে নিতে পারেননি অথবা বলতে হয়, ইরানের কাছে আমেরিকার ড্রোন হারানোর পালটা উপযুক্ত ব্যবস্থা কী হতে পারে, এর পরামর্শও কেউ ঠিকমতো দিতে পারেনি। সবচেয়ে বড়কথা, ট্রাম্পের এই কথিত পাল্টা হামলার নির্দেশে যে যুদ্ধ শুর্টাহয়ে যাবে তা শুধু আমেরিকা-ইরান নয়, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে তো পড়বেই, এমনকি এখান থেকে নতুন বিশ্বযুদ্ধও শুরু হতে পারে – এটাও তারা কেউ ভাবতেই পারেনি – এমন বোকা-বোকা কথা – এটাই কি ট্রাম্প বলতে চাইছেন? সত্যিই অবিশ্বাস্য! তাহলে আমেরিকা শুধু নয়, সারা দুনিয়া কার নাদানিতে বা কাদের হাতে পড়েছে? আমেরিকান কোন প্রেসিডেন্ট এর আগে এমন আনস্মার্ট, বোকা কথা বলেন নাই; আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হওয়ার মানে কী, দায়দায়িত্ব কী, তাঁর যেকোন পদক্ষেপের দুনিয়াজুড়ে পড়া প্রভাব ও পরিণতি কী হয় সেটা তাঁর অজানা বেখবর এমন নাদানি আচরণ কোন প্রেসিডেন্ট কখনও করেন নাই। ট্রাম্পের বেইজ্জতির শুরু এখান থেকেই।

আসলে বাস্তবে খুব সম্ভব যে, সৌদি আরবের অনুরোধে ট্রাম্প এই ইরান হামলার নির্দেশ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ, ইরানে কোন হামলা হলে এর পাল্টা প্রথম ইরানি হামলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা সৌদি আরবের সবচেয়ে বেশি।

এরপর শুক্রবার বাকি সারা দিনের ঘটনা হল, সৌদি আরব ছাড়া আর কেউ ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ায়নি। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়া ও ভ্যাটিকানসহ সবাই ট্রাম্পকে সাবধান করে বিবৃতি দিয়েছে [‘Brink of war’: World leaders push for Iran-US restraint]। কিন্তু কোন দায় কেউ নেয়নি। বরং ট্রাম্পকে সংযত হতে ইরানের সাথে ডায়লগে যেতে পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া কেউই ইরানের নিন্দা করা দূরে থাক, ইরানের আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত করাতে কোন আপত্তিও জানায়নি। আমেরিকার নেতৃত্বের গত ৭০ বছরের দুনিয়ায় এটা এক বড় ব্যতিক্রম।

এমন হওয়ার পেছনে অন্তত দু’টি কারণ পাওয়া যায়। এক. এখন পর্যন্ত ২০১৫ সালে ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি বাতিল করে কেন ট্রাম্প বের হয়ে এলেন তা তিনি ইসরাইল ও সৌদি আরব ছাড়া আর কারো কাছে উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও সাফাই দিয়ে বলতে পারেননি। ট্রাম্পের একা হয়ে পড়ার শুরু এখান থেকেই। দুই. এ ছাড়াও সে চুক্তি বাতিলের পর ট্রাম্প আসলে ঠিক কী চাচ্ছেন, ইরানকে কোথায় নিতে চান? তা তিনি নিজ কথার মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে বলতে পারছেন না। যেমন এখন বলছেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র উঠতে দেবেন না। ভাল কথা। কিন্তু তাই যদি হবে, তবে আগের চুক্তি ভেঙে দিলেন কেন? কারণ, চুক্তিতে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ, তা কেবল জ্বালানিতে ব্যবহারযোগ্যতার মধ্যে রাখতে হবে এই বাধ্যবাধকতা ছিল; আর তা জাতিসঙ্ঘের নিরপেক্ষ এক্সপার্টের তদারকিতে ছিল।

আসল ব্যাপার হল, ইসরাইল আর সৌদি আরব চায় চুক্তি বাতিল করে আর ইরানকে অবরোধে ফেলে অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্বল করে রাখতে। তাদের এই বায়না – এটাকে ট্রাম্প আর কারও কাছেই ন্যায্য বলে হাজির করতে পারেননি। এমনকি এতে আমেরিকার নিজের কী স্বার্থ, তাও দেখাতে পারেননি। কেবল ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ জন বোল্টন অ্যান্ড গং – এসব উপদেষ্টা্রা আড়ালে [Bolton: ‘Our Goal Should Be Regime Change in Iran’] ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর কথা আওড়াতে দেখা যায়। অথচ চাইলেই কী আমেরিকা তা করতে পারবে? আমেরিকা এ ব্যাপারে দিনকে দিন মুরোদহীন হয়ে পড়ছে সে খবর নাই।

আবার এ কথাগুলো খোদ ট্রাম্পেরই মৌলিক নীতিবিরোধী। কারণ, তিনি ২০১৭ সালে ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে তার জাতিবাদী “আমেরিকা ফাস্ট” [AMERICA FAST] নীতিতে তিনি বলে আসছেন, গ্লোবাল নেতা হিসেবে তাঁর আমেরিকা আর কোনও যুদ্ধে তিনি আর নেই। যুদ্ধবিষয়ক যা কিছু স্থায়ী “কাঠামোগত স্থাপনা” আছে সেগুলোর সব কিছুতেই খরচ কমানো – এমনকি ন্যাটো বা জাতিসঙ্ঘ থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। অর্থাৎ কোন গ্লোবাল দায়দায়িত্ব বা কোন যুদ্ধে জড়ানো থেকে তিনি আমেরিকাকে বের করে আনার পক্ষে – এই নাকি তাঁর মৌলিক নীতি। তাই যদি হয়, তবে ইরানের সাথে চুক্তি ভেঙে দিলেন কেন? আরো এগিয়ে এখন তিনি ইরানে হামলা করে শুধু আমেরিকা নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র দুনিয়াকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে চাইছেন। কেন? এমনকি তিনি তো আসলেই “অন্ধ”, যিনি আমেরিকাকে রাস্তা দেখানো ও গাইড পরিচালনা করার দড়ি নেতানেহায়ুর ইসরাইলের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন! এটা তার কোন ধরনের নীতি?

আরও স্ববিরোধের দিক হল, ইরানের সাথে চুক্তি থেকে বের হওয়ার পর আবার এখন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে অবরোধ দিয়ে রাখার পথ ধরেছেন ট্রাম্প। কিন্তু কেন করছেন, এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? ট্রাম্প দাবি করছেন, তার লক্ষ্য নাকি ইরানকে টেবিলে বসানো। কিন্তু এটা ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে কখনো করা যায়নি, শতচাপের মুখেও তা কাজ করেনি। ফলে এখনো তা হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আবার ট্রাম্পের এই চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে টেবিলে বসানোর আশা করার কায়দাটা ছেলেভুলানো হাস্যকর খেলা বললেও কম বলা হয়। রয়টার্স বলছে [Exclusive: Trump warned Iran via Oman that U.S. attack was imminent, called for talks] ইরানে হামলার নির্দেশ যেটা পরে পিছু হটেছে এটার সাথে নাকি ওমানের মাধ্যমে ইরানকে একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল ট্রাম্প। আচ্ছা, এটা কী রাস্তায় ছিনতাই বা গুন্ডামি করার মত কাজ? যে বলবে যা আছে সব দিয়ে দেও নাইলে ছুরি মেরে দিব?  সেভাবে – ট্রাম্প বলে পাঠিয়েছে ইরান তুমি আলোচনায় বস, না হলে বোমা মারতে পাঠালাম!

স্বভাবতই এতে ইরান কেন, কোন রাষ্ট্রেরই রাজি হবার কোনই কারণ নাই। তাই উল্টো ইরান বলছে,যাকে আস্থা-ভরসা করা যায়, ট্রাম্প এমন লোক নন, তাই সে কথা বলবে না, ট্রাম্পের সাথে ডিল করবে না। অর্থাৎ অন্য গ্যারান্টার দরকার। এটা ট্রাম্পের বড় সমস্যা। আসলে ট্রাম্প যা বলেন তাতে কেউ ভরসা রাখে না, মিডিয়াও না। যার কথার দাম নাই তিনি এমন প্রেসিডেন্ট। যেমন- ট্রাম্প ইরানে হামলা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এতে দুনিয়া অখুশি। আবার হামলা না করে ফেরত এলেন, যেটা এই প্রথম আমেরিকা করল। কিন্তু এটাকে মানুষ আমেরিকার দুর্বলতা মনে করে, যদিও প্রকাশ্যে বলছে না কেউ।

আবার ওদিকে  ইরান-আমেরিকার মধ্যে বিতর্ক আছে যে স্থানে ইরান আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত করেছে, সেটা ইরানের ভূখণ্ডে নাকি বাইরে – মজার কথা হল এই তর্কে কোন রাষ্ট্র বা কোন মিডিয়া কেউ আমেরিকার পক্ষ নেয়নি, পরিস্কার দূরত্ব বজায় রেখেছে। এছাডা দেখা যাচ্ছে এ ব্যাপারে মিডিয়ায় আমেরিকার সরবরাহ করা তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা তুলনায় কম। ড্রোন ইরানি আকাশসীমায় ঢুকেছিল কি না এ ব্যাপারে আলজাজিরার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর জেমস বেসের মন্তব্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইরানের সরবরাহ করা জিপিএস থেকে নেয়া তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা আমেরিকার দেয়া তথ্যের চেয়ে বেশি। নিউ ইয়র্ক টাইমসই প্রথম ডিটেইল ম্যাপ জোগাড় করে ছেপেছিল। আর তাতে দেখিয়েছিল, ড্রোন যখন ইরানি হামলার শিকার হয় তখন আমেরিকা ও ইরানের দাবি করা স্থান দুটো কোথায়। এই দুই দেশের দাবির ফারাক কতটা। নিউ ইয়র্ক টাইমস তার সে রিপোর্ট আপডেট করেছে ইরানের পার্স টিভির দেয়া তথ্য থেকে।

ড্রোন হামলা বা পরে ট্রাম্পের পাল্টা হামলার সিদ্ধান্ত ও সেখান থেকে পিছিয়ে আসা- এই পুরো ব্যাপারটা জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলাই হয়নি। কোনো বৈঠকও ডাকা হয়নি। কারো যেন আগ্রহ নেই। আমেরিকার বন্ধুহীনতার বেলায় এটা বিরাট ব্যতিক্রম। সবশেষে জানা গেল, আমেরিকা নিজেই সোমবার মানে আরো ৭২ ঘণ্টা পরে এই বৈঠক চেয়েছে।

কিন্তু সেখানেও ট্রাম্পের জন্য আরো বিপদ। কারণ, এটা এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম যে, আমেরিকার নিজের ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পরে সে কূটনৈতিক পথে যায়নি, নিরাপত্তা পরিষদে আসেনি; বরং এককভাবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিল। তাহলে এখন আবার সেটা ত্যাগ করে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে এসেছে কেন? এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা কারো নেই। ফলে আমেরিকার অবস্থান আসলে ঠিক কোনটা- সামরিক না কূটনৈতিক, এ ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদের সবাই অনিশ্চিত ও অস্পষ্টতায়, অনাস্থায়। ব্যাপারটাকে তুলে ধরতে আমেরিকার প্রভাবশালী ব্লুমবার্গ মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে- ‘ট্রাম্প ইউটার্ন নিয়েছেন, ইরানে আকাশ হামলা বন্ধ করে রেখেছেন; কিন্তু তবু সাথী বন্ধুরা অস্বস্তিতে” [Trump Leaves Iran, Allies Uneasy Even After Stopping Airstrike]।’

সব দেখেশুনে আলজাজিরার এক কমেন্টেটর বলছেন, পুরো ঘটনা শেষে ইরান এখন ঘটনার ড্রাইভিং সিটে আছে। তা বিশেষত ইরানের দু’টি দাবির কারণে। ইরান বলছে, ওই ড্রোনটা চার ঘণ্টা ধরে আকাশে উড়ছিল। শেষের দিকে সেটাতে ইরান রেডিও মেসেজ পাঠায় যে, তুমি ইরান সীমায় ঢুকে যাচ্ছো, সামলাও নিজেকে। এই ড্রোনে মানুষ না থাকলেও ওর বেজ স্টেশনের সাথে সব সময় যুক্ত থেকেই ওটা পরিচালিত হয়। তাই সে বাইরের রেডিও মেসেজ পেলে সেটা বেজ স্টেশনের কাছে পাঠিয়ে করণীয় জানতে চেয়ে, জেনে সে মোতাবেক কাজ করতে পারে। কিন্তু ওই ড্রোন বা সংশ্লিষ্ট বেজ স্টেশন সব মেসেজ উপেক্ষা করে গেছে। সব আকাশযানের নিচে সাধারণত ওর পরিচিতিসূচক শব্দ লেখা বা চিহ্ন দেয়া থাকে, যা ভূমি বা নিচ থেকে পড়া যায়; যা থেকে বুঝা যায় ওটা কোন দেশের বা কী কাজের।

ইরান দাবি করছে, ওই ড্রোনের সেসব পরিচিতি সূচক লেখা বা চিহ্ন ঢেকে রাখা ছিল, যার মানে, সেটা গোয়েন্দাগিরি ইঙ্গিত। এ ছাড়া ইরান নিজের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দেখানোর জন্য আর একটা তথ্য দিয়েছে। ইরান বলছে, একই সময়ে আর একটা আমেরিকান (সম্ভবত) গোয়েন্দা বিমানও আকাশে ছিল। ইরানের দাবি, তা তেত্রিশ জন মানুষ বহনের যান ছিল, তাই ইরান তাতে হামলা করেনি। চাইলে করতে পারত। সেটা না করে তাদেরকেও সতর্ক রেডিও বার্তা পাঠালে তারা ইরানি আকাশসীমা ছেড়ে চলে যায়। শেষে ইরান মানুষবিহীন ওই ড্রোনকেই ভূপাতিত করেছে। এ কারণে মন্তব্যকারীরা বলছেন, ঘটনা শেষে ইরানই ‘ড্রাইভিং সিটে’। ট্রাম্প সম্ভবত এই প্রথম বুঝছেন যে, একজন ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ হওয়া বলতে ঠিক কী বুঝায়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২২ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)  “ট্রাম্প আমাদের যুদ্ধে নিচ্ছিলেন প্রায় এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

গৌতম দাস

৩০ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৩

http://wp.me/p1sCvy-2fK

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশ সফর সমাপ্ত করলেন। নয়দিন ব্যাপী এই সফর ট্রাম্পের সৌদি আরব সফর দিয়ে শুরু হয়ে বেলজিয়াম  সফর দিয়ে শেষ হয়েছে। বেলজিয়াম বলা হলেও এটা আসলে ছিল আমেরিকার ইউরোপের বন্ধুদের সাথে নীতি সমন্বয়ের সফর যেখানে অন্তর্ভুক্ত গ্রুপ সেভেন ( G7, মানে শীর্ষ সাত বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রজোট বা ক্লাব)  এর মিটিং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মিটিং আর ন্যাটোর সাথে মিটিং।

চলতি মে মাসের ২০-২১ তারিখে ছিল ট্রাম্পের রাজকীয় সৌদি আরবে সফর। এটা সেই একই ট্রাম্প, যিনি গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েই তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘মুসলিম ব্যান’ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, সব মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সেটা তাঁর মুরোদে না কুলালেও অন্তত সাত মুসলমান দেশ থেকে রওনা দিয়ে এসে আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি। তবে তিনি তার সেই আদেশও টিকাতে পারেননি। আমেরিকান আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে সেটা রদ হয়ে যায়, এবং পরপর তা দু’বার। সেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মুসলমানদের খুবই গুরুত্বপুর্ণ দেশ, সৌদি আরব সফরে গেছিলেন। তাঁকে যেতেই হয়েছিল, সবই ভাগ্যের পরিহাস! কারণ প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার প্রথম বিদেশ সফর এই সৌদি আরবেই। আর আমেরিকান সরকারের জন্য খুবই লোভনীয় কিছু সেখানে হাজির হয়েছিল, তাই।  ফলে কী ছিল এই লোভনীয় সফরে?

মাত্র ২৫ বছর ব্যবধানের (১৯১৪ আর ১৯৩৯) দুনিয়া দুই বিশ্বযুদ্ধ দেখেছিল।  দুনিয়ার ইতিহাস ভুগোলের আগা-পাশ-তলার বহু কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছিল সে যুদ্ধ। বিশেষ করে ইসলামি জনগোষ্ঠীর সর্বশেষ এক খলিফার শাসনাধীন অটোম্যান সাম্রাজ্যকে প্রথমে ভেঙে দুই বড় টুকরোয় ভাগ করে নিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী ততকালীন ব্রিটিশ আর ফরাসি সরকার। এরপর দুই অংশেরই তস্য টুকরো টুকরা করা শুরু করেছিল। ব্রিটিশ অংশ থেকে এক বড় টুকরা ভাগ নিয়ে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা (আবদুল-আজিজ আল-সৌদ) ইবনে সৌদের হাতে ১৯৩২ সালে রাজতন্ত্রী সৌদি আরব রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অবশ্য তাহলেও আমেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষে, ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মিসর সফরে এসে কিছু আরব নেতার সাথে দেখা করেছিলেন। সে সময় বাদশাহ ইবনে সৌদ আর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে প্রথম শীর্ষ বৈঠক হয়েছিল সুয়েজ খালে নোঙর করা আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কুইনসে বসে। সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক অনেক পুরনা, সৌদি আরবের জন্মের মাত্র ১৩ বছর পর থেকে যা এখনও বর্তমান। সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘এশিয়ান টাইমস’ গত ১৮ মে সংখ্যায় এসব পুরনো ইতিহাস স্মরণ করেছে।
এক রাজকীয় রেওয়াজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি বাদশাহ এক কাপ কড়া সৌদি কফি পান করতে দিয়েছিলেন তার বিশেষ অতিথি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে। প্রেসিডেন্ট শান্তভাবে সে কফি পান করার পরে রাজা ওই কাপ মেঝেতে আছড়ে ভেঙে ফেলে বলেছিলেন, “আপনি আমার কাছে খুবই বিশেষ একজন। তাই এই কাপ আপনার পর আর কেউ যেন ব্যবহার করতে না পারে তাই ভেঙে ফেললাম”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই নায়ক রুজভেল্ট দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ওই সফরের দু’মাসের মাথায় সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই মারা যান; তবু বলা যায়, এই রিচুয়াল দিয়ে সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ভালোভাবেই কার্যকর হতে পেরেছিল। এশিয়ান টাইমস লিখছে, “ইবনে সৌদের সাথে রুজভেল্টের চুক্তি হয়েছিল যে, সৌদি তেলের বিনিময়ে আমেরিকা ইবনে সৌদ ও তার উত্তরাধিকারীদের সৌদি সরকারগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে”। (In exchange for Saudi oil, the Americans promised to support the kingdom, militarily and politically, under Ibn Saud and all of his successors. )। পরে এই সম্পর্ক আরেক উঁচুপর্যায়ে পৌঁছেছিল প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে ১৯৭৪ সালে। বলা ভালো, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর শেষ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের হার হয়েছিল আর এর প্রতিক্রিয়ায় পরের ছয় মাস ধরে তেল অবরোধ চলেছিল।
ইসরায়েল সমর্থক আমেরিকা ও তাদের বন্ধু অন্য রাষ্ট্রগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল এই তেল অবরোধে। এই অবরোধের সমাপ্তিতে নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে সৌদি-আমেরিকা পরস্পরের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হিসেবে অনুভব করেছিল। সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন এমন  প্রথম আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি সফরে গিয়ে তাদের সেই সম্পর্ক আরো পাকা করেছিলেন। ফলে সৌদি আরবের মনে হয়েছিল আমেরিকান প্রটেকশনের প্রতিশ্রুতিতে সৌদি আরব শাসনে রাজতন্ত্র ব্যবস্থার আয়ু আরো দীর্ঘ হয়েছে এবং তা যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে থিতু অবস্থায়। কিন্তু সৌদি আরবের সেই সুখ অনুভব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব আবার এক অনিশ্চয়তা হিসেবে সৌদি রাজ শাসনের উপর ছায়া ফেলেছিল। ইরানের বিপ্লব রাজতান্ত্রিক শাসনের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন তুলে নড়বড়ে করে দেয়ার ক্ষমতা নিয়ে হাজির হয়েছিল। তবে আরেক দিক থেকে দেখলে ইরানের এই বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি আমেরিকাও। কারণ সে শাহের ইরান হারিয়েছিল এবং বিপ্লবের ফলে ইরানের সাথে আমেরিকার আবার সহসাই কোনো ধরনের সম্পর্ক ফিরে  তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে ইরান-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্ক সেই থেকে খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়ে যায়। তবে উল্টা দিকে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের প্রায় স্থায়ী হয়ে যাওয়া খারাপ সম্পর্ক সৌদি আরবকে স্বস্তি দিয়েছিল। সৌদিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময়ই এবং এই সঙ্ঘাতের দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্যেই সৌদি আরব রাজতন্ত্রের ভাগ্য নিহিত। পরের ৩৫ বছর ধরে ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময় থেকেছে। তদুপরি, ইরানের ওপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে যথেষ্ট ভুগিয়েছে।
সবশেষে ২০১৫ সালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসনের আমলে এক ‘নিউক্লিয়ার ডিল’-এর বিনিময়ে, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেয়া শুরু হয়েছিল। আর সেই থেকে সৌদি আরবের অস্বস্তি আর অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। রাজপরিবার সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম চিন্তিত হয়ে পড়ে।
ওবামা প্রশাসন ইরানের সাথে ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ কেন করতে গিয়েছিল এর প্রধান কারণ ছিল আইএস মোকাবেলায় ইরানকে পাশে পাওয়া এবং অনেক দায় ও খরচ ইরানের ওপর দেয়ার সুযোগ নেয়া। কারণ ইরাকের ওপর আইএসের আক্রমণ ও তৎপরতার চাপ বাড়ছিল। ওবামা প্রথম টার্মে তো বটেই, দ্বিতীয় টার্মেও সামগ্রিকভাবে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে ‘আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার’ আর বিশেষ করে ‘মাঠের সৈন্য প্রত্যাহার’ এই নীতিতে পরিচালিত হচ্ছিলেন। এর মূল কারণ ছিল, আমেরিকান অর্থনীতির যুদ্ধের খরচ মিটাতে অপারগতা হয়ে পড়েছিল। ফলে ২০১৪ ডিসেম্বরকে আগেই কাট-অফ ডেট ঘোষণা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ এটাও ছিল যে, আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়া অন্তহীন যুদ্ধে থেকে দেশকে বের করে আনা। অথচ ২০১৫ সালের আইএসের তৎপরতা সেখানে মাঠের সৈন্য বাড়াবার তাগিদ হাজির করছিল। এই অপারগ পরিস্থিতিতে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ জোট তৎপরতায় ওবামা ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করে পেতে চাইলেন। বিশেষ করে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকার ইরাক দখলের পরের ইরাক ইরান প্রভাবিত মালেকী সরকারের হাতেই চলছিল। ফলে ওবামার হিসাব হলো, ইরাক সরকারের সাথে ইরান এসে যোগ দিয়ে তারাই ইরাকে আইএস তৎপরতা রোধের বাড়তি দায়িত্বে নিক। তাতে খরচের ও সামরিক দায়ের এক বড় অংশ ইরান সরকারই বহন করবে।
আর ওবামার এই নতুন নীতিকে সৌদি সরকার ঘোরতরভাবে নিজ স্বার্থবিরোধী এবং বিশেষ করে নিজ রাজতন্ত্রের আয়ূর দিক থেকে বড় বিপদ হিসেবে দেখেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকার ওপর সৌদি ক্ষোভ আর হতাশা কত তীব্র হয়েছিল তা বুঝার একটা উপায় হলো সৌদি আরব রাশিয়ার পুতিনের সাথে নিজের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলেছিল। আমেরিকার বদলে নিজের সুরক্ষার কাজ রাশিয়ার সাথে করা যায় কিনা, রাশিয়াকে দেয়া যায় কিনা সে আলোচনায় বসেছিল। তখনও রাশিয়া থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের অস্ত্র সৌদি আরবের দিক থেকে ক্রয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কিন্তু শর্ত ছিল, সিরিয়াসহ পুরা ইরানি ব্লক থেকে রাশিয়াকে দূরে সরে আসতে হবে। কিন্তু রাশিয়ার কাছে স্থায়ী ও কৌশলগত সম্পর্কের দিক থেকে ইরান-সিরিয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার বলে গণ্য করে, দখল করে আছে। ফলে সেই প্রস্তাবিত রাশিয়ান ডিল কোনো ইতি পরিণতি পায়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রার্থিতার মধ্যে আশার আলো দেখেছিল সৌদি আরব। কারণ, যেটা বুঝা গিয়েছিল, কোন ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট ফিরে এলে ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ উল্টে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে রিপাবলিকান হলে কিছু হলেও সম্ভাবনা আছে, যদি সবটা নেই। কারণ এটা শুধু ইরান-আমেরিকান সমঝোতা নয় বরং এটা জার্মানিসহ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের (৫+১) সাথে একযোগে ইরানের ডিল।
তবু এক কথায় বললে, ট্রাম্পের এই সৌদি সফর ছিল এক পুরোপুরি আই ওয়াশ। দেখানো হয়েছে, সৌদি উদ্যোগে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিলের নেতৃত্বে এক “আরব ন্যাটো” গঠন করা হয়েছে।আর আসলে  তা অপ্রকাশ্যে হল এক ইরানবিরোধী সুন্নি রাষ্ট্র জোট। আর কাজের সৌদি উদ্দেশ্য হল,  সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর জনগণ না হোক অন্তত সরকারগুলোকে নিজের রাজতন্ত্রের পক্ষে ‘বুক’ করে রাখা। যাতে সৌদি আরবের রাজতন্ত্র ভিত্তি কোন ক্রাইসিসে পড়লে এই সরকারগুলোকে সৌদি আরব আগে থেকেই নিজের পক্ষে পাবে।  তামাশার দিকটা হলো এই ‘আরব ন্যাটো’ এটা করা হলো ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি রাষ্ট্রজোট’ বলে। আর এই জোটের উদ্বোধন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে দিয়ে করিয়ে তার মুখ দিয়ে ইরানবিরোধী বুলি হাজির করা হলো। তার মানে এখানে “সন্ত্রাসবাদ” বলা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই সন্ত্রাসবাদী হল ইরান!
তাই এমন কোনো মিডিয়া দেখা যায়নি, আমেরিকা্নর ভিতরের বা বাইরের, যে ট্রাম্পের এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে অথবা ফেসভ্যালুতেই সম্মেলন যা কিছু বলা হয়েছে তা বিশ্বাস করেছে। যেমন  সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট তার আর্টিকেলের শিরোনাম করেছে, “New tricks Donald Trump’s reset on Islam” যার ভিতরে প্রায় প্রতিটা বাক্যই ট্রাম্পের শঠতা প্রসঙ্গে লেখা। লিখেছে, ট্রাম্পের এই সফরকে ওবামার ২০০৯ সাল কায়রো সফরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ঐ সফরে ওবামা তার আগের প্রেসিডেন্ট বুশের ওয়ার অন টেররের নীতির কারণে ক্ষুব্ধ মুসলমানদের অভিযোগ শুনে তাদের মানায় নেবার চেষ্টায় বক্তৃতা করেছিলেন। আর এখন ট্রাম্প হাজির হয়েছেন নিজের ইসলামোফোবিক যতসব বকোয়াজ নিয়ে নিজেই এক বোঝা হিসাবে হাজির হয়েছেন। (“But whereas Mr Obama attempted to mend the damage wrought by the war in Iraq, Mr Trump was burdened by his own Islamophobic rhetoric)“। ইকোনমিস্ট আরো বলছে, ট্রাম্প এই সফরে চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়ার কথা বলেছেন। আবার বলেছেন এই যুদ্ধ বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেকার লড়াই নয় এটা নাকি ভাল মানুষ আর শয়তানের লড়াই (“not a battle between different faiths”, but “between good and evil”)।  ট্রাম্প সেখানে ইরানের  মানবাধিকারের রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন বলেছেন, ইরানকে ঝাড়ি দিয়েছেন। অথচ ট্রাম্পের হোস্ট সৌদি আরব তার রেকর্ডই আরও বেশি খারাপ। আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে ইরানের চেয়ে সৌদি লোক বেশি।

ওদিকে নিউইয়র্ক টাইমস ২১ মে আর এক রিপোর্ট বের করেছে যার শিরোনাম হল, “ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্প সৌদি আরবে সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর কাছে পৌচেছেন” (In Saudi Arabia, Trump Reaches Out to Sunni Nations, at Iran’s Expense)। ঐ রিপোর্টে টাইমস লিখেছে ট্রাম্প তার বক্তৃতায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আরব স্বৈরশাসকদের সাথে আমেরিকার বিশেষ শখ্যতার যে পুরান নীতি আমেরিকার ছিল তাতে তিনি  ফিরে আসতে চলেছেন। তাতে এসব স্বৈরশাসকদের মানবাধিকার রেকর্ড যতই খারাপ হোক না কেন; আর এদের কারণে বিভিন্ন জায়গায় আমেরিকার বদনাম বা স্বার্থহানি যা কিছুই হোক না কেন – প্রেসিডেন্ট আরব রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (In using the headline address of his first foreign trip as president to declare his commitment to Sunni Arab nations, Mr. Trump signaled a return to an American policy built on alliances with Arab autocrats, regardless of their human rights records or policies that sometimes undermine American interests.)

এসব ত গেল আরব স্বৈরশাসকের সাথে আমেরিকার মহান নেতা ট্রাম্প কী করবেন, কী শখ্যতা গড়বেন  আর নতুন তাদের বয়ানে ইরানই হল সন্ত্রাসবাদের নেতা – এসব পুরান ধান্দার কথা আমরা কমবেশি জানি। ফলে এই সফর আসলে ছিল ট্রাম্পের “ইরান ব্যাসিং” (ঝাড়ি মারা) করে আরব স্বৈরশাসকদের কোলে উঠে পড়া।  কিন্তু তাহলে ইরান-আমেরিকান যে “নিউক্লিয়ার ডিল”  ওবামা দুবছর আগে রচনা করে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী তা ফেলে দিয়েছেন? ঐ চুক্তিত স্টাটাস কি এখন?

ফ্যাক্টস হল এই সফরে ইরানের বিরুদ্ধে  ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন চাপা মারুন না কেন, বাস্তবতা হল, ট্রাম্প ওবামার ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ থেকে একচুলও পিছু হটেন নাই। বরং আমেরিকার প্রভাবশালী রেডিও-এর ওয়েব সাইট এনপিআর (NPR,ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও) এর ১৭ মে-এর রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্প প্রশাসন (ইরান অবরোধ প্রয়োগ না করে ছাড় দেয়ার ওবামা নীতি বজায় রাখছেন, নিউক্লিয়ার ডিল্কে বাচিয়ে রাখছেন” (Trump Administration Upholds Iran Sanctions Waiver, Keeping Nuclear Deal Alive)। এরপর ঐ রিপোর্ট ব্যাখ্যা করেছে কেন ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের পথে। লিখেছে, “ইরানের সাথে এই চুক্তির অংশীদার একা আমেরিকা নয়, সাথে ইইউ রাশিয়া এবং চীনও। ফলে আসলে ট্রাম্প প্রশাসন এই ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি ভাঙ্গার দায় নিয়ে পারবে না। কারণ এরপর তাহলে আর  কোন পার্টনার খুজে বের করা অসম্ভব হবে। এবং সেসব পার্টনারেরা এখনও এই চুক্তি ধরে রাখার পক্ষে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে”।

ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি অনুসারে, ইরান তার উপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ পশ্চিম শিথিল করবে আর এর বিনিময়ে ইরান নিজের নিউক্লিয়ার কর্মসুচি কাটছাট করে সীমিত করে আনবে। কিন্তু যেসব অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে তা নিয়মিত সময় অন্তর পরীক্ষা করে দেখে সব ঠিক থাকলে তা রিনিউ করে দেয়া দরকার। গত ১৭ মে ছিল ট্রাম্পের আমলে এসে এর প্রথম ডেডলাইন।  এই পটভুমি  পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আর এক গুরুত্বপুর্ণ পত্রিকা “মনিটর” জানাচ্ছে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ফরেন সেক্রেটারী টিলারসন বলেছেন “১৮ এপ্রিল কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে তিনি সার্টিফাই করে জানিয়েছেন, ইরানি ডিলে ইরান সঠিকভাবে তার করণীয় শর্তাবলি মেনে চলছে”। (Secretary of State Rex Tillerson certified in an April 18 letter to Congress that Iran was adhering to the nuclear deal)।  আরেক কর্মকর্তা বলছেন, আমরা যদিও এখনো পর্যন্ত ইরানি ডিল পুরোটাই পর্যালোচনা করে দেখছি। কিন্তু এইদিন পর্যন্ত যা দেখেছি  তার সবকিছুই ইরান ঠিকঠাক পালন করেছে ফলে তারা চুক্তি বজায় রাখার পক্ষে থাকবে।

 

তাহলে পাগলা ট্রাম্প “উল্টা হাওয়া হয়ে” সৌদি আরবে গেল কেন? কারণ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি হলে ক্রেতার সন্তুষ্টিতে কিছু তো করা দরকার! বোম্বাস্টিং চাপাবাজি কিছু অন্ততঃ! একটু তলোয়ার নাচ নেচে আসলেন – এই আর কী!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২৮ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া ২৯ মে অনলাইন দুরবিন -এ তেও অন্সেয এক ভার্সান ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]