কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়
গৌতম দাস
১৮ আগস্ট ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1Hu

সম্প্রতিকালের বাংলাদেশ ‘জঙ্গী’ হামলার ব্যাপকতা দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। গত এক-দেড় বছর ধরে কিছু বিশেষ ধরণের সশস্ত্র হামলা, গলা কেটে দেওয়া বা বোমা হামলার মত ঘটনাগুলো আমরা দেখছিলাম। হামলার বৈশিষ্ঠের দিক থেকে এগুলোর কোনটাই ঠিক হামলাকারির আত্মঘাতি ধরণের তৎপরতা ছিল না। এর পরবর্তিতে আমরা বড় ব্যতিক্রম দেখলাম গুলশানের ‘হলি আর্টজান বেকারি’ নামের রেস্টুরেন্টে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ঘটনা। এটাকে ব্যতিক্রম বলছি এজন্য যে এই ঘটনাটা প্রথমে জিম্মি করা আর পরে সকলকে হত্যা করা ধরণের। যদিও এরপর সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কালে পাঁচজন হামলাকারির মৃত্যু ঘটে। এই অর্থে হামলাকারিরা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বা আত্মঘাতি প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়েই এই হামলা চালিয়েছিল বলা যায়। এর আগে কখনও এমন  বৈশিষ্ঠের হামলা আমরা দেখি নাই। আগে হামলাকারিরা কখনও আক্রমণস্থলে নিহতও হন নাই। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারি গ্রেফতারও না হয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এসব দিক থেকে বিবেচনায় গুলশানের হামলার ধরনটা ভিন্ন – জিম্মি করে হত্যা করা আর শেষে নিজেরাও নিহত হওয়া – এটা একেবারে নতুন।

এই নতুনত্ব শুধু হামলার ধরণেই নয় আরও অনেক জায়গায় নতুনত্ব এনেছে। যেমন আগে সমাজে ‘জঙ্গিবিষয়ক’ নানা আলাপ হতে দেখা যেত, যেখানে সত্য-মিথ্যা প্রচারণা করতে দেখা যেত। যার বিবেচনা যে তাঁর শত্রু সে আসলে জঙ্গি হোক আর নাই হোক তাঁর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ প্রচারণায় নামতে আমরা দেখেছিলাম। অথবা, কারা জঙ্গী হয় এই প্রশ্নে একচেটিয়া বাছবিচার ছাড়া মাদ্রাসাগুলোকে দায়ী করে প্রচারণা ইত্যাদি এসবও আমরা দেখে আসছি গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। কিন্তু এবার বড় ব্যতিক্রম। স্পষ্ট হাতেনাতে প্রমাণে জানা গেল হামলাকারিরা সমাজেরই উচু ঘরের। একেবারে রাজধানী শহরের সবচেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের শিক্ষালাভ দেশের মর্ডান ইংলিশ স্কুলের ও দেশি বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এককথায় বললে তা মাদ্রাসা তো নয়ই, বরং তারা একেবারে আধুনিক উচ্চস্তরের শিক্ষা, মর্ডান কারিকুলামের ভিতরে থেকে তাদের পড়াশুনা করছিলেন। ফলে হামলাকারিদেরকে ‘পশ্চাদপদ’ বলে নাক সিটকানো, গরীব মাদ্রাসার তুচ্ছ ও দায়ী করা অথবা লজিক্যাল র‍্যাশনাল মন থাকলে সবকিছুর সমাধান পাওয়া যেত ইত্যাদিতে আধুনিকতার শ্রেষ্ঠত্ব ধারণা যা এতদিন করে খাচ্ছিল সেই ভ্যানিটি আর মিথ্যা গৌরব সবকিছুই এবার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছিল। এটাও একটা বিশাল ব্যতিক্রমি ঘটনা মানতে হয়। এরকম করে হয়ত আরও  অনেক ব্যতিক্রমী দিক আমরা খুঁজলে বের করতে পারব। কিন্তু আসল  উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম যা এখানে লেখার মুল প্রসঙ্গ তা হল, হামলাকারি ‘জঙ্গিদের’ মৃত্যু পরবর্তি জটিলতা। অর্থাৎ মৃত ‘জঙ্গিদের’ মাটি পাওয়া বা দেওয়া। যতদুর মিডিয়া দেখে জানা গেছে তাতে মৃত ‘জঙ্গিদেরকে’ মাটি দেওয়া বা সৎকারের কাজ করার ব্যাপারে খোদ নিজ পরিবারের প্রধানদেরকে প্রকাশ্য অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এমনকি লাশ গ্রহণ না করার পক্ষেই প্রকাশ্যে ঘোষণা বা অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

মানুষ মারা গেলে সে তখন লাশ মাত্র – একে সৎকার করতে হবে। এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়। গোত্র বা ধর্মীয় নানান রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণে করে দুনিয়ার সব সমাজ কমিউনিটিই তা পালন করে থেকে। আমাদের যার যার ধর্ম ও সমাজ সভ্যতার রীতিনীতি সম্পর্কে যত প্রাচীন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় সব ধরণের কমিউনিটিতে লাশের সৎকার করার বাধ্যবাধকতা সব সমাজেই আছে থাকে দেখা যায়। এছাড়া আর একটা দিক হল, জীবিত অবস্থায় মানুষ কারও কাছে অথবা অনেক মানুষের কাছে বন্ধু হয়,আবার শত্রুও হয়। একারণে মানূষের কাজ ততপরতার মুল্যায়নে জীবিত অবস্থাতেই সে খুবই ঘৃণিতও হয়, হতেই পারে। প্রচন্ড অন্যায়কারি বা অত্যাচারিও হতে পারে। আবার মানুষের যা কিছু স্বভাব বা বদস্বভাব এর মুল্যায়ন শুধু তার জীবতকালে এবং মারা যাবার পরও চলে, চলতে থাকে। তবে মারা যাবার পর কেবল একটা জায়গায় তফাত হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে নানান মূল্যায়ন তখনও জারি থাকে। যেটা থাকে না তা হল মুল্যায়ন-উত্তর করণীয় একশন – অর্থাৎ মুল্যায়নে যদি দোষ পাওয়া যায় তবুও ওখানেই তার সমাপ্তি টানা হয়। দোষের জন্য আমরা কোন বিচার বা শাস্তির পদক্ষেপ আর থাকে না। মানে আমাদের মুল্যায়নে যদি দেখা যায় যে উনি জীবিত অবস্থায় খারাপ ছিলেন, ধরা যাক অত্যাচারি ছিলেন – তবুও মারা যাবার পর এর জন্য তাকে কোন শাস্তি দেওয়া, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ইত্যাদি থেকে আমরা বিরত থাকি। কারণ তখন এগুলো অর্থহীন। কিন্তু পরিস্কার রাখার জন্য মনে করিয়ে দেই, মৃত মানুষের মুল্যায়ন মৃতের-বাসায় না হোক সমাজে বন্ধ হয় না। কিন্তু তবু মুল্যায়ন করার পর সেটা আর বিচার শাস্তি বা অভিযোগের পদক্ষেপের দিকে যায় না, আমরা নেই না। কারণ বাস্তবে সে তখন শাস্তির উর্ধে।  এধারণাটাই অনুসরণ করে আধুনিক রাষ্ট্রের আদালতেও মৃত ব্যক্তির পক্ষে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট দাখিল করলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কিন্তু মৃত অপরাধীকেও আদালত ঐ ব্যক্তির নামে আনা সব অভিযোগ থেকে তাকে রেহাই ও মুক্ত করার রায় দেন।

মুল্যায়ন বিচার কথাটা ব্যাপক দিক থেকে দেখলে, মানুষের বিচার দুই দুনিয়াতেই হয় বলে মনে করা হয়। এই দুনিয়ার বিচার মানে রাষ্ট্রের আইন আদালত। রাষ্ট্রের আদালত কোন মৃত মানুষের বেলায় দুনিয়ায় তাঁর কৃতকাজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত বলে রায় দেয়। আর অন্য দুনিয়া বেলায়, সেখানে আবার  বিচারের এক্তিয়ার আর আমাদের নয়, একমাত্র আল্লাহর। এই পরেরটার ব্যাপারে আমরা কেউ জানি না সেই বিচারে কার কী হবে, কে কীসে দোষী না বেকসুর বলে সাব্যস্ত হবে। আমাদের মানুষের এক্তিয়ারের বাইরে সেটা। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ মারা যাবার পর মুল্যায়ন তখনও চলে কিন্তু বিচার বা মুল্যায়ন-পরবর্তি কোন একশন আর চলে না। মানুষের সাধ্য নাগালের বাইরে এটা। তাহলে দাঁড়াল, দুনিয়ার আদালত তাকে মুক্ত করেই দেয়। আর আল্লাহর এক্তিয়ার তো আমাদের নয়। এটা আল্লাহর উপরই ছেড়ে রাখতে হয় আর সেটাই বিধানও বটে।

এই অর্থে সারকথাটা হল,মানুষ মারা গেলে সে সব বিচার-শাস্তির উর্ধে চলে যায়। কারণ সব অভিযোগ তখন অর্থহীন হয়ে যায়।

গুলশান ঘটনার পর সরকারের দিক থেকে সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার তাগিদ অনুভব খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। সরকার জনগণের সাথে বন্ধুমুলক মানে যাকে ফ্রেন্ডলি বা পপুলার বলি – তা হোক আর নাই হোক সব সরকারই এমন ঘটনার পর হামলা ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টাই করে থাকে। এদিক থেকে তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তুই কতদুর এটা স্বাভাবিক? যতদুর তা মাটি দেওয়ার বিরুদ্ধেও জনমত তৈরির ব্যাপার পর্যন্ত প্রসারিত না হয়।

তাহলে অভিভাবক পিতারা কেন অনীহা দেখাচ্ছেন,কেন প্রকাশ্যে লাশ নিতে চাচ্ছেন না? মনে হচ্ছে তারা বাবা হিসাবে নিজ মৃত সন্তানের সৎকারের দায় আর ব্যক্তি বা সমাজের একজন হিসাবে দায় – এই দুইয়ের মধ্যে গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে আমাদের এমন গন্ডগোলে পড়ার কথা না। সমাজে একই মানুষের একই সাথে নানান রকমের ভুমিকা পালন করতে হয়, থাকে। মুল ব্যাপারটা হল, নিজ সন্তান ‘জঙ্গি’ হবার পথে গিয়েছে অথবা কাউকে হত্যা করে শেষে নিজেও নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম কথা হল, যেভাবে যাই ঘটুক, শেষ বিচারে সাবালক সন্তানের কৃতকর্মের দায় ঐ সন্তানের। লিগাল দায় সন্তানের, পিতা বা অভিভাবকের নয়। রাষ্ট্রীয় আইন আদালতের ক্ষেত্রেও এটা এমনই। এমনকি শুধু সন্তান কেন, যে কোন একজনের দায়ে অন্য জনকে শাস্তি দেওয়া যায় না। আর ওদিকে ধর্মীয় বা আখিরাতের বিচারেও দুনিয়ায় যার যার কৃতকর্মের দায় তাঁর নিজের। এমনকি, চুরি ডাকাতি করে সংসার চালানো পিতার ঐ সংসার থেকে ভরণপোষণ পাওয়া পোষ্য সদস্যদের কারও উপর কোন চুরি ডাকাতির দায় বর্তায় না। না এই দুনিয়া না সেই দুনিয়ার বিচারে। যদিও সন্তান ‘জঙ্গী’ বলে পিতা বা অভিভাবকের মনে অস্বস্তি থাকতে পারে, সন্তাহ হারানোর বেদনাও সেখানে  থাকে, এমনকি সন্তান যাকে হত্যা করেছে তার বা তাঁর পরিবারের প্রতিও সমবেদনা থাকে – সেগুলো আলাদা জিনিষ।

অতএব ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ততপরতার বিরুদ্ধে সমাজ বা রাষ্ট্র জনমত তৈরি করলে সেখানেও  কোন মৃত ‘জঙ্গির’ পিতাও সমাজের একজন হিসাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি একইসাথে কোন মৃত সন্তানের পিতা হন আর নাই হন। স্বাভাবিক অংশগ্রহণই তিনি করবেন। এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি যদি নিন্দা জানাতে মনস্থ করেন সক্রিয় অথবা নিষ্ক্রিয়ভাবে – তবে তাও করবেন, একদম স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তাই বলে সেই একই পিতা সন্তানের সৎকারের প্রসঙ্গে তার করণীয় যা, সৎকারে আয়োজনের ক্ষেত্রে পিতার যা ভুমিকা হয় তাও পালন করবেন, তাকে করতে হবে। কেননা এটা শুধু পিতা বলে নয়। মনে রাখতে হবে, এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়ও।

আমরা আশা করব অভিভাবক পিতারা ‘জঙ্গী’ ততপরতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ব্যাপারের অংশগ্রহণের সাথে সাথে, মৃত সন্তানের  লাশ গ্রহণ ও  সৎকারের  প্রসঙ্গে পিতা হিসাবে তার যা কিছু দায় তারও প্রতিটা তিনি পালন করবেন। এই দুইয়ের মধ্যে কোন স্ববিরোধ নাই।

আচ্ছা, কোন পিতা বা অভিভাবক যদি লাশ না নেন, অস্বীকার করেন তাহলে সেক্ষেত্রে লাশের কী হবে? এখান একটা কথা মনে রাখতে হবে – ধর্মীয় রীতিনীতি যাই থাক, জীবিত মানুষ নিজের ব্যবহারিক স্বার্থেই মৃত মানুষকে কবরস্ত করে। পাশে রেখে ঘুমায় না। এটাও জীবন বাস্তবতার আর এক দিক। কারণ লাশ পাশে রেখে বা পচিয়ে ঘর সংসার পরিবার করা চলে না। পচনশীলতার ম্যানেজমেন্ট দিক থেকে সে হিসাবেও লাশ সম্মানের সাথে কবরস্তই সঠিক ও বাস্তব বিধান। একাজ  মৃতের  পিতা বা অভিভাবক না করলেও সমাজ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে না কাউকে তা করতেই হবে। এবং সেটা করতে হবে একেবারে সম্মানের সাথে। কারণ মৃত মানুষের ভিতরে আমরা জীবিতরা  প্রত্যেকেই নিজেকে দেখতে পাই। আমার মৃত্যুর পর যেহেতু  আমিও আমার অসম্মান দেখতে চাইতে পারি না। তাই আমার মৃত্যুর আগেই সমাজে সৎকার ব্যবস্থা – এটা সমাজের রেওয়াজ হিসাবে গড়ে উঠুক, আমরা সবাই তা চাই। তাই আমরা দুনিয়ার সব লাশ এমনকি একেবারে অচেনা অজানা লাশকেও অজান্তে মনের গভীর থেকে সম্মান করি। তবুও কেউ কেউ, কাউকে হত্যা করে সেই লাশের উপর নৃত্য করার রেফারেন্স দিতে চাইতে পারেন।  হা পারেন তবে সেটাকে আমরা জিঘাংসা বলি। জিঘাংসা এক মানসিক রোগ যা থেকে বের হয়ে আসার উপায় বা পাথেয় হল মনোরোগের চিকিৎসা। কী আর করা,  জিঘাংসা মানুষের মৌলিক স্বভাব না হলেও আমরা অনেক মানুষকে জিঘাংসার ভিতর সুখ খুজতে দেখি।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

Advertisements

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
গৌতম দাস
০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1lk

তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

[এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1yl

গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
সব শেষ।

আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ
গৌতম দাস
১৩ মে, ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-17R

 

 

পশ্চিমা দেশগুলো “সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম” বলে তাদের “ওয়ার অন টেররের” শত্রুদের  ডেকে থাকে। এই শব্দগুলোকে তাদের শত্রুর সাধারণ ডাকনাম বানিয়ে ফেলেছে। আর এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে আমাদের সরকার তার বিরোধীদের বিশেষ করে যারা সরকারের ক্ষমতা ও প্রধান ধারার রাজনৈতিক বিরোধী  তাদেরকেও ওই একই দড়িতে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করছে। সময়ে তা বিরাট তামাশা হয়ে হাজির হচ্ছে।

যেমন  আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু চেষ্টা করেছেন, পশ্চিমের টেরিরজমের বয়ানের ভিতর একই আগুনে সেকে আমাদের রাজনীতিতে পরিচিত “সামরিক স্বৈরাচার” শব্দটাকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে চালিয়ে দিতে। বলা বাহুল্য এটা তথ্যমন্ত্রীর খুবই অপরিপক্ক ও ব্যর্থ এক প্রচেষ্টা। কিলিয়ে কাঁঠাল পাঠানোর ধারণাও এখানে খাটো।

“সামরিক স্বৈরাচারেরা টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল”
দক্ষিণ ভারতীয় এক প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’, সেখানে বাংলাদেশ বিষয়ক এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। আসলে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সংবাদদাতা কল্লোল বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরে থাকার সময় বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর এক সাক্ষ্যাৎকার নিয়ে এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল ঐ রিপোর্ট। রিপোর্টটা প্রকাশিত হবার পর তা পড়ে মনে করার কারণ আছে যে মন্ত্রীই “একটা নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে, গাড়তে” ঐ পত্রিকার সাথে কথা বলেছিলেন।  দি হিন্দু পত্রিকায় ঐ রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, (Terrorist in tie up with military autocrat) ‘টেররিষ্ট ইন টাই-আপ উইথ মিলিটারি অটক্রাট, সেইজ বাংলাদেশ মিনিস্টার”। যার বাংলা করলে হবে, “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল– বলেছেন  বাংলাদেশের মন্ত্রী”।

“There are thousands of AL-Qaeda-trained extremists in Bangladesh who have links to military autocratic forces as well as international terrorist groups, says Hasanul Haq Inu, Minister of Information in Prime Minister Sheikh Hasina’s government”.এই ছিল ঐ রিপোর্টের শুরুর একটা বাক্য। বাংলাদেশে হাজার হাজার আলকায়েদার ট্রেনিং প্রাপ্ত জঙ্গী আছে যারা সামরিক স্বৈরাচারি শক্তির এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে যুক্ত আছে – বলেছেন বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

স্বাধীনতা পরবর্তি হিসাবে ধরলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মিলিটারি অটোক্রেটিক’ বা ‘সামরিক স্বৈরাচার’  বলতে জিয়ার ১৯৭৫-৮১ সময়কালের শাসন আর এরশাদের ১৯৮২-১৯৯০ সময়কালের শাসন সাধারণত অনেকে এই সময়টাকে বুঝিয়ে থাকেন। অর্থাৎ সারকথায় বললে ১৯৯০ সালের পরের অন্তত ১৫ বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরাচার বলে কেউ ছিল না।  ওদিকে আল-কায়েদা নামটা আমরা প্রথম জানি, নজর করি ৯/১১ বা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলায় হামলাকারিদের নাম হিসাবে। যদিও আল-কায়েদার অপ্রকাশিত জন্ম বলা হয় ১৯৮৮ সালে। তাহলে জিয়া তো বটেই এমনকি এরশাদ এই দুই সামরিক স্বৈরাচার আল-কায়েদার সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকবে কী করে? এমনকি যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই ১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা কেবল জন্ম নিয়েছে ততপর হয় নাই, ততপরতাও শুরু হয় নাই এসময়টাতে সেক্ষেত্রেও একমাত্র এরশাদের জমানার কেবল শেষ  দুবছর তারা আল-কায়েদা নামটা শুনে থাকলেও থাকতে পারে। ট্রেনিং দেয়া অসম্ভব।

বুঝা যাচ্ছে ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞান সম্পর্কে ও হোমওয়ার্কে কাচা দুর্বল থেকেই এই বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া এটাও বুঝা যাচ্ছে যেভাবেই হোক ‘সামরিক স্বৈরাচার’ শব্দটাকে তিনি আল-কায়েদা নামের সাথে বেধে পচাতে চাইছেন। কিন্তু ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞানের অভাবে গল্পটা অপুষ্ট থেকে গেছে। আর ঐ সময়কালের ফ্যাক্টসগুলো মোটা দাগে বললে তা হল, এক. ১৯৭৯ সালের প্রথম অর্ধে ইরানে বিপ্লবী খোমেনী ক্ষমতা দখল করে। দুই. ইরানের পড়শি মুসলিক অধ্যুসিত সেন্ট্রাল এশিয়া যা ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সীমান্ত, সেই সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ নিজ ঘর সামলাতে ভীত হয়ে পড়েছিল। তিনি এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন যদি ইরান বিপ্লবের জোয়ার আছর প্রতিবেশী সেন্টাল এশিয়াতে পড়ে। যদি তারা ইরান বিপ্লবের প্ররোচনায় বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হবার আওয়াজ তোলে। তাই এর প্রতিক্রিয়ায় আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ১৯৭৯ সালে ঐ একই বছর শেষে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে যাতে মাঝের বাফার রাষ্ট্র হিসাবে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করা যায়।  সেন্ট্রাল এশিয়ার যেকোন সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানের উপর বল প্রয়োগ করা যায়। তিন. সোভিয়েত এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমেরিকা পালটা ব্যবস্থা নিতে চায়। আর নিকট পড়শি পাকিস্তানও হুমকি অনুভব করতে থাকে।তাই আমেরিকান প্ররোচনায় ও তার সামরিক ও অর্থ সাহায্যে পাকিস্তান স্থানীয় ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের (নানান গ্রুপের মুজাহেদিন)  সংগঠিত করে ফেলে। এভাবে দীর্ঘ দশ বছর মুজাহেদিনদের সাথে লড়ার পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালের শুরুতেই আফগানিস্থান ছেড়ে চলে যায়, সব সৈন্য প্রত্যাহার করে। চার. সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পরে আল কায়েদা গ্রুপের ভ্রুণ এর জন্ম হয়। আর ইতোমধ্যে ১৯৯৬ সালের দিকে মুজাহেদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে তালেবান গ্রুপ আমেরিকান পরোক্ষ সমর্থনে এবং তারা সরার চেয়ে সংগঠিত ও কার্যকর ছিল বলে পুরা আফগানিস্তানের শাসন হাতে পায়, সরকার গঠন করেছিল। এতে আল-কায়েদা ও তালেবান পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করেছিল ও চিন্তায় প্রভাবিত করতে পেরেছিল, সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।   পাঁচ. তাহলে আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গের দিক থেকে ফ্যাক্টস হল, আমাদের দুই ‘সামরিক স্বৈরাচারের’ আমলে আল-কায়েদা ফেনোমেনা দৃশ্যমান ছিল না বা বা দৃশ্যমান হয়ে উঠার পর্যায়ে যায় নাই।  ছয়. তবে এটা সত্য যে মুলত পুরা নব্বুই এর দশক জুড়েই বা তার আগেও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই জোশ আগ্রহে ইসলামি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা নিতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল, নানান মুজাহিদ গ্রুপের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। আর এরাই ১৯৯৬ সালের পর থেকে দেশে ফিরে এসেছিল। এখানে পাশাপাশি মনে রাখা যেতে পারে, আশির দশকে কমিউনিস্টরাও একইভাবে প্যালেস্টাইনে বিপ্লব বা যুদ্ধের স্বাদ নিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক,মন্ত্রী ইনু হয়ত আফগান ফেরত সেসব যোদ্ধাদের কথা বুঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাবলী এবং এর সময়কাল বাংলাদেশের কোন সামরিক স্বৈরাচারের আমলের ঘটনাই নয়। এটা হতেই পারে,মন্ত্রী ইনুর জিয়াউর রহমানের উপর বা বিএনপির উপর ক্ষোভ আছে। বিশেষত ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে হয়ত। তবু বলতেই হয় এটা তাঁর খুবই দুর্বল ও কাঁচা প্রচেষ্টা। কারণ তিনি সময়কাল মিলাতে পারেন নাই।

তবু দি হিন্দুর রিপোর্টটা অন্য দিক থেকে দেখা যেতে পারে। রিপোর্টটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এর সুনির্দিস্ট ফোকাস এর অভাব আছে, ফলে  খাপ ছাড়া।  খুব সম্ভবত এটা হতে পারে যে, মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতকার নেয়া শেষ করা হয়েছে কিন্তু কোথায় ফোকাস করে পত্রিকা বা ঐ রিপোর্টার রিপোর্টটা প্রকাশ করবেন তা ঠিক হয় নাই। কারণ সে বিষয়ে সম্ভবত মন্ত্রীর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে রিপোর্টারকে তিনি নিজের মতের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রাজি করাতে বা মানাতে পারেন নাই। অথবা এমন হতে পারে যেভাবে মন্ত্রী ব্রিফ করেছিলেন রিপোর্টার সেভাবে বুঝে নাই বা বুঝতে রাজি হয় নাই। ফলে রিপোর্টের একটা বিপর্যয় সেখানে ঘটেছে। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন ফোকাসের ছাড়া একটা রিপোর্ট হয়ে গেছে। সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের আম পাঠকের চোখে – “জিয়া, এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারেরা ইসলামি সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত ছিলেন” – এই নতুন বয়ান তাদের পাতে পড়া অথবা নজরে পড়া দূরে থাক এই বক্তব্য কারও আমলেই আনা যায় নাই। বিশেষত আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার কারণে। সেখানে নতুন বয়ানটা প্রতিষ্ঠা করা সে তো অনেক দুরের ব্যাপার।

মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসে নাই, বাধা স্থানীয় মিডিয়া
মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসতে পারে নাই, আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার বাধার কথা বলছিলাম। কারণ একটা মজার ব্যাপার হল দি হিন্দুর ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃৎ করে বাংলাদেশের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে রিপোর্ট হয়েছিল। কিন্তু কেউই ‘দি হিন্দুর’ শিরোনামকে নিজ রিপোর্টের শিরোনাম করে নাই। এমনকি মন্ত্যরীর পছন্দের সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গটাকে আমলেই নেয় নাই। প্রিন্ট পত্রিকার প্রত্যেকেই নিজস্ব ও ভিন্ন শিরোনাম করেছে।  আমাদের দৈনিক মানবজমিন গতকাল ১৫ এপ্রিল দিনের কোন এক সময়ে অনলাইনে এক রিপোর্ট ছাপতে দেখা গেছে,  যার বডির লেখা এত অল্প যে তার চেয়ে লেখার ব্যানার হেডলাইনটা বড় অথবা  তা না হলেও প্রায় সমান। আর শিরোনাম করেছিল,  “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” এটা হল সেই হেডলাইন। হেডলাইন দিয়ে চমকে দেবার খবর অর্থে এটা চমকপ্রদ খবর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ নিজের দেয়া শিরোনামের ঐ পাঁচটা শব্দই কেবল সব বক্তব্য।  বাক্যগুলো ‘দি হিন্দুর’ লেখার রিপোর্টের বডি থেকে তুলে নেয়া কয়েকটি শব্দ। আবার প্রায় একই হেডলাইন – “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮ হাজার জঙ্গি রয়েছে বাংলাদেশে ” – এটা হল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ঐ দিনের শিরোনাম। কিন্তু এদুটো পত্রিকার কেউই ‘দি হিন্দু’র পত্রিকার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐ রিপোর্টের সুত্রে ও বরাতে ছাপিয়েছে বলে জানিয়েছে ঠিকই কিন্তু কেউই মন্ত্রী ইনু যে বক্তব্যটা ফোকাস চাইছিলেন যে “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল” এদিকটা নিয়ে কোন উতসাহই তাদের ছিল না।  বরং ভারতের দি হিন্দুতে তা ছাপা হওবার পর পরই বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃত করেছে ঠিকই কিন্তু  নিজেরা ভিন্ন ট্রিটমেন্টে  ও ভিন্ন শিরোনাম দিয়ে।  কিন্তু কী তাদের প্ররোচিত করেছিল?

স্থানীয় শিরোনাম হয়ে গেল, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” 
‘দি হিন্দুতে’ শিরোনামটা পড়ার পরই যেকপোন দেশী পাঠকের মনে যে বিরাট খটকা লাগে তা হল বাংলাদেশের ‘সামরিক স্বৈরাচার’ আর ‘সন্ত্রাসবাদ’ এই শব্দদুটো মিলিয়ে কেমনে কোন বাক্য রচনা করা গেল। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকা সেজন্য রিপোর্টার শিরোনাম বদলে তাদের স্থানীয় শিরোনাম, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” করে নাই।

একথা ঠিক যে যেকোন ভারতীয় সাংবাদিকও টেররিজম শব্দটার প্রতি অতিরিক্ত সেনসেটিভ থাকে। কিন্তু এর মানে এই না যে কোন গারবেজ বা যে কোন কিছুকে টেররিজম বলে দাবি করলেই তাদেরকে তা খাওয়ানো যাবে, তারা মেনে নিবে। বাংলাদেশের সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া বা এরশাদ এরা আজকের মতই “ইসলামি জঙ্গী” ছিল অথবা “ইসলামি জঙ্গীবাদের” সাথে যুক্ত ছিল ইনুর এমন বক্তব্য  ইতিহাস-সম্পর্কহীন। একেবারেই ইতিহাসবোধহীনের ম্যানুফ্যাকচারড। দি হিন্দুর সাংবাদিক মন্ত্রীত ইনুর দাবি প্রমাণের দায়িত্ব না নিয়েই তাঁর কথাই ছেপেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবদিকেরা সেদিকে যায়ই নাই। তারা তুলে নিয়েছে, “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  ৮ হাজার জঙ্গি” এই কয়টা শব্দ কেবল। তাও আবার হিন্দুর রিপোর্টের বডি থেকে  কয়েকটা শব্দ। এতে দেশের মিডিয়ায় তথ্যমন্ত্রীর  দাবি আসে নাই, এই অর্থে বেকার হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এতে একটা সুবিধা তথ্যমন্ত্রী পেয়েছেন যে এই রিপোর্টে যে কোন প্রমাণ সম্পর্কহীন উদ্ভট দাবি এখানে আছে তা বাংলাদেশের মিডিয়া আমলই করে নাই। কিন্তু কেন?

গত প্রায় এক বছর ধরে যত সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে তা তে আইএস জড়িত নয়, তারা হাজির নাই, হয় নাই, এটা বলা সরকারি অবস্থান বা ভাষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি এই অবস্থানটাই ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার হল, তথ্যমন্ত্রী ইনু দি হিব্দু পত্রিকার সাক্ষাতকারে দাবি করে ফেলেছেন “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে”। যদিও এটা বলার উদ্দেশ্য তাঁর ভিন্ন ছিল।  কিন্তু একথা বলার আগে তথ্যমন্ত্রী খেয়ালই করেন নাই যে এভাবে বললে “আইএস নাই” প্রসঙ্গে সরকারি অবস্থানের বিরুদ্ধে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি ইনু আর এক মন্ত্রী, খোদ বিরোধীতা করে ফেলছেন। আর স্ববিরোধিতার সেদিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার সুযোগ ঐ দুই দেশি পত্রিকা ছাড়তে চায় নাই।

এখন ফলাফলঃ ফলাফল হল, দি হিন্দুর রিপোর্ট মন্ত্রীর  ঈস্পিত লক্ষ্য তো পূরণ করতে পারেই নাই উলটা বরং ক্ষতি করে ফেলেছে। “বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নাই, সাংগঠনিক কাঠামো নাই” – একথাগুলো বলা এখন সরকারের বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসিয়াল অবস্থান। সরকার মনে করে এগুলো স্বীকার করে নিলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের রাস্তা খুলে দেয়া হবে। আই এস দমাতে তাদের এখন আমাদের দেশে আরও সরাসরি ভুমিকা দরকার বলে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যুক্তি সাজিয়ে বসতে পারে। অনেকটা খালেদা সরকারকে উতখাতে বা ১/১১ এর সরকার কায়েমের পক্ষে যেভাবে যুক্তি সাজানো হয়েছিল। সরকারের এই অনুমানগুলো পটেনশিয়াল। ফলে বিপদজনক হতেও পারে। কিন্তু তথ্যমন্ত্রীর বয়ান অবশ্যই সরকারি ভাষ্যকে দুর্বল করেছে।

কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

কানে পানি গেছে,
এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

গৌতম দাস
০১ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-hR

বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

দুই.
ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২