কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

গৌতম দাস
২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
https://wp.me/p1sCvy-2lz

বার্মার রোহিঙ্গার পর এবার কম্বোডিয়া। তবে এবার গ্লোবাল রাজনীতির প্রসঙ্গে সেদিক থেকে কথা বলা হচ্ছে, গ্লোবাল অর্থনীতি নয়। সচরাচর চীন মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শীর্ষ উঠার কথা তুলে বলে থাকি। কিন্তু এবার নয়, সেটা যেন পাঠকের মনোযোগ ফস্কে না যায়, নজরে থাকে সেটা আশা করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা দুনিয়ায় গ্লোবাল রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ক্রমশ নিজ সক্ষমতা দেখিয়ে দুনিয়াকে নিজের একক নেতৃত্বে নিয়েছিল। সেটা এখনও আছে, যদিও সময়ে এখন একটা ভাটার টান অনুভুত হওয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমানভাবে ঢিলা হতে শুরু হয়েছে অনেক আগেই, তুলনায় যদিও গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন একেবারেই নয়। এই পরিস্থিতিতে পাঠকের নজর টানব সত্তরের দশকের  কমিউনিস্ট বিপ্লবের ছোট দেশ কম্বোডিয়ার দিকে।

রাষ্ট্রের নাম কম্বোডিয়া, রাজধানী যার নম পেন। থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামের পড়শি এই রাষ্ট্রের দেড় কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ সবাই খেমার (Khmer) নামে এক এথনিক জনগোষ্ঠীর, তাদের ভাষার নামও খেমার। দেশের সাইজ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বড়, এর জনগোষ্ঠি মূলত বৌদ্ধ-ধর্মীয়। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এক রাজতন্ত্রে শাসিত ছিল খেমাররা। কিন্তু এরপর নানা হাত ঘুরে কলোনি দখলের যুগে এসে শেষে, ফরাসি কলোনি রাজ্যে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৫৩ সালে, কিন্তু থিতু হতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৪৫-৭৫) সাথে ভাগ্য ক্রমশ বাধা পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলে, কম্বোডিয়ান চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি খেমাররুজ (ফরাসি ভাষায় রুজ মানে লাল। অর্থাৎ কমিউনিস্ট লাল খেমার বা Khmer Rouge) নেতা পলপট কম্বোডিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তার কুখ্যাত শাসনের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) এই দল শ্রেণী-শত্রু হত্যা নৃশংসতার উদাহরণ হয়ে যায়; বলা হয় ঐ সময়কালে গ্রামে মালিকানা উচ্ছেদের নামে এরা ২০ লাখ লোককে গণহত্যা করেছিল।

প্রতিক্রিয়ায় এরপর অনেক ক্যু, পালটা ক্যু শেষ করে সেসব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে সব বিবদমান পক্ষগুলোকে নিয়ে ‘প্যারিস শান্তিচুক্তিতে’ এক রাজনৈতিক আপোষনামা তৈরি হয়েছিল; এরও আরো পরে, কম্বোডিয়া থিতু হতে হতে ১৯৯৭ সাল লেগে যায়। আর সেসব প্রক্রিয়ারই আর এক অংশ, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘খেমাররুজের গণহত্যার’ বিচার এখনও চলছে। সেই থেকে সাজিয়ে রাখা মৃত মানুষের সাদা সাদা মাথায় খুলি হয়ে যায় কম্বোডিয়ার ব্যঙ্গপ্রতীক। তবে এই কম্বোডিয়া এখন এক কনষ্টিটিউশনাল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; অর্থাৎ এর নামকাওয়াস্তে রাজতন্ত্র বা এক রাজা আছে ঠিকই, তবে সব কিছুই জনগণ নির্বাচিত, এক কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক এটা। আর ১৯৮৫ সাল থেকে নানা কায়দা করে এর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন হুন সেন। একালে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়া ও এর শ্রম। চীনের বিপুল বিনিয়োগের এক গন্তব্য এখন কম্বোডিয়া। চলতি বছরেও টার্গেট দুই বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড এর পড়শি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-গঠনের দিক থেকে প্রায় একইরকম বলে ব্যাংককের মত ট্যুরিজমের আয় কম্বোডিয়ার এক বড় আয়ের খাত হয়ে উঠছে ক্রমেই। আর সমুদ্র সীমান্তে (অফসোরে) তেল গ্যাস পাওয়ায় তা অর্থনীতিতে এক বিশাল খাত হয়ে উঠছে। এই হল পুরনো দিক থেকে কম্বোডিয়ার বর্ণনা-পরিচিতি, এবার চলতি লেটেস্ট দিক থেকে আর এক পর্ব শুরু করা যাক।

আগামী বছর ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় আবার সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। আবার বলছি কারণ গত ২০১৩ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে তা শেষ হয়েছিল। স্বল্প ভোটে বিরোধী দল (কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি, CNRP) হেরেছিল এভাবে দেখিয়ে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। আর চলতি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দলকে (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, CPP) বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে ‘বিরোধীদের সংসদ বয়কট’ – আমাদের পরিচিত এই ফেনোমেনায় কম্বোডিয়ার বিরোধী দল বেশির ভাগ সময়টা সংসদের বাইরে কাটায়। ওদিকে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন, গুম, খুন করা, ইংরাজী দৈনিক পত্রিকা বন্ধ, রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এগুলো খুবই কমন। কিন্তু ওদিকে সরকারের সংসদে পাশ করা বড় অদ্ভুত কিছু আইন চালু আছে। যেমন একটা হল কুখ্যাত ‘কটূক্তি আইন’ (ডিফেমেশন ল), যা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদ ধারক কারও সমালোচনা করলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া সম্ভব। এরকম অদ্ভুত আরো কিছু আইন প্রচলিত আছে সেখানে। যেমন – সরকারের আইনি অধিকার আছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সামান্য অজুহাতে নিষিদ্ধ করে দেয়ার। এই আইনে বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান তিনি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন – এই অজুহাতে তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। এর পরে ফেব্রুয়ারি থেকে যিনি দলের নেতা হয়ে আসেন তিনিও গত কয়েক মাস থেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ জেলে আছেন। আর উচ্চ আদালত এর পুরো বিচার শেষ নাই বটে, কিন্তু তা না করেই গত ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর জামিনের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উলটা ডিটেনশন দিয়ে রেখেছে।

ঐ রায়ের বিচারক খিম পন তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় এই নেতা কেম সোখাকে ডিটেনশন দেয়া হল, নতুন ক্রাইম ঠেকাতে আর যাতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আদালত গ্যারান্টি দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে’ সেজন্য।  [The detention of Kem Sokha is to prevent new crimes and that the court can  guarantee public order, JUDGE KHIM PONN]  কম্বোডিয়ায় আরেকটা মজার আইন আছে। তা হল, রাজনৈতিক দলের প্রধানের নামে যদি আদালতে কোন ক্রিমিনাল অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয় ও তা বিচারের শেষে আদালতের রায়ে যদি সাজা হয়, তবে এরপর পুরা ঐ দলকেই সরকার ‘বিলুপ্ত’ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার প্রধান বিরোধী দলের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে।  প্রধান বিরোধী দল CNRP এর সর্বশেষ অবস্থা হল, এই দলের আগের প্রধান যে ছিলেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সাজা হয়ে গেছে, তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন। আর দলের চলতি প্রধান ডিটেনশনে আছেন। অভিযোগ হল সেই ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকান সরকারি লোকের সাথে  তিনি কথা বলছেন এমন এক ভিডিও দেখিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। আর গত ৬ অক্টোবর, তাই এইবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতে  বিরোধী দলকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করার আবেদন করেছিলেন। আর তাতে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রায় দেন। ঐ রায়ের ফলে সেই সাথে ওই দলের ১১৮ জন সিনিয়র সদস্য ও রাজনীতিক নিষিদ্ধ হবেন এবং গত চার বছরে  যে ৪৮৯টি কমিউন (স্থানীয়) নির্বাচনে CNRP দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাও সবাই পদ হারাবেন। ওদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের ৫৫টি আসনই হারাবেন।

এই অবস্থায় তাহলে আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে ছলেবলে কৌশলে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হল, এর অর্থ তাৎপর্য না বোঝার কিছু নেই। আমাদের দেশের বিনা নির্বাচনে বিজয়ের মতো কিছু একটা সেখানে এখন হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নাই। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে এই বিরোধীরা হুন সেনকে বহু পেরেসান করেছিল। এবার তাই তিনি কোনো রিস্ক রাখলেন না। আর ওই ৫৫টি আসন এখন (আমাদের এরশাদের মত) খুচরা বিরোধী দলগুলো যারা সবাই মিলে গত নির্বাচনে মোট ভোটের মাত্র ৭ শতাংশ পেয়েছিল এদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। এসব ছোট দলের সদস্যদের মধ্যে তাই হুটোপুটি শুরু হয়েছে পদ-পদবি ও সুবিধাদি নেবার জন্য। আরো আছে। একই অভিযোগ এনে এখন আরো সম্ভাব্য ১০০ জন্য বিরোধী প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করে রাখার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

সাবেক খেমাররুজ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে, একনাগাড়ে প্রায় ৩৩ বছর। সম্প্রতি তার দেশে এক বয়ান,  ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ এ কথা কয়টাক এক বিরাট ইস্যু বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এক পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ আরো এক যুগ তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।

তাহলে এখন থেকে যা বোঝার বুঝে নেন। কিন্তু কোথাকার এক কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ইতিহাস নিয়ে আমি কেন আপনাদের শুনাতে এলাম? বাংলাদেশের সরকার আর বিরোধী দল আর ওদিকে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বলার জন্য কী? না একেবারেই নয়। এই অনুমান ভুল। বরং আসল উদ্দেশ্য এতক্ষণ উপরে কোথাও লেখাই হয়নি। কী সেটা?
কম্বোডিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক দশা পরিস্থিতি নিয়ে ইষ্ট এশিয়ার মিডিয়াগুলোর অনেকেই নানা আর্টিকেল ছেপেছে। এমনি একটা হল, হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। ‘মর্নিং পোস্টে’ একটি কলাম ছাপা হয়েছে, লেখক এডোয়ার্ড মরটন।

তিনি বলছেন, “হুন সেন চীনের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে নেমেছেন। কিন্তু হুন সেনের এই হিসাব ‘যা নয় তাই বাড়িয়ে ধরা’ অনুমান বলে প্রমাণিত হবে।” কিছু বিশ্লেষক, কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জার্নালিস্টদের বক্তব্যের রেফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এসব মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হুন সেনের আরেক মন্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, ‘আগামী বছরের নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমাদের স্বীকৃতি জোগাড়ের প্রয়োজন হবে না।’ কিন্তু তবু এটাও আমার এই লেখার ফোকাস নয়। তবে এবার লিখছি ফোকাসটা কোথায় এবং তা কী? যা খুবই বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

আলজাজিরা টিভি গত ১৭ নভেম্বর কম্বোডিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের টকশোর মতো অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’ প্রচার করেছে। সেখানে তিন অতিথি ছিলেন ০১. মু সোচুয়া – তিনি সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিরোধী দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পলাতক হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ০২, ভিকটর গাও – চায়না ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক। তিনি আসলে আবার ‘চায়না এনার্জি সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের’ চেয়ারম্যান। তার আরেক পরিচয় হল, তিনি বিখ্যাত চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের অনুবাদক হিসাবে কাজ করেছেন। আর ০৩. হোসেক লি ম্যাকিয়ামা – তিনি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক। এই তিন প্যানেল বক্তার মধ্যে চীনা একাডেমিক মি: গাও – এর বক্তব্য আমার প্রসঙ্গ।

গাও তার পালা এলে তিনি স্পষ্ট করে হুন সেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। হুন সেনের সরকার, তার গৃহীত পদক্ষেপ সব সমর্থন করলেন। এটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জেনারেলদের পক্ষেও এত স্পষ্ট করে পাবলিক মিডিয়ায় চীন কথা বলেনি। ১৯৭০-এর দশকে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক পাকা হয়, আর সে সময়ে নিজেরা যার যার স্বার্থ বুঝাবুঝি, পারস্পরিক স্বীকৃতি বা দেনাপাওনাগুলো ঠিকঠাক হয়েছিল ১৯৭১-৭৮ সালের মধ্যে। আমেরিকান বিনিয়োগে চীনে এক ক্যাপিটালিজম জগত প্রবেশ করবে আর, এক নতুন অর্থনৈতিক পথে চীন যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকেই চীন নিজের জন্য আর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর ফলে ক্রমশ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সক্ষমতা ক্রমশ বেড়ে চললেও এর প্রভাবে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নাক গলানোর বা গ্লোবাল প্রভাবের ভাগিদারি ভাগ পাওয়ার সুযোগ হাতে পেলেও চীন তাতে জড়িত হবে না। না এটা চীনের কোনো ভালো মানুষি নয়। বরং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকান যে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়ে আছে এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ভাগিদারি এই খাতে চীন নিজেকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অথবা প্রভাবের শেয়ার নিতেও সে যাবে না। বরং চীন যদি এতে পুরো ছাড় আমেরিকাকে দিয়ে দিলে, দুনিয়ার সব কোনা থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বিষয়াদির ভাগিদারি কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিনা বাধায় পেতে সহজ হবে। ফলে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক অ-সাংঘর্ষিকভাবে বিকশিত হতে পারবে। চীন চেয়েছিল গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো ভাগ আমেরিকার কাছে সে চাচ্ছে না। অথবা চীন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই বার্তা আমেরিকাকে  জানানো। আর সে কারণে সবার আগে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের উত্থান পর্বকে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। যেটা  আসলে সহজে চীন বাস্তবে অর্জন করেছিল।

যেমন – ২০১৪ সালে আমাদের নির্বাচন ইস্যুতে দেখা গিয়েছিল কোন রাজনৈতিক স্টেক বা কেমনভাবে নির্বাচন হতে হবে তা নিয়ে কোনো বক্তব্য চীনের ছিল না। কিন্তু সরকারে যেই থাক বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় চীনের যা স্বার্থ যা সে চায় তা নিয়ে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সে পশ্চিমা অবস্থানের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে তা নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে ভাগিদার সাজতে না চাওয়া চীনের এই নীতি অবশ্যই বেশ লম্বা সময়ের জন্য, তবুও তা আবার এক অর্থে সাময়িক। যেমন, যত দিন চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হচ্ছে  ততদিন একই সাথে গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে হাত বাড়াতে চীন যাবে না। তবে এর পরে অবশ্যই যাবে। এরই সোজা অর্থ সম্ভবত এবার রাজনৈতিক ইস্যুতেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন দুনিয়ায় হাজির হতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হুন সেনের পক্ষ দাঁড়িয়েছে শুধু তাই নয়, হুন সেন একটি ন্যূনতম ভাবে ফেয়ার নির্বাচিত সরকার হয়ে থাক সেটার দরকার নেই – এ কথায় এতদূর গিয়ে প্রবক্তা হয়েছে। মি. গাও বলেছেন. কম্বোডিয়ায় একটা ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে যদি পুরনো অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে এসে পড়ে’ তাই এর দরকার নেই। আর এতে অর্থ সম্পদও নষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’ (তিনি তথাকথিত বা সোকল্ড শব্দটা ব্যবহার করেছেন) বাস্তবায়নকে দেখার অনেক ধরন আছে। অর্থাৎ হুন সেন বিরোধীদের মেরে ধরে গুম নির্যাতন করে, জবরদস্তি যদি নিজেকে ভুয়া নির্বাচিত হিসেবে দেখায় তবুও সেটা চীনের স্টাইলের নির্বাচন (গণতন্ত্রকে দেখার নানা পথ আছে) মনে করে এবং ‘স্থিতিশীলতার স্বার্থে’, ‘সম্পদ নষ্ট না করার স্বার্থে’ হুন সেনকেই নির্বাচিত মানতে হবে। চীনের নিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রে নাগরিকের কোনো রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার, মানবিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন- এগুলোকে সে নিজ করণীয় বলে মনে করে না। নিজে করেওনি। বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জন এগুলোই করণীয়। অর্থাৎ মানুষ বৈষয়িক বিষয়াদির ভোগকারি মাত্র। তার কোন স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, করণীয়, দায়দায়িত্ব এসব কিছু নাই- এই হলো চীনা কল্পনায় দেখা মানুষ। মানুষ সম্পর্কে এই অনুমানের উপরে দাঁড়ানো আছে চীনের নেতৃত্ব।

তাহলে কী দাঁড়াল? চীন কী এখন থেকে আমেরিকার সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রভাব এর ভাগিদার বা পুরা কতৃত্ব নেয়ার জন্য এখন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুরু করবে? যার বাইরের দিকটা দেখে লাগবে কম্বোডিয়ায় মতই, কোনো বিরোধী দল সেখানে নেই অথবা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা থাকার দরকার আছে কিনা এই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের লড়াই? নাকি কম্বোডিয়ার মত কিছু দেশের বেলায় (সব দেশের বেলায় নয়) চীন একক রাজনৈতিক প্রভাব হাসিলের জন্য এখন থেকে আমেরিকার সাথে লড়বে? এই দুইয়ের মধ্যে সেটা যেটাই হোক, চীন গোহারা হারবে সেটা আগেই বলে দেয়া যায়। কারণ মডার্নিটি পরবর্তী দুনিয়া ১৯৪৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইট চার্টার পর্যন্ত গিয়েছে। ওর অনেক খামতি আছে। কিন্তু তাই বলে সেটা ওর পেছনের সময়ে ফিরে যেতে পারে না। দুনিয়া এমনকি সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট বুঝে আবার ফিরে যেতে পারে না।

অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন যতই এগিয়ে যাক, চীনের রাজনৈতিক বুঝাবুঝিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। তবুও, আচ্ছা এটাই কী চীনের সদ্য সমাপ্ত দলীয় কংগ্রেসে উল্লেখিত ‘মডার্ন সমাজতন্ত্রের’ ব্যাখ্যা; আর এজন্য শি জিনপিংকে মাওয়ের সমতুল্য নেতা বলে দাঁড় করানো শুরু? সেটা যাই হোক, চীনের এই পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে যাওয়ার ইঙ্গিত!

সর্বশেষঃ
 রয়টার্স এজেন্সির খবর,  ১৭ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার বিফ্রিংয়ে প্রশ্নের উত্তরে জানায়, কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরোধী দল ও নেতাদের নির্মুল ও শুন্য করা প্রসঙ্গে চীন বলছে, এটা “কম্বোডিয়ার নিজস্ব কায়দার উন্নয়নের রাস্তা অনুসরণ” করা বলে চীন মনে করে। [Cambodia in pursuing its own development path……)
আর এর পাল্টা আমেরিকা বলছিল, আমেরিকা নির্বাচন সম্পর্কিত সব ফান্ড প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ [“concrete steps”] নিতে যাচ্ছে।  এর প্রতিক্রিয়ার হুন সেন গতকাল ১৯ নভেম্বর বলেছেন, তিনি  সমস্ত আমেরিকান এইড প্রত্যাহার করে নিতে স্বাগত জানায়। [“Hun Sen … welcomes and encourages the U.S. to cut all aid.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com   

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements