বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

 নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

গৌতম দাস
০৪ অক্টোবর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RL

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে জনসভায় জানিয়েছেন যে তিনি সামরিক যুদ্ধ বা যুদ্ধের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা করতে চান না। বরং কোন দেশ কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এর প্রতিযোগিতা করতে চান। ফলে সেই প্রতিযোগিতার আহ্বান জানাতে জনসভা থেকে তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে বক্তব্য রেখেছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধ বিষয়ে যেন তা লেগেই যাচ্ছে এইভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গরম কথা বলে মোদি নিজ জনগণকে আগে তাতিয়েছিলেন, শেষে কোঝিকোড়ে শহরের বক্তৃতায় সব উত্তেজনায় নিজেই ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন যুদ্ধ নয়, তিনি উন্নয়ন চান। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে তিনি যাবেন না। ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ কথার অর্থ কী, সেটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, পাকিস্তানকে তিনি ‘টেরোরিজমের’ অভিযোগে বড় প্রভাবশালী বা ছোট রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার চালিয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। এখন আমরা দেখছি “সার্জিক্যাল অপারেশনএর” নামে আবার এক বুঝরুকি। মোদীর প্রপাগান্ডার লড়াই, যা এখন উভয় পক্ষের দিক থেকেই প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে।  অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মোদী সবশেষে কোন সিরিয়াস যুদ্ধের দিকে যদি না-ই যাবেন, তিনি তা হলে গরম কথায় যুদ্ধের মত হুমকি দিয়েছিলেন কেন?
আমাদের ভুললে চলবে না, মূল ইস্যু ছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন। যেটা এখন প্রায় ৮০ দিনের বেশি টানা কারফিউ এর সত্ত্বেও চলছে। ওদিকে কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ইসলামি ঐক্য সংস্থা গত মাসে ২১ আগষ্ট ২০১৬ শক্ত ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেছিলেন । (OIC Secretary General Iyad Ameen Madani Monday expressed concern over the situation in Kashmir and called for an immediate cessation of atrocities by India, urging the Indian government for peaceful settlement of the dispute ‘in accordance with wishes of Kashmiri people and the UNSC resolutions’.।) বিগত ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নেয়া এক প্রস্তাব হল কাশ্মীরবাসী ভারতে থাকতে চায় কি না তা জানতে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। ওআইসি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানায়েছিল।  ওআইসি কাশ্মীরের প্রতিরোধ লড়াইকে তাদের “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য লড়াই” মনে করে, তাও জানিয়েছিলেন। কাশ্মীরের নিরস্ত্র গ-আন্দোলনের ধারার রাজনৈতিক দল হুরিয়াত কনফারেন্স। ওআইসির বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে তাদের বিবৃতির ভাষা ছিল আরও কড়া। তারা তুরস্ক সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন পাঠাবার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছিল।  ওদিকে এ বিষয়ে জাতিসংঘে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পরস্পরের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস সংগঠন হিউম্যান রাইট কাউন্সিল  দুই রাষ্ট্রের দুই কাশ্মির অংশেই সরেজমিন গিয়ে তদন্ত ও প্রত্যক্ষ দেখে যাচাই করে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারত উভয় সরকারের কাছে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অনুমতি চেয়েছিল। জবাবে পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ রাজি বলে জানালেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ওদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং তা মিডিয়ায় আসা শুরু করেছিল এই বলে যে, ক্রসফায়ারের নামে গ্রাম ঘিরে তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানিকে খুঁজে বের করে হত্যা করলে যে জনগণ কার্ফু ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যাবে – এ’সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী কিছুই আগাম জানাতে পারে নাই। এখানেই এবং এ’ঘটনা থেকেই ভারতের কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মারাত্মক গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতার কারণেই কাশ্মিরের বহু জেলা শহর এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিয়মিত আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মোদি সরকারের কাছে এসব বিপদের দিক তুলে ধরেছিল। আর প্রতিদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী মিডিয়া এই ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগে জনগণের দৃষ্টিকে ও মিডিয়াকে কাশ্মির থেকে সরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছিলেন মোদি। তাই ভারতের সীমান্ত শহর উরির ব্যারাকে হামলায় ১৮ সেনা হত্যা – তা সে যেই ঘটাক, একে ইস্যু করে মোদি দৃষ্টি সরানোর কাজ করতে সফল হন। মিডিয়া ও জনগণ থেকে কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন বা লাগাতর কারফিউ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটনার উল্লেখ এতে হাওয়া হয়ে যায়। নতুন প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আসন্ন কি না’, আর ‘পাকিস্তান থেকে আসা কথিত জঙ্গি’ এসব হয়ে যায় মিডিয়ার মূল প্রসঙ্গ। এগুলোই যেনবা সব সমস্যার কারণ। এই দৃষ্টি ঘুরাতেই মরিয়া হয়ে যুদ্ধের হুমকির গরম বক্তৃতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল মোদিকে।
কিন্তু তাতে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়  – ম্যালেরিয়া হওয়াতে রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু এখন কুইনাইনের প্রভাব প্রতিক্রিয়া শরীরে ছেয়ে মারাত্মক হয়ে গেছে, ফলে তা কমানো হবে কী দিয়ে? নিজেরই বাজানো ও ঝড় তোলা যুদ্ধের দামামা এখন কমাবে কী দিয়ে? অবস্থা দেখে খোদ বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরাই নাখোশ, হতাশ হয়ে পড়েছিল। সব দিক বিবেচনা শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে নেতাকর্মীদের হতাশার মধ্যেই সবার আগে পাবলিক বক্তৃতায় ‘যুদ্ধ নয়, উন্নয়ন চাই’ আর ‘কেবল কূটনীতি হবে চরম পদক্ষেপ’ বলে নিজের মূল অবস্থান পরিষ্কার ও প্রচার করে নেন মোদী।

আর এর সাথে পরদিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোদি নিয়েছিলেন। এক হল, সর্বদলীয় মানে সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা সভা থেকে নিজের ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে উপস্থিত সবার সমর্থন নিয়ে নেন তিনি। দুই. তিনি সব মিডিয়ার কাছে ওই নীতির পক্ষে সমর্থন চান। স্বভাবতই তা অন্তরালে। এটি এক কমন ফেনোমেনা এবং চর্চা যে ভারতের জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো আর সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিরোধিতা করে না। এবং সেই সাথে সব মিডিয়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। ফলে পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর কেউ কেউ মোদির বক্তৃতার নেতি রিপোর্ট ও সমালোচনা করলেও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় মিডিয়া মোদির ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি একযোগে মোদী সরকারের পক্ষে সামলে নিয়ে আসতে শুরু করে। বলা যায়, দুই দিনের মাথায় পরিস্থিতি মোদির পক্ষে ঘুরে যায়। এ কাজে মিডিয়াও আবার সাহায্য নিয়েছিল কয়েকটি ইস্যুর। যেমন এক. আগামী সার্ক সম্মেলনে একসাথে চার সদস্য দেশের যোগদানের অনীহা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। চার দেশের যোগ না দিতে অনীহার কারণ আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু তা ভারতের কূটনৈতিক লবির কারণে একসাথে প্রকাশ হওয়াতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটার কনস্টিটোয়েন্সির কাছে ব্যাপারটাকে ‘মোদির প্রতিশ্রুতি কাজ করছে’ এটা সাফল্য হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয় ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ছিল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি বাতিলের হুমকি। গত ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মিটিয়ে এই চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল এই দুই রাষ্ট্র। আসলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী মোট ছয়টি। ওই চুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র তিনটি করে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভাগ করে নেয়, যাতে প্রতি তিন নদীর পানিপ্রবাহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এক এক রাষ্ট্রের। এভাবে ওই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল। উভয় পক্ষই এতে এত দিন খুশি ছিল, এখনো পানির পরিমাণ ও ভাগের দিক দিয়ে উভয়ই খুশি। কিন্তু একটি টেকনিক্যাল দিক আছে। তা হল, ওই ছয়টি নদীরই উজানের দেশ হল ভারত। অর্থাৎ ভাটির দেশ হল পাকিস্তান। সোজা কথায় প্রথমে ভারত হয়ে, এরপর ওইসব নদী পাকিস্তানে প্রবেশ করে। ঠিক বাংলাদেশের মত। ফলে নদীর পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ করার ভূ-অবস্থানগত সুবিধাগুলো ভারতের পক্ষে। যদিও আন্তর্জাতিক নদী আইনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশকে প্রাপ্য পানিবঞ্চিত করা সম্পুর্ণ বেআইনি। কিন্তু মোদি ব্যাপারটিকে অন্তত প্রোপাগান্ডায় নেয়ার জন্য ওই চুক্তিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার জন্য সরকারি আমলা ও টেকনিক্যাল লোকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। বাস্তবে ভারত এই চুক্তি ভঙ্গ ও অমান্য করবে কি না, বাঁধ অথবা কোনো বাধা তৈরি করবে কি না সেটা অনেক পরের ব্যাপার; কিন্তু ইতোমধ্যে মোদির ওই নির্দেশ ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক প্রচারে নিয়ে গেছে। মোদী হুশিয়ারী দিয়ে বলছেন, “রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না, হুঁশিয়ারি মোদীর”। ফলে সাধারণ ভারতীয়দের মনে মোদী যুদ্ধ করার উসকানি যতটা তাতিয়েছিল, তা অনেকটাই এবার প্রশমিত হয়েছে এতে। যদিও মিডিয়ার এক কোণে ভারতীয় টেকনিক্যাল লোক বা প্রকৌশলীরা মন্তব্য করেছেন, এই পানি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ এটি প্রবল খরস্রোতা ও খাড়া প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। আবার পাকিস্তান থেকেও ওখানকার মিডিয়ায় পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে বলা হয়েছে, বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তবে সুবিধা হল, ভারতীয় মিডিয়া এই খবরটাকে নিজ দেশে তেমন প্রচারে নেয়নি। অবশ্য প্রথম দিন রাশিয়া-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বনির্ধারিত এক যৌথ মহড়া এ সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর তা যথাসময়েই শুরু হয় বলে এটাকে ভারতের জনগণের মন খারাপ করা খবর ও ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ভারতের মিডিয়া সেটাও সফলভাবেই সামলে নেয়।

অপর দিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আরেক খবর ছাপে যে, লাহোরে চীনা অ্যাম্বাসির কনসাল জেনারেল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই) সাথে দেখা করার সময় ভারত-পাকিস্তান বিরোধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে বলে জানিয়েছে। শাহবাজের তরফ থেকে বিবৃতির সূত্রে খবরটি ছাপা হয়। এই খবরটি পাক্কা দুই দিন টিকে থাকতে পেরেছিল। দুই দিন পরে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ে এমন খবর তাদের জানা নেই বলে জানায়। তবে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান প্রকাশ করে। তা হল, উভয় দেশ যেন সামরিক বিরোধে না জড়িয়ে বসে ডায়ালগে সমাধান খোঁজে, চীন এর আহ্বান জানায়। ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটি ব্যাপক প্রচারে নিয়ে যাওয়াতে এটিও মোদির পক্ষে জনগণের সমর্থন আনতে সাহায্য করে মিডিয়া। শুধু তাই নয়, ভারতের মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে যে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে আছে। যেমন- আনন্দবাজারের এক খবরের শিরোনাম হলো, ‘চাপের মুখেও পাক তর্জন, মার্কিন প্রশাসন পাশে আছে ভারতের।’ কিন্তু এটাকে প্রোপাগান্ডা বলছি কেন? অথবা আসলেই চীন ও আমেরিকার ভারত-পাকিস্তান বিরোধে অবস্থান কী, কেন? আর সেটাই বা কত দিন থাকবে বা জেনুইন কি না? পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার সমস্যা হিসেবে কংগ্রেস নেতা, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কেরালার এমপি শশী থারুর তাকে উদ্ধৃত করে হংকংয়ের এক মিডিয়া জানাচ্ছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। আমেরিকার আফগানিস্তানের কারণে পাকিস্তানকে দরকার। চীন পাকিস্তানে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এক একক বড় প্রকল্প নিয়েছে। যেটা দক্ষিণে বেলুচ সমুদ্রসীমায় এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সেখান থেকে দক্ষিণ থেকে উত্তর অবধি পাকিস্তানের বুক চিরে এরপর চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, এমন সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বছর শেষে তা প্রথম পর্যায় শেষ করা হবে। উদ্দেশ্য, এই সড়ক চীনের একমাত্র মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত যাবে। এভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ভূমিবেষ্টিত এই প্রদেশকে সমুদ্র পর্যন্ত এক্সেস দেয়া, যাতে পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে যায়। এটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নামে পরিচিত। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চীন থেকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন।

এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ আছে- গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থাৎ গ্লোবাল ক্যাপিটালের স্বার্থ। গত মাসে চীনে জি-২০ এর সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জি-২০ মানে হল, অর্থনীতির সাইজের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপরের দিকের রাষ্ট্র যারা – এমন টপ ২০টি বড় অর্থনীতির দেশের সম্মেলন। উদ্দেশ্য গ্লোবাল অর্থনীতিতে কিছু কমন সাধারণ স্বার্থের দিক নিয়ে একমত হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমন এবারের মূল ঐকমত্য হল, গ্লোবাল মন্দা বিষয়ে। দুনিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় ১৯৩০ সালে প্রথম মহামন্দা আসে। মহামন্দার সারার্থ হলো, সব রাষ্ট্রের নিজ মুদ্রার মান-দাম কমিয়ে অন্যের ওপর বাজার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা। এই ঘটনার লেজ ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল, যা থেকে প্রতিকার হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম। এ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো আবার যাতে মন্দা না হয় তা ঠেকানো। তবুও ২০০৭-০৮ সালে আবার মন্দা দেখা দিয়েছিল। আফগানিস্তান-ইরাকে যুদ্ধে গিয়ে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপুল যুদ্ধ খরচের এই ভারসাম্যহীনতা থেকে এর জন্ম বলে মনে করা হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিপুল অর্থ ঢেলে ব্যক্তি-কোম্পানিগুলোর ধস ঠেকায়। অথচ পশ্চিমের বাইরে চীন তখনো ডাবল ডিজিটের অর্থনীতি টেকাতে পেরেছিল, কারণ সে যুদ্ধের বাইরে। ফলে পশ্চিমাদের চোখে গ্লোবাল মন্দা ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে এক ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। চীন টিকলে তার ছোঁয়া ও প্রভাবে পশ্চিম তার সঙ্কট কাটাতে সুবিধা পাবে তাই। মন্দা দুনিয়াজুড়ে ছেয়ে যেতে বাধা হবে চীন তাই। পশ্চিম সেই থেকে মন্দা একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ওদিকে গত দুই বছর চীনের অর্থনীতি নিচের দিকে; কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতে আগের কংগ্রেস আমলে ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি এবার মোদির আমলে এখনো উঠতির দিকে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিই উঠতির দিকে পশ্চিমের চোখে সে আকর্ষণীয় ও আদরের। অতএব কোনোভাবেই ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা আবার ফিরে আসুক তা ঠেকাতে সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এবারের জি-২০ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল। ফলে এবার জি-২০ এর সর্ব সম্মতিতে, সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্ত নেয়, সঙ্কটের মুখে নিজ মুদ্রার মান-দাম কমানো এমন পদক্ষেপের পথে কেউ যাবে না। এ কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ফলাফলে তা গ্লোবাল অর্থনীতিকে ডুবিয়ে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। অতএব এই বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থের কারণে বড় অর্থনীতির কোনো রাষ্ট্রই সম্ভাব্য এই যুদ্ধকে নিজের স্বার্থের বিপক্ষে, নিজের জন্য বিপদ হিসেবে দেখে। যেন বলতে চায়, যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেয়ার বা পাওয়ার এটা সময় নয়।
গ্লোবাল উদ্বেগ ও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এ দিকটি সম্পর্কে মোদির জানা, সবাই তাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু তবুও মোদির কিছু একান্ত স্বার্থ আছে। একালে দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উত্তর প্রদেশে (সাথে পাঞ্জাবসহ আরো কয়েকটি) রাজ্য সরকারের নির্বাচন। এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোদি বা বিজেপি এখানে হেরে গেলে এখান থেকেই নীতিশ-মমতার নেতৃত্বে আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জোট গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা।
ওপরে লিখেছিলাম, মিডিয়াসহ মোদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর তৃতীয়টি হল, খুবই সীমিত পর্যায়ে সামরিক অ্যাকশন, যাতে আগামি ভোটে মোদির মুখ রক্ষা হয়। ভোটের বাক্স ভরে উঠে। এক কথায় বললে, “যুদ্ধ না উন্নয়ন আর কূটনীতি” এই নীতির পক্ষে ভারতের মিডিয়া একযোগে দাঁড়িয়েছিল খুবই সফলভাবে। মানুষের মন থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার পক্ষে আগের তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করে আনতে পেরেছিল; কিন্তু সম্ভবত সামরিকবাহিনীকে আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা তৈরি করে আনতে বলেছিলেন, যা তারা হাজির করেছিল একা মিডিয়াই তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করতে পারার পরে। সেই অর্থে আবার এই সামরিক এডভেঞ্চার তা ছোটখাট বলা হলেও মোদীর সেদিকে না গেলেও চলত।  কিন্তু সম্ভবত লোভে পড়ে, বাড়তি লাভের আশায় মোদী এই সামরিক অ্যাকশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেন। এই পরিকল্পনা মোতেও ছট খাটও নয়, রিস্কবিহীনও নয়। বরং মোদীর ভারতের জন্য আগুন নিয়ে খেলার মত রিস্কি। কিন্তু মোদী আগামি ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচনে ভাল করার লোভে এই আগুন নিয়ে খেলা খেলতে গিয়েছেন। এর অর্থ এখন মূল্যায়ন বসলে পরিস্কার দেখা যাবে, আগামী নির্বাচনে ভোটে সুবিধা দেয়ার কাজেই সামরিক বাহিনী ও এর ঐ পরিকল্পনা দেশের নয় দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। বিশেষত সামরিক হামলা তা যত ছোট দিয়ে শুরু হোক না কেন, এখন পাল্টাপাল্টি বড় থেকে আরো বড় হামলার দিকে দুই দেশ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। এ সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। শেষে এটা পুর্ণ যুদ্ধে না পরিণত হয়। যেটা তারা উভয়ে কেউ চায় না; কিন্তু সেখানেই গিয়ে পৌঁছবে। বিশেষ করে ভারত “সার্জিক্যাল অপারেশন” এই গালভরা নামের হামলা করতে গিয়ে যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইচ্ছা না থাকলেও ভারতকে এরপর আরেক দফা হামলায় যেতে হবে। কারণ ভারতের ঐ গালভরা নামের হামলায় এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে ধরা পরে আছে। ভারত প্রথম হামলা করার পর  মিডিয়াকে বীরদর্পে জানিয়েছিল, নিজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তারা নাকি পাকিস্তানের ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। যেন বলা হচ্ছিল, এখন ভারতের মিডিয়া মোদীর পক্ষে নির্বাচনী ক্রেডিট বিতরণ করতে নেমে পড়তে পারে। কিন্তু সন্ধ্যা লাগতেই জানা গেল, এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে আটকা পড়ে আছে। অথচ এটা আগে থেকেই এটা জানা সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনীর নেতারা তা লুকিয়ে অস্বীকার করে রেখেছিলেন। এটা ছাড়া যেটা এখন আর এক সবচেয়ে বড় সমস্যা তা হল – দুই দেশের বাহিনীই এখন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ঢুকে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ সত্যতা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে কি পূর্ণ যুদ্ধের (পারমাণবিক বোমা পকেটে রেখে) দিকেই যাবে বা যাচ্ছে পরিস্থিতি? সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। দুই পক্ষই তা না চাইলেও নিজ নিজ জনগণের কাছে বীরত্ত্ব আর  ‘ইজ্জত রক্ষার স্বার্থ’ দেখাতে গিয়ে পূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভাল সম্ভাবনা আছে।  এই সম্ভাবনা প্রবলতর হবে যদি না মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীন-আমেরিকা যৌথভাবে এগিয়ে আসে ও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় । পুরনো ইতিহাস বলছে, মধ্যস্থতাকারীর কিছু ভূমিকা আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০২ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে ০৩ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ]

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন
গৌতম দাস
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RC

 

 

যেকোনো আন্দোলন, বিক্ষোভ বা প্রতিরোধের পন্থা দেখা যায় – হয় সেটা গণ-আন্দোলন না হয়, সশস্ত্র তৎপরতায় পথে ঘটে। ভারতের দখলকৃত কাশ্মীরে জনগণের আন্দোলন শুরু থেকেই নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এটা সেখানে প্রতিষ্ঠিত যে ভারতের দখলের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গণ-আন্দোলনের পথ এখানে বেশি কার্যকর। আর সেখান থেকেই অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স নামে এক সামাজিক রাজনৈতিক জোটের জন্ম এবং এর নেতা হিসাবে সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক অথবা ইয়াসিন মালিক ইত্যাদি নামে গণ-আন্দোলন পন্থার নেতাদের আবির্ভাব। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সময়ে সশস্ত্রভাবে ভারতীয় সেনা ব্যারাকে গিয়ে দুটো সেনা মেরে আসার চেয়ে রাজপথের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী ও ফলদায়ক। সামরিকভাবে হামলার চেয়ে কার্ফু ভেঙ্গে রাস্তায় সাধারণ মানুষের নেমে আসা অথবা জানাজায় অংশগ্রহণ, কোন গৃহবধুর রাস্তায় নামা ইত্যাদি এগুলো অনেক বেশী শক্তিশালী। কাশ্মীরে দিল্লীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখানে উদোম করে চোখ আঙুল দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখানো সহজ হয়ে যায়। এই কারণ কাশ্মীরে সশস্ত্র প্রতিরোধ চলুক এটা দিল্লীর সরকারেরও পছন্দের দিক। দিল্লী তাই এই প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলার পথ একটাই – এদেরকে জঙ্গী বলে প্রপাগান্ডা করা। এরা জঙ্গি, পাকিস্তান থেকে আসা “সীমা পারকে আতঙ্কবাদী” অর্থাৎ কাশ্মীর ভারতের দখলকৃত থাকার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগণের কোন চাওয়া নাই, কোন প্রতিরোধ নাই – সব সমস্যার গোড়া হল “শান্তির” কাশ্মীরে পাকিস্তান থেকে পাঠানো সন্ত্রাসবাদ। এই বলে প্রপাগান্ডা করা। অতএব “ওরা জঙ্গী” এটা বলতে পারলেই একমাত্র ভারত সরকারের তাদেরকে সরাসরি গুলি করে মারার পক্ষে ন্যায্যতা হাজির করতে পারে। এসব কারণে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থার স্তরে গণ-আন্দোলন বেশী ফলদায়ক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বর্তমান স্তরে বলেছি, সব সময় বলি নাই।  কারণ কে না জানে বিজয় লাভ করতে হলে চুড়ান্ত দিনগুলোতে সাধারণত সশস্ত্র পথেই তা ঘটাতে দেখা যায়। কারণ সব পথ তখন একটাই, সশস্ত্র প্রতিরোধ, মোকাবিলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এর এক আদর্শ উদাহরণ। এগুলো সবাই জানে। কিন্তু যেটা মানুষ কম জানে বা খেয়াল করেনি, তা হলো ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলে একটি ব্যাপার আছে। ‘সফট ল্যান্ডিং’ ধারণাটি উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট, সেখান থেকে ধার করে এনেছি। এর মানে হল, উড়োজাহাজে যাত্রা আকাশে যতই আরামদায়কভাবে উড়ুক বা ঘটুক না কেন, সেটা আসল আরামদায়ক ভ্রমণ কি না, এর বিচার করা হবে ওই উড়োজাহাজের মাটিতে নামা মসৃণ ছিল কি না তা দিয়ে। অর্থাৎ মাটিতে নামার সময় ল্যান্ডিং বা নেমে আসাকে অবশ্যই কোনো বড় ঝাঁকুনি বা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে একেবারে মসৃণভাবে ঘটতেই হবে। নইলে সব বৃথা। ঠিক সে রকম আন্দোলন যদি গণ-আন্দোলন থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের স্তরে যাওয়ার সময় মসৃণ না হয়, পরিপক্ব হওয়ার আগে অস্ত্র ধরা হয় অথবা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্ত্র ধরা হয়- দুই ক্ষেত্রেই ওই আন্দোলন ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এতে তা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। উড়োজাহাজের  গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ার মত হবে।
কাশ্মিরের নিরস্ত্র গণ-আন্দোলন বিক্ষোভ প্রতিরোধ পঁচাত্তর দিনেরও বেশি কারফিউ অমান্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উরির ব্যারাকে হামলা করিয়ে কেউ না কেউ অপরিপক্ব অবস্থায় ওর মধ্যে সশস্ত্রতার আমদানি ঘটিয়ে দিয়েছে। কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ব্যারাক উরিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক হামলায় ১৮ জন সেনার মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারত দাবি করে যে, এই হামলা পাকিস্তান থেকে এসে ‘সীমা পার কি জঙ্গীরা’ করেছে। জবাবে স্বভাবতই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটা প্রমাণহীন এবং কোনো ইনভেস্টিগেশন বা তদন্তের আগেই করা প্রপাগান্ডা বলে দাবি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘‘পাকিস্তানের মাটি থেকে কোনও রকম অনুপ্রবেশ হয়নি।’’

কিন্তু আসল ব্যাপার হল, এমন দাবি আর পাল্টা দাবিতে কে ঠিক বলছে, তাতে আর কিছুই আসে যায় না। কারণ ভারতের নিট উদ্দেশ্য লাভ এতে ঘটে গিয়েছে। কাশ্মিরে লাগাতার প্রায় তিন মাস হতে চলা বিক্ষোভ আর সেটা মোকাবেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাম ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দিল্লি সরকার যখন ছেঁড়াবেড়া অবস্থা, তখন মোদির সরকার এখন স্থানীয়সহ গ্লোবাল মিডিয়াকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে যে, আসল ইস্যু ছিল কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন এবং এতে নির্যাতন-নিপীড়ন। তা আর আজ ইস্যু নয়। এখন ইস্যু হল ভারত-পাকিস্তানের বিবাদ। মূলকথা উরির সামরিক ব্যারাকে হামলা যেই করুক, কাশ্মিরে চলা গণ-আন্দোলনকে আড়ালে ফেলে ভারত-পাকিস্তানের সম্ভাব্য যুদ্ধকে সফলভাবে সামনে এনে ভারত গণ-আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করতে পেরেছে। আর এরই নিট বেনিফিট নিয়েছে, বেনিফিসিয়ারি হয়ে মোদি সরকার যুদ্ধের ঢোল পেটাচ্ছে। কি মজা!
গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই জানতে চেয়েছে, যুদ্ধ কি লেগে যাবে নাকি? তাদের আশঙ্কার বড় কারণ জানা গেল যে, শেখ হাসিনা সরকার এই ইস্যুতে ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলে বিবৃতিতে জানিয়েছে সেখান থেকে। ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলাতে আমাদের এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই সেকথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করে কথা বলা সহজ হয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত মানে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিডিয়ায় যা এসেছে, তাতে যুদ্ধ আসন্ন- এমন মনে করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে মূলকথা হল, সেনাছাউনিতে সশস্ত্র হামলার ঘটনার বেনিফিসিয়ারি হিসেবে মোদি ভারত-পাক যুদ্ধের দামামা তুলতে পেরেছে। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, উরির ঘটনার চিত্রনাট্য ইন্ডিয়ার নিজেরই তৈরি কি না। প্রথমে প্রশ্নটা তুলেছিল পাকিস্তানি মিডিয়া, পরে খোদ ইন্ডিয়ান মিডিয়া। এবিষয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, কিন্তু একই ভাবে উরি হামলার মুহূর্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমও। তবে সেই ভারতের মিডিয়া এই সন্দেহের কথা তুলেছিল কিছু ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের বরাতে, পরোক্ষভাবে। যেমন, ভারতের দাবি অনুসারে চারজন কথিত হামলাকারী জয়স-ই মোহাম্মদ জঙ্গি। ব্যারাকে জঙ্গি হামলায় পরে নাকি এরা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিটায়ার্ড এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কেকের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস প্রশ্ন তুলছে- এই চার জঙ্গির দাফনের জন্য কেন এত তাড়াহুড়া করা হলো। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, (“Should India have waited? ‘Hurried’ burial for Uri attackers raises eyebrows”) “দাফন করতে ভারতের দেরি করা উচিত ছিল।’ তাড়াহুড়া না করে এর বদলে তারা এই লাশগুলো সংরক্ষণ করে পাকিস্তানের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারত।

কপিল কেক পুরানা রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, এ ধরনের জঙ্গি হামলার ক্ষেত্রে সাধারণত ‘হামলাকারীদের মৃতদেহগুলা সংরক্ষণ করা হয়, পাকিস্তানকে তলব করা হয়, প্রমাণাদি পেশ করা হয়। মৃতের পরিবারকে খবর দিতে বলা হয়, যাতে তারা লাশ নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ কপিল বলছেন, কমন প্র্যাকটিস হলো… “এর আগে গত জানুয়ারি মাসে পাঠানকোট এয়ারবেজ হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের লাশ চার মাস ধরে রাখার পর দাফন হয়েছিল। আর ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় নিহত ৯ জন লস্কর-ই তাইয়্যেবা জঙ্গির লাশ প্রায় এক বছর মর্গে রাখা হয়েছিল। ২০০১ সালের পার্লামেন্ট ভবনে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় পাঁচ জঙ্গির লাশ দাফন করা হয়েছিল প্রায় এক মাস বাদে”। এ ছাড়া সব ক্ষেত্রেই লাশ নিয়ে গিয়ে দাফন-কাফন করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, যদিও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অথচ উরিতে শেষ রাতের এই হামলা ঘটে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর জানানো হলো যে, এই জঙ্গিরা সবাই পাকিস্তানি। এমনকি এ ক্ষেত্রে জঙ্গি হামলার লাশ দাফনের প্রচলিত জায়গাও বদলানো হয়েছে।
আবার ২১ সেপ্টেম্বরের হিন্দুস্তান টাইমস পাঁচটা পয়েন্ট তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, কেন পাকিস্তানে হামলা করা ভারতের জন্য সহজ হবে না। এ ছাড়া ওই রিপোর্টে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক কমিউনিটি কে কিভাবে দায়সারা করে এই হামলার নিন্দা করছে তা উল্লেখ করেছে। প্রায় প্রত্যেকেই শুধু হামলার নিন্দা করছে কিন্তু কেউ পাকিস্তানের নাম নেয়নি, দায়ী করে নাই বা উল্লেখ করেনি। এমনকি বাংলাদেশের নিন্দার বিবৃতিতেও পাকিস্তানের নাম নেয়া হয়নি। অর্থাৎ হামলায় ভারতীয় ভাষ্য বাইরের দুনিয়ার প্রায় সবাই এড়িয়ে গেছে, সম্ভবত এই দাবি প্রমাণসাপেক্ষ বলে। যেমন রাশিয়ার পুতিন মন্তব্য করেছেন কোনো দায়দায়িত্ব না নিয়ে খুব সাবধানে। বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী’। (stating: “We are also concerned about the fact that, according to New Delhi, the army base near Uri was attacked from Pakistani territory.”) আমেরিকানদের বক্তব্যও একই রকম সাবধানের, পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলেছে কাশ্মির (“an attack in the Valley”) ‘ভ্যালিতে যে হামলা হয়েছে আমরা তার নিন্দা করি”। – ওদিকে ব্রিটিশ সরকার উল্টা ডুবিয়েছে। উরি হামলার নিন্দা করে তারা বলেছে, ‘ইন্ডিয়া অ্যাডমিনিস্ট্রেডেট কাশ্মির’ (Uri as a part of “India-administrated Kashmir)। অর্থাৎ বলতে চেয়েছে যেন কাশ্মির ভূখণ্ডটি আসলে ঠিক ভারতের না।
ওদিকে বিবিসি ‘ভারত কি পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারবে?’ এই শিরোনামে ২০ সেপ্টেম্বর এক রিপোর্ট করেছে। লিখেছে, ভারতের একজন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অজয় শুক্লা মনে করেন, “নরেন্দ্র মোদি সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রেখেছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী হামলার বিপরীতে কড়া জবাব দেয়ার মতো সামরিক শক্তি এবং পরিকল্পনা তৈরি করেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। এখন মনে হচ্ছে সরকার তার নিজের বাগাড়ম্বরের মধ্যেই আটকা পড়ে গেছে”। অর্থাৎ মোদি কাশ্মিরের গণপ্রতিরোধ থেকে দেশি বিদেশি সবার চোখ সরাতে পেরেছেন ঠিকই, কিছু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বা মুডে নেই। ওই রিপোর্টের শেষ বাক্য হল, “অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ভারতকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সুচিন্তিত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বিপরীতে শুধু রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর করলে সেটি শুধু ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষতি করবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন”। অথচ ঠিক সেই সমস্যাই ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছেন মোদি।
মোদিসহ বিজেপি নেতারা এখন কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে, শনিবার ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী বিজেপির জাতীয় কমিটির সভা চলছে। ভারতের মিডিয়াতে এক নতুন শব্দের আমদানি হয়েছে- jingoism বা ‘জিঙ্গ-ইজম’। যার অর্থ উগ্র জাতীয়তাবাদী গরম কিন্তু ফাঁপা কথা বলে যুদ্ধের দামামা বাজানো। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ান গানবোটের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতির সপক্ষে একটা বাগাড়ম্বর গান লেখা হয়েছিল, সেখানে jingo বলে এক শব্দ ছিল। তাদের কারবারকে ঠাট্টা করতে “jingoism’ শব্দ দিয়ে তাদেরকে চিনানো শুরু হয়েছিল। তাই থেকে ‘জিঙ্গ-ইজম’ এই শব্দের উৎপত্তি। সমালোচকদের সবার অভিযোগ মোদিসহ দলের নেতারা ‘জিঙ্গ-ইজমে’ ভুগছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তবু এতে জনগণ দূরে থাক, নিজ বিজেপি দলের কর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা জবাব দিতে পারছেন না নেতারা। আনন্দবাজার গত প্রায় দশ দিনের বেশি হবে কাশ্মির ইস্যুতে সরকারের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কাহিনী নিয়ে বিস্তারিত লিখে চলছিল। শনিবার ২৪ তারিখের আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক সম্পাদকীয়তে দুঃখ জানিয়ে লিখছেন, ‘যুদ্ধের বিরোধিতাও যেন দেশদ্রোহিতার নামান্তর!’ এরপর ওইদিনের এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “কড়া জবাব কোথায়, ফুঁসছে বিজেপি, নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদি এখন নিজ দলের কর্মীদের সামলাতে হয়রান হয়ে গেছে – নিজের কর্মীরাই ফুঁসছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল প্রথম দিনেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন যিনি, তার গলাতেই আজ নরম সুর”। এটা বলতে আনন্দবাজার বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের কথা বুঝিয়েছে। মোদির সবচেয়ে বিশ্বস্ত লাঠি হল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। আর তাঁর পরের ব্যক্তিত্ব, মূল সংগঠন ‘সঙ্ঘ পরিবার’ থেকে এসে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক এই নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন রাম মাধব। তিনি এক গরম বক্তৃতায় আগের দিন ‘দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল’ খুলে নেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই বরাতে আনন্দবাজারের ওই কথা। রিপোর্টে আনন্দবাজার এর পরে লিখেছে, “পাকিস্তানকে জবাব দিতে কূটনীতি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপের হদিস দিতে পারেননি” রাম মাধব। অসন্তুষ্ট ক্ষুব্ধ দলের কর্মীদের চাপের মুখে পরে দলের আরেক সচিব শ্রীকান্ত শর্মা বোঝানোর চেষ্টা করেন, “প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনার তরফে গোড়া থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেনাকে পদক্ষেপ করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এবার সেনা কিভাবে কাজ করবে, সেটি তাদের এখতিয়ারে পড়ে। এর বেশি আর কী করা যেতে পারে এ মুহূর্তে?” – আনন্দবাজার থেকে কোট করে আনা কথাগুলো।  ওদিকে কাশ্মীর ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রীর মতভেদ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কয়েকটা গুরুত্বপুর্ণ সভায় উপস্থিত থাকেন নাই এমন রিপোর্টও ভারতীয় মিডিয়ায় এসেছে।  কেরালায় বিজেপির অভ্যন্তরীণ ঐ সভার প্রথম দিন পাকিস্তান প্রসঙ্গে মোদি কী করতে চান, তা তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি কোঝিকোড়ে শহরে এক জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ওই বক্তৃতা থেকে কোট করে তা দশটা পয়েন্ট হিসেবে তুলে এনে ছাপিয়েছে। এই দশটা পয়েন্ট পড়লে যে কেউ বুঝবে মোদি পাকিস্তানের সাথে কোনো যুদ্ধের চিন্তা করছেন না, এটা তার মাথাতেই নেই।

ওই দশ পয়েন্টের দ্বিতীয় এবং সাত থেকে দশ নম্বর পয়েন্ট- এগুলো পড়লে যে কেউ এটা বুঝবে। দ্বিতীয় পয়েন্টটি হল, ‘উরিতে যে আঠারোজন সেনা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করবে”। (Indians will never forget the gruesome act of killing 18 soldiers in Uri.) অর্থাৎ সম্ভবত এর মানে হল, ওই আঠারোজনই সবচেয়ে বড় সংখ্যার ‘শহীদ’। এরা ছাড়া আগামিতে আর কোন সেনা শহীদ হচ্ছে না। মোদি ইতোমধ্যে তা জেনে গেছেন। আর ওই আঠারোজনের জীবনের বিনিময়েই মোদী কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হলেন- সেজন্য কি? এর জবাব আগামীতে পরিষ্কার হবে।
পরের সাত ও আট নম্বর পয়েন্টে দেখা যাচ্ছে মোদি পাকিস্তানের সরকারের বদলে পাকিস্তানের জনগণের সাথে কথা বলতে চাইছেন। সেজন্য তাদের অ্যাড্রেস করে বক্তব্য রেখেছে। কংগ্রেস মোদীর বক্তৃতার সেদিকটাতে খোচা দিতে পরেরদিন টিপ্পনি করে বলেছে, মোদী সম্ভবত আগামি নির্বাচন “পাকিস্থান থেকে লড়বেন”।  অর্থাৎ সার কথা হল, তিনি যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছেন না, এর ইঙ্গিত সেটা। যেমন সাত নম্বরের প্রথম বাক্যটা হল, তিনি “পাকিস্তানের জনগণকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন- আসেন একটা যুদ্ধ লড়ি।’ এটুকু পড়ে পাঠকের মনে সামরিক যুদ্ধের কথাই ভেসে উঠবে। কিন্তু না, মোদি সামরিক যুদ্ধের কথা বলছেন না। পরের বাক্যে জানা গেল যে – “কে কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এরই প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে জেতার চ্যালেঞ্জ” দিচ্ছেন তিনি। বলছেন, “এটা হবে কে আগে বেশি চাকরি সৃষ্টি করা, দারিদ্র্য দূর করা আর শিক্ষার হার বাড়াতে পারে- এরই চ্যালেঞ্জ”। এ কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, তিনি আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের বয়ানে৪ও নাই। এখন “উন্নয়নের” (তার শ্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’) চিন্তার ভেতরেই সরে আসতে চাইছেন। যুদ্ধে যাওয়ার মানে উন্নয়ন-বিরোধী কাজ, (যা তিনি করেছেন সব ডুবে যাবে, সব বেপথে যাবে- এটা পরিষ্কার করে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ফলে মোদির পরিষ্কার যুদ্ধবিরোধী পথের ইঙ্গিত।
আট নম্বর পয়েন্টও একই ইঙ্গিত। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের জনগণের তাদের নেতাদেরকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, “আমরা দুই দেশ একই সময়ে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আমরা করি সফটওয়্যার রফতানি আর পাকিস্তান করে সন্ত্রাসবাদ রফতানি, কেন”। অর্থাৎ একই চিন্তা কাঠামোর বক্তব্য- “যুদ্ধ বনাম উন্নয়ন আর তিনি উন্নয়নের পক্ষে”। এরপর ৯ নম্বর পয়েন্ট। এটা হলো পাকিস্তান বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ কী করবেন, সে প্রসঙ্গে। এক কথায় বললে, কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং এটাই হবে সেই সর্বোচ্চ করণীয়। তিনি পাকিস্তানকে পশ্চিমাসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, কূটনীতি তার পথ।
শেষে দশ নম্বর পয়েন্ট। এটা বদ দোয়া দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। মোদি বলছেন,”একদিন পাকিস্তানের জনগণ নিজ ঘরের তৈরি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে”। যুদ্ধের ভুয়া দামামা বাজানোর চেয়ে তবুও এটা ভালো নিঃসন্দেহে। দশ পয়েন্টের সারকথা, যুদ্ধ বনাম উন্নয়নে মোদি উন্নয়নের পক্ষে।
আনন্দবাজারের রিপোর্টের শেষ দুই বাক্য এ রকম- “পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি এই বিদ্রোহী নেতাদের আগামীকাল সংবর্ধনা দেবেন। তার পরই “গরিবি হটাওয়ের স্লোগান দেবেন তিনি। লক্ষ্য, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাবের ভোট”। অর্থাৎ লক্ষ্যণীয় যে মোদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা পরিচয় করাচ্ছে এই বলে যে, তিনি হলেন- ‘পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি।’ এরপর আর কোনো মন্তব্য নিঃপ্রয়োজন। যুদ্ধ বিষয়ে কোনো খবর আর নেই। কাজকর্ম যেমন চলছিল, তেমনি রুটিন। সামনের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, আর এর কৌশল নির্ধারণ। বিজনেস এজ ইউজুয়াল! আসলে হিন্দুত্ত্ব – এর শ্লোগান তুলে ভোটের বাক্স ভরে তোলা যায় হয়ত তবে যুদ্ধের বাজারে এই শ্লোগান একেবারেই অচল। কোনই কাজে আসে না, উলটা মিথ্যার ভান্ড ফুটে যাবার  বিপদ ঢেকে আনে। বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে ২৬ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

 

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা
গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর  ২০১৬, সোমবার ০০ঃ০১

http://wp.me/p1sCvy-1R1

ভারতের জন্মের শুরু থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বিস্তর চড়াই-উতরাই আছে। কখনো তা চরম তুঙ্গে, আবার কখনো তুলনামূলক শীতল। কিন্তু এবারের চরম অবস্থা নিজগুণেই যেন তুলনাহীন। টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৭ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে রিপোর্টে জানাচ্ছে, কাশ্মিরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া চলমান কারফিউ ২৭ আগস্টে পঞ্চাশতম দিন পূর্ণ করেছে। কিন্তু পুরা ঘটনার বেজ-ফ্যাক্টস মানে, কী থেকে ঘটনা স্ফুলিঙ্গে রূপ নিল সেটা কী? সেটা ভারত সরকারের ভাষায় বলা যাক। ভারতের এনডিটিভির খবর অনুবাদ করে আমাদের বাংলা ট্রিবিউন কী ছেপেছে সেটা দেখে নেয়া যেতে পারে।  সেই ভাষ্যটা হল,  হিজবুল মুজাহিদিন নামে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠনের নেতা বুরহান ওয়ানী গত ৯ জুলাই ২০১৬ ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। তার ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়া রাজনৈতিক গণ-অসন্তোষ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কারফিউ অমান্য করেছিল জনগণ এবং জানাজায় অংশ নেয়া থেকে অসন্তোষ ও এর তীব্রতা শুরু। আর তা এবার ৫০ দিন পূর্ণ করল। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত দিয়ে তৈরি। এই শব্দ দিয়ে আমরা অনেক কিছু ঘটনা বুঝে ফেলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আমাদের পরিচিত এই বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে ব্যাপারটা বুঝানো হল। যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়া সুনির্দিষ্ট করে ‘এনকাউন্টার’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এটা ভারতীয় গণমাধ্যমের শব্দ। অপর দিকে যে শহরে ৫০ দিন টানা কারফিউ দিয়ে রাখতে হয়, সেখানকার জনজীবনের অবস্থা কী, মানুষের আয়-ইনকাম দিন এনে খায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সরকার সবসময় যথেচ্ছাচার বলপ্রয়োগে দাবড়ে সমাধান করে এসেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। কিন্তু এবার বুরহান এনকাউন্টারের পরের পরিস্থিতি যে এমন অগ্নিরূপ ধারণ করবে, কারফিউ দিলেও যে তা ভেঙ্গে মানুষ বুরহানের জানাজায় অংশগ্রহণ করে বসবে এগুলো তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কাশ্মীরের রাজ্য সরকারে উপরে কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনীর রুস্তমি চলে থাকে। এজন্য আইনগত ভাবেই সামরিক বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিগত ১৯৫৮ সালের এক আইনে (ওটা প্রথম আইন আসামের নাগাদের জন্য ছিল। পরে ঐ আইনের আদলে ১৯৯০ সালে বিশেষ করে কাশ্মীরের জন্য এক আইন প্রনয়ন করা হয়) যার নাম Armed Forces (Special Powers) Acts (AFSPA)। ফলে বলা যায় এই বাহিনীই এই প্রথম কার্যত পর্যদুস্ত হয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার এই বিষয়ে একটা রিপোর্ট লিখেছে যার শিরোনাম, “কোন পথে উপত্যকায় শান্তি আসতে পারে, হাতড়ে বেড়াচ্ছে নয়াদিল্লি”।  যেখানে ভারতের গোয়েন্দা-নিরাপত্তা মহলের হারু ও পর্যদুস্ত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আনন্দবাজার সেখানে লিখছে,  “প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামলাতে না পারার জন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে কেন্দ্র। এক জন জঙ্গির মৃত্যুর প্রতিবাদে কাশ্মীরে যে এত বড় মাপের অশান্তি হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও ধারণাই ছিল না গোয়েন্দাদের। এমনকী দিল্লিতে বসে শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তারা দাবি করেছিলেন,বিক্ষোভ সাময়িক। দশ দিনেই থেমে যাবে। তা যে কবে থামবে,সে ধারণাও নেই কারও! উপত্যকার অশান্তি সেটাই!”।খুব সহজে কাতর হন না এমন ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর গায়েও আঁচ লেগেছে। আর চুপ থাকা যায়নি এবং আনন্দবাজারের রিপোর্ট তা ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলা যায়। এসব পরিমাপের দিক থেকে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও কাশ্মিরের এবারের ঘটনায় আর চুপ থাকতে পারেননি। আনন্দবাজারের ভাষ্যটাই তুলে আনছি, এক টিভি সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেছেন,

“সরকার এতটাই খারাপভাবে কাশ্মির-পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে যে এটাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপরে সবচেয়ে বড় দাগ হিসেবেই দেখছে গোটা বিশ্ব”। চার দিক থেকে সবাই বিষয়টিকে সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে নাড়াচাড়ার ত্রুটি হিসেবেই দেখছে তাতে সন্দেহ নেই। সেটা এখানে তুলে ধরতে একটু বড় এক উদ্ধৃতি আনন্দবাজার থেকে আনছি। লিখেছে “সমালোচনা হচ্ছিলই। কাশ্মিরের উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দুষছিল মোদি সরকারকে। আরএসএস নেতাদের একাংশও মনে করছেন, কাশ্মিরের পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলানো হচ্ছে না। কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এভাবে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে মুখর হওয়ায় চাপ আরো বাড়ল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার সরকারের ওপরে। কাশ্মিরিদের মধ্যে যে দেশের বাকি অংশ সম্পর্কে নানা রকম মত রয়েছে, সে কথাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য। কিন্তু সেই বাস্তবতার নিরিখেও সরকার যে ভূমিকা নিচ্ছে, অমর্ত্যরে মতে সেটা বড় রকমের ভুল। এই সূত্রে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, কাশ্মিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা জরুরি। তবে সেটাই কাশ্মিরিদের মূল সমস্যা বলে ধরে নেয়াটা ভুল। …অমর্ত্য সেনের এই সমালোচনার জবাবে সরকারের তরফে কেউ মুখ খোলেননি তাৎক্ষণিকভাবে। এবং ভূস্বর্গে অব্যাহতই রয়েছে অশান্তি। দক্ষিণ কারের কাজিগুন্দে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে গুরুতর জখম আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে আজ। এই নিয়ে ১১ দিনে উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৪৪। তবে গুলি চালনার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।”

আনন্দবাজারের এই রিপোর্ট গত ২০ জুলাইয়ের। ফলে নিহতের সংখ্যা এটা সর্বশেষ সংখ্যা নয়। কারফিউর ৫০তম দিনে মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৬৯ জন।
এক কথায় বললে মোদি সরকার এবারের কাশ্মির ইস্যুটি নিয়ে বড়ই পেরেশান আর বেকায়দায় আছে। বেকায়দায় পড়লে মানুষ আরো উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। এখানেও তাই হয়েছে। আর সেটাই এখানে  আমাদের এই রচনার মুল প্রসঙ্গ।

তবে ঘটনাস্থল এবার ঠিক কাশ্মীর নয়। কাশ্মীর থেকে ব্যাঙ্গালোরে, যদিও ইস্যু সেই একই কাশ্মীর। ব্যাঙ্গালোরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের’ (এআই) শাখা অফিস কাশ্মিরে মানবাধিকার ইস্যুতে এক সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
কিন্তু বিজেপির ছাত্রসংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের’ (এভিবিপি) অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে, তাদের আয়োজিত ঐ কাশ্মির বিষয়ক সেমিনারে ভারতের বিরুদ্ধে ও ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে লাগাতার স্লোগান দেয়া হয়েছে। তাই অ্যামনেস্টি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে এর পরের দু-তিন দিন ধরেই ব্যাঙ্গালুরুতে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিজেপির ছাত্র শাখা। যদিও জবাবে অ্যামনেস্টি দাবি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনার কোনো ভিত্তিই থাকতে পারে না।
ঘটনার সূত্রপাত সেমিনারের একজন বক্তা, কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিত নেতা আর কে মাট্টু দাবি করেছিলেন “ভারতীয় সেনার মতো সুশৃঙ্খল বাহিনী দুনিয়াতে কমই আছে”। এই তথ্যগুলো নিয়েছি ভারতীয় বিবিসির ১৬ আগস্টের এক রিপোর্ট থেকে। ব্যাঙ্গালুরুতে ঐ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল এর আগের শনিবার, মানে ১৩ আগস্ট। ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কিছু কাশ্মীরি ছাত্র, যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করেন। ফলে হিন্দু পণ্ডিত নেতা মাট্টুর ওই বক্তব্যের পর সভায় উপস্থিত কাশ্মীরি যুবকেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন, তাঁরা কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করেন। আসলে ঐ সভায় হিন্দু নেতা আর কে মাট্টুসহ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের উপস্থিতিও গণ্ডগোল লাগানোর দিক থেকে পরিকল্পিত বলা যায়। দাওয়াতি না হয়েও তারা গণ্ডগোল পাকানোর উদ্দেশ্যে সভায় শুরুতে দলবেঁধে ওই সভায় প্রবেশ করেন। এরপর উসকানিমূলকভাবে কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর তৎপরতার পক্ষে উগ্র ও কড়া সাফাই বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দিয়েছিল তারা।
কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের পর ঘটনা পরিকল্পনায় মঞ্চে হাজির হয় এভিবিপি। পরের দিন গুলোতে  বিজেপির ছাত্র শাখা এভিবিপি, তারা ঐ অনুষ্ঠানে স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে এবং শহরে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে মিছিল করে জনমত খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে তাঁরা ব্যাঙ্গালুরু অ্যামনেস্টির অফিসে হামলা করেছিল। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে পুলিশের ওপর উলটা চাপ সৃষ্টি করে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা’ করে।
এ বিষয়ে বিবিসি তাদের রিপোর্টে লিখেছে, অনেকটা তাদের চাপের মুখেই ব্যাঙ্গালুরুর পুলিশ ‘অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার’ বিরুদ্ধে দেশদ্রোহসহ আরো নানা অভিযোগে এফআইআর দাখিল করে। এ ছাড়া বিবিসি আরো লিখেছে, বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা সাকেত বহুগুনা বলছেন, “অ্যামনেস্টি ও তাদের মতো আরো কিছু এনজিও বারবার এটাই বলে চলেছে কাশ্মিরে সব সমস্যার মূলে আছে ভারতীয় সেনা। তারা এমন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে যে, কাশ্মিরের মুসলিমরা সেনাদের হাতে নির্যাতিত। তাদের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে, এখন বলুন কোন দেশ এটা সহ্য করবে যে, তাদেরই একটা অংশকে আলাদা করে ফেলতে প্রকাশ্যে উসকানি দেয়া হচ্ছে?’।
কাশ্মির ইস্যুতে সাধারণভাবে বিজেপির অবস্থান হল, যেভাবে সাকেত বহুগুনার বক্তব্যে দেখা গেছে, মোটা দাগে সেটাই। কাশ্মিরের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠলেই সেটাকে তারা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ বলে অভিযোগ আনে। সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে তারা জনমনে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করে থাকে।
উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগিরে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন যে কাশ্মিরের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠালে তা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ হতেও পারে। কিন্তু না, এটা রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ নয়। এটা আমার কথা নয়, এ নিয়ে বহু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার বক্তব্য ও ঐ ধরণের বহু মামলায় বেকসুর খালাসের রায় আছে। আশির দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রথম এমন রায় দিয়েছিলেন। যা পরে অন্যান্য অনেক ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা হিসেবে কোর্টের সামনে আনা হয়েছিল। এখানে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার সীমা টেনে দেয়া লাইন হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের স্লোগান – সেটা কাশ্মিরের স্বাধীনতা চাই অথবা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা চাই; যা-ই তোলা হোক এগুলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ’ ঘটে এমন কাজ নয়। স্বাধীনতার দাবি করে স্লোগান দিলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না। তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অথবা সেনাবাহিনী যার বিরুদ্ধেই স্লোগান হোক না কেন। তবে একমাত্র কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে স্লোগান দিলে বা সশস্ত্র সাংগঠনিক তৎপরতা চালালে বা সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন চালালে তা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহ হবে।
বিজেপি এই রায়ের কথা জানে। তবুও সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে হাজির করে আবেগ থেকে ফায়দা নিতে চাওয়া তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশল। তারা বলছে, ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে। এখন বলুন, কোন দেশ এটা সহ্য করবে?’ – হ্যাঁ, ভারত রাষ্ট্রই এটা সহ্য করবে, নিরস্ত্র হলেই করবে। করতে হবে এটাই সুপ্রিম কোর্টের রায়। সেনাবাহিনী অন্যায় করলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে, যদি তা নিরস্ত্র হয় এবং তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে না।

ওদিকে ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনার আরেক তামাশার দিক আছে। কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু (পুরানা নাম ব্যাঙ্গালোর)। এর রাজ্য সরকার বা প্রাদেশিক সরকার হল কংগ্রেস দলের ফলে এর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসি। বিবিসি তাদের ওই রিপোর্টে বলছে, “কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া আবার যুক্তি দিচ্ছেন, একটা সভায় দেশবিরোধী স্লোগান ওঠার পরও সরকার হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না। তাই বিষয়টি নিয়ে তার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে”। অর্থাৎ একজন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তিনিও বিজেপির রাজনীতি অনুসরণ করে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, পছন্দ করছেন। কেন? তিনি তো বিজেপি করেন না, কংগ্রেস দল করেন ও সেই দলের মুখ্যমন্ত্রী! তাতে কী? তিনিও বিজেপির সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে জনমনে বিভ্রান্তি জাগানোর বিরুদ্ধে দাড়াতে, সত্য বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিজেপি হিন্দুত্বের জিগিরের এমনই এক আবহাওয়া তৈরি করে ফেলেছে। ফলে তিনি কিছুতেই ঐ  হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ারের সামনে দাড়াতে চাচ্ছেন না, এতে তিনি অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ার তুলে এর সামনে ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীকেও বিজেপির রাজনীতি করতে বাধ্য করেছে বিজেপি। অথচ সব দলই জানে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা বা অভিযোগ কোনো হাইকোর্ট আমল করবেন না, বেকসুর খালাস দিয়ে দেবেন। কিছু দিন আগে দিল্লীতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা কাহানাইয়ার মামলাতেই একই ঘটনা হয়েছিল। মামলা চলে নাই। কাহানাইয়া এখন মুক্ত কিন্তু কয়েক মাস তাকে জেলে থাকা সহ বিশাল হয়রানী পোহাইতেই হয়। অর্থাৎ আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ নিতে, হয়রানির রাজনীতি করতে কংগ্রেস বিজেপির থেকে প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে থাকতে চায় না। এই হলো হিন্দুত্বের রাজনীতি, এই তার মহিমা।
হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা এতই যে, বিবিসি লিখেছে, ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিলেও দিল্লিতে দলের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলছেন, “একটা প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলা যায় কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ আছে”।
মি. সিংভির বক্তব্য, ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি দেয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর হতেই পারে, কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা বোধ হয় সমীচীন নয়।’ ‘কোনো ব্যক্তি হয়তো তার বাকস্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটা সংস্থাকে এভাবে অভিযুক্ত করা ভুল বলেই আমার ধারণা।’ অর্থাৎ কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি জানেন বুঝেন নিজেই এটাকে ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি’ দিয়ে নাচা বলছেন। এর পরও হিন্দুত্বের রাজনীতি করার লোভ না ছেড়ে বরং চিকনে মেরে ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই’ বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা ছাড়তে চাচ্ছে না। যাতে এ-ও হয় সে-ও হয়, এমন একটা ঝাপসা অবস্থান থাকে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

লেখাটা এর আগে গত ২৮ আগষ্ট দৈনিক নয়াদিগন্তে অনলাইনে (প্রিন্টে ২৯ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে আপডেট ভার্সান হিসাবে এখানে আবার ছাপা হল।

 

 

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়
গৌতম দাস
০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Nl

 

ঘটনার শুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ থেকে। সেখানে তিনি এই ভাষণে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ( এবং সাথে পাকিস্তানের কাশ্মীর অংশেও) দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ এনেছেন। ‘আমি বালুচিস্তান, গিলগিট, ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিষয়ে বলতে চাই। এ নিয়ে ভারত সরব হওয়ায় গত কয়েক দিনে ওখানকার অনেক লোক আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।’’ এর ব্যাখ্যা হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে (ভারতীয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ব্যক্তি যোগাযোগে করলে) নাকি বলা হয়েছে, মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ এনেছেন এ জন্য যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আগের দিন ১৪ আগস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে চলমান লাগাতার বিক্ষোভ, কারফিউর প্রসঙ্গ টেনে একে ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মানে এসব আসলে একটা পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা, যেখান থেকে সত্যতা বের করা কঠিন। তবে ১৪ আগস্টের আগেও ড্রেস রিহার্সেলের মত করে মোদী বেলুচ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। গত ১২ আগস্ট ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে ভারতের কাশ্মিরকেন্দ্রিক সব রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক হয়। মুজাহিদ কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরে লাগাতার কারফিউ কাশ্মিরের জনজীবন স্থবির করে রেখেছে। সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বৈঠকে মোদী সর্বপ্রথম বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আনন্দবাজারের রিপোর্টের ভাষায়, ‘গত শুক্রবার কাশ্মির প্রসঙ্গে সবর্দলীয় বৈঠকে প্রথম এই নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী। এই নতুন পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি সেই বৈঠকে বলেছিলেন,পাক-অধিকৃত কাশ্মির ও বালুচিস্তানের মানুষ যারা এখন অন্য কোনো দেশে থাকেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানের নির্যাতনের কথা সামনে আনতে হবে।’ সার কথা হল, কাশ্মির অসন্তোষে বুরহান ইস্যুর পর থেকে বর্তমানে ভারত যে চাপের মুখে আছে সেখান থেকে মুক্তি পেতে পাল্টাপাল্টিতে পড়ে ঘটনা এখন মোদীর ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ পর্যন্ত ঠেকেছে।

নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলা অন্তত ভারতের দিক থেকে একেবারেই নতুন অস্ত্র। এই অস্ত্র ভারতের জন্য শুধু নতুন তাই নয়। কারণ মানবাধিকার ইস্যু সবসময়ই দু’ধারী তলোয়ারের মত। কাঁচের ঘরে বসে অ্ন্যের উপর ঢিল ছুড়ার মত। ফলে তা ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করে ভারত নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। এক কথায় বললে কারো বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ আনা ভারত কখনোই নিজের কাজ মনে করেনি বা নিজের চায়ের কাপ হিসেবে গ্রহণ করেনি। আজ ভারত যেমন এক এককাট্টা রাষ্ট্র বলে দেখি কলোনি আমলের বৃটিশ-ভারত ঠিক তা ছিল না। সরাসরি কিছু প্রাদেশিক (সেকালে প্রেসিডেন্সী বলা হত) সরকারি এলাকা আর প্রায় ৫০০ এরও বেশি ছোট বড় করদ রাজ্য – এই সব মিলিত ভুখন্ডটাকে বলা হত বৃটিশ-ভারত। বিগত ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্মের সময় থেকেই অন্তত পরের তিন বছর ধরে সমানে পিটাপাটা আর সামরিক বলপ্রয়োগ করে বিভিন্ন রাজার রাজ্যকে মুল ভুখনন্ডে অন্তর্ভুক্তিতে বাধ্য করতে হয়েছিল। অর্থাৎ নেহেরুর নেতৃত্বের নতুন ভারত সরকারের অধীনে পুরান স্টাইলে কোন রাজাকে কর-খাজনা দিয়ে করদ রাজ্য হয়ে থাকার ব্যবস্থা রাখেন নাই। যেখানে ভারতভুক্তি আপোষে হয় নাই সেখানে সামরিক বল প্রয়োগ করে তা করা হয়েছিল। এর পরবর্তিকালের ভারতে একের পর এক লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও মাওবাদী আন্দোলনের সমস্যা ভারত রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কাশ্মির, পাঞ্জাব, নকশাল আর উত্তর-পূর্বের সাত বোন রাজ্যের আন্দোলন সেসবের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রকে জন্মের পর থেকেই লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাজনৈতিক সমস্যাকে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বলপ্রয়োগ, হত্যা-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে দমিয়ে নিজের রাষ্ট্রকে সংহত রাখতে হয়েছে ও হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট সেই রাষ্ট্রের কাছে ‘মানবাধিকার’ শব্দটিই হারাম। কারণ সে নিজেই সর্বক্ষণ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। স্বভাবতই ওই রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হবে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা। জন্মের পর থেকে এটাই এত দিন ভারত রাষ্ট্রের পুরানা সব সরকারের গৃহীত নীতি ছিল। ছিল বলতে হচ্ছে, কারণ অগ্রপশ্চাৎ যথেষ্ট বিবেচনা করে মোদি সেই নীতি এখন ভেঙেছে তা মনে করা যাচ্ছে না। খুব সম্ভবত চলতি কাশ্মীর ক্রাইসিস আরও মহীরুহ হয়ে সামনে আসতেছে এটা আঁচ  করে, মোকাবিলায় উপায়ন্ত না দেখে আপাতত “কুইনাইন খাইয়ে” যেভেবেই হোক জ্বর ছাড়াবার ব্যবস্থা এটা। এতে এরপর কুইনাইন সারাবে কে সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা – এটাই এতদিনের ভারতের নীতি ছিল তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত দেখা যায় পশ্চিমা রাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কের দিকে, বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের দিকে তাকালে। যেকোনো পশ্চিমা বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর শুরুতে ভারত সব সময় সবার আগে কবুল করিয়ে নেয় যে ‘কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু’, ভারত এই ইস্যুর ‘কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না’, এমনকি ‘জাতিসঙ্ঘেও মুখোমুখি হতে চায় না’ – এ ব্যাপারে ভারতের সেই পরদেশী বন্ধু একমত আছে। এমন একমত হবার পরই কেবল ভারত সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে আগায়। সে কারণে যে আমেরিকা মানবাধিকার ইস্যুকে অন্য রাষ্ট্রের পেছনে লাগার, তাকে বিব্রত করার বিষয় হিসেবে ব্যবহার করে প্রতি বছর রিপোর্ট বের করে থাকে, অথচ সে ভারতের কাশ্মির ইস্যুতে উল্টো নিজেকেই নিয়ন্ত্রিত রাখে। তো এই হল, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ইস্যু কেন ভারতের চায়ের কাপ নয়, এটা ভারতের জন্য নয়- এই ভাব ধরে রাখার ভারতীয় স্টাইল। তাই ‘মানবাধিকার’ ভারতের জন্য ‘নো গো’ বা অগম্য এলাকা- এভাবেই এত দিন ছিল। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীদের ব্রিফিংও এত দিন এই আলোকে সাজানো ছিল, এভাবেই চলে আসছিল।
তাই  ‘বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে’- মোদির এই নতুন বয়ানের পথ অনুসরণ করা দেখে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছে ভারতের ভেতরেরই অন্য রাজনৈতিক, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া গোষ্ঠী। তাঁরা দেখতে পাচ্ছে, মোদির রাজনৈতিক লাইনটি এ রকম যে, মোদি এখন থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তুলবে। আর তাতেই নাকি পাকিস্তান কুপোকাত হয়ে যাবে। মোদির এই লাইনের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, ভারতের কাশ্মিরের অসন্তোষ তৈরি করার জন্য পুরোপুরিভাবে পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করে দোষ চাপানোর ফলে অনেক রিলিফ পাওয়া যাবে, চাপ কমানো যাবে। ঠিক যেমন বেলুচিস্তানে অসন্তোষের জন্য পাকিস্তান ভারতকে দায়ী করে থাকে। উভয় পক্ষের এসব দায়ী করার ঘটনার সাথে সবচেয়ে ভাল তুলনীয় ঘটনা হল, ঠিক যেমন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হত ভারতের প্ররোচনাতেই নাকি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে। যেন বাংলাদেশের জনগণের কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্খা বা লড়াই-আন্দোলন বলে কিছু ছিল না। আবার তাই বলে বাংলাদেশের আন্দোলন বলশালী হলে এর মধ্যে ভারতের কোনোই স্বার্থ-প্রভাব ছিল না, এটা ঠিক তা বলাও নয়। ব্যাপারটা হল হবু বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষই নিজের নিজের স্বার্থ দেখেছিল। ফলে স্বার্থের এক সম্মিলন আমরা দেখেছিলাম। তবে প্রপাগান্ডার সময় মুখ রক্ষার্থে পাকিস্তান ভারতের প্ররোচনার কথাই বলবে। ঠিক যেমন ভারতের কাশ্মির সমস্যা ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের প্ররোচনাকে দায়ী করার পথ ধরতে চাইছে। প্রচারণার এসব স্টাইল নতুন নয়। যেটা নতুন তা হল ভারতের আমলা কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা মোদীর এই নতুন রাজনৈতিক লাইনের ভেতর বিরাট বিপদ ও সমস্যা দেখছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট মোদির বক্তব্য নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তারা তখনো ছিল খোশমেজাজে, কারণ বিপদ তখনো কেউ তাদের মনে করিয়ে দেয়নি। এ দিনের আনন্দবাজারের দু-দু’টি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ভারত-পাক সঙ্ঘাতের নয়া কেন্দ্র চিরবিদ্রোহী বালুচিস্তান’ এবং ‘কাশ্মিরের জবাবে বালুচ তাস, পাকিস্তানকে ফের খোঁচা মোদির’– যা তাদের স্পষ্ট উচ্ছ্বাসের প্রকাশ। আনন্দবাজার সবসময় তাতানো সেনসেশনাল আর খুবই সস্তা জাতীয়তাবাদী শিরোনামে রিপোর্ট লিখে থাকে। এই উচ্ছাস তেমনই। তবে সে হানিমুনের পিরিয়ড এখানেই শেষ। এর পরের দিন থেকে আনন্দবাজারসহ সব মিডিয়া, কূটনীতিক সবাই খুবই সতর্ক, যার প্রতিফলন দেখা যায় মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে। পরের দিন ১৭ আগস্ট থেকে মিডিয়া পুরো উল্টে যায়। যেমন এবার আনন্দবাজারের রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘লাভ কী হবে বালুচ তাসে, উঠছে প্রশ্ন’ অথবা আরও একদিন পর ১৮ আগস্টের রিপোর্ট, ‘বালুচিস্তান নিয়ে বেপরোয়া হতে গিয়ে মোদি এখন ঘোর কূটনৈতিক প্যাঁচে’। এখানে ভারতীয় বাংলা পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বাংলায় বুঝানোর সুবিধা নিলাম। ইংরেজি পত্রিকা রিপোর্টগুলোও কমবেশি একই রকম।
তাহলে কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা এতে কী বিপদ দেখলেন? তারা আসলে বলতে চান মানবাধিকার রেকর্ডের রিপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারত প্রতিযোগিতা করলে তাতে পাকিস্তানের যা হবে হোক, কিন্তু ভারতের কাপড় খুলে যাবে। কারণ জন্ম থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদ বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হুমকি সামলাতে গিয়ে ভারত মারাত্মক দুস্থ ও বিপজ্জনক অবস্থায় আছে; কারণ তার মানবাধিকার রেকর্ড খুবই খারাপ। ফলে মানবাধিকারের কথা যত চেপে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় ততই ভাল।
তাই আনন্দবাজার লিখছে, “…দ্বিধাবিভক্ত দেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক শিবির। অনেকের প্রশ্ন, ইসলামাবাদের ঢিলের বদলে পাটকেল ছোড়ার এই নতুন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে কি না?”। আর সবশেষে লিখছে, তবে কূটনীতিকদের একাংশের মত, “বালুচিস্তান নিয়ে ভূকৌশলগত খেলা চালিয়ে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করা যাবে। কিন্তু তাতে কাশ্মির সমস্যা মিটবে না। বালুচিস্তানের সাথে চিন ও ইরানের স্বার্থও জড়িত। মোদির এই তাসে ওই দু’টি দেশও ক্ষুব্ধ হবে বলেই মত অনেক কূটনীতিকের”। যদিও মোদীর এই মানবাধিকার বয়ানের লাইনের আরও এক আসল কারণ আছে তা এখানে আনন্দবাজার বলে নাই। সেটা এই রচনার শেষের দিকে আনব।
অর্থাৎ এখানেও আসল কারণ লুকিয়েছে মিডিয়া রিপোর্ট। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কংগ্রেসের সাবেক বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, তিনি আসল কারণ কিছুটা বলেছেন। আনন্দবাজার বলছে, সলমন খুরশিদের মতে, “অন্য দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু খোলাখুলিভাবে তা নিয়ে ভারত নাক গলায় না। …সে দেশের নেতাদের কাছে ঘরোয়াভাবে আমরা উদ্বেগ জানাই ঠিকই। কিন্তু সেটাকে কখনো নীতি হিসেবে ব্যবহার করি না। তাহলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের পার্থক্য কী হলো? …বালুচিস্তান নিয়ে ভারত গলা চড়ালে পাকিস্তানও কাশ্মির নিয়ে আরো সরব হওয়ার সুযোগ পাবে”। তবে কংগ্রেস দল সলমন খুরশিদের কথাকে নিজ দলের কথা তা বলতে পারেনি। বরং বলেছে এটা সলমনের ব্যক্তিগত মতামত। আনন্দবাজার এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছে, “ভোটের রাজনীতির কথা ভেবে কংগ্রেস মোদির পাকিস্তান বিরোধিতা থেকে দূরে যেতে চায়নি। তাই এমন সিদ্ধান্ত”।
এখানে এখন একটা তথ্য দেইয়া যাক। পাঠকের মনে হতে পারে এগুলো ভারত-পাকিস্তানের “সাদিও পুরানা” ক্যাচাল, এতে আমাদের কী! এমন দেশী পাঠককে সন্তুষ্ট করার জন্য তথ্যটি হল, আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার তথ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সাথে কথা বলেছেন। ওই পত্রিকার এসংক্রান্ত রিপোর্টের শিরোনাম, ‘মোদীর বেলুচিস্তান ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থন’ (Bangladesh backs Modi on Balochistan)। ওই রিপোর্ট থেকে দু’টি উদ্ধৃতি আনব এখানে। এক. ইনু বলেছেন, “বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে (বেলুচ) মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য এবং আমরা শিগগিরই বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ আমাদের সরকারের নীতি ঘোষণা করব”। এরপর উদ্ধৃতি দুই. “দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাপারের টেররিজম পাঠিয়ে আর বেলুচদের মতো গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের নিজ ভূখণ্ডে নির্যাতন করে ইসলামাবাদ কী পেতে চায় তা ব্যাখ্যা করা উচিত”।
মানবাধিকারের নীতিগত দিক থেকে এবং সে বিচারে আমাদের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। যেকোনো মুক্তি আন্দোলন বা রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি নির্যাতনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খুবই মারাত্মক। কিন্তু তবু তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারত সন্তুষ্ট হয়েছে কি না বলা মুশকিল। কারণ, যে কেউই ওই একই বাক্যে বেলুচ শব্দের জায়গায় কাশ্মির আর ইসলামাবাদের জায়গায় দিল্লি বসিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। এতে ভারতের কোনো সরকারি পাঠক খুশি না হয়ে উল্টো বিপদ দেখে ফেলতে পারেন।

সবশেষে এখানে মোদীর মানবাধিকার কর্মী হবার এই লাইন কেন নিলেন এর আসল কারণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এটা সেপ্টেম্বর মাস। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ ২৫ তারিখের আশেপাশে নিউইয়র্ক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়ে সরগরম থাকে। কারণ জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলি বা সাধারণ পরিষদের বৈঠক চলে। বিগত ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীরে গণভোট দিবার এক প্রস্তাব পেন্ডিং বা চাপা পড়ে আছে। এজন্যই ভারত বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের আগে কবুল করিয়ে নিয়ে রাখে যে, “কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু”, ভারত এই ইস্যুর “কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না”।  কাশ্মীরের অসন্তোষ চলছে। এবারের বুরহান ইস্যুতে এপর্যন্ত প্রায় ৭৫ এর উপরে মানুষ সেখানে মারা গিয়েছে।  তাই ভারতের আশঙ্কা পাকিস্তান এবারের জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে কাশ্মীর ইস্যুকে সরগরম করার চেষ্টা করবে। তাই পালটা কৌশল হিসাবে আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আর টেররিজমের ইস্যু তুলে রাখার কৌশল নিয়েছে ভারত। অন্যান্য মিডিয়া ব্যাপারটা আবছা ভাষায় বললেও ভারতের livemint পত্রিকা স্পষ্ট করে লিখেছে পাকিস্তান ২২ জন ডিপ্লোম্যাট নিয়োগ দিয়েছে যারা কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লবি করবে। মোদীর ভাষ্য জাতিসংঘে এই লড়াইয়ে জিতবার জন্যই সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাই এবারের G20 বা টপ ২০টা অর্থনীতির রাষ্ট্রের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ৫ সেপ্টেম্বর চীনে। মোদী সেখানকার বক্তৃতায় নাম না ধরে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও টেররিজমের অভিযোগ তুলে বক্তৃতা করেছেন। আর ওদিক সিপিএম এর সীতারাম ইয়াচুরী মোদীকে অভিযোগ করছেন যে তিনিওই পাকিস্তানকে জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলছেন,

We are giving an opportunity to Pakistan by raising the Balochistan issue. Now Pakistan may say that since India is taking about Balochistan, which is an integral part of that country, they have the right to talk about Kashmir. With this kind of foreign policy, we are giving an opportunity to others to internationalise the Kashmir issue, Mr. Yechuri said.

অর্থাৎ ইয়াচুরি বলতে চাইছেন, আমরা সবসময় বলে এসেছিলাম, “কাশ্মীর ইস্যু ইন্টারনাশনালাইজ করতে দিব না। সেখান থেকে মোদী সরে আসাতেই এটা ঘটতেছে”। এখন দেখা যাক, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা কী দেখব। আগামি নভেম্বরে সার্ক সম্মেলন বসার কথা পাকিস্তানে। আদৌও তা হবে কিনা তা পুরাটাই নির্ভর করছে এই সেপ্টেম্বরের ফলাফল কেমন কী হয়, তিক্ততা কেমন মাত্রায় ছড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছু উপরে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সরকার প্রধান যেতে পারছেন না বলে প্রচার হওয়া শুরু করেছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ২১ আগষ্ট ২০১৬ (প্রিন্টে ২২ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট  করে আবার ফাইনাল ভার্সান আকারে ছাপা হল।]

বিচারকের ‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা

রাষ্ট্রের কারও বিচার করা মানে কীঃ
‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা করা
গৌতম দাস
০৭ মার্চ ২০১৬, সোমবার
http://wp.me/p1sCvy-LB

অবশেষে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ)  ছাত্রসংসদের নেতা কানহাইয়া কুমারকে ভারতের আদালত জামিন দিয়েছে। তিনি এখন মুক্ত। দেশদ্রোহ মামলায় গত ফেব্রুয়ারি মাসের নয় তারিখ থেকে তিনি গ্রেফতার ছিলেন। ভারতের মিডিয়া এতদিন জেএনইউ আর কানহাইয়া শব্দে  তাদের পাতা ভরিয়ে রেখেছিল। সে উত্তেজনা সীমান্ত ছাড়িয়ে বাংলাদেশেও এসে পড়েছিল।  আবেগ শুণ্য হয়ে বিষয়টা একটু রিভিউ করার এবার সম্ভবত সময় হয়েছে।

মুল ঘটনার সংক্ষেপ হল, ২০০১ সালে ডিসেম্বরে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে এক সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছিল। অনুমান করা হয় কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাজ এটা। পাঁচজন হামলাকারীসহ মোট ১৪ জন ওই হামলায় নিহত হন। পরে ওই হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অন্য অনেকের সাথে এক আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। আদালতের রায়ে তার ফাঁসির আদেশ হয়। কিন্তু ওই আদেশ সঙ্গোপনে বাস্তবায়ন করা হয় এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেলখানার ভেতরেই তাকে কবর দেয়া হয়েছিল। ফাঁসি্র দড়িটানার দিনক্ষণ কবে কখন তা স্ত্রী, পরিবার, আত্মীয়স্বজন কাউকেই আগে জানানো হয়নি। তবে ফাঁসি কার্যকর করার পরের দিন সকালে তা সকলকে জানানো হয়। আর জনরোষের ভয়ে আফজাল গুরুর লাশ স্ত্রী,পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে কখনই দেয়া হয়নি। এমনকি জেলে আফজালের ব্যবহার্য জিনিসপত্রও কখনই ফেরত দেয়া হয়নি। তার বিচার সঠিক হয়নি, ত্রুটিপূর্ণ ইত্যাদি অভিযোগ সে সময়ই উঠেছিল; কিন্তু সেগুলো সুরাহা না করেই ফাঁসি দেয়া হয়েছিল- ভারতের জনসমাজের কোথাও কোথাও এমন অনুমান এখনও বজায় আছে।

রাজনৈতিক কমিউনিটি তৈরি করে না নিলে বিচ্ছিন্নতাবাদ আসে
ভারত এক এককাট্টা ভুখন্ড এক রাষ্ট্র, আজ বেশির ভাগের মানুষের মনে ধারণাটা এমন। যদিও খোদ বৃটিশ আমলেও তা এককাট্টা বৃটিশ-ইন্ডিয়া রাষ্ট্র ছিল না। ছিল তিন প্রেসিডেন্সী (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বে) আর প্রায় ৫৫০ টার মত ছোট-বড় নানান করদ রাজ্য বা প্রিন্সলি স্টেট – এই সবকিছু মিলিয়ে কালেকটিভ ভুখন্ডটাকে বৃটিশ-ইন্ডিয়া বলা হত। অবশ্য সময়ে নানান এলাকাকে প্রশাসনিকভাবে প্রদেশও ঘোষণা করা হয়েছিল। এককথায় বললে, অন্ততপক্ষে আজ ভারত যেমন নানান রাজ্যে সীমানায় (সর্বশেষ সম্ভবত ২৯টা) বিভক্ত, সেরকম কোন রাজ্য বা সীমানা ধারণা তখন ছিল না। এই সীমানা টানা হয়েছে ১৯৪৭ সালের পরের সময়ে বিভিন্ন রাজার রাজ্য একেক রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অথবা বিচ্ছিন্ন করে। তাহলে দাড়াল, বৃটিশ-ইন্ডিয়ার পুরা প্রায় ২০০ বছর ভারত বলতে কোন ইন্টিগ্রেটেড বা সম্মনিতভাবে অন্তর্ভুক্ত কোন ভুখন্ডকে বুঝান হত না। বৃটিশ-ইন্ডিয়ার পরিসমাপ্তিতে ১৯৪৭ সালে ইউনিয়ন রাষ্ট্র বা ইউনাইটেড ভারত বলে একটা কিছু খাড়া করা হয়েছিল বটে কিন্তু তা করা হয়েছিল উপাদান হিসাবে একমাত্র বলপ্রয়োগকে ব্যবহার করে, সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে। আর কোন উপাদানের কথা ভাবাও হয় নাই, উপস্থিত ছিলও না। তবে এক উপাদানের কথা বলা যেতে পারে, হিন্দুত্ত্ব বলে এক ধারণা। এসব কারণে ভারত ভুখন্ডের “রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি” হিসাবে আবির্ভাব অথবা রাজনৈতিক কমিউনিটি বা এক রাজনৈতিক পরিসর হিসাবে আবির্ভাব সব সময়ই খুবই দুর্বল  থেকে গেছে। এটাকে আর এক দিক থেকে কেউ বিশাল ভারতের ইন্টিগ্রেশনের দুর্বলতাও বলতে পারেন, যেটা ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই এবং একমাত্র বলপ্রয়োগ করে তা মোকাবিলার চেষ্টাও সেই থেকে। বৃটিশ আমলে ভারতে বৃটিশরা ছিল খোলাখুলি বলে কয়ে কলোনি শাসক এবং এক ধরণের দুর্বল ইন্টিগ্রেটেড ভুখন্ড বৃটিশ-ভারত। আর ১৯৪৭ সালের পর জবরদস্তিতে জড়ো করা সেটাকেই দাবি করা হল এককাট্টা এক ভুখন্ড। আর কলোনির বদলে এবার দাবি করা হল সেটা একটা  মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র। এসব কিছুরই বিপরীত দিকটা বা প্রতিক্রিয়াগত দিকটা হল বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির আবির্ভাব। কাশ্মীর ভারতের তেমন এক বিচ্ছিন্নতাবাদিতার সমস্যার নাম।

রাষ্ট্রদ্রোহ নাকি খোদ রাষ্ট্রেরই নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা
বিতর্কিত বিচারে কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদীর ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ভারতে কি বৈধ হবে, না রাষ্ট্রদ্রোহ মনে করা হবে – এমন আদলের এক তর্ক ও মামলা এখানে জড়িয়ে আছে। আফজাল গুরুর ফাঁসি দেয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে এবার তৃতীয় বার্ষিকীতে তা স্মরণ করতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল জওয়াহেরলাল নেহরু  বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কিছু ছাত্র সংগঠন। পালটা জমায়েত নিয়ে এর বিরোধীতায় নামে বিজেপির ছাত্র সংগঠন। এতে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়াতে মাঝখানে পুলিশ এসে দাড়ায়। কানহাইয়া বামপন্থী সিপিয়াই এর রাজনীতিতে জড়িত। তাঁর দাবি ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসাবে উত্তেজনা থামাতে তিনিও সেখানে গিয়েছিলেন। আর মোদীর দল ও পুলিশের দাবি তিনিই সেখানে রাষ্ট্রবিরোধী শ্লোগান দিয়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। এতে কানহাইয়াসহ মোট সাতজন অন্যান্য ছাত্রও গ্রেফতার হয়ে ছিলেন। সাধারণ ছাত্রছাত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি মনে করছে এটা অন্যায় এবং মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ বাড়াবাড়ি। যদিও তাদের বিরুদ্ধে বিজেপি-মিডিয়ার ভাষ্য হলো, তারা ভারত ‘কাশ্মির দখল করে রেখেছে’, ‘ভারত ধ্বংস (ভারত কা বরবাদি তক) হয়ে যাওয়া পর্যন্ত কাশ্মিরের স্বাধীনতা (আজাদী) আন্দোলন চলবে’ ইত্যাদি বক্তব্য ও স্লোগান দিয়েছে যেগুলো দেশদ্রোহী স্লোগান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টুইটারে লিখেছেন, তিনি ‘এন্টি ন্যাশনাল এলিমেন্টদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে’ যেতে দিল্লি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে রেইড দেয়া ছাড়াও ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল স্লোগান’ দেয়ার জন্য দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা দিয়েছেন। আলজাজিরার দিল্লি ব্যুরো চিফ অমল সাক্সেনা লিখেছেন, রাজনাথ বলেছেন, ‘কেউ যদি ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে থাকে জাতির সার্বভৌমত্ব ও সংহতিকে চ্যালেঞ্জ করে এটা সহ্য ও বরদাশত করা হবে না’। ও দিকে এর পাল্টা উদার রাজনীতির (লিবারেল) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য হলো, ‘সরকার ভিন্নমত অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে’, ‘তারা মুক্ত চিন্তার ওপর আক্রমণ করছে’, ‘নিরীহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা টার্গেট হয়েছে’ ইত্যাদি। তাই এর বিরুদ্ধে সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘট-আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী, বামজোট সিপিএমের নেতা সীতারাম ইয়াচুরি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রেফতারের দুদিনের মাথায় ক্যাম্পাসে এসে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানোর পড় থেকে তা ভারতের জাতীয় রাজনীতির এক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। এর এক দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগের ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডা আর এক ধাপ চড়িয়ে ছিলেন। তিনি টুইটে দাবি করলেন ওই স্লোগান তোলার ঘটনায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসী সংগঠন লস্করই তৈয়বার প্রধান নেতা হাফিজ সাঈদয়ের মদদ ছিল। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা এ প্রসঙ্গে শিরোনাম করে লিখেছিল এটা ‘তিলকে তাল করা’। রাজনাথ দাবি করেছিলেন ‘জনগণকে বুঝতে হবে’ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে ওই দিনের কর্মসূচিকে সমর্থন করার জন্য আহ্বান রেখেছেন। কিন্তু পরদিন জানা গেল ওই কথিত বিবৃতি পাকিস্তানের হাফিজ সাঈদের নয়, আসলে ওই নামে একটা নকল বেনামি অ্যাকাউন্টের। দিল্লি পুলিশই সেটা নিশ্চিত করেছিল। আবার খোদ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে নিজে বিবৃতি দিয়ে এটা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে রাজনাথ সিং প্রপাগান্ডা করার যা কিছু সুখ পাওয়া যায় তা কামাই করে নিয়ে ফেলেছেন। গ্রেফতার করা ছাত্ররা বেশির ভাগই পিএইচডি এর ছাত্র। ইতোমধ্যে তাদের দফায় দফায় বর্ধিত রিমান্ড শেষ হয়েছে। কিন্তু পরপর দুদিন দিল্লির পাতিয়ালা এলাকা আদালতপাড়ায় জামিনের জন্য যাতায়াত করার সময় এক অবাক করা এবং মারাত্মক কাণ্ড ঘটেছিল। আদালতপাড়ায় পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামি কানহাইয়া ও তাঁর উকিল বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থক ওপ উকিলদের হাতে মার খেয়েছেন। আর শুধু তিনি নন, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি বন্ধু, শিক্ষক এমনকি সাংবাদিকেরাও সেখানে মার খেয়েছেন পরপর দু’দিনই। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, “চলতি সপ্তাহে পাটিয়ালা হাউজ কোর্টে পরপর দু’দিন বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছিলেন জেএনইউয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এমনকি সাংবাদিকেরাও। বুধবার পুলিশি ঘেরাটোপে থাকা সত্ত্বেও আক্রান্ত হন কানহাইয়া, যা দেখে শিউরে ওঠে পুলিশ কমিশনারের কাছে রিপোর্ট তলব করে শীর্ষ আদালত। এরপরই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন কানহাইয়ার হয়ে মামলা লড়তে আসা সোলি সোরাবজি, রাজু রামচন্দ্রন, রাজীব ধবনের মতো প্রবীণ আইনজীবীরা”। আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে হামলায় নেতৃত্ব দেন দিল্লির বিজেপি বিধায়ক ও পি শর্মা।
কিন্তু সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিন চাওয়াতে কিছুটা হিতে বিপরীত ঘটে গেছিল। কানহাইয়ার উকিলেরা আদালতে কানহাইয়ার নিরাপত্তা ও পাটিয়ালা হাউজ কোর্টের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির যুক্তি দেখিয়ে  হাহকোর্টও ফেলে সরাসরি তাদের সুপ্রিম কোর্ট আসার কারণ ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতিরা বলেন, ওই জেলা আদালতের ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি সম্পর্কে তারাও অবহিত। কিন্তু সে ক্ষেত্রে হাইকোর্টে যাওয়া উচিত ছিল। কানহাইয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, পাটিয়ালা হাউজ কোর্ট ও দিল্লি হাইকোর্ট একই চত্বরে। তাই তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করাতে সেখানেও যান নাই। সরকারি আইনজীবীরা পাল্টা বলেন, হাইকোর্টে নিরাপত্তার সমস্যা নেই। বিচারপতিরা তখন বলেন, “সুপ্রিম কোর্টই একমাত্র নিরাপত্তা দিতে পারে, বাকি আদালত পারে না তারা এমন কোনো বার্তা দিতে চান না। আর এতে সবাই কিছু হলেই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টেই জামিন চাইতে আসার জন্য উৎসাহিত হয়ে যাবে”। আনন্দবাজার মন্তব্য করে লিখছে, “বিচারপতিদের কথায় যুক্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু এ থেকে ভারতের খোদ রাজধানীর এক জেলা আদালতের পরিস্থিতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেল তা ভয়ঙ্কর”। বাংলাদেশের আদালতপাড়ায়ও বিচারকের উপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে প্রভাবিত করাসহ নানা সমস্যা আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু জামিন চাইতে এসে হেফাজতে থাকা আসামি এবং আসামির উকিলকে সরকারি দলের হাতে মার খেতে হয়েছে, এটা আমরা এখানে এখনো কল্পনা করতে পারিনি।
আনন্দবাজার আরও জানিয়েছিল, “তবে সুপ্রিম কোর্ট মামলা না শুনলেও দিল্লির পুলিশের ওপর নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ জারি করার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে গেছে। এমনকি শুধু নির্দেশ নয়, এ বিষয়ে কেন্দ্রের সলিসিটর (অ্যাটর্নি) জেনারেল রঞ্জিত কুমারের কাছ থেকে রীতিমতো আশ্বাস আদায় করে নিয়েছেন বিচারপতিরা”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে সঠিক জায়গা আর ঠিক সময়মতো ধরতে পারলে ভারতের বিচার ব্যবস্থায়ও ‘মার খাওয়ার’ বিরুদ্ধে প্রতিকার আছে।

হিন্দুত্বগিরি ভুলে লিবারেল গণতন্ত্রী হওয়ার হাওয়া কেন
কিন্তু হঠাৎ করে ভারতে বিজেপি বিরোধীদের এমন এক হাওয়া বইছে, যেন ভারত হিন্দুত্বগিরি ভুলে গেছে। লিবারেল গণতন্ত্রী হয়ে গেছে সবাই এবং যেন এমন চিন্তাকারিরাই সারা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রধান ধারা হয়ে গেছে। ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া অথবা এদের সম্পাদকীয় নীতিতে কে কার চেয়ে কত উদার এবং হিন্দুত্ব বা বিজেপিবিরোধী তা প্রমাণের যেন প্রতিযোগিতা লেগেছে। অথচ ভারতে প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নিজ রাষ্ট্র প্রসঙ্গে মতাদর্শিক অবস্থানের ফলাফল হল, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে তৈরি এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে পাল্লা দিতে পাল্টাপাল্টি উগ্র জাতীয়তাবাদের এই প্রতিযোগিতা চলে আসছে ১৯৪৭ সালে উভয় রাষ্ট্রের জন্মের সময় থেকেই। কংগ্রেস এবং বিজেপির লালন করা এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে এমন ক্যাটাগরিতে স্পষ্টতই হুবহু ফেলা যায়। তবে এই বিচারে ভারতের ‘বাম প্রগতিশীলরা’ নিজেদের আলাদা মনে করতে পারেন; বিশেষত তারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করেন না দাবি করতে পারেন। কিন্তু কোনো হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া এক ভারত রাষ্ট্রে ভারতের সব অংশকে ধরে রাখা যাবে কি না- এ প্রশ্নে তারাও সৎভাবে অন্তত একান্তে এটা স্বীকার করবেন মনে করা যায়। আর কংগ্রেস একটু ব্যতিক্রম – এক সেকুলার জামার আড়ালে থেকে সে একই কথাগুলো হাজির করতে চাইবে হয়ত। এ ছাড়া ভারতের রাজনীতিবিদেরা আচার-আচরণে হিন্দুত্বের ভিত্তিকে অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয় গণ্য করে থাকেন। নকশালি র‌্যাডিকেল কিছু রাজনৈতিক ধারা ছাড়া ভারতের বাকি প্রায় সব রাজনৈতিক দল দৃঢ়বিশ্বাস করে যে, ‘হিন্দুত্বের ভিত্তি’ ছাড়া ভারতকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখাই সম্ভব নয়। তবে অবশ্যই এটা ভারতের রাজনৈতিক দল-জগতের খবর। একাদেমিসিয়ান এর ব্যতিক্রম হতে পারেন; তাদের কথা এখানে ধরা হয়নি।
আসলে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যেটা চলছে, এটা আসলে ছাত্র-শিক্ষকের বুদ্ধিবৃত্তিক দুনিয়ার লিবারেল আকাক্সক্ষা বিজেপিবিরোধী কংগ্রেস-সিপিএম রাজনৈতিক দলগুলোর সস্তা ভোটের রাজনীতির পড়ে বলি হয়ে যাওয়া।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও যে এমন ন্যাক্কারজনক হামলার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে রাজধানীর পুলিশ কমিশনারকে ব্যবহার করে তা দেখে আমরা বেশ পুলকিত হতে পারি এই ভেবে যে, আমরাও ভারতের চেয়ে বেশি খারাপ নই। রাজধানী হলেও দিল্লি এক জেলা শহর বটে, তবে দিল্লি অন্তত কাশ্মিরের মতই বেইনসাফি ও দমবন্ধের স্থান নয় বলে যে ধারণা আমাদের ছিল কানহাইয়ার জামিনবিষয়ক রিপোর্ট পড়ে সে ধারণা বেশ চোট পায় বৈ কি! যেমন একই ২০ ফেব্রুয়ারির আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা আরো কিছু অংশ “জেএনইউয়ের ঘটনায় মোদি সরকার, বিজেপি-সঙ্ঘ পরিবারের পাশাপাশি আঙুল উঠেছে দিল্লির পুলিশ কমিশনার বি এস বসসীর দিকেও। বুধবার আদালত চত্বরে কানহাইয়াকে মারার ঘটনা বেমালুম অস্বীকার করে গিয়েছিলেন বসসী। কিন্তু রাতে তিহার জেলে বুকে ব্যথা অনুভব করেন কানহাইয়া। তাকে রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার মেডিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, কানহাইয়ার নাক, উরুসহ বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও জানিয়েছে, আদালত চত্বরে পুলিশের সামনেই কানহাইয়ার ওপর হামলা সংঘটিত এবং তা পূর্বপরিকল্পিত। তার ওপর মানসিক চাপ দেয়া হয়েছিল বলেও ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে”। যাক এ রিপোর্ট স্বব্যাখ্যাত তাই কিছু বলার নেই। কেবল একটা বিষয় ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের মতোই দাঁত-নখহীন এমন ধারণা করা একেবারেই ভুল হবে। এমনকি ভারতের আদালতের রিপোর্ট ও অবজারভেশনও বিশাল গুরুত্ব রাখে।

পেনাল কোড ১২৪এ – রাষ্ট্রদ্রোহ
ভারতীয় পেনাল কোড বা আইপিসির ‘সেকশন ১২৪এ’ হলো সেডিশন-বিষয়ক (বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) অপরাধের ধারা। এই পেনাল কোড ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে একই। কারণ ব্রিটিশ কলোনিয়াল আমলে ১৮৬০ সালে এই পেনাল কোড চালু হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে এই তিন দেশই এখনো সেই একই পেনাল কোড অনুসরণ করে থাকে। সেডিশন ধারার মূল অভিযোগ হলো ঠিক রাষ্ট্র নয়, সরকারের বিরুদ্ধে গণদাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি করা বা উসকানি দেয়া। এই অর্থে এটা আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে দ্রোহিতার অপরাধ। তবে লিগ্যাল শব্দ হিসেবে এটা সঠিকভাবে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ না হলেও ; পপুলারলি আমরা এমনটা বলে থাকি।
অতীতে ভারতের বিচার বিভাগ বহু সেডিশনের অভিযোগের (আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে দ্রোহিতার অপরাধ) মামলা নাকচ করে দিয়েছেন। সেডিশনের মামলায় কোনো অভিযোগ প্রকৃত বলে টিকে গেছে এমন মামলার সংখ্যা খুবই কম। এসব মামলার রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা দিলেই সেখানে সেডিশন হয়েছে বলে তা বিবেচিত হবে না যদি না ওই বক্তৃতার ফলে দাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি হয়, অথবা কাজে ততপরতায় জনশৃঙ্খলায় এটি ব্যাঘাত করে থাকে। ফলে ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা সেসব মামলার রেফারেন্স দিয়ে রিপোর্ট করেছে যে কানহাইয়ার মামলারও একই পরিণতি হবে। শুধু “ভারত নিপাত যাক”, এমন স্লোগান দিলেই সেটাকে সেডিশনের অভিযোগ হিসেবে মানতে ভারতের আদালত রাজি নয়। বহু আগে থেকেই এমন মামলাগুলো আদালত নাকচ করে দিয়ে আসছে। কিন্তু তবু নিজ বিরোধীদের হেনস্তা করতে সরকারগুলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয়া বন্ধ করেনি। এ ব্যাপারে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের কোনো সরকারই কারো চেয়ে কম যায়নি।
গত ২০১৪ সালের মে মাসে বিজেপির মোদি সরকার বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিল। ওই নির্বাচনে বিজেপি নিজস্ব জোটবদ্ধতার সমর্থন ছাড়াও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। বিপরীতে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে হয়ে যায় ৫০-এরও নিচে, মানে ১০ শতাংশ আসনেরও কম। সিপিএমের অবস্থা আরো খারাপ। কিন্তু সেই থেকে মোদি সরকারের বয়স প্রায় দু’বছর পার হলেও কোনো ইস্যুতে স্পষ্টতই জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেছে এমনটি ঘটেনি। তবে কোন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোদির দলের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে এমন রেকর্ড আছে। কিন্তু ওই সব আঞ্চলিক বা রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেসের ভূমিকা কোনো বড় নির্ধারকের নয়। বাম জোটের গোনায় ধরে না গুরুত্ব পায় না অবস্থা। ফলে কংগ্রেস ও সিপিএম অনেক মরিয়া হয়ে অনেক দিন থেকে খুঁজছিল যেকোনো ইস্যুতে খাড়া হয়ে যাওয়া যায় কি না। কংগ্রেস বা বামজোটের সিপিএমের দিক থেকে তাকিয়ে বললে তারা সম্ভবত এই প্রথম কিছু আশার আলো দেখতে যাচ্ছে। ফলে সস্তা ভোট রাজনীতির বেশি কিছু আমল করার মত সিরিয়াস এগুলো নয়। যদিও এটা কেবল জেএনইউ নয়, ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রছাত্রীরা এই আন্দোলনের পক্ষে সাড়া দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে। আর ঠিক ততটাই মোদি সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে গেছিল যে, এটা যে আসলেই একটা আইনানুগ সরকারদ্রোহিতার বা সেডিশন অপরাধ হয়েছে তা জনগণকে বিশ্বাস করানো। জনগণের কাঠগড়া ছাড়াও ও দিকে আদালতের কাঠগড়ায়ও মোদি সরকার সেডিশন প্রমাণ করতে পারবে না সে আলামতও পরিষ্কার হয়েছে।
আবার বাংলাদেশের সরকারের সাথে এ জায়গায় মোদি সরকারের মিল খুব বেশি। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক-বিরোধী ভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে সেডিশনের অভিযোগ দিয়ে ঘায়েল করা, সস্তা প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানোর ব্যাপারে ওখানে মোদি সরকার আর এখানে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে খুবই মিল। যেমন মুক্তিযুদ্ধে ‘৩০ লাখ’ ইস্যু অথবা ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনামের মাফ চাওয়ার ইস্যু এগুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা সেডিশনের অভিযোগে ঝুলিয়ে দেয়া, “পাকিস্তানি মনোভাব” বলে ভুতুড়ে অভিযোগ করা, পাকিস্তানি চিন্তা ইত্যাদি শব্দটা জড়িয়ে প্রপাগান্ডা করা ইত্যাদির ব্যাপারে দুই সরকারের মিল ব্যাপক। এ ধরণের অভিযোগ তোলার পেছনের অনুমান হলো জনগণ আসলে খুবই বোকা, তাদের বিবেচনাবোধ নেই, তারা আবেগি এই মনে করা হয়ে থাকে।

উগ্র জাতীয়তাবাদের রাজনীতির কারণে মানবাধিকার রাজনীতিতে  নির্বাসিত ইস্যু
ভারতের কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে বিচ্ছিন্নতাবাদী কোন ইস্যু সামলাতে তার কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের কারণে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটেছে, সরকারের বিরোধীরা এমন কোনো অভিযোগ কখনো করেছেন, এমন দেখা যায় না। ভারতের রাজনীতি ও রাষ্ট্র ‘হিন্দুত্বভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদে’ ভরপুর বলে এমনটি হয় তা মনে করার কারণ আছে। এমনকি, কমিউনিস্ট কোনো দলকেও সরকারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলতে দেখা যায় না। প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলো কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা বা ইস্যুতে- সরকারের দিক থেকে এই ইস্যু মোকাবেলা করতে গিয়ে মানবাধিকারের দিকটি রক্ষা করছে কি না, তা দেখে না। এমন অভিযোগ করে না এই ভয়ে যে, সেটা করলে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রটাই চোট খায় কি না। যেন মানবাধিকারের রেকর্ড শক্ত করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায়। এই কারণে ভারতের রাজনীতিতে একমাত্র বিবেচ্য হয়ে গেছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের দাপট। এ পর্যন্ত কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপি খুবই কম সময়ে সরকারে এসেছে বা সরকার গঠন করেছে। ফলে কংগ্রেসের ধারণা, সরকারে থাকলে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন গোয়েন্দা বা ইন্টেলিজেন্স স্বার্থের পক্ষে থাকতে গিয়ে দলকে পাবলিকলি অপ্রিয় হতে হয়। বিপরীতে, বিরোধী দলে যে থাকে, সে এসব ব্যাপারে উদাসীন থাকার কিছু সুবিধা পায়; গা-ছাড়া ভাব দেখাতে পারে। এবারই প্রথম কংগ্রেস খুবই শোচনীয় অবস্থায় মাত্র ১০ শতাংশেও নিচে সদস্যসংখ্যা নিয়ে পার্লামেন্টে আছে। বিপরীতে জোট ছাড়াই এতে বিজেপি সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই কংগ্রেস এবার পালটা ‘গা-ছাড়া ভাব দেখানোর’ সুবিধা নিতে চাইছে। অতএব সারকথা, কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদী আফজাল গুরুর ফাঁসিবার্ষিকীতে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকা রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ কি না- এই প্রশ্নে বিজেপি মনে করে এটা রাষ্ট্রদ্রোহী। বিপরীতে, কংগ্রেস ও সিপিএমের অবস্থান- এটা রাষ্ট্রদ্রোহী নয়। ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’কে শায়েস্তা করার দায় এবার বিজেপি নিক আর নিজেরা এর সুবিধা নিয়ে পপুলার হোক। তবে কংগ্রেসের এই অবস্থান ভুঁইফোড়ের মতো। ভারতের রাজনীতিতে এমন অবস্থান নেয়াকে বলা হয়, ভোটের রাজনীতি অথবা ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা। অর্থাৎ কোনো নীতিগত কারণ মেনে আচরণ না করা, না চলা, অবস্থান না নেয়া; কেবল ভোট পাওয়ার লোভে যেদিকে সুবিধা, সেদিকে অবস্থান নেয়া। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুগুলোতে, যেগুলোকে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী ঘটনা বলে চালানো হয়, এসব ঘটনাকে ভারতের রাজনীতিতে মানবাধিকারের দিক থেকে দেখার চল নেই। বরং মিথ্যা প্রপাগান্ডা, উগ্র জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে নগদ সুবিধা লাভ করাই মুখ্য এবং এ কাজে কংগ্রেস বা বিজেপি তো বটেই, সিপিএমও কোনো অংশে ভোটের রাজনীতি করতে পিছপা নয়। এর সবচেয়ে হাতের কাছের নগদ উদাহরণ হলো- বছর দেড়েক আগে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বোমা হামলার ঘটনা। সিপিএম বিজেপির মতো একই ভাষায় সেসময় মমতার বিরুদ্ধে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করে গিয়েছিল। কারণ, মমতা সিপিএমের মুসলমান ভোট নিয়ে গেছে। কিন্তু পরে মাঝপথে মোদি সরকার কোনো কারণে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ-নীতির সাথে আর না থাকার সিদ্ধান্ত নেয়াতে ওই ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। আজকে কোথায় ‘বর্ধমান বোমা’ ইস্যু? অথচ আনন্দবাজার পত্রিকাকে সাথে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা তখন তুঙ্গে উঠেছিল। আজ সেই আনন্দবাজার আবার বিজেপির বিরুদ্ধে।
জেএনইউ রাষ্ট্রদ্রোহিতা ইস্যু তাই কংগ্রেস ও সিপিএমের কাছে আসলে বড়জোর ভোটব্যাংকের একটি ইস্যু। বিজেপিবিরোধী জোট প্রথমবারের মতো শক্ত ভিত গড়াই এর সঙ্কীর্ণ লক্ষ্য। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এটা আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিগত কংগ্রেস সরকারের চার বছরের (২০০৮-২০১২) কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মাদ্রাজি কংগ্রেস নেতা পি. চিদাম্বরম। তিনি দলীয় পরিচয় ফেলে হঠাৎ করে ‘ব্যক্তি’ হয়ে গেছেন। আফজাল গুরুর ফাঁসির সময়ও তিনি মন্ত্রী ছিলেন, তবে আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন। মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ফাঁসি ঠেকাতে তখন কিছু না করে এখন বলছেন, ‘আফজাল গুরুর বিচার সঠিক ছিল কি না, সন্দেহ হয়।’ বলছেন, এটা তার ব্যক্তিগত মতামত আর তিনি ফাঁসি হওয়ার বছরখানেক আগে থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন না। তাই তার কিছু করার ছিল না। এই অর্থে ওই “ভুল ফাঁসির দায়” তিনি নিজ দলের সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়েছেন। এ দিকে কায়দা করে আজ পর্যন্ত চিদাম্বরমের বক্তব্যের দায় কংগ্রেস স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। কিন্তু এতে সুবিধা হলো, কংগ্রেস ও সিপিএম এখন ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতিবাদকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়, বরং একটা ন্যায্যতা দিতে পারল। তিনি এখন বলছেন, “আফজাল গুরুকে যাবজ্জীবন দেয়া যেত এবং এই প্রতিবাদ করা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়”।
ওদিকে এসব ঘটনা ফুটা করে দিয়ে আফজাল গুরুর বউ তাবাসসুম গুরু খাড়া কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলছেন, “চিদাম্বরম ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতির’ জন্য ‘এত দেরিতে’ এমন কথা বলছেন। ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি’ অর্থাৎ এই প্রথম বিজেপির বিরুদ্ধে একটা জোট খাড়া করে তা থেকে আগামী ভোটে সুবিধা পাওয়ার জন্য এটা করছেন। আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে বেইনসাফি ও অপরাধ হয়েছে কি না, এটা আসলে চিদাম্বরমের কাছে ইস্যু নয়। যদি হতো, তবে তো তিনি সে সময়ই পদক্ষেপ নিতে পারতেন। অথচ চিদাম্বরম ‘ঠুঁটো’ দর্শক হয়ে সে সময় দাঁড়িয়েছিলেন কেন? ‘তিনি বরং এখন এসব কথা বলে আমাদের কাটা ঘায়ে লবণ ছিটাচ্ছেন”। তাবাসসুম গুরু বরং আরেক মারাত্মক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “দিল্লিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আফজালের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসলে ভারতের গালেই থাপ্পড় মেরেছে”।
অতএব সারকথা, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলন- বুদ্ধিবৃত্তিজীবী এরা সৎ ও আন্তরিক হলেও এদের প্রভাব একাডেমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে। কিন্তু এই লিবারেল রাজনৈতিক প্রভাবও কংগ্রেস ও সিপিএমের সস্তা ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে’ পরে বিক্রি হয়ে যাবে। বিজেপির বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হবে। কিন্তু মূল বিষয়, ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনে কাজে আসবে না।

বিচারক ‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা করছেন
আগে বলেছি, ভারতের জনসমাজের কোথাও কোথাও এমন অনুমান এখনও বজায় আছে যে আফজাল গুরুর বিচার ত্রুটিপুর্ণ। যেমন,পুলিশের কাছে আফজালের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী ভারতের আদালত মানে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট তা “স্বেচ্ছায় প্রদত্ত” হিসাবে “গ্রহণযোগ্য” মনে করেনি। কিন্তু আবার পরিস্থিতি ও পরিবেশগত প্রমাণের দিক থেকে ঐ একই আদালত মনে করে “আফজাল প্রত্যক্ষ হামলাকারি না হলেও হামলাকারিদের সহযোগী ছিল এবং এই সহযোগিতা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ”। ওদিকে আফজালের বিশ্বাস ছিল, যেহেতু সে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কেউ নয়, এ ছাড়া স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সে ধরা দিয়েছে,ফলে বিচারের রায়ে তাঁর অন্তত ফাঁসি হওয়ার কথা নয়। ফলে এটাও একটা ক্ষোভের কারণ। কিন্তু এর চেয়েও আর বড় একটা কারণ হল, যে ভাষায় এর রায় লেখা হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার সময় সুপ্রিম কোর্ট সে সময় কী বলেছিল” শিরোনামে এক রিপোর্ট করেছে – সেখান থেকে নেয়া উদ্ধৃতিতে আমার অনুবাদে, “অপরাধ এতই ওজনদার ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রচুর হতাহত ঘটানো ঐ ঘটনা সারা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল ফলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেই একমাত্র সমাজের সম্মিলিত বিবেক বা চেতনা (কালেকটিভ কনসাসনেস অব দা সোসাইটি) শান্তি পেতে পারে”। ………”ভারতের সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও ঐক্যের চ্যালেঞ্জটা হলো …একমাত্র সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েই পূরণ করা সম্ভব। আপিল-দরখাস্তকারী একজন (ফিরে আসা) আত্মসমর্পণকারী জঙ্গি, কিন্তু আবার জাতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার কাজে যোগ দিয়েছিল; ফলে সে সমাজের জন্য হুমকিধারী আপদ এবং তার জীবন অবশ্যই নিভে যেতে হবে। তাই, আমরা তার মৃত্যু পরোয়ানার রায় বজায় রাখলাম”।
রায়ের ইউনিক এই দিকটার কথা অনেকেই গুরুত্ব দেন নাই। এটা এক তামাসা যে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একটা ফাঁসির আদেশের ন্যায্যতা টানছেন মামলার মেরিট থেকে নয়। টানছেন গণমন একটা কল্পনা করে নিয়েছেন আগে; এরপর ঐ কল্পিত গণমনের কলিজা কিসে ঠান্ডা হবে বলে বিচারকরা মনে করছেন তা দিয়ে শাস্তির মাত্রা ঠিক করছেন। এটা সত্যিই ইউনিক। অথচ বিচারকেরা বলতে পারতেন ওমুক মাত্রার অপরাধের জন্য শাস্তি এই। কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটানোর অবিচার করেছে আদালত। আদালত সে জায়গায় বিমুর্তভাবে “গণমনের কলিজার” “মানসিক শান্তি” হবে কিসে – ধরণের আজীব ধারণার কথা টেনেছে। আর সেটা বিচারকেরা মাপলেন কী দিয়ে সেও এক বিরাট প্রশ্ন! যেন বিচারকেরা অন্তর্যামি হয়ে গিয়ে তা মেপে ফেললেন। আমাদের শাহবাগে “ফাঁসি চাই” বলে একটা বিক্ষোভ হয়েছিল ফলে আমাদের বিচারকেরাও মন-গণক অন্তর্যামি হয়ে গেছিলেন। সহজেই বুঝে গিয়েছিলেন গণমনের কলিজা কিসে ঠান্ডা হবে।
সবশেষ আর এক গুরুত্বপুর্ণ মাত্রার দিক তুলব। “সমাজের সম্মিলিত বিবেক বা চেতনার শান্তির” কথা তুলে বিচারকেরা প্রমাণ করেছেন বিচারের নামে ওটা ছিল এক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার । কালেকটিভ কনসাসনেস অব দা সোসাইটির মানসিক শান্তি মানে কী ?কোন  বিচারালয়ে বিচারকের কাছে কালেকটিভ কনসাসনেস কী বস্তু? যে কালেকটিভ কনসাসনেস আবার অসুস্থ অশান্ত যার মানসিক শান্তি দরকার ? এটা একটা অসুস্থতা – তাই কী বিচারকেরা স্বীকার করে নিয়েছেন না? আর সেজন্যই কী অপরাধীর বিচার করার নামে সে নিজের  প্রতিহিংসা মিটাতে চাচ্ছে না? এমন অর্থই সেখানে দাড়িয়েছে।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে মানসিক শান্তির জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া এটা নির্জলা “প্রতিহিংসা” ছাড়া আর কিছুই নয়। বিচারকেরা নিজে মানসিক শান্তি পাবার জন্য অথবা কাউকে পাইয়ে দিবার জন্য শাস্তির রায় ঘোষণা করেন না। করতে পারেন না। আসলে এভাবে মানসিক শান্তি পাওয়াকে প্রতিহিংসা বলে। আর প্রতিহিংসা এটা এক মানসিক ডিসঅর্ডারের নাম। রাষ্ট্রের পুলিশ বা বিচারকদের ভুমিকা কোনভাবেই নিজের ব্যক্তি “প্রতিহিংসা” অথবা “জাতির” প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা নয়। প্রতিহিংসা এক মানসিক অসুস্থতার নাম। ফলে স্বভাবতই এর নিদান চিকিতসা করানো।
তাহলে সারকথা হল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আফজাল গুরুকে ফাঁসি দিয়ে আর রাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট সকলে তা বাস্তবায়ন করে জনগোষ্ঠিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। এরা সকলে মানসিকভাবে অসুস্থ।
ফাঁসি শাস্তি দিলেই একমাত্র যে “জাতির” কলিজা ঠাণ্ডা হয় সেই কলিজা যে সমস্যাযুক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ,এই সন্দেহ পাঠকমাত্র আসা উচিত। আর এমন কলিজা যে ‘জাতির’,সে কলিজা অবশ্যই অসুস্থ। এর চিকিৎসা দরকার। এ ছাড়া এমনকি বিষাক্ত পোকামাকড় বা গাছ লতাপাতাকেও মানুষ নিজের সমাজ থেকে বিলুপ্ত করার দরকার মনে করে না, কেবল নিজের গার্হস্থ্য সমাজ থেকে বাইরে রাখে। এর থেকে মানুষের মৌলিক স্বভাব টের পাওয়া যায়। অথচ বিচারকেরা প্রমাণ করতে গেছেন, আফজাল গুরু নামের মানুষের জীবনটাকেই নিভিয়ে দেয়া ছাড়া ভারতের জনমানুষদের নাকি আর কোনো উপায়ই ছিল না। বিচারকেরা আফজাল গুরুর জীবনকে যতই খামাখা এবং জীবিত নাগরিকদের জীবনের তুলনায় তুচ্ছ প্রমাণ করতে গেছেন, ততই ওটা আর বিচারের রায় না থেকে যেন প্রতিহিংসার দলিল হিসেবে হাজির হয়েছে। অথচ কোনো রায় তো কখনো প্রতিহিংসাপত্র নয়।

আশা করি কানহাইয়াকে নিয়ে মাথায় তুলে নাচবার আগে না হলেও সাথে সাথে আমরা এসব প্রসঙ্গের দিকেও নজর দিব। তবে অবশ্যই কানহাইয়ার দেশদ্রোহ মামলার সাথে বাংলাদেশেরও দেশদ্রোহ মামলার বিশাল মিলের দিক আছে, সে প্রসঙ্গ আলাদা।

[উপরের লেখাটা আফজাল গুরু ও জেএনইউ-কানহাইয়া ইস্যুতে সগের লেখা প্রায় চারটা লেখার সার করে লেখা, চুড়ান্ত ভার্সান। আগের লেখাগুলো দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত হয়েছিল।]
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com