শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

গৌতম দাস

০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2ti

 

 

শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা – ছবি : ফেবু থেকে সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যে স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে, তা নিয়ে চার দিকে তুমুল অলোচনা চলছে। এ স্লোগানগুলোতে দেশের পরিস্থিতির নানা চিত্র উঠে এসেছে। গত চার দিনের চলমান রাস্তার আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের দেয়া স্লোগানের ভাষা কী অশ্লীল, প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এক কথায় বললে এর প্রথম জবাব হবে ‘কে আপনি’, প্রশ্নটি তুলতেছেন। আপনি যদি ক্ষমতাসীন দানব ক্ষমতার মানে দানব এস্টাবলিসমেন্টের পক্ষের লোক হন কিংবা জেনে – নাজেনে এই দানব ক্ষমতাকে সম্মতিদাতা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার অভিযোগ হবে শিক্ষার্থীদের ভাষা ‘অশ্লীল’। আপনি দানব ক্ষমতার সুবিধাভোগী হলেও বলবেন, এটা ‘অশ্লীল’ ভাষা। ক্ষমতাসীনদের সাগরেদ হলে ‘এথিক্যাল পুলিশের’ ভূমিকায় নামতে ইচ্ছে করবে আপনার কিংবা নেমেই যাবেন। কারণ আপনি হারতেছেন – লুজিং। চ্যালেঞ্জড হয়েছেন – এরই দিশাহারা প্রতিক্রিয়া এটা!

আসলে এটাকে শ্লীল-অশ্লীলের বিষয় না বলে মানে ‘নৈতিকতার পুলিশগিরি’ পজিশন না নিয়ে বরং এটা ফরমাল বনাম ইনফরমাল ভাষার তর্ক – এভাবে বর্ণনা অর্থে সেটি বলাই সম্ভবত সঠিক হবে। স্ল্যাং (slang) বা অশ্লীল ভাষা সব সমাজে থাকে, চর্চাও হয় সমানে। [স্ল্যাংয়ের ডিকশনারি অর্থও আরও সহজ – very casual speech or writing।] মানে স্যুট-কোর্ট থুয়ে হাফ প্যান্ট পড়ে কথা বলা। এমন সমাজ দুনিয়ায় পাওয়া যাবে না যেখানকার ভাষায় স্ল্যাং শব্দ নাই বা এই শব্দের চর্চা নাই। তবে স্বভাবতই এই চর্চা হয় মূলত সমাজের ইনফরমাল পকেটগুলোতে – চায়ের দোকানে, ক্লাব আড্ডায়, সমবয়সী ও বন্ধু মহলে। তবে ফরমাল জায়গাগুলোর ভাষা যেহেতু আলাদা হয়, তাই সেখানে এই ভাষা দেখা যায় না। কিন্তু একটা কথা মানতে হবে, ভাষার মুখ্য কাজটা হল মনের কথা ঠিক ঠিক-ঠিকভাবে বাইরে আনা, যেটাকে আমরা বলি এক্সপ্রেশন বা প্রকাশ ঘটানো। লক্ষ করবেন, ইনফরমাল শব্দ মানে যার ভিতর স্ল্যাং শব্দ অন্তর্ভুক্ত – এই শব্দ অন্য যেকোন কিছু চেয়ে খুবই সফল ও সাবলীলভাবে এক্সপ্রেশন ঘটায়, অন্তত ফরমাল ভাষার তুলনায় এবং ওর চেয়ে সহজে। তুলনায় এই চমৎকার প্রকাশগুণ, এটাই ইনফরমাল ভাষা কদর পাওয়ার একটি অন্যতম কারণ। আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই প্রকাশগুণসম্পন্ন হয়, তাই ইনফরমাল আবহের সুযোগ পেলেই তা নিয়ে আমরা এই ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ নিয়ে নেই। মূল কারণ, সহজে এখানে নিজের মনের ঠিক ঠিক ভাব তুলে ধরা বা বাইরে আনা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, মূলত যেমন ধরেন রেগে গেলে বা রাগে, ক্ষোভে অথবা দীর্ঘদিনের চাপা থাকা অবস্থার মন অসহ্য হয়ে পড়লে সাধারণত আমাদের প্রকাশভঙ্গির শব্দ ইনফরমাল হয়ে যায়। অর্থাৎ ফরমালিটির কন্ট্রোল তখন অকার্যকর হয়। মনে হতে থাকে, রুলিং পাওয়ার বা শাসকসমাজ আমাকে আমল করছে না, আমার ব্যথা বুঝছে না, বুঝতেই চাচ্ছে না; তাহলে আমি কেন একপক্ষীয় তাকে আমল করার দায় নেব! ফলে ইনফরমাল শব্দ ব্যবহারকারির মানসিক অবস্থা থাকে এরকম। আর আমরা সবাই জীবনের নানান চড়াই-উতরাইয়ের স্তরে পরে কখন না কখনও ইনফরমাল স্তরে যাবার সদুযোগ নিয়ে নিজেকে হাল্কা অনুভব করার সুযোগ নিয়েই থাকি।

তার মানে দাঁড়াল ফরমাল-ইনফরমাল ভাষা বলে সমাজে একটা ফারাক, সব দেশ-সমাজে আছে আর তা বজায় বা ধরে রাখা হয় বা থাকে। ফরমাল সমাজের আড়ালে থেকে থাকা ভাষা আসলে ‘দোস্ত-বন্ধু সার্কেলের ভাষা;’ যাকে ইনফরমাল ভাষা বলছি তা সফল আয়ু নিয়ে টিকে থাকে, ফরমাল ভাষার পাশাপাশি হেঁটে চলে।

তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু এর মানে কি এটা যে এখন থেকে দেশে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ, ভাষার ফারাক এগুলো কি এখন থেকে উঠে যাবে? এই আন্দোলনে যারা বেশির ভাগ বা সংখ্যায় ভারী এরা মূলত ১৬-১৭ বছরের কিশোর বা তরুণ। এই ১৬-১৭ বছরের তরুণ, এরা ইনফরমাল ভাষা অবলীলায় ব্যবহার করছে – এর মানে কী এখন থেকে বাসার ড্রয়িংরুমে, ডাইনিং টেবিলে কিংবা ক্লাসরুমে এরা নিয়মিত ইনফরমাল ভাষায়ই কথা বলা শুরু করবে? পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ভাষা কি সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? না, একেবারেই না। আসলে ঘটনা খুবই সিম্পল। আগে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ যতটা আপনা-আপনিই বজায় রাখা যেত বা থাকত, এখন সেখানে একটা ব্যত্যয় ঘটেছে। তা ঘটিয়েছে সোস্যাল মিডিয়া। সোস্যাল মিডিয়ার কারণে ইনফরমাল জগৎ ও এর ততপরতা ফরমাল দুনিয়ায় হাজির হয়ে গেছে। অর্থাৎ ইনফরমাল ভাষা তাদের বন্ধুমহল ছেড়ে মিডিয়ার কল্যাণে সবার সামনে চলে এসেছে। আর তাতেই এত তর্ক উঠেছে। খেয়াল করলে দেখব, ফেসবুকই এ ধরনের ইনফরমাল ভাষার প্ল্যাকার্ড বা এর ছবি সবার কাছে প্রকাশ করে দিচ্ছে, ফেসবুক এর প্রধান সোর্স। পাশাপাশি তুলনা করলে দেখব, আমাদের মেন স্ট্রিম বা প্রচলিত মিডিয়া এমনকি টিভি মিডিয়ারও যাদের কাছে এমন প্ল্যাকার্ড ও এর ছবির কথা অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু তাদের মিডিয়ায় ইনফরমাল ভাষার খবর, এটা অনুপস্থিত। তারা কিন্তু ফরমাল জগতে একে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

তাহলে এই ফরমাল-ইনফরমাল জগৎ ও ভাষার যে ভেদ এখন দেখা যাচ্ছে তাতে কিছু ছিদ্র দেখা গেছে, এই হল কথা। এখন এই ছিদ্র দেখা দেয়ায় আগামীতে এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, এই ভাষার ফরমাল-ইনফরমাল ভেদ কখনই উঠে যাবে না। যদিও ঠিক যেমন, অন্তত মা জানে তার সন্তান সিগারেট খায়, কিন্তু তা নিয়ে নাড়াচাড়া করার কায়দাও কেমন নরম-গরমে রাখতে হয় তা মায়েরা জানে। বাড়াবাড়ি করে না। এরকম হয়ে থেকে যাবে। ফলে হয়তো সেভাবে সোস্যাল মিডিয়ায় এটা জানাজানি ঘটা অবস্থাতেই তা থাকবে, কিন্তু আবার এই তথ্য ফরমাল সমাজ উপেক্ষা করতেও থাকবে, ফরমাল সমাজে তা আনবে না। আর সম্ভবত এটা নির্ধারিত হবে অভিভাবক মা-বাবারা সন্তানদের এই আন্দোলনের প্রতি কী মনোভাব পোষণ করছে ও করবে তা দিয়ে।

এখন পর্যন্ত যা প্রকাশিত তাতে মনে করার কারণ আছে যে, এটা কেবল ১৬-১৭ বছরের তরুণদের আন্দোলনই নয় এর পাশাপাশি এটা তাদের মা-বাবারও সম্মতির আন্দোলন। বিশেষ করে মায়েরাই মূলত সন্তানদের স্কুল-কলেজে পৌঁছে দিতে আসে সেই মায়েদেরও সম্মতিতে সন্তানদের আন্দোলন। এর একটা বড় কারণ সড়ক ও যানবাহনের অনিরাপত্তা। এমনিতেও তারা চিনায় দিচ্ছে যে নিরাপদ সড়ক – এটাই তাদের আন্দোলনের ইস্যু। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে এই মায়েদের পূর্ণ সম্মতি আছে পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রতি। অন্তত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, আশির দশকেও তখনকার আন্দোলনে এমনটা কোনো অভিভাবককে পাওয়া যেত না যে সন্তানের আন্দোলনে অংশ নেয়াকে সম্মতি দিত। কিন্তু এখনকার পড়ুয়াদের আন্দোলনে অভিভাবকদের পূর্ণ সম্মতি আছে, এর বড় প্রমাণ হল গত চার দিনে তরুণেরা তারা লাগাতার মাঠে উপস্থিত থাকছে; বাসায় বাধা তেমন পায়নি শুধু তাই না, মায়েরা নিজেই পরের দিনও ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনছে বা তাদের আসতে দিচ্ছে। সম্ভাব্য এর মূল কারণ হল, চরম অনিরাপদ বেপরোয়া যানবাহন আর এই নৈরাজ্যকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে এমন ‘পাবলিক জবাবদিহিতাহীন’ সরকার ও এর ক্ষমতা- এসবের  প্রতি মায়েদের গভীর অনাস্থা। বেপরোয়া এই ব্যবস্থা রাজীব ও মীমকে হত্যা আর সাথে আরো দশজনকে মারাত্মকভাবে পিষে মেরে ফেলার অবস্থায় আহত করেছে। কিন্তু এই বীভৎসতার অভিজ্ঞতা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, এটা কেবল রাজীব বা মিমেরও নয়, রাজীব অথবা মিমের ভেতর দিয়ে আসলে প্রতিটি শিক্ষার্থী ও  অনিরাপদ সড়ক তাদের নিরাপত্তা দিতে আসা মায়েরা প্রত্যেকে নিজেকেই দেখতে পেয়েছেন। ঘাতক বেপরোয়া পরিবহনের সরাসরি শিকার এখন মা এবং সন্তানেরা। তাদের সাথে রাজীব-মিমের ফারাক হল এই যে, এরা দু’জন পরিবহন নৈরাজ্যে হত্যার শিকার হয়েছে; আর এই মা-সন্তানেরা এক্সিডেন্টলি মারা যায়নি, তাই বেঁচে আছে। ফলে চরম নৈরাজ্যের বিপরীতে একটা সুস্থ সিস্টেমের এক নির্বাহী সরকার পরিচালনার অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে মা বা সন্তান কাউকেই দাওয়াত দিতে হয়নি। এটি ভুক্তভোগীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের প্রকাশ। এ কারণে সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা গেছে অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে নিজেই মাঠে আইডেন্টিফাই করে বাহবা দিতে। অর্থাৎ পড়ুয়া সন্তানের সাথে সমান সরাসরি ভুক্তভোগী বলেই অভিভাবকেরা এই আন্দোলনে সম্মতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে।

এই আন্দোলনকারী কারা? অনেকে এদেরকে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা ছেলে বলে সম্বোধন করছেন। এটা সম্ভবত অসতর্কতা অথবা আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি বোঝাতে ‘বাচ্চা ছেলে’ কথা যতটা না তাদের বয়স বোঝানোর শব্দ, এর চেয়ে বেশি তাদের প্রতি সহানুভূতিসূচক শব্দ। তবুও সেটি যাই হোক, বয়সের বিচারে এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৬-১৭ বছর। অর্থাৎ টিনএজের শেষার্ধে। এই বয়সের মূল বৈশিষ্ট্য হল, পরিবার ও সমাজকে তারা এটা জানান দিতে চায় যে, “আমি এখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারি, আমার চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয়েছে, মনে বুঝাবুঝির ফ্যাকাল্টি ডেভেলপ করে গিয়েছে  ও ন্যূনতম পরিপক্বতা এসেছে। ফলে প্রতিটি বিষয় আমি কিভাবে চাই অথবা দেখতে চাই তা আমাকে আমার মত করে দেখতে ও তাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে; আর সেই সাথে অন্যদের তা আমল করতে হবে। আপনার আইডিয়ার তলে আমাকে চেপে দেয়ার সুযোগ আর নাই”।

এরপর ১৮ বছর হয়ে গেলে এ ভাবটাকেই তো আইনসিদ্ধ মতামত জানানোর মত পোক্ত বলে মানা হয়, আমরা মেনে নেই যে তারা রাজনীতি ও নির্বাচনে ভোট বা মতামত দেয়ার যোগ্য বিবেচিত। এ জন্য উল্টো এক কমন ট্রেন্ড দেখা যায় এদের মধ্যে তা হল, তাদের মতামত প্রকাশ করতে না দিলে বা এদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অবস্থান নিলে এরা ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ করে, এদের প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায় জীবন দিয়ে দেওয়ার মত মরিয়া। এরা নিজেদের আমল করানো, তাদের কথা শোনানোর জন্য কোনো ২৫ বা ৩৫ বছর বয়সী মানুষের চেয়েও বহু দূর যেতে রাজি থাকে। তবে ঠাণ্ডামাথায় বুঝিয়ে বলেই একমাত্র যদি তাদের মানানো যায় বা যেতে পারে।

এসব কারণে তাদের দাবি খুবই চিন্তা করে বলা যার মূল সুর হল অনিরাপদ সড়কের তাদের আপত্তি ও অভিযোগ, সড়ক নিরাপত্তা তাদের মূল ইস্যু। দানব ক্ষমতার নৈরাজ্যের এক প্রকাশ পরিবহন নৈরাজ্য – এটা তাদের সব ক্ষোভের কেন্দ্র। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ সড়কে আহত নিজের কোনো বাসযাত্রীকে চিকিৎসা দেয়ার ঝামেলা এড়াতে নদীতে ছুড়ে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে – পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ এই ভয়ংকর অবিশ্বাস্য অমানুষের জায়গায় চলে গেছে। কেউ আর মানুষের গুণ স্বভাবে নেই। এমনকি এ ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সরকার-মালিক-শ্রমিক নেতা কারো দিক থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং নতুন করে আবার দায় এড়ানোর বুদ্ধি আঁটছে তারা।

এক কথায় বললে ১৯৮৩ সালে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BRTA) গঠনের সময় থেকেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা সোজাসাপ্টা চেয়েছে – তারা লাইসেন্স কিনে নিতে পারে এমন ব্যবস্থা চায়। কোন ট্রেনিং শেষে যোগ্যতা পরীক্ষার প্রমাণ দেয়া নয়, সরাসরি কাগজ কেনা এমন একটা লাইসেন্সিং-অনুমোদন ব্যবস্থা যেন কায়েম হয়। আর সেকাজে প্রগতি বা অ-প্রগতিবাদী পরিবহণ নেতারা সকলেই এই ব্যবস্থায় সায় দিয়েছে এই অজুহাতে যে ট্রেনিং-পরীক্ষার যে ব্যবস্থাকে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া বলে এটা নাকি ‘আমলাতান্ত্রিক’। কারণ আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গালি দিতে পারা চরম বিপ্লবীপনা মানা হয়। ফলে তারা এই আমলাতন্ত্রের অজুহাতের আড়ালে সকলেই চেয়েছে পয়সা দিয়ে কেনা যায় এমন এক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কায়েম হোক। আর আমলারাও এমন ব্যবস্থা হলে সহজেই পরিবহণের কাঁচা পয়সার ভাগ মিলবে বলে এতে সামিল হয়েছিল। এভাবে পয়সা দিয়ে কিনে নেয়ার এই ব্যবস্থায় তারা সরকারকেও শামিল করে নিয়েছিল। সেটাই এখন ভয়াবহ দানব মহীরুহ হয়েছে। তাই গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্স দিতে হবে- এটা মন্ত্রী এখন প্রকাশ্যেই দাবি করছেন। অথচ মূল ব্যাপারটা হল, লাইসেন্স বা অনুমোদন যদি কিনেই নেয়া যায়, এরপর তা কি আর ‘লাইসেন্স’ বলে বিবেচ্য হতে পারে? না সেটা লাইসেন্স থাকে? সেটা তো তখন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষালব্ধ দলিল অর্থে লাইসেন্স নয়, এক টুকরো কাগজ মাত্র। এটা চিন্তা করা অবস্থায় সরকার-মালিক-শ্রমিকেরা কেউ নেই। আসলে সরকার-মালিক-শ্রমিকের মিলিত এক সিন্ডিকেট বিআরটিএ’র মাধ্যমে মানুষ মারার ‘লাইসেন্স’ কেনাবেচা করছে মাত্র। আর অন্যদিকে পরিবহনের এই মন্ত্রী-মালিক-শ্রমিকদের গুণ্ডামির এরা এক কোটারি ক্ষমতা, এটাকে দানব সরকার নিজের ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে তাদের মধ্যে এই দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের সিন্ডিকেট, সে আরো চরম বেপরোয়া। অর্থাৎ সরকার মালিক-শ্রমিকদের এই সিন্ডিকেট প্রমাণ করেছে বিআরটিএ আসলে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এক সংগঠন। কার্যকর কোনো রাষ্ট্র-সরকার ও বিআরটিএ সব কিছু একেবারেই বাস্তবত অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এই জায়গা থেকে দেখলে বোঝা যায় টিনএজ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন আমাদের বলতে চাচ্ছে, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য আসলে নতুন রাষ্ট্র-সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন।

তাহলে ব্যাপারটা শুধু পরিবহন নৈরাজ্য নয়, খোদ রাষ্ট্র ও সরকারই এক নৈরাজ্যের দানব, প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এরই প্রধান প্রতিভূ যাকে মাঠের লড়াকু তরুণেরা সম্মুখ মোকাবেলা করছে, তারা হলো পুলিশ। পুলিশ হয়ে উঠেছে নৈরাজ্যের দানবীয় প্রতীক।

ফলে তরুণদের স্লোগানের টার্গেট মূলত পুলিশ ও ক্ষমতা। কিন্তু এই পুলিশ ও ক্ষমতা এটা নষ্টা, বিচ্যুত ও অধঃপতিত। “পুলিশ তুই কোন চ্যাট@র বা@…”। অর্থাৎ তুই আমার কাছে, আমার চোখে তুচ্ছ – এটাই আন্দোলনকারীদের বক্তব্য-বয়াত্নের সার কথাটা। সারকথায়, তাই একে তুচ্ছজ্ঞান করে দেয়া। কারণ, নষ্টা ক্ষমতা, despotic বা ‘দাগী’ ক্ষমতা সে তো পশমের মতোই তুচ্ছ। এই বয়ান হাজির করাই তরুণদের আন্দোলনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরম রাগ-ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ হয়ে কাউকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দেয়া- সে কিছুই না, তাকে সে মানে না পাত্তা দেয় না; এটা বোঝানোর ক্ষেত্রে ইনফরমাল ভাষা- এক্সপ্রেশন হিসেবে অতুলনীয়, আনপ্যারালাল। তাই পুলিশ সম্পর্কিত সব স্নোগানই তাদের তুচ্ছ জ্ঞান করার ভাষা। ইনফরমাল ভাষা যাকে বলি। এখন আপনি দানব ক্ষমতার বেনিফিসারি হলে ওর সাথে থাকলে, আত্মীয় হলে তো এই ভাষার বয়ান নিজের স্বার্থে আঘাত খেয়ে প্রতিক্রিয়ায় নিচা দেখাতে একে ‘অশ্লীল’ বলতে চাইবেনই। তাহলে দেখা যাচ্ছে শেষ বিচারে শ্লীল-অশ্লীল ব্যাপারটা পৌঁছাল যে, এটা আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন। আপনি দানব ক্ষমতার আত্মীয় হলে দানব ক্ষমতার চ্যালেঞ্জকারীকে অশ্লীলই বলবেন।

একটা ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়েও ওপর পুলিশ লাঠি তুলছে, পেটাচ্ছে বা ভয় দেখাচ্ছে – এমন অনেক ছবি মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু সব ছবিতেই দেখবেন তরুণদের ভিতর কোনো ভয় পাওয়ার চিহ্ন নেই, সটান দাঁড়িয়ে আছে, একটুও হেলেনি, মার থেকে বাঁচার চেষ্টা নেই। অথচ ঐ উদ্যত লাঠির বাড়ি পড়লে মাথা দুভাগ হবার সম্ভাবনা। তবু সে ভয়ডর কারও ভিতর কাজ করছে মনে হয় না। কেউ একজন ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়ে – এরই হুবহু প্রতীক হল এ ছবিগুলো। সে বলতে চায়, সে স্বাধীন চিন্তা করতে সক্ষম। ফলে তাকেও আমল দিতে হবে। তার কথা শুনতে হবে।

গ্রীক এক প্রবাদ আছে, যা আপনি কাউকে দিবার যোগ্যতা রাখেন না মুরোদ নাই তা কারও থেকে কেড়ে নিবারও আপনি কেউ না, আপনার সে অধিকার নাই। সুর্যের আলো আপনি কাউকে দিতে পারেন না, সে যোগ্য আমরা কেউ নই। তাহলে কারও সুর্যের আলো পাওয়ার পথে আপনি বাধা হতে পারেন না। সে অধিকারই নাই। মীমের বাবা-মার কথাই ধরা যাক। তারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, বড় জোর ২৫ হাজার টাকার মধ্যে নিরন্তর কষ্ট করে সংসারে মাসের সব খরচ চালাতে বাধ্য হন এমন পরিবার। আশা করার মত তাদের কিছু নাই। কিন্তু এধরণের জীবন নিয়ে মানুষ বেচে থাকে কেন? বাকি জীবনে এর পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নাই। তাহলে কী আছে যা তাদের বাঁচিয়ে রাখে? আত্মহত্যা করতে দেয় না, বাঁচতে আগ্রহ যোগায়? সেই উসিলাটা কী? ঘনিষ্ট হয়ে বসে এদের যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে শুনবেন “বাচ্চাদের মুখের দিকে চেয়ে বেচে আছি”। এক স্বপ্ন আছে যা তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, বেঁচে থাকতে প্রেরণা দেয়। অর্থাৎ মা-বাবারা বুঝে গেছে তাদের প্রজন্ম গেছে। কিন্তু পরের প্রজন্মের সময়ে জীবনমান অবস্থা বদলের স্বার্থে নিজের প্রজন্মকে বলি দিতে রাজি আছে।  যেমন আশা করে থাকে যে মীম পড়ালেখা করে বড় হলে একটা (সরকারি) চাকরি পেলে তাদের চির দুঃখের অবসানে তাদের জীবনযাত্রার মান এক নতুন স্তরে উতীর্ণ হতে পারে। কিন্তু মীমের মৃত্যু তাদের পাচজনের পরিবারের সবস্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার করে দিয়েছে। জীবন ও এতদিনের দাতচেপে ধরে করা কষ্ট সব এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। রাষ্ট্র তাদেরকে একটা নুন্যতম অভাবপুরণের জীবন দিতে পারে নাই। তাহলে রাষ্ট্র-সরকারের কী অধিকার আছে তাদের স্বপ্ন ছিনিয়ে নিবার? কিন্তু এর জবাব দিবার কেউ নাই। কারণ মীমের পরিবারের সংগ্রাম আর তাদের দিক থেকে জীবনকে একবার দেখারও কেউ নাই! আমরা এমন সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাস করছি।

তাহলে আগামীতে কী হবে? প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কী বুঝবেন বা বুঝেছেন- তারা কার মুখোমুখি হয়েছেন, কার সাথে ডিল করছেন? এর জবাব সম্ভবত হতাশাব্যঞ্জক হবে! তারা বুঝবেনই না; অথচ  কী শক্তি ছিল অদমনীয় ১৬-১৭ বছরের এই তরুণদের ভিতর। কাজেই মাননীয় ক্ষমতা- আপনি পরাজিতই হবেন। আপনারা নো বডি, তুচ্ছ! তাহলে আমরা কি একটা ম্যাসাকার দেখতে যাচ্ছি। এক কঠিন সময়ের প্রান্তে আমরা।

[এই রচনাটা লিখতে যাদের ফিল্ড রিপোর্ট আমাকে খুবই সাহায্য করেছে, বিশেষ করে আলনোলনরত মা-সন্তানদের তথ্য আর অথবা রাজীব ও মীমের পারিবারিক তথ্য – এসবগুলোকে আমার ইমাজিনেশনে নিতে পেরেছি, তা নিয়েছি দৈনিক প্রথম আলো থেকে। তাদের রিপোর্টিং সত্যিই ছিল প্রফেশনাল যা আমাকে খুবই সহায়তা করেছে। তারা জানে তারা কি করছে। আর আমার দিক থেকে, কারণ সমাজতত্বের আলাপ তুলতে গেলে যে ধরণের নুন্যতম তথ্য দরকার হয় তা একমাত্র প্রথম আলোতেই ছিল। তাদের সকলকে তাই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ আগস্ট ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

গৌতম দাস

২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2t0

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল হতে যাচ্ছে? – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানে নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ দলের (Movement for Justice) নেতা প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ২৭ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত শেষ খবর পর্যন্ত পাকিস্তানের ডন পত্রিকা বলছে, ২৭২ আসনের পার্লামেন্টে ইমরানের যোগাড় করেছে ১১৫ আসন। [bagging 115 of the total 270 seats on which elections were held, according to the preliminary results announced by the Election Commission of Pakistan (ECP).]অর্থাৎ সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ১৩৭ আসনের থেকে ২২ আসন দূরে। যেটা তারা আশা করছে অন্য প্রধান দুই দল  ৬৩ আসন পাওয়া নওয়াজ-মুসলিম লীগ অথবা ৪৩ আসন পাওয়া ভুট্টো পরিবারের পিপিপির কোন সহযোগিতা ছাড়াই ছোট দলের সহযোগিতায় পূরণ করে নিতে পারবে। অর্থাৎ তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনের পরের দিন ২৬ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, “ইমরান খান ও মিলিটারি বসেরা ভাবতে শুরু করেছেন যে তারা একসাথে কাজ করবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইমরান মিলিটারি বসদের একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেন যে, পাকিস্তানের আমেরিকার সাথে যো-হুজুর করে পড়ে থাকা অবস্থা কমিয়ে ফেলতে হবে আর তালেবান বা অন্যান্য চরমপন্থিদের সাথে ডায়লগে আরও কথা বলে দ্বন্দ্ব-বিরোধ কমিয়ে ফেলতে হবে”। [Mr. Khan, on the other hand, was someone the military bosses seemed to think they could work with. Analysts said he shared their worldview, in which Pakistan would kowtow less to the United States and talk more with the Taliban and other extremist groups.]

ইমরান মনে করেন, পাকিস্তানে চরমপন্থার রাজনীতি আছে কথা সত্য, কিন্তু মূল সমস্যা রাষ্ট্র শাসনের বা গভর্নেসের চরম ব্যর্থতা। [“In Pakistan, the main problem is not extremism,” he said in a recent interview with The New York Times. “We are a governance failure. And in any third world country, the moment the governance collapses, mafias appear.”]
এই হল মোটা দাগে সর্বশেষ, পাকিস্তানে কী হতে যাচ্ছে এর সংক্ষিপ্ত ধারণা। এবার মুল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

“পাকি” অথবা “পাকিস্তানে পাঠানো’
অন্য কারও মধ্যে নিজের অপছন্দের ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কিছু দেখলেই তাকে “পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার” হুমকি দিতে দেখা যায় আজকাল হামেশাই – সেই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫ জুলাই। একালের বাংলাদেশেও ভারতের মতোই ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ হুমকি সমান হাজির; আর সেটা প্রায় সমান ভারতীয় অর্থে – প্রায় একই ভাষা ও বয়ানে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে হুমকিদাতা যেন বুঝানোর চেষ্টা করে যে ভারত, আমরা তো তোমাদের মতোই। কিন্তু এই ‘তোমাদের মতোই’ মানে আসলে কী? প্রগতিশীল? অবশ্যই না। সেটা এককালে ছিল। তাহলে কি একই রাষ্ট্রনীতির কারণে? সম্ভবত হ্যাঁ। বাংলাদেশের সরকারকে প্রবল সমর্থন করা ভারত, এ দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি একই। বাস্তবে এই দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি এক হোক আর নাই হোক, পাকিস্তান প্রশ্ন এলেই চলতি আমলে আমাদের সরকারের ঝোঁক থাকে এটা দেখানোর যে, আমাদের অবস্থান ভারতের মতোই। কিন্তু তাতেও আবার সেই কথা, ভারতের মতোই মানে কী?

প্রথমেই বলে নেয়া যায় যে, ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ বুলি এটা মূলত এক “হিন্দু জাতীয়তাবাদী” রাজনীতির বয়ান। যার প্রত্যক্ষ খাতক মোদীর বিজেপি। যদিও সেই সাথে বকলমে অন্য অনেক দলই। তবে তার চেয়েও বড় কথা এই বুলির বয়ান আদতে বর্ণবাদিতার বা রেসিজমের। অথবা বিশেষ করে কাউকে “পাকি” বলে ডাকা বা ব্যঙ্গ করা। কেন? কারণ, কোনো নির্দিষ্ট আমলের পাকিস্তান সরকারের নীতি পলিসি এখানে রেফারেন্স তো নয়ই, বরং পুরো পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীকেই অভিযুক্ত করা হয়, ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়ে থাকে এখানে এই ইঙ্গিত দিয়ে যে  ‘তাদের রক্তই খারাপ’। যেন তারা  “রক্ত খারাপ” এক জনগোষ্ঠি। এটা এক ধরনের হিটলারি বর্ণবাদী যুক্তির বয়ান। তাই তারা দোষী। আসলে এটা এক ভয়ঙ্কর প্রবল ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচি। তবে অনেকে এতসব জেনে বা না জেনে সহজেই এতে সামিল হয়ে যান, আর রেসিস্ট উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের শিকার হয়ে পড়েন। ভারতে একালে এই বয়ান প্রবল করেছে বিজেপি-আরএসএসের মোদি সরকার; যদিও এর আগেও এটা কম-বেশি ছিল। ফলে উঠতি তরুণ যারা রেসিজমের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান তাদের এ ব্যাপারে সচেতন হতেই হবে। আমার অপছন্দের কিছু হলেই আমরা কাউকে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ কথা বলতে পারি না। কারণ এটা রেসিজম। বরং কোন পাকিস্তান সরকারের সুনির্দিষ্ট সেই নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা নিন্দা করাই সঙ্গত হবে। অজান্তে প্রগতিবাদিতার নামে হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক হয়ে যাওয়াটাই কোনো কাজের কথা নয়।

“পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন”
পাকিস্তান- এই শব্দটা দিয়ে এছাড়াও এই অঞ্চলে আমরা আরও অনেক কিছু ইঙ্গিতে মানে করি। যেমন পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন- এটা সমার্থক। একজন ‘প্রগতিশীল’ রাইটার আজ লিখছেন, ‘পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হল।’ অর্থাৎ তার আগাম অনুমানটা হল পাকিস্তান মানে তো সেখানে ‘সামরিক অভ্যুত্থান হবারই কথা’, সেটা না হয়ে নির্বাচন হয়েছে। কেন? কারণ, জুড়ে দেয়া ট্যাগিং অর্থটা হল, পাকিস্তানের জেনারেলরা নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া থাকতেই পারে না। এখানেও আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হল যে, জেনারেলরা যেন খুবই ক্ষমতালোভী, সে কারণেই নিজ ইচ্ছায় তারা অভ্যুত্থান করে থাকেন। আর ঘটা এ ধরনের অভ্যুত্থানগুলোতে বোধহয় পাকিস্তানের বাইরের গ্লোবাল পরিস্থিতির ও পরাশক্তি রাষ্ট্রের কোনো সংযোগ ও ভূমিকা নেই। সবই যেন স্থানীয় জেনারেলরা লোভী বলেই কেবল তারা ক্ষমতা নিয়ে নেন। এই হল প্রপাগান্ডা অনুমানগুলো।

এসব অনুমান বাস্তবতা বিবর্জিত ও ভিত্তিহীন। ফ্যাক্টস হল, পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলগুলো হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায়, ঐ রাষ্ট্রের নীতি-পলিসির কারণে। জেনারেলদের নিজের ইচ্ছায় মানে, আমেরিকার ইচ্ছা অমান্য করে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল একবারই হয়েছে; সেটা ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বেলায়। তাও সেটার পিছনে বিশেষ কারণ আছে। শ্রীলংকা থেকে দেশে ফিরতে  বাণিজ্যিক বিমানে রওনা করেছেন মোসাররফ। আর ঠিক এর পরেই ভ্রমণরত অবস্থায় মোশাররফকে সেনাপ্রধান থেকে সরানো এবং তার বিমান মাটিতে নামতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা জারি করেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। এর বিরুদ্ধে সেনা সদস্যদের মিলে পালটা যৌথ অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের জ্বালানি থাকা অবস্থায় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা মোসাররফের বিমান মাটিতে নামিয়ে আনেন।  কোন বাণিজ্যিক বিমানকে নামতে না দেওয়ার নির্দেশ জারি এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। মূলত ভারত-পাকিস্তানের কারগিল যুদ্ধের দায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর্মিকে দায়ী করা এবং বিশেষত মোশাররফের ওপর তা চাপানো আর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের তাতে মৌন সম্মতিতে ঘটেছিল এমন হাতছুট ঘটনা ও এর পরিণতি। তাও এর দু’বছর পরে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন, টুইনটাওয়ার হামলার পরের দিনই আমেরিকা মোশাররফ সরকারকে মেনে নিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সদ্য স্বাধীন সেকালের পাকিস্তানে, ১৯৫১ সালে প্রথম যে সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা করেছিল তা করেছিল পাকিস্তানের কমিউনিস্টরাই। “রাওয়ালপিন্ডি কন্সপিরেসি” নামে যা পরিচিত। ফলে জন্ম থেকেই, ইসলাম-পাকিস্তান-সামরিক ক্যু, এগুলো সব সমার্থক শব্দ, এ কথা বলে যে প্যারালাল টানা হয় এই কথারও কোন ভিত্তি নাই।

আসল কথাটা অর্থাৎ যে জায়গায় বসে পাকিস্তান বা সামরিক বিষয়টাকে দেখতে হবে তা হল কোল্ড ওয়ার; মানে ১৯৫০-১৯৯১ সাল, এই সময়কাল ধরে চলা আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে লড়াইয়ের যুগ। এইকালে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ ক্যু হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায় ও নীতিতে সামরিক শাসনে চলেছে। মূলত কমিউনিস্টদের পপুলার প্রভাবে আমেরিকার পক্ষে এসব দেশে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সরকার দূরে থাক, নামকাওয়াস্তে কোনো লিবারেল দুর্বল সরকারও টিকিয়ে রাখতে পারেনি সেকালে। ফলে আমেরিকার প্রভাব-স্বার্থ টিকাতে সামরিক ক্ষমতা দখলই ওর একমাত্র ভরসা ছিল ।

কোল্ড ওয়ার মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে (১৯৪৫) কলোনি উত্তর সময়ে কলোনিমুক্ত দেশগুলোকে নিজ বলয়ে নিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি প্রভাব বিস্তারের লড়াই, তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র-ব্লকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আসার টানাপড়েন – এটাই কোল্ড ওয়ার যুগ-বৈশিষ্ট্য। এবং অবশ্যই সেগুলো কমিউনিস্ট ও এন্টি-কমিউনিস্ট মতাদর্শের মধ্যকার লড়াই, এই উছিলায় ঘটেছিল। এতে কে সঠিক ছিল, সেটা আমরা যার যার পছন্দের মতাদর্শের ভিত্তিতে জবাব দেব আর এভাবে বিভক্ত হয়ে যাবো কোন সন্দেহ নেই। ফলে সেদিকে না গিয়ে, বরং সেই সময়ের আমেরিকান নীতি সম্পর্কে চলতি শতকে এসে আমেরিকানদের ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন কী- সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা তুলব। তবে মূল কথা হলো, অনেক হয়েছে আর কত, পাকিস্তানের ঘটনাবলি বুঝতে কোল্ড ওয়ারের চিন্তা-ফ্রেম তো লাগবেই  সাথে লাগবে আমাদের পরিপক্কতা। হিন্দু অথবা মুসলমান জাতীয়তাবাদের বাইরেও দুনিয়া আছে। ফলে বাইরে যেতে হবে। পাকিস্তানের ঘটনাবলির কারণ সেখানেও দেখতে হবে। অন্তত, দুই জাতীয়তাবাদের কোনো একটার ঘরে বসে অন্যটাকে কোপানো – এগুলোর দিন শেষ করতে হবে। পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।

RAND ও আরব স্প্রিং
র‌্যান্ড করপোরেশন (RAND Corporation) – এটা আমেরিকান আর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের নাম। বহু পুরানা, বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এর জন্ম। যখন সে আমেরিকান এয়ার ফোর্সকে নিজের নীতি গবেষণার কাজ দিয়ে সহায়তা দিত। কারণ, যুদ্ধবিমান তৈরি করে এয়ারফোর্সকে বিক্রি করে এমন এক কোম্পানি থেকে র‍্যান্ডের চলার ফান্ড আসত। বর্তমানে (১৯৪৮ সালের পর থেকে) এটা নিজেই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসাবে রেজিষ্টার্ড। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, পিএইচডি প্রোগ্রাম অফার করে থাকে। যেখান থেকে এর বিস্তর একাডেমিক তৎপরতা – স্টাডি, গবেষণার কাজ চলে। স্বভাবতই এর মূল লক্ষ্য হল, অ্যাকাডেমিক তৎপরতা- স্টাডি, গবেষণার মাধ্যমে আমেরিকান সরকারগুলোকে সম্ভাব্য তার পলিসি কী হওয়া উচিত, তা ঠিক করতে সহায়তা করা। এই অর্থে আমেরিকান রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ দেখাটাই তার কাজ। তার অনেক কাজের মধ্যে একালে এক প্রভাবশালী কাজ – পপুলারলি যেটাকে ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ নামে চেনানো যায়। বড় পরিসর থেকে বললে, ২০০১ সালে টুইনটাওয়ার হামলার পরে বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নীতিটা ছিলঃ মুসলমানমাত্রই শক্ত হাতে দমন, তাদের ধর আর মার। এই নীতি নিষ্ফলা পরাজিত হয় ও অনন্ত সমাপ্তিহীন এক যুদ্ধের ভেতর আমেরিকাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই থেকে, আমেরিকান অর্থনীতির পতনের পিছনে এটা মূল কারণ।  ২০০৬ সালের মধ্যে আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের গবেষণা মূল্যায়নে পাওয়া ফল হিসেবেই এই নিষ্ফলা পরাজয় আর অর্থনীতির পতনের ঘটনাবলি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আর এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে আর আগে থেকে চলে আসা র‌্যান্ডের এক গবেষণার ফলাফল – মূলত এই দুই থেকে তৈরি নীতি হল ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’। ওবামা প্রশাসন ২০০৯ সালে ক্ষমতা নিলে এটা স্থায়ী ও রুটিন বিদেশ নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

সার কথায় বললে, এটা হল নির্বিচারে আর মারধর-দমন নয়, ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট করার নীতি। সশস্ত্র ইসলামি ধারাগুলোর সাথে আমেরিকার আগেরই মারধর-দমন চলেছে তা বাদে ওর বাইরে বাকি সব ইসলামি ধারার সাথে আমেরিকার রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়া, রাষ্ট্র-সরকারে তাদের আসতে অংশগ্রহণে সহায়তা, সহযোগিতা করা। এরই প্রথম সবল প্রচেষ্টা ছিল মিসরে মোবারকের পতন ও পপুলার নির্বাচিত এক সরকার সৃষ্টি – আরব স্প্রিং। আর এই কাজে ইসলামি ব্রাদারহুডের সাথে কাজ করা, এটাই ছিল আমেরিকার ইসলামের সাথে এনগেজমেন্টের প্রথম উদ্যোগ। দুঃখজনক হল এটা ফেল করে যায় বা কাজ করেনি। না করলেও ওবামা আরো কিছু চেষ্টা করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু মূলত ব্রাদারহুড সম্পর্কে সৌদিরাজের ভীতি, বিশেষত প্রেসিডেন্ট মুরসির ইরান সফর করা থেকে সেই ভীতি আরো ট্রিগার করে প্রবল হওয়া থেকে, এরপর সৌদি উদ্যোগে জেনারেল সিসির আগমন উত্থানে ওবামা এতে নীরব বা উপায়হীন সমর্থকে পরিণত হয়েছিল। ফলে মুরসির পতন ঘটে। মিসর এক্সপেরিমেন্টের এখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ইজিপ্ট ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর একটা মাত্র। এই প্রজেক্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার সব দেশেই চালু তো আছেই, ফলে বাংলাদেশেও আছে। এমনকি ইন্ডিয়াতেও আছে। কারণ এটা সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির চলমান অন্যতম মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

আমেরিকার যুদ্ধের ময়দান পাকিস্তান
যুদ্ধটা শতভাগ আমেরিকার। নিজ দেশের ভুমিতে সে যুদ্ধ না করে পাকিস্তানকে যুদ্ধের ময়দান বানানো ও ব্যবহার করা, পাকিস্তানকে এক গজব বানিয়ে ফেলার শতভাগ দায় আমেরিকার। সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির সাথে আমেরিকান যুদ্ধের ময়দান হল পাকিস্তান। পাকিস্তানকে আমেরিকার হয়ে এই ময়দান হতেই হবে। নইলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে মাটির সাথে মিটিয়ে ‘পুরান প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানো হবে – এটাই ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজের প্রেসিডেন্ট মোশাররফকে টেলিফোন কথোপকথনে দেয়া পরামর্শ বা হুমকি। মোশাররফের ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইতে এর বিস্তারিত বয়ান আছে। তাই জেনারেলদের সিদ্ধান্তের পাকিস্তানের সব ‘টেররিজম’ ঘটনা ঘটছে- এ কথাগুলো অর্থহীন। আমেরিকান ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে বাধ্য হয়ে নিজেদেরকে ব্যবহৃত হতে দেওয়া এই বৃহত্তর দিক বাদ দিয়ে কেবল জেনারেলদের দায়ী করার সংকীর্ণ চোখ – এটা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের ফরেন পলিসি।  তা যাই হোক, আমেরিকান রুটিন পলিসি হিসেবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার রাষ্ট্র বলে পাকিস্তান ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর এক বড় খাতক, এই প্রকল্পের শুরু থেকেই।

আমরা বেশির ভাগই না আরব স্প্রিং পলিসির যথেষ্ট খবর নেই না পাকিস্তানের। এই প্রচারণার কাছে পাকিস্তান মানে হল ঘৃণা। এটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের চোখে দেখা ১৯৪৭ এর দেশভাগ অথবা সত্য সত্যই ১৯৭১ এর পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা নৃশংসতাও এর কারণ বটে। যদিও এরপর এরা আবার জিয়াউল হকের আমলে এসে থেমে যায়।  বুঝতে চায়না অথবা দেখতে পায়না ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল – এই ট্রিগার পয়েন্ট সব ঘটনার আরম্ভ-বিন্দুকে। যেখানে মুল বিষয় হল, রাশিয়ান জার-সাম্রাজ্য সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজ বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে নিজ সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করে আর এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে ১৮৮৯ সালে আফগানিস্তানের মাটিতে ব্রিটিশ-জার এ দুই সাম্রাজ্য লড়াই করেছিল। এরই পুনরাবৃত্তি হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল। যার আবার পিছনের মূল কারণ ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব-ভীতি। ইরান বিপ্লব ছিল এক গ্লোবাল ঐতিহাসিক তাতপর্যময় ঘটনা এই অর্থে যে সোভিয়েত ব্রেজনেভ-আফগানিস্তান-আমেরিকা-পাকিস্তান-টেরর-আলকায়েদা-তালেবান-আইএস ইত্যাদি সব শব্দাবলীতে এরপর থেকে এক চেন রিয়াকশন ঘটে গেছে এখান থেকে। একালের দুনিয়ার সবঘটনার আরম্ভ বিন্দু এখানে। । মূলত ইরান বিপ্লবের প্রভাবে মুসলিম সেন্ট্রাল এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ছাড়া হয়ে যায় কিনা আগাম সেই ভয় মনে এসেছিল সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের। আর তা থেকে তিনি ‘সমাজতন্ত্র নামের আড়ালে’  কলোনী দখলগিরিতে করতে নেমে পরেন। আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান ইরান আর সেন্টাল এশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ) প্রায় মাঝখানে। ফলে আফগানিস্তানকে বলি চড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ব্রেজনেভ এই মনে করে যে বাফার হিসেবে আফগানিস্তান দখল করে আফগানিস্তানকে  বাফার রাষ্ট্র হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।  পুরানাকালে রাশিয়ান জারের তৎপরতায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভয় পেয়ে এর বিরুদ্ধে লড়েছিল, একালে সেই একই ভয় পায় পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান যুদ্ধের দায়টা নিয়েছিল আমেরিকার হয়ে, কোল্ড ওয়ারের লড়াই লড়তে। যে যুদ্ধের শেষটায় এখান থেকেই আল-কায়েদা ও তালেবান উত্থান-পতনে, এখনও যা চলমান।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও তা ভেঙে গেলে এর আমেরিকার থিঙ্কট্যাঙ্ক একাদেমিক মহলে প্রধান তাৎপর্যময় বিষয় হয়ে উঠে যে “কোল্ড ওয়ারের” তাহলে এখন কী হবে! কারণ বাস্তবত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও নাই মানে মাঠে এবং বাস্তবে কোল্ড ওয়ার নাই হয়ে যাওয়া। ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল যে কোল্ড ওয়ারের পুরা যুগে আমাদের মত দেশে আমেরিকা সামরিক ক্যু’র করানোর পথ অনুসরণ, সেটা এবার তাহলে ফরেন পলিসি থেকে বাদ দিতে হবে।

আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন
কিন্তু আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন? এ প্রসঙ্গে র‌্যান্ড রিপোর্টের দেয়া একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তা হল, আমেরিকান পলিসি মেকারদের চোখে সমাজতন্ত্র এক এবসার্ড (বাস্তবায়ন অযোগ্য) আইডিয়া। না, এটা তাদের অপছন্দের মতাদর্শ বলে নয়। কারণ এটা এমন এক প্রজেক্ট যার সাথে আমেরিকানদের এনগেজমেন্ট বা কোনো দেয়া-নেয়া, রাষ্ট্র বা সরকারে পাশাপাশি থাকা, দুটো আলাদা দল হিসেবে থাকা, অথবা সরকারে বা বিরোধী হিসাবে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। ব্যাপারটা হয় তারা না হলে আমরা। এছাড়া কমিউনিস্টদের “সব মালিকানা উচ্ছেদ করে দিতে হবে” – এটা মধ্যবিত্ত ও গরিবদের মধ্যে খুবই পপুলার দাবি। অথচ আমেরিকার চোখে এটা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন এক এবসার্ড দাবি। তবে এবসার্ড হলেও কিন্তু তা পপুলার দাবি বলে এর সামনে আমেরিকা অসহায় এবং উপায়ন্তহীন। তাই আমেরিকা এশিয়ায় আমাদের মতো দেশে কোল্ড ওয়ারের পুরা ৪২ বছরে কোনো লিবারেল সরকারও কায়েম করতে পারেনি। এরই পরিণতি হল সামরিক ক্যু ফেনোমেনা।

এই কথাগুলো এখানে বলা হল, আমেরিকান নীতি বুঝার জন্য কেবল। তা মেনে নেয়ার জন্য এটা কোনো সুপারিশ নয়। অথবা এটাকে সাফাই হিসেবে নেয়ার জন্য নয়, তা ভুল হবে। আমেরিকানদের ভালো বা মন্দ কাজের সাফাই দেয়ার দায় আমেরিকার।

তাই সোভিয়েত ভেঙ্গে পড়ার (১৯৯১) পরে এবার আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল এবং শেষে নীতিগতভাবে আমেরিকা সিদ্ধান্ত অবস্থান নেয় যে আর সামরিক ক্ষমতা দখলকে নিজের স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে আর দেখা হবে না। সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১) প্রশাসনের শুরুর আমল। বিল ক্লিনটনের ২০০০ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফর ছিল সেই বার্তা পৌছানোর যে আমরা এখন থেকে আর সামরিক ক্যু নয় লিবারেল নির্বাচিত সরকারের পক্ষে।  আর ঠিক এই কারণে অর্থাৎ আমেরিকান ‘ক্যু-বিরোধী’ নতুন পলিসি কমিটমেন্টের পর জেনারেল মোশাররফের ক্যু এই সাময়িক দুর্ঘটনাটা ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেনি। মূল কারণ আমেরিকান নীতিগতভাবে সামরিক পথে না যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত প্রতিশ্রুতি। ফলে যারা কিছু হলেই পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল নিয়ে শঙ্কা তোলেন তারা মুখস্থ বলেন। তারা আমেরিকার পলিসির হাল-হকিকত সম্পর্কে খোঁজ রাখেন তা মনে হয় না।

আবার আমরা বেশির ভাগই একালের পাকিস্তান, নতুন প্রজন্মের পাকিস্তান সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকেবহাল নই। বিশেষ করে আরব স্প্রিংয়ের প্রভাব পাকিস্তানে কেমন পড়েছিল। ঠিক যেমন বাংলাদেশে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনকি আমাদের বেসরকারি মেয়েদের স্কুল ভিকারুন্নিসা পর্যন্ত আরব স্প্রিং ছড়িয়ে আছে, আমরা কী জানি! মনে হয় না। অবশ্য ধরতে পারারও একটা ব্যাপার আছে। এই ততপরতাগুলোকে চেনার একটা সহজ উপায় হল, ‘ইয়ুথ’ বা ‘লিডারশিপ’ – এসব শব্দে প্রকাশিত কোনো তৎপরতা দেখতে পেলেই বুঝতে হবে এটাই সেই। বাইরে থেকে দেখতে এটা আমাদের পরিচিত ‘শিক্ষার্থীদের কোন ক্লাব’ (ডিবেটিং) ধরনের এমন নানা তৎপরতা, যেগুলো যে কোনো অ্যাকাডেমিতে এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি বলা হয় তেমনই ধরনের।
র‌্যান্ডের ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ঙ্গামেরিকান ফরেন পলিসি হিসাবে গৃহিত হওয়া আসলে আমেরিকারই সামরিক ক্যু’র পথে আর না যাওয়ারই আরেক পরিপূরক অবস্থান, আরেক এক্সটেনশন।

তাহলে মূল কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়াতে তাই আমেরিকাকে এরপর দেখানো জরুরি হয়ে পড়ল যে, এখন তাহলে রাষ্ট্র গঠনে, রাষ্ট্রীয় কনস্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া, মৌলিক অধিকার সম্পর্কে মাস লেভেলে সচেতনতা তৈরি ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকার এগিয়ে আসা উচিত। এ্টাই ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ এর কোর লক্ষ্য । যুক্তির শুরু এখান থেকেই। তবে মূলত এর মাঝে টুইনটাওয়ার হামলা ঘটে যাবার কারণে, মূল প্রজেক্টকে মুসলমান জনসংখ্যার জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য এমন বিশেষ আর এক মাত্রা দিয়ে সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল যাতে তা ‘ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্টের ইচ্ছার’ প্রকাশ হিসাবেও কাজ করতে পারে।

টার্গেট হিসাবে এই প্রজেক্ট মূলত এটা তরুণদের মধ্যে বেশি কাজ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে, পপুলারও হতে চায়। এটা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র, কনস্টিটিউশন, প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে এবং সমাজকে নেতৃত্ব দেয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আমেরিকান প্রকল্প।

“Youth leadership”
পাকিস্তানে এই প্রকল্প তৎপরতা খুব সম্ভবত ২০১০ সাল থেকে ব্যাপকতা লাভ করে। ইমরান খানের দলের নাম পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ, সংক্ষেপে পিটিআই। যার মানে হল (Movement for Justice) বা ইনসাফের লড়াই।  যদিও পিটিআইয়ের জন্ম ১৯৯৬ সালে আরব স্প্রিংয়েরও বহু আগে থেকে। তবে আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতা ধীরে ধীরে জমে ওঠার পর গত ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে দিয়ে সমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থেকে তারা একটা দল বেছে নিয়েছিল। সেটা ইমরান খানের দলের সাথেই, সেখান থেকে তাদের বুঝাপড়া ও এক সাথে কাজ করার ঐক্য হয়েছিল। এমনিতে আরব স্প্রিংয়ের প্রকল্পগুলো মাঠে হাজির থাকে এনজিও প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা হিসেবে। তবে বাইরে আমরা দেখি কেবল তাদের সুবিধালাভ যারা যারা করে এমন শিক্ষার্থীদেরকেই। সরাসরি ইউএস এইডের সরকারি ফান্ড এটা; অন্য কোন সামাজিক দাতব্যের ফান্ড নয়। আমেরিকান প্রায় ৯টি এনজিও প্রতিষ্ঠান সাধারণত এ কাজ-ততপরতায় জড়িত।   ফলে তারা সরাসরি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে পারে না, করেও না। তবে তাদের তৎপরতা থেকে সুবিধা-লাভকারি স্থানীয় জনগণ বা শিক্ষার্থী নিজেরা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথেও কাজ করতে পারে। তবে “youth leadership” নামে চলা কর্মসুচিগুলো কবে কখন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কর্মিদের সাথেও সম্পর্ক কাজ করবে এটা ভ্যরি করে। সাধারণত এটা অনেক দেরি করে ঘটে। মিসরের “সিক্সথ অক্টোবর লিডারশীপ গ্রুপ” শেষে নিজেই রাজনৈতিক দল হয়ে যায়। তবে কোন কারণে তা নির্বাচনের পরে হয়েছিল।

“youth leadership” ্ধরণের কাজের মাধ্যমে গত বিশ বছরে তরুণ পাকিস্তানিরা, পাকিস্তানের পরিচিতি অনেক বদলে দিয়েছে। এরা মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত।  ইমরানের দলের গত পাঁচ বছরের তৎপরতায় মনে করার কারণ আছে যে, এসব তরুণ নেতৃত্বেও কিছু যোগ্যতা অর্জন করেছে। পাকিস্তান সমাজের এই অংশটার কথাই বাইরের আমরা খুবই কম জানি কারণ আমাদের পরিচিত পাকিস্তান যেটা ছিল সেটা মূলত বড়জোর সত্তরের দশকের; সেটা দিয়েই একালের পাকিস্তানকে বুঝতে চাই বলে সমস্যা হয়। নিরন্তর যুদ্ধ, রিফুইজি, অস্ত্র  বোমা আর ইসলামের হরেক রক্ষণশীল বয়ান- ইত্যাদি এসবের পালটা এসব কিছুতে ত্যক্তবিরক্ত এসব তরুণেরা এক ব্যাপক মডার্নাইজেশন বা রুপান্তরের ভেতর দিয়ে পার হয়ে গেছে। যার প্রধান উপায় হিসেবে কাজ করেছে এনজিও তৎপরতা। এরই সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল ব্যাপক  ও একটিভ নারী ভোটার এর ততপরতা। পাকিস্তান রক্ষণশীল সমাজ তা সত্বেও নারীরা সক্রিয়ভাবে সবকিছুতে তাদের উপস্থিতি আজ দেখতে পাওয়া যায়। এই নির্বাচনে শিখ, হিন্দু, খ্রীশ্চান ও নারী এমনকি ট্রান্সজেন্ডারেরা প্রার্থী হয়েছে। কয়েকজন সম্ভবত নির্বাচিতও হয়েছেন। এর পিছনে মূল যে বাস্তবতা কাজ করেছে তা হল, নারীরা বাইরে বের না হওয়ার মানে কঠিন কষ্টকর জীবন সংগ্রামে পরিবারের আয়ের তাবত দায় কেবল পুরুষ সদস্যদের নিতে হবে। স্বভাবতই তা পরিমাণেও কম হবে। অনটন বাড়বে। ফলে এই কঠিন বাস্তবতার ফলাফল হল নারীদেরকে বাইরে দেখতে পাওয়া। সমাজে তা গ্রহণযোগ্যও করে নেয়া হয়েছে, হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আমরা আফগানিস্থানের সাথে তুলনা করলে দেখি সেখানে নারীরা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া (তা আটবছরের বালক হলেও) এখনও বাইরে বের হতেই পারেন না। এসব কিছু মিলিয়ে এক পরিবর্তন – পরিবর্তিত পাকিস্তান – এরই প্রতীক ইমরান।

এরা নিঃসন্দেহে একেবারেই নতুন প্রজন্ম, নতুন তাদের অভিজ্ঞতা। তাদের তৎপরতার প্রথম ফলাফল দেখার সময় সম্ভবত এই নির্বাচন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে পিটিআই সবার চেয়ে এগিয়ে। এর পেছনের একটা বড় কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ পরিবারসহ তার অর্থ পাচারের দুর্নীতির মামলার রাজনৈতিক তৎপরতা করার অযোগ্য ঘোষিত হয়ে যাওয়া, এর নৈতিক প্রভাব। মনে হচ্ছে পিটিআই অথবা তাদের নেতৃত্বের এক জোট, সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রিগিংয়ের অভিযোগ আছে। বিদেশি অবজারভাররা নির্বাচন ভাল হয় নাই বলেছে কারণ নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না তারা বলছে। তবু সব কিছু যতটা সম্ভব আমল করে, প্রতিকার করে কাটিয়ে ইমরান খান সরকার গড়তে যাচ্ছেন – এটাই  ডমিনেটিং পাবলিক মনোভাব ও আকাঙ্খা। এই তথ্য আলজাজিরার পাকিস্থানের স্থায়ী সংবাদদাতা কামাল হায়দারের বরাতে বলছি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পাকিস্তানে আরব বসন্তের নতুন মডেল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2sO

Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

[Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

[New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

গৌতম দাস

১৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sE

File photo of 1st China-South Asia Cooperation Forum ((CSACF), Fuxian Lake Initiative – ORF

ভারতের অন্যতম বেসরকারি দাতব্য থিংকট্যাংক বা বেসরকারি পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা সংক্ষেপে ওআরএফ (Observer Research Foundation, ORF)। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনেকেই থাকেন রিসার্চ ফেলো হিসেবে, যারা সাধারণত হন দীর্ঘ পেশাদার জীবন কাটানো কোনো কূটনীতিক, জার্নালিস্ট বা একাডেমিক ইত্যাদি পেশাজীবী। কিন্তু ওআরএফ রিসার্চ ফেলোদের নিয়ে এক আজব ঝোঁক দেখা যাচ্ছে যে, তারা তাদের সহকর্মী একই বিষয়ের কী নিয়ে কাজ করছে, কোথায় কী বলছে, সেসবের খবর রাখে না। তাই একই প্রতিষ্ঠান ওআরএফের এক সহকর্মী যা বলছেন, অপর সহকর্মী ঠিক এর উল্টো বলছেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য খারাপ নাম কামিয়ে বাংলাদেশের চোখে পড়ে যাওয়া ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। পরবর্তী সময়ে কূটনীতিক চাকরির জীবন শেষ করে তিনি ২০১৬ সালে ভারতের ওআরএফ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো হয়েছিলেন। এমনিতেই ভারতের থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ ঝোঁক হলো প্রো-আমেরিকান পলিসি অনুসরণ করা অথবা তাদের জন্মই হয় আমেরিকান অর্থে আমেরিকান নীতি-পলিসি প্রচারের জন্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, বিপুল উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির পক্ষে প্রচারণা চালাতে ভারতের প্রায় সব থিংকট্যাংকই ভাড়া খাটে। এর মূল কারণ, এদের বেশির ভাগেরই জন্ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডিং এ কারণে। তেমনই, প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খাটা, আর আমেরিকান বলে বলীয়ান এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর হলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। যদিও কপাল খারাপ, এখন ট্রাম্পের জমানা, আর তাতে এসব ভাড়াটেদের অবশ্য অবস্থা খুবই শোচনীয়। ট্রাম্পের চলতি “বাণিজ্য যুদ্ধের” নীতির ঠেলায় আমেরিকান পলিসির পক্ষে দাঁড়ানো ও ওকালতি তারা করুক এব্যাপারে ট্রাম্পই তেমন আগ্রহী না, গুরুত্ব দেয় না। সময়ে বেইজ্জতি করে দেয়। আর ভারতের বিরুদ্ধেও যে আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছে সেই প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খেটে ইজ্জত রক্ষা করা অসম্ভব। অর্থহীন এক দালালিতে পরিণত হয়েছে একাজ।  কিন্তু তা হলেও সেই ২০১৬ সালেও পিনাক রঞ্জনদের ডাটফাট ছিল আলাদা, খুবই আক্রমণাত্মকভাবে আমেরিকান ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে তারা চোটপাট করে যেতেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র-জোট সার্কের (SAARC) ২০১৬ সালে অক্টোবরের সম্মেলন ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম হয় ভারত। সেবারের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে। ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশও পাকিস্তানে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার পক্ষে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিল। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ রিপোর্ট ছিল, সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যাচ্ছে না বাংলাদেশসহ চার দেশ । সার্ক ভন্ডুল করার ক্ষেত্রে ভারতের সফলতা হিসাবে প্রথম আলো লিখেছিল, সার্কের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে।

ভারতের কূটনৈতিক লবিতে অবজারভার সদস্য আফগানিস্তানসহ চার রাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান) পাকিস্তানের সার্কের সম্মেলনে যেতে অপারগতা জানায়। আনন্দবাজার লিখেছিল ভারতের মনের গোপন কথাটা। অক্টোবর ২০১৬ তে লিখেছিল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লিভারতের অমিত বসু কালের কন্ঠে কলাম লিখে ছিলেন, “ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক সুতোয় ঝুলছে। ছিঁড়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়। দুই দেশের মৈত্রী উধাও”। শুধু তাই নয়, আবার কবে সার্ক সচল হবে, সেটাও অনিশ্চিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- তার জন্মজন্মান্তরের শত্রু পাকিস্তানকে একঘরে করা।

ইতোমধ্যে ১৯৯৭ সালে এক ‘বে অব বেঙ্গল উদ্যোগ’ হিসেবে এবং ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) নামে আর এক রাষ্ট্র জোট গঠন হয়েছিল। যেখানে পাকিস্তান ছাড়া সার্কের বাকি পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বাড়তি নতুন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এ দুই রাষ্ট্র, এভাবে মোট সাত রাষ্ট্র নিয়ে এটা গঠিত ছিল।

ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সার্কের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশনীতির পক্ষে ২০১৬ সালে প্রচারণার কাজ হাতে নেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল এ রকম- ‘সার্কের দিন শেষ’। ফলে পাকিস্তানও একঘরে হয়ে শেষ। এখন থেকে এর বদলে, এর জায়গায় এখন সবাইকে ‘বিমসটেক’ নিয়ে ভাবতে হবে। গত ৪ অক্টোবর ২০১৬ যুগান্তর লিখেছিল,  এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই।’

আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল এমন যে, এ ঘটনার প্রায় একই কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশের কিছু প্রো-গভর্নমেন্ট সাংবাদিক ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সফরসূচির অংশ হিসেবে তারা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জনের সাথে দেখা করেছিলেন। দেশে ফিরে ওসব সাংবাদিকরা পিনাক রঞ্জনের বরাতে বিরাট নিউজ করেছিলেন, ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন’। উপরে যুগান্তরের রিপোর্টের ঐ সাংবাদিকও ছিলেন ঐ সফরে। এছাড়া, ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে অনলাইন বিডিনিউজ২৪-এর রিপোর্টের শিরোনাম দেখতে পারেন। বিডিনিউজের রিপোর্টারও ছিলেন ঐ ভারত সফরে। আর তাতে মূল খবরটি ছিল এভাবে- ‘সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক।’

তাহলে এতক্ষণের সার কথা হল, গত ২০১৬ সালেই সার্কের “কবর দিতে” বা “ভুলিতে দিতে” ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। এবং এর পালটা হিসাবে ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) কে হাজির করার সিদ্ধান্ত সকলকে প্রকাশ্যেই ভারত জানিয়েছিল।

কিন্তু, আসলে সবই ভাগ্যের পরিহাস। নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটাই প্রমাণিত হলো। সার্ক প্রসঙ্গে ভারতের ঘৃণা ও প্রচারণায় এই ফেলা থুথু এখন সেই ভারতকেই এখন ফিরে চাটতে হইতেছে।

কারণ, বেশি দিন লাগেনি, প্রায় দেড় বছর না যেতেই গত ১০ জুলাই ২০১৮ ওই একই ওআরএফের সাইটে এবার আরেক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, ‘সার্ক কোমায়, চীন আর এক নতুন আঞ্চলিক জোট হাজির করেছে।’ [SAARC in coma, China throws another challenging regional initiative]। তার মানে এই রিপোর্ট এখানে সেই সার্কের প্রতি ভারত এখন কত সহানুভুতিশীল তাই দেখাতে চাইছে। একেবারে পুরা উল্টা-রথ।

যদিও এবারের রিপোর্টটা আর পিনাক রঞ্জনের করা নয়, করেছেন আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি’। আর এখানে এবার বিশেষ করে লক্ষণীয় হল, দেড় বছর আগে যে ওআরএফ একই ‘সার্ক’ এবং সাথে পাকিস্তানের ‘ডুবে যাক’ চাচ্ছিল, সবারই ‘ভুলে যাওয়া’ চাচ্ছিল; এবার সেই একই সার্কের পক্ষে ওআরএফের দরদ ও প্রীতি ঝরে পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ ভারতের এখন বিপরীত মুডে, সার্কের পক্ষে ভারতের প্রীতি এখন উপচানো। সত্যি এ’এক বড়ই আজব ঘটনা! ভারতের এই উল্টো যাত্রা কেন? ঘটনা কী?

ঘটনা হল, গত মাসে চীনের গুয়াংজুতে চীনা উদ্যোগে এক আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। জোটের নাম চীন-দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা ফোরাম, [China-South Asia Cooperation Forum] (CSACF)। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আগের সার্ক আর সাথে উদ্যোক্তা চীন। দক্ষিণ এশিয়া রাষ্ট্র জোটের সাথে চীনের সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম এটা। অর্থাৎ এটা মূলত (সেই ভারত-পাকিস্তানসহ) সার্ক প্লাস চীনের জোট।

এখন তাহলে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা সংক্ষেপে ওআরএফের আগে কি আগে স্বীকার ও ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল না যে, ২০১৬ সালে ‘সার্ককে ডুবিয়ে দেয়ার পক্ষে’ ভারতের যে বিদেশনীতি ছিল আর যেটা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন প্রশংসা ও সমর্থন করেছিলেন, সেটা থেকে এখনকার ওআরএফ সরে এসেছে? এবং কেন এই সরে আসা, সে ব্যাখ্যাই বা কী? নাকি ওআরএফ এর আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি এখনো জানেনই না যে, পিনাক রঞ্জন এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালে এমন একটি অবস্থান ছিল?

তবে এটা হওয়াও অসম্ভব নয়, এখন নতুন চীনা উদ্যোগে আগের ‘সার্ক +’ জোট একটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দেখে রাতারাতি ভোল বদলে ওআরএফ এখন সার্কের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অবস্থান নিচ্ছে? অর্থাৎ এই সহানুভূতিও ফাঁপা, ওআরএফের দরকার চীনের বিরুদ্ধে খোঁড়া হলেও একটি যুক্তি (নিজের স্ববিরোধিতা প্রকাশ হয়ে গেলেও তা) হাজির করা। কিন্তু তাতেও, প্রশ্ন আরো আছে।

কারণ, ওআরএফ এবার নিজেই জানাচ্ছে, চীনে এই সম্মেলনের খবর ভারতে খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। (এমনকি বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় এসেছে চোখে পড়েনি, অথচ বাংলাদেশের প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিল।) কিন্তু ভারতে প্রচার হয়নি কেন?

এছাড়া, আরো বেশ কিছু সিরিয়াস ‘কেন’ প্রশ্ন আছে?
কারণ, ওআরএফ ছদ্ম সার্ক-দরদি সেজে এক খোঁচামারা মন্তব্য করে বলেছে, “চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরাম কি আসলে চীনের বেল্ট রোডেরই এক সহযোগী উদ্যোগ, যার ভেতর দিয়ে সার্কের মৃত্যুঘণ্টা বাজবে?” [The parallel, yet unasked question, either at or outside the CSACF venue, was if the new Chinese initiative, alongside the more-visible Belt and Road Initiative (BRI) could ring the death-knell for the South Asian Association for Regional Cooperation (SAARC), where it had failed to go beyond the ‘Observer’ status, to obtain full membership.]

ওআরএফের এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেন সার্কের মৃত্যু হলে ভারতের জান চলে যাবে। এতই পতিপ্রাণা, অথচ কারপেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা কথাটা হল,  ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়ে ভারত আগেই সার্কের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। আর এখন দরদি সাজছে। কুমিরের চোখে যেন জল।

এ ছাড়া, আরেকটা খোঁচা দিয়ে ওআরএফ বলছে যে, সার্ক থেকে চীনকে কখনোই অবজারভারের বেশি মর্যাদা ভারত দিয়ে দেয়নি। আর যেন তা ভারতের বিরাট সাফল্য ছিল? এতে পরিষ্কার যে, ভারত কখন কী চেয়ে কী করে আর তাতে লক্ষ্যই বা কী- এসবের পেছনে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করার কোনো পরিকল্পনাই থাকে না।

এবারের চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরামের সভায় খুব ভালোভাবেই ভারতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। প্রতিনিধিত্ব করেছেন গুয়াংজুতে ভারতের কনসাল জেনারেল সাইলাস থাংগেল (Sailas Thangal)। ভারতের প্রতিনিধি ওই সভায় এই জোট উদ্যোগকে বহুল প্রশংসা করেছেন, বলেছেন এই উদ্যোগ এ অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে হাজির করবে। [Praising Beijing’s initiative, Indian Consul General in Guangzhou, Sailas Thangal said the CSACF boasts of the world’s biggest market. But the region also boasts of being home to millions of poor people.] শ্রীলঙ্কার এক অনলাইন পত্রিকা দ্য আইল্যান্ড এই খবর দিয়েছে। এ ছাড়া, চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক ডিরেক্টর জেনারেল লি জিমিংয়ের বরাতে আইল্যান্ড লিখেছে, ‘CSACF’ ফোরাম আসলে বেল্ট রোড উদ্যোগেরই অংশ, যেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে চীনের ভৌগোলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গাঢ় করবে।’ [He declared that the CSACF was a part of the BRI, “which is expected to bring together South Asian countries that share a geographical vicinity and cultural affinity with China” ]

মজার কথা হলো এসব খবর ওআরএফ নিজেই নিজের রিপোর্টে লিখে জানাচ্ছে। তাহলে এর মানে কি এই এক ফাইন মর্নিংয়ে আমরা উল্টো প্রশ্নের সম্মুখীন হব যে, ভারত তখন উল্টো আমাদের জিজ্ঞেস করবে, ভারত কবে চীনা বেল্ট রোড উদ্যোগের বিরোধী ছিল?

এসব কারবার দেখে মনে হয় থিংকট্যাংক, রিসার্চ, পলিসি ইত্যাদি এসব শব্দ এসব ব্যক্তি এখনো গুরুত্বের সাথে নেয়নি। যথার্থ ওজন বুঝে ব্যবহার করে না। আসলে নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটা তাদের বোঝানোর কেউ নেই।

তবে তামাশার কথাটা হল, ভারত চীনা উদ্যোগের এর CSACF সভায় ঠিকই পাকিস্তানের সাথে ও পাশে বসতে পেরেছে। বস্তুত CSACF  ফোরামটা হল আগেরই সার্ক + চীন। তাহলে, সার্ককে চলতেই না দিলেও এবার চীনা দাবড়ে এই ফোরামে ঠিকই পাকিস্তানের পাশে অবলীলায় বসতে পারছে ভারত! আসলে ভারত হল শক্তের ভক্ত, তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৪ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সার্ক দরদের স্বরূপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

গৌতম দাস

০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2sw

 

রাষ্ট্রসংঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায় – ছবি : সংগৃহীত বাংলানিউজ থেকে

বাংলাদেশ জুলাই মাসটা শুরু করেছে গ্লোবাল মিডিয়ায় ব্যানার হেডলাইন হয়ে, কারণ রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলসহ পাঁচ সংগঠনের প্রধান একসাথে একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তেনিও গুতেরেস (Antonio Guterres), বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম (Jim Yong Kim) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মরা (Peter Maurer) এবং সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৃহত্তর অধীনেই কাজ করা আরো দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি (Filippo Grandi ) ও মিয়ানমারের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ের ইয়াংহি লি বাংলাদেশে গত ৩০ জুন তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে পৌঁছে গেছিলেন। বলাবাহুল্য হবে না যে রোহিঙ্গা  ইস্যুতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হল, মূলত তিন বিষয়ে। এক : রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে সাময়িক অবস্থানের সময়ে দেখভালের ন্যূনতম ব্যবস্থার সব বিষয় নিশ্চিত করতে কাজ করা। দুই : রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর একটা ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। আর তিন : যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা। সারকথায় এ সফরে তাই মূল উদ্দেশ্য বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের এবং আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা। এছাড়া আশ্রয় দেয়ার অর্থনৈতিক দায় গ্লোবালি শেয়ার করা, তাই বিশ্বব্যাংক নিজেই ৪৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানাল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাই বলছেন ইতোমধ্যেই “উদার জনগোষ্ঠি বাংলাদেশিরা” রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে “বিপুল বোঝা নিজের কাধে” নিয়েছে। “তাদেরকে আর শাস্তি না দিয়ে তাদের বোঝা আমাদের শেয়ার করা উচিত”। ইংরাজি দৈনিক ডেইলি স্টার লিখেছে, “Generous humane country like Bangladesh shouldn’t be punished: WB”।

দুনিয়ায় মানুষ, সাধারণভাবে সব মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন “বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন” (Multi-lateral) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত চলে আসা দুনিয়াতে মানুষের অর্জন কম নয়। এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই আজকাল পাওয়া যাবে যারা সাফল্যের সাথে দুনিয়ার মানুষের সম্ভাবনা, মানুষের সাফল্যের ও অর্জনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বহুরাষ্ট্রীয় শব্দটাকে ইংরাজিতে মাল্টি-ল্যাটারেল (Multi-lateral) বলা হয়। কারণ তা, এ কথা মনে রেখে যে, আধুনিক যেকোনো ছোট বা বড় রাষ্ট্র মাত্রই সার্বভৌম রাষ্ট্র; যার সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের উপরে ক্ষমতাশালী অন্য কেউ থাকতে পারে না, পারবে না। ফলে ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের অন্য কোনো সংগঠনও এর উপরে থাকতে পারে না, কর্তৃত্বাধীন করতে পারে না। তাই ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের সংগঠন যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, রেডক্রস ইত্যাদির মতো সংগঠনগুলোর জন্ম হয়েছে এমনভাবে, যেন এসব সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুপ্রীম, তা অলঙ্ঘনীয় এ মূলনীতিকে মাথায় রেখে। তাই ল্যাটারাল ধারণাটা পাশাপাশির, কেউ কারো ওপরে নয়; না কোনো সদস্য আর এক সদস্য রাষ্ট্র, না কোনো অ্যাসোসিয়েশন সংগঠন নিজে সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে কর্তৃত্ববান। এই কারণেই ল্যাটারাল শব্দটা যার আক্ষরিক বাংলাটা হল “বহু বাহু” বিশিষ্ট।

তবু বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ার বেলায় সার্বভৌমত্বও এখানে ঠিক মূল বিষয় নয়। বরং মূল বিষয় মূল্যবোধ (values)। ঠিক কিসের বা কী সংক্রান্ত মূল্যবোধ? এককথায় বললে মানুষ সংক্রান্ত। মানুষ কে, কারা, কী এসব বিষয়ে মৌলিক ধারণা সংক্রান্ত মূল্যবোধ।

লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় হল, মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে “রাষ্ট্রসংঘ”, যুদ্ধে দুতয়ালি, ত্রাণ আশ্রয় সুরক্ষা চিকিৎসা সেবা দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ক এবং যুদ্ধকেই কিছু নীতি কনভেনশনের অধীনে আনার সংগঠন “রেডক্রস” ইত্যাদির জন্ম বেশি দিন আগের নয়। মাত্র গত শতাব্দীতে, তাও বিশেষত ১৯০০-১৯৫০ এই প্রথম অর্ধের মধ্যে। এর মূল কারণ একটি অভিন্ন মূল্যবোধের উপরে দুনিয়ার সবাইকে নিয়ে একমতে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। কেন? কারণ, দুনিয়ার নিয়ম যখন থাকে অপর রাষ্ট্রকে সরাসরি জবর দখল ও কলোনি করে রাখা, সেখানে মানুষের আর মূল্য কী? মূল্যবোধই বা কী? তবু গত ১৯১৯ সালে রেডক্রসের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল।

তবে বুঝার সুবিধার জন্য একটা কথা আগে বলে রাখা ভাল। বুঝার সূত্র। কলোনি দখল যুগের শুরু হয়েছিল মোটামুটি ১৭০০ সালের পর থেকে ফলে সেটা ঐ কলোনি দখলের যুগের কারণেই সম্ভবত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সেকালে নেই। কিন্তু মজার কথা এর প্রথম দুই শ’ বছর যুদ্ধবিগ্রহ চলেছিল কলোনি দখল মাস্টারদের মধ্যে তবে সেটা তাদের নিজ  ইউরোপীয় দেশে নয়। বরং যে দেশ-রাষ্ট্র দখল করা হবে এশিয়া, আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার সেসব প্রান্তীয় অঞ্চলে সেখানে, কলোনি দখলকারদের মধ্যে। ফলে এসব গরীব দেশের লোক মরলে তা দেখে দুঃখ মনোকষ্ট পাওয়ার কেউ ছিল না। কিন্তু দিন একভাবে যায়নি। হঠাৎ ১৯০০ সালের পরে এসে দেখা গেল যুদ্ধ এবার হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে, খোদ ইউরোপের কলোনি দখলের মাস্টারদের নিজ দেশে, দেশগুলোর মধ্যে। তাই এবার এটাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ১৯১৪-১৮ সাল। ইউরোপের সেই যুদ্ধ যার মূল বিষয় ছিল আসলে কলোনি দখলদার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কামড়াকামড়ি, তবে মরণ কামড়াকামড়ি। কিন্তু যেহেতু ঘটনায় এবারের ভিকটিম খোদ মালিক মহাজনের ঘর ফলে এবার এখান থেকে সুফল এসেছিল। কলোনি মাস্টার ভিকটিম ফলে এলিট, তাই অমানবিক, মানবেতর, নৃশংস, ঘৃণিত ইত্যাদি এসব মূল্যবোধযুক্ত শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে আর একটা বিষয় অবশ্যই বিরাট প্রভাব রেখেছিল বলা যায়। তাহলো ইতোমধ্যে সারা ইউরোপে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মানব-অধিকারের ধারণা ও মূল্যবোধের ব্যবহার ও চর্চা অন্তত নিজ ঘর থেকে শুরু হয়ে গেছিল। ফলে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, জীবিকা নির্বাহ, ইনসাফ পাওয়া ইত্যাদির অধিকার এবং সাধারণভাবে মানুষের অধিকার ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক এবং মানুষ নিজেই, অন্য কেউ না, একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসন করার হকদার এসব মূূূল্যবোধগুলো গেড়ে বসা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘটনাবলির শেষে রাষ্ট্রসংঘ, এসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর রাষ্ট্রসংঘ জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৪ সালে।

একটি ডিসক্লেমার জানিয়ে রাখার সময় বোধহয় পেরিয়ে যাচ্ছি। তাহলো, এখানে সাধারণভাবে সব পরিচয় ভিন্নতার ঊর্ধ্বে যেকোনো মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ে তোলা প্রসঙ্গে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। এর মানে এই নয় যে এসব সংগঠনগুলো সব আদর্শ ও ধোয়া তুলসীপাতা ও চরম সব অর্জনের সংগঠন এরা। না এমন আগাম অনুমান ধরে নেয়া ভুল ও তা ভিত্তিহীন। তবে, জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান “এটা এক চরম অর্জনের” – এ কথা মারাত্মক ভুল। আবার এর কোনো অর্জনই নেই এটাও মারাত্মক ভুল। বাস্তবতা হল, তাদের অনেক অর্জন থাকলেও এর বিরাট বিরাট ঘাটতি ও খামতি আছে সেগুলো পূরণের জন্য কাজ করতে হবে, লড়তে হবে এখনো অনেক, এটাই হল সঠিক মূল্যায়ন। এখানে জাতিসংঘ বলতে মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ সহ যত আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নিয়ম রেওয়াজ ইত্যাদি মানব-অধিকার ও মূল্যবোধ যা এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সেসব ধরে নিয়ে কথা বলেছি।

সেকালে এসব যা কিছু অর্জন এর পেছনে এক শীর্ষ ভূমিকা ছিল আমেরিকার। যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়া এটা আমেরিকারই এক দ্বিতীয় উদ্যোগ প্রচেষ্টা ছিল, আর তা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের। আর রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়ার প্রথম তবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া প্রচেষ্টাটা ছিল যার নাম হল “লিগ অব নেশন”, (রাষ্ট্রসঙ্ঘের আগের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানের নাম )। সেকালে এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের সময়কালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। এছাড়া, মনে রাখতে হবে কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে একমাত্র শাসন করবে অর্থাৎ কলোনি শাসকের শাসন নয়, এই ভিত্তিতেই সদস্য রাষ্ট্রদের নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো গড়তে আমেরিকা নিজের অবদান ও ভূমিকা যা রাখা সঠিক ও সম্ভব মনে করেছিল অথবা যা পারেনি করেছে, আর এভাবে আমেরিকা দুনিয়া শাসন ও নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পেরেছিল গত প্রায় ৭০ বছর। কিন্তু সময় এখন পালাবদলের। অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এবার এখন নতুন নেতা চীনা।

কিন্তু সেই সাথে আমরা কী দেখছি?
একটা উদ্যোগ যদি হয় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সফর। তাহলে অপর দিকে এক উদ্যোগ, প্রায় সমান্তরাল আর এক তৎপরতা আছে চীনের নেতৃত্বে। স্পষ্ট করে বললে, বার্মা, বাংলাদেশ ও চীনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়ের চীনে বৈঠক হয়েছে। এ তৎপরতাটা বিপরীত উদ্যোগ হিসেবে হাজির আছে।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবসময় প্রধান বাধা এসে যা হাজির হয় তাহল, সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থ অথবা  ঐ রাষ্ট্র পরিচালক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। বাংলাদেশের ভূমিকা কী তাই হতে যাচ্ছে?
এ ছাড়া স্বভাবতই মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বিপক্ষীয় ক্যাম্পে দেখতে পছন্দ করব না হয়ত। কিন্তু আমরা অপছন্দ করলেও চীন আমাদের হতাশ করার দিকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ চীন মনে করছে এ ব্যাপারে সে আমেরিকার আমলের স্টান্ডার্ডও ধরে রাখার চেষ্টা করবে বা, নিচে পড়ে থাকবে। অথচ দুনিয়ার নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের ষোলোআনা। এটা স্ববিরোধী। এ বিষয়ে, এককথায় এখনই বলা যায় –  গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ত হতে পারবে কিন্তু  দুনিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বে চীনের আসা অসম্ভব। এমনিতেই কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ার কারণে চীনের পক্ষে ‘পলিটিকস’ ও ‘রাইট’ শব্দগুলো অর্থ তাৎপর্য বুঝার ক্ষেত্রে তা এক বিরাট প্রতিবন্ধক। কারণ এখানে কমিউনিস্ট চিন্তার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর প্রচুর। ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ কথার অর্থ তাৎপর্য বুঝতে কার্ল মার্কসের ঘাটতি আছে কি না সে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় ৭০ বছরের পরিচিত চর্চার “মার্কসবাদ”, সেই মার্কসবাদ এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে অক্ষম। সে এখনো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এগুলোর বাইরে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে অক্ষম। অথচ ঐ শব্দগুলো সবই বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সুবিধা সংক্রান্ত। রাজনৈতিক ক্যাটাগরির শব্দ বা ধারণাই নয় ওগুলো। যেমন মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অধিকার নয় বরং এগুলোর বাইরে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে, বঞ্চিত করেছে।

এছাড়াও, কথা পরিস্কার রাখতে হবে; রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের এক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে তা হল, রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বার্মার রাখাইনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। একবার ও শেষবারের মতো। আর সেক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সরকার নিজের কোনো এক সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এর বিরুদ্ধে গেলে বা এই স্বার্থকে রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আজ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রশংশিত হচ্ছে। আমরা ভুলতে পারি না আর ঠিক সেই কারণেই এর আগের বছর কোন রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে কথা ভুলে যেতে পারি না। পরের বছরও শুরুতে ভারতের প্ররোচনায় সীমান্ত সিল করে দিবার নীতি নীতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীন নিজ জনগণের সহানুভুতি ও আশ্রয় না দিবার ক্ষোভ আঁচ করে পরে সীমান্ত খুলে দেয়াওয়া হয়।

এমনিতেই, বল গড়ানো শুরু করেছে দুইটা জায়গা থেকে। এক সাংগ্রিলা বৈঠক। সাংগ্রিলা মূলত এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক এক রাষ্ট্রজোট। সিঙ্গাপুরের  “সাংগ্রিলা নামের এক হোটেলে” তা প্রতিবছর আয়োজিত হয়ে থাকে। যেখানে সদস্য হিসেবে আমেরিকাও আছে, চীনও আছে। ইউরোপের মাতব্বর রাষ্ট্রেরা আছে, আছে মিয়ানমারও। গত জুন ২ তারিখের এবারের সিঙ্গাপুরের বার্ষিক বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন (National Security Adviser Thaung Tun)। মায়ানমার বা বার্মার গলার স্বর নামা শুরু হয় সেখান থেকে। তিনি সাত লাখ রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নিতে নিজে প্রস্তাব দেন ও সম্মতি জানান। তিনি আবেদনের স্বরে সেখানে প্রশ্ন রেখেছেন, “স্বেচ্ছায় যদি ৭ লাখকে ফেরত পাঠানো যায় তাহলে আমরা মায়ানমার তাদের গ্রহণে আগ্রহী। এরপরেও এটাকে কি জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলা যায়”?

“Myanmar is willing to take back all 700,000 Rohingya Muslim refugees who have fled to Bangladesh if they volunteer to return, the country’s National Security Adviser Thaung Tun said on Saturday”.

এবিষয়ে রয়টার্সের  এক ডিটেলড রিপোর্ট দেখা যেতে পারে এখানে। দেখা যাচ্ছে, তিনি এ প্রস্তাব দেন কারণ ওই সাংগ্রিলা সম্মেলনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি কি মিয়ানমারকে জাতিসঙ্ঘের আরটুপি (রেসপন্সিভিলিটি টু প্রটেক্ট) ফ্রেমওয়ার্ক চালুর দিকে নিয়ে যাবে? কথিত এই আরটুপি ফ্রেমওয়ার্কটি ২০০৫ সালে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়। [Shangri-La Dialogue, a regional security conference in Singapore, where he was asked if the situation in Myanmar’s Rakhine state, where most Rohingya live, could trigger use of the Responsibility to Protect framework of the United Nations.]

এর মধ্য দিয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিজ দেশের জনগণকে রক্ষা এবং এই প্রতিশ্রুতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতা করবে। [The so-called R2P framework was adopted at the 2005 U.N. World Summit in which nations agreed to protect their own populations from genocide, war crimes, ethnic cleansing and crimes against humanity and accepted a collective responsibility to encourage and help each other uphold this commitment.]

আর ওদিকে দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, এই মুহূর্তে জোকের মুখে নুনের মতো এক উদ্যোগ। সেটা হল, আইসিসির  ( International Criminal Court, ICC) প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোহ বেনসুদার উদ্যোগ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের কারণে তিনি যে অভিযোগের তদন্ত করতে চাইছেন তা হচ্ছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়-‘জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন বা জোর করে অন্যত্র ঠেলে সরিয়ে দেয়া’ (অনুচ্ছেদ ৭ [১] [ডি])। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি অভিযোগ দায়ের করতে চান। আপাতদৃষ্টে অভিযোগটি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে না হলেও এর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব কম নয়, কেননা এই অভিযোগের শাস্তি ওইসব অভিযোগের চেয়ে কম নয়, প্রায় একই।

অর্থাৎ মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইসিসির আদালতে তুলতে সক্ষম হতে পারার ইঙ্গিত। এই উদ্যোগের বিশেষ দিকটা হল, এতদিন  চীন বা রাশিয়ার দেয়া সবকিছুতে ভেটো মেরে মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার সব কিছুকে আটকে ফেলা যত সহজ মনে হচ্ছিল এই প্রথম বার দেখা যাচ্ছে সেটা সম্ভবত এবার অকেজো হবে।

এমনিতেই শুরু থেকেই (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প বার্মার জেনারেলেরা সবাই কে খাইয়েছিল। আর তা ভারত, চীন এবং আমেরিকাসহ সবাই আনন্দের সাথে খেয়েছিল। কারো অরুচি লাগেনি।  বার্মার দেয়া বৈষয়িক সুবিধা বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের লোভে সবার কাপড় উদোম হয়ে গেছিল। সবাই জেনারেলদের ভক্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের বানানো (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প কার আগে কে বেশি বিশ্বাস করবে সে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছিল।  সবাই গল্প সহজেই মেনে নিয়েছিল যে আরসা সন্ত্রাসীদের হামলাই সব কিছুর জন্য দায়ী। কিন্তু  কেউ নিজেকে প্রশ্ন করে নাই যে তাহলে হত্যা ও ধর্ষণের ভিতর দিয়ে  সাত লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়া হতে হল কেন? বার্মার সেনাবাহিনীকেই বা কেন রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়ন করতে হবে – এই প্রশ্ন চীন বা আমেরিকাসহ কেউই তখন তুলতে চায়নি। কিন্তু আগে যেমন অসহায়ভাব দেখা যাচ্ছিল, যে কেউ একটা জঙ্গি হামলার গল্প রান্না করলেই দুনিয়ার মা-বাপ যারা তারা সবাই তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়, কোনো প্রশ্ন করে না। এখন দেখা যাচ্ছে সেসব গল্প সবার এবার বদহজম হয়ে গেছে।

চীনের গ্লোবাল টাইমসে দাবি করা হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে, ‘চীনের নীতি ধারাবাহিকতায় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ’। [On the issue of the Rakhine State, China’s position is consistent]। আসলে এটা একটা মুখরক্ষার কথা, কিন্তু অসত্য কথা। তাই যদি হয় তবে চীন তখন (২০১৭ সালে) কথিত আরসা জঙ্গি হামলাকে দায়ী করে জেনারেলদের গণহত্যা ও ধর্ষণ ও বিতারণ কাজের পক্ষে সাফাই দিয়েছিল কেন? আর এখন সে সাফাই কোথায়? এখন জেনারেলেরা আপস করতেই বা রাজি কেন? কেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে, এই ইস্যুতে চীন নিঃশ্চুপ?

[We believe that the issue should be solved through dialogue and consultations between Myanmar and Bangladesh, and the international community should act according to the two countries’ wishes,]

এ ছাড়া এখন রোহিঙ্গাদের তাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। এ ছাড়া যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা চীন কী এ দুই কাজ ও তৎপরতার বিরোধী? তাহলে কেন মায়ানমার আর বাংলাদেশের ডায়লগে সব সমাধা করতে চায় চীন?

গত চল্থ্বালিশ বছরে বার্মার সামরিক শাসকদের এই একই নিরবিচ্ছিন্ন নীতি চলে আসছে তাদের সাথে নতুন করে ডায়লগের ভিত্তি ও ভরসা কী?

বার্মার চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘনকে আড়াল করতে চীন জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠলেই বার্মায় বাইরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মনে করছে কেন? চীন অপরাধীদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে চায় না, না করলে কেন তা স্পষ্ট ভাষায় চীনের বলা উচিত।

চীন কী মনে করে বার্মায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটা কী সেখানে চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের নিচে, কম গুরুত্বপুর্ণ? দেখা যাচ্ছে প্রশ্নটাকে চীন বরং দানব শাসকের ব্যক্তি ইচ্ছায় পর্যবসিত করে রাখবে, আর ওই ব্যক্তিশাসকের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের (বার্মা বা বাংলাদেশ) সার্বভৌমত্ব বলে চালিয়ে দেবে তবে, এ চীন অচিরেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে অপসৃত হবে তা আগাম বলা যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
৫ জুলাই ২০১৮
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জাতিসঙ্ঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sc

 

 

আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়

লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

গৌতম দাস

০৯ জুন ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2s2

 

 

কখনও কখনও কারো কারো কোন কথা বিশ্বাস হতে চায় না। তেমনই এক অবস্থা তৈরি হয়েছে ভারতের কিছু রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদেরকে নিয়ে। সত্যি কথাও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। ধরা যাক, এমন একটা বাক্য পত্রিকার পাতায় পাওয়া গেল যেখানে ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা অথবা মন্ত্রী বলছেন, “ধর্মের নামে জনগণের মাঝে বিভক্তি আনার কথা বলা অনুচিত”। অথবা বাক্যটা একটু এরকম যে বলা হয়েছে, “ভারত এমন এক দেশ যেখানে জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারও প্রতি বৈষম্য করার সুযোগ নেই। এটা কখনো বরদাস্ত করা হবে না”। বলাই বাহুল্য এমন বক্তব্য নিশ্চয় ভারতের কোনো সেকুলার বা কমিউনিস্ট নেতার বক্তব্য বলেই আমরা ধরে নিব।

কিন্তু না। এই অনুমান ও ধারণা অবিশ্বাস্যভাবে শতভাগ ভুল। আসলে প্রথম কথাটা বলেছেন, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। আর পরের কথাটা বলেছেন, ভারতের মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এদের দু’জনের বক্তব্য একই প্রসঙ্গে একই দিনে। ভারতের লিডিং সব ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকাতে গত ২২ মে অথবা পরের দিন এই খবর পাওয়া যাবে। এমনকি গ্লোবাল নিউজ এজেন্সি রয়টার্সও একই খবর পাঠিয়েছে। ফলে পাঠককে আশ্বস্ত করে বলা যায়, এখানে দেখতে বা পড়তে কোনো ভুল হয়নি।

ওদিকে আবার, আমরা যদি দেখি কেউ কাউকে “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা” করতে পরামর্শ দিচ্ছেন, আমরা ধরে নিতে পারি যে, ওই পরামর্শদাতা আর যাই হোক বিজেপি কোনো নেতা বা মন্ত্রী নিশ্চয় নন। কিন্তু না, এখানেও বিস্মিত হওয়ার পালা। মোদী সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক এক মন্ত্রী আছেন যার নাম মুক্তার আব্বাস নাকভি। তিনি বলেছেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার। আমরা তাদের এটাই বলতে পারি যে, প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন”। এখানেও আগের একই প্রসঙ্গে মন্ত্রী নাকভিও এই বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে কী সেই প্রসঙ্গ, যা থেকে অবিশ্বাস্য সব কথা বের হয়ে আসছে বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীদের মুখ দিয়ে?

রয়টার্স লিখেছে, “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান। কাগজকলমে ভারত সেকুলার হলেও পাঁচ ভাগের চার ভাগ মানুষ এদেশে হিন্দুধর্ম চর্চা করে”। [Christians constitute less than 3 percent of Hindu-majority India’s 1.3 billion people. India is officially secular, but four-fifths of its population profess the Hindu faith.] এই তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সারা ভারতেই ছড়িয়ে আছে, দক্ষিণ ভারতে তুলনামূলকভাবে এর ঘনত্ব বেশি। আর রাজধানী দিল্লির ক্ষমতা কাঠামোর করিডোরে অথবা একাডেমিক বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিও দৃশ্যমান। বিশেষ করে নাম কামানো মিশনারি স্কুল ও কলেজগুলোর কারণে ঐ সমাজে তারা অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। আবার সারা দুনিয়ার মতো ভারতেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধারা রয়েছে। দিল্লির ক্যাথলিক ধারার আর্চবিশপ হলেন অনিল কুটো (Anil Couto)। তিনি তাঁর ধারার অন্যান্য বিভিন্ন চার্চ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এক অভ্যন্তরীণ চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমরা একটা টালমাটাল রাজনৈতিক আবহাওয়া প্রত্যক্ষ করছি, যেটা আমাদের কনষ্টিটিউশনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং আমাদের জাতীয় সেকুলার নীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে”। [“We are witnessing a turbulent political atmosphere which poses a threat to the democratic principles enshrined in our Constitution and the secular fabric of our nation,”]। তাই ঐ চিঠিতে তিনি আহ্বান জানান আগামী বছরের নির্বাচন পর্যন্ত তাদের অনুসারী শাখাগুলো যেন এ জন্য এক ‘বিশেষ প্রার্থনা কর্মসূচি’ হাতে নেয়। এই চিঠি তিনি লিখেছিলেন গত ৮ মে। সেটা দু’সপ্তাহ পরে হলেও প্রকাশ্যে বিজেপির নজরে আসাতে তারা আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এই চিঠির ‘বিপদ’ টের পেয়ে যান। এই চিঠিটা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী জোট খাড়া করে ফেলার উপাদানে ভরপুর, তা বুঝতে বিজেপির দেরি হয়নি।

যদিও এই চিঠিতে যে একশনের আহ্বান জানানো হয়েছে তা খুবই ‘হেদায়েতি ভাষ্য’। বলা হয়েছে – যিশু ও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে। অর্থাৎ কোনো মিছিল মিটিং করার আহ্বান দূরে থাক, আলোচনা সভাও করতে বলা হয়নি। আর প্রতি শুক্রবার “জাতির জন্য উপাস থাকা’ পালন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এর সোজা মানে করে বললে এটা হল, বড় জোর আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ধরনের একটা ততপরতা। এর মধ্যে ন্যূনতম কোনো আক্রমণাত্মক ভাষ্য নেই। সাদামাটা এ বক্তব্যের মধ্যে স্পিরিচুয়্যাল শক্তির প্রার্থনা, নালিশ ও আহ্বান আছে অবশ্যই। সেই সাথে, সব ধর্মের লোকদের মাঝে পারস্পরিক ঘৃণা বা হিংসার সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় যেন থাকে, এ কামনায় প্রার্থনা করতে বলেছেন আর্চ বিশাপ।

কিন্তু এটাও সহ্য করার অবস্থায় নাই বিজেপি। কারণ এই চিঠিতে খ্রিস্টান, অখ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার প্রতি আবেদন রেখে সবাইকে মানবিক স্পর্শে ছুয়ে ফেলে মিলিত এক শক্তি হয়ে ওঠার মতো বহু উপাদান ও ক্ষমতা আছে। এটাই এই চিঠির শক্তির দিক। আর আসন্ন (২০১৯ সালে) নির্বাচনে এটা বিজেপির রাজনীতির জন্য বিরাট বিপদের দিক ঠিক ততটাই। তাই, সহজেই অনুমান করা যায় এই ধারণা থেকেই বিজেপি ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসভাবে নিয়ে পাল্টা চাপ তৈরি ও অভিযোগ অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিজেপির মূল আদর্শিক সংগঠন আরএসএস (RSS), সেও উপায়ান্তর না দেখে নিজেই ‘সেকুলার’ হয়ে গেছে। দাবি করেছে, আর্চবিশপের এই চিঠি “ভারতের সেকুলারিজম ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ”। […the RSS claimed it was a “direct attack on Indian secularism and democracy].’ আর তা থেকেই ২২ মে, অমিত শাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথসহ বিজেপি অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীদের সব অবিশ্বাস্য বক্তব্য।

কিন্তু বিজেপির কাছে সমস্যা দেখা দেয় যে, বিজেপি কী বয়ান দিয়ে এই চিঠির বিরোধিতা করবে? কারণ এই চিঠির অভিযোগের বিরোধিতা করতে গেলে খোদ বিজেপির রাজনীতিরই বিরুদ্ধে ও বাইরে চলে যেতে হবে। যেমনঃ এখানে সবচেয়ে বড় তামাশার শব্দ হয়ে উঠেছে ‘পোলারাইজেশন’- যার বাংলা হল, “জনগণের মাঝে বিভক্তি” অথবা “সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্তি”। এখানে আর্চবিশপের চিঠির অভিযোগকে মিথ্যা বলে বিজেপি অস্বীকার করে কোনো পাল্টা বয়ান খাড়া করতে গেলে তাতে ভারত রাষ্ট্র ও সরকারের জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারো প্রতি বৈষম্য করার বিরোধিতা করতে হবে অথবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি করার বিরোধিতা করতে হবে। এটাই মডার্ন রিপাবলিক কোনো রাষ্ট্রের “সাম্য নীতির” মূল কথাঃ কোনো পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সবাইকে সমান গণ্য করতে হবে, রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ, বা সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে না।

কিন্তু বিজেপির রাজনীতির মূল কথাই হচ্ছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজকে পোলারাইজ করতে বা বিভক্তি টানতে হবে। এটা তারা করে যতটা হিন্দুত্বকে ভালোবেসে এর চেয়েও বেশি হল, ‘হিন্দুত্বের ভোট’ বাক্সের প্রতি ভালোবাসা। প্রধানত, হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশে ‘হিন্দুত্বের ভোট’-এর জোর অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এটাই দলটা সবচেয়ে ভাল করে জানে। তাই বিজেপি মানেই সমাজকে হিন্দুত্বে উসকে পোলারাইজ করা; ভোটের বাক্স ভর্তি করা।

কিন্তু আর্চবিশপের অভিযোগ বিজেপিকে কুপোকাত করে দিয়েছে। তাই উপায় কী, নরম ভাষায় হলেও, বিজেপিকে নির্বাচনের বছরে খ্রিষ্টান কমিউনিটির অভিযোগ তো ঝেড়ে অস্বীকার করতেই হবে। নিরুপায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবার তাই সুশীল ভদ্র হয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘It’s not appropriate if anyone is talking about polarising people in the name of religion । আসলে নিজেরই দলের স্বভাব ও রাজনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, “পোলারাইজেশন হারাম”। একইভাবে, অগত্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কনস্টিটিউশনের সাম্যনীতি আঁকড়ে ধরে হুঙ্কার (আসলে নিজের বিরুদ্ধেই) দিচ্ছেন, “… no discrimination against anyone on the basis of caste, sect or religion. Such a thing cannot be allowed,” – কোনো বৈষম্য বরদাস্ত করা হবে না। আর বিজেপি সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নাকভি সোজা মিথ্যা বলেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো রকম ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার”। আর সেই সাথে তিনি আবার ‘প্রগতিশীল’ বলে শব্দটাও ধার করেছেন, তা বিজেপি রাজনীতির পরিভাষা নয় অবশ্যই। বলেছেন, “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুন”।  আসলে বিজেপির মূল অবস্থান হল, আর্চবিশপ অনিল কুটোর অভিযোগ যেভাবেই হোক অস্বীকার করতে হবে, তাতে বিজেপির নিজ রাজনীতির বিরোধিতা করে হলেও। দলটার এতই দিশেহারা অবস্থা। তবে আর একটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা হল – উল্টা আর্চবিশপের ওপর অভিযোগ আনা যে, তিনি খ্রিষ্টান-অখ্রিষ্টান বিভেদ তুলছেন এবং বিশপের বক্তব্য রাজনৈতিক, এই অভিযোগ তোলা।

এদিকে ভারতের মিডিয়ার অবস্থা ‘ভয়াবহ’ বললে কম বলা হয়। সম্প্রতি বিজেপির এক ছদ্ম সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে [sting operation] শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২৫ টিভি চ্যানেলকে তারা বিজেপির হিন্দুত্বের পক্ষে টাকার বিনিময় প্রচার চালাতে চায় কী না – এই অফার দিলে দেখা গেছে দুইটা বাদে তারা প্রায় সবাই রাজি। এই অপারেশন চালানোর পর ‘কোবরাপোস্ট’ https://www.cobrapost.com    নামে এক ওয়েবসাইট থেকে ইউটিউবে সব কথোপকথন ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। তেমনি এক নিউজ এজেন্সি এএনআই টিভি, (ANI TV) তারা এই ইস্যুতে বিজেপিকে সার্ভিস দিতে নিউজ ক্লিপ তৈরি করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আসলে বিজেপির দিক থেকে আর্চবিশপকে দেয়া হুমকিমূলক বার্তায় ভরপুর বলা যায়। বিজেপির আর এক মন্ত্রী গিরিজা সিং সেখানে আর্চবিশপের চিঠির ঘটনাতে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে।’ [Giriraj Singh as saying that “every action has a reaction”]। বিজেপির আর এক নেতা বিনয় কাতিয়ার বলছেন, আর্চবিশপের মন্তব্য বিভিন্ন ‘সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা, অসন্তোষ তৈরি’ করতে পারে [archbishop’s comments could lead to “communal tensions”.]। মোদী সরকারের টুরিজম মন্ত্রী বলেছেন, Union minister of tourism KJ Alphons said Couto’s remarks were “unfair” to the government and that “godmen” should stay away from politics. অর্থাৎ এটা হলো দাঙ্গা তৈরির অপবাদ দিয়ে ভয় দেখানো। স্বভাবতই এতে খ্রিষ্টান ধর্মের অন্য প্রায় সব ধারার নেতারা আর্চবিশপের পদক্ষেপ ও অভিযোগকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।

আর্চবিশপের অভিযোগের ফলে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়ার পক্ষে তা ভূমিকা রাখতে পারে ভেবে বিজেপি আজ ‘ভেজা বিলাই’ সাজছে, সব অভিযোগ অস্বীকার করছে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ২০১৫ সাল থেকেই নিয়মিতভাবে বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠন, ‘ঘর ওয়াপাসি’ প্রোগ্রামের নামে নির্বিচারে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, সম্পত্তি দখল, চার্চ ও মসজিদে হামলা, হত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে। গত ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসীন হবার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় ও পরবর্তিতে, তিনি সরবে ও প্রকাশ্যে মোদি সরকারের খ্রিস্টান ও মুসলমান দলনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভারত রাইজিং ইকোনমির দেশ হয়ে চাইলে এগুলো বন্ধ করতে হবে, এগুলো নেতি ইমেজ তৈরি করে। ওবামা বলেছিলেন,  “ভারত সফল হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ধর্মীয় লাইনে বিচ্ছিন্নতা বিভক্ত হয়ে পড়া ঠেকাতে পারবে [India will succeed as long as it is not ‘splintered’ on religious lines: Obama]

ফলে পরে চাপের মুখে মোদী এবিষয়ে তাঁর সরকারের নীতি কী তা পাবলিকলি ঘোষণা করেছিলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। তিনি বলেছিলেন,  “যেকোন নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা রক্ষা’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব” – এটাই নিজের সরকারি নীতি বলে দিল্লির এক চার্চে্র অনুষ্ঠানে তিনি লিখিতভাবে এই বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছিলেন। কথাগুলো মোদীর মুখ থেকে বের হয়েছে ভেবে অবাক অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু এই লিখিত কথাগুলা মোদীর নিজস্ব ওয়েব সাইটে এখনও আছে। সেখান থেকে আমি এখনই টুকে আনলাম। অন্যান্য নিউজ অন লাইনেও পাবেন।

My government will ensure that there is complete freedom of faith and that everyone has the undeniable right to retain or adopt the religion of his or her choice without coercion or undue influence. My government will not allow any religious group, belonging to the majority or the minority, to incite hatred against others, overtly or covertly. Mine will be a government that gives equal respect to all religions.

উপরের অংশটুকুর বাংলা অনুবাদ আমার করাঃ ভারতের পক্ষ থেকে, আমার সরকারের পক্ষ থেকে বললে আমি ঘোষণা করছি আমার সরকার ওপরের ঘোষণার প্রতিটা শব্দ ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমার সরকার ধর্মবিশ্বাসের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে যে প্রত্যেক নাগরিক সে কোনো ধর্ম ধরে রাখা অথবা গ্রহণ করা তার পছন্দের বিষয় এবং এটা কোনো ধরনের কারো বলপ্রয়োগ অথবা অন্যায্য প্রভাব ছাড়াই সে করবে এটা নাগরিকের অ-অমান্যযোগ্য অধিকার। আমার সরকার কোনো ধর্মীয় গ্রুপ, তা সে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যে ধরনেরই হোক, সঙ্গোপনে অথবা খোলাখুলি অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহ্য করবে না। সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান দেবে আমার এই সরকার।

মোদীর পুরা বক্তৃতার টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করা পাবেন এখানে, আমার আগের লেখায় শেষ অংশ।

কিন্তু তার এই কথায় যে ফাঁক ছিল তা হল, তিনি “মোদী সরকারের” নীতি শুনিয়েছিলেন। “মোদীর দল বিজেপির” নীতি নয়। এছাড়া  আসলে দুঃখের বিষয়, মোদী নিজেই এরপরে বিজেপি দলে, বিশেষ করে আরএসএসে নিজ প্রতিদ্বন্দ্বিদের ঠেলাগুতা চাপ পড়ে নিজেই “সংখ্যালঘু মত” হয়ে যান। বিশেষ করে  ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির মূল পরিচালক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (আরএসএস এর অঙ্গ সংগঠন) প্রভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে হেরে যান। ‘ঘর ওয়াপসি’ কথার আক্ষরিক মানে হল “ঘরে ফিরিয়ে আনা”। সোজা মানে হল, এর আগে কোন ভারতীয় যে কেউ খ্রিষ্টান বা মুসলমান হয়েছে তাকে এবার বাধ্য করে হিন্দুত্বে ফিরিয়ে আনার তাণ্ডব তৈরি করা। অথবা সুনির্দিষ্ট ঘটনা অভিযোগ থাকুক না থাকুক, ভুয়া অভিযোগে চার্চ বা মসজিদে আক্রমণ করা, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কিংবা জোর করে কোনো মুসলমান নাগরিককে নির্যাতনে বাধ্য করে “জয় শ্রীরাম” বলানো ইত্যাদি। এরই বর্ধিত আর এক রূপ হল গোমাংসকে নিয়ে তান্ডব তৈরি করা। [‘মাংসমাত্রই তা গরুর মাংস’; এই অনুমান ও এই অভিযোগে মাংস খাওয়া, রাখা, বহন করা নিয়ে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো। ]

ফলে মোদী সরকারের “ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার নীতি” নিছকই তা কাগুজে ঘোষণা হয়ে থেকে যায়। আর বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ আরএসএসের সহযোগী সব দলের ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি আগের মতোই সরকারের দিক থেকে প্রশাসনিক বাধাহীন, অবাধে চলতে থাকে। কেবল গরুর মাংসের বিরুদ্ধে করা মোদির আইন (জবাই, কেনাবেচা, বহন ও খাওয়া ইত্যাদি) ও বিতর্কের ব্যাপারে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আপত্তির কারণে শেষে সরকার নিজেই “আইনটা আপাতত প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে আদালতকে জানিয়ে নিষ্পত্তি করেছিল। কিন্তু তাতে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু ঘটানো – এগুলো বন্ধ হয় নাই। এই তো গত মাসেই (২৮ মে ) উত্তরপ্রদেশের কাইরানা নির্বাচনি এলাকায় উপ-নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বিজেপির পুরানা কৌশল গরুর মাংস খাওয়ার ভুয়া অপরাধে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। যাতে এই টেনশনে হিন্দুত্ব ভোটের জিগির উঠে, পোলারাইজেশন ঘটে। যদিও আগে এটা বিজেপির আসন ছিল। তবুও এই উপনির্বাচনে বিজেপি হেরে যায়।

আসলে বিজেপির মূল রাজনৈতিক কৌশলই হল, এভাবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজে পোলারাইজেশন ঘটানো, ‘জোশ-জজবা’ তোলা – একাজ করেই বিজেপি আগিয়ে চলেছে। এভাবে ভোটের বাক্সে হিন্দুত্বের ভোট জোগাড় করে ভরে তোলা। এই নীতিতেই মোদির ভারত গত চার বছর পার করেছে। তাই, সার কথাটা হল, মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লির আর্চবিশপের অভিযোগ শতভাগ সঠিক। তবে তাঁর এখনকার এই পদক্ষেপ ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদীকে কতটা ঠেকাতে পারবে তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে নগদ লাভ হল, অমিত শাহ আর রাজনাথের ‘পোলারাইজেশন বিরোধিতা’র ‘ভক্ত’ হয়ে যাওয়া, এই তামশা দেখার সুযোগ হলো আমাদের।

আর একটা দিক আছে, অনেকেই ইস্যুটাকে (পোলারাইজেশন বিরোধী অবস্থান নেয়া) সেকুলারিজম বা প্রগতিশীলতা বলে বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করছেন। এটা শতভাগ ভুল। আসলে এটাই এদের নিজ ইসলামবিদ্বেষী অবস্থানের লুকানোর জায়গা। বিষয়টার মূলধারণাটা হচ্ছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাম্যের নীতি রক্ষা, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি পালন করে চলল কিনা। নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এই হলো ইস্যু। অথচ রাষ্ট্র ধারণা বুঝে না বুঝে বিভ্রান্তিকরভাবে এই ইস্যু ও ভাবটাকে ‘সেকুলার’ শব্দ দিয়ে খামোখা বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করতে দেখা হয়। আর এই ‘সেকুলার’ শব্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ।

অনিল কুটো ধরনের ব্যক্তিরাও বুঝে না বুঝে ‘জাতীয় সেকুলার নীতির’ কথা তুলে নিজেদের বিভ্রান্তিতে ও অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় ঢুকিয়ে রাখেন। এভাবে ভুতুড়ে না-বুঝা এক ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আড়ালে ধর্মবিদ্বেষ জারি থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় এটাকে ‘ধর্মের সাথে রাজনীতি’ মেলানো বা না-মিলানোর বাজে বিতর্ক হিসেবে হাজির হতে দেন। অথচ পরিষ্কার ভাষায় বললে, রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি, নাগরিকের জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যহীনতার নীতি, সুরক্ষার নীতি পালন করে চলল কিনা; এবং নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এটাই হলো দাবি ও মূল ইস্যু।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৭ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নির্বাচন ২০১৯ঃ  বিজেপিবিরোধী কাম্য ক্ষমতাজোট

নির্বাচন ২০১৯ঃ  বিজেপিবিরোধী কাম্য ক্ষমতাজোট

গৌতম দাস

২৬ মে ২০১৮, ০০ঃ০১ শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rM

 

 

 

ভারতের রাজনীতিতে ২৩ মে সম্ভবত, মনে রাখার মত এক গেম চেঞ্জার বা খেলা পাল্টানোর দিন তৈরি হল। যেমন, এই প্রসঙ্গে ভারতের ইংরাজি দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়ার’ ২৪ মে এক রিপোর্টারের শিরোনাম ছিল, “মোদি বনাম বাকি সবাই : ১৯৯৬ সালের পর সবচেয়ে বড় বিজেপিবিরোধী ঐক্যজোটের মহড়া। ২০১৯ সাল পর্যন্ত টিকবে তো?” [Modi vs Rest : Biggest anti-BJP unity show since 1996. Will it hold till 2019?] কিন্তু ২৩ মে দিনটা এমন কী ছিল? মূলত ২৩ মে ছিল সদ্য সমাপ্ত কর্ণাটক রাজ্যের নির্বাচনে নির্বাচিত নতুন সরকারের শপথ নিবার দিন।

ঘটনা হিসাবে খুবই সাদামাটা। ভারতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৯ টা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকার আছে। এসব রাজ্যে নির্বাচন অথবা সরকার গঠনের ভাঙাগড়া, অথবা স্থানীয় ইস্যুতে নানান সঙ্কট – এগুলো লেগেই আছে।  তো সেগুলোরই একটার মত ২৩ মে ছিল দক্ষিণ ভারতের পুরনো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য কর্নাটকের নবনির্বাচিত প্রাদেশিক বা রাজ্যসরকারের মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্যদের শপথ নেয়া ও নতুন সরকার গঠনের দিন। কিন্তু এটা নিয়ে এত রাজনৈতিক হইচইয়ের কারণ কী? কারণ হল, মোদি বা বিজেপিবিরোধী যত মুখ্যমন্ত্রী বা রাজনৈতিক দলের নেতা বর্তমানে ভারতে আছেন, তারা প্রায় সবাই (কংগ্রেসের সোনিয়া-রাহুলসহ) এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন এবং তারা সবাই এসেছিলেন। আর ওই শপথ অনুষ্ঠানের পর তারা নিজেরাই শপথ মঞ্চে এসে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে আসন্ন ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে মোদি যেন দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে জিততে না পারেন, সে লক্ষ্যে সবাই একাত্মতা প্রকাশ করেন। এটাই বিশাল অর্থপূর্ণভাবে মোদীবিরোধী সম্ভাব্য জোটের এক প্রথম প্রদর্শনী হয়ে উঠেছিল। এটাই বিশেষ তাতপর্য।

এভাবেই এক স্থানীয় রাজ্য সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ঘটনা ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির ঘটনা হিসেবে হাজির হল। আর সেই সাথে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন বা লোকসভার নির্বাচনী লড়াই যে শুরু হয়ে গেল তা বলা চলে। যদিও মোদী সরকারের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে প্রায় আরো এক বছর পর, পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে। তাহলেও এখনই ‘নির্বাচনী লড়াই শুরু’ বলার কারণ হল, আসলে ২৩ মের ঘটনাটি ছিল প্রক্সি নির্বাচনী লড়াই। অর্থাৎ আগামী বছরের হবু লড়াইয়ের একটি ছায়া যা ভিন্ন পাত্রপাত্রী আর ভিন্ন এক ঘটনার ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হল। ভারতের রাজনীতিতে ১৯৮৫   সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে এক দলের বিরুদ্ধে আরেক দল কেন্দ্রে সরকার গড়বে এমন ধারায় আর চলে নাই। বিষয়টি আর সেই জায়গায় থাকে নাই। বরং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার প্রার্থী বা প্লেয়ার এখন আর কংগ্রেস বা বিজেপির মতো সর্বভারতীয় দল নয়, বরং আঞ্চলিক দলগুলোই (মূলত রাজ্যভিত্তিক স্থানীয় দল) গুরুত্বপূর্ণ ও খুবই নির্ধারক। উলটা করে বললে সর্বভারতীয় দল দুটো আসন এমন কমে গেছে যে সাথে আঞ্চলিক দলগুলোকে পেলে তবেই একমাত্র তারা সরকার গঠনের মত সংখ্যায় পৌছায়। এভাবে ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস অথবা বিজেপি এককভাবে কেউই কেন্দ্রীয় সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসতে পারে নাই। বরং উভয়েই (কংগ্রেসের ইউপিএ অথবা বিজেপির এনডিএ নামে জোট) দুই ভিন্ন জোটের নামে ক্ষমতায় ছিল। আবার ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু এই ট্রেন্ডেরই প্রথম আর এক চরম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে। সেবার কেবল কিছু আঞ্চলিক দলের জোট সাথে কংগ্রেস বা বিজেপির কাউকে না নিয়ে নিজেরাই কেন্দ্রে সরকার গড়েছিল।  এমনকি এবার শুরুতে মোদি সরকারের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বিজেপি ‘এনডিএ জোট সরকার’ হিসেবে ক্ষমতাসীন আছে। আর এখন কর্ণাটকের নির্বাচনের পর থেকে অবশ্য বিজেপি দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও হারিয়েছে, এক বা দুই আসনের কমতি হয়ে গেছে। যদিও জোট হিসেবে মোদী সরকারের কোনো সঙ্কট নেই। মূল কথা হল, ভারতের রাজনীতি আঞ্চলিক দলগুলোর ভূমিকা ক্রমেই বড় থেকে আরো বড় ও প্রভাবশালী এবং নির্ধারক হয়ে উঠছে। মোদি বা বিজেপিবিরোধী জোটের ছায়ায় একাধিক আঞ্চলিক দল ও মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি গত ২৩ মের এক মুখ্যমন্ত্রীর সামান্য শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান একারণে ভারতের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে হাজির হয়েছে।

চলতি মে মাসের ১২ তারিখে কর্নাটকের রাজ্য সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ফল গণনা ও তা প্রকাশিত হয় ১৫ মে। কিন্তু ফলাফল আসে তিন দলের এক ঝুলন্ত সংসদ। মোট ২২৪ আসনের কর্নাটক সংসদে রাজ্যসরকার গঠন করতে গেলে ১১১ আসন দরকার (দুই আসন নির্বাচন হয়নি, ফাঁকা আছে তাই ১১৩ আসনের জায়গায় নির্বাচিত মোট ১১১ আসন যোগাড় করতে পারলেই সরকার গড়া যায়), যা কোনো দলই পায়নি। যদিও বিজেপি গতবারের (৪০ আসন) চেয়ে এবার সবার চেয়ে বেশি, ১০৪ আসন পেয়েছে। আর গতবার ১২২ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে থাকা কংগ্রেস, তার এবার আসন কমে নেমে এসেছে মাত্র ৭৮ আসনে। আর স্থানীয় দল, জনতা দল (এস) আগে পেয়েছিল ৪০ আর এবার অল্প কিছু কমে গিয়ে পেয়েছে ৩৭ আসন।

সারকথায়, বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১১১ আসন) না থাকায় সরকার গড়তে পারছিল না। এর পিছনের বড় কারণ, স্বতন্ত্র বা এক-দুই আসন পাওয়া কোনো ছোট-বড় দল এবার নাই যে এদেরকে সামিল করে বিজেপি সরকার গড়তে পারে। আসলে এমন আসনই হল এবার মোট  মাত্র দু’টি। অর্থাৎ সরকার গঠনে বিজেপির ঘাটতি সাত আসন, এটা পূরণ করতে হলে তাকে মূলত জনতা দল (এস) থেকে অথবা না পারলে কংগ্রেস দল থেকেই টাকা দিয়ে তাদের এমপি ভাগিয়ে আনতে হবে। যেটা আর সহজ নয়। কারণ, ওদিকে কংগ্রেস দল ফল প্রকাশের সাথে সাথে উল্টা জনতা দল (এস)-কে মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিয়ে দেয়। বিনিময়ে কোয়ালিশন বা জোট সরকার গড়তে রাজি করে নেয়। এরপরও বিজেপি হাল ছাড়তে রাজি হয় নাই। অর্থের উপর ভরসা করে সব সামলাবে বলে ভেবেছে। তাই তারা কর্নাটক রাজ্যের রাজ্যপালের সাথে দেখা করে ‘সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে’ এই দাবি জানায়। তাতে রাজ্যপাল যেন বিজেপিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানায়, সেই দাবি করা হয়। এর পরের দিন ১৮ মে রাজ্যপালও বিজেপি নেতা ইয়েদুরাপ্পাকে শপথ নিতে আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন।

ভারতের রাজনীতিক কাঠামো ও সরকারব্যবস্থায় মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্যপাল নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তাই রাজ্যপালরা বাস্তবত কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকারের নয়, খোদ সরকারী দলেরই মুখ হয়ে থাকেন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর হুকুম তামিলের দলীয় ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। ফলে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কখনো কখনো রাজ্যপাল ক্ষমতার পাত্রের বিশাল ফুটা ও বিরাট ফাঁক-ফোকর হয়ে ওঠে। কর্নাটকে এটা স্পষ্ট ছিল যে বিজেপি (গোপনে টাকার বিনিময়ে) অন্য দলের এমপি ভাগিয়ে আনা বা হর্স ট্রেডিং ছাড়া সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে পারবে না। বিপরীতে কংগ্রেস-জনতা দল (এস) এদের জোট তাদের মোট ১১৫ আসনের সবার নামসহ তালিকা রাজ্যপালের কাছে সরবরাহ ও আবেদন করলেও তিনি তাদের সরকার গঠনের দাবি অগ্রাহ্য করেন। সম্ভবত রাজ্যপালের দুর্বল যুক্তি এই যে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও তিনি সবচেয়ে ‘বেশি আসন পাওয়া’ বিজেপিকেই সবার আগে সরকার গঠন করে দেখানোর জন্য ডাকতেই পারেন। বিজেপি তাতে ব্যর্থ হলে এর পরে তিনি হয়ত কংগ্রেসের জোটকে ডাকবেন। অর্থাৎ এতে রাজ্যপালের কথা ও আইনের ফাঁকটা হল, জেনেশুনে তিনি বিজেপিকে হর্স ট্রেডিং করে অন্য দলের লোক ভাগিয়ে আনার সুযোগ করে দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, এই কেনাবেচার কাজ করতে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ যেন যথেষ্ট সময় পান; সেজন্য বিজেপি নেতা হবু মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেখাতে লম্বা ১৫ দিনের সময় দেন। ফলে বিক্ষুব্ধ কংগ্রেস জোট এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপত্তি জানায়।

যদিও ইদানিং ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এমন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কথা উঠেছে যে সেই অনিয়মের সুযোগে শেষ বিচারে তা থেকে ক্ষমতাসীন নেতাদের কেউ কেউ ‘পার পাওয়ার’ সুবিধা পেয়ে যান। ওদিকে মূলত একই অভিযোগ তবে ভিন্ন আইনি ভাষায় ও প্রকাশ্যে সম্প্রতি অন্য বিচারপতিরাও প্রেসের সামনে অভিযোগ তুলেছিলেন। সেসবের কোন সুরাহা হয় নাই। এমনকি রাজ্যসভাতেও কংগ্রেসের নেতৃত্বে এক জোটও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব তুলেছিলেন। কিন্তু স্পিকার তা নাকচ করে দেওয়াতে তারা আদালতেও গিয়েছিলেন। মোটকথা রাজনৈতিক দল আর সুপ্রীম কোর্ট মিলে ক্ষমতার করিডোরে কোনাকাঞ্চিতে কোথাও কোথাও এক ধরণের অস্বস্তি এখন লুকায়ে আছে। ফলে ভারতের কোর্ট পাড়ার সময়টাকে বলা যায় এক ধরণের আভ্যন্তরীণ বিভক্তি সেখানে আছে। ফলে কিছু ক্ষত আছে যা এখনও পুরা শুকায় নাই। তবে সকলেই নিজের জায়গায় বসে চেষ্টা করছে।

তবু এসব অস্বস্তিকর ব্যাপার থাকা সত্বেও ভাগ্য ভাল বলতে হয় যে [ সুপ্রীম কোর্টের এক প্রাক্তন বিচারপতি এই এমনই “ভাগ্য ভাল” বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় মন্তব্য করেছেন। ] ভারতের সুপ্রীম কোর্ট সব শুনে রায়ে হবু মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে শপথ নিতে বাধা দেন নাই বটে। কিন্তু হর্স ট্রেডিং এর বিরুদ্ধে দুটা স্পষ্ট পদক্ষেপ নেন।

আদালত শর্ত দেন যে ১৫ দিন নয়, ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পূর্ণ সংসদ ডেকে সেখানে বিজেপির হবু মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে নিজ সমর্থক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে হবে। এ ছাড়াও এর সব কিছুই ঘটতে হবে, অন ক্যামেরা। ফলে সোজাকথায় বললে, টাকা দিয়ে এমপি কেনার কোনো সুযোগ ও সময় আদালত বিজেপির জন্য রাখেননি। এতে অবস্থা এতই বেগতিক ও বিপজ্জনক বলে মোদীসহ বিজেপি দলের অন্যান্য নেতারা অনুমান করে যে পরবর্তিতে অনুষ্ঠিত বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পার শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও দলীয় সভাপতি অমিত শাহ অনুপস্থিত হয়ে যান। অথচ এ পর্যন্ত সব নতুন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথে তারা গর্বের সাথে উপস্থিত থাকতেন। শুধু তাই নয়, শপথের পরপরই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মোদী মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে খবর পাঠান যে, তিনি যেন সংসদ ডেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের দিকে আর চেষ্টায় না যান। এর বদলে আগেই রাজ্যপালের কাছে যেন নিজের অপারগতা জানান ও পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। কারণ, সংসদ ডেকে বসলে বিজেপির বেইজ্জতি আরো বেশি হত। ফলে ইয়েদুরাপ্পার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এরপর উপায়হীন রাজ্যপাল এবার কংগ্রেস- জনতা দল (এস)-এর জোটের নেতা কুমারস্বামীকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। আর এই কুমারস্বামীর মুখ্যমন্ত্রীত্বের সরকারের শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানই ছিল মূলত ২৩ মের অনুষ্ঠান। মোদী এই অনৈতিক হর্স ট্রেডিং করতে গিয়ে ব্যর্থতার শুরু। আর তা থেকেই মোদী বা বিজেপিবিরোধী জোটের নৈতিক বিজয় হয়ে হাজির হয়েছে বলে বিরোধীরা মনে করছে। এই বিজয় উদযাপনই যেন হয়ে উঠে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। কলকাতার আনন্দবাজার এবিষয়ে রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, “বিরোধী শক্তির শপথ”।

এখন আমরা যদি দেখি, আঞ্চলিক এক জনতা দল (এস) কারা এবং তার নেতা মুখ্যমন্ত্রী কুমারস্বামী কে? আমাদের মনে থাকার কথা এইচ ডি দেবগৌড়ার নাম। দেবগৌড়া ১৯৯৬ সালে কলকাতার জ্যোতি বসুর সিপিএমসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সহযোগিতায় গড়া কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ভারতে কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর কোন জোটও যে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারে এর প্রথম প্রমাণ হল সেই দেবগৌড়া সরকার।  আর আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ ঘটনাটা হল,  একমাত্র সেই সরকারের আমলেই বাংলাদেশ-ভারত পানিচুক্তি হয়েছিল এবং আমরা কিছু দিন গঙ্গা নদীর পানি পেয়েছিলাম। সেই দেবগৌড়া একজন কর্নাটকি। তারই দলের নাম জনতা দল (এস) এবং তিনি এখনো ঐ আঞ্চলিক দল, জনতা দলের প্রধান। আর তারই বড় ছেলে হলেন এইচ ডি কুমারস্বামী, তিনি এবার মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিলেন। দেবগৌড়া এখনো দলে সক্রিয় আছেন; তবে ছেলেকে সামনে রাখেন।

এদিকে মোদীবিরোধী জোট গড়ার আরও পাত্রপাত্রীদের ততপরতার খবরও আছে। কর্ণাটকের  নির্বাচনে ঝুলন্ত ফলাফলের খবর প্রকাশের পরপরই কর্নাটকের জোট সরকার গড়ার ক্ষেত্রে দেবগৌড়া-সোনিয়ার সাথে কথা বলে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যয়। কর্ণাটকে যেন কংগ্রেস-জনতা দল এর জোট সরকার গঠিত হয় সে ব্যাপারে উদ্যোগগুলোর প্রধান ভুমিকায় ছিলেন মমতা। তার সাথে আরো ছিলেন উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিএসপি দলের মায়াবতী, সমাজবাদী দলের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। ফলে এটা কেবল দেবগৌড়া-সোনিয়ার জোটের রাজ্যসরকার নয়; বলতে গেলে যেসব আঞ্চলিক নেতা বা মুখ্যমন্ত্রী ওই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তারা সবাই মোদিবিরোধী জোটের একেকজন কারিগর হয়ে ভুমিকা নিয়েছিলেন।

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আমরা কেউই এখনই জানি না। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়েও এই নির্বাচনে কোন ভোট পড়বে না, সরকার গঠনও হবে না। তবে সারকথায় আমরা কেবল বলতে পারি, ভারতে কোন দল জোট ক্ষমতায় এলে তা বাংলাদেশের জন্য কী প্রভাব পড়তে পারে বা আনতে পারে। এই বিচারে ভারতে আঞ্চলিক দলের যেকোন এক জোট কোয়ালিশন সরকার আমাদের জন্য সবচেয়ে ফেবারেবল বা কাম্য সরকার হবে। বাংলাদেশের স্বার্থের জায়গায় বসে দেখলে এটাই দেখা যায়। গত ১৯৯৬ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে। তবে পরিস্কার থাকতে হবে, কংগ্রেসের নেতৃত্বের কোনো জোট সরকার অথবা বিজেপির নেতৃত্বে কোনো জোট সরকা্রের কথা এখানে বলা হচ্ছে না। আবার ভারতের সরকার বাংলাদেশে কোন দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিক কিংবা আজীবন রাখুক- এ আকাঙ্খা বাংলাদেশে যাদের আছে, এদেরকে বাইরে রেখে কেবল বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের দিক থেকে দেখে একথা বলা। আসলে, গত ১৯৯৬ সালের কোয়ালিশন সরকার এই ব্যতিক্রমটা ছাড়া, তুলনামূলক অর্থে বাংলাদেশের স্বার্থের বিচারে, ভারতের সব সরকারই মূলত ছিল হকিশ (hawkish) মানে, বাজপাখির মত ধরো-মারো-লুটে খাও বৈশিষ্টের সরকার। সে তুলনায় ১৯৯৬ সালের ভারতের সরকারকে বলা যায় এক লিবারেল সরকার। এই লিবারেলিজম দেখতে পাওয়ার সাথে তাদের ওই আঞ্চলিক জোট সরকারের কোয়ালিশন বৈশিষ্ট্ থাকা সম্পর্কিত বলে মনে করার কারণ আছে। অর্থাৎ আঞ্চলিক জোট বলেই তারা লিবারেল বৈশিষ্ট্যর। আগে অবশ্য আঞ্চলিক জোটে যেন কংগ্রেস বা বিজেপি দলও না থাকে এমন আঞ্চলিক জোটের কথা বলেছি। তবে একটা ব্যতিক্রম আছে। গত ২০১৬ সালে বিহারের রাজ্য সরকারের নির্বাচন হয়েছিল বিজেপি বনাম বিজেপিবিরোধী বিহারের আঞ্চলিক দল, এভাবে। আর তাতে কংগ্রেস আঞ্চলিক দল হিসাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ সর্বভারতীয় কংগ্রেস নয়, ওর বিহার আঞ্চলিক শাখা (বিহার প্রাদেশিক কংগ্রেস) তাতে যুক্ত ছিল। এই হিসাবে, এমনকি আগামীতে সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোট বা কোয়ালিশন সরকারের ভেতরে কংগ্রেসও আঞ্চলিক দলের মতই সমান মর্যাদায় থাকতে পারে।

কোনোভাবেই সেটি প্রভাবশালী এক কংগ্রেস দলের নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলের জোট যেমন ২০০৪-২০১৪ সাল পর্যন্ত দুই ইউপিএ মতো হবে না। আগামী আঞ্চলিক জোট এমন হলে তবেই তা বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে যেতে পারে বলে অনুমান করা যায়। এই বিচারে তৃণমূলের মমতা বা সিপিএমের ইয়াচুরিসহ অনেকের মাথায় কংগ্রেস বা বিজেপির বাইরে একটি কাঙ্খিত আঞ্চলিক জোট দেখতে পাওয়ার আকাঙ্খা কথা জানা যায়। মূলত আঞ্চলিক দলের ভেতর দিয়ে ভারতের নির্বাচনী ক্ষমতার প্রধান প্রকাশিত ধারা- ভারতের এমন জোট সরকার বাংলাদেশের সবচেয়ে ফেবারেবল হবে। আমরা কি আগামিতে এমন আঞ্চলিক দলের জোট সরকার দেখতে পাবো? ভারতের কাছে আমেরিকার বিক্রি করে দেওয়া বাংলাদেশ কী মুক্তি পাবে?

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতে বিজেপিবিরোধী জোটের মহড়া”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

গৌতম দাস

১২ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rG

 

 

 

ভারতীয় থিংকট্যাংক (Think Tank or Policy Institute) প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা হালহকিকত নিয়ে প্রায় সময়ই আমার লেখায় নানা মন্তব্য থাকে। সেখানে আমি সবসময় প্রশ্ন তুলেছি যে, কোন আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা (আমেরিকান ফান্ড চলা) ভারত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষ থেকে পলিসি নিয়ে কাজ করা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ফলে শেষ বিচারে এগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের এক পলিসি প্রতিষ্ঠানই হবে। কারণ এটা  থিংকট্যাংক অর্থাৎ চিন্তা, আইডিয়া ও মতাদর্শ তৈরি করা বা করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রস্বার্থ জিনিষটা কোকিলের ঘরে কাকের বাসার গড়ার মত কাজ কারবারের না; সেটা এখানে চলতে পারে না। ফলে শুধু আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা নয়, এমনকি আমেরিকান (এনজিও) ফান্ডে চলে এমন স্থানীয় ভারতীয় থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই কারণে সেগুলোও ভারতের মাটিতে “আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পলিসি প্রতিষ্ঠানই” হবে।

বুশের আমল থেকে এভাবেই আমেরিকা ভারতের ঘাড়ে চড়ে আমেরিকার নিজের “চীন ঠেকাও নীতি” বাস্তবায়ন চালিয়ে গিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এখানে কথাগুলোর মূল বিষয় সাধারণভাবে বিদেশি এনজিও প্রসঙ্গে নয়। ফলে সাধারণভাবে এনজিও এর মাধ্যমে আমেরিকান ফান্ড বিতরণ এর বিরুদ্ধে কথা বলা বলে বুঝলে ভুল হবে। যারা বস্তুগত, বা বিষয়আশয় বিতরণের দাতব্য বিদেশি এনজিও – তাদের ক্ষেত্রে এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু চিন্তা, মতামত ও পলিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফান্ডে হলে এখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের সাথে স্বার্থ সংঘাত, সমস্যা হবেই। এটাই মূল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত চরম ন্যাশনালিজমের ভারতের রাজনীতি, অথচ থিংকট্যাংক প্রশ্নে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংককে অবলীলায় ততপর করে রেখেছে।  আসলে আমেরিকায় ভারতের ভর্তুকির রপ্তানি পণ্য বিক্রি করতে দেওয়াতে রপ্তানি বাজারের এই লোভে সম্ভবত ভারতরাষ্ট্র নিজ দেশে আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রভাব প্রতিপত্তি চালু রাখতে দিয়েছে। এই অনুমান যদি সঠিক হয় তবে বুঝতে হবে এবার  ভারতে ততপর আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা অথবা অথবা আমেরিকান ফান্ডে চলা লোকাল থিংকট্যাংক এদের সবার ততপরতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে এবার ঢিলা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। হাত গুটাতে হবে তাদের। এক ব্যাপক বদল আসন্ন হয়ে উঠছে। মূল কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতিতে “চীন ঠেকানো” প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে ছিল বিগত প্রায় ষোল বছর – প্রেসিডেন্ট বুশের আট বছর আর পরে ওবামার আরও আট বছরে। এর ফলে এটা শুধু স্থায়ী নীতি হয়ে যাওয়া না, বরং “চীন ঠেকানো” ছিল আগের বুশ ও ওবামা প্রশাসনের পলিসিগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার। কিন্তু এই প্রথম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। অন্তত প্রায়রিটি উলটে দিয়েছেন তিনি। আগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র স্বার্থের টপ প্রায়রিটি। আর এর বদলে ট্রাম্পের প্রায়রিটি হল বাণিজ্যস্বার্থ এখন টপ প্রায়রিটি। অর্থাৎ চীন ঠেকানো ট্রাম্পের কাছে প্রায়রিটি নয়। চীনের কাছে হারিয়ে ফেলা বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার ট্রাম্পের টপ প্রায়রিটি। এসবের ফলাফলে  ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক ততপরতাগুলোর শুকিয়ে যাবার কথা। দেখা যাক কী হয়। বাস্তবে কী ঘটে তা দেখার জন্য আমাদেরকে কমপক্ষে এবছরটা অপেক্ষা করতে হবে।

তবে ভবিষ্যত অবস্থা যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, ভারতের আমেরিকান থিংকট্যাংক ব্যাক্তিত্বরা এখনই হাল ছেড়ে দেন নাই।  তেমনই এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী থিংকট্যাংকার ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজা মোহন। বর্তমানে তিনি কার্ণিগি ইন্ডিয়ার (Carnegie India) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কার্ণিগি মানে হল, আমেরিকার ওয়াশিংটনভিত্তিক এক ফরেন পলিসি – বিষয়ক থিংকট্যাংক যার নাম – কার্ণিগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারনাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)। এই পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রূপের নাম হল, কার্নোগি। আর এর ভারতীয় শাখা হল, কার্নোগি ইন্ডিয়া। রাজামোহন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স পাস করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তবে পরে দিল্লির জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। এরপর অধ্যাপনা করেছেন অথবা নানান ধরণের একাডেমিক কাজে জড়িয়ে ছিলেন কখনও ভারতে, সিঙ্গাপুরে, অস্ট্রেলিয়ায় নয়তো আমেরিকায়। তবে তার মূল পরিচয় এখন “ফরেন পলিসি এনালিস্ট”, তার নিজের পরিচিতির ভাষায় তিনি “থিংকট্যাংকার”। আমেরিকায় থাকার সময় থেকে তিনি দক্ষিণ ভারতে তামিলনারুর প্রাচীন ইংরেজ জমানার ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকার ওয়াশিংটন করসপন্ডেন্স ছিলেন। পরে ডিপ্লোমেটিক এডিটর বা কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এই দ্য হিন্দু অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাতেও। বর্তমানে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখছেন। ভারত সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক অথবা থিংকট্যাংক সংশ্লিষ্ট যত প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারক বোর্ড আছে তিনি প্রতি বছরই একাধিক এমন সব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য থাকেন। তিনি এমনই প্রভাবশালী শিরোমণি। তার গুরুত্বপূর্ণ উত্থান ২০০৪ সালের আশেপাশের সময় থেকে। বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের আমলে, জুলাই ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম ভারত সফর কাল থেকে। আমেরিকার ভারতনীতি কী হবে – তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তখন থেকেই ‘আমেরিকার বন্ধু’ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব ও নীতির বিচারে তিনি প্রভাবশালী এক বিরাট ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশও সফর করেছেন কয়েক বছর আগে; অনুমান করি সেটা ভারতের বাংলাদেশ নীতি সমন্বয়ের কাজে। সে সময়ে চ্যানেল আই টিভিতে জিল্লুর রহমানের টকশো অনুষ্ঠানের শ্লটে। কিন্তু রাজামোহন সেখানে এসেছিলেন একক বক্তা, বলা যায় সেটা ছিল ডায়ালগের বদলে এক মনোলগ অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য, তিনি আমেরিকার এশিয়া নীতিতে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ (বা চীন ঠেকাও) – এর প্রবক্তা। যার বাংলা কথাটা হল, এশিয়ার সবাই আমেরিকার পাশে থেকে চীন কোপাক, চীন ঠেকানোর কাজে লাগুক। আমেরিকার এই স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেক। যেটাতে রাজামোহন যেন একজন ন্যাশনালিস্ট ভারতীয়ের বক্তব্য দিচ্ছেন এমন মনে করানোর চেষ্টা থাকে। যদিও আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজের কাঁধে তুলে নিলে অথবা না নিলে সেটা ভারতের স্বার্থের পক্ষে যাবেই ব্যাপারটা এমন নয়। তবু এতদিন প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সব মিডিয়া এই একই ধারায় প্রপাগাণ্ডা করে গেছে। উইকিপিডিয়া পরিচিতি হিসেবে রাজামোহনের সম্পর্কে লিখা হয়েছে, তাঁর বিদেশনীতি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মোটা দাগে লিবারেল ও বাস্তববাদী, তবে তিনি আমেরিকার মতো গ্লোবাল প্লেয়ারদের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার” পক্ষে কথা বলে থাকেন।

আগেই বলেছে ট্রাম্প আমলে এসে, ভারতের এহেন থিংকট্যাংকদের দিনকাল ইদানীং খুবই খারাপ যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার নীতি ভারতের থিংকট্যাংকারদের তাদের কাজ তৎপরতাসহ সব এলোমেলো করে ডুবিয়ে দিয়েছে। মূল কারণ তারা অবিরত ভারতে আমেরিকার হয়ে জনমত তৈরি ও প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করে ভারতের আমেরিকাতে রপ্তানি ততপরতায় হাহাকার তুলে ফেলেছে।  আমেরিকায় ভর্তুকির ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা বা বাড়তি ট্যারিফ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প এদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ফেরি করার দিন শেষ। এসবের আর মূল্য নেই। অথবা আমেরিকা প্রভাবিত থিংকট্যাংকগুলোর করা ভারতের মিডিয়া-প্রোপাগান্ডা সব মিথ্যা হয়ে যাওয়ার চেয়েও সেগুলো বাস্তবতা হারিয়ে অচল অসার বক্তব্য হয়ে গেছে। আর ওই দিকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মোদির সরকার লজ্জার মাথা খেয়ে যেসব তৎপরতায় নেমেছে সেটাকে যদি চীনকে খুশি করার উদ্যোগ বলা এড়াতেও চাই তো বলতে হবে ‘চীন অখুশি হবে’ এমন সব কাজ পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চোটটা গিয়ে পড়েছে তিব্বতের দালাইলামার ওপরে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ ঘটনা হল, মোদি ও শি জিনপিংয়ের দুই দিনের একান্ত ইনফরমাল সামিট। (বিস্তারিত এখানে)

রাজামোহন গত ১ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তার নিয়মিত কলামে মোদি ও শি জিনপিংয়ের একান্ত ইনফরমাল সামিটকে নিজের লেখার প্রসঙ্গ করেছেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংকারদের করুণ অবস্থা স্বীকার করতে এখনো রাজি হননি। বরং রাজামোহন লিখছেন, গত সপ্তাহে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চীনের য়ুহান (Wuhan) শহরে একান্ত ইনফরমাল সামিট হয়েছে, সেটা ভারতের চীনা নীতিকে রিসেট (reset) বা “ফিরসে শুরু” করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা আসলে বরং চীন, যে এশিয়ার তার ‘প্রতিবেশী নীতি’ বদলিয়েছে। আর দিল্লি তাতে কেবল চিন্তাই করা যায় না এমন পাওয়া সুবিধা পেতে সাড়া দিয়েছে মাত্র। ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, চীনই তার আঞ্চলিক নীতি ‘ফির সে শুরু’ করে সাজিয়েছে কারণ সে ট্রাম্পের উজানে বাওয়া দেখে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনকে এমনটা করতে হয়েছে। [Last week’s informal summit in Wuhan between Prime Minister Narendra Modi and President Xi Jinping was widely billed as India’s ‘reset’ of its China policy. A close look suggests it was Beijing that was really recasting its policy towards its Asian neighbours. Delhi was merely responding to an unexpected opportunity. A closer examination, however, suggests China’s reset of its regional policy was itself a response to the American upheaval under President Donald Trump.]

ইন্টেলকট বা একাদেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ যাদের করতে হয় তাদের বক্তব্যের ধার বা পয়েন্ট যখন এমন হাল্কা তর্কে নামা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝা যাচ্ছে, রাজামোহনের অবস্থা আসলে খুবই মরিয়া দশায়। পরের প্যারায় তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে আরও লিখছেন, “গ্লোবাল ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকা-চীন এই দুইয়ের মধ্যে চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে যে ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়ে গেছিল মাত্র ১৬ মাসে তা একা হাতে ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ করে উল্টে দিতে পেরেছে।’ ট্রাম্প কেবল তার নিজের বিশেষ আজব ঢংয়ে বলে দিতে পেরেছে, ‘না, এত তাড়াতাড়ি সেটা ঘটবে না”। [“In a short span of 16 months, Trump has single-handedly challenged widespread perception that the balance of power between America and China was tilting in favour of the latter. Trump, in his own peculiar way, has said, ‘not so fast’”.

এই লেখা আসলে ডেসপারেট এক ট্রাম্পভক্তের; রাজামোহন সম্পর্কে এ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। যেন এ’এক আমেরিকা প্রেমে মজে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যেন দুই শিশু তুমুল তর্ক করছে যে, “কার বাবা বেশি বড়লোক”। কম করে বললে এমন তর্ক অশোভন, অন্তত একাডেমিক পর্যায়ের লোকদের তর্ক এটা নয়।

এটা আমেরিকা অথবা চায়নাকে ভাল বলে তাদের কারও পক্ষে ওকালতির ইস্যু না। ট্রাম্পের আমেরিকা ভাল না চায়না ভাল – এই স্টাইলে তর্ক  বলাই বাহুল্য খুবই নিম্নমানের। বরং একাডেমিকদের তর্ক হতে পারে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের নীতি ছেড়ে চলে যেতে পরোয়া করছে না কেন?  দুনিয়ায় গত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো আমেরিকার যে গ্লোবাল ভূমিকা ও এক এম্পায়ার (empire) ভূমিকা এবং দুনিয়ার নেতার ভূমিকা – সেসব ঢিলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা আমরা মানলেও ট্রাম্পের আমেরিকা তা যেচে ত্যাগ করতে আর পরোয়া করছে না, কেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে আকার পেয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ – এখন সেই গর্বও ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। কেন? একই সময়ে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপের সাথে আমেরিকার প্রধান সহযোগী হিসাবে সম্পর্ক, সত্তর বছর পরে এসে আমেরিকা অবলীলায় এই প্রথম বেপরোয়াভাবে এই সম্পর্ককে ত্যাগ করছে। ন্যাটোসহ ইউরোপের সাথে মিলে যা কিছু যৌথ প্রতিষ্ঠান এতদিন  ধরে গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকা এখন সব ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। অথচ এগুলোই তো আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের মৌলিক ভূমিকা পালনের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমেরিকাকে সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এগুলোকেই ট্রাম্প স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চাইছে, ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাহলে “চীনের বদলে আমেরিকার হাতেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থাকছে, এত তাড়াতাড়ি তা যাচ্ছে না” – রাজামোহনের এই কথা বলে ট্রাম্পকে বিরাট ত্রাতা বলে তোষামোদীর কারণ কী?  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প নিজেই তার কোনো উপদেষ্টার কোনো কথা রাখছেন না বা অবস্থান কমিটমেন্ট যেখানে যা কিছু বলে আসছেন ট্রাম্প তা রক্ষা করছেন না, মানছেন না। তিনি মূলত পরিচালিত হয়ে চলছেন অসংখ্য লবিস্ট (ব্যবসায়ী) তাকে যখন যেভাবে বলাচ্ছেন বেশির ভাগ সময় তিনি তাদের খপ্পরে। ট্রাম্পের প্রশাসনের এসব অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ট্রাম্পের আমলেই রেকর্ড পরিমাণ কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা বা প্রশাসনিক কর্তার বরখাস্ত হওয়া বা পদত্যাগ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এথেকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়!

আর সবচেয়ে বড় কথা ট্রাম্পের প্রশংসা করে রাজামোহনের দাবি যদি সঠিকও হয় তাতে রাজামোহনের ভারতের কী লাভ এতে? মোদির সরকার প্রশাসন থেকে কী আমরা ইতোমধ্যেই জানি নাই যে, খোদ ট্রাম্প বা আমেরিকার কাছ থেকে বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের আর কিছুই পাওয়া নেই? এটা মোদির সরকার প্রশাসন প্রকাশ করেননি! ভারত আমেরিকায় তার রফতানি বাজারটাই হারিয়েছে, এটাই চরম বাস্তবতা। তাহলে রাজামোহন কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? কার খুশিতে খুশি হচ্ছেন? কোন আমেরিকা? এই আমেরিকা কী কেবল শুধু ভারতের নয়, দুনিয়ার কারো জন্যই কেউ নয়, তাই নয়? তাহলে রাজামোহন কার স্বার্থের প্রতিনিধি? বটম অব দা হার্ড ফ্যাক্টস হল, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থের উপরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে টপ প্রায়রিটিতে এনেছেন। আর আগের আমেরিকার “চীন ঠেকানো” – এটাকে রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে দেখে ও প্রাধান্যে রাখাতে ভারতের পণ্য তা প্রতিযোগিতায় না পারলেও ভর্তুকিতে রপ্তানিযোগ্য করে তা আমেরিকায় রপ্তানি করতে দিয়েছিল। এই সত্যকে আড়াল করে ট্রাম্পকে রাজামোহন হিরো বানায় কী করে, এটা সত্যিই বিস্ময়! ্ট্রাম্প কার চোখে হিরো? কার জন্য হিরো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরা পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল ও থেকেছিল। আর আমেরিকা ছিল তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাদাতা। ছিল বলছি কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণ  নীতির কারণে এর দিন শেষ। অথচ এসব ইঙ্গিত যেমন, চলতি দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মোচড় মনে হচ্ছে রাজামোহন দেখেও না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে মূল ইঙ্গিতটা হল, পুর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করছে আমেরিকাকে সবসময় নিজ ভাবনার সাথে মিলিয়ে এক গণ্ডিতে সাথে রেখে চিন্তাভাবনা করার দিন ফুরিয়েছে। ভারতের এ্ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (O.P. Jindal Global University, in Sonipat, India) দুই প্রফেসর জাপানের নতুন ভাবনার পক্ষে বিভিন্ন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। যেমন দেখুন, Trump Is Driving Xi Into Modi’s Arms

সেসব রচনার সার কথা হল, সাম্প্রতিককালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের পর থেকে বহু কিছু বদলে গেছে। জাপান এমনকি চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার সুযোগ কী তার জন্য আছে তা এক্সপ্লোর করতে শুরু করেছে। এমন একটা আর্টিকেলে লেখা হয়েছে, ভারতের জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার। [A lesson for India in Japan’s approach to China’s belt and road initiative] অপরদিকে দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ সামিট সম্প্রতি আমরা দেখেছি – যদিও এমন সামিট এর আগেও মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবার নেতাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বিশেষ ধরনের আলাদা। যেন দুই কোরিয়া একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তারা এবার খুজে পেয়ে গেছে। প্রথম যেদিনে সীমান্তে দুই প্রেসিডেন্টের পরস্পর দেখা হয়, তখন থেকে। বিশেষ করে উত্তরের প্রেসিডেন্টের আন্তরিকতা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছেও কাম্য অবশ্যই, তবে অদৃশ্যপূর্ব ঠেকেছে। এর পেছনের মূল কথাটা কী? সেটি হল, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে, পরস্পরের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি। তাই এটা এখনই বলে দেয়া যায় আগামী ইতিহাসে যখন খুঁজে দেখা হবে যে, কবে থেকে গ্লোবাল ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আমেরিকা থেকে চীনের হাতে চলে এসেছিল? এক বাক্যে সেই ইতিহাস বলবে চীনের মধ্যস্থতায় দুই কোরিয়ার পরস্পরকে বিশ্বাসের সাথে পরস্পরের কাছে আসার শুরু থেকে। আর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বন্ধু জাপান যখন আমেরিকা ছেড়ে চীনের ভেতরে বন্ধুত্ব খুঁজতে রওনা হয়েছিল আর চীন এর উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিল, তখন থেকে।

আসলে এসবের মূল কথাটা হল, যে আমেরিকা কেবল নিজের জন্য আমেরিকা – এটা কোন এম্পায়ার আমেরিকা নয়। বরং নিজেই নিজেকে দুনিয়ার নেতা – এম্পায়ার – এই অবস্থান থেকে নিজেই নিজেকে খারিজ করে দেয়া। এভাবে কোনো রাষ্ট্র যখন চরম রক্ষণশীল অবস্থান নেয় তখন কেউই আর সেই আমেরিকার কেউ থাকে না। এ যুগে এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান বলে নিজের কোনো অবস্থানের বাস্তবতা সম্ভব বলে মনে করা হলে এর সোজা অর্থ হল – সেই রাষ্ট্র আর তখন ইউরোপ, জাপান বা কোরিয়ার জন্য কেউই নয় হয়ে যায়। কেবল তখনও ট্রাম্পের আমেরিকার একমাত্র ভক্ত-বন্ধু থাকে সি রাজামোহন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের থিংকট্যাংক এখনো ট্রাম্পভক্ত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

গৌতম দাস
০৫ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ry

 

 

চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ব্যাপারটাকে সম্ভবত এভাবে বলা যায় যে, চীন ও ভারতের সম্পর্ক যেটা এত দিন ভাসতে ভাসতে ক্রমেই বড় দূরত্বে এবং বিচ্ছিন্ন ও সঙ্ঘাতপূর্ণ পথ ধরছিল; তা হঠাৎ করেই এবার উল্টো এক পথ তালাশ করতে নেমেছে। সেটা হল, পরস্পর কাছে আসার উত্তম পথ কী হতে পারে তা দ্রুত খুঁজে বের করা। ব্যাপারটা যেন উভয়ে মিলে স্থায়ী ও শক্ত কোনো ভিতের ঠিকানা খুঁজে ফেরা। কারণ, তারা তাদের সম্পর্ককে এবার স্থায়ী ভিতের উপর ও ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড় করাতে অধীর হয়ে পড়েছে। গত মাসে ৩ এপ্রিল “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা- সেই বিউগল বেজে গেছে” শিরোনামে আমার লেখায় এই পরিবর্তন শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যে অবস্থায় ছিল, এর সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে; ভারতের ভাষায় এটা ‘রিসেট’ (reset) হয়ে গেছে। এটা হতে অবশ্য ১৬ বছর লাগল।

কিন্তু দূরত্ব ও সঙ্ঘাতের পথ হঠাৎ ত্যাগ করে চীন ও ভারতের সম্পর্ক উল্টো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ কেন, এর পেছনের কারণ কী? তা সবাই তা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলেও সে কারণটি হল – মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করা। আমেরিকার সেই মূল বাণিজ্য লড়াই চীনের সাথে হলেও, তা ভারতের বিরুদ্ধেও পরিচালিত। এত দিন আমেরিকার কাছ থেকে এক ‘বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা’ বা ‘চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার দেয়া ঘুষ’ প্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে ভারত নিজের সরকারি ভর্তুকি দেয়া পণ্য আমেরিকায় রফতানি করে চলেছিল। এ ‘বিশেষ’ সুযোগটাই ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের শুরুতে সবার আগে বাদ করে দিয়েছে। আর ঠিক ততোধিক বেগে ভারতের চীনমুখী রাস্তা খুঁজে বের করতে ঝাঁপিয়ে পড়া এখান থেকেই।

সম্ভাব্য এই ইউটার্ন বা উল্টো পথ যে ধরতে হতে পারে, তা ভারতের অজানা ছিল না, বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি; যেটা ট্রাম্প ২০১৭ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার সময় থেকেই বলতে শুরু করেছিলেন। কথাটির ব্যবহারিক অর্থ যদিও অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। গত আশির দশক থেকে, পণ্য বিনিময় (সেই সাথে পুঁজিও) দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে এক গ্লোবাল অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রবক্তা আমেরিকা নিজেই এখন রক্ষণশীল, সবার আগে নিজ পণ্যবাজার সংরক্ষণ করতে হবে – এই উল্টো লাইনে চলে যাওয়া। এটাই ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতির সারকথা।  ফলে ‘ফরেন পলিসি’ নামে আমেরিকার নামকরা এক ম্যাগাজিনের মতামত কলামে লেখা হয়েছে, ‘চীন-ভারতের কাছাকাছি আসতে চাইবার পেছনে একটা থার্ড পার্টি বা তৃতীয় পক্ষ আছে; যার নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। [But there’s an unacknowledged third party — U.S. President Donald Trump.] অর্থাৎ ট্রাম্পের নীতি এদের পরস্পরের কাছে আসতে বাধ্য করেছে।

তবে সম্ভাব্য এই পরিস্থিতির কিছু গ্রাউন্ডওয়ার্ক করে রেখেছিলেন এখনকার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে। এ বছর ৩০ জানুয়ারি তিনি নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। এর মাত্র তিন মাস আগে অক্টোবর ২০১৭ মাস পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রায় দুই বছর ধরে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত। মোদী ও তাঁর ‘খামাখা শক্ত লাইন’ পথের মুখ্য সঙ্গী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের অনুসৃত নীতির কারণে ভারত যখন ভুটানের ডোকলাম সঙ্কটে নাকানি-চুবানি খেয়ে আটকে যায়; তখন যারা যারা মোদিকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন; তাদের মূল লোক ধরা হয় সে সময়ের ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্করকে। আর ভারতের পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের মতে, [দেখুনঃ Who is Vijay Keshav Gokhale] জয়শঙ্করের সাথে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এই গোখলেও বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই সঙ্কটকালে সফট পাওয়ারের ব্যবহার করে সব কিছুকে স্বাভাবিক করতে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

জানুয়ারির শেষে পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে গোখলে চীন সফরে যান, যেখান থেকে বলা হয় চীন-ভারতের সম্পর্কের নতুন ধারার শুরু। আর এতে বিগত দুই মাসেই চীনের বাণিজ্যমন্ত্রীর ভারত সফর এবং ভারতের দিক থেকে তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর শেষ হয়েছে। এর শেষেই নেয়া হয়েছিল মোদির চীন সফরসূচি, ২৭-২৮ এপ্রিল। এই সফরের ফরম্যাট দেখলে আর কোথায় কোন পটভূমিতে মোদির এই সফর হয়েছে, তা বিচার করলে অনেক বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হবে।

মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে – মোদির এই ‘বিশেষ’ চীন সফর যেমন ভারতের দিক থেকে আশা করা হয়েছিল, সেভাবে শেষ হয়েছে। মে মাসের শুরুতে আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, মোদীর সফরে কী চীন-ভারত সম্পর্ক নতুন অগ্রগতি ও আকার পাবে? আমার জবাব ছিল, এটা আর পাবে কি না, সে পর্যায়ে নেই। বরং নতুন আকারে একটা বিরাট ‘ডিল’ হতে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। এখন কী কী বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়ে আর দেনা-পাওনার বিষয় সেটেল করে তা হবে, সেটাই নির্ধারণের কথাবার্তা চলছে। মোদীর চীন সফরের আগের সপ্তাহে ২২ এপ্রিল ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ চীনে গিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে মিটিংয়ে মোদীর সফরের বাকি খুঁটিনাটি সম্পন্ন করেন।

সেখান থেকে তারা দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য টেনে মোদী-শি’র সামিটকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু মোদী তার চীন সফরের শুরুতে একটা বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে মোদী বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি ও আমি এক গুচ্ছ দ্বিপক্ষীয় ও গ্লোবাল গুরুত্বের ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় করব। আমরা আমাদের প্রত্যেকের জাতীয় উন্নয়ন, বিশেষ করে চলতি ও আগামী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলব”। [“President Xi and I will exchange views on a range of issues of bilateral and global importance. We will discuss our respective visions and priorities for national development, particularly in the context of current and future international situation,” PM Modi said in a statement.]

এই দুই বাক্য অনেক ডিপ্লোমেটিক ভঙ্গি ও ভাষায় ভরপুর, সন্দেহ নেই। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘গ্লোবাল গুরুত্বের’ বিষয় তাদের আলোচনার ইস্যু – এই শব্দ দুটো। এ ছাড়া “চলতি ও আগামী বিশ্বপরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতের প্রসঙ্গ” টেনে কথা বলাও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব কথার অর্থ হল – মোদি বলতে চাইছেন,  ট্রাম্পের অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন ও নিজ বাজারে রক্ষণশীল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি চলতি গ্লোবালাইজড (দুনিয়াব্যাপী এক ব্যাপক পুঁজি ও পণ্যবিনিময় ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ায় সবার তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া) বিশ্ব- অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়াতে – এই অর্থে এই দুই রাষ্ট্রকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে ও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করেছে। কথা অবশ্যই সত্য, আর চীন ও ভারতের জনসংখ্যা মেলালে তা দুনিয়ার ৪০ শতাংশ, এ কথা স্মরণ করলে তা আরো ভালো বোঝা যায়। অনেক এক্সপার্ট মনে করেন, চীন-ভারতের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে যদি মোড় নেয়, তবে ৩০ বছর ধরে তা আগামী দুনিয়াকে আকার দেয়ার সামর্থ্য রাখে। [“The relationship between New Delhi and Beijing has the potential to shape the world for the next 30 years,” says political commentator Einar Tangen.]

আসলে এক কথায় বললে, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও (SCO) এর বৈঠকে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি চীন সফর করছেন, এ কথা কেবল এক উসিলা। প্রথমত, এটা ছিল এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক।  এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রধানদের কোন বৈঠক নয়। আর এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, আগামী ৯-১০ জুন চীনে এসসিও’র মূল বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, তারই প্রস্তুতি বৈঠক করা। তবে এবারের এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের এক বাড়তি অনুষঙ্গ ছিল। তা হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের আগে এসসিও সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের ২৩-২৪ এপ্রিল এক বৈঠকে বসা। আর এরপরেই এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের অফিসিয়াল সুচি ছিল ২৫-২৬ এপ্রিল। তাই, ভারতের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এর দিন কয়েক আগে ২২ এপ্রিল বেইজিংয়ে গিয়েই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঘোষণা করেন যে, চীনের য়ুহান শহরে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে ‘ঘরোয়া সামিট’ হবে। বিবিসি-বাংলার ভাষায় এই ঘোষণা ‘কূটনৈতিক মহলে ছিল রীতিমতো অভাবিত’। তাই ক্রিটিক্যালি দেখলে এসসিও’র কোনো বৈঠকের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রত্যক্ষ কোন লেনদেন ছিলই না। এমনকি মোদী এবং হোস্ট চীনের প্রেসিডেন্ট ছাড়া আর কোনো এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ঐ সময়কালে চীন সফরেই আসেন নাই।

দ্বিতীয়ত, য়ুহান (Wuhan) বাইরের মিডিয়ায় খুবই অপরিচিত এক শহর; যদিও চীনের ভেতরে এর আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ, য়ুহান হল,  মূলত মাও সে তুংয়ের ছুটি কাটানোর প্রিয় শহর। ফলে এটা এখন মাওয়ের স্মৃতিবাহী এক মিউজিয়ামের শহর। খরস্রোতা ইয়াংসি নদীর তীরে এই শহর, যে নদীতে অবসরে সাঁতার কাটতে ভালোবাসতেন মাও। আর সেখানে এক বিখ্যাত ‘ইস্ট লেক’ আছে, যার তীরে এক ভিলায় মোদি-শি’র থাকা ও বৈঠকের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই শীর্ষ সামিটের নাম দেখেছি আমরা “ঘরোয়া সামিট” বলে। ‘ঘরোয়া’ শব্দটি বিবিসি বাংলার করা বাংলা। মূল শব্দটি ইংরেজিতে ছিল ‘ইনফরমাল’। অর্থাৎ এখানে তারা যে যাই দু’জনে দু’জনকে বলবে তা আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান বলে বিবেচনা করা হবে না। ফলে এক ধরনের দায়শূন্যতার সুবিধা থাকবে এবং মনখুলে কথা বলা যাবে। শুধু তাই নয়, তারা দু’জন অনুবাদক ছাড়া কোনো সরকারি বা মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্ত্রী বা সহযোগীকে সাথে রাখার কথা ছিল না, নেনও নাই তাই সব অর্থেই এটা ‘ইনফরমাল’। কিন্তু ‘ইনফরমাল’ রাখা হল কেন?
কারণ, ইনফরমাল বলে ঘোষণা করে রাখলে আসল কথা সরাসরি তারা বলে নিতে পারেন – পারস্পরিক স্বার্থ, অসুবিধা, সুবিধা ইত্যাদি সব সেগুলো হয়ত ফরমাল সভায় কেউ কখনও বলবেন না, বলেন না। আর এখানকার কথা, মানে এর কোনো রেফারেন্স পরবর্তি কোনো আনুষ্ঠানিক সভায় উঠবেই না। তাহলে এখন আসি, সেখানে মোদি আসলে কী খুঁজতে গিয়েছেন?

মোদি বলতে চাইছেন, এখান থেকে তারা ‘চীন-ভারত সম্পর্কের এক পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন সম্ভাবনা বের করতে চাইছেন, যাতে তাদের নতুন স্ট্র্যাটেজিক নীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থ কী হতে পারে’ [Modi said he and Chinese President Xi Jinping will review the developments in Sino-Indian relations from a strategic and long-term perspective during a two-day informal summit at Wuhan in China from tomorrow.] সে সম্পর্কে উভয়েই পরিষ্কার হতে পারেন। এটা বিজনেস টুডে থেকে নেয়া।  এসব কারণে ভারতের ‘বিজনেস টুডে’ পত্রিকা এটাকে ‘হার্ট-টু-হার্ট সামিট’ নামে ডাকছে। এই বিজনেস টুডে ছাড়াম আমাদের প্রথম আলো বা বিবিসি বাংলা এবং ভারতের যতগুলো মিডিয়া এই সফরের রিপোর্ট কাভার করেছে, সবাই আসলে আন্দাজে হাতড়েছে যে, এই সামিটে আসলে কী হচ্ছে, কী হবে, কেন ইত্যাদি। এসব প্রসঙ্গে সবাই একেকটা মনগড়া ব্যাখ্যার কথা লিখেছেন। এমনকি ভারতের কথিত থিংকট্যাংকগুলো মিডিয়াকে আরও বিভ্রান্ত করেছে। যেমন, বিবিসি বাংলা কথিত এক চীন-বিশেষজ্ঞ অলকা আচারিয়ার বরাতে লিখেছে,  আচারিয়া বলেছেন, ” দুই দেশের সম্পর্ককে এখন যে আবার ‘রিসেট’ করার কথা বলা হচ্ছে, ডোকলাম সঙ্কটের তলানিই কিন্তু তাকে গতি দিয়েছে। আমার মতে, ডোকলাম দুই দেশের জন্যই ছিল একটা ওয়েকআপ কল। সম্পর্কটি যাতে আরো খারাপের দিকে না গড়ায়, দুই নেতাই সেই সুযোগ নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে”। এমন আন্দাজি কথা বলার মূল কারণ হল, ভারতের থিংকট্যাংক একাডেমিকরা আসলে একেকজন “আমেরিকান স্বার্থের চোখে”, মানে তাঁরা আমেরিকান স্বার্থের ‘চায়না কন্টেনমেন্টের ভেতরেই’ সব কিছুকে দেখতে অভ্যস্ত। তাই সত্যি কথাটা হল, ভারতের এসব ‘আমেরিকান চোখগুলো’রই সবার আগে ‘রিসেট’ দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একাডেমিক জগতের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল – এরা মারাত্মকভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল।

অপর দিকে মিডিয়া বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভবত আরো একটা কারণ আছে। তা রয়টারের এক ডিটেল রিপোর্ট। সেটা হলো, এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এক প্রস্তাব নেয়া হয়েছিল। তাতে ভারত ছাড়া এসসিও’র সব সদস্য রাষ্ট্রই চীনের OBOR প্রকল্পে নিজেদের অংশগ্রহণ ও সমর্থনের কথা জানিয়েছে। একারণে মোদি-শি’র বৈঠকের আগে রয়টারের ঐ রিপোর্টের শিরোনাম হলও, ‘OBOR প্রকল্পে চীন ভারতের সমর্থন জোগাড়ে ব্যর্থ হয়েছে।’ [China fails to get Indian support for Belt and Road ahead of summit] কিন্তু সেটাই তো হওয়ার কথা। SCO এর ঐ বৈঠক তো ভারতকে মানানোর কোন বৈঠক ছিল না। বরং SCO এর যেকোন বৈঠকের বাইরে মোদী-শি’র ওই শীর্ষ বৈঠকে, ভারতের সাথে চীনের সামগ্রিক সম্পর্কের বিষয়ই ছিল মোদি-শি’র ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। তাই কেউ যদি SCO এর কোন বৈঠকের ভিতর চীনের ‘আকাঙ্ক্ষা’ আগে থেকেই ছিল, এ কথা সামনে ঝুলিয়ে দেন  এর তো কোন মানে হয় না। একারনেই, এমন রিপোর্ট অর্থপূর্ণ। চীনের (এবং ভারতেরও) সব আকাঙ্খার মূল জায়গা এসসিও’র কোনো সভা নয়, বরং মোদি-শি’র শীর্ষ ঘরোয়া বৈঠক। তাই রয়টারের রিপোর্ট মোদি-শি’র শীর্ষ বৈঠককে প্রধান গুরুত্ব না দেয়ায় এই বিভ্রান্তি।

এখন তাহলে, শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে কী করা হবে, মানে, তা প্রকাশিত হবে কোথায়? কীভাবে? সেটাও নির্ধারিত। আগেই বলেছি, এসসিও’র সভা আসলে মোদি-শি’র শীর্ষ ইনফরমাল বৈঠক ঘটানোর ক্ষেত্রে এক উসিলা মাত্র। তাই সেই বৈঠকের ফলাফল প্রকাশের নির্ধারিত স্থান হল, পরবর্তিতে আগামি জুন মাসে আবার এসসিও’র শীর্ষ বৈঠক আছে চীনেই; সেই সময় তবে আলাদা করে সভা করে তা তুলে ধরা বা মূল্যায়নের সমাপ্তি টানা হবে। সম্ভবত এসসিও’র সম্মেলন শুরুর আগে বা পরের অবশ্যই কোনো আলাদা সময়ে মোদী-শি’র আবার কোন শীর্ষ বৈঠক থেকে তা প্রকাশ করা হবে। তত দিন আরো দৌড়ঝাঁপ আমাদের দেখতে হবে।

সবশেষে, ভারতের সম্পর্কের প্রভাব ও ভূমিকা বাংলাদেশে কী হতে পারে? প্রথমত, সহসাই এর কোনো প্রভাব আমরা কোথাও পড়তে দেখব না। এমনকি মোদী-শি’র শীর্ষ বৈঠকের ফলাফলে চীন-ভারত সবচেয়ে কাছাকাছি চলে এলেও এখন সহসাই কোন প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ চীনের প্রভাব বলয়ে যেন না যায়, সেটা তো বটেই, এমনকি বাংলাদেশে যেন চীনা বিনিয়োগ না ঢুকে – ভারতের এখনকার এই অবস্থানই বজায় থাকবে। তবে হয়ত অনেক দীর্ঘ সময় পরে কখনো তা বদলাতে পারে। এ ছাড়া, বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর তাৎক্ষণিক কারণ নেই। এছাড়াও, গত সপ্তাহে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণচুক্তি (প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটা মনে রাখা যেতে পারে।

আসলে এখনও মুখ্য বিষয় হল – ভারত চীনের কাছ থেকে কী পাবে, মূলত এই প্রসঙ্গকে ঘিরে। এসব দিকের সুরাহা হলে এরপরে এশিয়ায় অন্য দেশে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গে যেমন বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে ভারতের আপত্তি বন্ধ হবে কি না, নাকি একই রকম থাকবে; হলে কিভাবে, কী শর্তে, সেসব প্রসঙ্গ উঠতে পারে। এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর কোন কারণ দেখা যাচ্ছে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]