ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

গৌতম দাস

১৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sE

File photo of 1st China-South Asia Cooperation Forum ((CSACF), Fuxian Lake Initiative – ORF

ভারতের অন্যতম বেসরকারি দাতব্য থিংকট্যাংক বা বেসরকারি পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা সংক্ষেপে ওআরএফ (Observer Research Foundation, ORF)। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনেকেই থাকেন রিসার্চ ফেলো হিসেবে, যারা সাধারণত হন দীর্ঘ পেশাদার জীবন কাটানো কোনো কূটনীতিক, জার্নালিস্ট বা একাডেমিক ইত্যাদি পেশাজীবী। কিন্তু ওআরএফ রিসার্চ ফেলোদের নিয়ে এক আজব ঝোঁক দেখা যাচ্ছে যে, তারা তাদের সহকর্মী একই বিষয়ের কী নিয়ে কাজ করছে, কোথায় কী বলছে, সেসবের খবর রাখে না। তাই একই প্রতিষ্ঠান ওআরএফের এক সহকর্মী যা বলছেন, অপর সহকর্মী ঠিক এর উল্টো বলছেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য খারাপ নাম কামিয়ে বাংলাদেশের চোখে পড়ে যাওয়া ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। পরবর্তী সময়ে কূটনীতিক চাকরির জীবন শেষ করে তিনি ২০১৬ সালে ভারতের ওআরএফ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো হয়েছিলেন। এমনিতেই ভারতের থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ ঝোঁক হলো প্রো-আমেরিকান পলিসি অনুসরণ করা অথবা তাদের জন্মই হয় আমেরিকান অর্থে আমেরিকান নীতি-পলিসি প্রচারের জন্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, বিপুল উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির পক্ষে প্রচারণা চালাতে ভারতের প্রায় সব থিংকট্যাংকই ভাড়া খাটে। এর মূল কারণ, এদের বেশির ভাগেরই জন্ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডিং এ কারণে। তেমনই, প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খাটা, আর আমেরিকান বলে বলীয়ান এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর হলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। যদিও কপাল খারাপ, এখন ট্রাম্পের জমানা, আর তাতে এসব ভাড়াটেদের অবশ্য অবস্থা খুবই শোচনীয়। ট্রাম্পের চলতি “বাণিজ্য যুদ্ধের” নীতির ঠেলায় আমেরিকান পলিসির পক্ষে দাঁড়ানো ও ওকালতি তারা করুক এব্যাপারে ট্রাম্পই তেমন আগ্রহী না, গুরুত্ব দেয় না। সময়ে বেইজ্জতি করে দেয়। আর ভারতের বিরুদ্ধেও যে আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছে সেই প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খেটে ইজ্জত রক্ষা করা অসম্ভব। অর্থহীন এক দালালিতে পরিণত হয়েছে একাজ।  কিন্তু তা হলেও সেই ২০১৬ সালেও পিনাক রঞ্জনদের ডাটফাট ছিল আলাদা, খুবই আক্রমণাত্মকভাবে আমেরিকান ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে তারা চোটপাট করে যেতেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র-জোট সার্কের (SAARC) ২০১৬ সালে অক্টোবরের সম্মেলন ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম হয় ভারত। সেবারের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে। ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশও পাকিস্তানে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার পক্ষে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিল। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ রিপোর্ট ছিল, সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যাচ্ছে না বাংলাদেশসহ চার দেশ । সার্ক ভন্ডুল করার ক্ষেত্রে ভারতের সফলতা হিসাবে প্রথম আলো লিখেছিল, সার্কের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে।

ভারতের কূটনৈতিক লবিতে অবজারভার সদস্য আফগানিস্তানসহ চার রাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান) পাকিস্তানের সার্কের সম্মেলনে যেতে অপারগতা জানায়। আনন্দবাজার লিখেছিল ভারতের মনের গোপন কথাটা। অক্টোবর ২০১৬ তে লিখেছিল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লিভারতের অমিত বসু কালের কন্ঠে কলাম লিখে ছিলেন, “ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক সুতোয় ঝুলছে। ছিঁড়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়। দুই দেশের মৈত্রী উধাও”। শুধু তাই নয়, আবার কবে সার্ক সচল হবে, সেটাও অনিশ্চিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- তার জন্মজন্মান্তরের শত্রু পাকিস্তানকে একঘরে করা।

ইতোমধ্যে ১৯৯৭ সালে এক ‘বে অব বেঙ্গল উদ্যোগ’ হিসেবে এবং ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) নামে আর এক রাষ্ট্র জোট গঠন হয়েছিল। যেখানে পাকিস্তান ছাড়া সার্কের বাকি পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বাড়তি নতুন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এ দুই রাষ্ট্র, এভাবে মোট সাত রাষ্ট্র নিয়ে এটা গঠিত ছিল।

ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সার্কের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশনীতির পক্ষে ২০১৬ সালে প্রচারণার কাজ হাতে নেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল এ রকম- ‘সার্কের দিন শেষ’। ফলে পাকিস্তানও একঘরে হয়ে শেষ। এখন থেকে এর বদলে, এর জায়গায় এখন সবাইকে ‘বিমসটেক’ নিয়ে ভাবতে হবে। গত ৪ অক্টোবর ২০১৬ যুগান্তর লিখেছিল,  এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই।’

আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল এমন যে, এ ঘটনার প্রায় একই কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশের কিছু প্রো-গভর্নমেন্ট সাংবাদিক ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সফরসূচির অংশ হিসেবে তারা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জনের সাথে দেখা করেছিলেন। দেশে ফিরে ওসব সাংবাদিকরা পিনাক রঞ্জনের বরাতে বিরাট নিউজ করেছিলেন, ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন’। উপরে যুগান্তরের রিপোর্টের ঐ সাংবাদিকও ছিলেন ঐ সফরে। এছাড়া, ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে অনলাইন বিডিনিউজ২৪-এর রিপোর্টের শিরোনাম দেখতে পারেন। বিডিনিউজের রিপোর্টারও ছিলেন ঐ ভারত সফরে। আর তাতে মূল খবরটি ছিল এভাবে- ‘সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক।’

তাহলে এতক্ষণের সার কথা হল, গত ২০১৬ সালেই সার্কের “কবর দিতে” বা “ভুলিতে দিতে” ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। এবং এর পালটা হিসাবে ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) কে হাজির করার সিদ্ধান্ত সকলকে প্রকাশ্যেই ভারত জানিয়েছিল।

কিন্তু, আসলে সবই ভাগ্যের পরিহাস। নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটাই প্রমাণিত হলো। সার্ক প্রসঙ্গে ভারতের ঘৃণা ও প্রচারণায় এই ফেলা থুথু এখন সেই ভারতকেই এখন ফিরে চাটতে হইতেছে।

কারণ, বেশি দিন লাগেনি, প্রায় দেড় বছর না যেতেই গত ১০ জুলাই ২০১৮ ওই একই ওআরএফের সাইটে এবার আরেক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, ‘সার্ক কোমায়, চীন আর এক নতুন আঞ্চলিক জোট হাজির করেছে।’ [SAARC in coma, China throws another challenging regional initiative]। তার মানে এই রিপোর্ট এখানে সেই সার্কের প্রতি ভারত এখন কত সহানুভুতিশীল তাই দেখাতে চাইছে। একেবারে পুরা উল্টা-রথ।

যদিও এবারের রিপোর্টটা আর পিনাক রঞ্জনের করা নয়, করেছেন আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি’। আর এখানে এবার বিশেষ করে লক্ষণীয় হল, দেড় বছর আগে যে ওআরএফ একই ‘সার্ক’ এবং সাথে পাকিস্তানের ‘ডুবে যাক’ চাচ্ছিল, সবারই ‘ভুলে যাওয়া’ চাচ্ছিল; এবার সেই একই সার্কের পক্ষে ওআরএফের দরদ ও প্রীতি ঝরে পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ ভারতের এখন বিপরীত মুডে, সার্কের পক্ষে ভারতের প্রীতি এখন উপচানো। সত্যি এ’এক বড়ই আজব ঘটনা! ভারতের এই উল্টো যাত্রা কেন? ঘটনা কী?

ঘটনা হল, গত মাসে চীনের গুয়াংজুতে চীনা উদ্যোগে এক আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। জোটের নাম চীন-দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা ফোরাম, [China-South Asia Cooperation Forum] (CSACF)। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আগের সার্ক আর সাথে উদ্যোক্তা চীন। দক্ষিণ এশিয়া রাষ্ট্র জোটের সাথে চীনের সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম এটা। অর্থাৎ এটা মূলত (সেই ভারত-পাকিস্তানসহ) সার্ক প্লাস চীনের জোট।

এখন তাহলে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা সংক্ষেপে ওআরএফের আগে কি আগে স্বীকার ও ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল না যে, ২০১৬ সালে ‘সার্ককে ডুবিয়ে দেয়ার পক্ষে’ ভারতের যে বিদেশনীতি ছিল আর যেটা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন প্রশংসা ও সমর্থন করেছিলেন, সেটা থেকে এখনকার ওআরএফ সরে এসেছে? এবং কেন এই সরে আসা, সে ব্যাখ্যাই বা কী? নাকি ওআরএফ এর আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি এখনো জানেনই না যে, পিনাক রঞ্জন এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালে এমন একটি অবস্থান ছিল?

তবে এটা হওয়াও অসম্ভব নয়, এখন নতুন চীনা উদ্যোগে আগের ‘সার্ক +’ জোট একটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দেখে রাতারাতি ভোল বদলে ওআরএফ এখন সার্কের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অবস্থান নিচ্ছে? অর্থাৎ এই সহানুভূতিও ফাঁপা, ওআরএফের দরকার চীনের বিরুদ্ধে খোঁড়া হলেও একটি যুক্তি (নিজের স্ববিরোধিতা প্রকাশ হয়ে গেলেও তা) হাজির করা। কিন্তু তাতেও, প্রশ্ন আরো আছে।

কারণ, ওআরএফ এবার নিজেই জানাচ্ছে, চীনে এই সম্মেলনের খবর ভারতে খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। (এমনকি বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় এসেছে চোখে পড়েনি, অথচ বাংলাদেশের প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিল।) কিন্তু ভারতে প্রচার হয়নি কেন?

এছাড়া, আরো বেশ কিছু সিরিয়াস ‘কেন’ প্রশ্ন আছে?
কারণ, ওআরএফ ছদ্ম সার্ক-দরদি সেজে এক খোঁচামারা মন্তব্য করে বলেছে, “চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরাম কি আসলে চীনের বেল্ট রোডেরই এক সহযোগী উদ্যোগ, যার ভেতর দিয়ে সার্কের মৃত্যুঘণ্টা বাজবে?” [The parallel, yet unasked question, either at or outside the CSACF venue, was if the new Chinese initiative, alongside the more-visible Belt and Road Initiative (BRI) could ring the death-knell for the South Asian Association for Regional Cooperation (SAARC), where it had failed to go beyond the ‘Observer’ status, to obtain full membership.]

ওআরএফের এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেন সার্কের মৃত্যু হলে ভারতের জান চলে যাবে। এতই পতিপ্রাণা, অথচ কারপেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা কথাটা হল,  ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়ে ভারত আগেই সার্কের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। আর এখন দরদি সাজছে। কুমিরের চোখে যেন জল।

এ ছাড়া, আরেকটা খোঁচা দিয়ে ওআরএফ বলছে যে, সার্ক থেকে চীনকে কখনোই অবজারভারের বেশি মর্যাদা ভারত দিয়ে দেয়নি। আর যেন তা ভারতের বিরাট সাফল্য ছিল? এতে পরিষ্কার যে, ভারত কখন কী চেয়ে কী করে আর তাতে লক্ষ্যই বা কী- এসবের পেছনে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করার কোনো পরিকল্পনাই থাকে না।

এবারের চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরামের সভায় খুব ভালোভাবেই ভারতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। প্রতিনিধিত্ব করেছেন গুয়াংজুতে ভারতের কনসাল জেনারেল সাইলাস থাংগেল (Sailas Thangal)। ভারতের প্রতিনিধি ওই সভায় এই জোট উদ্যোগকে বহুল প্রশংসা করেছেন, বলেছেন এই উদ্যোগ এ অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে হাজির করবে। [Praising Beijing’s initiative, Indian Consul General in Guangzhou, Sailas Thangal said the CSACF boasts of the world’s biggest market. But the region also boasts of being home to millions of poor people.] শ্রীলঙ্কার এক অনলাইন পত্রিকা দ্য আইল্যান্ড এই খবর দিয়েছে। এ ছাড়া, চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক ডিরেক্টর জেনারেল লি জিমিংয়ের বরাতে আইল্যান্ড লিখেছে, ‘CSACF’ ফোরাম আসলে বেল্ট রোড উদ্যোগেরই অংশ, যেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে চীনের ভৌগোলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গাঢ় করবে।’ [He declared that the CSACF was a part of the BRI, “which is expected to bring together South Asian countries that share a geographical vicinity and cultural affinity with China” ]

মজার কথা হলো এসব খবর ওআরএফ নিজেই নিজের রিপোর্টে লিখে জানাচ্ছে। তাহলে এর মানে কি এই এক ফাইন মর্নিংয়ে আমরা উল্টো প্রশ্নের সম্মুখীন হব যে, ভারত তখন উল্টো আমাদের জিজ্ঞেস করবে, ভারত কবে চীনা বেল্ট রোড উদ্যোগের বিরোধী ছিল?

এসব কারবার দেখে মনে হয় থিংকট্যাংক, রিসার্চ, পলিসি ইত্যাদি এসব শব্দ এসব ব্যক্তি এখনো গুরুত্বের সাথে নেয়নি। যথার্থ ওজন বুঝে ব্যবহার করে না। আসলে নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটা তাদের বোঝানোর কেউ নেই।

তবে তামাশার কথাটা হল, ভারত চীনা উদ্যোগের এর CSACF সভায় ঠিকই পাকিস্তানের সাথে ও পাশে বসতে পেরেছে। বস্তুত CSACF  ফোরামটা হল আগেরই সার্ক + চীন। তাহলে, সার্ককে চলতেই না দিলেও এবার চীনা দাবড়ে এই ফোরামে ঠিকই পাকিস্তানের পাশে অবলীলায় বসতে পারছে ভারত! আসলে ভারত হল শক্তের ভক্ত, তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৪ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সার্ক দরদের স্বরূপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

গৌতম দাস
০৫ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ry

 

 

চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ব্যাপারটাকে সম্ভবত এভাবে বলা যায় যে, চীন ও ভারতের সম্পর্ক যেটা এত দিন ভাসতে ভাসতে ক্রমেই বড় দূরত্বে এবং বিচ্ছিন্ন ও সঙ্ঘাতপূর্ণ পথ ধরছিল; তা হঠাৎ করেই এবার উল্টো এক পথ তালাশ করতে নেমেছে। সেটা হল, পরস্পর কাছে আসার উত্তম পথ কী হতে পারে তা দ্রুত খুঁজে বের করা। ব্যাপারটা যেন উভয়ে মিলে স্থায়ী ও শক্ত কোনো ভিতের ঠিকানা খুঁজে ফেরা। কারণ, তারা তাদের সম্পর্ককে এবার স্থায়ী ভিতের উপর ও ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড় করাতে অধীর হয়ে পড়েছে। গত মাসে ৩ এপ্রিল “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা- সেই বিউগল বেজে গেছে” শিরোনামে আমার লেখায় এই পরিবর্তন শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যে অবস্থায় ছিল, এর সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে; ভারতের ভাষায় এটা ‘রিসেট’ (reset) হয়ে গেছে। এটা হতে অবশ্য ১৬ বছর লাগল।

কিন্তু দূরত্ব ও সঙ্ঘাতের পথ হঠাৎ ত্যাগ করে চীন ও ভারতের সম্পর্ক উল্টো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ কেন, এর পেছনের কারণ কী? তা সবাই তা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলেও সে কারণটি হল – মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করা। আমেরিকার সেই মূল বাণিজ্য লড়াই চীনের সাথে হলেও, তা ভারতের বিরুদ্ধেও পরিচালিত। এত দিন আমেরিকার কাছ থেকে এক ‘বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা’ বা ‘চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার দেয়া ঘুষ’ প্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে ভারত নিজের সরকারি ভর্তুকি দেয়া পণ্য আমেরিকায় রফতানি করে চলেছিল। এ ‘বিশেষ’ সুযোগটাই ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের শুরুতে সবার আগে বাদ করে দিয়েছে। আর ঠিক ততোধিক বেগে ভারতের চীনমুখী রাস্তা খুঁজে বের করতে ঝাঁপিয়ে পড়া এখান থেকেই।

সম্ভাব্য এই ইউটার্ন বা উল্টো পথ যে ধরতে হতে পারে, তা ভারতের অজানা ছিল না, বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি; যেটা ট্রাম্প ২০১৭ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার সময় থেকেই বলতে শুরু করেছিলেন। কথাটির ব্যবহারিক অর্থ যদিও অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। গত আশির দশক থেকে, পণ্য বিনিময় (সেই সাথে পুঁজিও) দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে এক গ্লোবাল অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রবক্তা আমেরিকা নিজেই এখন রক্ষণশীল, সবার আগে নিজ পণ্যবাজার সংরক্ষণ করতে হবে – এই উল্টো লাইনে চলে যাওয়া। এটাই ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতির সারকথা।  ফলে ‘ফরেন পলিসি’ নামে আমেরিকার নামকরা এক ম্যাগাজিনের মতামত কলামে লেখা হয়েছে, ‘চীন-ভারতের কাছাকাছি আসতে চাইবার পেছনে একটা থার্ড পার্টি বা তৃতীয় পক্ষ আছে; যার নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। [But there’s an unacknowledged third party — U.S. President Donald Trump.] অর্থাৎ ট্রাম্পের নীতি এদের পরস্পরের কাছে আসতে বাধ্য করেছে।

তবে সম্ভাব্য এই পরিস্থিতির কিছু গ্রাউন্ডওয়ার্ক করে রেখেছিলেন এখনকার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে। এ বছর ৩০ জানুয়ারি তিনি নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। এর মাত্র তিন মাস আগে অক্টোবর ২০১৭ মাস পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রায় দুই বছর ধরে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত। মোদী ও তাঁর ‘খামাখা শক্ত লাইন’ পথের মুখ্য সঙ্গী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের অনুসৃত নীতির কারণে ভারত যখন ভুটানের ডোকলাম সঙ্কটে নাকানি-চুবানি খেয়ে আটকে যায়; তখন যারা যারা মোদিকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন; তাদের মূল লোক ধরা হয় সে সময়ের ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্করকে। আর ভারতের পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের মতে, [দেখুনঃ Who is Vijay Keshav Gokhale] জয়শঙ্করের সাথে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এই গোখলেও বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই সঙ্কটকালে সফট পাওয়ারের ব্যবহার করে সব কিছুকে স্বাভাবিক করতে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

জানুয়ারির শেষে পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে গোখলে চীন সফরে যান, যেখান থেকে বলা হয় চীন-ভারতের সম্পর্কের নতুন ধারার শুরু। আর এতে বিগত দুই মাসেই চীনের বাণিজ্যমন্ত্রীর ভারত সফর এবং ভারতের দিক থেকে তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর শেষ হয়েছে। এর শেষেই নেয়া হয়েছিল মোদির চীন সফরসূচি, ২৭-২৮ এপ্রিল। এই সফরের ফরম্যাট দেখলে আর কোথায় কোন পটভূমিতে মোদির এই সফর হয়েছে, তা বিচার করলে অনেক বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হবে।

মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে – মোদির এই ‘বিশেষ’ চীন সফর যেমন ভারতের দিক থেকে আশা করা হয়েছিল, সেভাবে শেষ হয়েছে। মে মাসের শুরুতে আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, মোদীর সফরে কী চীন-ভারত সম্পর্ক নতুন অগ্রগতি ও আকার পাবে? আমার জবাব ছিল, এটা আর পাবে কি না, সে পর্যায়ে নেই। বরং নতুন আকারে একটা বিরাট ‘ডিল’ হতে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। এখন কী কী বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়ে আর দেনা-পাওনার বিষয় সেটেল করে তা হবে, সেটাই নির্ধারণের কথাবার্তা চলছে। মোদীর চীন সফরের আগের সপ্তাহে ২২ এপ্রিল ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ চীনে গিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে মিটিংয়ে মোদীর সফরের বাকি খুঁটিনাটি সম্পন্ন করেন।

সেখান থেকে তারা দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য টেনে মোদী-শি’র সামিটকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু মোদী তার চীন সফরের শুরুতে একটা বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে মোদী বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি ও আমি এক গুচ্ছ দ্বিপক্ষীয় ও গ্লোবাল গুরুত্বের ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় করব। আমরা আমাদের প্রত্যেকের জাতীয় উন্নয়ন, বিশেষ করে চলতি ও আগামী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলব”। [“President Xi and I will exchange views on a range of issues of bilateral and global importance. We will discuss our respective visions and priorities for national development, particularly in the context of current and future international situation,” PM Modi said in a statement.]

এই দুই বাক্য অনেক ডিপ্লোমেটিক ভঙ্গি ও ভাষায় ভরপুর, সন্দেহ নেই। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘গ্লোবাল গুরুত্বের’ বিষয় তাদের আলোচনার ইস্যু – এই শব্দ দুটো। এ ছাড়া “চলতি ও আগামী বিশ্বপরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতের প্রসঙ্গ” টেনে কথা বলাও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব কথার অর্থ হল – মোদি বলতে চাইছেন,  ট্রাম্পের অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন ও নিজ বাজারে রক্ষণশীল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি চলতি গ্লোবালাইজড (দুনিয়াব্যাপী এক ব্যাপক পুঁজি ও পণ্যবিনিময় ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ায় সবার তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া) বিশ্ব- অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়াতে – এই অর্থে এই দুই রাষ্ট্রকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে ও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করেছে। কথা অবশ্যই সত্য, আর চীন ও ভারতের জনসংখ্যা মেলালে তা দুনিয়ার ৪০ শতাংশ, এ কথা স্মরণ করলে তা আরো ভালো বোঝা যায়। অনেক এক্সপার্ট মনে করেন, চীন-ভারতের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে যদি মোড় নেয়, তবে ৩০ বছর ধরে তা আগামী দুনিয়াকে আকার দেয়ার সামর্থ্য রাখে। [“The relationship between New Delhi and Beijing has the potential to shape the world for the next 30 years,” says political commentator Einar Tangen.]

আসলে এক কথায় বললে, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও (SCO) এর বৈঠকে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি চীন সফর করছেন, এ কথা কেবল এক উসিলা। প্রথমত, এটা ছিল এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক।  এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রধানদের কোন বৈঠক নয়। আর এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, আগামী ৯-১০ জুন চীনে এসসিও’র মূল বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, তারই প্রস্তুতি বৈঠক করা। তবে এবারের এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের এক বাড়তি অনুষঙ্গ ছিল। তা হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের আগে এসসিও সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের ২৩-২৪ এপ্রিল এক বৈঠকে বসা। আর এরপরেই এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের অফিসিয়াল সুচি ছিল ২৫-২৬ এপ্রিল। তাই, ভারতের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এর দিন কয়েক আগে ২২ এপ্রিল বেইজিংয়ে গিয়েই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঘোষণা করেন যে, চীনের য়ুহান শহরে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে ‘ঘরোয়া সামিট’ হবে। বিবিসি-বাংলার ভাষায় এই ঘোষণা ‘কূটনৈতিক মহলে ছিল রীতিমতো অভাবিত’। তাই ক্রিটিক্যালি দেখলে এসসিও’র কোনো বৈঠকের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রত্যক্ষ কোন লেনদেন ছিলই না। এমনকি মোদী এবং হোস্ট চীনের প্রেসিডেন্ট ছাড়া আর কোনো এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ঐ সময়কালে চীন সফরেই আসেন নাই।

দ্বিতীয়ত, য়ুহান (Wuhan) বাইরের মিডিয়ায় খুবই অপরিচিত এক শহর; যদিও চীনের ভেতরে এর আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ, য়ুহান হল,  মূলত মাও সে তুংয়ের ছুটি কাটানোর প্রিয় শহর। ফলে এটা এখন মাওয়ের স্মৃতিবাহী এক মিউজিয়ামের শহর। খরস্রোতা ইয়াংসি নদীর তীরে এই শহর, যে নদীতে অবসরে সাঁতার কাটতে ভালোবাসতেন মাও। আর সেখানে এক বিখ্যাত ‘ইস্ট লেক’ আছে, যার তীরে এক ভিলায় মোদি-শি’র থাকা ও বৈঠকের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই শীর্ষ সামিটের নাম দেখেছি আমরা “ঘরোয়া সামিট” বলে। ‘ঘরোয়া’ শব্দটি বিবিসি বাংলার করা বাংলা। মূল শব্দটি ইংরেজিতে ছিল ‘ইনফরমাল’। অর্থাৎ এখানে তারা যে যাই দু’জনে দু’জনকে বলবে তা আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান বলে বিবেচনা করা হবে না। ফলে এক ধরনের দায়শূন্যতার সুবিধা থাকবে এবং মনখুলে কথা বলা যাবে। শুধু তাই নয়, তারা দু’জন অনুবাদক ছাড়া কোনো সরকারি বা মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্ত্রী বা সহযোগীকে সাথে রাখার কথা ছিল না, নেনও নাই তাই সব অর্থেই এটা ‘ইনফরমাল’। কিন্তু ‘ইনফরমাল’ রাখা হল কেন?
কারণ, ইনফরমাল বলে ঘোষণা করে রাখলে আসল কথা সরাসরি তারা বলে নিতে পারেন – পারস্পরিক স্বার্থ, অসুবিধা, সুবিধা ইত্যাদি সব সেগুলো হয়ত ফরমাল সভায় কেউ কখনও বলবেন না, বলেন না। আর এখানকার কথা, মানে এর কোনো রেফারেন্স পরবর্তি কোনো আনুষ্ঠানিক সভায় উঠবেই না। তাহলে এখন আসি, সেখানে মোদি আসলে কী খুঁজতে গিয়েছেন?

মোদি বলতে চাইছেন, এখান থেকে তারা ‘চীন-ভারত সম্পর্কের এক পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন সম্ভাবনা বের করতে চাইছেন, যাতে তাদের নতুন স্ট্র্যাটেজিক নীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থ কী হতে পারে’ [Modi said he and Chinese President Xi Jinping will review the developments in Sino-Indian relations from a strategic and long-term perspective during a two-day informal summit at Wuhan in China from tomorrow.] সে সম্পর্কে উভয়েই পরিষ্কার হতে পারেন। এটা বিজনেস টুডে থেকে নেয়া।  এসব কারণে ভারতের ‘বিজনেস টুডে’ পত্রিকা এটাকে ‘হার্ট-টু-হার্ট সামিট’ নামে ডাকছে। এই বিজনেস টুডে ছাড়াম আমাদের প্রথম আলো বা বিবিসি বাংলা এবং ভারতের যতগুলো মিডিয়া এই সফরের রিপোর্ট কাভার করেছে, সবাই আসলে আন্দাজে হাতড়েছে যে, এই সামিটে আসলে কী হচ্ছে, কী হবে, কেন ইত্যাদি। এসব প্রসঙ্গে সবাই একেকটা মনগড়া ব্যাখ্যার কথা লিখেছেন। এমনকি ভারতের কথিত থিংকট্যাংকগুলো মিডিয়াকে আরও বিভ্রান্ত করেছে। যেমন, বিবিসি বাংলা কথিত এক চীন-বিশেষজ্ঞ অলকা আচারিয়ার বরাতে লিখেছে,  আচারিয়া বলেছেন, ” দুই দেশের সম্পর্ককে এখন যে আবার ‘রিসেট’ করার কথা বলা হচ্ছে, ডোকলাম সঙ্কটের তলানিই কিন্তু তাকে গতি দিয়েছে। আমার মতে, ডোকলাম দুই দেশের জন্যই ছিল একটা ওয়েকআপ কল। সম্পর্কটি যাতে আরো খারাপের দিকে না গড়ায়, দুই নেতাই সেই সুযোগ নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে”। এমন আন্দাজি কথা বলার মূল কারণ হল, ভারতের থিংকট্যাংক একাডেমিকরা আসলে একেকজন “আমেরিকান স্বার্থের চোখে”, মানে তাঁরা আমেরিকান স্বার্থের ‘চায়না কন্টেনমেন্টের ভেতরেই’ সব কিছুকে দেখতে অভ্যস্ত। তাই সত্যি কথাটা হল, ভারতের এসব ‘আমেরিকান চোখগুলো’রই সবার আগে ‘রিসেট’ দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একাডেমিক জগতের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল – এরা মারাত্মকভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল।

অপর দিকে মিডিয়া বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভবত আরো একটা কারণ আছে। তা রয়টারের এক ডিটেল রিপোর্ট। সেটা হলো, এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এক প্রস্তাব নেয়া হয়েছিল। তাতে ভারত ছাড়া এসসিও’র সব সদস্য রাষ্ট্রই চীনের OBOR প্রকল্পে নিজেদের অংশগ্রহণ ও সমর্থনের কথা জানিয়েছে। একারণে মোদি-শি’র বৈঠকের আগে রয়টারের ঐ রিপোর্টের শিরোনাম হলও, ‘OBOR প্রকল্পে চীন ভারতের সমর্থন জোগাড়ে ব্যর্থ হয়েছে।’ [China fails to get Indian support for Belt and Road ahead of summit] কিন্তু সেটাই তো হওয়ার কথা। SCO এর ঐ বৈঠক তো ভারতকে মানানোর কোন বৈঠক ছিল না। বরং SCO এর যেকোন বৈঠকের বাইরে মোদী-শি’র ওই শীর্ষ বৈঠকে, ভারতের সাথে চীনের সামগ্রিক সম্পর্কের বিষয়ই ছিল মোদি-শি’র ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। তাই কেউ যদি SCO এর কোন বৈঠকের ভিতর চীনের ‘আকাঙ্ক্ষা’ আগে থেকেই ছিল, এ কথা সামনে ঝুলিয়ে দেন  এর তো কোন মানে হয় না। একারনেই, এমন রিপোর্ট অর্থপূর্ণ। চীনের (এবং ভারতেরও) সব আকাঙ্খার মূল জায়গা এসসিও’র কোনো সভা নয়, বরং মোদি-শি’র শীর্ষ ঘরোয়া বৈঠক। তাই রয়টারের রিপোর্ট মোদি-শি’র শীর্ষ বৈঠককে প্রধান গুরুত্ব না দেয়ায় এই বিভ্রান্তি।

এখন তাহলে, শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে কী করা হবে, মানে, তা প্রকাশিত হবে কোথায়? কীভাবে? সেটাও নির্ধারিত। আগেই বলেছি, এসসিও’র সভা আসলে মোদি-শি’র শীর্ষ ইনফরমাল বৈঠক ঘটানোর ক্ষেত্রে এক উসিলা মাত্র। তাই সেই বৈঠকের ফলাফল প্রকাশের নির্ধারিত স্থান হল, পরবর্তিতে আগামি জুন মাসে আবার এসসিও’র শীর্ষ বৈঠক আছে চীনেই; সেই সময় তবে আলাদা করে সভা করে তা তুলে ধরা বা মূল্যায়নের সমাপ্তি টানা হবে। সম্ভবত এসসিও’র সম্মেলন শুরুর আগে বা পরের অবশ্যই কোনো আলাদা সময়ে মোদী-শি’র আবার কোন শীর্ষ বৈঠক থেকে তা প্রকাশ করা হবে। তত দিন আরো দৌড়ঝাঁপ আমাদের দেখতে হবে।

সবশেষে, ভারতের সম্পর্কের প্রভাব ও ভূমিকা বাংলাদেশে কী হতে পারে? প্রথমত, সহসাই এর কোনো প্রভাব আমরা কোথাও পড়তে দেখব না। এমনকি মোদী-শি’র শীর্ষ বৈঠকের ফলাফলে চীন-ভারত সবচেয়ে কাছাকাছি চলে এলেও এখন সহসাই কোন প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ চীনের প্রভাব বলয়ে যেন না যায়, সেটা তো বটেই, এমনকি বাংলাদেশে যেন চীনা বিনিয়োগ না ঢুকে – ভারতের এখনকার এই অবস্থানই বজায় থাকবে। তবে হয়ত অনেক দীর্ঘ সময় পরে কখনো তা বদলাতে পারে। এ ছাড়া, বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর তাৎক্ষণিক কারণ নেই। এছাড়াও, গত সপ্তাহে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণচুক্তি (প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটা মনে রাখা যেতে পারে।

আসলে এখনও মুখ্য বিষয় হল – ভারত চীনের কাছ থেকে কী পাবে, মূলত এই প্রসঙ্গকে ঘিরে। এসব দিকের সুরাহা হলে এরপরে এশিয়ায় অন্য দেশে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গে যেমন বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে ভারতের আপত্তি বন্ধ হবে কি না, নাকি একই রকম থাকবে; হলে কিভাবে, কী শর্তে, সেসব প্রসঙ্গ উঠতে পারে। এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর কোন কারণ দেখা যাচ্ছে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

গৌতম দাস
২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার

https://wp.me/p1sCvy-2qc

ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন ও উল্লেখযোগ্য বাঁক নেয়া শুরু হয়েছে। একালে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধ বা স্বার্থসংঘাতের ধরন ও প্রকাশ কিছুটা নতুন। কারণ, এখন বিরোধ বা সংঘাত হয় ইস্যুভিত্তিক; মানে একেক ইস্যুতে একেক রকম। অর্থাৎ এক ইস্যুতে চরম বিরোধে সামরিক সংঘাত পর্যন্ত লাগার অবস্থা, অথচ একই সময়ে আরেক ইস্যুতে গলাগলি সহযোগিতা অথবা আধা সহযোগিতা, কিংবা নিউট্রাল অথবা সুপ্ত বিরোধে আগানো ইত্যাদি নানা রূপ এখন দেখা যায়। অবশ্য এর কোনো কোনোটা দীর্ঘ সময় বা স্থায়ীভাবে মুখ্য বিরোধের বিষয় হয়ে থাকে।

ভারতের পিঠে হাত রেখে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment) পলিসি, একটা ভিত্তি প্রস্তুত করা অর্থে শুরু হয়েছিল মোটা দাগে ২০০৫ সাল থেকে বুশের আমলে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার দুই টার্মের সময়ে সেটা আরো পোক্ত হয়েছিল, অ্যাকশনে গিয়েছিল। আর সেটাই ট্রাম্পের আমলে এঁটে বসা পলিসি হিসেবে এখনো আছে, তবে প্রশাসনের রুটিন গাইডলাইনের মত। মানে অতিরিক্ত বা নতুন কোনো মাত্রা তাতে যোগ হয়নি। তবে ট্রাম্পের অর্থনীতি্তের বৈশিষ্টে – বাজারে কাজ সৃষ্টি, হাতছাড়া হওয়া কাজ ফেরানো অথবা  ‘আমেরিকা ফাস্ট’ ধরনের যেসব কথিত ‘দেশী জোশের’ (অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন) কর্মসূচি আছে তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক। বিশেষ করে আইটি খাতে ভারত বাজার ও চাকরি হারিয়েছে; কিন্তু তা নিয়ে ট্রাম্প কোনো দয়ামায়া দেখাননি, বিকল্প কিছু দিয়ে ক্ষতিপুরণ করেননি । এমনিতেই আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিকে ভারতের দিক থেকে দেখা হয়েছিল এভাবে যে, এর আসল ঠেকা আমেরিকানদের। ফলে আমেরিকা ‘ভালো দাম ধরে দিলে’ তবেই ভারত এতে খেদমত করতে রাজি। ফলে ব্যাপারটা যেন এমন যে – আমেরিকা হল তোয়াজকারি কাজদাতা আর ভারত এক্সিকিউটর বা বাস্তবায়ক। ‘উপযুক্ত মূল্য দাও তো কাজ করে দেবো’ ধরণের এক সম্পর্ক। তবে আবার ভারতের অনুভূতি হল, আমেরিকাকে তার দরকার, গভীরভাবে দরকার। এটা তার অন্তরের অনুভব; অন্তত দু’টি প্রসঙ্গে। এক. আমেরিকা হলো ভারতের জন্য পারফেক্ট অস্ত্রের সরবরাহকারী বা উৎস। কারণ, ভারতের দৃষ্টিতে তার নিজের সমস্যা হচ্ছে, কখনো যদি কোনো সামরিক বিরোধে তাকে জড়াতে হয় তবে সম্ভাব্য সেই যুদ্ধের বিপক্ষ হিসেবে চীনকে দেখতে পায় সে। পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়ে ভারত দেখে চীনকে; কারণ, পাকিস্তান বিষয়টা ভারত নিজেই ম্যানেজ করতে পারবে বলে মনে করে। ওদিকে আবার চীন-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে আমদানি-রপ্তানি হয় মোট প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে ৯০ শতাংশই চীনা রফতানি। এছাড়াও ভারতে চীনা বিনিয়োগ আছে। কিন্তু তাই বলে, ভারতে চীনা অস্ত্র আমদানি এক অসম্ভব কল্পনা। আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হল, যে পাড়ায় আপনি থাকেন সেখানে সম্ভাব্য বিরোধের বিষয় থাকলে আপনি আগেই পাড়ার প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সালিস বৈঠকের সাধারণত মধ্যস্থতাকারী যে হয় তাঁর সাথে আগাম যোগাযোগ রাখা দরকার মনে করেন। ভারতের কাছে আমেরিকার গভীর প্রয়োজন মূলত এখানেই।

সম্প্রতি সম্ভবত ভারত মত ও নীতি বদলিয়েছে বা বদলাচ্ছে। মানে, আমেরিকা যেসব সুযোগ সুবিধা ভারতকে দেয়ার জন্য কমিটেড, যেসব বাড়তি বা ফাও সুবিধা ভারত পায়, সে বিষয়টি ভারত নতুন করে সম্ভবত মূল্যায়ন করেছে। অনুমান হলো, ভারত চেষ্টা করলে আরো বেশি মূল্য আদায় করতে পারে। ফলে সে আমেরিকার উদ্দেশ্যে নাক উঁচা করেছে।

ঘটনা শুরু হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের’ বার্ষিক সভায়। এ সভা মূলত অর্থনীতিতে গ্লোবালাইজেশনের ইস্যুতে সুবিধা-অসুবিধা বা বাধা নিয়ে এক ধরনের সমন্বয় সভা। ফলে এর মূল ফোকাস হল, গ্লোবালাইজেশন। ওদিকে, গত বছর ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে শপথ নেয়ার সময় থেকেই অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের ধারণায় তথাকথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী নীতির কথা বলতে শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের শুরুর দিকের এর সপক্ষে যে মূল নেতা ছিল সেই আমেরিকা এখন ট্রাম্পের আমলে এসে পারুক আর না-ই পারুক ‘উগ্র’ জাতিবাদী এবং নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী নীতির স্লোগান তুলেছিল। প্রতিবার এই ফোরামের সভা হয় জানুয়ারির শেষে, মানে গত বছরও তা হয়েছিল ট্রাম্পের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারির পরে; তবে তা হলেও ট্রাম্প গতবার এই সভায় নিজে যোগ দেননি। ফলে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ সারা ইউরোপ শান দিয়ে বসে ছিল ট্রাম্পকে ‘ধোলাই দিতে’, কিন্তু পারেনি। একটা জাতিবাদী ভিত্তিক গ্লোবাল অর্থনীতিকে গ্লোবালাইজেশনে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। কিন্তু একই গ্লোবে বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিগুলোকে একবার একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীলভাবে গড়ে তুলে এবং বাজার শেয়ারের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে সাজিয়ে দিয়ে ফেললে (যাকে আমরা গ্লোবালাইজেশন বলি) তাতে এভাবে ঢুকে যাওয়ার পরে তাকে ফিরিয়ে আবার আগের জায়গায় আনা কঠিন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। আমেরিকার উদ্যোগে সাড়া দিয়েই ইউরোপ একসাথে গ্লোবালাইজেশনের পথে এসেছিল। কারণ, গ্লোবালাইজেশনে একসাথেই যেতে হয়, একসাথে করার বিষয় এটা। এখন একা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী ও সংরক্ষণবাদী নীতি আওড়ানোর ফলে চীন ও ইউরোপের ক্ষোভ বেশি; এমনকি ভারতেরও। তাই এবারই প্রথম ট্রাম্পকে পাওয়ার পর তাকে কঠোর সমালোচনার সামনে পড়তে হয়। আর এবার মোদি সেখানে ছিলেন প্রথম বক্তা। তিনি নাম না ধরে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির কঠিন সমালোচনা করেছেন। [“Instead of globalization, the power of protectionism is putting its head up,” ] জলবায়ু-পরিবেশ ইস্যু থেকে দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যও আমেরিকার সমালোচনা করেন তিনি। এমনকি প্রটেকশনিজম (সংরক্ষণবাদ) ‘সন্ত্রাসবাদের মতোই ভয়ঙ্কর’ (as dangerous as terrorism) বলে এক বাণী দেন তিনি। আনন্দবাজার লিখেছে,  “ট্রাম্পের আমলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে ধাক্কা খাচ্ছে ভারত-সহ একাধিক দেশ”। এরপরে এমনকি টিট ফর টেট হিসাবে বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করার কথা, এভাবে ট্রাম্পও পালটা পাটকেল মারার কথা ভাবছে বলে ভারতের আর এক টিভি, এনডিটিভি জানাচ্ছে।  

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, এটা মূলত দুনিয়ার প্রভাবশালী সরকার এবং ব্যবসায় প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের মিলে এক ‘প্রাইভেট-পাবলিক জমায়েত’। ফলে সব দেশের সরকারপ্রধান প্রতিবার নিজে এ ফোরামে যান না। তবে কেউ নিজেকে ব্যবসাবান্ধব বা ব্যবসা-উপযোগী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটা একটা ভাল ফোরাম মনে করা হয়। এ বিচারে গতবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম গিয়েছিলেন। অনেকটা আমেরিকার কাছাকাছি গ্লোবাল লিডার হয়েছে চীন, যেন সেটা জানান দিতে। আর এবার মোদি গেলেন ভারত নেতা হয়েছে; না হলেও অনেক দূর এগিয়েছে, এটা জানাতে। কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠা এক ঘটনা হল, ভারতের ‘গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে দাঁড়ানো ও আমেরিকার সমালোচনাকে’ চীনের পররাষ্ট্র বিভাগের রেগুলার ব্রিফিংয়ে প্রকাশ্যে ও  সরাসরি প্রশংসা করা হয়। এমনকি চীনা পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের প্রথম পেজে মোদির ছবিসহ এ প্রসঙ্গে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ এ ইস্যুতে আমেরিকা হলো পুরনো নেতা; কিন্তু সূর্যের মতো ক্রমেই ডুবে যাওয়া বিরাট শক্তি। এর বিপরীতে চীন নতুন নেতা, ভারতও উদীয়মান। এ বিচারে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ভারতের অভিন্ন অবস্থান আকাঙ্খিত, এমনই হওয়ার কথা অন্তত ইকোনমিক ইস্যুতে। কিন্তু তা না হয়ে ভারত দুই নৌকায় পা দিয়ে গাছের আর তলার দুই দিকে খামচা দিয়ে খাচ্ছে; যেন দুনিয়ার কোনো কিছুতে তার দায় নেই। আবার ন্যূনতম ন্যায়নীতি বইবার মতো কাঁধই তার তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ তার কাছে এতই তুচ্ছ যে, তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে সে বেপরোয়া, কোনো কিছুতে যার কমিটমেন্ট নেই। আর ওদিকে চীন খামাখা ধর্মবিরোধিতা করে বেড়াচ্ছে আর মানুষের ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাকেই চীন আমল করার যোগ্য হয়নি বলে, আমাদের ধারণা দিচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক মুল্যবোধের বিষয়ে  গ্লোবাল অর্জনগুলো রক্ষার ও তা বয়ে নিবার জন্য অন্তত মুখে সমর্থন করার যোগ্য, দুনিয়ার আগামী সম্ভাব্য নেতৃত্ব এরা কেউ নয়। এমনই এক অবস্থায় সমগ্র দুনিয়া যেন ঝুলে আছে বা জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে।

এ দিকে আরেক ঘটনা হল – অস্থির সময়ে ‘পাগলা’ ট্রাম্পের আড়ালে আমেরিকার ড্রাইভিং সিটে ক্রমেই সাবেক আর সিটিং জেনারেলরা সংগঠিত হয়ে উঠছেন। ‘পাগলা’ ট্রাম্পকে সামনে রেখে কোর আমেরিকান স্বার্থ ধরে রাখা আর নানাভাবে দুনিয়ার নেতৃত্বে আমেরিকার টিকে থাকা এবং একে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। বুড়া ঘোড়াকে চাবকে আবার খাড়া করার চেষ্টা বলা যায় এটাকে। তেমনি এক ঘটনার ক্ষেত্র হল, থাইল্যান্ড। অর্থনৈতিক দিক থেকে থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে অগ্রসর এবং এর সেনাবাহিনী আমেরিকার হাতে তৈরি। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আমেরিকার সাথে উঠাবসা করে জন্ম নেয়া। স্থানীয় থাই এলিটদের পছন্দের গন্তব্য ইউরোপের কোনো শহর নয়, আমেরিকা। রাজধানী ব্যাঙ্কক, এর কালচারাল মডেল হচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু ওয়াশিংটনের আজকের দুরবস্থা দেখে সেই ব্যাঙ্কক আজ মুখ ফিরিয়েছে, তাদের সম্পর্ক ঢলে পড়া ও স্থবির হয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি ব্যাঙ্ককের সামরিক শাসনের ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছিল আমেরিকা, এটাও কারণ। সেই স্থবিরতা ঘুচাতে বহুদিন পরে আমেরিকান মেরিনের জয়েন্ট চিফ জেনারেল ডানফোর্ড ব্যাংকক হাজির হয়েছেন। উদ্দেশ্য, পুরনো সামরিক সম্পর্কসহ রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও চাঙ্গা করা। কিন্তু তিনি প্বরথমেই কথা শুরু করেছেন এভাবে বলে, ‘আমেরিকা কোনো পড়তি শক্তি নয়’ (not a declining power)। অর্থাৎ জেনারেলের মনে আসলে ভয় ঢুকেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। তবে বাস্তবতায় কে না ভয় পায়? ওবামাও ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ড সফরের সময় পাবলিক মিটিংয়ে বলেছিলেন, ‘দুনিয়াকে আমেরিকাই আরো বহুদিন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে, চিন্তার কিছু নেই।’

আর এক ঘটনা হল, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ভারত সফর করে গেলেন। যখন ট্র্রাম্পের আমেরিকা ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি (এটা আমেরিকা-ইরান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নয়, বরং পি৫+১; অর্থাৎ এর সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্য ও জার্মানি মিলে একত্রে করা চুক্তি, Nuclear Deal) বাতিল করে আবার কঠোর অবরোধ আরোপ করতে চাইছে। সেটা মূলত ইসরাইল ও সৌদি আরবের চাপ ও লবিতে। এর সারকথায় বলে দেখা যাচ্ছে, চীন ঠেকানো ইস্যুতে আমেরিকার দেয়া সুবিধা সব আদায় করে নিলেও ভারত ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনুসরণ করতে পারছে না। অবশ্য ইরান আবার চীনের সাথেও বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তবে তাতে ভারত অথবা ইরান এদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়তে কারো কোন সমস্যা নেই। এর প্রধান কারণ হলো পাকিস্তানের বিকল্প হিসেবে, ইরান হয়ে আফগানিস্তান ঢোকার নতুন এক সড়ক-ট্রানজিট রুট তৈরি করেছে ওই জোট। আনুষ্ঠানিকভাবে এটা ভারত, পাকিস্তানসহ সাত রাষ্ট্রীয় ‘আশগাবাত চুক্তি’ নামে পরিচিত; আর আশগাবাত বা আশাকাবাদ (Ashgabat)  তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী এবং তা ইরানি সমুদ্রসীমায় চাবাহার নতুন পোর্টকে কেন্দ্র করে গড় উঠেছে। ফলে স্বভাবতই ইরান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট হাব’ হবে। বলা বাহুল্য এটা আমেরিকার জন্য অস্বস্তিকর।

এম ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তার ভাষায়, এটা ভারতের আমেরিকান নীতিকে অমান্য ও উপেক্ষা করা। শুধু এটুকুই নয়, ভারতের তৃতীয় তেল সরবরাহকারী দেশ এখন ইরান। এ ছাড়া পুতিনের রাশিয়ার এক কোম্পানি ইরান থেকে ইন্ডিয়া পর্যন্ত  এক গ্যাস পাইপলাইনের প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে। সব মিলিয়ে আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারত নতুন ‘অরবিট’ তৈরি করছে ও যোগ দিচ্ছে। তবে আমেরিকার জন্য ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক’ বিষয় এখানে আর একটা আছে; তা হলো- রাশিয়া, ইরান ও ইন্ডিয়া এরা মিলে তৈরি সব প্রকল্পে পরস্পরের দেনা-পাওনার মুদ্রা হিসাবে তা আমেরিকান ডলারে না করে নিজস্ব মুদ্রায় করবে। বলা বাহুল্য, এটা হবে আমেরিকার জন্য বিরাট ‘বড় ঘুষি’ খাওয়া।

আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ নীতিতে ভারতের আবদার মেটাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়েছে – এটাই হল মূল কথা। কিন্তু এ দিকে যত দিন যাচ্ছে, নানান ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থজোট যত তৈরি হচ্ছে তাতে আমেরিকার বা ভারতের স্বার্থ বেশির ভাগ সময় একই লাইনে মিলছে না বা থাকছে না। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ, আমেরিকান স্বার্থের মুখোমুখি বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যু। আমেরিকা মিয়ানমার সরকারকে জেনোসাইডের জন্য ধমকাচ্ছে আর ভারত মিয়ানমারের জেনোসাইডের পক্ষে সাফাই বয়ান দিচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারতের ও আমেরিকান স্বার্থ এক জায়গায় থাকছে না।

তবে এ কথা ঠিক, ভারতের ও আমেরিকার স্বার্থবিরোধ প্রকট হয়ে হাজির করার পেছনে কিছু অংশের অবদান ভারত;  আমেরিকার কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করার জন্য। এর অর্থ, এখানে আমেরিকানদের ঠেকা বেশি, তাই সেই সুযোগে ভারত বেশি মূল্য আদায় করতে চাইছে। আর বাকি অংশ আমেরিকা বা ভারত না চাইলেও সেসব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ বিরোধী হয়ে উঠে আসছে, সেটা মৌলিকভাবেই পরস্পরবিরোধী। এই স্বার্থবিরোধ কি তাহলে কোন চূড়ায় বা চরমে পৌঁছেছে? বিশেষ করে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলছেন, ‘টেররিজম নয়; আমাদের প্রধান হুমকি চীন ও রাশিয়া’। ফলে ভারত-আমেরিকান ‘সহযোগিতা’র বেলায় যে অভিন্ন জায়গা বের করা হয়েছিল তা কি এখন বন্ধ বা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে? তাহলে আমাদের কি মুক্তি মিলবে? এ দিকে সতর্ক চোখ রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]