রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2oJ

ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

গৌতম দাস

বৃহষ্পতিবার ২৭ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2f3

 

ঘটনার শুরু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলায়, যা ৯/১১ বলে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে বিশেষ ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেয় এবং তা নির্মূল করবার জন্য নতুন ধরণের যুদ্ধের সূচনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ‘আল কায়েদা’কে দায়ী করে। বুশের নেতৃত্বে আমেরিকা আল-কায়েদার রাজনীতি ও হামলা মোকাবিলার যে নীতি গ্রহণ করে তার বৈশিষ্টগুলো হলোঃ

১. খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় আল কায়েদা নির্মূলের যুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিশ্চান জগতের ক্রুসেড সাব্যস্ত করে লড়া।

২. “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়া, এই ডাকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে পক্ষে টানা। সবাইকে সতর্ক করা যে এটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সামিল হয়ে এই হামলা মোকাবিলা করার কমন লাইন হলো, ওয়ার অন টেরর।

৩.“হয় তুমি আমার পক্ষে নইলে তুমি আমার শত্রু” – এই নীতির ভিত্তিতে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নৌকায় উঠতে বাধ্য করা, ভূগোল জুড়ে এই বিভাজনের ভিত্তিতে নতুন এক অক্ষশক্তি তৈরি করা যার লক্ষ্য হচ্ছে যারা এই ক্রুসেডের পক্ষে নয় তাদের নির্মূল করা।

৪. এই যুদ্ধকে খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় ক্রুসেড বলে মনে করলেও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে আবার সেকুলারিজমের রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলে দাবি করা ও প্রচার চালানো। ক্রুসেডের মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশাবে তৈরি হওয়া এই সেকুলারিজমের সোজা মানে দাঁড়ালো, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়া। ইসলাম ডাকনামে যত রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রকাশ দুনিয়ায় আছে সবকিছুকেই শত্রুর কাতারে ফেলা। দুষমন জ্ঞান করে নির্মূল করা, ইত্যাদি।

 

যুদ্ধের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা
আমাদের নিশ্চয় স্মরণ হবে ৯/১১ হামলার সময় বাংলাদেশ ছিল একটা সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। তবুও তাকে আফগানিস্তান হামলায় বিমানের রিফুয়েলিং ও এয়ার স্পেস ব্যবহার করতে অনুমতি দিতে হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যুদ্ধ চাহিদা মেটানোর দায় কবুল করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত কোন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলেও এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লতিফুরকে নিতে হয়েছিল ।

একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশকে ওয়ার অন টেররের নৌকায় তুলে নেয়ার কাজটাতে একটা পজ দিতে হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ আগেই ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে কো্ন দল ক্ষমতায় আসে সেটা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসকে এটা মানতে হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যে, ওয়াশিংটনের পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস যে-লাইনে আগানোর পরিকল্পনা নেয় সেটা হলো, ইসলামের নাম-গন্ধ আছে এমন সব দল ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার কায়েম করা। নির্বাচিত বিএনপির জোটের সরকারকে ক্রুসেড নীতি্র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তা বাস্তবায়নের জনু উপযুক্ত মনে হয় নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মোকাবিলার একটা জাতীয় সরকার গঠিত হোক। তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ওয়ার অন টেররের নৌকায় উঠুক। প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার উদ্যোগ ছিল এটাই।

জোট সরকার ও মার্কিন যুদ্ধের অংশীদারিত্ব নেবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা
মোটা দাগে বললে, বিএনপি বাংলাদেশ সরকারকে বুশের নৌকায় ওঠানো এড়িয়ে যেতে পারে নাই। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ক্ষমতা শেয়ার আর ইসলামী রাজনীতির যাবতীয় প্রকাশগুলোকে শত্রু গণ্য করে একটা ভাগ তৈরির পলিসি জোট সরকার মানে নাই, এই দিকটা এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে আবার র‍্যাব গঠন, পশ্চিমের টার্গেট করা লোকদের ধরে নির্যাতন করে তথ্য আদায় ও তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ, ইত্যাদি কাজে জোট সরকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সহযোগী ভূমিকাই পালন করেছে। এককথায় রেনডিশনের কাজে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে বিশেষ সিকিউরিটি স্টেট আকারে সাজানো, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস ও পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলকে জোট সরকার মোটামুটি আস্থায় নিতে পেরেছিল। সেটাও সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। বেচারা বদরুদ্দোজার পদত্যাগ এসবেরই প্রতীকি প্রকাশ।

তখনকার মত পরিস্থিতি এভাবে থিতু হওয়াতে হাসিনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে হতাশ হাসিনা এই ঘটনার ভিতর থেকে পশ্চিমের চাহিদাটা ভাল করে বুঝেছিলেন। এই চাহিদা হবহু পূরণ করে দিতে পারলে তিনি পশ্চিমের চোখে একচ্ছত্র প্রার্থী হতে পারেন – এই সম্ভাবনার কথা ভেবে পরবর্তীতে তিনি এই লাইনেই রাজনীতি করবেন বলে মনস্থ করেন। শেখ হাসিনা পশ্চিমের ওয়ার অন টেররের চাহিদা বুঝে তাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের দিকে পা বাড়ান। সিদ্ধান্ত নেন এই চাহিদা মোতাবেক নিজে ও দলকে ঢেলে সাজাবেন। সে মোতাবেক রাজনৈতিক কৌশল তৈরিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির চেয়ে নিজেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি আন্তরিক ও উপযুক্ত খেদমতগার হিশাবে পশ্চিমের বাজারে হাজির করা। এই কাজের জন্য তিনিই একমাত্র ক্যান্ডিডেড হিসাবে নিজেকে বিক্রির কাজটা করতে পারা। ওয়ার অন টেররের উপযুক্ত সৈনিক হিশাবে আমেরিকান সমর্থন যোগাড় করা তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। এই লক্ষ্যকেই ধ্যানজ্ঞান করে ২০০২ সাল থেকে শেখ হাসিনা কাজ করে গেছেন।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশল, লোকাল এজেন্ডা
নিজের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ হাসিনার কৌশল হলো, ওয়ার অন টেররের আমেরিকান নৌকায় তিনি সদলবলেই উঠবেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এর নাম দিবেন “যুদ্ধাপরাধের বিচার”। আবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে তিনি একনিষ্ঠ – এই ভাব ধরে “স্বাধীনতার চেতনার” নামে নতুন এক রাজনীতি তিনি কায়েম করবেন। হাসিনার এই “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতির মানে হোল নিজের বাইরের আর সব রাজনীতি, চিন্তা, তৎপরতার যা কিছু বাংলাদেশে আছে তাকে নির্মূল করবার পথে অগ্রসর হওয়া। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের যে দাবি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গুমরে মরছিল, তাকে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়নের অধীনে এনে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের বীজ তিনি বপন করলেন তার কুফল শাহবাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে পড়ল। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে পারে নি, তাদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যারা করেছিল তাদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। সুষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া মেনে ও দেশে বিদেশে সকলের কাছে বৈচারিক নীতির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য একটি বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুষিয়ে রাখা এই দাবি মেটানোই ছিল সঠিক পথ। শেখ হাসিনা সেই পথে অগ্রসর হন নি।

ওয়ার অন টেররের ছাতার নীচে পপুলার এক উন্মত্ততা (ফ্যাসিজম) তৈরি করে কঠোরভাবে তার নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও নির্মূল করবার পথে তিনি গেলেন। ‘নির্মূল’ করাটা আক্ষরিক অর্থেই, অর্থাৎ ফিজিক্যালি বা শারিরীক ভাবে নির্মূল করা। এছাড়া হাসিনা যেভাবে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বুঝেছেন, তিনি চেয়েছেন চেতনার জয়গান। তার গান গাওয়াই হবে বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। খাঁটি বাঙালি তারাই যারা তার চেতনা ধারণ করে। শেখ হাসিনার “স্বাধীনতার চেতনায়” সওয়ার হয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোও বাঙালির খাঁটি চেতনা পয়দা করবার কাজে নেমে পড়ল। এই খাঁটি চেতনা, খাঁটি ইতিহাস, খাঁটি বাঙালি ধারণা, খাঁটি বাঙালি (পাঠ্য পুস্তকসহ) বই পুস্তক ছাড়া বাকি সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক উন্মাদনা তিনি আনলেন। নিজের এই খাঁটি বাঙালিত্ব বাদে আর সমস্ত চিন্তাকে রাজাকারি বা রাজাকারের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগিয়ে নির্মুল করবেন। একেই আমরা “বাঙালী জাতীয়তাবাদের” উগ্রতার চরম ও ৭১ এর পরের নব উত্থান এবং একই সাথে শেষ পর্যায় বলতে পারি। যারা গত পাঁচ-ছয় বছরের বাংলা ব্লগ ট্রেন্ড খেয়াল করেছেন তারা ভাল বুঝবেন এই নব উত্থিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ আক্ষরিক অর্থে তার প্রতিপক্ষকে ফিজিকালি নির্মূল করবার আকাংখা কিভাবে চর্চা করেছে। এই নির্মূলের আকাংখার তাগিদেই তাদের কদম কদম বাড়বৃদ্ধি হয়েছে। সেতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তচিন্তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে। এই উন্মাদনায় ধর্ম বা ইসলাম আমাদের সব চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান শত্রু এই ধারণা ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে আবার শুরু হয় আস্তিক-নাস্তিক ইত্যাদি নানান বিতর্কের ঝড়।

এতটুকু তাও সহনীয় ছিল। সব সমাজে নাস্তিকতা থাকে,আমাদের সমাজেও অনেকদিন থেকে আছে। কিন্তু এবারের আক্ষরিক অর্থে বিনাশ বা শারিরীক ভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মুলের আকাঙ্খা এতোই উন্মত্ত ছিল যে আস্তিক-নাস্তিক ঝগড়া সহজেই ইসলামের আখেরি নবীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চর্চার নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কারণ এই রাজনীতির অনুমান হচ্ছে লাখ দুয়েক রাজাকার ও রাজাকারের সহযোগী বলে যাদের ট্যাগ লাগানো হবে তাদের সবাইকে নির্মূল করে দিলে “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতিকে একচ্ছত্র করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয় নিশ্চিত করা যাবে। এই নির্মূল পরিকল্পনা আক্ষরিক অর্থেই এক ক্লিনজিং অপারেশানের মতো, এই ধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক ভাবে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবার এটাই উপযুক্ত পথ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রেখে এই যুদ্ধ চালাবার এটাই মোক্ষম সময়। দ্বিতীয় পজন্মের মুক্তিযুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এভাবেই বিশুদ্ধ এক বাঙালির বাংলাদেশ কায়েম করতে হবে। আরেকবার রক্তে স্নান করে একাত্তরের যুদ্ধের দায় মুক্তি ঘটবে।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশলের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি
কিন্তু হাসিনার এই নতুন যুদ্ধবাজ রাজনীতির বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা আছে।

১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বড় জোর একটা ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার হতে পারে। এটাকে ওয়ার অন টেরর বা পশ্চিমের চোখে সন্ত্রাস দমনের কাজ হিসাবে কতটুকু হাজির করা সম্ভব যাতে পশ্চিমারা আগ্রহী হবেন?

২. জামাত একটা সংবিধান মেনে চলা দল, যারা কনস্টিটিউশনাল রাজনীতি করে। পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা মানে এবং সেখানে অংশ গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য তা বিশ্বাসও করে। এমন একটি লিবারাল নির্বাচনমুখী ইসলামী দলকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাস্তবেও এটা সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন তৈরির দল। বাংলাদেশের শ্রেণি-গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশেরই আশা আকাঙ্খার দল। শেখ হাসিনা একে একটা ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসাবে হাজির করবেন কি করে? জামাত যতটুকু ত্রাস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তা অন্য দুই প্রধান পার্লামেন্টারী দল আওয়ামী বা বিএনপির চাপাতি, পিস্তল বা কাটা রাইফেলের ত্রাস সৃষ্টি করতে পারার মতই। কিন্তু একটা পার্লামেন্টারী রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী দল বলে হাজির করতে গেলে অন্ততপক্ষে তাকে নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠন বলে হাজির করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। যে দল ভোট চাইতে জনগণের কাছে যায় তাকে একটা গোপন, সহিংস বা সশস্ত্র দল হিসাবে দেশে বিদেশে চেনানো কঠিন।

৩. বাংলাদেশে জামাতই একমাত্র ইসলামী দল নয় বা ইসলামী রাজনীতির একমাত্র প্রকাশ নয়। যারা আফগানিস্তান ফিরে এসেছে তারা কেউ জামাতের রাজনীতি করে না, কখনও করে নাই। বরং তারা আওয়ামী লীগ করে এমন নজিরই বরং আছে। আবার মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নয়। কিম্বা ইসলামি বিপ্লবও নয়। জামাতে ইসলামি ক্যাডার ভিত্তিক রেজিমেন্টেড সৎ চরিত্রের মানুষ গড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল। এই দিক থেকে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল ‘সুশীল’দের রাজনীতির। যারা জামাতে ইসলামির মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক চায়। মওলানা মওদুদি মনে করতেন ঈমানের দুর্বলতার জন্য রাষ্ট্রের সদর্থক উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায় । তার মানে আল্লাভীরু সৎ চরিত্রের লোকের রাষ্ট্রনায়কী নেতৃত্বের অভাবে। সমস্যাটা নৈতিকতার। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে তার চিন্তায় মধ্যে বিপুল ওসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতা আছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হচ্ছে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বহুদিক ইসলামী ঈমান আকিদা ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা করলেও শেষমেষ ‘আধুনিক রাষ্ট্রই কায়েম করতে চেয়েছেন। অথচ ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র কায়েম আদৌ ইসলামের লক্ষ্য হতে পারে কিনা সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিশাবে হাজির হয়েছে।

অন্যদিকে ‘৭২ সালের পর থেকে মওলানা মওদুদির নিজের চিন্তার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের পুরানা রাজনীতিতে তিনিই আর থাকেননি। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাকি ৭ বছর তার কেটেছে সৌদি আরবে। ইরানী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশে ইসলামের রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক আঁচ থেকে বাঁচানোর কাজটা সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। জামাতে ইসলামি সে কারনে সোদি রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণহয়ে ওঠে । সুন্নি বাংলাদেশে সৌদি রাজতন্ত্রকে সেই সার্ভিস আন্তরিকতার সঙ্গেই জামাত দিয়েছে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। মোগল আমল থেকেই সামাজিক সৌজন্য আকারে আমরা বিদায় বেলায় “খোদা হাফেজ” বলতে অভ্যস্ত। আমাদের বয়স্ক প্রজন্ম এখনও তাই বলেন। কিন্তু এখন এটা “আল্লাহ হাফেজ” হয়ে গেছে। কখন থেকে কিভাবে এটা ঘটে গেছে কেউ টের পাইনি।

কোন ধরণের রেডিক্যাল ইসলামী রাজনীতি জামাতের লক্ষ্য নয় সেটা ১৯৭৯ সালের পরের সময়কালে জামাতের ভুমিকা আরও সাক্ষ্য দেয়। রাজনৈতিক দল হিশাবে জামাতে ইসলামি কখনই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন ক্ষেত্রেই জালিমের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু ভূমিকার চর্চা করে নি, বরং সবসময়ই নিজের ভাবমূর্তি এভাবেই তৈরী করেছে যে কোন প্রকার বিপ্লবী ইসলামী রাজনীতি তার স্বার্থের বিরোধী। ইরানী বিপ্লব থেকে কেউ যেন কোন ইতিবাচক পাঠ না নেয় জামাত সেই কাজটাই সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিক ভাবে করে গিয়েছে। ইসলামী রাজনীতির পরিমণ্ডলে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামির সখ্যতা গভীর। এককথায় বললে বলতে হয় ইসলামের নামে কোন রাডিক্যাল রাজনীতি যেন বাংলাদেশে জেগে না ওঠে ও দানা বাঁধতে না পারে পাশ্চাত্যের পক্ষে জামাতে ইসলামি তারই খেদমতগারি করে গিয়েছে। এই ধরণের মিত্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের চোখে শত্রু প্রমাণ করা শেখ হসিনার জন্য কঠিন একটি কাজ।

টাইম বাউন্ডিং দুর্বলতা বা গ্লোবাল যুদ্ধ কৌশলে বদল
উপরে শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতির যেসব বড় দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বললাম সেগুলো স্থায়ী। কিন্তু আর এক বিশাল দুর্বলতার দিক আছে যাকে বলা যায় “টাইম বাউন্ডিং” বা সময় নির্ধারিত দুর্বলতা। মানে, কোন্‌ সময়ে তিনি তার রাজনীতিটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতিটার ২০০৭-৮ সালের আগে করতে সক্ষম হলে এক রকম হত, কিন্তু এর পরের যে কোন সময়ে করতে চাওয়াটা এক বিরাট বাধা। কেন? মুল কারণ ২০০৮ সালের পর খোদ আমেরিকাই আর বুশের নীতিতে থাকেনি। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট যুদ্ধনীতি বদলে ফেলেছে। এটা ২০০৮ সালে বুশের বদলে ওবামা জিতেছে বলে নয়। বুশের সম্মুখ সমরে ইসলাম মোকাবিলার নীতি তার ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরে নিজস্ব মুল্যায়ন রিপোর্টে ঐ নীতি অকেজো প্রমাণিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষের নাম লক্ষণ নাই বরং তা আফগানিস্তান বা ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর সবকিছুর উপরে যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের উপরে দাঁড়ানো বলে পরিণতিতে এটা একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা (২০০৭-৮) হিসাবে হাজির হয়।

এর ফলে বুশের সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে অল-রাউন্ড যুদ্ধ মোড় বদলাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধকৌশল মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক খুজে বের করার দিকে ধাবিত হয়, যার বাইরের নাম আরব স্প্রিং। ব্যাড মুসলিম আর গুড মুসলিমের ভাগাভাগি শুরু হয়। ওয়ার অন টেররের বাগাড়ম্বর স্তিমিত কিম্বা অবস্থা বিশেষে গায়েব হয়ে যায়। যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো আর বাড়ানো নয় বরং কত দ্রুত (২০১৪ সাল টার্গেট) সবগুলোকে গুটিয়ে নেয়া যায় – এটাই হয়ে যায় মার্কিন নীতি। কিন্তু হাসিনার স্থানীয় যুদ্ধকৌশল তো বুশের একরোখা ওয়ার অন টেররের উপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ইতমধ্যে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া হয়ে ওঠে ওবামা প্রশাসনের কাছে আগামি দিনের সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ আর সেকারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুকরাষ্ট্র কতোটা সমর্থন তা এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ওবামা আমলে আমেরিকার নতুন নীতি ও যুদ্ধকৌশলের সীমার ভিতরে হাসিনার নেয়া স্থানীয় ইসলাম নির্মূল কৌশল আনফিট ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ এই দিকটা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূল নীতির পালে হাওয়া লাগা অসম্ভব কিছু নয়। টাইম বাউন্ডিং বা সময় দ্বারা নির্ধারিত এই দুর্বলতার দিকটা বাদ রেখে হাসিনা তার দুর্বলতাগুলো কিভাবে কাটিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলোচনা এখন সেদিকে নেবো।

শেখহাসিনা-নির্মুল কমিটির পরিপূরক সম্পর্ক
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দুর্বলতাগুলো পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখেন শাহরিয়ার কবীর ও তার নির্মুলের রাজনীতি। এটাকে হাসিনার কৌশলের সাথে শাহরিয়ারের রাজনীতির পারফেক্ট ম্যাচ মেকিং বলা যায়। হাসিনার নতুন কৌশলটা শাহরিয়ার কবীরই সবচেয়ে পছন্দ করেছিলেন। সেই ২০০২ সাল থেকে নির্মুলের রাজনীতি প্রচার ও চর্চার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছিলেন তিনি। একাজে তিনি নতুন শত্রুর যে ভাগটা তৈরি করেন তা হলো, ব্রড হেডলাইনে ইসলাম আর তার প্রকাশ মানেই হলো জামাত। এভাবে তিনি কি করেছিলেন এবং কেন তা পেরেছিলেন এর তিনটা কারণ উল্লেখ করা যায়।

১. বাংলাদেশে আলকায়েদা বা তালেবানদের মত ইসলামী রাজনীতির সোল এজেন্ট, একমাত্র সম্ভাব্য দল হলো জামাত -এই মিথ্যা ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে তিনি একাজ করেছেন। এছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামাত মানেই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সকল ধারা ও প্রবণতার উৎপত্তি কারণ, উৎস ও প্রতীক। এভাবে বয়ান তৈরির সম্ভব হয়েছিল কারণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তো বটেই কমিউনিস্টরাও দুনিয়ায় বা বাংলাদেশের ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে কোনটার সাথে কোনটার মৌলিক রাজনৈতিক তফাত কি, কোন ইস্যুতে তাদের পার্থক্য, কোথায় তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক — এইসবের কোন খবর জানে না, রাখার দরকারও মনে করে না। বরং মনে করে মানুষের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ হলো ধর্ম, মানে ইসলাম। ফলে ধর্ম উৎখাত তাদের বিশাল রাজনৈতিক কর্তব্য। এই পরিস্থিতি শাহরিয়ারকে তার বয়ান তৈরি করতে সহায়তা করেছে।

২. ১৯৭১ সালে জামাতের রাজনীতি আর একালের তালেবান রাজনীতির কোন মিল থাকুক আর নাই থাকুক জামাতের ৭১ সালের ভুমিকাই হোল অকাট্য প্রমাণ যে জামাত তালেবানের মত একটা “সন্ত্রাসী” দল। জামাতের ৭১ এর ভুমিকা নিয়ে জনগনের মনে যে সেন্টিমেন্ট আছে তা কচলে ব্যবহার করে সাধারণভাবে সব ইসলামী রাজনীতিকে দানব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এই জবরদস্তি শাহরিয়ারের দরকার ।

৩. আফগান ফেরতদের দলগুলোর নানান তৎপরতা এবং জেএমবির স্বল্পকালীন উত্থান (২০০৫) এই ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবীরদের দারুণ কাজে লেগেছিল। শহুরে মধ্যবিত্তকে জঙ্গী ইসলামের নিশ্চিত আবির্ভাব সম্পরক্কে ভীত ও আতংকিত করা গেছে। জেএমবির উত্থান রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে অন্ধ অবস্থা তৈরী করেছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছিলে নির্মূলের রাজনীতি। জামাতের রাজনীতির সাথে জেএমবির রাজনীতির কোনই মিল নাই। কিন্তু মিল না থাকলেও মধ্যবিত্ত, সেকুলার,কমিউনিস্ট আর মিডিয়ার চোখে এদের জামাতি বলে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ঘটলো যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটা আর ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার থাকল না। বিচারের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকল না। বয়ানের পাটাতন একেবারে বদলে গিয়ে হয়ে দাড়ালো, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে সবকিছুরই নির্মুল, বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে ঝেড়ে মুঝে সাফ করে ফেলা। একাকার করা এই বয়ানে এক দড়িতে ফাঁসি হয়ে গেল “বিচার” আর ইসলামের।

এতে দ্বিতীয় আরেক বিপদ তৈরি হলো। ধরা যাক ঠিক বিচার নয়, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ আছে সেগুলোকেই মোকাবিলা করতে চান শাহরিয়ার ও তার নির্মুল কমিটি। তাতে একটু না হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার কথাটা ঢাল হিসাবেই ব্যবহারই তিনি করেছেন। এভাবেই যদি ধরি তো সেক্ষেত্রেও যে প্রশ্ন আমাদের ছাড়ে না তা হলো,ইসলাম নামে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশগুলোর মোকাবিলা কি নির্মূল বা ইসলাম ক্লিনজিং করে করা যায়, নাকি সম্ভব? অর্থাৎ কাজটা কি নির্মুল বা ক্লিনজিং -এর? যার যার মাথায় ইসলামী চিন্তা আছে এমন লোকদের এক এক করে ধরে মাথা কেটে ফেলার ব্যাপার ? মোটেই না। চিন্তার মোকাবিলা একমাত্র আরো অগ্রসর চিন্তা দিয়েই করা সম্ভব। নইলে তার পরাস্ত হবার কোন সম্ভবনাই নাই। । অর্থাৎ চিন্তা বা ভাবাদর্শগত ভাবে পরাস্ত করা এবং সেভাবে পরাস্ত করবার রাজনীতির মানে আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করা নয়। ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়া মানে মানুষের পুনর্গঠন আর পুনর্গঠিত সেই নারী ও পুরুষের নতুন সম্পর্ক রচনা — দুনিয়া থেকে পুরুষ নির্মূলের কর্মসুচী নয়। মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব সংঘাত শ্রেণীযুদ্ধ বটে কিন্তু কোনভাবেই এটা সমাজের মালিক অথবা শ্রমিক কাউকেই ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। বরং এটা সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্গঠনের যাতে সমাজে একদিকে পুঁজিপতি আর অন্যদিকে শ্রমিক উৎপাদন করতে না পারে। অর্থাৎ সামাজিক মানুষ যেন দুই বিবাদমান শ্রেণি হয়ে উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত না হয়, ইত্যাদি।

ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে অনেকের মনে হতে পারে বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষমতার জন্ম দিতে গেলে একটা যুদ্ধ তো হবেই, সেটা কি? সেটা আর যাই হোক কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং অপারেশান নয়। বিদ্যমান ক্ষমতাকে পরাস্ত করে নতুন ক্ষমতা কায়েমের জন্য যতোটুকু বলপ্রয়োগ লাগে ততোটুকুই। বৈপ্লবিক রূপান্তরে প্রাণের ক্ষয় ঘটে ঠিক, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়, নতুন ক্ষমতার জন্ম দেওয়া এবং নতুন আইন ও নীতিনৈতিকতার জন্ম দিয়ে নিজের নতুন ক্ষমতার বৈধতা ও ন্যায্যতা প্রমান করা। নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা যেন নতুন মানুষ তৈরী হতে পারে। কোনভাবেই সেটা ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। । এমন বাসনা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা কেউ একা বা দলবদ্ধভাবে তৈরি করা নয়। সমাজের সংস্কার বা বিপ্লব প্রতিহিংসার চর্চা হতে পারে না। জিঘাংসার আকাঙ্খা যে উন্মাদনা তৈরি করে বাস্তবে একা বা গোষ্ঠিসহ কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং করা মানেই হলো আরেকটি যুদ্ধাপরাধ ঘটানো।

সমাজে চিন্তা ও ভাবাদর্শগত লড়াইকে খুনোখুনি করে সস্তায় সেরে ফেলতে চেয়েছেন শাহরিয়ার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে হাসিনা আর নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার, মুনতাসির ইত্যাদিরা মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে গেছেন আর সমর্থকদের মনে সফল ভাবে ঢুকিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর ক্লিনজিং-এর আকাঙ্খা। নির্মূল বাসনার এক অসুস্থ উন্মত্ততা।

শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ারের এই যৌথ প্রকল্পের খবর অনেকেই রাখেননি। বলা বাহুল্য শেখ হাসিনার সাথে শাহরিয়ারের এই মহামিলন ও তাদের প্রজেক্টের অভিমুখ ও পরিণতি হলো হাসিনার কারজাই হওয়া। আর প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই এটা তালেবান রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা। ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে শাহরিয়ার আজীবন নির্মূলের মধ্যেই তার সমাধান দেখেছেন। তার সাফল্য হলো,এই উন্মাদনাকে তিনি বাংলাদেশের সমাজে একটা মানসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পেরেছেন। এখন বলে বুঝিয়ে এদের কাউকে বিরত করা যাবে মনে হয় না। কারণ এই উন্মাদনা চেপে বসেছে। তাদের অনুমানে দুলাখ ইসলামপন্থীদের নির্মূলের পথে নিয়া যাবার জন্য এরা তাদের মন ও সেকুলার জিঘাওংসাকে পুরাপুরি বেঁধে ফেলেছেন।

শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নির্মূল বাসনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটাচ্ছে সেটা বিচার করবার সাথে সাথে আমাদের কাছে একটা দিক পরিস্কার থাকতে হবে। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত একটি ইস্যু। বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ায় এর ফয়সালা না করলে নানান পেটি স্বার্থে এই জাতীয় ইস্যুটি সবসময় রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতেই থাকবে। যেমন শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর যেভাবে করছেন।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শাহরিয়ারের যুদ্ধ প্রস্তাব
তবু শেষ বিচারে হাসিনা আর শাহরিয়ারের রাজনৈতিক আকাঙ্খা কিন্তু এক নয়। শেখ হাসিনার আকাংখা ও পথ হোল যে-রাজনৈতিক লাইন বুকে ধরে তিনি গত দশ বছর এগিয়েছেন তা দিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার কাজে এই পথটাকে ব্যবহার করা। এই বিচারে শাহরিয়ার কিন্তু সৎ ও নির্মূলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর নিজের ভাষাতেও “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করতে চান। এজন্য তিনি VOA এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছে হস্তক্ষেপ সহায়তা চেয়েছেন। হাসিনা পশ্চিমের সমর্থনে একনিষ্ঠ “ওয়ার অন টেররের” একনিষ্ঠ খেদমতগার হয়ে বিনিময়ে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চান, নিজস্ব “স্বাধীনতার চেতনার” বাইরে থাকা বাকি সবাইকে মেরে কেটে সাফ করা যার লক্ষ্য, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আতাত ও আপোষ করতে বাধা নাই। । শাহরিয়ার চান একই “ওয়ার অন টেররের” খেদমতগার হওয়া, কিন্তু কোন আঁতাত বা আপোষ নয়। কারন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন তার উদ্দেশ্য নয়। বরং “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করবার কাজে একনিষ্ঠ থাকতে চান। এই কাজে তিনি শেখ হাসিনার ওপর পুরাপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। বরং সরাসরি আমেরিকার সমর্থন, লজিস্টিক , সৈন্য সব কিছুই চান। কোথায় তাদের মিল আর কোথায় পার্থক্য সেটা আমাদের বুঝতে হবে। একই সাথে শাহবাগের অংশ গ্রহণকারীরা যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে নিজেদের পৃথক দাবি করে, তারা শাহরিয়ারের নির্মূলের রাজনীতি ধারণ করে বলেই সে কথা বলে। ঠিক যে শাহবাগ শেখ হাসিনার আশু রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলিত থাকলেও শাহবাগের রাজনীতি শেখ হাসিনার রাজনীতি নয়। সেটা একান্তই শাহরিয়ার কবীরের নির্মূল বা ক্লিনজিং-এর রাজনীতি।

লক্ষ্য করার বিষয় ভয়েস অব আমেরিকার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার কিন্তু আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলছেন না। বলছেন ওয়ার অন টেররের খাঁটি লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন”। এটাই চান তিনি। বিষয়টা শাহরিয়ারের কাছে স্পষ্টতই এখন আর আদালত পাড়ার বিষয় নয়, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবার বিষোয়।। তাই তিনি প্রকাশ্যে সাক্ষ্যতকারে দাবি করছেন,“জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”। কিন্তু প্রশ্ন হোল এখন তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকারঙ্করে সবাইকে জানাচ্ছেন কেন? এতদিন আড়ালে যেভাবে চলছিল সেই পর্দা উঠিয়ে ফেলার কী দরকার ছিল।

কারণ শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ার – প্রতীকি নামের দুই রাজনৈতিক আকাঙ্খা হাত ধরাধরি করে চলতে থাকলেও তাদের উদ্দেশ্যে পার্থক্য ছিল। এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও এতদিন তাদের সহাবস্থানে অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এখন সেটা দিনকে দিন সেটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ারের নির্মূল ধারা মনে করছে হাসিনা যথেষ্ঠ কঠোর পথে যাচ্ছেন না। কি সেই কঠোর পথ? সুনির্দিষ্ট করে বললে, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে দানব হয়ে মাঠে নেমে পড়া, দাবড়ানো, খুনোখুনি। জিতি অথবা মরি জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে হাসিনা নির্বাহি ক্ষমতায় আছেন আর শাহরিয়ার আছেন একই নির্মূলের আদর্শে, চিন্তায় রাজনৈতিক লাইনে, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকার ঠেলা বা বিপদ শাহরিয়ারের বুঝের বাইরে। পোলাপান অনেক কিছুই আবদার করে। কিন্তু বাবাকে টাকা কামিয়ে, সেই কামানো অনুপাতে ব্যয় করতে হয়। তার পর আবদার কতক অংশ পুর্ণ করতে পারে কতক অংশ পারে না। পোলাপানের আবদারকে ভিত্তি মেনে বাবার চলা অসম্ভব। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার মানে ও পরিণতি কী সেটা না বুঝে শেখ হাসিনা পা ফেলতে পারেন না। বিশেষত সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার সায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আগে নিতে হবে। তা না নিয়ে লাঠি হাঁকাতে পারেন না তিনি। সন্ত্রাস দমন আইন দিয়ে ক্লিনজিংয়ে্র লাইনে ঝাপিয়ে পড়ার মানে শুধু পরিস্থিতি লেজে গোবরে করে ফেলা না, কিম্বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও না, বরং নিজের জান বাচানোও এতে সঙ্গীন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, লজিষ্টিক বা রসদের সরবরাহ পাওয়া না পাওয়ার কথা নাইবা তুললাম।

শেখ হাসিনাএখন একটা স্ববিরোধিতায় পড়েছেন। তিনি সচেতন ভাবে ক্লিনজিংয়ের ধারণা দিয়ে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠিকে তাতিয়েছেন। শুধু আওয়ামী পন্থী নয়, যারা আওয়ামী লীগ করে না সেকুলারিষ্ট, বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক, তরুণ ভোটার -ইত্যাদি সকলকে জিঘাংসার উন্মাদনায় শেখ হাসিনা উন্মত্ত করেছেন। তিনি এসব করেছেন এই উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ভাবে প্রবাহিত করে নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করার কাজে একে ব্যবহার করতে। অন্যদিকে শাহরিয়ার চাইছেন, উন্মাদনাকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মত্ত ব্যবহারে প্রয়োগ করতে, ক্লিনজিংয়ের কাজে লাগাতে। এজন্য তিনি পরিষ্কার করেই এখন বলছেন আদালতে কোন ‘বিচার’ এমনকি শাহবাগের মত ফাঁসিও না, একেবারে নির্মুল বা ক্লিনজিং করবার কাজ সম্পন্ন করতে চান তিনি। চান চিরতরে “জঙ্গি মৌলবাদ দমন”। একাজেই “আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”।

শাহরিয়ার কবীরের এই নির্মূল বাসনা আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যে তীব্র সংঘাত চলছে তার প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তাহ তিনেক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির এক টকশো তে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর প্রয়োগের পক্ষে আর বিপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুব। ওখানে মাহবুব বারবার আর্গু করছিলেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আর ব্যারিষ্টার আমিরুল ততই বারবার আর্গু করছিলেন সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ধরে নিতে পারি হাসিনা অন্তত বোঝেন “সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯” বাংলাদেশের হলেও আইনটা কার্যত আমেরিকার। আমেরিকার আগ্রহে ও ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি গাইড লাইন মেনে এটা তৈরি। এই আইন ব্যবহার করে নির্মুল বা ক্লিনজিং-এর পথে যেতে গেলে আমেরিকার আশির্বাদ লাগবে। কিন্তু শাহরিয়ার, মুনতাসির বা আমিরুল সেটা বেখবর। ফলে তারা বালখিল্য আচরণ করছেন। কান্নাকাটি করছেন, আমেরিকা কেন আফগানিস্তান বা ইরাকের মত বাংলাদেশেও একটা নতুন তালেবান মোকাবিলার ফ্রন্ট খুলছে না।

সন্ত্রাস দমন আইন এমন আইন যা কোথাও ব্যবহার করলে এর সব একটিভিটি রিপোর্ট আমেরিকাকে দিতে হয়। কেন? সেটা আমরা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ বুঝি সেই সহজ বোঝাবুঝি ছাড়াও আরও ভিন্ন দিক থেকে বোঝার ব্যাপার আছে। আমেরিকাকে না জানিয়ে হাসিনা যদি এই আইন একার বুদ্ধিতে ব্যবহার করে তবে সে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠবে। সেটা একটা তালেবান পরিস্থিতি তৈরি করবে, প্রথম চোটে যার অভিমুখ হবে এন্টি-আমেরিকান, বাংলাদেশের সব পশ্চিমা ইনষ্টলেশন এর টার্গেট হবে। অল-রাউন্ড একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট ওপেন করলে যেমন ঘটে। শুধু তাই নয়,এর উপচে পড়া প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশে না, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বার্মাসহ পুরা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের প্রতিদিনের আঞ্চলিক ঝগড়া দ্বন্দ্ব বিবাদ সবসময়ে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মায়ানমারে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিবাদ হিসাবে চলছে এগুলো সমন্বিত হবে আর তার নির্দিষ্ট অভিমুখ হবে পশ্চিমা-বিরোধী। স্থানীয় যে কোন বিরোধ এভাবে গ্লোবাল বিরোধ হয়ে হাজির হতে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য আত্মরক্ষামূলক ধরণের হলেও সেই সীমিত লক্ষ্যের নতুন ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতা তৈরি করে ফেলবে। ফলে সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ দেখতে বাংলাদেশের মনে হলেও এর প্রয়োগ ও পরিণতি শতভাগ আঞ্চলিক ও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। এদেশে যারা দুলাখ জামাত ও রাজাকারি ট্যাগ লাগানো লোক মেরে নির্মুলের মধ্যে ঘটনার সুখকর সমাপ্তি দেখছেন তাদের বেহুঁশ ও বালখিল্য বললে কম বলা হয়। আমেরিকার যুদ্ধ বালখিল্য ব্যাপার নয়। যদি তাই হোত তাহলে সারা দুনিয়ার উপর সাম্রাজ্যের ছড়ি ঘুরাতে পারত না। তাহলে কি শাহরিয়ারের লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন” কাজে আমেরিকাকে ডাকার চেষ্টাটা ভূয়া? এতে কিছু হবে না? কোন বিপদ নাই?

না ভূয়া বলছি না। বলতে পারলে ভাল লাগত। গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো,আওয়ামী লীগ, অ-আওয়ামী লীগার, সেকুলারিস্ট,বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক –সকলেই একপ্রকার জিঘাংসার উন্মাদনায় আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তাতানোর ফলাফল এটা। এটা পটেনশিয়াল ও খুবই বিপজ্জনক। যে কোন দিকে এর মোড় নেবার সম্ভাবনা আছে। হাসিনা একে তার নির্বাচনী বা ক্ষমতা লাভালাভের কাজের মধ্যে পরিণতি টানবার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। শাহবাগ নামে যা ফেটে বের হয়েছে। আবার শাহবাগের অনেকেই যেমন বলে শাহবাগের অভিমুখ একটা না, ভিতরে অনেক অভিমুখ আছে। এর ভিতরের একটা শক্ত অভিমুখকে চিনিয়ে দেই। যেমন ষ্টেজে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আছেন সবসময় ইমরানের পাশে। নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একই সাথে হাসিনা ও নির্মূল কমিটির প্রতীক। ওখানে যে আইকন বা ছবি তোলা হয়েছে সেটা “বঙ্গবন্ধুর” না, নির্মুল কমিটির জাহানারা ইমামের । বেঁচে থাকলে জাহানারা নির্মূলের রাজনীতি করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তার ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটির পটেনশিয়ালিটি নিশ্চয় নতুন করে বলবার কিছু নাই।

কোথায় নিয়ে যাবে এরা?
পটেনশিয়ালিটি – মানে কিছু ঘটিয়ে দেবার উন্মত্ততা। শেখ হাসিনা কিন্তু এখনো তৈরি হওয়া এই উন্মত্ততা দিয়ে কিছু ঘটিয়ে ফেলার পটেনশিয়াল নিস্তেজ করতে পারেন নি। ওদিকে শাহরিয়ার, মুনতাসির বা ব্যারিস্টার আমিরুলের নির্মুলের রাজনৈতিক আকাঙ্খা জীবিত আছে, সরব হচ্ছে। হাসিনার টালবাহানা দেখে শাহরিয়ার সরাসরি আমেরিকার কাছে আহ্বান নিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে নির্মুল কমিটির ধারাটাই উন্মত্ততার উপযুক্ত ও কার্যকর ক্যারিয়ার হতে পারে। এই হোল পটেনশিয়াল বিপদ তৈরি হয়ে থাকার দিক। ওদিকে আমেরিকাও বাংলাদেশে কোন নতুন ফ্রন্ট খোলার কোন তাগিদ দেখাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও অর্থ খরচের সামর্থ হারাচ্ছে তারা। অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উন্মত্ততার লাইন প্রথম ঝাপ্টায় ইতোমধ্যে দেড়শ লোক মেরে ফেলেছে, কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। প্রথম দফার রক্তারক্তির পর উভয় পক্ষই সমাজকে স্ব স্ব পক্ষে নতুন শক্তি ও শ্রেণি বিন্যাস তৈরির জন্য সময় নিচ্ছে। কোন পক্ষই টোন ডাউন করবে এমন বাস্তবতা নাই। কিছু ঘটাবার সক্ষমতা উভয় পক্ষেই আছে। এটাই অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা আর অনিচ্ছুক আমেরিকাকে যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতায় টেনে নিতে পারে। একটা লোকাল ঘটনা রিজিওনাল ও গ্লোবাল হয়ে উঠতে পারে। এর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাকে কিছু তো করতে হবে, অন্তত আত্মরক্ষামূলক। লিবিয়ার “আরব স্প্রিং” উন্মাদনার এত বড় ঘটনায় খরচের কথা চিন্তা করে আমেরিকা কোন মেরিন পাঠানোর পথে যায় নাই। এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু গাদ্দাফি উত্তরকালে নিজের রাষ্ট্রদুত খুন হবার পর কিন্তু সে মেরিন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সোজা মানে হলো, মেরিন পাঠানোর অবস্থা তার এখনও নাই বললে চলে, একান্ত বাধ্য হয়ে না গেলে। খরচ সামলানো মুশকিল। এখন কম খরচে ন্যূনতম কিছু করতে হলে সেটা হবে ড্রোন হামলা।

এসব বিবেচনায় করেই প্রতীকি ভাবে ড্রোনের কথা এসেছে। কিন্তু মুল বিষয় হলো, যে পটেনশিয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে তা যে কোন দিকে মোড় নেবার ঝুঁকি রাখে। উন্মত্ততা নিস্তেজ করবে কে, কি দিয়ে এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে না। এখন এই সম্ভাবনা আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

 

[এই লেখাটির একটি প্রাথমিক খসড়া সর্বপ্রথম তোলা হয়েছিল গত ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ফেসবুকে নোট আকারে। শিরোনাম ছিল, ‘শাহরিয়ার ও শাহবাগ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে’সেই লেখাটি এক সম্পাদিত রূপ এরপর ছাপা হয়েছিল চিন্তা নামের ওয়েব পত্রিকায়।  চিন্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল দুদিন পড়ে  ২৪ মার্চ ২০১৩ সালে। এখানে চিন্তা পত্রিকার ভার্সানটাই আবার এখানে হুবহু তুলে আনা হল, সংরক্ষণের জন্য।]

 

 

নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

 নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

গৌতম দাস
০৪ অক্টোবর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RL

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে জনসভায় জানিয়েছেন যে তিনি সামরিক যুদ্ধ বা যুদ্ধের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা করতে চান না। বরং কোন দেশ কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এর প্রতিযোগিতা করতে চান। ফলে সেই প্রতিযোগিতার আহ্বান জানাতে জনসভা থেকে তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে বক্তব্য রেখেছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধ বিষয়ে যেন তা লেগেই যাচ্ছে এইভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গরম কথা বলে মোদি নিজ জনগণকে আগে তাতিয়েছিলেন, শেষে কোঝিকোড়ে শহরের বক্তৃতায় সব উত্তেজনায় নিজেই ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন যুদ্ধ নয়, তিনি উন্নয়ন চান। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে তিনি যাবেন না। ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ কথার অর্থ কী, সেটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, পাকিস্তানকে তিনি ‘টেরোরিজমের’ অভিযোগে বড় প্রভাবশালী বা ছোট রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার চালিয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। এখন আমরা দেখছি “সার্জিক্যাল অপারেশনএর” নামে আবার এক বুঝরুকি। মোদীর প্রপাগান্ডার লড়াই, যা এখন উভয় পক্ষের দিক থেকেই প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে।  অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মোদী সবশেষে কোন সিরিয়াস যুদ্ধের দিকে যদি না-ই যাবেন, তিনি তা হলে গরম কথায় যুদ্ধের মত হুমকি দিয়েছিলেন কেন?
আমাদের ভুললে চলবে না, মূল ইস্যু ছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন। যেটা এখন প্রায় ৮০ দিনের বেশি টানা কারফিউ এর সত্ত্বেও চলছে। ওদিকে কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ইসলামি ঐক্য সংস্থা গত মাসে ২১ আগষ্ট ২০১৬ শক্ত ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেছিলেন । (OIC Secretary General Iyad Ameen Madani Monday expressed concern over the situation in Kashmir and called for an immediate cessation of atrocities by India, urging the Indian government for peaceful settlement of the dispute ‘in accordance with wishes of Kashmiri people and the UNSC resolutions’.।) বিগত ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নেয়া এক প্রস্তাব হল কাশ্মীরবাসী ভারতে থাকতে চায় কি না তা জানতে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। ওআইসি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানায়েছিল।  ওআইসি কাশ্মীরের প্রতিরোধ লড়াইকে তাদের “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য লড়াই” মনে করে, তাও জানিয়েছিলেন। কাশ্মীরের নিরস্ত্র গ-আন্দোলনের ধারার রাজনৈতিক দল হুরিয়াত কনফারেন্স। ওআইসির বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে তাদের বিবৃতির ভাষা ছিল আরও কড়া। তারা তুরস্ক সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন পাঠাবার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছিল।  ওদিকে এ বিষয়ে জাতিসংঘে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পরস্পরের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস সংগঠন হিউম্যান রাইট কাউন্সিল  দুই রাষ্ট্রের দুই কাশ্মির অংশেই সরেজমিন গিয়ে তদন্ত ও প্রত্যক্ষ দেখে যাচাই করে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারত উভয় সরকারের কাছে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অনুমতি চেয়েছিল। জবাবে পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ রাজি বলে জানালেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ওদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং তা মিডিয়ায় আসা শুরু করেছিল এই বলে যে, ক্রসফায়ারের নামে গ্রাম ঘিরে তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানিকে খুঁজে বের করে হত্যা করলে যে জনগণ কার্ফু ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যাবে – এ’সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী কিছুই আগাম জানাতে পারে নাই। এখানেই এবং এ’ঘটনা থেকেই ভারতের কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মারাত্মক গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতার কারণেই কাশ্মিরের বহু জেলা শহর এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিয়মিত আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মোদি সরকারের কাছে এসব বিপদের দিক তুলে ধরেছিল। আর প্রতিদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী মিডিয়া এই ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগে জনগণের দৃষ্টিকে ও মিডিয়াকে কাশ্মির থেকে সরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছিলেন মোদি। তাই ভারতের সীমান্ত শহর উরির ব্যারাকে হামলায় ১৮ সেনা হত্যা – তা সে যেই ঘটাক, একে ইস্যু করে মোদি দৃষ্টি সরানোর কাজ করতে সফল হন। মিডিয়া ও জনগণ থেকে কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন বা লাগাতর কারফিউ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটনার উল্লেখ এতে হাওয়া হয়ে যায়। নতুন প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আসন্ন কি না’, আর ‘পাকিস্তান থেকে আসা কথিত জঙ্গি’ এসব হয়ে যায় মিডিয়ার মূল প্রসঙ্গ। এগুলোই যেনবা সব সমস্যার কারণ। এই দৃষ্টি ঘুরাতেই মরিয়া হয়ে যুদ্ধের হুমকির গরম বক্তৃতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল মোদিকে।
কিন্তু তাতে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়  – ম্যালেরিয়া হওয়াতে রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু এখন কুইনাইনের প্রভাব প্রতিক্রিয়া শরীরে ছেয়ে মারাত্মক হয়ে গেছে, ফলে তা কমানো হবে কী দিয়ে? নিজেরই বাজানো ও ঝড় তোলা যুদ্ধের দামামা এখন কমাবে কী দিয়ে? অবস্থা দেখে খোদ বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরাই নাখোশ, হতাশ হয়ে পড়েছিল। সব দিক বিবেচনা শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে নেতাকর্মীদের হতাশার মধ্যেই সবার আগে পাবলিক বক্তৃতায় ‘যুদ্ধ নয়, উন্নয়ন চাই’ আর ‘কেবল কূটনীতি হবে চরম পদক্ষেপ’ বলে নিজের মূল অবস্থান পরিষ্কার ও প্রচার করে নেন মোদী।

আর এর সাথে পরদিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোদি নিয়েছিলেন। এক হল, সর্বদলীয় মানে সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা সভা থেকে নিজের ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে উপস্থিত সবার সমর্থন নিয়ে নেন তিনি। দুই. তিনি সব মিডিয়ার কাছে ওই নীতির পক্ষে সমর্থন চান। স্বভাবতই তা অন্তরালে। এটি এক কমন ফেনোমেনা এবং চর্চা যে ভারতের জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো আর সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিরোধিতা করে না। এবং সেই সাথে সব মিডিয়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। ফলে পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর কেউ কেউ মোদির বক্তৃতার নেতি রিপোর্ট ও সমালোচনা করলেও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় মিডিয়া মোদির ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি একযোগে মোদী সরকারের পক্ষে সামলে নিয়ে আসতে শুরু করে। বলা যায়, দুই দিনের মাথায় পরিস্থিতি মোদির পক্ষে ঘুরে যায়। এ কাজে মিডিয়াও আবার সাহায্য নিয়েছিল কয়েকটি ইস্যুর। যেমন এক. আগামী সার্ক সম্মেলনে একসাথে চার সদস্য দেশের যোগদানের অনীহা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। চার দেশের যোগ না দিতে অনীহার কারণ আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু তা ভারতের কূটনৈতিক লবির কারণে একসাথে প্রকাশ হওয়াতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটার কনস্টিটোয়েন্সির কাছে ব্যাপারটাকে ‘মোদির প্রতিশ্রুতি কাজ করছে’ এটা সাফল্য হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয় ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ছিল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি বাতিলের হুমকি। গত ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মিটিয়ে এই চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল এই দুই রাষ্ট্র। আসলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী মোট ছয়টি। ওই চুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র তিনটি করে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভাগ করে নেয়, যাতে প্রতি তিন নদীর পানিপ্রবাহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এক এক রাষ্ট্রের। এভাবে ওই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল। উভয় পক্ষই এতে এত দিন খুশি ছিল, এখনো পানির পরিমাণ ও ভাগের দিক দিয়ে উভয়ই খুশি। কিন্তু একটি টেকনিক্যাল দিক আছে। তা হল, ওই ছয়টি নদীরই উজানের দেশ হল ভারত। অর্থাৎ ভাটির দেশ হল পাকিস্তান। সোজা কথায় প্রথমে ভারত হয়ে, এরপর ওইসব নদী পাকিস্তানে প্রবেশ করে। ঠিক বাংলাদেশের মত। ফলে নদীর পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ করার ভূ-অবস্থানগত সুবিধাগুলো ভারতের পক্ষে। যদিও আন্তর্জাতিক নদী আইনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশকে প্রাপ্য পানিবঞ্চিত করা সম্পুর্ণ বেআইনি। কিন্তু মোদি ব্যাপারটিকে অন্তত প্রোপাগান্ডায় নেয়ার জন্য ওই চুক্তিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার জন্য সরকারি আমলা ও টেকনিক্যাল লোকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। বাস্তবে ভারত এই চুক্তি ভঙ্গ ও অমান্য করবে কি না, বাঁধ অথবা কোনো বাধা তৈরি করবে কি না সেটা অনেক পরের ব্যাপার; কিন্তু ইতোমধ্যে মোদির ওই নির্দেশ ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক প্রচারে নিয়ে গেছে। মোদী হুশিয়ারী দিয়ে বলছেন, “রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না, হুঁশিয়ারি মোদীর”। ফলে সাধারণ ভারতীয়দের মনে মোদী যুদ্ধ করার উসকানি যতটা তাতিয়েছিল, তা অনেকটাই এবার প্রশমিত হয়েছে এতে। যদিও মিডিয়ার এক কোণে ভারতীয় টেকনিক্যাল লোক বা প্রকৌশলীরা মন্তব্য করেছেন, এই পানি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ এটি প্রবল খরস্রোতা ও খাড়া প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। আবার পাকিস্তান থেকেও ওখানকার মিডিয়ায় পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে বলা হয়েছে, বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তবে সুবিধা হল, ভারতীয় মিডিয়া এই খবরটাকে নিজ দেশে তেমন প্রচারে নেয়নি। অবশ্য প্রথম দিন রাশিয়া-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বনির্ধারিত এক যৌথ মহড়া এ সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর তা যথাসময়েই শুরু হয় বলে এটাকে ভারতের জনগণের মন খারাপ করা খবর ও ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ভারতের মিডিয়া সেটাও সফলভাবেই সামলে নেয়।

অপর দিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আরেক খবর ছাপে যে, লাহোরে চীনা অ্যাম্বাসির কনসাল জেনারেল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই) সাথে দেখা করার সময় ভারত-পাকিস্তান বিরোধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে বলে জানিয়েছে। শাহবাজের তরফ থেকে বিবৃতির সূত্রে খবরটি ছাপা হয়। এই খবরটি পাক্কা দুই দিন টিকে থাকতে পেরেছিল। দুই দিন পরে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ে এমন খবর তাদের জানা নেই বলে জানায়। তবে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান প্রকাশ করে। তা হল, উভয় দেশ যেন সামরিক বিরোধে না জড়িয়ে বসে ডায়ালগে সমাধান খোঁজে, চীন এর আহ্বান জানায়। ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটি ব্যাপক প্রচারে নিয়ে যাওয়াতে এটিও মোদির পক্ষে জনগণের সমর্থন আনতে সাহায্য করে মিডিয়া। শুধু তাই নয়, ভারতের মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে যে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে আছে। যেমন- আনন্দবাজারের এক খবরের শিরোনাম হলো, ‘চাপের মুখেও পাক তর্জন, মার্কিন প্রশাসন পাশে আছে ভারতের।’ কিন্তু এটাকে প্রোপাগান্ডা বলছি কেন? অথবা আসলেই চীন ও আমেরিকার ভারত-পাকিস্তান বিরোধে অবস্থান কী, কেন? আর সেটাই বা কত দিন থাকবে বা জেনুইন কি না? পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার সমস্যা হিসেবে কংগ্রেস নেতা, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কেরালার এমপি শশী থারুর তাকে উদ্ধৃত করে হংকংয়ের এক মিডিয়া জানাচ্ছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। আমেরিকার আফগানিস্তানের কারণে পাকিস্তানকে দরকার। চীন পাকিস্তানে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এক একক বড় প্রকল্প নিয়েছে। যেটা দক্ষিণে বেলুচ সমুদ্রসীমায় এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সেখান থেকে দক্ষিণ থেকে উত্তর অবধি পাকিস্তানের বুক চিরে এরপর চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, এমন সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বছর শেষে তা প্রথম পর্যায় শেষ করা হবে। উদ্দেশ্য, এই সড়ক চীনের একমাত্র মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত যাবে। এভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ভূমিবেষ্টিত এই প্রদেশকে সমুদ্র পর্যন্ত এক্সেস দেয়া, যাতে পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে যায়। এটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নামে পরিচিত। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চীন থেকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন।

এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ আছে- গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থাৎ গ্লোবাল ক্যাপিটালের স্বার্থ। গত মাসে চীনে জি-২০ এর সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জি-২০ মানে হল, অর্থনীতির সাইজের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপরের দিকের রাষ্ট্র যারা – এমন টপ ২০টি বড় অর্থনীতির দেশের সম্মেলন। উদ্দেশ্য গ্লোবাল অর্থনীতিতে কিছু কমন সাধারণ স্বার্থের দিক নিয়ে একমত হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমন এবারের মূল ঐকমত্য হল, গ্লোবাল মন্দা বিষয়ে। দুনিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় ১৯৩০ সালে প্রথম মহামন্দা আসে। মহামন্দার সারার্থ হলো, সব রাষ্ট্রের নিজ মুদ্রার মান-দাম কমিয়ে অন্যের ওপর বাজার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা। এই ঘটনার লেজ ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল, যা থেকে প্রতিকার হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম। এ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো আবার যাতে মন্দা না হয় তা ঠেকানো। তবুও ২০০৭-০৮ সালে আবার মন্দা দেখা দিয়েছিল। আফগানিস্তান-ইরাকে যুদ্ধে গিয়ে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপুল যুদ্ধ খরচের এই ভারসাম্যহীনতা থেকে এর জন্ম বলে মনে করা হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিপুল অর্থ ঢেলে ব্যক্তি-কোম্পানিগুলোর ধস ঠেকায়। অথচ পশ্চিমের বাইরে চীন তখনো ডাবল ডিজিটের অর্থনীতি টেকাতে পেরেছিল, কারণ সে যুদ্ধের বাইরে। ফলে পশ্চিমাদের চোখে গ্লোবাল মন্দা ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে এক ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। চীন টিকলে তার ছোঁয়া ও প্রভাবে পশ্চিম তার সঙ্কট কাটাতে সুবিধা পাবে তাই। মন্দা দুনিয়াজুড়ে ছেয়ে যেতে বাধা হবে চীন তাই। পশ্চিম সেই থেকে মন্দা একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ওদিকে গত দুই বছর চীনের অর্থনীতি নিচের দিকে; কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতে আগের কংগ্রেস আমলে ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি এবার মোদির আমলে এখনো উঠতির দিকে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিই উঠতির দিকে পশ্চিমের চোখে সে আকর্ষণীয় ও আদরের। অতএব কোনোভাবেই ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা আবার ফিরে আসুক তা ঠেকাতে সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এবারের জি-২০ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল। ফলে এবার জি-২০ এর সর্ব সম্মতিতে, সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্ত নেয়, সঙ্কটের মুখে নিজ মুদ্রার মান-দাম কমানো এমন পদক্ষেপের পথে কেউ যাবে না। এ কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ফলাফলে তা গ্লোবাল অর্থনীতিকে ডুবিয়ে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। অতএব এই বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থের কারণে বড় অর্থনীতির কোনো রাষ্ট্রই সম্ভাব্য এই যুদ্ধকে নিজের স্বার্থের বিপক্ষে, নিজের জন্য বিপদ হিসেবে দেখে। যেন বলতে চায়, যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেয়ার বা পাওয়ার এটা সময় নয়।
গ্লোবাল উদ্বেগ ও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এ দিকটি সম্পর্কে মোদির জানা, সবাই তাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু তবুও মোদির কিছু একান্ত স্বার্থ আছে। একালে দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উত্তর প্রদেশে (সাথে পাঞ্জাবসহ আরো কয়েকটি) রাজ্য সরকারের নির্বাচন। এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোদি বা বিজেপি এখানে হেরে গেলে এখান থেকেই নীতিশ-মমতার নেতৃত্বে আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জোট গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা।
ওপরে লিখেছিলাম, মিডিয়াসহ মোদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর তৃতীয়টি হল, খুবই সীমিত পর্যায়ে সামরিক অ্যাকশন, যাতে আগামি ভোটে মোদির মুখ রক্ষা হয়। ভোটের বাক্স ভরে উঠে। এক কথায় বললে, “যুদ্ধ না উন্নয়ন আর কূটনীতি” এই নীতির পক্ষে ভারতের মিডিয়া একযোগে দাঁড়িয়েছিল খুবই সফলভাবে। মানুষের মন থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার পক্ষে আগের তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করে আনতে পেরেছিল; কিন্তু সম্ভবত সামরিকবাহিনীকে আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা তৈরি করে আনতে বলেছিলেন, যা তারা হাজির করেছিল একা মিডিয়াই তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করতে পারার পরে। সেই অর্থে আবার এই সামরিক এডভেঞ্চার তা ছোটখাট বলা হলেও মোদীর সেদিকে না গেলেও চলত।  কিন্তু সম্ভবত লোভে পড়ে, বাড়তি লাভের আশায় মোদী এই সামরিক অ্যাকশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেন। এই পরিকল্পনা মোতেও ছট খাটও নয়, রিস্কবিহীনও নয়। বরং মোদীর ভারতের জন্য আগুন নিয়ে খেলার মত রিস্কি। কিন্তু মোদী আগামি ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচনে ভাল করার লোভে এই আগুন নিয়ে খেলা খেলতে গিয়েছেন। এর অর্থ এখন মূল্যায়ন বসলে পরিস্কার দেখা যাবে, আগামী নির্বাচনে ভোটে সুবিধা দেয়ার কাজেই সামরিক বাহিনী ও এর ঐ পরিকল্পনা দেশের নয় দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। বিশেষত সামরিক হামলা তা যত ছোট দিয়ে শুরু হোক না কেন, এখন পাল্টাপাল্টি বড় থেকে আরো বড় হামলার দিকে দুই দেশ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। এ সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। শেষে এটা পুর্ণ যুদ্ধে না পরিণত হয়। যেটা তারা উভয়ে কেউ চায় না; কিন্তু সেখানেই গিয়ে পৌঁছবে। বিশেষ করে ভারত “সার্জিক্যাল অপারেশন” এই গালভরা নামের হামলা করতে গিয়ে যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইচ্ছা না থাকলেও ভারতকে এরপর আরেক দফা হামলায় যেতে হবে। কারণ ভারতের ঐ গালভরা নামের হামলায় এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে ধরা পরে আছে। ভারত প্রথম হামলা করার পর  মিডিয়াকে বীরদর্পে জানিয়েছিল, নিজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তারা নাকি পাকিস্তানের ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। যেন বলা হচ্ছিল, এখন ভারতের মিডিয়া মোদীর পক্ষে নির্বাচনী ক্রেডিট বিতরণ করতে নেমে পড়তে পারে। কিন্তু সন্ধ্যা লাগতেই জানা গেল, এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে আটকা পড়ে আছে। অথচ এটা আগে থেকেই এটা জানা সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনীর নেতারা তা লুকিয়ে অস্বীকার করে রেখেছিলেন। এটা ছাড়া যেটা এখন আর এক সবচেয়ে বড় সমস্যা তা হল – দুই দেশের বাহিনীই এখন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ঢুকে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ সত্যতা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে কি পূর্ণ যুদ্ধের (পারমাণবিক বোমা পকেটে রেখে) দিকেই যাবে বা যাচ্ছে পরিস্থিতি? সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। দুই পক্ষই তা না চাইলেও নিজ নিজ জনগণের কাছে বীরত্ত্ব আর  ‘ইজ্জত রক্ষার স্বার্থ’ দেখাতে গিয়ে পূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভাল সম্ভাবনা আছে।  এই সম্ভাবনা প্রবলতর হবে যদি না মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীন-আমেরিকা যৌথভাবে এগিয়ে আসে ও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় । পুরনো ইতিহাস বলছে, মধ্যস্থতাকারীর কিছু ভূমিকা আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০২ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে ০৩ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ]

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন
গৌতম দাস
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RC

 

 

যেকোনো আন্দোলন, বিক্ষোভ বা প্রতিরোধের পন্থা দেখা যায় – হয় সেটা গণ-আন্দোলন না হয়, সশস্ত্র তৎপরতায় পথে ঘটে। ভারতের দখলকৃত কাশ্মীরে জনগণের আন্দোলন শুরু থেকেই নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এটা সেখানে প্রতিষ্ঠিত যে ভারতের দখলের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গণ-আন্দোলনের পথ এখানে বেশি কার্যকর। আর সেখান থেকেই অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স নামে এক সামাজিক রাজনৈতিক জোটের জন্ম এবং এর নেতা হিসাবে সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক অথবা ইয়াসিন মালিক ইত্যাদি নামে গণ-আন্দোলন পন্থার নেতাদের আবির্ভাব। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সময়ে সশস্ত্রভাবে ভারতীয় সেনা ব্যারাকে গিয়ে দুটো সেনা মেরে আসার চেয়ে রাজপথের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী ও ফলদায়ক। সামরিকভাবে হামলার চেয়ে কার্ফু ভেঙ্গে রাস্তায় সাধারণ মানুষের নেমে আসা অথবা জানাজায় অংশগ্রহণ, কোন গৃহবধুর রাস্তায় নামা ইত্যাদি এগুলো অনেক বেশী শক্তিশালী। কাশ্মীরে দিল্লীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখানে উদোম করে চোখ আঙুল দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখানো সহজ হয়ে যায়। এই কারণ কাশ্মীরে সশস্ত্র প্রতিরোধ চলুক এটা দিল্লীর সরকারেরও পছন্দের দিক। দিল্লী তাই এই প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলার পথ একটাই – এদেরকে জঙ্গী বলে প্রপাগান্ডা করা। এরা জঙ্গি, পাকিস্তান থেকে আসা “সীমা পারকে আতঙ্কবাদী” অর্থাৎ কাশ্মীর ভারতের দখলকৃত থাকার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগণের কোন চাওয়া নাই, কোন প্রতিরোধ নাই – সব সমস্যার গোড়া হল “শান্তির” কাশ্মীরে পাকিস্তান থেকে পাঠানো সন্ত্রাসবাদ। এই বলে প্রপাগান্ডা করা। অতএব “ওরা জঙ্গী” এটা বলতে পারলেই একমাত্র ভারত সরকারের তাদেরকে সরাসরি গুলি করে মারার পক্ষে ন্যায্যতা হাজির করতে পারে। এসব কারণে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থার স্তরে গণ-আন্দোলন বেশী ফলদায়ক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বর্তমান স্তরে বলেছি, সব সময় বলি নাই।  কারণ কে না জানে বিজয় লাভ করতে হলে চুড়ান্ত দিনগুলোতে সাধারণত সশস্ত্র পথেই তা ঘটাতে দেখা যায়। কারণ সব পথ তখন একটাই, সশস্ত্র প্রতিরোধ, মোকাবিলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এর এক আদর্শ উদাহরণ। এগুলো সবাই জানে। কিন্তু যেটা মানুষ কম জানে বা খেয়াল করেনি, তা হলো ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলে একটি ব্যাপার আছে। ‘সফট ল্যান্ডিং’ ধারণাটি উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট, সেখান থেকে ধার করে এনেছি। এর মানে হল, উড়োজাহাজে যাত্রা আকাশে যতই আরামদায়কভাবে উড়ুক বা ঘটুক না কেন, সেটা আসল আরামদায়ক ভ্রমণ কি না, এর বিচার করা হবে ওই উড়োজাহাজের মাটিতে নামা মসৃণ ছিল কি না তা দিয়ে। অর্থাৎ মাটিতে নামার সময় ল্যান্ডিং বা নেমে আসাকে অবশ্যই কোনো বড় ঝাঁকুনি বা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে একেবারে মসৃণভাবে ঘটতেই হবে। নইলে সব বৃথা। ঠিক সে রকম আন্দোলন যদি গণ-আন্দোলন থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের স্তরে যাওয়ার সময় মসৃণ না হয়, পরিপক্ব হওয়ার আগে অস্ত্র ধরা হয় অথবা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্ত্র ধরা হয়- দুই ক্ষেত্রেই ওই আন্দোলন ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এতে তা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। উড়োজাহাজের  গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ার মত হবে।
কাশ্মিরের নিরস্ত্র গণ-আন্দোলন বিক্ষোভ প্রতিরোধ পঁচাত্তর দিনেরও বেশি কারফিউ অমান্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উরির ব্যারাকে হামলা করিয়ে কেউ না কেউ অপরিপক্ব অবস্থায় ওর মধ্যে সশস্ত্রতার আমদানি ঘটিয়ে দিয়েছে। কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ব্যারাক উরিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক হামলায় ১৮ জন সেনার মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারত দাবি করে যে, এই হামলা পাকিস্তান থেকে এসে ‘সীমা পার কি জঙ্গীরা’ করেছে। জবাবে স্বভাবতই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটা প্রমাণহীন এবং কোনো ইনভেস্টিগেশন বা তদন্তের আগেই করা প্রপাগান্ডা বলে দাবি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘‘পাকিস্তানের মাটি থেকে কোনও রকম অনুপ্রবেশ হয়নি।’’

কিন্তু আসল ব্যাপার হল, এমন দাবি আর পাল্টা দাবিতে কে ঠিক বলছে, তাতে আর কিছুই আসে যায় না। কারণ ভারতের নিট উদ্দেশ্য লাভ এতে ঘটে গিয়েছে। কাশ্মিরে লাগাতার প্রায় তিন মাস হতে চলা বিক্ষোভ আর সেটা মোকাবেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাম ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দিল্লি সরকার যখন ছেঁড়াবেড়া অবস্থা, তখন মোদির সরকার এখন স্থানীয়সহ গ্লোবাল মিডিয়াকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে যে, আসল ইস্যু ছিল কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন এবং এতে নির্যাতন-নিপীড়ন। তা আর আজ ইস্যু নয়। এখন ইস্যু হল ভারত-পাকিস্তানের বিবাদ। মূলকথা উরির সামরিক ব্যারাকে হামলা যেই করুক, কাশ্মিরে চলা গণ-আন্দোলনকে আড়ালে ফেলে ভারত-পাকিস্তানের সম্ভাব্য যুদ্ধকে সফলভাবে সামনে এনে ভারত গণ-আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করতে পেরেছে। আর এরই নিট বেনিফিট নিয়েছে, বেনিফিসিয়ারি হয়ে মোদি সরকার যুদ্ধের ঢোল পেটাচ্ছে। কি মজা!
গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই জানতে চেয়েছে, যুদ্ধ কি লেগে যাবে নাকি? তাদের আশঙ্কার বড় কারণ জানা গেল যে, শেখ হাসিনা সরকার এই ইস্যুতে ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলে বিবৃতিতে জানিয়েছে সেখান থেকে। ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলাতে আমাদের এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই সেকথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করে কথা বলা সহজ হয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত মানে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিডিয়ায় যা এসেছে, তাতে যুদ্ধ আসন্ন- এমন মনে করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে মূলকথা হল, সেনাছাউনিতে সশস্ত্র হামলার ঘটনার বেনিফিসিয়ারি হিসেবে মোদি ভারত-পাক যুদ্ধের দামামা তুলতে পেরেছে। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, উরির ঘটনার চিত্রনাট্য ইন্ডিয়ার নিজেরই তৈরি কি না। প্রথমে প্রশ্নটা তুলেছিল পাকিস্তানি মিডিয়া, পরে খোদ ইন্ডিয়ান মিডিয়া। এবিষয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, কিন্তু একই ভাবে উরি হামলার মুহূর্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমও। তবে সেই ভারতের মিডিয়া এই সন্দেহের কথা তুলেছিল কিছু ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের বরাতে, পরোক্ষভাবে। যেমন, ভারতের দাবি অনুসারে চারজন কথিত হামলাকারী জয়স-ই মোহাম্মদ জঙ্গি। ব্যারাকে জঙ্গি হামলায় পরে নাকি এরা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিটায়ার্ড এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কেকের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস প্রশ্ন তুলছে- এই চার জঙ্গির দাফনের জন্য কেন এত তাড়াহুড়া করা হলো। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, (“Should India have waited? ‘Hurried’ burial for Uri attackers raises eyebrows”) “দাফন করতে ভারতের দেরি করা উচিত ছিল।’ তাড়াহুড়া না করে এর বদলে তারা এই লাশগুলো সংরক্ষণ করে পাকিস্তানের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারত।

কপিল কেক পুরানা রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, এ ধরনের জঙ্গি হামলার ক্ষেত্রে সাধারণত ‘হামলাকারীদের মৃতদেহগুলা সংরক্ষণ করা হয়, পাকিস্তানকে তলব করা হয়, প্রমাণাদি পেশ করা হয়। মৃতের পরিবারকে খবর দিতে বলা হয়, যাতে তারা লাশ নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ কপিল বলছেন, কমন প্র্যাকটিস হলো… “এর আগে গত জানুয়ারি মাসে পাঠানকোট এয়ারবেজ হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের লাশ চার মাস ধরে রাখার পর দাফন হয়েছিল। আর ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় নিহত ৯ জন লস্কর-ই তাইয়্যেবা জঙ্গির লাশ প্রায় এক বছর মর্গে রাখা হয়েছিল। ২০০১ সালের পার্লামেন্ট ভবনে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় পাঁচ জঙ্গির লাশ দাফন করা হয়েছিল প্রায় এক মাস বাদে”। এ ছাড়া সব ক্ষেত্রেই লাশ নিয়ে গিয়ে দাফন-কাফন করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, যদিও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অথচ উরিতে শেষ রাতের এই হামলা ঘটে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর জানানো হলো যে, এই জঙ্গিরা সবাই পাকিস্তানি। এমনকি এ ক্ষেত্রে জঙ্গি হামলার লাশ দাফনের প্রচলিত জায়গাও বদলানো হয়েছে।
আবার ২১ সেপ্টেম্বরের হিন্দুস্তান টাইমস পাঁচটা পয়েন্ট তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, কেন পাকিস্তানে হামলা করা ভারতের জন্য সহজ হবে না। এ ছাড়া ওই রিপোর্টে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক কমিউনিটি কে কিভাবে দায়সারা করে এই হামলার নিন্দা করছে তা উল্লেখ করেছে। প্রায় প্রত্যেকেই শুধু হামলার নিন্দা করছে কিন্তু কেউ পাকিস্তানের নাম নেয়নি, দায়ী করে নাই বা উল্লেখ করেনি। এমনকি বাংলাদেশের নিন্দার বিবৃতিতেও পাকিস্তানের নাম নেয়া হয়নি। অর্থাৎ হামলায় ভারতীয় ভাষ্য বাইরের দুনিয়ার প্রায় সবাই এড়িয়ে গেছে, সম্ভবত এই দাবি প্রমাণসাপেক্ষ বলে। যেমন রাশিয়ার পুতিন মন্তব্য করেছেন কোনো দায়দায়িত্ব না নিয়ে খুব সাবধানে। বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী’। (stating: “We are also concerned about the fact that, according to New Delhi, the army base near Uri was attacked from Pakistani territory.”) আমেরিকানদের বক্তব্যও একই রকম সাবধানের, পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলেছে কাশ্মির (“an attack in the Valley”) ‘ভ্যালিতে যে হামলা হয়েছে আমরা তার নিন্দা করি”। – ওদিকে ব্রিটিশ সরকার উল্টা ডুবিয়েছে। উরি হামলার নিন্দা করে তারা বলেছে, ‘ইন্ডিয়া অ্যাডমিনিস্ট্রেডেট কাশ্মির’ (Uri as a part of “India-administrated Kashmir)। অর্থাৎ বলতে চেয়েছে যেন কাশ্মির ভূখণ্ডটি আসলে ঠিক ভারতের না।
ওদিকে বিবিসি ‘ভারত কি পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারবে?’ এই শিরোনামে ২০ সেপ্টেম্বর এক রিপোর্ট করেছে। লিখেছে, ভারতের একজন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অজয় শুক্লা মনে করেন, “নরেন্দ্র মোদি সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রেখেছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী হামলার বিপরীতে কড়া জবাব দেয়ার মতো সামরিক শক্তি এবং পরিকল্পনা তৈরি করেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। এখন মনে হচ্ছে সরকার তার নিজের বাগাড়ম্বরের মধ্যেই আটকা পড়ে গেছে”। অর্থাৎ মোদি কাশ্মিরের গণপ্রতিরোধ থেকে দেশি বিদেশি সবার চোখ সরাতে পেরেছেন ঠিকই, কিছু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বা মুডে নেই। ওই রিপোর্টের শেষ বাক্য হল, “অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ভারতকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সুচিন্তিত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বিপরীতে শুধু রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর করলে সেটি শুধু ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষতি করবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন”। অথচ ঠিক সেই সমস্যাই ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছেন মোদি।
মোদিসহ বিজেপি নেতারা এখন কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে, শনিবার ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী বিজেপির জাতীয় কমিটির সভা চলছে। ভারতের মিডিয়াতে এক নতুন শব্দের আমদানি হয়েছে- jingoism বা ‘জিঙ্গ-ইজম’। যার অর্থ উগ্র জাতীয়তাবাদী গরম কিন্তু ফাঁপা কথা বলে যুদ্ধের দামামা বাজানো। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ান গানবোটের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতির সপক্ষে একটা বাগাড়ম্বর গান লেখা হয়েছিল, সেখানে jingo বলে এক শব্দ ছিল। তাদের কারবারকে ঠাট্টা করতে “jingoism’ শব্দ দিয়ে তাদেরকে চিনানো শুরু হয়েছিল। তাই থেকে ‘জিঙ্গ-ইজম’ এই শব্দের উৎপত্তি। সমালোচকদের সবার অভিযোগ মোদিসহ দলের নেতারা ‘জিঙ্গ-ইজমে’ ভুগছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তবু এতে জনগণ দূরে থাক, নিজ বিজেপি দলের কর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা জবাব দিতে পারছেন না নেতারা। আনন্দবাজার গত প্রায় দশ দিনের বেশি হবে কাশ্মির ইস্যুতে সরকারের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কাহিনী নিয়ে বিস্তারিত লিখে চলছিল। শনিবার ২৪ তারিখের আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক সম্পাদকীয়তে দুঃখ জানিয়ে লিখছেন, ‘যুদ্ধের বিরোধিতাও যেন দেশদ্রোহিতার নামান্তর!’ এরপর ওইদিনের এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “কড়া জবাব কোথায়, ফুঁসছে বিজেপি, নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদি এখন নিজ দলের কর্মীদের সামলাতে হয়রান হয়ে গেছে – নিজের কর্মীরাই ফুঁসছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল প্রথম দিনেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন যিনি, তার গলাতেই আজ নরম সুর”। এটা বলতে আনন্দবাজার বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের কথা বুঝিয়েছে। মোদির সবচেয়ে বিশ্বস্ত লাঠি হল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। আর তাঁর পরের ব্যক্তিত্ব, মূল সংগঠন ‘সঙ্ঘ পরিবার’ থেকে এসে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক এই নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন রাম মাধব। তিনি এক গরম বক্তৃতায় আগের দিন ‘দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল’ খুলে নেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই বরাতে আনন্দবাজারের ওই কথা। রিপোর্টে আনন্দবাজার এর পরে লিখেছে, “পাকিস্তানকে জবাব দিতে কূটনীতি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপের হদিস দিতে পারেননি” রাম মাধব। অসন্তুষ্ট ক্ষুব্ধ দলের কর্মীদের চাপের মুখে পরে দলের আরেক সচিব শ্রীকান্ত শর্মা বোঝানোর চেষ্টা করেন, “প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনার তরফে গোড়া থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেনাকে পদক্ষেপ করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এবার সেনা কিভাবে কাজ করবে, সেটি তাদের এখতিয়ারে পড়ে। এর বেশি আর কী করা যেতে পারে এ মুহূর্তে?” – আনন্দবাজার থেকে কোট করে আনা কথাগুলো।  ওদিকে কাশ্মীর ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রীর মতভেদ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কয়েকটা গুরুত্বপুর্ণ সভায় উপস্থিত থাকেন নাই এমন রিপোর্টও ভারতীয় মিডিয়ায় এসেছে।  কেরালায় বিজেপির অভ্যন্তরীণ ঐ সভার প্রথম দিন পাকিস্তান প্রসঙ্গে মোদি কী করতে চান, তা তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি কোঝিকোড়ে শহরে এক জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ওই বক্তৃতা থেকে কোট করে তা দশটা পয়েন্ট হিসেবে তুলে এনে ছাপিয়েছে। এই দশটা পয়েন্ট পড়লে যে কেউ বুঝবে মোদি পাকিস্তানের সাথে কোনো যুদ্ধের চিন্তা করছেন না, এটা তার মাথাতেই নেই।

ওই দশ পয়েন্টের দ্বিতীয় এবং সাত থেকে দশ নম্বর পয়েন্ট- এগুলো পড়লে যে কেউ এটা বুঝবে। দ্বিতীয় পয়েন্টটি হল, ‘উরিতে যে আঠারোজন সেনা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করবে”। (Indians will never forget the gruesome act of killing 18 soldiers in Uri.) অর্থাৎ সম্ভবত এর মানে হল, ওই আঠারোজনই সবচেয়ে বড় সংখ্যার ‘শহীদ’। এরা ছাড়া আগামিতে আর কোন সেনা শহীদ হচ্ছে না। মোদি ইতোমধ্যে তা জেনে গেছেন। আর ওই আঠারোজনের জীবনের বিনিময়েই মোদী কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হলেন- সেজন্য কি? এর জবাব আগামীতে পরিষ্কার হবে।
পরের সাত ও আট নম্বর পয়েন্টে দেখা যাচ্ছে মোদি পাকিস্তানের সরকারের বদলে পাকিস্তানের জনগণের সাথে কথা বলতে চাইছেন। সেজন্য তাদের অ্যাড্রেস করে বক্তব্য রেখেছে। কংগ্রেস মোদীর বক্তৃতার সেদিকটাতে খোচা দিতে পরেরদিন টিপ্পনি করে বলেছে, মোদী সম্ভবত আগামি নির্বাচন “পাকিস্থান থেকে লড়বেন”।  অর্থাৎ সার কথা হল, তিনি যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছেন না, এর ইঙ্গিত সেটা। যেমন সাত নম্বরের প্রথম বাক্যটা হল, তিনি “পাকিস্তানের জনগণকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন- আসেন একটা যুদ্ধ লড়ি।’ এটুকু পড়ে পাঠকের মনে সামরিক যুদ্ধের কথাই ভেসে উঠবে। কিন্তু না, মোদি সামরিক যুদ্ধের কথা বলছেন না। পরের বাক্যে জানা গেল যে – “কে কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এরই প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে জেতার চ্যালেঞ্জ” দিচ্ছেন তিনি। বলছেন, “এটা হবে কে আগে বেশি চাকরি সৃষ্টি করা, দারিদ্র্য দূর করা আর শিক্ষার হার বাড়াতে পারে- এরই চ্যালেঞ্জ”। এ কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, তিনি আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের বয়ানে৪ও নাই। এখন “উন্নয়নের” (তার শ্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’) চিন্তার ভেতরেই সরে আসতে চাইছেন। যুদ্ধে যাওয়ার মানে উন্নয়ন-বিরোধী কাজ, (যা তিনি করেছেন সব ডুবে যাবে, সব বেপথে যাবে- এটা পরিষ্কার করে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ফলে মোদির পরিষ্কার যুদ্ধবিরোধী পথের ইঙ্গিত।
আট নম্বর পয়েন্টও একই ইঙ্গিত। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের জনগণের তাদের নেতাদেরকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, “আমরা দুই দেশ একই সময়ে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আমরা করি সফটওয়্যার রফতানি আর পাকিস্তান করে সন্ত্রাসবাদ রফতানি, কেন”। অর্থাৎ একই চিন্তা কাঠামোর বক্তব্য- “যুদ্ধ বনাম উন্নয়ন আর তিনি উন্নয়নের পক্ষে”। এরপর ৯ নম্বর পয়েন্ট। এটা হলো পাকিস্তান বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ কী করবেন, সে প্রসঙ্গে। এক কথায় বললে, কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং এটাই হবে সেই সর্বোচ্চ করণীয়। তিনি পাকিস্তানকে পশ্চিমাসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, কূটনীতি তার পথ।
শেষে দশ নম্বর পয়েন্ট। এটা বদ দোয়া দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। মোদি বলছেন,”একদিন পাকিস্তানের জনগণ নিজ ঘরের তৈরি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে”। যুদ্ধের ভুয়া দামামা বাজানোর চেয়ে তবুও এটা ভালো নিঃসন্দেহে। দশ পয়েন্টের সারকথা, যুদ্ধ বনাম উন্নয়নে মোদি উন্নয়নের পক্ষে।
আনন্দবাজারের রিপোর্টের শেষ দুই বাক্য এ রকম- “পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি এই বিদ্রোহী নেতাদের আগামীকাল সংবর্ধনা দেবেন। তার পরই “গরিবি হটাওয়ের স্লোগান দেবেন তিনি। লক্ষ্য, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাবের ভোট”। অর্থাৎ লক্ষ্যণীয় যে মোদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা পরিচয় করাচ্ছে এই বলে যে, তিনি হলেন- ‘পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি।’ এরপর আর কোনো মন্তব্য নিঃপ্রয়োজন। যুদ্ধ বিষয়ে কোনো খবর আর নেই। কাজকর্ম যেমন চলছিল, তেমনি রুটিন। সামনের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, আর এর কৌশল নির্ধারণ। বিজনেস এজ ইউজুয়াল! আসলে হিন্দুত্ত্ব – এর শ্লোগান তুলে ভোটের বাক্স ভরে তোলা যায় হয়ত তবে যুদ্ধের বাজারে এই শ্লোগান একেবারেই অচল। কোনই কাজে আসে না, উলটা মিথ্যার ভান্ড ফুটে যাবার  বিপদ ঢেকে আনে। বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে ২৬ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

 

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়
গৌতম দাস
০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Nl

 

ঘটনার শুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ থেকে। সেখানে তিনি এই ভাষণে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ( এবং সাথে পাকিস্তানের কাশ্মীর অংশেও) দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ এনেছেন। ‘আমি বালুচিস্তান, গিলগিট, ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিষয়ে বলতে চাই। এ নিয়ে ভারত সরব হওয়ায় গত কয়েক দিনে ওখানকার অনেক লোক আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।’’ এর ব্যাখ্যা হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে (ভারতীয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ব্যক্তি যোগাযোগে করলে) নাকি বলা হয়েছে, মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ এনেছেন এ জন্য যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আগের দিন ১৪ আগস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে চলমান লাগাতার বিক্ষোভ, কারফিউর প্রসঙ্গ টেনে একে ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মানে এসব আসলে একটা পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা, যেখান থেকে সত্যতা বের করা কঠিন। তবে ১৪ আগস্টের আগেও ড্রেস রিহার্সেলের মত করে মোদী বেলুচ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। গত ১২ আগস্ট ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে ভারতের কাশ্মিরকেন্দ্রিক সব রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক হয়। মুজাহিদ কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরে লাগাতার কারফিউ কাশ্মিরের জনজীবন স্থবির করে রেখেছে। সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বৈঠকে মোদী সর্বপ্রথম বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আনন্দবাজারের রিপোর্টের ভাষায়, ‘গত শুক্রবার কাশ্মির প্রসঙ্গে সবর্দলীয় বৈঠকে প্রথম এই নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী। এই নতুন পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি সেই বৈঠকে বলেছিলেন,পাক-অধিকৃত কাশ্মির ও বালুচিস্তানের মানুষ যারা এখন অন্য কোনো দেশে থাকেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানের নির্যাতনের কথা সামনে আনতে হবে।’ সার কথা হল, কাশ্মির অসন্তোষে বুরহান ইস্যুর পর থেকে বর্তমানে ভারত যে চাপের মুখে আছে সেখান থেকে মুক্তি পেতে পাল্টাপাল্টিতে পড়ে ঘটনা এখন মোদীর ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ পর্যন্ত ঠেকেছে।

নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলা অন্তত ভারতের দিক থেকে একেবারেই নতুন অস্ত্র। এই অস্ত্র ভারতের জন্য শুধু নতুন তাই নয়। কারণ মানবাধিকার ইস্যু সবসময়ই দু’ধারী তলোয়ারের মত। কাঁচের ঘরে বসে অ্ন্যের উপর ঢিল ছুড়ার মত। ফলে তা ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করে ভারত নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। এক কথায় বললে কারো বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ আনা ভারত কখনোই নিজের কাজ মনে করেনি বা নিজের চায়ের কাপ হিসেবে গ্রহণ করেনি। আজ ভারত যেমন এক এককাট্টা রাষ্ট্র বলে দেখি কলোনি আমলের বৃটিশ-ভারত ঠিক তা ছিল না। সরাসরি কিছু প্রাদেশিক (সেকালে প্রেসিডেন্সী বলা হত) সরকারি এলাকা আর প্রায় ৫০০ এরও বেশি ছোট বড় করদ রাজ্য – এই সব মিলিত ভুখন্ডটাকে বলা হত বৃটিশ-ভারত। বিগত ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্মের সময় থেকেই অন্তত পরের তিন বছর ধরে সমানে পিটাপাটা আর সামরিক বলপ্রয়োগ করে বিভিন্ন রাজার রাজ্যকে মুল ভুখনন্ডে অন্তর্ভুক্তিতে বাধ্য করতে হয়েছিল। অর্থাৎ নেহেরুর নেতৃত্বের নতুন ভারত সরকারের অধীনে পুরান স্টাইলে কোন রাজাকে কর-খাজনা দিয়ে করদ রাজ্য হয়ে থাকার ব্যবস্থা রাখেন নাই। যেখানে ভারতভুক্তি আপোষে হয় নাই সেখানে সামরিক বল প্রয়োগ করে তা করা হয়েছিল। এর পরবর্তিকালের ভারতে একের পর এক লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও মাওবাদী আন্দোলনের সমস্যা ভারত রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কাশ্মির, পাঞ্জাব, নকশাল আর উত্তর-পূর্বের সাত বোন রাজ্যের আন্দোলন সেসবের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রকে জন্মের পর থেকেই লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাজনৈতিক সমস্যাকে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বলপ্রয়োগ, হত্যা-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে দমিয়ে নিজের রাষ্ট্রকে সংহত রাখতে হয়েছে ও হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট সেই রাষ্ট্রের কাছে ‘মানবাধিকার’ শব্দটিই হারাম। কারণ সে নিজেই সর্বক্ষণ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। স্বভাবতই ওই রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হবে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা। জন্মের পর থেকে এটাই এত দিন ভারত রাষ্ট্রের পুরানা সব সরকারের গৃহীত নীতি ছিল। ছিল বলতে হচ্ছে, কারণ অগ্রপশ্চাৎ যথেষ্ট বিবেচনা করে মোদি সেই নীতি এখন ভেঙেছে তা মনে করা যাচ্ছে না। খুব সম্ভবত চলতি কাশ্মীর ক্রাইসিস আরও মহীরুহ হয়ে সামনে আসতেছে এটা আঁচ  করে, মোকাবিলায় উপায়ন্ত না দেখে আপাতত “কুইনাইন খাইয়ে” যেভেবেই হোক জ্বর ছাড়াবার ব্যবস্থা এটা। এতে এরপর কুইনাইন সারাবে কে সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা – এটাই এতদিনের ভারতের নীতি ছিল তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত দেখা যায় পশ্চিমা রাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কের দিকে, বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের দিকে তাকালে। যেকোনো পশ্চিমা বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর শুরুতে ভারত সব সময় সবার আগে কবুল করিয়ে নেয় যে ‘কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু’, ভারত এই ইস্যুর ‘কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না’, এমনকি ‘জাতিসঙ্ঘেও মুখোমুখি হতে চায় না’ – এ ব্যাপারে ভারতের সেই পরদেশী বন্ধু একমত আছে। এমন একমত হবার পরই কেবল ভারত সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে আগায়। সে কারণে যে আমেরিকা মানবাধিকার ইস্যুকে অন্য রাষ্ট্রের পেছনে লাগার, তাকে বিব্রত করার বিষয় হিসেবে ব্যবহার করে প্রতি বছর রিপোর্ট বের করে থাকে, অথচ সে ভারতের কাশ্মির ইস্যুতে উল্টো নিজেকেই নিয়ন্ত্রিত রাখে। তো এই হল, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ইস্যু কেন ভারতের চায়ের কাপ নয়, এটা ভারতের জন্য নয়- এই ভাব ধরে রাখার ভারতীয় স্টাইল। তাই ‘মানবাধিকার’ ভারতের জন্য ‘নো গো’ বা অগম্য এলাকা- এভাবেই এত দিন ছিল। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীদের ব্রিফিংও এত দিন এই আলোকে সাজানো ছিল, এভাবেই চলে আসছিল।
তাই  ‘বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে’- মোদির এই নতুন বয়ানের পথ অনুসরণ করা দেখে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছে ভারতের ভেতরেরই অন্য রাজনৈতিক, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া গোষ্ঠী। তাঁরা দেখতে পাচ্ছে, মোদির রাজনৈতিক লাইনটি এ রকম যে, মোদি এখন থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তুলবে। আর তাতেই নাকি পাকিস্তান কুপোকাত হয়ে যাবে। মোদির এই লাইনের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, ভারতের কাশ্মিরের অসন্তোষ তৈরি করার জন্য পুরোপুরিভাবে পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করে দোষ চাপানোর ফলে অনেক রিলিফ পাওয়া যাবে, চাপ কমানো যাবে। ঠিক যেমন বেলুচিস্তানে অসন্তোষের জন্য পাকিস্তান ভারতকে দায়ী করে থাকে। উভয় পক্ষের এসব দায়ী করার ঘটনার সাথে সবচেয়ে ভাল তুলনীয় ঘটনা হল, ঠিক যেমন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হত ভারতের প্ররোচনাতেই নাকি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে। যেন বাংলাদেশের জনগণের কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্খা বা লড়াই-আন্দোলন বলে কিছু ছিল না। আবার তাই বলে বাংলাদেশের আন্দোলন বলশালী হলে এর মধ্যে ভারতের কোনোই স্বার্থ-প্রভাব ছিল না, এটা ঠিক তা বলাও নয়। ব্যাপারটা হল হবু বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষই নিজের নিজের স্বার্থ দেখেছিল। ফলে স্বার্থের এক সম্মিলন আমরা দেখেছিলাম। তবে প্রপাগান্ডার সময় মুখ রক্ষার্থে পাকিস্তান ভারতের প্ররোচনার কথাই বলবে। ঠিক যেমন ভারতের কাশ্মির সমস্যা ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের প্ররোচনাকে দায়ী করার পথ ধরতে চাইছে। প্রচারণার এসব স্টাইল নতুন নয়। যেটা নতুন তা হল ভারতের আমলা কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা মোদীর এই নতুন রাজনৈতিক লাইনের ভেতর বিরাট বিপদ ও সমস্যা দেখছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট মোদির বক্তব্য নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তারা তখনো ছিল খোশমেজাজে, কারণ বিপদ তখনো কেউ তাদের মনে করিয়ে দেয়নি। এ দিনের আনন্দবাজারের দু-দু’টি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ভারত-পাক সঙ্ঘাতের নয়া কেন্দ্র চিরবিদ্রোহী বালুচিস্তান’ এবং ‘কাশ্মিরের জবাবে বালুচ তাস, পাকিস্তানকে ফের খোঁচা মোদির’– যা তাদের স্পষ্ট উচ্ছ্বাসের প্রকাশ। আনন্দবাজার সবসময় তাতানো সেনসেশনাল আর খুবই সস্তা জাতীয়তাবাদী শিরোনামে রিপোর্ট লিখে থাকে। এই উচ্ছাস তেমনই। তবে সে হানিমুনের পিরিয়ড এখানেই শেষ। এর পরের দিন থেকে আনন্দবাজারসহ সব মিডিয়া, কূটনীতিক সবাই খুবই সতর্ক, যার প্রতিফলন দেখা যায় মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে। পরের দিন ১৭ আগস্ট থেকে মিডিয়া পুরো উল্টে যায়। যেমন এবার আনন্দবাজারের রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘লাভ কী হবে বালুচ তাসে, উঠছে প্রশ্ন’ অথবা আরও একদিন পর ১৮ আগস্টের রিপোর্ট, ‘বালুচিস্তান নিয়ে বেপরোয়া হতে গিয়ে মোদি এখন ঘোর কূটনৈতিক প্যাঁচে’। এখানে ভারতীয় বাংলা পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বাংলায় বুঝানোর সুবিধা নিলাম। ইংরেজি পত্রিকা রিপোর্টগুলোও কমবেশি একই রকম।
তাহলে কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা এতে কী বিপদ দেখলেন? তারা আসলে বলতে চান মানবাধিকার রেকর্ডের রিপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারত প্রতিযোগিতা করলে তাতে পাকিস্তানের যা হবে হোক, কিন্তু ভারতের কাপড় খুলে যাবে। কারণ জন্ম থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদ বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হুমকি সামলাতে গিয়ে ভারত মারাত্মক দুস্থ ও বিপজ্জনক অবস্থায় আছে; কারণ তার মানবাধিকার রেকর্ড খুবই খারাপ। ফলে মানবাধিকারের কথা যত চেপে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় ততই ভাল।
তাই আনন্দবাজার লিখছে, “…দ্বিধাবিভক্ত দেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক শিবির। অনেকের প্রশ্ন, ইসলামাবাদের ঢিলের বদলে পাটকেল ছোড়ার এই নতুন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে কি না?”। আর সবশেষে লিখছে, তবে কূটনীতিকদের একাংশের মত, “বালুচিস্তান নিয়ে ভূকৌশলগত খেলা চালিয়ে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করা যাবে। কিন্তু তাতে কাশ্মির সমস্যা মিটবে না। বালুচিস্তানের সাথে চিন ও ইরানের স্বার্থও জড়িত। মোদির এই তাসে ওই দু’টি দেশও ক্ষুব্ধ হবে বলেই মত অনেক কূটনীতিকের”। যদিও মোদীর এই মানবাধিকার বয়ানের লাইনের আরও এক আসল কারণ আছে তা এখানে আনন্দবাজার বলে নাই। সেটা এই রচনার শেষের দিকে আনব।
অর্থাৎ এখানেও আসল কারণ লুকিয়েছে মিডিয়া রিপোর্ট। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কংগ্রেসের সাবেক বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, তিনি আসল কারণ কিছুটা বলেছেন। আনন্দবাজার বলছে, সলমন খুরশিদের মতে, “অন্য দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু খোলাখুলিভাবে তা নিয়ে ভারত নাক গলায় না। …সে দেশের নেতাদের কাছে ঘরোয়াভাবে আমরা উদ্বেগ জানাই ঠিকই। কিন্তু সেটাকে কখনো নীতি হিসেবে ব্যবহার করি না। তাহলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের পার্থক্য কী হলো? …বালুচিস্তান নিয়ে ভারত গলা চড়ালে পাকিস্তানও কাশ্মির নিয়ে আরো সরব হওয়ার সুযোগ পাবে”। তবে কংগ্রেস দল সলমন খুরশিদের কথাকে নিজ দলের কথা তা বলতে পারেনি। বরং বলেছে এটা সলমনের ব্যক্তিগত মতামত। আনন্দবাজার এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছে, “ভোটের রাজনীতির কথা ভেবে কংগ্রেস মোদির পাকিস্তান বিরোধিতা থেকে দূরে যেতে চায়নি। তাই এমন সিদ্ধান্ত”।
এখানে এখন একটা তথ্য দেইয়া যাক। পাঠকের মনে হতে পারে এগুলো ভারত-পাকিস্তানের “সাদিও পুরানা” ক্যাচাল, এতে আমাদের কী! এমন দেশী পাঠককে সন্তুষ্ট করার জন্য তথ্যটি হল, আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার তথ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সাথে কথা বলেছেন। ওই পত্রিকার এসংক্রান্ত রিপোর্টের শিরোনাম, ‘মোদীর বেলুচিস্তান ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থন’ (Bangladesh backs Modi on Balochistan)। ওই রিপোর্ট থেকে দু’টি উদ্ধৃতি আনব এখানে। এক. ইনু বলেছেন, “বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে (বেলুচ) মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য এবং আমরা শিগগিরই বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ আমাদের সরকারের নীতি ঘোষণা করব”। এরপর উদ্ধৃতি দুই. “দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাপারের টেররিজম পাঠিয়ে আর বেলুচদের মতো গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের নিজ ভূখণ্ডে নির্যাতন করে ইসলামাবাদ কী পেতে চায় তা ব্যাখ্যা করা উচিত”।
মানবাধিকারের নীতিগত দিক থেকে এবং সে বিচারে আমাদের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। যেকোনো মুক্তি আন্দোলন বা রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি নির্যাতনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খুবই মারাত্মক। কিন্তু তবু তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারত সন্তুষ্ট হয়েছে কি না বলা মুশকিল। কারণ, যে কেউই ওই একই বাক্যে বেলুচ শব্দের জায়গায় কাশ্মির আর ইসলামাবাদের জায়গায় দিল্লি বসিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। এতে ভারতের কোনো সরকারি পাঠক খুশি না হয়ে উল্টো বিপদ দেখে ফেলতে পারেন।

সবশেষে এখানে মোদীর মানবাধিকার কর্মী হবার এই লাইন কেন নিলেন এর আসল কারণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এটা সেপ্টেম্বর মাস। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ ২৫ তারিখের আশেপাশে নিউইয়র্ক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়ে সরগরম থাকে। কারণ জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলি বা সাধারণ পরিষদের বৈঠক চলে। বিগত ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীরে গণভোট দিবার এক প্রস্তাব পেন্ডিং বা চাপা পড়ে আছে। এজন্যই ভারত বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের আগে কবুল করিয়ে নিয়ে রাখে যে, “কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু”, ভারত এই ইস্যুর “কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না”।  কাশ্মীরের অসন্তোষ চলছে। এবারের বুরহান ইস্যুতে এপর্যন্ত প্রায় ৭৫ এর উপরে মানুষ সেখানে মারা গিয়েছে।  তাই ভারতের আশঙ্কা পাকিস্তান এবারের জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে কাশ্মীর ইস্যুকে সরগরম করার চেষ্টা করবে। তাই পালটা কৌশল হিসাবে আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আর টেররিজমের ইস্যু তুলে রাখার কৌশল নিয়েছে ভারত। অন্যান্য মিডিয়া ব্যাপারটা আবছা ভাষায় বললেও ভারতের livemint পত্রিকা স্পষ্ট করে লিখেছে পাকিস্তান ২২ জন ডিপ্লোম্যাট নিয়োগ দিয়েছে যারা কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লবি করবে। মোদীর ভাষ্য জাতিসংঘে এই লড়াইয়ে জিতবার জন্যই সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাই এবারের G20 বা টপ ২০টা অর্থনীতির রাষ্ট্রের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ৫ সেপ্টেম্বর চীনে। মোদী সেখানকার বক্তৃতায় নাম না ধরে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও টেররিজমের অভিযোগ তুলে বক্তৃতা করেছেন। আর ওদিক সিপিএম এর সীতারাম ইয়াচুরী মোদীকে অভিযোগ করছেন যে তিনিওই পাকিস্তানকে জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলছেন,

We are giving an opportunity to Pakistan by raising the Balochistan issue. Now Pakistan may say that since India is taking about Balochistan, which is an integral part of that country, they have the right to talk about Kashmir. With this kind of foreign policy, we are giving an opportunity to others to internationalise the Kashmir issue, Mr. Yechuri said.

অর্থাৎ ইয়াচুরি বলতে চাইছেন, আমরা সবসময় বলে এসেছিলাম, “কাশ্মীর ইস্যু ইন্টারনাশনালাইজ করতে দিব না। সেখান থেকে মোদী সরে আসাতেই এটা ঘটতেছে”। এখন দেখা যাক, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা কী দেখব। আগামি নভেম্বরে সার্ক সম্মেলন বসার কথা পাকিস্তানে। আদৌও তা হবে কিনা তা পুরাটাই নির্ভর করছে এই সেপ্টেম্বরের ফলাফল কেমন কী হয়, তিক্ততা কেমন মাত্রায় ছড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছু উপরে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সরকার প্রধান যেতে পারছেন না বলে প্রচার হওয়া শুরু করেছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ২১ আগষ্ট ২০১৬ (প্রিন্টে ২২ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট  করে আবার ফাইনাল ভার্সান আকারে ছাপা হল।]

কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়
গৌতম দাস
১৮ আগস্ট ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1Hu

সম্প্রতিকালের বাংলাদেশ ‘জঙ্গী’ হামলার ব্যাপকতা দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। গত এক-দেড় বছর ধরে কিছু বিশেষ ধরণের সশস্ত্র হামলা, গলা কেটে দেওয়া বা বোমা হামলার মত ঘটনাগুলো আমরা দেখছিলাম। হামলার বৈশিষ্ঠের দিক থেকে এগুলোর কোনটাই ঠিক হামলাকারির আত্মঘাতি ধরণের তৎপরতা ছিল না। এর পরবর্তিতে আমরা বড় ব্যতিক্রম দেখলাম গুলশানের ‘হলি আর্টজান বেকারি’ নামের রেস্টুরেন্টে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ঘটনা। এটাকে ব্যতিক্রম বলছি এজন্য যে এই ঘটনাটা প্রথমে জিম্মি করা আর পরে সকলকে হত্যা করা ধরণের। যদিও এরপর সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কালে পাঁচজন হামলাকারির মৃত্যু ঘটে। এই অর্থে হামলাকারিরা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বা আত্মঘাতি প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়েই এই হামলা চালিয়েছিল বলা যায়। এর আগে কখনও এমন  বৈশিষ্ঠের হামলা আমরা দেখি নাই। আগে হামলাকারিরা কখনও আক্রমণস্থলে নিহতও হন নাই। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারি গ্রেফতারও না হয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এসব দিক থেকে বিবেচনায় গুলশানের হামলার ধরনটা ভিন্ন – জিম্মি করে হত্যা করা আর শেষে নিজেরাও নিহত হওয়া – এটা একেবারে নতুন।

এই নতুনত্ব শুধু হামলার ধরণেই নয় আরও অনেক জায়গায় নতুনত্ব এনেছে। যেমন আগে সমাজে ‘জঙ্গিবিষয়ক’ নানা আলাপ হতে দেখা যেত, যেখানে সত্য-মিথ্যা প্রচারণা করতে দেখা যেত। যার বিবেচনা যে তাঁর শত্রু সে আসলে জঙ্গি হোক আর নাই হোক তাঁর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ প্রচারণায় নামতে আমরা দেখেছিলাম। অথবা, কারা জঙ্গী হয় এই প্রশ্নে একচেটিয়া বাছবিচার ছাড়া মাদ্রাসাগুলোকে দায়ী করে প্রচারণা ইত্যাদি এসবও আমরা দেখে আসছি গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। কিন্তু এবার বড় ব্যতিক্রম। স্পষ্ট হাতেনাতে প্রমাণে জানা গেল হামলাকারিরা সমাজেরই উচু ঘরের। একেবারে রাজধানী শহরের সবচেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের শিক্ষালাভ দেশের মর্ডান ইংলিশ স্কুলের ও দেশি বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এককথায় বললে তা মাদ্রাসা তো নয়ই, বরং তারা একেবারে আধুনিক উচ্চস্তরের শিক্ষা, মর্ডান কারিকুলামের ভিতরে থেকে তাদের পড়াশুনা করছিলেন। ফলে হামলাকারিদেরকে ‘পশ্চাদপদ’ বলে নাক সিটকানো, গরীব মাদ্রাসার তুচ্ছ ও দায়ী করা অথবা লজিক্যাল র‍্যাশনাল মন থাকলে সবকিছুর সমাধান পাওয়া যেত ইত্যাদিতে আধুনিকতার শ্রেষ্ঠত্ব ধারণা যা এতদিন করে খাচ্ছিল সেই ভ্যানিটি আর মিথ্যা গৌরব সবকিছুই এবার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছিল। এটাও একটা বিশাল ব্যতিক্রমি ঘটনা মানতে হয়। এরকম করে হয়ত আরও  অনেক ব্যতিক্রমী দিক আমরা খুঁজলে বের করতে পারব। কিন্তু আসল  উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম যা এখানে লেখার মুল প্রসঙ্গ তা হল, হামলাকারি ‘জঙ্গিদের’ মৃত্যু পরবর্তি জটিলতা। অর্থাৎ মৃত ‘জঙ্গিদের’ মাটি পাওয়া বা দেওয়া। যতদুর মিডিয়া দেখে জানা গেছে তাতে মৃত ‘জঙ্গিদেরকে’ মাটি দেওয়া বা সৎকারের কাজ করার ব্যাপারে খোদ নিজ পরিবারের প্রধানদেরকে প্রকাশ্য অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এমনকি লাশ গ্রহণ না করার পক্ষেই প্রকাশ্যে ঘোষণা বা অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

মানুষ মারা গেলে সে তখন লাশ মাত্র – একে সৎকার করতে হবে। এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়। গোত্র বা ধর্মীয় নানান রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণে করে দুনিয়ার সব সমাজ কমিউনিটিই তা পালন করে থেকে। আমাদের যার যার ধর্ম ও সমাজ সভ্যতার রীতিনীতি সম্পর্কে যত প্রাচীন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় সব ধরণের কমিউনিটিতে লাশের সৎকার করার বাধ্যবাধকতা সব সমাজেই আছে থাকে দেখা যায়। এছাড়া আর একটা দিক হল, জীবিত অবস্থায় মানুষ কারও কাছে অথবা অনেক মানুষের কাছে বন্ধু হয়,আবার শত্রুও হয়। একারণে মানূষের কাজ ততপরতার মুল্যায়নে জীবিত অবস্থাতেই সে খুবই ঘৃণিতও হয়, হতেই পারে। প্রচন্ড অন্যায়কারি বা অত্যাচারিও হতে পারে। আবার মানুষের যা কিছু স্বভাব বা বদস্বভাব এর মুল্যায়ন শুধু তার জীবতকালে এবং মারা যাবার পরও চলে, চলতে থাকে। তবে মারা যাবার পর কেবল একটা জায়গায় তফাত হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে নানান মূল্যায়ন তখনও জারি থাকে। যেটা থাকে না তা হল মুল্যায়ন-উত্তর করণীয় একশন – অর্থাৎ মুল্যায়নে যদি দোষ পাওয়া যায় তবুও ওখানেই তার সমাপ্তি টানা হয়। দোষের জন্য আমরা কোন বিচার বা শাস্তির পদক্ষেপ আর থাকে না। মানে আমাদের মুল্যায়নে যদি দেখা যায় যে উনি জীবিত অবস্থায় খারাপ ছিলেন, ধরা যাক অত্যাচারি ছিলেন – তবুও মারা যাবার পর এর জন্য তাকে কোন শাস্তি দেওয়া, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ইত্যাদি থেকে আমরা বিরত থাকি। কারণ তখন এগুলো অর্থহীন। কিন্তু পরিস্কার রাখার জন্য মনে করিয়ে দেই, মৃত মানুষের মুল্যায়ন মৃতের-বাসায় না হোক সমাজে বন্ধ হয় না। কিন্তু তবু মুল্যায়ন করার পর সেটা আর বিচার শাস্তি বা অভিযোগের পদক্ষেপের দিকে যায় না, আমরা নেই না। কারণ বাস্তবে সে তখন শাস্তির উর্ধে।  এধারণাটাই অনুসরণ করে আধুনিক রাষ্ট্রের আদালতেও মৃত ব্যক্তির পক্ষে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট দাখিল করলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কিন্তু মৃত অপরাধীকেও আদালত ঐ ব্যক্তির নামে আনা সব অভিযোগ থেকে তাকে রেহাই ও মুক্ত করার রায় দেন।

মুল্যায়ন বিচার কথাটা ব্যাপক দিক থেকে দেখলে, মানুষের বিচার দুই দুনিয়াতেই হয় বলে মনে করা হয়। এই দুনিয়ার বিচার মানে রাষ্ট্রের আইন আদালত। রাষ্ট্রের আদালত কোন মৃত মানুষের বেলায় দুনিয়ায় তাঁর কৃতকাজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত বলে রায় দেয়। আর অন্য দুনিয়া বেলায়, সেখানে আবার  বিচারের এক্তিয়ার আর আমাদের নয়, একমাত্র আল্লাহর। এই পরেরটার ব্যাপারে আমরা কেউ জানি না সেই বিচারে কার কী হবে, কে কীসে দোষী না বেকসুর বলে সাব্যস্ত হবে। আমাদের মানুষের এক্তিয়ারের বাইরে সেটা। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ মারা যাবার পর মুল্যায়ন তখনও চলে কিন্তু বিচার বা মুল্যায়ন-পরবর্তি কোন একশন আর চলে না। মানুষের সাধ্য নাগালের বাইরে এটা। তাহলে দাঁড়াল, দুনিয়ার আদালত তাকে মুক্ত করেই দেয়। আর আল্লাহর এক্তিয়ার তো আমাদের নয়। এটা আল্লাহর উপরই ছেড়ে রাখতে হয় আর সেটাই বিধানও বটে।

এই অর্থে সারকথাটা হল,মানুষ মারা গেলে সে সব বিচার-শাস্তির উর্ধে চলে যায়। কারণ সব অভিযোগ তখন অর্থহীন হয়ে যায়।

গুলশান ঘটনার পর সরকারের দিক থেকে সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার তাগিদ অনুভব খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। সরকার জনগণের সাথে বন্ধুমুলক মানে যাকে ফ্রেন্ডলি বা পপুলার বলি – তা হোক আর নাই হোক সব সরকারই এমন ঘটনার পর হামলা ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টাই করে থাকে। এদিক থেকে তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তুই কতদুর এটা স্বাভাবিক? যতদুর তা মাটি দেওয়ার বিরুদ্ধেও জনমত তৈরির ব্যাপার পর্যন্ত প্রসারিত না হয়।

তাহলে অভিভাবক পিতারা কেন অনীহা দেখাচ্ছেন,কেন প্রকাশ্যে লাশ নিতে চাচ্ছেন না? মনে হচ্ছে তারা বাবা হিসাবে নিজ মৃত সন্তানের সৎকারের দায় আর ব্যক্তি বা সমাজের একজন হিসাবে দায় – এই দুইয়ের মধ্যে গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে আমাদের এমন গন্ডগোলে পড়ার কথা না। সমাজে একই মানুষের একই সাথে নানান রকমের ভুমিকা পালন করতে হয়, থাকে। মুল ব্যাপারটা হল, নিজ সন্তান ‘জঙ্গি’ হবার পথে গিয়েছে অথবা কাউকে হত্যা করে শেষে নিজেও নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম কথা হল, যেভাবে যাই ঘটুক, শেষ বিচারে সাবালক সন্তানের কৃতকর্মের দায় ঐ সন্তানের। লিগাল দায় সন্তানের, পিতা বা অভিভাবকের নয়। রাষ্ট্রীয় আইন আদালতের ক্ষেত্রেও এটা এমনই। এমনকি শুধু সন্তান কেন, যে কোন একজনের দায়ে অন্য জনকে শাস্তি দেওয়া যায় না। আর ওদিকে ধর্মীয় বা আখিরাতের বিচারেও দুনিয়ায় যার যার কৃতকর্মের দায় তাঁর নিজের। এমনকি, চুরি ডাকাতি করে সংসার চালানো পিতার ঐ সংসার থেকে ভরণপোষণ পাওয়া পোষ্য সদস্যদের কারও উপর কোন চুরি ডাকাতির দায় বর্তায় না। না এই দুনিয়া না সেই দুনিয়ার বিচারে। যদিও সন্তান ‘জঙ্গী’ বলে পিতা বা অভিভাবকের মনে অস্বস্তি থাকতে পারে, সন্তাহ হারানোর বেদনাও সেখানে  থাকে, এমনকি সন্তান যাকে হত্যা করেছে তার বা তাঁর পরিবারের প্রতিও সমবেদনা থাকে – সেগুলো আলাদা জিনিষ।

অতএব ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ততপরতার বিরুদ্ধে সমাজ বা রাষ্ট্র জনমত তৈরি করলে সেখানেও  কোন মৃত ‘জঙ্গির’ পিতাও সমাজের একজন হিসাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি একইসাথে কোন মৃত সন্তানের পিতা হন আর নাই হন। স্বাভাবিক অংশগ্রহণই তিনি করবেন। এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি যদি নিন্দা জানাতে মনস্থ করেন সক্রিয় অথবা নিষ্ক্রিয়ভাবে – তবে তাও করবেন, একদম স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তাই বলে সেই একই পিতা সন্তানের সৎকারের প্রসঙ্গে তার করণীয় যা, সৎকারে আয়োজনের ক্ষেত্রে পিতার যা ভুমিকা হয় তাও পালন করবেন, তাকে করতে হবে। কেননা এটা শুধু পিতা বলে নয়। মনে রাখতে হবে, এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়ও।

আমরা আশা করব অভিভাবক পিতারা ‘জঙ্গী’ ততপরতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ব্যাপারের অংশগ্রহণের সাথে সাথে, মৃত সন্তানের  লাশ গ্রহণ ও  সৎকারের  প্রসঙ্গে পিতা হিসাবে তার যা কিছু দায় তারও প্রতিটা তিনি পালন করবেন। এই দুইয়ের মধ্যে কোন স্ববিরোধ নাই।

আচ্ছা, কোন পিতা বা অভিভাবক যদি লাশ না নেন, অস্বীকার করেন তাহলে সেক্ষেত্রে লাশের কী হবে? এখান একটা কথা মনে রাখতে হবে – ধর্মীয় রীতিনীতি যাই থাক, জীবিত মানুষ নিজের ব্যবহারিক স্বার্থেই মৃত মানুষকে কবরস্ত করে। পাশে রেখে ঘুমায় না। এটাও জীবন বাস্তবতার আর এক দিক। কারণ লাশ পাশে রেখে বা পচিয়ে ঘর সংসার পরিবার করা চলে না। পচনশীলতার ম্যানেজমেন্ট দিক থেকে সে হিসাবেও লাশ সম্মানের সাথে কবরস্তই সঠিক ও বাস্তব বিধান। একাজ  মৃতের  পিতা বা অভিভাবক না করলেও সমাজ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে না কাউকে তা করতেই হবে। এবং সেটা করতে হবে একেবারে সম্মানের সাথে। কারণ মৃত মানুষের ভিতরে আমরা জীবিতরা  প্রত্যেকেই নিজেকে দেখতে পাই। আমার মৃত্যুর পর যেহেতু  আমিও আমার অসম্মান দেখতে চাইতে পারি না। তাই আমার মৃত্যুর আগেই সমাজে সৎকার ব্যবস্থা – এটা সমাজের রেওয়াজ হিসাবে গড়ে উঠুক, আমরা সবাই তা চাই। তাই আমরা দুনিয়ার সব লাশ এমনকি একেবারে অচেনা অজানা লাশকেও অজান্তে মনের গভীর থেকে সম্মান করি। তবুও কেউ কেউ, কাউকে হত্যা করে সেই লাশের উপর নৃত্য করার রেফারেন্স দিতে চাইতে পারেন।  হা পারেন তবে সেটাকে আমরা জিঘাংসা বলি। জিঘাংসা এক মানসিক রোগ যা থেকে বের হয়ে আসার উপায় বা পাথেয় হল মনোরোগের চিকিৎসা। কী আর করা,  জিঘাংসা মানুষের মৌলিক স্বভাব না হলেও আমরা অনেক মানুষকে জিঘাংসার ভিতর সুখ খুজতে দেখি।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1yl

গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
সব শেষ।

আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ

ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ
গৌতম দাস
১৩ মে, ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-17R

 

 

পশ্চিমা দেশগুলো “সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম” বলে তাদের “ওয়ার অন টেররের” শত্রুদের  ডেকে থাকে। এই শব্দগুলোকে তাদের শত্রুর সাধারণ ডাকনাম বানিয়ে ফেলেছে। আর এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে আমাদের সরকার তার বিরোধীদের বিশেষ করে যারা সরকারের ক্ষমতা ও প্রধান ধারার রাজনৈতিক বিরোধী  তাদেরকেও ওই একই দড়িতে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করছে। সময়ে তা বিরাট তামাশা হয়ে হাজির হচ্ছে।

যেমন  আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু চেষ্টা করেছেন, পশ্চিমের টেরিরজমের বয়ানের ভিতর একই আগুনে সেকে আমাদের রাজনীতিতে পরিচিত “সামরিক স্বৈরাচার” শব্দটাকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে চালিয়ে দিতে। বলা বাহুল্য এটা তথ্যমন্ত্রীর খুবই অপরিপক্ক ও ব্যর্থ এক প্রচেষ্টা। কিলিয়ে কাঁঠাল পাঠানোর ধারণাও এখানে খাটো।

“সামরিক স্বৈরাচারেরা টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল”
দক্ষিণ ভারতীয় এক প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’, সেখানে বাংলাদেশ বিষয়ক এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। আসলে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সংবাদদাতা কল্লোল বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরে থাকার সময় বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর এক সাক্ষ্যাৎকার নিয়ে এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল ঐ রিপোর্ট। রিপোর্টটা প্রকাশিত হবার পর তা পড়ে মনে করার কারণ আছে যে মন্ত্রীই “একটা নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে, গাড়তে” ঐ পত্রিকার সাথে কথা বলেছিলেন।  দি হিন্দু পত্রিকায় ঐ রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, (Terrorist in tie up with military autocrat) ‘টেররিষ্ট ইন টাই-আপ উইথ মিলিটারি অটক্রাট, সেইজ বাংলাদেশ মিনিস্টার”। যার বাংলা করলে হবে, “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল– বলেছেন  বাংলাদেশের মন্ত্রী”।

“There are thousands of AL-Qaeda-trained extremists in Bangladesh who have links to military autocratic forces as well as international terrorist groups, says Hasanul Haq Inu, Minister of Information in Prime Minister Sheikh Hasina’s government”.এই ছিল ঐ রিপোর্টের শুরুর একটা বাক্য। বাংলাদেশে হাজার হাজার আলকায়েদার ট্রেনিং প্রাপ্ত জঙ্গী আছে যারা সামরিক স্বৈরাচারি শক্তির এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে যুক্ত আছে – বলেছেন বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

স্বাধীনতা পরবর্তি হিসাবে ধরলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মিলিটারি অটোক্রেটিক’ বা ‘সামরিক স্বৈরাচার’  বলতে জিয়ার ১৯৭৫-৮১ সময়কালের শাসন আর এরশাদের ১৯৮২-১৯৯০ সময়কালের শাসন সাধারণত অনেকে এই সময়টাকে বুঝিয়ে থাকেন। অর্থাৎ সারকথায় বললে ১৯৯০ সালের পরের অন্তত ১৫ বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরাচার বলে কেউ ছিল না।  ওদিকে আল-কায়েদা নামটা আমরা প্রথম জানি, নজর করি ৯/১১ বা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলায় হামলাকারিদের নাম হিসাবে। যদিও আল-কায়েদার অপ্রকাশিত জন্ম বলা হয় ১৯৮৮ সালে। তাহলে জিয়া তো বটেই এমনকি এরশাদ এই দুই সামরিক স্বৈরাচার আল-কায়েদার সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকবে কী করে? এমনকি যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই ১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা কেবল জন্ম নিয়েছে ততপর হয় নাই, ততপরতাও শুরু হয় নাই এসময়টাতে সেক্ষেত্রেও একমাত্র এরশাদের জমানার কেবল শেষ  দুবছর তারা আল-কায়েদা নামটা শুনে থাকলেও থাকতে পারে। ট্রেনিং দেয়া অসম্ভব।

বুঝা যাচ্ছে ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞান সম্পর্কে ও হোমওয়ার্কে কাচা দুর্বল থেকেই এই বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া এটাও বুঝা যাচ্ছে যেভাবেই হোক ‘সামরিক স্বৈরাচার’ শব্দটাকে তিনি আল-কায়েদা নামের সাথে বেধে পচাতে চাইছেন। কিন্তু ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞানের অভাবে গল্পটা অপুষ্ট থেকে গেছে। আর ঐ সময়কালের ফ্যাক্টসগুলো মোটা দাগে বললে তা হল, এক. ১৯৭৯ সালের প্রথম অর্ধে ইরানে বিপ্লবী খোমেনী ক্ষমতা দখল করে। দুই. ইরানের পড়শি মুসলিক অধ্যুসিত সেন্ট্রাল এশিয়া যা ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সীমান্ত, সেই সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ নিজ ঘর সামলাতে ভীত হয়ে পড়েছিল। তিনি এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন যদি ইরান বিপ্লবের জোয়ার আছর প্রতিবেশী সেন্টাল এশিয়াতে পড়ে। যদি তারা ইরান বিপ্লবের প্ররোচনায় বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হবার আওয়াজ তোলে। তাই এর প্রতিক্রিয়ায় আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ১৯৭৯ সালে ঐ একই বছর শেষে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে যাতে মাঝের বাফার রাষ্ট্র হিসাবে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করা যায়।  সেন্ট্রাল এশিয়ার যেকোন সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানের উপর বল প্রয়োগ করা যায়। তিন. সোভিয়েত এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমেরিকা পালটা ব্যবস্থা নিতে চায়। আর নিকট পড়শি পাকিস্তানও হুমকি অনুভব করতে থাকে।তাই আমেরিকান প্ররোচনায় ও তার সামরিক ও অর্থ সাহায্যে পাকিস্তান স্থানীয় ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের (নানান গ্রুপের মুজাহেদিন)  সংগঠিত করে ফেলে। এভাবে দীর্ঘ দশ বছর মুজাহেদিনদের সাথে লড়ার পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালের শুরুতেই আফগানিস্থান ছেড়ে চলে যায়, সব সৈন্য প্রত্যাহার করে। চার. সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পরে আল কায়েদা গ্রুপের ভ্রুণ এর জন্ম হয়। আর ইতোমধ্যে ১৯৯৬ সালের দিকে মুজাহেদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে তালেবান গ্রুপ আমেরিকান পরোক্ষ সমর্থনে এবং তারা সরার চেয়ে সংগঠিত ও কার্যকর ছিল বলে পুরা আফগানিস্তানের শাসন হাতে পায়, সরকার গঠন করেছিল। এতে আল-কায়েদা ও তালেবান পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করেছিল ও চিন্তায় প্রভাবিত করতে পেরেছিল, সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।   পাঁচ. তাহলে আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গের দিক থেকে ফ্যাক্টস হল, আমাদের দুই ‘সামরিক স্বৈরাচারের’ আমলে আল-কায়েদা ফেনোমেনা দৃশ্যমান ছিল না বা বা দৃশ্যমান হয়ে উঠার পর্যায়ে যায় নাই।  ছয়. তবে এটা সত্য যে মুলত পুরা নব্বুই এর দশক জুড়েই বা তার আগেও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই জোশ আগ্রহে ইসলামি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা নিতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল, নানান মুজাহিদ গ্রুপের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। আর এরাই ১৯৯৬ সালের পর থেকে দেশে ফিরে এসেছিল। এখানে পাশাপাশি মনে রাখা যেতে পারে, আশির দশকে কমিউনিস্টরাও একইভাবে প্যালেস্টাইনে বিপ্লব বা যুদ্ধের স্বাদ নিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক,মন্ত্রী ইনু হয়ত আফগান ফেরত সেসব যোদ্ধাদের কথা বুঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাবলী এবং এর সময়কাল বাংলাদেশের কোন সামরিক স্বৈরাচারের আমলের ঘটনাই নয়। এটা হতেই পারে,মন্ত্রী ইনুর জিয়াউর রহমানের উপর বা বিএনপির উপর ক্ষোভ আছে। বিশেষত ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে হয়ত। তবু বলতেই হয় এটা তাঁর খুবই দুর্বল ও কাঁচা প্রচেষ্টা। কারণ তিনি সময়কাল মিলাতে পারেন নাই।

তবু দি হিন্দুর রিপোর্টটা অন্য দিক থেকে দেখা যেতে পারে। রিপোর্টটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এর সুনির্দিস্ট ফোকাস এর অভাব আছে, ফলে  খাপ ছাড়া।  খুব সম্ভবত এটা হতে পারে যে, মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতকার নেয়া শেষ করা হয়েছে কিন্তু কোথায় ফোকাস করে পত্রিকা বা ঐ রিপোর্টার রিপোর্টটা প্রকাশ করবেন তা ঠিক হয় নাই। কারণ সে বিষয়ে সম্ভবত মন্ত্রীর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে রিপোর্টারকে তিনি নিজের মতের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রাজি করাতে বা মানাতে পারেন নাই। অথবা এমন হতে পারে যেভাবে মন্ত্রী ব্রিফ করেছিলেন রিপোর্টার সেভাবে বুঝে নাই বা বুঝতে রাজি হয় নাই। ফলে রিপোর্টের একটা বিপর্যয় সেখানে ঘটেছে। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন ফোকাসের ছাড়া একটা রিপোর্ট হয়ে গেছে। সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের আম পাঠকের চোখে – “জিয়া, এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারেরা ইসলামি সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত ছিলেন” – এই নতুন বয়ান তাদের পাতে পড়া অথবা নজরে পড়া দূরে থাক এই বক্তব্য কারও আমলেই আনা যায় নাই। বিশেষত আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার কারণে। সেখানে নতুন বয়ানটা প্রতিষ্ঠা করা সে তো অনেক দুরের ব্যাপার।

মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসে নাই, বাধা স্থানীয় মিডিয়া
মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসতে পারে নাই, আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার বাধার কথা বলছিলাম। কারণ একটা মজার ব্যাপার হল দি হিন্দুর ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃৎ করে বাংলাদেশের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে রিপোর্ট হয়েছিল। কিন্তু কেউই ‘দি হিন্দুর’ শিরোনামকে নিজ রিপোর্টের শিরোনাম করে নাই। এমনকি মন্ত্যরীর পছন্দের সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গটাকে আমলেই নেয় নাই। প্রিন্ট পত্রিকার প্রত্যেকেই নিজস্ব ও ভিন্ন শিরোনাম করেছে।  আমাদের দৈনিক মানবজমিন গতকাল ১৫ এপ্রিল দিনের কোন এক সময়ে অনলাইনে এক রিপোর্ট ছাপতে দেখা গেছে,  যার বডির লেখা এত অল্প যে তার চেয়ে লেখার ব্যানার হেডলাইনটা বড় অথবা  তা না হলেও প্রায় সমান। আর শিরোনাম করেছিল,  “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” এটা হল সেই হেডলাইন। হেডলাইন দিয়ে চমকে দেবার খবর অর্থে এটা চমকপ্রদ খবর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ নিজের দেয়া শিরোনামের ঐ পাঁচটা শব্দই কেবল সব বক্তব্য।  বাক্যগুলো ‘দি হিন্দুর’ লেখার রিপোর্টের বডি থেকে তুলে নেয়া কয়েকটি শব্দ। আবার প্রায় একই হেডলাইন – “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮ হাজার জঙ্গি রয়েছে বাংলাদেশে ” – এটা হল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ঐ দিনের শিরোনাম। কিন্তু এদুটো পত্রিকার কেউই ‘দি হিন্দু’র পত্রিকার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐ রিপোর্টের সুত্রে ও বরাতে ছাপিয়েছে বলে জানিয়েছে ঠিকই কিন্তু কেউই মন্ত্রী ইনু যে বক্তব্যটা ফোকাস চাইছিলেন যে “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল” এদিকটা নিয়ে কোন উতসাহই তাদের ছিল না।  বরং ভারতের দি হিন্দুতে তা ছাপা হওবার পর পরই বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃত করেছে ঠিকই কিন্তু  নিজেরা ভিন্ন ট্রিটমেন্টে  ও ভিন্ন শিরোনাম দিয়ে।  কিন্তু কী তাদের প্ররোচিত করেছিল?

স্থানীয় শিরোনাম হয়ে গেল, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” 
‘দি হিন্দুতে’ শিরোনামটা পড়ার পরই যেকপোন দেশী পাঠকের মনে যে বিরাট খটকা লাগে তা হল বাংলাদেশের ‘সামরিক স্বৈরাচার’ আর ‘সন্ত্রাসবাদ’ এই শব্দদুটো মিলিয়ে কেমনে কোন বাক্য রচনা করা গেল। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকা সেজন্য রিপোর্টার শিরোনাম বদলে তাদের স্থানীয় শিরোনাম, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” করে নাই।

একথা ঠিক যে যেকোন ভারতীয় সাংবাদিকও টেররিজম শব্দটার প্রতি অতিরিক্ত সেনসেটিভ থাকে। কিন্তু এর মানে এই না যে কোন গারবেজ বা যে কোন কিছুকে টেররিজম বলে দাবি করলেই তাদেরকে তা খাওয়ানো যাবে, তারা মেনে নিবে। বাংলাদেশের সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া বা এরশাদ এরা আজকের মতই “ইসলামি জঙ্গী” ছিল অথবা “ইসলামি জঙ্গীবাদের” সাথে যুক্ত ছিল ইনুর এমন বক্তব্য  ইতিহাস-সম্পর্কহীন। একেবারেই ইতিহাসবোধহীনের ম্যানুফ্যাকচারড। দি হিন্দুর সাংবাদিক মন্ত্রীত ইনুর দাবি প্রমাণের দায়িত্ব না নিয়েই তাঁর কথাই ছেপেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবদিকেরা সেদিকে যায়ই নাই। তারা তুলে নিয়েছে, “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  ৮ হাজার জঙ্গি” এই কয়টা শব্দ কেবল। তাও আবার হিন্দুর রিপোর্টের বডি থেকে  কয়েকটা শব্দ। এতে দেশের মিডিয়ায় তথ্যমন্ত্রীর  দাবি আসে নাই, এই অর্থে বেকার হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এতে একটা সুবিধা তথ্যমন্ত্রী পেয়েছেন যে এই রিপোর্টে যে কোন প্রমাণ সম্পর্কহীন উদ্ভট দাবি এখানে আছে তা বাংলাদেশের মিডিয়া আমলই করে নাই। কিন্তু কেন?

গত প্রায় এক বছর ধরে যত সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে তা তে আইএস জড়িত নয়, তারা হাজির নাই, হয় নাই, এটা বলা সরকারি অবস্থান বা ভাষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি এই অবস্থানটাই ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার হল, তথ্যমন্ত্রী ইনু দি হিব্দু পত্রিকার সাক্ষাতকারে দাবি করে ফেলেছেন “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে”। যদিও এটা বলার উদ্দেশ্য তাঁর ভিন্ন ছিল।  কিন্তু একথা বলার আগে তথ্যমন্ত্রী খেয়ালই করেন নাই যে এভাবে বললে “আইএস নাই” প্রসঙ্গে সরকারি অবস্থানের বিরুদ্ধে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি ইনু আর এক মন্ত্রী, খোদ বিরোধীতা করে ফেলছেন। আর স্ববিরোধিতার সেদিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার সুযোগ ঐ দুই দেশি পত্রিকা ছাড়তে চায় নাই।

এখন ফলাফলঃ ফলাফল হল, দি হিন্দুর রিপোর্ট মন্ত্রীর  ঈস্পিত লক্ষ্য তো পূরণ করতে পারেই নাই উলটা বরং ক্ষতি করে ফেলেছে। “বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নাই, সাংগঠনিক কাঠামো নাই” – একথাগুলো বলা এখন সরকারের বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসিয়াল অবস্থান। সরকার মনে করে এগুলো স্বীকার করে নিলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের রাস্তা খুলে দেয়া হবে। আই এস দমাতে তাদের এখন আমাদের দেশে আরও সরাসরি ভুমিকা দরকার বলে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যুক্তি সাজিয়ে বসতে পারে। অনেকটা খালেদা সরকারকে উতখাতে বা ১/১১ এর সরকার কায়েমের পক্ষে যেভাবে যুক্তি সাজানো হয়েছিল। সরকারের এই অনুমানগুলো পটেনশিয়াল। ফলে বিপদজনক হতেও পারে। কিন্তু তথ্যমন্ত্রীর বয়ান অবশ্যই সরকারি ভাষ্যকে দুর্বল করেছে।

কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

কানে পানি গেছে,
এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

গৌতম দাস
০১ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-hR

বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

দুই.
ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২