ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

গৌতম দাস

১২ আগষ্ট ২০১৯, ০০;০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Fc

[সার সংক্ষেপঃ অবিভক্ত ভারতে যাদের জন্ম বা উত্তরসুরি আমাদের সকলের এক “আদি-পাপ” হল, সেই রামমোহন রায়ের তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র-ধারণাটা ওর মূল ফিচার অথবা কী পয়েন্ট ও বৈশিস্টগুলো কী থাকতেই হয় তা আমরা রপ্ত করতে পারি নাই। অথচ ভারতে আধুনিকতা এসে গেছে, প্রগতিশীলতাও বলে গর্ব ফুটিয়ে বেড়াই। আসলে তো মনে মনে হিন্দুত্বের বাসনা আর বর্ণহিন্দুর জাতবিচারে শ্রেষ্ঠত্ব ভাবনা সব জায়গায় ঘুরে ফিরে আগের মতই আধিপত্যের আসনে বসে আছে। কিছু বদলাতে দেয় নাই। যে দেশে সমাজের সবখানে  বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথা সক্রিয় ও সবলভাবে টিকে আছে সেদেশে রিপাবলিক রাষ্ট্র কার্যকর আছে , নাগরিক-নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য নাই এমন দাবির রাষ্ট্র আছে – এর চেয়ে ঠাট্টা আর কী হতে পারে?  এছাড়া, এই যেমন ধরেন কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তান কোনদিকে যোগ দিবে?  না, এটা কোন এক হরি সিং রাজার খায়েস কোনদিকে এর দ্বারা নির্ধারিত হবে না, সে মামলা এটা একেবারেই নয়। তাহলে সমস্যাটা কী? গোড়ার সমস্যা হল আপনি হিন্দুত্ব-ছাড়া অন্য কোনভাবে রাষ্ট্র বুঝতে বা গড়তেই রাজি না। এটাই সমস্যার গোড়া। এখন ভেবে দেখেন হিন্দুত্ব-ছাড়া রাষ্ট্র বুঝতে না পারা বা চাওয়ার কারণে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী এক হিন্দুত্বই নির্ধারণ করে দিয়েছে – বলতে পারেন বাধ্য করে বলছে যে মুসলমান তুমি মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র কর। এভাবে একেবারে জবরদস্তিতে এদিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।  অথচ আবার এর জন্য দায়ী করা হয়েছে উলটে মুসলমানদেরকেই।

অথচ সহজ সমাধান ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কোন নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না, কাউকে করতেও দিবে না, হতে দিবে না।  যেকোন ধর্ম, কিংবা পাহাড়ি-সমতলি, সাদা-কাল, বাংলা বা হিন্দিভাষী ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলেই রাষ্ট্রের চোখে সমান নাগরিক হবে – এমন রাষ্ট্র গড়তে হত। এক সমান নাগরিক পরিচয় ছাড়া আর কোন পরিচয়ে রাষ্ট্র কাউকে চিনে না। এই ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র, যেটাকে ইতিবাচকভাবে অনেকে সাম্যের (equality) রাষ্ট্র বলে বুঝে। কিন্তু হিন্দুত্বের নেহেরু ভাবলেন কেউ বুঝে ফেলার আগের সেরে ফেলবেন ব্যাপারটা; তাই তিনি কাশ্মীর যেন হরি সিং-এর ব্যক্তি সম্পত্তি ও সে অনুসারে সিদ্ধান্তের বিষয় বলে চালিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু কথায় আছে, পাপ তো কারও  বাপকেও ছাড়ে না।  তাই আমরা সকলেই আবার ব্যাক-টু-প্যাভেলিয়ান। কাশ্মীর ইস্যু আমাদের সকলকেই আবার ১৯৪৭ এর পুরানা অমীমাংসিত প্রশ্নে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তফাত এটাই যে এখন হিন্দুত্ব দগদগে সর্বাঙ্গে ঘাঁ-এর বিভৎস শরীর নিয়ে সে হাজির। তাই সকলেই চিনে ফেলতে পারছে। হিন্দুত্বকে আজ তাই সহজে সকলেই চিনতে পারে। সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে। আরও ভাঙ্গবে। কিন্তু শুধু চিনতে পারা নয় দরকার এক্ট করা, দৃঢ় পদক্ষেপের একশন।]

 


কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এটা নেহেরু-গান্ধীসহ ততকালীন কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারাও জানতেন ও মানতেন। কেন? কিন্তু এই “অংশই” বা করে নিবার সঠিক বা জনসমর্থিত পথ ও পদ্ধতি হত কোনটা? এটা সেই ১৮১৫ সালের রামমোহনের রেনেসাঁ থেকে একাল পর্যন্ত ভারতের নেতাদের কারই জানা হয় নাই। বরং কমবেশি সকলেরই বেকুবি ধারণাটা হল, ব্যাপারটা বোধ হয় বলপ্রয়োগ করেই করার বিষয়।

বৃটিশ-ইন্ডিয়ার প্রশাসন মানে কীঃ
আমাদের অনেকের ধারণা, অবিভক্ত ভারত মানে একটা একক প্রশাসনিক এলাকা; যা ব্রিটিশেরা ১৯৪৭ সালে চলে যাওয়ার সময় যেন একটা অংশ নেহরু-গান্ধীদের  দিয়ে যায় যা থেকে ভারত আর অপর অংশ মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র বানাতে দিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই ধারণা ভিত্তিহীন। ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়া ছিল প্রধানত তিন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিভক্ত ভারত – বড় তিন প্রেসিডেন্সি (বাংলা,বোম্বাই ও মাদ্রাজ), প্রায় ১৭টা প্রদেশ আর ৫৫০-এরও বেশি প্রিন্সলি স্টেট (Princely State বা করদরাজ্য)। আর এদের প্রত্যেকেই ছিল কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (সংক্ষেপে এখন থেকে “কোম্পানি” লিখব) হেডকোয়ার্টারের অধীনে সরাসরি শাসনে; কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ আর প্রিন্সলি স্টেটগুলো এভাবে এরা সবাই একেকটা আলাদা সত্তা। প্রিন্সলি স্টেটগুলো আবার আরো জটিল এ কারণে যে, সেগুলোর অভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন প্রশাসন কোম্পানির অধীনে নয়, তৈরিও নয়। বরং কেবল বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ- এ বিষয়গুলোই এককভাবে কোম্পানির এক্তিয়ার, দখলে ও অধীনে। এসব ইস্যুতে কোম্পানি যা সিদ্ধান্ত নিবে তাই ফাইনাল। আসলে এর মূল কারণ ছিল বৃটিশ কলোনির প্রতিদ্বন্দ্বি অন্যরা যেমন ফরাসি, ডাচ  এমন অন্য কলোনি মালিকেরা যেন বৃটিশের অধীনের রাজাদের সাথে যোগাযোগ করে বেশি সুবিধা দিবার লোভ দেখায় বৃটিশদের থেকে রাজাদেরকে ভাগায় নিয়ে যেতে না পারে, তাই “নো ফরেন কমিউনিকেশন” নীতি পালন করত তারা।

তবে করদ রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, প্রশাসন ও রাজস্ব আদায় একচেটিয়াভাবে রাজাদের হাতেই থাকত, যদিও রাজারা আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট শেয়ার ব্রিটিশদেরকে দিতে বাধ্য থাকত। এ বিষয়ে প্রত্যেক রাজার সাথেই কোম্পানির আলাদা আলাদা চুক্তি ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম এক শ’ বছর, অর্থাৎ ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে ছিলাম। আর ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটলে, একে দমনের পর থেকে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি কোম্পানির সব কর্তৃত্ব নিজে অধিগ্রহণ করেছিল, আর শাসন করেছিল ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত।

তাই দেশ ভাগের সময় প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগুলো সহজে ও সরাসরি স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে গেলেও প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বলেই ব্রিটিশ সরকার বিদায় নিয়েছিল। কারণ কোম্পানি বা বৃটিশদের সাথে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিতে এমন কিছু লেখা নাই – এই যুক্তিতে তারা ইস্যুটা ফেলে পালিয়েছিল। আবার প্রিন্সলি স্টেট মানে আসলে, কোম্পানির ভারতে জেঁকে বসার আগে থেকেই এরা অসংখ্য ছোট-বড় রাজার রাজ্য ছিল। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে অনেকগুলোকে কোম্পানি পরাস্ত করে নিজ প্রশাসনিক দখলে নেয়নি, কিন্তু কোম্পানির অধীনে করদরাজ্য করে রেখে দিয়েছিল। তাই প্রশাসন রাজার হাতেই থেকে গিয়েছিল।

       প্রিয়জীত দেবসরকার: ‘ত্রিদিব রায় ছিলেন এমন একজন রাজা যিনি ব্যক্তি স্বার্থ-র জন্য তাঁর রাজত্ব হারিয়েছেন’ – বিবিসি বাংলা

কাশ্মীর আর আমাদের পাহাড়ি ইস্যুর মিল কেবল করদ রাজ্য হিসাবেঃ
ভারতের ভাগে পড়া প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে নেহরু নিজের জন্য যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তা হল, সব প্রিন্সলি স্টেটকে নবজাত ভারতে অন্তর্ভুক্ত অংশ করে নেয়া হবে। রাজাদেরকে স্বেচ্ছায় সারেন্ডার করতে হবে নইলে বলপ্রয়োগ করে রাজ্য দখল করে নেয়া হবে। এবং বিনা ক্ষতিপুরণে। অর্থাৎ রাজপরিবারকে কোনো খোরপোশ বা ভাতাও দেয়া হবে না। তবে বসতভিটা বা হাভেলির নামে যা নিতে পারে, নিবে। এই কাজটা নেহেরু বাস্তবায়ন করেছিলেন প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেলকে দিয়ে। বিপরীতে পাকিস্তান প্রিন্সলি স্টেট নিয়ে এত সিরিয়াস ছিল না। একারণেই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাজারা পাকিস্তান “মুসলমানদের” এটা জানা সত্বেও তাদের সাথেই যুক্ত হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এনিয়ে সম্প্রতি একটা পিএইচডি গবেষণা হয়েছে, যাতে এই কারণটাই উঠে এসেছে। এনিয়ে রিপোর্ট বিবিসি বাংলাতে প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০১৫ সালে। বিবিসির মতে, “সেই কাজটি করেছেন লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার, যার বই ‘দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান’ ঐ রিপোর্টের আগের সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছিল”। উপরের ছবিতে সেই বইটাই হাতে তুলে ধরে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কাজেই এরপর আমরা আশা করব পাহাড়ি ইস্যুতে বাংলাদেশকে দোষারোপ অভিযুক্ত করার আগে প্রগতিশীলেরা একটু পড়াশুনা করে নিবে। ইসলামবিদ্বেষী হয়ে বাংলাদেশের যারা কথিত প্রগতিশীলতা বা ভিকটিমহুডের ইমেজ তৈরি করে কাশ্মিরের সাথে পাহাড়ি ইস্যু মিলিয়ে তুলনা করছেন, সেটা ভিত্তিহীন। এই খবর যেন তাদের থাকে। আসলে পাহাড়ি রাজারা, পাকিস্তানে রাজা হিসেবে যোগ দিলেও মডার্ন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভেতরে ‘রাজাগিরি’ অকেজোই থেকে যায়, এই “আধুনিক” বাস্তবতাতে তা নিজেই শুকিয়ে গেছিল। কেবল পাহাড়িদের পুরানা ‘১৯০০ সালের ম্যানুয়াল’ বলে অকেজো কিছু একটা আছে। আর জমির অনেক অংশই এখন বাঙালিদের দ্বারা বেদখল হয়ে আছে, এও আরেক সত্য। কিন্তু সাবধান, এগুলো কেবল ১৯৭৫ সালের পরের, পাহাড়িরা অস্ত্র হাতে তুলে নিবার পরের নতুন ঘটনা। ভারতের প্ররোচনায় পাহাড়িরা আগে-পিছে চিন্তা না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে তাতে ফেল করার ভুল রাজনীতির পরিণতিতে এটি হয়েছে। পাহাড়িদের, যারা যে জমিতে আগে ছিল তাকে সেখানেই অবশ্যই পুনর্বাসন করা সম্ভব, যদি তারা ইতিবাচক রাজনীতির পথে ফিরে, সঠিক বন্ধু বাঙালি রাজনীতিকদের খুঁজে বের করে নেয়ার যোগ্য হয়।

কাশ্মীরের বেলায় নেহেরুর নিজের নীতি ভেঙ্গেছিলেনঃ
যা হোক, নেহরু নিজ নীতি ভেঙে ‘ব্যতিক্রম’ করেছিলেন কাশ্মিরের বেলায়। কাশ্মিরের দুর্ভাগ্য যে, এটা এক প্রিন্সলি স্টেট। এটা না হয়ে যদি কাশ্মির সরাসরি কোম্পানির অধীনস্থ কোনো প্রদেশ হত? তাহলে এর সোজা মানে হত কাশ্মীর মুসলিমপ্রধান অঞ্চল বলে এই কাশ্মীর সরাসরি পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত। কারণ, ১৯৪৭ সালের ডেমোগ্রাফিতে দেখা যায়, পুরো জম্মু-কাশ্মিরের কাশ্মির বা উপত্যকা অংশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নেই বললেই চলে। আর জম্মু অংশেও ৩০ শতাংশের বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠী নাই।  আর এটা বাদে বাকি সারা অবিভক্ত কাশ্মিরে ৯৫-৯৯ শতাংশই মুসলমান। তাই পাকিস্তানে সপক্ষে যোগ দিবার ক্ষেত্রে এটাই হ্ত কাশ্মীরিদের   প্রধান যুক্তি।

কিন্তু কাশ্মীরের পাঞ্জাবি (হিন্দু) রাজা হরি সিং ভারতের সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন এবং ভারতে যোগ দিতে চাওয়ার খায়েশ প্রকাশ করাতে নেহরু প্রলুব্ধ হয়ে উল্টো পথে হাঁটেন। নেহরু প্রিন্সলি স্টেট হায়দরাবাদের নিজাম (রাজা) [একমাত্র মুসলমান রাজা যিনি জমির উদ্বৃত্ব থেকে রাজস্ব আয়ে আয়েসি জীবন কাটিয়ে কিংবা বাঈজি নাচিয়ে জীবনযাপন না করে বরং জমির উদ্বৃত্ব সঞ্চয় জড়ো করে  ইন্ডাস্ট্রি গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে এর পণ্য বেচা এক ব্যতিক্রমি রাজা তিনি], তাকেও নেহরু আর্মি পাঠিয়ে উৎখাত করেছিলেন। সেই নেহরু হরি সিংয়ের কথায় প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। কাশ্মীরের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, একটি মূল ভারতের ভুখন্ডের ভিতরের কোন প্রিন্সলি স্টেট নয়। বরং এর অবস্থান সীমান্তে, ভারতের উত্তর পাশে সীমান্তে তো বটেই, আবার এর বড় এক অন্য ভুখন্ড অংশ পাকিস্তানেরও উত্তর সীমান্তে। তাই কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তানে যুক্ত হবে – এমন দুই রাস্ট্রের যেকোনটাই যোগ দিবার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

বৃটিশেরা ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগের পরে প্রিন্সলি স্টেটগুলো ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার যে প্রচলিত চুক্তির রূপ – একেই বলা হয় কাশ্মীরেr “ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন” [instrument of accession] বা “সংযুক্ত হওয়ার (আইনগত) উপায়”।  তবে হরি সিংয়ের সাথে নেহরু যে একসেশন চুক্তি করেন তা ব্যতিক্রম ফলে শর্তযুক্ত। তা আসলে ব্রিটিশের সাথে কলোনি আমলে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিরই অনুরূপ, মডেলের। এটা মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় ভারতের হাতে দিয়ে দেয়া সাপেক্ষে বাকি ইস্যুতে নিজে করদ-রাজা হয়ে থাকার খায়েসি চুক্তি। অনস্বীকার্য বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল, নেহেরু সংখ্যালঘুর সমর্থনপুষ্ট রাজা হরি সিংয়ের সাথেই “শর্তযুক্ত” একসেশন চুক্তি করেছিলেন। কেন? খুব সম্ভবত, মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মির তো নেহরুর ভারতে যুক্ত হওয়ার কথাই নয়। কাজেই “পড়ে পাওয়া চারআনার” ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শর্তযুক্ত চুক্তি করলেই বা কী? এমন ভাবনার কারণে।

নেহেরু ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ চুক্তি করলেও রাজাগিরি রাখেন নাইঃ
কিন্তু নেহরু এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেন নাই। অর্থাৎ চুক্তি করলেও কাশ্মীর নেহরুর ভারতের নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে দাঁড়ায়নি। নেহরুর হাতে এ কাজে হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন কাশ্মিরের ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের নেতা শেখ আবদুল্লাহ। কাশ্মির ছিল প্রিন্সলি স্টেট মানে, রাজার রাজ্য ছিল বলে সেখানে ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজনৈতিক দল জমেনি। কারণ আমরা বুঝব, কোন রাজার রাজ্যে রাজনীতি থাকতে নাই। বুদ্ধিমান রাজারা তা থাকতে দেয় না। কারণ, রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল  থাকলেই তা রাজতন্ত্রের রাজ্যকে প্রজাতন্ত্র হওয়ার দিকে নিতে রওনা দিবে, যা রাজতন্ত্রের জন্য যম বা মরণকাঠি। তাই রাজার দেশে রাজা কোন পাল্টা ক্ষমতা জন্ম নিবার বীজ ও চিন্তাভাবনা হিসেবে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, জমায়েত এগুলো থাকতে দেয় না। তাই শেখ আব্দুল্লাহর পিঠে হাত রেখে নেহরু ঐ শেখেরই ন্যাশনাল কনফারেন্সকে কাশ্মীরে নেহেরু কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে উঠে আসতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। তাই চুক্তি করলেও কাশ্মীর নয়া দিল্লির নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, রাজার বিকল্প হিসেবে নেহরু শেখ আব্দুল্লাহকেই কাশ্মীরের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে ফেলেন। তবে এটা প্রথম পর্যায়। আর রাজা মনের দুঃখে বনবাসে যাওয়ার অবস্থায়। কালক্রমে রাজা কাশ্মীর থেকে দূরে পুরানা বোম্বাইয়ে বসবাস করতে থাকেন, সেখানেই ১৯৫১ সালে মারা যান। যদিও নেহরুর আসল দুঃখ তাতে ঘোচেনি।

সারা ভারতের যে কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, কাশ্মীর ভারতের অংশ হল কী করে? সবাই একবাক্যে বলবেন হরি সিং লিখে দিয়েছেন। এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ একসেশন চুক্তি অনুযায়ী হরি সিং কিন্তু ভারতকে কেবল মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো হস্তান্তর করেছেন, পুরা কাশ্মীর বা এর কোন ভুখন্ড না। এর অর্থ কাশ্মীর ভারত রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নয় বা ভারতের আইন ও কনস্টিটিউশনের অধীন নয়। তাই হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিতে থাকা কথাগুলোই এবার আবার লিখে ভারতের কনস্টিটিউশনে যে অনুচ্ছেদে সাজিয়ে আনা হয়, সেটাই ৩৭০ ধারা।
কিন্তু এরও আগে নেহরু পরিষ্কার জানতেন, কাশ্মির ভারতের অংশ নয়। বরং এটাই ভারত বা নেহেরুর দুর্বলতা। কিন্তু এই দুর্বলতা কাটাতে গিয়ে তিনি আরেক ভুল করে বসেন। তিনিই প্রথমে নিজে কাশ্মীর ইস্যুকে জাতিসঙ্ঘে তোলেন। যদিও এমনিতেও জাতিসঙ্ঘ এই বিবাদের ভেতরে ঢুকেই ছিল।

কাশ্মীরে এক দিকে ভারত অন্য দিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসঙ্ঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন, এটাই ভারত-পাকিস্তান অবজারভার মিশন [United Nations India-Pakistan Observation Mission (UNIPOM)]। জন্মলগ্নের সেকালে জাতিসঙ্ঘ মধ্যস্থতা করার জন্যই একপায়ে খাড়া থাকত। কেন?

হরি সিং কাশ্মীর কাউকে দিয়ে দেওয়ার কেউই ননঃ
প্রথমত একটা ফ্যাক্টস মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালিত ও শেষ করা হবে কীভাবে কী বৈশিষ্ট চেহারা নিয়ে – এসবের প্রধান নির্দেশক ও স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন সেকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। জাতিসংঘ তাঁরই ইমাজিনেশনের বাস্তব রূপ। যার সারকথাটা হল, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্ব স্ব রাষ্ট্রস্বার্থ নিয়ে যত বিবাদ এর অনেকগুলোই জাতিসংঘের নীতি কনভেনশন মেনে এর মধ্যস্ততায় বিনা যুদ্ধে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। সেকাজেই জাতিসংঘ গড়া। তাই কাশ্মীরে যতই আপাত থিতু এসেছিল ততই একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসংঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন– এভাবে বসে যায়।

হরি সিং একসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭। আর নেহরু কাশ্মীর ইস্যু জাতিসঙ্ঘে তোলেন ১ জানুয়ারি ১৯৪৮। প্রথমত, নেহরুর জাতিসঙ্ঘে যাওয়াটাই প্রমাণ করে যে, কাশ্মীর ভারতের নয় – এটা নেহেরুও মানছেন। এ ছাড়া হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিটা দুর্বল, নেহরুর তা না বুঝবার কথা নয়। সেই দুর্বলা পূরণ করতে, সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন জাতিসঙ্ঘ তাকে ফেভার করতে পারে। কিন্তু তার অনুমানটা ভুল ও ভিত্তিহীন। কাশ্মীর ভারতের, এমন রায় নেহরু জাতিসঙ্ঘ থেকে আনতে পারেননি। এক কথায় তিনি ব্যর্থ। কেন?

নেহরু কত দূর রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারী ছিলেন? তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্ব এনজয় করতেন কী চোখে? নীতি করণীয় ঠিক করতেন কোন মানদণ্ডে? এসব বিচারে এক কথায় তিনি ছিলেন, আসলে একজন কলোনাইজার । শাসক হওয়া বলতে তিনি কলোনি শাসক হওয়া বুঝতেন, আকাঙ্খী ছিলেন। তিনি নিজেকে একজন কলোনি শাসকের বেশি ভাবেননি। তাই ভারত কলোনিমুক্ত হয়ে গেলেও, রাষ্ট্র বলতে তাঁর ইমাজিনেশন বা বুঝ হল – এক কলোনি শাসক তিনি। তিনি মডার্ন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধারণায় জন্ম নেয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এর মর্ম তিনি যাই বুঝে থাকুন না কেন, সেটা তার ব্যবহারিক রাষ্ট্রে ও প্রধানমন্ত্রিত্বে প্রতিফলিত করতে পারেননি – রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে তাঁর কলোনি শাসক বুঝের কারণে। এটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছিল জাতিসঙ্ঘের কাছে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর আশা-কামনার মধ্যে। তিনি সম্ভবত খেয়ালই করেননি কোন বয়ানের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনাকারী ও বিজয়ীরা তা শেষ করেছিল। আর যুদ্ধ শেষে দুনিয়া নতুন করে সাজানো হচ্ছিল কোন মৌলিক ভিত্তিমূলক নতুন ভাবনার ভিত্তিতে।

“কোন  জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রকে কে শাসন করবে, কিভাবে তা শাসিত হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার কেবল ঐ জনগোষ্ঠীর”। রুজভেল্টের [Franklin Delano Roosevelt] এই প্রস্তাব প্রথম চোখবন্ধ মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল (আগষ্ট ১৪, ১৯৪১)  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। পরে রাশিয়াসহ সারা ইউরোপ এটাকে ভিত্তি হিসেবে মানতে রাজি হওয়াতেই রুজভেল্ট হিটলার ঠেকাতে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। রুজভেল্ট রাশিয়াসহ ইউরোপের সবাইকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে যুদ্ধে জিতিয়েছিলেন। আর যুদ্ধ শেষের  দুনিয়াটাকে একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ে সেটাসহ সাজানো হয়েছিল ঐ একই শাসন-নীতির ভিত্তিতে। যে নীতিটা বলে দিয়েছিল বা ওর সারকথাটা ছিল – কলোনি শাসন অবৈধ। এবং রাজাও।

কোন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কে নেবে, তা নির্ধারিত করবে কেবল নিজ নিজ জনগোষ্ঠী – এই নীতিতে যদি কাশ্মীর ইস্যুর ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দেখি, হরি সিং আসলে কাশ্মীরের কেউ নন। বরং কাশ্মিরের জনগণই ঠিক করবে কাশ্মিরের ভাগ্য কী হবে। তাই হরি সিং কোথায় কী চুক্তি অথবা সই করেছেন তা মূল্যহীন। নেহেরু-হরি সিং একসেশন চুক্তি তাই বিশ্বযুদ্ধের পরে সাজানো জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে যে World order, সেই নতুন দুনিয়ার চোখে অকেজো, মুল্যহীন এক কাগজ মাত্র।

নেহেরুর কাছে  রিপাবলিক ধারণা আকর্ষণীয় না, তাই নতুনওয়ার্ল্ড বুঝেন নাই, মনেপ্রাণে কলোনি-ক্ষমতার ভক্তঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মূল মর্ম নেহরু যদি বুঝতেন তিনি কখনই কলোনি শাসকের নকল করতে যেতেন না। ফলে তখন তিনি হরি সিং  একসেশন চুক্তিকে বাইবেল জ্ঞান করতেন না। তিনি জাতিসঙ্ঘেও যেতেন না। কারণ জাতিসঙ্ঘের জন্মই হয়েছে রুজভেল্টের ওই “নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর” শাসননীতিতে। তাই জাতিসঙ্ঘে গেলে, সে প্রতিষ্ঠান হরি সিংয়ের চুক্তিকে ন্যাকড়া মনে করে ফেলে দেয়ারই কথা। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের রায় – রাজা নয়, একমাত্র “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই”  সিদ্ধান্ত নিতে হবেই – এমনই হবে, এটা তো জানা কথাই ছিল। “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই” সব কিছু নির্ধারণের ভিত্তি, একেই মানতে বলবে। এটা নেহরুর জানা থাকা উচিত ছিল। তাই নেহেরুর জাতিসংঘে যাওয়া প্রমাণ করে যে নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ না অসচেতন ছিলেন।

নেহরু তাই জাতিসঙ্ঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করে এরপর সে খামতি নিজেই পূরণ করতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহকে আরো বেশি করে হরি সিংয়ের উপরে তুললেন। আর এখান থেকে জন্ম নিল, আর্টিকেল ৩৭০। এর সারকথা হল, একসেশন চুক্তি যেন ভারতের কনস্টিটিউশনের বিরোধী না হয়ে, সামঞ্জস্যপুর্ণ করে নেয়া যায়। আমাদের দেশী ভাষায় বললে, হালাল করে নেয়া হয়। কারণ একসেশন চুক্তি আসলেই তো ভারতীয় কনস্টিটিউশন-বিরোধী। কারণ, চুক্তিতে কাশ্মীরের জনগোষ্ঠিকে বুঝাতে কাশ্মীরের জনগণ নিজেরা নয়, কোথাকার এক ‘রাজা’কে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি বলে স্বীকার করা ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো রিপাবলিকের চোখে কোনো রাজা এমন গুরুত্ব পেতেই পারেন না। কোনো রাজা বা রাজতন্ত্রের চিন্তাকে কোন প্রজাতন্ত্র স্বীকার করতেই পারে না। তবু নেহরু অ্যাকসেশন চুক্তিকে হালাল করে নিতে কনস্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা যোগ করে। ভারতের কনস্টিটিউশন যারা ড্রাফট করেছেন, এর মূল ভূমিকায় ছিলেন প্রথম আইনমন্ত্রী ড. অম্বেদকার। নেহরু তাকে অনুরোধ করেন, হবু ৩৭০ ধারা ড্রাফট করতে। অম্বেদকার তা করতে অস্বীকার করেন।
ব্রিটিশ আমলে শাসক হিসেবে হরি সিং কাশ্মীরে এক বড় রাজত্বই চালাতেন। ফলে তার আমলাদের যথেষ্ট দক্ষ হতে হয়েছিল। এছাড়া পাশে ব্রিটিশরা থাকাতে তাদের থেকে এরা ট্রেনিং পেতেন সহজেই। এমনকি স্বয়ং হরি সিং স্বল্প বয়সে বাবার পরে কাকাও মারা যাওয়াতে রাজা হন। পরে তাঁর তাবৎ একাডেমিক শিক্ষা ও সামরিক ট্রেনিংও ব্রিটিশদের হাতে হয়েছিল। তাই কাশ্মীরের রাজার মুখ্য আমলা যাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত, তিনি হলেন ব্রিটিশ ট্রেইনড এক তামিল ব্যক্তিত্ব গোপালস্বামী আয়াঙ্গার। এই আয়াঙ্গার আর শেখ আবদুল্লাহ মিলে ৩৭০ ধারা ড্রাফট করেছিলেন।

৩৭০ ধারা আসলে কী?
এই ৩৭০ ধারা কী? ধরেন, আপনার লাখ টাকা আগেই আমি আমার বলে নিয়ে নিলাম। এরপর এই টাকা ফেরত দেয়ার সময় একটা দলিল করলাম। দলিলে লিখলাম, ১. আমিই আপনাকে লাখ টাকা দিলাম। ২. আপনি এই টাকা এখন আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দু’টাই মিলে গেলে, সে মোতাবেক খরচ করবেন। ৩. আপনার বাসায় কাউকে বসবাস করতে দিবেন না; আমার বাসা থেকে কেউ গেলেও না। তবে কাকে দেবেন না দেবেন, সেটি আপনাকে ঠিক করার অনুমতিটা আমিই আপনাকে দিয়ে দিলাম।
এতিনটা ধারার প্রথম দু’টি মিলে হল ৩৭০ ধারা, পাস হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। আর তৃতীয় ধারাটি হলো ৩৫এ, যা প্রেসিডেন্টের আদেশ হিসেবে ১৯৫৪ সালে চালু করা হয়েছিল।

তাহলে এবার মোদী-অমিত ঠিক কী করলেনঃ
আসলে এবার মোদী-অমিত মিলে যা করলেন তা হল – তারা বললেন এখন আর আপনার টাকাই আপনাকে দেয়ার দলিল না। দলিল থাকবে বাদ বা রদ। আর খোদ আপনি পুরাটাই এখন থেকে আমার।
এটাই ‘দ্যা কনস্টিটিউশন (অ্যাপ্লিকেশন টু জম্মু ও কাশ্মির) অর্ডার ২০১৯’  [The Constitution (Application to JAMMU & KASHMIR) Order 2019 ] এই নামে গত ৫ আগস্ট এক প্রেসিডেন্ট আদেশরূপে জারি করা হয়। আর এতে বলা হয়, এটাই “আগের “আর্টিকেল ৩৫এ” কে সুপারসিড’ করল। [It shall came into force at once and shall thereupon supersede the constitution (Application to Jammu & Kashmir) order, 1954……] মানে আগে যা-ই থাক, এখন থেকে এটাই 35A এর জায়গা নিল। এর সোজা মানে – এখন যা হল, একেবারে গায়ের জোরে পুরা কাশ্মীরকে (পাকিস্তান এবং চীনের কাশ্মীর অংশসহ) ভারতের ভুখন্ড বলে দাবি করে নিয়ে নেয়া হল।

এখন তাহলে আগে দলিলে যে লেখা ছিল ‘আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দুটাই মিলে গেলে’ [এই কথাটা বুঝাতে সব সময় সব জায়গায় concurrence শব্দটা ব্যবহার করা আছে।  বাংলায় যার মানে “সমঘটিত”। ] এটাই ভারতের পার্লামেন্টে পাশের পর যেকোন আইন আবার কাশ্মীরের পার্লামেন্টেও পাশ হলে বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটার কী হল? এছাড়া, এটাই ৩৭০ ধারা তে বাতিলের আগে কাশ্মীরিদের মত নেওয়ার পদ্ধতি বলে বুঝানো হয়েছে, তা হল কিভাবে?
এর জবাবে অমিত শাহ বলবেন, কাশ্মীরিদের মতামত মানে তো স্থানীয় প্রাদেশিক পার্লামেন্ন্টটে অনুমোদন, তাই তো? ঘটনা হল, এখন কাশ্মীরে  পার্লামেন্ট নেই, প্রেসিডেন্ট শাসনে আছে রাজ্যটাতে। তাই প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা – এর মানেই তো কাশ্মীরিদের মতামত বুঝতে হবে।

অর্থাৎ, অমিতের  ব্যাখ্যা অনুসারে, কাশ্মীরিদের মতামত=ভারতের প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা।  তাই ৫ আগষ্টের ঐ প্রেসিডেন্টের আদেশে শুরুর বাক্যটা হল এভাবে – আমি আমার সাথে একমত হয়ে… এই আদেশ জারি করলাম।

কিছু বাড়তি প্রসঙ্গঃ
আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো পরের লেখায় আনা যাবে হয়ত। সেখান থেকে কেবল দুটা সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ দিয়ে এখন শেষ করব।
সোশাল মিডিয়ায় দেখলাম সবাই আশা করছে এখন কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান বলতে বন্ধু রাষ্ট্র, দেশ, গ্রুপ বা ব্যক্তির সামরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো – এভাবে বুঝে। মানে মিলিটারি পদক্ষেপ বা যুদ্ধই এর একমাত্র সমাধান। এই অনুমান ভিত্তিহীন। এছাড়া যুদ্ধে যেতে চাইলেও অন্তত ভারত-পাকিস্তান কারই যুদ্ধে যাবার অর্থনৈতিক সামর্থ নাই।
আসলে ইস্যুটার ফোকাস মূলত লিগাল। তাই সেটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠবে। ভারতের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্যের একজনকে যদি পেতে হয়, তবে সম্ভাব্য সেটা হতে পারে আমেরিকা। কিন্তু সেটা ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে পাকিস্তানের গলা চড়ানো পদক্ষেপে।  ভারতের হাত আমেরিকা যতটুকু আড়ালে ধরেছিল, সেটি ছেড়ে এখন আমেরিকা তা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে [No policy change on Kashmir, says U.S.]। আমেরিকার স্টেটস ডিপার্টমেন্টের বা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত Ms. Ortagus এর প্রেস ব্রিফিং থেকে এটা পরিস্কার। অর্থাৎ, পাকিস্তানের কূটনীতির একটা বিরাট ভূমিকা এখানে আছে এবং আগামিতে থাকবে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান যতটুকু করেছে, তাতেই ভারত ইতোমধ্যে ব্যাকফুটে। ভারতের বিবৃতিগুলোতে তা পরিষ্কার।

পাকিস্তানের ডিপ্লোমেটিক প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পাঁচ পদক্ষেপঃ
1. Downgrading of diplomatic relations with India. 2. Suspension of bilateral trade with India.
3. Review of bilateral arrangements. 4. Pakistan to go to UN, including the Security Council.
5. August 14 (Pakistan’s Independence Day) to be observed in “solidarity with brave Kashmiris”. India’s Independence Day will be marked as “Black Day”.
পাকিস্তানের একক সিদ্ধান্ত – ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিচা স্কেলে নামিয়ে আনা – এটাকরে ফেলে নিজ রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার করা ও ভারতকে তারটা ফেরত নিতে বলা – এটা পশ্চিমাদেশের জন্য শক্ত ও সিরিয়াস ম্যাসেজ হিসাবে হাজির হয়েছে। এতে ভারতের প্রতিক্রিয়ার তাদের ভাষায় সেটা বুঝা গেছে। ভারতের the wire পত্রিকার ভাষ্যও তাই। পাকিস্তানের পদক্ষেপের পর ভারতের বিবৃতি বলছে, পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছে [India urged Islamabad to review these measures…।।] দেখে এই পত্রিকা বলছে। পত্রিকাটার ধারণা ইউরোপ, আমেরিকা পাকিস্তানের বিবৃতির পক্ষে চলে যেতে পারে এই ভয়ে ভারত এমন বিবৃতি দিয়েছে।  এছাড়া পত্রিকাটা মন্তব্য করছে, ভারতের বিবৃতিটা কম কড়া বা কম কর্কশ ভাষার [The Indian response seemed comparatively less strident, ]।
ওই দিকে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ভারতের বিরুদ্ধে চলে যাবে ধীরে ধীরে, যেটা উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে দেখা গিয়েছে। ওআইসি ধরনের আন্তর্জাতিক বডিগুলোতে ব্যাপক লবি লাগবে, কারণ আমির ও বাদশাহরা ‘পিছলে ভারতের পক্ষে  চলে যেতে পারে’। যেটা ঠেকাতে পাকিস্তানের কূটনীতির বিরাট ভুমিকা আছে। এসব ব্যাপারে আমাদের উলটা নাদান চিন্তাও প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। পাকিস্তানের জামায়েত বা কিছু ইসলামপন্থি দলগুলোর জোটের প্রতিক্রিয়া হল ইমরান খান কাশ্মীর ইস্যু আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা আসলে পাকিস্তানে কোনঠাসা হয়ে পড়া বিরোধি দলের ইমরানকে আক্রমণের আভ্যন্তরীণ ইস্যু। এতে তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন কিছু প্রমাণ দেয়াটা গুরুত্বপুর্ণ নয় – তাই তারা দেনও নাই। বরং এই আক্রমণটায় মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে কিনা সেটাই বিবেচ্য। তাই অভিযোগটা কাশ্মীরের পক্ষে বা বিপক্ষে গেল কিনা সেটা একেবারেই বিবেচনার বিষয় নয়। বরং আভ্যন্তরীণভাবে পাকিস্তানের বিরোধীদেরকে মাইলেজ দিয়েছে কি না সেটাই বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশ বসে আমাদের পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে কারও মুখপাত্র হওয়ার কোন মানে হয় না। আমাদের কাছে মুখ্য হওয়া উচিত কাশ্মীরের স্বার্থ, পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কে আগিয়ে থাকল সেটা একেবারেই নয়।

সুপ্রীম কোর্ট কী প্রতিকার দিবে, ভরসা করা যায়?
ভারতের সুপ্রীম কোর্ট জনমত শক্ত হয়ে না উঠলে মামলাটাই নেবে না, পিছলাবে মনে হচ্ছে। এটা কিছুটা পরিস্কার হয়েছে এক মামলায় রায়ে [৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে]। আসলে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরার বিরুদ্ধে  নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আদালতের সাজার রায় হলে তিনি পালটা জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। ক্ষমতা ছাড়েন নাই, জেলেও যান নাই। সেই থেকে ভারতের আদালত ও একাদেমিকদের বুঝাবুঝি হল –  নির্বাহী ক্ষমতা বা প্রধানমন্ত্রী আগ্রাসি হয়ে গেলে আদালত মানতে না চাইলে – তাতে সেক্ষেত্রে ওর সামনে না গিয়ে ততটাই পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই সঠিক – এই অবস্থানে যেতে হবে। যদিও এমন সিদ্ধান্তে দুনিয়ার কোথাও রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া ঠেকানো যায় নাই। পারার কথাও নয়। তবু এসব আকাম্মা মধ্যবিত্তসুলভ গা-বাঁচানো চিন্তা এখনও ভারতে ভেসে বেড়াচ্ছে। গত নির্বাচনেও আমরা তাই দেখেছি। মোদীকে নির্বাচন কমিশন কোন নুন্যতম দন্ড দিতেই পারে নাই, কমিশন নিজেই গা-বাঁচিয়ে পালিয়েছে। ফলে আগ্রাসি মোদীর সামনে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া – আদালতের এই অবস্থান হওয়াটা অসম্ভব নয়।  যদিও ২০১৮ সালের অক্টোবরে এক মামলায়, আদালতের রায় দিয়েছিল যে, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।

ভারত ভেঙ্গে পড়ার প্রাথমিক আলামতঃ
ওদিকে রাজ্যগুলোও খুবই ভয় পেয়েছে। কারণ ভারত রাষ্ট্র মানে কথিত এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, “কেন্দ্র” নামে যে জারি আছে। কে তাকে কী ক্ষমতা দিয়েছে, এই ক্ষমতার উৎস কী, কেউ জানে না। কিন্তু এই ক্ষমতা চাইলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কাল থেকে বিধানসভা বলে কোনো প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি নাই – এমন ঘোষণা দিতে পারে। ব্যাপারটা এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে। এই ভুতুড়ে কেন্দ্র এখন, পশ্চিমবঙ্গকেও একটা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। এবং তা কেন্দ্রিয় পার্লামেন্ট অথবারাজ্য বিধান সভাতেও কোন আলোচনা পরামর্শ ছাড়াই।  কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল ইস্যুতে রাজ্যগুলো এটাই দেখল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে আগে শঙ্কিত হয়েছে নাগাল্যান্ড ধরনের ট্রাইবাল ছোট রাজ্যগুলো। এব্যাপারে ভারতেরই এক মিডিয়া পর্যালোচনায় ভীতি ও আশঙ্কা এখানে পড়ে দেখা যেতে পারে [No debate, no discussion, no dissent, and the Constitution is changed]।

মোদীর রাজ্যসভার ভোট ম্যানেজ – ভারতের “দুদুকের” ভয়ে বাঘ বিড়াল যেনঃ
শুধু তাই না। ভারতের কনষ্টিটিউশন অনুসারে কোন বিষয় আইন হতে হলে তা লোকসভা ও রাজ্যসভা এই দুই পার্লামেন্টেই পাশ হতে হবে।  গত পাঁচ বছর মোদী্র লোকসভায় পাশ করা কোন আইনকে পরিপুর্ণতা দিতে রাজ্যসভা থেকে একক বিজেপি-জোটের ভোটে পাশ করাতে পারে নাই। বরং যা কিছু আইন পাশ হয়েছে এর সবই বিরোধী দলেরও ভোট-সমর্থন পাওয়া সাপেক্ষে। মোদীর দ্বিতীয় সরকারের বেলাতেও তাই, এবারও রাজ্য সভায় বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। কিন্তু তিনি কাশ্মীর ইস্যুসহ পরপর দুইটা আইন পাশ করিয়ে নিলেন। কীভাবে?

সোজা বুদ্ধি – যারই বা ঘনিষ্ট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে মামলা আছে – সিবিআই-ইডি [CBI-ED] (আমাদের দুদুক যেমন) এর হয়রানি বা মামলা খাবার ভয় আছে এমন সব দলের সদস্যদেরকে মোদীর পক্ষে ভোট দিবার বিনিময়ে সওদা করা হয়েছে। তাতে রাজ্যসভায় মোদীর দল ও জোটের এখন ১০৬ ভোট আর বিরোধীরা ১০০ ভোট হয়ে গেছে। AGP, YSR, BSP, NCP, TDP অথবা kejrilal  এদের এসব আঞ্চলিক দলের এরা কেউ  গত নিবাচনেও মোদীর দলে বা জোটের পক্ষের কেউ ছিল না। বরং বিপক্ষ জোটে ছিল। কিন্তু তারা সকলে কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর পক্ষে ভোট দিয়েছে।

,এখন, সব মিলিয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, ব্যাপারটা ভুতুড়ে ক্ষমতার কারণে ভারত রাষ্ট্রের ভেঙে টুকরা হয়ে যাওয়ার দিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছে তাই নির্দেশ করে। আর ইতিবাচকভাবে দেখলে, মাথা নাগরিকদের মুরোদ থাকলে এই ভাঙাটাই পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ কোন কিছু না ভাঙলে তা ফিরে গড়বেন কী করে? তবে পুনর্গঠনের মুরোদ যদি থাকে – এই হল মুখ্য প্রশ্ন। যদি তা না থাকে, তখনই এর অর্থ ভারতের ৩৬ টুকরা হয়ে যাওয়া। আর মুরোদ দেখাতে পারলে, পুনরায় আমেরিকার মত এক ফেডারেল ভারত হিসাবে নিজেকে পুনর্গঠিত ভারত হিসেবে আবির্ভূত করে ফেলা। বলাই বাহুল্য, সেক্ষেত্রে সবার আগের করণীয় বা লক্ষ্মণ হল,  “হিন্দুত্ব” কে চিরতরে সামাজিক চিন্তা থেকে ঝেটিয়ে বিদায়, একে  নির্বাসন করতে হবে। কেবলমাত্র এরপরেই ফেডারেল রাষ্ট্রবিষয়ক পাঠ পড়াশুনাগুলা সম্পন্ন করতে হবে বা যেতে পারে। কাশ্মীর তাই আসলে বিরাট ধবংস ও পতনের বীজ এক আইসবার্গ [iceberg], বিরাট বরফের চাঙ্গর, হিমশৈল। বাইরে থেকে এর কেবল উপরে ভেসে থাকা ছোট্ট মাথাটা  দেখা যাচ্ছে। অথচ সে বিরাট জাহাজ ঢুবিয়ে দিয়ে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন! না ভারতের কেউ এটা দেখতে পাচ্ছে, তা মনে হচ্ছে না। কারণ চারিদিকে প্রবল এক হিন্দুত্ব-জ্বর ছেয়ে গেছে, সবাই ভুগছে! এক অধপতিত নস্টা  চিন্তা – কাশ্মীরি নারীর নিয়ে ইতরোচিত অবদমিত ফ্যান্টাসি, হিন্দুত্ব-চিন্তাকে পুষ্ট করে আগাচ্ছে! এক গভীর অসুখে ভুগছে ভারত!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে ভাঙ্গন শুরু হতে পারে কাশ্মীর থেকে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  একই শিরোনামে  বিডিভিউজ  অন লাইনেও ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

গৌতম দাস

০৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2EJ

 

[সার সংক্ষেপঃ ভারতে আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯,  ভয়েজ অব আমেরিকার সাথে সাক্ষাতকারে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার বক্তব্যঃ
“ভারতে কোন অবৈধ বাংলাদেশি থাকার খবর ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধরনের খবর উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের পলিটিক্স।’
স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশি সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?’
বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই।”

তাহলে আগামি ০৭ আগষ্ট ২০১৯, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে তাঁর সাথে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বৈঠকে, আসামের এনআরসি ইস্যুর কোন কিছুই এজেন্ডাতেই আসতে পারে না। অথচ ভারতীয় মিডিয়ার দাবি এটাই এজেন্ডায় আছে।]

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে,
আসামের এনআরসি আলোচনার কোন এজেন্ডাই হতে পারে নাঃ
ভারতের এনআরসি [National Register of Citizens (NRC)]  মানে আসামের তথাকথিত বৈধ ভারতীয় নাগরিক বাছাই। শেষে এটা দাড়িয়েছে এমন যেন – কারা ভারতীয় নয়, তা খুঁজে বের করার নামে এক মুসলমানবিদ্বেষী প্রক্রিয়া। যার পেছনের বিদ্বেষী ভাবনাটা হল যে, আসামের কোথাও কোন মুসলমানকে পাওয়া গেলেই তা আগাম নিশ্চিত ধরে নেয়া যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু। এটা আরও বেশি হয়েছে, ২০১৬ সালে আসাম রাজ্য সরকারে বিজেপির কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নিবার পর থেকে। আর এর আগে মানে  ২০১৬ সালের আগের এব্যাপারে ভার্সানটা ছিল এমন যে কোন মুসলমান বা বাঙালি পেলেই বাছবিচার  ছাড়া আগাম ধরে হত যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু।  এমনই পরিস্থিতিতে গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, তার নিজের তত্ত্বাবধানে এনআরসি বা নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা শুরুর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে এই নাগরিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ করে এক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে – এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

ইতোমধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ডেডলাইন অনেকবারই বদলানো হয়েছে। এমন চারবার বদলানোর পরে এক খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর ৩১ জুলাই ২০১৮। ভারতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী (২০১৬), আসামের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৩৯ লাখ। এখন সাড়ে তিনকোটির কিছু বেশি হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ হিন্দু ও মুসলমান নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি বলে দাবি তালিকা প্রণয়নকারীদের। যদিও এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রায় প্রতিদিনই খবর আসছে। যেমন বাবা-মা নাগরিক অথচ সন্তান নয় এমন কেস সামনে আসছে।  আবার কাছাকাছি নাম, বা নামের মিলের জন্য অন্যজনকে ধরে আনার ঘটনা আছে। এমন বহু আজিব কাহিনীও আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা এই প্রজন্মের ধারণা নাই, রেশন মানে কী? কেরোসিন, চিনি, লুঙ্গি, সাবান এসবের জন্য সারাদিন ধরে লাইন ধরে পড়ে থাকা – এই অভিজ্ঞতা যার নাই সে বুঝবে না এটা কী।  এককথায় বললে মানুষের নুন্যতম মর্যাদাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয় এতে – পুরা ডি-হিউম্যানাইজ। পুরা আসামের সবাইকে বিশেষত মুসলমানদেরকে নাগরিক্ত্বের প্রমাণ করার নামে মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়েছে। কারণ কাজের পুরা পদ্ধতিটাই সেই সত্তর দশকের চিন্তায়, রেশনের লাইনে পাবলিককে সারাদিন খাড়া করায় রাখার মত। যখন এডুকেটেড মানুষও জানত কী “ম্যানেজমেন্ট” মানে কী?

এখন পর্যন্ত এই ৪০ লাখসহ পরে ঘোষিত আরো প্রায় এক লাখ বাদে বাকি জনসংখ্যা নাগরিক তালিকায় বৈধ নাগরিক বলে ভুক্তি ঘটেছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে ওই খসড়া তালিকায়। আর গতমাসে ৩১ জুলাই ২০১৯ এই খসড়ারই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালতের নির্ধারিত সেই ডেডলাইন এ পর্যন্ত মোট ছয়বার বদলানোর পরে গত মাসের (জুলাই ২০১৯) শুনানিতে আর একবার মাত্র এক মাস বাড়িয়ে চূড়ান্ত তারিখ (সম্ভবত এবারই শেষ) আদালত দিয়েছে ৩১ আগস্ট ২০১৯।

কিন্তু এবার তামাশার দিকটা হল – এতে কেউ, ভারতের কোনো পক্ষই সন্তুষ্ট নয়। না অসমিয়া বাসিন্দা, না কেন্দ্র বা রাজ্য বিজেপি, না আসাম কংগ্রেস না আসামের পাহাড়ি উপজাতিসহ আর কোনো রাজনৈতিক দল।  আসাম কংগ্রেসের নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গোগোই এর দাবি আসাম এক নির্ভুল নাগরিক তালিকার বদলে আসাম একটা কাগজের তেনা পাইতে যাইতেছে [Assam won’t get an error free NRC on August 31: Tarun Gogoi ]। আর প্রতীক হাজেলা নামের মুখ্য আমলা – যাকে এই প্রকল্পের মুখ্য সমন্বয়-কর্তা হিসেবে আদালত সরাসরি নিজের অধীনে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই প্রতীক হাজেলাকে দায়ী করে সবপক্ষই এখন যার যার নিজেদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।  গত মাসের শুনানিতে আদালতে খোদ আসাম রাজ্য সরকারও অন্যদের সাথে জানিয়েছিলেন তৈরি খসড়া তালিকাও “ভুলমুক্ত” নয়। তাই একে শুদ্ধ করে তুলতে সময় অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে হবে, যাতে তা একটা ভুলমুক্ত তালিকা হয়ে উঠতে পারে – এই বলে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত সে আবেদনে সাড়া দেননি। কেবল ৩১ জুলাইয়ের ফাইনাল ডেডলাইনটা মাত্র এক মাস পিছিয়ে ৩১ আগস্ট করেছেন।

ওই আবেদন করেছিল মূলত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার আলাদা দরখাস্তে, কিন্তু একই ভাষায়, [In identical but separate applications, they urged the Supreme Court ] অর্থাৎ মূলত বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ, যিনি এখন নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার কথাতেই এই আবেদন। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার বলতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই ছিল ঐ আবেদনকারী। আর এখন জানা যাচ্ছে, কেন অমিত শাহ আবার সময় চাচ্ছিলেন। আদালতে পেশ করা ওই আবেদনে লেখা ছিল, খসড়া তালিকাটা ‘নির্ভুল’ নয়।

কেন্দ্রিয় সরকারের এটর্নি তুষার মেহতা আদালতে পাবলিকের  অনুমানের [perception] দোহাই দিয়ে  দাবি করেছিলেন,
“There is a growing perception. They must have done excellent work, but mistakes have crept in. The quantum of people included in certain areas is more… Wrongful inclusions are manifold in the bordering districts, lakhs of illegal immigrants have been included in the draft NRC list.”। অর্থত পাবলিক পারসেপশন হল তালিকা নির্ভুল না।
তাই ঐ দাবির আবেদনে বলা হয়েছিল, অতএব এক নির্ভুল নাগরিক তালিকা করতে বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর আসামের জেলাগুলো থেকে খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ২০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায় এরা। এ ছাড়া এরা বাকি পুরো আসামের খসড়া নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ১০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায়। আদালত যদিও এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন, কিন্তু অমিত শাহদের এতে উদ্দেশ্য কী ছিল?

কথা সত্য, যে আসামে কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা তৈরি করা গেছে বলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। কেন? পাবলিক পারসেপশন [Public perception] কথাটার মানে হল – জনমনে যে অনুভব বা ধারণা তৈরি হয়ে আছে। এই অনুভব কিন্তু বাস্তবে সত্যি হতে পারে আবার মিথ্যাও।
কিন্তু আসামে কয়েক যুগ ধরে চলা উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলন – এমন একটা জনমনের অনুভব বা শক্ত পারসেপশন তৈরি করেছে যে  – “বিদেশি” বা “বাংলাদেশি বাঙালি”, “অনুপ্রবেশকারি”, “মুসলমান” ইত্যাদি শব্দগুলো – এগুলাই তাদের সব দুঃখের কারণ। এক শব্দে বললে “বিদেশিরাই” [xenophobia] এমন এক “বিদেশি-আতঙ্ক”  সব দুঃখের কারণ মনে গেথে দেওয়া হয়েছে।  কাজেই সত্যিকার নাগরিক তালিকা তৈরি মানে কিন্তু আসলে জনমনের এই অনুভব বা পারসেপশন সত্যি কিনা এর যাচাইমনে গেথে বসা ধারণাটার পক্ষে বিনা বিচারে কোন সাফাই তৈরি করার প্রকল্প নয় এটা।   কিন্তু পুরা আসাম NRC তৈরির কাজটাকে দেখেছে এভাবে যে এই প্রক্রিয়াটা হল তাদের “জনমনের অনুভব” এর পক্ষে সাফাই তৈরির কাজ এর প্রক্রিয়া হিসাবে।
অথচ সত্যতা যাচাই মানে তো সাফাই তৈরির কাজ না। তাই এই কারণের আসাম কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা পাবে না। 

ইতোমধ্যে আসামের রাজ্য (প্রাদেশিক) পার্লামেন্টে পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী রাজ্যভিত্তিক এনআরসির খসড়া ডাটা প্রকাশ করে দিয়েছেন। গত ০১ আগষ্ট ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা [With district-wise data, Assam govt. pushes for NRC ] এবিষয়ে জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশের সীমান্ত আসামের জেলাগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমান নাগরিক তারা সবাই খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আসামের মুসলমান অধ্যুষিত ধুবরি, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও সাউথ সালমারা জেলায় যথাক্রমে ৯১.৭৮ শতাংশ, ৯২.৩৩ শতাংশ, ৯১.৯৬ শতাংশ ও ৯২.৭৮ শতাংশ মানুষ খসড়া বৈধ নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এটাই বিজেপির বিরাট মাথাব্যথার মূল কারণ। আসামের পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী এই তথ্য তুলে ধরে এখন হায় হায় করছেন। কারণ, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এই ডাটা,  এটা অসমিয়া ও বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী যে প্রপাগান্ডা আছে যে, “মুসলমান মাত্রই এরা সবাই বাংলাদেশী” একে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে। সারকথা হল, আসামের অমুসলমান সবগুলো স্থানীয় পক্ষ এবং সাথে বিজেপি- এদের সবারই মুসলমানবিরোধী যে বয়ান তা হল, সীমান্ত এলাকা বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানে সব ভরে গেছে। অর্থাৎ মুসলমানবিরোধী সবগুলো পক্ষের অনুমানের বয়ান আর বাস্তবতা এ দুটোর বিরাট অমিল – এই খসড়া নাগরিক তালিকায় দেখা দিয়েছে। তাই তাদের আহাজারি উঠেছে।

তাই অমিত শাহ-দের ইচ্ছা ছিল যদি ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেক করার সুযোগ – এই অজুহাত তারা পেত, তবে “কিছু একটা” তারা করার চেষ্টা করত, যাতে ১৯৮৫ সালের চুক্তির বয়ান আর একালে বিজেপির মুসলমানবিরোধী বয়ানকে সত্য বলে হাজির করা যেত যে, এরা বেশির ভাগই বাংলাদেশী।

কিন্তু আদালত তাদের আবেদন পুরাই নাকচ করে সব মাটি করে দিয়েছে। যদিও আদালতের যুক্তি ছিল ভিন্ন। আদালত বলেছিল, আগেরবার তারিখ বাড়িয়ে নেয়ার আবেদন নিয়ে শুনানিতে প্রতীক হাজেলা আদালতে পেশ করা রিপোর্টে নিজেই স্বীকার করে জানিয়েছিলেন, প্রায় ২৭ শতাংশ ডাটা ইতোমধ্যে দু’বার চেক করা হয়ে গেছে। তাই এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আদালত বলেছিল যে তাহলে এখন আবার ২০ শতাংশের দাবি কেন? বরং আরো বেশি ২৭ শতাংশ ডাটা দু’বার চেক যেহেতু হয়েই গেছে, সেই যুক্তিতে আবার সময় দেয়া আর ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেকিংয়ের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য।  গত মাসে ২৩ জুলাই ২০১৯, শুনানি শেষে আদালত পুরো সে আবেদনই নাকচ করে দিয়েছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে বাঙালিবিরোধী অহমিয়া (অসমিয়া) ও মুসলমানবিরোধী বিজেপি সবারই রাজনৈতিক বয়ান ও দাবির পক্ষে সাফাই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দেখে এই অসন্তুষ্টিতে তারা সবাই এখন সব দোষারোপ ঢেলে দিচ্ছেন প্রতীক হাজেলার ওপর। অনেক স্থানীয় পত্রিকা প্রতীক হাজেলাকে “বিশ্বাসঘাতক’ বলতে দ্বিধা করেছেন না। নর্থ ইস্টের এমন এক পত্রিকা লিখছে- “আসাম-বিজেপির এক সভা থেকে প্রতীক হাজেলার ‘অবস্থানকে সন্দেহজনক’ বলে এক প্রস্তাব প্রকাশিত” হয়েছে [প্রান্তজ্যোতি প্রতিবেদন, গুয়াহাটি ২৬ জুলাই ২০১৯]। এছাড়া ‘নয়া ঠাহর’ নামে এ রকম আর এক পত্রিকার ভাষায় ২৫ জুলাই,   [পত্রিকাটার অসমিয়া স্টাইলের বাংলা হুবহু রেখে দেয়া হয়েছে এখানে] “আসামের জনসাধারণ,কেন্দ্র, রাজ্য সরকারকে অন্ধকারে রেখে একটি ত্রুটিপূর্ণ বিদেশী নাম যুক্ত এনআরসি প্রকাশের জন্য প্রতীক হাজেলা এক বিশেষ শক্তির নির্দেশে কাজ করছে বলে মনে হয়েছে । প্রতিক হাজেলার এমন পরিস্থিতি অসমীয়া জাতির জন্য এক অশুভ ইঙ্গিত বহন করে করছে বলে আসাম বিজেপি এক বিবৃতি যোগে প্রকাশ করেছে”।
পত্রিকাটি আরো লিখেছে, “উল্লেখ্য, প্রতীক হাজেলার উচ্চতম ন্যায়ালয়ের কোনো নির্দেশ না হওয়ার আগেই খসড়াতে সন্নিবিষ্ট লোকের ২৭ শতাংশ পুনরায় পরীক্ষণ করা হয়েছে বলে উচ্চতম ন্যায়ালয়ে দাখিল করা বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আসামের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের প্রতি লক্ষ রেখে রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসিতে নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নাগরিকের ২০ শতাংশ নাগরিকের নাম পুনরায় পরীক্ষার জন্য উচ্চতম ন্যায়ালয়কে আবেদন জানিয়েছিল। এই আবেদন সম্পর্কে ন্যায়ালয়ের নির্দেশ না হওয়ার আগেই ২৭ শতাংশ নাগরিকের পুনরায় পরীক্ষণ হাওয়ার কথা বলে প্রতীক হাজেলা যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় বলেই বিজেপি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে”।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরঃ
মনে হচ্ছে, এই অবস্থায় ইতোমধ্যে অমিত শাহরা আরেক বড় পরিকল্পনা এঁটেছে। আগেই বলেছি, অমিত শাহ এবারের দ্বিতীয় মোদী সরকারে নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। খবর বেরিয়েছে, তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে আগামী ৭ আগস্ট দিল্লিতে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। কোন বৈঠকের অনেক আগেই বৈঠকের অ্যাজেন্ডা কী হবে তা যেকোনো পক্ষই প্রস্তাব করতে পারে। এরপর দু’পক্ষই একমত হলে তবেই তা আলোচ্যসূচি বা এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশের মিডিয়ায় এই বৈঠকের এজেন্ডা কী তা নিয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে তা হল – ‘সীমান্তে পাচার, ভারতীয় ভুয়া মুদ্রা, ভারতীয় বিদ্রোহী গ্রুপ, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও জনগণ সম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যু।’ কিন্তু এসবের বাইরে আরেক বিশেষ এজেন্ডার কথা প্রকাশিত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের ‘ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকায়, ৩০ জুলাই। লেখা হয়েছে, ‘অমিত শাহ অবৈধ মাইগ্রেন্ট ইস্যু নিয়ে কথা তুলবেন” [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart]। আরো বলা হয়েছে, India is keen to ink a deportation deal…। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের সাথে একটা একেবারে “বিতাড়িত করার চুক্তি” করতে ভারত খুবই আগ্রহী। কী নিয়ে? না, আসামের নাগরিক তালিকাতে যে ৪০ লাখ লোক বাদ পড়েছে তাদের নিয়ে। কী আজব কথা!

এটি আসলে বিনা মেঘে বজ্রপাতের থেকেও বড় কোন ঘটনা।
প্রথমত এটা কোনোভাবেই দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের এজেন্ডাতেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। বাংলাদেশ রাজি হতে পারেনা। কারণ, এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের ঘোষিত অবস্থানের বিরোধী এটা। যেমনঃ প্রথম পয়েন্ট – গত ২০১৮ সালের আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে [শিরোনাম ছিল, NRC is India’s ‘local internal matter’ with ‘ethnic undertones’: Bangladesh] আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “প্রথমত আমরা এটিকে ভারতের আসাম রাজ্যের এক অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় রাজনৈতিক ইস্যু মনে করি”[“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। এ ছাড়া কেন আমরা এটা মনে করি তা নিয়ে এক শক্ত যুক্তি দেখিয়ে পরের বাক্যে তিনি বলেছিলেন, “যেহেতু এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, বন্ধু পড়শি রাষ্ট্রের ব্যাপার, তাই এ নিয়ে ভারতের সাথে কথা তোলার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। এছাড়া গত ৪৮ বছরে ভারত সরকার কখনোই এমন ইস্যু নিয়ে আমাদের কাছে কোনো কথা তোলেনি” [“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbour.”]।
এবার দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, গত বছর ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯, স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার। আমাদের ইত্তেফাক ঐ সাক্ষাৎকার থেকে নেয়া এক টেক্সট রিপোর্ট ছেপেছিল পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সেখানে লেখা দেখা যাচ্ছে- ‘শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশী সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?”  বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সাথে তার কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই”। অর্থাৎ শেষ বাক্যটাই সব জল্পনা-কল্পনার সব কিছুর ওপর পানি ঢেলে দেয়। সার কথাটা হল, আসামের এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান কী, আমাদের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী পাবলিককে তা জানিয়েছেন এবং তা খুবই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

তাহলে আসন্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে, আসামের এনআরসি অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে – তা আলোচনার এজেন্ডায় উঠে আসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

অথচ উদ্বেগের ব্যাপার হল, ভারতের ইকোনমিক টাইমস ৩০ জুলাই এমন রিপোর্ট করার পরে এর উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন আর যমুনা টিভির নিউজ ওয়েবসাইটে রিপোর্টটি একই দিনে বাংলায় ছাপা হলেও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের বা বাংলাদেশের ছাপা রিপোর্ট নিয়ে আমাদের আম-পাবলিককে কিছুই জানায়নি। কোন সাড়াশব্দও নাই। বাংলাদেশের প্রকাশ্যে গৃহীত অবস্থান ছাপিয়ে ভারতের সাথে একটা আলোচনার একে এক অ্যাজেন্ডা বলে হাজির করানোর দাবি করা হয়েছে, অথচ এর বিরুদ্ধে আমাদের সরকার পুরো নিশ্চুপ।

ওই দিকে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন চলতি বছরের শুরুতে প্রথম ভারত সফরে বলে বসেছিলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নাকি স্বামী-স্ত্রীর। এমন লুজটক করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার কেউ কখনো দেখেছে জানা যায় না। তিনি গত মাসে আর এক লুজটক করে ভারতের স্ক্রোল পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নিয়ে অনেক বিপদে আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। এই গ্রহে বাংলাদেশই সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ” [We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”। অর্থাৎ তিনিও খেয়াল রাখেননি, খোঁজ নেননি আসামের এনআরসি ইস্যুতে ইতোমধ্যে আমাদের গৃহীত অবস্থান কী? আমাদের তো এনআরসি ইস্যুতে ভারতের সাথে কথা বলাই উচিত না। বললে বরং সেটা আমাদেরই স্ববিরোধী অবস্থান হবে। এছাড়া, রাষ্ট্রের বিদেশনীতির প্রথম কথাই হচ্ছে নীতিগত অবস্থানের রেকর্ড স্ট্রেট রাখা, পরিষ্কার করে রাখা আর তা মেনে চলার ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখা। এর বাইরে কোনো লুজটক না করা।

তাহলে এর মানে কী, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এই ভারত সফরে, আসামের এনআরসি নিয়ে অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে কি কোনো চুক্তি করতে যাচ্ছেন? অথবা তাহলে হচ্ছেটা কী? পাবলিক তা কার কাছ থেকে জানবে?

অথচ হওয়া উচিত ছিল উলটা। ঐ অমিত শাহ এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। এর আগে যখন কোন মন্ত্রী বা সরকারের কেউ ছিলেন না তখন তিনি বাংলাদেশিদেরকে তেলাপোকা, উইপোকা, পিষে মেরে ফেলবেন, ছুড়ে ফেলে দিবেন ইত্যাদি বলে পাবলিক বক্তৃতা করতেন। এখন গত মাসে  ১৭ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় তিনি আবার বলেছেন, “দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি থেকে অবৈধ ভাবে বসবাসকারী অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বার করবে সরকার। এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদের ফেরত পাঠাবে”। ইউটিউবে দেখুন, [“Illegal Immigrants Living On Every Inch Will Be Deported”: Amit Shah] একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এধরণের কথার কোন জবাবদিহিতার ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আদায়ের আগে এই লোকের সাথে তো আমাদের কোন বৈঠকই করা উচিত না!

এদিকে, আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা ঘোষণার দিন চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট ২০১৯, টিকটিক করে এগিয়ে আসছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসামের এনআরসি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর কি সম্পর্কিত?” এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

গৌতম দাস

২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wW

 

আবার হেডলাইনে আসাম। তবে এবার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নতুন “নাগরিকত্ব বিল”। যদিও সম্প্রতিকালে আসাম বলতে বাংলাদেশের মানুষ চিনে এনআরসি-এর আসাম। NRC বা এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস; অর্থাৎ আসামে এখন বসবাসকারী সবাইকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে এক নাগরিকত্বের তালিকায় নাম তুলতে হচ্ছে। যার মূল কথা – ‘পড়শি’ দেশ থেকে যারা আসামে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর পরে আসামে এসেছে তাদের চিহ্নিত করা, যারা আসামের নাগরিক গণ্য হবেন না। তাদের অনুমান ছিল যে ইতোমধ্যে এক ব্যাপক সংখ্যক লোক আসামে এসে ঢুকেছে। যদিও নানা কারণে অনেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ দিতে পারেনি; যেমন সন্তান পেরেছি কিন্তু পিতা কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেন নাই এমনও হয়েছে। তবু এসব অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া কিন্তু চিহ্নিত নাগরিকদের নিয়ে এরপর তাদের নিয়ে ঠিক কি করা হবে তা “আনুষ্ঠানিক” ভাবে কেউ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত ভারতের সরকারি অবস্থান হল যে এটা ভারতের “অভ্যন্তরীণ বিষয়”  – এই বলে চালাতে চাইছে। ঠিক যেমন ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু করলেও তা আর কখনই বন্ধ করা হয় নাই। এদিকে এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল। এই তালিকা তৈরির নির্দেশ কিন্তু ভারতের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে এসেছে। তা সত্ত্বেও সেই কোর্টও স্পষ্ট করে বলছে না যে, ‘নাগরিক প্রমাণ দিতে না পারলে’ সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে কী করা হবে। কারণ, কারও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত না হওয়া মাত্রই এটা আপনাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে না যে, সে বাংলাদেশের নাগরিক। আর মূল কথা সে ক্ষেত্রে ঐ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ইস্যু নিয়ে কোন ততপরতার শুরুর আগে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিকভাবে ফরমাল কথা বলতে হবে। বাংলাদেশকে রাজি করাতে হবে। বাংলাদেশ যদি রাজি হয় তবেই এরপরেই কেবল আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারবে।

তবে সে কথা এখন থাক। কারণ, ইস্যু এখন তার চেয়ে আলাদা এবং ভয়াবহ। হিন্দুত্বের মোদী এবার আবার আর এক নতুন দানবীয় ইস্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাকে আসামে নতুন করে আগুন লাগানোর লক্ষ্যে মোদীর ‘নাগরিকত্ব বিল’ বলা যায়। যার আঁচ বাংলাদেশেও টের পাওয়া যাবে এমনই ভয়ঙ্কর। এই বিলের আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হল – সিটিজেনশিপ (সংশোধনী) বিল ২০১৬ (Citizenship (Amendment) Bill, 2016)। এই বিলটা বিজেপি ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় পেশ করেছিল ১৯ জুলাই ২০১৬ সালে। তাই বিলের নামের সাথে ২০১৬ শব্দটা লেগে আছে। এতদিন সেটা এক যাচাই কমিটিতে ইচ্ছা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। আসলে মোদী এটা সময়-সুবিধামত বের করবেন তাই গত দু-আড়াই বছর এটা আটকা ছিল। এখন গত সপ্তাহে ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঐ শিরোনামের আইনটা ভারতের লোকসভায় শেষ অধিবেশনে পাস হয়েছে।

সার করে বললে, মূলত এটা এর আগে ভারতের “নাগরিকত্ব বিল ১৯৫৫” (Citizenship Act, 1955) এর কিছু ধারায় আনা সংশোধনের পরের নতুন রূপ। সংশোধিত হবার পর ঐ বিলের সারকথাটা হল – বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশ থেকে (মুসলমান বাদে) হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান এই ছয় ধর্মের লোক ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হলে – আর ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে তাদের ছয় বছর বসবাস পূর্ণ হলে পরে এবার তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া যাবে। এই লক্ষ্যে এমন কেউ ভারতে প্রবেশ করলে যা আগের (১৯৫৫) সংজ্ঞা অনুসারে ‘অবৈধ ইমিগ্রান্ট’ (illegal immigrant) বলে বিবেচিত হতেন, এখন এই বিল পাশের পরে তারা “আশ্রয়প্রার্থী নাগরিক” বলে বিবেচিত হবেন। ফলে তারা ভারত থেকে বহিস্কৃত (deported) হবেন না, বা অবৈধ প্রবেশের দায়ে আদালতে পঁচে মরবেন না। বরং ভারতে থাকার পারমিট পাবেন। আর এভাবে টানা সাত বছর (আগের আইনে এটা ১২ বছর ছিল) থাকার পরে আবেদন করলে, ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন।

যদিও (মুসলমান বাদে) শব্দগুলো সেখানে লেখা নেই, কিন্তু অর্থ তাই। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শব্দগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে, আর ছয় ধর্মের নামও পরিস্কার উল্লেখ করা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়া বারবার ছয় ধর্মের উল্লেখ করার ঝামেলা এড়াতে েদের বদলে একটা শব্দ লেখা শুরু করেছে – ‘অ-মুসলমান”। যেমন ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনাম হল, (Lok Sabha passes Citizenship Bill amid protests, seeks to give citizenship to non-Muslims from 3 countries)। অর্থাৎ মোদী সরকার আসলে যা বুঝাতে চেয়েছে, মিডিয়াগুলো তাই লেখা শুরু করেছে।

কেন এই আইন আদালতে অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত
যে লিগাল ত্রুটির কারণে এই বিল অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত মূল সে যুক্তিটা হলঃ এটা বৈষম্যমূলক। অর্থাৎ এটা কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক “সাম্য নীতি” ভঙ্গ করেছে। ঐ বিলে বলা হয়েছে – ঐ তিন দেশে ‘ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে থাকারা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী যারা, তারা এ সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু তা সাধারণভাবে সব ধর্মের লোক না বরং ‘মুসলমান বাদে’ ভারতের ছয় ধর্মের কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে, যাদের বেলায়ই কেবল এটা প্রযোজ্য হবে। এটা স্পষ্টত এক বৈষম্যমূলক আইন। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা থাকা ও বাস্তবায়ন – এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের এক মৌলিক ভিত্তি।  এখানে সাম্য কথাটা ইতিবাচকভাবে বলা হয়। যেখানে মূল ভাবটা হল, বৈষম্য – নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, কোন আইন করা যাবে না যার মাধ্যমে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মানে রাষ্ট্রকে এক “নাগরিক বৈষম্যহীনতার” নীতি অনুসরণ করতেই হবে। বৈষম্যহীনতা মানেই ত সাম্য – তাই শব্দটাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে “সাম্যের” নীতি বলা হয়ে থাকে। এই কারণে, কোনও রিপাবলিক রাষ্ট্র কেউ মুসলমান বলে বা হিন্দু বলে যেকোন নাগরিক এমন কারও প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পারে না। এটাই নাগরিক সাম্য বা Equility এর মৌলিক নীতি, অথবা রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন থাকার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। এই যুক্তিতে কোন সুপ্রীম কোর্ট এই বিলকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।

এছাড়া, আর একটা কথা হল কখন কোন জিনিষ আইন বলে গণ্য হবে – এই প্রসঙ্গে আইনের ভিতমূলক প্রস্তাব বলে থাকে যে কোন বিষয় আইন বলে তখনই মানা হবে যদি তা নাগরিক-নির্বিশেষে সবার উপর প্রযোজ্য করা হয় তবেই। নইলে তা কোন আইনই নয়। সোজা কথা যা সবার উপর প্রযোজ্য করা যায় না তা কোন আইনই নয়। মোদীর নাগরিক বিল এই যুক্তিতে কোন আইনই নয়। ফলে ভারতের আদালতে রিট হলে আর  সৎ ও দুরদৃষ্টির যেকোন পেশাদার বিচারক এই আইনকে অবৈধ ও রদ (null & Void) করা হল – বলে রায় দিবেন।

ওদিকে বিল পাশের আগের সপ্তাহে ০৪ জানুয়ারি আসামের শিলচর গিয়ে মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছিলেন। সেখানে আবেগী বক্তৃতায়  দিয়ে মোদী বলছেন, ভারত মাতার সন্তানদের প্রতি ভারতের দায় আছে (আগ্রহীরা ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন। 15:58 মিনিটের এই ক্লিপে 05:30 মিনেটের পর থেকে মোদীর “ভারতমাতার” সে কাহিনী শুনা যেতে পারে।)। সেই দায় থেকে ঐ তিন দেশের ঐ ছয় ধর্মের যারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদেরকে আশ্রয় দেয়া মোদীর দায়িত্ব – এটাই মোদীর সারকথা। কিন্তু এখন মোদীর এই যুক্তি অনুসারেই মুসলমানদের বাদ পড়ার কোন কারণ নাই। এটা এমনই উদাম এক মুসলমান-বিদ্বেষী আইন।  যেখানে এমনকি পারসি, খ্রীশ্চান ধর্মও মোদীর ধর্ম-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  যেমন, আরএসএস-বিজেপি তাদের উদাম বিদ্বেষ ঢাকতে প্রায়ই বলে থাকে, “ইসলাম বা মুসলমানেরা ভারতে বহিরাগত”। এখন এসব বিদ্বেষী-ভাষ্য যদি এটা মেনেও নেই তাহলে খোদ আর্যরা কী বহিরাগত নয়? তারা কোন ভারতের ঘরের লোক? এছাড়া প্রাক-ইসলামি যুগের পারস্য বা ইরানের পারসিক অথবা ইউরোপীয় খ্রীশ্চান এরা কীভাবে ভারতের ঘরের? আরএসএস-বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষ কত তীব্র তার প্রমাণ এগুলো। না তবে সাবধান। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে বলবার জন্য একথাগুলো বলা হচ্ছে অজান্তেও তা মনে করা যাবে না। সেটা আর এক বিরাট বে-ইনসাফি হবে। যেমন মোদী যদি বলতে পারতেন “যে কোন ধর্মের” আর “যে কোন দেশের” নাগরিক যারা ধর্মের কারণ নির্যাতিত তাদের জন্য এই আইন – তবে সেটাই হত সবচেয়ে মানবিক আর সবার জন্য কাম্য ও আদরের এক নাগরিকত্ব আইন।

এখন তাই মোদির নাগরিক বিল পাস হওয়ার দিন, ৮ জানুয়ারি এক উল্লেখযোগ্য নতুন বৈষম্যের দিন হয়ে থাকল। কারণ, একে তো এমনিতেই আসামে আগের নাগরিক তালিকা তৈরির – এনআরসি তাতে, ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে আসামের অপ্রমাণিত নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে আবার ১৮ লাখই হিন্দু। অর্থাৎ এনআরসি তৈরির উদ্যেশ্য বা পেছনের অনুমান ছিল যে প্রমাণ করতে না পারা অর্থে অবৈধ নাগরিকের বেশির ভাগ হবে মুসলমান। আর মুসলমান মানেই ধরে নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অনুমানই ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে যায় যখন হাজির হয় যে এর মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাদের নিয়ে কী করা হবে সেই টেনশন বাড়ছিল। এর ভেতর নতুন করে আর এক দিকে উত্তেজনা ঘুরিয়ে বিজেপির দলীয়করণ করে নেয়া হল।

১৯৮৫ সালের চুক্তি বনাম মোদীর বিল
অহমিয়াদের সাথে রাজীব গান্ধী সরকারের ১৯৮৫ সালের চুক্তিতে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন ভাগ ছিল না। বলা ছিল, যারাই ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের পরে আসামে প্রবেশ করেছে বলে জানা যাবে তাদেরকে আসামের নাগরিক মানা হবে না – এই ছিল চুক্তি মূল কথা।  এই কারণে, NRC এর ভিত্তিও একই। কিন্তু বিজেপি এই ৪০ লাখ  হিন্দু-মুসলমান, এমন অপ্রমাণিত-নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবার বাস্তবতায় হিন্দুদেরকে সুবিধা আর মুসলমানদেরকে বঞ্চনা দিয়ে এক বৈষম্য করে এতে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের খাড়া করতে চাইছে।  এমনিতে বিজেপির সবখানের কমন রাজনৈতিক কৌশল হল – সাধারণভাবে “নাগরিক অধিকার” রক্ষা নয়, বরং একে পাশ কাটিয়ে হিন্দুত্বের আওয়াজ তুলে এর ভিত্তিতে সমাজে ভোটের মেরুকরণ তৈরি করা। আর এই সুযোগে হিন্দুত্বের নামে নিজদলের ভোটের বাক্স ভারি করা। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে সেই কাজটাই করা হল; তাতে সমাজে খামোখা বিভক্তি রেষারেষি বৈষম্য বাড়ল কীনা, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল কিনা – এসব কিছু ফেলে এখন পাঁচ বছরের মোদীর শাসনের শেষে উল্লেখযোগ্য সবই হারানো বিজেপি এখন বেপরোয়া।

এই বিলের প্রভাব ও পরিণতি
প্রথমত, আমাদের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, মোদির এই বিল আসামের এনআরসি বিতর্কের কোনো সুস্থ সুরাহা করার দিকে তাকিয়ে করা হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্য এ বিতর্ককে ব্যবহার করে বিজেপির নিজের বিভাজনের রাজনীতিকে বিস্তার ঘটান। তাই বেপরোয়া হয়ে অর্ধজ্ঞানের গোয়াঁর বিজেপি নেতারা [আসামের মন্ত্রী ও সারা নর্থ-ইস্টে বিজেপির মুল সংগঠক Himanta Biswa Sarma, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Sarbananda Sonowal ] মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন করে তারা দাবি করছে এটা নাকি তাদের তথাকথিত “সভ্যতার লড়াই”। বলছে – ……They want us to be slaves of a particular civilisation. However in this civilisational fight we must win. যদিও নেপথ্যে তারা বলছেও তারা নিরুপায়। অন্য সব ইস্যু বা অর্জন হারানো বিজেপি এখন তাই আসন্ন নির্বাচনে মূল ফোকাস শ্লোগান করবে তথাকথিত হিন্দুস্বার্থ, হিন্দুত্ব বা কথিত সভ্যতার লড়াই……।

এভাবে বিভাজন ঘটিয়ে তাদের শেষ আশা যে এভাবেই তারা আসন্ন নির্বাচন পার হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে,  সাধারণভাবে ভারতীয় “নাগরিক” এমন পরিচয়ের রাজনীতি বিজেপি করে না বরং এক বিভক্ত পরিচয় হিন্দুত্ব – এমন হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিই বিজেপি করে। এই হিন্দুত্ব পরিচয়ে ভোটারদের জন্য সে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে কেবল তথাকথিত হিন্দু স্বার্থের আওয়াজ তুলে মেরুকরণ করা ও ভোট বাক্সে তা পৌঁছান- এই হলো বিজেপির রাজনীতির কৌশল। তাই মোদির নাগরিকত্ব বিল সাধারণভাবে ভারতের সব রাজ্যের দিকে তাকিয়ে করা বলে মনে হলেও তা আসলে আড়াল সৃষ্টি করা। আর এই আড়ালে তাঁর বিশেষ টার্গেট রাজ্য হল – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। যেমন এ বিলের মাধ্যমে আসলে বলা হয়ে গেছে যে, আসামের তাদের এনআরসি-ইস্যুতে অপ্রমাণিত নাগরিকদের মধ্যেকার ১৮ লাখ হিন্দুকে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিজেপি নিয়ে নিল। আর এভাবেই আসামকে এখন হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করল বিজেপি।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এতদিন বিজেপি অভিযোগ করত,  পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া হিন্দু বাঙালি [পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভাষায় যারা ‘বাঙাল’], কংগ্রেস আর সিপিএম, কেবল এদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে গেছে। ‘বাঙালদের’ রেশনকার্ড আর ভোটার বানিয়ে দিয়ে নিজের দল-ভারী করার সহজ রাজনীতি করে গেছে। এমন ধরণের পাল্টাপাল্টি বয়ান অনেক আছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল এমন অভিযোগ – কংগ্রেস, সিপিএম অথবা বিজেপি – এরা কেউই মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কখনো করে না। তাহলে কী উল্টা? মানে, মমতা “বাঙালদের” বিরুদ্ধের রাজনীতিটা করে? না, সেটাও না। এমন অভিযোগও দেখা যায়নি। তবে মজার ব্যাপারটা হল এখন এ বিলের মাধ্যমে এবার বিজেপি নিজেই “বাঙাল” মনোরঞ্জনে সবার ওপরে এগিয়ে থাকার রাজনীতিতে নামল। যে অভিযোগ সে এতদিন অন্যদের বিরুদ্ধে করত।

সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া ধর্ম-নির্বিশেষে যে কেউই হোক, তাকে ভারতে নাগরিক হিসাবে “ন্যাচারালাইজ” করে নেয়া – এটা কোনোই খারাপ বা অন্যায় কাজ নয়। আপত্তি করারও কিছু এখানে নাই। যদিও আগে আইন বানিয়ে আইনসম্মত ভাবে তা করলে সেটা তো আরও ভাল। কিন্তু ঘোরতর বে-ইনসাফি অন্যায় ও খারাপ কাজ হবে যদি বৈষম্য করা হয় যে, “কেবল অমুক ধর্ম” হলেই তাকে স্বাগত। মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে যখন “মুসলমান বাদে” বলে নীতি-পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিজেপি সেই ভয়ঙ্কর বীজ বপনের কাজ শুরু করল। আসামের ঐ ১৮ লাখ হিন্দুর কথা তুলে বিজেপি আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনি ফোকাসের বক্তব্য করতে চায়। যাতে সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর বিশেষ করে “বাঙাল” হিন্দুরা সহানুভূতিশীল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটের বাক্সে আসে, প্রতিফলিত হয়। তাই মোদীর এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করা করা হয়েছে – অহমীয়াদের স্বার্থদের বিরুদ্ধে। এই হল নাগরিকত্ব বিল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি টার্গেট। মোদী তান্ডব আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই বিলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মমতাই এখন প্রধান প্রতিরোধকারি ও ভরসা।

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এমনকি এর সাথে পশ্চিমবঙ্গেও আর এক  বিজেপি প্রপাগান্ডাও চলবে যে, আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা “নাগরিক তালিকা” তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার শুরু করা হবে যে, তারা তুচ্ছ তেলাপোকা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাচনী অপপ্রচার এবং এই চরম ঘৃণা ছড়ান উন্মাদনা, এটাও বিজেপি পাশাপাশি চালাবেই। এটাই হবে, হিন্দুমনে জাগানো ঘৃণা-বিদ্বেষ কাজের মূল ফোকাস বয়ান। তার নির্বাচনি মুখ্য বয়ান।

যদিও এখানে খেয়াল রাখতে হবে আসামের মূল এনআরসির দাবি বা চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে আইনত তারা ঠিক কেবল মুসলমান বুঝায় নাই। এটা তেমন ভিত্তির ওপর দাঁড়ান নয়। ফলে তারা কেবল মুসলমানদের বের করে দিতে এ কাজ করছে তা নয়, বরং স্পষ্ট করে বলছে – ২৪ মার্চের পরে ধর্ম-নির্বিশেষে যারাই আসামে এসেছে তাদের বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে হবে। কিন্তু বিজেপি বা মোদি এই সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাদের সোজা ভাষ্য ও অর্থ হল – এনআরসির কর্মকান্ড বলতে কেবল ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ বুঝতে হবে।

আসামে এই বিলের প্রতিক্রিয়া
কেবল আসাম নয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আসাম ছাড়াও যেমন মনিপুরে, এমনকি ত্রিপুরায়ও। অনুমান করা যায় – তাদের মূল উদ্বেগের কারণ হল, এই সাত রাজ্যের মধ্যে যাদের সীমান্তের অপর পাড় বাংলাদেশ, তারা তো বটেই, এমনকি যারা নয়, তাদের এলাকাতেও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা এবার নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়েই এসে গেড়ে বসে যাবে – এই হল তাদের মুল উদ্বেগ। সাধারণভাবে এখানে আগে থেকেই থাকা সবচেয়ে বড় টেনশনের ইস্যু হয়ে ছিল, সমতলি-পাহাড়ি। আসামেরও মূল দ্বন্দ্ব, টেনশনও এটা। [আমাদের দেশে যেটা পাহাড়ি সেটা নর্থ-ইস্টের ভাষায় জনজাতি বা ট্রাইব।]  কারণ এই অঞ্চলের বড় বৈশিষ্ট হল পাহাড়ি বাসিন্দা অথবা ‘জনজাতি’ বাসিন্দা। ফলে এই অঞ্চলের সমতলি-পাহাড়ির মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন আর তা থেকে উদ্ভুত উচ্চ বা নিম্নস্বরে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা সেখানে সবসময় কাজ করে থাকে। এরই মধ্যে আবার “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করে তৈরি করা নাগরিকত্ব বিল এটাকে তারা দেখছে যে এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের (তারা বলতে চাচ্ছে এতে সমতলিদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে) নতুন করে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে আর স্বভাবতি তা ঘটলে তাতে আগের টেনশন আরও বড় নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে সুনির্দিষ্ট করে আসামের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক, তা অনুমান করা যায়। যেমন এমনিতেই আসামের এনআরসিতে যে ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকেছিল, তাদের মধ্যকার ১৮ লাখ হিন্দু নিজেদের ভাগ্য মোদী ফিরাবে একটা গতি হবে এই ভরসায় ইতোমধ্যেই তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের ও মোদীর ভক্ত হয়েছিলেন। সেটা কেবল ওই ১৮ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা আসামের বাঙালি হিন্দুমাত্রই তাঁরা ক্রমেই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছিলেন। এককথায় বললে, মোদীর হিন্দুত্বের ভিত্তিতে পাবলিক মেরুকরণ এর রাজনীতি এখানই বিভক্তির প্রভাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর তাই এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি”।

কেন? এখন এই ১৮ লাখ হিন্দুই হবেন আসামের পাহাড়ি বা যারা নিজেদের অহমিয়া পরিচয় দাবি করেন তাদের হাতে আক্রান্ত হবার প্রধান টার্গেট। আসামের পাহাড়ি বা অহমিয়া পরিচয়ধারীদেরই মূল রাজনৈতিক দল হল – অহম গণ পরিষদ ও বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। যারা বিজেপির সাথে মিলে বিজয়ে গত ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচন থেকে আসামের প্রাদেশিক জোট সরকারে ছিল। মোদীর নাগরিকত্ব বিল পাসের প্রতিবাদে এরাই এখন জোট-সরকার থেকে বের হয়ে গেছে। বিজেপির জোট শরিক অহম গণপরিষদের তিন মন্ত্রী রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে নয় জানুয়ারি সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরাই ১৯৮৫ সালের চুক্তির মুল দাবিদার পক্ষ যে চুক্তির মূলকথা হল, অ-অহমিয়দের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এরা এর প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক। এর আগে বাঙালি-নিধনের বহু রেকর্ড এদের আছে, এবং সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়া জেলায় পাঁচ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা ওই ১৮ লাখ হিন্দু বাঙালির ভাগ্যে এখন কী হবে এর ইঙ্গিত বলেছেন অনেকেই।

এ দিকে, আর এক অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যাচ্ছে। তা হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ মোদীর এই বিল পাসে খুশি হয়নি মনে হচ্ছে, অন্তত ভাল কাজ মনে করছে না। যদিও পেশাদার হিসেবে তাঁরা তাঁদের আপত্তি মনে মনে রেখেছে। তবে সেই সাথে আর একটা কাজ করেছে। তা হল, তাদের সাথে সম্পর্কিত বা এসাইনড লোকেদের হাতে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকে তাদের আপত্তি বা যুক্তিগুলো জানা গেছে। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিল পাসের ফলে এতে গত ছয় বছরে উলফার (ULFA, আসামে এটা উচ্চারিত হয় আলফা বলে) কমে আসা তৎপরতা যা এখন পরেশ বরুয়া অংশের নামে আছে কিন্তু স্তিমিত তাদের পুরনো সেসব তৎপরতা আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে তাঁরা। এমনিতেই জটিল পরিস্থিতি ও সমীকরণের আসামে আবার নতুন উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতের ফলে তাদের এতদিনের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যা কিছু অর্জন এত দিনে হয়েছিল তার উপর পানি ঢেলে দেয়া হবে বলে তারা মনে করে। তাই অশান্তি আর তাদের কাজ বাড়বে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া
এবারের ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি ও মোদীর রাজনীতি হবে বাংলাদেশের জন্যও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই বাংলাদেশের স্থানীয় হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই এখন আরএসএসের মুঠোয়। এই বিল “বাঙালি-হিন্দুমুখি” বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের “বাঙালদের” মনোরঞ্জন-মুখি এই অভিযোগ অনেকের।  ফলে মোদীর নাগরিকত্ব বিলের রাজনীতি হাজির করে বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই আরএসএসের মুঠোয় ভরতে তাদের সাহায্য করেছে। যদিও নিকট আগামিতেই বাংলাদেশের হিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে আত্মঘাতি বলে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য যে ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে তা হল, এই বিল এক বিশাল মরিচিকা।

ওদিকে অর্থনীতিক ‘উন্নয়ন ও বিকাশে’ রাজনীতিতে মোদী ইতোমধ্যেই ফেল মেরেছে। আসলে সেকারণেই মোদীর এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতি এত সিরিয়াস-নেস। আর একেই বিকল্প ইস্যু ভাব ধরে হাজির করার উদ্যোগ। মানে তার এখন একমাত্র সম্ভাব্য ইস্যু হবে হিন্দুত্ব, যার বিশেষ ফোকাস হবে ‘নাগরিকত্ব বিল’। আমরা ইতোমধ্যে – মুসলমানেরা তুচ্ছ তেলাপোকা, পিসে মেরে ফেলা হবে, বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে উপড়ে ফেলা হবে, ইত্যাদি এসব বলে গত নভেম্বর পাঁচ রাজ্য নির্বাচন লড়েছে বিজেপি দেখেছি।

সেই মহড়ার পর এবার আবার মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় নামতে হবে মোদীকে। আমাদের সরকার গতবার কেবল তথ্যমন্ত্রী ইনুকে দিয়ে এই ইস্যুতে ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নাগরিকত্বের বিল পাস করার পরে মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডা আরও তীব্র হবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ এবার এটা আরও বড় স্টেক; মোদী নির্বাচনে জেতার মামলা যেখানে আবার নাগরিকত্ব বিল মুল ইস্যু।

এছাড়া ওদিকে আবার বিশেষ করে আসামে যেখানে অহমিয়া-বাঙালি সঙ্ঘাত উসকে গেল সে পরিপ্রেক্ষিতঅও তৈরি হচ্ছে। হাসিনা সরকার তার প্রথম পাঁচ বছরেই উলফা দমনে যে ভূমিকা ও সহায়তা দিয়েছিল এর প্রশংসায় ভারতের গোয়েন্দা-আমলা থেকে রাজনীতিক সবাই পঞ্চমুখ। যদি তাই হয় তবে একদিকে এখন সেই অর্জন ভেঙে ফেলতে পরোয়া করছে না মোদীর নির্বাচনে জিতবার স্বার্থ। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের তেলাপোকা বলে ঘৃণা আর গালির জোয়ার তুলছে। এটা কতটুকু ফেয়ার? মোদীকেই জিতাবার স্বার্থে আমাদের সরকার কী মোদীর অত্যাচার, অনাচার জুলুমের দায়ীত্ব নিজের কাধে নিবে? আমাদের সরকারের নিজেকে আরও ভারতমুখি পরিচয়ে আর নিজেকে গণবিরোধী করার রিস্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে? মনে হয় না।

ভারতের হবু নির্বাচনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দুই দিকে দুই রাজ্যে থেকেই মোদীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় (যা ইতোমধ্যে আমরা রাজস্থান, ছত্তিসগড় নির্বাচনে দেখেছি) দেখতে হবে আমাদেরকে। বলা বাহুল্য এতে বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে পাল্টা সরব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর সম্ভাব্য সে পরিস্থিতির কথা আঁচ করে আগে থেকেই ভারতকে সাবধান করে নিজেদের স্বার্থ-প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে না ধরা হবে আমাদের সরকারের আর এক বড় ভুল।

গুরুতর প্রশ্ন, এ নাগরিকত্ব বিল পাসের পরে আসাম্র ‘নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকে যাওয়া’ প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের কী হবে? রোহিঙ্গাদের মত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে? অথবা মোদীর উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের কারণে জীবনের ভয়ে তারা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামাবে, নাকি তাদের বাধ্য করা হবে?

আমাদের উচিত হবে এমন যেকোনো কিছুর আগে এনিয়ে মোদীর সাথে ‘ডায়লগ ওপেন’ করা। মোদীকে আগে থেকেই সংযত করা, আমাদের উদ্বেগের কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি আদায় করা হবে আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অন্যথায় আমাদের সরকারকে অজনপ্রিয় হওয়ার অপ্রয়োজনীয় ভারতমুখি পরিচয়ের রিস্ক নিতে হবে।

শেষ কথাঃ
শেষ কথাটা হল এই বিল পুরাপুরি আইনসিদ্ধ হবার প্রক্রিয়া এখনও বাকী। কারণ লোকসভায় পাশের পর এবার ভারতের উচ্চ-কক্ষ, রাজসভাতেও তা পাশ হতে হবে। তবেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা পরিপুর্ণ আইন হবে। রাজ্যসভা বসবে আগামি ৩১ জানুয়ারি। সবচেয়ে বড় কথা কিন্তু এখানে বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই। এর অর্থ এই বিল এখানে পাশ হবার কোন সম্ভাবনা নাই। ২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর জোট এখনো ৮৮ জন সদস্য। বিপরীতে বিজেপি বিরোধী শিবিরের এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যা ১৫৬। তাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
তাহলে এটা জানার পরেও মোদী এত উদ্যোগী কেন? কারণ, আপাতত তাঁর “বাঙালি-হিন্দুমুখি” প্রেমের প্রকাশ – আর কিছু পারুক না পারুক  মোদীর মূল উদ্যোগ হল – এটা দেখিয়েই সে কাজ সারতে চায়। এটাই তাঁর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম-ত্রিপুরাসহ পুরা নর্থ-ইস্টে (মোট ৬৬ আসনে) নির্বাচনে লড়বার লক্ষ্যে মেরুকরণে হিন্দুত্ব রাজনীতির একমাত্র কৌশল।  আর এই মেরুকরণে এই অঞ্চলের প্রাণ-বেড়িয়ে যাবার অবস্থা তৈরি হলেও সংকীর্ণ স্বার্থপর বিজেপি ও মোদী নির্বিকার; যেভাবেই হোক তাঁকে ক্ষমতা পেতে হবে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) মোদির নতুন বিল: আসাম ও বাংলাদেশ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

গৌতম দাস

০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2we

 

 

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

শেষ কথাঃ
কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

গৌতম দাস

২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2w6

 

নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং – ফাইল ছবি

আমরা এমন এক দুনিয়ায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলে। শুনতে স্ববিরোধী মনে হলেও কথাটা সত্য। আর তা বোঝার জন্য কথা আরো ভেঙে বলা যেতে পারে। এখন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একই সাথে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলে, এজন্য যে এখন কূটনীতি চলে ইস্যুভিত্তিক। ইস্যুটা কী – আলাদা করে শুধু সেই ইস্যুর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের অবস্থান বা নীতি-পলিসি নিতে হয়। তাই অপর রাষ্ট্রের সাথে একটা ইস্যুতে মিত্রতা বা আপসের একই অবস্থান আছে, অথচ দেখা যাবে হয়ত অন্য ইস্যুতে অপর ঐ রাষ্ট্রের সাথেই শত্রুতা, মানে প্রবল ঝগড়া-দ্বন্দ্বের অবস্থান দাঁড়াতে পারে, দাঁড়াতে হয়। এর অনেক উদাহরণই আছে, তবে এব্যাপারে সম্ভবত সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, চীন-ভারত সম্পর্ক।

ভারত-চীন দুই রাষ্ট্রের নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত বর্তমানে অন্তত চলতি বছরের প্রথম কোয়ার্টার থেকে খুবই নরম ও ঐক্যকামী। কিন্তু এশিয়ার তৃতীয় যে কোনো রাষ্ট্রে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়া দেখা গেলে ভারত এর বিরুদ্ধে চরমতম বিরোধীতায় ততপর। সম্পর্ক-অবস্থান ইস্যুভিত্তিক বলে, ভারত-চীনের এমন খারাপ-ভাল অথবা উত্থান-পতনের সম্পর্কের মাঝেও তাদের এক বড় সফলতা হল য়ুহান সম্মেলন (Wuhan, April 2018)। এটা ছিল যারা ভারত-চীনের ঘনিষ্ঠতায় নিজের স্বার্থহানি দেখেন এমন প্রো-আমেরিকানদের মুখে ছাই দিয়ে, চীন-ভারতের প্রথম কাছাকাছি আসার ভিত্তি তৈরির উদ্যোগে, চীনের য়ুহান শহরে শীর্ষ সম্মেলন।   প্রধান সব রাষ্ট্রের আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির উপর ট্রাম্পের  বাড়তি ট্যারিফ শুল্ক আরোপের যুদ্ধে ভারতকেও তালিকায় যুক্ত করাতে ভারত আমেরিকায় রফতানি বাজার হারানোর পর থেকে এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু। এতে চীন-ভারতের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধে তা পুরা মিটিয়ে না হলেও কমিয়ে আরও কাছাকাছি আসার বিরাট উদ্যোগ ছিল এটা। মোদী চীনের য়ুহান প্রদেশ সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক বিশেষ ধরনের বৈঠকে বসেছিলেন। এই সম্মেলন আর এর প্রবল প্রভাবের কাল ছিল এ বছরেরই গত এপ্রিল-মে মাসজুড়ে।

এটা বিশেষ ধরনের বৈঠক মানে এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে এখানে বলা হয়েছে, এটা ছিল এক “ইনফরমাল সামিট”; মানে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন। অর্থাৎ যে বৈঠকের কথা বিস্তারিত প্রকাশ করতে হবে না। আবার কোনো ইস্যুতে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটি যেহেতু অনানুষ্ঠানিক, তাই এমন বা অমন কথা হয়েছে সে রকম কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড [রেকর্ড অবশ্যই থাকবে কিন্তু তা কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে রেফার/স্বীকার করা হবে না। ] রাখার দায়ও কোনো পক্ষের নেই। এ এক বিরাট সুবিধা। বিশেষ করে ভারতের। কারণ, ভারতে রাজনীতি চর্চার স্টাইল ভোটের সস্তা পপুলিস্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অন্য বিরোধীরা বিদেশে আপোষ করে এসেছে বলে প্রপাগান্ডার নানা অভিযোগ তুলে বসে। আর এই ভয় থাকার কারণে কিছু বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অনেক বিরোধ আর কাটে না।

এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল, পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতের যেকোনো সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ। এই বিচারে য়ুহান সম্মেলনে আলোচনার কাঠামোই এমন ছিল যে, এখানে সেসব সমস্যা নেই। ফলে এই সম্মেলনে চীন-ভারতের বহু বা প্রায় সব ইস্যুতে দুই শীর্ষ নেতা মন খুলে কথা বলেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণ রাখার ভয় ভুলে, না রেখে বা ফরমাল নোট না রেখে। দোভাষী ছাড়া অন্য কোনো সহায়ক ব্যক্তিকেও কোনো পক্ষ সাথে সেখানে রাখেন নাই।

অথচ এখানেই উভয়পক্ষ বহু বিষয়ে বিরোধ মীমাংসার মৌলিক নীতিগত দিক সেটেল করেছেন। যাতে এই মৌলিক নীতিগত দিকের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বহু অমীমাংসিত ইস্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান টানা হতে পারবে। এটি ছিল এই সম্মেলনের বড় সুবিধা।

তবে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি নিয়ে চলার দুনিয়ায় আমরা এসে পৌঁছানোতে কি ব্যাপারটা খারাপ হয়েছে?  না, অবশ্যই নয়। তাহলে খারাপের ধারণা কেন আসছে?  আসলে ‘খারাপ’ হতে পারে এই ধারণাটাই হল – কোল্ড ওয়ার আমলের (১৯৫০-৯১) চিন্তার অভ্যাসে বলা কথা। কারণ, কোল্ড ওয়ার মানেই দুনিয়াকে পরস্পর দুই শত্রুর দু’টি রাষ্ট্রের গ্রুপে – সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা এভাবে দুটো ব্লকে দুনিয়াকে ভাগ করে ফেলা। এটা এমনই ব্লক যে, এখানে শত্রুতা ছাড়া অন্য কিছুর জায়গাই নেই। একেবারে হিন্দু জাতপ্রথার ছোঁয়াছুঁয়ির মত দুই রাষ্ট্রজোটের পরস্পরের সাথে সম্পর্কহীন থাকা আর শত্রুতাই এর একমাত্র বাস্তবতা। তবে আলোচ্য এখানকার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল, কেন এমন সম্পর্কহীনতার দুই ব্লক সেকালে চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল? এর জবাব হল, মুল কারণ যেহেতু দুই ব্লকের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, তাই এটা টিকে ছিল। অর্থনৈতিক বা বিনিময় সম্পর্ক মানে হল – কোনো পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগ এর বিনিময় সম্পর্ক। ফলে এমনকি কোনো ভাব বিনিময় সম্পর্কও সেখানে ছিল না। তাই সম্পর্কহীনতার দুই রাষ্ট্রজোট বা ব্লক চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল।

বিপরীতভাবে বললে, এ কালে সম্পর্কহীনতার এমন কোনো দুই ব্লক থাকা সম্ভব নয়। অথবা ইতিবাচকভাবে বললে, একালেই ‘য়ুহান ইনফরমাল সামিট’ সম্ভব। কেন? এর মূল কারণ দুনিয়ায় এখন আগের সোভিয়েত ব্লকের সকলেসহ সব রাষ্ট্র একই “গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার” – এর নিয়মশৃঙ্খলার অংশ। তাই সবধরণের পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগসহ সব ধরণের বিনিময় সম্পর্ক ওতপ্রতভাবে জড়িত। ভাব-ভাষাও।

পুঁজির জন্ম-স্বভাব হচ্ছে গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবাল থাকা; তাই সে দুনিয়াজুড়েই বিস্তৃত হবে। লোকাল পুঁজি বা কেবল কোন এক ছোট ভুগোলের পুঁজি বলে কিছুই থাকবে না। তাই, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের প্রতিটি কোনায় বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া পুঁজিতান্ত্রিক তৎপরতাগুলো ক্রমেই অপরাপর কোণের ততপরতাগুলো এরা পরস্পরের হাত ধরে ফেলবে, আর ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতরভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাবে। আর এই সম্পর্ক মানে? মনে রাখতে হবে, এটা হল পরস্পরের ওপর পরস্পরের গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক সম্পর্ক। এক গ্লোবাল সমাজ হয়ে উঠা। আবার একই ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার’ – এই সিস্টেম শৃঙ্খলার অংশ বলেই এটা সহজ এবং তা হতে বাধ্য। এই ইতিবাচক দিকটিই চীন-ভারতের চরম স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাতের মধ্যেও “য়ুহান ইনফরমাল সামিট” ঘটিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছিল।

চলতি ২৩-২৪ নভেম্বর ২০১৮, চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার ২১তম বৈঠক শুরু হয়েছে। ২১তম মানে এ ধরনের বৈঠকের শুরু অনেক পুরানা দিনে, সেই ২০০৩ সালে বাজপেয়ির চীন সফর থেকে। চুক্তি বা বুঝাবুঝি অনুসারে এর বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দুই রাষ্ট্রপক্ষের পূর্বঘোষিত স্থায়ী দুই ‘স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ থাকবে। আর তাদের উদ্যোগে ডায়ালগের মাধ্যমেই চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধের সমাধান তারা খুঁজবে। ভারত-চীনের সীমান্তের অনেক জায়গায় উভয়পক্ষের একমতে টানা সীমান্ত বা ‘ডিমারকেটেড’ বা চিহ্নিত নাই। এই অচিহ্নিত সীমান্ত সমস্যা সেই কলোনি আমল থেকে, এটা অমীমাংসিত হয়ে থেকে যাওয়া সমস্যা। সেটাই মিটানোর চেষ্টাই এর উদ্দেশ্য। সে হিসেবে এই বৈঠক এখন রুটিনের মতো হয়ে গেলেও য়ুহান ‘ইনফরমাল সামিট’-এর পরে এর গুরুত্ব এবার অনেক বেশি। কেন?

কোনটা, কত দূর কার সীমানা – সে ব্যাপারে উভয়ের একমত হয়ে এভাবে পুরো চীন-ভারত সীমান্তকে ‘চিহ্নিত সীমানা’ হিসেবে এঁকে ফেলা অবস্থায় পৌঁছানোই ‘এমন বিশেষ বৈঠক’ উদ্যোগে এবারের লক্ষ্য।  এখানে LAC বা ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ বলে উভয় পক্ষের একমতে একটা ধারণা আছে। সেটা হল, এক মতে “সীমানা চিহ্নিত” করে ফেলার আগে এখন সীমান্ত-ভূমি যেখানে যার দখলে যা আছে ও স্থিতাবস্থায় আছে, সেটাকেই উভয়ে “লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি” বলে মানে। যেটাকে আসলে “অস্থায়ী কিন্তু বাস্তব সীমানা’ বলা যায়। এবারের ২১তম আলোচনায় উভয়পক্ষ এখানেই এক নীতিগত জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। তা হল, সীমানা বিরোধ মিটানোর কাজে অগ্রগতি আর কিছু হোক আর না-ই হোক, বর্তমান এলওসি বা “অস্থায়ী বাস্তব সীমানা”- এটাকেই উভয়পক্ষ ‘বেস্ট অপশন’ বা সবচেয়ে ভাল সমাধান বলে মেনে নিবে। [“best option is “as it is; where it is”.] এ বিষয়ে উভয়ের ঘোষিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। এরপর আরও আলোচনা চলবে উভয়ের একমতে এরচেয়েও ভাল সমাধান খুঁজে পেতে।

সুতরাং চীন-ভারতের সীমান্ত আলোচনায় “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” কথাটার বিশেষ মানে আছে। এখানে ভারত-চীন কাকে নিজ নিজ পক্ষের “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” বলে ঘোষণা করে রাখবে – সেটা এপর্যন্ত দেখা অভিজ্ঞতা বলছে এটা চলতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নিরাপত্তা  উপদেষ্টা অথবা চীনের ক্ষেত্রে পলিটব্যুরোর বিশেষ সদস্যকেও হতে দেখা গেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এবার থাকবেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। আর চীনের দিক থেকে ছিলেন  পলিটব্যুরোর এক বিশেষ প্রভাবশালী সদস্য। এবার সভা থেকে তাঁর বদলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই দায়িত্বে পাবেন। আসলে “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” এরা মূলত সীমান্ত ইস্যুতে কথা বলার জন্য হলেও এর একটা স্থায়ী দায়ীত্বের পোস্ট বলে এদের কিছু আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ উভয়পক্ষ বাড়তি ইনফরমালি অনেক মনের কথা বলার সুযোগ ও দায়িত্ব এরা পালন করে থাকে। যেমন এরা এবার চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ”(BRI) [ এতে যোগ দেওয়ার অফার এপর্যন্ত ভারত ফিরিয়ে দিয়ে আসছে ] নিয়েও কিছু কথা বলবেন।  ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে,  “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” অজিত দোভাল এলএসি, বিআরআই এবং অন্যান্য ইস্যুর সাথে নিরাপত্তা নিয়েই কথা বলবেন। [Ajit Doval will discuss security along the Line of Actual Control (LAC), belt and road initiative (BRI) and other issues]।

ভারতের এক প্রাক্তন কূটনীতিক এমকে ভদ্রকুমার। ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান; মানে প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নিতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি হাতেগোনা দু-তিন কূটনীতিকের মধ্যে একজন, যিনি তা নন। উজবেকিস্তান ও তুরস্কে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভদ্রকুমার, যিনি ভারতের ভবিষ্যৎ আমেরিকার মধ্যে দেখেন না। সেই ভদ্রকুমার দেখছেন, চীনের সাথে ভারত তার নানান বিরোধের ইস্যুগুলো মিটাতে এখন প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠতে; একালের চলতি সময়ে মোদির ভারতকে।

অবশ্য শুধু সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার বৈঠক দেখে তিনি এ কথা বলেননি। তিনি আরো এক ইস্যু দেখেছেন। এই ১৩-১৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটা আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ মোট ১৮ রাষ্ট্রের এক সম্মেলন; যার শুরু হয়েছিল আসিয়ান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সাথে অন্যান্য ইস্ট এশিয়ান রাষ্ট্রকে নিয়ে। অর্থাৎ এখন এতে বাড়তি অনেককেই সদস্য করে নিয়েছে।

এবারের এই বৈঠক থেকে চীনের অর্জন অনেক। এখানে চীন-সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপগ্রেড ভাষ্য) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভদ্রকুমার বলছেন,  এতে এই প্রথম “বেল্টরোড উদ্যোগ”ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। [One highlight is the signing on Monday of an upgraded Free Trade Agreement between China and Singapore to include Belt and Road Initiative for the first time.] বলাই বাহুল্য, যারা চীনের ‘বেল্টরোড উদ্যোগে’ অন্তর্ভুক্ত হতে আপত্তি বা দ্বিধা করে থাকে, তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম ছিল। বিশেষ করে যেখানে আবার পশ্চিমের কাছে সিঙ্গাপুর এক বিশেষ অর্থ ও গুরুত্ব বহন করে। যেখানে তারা সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলেছিল ফ্রি-পোর্টসহ পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের এশিয়ান স্টোর/গোডাউন হিসেবে; আর একই সাথে ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ পুঁজির স্থানীয় বা বর্ধিত অফিস হিসেবে। এই হল ফ্রি-পোর্ট সিটির সিঙ্গাপুর; মানে বিনা মাশুলে পুনঃরফতানিযোগ্য করে নিয়ম বানানোর সিঙ্গাপুর। পশ্চিমের সেই সিঙ্গাপুরে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগকে একালে জায়গা করে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, আজকাল খোদ সেই সিঙ্গাপুরও চীনের ওপর কত বিরাট নির্ভরশীল। সেটা কী রকম?

পশ্চিম চীনের সাথে বহু সম্পর্কই করে থাকে সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, সিঙ্গাপুরে অফিস খুলে। যেমন একটা উদাহরণ দেই। আজকাল চীনে উঠতি সম্পদের মালিক যারা, এমন যাদের এক মিলিয়ন ডলার বা এর বেশি অর্থ বাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আছে – এমন এদেরকে বাজারে নিয়ে আসা সহজ করতে সাহায্য করতে, এমন ব্যক্তি ক্লায়েন্টদের ধরতে আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে অফিস খুলেছে। আর সেখান থেকে তাদের রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা চীনে সরাসরি ক্লায়েন্টদের বাসা সফর করছে। ফলে সার কথায় সিঙ্গাপুর আর কেবল পশ্চিমের এক্সটেনডেড দোকান থাকেনি, চীনেরও হয়ে উঠছে। তাহলে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগে নতুন অন্তর্ভুক্তি, সেটা শুধু কি সিঙ্গাপুরই?

না আরো আছে, আরও বড় সে নাম হল খোদ জাপান। কারণ কী? ব্যাপারটা হল, চীনের নতুন এক সিদ্ধান্ত। এমনিতেই চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগ এক বহুরাষ্ট্রীয় (৬৫ রাষ্ট্রেরও বেশি) অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প। ফলে ভুগোলের বিচারে এতে বিনিয়োগ সুযোগের বড় অংশই চীনের বাইরে। চীন ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগের’ অংশ হিসেবে তৃতীয় রাষ্ট্রে চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগে সিঙ্গাপুর বা জাপানকে সংশ্লিষ্ট হতে চীন অফার (Investment in Third Country) দিয়েছে। এতে সিঙ্গাপুরের মত জাপানও প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

ওদিকে সবকিছুর পালটা কিছু থাকে। তাই, এশিয়ায় চীনের ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’-এর পাল্টা আমেরিকান নেতৃত্বের যে উদ্যোগ আছে, সেটি মূলত “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি” নামে হাজির আছে। আর এর সহযোগী উদ্যোগ হল “কোয়াড”(QUAD) , মানে চীনবিরোধী ‘আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া’ এই চারদেশীয় জোট। কিন্তু কখনই এই চার দেশ একসাথে একমতে খাড়া হতে পারেনি। কমন ভাষায় একটা বিবৃতি দিতে পারে নাই। এর মূল কারণ, এরা সবাই চীনের সাথে নানান ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িয়ে আছে আবার একই সাথে অন্যন্য স্বার্থবিরোধে জড়িয়ে থাকার কারণে আমেরিকার সাথে এক কমন প্লাটফর্মে আসতে চেয়েছে কিন্তু বড় কিছু করে দেখাতে অসফল। ফলে সব সময়ই দেখা গেছে এই চারের কেউ একজন চীনের সাথে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাবল্য অনুভব করে বাকিদের সাথে থাকেনি।

‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’ চীনের সাথে তৃতীয় রাষ্ট্রে যৌথ বিনিয়োগের অফার পাওয়া জাপান, তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝাতে ভদ্রকুমার কিছু ঘটনা টেনেছেন। তাঁকে এক জাপানি কূটনীতিক বলছেন, “আমাদের কিছু আসিয়ান সদস্য বেল্ট-রোড উদ্যোগের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে তুলনা করতে পছন্দ করছে না”। [“Some ASEAN members didn’t like the idea of having to make a choice between an Indo-Pacific strategy and the Belt and Road Initiative]।  ফলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে এরপর “ইন্দো-প্যাসিফিক” শব্দটি বলা বন্ধ করেছেন। তা না বলে এর বদলে বলছেন “ভিশন”। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাপানি কর্মকর্তা বলছেন, আসলে “স্ট্র্যাটেজি শব্দটির মধ্যে অন্য রাষ্ট্রকে পরাজিত করানোর একটা অর্থ লেপটে আছে, সে কারণেই এই পরিবর্তন”। অর্থাৎ জাপানও কোয়াড থেকে নিজেকে দূরে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ছাড়া ছাড়াভাবে চলা কোয়াডের যুগ্মসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকে ভারত যোগ দিচ্ছে। সেই রেফারেন্স তুলে ভদ্রকুমার বলছেন, জাপান ভারতকে পেছনে ফেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেল। এভাবে এশিয়া-প্যাসিফিকের ভূকৌশলগত অবস্থা পরিস্থিতিই বদলে যাচ্ছে। আর মোদির ভারত এতে বিরাট কিছু সুবিধা হারাচ্ছে, অথচ নিজ অবকাঠামোগত সুবিধা পাওয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

শেষ কথাঃ
শেষ বিচারে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক গন্তব্য-অভিমুখ হল তাদেরকে পরস্পর ঘনিষ্ট হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে হাত ধরে উঠে দাঁড়ানো। আমেরিকা দুনিয়ার অতীত, যেখানে চীন আগামি। ভারতকেও আগামির অংশ হওয়ার খাতিরে খাবলা-সুবিধা নেয়া ত্যাগ করে স্থির-পক্ষ নিতে হবে। কিন্তু মায়ের দুষ্ট ছেলের মত প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে ভারত প্রায়ই টেবিল ছেড়ে চলে যায়; যার অনিরাপদবোধও আছে। এসবের মানে আবার এই না যে চীনের সিদ্ধান্ত বা অবস্থান সবসময় ফেয়ার বা বেস্ট হয় বা থাকে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন-ভারতের শত্রুতা ও মিত্রতা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

গৌতম দাস

২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2vW

 

 

এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

গৌতম দাস

২৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১৩

https://wp.me/p1sCvy-2vc

Paro locals question project DANTAK welcome sign, kuenselonline

ভুটানের পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে, দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি বা DNT) – এই দল বিজয়ী হয়েছে। এই দলের নেতা মেডিক্যাল ডাক্তার লোটে শেরিং প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
গত ১৮ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হওয়া এটা ছিল ভুটানের দ্বিতীয় ও শেষ রাউন্ডের নির্বাচন। ভুটানের কনষ্টিটিউশন অনুসারে এর নির্বাচন পদ্ধতি দুই স্তরে সম্পন্ন হতে হয়। প্রথম পর্বের সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় দলকে নিয়ে আবার নির্বাচনে নির্ধারিত হয় কে বিজয়ী বা কোন দল ক্ষমতাসীন হবে। এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে আমরা জেনেছিলাম ক্ষমতাসীন পিডিপি শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছে। ‘শোচনীয়’ বলা হচ্ছে এ জন্য যে, প্রথম পর্বের ফলাফলেই পিডিপি তৃতীয় অবস্থানে চলে যায়। প্রথম রাউন্ডেই তৃতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া দলের আর দ্বিতীয় রাউন্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।
ভুটানের মোট জনসংখ্যা প্রায় আট লাখ, যার মধ্যে এবারের ভোটদানে যোগ্য ভোটার ছিল প্রায় তিন লাখ। প্রথম রাউন্ডে এমন মোট ভোটগুলা প্রধান তিন দলের মধ্যে ভাগ হয়েছিল এভাবে – দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি) ৯২ হাজার ৭২২ ভোট, দ্রুক ফুয়েনসাম শোগপা (ডিপিটি) ৯০ হাজার ২০ ভোট আর পিউপুলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) ৭৯ হাজার ৮৮৩ ভোট। তৃতীয় হওয়ায় ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যায়। আর প্রথম রাউন্ডে প্রথম হয়েছিল ডিএনটি; সেই দলটি এবার শেষ রাউন্ডের নির্বাচনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। ভুটানের পার্লামেন্টে মোট আসন ৪৭। এর মধ্যেই ডা: লোটে শেরিংয়ের বিজয়ী দল ডিএনটি, এরা পায় ৩০টি আসন, আর বিরোধী ডিপিটি পায় ১৭টি। ইতোমধ্যে এটাও নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশ থেকে পাস করে যাওয়া ডাক্তার শেরিং-ই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।

কিন্তু ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে গেছে  এই কথার লেজ ধরে  নতুন ইঙ্গিত কী এই যে, তাহলে এখন এর বদলে হবু ক্ষমতার দল যেটা আসছে সে চীনমুখী? না, তা নয়। মজার কথা হল, তা কেউ বলছে না। এমনকি আগ্রাসী আচরণের কোনো ভারতীয় ব্যক্তি বা মিডিয়াও এ কথা বলছেন না। যেমন ভারতের সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক, [বিদেশি পয়সার এনজিও নয়, নিজ ব্যবসায়ীদের পয়সায় চলা দাতব্য প্রতিষ্টান (ORF), Observer Research Foundation] ওআরএফ। এর এক ফেলো মনোজ যোশির এই প্রসঙ্গে তাঁর লেখার শিরোনাম লিখেছেন, “ভুটানের হবু সরকারের ভারতের প্রতি মনোভাব অস্পষ্ট। এটা ভারতের উদ্বেগের কারণ হতে পারে”। [New Bhutan government’s attitude towards India is not clear, this should worry India]।

একথা আবার তিনি লিখেছেন আগ্রাসী নয় বরং দুঃখ করার মুডে। তার এই পুরা লেখাটাই এক হারুপার্টি বা পরাজিতের ভঙ্গিতে লেখা, আর একটা ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিতে তো বটেই। প্রথমেই নিজেদেরকে আত্মদোষী করে বলছেন, ‘ভুটানের নির্বাচন ভারতের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অথচ ভারতের মিডিয়া সেটা আমল করতে পারেনি। এ থেকে, পড়শির প্রতি আমরা কেমন গুরুত্ব দেই আমাদের সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন এটা”।

হারুপার্টি বা পরাজিত কথাটা এখানে আক্ষরিক অর্থেই বলা হয়েছে। কারণ ঘটনা হল, গত ২০১৩ সালের ভুটানের নির্বাচনের আগের দিন ততকালীন মনমোহন সরকার ভুটানে ভারতের সরবরাহ করা তেল গ্যাস জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সেবার এতে ভারতমুখি দল পিডিপির জয়লাভ আর প্রতিদ্বন্দ্বি ডিপিটি দলের হারের কারণ মনে করা হয়। আর ডিপিটি দলের উপর ভারতের এমন বিরাগ ও সাজা দিবার কারণ তার নেতা ২০১২ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাত করেছিল। তাই ভর্তুকি প্রত্যাহার করে যেন এটা বুঝাতে যে ভারতের কত ক্ষমতা বা ভারতের ইচ্ছার দাম কত, তাই তা ভুটানিজদের কতটা গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে হবে। এদিকে প্রায় এমন একই ঘটনা, তবে আরো ভয়াবহভাবে ঘটেছিল নেপালে; ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোদী সরকারের সিদ্ধান্তে। ভারতের অপছন্দকে আমলে না নিয়ে নেপাল তার নতুন কনষ্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ায়, ভারত জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ সব পণ্যের ভারতের উপর দিয়ে নেপালে আমদানির সব সড়ক ভারত অবরোধ করে রেখেছিল দীর্ঘ ছয়মাস ধরে। নেপাল ও ভুটানকে মূলত ভারতের ওপর দিয়ে বাইরে বের হতে হয়, এমন ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। আর এর সুযোগ নিয়ে নেহরু ১৯৪৯-৫০ সালে এ দুই রাষ্ট্রকে আলাদা দুই কলোনি সম্পর্কের চুক্তিতে বেঁধে ফেলে। যার সার কথা হল, নেপাল বা ভুটান দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সব সুযোগ এককভাবে ভারতকে দিতে হবে।
যেমন – নেপাল বা ভুটান তাদের উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারত ছাড়া তৃতীয় আর কোনো বিদেশী রাষ্ট্রে বিক্রি করা যাবে না; অথবা ভারতীয় কোম্পানির মাধ্যমে তৃতীয় রাষ্ট্রে বিক্রি করতে হবে, নিজে পারবে না। ভৌগলিকভাবে উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত বলে ঐ উচ্চতার পাহাড়ি নদী বা পানি ঢলকে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে খুব সহজেই পানি-বিদ্যুৎ উতপাদন করা যায়। আর পানিবিদ্যুত বলে এর উতপাদন খরচ সবচেয়ে কম, ২৫-৫০ পয়সা প্রতি ইউনিট। তাই বিদেশি মুদ্রা আয়ের এই বড় উৎস পানিবিদ্যুত হলেও ভারতের একচেটিয়া আর অযাচিত আধিপত্যের কারণে এর সুফল নেপাল বা ভুটানের ঘরে ঠিকমত উঠে না। আর আসলে এই লুটে নেয়া সুবিধার কিঞ্চিত ফেরৎ হিসাবে (তথাকথিত রেসিপ্রোকাল, reciprocal) ভূটানে জ্বালানি তেল ও সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ ভারতের অভ্যন্তরীণ দরে ভর্তুকিতে ভারত দিয়ে আসছিল। ভারত এটা দেয়, যাতে ভুটানে ঋণ ও বিনিয়োগ নিয়ে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে হাজির হতে না দেয়া যায়। ব্যবসা কেবল নিজের হাতে আর প্রভাবে বজায় থাকে। এই ঘটনাটার সবচেয়ে বেশি প্রতিফলন দেখতে পাব আমরা যে, ভুটানের ঋণগ্রস্ততা এখন বিশাল আর এর পরিমাণ ভুটানের জিডিপির ১১৮%। আর এই মোট ঋণের ৬৪% এর দাতা, ঋণ-মহাজন হল ভারত। ভুটানের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস পানিবিদ্যুৎ। তাই ভুটানের অর্থনৈতিক নুয়ে পড়া দশার বড় উৎস এখানেই।  ভারতের কাছে নেয়া ও পরিশোধ না হওয়া বৈদেশিক (মূলত পানিবিদ্যুতের জন্য) ঋণ ব্যাপারটা এত ভয়াবহ যায়গায় পৌচেছে যে ভারতের প্রাচীন পত্রিকার  দ্যা হিন্দু  বৈদেশিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার লিখছেন, ভারত যদি কিছু না করে তবে খোদ ভারতই এবার ভুটানকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলার পরিকল্পনা আটছে বলা হবে; যে অভিযোগের প্রপাগান্ডা ভারত এতদিন চীনের বিরুদ্ধে করে আসছে।   [……And unless India finds ways to help, it will be accused of the same sort of “debt-trapping” that China is accused of today.]

কিন্তু পালটা সুযোগ ভুটানের দোরগোড়ায় সম্ভবত টোকা দিচ্ছে। ভারতের দিক থেকে ভুটানকে এভাবে বেঁধে রাখা, এটাই একালে ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। এর প্রধান অবজেকটিভ কারণ মানে ভারত চাইলেও ঠেকিয়ে রাখতে পারে না এমন কারণ হল, চীনের কাছ থেকে আমাদের মত দেশের ঋণ বা বিনিয়োগপ্রাপ্তি সহজলভ্য হয়ে গেছে একালে; তাই “আমার বাড়ির পিছন বাগানে (মানে পড়শি দেশে) অন্যকে ঢুকতে দেবো না” বলে অক্ষম ভারতের প্রবল নাকিকান্না দেখছি আমরা।

কিন্তু এবিষয়টা ভারতের বদলে চীন মানে চীন “ভাল” আর ভারত ‘খারাপ’ – অতএব এখন আমাদের সবাইকে চীন-ভক্ত হয়ে যেতে হবে, এখন চীনের পক্ষে ঢোল পিটাতে হবে – এমন ভাড়ামো বা দালালির বিষয় নয় একেবারেই। বরং একচেটিয়া ভারত ভুটানে ব্যবসা ও বিনিয়োগের একমাত্র উৎস হয়ে থাকার বদলে পাশে চীনও আরেক উৎস হয়ে থাকলে, ভারতের একচেটিয়াত্ব ভাঙবে। ভুটান তুলনা করে দেখতে সুযোগ পাবে। এখান থেকে দেখতে হবে। মূলকথা, ভুটানকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া যে সে কোনটা নেবে, কাকে কোন ব্যবসা দিবে কিংবা আদৌও দিবে না – এগুলো বেছে নেয়ার সুযোগ পেতে হবে তাকে। এটা ভুটানের অধিকার।
এ ছাড়া ভারতের পাশাপাশি চীনও যদি ভুটানকে ট্রানজিট দেয়, (নেপাল যেমন সম্প্রতি পেয়ে নিয়েছে) আর সেই ট্রানজিট ব্যবহার করতে ভুটানে নতুন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও তা গড়ে দেয় সেটা হবে ভুটানবাসীর ভাগ্য খুলে যাওয়া। সবচেয়ে বড় পাওনা হবে ভারতের একচেটিয়া নাগপাশ থেকে  ভুটান অন্তত একটু মুক্ত, সেই বাধন ঢিলা হবে এতে।

একালে ভুটানের জনগণ বিশেষ করে কাজ-চাকরিপ্রার্থী তরুণেরা, এদের কাছে বিষয়গুলো তাদের না বুঝার বা আমল না করার কিছু নেই। সহজেই তারা বুঝতে পারে। এছাড়া পেটের তাগিদ বাড়ছে। এক হিশাবে বলা হচ্ছে তরুণ জনসংখ্যার প্রায় ১০% বেকার। এছাড়া বিশেষ করে নেপাল তাদের সামনে এক মুক্তির মডেল হয়ে যেখানে হাঁটছে। আমরা মনে রাখতে পারি যে ‘ভারত-নেপাল’ আর ‘ভারত-ভুটান’ এই দুই কলোনি-দাসত্ব চুক্তি একই ছাঁচ বা ড্রাফটের উপর করা হয়েছে। আসলে ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি তুলে নেয়ার পর থেকে ভুটানের জনমনে প্রথমে ভীতি জন্মায়। পরে তা থেকে ক্ষোভ আর শেষে এক তোলপাড়-বুঝাবুঝি-সচেতনতা ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়ে যায়। ভুটানের সরব তরুণদের টগবগে ফেসবুক পেজ বা গ্রুপ দেখলে তা বুঝা যায়।

এককথায় ভুটান বদলে যাচ্ছে। স্থবির ভুটান যেন সামনে আলো দেখছে। একটা ছোট ঘটনার বর্ণনা দেই। ভুটানের আকাশ থেকে নামলেই আপনি বিমান বন্দরে একটা স্বাগতম বোর্ড দেখতে পেতেন। এই লেখায় শুরুতে যে ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা খেয়াল করতে পারেন। এটা গতবছর ২০১৭ এপ্রিল ১১ এর আগের ছবি। এই সাইনবোর্ড নিয়ে আপত্তি-বিতর্কের ফলাফলে সেটার বদলে এখন নতুন সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে। নতুন সাইনবোর্ডের লিঙ্ক এখানে। এটা স্রেফ একটা সাইনবোর্ড বদল নয়, প্রতীকীভাবে এটা ভারতের হাত থেকে ভুটানের হারানো সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার লড়াই। ভুটানের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ মূলত ভারত নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। ঠিক যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ রেখে দিয়েছে। এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ভারত যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করে থাকে সেই ১৯৬১ সাল থেকে সেটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধীনস্ত এক প্রতিষ্ঠান যার নাম Border Roads Organisation। এক ভারতীয় ব্রিগেডিয়ারকে চীফ ইঞ্জিনিয়ার করে এর অধীনেই নেয়া কনষ্ট্রাকশন প্রজেক্টের নাম Dantak। ফলে সংক্ষেপে একে  DANTAK-BRO অথবা Dantak (ড্যানটক) বলা হয়ে থাকে। শুরুতে দেয়া ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভুটানের প্রধান এয়ারপোর্ট, “পারো এয়ারপোর্টে” ভিজিটরদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে ড্যানটক। এটা নিয়ে স্থানীয় পাবলিক জনমনে ঘোরতর অস্বস্তি আপত্তি তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে মিডিয়ায় যারা কথা বলেছেন তাদের মধ্যে আছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ট্যুর গাইড, প্রাক্তন আমলা  ইত্যাদি। তাদের বক্তব্য হল ড্যানটক ভারতীয় আর্মির সংগঠন ফলে তারা ভুটানের ভিজিটরদের স্বাগত জানানোর কেউ না; আর রাস্তার সাইনবোর্ড টাঙ্গানোর  অথরিটিও তারা নয়। বরং রাস্তায় “পথচারি সাইন” টাঙ্গানোর ভূটানিজ স্থানীয় যে আইন তা ভঙ্গ করে ভারত একাজ করেছে। মূলকথা হল, ভুটানে কেউ আসলে সেই ভিজিটরদের ভারতীয় কেউ স্বাগত জানাবে এটা ভুটানিজরা পছন্দ করছে না। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা বছর খানেক আগে ভুটানের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ক্স মন্ত্রণালয় এই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলতে চিঠি দিলেও ড্যানটক তা উপেক্ষা করে চলেছে তো বটেই এমনকি স্থানীয় এক ইংরাজি পত্রিকাকে সাক্ষাতকার দিয়ে ঐ ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার যিনি ড্যানটকের চীফ ইঞ্জিনিয়ার, খোলাখুলি বলছেন যে এনিয়ে বিরূপ পাবলিক সেন্টিমেন্ট তিনি “অগুরুত্বপুর্ণ” মনে করে উপেক্ষা করেছেন।  এছাড়া তিনি উদ্ধতের সঙ্গে বলছেন “ড্যানটক-কে অন্যান্য বিদেশি দাতা সংস্থার সঙ্গে তুলনা করাতে উলটা তিনিই ক্ষুব্ধ। কারণ ড্যানটক অবিচ্ছেদ্য অংশ [DANTAK has been an integral part of the infra-structure development ……]”। যেন ভুটান ভারতেরই অংশ। গতবছরের এপ্রিলে সেবার অসন্তোষের প্রকাশটা এই সাক্ষাতকারের কারণে  তুঙ্গে উঠেছিল। আর তা থেকে এবার ছয়দিনের মাথায় এপ্রিলে ভুটানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবার নিজেই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলে নিজেদের সাইনবোর্ড স্থাপন করেছিল। সারা পারো শহরে এধরণের বিলবোর্ড বহু জায়গায় ছড়িয়ে ছিল, আর রাস্তার পেভমেন্টেও ভারতীয় পতাকার তে-রং দিয়ে রাঙিয়ে রাখা হয়েছিল।

মূল কথাটা হল এখানে প্রদর্শিত এটিচ্যুড, আর কূটনৈতিক মনোভাব বা শিষ্টাচারের অভাব অথবা ভুটানের সার্বভৌমত্বকে  সম্মান  না জানানো – এগুলোর কোনকিছুই এখানে কাজ করে নাই। যেন ড্যানটক নিজেই অবকাঠামো গড়ার কাজ করতে ভুটানে এসেছে, ভুটানের সরকারের কেউ তাকে “ওয়ার্ক-অর্ডার” দেয় নাই। এর পিছনের ভারতের ধরে নেয়া ভয়ঙ্কর অনুমানটা হল, খোদ ভুটান তো ভারতেরই। ভারতের এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান বাকা-করে বলা কথা নয়।

যেমন প্রথমত, গত বছর ২০১৭ সালের চীন-ভারতের কথিত “ডোকলাম সঙ্কট”। ডোকলাম ভুটানের ভুমি, এটা ভারতও অস্বীকার করে না। ভুটানের সঙ্গে চীনের অচিহ্নিত সীমানা বিতর্ক দীর্ঘদিনের, সেই কলোনি আমলের। একালে তা আপোষে মীমাংসার জন্য উভয় রাষ্ট্রই তাদের বিভিন্ন স্থানের “ভুখন্ড বিনিময়” করে এই বিতর্ক মিটানোর চেষ্টা করছে। এখন এর ২৫তম রাউন্ডের আলোচনা বৈঠক চলছে। এরই অংশ হিশাবে ডোকলামের কিছু অংশ চীনের সাথে বিনিময়ে দিয়ে দেওয়াতে এরপর, চীনে সেখানে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে  ভারত সামরিকভাবেই তাতে বাধা দেয়। পরবর্তিতে হুমকি-আলোচনা শেষে, ৭৩ দিন পরে ভারত সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়াতে ঐ সঙ্কট দৃশ্যত মিটে যায়। তাহলে ব্যাপার হল, ভুটানের ভুমিকে ভারত নিজের মনে করে, চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। এছাড়া দ্বিতীয়ত, ভূটান এখন মোট ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ে কূটনৈতিক সম্পর্কে স্বীকৃতিতে আবদ্ধ। ভুটানের মাত্র দুই পড়শি – ভারত ও চীন। ভৌগলিকভাবে ভারতেরই সমানতুল্য আর এক প্রতিবেশি চীন হলেও ভুটানের সাথে চীনের কুটনৈতিক স্বীকৃতি নাই। গুরুত্বপুর্ণ হল এই কুটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করতে, এখানে দেশি-বিদেশি আইনি কোন বাধা নাই। কারণ সার্বভৌম ভুটান কোন রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করবে এটা ভারতের নাকগলানোর বিষয় নয়। কিন্তু বাধা হল বড়ভাই, বড়ভাই মাইন্ড করবে। ভারত অসন্তুষ্ট হবে এটাই আকারে-প্রকারে বুঝিয়ে ঠেকায়, চাপ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

আসলে ভারত ভূটানের ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ের বেলায় আপত্তি না করলেও চীনের ব্যাপারে ছুপা আপত্তি কেন? এককথায় বললে, অন্যান্য রাষ্ট্র কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করার পরে, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ যে সম্পর্কই করুক তা ভারতের ভুমি দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে তা বাধাগ্রস্থ করা না করা ভারতের ইচ্ছাধীনে থাকে। মানে ভারতের অনুমতি সাপেক্ষেই কেবল কোন কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু চীন –  সে ভুটানের  অপর পড়শি বলে ভারতের কোন বাধাই পরোয়া না করে সরাসরি চীন থেকে ভুটানে সব ধরণের যোগাযোগ  স্থাপন করতে পারে। অর্থাৎ ভুটানকে চুক্তিতে আটকিয়ে কলোনি করে রাখার ভারতের কূট-বুদ্ধি এখানে অচল। একারণেই, সারকথায় ভুটানকে ভারতের নিজেরই ভুখন্ড মনে করে চলা – এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান চীনের কারণ বাস্তবতা হারাবে, এটা ভারত ভালই বুঝে। এই কারণে, চীন-ভূটান কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময়ে ভারতের ছুপা আপত্তি।

এসব কিছু মিলিয়ে ভুটানের জনমনে বিশেষ করে তরুণদের মনে যে ক্ষোভ তা এখন প্রবল এবং সংগঠিত হয়ে উঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তাদের ক্ষোভের একটা বড় পয়েন্ট হল, ভুটান কেন নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে চীনের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক করবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সম্প্রতি ভুটানিজ স্থানীয় বিশেষ করে তরুণদের প্রতিরোধী মনোভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি একটা রিপোর্ট করেছে যেটা হংকং থেকে প্রকাশিত  সাউথ চায়না মর্ণিং পোষ্টে ছাপা হয়েছে। সেখান থেকে টুকছিঃ  “থ্রিম্পুতে ২১ বছর বয়স্ক কলেজ ছাত্র বিমলা প্রধান বলেন, ভারত ও ভুটান যদি ভালো বন্ধু হয়, তবে আমাদের বন্ধুত্ব অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের কারণে প্রভাবিত হবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, সবকিছুর জন্যই ভারতের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় ভুটানকে। ভারত সবসময়ই অন্যদের আগে আসবে। কিন্তু ভারতের উচিত হবে না ঈর্ষান্বিত বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করা”। ঠিক এমনই আর অনেক কথোপকথন আছে সেখানে। [এর এক বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে এখানে] এএফপি আরও লিখছে, ” ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংজাং দর্জি ভুটানের কূটনীতি সম্পর্কে মাথা ঘামাতে চান না। তবে তিনি বিদেশী বিনিয়োগের মূল্য বোঝেন। তিনি বলেন, ভুটানের উচিত হবে অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। তিনি বলেন, অনেক চীনা পর্যটক এখানে আসতে শুরু করেছে। তারা অনেক টাকা নিয়ে আসে”।

এই ব্যাপারটা ইদানিং এতই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তা টের পায় মানে স্বীকার করে ভারতের কিছু মিডিয়া। গত মাসে প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে ভারত-মুখি পিডিপির শোচনীয় হার দেখার পরে,  টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টার সরাসরি ভারত সরকারকে  ভুটানে জ্বালানিতে ভর্তুকি তুলে নেয়ার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দায়ে অভিযুক্ত করেছিল।
উপরে থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো মনোজ যোশির ‘পরাজিত মনোভঙ্গির’ কথা বলছিলাম। অনুমান করা যায়, তাঁরও এদিকগুলো আমল না করতে পারার কথা নয়। এর পরও তিনি আক্ষেপ করছেন যে এই নির্বাচনের ইস্যু হিশাবে ভারত বা ভুটান-ভারত সম্পর্ক কোন প্রকাশ্য বিষয় ছিল না। তিনি লিখে চলেছেন, “এর আগের ভারতমুখী পিডিপির সরকার থাকাতে ও সে সহযোগিতা করাতে ভারত তখন চীনের সাথে ‘ডোকলাম সঙ্কট’ আরামে মেটাতে পেরেছিল”। [The defeat of the incumbent government headed by Tshering Tobgay could not have been comfortable for New Delhi. This is especially because along with the Bhutanese government, New Delhi had managed the crisis over Doklam successfully last year.] এটা আসলেই যোশির কল্পনা আর আক্ষেপের কথা; বাস্তবতা নয়। এই অর্থে এটা একটা চাপাবাজি, ভিত্তিহীন কথা।

কারণ, প্রথম কথা ভারতীয় সৈন্য প্রায় স্থায়ীভাবে ভুটানে এখনো আছে। আর ভুটানের অপর পাড়ে চীনের সীমান্ত শুরু হবার আগে  পর্যন্ত সেটা ভুটানের আর ভুটানের যেহেতু অতএব তা, যেন ভারতেরই ভূমি ও সীমান্ত – এমন চিন্তার অভ্যাস ও বিশ্বাস জন্মে গেছে ভারতের। ঘটনা হল – সীমান্ত নিয়ে বিতর্ক কলোনির সেকাল থেকে যখন কলোনি শাসক ব্রিটিশ, চীনের সেকালের রাজারা আর নেপাল-ভুটানের করদ রাজা – এদেরই রাজ্য-সাম্রাজ্যের অমীমাসিত সীমানা। এদের পারস্পরিক সীমান্তের বহু অংশ সেকাল থেকেই বিতর্কিত ছিল, যা ভিন্ন ভিন্ন দাবির সীমানা হয়েই তখন থেকে এখনো রয়ে গেছে। চীন-ভারত সীমান্তের বিতর্ক এমনই উদাহরণ। তেমনিভাবে, চীন-ভুটানের এমন বিতর্কিত সীমান্ত একালে চীন ও ভুটান পরস্পর এক অংশের দাবি ত্যাগ করে অপর অংশ পেয়ে নিয়ে তারা আপস মিটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আয়তনের দিক থেকে সেখানে চীন ভুটানকে বেশি এলাকা দিয়ে দিতে চায়। কারণ ভুটান থেকে পাওয়া ভূমির কৌশলগত মূল্য চীনের কাছে বেশি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চীন-ভুটানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো নাই; বড়ভাই ভারত আইনি বাধা না দিতে পারলেও সে অখুশি হবে, তার অস্বস্তি হবে এগুলো চিন্তা করে ভুটান এই সম্পর্ক করতে আগাতে পারে নাই।
তাসত্বেও চীনের ভাইস পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত জুলাইয়ে ভুটান সফর করে গেছেন। এছাড়া তৃতীয় দেশে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস তারা ভিজিট করে থাকে। এমনকি ভারতে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস নিয়মিত ভিজিট করে থাকেন। বিশেষ কারণ, দিল্লিতে চীনের এমবেসি ভুটানেরও প্রক্সি এমবেসি বা কুটনৈতিক অফিস হিশাবে কাজ করে থাকে। এই বিষয়গুলো চীন-ভূটান যোগাযোগ ও নানান স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট বাধা। এসব কারণ সবাই শেরিংয়ের হবু সরকারের আমলে এ বাধা অপসারণ হবে এটা সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান এজেন্ডা ও প্রবল কামনা। মনোজ যোশি লিখছেন, “ডোকলাম যেটা চীনের দাবি করা, কিন্তু দৃশ্যত ভুটানের জায়গা”। [Doklam, which was ostensibly about Bhutanese territory claimed by China, did not figure in the elections.] কিন্তু ডোকলামকে ভুটান কেন নির্বাচনে ইস্যু করেনি এই তাঁর আপত্তি বা অবজারভেশন। যোশি এখানে প্রকারন্তরে স্বীকার করছেন ডোকলাম ভারতের নয়। ফলে তা চীনের হোক কিংবা ভুটানের তাতে ভারতের কী? এর কোন জবাব যোশি কথায় পাওয়া যায় না। অথচ “ডোকলাম ভুটানের” ভারতের এই ভুয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে সৈন্য হাঁকিয়েছিল ভারতই। আর তাতে তো ভারত নিজের জন্য তা সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। পরে ডোকলাম ভুটান-চীনের ইস্যু – এটা স্বীকার করে সৈন্য প্রত্যাহারের ফলেই ভারতের ইজ্জত বেচেছিল। তাই এখন সেসময়ে “ভুটানে পিডিপির দলের সরকার ছিল বলে” ভারত ডোকলাম সমস্যা সহজে মিটাতে পেরেছিল, এ কথা ভিত্তিহীন, মুখরক্ষার কথা। বরং সেসময়ে ভুটান ভারতের ওপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে একেবারেই নিশ্চুপ নির্বাক ছিল। অনাহূত ভারত সেসময়ে “ভুটানের ডোকলাম রক্ষার নামে”  চীনকে বাধা দিতে গেছে, এটা ভুটান একেবারেই পছন্দ করেনি।
আসলে তখন থেকেই ভারত বুঝেছিল দিন বদলে যাচ্ছে। এটা আর আগের ভুটান নয়। ‘বৌদ্ধ নিশ্চুপতা’ এক বিরাট শক্তি। দুর্বলের “নির্বাক থাকা” সময়ে এক বিশাল শক্তি হয়ে উঠে। এটা ভারত দ্রুত বুঝলেই তার জন্য ভাল। কেন?

কারণ, “ভুটান ভারতের যেন কলোনি। যেন ভুটানের মালিক অথবা মা-বাবা সে।” এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের ছড়ি ঘুরানো আর কত? জনসচেতনতা, ক্ষোভের কারণে তা এখন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। এটাই মূল ইস্যু হলেও ভারত খোড়া যুক্তিতে হয়ত বলতে চাইবে, আমার ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ কোনো যুদ্ধাবস্থার সময় চীন দখল নিতে পারে। হা, হয়তো পারে। কিন্তু সে কারণে ভুটানকে ভারতের কলোনি (১৯৪৯ সালের চুক্তি) হয়ে থাকতে হবে, কেন? এটাই কি ভারত বলতে চাইছে? চাইলে খুলে বলুক! এ কারণেই কি ভুটান-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে পারবে না? আসলে ডোকলাম ভূটানের নির্বাচনি ইস্যু কেন হতে হবে? ভারত চাইলে সে নিজেই এটাকে ভারতের নির্বাচনী ইস্যু বানাক!

আবার বলা হচ্ছে, হবু-ক্ষমতাসীন বিজয়ী ডিএনটি দল খুবই বোকা। যোশি বলতে চাইছেন। কারণ, “তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে কোনো ফরেন পলিসির চ্যাপ্টার ছিল না”। [The DNT had no section on external affairs in its manifesto.] ফলে “চীন-ভারত বা ডোকলাম ইস্যুতে দলগুলার কোনো বক্তব্য রাখার সুযোগ ছিল না। অবশ্যই তা সত্যি। কিন্তু এনিয়ে, অন্ধের হস্তি দেখার মত কেউ বলছেন, DNT এই দলটা আসলে নাকি রাজার অনুগত দল। তাই তাদের বিদেশনীতি নেই। ওরা নাকি অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে, অর্থনীতির উন্নতি নিয়ে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছড়িয়ে দিতে চায় ইত্যাদি নিয়েই কেবল নির্বাচনে ব্যস্ত ছিল। ভারতের ইমেরিটাস প্রফেসর এস ডি মুনি তারও [হংকংয়ের scmp পত্রিকায়] এক আর্টিকেলে এমনটা দাবি করা হয়েছে। বলছেন, Foreign and security policy issues were left out। তিনি বলছেন, “ধনী-গরীবের সম্পদের গ্যাপ কমাতে হবে” এমন অর্থনৈতিক শ্লোগান দিয়ে ডিএনটি দলের শেরিং নির্বাচন করেছেন। হা অবশ্যই, দৃশ্যত একথা সত্য। কিন্তু তবু তারা সবটা দেখতে পায়নি অথবা দেখেও ভিন্ন কথা বলছেন।কেন? একথার মানে কী?

ব্যাপার হল, সামরিক ক্ষমতাই একমাত্র ক্ষমতা নয়। যারা সামরিক অথবা লোকবলের দিক থেকে দুর্বল তাদেরকে অন্য যেকোন কিছু যেমন “চার চোখের ক্ষমতা” বা “বুদ্ধি খাটিতে” চলতে হয়। ২০০৭ সালে ভুটানের পশ্চিমা শিক্ষিত রাজা বুঝে গিয়েছিলেন ভুটানকে ভারতের হাত থেকে টিকানো ও বাঁচানো জন্য অন্য রাস্তা ধরতে হবে। “রাজকীয়” রাষ্ট্র কাঠামো দিয়ে আট লাখ জনগণের রাষ্ট্র ভারতের হাত থেকে বাচানো কঠিন। তাই তিনি  যেচে রাজার শাসন বা মনার্কিজম ছেড়ে নিজেই সোজা ভুটানকে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন। এক কথায় বললে, ক্ষমতায় জনগণকে সংশ্লিষ্ট করা, জনগণের ভেতর দিয়ে এক গণক্ষমতা তৈরি করা। এগুলোই একটি রাষ্ট্রকে টিকাতে পারে। ভারতের কলোনি চক্ষুকে উপেক্ষা করতে পারে। জনগণ নিজের রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষক নিজেই হতে পারে।  ছোট আট লাখ জনসংখ্যার রাষ্ট্রে এটা এক উপযুক্ত ও বিরাট অগ্র-পদক্ষেপ ছিল।

খেয়াল করলে আমরাও সকলেই জানব যে, ভারতের কৌশল হল পড়শি দেশে এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলকে নিজের ভাঁড় বানানো। ক্ষমতায় রাখার নামে ঐ দল বা ব্যক্তিকে ভারতের দালাল বানানো, পুতুল বানানো। গত ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি উঠানো থেকে ভুটান এ বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছে। ভুটানে রাজার প্রভাব এখনো অনেক। রাজা এখন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনাল প্রধানও বটে।  তিনি ভারতের কৌশল অকেজো করে দিয়েছেন। সে কারণে এই নির্বাচনে কোনো বিদেশনীতি বিশেষত ভারত অথবা চীন সম্পর্কিত ইস্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক তোলা যাবে না – এই নীতিতে সকল দলকে আসতে রাজি করিয়েছেন। এটাই এখন নির্বাচনী আইন এবং এটা কেউ ভঙ্গ করলে নির্বাচন কমিশন জরিমানা করতে পারবে, এই নিয়ম জারি করেছে। [গত নির্বাচনে দুটা দলকে ২০০ ডলার করে ফাইন-ও করেছিল কমিশন।]  আর আসলে ওদিকে রাজার মধ্যস্থতা বা সভাপতিত্বে চীন-ভারত বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মিলে একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করবে, যেটা ক্ষমতাসীন দল সে অনুযায়ী চলবে, এই হলো সেই কৌশল। অর্থাৎ চীন-ভারত ইস্যুতে পপুলার প্রপাগান্ডা চলবে না। কেবল সুনির্দিষ্ট ফোরামে বসে সিরিয়াস তর্কবিতর্ক করতে হবে। আর এতে এক বড় লক্ষ্য হল ভারত যেন কোনো একটা দলকে তার দালাল বা পুতুল বানাতে যাতে না পারে। ফলে এই অর্থে এখন সব দলই দৃশ্যত “রাজার অনুগত”।  নতুন হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং বলছেন, বিদেশ নীতি প্রসঙ্গ নিয়ে তারা না, রাজা বলবেন। অতএব অচিরেই, হবু ক্ষমতাসীন ডিএনটি দলই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনসহ ভারতের কলোনি নিগড় ছিন্ন করে ভুটান বিদেশনীতি সাজাচ্ছে – খুব সম্ভবত এটাই দেখব আমরা।

এছাড়া ওদিকে লক্ষ্য করলে দেখব, আসলেই কী হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং কেবল অর্থনৈতিক ইস্যুতে নির্বাচন করলেন? শেরিংয়ের দল  ডিএনটি বলছে, ভুটানের অর্থনীতি অতিমাত্রায় পানিবিদ্যুৎ উতপাদন ও বেচাকেন্দ্রিক। বৈদেশিক ঋণের ৮০% এর কারণ এই অব্যবস্থাপনার পানিবিদ্যুত। ভূটানে এটা বদলাতে হবে। নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বের করতে হবে। এর অর্থ – ভারতের নিয়ন্ত্রিত এই পানিবিদ্যুৎ আর সীমিত বিনিয়োগের ও বৈচিত্রহীন বিনিয়োগের ভারতীয় খাঁচা থেকে ভুটানকে বের হতে হবে। তাহলে এখন এটা কি আর অভ্যন্তরীণ নীতির নির্বাচন থাকল?

এসবের কিছু খবর অন্তত ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পেয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ভারত সরকারকে কড়া সাবধান করে তার এক সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে,  আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। ওর শিরোনাম হল – “ভারতকে ভুটানের আকাঙ্খার সাথে নিজের কৌশলগত স্বার্থ ভারসাম্যপূর্ণ করে গড়তে হবে”। এসব ব্যাপার, এগুলো কিসের লক্ষণ? এরা বলতে চাচ্ছেন, ভুটান-চীনের কূটনৈতিকসহ সব সম্পর্ক হওয়া একেবারে নেপালের মত ভারতের বিকল্প চীনের ভিতর দিয়ে ট্রানজিট পাওয়া পর্যন্ত আরও কিছু হওয়া ঠেকানো আর অসম্ভব। আর একভাবে বললে, এএফপির ভুটানিজ তরুণদের মনোভাব নিয়ে রিপোর্ট যেটা হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এটারই স্বপক্ষে ভারতের অধ্যাপক এস ডি মুনি র লেখা সেটাও হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপানো ছিল পালটা, তবে ইতিবাচক জবাব। প্রফেসর মুনি লিখছেন, “এটা বিশ্বাস না করার কারণ নাই যে আগামিতে চীন-ভূটানের কূটনৈতিক সম্পর্ক হওয়া ভারত কাছে অগ্রহণীয় হবে, যদি নিরাপত্তা, শান্তি ও ইতিবাচক ব্যবসার পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে ভারতের কোর স্বার্থকে তা ক্ষতিগ্রস্থ না করে”। [There is no reason to believe India would not accept Bhutan’s establishment of diplomatic relations with China in future if its core interests of preserving security, peace and a positive business climate are not disturbed.] অর্থাৎ শর্ত সাপেক্ষে [খুব সম্ভবত শিলিগুড়ি করিডোর মাথায় রেখে] তিনি রাজি হচ্ছেন। তবে একটা মজার দিক হল দুটো রিপোর্টেরই শিরোনামে বলতে চাইছে ভারতের কপাল পুরেছে, ভারতকে আগের অবস্থানে ছাড় দিতে হবে। যেমন এএফপি লিখছে “at the expense of rival India”। আর কমিউনিস্ট প্রফেসর মুনি অহেতুক ন্যাশনালিস্ট হয়ে লিখছেন, “with India’s blessing”। মানে বলতে চাচ্ছেন যে, “মহান দাতা ভারতের আশীর্বাদ” পেলে পরে, চীন-ভুটান মিলতে পারবে।  মানে একজন খই খাচ্ছিল, তার কিছু খই বাতাসে উড়ে গেলে সেটা ঠাকুর গোবিন্দের নামে দান করে দেয়া হল বলে চালিয়ে দেয়া।

একটা তথ্য দিয়ে শেষ করা যাক। সার্ক (BBIN) Motor Vehicles Agreement চুক্তি বলে একটা বিষয় ছিল যেটার সারকথা হল, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একই মটরযান নিয়ে ভ্রমণের চুক্তি। সেই সময়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভুটানের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে নিজেকে তারা ঐ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কারণ বলা হয়েছিল, প্রচুর যানবাহনের হাঙ্গামায় শান্ত বৌদ্ধ ভুটানিজ ধ্যানে বাধাগ্রস্থ হতে পারে একারণে আর তাদের অত যানবাহন সামলানোর মত অবকাঠামো নাই বলে। খেয়াল করতে হবে সেটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু পার্লামেন্টের। মানে বিরোধীদের বাধা, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ছিল তাই সরকার পিছু হটে ছিল। কিন্তু এর পিছনের আসল কারণ এখন বলা হচ্ছে।  বিরোধীরা তারাই আসলে ঐ সময় থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল এবং এরই প্রথম বিজয়ী পদক্ষেপ ছিল সেটা। সব ব্যাপারে “ভারতের অনুমতি নিতে হয়”  – এই অনুমতিদানের ভারত একে প্রতিহত করে স্বাধীন ইচ্ছার সিদ্ধান্তের ভুটান, এর কায়েমই ছিল তাদের কমন লক্ষ্য।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভুটানে সব ভারতের হাতছূটে চলে যাচ্ছে, এটা আমল হওয়া শুরু হয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সুজন হয়, একমাত্র তবেই এর বিপদ বুঝবে।

এদিকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার ভুটান যদি নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করতে পারে, আমাদের মধ্যে কী কেউ কেউ নিশ্চয় বুদ্ধিমান হবেন, এমন পাওয়া যাবে না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভুটানের বুদ্ধিমান রাজা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

গৌতম দাস

০৯ জুন ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2s2

 

 

কখনও কখনও কারো কারো কোন কথা বিশ্বাস হতে চায় না। তেমনই এক অবস্থা তৈরি হয়েছে ভারতের কিছু রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদেরকে নিয়ে। সত্যি কথাও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। ধরা যাক, এমন একটা বাক্য পত্রিকার পাতায় পাওয়া গেল যেখানে ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা অথবা মন্ত্রী বলছেন, “ধর্মের নামে জনগণের মাঝে বিভক্তি আনার কথা বলা অনুচিত”। অথবা বাক্যটা একটু এরকম যে বলা হয়েছে, “ভারত এমন এক দেশ যেখানে জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারও প্রতি বৈষম্য করার সুযোগ নেই। এটা কখনো বরদাস্ত করা হবে না”। বলাই বাহুল্য এমন বক্তব্য নিশ্চয় ভারতের কোনো সেকুলার বা কমিউনিস্ট নেতার বক্তব্য বলেই আমরা ধরে নিব।

কিন্তু না। এই অনুমান ও ধারণা অবিশ্বাস্যভাবে শতভাগ ভুল। আসলে প্রথম কথাটা বলেছেন, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। আর পরের কথাটা বলেছেন, ভারতের মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এদের দু’জনের বক্তব্য একই প্রসঙ্গে একই দিনে। ভারতের লিডিং সব ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকাতে গত ২২ মে অথবা পরের দিন এই খবর পাওয়া যাবে। এমনকি গ্লোবাল নিউজ এজেন্সি রয়টার্সও একই খবর পাঠিয়েছে। ফলে পাঠককে আশ্বস্ত করে বলা যায়, এখানে দেখতে বা পড়তে কোনো ভুল হয়নি।

ওদিকে আবার, আমরা যদি দেখি কেউ কাউকে “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা” করতে পরামর্শ দিচ্ছেন, আমরা ধরে নিতে পারি যে, ওই পরামর্শদাতা আর যাই হোক বিজেপি কোনো নেতা বা মন্ত্রী নিশ্চয় নন। কিন্তু না, এখানেও বিস্মিত হওয়ার পালা। মোদী সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক এক মন্ত্রী আছেন যার নাম মুক্তার আব্বাস নাকভি। তিনি বলেছেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার। আমরা তাদের এটাই বলতে পারি যে, প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন”। এখানেও আগের একই প্রসঙ্গে মন্ত্রী নাকভিও এই বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে কী সেই প্রসঙ্গ, যা থেকে অবিশ্বাস্য সব কথা বের হয়ে আসছে বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীদের মুখ দিয়ে?

রয়টার্স লিখেছে, “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান। কাগজকলমে ভারত সেকুলার হলেও পাঁচ ভাগের চার ভাগ মানুষ এদেশে হিন্দুধর্ম চর্চা করে”। [Christians constitute less than 3 percent of Hindu-majority India’s 1.3 billion people. India is officially secular, but four-fifths of its population profess the Hindu faith.] এই তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সারা ভারতেই ছড়িয়ে আছে, দক্ষিণ ভারতে তুলনামূলকভাবে এর ঘনত্ব বেশি। আর রাজধানী দিল্লির ক্ষমতা কাঠামোর করিডোরে অথবা একাডেমিক বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিও দৃশ্যমান। বিশেষ করে নাম কামানো মিশনারি স্কুল ও কলেজগুলোর কারণে ঐ সমাজে তারা অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। আবার সারা দুনিয়ার মতো ভারতেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধারা রয়েছে। দিল্লির ক্যাথলিক ধারার আর্চবিশপ হলেন অনিল কুটো (Anil Couto)। তিনি তাঁর ধারার অন্যান্য বিভিন্ন চার্চ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এক অভ্যন্তরীণ চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমরা একটা টালমাটাল রাজনৈতিক আবহাওয়া প্রত্যক্ষ করছি, যেটা আমাদের কনষ্টিটিউশনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং আমাদের জাতীয় সেকুলার নীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে”। [“We are witnessing a turbulent political atmosphere which poses a threat to the democratic principles enshrined in our Constitution and the secular fabric of our nation,”]। তাই ঐ চিঠিতে তিনি আহ্বান জানান আগামী বছরের নির্বাচন পর্যন্ত তাদের অনুসারী শাখাগুলো যেন এ জন্য এক ‘বিশেষ প্রার্থনা কর্মসূচি’ হাতে নেয়। এই চিঠি তিনি লিখেছিলেন গত ৮ মে। সেটা দু’সপ্তাহ পরে হলেও প্রকাশ্যে বিজেপির নজরে আসাতে তারা আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এই চিঠির ‘বিপদ’ টের পেয়ে যান। এই চিঠিটা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী জোট খাড়া করে ফেলার উপাদানে ভরপুর, তা বুঝতে বিজেপির দেরি হয়নি।

যদিও এই চিঠিতে যে একশনের আহ্বান জানানো হয়েছে তা খুবই ‘হেদায়েতি ভাষ্য’। বলা হয়েছে – যিশু ও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে। অর্থাৎ কোনো মিছিল মিটিং করার আহ্বান দূরে থাক, আলোচনা সভাও করতে বলা হয়নি। আর প্রতি শুক্রবার “জাতির জন্য উপাস থাকা’ পালন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এর সোজা মানে করে বললে এটা হল, বড় জোর আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ধরনের একটা ততপরতা। এর মধ্যে ন্যূনতম কোনো আক্রমণাত্মক ভাষ্য নেই। সাদামাটা এ বক্তব্যের মধ্যে স্পিরিচুয়্যাল শক্তির প্রার্থনা, নালিশ ও আহ্বান আছে অবশ্যই। সেই সাথে, সব ধর্মের লোকদের মাঝে পারস্পরিক ঘৃণা বা হিংসার সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় যেন থাকে, এ কামনায় প্রার্থনা করতে বলেছেন আর্চ বিশাপ।

কিন্তু এটাও সহ্য করার অবস্থায় নাই বিজেপি। কারণ এই চিঠিতে খ্রিস্টান, অখ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার প্রতি আবেদন রেখে সবাইকে মানবিক স্পর্শে ছুয়ে ফেলে মিলিত এক শক্তি হয়ে ওঠার মতো বহু উপাদান ও ক্ষমতা আছে। এটাই এই চিঠির শক্তির দিক। আর আসন্ন (২০১৯ সালে) নির্বাচনে এটা বিজেপির রাজনীতির জন্য বিরাট বিপদের দিক ঠিক ততটাই। তাই, সহজেই অনুমান করা যায় এই ধারণা থেকেই বিজেপি ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসভাবে নিয়ে পাল্টা চাপ তৈরি ও অভিযোগ অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিজেপির মূল আদর্শিক সংগঠন আরএসএস (RSS), সেও উপায়ান্তর না দেখে নিজেই ‘সেকুলার’ হয়ে গেছে। দাবি করেছে, আর্চবিশপের এই চিঠি “ভারতের সেকুলারিজম ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ”। […the RSS claimed it was a “direct attack on Indian secularism and democracy].’ আর তা থেকেই ২২ মে, অমিত শাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথসহ বিজেপি অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীদের সব অবিশ্বাস্য বক্তব্য।

কিন্তু বিজেপির কাছে সমস্যা দেখা দেয় যে, বিজেপি কী বয়ান দিয়ে এই চিঠির বিরোধিতা করবে? কারণ এই চিঠির অভিযোগের বিরোধিতা করতে গেলে খোদ বিজেপির রাজনীতিরই বিরুদ্ধে ও বাইরে চলে যেতে হবে। যেমনঃ এখানে সবচেয়ে বড় তামাশার শব্দ হয়ে উঠেছে ‘পোলারাইজেশন’- যার বাংলা হল, “জনগণের মাঝে বিভক্তি” অথবা “সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্তি”। এখানে আর্চবিশপের চিঠির অভিযোগকে মিথ্যা বলে বিজেপি অস্বীকার করে কোনো পাল্টা বয়ান খাড়া করতে গেলে তাতে ভারত রাষ্ট্র ও সরকারের জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারো প্রতি বৈষম্য করার বিরোধিতা করতে হবে অথবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি করার বিরোধিতা করতে হবে। এটাই মডার্ন রিপাবলিক কোনো রাষ্ট্রের “সাম্য নীতির” মূল কথাঃ কোনো পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সবাইকে সমান গণ্য করতে হবে, রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ, বা সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে না।

কিন্তু বিজেপির রাজনীতির মূল কথাই হচ্ছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজকে পোলারাইজ করতে বা বিভক্তি টানতে হবে। এটা তারা করে যতটা হিন্দুত্বকে ভালোবেসে এর চেয়েও বেশি হল, ‘হিন্দুত্বের ভোট’ বাক্সের প্রতি ভালোবাসা। প্রধানত, হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশে ‘হিন্দুত্বের ভোট’-এর জোর অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এটাই দলটা সবচেয়ে ভাল করে জানে। তাই বিজেপি মানেই সমাজকে হিন্দুত্বে উসকে পোলারাইজ করা; ভোটের বাক্স ভর্তি করা।

কিন্তু আর্চবিশপের অভিযোগ বিজেপিকে কুপোকাত করে দিয়েছে। তাই উপায় কী, নরম ভাষায় হলেও, বিজেপিকে নির্বাচনের বছরে খ্রিষ্টান কমিউনিটির অভিযোগ তো ঝেড়ে অস্বীকার করতেই হবে। নিরুপায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবার তাই সুশীল ভদ্র হয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘It’s not appropriate if anyone is talking about polarising people in the name of religion । আসলে নিজেরই দলের স্বভাব ও রাজনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, “পোলারাইজেশন হারাম”। একইভাবে, অগত্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কনস্টিটিউশনের সাম্যনীতি আঁকড়ে ধরে হুঙ্কার (আসলে নিজের বিরুদ্ধেই) দিচ্ছেন, “… no discrimination against anyone on the basis of caste, sect or religion. Such a thing cannot be allowed,” – কোনো বৈষম্য বরদাস্ত করা হবে না। আর বিজেপি সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নাকভি সোজা মিথ্যা বলেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো রকম ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার”। আর সেই সাথে তিনি আবার ‘প্রগতিশীল’ বলে শব্দটাও ধার করেছেন, তা বিজেপি রাজনীতির পরিভাষা নয় অবশ্যই। বলেছেন, “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুন”।  আসলে বিজেপির মূল অবস্থান হল, আর্চবিশপ অনিল কুটোর অভিযোগ যেভাবেই হোক অস্বীকার করতে হবে, তাতে বিজেপির নিজ রাজনীতির বিরোধিতা করে হলেও। দলটার এতই দিশেহারা অবস্থা। তবে আর একটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা হল – উল্টা আর্চবিশপের ওপর অভিযোগ আনা যে, তিনি খ্রিষ্টান-অখ্রিষ্টান বিভেদ তুলছেন এবং বিশপের বক্তব্য রাজনৈতিক, এই অভিযোগ তোলা।

এদিকে ভারতের মিডিয়ার অবস্থা ‘ভয়াবহ’ বললে কম বলা হয়। সম্প্রতি বিজেপির এক ছদ্ম সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে [sting operation] শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২৫ টিভি চ্যানেলকে তারা বিজেপির হিন্দুত্বের পক্ষে টাকার বিনিময় প্রচার চালাতে চায় কী না – এই অফার দিলে দেখা গেছে দুইটা বাদে তারা প্রায় সবাই রাজি। এই অপারেশন চালানোর পর ‘কোবরাপোস্ট’ https://www.cobrapost.com    নামে এক ওয়েবসাইট থেকে ইউটিউবে সব কথোপকথন ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। তেমনি এক নিউজ এজেন্সি এএনআই টিভি, (ANI TV) তারা এই ইস্যুতে বিজেপিকে সার্ভিস দিতে নিউজ ক্লিপ তৈরি করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আসলে বিজেপির দিক থেকে আর্চবিশপকে দেয়া হুমকিমূলক বার্তায় ভরপুর বলা যায়। বিজেপির আর এক মন্ত্রী গিরিজা সিং সেখানে আর্চবিশপের চিঠির ঘটনাতে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে।’ [Giriraj Singh as saying that “every action has a reaction”]। বিজেপির আর এক নেতা বিনয় কাতিয়ার বলছেন, আর্চবিশপের মন্তব্য বিভিন্ন ‘সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা, অসন্তোষ তৈরি’ করতে পারে [archbishop’s comments could lead to “communal tensions”.]। মোদী সরকারের টুরিজম মন্ত্রী বলেছেন, Union minister of tourism KJ Alphons said Couto’s remarks were “unfair” to the government and that “godmen” should stay away from politics. অর্থাৎ এটা হলো দাঙ্গা তৈরির অপবাদ দিয়ে ভয় দেখানো। স্বভাবতই এতে খ্রিষ্টান ধর্মের অন্য প্রায় সব ধারার নেতারা আর্চবিশপের পদক্ষেপ ও অভিযোগকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।

আর্চবিশপের অভিযোগের ফলে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়ার পক্ষে তা ভূমিকা রাখতে পারে ভেবে বিজেপি আজ ‘ভেজা বিলাই’ সাজছে, সব অভিযোগ অস্বীকার করছে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ২০১৫ সাল থেকেই নিয়মিতভাবে বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠন, ‘ঘর ওয়াপাসি’ প্রোগ্রামের নামে নির্বিচারে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, সম্পত্তি দখল, চার্চ ও মসজিদে হামলা, হত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে। গত ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসীন হবার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় ও পরবর্তিতে, তিনি সরবে ও প্রকাশ্যে মোদি সরকারের খ্রিস্টান ও মুসলমান দলনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভারত রাইজিং ইকোনমির দেশ হয়ে চাইলে এগুলো বন্ধ করতে হবে, এগুলো নেতি ইমেজ তৈরি করে। ওবামা বলেছিলেন,  “ভারত সফল হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ধর্মীয় লাইনে বিচ্ছিন্নতা বিভক্ত হয়ে পড়া ঠেকাতে পারবে [India will succeed as long as it is not ‘splintered’ on religious lines: Obama]

ফলে পরে চাপের মুখে মোদী এবিষয়ে তাঁর সরকারের নীতি কী তা পাবলিকলি ঘোষণা করেছিলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। তিনি বলেছিলেন,  “যেকোন নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা রক্ষা’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব” – এটাই নিজের সরকারি নীতি বলে দিল্লির এক চার্চে্র অনুষ্ঠানে তিনি লিখিতভাবে এই বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছিলেন। কথাগুলো মোদীর মুখ থেকে বের হয়েছে ভেবে অবাক অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু এই লিখিত কথাগুলা মোদীর নিজস্ব ওয়েব সাইটে এখনও আছে। সেখান থেকে আমি এখনই টুকে আনলাম। অন্যান্য নিউজ অন লাইনেও পাবেন।

My government will ensure that there is complete freedom of faith and that everyone has the undeniable right to retain or adopt the religion of his or her choice without coercion or undue influence. My government will not allow any religious group, belonging to the majority or the minority, to incite hatred against others, overtly or covertly. Mine will be a government that gives equal respect to all religions.

উপরের অংশটুকুর বাংলা অনুবাদ আমার করাঃ ভারতের পক্ষ থেকে, আমার সরকারের পক্ষ থেকে বললে আমি ঘোষণা করছি আমার সরকার ওপরের ঘোষণার প্রতিটা শব্দ ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমার সরকার ধর্মবিশ্বাসের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে যে প্রত্যেক নাগরিক সে কোনো ধর্ম ধরে রাখা অথবা গ্রহণ করা তার পছন্দের বিষয় এবং এটা কোনো ধরনের কারো বলপ্রয়োগ অথবা অন্যায্য প্রভাব ছাড়াই সে করবে এটা নাগরিকের অ-অমান্যযোগ্য অধিকার। আমার সরকার কোনো ধর্মীয় গ্রুপ, তা সে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যে ধরনেরই হোক, সঙ্গোপনে অথবা খোলাখুলি অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহ্য করবে না। সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান দেবে আমার এই সরকার।

মোদীর পুরা বক্তৃতার টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করা পাবেন এখানে, আমার আগের লেখায় শেষ অংশ।

কিন্তু তার এই কথায় যে ফাঁক ছিল তা হল, তিনি “মোদী সরকারের” নীতি শুনিয়েছিলেন। “মোদীর দল বিজেপির” নীতি নয়। এছাড়া  আসলে দুঃখের বিষয়, মোদী নিজেই এরপরে বিজেপি দলে, বিশেষ করে আরএসএসে নিজ প্রতিদ্বন্দ্বিদের ঠেলাগুতা চাপ পড়ে নিজেই “সংখ্যালঘু মত” হয়ে যান। বিশেষ করে  ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির মূল পরিচালক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (আরএসএস এর অঙ্গ সংগঠন) প্রভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে হেরে যান। ‘ঘর ওয়াপসি’ কথার আক্ষরিক মানে হল “ঘরে ফিরিয়ে আনা”। সোজা মানে হল, এর আগে কোন ভারতীয় যে কেউ খ্রিষ্টান বা মুসলমান হয়েছে তাকে এবার বাধ্য করে হিন্দুত্বে ফিরিয়ে আনার তাণ্ডব তৈরি করা। অথবা সুনির্দিষ্ট ঘটনা অভিযোগ থাকুক না থাকুক, ভুয়া অভিযোগে চার্চ বা মসজিদে আক্রমণ করা, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কিংবা জোর করে কোনো মুসলমান নাগরিককে নির্যাতনে বাধ্য করে “জয় শ্রীরাম” বলানো ইত্যাদি। এরই বর্ধিত আর এক রূপ হল গোমাংসকে নিয়ে তান্ডব তৈরি করা। [‘মাংসমাত্রই তা গরুর মাংস’; এই অনুমান ও এই অভিযোগে মাংস খাওয়া, রাখা, বহন করা নিয়ে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো। ]

ফলে মোদী সরকারের “ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার নীতি” নিছকই তা কাগুজে ঘোষণা হয়ে থেকে যায়। আর বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ আরএসএসের সহযোগী সব দলের ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি আগের মতোই সরকারের দিক থেকে প্রশাসনিক বাধাহীন, অবাধে চলতে থাকে। কেবল গরুর মাংসের বিরুদ্ধে করা মোদির আইন (জবাই, কেনাবেচা, বহন ও খাওয়া ইত্যাদি) ও বিতর্কের ব্যাপারে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আপত্তির কারণে শেষে সরকার নিজেই “আইনটা আপাতত প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে আদালতকে জানিয়ে নিষ্পত্তি করেছিল। কিন্তু তাতে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু ঘটানো – এগুলো বন্ধ হয় নাই। এই তো গত মাসেই (২৮ মে ) উত্তরপ্রদেশের কাইরানা নির্বাচনি এলাকায় উপ-নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বিজেপির পুরানা কৌশল গরুর মাংস খাওয়ার ভুয়া অপরাধে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। যাতে এই টেনশনে হিন্দুত্ব ভোটের জিগির উঠে, পোলারাইজেশন ঘটে। যদিও আগে এটা বিজেপির আসন ছিল। তবুও এই উপনির্বাচনে বিজেপি হেরে যায়।

আসলে বিজেপির মূল রাজনৈতিক কৌশলই হল, এভাবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজে পোলারাইজেশন ঘটানো, ‘জোশ-জজবা’ তোলা – একাজ করেই বিজেপি আগিয়ে চলেছে। এভাবে ভোটের বাক্সে হিন্দুত্বের ভোট জোগাড় করে ভরে তোলা। এই নীতিতেই মোদির ভারত গত চার বছর পার করেছে। তাই, সার কথাটা হল, মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লির আর্চবিশপের অভিযোগ শতভাগ সঠিক। তবে তাঁর এখনকার এই পদক্ষেপ ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদীকে কতটা ঠেকাতে পারবে তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে নগদ লাভ হল, অমিত শাহ আর রাজনাথের ‘পোলারাইজেশন বিরোধিতা’র ‘ভক্ত’ হয়ে যাওয়া, এই তামশা দেখার সুযোগ হলো আমাদের।

আর একটা দিক আছে, অনেকেই ইস্যুটাকে (পোলারাইজেশন বিরোধী অবস্থান নেয়া) সেকুলারিজম বা প্রগতিশীলতা বলে বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করছেন। এটা শতভাগ ভুল। আসলে এটাই এদের নিজ ইসলামবিদ্বেষী অবস্থানের লুকানোর জায়গা। বিষয়টার মূলধারণাটা হচ্ছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাম্যের নীতি রক্ষা, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি পালন করে চলল কিনা। নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এই হলো ইস্যু। অথচ রাষ্ট্র ধারণা বুঝে না বুঝে বিভ্রান্তিকরভাবে এই ইস্যু ও ভাবটাকে ‘সেকুলার’ শব্দ দিয়ে খামোখা বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করতে দেখা হয়। আর এই ‘সেকুলার’ শব্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ।

অনিল কুটো ধরনের ব্যক্তিরাও বুঝে না বুঝে ‘জাতীয় সেকুলার নীতির’ কথা তুলে নিজেদের বিভ্রান্তিতে ও অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় ঢুকিয়ে রাখেন। এভাবে ভুতুড়ে না-বুঝা এক ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আড়ালে ধর্মবিদ্বেষ জারি থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় এটাকে ‘ধর্মের সাথে রাজনীতি’ মেলানো বা না-মিলানোর বাজে বিতর্ক হিসেবে হাজির হতে দেন। অথচ পরিষ্কার ভাষায় বললে, রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি, নাগরিকের জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যহীনতার নীতি, সুরক্ষার নীতি পালন করে চলল কিনা; এবং নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এটাই হলো দাবি ও মূল ইস্যু।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৭ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

গৌতম দাস

১২ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rG

 

 

 

ভারতীয় থিংকট্যাংক (Think Tank or Policy Institute) প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা হালহকিকত নিয়ে প্রায় সময়ই আমার লেখায় নানা মন্তব্য থাকে। সেখানে আমি সবসময় প্রশ্ন তুলেছি যে, কোন আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা (আমেরিকান ফান্ড চলা) ভারত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষ থেকে পলিসি নিয়ে কাজ করা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ফলে শেষ বিচারে এগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের এক পলিসি প্রতিষ্ঠানই হবে। কারণ এটা  থিংকট্যাংক অর্থাৎ চিন্তা, আইডিয়া ও মতাদর্শ তৈরি করা বা করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রস্বার্থ জিনিষটা কোকিলের ঘরে কাকের বাসার গড়ার মত কাজ কারবারের না; সেটা এখানে চলতে পারে না। ফলে শুধু আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা নয়, এমনকি আমেরিকান (এনজিও) ফান্ডে চলে এমন স্থানীয় ভারতীয় থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই কারণে সেগুলোও ভারতের মাটিতে “আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পলিসি প্রতিষ্ঠানই” হবে।

বুশের আমল থেকে এভাবেই আমেরিকা ভারতের ঘাড়ে চড়ে আমেরিকার নিজের “চীন ঠেকাও নীতি” বাস্তবায়ন চালিয়ে গিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এখানে কথাগুলোর মূল বিষয় সাধারণভাবে বিদেশি এনজিও প্রসঙ্গে নয়। ফলে সাধারণভাবে এনজিও এর মাধ্যমে আমেরিকান ফান্ড বিতরণ এর বিরুদ্ধে কথা বলা বলে বুঝলে ভুল হবে। যারা বস্তুগত, বা বিষয়আশয় বিতরণের দাতব্য বিদেশি এনজিও – তাদের ক্ষেত্রে এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু চিন্তা, মতামত ও পলিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফান্ডে হলে এখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের সাথে স্বার্থ সংঘাত, সমস্যা হবেই। এটাই মূল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত চরম ন্যাশনালিজমের ভারতের রাজনীতি, অথচ থিংকট্যাংক প্রশ্নে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংককে অবলীলায় ততপর করে রেখেছে।  আসলে আমেরিকায় ভারতের ভর্তুকির রপ্তানি পণ্য বিক্রি করতে দেওয়াতে রপ্তানি বাজারের এই লোভে সম্ভবত ভারতরাষ্ট্র নিজ দেশে আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রভাব প্রতিপত্তি চালু রাখতে দিয়েছে। এই অনুমান যদি সঠিক হয় তবে বুঝতে হবে এবার  ভারতে ততপর আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা অথবা অথবা আমেরিকান ফান্ডে চলা লোকাল থিংকট্যাংক এদের সবার ততপরতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে এবার ঢিলা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। হাত গুটাতে হবে তাদের। এক ব্যাপক বদল আসন্ন হয়ে উঠছে। মূল কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতিতে “চীন ঠেকানো” প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে ছিল বিগত প্রায় ষোল বছর – প্রেসিডেন্ট বুশের আট বছর আর পরে ওবামার আরও আট বছরে। এর ফলে এটা শুধু স্থায়ী নীতি হয়ে যাওয়া না, বরং “চীন ঠেকানো” ছিল আগের বুশ ও ওবামা প্রশাসনের পলিসিগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার। কিন্তু এই প্রথম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। অন্তত প্রায়রিটি উলটে দিয়েছেন তিনি। আগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র স্বার্থের টপ প্রায়রিটি। আর এর বদলে ট্রাম্পের প্রায়রিটি হল বাণিজ্যস্বার্থ এখন টপ প্রায়রিটি। অর্থাৎ চীন ঠেকানো ট্রাম্পের কাছে প্রায়রিটি নয়। চীনের কাছে হারিয়ে ফেলা বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার ট্রাম্পের টপ প্রায়রিটি। এসবের ফলাফলে  ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক ততপরতাগুলোর শুকিয়ে যাবার কথা। দেখা যাক কী হয়। বাস্তবে কী ঘটে তা দেখার জন্য আমাদেরকে কমপক্ষে এবছরটা অপেক্ষা করতে হবে।

তবে ভবিষ্যত অবস্থা যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, ভারতের আমেরিকান থিংকট্যাংক ব্যাক্তিত্বরা এখনই হাল ছেড়ে দেন নাই।  তেমনই এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী থিংকট্যাংকার ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজা মোহন। বর্তমানে তিনি কার্ণিগি ইন্ডিয়ার (Carnegie India) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কার্ণিগি মানে হল, আমেরিকার ওয়াশিংটনভিত্তিক এক ফরেন পলিসি – বিষয়ক থিংকট্যাংক যার নাম – কার্ণিগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারনাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)। এই পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রূপের নাম হল, কার্নোগি। আর এর ভারতীয় শাখা হল, কার্নোগি ইন্ডিয়া। রাজামোহন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স পাস করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তবে পরে দিল্লির জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। এরপর অধ্যাপনা করেছেন অথবা নানান ধরণের একাডেমিক কাজে জড়িয়ে ছিলেন কখনও ভারতে, সিঙ্গাপুরে, অস্ট্রেলিয়ায় নয়তো আমেরিকায়। তবে তার মূল পরিচয় এখন “ফরেন পলিসি এনালিস্ট”, তার নিজের পরিচিতির ভাষায় তিনি “থিংকট্যাংকার”। আমেরিকায় থাকার সময় থেকে তিনি দক্ষিণ ভারতে তামিলনারুর প্রাচীন ইংরেজ জমানার ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকার ওয়াশিংটন করসপন্ডেন্স ছিলেন। পরে ডিপ্লোমেটিক এডিটর বা কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এই দ্য হিন্দু অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাতেও। বর্তমানে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখছেন। ভারত সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক অথবা থিংকট্যাংক সংশ্লিষ্ট যত প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারক বোর্ড আছে তিনি প্রতি বছরই একাধিক এমন সব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য থাকেন। তিনি এমনই প্রভাবশালী শিরোমণি। তার গুরুত্বপূর্ণ উত্থান ২০০৪ সালের আশেপাশের সময় থেকে। বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের আমলে, জুলাই ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম ভারত সফর কাল থেকে। আমেরিকার ভারতনীতি কী হবে – তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তখন থেকেই ‘আমেরিকার বন্ধু’ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব ও নীতির বিচারে তিনি প্রভাবশালী এক বিরাট ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশও সফর করেছেন কয়েক বছর আগে; অনুমান করি সেটা ভারতের বাংলাদেশ নীতি সমন্বয়ের কাজে। সে সময়ে চ্যানেল আই টিভিতে জিল্লুর রহমানের টকশো অনুষ্ঠানের শ্লটে। কিন্তু রাজামোহন সেখানে এসেছিলেন একক বক্তা, বলা যায় সেটা ছিল ডায়ালগের বদলে এক মনোলগ অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য, তিনি আমেরিকার এশিয়া নীতিতে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ (বা চীন ঠেকাও) – এর প্রবক্তা। যার বাংলা কথাটা হল, এশিয়ার সবাই আমেরিকার পাশে থেকে চীন কোপাক, চীন ঠেকানোর কাজে লাগুক। আমেরিকার এই স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেক। যেটাতে রাজামোহন যেন একজন ন্যাশনালিস্ট ভারতীয়ের বক্তব্য দিচ্ছেন এমন মনে করানোর চেষ্টা থাকে। যদিও আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজের কাঁধে তুলে নিলে অথবা না নিলে সেটা ভারতের স্বার্থের পক্ষে যাবেই ব্যাপারটা এমন নয়। তবু এতদিন প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সব মিডিয়া এই একই ধারায় প্রপাগাণ্ডা করে গেছে। উইকিপিডিয়া পরিচিতি হিসেবে রাজামোহনের সম্পর্কে লিখা হয়েছে, তাঁর বিদেশনীতি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মোটা দাগে লিবারেল ও বাস্তববাদী, তবে তিনি আমেরিকার মতো গ্লোবাল প্লেয়ারদের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার” পক্ষে কথা বলে থাকেন।

আগেই বলেছে ট্রাম্প আমলে এসে, ভারতের এহেন থিংকট্যাংকদের দিনকাল ইদানীং খুবই খারাপ যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার নীতি ভারতের থিংকট্যাংকারদের তাদের কাজ তৎপরতাসহ সব এলোমেলো করে ডুবিয়ে দিয়েছে। মূল কারণ তারা অবিরত ভারতে আমেরিকার হয়ে জনমত তৈরি ও প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করে ভারতের আমেরিকাতে রপ্তানি ততপরতায় হাহাকার তুলে ফেলেছে।  আমেরিকায় ভর্তুকির ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা বা বাড়তি ট্যারিফ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প এদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ফেরি করার দিন শেষ। এসবের আর মূল্য নেই। অথবা আমেরিকা প্রভাবিত থিংকট্যাংকগুলোর করা ভারতের মিডিয়া-প্রোপাগান্ডা সব মিথ্যা হয়ে যাওয়ার চেয়েও সেগুলো বাস্তবতা হারিয়ে অচল অসার বক্তব্য হয়ে গেছে। আর ওই দিকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মোদির সরকার লজ্জার মাথা খেয়ে যেসব তৎপরতায় নেমেছে সেটাকে যদি চীনকে খুশি করার উদ্যোগ বলা এড়াতেও চাই তো বলতে হবে ‘চীন অখুশি হবে’ এমন সব কাজ পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চোটটা গিয়ে পড়েছে তিব্বতের দালাইলামার ওপরে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ ঘটনা হল, মোদি ও শি জিনপিংয়ের দুই দিনের একান্ত ইনফরমাল সামিট। (বিস্তারিত এখানে)

রাজামোহন গত ১ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তার নিয়মিত কলামে মোদি ও শি জিনপিংয়ের একান্ত ইনফরমাল সামিটকে নিজের লেখার প্রসঙ্গ করেছেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংকারদের করুণ অবস্থা স্বীকার করতে এখনো রাজি হননি। বরং রাজামোহন লিখছেন, গত সপ্তাহে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চীনের য়ুহান (Wuhan) শহরে একান্ত ইনফরমাল সামিট হয়েছে, সেটা ভারতের চীনা নীতিকে রিসেট (reset) বা “ফিরসে শুরু” করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা আসলে বরং চীন, যে এশিয়ার তার ‘প্রতিবেশী নীতি’ বদলিয়েছে। আর দিল্লি তাতে কেবল চিন্তাই করা যায় না এমন পাওয়া সুবিধা পেতে সাড়া দিয়েছে মাত্র। ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, চীনই তার আঞ্চলিক নীতি ‘ফির সে শুরু’ করে সাজিয়েছে কারণ সে ট্রাম্পের উজানে বাওয়া দেখে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনকে এমনটা করতে হয়েছে। [Last week’s informal summit in Wuhan between Prime Minister Narendra Modi and President Xi Jinping was widely billed as India’s ‘reset’ of its China policy. A close look suggests it was Beijing that was really recasting its policy towards its Asian neighbours. Delhi was merely responding to an unexpected opportunity. A closer examination, however, suggests China’s reset of its regional policy was itself a response to the American upheaval under President Donald Trump.]

ইন্টেলকট বা একাদেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ যাদের করতে হয় তাদের বক্তব্যের ধার বা পয়েন্ট যখন এমন হাল্কা তর্কে নামা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝা যাচ্ছে, রাজামোহনের অবস্থা আসলে খুবই মরিয়া দশায়। পরের প্যারায় তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে আরও লিখছেন, “গ্লোবাল ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকা-চীন এই দুইয়ের মধ্যে চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে যে ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়ে গেছিল মাত্র ১৬ মাসে তা একা হাতে ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ করে উল্টে দিতে পেরেছে।’ ট্রাম্প কেবল তার নিজের বিশেষ আজব ঢংয়ে বলে দিতে পেরেছে, ‘না, এত তাড়াতাড়ি সেটা ঘটবে না”। [“In a short span of 16 months, Trump has single-handedly challenged widespread perception that the balance of power between America and China was tilting in favour of the latter. Trump, in his own peculiar way, has said, ‘not so fast’”.

এই লেখা আসলে ডেসপারেট এক ট্রাম্পভক্তের; রাজামোহন সম্পর্কে এ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। যেন এ’এক আমেরিকা প্রেমে মজে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যেন দুই শিশু তুমুল তর্ক করছে যে, “কার বাবা বেশি বড়লোক”। কম করে বললে এমন তর্ক অশোভন, অন্তত একাডেমিক পর্যায়ের লোকদের তর্ক এটা নয়।

এটা আমেরিকা অথবা চায়নাকে ভাল বলে তাদের কারও পক্ষে ওকালতির ইস্যু না। ট্রাম্পের আমেরিকা ভাল না চায়না ভাল – এই স্টাইলে তর্ক  বলাই বাহুল্য খুবই নিম্নমানের। বরং একাডেমিকদের তর্ক হতে পারে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের নীতি ছেড়ে চলে যেতে পরোয়া করছে না কেন?  দুনিয়ায় গত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো আমেরিকার যে গ্লোবাল ভূমিকা ও এক এম্পায়ার (empire) ভূমিকা এবং দুনিয়ার নেতার ভূমিকা – সেসব ঢিলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা আমরা মানলেও ট্রাম্পের আমেরিকা তা যেচে ত্যাগ করতে আর পরোয়া করছে না, কেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে আকার পেয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ – এখন সেই গর্বও ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। কেন? একই সময়ে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপের সাথে আমেরিকার প্রধান সহযোগী হিসাবে সম্পর্ক, সত্তর বছর পরে এসে আমেরিকা অবলীলায় এই প্রথম বেপরোয়াভাবে এই সম্পর্ককে ত্যাগ করছে। ন্যাটোসহ ইউরোপের সাথে মিলে যা কিছু যৌথ প্রতিষ্ঠান এতদিন  ধরে গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকা এখন সব ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। অথচ এগুলোই তো আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের মৌলিক ভূমিকা পালনের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমেরিকাকে সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এগুলোকেই ট্রাম্প স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চাইছে, ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাহলে “চীনের বদলে আমেরিকার হাতেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থাকছে, এত তাড়াতাড়ি তা যাচ্ছে না” – রাজামোহনের এই কথা বলে ট্রাম্পকে বিরাট ত্রাতা বলে তোষামোদীর কারণ কী?  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প নিজেই তার কোনো উপদেষ্টার কোনো কথা রাখছেন না বা অবস্থান কমিটমেন্ট যেখানে যা কিছু বলে আসছেন ট্রাম্প তা রক্ষা করছেন না, মানছেন না। তিনি মূলত পরিচালিত হয়ে চলছেন অসংখ্য লবিস্ট (ব্যবসায়ী) তাকে যখন যেভাবে বলাচ্ছেন বেশির ভাগ সময় তিনি তাদের খপ্পরে। ট্রাম্পের প্রশাসনের এসব অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ট্রাম্পের আমলেই রেকর্ড পরিমাণ কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা বা প্রশাসনিক কর্তার বরখাস্ত হওয়া বা পদত্যাগ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এথেকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়!

আর সবচেয়ে বড় কথা ট্রাম্পের প্রশংসা করে রাজামোহনের দাবি যদি সঠিকও হয় তাতে রাজামোহনের ভারতের কী লাভ এতে? মোদির সরকার প্রশাসন থেকে কী আমরা ইতোমধ্যেই জানি নাই যে, খোদ ট্রাম্প বা আমেরিকার কাছ থেকে বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের আর কিছুই পাওয়া নেই? এটা মোদির সরকার প্রশাসন প্রকাশ করেননি! ভারত আমেরিকায় তার রফতানি বাজারটাই হারিয়েছে, এটাই চরম বাস্তবতা। তাহলে রাজামোহন কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? কার খুশিতে খুশি হচ্ছেন? কোন আমেরিকা? এই আমেরিকা কী কেবল শুধু ভারতের নয়, দুনিয়ার কারো জন্যই কেউ নয়, তাই নয়? তাহলে রাজামোহন কার স্বার্থের প্রতিনিধি? বটম অব দা হার্ড ফ্যাক্টস হল, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থের উপরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে টপ প্রায়রিটিতে এনেছেন। আর আগের আমেরিকার “চীন ঠেকানো” – এটাকে রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে দেখে ও প্রাধান্যে রাখাতে ভারতের পণ্য তা প্রতিযোগিতায় না পারলেও ভর্তুকিতে রপ্তানিযোগ্য করে তা আমেরিকায় রপ্তানি করতে দিয়েছিল। এই সত্যকে আড়াল করে ট্রাম্পকে রাজামোহন হিরো বানায় কী করে, এটা সত্যিই বিস্ময়! ্ট্রাম্প কার চোখে হিরো? কার জন্য হিরো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরা পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল ও থেকেছিল। আর আমেরিকা ছিল তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাদাতা। ছিল বলছি কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণ  নীতির কারণে এর দিন শেষ। অথচ এসব ইঙ্গিত যেমন, চলতি দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মোচড় মনে হচ্ছে রাজামোহন দেখেও না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে মূল ইঙ্গিতটা হল, পুর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করছে আমেরিকাকে সবসময় নিজ ভাবনার সাথে মিলিয়ে এক গণ্ডিতে সাথে রেখে চিন্তাভাবনা করার দিন ফুরিয়েছে। ভারতের এ্ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (O.P. Jindal Global University, in Sonipat, India) দুই প্রফেসর জাপানের নতুন ভাবনার পক্ষে বিভিন্ন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। যেমন দেখুন, Trump Is Driving Xi Into Modi’s Arms

সেসব রচনার সার কথা হল, সাম্প্রতিককালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের পর থেকে বহু কিছু বদলে গেছে। জাপান এমনকি চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার সুযোগ কী তার জন্য আছে তা এক্সপ্লোর করতে শুরু করেছে। এমন একটা আর্টিকেলে লেখা হয়েছে, ভারতের জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার। [A lesson for India in Japan’s approach to China’s belt and road initiative] অপরদিকে দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ সামিট সম্প্রতি আমরা দেখেছি – যদিও এমন সামিট এর আগেও মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবার নেতাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বিশেষ ধরনের আলাদা। যেন দুই কোরিয়া একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তারা এবার খুজে পেয়ে গেছে। প্রথম যেদিনে সীমান্তে দুই প্রেসিডেন্টের পরস্পর দেখা হয়, তখন থেকে। বিশেষ করে উত্তরের প্রেসিডেন্টের আন্তরিকতা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছেও কাম্য অবশ্যই, তবে অদৃশ্যপূর্ব ঠেকেছে। এর পেছনের মূল কথাটা কী? সেটি হল, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে, পরস্পরের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি। তাই এটা এখনই বলে দেয়া যায় আগামী ইতিহাসে যখন খুঁজে দেখা হবে যে, কবে থেকে গ্লোবাল ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আমেরিকা থেকে চীনের হাতে চলে এসেছিল? এক বাক্যে সেই ইতিহাস বলবে চীনের মধ্যস্থতায় দুই কোরিয়ার পরস্পরকে বিশ্বাসের সাথে পরস্পরের কাছে আসার শুরু থেকে। আর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বন্ধু জাপান যখন আমেরিকা ছেড়ে চীনের ভেতরে বন্ধুত্ব খুঁজতে রওনা হয়েছিল আর চীন এর উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিল, তখন থেকে।

আসলে এসবের মূল কথাটা হল, যে আমেরিকা কেবল নিজের জন্য আমেরিকা – এটা কোন এম্পায়ার আমেরিকা নয়। বরং নিজেই নিজেকে দুনিয়ার নেতা – এম্পায়ার – এই অবস্থান থেকে নিজেই নিজেকে খারিজ করে দেয়া। এভাবে কোনো রাষ্ট্র যখন চরম রক্ষণশীল অবস্থান নেয় তখন কেউই আর সেই আমেরিকার কেউ থাকে না। এ যুগে এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান বলে নিজের কোনো অবস্থানের বাস্তবতা সম্ভব বলে মনে করা হলে এর সোজা অর্থ হল – সেই রাষ্ট্র আর তখন ইউরোপ, জাপান বা কোরিয়ার জন্য কেউই নয় হয়ে যায়। কেবল তখনও ট্রাম্পের আমেরিকার একমাত্র ভক্ত-বন্ধু থাকে সি রাজামোহন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের থিংকট্যাংক এখনো ট্রাম্পভক্ত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

গৌতম দাস
১২ এপ্রিল ২০১৮,  বৃহস্পতিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rh

 

ভারতকে নেপালে পানিবিদ্যুতের ড্যাম নির্মাণ প্রকল্পের কাজ না দিয়ে তা চীনকে দিলে ভারত ওই উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজেও কিনবে না আর নেপালের বাইরে কাউকে বিক্রি করতেও দেবে না। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি গত সপ্তাহে (৬-৮ এপ্রিল) দু’দিনের ভারত সফর করে গেলেন।

গত ডিসেম্বর ২০১৭ সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পরে গত মাসের ১১ মার্চ নেপালের প্রথম নির্বাচিত সংসদে ৮৮ শতাংশ আস্থা ভোট পাওয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি। তার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট (UML) এবং অপর কমিউনিস্ট মাওবাদী দলের সাথে মিলে জোট করে নির্বাচনে লড়েছিল তাঁরা এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতেছিল। আর নির্বাচন সম্পন্ন হবাব পর ফলাফলে দেখা যায় বড় দুই মাধেসি আঞ্চলিক দলই কেবল মূলত মাধেসি অঞ্চলের আসনগুলো লাভ করে। ফলে  এদেরকেও  ঐ কমিউনিষ্ট জোটে সাথে নেওয়াতে সংসদের মোট ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী কে পি অলির দল সরকার গঠন করেছিল গত মাসে। আর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে এক যৌথ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে দুই কমিউনিস্ট পার্টি, তারা এবার এক পার্টি হওয়ার পথে আগাচ্ছে।

ভারতের বাধা উপেক্ষা করে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের মাধ্যমে নেপালে নতুন সংবিধানের কার্যকারিতা শুরু হয়েছিল। পরে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নেপালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সাল থেকেই নেপালে ভারতের প্রভাব খর্ব হওয়ার মতো একের পর এক আনুষ্ঠানিক পরাজয় শুরু হয়েছে। যার সর্বশেষ বড় পরাজয় ছিল সাধারণ নির্বাচনে দুই কমিউনিস্ট জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ, দুই পার্টি আবার এই এপ্রিল মাসেই এক পার্টি হতে যাচ্ছে। আর এই জোটবদ্ধতা বেড়ে ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকারে পরিণত হওয়া। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই পরিবর্তন আসলে ভারতের বিদেশনীতির পরোক্ষ অবদান। ভোটের হিসাবেও বলা যায়, ৮৮ শতাংশ আসন বা ভোটার সমর্থকেরা এখন ভারতবিরোধী। ভারতের বিদেশনীতি বা নেপালনীতির এমনই নেতিগুণ।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০১৭-এর সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত এই সময়কালের মধ্যে সারা নেপালে ভারতবিরোধিতা সবচেয়ে চরমে উঠেছিল। আর এই সময়কালে ভারতের সর্বশেষ আর একমাত্র আশ্রয় হয়েছিল মাধেসি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো। অথচ গত মাসে ওলির সরকার গঠনের সময় থেকে মাধেসি অঞ্চলের প্রায় সব আসন পাওয়া আঞ্চলিক দুই দলও অলির জোটকে সমর্থন করে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে। ফলে ভারতের সমর্থক নেপালের রাজনৈতিক দল বলতে এখন রয়ে গেছে নেপালি কংগ্রেস। ভারতের সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জ্যোতি মালহোত্রা কেবল এই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে লেখা তার নিয়মিত রিপোর্টে ভারত সরকার তার ভুল স্বীকার ও সংশোধন করছে বলে জানিয়েছেন। এপ্রিলের চার তারিখে “Winning the neighbourhood শিরোনামে তিনি লিখেছেন,

As India stoops to conquer Nepal by laying out the red carpet for the visit of prime minister Khadga Prasad Oli later this week, it is indicating a new self-awareness that its foreign policy missteps have allowed China to gain ground in the neighbourhood, and demonstrating its willingness to sweat behind the scenes to make up for lost time.

জ্যোতি মালহোত্রার ভাষায় ভারত ‘stoops to conquer Nepal’ মানে নেপালের মন জয়ের জন্য নিজেকে বাকা বা নমনীয় করেছে। এটা নাকি ভারতের “foreign policy missteps” বিদেশনীতির ভুল পদক্ষেপ সম্পর্কে আত্মসচেতন বা নিজে নিজের ভুল সংশোধনের নজির।

ভারত এক ভিন্ন রাষ্ট্র হয়েও নেপাল রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত কনষ্টিটিউশনে তার অনধিকারে অযাচিত আপত্তি জানিয়েছিল। আর কারণ হিসাবে বলেছিল, নেপালের সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ এতে ক্ষুন্ন হয়েছে। এরই আপত্তি করছে ভারত। অর্থাত ভারতই যেন নেপালের ঐ অঞ্চলের অযাচিত ও স্বঘোষিত জনপ্রতিনিধি।

নেপালে কমিউনিস্ট জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচনে জয়ী হবার পরে ভারত সরকার তার বিগত দুবছরের নেপাল নীতি পদক্ষেপের ভুল স্বীকার করে নতুন পথে হাটতে গত ১ ফেব্রুয়ারি নেপাল সফরে আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।  তাই জ্যোতি মালহোত্রা লিখছেন, in Kathmandu, she told Oli that Delhi is ready to deal with Nepal as an important neighbour, irrespective of how it wants to discriminate against the people of the Terai. মানে সুষমা বলেছেন তারা আর তরাই অঞ্চল নিয়ে মাথা গলাবে না তাতে নেপাল তরাই অঞ্চলের সাথে বৈষম্যমূলক রাখুক কিংবা না।

আসলে ভারতের এমন উপলব্দি স্বীকার খাওয়াটাই বাহুল্য। কারণ সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের যতগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে তারা দুই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই হোক কিংবা আঞ্চলিক বড় দুই মাধেসি দলের – এরা সকলেই এখন ওলির সরকারের সমর্থনে দাঁড়িয়ে আছে। অলির সরকারের পার্টনার। এটা যেন দুধ আর আম এক হয়ে যাওয়া আর (ভারতের) আমের আঠি হয়ে দূরে হেলায় গড়াগড়ি যাওয়া!  ফলে সুষমা স্বরাজ একথা না বলে আর কী করবেন!

নেপালের বিগত সরকারের পাঁচ বছর কেটেছিল নানান কোয়ালিশন সরকারে। সে সময়ের নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত আসন এমন ছিল যে, প্রতি দু’টি মিলে কোয়ালিশন করলেই সংখ্যার দিক থেকে তা সরকার গঠন করার জন্য যথেষ্ট হত, আর এভাবেই কমপক্ষে চারবার কোয়ালিশন সরকার  (ভেঙ্গে ও গড়ে) গড়ে নেপালের রাজনীতি কেটেছিল। এরই সর্বশেষ ঘটনা ছিল, প্রত্যেকে ১১ মাস করে গঠিত দুই সরকার যার প্রথমটা ছিল মাওবাদী পুষ্পকমল দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার আর শেষেরটা নেপালি কংগ্রেসের দুবের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার।

নেপালের রাজনীতিতে দুই কমিউনিস্ট দলের প্রধান দাহাল ও অলির মধ্যে তুলনা করলে দাহালের ভূমিকা হল, দেশের দলগুলোর যেকোনো বিভক্ত মতামত (দলের ভেতরে বা বাইরে) ও উদ্যোগ নাই পরিস্থিতিতে তিনিই হাজির হন কাণ্ডারি হিসেবে। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা মতামত বা কমন অবস্থানে সবাইকে (সব বিবদমান দল বা পক্ষকে) নিয়ে এসে এবার সঙ্কট কাটিয়ে করে এগিয়ে যাওয়ার পথ রচনা করেন। এভাবে প্রতিবার নানান রাজনৈতিক বাধা কাটিয়ে নেপালকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে কাজ করে যাওয়া নেপালের রাজনীতিতে অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব হলেন দাহাল। বিপরীতে খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি, তিনি ভিন্ন নরম কমিউনিস্ট পার্টির। গত ২০১৩ সালের দ্বিতীয় কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচনের সময় থেকে তিনি মূলত ক্রমেই ভারতবিরোধী অবস্থান নেয়া শুরু করেন। যদিও তার দল ও দলের রাজনীতি কখনই কোনো রেডিক্যাল কমিউনিস্ট অবস্থানের দল নয়; বরং গত নব্বইয়ের দশকে নেপাল-ভারতের যৌথ নদী, মহাকালি নদীর পানিবণ্টনের ঝগড়া মীমাংসার ক্ষেত্রে মন্ত্রী হিসাবে অলি নিজ দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভারতপন্থী অবস্থান নিয়েছিলেন সে ইতিহাস আছে।

সেই অলি গত সেপ্টেম্বরে ২০১৫ সালে কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের পরে কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে চরম ভারতবিরোধী অবস্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষত ওই সময়টা যখন টানা প্রায় পাঁচ মাস নেপালে সব পণ্য আমদানিতে ভারত অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল। ফলে সারা নেপাল গরিব-ধনী নির্বিশেষে ভারতবিরোধী হয়ে উঠেছিল আর সবচেয়ে কষ্টকর দুর্বিষহ জীবন হয়ে উঠেছিল গরিব ও নারীদের। কারণ রান্নার গ্যাস বা যানবাহন চলাচলের জ্বালানির সরবরাহও বন্ধ করে রেখেছিল ভারতের ওই পণ্য অবরোধ। তাই বলা চলে অবরোধের কারণে নেপালের জনগণের মধ্যে যে চরম ভারত বিরোধিতার সেন্টিমেন্ট উঠেছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলি পরিপূর্ণভাবে এর সাথে ছিলেন এবং ঐ আবেগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই সময় থেকে তার ভারতবিরোধী অবস্থান তিনি এখনো স্থায়ী করে রেখেছেন। আর তার সাথে দাহালকে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি যেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার প্রবক্তা হওয়ার কাজ অলিকেই একছত্রভাবে দিয়ে দিয়েছেন। আর নিজে ভারতের তৈরি মাধেসি ইস্যুর জট কাটানো, অনিশ্চিত হয়ে থাকা কনস্টিটিউশন সংশোধনীর কাজ শেষ করা, প্রদেশে ভাগ করে সীমানা টানার অসমাপ্ত কাজ ঐকমত্য গড়ে সমাপ্ত করা, বিগত ২০ বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়নি, তা অনুষ্ঠিত করা এবং থিতু এক কনস্টিটিউশনে পৌঁছানো এবং সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার পথ খুলে দেয়া ইত্যাদি জটিল সব কাজ সমাপ্ত করার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এ যেন অলি আর দাহালের মধ্যে একধরনের শ্রমবিভাজন, যা তাদের পরস্পরের পরিপূরক।

দাহাল যেন জানতেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার মূল প্রবক্তা তিনিও হতে পারতেন, কিন্তু তাতে ভারতের বিষিয়ে তোলা মাধেসি জনমতের সাথে একটা নিগোশিয়েশন ও ঐকমত্য তৈরিসহ একটা সমঝোতায় পৌঁছানো, আর এই উদ্যোগের নেতা হয়ে কাজ শেষ করা তার জন্য কঠিন হত।

যেকথা বলছিলাম মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস – এই দুই দলের চুক্তিতে  সর্বশেষ ১১ মাসের করে কোয়ালিশন সরকার গঠনের করে ক্ষমতায় থাকার কথা। পুষ্পকমল দাহাল তার প্রথম ১১ মাসের প্রধানমন্ত্রীর আমলে নেপালের বুধি-গান্ডাকি (Budhi Gandaki) নদীতে আড়াই বিলিয়ন ডলারের ‘বুধি-গান্ডাকি ড্যাম ও পানিবিদ্যুৎ (১২০০ মেগাওয়াট) নির্মাণ প্রকল্পের’ (Budhi Gandaki project) চুক্তি করেছিলেন চীনের এক কোম্পানীর সাথে। কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে চলে যায়। মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস এই দুই দলের চুক্তি অনুযায়ী শেষের ১১ মাসের সরকার গঠন করে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি শের বাহাদুর দুবের সরকার (২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল)। ক্ষমতায় এসে তিনি প্রথম ভারত-তোষণে অবস্থান নেয়া শুরু করেন। ভারতীয় প্ররোচনায় দুবে চীনের সাথে করা ওই পানিবিদ্যুত প্রকল্প চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা দেন। আর ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট ছড়িয়েছিল যে, (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১৫ নভেম্বর ২০১৭) ওই প্রকল্প ভারতের সরকারি করপোরেশনকে (NHPC) দেয়া হচ্ছে। শিরোনামেই লিখেছিল , “Nepal scraps hydro project with Chinese company; Indian company to get it?”।

এটা ছিল নির্বাচনের এক মাস আগের ঘটনা। নির্বাচনের পরে অলির দলের কমিউনিস্ট জোট ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে আর অলির দলই সবচেয়ে বেশি আসন পেলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, এটা নিশ্চিত হয়ে যায়। এশিয়ার প্রভাবশালী দুই দৈনিকের একটা হংকংয়ের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট পত্রিকায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক সাক্ষাৎকার দেন হবু প্রধানমন্ত্রী অলি। সেখানে তিনি ওই বিদ্যুৎ প্রকল্প আবার চালু করার কথা বলেন।  তিনি ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে,  “Political prejudice or pressure from rival companies may have been instrumental in scrapping of the project. But for us, hydropower is a main focus and come what may, we will revive the Budhi Gandaki project,” । অর্থাৎ তিনি বলছেন, “ওই প্রকল্পের কাজ পেতে বিবদমান প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির সাথে  আসা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও চাপের কারণে প্রকল্প বাতিল হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে বিদ্যুৎ পাওয়াই মূল বিষয়। তাই আমরা প্রকল্প আবার চালু করব”।

এছাড়া অলি ভারতের জন্য অস্বস্তিকর ও ধরা পড়ে যাবার মত ইস্যু কিন্তু নেপালের জন্য যা খুবই জেনুইন কিছু স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি  ‘১৯৫০ সালের নেপাল-ভারত শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি’ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে কথাটা এভাবে বলেন যে তিনি ঐ চুক্তির ‘আপডেট’ করা ও ‘সমকালীন উপযোগী’ করতে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনের কথাও তুলেছিলেন ওই সাক্ষাৎকারে। এ ছাড়া নেপালের গোর্খা সৈনিকেরা এক চুক্তি অনুসারে ভারতীয় সেনা ও প্যারামিলিটারি বাহিনীতে নিযুক্ত হয়ে আছে। ওই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাদের দেশের নিজবাহিনীতে ফিরিয়ে নেয়াসহ ভারতের জন্য অস্বস্তিকর বহু ইস্যু নিয়ে খোলামেলা কথা তুলেছিলেন। যদিও নির্বাচনে কমিউনিস্টদের ব্যাপক বিজয় ও ফলাফলে অলি সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকেই হাওয়া বদলে যায়। স্পষ্টত ভারতের নেপালনীতি হেরে যাওয়ায় নতুন সংশোধিত নীতি হিসেবে মোদি সরকার সুর নরম করে ফেলেন। তিনি দুইবার অলিকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করেছিলেন আর অলিকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একই সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে গত ফেব্রুয়ারিতে পালে পাঠিয়েছিলেন। আর অলির সফর ছিল ৬-৮ এপ্রিল।

কিন্তু ভারতের মনের যত খারাপ দিক ও কলোনিয়াল বাসনা ফুটে উঠতে শুরু করে ওলির সফরের দিন ৬ তারিখ থেকে। ঐদিন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় আবার এক বেনামি সরকারি মন্তব্য ও মনোভাব ছাপা হয়। যার শিরোনাম হল, “যদি চীন তোমার ড্যাম নির্মাণ করে দেয় তাহলে ইন্ডিয়া তোমার বিদ্যুৎ কিনবে না : মোদি অলিকে বলবেন।’ [If China builds your dams, India won’t buy energy: PM Narendra Modi to tell KP Oli।]। বেনামী “সিনিয়র সরকারি অফিসিয়ালের” বরাতে এই খবর ভারত সরকার ছেড়ে দেয়।  ভারত সকারের এই বিরক্তিকর বীরত্বের রিপোর্টে একটা অসত্য বা ‘সত্য লুকানোর’ ঘটনা আছে। যদিও আপতিকভাবে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, প্রকল্প নির্মাণ চীন করলে ওতে উতপাদিত বিদ্যুৎ ভারতকে কেনার বাধ্যবাধকতার কথা আসবে কেন, ফলে কোন কিছুরই দায় বর্তায় না। এই কথাই সঠিক।  ফলে ভারত খুবই ন্যায্য কথা বলেছে বলে মনে হয়। কিন্তু সরি, ব্যাপারটা তা না। ব্যাপারটা বুঝতে তাই, বরং প্রশ্ন করা যাক উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারতের কেনা বা না কেনার প্রশ্ন উঠছে কেন?

ভোক্তা হিসাবে নেপালকে বিচার করলে, ১২০০ মেগাওয়াট উতপাদিত বিদ্যুৎ দেশটির ছোট অর্থনীতির বিচারে বেশি বা বাড়তি। ফলে এর কিছু অংশ বিক্রি করতেই হবে। কিন্তু স্বাধীনভাবে নেপাল এই বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে কি?  এটাই মুখ্য প্রশ্ন। যেমন-  এই বিদ্যুৎ   বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করলেই তো হয়, বিশেষত পানিবিদ্যুৎ বলে এটা জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের উতপাদন খরচ তুলনায় অনেক সস্তা পড়বে। বাংলাদেশের হিসাবে ২৫-৩৫ পয়সা ইউনিট। না, নেপাল তা বিক্রি করতে পারবে না। এখানেই ভারতের লুকানো গোপন করা সত্য আছে। নেপাল-ভারত তথাকথিত শান্তি বন্ধুত্ব চুক্তি অনুযায়ী, নেপালে উৎপাদিত কোনো পণ্য তা ভারতীয় বা নেপালি কোম্পানি যারই উতপাদিত হোক, তা নেপালের বাইরে বিক্রির কোম্পানি হতে হবে ভারতীয় মালিকের। আর উতপাদন অথবা  বিক্রির কোম্পানি নেপালি কোম্পানি হলে সেটা প্রতিটি কেসের বেলায় ভারত সরকারের কাছে আগাম অনুমতি নিতে হবে। সেই অনুমতি পাওয়া সাপেক্ষেই কেবল বিক্রি করতে পারে। আসলে এই অনুমতি পাওয়া যাবে না। মূলকথা নেপালের পণ্য তৃতীয় দেশে বিক্রি করতে গেলে কেবল ভারতীয় ব্যবসায়ীরাই তা করতে পারবেন। এই হল সেই কলোনি সম্পর্কে দাবড়ে রাখা চুক্তি। ফলে নেপালকে কেবল ভারতীয়দের কাছেই বিক্রি করতে হবে বা এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। আর এ কারণেই এখানে “ভারতের কেনার” প্রসঙ্গ আসছে। এতে একেবারে মূলকথা দাঁড়াচ্ছে, ভারতের সরকার বা ব্যবসায়ীর ইচ্ছাতেই কেবল নেপালে কোনো পণ্য উৎপাদন করা যাবে। এই দাসখত কলোনি চুক্তি দিয়ে ভারত নেপালকে বেঁধে রাখতে চায়। বামন অবিকশিত নেপাল করে রাখতে চায়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে নাম পরিচয় ছুপানো সরকারি কর্তা নেপালের জন্য এক লাল দাগের লক্ষণ রেখা টেনে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ঐলাইন ক্রশ করলে নেপালের উপর তারা ঝাপায় পড়বেন। […….will be couched in the niceties of diplomatic prose, but there will be no denying “India’s red lines,” a senior government official told The Indian Express.] এর মানে হল এখনও ভারতের আক্কেল হয় নাই।

তাই ভারতের নীতি ও পদক্ষেপের ধরণ ও  অভিমুখ বিচার করে বলা যায়, এশিয়ার বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক আরো বড় সঙ্ঘাতময় হয়ে উঠার সম্ভাবনা সামনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমনকি বাংলাদেশে যদি হাসিনা সরকারের মতো সরকার থাকে তাহলেও। এই সঙ্ঘাতের মূল কারণ হবে, ভারতের কলোনি বৈশিষ্ঠের বিদেশনীতি অথবা বলা যায় এই একুশ শতকে এসেও কলোনিয়াল মনোভাবে গড়ে ওঠা বিদেশনীতির কারণে।  ভারত অকর্মন্য ও উত্থানরহিত অথচ সে ভাবে তার অর্থনীতির এই খামতি যেন বা কলোনি স্টাইলের নীতি দিয়ে উতরানো যাবে। তবে আর এক দিক থেকে বলা যায় এর মৌলিক বৈশিষ্ট হল, এক শব্দে ‘হামবড়া’। যার অর্থ হল আক্ষরিক অর্থে আমি বড় বা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এতটুকুই না; এর আরো অর্থ হল, বিশেষত যখন কেউ নিজে বড় বা বিশেষ কেউ না হওয়া সত্ত্বেও মিছাই নিজেকে ওভার-এস্টিমেট করে বড় বা ক্ষমতাবান মনে করে।

সক্ষমতা অর্থে ক্ষমতাকে যদি দু’টি প্রকরণে ভাগ করে বলি, তবে এর একটা হল অবজেকটিভ। মানে বৈষয়িক বা ফিজিক্যাল দিক থেকে যা বাস্তব। আর অপরটি হলো সাবজেকটিভ, মানে কর্তাসাপেক্ষ। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের এক বিশাল অবজেকটিভ সক্ষমতা। সাধারণভাবে বললে এটি আসলে একটি বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা যেখানে লাগাবে যেভাবে লাগাবে এর ওপর নির্ধারিত হবে আগামী দিনের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে। যদি যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করে বা বাধ্য হয়, তাহলে তা এক রকম হবে। যদি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ হিসাবে ব্যবহার করে, যার আবার দু’টি ধরণ হয়; স্বল্পসুদের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ আর সরাসরি (এফডিআই) বাণিজ্যিক বিনিয়োগ – এ দুইয়ের এক ভারসাম্য অনুপাত বিনিয়োগ হয় তবে আরেক রকম হবে। এটা অবজেকটিভ ক্ষমতা।

একুশ শতকের এখনকার দুনিয়ায় সবচেয়ে নির্ধারক শক্তি চীনের এই সক্ষমতা আছে। অপর দিকে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেটা সাবজেকটিভ, এরা ওই অবজেকটিভ ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চাইলে বা না চাইলেও চীনের এই সক্ষমতা থেকে যাবে। কিন্তু আরেকটা পরিস্থিতিও কল্পনা করা যাক। ধরা যাক চীনের অবজেকটিভ পটেনশিয়াল বা সক্ষমতা নেই বা থাকলেও তবে সেটা তেমন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের আকাঙ্খা প্রবল এবং খুবই ভালো স্বপ্ন ও পরিকল্পনাও আছে – তাহলে কী হবে? সেটাই হলো ওই ‘হামবড়া’ পরিস্থিতি। আর এ অবস্থাই হলো ভারতের। সক্ষমতা নাই কিন্তু স্বপ্ন আছে। ভারতের এই ‘হামবড়া’ বৈশিষ্ট্যের বিদেশনীতি এশিয়ার ভারতসহ আমাদের সবার জন্য বিরাট দুঃখের কারণ।

যেমন চীনকে দেয়া আড়াই বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের মতই বহু আগে ভারতকে কার্যাদেশ দিয়ে দেয়া এমনই এক প্রকল্প আছে, যা গত দুবছর ধরে পড়ে আছে, কোন কাজও শুরু হয় নাই। কিন্তু দেখেন ভারতের অবস্থান হল সে পারুক আর নাই পারুক নেপাল তা ভারতকেই দিবে। এই বক্তব্য আমার নয়, নভেম্বর ২০১৭ সালে চুক্তি বাতিলের সময় খোদ সুবীর ভৌমিক ভারতের নীতির এই দশা অকর্মন্যতার কথা তুলে ভারত নিজে যতটুকু পারে তাতে মনোযোগ দিতেও পরামর্শ রেখেছিল।

নেপালে স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট সার্ভিস একচেটিয়া সরবরাহকারি ছিল ভারত। সম্প্রতি চীনও সেখানে বিকল্প সরবরাহকারি হিসাবে হাজির হয়ে একচেটিয়া ভেঙে দিয়েছে। ফলে এখন ভাল সার্ভিস দেওয়ার ও মুল্যের  প্রতিযোগিতা করেই ভারতকে টিকতে হবে। এধরণের বিষয়গুলোর ভারতের কলোনি মালিকের মত আচরণের পিছনের মূল কারণ। স্বভাবতই এখনই নিশ্চিত করেই বলা যায় কলোনি মালিকেরা নিপাত যাবে, হেরে যাবে।

তাহলে নেপাল এখন কোন দিকে যাবে? বলা বাহুল্য, ভারতই নেপালকে এখন তথাকথিত ১৯৫০ সালের চুক্তি ভাঙার পথে ঠেকে দিচ্ছে ও যাবে। মনে রাখতে হবে, ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকার এখন নেপালে। দেশটির জনগণের সামনে এই ভারতীয় নিগড়, এই চুক্তি ভাঙা, ছুড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই বাস্তবতা আরও প্রকট হবে সামনের দিনে। নেপালকে সেদিকে ঠেলে দিচ্ছে ভারত।

চীনের সক্ষমতার সাথে পেরে না উঠে ভারত কলোনি স্টাইলে নিগড়ে নেপালকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেপালের জনগণেরই বিজয় হবে। আর ভারতের ভাগ্যে জুটবে চিরদিনের ঘৃণা। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক আইন ক্রমেই নেপালের মতো রাষ্ট্রের স্বার্থের দিকে মানে ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের পক্ষে হাজির হচ্ছে। অন্য রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে অবাধ পণ্য আনা নেয়া “ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের অধিকার” হিসেবে জাতিসঙ্ঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সুবিন্যস্ত করে হাজির হচ্ছে।

ভারত একদিকে নিজেই স্বীকার করছে নেপালে নিজের ভুলনীতি ও পদক্ষেপের কারণে সেখানে চীন ঢুকে পড়েছে। অথচ নিজে সংশোধন হয়ে যাবার কথা বলে আবার সেই একই পথে হাটছে। ভারতের  নিজের অবজেকটিভ অসক্ষমতা সম্ভবত তাকে এই ভুল করতে প্ররোচিত করছে। মিথ্যা হামবড়া বোধ, যা সে নয় এমন এক কল্পিত বোধ তাকে বারবার স্বপ্নে পোলাও খেতে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এটাই এশিয়ার দুঃখ হয়ে থাকবে অনেকদিন!

ওদিকে অলির ভারত সফরে স্বাগত  জানাতে এয়ারপোর্টে মোদি নিজে না গিয়ে হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথকে পাঠিয়েছেন। সোজাসাপ্টা করে বললে এতে নেপালবাসীকে অপমান করা হয়েছে এবং এটা অপ্রয়োজনীয় ও অযাচিত সস্তা আচরণ, তাই অগ্রহণযোগ্য। রাষ্টাচারের কনভেনশনে ছোট রাষ্ট্র বা বড় রাষ্ট্র বলে কিছু নাই। আছে মূলত নাগরিক জনগণের সম্মান, যা অলংঘনী্‌ যা ওভারস্টেপ করা যায় না। এমন আচরণ নেপালও করতে পারে। যদিও এগুলো কোনো বাহাদুরি নয়। ফলে এটা কাম্য নয়। কোন রাষ্ট্রদ্বয়ের পরস্পর রাজনৈতিক স্বার্থ না মিললে কোনো সম্পর্ক হবে না, কিন্তু নেপালের জনগণকে অপমান করার অধিকার মোদীর নাই। এটা কোন প্রধানমন্ত্রীর নয়, ভাংড়ির দোকানদারের আচরণ হয়েছে। এটা মোদীর ভুলা উচিত নয়।  মোদীকে একদিন  চুকাতে হবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালে ভারতের ‘হামবড়া’ কূটনীতি  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]