ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

গৌতম দাস

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Sm

বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও তার ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতা অব্যাহত আছে তো বটেই বরং বেড়েছে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। মানে, বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বা সংশোধিত নাগরিক আইন পাস করার পরে এ নিয়ে বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি বাড়িয়েই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারা এখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধিদের “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে;  নিজ কর্মীদের নিয়ে গুলি করে মারার শ্লোগান তুলেছে। এরই মধ্যে লন্ডনের ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন এই ইস্যুতে গত সপ্তাহে এক আর্টিকেল ছেপেছে। শিরোনাম “ইকোনমিস্ট এক্সপ্লেনস, দ্যা ইরোশন অব সেকুলার ইন্ডিয়া” [The Economist explains, The erosion of secular India]
‘Explains’ – শিরোনামে উল্লেখ থাকে এমন টাইপের লেখা সাধারণত অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হয় দেখা যায়; যাতে পাঠক ওই ইস্যুর খুঁটিনাটি দিকগুলো ঐ লেখা থেকে জেনে নিতে আগ্রহী হয়। ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেলটা তেমনি ধরনের এক লেখা, যেটার শিরোনাম হল – আমরা “ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা করে বলছি, ভারতের সেকুলারিজমে ক্ষয় ধরে গিয়েছে”।
এই আর্টিকেলের লেখক দিল্লিতে বসে লিখেছেন তা নিজেই জানিয়েছেন। আর এ ধরনের লেখাকে পত্রিকার নিজের অবস্থান, অন্তত কিছু দায়দায়িত্ব নিয়ে লেখা মনে করা হয়ে থাকে।
কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হল “সেকুলার” শব্দের ব্যবহার। সারা ভারতে সেকুলার শব্দের এধরণের বিশেষ আবিষ্কার ও বিরক্তিকর ব্যবহার প্রচলিত আছে সেই ১৯৪৭ সালের আশেপাশের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। সেটা এখন ‘লন্ডন ইকোনমিস্ট’ পর্যন্ত এতে সওয়ার হয়েছে এটা দেখতে পাওয়াটা বড়ই চমকপ্রদ ও তামাশার নিঃসন্দেহে! ইকোনমিস্ট এখানে ধরে নিয়েছে যে, ভারত একটা সেকুলার রাষ্ট্র, অন্তত সেকুলার রাষ্ট্র ছিল – ইকোনমিস্ট এই সার্টিফিকেট এখানে বিতরণ করেছে। কিন্তু ‘সেকুলা’র মানে কী? আর কোনটা সেকুলার কোনটা না, তা চেনার উপায় কী?

যারা দাবি করে থাকে যে সে সেকুলার অথবা তাদের অমুক রাষ্ট্র সেকুলার তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তিনি সেকুলারিজম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কনসেপ্ট সম্পর্কে আসলে খুবই কম কিছুই জানেন। যেমন এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় যে, ওমুক রাষ্ট্র বা ভারত সেকুলার কি না! ইউরোপে কোন রাষ্ট্র সেকুলার আর কোনটা না- এমন প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। এমনকি আমেরিকা কি সেকুলার রাষ্ট্র? এই প্রশ্ন করতে দেখা যায় না কেন? এছাড়া আবার ঠিক কী প্রয়োজন মিটাতে কোন রাষ্ট্রের সেকুলার হওয়া জরুরি কেন? এর জবাব কী তারা জানেন? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন- কোনো রাষ্ট্র সেকুলার কিনা তা বুঝার উপায় কী?

ইকোনমিস্টের এই লেখায় কোথাও অবশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কী অর্থে ভারতে ‘সেকুলারিজম আছে বা ছিল’ বলা হচ্ছে। এটা বলতেই বা আসলে কী বুঝান হয়েছে? তবুও ঐ লেখায় লেখকের এক দাবি হল- “১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত ভারতে সেকুলার ভিশন বজায় ছিল এবং তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নাই” , [“It was the secular vision which prevailed and which remained pretty much unchallenged until the 1980s.”] অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, সেকুলার শব্দের পাশে একটা ‘ভিশন’ শব্দ লাগানো হয়েছে; মানে সেকুলার জিনিসটা একটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে ব্যাখ্যা করতে দেখছি। এমনিতে অবশ্য ভারতের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ভারত সেকুলার কি না’ এই গর্ব বা তর্কের মীমাংসা করার পদ্ধতিটা দেখা যায়, খুবই সহজ। ভারতে একজন মুসলমানকে প্রেসিডেন্ট বানানো হলে এটাই তাদের কাছে সেখানে প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে গৃহীত হয়ে যায় যে, ভারত সেকুলার। অথচ ইস্যুটা অমন লোক দেখানোর মোটেই নয়। রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে যারা সিরিয়াস তাদের কাছে এসব আমলযোগ্য কথা হতে পারে না।

এ ছাড়া ঐ আর্টিকেলের শুরুতে বলা হয়েছে, ভারতের যারা মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ছিল (মানে কংগ্রেসকে কল্পনা করা হয়েছে) এরা নাকি ‘সেকুলারিজমের স্বপ্ন’ ও ‘ইনক্লুসিভ রিপাবলিক’-এর স্বপ্ন দেখতেন, [Whereas the mainstream of India’s independence movement envisioned a secular, inclusive republic……]। কিন্তু সরি, লেখক মহাশয়! আপনার এই কথা বাস্তবের সাথে মিলে না। ফলে, এটা অগ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো ধারণা প্রকাশ করা আমেরিকানদের চালু করা শব্দ। এ ছাড়া কোল্ড ওয়ার যুগ শেষের আগে আমাদের এদিকে এই শব্দ দেখা যায়নি। বিশেষ করে গ্লোবালি ইসলামী রাজনীতিতে একালে তা বাধ্যতামূলক আমলযোগ্য ইস্যু হয়ে পড়ার পর এটা আমেরিকানদের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশের পরই কেবল এটা এক ভাষ্য হয়ে উঠেছে; আগে না। ইসলামী রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র বা শাসন ধারণার “খেলাফত” শব্দে আমেরিকার আপত্তি তারা এভাবেই এই শব্দ দিয়েই প্রকাশ করে থাকে যে রাষ্ট্র মাত্র তাতে বসবসকারি সকল অংশকে সাথে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করতে হবে। কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, উপেক্ষায় ফেলে রাখা সুযোগ নেয়া যাবে না।

এছাড়া মূলত কংগ্রেস কখনই “ইনক্লুসিভ রিপাবলিক” বলে কোনো ধারণা ব্যবহার করে নাই। এমনকি ১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার সময় রুটিন কাজ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা ব্যবহার করা ছাড়া আর ভারতের আর কোথাও শব্দটাই ব্যবহার করা হয়নি। আসলে রিপাবলিক শব্দটাই আমাদের এশিয়ায় এদিকে প্রয়োজনীয় ধারণা মনে করার রেওয়াজ নাই। খুব সম্ভবত আমেরিকানেরা কমিউনিস্ট ঠেকাতে চালু করা এক ভুয়া শব্দ “ডেমেক্রেসি” – এটা চালু করার কারণে গুরুত্বপুর্ণ ‘রিপাবলিক’ ধারণাটা চাপ দিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই  এই দুর্দশা।  আর সোজা হিসাবে এদিকে ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটার ব্যবহার কংগ্রেস দলের নেতা ব্যক্তিত্বরা  যদি বুঝেই থাকত ও মেনে নিত, তবে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার দিকে যেত না। অথবা বলা যায় তাঁরা যেতে দিয়েছিল কী করে? তাহলে নেহরুর “অখণ্ড ভারত” দখলের ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা,  যেটা তাঁর ষোলোআনা ছিল, তার কী হবে? আমরা তো সেটার এখনো সহজেই এর প্রমাণ পাই। মনে রাখতে হবে, অখণ্ড ভারত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সবাইকে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ ভারত রাষ্ট্র গড়া- এ দুটো কারও কারও কাছে অতি উতসাহে শুনতে কাছাকাছি মনে হবে হয়ত। কিন্তু এ দুটো- একই বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও, এরা একেবারেই ভিন্ন বিষয়। আসলে একটা হল, স্রেফ ভূখণ্ডের লোভ। আর একটা হল সবাইকে একই ও সমান নাগরিক মানুষ হিসেবে একত্রে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ও গণ্য করে গড়ে তুলতে চাওয়া।
ওদিকে আবার, গান্ধী ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন; এর প্রমাণ দেখা যায় না।  বরং আসলে তা হবার কথাই না। কারণ  গান্ধী-নেহেরুর রাষ্ট্র-চিন্তা – সেটা এক জাতিরাষ্ট্র পাবার চিন্তা। আর জাতিরাষ্ট্র চিন্তায় “খেলাফত কোন অনিবার্য প্রয়োজনীয় ধারণা নয়।  বরং, তাদের কথিত “দেশপ্রেমিক জাতি” হলেই চলে। গান্ধী বরং তাঁর খামতি চিন্তার অপুষ্টির কারণে  সারাজীবন তিনি “হিন্দু আর মুসলমান’ – এভাবে পরিচয়মূলক শব্দ আওড়ায়ে গেছেন। নন-আইডেনটিটি-মূলক সিটিজেন বা নাগরিক শব্দ কখনই ব্যবহার করতে পারেন নাই।  আসলে মূলত তিনি ‘হিন্দু-মুসলমান এক করতে হবে’ এই হাল্কা ও অর্থহীন ভাষ্য আউড়িয়ে গেছেন। একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে দুটো আলাদা ধর্ম হিন্দু-মুসলমান, এদের এক করতে হবে কেন? এর চেয়েও বড় কথা- দুটো আলাদা ধর্মকে এক করা কি আদৌ সম্ভব, না এর দরকার আছে? এদিকগুলো তিনি ভাবতে সক্ষম ছিলেন মনে হয় না।
দুনিয়াতে ‘আধুনিক রিপাবলিক’ রাষ্ট্রধারণা আসা ও এটা গড়ার চিন্তা এসেছে কবে থেকে? জবাবে সবাই মেনে থাকেন যে, এটা মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর থেকে। একটা ভুল ধারণাও এখানে আছে যা অনেকে ধারণ করে থাকতে পারে। ১৬৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত জন্ম নেয়া সব রাষ্ট্র একই ধরনের রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রধারণা, তা কিন্তু নয়। সহজে চিনবার জন্য বললে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আর পরের ধারণা আলাদা এভাবে মনে রাখলেই চলে। এই যুদ্ধ সব বদলে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে ফারাকটা কী ছিল? তা হল, ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বলতে একমাত্র তা নেশন-স্টেট বলে বুঝা হত। আর পরে সেগুলো সবই হয়েছে অধিকারভিত্তিক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্রের “কাউন্সিল অব ইউরোপ” গঠনকে যদি  লক্ষ্য করা যায়। এর জন্ম-উদ্দেশ্যই ছিল এক হিউম্যান রাইটস কনভেনশন ডাকা (নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস, ECHR)। নিজেদের রাষ্ট্র-ভিত্তি কথিত “জাতি” ধারণা থেকে বদলে হিউম্যান রাইটে রূপান্তরিত করে নেয়া যায়।  যাতে ওই কনভেনশন শেষে একমত হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা, এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোকে জাতিরাষ্ট্র থেকে হিউম্যান রাইটসভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র আকারে ভিত্তি বদলে নেয়া যায়।

অতএব যে ইউরোপের কথা আমরা শুনি জানি, যার এক নমুনা হল সেকালের কলোনি-মালিক ব্রিটিশ রাষ্ট্র; এটা আসলে সেকালে ছিল এক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট; মানে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। আর তাই যে জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে সেকালের রেনেসাঁ-চিন্তা ব্রিটিশের হাত ধরে ভারতবর্ষে এসেছিল সেই রেনেসাঁ ছিল মূলত একটা জাতিরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ও ধারণা। কমিউনিস্ট সার্টিফিকেট অনুসারে সেকালের রাজা রামমোহন রায়কে ‘ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু’ মানা হয়। সেই রামমোহনের সক্রিয়তার কাল (১৮১৫) থেকে পরিশেষে ১৯৪৭ সালের আশপাশের সময়কালের নেহরু-গান্ধীর রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি এখনো সেই রাষ্ট্রধারণাটা মূলত একটা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৪৭ সালের পর  ‘গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত’ আসলে এক নেশন-স্টেট হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু ভারত নেশন-স্টেট বুঝের ভারত হলে, তাতে কী সমস্যা?

এক্কথায় এর জবাব হল, নেশন-স্টেট ধারণা “নাগরিক অধিকার” বা “হিউম্যান” রাইট ধারণা বুঝতেই পারে না। আর নেশন-স্টেট ধারণা এসেছে – রাষ্ট্রগড়া বলতে যেখানে মুল কর্তব্য ছিল একটা “রাজনৈতিক কমিউনিটি” গড়া – এই কাজ থেকে বিচ্যুতি [derailment] হিসাবে।
এছাড়া রাষ্ট্র বলতে এক ‘জাতিরাষ্ট্রে’র স্বপ্ন-কল্পনা থাকলে গঠনকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, কাকে তারা ‘জাতি’ হিসেবে নেবে? যেমন রামমোহন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র দেখে এক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু খেয়াল করতে হবে তার এই জাতি ধারণাটা আসলে (এথনিক অর্থে) এক ধর্মীয়-জাতি ধারণা। ঠিক যেমন এই একই  বিচারে ব্রিটিশরা হল, এঙলো-ক্যাথলিক খ্রিশ্চান, আর এই ধর্মের ভিত্তিতে তারা এক ব্রিটিশ জাতি। আর এখান থেকেই রামমোহন একটা একক ধর্মের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতির কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এতে হিন্দুধর্ম তার ‘ঐ’ প্রয়োজন মিটাতে পারবে, তা তিনি মনে করেননি। কারণ এই হিন্দুধর্ম জাতভেদ প্রথায় ডুবে অসংখ্য জাতে বিভক্ত। এছাড়া ভারতে আরো ধর্মও আছে। এছাড়াও তিনি কোন একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম হলে তা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হবে বলে মনে করতেন। কারণ হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার ধারণাকে তিনি এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনের দিক থেকে দেখে সমস্যা ভাবতেন। এসব চিন্তা থেকেই ১৮১৫ সালে তিনি একেশ্বরবাদী ‘ব্রাহ্মধর্মের’ প্রচলন করেছিলেন।
কিন্তু এই “জাতি” ধারণা প্রয়োজনে ধর্ম-প্রকল্প বাস্তবায়ন রামমোহন বা তার অনুসারীরা কেউ সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আর ১৮৭২ সালের দিকেই, খোদ ব্রাহ্মধর্মই দু’ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ সবাইকে এক ধর্মের অনুসারী করে জাতিরাষ্ট্র বানানো দূরে থাক ব্রাহ্মধর্ম নিজেই বিভক্ত হয়ে যায়। তাই, এটা উদ্যোক্তাদের কাছে অবাস্তব প্রকল্প মনে হতে থাকে আর ততই পরবর্তিকালে বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-বঙ্কিমচন্দ্রসহ সবার কাছেই “ব্রাহ্ম-প্রকল্প বাদ দিয়ে” হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একমাত্র বাস্তবতা বলে নিরুপায় ‘সাফাই’ হয়ে উঠতে থাকে। কংগ্রেসের জন্মের (১৮৮৫) পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা- এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন গান্ধী। পরের বছরের মধ্যে তিনি কংগ্রেসের হাল ধরেন । তখন থেকেই এবং মূলত ১৯২৩ সালের ‘লক্ষৌ প্যাক্ট’-এর ঐক্য ব্যর্থ হয়ে যারার পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একেবারে নির্দিষ্ট হয়ে জায়গা পেয়ে যায়। তবে গান্ধীর কৌশলে, এটা হিন্দুধর্মভিত্তিক বা এটা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সে কথা সরাসরি না বলে আবছা করে রাখা হয়। আর তখন থেকে বিপদে পড়লে হিন্দু শব্দটা ঠিক ধর্ম নয়, সভ্যতা বলে বুঝতে হবে বলে দাবি করার চাতুরী তারা করে গেছেন।

আসলে জাতিরাষ্ট্র বুঝের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এখানে ‘জাতি’ মানেই কোনো একটা আইডেনটিটির জাতি মানে, ভাষা ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়কে ভিত্তিতে জাতি ধরেই এখানে আগাতেই হয়। আর এতেই অন্যান্য ধর্ম অথবা অন্য আইডেনটিটিগুলোও কেন জাতির ভিত্তি হিসেবে তাদেরটা নেয়া হবে না, সে দাবিদারির প্রশ্ন উঠে নতুন অসন্তোষ তো অবশ্যই উঠে কিন্তু সবচেয়ে বড় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব খাড়া হয় যে নাগরিকদের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে একটা না একটা অসাম্য রাষ্ট্র নিয়মিত তৈরি করতে থাকে।

তুলনায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলো মীমাংসিত। যদিও কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার পরে এবার তা বাস্তবায়ন করাটা মূল কাজ যে, ধর্ম বা যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সারকথাটা হল গান্ধী-নেহরুরা হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা আঁকড়ে থাকাতে তারা জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বা কোনো মুসলমানের প্রতি বৈষম্যের কোন সদুত্তর বা সন্তোষজনক জবাব তৈরি করতে পারেননি। পরিণতিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি বড় হয়ে শেষে তারা আলাদা হয়ে যায়; যদিও অনেক মুসলমান দেশত্যাগ করলে নিজের বৈষয়িক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার হবু আশঙ্কায় ভয়ে আপসে ভারতেই থেকে যান।

এর সার কথাটা হল, এখান থেকেই হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণার কারণে ভারতের সব প্রধান দলই কমবেশি ‘হিন্দুত্ব’- এই জাতিবাদের অনুসারী থেকে যায়। এর মধ্যে সেকালের আরএসএস কে (একালের বিজেপি) বলা যায় ‘চরম’ হিন্দুত্ববাদের দল। এ কারণে লক্ষ্যণীয় যে বিজেপির চোখে এখনও ‘নাগরিক’ বলে কোনো ধারণা নেই। তাই সহজেই, মুসলমান বা অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার কোনো দায় অনুভব করে না বিজেপি। তাদের দলের কোনো দলিলেও এর স্বীকৃতি নেই।

তাহলে এটা কী কংগ্রেসের কি আছে? না তাও নেই। কারণ ভারত মূলত ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার দল দিয়েই গঠিত ও পরিচালিত। ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণা ও বোধের দল দিয়ে নয়, তাতে সে দল কমিউনিস্ট হোক কি বিজেপি!

উনিশ শ’ আশির দশকের শেষের দিক থেকে ভারতে কংগ্রেস দলের প্রভাব ও আধিপত্যের পতন শুরু হয়ে যায়। আর এটা লক্ষ্য করেই ইকোনমিস্টের লেখক দাবি করছেন সেকুলারিজমের ক্ষয় তখন থেকে। তিনি ‘কংগ্রেস’ শব্দের জায়গায় ‘সেকুলারিজম’ বসিয়ে কাজ সেরেছেন যেন এর আগে ভারত বিরাট সেকুলার ছিল। এর আগে যেন বছর বছর দাঙ্গা হয়নি। কাশ্মিরে নির্বাচনে ভোটে কারচুপি করে ভোটের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো আর রাজনীতিতে সশস্ত্রতার আমদানি কি ১৯৮৭ সালে কংগ্রেস আমলে হয়নি? তাই, একা বিজেপি সব দোষের ভাগী এ কথা ভিত্তিহীন। রাহুল গান্ধী কি একালে ‘সফট হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছেন না?

তাহলে এখন সত্যিকারভাবে চিনতে হয় কী করে যে, রাষ্ট্র সেকুলার কিনা? রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও বোধের অভাব আর সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে সেকুলারিজম সম্পর্কে সব অদ্ভুত ধারণা আমরা দেখতে পাই। সেটা মুসলমান রাষ্ট্রপতি দেখানো মানে, তা সেকুলারের লক্ষণ পর্যন্ত। এমনকি এটা কনস্টিটিউশনে ওই রাষ্ট্র সেকুলার বলে ঘোষণা দেয়া আছে কিনা অথবা রাষ্ট্রের মূলনীতির একটা সেকুলারিজম কিনা, ইত্যাদি দেখিয়ে যারা দাবি করে, আমার বা অমুকের রাষ্ট্রটা সেকুলার তারা রাষ্ট্র বা সেকুলারিজমের কিছুই বুঝে না। এটা আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। তবে একাজটা তারা করে তাদের একটাই উদ্দেশ্য হল, মূলত ধর্মীয় সংখালঘুদের ভোট এই উপায়ে হাসিল করা।

তাহলে আবার প্রশ্ন সেকুলারিজম বুঝব কেমন করে?  এপর্যন্ত আমরা দেখেছি সেকুলারিজম যেন অবশ্যই ধর্মবিষয়্ক একটা ইস্যু। হা আপতিকভাবে তা মনে হতে পারে কিন্তু এটা মূলত নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষম্যের ইস্যু। কোন দুই নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সাম্য বজায় না রাখার সমস্যা।  যেমন দেখেন, আমাদের রাষ্ট্র এখন ছাত্রলীগের বা আওয়ামি কোন অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইনভঙ্গ করে হলেও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। তাদের কৃত কোন অপরাধ বা রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকে উপেক্ষা বা প্রশ্রয় দিচ্ছে।  রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইন ভঙ্গ করে হলেও ছাড় দিচ্ছে, বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে – এগুলো যথেষ্ট প্রমাণ যে, এই রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষমাই করছে – ফলে বৈষম্যের রাষ্ট্র। নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র নয়। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক বৈষম্য করা মানে তা যদি হয় ধর্ম পরিচয়ের কারণ-সংশ্লিষ্ট তখন এটাকে রাষ্ট্র সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করছে বলা হয়। তাই ‘সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গ’ কথার মূল অর্থ হল নাগরিক বৈষম্য করা।
যেমন মোদীর সিএএ – এই আইনে মুসলমানদের বেলায় বৈষম্য করা হয়েছে তাই এই আইন সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে – এভাবে বলা যায়।  যদিও এখানে মূল কথাটা হল নাগরিকের মধ্যে অধিকার বৈষম্য করা। আর কেমন ধারার বৈষম্য এর উত্তরে বলা যায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিক বলে সংখ্যালঘু বলে তাদের সাথে করা বৈষম্য এটা।
আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এটাও বৈষম্য করা। ধর্মের কারণেসহ যেকোনো কারণে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা, বৈষম্যের চোখে দেখা ও আচরণ করা এটাই মূলত নাগরিক সাম্য বজায় রাখার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।  কেবল ধর্মীয় বৈষম্য নয়, বরং যেকোনো নাগরিক বৈষম্যই নাগরিক-সাম্যের নীতি ভঙ্গ করা।
এরপরে আর একটা দিক আছে। আলাদা করে “আমাদের রাষ্ট্র সেকুলার” – একথা কনস্টিটিউশনে লিখে রাখা বা না রাখাটা গুরুত্বপুর্ণ না। কারণ মূলত রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কারণের বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হয়ে দাড়ানোই  নাগরিক সাম্যনীতি।  তাই  রাষ্ট্র সেকুলার কিনা  এটা বুঝবার আসল জায়গা হল ঐ রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেখানে তাকাতে হবে।  আমার রাষ্ট্র সেকুলার – আলাদা করে একথা লিখা রাখা না রাখা এজন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।  মানে লিখে রাখলেও সেকুলারিজম কায়েম হবে না। এজন্যই যারা এই লিখে রাখাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এরা সেকুলারিজম ইস্যুটা বুঝে কিনা সন্দেহ করা যায়। রাষ্ট্রের চোখে দেশের সবার পরিচয় যাই থাক, মূল বিষয় হবে তাদেরকে কমন “নাগরিক” পরিচয়ে আমল করা হচ্ছে কি না, সে সমান অধিকারের নাগরিক বলে মানা হচ্ছে কি না, কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার সে হচ্ছে কি না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এগুলোর সদুত্তর হল সেকুলার রাষ্ট্রের চিহ্ন। নাগরিক সাম্যের ব্যত্যয় ঘটলেই মানে, অধিকারে বৈষম্য ঘটলেই আসলে  নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ হবে। আর নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ মানে সেখানে সেকুলারিজম নীতিভঙ্গও ঘটবেই। তাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলার লেখা আছে কি না এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেদিকে পরীক্ষা করতে হবে।

ওদিকে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র না হলে নাগরিক সাম্য বজায় থাকা বা বৈষম্যহীনতা রক্ষা করা আশা করা যায় না। আর সেকুলারিজম চিনার উপায় হল রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের বেলায় বৈষম্যমূলক কিনা মানে নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না এটা চেক করে দেখতে হব।

জন্ম থেকেই ভারত হিন্দুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই ভারতের নাগরিক জীবনে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতা বজায় থাকার দাবি বা এই বোধ সরব বা সক্রিয় নয়। একই কারণে তাই সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের উপর নাগরিকের দাবি বা চাপ তেমন নেই। জেলা শহরভিত্তিক মফস্বলে বিজেপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা, মুসলমান বলে কোনো মানুষকে ধরে নির্যাতন করছে, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর লাফ দিয়ে জোড়া পায়ে উঠছে। অথচ গোল হয়ে চার পাশে মানুষ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে এই নির্যাতন উপভোগ করছে। অথচ  কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তাদের। এমন ভিডিও ক্লিপ মোদীর একালে আমরা অনেক দেখেছি। এর মানে হল,  নির্যাতিতকে কেউ তাঁরা তারই মত সমান মর্যাদা ও অধিকারের নাগরিক মনে করছে না। এটাই এর অর্থ তাতপর্য। আবার গত নির্বাচনে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি বা রায় দেয়নি। কেন? বিজেপি দলের ম্যানিফেস্টোতে নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই কেন? নির্বাচন কমিশন কোনো আপত্তি তুলেনি কেন? আবার বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়াতে এই ভাবনার উৎস হিসেবে দলের দলিল তালাশ করে কী কমিশন কখনও দেখেছে?  কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছে?  মনে হয় না। অথচ এগুলো সবই নাগরিক অসাম্যের মামলা। মানে সেকুলারিজমের নীতিও ভঙ্গের মামলা। অথচ ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে সেকুলারিজম শব্দের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ করা ও উল্টা বৈষম্য করা সবই যেন বৈধ।
এখন দিল্লির নির্বাচন চলছে। বিজেপি নেতা কাপিল গুজ্জর গুলি ছুড়ে হুমকি দিয়ে বলেন  এই দেশে কেবল হিন্দুরা যাই বলবে তাই চলবে On 1 February, Kapil Gujjar fired shots at Shaheen Bagh saying, “Iss desh mein sirf Hinduon ki chalegi (Only Hindus will have their say in this country).”। এগুলো গুরুতর নাগরিক বৈষম্য করার মামলা। এবং সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গের মামলা।

এভাবে এক হিন্দুত্ববাদ ছেয়ে বসছে চারদিকে; যেন হিন্দুত্ববাদই, অর্থাৎ এর এই বৈষম্য ও অবিচারের আধিপত্যই একালের নিয়ম!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘ইকোনমিস্টের’ মোদি-পাঠ”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

কোটা বনাম নির্বাচনী ব্রান্ডিং – মুক্তিযুদ্ধ

কোটা বনাম নির্বাচনী ব্রান্ডিং – মুক্তিযুদ্ধ

গৌতম দাস

২৬ এপ্রিল ২০১৮, বৃহষ্পতিবার, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2rq

 

 

এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন মনে হচ্ছে শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছরই সরকারি বিশেষত; বিসিএস চাকরিতে চেপে বসা কোটা, সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন আমরা হতে দেখেছি। সেটা আরও বেশি করে ঘটেছে সম্ভবত সরকারি চাকরিতে বেতন কাঠামো প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলার পর থেকে। অর্থাৎ সরকারি বিসিএস চাকরির প্রতি গ্রাজুয়েটদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ারই বিশেষ প্রকাশ হিসেবে আমরা দেখছি। প্রতি বছরের পাস করে বের হওয়া গ্রাজুয়েটদের মধ্যে ওপরের ভালো ফল করা চাকরিপ্রার্থীদের দৃষ্টিতে বিসিএস চাকরি লোভনীয় হয়ে উঠেছে। সার করে কথাটাকে বলা যায়, গ্রাজুয়েট চাকরির বাজারে বিসিএস প্রথম পছন্দের চাকরি হয়ে উঠেছে তখন থেকে। কিন্তু  এখানে চাকরিপ্রার্থী হতে এসে এবার তারা প্রধান বাধা হিসেবে আবিষ্কার করছে এই কোটা পদ্ধতিকে। কারণ এখানে ৫৬ শতাংশ আসন পূরণ করা হয়ে থাকে নানা ধরনের কোটার ভিত্তিতে। আর এই ৫৬ শতাংশের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হল ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এর পর বাকি মেধার আসন পূরণ হওয়ার প্রশ্ন।

স্বভাবতই শিক্ষার্থীদের নিজের ভেতর বঞ্চনার উপলব্দি এখান থেকেই। তবে বঞ্চনার উপলব্দির তীব্রতাও বেশ যথেষ্ট। সম্ভবত, এর মূল কারণ মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে ভুয়াপ্রার্থীদের অপব্যবহার। মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখা ন্যায্য কী না এর চেয়েও বড় আপত্তির বিষট হল ভুয়া সনদ সার্টিফিকেটের ছড়াছড়ি। প্রশাসনের সর্বোচ্চপদ সচিব থেকে শুরু করে একটি সাধারণ সরকারি চাকরিতেও ভুয়ামুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটের জয়জয়কার। আর সেই সাথে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স কত হবে তা নিয়ে সরকারের প্রায় প্রতি বছর একে  নামাতে থাকা। অর্থাৎ এই জুয়াচুরিতে সরকারের প্রচ্ছন্ন সায় দেয়া। এসবেরই নীট ফলাফল হল, মুক্তিযোদ্ধা এই সেন্টিমেন্ট বা আবেগ নিজ নৈতিকতাকে নিজেই ঢিলা করে ফেলেছে।

দু-একদিন পরপর মিডিয়াতে কোনো না কোনো এক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া কাণ্ডকারখানা ছাপা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা যেন এক ব্যাকডোর, ফাঁকি দিয়ে চাকরিতে ঢুকে পড়ার এক সহজ রাস্তা হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের বঞ্চনার উপলব্দির তীব্রতা এখন থেকেই। তবে আসল বটম অব দা ফ্যাক্ট হল – মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধ তা যতই আবেগের জিনিষ হোক না কেন; এর ছত্রছায়ায় বা আড়ালে আমরা কেউ অন্যায্যকে ন্যায্য বলে বা অন্যায়কে ন্যায় বলে চালাতে চাইলে তা চলবে না।  এতে তৈরি হওয়া অস্বস্তিটা শুরুর দিকে পাবলিক হয়তো প্রকাশ্যে আনবেন না আনেন না, কিন্তু একটা পর্যায়ে যখন এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসবে তখন এটা বিস্ফোরিত হয়ে উঠতে পারে। যেমন অনেক খোদ মুক্তিযোদ্ধা বা কমিউনিস্ট নেতাই আবেগাক্রান্ত না হয়ে গোড়ার প্রশ্ন তুলছেন। দেখা যাচ্ছে তারা যুক্তি তুলছেন যে কোনো মুক্তিযোদ্ধার গুণ, আদর্শ বা ব্যক্তিত্ব এগুলো কি জেনিটিক্যালি মানে, বংশ পরম্পরায় রক্তে বাহিত হয়ে বয়ে চলে; এমন জিনিষ? কথা তো সত্যি। মুক্তিযোদ্ধা গুণ কোন রক্তে প্রবাহিত বংশ স্বভাব তা  তো  নয়। তাহলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পেরিয়ে নাতিপুতি পর্যন্ত কোটার আওতায় থাকবে এর ন্যায্যতা কই? আর যদি প্রশ্ন হয় কোন মুক্তিযোদ্ধার আর্থিক অস্বচ্ছলতার; তবে এর জন্য বিসিএসের চাকরি ছাড়াও আরও বহু পথে সাহায্য করার রাস্তা আছে। এছাড়া প্রশাসনে মেধাবী প্রার্থীদের আকর্ষণ করার খুবই দরকার। এতদিন সেটা করা যায়নি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বেসরকারি চাকরির সাথে প্রতিযোগিতামূলক ছিল না বলে।

এ দিকে এখন কোটাটাই এক বিরাট সমস্যা হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য। তাঁর ক্ষমতার পুরাটাই গত ১০ বছর ধরে তার ব্রান্ডিং ছিল ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ইস্যু। কিন্তু এরচেয়েও বড় প্রসঙ্গ হলো আগামী সম্ভাব্য এ বছরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচনী ইস্যু তিনি ঠিক করেছেন ‘উন্নয়ন’ আর এই ‘মুক্তিযুদ্ধ’কেই। শিক্ষার্থীদের এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার অনেক আগেই প্রধানমন্ত্রী ‘মুক্তিযুদ্ধকে’ তার নির্বাচনী ব্রান্ডিং ঠিক করে ফেলেছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে এর সমস্যার দিকটি যথেষ্ট মনোযোগে খেয়াল করেননি তিনি। ফলে এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে পরে তিনি শিক্ষার্থীদেরকে তার নির্বাচনী ব্রান্ডিং নিয়ে আপত্তি তুলতে হুঁশিয়ার করার প্রয়োজন অনুভব করেন। হয়তো ভেবেছিলেন, শিক্ষার্থীরা তার দৃঢ়তা দেখলে থেমে যাবে। তাই গত ২১ মার্চ পটিয়ার জনসভায় দৃঢ় ভাবে জানিয়ে দেন যে “মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে”। দেখুন মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে: প্রধানমন্ত্রী (প্রথম আলো)। তিনি যুক্তি তুলে বলেন যে “মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, এ কথাটা ভুললে চলবে না। কাজেই তাদেরকে আমাদের সম্মান দিতেই হবে। তাদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, পুতি পর্যন্ত যাতে চাকরি পায়, সে জন্য কোটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোটা যদি পূরণ না হয়, তাহলে শূন্য পদে সাধারণ চাকরিপ্রার্থী মেধাবীদের নিয়োগ দিতে কোটার বিষয়টি শিথিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, যদি মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন না করতেন, তাহলে কেউ আমরা কোনো চাকরি পেতাম না”।

অর্থাৎ, তিনি কোটা সংস্কারের দাবিকারীদের জবাব দিলেন, যে উনি নিজের ব্রান্ডিং – “মুক্তিযুদ্ধ” থেকে সরতে পারবেন না। কারণ, এটা চলতি নির্বাচনী বছরে তার নির্বাচনী ব্রান্ডিং। কিন্তু তাতে ফল হল উল্টা। শিক্ষার্থীরা বুঝল তাদের এবার আরও শক্ত সংগঠিতভাবে আন্দোলন করতে হবে। আসলে এত বছর কোটা  সংস্কার ইস্যুতে আন্দোলন হয়েছে কিন্তু সেটাকে তেমন অ্যাড্রেস না করেই প্রধানমন্ত্রী ইস্যুটাকে ভালো ম্যানেজ করতে পেরেছিলেন। এবার অ্যাড্রেস করতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেছেন। তবে এবার তা না করে তিনি আদৌ সামনে যেতে পারতেন কি না সেটাও এক প্রশ্ন অবশ্য। তবে আমাদের যেন চোখ না এড়ায় যে, প্রধানমন্ত্রীর মূল সমস্যা তার অন্যতম নির্বাচনী ব্রান্ডিং ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এটা মারা পড়ল না বেঁচে উঠল তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো আবেদন নেই। সে আবেদন তৈরি করতে প্রধানমন্ত্রী পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। সেখান থেকেই সব সমস্যার শুরু। অবশ্য এমন হবারই কথা সব সময় ছিল। কারণ, অতি-ব্যবহারে আর সবকিছুতে মুক্তিযুদ্ধ বিক্রি করতে করতে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ শক্তিহীন, ধারহীন, আবেদনহীন আর কিছু দলবাজ মাফিয়ার আপন ভাগ্যগড়ার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটা কতদূর উঠেছে এর রেকর্ড হল – কয়েকজন সচিবের মত পদমর্যাদার লোকের ভুয়া সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চাকরির এক্সটেনশন নেয়া থেকে বুঝা যায়। ফলে এসবের সারকথা হল – প্রধানমন্ত্রী আসলে সবশেষে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের কাছে এখানে হেরে গেছেন।

যদিও ১১ এপ্রিল সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আবার খুবই কৌশলে সেই হার স্বীকার করেছেন। ‘কোটাই রাখব না’ ধরনের জিদের ভাষায় তিনি তা করেছেন। তবে এখনও নিজ ঘোষণার স্বপক্ষে কোনো গেজেট প্রকাশ করেননি। অথবা জনপ্রশাসন দফতরকে কোনো নির্দেশনাও দেননি। বরং ২৪ এপ্রিল অন্তত তার দুই মন্ত্রী পাল্টা সমাবেশের আয়োজন করার কথা বলেছেন। একজন (মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী) ১৮ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় বলছেন, কোটা বাতিলের ঘোষণায় ‘মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে’। আর একজন, নৌপরিবহন মন্ত্রী ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম সমন্বয় পরিষদ’ নামের সংগঠন থেকে ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন যার সার কথা- এবার তাদের কথা শুনতে হবে। তিনি নিজেই ১৫ এপ্রিল বলছেন, “যেসব ছাত্র জামায়াত-শিবির, রাজাকারদের সন্তান, তাদের কি চাকরি দেয়া উচিত?”  মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে চাকরি দেয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “স্বাধীনতার বিপক্ষের মেধাকে চাকরি দেয়া যাবে না” (বাংলা ট্রিবিউন)।

অর্থাৎ, এককথায় বললে, কোটা ইস্যু বনাম নির্বাচনী ব্র্যান্ডিং ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এই দুইয়ের লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রীর হার হয়েছে। যদিও হারটা তিনি কীভাবে মানবেন মনে হচ্ছে তা  নিয়ে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে।   তিনি হয়তো তা নানা কৌশলে অস্বীকার করে এখন ধামাচাপা দেয়ার পথ ধরতে পারেন। দুই মন্ত্রীর ততপরতা তেমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাতে এভাবে তিনি ইস্যুটাকে আরও জীবন্ত করে জাগিয়ে তুলবেন, আর এতে তুলনামূলক এই ছোট হার তাকে বড় হারের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। এখনো পর্যন্ত কোটা ইস্যুটা ঠিক তার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে তেমন নয়।  তবে তার নতুন সব কৌশলই তার ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে থাকবে।

একটি কথা আমরা প্রায়ই শুনি “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ বা বিপক্ষ শক্তি”। এটা দিয়ে অনেক কিছু বুঝাতে চায় প্রগতিবাদীরা। যা বুঝানো যায় না তাও। অনেকে পত্রিকায় মতামত-কলামও লিখে থাকেন, “রাজাকার আলবদরের সন্তানদের জন্যে আইন করতে হবে”, এমন শিরোনামে। অথবা মন্ত্রী শাজাহান খান যেমন দাবি তুলছেন, “স্বাধীনতার বিপক্ষের মেধাকে চাকরি দেয়া যাবে না” অথবা “জামায়াত-শিবির-রাজাকার সন্তানদের চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ করতে হবে”। এসব বক্তব্যগুলো কি আগাম অনুমান ধরে নিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সে প্রসঙ্গের কিছু কথা।

দুনিয়ার সব রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা (বা ধর্মীয় বিচারব্যবস্থাও) কোনো অপরাধীর অপরাধের জন্য তার সন্তানকেও কখনও অভিযুক্ত করেনি। কখনও করে না, করার সুযোগ রাখেনি। অনেক ধর্মে চোরের চুরির পয়সায় সংসার চালানোতে চোরের স্ত্রী-সন্তানেরা ওই চুরির আয় ভোগ করলেও তারা “চুরির দায়মুক্ত” বলে রায় দিয়ে রেখেছে। আমাদের কনস্টিটিউশনও এই নীতি অনুসরণ করেছে, এর বাইরের নয়। কিন্তু তবু আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তিরা’ এটা সুবিধাভোগী এক কোটারি গোষ্ঠী, যাদের সময় নেই এদিকগুলো ভেবে দেখার। এরা সারা দুনিয়ার এই নীতিগত দিক নিয়ে পড়াশুনা বা জানার আগ্রহ রাখেন না। বরং সেন্টিমেন্টাল উস্কানিতে নীতিগত দিকটা আড়ালে রাখতে চান। আর এতে ঘিন ঘিনে ঘৃণা ছড়ায় কেবল। এরা ‘জামায়াত-শিবির-রাজাকার’, এদের অপরাধের দায়ভার সন্তানদের ওপর চড়াতে খুবই ব্যাকুল। এরা অপরাধকে অপরাধ হিসাবে দেখতে রাজি না বরং অপরাধীর “রক্তের দোষ” থাকে, “অপরাধীরা দুষিত” এমন ধরণের বর্ণবাদী রেসিজম এর বয়ান খাড়া করতে আগ্রহী। রক্তের দোষ দেখতে পাওয়া এটাই হিটলারি রেসিজম। তবে নিজ কোটারি স্বার্থে টনটনে হয়ে এই রেসিজম ব্যবহার করে। কেবল রগেরগে ঘৃণার জোশে এরা নিজের কোটারি স্বার্থের পক্ষে নানা সময় নানা দাবি তুলে।

এদের বক্তব্যগুলোর পেছনের আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হল, অপরাধীর অপরাধ এই দোষটা জেনিটিক্যালি বংশগতভাবে রক্তে প্রভাবিত হয়। আচ্ছা ধরা যাক এটা যদি তাই হত তাহলে এর মানে কী দাড়ায়? তবে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ফৌজদারি আদালতে বিচারে যারা অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন তাদের সন্তান-সন্ততিদের সবাইকেই তো শাস্তির আওতায় আনতে হয়। এতে এমন লোক যার বংশের কেউ অপরাধ করেনি ফলে সে শাস্তিভোগের বাইরে থাকবে এমন কাউকেই আর সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা এই দাবি জানাচ্ছে এদের সবাইও নিজ বংশের কারও না কারও অপরাধের দায়ের বাইরে থাকবে তা কে নিশ্চিত করতে পারে? এদিকটা কি তারা ভেবেছেন? রেসিজম আমাদের কোথায় নিয়ে যায়, কীভাবে অন্ধ করে দেয়!

সবশেষে, কোটা নিয়ে যেকোনো আধুনিক রাষ্ট্রের মূলনীতি কী, তা নিয়ে দু’টো কথা। প্রথমত, যেই রাষ্ট্র তার নাগরিক নির্বিশেষে মানে – নাগরিকের ধর্ম পরিচয়, গায়ের রঙ, পাহাড়ি-সমতলি, ভুগোল ইত্যাদি নির্বিশেষে  সব বিভেদ চিহ্নের উর্ধে সমান গণ্য না করে,  এই সাম্যতার নীতিতে গড়ে না তুলে – সেটা কোনো রাষ্ট্রই নয়। তাতে সেটা যেকোনো (কমিউনিস্ট, ইসলামিস্ট ইত্যাদি) আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রই হোক না কেন! জনস্বার্থের রাষ্ট্র গড়তে গেলে সাম্যের এই নীতি আমরা মানতে বাধ্য। একইভাবে কোনো রাষ্ট্র এমন আইন করতে পারে না যা সবার ওপর সমান প্রযোজ্য হবে না। উল্টা করে বললে যা সবার ওপর প্রযোজ্য নয় তা কোন আইনই নয়। অর্থাৎ, আইনকে মুখ দেখে কারও কারও উপর অপ্রযোজ্য করে রাখা যাবে না। এ ছাড়া নাগরিক-ভেদে কোনো কিছুতেই রাষ্ট্র কোন বৈষম্য করতে পারে না। এসব হল রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠনের একেবারে আদি কিছু মৌলিক নীতি। কিন্তু নীতি না মানলে কী হবে? প্রথমত, এতে নাগরিক সাম্যের নীতি লঙ্ঘন করা হল। আর ওই রাষ্ট্রের উচ্চ আদালতকে স্বত্ব ক্ষমতা দেয়া থাকে, যে ‘সাম্যের নীতি লঙ্ঘন’ করে কোন আইন প্রণীত হলে সেই আইন বাতিল বলে ঘোষণা করবে। আমাদের রাষ্ট্রের মূল তিন নীতির একটি হল এই ‘নাগরিক সাম্য’; যেটা কোনো রাষ্ট্রকে চিনবার, এটা কেমন রাষ্ট্র এটা বুঝবার এক মৌলিক চিহ্ন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গৌরব্বোজ্জ্বল মুল্যবোধ হল এই “নাগরিক সাম্য” প্রতিষ্ঠাকে নীতি হিসাবে আকড়ে ধরা, মূল নীতি হিসাবে আর করণীয় বলে ঘোষণা করা। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে যদি মনে রাখে তবে এই “নাগরিক সাম্য” এই মূলনীতির জন্যই আর এর প্রতিষ্ঠার জন্যই মনে রাখবে। কোটা বা কোন বৈষয়িক সুবিধার লোভ দেখিয়ে মানুষকে “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে” রাখা যাবে না। তাহলে এখন আসি, নাগরিক সাম্যের নীতি আকড়ে ধরলে এসব রাষ্ট্রে আবার কোটা পদ্ধতি চালু করা যাবে কী করে?

কারণ, কোটা মানে তো কাউকে অন্যের ওপরে বিশেষ সুবিধা দেয়া, মানে বৈষম্য করা! এ কারণে এক্ষেত্রে বাড়তি একটি যুক্তি দেয়া হয়ে থাকে এবং বলা থাকতেই হয় যে এটা সাময়িক। সেই যুক্তির সার কথাটা হল,  কনস্টিটিউশন চালুর আগে থেকেই নিজ সমাজের বিকাশ অসম ছিল, এই অসম বিকশিত হওয়াতে যে বৈষম্য আগেই তৈরি হয়ে আছে কেবল সেগুলোকে সবার আগে এক সাম্যের জায়গায় আনা প্রয়োজন। কেবল এমন এমন ক্ষেত্রে এসব কোনো ইস্যু থাকলেই তখন কেবল কোটা আনা যাবে এবং অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট সময় পরে কোটা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই কাজকে affirmative action বলা হয় এবং কোটা চালুর সময়ই এটা কতদিন থাকবে সেই সময় উল্লেখ রাখতে হয়। অর্থাৎ, নাগরিক সাম্যের মূলনীতি লঙ্ঘন না করেই কেবল কোটা নামে এক সাময়িক ব্যবস্থা চালু করা যায়।

কিন্তু মূলকথা মনে রাখতে হবে, সমাজের অসম বিকাশ আগেই যা তৈরি হয়ে আছে যেমন, নারীরা সামাজিক সুবিধায় আগে থেকেই হয়ে থাকা অসাম্যের কারণে পুরুষের চেয়ে তারা পিছিয়ে আছে। অথবা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের এলাকায় পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক অবকাঠামো না থাকায় তারা বাঙালি জনগোষ্ঠীর চেয়ে পিছিয়ে আছে। তাই কেবল এসব ক্ষেত্রে তাদেরকে সাম্যে না আনা পর্যন্ত একটা কোটা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে বা যেতে পারে। কিন্তু এই বিচারে মুক্তিযোদ্ধা বলে কোটা করার সুযোগই নেই। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে কেন এই কোটা থাকবে এর সাফাই বা ন্যায্যতা হাজির করা ছাড়াই এটা চলে আসছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা কোন ‘সামাজিক অসাম্যকে’ সমান করতে affirmative action তা আমরা এখনো জানি না। যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখতে চান তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। তবে যুক্তি না পেলেও, মুক্তিযুদ্ধ এই আবেগের বিরুদ্ধে যাওয়া এড়াতে আমরা খুলে কিছু বলি না। আর এরই সুযোগ নিতে চাচ্ছে কথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি’।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কোটা বনাম নির্বাচনী ব্রান্ডিং  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]