নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
গৌতম দাস
২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

http://wp.me/p1sCvy-1Jc

 

 

নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]

 

নেপালে আবার নড়াচড়া

নেপালে আবার নড়াচড়া
গৌতম দাস
১৭ মে ২০১৬,  মঙ্গলবার
http://wp.me/p1sCvy-1bK

ভারতের সাথে তার সব পড়শি রাষ্ট্রের সম্পর্কই নানান রকম খটমট ও সঙ্ঘাতে পরিপূর্ণ। ব্যতিক্রম বা ভারতেরই ভাষায় ‘সফলতা’, কেবল বাংলাদেশে। গত সপ্তাহে ৯ মে নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারির সরকারিভাবে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা হওয়ার কথা ছিল ভারতের রাষ্ট্রপতির অতিথি হিসেবে তাঁর ভারত সফর। কিন্তু সফরের মাত্র দুই দিন আগে ৬ মে নেপাল থেকে সরকারিভাবে জানানো হয় যে, নেপালের রাষ্ট্রপতি এই সফর বাতিল করেছেন। এই খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। কিন্তু খবরটার গুরুত্ব ছিল আরো কয়েক গুণ বেশি। কারণ একটা বাড়তি খবরও সাথে ছিল, নেপাল সরকার ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদূত দীপ কুমার উপাধ্যায়কেও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কূটনীতিতে ‘প্রত্যাহার’ শব্দটির বিশেষ অর্থ আছে। অর্থাৎ প্রত্যাহার বা recall এই শব্দটি কী কী অর্থ নিশ্চিত করে আর কী কী করে না, তা সুনির্দিষ্ট থাকে। যেমন নিশ্চিত অর্থ হল, তার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে  ঐ রাষ্ট্রদুতকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এরপর, কেন বলা হয়েছে এর কারণের দিক থেকে এর আবার দুটো মানে হতে পারে- এক. ঐ রাষ্ট্রদূতকে চাকরিচ্যুত বা দায়িত্বচ্যুত করা হয়েছে। অথবা দুই. কেবল ওই দেশ থেকে রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে কিন্তু তাঁর চাকরি বহাল আছে। ফলে এরপর অন্য কোথাও তাঁকে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু নেপালের রাষ্ট্রদূতের বেলায় তার প্রত্যাহারের কারণও মিডিয়ায় উল্লিখিত হতে থাকে। আর কারণটা সরকার নিজে মিডিয়ায় প্রচার করতে না চাইলেও মিডিয়া নিশ্চিত করছে যে নেপালি সরকার রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত হিসেবে অভিযোগ তিনটার: প্রথমটাই বড় সাঙ্ঘাতিক, কাটমান্ডুতে থাকার সময় চলতি প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির (K P Sharma OLI অথবা K P OLI নামে তিনি বেশি পরিচিত) সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় অভিযোগ, দিল্লিতে বসে অফিস চালিয়েছেন এমনভাবে যে সেখানে তিনি কী করছেন কিভাবে করছেন তা নিজ দেশে তার কাজের হিসাব নেয়া রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানানো। আর তৃতীয় অভিযোগ, ভারতের রাষ্ট্রদূত রণজিত রায়ের (Ranjit Rae) সাথে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত সফরে গিয়েছেন অথচ দেশের নিজ মন্ত্রণালয়কে কিছুই জানাননি। অনুমান করা যায়, মূল অভিযোগ আসলে শেষেরটাই। আর সেটা করতে গিয়ে প্রথম দু’টি অভিযোগ তৈরির অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।

আসলে গত ৬ মে ছিল নেপালের জন্য ঘটনাবহুল দিন। সেটা শুধু রাষ্ট্রপতির সফর বাতিল আর ভারত থেকে নেপালি রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাহারে ঘটনার কারণে নয়। এ দুটো যদি দেশের বাইরের ঘটনা বলি তবে ঐদিনের বাকি ঘটনাবলি ছিল অভ্যন্তরীণ। এর আগের দিন মানে, ৫ মে অলি সরকারের অন্য পার্টনার দল হল নেপাল মাওবাদী পার্টি, যার সমর্থনে (কিন্তু তারা সরকারে অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছে) অলির সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে সেই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ড মিডিয়ায় জানিয়ে দিয়েছিলেন তার দল ওলি সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। তবে এও জানিয়েছিলেন ঐদিনের সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর মিটিং আছে। পরের দিন ৬ মে প্রচন্ড জানান, তিনি আপাতত সমর্থন প্রত্যাহার করছেন না; বরং এপ্রসঙ্গে নয় দফা দাবিতে তাদের সমঝোতা হয়েছে। ফলে সরকার আগের মতোই থাকছে।
এরপর ঘটনাবলী নিয়ে আরো কিছু বর্ণনায় যাওয়ার আগে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনের পটভূমি সংক্ষেপে বলে নেয়া ভালো হবে যাতে এখনকার অবস্থা বুঝতে সুবিধা হয়।
সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনের ফল অনুসারে নেপালের মোট ৬০১ আসনের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রধান তিন দলের মোট আসন সংখ্যা, এরা প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা ৪৫১ আসন দখল করে আছে। কিন্তু কেউই নিরঙ্কুশ বা অর্ধেকের বেশি ৩০১ আসন পায়নি বলে, কেউ একক সরকার গঠনে সক্ষম নয়। আর আসনসংখ্যা অনুসারে ওপরের প্রথম দল নেপালি কংগ্রেস (১৯৬ আসন), দ্বিতীয় (চলতি প্রধানমন্ত্রীর) নেপালি কমিউনিস্ট ইউএমএল (১৭৫ আসন) আর তৃতীয় মাওবাদী কমিউনিস্ট (৮০ আসন)। বিগত রাজতান্ত্রিক সরকার উচ্ছেদ করার পরে নেপালে প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের স্থাপন করার ক্ষেত্রে সোচ্চার মূলত মাওবাদীরা হলেও এদের সাথে অপর দুই দলও ছিল। ফলে এই তিন দল সে সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা ছিল দ্বিতীয় প্রচেষ্টার নির্বাচনী ফলাফল। কারণ প্রথম প্রচেষ্টা ফেল করেছিল। আর এই তিন দলের আসন সংখ্যা মোট করে দেখানোর কারণ হল, ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর এই তিনটা দলই ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। খুব সম্ভবত এই তিন দলের মধ্যে ভারত প্রসঙ্গে কমন কিছু অবস্থান আছে, যা ইনফরমাল এবং অপ্রকাশ্য। এটাই ভারত থেকে চরমভাবে এই তিন দলকে দূরে নিয়ে যায় আবার এটাই তাদের পরস্পরের মধ্যে বন্ধনের হেতু, ও ভিত্তি।
আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের (মে ২০০৮) পরে, প্রথমবারের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টায় নির্বাচিত সরকার গঠনের পর থেকে ভারতের সাথে এক এক করে প্রধান তিনটি দলেরই সঙ্ঘাতময় সম্পর্ক হয়ে যায়। অথচ রাজতন্ত্র উচ্ছেদে রাজনৈতিক পরিকল্পনার শুরুর সময় থেকে ভারতের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। সেসময় আমেরিকানদের কূটনীতির সহযোগী অবস্থান ছিল খুবই নির্ধারক। ফলে আমেরিকার সাথে সমন্বিত ভারতের সে ভূমিকা ছিল গঠনমূলক। কিন্তু রাজতন্ত্র উচ্ছেদ উতখাতের পর তৎকালীন প্রথম অন্তর্বর্তি নির্বাচিত সরকার ছিল মাওবাদীদের সরকার। আর ভারত ক্রমেই কাজের ও স্বার্থের দিক থেকে গড়ে ওঠা এতদিনের ভালো সম্পর্ককে প্রথমে মাওবাদী সরকারের সাথে ও পরে অন্য দুই পার্টির সাথে ক্রমেই আস্থা হারিয়ে তিক্ত করে ফেলেছিল। ফলে মাওবাদী সরকার সংবিধান রচনা সম্পন্ন হয়েছে, এ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়। বলা যায়, তিন পার্টির সাথে সম্পর্ক হারিয়ে, ‘কনষ্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছে’ এই ঘোষণা ঠেকিয়ে দেয়াকেই ভারত নিজের সাফল্য মনে করেছিল। ভারত নেপালের প্রধান এই তিনটি দলকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ লক্ষ্যণীয়, ভারতের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সেখানে ছিল না। সংক্ষেপে কয়েক বাক্যে এর কারণ চিহ্নিত করলে বলতে হবে- ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই নেহরুর হাতে যে ভারত হাজির হয়েছিল, তাতে পড়শিনীতি বা বিদেশনীতির মৌলিক কিছু জন্মত্রুটি ছিল। যেমন নেহরু যেন মনে করতেন, পড়শি বা বিদেশনীতি মানেই বিগত ব্রিটিশ কলোনির বিদেশনীতিই। কথাটা এভাবে বলার পিছনের কারণ হল, মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পঞ্চাশের দশক ছিল দুনিয়া ব্যাপী “উপনিবেশ মুক্তির” যুগ। [কিন্তু খুব সতর্কভাবে ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার  মানে বুঝতে হবে।  এসম্পর্কে বাড়তি বিস্তারিত কিছু কথা আলাদা করে নিচে সবশেষের কয়েক প্যারায় আনা হয়েছে।  আগ্রহীরা এসম্পর্কে বিস্তারিত সেখানে পড়তে পারেন।] নেহেরুর চোখে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ উপনিবেশকালীন রূপ – ‘প্রভু-দাস’ এই রূপেরই ধারাবাহিকতা। এরই ছাপ আমরা দেখি নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তিতে। সেই থেকে ভারতের পড়শি বা বিদেশ নীতি এই আলোকে সাজানো হয়ে আছে। মানে জবরদস্তি, চাপ খাটানো, অন্যের সার্বভৌমত্বকে সম্মানের কোনো বিষয় সেখানে রাখার দরকার কী এমন ভাবনায় পরিচালিত এক অবস্থা! অথচ উপনিবেশ-উত্তর সে যুগে উপনিবেশ মুক্তিই বা পড়শির সাবভৌমত্বকে সম্মান করার বিষয় তখন স্পষ্ট প্রধান বিষয় হয়েছিল। এসব পালনীয় শেষ করে বা সুরক্ষিত রেখেও ভারত পড়শি দেশসহ যেকোন দেশে বিদেশ নীতি পরিচালনা করা সম্ভব করতে পারত। ভারতের জনসংখ্যা বড় মানে অর্থনীতিও বড়। এছাড়া ভারত ভাগ হয়েছে বটে কিন্তু কলোনিয়াল শাসনকালের মাখনটা মূল ভারত ভুখন্ডেই থেকে গিয়েছে। পরবর্তিতে আজ পর্যন্ত একটা ভাল রকমের পুজিতান্ত্রিক বিকাশ এই ভারতে ঘটে গিয়েছে। এই অগ্রসর অবস্থার কারণে পড়শী যেকোন দেশের সাথে ভারতের পণ্য বাণিজ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেয়ার এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক হলেও সেখানে পড়ে পাওয়া ভাবে ঐ বিনিময়ের ভারসাম্য ভারতের পক্ষেই থাকবে। ফলে এক দেয়ানেয়ার ফেয়ারনেস-ন্যায্যতা বজায় রাখলেও সেই অর্জন ভারতের জন্য যথেষ্ট। অথচ প্রজাতান্ত্রিক ভারতের জন্মের পরে সত্তর বছর পেরিয়ে একুশ শতকে এসেও ভারতের বিদেশনীতির পুরনো তরিকাকেই আছে আর একেই তার নীতি ও সাফল্যের কাঠি মনে করে যাচ্ছে। ল্যান্ডলকড কোনো কিছু শর্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রেরও পড়শির সমুদ্রবন্দরের প্রবেশ ও ব্যবহারের অধিকার আছে- জাতিসঙ্ঘের এমন আইন কনভেনশন যখন প্রণীত হতে যাচ্ছে তখন এই আমলে ল্যান্ডলকড নেপালকে প্যাঁচে ফেলে তার সাথে কলোনি-দাসের মতো আচরণ করতে চাইলে পালটা ঝাপ্টা তো খেতেই হবে।
নেপালের জনগণ নিজ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে একে উচ্ছেদ করেছে। সে কাজে ভারতের সাহায্য পেয়েছে, কিন্তু সেটা ফিরে আবার ভারতের কলোনি হওয়ার জন্য নয় নিশ্চয়ই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভুল নীতিতে পরিচালনের কারণে নেপালের প্রধান তিনটি দলই এর পর থেকে ভারতের প্রভাবের একেবারে বাইরে চলে গেছে। ভুল বিদেশনীতিতে সব হারিয়ে উপায়হীন হয়ে ভারত এর পর থেকে মাধেশি ও জনজাতির জনগোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে নিজের শক্তি দেখাতে গিয়েছে। ফলে একদিকে সরকারসহ তিন নেপালি দল আর অন্যদিকে ভারত – এরকম পক্ষাপক্ষিতে পরস্পরের প্রতি শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা হলো গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ – ওই তিন দলের নেপালের সংবিধান রচনা সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে বসা। আর তা প্রতিরোধে ভারত নিজের সীমান্ত শুল্ক বিভাগ আর সাথে মাধেশি অঞ্চলের ছোট দলের মাধ্যমে ভারত থেকে ল্যান্ডলকড নেপাল অভিমুখে পণ্য চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। যদিও মুখে তা স্বীকার করে নাই। এখানে প্রথমত যে প্রশ্নটা ওঠে, নেপালের সংবিধান ঘোষণাতে এর বিরুদ্ধে ভারতের কী বলার আছে! ভারত ভিন রাষ্ট্র, তার কী বলার থাকে না থাকতের পারে? ভারত কী নেপালের মাধোশি বা জনজাতি জনগোষ্ঠিগুলোর প্রতিনিধি? নাকি ভারত ভিন রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিনিধি হবার কোন সুযোগ সেখানে আছে?  এভাবে আজিব প্রতিনিধি সাজার চেষ্টা এটাই তো ভারতের জন্য বিপদজনক। বাজে উদাহরণ নয় কী? ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও আমলারা নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকতে এন অবস্থার সৃষ্টি করেছে।  কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন গৃহিত হবার ঘোষণার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারে সে দেশেরই কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠী। পড়শির আপত্তি করার বিষয়ই নয় এটা। লিগ্যাল এই পয়েন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখান থেকেই পড়শির ওপর হস্তক্ষেপের জেনুউন অভিযোগ উঠে আসে। এটা সম্ভবত দুনিয়ায় প্রথম উদাহরণ এবং ভারতের দিক থেকেও খুবই বাজে উদাহরণ। কারণ এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়িয়ে সেই পড়শি রাষ্ট্রের  বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার পথ দেখিয়ে রাখল ভারত। অথচ বিষয়টা এত জটিল ছিল না। একটা স্থিতিশীল নেপালের জন্য অথবা অন্য কোনো যুক্তিতে ভারতের নিজ স্বার্থের দিক থেকে উদ্বেগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ভঙ্গী খুব গুরুত্বপুর্ণ। ভারতকে সেটা প্রকাশ করতে গেলে অবশ্যই ন্যুনতম পড়শির সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করেই তা হতে হবে এবং তা করা সম্ভবও। সে লক্ষ্যে ভারত পড়শি সরকার বা দল্গুলোকে লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু এটা যে প্রচেষ্টা করা হয়েছে তা খুবই নিকৃষ্ট। আসলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাতে সাহায্য সহযোগিতা করার সময় থেকেই ভারত নিজেরও স্বার্থগুলো স্পষ্ট করে এই প্রধান তিন দলের মধ্যে বুঝিয়ে রাজি করার উদ্যোগ নিতে পারত। যেটাকে আমরা পারশু (pursue) বা লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা বলি। কিন্তু ভুল বিদেশনীতি, ভুয়া আত্মগরিমা, নকল উপনিবেশী ভ্যানিটি ভারতকে সে পথে যেতে দেয়নি। এই ভুলের মূল্যায়ন ভারতের ভেতর থেকেই একদিন উঠে আসবে। কারণ তবেই ভারতের সামনে আগানোর বাধা সরাতে সক্ষম হবে।
এমনিতেই টানা সাড়ে চার মাস ধরে চলা নেপালের সাথে পণ্য চলাচলে অবরোধের ফলাফলও শেষ বিচারে ভারতের বিপক্ষে গেছে। উদ্দেশ্য ছিল নেপালি জনগণকে শাস্তি দেয়া। কিন্তু ভারতের শাস্তিও কম হয় নাই। এই সাড়ে চার মাস আসলে যেন উভয় পক্ষের কার কত দূর সহ্যক্ষমতা তারই পরীক্ষা চলেছে। পরিশেষে এতে নেপালের দিক থেকে দেখলে তার বিজয়ের দিকটি হল, নেপালের জনগণের কাছে এত দিন যেটা অকল্পনীয় মনে হয়েছিল যে ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া তাদের অন্যভাবে অন্য কোন দিক দিয়ে বাইরের দুনিয়ায় বের হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু ভয়াবহ ঐ নিরুপায় পরিস্থিতিই অপর পড়শি চীনের ভেতর দিয়ে বের হওয়ার বিকল্প উপায় অবরোধের এই দুর্যোগের সময়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অলি চীনের সাথে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলেছেন। নানান সুবিধাজনক স্পটে ৯টা রেল ও সড়কপথ হবে বের হবার পথ। আর এরই লক্ষ্যে সার্বিক পরিকল্পনা, ভায়াবিলিটি স্টাডি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ভারতের মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, একবার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে গেলে সেই নেপালকে আর কোনো কথাই শুনানো ভারতের পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং এত দিন ভারতের দাবড়ে মুখচাপা দিয়ে রাখা আচরণের বিরুদ্ধে সব অর্গল খুলে ওই নেপালি জনগণ যা করার তাই করবে। বলা বাহুল্য সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানগত। ওদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে নতুন রেল ও সড়কপথে ব্যয় শুরুতে কিছুটা বেশি হলেও এক দিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাম চুকানোর স্বার্থে আশা করা যায় নেপালের জনগণ তা বইতে রাজি হবে। আর এতে ক্রমেই আরো বাড়তি উৎপাদন ও চলাচল বেড়ে যাওয়ার মুখে আস্তে আস্তে ব্যয়ও কমে আসতে শুরু করবে। তবে এখান থেকে এমন মনে করা ভুল হবে যে চীন এটাকে পড়ে পাওয়া ফায়দা হিসেবে দেখবে কি না। এ প্রসঙ্গে চীন অনেক আগেই পরিষ্কার করে রেখেছে। এশিয়ার অর্থনৈতিক পড়শি শক্তি হিসেবে ট্র্যাডিশনালি বা নিজ যোগ্যতায় যেসব বাজার বা সম্পর্ক সুবিধা তার আছে এর শেয়ার ভারতকে দেয়া চীন নিজের বৃহত্তর স্বার্থের দিক থেকে করণীয় মনে করে। কারণ সে জানে ও মানে দুনিয়াতে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কায়েমের ক্ষেত্রে ভারত তার সঙ্গী। নতুন অর্ডার তৈরির ক্ষেত্রে চলতি নেতা আমেরিকা হবে অতীত নেতা আর ভারত হবে আগামী সহযোগী। ভারত সেসবের পক্ষে নিজের ভূমিকা বুঝে এগিয়ে আসার আগেই চীন ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে নিজ আমন্ত্রণের মনোভাব স্পষ্ট করে রাখতে চায়।
যেমন নেপালের আমদানি তেলের চাহিদার মাত্র ১৩ ভাগ চীন থেকে আসার চুক্তি হয়েছে। এখন বাকিটা নির্ভর করে ভারতের ওপর। ভারত যদি অবরোধ-সম্পর্কের পথেই থাকতে চায়, তবে এই ভাগের হার শতভাগ হওয়ার দিকে যাওয়া ছাড়া যে উপায় থাকবে না তা বলাই বাহুল্য।
ইতোমধ্যে ভারত আরেক হুমকি তৈরির চেষ্টা করেছে। ভারতের ভাষায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। বিগত মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি পরিচালনার সময়ের পুরনো মানবাধিকার ভঙ্গের মামলা, এ ছাড়া একালে সাড়ে চার মাসের অবরোধের সময় মাধেশি জনগোষ্ঠীর অনেকে আহত, নিহত হয়েছেন। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ বা ইউপিআরের মুখোমুখি হতে হয়। গত বছরের শেষে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নেপাল প্রসঙ্গের সভায় ভারত ওপরের উল্লেখ করার দুই ইস্যুতে আপত্তি দায়ের করে। যাতে সরকার ও মাওবাদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ এখানেও ভারত একইভাবে নিজের বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো দেশের অভিযোগের আঙুল উঠানোর রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। যেমন সেই অভিযোগ হতে পারে ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মির ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত। এটা ভারতও জানে। ফলে ভারতের এক মিডিয়া জানাচ্ছে ইউপিআর ইস্যু নিয়ে বেশি দূর যেতে ভারতের ইচ্ছা নেই।
কিন্তু তবু এই পদক্ষেপের কথা ভেবেই মাওবাদী দলনেতা প্রচন্দ অলির ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন গত ৫ মে, নতুন কিছু পালটা পদক্ষেপে নিতে চেয়েছিলেন। তার প্রস্তাব ছিল, এই তিন দলের সমন্বয়ে একটা সর্বসম্মতির সরকার হোক যাতে সম্মিলিত কৌশলে ভারতের যেকোনো সিদ্ধান্ত মোকাবেলা করতে পারে। আর যদি তা না করা যায়, সবাই রাজি না হয়, সে ক্ষেত্রে নেপাল কংগ্রেস দলের সমর্থনে সে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে সরকার গড়তে চায়। এমন সিদ্ধান্তের কারণ, অলি সরকারের ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। যার মূল কারণ সরকারের অদক্ষতা বা নন-পারফরম্যান্স। আর সবচেয়ে বড় হলো, এখন অবরোধ উঠে গেলেও জ্বালানি তেল, চিনি ইত্যাদি এজাতীয় জিনিসের দাম কমেনি। ব্যাপক চোরাচালানি মজুদদারি কারবার চলছে সরকার ও দলের প্রশ্রয়ে। ফলে কোনো পদক্ষেপ ছাড়া ওলির হাতে সরকার ছেড়ে রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না মাওবাদী নেতা প্রচন্দ। এতে গত ৬ মে নেপাল ঘটনাবহুল হওয়ার পেছনে ভারতের চাপ সামলানোর নতুন কৌশল ও পদক্ষেপ হিসেবে কী করা যায়, এর অংশ মনে করা যেতে পারে। আর এ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়ার ব্যাখ্যা হলো, অলি সরকার এসব ঘটনায় ভারতকে দায়ী করে নিজ জনগণের কাছে দেখাতেই নেপালের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর আচমকা বাতিল করায়। এতে নিজ সরকারের ব্যর্থতার অনেক কিছুই আড়াল করার কিছু সুযোগ পেতে পারেন, এটাও ভেবে থাকতে পারেন।

[ওদিকে ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার পর্ব খুবই খারাপভাবে শেষ হয়। রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের আদেশ মানতে অস্বীকার করেন। ফলে স্বভাবতই অলি সরকার তাঁকে বরখাস্ত করেন এবং ভারত সরকারকে নোটিফাই করেন। পরে এই ঘটনা আর এক মোড় নেয়। কূটনৈতিক পাড়ায় খবর উঠতে থাকে৪ যে এই ইস্যুতে নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদুত রণজিত রাওকে নেপালে “পারশন নন গ্রাটা” বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। কোন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে হোস্ট দেশ কোন ক্রিমিনাল চার্জ আনার সুযোগ নাই জেনেভা কনভেন অনুসারে। তিনি যে অপরাধই করেন না কেন। এর বদলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা হল ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা। যার বাস্তব ফলাফল ঐ দেশ থেকে বের করে দেয়া। এই প্রচার তুঙ্গে উঠার এক পর্যায়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতি দিতে এই জল্পনাকল্পনা নাকচ করেন।]

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা গতকাল ১৬ মে অনলাইনে (আজ প্রিন্টে ) দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আবার নানা সংযোজনে ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

ফুটনোটঃ
‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার অর্থ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা ইউরোপের ইতিহাস আমরা বৃটিশদের চোখ দিয়ে পড়েছি ও জানি।  ফলে ঐ যুদ্ধে “আর কখনও কলোনি করব না” আমেরিকাকে দেয়া বৃ্টিশদের এই দাসখতের কথা আমাদের জানা হয় নাই। এই যুদ্ধ সম্পর্কে এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস বৃটিশ বয়ান এডিয়া গিয়েছে। সোজা কথায় বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার কৃতীত্ব হল সে সারা ইউরোপের কলোনি প্রভুদের কাছ থেকে কলোনি আর না করার দাসঅখত লিখায় নিয়েছে। আর সারা দুনিয়াকে এক ‘উপনিবেশ মুক্ত দুনিয়া’ উপহার দেবার রাস্তা খুলে দিয়েছে।  অনেকের কাছে এটা অবাক লাগতে পারে। তারা “আটলান্টা চার্টার” পড়ে দেখতে পারেন, যেটা আসলে কলোনি প্রভুদের আমেরিকাকে দেয়া দাসখত। আর আমাদের সৌভাগ্য যে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীট বুঝেছিল দুনিয়া থেকে উপনিবেশ তুলে দেয়াই তার স্বার্থ, ক্যাপিটালিজম আরও গ্লোবাল ও  বিকাশিত হয়ে উঠার পুর্বশর্ত। ফলে হিটলারের হাত থেকে আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত কলোনি প্রভু-শিরোমনি বৃটিশসহ ইউরোপকে  বাচাতে আমেরিকা এগিয়ের আসার পুর্বশর্ত হিসাবে এই দাসখত স্বাক্ষর করিয়ে নেবার সুযোগ নিয়েছিল।
কিন্তু আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য সেসব কথার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুই যে জওহরলাল নেহেরুও দুনিয়া থেকে উপনিবেশ উঠে যাবার উপরে উল্লেখিত দিকটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ছিলেন না। তাঁর বিচারে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ কেবল একটাই, মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু ও দাস এর বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না।  নেপালের সাথে পুরানা বৃটিশ-নেপাল ১৯২৬ সালের চুক্তির আদলে করা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তি করা এই সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। নেহেরু ধরতেই পারেন নাই আটলান্টা চার্টার চুক্তি কেমন আগামি দুনিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।  ফলে এখন থেকে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ আর কেবল কলোনি মাস্টারের প্রভু-দাস রূপ ছাড়াও অন্যরূপে বিকশিত হবার শর্ত তৈরি হয়েছে।  এবসলিউট অর্থে নয় তবে এটা তুলনামূলক অর্থে আগের সরাসরি উপনিবেশ রূপের চেয়ে লিবারেল রূপ সম্পর্ক আকারে হাজির হবে।